📄 এক: ওয়াট-এর মৌল চিন্তা: এ. পৌলেন-এর তত্ত্ব
এই সকল প্রাথমিক আলোচনার পর ওয়াট এ. পৌলেন তাহার 'Graces of Interior Prayer' পুস্তকে "বাচনভঙ্গি” এবং “দর্শন” (vision) সম্পর্কিত যাহা বর্ণনা করিয়াছেন তাহার সূচনা করেন। ঐ লেখকের মতে, ওয়াট বলেন, "বাচনভঙ্গি” এবং “দর্শন"-এর প্রতিটির হয় "বাহ্যিক” অর্থ হইবে নতুবা "অভ্যন্তরীণ” অর্থ হইবে। "বাহ্যিক বাচনভঙ্গি” এমন হইবে যাহার মধ্যে "শব্দসমূহ কানের দ্বারা শ্রুত হয়, যদিও তাহা স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয় না"। অনুরূপভাবে "বাহ্যিক দর্শনসমূহ হইল" বস্তুগত দর্শনসমূহ অথবা যাহা অনুরূপ মনে হয়; যাহা বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায়। "অভ্যন্তরীণ বাচনভঙ্গি” এবং "অভ্যন্তরীণ দর্শন"-এর প্রতিটিই হয় কল্পনাগত হইবে অথবা বুদ্ধিগত হইবে। "কল্পনাপ্রসূত বাচনভঙ্গি" সাধারণত সরাসরি কানের সহায়তা ছাড়া কল্পনার ধারণার মাধ্যমে পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি শব্দ ছাড়া চিন্তার যোগাযোগের এক সাধারণ বিষয় এবং ফলত কোন নির্দিষ্ট ভাষা ছাড়াই তাহা ব্যক্ত হয়”। ৩ এই "উপকরণ”-সহ ওয়াট "কুরআন ও হাদীছের বর্ণনার" দিকে ফিরিয়া যান।
ওয়াট এই উপকরণ বা তথ্যাদি কিরূপে ব্যবহার করেন তাহা দেখার পূর্বে ওয়াট-এর উপস্থাপনা বা বক্তব্য প্রকাশে সহজাত আত্মবিরোধ ও অসঙ্গতির প্রতি ইঙ্গিত করা সময়োপযোগী হইবে। তিনি অঙ্গীকার করেন যে, তিনি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নাবলী সম্পর্কে নিরপেক্ষ থাকিবেন এবং যে কোন ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করা হইতে বিরত থাকিবেন। কিন্তু এইরূপ বলার পরপরই তিনি তাহার মত পরিবর্তন করিয়া "Mystical theology" নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং এই গ্রন্থে বর্ণিত তাহার তত্ত্বকে সত্য ও সঠিক বলিয়া ঘোষণা করেন। এই গ্রন্থে তিনি অপরিহার্যরূপে “খৃস্টান পাদ্রী-পুরহিতদের অভিজ্ঞতাসমূহ ও "অভ্যন্তরীণ" প্রার্থনা সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং এই আলোচনার সূত্র ধরিয়া তিনি কুরআনের ওহী অথবা "মুহাম্মাদ -এর পয়গাম্বরসুলভ সচেতনতার স্বরূপ সম্পর্কে তিনি (ওয়াট) যাহা বলেন সেইসব বিষয় আলোচনা করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি "ইসলামের কোন মৌলিক বিশ্বাসের" বিরোধিতা করিবেন না। যাহা হউক, বাস্তবে তিনি এই ঘোষণার পরপরই ঠিক বিপরীত পথে অগ্রসর হন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ইহা দেখাইতে চাহেন যে, কুরআনের ওহী A. Poulain -এর সজ্ঞা অনুযায়ী "ওহী হইল বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”, নিম্নোক্ত বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ন: ইহা অর্থাৎ কুরআনিক ওহী "শব্দ ছাড়া কেবল চিন্তাগত যোগাযোগ মাত্র" ইত্যাদি। ইহা অস্বীকৃতি ছাড়া আর কিছুই নহে, ইহা অপমানজনক না হইলেও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের অস্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস এই যে, কুরআনের ওহী "কেবল শব্দ ছাড়া চিন্তাগত যোগাযোগের মাধ্যমে" নহে এবং ইহা এমনও নহে যে, ইহা মুহাম্মাদ-এর স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক অবস্থায় সচেতনতার একটি পদ্ধতি। প্রকৃত বিষয় এই যে, ওয়াট এইখানে A. Poulain-এর তত্ত্ব উদ্ধৃত করিয়া কেবল খৃস্টান মিশনারী এবং প্রাচ্যবিদগণের চিন্তাধারা প্রমাণ করিতে চাহেন। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলিতে গেলে, তিনি রিচার্ড বেল-এর চিন্তাধারা প্রমাণ করিতে চাহেন, তবে বুদ্ধিজীবীসুলভ পোশাক পরাইয়াছেন মাত্র। ইহা বোধগম্য যে, একজন নিষ্ঠাবান খৃস্টান হইয়াও ওয়াট নীতিবোধ ও নৈতিক চেতনার ভিত্তিতে মুসলিম চিন্তা-চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা রাখিয়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আলোচনা করেন নাই। কিন্তু তিনি প্রকৃতপক্ষে কী করিতে চাহেন সেই সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ও সতর্ক হওয়ার পরও ইহা তাহার জন্য ভাল হইত, যদি তিনি নিরপেক্ষ থাকার ওয়াদা না করিতেন এবং ইসলামের মৌলিক কোন বিশ্বাসকে অস্বীকার না করার প্রতিশ্রুত না দিতেন।
টিকাঃ
২. লণ্ডন, ১৯২৮ খৃ.।
৩. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৫৪, উদ্ধৃতি A. Poulain, op. cit., পৃ. ২৯৯ প।
এই সকল প্রাথমিক আলোচনার পর ওয়াট এ. পৌলেন তাহার 'Graces of Interior Prayer' পুস্তকে "বাচনভঙ্গি” এবং “দর্শন” (vision) সম্পর্কিত যাহা বর্ণনা করিয়াছেন তাহার সূচনা করেন। ঐ লেখকের মতে, ওয়াট বলেন, "বাচনভঙ্গি” এবং “দর্শন"-এর প্রতিটির হয় "বাহ্যিক” অর্থ হইবে নতুবা "অভ্যন্তরীণ” অর্থ হইবে। "বাহ্যিক বাচনভঙ্গি” এমন হইবে যাহার মধ্যে "শব্দসমূহ কানের দ্বারা শ্রুত হয়, যদিও তাহা স্বাভাবিকভাবে উৎপন্ন হয় না"। অনুরূপভাবে "বাহ্যিক দর্শনসমূহ হইল" বস্তুগত দর্শনসমূহ অথবা যাহা অনুরূপ মনে হয়; যাহা বাহ্যিক চক্ষু দ্বারা প্রত্যক্ষ করা যায়। "অভ্যন্তরীণ বাচনভঙ্গি” এবং "অভ্যন্তরীণ দর্শন"-এর প্রতিটিই হয় কল্পনাগত হইবে অথবা বুদ্ধিগত হইবে। "কল্পনাপ্রসূত বাচনভঙ্গি" সাধারণত সরাসরি কানের সহায়তা ছাড়া কল্পনার ধারণার মাধ্যমে পাওয়া যায়। পক্ষান্তরে "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি শব্দ ছাড়া চিন্তার যোগাযোগের এক সাধারণ বিষয় এবং ফলত কোন নির্দিষ্ট ভাষা ছাড়াই তাহা ব্যক্ত হয়”। ৩ এই "উপকরণ”-সহ ওয়াট "কুরআন ও হাদীছের বর্ণনার" দিকে ফিরিয়া যান।
📄 দুই: ওয়াট-এর বিবেচ্য তত্ত্বের প্রয়োগ
A. Poulain-এর সংজ্ঞা উল্লেখ করার পর ওয়াট আস-সুয়ূতীর আল-ইতকান গ্রন্থে উল্লিখিত এবং অন্যান্য উৎস হইতে ওহী অবতরণের "অবস্থা" বা "ধরন" সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপস্থাপন করেন এবং বলেন, ওহী অবতরণের মূল পদ্ধতি কুরআনের ৪২: ৫০-৫২ আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে। তিনি এই আয়াত নিম্নোক্তভাবে অনুবাদ করেন:
It belongeth not to any human being that God should speak to him except by suggestion (wahyan) or from behind a veil, or by sending a massenger to suggest (fayuhiya) by His permission what He pleaseth... Thus We have suggested to thee a spirit belonging to Our affair (awhayna)".
"কোন মানুষের পক্ষেই ইহা সম্ভব নহে যে, আল্লাহ তাহার সঙ্গে কথা বলিবেন, কেবল তাহাকে কোন ধারণা দেওয়া ছাড়া (Wahyan; وَحْيًا) অথবা পর্দার অন্তরাল ছাড়া অথবা এমন একজন দূত প্রেরণের দ্বারা, তিনি যাহা চাহেন, তাহার অনুমতিক্রমে ধারণা দান (ফাইউহিয়া : فَيُوْحَى) করিবে...। এইভাবে আমি তোমাকে ধারণা দান করিয়াছি রূহ তথা আমার বিষয় সম্পর্কে (আওহায়না : أَوْحَيْنَا)৷"4
ওয়াট তাহার ধারাবাহিক বর্ণনায় আরও বলেন, "সুতরাং ওহী অবতরণের প্রথম পদ্ধতি" "যে ক্ষেত্রে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে কথা বলেন"। তারপর তিনি তিনটি বিষয় বর্ণনা করেন:
(এক) তিনি এই ক্ষেত্রে রিচার্ড বেলকে উদ্ধৃত করেন যিনি কুরআনে বর্ণিত ওহী পরিভাষাটির বিভিন্নমুখী ব্যবহারের বিষয়ে অধ্যয়নের পর বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এই "ওহী" পরিভাষাটি মূল পাঠ-এর মৌখিক যোগাযোগ-এর অর্থ বুঝাইত না, বরং "পরামর্শ", "বিস্মৃত শব্দ জোগাইয়া দেওয়া" অথবা "উদ্বুদ্ধ করা" ইত্যাদি অর্থে যাহা ব্যক্তির মনে উদিত হয়।
(দুই) ওয়াট বলেন, [রাসূল -এর "মক্কী জীবনের অধিকাংশ সময়ে" ওহী ছিল "উদ্দীপনার কাজ”। তাহার এই বর্ণনার সমর্থনে তিনি ২৬ : ১৯২-১৯৪ আয়াত উদ্ধৃত করেন যাহা তিনি নিম্নোক্তরূপে অনুবাদ করেন:
"Verily it is the revelation (tanzil) of the Lord of the Worlds, With which hath come down (nazala bihi) the Faithful Spirit Upon they heart, that thou mayest be of those who warn".
“এই ওহী অবশ্যই বিশ্বের প্রভুর (আল্লাহ্) নিকট হইতে, যাহা (পবিত্র) বিশ্বাসী আত্মার (নزل به) সঙ্গে নাযিল হয় আপনার অন্তরে, যাহাতে আপনি সতর্ককারীদের মধ্য হইতে একজন হইতে পারেন"।
ওয়াট এইখানে যোগ করেন, এইখানে সংবাদ বহনকারী ফেরেশতার উল্লেখ "সম্ভবত পরবর্তী সময়ের"।
(তিন) তিনি বলেন যে, তিনি যতদূর বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর নিকট যাহা লইয়া আসা হয় তাহা রাসূলুল্লাহ "মক্কায় জীবনযাপন কালে" তিনি শ্রবণ করেন, এই সম্পর্কিত কোন উল্লেখ নাই। এই ক্ষেত্রে ওয়াট বলেন, "উদ্দীপনা" মুহাম্মাদ -এর অন্তরে অথবা মনে বক্তব্য ছাড়া অন্যান্য কতিপয় পদ্ধতিতে সংবাদ" প্রদান করে এবং এইভাবে ইহা "এক অভ্যন্তরীণ বাচনভঙ্গি এবং সম্ভবত এক বুদ্ধিগত বিষয়ে পরিণত হয়"।5
এক্ষণে ৪২ : ৫১-৫২ আয়াত কার্যত ওহীর প্রকৃত ধরন সম্পর্কে বর্ণনা করে, যে ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ নিজের বক্তব্য মানুষের নিকট পৌছাইয়া দেন। এই আয়াতসমূহের যে অনুবাদ ওয়াট করিয়াছেন তাহা যুগপৎভাবে অশুদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর। 'ওহী' ও 'আওহা' শব্দদ্বয়ের অনুবাদ “পরামর্শ” এবং “পরামর্শকৃত” ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে করা সম্পূর্ণ ভুল যেমন আমরা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। ৬
ওয়াট এইখানে বেল-এর রেফারেন্স দিয়াছেন এবং ওহী পরিভাষাটির অর্থ সম্পর্কে তাহার চূড়ান্ত মতামত উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা ইতোপূর্বে তাহার নিবন্ধের বিশদ আলোচনা করিয়াছি এবং তাহার ধারণা-র “ধারণা” ইত্যাদির কথা উল্লেখ করিয়াছি। এই পরিভাষার এই ধরনের অর্থ করা মারাত্মক ভুল এবং কুরআনিক ওহীর ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে অপ্রযোজ্য। এই বক্তব্য অর্থাৎ “ধারণা” সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে না যেখানে ওহী পরিভাষাটি অথবা ইহার প্রকৃতি প্রত্যয়ান্ত শব্দ দৃষ্ট হয়, তাহা হইলে ইহা এই আয়াত হইতে একটি দৃষ্টান্ত হইবে যে, আয়াত ওয়াট এইখানে অনুবাদ করিয়াছেন। এইভাবে তর্কের খাতিরে আমরা যদি আয়াতে প্রথম অংশের 'ওয়াহ্য়ান' (وَحْيًا ) শব্দটির জন্য "Suggestion" প্রতিশব্দটি লই তাহা হইলেও অনুরূপ শব্দ দ্বারা (অর্থাৎ "Suggestion") আয়াতের একই অংশে উক্ত শব্দ 'ফাইউহিয়া' (فيوحى)-এর অনুবাদ করিলে যথাযথ হইবে না (অর্থাৎ "একজন রাসূল প্রেরণ করিয়া ধারণা বা পরামর্শ দেওয়া (?) তাহার অনুমতিক্রমে...)"। এই পরবর্তী ক্ষেত্রে রাসূল কি করিবেন। কারণ তিনি একজন দূতমাত্র, ডেলিগেট বা প্রতিনিধি নহেন? বাস্তবে ঐ রকম নহে যে, তিনি "ধারণা বা পরামর্শ” দান করেন, বরং একমাত্র আল্লাহ্ ওহী পৌঁছাইয়াছেন অথবা প্রকাশ করেন। অনুরূপভাবে ইউহিয়া يُوحى শব্দটির এই ক্ষেত্রে অর্থ হইবে "জ্ঞাপন করা” অথবা “প্রকাশ করা”, "ধারণা করা” নহে, যেমন ওয়াট অনুবাদ করেন। তিনি ৫২ নম্বর আয়াতের অনুবাদেও দ্বিধান্বিত, যেমন "অনুরূপভাবে আমরা আপনাকে আমাদের বিষয় সম্পর্কে আত্মিক ধারণা দান করিয়াছি"। "আমাদের বিষয়ে আত্মার যুক্ত হওয়া" কিভাবে "ধারণা"-এর অর্থ দিতে পারে তাহা সহজে বোধগম্য নহে। এই বক্তব্যের অর্থ পরিষ্কার নহে। 'মিন আমরিনা' (مِنْ أَمْرِنَا) বক্তব্যটির এইখানে অর্থ হইল "আমাদের নির্দেশবলে”। কিন্তু তাহা সত্ত্বেও আমরা যদি এই বক্তব্যের ওয়াট কর্তৃক কৃত অনুবাদ গ্রহণ করি তবে এইখানে 'রূহ' শব্দটি আওহায়না (أَوْحَيْنَا) ক্রিয়ার কর্ম (object) হিসাবে স্বীকৃত। সুতরাং 'রূহ' এমন কিছু যাহা ইতোমধ্যে ওহীকৃত (Wahy-ied) হইয়াছে। অন্য কথায় বলা যায়, এইখানে 'রূহ' শব্দটির অর্থ ওহী, যাহা কর্ম (object), ক্রিয়া নহে। কর্ম (object)-এর ধরন বা প্রকৃতি আয়াতের উপসংহারমূলক অংশে পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে যাহার বর্ণনা এইরূপঃ "তুমি তো জানিতে না কিতাব কী এবং জানিতে না ঈমান কী! পক্ষান্তরে আমি ইহাকে করিয়াছি আলো, যাহা দ্বারা আমি আমার বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি..."। ৭. এই বিশ্লেষণমূলক বর্ণনা ইহা পরিষ্কার করিয়া দিয়াছে যে, পূর্বে উল্লিখিত 'রূহ' হইল গ্রন্থ অর্থাৎ মূল পাঠযোগ্য গ্রন্থ (কুরআন) যাহা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহীকৃত (Wahy-ied)।
ওয়াট-এর দ্বিতীয় যুক্তি-তর্কের বিষয়ে বলেন যে, "রাসূলুল্লাহ -এর মক্কী জীবনের অধিকাংশ সময় ওহী ছিল "আত্মার কার্যাবলী” এবং ঐ ফেরেশতাদেরকে দূত হিসাবে উল্লেখ করা হয় "সম্ভবত" পরবর্তী সময়ে। তিনি দুইটি বিষয়ে ভুল করেন। এই সম্পর্কে তাহার উদ্ধৃত আয়াত ২৬ঃ ১৯২-১৯৪-এর দ্বারা দেখা যায় যে, তিনি এই আয়াতের মূল বক্তব্য সার্বিকভাবে অনুধাবনে ভুল করেন এবং "Faithful Spirit"-এর অর্থ নির্ণয়েও (আর-রূহুল আমীন) ভুল করেন। ওয়াট এইখানে ওহীর প্রথম পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন অর্থাৎ “যেখানে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে কথা বলেন" এবং অন্য কোন পদ্ধতি সম্পর্কে নহে। উদাহরণস্বরূপ "পর্দার অন্তরাল হইতে" তাহার কথা বলা অথবা "দূত প্রেরণের" মাধ্যমে কথা বলা। যাহা হউক, আয়াতে বর্ণিত বিষয় শেষে উল্লিখিত পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং প্রথমে উল্লিখিত পদ্ধতির সঙ্গে কোনক্রমেই সম্পর্কিত নহে। ইহা এই বুঝায় যে, ওয়াট এইখানে "The faithful spirit" অংশের অর্থ বুঝাইতে আল্লাহকে বুঝাইয়াছেন। ইহার পর তিনি এই আয়াত উদ্ধৃত করেন ওহীর প্রথম পদ্ধতির উদাহরণ ও বিশ্লেষণ হিসাবে এবং faithful ও spirit শব্দদ্বয়ের প্রথম অক্ষর capital letter-এ লিখেন। এরূপ করার পর তিনি খৃস্টবাদের এক উদ্ভূত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় আমদানী করেন। তিনি রেফারেন্সে উক্ত প্রথম আয়াতের প্রয়োগ সম্পর্কে বুঝিতে মনোযোগ দিতে পারেন নাই অথবা ব্যর্থ হন। এই আয়াত কুরআনকে 'তানযীল' হিসাবে আখ্যায়িত করে অর্থাৎ কোন কিছু "অবতরণ করান” এবং প্রেরক হইলেন "বিশ্বপ্রভু”। পরবর্তী আয়াত কর্তৃত্ব বা প্রতিনিধিত্বের কথা উল্লেখ করে যাহা অবতরণ করে "যাহার সঙ্গে (নাযালা বিহি - نزل به( "বিশ্বাসী (পবিত্র( আত্মা অবতরণ করেন"। এইভাবে বিশ্বাসী আত্মা হইলেন দূত, যিনি ইহা লইয়া আসেন। আনুষঙ্গিকভাবে ইহা লক্ষণীয় যে, ওয়াট 'তানযীল' শব্দটি অনুবাদ করেন যাহা এইখানে সুস্পষ্টরূপে কুরআনিক ওহীকে বুঝায় "প্রত্যাদেশ” হিসাবে। সম্ভবত এই কারণেই এইখানে যে কোনভাবেই তিনি "Suggestion" শব্দটিকে ধারণা অর্থে প্রয়োগ করিতে পারেন না। তাহা সত্ত্বেও তাহার শর্ত এই যে, গাঠকের উচিত "তেমন সরবরাহ করা অথবা অনুরূপ যে কোন বাগবৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করা, বর্তমান উদাহরণে যাহা অপ্রযোজ্য।
faithful spirit বক্তব্যটি সম্পর্কে বলা যায়, ইহা ইতোপূর্বেই দেখানো হইয়াছে যে, ইহা ঐ আয়াতের অনুরূপ। যেমন 'রাসূল কারীম' শব্দদ্বয় ৬৯ : ৪০ এবং ৮১ : ১৯ আয়াতসমূহে উদ্ধৃত করা হইয়াছে। পরবর্তী স্থানে (৮১ : ২১) তিনি 'আমীন' হিসাবে বর্ণিত হইয়াছেন এবং তিনি অবশ্যই একজন ফেরেশতা। ইহাও ওয়াট-এর দাবিকে অস্বীকার করে যে, "পরবর্তী সময়ে" ফেরেশতাকে দূত হিসাবে বলা হইয়াছে। ইহার পর এই বিষয়টি পরিষ্কার করিয়া বলা দরকার যে, কুরআনের কোথায়ও 'আল-আমীন' শব্দটি আল্লাহ্ গুণ অথবা নাম হিসাবে উল্লিখিত হয় নাই, ইহা বিশেষণও নহে। faithful শব্দটি spirit শব্দের মধ্যে প্রয়োগ হয় নাই যাহাকে খৃস্টানগণ "ত্রিত্ববাদ"-এর দৃষ্টিকোণ হইতে মূল্যায়ন করে। 'রূহ' পরিভাষাটি কুরআনে অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, spirit of life, ফেরেশতা, যেমন ৪২:৫০-৫২ আয়াতে দৃষ্ট হয়, ওহীর শাবণায়।
ওয়াট-এর তৃতীয় যুক্তি এই যে, "রাসূলুল্লাহ-এর মক্কী জীবনে যাহা তাঁহার নিকট অবতারিত হইয়াছিল তাহা 'শ্রবণ করার' কোন উল্লেখ নাই"। অবশ্যই কুরআনের মক্কী সূরাসমূহে এবং মাদানী সূরাসমূহে এমন কোন উল্লেখ নাই যে, রাসূলুল্লাহওহী বা প্রত্যাদেশ "শুনিয়াছিলেন"। ইহা এই কারণে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহকর্তৃক রচিত ছিল না। কিন্তু কেহ যদি বিন্দুমাত্রও সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করে তাহা হইলে বুঝিতে পারিবে যে, কুরআনের রচয়িতা হইলেন আল্লাহ নিজে। আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে কুরআন নাযিল হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এই কথা শিখাইয়া দেন যে, কিভাবে ওহী গ্রহণ করিতে হইবে এবং বারবার বলিয়া দেন, "যে আয়াত তাহার নিকট পাঠ করা হয় তাহা যেন তিনি তাড়াহুড়া করিয়া আবৃত্তি করা ও পনুরাবৃত্তি করার পূর্বে সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করেন"। "তাড়াহুড়া করিয়া ওহী আয়ত্ত করিবার জন্য তুমি তোমার জিহ্বা উহার সঙ্গে সঞ্চালন করিও না। ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি উহা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর" (৭৫: ১৬-১৮)।৯
অনুরূপ নির্দেশ ২০: ১১৪ আয়াতে পুনর্বার দেওয়া হয়ঃ "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না"। ১০ পুনরায় অনুরূপ উদাহরণ হইল ৮৭: ৬ আয়াতঃ "নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না"। ১১ এইগুলি হইল মক্কী জীবনের প্রাথমিক সময়ের সূরা এবং এইগুলি রাসূলুল্লাহ-এর নির্ভুল প্রেরণা ও পরামর্শসম্বলিত এবং কুরআনের প্রথম শ্রবণযোগ্য আবৃত্তিকৃত আয়াত এবং তখন তিনি ইহা আবৃত্তি করেন। প্রকৃতপক্ষে কুরআন, যেমন রিচার্ড বেল্ এবং ওয়াট ইহা স্বীকার করেন যে, ইহার (কুরআনের) অর্থ পড়া/আবৃত্তি করা। ইহা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কোন কিছুই পড়া অথবা আবৃত্তি করা মনমত হয় না, এমনকি তাহা যদি "স্মৃতি হইতেও হয়, কিন্তু তাহা যদি সুনির্দিষ্ট রচনা হইতে হয় তবে সেইটি হৃদয়গ্রাহী হয় এবং আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে কুরআনে বলেন যে, তিনি এই কুরআন "আরবী ভাষায় আবৃত্তি"যোগ্য করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন। "নিশ্চয় আমি কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করিয়াছি"।১২
ওয়াট মনে হয় এই বক্তব্যটি উল্লেখ করেন, 'আলা কালবিকা' (আপনার অন্তরে) ২৬: ১৯২-১৯৩ আয়াতে এই কথা বুঝাইতে যে, ওহী ছিল কতক "পরামর্শ” বা ধারণা। প্রশ্নের উল্লিখিত বক্তব্য-এর অর্থ "ধারণা” ছাড়া আর কিছুতেই প্রযোজ্য নহে। এইজন্য অতি তাড়াতাড়ি তিনি যোগ করেন যে, যাহা অবতীর্ণ হয় তাহা এই بلسان عربی مبین সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়, ২৬ঃ ১৯৪), এইভাবে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহার ধরন বর্ণনা করিয়া সন্দেহের অপনোদন করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে 'আলা কালبিকা' বক্তব্যটি জোর দেওয়ার অভিপ্রায়ে উল্লেখ করা হইয়াছে, এইরূপে মূল পাঠ অবতীর্ণ হইয়াছে এবং রাসূলুল্লাহ-এর অন্তরকে আকস্মিক আবেগে অবশ করিয়া ফেলে অর্থাৎ আল্লাহ্র ইচ্ছায় মনে এবং মস্তিষ্কে প্রোথিত হয়, ফলে তিনি ইহা ভুলেন নাই। ইহার অনুরূপ ধারণা ৭৫: ১৭ আয়াতে ব্যক্ত হইয়াছে ("ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই") এবং ৮৭ঃ ৬ আয়াতে বলা হইয়াছে ("নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্তৃত হইবে না")। প্রকৃতপক্ষে "আন্তরিকভাবে পাওয়া" এই বক্তব্যটি ইংরেজী ভাষার প্রকাশভঙ্গি বা বাগবৈশিষ্ট্য-এর সঙ্গে পরিচিত, যেমন স্মৃতিতে কিছু অর্পণ করা। এইসব কিছু আমাদের মাতৃভাষার অথবা বৈদেশিক ভাষার জ্ঞান, কোন সুনির্দিষ্ট পাঠ অথবা শব্দগুচ্ছ সম্পর্কে কিছু বলা নহে, ইহার ব্যাপারে পরবর্তী তাত্ত্বিক আলোচনা করা যাহা প্রত্যেকের হৃদয়ে অনুরূপভাবে প্রাপ্ত হয় এবং নিজ নিজ ভাষা অথবা ভাষাসমূহের শব্দভাণ্ডারের প্রত্যেকটি শব্দ, যেমন আমাদেরকে অনুভূতিহীন করিয়া তোলে যখন আমরা উহাদেরকে দেখি অথবা ব্যবহার করি। আমরা কেবল ইহাদেরকে আমাদের স্মৃতি হইতে পুনঃ উৎপাদন করি (অর্থাৎ অন্তর হইতে)। 'আলা কালবিকা' বক্তব্যটি যাহা তথ্য হিসাবে আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে তাহা রাসূলুল্লাহ -এর অন্তরে আকস্মিক আবেগতাড়িত ধারণা সৃষ্টি করে এবং ইহা "পরামর্শ" -এর ধারণায় অথবা তাহার সঙ্গে ধারণাগত যোগাযোগের অর্থে নহে।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ওহীর প্রথম ধরন সম্পর্কে ওয়াট আল-হারিছ ইবন হিশামের হাদীছ উদ্ধৃত করেন। ১৩ এই হাদীছে রাসূলুল্লাহ বলেন যে, কোন কোন সময় ওহী তাঁহার নিকট ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় )صَلْصَلَةُ الْجَرَس( আসিত। ওয়াট বলেন, ইহা "সম্পূর্ণ সুসঙ্গত” প্রথম ধরন-এর সঙ্গে এবং ইহা ছিল "নিঃসন্দেহে একটি ধারণাগত অভিজ্ঞতা", একটি "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”। তিনি বলেন, "ঘণ্টাধ্বনির শ্রবণ নিঃসন্দেহে একটি ধারণাগত অভিজ্ঞতা, কিন্তু কেহ এই ঘণ্টাধ্বনি শুনিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করে নাই অথবা কথিত শব্দসমূহ শুনে নাই, এমনকি ধারণাগতভাবেও নহে। পক্ষান্তরে অভিজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ কেবল ওহীকৃত শব্দসমূহ যাহা তাঁহার অন্তরে উদিত হয় তাহা উদঘাটন করেন। ইহা চমৎকারভাবে সুষ্পষ্ট যে, ....ইহা একটি বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গিপূর্ণ বর্ণনা”। ১৪
ইহা তাৎক্ষণিকভাবে খোলাখুলি বলা দরকার যে, ওয়াট যে ওহীকে প্রথম ধরন বলেন, ওহীর এই ধরন বা পদ্ধতিকে সম্পর্কিত বক্তব্যে তিনি সঠিক নহেন। অর্থাৎ ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়াই ওহী আসে। উদাহরণস্বরূপ বুখারীর অনুরূপ বর্ণনার অন্য একটি ভাষ্যে ইহা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, এইটিও ওহী নাযিলের একটি পদ্ধতি ছিল যাহা ফেরেশতার দ্বারা নাযিল করা হইত। ১৫ ওয়াট এই বিষয়টিরও ভুল বর্ণনা করেন যখন তিনি বলেন, "ঘণ্টাধ্বনি শ্রবণ হইল নিঃসন্দেহে একটি কাল্পনিক অভিজ্ঞতা..."। ইহা ঘণ্টাধ্বনি শ্রবণের বিষয় ছিল না, ইহা ছিল ওহী যাহা রাসূলুল্লাহ ঘণ্টাধ্বনির মত শুনিতে পান। মিছলা )مثل( শব্দটি সালসালাহ্ শব্দের সঙ্গে একত্রে ব্যবহৃত হইয়া ইহাকে সম্পূর্ণ স্পষ্ট করিয়া দেয়। না ছিল ইহা একটি "কাল্পনিক অভিজ্ঞতা", যেমন ওয়াট ইহাকে সংজ্ঞায়িত করেন। উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেন, ইহা ছিল "আমার উপর কঠিনতম" এতদসঙ্গে তিনি বলেন যে, ইহা ছিল তাঁহার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন এক শারীরিক অভিজ্ঞতা। এই অনুরূপ বিষয়টিতে হযরত 'আয়েশা (রা) আরও জোর দেন যখন তিনি বলেন যে, তিনি তাঁহাকে দেখিয়াছিলেন তাঁহার নিকট ওহী আসার সময়ে "একটি অত্যন্ত ঠাণ্ডা দিনেও তাঁহার কপাল দিয়া ঘাম ঝরিয়াছে"। ইহা আশ্চর্য ব্যাপার যে, ওয়াট এই বর্ণনা আক্ষরিকভাবে উদ্ধৃত করার পর (উদ্ধৃত শব্দগুলি তাহার নিজের) পরামর্শ দেন যে, ইহা ছিল "একটি কাল্পনিক অভিজ্ঞতা"।
ওয়াটের দ্বিতীয় গুরুতর ভুলটি তাহার বর্ণনায় বিধৃত "... কাহারও শ্রবণ করার কথা উল্লেখ নাই, যে কাহারও বলা অথবা কথিত শব্দাবলী শ্রবণের উল্লেখ নাই, এমনকি কাল্পনিকভাবেও নহে”। এক্ষণে এইখানে হাদীছের সংশ্লিষ্ট একটি অংশ এইঃ "ওয়াকাদ ওয়াআয়তু 'আনহু মা কালা” )وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْهُ مَا قَالَ( যাহার অর্থ এইঃ "এবং তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা আমি স্মৃতিতে ধারণ করিলাম"।... কোন ঘটনা ঘটার কথা তাঁহার নিকট এইভাবে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনার মাধ্যমে বলা হয়। ওয়াট এই রিপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাকে অগ্রাহ্য করেন এবং জোর দিয়া বলেন যে, এই ঘটনায় "কেহ কথা বলিতেছে" ইহার "কোন উল্লেখ নাই"। তিনি মনে হয় এমন চিন্তা করেন যে, 'ওয়া'আয়তু' ক্রিয়াটি কোন ধারণার অর্থ বহন করে না এবং ইহা কাহারও নিজে নিজে কিছু বুঝিতে পারার অর্থ প্রকাশ করে। ইহা সম্পূর্ণ ভুল। وَعَى يَعىَ ক্রিয়ার প্রাথমিক অর্থ 'মনে করা, অভ্যন্তরে ধারণ করা, স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা, মনে রাখা, স্মরণ করা, সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করা এবং মনে রাখা' ইত্যাদি। ১৬ আরও বিশেষভাবে বলিতে গেলে বলা যায় যে, যখন ইহা 'মা কালা' )مَا قَالَ( -এর সঙ্গে বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন ইহা অবশ্যই 'সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করা' এবং 'যাহা বলা হইয়াছে তাহা মুখস্থ' করা' অর্থ প্রকাশ করে। ওয়াট নিজে এই বাক্যাংশটি অনুবাদ করেন এইভাবে: "And I have understood from it what He (or he) said" "...এবং আমি ইহা হইতে তাহাই বুঝিয়াছি, যাহা তিনি বলিয়াছেন"। এমন ইংরাজীতে যখন ইহা বলা হয় তখন এইভাবে বলা হয়: "I have understood what he said" "তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা আমি বুঝিতে পারিয়াছি", ইহা ঐ শ্রবণযোগ্য বিষয়কে বাদ দেয় না যাহা তিনি বলিয়াছেন। যাহা হউক, ওয়াট তাহার উপরোল্লিখিত বর্ণনায় অন্য আর এক ভুল করেন। তিনি মূল পাঠে উল্লিখিত 'আনহু' (عَنْهُ) শব্দটির অনুবাদ করেন "from it" (ইহা হইতে)। তিনি "ইহা” সুস্পষ্টভাবে এই অর্থ করেন যাহা তিনি কল্পনা করেন ঘণ্টাধ্বনি হিসাবে, কিন্তু ঘটনা এমন নহে। (হু) সর্বনামটি এইখানে ফেরেশতাকে বুঝাইয়াছে, সালসাতুল জারাস )صَلْصَلَة الجرس(-কে নহে। উদাহরণস্বরূপ ঐ বিষয়ে ইহা স্ত্রীবাচক সর্বনাম ৯ (হা)-এর সঙ্গে যুক্ত, 'সালসালাহ' শব্দটি স্ত্রীবাচক।
প্রকৃতপক্ষে یعی/ وعى ক্রিয়াটি ইহার বিভিন্ন ব্যবহার পদ্ধতিতে একটি যথাযথ পরিভাষা যাহা হাদীছ সাহিত্যে ব্যবহৃত হইয়া অর্থ প্রকাশ করে, 'তিনি যাহা বলিয়াছেন' তাহা মুখস্থ করা এবং "সতর্কতার সঙ্গে” শ্রবণ করা অথবা অন্য কোন ব্যক্তির দ্বারা বর্ণনা করা। নিম্নলিখিত তিনটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উদাহরণ ক্রিয়ার বিশেষ অর্থ বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করে।
(ক) আবূ হুরায়রা (রা)-এর বিখ্যাত হাদীছে তিনি বলেন:
... مَا كَانَ أَحَدٌ أَعْلَمَ بِحَدِيْثِ رَسُولِ اللهِ اللهُ مِنِّي مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ بِيَدِهِ وَيَعِيَ بِقَلْبِهِ وَكُنْتُ أَعِيْهِ بِقَلْبِي وَلَا اكْتُبُ بِيَدِي ....
"আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ছাড়া রাসূলুল্লাহ -এর হাদীছ আমার চাইতে আর কেহ বেশী জানে না। কেননা ইহা তিনি স্বহস্তে লিখিয়া লইতেন এবং অন্তরের দ্বারা মুখস্থ করিতেন। কিন্তু আমি ইহা মুখস্থ করিয়া লইতাম এবং স্বহস্তে লিখিতাম না..."। ১৭
(খ) খালিদ আল-'আদওয়ানীর হাদীছ:
قَالَ فَسَمِعْتُهُ يَقْرَأُ وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ) حَتَّى خَتَمَهَا قَالَ فَوَعَيْتُهَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَأَنَا مُشْرِكٌ ثُمَّ قَرَأْتُهَا فِي الْإِسْلام ....
"তিনি বলেন, আমি তাঁহাকে পাঠ করিতে শুনিলামঃ "ওয়াস-সামাই ওয়াতারিক' শেষ পর্যন্ত তিনি পাঠ করিলেন (৮৪ নং সূরা)। তিনি বলেন, সুতরাং আমি জাহিলী যুগে মুশরিক অবস্থায় ইহা স্মৃতিতে ধরিয়া রাখিয়াছিলাম। অতঃপর আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়া ইহা পাঠ করিলাম (অর্থাৎ তাহার ইসলাম গ্রহণের পর)"। ১৮
(গ) 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর হাদীছঃ
... وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْ كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمُ الْحَدِيثَ الَّذِي حَدَّثَنِي ....
"... এবং আমি তাহাদের প্রত্যেকের নিকট হইতে এই হাদীছ মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছি যাহা তিনি আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন"। ১৯
আরও অনেক বর্ণনা এমন রহিয়াছে যাহাতে ক্রিয়াটি সুনির্দিষ্টভাবে "যাহা বলা হইয়াছে তাহা সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করা এবং স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা" এই অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ২০ ক্রিয়াটির অনুরূপ অর্থ কুরআনের ৬৯: ১২ আয়াত দ্বারাও সুষ্পষ্ট":
لَنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذكرَةً وَتَعِبَهَا أُذُنٌ وَاعِيَةٌ .
"আমি ইহা করিয়াছিলাম তোমাদের শিক্ষার জন্য এবং এইজন্য যে, যেন শ্রুতিধর কর্ণ ইহা সংরক্ষণ করে" (৬৯: ১২)।
এইরূপে ওয়াট বর্ণনায় উল্লিখিত 'ওয়া'আয়তু' ক্রিয়াটির অর্থ উপলব্ধি করিতে ভুল করেন এবং এই ধারণায় ভুল করেন যে, এইখানে বলা এবং শ্রবণ করার ব্যাপারে কোন কিছুর উল্লেখ নাই। তদুপরি রাসূলুল্লাহ তাঁহার অভিজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে "ওহীর শব্দসমূহ কেবল তাঁহার অন্তরে প্রাপ্ত হইতেন" বর্ণনার ব্যাপারে ওয়াট-এর মূল্যায়নে মৌলিক ত্রুটি এই য়ে, যখন ইহা ওহী আগমনের একক পদ্ধতির ব্যাপারে কথা বলে, তখন তিনি এই পদ্ধতিকে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতায় বিভক্ত করেন- একটি তথাকথিত "কাল্পনিক অভিজ্ঞতা" এবং অপরটি তথাকথিত "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”। বর্ণনার মূল পাঠ কিছুতেই একক পদ্ধতির এমন বিভক্তিকে সমর্থন করে না। ওহী আসার পদ্ধতির কথা এইখানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা 'কাল্পনিক অভিজ্ঞতা' ছিল না এবং বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গিও ছিল না। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিক হইতে এক রকম শারীরিক অভিজ্ঞতা এবং মূল পাঠের এক মৌখিক যোগাযোগ যাহা তিনি শ্রবণ করেন এবং তাঁহার স্মৃতিতে ধরিয়া রাখেন।
ওহী আগমনের দ্বিতীয় পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনার সময়, যেখানে আল্লাহ্ বক্তব্য "পর্দার অন্তরাল হইতে"-এর ব্যাপারে ওয়াট বলেন যে, এই বক্তব্যটি প্রাথমিক পর্যায়ে ওহী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অভিজ্ঞতার উদাহরণ, "যেমন আয-যুহরী হইতে প্রাপ্ত বর্ণনার Passage 'B'-এ বর্ণিত হইয়াছে"। সেইখানে বলা হইয়াছে, "তাঁহার নিকট সত্য আসিল এবং বলিল, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল"। ২১ ওয়াট পুনরায় বলেন, যেহেতু "পর্দার অন্তরাল হইতে” শব্দসমূহ ধারণা দেয় যে, বক্তাকে দেখা যায় নাই, ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, এই ব্যাপারে একমাত্র "শব্দাবলী শ্রুত হইয়াছে এবং এইজন্য ইহা একটি কাল্পনিক বাচনভঙ্গি (অথবা এমনকি এইটি বাহ্যিক বাচনভঙ্গি)"। ২২
উপরোল্লিখিত বাক্যসমূহে ওয়াট তাহার বক্তব্যের অসঙ্গতি স্বীকার করিয়াছেন (যদিও তিনি প্রকৃতপক্ষে তাহা উপলব্ধি করিতে পারেন নাই)। তিনি অনেক পূর্বেই Passage 'B'-এর বক্তব্য ব্যবহার করেন, বিশেষ করিয়া "তাঁহার নিকট সত্য আসিল এবং বলিল...", এই বক্তব্য তিনি আল্লাহর দর্শনের সাক্ষ্য হিসাবে উল্লেখ করেন অথবা অন্ততঃপক্ষে আল্লাহর প্রতীক-এর প্রত্যেক্ষ দৃশ্য (অথবা সম্ভবত, যেমন তিনি ধারণা করেন, মানসিক অথবা কাল্পনিকভাবে আল্লাহকে দেখা)। কিন্তু এখন তিনি সেই Passage-এর বক্তব্য উল্লেখ করেন আল্লাহ্র বক্তব্যের ধরন বিশ্লেষণ করার জন্য অর্থাৎ "পর্দার অন্তরাল হইতে" এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করার জন্য অর্থাৎ না দেখিয়া এবং এই সময় হইতে ইহা ছিল একমাত্র বিষয় যে, দৃশ্য অবলোকন ছাড়া কেবল বক্তব্য শ্রবণ-"একটি কাল্পনিক" অথবা "বাহ্যিক বাচনভঙ্গি”। ইহা কার্যত ওয়াট-এর অসঙ্গতির সহিত তাল মিলাইয়া চলা বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠিন। একমাত্র উপদেশমূলক দৃশ্য এই যে, তিনি দ্রুত এই পদ্ধতির সংযোগ করেন, "ইহা ধারণাগত দিক হইতে সাধারণ নহে” এবং কল্পনা প্রয়াসে তিনি "হযরত মূসা (আ)-এর বর্ণনা দেওয়ার ইচ্ছা করেন"। ২৩
ওহী আগমনের তৃতীয় পদ্ধতি সম্পর্কিত বক্তব্যে বলা হইয়াছে, আল্লাহ ওহী প্রকাশের জন্য দূত প্রেরণ করেন। ওয়াট বলেন, মুসলিম পণ্ডিতগণ চিন্তা করেন, এই দূত ছিলেন জিবরাঈল এবং তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব যিনি শুরু হইতেই ওহী লইয়া আসিতেন। কিন্তু পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ বর্ণনা করেন যে, মাদানী জীবন শুরু না হওয়া পর্যন্ত কুরআনে জিবরাঈল (আ) তাঁহার নামসহ উল্লিখিত হন নাই। তবে কুরআন ও হাদীছে তিনি "অনেক বেশী উল্লিখিত হন", "ইহা মুসলমানদের সাধারণ ধারণার বিপরীত"। মুসলমানদের ধারণা এই যে, পরবর্তী ঘটনাকে পূর্ববর্তী ঘটনার সহিত যুক্ত করা হইয়াছে। ২৪
পরবর্তীতে ওয়াট বলেন, মাদানী জীবনকালে ওহী অবতরণের কাজ জিবরাঈল কর্তৃক সম্পন্ন হয় যাহা সাধারণ বিশ্বাসের ব্যাপার। কিন্তু এমনকি "এই ধরনের বিষয়ে ওহী ছিল ধারণাগতভাবে একটি কাল্পনিক বাচনভঙ্গি”। উদাহরণস্বরূপ, জিবরীলের উল্লেখ আসিয়াছে "একজন মানুষের আকৃতিতে” যাহা এই ধারণা দেয় যে, ইহা ছিল "একটি কাল্পনিক দৃশ্য"। ২৫
এইখানে ওয়াট একই পুরানো যুক্তির পুনরাবৃত্তি করেন যে, মাদানী জীবন শুরু না হওয়া পর্যন্ত কুরআন শরীফে জিবরাঈল নাম উল্লিখিত হয় নাই এবং ইহার ভিত্তিতে তিনি বর্ণনা করেন যে, মুসলিম ধারণা পরবর্তী ঘটনাকে পূর্ববর্তী ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করিয়াছে।
এই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য যথাযথ পুনরাবৃত্তি, যাহা বেল এই সম্পর্কে বলিয়াছেন। ২৬ এই মন্তব্য এবং বর্ণনা এই যে, মুসলিম ধারণা ইহার বিপরীত, যাহা কুরআনের ও হাদীছের বক্তব্য সম্বলিত। কুরআন ও হাদীছ সুস্পষ্টরূপে উপরোল্লিখিত যুক্তিভিত্তিক এবং অন্যান্য ধারণাভিত্তিক, উদাহরণস্বরূপ (ক) যেমন, আয-যুহরীর বর্ণনা "সত্য" (the truth) সম্পর্কে বলেন এবং জিবরাঈল যে ওহী লইয়া আসেন, তাহার উল্লেখ নাই; (খ) যেমন সূরাতুন নাজম-এর আয়াত আল্লাহ্র দর্শন সম্পর্কে কথা বলে; এবং (গ) যেমন, ওহী পরিভাষাটি, যেমন কুরআনে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা মূল পাঠ-এর মৌখিক প্রত্যাদেশের অর্থ প্রকাশ করে না। এই সকল ধারণা ইতিপূর্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হইয়াছে এবং ভুল ও অসমর্থনীয় বলিয়া প্রতিভাত হইয়াছে। ২৭
ওয়াট স্বীকার করেন যে, জিবরীলের মাধ্যমে ওহী অবতরণ মাদানী জীবনে একটি সাধারণ বিষয় ছিল। কেন তখন এই একই ফেরেশতা প্রাথমিক সময়ে ওহী অবতরণকারী হইতে পারেন না তাহা ওয়াট ব্যাখ্যা করেন নাই। তাহার পূর্ববর্তী রিচার্ড বেল অবশ্য ধারণা করেন, যেমন আগে দেখানো হইয়াছে ২৮ যে, জিবরাঈল (আ) মদীনায় পরিচিত হন। কারণ ইহা ছিল কেবল তখনই যখন রাসূলুল্লাহ জিবরাঈল (আ) সম্পর্কে জানিতে পারেন। এই ব্যাখ্যার অযৌক্তিকতা ইতোপূর্বে নির্দেশ করা হইয়াছে। ওয়াট এই সম্পর্কে কোন ব্যাখ্যা প্রদান করিতে অগ্রসর হন নাই, সম্ভবত ইহা দ্বারা বুঝা যায় যে, তিনি বেল-এর ব্যাখ্যার দুর্বলতা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন।
একদিকে ওয়াট স্বীকার করেন যে, মাদানী জীবনকালে জিবরাঈল (আ) কর্তৃক ওহী অবতরণ একটি সাধারণ বিষয় ছিল। অন্যদিকে তিনি বলেন যে, এই ধরনের ব্যাপারে এইসব বিষয় "ধারণাগতভাবে কাল্পনিক" বাচনভঙ্গি। কারণ হাদীছসমূহ জিবরাঈল (আ)-কে "মানুষের বেশে" উপস্থিত হওয়ার কথা উল্লেখ করিয়াছে। উহা এই ধারণা দেয় যে, তাঁহার উপস্থিতি ছিল "কাল্পনিক দৃশ্য"। এইখানে কেবল এই বিষয়টি উল্লেখ করা দরকার যে, রাসূলুল্লাহ -এর নিকট জিবরাঈল (আ)-এর আগমন সবসময় তাঁহার জন্য একান্ত গোপন বিষয় ছিল না। যেমন ঈমান ও ইহসান সম্পর্কিত বিখ্যাত হাদীছে উক্ত জিবরাঈল (আ)-এর একজন মানুষের বেশ ধরিয়া আগমন বা উপস্থিতি ছিল এক শারীরিক ব্যাপার যাহা রাসূলুল্লাহ -এর সাহাবীগণের দ্বারা বর্ণিত হইয়াছে। সুতরাং এই বিষয়টি কেবল এই কথা বলিয়া মীমাংসা হইতে পারে না যে, ফেরেশতার উপস্থিতি ছিল "সম্ভবত একটি কাল্পনিক দৃশ্য" যাহা রাসূলুল্লাহ-এর একার জন্য প্রয়োজ্য ছিল।
ইহা লক্ষ্য করা গিয়াছে যে, ওহীর ধরন যাহাই হউক না কেন, ওয়াট ইহা দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, 'ইহা হয় একটি কাল্পনিক অথবা একটি বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি'। এইভাবে ওহীর প্রথম ধরন, ওয়াট-এর মতে, ছিল একটি "অভ্যন্তরীণ বিষয়", "সম্ভবত" একটি "বুদ্ধিগত" বাচনভঙ্গি। দ্বিতীয় ধরন, "একটি কাল্পনিক বাচনভঙ্গি (অথবা এমনকি ইহা একটি বাহ্যিক বাচনভঙ্গি)" এবং তৃতীয় ধরন এই যে, "সম্ভবত ইহা একটি কাল্পনিক" বাচনভঙ্গি। সম্পূর্ণ কৌশল এইভাবে পরিচালনা করিয়া দেখানো হইয়াছে যে, কুরআনিক ওহী ছিল রাসূলুল্লাহ-এর মন, "বুদ্ধিমত্তা” ও বিবেকপ্রসূত বিষয়। ইহা যে কোন মূল পাঠ-এর মৌলিক প্রত্যাদেশ নহে, যাহা কোন প্রতিনিধির মাধ্যমে শারীরিকভাবে হয় নাই। এই কৌশল অবলম্বন করিয়া ওয়াট মনে হয় এই উদ্দেশ্যেও ইসলামিক ওহীকে খৃস্টান ধ্যান-ধারণার "উদ্দীপনা"র সঙ্গে একই পথে লইয়া আসেন। ইহার পর তিনি তাঁহার পাঠকদেরকে "দর্শন" এবং "বাচনভঙ্গি”-এর সঙ্গে অলীক কিছু অস্তিত্বের বিশ্বাসকে বিভ্রান্তিপূর্ণ বলিতে নিষেধ করেন। বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করিয়া "বিজ্ঞান” এবং গূঢ় অর্থপূর্ণ ধর্মতত্ত্বের "শৃঙ্খলা" যেমন A. Paulain-এর মত লেখকদের দ্বারা বিকশিত হয় এবং তিনি বলেন যে, ইহা নিঃসন্দেহে সুবিধাজনক হইবে, যাহাকে মুহাম্মাদ -এর অভিজ্ঞতার বিস্ময়কর বিষয়কে খৃস্টান সাধু ও সূফীবাদ-এর সঙ্গে তুলনা করেন। ২৯
ইহা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে, ওয়াট কর্তৃক যতদূর কুরআনিক ওহীর “পদ্ধতি” এবং A. Paulain-এর সূফীতাত্ত্বিক ধারণার মধ্যে যে তুলনামূলক বিবরণ প্রদত্ত হইয়াছে তাহা না যুক্তিনির্ভর, না সমর্থনযোগ্য। কুরআনিক ওহী অবতরণ পদ্ধতি খৃস্টান সাধুতত্ত্ব ও সূফীতত্ত্বের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনীয় নহে, যাহারা "উদ্বুদ্ধ” হন তাহাদের নিজেদের কথিত শব্দাবলীর দ্বারা, যাহা তাহারা "উদ্দীপনা” হইতে উপলব্ধি করেন।
সর্বশেষে, ওয়াট “ওহী প্রাপ্তির সঙ্গে শারীরিক সহযোগ"-এর কথা উল্লেখ করেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর ঘটনাবলী (দিছার: dithar)-এর উপর প্রয়োগ করেন এবং বলেন, যে সকল অনুষঙ্গ বর্ণিত হইয়াছে তাহা সন্ন্যাস রোগের সঙ্গে চিহ্নিত নহে, যে অভিযোগ-ওয়াট বাতিল করেন এই বলিয়া যে, ইহা "সম্পূর্ণরূপে ত্রুটিপূর্ণ, অবিশ্রিত অজ্ঞতা ও কুসংস্কারভিত্তিক”। যাহা হউক, এমন মন্তব্য করিয়া তিনি ক্লান্তিকরভাবে আলোচনা করিতে গিয়া রাসূলুল্লাহ-এর ওহীর "প্ররোচনা"র পদ্ধতি সম্পর্কে "শ্রুতির” দ্বারা অথবা স্বেচ্ছাঅভিভূত হওয়া অথবা আমরা ইহাকে যাহাই বলি না কেন, ত্রুটিপূর্ণতার কথা বলেন। ৩০ ইহার পরও অভিযোগ করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ কুরআন সংশোধন করার পদ্ধতি জানিতেন, ... সঠিক পদ্ধতি উদ্ভাবন করিতে জানিতেন, যাহা তাঁহার নিকট অসম্পূর্ণ অবস্থায় অবতীর্ণ হইত অথবা অশুদ্ধ পদ্ধতিতে অবতীর্ণ হইত"। ৩১ ইতোপূর্বে, রাসূলুল্লাহ-এর "ওহী সংশোধনের প্ররোচনা"র প্রচেষ্টা সম্পর্কে ওয়াট যাহা বলেন, সেই সম্পর্কে তিনি যখন কথা বলেন, তিনি লক্ষ্য করেন যে, "ইহা নিষ্ঠাবান মুসলিম তত্ত্বের একটি অংশ, যাহার কতক ওহী অন্যদের দ্বারা বাতিল হইয়া যায়”। ৩২
এক্ষণে ইহা বলা উচিত যে, ওয়াট এইখানে তাহার পূর্বসূরীদের দুইটি ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্ব একটি ধারণার মধ্যে একীভূত করিয়াছেন। তিনি একদিকে পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন মারগোলিয়থের ওহীর প্ররোচনা তত্ত্বের স্বেচ্ছাঅভিভূত হওয়ার মাধ্যমে ইত্যাদি এবং অপরদিকে তিনি ইহাকে বেল্-এর পুনরাবৃত্তি তত্ত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন যে, পুনরাবৃত্তি কুরআনে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক সংঘটিত হয়। ইহা স্মর্তব্য যে, পক্ষান্তরে মারগোলিয়থ তাহার "প্ররোচনা" তত্ত্বকে "শারীরিক সহযোগে ওহী প্রাপ্তি”-এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করিয়া বিন্যস্ত করেন। বেল তাহার তত্ত্ব কুরআনের ভাষার আঙ্গিক এবং বাতিল বা রহিতকরণ-এর উপর ভিত্তি করিয়া বিন্যস্ত করেন। সুতরাং শেষোক্ত জন অর্থাৎ বেল্-এর ধারণাসমূহ এই আলোচনার সঙ্গে সম্পৃক্ত, এই ধারণাসমূহ পূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে এবং অযৌক্তিক প্রমাণিত হইয়াছে। ৩৩
ইহা পুনরায় স্পষ্ট করিয়া বলা যাইতে পারে যে, রহিতকরণ (নাস্ব)-এর ধারণা কুরআনের কোন আয়াতের স্থলে অন্য আয়াতের বা আয়াতসমূহের পুনস্থাপন নির্দেশ করে না, বরং নির্দিষ্ট আদেশ অথবা নির্দেশাবলী এবং হেদায়াতের নিয়ামাবলীর সংশোধনী বুঝায়। ওয়াট দুইটি ধারণাকে "শারীরিক ধারণা সহযোগের মাধ্যমে সূক্ষ্ম কৌশলের দ্বারা সংযুক্ত করেন যাহাকে "কৌশল" বলে, যে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ-এর স্বপক্ষে যুক্তি দেখান হয় যে, তিনি কুরআন সংশোধনের জন্য "শ্রবণ” এবং “বিস্মৃত আয়াতসমূহের” উৎঘাটনে উন্নয়ন সাধন করেন। কটাক্ষের বিষয়টি এই যে, সম্ভবত ওহীর তথাকথিত "প্ররোচনার সংযোগ একদিকে এবং কুরআন সংশোধনের "কৌশল” অথবা কুরআন পুনঃ পরীক্ষণ অপরদিকে অর্থাৎ এই উভয় ব্যাপারে ইহা একটি অভিজ্ঞতা ও কৌশলের বিষয় যাহা রাসূলুল্লাহ কর্তৃক অর্জিত অথবা কৃত্রিমভাবে প্রবর্তিত। ইহা একটি স্বেচ্ছাঅভিভূত হওয়ার ব্যাপার অথবা আমরা ইহাকে যাহাই বলিনা কেন"। ইহা বিচার করা মুশকিল, কিভাবে এই কটাক্ষপাতের বিষয়টি সন্যাসরোগ বা মৃগীরোগের অভিযোগের চাইতে ভাল হইতে পারে যাহা ওয়াট অত্যন্ত বাগাড়ম্বরপূর্ণভাবে বাতিল করেন। তাহার সন্যাসরোগ তত্ত্ব বাতিল করার মূল কারণের উদ্ভব হওয়ায় রাসূলুল্লাহ-এর ভাবমূর্তিকে একটি উত্তম পদ্ধতিতে উপস্থাপনের মনোভাবের দ্বারা তাড়িত হওয়া নহে, বরং মূল বিষয়টি উপলব্ধি করাই আসল কথা। যেমন ওয়াট বিশ্লেষণ করেন যে, "ঐ রোগ অর্থাৎ সন্যাসরোগ একটি মানুষকে শারীরিক ও মানসিকভাবে অধঃপতিত করে, কিন্তু পক্ষান্তরে মুহাম্মাদ শেষ পর্যন্ত তাঁহার সকল মানবীয় গুণাবলীসহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলেন”। ৩৪
রাসূলুল্লাহ-এর চরিত্র ও ন্যায়পরায়ণতার বিকল্প এবং অত্যন্ত বাস্তব প্রতিফলনের উপর আলোকপাত করিতে গিয়া ওয়াট কোন একটি উদাহরণও উল্লেখ করেন নাই, যখন রাসূলুল্লাহ "শারীরিক অবয়বসহ” "প্ররোচিত” হন অথবা "কুরআন সংশোধনের" "কৌশল” প্রয়োগ করেন অথবা "বিস্মৃত আয়াতগুলি উদ্ধারে" ব্যাপৃত হন। ওয়াট কেবল অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য তাহার মূল প্রয়োজনীয় বিষয়গুলি বর্ণনা করিয়া বলেন যে, "বিস্তারিত বিষয় অবশ্যই অনুমান সাপেক্ষ। কিন্তু ইহা নিশ্চিত মনে হয় যে, মুহাম্মাদ -এর কুরআন সংশোধনের কতিপয় পদ্ধতি ছিল..."। ৩৫
এইরূপে ওয়াট তাহার উপসংহার "আনুমানিক" বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া উপস্থাপন করেন এবং যাহা "নিশ্চিত মনে হয়" (তাহার মনে) এমন বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া উপস্থাপন করেন। এমনকি তিনি এই অংশটি শুরু করেন অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে রাসূলুল্লাহ -এর নিষ্ঠা ও সততার কথা স্মরণ করানোর মাধ্যমে, "উপসংহারমূলক প্রমাণ হইল আপাত দৃষ্টিতে ন্যায়সঙ্গত বিষয় প্রদর্শনের চাইতে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়"। সুস্পষ্টভাবে ওয়াট স্বীকৃত উদ্দেশ্যকে বেদীতে উৎসর্গ করেন ন্যায়সঙ্গত বিষয়ে নহে বরং কুসংস্কার রক্ষা করার ধারণায়।
ওয়াট কিছুটা নরম হইয়া তাহার উপসংহারে এই কথা যোগ করেন, ঘটনা এই যে, "মুহাম্মাদ কোন কোন সময় তাঁহার নিকট ওহী অবতরণের অভিজ্ঞতায় প্ররোচিত হন" এই বক্তব্যটি "ধর্মতত্ত্ববিদগণের বৈধতার বিচারে" প্রাসঙ্গিক নহে। ৩৬ বিবরণটি অপ্রয়োজনীয়। কারণ ওয়াট কোন ধর্মতাত্ত্বিক মতামত প্রকাশ না করার কথা স্বীকার করেন। কিন্তু প্রশ্নটি প্রাসঙ্গিক হউক অথবা ধর্মতাত্ত্বিকগণের বিচারের বিষয় হউক, ইহা ঐতিহাসিকগণের সত্য অনুসন্ধানের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। অবিমিশ্রভাবে তিনি তাহার পূর্ববর্তীদের ধ্যান-ধারণা নূতন করিয়া গঠন করিয়া বলেন, "রাসূলুল্লাহ কোন কোন সময় প্ররোচিত" হইতেন, অর্থাৎ তিনি কৃত্রিমভাবে ওহী উৎপাদন করিতেন অথবা মন্ত্রমুগ্ধতার দ্বারা অথবা অনুরূপ কোন কিছুর দ্বারা কুরআনের সংশোধন করিতেন। ওয়াট সুস্পষ্টভাবেই তাহার ঐতিহাসিক অবস্থান হইতে পদস্খলিত হন এবং তিনি তাহার শুরুতে যে মানদণ্ড স্থাপন করেন সেই অনুযায়ী কাজ করিতে ব্যর্থ হন।
ইহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এইখানে ওয়াট একটি অসুবিধার মধ্যে পরিশ্রম করিয়াছেন, তাহার মনোযোগ A. Poulain-এর "কাল্পনিক" ও "বুদ্ধিগত” বাচনভঙ্গির গঠন কাঠামোর প্রতি "ওহীর অভিজ্ঞতা” উদ্দেশ্যে সম্পূর্ণ নিবদ্ধ করেন। অবশেষে তিনি নিজেকে শারীরিক কঠোরতার এবং বৈশিষ্ট্যের ঘটনাবলীর সঙ্গে দ্বন্দ্বমুখর অবস্থায় এমনভাবে পান যে, নিঃসন্দেহে কোন কোন সময় রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ওহী আসার বিষয়ে ওয়াট এই দ্বান্দ্বিকতার কথা উল্লেখ করেন। ওয়াট বুদ্ধিগত অথবা কাল্পনিক বাচনভঙ্গির তত্ত্বে ইহার সমন্বয় অসম্ভব বলিয়া মনে করেন। ইহার পর হইতেই তিনি কেবল মারগোলিয়থ বেল্-এর ওহীর প্ররোচনা ও কুরআন সংশোধন তত্ত্বকে মনোবেদনায় আবর্জনার ঝুড়িতে নিক্ষেপ করেন। তিনি মনে হয় নিজে নিজে প্ররোচিত হন এবং মনে করেন যে, অতঃপর (সন্যাস) রোগতত্ত্ব কোন কার্যকর কাজ করে না, অর্থাৎ কোন বিবেচনাপূর্ণ কাজ করে না। উদাহরণস্বরূপ কৃত্রিমভাবে লক্ষণসমূহ এবং ওহী অবতরণ প্ররোচিত করে। যদি ওয়াট বাস্তবিকভাবে ও কার্যকরভাবে ঘটনাবলী বিবেচনা করিতেন, তাহা হইলে তিনি এই বৈশিষ্ট্য বাদ দিতেন না যে, "শারীরিক অবয়ব সহযোগে ওহী লাভ" যাহা অত্যন্ত বলিষ্ঠতার "সঙ্গে” বুদ্ধিগত অথবা কাল্পনিক বাচনভঙ্গি তত্ত্বের বিরুদ্ধে মুকাবিলা করিয়াছে। সর্বোপরি খৃস্টান সাধু-সন্তদের ব্যাপারে A. Poulain প্রধানত এই ধারণা দেন যে, তাহারা মনে করেন, রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী নাযিল হওয়ার সময় "শারীরিক অবয়ব সহযোগে” ওহী নাযিল হওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁহার ছিল না। তাঁহার বিষয়টি খৃস্টান সাধু-সন্তদের হইতে সম্পূর্ণ আলাদা ছিল। তাহাদের "অভ্যন্তরীণ প্রার্থনার" প্রকৃতি এবং "প্রেরণা” যাহাই হউক না কেন, তাহাদের অবস্থা রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি স্থানান্তরিত হইতে পারে না।
শারীরিক অবয়ব সহযোগে ওহী প্রাপ্তির উদাহরণ উল্লিখিত হইয়াছে, প্রকৃতপক্ষে এমন ঘটনা খুবই কম। সুতরাং যদি ওহী অধিকাংশ সময়ে বুদ্ধিগত অথবা কাল্পনিক বাচনভঙ্গি হইয়া থাকিত, যেমন ওয়াট বলেন, ইহা বোধগম্য নহে, কেন রাসূলুল্লাহ "প্ররোচনা পদ্ধতির আশ্রয় গ্রহণ করিতেন অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে লক্ষণসমূহ এবং ওহী নাযিলের অবস্থা তৈরী করিতেন। প্ররোচনার বিষয়টির লক্ষণ তখনই উপস্থাপিত হয় যখন লক্ষণসমূহ ক্রমাগত দৃশ্যমান হয় অথবা ওহী আগমনের সহগামী হয়। কিন্তু সর্বোপরি বিষয়টি এমন নহে। অতঃপর লক্ষণসমূহ না রাসূলুল্লাহ কর্তৃক প্ররোচিত ছিল এবং না ওহী আসার বিষয়টি ঐ লক্ষণসমূহ ছাড়া কেবল বুদ্ধিগত অথবা কাল্পনিক বাচনভঙ্গি ছিল।
"কাল্পনিক বাচনভঙ্গি” অথবা “বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি” এই বক্তব্য প্রকৃতপক্ষে পরিভাষাগত দিক হইতে বিরোধপূর্ণ। "Locution"-এর অর্থ "বক্তব্যের স্টাইল", "শব্দ ব্যবহারের পদ্ধতি", বাক-বৈশিষ্ট্য ও বাগধারা"। A. Poulain বলেন যে, যখন "কাল্পনিক বাচনভঙ্গি” কানের সহায়তা ছাড়া (শ্রবণশক্তির সহায়তা ছাড়া) কাল্পনিক ধারণা দ্বারা প্রাপ্ত হয়, "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি” হইল শব্দাবলী ছাড়া চিন্তার সাধারণ যোগাযোগ এবং ফলত এই যোগাযোগ সুনির্দিষ্ট ভাষা ছাড়া"। এক্ষণে চিন্তা ও ধারণা একটি বিমূর্ত বিষয়, যাহা প্রকাশিত হয় অথবা যোগসূত্র তৈরী করে একমাত্র শব্দাবলীর দ্বারা এবং ভাষার দ্বারা, এইগুলি হইল ইহাদের একমাত্র বাহন। শব্দাবলী এইরূপে চিন্তা ও ধারণা হইতে অবিচ্ছেদ্য। কোন একজন ব্যক্তি, তাহার ভাষা যাহাই হউক না কেন, তাহার চিন্তা ও স্বপ্ন তাহার নিজের ভাষার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়, সে ইহাদেরকে মৌখিকভাবে প্রকাশ করুক অথবা না করুক অথবা তাহার বক্তব্য প্রকাশের সময় সে অনুরূপ শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করুক অথবা অনুরূপ ভাষা ব্যবহার করুক বা না করুক। যে কোন ব্যক্তি, যাহার কোন ভাষা নাই, তাহার কোন ধারণা শক্তিও থাকিবে না এবং চিন্তাশক্তিও থাকিবে না। A. Poulain-এর "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”র সংজ্ঞা "চিন্তার সাধারণ যোগাযোগ"-এর মত যাহা শব্দ এবং ভাষা ছাড়া এমনভাবে উদ্ভূত হয় যাহা উচ্চকণ্ঠযুক্ত অর্থাৎ গলাবাজি অর্থহীন প্রলাপ।
A. Poulain এবং ওয়াট এই বক্তব্যের ধারণা সম্পর্কে যাহাই মনে করুন না কেন, ধারণার বা কল্পনার কিছু কার্যকারিতা আছেই, তাহা বুদ্ধিগত দিক হইতে হউক অথবা কাল্পনিক দিক হইতে হউক। ইহার উপাদানের অস্তিত্বের প্রাক-ধারণাগত বিষয় ব্যক্তির অবচেতন মনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। ব্যক্তি অবশ্যই ইহার গভীর অনুভূতি, ধারণা অথবা কল্পনা ইত্যাদি যে কোনভাবে অথবা অন্য যে কোন পর্যায়ে অথবা জীবনেব কোন না কোন স্তরে অর্জন করে। রাসূলুল্লাহ-এর ব্যাপারে কথা হইল, সকল তত্ত্ব-থিওরীর অবতারণা সত্ত্বেও প্রকৃত বিষয়টি এই যে, উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি ওয়ারাকা ইবন নাওফাল এবং মক্কার বাজারের, এমনকি অন্যান্য স্থানের সাধারণের নিকট হইতে ভাল অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ইহা প্রমাণিত হয় নাই যে, তিনি পূর্বেই এইসব ধারণা এবং তথ্যাদি লাভ করিয়াছিলেন কি না, যে বিষয়গুলির কথা কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে অথবা কুরআন সেই বিষয় সম্পর্কে কথা বলিয়াছে। পক্ষান্তরে যদি এই প্রাক-প্রয়োজনীয় জ্ঞান অথবা ধারণা অবচেতন মনে অস্তিত্বপূর্ণ হইত তাহা হইলে তাহা এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইত, এই বিষয়ে ইহা "অতিন্দ্রীয়” জ্ঞানের ভূমিকার অপরিহার্যতায় পরিণত হইত। ওয়াট অবশ্য এক সময় বলেন, রাসূলুল্লাহ এই প্রত্যাদেশ "অতিন্দ্রীয়”ভাবে লাভ করেন"। ৩৭ বুদ্ধিগত এবং কাল্পনিক বাচনভঙ্গি তত্ত্বকে কুরআনের ওহীর ব্যাপারে প্রয়োগ করায় ওয়াট কোন ক্ষেত্রেই "অতিন্দ্রীয়তার" কথা উল্লেখ করেন নাই, এমনকি তিনি ইহার সঙ্গে বুদ্ধিগত ও কাল্পনিক বাচনভঙ্গির পদ্ধতির সম্পর্কের যোগসূত্র চিহ্নিত করেন না। প্রকৃতপক্ষে যদি "অতিন্দ্রীয়তা”র ভূমিকা বিশ্বাসযোগ্যভাবে সুসামঞ্জস্যতাপূর্ণভাবে নিরবিচ্ছিন্নভাবে স্বীকৃত হয় তাহা হইলে A. Poulain কর্তৃক সরবরাহকৃত "তথ্যাদি” (equipment) ব্যবহারের কোন প্রয়োজন হইবে না।
উপরের আলোচনা হইতে ইহা পরিষ্কার হওয়া উচিত যে, একদিকে ওয়াট কুরআনিক ওহীর ব্যাপারে বেল্-এর ধারণা অনিবার্যভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। শেষোক্ত জনের কুরআনে উল্লিখিত এবং কুরআনের সূরা ৫৩: ৪-১৪ ও ৪২:৫০-৫২-এ উল্লিখিত ওহী পরিভাষার ব্যাখ্যা অবলম্বনে তিনি ইহা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। অন্যদিকে হযরত আয়েশা (রা) কর্তৃক বর্ণিত রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী আসার বর্ণনাকে বিকৃত করিয়া এবং A. Poulain কর্তৃক সরবরাহকৃত "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”-এর উপকরণ বা তথ্যাদির আশ্রয় গ্রহণ করিয়া আলোচনা উপস্থাপন করেন। বেল তাহার ওহী পরিভাষার ব্যাখ্যায় মারাত্মক ভুল করিয়াছেন যাহা কুরআনের কতিপয় আয়াত বিশ্লেষণ করিয়া ইতিপূর্বে দেখানো হইয়াছে ৩৮ যেখানে এই সুনির্দিষ্ট ষাটি কুরআনের ওহী নাযিলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রেই দৃষ্ট হয়। যাহা হউক, কুরআনের বহু সংখ্যক আয়াতে ওহী পরিভাষাটি ব্যবহার ছাড়াই অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে কুরআন নাযিল হওয়ার রীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে বলা হইয়াছে। বেল এবং ওয়াট এই দুইজনের কেহই এই আয়াতগুলিকে বিবেচনায় আনেন নাই। এইসব আয়াত উদ্ধৃত করিয়া বর্তমান আলোচনা সমাপ্ত করা সময়োপযোগী হইবে।
টিকাঃ
২. লণ্ডন, ১৯২৮ খৃ.।
৩. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৫৪, উদ্ধৃতি A. Poulain, op. cit., পৃ. ২৯৯ প।
৪. ওয়াট, op.cit., পৃ. ৫৪।
৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৫।
৬. Supra, পৃ. ৪৩০-৪৩২।
৭. মূল পাঠ নিম্নরূপ : مَا كُنْتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيْمَانُ وَلَكِنْ جَعَلْتُهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَنْ نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا...
"তুমি তো জানিতে না কিতাব কি এবং ঈমান কি। পক্ষান্তরে আমি ইহাকে করিয়াছি আলো যাহা দ্বারা আমি বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি" (৪২৪৫২)।
৮. Supra, পৃ. ৪১৯-৪২২; ৪৫৪-৪৫৭।
৯. মূল পাঠ নিম্নরূপ: لَا تُحرك بِهِ لِسَانَكَ لِتَعْجَلَ بِهِ إِنَّ عَلَيْنَا جَمْعَهُ وَقُرَأْنَهُ فَإِذَا قَرَأْتُهُ فَاتَّبِعْ قُرَأْنَهُ .
"তাড়াতাড়ি ওহী আয়ত্ত করিবার জন্য তুমি তোমার জিহ্বা উহার সহিত সঞ্চালন করিও না, ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি উহা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর" (৭৫: ১৬-১৮)।
১০. মূল পাঠ নিম্নরূপ : وَلَا تَعْجَلْ بِالْقُرْآنِ مِنْ قَبْلِ أَنْ يُقْضَى إِلَيْكَ وَحْيُهُ "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না" (২০:১১৪)।
১১. মূল আরবী পাঠ হইল : سَنُقْرِئُكَ فَلَا تَنْسَى "নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না" (৮৭:৬)।
১২. ১২ : ২. إنا أنزلنه قرآنا عربياً “ইহা আমি অবতীর্ণ করিয়াছি আরবী ভাষায় কুরআন"। আরও দ্র. ১২ : ১১৩; ৩৯ : ২৮; ৪১: ৩; ৪২: ৭ এবং ৪৩: ৩।
১৩. বুখারী, হাদীছ নং ২।
১৪. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৫৫-৫৬।
১৫. বুখারী, হাদীছ নং ৩২১৫।
১৬. দ্র. লিসানুল 'আরাব, وعى শিরোনাম অথবা মানসম্পন্ন অন্য যে কোন আরবী-ইংরেজী অভিধান, উদাহরণস্বরূপ, Hans Wehr, A Dictionary of Modern Written Arabic (ed. J. Milton Cowan), وعى শিরোনামে দ্র.।
১৭. মুসনাদ, ২৪৪৩।
১৮. মুসনাদ, ৪খ., পৃ. ৩৩৫।
১৯. প্রাগুক্ত, ৬খ., পৃ. ১৯৪।
২০. উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য বুখারী, হাদীছ নং ২০৪৭; তিরযিমী, হাদীছ নং ২৬৫৮; দারিমী, ভূমিকা, পৃ. ২৪; মুসনাদ, ২খ., পৃ. ১৬১, ৪৭৫; ৪খ., পৃ. ১৫৪, ৩৬৬।
২১. ওয়াট, op.cit, পৃ. ৫৬।
২২. প্রাগুক্ত।
২৩. প্রাগুক্ত।
২৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৬।
২৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭।
২৬. দ্রষ্টব্য M.W., ১৯৩৪ খৃ., পৃ. ১৪৯।
২৭. Supra, পৃ. ৬০৯-৬২৭, ৬৫০-৬৬২।
২৮. Supra, পৃ. ৪৪২-৪৪৪।
২৯. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৫৭।
৩০. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৭-৫৮।
৩১. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮।
৩২. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৩।
৩৩. Supra, পরিচ্ছেদ ১, সেকশন ৪।
৩৪. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৫৭।
৩৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৮।
৩৬. প্রাগুক্ত।
৩৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭।
৩৮. Supra, পরিচ্ছেদ ১৮, সেকশন ৪।
ওয়াট এই উপকরণ বা তথ্যাদি কিরূপে ব্যবহার করেন তাহা দেখার পূর্বে ওয়াট-এর উপস্থাপনা বা বক্তব্য প্রকাশে সহজাত আত্মবিরোধ ও অসঙ্গতির প্রতি ইঙ্গিত করা সময়োপযোগী হইবে। তিনি অঙ্গীকার করেন যে, তিনি ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নাবলী সম্পর্কে নিরপেক্ষ থাকিবেন এবং যে কোন ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করা হইতে বিরত থাকিবেন। কিন্তু এইরূপ বলার পরপরই তিনি তাহার মত পরিবর্তন করিয়া "Mystical theology" নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেন এবং এই গ্রন্থে বর্ণিত তাহার তত্ত্বকে সত্য ও সঠিক বলিয়া ঘোষণা করেন। এই গ্রন্থে তিনি অপরিহার্যরূপে “খৃস্টান পাদ্রী-পুরহিতদের অভিজ্ঞতাসমূহ ও "অভ্যন্তরীণ" প্রার্থনা সম্পর্কে আলোচনা করেন এবং এই আলোচনার সূত্র ধরিয়া তিনি কুরআনের ওহী অথবা "মুহাম্মাদ -এর পয়গাম্বরসুলভ সচেতনতার স্বরূপ সম্পর্কে তিনি (ওয়াট) যাহা বলেন সেইসব বিষয় আলোচনা করেন। দ্বিতীয়ত, তিনি ঘোষণা করেন যে, তিনি "ইসলামের কোন মৌলিক বিশ্বাসের" বিরোধিতা করিবেন না। যাহা হউক, বাস্তবে তিনি এই ঘোষণার পরপরই ঠিক বিপরীত পথে অগ্রসর হন। উদাহরণস্বরূপ, তিনি ইহা দেখাইতে চাহেন যে, কুরআনের ওহী A. Poulain -এর সজ্ঞা অনুযায়ী "ওহী হইল বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”, নিম্নোক্ত বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ন: ইহা অর্থাৎ কুরআনিক ওহী "শব্দ ছাড়া কেবল চিন্তাগত যোগাযোগ মাত্র" ইত্যাদি। ইহা অস্বীকৃতি ছাড়া আর কিছুই নহে, ইহা অপমানজনক না হইলেও ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের অস্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস এই যে, কুরআনের ওহী "কেবল শব্দ ছাড়া চিন্তাগত যোগাযোগের মাধ্যমে" নহে এবং ইহা এমনও নহে যে, ইহা মুহাম্মাদ-এর স্বাভাবিক অথবা অস্বাভাবিক অবস্থায় সচেতনতার একটি পদ্ধতি। প্রকৃত বিষয় এই যে, ওয়াট এইখানে A. Poulain-এর তত্ত্ব উদ্ধৃত করিয়া কেবল খৃস্টান মিশনারী এবং প্রাচ্যবিদগণের চিন্তাধারা প্রমাণ করিতে চাহেন। আরও সুনির্দিষ্টভাবে বলিতে গেলে, তিনি রিচার্ড বেল-এর চিন্তাধারা প্রমাণ করিতে চাহেন, তবে বুদ্ধিজীবীসুলভ পোশাক পরাইয়াছেন মাত্র। ইহা বোধগম্য যে, একজন নিষ্ঠাবান খৃস্টান হইয়াও ওয়াট নীতিবোধ ও নৈতিক চেতনার ভিত্তিতে মুসলিম চিন্তা-চেতনার প্রতি শ্রদ্ধা রাখিয়া ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও আলোচনা করেন নাই। কিন্তু তিনি প্রকৃতপক্ষে কী করিতে চাহেন সেই সম্পর্কে নিঃসন্দেহ ও সতর্ক হওয়ার পরও ইহা তাহার জন্য ভাল হইত, যদি তিনি নিরপেক্ষ থাকার ওয়াদা না করিতেন এবং ইসলামের মৌলিক কোন বিশ্বাসকে অস্বীকার না করার প্রতিশ্রুত না দিতেন।
দুই: ওয়াট-এর বিবেচ্য তত্ত্বের প্রয়োগ
A. Poulain-এর সংজ্ঞা উল্লেখ করার পর ওয়াট আস-সুয়ূতীর আল-ইতকান গ্রন্থে উল্লিখিত এবং অন্যান্য উৎস হইতে ওহী অবতরণের "অবস্থা" বা "ধরন" সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা উপস্থাপন করেন এবং বলেন, ওহী অবতরণের মূল পদ্ধতি কুরআনের ৪২: ৫০-৫২ আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে। তিনি এই আয়াত নিম্নোক্তভাবে অনুবাদ করেন:
It belongeth not to any human being that God should speak to him except by suggestion (wahyan) or from behind a veil, or by sending a massenger to
suggest (fayuhiya) by His permission what He pleaseth... Thus We have suggested to thee a spirit belonging to Our affair (awhayna)".
"কোন মানুষের পক্ষেই ইহা সম্ভব নহে যে, আল্লাহ তাহার সঙ্গে কথা বলিবেন, কেবল তাহাকে কোন ধারণা দেওয়া ছাড়া (Wahyan; وَحْيًا) অথবা পর্দার অন্তরাল ছাড়া অথবা এমন একজন দূত প্রেরণের দ্বারা, তিনি যাহা চাহেন, তাহার অনুমতিক্রমে ধারণা দান (ফাইউহিয়া : فَيُوْحَى) করিবে...। এইভাবে আমি তোমাকে ধারণা দান করিয়াছি রূহ তথা আমার বিষয় সম্পর্কে (আওহায়না : أَوْحَيْنَا)৷"18
ওয়াট তাহার ধারাবাহিক বর্ণনায় আরও বলেন, "সুতরাং ওহী অবতরণের প্রথম পদ্ধতি" "যে ক্ষেত্রে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে কথা বলেন"। তারপর তিনি তিনটি বিষয় বর্ণনা করেন:
(এক) তিনি এই ক্ষেত্রে রিচার্ড বেলকে উদ্ধৃত করেন যিনি কুরআনে বর্ণিত ওহী পরিভাষাটির বিভিন্নমুখী ব্যবহারের বিষয়ে অধ্যয়নের পর বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ে এই "ওহী" পরিভাষাটি মূল পাঠ-এর মৌখিক যোগাযোগ-এর অর্থ বুঝাইত না, বরং "পরামর্শ", "বিস্মৃত শব্দ জোগাইয়া দেওয়া" অথবা "উদ্বুদ্ধ করা" ইত্যাদি অর্থে যাহা ব্যক্তির মনে উদিত হয়।
(দুই) ওয়াট বলেন, [রাসূল -এর "মক্কী জীবনের অধিকাংশ সময়ে" ওহী ছিল "উদ্দীপনার কাজ"। তাহার এই বর্ণনার সমর্থনে তিনি ২৬ : ১৯২-১৯৪ আয়াত উদ্ধৃত করেন যাহা তিনি নিম্নোক্তরূপে অনুবাদ করেন:
"Verily it is the revelation (tanzil) of the Lord of the Worlds, With which hath come down (nazala bihi) the Faithful Spirit Upon they heart, that thou mayest be of those who warn".
“এই ওহী অবশ্যই বিশ্বের প্রভুর (আল্লাহ্) নিকট হইতে, যাহা (পবিত্র) বিশ্বাসী আত্মার (نزل به) সঙ্গে নাযিল হয় আপনার অন্তরে, যাহাতে আপনি সতর্ককারীদের মধ্য হইতে একজন হইতে পারেন"।
ওয়াট এইখানে যোগ করেন, এইখানে সংবাদ বহনকারী ফেরেশতার উল্লেখ "সম্ভবত পরবর্তী সময়ের"।
(তিন) তিনি বলেন যে, তিনি যতদূর বলেন, রাসূলুল্লাহ -এর নিকট যাহা লইয়া আসা হয় তাহা রাসূলুল্লাহ "মক্কায় জীবনযাপন কালে" তিনি শ্রবণ করেন, এই সম্পর্কিত কোন উল্লেখ নাই। এই ক্ষেত্রে ওয়াট বলেন, "উদ্দীপনা" মুহাম্মাদ -এর অন্তরে অথবা মনে বক্তব্য ছাড়া অন্যান্য কতিপয় পদ্ধতিতে সংবাদ" প্রদান করে এবং এইভাবে ইহা "এক অভ্যন্তরীণ বাচনভঙ্গি এবং সম্ভবত এক বুদ্ধিগত বিষয়ে পরিণত হয়"।5
এক্ষণে ৪২ : ৫১-৫২ আয়াত কার্যত ওহীর প্রকৃত ধরন সম্পর্কে বর্ণনা করে, যে ওহীর মাধ্যমে আল্লাহ নিজের বক্তব্য মানুষের নিকট পৌছাইয়া দেন। এই আয়াতসমূহের যে অনুবাদ ওয়াট করিয়াছেন তাহা যুগপৎভাবে অশুদ্ধ ও বিভ্রান্তিকর। 'ওহী' ও 'আওহা' শব্দদ্বয়ের অনুবাদ
“পরামর্শ" এবং "পরামর্শকৃত” ইত্যাদি শব্দের মাধ্যমে করা সম্পূর্ণ ভুল যেমন আমরা পূর্বে উল্লেখ করিয়াছি। ৬
ওয়াট এইখানে বেল-এর রেফারেন্স দিয়াছেন এবং ওহী পরিভাষাটির অর্থ সম্পর্কে তাহার চূড়ান্ত মতামত উল্লেখ করিয়াছেন। আমরা ইতোপূর্বে তাহার নিবন্ধের বিশদ আলোচনা করিয়াছি এবং তাহার ধারণা-র “ধারণা” ইত্যাদির কথা উল্লেখ করিয়াছি। এই পরিভাষার এই ধরনের অর্থ করা মারাত্মক ভুল এবং কুরআনিক ওহীর ব্যাপারে সম্পূর্ণরূপে অপ্রযোজ্য। এই বক্তব্য অর্থাৎ “ধারণা” সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হইতে পারে না যেখানে ওহী পরিভাষাটি অথবা ইহার প্রকৃতি প্রত্যয়ান্ত শব্দ দৃষ্ট হয়, তাহা হইলে ইহা এই আয়াত হইতে একটি দৃষ্টান্ত হইবে যে, আয়াত ওয়াট এইখানে অনুবাদ করিয়াছেন। এইভাবে তর্কের খাতিরে আমরা যদি আয়াতে প্রথম অংশের 'ওয়াহ্য়ান' (وَحْيًا ) শব্দটির জন্য "Suggestion" প্রতিশব্দটি লই তাহা হইলেও অনুরূপ শব্দ দ্বারা (অর্থাৎ "Suggestion") আয়াতের একই অংশে উক্ত শব্দ 'ফাইউহিয়া' (فيوحى)-এর অনুবাদ করিলে যথাযথ হইবে না (অর্থাৎ "একজন রাসূল প্রেরণ করিয়া ধারণা বা পরামর্শ দেওয়া (?) তাহার অনুমতিক্রমে...")। এই পরবর্তী ক্ষেত্রে রাসূল কি করিবেন। কারণ তিনি একজন দূতমাত্র, ডেলিগেট বা প্রতিনিধি নহেন? বাস্তবে ঐ রকম নহে যে, তিনি "ধারণা বা পরামর্শ” দান করেন, বরং একমাত্র আল্লাহ্ ওহী পৌঁছাইয়াছেন অথবা প্রকাশ করেন। অনুরূপভাবে ইউহিয়া يُوحى শব্দটির এই ক্ষেত্রে অর্থ হইবে "জ্ঞাপন করা” অথবা “প্রকাশ করা”, "ধারণা করা” নহে, যেমন ওয়াট অনুবাদ করেন। তিনি ৫২ নম্বর আয়াতের অনুবাদেও দ্বিধান্বিত, যেমন "অনুরূপভাবে আমরা আপনাকে আমাদের বিষয় সম্পর্কে আত্মিক ধারণা দান করিয়াছি"। "আমাদের বিষয়ে আত্মার যুক্ত হওয়া" কিভাবে "ধারণা"-এর অর্থ দিতে পারে তাহা সহজে বোধগম্য নহে। এই বক্তব্যের অর্থ পরিষ্কার নহে। 'মিন আমরিনা' (مِنْ أَمْرِنَا) বক্তব্যটির এইখানে অর্থ হইল "আমাদের নির্দেশবলে” কিন্তু তাহা সত্ত্বেও আমরা যদি এই বক্তব্যের ওয়াট কর্তৃক কৃত অনুবাদ গ্রহণ করি তবে এইখানে 'রূহ' শব্দটি আওহায়না (أَوْحَيْنَا) ক্রিয়ার কর্ম (object) হিসাবে স্বীকৃত। সুতরাং 'রূহ' এমন কিছু যাহা ইতোমধ্যে ওহীকৃত (Wahy-ied) হইয়াছে। অন্য কথায় বলা যায়, এইখানে 'রূহ' শব্দটির অর্থ ওহী, যাহা কর্ম (object), ক্রিয়া নহে। কর্ম (object)-এর ধরন বা প্রকৃতি আয়াতের উপসংহারমূলক অংশে পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে যাহার বর্ণনা এইরূপঃ "তুমি তো জানিতে না কিতাব কী এবং জানিতে না ঈমান কী! পক্ষান্তরে আমি ইহাকে করিয়াছি আলো, যাহা দ্বারা আমি আমার বান্দাদিগের মধ্যে যাহাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করি..."। ৭. এই বিশ্লেষণমূলক বর্ণনা ইহা পরিষ্কার করিয়া দিয়াছে যে, পূর্বে উল্লিখিত 'রূহ' হইল গ্রন্থ অর্থাৎ মূল পাঠযোগ্য গ্রন্থ (কুরআন) যাহা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহীকৃত (Wahy-ied)।
ওয়াট-এর দ্বিতীয় যুক্তি-তর্কের বিষয়ে বলেন যে, "রাসূলুল্লাহ -এর মক্কী জীবনের অধিকাংশ সময় ওহী ছিল "আত্মার কার্যাবলী” এবং ঐ ফেরেশতাদেরকে দূত হিসাবে উল্লেখ করা
হয় "সম্ভবত" পরবর্তী সময়ে। তিনি দুইটি বিষয়ে ভুল করেন। এই সম্পর্কে তাহার উদ্ধৃত আয়াত ২৬ঃ ১৯২-১৯৪-এর দ্বারা দেখা যায় যে, তিনি এই আয়াতের মূল বক্তব্য সার্বিকভাবে অনুধাবনে ভুল করেন এবং "Faithful Spirit"-এর অর্থ নির্ণয়েও (আর-রূহুল আমীন) ভুল করেন। ওয়াট এইখানে ওহীর প্রথম পদ্ধতি সম্পর্কে বলেন অর্থাৎ “যেখানে আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে কথা বলেন" এবং অন্য কোন পদ্ধতি সম্পর্কে নহে। উদাহরণস্বরূপ "পর্দার অন্তরাল হইতে" তাহার কথা বলা অথবা "দূত প্রেরণের" মাধ্যমে কথা বলা। যাহা হউক, আয়াতে বর্ণিত বিষয় শেষে উল্লিখিত পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং প্রথমে উল্লিখিত পদ্ধতির সঙ্গে কোনক্রমেই সম্পর্কিত নহে। ইহা এই বুঝায় যে, ওয়াট এইখানে "The faithful spirit" অংশের অর্থ বুঝাইতে আল্লাহকে বুঝাইয়াছেন। ইহার পর তিনি এই আয়াত উদ্ধৃত করেন ওহীর প্রথম পদ্ধতির উদাহরণ ও বিশ্লেষণ হিসাবে এবং faithful ও spirit শব্দদ্বয়ের প্রথম অক্ষর capital letter-এ লিখেন। এরূপ করার পর তিনি খৃস্টবাদের এক উদ্ভূত ধর্মতাত্ত্বিক ধারণা কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় আমদানী করেন। তিনি রেফারেন্সে উক্ত প্রথম আয়াতের প্রয়োগ সম্পর্কে বুঝিতে মনোযোগ দিতে পারেন নাই অথবা ব্যর্থ হন। এই আয়াত কুরআনকে 'তানযীল' হিসাবে আখ্যায়িত করে অর্থাৎ কোন কিছু "অবতরণ করান” এবং প্রেরক হইলেন "বিশ্বপ্রভু”। পরবর্তী আয়াত কর্তৃত্ব বা প্রতিনিধিত্বের কথা উল্লেখ করে যাহা অবতরণ করে "যাহার সঙ্গে (নাযালা বিহি - نزل به( "বিশ্বাসী (পবিত্র( আত্মা অবতরণ করেন"। এইভাবে বিশ্বাসী আত্মা হইলেন দূত, যিনি ইহা লইয়া আসেন। আনুষঙ্গিকভাবে ইহা লক্ষণীয় যে, ওয়াট 'তানযীল' শব্দটি অনুবাদ করেন যাহা এইখানে সুস্পষ্টরূপে কুরআনিক ওহীকে বুঝায় "প্রত্যাদেশ” হিসাবে। সম্ভবত এই কারণেই এইখানে যে কোনভাবেই তিনি "Suggestion" শব্দটিকে ধারণা অর্থে প্রয়োগ করিতে পারেন না। তাহা সত্ত্বেও তাহার শর্ত এই যে, গাঠকের উচিত "তেমন সরবরাহ করা অথবা অনুরূপ যে কোন বাগবৈশিষ্ট্য প্রয়োগ করা, বর্তমান উদাহরণে যাহা অপ্রযোজ্য।
faithful spirit বক্তব্যটি সম্পর্কে বলা যায়, ইহা ইতোপূর্বেই দেখানো হইয়াছে যে, ইহা ঐ আয়াতের অনুরূপ। যেমন 'রাসূল কারীম' শব্দদ্বয় ৬৯ : ৪০ এবং ৮১ : ১৯ আয়াতসমূহে উদ্ধৃত করা হইয়াছে। পরবর্তী স্থানে (৮১ : ২১) তিনি 'আমীন' হিসাবে বর্ণিত হইয়াছেন এবং তিনি অবশ্যই একজন ফেরেশতা। ইহাও ওয়াট-এর দাবিকে অস্বীকার করে যে, "পরবর্তী সময়ে" ফেরেশতাকে দূত হিসাবে বলা হইয়াছে। ইহার পর এই বিষয়টি পরিষ্কার করিয়া বলা দরকার যে, কুরআনের কোথায়ও 'আল-আমীন' শব্দটি আল্লাহ্ গুণ অথবা নাম হিসাবে উল্লিখিত হয় নাই, ইহা বিশেষণও নহে। faithful শব্দটি spirit শব্দের মধ্যে প্রয়োগ হয় নাই যাহাকে খৃস্টানগণ "ত্রিত্ববাদ"-এর দৃষ্টিকোণ হইতে মূল্যায়ন করে। 'রূহ' পরিভাষাটি কুরআনে অনেক অর্থে ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, spirit of life, ফেরেশতা, যেমন ৪২:৫০-৫২ আয়াতে দৃষ্ট হয়, ওহীর শাবণায়।
ওয়াট-এর তৃতীয় যুক্তি এই যে, "রাসূলুল্লাহ-এর মক্কী জীবনে যাহা তাঁহার নিকট অবতারিত হইয়াছিল তাহা 'শ্রবণ করার' কোন উল্লেখ নাই"। অবশ্যই কুরআনের মক্কী সূরাসমূহে
এবং মাদানী সূরাসমূহে এমন কোন উল্লেখ নাই যে, রাসূলুল্লাহওহী বা প্রত্যাদেশ "শুনিয়াছিলেন"। ইহা এই কারণে যে, কুরআন রাসূলুল্লাহকর্তৃক রচিত ছিল না। কিন্তু কেহ যদি বিন্দুমাত্রও সতর্কতার সঙ্গে লক্ষ্য করে তাহা হইলে বুঝিতে পারিবে যে, কুরআনের রচয়িতা হইলেন আল্লাহ নিজে। আল্লাহ রাসূলুল্লাহকে কুরআন নাযিল হওয়ার প্রাথমিক পর্যায়ে এই কথা শিখাইয়া দেন যে, কিভাবে ওহী গ্রহণ করিতে হইবে এবং বারবার বলিয়া দেন, "যে আয়াত তাহার নিকট পাঠ করা হয় তাহা যেন তিনি তাড়াহুড়া করিয়া আবৃত্তি করা ও পনুরাবৃত্তি করার পূর্বে সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করেন"। "তাড়াহুড়া করিয়া ওহী আয়ত্ত করিবার জন্য তুমি তোমার জিহ্বা উহার সঙ্গে সঞ্চালন করিও না। ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই। সুতরাং যখন আমি উহা পাঠ করি তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর" (৭৫: ১৬-১৮)।৯
অনুরূপ নির্দেশ ২০: ১১৪ আয়াতে পুনর্বার দেওয়া হয়ঃ "তোমার প্রতি আল্লাহ্ ওহী সম্পূর্ণ হইবার পূর্বে কুরআন পাঠে তুমি ত্বরা করিও না"। ১০ পুনরায় অনুরূপ উদাহরণ হইল ৮৭: ৬ আয়াতঃ "নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না"। ১১ এইগুলি হইল মক্কী জীবনের প্রাথমিক সময়ের সূরা এবং এইগুলি রাসূলুল্লাহ-এর নির্ভুল প্রেরণা ও পরামর্শসম্বলিত এবং কুরআনের প্রথম শ্রবণযোগ্য আবৃত্তিকৃত আয়াত এবং তখন তিনি ইহা আবৃত্তি করেন। প্রকৃতপক্ষে কুরআন, যেমন রিচার্ড বেল্ এবং ওয়াট ইহা স্বীকার করেন যে, ইহার (কুরআনের) অর্থ পড়া/আবৃত্তি করা। ইহা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কোন কিছুই পড়া অথবা আবৃত্তি করা মনমত হয় না, এমনকি তাহা যদি "স্মৃতি হইতেও হয়, কিন্তু তাহা যদি সুনির্দিষ্ট রচনা হইতে হয় তবে সেইটি হৃদয়গ্রাহী হয় এবং আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে কুরআনে বলেন যে, তিনি এই কুরআন "আরবী ভাষায় আবৃত্তি"যোগ্য করিয়া প্রেরণ করিয়াছেন। "নিশ্চয় আমি কুরআন আরবী ভাষায় অবতীর্ণ করিয়াছি"।১২
ওয়াট মনে হয় এই বক্তব্যটি উল্লেখ করেন, 'আলা কালবিকা' (আপনার অন্তরে) ২৬: ১৯২-১৯৩ আয়াতে এই কথা বুঝাইতে যে, ওহী ছিল কতক "পরামর্শ” বা ধারণা। প্রশ্নের উল্লিখিত বক্তব্য-এর অর্থ "ধারণা” ছাড়া আর কিছুতেই প্রযোজ্য নহে। এইজন্য অতি তাড়াতাড়ি তিনি যোগ করেন যে, যাহা অবতীর্ণ হয় তাহা এই بلسان عربی مبین সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়, ২৬ঃ ১৯৪), এইভাবে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহার ধরন বর্ণনা করিয়া সন্দেহের অপনোদন করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে 'আলা কালبিকা' বক্তব্যটি জোর দেওয়ার অভিপ্রায়ে উল্লেখ করা হইয়াছে, এইরূপে মূল পাঠ অবতীর্ণ হইয়াছে এবং রাসূলুল্লাহ-এর অন্তরকে আকস্মিক আবেগে অবশ করিয়া ফেলে অর্থাৎ আল্লাহ্র ইচ্ছায় মনে এবং মস্তিষ্কে প্রোথিত হয়, ফলে তিনি ইহা ভুলেন নাই। ইহার অনুরূপ ধারণা ৭৫: ১৭ আয়াতে ব্যক্ত হইয়াছে ("ইহা সংরক্ষণ ও পাঠ করাইবার দায়িত্ব আমারই") এবং ৮৭ঃ ৬ আয়াতে বলা হইয়াছে ("নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্তৃত হইবে না")। প্রকৃতপক্ষে "আন্তরিকভাবে পাওয়া" এই বক্তব্যটি ইংরেজী ভাষার প্রকাশভঙ্গি বা বাগবৈশিষ্ট্য-এর সঙ্গে পরিচিত, যেমন স্মৃতিতে কিছু অর্পণ করা। এইসব কিছু
আমাদের মাতৃভাষার অথবা বৈদেশিক ভাষার জ্ঞান, কোন সুনির্দিষ্ট পাঠ অথবা শব্দগুচ্ছ সম্পর্কে কিছু বলা নহে, ইহার ব্যাপারে পরবর্তী তাত্ত্বিক আলোচনা করা যাহা প্রত্যেকের হৃদয়ে অনুরূপভাবে প্রাপ্ত হয় এবং নিজ নিজ ভাষা অথবা ভাষাসমূহের শব্দভাণ্ডারের প্রত্যেকটি শব্দ, যেমন আমাদেরকে অনুভূতিহীন করিয়া তোলে যখন আমরা উহাদেরকে দেখি অথবা ব্যবহার করি। আমরা কেবল ইহাদেরকে আমাদের স্মৃতি হইতে পুনঃ উৎপাদন করি (অর্থাৎ অন্তর হইতে)। 'আলা কালবিকা' বক্তব্যটি যাহা তথ্য হিসাবে আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে তাহা রাসূলুল্লাহ -এর অন্তরে আকস্মিক আবেগতাড়িত ধারণা সৃষ্টি করে এবং ইহা "পরামর্শ" -এর ধারণায় অথবা তাহার সঙ্গে ধারণাগত যোগাযোগের অর্থে নহে।
এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে ওহীর প্রথম ধরন সম্পর্কে ওয়াট আল-হারিছ ইবন হিশামের হাদীছ উদ্ধৃত করেন। ১৩ এই হাদীছে রাসূলুল্লাহ বলেন যে, কোন কোন সময় ওহী তাঁহার নিকট ঘণ্টাধ্বনির ন্যায় )صَلْصَلَةُ الْجَرَس( আসিত। ওয়াট বলেন, ইহা "সম্পূর্ণ সুসঙ্গত” প্রথম ধরন-এর সঙ্গে এবং ইহা ছিল "নিঃসন্দেহে একটি ধারণাগত অভিজ্ঞতা", একটি "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি”। তিনি বলেন, "ঘণ্টাধ্বনির শ্রবণ নিঃসন্দেহে একটি ধারণাগত অভিজ্ঞতা, কিন্তু কেহ এই ঘণ্টাধ্বনি শুনিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করে নাই অথবা কথিত শব্দসমূহ শুনে নাই, এমনকি ধারণাগতভাবেও নহে। পক্ষান্তরে অভিজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ কেবল ওহীকৃত শব্দসমূহ যাহা তাঁহার অন্তরে উদিত হয় তাহা উদঘাটন করেন। ইহা চমৎকারভাবে সুষ্পষ্ট যে, ....ইহা একটি বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গিপূর্ণ বর্ণনা”। ১৪
ইহা তাৎক্ষণিকভাবে খোলাখুলি বলা দরকার যে, ওয়াট যে ওহীকে প্রথম ধরন বলেন, ওহীর এই ধরন বা পদ্ধতিকে সম্পর্কিত বক্তব্যে তিনি সঠিক নহেন। অর্থাৎ ফেরেশতার মাধ্যম ছাড়াই ওহী আসে। উদাহরণস্বরূপ বুখারীর অনুরূপ বর্ণনার অন্য একটি ভাষ্যে ইহা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, এইটিও ওহী নাযিলের একটি পদ্ধতি ছিল যাহা ফেরেশতার দ্বারা নাযিল করা হইত। ১৫ ওয়াট এই বিষয়টিরও ভুল বর্ণনা করেন যখন তিনি বলেন, "ঘণ্টাধ্বনি শ্রবণ হইল নিঃসন্দেহে একটি কাল্পনিক অভিজ্ঞতা..."। ইহা ঘণ্টাধ্বনি শ্রবণের বিষয় ছিল না, ইহা ছিল ওহী যাহা রাসূলুল্লাহ ঘণ্টাধ্বনির মত শুনিতে পান। মিছলা )مثل( শব্দটি সালসালাহ্ শব্দের সঙ্গে একত্রে ব্যবহৃত হইয়া ইহাকে সম্পূর্ণ স্পষ্ট করিয়া দেয়। না ছিল ইহা একটি "কাল্পনিক অভিজ্ঞতা", যেমন ওয়াট ইহাকে সংজ্ঞায়িত করেন। উদাহরণস্বরূপ রাসূলুল্লাহ দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে উল্লেখ করেন, ইহা ছিল "আমার উপর কঠিনতম" এতদসঙ্গে তিনি বলেন যে, ইহা ছিল তাঁহার পক্ষে অত্যন্ত কঠিন এক শারীরিক অভিজ্ঞতা। এই অনুরূপ বিষয়টিতে হযরত 'আয়েশা (রা) আরও জোর দেন যখন তিনি বলেন যে, তিনি তাঁহাকে দেখিয়াছিলেন তাঁহার নিকট ওহী আসার সময়ে "একটি অত্যন্ত ঠাণ্ডা দিনেও তাঁহার কপাল দিয়া ঘাম ঝরিয়াছে"। ইহা আশ্চর্য ব্যাপার যে, ওয়াট এই বর্ণনা আক্ষরিকভাবে উদ্ধৃত করার পর (উদ্ধৃত শব্দগুলি তাহার নিজের) পরামর্শ দেন যে, ইহা ছিল "একটি কাল্পনিক অভিজ্ঞতা"।
ওয়াটের দ্বিতীয় গুরুতর ভুলটি তাহার বর্ণনায় বিধৃত "... কাহারও শ্রবণ করার কথা উল্লেখ নাই, যে কাহারও বলা অথবা কথিত শব্দাবলী শ্রবণের উল্লেখ নাই, এমনকি কাল্পনিকভাবেও নহে”। এক্ষণে এইখানে হাদীছের সংশ্লিষ্ট একটি অংশ এইঃ "ওয়াকাদ ওয়াআয়তু 'আনহু মা কালা” )وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْهُ مَا قَالَ( যাহার অর্থ এইঃ "এবং তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা আমি স্মৃতিতে ধারণ করিলাম"।... কোন ঘটনা ঘটার কথা তাঁহার নিকট এইভাবে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনার মাধ্যমে বলা হয়। ওয়াট এই রিপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনাকে অগ্রাহ্য করেন এবং জোর দিয়া বলেন যে, এই ঘটনায় "কেহ কথা বলিতেছে" ইহার "কোন উল্লেখ নাই"। তিনি মনে হয় এমন চিন্তা করেন যে, 'ওয়া'আয়তু' ক্রিয়াটি কোন ধারণার অর্থ বহন করে না এবং ইহা কাহারও নিজে নিজে কিছু বুঝিতে পারার অর্থ প্রকাশ করে। ইহা সম্পূর্ণ ভুল। وَعَى يَعىَ ক্রিয়ার প্রাথমিক অর্থ 'মনে করা, অভ্যন্তরে ধারণ করা, স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা, মনে রাখা, স্মরণ করা, সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করা এবং মনে রাখা' ইত্যাদি। ১৬ আরও বিশেষভাবে বলিতে গেলে বলা যায় যে, যখন ইহা 'মা কালা' )مَا قَالَ( -এর সঙ্গে বাক্যে ব্যবহৃত হয় তখন ইহা অবশ্যই 'সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করা' এবং 'যাহা বলা হইয়াছে তাহা মুখস্থ' করা' অর্থ প্রকাশ করে। ওয়াট নিজে এই বাক্যাংশটি অনুবাদ করেন এইভাবে: "And I have understood from it what He (or he) said" "...এবং আমি ইহা হইতে তাহাই বুঝিয়াছি, যাহা তিনি বলিয়াছেন"। এমন ইংরাজীতে যখন ইহা বলা হয় তখন এইভাবে বলা হয়: "I have understood what he said" "তিনি যাহা বলিয়াছেন তাহা আমি বুঝিতে পারিয়াছি", ইহা ঐ শ্রবণযোগ্য বিষয়কে বাদ দেয় না যাহা তিনি বলিয়াছেন। যাহা হউক, ওয়াট তাহার উপরোল্লিখিত বর্ণনায় অন্য আর এক ভুল করেন। তিনি মূল পাঠে উল্লিখিত 'আনহু' (عَنْهُ) শব্দটির অনুবাদ করেন "from it" (ইহা হইতে)। তিনি "ইহা” সুস্পষ্টভাবে এই অর্থ করেন যাহা তিনি কল্পনা করেন ঘণ্টাধ্বনি হিসাবে, কিন্তু ঘটনা এমন নহে। (হু) সর্বনামটি এইখানে ফেরেশতাকে বুঝাইয়াছে, সালসাতুল জারাস )صَلْصَلَة الجرس(-কে নহে। উদাহরণস্বরূপ ঐ বিষয়ে ইহা স্ত্রীবাচক সর্বনাম ৯ (হা)-এর সঙ্গে যুক্ত, 'সালসালাহ' শব্দটি স্ত্রীবাচক।
প্রকৃতপক্ষে یعی/ وعى ক্রিয়াটি ইহার বিভিন্ন ব্যবহার পদ্ধতিতে একটি যথাযথ পরিভাষা যাহা হাদীছ সাহিত্যে ব্যবহৃত হইয়া অর্থ প্রকাশ করে, 'তিনি যাহা বলিয়াছেন' তাহা মুখস্থ করা এবং "সতর্কতার সঙ্গে” শ্রবণ করা অথবা অন্য কোন ব্যক্তির দ্বারা বর্ণনা করা। নিম্নলিখিত তিনটি বৈশিষ্ট্যপূর্ণ উদাহরণ ক্রিয়ার বিশেষ অর্থ বিস্তৃতভাবে বর্ণনা করে।
(ক) আবূ হুরায়রা (রা)-এর বিখ্যাত হাদীছে তিনি বলেন:
... مَا كَانَ أَحَدٌ أَعْلَمَ بِحَدِيْثِ رَسُولِ اللهِ اللهُ مِنِّي مِنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرٍو فَإِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ بِيَدِهِ وَيَعِيَ بِقَلْبِهِ وَكُنْتُ أَعِيْهِ بِقَلْبِي وَلَا اكْتُبُ بِيَدِي ....
"আবদুল্লাহ ইবন 'আমর ছাড়া রাসূলুল্লাহ -এর হাদীছ আমার চাইতে আর কেহ বেশী জানে না। কেননা ইহা তিনি স্বহস্তে লিখিয়া লইতেন এবং অন্তরের দ্বারা মুখস্থ করিতেন। কিন্তু আমি ইহা মুখস্থ করিয়া লইয়াছিলাম এবং স্বহস্তে লিখিতাম না..."। ১৭
(খ) খালিদ আল-'আদওয়ানীর হাদীছ:
قَالَ فَسَمِعْتُهُ يَقْرَأُ وَالسَّمَاءِ وَالطَّارِقِ) حَتَّى خَتَمَهَا قَالَ فَوَعَيْتُهَا فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَأَنَا مُشْرِكٌ ثُمَّ قَرَأْتُهَا فِي الْإِسْلام ....
"তিনি বলেন, আমি তাঁহাকে পাঠ করিতে শুনিলামঃ "ওয়াস-সামাই ওয়াতারিক' শেষ পর্যন্ত তিনি পাঠ করিলেন (৮৪ নং সূরা)। তিনি বলেন, সুতরাং আমি জাহিলী যুগে মুশরিক অবস্থায় ইহা স্মৃতিতে ধরিয়া রাখিয়াছিলাম। অতঃপর আমি ইসলাম গ্রহণ করিয়া ইহা পাঠ করিলাম (অর্থাৎ তাহার ইসলাম গ্রহণের পর)"। ১৮
(গ) 'আবদুল্লাহ ইবন মাস'উদ (রা)-এর হাদীছঃ
... وَقَدْ وَعَيْتُ عَنْ كُلَّ وَاحِدٍ مِّنْهُمُ الْحَدِيثَ الَّذِي حَدَّثَنِي ...
"... এবং আমি তাহাদের প্রত্যেকের নিকট হইতে এই হাদীছ মুখস্থ করিয়া রাখিয়াছি যাহা তিনি আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন"। ১৯
আরও অনেক বর্ণনা এমন রহিয়াছে যাহাতে ক্রিয়াটি সুনির্দিষ্টভাবে "যাহা বলা হইয়াছে তাহা সতর্কতার সঙ্গে শ্রবণ করা এবং স্মৃতিতে ধরিয়া রাখা" এই অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ২০ ক্রিয়াটির অনুরূপ অর্থ কুরআনের ৬৯: ১২ আয়াত দ্বারাও সুষ্পষ্ট":
لَنَجْعَلَهَا لَكُمْ تَذكرَةً وَتَعِبَهَا أُذُنٌ وَاعِيَةٌ .
"আমি ইহা করিয়াছিলাম তোমাদের শিক্ষার জন্য এবং এইজন্য যে, যেন শ্রুতিধর কর্ণ ইহা সংরক্ষণ করে" (৬৯: ১২)।
এইরূপে ওয়াট বর্ণনায় উল্লিখিত 'ওয়া'আয়তু' ক্রিয়াটির অর্থ উপলব্ধি করিতে ভুল করেন এবং এই ধারণায় ভুল করেন যে, এইখানে বলা এবং শ্রবণ করার ব্যাপারে কোন কিছুর উল্লেখ নাই। তদুপরি রাসূলুল্লাহ তাঁহার অভিজ্ঞতার শেষ পর্যায়ে "ওহীর শব্দসমূহ কেবল তাঁহার অন্তরে প্রাপ্ত হইতেন" বর্ণনার ব্যাপারে ওয়াট-এর মূল্যায়নে মৌলিক ত্রুটি এই য়ে, যখন ইহা ওহী আগমনের একক পদ্ধতির ব্যাপারে কথা বলে, তখন তিনি এই পদ্ধতিকে দুইটি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতায় বিভক্ত করেন- একটি তথাকথিত "কাল্পনিক অভিজ্ঞতা" এবং অপরটি তথাকথিত "বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি” । বর্ণনার মূল পাঠ কিছুতেই একক পদ্ধতির এমন বিভক্তিকে সমর্থন করে
না। ওহী আসার পদ্ধতির কথা এইখানে যাহা বলা হইয়াছে তাহা 'কাল্পনিক অভিজ্ঞতা' ছিল না এবং বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গিও ছিল না। ইহা ছিল রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর দিক হইতে এক রকম শারীরিক অভিজ্ঞতা এবং মূল পাঠের এক মৌখিক যোগাযোগ যাহা তিনি শ্রবণ করেন এবং তাঁহার স্মৃতিতে ধরিয়া রাখেন।
ওহী আগমনের দ্বিতীয় পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনার সময়, যেখানে আল্লাহ্ বক্তব্য "পর্দার অন্তরাল হইতে"-এর ব্যাপারে ওয়াট বলেন যে, এই বক্তব্যটি প্রাথমিক পর্যায়ে ওহী সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর অভিজ্ঞতার উদাহরণ, "যেমন আয-যুহরী হইতে প্রাপ্ত বর্ণনার Passage 'B'-এ বর্ণিত হইয়াছে"। সেইখানে বলা হইয়াছে, "তাঁহার নিকট সত্য আসিল এবং বলিল, হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল"। ২১ ওয়াট পুনরায় বলেন, যেহেতু "পর্দার অন্তরাল হইতে” শব্দসমূহ ধারণা দেয় যে, বক্তাকে দেখা যায় নাই, ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, এই ব্যাপারে একমাত্র "শব্দাবলী শ্রুত হইয়াছে এবং এইজন্য ইহা একটি কাল্পনিক বাচনভঙ্গি (অথবা এমনকি এইটি বাহ্যিক বাচনভঙ্গি)"। ২২
উপরোল্লিখিত বাক্যসমূহে ওয়াট তাহার বক্তব্যের অসঙ্গতি স্বীকার করিয়াছেন (যদিও তিনি প্রকৃতপক্ষে তাহা উপলব্ধি করিতে পারেন নাই)। তিনি অনেক পূর্বেই Passage 'B'-এর বক্তব্য ব্যবহার করেন, বিশেষ করিয়া "তাঁহার নিকট সত্য আসিল এবং বলিল...", এই বক্তব্য তিনি আল্লাহর দর্শনের সাক্ষ্য হিসাবে উল্লেখ করেন অথবা অন্ততঃপক্ষে আল্লাহর প্রতীক-এর প্রত্যেক্ষ দৃশ্য (অথবা সম্ভবত, যেমন তিনি ধারণা করেন, মানসিক অথবা কাল্পনিকভাবে আল্লাহকে দেখা)। কিন্তু এখন তিনি সেই Passage-এর বক্তব্য উল্লেখ করেন আল্লাহ্র বক্তব্যের ধরন বিশ্লেষণ করার জন্য অর্থাৎ "পর্দার অন্তরাল হইতে" এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করার জন্য অর্থাৎ না দেখিয়া এবং এই সময় হইতে ইহা ছিল একমাত্র বিষয় যে, দৃশ্য অবলোকন ছাড়া কেবল বক্তব্য শ্রবণ-"একটি কাল্পনিক" অথবা "বাহ্যিক বাচনভঙ্গি”। ইহা কার্যত ওয়াট-এর অসঙ্গতির সহিত তাল মিলাইয়া চলা বাস্তবিকই অত্যন্ত কঠিন। একমাত্র উপদেশমূলক দৃশ্য এই যে, তিনি দ্রুত এই পদ্ধতির সংযোগ করেন, "ইহা ধারণাগত দিক হইতে সাধারণ নহে” এবং কল্পনা প্রয়াসে তিনি "হযরত মূসা (আ)-এর বর্ণনা দেওয়ার ইচ্ছা করেন"। ২৩
ওহী আগমনের তৃতীয় পদ্ধতি সম্পর্কিত বক্তব্যে বলা হইয়াছে, আল্লাহ ওহী প্রকাশের জন্য দূত প্রেরণ করেন। ওয়াট বলেন, মুসলিম পণ্ডিতগণ চিন্তা করেন, এই দূত ছিলেন জিবরাঈল এবং তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব যিনি শুরু হইতেই ওহী লইয়া আসিতেন। কিন্তু পাশ্চাত্য পণ্ডিতগণ বর্ণনা করেন যে, মাদানী জীবন শুরু না হওয়া পর্যন্ত কুরআনে জিবরাঈল (আ) তাঁহার নামসহ উল্লিখিত হন নাই। তবে কুরআন ও হাদীছে তিনি "অনেক বেশী উল্লিখিত হন", "ইহা মুসলমানদের সাধারণ ধারণার বিপরীত"। মুসলমানদের ধারণা এই যে, পরবর্তী ঘটনাকে পূর্ববর্তী ঘটনার সহিত যুক্ত করা হইয়াছে। ২৪
পরবর্তীতে ওয়াট বলেন, মাদানী জীবনকালে ওহী অবতরণের কাজ জিবরাঈল কর্তৃক সম্পন্ন হয় যাহা সাধারণ বিশ্বাসের ব্যাপার। কিন্তু এমনকি "এই ধরনের বিষয়ে ওহী ছিল ধারণাগতভাবে একটি কাল্পনিক বাচনভঙ্গি”। উদাহরণস্বরূপ, জিবরীলের উল্লেখ আসিয়াছে "একজন মানুষের আকৃতিতে” যাহা এই ধারণা দেয় যে, ইহা ছিল "একটি কাল্পনিক দৃশ্য"। ২৫
এইখানে ওয়াট একই পুরানো যুক্তির পুনরাবৃত্তি করেন যে, মাদানী জীবন শুরু না হওয়া পর্যন্ত কুরআন শরীফে জিবরাঈল নাম উল্লিখিত হয় নাই এবং ইহার ভিত্তিতে তিনি বর্ণনা করেন যে, মুসলিম ধারণা পরবর্তী ঘটনাকে পূর্ববর্তী ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত করিয়াছে।
এই সুনির্দিষ্ট বক্তব্য যথাযথ পুনরাবৃত্তি, যাহা বেল এই সম্পর্কে বলিয়াছেন। ২৬ এই মন্তব্য এবং বর্ণনা এই যে, মুসলিম ধারণা ইহার বিপরীত, যাহা কুরআনের ও হাদীছের বক্তব্য সম্বলিত। কুরআন ও হাদীছ সুস্পষ্টরূপে উপরোল্লিখিত যুক্তিভিত্তিক এবং অন্যান্য ধারণাভিত্তিক, উদাহরণস্বরূপ (ক) যেমন, আয-যুহরীর বর্ণনা "সত্য" (the truth) সম্পর্কে বলেন এবং জিবরাঈল যে ওহী লইয়া আসেন, তাহার উল্লেখ নাই; (খ) যেমন সূরাতুন নাজম-এর আয়াত আল্লাহ্র দর্শন সম্পর্কে কথা বলে; এবং (গ) যেমন, ওহী পরিভাষাটি, যেমন কুরআনে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা মূল পাঠ-এর মৌখিক প্রত্যাদেশের অর্থ প্রকাশ করে না। এই সকল ধারণা ইতিপূর্বে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হইয়াছে এবং ভুল ও অসমর্থনীয় বলিয়া প্রতিভাত হইয়াছে। ২৭
📄 তিন: কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে কুরআনের আরও প্রমাণ
(১) পবিত্র কুরআনের ১২৫টিরও অধিক আয়াতে কুরআন যে নাযিলকৃত সেই বিষয়টি সম্পর্কে বলা হইয়াছে (তানযীল, تَنْزِيْلُ আন্যালনা اَنْزَلْنَا, মুনায্যাল مُنَزِّل ইত্যাদি)। এইখানে এই বিষয়টি জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, প্রত্যাদিষ্ট বিষয়টি ছিল সুনির্দিষ্ট মূল পাঠ। কোন কোন বিমূর্ত চিন্তা অথবা ধারণা অথবা প্রেরণায় "অবতীর্ণ" হয় নাই। কতিপয় আয়াতে, উদাহরনস্বরূপ ৬:৯৩ আয়াতে 'উনযিলা' ও 'আন্যালা' এই দুইটি শব্দের প্রয়োগ 'উহিয়া' ও 'আওহা' ৩৯ শব্দদ্বয়ের সঙ্গে অত্যন্ত সামঞ্জস্যপূর্ণ। ১২৫ অথবা অনুরূপ সংখ্যকবারের মধ্যে কমপক্ষে আরও ৩৪ বার শব্দটি আল্লাহ "ইহা অবতীর্ণ করিয়াছেন" এই অবয়বে উল্লিখিত হইয়াছে (নায্যালা نَزَّلَ এবং আনযালা أَنْزَلَ)।৪০ পুনরায় আল্লাহ নিজে তাঁহার বক্তব্যে প্রথম পুরুষে কমপক্ষে ৩৪বার বলেন, "আমি ইহা অবতীর্ণ করিয়াছি” (আন্যালতু اَنْزَلْتُ, আনযালনা اَنْزَلْنَا, নায্যালনা نَزَّلْنَا)। ৪১ কমপক্ষে ৪৪ বার ইহা কর্মবাচ্যে বলা হইয়াছে যে, “ইহা অবতীর্ণ করা হইয়াছে” (উনযিলা أُنْزِلَ, উনযিলাত أُنْزِلَتْ, নুযাযিলা نُزِّلَ, নুযাযিলাত نُزِّلَتْ, ইয়ুনায্যালু يُنَزِّلُ, তুনায্যালু تُنَزِّلُ)। ৪২ এবং কমপক্ষে ১৪ বার কুরআন "যাহা নাযিলকৃত” হিসাবে বর্ণিত হইয়াছে (তানযীল تَنْزِيل, মুনায্যাল مُنَزِّلُ)। ৪৩ পুনরায় এই সম্পর্কে সকল সন্দেহ দূর করার জন্য আল্লাহ নিজে নিম্নেবর্ণিত আয়াতে দ্ব্যর্থহীনভাবে সাক্ষ্য দিয়াছেন:
لَكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ بِمَا أَنْزَلَ إِلَيْكَ أَنْزَلَهُ بِعِلْمِهِ وَالْمَلْئِكَةُ يَشْهَدُونَ وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا.
"পরন্তু তোমার প্রতি আল্লাহ যাহা অবতীর্ণ করিয়াছেন তাহা তিনি সজ্ঞীনে নাযিল করিয়াছেন (এই সম্পর্কে পূর্ণ সচেতনতা সহকারে)। আল্লাহ ইহার সাক্ষ্য দেয় এবং ফেরেশতাগণও সাক্ষ্য এবং সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট" (৪: ১৬৬)।
(২) অনুরূপভাবে অন্ততপক্ষে এক ডজনবার জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, “যাহা অবতীর্ণ করা হইয়াছে তাহা আরবী ভাষায় এক সুনির্দিষ্ট শব্দে বলা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
إِنَّا أَنْزَلْنَهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا ... (۱۲ : ۲). "ইহা আমিই অবতীর্ণ করিয়াছি আরবী ভাষায় কুরআন" (১২ঃ ২)।
وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَلَمِينَ .... بِلِسَانِ عَرَبِي مُبِين . "নিশ্চয় আল-কুরআন জগতসমূহের প্রতিপালক হইতে অবতীর্ণ, ................. অবতীর্ণ করা হইয়াছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়" (২৬ঃ ১৯২...১৯৫) ।৪৪
(৩) এই কুরআন সামগ্রিকভাবে নাযিল করা হইয়াছে, এমনকি কয়েক গণ্ডারও বেশি সংখ্যক আয়াতে ইহা 'কিতাব' (পুস্তক) হিসাবে উল্লিখিত বা বর্ণিত রহিয়াছে। ৪৫. নিম্নে এই ধরনের কতিপয় আয়াত উল্লেখ করা হইল:
تَنْزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَّبِّ الْعَلَمِينَ . "এই কিতাব জগতসমূহের প্রতিপালকের নিকট হইতে অবতীর্ণ, ইহাতে কোন সন্দেহ নাই" (৩২:২)।
تَنْزِيلُ الْكِتَبِ مِنَ اللَّهِ الْعَزِيزِ الْحَكِيمِ . إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ.. "এই কিতাব অবতীর্ণ পরাক্রমশালী প্রজ্ঞাময় আল্লাহর নিকট হইতে। আমি তোমার নিকট এই কিতাব যথাযথভাবে অবতীর্ণ করিয়াছি..." (৩৯:১-২)।
اللَّهُ نَزَّلَ أَحْسَنَ الْحَدِيثِ كتبًا "আল্লাহ অবতীর্ণ করিয়াছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব" (৩৯ : ২৩)।
(৪) ইহা উল্লেখযোগ্য যে, উপরে উল্লিখিত আয়াতে, যাহা নাযিল করা হইয়াছে সেই বক্তব্যকে "বক্তব্য/বাণী" অথবা "পাঠ” (হাদীছ) হিসাবে অভিহিত করা হয়। অনুরূপ বর্ণনা অন্যান্য আয়াতেও উল্লিখিত হয়। উদাহরণস্বরূপ :
فَذَرْنِي وَمَنْ يُكَذِّبُ بِهَذَا الْحَدِيثِ .. "সুতরাং যাহারা এই বাণীকে প্রত্যাখ্যান করে তাহাদিগকে আমার হাতে ছাড়িয়া দাও” (৬৮:৪৪)।
فَلْيَأْتُوا بِحَدِيث مِثْلِهِ إِنْ كَانُوا صُدِقِينَ.. “উহারা যদি সত্যবাদী হয় ইহার সদৃশ কোন রচনা উপস্থিত করুক না" (৫২ : ৩৪)। ১৬
(৫) একই সমান গুরুত্বপূর্ণ যে, নাযিলকৃত ওহীকে আল্লাহ্র নির্দেশ (Decree- হুকুম), তাঁহার আদেশ/নির্দেশ (Amr - امر) হিসাবে বর্ণনা করা হয়। "ইহা আল্লাহর বিধান যাহা তিনি তোমাদের প্রতি নাযিল করিয়াছেন” (৬৫ : ৫)। উদাহরণস্বরূপ বর্ণনা :
ذلِكَ أَمْرُ اللَّهِ أَنْزَلَهُ إِلَيْكُمْ وَكَذلِكَ أَنْزَلْنَاهُ حُكْمًا عَرَبِيًّا "ইহা আল্লাহ্র বিধান যাহা তিনি তোমাদের প্রতি নাযিল করিয়াছেন" (৬৫ : ৫)। "এবং এইভাবে আমি উহা অবতীর্ণ করিয়াছি এক নির্দেশ, আরবী ভাষায়” (১২: ৩৭)।
(৬) ইহা সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, যাহা অবতীর্ণ করা হইয়াছে, উহাকে সুনির্দিষ্টভাবে একটি সূরা বলিয়া অভিহিত করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ :
ورَةً أَنْزَلْتُهَا وَفَرَضْتُهَا وَأَنْزَلْنَا فِيهَا أَيْتِ بَيِّنَتِ . "ইহা একটি সূরা, ইহা আমি অবতীর্ণ করিয়াছি এবং ইহার বিধানকে অবশ্য পালনীয় করিয়াছি, ইহাতে আমি অবতীর্ণ করিয়াছি সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ” (২৪:১)।
يَحْذَرُ الْمُنْفِقُونَ أَنْ تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ.. "মুনাফিকেরা ভয় করে, তাহাদের সম্পর্কে এমন এক সূরা অবতীর্ণ না হয়..." (৯:৬৪)। ৪৭
(৭) পুনরায় বলা যায় যে, যাহা "প্রেরিত হইয়াছে", তাহাকে যিক্র পরিভাষায় উল্লেখ করা হয় (উদ্ধৃতি, ঘটনা, বর্ণনা, স্মৃতিচারণ)। উদাহরণস্বরূপঃ
اِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَاِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ. "আমিই কুরআন (যিক্র) অবতীর্ণ করিয়াছি এবং আমিই উহার সংরক্ষক” (১৫ : ৯)।
وَقَالُوْا يَا أَيُّهَا الَّذِيْ نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ اِنَّكَ لَمَجْنُوْنٌ. "উহারা বলে, 'ওহে যাহার প্রতি কুরআন (যিক্র) অবতীর্ণ হইয়াছে। তুমি তো নিশ্চয় উন্মাদ” (১৫ : ৬)।
... وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ. "এবং আমি তোমার প্রতি কুরআন (যিক্র) অবতীর্ণ করিয়াছি মানুষকে সুস্পষ্টভাবে বুঝাইয়া দিবার জন্য যাহা তাহাদের প্রতি অবতীর্ণ করা হইয়াছে” (১৬ : ৪৪)।৪৮
(৮) ইহা ছাড়াও "অবতীর্ণ করা বা নাযিল করা" এই পরিভাষার বদলে কুরআনিক ওহী বুঝাইবার জন্য অন্যান্য পরিভাষাও ব্যবহৃত। এই ধারাবাহিকতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা হইল 'ইলকা'; ইহার অর্থ 'প্রকাশ করা, নিক্ষেপ করা, সবেগে নিক্ষেপ করা বা উপর হইতে ছুঁড়িয়া দেওয়া, হুকুম করা' ইত্যাদি, যাহা প্রথমদিকে নাযিলকৃত সূরাসমূহে ব্যবহৃত হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
اِنَّا سَنُلْقِي عَلَيْكَ قَوْلاً ثَقِيلاً. "আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করিতেছি গুরুভার বাণী” (৭৩ : ৫)।
اُلْقِيَ الذِّكْرُ عَلَيْهِ مِن بَيْنِنَا. অন্য একটি প্রাথমিক পর্যায়ের আয়াতে এই পরিভাষাটি উল্লিখিত হয়: "আমাদিগের মধ্যে কি উহার প্রতি প্রত্যাদেশ হইয়াছে” (৫৪ : ২৫)?
(৯) অনুরূপ গুরুত্বপূর্ণ শব্দ হইল ওয়াস্সালনা (وَصَّلْنَا), ইহার অর্থ "আমরা পৌঁছাইয়া দিয়াছি"। এই শব্দটি কুরআনের ওহী নাযিল হওয়ার প্রসঙ্গে ব্যবহৃত হইয়াছে, যেমন:
وَلَقَدْ وَصَّلْنَا لَهُمُ الْقَوْلَ لَعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُوْنَ. "আমি তো উহাদিগের নিকট পরপর বাণী পৌঁছাইয়া দিয়াছি, যাহাতে উহারা উপদেশ গ্রহণ করে" (২৮ : ৫১)।
(১০) অনুরূপভাবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আয়াতে 'কাসাস্না' (قَصَصْنَا) (আমরা বর্ণনা করিয়াছি) এবং 'নাকুস্সু' (نَقُصُّ) (আমরা বর্ণনা করি) শব্দদ্বয় 'আওহায়না' (أَوْحَيْنَا) (আমরা প্রত্যাদেশ করিয়াছি) এবং 'নূহী' (نوحى) (আমরা প্রত্যাদেশ প্রেরণ করি) শব্দদ্বয়ের অনুরূপ অর্থ বহন করে। উদাহরণস্বরূপ:
تلك القرى نقص عليك من أنبائها "এই সকল জনপদের কিছু বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বিবৃত করিতেছি” (৭:১০১)।
وكلا نقص عليك من أنباء الرسل . نحن نقص عليك نبأهم بالحق . "রাসূলদিগের ঐ সকল বৃত্তান্ত আমি তোমার নিকট বর্ণনা করিতেছি” (১১: ১২০)। "আমি তোমার নিকট উহাদিগের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করিতেছি” (১৮: ১৩)।৫০
ইহা উল্লেখ্য যে, যেসকল আয়াত বর্ণনা করা হইল উহার সব কয়টিতেই এই পরিভাষাটি "বিবরণ / বর্ণনা" ইত্যাদি (নাবা, আন্না) অর্থে প্রযোজ্য।
(১১) আরও অধিকতর তাৎপর্য রহিয়াছে কতিপয় বক্তব্যের মধ্যে, যেমন: نفرى, নুরিউ "আমরা ইহা পাঠ করিয়াছি”; قرآنا, কারা'না: "আমরা পাঠ করিয়াছি” এবং نتلو ,নাতলু, "আমরা আবৃত্তি করিয়াছি" : نوحى (নূহী) এবং أوحينا (আওহায়না) শব্দের পরিবর্তে উপরিউক্ত শব্দগুলি আসিয়াছে। উদাহরণস্বরূপ:
سنقرئك فلا تنسى . "নিশ্চয় আমি তোমাকে পাঠ করাইব, ফলে তুমি বিস্মৃত হইবে না" (৮৭:৬)।
فإذا قرأته فاتبع قرأنه . "সুতরাং যখন আমি উহা পাঠ করি, তুমি সেই পাঠের অনুসরণ কর" (৭৫: ১৮)।
تلك أيت الله نتلوها عليك بالحق . "এইগুলি আল্লাহ্ আয়াত যাহা আমি তোমার নিকট পাঠ করিতেছি যথাযথভাবে" (৪৫:৬)।৫০
ইহা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, উপরে বর্ণিত ৮ ও ৯ ক্রমিক নম্বরে উল্লিখিত বক্তব্য অনুযায়ী, যাহা কিছু রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাকে قول অর্থাৎ আল্লাহর বক্তব্য বা কথা/শব্দ বলে। ৫১ এই পরিভাষাটির ইতোপূর্বে উল্লিখিত হাদীছের (বর্ণনা, বক্তব্য) এবং কালিমাত (শব্দসমূহ)-এর অনুরূপ তাৎপর্য রহিয়াছে। পক্ষান্তরে قل (তুমি বল), এই বক্তব্যটি কুরআনে কমপক্ষে ৩৩২ বার উল্লিখিত হইয়াছে। সুতরাং জোর দিয়া বলা যায় যে, আল্লাহ্র রাসূল আল্লাহ্ পক্ষ হইতেই নির্দেশনা প্রাপ্ত হন।
পুরা বিষয়টির সারমর্ম এই দাঁড়ায় যে, কমপক্ষে অর্ধ ডজন বিভিন্ন ধরনের পরিভাষা কুরআনে ব্যবহৃত হইয়াছে 'ওহী' শব্দের পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট কুরআনের ওহী অবতরণকে বুঝাইবার জন্য। এইসব পরিভাষা পুনরায় আলোচনা করা যাইতে পারে:
(ক) আনযালনা (اَنْزَلْنَا) : "আমরা অবতীর্ণ করিয়াছি": মূল শব্দে বিভিন্ন গঠন কাঠামোয় এবং পুনঃ পুন প্রতিভাত হয় যে, কুরআন একটি "নাযিলকৃত” (তানযীল, মুনায্যাল) বিষয়।
(খ) ওয়াসালনা وَصَلْنَا : "আমরা পৌছাইয়াছি"।
(গ) নুকরিউ/কারা'না (نُفْرى / قرآنًا) : "আমরা ইহা পাঠ করিয়াছি"।
(ঘ) নাতলূ (نتلوا) : "আমরা আবৃত্তি” করিয়াছি।
(ঙ) নুল্কী (نتلقى) : "আমরা নিক্ষেপ করি/পৌছাইয়া দেই”
(চ) নাকুসু (نَقُصُ) : "আমরা বিববরণ দেই/বর্ণনা করি"।
এই শব্দগুলি সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করে যে, যাহা কিছু রাসূলুল্লাহ -এর নিকট নাযিল হইয়াছিল তাহা ছিল সুনির্দিষ্ট পাঠযোগ্য পদ্ধতিতে, কিন্তু প্রমাণাদি কেবল একটি পরিভাষায় সীমাবদ্ধ নহে। ঐ আয়াতসমূহ 'ওহী' পরিভাষার সঙ্গে অন্যান্য পরিভাষা সম্বলিতও ছিল এবং অনেক বর্ণনায় দ্ব্যর্থহীনভাবে বলা হয় যে, অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ -এর কাছে যাহা অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহা ছিল এই যে:
(ক) A Quran, কুরআন (পাঠ/আবৃত্তি)।
(খ) A Kitab, কিতাব (পুস্তক/ধর্মগ্রন্থ)।
(গ) A Surah, সূরা (সূরা, অধ্যায়)।
(ঘ) Hadith, হাদীছ (আল্লাহ্র বর্ণনা/বক্তব্য)।
(ঙ) Qawl, কাওল (আল্লাহ্ বাণী/বক্তব্য)।
(চ) Kalimat, কালিমাত (আল্লাহ্ কথাসমূহ)।
(ছ) Hukm, হুম (আল্লাহ্র আদেশ/নির্দেশ)।
(জ) Amr, আম্র (আল্লাহ্র নির্দেশ)।
(ঝ) 'Anba, আন্না (আল্লাহ প্রদত্ত বিবরণ/বর্ণনাসমূহ)।
অবশ্যই উপরিউক্ত পরিভাষা ও শব্দাবলী ছাড়াও কুরআনের ওহী বুঝাইবার জন্য আরও পরিভাষা রহিয়াছে। যাহা হউক, উপরের আলোচনা হইতে ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত যে, কুরআনের ওহীর ধরন সম্পর্কে কুরআনী সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং ইহার সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের ধারণা পরস্পর বিরোধী। অতএব উদাহরণস্বরূপ বলা যায়:
(ক) কুরআন বলে (এবং প্রামাণ্য বিবরণ অনুরূপ ঘটনার ক্ষেত্রে পুনঃ বর্ণিত) যে, আল্লাহ একজন দূত-ফেরেশতাকে (জিবরীল) কুরআনের ওহীসহ রাসূলুল্লাহ-এর নিকট প্রেরণ করেন। পক্ষান্তরে প্রাচ্যবিদগণ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ফেরেশতার আগমন ছিল "সম্ভবত" একটি "বুদ্ধিগত" বিষয় অথবা তাঁহার পক্ষে একটি "কাল্পনিক” দৃশ্য মাত্র!
(খ) কুরআন বলে যে, কুরআনের ওহী প্রাপ্ত হওয়ার প্রাথমিক স্তরে রাসূলুল্লাহ ওহী মুখস্থ করার জন্য তাড়াহুড়া করিয়া তাঁহার জিহ্বা বারবার সঞ্চালন করিতেন। কিন্তু তিনি এইরূপ না করার জন্য (আল্লাহ কর্তৃক) নির্দেশিত হন এবং আল্লাহ তাঁহাকে কুরআন স্মরণে রাখা ও আবৃত্তি বা তিলাওয়াত করায় সক্ষমতা দানের প্রতিশ্রুতি দেন। পক্ষান্তরে প্রাচ্যবিদগণ বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর অভিজ্ঞতা ছিল "সম্ভবত" একটি 'বাহ্যিক বিষয়' অথবা একটি 'বুদ্ধিগত' বাচনভঙ্গিপূর্ণ বিষয়।
(গ) কুরআন বলে যে, ইহা আল্লাহ্র 'বাণী' (কালিমাত), তাঁহার "বক্তব্য" (কাওল/হাদীছ), 'একটি পুস্তক' (কিতাব), যাহা রাসূলুল্লাহ-এর প্রতি অবতীর্ণ হয় এবং ইহা "সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়" অবতীর্ণ হয়। পক্ষান্তরে প্রাচ্যবিদগণ জোর দিয়া বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর কেবল বুদ্ধিগত বাচনভঙ্গি ছিল "শব্দাবলী ছাড়া" এবং এমনকি "কোন সুনির্দিষ্ট ভাষা ছাড়া"! সুস্পষ্টভাবে এইরূপ ধারণার কোন সমর্থন কুরআনে বিদ্যমান নাই, যে কোন "তথ্যাদি" দ্বারা ইহা বিন্যস্ত করা হউক না কেন।
ওহী পরিভাষা ও ইহার সমতুল্য পরিভাষাসম্বলিত আয়াতসমূহ ছাড়া কুরআনে অনেক সংখ্যক এমন ঘটনার উল্লেখ করা হইয়াছে যেগুলি সুস্পষ্টরূপে কুরআনের ওহীর ধরন প্রকাশ করে। যেমন:
(১) কুরআন স্বয়ং এবং রাসূলুল্লাহ নিজেও দৃঢ়ভাবে এবং বারবার অবিশ্বাসীদের এই দাবি অস্বীকার করেন যে, ইহা (কুরআন) তাঁহার নিজের রচনা ছিল। বর্ণিত আছে যে, এমন গুরুতর পাপী কেহ নাই যে নিজ হইতে একটি পুস্তক রচনা করিবে এবং ইহাকে আল্লাহ্র রচিত পুস্তক বলিয়া মিথ্যা দাবি করিবে এবং রাসূলুল্লাহ যদি এমন দাবি করিতেন তাহা হইলে তিনি এমন অপরাধমূলক কাজের জন্য কঠিন শাস্তি এড়াইতে পারিতেন না। ৫২
(২) ঘনিষ্ঠভাবে সংশ্লিষ্ট এই ধরনের পুনঃ পুনঃ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান একটি চ্যালেঞ্জস্বরূপ, যাহার সম্পর্কে কুরআন (এবং এমনকি রাসূলুল্লাহ নিজেও) (কুরআনের বিরুদ্ধে) সকল যুগের কুৎসা রটনাকারীদেরকে প্রাপ্ত কুরআনের অনুরূপ একটি গ্রন্থ রচনা করার চ্যালেঞ্জ প্রদান করে। ইহা অবশ্যই উল্লেখযোগ্য যে, এই চ্যালেঞ্জ পরবর্তী কালে তথাকথিত ইসলামী গোড়াপন্থীদের কোন অনুষঙ্গ নহে, বরং একান্তভাবেই কুরআনের নিজস্ব চ্যালেঞ্জ। ৫৩ এই চ্যালেঞ্জ অদ্যাবধি উন্মুক্ত। কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে, ইহা ঐ সময়কার চ্যালেঞ্জ যখন কুরআন এবং রাসূলুল্লাহ উভয়ে 'ইহা তাঁহার রচনা' বলিয়া যে অভিযোগ ছিল তাহা প্রত্যাখ্যান করেন।
(৩) কুরআন আরও বলে যে, ঐ সময়ের অবিশ্বাসী কাফিররা পরোক্ষভাবে স্বীকার করিয়া লয় যে, কুরআন প্রকৃতপক্ষে রাসূলুল্লাহ -এর নিজের রচনা নহে। যখন তহারা এই বাস্তবতা উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইল যে, তিনি নিজে এই কুরআন রচনা করিতে অপারগ, তখন তাহারা আর একটি বিকল্প অভিযোগ আনিল যে, অন্য কেহ তাঁহার জন্য এই কুরআন রচনা করিয়া দিয়াছে। ঐ অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাখ্যান ও খণ্ডন করা হয়। ৫৪
(৪) কাফিরদের পক্ষ হইতে আর একটি পরোক্ষ স্বীকারোক্তি এই ছিল যে, যদিও তাহারা রাসূলুল্লাহ -এর নিকট কিছু সুনির্দিষ্ট অলৌকিক বিষয় প্রদর্শনের দাবি করিয়াছিল কিন্তু তাহারা কুরআনের অসাধারণত্ব সম্পর্কে তাহাদের আশ্চর্যান্বিত হওয়ার বিষয়টি গোপন করিতে পারে নাই। অতএব যখন কোন একটি সূরা অথবা কোন আয়াত তাহাদিগকে পেশ করা হইত তখন তাহারা মন্তব্য করিত যে, ইহা “একটি সুস্পষ্ট মায়া”, “এক সুস্পষ্ট যাদু” (سحر مبین) (৫৫ তাহাদের এই কথার দ্বারা ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, সর্বোপরি তাহারা কুরআনের আয়াতসমূহকে রাসূলুল্লাহ -এর সাধারণ বক্তব্য হিসাবে বিবেচনা করিত না এবং তাহারা আয়াতসমূহকে যে ধরনের রচনা শ্রবণ করিতে অভ্যস্ত ছিল, সেই ধরনের রচনার সঙ্গে তুলনা করার চিন্তাও করিত না।
(৫) ইহা আরও উল্লেখ্য যে, অবিশ্বাসী কাফিররা রাসূলুল্লাহ -কে পুনঃ পুনঃ তাগাদা দিত তাহাদেরকে ভিন্ন ধরনের কুরআন অথবা ইহার পরিবর্তে অন্য কিছু দেওয়ার জন্য। ইহার উত্তরে তিনি তাহাদেরকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলেন যে, তাঁহার কাছে যাহা ওহী করা হয়, এমনকি ইহার একটি শব্দ পর্যন্ত পরিবর্তন করার কোন ক্ষমতা তাঁহার নাই এবং তিনি নিজে অক্ষরে অক্ষরে ইহার অনুসরণ করিতে বাধ্য। অবিশ্বাসী কাফিরদের এই দাবি সম্পর্কে কুরআন বলেঃ
وَإِذَا تُتْلَى عَلَيْهِمْ آيَاتُنَا بَيْنَتٍ قَالَ الَّذِينَ لَا يَرْجُونَ لِقَاءَنَا ائْتِ بِقُرْآنٍ غَيْرِ هَذَا أَوْ بَدِّلْهُ قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَبَدَّلَهُ مِنْ تِلْقَائِي نَفْسِي إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَى إِلَيَّ .
"যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তাহাদের নিকট পাঠ করা হয় তখন যাহারা আমার সাক্ষাতের আশা পোষণ করে না তাহারা বলে, তুমি অন্য এক কুরআন আন ইহা ছাড়া অথবা ইহাকে বদলাও। বল, নিজ হইতে ইহা বদলানো আমার কাজ নহে। আমার প্রতি যাহা ওহী হয় আমি কেবল তাহাই অনুসরণ করি" (১০: ১৫)।
উপরের আয়াতের শেষ বাক্যটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শুধু তাহাই নহে, রাসূলুল্লাহ কুরআন রচনা করেন নাই, এমনকি তিনি ইহার একটি শব্দও পরিবর্তন করার এখতিয়ার রাখেন না। ইহার আদেশ ও নির্দেশ মানিয়া চলা তাঁহার নিজের জন্য অপরিহার্য। ৫৬
(৬) পুনরায়, আল্লাহ্র রাসূল -এর রিসালাত-পূর্ব জীবনের কথা উল্লিখিত হইয়াছে এই বাস্তব তথ্য তুলিয়া ধরার জন্য যে, কুরআন মোটেই তাঁহার রচনাকর্ম ছিল না। অতএব নিম্নলিখিত আয়াত উপরের বর্ণনার সমর্থন করে:
فَلَوْ شَاءَ اللَّهُ مَا تَلَوْتُهُ عَلَيْكُمْ وَلَا أَدْرَاكُمْ بِهِ فَقَدْ لَبِثْتُ فِيكُمْ عُمُرًا مِنْ قَبْلِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ
“বল, আল্লাহ্র সেরূপ অভিপ্রায় হইলে আমি তোমাদিগের নিকট ইহা পাঠ করিতাম না এবং তিনিও তোমাদিগকে এ বিষয়ে অবহিত করিতেন না। আমি তো ইহার পূর্বে তোমাদিগের মধ্যে জীবনের দীর্ঘকাল অবস্থান করিয়াছি। তবুও কি তোমরা বুঝিতে পার না” (১০ : ১৬)?
উপরিউক্ত আয়াত প্রকৃতপক্ষে অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছে। (এক) ইহা সাধারণত তাঁহার নবুওয়াত-পূর্ব জীবনের চরিত্র ও আচার-আচরণের প্রতি ইঙ্গিত করে, বিশেষ করিয়া তাঁহার সত্যবাদিতা ও সততা সম্পর্কে। এইভাবে ঘটনার প্রতি জোর দিয়া বলা হয় যে, তিনি এমন কোন ব্যক্তিত্ব ছিলেন না, যিনি তাঁহার সম্প্রদায়ের নিকট হঠাৎ করিয়া তাঁহার স্বপক্ষে এক মিথ্যা দাবি নিয়া আবির্ভূত হন এবং তিনি তাঁহার সম্প্রদায়কে যে শিক্ষা দেন তাহাও মিথ্যা ছিল না।
(দুই) ইহা এই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে কমপক্ষে তাঁহার চল্লিশ বৎসরের জীবনে তিনি কখনও তাঁহার জনগণের নেতা হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন নাই, এমনকি তিনি তাঁহার সমাজের সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কার সাধনের কোন ইচ্ছাও প্রকাশ করেন নাই।
(তিন) তিনটির মধ্যে সর্বাহইতে গুরুত্বপূর্ণ হইল, তিনি কখনও কোন সাহিত্যিক কৃতিত্ব অথবা উচ্চাকাঙ্খা প্রদর্শন করেন নাই এবং তাঁহার নিকট ওহী আগমনের পূর্বে তিনি আরবী ভাষার একটি বাক্যও রচনা করেন নাই। তিনি বাস্তবতাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান করে। উদাহরণস্বরূপ ইহা সাধারণ জ্ঞানের বিষয় যে, একজন মানুষ, যাহার কোন সাহিত্যিক অভিজ্ঞতা অথবা প্রশিক্ষণ নাই, তিনি কোনভাবেই একটি প্রথম শ্রেণীর অথবা অতুলনীয় সাহিত্যকর্ম হঠাৎ করিয়া রচনা করিতে পারেন না, এমনকি তিনি যদি অন্য কোন উৎস হইতে সাহিত্য রচনার জন্য ধারণা ও বিষয়বস্তুও প্রাপ্ত হন, তাহা হইলেও সম্ভব নহে।
(৭) কুরআন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈজ্ঞানিক তথ্যসমৃদ্ধ, সাম্প্রতিক কালে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে যাহার অর্থ ও তাৎপর্য সুস্পষ্টভাবে প্রকাশিত হইতেছে। ১৭ এই উদাহরণ ইহা প্রমাণ করে যে, রাসূলুল্লাহ নিজে অথবা তাঁহার অন্য কোন অনুগত সহকারী এই ধরনের কুরআনের মূল পাঠ রচনা করিতে সক্ষম ছিলেন না।
(৮) সর্বশেষ কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নহে, ফাতরাহ অর্থাৎ ওহী আগমনে বিরতি অথবা সাময়িক বিরতির ঘটনা, যাহা ইতোপূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, ইহা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, ইহা কোনভাবেই রাসূলুল্লাহ -এর ব্যক্তিত্বের কারণে হয় নাই এবং এমনকি ইহা তাঁহার কোন সচেতন কর্মকাণ্ডের ফলও ছিল না। ইহা যদি অপ্রূপ হইত তাহা হইলে ওহী আগমনে না থাকিত কোন বিরতি এবং ‘ফাতরাহ’র ফলে রাসূলুল্লাহ -এর ঐ সম্পর্কে না থাকিত কোন বিচলিত ভাব ও দুঃখবোধ।
টিকাঃ
৩৯. কুরআনের আয়াত নিম্নরূপ: وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ كَذِبًا أَوْ قَالَ أُوحِيَ إِلَى وَلَمْ يُوْحَ إِلَيْهِ شَيْ وَمَنْ قَالَ سَأُنْزِلُ مِثْلَ مَا أَنْزَلَ اللهُ. "যে আল্লাহ সম্বন্ধে মিথ্যা রচনা করে কিংবা বলে, 'আমার নিকট ওহী হয়, যদিও তাহার প্রতি নাযিল হয় না এবং যে বলে, আল্লাহ যাহা নাযিল করিয়াছেন আমিও উহার অনুরূপ নাযিল করিব, তাহার চেয়ে বড় জালিম আর কে" (৬:৯৩)?
৪০. আয়াতগুলি এইঃ কুরআন ২:২৯; ২:১৭০; ২: ২৩১; ৩:৪৪; ৩:৪৭; ৪:৪৬১; ৪: ১১৩; ৪: ১৩৬; ৪:১৬৬; ৫:৪; ৫:৪৫; ৫:৪৭; ৫:৪৮;৫: ৪৯ (দুইবার); ৫: ১০৪; ৬:৪৯১; ৬:৪৯৩; ৬: ১১৪; ৯:৯৭; ১৬: ২; ১৬: ২৪; ১৬: ৩০; ১৬: ১১০; ১৮:১; ২৫:৬; ৩১: ২১; ৩৬: ১৫; ৪২: ১৫; ৪২: ১৭; ৪৭:৯; ৫৭:৯; ৬৫: ৫ এবং ৬৫:৯।
৪১. আয়াতগুলি নিম্নরূপ: কুরআন ২৪৪১; ২:৯৯; ৪:১০৫; ৪: ১৭৪; ৫:৪৮; ৬:৯২; ৬: ১১৫; ১০:৯৪; ১২: ২; ১৩:৩৭; ১৪:১; ১৬:৪৪; ১৭: ১০৫; ১৭: ১০৬; ২০: ২; ২০: ১১৩; ২১: ১০; ২১:৫০; ২২: ১৬; ২৪: ১; ২৪: ৩৪; ২৪: ৪৬; ২৯:৪৭; ২৯:৫১; ৩৮: ২৯; ৩৯:২; ৩৯:৪১; ৪৪:৩; ৫৮:৫; ৫৯: ২১; ৬৪:৮; ৭৬: ২৩; ৯৭:১।
৪২. আয়াতগুলি নিম্নরূপঃ কুরআন أنزل = ২:৪; ২:৯১; ২:১৩৬; ২:১৮৫; ২: ২৮৫; ৩ঃ ৭২; ৩:৮৪; ৩: ১৯৯; ৪:৬০; ৪: ১৬২; ৫:৬৭; ৫:৭০; ৫:৭১; ৫:৮৪; ৫:৮৬; ৬:১৫৬; ৬:১৫৭; ৭:২; ৭:৩; ৭: ১৫৭; ১১: ১৪; ১৩: ১; ১৩: ১৯; ১৩: ৩৬; ২৯:৪৬; ২৯:৪৬; ৩৮:৮; ৩৯:৫৫; ৪৬:৩০। أنزلت ৯:৮৬; ৯:১২৪; ৯:১২৭; ২৮:৮৭; ৪৭ : ২০ । نزل = ১৫:৬; ১৬:৪৪ ২৫: ৩২; ৪৩: ৩১; ৪৭ : ২। نزلت = ৪৭:২: ৮৭২01। تنزل = ২:১৫০৫; ২:১৫০৮। يُنزل = ৬:৬৮।
৪৩. আয়াতগুলি নিম্নরূপঃ কুরআন ৬:১১৪; ১৭:১০৬; ২০:৪; ২৬:১৯২; ৩২:২; ৩৬:৫; ৩৯:১; ৪০:২; ৪১:৪২; ৪৫: ২; ৪৬: ২; ৫৬:৮০; ৬৯:৪৩; ৭৬: ২৩।
৪৪. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ১৩: ৩৭; ১৬: ১০৩; ১৯:৯৭; ২০: ১১৩; ৩৯: ২৮; ৪১: ৩; ৪২: ৭ এবং ৪৩: ৩।
৪৫. উদাহরণস্বরূপ আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ২:১৭৬; ২: ২৩১; ৩:৪৩; ৩:৪৭; ৪:১৫৫; ৪: ১১৩; ৪: ১৩৬; ৪: ১৪০; ৫:৪৮; ৬:৯২; ৬:১৫৫; ৭:২; ৭: ১৯৬; ১৪:১; ১৫:৬; ১৫:৯; ১৬:৪৪; ১৬:৬৪; ১৬:৮৯; ১৭:১০৬; ১৮:১; ২০:২; ২১৪ ১০; ২৯:৪৭; ২৯: ৫১; ৩৮: ২৯; ৩৯:৪১; ৪২: ১৫; ৪২: ১৭; ৪৫: ২; ৪৬: ৩০।
৪৬. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ৭: ১৮৫; ১৮:৬; ৪৫:৪৬; ৫৩:৫৯; ৫৬:৮১ এবং ৭৭:৫০।
৪৭. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ৯:৮৬; ৯:১২৭; এবং ৪৭: ২০।
৪৮. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ৭ : ৬৩; ৭: ৬৯; ১২:১০৪; ২১:২; ২১৪৫০; ২৬:৫; ৩৬:১১; ৩৬:৬৯; ৩৮:১; ৩৮:৮; ৩৮:৪৯; ৩৮:৮৭; ৪১৪৪১; ৪৩:৫; ৪৩:৪৪; ৫৪: ২৫; ৬৮: ৫১; ৬৮: ৫২ এবং ৮১: ২৭।
৪৯. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ৪: ১৬৪; ৬:৫৭; ১১:১০০; ১২:৪৩; ১৬:১১৮; ১৮: ১৩; ২০: ৯৯ এবং ৪০ ৭৮।
৫০. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ২৪ ২৫২; ৩: ২৮; ৩: ১০৮।
৫১. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ১৮: ৩৯; ২৩: ৬৮; ৬৯: ৪০; ৮১: ১৯সং এবং ৮৬: ১৩।
৫২. কুরআন ৩:৯৪; ৬:২১; ৬:৯৩; ৬:১৪৪; ৭:৩৭; ১০:৩৭; ১০; ৩৭-৩৮; ১০: ৬৯; ১১:১৩; ১১:১৮; ১১:৩৫; ১৬:১১৬; ১৮:১৫; ২১৪৫; ২৫:৪; ২৯:৬৮; ৩২৪ ৩; ৪২: ২৪; ৪৬:৮; ৬১৪৭ এবং ৬৯: ৪৪-৪৭।
৫৩. কুরআন ২: ২৩; ১১: ১৩; ৫২৪৩৪।
৫৪. কুরআন ১৬: ১০৩; আরও দ্রষ্টব্য, Supra, পরিচ্ছেদ ১১, সেকশন ৪।
৫৫. উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য কুরআন ৫:১১০; ৬: ৭; ১০: ৭৬; ১১৪ ৭; ২১৪৩; ২৭: ১৩; ৩৪:৪৩; ৩৭: ১৫; ৪৩: ৩০; ৪৬: ৭; ৫২: ২; ৬: ১৬ এবং ৭৪: ২৪।
৫৬. আরও দ্রষ্টব্য কুরআন ৬: ১০৬; ৭: ২০৩ এবং ৪৬: ৯।
৫৭. Supra, পরিচ্ছেদ ১২, সেকশন ২।
৫৮. ফুরআন ২১:৫।