📄 দুই: "মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর দৃশ্য অবলোকন
ওয়াট তাহার প্রথম উপ-শিরোনামযুক্ত বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন আয-যুহরীর বর্ণনার সেই অংশের বরাতে যে অংশটি তিনি তাহার প্যারা 'A'-তে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর রাসূল হিসাবে অভিজ্ঞতা শুরু হইয়াছিল "সত্য দৃশ্য” অবলোকন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, এই বিষয়ে সন্দেহ করার কোন সঠিক ভিত্তি নাই। ইহা স্বপ্ন হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং দৃশ্য (vision) সম্পর্কে প্যারা B ও J-তে উল্লেখ আছে (জিবরাঈলের উপস্থিতির বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে প্যারা D ওI-এ রহিয়াছে)। ৫
ইহা তাৎক্ষণিকভাবে বলা প্রয়োজন যে, ওয়াট এইখানে "আর-রু'ইয়া আস্-সাদিকা" উদ্ধৃতিটিতে কেবল বেল্-এর অনুবাদ অবলম্বন করিয়াছেন। এই উদ্ধৃতির, যাহার সম্পর্কে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত করা হইয়াছে, ৬ অর্থ "সত্য স্বপ্ন", "সত্য দৃশ্য” নহে। ইহা স্বত্য যে, বুখারী শরীফে বর্ণিত আয-যুহ্রীর অথবা হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায়, যাহা বেল্ উদ্ধৃত করিয়াছেন, "সত্য স্বপ্ন” (true dreams)-এর পর "ঘুমন্ত অবস্থায়" (in sleep) শব্দ রহিয়াছে। সংশ্লিষ্ট রিওয়ায়াতে আত-তাবারীর ভাষ্য যাহা সম্পূর্ণ সঠিক নহে এবং যাহা ওয়াট উদ্ধৃত করেন, উহাতে অবশ্যই In Sleep শব্দটি নাই। কিন্তু ইহা এমনকি এই ভাষ্যের অভ্যন্তরীণ প্রমাণ হইতে স্পষ্ট যে, 'আর-রু'ইয়া আস্-সাদিকা' যাহা রাসূল হিসাবে অভিজ্ঞতার শুরুতে বর্ণিত সম্পূর্ণরূপে একটি বিশেষ পর্যায়। ইহার পূর্বে তিনি একটি বিষয় অনুসরণ করেন, যেমন হেরা গুহায় তাহান্নুছ অবলম্বন এবং এই অভিজ্ঞতা যাহা জাগ্রত অবস্থায় আসিয়াছিল। রিপোর্টের দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা যাহা ওয়াট তাহার প্যারা "B" -এর শুরুতে উল্লেখ করেন তাহা এইঃ "ইহার পর তাঁহার নিকট নির্জনবাস প্রিয় হইয়া উঠে এবং তাহানুছ-এ নিমগ্ন হওয়ার জন্য তিনি হেরা গুহায় গমন করেন..."। ওয়াট এই বর্ণনায় উল্লিখিত দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করার বিষয়টি উপেক্ষা করেন, হয় ভুলবশত অথবা বেল্-এর অনুবাদের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিয়া পড়ার কারণে এবং এইভাবে আর-রু'ইয়া আস্-সাদিকা বক্তব্যটিকে তাহার প্যারা "B" এবং '১'-এ বর্ণিত অন্যান্য ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন। এইভাবে তিনি অবস্থার তীব্রতা এবং মূল পাঠের মর্ম উদ্ধার করার রীতি অবলম্বন করেন। তাহানুছ-পূর্ব অভিজ্ঞতা হাদীছের কোথায়ও বর্ণিত হয় নাই। এমনকি কুরআনেও আর-রু'ইয়া আস-সাদিকার কথা বর্ণিত হয় নাই। মুহূর্তকালের চিন্তা ইহাকে স্পষ্ট করিয়া তোলে যে, আর-রু'ইয়া কর্মের সঙ্গে আস্-সাদিকা বিশেষণের সংযোজন এই বিষয়টি নির্দেশ করে যে, ইহা এমন এক ধরনের অবলোকন যাহা সাধারণত এবং স্বাভাবিকভাবে "সত্য” নহে অর্থাৎ স্বপ্ন। সম্ভবত কেহই "সত্য” বিশেষণটি কাহারও চাক্ষুষ দেখার সঙ্গে সংযোজন করার জন্য মাথা ঘামান না।
যাহা হউক, ওয়াট-এর উদ্দেশ্য এই যে, তিনি সূরা আন-নাজম-এ বর্ণিত তথাকথিত "দর্শন” (vision) বিষয়টি আলোচনায় লইয়া আসেন এবং পূর্বের অধ্যায়ে আলোচিত মারগোলিয়থ বেল্-এর থিওরী সমর্থন করেন। অতএব উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পর পরই ওয়াট "দর্শন” (vision)-এর প্রমাণ সমর্থনকারী হিসাবে ঐ সূরা উদ্ধৃত করেন এবং তাহার নিজস্ব অনুবাদে (১১ ও ১২ নং আয়াত বাদ দিয়া) সূরার ১৮ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দেন। তারপর তিনি পর্যবেক্ষণ করিয়া বলেন, এই বিষয়টি মনে করার কারণ রহিয়াছে যে, মুহাম্মাদ মূলত এই সব বিষয়কে নিজ হইতেই আল্লাহর দর্শন হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। ওয়াট ইহার কারণ বা ভিত্তিগুলিকে নিম্নে চিহ্নিত করেন:
(১) মাদানী জীবনকালের পূর্বে কুরআন শরীফের কোথায়ও জিবরাঈল ('আ)-এর উল্লেখ নাই।
(২) সূরা আন-নাজম-এর ১০ নং আয়াতের ক্রিয়ার কর্তা হওয়া উচিত 'আল্লাহ', অন্যথায় বাক্যবিন্যাস 'বেমানান' হইবে।
(৩) প্যারা 'B'-এর শেষে বর্ণিত বাক্যটি 'সত্য তাঁহার নিকট অসিল এবং তিনি বলিলেন...' -এর সমান অর্থ প্রকাশক, যেমন "সত্য হইল আল্লাহ্ দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করার পন্থা"।
(৪) হযরত জাবির ইব্ন আবব্দুল্লাহ (রা)-র হাদীছ যাহা বেল্ উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ -এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন (বেল্-এর অনুবাদ অনুযায়ী) "... আমি আমাকে ডাকিবার একটি শব্দ শুনিলাম এবং আমি চতুর্দিকে তাকাইলাম, কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না। পরে আমি আমার মাথার উপরের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, তিনি সিংহাসনে বসিয়া আছেন"।৭
সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতের অনুবাদে ওয়াট বেল্-এর 'ওহী' এবং 'আওহা' শব্দের একই অর্থ করিয়াছেন, যেমন “পরামর্শ” এবং “পরামর্শকৃত"। এই অর্থসমূহ, যেমন পূর্বের অধ্যায়ে বলা হইয়াছে, ইহা কুরআনিক ওহীর জন্য সঠিক অর্থ নহে। দ্বিতীয়ত, ওয়াট-এর বর্ণনাঃ "মুহাম্মাদ এইগুলি অর্থ করিয়াছেন" ইত্যাদি দুইটিই কটাক্ষপূর্ণ বক্তব্য সম্বলিত। ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, “দর্শন” বাস্তব ছিল না, বরং কিছুটা মানসিক বিষয় ছিল, এই ধারণাই ওয়াট সর্বোতোভাবে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছেন। ইহাও বলা যায় যে, সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতকে ভিত্তি ধরিয়া ওয়াট সুস্পষ্টরূপে তাহার বর্ণনা এইভাবে দেন যে, ইহা এমন একটি "ব্যাখ্যা” যাহা মুহাম্মাদ কর্তৃক রচিত। এই ধারণা সকল প্রাচ্যবিদের, যদিও ওয়াট ইহাকে খোলাখুলি সত্য বলিয়া ঘোষণা করেন নাই।
ওয়াট কর্তৃক বর্ণিত ৪টি ভিত্তির মধ্যে তৃতীয়টি ছাড়া বাকীগুলি তাঁহার নিজস্ব, তৃতীয়টি বেল কর্তৃক বর্ণিত। তাহার এই পূর্ব-ধারণাগুলি এবং তাহাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল সূত্রসমূহ ইতোমধ্যে পরীক্ষা করা হইয়াছে এবং ইহা দেখানো হইয়াছে যে, প্রত্যেক ধারণার দফাগুলি অসমর্থনীয়। ১০ ৪র্থ অবস্থা বর্ণনায় ওয়াট সুনির্দিষ্টভাবে বেল্-এর ভুল দাবির পুনরাবৃত্তি করেন নাই, "The throne" (সিংহাসন) শব্দটি আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য এবং ইহা বুঝার দায়িত্ব পাঠকদের উপর ছাড়িয়া দেন। এই বিশেষ ধারণায় ভুল করার বিষয়টিও ইতোমধ্যে নির্দেশ করা হইয়াছে। ১১ জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ আনসারী (রা)-র বর্ণনা যাহা ওয়াট নিজেই উদ্ধৃত করেন। ১২ ইহাও বলা লক্ষণীয় যে, ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্র রাসূল "ফেরেশতাকে দেখিয়াছিলেন" যিনি হেরা গুহায় তাঁহার নিকট আসিতেন আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে একটি সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায়।
যুক্তি প্রদর্শন তালিকায় ওয়াট-এর নিজস্ব যুক্তির সঙ্গে যোগকৃত বিষয়, যেমন উপরে ৩. (iii) নম্বরে উল্লেখ করা হইয়াছে, সেই স্থানের দুইটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রথমত, বুখারী শরীফে উল্লিখিত আয-যুরীর বর্ণনা এবং এই বিষয়ে কিছুটা ভিন্নধর্মী অপর একটি রচনা। বর্ণনাটি এই: حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ وَهُوَ فِي غَارِ حِرَاءٍ فَجَاءَهُ الْمَلَكُ فَقَالَ .... “হেরা গুহায় অবস্থানকালে শেষে তাঁহার নিকট সত্য আসিল, তাঁহার নিকট ফেরেশতা আসিয়া বলিল..."।
তাবারীর বর্ণনা যাহা ওয়াট উল্লেখ করেন: فَجَاءَهُ الْحَقُّ فَآتَاهُ فَقَالَ "সুতরাং তাঁহার নিকট সত্য আসিল, তিনি তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন..."। এইভাবে শব্দটির স্থলে আছে এবং এই বর্ণনায় ফেরেশতার কথা উল্লেখ নাই। কিন্তু ইহা সুস্পষ্ট যে, فَجَاءَهُ الْحَقُّ একটি বাক্য এবং فَأَتَاهُ فَقَالَ আর একটি বাক্য। যাহা হউক, বর্ণনার এই অংশটি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে অনুবাদ করেন নাই। তিনি দুইটি বাক্যকে একটি বাক্যে একীভূত করেন এবং এইভাবে অনুবাদ করেন "At length unexpectedly the Truth came to him and said..." (অবশেষে অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁহার নিকট সত্য আসিল এবং বলিল...")। এই অনুবাদের আরবী সমতুল্য বর্ণনা হইবে : فَجَاءَهُ الْحَقُّ وَقَالَ ; ওয়াট তাহার অনুবাদে দুইটি বাক্যকে একটি বাক্যে একীভূত করেন ও বাক্যাংশটি বাদ দিয়া যাহা একটি স্বতন্ত্র বাক্যের প্রারম্ভিক অংশ। তিনি "truth শব্দের প্রথম অক্ষরটিতেও Capital letter ব্যবহার করেন যাহাতে ইহার অর্থ অবশ্যই তাহার ধারণা অনুযায়ী হয়। যদি ইহা না করা হইত এবং যদি সুনির্দিষ্টভাবে মূল পাঠের দুই স্থানে ফেরেশতার উল্লেখের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হইত যাহা মূল পাঠে অব্যাহত আছে, কিন্তু ইহাকে ওয়াট "সুবিধার জন্য" ৭টি অংশে বিভক্ত করিয়াছেন। ইহা সুস্পষ্ট যে, র্টার্ড ক্রিয়ার কর্তা ফেরেশতা। এমনকি ধারাবাহিক মূল পাঠে এই ধরনের বিভক্তির পরও ওয়াট স্বীকার করেন যে, ফেরেশতা জিবরাঈল তাহার নিজ নামে উল্লিখিত হন যাহা এই অংশ হইতে দূরে নহে অর্থাৎ যাহা তিনি প্যারা 'D'-তে উল্লেখ করিয়াছেন।
পুনরায় ইহা লক্ষণীয় যে, ধারাবাহিক মূল আরবী পাঠে অস্তিত্বশীল বস্তু সম্পর্কে তিনবার উল্লেখ করা হইয়াছে এইভাবেঃ "অতঃপর তিনি তাঁহার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন.... فَأَتَاهُ ...فَقالَ "অতঃপর তিনি আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন...". ثُمَّ أَتَانِی فَقَالَ “অবিলম্বে তিনি আমার সম্মুখে আসিলেন ...তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল..." فَتَبَدُّى فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ أَنَا جِبْرِيلُ ফ, ছুম্মা ও ফা অব্যয়সমূহ ক্রিয়ার পূর্বে বসিয়া এই উপসংহারমূলক বর্ণনা প্রদর্শন করে যে, ইহা একটি অব্যাহত বিবরণ এবং সর্বক্ষেত্রে একই সত্তা কথা বলা হইয়াছে।
এই সীমা পর্যন্ত বর্ণনায় কোন বিরতি নাই, বর্ণনাকারীরও কোন পরিবর্তন নাই। এইখানে একমাত্র বর্ণনাকারী হইলেন হযরত আয়েশা (রা) যিনি কখনও তাঁহার নিজ ভাষায় বর্ণনা করেন, কখনও রাসূলুল্লাহ-এর ভাষায় বর্ণনা করেন। ওয়াট নিজে এই ঘটনার স্বীকৃতি দেন যখন তিনি বলেন: প্যারা 'A' হইতে 'H' পর্যন্ত বর্ণনা প্রমাণহীনভাবে স্বীকৃত যে, ইহা অব্যাহতভাবে আয-যুহরীর বর্ণনায় বর্ণিত। কিন্তু সবগুলি বর্ণনা হযরত আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে আসার প্রয়োজন ছিল না। ১৩ এই কৌশল এমনভাবে অবলম্বন করা হইয়াছে, হযরত আয়েশা (রা) যে একজন সুষ্পষ্ট বর্ণনাকারী সেই বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা হইয়াছে, কিন্তু ইহা প্রমাণযোগ্য নহে।
প্যারা 'H' অবশ্য আত্-তাবারীতে একটি পৃথক প্যারাগ্রাফে অসিয়াছে এবং ইহা তাহার (আয়েশার) নিকট হইতে আসে নাই। কিন্তু ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, প্যারা 'H' -এর পূর্বের প্যারা একটি অব্যাহত বর্ণনা এবং ইহার একমাত্র বর্ণনাকারী হযরত আয়েশা (রা)। ওয়াট এই ক্ষেত্রে আর একটি সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তিন বলেন যে, ঘটনায় ইবন ইসহাক, হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় বিরতি দেন, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ -এর নিকট নির্জনবাস প্রিয় হওয়ার পর] প্যারা 'B' -এর প্রথম বাক্য সম্ভবত তাহার অন্য অংশের অবশিষ্ট অংশ, সেটিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়াছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঐ স্থানে উৎসের কোন বিরতির কথা উল্লেখ করেন নাই। ১৪ এই মন্তব্য কৌতূহলপূর্ণ, কারণ ইবন ইসহাকের "অন্য ভাষ্যের" "অগ্রাধিকার দেওয়া ঐ স্থানের উৎসে অপরিহার্যরূপে কোন বিরতি নির্দেশ করে না"। তাই কেন আমরা হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় তাহার বিরতি দেওয়ার উপর জোর দিব? এই মন্তব্যও যথাযথ নহে। কারণ এই স্থানে আত্-তাবারীতে প্রদত্ত হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার সঙ্গে (আয-যুহরীর) বর্ণনা সম্পৃক্ত, ইবন ইসহাকের ভাষ্যের সঙ্গে নহে যাহা ওয়াট নিজে উদ্ধৃত করেন নাই। কারণ তাঁহার মতে, ইহা পুনর্লিখিত। আয-যুহরীর বর্ণনা, বর্ণনাকারীর পরিবর্তনের ফলে তিনি যাহা বলেন, সেই বিষয়বস্তুকে বিরতির ভিত্তিতে আয-যুহরীর বর্ণনা যখন বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা হয়, একই সময়ে তিনি ঐ ঘটনা গোপন করিতে পারেন না। কারণ বাস্তবিকপক্ষে ইহার বৃহত্তর এবং অত্যন্ত মৌলিক অংশের বর্ণনায় কোন বিরতি নাই, নাই সেখানে কোন বর্ণনাকারীর পরিবর্তন এবং তাহার দ্বারা কৃত বিভক্তি খামখেয়ালীপূর্ণ। ইহা তাহার উত্থাপিত ভিত্তি অনুযায়ী হয় নাই।
ইহা অনুমিত হয় যে, ইহার কিছু পরেই প্রকৃতপক্ষে তিনি আয-যুহরীর বর্ণনা বিভিন্ন পৃথক অংশে টুকরা টুকরা করেন। মুহাম্মাদ -কে বক্তব্য প্রদানকারী প্যারা 'B' -এর বক্তব্য হইল "সত্য" (the truth), 'C' অংশে "একমাত্র তিনিই" এবং 'D' ও 'I' অংশে 'জিবরাঈল'। ১৫ ওয়াটের উদ্দেশ্য হইল এই কথা বলা যে, জিবরাঈল উল্লিখিত দুই অংশে স্বনামে উক্ত হইয়াছেন, উহা মুহাম্মাদ -এর প্রতি ওহী অসার আলোচনায় লইয়া আসার প্রয়োজন নাই। ইহা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত যে, আয-যুহরীর বর্ণনা অব্যাহত এবং বিভক্তি সত্ত্বেও ওয়াট কর্তৃক উদ্দেশ্যপূর্ণরূপে প্রবর্তিত ফা, ছুম্মা ও ফা অব্যয়ের ক্রিয়ার সঙ্গে অস্তিত্বপূর্ণ বাক্য "فَجَاءَهُ الْحَقُّ" এই অর্থ প্রকাশ করে যে, ইহাও একই সত্তা অর্থাৎ জিবরাঈল যাঁহার সম্পর্কে সর্বত্র বলা হইয়াছে এবং যিনি শেষ পর্যন্ত স্বনামেই চিহ্নিত হন। বর্ণনার ধারাবহিকতা এমনকি ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী জিবরাঈলকেই তাত-এর মধ্যস্থ ক্রিয়ার কর্তা হিসাবে গ্রহণ করা উচিত যাহার মাধ্যমে বর্ণনা শুরু হইয়াছে এবং যাহা ওয়াট তাহার অনুবাদে বাদ দিয়াছেন।
তৃতীয় বিষয় যাহা এই সম্পর্কে উল্লেখ করা প্রয়োজন তাহা হইল, বাক্যের সম্পর্ক فَجَاءَ الْحَقُّ "হঠাৎ তাঁহার নিকট সত্য আসিল," মূল পাঠে যাহা অনুসরণ করা হইয়াছে। এমনকি এই বক্তব্যের অর্থ হইল আল-হাক্ক (الحق)। ইহা পুনরায় এইভাবে স্মরণ করা যায় যে, এই সংক্রান্ত বর্ণনার অপর ভাষ্যের বক্তব্য হইল, "অতঃপর তাঁহার নিকট সত্য আসিল"। যাহা হউক, বাক্-পদ্ধতির পার্থক্য হইলেও অর্থের কোন পার্থক্য নাই যাহা মূল পাঠে অনুসৃত ও বর্ণনায় বিধৃত যে, কিভাবে "সত্য" রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আসিল? কিন্তু এইখানে আল-হাক্ক-এর অর্থ আল্লাহ নহে, উপরে যেমনটি বর্ণনা করা হইয়াছে, পরবর্তী বর্ণনার ক্রিয়াপদের উদ্দেশ্যও নহে। ওয়াট উপরের বক্তব্যে উল্লিখিত 'God' শব্দের অর্থ প্রয়োগ করেন। কারণ তাহার মতে, "আল্লাহ্ প্রতি ইঙ্গিত করার ইহাই একটি পদ্ধতি"। ১৬ তাহার এই কারণ বর্ণনা গ্রহণযোগ্যতা পায় নাই এই জন্য যে, আরও বিভিন্ন ধারণায় এই বক্তব্য ব্যবহৃত হইয়াছে। কার্যত ইহা কুরআন শরীফে অনধিক ২৬০ বার দৃষ্ট হয়, ইহার মধ্যে ২০বার ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ১৭ যাহা হউক কুরআনের কোথাও আল্লাহকে বুঝাইতে আল্-হাক্ক শব্দটি এককভাবে আসে নাই। ইহা কেবল ৯টি স্থানে আল্লাহ্র গুণ হিসাবে আসিয়াছে, কিন্তু সব সময় আল্লাহ অথবা রাব্ব (3) শব্দের সঙ্গে উল্লিখিত হয়। যেমন ২০:১১৪ এবং ২৩:১১৬ নম্বর আয়াতে فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ : ২০:১০০ ; 28 : 24 هُوَ اللهُ أَنَّ ; 39 : 20 فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ ; 52 : 59 وَرُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَهُمُ الْحَقُّ الْحَقُّ ইত্যাদি। ১৮ অপরদিকে ইহা কুরআনিক ওহী অর্থে পঞ্চাশাধিক স্থানে ব্যবহৃত হইয়াছে। ১৯ বৃহত্তম একক সংখ্যাগরিষ্ঠ উদাহরণে ইহা একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং এই ব্যবহার প্রায় সব সময় " 3 " ক্রিয়ার সঙ্গে হইয়াছে। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হইল :
(১) فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا إِنَّ هَذَا لَسِحْرٌ مُّبِينُ (۱۰:۷۲) . “অতঃপর যখন উহাদিগের নিকট আমার পক্ষে হইতে সত্য আসিল তখন উহারা বলিল, ইহা তো নিশ্চয়ই স্পষ্ট যাদু” (১০:৭৬)।
(২) لَقَدْ جَاءَكَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ (١٠ : ٩٤) . "তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার নিকট 'সত্য' অবশ্যই আসিয়াছে। তুমি কখনও সন্দিগ্ধচিত্তদিগের অন্তর্ভুক্ত হইও না” (১০:৯৪)।
(৩) فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا لَوْلا أُوتِيَ مِثْلَ مَا أُوتِيَ مُوسَى (٤٨:٢٨) "অতঃপর যখন আমার নিকট হইতে উহাদিগের নিকট সত্য আসিল, উহারা বলিতে লাগিল, মূসাকে যেরূপ দেওয়া হইয়াছিল, তাহাকে সেরূপ দেওয়া হইল না কেন” (২৮:৪৮)?
(4) بَلْ مَتَّعْتُ هَؤُلاَءِ وَآبَاءَهُمْ حَتَّى جَاءَهُمُ الْحَقُّ وَرَسُولٌ مُّبِينٌ (۲۹:۴۳) . "বরঞ্চ আমিই উহাদিগকে এবং উহাদিগের পূর্বপুরুষদিগকে দিয়াছিলাম ভোগের সামগ্রী, অবশেষে উহাদিগের নিকট আসিল সত্য ও স্পষ্ট বর্ণনাকারী রাসূল" (৪৩:২৯)।
(৫) وَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ وَإِنَّا بِهِ كَافِرُونَ (۴۳:۳۰) . "যখন উহাদিগের নিকট সত্য আসিল উহারা বলিল, 'ইহা তো যাদু এবং আমরা ইহা প্রত্যাখ্যান করি” (৪৩:৩০)।
(৬) الَّذِي أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ هُوَ الْحَقُّ (٦ : ٣٤) . "তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাই সত্য” (৩৪:৬)।
(۷) وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الْكِتب هُوَ الْحَقُّ ( ٣٥ : ٣١) . "আমি তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি তাহা সত্য" (৩৫: ৩১)।
অনুরূপভাবে কুরআনের একটি উদাহরণ (এমনকি হাদীছের উদাহরণ) এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, কুরআনে ওহীর অর্থে আল্-হাক্ক (اَلْحَقُّ) শব্দ বহুল ব্যবহৃত এবং এই পরিভাষা যদিও নিঃসন্দেহে আল্লাহর একটি গুণ, তবুও আল্লাহকে বুঝাইতে এই শব্দটি কখনও এককভাবে ব্যবহৃত হয় নাই। فَجَاءَ الْحُقُّ অথবা فَجَاءَهُ الْحَقُّ বক্তব্যটি আলোচ্য আয়াতে ওহীর অর্থে ব্যবহৃত, এমন নহে যেমন ওয়াট আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে আল্লাহ্ আবির্ভাব ঘটে। আয-যুহরীর বর্ণনা এবং সূরা আন্ নাজম-এর বর্ণনার দ্বারা ওয়াট দেখাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ আল্লাহ্র "দর্শন” লাভ করিয়াছেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন। ওয়াট সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আরও বলেন যে, ইহা যদি আল্লাহকে মুহাম্মাদের দেখার মূল ব্যাখ্যা হইয়া থাকে, তাহা হইলে ইহা কদাচিৎ তাঁহার চূড়ান্ত দাবি হইবে। ইহা ৬: ১০৩ নং আয়াতের সঙ্গে মতপার্থক্যের সৃষ্টি করে। ঐ আয়াতে বলা হয়, “দর্শন” তাঁহার পর্যন্ত পৌঁছে না”। এই সম্পর্কে ওয়াট সূরা আন্-নাজম-এর ১১ নম্বর আয়াতের উদাহরণ দেন, যাহা তিনি বেল্-এর অনুবাদ অনুযায়ী উদ্ধৃত করেন, যেমন, "ইহা যাহা দেখিয়াছে অন্তর, তাহা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না"। এবং তিনি বলেন যে, এই আয়াত "সম্ভবত পরবর্তী সময়ের সংযোজন"। ২০ যে কেহ ইহা সহজেই চিহ্নিত করিতে পারিবে যে, এইখানে ওয়াট কেবল বেল্-এর ধারণাসমূহ উল্লেখ করেন যে, মুহাম্মাদ প্রথমে আল্লাহকে দেখার দাবি করেন এবং পরে তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারিয়া তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন এবং এই সূরার আর একটি আয়াত উল্লেখ করিয়া (চাক্ষুষ দর্শনের পরিবর্তে) আধ্যাত্মিক দর্শনের অথবা মানসিক দর্শনের ধারণা প্রদান করেন। ২১ যে সূত্রের উপর ভিত্তি করিয়া এইসব ধারণা করা হইয়াছে, তাহা ইতোমধ্যে পরীক্ষা করা হইয়াছে এবং সমর্থন অযোগ্য প্রমাণিত হইয়াছে। ২২ ইহা পুনরায় জোর দিয়া বলা যায় যে, না আয-যুহরীর বর্ণনা, না সূরা আন্-নাজম "আল্লাহ্র দর্শন" সম্পর্কে বলিয়াছে। সুতরাং কুরআনের অন্যান্য আয়াতের সঙ্গে এই ব্যাপারে মতপার্থক্যের কোন অবকাশ নাই, যেমন ৬: ১০৩ নং আয়াতে সূরা আন্ নাজ্য-এর পরবর্তী আয়াতে কোন সংশোধন নাই। "আল্লাহর দর্শন" কথাটি একটি ভিত্তিহীন অনুমান যাহার উপর ভিত্তি করিয়া পরবর্তী অশুদ্ধ ধারণার বিতর্ক এবং পরবর্তী সংশোধনের অনুমান করা, ইহার সবকিছুই ভ্রান্ত এবং সমর্থন অযোগ্য।
ইহা পুনরায় স্মরণ করা যাইতে পারে যে, ২৩ সূরা আন্-নাজম-এর ১৮ নং আয়াত যাহা রাসূলুল্লাহ -এর স্বচক্ষে দেখার কথা বলে। "তাঁহার প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্শন", ইহা মানসিক ও আধ্যাত্মিক দর্শন ও আল্লাহ্র দর্শন-এর বিরোধী তত্ত্ব হিসাবে প্রচলিত। বেল্ যখন এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন তখন নীরবে এই আয়াত উপেক্ষা করেন। যাহা হউক, ওয়াট বেল্-এর উপস্থাপনার ফাঁক-ফোকর বন্ধ করার ইচ্ছা করেন এবং এই প্রসঙ্গে আধ্যাত্মিক দর্শন-এর তত্ত্ব সম্বলিত আয়াত আনার চেষ্টা করেন। এই সময় হইতে আয়াতের উদাহরণ তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, "অবশ্যই ইহা এই অর্থে লওয়া হয় যে, যাহা মুহাম্মাদ দেখিয়াছিলেন তাহা ছিল ঔজ্জ্বল্য ও আল্লাহ্র মহিমার নির্শন অথবা প্রতীক"। তখন তিনি ইহাকে ১১ নং আয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন ("তিনি যাহা দেখেন, অন্তর ইহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নাই") এবং বলেন যে, “যখন চক্ষুসমূহ নিদর্শন অথবা প্রতীক প্রত্যক্ষ করে তখন অন্তর প্রতীকী বস্তুকে প্রত্যক্ষ করে"। এইভাবে ওয়াট যদিও হযরত মুহাম্মাদ -এর মূল ব্যাখ্যা "দর্শন হইল সরাসরি আল্লাহকে দেখা” সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না, প্রত্যাশিতভাবে তিনি ভুল করেন না। সম্ভবত আয়াতের অনুবাদ এইভাবে করা যাইতে পারেঃ "সে, লোকটি যাহা দেখিয়াছে সেই সম্পর্কে অন্তর ভুল করে নাই। ২৪
উপরের মন্তব্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে করা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ "মৌলিকভাবে দর্শন (vision)-কে আল্লাহকে সরাসরি দেখা হিসাবে ব্যাখ্যা করেন"। তিনি এইরূপ ব্যাখ্যাও করেন নাই এবং সূরা আন্-নাজম্-এর আয়াতও ঐরূপ অর্থ বহন করে না। অতএব সূরার আয়াতসমূহের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নাই এবং তাই উহাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার মত ব্যাখ্যা লইয়া অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনও নাই যাহাতে প্রকৃতপক্ষে এই ব্যাখ্যা ১১ নং আয়াতের একটি অন্যায্য ও বিকৃত অর্থ করে। কারণ ওয়াট বলেন, "যখন চক্ষুসমূহ নিদর্শন অথবা প্রতীক প্রত্যক্ষ করে তখন অন্তর প্রতীকী বস্তুকে প্রত্যক্ষ করে" তাহাই আল্লাহ। আয়াত কোন প্রকারেই এই অর্থ বহন করে না যে, চক্ষু একটি জিনিস অর্থাৎ আল্লাহর একটি নিদর্শন দেখিয়াছে এবং অন্তর দেখিয়াছে বা ধারণ করিয়াছে অন্য জিনিস অর্থাৎ আল্লাহকে। আয়াতের সরল অর্থ এই যে, অন্তর ও চক্ষু ছিল ঐক্যবদ্ধ-ইহা অন্তরের ভুল ছিল না অর্থাৎ তিনি (রাসূলুল্লাহ) তাঁহার চক্ষু দ্বারা যাহা দেখিয়াছেন তাহাতে তিনি কোন ভুল ধারণা করেন নাই। যেমন ওয়াট ইহার বিকল্প অনুবাদ করেন এইভাবে, "অন্তর ভুল করে নাই", "তিনি যাহা দেখিয়াছেন"। মানুষ দেখিয়াছে এই ক্ষেত্রে মানসিক অথবা আত্মিক বিষয়ের পরস্পরবিরোধী শব্দাবলীর ব্যবহারের উপর সম্পূর্ণ জোর দেওয়া হইয়াছে।
ওয়াট-এর উদ্দেশ্য হইল এই ধারণার মধ্যে বিকৃতি প্রদান করা। যেমন তিনি সাধারণভাবে বলেন, "ইহাকে জিবরাঈলের দর্শন (vision) হিসাবে চালাইয়া দেওয়ার বিষয়টিকে পরিহার করা। যাহা ইতিহাসের পরিপন্থী হিসাবে পরিগণিত হইবে এবং তিনি ইসলামিক প্রগাঢ় নিষ্ঠাপূর্ণ ধারণা সম্পর্কিত মতপার্থক্যকে পরিহার করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ আল্লাহকে দেখেন নাই। ২৫ এইখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় : ইহা প্রমাণ করার জন্য এই আগ্রহ কেন সৃষ্টি হইল যে, যিনি রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছিলেন তিনি জিবরাঈল ছিলেন না। যদি সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতের পরিষ্কার অর্থ তাহাই হয়, যাহা ওয়াট ও বেল্ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ মূলত ভুল করিয়া ইহাকে সরাসরি আল্লাহ্র দর্শন বলিয়া মনে করেন এবং পরবর্তী কালে এই ভুল সংশোধন করিয়া মানসিক দর্শন সম্পর্কিত ধারণা প্রদান করেন? ওয়াট-এর সত্য বলিয়া ঘোষিত স্বীকৃতির উদ্দেশ্য বরং তাহার প্রকৃত ঘটনার সতকর্তার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এইজন্য যে, তিনি সূরা আন-নাজম-এর আয়াতের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাহা ইহার সরল অর্থ নহে। আরও যে কারণ বলা হইয়াছে, যেমন জিবরাঈলকে দেখা “ইতিহাস পরিপন্থী হইবে” এই বক্তব্যটি পরিষ্কারভাবে পুরানো যুক্তিভিত্তিক। কারণ কুরআনের মক্কী সূরাসমূহে জিবরাঈলকে নাম দ্বারা চিহ্নিত করা হয় নাই। যে যুক্তি ইতোমধ্যে দেখানো হইয়াছে অসমর্থনীয় এবং ভুল। ২৬ এই যুক্তি ওয়াট-এর দিক হইতেও অসঙ্গতিপূর্ণ যাহা বেল্-এর মত নহে। তিনি এই ধরনের মনোভাব পোষণ করেন না যে, এই ব্যাপারে বিবেচনার জন্য হাদীছ দ্বারা যুক্তি প্রদান করা উচিত নহে অর্থাৎ হাদীছ বিবেচ্য। ওয়াট স্বীকার করেন যে, আয-যুহরীর বর্ণনায় জিবরাঈল-এর সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। বিশেষ করিয়া তাঁহার 'D' এবং 'I' প্যারায় উল্লেখ করেন। ওয়াট প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে জিবরাঈলের উল্লেখ সম্পর্কিত সন্দেহ দূর করেন। এইভাবে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করেন যে, বর্ণনাসমূহের ঐ অংশগুলি পরবর্তী কালের বর্ণনাকারীদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়। এই ধরনের প্রয়োগও অসঙ্গতিপপূর্ণ এই কারণে, যাহা তিনি আয-যুহরীর বর্ণনায় অগ্রাধিকার প্রদান করেন। যেমন ইবন হিশামের বর্ণনার মত ইহা পুনর্লিখিত হয় নাই। যদি পরবর্তী কালের বর্ণনাকারীগণ বর্ণনার ঐ অংশ সংশোধন করিয়া থাকেন। তাহারা সম্ভবত ইহার প্রাথমিক অংশও সংশোধন করিয়া থাকিবেন, যে বর্ণনায় সত্য আসার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ ওয়াট-এর মতে, উহার অর্থ রাসূলুল্লাহ-এর সম্মুখে আল্লাহ্ আবির্ভাব এবং ইহা ঐ বক্তব্যের বিপরীত যাহা তিনি ইসলামিক মৌলিক বিষয়ে বলেন। প্রকৃত বিষয় এই যে, বর্ণনার ঐ অংশে যে জিবরাঈলের উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহা পরবর্তী কালের প্রক্ষেপণ নহে এবং সত্য আসার অর্থ আল্লাহ আবির্ভূত হওয়াও নহে। আরও স্মরণ করা যাইতে পারে যে, সূরা আন্-নাজম-এর এই আয়াতই রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ওহী আসার একমাত্র কুরআনী সংবাদ তথ্য নহে এবং এই আয়াত বুঝার জন্য কুরআনের অপর অনুরূপ আয়াতসমূহের সঙ্গে একসঙ্গে বুঝিতে হইবে, বিশেষ করিয়া ৮১: ১৯-২৩ আয়াত যাহা ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ২৭
ওয়াট এই বিষয়ের কুরআনের অন্যান্য আয়াতের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক। তিনি ঐসব আয়াতের ব্যাপারে কি মত পোষণ করেন তাহা জানার পূর্বে সূরা আন-নাজম-এর আয়াতের তাহার উপরোল্লিখিত ব্যাখ্যার দ্বিতীয় উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, “ইসলামের গোঁড়া ধ্যান-ধারণার বিতর্ক এড়ানোর জন্য (এইরূপ বলা) যে, মুহাম্মাদ আল্লাহকে দেখেন নাই”। এই রচনার পূর্বের অধ্যায়ের পাঠকারী যে কোন পাঠক তাৎক্ষণিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করিবে যে, ওয়াট-এর এই বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে বেল্-এর ভিত্তিহীন ধারণাপ্রসূত, যাহা তথাকথিত গোঁড়া ইসলামিক বিশ্বাস এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ-এর সময়ের পরবর্তীতে এক উন্নতির লক্ষণ ছিল এবং ইহা কুরআনের প্রামাণ্য বিষয়ে বেল্-এর চিন্তায় পার্থক্য সৃষ্টি করে, যাহার ফলে তিনি মনে করেন যে, মুহাম্মাদ মূলত আল্লাহকে দেখিয়াছেন বলিয়া দাবি করেন। এই প্রশ্নটি এইভাবে পুনরায় সূরা আন-নাজম-এর ব্যাখ্যার উপর মোড় নেয় এবং ইহা পুনরায় পরিষ্কার করিয়া বলা উচিত যে, বেল্ ও ওয়াট কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা ভুল।
ওয়াট সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতের সমার্থক কুরআনের অন্যান্য আয়াতের অস্তিত্ব সম্পর্কে সর্তক ছিলেন যাহা ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে। কিন্তু তিনি কার্ল এহরেন্স (Karl Ahrens)-এর মতামতের দ্বারা এইগুলি বিন্যস্ত করেন। কার্ল বলেন যে, কুরআনের মক্কী সূরায় জিবরাঈলের কথা উল্লেখ নাই, কেননা মূলত রাসূলে করীম -ই আর-রূহ নামে ৮১ : ১৯ আয়াতে চিহ্নিত হইয়াছিলেন এবং ফেরেশতারা মক্কী সূরাসমূহে একমাত্র বহুবচন-এর মাধ্যমে উল্লিখিত হন। ওয়াট এই ব্যাপারে ২৬ : ১৯৩ আয়াতের প্রতি মনোযোগ প্রদান করিতে বলেন যাহার মাধ্যমে বিশ্বসী আত্মা অর্থাৎ জিবরাঈল আসিয়াছে। এবং তিনি বলেন, ইহা এই ক্ষেত্রে যে ধারণা উন্নতি লাভ করিয়াছে তাহার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হইবে”২৮ উহাই হইল ঐ ধারণা, যাহার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ আধ্যাত্মিকভাবে আল্লাহ্র দর্শন লাভ করেন।
কার্ল এহরেন্স এই কথা বলার ক্ষেত্রে সঠিক যে, রাসূলে করীম ৮১ : ১৯ আয়াতে আর্-রূহ্ নামে চিহ্নিত (যেমন ৯৭ : ৪ আয়াতে চিহ্নিত)। কিন্তু ইহা নির্ভুল নহে যে, আর-রূহ্ অথবা আর্-রূহ আল্-আমীন (বিশ্বাসী আত্মা) জিবরাঈল ছাড়া অন্য কেহ অথবা ইহা আল্লাহ্ত্র আধ্যাত্মিক দর্শন ছাড়া অন্য কিছু ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ইহাও ভ্রান্ত যে, ফেরেশতারা একমাত্র কুরআনের মক্কী সূরাসমূহে বহুবচন দ্বারা উল্লিখিত। ২৯
এক্ষণে আমরা কুরআনের ৩টি আয়াত বিবেচ্য হিসাবে উদ্ধৃত করি (আর্থাৎ ৮১ : ১৯; ৯৭: ৪ ও ২৬: ১৯৩)। উদ্ধৃত ১ম আয়াত৩০ সম্পর্কে ৪টি বিষয় সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা করা দরকার।
(ক) এই আয়াতে রাসূলে করীম বিশেষভাবে কুরআনের ওহী প্রকাশকারী হিসাবে উল্লিখিত হন।
(খ) বাস্তব ঘটনা এই যে, তিনি একজন আদর্শ দূত হিসাবে বর্ণিত যিনি আল্লাহ্র দ্বারা চিহ্নিত বা পরিচিত হওয়া ছাড়াও আল্লাহ্ আনুকূল্যে শক্তিসম্পন্ন। তিনি কেবল আল্লাহ্র দূত।
(গ) এই আয়াতের অব্যবহিত পরের আয়াতেও তাঁহার অনুরূপ বৈশিষ্ট্যের কথা জোর দিয়া বলা হইয়াছে (৮১: ২০)। আয়াতে এই কথা বলা হইয়াছে যে, "তিনি তাহার অবস্থানে আছেন প্রভুর সিংহাসনের সন্নিকটে"। উহার অর্থ এই, তিনি কোনক্রমেই "সিংহাসনের প্রভু” (আল্লাহ্) বলিয়া গণ্য করা হইবে না। এই আয়াত সম্পর্কে আরও বলা যায় যে, তিনি "শক্তির অধিকারী" (ذِي قُوَّةٍ)। এই প্রবাদ বাক্যের অনুরূপ সূরা আন্-নাজম-এ বর্ণিত বর্ণনা "ক্ষমতায় শক্তিশালী" (شَدِيدُ الْقُوى) লক্ষণীয়।
(ঘ) তিনি পরবর্তী আয়াতে বর্ণনা করেন (৮১ : ২১), যেমন "যাহার অনুসরণ করা হয় (مُطَاعٍ) এবং “বিশ্বাসী” (أَمِين)। যেমন, তিনি সিংহাসনের প্রভু নহেন। বক্তব্য হইল এই, "অন্যরা তাহাকে অনুসরণ করে”, অবশ্যই তাহার মত অন্যের প্রতি ইঙ্গিত করা, যে তাহাকে অনুসরণ করা হয়, অর্থাৎ কেবল তাঁহারই রহিয়াছে মূখ্যতম স্থান তাঁহার সহযোগী ফেরেশতাদের মধ্যে। অন্য কথায় বলা যায়, তিনি তাঁহার সমকক্ষদের মধ্যে এক "বিশেষ" স্থানের অধিকারী। ইহাও উল্লেখ্য যে, আমীন (امین) শব্দটি লক্ষণীয়ভাবে ২৬ : ১৯৩ আয়াতে বর্ণিত আর্-রূহ শব্দের অনুরূপ, আর-রূহ্ আল্-আমীন শব্দের অর্থ "বিশ্বাসী আত্মা"। কার্ল এহরেন্স এবং তাহার সঙ্গে ওয়াটও একমত এই বলিয়া যে, ৮১ : ১৯ আয়াতে বর্ণিত 'রাসূল কারীম' শব্দদ্বয় আর-রূহ-কে নির্দেশ করে। এইরূপে ৮১ : ১৯ আয়াতের অভ্যন্তরীণ প্রমাণে এবং তাহাদের স্বীকারোক্তিতে রাসূল কারীম আর্-রূহ্ আল্-আমীন একই ব্যক্তি এবং তিনি আল্লাহ্ নহেন। অধিকন্তু তিনি ওহী বার্তাবহ।
দ্বিতীয় আয়াত সম্পর্কে বলা যায়, যেমন ৯৭:৪-এর বক্তব্য হইল কেবল আর্-রূহ্, যাহা আল্-মালাইকা (ফেরেশতাগণ) শব্দের সঙ্গে উল্লিখিত। কার্ল এহরেন্স এবং ওয়াট পরোক্ষভাবে প্রকাশ করেন যে, 'আর-রূহ' 'আল্-মালাইকা' হইতে প্রকৃতিগতভাবে পৃথক, কিন্তু উহা সঠিক নহে। ইহা আরবী ভাষার একটি স্বীকৃত পদ্ধতি যে, বিশেষ একটি বিষয়কে একটি বিশেষ গ্রুপের সাধারণ বিষয়াদির মধ্য হইতে পৃথক (খাস) করিয়া চিহ্নিত করা হয়, যখন সেই বিষয়সমূহ একত্রে উল্লেখ করা হয়। খাস-এর এই ধরনের উদাহরণের পৃথক উল্লেখ সাধারণ বিষয়াদির সঙ্গে ('আম্ম) করার মত অসংখ্য উদাহরণ আরবী সাহিত্যে বিদ্যমান। কিন্তু ভাষার এই নিয়ম-কানুনের বাহিরে আয়াতের অভ্যন্তরস্থ প্রমাণ ইহা সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে যে, আর্-রূহ আল্লাহ হইতে পৃথক সত্তা। উদাহরণস্বরূপ বাক্যে বলা হয় যে, ফেরেশতাগণ (আল্-মালাইকা) এবং আর-রূহ "তাহাদের প্রভুর অনুমতির মাধ্যমে” (বাذن ربهم) অবতরণ করেন। সুতরাং ফেরেশতাগণ এবং আর্-রূহ উভয়ই আল্লাহ হইতে পৃথক। এইখানে আর-রূহ সুস্পষ্টভাবে আল্লাহ্ সঙ্গে অভিন্ন নহে এবং তিনি (আর-রূহ) বিশেষত ফেরেশতাদের দ্বারা চিহ্নিত। তিনি (আর-রূহ্) এবং তাহারা সকলে তাহাদের প্রভুর অনুমতির মাধ্যমে অবতরণ করেন। অপরিহার্য অর্থ এই যে, তিনি (আর-রূহ্) তাহাদের মধ্য হইতে বিশেষ একজন এবং যেহেতু ৮১ : ১৯ আয়াতে 'রাসূল কারীম' বলিতে বিশেষ এক ব্যক্তিত্ব হিসাবে চিহ্নিত এবং ওহী বাহক হিসাবে চিহ্নিত এবং কার্ল এহরেন্স ও ওয়াট উভয়ে এই বক্তব্যে একমত যে, 'রাসূল কারীম' আর-রূহ অভিধা দ্বারা চিহ্নিত অভিন্ন সত্তা, যিনি ওহী লইয়া আসেন এবং যিনি একজন ফেরেশতা। ইহা লক্ষণীয় যে, সাধারণভাবে বার্তাবাহক হইলেও শুধু একজনকে ওহীর বার্তাবাহক বলিয়া উল্লেখ করা হয়। 'রাসূল কারীম' অর্থ 'ফেরেশতা' হওয়ার বিষয়টি ৩৫: ১ আয়াত সমর্থিত, যেখানে আল্লাহ কর্তৃক ফেরেশতাগণের মধ্য হইতে দূত (رسُلُ) নিয়োগের কথা বলা হইয়াছে। মনে রাখা দরকার যে, উক্ত আয়াতে যখন সাধারণভাবে ফেরেশতাগণকে দূত হিসাবে গ্রহণ করা হইয়াছে, সেখানে একবচনে (রَسُولٌ) একজন বিশেষ হইবেন যিনি সর্বদা 'ওহীর বাহক' হিসাবে কথিত হন।
অনুরূপভাবে তৃতীয় আয়াত (২৬: ১৯৩) সুস্পষ্টভাবে এই কথা বলে, " বিশ্বাসী আত্মা", ইহা এমন এক সত্তা যিনি ওহী লইয়া আসেন )نَزَلَ به الرُّوحُ الْآمين(। এই একই কারণে, যেমন উপরে বর্ণিত হইয়াছে, এই 'আর্-রূহুল আমীন' হইলেন 'রাসূল কারীম'-এর সাথে অভিন্ন সত্তা, যিনি 'আমীন' (বিশ্বসী) বলিয়া এবং ওহীবাহক হিসাবে বর্ণিত হইয়াছেন। ইহার অন্তস্থ প্রমাণ এই ক্ষেত্রে 'আর্-রূহুল আমীন'-কে আল্লাহ হইতে পৃথক করে। যেমন পূর্ববর্তী ২৬: ১৯২ আয়াতে কুরআন (অথবা কুরআনীয় ওহীকে) বলা হইয়াছে 'তানযীল' আর্থাৎ সমগ্র বিশ্ব নিয়ন্তা প্রভু কর্তৃক অবতারিত কিছু। 'তানযীল' শব্দের কার্যকারণ প্রকৃতি প্রদর্শন করে যে, আল্লাহ ইহা (কুরআন) অবতরণ করান, এমন নহে যে, তিনি নিজে ইহার সঙ্গে অবতরণ করেন। পরবর্তী ২৬: ১৯৩ আয়াত পরের অবস্থা স্পষ্ট করিয়া দেয় এবং বলে যে, ইনি 'রূহুল আমীন' যিনি ওহী লইয়া আসেন।
এমনিভাবে 'রাসূল কারীম' এবং 'আর্-রূহুল আমীন' এই দুইটি অভিধাই ওহী বাহক হিসাবে চিহ্নিত; উভয়ে এক ও অভিন্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি একজন ফেরেশতা, যিনি: (ক) অন্যান্য ফেরেশতাদের মধ্যে বিশেষ একজন হিসাবে আর-রূহ নামে চিহ্নিত (৭০:৪; ৭৮: ৩৮ এবং ৯৭:৪); (খ) ফেরেশতাদের চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে আল্লাহ কর্তৃক দূত হিসাবে নিয়েজিত হন (৩৫: ১); (গ) ওহী আনয়নকারী বা বাহক হিসাবে চিহ্নিত ব্যক্তিত্ব একজন আর্দশ দূত অর্থাৎ ফেরেশতাদের মধ্য হইতে বিশেষ একজন যিনি দূত হিসাবে মনোনীত; (ঘ) তাহাকে সুনির্দিষ্টভাবে জিবরাঈল নামে ২ঃ ৯৭ আয়াতে ওহী অবতরণকারী বলা হইয়াছে এবং (ঙ) তাঁহাকে হাদীছ ওহী অবতরণকরী হিসাবে স্বনামে চিহ্নিত করা হইয়াছে।
পবিত্র কুরআনের মাদানী সূরায় কেবলমাত্র তিনবার 'জিব্রাঈল' নামটি দৃষ্ট হয়, কিন্তু ইহা এই কথা বুঝায় না যে, মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহে তাহার সম্পর্কে কোন ইঙ্গিত নাই। উহাও নহে যে, মক্কী সূরায় তাহাকে ওহী অবতরণকারী বলা হয় নাই। উদাহরণস্বরূপ এক বিবেচনায় 'আর্-রূহ' অথবা 'আর্-রূহুল অমীন, 'রাসূল কারীম' বলা হয় নাই, খৃস্টান আধ্যাত্মিক ধারণা অথবা পবিত্র আত্মিক ধারণা হইতে এই জোরালো ধারণা নেওয়া হইয়াছে, যাহা মনে হয় ওয়াটও ধারণা করেন। "আর্-রূহ, আর্-রূহুল আমীন এবং রুহুল কুদুস" অভিধাসমূহ পবিত্র কুরআনে একুশবার উক্ত হইয়াছে। ৩১ ২১ স্থানের কোথায়ও ঐ অভিধাসমূহ আল্লাহকে অথবা আল্লাহ্র গুণ বুঝাইতে ব্যবহৃত হয় নাই। ২১ স্থানের মধ্যে ৬টি স্থানে এই অভিধা (আর-রূহ্ অথবা আর-রূহুল আমীন) হযরত ঈসা ('আ) এবং তাঁহার মাতা হযরত মারয়াম ('আ)-কে বুঝাইতে ব্যবহৃত হইয়াছে। ৩২ কিন্তু ঐ সকল স্থানের প্রত্যেকটিতে ইহার অর্থ, হয় জীবনের উদ্দীপনা বা কর্মশক্তি অথবা ইহার অর্থ ফেরেশতা (জিবরাঈল)। যে কোন অবস্থায় ঐ স্থানসমূহের কোথায়ও এই শব্দটি আল্লাহ্র সত্তার সঙ্গে একই অর্থবিশিষ্ট নহে। কারণ নির্ভুল মর্মার্থ এবং প্রত্যেক আয়াতের অন্তর্হিত অর্থ ত্রিত্ববাদের ধারণা অস্বীকার করে এবং হযরত ঈসা ('আ)-এর ঐশ্বরত্বকেও অস্বীকার করে। ৩৩
টিকাঃ
৫৬. উদাহরণস্বরূপ দ্রষ্টব্য আত্-তাবারী, তাফসীর, ২খ., পৃ. ৩৬ এবং তাফসীর ইব্ন কাছীর, ১খ., পৃ. ১৮৫-১৯১।
৫৭. William Geseneus, হিব্রু-ইংরেজী অভিধান, মালিক গোলাম ফরিদ কর্তৃক "The Holy Quran English Translation and Commentary" গ্রন্থে উদ্ধৃত, রাবওয়াহ (পাকিস্তান) ১৯৬৯, পৃ. ৪৬, নং ১২৩।
৫৮. 'পবিত্র আত্মা' নহে; কারণ বাক্যে গঠনপ্রণালীতে মুদাফ-মুদাফ ইলায়হি (مضاف - مضاف اليه) সিফাত-মাওসূফ (صفة - موصوف) নহে।
৫৯. Nâmûs পরিভাষাটি 'লিসানুল আরাব' গ্রন্থে দ্রষ্টব্য।
৩০. আরও দ্রষ্টব্য Supra, পৃ. ৪১৮-৪২১, ৪৩৯-৪৪২।
৩১. স্থানগুলি হইল: কুরআন ২৪৮৭; ২৪ ২৫৩; ৪: ১৭১; ৫: ১১০; ১৬: ২; ১৬ ৪ ১০২; ১৭৪৮৫ (দুইবার); ২৬ ৪ ১৯৩; ৪০ ৪ ১৫; ৫৮ ৪ ২২; ৭০:৪;৭৮: ৩৮; ৯৭ ৪ ৪; ৪২ঃ ৫১; ১৯:৯৭; ২১: ৯১; ৬৬: ১২; ৩২: ৯; ১৫: ২৯ এবং ৩৮: ৭২।
৩২. স্থানগুলি হইল: কুরআন ২৪৮৭; ২৪ ২৫৩; ৪ ৪ ১৭১; ৫: ১১৩; ২১৪ ৯১; ৬৬ ৪ ১২।
৩৩. রূহ সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার জন্য দ্র. ইবনুল কাইয়্যিম, কিতাবুর রূহ, হায়দরাবাদ ১৩২৪ হি.। আরও দ্র. M.W. -এ ইহার সারাংশ, ১৯৩৫ খৃ., পৃ. ১২৯-১৪৪, তু. D.B. Macdonald, "The development of the idea of Spirit in Islam", M.W., ১৯৩২ খৃ., পৃ. ২৫-৪২ এবং ১৫৩-১৬৮।
ওয়াট তাহার প্রথম উপ-শিরোনামযুক্ত বিষয়ে আলোচনা শুরু করেন আয-যুহরীর বর্ণনার সেই অংশের বরাতে যে অংশটি তিনি তাহার প্যারা 'A'-তে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর রাসূল হিসাবে অভিজ্ঞতা শুরু হইয়াছিল "সত্য দৃশ্য” অবলোকন ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে, এই বিষয়ে সন্দেহ করার কোন সঠিক ভিত্তি নাই। ইহা স্বপ্ন হইতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যপূর্ণ এবং দৃশ্য (vision) সম্পর্কে প্যারা B ও J-তে উল্লেখ আছে (জিবরাঈলের উপস্থিতির বিষয়টি স্বতন্ত্রভাবে প্যারা D ওI-এ রহিয়াছে)। ৫
ইহা তাৎক্ষণিকভাবে বলা প্রয়োজন যে, ওয়াট এইখানে "আর-রু'ইয়া আস্-সাদিকা" উদ্ধৃতিটিতে কেবল বেল্-এর অনুবাদ অবলম্বন করিয়াছেন। এই উদ্ধৃতির, যাহার সম্পর্কে ইতোমধ্যে ইঙ্গিত করা হইয়াছে, ৬ অর্থ "সত্য স্বপ্ন", "সত্য দৃশ্য” নহে। ইহা স্বত্য যে, বুখারী শরীফে বর্ণিত আয-যুহ্রীর অথবা হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায়, যাহা বেল্ উদ্ধৃত করিয়াছেন, "সত্য স্বপ্ন” (true dreams)-এর পর "ঘুমন্ত অবস্থায়" (in sleep) শব্দ রহিয়াছে। সংশ্লিষ্ট রিওয়ায়াতে আত-তাবারীর ভাষ্য যাহা সম্পূর্ণ সঠিক নহে এবং যাহা ওয়াট উদ্ধৃত করেন, উহাতে অবশ্যই In Sleep শব্দটি নাই। কিন্তু ইহা এমনকি এই ভাষ্যের অভ্যন্তরীণ প্রমাণ হইতে স্পষ্ট যে, 'আর-রু'ইয়া আস্-সাদিকা' যাহা রাসূল হিসাবে অভিজ্ঞতার শুরুতে বর্ণিত সম্পূর্ণরূপে একটি বিশেষ পর্যায়। ইহার পূর্বে তিনি একটি বিষয় অনুসরণ করেন, যেমন হেরা গুহায় তাহান্নুছ অবলম্বন এবং এই অভিজ্ঞতা যাহা জাগ্রত অবস্থায় আসিয়াছিল। রিপোর্টের দ্ব্যর্থহীন বর্ণনা যাহা ওয়াট তাহার প্যারা "B" -এর শুরুতে উল্লেখ করেন তাহা এইঃ "ইহার পর তাঁহার নিকট
নির্জনবাস প্রিয় হইয়া উঠে এবং তাহানুছ-এ নিমগ্ন হওয়ার জন্য তিনি হেরা গুহায় গমন করেন..."। ওয়াট এই বর্ণনায় উল্লিখিত দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য করার বিষয়টি উপেক্ষা করেন, হয় ভুলবশত অথবা বেল্-এর অনুবাদের প্রতি ইচ্ছাকৃতভাবে ঝুঁকিয়া পড়ার কারণে এবং এইভাবে আর-রু'ইয়া আস্-সাদিকা বক্তব্যটিকে তাহার প্যারা "B" এবং '১'-এ বর্ণিত অন্যান্য ধরনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে উল্লেখ করেন। এইভাবে তিনি অবস্থার তীব্রতা এবং মূল পাঠের মর্ম উদ্ধার করার রীতি অবলম্বন করেন। তাহানুছ-পূর্ব অভিজ্ঞতা হাদীছের কোথায়ও বর্ণিত হয় নাই। এমনকি কুরআনেও আর-রু'ইয়া আস-সাদিকার কথা বর্ণিত হয় নাই। মুহূর্তকালের চিন্তা ইহাকে স্পষ্ট করিয়া তোলে যে, আর-রু'ইয়া কর্মের সঙ্গে আস্-সাদিকা বিশেষণের সংযোজন এই বিষয়টি নির্দেশ করে যে, ইহা এমন এক ধরনের অবলোকন যাহা সাধারণত এবং স্বাভাবিকভাবে "সত্য” নহে অর্থাৎ স্বপ্ন। সম্ভবত কেহই "সত্য” বিশেষণটি কাহারও চাক্ষুষ দেখার সঙ্গে সংযোজন করার জন্য মাথা ঘামান না।
যাহা হউক, ওয়াট-এর উদ্দেশ্য এই যে, তিনি সূরা আন-নাজম-এ বর্ণিত তথাকথিত "দর্শন” (vision) বিষয়টি আলোচনায় লইয়া আসেন এবং পূর্বের অধ্যায়ে আলোচিত মারগোলিয়থ বেল্-এর থিওরী সমর্থন করেন। অতএব উপরে উল্লিখিত বর্ণনার পর পরই ওয়াট "দর্শন” (vision)-এর প্রমাণ সমর্থনকারী হিসাবে ঐ সূরা উদ্ধৃত করেন এবং তাহার নিজস্ব অনুবাদে (১১ ও ১২ নং আয়াত বাদ দিয়া) সূরার ১৮ নং আয়াতের উদ্ধৃতি দেন। তারপর তিনি পর্যবেক্ষণ করিয়া বলেন, এই বিষয়টি মনে করার কারণ রহিয়াছে যে, মুহাম্মাদ মূলত এই সব বিষয়কে নিজ হইতেই আল্লাহর দর্শন হিসাবে ব্যাখ্যা করেন। ওয়াট ইহার কারণ বা ভিত্তিগুলিকে নিম্নে চিহ্নিত করেন:
(১) মাদানী জীবনকালের পূর্বে কুরআন শরীফের কোথায়ও জিবরাঈল ('আ)-এর উল্লেখ নাই।
(২) সূরা আন-নাজম-এর ১০ নং আয়াতের ক্রিয়ার কর্তা হওয়া উচিত 'আল্লাহ', অন্যথায় বাক্যবিন্যাস 'বেমানান' হইবে।
(৩) প্যারা 'B'-এর শেষে বর্ণিত বাক্যটি 'সত্য তাঁহার নিকট অসিল এবং তিনি বলিলেন...' -এর সমান অর্থ প্রকাশক, যেমন "সত্য হইল আল্লাহ্ দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করার পন্থা"।
(৪) হযরত জাবির ইব্ন আবব্দুল্লাহ (রা)-র হাদীছ যাহা বেল্ উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি রাসূলুল্লাহ -এর বক্তব্য উদ্ধৃত করেন (বেল্-এর অনুবাদ অনুযায়ী) "... আমি আমাকে ডাকিবার একটি শব্দ শুনিলাম এবং আমি চতুর্দিকে তাকাইলাম, কিন্তু কাহাকেও দেখিতে পাইলাম না। পরে আমি আমার মাথার উপরের দিকে তাকাইয়া দেখিলাম, তিনি সিংহাসনে বসিয়া আছেন"।৭
সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতের অনুবাদে ওয়াট বেল্-এর 'ওহী' এবং 'আওহা' শব্দের একই অর্থ করিয়াছেন, যেমন “পরামর্শ” এবং “পরামর্শকৃত"। এই অর্থসমূহ, যেমন পূর্বের অধ্যায়ে বলা হইয়াছে, ইহা কুরআনিক ওহীর জন্য সঠিক অর্থ নহে। দ্বিতীয়ত, ওয়াট-এর বর্ণনাঃ "মুহাম্মাদ
এইগুলি অর্থ করিয়াছেন" ইত্যাদি দুইটিই কটাক্ষপূর্ণ বক্তব্য সম্বলিত। ইহা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, “দর্শন” বাস্তব ছিল না, বরং কিছুটা মানসিক বিষয় ছিল, এই ধারণাই ওয়াট সর্বোতোভাবে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছেন। ইহাও বলা যায় যে, সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতকে ভিত্তি ধরিয়া ওয়াট সুস্পষ্টরূপে তাহার বর্ণনা এইভাবে দেন যে, ইহা এমন একটি "ব্যাখ্যা” যাহা মুহাম্মাদ কর্তৃক রচিত। এই ধারণা সকল প্রাচ্যবিদের, যদিও ওয়াট ইহাকে খোলাখুলি সত্য বলিয়া ঘোষণা করেন নাই।
ওয়াট কর্তৃক বর্ণিত ৪টি ভিত্তির মধ্যে তৃতীয়টি ছাড়া বাকীগুলি তাঁহার নিজস্ব, তৃতীয়টি বেল কর্তৃক বর্ণিত। তাহার এই পূর্ব-ধারণাগুলি এবং তাহাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল সূত্রসমূহ ইতোমধ্যে পরীক্ষা করা হইয়াছে এবং ইহা দেখানো হইয়াছে যে, প্রত্যেক ধারণার দফাগুলি অসমর্থনীয়। ১০ ৪র্থ অবস্থা বর্ণনায় ওয়াট সুনির্দিষ্টভাবে বেল্-এর ভুল দাবির পুনরাবৃত্তি করেন নাই, "The throne" (সিংহাসন) শব্দটি আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য এবং ইহা বুঝার দায়িত্ব পাঠকদের উপর ছাড়িয়া দেন। এই বিশেষ ধারণায় ভুল করার বিষয়টিও ইতোমধ্যে নির্দেশ করা হইয়াছে। ১১ জাবির ইবন 'আবদুল্লাহ আনসারী (রা)-র বর্ণনা যাহা ওয়াট নিজেই উদ্ধৃত করেন। ১২ ইহাও বলা লক্ষণীয় যে, ইহা দ্ব্যর্থহীনভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্র রাসূল "ফেরেশতাকে দেখিয়াছিলেন" যিনি হেরা গুহায় তাঁহার নিকট আসিতেন আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তী স্থানে একটি সিংহাসনে উপবিষ্ট অবস্থায়।
যুক্তি প্রদর্শন তালিকায় ওয়াট-এর নিজস্ব যুক্তির সঙ্গে যোগকৃত বিষয়, যেমন উপরে ৩. (iii) নম্বরে উল্লেখ করা হইয়াছে, সেই স্থানের দুইটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রথমত, বুখারী শরীফে উল্লিখিত আয-যুরীর বর্ণনা এবং এই বিষয়ে কিছুটা ভিন্নধর্মী অপর একটি রচনা। বর্ণনাটি এই: حَتَّى جَاءَهُ الْحَقُّ وَهُوَ فِي غَارِ حِرَاءٍ فَجَاءَهُ الْمَلَكُ فَقَالَ .... "হেরা গুহায় অবস্থানকালে শেষে তাঁহার নিকট সত্য আসিল, তাঁহার নিকট ফেরেশতা আসিয়া বলিল..."।
তাবারীর বর্ণনা যাহা ওয়াট উল্লেখ করেন: فَجَاءَهُ الْحَقُّ فَآتَاهُ فَقَالَ "সুতরাং তাঁহার নিকট সত্য আসিল, তিনি তাঁহার নিকট আসিয়া বলিলেন..."। এইভাবে শব্দটির স্থলে আছে এবং এই বর্ণনায় ফেরেশতার কথা উল্লেখ নাই। কিন্তু ইহা সুস্পষ্ট যে, فَجَاءَهُ الْحَقُّ একটি বাক্য এবং فَأَتَاهُ فَقَالَ আর একটি বাক্য। যাহা হউক, বর্ণনার এই অংশটি সম্পূর্ণ বিশ্বস্ততার সঙ্গে অনুবাদ করেন নাই। তিনি দুইটি বাক্যকে একটি
বাক্যে একীভূত করেন এবং এইভাবে অনুবাদ করেন "At length unexpectedly the Truth came to him and said..." (অবশেষে অপ্রত্যাশিতভাবে তাঁহার নিকট সত্য আসিল এবং বলিল...")। এই অনুবাদের আরবী সমতুল্য বর্ণনা হইবে : فَجَاءَهُ الْحَقُّ وَقَالَ ; ওয়াট তাহার অনুবাদে দুইটি বাক্যকে একটি বাক্যে একীভূত করেন ও বাক্যাংশটি বাদ দিয়া যাহা একটি স্বতন্ত্র বাক্যের প্রারম্ভিক অংশ। তিনি "truth শব্দের প্রথম অক্ষরটিতেও Capital letter ব্যবহার করেন যাহাতে ইহার অর্থ অবশ্যই তাহার ধারণা অনুযায়ী হয়। যদি ইহা না করা হইত এবং যদি সুনির্দিষ্টভাবে মূল পাঠের দুই স্থানে ফেরেশতার উল্লেখের প্রতি মনোযোগ দেওয়া হইত যাহা মূল পাঠে অব্যাহত আছে, কিন্তু ইহাকে ওয়াট "সুবিধার জন্য" ৭টি অংশে বিভক্ত করিয়াছেন। ইহা সুস্পষ্ট যে, র্টার্ড ক্রিয়ার কর্তা ফেরেশতা। এমনকি ধারাবাহিক মূল পাঠে এই ধরনের বিভক্তির পরও ওয়াট স্বীকার করেন যে, ফেরেশতা জিবরাঈল তাহার নিজ নামে উল্লিখিত হন যাহা এই অংশ হইতে দূরে নহে অর্থাৎ যাহা তিনি প্যারা 'D'-তে উল্লেখ করিয়াছেন।
পুনরায় ইহা লক্ষণীয় যে, ধারাবাহিক মূল আরবী পাঠে অস্তিত্বশীল বস্তু সম্পর্কে তিনবার উল্লেখ করা হইয়াছে এইভাবেঃ "অতঃপর তিনি তাঁহার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন.... فَأَتَاهُ ...فَقالَ "অতঃপর তিনি আমার নিকট আসিলেন এবং বলিলেন...". ثُمَّ أَتَانِی فَقَالَ “অবিলম্বে তিনি আমার সম্মুখে আসিলেন ...তিনি বলিলেন, হে মুহাম্মাদ! আমি জিবরাঈল..." فَتَبَدُّى فَقَالَ يَا مُحَمَّدُ أَنَا جِبْرِيلُ ফ, ছুম্মা ও ফা অব্যয়সমূহ ক্রিয়ার পূর্বে বসিয়া এই উপসংহারমূলক বর্ণনা প্রদর্শন করে যে, ইহা একটি অব্যাহত বিবরণ এবং সর্বক্ষেত্রে একই সত্তার কথা বলা হইয়াছে।
এই সীমা পর্যন্ত বর্ণনায় কোন বিরতি নাই, বর্ণনাকারীরও কোন পরিবর্তন নাই। এইখানে একমাত্র বর্ণনাকারী হইলেন হযরত আয়েশা (রা) যিনি কখনও তাঁহার নিজ ভাষায় বর্ণনা করেন, কখনও রাসূলুল্লাহ-এর ভাষায় বর্ণনা করেন। ওয়াট নিজে এই ঘটনার স্বীকৃতি দেন যখন তিনি বলেন: প্যারা 'A' হইতে 'H' পর্যন্ত বর্ণনা প্রমাণহীনভাবে স্বীকৃত যে, ইহা অব্যাহতভাবে আয-যুহরীর বর্ণনায় বর্ণিত। কিন্তু সবগুলি বর্ণনা হযরত আয়েশা (রা)-এর নিকট হইতে আসার প্রয়োজন ছিল না। ১৩ এই কৌশল এমনভাবে অবলম্বন করা হইয়াছে, হযরত আয়েশা (রা) যে একজন সুষ্পষ্ট বর্ণনাকারী সেই বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা হইয়াছে, কিন্তু ইহা প্রমাণযোগ্য নহে।
প্যারা 'H' অবশ্য আত্-তাবারীতে একটি পৃথক প্যারাগ্রাফে অসিয়াছে এবং ইহা তাহার (আয়েশার) নিকট হইতে আসে নাই। কিন্তু ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, প্যারা 'H' -এর পূর্বের প্যারা একটি অব্যাহত বর্ণনা এবং ইহার একমাত্র বর্ণনাকারী হযরত আয়েশা (রা)। ওয়াট এই ক্ষেত্রে আর একটি সন্দেহ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। তিন বলেন যে, ঘটনায় ইবন ইসহাক, হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় বিরতি দেন, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ -এর নিকট নির্জনবাস প্রিয় হওয়ার পর] প্যারা 'B' -এর প্রথম বাক্য সম্ভবত তাহার অন্য অংশের অবশিষ্ট অংশ, সেটিকে তিনি অগ্রাধিকার দিয়াছেন এবং অপ্রয়োজনীয়ভাবে ঐ স্থানে উৎসের কোন বিরতির কথা উল্লেখ করেন
নাই। ১৪ এই মন্তব্য কৌতূহলপূর্ণ, কারণ ইবন ইসহাকের "অন্য ভাষ্যের" "অগ্রাধিকার দেওয়া ঐ স্থানের উৎসে অপরিহার্যরূপে কোন বিরতি নির্দেশ করে না"। তাই কেন আমরা হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনায় তাহার বিরতি দেওয়ার উপর জোর দিব? এই মন্তব্যও যথাযথ নহে। কারণ এই স্থানে আত্-তাবারীতে প্রদত্ত হযরত আয়েশা (রা)-এর বর্ণনার সঙ্গে (আয-যুহরীর) বর্ণনা সম্পৃক্ত, ইবন ইসহাকের ভাষ্যের সঙ্গে নহে যাহা ওয়াট নিজে উদ্ধৃত করেন নাই। কারণ তাঁহার মতে, ইহা পুনর্লিখিত। আয-যুহরীর বর্ণনা, বর্ণনাকারীর পরিবর্তনের ফলে তিনি যাহা বলেন, সেই বিষয়বস্তুকে বিরতির ভিত্তিতে আয-যুহরীর বর্ণনা যখন বিভিন্ন অংশে বিভক্ত করা হয়, একই সময়ে তিনি ঐ ঘটনা গোপন করিতে পারেন না। কারণ বাস্তবিকপক্ষে ইহার বৃহত্তর এবং অত্যন্ত মৌলিক অংশের বর্ণনায় কোন বিরতি নাই, নাই সেখানে কোন বর্ণনাকারীর পরিবর্তন এবং তাহার দ্বারা কৃত বিভক্তি খামখেয়ালীপূর্ণ। ইহা তাহার উত্থাপিত ভিত্তি অনুযায়ী হয় নাই।
ইহা অনুমিত হয় যে, ইহার কিছু পরেই প্রকৃতপক্ষে তিনি আয-যুহরীর বর্ণনা বিভিন্ন পৃথক অংশে টুকরা টুকরা করেন। মুহাম্মাদ -কে বক্তব্য প্রদানকারী প্যারা 'B' -এর বক্তব্য হইল "সত্য" (the truth), 'C' অংশে "একমাত্র তিনিই" এবং 'D' ও 'I' অংশে 'জিবরাঈল'। ১৫ ওয়াটের উদ্দেশ্য হইল এই কথা বলা যে, জিবরাঈল উল্লিখিত দুই অংশে স্বনামে উক্ত হইয়াছেন, উহা মুহাম্মাদ -এর প্রতি ওহী অসার আলোচনায় লইয়া আসার প্রয়োজন নাই। ইহা অবশ্যই বিবেচনা করা উচিত যে, আয-যুহরীর বর্ণনা অব্যাহত এবং বিভক্তি সত্ত্বেও ওয়াট কর্তৃক উদ্দেশ্যপূর্ণরূপে প্রবর্তিত ফা, ছুম্মা ও ফা অব্যয়ের ক্রিয়ার সঙ্গে অস্তিত্বপূর্ণ বাক্য "فَجَاءَهُ الْحَقُّ" এই অর্থ প্রকাশ করে যে, ইহাও একই সত্তা অর্থাৎ জিবরাঈল যাঁহার সম্পর্কে সর্বত্র বলা হইয়াছে এবং যিনি শেষ পর্যন্ত স্বনামেই চিহ্নিত হন। বর্ণনার ধারাবহিকতা এমনকি ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী জিবরাঈলকেই তাত-এর মধ্যস্থ ক্রিয়ার কর্তা হিসাবে গ্রহণ করা উচিত যাহার মাধ্যমে বর্ণনা শুরু হইয়াছে এবং যাহা ওয়াট তাহার অনুবাদে বাদ দিয়াছেন।
তৃতীয় বিষয় যাহা এই সম্পর্কে উল্লেখ করা প্রয়োজন তাহা হইল, বাক্যের সম্পর্ক فَجَاءَ الْحَقُّ "হঠাৎ তাঁহার নিকট সত্য আসিল," মূল পাঠে যাহা অনুসরণ করা হইয়াছে। এমনকি এই বক্তব্যের অর্থ হইল আল-হাক্ক (الحق)। ইহা পুনরায় এইভাবে স্মরণ করা যায় যে, এই সংক্রান্ত বর্ণনার অপর ভাষ্যের বক্তব্য হইল, "অতঃপর তাঁহার নিকট সত্য আসিল"। যাহা হউক, বাক্-পদ্ধতির পার্থক্য হইলেও অর্থের কোন পার্থক্য নাই যাহা মূল পাঠে অনুসৃত ও বর্ণনায় বিধৃত যে, কিভাবে "সত্য" রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আসিল? কিন্তু এইখানে আল-হাক্ক-এর অর্থ আল্লাহ নহে, উপরে যেমনটি বর্ণনা করা হইয়াছে, পরবর্তী বর্ণনার ক্রিয়াপদের উদ্দেশ্যও নহে। ওয়াট উপরের বক্তব্যে উল্লিখিত 'God' শব্দের অর্থ প্রয়োগ করেন। কারণ তাহার মতে, "আল্লাহ্ প্রতি ইঙ্গিত করার ইহাই একটি পদ্ধতি"। ১৬ তাহার এই কারণ বর্ণনা গ্রহণযোগ্যতা পায় নাই এই
জন্য যে, আরও বিভিন্ন ধারণায় এই বক্তব্য ব্যবহৃত হইয়াছে। কার্যত ইহা কুরআন শরীফে অনধিক ২৬০ বার দৃষ্ট হয়, ইহার মধ্যে ২০বার ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ১৭ যাহা হউক কুরআনের কোথাও আল্লাহকে বুঝাইতে আল্-হাক্ক শব্দটি এককভাবে আসে নাই। ইহা কেবল ৯টি স্থানে আল্লাহ্র গুণ হিসাবে আসিয়াছে, কিন্তু সব সময় আল্লাহ অথবা রাব্ব (3) শব্দের সঙ্গে উল্লিখিত হয়। যেমন ২০:১১৪ এবং ২৩:১১৬ নম্বর আয়াতে فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ : ২০:১০০ ; 28 : 24 هُوَ اللهُ أَنَّ ; 39 : 20 فَذَلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمُ الْحَقُّ ; 52 : 59 وَرُدُّوا إِلَى اللَّهِ مَوْلَهُمُ الْحَقُّ الْحَقُّ ইত্যাদি। ১৮ অপরদিকে ইহা কুরআনিক ওহী অর্থে পঞ্চাশাধিক স্থানে ব্যবহৃত হইয়াছে। ১৯ বৃহত্তম একক সংখ্যাগরিষ্ঠ উদাহরণে ইহা একটি বিশেষ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং এই ব্যবহার প্রায় সব সময় " 3 " ক্রিয়ার সঙ্গে হইয়াছে। নিম্নে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া হইল :
(১) فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا إِنَّ هَذَا لَسِحْرٌ مُّبِينُ (۱۰:۷۲) . "অতঃপর যখন উহাদিগের নিকট আমার পক্ষে হইতে সত্য আসিল তখন উহারা বলিল, ইহা তো নিশ্চয়ই স্পষ্ট যাদু" (১০:৭৬)।
(২) لَقَدْ جَاءَكَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِينَ (١٠ : ٩٤) . "তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার নিকট 'সত্য' অবশ্যই আসিয়াছে। তুমি কখনও সন্দিগ্ধচিত্তদিগের অন্তর্ভুক্ত হইও না” (১০:৯৪)।
(৩) فَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ مِنْ عِنْدِنَا قَالُوا لَوْلا أُوتِيَ مِثْلَ مَا أُوتِيَ مُوسَى (٤٨:٢٨) "অতঃপর যখন আমার নিকট হইতে উহাদিগের নিকট সত্য আসিল, উহারা বলিতে লাগিল, মূসাকে যেরূপ দেওয়া হইয়াছিল, তাহাকে সেরূপ দেওয়া হইল না কেন” (২৮:৪৮)?
(4) بَلْ مَتَّعْتُ هَؤُلاَءِ وَآبَاءَهُمْ حَتَّى جَاءَهُمُ الْحَقُّ وَرَسُولٌ مُّبِينٌ (۲۹:۴۳) . "বরঞ্চ আমিই উহাদিগকে এবং উহাদিগের পূর্বপুরুষদিগকে দিয়াছিলাম ভোগের সামগ্রী, অবশেষে উহাদিগের নিকট আসিল সত্য ও স্পষ্ট বর্ণনাকারী রাসূল" (৪৩:২৯)।
(৫) وَلَمَّا جَاءَهُمُ الْحَقُّ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ وَإِنَّا بِهِ كَافِرُونَ (۴۳:۳۰) . "যখন উহাদিগের নিকট সত্য আসিল উহারা বলিল, 'ইহা তো যাদু এবং আমরা ইহা প্রত্যাখ্যান করি” (৪৩:৩০)।
(৬) الَّذِي أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ هُوَ الْحَقُّ (٦ : ٣٤) . "তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে তোমার প্রতি যাহা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাই সত্য" (৩৪:৬)।
(۷) وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الْكِتب هُوَ الْحَقُّ ( ٣٥ : ٣١) .
"আমি তোমার প্রতি যে কিতাব অবতীর্ণ করিয়াছি তাহা সত্য" (৩৫: ৩১)।
অনুরূপভাবে কুরআনের একটি উদাহরণ (এমনকি হাদীছের উদাহরণ) এই বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, কুরআনে ওহীর অর্থে আল্-হাক্ক (اَلْحَقُّ) শব্দ বহুল ব্যবহৃত এবং এই পরিভাষা যদিও নিঃসন্দেহে আল্লাহর একটি গুণ, তবুও আল্লাহকে বুঝাইতে এই শব্দটি কখনও এককভাবে ব্যবহৃত হয় নাই। فَجَاءَ الْحُقُّ অথবা فَجَاءَهُ الْحَقُّ বক্তব্যটি আলোচ্য আয়াতে ওহীর অর্থে ব্যবহৃত, এমন নহে যেমন ওয়াট আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে আল্লাহ্ আবির্ভাব ঘটে। আয-যুহরীর বর্ণনা এবং সূরা আন্ নাজম-এর বর্ণনার দ্বারা ওয়াট দেখাইতে চাহেন যে, রাসূলুল্লাহ আল্লাহ্র "দর্শন” লাভ করিয়াছেন বলিয়া দাবি করিয়াছেন। ওয়াট সম্মুখে অগ্রসর হইয়া আরও বলেন যে, ইহা যদি আল্লাহকে মুহাম্মাদের দেখার মূল ব্যাখ্যা হইয়া থাকে, তাহা হইলে ইহা কদাচিৎ তাঁহার চূড়ান্ত দাবি হইবে। ইহা ৬: ১০৩ নং আয়াতের সঙ্গে মতপার্থক্যের সৃষ্টি করে। ঐ আয়াতে বলা হয়, “দর্শন” তাঁহার পর্যন্ত পৌঁছে না”। এই সম্পর্কে ওয়াট সূরা আন্-নাজম-এর ১১ নম্বর আয়াতের উদাহরণ দেন, যাহা তিনি বেল্-এর অনুবাদ অনুযায়ী উদ্ধৃত করেন, যেমন, "ইহা যাহা দেখিয়াছে অন্তর, তাহা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না"। এবং তিনি বলেন যে, এই আয়াত "সম্ভবত পরবর্তী সময়ের সংযোজন"। ২০ যে কেহ ইহা সহজেই চিহ্নিত করিতে পারিবে যে, এইখানে ওয়াট কেবল বেল্-এর ধারণাসমূহ উল্লেখ করেন যে, মুহাম্মাদ প্রথমে আল্লাহকে দেখার দাবি করেন এবং পরে তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারিয়া তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন এবং এই সূরার আর একটি আয়াত উল্লেখ করিয়া (চাক্ষুষ দর্শনের পরিবর্তে) আধ্যাত্মিক দর্শনের অথবা মানসিক দর্শনের ধারণা প্রদান করেন। ২১ যে সূত্রের উপর ভিত্তি করিয়া এইসব ধারণা করা হইয়াছে, তাহা ইতোমধ্যে পরীক্ষা করা হইয়াছে এবং সমর্থন অযোগ্য প্রমাণিত হইয়াছে। ২২ ইহা পুনরায় জোর দিয়া বলা যায় যে, না আয-যুহরীর বর্ণনা, না সূরা আন্-নাজম "আল্লাহ্র দর্শন" সম্পর্কে বলিয়াছে। সুতরাং কুরআনের অন্যান্য আয়াতের সঙ্গে এই ব্যাপারে মতপার্থক্যের কোন অবকাশ নাই, যেমন ৬: ১০৩ নং আয়াতে সূরা আন্ নাজ্য-এর পরবর্তী আয়াতে কোন সংশোধন নাই। "আল্লাহর দর্শন" কথাটি একটি ভিত্তিহীন অনুমান যাহার উপর ভিত্তি করিয়া পরবর্তী অশুদ্ধ ধারণার বিতর্ক এবং পরবর্তী সংশোধনের অনুমান করা, ইহার সবকিছুই ভ্রান্ত এবং সমর্থন অযোগ্য।
ইহা পুনরায় স্মরণ করা যাইতে পারে যে, ২৩ সূরা আন্-নাজম-এর ১৮ নং আয়াত যাহা রাসূলুল্লাহ -এর স্বচক্ষে দেখার কথা বলে। "তাঁহার প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নির্দশন", ইহা মানসিক ও আধ্যাত্মিক দর্শন ও আল্লাহ্র দর্শন-এর বিরোধী তত্ত্ব হিসাবে প্রচলিত। বেল্ যখন এই তত্ত্ব উপস্থাপন করেন তখন নীরবে এই আয়াত উপেক্ষা করেন। যাহা হউক, ওয়াট বেল্-এর
উপস্থাপনার ফাঁক-ফোকর বন্ধ করার ইচ্ছা করেন এবং এই প্রসঙ্গে আধ্যাত্মিক দর্শন-এর তত্ত্ব সম্বলিত আয়াত আনার চেষ্টা করেন। এই সময় হইতে আয়াতের উদাহরণ তিনি পর্যবেক্ষণ করেন, "অবশ্যই ইহা এই অর্থে লওয়া হয় যে, যাহা মুহাম্মাদ দেখিয়াছিলেন তাহা ছিল ঔজ্জ্বল্য ও আল্লাহ্র মহিমার নির্শন অথবা প্রতীক"। তখন তিনি ইহাকে ১১ নং আয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেন ("তিনি যাহা দেখেন, অন্তর ইহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নাই") এবং বলেন যে, “যখন চক্ষুসমূহ নিদর্শন অথবা প্রতীক প্রত্যক্ষ করে তখন অন্তর প্রতীকী বস্তুকে প্রত্যক্ষ করে"। এইভাবে ওয়াট যদিও হযরত মুহাম্মাদ -এর মূল ব্যাখ্যা "দর্শন হইল সরাসরি আল্লাহকে দেখা” সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না, প্রত্যাশিতভাবে তিনি ভুল করেন না। সম্ভবত আয়াতের অনুবাদ এইভাবে করা যাইতে পারেঃ "সে, লোকটি যাহা দেখিয়াছে সেই সম্পর্কে অন্তর ভুল করে নাই। ২৪
উপরের মন্তব্যসমূহ সুস্পষ্টভাবে ভ্রান্ত ধারণার ভিত্তিতে করা হইয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ "মৌলিকভাবে দর্শন (vision)-কে আল্লাহকে সরাসরি দেখা হিসাবে ব্যাখ্যা করেন"। তিনি এইরূপ ব্যাখ্যাও করেন নাই এবং সূরা আন্-নাজম্-এর আয়াতও ঐরূপ অর্থ বহন করে না। অতএব সূরার আয়াতসমূহের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নাই এবং তাই উহাদের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করার মত ব্যাখ্যা লইয়া অগ্রসর হওয়ার প্রয়োজনও নাই যাহাতে প্রকৃতপক্ষে এই ব্যাখ্যা ১১ নং আয়াতের একটি অন্যায্য ও বিকৃত অর্থ করে। কারণ ওয়াট বলেন, "যখন চক্ষুসমূহ নিদর্শন অথবা প্রতীক প্রত্যক্ষ করে, অন্তর যে প্রতীকী বস্তুকে প্রত্যক্ষ করে" তাহাই আল্লাহ। আয়াত কোন প্রকারেই এই অর্থ বহন করে না যে, চক্ষু একটি জিনিস অর্থাৎ আল্লাহর একটি নিদর্শন দেখিয়াছে এবং অন্তর দেখিয়াছে বা ধারণ করিয়াছে অন্য জিনিস অর্থাৎ আল্লাহকে। আয়াতের সরল অর্থ এই যে, অন্তর ও চক্ষু ছিল ঐক্যবদ্ধ-ইহা অন্তরের ভুল ছিল না অর্থাৎ তিনি (রাসূলুল্লাহ) তাঁহার চক্ষু দ্বারা যাহা দেখিয়াছেন তাহাতে তিনি কোন ভুল ধারণা করেন নাই। যেমন ওয়াট ইহার বিকল্প অনুবাদ করেন এইভাবে, "অন্তর ভুল করে নাই", "তিনি যাহা দেখিয়াছেন"। মানুষ দেখিয়াছে এই ক্ষেত্রে মানসিক অথবা আত্মিক বিষয়ের পরস্পরবিরোধী শব্দাবলীর ব্যবহারের উপর সম্পূর্ণ জোর দেওয়া হইয়াছে।
ওয়াট-এর উদ্দেশ্য হইল এই ধারণার মধ্যে বিকৃতি প্রদান করা। যেমন তিনি সাধারণভাবে বলেন, "ইহাকে জিবরাঈলের দর্শন (vision) হিসাবে চালাইয়া দেওয়ার বিষয়টিকে পরিহার করা। যাহা ইতিহাসের পরিপন্থী হিসাবে পরিগণিত হইবে এবং তিনি ইসলামিক প্রগাঢ় নিষ্ঠাপূর্ণ ধারণা সম্পর্কিত মতপার্থক্যকে পরিহার করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ আল্লাহকে দেখেন নাই। ২৫ এইখানে প্রশ্ন উত্থাপিত হয় : ইহা প্রমাণ করার জন্য এই আগ্রহ কেন সৃষ্টি হইল যে, যিনি রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছিলেন তিনি জিবরাঈল ছিলেন না। যদি সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতের পরিষ্কার অর্থ তাহাই হয়, যাহা ওয়াট ও বেল্ আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ মূলত ভুল করিয়া ইহাকে সরাসরি আল্লাহ্র দর্শন বলিয়া
মনে করেন এবং পরবর্তী কালে এই ভুল সংশোধন করিয়া মানসিক দর্শন সম্পর্কিত ধারণা প্রদান করেন? ওয়াট-এর সত্য বলিয়া ঘোষিত স্বীকৃতির উদ্দেশ্য বরং তাহার প্রকৃত ঘটনার সতকর্তার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ এইজন্য যে, তিনি সূরা আন-নাজম-এর আয়াতের যে ব্যাখ্যা প্রদান করেন তাহা ইহার সরল অর্থ নহে। আরও যে কারণ বলা হইয়াছে, যেমন জিবরাঈলকে দেখা “ইতিহাস পরিপন্থী হইবে” এই বক্তব্যটি পরিষ্কারভাবে পুরানো যুক্তিভিত্তিক। কারণ কুরআনের মক্কী সূরাসমূহে জিবরাঈলকে নাম দ্বারা চিহ্নিত করা হয় নাই। যে যুক্তি ইতোমধ্যে দেখানো হইয়াছে অসমর্থনীয় এবং ভুল। ২৬ এই যুক্তি ওয়াট-এর দিক হইতেও অসঙ্গতিপূর্ণ যাহা বেল্-এর মত নহে। তিনি এই ধরনের মনোভাব পোষণ করেন না যে, এই ব্যাপারে বিবেচনার জন্য হাদীছ দ্বারা যুক্তি প্রদান করা উচিত নহে অর্থাৎ হাদীছ বিবেচ্য। ওয়াট স্বীকার করেন যে, আয-যুহরীর বর্ণনায় জিবরাঈল-এর সুস্পষ্ট উল্লেখ আছে। বিশেষ করিয়া তাঁহার 'D' এবং 'I' প্যারায় উল্লেখ করেন। ওয়াট প্রত্যক্ষণের মাধ্যমে জibraঈলের উল্লেখ সম্পর্কিত সন্দেহ দূর করেন। এইভাবে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করেন যে, বর্ণনাসমূহের ঐ অংশগুলি পরবর্তী কালের বর্ণনাকারীদের দ্বারা পরিবর্তিত হয়। এই ধরনের প্রয়োগও অসঙ্গতিপপূর্ণ এই কারণে, যাহা তিনি আয-যুহরীর বর্ণনায় অগ্রাধিকার প্রদান করেন। যেমন ইবন হিশামের বর্ণনার মত ইহা পুনর্লিখিত হয় নাই। যদি পরবর্তী কালের বর্ণনাকারীগণ বর্ণনার ঐ অংশ সংশোধন করিয়া থাকেন। তাহারা সম্ভবত ইহার প্রাথমিক অংশও সংশোধন করিয়া থাকিবেন, যে বর্ণনায় সত্য আসার কথা উল্লেখ করা হইয়াছে। উদাহরণস্বরূপ ওয়াট-এর মতে, উহার অর্থ রাসূলুল্লাহ-এর সম্মুখে আল্লাহ্ আবির্ভাব এবং ইহা ঐ বক্তব্যের বিপরীত যাহা তিনি ইসলামিক মৌলিক বিষয়ে বলেন। প্রকৃত বিষয় এই যে, বর্ণনার ঐ অংশে যে জিবরাঈলের উল্লেখ করা হইয়াছে, তাহা পরবর্তী কালের প্রক্ষেপণ নহে এবং সত্য আসার অর্থ আল্লাহ আবির্ভূত হওয়াও নহে। আরও স্মরণ করা যাইতে পারে যে, সূরা আন্-নাজম-এর এই আয়াতই রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ওহী আসার একমাত্র কুরআনী সংবাদ তথ্য নহে এবং এই আয়াত বুঝার জন্য কুরআনের অপর অনুরূপ আয়াতসমূহের সঙ্গে একসঙ্গে বুঝিতে হইবে, বিশেষ করিয়া ৮১: ১৯-২৩ আয়াত যাহা ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ২৭
ওয়াট এই বিষয়ের কুরআনের অন্যান্য আয়াতের অস্তিত্ব সম্পর্কে অবশ্যই সতর্ক। তিনি ঐসব আয়াতের ব্যাপারে কি মত পোষণ করেন তাহা জানার পূর্বে সূরা আন-নাজম-এর আয়াতের তাহার উপরোল্লিখিত ব্যাখ্যার দ্বিতীয় উদ্দেশ্যের প্রতি দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ তিনি বলেন, “ইসলামের গোঁড়া ধ্যান-ধারণার বিতর্ক এড়ানোর জন্য (এইরূপ বলা) যে, মুহাম্মাদ আল্লাহকে দেখেন নাই”। এই রচনার পূর্বের অধ্যায়ের পাঠকারী যে কোন পাঠক তাৎক্ষণিকভাবে এই স্বীকৃতি প্রদান করিবে যে, ওয়াট-এর এই বর্ণনা সম্পূর্ণরূপে বেল্-এর ভিত্তিহীন ধারণাপ্রসূত, যাহা তথাকথিত গোঁড়া ইসলামিক বিশ্বাস এই ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ-এর সময়ের পরবর্তীতে এক উন্নতির লক্ষণ ছিল এবং ইহা কুরআনের প্রামাণ্য বিষয়ে বেল্-এর চিন্তায় পার্থক্য সৃষ্টি করে, যাহার ফলে তিনি মনে করেন যে, মুহাম্মাদ মূলত আল্লাহকে দেখিয়াছেন বলিয়া দাবি
করেন। এই প্রশ্নটি এইভাবে পুনরায় সূরা আন-নাজম-এর ব্যাখ্যার উপর মোড় নেয় এবং ইহা পুনরায় পরিষ্কার করিয়া বলা উচিত যে, বেল্ ও ওয়াট কর্তৃক প্রদত্ত ব্যাখ্যা ভুল।
ওয়াট সূরা আন্-নাজম-এর আয়াতের সমার্থক কুরআনের অন্যান্য আয়াতের অস্তিত্ব সম্পর্কে সর্তক ছিলেন যাহা ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে। কিন্তু তিনি কার্ল এহরেন্স (Karl Ahrens)-এর মতামতের দ্বারা এইগুলি বিন্যস্ত করেন। কার্ল বলেন যে, কুরআনের মক্কী সূরায় জিবরাঈলের কথা উল্লেখ নাই, কেননা মূলত রাসূলে করীম -ই আর-রূহ নামে ৮১ : ১৯ আয়াতে চিহ্নিত হইয়াছিলেন এবং ফেরেশতারা মক্কী সূরাসমূহে একমাত্র বহুবচন-এর মাধ্যমে উল্লিখিত হন। ওয়াট এই ব্যাপারে ২৬ : ১৯৩ আয়াতের প্রতি মনোযোগ প্রদান করিতে বলেন যাহার মাধ্যমে বিশ্বসী আত্মা অর্থাৎ জিবরাঈল আসিয়াছে। এবং তিনি বলেন, ইহা এই ক্ষেত্রে যে ধারণা উন্নতি লাভ করিয়াছে তাহার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হইবে”২৮ উহাই হইল ঐ ধারণা, যাহার মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ আধ্যাত্মিকভাবে আল্লাহ্র দর্শন লাভ করেন।
কার্ল এহরেন্স এই কথা বলার ক্ষেত্রে সঠিক যে, রাসূলে করীম ৮১ : ১৯ আয়াতে আর্-রূহ্ নামে চিহ্নিত (যেমন ৯৭ : ৪ আয়াতে চিহ্নিত)। কিন্তু ইহা নির্ভুল নহে যে, আর-রূহ্ অথবা আর্-রূহ আল্-আমীন (বিশ্বাসী আত্মা) জিবরাঈল ছাড়া অন্য কেহ অথবা ইহা আল্লাহ্ত্র আধ্যাত্মিক দর্শন ছাড়া অন্য কিছু ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। ইহাও ভ্রান্ত যে, ফেরেশতারা একমাত্র কুরআনের মক্কী সূরাসমূহে বহুবচন দ্বারা উল্লিখিত। ২৯
📄 তিন: হেরা গুহায় অবস্থান: তাহানুছ
"মুহাম্মাদ-এর দৃশ্য অবলোকন" সম্পর্কে ওয়াট যাহা কিছু বলিয়াছেন, তাঁহার সেই ধারণাসমূহ উপস্থাপনের পর তিনি দ্বিতীয় উপ-শিরোনাম "হেরা গুহায় অবস্থান: তাহানুছ"-এর দিকে অগ্রসর হন। ইহা কিছুতেই মনে করা উচিত নহে যে, মুহাম্মাদ কর্তৃক আল্লাহকে দেখার (দৃশ্য অবলোকন) বিষয়টি ত্যাগ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে ইহা সর্বক্ষেত্রেই এক নিরবচ্ছিন্ন ধারণা সৃষ্টি করিয়াছে এবং সব সময় ওয়াট-এর উদ্দেশ্য হইল "দৃশ্য” (vision) সম্পর্কে আলোচনা করা, বিশেষত ওহী সম্পর্কে। তাহার মতে ওহী হইল ধরনগত দিক হইতে মানসিক, মনোবৈজ্ঞানিক অথবা মনো-বুদ্ধিগত বিষয়।
মুহাম্মাদ-এর হেরা গুহায় গমন বা অবস্থান এবং তাহানুছ সম্পর্কে ওয়াট তাহার গুরু রিচার্ড বেল হইতে ভিন্নমত পোষণ করেন। বেল্ এতদসংক্রান্ত বিষয়সমূহের বর্ণনাগুলির বিশুদ্ধতা অস্বীকার করেন। ওয়াট বলেন যে, "মুহাম্মাদ-এর হেরা গুহায় গমন সম্পর্কে কোন অসম্ভাব্যতা নাই"। ৩৪ তিনি তখন এমন বিষয় উপস্থাপন করেন যাহা একজন পণ্ডিত অত্যন্ত সংগতভাবেই বলেন, "অন্যদের ধারণাসমূহের ইহা একটি মিশ্রণ মাত্র”। ৩৫ ওয়াট বলেন যে, মুহাম্মাদ-এর হেরা গুহায় গমনের কারণ "মক্কার উত্তপ্ত অবস্থা হইতে নিজেকে বাঁচানোর পদ্ধতি হিসাবে বিবেচিত হইতে পারে। কেননা মক্কার জীবন তাঁহার জন্য অপ্রীতিকর ছিল, যিনি সেই সময় তায়েফ-এ গমনের সঙ্গতি রাখিতেন না। এই কথা বলার পরপরই ওয়াট নিম্নোক্ত বক্তব্য যোগ করেন: মুহাম্মাদ-এর হেরায় অবস্থান (ধ্যান করার বিষয়টি) ইয়াহুদী-খৃস্টীয় প্রভাবের ফল, যেমন মঠবাসী ভিক্ষুদের উদাহরণ অথবা ব্যক্তিগত কিছু অভিজ্ঞতা "মুহাম্মাদ প্রদর্শন করিয়াছেন", তাঁহার নির্জনবাসের প্রয়োজনীয়তা ও ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে। ৩৬
উপরে ধারাবাহিকভাবে উদ্ধৃত দুইটি বাক্যে প্রকৃতপক্ষে দুইটি ভিন্ন ধারণা বর্ণনা করা হইয়াছে। (এক) হেরা গুহায় প্রায়শই যাওয়ার বিষয়টি দরিদ্র লোকের গ্রীষ্ম অবকাশ যাপনের মত কিছু। এই ধারণাটি প্রথমে এলয় স্প্রেংগার (Aloy Sprenger) উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে উপস্থাপন করেন। ৩৭ যাহা হউক, যে সময় হইতে তিনি এই ধারণা প্রদান করেন সেই সময় কোন ইউরোপীয় লেখক এই ধারণার সৃষ্টি করেন নাই অথবা এই সম্পর্কিত যুক্তিপূর্ণ ব্যাখ্যা হিসাবে ইহাকে গণ্য করেন নাই। ওয়াট কোনভাবেই স্প্রেংগারের বরাত না দিয়া এই ধারণা অবলম্বন করেন এবং ইহা হুবহু পুনঃ উপস্থাপন করেন। স্প্রেংগার ও ওয়াট এই দুইজনের কেহই নিজেদেরকে এই প্রশ্ন করেন নাই যে, অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই এই প্রশ্ন উঠে, হেরার আবহাওয়া সার্বিকভাবেই গ্রীষ্মকালে মক্কা শহরের আবহাওয়া হইতে ভিন্ন ছিল কিনা এবং পার্শ্বে এত পাহাড়-পর্বত থাকা সত্ত্বেও হেরা পর্বত গুহা কেন গ্রীষ্মকালে আশ্রয় বা সাধনার জন্য পছন্দ করা হয়? যদি তাহারা নিজেদেরকে মক্কার ভৌগোলিক অবস্থা সম্পর্কে এই প্রাথমিক প্রশ্ন করিতেন তাহা হইলে তাহারা অবশ্যই তাহাদের এই ধারণা সম্পর্কে বিকল্প চিন্তা-ভাবনা করিতেন।
(দুই) ইয়াহুদী-খৃস্টীয় প্রভাব, বিশেষ করিয়া খৃস্টান সাধুদের উদাহরণ, তাহাদের ধারণা "নির্জনবাসের প্রয়োজনীয়তা ও ইচ্ছাশক্তি সম্পর্কে কার্যত এই ধারণা ওয়াট-এর পূর্ববর্তী একদল পণ্ডিত পোষণ করিতেন, যেমন তাহাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একজন জে. হার্সফিল্ড (J. Herschfield) ৩৮ এবং আরেকজন টর আন্ড্রে (Tor Andrae)। ৩৯ কিন্তু ওয়াট তাহাদের কাহাকেও এই ব্যাপারে উদ্ধৃত করেন নাই। হযরত মুহাম্মাদ-এর চিন্তাধারার বিবর্তনের উপর ইয়াহুদী-খৃস্টীয় প্রভাবের সাধারণ ধারণাটি ত্রুটিযুক্ত হওয়ার কথা ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে। ৪০ যাহা হউক, এইখানে এই বিষয়টি লক্ষ্য করা যায় যে, যে দুইটি ধারণা এই মতে বিবেচনার জন্য দুইটি ধারাবাহিক বাক্যে উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা পরস্পর বিরোধী। যদি হেরা গুহায় গমন করা গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের মত মনে করা হইত তাহা হইলে এই ব্যাপারে ইয়াহুদী-খৃস্টীয় প্রভাব সাহায্যের জন্য টানিয়া আনার প্রয়োজন হইত না। পক্ষান্তরে যদি ইহা খৃস্টান সাধুসন্তদের প্রথার অনুকরণে হইত তাহা হইলে এই গ্রীষ্মকালীন অবকাশ যাপনের বিষয়টি সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও অপ্রাসঙ্গিক হইয়া যায়।
হেরা গুহায় গমন সম্পর্কে উপরোল্লিখিত মন্তব্য করার পর ওয়াট তাহানুছ পরিভাষাটির অর্থ ও উৎসের প্রতি ইঙ্গিত করেন। এই সম্পর্কে তিনি বেল্ এবং হার্সফিল্ড-এর ধারণার সাধারণভাবে অনুসরণ করেন। যেমন পরিভাষাটির অর্থ হয় 'আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের জন্য আল্লাহর ইবাদত করা' নতুবা "পাপকার্য বা অপরাধমূলক কার্য হইতে বাঁচার জন্য কোন কাজ করা"। ওয়াট তখন "কল্পনায় পরিপূর্ণ” ধারণার মাধ্যমে অগ্রসর হন, যেমন তিনি বলেন, যেসব বর্ণনা প্রকৃতপক্ষে প্রকাশিত হইয়াছে। তিনি বলেন যে, মুহাম্মাদ প্রথম জীবনে মক্কার সামাজিক ও ধর্মীয় সমস্যাসমূহের ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন। তিনি একজন ইয়াতীম হওয়ার কারণে ঐসব সমস্যা সম্পর্কে পূর্ণ সচেতন ছিলেন। তিনি "মক্কার অত্যন্ত আলোকিত ব্যক্তিবর্গের মধ্যে প্রাপ্ত অস্পষ্ট একত্ববাদ"-কেও আত্মস্থ করিয়াছিলেন। তিনি কতিপয় সংস্কারের জন্যও সচেষ্ট ছিলেন "এবং সকল প্রেক্ষাপট এই ধারণা দেয় যে, এই সংস্কার প্রাথমিকভাবে অবশ্যই ধর্মীয় সংস্কার হইবে"। তাঁহার মনের এই অবস্থার প্রেক্ষিতে তিনি ধীর ও স্বর্গীয় বিষয়াদি সম্পর্কে জ্ঞান লাভের জন্য নির্জনবাস অবলম্বন করেন এবং ইবাদতের কতিপয় কার্যাবলী পালন করেন সম্ভবত গুনাহ হইতে ক্ষমা প্রার্থনার উদ্দেশ্যে। ৪১
ওয়াট এইভাবে ইতোপূর্বে মুহাম্মাদ কর্তৃক গ্রীষ্মে অবকাশ পালন এবং খৃস্টান সাধু-সন্তদের সাধনা পদ্ধতিকে তাঁহার সম্ভাব্য অনুকূল করা সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়াছিলেন তিনি নিজেই তাহা কার্যত নাকচ করিয়া দেন। কারণ তিনি যদি মক্কায় কতিপয় সংস্কারকার্য করিতে চাহিতেন এবং যদি "সকল প্রেক্ষাপট এই ধারণা দেয় যে, এই সংস্কারকার্য অবশ্যই প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় হইবে" এবং এইজন্য তিনি ধীর ও সতর্কভাবে ঊর্ধ্বজাগতিক বিষয়াদির বিকাশের জন্য নির্জনবাস অবলম্বন করেন" ইত্যাদি। এই উভয় অনুমান বা ধারণা তাঁহার হেরা গুহায় নির্জনবাস-এর বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য অপ্রয়োজনীয়। যাহা হউক, এইখানে ওয়াট-এর মন্তব্য তাহার দুইজন বিখ্যাত পূর্বসূরী উইলিয়াম মুর ও মার্গোলিয়থ-এর ধারণার ভিত্তিতে করা হইয়াছে। প্রথমজন এই ধারণা দেন যে, মুহাম্মাদ-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও প্রবৃত্তি ছিল একজন রাসুল-সংস্কারকের ভূমিকা পালন করা। অপরজন এই তত্ত্ব দেন যে, আরবে ও আরবের প্রতিবেশী খৃস্টান বায়ান্টাইন রাষ্ট্রসমূহের রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অবস্থা এই ধারণা দেয় যে, ধর্মীয় দিক হইতে গভীর চিন্তা ও ধ্যান-ধারণা প্রস্তুত একটি সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনা করা উচিত এবং এই কারণে হযরত মুহাম্মাদ একজন রাসুলের ভূমিকা পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এমনকি ইহাও লক্ষণীয় যে, তিনি হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যান করিতে গমন করিয়া সম্ভবত এমন কিছু কাজ করেন, যাহা “পাপের ক্ষমার জন্য” ছিল, তাহা ছিল তাঁহার (মুহাম্মদ) পূর্বের ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা সম্পর্কে মুর, মার্গোলিয়থ-ওয়্যাট-এর ধারণার স্মৃতিচারণ।
এই সকল বক্তব্য সম্পর্কে ইতোমধ্যেই আলোচনা করা হইয়াছে। রাসূলুল্লাহ অবশ্য হেরা গুহায় গমন করেন ঊর্ধ্বজাগতিক বিষয়াদির ব্যাপারে গভীরভাবে ধ্যান করার জন্য। কিন্তু সেইখানে কোন উৎস সম্পর্কে কোন নির্দেশনা ছিল না যে, তিনি এরূপ করিয়াছিলেন তাঁহার গভীর ধ্যান প্রস্তুত ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কারের গঠন কাঠামো বিনির্মাণের লক্ষ্যে। ওয়াট-এর বর্ণনা যাহা তিনি নিজেই বিস্তারিত বলেন, তাহা ছিল কল্পনা প্রস্তুত এবং আমরা যেমন ব্যাখ্যা করিয়াছি তাহার পূর্বসূরীর ধ্যান-ধারণার ভিত্তিতে। হেরা গুহায় নির্জনে ধ্যানে মগ্ন হওয়ায় রাসূলুল্লাহ-এর উদ্দেশ্য যাহাই থাকুক, তাঁহার নিকট ওহী আসার বিষয়টি সর্বতোভাবে ছিল কিছুটা আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। হেরা গুহায় যাহা ঘটিয়াছিল তাহাতে তাঁহার হতবাক হওয়া এবং পরবর্তীতে ওয়ারাকা ইবন নওফাল-এর সঙ্গে পরামর্শ করা—তাহার দিক হইতে কেবল অপ্রত্যাশিত ও অপ্রস্তুত অবস্থাকে জোরালোভাবে প্রমাণিত করে। এইসব কারণ এইভাবে সরাসরি গভীর চিন্তা প্রস্তুত সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং প্রবৃত্তির ধারণার কার্যত সম্পূর্ণ পরিপন্থী। গভীরভাবে চিন্তা ও ধ্যানের মাধ্যমে সংস্কার তত্ত্বকে অব্যাহত রাখার ক্ষেত্রে ইহা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কারণ বিষয়টির আকস্মিকতা এই তত্ত্বকে নস্যাৎ করিয়া দেয় অথবা ইহার ব্যাপারে কমপক্ষে সন্দেহ সৃষ্টি করে। ওয়াট যাহা ইচ্ছা করেন বিষয়টি প্রকৃতপক্ষে তাহাই। এইভাবে বর্ণনাটি কাল্পনিকতায় পরিপূর্ণ হওয়ার পরপরই তিনি লক্ষ্য করেন যে, যদিও গতানুগতিক বর্ণনা “এই ধারণা দেয়, দৃশ্যসমূহ (তাহার) নির্জনবাস-এর সময় আসে (দৃষ্টিগোচর হয়)। মুহাম্মদ-এর বর্ণনায় বিভিন্ন দৃশ্যপট-এর তুলনামূলক তারিখ অনির্দিষ্ট ছিল। অনেক সময় দৃশ্যমান দৃশ্যপটকে অপ্রত্যাশিত বলা হইয়াছে এবং কোন কোন সময় হযরত খাদীজা (রা) খুব দূরে থাকিতেন বলিয়া মনে হইত না।
ইহা তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত যে, “ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যপটের তুলনামূলক তারিখ-এর বক্তব্যের ব্যাপারে যাহা বলা হইয়াছে সেই সম্পর্কে যতই অনিশ্চয়তা থাকুক, ইহার মূল দৃশ্যপটের নির্দেশনার ব্যাপারে কোন অনিশ্চয়তা নাই, এমনকি ইহার আকস্মিকতা ও অপ্রত্যাশিতব্যতা সম্পর্কেও কোন অনিশ্চয়তা নাই। সার্বিকভাবে এই ‘ডাক’ (আহবান) হেরা গুহায় গমনের পর, নির্জন ধ্যানের সময় জাগ্রত অবস্থায় সংঘটিত হয় এবং (ফেরেশতার) "উপস্থিতি” বা দর্শন অথবা "দৃশ্যপট" অবলোকন ছিল অবিচ্ছিন্নভাবে, প্রকৃতপক্ষে আহ্বানের এক নিরবচ্ছিন্ন দৃশ্য। হযরত খাদীজা (রা) হেরা গুহায় রাসূলুল্লাহ-এর নিকটে ছিলেন যেমন ইবন ইসহাক কর্তৃক বর্ণিত এক বর্ণনায় উক্ত হইয়াছে অথবা রাসূলুল্লাহ তাঁহার গৃহে হযরত খাদীজা (রা)-এর নিকট ছিলেন, যেমন ওয়াট কর্তৃক উদ্ধৃত আয-যুহরীর বর্ণনায় উক্ত হইয়াছে। জিবরাঈলের "উপস্থিতি" প্রত্যেক ক্ষেত্রে ছিল আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত। ইহা "কোন কোন সময়ে" নহে যে, উপস্থিতিকে অপ্রত্যাশিত বলা হইয়াছে। বর্ণনায় ইহা সবসময় অপ্রত্যাশিত। "আহবান" (call) ও "দৃশ্য প্রদর্শন"-এর আকস্মিকতা ও অপ্রত্যাশিত হওয়ার উপর জোর দেওয়ার বিষয়টি সকল বর্ণনাকারীর বর্ণনায় অবিচ্ছিন্নভাবে আসিয়াছে, তাহাদের বর্ণনার বিস্তারিত বিষয়বস্তুর পার্থক্য সত্ত্বেও। ওয়াট নিজে "সত্যের” এই অপ্রত্যাশিত দৃশ্যমানতার কথা ব্যবহার করেন তাহার "আল্লাহ্র দর্শন"-এর ধারণা (তত্ত্ব)-কে সমর্থন করার জন্য যাহা একটু আগেই আমরা দেখিতে পাইয়াছি। কিন্তু তিনি এক্ষণে ইহা অনুধাবন করিতে পারেন যে, "আহবান" (call) ও দৃশ্যমানতা-এর আকস্মিকতার বিষয় এবং রাসূলুল্লাহ-এর দিক হইতে পরবর্তীতে হতবিহ্বল হওয়া বা বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তা তাঁহার সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারের ব্যাপারে গভীর চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা তত্ত্বের প্রচণ্ড বিরোধী। এই সময় হইতে ওয়াট "আহবানের" আকস্মিকতা সম্পর্কে সন্দেহ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন এবং তিনি ইহা দেখাইতে চাহেন যে, ইহা "দৃশ্যমানতার” কিছু অমুখাপেক্ষিতা ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই বিষয়ের উপর ওয়াট তাহার আলোচনার বাকী অংশগুলিতে "আহবান" (call) হইতে "দৃশ্যমানতা” (vision)-কে পৃথক করেন এবং ধারণা দেন যে, রাসূলুল্লাহ তাঁহার অবস্থান সম্পর্কে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও প্রত্যাদেশ (ওহী) প্রাপ্ত হইতেছিলেন এবং প্রায় তিন বৎসর ধরিয়া এই সকল প্রত্যাদেশ জনসাধারণ্যে প্রকাশ করিতে থাকেন। ওহী অবতরণের বিরতিকালের পর তিনি ওহী জনসাধারণ্যে প্রকাশ করেন এবং তিনি যখন "গোপনে" প্রচার করিতেছিলেন তখন "দৃশ্যাবলী” অবলোকন করেন অথবা প্রথম "দৃশ্য" অবলোকন করেন। ৪৫
📄 চার: আপনি আল্লাহ্র রাসূল
ওয়াট এইভাবে তাহার উপরোল্লিখিত তৃতীয় উপশিরোনামের অধীনে "আহবান" (call) এবং "দৃশ্যাবলী” (vision)-এর বিষয়াদি সম্পর্কে আলোচনা করেন। "তিনি আয-যুহরীর প্যারা"-এর B. C. D এবং I-এ এই বলিয়া শুরু করেন, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল", এই বক্তব্যটি চারবার উক্ত হইয়াছে। প্রথম বক্তব্যে "সত্য”, দ্বিতীয় বক্তব্যে "একমাত্র তিনিই" এবং শেষ দুইটি বক্তব্যে 'জিবরাঈলকে' বুঝানো হইয়াছে। তিনি তখন বলেন যে, ৪টি প্যারায় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিত বিদ্যমান এবং এইখানে হয়ত এই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়, এইগুলি একটি ঘটনারই ৪টি ভাষ্য। কোন না কোনভাবে অথবা অন্য কোন পন্থায় বিভিন্ন দৃশ্যপটে উন্নীত হয়? ওয়াট লক্ষ্য করেন যে, “এই প্রাথমিক পর্যায়ে" জিবরাঈলের উল্লেখ "সন্দেহপূর্ণ”। এই সময় হইতে তিনি কুরআনে উক্ত হন নাই, অনেক পরে তাহার উল্লেখ না হওয়া পর্যন্ত এবং আরও যোগ করিয়া বলেন যে, সূরায় যে অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করা হয় তাহা দুই ধরনের—প্রথম দুইটিতে (প্যারা B ও C) মুহাম্মাদ -কে “মূল আহবানে একজন দূত (রাসূল) হিসাবে বর্ণনা করা এবং অপর দুইটিতে (প্যারা D ও I) উদ্বিগ্নতার সময়ে তাহাকে উপস্থিতির পুনঃ নিশ্চয়তার মাধ্যমে নিশ্চয়তা দান করা। ৪৬
ইহা পুনরায় লক্ষণীয় যে, ওয়াট আয-যুহরীর রিওয়ায়াতকে অবলম্বন করিয়া যাহা বলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে তিনি আয-যুহরীর ধারাবাহিক বর্ণনা হইতে বর্ণনা তৈরী করিয়া বলেন। মূল পাঠে এই ধরনের বিভক্তি সৃষ্টি করিয়া ওয়াট চিন্তা করেন অথবা ইহা দেখাইতে চাহেন যে, প্যারা B এবং D-ও পরবর্তীতে “বক্তাগণ” ভিন্ন ভিন্ন, যেমন উপরে বর্ণনা করা হইয়াছে। পরিপ্রেক্ষিত এবং ব্যাকরণের নিয়ম-কানুনের কোনটিই এই ধারণাকে সমর্থন করে না। পুরা অংশে জিবরাঈল হইলেন বক্তা। অনুরূপভাবে এই যুক্তি যে, এখানে জিবরাঈলের উপস্থিতি সন্দেহজনক, কারণ তিনি কুরআনে শেষ পর্যায় ছাড়া উল্লিখিত হন নাই, ইহাও অসমর্থনীয়। ইহাও ওয়াট-এর নিজের বক্তব্যের মাধ্যমে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ তিনি একমাত্র আত্-তাবারীর ভাষ্য অবিকল উপস্থাপন করেন। আয-যুহরীর বর্ণনায় অন্য সকল ভাষ্য বাদ দিয়া এই যুক্তিতে যে, ইহা “পুনঃলিখিত” হয় নাই অর্থাৎ অন্যান্যদের দ্বারা পরিমার্জিত হয় নাই। এই ভাষ্যের অংশবিশেষের উপর তাহার সন্দেহ সৃষ্টি হইয়াছে এবং কার্যত জিবরাঈল (আ) সম্পর্কে তাহার বিশ্বাস হইল কুরআনের প্রমাণ, যাহা তিনি ভুল ধারণা করেন, তাহা সুস্পষ্টভাবেই অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
যাহা হউক, ওয়াট-এর উদ্দেশ্য হইল "দৃশ্য" (vision) হইতে "আহবান" (call)-কে পৃথক করা। উপরোল্লিখিত বর্ণনা প্রদানের পরপরই তিনি আর একটি অনুচ্ছেদ প্রশ্নের মাধ্যমে শুরু করেন: যদি প্যারা B মূল আহবানের দিকে নির্দেশ করে তাহা হইলে "দৃশ্য" (vision)-এর সঙ্গে ইহার সম্পর্ক কি? প্রশ্নটি সুস্পষ্টরূপে বিভ্রান্তিপূর্ণ। প্যারা B-এ যেমন ওয়াট এই পর্যন্ত বলিয়াছেন, "উপস্থিতি" অথবা "দৃশ্য” বর্ণনা করেন এবং তিনি কিছু আগে এই ধারণা দিতে চেষ্টা করেন যে, ইহার মধ্যে উল্লিখিত "সত্য” শব্দটির অর্থ আল্লাহ বলিয়া বুঝিতে হইবে। কিন্তু এক্ষণে তিনি ঐ অবস্থান হইতে সরিয়া আসেন এবং এই ধারণা দিতে চাহেন যে, ঐ আয়াত একমাত্র মূল আহবানকে দূত হিসাবে বর্ণনা করে। পরোক্ষভাবে ইহা বলা যায় যে, ইহা সম্পূর্ণরূপে "দৃশ্য" (vision) হইতে পৃথক। সুতরাং এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্কটি নির্দিষ্ট করা উচিত। ইহা তাৎক্ষণিকভাবে বলা উচিত যে, "Original call" (মূল আহবান)-এ তিনি কী বলিয়াছেন বা বর্ণনা করিয়াছেন তাহা বিবেচ্য নহে, বরং "দৃশ্য" (vision)-এর মধ্যে কী ঘটিয়াছে তাহাই প্যারা B-এ বর্ণিত হইয়াছে। তাহার প্রশ্ন বাস্তবিকপক্ষে এই অদ্ভূত প্রশ্নের রূপ নেয় যে, "দৃশ্যের সঙ্গে দৃশ্যের সম্পর্ক কি"?
উপরোল্লিখিত প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া ওয়াট সূরা আন-নাজম-এর আয়াতের উদ্ধৃতি দেন এবং ইহার ফলে এই সম্পর্কে বেল্ কি বলেন তাহা পুনর্ব্যক্ত করেন। যেমন ওহীর বিশুদ্ধতার বিরুদ্ধে মক্কার অবিশ্বাসীদের আপত্তি উত্থাপনের জওয়াবে ঐ সূরায় "প্রথম দৃশ্যমানতা” সম্পর্কে বিবরণ দেওয়া হয় এবং এইজন্যই অন্ততপক্ষে এক বা একাধিকবার ওহী নাযিলের ঘটনা ঐ সূরায় "দৃশ্য" (vision) -এর বর্ণনা করার পূর্বেই প্রচার করা হয়। ওয়াট পরে আবার বলেন, দৃশ্য যাহা বর্ণিত হইয়াছিল ওহী প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে এইভাবে "কোন কিছু অবশ্যই করিতে হইবে"। তাহা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সূরা/ আয়াতসমূহের প্রাপ্তির সঙ্গে কোন দৃশ্য (vision) প্রদর্শিত হয় নাই। ৪৯
এই শেষ বিবরণ তৈরী করিতে ওয়াট সুস্পষ্টরূপে তাহার ক্ষেত্র পুনরায় পরিবর্তন করেন এবং উহা দুইভাবে করেন। (এক) তিনি কুরআনিক সাক্ষ্য-প্রমাণ হইতে সরিয়া আসেন এবং একমাত্র তাহার উদ্ধৃত বর্ণনার প্রমাণের উপর নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেন বলিয়া মনে হয়। (দুই) তিনি ইহাও বলেন যে, বর্ণনার প্যারা B 'দৃশ্য' (vision)-এর কথা বর্ণনা করে, কিন্তু ইহা কোন নির্দিষ্ট সূরা অবতরণের কথা নির্দেশ করে না। অন্যথায় উদাহরণস্বরূপ তাহার এই বর্ণনা তৈরী করার কোন ক্ষেত্র নাই। কেননা "দৃশ্য" (vision) সহকারে কোন নির্দিষ্ট সূরা প্রাপ্ত হওয়ার বিষয়টি তিনি দেখাইতে পারিবেন না।
এক্ষণে মূল পাঠ, যাহাকে ওয়াট প্যারা B-এর জন্য নির্দিষ্ট করেন এবং যেইটি সম্পর্কে তিনি এই ধারণা পোষণ করেন এবং সেই সত্তা সম্পর্কে বলেন যে সত্তা মুহাম্মাদকে উদ্দেশ্য করিয়া সম্বোধন করেন, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল (দূত)" এবং কুরআনের কোন নির্দিষ্ট সূরা নাযিল হওয়ার দিকে ইঙ্গিত করেন না। কিন্তু যাহা ইতোমধ্যে বলা হইয়াছে, ওয়াট-এর প্যারাসমূহ 'A' হইতে 'G' পর্যন্ত সবগুলিই আত্-তাবারীতে বর্ণিত আয-যুহ্রীর ধারাবাহিক বর্ণনায় উদ্ধৃত এবং প্যারা 'E' পর্যন্তকার বর্ণনায় বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত অনুযায়ী "আহবান" (call)-এর উল্লেখ এবং সূরা ইকরা-এর অবতরণ সম্পর্কে বলা হয়। ওয়াট-এর নিজের অনুবাদ অনুযায়ী প্যারা 'E' এইভাবে শুরু হইয়াছে, "তখন তিনি বলেন, পড়। আমি বলিলাম, আমি পড়িতে পারি না...."। "Then he" এই বক্তব্যটি নির্ভুলভাবে জিবরীলের দিকে ইঙ্গিত করে যিনি পূর্বে উল্লিখিত প্যারা 'D'-তে উক্ত হইয়াছেন। ওয়াট অবশ্য এই ক্ষেত্রে জিবরাঈলের প্রতি ইঙ্গিত করার বিষয়টি সন্দেহ করেন। কিন্তু তিনি (ওয়াট) ইহা অস্বীকার করেন না বা করিতে পারেন না যে, প্যারা 'D' "উপস্থিতি” অথবা "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে বলে এবং উভয় প্যারা 'D' এবং 'E' একসঙ্গে দৃশ্য (vision) সম্পর্কে বলে এবং সূরা ইকরা-এর অবতরণ সম্পর্কে বলে যাহা সর্বত্রই ওয়াট স্বীকার করেন যে, কুরআনের প্রথম সূরা হিসাবে ইকরা অবতারিত। ৫০ এইরূপে তাহার বর্ণনা এই যে, “এমন কোন তথ্য নাই যে, নির্দিষ্ট সূরা যাহা আল্লাহর পক্ষ হইতে প্রাপ্ত বা অবতারিত ছিল, তাহার 'দৃশ্য' (vision)-এর কথা ছিল" এই বক্তব্যটি অসমর্থনীয় এবং তাহার নিজেদের প্রমাণের পরিপন্থী।
এই বর্ণনা কুরআনের প্রমাণেরও বিপরীত। উদাহরণস্বরূপ বেল্ ও ওয়াট-এর সূরা আন-নাজ্য-এ বর্ণিত "দৃশ্যমান" সত্তার অস্তিত্ব সম্পর্কে ধারণা যাহাই হউক না কেন, এই সূরায় পর্যায়ক্রমে বলা হইয়াছে যে, ইহা ছিল ঐ সত্তা যিনি 'শাদীদুল কুওয়া' এবং 'যু মিররা', যিনি "দুইটি ধনুকের দূরত্বের" চাইতেও অধিকতর কাছে টানিয়া নেন এবং রাসুলুল্লাহ-এর নিকট নাযিল করেন যাহা তাঁহাকে ওহী হিসাবে প্রদান করা হইয়াছে" (আয়াত ৪-১০)। একই বিষয়ে জোর দিয়া বলা হইয়াছে ৮১ : ১৯-২৩ আয়াতে। ঐ আয়াত বলে যে, ইহা হইল "বক্তব্য", একটি পাঠযোগ্য (বক্তব্য), যাহা "একজন আদর্শ দূত কর্তৃক অবতারিত, যাহাকে রাসূলুল্লাহ "পরিষ্কার দিগন্তে” দেখিয়াছেন। উভয় আয়াত অতীত ঘটনা সম্পর্কে বলে এবং তাহাদের বরাত সুস্পষ্টভাবে ওহী অবতরণের প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে, যে ওহী রাসূলুল্লাহ মক্কাবাসীদের মধ্যে প্রচার করেন এবং উভয় সূরায় অবতারিত আয়াতে সেই সত্তার উপর জোর দেওয়া হয় যে সত্তাকে তিনি দেখিয়াছেন।
আয-যুহরীর বর্ণনার অন্যান্য ভাষ্য, বিশেষ করিয়া বুখারী শরীফে সুস্পষ্টভাবে জিবরাঈল কর্তৃক সূরা ইকরা নাযিল সম্পর্কে বলা হইয়াছে, যিনি এই উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ -এর সম্মুখে আবির্ভূত হন। ওয়াট তাহার পাঠকদেরকে এই ভাষ্য সম্পর্কে এবং বর্ণনার অন্যান্য ভাষ্য সম্পর্কে অবহিত রাখিতে চাহেন। প্রকৃতপক্ষে এহেন কার্যের দ্বারা এবং অন্যান্য সকল কলাকৌশল দ্বারা বিধি-বহির্ভূতভাবে বা খামখেয়ালীভাবে ভাষ্যটিকে বিভক্ত করেন যাহা তিনি কয়েকটি কৃত্রিম বিভাজনের অংশে উদ্ধৃত করেন, 'দৃশ্য' (vision) হইতে 'আহবান' (call) পৃথক করার মাধ্যমে, অদ্ভূত ও সন্দেহজনক প্রশ্ন উত্থাপন করিয়া ইহাদের সম্পর্ক বিশ্লেষণ করেন এবং অসমর্থনীয় বর্ণনা তৈরী করিয়া এমন বিবরণ দেন যে, কোন সুস্পষ্ট ও সঠিক পাঠ দৃশ্যমানতার সময় অবতীর্ণ হয় নাই। ওয়াট ও তাহার পূর্ববর্তী পণ্ডিতদের মতে মূল তত্ত্ব এই যে, কুরআনের ওহী মৌখিক ছিল না, কেবল পরামর্শ আকারে ছিল অথবা এই ধারণাসমূহ রাসূলুল্লাহ -এর নিকট আসিয়াছে। ইহার পর তিনি পুনরায় বলেন যে, “দৃশ্যের বাস্তব ফলাফল" সম্ভবত কোন কিছু "দৃঢ় বিশ্বাস বা প্রত্যয়ের মত যে, সূরা বা আয়াতগুলি আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সংবাদস্বরূপ ছিল" এবং রাসূলুল্লাহ "এই সংবাদসমূহ জনসাধারণ্যে প্রচার করার জন্য আদিষ্ট হইয়াছিলেন"। ৪৯
বক্তব্যের আলোচনা "সূরাসমূহ আল্লাহ্র পক্ষ হইতে সংবাদস্বরূপ ছিল" অর্থাৎ সূরাসমূহ উহাদের আঙ্গিকের দিক দিয়া আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ছিল না, কেবল ইহাদের মর্মবাণীসমূহ আল্লাহর পক্ষ হইতে ছিল। ইহা ওয়াট কর্তৃক ব্যাখ্যা করা হয় নাই যে, কিভাবে মর্মবাণী “দৃশ্য” (vision)-এর পূর্বে প্রাপ্ত হন। তাহা না হইলে কেন এবং কিভাবে মুহাম্মাদ ওহী প্রাপ্তির পূর্বে নিশ্চিত হন যে, এইগুলি আল্লাহ্র নিকট হইতে আসিয়াছিল? ইহাদিগকে কি সূরায় সুসংবদ্ধ দান করেন কেন? ওয়াট এই ধরনের কোন প্রাক্-দৃশ্য সম্বলিত সূরার উল্লেখও করেন নাই। তিনি কেবল তাহার ধারণার স্বপক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট যুক্তি প্রদর্শন করেন। যেমন, যে সময় হইতে এই 'দৃশ্য' এই প্রত্যয় জ্ঞাপন করে যে, "সূরাসমূহ আল্লাহ্ পক্ষ হইতে সংবাদস্বরূপ ছিল", এই বিষয়টি পূর্ব ধারণা দেয় যে, মুহাম্মাদ ইতোমধ্যে কতিপয় ওহী লাভ করিয়াছেন, কিন্তু ওহীর ধরন বা বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় নাই। "এক্ষণে তিনি জ্ঞাত হইলেন অথবা তাঁহাকে উহার সম্পর্কে নিশ্চয়তা প্রদান করা হইল"। ৫০ যে কেহ সহজেই বিষয়টি চিহ্নিত করিতে পারে যে, ইহা কেবল ম্যূর-মার্গোলিয়থ-বেল কর্তৃক পুনরায় বর্ণিত আর এক ফর্মুলা, যে ফর্মুলায় তাহারা বলেন যে, সূরা ইকরা নাযিল হওয়ার পূর্বে কুরআনের অন্য আরও কতিপয় সূরা নাযিল হইয়াছে এবং তিনি পরবর্তী সময়ে ঐগুলিকেও আল্লাহ্র পক্ষ হইতে ওহীকৃত বলিয়া মনে করেন।
ওয়াট বিকল্প পদ্ধতিতে তাহার আলোচনা অব্যাহত রাখেন, "দৃশ্যকে অবশ্যই ওহী পাওয়ার আহবান হিসাবে মনে করিতে হইবে এবং মুহাম্মাদ সম্ভবত তাহাদেরকে প্ররোচিত করার পদ্ধতি সম্পর্কে কিছু জানিতেন"। ওহীর জন্য "প্ররোচিত” তত্ত্বটি, স্মরণ করা যাইতে পারে যে, ইহা মূলত মার্গোলিয়থের তত্ত্ব। ৫১ তিনি ইহাকে অবশ্য কায়িক কঠোর পরিশ্রমের সঙ্গে যুক্ত করেন এবং অন্যান্য বৈশিষ্ট্যসমূহও রাসূলুল্লাহ-এর নিকট ওহী আসার সময় প্রকাশ পাইত।
ওয়াট মার্গোলিয়থের বরাত দেন নাই এবং তিনি প্রথম সুযোগেই তাহার স্বপক্ষে যুক্তি দেখাইয়া "আহবান" (call) এবং "দৃশ্য" (vision)-এর প্রারম্ভেই এক অসম্ভব প্রয়োগের অবতারণা করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ কদাচ তাঁহার মিশন শুরু করার পূর্বেই ওহী অবতরণের জন্য "প্ররোচিত করার পদ্ধতি সম্পর্কে জ্ঞাত হইতেন"।
যাহা হউক, ওয়াট এই ধারণা এইখানে প্রকাশ করেন নাই। উদাহরণস্বরূপ আমরা বর্তমানে দেখিতেছি, তিনি অবশ্য পরবর্তী কালে ইহার প্রতি প্রত্যাবর্তন করেন। ৫২ সাধারণ যুক্তি প্রদর্শনের পর তিনি লক্ষ্য করেন যে, "পূর্বে উল্লিখিত বিকল্পসমূহ" অর্থাৎ দৃশ্যের ফলাফল কেবল এই প্রত্যয় জন্মায় যে, "সূরাসমূহ" ছিল আল্লাহ্ পক্ষ হইতে সংবাদস্বরূপ, যাহা "অধিকতর সম্ভাব্য"; ইহা এই ধারণা সংশ্লিষ্ট এবং ওয়াট এই ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে বেল্-এর উদ্ধৃতি দান করেন "যাহা তাঁহাকে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল অথবা তাঁহাকে ধারণা দান করিয়াছিল তাহা ছিল বাস্তব পথনির্দেশনা, যাহা তিনি প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করেন"। ৫৩ ইহা তাৎক্ষণিকভাবে বলা প্রয়োজন যে, ইহা কেবল বিশেষ কোন বক্তব্য নহে, বরং সার্বিকভাবে একটি তত্ত্বগত বিষয় যে, কুরআনের ওহী মূল পাঠের শাব্দিক যোগাযোগের অর্থ বুঝায় না, বরং 'ধারণা' অথবা "উদ্বুদ্ধকরণ” ইত্যাদি বুঝায় যাহা বেল এবং অন্যান্যদের ধারণা এবং যাহা ওয়াট কেবল সাধারণভাবে কতিপয় অর্থ বা অন্যান্য বিষয় দ্বারা তাহার ধারণাকে প্রমাণ করিতে চাহেন। যাহা হউক, এই বিশেষ ধারণার যতটুকু সম্পৃক্ততা রহিয়াছে, ইহার অসম্ভাব্যতা অনেক পূর্বেই আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৪
পরিশেষে ওয়াট বলেন যে, vision-এর মর্ম যদি মোটামুটি সাধারণ দৃশ্য হয় তাহা হইলে ইহা প্যারা B-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি তখন বলেন যে, এই বক্তব্য "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" সম্ভবত "বাহ্যিক বাচনভঙ্গি ছিল না", এমনকি ধারণাগত বাচনভঙ্গিও ছিল না, বরং একটি বুদ্ধিভিত্তিক বাচনভঙ্গি”। ইহার অর্থ এই যে, ইহা ছিল একটি "যোগাযোগ" যাহা তৈরী হইয়াছিল "শব্দ” ছাড়া। "শব্দের গঠন সম্ভবত প্রকৃত দৃশ্যের অনেক পরে হয়"। ৫৬
প্রকৃতপক্ষে এই বিবরণ ওয়াট-এর দিক হইতে একটি স্বীকারোক্তি যে, "মূল আহবান” এবং "দৃশ্য" (vision) বাস্তবিকপক্ষে দুইটি পৃথক ঘটনা নহে। যেমন তিনি এই সময়ে পরোক্ষভাবে প্রকাশ করেন, কিন্তু অনুরূপ ঘটনার উদ্দেশ্যের বর্ণনা করা হয় প্যারা B-এ। উহার স্বীকৃতি দেওয়ার পর তিনি বুঝিতে পারেন যে, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" এই বক্তব্যটি যদিও কুরআনের আয়াত নহে, তৎসত্ত্বেও ইহা একটি "শব্দাবলী” সম্বলিত বর্ণনা যাহা প্যারা B-এ "দৃশ্য” (vision)-এর সময় রাসূলুল্লাহ-এর নিকট অবতীর্ণ হয়। ইহার পর ওয়াট জুড়িয়া দেন যে, এইসব শব্দ সম্ভবত "একটি বুদ্ধিভিত্তিক বাচনভঙ্গি এক্ষণে তাহার অদ্ভুত যুক্তি লক্ষ্য করুন। তিনি জোর দিয়া বলেন যে, কোন প্রমাণ নাই-যে কোন শাব্দিক পাঠ-এর দৃশ্য (vision) -এর সহিত অবতীর্ণ হইয়াছিল। কিন্তু এক্ষণে তিনি করিতে পারেন না যে, Passage B-এ যাহা তিনি অন্যান্য অংশ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দেখিয়াছেন তাহাও কিছু শাব্দিক অবতারণের কথা বলেন। তাই তিনি তাহার পাঠকদের বলেন যে, এই সমস্ত "শব্দাবলী” কোন "শব্দাবলী ছাড়া" যোগাযোগকৃত এক বুদ্ধিভিত্তিক বাচনভঙ্গি। প্রকৃত ঘটনা এই, তাহার বর্ণনা এই যে, এই যোগাযোগের কোন নির্দিষ্ট মূল পাঠ নাই, এই মিথ্যা ধারণা জন্মায় এবং তাহার Passage B-এর পরিপন্থি। তদুপরি তাহার এই কথার দ্বারাও বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যেখানে তিনি বলেন, "শব্দের সুসংবাদ সম্ভবতঃ প্রকৃত দৃশ্যের অনেক পরে তৈরী হয়"। তিনি বিধি বহির্ভূতভাবে ইচ্ছামত এক ধারণা পোষণ করেন যাহার যথার্থতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনভাবেই প্রমাণ করে না। এহেন কার্য করার পরও তিনি Passage B-এর বিশ্বাসযোগ্যতার উপর সন্দেহপোষণ করেন। যেমন আমরা দেখিয়াছিলাম যে, তিনি Passage B এবং D-এ সন্দেহ পোষণ করেন, কারণ ঐ সব Passage -এ হযরত জিবরাঈল (আ)-এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়, যে বিষয় তাহার ধারণার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নহে। এক্ষণে তিনি Passage B-এর প্রতিও অশুদ্ধতার ইঙ্গিত করেন, কারণ Passage B-এ শাব্দিক অবতারণের ইঙ্গিত রহিয়াছে "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" ইহার বাস্তবতা তাহার অন্য ধারণার সঙ্গে বিরোধপূর্ণ। তাহা সত্ত্বেও তিনি আমাদেরকে বিশ্বাস করাইতে চাহেন যে, তাহার ধারণাসমূহ এই সকল Passage দ্বারা সমর্থিত।
এমনকি এই ধরণের কৌশল সত্ত্বেও ওয়াট বাস্তবতা এড়াইতে পারেন নাই যে, সূরা ইকরা, তাহার Passage D এবং E সহ সর্বোতোভাবে 'দৃশ্য' (vision)-এর সময়ে অবতীর্ণ হয়। ইহার পর তিনি এই সম্পর্কে আলোচনার জন্য তাহার ৪র্থ উপ-শিরোনামের দিকে অগ্রসর হন। যাহা নিম্নে উল্লেখ করা হইল।
টিকাঃ
৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
৫৭. প্রাগুক্ত।
৫৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭, উদ্ধৃতি বেল, Origin etc., পৃ. ৯০।
৫৯. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৭।
৬০. প্রাগুক্ত।
৬১. দ্রষ্টব্য Supra, পৃ. ৪৪১-৪৫০।
৬২. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৭।
৬৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯।
৬৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৮, আরও দ্র., ইব্ন হিশাম, ১খ., পৃ. ২৬২।
৬৫. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৮।
📄 পাঁচ: আবৃত্তি করুন (পড়ুন)
এই উপ-শিরোনামে ওয়াট তিনটি বিষয় পর পর তিনটি অনুচ্ছেদে আলোচনা করেন। প্রথম অনুচ্ছেদে তিনি সূরাতুল আলাক নাযিল হওয়া সম্পর্কে হাদীছের অনেকগুলি ভাষ্য উল্লেখ করেন এবং পরে আয-যুহরীর বর্ণনার রেফারেন্স সহকারে বলেন যে, মা আক্রাউ (مَا أَقْرَ) শব্দটি হাদীছে দৃষ্ট হয়, যাহা অবশ্যই অনুবাদ করিতে হইবে, আমি পড়িতে (অথবা আবৃত্তি করিতে) পারি না”। উদাহরণ স্বরূপ এই স্থলে একটি পার্থক্য রহিয়াছে, যেমন অন্যান্য ভাষ্যে বলা হইয়াছে, মা আনা বি কারিইন (مَا آنَا بقارئ) এবং কারণ এই যে, ইন্ন হিশাম মা আক্রাউ এবং মা যা আক্সাউ (مَا ذَا أَقْرَهُ - مَا أَقْرَاءُ) -এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। দ্বিতীয় ভাষ্যটির অর্থ "আমি কী আবৃত্তি করিব?" ইহা বলিয়া ওয়াট জোর দিয়া উল্লেখ করেন, "পরে উল্লিখিত ভাষ্যটির অর্থ অধিক বাস্তবসম্মত, প্রথমে উল্লিখিত 'মা আক্রাউ'-এর তুলনায়"। এই বর্ণনার সমর্থনে তিনি হাদীছ বর্ণনাকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করিয়া বলেন, "ইহা প্রায় নিশ্চিত যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ উল্লিখিত শব্দসমূহের স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত অর্থ পরিহার করিয়াছেন"। এই মতবাদ তুলিয়া ধরার জন্য বলেন, "মুহাম্মাদ লিখিতে পারিতেন না যাহা ছিল কুরআন শরীফের অলৌকিক প্রকৃতির প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ"। ৫৬ তিনি এই সম্পর্কে আত্-তাবারীর তাফসীরে প্রদত্ত আবদুল্লাহ্ ইবন শাদ্দাদের বর্ণনাও উদ্ধৃত করেন। ৫৭ তিনি বলেন যে, মূল পাঠ-এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন যে, মা (ما) শব্দটি 'কী' (what) অর্থে লওয়া হইয়াছে। কেননা ইহার পূর্ববর্তী শব্দ হইল "এবং"।
ওয়াট তখন দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বেল্-এর ধারণা পুনরুল্লেখ করেন যে, 'কারাআ' এবং 'কুরআন' (قرآن-قراً) শব্দ সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দাবলী হইতে লওয়া হইয়াছে এবং কুরআন শব্দের অর্থ "পড়া, পাঠ করা" এবং "ধর্মশাস্ত্র পাঠ”। ৫৮ ইহা বলার পর ওয়াট আরও বলেন যে, 'ইকরা' (اقرا) ক্রিয়াটির পরবর্তী শব্দরূপের অর্থ 'পড়'। এই সূরায় সম্ভবত ইহার অর্থ "স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করা বা পড়া"। যেমন এমন স্মৃতি হইতে যাহা আলৌকিকভাবে তাঁহার নিকট অবতীর্ণ করা হইয়াছে। ৫৯
ইহার পর ওয়াট তাহার এই উপ-শিরোনামের আলোচ্য বিষয়ের শেষ অনুচ্ছেদে বলেন যে, মুসলিম পণ্ডিতদের সার্বজনীন ধারণার ব্যাপারে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, "ইহাই কুরআনের ওহীকৃত প্রথম সূরা"। তিনি তখন ব্যাখ্যা করিয়া বলেন, এই সূরা "প্রার্থনা করার একটি নির্দেশনা" এবং তিনি বেল্-এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করিয়া (যিনি বলেন যে, সূরাটি এমন সময় নাযিল হয় যখন রাসূলুল্লাহ কতিপয় অনুসারী একত্র করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন) বলেন যে, “ইহা সম্ভবত একটি ভাল পর্যায় বা সময় ছিল, যখন তিনি ইহা অন্যদের নিকট প্রচার করিতে শুরু করেন"। তাহা সত্ত্বেও ওয়াট দৃঢ়তা সহকারে বলেন, এই সম্ভাব্যতা কোনক্রমেই উড়াইয়া দেওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ ইতোমধ্যেই আরও বাণী লাভ করিয়াছিলেন যাহা তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই। হাদীছে ইহার একটি উদাহরণ রহিয়াছে, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬০
এক্ষণে প্রথম আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে ইহা পরিষ্কার যে, ওয়াট এই সম্পর্কে যাহা কিছু বলেন, তাহার উদ্দেশ্য ছিল ইহা নস্যাত করা যে, রাসূলুল্লাহ পড়িতে বা লিখিতে জানিতেন না। তাঁহার লেখা-পড়া না জানার বিষয়টি এবং প্রাচ্যবিদদের এই সম্পর্কিত ধারণা ইতোমধ্যে আলোচিত হইয়াছে। ৬১ এই ব্যাপারে এইখানে কেবল ইহাই বলা যায় যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণের যুক্তি প্রদর্শনের বিষয় পরিহার করা হইয়াছে যেখানে 'মা আক্রাউ' শব্দের ""স্বাভাবিক অর্থ” করা হইয়াছে যাহা সম্পূর্ণ অন্যায্য। ইহাও সত্য নহে যে, রাসূলুল্লাহ-এর লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত তথাকথিত মতবাদ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। পবিত্র কুরআন এই সম্পর্কে বলে : وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتب وَلَا تَخْطُهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ "তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯ : ৪৮)। রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত "মতবাদ" কে কি বলা হয়, অনুরূপভাবে ইহার উপর ভিত্তি করিয়া এবং কুরআনের অনুরূপ অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় এবং ইহা পরবর্তী কালের উদ্ভাবন নহে। তদুপরি ইহা বলা সঠিক নহে যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ শব্দসমূহের তথাকথিত স্বাভাবিক অর্থ পরিহার করিয়াছেন। তাঁহাদের অনেকেই বিভিন্ন ভাষ্য বিবেচনা করিয়াছেন এবং ভাষ্যগুলির অর্থের নির্দেশ করিয়াছেন। ওয়াট শব্দসমূহের স্বাভাবিক অর্থের ব্যাপারে যে জিদ করিয়াছেন তাহার সম্ভবত দুইটি ভাষ্যে উদ্ধৃত 'মা' (ما) শব্দটি 'না'বোধক নাকি 'প্রশ্নবোধক' এই ব্যাপারে তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন।
ওয়াট তাহার প্রথম অনুচ্ছেদে যাহা বলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে তাহার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে 'ইকরা' শব্দের মূল উৎস ও অর্থ সম্পর্কে তাহার আলোচিত বিষয়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। আমরা এই প্রশ্নের উপর আলোচনা দীর্ঘ করার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি না, যে প্রশ্নের ভাষ্যে বলা হইয়াছে—'ইকরা' এবং 'কুরআন' শব্দ দুইটি সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। এমনকি বেল-এর মতে যাহাকে ওয়াট উদ্ধৃত করেন, 'কুরআন' অর্থ “পড়া” অথবা "ধর্মীয় পাঠ”। কিন্তু যদি, যেমন ওয়াট আমাদের বিশ্বাস করাইতে চাহেন, 'ইকরা' ক্রিয়াপদ একমাত্র পরবর্তীতে “পড়” অর্থে আসে এবং যদি এই সূরা আল-'আলাক-এর আয়াতে রাসূলুল্লাহ -কে নির্দেশ আকারে বলা হয় "পড়ুন আপনার স্মৃতি হইতে” যাহা অতিপ্রাকৃতভাবে তাহার নিকট অবতারিত হইয়াছিল। পরে ওয়াট-এর পূর্বের সকল মন্তব্য, বিশেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা এবং মুহাদ্দিছগণের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন, এই উভয় বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ পড়া অথবা লেখার সক্ষমতার প্রয়োজন হয় না, যদি স্মৃতি হইতে কেবল আবৃত্তি করার কাজ হয়। সুস্পষ্টরূপে ওয়াট প্রথমে ধারণা করেন, পড়ার অর্থকে ক্রিয়া হিসাবে গণ্য করেন এবং ঐ ভিত্তিতে তাহার উপরোল্লিখিত মন্তব্য করেন। পরে তিনি তাহার অবস্থান পরিবর্তন করেন, শব্দের ঐ অর্থ বাতিল করেন এবং এই ধারণা দেন যে, ইহা কেবল স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার নির্দেশ-এর অর্থ বুঝায় ইত্যাদি। পুনরায় বলা যায়, তিনি ইহা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কখন এবং কিভাবে মুহাম্মাদ সূরা 'ইকরা'-এর মাধ্যমে যোগাযোগের পূর্বে অতিপ্রাকৃতিক অবতরণ গ্রহণ করেন এবং ইকরা সূরার পূর্বের সম্ভাব্য ঐ সূরাগুলি কি ছিল অথবা সূরাসমূহের জন্য কি সংবাদ ছিল এবং সেইগুলি কি আবৃত্তি করার প্রয়োজন ছিল? সুস্পষ্টরূপে ওয়াট এইখানে যাহাকে "দৃশ্য" (the vision) বলা হইয়াছে তাহার পূর্বে রাসূলুল্লাহ যে ওহী লাভ করিয়াছিলেন তাহার সেই পুরানো ধারণার পুনরাবৃত্তি করার ইচ্ছা করেন।
কিন্তু পুনরায় আরেকবার ওয়াট তাহার তৃতীয় অনুচ্ছেদে কিছুটা বিরোধিতা করেন যাহা তিনি দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেও বলেন। তিনি বলেন যে, এই ধারণার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, সূরা ইব্রা ছিল কুরআনের সর্বপ্রথম ওহীকৃত অংশ। এই বিবরণের কঠোর অনুষঙ্গ এই পরামর্শ বাতিলের প্রয়োজন বলিয়া মনে করে। কারণ সেইখানে বলা হইয়াছে যে, সূরা ইব্রা-এর পূর্বে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অন্য সূরা নাযিল হইয়াছিল, ওয়াট তাহার এই শেষ বর্ণনার ব্যাপারে উত্থাপিত সমস্যার কথা মনে হয় স্বীকার করেন। অতঃপর তিনি তাহার আলোচ্য অনুচ্ছেদের শেষদিকে দৃঢ়তা সহকারে বলেন যে, "মুহাম্মাদ ইতোপূর্বে অবশ্যই অন্যান্য সংবাদ প্রাপ্ত হন, যেগুলিকে তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই"। যেমন উহার একটি উদাহরণ নিম্নোক্ত শব্দসমূহ, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬২ এই শেষ বক্তব্যটি আলোচ্য বিষয়টিকে কেবল ভিন্ন পথে সরাইয়া নেওয়ার প্রচেষ্টামাত্র। এইখানে 'ইকরা'-পূর্ব অন্য সূরা প্রাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা অথবা সূরা ইব্রা-পূর্ব সংবাদ যাহা কুরআনের অংশবিশেষ গঠন করে এবং রাসূলুল্লাহ -কে সূরা ইকরা-এ স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার জন্য বলা হয় এবং এই সম্পর্কে নহে, যে ক্ষেত্রে ওয়াট নিজে ইহাকে (ইকরা-পূর্ব সংবাদ) কুরআনের অংশ নহে বলিয়া স্বীকার করেন। তদুপরি যদি ওহী, যেমন তিনি ও তাহার শিক্ষক বেল্ মনে করেন, কেবল বাস্তব চরিত্রের জন্য "উদ্বুদ্ধকরণ” বা "পরামর্শ” হইত যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করেন এমনভাবে যে, যাহা হইতে এমন কিছু বাহির হয় না, যে প্রণোদনায় "তিনি স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করিতে পারেন"। যাহা হউক এই বিরোধিতার পরিণতিতে পরবর্তী দুই পৃষ্ঠায় লিখেন, যেখানে ওয়াট বলেন যে, “দৃশ্য” (vision) এবং এই সম্বোধন "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" এই দুইটি ঘটনা "মূল আহবানের" প্রায় তিন বৎসর পর সংঘটিত হইয়াছিল। ৬৩ যেমন (ওয়াট এইখানে বলেন) এই বর্ণনাটি আয-যুহরীর বর্ণনায় ওয়াট তাহার প্যারা B-এ বর্ণনা করেন।
টিকাঃ
৫৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৬।
৫৭. প্রাগুক্ত।
৫৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৭, উদ্ধৃতি বেল, Origin etc., পৃ. ৯০।
৫৯. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৭।
৬০. প্রাগুক্ত।
৬১. দ্রষ্টব্য Supra, পৃ. ৪৪১-৪৫০।
৬২. ওয়াট, op. cit., পৃ. ৪৭।
৬৩. প্রাগুক্ত, পৃ. ৪৯।
এই উপ-শিরোনামে ওয়াট তিনটি বিষয় পর পর তিনটি অনুচ্ছেদে আলোচনা করেন। প্রথম অনুচ্ছেদে তিনি সূরাতুল আলাক নাযিল হওয়া সম্পর্কে হাদীছের অনেকগুলি ভাষ্য উল্লেখ করেন এবং পরে আয-যুহরীর বর্ণনার রেফারেন্স সহকারে বলেন যে, মা আক্রাউ (مَا أَقْرَ) শব্দটি হাদীছে দৃষ্ট হয়, যাহা অবশ্যই অনুবাদ করিতে হইবে, আমি পড়িতে (অথবা আবৃত্তি করিতে) পারি না”। উদাহরণ স্বরূপ এই স্থলে একটি পার্থক্য রহিয়াছে, যেমন অন্যান্য ভাষ্যে বলা হইয়াছে, মা আনা বি কারিইন (مَا آنَا بقارئ) এবং কারণ এই যে, ইন্ন হিশাম মা আক্রাউ এবং মা যা আক্সাউ (مَا ذَا أَقْرَهُ - مَا أَقْرَاءُ) -এর মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করেন। দ্বিতীয় ভাষ্যটির অর্থ
"আমি কী আবৃত্তি করিব?" ইহা বলিয়া ওয়াট জোর দিয়া উল্লেখ করেন, "পরে উল্লিখিত ভাষ্যটির অর্থ অধিক বাস্তবসম্মত, প্রথমে উল্লিখিত 'মা আক্রাউ'-এর তুলনায়"। এই বর্ণনার সমর্থনে তিনি হাদীছ বর্ণনাকারীদের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন করিয়া বলেন, "ইহা প্রায় নিশ্চিত যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ উল্লিখিত শব্দসমূহের স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত অর্থ পরিহার করিয়াছেন"। এই মতবাদ তুলিয়া ধরার জন্য বলেন, "মুহাম্মাদ লিখিতে পারিতেন না যাহা ছিল কুরআন শরীফের অলৌকিক প্রকৃতির প্রমাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ"। ৫৬ তিনি এই সম্পর্কে আত্-তাবারীর তাফসীরে প্রদত্ত আবদুল্লাহ্ ইবন শাদ্দাদের বর্ণনাও উদ্ধৃত করেন। ৫৭ তিনি বলেন যে, মূল পাঠ-এর বিশ্লেষণ প্রয়োজন যে, মা (ما) শব্দটি 'কী' (what) অর্থে লওয়া হইয়াছে। কেননা ইহার পূর্ববর্তী শব্দ হইল "এবং"।
ওয়াট তখন দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে বেল্-এর ধারণা পুনরুল্লেখ করেন যে, 'কারাআ' এবং 'কুরআন' (قرآن-قراً) শব্দ সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দাবলী হইতে লওয়া হইয়াছে এবং কুরআন শব্দের অর্থ "পড়া, পাঠ করা" এবং "ধর্মশাস্ত্র পাঠ”। ৫৮ ইহা বলার পর ওয়াট আরও বলেন যে, 'ইকরা' (اقرا) ক্রিয়াটির পরবর্তী শব্দরূপের অর্থ 'পড়'। এই সূরায় সম্ভবত ইহার অর্থ "স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করা বা পড়া"। যেমন এমন স্মৃতি হইতে যাহা আলৌকিকভাবে তাঁহার নিকট অবতীর্ণ করা হইয়াছে। ৫৯
ইহার পর ওয়াট তাহার এই উপ-শিরোনামের আলোচ্য বিষয়ের শেষ অনুচ্ছেদে বলেন যে, মুসলিম পণ্ডিতদের সার্বজনীন ধারণার ব্যাপারে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, "ইহাই কুরআনের ওহীকৃত প্রথম সূরা"। তিনি তখন ব্যাখ্যা করিয়া বলেন, এই সূরা "প্রার্থনা করার একটি নির্দেশনা" এবং তিনি বেল্-এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করিয়া (যিনি বলেন যে, সূরাটি এমন সময় নাযিল হয় যখন রাসূলুল্লাহ কতিপয় অনুসারী একত্র করিয়া অবস্থান করিতেছিলেন) বলেন যে, “ইহা সম্ভবত একটি ভাল পর্যায় বা সময় ছিল, যখন তিনি ইহা অন্যদের নিকট প্রচার করিতে শুরু করেন"। তাহা সত্ত্বেও ওয়াট দৃঢ়তা সহকারে বলেন, এই সম্ভাব্যতা কোনক্রমেই উড়াইয়া দেওয়া যায় না। রাসূলুল্লাহ ইতোমধ্যেই আরও বাণী লাভ করিয়াছিলেন যাহা তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই। হাদীছে ইহার একটি উদাহরণ রহিয়াছে, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬০
এক্ষণে প্রথম আলোচ্য বিষয় সম্পর্কে ইহা পরিষ্কার যে, ওয়াট এই সম্পর্কে যাহা কিছু বলেন, তাহার উদ্দেশ্য ছিল ইহা নস্যাত করা যে, রাসূলুল্লাহ পড়িতে বা লিখিতে জানিতেন না। তাঁহার লেখা-পড়া না জানার বিষয়টি এবং প্রাচ্যবিদদের এই সম্পর্কিত ধারণা ইতোমধ্যে আলোচিত হইয়াছে। ৬১ এই ব্যাপারে এইখানে কেবল ইহাই বলা যায় যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণের যুক্তি প্রদর্শনের বিষয় পরিহার করা হইয়াছে যেখানে 'মা আক্রাউ' শব্দের ""স্বাভাবিক অর্থ” করা হইয়াছে যাহা সম্পূর্ণ অন্যায্য। ইহাও সত্য নহে যে, রাসূলুল্লাহ-এর
লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত তথাকথিত মতবাদ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। পবিত্র কুরআন এই সম্পর্কে বলে :
وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتب وَلَا تَخْطُهُ بِيَمِينِكَ إِذًا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ
"তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯ : ৪৮)।
রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা সম্পর্কিত "মতবাদ" কে কি বলা হয়, অনুরূপভাবে ইহার উপর ভিত্তি করিয়া এবং কুরআনের অনুরূপ অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে বলা হয় এবং ইহা পরবর্তী কালের উদ্ভাবন নহে। তদুপরি ইহা বলা সঠিক নহে যে, পরবর্তী কালের মুহাদ্দিছগণ শব্দসমূহের তথাকথিত স্বাভাবিক অর্থ পরিহার করিয়াছেন। তাঁহাদের অনেকেই বিভিন্ন ভাষ্য বিবেচনা করিয়াছেন এবং ভাষ্যগুলির অর্থের নির্দেশ করিয়াছেন। ওয়াট শব্দসমূহের স্বাভাবিক অর্থের ব্যাপারে যে জিদ করিয়াছেন তাহার সম্ভবত দুইটি ভাষ্যে উদ্ধৃত 'মা' (ما) শব্দটি 'না'বোধক নাকি 'প্রশ্নবোধক' এই ব্যাপারে তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন।
ওয়াট তাহার প্রথম অনুচ্ছেদে যাহা বলেন তাহা প্রকৃতপক্ষে তাহার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে 'ইকরা' শব্দের মূল উৎস ও অর্থ সম্পর্কে তাহার আলোচিত বিষয়ের সঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। আমরা এই প্রশ্নের উপর আলোচনা দীর্ঘ করার প্রয়োজন আছে বলিয়া মনে করি না, যে প্রশ্নের ভাষ্যে বলা হইয়াছে—'ইকরা' এবং 'কুরআন' শব্দ দুইটি সিরীয় খৃস্টানদের ধর্মীয় শব্দভাণ্ডার হইতে উৎপন্ন হইয়াছে। এমনকি বেল-এর মতে যাহাকে ওয়াট উদ্ধৃত করেন, 'কুরআন' অর্থ “পড়া” অথবা "ধর্মীয় পাঠ”। কিন্তু যদি, যেমন ওয়াট আমাদের বিশ্বাস করাইতে চাহেন, 'ইকরা' ক্রিয়াপদ একমাত্র পরবর্তীতে “পড়” অর্থে আসে এবং যদি এই সূরা আল-'আলাক-এর আয়াতে রাসূলুল্লাহ -কে নির্দেশ আকারে বলা হয় "পড়ুন আপনার স্মৃতি হইতে” যাহা অতিপ্রাকৃতভাবে তাহার নিকট অবতারিত হইয়াছিল। পরে ওয়াট-এর পূর্বের সকল মন্তব্য, বিশেষ করিয়া রাসূলুল্লাহ -এর লেখাপড়া না জানা এবং মুহাদ্দিছগণের বিরুদ্ধে যুক্তি প্রদর্শন, এই উভয় বক্তব্য অপ্রাসঙ্গিক ও অপ্রয়োজনীয় হইয়া পড়ে। উদাহরণস্বরূপ পড়া অথবা লেখার সক্ষমতার প্রয়োজন হয় না, যদি স্মৃতি হইতে কেবল আবৃত্তি করার কাজ হয়। সুস্পষ্টরূপে ওয়াট প্রথমে ধারণা করেন, পড়ার অর্থকে ক্রিয়া হিসাবে গণ্য করেন এবং ঐ ভিত্তিতে তাহার উপরোল্লিখিত মন্তব্য করেন। পরে তিনি তাহার অবস্থান পরিবর্তন করেন, শব্দের ঐ অর্থ বাতিল করেন এবং এই ধারণা দেন যে, ইহা কেবল স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার নির্দেশ-এর অর্থ বুঝায় ইত্যাদি। পুনরায় বলা যায়, তিনি ইহা ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কখন এবং কিভাবে মুহাম্মাদ সূরা 'ইকরা'-এর মাধ্যমে যোগাযোগের পূর্বে অতিপ্রাকৃতিক অবতরণ গ্রহণ করেন এবং ইকরা সূরার পূর্বের সম্ভাব্য ঐ সূরাগুলি কি ছিল অথবা সূরাসমূহের জন্য কি সংবাদ ছিল এবং সেইগুলি কি আবৃত্তি করার প্রয়োজন ছিল? সুস্পষ্টরূপে ওয়াট এইখানে যাহাকে "দৃশ্য" (the vision) বলা হইয়াছে
তাহার পূর্বে রাসূলুল্লাহ যে ওহী লাভ করিয়াছিলেন তাহার সেই পুরানো ধারণার পুনরাবৃত্তি করার ইচ্ছা করেন।
কিন্তু পুনরায় আরেকবার ওয়াট তাহার তৃতীয় অনুচ্ছেদে কিছুটা বিরোধিতা করেন যাহা তিনি দ্বিতীয় অনুচ্ছেদেও বলেন। তিনি বলেন যে, এই ধারণার ক্ষেত্রে কোন কার্যকর আপত্তি নাই যে, সূরা ইব্রা ছিল কুরআনের সর্বপ্রথম ওহীকৃত অংশ। এই বিবরণের কঠোর অনুষঙ্গ এই পরামর্শ বাতিলের প্রয়োজন বলিয়া মনে করে। কারণ সেইখানে বলা হইয়াছে যে, সূরা ইব্রা-এর পূর্বে রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অন্য সূরা নাযিল হইয়াছিল, ওয়াট তাহার এই শেষ বর্ণনার ব্যাপারে উত্থাপিত সমস্যার কথা মনে হয় স্বীকার করেন। অতঃপর তিনি তাহার আলোচ্য অনুচ্ছেদের শেষদিকে দৃঢ়তা সহকারে বলেন যে, "মুহাম্মাদ ইতোপূর্বে অবশ্যই অন্যান্য সংবাদ প্রাপ্ত হন, যেগুলিকে তিনি কুরআনের অংশ হিসাবে গণ্য করেন নাই"। যেমন উহার একটি উদাহরণ নিম্নোক্ত শব্দসমূহ, "আপনি আল্লাহ্র রাসূল”। ৬২ এই শেষ বক্তব্যটি আলোচ্য বিষয়টিকে কেবল ভিন্ন পথে সরাইয়া নেওয়ার প্রচেষ্টামাত্র। এইখানে 'ইকরা'-পূর্ব অন্য সূরা প্রাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা অথবা সূরা ইব্রা-পূর্ব সংবাদ যাহা কুরআনের অংশবিশেষ গঠন করে এবং রাসূলুল্লাহ -কে সূরা ইকরা-এ স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করার জন্য বলা হয় এবং এই সম্পর্কে নহে, যে ক্ষেত্রে ওয়াট নিজে ইহাকে (ইকরা-পূর্ব সংবাদ) কুরআনের অংশ নহে বলিয়া স্বীকার করেন। তদুপরি যদি ওহী, যেমন তিনি ও তাহার শিক্ষক বেল্ মনে করেন, কেবল বাস্তব চরিত্রের জন্য "উদ্বুদ্ধকরণ” বা "পরামর্শ” হইত যাহা রাসূলুল্লাহ প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ করেন এমনভাবে যে, যাহা হইতে এমন কিছু বাহির হয় না, যে প্রণোদনায় "তিনি স্মৃতি হইতে আবৃত্তি করিতে পারেন"। যাহা হউক এই বিরোধিতার পরিণতিতে পরবর্তী দুই পৃষ্ঠায় লিখেন, যেখানে ওয়াট বলেন যে, “দৃশ্য” (vision) এবং এই সম্বোধন "আপনি আল্লাহ্র রাসূল" এই দুইটি ঘটনা "মূল আহবানের" প্রায় তিন বৎসর পর সংঘটিত হইয়াছিল। ৬৩ যেমন (ওয়াট এইখানে বলেন) এই বর্ণনাটি আয-যুহরীর বর্ণনায় ওয়াট তাহার প্যারা B-এ বর্ণনা করেন।