📄 পাঁচ: আবৃত্তি করুন (পড়ুন)
এই উপ-শিরোনামে ওয়াট তিনটি বিষয় পর পর তিনটি অনুচ্ছেদে আলোচনা করেন। প্রথম অনুচ্ছেদে তিনি সূরাতুল আলাক নাযিল হওয়া সম্পর্কে হাদীছের অনেকগুলি ভাষ্য উল্লেখ করেন এবং পরে আয-যুহরীর বর্ণনার রেফারেন্স সহকারে বলেন যে, মা আক্রাউ (مَا أَقْرَ) শব্দটি হাদীছে দৃষ্ট হয়, যাহা অবশ্যই অনুবাদ করিতে হইবে, আমি পড়িতে (অথবা আবৃত্তি করিতে) পারি না”। উদাহরণ স্বরূপ এই স্থলে একটি পার্থক্য রহিয়াছে, যেমন অন্যান্য ভাষ্যে বলা হইয়াছে, মা আনা বি কারিইন (مَا آنَا بقارئ) এবং কারণ এই যে, ইন্ন হিশাম মা আক্রাউ এবং মা যা আক্সাউ (مَا ذَا أَقْرَهُ - مَا أَقْرَاءُ) -এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। দ্বিতীয় ভাষ্যটির অর্থ "আমি কী আবৃত্তি করিব?" ইহা বলিয়া ওয়াট জোর দিয়া উল্লেখ করেন, "পরে উল্লিখিত ভাষ্যটির অর্থ অধিক বাস্তবসম্মত, প্রথমে উল্লিখিত 'মা আক্রাউ'-এর তুলনায়"। এই বর্ণনার সমর্থনে তিনি হাদীছ বর্ণনাকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করিয়া বলেন, "ইহা প্রায় নিশ্চিত যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ উল্লিখিত শব্দসমূহের স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত অর্থ পরিহার করিয়াছেন"। এই মতবাদ তুলিয়া ধরার জন্য বলেন, "মুহাম্মাদ লিখিতে পারিতেন না যাহা ছিল কুরআন শরীফের অলৌকিক প্রকৃতির প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ"। ৫৬ তিনি এই সম্পর্কে আত্-তাবারীর তাফসীরে প্রদত্ত আবদুল্লাহ্ ইবন শাদ্দাদের বর্ণনাও উদ্ধৃত করেন। ৫৭ তিনি বলেন যে, মূল পাঠ-এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন যে, মা (ما) শব্দটি 'কী' (what) অর্থে লওয়া হইয়াছে। কেননা ইহার পূর্ববর্তী শব্দ হইল "এবং"।
ওয়াট তখন দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বেল্-এর ধারণা পুনরুল্লেখ করেন যে, 'কারাআ' এবং 'কুরআন' (قرآن-قراً) শব্দ সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দাবলী হইতে লওয়া হইয়াছে এবং কুরআন শব্দের অর্থ "পড়া, পাঠ করা" এবং "ধর্মশাস্ত্র পাঠ”। ৫৮ ইহা বলার পর ওয়াট আরও বলেন যে, 'ইকরা' (اقرا) ক্রিয়াটির পরবর্তী শব্দরূপের অর্থ 'পড়'। এই সূরায় সম্ভবত ইহার অর্থ "স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করা বা পড়া"। যেমন এমন স্মৃতি হইতে যাহা আলৌকিকভাবে তাঁহার নিকট অবতীর্ণ করা হইয়াছে। ৫৯
ইহার পর ওয়াট তাহার এই উপ-শিরোনামের আলোচ্য বিষয়ের শেষ অনুচ্ছেদে বলেন যে, মুসলিম পণ্ডিতদের সার্বজনীন ধারণার ব্যাপারে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, "ইহাই কুরআনের ওহীকৃত প্রথম সূরা"। তিনি তখন ব্যাখ্যা করিয়া বলেন, এই সূরা "প্রার্থনা করার একটি নির্দেশনা" এবং তিনি বেল্-এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করিয়া (যিনি বলেন যে, সূরাটি এমন সময় নাযিল হয় যখন রাসূলুল্লাহ কতিপয় অনুসারী একত্র করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন) বলেন যে, “ইহা সম্ভবত একটি ভাল পর্যায় বা সময় ছিল, যখন তিনি ইহা অন্যদের নিকট প্রচার করিতে শুরু করেন"। তাহা সত্ত্বেও ওয়াট দৃঢ়তা সহকারে বলেন, এই সম্ভাব্যতা কোনক্রমেই উড়াইয়া দেওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ ইতোমধ্যেই আরও বাণী লাভ করিয়াছিলেন যাহা তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই। হাদীছে ইহার একটি উদাহরণ রহিয়াছে, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬০
এক্ষণে প্রথম আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে ইহা পরিষ্কার যে, ওয়াট এই সম্পর্কে যাহা কিছু বলেন, তাহার উদ্দেশ্য ছিল ইহা নস্যাত করা যে, রাসূলুল্লাহ পড়িতে বা লিখিতে জানিতেন না। তাঁহার লেখা-পড়া না জানার বিষয়টি এবং প্রাচ্যবিদদের এই সম্পর্কিত ধারণা ইতোমধ্যে আলোচিত হইয়াছে। ৬১ এই ব্যাপারে এইখানে কেবল ইহাই বলা যায় যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণের যুক্তি প্রদর্শনের বিষয় পরিহার করা হইয়াছে যেখানে 'মা আক্রাউ' শব্দের ""স্বাভাবিক অর্থ” করা হইয়াছে যাহা সম্পূর্ণ অন্যায্য। ইহাও সত্য নহে যে, রাসূলুল্লাহ-এর লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত তথাকথিত মতবাদ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। পবিত্র কুরআন এই সম্পর্কে বলে : وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتب وَلَا تَخْطُهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ "তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯ : ৪৮)। রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত "মতবাদ" কে কি বলা হয়, অনুরূপভাবে ইহার উপর ভিত্তি করিয়া এবং কুরআনের অনুরূপ অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় এবং ইহা পরবর্তী কালের উদ্ভাবন নহে। তদুপরি ইহা বলা সঠিক নহে যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ শব্দসমূহের তথাকথিত স্বাভাবিক অর্থ পরিহার করিয়াছেন। তাঁহাদের অনেকেই বিভিন্ন ভাষ্য বিবেচনা করিয়াছেন এবং ভাষ্যগুলির অর্থের নির্দেশ করিয়াছেন। ওয়াট শব্দসমূহের স্বাভাবিক অর্থের ব্যাপারে যে জিদ করিয়াছেন তাহার সম্ভবত দুইটি ভাষ্যে উদ্ধৃত 'মা' (ما) শব্দটি 'না'বোধক নাকি 'প্রশ্নবোধক' এই ব্যাপারে তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন।
ওয়াট তাহার প্রথম অনুচ্ছেদে যাহা বলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে তাহার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে 'ইকরা' শব্দের মূল উৎস ও অর্থ সম্পর্কে তাহার আলোচিত বিষয়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। আমরা এই প্রশ্নের উপর আলোচনা দীর্ঘ করার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি না, যে প্রশ্নের ভাষ্যে বলা হইয়াছে—'ইকরা' এবং 'কুরআন' শব্দ দুইটি সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। এমনকি বেল-এর মতে যাহাকে ওয়াট উদ্ধৃত করেন, 'কুরআন' অর্থ “পড়া” অথবা "ধর্মীয় পাঠ”। কিন্তু যদি, যেমন ওয়াট আমাদের বিশ্বাস করাইতে চাহেন, 'ইকরা' ক্রিয়াপদ একমাত্র পরবর্তীতে “পড়” অর্থে আসে এবং যদি এই সূরা আল-'আলাক-এর আয়াতে রাসূলুল্লাহ -কে নির্দেশ আকারে বলা হয় "পড়ুন আপনার স্মৃতি হইতে” যাহা অতিপ্রাকৃতভাবে তাহার নিকট অবতারিত হইয়াছিল। পরে ওয়াট-এর পূর্বের সকল মন্তব্য, বিশেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা এবং মুহাদ্দিছগণের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন, এই উভয় বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ পড়া অথবা লেখার সক্ষমতার প্রয়োজন হয় না, যদি স্মৃতি হইতে কেবল আবৃত্তি করার কাজ হয়। সুস্পষ্টরূপে ওয়াট প্রথমে ধারণা করেন, পড়ার অর্থকে ক্রিয়া হিসাবে গণ্য করেন এবং ঐ ভিত্তিতে তাহার উপরোল্লিখিত মন্তব্য করেন। পরে তিনি তাহার অবস্থান পরিবর্তন করেন, শব্দের ঐ অর্থ বাতিল করেন এবং এই ধারণা দেন যে, ইহা কেবল স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার নির্দেশ-এর অর্থ বুঝায় ইত্যাদি। পুনরায় বলা যায়, তিনি ইহা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কখন এবং কিভাবে মুহাম্মাদ সূরা 'ইকরা'-এর মাধ্যমে যোগাযোগের পূর্বে অতিপ্রাকৃতিক অবতরণ গ্রহণ করেন এবং ইকরা সূরার পূর্বের সম্ভাব্য ঐ সূরাগুলি কি ছিল অথবা সূরাসমূহের জন্য কি সংবাদ ছিল এবং সেইগুলি কি আবৃত্তি করার প্রয়োজন ছিল? সুস্পষ্টরূপে ওয়াট এইখানে যাহাকে "দৃশ্য" (the vision) বলা হইয়াছে তাহার পূর্বে রাসূলুল্লাহ যে ওহী লাভ করিয়াছিলেন তাহার সেই পুরানো ধারণার পুনরাবৃত্তি করার ইচ্ছা করেন।
কিন্তু পুনরায় আরেকবার ওয়াট তাহার তৃতীয় অনুচ্ছেদে কিছুটা বিরোধিতা করেন যাহা তিনি দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেও বলেন। তিনি বলেন যে, এই ধারণার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, সূরা ইব্রা ছিল কুরআনের সর্বপ্রথম ওহীকৃত অংশ। এই বিবরণের কঠোর অনুষঙ্গ এই পরামর্শ বাতিলের প্রয়োজন বলিয়া মনে করে। কারণ সেইখানে বলা হইয়াছে যে, সূরা ইব্রা-এর পূর্বে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অন্য সূরা নাযিল হইয়াছিল, ওয়াট তাহার এই শেষ বর্ণনার ব্যাপারে উত্থাপিত সমস্যার কথা মনে হয় স্বীকার করেন। অতঃপর তিনি তাহার আলোচ্য অনুচ্ছেদের শেষদিকে দৃঢ়তা সহকারে বলেন যে, "মুহাম্মাদ ইতোপূর্বে অবশ্যই অন্যান্য সংবাদ প্রাপ্ত হন, যেগুলিকে তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই"। যেমন উহার একটি উদাহরণ নিম্নোক্ত শব্দসমূহ, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬২ এই শেষ বক্তব্যটি আলোচ্য বিষয়টিকে কেবল ভিন্ন পথে সরাইয়া নেওয়ার প্রচেষ্টামাত্র। এইখানে 'ইকরা'-পূর্ব অন্য সূরা প্রাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা অথবা সূরা ইব্রা-পূর্ব সংবাদ যাহা কুরআনের অংশবিশেষ গঠন করে এবং রাসূলুল্লাহ -কে সূরা ইকরা-এ স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার জন্য বলা হয় এবং এই সম্পর্কে নহে, যে ক্ষেত্রে ওয়াট নিজে ইহাকে (ইকরা-পূর্ব সংবাদ) কুরআনের অংশ নহে বলিয়া স্বীকার করেন। তদুপরি যদি ওহী, যেমন তিনি ও তাহার শিক্ষক বেল্ মনে করেন, কেবল বাস্তব চরিত্রের জন্য "উদ্বুদ্ধকরণ” বা "পরামর্শ” হইত যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করেন এমনভাবে যে, যাহা হইতে এমন কিছু বাহির হয় না, যে প্রণোদনায় "তিনি স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করিতে পারেন"। যাহা হউক এই বিরোধিতার পরিণতিতে পরবর্তী দুই পৃষ্ঠায় লিখেন, যেখানে ওয়াট বলেন যে, “দৃশ্য” (vision) এবং এই সম্বোধন "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" এই দুইটি ঘটনা "মূল আহবানের" প্রায় তিন বৎসর পর সংঘটিত হইয়াছিল। ৬৩ যেমন (ওয়াট এইখানে বলেন) এই বর্ণনাটি আয-যুহরীর বর্ণনায় ওয়াট তাহার প্যারা B-এ বর্ণনা করেন।
টিকাঃ
৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
৫৭. প্রাগুক্ত।
৫৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭, উদ্ধৃতি বেল, Origin etc., পৃ. ৯০।
৫৯. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৭।
৬০. প্রাগুক্ত।
৬১. দ্রষ্টব্য Supra, পৃ. ৪৪১-৪৫০।
৬২. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৭।
৬৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯।
এই উপ-শিরোনামে ওয়াট তিনটি বিষয় পর পর তিনটি অনুচ্ছেদে আলোচনা করেন। প্রথম অনুচ্ছেদে তিনি সূরাতুল আলাক নাযিল হওয়া সম্পর্কে হাদীছের অনেকগুলি ভাষ্য উল্লেখ করেন এবং পরে আয-যুহরীর বর্ণনার রেফারেন্স সহকারে বলেন যে, মা আক্রাউ (مَا أَقْرَ) শব্দটি হাদীছে দৃষ্ট হয়, যাহা অবশ্যই অনুবাদ করিতে হইবে, আমি পড়িতে (অথবা আবৃত্তি করিতে) পারি না”। উদাহরণ স্বরূপ এই স্থলে একটি পার্থক্য রহিয়াছে, যেমন অন্যান্য ভাষ্যে বলা হইয়াছে, মা আনা বি কারিইন (مَا آنَا بقارئ) এবং কারণ এই যে, ইন্ন হিশাম মা আক্রাউ এবং মা যা আক্সাউ (مَا ذَا أَقْرَهُ - مَا أَقْرَاءُ) -এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। দ্বিতীয় ভাষ্যটির অর্থ
"আমি কী আবৃত্তি করিব?" ইহা বলিয়া ওয়াট জোর দিয়া উল্লেখ করেন, "পরে উল্লিখিত ভাষ্যটির অর্থ অধিক বাস্তবসম্মত, প্রথমে উল্লিখিত 'মা আক্রাউ'-এর তুলনায়"। এই বর্ণনার সমর্থনে তিনি হাদীছ বর্ণনাকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করিয়া বলেন, "ইহা প্রায় নিশ্চিত যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ উল্লিখিত শব্দসমূহের স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত অর্থ পরিহার করিয়াছেন"। এই মতবাদ তুলিয়া ধরার জন্য বলেন, "মুহাম্মাদ লিখিতে পারিতেন না যাহা ছিল কুরআন শরীফের অলৌকিক প্রকৃতির প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ"। ৫৬ তিনি এই সম্পর্কে আত্-তাবারীর তাফসীরে প্রদত্ত আবদুল্লাহ্ ইবন শাদ্দাদের বর্ণনাও উদ্ধৃত করেন। ৫৭ তিনি বলেন যে, মূল পাঠ-এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন যে, মা (ما) শব্দটি 'কী' (what) অর্থে লওয়া হইয়াছে। কেননা ইহার পূর্ববর্তী শব্দ হইল "এবং"।
ওয়াট তখন দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বেল্-এর ধারণা পুনরুল্লেখ করেন যে, 'কারাআ' এবং 'কুরআন' (قرآن-قراً) শব্দ সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দাবলী হইতে লওয়া হইয়াছে এবং কুরআন শব্দের অর্থ "পড়া, পাঠ করা" এবং "ধর্মশাস্ত্র পাঠ”। ৫৮ ইহা বলার পর ওয়াট আরও বলেন যে, 'ইকরা' (اقرا) ক্রিয়াটির পরবর্তী শব্দরূপের অর্থ 'পড়'। এই সূরায় সম্ভবত ইহার অর্থ "স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করা বা পড়া"। যেমন এমন স্মৃতি হইতে যাহা আলৌকিকভাবে তাঁহার নিকট অবতীর্ণ করা হইয়াছে। ৫৯
ইহার পর ওয়াট তাহার এই উপ-শিরোনামের আলোচ্য বিষয়ের শেষ অনুচ্ছেদে বলেন যে, মুসলিম পণ্ডিতদের সার্বজনীন ধারণার ব্যাপারে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, "ইহাই কুরআনের ওহীকৃত প্রথম সূরা"। তিনি তখন ব্যাখ্যা করিয়া বলেন, এই সূরা "প্রার্থনা করার একটি নির্দেশনা" এবং তিনি বেল্-এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করিয়া (যিনি বলেন যে, সূরাটি এমন সময় নাযিল হয় যখন রাসূলুল্লাহ কতিপয় অনুসারী একত্র করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন) বলেন যে, “ইহা সম্ভবত একটি ভাল পর্যায় বা সময় ছিল, যখন তিনি ইহা অন্যদের নিকট প্রচার করিতে শুরু করেন"। তাহা সত্ত্বেও ওয়াট দৃঢ়তা সহকারে বলেন, এই সম্ভাব্যতা কোনক্রমেই উড়াইয়া দেওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ ইতোমধ্যেই আরও বাণী লাভ করিয়াছিলেন যাহা তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই। হাদীছে ইহার একটি উদাহরণ রহিয়াছে, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬০
এক্ষণে প্রথম আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে ইহা পরিষ্কার যে, ওয়াট এই সম্পর্কে যাহা কিছু বলেন, তাহার উদ্দেশ্য ছিল ইহা নস্যাত করা যে, রাসূলুল্লাহ পড়িতে বা লিখিতে জানিতেন না। তাঁহার লেখা-পড়া না জানার বিষয়টি এবং প্রাচ্যবিদদের এই সম্পর্কিত ধারণা ইতোমধ্যে আলোচিত হইয়াছে। ৬১ এই ব্যাপারে এইখানে কেবল ইহাই বলা যায় যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণের যুক্তি প্রদর্শনের বিষয় পরিহার করা হইয়াছে যেখানে 'মা আক্রাউ' শব্দের ""স্বাভাবিক অর্থ” করা হইয়াছে যাহা সম্পূর্ণ অন্যায্য। ইহাও সত্য নহে যে, রাসূলুল্লাহ-এর
লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত তথাকথিত মতবাদ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। পবিত্র কুরআন এই সম্পর্কে বলে :
وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتب وَلَا تَخْطُهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
"তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯ : ৪৮)।
রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত "মতবাদ" কে কি বলা হয়, অনুরূপভাবে ইহার উপর ভিত্তি করিয়া এবং কুরআনের অনুরূপ অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় এবং ইহা পরবর্তী কালের উদ্ভাবন নহে। তদুপরি ইহা বলা সঠিক নহে যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ শব্দসমূহের তথাকথিত স্বাভাবিক অর্থ পরিহার করিয়াছেন। তাঁহাদের অনেকেই বিভিন্ন ভাষ্য বিবেচনা করিয়াছেন এবং ভাষ্যগুলির অর্থের নির্দেশ করিয়াছেন। ওয়াট শব্দসমূহের স্বাভাবিক অর্থের ব্যাপারে যে জিদ করিয়াছেন তাহার সম্ভবত দুইটি ভাষ্যে উদ্ধৃত 'মা' (ما) শব্দটি 'না'বোধক নাকি 'প্রশ্নবোধক' এই ব্যাপারে তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন।
ওয়াট তাহার প্রথম অনুচ্ছেদে যাহা বলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে তাহার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে 'ইকরা' শব্দের মূল উৎস ও অর্থ সম্পর্কে তাহার আলোচিত বিষয়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। আমরা এই প্রশ্নের উপর আলোচনা দীর্ঘ করার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি না, যে প্রশ্নের ভাষ্যে বলা হইয়াছে—'ইকরা' এবং 'কুরআন' শব্দ দুইটি সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। এমনকি বেল-এর মতে যাহাকে ওয়াট উদ্ধৃত করেন, 'কুরআন' অর্থ “পড়া” অথবা "ধর্মীয় পাঠ”। কিন্তু যদি, যেমন ওয়াট আমাদের বিশ্বাস করাইতে চাহেন, 'ইকরা' ক্রিয়াপদ একমাত্র পরবর্তীতে “পড়” অর্থে আসে এবং যদি এই সূরা আল-'আলাক-এর আয়াতে রাসূলুল্লাহ -কে নির্দেশ আকারে বলা হয় "পড়ুন আপনার স্মৃতি হইতে” যাহা অতিপ্রাকৃতভাবে তাহার নিকট অবতারিত হইয়াছিল। পরে ওয়াট-এর পূর্বের সকল মন্তব্য, বিশেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা এবং মুহাদ্দিছগণের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন, এই উভয় বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ পড়া অথবা লেখার সক্ষমতার প্রয়োজন হয় না, যদি স্মৃতি হইতে কেবল আবৃত্তি করার কাজ হয়। সুস্পষ্টরূপে ওয়াট প্রথমে ধারণা করেন, পড়ার অর্থকে ক্রিয়া হিসাবে গণ্য করেন এবং ঐ ভিত্তিতে তাহার উপরোল্লিখিত মন্তব্য করেন। পরে তিনি তাহার অবস্থান পরিবর্তন করেন, শব্দের ঐ অর্থ বাতিল করেন এবং এই ধারণা দেন যে, ইহা কেবল স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার নির্দেশ-এর অর্থ বুঝায় ইত্যাদি। পুনরায় বলা যায়, তিনি ইহা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কখন এবং কিভাবে মুহাম্মাদ সূরা 'ইকরা'-এর মাধ্যমে যোগাযোগের পূর্বে অতিপ্রাকৃতিক অবতরণ গ্রহণ করেন এবং ইকরা সূরার পূর্বের সম্ভাব্য ঐ সূরাগুলি কি ছিল অথবা সূরাসমূহের জন্য কি সংবাদ ছিল এবং সেইগুলি কি আবৃত্তি করার প্রয়োজন ছিল? সুস্পষ্টরূপে ওয়াট এইখানে যাহাকে "দৃশ্য" (the vision) বলা হইয়াছে
তাহার পূর্বে রাসূলুল্লাহ যে ওহী লাভ করিয়াছিলেন তাহার সেই পুরানো ধারণার পুনরাবৃত্তি করার ইচ্ছা করেন।
কিন্তু পুনরায় আরেকবার ওয়াট তাহার তৃতীয় অনুচ্ছেদে কিছুটা বিরোধিতা করেন যাহা তিনি দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেও বলেন। তিনি বলেন যে, এই ধারণার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, সূরা ইব্রা ছিল কুরআনের সর্বপ্রথম ওহীকৃত অংশ। এই বিবরণের কঠোর অনুষঙ্গ এই পরামর্শ বাতিলের প্রয়োজন বলিয়া মনে করে। কারণ সেইখানে বলা হইয়াছে যে, সূরা ইব্রা-এর পূর্বে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অন্য সূরা নাযিল হইয়াছিল, ওয়াট তাহার এই শেষ বর্ণনার ব্যাপারে উত্থাপিত সমস্যার কথা মনে হয় স্বীকার করেন। অতঃপর তিনি তাহার আলোচ্য অনুচ্ছেদের শেষদিকে দৃঢ়তা সহকারে বলেন যে, "মুহাম্মাদ ইতোপূর্বে অবশ্যই অন্যান্য সংবাদ প্রাপ্ত হন, যেগুলিকে তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই"। যেমন উহার একটি উদাহরণ নিম্নোক্ত শব্দসমূহ, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬২ এই শেষ বক্তব্যটি আলোচ্য বিষয়টিকে কেবল ভিন্ন পথে সরাইয়া নেওয়ার প্রচেষ্টামাত্র। এইখানে 'ইকরা'-পূর্ব অন্য সূরা প্রাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা অথবা সূরা ইব্রা-পূর্ব সংবাদ যাহা কুরআনের অংশবিশেষ গঠন করে এবং রাসূলুল্লাহ -কে সূরা ইকরা-এ স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার জন্য বলা হয় এবং এই সম্পর্কে নহে, যে ক্ষেত্রে ওয়াট নিজে ইহাকে (ইকরা-পূর্ব সংবাদ) কুরআনের অংশ নহে বলিয়া স্বীকার করেন। তদুপরি যদি ওহী, যেমন তিনি ও তাহার শিক্ষক বেল্ মনে করেন, কেবল বাস্তব চরিত্রের জন্য "উদ্বুদ্ধকরণ” বা "পরামর্শ” হইত যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করেন এমনভাবে যে, যাহা হইতে এমন কিছু বাহির হয় না, যে প্রণোদনায় "তিনি স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করিতে পারেন"। যাহা হউক এই বিরোধিতার পরিণতিতে পরবর্তী দুই পৃষ্ঠায় লিখেন, যেখানে ওয়াট বলেন যে, “দৃশ্য” (vision) এবং এই সম্বোধন "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" এই দুইটি ঘটনা "মূল আহবানের" প্রায় তিন বৎসর পর সংঘটিত হইয়াছিল। ৬৩ যেমন (ওয়াট এইখানে বলেন) এই বর্ণনাটি আয-যুহরীর বর্ণনায় ওয়াট তাহার প্যারা B-এ বর্ণনা করেন।
📄 ছয়: সূরা আল-মুদ্দাছছির: বিরতি কাল
ওয়াট এখন তাহার ৫ম উপ-শিরোনামের উপর আলোচনা করেন। তিনি তাহার অনুচ্ছেদে জাবির ইবন আবদুল্লাহ্ আল্-আনসারী (রা)-র বর্ণিত হাদীছ উদ্ধৃত করেন। সেই হাদীছে বলা হইয়াছে, আল্-মুদ্দাছছির-এর প্রথম আয়াত ছিল প্রথম নাযিলকৃক্ত ওহী। ওয়াট বলেন যে, ইহা কেবল এমন হইত যে, "যদি মুহাম্মাদ কোন প্রস্তুতিকাল ছাড়া তাঁহার কোন প্রকাশ্য দীনের দাওয়াত দিতে অপ্রত্যাশিতভাবে প্রবেশ করিতেন"। কেননা এই সূরা নিম্নবর্ণিত শব্দ সম্বলিত যেমন, "উঠ এবং সতর্ক কর", যে ক্ষেত্রে সূরা ইব্রা এই ধরনের কোন নির্দেশনা-সম্বলিত নহে এবং এইজন্য পরোক্ষভাবে প্রকাশ্য দীনের দাওয়াতের কথাও বুঝায় না।
সুতরাং তিনি লক্ষ্য করেন যে, "অত্যন্ত সম্ভাব্য ধারণা" হইল, এই সূরা আল-মুদ্দাছছির-এর আয়াত দ্বারা প্রকাশ্যে দীনের দাওয়াতের সূচনা হয়। এই বিবরণের সমর্থনে তিনি ইবন ইসহাকের উক্তি উদ্ধৃত করেন যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার তিন বৎসরের মিশন সম্পন্ন করার পর আল্লাহ্র নিকট হইতে তাঁহার কাছে যাহা আসিয়াছিল সেই বিষয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা দেওয়ার জন্য নির্দেশিত হইয়াছিলেন। ৬৪ ওয়াট অপর একটি প্রমাণ হাদীছের উদ্ধৃতিতে উল্লেখ করেন। ঐ হাদীছে বলা হয় যে, প্রথম তিন বৎসরের জন্য ফেরেশতা "আস্রাফিল" (ইসরাফীল), ওয়াট-এর শাব্দিক উচ্চারণ মতে, যিনি রাসূলুল্লাহ -এর নিকট ওহী আনয়নের "মাধ্যম" হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সম্পর্কে ওয়াট 'ফাত্রাহ্' (ওহী অবতরণে বিরতি)-এর কথা উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, আয-যুত্রী এই ফাতরাহ-এর কথা উল্লেখ করিয়া এই হাদীছের সমন্বয় সাধন করেন এই ধারণার মাধ্যমে যে, সূরা আল-'আলাক প্রথম নাযিল হয়। ৬৫ ওয়াট কর্তৃক দীনের প্রকাশ্য দাওয়াত ও অপ্রকাশ্য দাওয়াত-এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করা সুস্পষ্টভাবে মুসলিম পণ্ডিতদের নবুওয়াত (Call to Prophethood) এবং রিসালাত (Commission to preach)-এর মধ্যে পার্থক্যকে ভিত্তি করিয়াই করা হইয়াছে। মুসলিম পাণ্ডিত্যপূর্ণ মতামতও কম-বেশী সর্বসম্মতভাবে এই বলে যে, সূরাতুল মুদ্দাছছির-এর প্রথম আয়াত রিসালাতের সূচনা নির্দেশ করে। কিন্তু এই পার্থক্যের নির্দেশকে ইবন ইসহাক প্রকাশ্য প্রচার সম্পর্কে যাহা বলেন, সেই ব্যাপারে এবং ইসরাফীল সংক্রান্ত হাদীছের ব্যাপারে বিভ্রান্তিকর। ইবন ইসহাকের বর্ণনা নবুওয়াত ও রিসালাতের মধ্যে পার্থক্যের ভিত্তিতে করা হয় নাই, বরং এমনভাবে করা হইয়াছে যাহা তিনি প্রাথমিক সময়ে এমন ধারণায় করিয়াছেন, যাহা সহজে নজরে পড়ে না অথবা গোপন প্রচারের মাধ্যমে যাহার অনুবর্তীতে প্রকাশ্য প্রচারকাল শুরু হয়। প্রচারের কাজ উভয় সময়ে প্রকাশিত হয়। তিনি সূরাতুল মুদ্দাছছির -এর নাযিল হওয়ার সঙ্গে তাহার বর্ণনাকে সম্পৃক্ত করেন না, বরং কুরআনের অপর দুইটি সূরার সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন। ৬৬ ইহা বলা উচিত যে, তাহার প্রাথমিক সময়কালের বৈশিষ্ট্য, যাহা গোপন প্রচারকাল, ইহা কোন সুনির্দিষ্ট কর্তৃত্বের উপর ভিত্তি করিয়া নহে, বরং একটি অস্পষ্ট প্রামাণ্য বিষয়ের উপর ভিত্তি করিয়া, "যাহা আমরা জানিতে পারিয়াছি” ( فيما بلغنا)। তাহার বর্ণনার উভয় উদ্দেশ্য যেমন প্রচারের প্রাথমিক সময়ের ধরন এবং ইহার প্রলম্বিত অবস্থা অন্যান্য প্রাসঙ্গিক ঘটনাবলীর আলোকে পুনঃপরীক্ষা করা প্রয়োজন। ৬৭
ওয়াট ইবন ইসহাকের বর্ণনা গ্রহণ করার ব্যাপারে একটি ভুল করেন। যেমন অপ্রকাশ্য দাওয়াত এবং প্রকাশ্য দাওয়াত কাহাকে বলে, ইহার মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করিতে তিনি ভুল করেন। এই চিহ্নিতকরণের ব্যাপারে উত্থাপিত অসুবিধা মনে হয় তিনি বুঝিতে পারেন। তাই তিনি বলেন যে, দুইটির মধ্যে অর্থাৎ অপ্রকাশ্য (non public) দাওয়াত এবং প্রকাশ্য দাওয়াত (public ministry)-এর মধ্যে পার্থক্যকরণ অত্যন্ত দুরূহ। যেহেতু প্রথম দীক্ষাগ্রহণকারীরা প্রথম সময়কালের মধ্যেই দীক্ষা গ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়ে কোন অসুবিধা নাই। অসুবিধার সৃষ্টি হইয়াছে ওয়াট-এর নিজের ত্রুটিপূর্ণ চিহ্নিতকরণের কারণে এবং বৃহত্তর অর্থে প্রয়োজনীয় প্রায়োগিক পরিভাষা নবুওয়াত ও রিসালাত-এর অসতর্ক ইংরেজী অনুবাদ 'অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য দাওয়াত' করার কারণে। ইহা বলা প্রয়োজন যে, নবুওয়াত শব্দের অর্থ দাওয়াত নহে। এই পরিভাষার ব্যবহারে যে খৃস্টীয় ধর্মতাত্ত্বিক পরিভাষাসমূহকে ইসলামিক পারিভাষিক শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে ঝুঁকি রহিয়াছে তাহারই দৃষ্টান্ত বহন করে।
এই সম্পর্কে হাদীছে ইসরাফীলের উল্লেখ যথাযথ নহে। আলোচ্য হাদীছটি যাহাই হউক, প্রশ্ন হইল ইহার গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু? হাদীছটি নবুওয়াত ও রিসালাতের মধ্যে পার্থক্য বুঝানোর ব্যাপারে সম্পর্কিত নহে, এমনকি গোপন প্রচারের সময়কাল বলিতে কি বুঝায় তাহাও নির্দেশ করে না। ইহা বর্ণনাকে বিভ্রান্ত করে, যেমন ওয়াট করিয়া থাকেন, ফেরেশতা ইসরাফীল মধ্যস্থতা করিতেন অর্থাৎ তিনি তাঁহার মিশনের প্রথম তিন বৎসর রাসূলুল্লাহ -এর নিকট সংবাদ বহন করিতেন, ওহী নিয়া অসিতেন। হাদীছের মূল পাঠ কেবল ইহাই বলে যে, ইসরাফীল (আ) রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে 'সংযুক্ত' ছিলেন। ঐ ফেরেশতা যে কোন ওহী লইয়া আসিতেন তাহার কোন উল্লেখ নাই। ইহার বিপরীতে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ওহী আসার পূর্বে ফেরেশতা রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত ছিলেন (قَرْنُ بِرَسُولِ اللَّهِ ﷺ قَبْلَ أَنْ يُوْحَى إِلَيْهِ) ৬৮ যাহা হউক, হাদীছটি মুরসাল অর্থাৎ ইহার বর্ণনাধারা (সনদ) রাসূলুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায় নাই। আল্-ওয়াকিদী যিনি এই হাদীছ উল্লেখ করেন পর্যায়ক্রমিক বর্ণনায় বলেন যে, ইহা নির্ভরযোগ্য নহে।৬৯
এইভাবে "অপ্রকাশ্য ও প্রকাশ্য দাওয়াত"-এর মধ্যকার পার্থক্যের কথা বলার পর ওয়াট আল্-মুদ্দাছছির শব্দটি সম্পর্কে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, শব্দটি সাধারণত এই অর্থে লওয়া হয়: 'দিছার বা দাচার জড়ানো' অর্থাৎ "কম্বলে/আলখিল্লায় মোড়ানো" অর্থাৎ ইহা একটি আলখিল্লা বিশেষ এবং ইহার সঙ্গে ওহী প্রাপ্তির সম্পর্ক রহিয়াছে। যেমন এরূপ তিনি লক্ষ্য করেন, মোড়ানোর কাজটি হয় ওহীর জন্য প্ররোচিত করে নতুবা অধিকতর সম্ভাব্যতা এই যে, ইহা স্বর্গীয় দূতের আগমনের বিপদ হইতে গ্রহণকারী ব্যক্তিকে রক্ষা করে। অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে ইহা বলা উচিত যে, কোন হাদীছেই মোড়ানোর কাজ বর্ণিত হয় নাই, যাহার অর্থ বলা হইয়াছে "ওহীর জন্য প্ররোচিত করা" অথবা "স্বর্গীয় উপস্থিতির বিপদ হইতে গ্রহণকারী ব্যক্তিকে রক্ষা করা"। ওয়াট সাধারণভাবে এই পরিভাষাটি বিকৃত করিয়াছেন, ইহার মধ্যে "ওহীকে প্ররোচিতকরণ' তত্ত্বের এবং "আল্লাহ্র দর্শন” তত্ত্বের আমদানী করার জন্য।
ওয়াট-এর আল্-মুদ্দাছছির-এর রূপক শোভিত অর্থ সম্পর্কিত ধারণা অধিকতর অদ্ভূত। তিনি বলেন যে, ইহার অর্থ "এমন একজন দুর্বোধ্য মানুষ এবং যাহার খ্যাতি নাই" এবং তিনি এই প্রয়োগের সারমর্মে উপনীত হইতে চেষ্টা করেন, তাহার কথিত বক্তব্যের উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলেন, "এমন স্ট্যান্ডার্ড যাহা ধনী মক্কাবাসিগণের নিকট বিচার্য ছিল"। রাসূলুল্লাহ "তুলনামূলকভাবে গুরুত্বহীন ব্যক্তিত্ব ছিলেন"। ৭০ উল্লিখিত বিষয় সুস্পষ্টভাবে কুরআনের হইতে উৎপন্ন হইয়াছে যাহা (دثور) (দাছুর)। এই শব্দরূপ কোন কোন সময় অখ্যাত ব্যক্তির অর্থ বহন করে। ৭১ কিন্তু ইহা হইবে ভাষার নিয়ম-কানুনের লঙ্ঘন মাত্র। বিশেষ করিয়া একটি ধারণাকে অন্য একটি ধারণায় উৎপন্ন করা, যেমন মুদ্দাছছির। স্ট্যান্ডার্ড কোন আরবী অভিধানেই এই শব্দরূপের এমন অর্থ করা হয় নাই। তদুপরি ইহা সাধারণ ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত যে, উদ্ধৃত আয়াতে আল্লাহ তাঁহার রাসূলকে এই ধরনের মানহানিকর পরিভাষায় সম্বোধন করিবেন অথবা রাসূলুল্লাহ এই পরিভাষা তাঁহার নিজের প্রতি প্রয়োগ করিবেন।
এইভাবে তিনি অপ্রকাশ্য (non public) এবং প্রকাশ্য দাওয়াত (public ministry)-এর আলোচনা ফাত্রাহ্ (বিরতি) এবং আল্-মুদ্দাছছির-এর অর্থ সম্পর্কে ওয়াট নিম্নবর্ণিত "চিত্র”-এর সারমর্ম পেশ করেন। তিনি বলেন যে, তখন মুহাম্মাদ রাসূল হিসাবে তাঁহার ক্যারিয়ার গঠনের প্রস্তুতির পর্যায়ে ছিলেন। এই সময়কাল তিন বৎসর স্থায়ী ছিল। এই সময়কালে তিনি সূরাতুল 'আলাক-এর প্রথম অংশ, সূরাতুদ দুহা এবং "অধিকতর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যপূর্ণ” অন্যান্য ওহী প্রাপ্ত হন। ওয়াট পুনরায় এইখানে হাদীছে ইসরাফীল উল্লেখ করেন। তিনি তখন বলেন যে, ফাতরাহ্ (বিরতি) এই সময়কালের শেষদিকে সংঘটিত হয় এবং উহার পরে "দৃশ্যাবলী" (visions) অথবা এই সম্পর্কে প্রথম দৃশ্য সংঘটিত হয়। অর্থাৎ "আল্লাহর রাসূল" এই উপাধি প্রদান এবং সূরাতুল মুদ্দাছছির-এর অবতরণ একসঙ্গে সংঘটিত হয়। ৭২
এইভাবে ওয়াট সম্পূর্ণরূপে, যাহা তিনি যেইভাবে শুরু করিয়াছিলেন, তাহা উল্টাইয়া দেন। তিনি এই বলিয়া শুরু করেন যে, 'আর্-রু'ইয়া আস্-সাদিকা' হেরা-পূর্ব সময়ের ঘটনা ছিল যাহা “দৃশ্য” (vision)-এর অনুরূপ ছিল, যেমন এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী কালে রাসূলুল্লাহ লাভ করেন। পরে ওয়াট বলেন যে, হেরায় প্রত্যক্ষ “দৃশ্য" (vision) যাহা আয-যুহরীর বর্ণনার প্যারা 'B'-এ বর্ণনা করা হয়, ইহা ছিল "আল্লাহ্র দর্শন"। কারণ অন্যান্য বস্তুর মধ্যে ঐ সম্পর্কিত বর্ণনায় আল্-হাক্ক-এর উল্লেখ ছিল। তখন তিনি বলেন যে, প্যারা 'B' মূল আহ্বান (original call) বর্ণনা করে এবং এই অর্থ প্রকাশ করে যে, “দৃশ্য" (vision) ছিল আহ্বান হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন বস্তু। পরবর্তী সময়ে ইহা সংঘটিত হয় এবং ইহার মর্মার্থ ছিল কতক সাধারণ। যেমন রাসূলুল্লাহ তাঁহার নূতন অবস্থান পুনরায় জোর দিয়া বলেন এবং তাঁহাকে এই প্রত্যয় জ্ঞাপন করেন যে, "সূরাসমূহ ছিল আল্লাহর পক্ষ হইতে সংবাদ"। তাহা সত্ত্বেও তাহার "দৃশ্য" (vision)-এর মর্মার্থের ভিত্তিতে ওয়াট বলেন যে, ইহা প্যারা B-এর সঙ্গে ভালভাবে মানানসই। এইভাবে পুনরায় এই অর্থ প্রকাশ করে যে, ঐ প্যারার বিষয়বস্তু হইল "দৃশ্য" (vision) এবং ইহা ছিল "মূল আহবান"-এর আনুষঙ্গিক বিষয়। ইহার ভিত্তিতে তিনি জোর দিয়া বলেন, কিছুদিন পূর্বে এই সম্বোধন "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" ছিল কুরআন বহির্ভূত ওহী যাহা রাসূলুল্লাহ সূরা ইকরা নাযিল হওয়ার পূর্বে প্রাপ্ত হন এবং এক্ষণে ওয়াট সম্পূর্ণরূপে মত পরিবর্তন করিয়া বলেন যে, যদিও “প্রথম” দৃশ্য রাসূল হিসাবে তাঁহার নবুওয়াতী জীবনের ক্যারিয়ারের তিন বৎসর পর সংঘটিত হয় এবং তখন আল্লাহ্র রাসূল উপাধি প্রাপ্ত হন অর্থাৎ এই যোগাযোগ "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" সূরা ইকরা নাযিলের পূর্বে সংঘটিত হয় নাই, বরং ইহার অনেক পরে।
এই সন্দেহ এবং অসঙ্গতি সহজে পরিহার করা যাইতে পারে যদি ওয়াট তাহার মন প্রথম হইতে এই বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য নিবদ্ধ না করিতেন যে, তথাকথিত “দৃশ্য” (vision)-ও ওহীর মত যাহা ছিল রাসূলুল্লাহ-এর মনোগত ও বুদ্ধিগত বিষয়। এই উদ্দেশ্যের জন্য ওয়াট আয-যুহরীর ক্রমাগত বর্ণনাকে কৃত্রিম অনেক প্যারায় বিভক্ত করেন এবং অন্যান্য আরও কৌশলের মধ্যে একটি এই যে, তিনি নবুওয়াত ও রিসালাতকে প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য দাওয়াতে সমীকরণ করেন, পূর্বের বিষয়টিকে তথাকথিত গোপন প্রচারকালের সঙ্গে চিহ্নিত করেন যাহা ইবন ইসহাক কর্তৃক উল্লিখিত হইয়াছে এবং ইসরাফীলের রাসূলুল্লাহ-এর সঙ্গী হওয়ার সময়কালের সন্দেহপূর্ণতার সঙ্গেও তিনি সমীকরণ করেন। ইহা এই ভুল চিহ্নিতকরণের কারণে যে, ওয়াট ইহার প্রকৃত ধরন বুঝিতে খুব অসুবিধা বোধ করেন, যে কারণে তিনি ইহাকে অপ্রকাশ্য দাওয়াতের সময়কাল বলিয়া অভিহিত করেন। কারণ সেইখানে ছিল “কিছু বৈপরীত্য এইজন্য যে, মুহাম্মাদ জনসাধারণ্যে এই দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। এবং তাহার নিজের সৃষ্ট অসুবিধার কারণে ওয়াট সন্দেহপূর্ণতাকে বরণ করিতে অগ্রসর হন, যাহা অতিমাত্রায় আরোপিত হইয়াছে প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ের হাদীছ সংক্রান্ত বর্ণনাসমূহে”। ৭৩ যদি ওয়াট অপব্যাখ্যা না করিতেন তাহা হইলে তিনি দেখিতে পাইতেন যে, বর্ণনাসমূহের মধ্যে পার্থক্য পরিলক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও “আহবান” (the call) এবং “দৃশ্য” (the vision) ক্রমাগতভাবে সংঘটিত হইয়াছিল, কুরআনের ওহী ছিল সুনির্দিষ্ট মূল পাঠ-এর শাব্দিক অবতীর্ণ হওয়ার মাধ্যম। ওহী আগমনে ফাত্রাহ (বিরতি) অথবা সাময়িক ও আকস্মিক বিরতি ওহী নাযিল হওয়ার প্রাথমিক কালের একটি ঘটনা মাত্র। এই ধরনের বিরতি বৎসরকাল ধরিয়া চলে নাই, বরং কয়েক দিন বা সপ্তাহ ধরিয়া চলে, যেমন তিনি নিজে ইহা স্বীকার করেন ৭৪ এবং রিসালাত অথবা ধর্ম প্রচারের মিশন এবং সূরা আল্-মুদ্দাছছির নাযিল হওয়া এবং অন্যান্য সূরা নাযিল হওয়ার ঘটনা মূল আহবানের ঘটনা সংঘটিত হওয়ার খুব বেশী দিন পরে সংঘটিত হয় নাই। এইভাবে কোন বৈপরীত্য সম্পর্কে সন্দেহপ্রবণ হওয়ার কোন প্রয়োজন নাই যাহা ওহী নাযিলের প্রথম তিন বৎসরের মধ্যে সংঘটিত হইয়াছিল অথবা অনুরূপ কিছু রাসূলুল্লাহ-এর নবুওয়াতী জীবনে ঘটিয়াছিল।
টিকাঃ
৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮, আরও দ্র., ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৬২।
৬৫. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৮।
৬৬. আয়াত দুইটি ১৫: ৯৪ এবং ২৬ : ২১৪।
৬৭. Infra, পরিচ্ছেদ ২১, সেকশন ১।
৬৮. দ্রষ্টব্য আত-তাবারী, তারীখ (ইতিহাস), ১খ., পৃ. ১২৪৯।
৬৯. ইবন সা'দ, ১খ., পৃ. ১৯১; আরও উদ্ধৃত আত-তাবারী, op. cit.।
৭০. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৯।
৭১. দ্রষ্টব্য তাজুল আরুস, ৩খ., পৃ. ২০২।
৭২. ওয়াট, op.cit, পৃ. ৪৯।
৭৩. প্রাগুক্ত।
৭৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮।
📄 সাত: মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ভয় ও হতাশা
ইহার পর ওয়্যাট উল্লিখিত উক্ত উপ-শিরোনামের আলোচনা আরম্ভ করেন। তিনি এই বলিয়া শুরু করেন, “এই প্যারাগুলি আয়ু-যুহুরী হইতে”। তিনি দুই ধরনের ভয় ও হতাশার কথা বলেন : “প্রথমে ভয়ের কথা, তাঁহার সম্মুখে মহান সত্তা আল্লাহ্র প্রকাশিত হওয়া বা উপস্থিতির কারণে ভয় (C. F. J) এবং হতাশা, যাহা তাঁহাকে আত্মস্থতার চিন্তার দিকে লইয়া যায়” (D. I)।
ওয়্যাট-এর ব্যাপারে আরও সম্মুখে অগ্রসর হওয়ার পূর্বে এই বিষয়ে অন্যান্য বর্ণনা আরম্ভ করার সময় ইহা লক্ষ্য করা উচিত যে, প্যারা সমূহ, যদিও এইগুলি নিঃসন্দেহে “ভয়” সম্পর্কে বলা হয়, ইহা কোনক্রমেই মহান সত্তা আল্লাহ্র উপস্থিতি অথবা আবির্ভাবের কথা বুঝায় না। উদাহরণস্বরূপ প্যারা 'J', যাহা ওয়্যাট এইখানে এমনভাবে উল্লেখ করেন যেমন ইহা মহান সত্তার (আল্লাহ্) প্রকাশিত বিষয়টি নির্দেশ করিতেছে। দ্ব্যর্থহীনভাবে তিনি বলেন, যাহা ওয়্যাট-এর নিজস্ব অনুবাদের মাধ্যমে বর্ণনা করা হইল, “...আমি ফেরেশতাকে দেখিলা, যিনি আমার নিকট হেরায় আসিতেন, একটি সিংহাসনে (কুরসী) উপবিষ্ট অবস্থায়। সিংহাসনটি আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী স্থান ব্যাপিয়া ছিল। আমি তাঁহার ভয়ে ভীত হইলাম”। সুতরাং ইহা ছিল ফেরেশতা দর্শন, আল্লাহ্ তা'আলার দর্শন নহে যাহা ভয়ের কারণ ছিল। ইহা প্রমাণ বা নজীরস্বরূপ উল্লেখ করিলে স্পষ্টত অসঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া প্রতীয়মান হইবে অর্থাৎ “প্রকাশিত হওয়া” অথবা “উপস্থিতির” স্বপক্ষে প্যারা সমূহকে প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করা অসঙ্গতিপূর্ণ হইবে এবং তখন প্রতীয়মান হইবে যে, ঐ প্যারা-এর স্পষ্ট বর্ণনাকে উপেক্ষা করিয়া বলা যে, যে সত্তা আবির্ভূত হইয়াছিল তাহা অন্য কিছু ছিল।
দ্বিতীয়ত, সূরাতুন নাজম-এর আয়াত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া ওয়্যাট বলেন, যখন মুহাম্মদ —এর চক্ষু “তাঁহার প্রভুর অন্যতম বৃহত্তম চিহ্ন” দেখিতে পাইল তখন তাঁহার “হৃদয় প্রতীকী বস্তু উপলব্ধি করিল”। আমরা পূর্বে এই ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের ভুল চিহ্নিত করিয়াছি। কিন্তু ওয়্যাট-এর নিজস্ব স্বীকারোক্তি এই যে, রাসূলুল্লাহ্ তাঁহার চক্ষু দ্বারা যাহা দেখিয়াছিলেন তাহা ছিল আল্লাহ্র নিদর্শন বা “প্রতীক”, আল্লাহ্ নিজে নহেন। ইহা ছিল এই বিষয়ের বাহ্যিক দিক, আল্লাহ্র নির্শনর এই চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা অর্থাৎ ফেরেশতার দর্শন, যাহা ভয়ের কারণ। সর্বোপরি যাহা আধ্যাত্মিক অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক বা যাহা হৃদয় উপলব্ধি করে তাহা ভয়ের বস্তু হইতে পারে না।
তৃতীয়ত, বেল এবং ওয়্যাট বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ ওহী লাভের পর ভুলক্রমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহ্র “দর্শন” লাভ করিয়াছেন। পরবর্তী কালে তিনি তাঁহার অবস্থান সংশোধন করিয়া কেবল সূরা নাজম-এ নহে, বরং সর্বত্রই এই ধারণা পোষণ করেন যে, মানবীয় দৃষ্টি আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছাইতে পারে না। যদি ইহা তাহাই হইত তবে তিনি পরবর্তী সময়ে তাহা কোনক্রমেই এই ধারণা দিতে পারিতেন না যে, তিনি আল্লাহ্কে দেখিয়াছেন।
এক্ষণে আয-যুহরী হইতে বর্ণিত প্যারা, যেগুলিকে হযরত আয়েশা (রা)-এর অথবা অন্য কাহারও বর্ণনা হিসাবে গণ্য করা হয়, সুস্পষ্টরূপে রাসূলুল্লাহ কর্তৃক কথিত অবস্থান পরিবর্তনের পরের ঘটনা। এই সময় হইতে হযরত আয়েশা (রা) এবং পরবর্তী কালের অন্য কোন বর্ণনাকারী বলিতে পারেন না যে, দর্শন (vision) কোনভাবেই আল্লাহ্। এই প্যারা-এর ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে এইরূপ ধারণা দেওয়া (আল্লাহ্র দর্শন) একান্তই কাল নিরূপণে ভ্রান্তিমূলক।
ওয়াট-এর অন্যান্য বর্ণনা সম্পর্কে অগ্রসর হওয়া যাইতে পারে। ভয়ের কারণ সম্বলিত এই প্রশ্ন সম্পর্কে বলা যায় যে, মহান সত্তার আবির্ভূত হওয়া অথবা উপস্থিতির কারণে মুহাম্মাদ -এর মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি বলিয়া ওয়াট বলেন যে, ওল্ড টেস্টামেন্টের (আদিপুস্তকের) প্রত্যয়ন অনুসারে মাহান সত্তার নিকট উপস্থিতির ভয়ের একটি গভীর বদ্ধমূল ধারণা সেমেটিক ধ্যান-ধারণায় বিদ্যমান আছে। 'C' এবং 'J' প্যারা এই ভয়ের কথা উল্লেখ করে। "মূলত মনে হয়" তিনি মন্তব্য করেন যে, সূরা আল-মুযযাম্মিলের (৭৩: ১) শব্দের ব্যাখ্যায় এই ভয়ের উল্লেখ রহিয়াছে এবং এইগুলি ধারণা দেয় যে, "পরবর্তী তাফসীরকারগণ কেবল কুরআনের সমর্থনে ভয়ের উপস্থিতির সিদ্ধান্ত দেন এবং কুরআন ব্যতিরেকে এই সম্পর্কে আর কোন তথ্য নাই"। ৭৭
ওয়াট পুনরায় বলেন যে, অপ্রতিভ সংক্রমণ মুযযাম্মিল হইতে মুদ্দাছির পর্যন্ত এই বুঝায় যে, তাফসীরকারগণ আল্-মুয্যাম্মিলের সংশ্লিষ্টতার সিদ্ধান্ত দেয় যাহা মূলত মুহাম্মাদ -এর 'আহবান'-এর বর্ণনার অনুরূপ ছিল না। যদি এই ক্ষেত্রে ওয়াট যুক্তি প্রদর্শন করেন, "ইহা মনে হয় এইসব পরবর্তী তাফসীরকারগণ স্বাভাবিক, মুয্যাম্মিলকেও এই ব্যাখ্যার আওতায় লইয়াছেন। এই ভয় হইল মহান সত্তার অবির্ভাবের কারণে এবং ইহা ছিল ব্যাপক" এবং রাসূলুল্লাহ "সম্ভবত ইহা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন"। ৭৮
এক্ষণে ওয়াট বলেন যে, পরবর্তী সময়ের ব্যাখ্যাকারগণ এই সিদ্ধান্ত দেন যে, "ভয়ের উপস্থিতি কুরআন হইতে এবং কুরআন ব্যতিরেকে এই সম্পর্কে আর কোন তথ্যসূত্র নাই"। যাহা হউক, ভয় সম্পর্কে কুরআনে কোন নির্দেশনা না থাকুক। সূরা আল-মুয্যাম্মিল এবং সূরা আল-মুদ্দাছছির সহ সকল সূরা এই নির্দেশনা দেয় যে, রাসূলুল্লাহ এইসব উপাধি দ্বারা সম্বোধিত হন এবং হয় ঘুম হইতে জাগ্রত হইয়া রাত্রে আল্লাহর ইবাদত করার জন্য অথবা উঠিয়া মানুষকে সর্তক করার জন্য ইত্যাদি। এমকি সূরাতুন-নাজম, যে সূরা দর্শন-এর কথা বলে, এই সূরায়ও এমন কোন নির্দেশনা নাই যে, রাসূলুল্লাহ কোনও সময়েই ভয়ে ভীত ছিলেন। কিভাবে পরবর্তী ব্যাখ্যাকারগণ তখন এই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন যে, ভয়ের উপস্থিতি কুরআন হইতে গ্রহণ করা হইয়াছে, যদি তাহারা "কুরআন ব্যতিরেকে এই ব্যাপারে কোন তথ্য না পাইয়া থাকেন"? প্রকৃত বিষয় এই যে, এইখানে ওয়াট সন্দেহাতীতভাবে রিচার্ড বেল্-এর ধারণা এড়াইয়া যান যে, কুরআনের বর্ণনা ব্যাখ্যা করার জন্য পরবর্তী যুগে হাদীছসমূহ উদ্ভাবন করা হয়। একই সময়ে ওয়াট ভয়ের ঘটনার উপর তাহার মন্তব্য পান। এই সংক্রান্ত তথ্য কেবল হাদীছের মাধ্যমেই সরবরাহ করা হয়, কুরআনের মাধ্যমে নহে। যাহা হউক, ওয়াট-এর যুক্তিসমূহ প্রতারণাপূর্ণ এবং চক্রাকারে আবর্তিত। ইহা ছিল পরবর্তী ব্যাখ্যাকারগণ যাহাদের ভয় সম্পর্কিত বিষয়ে কোন তথ্য জানা ছিল না। যিনি এই সম্পর্কে কুরআন হইতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর "আহবান” সংক্রান্ত বর্ণনার মধ্যে মুয্যাম্মিল বক্তব্য সম্পর্কেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এই সময় হইতে তাহারা এই ধরনের সিদ্ধান্ত দান করেন, "মহান সত্তার প্রচণ্ডতার ভয়" অবশ্যই "বিস্তৃত ও ব্যাপক" ছিল এবং ইহা যেমন বিস্তৃত ছিল, মুহাম্মাদ সম্ভবত ইহার মধ্যে অংশীদার বা প্রভাবিত ছিলেন। সুস্পষ্ট বিষয় এই যে, এইখানে ওয়াট প্রথমে একটি অন্যায্য ও অশুদ্ধ ধারণার অবতারণা করেন এবং তখন ঐ ধারণার ভিত্তিতে পশ্চাদমুখী যুক্তি প্রদর্শন করেন "প্রচণ্ড” ভীতির বহু বিস্তৃতির অস্তিত্বকে প্রমাণ করার জন্য অথবা মহান সত্তার 'নিকটবর্তিতা' প্রমাণ করার জন্য, যে বিষয়ে রাসূলুল্লাহ-এর নিজেরও সম্পৃক্ততা আছে। এইভাবে যুক্তি উপস্থাপন করার পর ওয়াট ইহার ফলে তাহার শিক্ষক বেল্-এর আলোচনার মোড় উল্টাইয়া দেন। কেননা সাম্প্রতিক কালে বেল আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, মুহাম্মাদ তাঁহার "অজ্ঞতার কারণে প্রথমিক অবস্থায় "দাবি" করিয়াছিলেন, তিনি আল্লাহ্র দর্শন লাভ করিয়াছেন। কিন্তু ওয়াট এক্ষণে আমাদেরকে বলেন যে, মহান সত্তার প্রচণ্ড উপস্থিতি অথবা নিকট সান্নিধ্যের ধারণা এবং উপস্থিতির ভয় ছিল "বহু বিস্তৃত” এবং রাসূলুল্লাহ শুধু ইহাতে অংশগ্রহণ করেন বা প্রভাবিত হন।
যাহা হউক, আমরা এইখানে এতদসম্পর্কিত বিষয়ে আদিপুস্তকের (Old Testament) তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নই। আমাদের কেবল ইহা উল্লেখ করা উচিত যে, ইসলামের দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীতে যখন ব্যাখ্যাকারগণ স্বপক্ষে যুক্তি দেখানোর জন্য হাদীছ উদঘাটন করিয়া হাদীছের মাধ্যমে কুরআনের বর্ণনার ব্যাখ্যা করেন, তথাকথিত আদিপুস্তক (Old Testament)-এর ধারণা এবং মহান সত্তার আজমত (মাহাত্ম্য) সম্পর্কে ভয়-এর কথা ইসলামী অঞ্চলে (দেশে) আদৌ প্রচলিত ছিল না, বহু বিস্তৃত তো দূরের কথা। যে কারণসমূহের কথা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে সেই ব্যাখ্যাকারগণ আল্লাহর দর্শন (vision) সম্পর্কিত ধারণা পোষণ করিতেন না। বিশেষ করিয়া যখন বেল এবং ওয়াট উভয়ে সতর্কতার সঙ্গে বলেন যে, ইসলামিক অর্থোডক্সী (ইসলামী গোঁড়াপন্থীগণ)-এর ধারণা পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে। কেহই কল্পনার মাধ্যমে তৃতীয় শতাব্দীর এই বিস্তৃত ব্যাখ্যার বিষয়কে ঐ যুগের অব্যবহিত পূর্ব যুগে ব্যাখ্যা করেন নাই।
দ্বিতীয় ধারণা সম্পর্কিত আলোচনা প্রসঙ্গে উদাহরণস্বরূপ “হতাশা" যাহা তাঁহাকে "আত্মহত্যার চিন্তার" দিকে চালিত করে, ওয়াট ইহার সমপর্যায়ের ধারণা খুজিয়া পান "আদিপুস্তকের (Old Testament) রাসূলগণের এবং খৃস্টান সাধুদের জীবন হইতে"। এই সমান্তরাল দৃষ্টান্ত উপস্থাপনের মাধ্যমে তিনি A. Poulain কর্তৃক Avila-এর St. Teresa-র অনুভূতির অবিকল প্রতিরূপ পুনউপস্থাপন করেন, "যে বাচনভঙ্গি” তিনি প্রাপ্ত হন "শয়তানের নিকট হইতে অথবা কল্পনা হইতে" ইত্যাদি। ৭৯ ওয়াট পরে লক্ষ্য করেন যে, আত্মহত্যার চিন্তা মুহাম্মাদ-এর প্রতি আরোপ করা যাইত না "যদি না তিনি এই বিষয়ে কিছু বলিয়া থাকিতেন যাহা ইহার জন্য একটি ভিত্তি হইত" এবং অনুরূপভাবে "হতাশ হওয়ার সময়টি ছিল ওহী অবতরণের বিরতিকালের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ”। ৮০
যে উপমা বা উদাহরণ এইখানে ওয়াট উল্লেখ করেন তাহা সম্পূর্ণরূপে যথার্থতা বর্জিত। উদাহরণস্বরূপ Avila-এর St. Teresa-র বর্ণনা যাহা তিনি A. poulain-এর রচনা হইতে উদ্ধৃত করেন। এই বর্ণনায় কেবল তাহার (স্ত্রীলিঙ্গ) বিশ্বাস ও সন্দেহের দোলাচলে ঝুলিতে থাকা সম্পর্কে বলা হয়, যেমন এই বক্তব্য (বাচনভঙ্গি) কি আল্লাহ্ পক্ষ হইতে, শয়তানের নিকট হইতে অথবা কল্পনা হইতে? এবং শেষ পর্যন্ত তাহার কল্পনা এই সিদ্ধান্তে আসে যে, ইহারা (বক্তব্যসমূহ) আল্লাহ্র নিকট হইতে ছিল "যাহা রক্ষা করিতে প্রাণ বিসর্জন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন"। 'হতাশ' হওয়া যাহা এইখানে অস্পষ্টভাবে দেখিতে পাওয়া যায়, ইহা "বাচনভঙ্গির" মূল বাস্তবতা সম্পর্কে সন্দেহযুক্ত। অপরপক্ষে মুহাম্মাদ -এর এর হতাশ হওয়ার কারণ, তিনি যে ওহী প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহার মৌলিকত্বের ব্যাপারে কোনক্রমেই কোন সন্দেহের জন্য ছিল না, বরং একান্তভাবেই তাহা ছিল সাময়িকভাবে ওহী অবতরণ বন্ধ হওয়ার কারণে। তাঁহার বিষয়টি Avila-এর St. Teresa হইতে সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। ওয়াট কর্তৃক আদিপুস্তকে রাসূলদের বর্ণনার সঙ্গে খৃস্টান সাধুদের সাদৃশ্যপূর্ণ যে বর্ণনা রহিয়াছে তাহা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলিয়া মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ আমরা বর্তমানে দেখিতে পাই, তিনি চূড়ান্তভাবে এই ধারণা দেন যে, ইসলামিক ওহী খৃস্টান রাসূল ও সাধুদের "উদ্বুদ্ধকরণ”-এর সঙ্গে তুলনীয়। তাহারা আল্লাহ্র নিকট হইতে উদ্দীপনা (ধারণাসমূহ) প্রাপ্ত হইতেন এবং পরে তাহা তাহাদের নিজের ভাষায় লিখিয়া ফেলিতেন যাহা তাহারা "উদ্দীপনা"র মাধ্যমে বুঝিতে পারিতেন। ইহা বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কুরআনের ওহীর ধারণা সম্পূর্ণ আলাদা। প্রসঙ্গক্রমে বলা যায় যে, ওয়াট-এর এই উদ্ধৃতিসমূহ A. poulain-এর রচনা হইতে উল্লেখ করা ছিল আর একটি ধাপ যাহাতে তিনি উক্ত লেখকের ধাচে ইসলামের ওহীকে ফেলা যায়। ওয়াট চূড়ান্তভাবে এই কার্যটিই করেন।
এই সম্পর্কিত বিষয়ের মন্তব্যে বলা হয় যে, মুহাম্মাদ অবশ্যই এমন কিছু বলিয়া থাকিবেন যাহা তাঁহার সম্পর্কে আরোপিত আত্মহত্যার চিন্তা করার বক্তব্যটির একটি ভিত্তি তৈরি করে। ইহা ইতোমধ্যে বলা হইয়াছে যে, ৮১ আয-যুহরীর এই বর্ণনা তাঁহার পক্ষ হইতে একটি অনুমান মাত্র। এমনকি ওয়াট নিজে এই কথার স্বীকৃতি দিয়াছেন যে, ফাত্রাহ (ওহী অবতরণে বিরতি) সম্পর্কে আয-যুহরীর বর্ণনা তাহার নিজের অনুমান মাত্র। ৮২ ফাত্রাহ এবং রাসূলুল্লাহ -এর এতদসংক্রান্ত বিষয়ে হতাশা অবশ্য একটি সঙ্গত কারণ। এই হতাশা সম্পর্কে তাঁহার উল্লেখ এবং পুনরায় ফেরেশতার আবির্ভাব ও ফেরেশতার সঙ্গে দেখা হওয়ার আশায় বারবার তাঁহার পাহাড়ের গুহায় গমন সম্ভবত এই অনুমানের ভিত্তি তৈরি করিয়াছে। ফাত্রাত্র সময়কাল যাহাই হউক না কেন এবং রাসূলুল্লাহ-এর হতাশার ঘটনা যতই গভীর হউক না কেন, তাহারা উভয়ে জোরের সঙ্গে ঘটনাটি বর্ণনা করেন যে, ওহী তাঁহার (রাসূলের) নিজের সজ্ঞান ও সচেতনতা হইতে উদ্ভূত কোন কিছু নহে। ইহা তাঁহার ধারণাগত বা বুদ্ধিমত্তাপূর্ণ বাচনভঙ্গি নহে। ইহা যদি এমন কিছু হইত তাহা হইলে ইহার মধ্যে ফাত্রাহ এবং ফলে কোন হতাশা থাকিত না।
টিকাঃ
৭৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯-৫০।
৭৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১।
৭৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০।
৭৮. প্রাগুক্ত।
৭৯. প্রাগুক্ত।
৮০. প্রাগুক্ত।
৮১. Supra, পৃ. ৩৭০-৩৭৫; ৩৮৪-৩৮৫।
৮২. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৯।
📄 আট: হযরত খাদীজা (রা) এবং ওয়ারাকার নিকট হইতে উৎসাহ লাভ
ওয়াট আলোচনার শেষ উপ-শিরোনামে তাহার আলোচনা শুরু করেন এই বিষয়ের উপর জোর দিয়া যে, "হযরত খাদীজা (রা) কিভাবে হযরত মুহাম্মাদকে আশ্বাস দেন সেই বর্ণনা বাতিল করার কোন কারণ নাই"। ওয়াট তাহার বক্তব্য অব্যাহত রাখিয়া বলেন, ইহা এই প্রদর্শন যে, “এই পর্যায়ে মুহাম্মাদ-এর আত্মবিশ্বাসের অভাব ছিল"। তিনি পরে বেল্-এর ধারণার সঙ্গে এই বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করিয়া বলেন যে, নামূস সম্পর্কিত প্রকাশভঙ্গির নির্ভরযোগ্যতার ব্যাপারে সন্দেহ পেষণ করার কোন জোরালো কারণ নাই। ওয়াট যুক্তি প্রদর্শন করিয়া বলেন, নামূস শব্দটির ব্যবহার কুরআনে তাওরাতের উল্লেখ, বরং ইহার বিশুদ্ধতার একটি যৌক্তিক উদাহরণ। ওয়াট তখন বলেন যে, ওরাকার নিকট হইতে "পুননিশ্চিতকরণই ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়"। ইহা মুহাম্মাদ-কে তাঁহার অভিজ্ঞতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিজেকে উপনীত করার" প্রেরণা লাভ করেন। যেমন ইহা ছিল "তাঁহার অভ্যন্তরীণ উন্নতির ব্যাপারে অনেক গুরুত্ববহ"। ইহা হইতে আরও বুঝা যায় যে, "তিনি প্রাথমিক অবস্থায় দ্বিধাপূর্ণ স্বভাবের ছিলেন"। ওয়াট বর্ণনার শেষদিকে এই মন্তব্য করেন, মনে হয় তিনি এই ব্যাখ্যা করিতে চেষ্টা করেন যে, ওয়ারাকা কেন মুসলমান হইলেন না, যদিও তিনি মুহাম্মাদ-এর নবৃওয়াত (অনুমোদন) করিয়াছিলেন। ৮৩
ইতোমধ্যে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে৮৪ যে, নামূস শব্দটির ব্যবহার বর্ণনার বিশুদ্ধতার স্বপক্ষে চূড়ান্ত প্রমাণ। ওয়াট ইহা ব্যাখ্যা করিয়া বলেন নাই, কেন পরবর্তী বর্ণনাকারীগণ অথবা তথ্য প্রদানকারীগণ ওরাকাকে রক্ষা করার জন্য এত আগ্রহী ছিলেন এবং ইহাও ব্যাখ্যা করেন নাই যে, তিনি (ওয়ারাকা) কেন মুসলমান হন নাই? যদি তাহারা বাস্তবিক বর্ণনার সঙ্গে কিছু যোগ করিতেন অথবা বর্ণনাটির পরিশোধন করিতেন তাহা হইলে তাহারা আরও সঙ্গতভাবেই বর্ণনার ঐসব উদ্দেশ্য অনুযায়ী তাহা করিতেন, যেমন ওয়াট বর্ণনা করেন, তাহাদের রাসূল সম্পর্কে এই বক্তেব্যের মাধ্যমে যে, তিনি আত্মবিশ্বাসের অভাব এবং দ্বিধাপূর্ণ স্বভাবের ব্যক্তি ছিলেন। প্রকৃত ঘটনা এই যে, এই বর্ণনার উভয় অংশের কোন একটিও পরবর্তী কালে "অনুমান কল্পনার সংযোজন নহে”। সার্বিকভাবে ঘটনা এই সত্য তুলিয়া ধরে যে, মুহাম্মাদ-এর হেরায় নির্জন অবস্থানের পিছনে উদ্দেশ্য যাহাই থাকুন না কেন এবং তাহানুছ-এর ধরন যাহাই হউক না কেন, ওহী আগমনের বিষয়টি তাঁহার নিকট অপ্রত্যাশিত ও আকস্মিক ছিল এবং তাঁহার লোকজানের নিকট নিজেকে রাসূল হিসাবে ঘোষণা করার ব্যাপারে তাঁহার না কোন পরিকল্পনা ছিল এবং না কোন প্রস্তুতি ছিল।
বেল্-এর মত ওয়াটও এই চিন্তা করেন যে, নামুস (Nåmus) শব্দটি গ্রীক শব্দ nomos হইতে উদ্ভূত এবং ইহার অর্থ "আইন অথবা ওহীকৃত ধর্মশাস্ত্র"। ওয়াট বলেন, ওয়ারাকার মন্তব্যসমূহ এইভাবে মুহাম্মাদ সম্পর্কে কথিত : তিনি "ওহী পাইতে শুরু করেন" এবং তাহারা ইহা বুঝেন যে, তাঁহার নিকট যাহা আসে তাহা ইয়াহুদী এবং খৃষ্ট ধর্মের সঙ্গে অভিন্ন বা একই শ্রেণীভুক্ত ছিল এবং তিনি একটি সম্প্রদায়ের গোড়াপত্তনকারী অথবা আইন প্রবর্তনকারী হইতে পারেন। ৮৫
রাসূলুল্লাহ সম্পর্কে ওয়ারাকার মন্তব্য ছিল তাঁহার নিকট প্রথম ওহী আগমনের পর, অনেক কয়টি ওহী আগমনের পরে নহে। যদি তিনি অনেক কয়টি ওহী লাভ করিয়া থাকিতেন তাহা হইলে সেই বিষয়ের সঙ্গে তিনি সম্যক পরিচিত হইয়া যাইতেন। প্রাথমিক আকস্মিকতা অথবা অনিশ্চয়তার সমাপ্তি ঘটিয়া যাইত এবং আলোচনার জন্য তাঁহার ওয়ারাকার নিকট যাওয়ার কোন প্রয়োজন হইত না। পক্ষান্তরে যদি ওয়ারাকা তাহাই বুঝাইতে চাহিতেন যাহা ওয়াট চিন্তা করেন, তাহা হইলে এইরূপ করার গভীর কারণ থাকিত। ইহা কল্পনাতীত যে, ওয়ারাকার মত বুদ্ধিমান, জ্ঞানবান ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব এক স্বল্প পরিচিত ও তাঁহার আত্মীয়ের নিকট হইতে এক অসাধারণ বর্ণনা শ্রবণের পর লক্ষ দিয়া উপসংহারে চলিয়া যাইবেন যে, একটি আইন অথবা ধর্মশাস্ত্রের সঙ্গে ইয়াহুদী ও খৃস্টানের মধ্যে তুলনীয় তাহা তাঁহার নিকট আসিতে শুরু করিয়াছে। ওয়ারাকা তাঁহার উল্লিখিত মন্তব্যের পূর্বেই দুইটি বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন। তিনি প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নের মাধ্যমে একটি ধারণা প্রাপ্ত ছিলেন যে, ঐ ধর্মশাস্ত্রের বক্তব্যসমূহ অন্য একজন দূত আগমনের তাহার প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত হওয়ার সুসংবাদ রহিয়াছে। মুহাম্মাদ-এর পূর্ব ঘটনা ও বৈশিষ্ট্যের জ্ঞান দ্বারা ওয়ারাকার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, মুহাম্মাদ একজন দূত (রাসূল) হওয়ার যোগ্যতার অধিকারী। পরে যখন তিনি তাঁহার অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা ওয়ারাকার নিকট প্রকাশ করেন, তিনি দ্রুত উপসংহারে আসিয়া বলেন যে, অতীতের ওহী নাযিল ও একজন রাসূলের আগমন সম্পর্কে প্রাচীন ধর্মশাস্ত্র হইতে যাহা তিনি জানেন যে, মুহাম্মাদ বিশ্বাসী, বিশ্বাসযোগ্য এবং সত্যবাদী হিসাবে আল্লাহ্ মিশন ও ওহী লাভ করিয়াছেন।
'নামূস' শব্দটির অর্থ ও উৎস যাহাই হউক না কেন, ইহা যেমনভাবে ওয়ারাকা কর্তৃক ব্যবহৃত হইয়াছে, যাহার মুহাম্মাদ -এর নিকট আগমনের ব্যাপারে কোন সন্দেহ ছিল না এবং ঐ সম্পর্ক কেবল এই শব্দসমূহের জন্য নহে যাহা তিনি প্রাপ্ত হন, বরং ইহা ছিল এক অসাধারণ ঘটনা ও পরিবেশের জন্যও বটে। এই অসাধারণ ঘটনা ছিল সেই সত্তার উপস্থিতি, যিনি এই শব্দসমূহ অবতরণ করেন। ইহা ছিল এই "উপস্থিতি” যাহা মুহাম্মাদ-এর আশ্চর্য ও হতবুদ্ধিতার কারণ ছিল এবং যাহা তাঁহাকে এবং তাঁহার স্ত্রীকে সম্প্রদায়ের একজন জ্ঞানী লোকের নিকট ইহার ব্যাখ্যার জন্য লইয়া যায়। ইহা যদি মুহাম্মাদ-এর শ্রুত শব্দসমূহ হইত অথবা তাঁহার অভ্যন্তরীণ বাচনভঙ্গি হইত ধারণাগত অথবা বুদ্ধিগত, তাহা হইলে ইহা তাঁহার আশ্চর্যান্বিত হওয়ার এবং ভয় পাওয়ার কারণ হইত না। এই "উপস্থিতি" অথবা "দর্শন” এইভাবে আহ্বান শুরুর প্রধান বৈশিষ্ট্য। নামূস এই বৈশিষ্ট্য এবং প্রাপ্ত শব্দসমূহের প্রতি ইঙ্গিত করে।
ওয়ারাকার 'নামূস' শব্দটির ব্যবহার অন্যান্য ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। সার্বিক বর্ণনায় ইহা পরিষ্কার যে, প্রথম ব্যক্তিত্ব তাঁহারাই ছিলেন যাহাদের নিকট মুহাম্মাদ তাঁহার অসাধারণ অভিজ্ঞতার কথা প্রকাশ করেন, তাঁহারা ছিলেন হযরত খাদীজা (রা) ও ওয়ারাকা। তিনি যদি দাবি করিতেন অথবা তাঁহার দর্শনকে আল্লাহ্র দর্শন বলিয়া ব্যাখ্যা করিতেন তাহা হইলে ওয়ারাকা তাহার ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্মশাস্ত্রের জ্ঞান দ্বারা ইহাকে একটি ধারণা হিসাবে এবং ভুল হিসাবে সরাসরি নাকচ করিয়া দিতেন এবং ইহা মুহাম্মাদ-এর জন্য অথবা বিংশ শতাব্দীর কোন পণ্ডিত ব্যক্তি কর্তৃক এই ভুল ধরাইয়া দেওয়ার জন্য রাখিয়া যাইতেন না। ইহার নামূসের উৎস ও অর্থ যাহাই হউক না কেন "আল্লাহ্র দর্শন” অর্থে 'নামুস' শব্দটি প্রযোজ্য হইতে পারে না।
ওয়ারাকার আশ্বাস বাণীর উপর গুরুত্ব দেওয়ার পর ওয়াট বলেন, “প্রথম” ওহীর উপসংহারমূলক শব্দাবলী, যেমন "যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দেন, তিনি মানুষকে শিক্ষা দেন যাহা সে জানিত না", এই ওহী "পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশে"র প্রতি ইঙ্গিত করে। "পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশ” -এর দ্বারা ওয়াট আদি পুস্তক (Old Testament) এবং নূতন পুস্তক (New Testament) বুঝাইতে চাহেন এবং যুক্তি দিয়া বলেন যে, রাসূলুল্লাহ-এর এই কথা বলার কোন ক্ষেত্র ছিল না যে, আল্লাহ "কলমের ব্যবহার শিখাইয়াছেন", যদিও তিনি না পড়িতে পারিতেন, না লিখিতে পারিতেন। যেহেতু তিনি ওয়ারাকার ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে ছিলেন, যিনি তাঁহার খৃস্ট ধর্মশাস্ত্রের অধ্যয়নের ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন, মুহাম্মাদ তাঁহার নিকট হইতে "অনেক সাধারণ বৈশিষ্ট্য" শিখিয়াছিলেন। এইজন্য তিনি যখন এই সূরা পুন উচ্চারণ করেন, ইহা অবশ্যই তাঁহাকে "পুনরায় স্মরণ করাইয়া দেয় যাহার ব্যাপারে তিনি ওয়ারাকার নিকট ঋণী ছিলেন"। "পরবর্তী ইসলামী ধারণাসমূহ" বর্ণনার পর ওয়াট উপসংহার টানিয়া বলেন, "ইহা ব্যাপকভাবে ওয়ারাকার ধারণাসমূহের ছাঁচে গঠিত অর্থাৎ মুহাম্মাদ-এর নিকট আগত প্রত্যাদেশ পূর্বে আগত প্রত্যাদেশের ধারাবাহিকতা”। ৮৬
বলা বাহুল্য, যে কোন প্রাচ্যবিদের জন্য ইহা দুর্লভ সুযোগ, যিনি যখন, রাসূলের ওয়ারাকার সঙ্গে আলোচনার সুপরিচিত বর্ণনা উদ্ধৃত করার সুযোগ পান, তখন তিনি এই দৃষ্টিভঙ্গি জোরদার করিবার জন্য ইহা বলিতে কসুর করেন না যে, কুরআন এবং ইসলাম সম্পর্কিত জ্ঞান পেশ করিতে রাসূলুল্লাহ অনেক কিছুই ওয়ারাকার নিকট হইতে শিক্ষা লাভ করিয়াছিলেন।
পূর্বের ধর্মীয় পদ্ধতি হইতে সাধারণ ধারণা গ্রহণ করা, বিশেষ করিয়া ইয়াহুদীবাদ ও খৃস্টবাদ হইতে ধারণা গ্রহণ করার প্রাচ্যবিদদের দাবি পূর্বে খণ্ডন করাসহ আলোচিত হইয়াছে। ৮৭ এইখানে আমরা কেবল ওয়াট-এর উপরে উল্লিখিত কতিপয় মন্তব্য আলোচনা করিব। এই বক্তব্যটি "যিনি কলমের দ্বারা শিক্ষা দিয়াছেন" অথবা "যিনি কলম ব্যবহারের শিক্ষা দান করিয়াছেন" (এই দুইটি অনুবাদের মধ্যে অর্থের পার্থক্য খুবই কম) বিশেষ দক্ষতার ক্ষেত্রে কেবল জোর দেওয়া বুঝায় না। এই আয়াত সার্বিকভাবে একদিকে এই কথার উপর জোর দেয়, যেমন ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে, মানুষের মূল উৎস এবং সৃষ্টি সম্পর্কে তাহার মানসিক ও বুদ্ধিভিত্তিক উন্নতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হইল তাহার জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা। মানুষের মূল উৎস ও সৃষ্টির জন্য তাহার ঋণকে স্মরণ করাইয়া দেওয়ার চাইতে প্রত্যাদেশের জন্য আর কোন ভাল কিছুই শুরু করার নাই এবং যে গুণ তাহাকে অন্যান্য সৃষ্টি হইতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করিয়াছে, তাহা হইল একমাত্র আল্লাহপ্রদত্ত জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তা। এই ধারণায় কলমের উল্লেখের বিষয়টি এইখানে প্রতীকীমাত্র।
পক্ষান্তরে ইহা এই গুরুত্বও বহন করে যে, রাসূলুল্লাহ -এর প্রতি যাহা নাযিল হইয়াছিল তাহা ছিল ধর্মশাস্ত্রের প্রারম্ভিক বিষয়, তাহা পঠন ও আবৃত্তির মাধ্যমে এবং কলমের সাহায্যে তাহা সংরক্ষণ ও প্রচারের ব্যবস্থা করিতে হইবে। রাসূলুল্লাহ নিজে লিখার যোগ্যতাসম্পন্ন ছিলেন কি না ইহা বিবেচ্য বিষয় নহে। যাহা হউক, এই ক্ষেত্রেও ওয়াট-এর যুক্তি আমাদেরকে কোন দিকেই অগ্রসর করে না। যেমন ওয়াট ধারণা দেন, যদি সূরা ‘ইকরা’ কেবল মুহাম্মাদ -কে স্মরণ করাইয়া দেয় যখন তিনি ইহা পুনরুল্লেখ করেন, "যাহার ব্যাপারে তিনি ওয়ারাকার নিকট ঋণী", তখন তাঁহার ওয়ারাকার নিকট সম্পূর্ণ বিষয়ের ব্যাখ্যার জন্য যাওয়ার কোন কারণ থাকিত না। পক্ষান্তরে যদি ওয়ারাকা অনেক কিছু বিষয় শিক্ষা দিতেন, তাহা হইলে তিনি যে মন্তব্য করিয়াছিলেন তাহা তিনি করিতেন না। তিনি কেবল ইহাই বলিতেন, ইহা তো যাহা তিনি অনেক পূর্ব হইতে মুহাম্মাদ -কে শিক্ষা দিয়াছিলেন এবং তিনি সব কিছুর পর সত্য উপলব্ধি করিতে সক্ষম হইয়াছেন। এই ধারণা দেওয়ার সময় যে, রাসূলুল্লাহ ওয়ারাকার নিকট হইতে অনেক কিছু শিক্ষা গ্রহণ করিয়াছেন। ওয়াট এবং অন্যান্য প্রাচ্যবিদগণ নিজেদেরকে সহজ প্রশ্নটি করেন না, ওয়ারাকা কেন মুহাম্মাদ -এর নূতন ধর্মশাস্ত্র ও নূতন ধর্মের পরিকল্পনা প্রণয়নের গোপন সংবাদ জ্ঞাত হওয়ার চেষ্টা করেন নাই। তাহারা এই প্রশ্নও পরিহার করেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর দিক হইতে পাঠ শিক্ষা করা যুক্তিসঙ্গত এবং এইভাবে তাঁহার প্রাচীন ধর্মশাস্ত্রের জ্ঞান লাভ করা এবং তাঁহার নিজের পরিকল্পনাসমূহ ও প্রস্তুতি সম্পন্ন করার পরে অন্যদেরকে তাঁহার গোপন বিষয়াদি জানানো কি অধিকতর যুক্তিসঙ্গত হইত না? যদি "পরবর্তী ইসলামিক ধারণাসমূহ" যেমন মুহাম্মাদ -এর প্রতি আগত প্রত্যাদেশ-এর সঙ্গে পূর্ববর্তী প্রত্যাদেশসমূহের সম্পর্ক” ওয়ারাকার ধারণাসমূহের ছাঁচে গঠিত হইয়াছিল। এই ধরনের ধারণাসমূহ পরবর্তীতে তাঁহার পূর্ববর্তী ধর্মশাস্ত্রের অধ্যয়ন হইতে অবশ্যই উদ্ভূত হইত। ইসলামী ধ্যান-ধারণা এইভাবে কেবল বাইবেলের পুরাতন নিয়ম ও নূতন নিয়ম-এর শিক্ষার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকিত এবং ঐ বিষয়ে প্রাচ্যবিদগণের এই বিশেষ ধারণার কার্যকারিতা ও সত্যতার স্বীকৃতিদানে কোন অসুবিধা থাকিত না, বিশেষ করিয়া মৌল একত্ববাদ ও সকল প্রত্যাদিষ্ট ধর্মশাস্ত্রের পারস্পরিক সম্পর্ক। যদি "পরবর্তী ইসলামী ধারণার দ্বারা" এই বুঝায় যে, মুহাম্মাদ -এর নিকট প্রত্যাদিষ্ট ওহীর সঙ্গে পূর্বে প্রত্যাদিষ্ট ওহীর সম্পর্কের ধারণা রাসূলুল্লাহ -এর সময়ের পরে উন্নতি লাভ করে, তাহা হইলে এই বক্তব্য সম্পূর্ণ ভুল হইবে। কারণ এই সম্পর্কের কথা স্বয়ং কুরআনে অত্যন্ত জোর দিয়া বলা হইয়াছে এবং উহা অনুরূপভাবে ৮৭ : ১৮-১৯ আয়াতদ্বয়ে সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করা হইয়াছে: "ইহা তো আছে পূর্ববর্তী গ্রন্থে, ইবরাহীম ও মূসার গ্রন্থে"। পক্ষান্তরে যদি "পরবর্তী" শব্দটি এই অর্থ বুঝায় যে, রাসূলুল্লাহ পরবর্তী সময়ে তাঁহার নিকট "প্রত্যাদিষ্ট ওহীকে পূর্ববর্তী ওহীর" সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন, পরে তাঁহার নিকট এই বিষয়টি অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হয় এবং ইহা প্রমাণ করার জন্য এত কষ্ট করার কোন প্রয়োজন থাকে না। প্রকৃতপক্ষে এই প্রশ্ন সম্পর্কে গভীরভাবে অনুসন্ধান করার অধিকতর প্রয়োজন রহিয়াছে যে, তিনি যাহা দাবি করিয়াছেন তাহা ভিন্ন বা নূতন প্রত্যাদেশ যাহা তিনি প্রাপ্ত হইয়াছেন অথবা তিনি দাবি করিয়াছেন যে, যাহা তিনি প্রাপ্ত হইয়াছেন তাহাও প্রথমে নাযিলকৃত ওহী সম্বলিত ছিল কিন্তু মানবীয় দোষত্রুটি অথবা ভুলের কারণে তাহা বিলুপ্ত হইয়া গিয়াছে।
টিকাঃ
৭৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯-৫০।
৭৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪১।
৭৭. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০।
৭৮. প্রাগুক্ত।
৭৯. প্রাগুক্ত।
৮০. প্রাগুক্ত।
৮১. Supra, পৃ. ৩৭০-৩৭৫; ৩৮৪-৩৮৫।
৮২. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৯।
৮৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১।
৮৪. Supra, পৃ. ৪২৫-৪২৬।
৮৫. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৫১।
৮৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১-৫২।
৮৭. Supra, পরিচ্ছেদ ১১।