📄 তিন: সূরা আন-নাজমের আয়াত ৫৩ঃ ৪-১০-এর মারগোলিয়থের অপব্যাখ্যা
মারগোলিয়থের আনুপূর্বিক বর্ণনা হইতেছে তাহার সবচাইতে বড় ভুল ব্যাখ্যা এবং তাহা হইতেছে মুইর-এর অনুমানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আর ইহা হইতেছে, কুরআনে বলা হইয়াছে দুইটি ধনুকের পাল্লা হইতেও কম দূরত্বে অবস্থান করিয়া আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জিবরাঈল ওহী প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন। মারগোলিয়থ যদিও সুনির্দিষ্টভাবে ইহা উদ্ধৃত করেন নাই, তবুও কুরআনের আয়াত ৫৩:৪-১০ (সূরাতুন নাজম)-এর প্রসঙ্গে ইহা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এই আয়াতটি বিবেচনা করিবার পূর্বে ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থের এই অনুমানও তাহার সাধারণ মতবাদের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সব সময় প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার পূর্ববর্তী নবীদের কেবল অনুকরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার সকল ভাবধারা ও তথ্য পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে আহরণ করিয়াছেন। আর তিনি যোসেফ স্মিথ (Joseph Smith)-এর ন্যায় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন যিনি "দেবদূতগণের পথ-নির্দেশনায়" মর্মনদের কিতাব (Book of Mormon) উদ্ধার করিয়াছেন। তারপর নূতন বাইবেলেই জিবরাঈলের কথা বলা হইয়াছে, যিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী লইয়া তাঁহার নবীদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করিয়া মারগোলিয়থ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন
যে, কুরআনের প্রমাণকে ভিত্তি করিয়া দাবি করা হয় যে, মহানবী প্রারম্ভে সরাসরি আল্লাহ্ নিকট হইতে ওহী লাভ করেন বলিয়া উক্তি করেন। কিন্তু ইহা ব্যাখ্যা করা হয় নাই কেন? মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবীর রীতি হইতে অস্বাভাবিকভাবে দূরে সরিয়া যাইবেন? পূর্ববর্তী নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী লাভ করেন এবং তিনি তাহাদিগকে শুধু অনুকরণ করেন বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। অন্য কাহারও কর্তৃক অদৃশ্য ও অলক্ষ্যভাবে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে বাণী লাভ এবং ওহী প্রদানকারী ফেরেশতার দীর্ঘকালব্যাপী দৃশ্যপট হইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিতি সবচাইতে সঠিক পদ্ধতি হইবে কিনা তাহা মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মহানবী তাঁহার শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর ধর্মোপদেশের অতি প্রাকৃত উৎস সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার ও ইহা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।
বরং কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটি লইয়া আলোচনা করা যাইতে পারে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মারগোলিয়থ তাহার অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। আলোচ্য আয়াতগুলি এইভাবে অগ্রসর হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى . وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى . عَلَّمَهُ شَدِيدُ القُوى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى . وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى . ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ، فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى .
"তোমাদিগের সংগী (Prophet বা রাসূল) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিবার তাহা প্রত্যাদেশ করিলেন" (৫৩: ২-১০)।
যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আয়াতগুলি নাযিল হয় তাহা বুঝিতে হইবে এবং কুরআনের অন্য আয়াতসমূহে (আয়াত নং ৮১: ১৯-২৮; সূরাতুত তাকবীর) ইহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে, যাহাতে একই বিষয় আলোচিত হইয়াছে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন রচনাবলীর পণ্ডিতবর্গ, তৎসহ প্রাচ্যবিদগণের মতানুসারে এই পরবর্তী আয়াতগুলি (৮১: ১৯-২৮) ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে ৫৩: ২-১০ আয়াতসমূহের পূর্বেকার। ৫৯ এই উভয় সূরার আয়াতসমূহ মহানবী যে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ওহী লাভ করেন কাফিররা তাহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। কাফিররা দাবি করে যে, মহানবী একটি দুষ্ট আত্মার প্রভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এই আয়াতসমূহ নাযিল হইয়াছিল। সূরাতুত তাকবীর-এর আয়াতসমূহের বর্ণনা নিম্নরূপ:
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ ، مُطَاعٍ ثُمَّ أَمِينِ . وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ . وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْنِ . وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّحِيمٍ ، فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ . إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। এবং তোমাদিগের সাথী (রাসূল) উন্মাদ নহে, সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে, সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে। এবং ইহা অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নহে। সুতরাং তোমরা কোথায় চলিয়াছ? ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ” (৮১: ১৯-২৭)।
এইভাবে উভয় সূরার মধ্যকার সাধারণ বিষয়টি উল্লিখিত হইতে পারে। প্রথমত, উভয় সূরাই মহানবী -এর দিগন্তে একটি সত্তার দৃশ্য দেখিবার বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে অধিকতর পূর্বের ৮১: ২৩ নং আয়াতে এই সত্তাকে সুস্পষ্টভাবে একজন সম্মানিত বার্তাবাহক হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তা'আলার বার্তাবাহক একজন ফেরেশতা। তিনি নিজে আল্লাহ নহেন।
দ্বিতীয়ত, এই সূরাতে (৫৩: ২-১০) ইহা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নাই যে, এই সত্তা একজন "বার্তাবাহক”, তবুও সেখানে যে বিবরণ দেওয়া হইয়াছে তাহা সূরা ৮১: ১৯-২৭-এ প্রদত্ত বিবরণের প্রায় অনুরূপ। পক্ষান্তরে সূরা আত-তাকবীরে যখন তাহাকে একজন শক্তিশালী (ذِي قُوَّةٍ) ও আল্লাহ্র আরশের নিকটে অবস্থানকারী একজন সত্তা হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে তখন সূরা ৫৩: ২-১০-এ তাহাকে খুবই শক্তিশালী (شَدِيدُ الْقُوى) এবং শারীরিক ও মানসিক তেজসম্পন্ন ব্যক্তি (ذو مرة) হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে।
তৃতীয়ত, উভয় সূরাই মক্কার কাফিরদের অভিযোগ খণ্ডন করিয়া মহানবী -কে "তোমাদের সাথী (صاحبكم) বলিয়া উল্লেখ করে"। কারণ তিনি প্রকৃতই তাহাদের একজন ছিলেন এবং তাহাদের নিকট এক অতি সুপরিচিত ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত হইতেন।
চতুর্থত, উভয় সূরাতে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, মহানবী -কে কোন অপশক্তি আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই (৮১: ২২) কিংবা তিনি সঠিক পথ বিচ্যুত হইয়া বিচার-বুদ্ধিহীনের কাজ করেন নাই (৫৩ঃ ২)।
পঞ্চমত, উভয় সূরাতেই বলা হইয়াছে যে, মহানবী তাঁহার জনগণের মধ্যে যাহা ঘোষণা করিতেছিলেন তাহা একজন সম্মানিত বার্তাবাহক কর্তৃক তাঁহাকে প্রদত্ত বাণী (قول) বিশেষ ছিল এবং "সে একটি শক্তিশালী সত্তা” (৫৩ঃ ৫) ইহা তাঁহাকে শিখাইয়া দিয়াছিলেন।
সর্বশেষে, এই উভয় সূরাতেই পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে যে, মহানবী -এর নিকট ইহা ছিল আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত ওহী (৫৩: ৪) এবং তাহা কোন অপশক্তির কথা ছিল না, বরং সারা পৃথিবীর সমস্ত লোকের জন্য তাহা ছিল আল্লাহ্র বাণীর বর্ণনা (৮১: ২৫, ২৭)।
এইভাবে উভয় সূরাতে একই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং মক্কার কাফিরদের একই অভিযোগের একই জবাব দেওয়া হইয়াছে। আর একইরূপ বাক্যাংশ ও বিশেষণ দ্বারা দিগন্তে দৃশ্যমান সত্তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির প্রতিটিই ব্যাখ্যামূলক ও একে অপরের সম্পূরক এবং যেহেতু প্রথম উল্লিখিত (৮১) সূরাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দৃষ্ট সত্তাকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে, তাই ইহা ধারণা করা যাইতে পারে না যে, পরবর্তী সূরাতে এই বার্তাবাহককে স্বয়ং আল্লাহ হিসাবে দাবি করা হইবে যিনি নিচে অবতরণ করিয়া আসিয়া মহানবীকে কুরআনের বাণী হস্তান্তর করিবেন। এই একই বিষয়টি সত্য হইবে এমন কি যদি এই দুইটি সূরার নাযিল হওয়ার ক্রমটি পাল্টাইয়া দেওয়া হয়। কারণ মহানবী যদি এতই আত্মবিরোধী হইয়া পড়েন যে, তিনি কোন একটি সূরাতে আল্লাহ্ বাণী বহনকারীকে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত করিবেন এবং তাহাকে অন্যত্র ফেরেশতা বলিবেন তাহা হইলে কাফিরদের দ্বারা তিনি নিদারুণভাবে অপদস্ত হইতেন এবং তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি সংশোধনাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত।
এমনকি যদি ৫৩:২ - ১০ আয়াতসমূহকে ৮১: ১৯ - ২৭ আয়াতসমূহের প্রতি কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যাইত না যে, এই প্রসঙ্গটি আল্লাহ সম্পর্কিত। কারণ এই আয়াতে ইহার বিপরীতে চূড়ান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। এইভাবে এই সত্তাকে প্রচুর শক্তির অধিকারী (شديد القوى) হিসাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এখন আল্লাহ তো অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহাক্ষমতাশালী, কিন্তু কুরআনে তাঁহাকে কোথায়ও 'শাদীদুল কুওয়া' বা 'খুবই শক্তিশালী' বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে আপেক্ষিক শক্তির নির্দেশক এবং সর্বোচ্চ শক্তির নহে। অতএব, ইহা কখনও আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা হইতে পারে না। অনুরূপভাবে 'যু-মিররাহ' শব্দটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ অথবা শারীরিক ক্ষমতা কিংবা উভয় প্রকাশ করে। এই শব্দটি কেবল সৃষ্টিজীবের বেলায় প্রযোজ্য হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে নহে। তাহা ছাড়া কুরআনের কোথাও ইহাকে আল্লাহ্র বর্ণনা অথবা তাঁহার গুণের উল্লেখরূপে বর্ণনা করা হয় নাই। তৃতীয়ত, এই একই সূরার আরও কিছু পরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী ঐ একই সত্তার প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করেন এবং তারপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, তিনি যাহা দিগন্তে অবলোকন করেন তাহা তাঁহার মহান প্রভুর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল (مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) ৬০ অতঃপর মহানবী এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে যাহা অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ছিল একটি নিদর্শন অর্থাৎ তাঁহার প্রভুর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি—জিবরাঈল ফেরেশতা এবং তিনি মানুষের প্রকৃত অবয়ব ও গঠনে হাজির ছিলেন। আর তিনি স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন না।
আয়াত নং ৫৩ : ১০ (فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى)-এর বর্ণনা দ্বারা মারগোলিয়থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে। এই আয়াতের অর্থ বুঝিবার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:
প্রথমত, আরবী হরফ 'ফা' দিয়া আয়াতটি শুরু হইয়াছে এবং ইহার দুইটি ভাবার্থ রহিয়াছে-ইসতিকবালিয়াহ অর্থাৎ অনুবর্তিতা যাহার অর্থ করা হয় 'তখন' শব্দটি দ্বারা; এবং তাফসীরিয়াহ অর্থাৎ ব্যাখ্যামূলক; ইহার অর্থ 'এইরূপে' অথবা 'অতএব' কিংবা 'সুতরাং'।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করিতে হয় তাহা হইতেছে আয়াতের 'আবদিহি' শব্দটি। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার অর্থাৎ আল্লাহ্র বান্দাকে বুঝায় এবং ইহা হয় মহানবী-কে অথবা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রসঙ্গে গ্রহণ করা যাইতে পারে।
তৃতীয়ত, ইহা স্মরণে রাখা আবশ্যক যে, আরবী ভাষায় একটি সর্বনাম হয় স্পষ্ট অথবা একটি ক্রিয়াপদের সহিত উহ্য থাকিতে পারে এবং তাহা সব সময় অব্যবহিত পূর্ববর্তী সর্বনাম-এর (বিশেষ্য পদের পরিবর্তে ব্যবহৃত) সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে না। কিন্তু ইংরেজিতে বরং কর্তৃকারকের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে অথবা বিষয়বস্তুটি রচনার কোন অংশের বর্ণনা হইতে বোধগম্য হয়।
মনের মধ্যে এই তিনটি বিষয় ধারণ করিয়া ৫৩: ১০ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করা যাইতে পারিবে। 'ফা' হরফটি যাহার সহিত শুরু হইয়াছে তাহা যদি অনুবর্তিতার ভাবধারায় গৃহীত হয় তাহা হইলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে: "তখন তিনি (ফেরেশতা) তাঁহার (আল্লাহ তা'আলার) বান্দার (অর্থাৎ মহানবী) সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবেন যাহা তিনি (আল্লাহ অথবা মহানবী) প্রকাশ করিয়াছিলেন"। পক্ষান্তরে, ফা হরফটিকে যদি ব্যাখ্যামূলক ভাবধারায় গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে অর্থ হইবে: "এইরূপে অথবা সুতরাং (ফেরেশতার সহায়তায়) যিনি (আল্লাহ) নিশ্চয়ই তাঁহার বান্দার সহিত যোগাযোগ করেন যাহা তিনি প্রকাশ করিতে চাহেন"।
উপরে যে সকল অভ্যন্তরীণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা অস্বীকার করা স্পষ্টতই ভুল হইবে। তাহা ছাড়া বিষয়বস্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গ ও একটি আয়াতের সহিত অন্য আয়াতের সম্পর্ক, ৮১ : ১৯ - ২৭, এবং 'আবদিহি' (عبده) শব্দের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ইহা ধরিয়া লওয়া যে, আয়াতটিতে দিগন্তে দৃশ্যমান আল্লাহ নিজেই কথা বলিতেছেন অতঃপর মহানবী-এর নিকট অবতরণ করিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করিতেছেন-প্রভৃতি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধারণা।
মারগোলিয়থ ধারণা পোষণ করেন যে, মহানবী-এর প্রথমদিকের দাবি-আল্লাহ নিজেই তাঁহাকে কুরআনের বাণী প্রদান করেন-ইহা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ইহার অগ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও মারগোলিয়থের ধারণা তাহার উত্তরসুরি কর্তৃক গৃহীত ও পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। ফলে তাহারা মারগোলিয়থের অন্যান্য ধারণার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন যে, পরবর্তী কোন এক সময়ে ওহীর বাহক হিসাবে জিবরাঈল স্থলবর্তী হন। মারগোলিয়থের প্রধান তত্ত্ব যে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ও চক্রান্তপরায়ণতার সহিত একজন নবীর ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি যে অন্যভাবে একজন প্রতারক তাহা নূতন কিছুই নহে। ইসলাম সম্পর্কে মধ্যযুগের ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গের এই যে
ধারণা তাহা বাস্তবিকপক্ষে পুনরাবৃত্তি। সাম্প্রতিক কালের ইউরোপীয় পাণ্ডিত্য অবশ্য মহানবী -এর বিরুদ্ধে এইরূপ গায়ে পড়িয়া অভিযোগ করিবার ব্যাপারে কিছু পরিমাণ লজ্জাবোধ করে। কিছু পরেই দৃশ্যমান হইবে এইরূপ সাম্প্রতিক কালের কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন মহানবী -এর প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত লক্ষণাদির ৬১ প্রবর্তনের উপর কথা বলেন তখন তাহা বস্তুতপক্ষে মধ্যযুগীয় মনোভাবের প্রতিধ্বনি হিসাবেই বিবেচিত হয়।
আরেকটি ক্ষেত্রে মারগোলিয়থকে একটি নূতন পথের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তাহা হইতেছে ইসলামী প্রত্যাদেশের দৃশ্য ব্যাখ্যাকল্পে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন অথবা অতীন্দ্রিয়বাদের উপর প্রণীত আধুনিক গ্রন্থাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা। এইভাবে তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার উপর Podmore-এর গ্রন্থকে ব্যবহার করিয়া এই ধারণা দেন যে, মহানবী সৎ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হইলেও তিনি তবুও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওয়াট অতীন্দ্রিয়বাদের উপর A. Poulin-এর গ্রন্থের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর পক্ষে ওহী হইতেছে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাচনভঙ্গি। ৬২
টিকাঃ
৫৯. মুসলিম পণ্ডিতবর্গের মতানুসারে আত-তাকবীর ও আন-নাজম সূরা দুইটি ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে যথাক্রমে ৭ম ও ২৩তম অবস্থানে রহিয়াছে। Rodwell, Jeffery, Muir ও Nöldeke ইহাদিগকে যথাক্রমে ৩২তম ও ৪৬তম, ২৪তম ও ২৭তম, ২৭তম ও ৪৩তম এবং ২৭তম ও ২৮তম অবস্থানের বলিয়া মনে করেন.
৬০. কুরআন, ৫৩: ১৩, ১৮.
৬১. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ২০, ২য় অংশ.
৬২. ঐ, ১ম ও ২য় অংশ.
মারগোলিয়থের আনুপূর্বিক বর্ণনা হইতেছে তাহার সবচাইতে বড় ভুল ব্যাখ্যা এবং তাহা হইতেছে মুইর-এর অনুমানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আর ইহা হইতেছে, কুরআনে বলা হইয়াছে দুইটি ধনুকের পাল্লা হইতেও কম দূরত্বে অবস্থান করিয়া আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জিবরাঈল ওহী প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন। মারগোলিয়থ যদিও সুনির্দিষ্টভাবে ইহা উদ্ধৃত করেন নাই, তবুও কুরআনের আয়াত ৫৩:৪-১০ (সূরাতুন নাজম)-এর প্রসঙ্গে ইহা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এই আয়াতটি বিবেচনা করিবার পূর্বে ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থের এই অনুমানও তাহার সাধারণ মতবাদের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সব সময় প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার পূর্ববর্তী নবীদের কেবল অনুকরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার সকল ভাবধারা ও তথ্য পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে আহরণ করিয়াছেন। আর তিনি যোসেফ স্মিথ (Joseph Smith)-এর ন্যায় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন যিনি "দেবদূতগণের পথ-নির্দেশনায়" মর্মনদের কিতাব (Book of Mormon) উদ্ধার করিয়াছেন। তারপর নূতন বাইবেলেই জিবরাঈলের কথা বলা হইয়াছে, যিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী লইয়া তাঁহার নবীদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করিয়া মারগোলিয়থ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন
যে, কুরআনের প্রমাণকে ভিত্তি করিয়া দাবি করা হয় যে, মহানবী প্রারম্ভে সরাসরি আল্লাহ্ নিকট হইতে ওহী লাভ করেন বলিয়া উক্তি করেন। কিন্তু ইহা ব্যাখ্যা করা হয় নাই কেন? মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবীর রীতি হইতে অস্বাভাবিকভাবে দূরে সরিয়া যাইবেন? পূর্ববর্তী নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী লাভ করেন এবং তিনি তাহাদিগকে শুধু অনুকরণ করেন বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। অন্য কাহারও কর্তৃক অদৃশ্য ও অলক্ষ্যভাবে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে বাণী লাভ এবং ওহী প্রদানকারী ফেরেশতার দীর্ঘকালব্যাপী দৃশ্যপট হইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিতি সবচাইতে সঠিক পদ্ধতি হইবে কিনা তাহা মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মহানবী তাঁহার শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর ধর্মোপদেশের অতি প্রাকৃত উৎস সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার ও ইহা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।
বরং কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটি লইয়া আলোচনা করা যাইতে পারে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মারগোলিয়থ তাহার অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। আলোচ্য আয়াতগুলি এইভাবে অগ্রসর হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوى . وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى . عَلَّمَهُ شَدِيدُ القُوى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى . وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى . ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ، فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى .
"তোমাদিগের সংগী (Prophet বা রাসূল) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিবার তাহা প্রত্যাদেশ করিলেন" (৫৩: ২-১০)।
যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আয়াতগুলি নাযিল হয় তাহা বুঝিতে হইবে এবং কুরআনের অন্য আয়াতসমূহে (আয়াত নং ৮১: ১৯-২৮; সূরাতুত তাকবীর) ইহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে, যাহাতে একই বিষয় আলোচিত হইয়াছে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন রচনাবলীর পণ্ডিতবর্গ, তৎসহ প্রাচ্যবিদগণের মতানুসারে এই পরবর্তী আয়াতগুলি (৮১: ১৯-২৮) ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে ৫৩: ২-১০ আয়াতসমূহের পূর্বেকার। ৫৯ এই উভয় সূরার আয়াতসমূহ মহানবী যে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ওহী লাভ করেন কাফিররা তাহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। কাফিররা দাবি করে যে, মহানবী একটি দুষ্ট আত্মার প্রভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এই আয়াতসমূহ নাযিল হইয়াছিল। সূরাতুত তাকবীর-এর আয়াতসমূহের বর্ণনা নিম্নরূপ:
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ ، مُطَاعٍ ثُمَّ أَمِينِ . وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ . وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْنِ . وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّحِيمٍ ، فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ . إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। এবং তোমাদিগের সাথী (রাসূল) উন্মাদ নহে, সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে, সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে। এবং ইহা অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নহে। সুতরাং তোমরা কোথায় চলিয়াছ? ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ” (৮১: ১৯-২৭)।
এইভাবে উভয় সূরাতে একই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং মক্কার কাফিরদের একই অভিযোগের একই জবাব দেওয়া হইয়াছে। আর একইরূপ বাক্যাংশ ও বিশেষণ দ্বারা দিগন্তে দৃশ্যমান সত্তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির প্রতিটিই ব্যাখ্যামূলক ও একে অপরের সম্পূরক এবং যেহেতু প্রথম উল্লিখিত (৮১) সূরাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দৃষ্ট সত্তাকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে, তাই ইহা ধারণা করা যাইতে পারে না যে, পরবর্তী সূরাতে এই বার্তাবাহককে স্বয়ং আল্লাহ হিসাবে দাবি করা হইবে যিনি নিচে অবতরণ করিয়া আসিয়া মহানবীকে কুরআনের বাণী হস্তান্তর করিবেন। এই একই বিষয়টি সত্য হইবে এমন কি যদি এই দুইটি সূরার নাযিল হওয়ার ক্রমটি পাল্টাইয়া দেওয়া হয়। কারণ মহানবী যদি এতই আত্মবিরোধী হইয়া পড়েন যে, তিনি কোন একটি সূরাতে আল্লাহ্ বাণী বহনকারীকে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত করিবেন এবং তাহাকে অন্যত্র ফেরেশতা বলিবেন তাহা হইলে কাফিরদের দ্বারা তিনি নিদারুণভাবে অপদস্ত হইতেন এবং তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি সংশোধনাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত।
এমনকি যদি ৫৩:২ - ১০ আয়াতসমূহকে ৮১: ১৯ - ২৭ আয়াতসমূহের প্রতি কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যাইত না যে, এই প্রসঙ্গটি আল্লাহ সম্পর্কিত। কারণ এই আয়াতে ইহার বিপরীতে চূড়ান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। এইভাবে এই সত্তাকে প্রচুর শক্তির অধিকারী (شديد القوى) হিসাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এখন আল্লাহ তো অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহাক্ষমতাশালী, কিন্তু কুরআনে তাঁহাকে কোথায়ও 'শাদীদুল কুওয়া' বা 'খুবই শক্তিশালী' বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে আপেক্ষিক শক্তির নির্দেশক এবং সর্বোচ্চ শক্তির নহে। অতএব, ইহা কখনও আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা হইতে পারে না। অনুরূপভাবে 'যু-মিররাহ' শব্দটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ অথবা শারীরিক ক্ষমতা কিংবা উভয় প্রকাশ করে। এই শব্দটি কেবল সৃষ্টিজীবের বেলায় প্রযোজ্য হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে নহে। তাহা ছাড়া কুরআনের কোথাও ইহাকে আল্লাহ্র বর্ণনা অথবা তাঁহার গুণের উল্লেখরূপে বর্ণনা করা হয় নাই। তৃতীয়ত, এই একই সূরার আরও কিছু পরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী ঐ একই সত্তার প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করেন এবং তারপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, তিনি যাহা দিগন্তে অবলোকন করেন তাহা তাঁহার মহান প্রভুর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল (مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) ৬০ অতঃপর মহানবী এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে যাহা অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ছিল একটি নিদর্শন অর্থাৎ তাঁহার প্রভুর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি—জিবরাঈল ফেরেশতা এবং তিনি মানুষের প্রকৃত অবয়ব ও গঠনে হাজির ছিলেন। আর তিনি স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন না।
আয়াত নং ৫৩ : ১০ (فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى)-এর বর্ণনা দ্বারা মারগোলিয়থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে। এই আয়াতের অর্থ বুঝিবার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:
প্রথমত, আরবী হরফ 'ফা' দিয়া আয়াতটি শুরু হইয়াছে এবং ইহার দুইটি ভাবার্থ রহিয়াছে-ইসতিকবালিয়াহ অর্থাৎ অনুবর্তিতা যাহার অর্থ করা হয় 'তখন' শব্দটি দ্বারা; এবং তাফসীরিয়াহ অর্থাৎ ব্যাখ্যামূলক; ইহার অর্থ 'এইরূপে' অথবা 'অতএব' কিংবা 'সুতরাং'।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করিতে হয় তাহা হইতেছে আয়াতের 'আবদিহি' শব্দটি। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার অর্থাৎ আল্লাহ্র বান্দাকে বুঝায় এবং ইহা হয় মহানবী-কে অথবা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রসঙ্গে গ্রহণ করা যাইতে পারে।
তৃতীয়ত, ইহা স্মরণে রাখা আবশ্যক যে, আরবী ভাষায় একটি সর্বনাম হয় স্পষ্ট অথবা একটি ক্রিয়াপদের সহিত উহ্য থাকিতে পারে এবং তাহা সব সময় অব্যবহিত পূর্ববর্তী সর্বনাম-এর (বিশেষ্য পদের পরিবর্তে ব্যবহৃত) সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে না। কিন্তু ইংরেজিতে বরং কর্তৃকারকের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে অথবা বিষয়বস্তুটি রচনার কোন অংশের বর্ণনা হইতে বোধগম্য হয়।
মনের মধ্যে এই তিনটি বিষয় ধারণ করিয়া ৫৩: ১০ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করা যাইতে পারিবে। 'ফা' হরফটি যাহার সহিত শুরু হইয়াছে তাহা যদি অনুবর্তিতার ভাবধারায় গৃহীত হয় তাহা হইলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে: "তখন তিনি (ফেরেশতা) তাঁহার (আল্লাহ তা'আলার) বান্দার (অর্থাৎ মহানবী) সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবেন যাহা তিনি (আল্লাহ অথবা মহানবী) প্রকাশ করিয়াছিলেন"। পক্ষান্তরে, ফা হরফটিকে যদি ব্যাখ্যামূলক ভাবধারায় গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে অর্থ হইবে: "এইরূপে অথবা সুতরাং (ফেরেশতার সহায়তায়) যিনি (আল্লাহ) নিশ্চয়ই তাঁহার বান্দার সহিত যোগাযোগ করেন যাহা তিনি প্রকাশ করিতে চাহেন"।
উপরে যে সকল অভ্যন্তরীণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা অস্বীকার করা স্পষ্টতই ভুল হইবে। তাহা ছাড়া বিষয়বস্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গ ও একটি আয়াতের সহিত অন্য আয়াতের সম্পর্ক, ৮১ : ১৯ - ২৭, এবং 'আবদিহি' (عبده) শব্দের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ইহা ধরিয়া লওয়া যে, আয়াতটিতে দিগন্তে দৃশ্যমান আল্লাহ নিজেই কথা বলিতেছেন অতঃপর মহানবী-এর নিকট অবতরণ করিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করিতেছেন-প্রভৃতি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধারণা।
মারগোলিয়থ ধারণা পোষণ করেন যে, মহানবী-এর প্রথমদিকের দাবি-আল্লাহ নিজেই তাঁহাকে কুরআনের বাণী প্রদান করেন-ইহা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ইহার অগ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও মারগোলিয়থের ধারণা তাহার উত্তরসুরি কর্তৃক গৃহীত ও পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। ফলে তাহারা মারগোলিয়থের অন্যান্য ধারণার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন যে, পরবর্তী কোন এক সময়ে ওহীর বাহক হিসাবে জিবরাঈল স্থলবর্তী হন। মারগোলিয়থের প্রধান তত্ত্ব যে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ও চক্রান্তপরায়ণতার সহিত একজন নবীর ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি যে অন্যভাবে একজন প্রতারক তাহা নূতন কিছুই নহে। ইসলাম সম্পর্কে মধ্যযুগের ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গের এই যে
ধারণা তাহা বাস্তবিকপক্ষে পুনরাবৃত্তি। সাম্প্রতিক কালের ইউরোপীয় পাণ্ডিত্য অবশ্য মহানবী -এর বিরুদ্ধে এইরূপ গায়ে পড়িয়া অভিযোগ করিবার ব্যাপারে কিছু পরিমাণ লজ্জাবোধ করে। কিছু পরেই দৃশ্যমান হইবে এইরূপ সাম্প্রতিক কালের কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন মহানবী -এর প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত লক্ষণাদির ৬১ প্রবর্তনের উপর কথা বলেন তখন তাহা বস্তুতপক্ষে মধ্যযুগীয় মনোভাবের প্রতিধ্বনি হিসাবেই বিবেচিত হয়।
আরেকটি ক্ষেত্রে মারগোলিয়থকে একটি নূতন পথের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তাহা হইতেছে ইসলামী প্রত্যাদেশের দৃশ্য ব্যাখ্যাকল্পে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন অথবা অতীন্দ্রিয়বাদের উপর প্রণীত আধুনিক গ্রন্থাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা। এইভাবে তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার উপর Podmore-এর গ্রন্থকে ব্যবহার করিয়া এই ধারণা দেন যে, মহানবী সৎ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হইলেও তিনি তবুও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওয়াট অতীন্দ্রিয়বাদের উপর A. Poulin-এর গ্রন্থের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর পক্ষে ওহী হইতেছে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাচনভঙ্গি। ৬২