📄 পাঁচ: আল্লাহকে চাক্ষুস দেখা সম্পর্কে বেল্-এর থিওরী
পবিত্র কুরআনের ৫৩ : ১-১৮ (সূরা আন্-নাজম্)-এর বক্তব্য সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন। ইহা মারগোলিয়থের ধারণার একটি বিশদ ব্যাখ্যা মাত্র। আর এই ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে উক্ত আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল এই আয়াতের দৃঢ় ও অন্তর্নিহিত অর্থ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৩২ এইখানে বেল্-এর যুক্তি-তর্ক ও পর্যবেক্ষণসমূহ বিবেচনায় আনা হইল :
বেল্ সূরা আন্-নাজম-এর ৪ নং আয়াতের (عَلَمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى) অর্থ করিয়াছেন : "There taught him (or it) one strong in power".
"তাঁহাকে (অথবা ইহাকে) শিক্ষা দিয়াছেন একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী"।
এই আয়াতের সরল অনুবাদ হওয়া উচিত : "Onestrong in power taught him".
"একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী তাঁহাকে শিক্ষা দিয়াছেন"। আয়াতের অর্থ করার সময় বাক্যের শুরুতে "There" শব্দটি প্রবিষ্ট করার প্রয়োজন নাই। তিনি যাহা বলেন, তাহার বর্ণনার জন্য "দৃশ্য" শব্দটি পরবর্তী আরও দুইটি আয়াতে আসিয়াছে অর্থাৎ ৭-৯ নং আয়াতে। যাহা হউক, বেল-এর মূল যুক্তি সূরার ১০ নং আয়াতকে কেন্দ্র করিয়া বর্ণিত : فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى
তিনি মুসলিম ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা এই বলিয়া বাতিল করেন যে, আওহা (awha = أوحى) ক্রিয়ার কর্তা জিবরাঈল, পক্ষান্তরে 'আবদিহি (عبده=abdihi)-এর সহিত সংযুক্ত সর্বনাম আল্লাহকে নির্দেশ করে এবং ইহা একটি "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার"। তিনি স্বীকার করেন যে, কার্যত 'আবdihi শব্দের মধ্যে আল্লাহ্ সর্বনাম এবং পরে তিনি বলেন যে, ইহা এই অর্থ নির্দেশ করে যে, আল্লাহ্ শব্দটি ক্রিয়ার কর্তা এবং প্রকৃতপক্ষে সবকিছু অনুরূপভাবে বলা হইয়াছে। ৩৩
এই স্থানে এই বিষয়টি পরিষ্কার করিয়া বলা দরকার যে, ইহা ইংরেজীতে অসদৃশ, আরবী সর্বনামসমূহে সব সময় ইহা যথা পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নহে এবং একক বাক্যের সকল ক্রিয়ার ব্যাপারে একই উদ্দেশ্যের মধ্যে ধারণা করা যায় না। সর্বনামের এই ধরনের উদাহরণ আধুনিক আরবীতেও প্রচুর। এমকি ইংরেজীতেও এই বিশেষ ব্যাকরণগত নিয়ম সব সময় সঠিকভাবে পরিলক্ষিত হয় না এবং কোন বক্তব্যের অর্থ কেবল ইহার মূল পাঠের সম্পর্কের
মাধ্যমে এবং ঘটনাবলীর পটভূমি সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যমে যথাযথভাবে বোধগম্য হইতে পারে। ৩৪ যাহা হউক, যতদূর আরবী ভাষার সম্পৃক্ততা রহিয়াছে এই ক্ষেত্রে "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার" হয় নাই। প্রশ্নাধীন আয়াতে আওহা (awha=أوحى) ক্রিয়ার জন্য প্রশ্নাধীন একটি সর্বনাম এবং অপর একটি সর্বনাম 'আবদিহি (Abdihi = عبده) শব্দে রহিয়াছে।
প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক অস্তিত্বের উল্লেখ যে ৫-৯ নং আয়াতে রহিয়াছে তাহা বর্ণনার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বুঝা উচিত, একমাত্র ১০ নং আয়াতের ভিত্তিতে নহে। এই বিষয়টি ৫-৬ নং আয়াতে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে : "একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী” এবং “জ্ঞানে ভূষিত (অথবা মানসিক ও শারীরিকভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন)।" বেল্ নিজে স্বীকার করেন যে, ৬ নং আয়াতে 'মিরা' পরিভাষাটি 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) অর্থে নেওয়া হইয়াছে, এই 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) হয় শারীরিক অথবা জ্ঞান-বুদ্ধির দিক হইতে যোগ্যতা। ৩৫ যেমন ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, ৩৬ এইসব বিশেষণ স্পষ্টতই বৈশিষ্টগতভাবে আপেক্ষিক। কোনরূপ কল্পনায়ও এইগুলিকে আল্লাহ্ গুণাবলী বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। কুরআনের কোথায়ও আল্লাহকে এই ধরনের পরিভাষায় ও গুণাবলীর দ্বারা বর্ণনা করা হয় নাই। অপরদিকে ফেরেশতাদেরকে, অন্যান্যদের মত 'শাদীদ' এবং ইহার বহুবচন' শিদাদ' বিশেষণ দ্বারা বর্ণনা করা হইয়াছে। ৩৭ এইভাবে যদি এই বিষয় সম্পর্কিত হাদীছসমূহ এই আয়াতের আলোচনায় না আনাও হয় তাহা হইলে ইহার অভ্যন্তরীণ প্রমাণ নিশ্চিতভাবে যে কোন ধরনের প্রতিকূলে শক্তিসম্পন্ন হইয়া পড়িবে, যেক্ষত্রে অস্তিত্ব বলিতে আল্লাহকে বুঝানো হইয়াছে। ইহার বিপরীতে বর্ণনামূলক বাগ্বিধি মনে ধারণ করিয়া এবং এই বর্ণনাকে একই সূরার ১৮ নং আয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করিলে যাহা তিনি দেখিয়াছেন, সেই সম্পর্কে এই আয়াত কথা বলে, যেমন- "তাঁহার প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন," এবং প্রভু নিজে নহেন, অপরিহার্য অর্থ এই যে, কথিত অস্তিত্বশীল সত্তা হইল ফেরেশতা। পরবর্তীতে এই বিষয়টি কুরআনের ৮১ : ১৯-২৭ আয়াতের দ্বারা সুস্পষ্ট করা হইয়াছে, যে আয়াতসমূহ ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে। ৩৮ এই আয়াতসমূহ এই আলোচনার মধ্যে বিবেচনায় আনা দরকার। এই আয়াতে অস্তিত্বশীল সত্তা বলিতে "মহৎ দূত" বুঝানো হইয়াছে, যদিও তাঁহাকে একজন "ক্ষমতাশালী" (ذی قوة) সত্তা হিসাবেও বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্ পরামর্শ দেন যে, সূরা আন-নাজম-এর ১৮ নং আয়াত, ৮১ : ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর) নং আয়াত এবং ফেরেশতা জিবরাঈল সব কিছুই পরবর্তী পটভূমিকা হিসাবে বর্ণিত। কিন্তু যে পটভূমিতে এই ধারণাসমূহ তৈয়ার করা হইয়াছে, এই সব কিছুই অসমর্থনীয় যেমন শীঘ্রই দেখা যাইবে।
বেল্ তাহার ধারণা এমন বক্তব্যের দ্বারা সমর্থনযোগ্য করিতে চাহেন, যে বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ এই দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারেন এবং তিনি এই বক্তব্য সম্পর্কে আপত্তির মুখোমুখিও হন। এই ঘটনার প্রামাণ্যতার অভাবজনিত "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর” অবস্থার প্রেক্ষিতে বেল্ ১৭ : ৬০ (৬২) আয়াত উদ্ধৃত করেন যাহা বেল-এর অনুবাদ অনুযায়ী পাঠ করা যাইতে পারে : "আমরা এমন একটি দৃশ্য
(vision) প্রদর্শন করিয়াছিলাম যাহার মধ্যে আমরা তোমাকে মানুষের জন্য কেবল একটি পরীক্ষাস্বরূপ প্রদর্শন করিয়াছি"। ৩৯
বেল্ যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, এই আয়াত ইস্রা এবং মি'রাজের প্রতি ইঙ্গিত করে না যাহা ১৭: ১ আয়াতে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, যেমন-মুসলিম ভাষ্যকারগণ ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু সূরা আন-নাজ্য-এ "দৃশ্য" (vision)-এর বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্-এর মতে ১৭: ১ আয়াত কোন "দৃশ্য”-এর কথা বলে নাই। ৪০ যাহা হউক বেল্-এর এই যুক্তি সমর্থনযোগ্য নহে, ১৭: ১ আয়াত "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে বলে এবং এই "দৃশ্য”-কে আল্লাহ্ কতিপয় 'নিদর্শন' হিসাবে চিহ্নিত করে لِرِيهِ مِنْ آيَاتِنَا "এইভাবে আমরা অবশ্যই তাহাকে আমাদের নিদর্শনসমূহের মধ্যে কতিপয় নিদর্শন দেখাইব"। এমনিভাবে যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বেল্ সূরা আন-নাজ্য-এর "দৃশ্য (vision) সম্পর্কে তাঁহার যে "অস্বস্তিকর” ও “আপত্তিকর" ধারণা বিনির্মাণ করেন তাহা ভুল।
বেল্-এর এই দুইটি ভুল ধারণার ভিত্তিতে আরও অগ্রসর হইয়া বলা যায়, যেমন একটি ভুল ধারণা এই যে, সূরা আন-নাজম-এ রাসূলুল্লাহ প্রথমে আল্লাহকে দেখার দাবি করিয়াছিলেন এবং ঐ দাবির ফলে "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর" পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল। বেল্ মনে করেন যে, রাসূলুল্লাহ পরবর্তী সময়ে তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন এবং এই সংশোধন সূরার ১১-১৮ নং আয়াতে প্রকাশিত হইয়াছে। বেল্ সূরার ১১ নং আয়াত مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى -এর এইভাবে অনুবাদ করেন: "The heart did not falsify what it saw". "অন্তর যাহা দেখে তাহা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না"। এবং তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এইভাবে তাঁহার "আধ্যাত্মিক প্রকাশ"-এর ধারণা প্রদানের চেষ্টা করেন। ৪১
বেল্ পুনরায় সর্বনাম সম্পর্কে ভুল করিয়াছেন مَا رَأَى -এর ক্রিয়াপদের মধ্যস্থ সর্বনাম সন্দেহাতীতভাবে রাসূলুল্লাহ্, 'ইহা' নহে অর্থাৎ অন্তর নহে। স্বাভাবিক কারণ এই যে, ইহা বাস্তবিকভাবে এই ধারণা সৃষ্টিপূর্বক বলে না যে, অন্তর কখনও কোন কিছুকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না অর্থাৎ দৃশ্যকে উন্মোচিত করে মাত্র, যদি ইচ্ছার উপর জোর দিয়া বলা হইত যে, ইহা ছিল কেবল মানসিকভাবে দৃশ্য অবলোকন। ইহার বিপরীতে বলা হইয়াছে যে, যে সময় হইতে 'দৃশ্য' (ভিশন) অত্যন্ত বাস্তব ছিল, তখন ইহাকে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, অন্তর ইহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নাই অর্থাৎ ইহা ভুল ধারণা ছিল না, এমনকি অবিমিশ্র ধারণাও নহে। তিনি যাহা দেখিয়াছেন তাহার দিক হইতে ইহা অলীক অস্তিত্বে বিশ্বাস নহে। রাসূলুল্লাহ্-এর দৃশ্য দর্শন (vision) রহস্যপূর্ণ নহে, তাঁহার এতদসংক্রান্ত বর্ণনা এইখানে কেবল বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই জোরালো করিয়া তোলে। এই অর্থে رَأَى -এর মধ্যস্থিত সর্বনাম রাসূলুল্লাহ। ইহা ছিল একক ধরনের চাক্ষুস দর্শনের অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞতা পুনরায় ১৩ নং আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে।
যাহা আর একটি "অবতরণের" কথা বলে। এবং পরবর্তী ১৭ নং আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে "بصر (চক্ষু) শব্দটি উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা দেখার বা দর্শন করিবার একটি অঙ্গ। এইখানে যদি রহস্যপূর্ণ করার অথবা সংশোধন করার তাহার কোন ইচ্ছা থাকিত তাহা হইলে তথাকথিত সংশোধনী বিবৃতিতে দ্বিতীয় "অবতরণ অথবা চক্ষু"-র আদৌ উল্লেখ করিতেন না। অভিযোগে বর্ণিত সংশোধনী সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন এবং ১৩, ১৭, ও ১৮ নং আয়াত কোন কিছুকেই সংশোধন করে নাই।
তদুপরি যে বিষয়টি ইতোমধ্যে বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা সূরা ৫৩ : ১-১৮ (আন-নাজম)-কে ৮১: ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর)-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত, যে আয়াত "সম্মানিত দূত” অর্থাৎ একজন ফেরেশতা সম্পর্কে বলিয়াছে, যিনি ওহী বহনকারী ছিলেন। ৪২ বেল্ পরামর্শ দান করেন যে, এই আয়াত দ্বারা ৫৩: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি মানিয়া নেওয়া উচিত নহে। তাহার এই পরামর্শ দানের কারণগুলি এই : (ক) মদীনার জীবনকাল শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হযরত জিবরাঈলের উল্লেখ করা হইত না; (খ) যখন মক্কার অবিশ্বাসিগণ আপত্তি উত্থাপন করে, বেল্-এর মতে "একজন ফেরেশতাকে রাসূল হিসাবে পাঠানো উচিত ছিল অথবা অন্ততপক্ষে একজন ফেরেশতাকে যুগ্মভাবে তাঁহার (মুহাম্মাদের) সঙ্গে পাঠানো উচিত ছিল"। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর উত্তর ছিল, কোন ফেরেশতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার (রাসূলুল্লাহ্) নিকট ওহী লইয়া আসেন না, বরং তাঁহার পূর্ববর্তী রাসূলগণও মানুষই ছিলেন (১৬:৪৩); অথবা যদি একজন ফেরেশতা প্রেরণ করা হইত তাহা হইলে ঘটনার শেষ পর্যায়ে এবং তখন সেই ক্ষেত্রে কোন অবকাশ থাকিত না (৬:৮)। ৪৩ বেল্ পরবর্তী পর্যায়ে বলেন, ফেরেশতাদের "সম্পূর্ণ নূতন পরিমণ্ডল" রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অনেক পরে "উন্মুক্ত হয়"। তিনি যেমন পছন্দ করেন, তেমন তিনি তাঁহার নূতন সৃষ্টিতে সংযোজন ঘটান। যেমন সম্ভাব্য বর্ণনা এই যে, “যে সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছিল তাহা মুহাম্মাদ -এর নিকট নূতন ছিল"। ৪৪ এইভাবে যুক্তি প্রদর্শনের পর বেল উপসংহার টানিয়া বলেন, "৮১ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতা, ৫৩ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতার বর্ণনার পরবর্তী বর্ণনা এবং ইহার ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি অনুমোদন করা উচিত নহে”। ৪৫
এক্ষণে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার সকল ধারণায় সম্পূর্ণ ভুল, যেমন- (ক) রাসূলুল্লাহ সূরা আন-নাজম তিলাওয়াতের পরবর্তী সময়ে ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন; (খ) মক্কার অবিশ্বাসিগণের একজন দূত ফেরেশতার দাবির প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা এবং (গ) এই রকম ধারণা করা যে, জিবরাঈল কেবল মদীনায় ওহী অবতরণকারী হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন।
প্রথম ধারণা সম্পর্কে বলা যায় যে, ইহা যুক্তিতর্ক দ্বারা চূড়ান্তভাবে ভুল প্রমাণিত হইয়াছে, যাহা বেল্ নিজে তাঁহার অভিসন্দর্ভে স্বীকার করিয়াছেন। ঘটনা এই যে, মক্কাবাসী দূতরূপে একজন ফেরেশতা অথবা রাসূলের সঙ্গে একজন ফেরেশতাকে তাঁহার সহকারী হিসাবে দেখিতে চাওয়ায়
(প্রমাণিত হয় যে), মক্কার অবিশ্বাসীরা রাসূলুল্লাহ -এর কথা বাদ দিলেও ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে সূরা আন্-নাজম্-এর তিনটি স্থানে দেখা গিয়াছে যে, রাসূলুল্লাহ ফেরেশতাদের সম্পর্কে অবিশ্বাসীদের ভ্রান্ত ধারণা সংশোধন করার জন্য কথা বলিয়াছেন, চেষ্টা করিয়াছেন। অনুরূপ ২১ নং আয়াতে তাহাদের ভ্রান্ত ধারণা সম্পর্কে বলা হইয়াছে যেখানে তাহারা বলিয়াছিল যে, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা। ৪৬ ২৬ নং আয়াতে বলা হইয়াছে যে, প্রকৃতপক্ষে জান্নাতে অনেক ফেরেশতা রহিয়াছেন, তাহাদের কোন সুপারিশ ফলপ্রসূ হয় না, যতক্ষণ আল্লাহ যাহার জন্য ইচ্ছা ও যাহাকে পছন্দ করেন তাহাকে অনুমতি না দেন। ৪৭ এবং ২৭ নং আয়াতে বর্ণনা করা হয় যে, "যাহারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাহারা ফেরেশতাদেরকে নারীবাচক নাম দিয়া থাকে”। ৪৮ মক্কায় প্রথমদিকে অবতীর্ণ কুরআনের এক বিরাট সংখ্যক সূরায় দেখানো হইয়াছে যে, ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কিত জ্ঞান বা ধারণা আরবে সুবিদিত ছিল, বিশেষ করিয়া প্রাক-ইসলমী যুগ হইতে মক্কায়। ৪৯ অতএব ইহা সত্য হইতে অধিক দূরে এবং যুক্তির দিক হইতে অধিকতর ভ্রান্তিপূর্ণ যে, মুহাম্মাদের নিকট সূচিত হয় যে, ফেরেশতার অস্তিত্ব তাঁহার জীবনের পরবর্তী সময়ের ঘটনা।
অনুরূপভাবে বেল্ ১৬:৪৫ এবং ৬:৮ আয়াতসমূহের ভুল ব্যাখ্যা প্রদান করেন যে, আয়াতগুলি অবিশ্বাসীদের এমন দাবির সঙ্গে সম্পৃক্ত যাহাতে অবিশ্বাসীরা দাবি করে যে, ফেরেশতা তাহাদের নিকট রাসূল হিসাবে প্রেরিত হইতে পারে। উপরিউক্ত আয়াত দ্বারা তাহাদের দাবিব উত্তর দেওয়া হইয়াছে। ইহা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, এই বিষয় লইয়া কুরআনের এই দুইটি আয়াতই কেবল আলোচনা করে না, এতসম্পর্কিত বিষয়ে কমপক্ষে আরও ১০টি আয়াতে আলোচনা রহিয়াছে। ৫০ এইসব আয়াতে বলা হইয়াছে যে, ফেরেশতা আছে কি না, একজন ফেরেশতা তাঁহার নিকট আল্লাহ্র বাণী লইয়া আসিয়াছিলেন কিনা, রাসূলুল্লাহ সেই প্রশ্ন পরিহার করেন ভাসা ভাসা দৃষ্টিতে। এইসব আয়াত লক্ষ্য করিলে বিষয়টি নির্ভুলভাবে পরিষ্কার হইয়া উঠিবে যে, অবিশ্বাসীদের দাবি তাহাদের দিক হইতে দুইটি ধারণাকে কেন্দ্র করিয়া উত্থাপিত হইয়াছে। তাহারা ইহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকার করে যে, তাহাদের মত একজন মানুষ আল্লাহর রাসূল হইতে পারেন। তাহারা রাসূলুল্লাহকে এই বলিয়াও ব্যর্থ হিসাবে চিহ্নিত করিতে চাহে যে, যদি সত্যই একজন ফেরেশতা আল্লাহর বাণী তাঁহার নিকট নাযিল করিয়া থাকেন তাহা হইলে ফেরেশতা রাসূলের নিকট আগমন না করিয়া তাহাদের নিকট আসিলেন না কেন? অথবা অন্ততপক্ষে মুহাম্মাদ -এর সঙ্গে একজন সহ-সতর্ককারী প্রেরিত হইলেন না কেন? ইহা বলা আবশ্যক যে, মক্কার অবিশ্বাসীরা তাহাদের প্রতি একজন ফেরেশতা দূত হিসাবে প্রেরিত হইবেন, এমন ধারণা তাহারা নিজেরাও পোষণ করিতে পারে নাই। কারণ ঐ সময় পর্যন্ত তাহারা কেবল এই ধারণাই পোষণ করিত যে, ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা এবং তাহাদের প্রাথমিক দায়িত্ব ছিল আল্লাহ্ ও মানবজাতির সঙ্গে মধ্যস্থতা করা। এই ধারণা যে, একজন ফেরেশতা আল্লাহর দূত হিসাবে প্রেরিত হইতে পারেন, সুতরাং এই ঘটনাটি তাহাদের কাছে তখনই প্রকাশিত হইল যখন মুহাম্মাদ দাবি করিলেন যে, একজন ফেরেশতা বাস্তবিকই তাঁহার নিকট আল্লাহর বাণী
পৌঁছাইয়াছেন। যে কোন বিচারে তাহাদের এই দাবি ছিল সুস্পষ্টভাবে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ দাবি যাহা রাসূলুল্লাহ-এর দৃপ্ত ঘোষণার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়।
অবিশ্বাসীদের আপত্তি ও চ্যালেঞ্জের ধরন ২৫ঃ ৭ (সূরাতুল ফুরকান) এবং ১৫: ৬-৭ (সূরাতুল হিজ্ব) হইতে উদ্ধৃত করা যাইতে পারে। নিম্নে পর্যায়ক্রমে আয়াতগুলি উদ্ধৃত করা হইলঃ وَقَالُوا مَا لِهَذَا الرَّسُولِ يَأْكُلُ الطَّعَامَ وَيَمْشِي فِي الْأَسْوَاقِ لَوْلَا أُنْزِلَ إِلَيْهِ مَلَكُ فَيَكُونَ مَعَهُ نَذِيرًا
"এবং তাহারা বলে, এ কেমন রাসূল যে আহার করে এবং হাটে-বাজারে চলাফেরা করে? তাহার নিকট কোন ফেরেশতা নাযিল করা হইল না কেন যে তাহার সংগে সতর্ককারীরূপে থাকিত" (২৫:৭)? وَقَالُوا يَأَيُّهَا الَّذِي نُزِّلَ عَلَيْهِ الذِّكْرُ إِنَّكَ لَمَجْنُونٌ . لَوْمَا تَأْتِينَا بِالْمَلْئِكَةِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّدِقِينَ .
"তাহারা বলেন, ওহে যাহার প্রতি কুরআন নাযিল হইয়াছে-নিশ্চয় আপনি একজন উন্মাদ। তুমি সত্যবাদী হইলে আমাদের নিকট ফেরেশতাদিগকে উপস্থিত করিতেছ না কেন" (১৫:৬-৭)?
প্রথম আয়াতে এই কথা স্পষ্ট হইয়া উঠিয়াছে যে, একজন মানুষ যে আল্লাহর রাসূল হইতে পারেন, অবিশ্বাসীদের মনে এই প্রত্যয় জন্মায় নাই। দ্বিতীয় আয়াত অবিশ্বাসীদের দাবির সমুচিত জওয়াব প্রদান করিয়াছে। দ্বিতীয় আয়াতে অবিশ্বাসীদের বক্তব্যের ধরন প্রকাশিত হইয়াছে "ওহে যাহার প্রতি কুরআন নাযিল হইয়াছে", এই বক্তব্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইহার আর কোন বিকল্প নাই যে, এই কথায় অর্থাৎ রাসূলের উপর যে কুরআন নাযিল হইয়াছে তাহার উপর তাহারা বিশ্বাস স্থাপন করে। ইহা কেবল এক উপহাসপূর্ণ দ্বিরুক্তি যাহা তাহারা বলিয়াছে, যেমন আল্লাহ্ বাণী তাঁহার প্রতি "প্রেরিত" হয়। ৫১
নুযাযিলা (نُزِّلَ) শব্দটির অর্থ "নাযিল করা হইয়াছে"। এই শব্দটি এমন অন্তর্নিহিত অর্থ প্রকাশ করে যাহাতে কুরআন অবতরণকারীর কতিপয় মাধ্যম চিহ্নিত করা হইয়াছে। পরবর্তী আয়াত (১৫: ৭)-এর দ্বারা ইহা স্পষ্ট হয়। এই আয়াতে দাবি করা হইয়াছে যে, যদি রাসূলুল্লাহ তাহার এই দাবিতে "সত্যবাদী" হন তাহা হইলে তিনি তাঁহার সঙ্গে কেন একজন ফেরেশতা রাখেন না। অর্থাৎ তিনি যদি তাঁহার বর্ণনা সত্য বলিয়া উল্লেখ করেন যে, একজন ফেরেশতা তাঁহার নিকট পবিত্র কুরাআন লইয়া আসেন। রাসূলুল্লাহ-এর দাবির ধরন, সমুচিত জওয়াব দেওয়ার ধরন হইতে পার্থক্য করা বা উপলব্ধি করার যোগ্য। নিশ্চিতভাবে অবিশ্বাসীরা তাহাদের নিকট ফেরেশতা আসার কামনা করে নাই। যদি রাসূলুল্লাহ তাদেরকে এই কথা বলিতেন
যে, তিনি কুরআনের আয়াত সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। অনুরূপ কুরআনের আয়াত বেল্ -এর উত্থাপিত দুইটি ধারণাকেই নিশ্চিতভাবে ভুল প্রমাণ করে। একটি ধারণা এই : রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক পর্যায়ে এই দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে কুরআন প্রাপ্ত হন এবং দ্বিতীয় ধারণাটি এই—তিনি শুধু নবী জীবনের পরবর্তী সময়ে ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন।
অবিশ্বাসীদের দাবির প্রেক্ষিতে দুইটি উত্তর প্রদান করার পর বেল্ এই আলোচনার সঙ্গে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক বিষয় সংক্রান্ত অপর একটি বিষয়ের উল্লেখ করেন নাই যাহা তাহার উদ্ধৃত পরবর্তী আয়াতেই বর্ণিত হইয়াছে, যেমন ৬:৯ আয়াত। এই আয়াতে বলা হইয়াছে, যদি একজন ফেরেশতা মানুষের কাছে প্রেরণ করা হয় তবে তিনি অবশ্যই একজন মানুষের আকৃতিতে প্রেরিত হইবেন এবং ঐ বিষয়ে তাহাদের সন্দেহ কোনক্রমেই হ্রাস পাইত না। তাহাদের মূর্খতাপূর্ণ দাবি পরবর্তী পর্যায়ে ১৭:৯৫ আয়াতে বিশ্লেষণ করা হয়। এই আয়াতে বলা হয়—যদি পৃথিবীতে ফেরেশতাগণ শান্তি ও স্বচ্ছন্দে বিচরণ করিত তাহা হইলে আমি আকাশ হইতে কোন ফেরেশতাকেই পয়গাম্বর করিয়া প্রেরণ করিতাম। এইসব আপত্তি খণ্ডনে যাহা বলা হইতেছে তাহা এই নহে যে, ফেরেশতা আছেন কিনা বরং যদি একজন ফেরেশতা বাস্তবিকই আল্লাহর বাণী মুহাম্মাদ -এর নিকট প্রদান করেন তাহা হইলে কেন একজন ফেরেশতা শারীরিকভাবে মানুষের নিকট আল্লাহ্র দূত (রাসূল) হিসাবে উপস্থিত হন অথবা মুহাম্মাদ -এর সঙ্গে অন্ততপক্ষে সহ-দূত হিসাবে আগমন করেন না? অন্য কথায় মুহাম্মাদ একজন ফেরেশতাকে তাঁহার অনুকূলে সাক্ষীরূপে তাঁহার অনুসারীদের নিকট আগমনের জন্য কেন বলেন না?
এইরূপ ধারণা করা যে, রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, কারণ তিনি ঐ অবস্থায় ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন এবং ৫৩: ১-১৮ নং আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী অর্থাৎ এই আয়াতসমূহ এই ধরনের "দৃশ্য”-এর তথ্য সম্পর্কিত এবং ইহার পরবর্তী "সংশোধনীসমূহ" সম্পূর্ণরূপের অন্যায্য ও অসমর্থনীয়।
যাহা হউক, এই বিশেষ ধারণা পরিত্যাগ করার পূর্বে বেল্-এর আরও একটি বিষয় উল্লেখ করা যাইতে পারে। তিনি বলেন, ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছসমূহ পরবর্তী কালের উদ্ভাবন। বেল্ একই সময়ে এই বিষয়ে বুখারী শরীফে৫২ উদ্ধৃত জাবির ইবন 'আবদিল্লাহ (রা)-এর ব নিার দ্বারা তাহার ধারণার স্বপক্ষে সাহায্য লওয়া হইতে বিরত থাকেন নাই। তিনি বলেন, জাবির (রা)-এর বর্ণনা এই অর্থ প্রকাশ করে যে, ঐ দৃশ্য ছিল এক আল্লাহর, তিনি ইহার মধ্যে যোগ করেন, যেমন ইহা "গোঁড়া অনুভূতির বিরোধী"। ইহা "নিশ্চিতভাবে গোঁড়া ঐতিহ্য নির্দ্ধারিত হওয়ার পূর্বে অস্তিত্ব লাভ করে"। ৫৩ বেল্ এই কথা বলেন নিম্নোক্ত হাদীছের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাহা বর্ণনায় উল্লিখিত হয় :
فَإِذَا هُوَ جَالِسٌ عَلَى كُرْسِي .
তিনি উক্ত বাক্যের অনুবাদ করেন এইভাবে : "And there He was sitting upon the Throne". "এবং সেইখানে তিনি সিংহাসনে উপবিষ্ট ছিলেন" এবং তিনি যুক্তি দেখান যে, "সিংহাসন” আল্লাহ্ জন্যই প্রযোজ্য"। ৫৪
এক্ষণে ইহা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন যে, বর্ণনায় 'কুরসী' শব্দটি অনির্দিষ্ট আকারে আসিয়াছে। ইহার অর্থ “একটি চেয়ার" এবং নির্দিষ্ট ফর্মে নহে যাহার অর্থ "চেয়ারটি”। বেল্ ইহার ভুল অনুবাদ করেন। এইরূপে ইহা কেবল আল্লাহর জন্য "প্রযোজ্য” হওয়ার ব্যাপারে কোন যুক্তি নাই। এই বিষয়ে আরও বলা আবশ্যক যে, বুখারী শরীফে একই ধরনের বর্ণনায় দুইটি অংশে (অর্থাৎ ৪৯৯৪ নং এবং ৪৯৯৫ নং) ইহা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, তিনি যে সত্তাকে দেখিয়াছিলেন, তাহা ছিল "এই সেই ফেরেশতা যে হেরা গুহায় আমার নিকট আসিয়াছিল" فاذا الْمَلَكَ الَّذِي جَاءَنِي بِحْرَاء। বেল এই ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণরূপে অবহিত। কিন্তু তিনি ইহাকে এই বলিয়া অন্যভাবে ব্যাখ্যা করিতে চাহেন যে, হযরত জিবরাঈল (আ) প্রথমেই এই বিবরণ স্বচ্ছভাবে লইয়া আসেন। ৫৫ ইহা একটি অবাঞ্ছিত বিবরণ। তিনি এখনও এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন নাই যে, প্রথমে স্বচ্ছভাবে (Fairly early)-এর দ্বারা তিনি কি বুঝাইতে চহিয়াছেন। তিনি কি ইহা বলিতে চাহেন যে, এই ঘটনাটি হযরত জাবির (রা)-এর সুনির্দিষ্ট বর্ণনা আসার পূর্বে ঘটিয়াছে? কিন্তু তাহা সত্ত্বেও ইহা সব সমস্যার সমাধান করিতে পারিবে না। হযরত জাবির (রা) একজন আনসারী সাহাবী ছিলেন (মৃ. ৭৪ হি.) এবং রাসূলুল্লাহ মদীনায় হিজরত করার পর তিনি তাঁহার সান্নিধ্যে আসেন। জাবির (রা) সুনির্দিষ্টভাবে বলেন যে, তিনি তাঁহার তথ্যাবলী স্বয়ং রাসূলুল্লাহ-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত হন। এক্ষণে বেল্ যেমন বলেন যে, রাসূলুল্লাহ আপত্তির মুখে "দৃশ্য” (ভিশন) সংক্রান্ত প্রাথমিক ধারণার বর্ণনা সংশোধন করেন এবং এই ঘটনা সুস্পষ্টভাবে মক্কায় সংঘটিত হয়, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন এই ধরনের কোন ধারণা জাবির (রা)-কে প্রদান করেন নাই। প্রকৃতপক্ষে জাবির (রা)-এর বর্ণনার কোন অংশই এই অর্থ প্রকাশ করে না যে, “দৃশ্যটি” এক আল্লাহ্র ছিল। বেল্-এর বর্ণনা ছিল তথাকথিত “গোঁড়া হাদীছ” যাহা জাবির (রা)-র বর্ণনার পরে আসিয়াছে এবং ঐ বর্ণনায় জিবরাঈল (আ)-কে Fairly early হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে যাহা স্ববিরোধী ও সন্দেহপূর্ণ। বেল্-এর নিজস্ব ধারণা অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ হিজরতের পূর্বে তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন। ঐ সময় হইতে তথাকথিত গোঁড়া বর্ণনা সম্পর্কে আর কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হয় নাই যাহা পরবর্তী সময়ে জাবির (রা)-এর বর্ণনার পরে আসিয়াছে। জাবির (রা)-র ৪টি বর্ণনা একসঙ্গে করিলে ইহা পরিষ্কার হয় যে, রাসূলুল্লাহ যে সত্তাকে দেখিয়াছিলেন তিনি হযরত জিবরাঈল (আ), আল্লাহ নহেন।
পবিত্র কুরআনের ৫৩ : ১-১৮ (সূরা আন্-নাজম্)-এর বক্তব্য সম্পর্কে বেল্-এর ধারণা এই যে, রাসূলুল্লাহ প্রথমে দাবি করিয়াছিলেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন। ইহা মারগোলিয়থের ধারণার একটি বিশদ ব্যাখ্যা মাত্র। আর এই ধারণাটি সম্পূর্ণরূপে উক্ত আয়াতের ভুল ব্যাখ্যার উপর নির্ভরশীল এই আয়াতের দৃঢ় ও অন্তর্নিহিত অর্থ ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৩২ এইখানে বেল্-এর যুক্তি-তর্ক ও পর্যবেক্ষণসমূহ বিবেচনায় আনা হইল :
বেল্ সূরা আন্-নাজম-এর ৪ নং আয়াতের (عَلَمَهُ شَدِيدُ الْقُوَى) অর্থ করিয়াছেন : "There taught him (or it) one strong in power".
"তাঁহাকে (অথবা ইহাকে) শিক্ষা দিয়াছেন একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী"।
এই আয়াতের সরল অনুবাদ হওয়া উচিত : "Onestrong in power taught him".
"একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী তাঁহাকে শিক্ষা দিয়াছেন"। আয়াতের অর্থ করার সময় বাক্যের শুরুতে "There" শব্দটি প্রবিষ্ট করার প্রয়োজন নাই। তিনি যাহা বলেন, তাহার বর্ণনার জন্য "দৃশ্য" শব্দটি পরবর্তী আরও দুইটি আয়াতে আসিয়াছে অর্থাৎ ৭-৯ নং আয়াতে। যাহা হউক, বেল-এর মূল যুক্তি সূরার ১০ নং আয়াতকে কেন্দ্র করিয়া বর্ণিত : فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى
তিনি মুসলিম ভাষ্যকারদের ব্যাখ্যা এই বলিয়া বাতিল করেন যে, আওহা (awha = أوحى) ক্রিয়ার কর্তা জিবরাঈল, পক্ষান্তরে 'আবদিহি (عبده=abdihi)-এর সহিত সংযুক্ত সর্বনাম আল্লাহকে নির্দেশ করে এবং ইহা একটি "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার"। তিনি স্বীকার করেন যে, কার্যত 'আবদিহি শব্দের মধ্যে আল্লাহ্ সর্বনাম এবং পরে তিনি বলেন যে, ইহা এই অর্থ নির্দেশ করে যে, আল্লাহ্ শব্দটি ক্রিয়ার কর্তা এবং প্রকৃতপক্ষে সবকিছু অনুরূপভাবে বলা হইয়াছে। ৩৩
এই স্থানে এই বিষয়টি পরিষ্কার করিয়া বলা দরকার যে, ইহা ইংরেজীতে অসদৃশ, আরবী সর্বনামসমূহে সব সময় ইহা যথা পূর্ববর্তী শব্দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নহে এবং একক বাক্যের সকল ক্রিয়ার ব্যাপারে একই উদ্দেশ্যের মধ্যে ধারণা করা যায় না। সর্বনামের এই ধরনের উদাহরণ আধুনিক আরবীতেও প্রচুর। এমকি ইংরেজীতেও এই বিশেষ ব্যাকরণগত নিয়ম সব সময় সঠিকভাবে পরিলক্ষিত হয় না এবং কোন বক্তব্যের অর্থ কেবল ইহার মূল পাঠের সম্পর্কের
মাধ্যমে এবং ঘটনাবলীর পটভূমি সম্পর্কিত জ্ঞানের মাধ্যমে যথাযথভাবে বোধগম্য হইতে পারে। ৩৪ যাহা হউক, যতদূর আরবী ভাষার সম্পৃক্ততা রহিয়াছে এই ক্ষেত্রে "ভাষার অস্বাভাবিক ব্যবহার" হয় নাই। প্রশ্নাধীন আয়াতে আওহা (awha=أوحى) ক্রিয়ার জন্য প্রশ্নাধীন একটি সর্বনাম এবং অপর একটি সর্বনাম 'আবদিহি (Abdihi = عبده) শব্দে রহিয়াছে।
প্রকৃতপক্ষে স্বাভাবিক অস্তিত্বের উল্লেখ যে ৫-৯ নং আয়াতে রহিয়াছে তাহা বর্ণনার ভিত্তিতে প্রাথমিকভাবে বুঝা উচিত, একমাত্র ১০ নং আয়াতের ভিত্তিতে নহে। এই বিষয়টি ৫-৬ নং আয়াতে এইভাবে বর্ণিত হইয়াছে : "একজন ক্ষমতায় শক্তিশালী” এবং “জ্ঞানে ভূষিত (অথবা মানসিক ও শারীরিকভাবে যোগ্যতাসম্পন্ন)।" বেল্ নিজে স্বীকার করেন যে, ৬ নং আয়াতে 'মিরা' পরিভাষাটি 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) অর্থে নেওয়া হইয়াছে, এই 'ফিটনেস' (যোগ্যতা) হয় শারীরিক অথবা জ্ঞান-বুদ্ধির দিক হইতে যোগ্যতা। ৩৫ যেমন ইতোপূর্বে ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, ৩৬ এইসব বিশেষণ স্পষ্টতই বৈশিষ্টগতভাবে আপেক্ষিক। কোনরূপ কল্পনায়ও এইগুলিকে আল্লাহ্ গুণাবলী বলিয়া গ্রহণ করা যায় না। কুরআনের কোথায়ও আল্লাহকে এই ধরনের পরিভাষায় ও গুণাবলীর দ্বারা বর্ণনা করা হয় নাই। অপরদিকে ফেরেশতাদেরকে, অন্যান্যদের মত 'শাদীদ' এবং ইহার বহুবচন' শিদাদ' বিশেষণ দ্বারা বর্ণনা করা হইয়াছে। ৩৭ এইভাবে যদি এই বিষয় সম্পর্কিত হাদীছসমূহ এই আয়াতের আলোচনায় না আনাও হয় তাহা হইলে ইহার অভ্যন্তরীণ প্রমাণ নিশ্চিতভাবে যে কোন ধরনের প্রতিকূলে শক্তিসম্পন্ন হইয়া পড়িবে, যেক্ষত্রে অস্তিত্ব বলিতে আল্লাহকে বুঝানো হইয়াছে। ইহার বিপরীতে বর্ণনামূলক বাগ্বিধি মনে ধারণ করিয়া এবং এই বর্ণনাকে একই সূরার ১৮ নং আয়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত করিলে যাহা তিনি দেখিয়াছেন, সেই সম্পর্কে এই আয়াত কথা বলে, যেমন- "তাঁহার প্রভুর অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন," এবং প্রভু নিজে নহেন, অপরিহার্য অর্থ এই যে, কথিত অস্তিত্বশীল সত্তা হইল ফেরেশতা। পরবর্তীতে এই বিষয়টি কুরআনের ৮১ : ১৯-২৭ আয়াতের দ্বারা সুস্পষ্ট করা হইয়াছে, যে আয়াতসমূহ ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে। ৩৮ এই আয়াতসমূহ এই আলোচনার মধ্যে বিবেচনায় আনা দরকার। এই আয়াতে অস্তিত্বশীল সত্তা বলিতে "মহৎ দূত" বুঝানো হইয়াছে, যদিও তাঁহাকে একজন "ক্ষমতাশালী" (ذی قوة) সত্তা হিসাবেও বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্ পরামর্শ দেন যে, সূরা আন-নাজম-এর ১৮ নং আয়াত, ৮১ : ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর) নং আয়াত এবং ফেরেশতা জিবরাঈল সব কিছুই পরবর্তী পটভূমিকা হিসাবে বর্ণিত। কিন্তু যে পটভূমিতে এই ধারণাসমূহ তৈয়ার করা হইয়াছে, এই সব কিছুই অসমর্থনীয় যেমন শীঘ্রই দেখা যাইবে।
বেল্ তাহার ধারণা এমন বক্তব্যের দ্বারা সমর্থনযোগ্য করিতে চাহেন, যে বক্তব্যে রাসূলুল্লাহ এই দাবি করেন যে, তিনি আল্লাহকে দেখিয়াছেন, পরবর্তী সময়ে তিনি তাঁহার ভুল বুঝিতে পারেন এবং তিনি এই বক্তব্য সম্পর্কে আপত্তির মুখোমুখিও হন। এই ঘটনার প্রামাণ্যতার অভাবজনিত "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর” অবস্থার প্রেক্ষিতে বেল্ ১৭ : ৬০ (৬২) আয়াত উদ্ধৃত করেন যাহা বেল-এর অনুবাদ অনুযায়ী পাঠ করা যাইতে পারে : "আমরা এমন একটি দৃশ্য
(vision) প্রদর্শন করিয়াছিলাম যাহার মধ্যে আমরা তোমাকে মানুষের জন্য কেবল একটি পরীক্ষাস্বরূপ প্রদর্শন করিয়াছি"। ৩৯
বেল্ যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, এই আয়াত ইস্রা এবং মি'রাজের প্রতি ইঙ্গিত করে না যাহা ১৭: ১ আয়াতে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে, যেমন-মুসলিম ভাষ্যকারগণ ধারণা পোষণ করেন। কিন্তু সূরা আন-নাজ্য-এ "দৃশ্য" (vision)-এর বর্ণনা করা হইয়াছে। বেল্-এর মতে ১৭: ১ আয়াত কোন "দৃশ্য”-এর কথা বলে নাই। ৪০ যাহা হউক বেল্-এর এই যুক্তি সমর্থনযোগ্য নহে, ১৭: ১ আয়াত "দৃশ্য" (vision) সম্পর্কে বলে এবং এই "দৃশ্য”-কে আল্লাহ্ কতিপয় 'নিদর্শন' হিসাবে চিহ্নিত করে لِرِيهِ مِنْ آيَاتِنَا "এইভাবে আমরা অবশ্যই তাহাকে আমাদের নিদর্শনসমূহের মধ্যে কতিপয় নিদর্শন দেখাইব"। এমনিভাবে যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে বেল্ সূরা আন-নাজ্য-এর "দৃশ্য (vision) সম্পর্কে তাঁহার যে "অস্বস্তিকর” ও “আপত্তিকর" ধারণা বিনির্মাণ করেন তাহা ভুল।
বেল্-এর এই দুইটি ভুল ধারণার ভিত্তিতে আরও অগ্রসর হইয়া বলা যায়, যেমন একটি ভুল ধারণা এই যে, সূরা আন-নাজম-এ রাসূলুল্লাহ প্রথমে আল্লাহকে দেখার দাবি করিয়াছিলেন এবং ঐ দাবির ফলে "অস্বস্তিকর" ও "আপত্তিকর" পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছিল। বেল্ মনে করেন যে, রাসূলুল্লাহ পরবর্তী সময়ে তাঁহার অবস্থান সংশোধন করেন এবং এই সংশোধন সূরার ১১-১৮ নং আয়াতে প্রকাশিত হইয়াছে। বেল্ সূরার ১১ নং আয়াত مَا كَذَبَ الْفُؤَادُ مَا رَأَى -এর এইভাবে অনুবাদ করেন: "The heart did not falsify what it saw". "অন্তর যাহা দেখে তাহা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না"। এবং তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ এইভাবে তাঁহার "আধ্যাত্মিক প্রকাশ"-এর ধারণা প্রদানের চেষ্টা করেন। ৪১
বেল্ পুনরায় সর্বনাম সম্পর্কে ভুল করিয়াছেন مَا رَأَى -এর ক্রিয়াপদের মধ্যস্থ সর্বনাম সন্দেহাতীতভাবে রাসূলুল্লাহ্, 'ইহা' নহে অর্থাৎ অন্তর নহে। স্বাভাবিক কারণ এই যে, ইহা বাস্তবিকভাবে এই ধারণা সৃষ্টিপূর্বক বলে না যে, অন্তর কখনও কোন কিছুকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে না অর্থাৎ দৃশ্যকে উন্মোচিত করে মাত্র, যদি ইচ্ছার উপর জোর দিয়া বলা হইত যে, ইহা ছিল কেবল মানসিকভাবে দৃশ্য অবলোকন। ইহার বিপরীতে বলা হইয়াছে যে, যে সময় হইতে 'দৃশ্য' (ভিশন) অত্যন্ত বাস্তব ছিল, তখন ইহাকে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, অন্তর ইহাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে নাই অর্থাৎ ইহা ভুল ধারণা ছিল না, এমনকি অবিমিশ্র ধারণাও নহে। তিনি যাহা দেখিয়াছেন তাহার দিক হইতে ইহা অলীক অস্তিত্বে বিশ্বাস নহে। রাসূলুল্লাহ্-এর দৃশ্য দর্শন (vision) রহস্যপূর্ণ নহে, তাঁহার এতদসংক্রান্ত বর্ণনা এইখানে কেবল বাস্তব অভিজ্ঞতাকেই জোরালো করিয়া তোলে। এই অর্থে رَأَى -এর মধ্যস্থিত সর্বনাম রাসূলুল্লাহ। ইহা ছিল একক ধরনের চাক্ষুস দর্শনের অভিজ্ঞতা, এই অভিজ্ঞতা পুনরায় ১৩ নং আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে।
যাহা আর একটি "অবতরণের" কথা বলে। এবং পরবর্তী ১৭ নং আয়াতে সুনির্দিষ্টভাবে "بصر (চক্ষু) শব্দটি উল্লেখ করা হইয়াছে যাহা দেখার বা দর্শন করিবার একটি অঙ্গ। এইখানে যদি রহস্যপূর্ণ করার অথবা সংশোধন করার তাহার কোন ইচ্ছা থাকিত তাহা হইলে তথাকথিত সংশোধনী বিবৃতিতে দ্বিতীয় "অবতরণ অথবা চক্ষু"-র আদৌ উল্লেখ করিতেন না। অভিযোগে বর্ণিত সংশোধনী সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন এবং ১৩, ১৭, ও ১৮ নং আয়াত কোন কিছুকেই সংশোধন করে নাই।
তদুপরি যে বিষয়টি ইতোমধ্যে বর্ণনা করা হইয়াছে তাহা সূরা ৫৩ : ১-১৮ (আন-নাজম)-কে ৮১: ১৯-২৭ (সূরা আত-তাকবীর)-এর সঙ্গে যুগ্মভাবে ব্যাখ্যা করা উচিত, যে আয়াত "সম্মানিত দূত” অর্থাৎ একজন ফেরেশতা সম্পর্কে বলিয়াছে, যিনি ওহী বহনকারী ছিলেন। ৪২ বেল্ পরামর্শ দান করেন যে, এই আয়াত দ্বারা ৫৩: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি মানিয়া নেওয়া উচিত নহে। তাহার এই পরামর্শ দানের কারণগুলি এই : (ক) মাদানী জীবনকাল শুরু হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত হযরত জিবরাঈলের উল্লেখ করা হইত না; (খ) যখন মক্কার অবিশ্বাসিগণ আপত্তি উত্থাপন করে, বেল্-এর মতে "একজন ফেরেশতাকে রাসূল হিসাবে পাঠানো উচিত ছিল অথবা অন্ততপক্ষে একজন ফেরেশতাকে যুগ্মভাবে তাঁহার (মুহাম্মাদের) সঙ্গে পাঠানো উচিত ছিল"। এই সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ -এর উত্তর ছিল, কোন ফেরেশতা প্রকৃতপক্ষে তাঁহার (রাসূলুল্লাহ্) নিকট ওহী লইয়া আসেন না, বরং তাঁহার পূর্ববর্তী রাসূলগণও মানুষই ছিলেন (১৬:৪৩); অথবা যদি একজন ফেরেশতা প্রেরণ করা হইত তাহা হইলে ঘটনার শেষ পর্যায়ে এবং তখন সেই ক্ষেত্রে কোন অবকাশ থাকিত না (৬:৮)। ৪৩ বেল্ পরবর্তী পর্যায়ে বলেন, ফেরেশতাদের "সম্পূর্ণ নূতন পরিমণ্ডল" রাসূলুল্লাহ -এর নিকট অনেক পরে "উন্মুক্ত হয়"। তিনি যেমন পছন্দ করেন, তেমন তিনি তাঁহার নূতন সৃষ্টিতে সংযোজন ঘটান। যেমন সম্ভাব্য বর্ণনা এই যে, “যে সৃষ্টির কথা বলা হইয়াছিল তাহা মুহাম্মাদ -এর নিকট নূতন ছিল"। ৪৪ এইভাবে যুক্তি প্রদর্শনের পর বেল উপসংহার টানিয়া বলেন, "৮১ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতা, ৫৩ নং সূরায় বর্ণিত দূত ফেরেশতার বর্ণনার পরবর্তী বর্ণনা এবং ইহার ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার বিষয়টি অনুমোদন করা উচিত নহে”। ৪৫
এক্ষণে এই ক্ষেত্রে বেল্ তাহার সকল ধারণায় সম্পূর্ণ ভুল, যেমন- (ক) রাসূলুল্লাহ সূরা আন-নাজম তিলাওয়াতের পরবর্তী সময়ে ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত হন; (খ) মক্কার অবিশ্বাসিগণের একজন দূত ফেরেশতার দাবির প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা এবং (গ) এই রকম ধারণা করা যে, জিবরাঈল কেবল মদীনায় ওহী অবতরণকারী হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন।
📄 ছয়: হযরত জিবরাঈল (আ) সম্পর্কে ধারণা
রিচার্ড বেল্-এর ৫ম ধারণা, যেমন ৮১: ১৯-২৭ নং আয়াত তাহাকে (জিবরাঈলকে) একজন "মহান দূত” বলা হয়, এবং রাসূলুল্লাহ তাঁহার নবী জীবনের পরবর্তী সময়ে
জিবরাঈল (আ)-কে ওহী আনয়নকারী হিসাবে আখ্যায়িত করেন। এবং এইজন্য ৫৩: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার উচিত নহে যাহা ইতোমধ্যে ভুল প্রমাণিত হইয়াছে। দুইটি ভিত্তির উপর বেল-এর এই ধারণা দাঁড় করানো আছে। যেমন (এক) রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না; (দুই) তিনি অবিশ্বসীদেরকে এই কথাটি বলা পরিহার করিতেন যে, একজন ফেরেশতা তাঁহার নিকট আল্লাহ্ বাণী পৌঁছান, এই কথা সম্পূর্ণ ভুল। এইজন্য ৫২: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য ৮১: ১৯-২৭ আয়াত আলোচনায় আনা হইয়াছে।
বেল্-এর ধারণাসমূহের শেষ প্রকারটি আমাদের সামনে উপস্থাপন করে, যেমন জibraঈল (আ) ওহী আনয়নকারী হিসাবে কেবল মদীনায় আবির্ভূত হইয়াছিলেন। এক্ষণে এই বিষয়টি নিম্নের বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যাইতে পারে :
(ক) ফেরেশতারা মক্কায় রাসূলুল্লাহ এবং তাঁহার সমসাময়িকদের নিকট তাঁহার মিশনের শুরুতেই পরিচিত ছিলেন।
(খ) তাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলুল্লাহ-এর মধ্যে দৌত্যকর্ম পালনকারী হিসাবে আখ্যায়িত হইতেন।
(গ) মক্কায় ইহা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হইয়াছিল যে, একজন "মহান দূত” ওহীকৃত মূল পাঠ (কুরআন) রাসূলুল্লাহ-এর নিকট লইয়া আসিতেন।
(ঘ) রাসূলুল্লাহ এই দাবি করার পর মক্কায় অধিবাসীরা এক বিপরীত দাবি নিয়া দৃশ্যপটে আসে এবং বলে যে, একজন ফেরেশতাকে দূত হিসাবে অথবা মুহাম্মাদ -এর সঙ্গে একজন সহকারী দূত হিসাবে প্রেরণ করা উচিত।
(ঙ) ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছ এবং সুনির্দিষ্টভাবে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ) ওহী আনয়নকারী হিসাবে চিহ্নিত করার বিষয়টি পরবর্তী কালের উদ্ভাবন নহে, যেমন বেল্ মনে করেন।
(চ) এমনকি মক্কায়ও আরবের যে কোন স্থানে বসবাসকারী খৃস্টানরা বিশ্বাস করিত এবং জানিত যে, জিবরাঈল (আ) একজন ফেরেশতা যিনি আল্লাহ্ ওহী তাঁহার রাসূলদের নিকট লইয়া আসিতেন।
এইসব প্রামাণ্য ঘটনার আলোকে ইহা বলা সমীচীন নহে যে, রাসূলুল্লাহ মদীনায় আগমনের পরই জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট পরিচিত হন।
জিবরাঈল (আ) তাঁহার এই 'জিবরাঈল' নামের দ্বারা পবিত্র কুরআনে তিনবার চিহ্নিত হন এবং এই তিনটি স্থানই মাদানী সূরার অন্তর্ভুক্ত, যেমন ২: ৯৭; ২ঃ ৯৮ এবং ৬৬:৪। এই তিনটি স্থানের কেবল একটি স্থানে (২:৯৭) হযরত জিবরাঈল (আ)-কে ওহী অবতরণকরী হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই আয়াতের শব্দ প্রয়োগে ইহা সুস্পষ্ট যে, কতিপয় বিষয়ে জিবরাঈলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তির উত্তরে এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং জিবরাঈল সম্পর্কে
কতিপয় বক্তব্য এই আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এই সূরায় ওহী অবতরণ সংক্রান্ত সকল বর্ণনা এই বিবরণের সঙ্গে একমত যে, যখন মদীনায় ইয়াহুদীরা এই কথা জানিতে পারিল যে, রাসূলুল্লাহ এই যৌক্তিক দাবি করেন যে, ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট ওহী লইয়া আসেন, তখন তাহারা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রতি তাহাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করিল এবং বলিল যে, রাসূলুল্লাহ যদি এই কথা বলেন যে, ফেরেশতা হযরত মীকাঈল ওহী আনয়নকারী ছিলেন তাহা হইলে তাহারা তাঁহাকে (রাসূলুল্লাহ -কে) অনুসরণ করিবে। এই কারণে ইয়াহুদীদের আপত্তির উত্তর এই আয়াতে প্রদান করা হইয়াছে। ৫৬ এই আয়াত ও ইহার প্রেক্ষাপট, যাহা বর্ণনা দ্বারা জানা গেল তাহা এই তথ্য নির্দেশ করে না যে, জিবরাঈল (আ)-এর নাম এই স্থানেই প্রথমবারের মত ওহী আনয়নকারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
তদুপরি প্রকৃত ঘটনা এই যে, জিবরাঈল (আ) তাহার এই নামে আখ্যায়িত হওয়ার কথা কেবল মাদানী সূরায় উল্লিখিত হওয়া এই কথা বুঝায় না যে, মক্কী সূরায় তাঁহার (জিবরাঈল) সম্পর্কে কোন তথ্যনির্দেশ নাই। প্রকৃতপক্ষে 'রাসূল কারীম' (একজন মহান/সম্মানিত দূত) অভিধাটি যে ৮১: ১৯ আয়াতে এবং 'শাদীদুল কুওয়া' (ক্ষমতায় শক্তিশালী একজন) অভিধাটি ৫৩: ৩ আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে, সকল তাফসীরকার এই দুইটি অভিধার দ্বারা জিবরাঈল (আ)-কে বুঝান। ইহার দ্বারা মনে হয় যে, 'শাদীদুল কুওয়া' এবং জিবরাঈল পরিভাষা দুইটি সমার্থক। কাহারও মতে 'জিবরাঈল' একটি যৌগিক শব্দ, যাহা জার এবং ইল শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত, ইহার অর্থ "আল্লাহর সাহসী বীর" অথবা "আল্লাহর দাস"। জার শব্দটি হিব্রু ভাষায় Geber যাহার অর্থ “একজন দাস/চাকর” এবং II-এর অর্থ "শক্তিশালী" "ক্ষমতাশালী" অর্থাৎ আল্লাহ। ৫৭ অনুরূপ রূহ্ আল-কুদ্স্স (পবিত্র আত্মা) ৫৮ অভিধাটি ১৬: ১০২ আয়াতে এবং আর-রূহুল আমীন (বিশ্বস্ত আত্মা) ২৬: ১৯৩ আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে। এই দুইটি শব্দের দ্বারাও মুফাসসিরগণ সর্বসম্মতভাবে জিবরাঈলকে বুঝাইয়াছেন। ইহাও বলা আবশ্যক যে, 'নামূস' পরিভাষাটি হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে, ইহার অর্থ বিশ্বস্ত অথবা গোপনীয় ফেরেশতা। ৫৯ এইভাবে কুরআন ও হাদীছ এই বিষয়ে কোন পার্থক্য করে না। উভয়টিতে জিবরাঈল (আ)-কে নবী-রাসূলগণকে পৃথিবীতে প্রেরণের মিশন শুরু হওয়ার পর হইতে ওহী আনয়নকারী হিসাবে আখ্যায়িত করা হইয়াছে।
রিচার্ড বেল্-এর ৫ম ধারণা, যেমন ৮১: ১৯-২৭ নং আয়াত তাহাকে (জিবরাঈলকে) একজন "মহান দূত” বলা হয়, এবং রাসূলুল্লাহ তাঁহার নবী জীবনের পরবর্তী সময়ে
জিবরাঈল (আ)-কে ওহী আনয়নকারী হিসাবে আখ্যায়িত করেন। এবং এইজন্য ৫৩: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যাকে প্রভাবিত করার উচিত নহে যাহা ইতোমধ্যে ভুল প্রমাণিত হইয়াছে। দুইটি ভিত্তির উপর বেল-এর এই ধারণা দাঁড় করানো আছে। যেমন (এক) রাসূলুল্লাহ প্রাথমিক অবস্থায় ফেরেশতার অস্তিত্ব সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না; (দুই) তিনি অবিশ্বসীদেরকে এই কথাটি বলা পরিহার করিতেন যে, একজন ফেরেশতা তাঁহার নিকট আল্লাহ্ বাণী পৌঁছান, এই কথা সম্পূর্ণ ভুল। এইজন্য ৫২: ১-১৮ আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য ৮১: ১৯-২৭ আয়াত আলোচনায় আনা হইয়াছে।
বেল্-এর ধারণাসমূহের শেষ প্রকারটি আমাদের সামনে উপস্থাপন করে, যেমন জিবরাঈল (আ) ওহী আনয়নকারী হিসাবে কেবল মদীনায় আবির্ভূত হইয়াছিলেন। এক্ষণে এই বিষয়টি নিম্নের বিশ্লেষণের মাধ্যমে দেখা যাইতে পারে :
(ক) ফেরেশতারা মক্কায় রাসূলুল্লাহ এবং তাঁহার সমসাময়িকদের নিকট তাঁহার মিশনের শুরুতেই পরিচিত ছিলেন।
(খ) তাহারা আল্লাহ ও তাঁহার রাসূলুল্লাহ-এর মধ্যে দৌত্যকর্ম পালনকারী হিসাবে আখ্যায়িত হইতেন।
(গ) মক্কায় ইহা সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণনা করা হইয়াছিল যে, একজন "মহান দূত” ওহীকৃত মূল পাঠ (কুরআন) রাসূলুল্লাহ-এর নিকট লইয়া আসিতেন।
(ঘ) রাসূলুল্লাহ এই দাবি করার পর মক্কার অধিবাসীরা এক বিপরীত দাবি নিয়া দৃশ্যপটে আসে এবং বলে যে, একজন ফেরেশতাকে দূত হিসাবে অথবা মুহাম্মাদ -এর সঙ্গে একজন সহকারী দূত হিসাবে প্রেরণ করা উচিত।
(ঙ) ওহী আগমন সংক্রান্ত হাদীছ এবং সুনির্দিষ্টভাবে ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ) ওহী আনয়নকারী হিসাবে চিহ্নিত করার বিষয়টি পরবর্তী কালের উদ্ভাবন নহে, যেমন বেল্ মনে করেন।
(চ) এমনকি মক্কায়ও আরবের যে কোন স্থানে বসবাসকারী খৃস্টানরা বিশ্বাস করিত এবং জানিত যে, জিবরাঈল (আ) একজন ফেরেশতা যিনি আল্লাহ্ ওহী তাঁহার রাসূলদের নিকট লইয়া আসিতেন।
এইসব প্রামাণ্য ঘটনার আলোকে ইহা বলা সমীচীন নহে যে, রাসূলুল্লাহ মদীনায় আগমনের পরই জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট পরিচিত হন।
জিবরাঈল (আ) তাঁহার এই 'জিবরাঈল' নামের দ্বারা পবিত্র কুরআনে তিনবার চিহ্নিত হন এবং এই তিনটি স্থানই মাদানী সূরার অন্তর্ভুক্ত, যেমন ২: ৯৭; ২ঃ ৯৮ এবং ৬৬:৪। এই তিনটি স্থানের কেবল একটি স্থানে (২:৯৭) হযরত জিবরাঈল (আ)-কে ওহী অবতরণকরী হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই আয়াতের শব্দ প্রয়োগে ইহা সুস্পষ্ট যে, কতিপয় বিষয়ে জিবরাঈলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত আপত্তির উত্তরে এই আয়াত অবতীর্ণ হয় এবং জিবরাঈল সম্পর্কে
কতিপয় বক্তব্য এই আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এই সূরায় ওহী অবতরণ সংক্রান্ত সকল বর্ণনা এই বিবরণের সঙ্গে একমত যে, যখন মদীনায় ইয়াহুদীরা এই কথা জানিতে পারিল যে, রাসূলুল্লাহ এই যৌক্তিক দাবি করেন যে, ফেরেশতা হযরত জিবরাঈল (আ) তাঁহার নিকট ওহী লইয়া আসেন, তখন তাহারা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রতি তাহাদের বিদ্বেষ প্রকাশ করিল এবং বলিল যে, রাসূলুল্লাহ যদি এই কথা বলেন যে, ফেরেশতা হযরত মীকাঈল ওহী আনয়নকারী ছিলেন তাহা হইলে তাহারা তাঁহাকে (রাসূলুল্লাহ -কে) অনুসরণ করিবে। এই কারণে ইয়াহুদীদের আপত্তির উত্তর এই আয়াতে প্রদান করা হইয়াছে। ৫৬ এই আয়াত ও ইহার প্রেক্ষাপট, যাহা বর্ণনা দ্বারা জানা গেল তাহা এই তথ্য নির্দেশ করে না যে, জিবরাঈল (আ)-এর নাম এই স্থানেই প্রথমবারের মত ওহী আনয়নকারী হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
তদুপরি প্রকৃত ঘটনা এই যে, জিবরাঈল (আ) তাহার এই নামে আখ্যায়িত হওয়ার কথা কেবল মাদানী সূরায় উল্লিখিত হওয়া এই কথা বুঝায় না যে, মক্কী সূরায় তাঁহার (জিবরাঈল) সম্পর্কে কোন তথ্যনির্দেশ নাই। প্রকৃতপক্ষে 'রাসূল কারীম' (একজন মহান/সম্মানিত দূত) অভিধাটি যে ৮১: ১৯ আয়াতে এবং 'শাদীদুল কুওয়া' (ক্ষমতায় শক্তিশালী একজন) অভিধাটি ৫৩: ৩ আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে, সকল তাফসীরকার এই দুইটি অভিধার দ্বারা জিবরাঈল (আ)-কে বুঝান। ইহার দ্বারা মনে হয় যে, 'শাদীদুল কুওয়া' এবং জিবরাঈল পরিভাষা দুইটি সমার্থক। কাহারও মতে 'জিবরাঈল' একটি যৌগিক শব্দ, যাহা জার এবং ইল শব্দদ্বয়ের সমন্বয়ে গঠিত, ইহার অর্থ "আল্লাহর সাহসী বীর" অথবা "আল্লাহর দাস"। জার শব্দটি হিব্রু ভাষায় Geber যাহার অর্থ “একজন দাস/চাকর” এবং II-এর অর্থ "শক্তিশালী" "ক্ষমতাশালী" অর্থাৎ আল্লাহ। ৫৭ অনুরূপ রূহ্ আল-কুদ্স্স (পবিত্র আত্মা) ৫৮ অভিধাটি ১৬: ১০২ আয়াতে এবং আর-রূহুল আমীন (বিশ্বস্ত আত্মা) ২৬: ১৯৩ আয়াতে উল্লিখিত হইয়াছে। এই দুইটি শব্দের দ্বারাও মুফাসসিরগণ সর্বসম্মতভাবে জিবরাঈলকে বুঝাইয়াছেন। ইহাও বলা আবশ্যক যে, 'নামূস' পরিভাষাটি হাদীছে উল্লিখিত হইয়াছে, ইহার অর্থ বিশ্বস্ত অথবা গোপনীয় ফেরেশতা। ৫৯ এইভাবে কুরআন ও হাদীছ এই বিষয়ে কোন পার্থক্য করে না। উভয়টিতে জিবরাঈল (আ)-কে নবী-রাসূলগণকে পৃথিবীতে প্রেরণের মিশন শুরু হওয়ার পর হইতে ওহী আনয়নকারী হিসাবে আখ্যায়িত করা হইয়াছে।