📄 দুই: মারগোলিয়থের ধারণাসমূহ
মুইর-এর ন্যায় মারগোলিয়থ ওহী সম্পর্কিত বিষয়ের উপর যে আলোচনা করিয়াছেন তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ-এর উচ্চাকাংখা ও পরিকল্পনার একটি সম্প্রসারিত মূল ভাবধারা মাত্র। কিন্তু মারগোলিয়থ সম্ভবত মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ লক্ষ্য করিয়া তাহা পরিহার করেন যদিও এই বিষয়টির উপর আলোচনাকালে তিনি নূতন করিয়া অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতার মধ্যে নিজকে
নিপতিত করিয়াছেন। তিনি সরাসরি ধারণা করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ অতিমাত্রায় উচ্চাকাংখী হইয়া যে ভূমিকা পালন করিতে চাহেন তাহার জন্য নিজকে সতর্কতার সহিত প্রস্তুত করেন এবং যখন তাঁহার পরিকল্পনাসমূহ সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় তখন তিনি খুবই দক্ষতার সহিত তাহা বাস্তবায়ন করেন। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, ওহী সংক্রান্ত সমগ্র বিষয়টি ছিল প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত "ছলনা" ও "প্রতারণা” মাত্র। এইরূপ দাবি করা হয় যে, মুহাম্মাদ তাঁহার পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য জগত হইতে বাণী সংগ্রহ করিয়া তাহা প্রচারের একটি "মাধ্যম" ২৬ হিসাবে স্বীয় ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁহার সাফল্য নিশ্চিত করিবার জন্য তিনি ঐ সকল সংগৃহীত বাণীর "আকার" ও "বিন্যাস" এবং প্রক্রিয়াকে এমন কৌশলে উপস্থাপন করেন যে, তাহা যেন কোন "অতিপ্রাকৃতিক উৎস" হইতে আবির্ভূত হইয়াছে। ২৭ এইরূপে একটি ঐশী প্রত্যাদেশ উপস্থাপন করিতে গিয়া, মারগোলিয়থের ভাষায, তিনি সহজাত প্রেরণায় এক “প্রচণ্ড উত্তেজনার” মধ্যে পতিত হইতেন। তখন তাঁহার মুখমণ্ডল নীল বর্ণ ধারণ করিত২৮ এবং তিনি কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃত করিয়া ফেলিতেন। ইহার ফলে তাঁহার শরীরে প্রচুর ঘাম সৃষ্টি হইত এবং তাঁহার এই অবস্থায় বাণী প্রস্তুত থাকিত। ২৯ কম্বল দ্বারা নিজকে এইভাবে আবৃত করার অভ্যাস তিনি "প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত" বজায় রাখিয়াছেন বলিয়া বলা হইয়া থাকে। ৩০ আরও দাবি করা হয় যে, মহানবী "কোন এক সময়ে" মৃগী রোগের খিচুনি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, কোন প্রকার "সামান্যতম প্রস্তুতি" ব্যতিরেকে "নাক ডাকা ও মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ” করিয়া তিনি "কৃত্রিমভাবে" এই খিচুনি তৈয়ারী করিতেন। ৩১
মারগোলিয়থ বলেন যে, এইরূপ অবস্থাকে প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির "স্বাভাবিক অবস্থা হিসাবে স্বীকার করিয়া" লওয়া হইয়াছে। ৩২ মহানবী এই বিষয়ে এতই সুদক্ষ ছিলেন বলিয়া কথিত হয় যে, মারগোলিয়থের মতে "তিনি যখন আহার করিতেন সেই সময়ে তাঁহাকে সম্বোধনকৃত কোন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার কালে তিনি ঐশী আদেশ লাভ করিতেন। জবাব দেওয়া সমাপ্ত হইলে তিনি আহার পর্ব সমাধা করিবার জন্য অগ্রসর হইতেন। কিন্তু তিনি বাধাগ্রস্ত হইলে এই খাবার তাঁহার হাতে ধরা থাকিত অথবা তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়ান অবস্থায় তাঁহাকে কোন প্রশ্নের জবাব দানকালে ওহী অবতীর্ণ হইত"। ৩৩
ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থ তাহার প্রিয় পক্ষপাতপূর্ণ তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি করেন যে, মহানবী -এর প্রচুর পরিমাণে কথা বলিবার না থাকিলে তিনি "ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের উপর নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের" সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৩৪ কথিত হয় যে, তিনি ইহাকে মু'জিযা হিসাবে দাবি করেন-তিনি যে কিতাব কখনও পাঠ করেন নাই তাহার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি অবহিত আছেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি বলিয়াছেন যে, "তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতার মধ্যে এই মু'জিযার রহস্য নিহিত রহিয়াছে"। ৩৫ যাহা হউক, মারগোলিয়থ বলেন যে, একেবারে গোড়ার দিকে অবতীর্ণ ওহীর খণ্ডাংশসমূহ কুস্স ইবন সাইদা-এর ন্যায় ধর্মীয় বিষয়ে পুনরভ্যুদয়ের সমর্থকদের ধর্মীয় বাণী উচ্চারণের অনুকরণ ভিন্ন আর কিছুই নহে। ৩৬ আরও দাবি করা হয় যে,
মহানবী স্বাভাবিক আরবী বাগ্মিতার ধরনকে অনুকরণ করেন যাহা কিছু পরিমাণে কবিতার অনুরূপ কিন্তু ইহার প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁহার কমই জানা ছিল। ৩৯
ছলনা ও প্রতারণার মূল সুরটিকে বিশদ করিবার জন্য মারগোলিয়থ মহানবী-এর চরিত্র ও সততার স্বীকৃত বিশুদ্ধতাকে হেয় করিবার অপচেষ্টা গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি আধ্যাত্মিকতার উপর লিখিত F. Podmore-এর গ্রন্থের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, একজন সম্মানিত ব্যক্তি একই সময়ে তাহার অনুসারীদিগকে ধাঁধাঁ লাগাইয়া দিতে এবং তারপর তাহার "কৌশল” দেখাইতে পারে। মারগোলিয়থ বলেন, "Podmore-এর অবধারণা অনুযায়ী মুহাম্মাদ একই প্রকার সুবিধা লাভ করিয়াছেন এবং তাহার ফলে অনুগামীদের হৃদয় জয় করিয়াছেন"। ৩৮ তৎসত্ত্বেও মারগোলিয়থ বলিতে থাকেন যে, মহানবী-এর একজন ওহী লেখক "এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, সে ইহাকে প্রতারণা বলে এবং ফলে ইসলাম ধর্ম প্রত্যাখ্যান করে"। ৩৯ যাহাই ঘটুক না কেন মারগোলিয়থ উপসংহারে বলেন যে, "অতিপ্রাকৃত প্রত্যাদেশের রাজনৈতিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে কোন মাধ্যমের আন্তরিকতা"র খুব কমই গুরুত্ব রহিয়াছে। ৪০
ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভ প্রসঙ্গে মারগোলিয়থ বলেন যে, অনুকূল মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকা মহানবী-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই অধিকাংশ "মাধ্যমের" ন্যায় তিনি "পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যস্থিত ক্রান্তিকালের সদ্ব্যবহার করেন"। ৪১ মর্মন (Mormon) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা যোসেফ স্মিথ-এর সহিত একটি উপমা উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়, তিনি প্রথমে বনে-জঙ্গলে পরিভ্রমণরত ছিলেন। তারপর লোকালয়ে উপস্থিত হইয়া ভাবাবিষ্ট অবস্থায় তিনি বিভিন্ন বাণী উচ্চারণ করেন এবং ঘোষণা দান করেন যে, দেবদূত কর্তৃক এই ঐশীবাণী তাহার নিকট প্রেরিত হইয়াছে। মারগোলিয়থ ইহা উল্লেখ করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির জীবন নির্জনতার মাধ্যমেই শুরু হইয়াছিল। মারগোলিয়থ বলেন যে, বৎসরের একটি নির্দিষ্ট মাস ধরিয়া মক্কাবাসিগণ 'তাহান্নুছ' নামে অভিহিত একটি ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত। ইহা ছিল এক ধরনের কঠোর তপশ্চর্যা। এই মাসে "মুহাম্মাদ হেরা পর্বতের একটি গুহায় অবস্থানের একটি নিয়ম পালন করিতেন"। উক্ত মাসের কোন এক সময়ে তিনি যখন হেরা পর্বতে একাকী অবস্থান করিতেছিলেন তখন "দেবদূতের (অথবা ইহার তুল্য কোন কিছুর) আবির্ভাব ঘটে” যাহাকে তিনি ঐশীদূত বলিয়া আখ্যায়িত করেন। মারগোলিয়থ আরও বলেন যে, এই বিষয়ে হাদীছের বর্ণনানুযায়ী জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ ঘটে। এই ফেরেশতাই বার্তা প্রদান করিতেন বলিয়া নিউ টেস্টামেন্টে (New Testament) উল্লেখ আছে। কিন্তু "কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নিজেই পৃথিবীতে নামিয়া আসেন” বলিয়া প্রতীয়মান হয় এবং তিনি মহানবী হইতে দুইটি ধনুকের পাল্লারও কম দূরত্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারপর তিনি মহানবীকে সম্বোধন করেন। মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী -এর ধর্মতত্ত্বের উন্নয়নের কারণে পরবর্তী কালে জিবরাঈল স্থলাভিষিক্ত হন। ৪২
ওহী এবং মহানবী-এর একজন ধর্মীয় শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ সম্পর্কে মারগোলিয়থের ইহাই প্রধান অভিমত। মহানবী-এর উচ্চাকাংখা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত মূল ভাবধারা হিসাবে মুইর যাহা উল্লেখ করেন মারগোলিয়থ তাহাই স্পষ্টভাবে গ্রহণ করিয়াছেন এবং মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ পরিহার করিয়া তাহার পরবর্তীতে ব্যাপ্তি দান করেন। তিনি মৃগীরোগ ও "ভাবাবেশ” সংক্রান্ত দাবিকেও গ্রহণ করেন এবং ইহাকে তিনি মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণা তত্ত্বের সহিত সংযুক্ত করিবার প্রয়াস পান। ইহা করিতে গিয়া তিনি বলেন যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে এই সকল লক্ষণ তৈয়ার করিতেন। সর্বোপরি মুইর যেভাবে স্বীয় মতামত পেশ করিয়াছেন মারগোলিয়থও তেমনি জোর দিয়া বলিয়াছেন যে, কুরআনের মূল পাঠ অথবা সাধারণভাবে ঐশী প্রত্যাদেশসমূহ মহানবী-এর নিজস্ব রচনা। সকল প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনায় মারগোলিয়থের পূর্বসূরী যে পথ তৈয়ার করিয়া গিয়াছেন তাহা হইতে তিনি সরিয়া আসেন নাই। তবে তিনি অবশ্যই তাহার কিছু নূতন ধারণা ইহার সহিত সংযুক্ত করিয়াছেন যাহা বর্তমানে বিবেচনা করা হইবে।
যাহা পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, একদিকে উচ্চাকাংখা ও নবীর প্রস্তুতির এবং অন্যদিকে মৃগীরোগের অভিযোগ। এই দুইটি অভিযোগের কথা বাদ দিলেও মারগোলিয়থের প্রধান অভিযোগ হইতেছে মহানবী-এর প্রতারণা। তাহার মতে মহানবী প্রত্যাদেশের গঠন, বিন্যাস ও ধরনকে এমনভাবে পরিকল্পনা করিয়াছেন যে, ইহা যেন কোন অতিপ্রাকৃত উৎস হইতে উদ্ভূত হইয়াছে বলিয়া মনে হইবে। এমনকি ইহাও বলা হইয়াছে যে, মহানবী-এর জীবনের গোড়ার দিকে কথিত মৃগীরোগের যে খিচুনি হইত সেই দৃশ্য হইতে মহানবী তাঁহার সংকেতসূত্র গ্রহণ করিয়াছেন এবং তারপর তিনি ঐ সকল দৃশ্য-যেমন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় পতিত হওয়া, নাক ডাকা ও মুখমণ্ডলের রক্তিমবর্ণ ধারণ, প্রচুর পরিমাণ ঘাম নিঃসরণ অথবা কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃতকরণ প্রভৃতির পুনর্গঠন করিয়াছেন। আরও বলা হইয়াছে যে, "অনুপ্রেরণার স্বাভাবিক ধরন হিসাবে ইহাকে স্বীকৃতি দানের" জন্য আনয়ন করা হইয়াছে। কিন্তু মারগোলিয়থ যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেইগুলির মধ্যে পারস্পরিক সঙ্গতি নাই, বরং মহানবী-এর নিকট ওহী নাযিল হওয়ার বিভিন্ন ধরনের উল্লেখ রহিয়াছে। এই সকল প্রক্রিয়ার (ধরনের) অধিকাংশ স্পষ্টতই প্রতারণার তত্ত্বের সহিত খাপ খায় না। তাই:
(ক) ওহী নাযিল হওয়ার আরম্ভ সম্পর্কে এবং তত্ত্বটি প্রমাণ করার জন্য ইহা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারিত বলিয়া মারগোলিয়থ স্বীকার করেন যে, মহানবী হেরা উপত্যকায় সম্পূর্ণ একাকী থাকিবার অবস্থায় ওহী লাভ করেন। সেখানে ওহী নাযিল হওয়ার ধরন ও প্রণালী সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার আর কেহই উপস্থিত ছিল না। অবশ্য মারগোলিয়থ যেমন দাবি করেন নাই তেমনি উৎস গ্রন্থসমূহেও কোন ইঙ্গিত নাই যে, ওহী নাযিল হওয়ার সময় ভাবাবিষ্ট ইত্যাদি হওয়ার ন্যায় কোন লক্ষণ দেখা যায় নাই।
(খ) মহানবী যখন আহার করেন অথবা মসজিদের মিম্বরে দাঁড়াইয়া যখন ভাষণ দেন সেই অবস্থায় তাঁহার উপর ওহী নাযিল হওয়ার উদাহরণের উল্লেখ করেন। এই সকল ক্ষেত্রে উদ্ধৃত বর্ণনাসমূহে প্রকৃতপক্ষে উল্লেখ পাওয়া যায় না যে, মহানবী নাক ডাকা, মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ, ভাবাবেশে মগ্ন হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলেন।৪৩ অধিকন্তু এই সকল উদাহরণের সহিত কুরআনের ওহী নাযিলের কোন সম্পর্ক নাই। মহানবী সময়ে সময়ে অন্যান্য ধরনের যে সকল ওহী লাভ করিতেন তাহার সহিত কুরআনের ওহীকে সর্বদা স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করিতে হইবে।
. (গ) মারগোলিয়থ আরও দাবি করেন যে, মহানবী তাঁহার মিত্রদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালন অথবা তাঁহার অনুসারীদের কিছু সংখ্যককে তাঁহার পক্ষে জিবরাঈলের সহিত আলোচনাকারীর ভূমিকা পালনের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।৪৪ এইরূপ দাবি সম্পূর্ণরূপে অসমর্থনীয়। কিন্তু জিবরাঈল সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি রহিয়াছে তাহাতে সুস্পষ্টভাবে এই পরোক্ষ উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হইয়াছে যে, জিবরাঈল কখনও কখনও মানুষের অবয়বে আবির্ভূত হইয়া মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেন। তিনি যেমন একজন বহিরাগত ব্যক্তি অথবা মহানবী-এর সাহাবী দিয়া আল-কালবীর বেশে উপস্থিত হন। যাহাই হউক না কেন, জিবরাঈলের এই অবয়ব ধারণ কুরআনের মূল পাঠের অতিপ্রাকৃত উৎস সম্পর্কে দর্শনকারীদের কোনমতেই সন্তুষ্ট করিতে পারে না। ইহা ছিল কথিত প্রতারণা তত্ত্বকে প্রকাশের একটি কৌশল মাত্র। কারণ জibraঈল যে ব্যক্তির কথিত রূপ ধারণ করিবেন তাহাকে মহানবী-এর সহিত অধিকাংশ সময় অবস্থানকারী সাহাবীগণ (অনুসারীবৃন্দ) ছাড়িয়া দিবেন না, ইহাই স্বাভাবিক ছিল। এই সকল ক্ষেত্রেই মহানবী-এর কৃত্রিমভাবে মুর্ছা যাওয়াকে ভাবাবিষ্ট হইবার "স্বাভাবিক আচরণ বলিয়া দাবি করা হয়"। এইভাবে মারগোলিয়থ নিজে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন তাহা কোন মতেই মহানবী -এর পক্ষে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণের দাবিকে সত্য বলিয়া প্রমাণ করে না।
দ্বিতীয়ত, মহানবী-এর নির্জনে ইবাদত ও হেরা পর্বতের গুহায় একাকী অবস্থান (তাহান্নুছ) সম্পর্কে মারগোলিয়থ যে ধারণা পোষণ করেন তাহাতে অসঙ্গতি রহিয়াছে। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, অধিকাংশ “মাধ্যমের" ন্যায় মহানবী ইহাকে পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যবর্তী একটি ক্রান্তিকাল হিসাবে পরিকল্পনা করেন। যাহা হউক, একই তত্ত্বে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মক্কাবাসীরা প্রতি বৎসর রমযান মাসে এই ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত এবং এই মাসে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে অবস্থান করা মুহাম্মাদের অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। এখন মক্কাবাসীদের রমযান মাসে তাহান্নুছ পালন সম্পর্কিত বর্ণনা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে।৪৫ কিন্তু এই প্রশ্নকে একপাশে সরাইয়া রাখিয়া মারগোলিয়থের ন্যায় এইরূপ ধারণা পোষণ করা স্পষ্টতই পুরাতন জীবন পরিত্যাগ করিয়া নূতন ধরনের জীবনে সন্নিবিষ্ট হইবার জন্য তাহান্নুছ -এর সময়কে একটি পরিকল্পিত ক্রান্তিকাল হিসাবে অভিহিত করা অসঙ্গত হইবে। একই সঙ্গে
ইহাও বলা সঙ্গত হইবে না যে, হেরার গুহায় তাহানুছ পালনকালে মহানবী প্রতি বৎসর মক্কাবাসীদের পালনকৃত ধর্মানুষ্ঠানকে অনুসরণ করিয়া চলিতেন। প্রকৃত ঘটনা এই যে, মারগোলিয়থ এখানে আর একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারণা দ্বারা নিজকে আবদ্ধ করিয়া ফেলিয়াছেন। যেমন, মহানবী নবুওয়াত লাভের পূর্বেই পৌত্তলিক মক্কাবাসীদের ধর্মকে অনুসরণ করিতেন এবং এমনকি তিনি তাহাদের দেব-দেবীদের উপাসনা পর্যন্ত করিতেন। ৪৬ মারগোলিয়থ এই ভ্রান্ত ধারণায় এতই মুগ্ধ হইয়া পড়েন যে, তিনি অসতর্কভাবে ইহা এখানে উপস্থাপন করেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করিয়া দেখেন নাই যে, তাহার ধারণামতে মহানবী কর্তৃক পরিকল্পিত ক্রান্তিকালের মতবাদের সহিত ইহা সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গতিপূর্ণ। মারগোলিয়থ তাহার উপরোল্লিখিত ধারণামতে এখানে যে কষ্ট কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন তাহা তাহার সংযোজনকৃত তথ্য হইতে স্পষ্ট হইয়া উঠে। তিনি বলেন, "মহানবী তাঁহার পরিবারবর্গকে তাঁহার সহিত লইয়া যাইতেন বলিা অনুমিত হয়; তবুও সম্ভবত তাহাদের আল-লাত অথবা আল-'উযযা-এর দৈনন্দিন পূজা-অর্চনার কাজটি এইরূপ অবস্থায় সম্পাদিত হইত না"। ৪৭ ইহাতে অবশ্যই পুনর্বার জোর দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী এবং তাঁহার পত্নী কখনও তথাকথিত আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করেন নাই এবং পূর্বে যেভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে৪৮ তাহা এই প্রসঙ্গে মারগোলিয়থের বর্ণনা সংশ্লিষ্ট হাদীছের অর্থ না বুঝিয়া একটি চরম ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যাহা হউক, এখানে তিনি কার্যত তাহার একটি ভ্রান্ত ধারণাকে আর একটির বিপক্ষে দাঁড় করাইয়াছেন।
ওহীর ভাষা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুরূপ অসঙ্গতি মারগোলিয়থের ধারণাকে পরিব্যাপ্ত করিয়া ফেলিয়াছে। এইভাবে তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতাকে একটি মু'জিযা ৪৯ হিসাবে দাবি করেন। ইহার পর মারগোলিয়থ আরও কিছু দূর অগ্রসর হইয়া বর্ণনা করেন যে, সাধারণ আরববাসী কবিতার ছন্দে যে বাকপটুতা প্রদর্শন করিত তিনি (মহানবী )কেবল তাহারই অনুকরণ করিতেন, "যদিও তিনি ইহার অর্থ বুঝিতেন না"। ৫০ পুনশ্চ ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থের পর্যবক্ষেণ এই যে, মহানবীকে ইহার জন্য ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের আসমানী কিতাবের উপর নির্ভর করিতে হইত এবং এই বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ না করা পর্যন্ত তিনি উক্ত কিতাবসমূহের সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৫১ মারগোলিয়থ তাহার ধারণাকে বিশদীকৃত করিয়া আরও বলেন, "মুহাম্মাদ যখন রাষ্ট্রের কর্ণধার তখন তাঁহার অনেক কিছুই বলিবার ছিল, কিন্তু তাঁহার জীবনের প্রারম্ভে বিদ্যমান অবস্থা তাঁহাকে অনুরূপ কোন ভূমিকা গ্রহণ করিতে দেয় নাই"। অতএব "তিনি পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে তথ্য ধার করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন"। ৫২
* ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য ধার করিবার অভিযোগটি পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৩ এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থ কার্যত আর একটি চরম অসঙ্গতি দ্বারা এখানে তাঁহার স্বীয় অভিমতকে বাতিল করিয়াছেন। এইরূপে
উপরিউল্লিখিত মন্তব্য করিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁহার সম্পূর্ণ মত পরিবর্তন করেন এবং বলেন যে, মহানবী ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য আহরণের এই "নিরাপদ পদ্ধতি” অবলম্বন করেন যখন তিনি ক্রমবৃদ্ধিগত পরিমাণে প্রত্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করিতে অবস্থাগত কারণে বাধ্য হন। কিন্তু একেবারে গোড়ার দিকের প্রত্যাদেশের টুকরা টুকরা অংশসমূহ কুস্স ইবন সা'ইদা ৫৪-এর ন্যায় পুনরুজ্জীবনবাদী ধর্মপ্রচারকের উক্তিসমূহের অনুকরণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। এইরূপে এক নিঃশ্বাসে মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে প্রয়াস পাইয়াছেন যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে যখন মহানবী-এর তেমন বেশি কিছু বলিবার ছিল না তখন তিনি ইয়াহুদী -খৃস্টানদের কিতাব হইতে প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত বিষয়ে সাহায্য গ্রহণ করিতে পারেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং তিনি যথেষ্ট পরিমাণে কথা বলিতে পারেন। তারপর পুনঃ আমাদের বিশ্বাস করিতে হয় যে, মহানবী হয়ত এই "নিরাপদ পদ্ধতি" অবলম্বন করেন যখন অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং ইহা তাঁহার জন্য আবশ্যক হয় যে, তিনি বেশি পরিমাণে প্রত্যাদেশ প্রকাশ করিতে পারেন! মারগোলিয়থের পক্ষে একটি সতর্কতা অবলম্বনের কারণে এই অসঙ্গতির সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে যে, তথাকথিত একেবারে প্রথম প্রত্যাদেশের "খণ্ডাংশসমূহ” প্রকৃতপক্ষে পুরাতন ও নূতন বাইবেলের বিষয়বস্তুর সহিত তেমন কোন সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না এবং কুরআনের যে অংশসমূহের সহিত ইহাদের যে কোনভাবে একটি মিল রহিয়াছে তাহা মহানবী -এর নিকট প্রাথমিক পর্যায়ের ওহী ছিল না। কুস্স সম্পর্কিত ক্ষুদ্র কাহিনী প্রসঙ্গে এবং উকায মেলায় তাহার সহিত মহানবী-এর কথিত বাক্যালাপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে যাহা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৫৫ কিন্তু এমনকি এই বর্ণনাটিকে যদি সত্য বলিয়া গ্রহণ করা হয় তাহা হইলেও তাহার এই কথিত কথাবার্তার সহিত প্রথমদিকে নাযিলকৃত সূরাসমূহের সাদৃশ্য খুবই ক্ষীণ। পক্ষান্তরে প্রাথমিক পর্যায়ের সূরাসমূহের বিষয়বস্তুর একটি ক্ষুদ্র অংশেরও তাহাদের আলোচনার সহিত সাদৃশ্য দেখা যায় না।
প্রচুর পরিমাণে তথ্য বিকৃতি দ্বারা এই সকল অসঙ্গতির উপর প্রলেপ দেওয়া হইয়াছে এইভাবে মহানবী-এর উপর লিখিত উৎস গ্রন্থসমূহের যে সকল উদাহরণ দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী ওহী লাভ করিবার সময় শারীরিক কষ্টের অভিজ্ঞতা লাভ করেন-এই তথ্যটি তাঁহার মধ্যে মৃগীরোগের লক্ষণ রহিয়াছে বলিয়া বিকৃত করা হইয়াছে। এই রোগ সম্পর্কে যাহাদের ধারণা আছে তাহারা অবগত আছেন যে, ইহা রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর কিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। তাহারা তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিবেন যে, মহানবী-এর বিষয়টি ঐ রোগ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই একই বিষয়ের উপর দ্বিতীয় বিকৃতি সাধন হইতেছে পূর্ব অনুমান অর্থাৎ মহানবী কৃত্রিমভাবে মৃগীরোগের লক্ষণ সৃষ্টি করিতেন যদিও উৎস গ্রন্থসমূহে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, তিনি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন অথবা বহু সংখ্যক অনুসারী ও সাহাবী যাঁহারা বহু বৎসর ধরিয়া খুবই ঘনিষ্ঠভাবে তাঁহাকে ঘিরিয়া রাখিতেন তাঁহারা কখনও এইরূপ কোন ঘটনার কথা চিন্তাও করিতে পারেন না। একই বিষয়ের উপর তৃতীয় বিকৃতিসাধন
হইতেছে দৃঢ় দাবির যাহাতে বলা হইয়াছে যে, কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট কথিত উপসর্গসমূহ তাঁহার ভাবাবেশের স্বাভাবিক ধরন; যদিও বিভিন্ন সূত্র হইতে আহূত তথ্যানুযায়ী ইহা নিতান্তই স্পষ্ট যে, শারীরিক যন্ত্রণার ঘটনা তৎসহ ওহী প্রাপ্তি ছিল এক বিরল ও অনন্যসাধারণ বিষয় যাহা কদাচিৎ ঘটিত।
অনুরূপভাবে জিবরাঈলের ঘটনাটি যিনি কখনও কখনও মানুষের অবয়বে মহানবী -এর নিকট উপস্থিত হইতেন, বিকৃত করা হইয়াছে এই বলিয়া যে, মহানবী তাঁহার সঙ্গীদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। ইতোপূর্বে যেভাবে আলোচিত হইয়াছে যে, এইরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ কেবল প্রতারণাটিকেই প্রকাশ করিয়া দেয় এবং ওহী নাযিলের সময় উপস্থিত জনতার উপর যে ঐশী প্রভাব পড়ে তাহা প্রতারণা দ্বারা সম্ভবপর হয় না। মারগোলিয়থের পক্ষে এই নির্দিষ্টকর বিকৃতির প্রয়াস বেশ অস্বাভাবিক। কারণ তিনি একই সাথে উল্লেখ করেন যে, জিবরাঈল একজন ঐশীদূত, "তিনি নূতন নিয়মে (বাইবেল) বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত” । ৫৬ কেহ হয়ত প্রশ্ন করিবার জন্য প্ররোচনা বোধ করিতে পারেন : নূতন বাইবেলের ক্ষেত্রে নবীদের জন্য জিবরাঈল কর্তৃক বার্তা বহনের বিষয়টি যদি অস্বাভাবিক না হয় তাহা হইলে অন্য নবীর ক্ষেত্রে তাহা অস্বাভাবিক হইবে কেন? পরবর্তীজনের ক্ষেত্রে প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণ করিবার জন্য নূতন বাইবেলের নবীদের উদ্দেশ্যে ঐশীদূত কর্তৃক বার্তা বহনের প্রকৃত পদ্ধতির উল্লেখ করা আবশ্যক। মারগোলিয়থ অথবা তাহার বুদ্ধিজীবী শিষ্যদের মধ্যে যাহারা তাহার মতামত গ্রহণ করেন তাহারা কেহই ইহা সম্পাদন করেন নাই।
মূল গ্রন্থ বা পাঠের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া সাধারণ তথ্যের বিকৃতি ঘটানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ দুইটি অপব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য একটি রেখা টানিয়া দেওয়া প্রায়শ কঠিন হইয়া পড়ে। কমপক্ষে একজন ওহী লেখকের এইরূপ একটি ঘটনা আছে যে শপথপূর্বক ইসলাম ধর্মকে পরিত্যাগ করিয়াছে বলিয়া দাবি করা হয়। কারণ তাহার এইরূপ প্রতীতি জন্মায় যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিষয় হইতেছে একটি জালিয়াতি। ৫৭ বস্তুত মারগোলিয়থ কর্তৃক উদ্ধৃত হাদীছটিতে বলা হইয়াছে যে, মহানবীর জন্য যে ব্যক্তি ওহী লিখিবে এবং পরে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া মক্কার বিরোধী দলের সাথে যোগদান করিবে তাহার জন্য রহিয়াছে জঘন্য পরিণাম। তাহার ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগের কারণ বর্ণনা করিতে গিয়া মার্গোলিয়থ বলেন যে, মহানবী নিজে ওহী লেখককে ওহী লিখিবার নির্দেশ প্রদান করিতেন কিন্তু ওহী লেখক তাহা ভিন্নভাবে লিখিত। তাহাকে ভুল সংশোধনের জন্য বলা হইলে সে যাহা লিখিয়াছে তাহা পরিবর্তন করিতে অস্বীকৃতি জানাইত। সুতরাং মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী উক্ত ওহী লেখককে তাহার ইচ্ছানুযায়ী ওহী লিখিবার অনুমতি প্রদান করিতেন। এইরূপ একাধিকবার ঘটিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা হয়। ৫৮
এখন ইহা স্পষ্ট যে, এই বর্ণনা এইরূপ এক ব্যক্তির যে শত্রুতে পরিণত হয়। ইহাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ইহা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে। বর্ণনার মূল বিষয়বস্তু পরীক্ষা করিলে
ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি এক ছদ্মবেশী শত্রু যে ইসলামের নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়া মুসলমানদের দলে অনুপ্রবেশ করিয়াছিল। ইসলাম ও ওহীর মূল পাঠকে ধ্বংস করাই তাহার উদ্দেশ্য ছিল। যাহাই হউক না কেন, সাধারণ জ্ঞান ও যুক্তিতে উক্ত ব্যক্তির ঘোষণাকে কখনও সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। কারণ কোন যুক্তিবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কখনও তাহার কর্মচারী বা অনুসারিগণকে তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী লিখিবার অনুমতি দিতে এবং তাহাদের লিখিত বিষয়কে ওহী হিসাবে ঘোষণা করিতে পারেন না। আর একজন ধূর্ত ও সুনির্দিষ্ট ভণ্ড ব্যক্তির বেলায় তো ইহার প্রশ্নই উঠে না। এই বিবরণী সুস্পষ্টভাবে ইহাকে একটি মিথ্যা অভিযোগ হিসাবে উল্লেখ করে এবং ইহার ক্ষতিকর ফলাফলের বর্ণনা দেয় যাহা ইহার কুৎসা রটনাকারীর উপরই বর্তায়। মারগোলিয়থ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার উপর মিথ্যা আরোপ করিয়া ইহাকে সাক্ষ্য হিসাবে ভূয়া অভিযোগ দাঁড় করাইয়াছেন এবং তারপর ইহার বিকৃতি সাধনে রত হইয়াছেন। অধিকন্তু বিবরণীটিতে কোথাও উল্লেখ নাই যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে রোগের উপসর্গ তৈয়ার করিয়াছেন যাহা মারগোলিয়থ কথিত প্রতারণার চিহ্ন হিসাবে উদ্ধৃতি দিয়াছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মহানবী-এর হাজার হাজার বুদ্ধিমান ও সুবুদ্ধিপূর্ণ অনুসারীদের উদাহরণ হইতে তিনি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারেন নাই। এই সকল অনুসারী তাহাদের সারা জীবন মহানবী-এর প্রতি ছিলেন চির অনুগত ও উৎসর্গীকৃত। আর মারগোলিয়থের দৃষ্টিতে ইহারা হইয়া গেলেন মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণার শিকার!
টিকাঃ
২৬. 'মাধ্যম' হিসাবে মহানবী -এর এইরূপ চরিত্রায়ণ Tor Andrae এবং Maxim Rodinson-এর মত ব্যক্তিগণও গ্রহণ করেন। M. Rodinson মাধ্যমকে "মেগাফোন”-এ বিস্তৃত করেন.
২৭. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৮৪.
২৮. ঐ, ৮৫ (উদ্ধৃতি আত-তাবারী, তাফসীর, ২৮ খ., ৪).
২৯. ঐ.
৩০. ঐ, ৮৬.
৩১. ঐ (উদ্ধৃতি মুসনাদ, ৪খ., ২২২).
৩২. ঐ.
৩৩. ঐ (উদ্ধৃতি মুসনাদ, ৬খ., ৫৬ ও ৩খ., ২১).
৩৪. ঐ, পৃ. ৮০, ৮৬.
৩৫. ঐ, ৮৭.
৩৬. ঐ.
৩৭. ঐ. ৮৮.
৩৮. ঐ, পৃ. ৮৮-৮৯.
৩৯. ঐ, ৮৯.
৪০. ঐ.
৪১. ঐ, পৃ. ৯০.
৪২. ঐ, পৃ. ৯০-৯১.
৪৩. দ্র. মুসনাদ, ৩খ., ২১ এবং ৬ খ., ৫৬ (যথাক্রমে আয়েশা (রা) ও আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) -এর হাদীছ দ্র.).
৪৪. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৮৮ (উদ্ধৃতি ইব্ন সাদ, ২খ., পৃ. ৫২০).
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬, ৩৭৯-৩৮০.
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৫-২০৩.
৪৭. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৯১। মারগোলিয়থ এখানে মুসনাদ-এর উদ্ধৃতি দিয়াছেন, ৪খ., পৃ. ২২২.
৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৫-২০৩.
৪৯. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৮৭.
৫০. ঐ, ৮৮.
৫১. ঐ, ৮০.
৫২. ঐ, ৮৬.
৫৩. প্রাগুক্ত, পরিচ্ছেদ ১১.
৫৪. মারগোলিয়থ, পূ. গ্র., ৮৭.
৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪০-২৪১.
৫৬. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৯১.
৫৭. ঐ.
৫৮. মুসনাদ, ৩খ., ১২০-১২১.
মুইর-এর ন্যায় মারগোলিয়থ ওহী সম্পর্কিত বিষয়ের উপর যে আলোচনা করিয়াছেন তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ-এর উচ্চাকাংখা ও পরিকল্পনার একটি সম্প্রসারিত মূল ভাবধারা মাত্র। কিন্তু মারগোলিয়থ সম্ভবত মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ লক্ষ্য করিয়া তাহা পরিহার করেন যদিও এই বিষয়টির উপর আলোচনাকালে তিনি নূতন করিয়া অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতার মধ্যে নিজকে
নিপতিত করিয়াছেন। তিনি সরাসরি ধারণা করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ অতিমাত্রায় উচ্চাকাংখী হইয়া যে ভূমিকা পালন করিতে চাহেন তাহার জন্য নিজকে সতর্কতার সহিত প্রস্তুত করেন এবং যখন তাঁহার পরিকল্পনাসমূহ সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় তখন তিনি খুবই দক্ষতার সহিত তাহা বাস্তবায়ন করেন। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, ওহী সংক্রান্ত সমগ্র বিষয়টি ছিল প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত "ছলনা" ও "প্রতারণা” মাত্র। এইরূপ দাবি করা হয় যে, মুহাম্মাদ তাঁহার পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য জগত হইতে বাণী সংগ্রহ করিয়া তাহা প্রচারের একটি "মাধ্যম" ২৬ হিসাবে স্বীয় ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁহার সাফল্য নিশ্চিত করিবার জন্য তিনি ঐ সকল সংগৃহীত বাণীর "আকার" ও "বিন্যাস" এবং প্রক্রিয়াকে এমন কৌশলে উপস্থাপন করেন যে, তাহা যেন কোন "অতিপ্রাকৃতিক উৎস" হইতে আবির্ভূত হইয়াছে। ২৭ এইরূপে একটি ঐশী প্রত্যাদেশ উপস্থাপন করিতে গিয়া, মারগোলিয়থের ভাষায, তিনি সহজাত প্রেরণায় এক “প্রচণ্ড উত্তেজনার” মধ্যে পতিত হইতেন। তখন তাঁহার মুখমণ্ডল নীল বর্ণ ধারণ করিত২৮ এবং তিনি কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃত করিয়া ফেলিতেন। ইহার ফলে তাঁহার শরীরে প্রচুর ঘাম সৃষ্টি হইত এবং তাঁহার এই অবস্থায় বাণী প্রস্তুত থাকিত। ২৯ কম্বল দ্বারা নিজকে এইভাবে আবৃত করার অভ্যাস তিনি "প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত" বজায় রাখিয়াছেন বলিয়া বলা হইয়া থাকে। ৩০ আরও দাবি করা হয় যে, মহানবী "কোন এক সময়ে" মৃগী রোগের খিচুনি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, কোন প্রকার "সামান্যতম প্রস্তুতি" ব্যতিরেকে "নাক ডাকা ও মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ” করিয়া তিনি "কৃত্রিমভাবে" এই খিচুনি তৈয়ারী করিতেন। ৩১
মারগোলিয়থ বলেন যে, এইরূপ অবস্থাকে প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির "স্বাভাবিক অবস্থা হিসাবে স্বীকার করিয়া" লওয়া হইয়াছে। ৩২ মহানবী এই বিষয়ে এতই সুদক্ষ ছিলেন বলিয়া কথিত হয় যে, মারগোলিয়থের মতে "তিনি যখন আহার করিতেন সেই সময়ে তাঁহাকে সম্বোধনকৃত কোন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার কালে তিনি ঐশী আদেশ লাভ করিতেন। জবাব দেওয়া সমাপ্ত হইলে তিনি আহার পর্ব সমাধা করিবার জন্য অগ্রসর হইতেন। কিন্তু তিনি বাধাগ্রস্ত হইলে এই খাবার তাঁহার হাতে ধরা থাকিত অথবা তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়ান অবস্থায় তাঁহাকে কোন প্রশ্নের জবাব দানকালে ওহী অবতীর্ণ হইত"। ৩৩
ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থ তাহার প্রিয় পক্ষপাতপূর্ণ তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি করেন যে, মহানবী-এর প্রচুর পরিমাণে কথা বলিবার না থাকিলে তিনি "ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের উপর নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের" সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৩৪ কথিত হয় যে, তিনি ইহাকে মু'জিযা হিসাবে দাবি করেন-তিনি যে কিতাব কখনও পাঠ করেন নাই তাহার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি অবহিত আছেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি বলিয়াছেন যে, "তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতার মধ্যে এই মু'জিযার রহস্য নিহিত রহিয়াছে"। ৩৫ যাহা হউক, মারগোলিয়থ বলেন যে, একেবারে গোড়ার দিকে অবতীর্ণ ওহীর খণ্ডাংশসমূহ কুস্স ইবন সাইদা-এর ন্যায় ধর্মীয় বিষয়ে পুনরভ্যুদয়ের সমর্থকদের ধর্মীয় বাণী উচ্চারণের অনুকরণ ভিন্ন আর কিছুই নহে। ৩৬ আরও দাবি করা হয় যে,
মহানবী স্বাভাবিক আরবী বাগ্মিতার ধরনকে অনুকরণ করেন যাহা কিছু পরিমাণে কবিতার অনুরূপ কিন্তু ইহার প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁহার কমই জানা ছিল। ৩৯
ছলনা ও প্রতারণার মূল সুরটিকে বিশদ করিবার জন্য মারগোলিয়থ মহানবী-এর চরিত্র ও সততার স্বীকৃত বিশুদ্ধতাকে হেয় করিবার অপচেষ্টা গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি আধ্যাত্মিকতার উপর লিখিত F. Podmore-এর গ্রন্থের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, একজন সম্মানিত ব্যক্তি একই সময়ে তাহার অনুসারীদিগকে ধাঁধাঁ লাগাইয়া দিতে এবং তারপর তাহার "কৌশল” দেখাইতে পারে। মারগোলিয়থ বলেন, "Podmore-এর অবধারণা অনুযায়ী মুহাম্মাদ একই প্রকার সুবিধা লাভ করিয়াছেন এবং তাহার ফলে অনুগামীদের হৃদয় জয় করিয়াছেন"। ৩৮ তৎসত্ত্বেও মারগোলিয়থ বলিতে থাকেন যে, মহানবী-এর একজন ওহী লেখক "এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, সে ইহাকে প্রতারণা বলে এবং ফলে ইসলাম ধর্ম প্রত্যাখ্যান করে"। ৩৯ যাহাই ঘটুক না কেন মারগোলিয়থ উপসংহারে বলেন যে, "অতিপ্রাকৃত প্রত্যাদেশের রাজনৈতিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে কোন মাধ্যমের আন্তরিকতা"র খুব কমই গুরুত্ব রহিয়াছে। ৪০
ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভ প্রসঙ্গে মারগোলিয়থ বলেন যে, অনুকূল মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকা মহানবী-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই অধিকাংশ "মাধ্যমের" ন্যায় তিনি "পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যস্থিত ক্রান্তিকালের সদ্ব্যবহার করেন"। ৪১ মর্মন (Mormon) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা যোসেফ স্মিথ-এর সহিত একটি উপমা উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়, তিনি প্রথমে বনে-জঙ্গলে পরিভ্রমণরত ছিলেন। তারপর লোকালয়ে উপস্থিত হইয়া ভাবাবিষ্ট অবস্থায় তিনি বিভিন্ন বাণী উচ্চারণ করেন এবং ঘোষণা দান করেন যে, দেবদূত কর্তৃক এই ঐশীবাণী তাহার নিকট প্রেরিত হইয়াছে। মারগোলিয়থ ইহা উল্লেখ করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির জীবন নির্জনতার মাধ্যমেই শুরু হইয়াছিল। মারগোলিয়থ বলেন যে, বৎসরের একটি নির্দিষ্ট মাস ধরিয়া মক্কাবাসিগণ 'তাহান্নুছ' নামে অভিহিত একটি ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত। ইহা ছিল এক ধরনের কঠোর তপশ্চর্যা। এই মাসে "মুহাম্মাদ হেরা পর্বতের একটি গুহায় অবস্থানের একটি নিয়ম পালন করিতেন"। উক্ত মাসের কোন এক সময়ে তিনি যখন হেরা পর্বতে একাকী অবস্থান করিতেছিলেন তখন "দেবদূতের (অথবা ইহার তুল্য কোন কিছুর) আবির্ভাব ঘটে” যাহাকে তিনি ঐশীদূত বলিয়া আখ্যায়িত করেন। মারগোলিয়থ আরও বলেন যে, এই বিষয়ে হাদীছের বর্ণনানুযায়ী জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ ঘটে। এই ফেরেশতাই বার্তা প্রদান করিতেন বলিয়া নিউ টেস্টামেন্টে (New Testament) উল্লেখ আছে। কিন্তু "কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নিজেই পৃথিবীতে নামিয়া আসেন” বলিয়া প্রতীয়মান হয় এবং তিনি মহানবী হইতে দুইটি ধনুকের পাল্লারও কম দূরত্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারপর তিনি মহানবীকে সম্বোধন করেন। মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী -এর ধর্মতত্ত্বের উন্নয়নের কারণে পরবর্তী কালে জিবরাঈল স্থলাভিষিক্ত হন। ৪২
ওহী এবং মহানবী-এর একজন ধর্মীয় শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ সম্পর্কে মারগোলিয়থের ইহাই প্রধান অভিমত। মহানবী-এর উচ্চাকাংখা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত মূল ভাবধারা হিসাবে মুইর যাহা উল্লেখ করেন মারগোলিয়থ তাহাই স্পষ্টভাবে গ্রহণ করিয়াছেন এবং মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ পরিহার করিয়া তাহার পরবর্তীতে ব্যাপ্তি দান করেন। তিনি মৃগীরোগ ও "ভাবাবেশ” সংক্রান্ত দাবিকেও গ্রহণ করেন এবং ইহাকে তিনি মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণা তত্ত্বের সহিত সংযুক্ত করিবার প্রয়াস পান। ইহা করিতে গিয়া তিনি বলেন যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে এই সকল লক্ষণ তৈয়ার করিতেন। সর্বোপরি মুইর যেভাবে স্বীয় মতামত পেশ করিয়াছেন মারগোলিয়থও তেমনি জোর দিয়া বলিয়াছেন যে, কুরআনের মূল পাঠ অথবা সাধারণভাবে ঐশী প্রত্যাদেশসমূহ মহানবী-এর নিজস্ব রচনা। সকল প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনায় মারগোলিয়থের পূর্বসূরী যে পথ তৈয়ার করিয়া গিয়াছেন তাহা হইতে তিনি সরিয়া আসেন নাই। তবে তিনি অবশ্যই তাহার কিছু নূতন ধারণা ইহার সহিত সংযুক্ত করিয়াছেন যাহা বর্তমানে বিবেচনা করা হইবে।
যাহা পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, একদিকে উচ্চাকাংখা ও নবীর প্রস্তুতির এবং অন্যদিকে মৃগীরোগের অভিযোগ। এই দুইটি অভিযোগের কথা বাদ দিলেও মারগোলিয়থের প্রধান অভিযোগ হইতেছে মহানবী-এর প্রতারণা। তাহার মতে মহানবী প্রত্যাদেশের গঠন, বিন্যাস ও ধরনকে এমনভাবে পরিকল্পনা করিয়াছেন যে, ইহা যেন কোন অতিপ্রাকৃত উৎস হইতে উদ্ভূত হইয়াছে বলিয়া মনে হইবে। এমনকি ইহাও বলা হইয়াছে যে, মহানবী-এর জীবনের গোড়ার দিকে কথিত মৃগীরোগের যে খিচুনি হইত সেই দৃশ্য হইতে মহানবী তাঁহার সংকেতসূত্র গ্রহণ করিয়াছেন এবং তারপর তিনি ঐ সকল দৃশ্য-যেমন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় পতিত হওয়া, নাক ডাকা ও মুখমণ্ডলের রক্তিমবর্ণ ধারণ, প্রচুর পরিমাণ ঘাম নিঃসরণ অথবা কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃতকরণ প্রভৃতির পুনর্গঠন করিয়াছেন। আরও বলা হইয়াছে যে, "অনুপ্রেরণার স্বাভাবিক ধরন হিসাবে ইহাকে স্বীকৃতি দানের" জন্য আনয়ন করা হইয়াছে। কিন্তু মারগোলিয়থ যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেইগুলির মধ্যে পারস্পরিক সঙ্গতি নাই, বরং মহানবী-এর নিকট ওহী নাযিল হওয়ার বিভিন্ন ধরনের উল্লেখ রহিয়াছে। এই সকল প্রক্রিয়ার (ধরনের) অধিকাংশ স্পষ্টতই প্রতারণার তত্ত্বের সহিত খাপ খায় না। তাই:
(ক) ওহী নাযিল হওয়ার আরম্ভ সম্পর্কে এবং তত্ত্বটি প্রমাণ করার জন্য ইহা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারিত বলিয়া মারগোলিয়থ স্বীকার করেন যে, মহানবী হেরা উপত্যকায় সম্পূর্ণ একাকী থাকিবার অবস্থায় ওহী লাভ করেন। সেখানে ওহী নাযিল হওয়ার ধরন ও প্রণালী সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার আর কেহই উপস্থিত ছিল না। অবশ্য মারগোলিয়থ যেমন দাবি করেন নাই তেমনি উৎস গ্রন্থসমূহেও কোন ইঙ্গিত নাই যে, ওহী নাযিল হওয়ার সময় ভাবাবিষ্ট ইত্যাদি হওয়ার ন্যায় কোন লক্ষণ দেখা যায় নাই।
(খ) মহানবী যখন আহার করেন অথবা মসজিদের মিম্বরে দাঁড়াইয়া যখন ভাষণ দেন সেই অবস্থায় তাঁহার উপর ওহী নাযিল হওয়ার উদাহরণের উল্লেখ করেন। এই সকল ক্ষেত্রে উদ্ধৃত বর্ণনাসমূহে প্রকৃতপক্ষে উল্লেখ পাওয়া যায় না যে, মহানবী নাক ডাকা, মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ, ভাবাবেশে মগ্ন হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলেন।৪৩ অধিকন্তু এই সকল উদাহরণের সহিত কুরআনের ওহী নাযিলের কোন সম্পর্ক নাই। মহানবী সময়ে সময়ে অন্যান্য ধরনের যে সকল ওহী লাভ করিতেন তাহার সহিত কুরআনের ওহীকে সর্বদা স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করিতে হইবে।
. (গ) মারগোলিয়থ আরও দাবি করেন যে, মহানবী তাঁহার মিত্রদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালন অথবা তাঁহার অনুসারীদের কিছু সংখ্যককে তাঁহার পক্ষে জিবরাঈলের সহিত আলোচনাকারীর ভূমিকা পালনের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।৪৪ এইরূপ দাবি সম্পূর্ণরূপে অসমর্থনীয়। কিন্তু জিবরাঈল সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি রহিয়াছে তাহাতে সুস্পষ্টভাবে এই পরোক্ষ উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হইয়াছে যে, জিবরাঈল কখনও কখনও মানুষের অবয়বে আবির্ভূত হইয়া মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেন। তিনি যেমন একজন বহিরাগত ব্যক্তি অথবা মহানবী-এর সাহাবী দিয়া আল-কালবীর বেশে উপস্থিত হন। যাহাই হউক না কেন, জিবরাঈলের এই অবয়ব ধারণ কুরআনের মূল পাঠের অতিপ্রাকৃত উৎস সম্পর্কে দর্শনকারীদের কোনমতেই সন্তুষ্ট করিতে পারে না। ইহা ছিল কথিত প্রতারণা তত্ত্বকে প্রকাশের একটি কৌশল মাত্র। কারণ জিবরাঈল যে ব্যক্তির কথিত রূপ ধারণ করিবেন তাহাকে মহানবী-এর সহিত অধিকাংশ সময় অবস্থানকারী সাহাবীগণ (অনুসারীবৃন্দ) ছাড়িয়া দিবেন না, ইহাই স্বাভাবিক ছিল। এই সকল ক্ষেত্রেই মহানবী-এর কৃত্রিমভাবে মুর্ছা যাওয়াকে ভাবাবিষ্ট হইবার "স্বাভাবিক আচরণ বলিয়া দাবি করা হয়"। এইভাবে মারগোলিয়থ নিজে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন তাহা কোন মতেই মহানবী -এর পক্ষে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণের দাবিকে সত্য বলিয়া প্রমাণ করে না।
দ্বিতীয়ত, মহানবী-এর নির্জনে ইবাদত ও হেরা পর্বতের গুহায় একাকী অবস্থান (তাহান্নুছ) সম্পর্কে মারগোলিয়থ যে ধারণা পোষণ করেন তাহাতে অসঙ্গতি রহিয়াছে। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, অধিকাংশ “মাধ্যমের" ন্যায় মহানবী ইহাকে পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যবর্তী একটি ক্রান্তিকাল হিসাবে পরিকল্পনা করেন। যাহা হউক, একই তত্ত্বে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মক্কাবাসীরা প্রতি বৎসর রমযান মাসে এই ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত এবং এই মাসে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে অবস্থান করা মুহাম্মাদের অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। এখন মক্কাবাসীদের রমযান মাসে তাহান্নুছ পালন সম্পর্কিত বর্ণনা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে।৪৫ কিন্তু এই প্রশ্নকে একপাশে সরাইয়া রাখিয়া মারগোলিয়থের ন্যায় এইরূপ ধারণা পোষণ করা স্পষ্টতই পুরাতন জীবন পরিত্যাগ করিয়া নূতন ধরনের জীবনে সন্নিবিষ্ট হইবার জন্য তাহান্নুছ -এর সময়কে একটি পরিকল্পিত ক্রান্তিকাল হিসাবে অভিহিত করা অসঙ্গত হইবে। একই সঙ্গে
ইহাও বলা সঙ্গত হইবে না যে, হেরার গুহায় তাহানুছ পালনকালে মহানবী প্রতি বৎসর মক্কাবাসীদের পালনকৃত ধর্মানুষ্ঠানকে অনুসরণ করিয়া চলিতেন। প্রকৃত ঘটনা এই যে, মারগোলিয়থ এখানে আর একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারণা দ্বারা নিজকে আবদ্ধ করিয়া ফেলিয়াছেন। যেমন, মহানবী নবুওয়াত লাভের পূর্বেই পৌত্তলিক মক্কাবাসীদের ধর্মকে অনুসরণ করিতেন এবং এমনকি তিনি তাহাদের দেব-দেবীদের উপাসনা পর্যন্ত করিতেন। ৪৬ মারগোলিয়থ এই ভ্রান্ত ধারণায় এতই মুগ্ধ হইয়া পড়েন যে, তিনি অসতর্কভাবে ইহা এখানে উপস্থাপন করেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করিয়া দেখেন নাই যে, তাহার ধারণামতে মহানবী কর্তৃক পরিকল্পিত ক্রান্তিকালের মতবাদের সহিত ইহা সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গতিপূর্ণ। মারগোলিয়থ তাহার উপরোল্লিখিত ধারণামতে এখানে যে কষ্ট কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন তাহা তাহার সংযোজনকৃত তথ্য হইতে স্পষ্ট হইয়া উঠে। তিনি বলেন, "মহানবী তাঁহার পরিবারবর্গকে তাঁহার সহিত লইয়া যাইতেন বলিা অনুমিত হয়; তবুও সম্ভবত তাহাদের আল-লাত অথবা আল-'উযযা-এর দৈনন্দিন পূজা-অর্চনার কাজটি এইরূপ অবস্থায় সম্পাদিত হইত না"। ৪৭ ইহাতে অবশ্যই পুনর্বার জোর দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী এবং তাঁহার পত্নী কখনও তথাকথিত আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করেন নাই এবং পূর্বে যেভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে৪৮ তাহা এই প্রসঙ্গে মারগোলিয়থের বর্ণনা সংশ্লিষ্ট হাদীছের অর্থ না বুঝিয়া একটি চরম ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যাহা হউক, এখানে তিনি কার্যত তাহার একটি ভ্রান্ত ধারণাকে আর একটির বিপক্ষে দাঁড় করাইয়াছেন।
ওহীর ভাষা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুরূপ অসঙ্গতি মারগোলিয়থের ধারণাকে পরিব্যাপ্ত করিয়া ফেলিয়াছে। এইভাবে তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতাকে একটি মু'জিযা ৪৯ হিসাবে দাবি করেন। ইহার পর মারগোলিয়থ আরও কিছু দূর অগ্রসর হইয়া বর্ণনা করেন যে, সাধারণ আরববাসী কবিতার ছন্দে যে বাকপটুতা প্রদর্শন করিত তিনি (মহানবী )কেবল তাহারই অনুকরণ করিতেন, "যদিও তিনি ইহার অর্থ বুঝিতেন না” ৫০ পুনশ্চ ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থের পর্যবক্ষেণ এই যে, মহানবীকে ইহার জন্য ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের আসমানী কিতাবের উপর নির্ভর করিতে হইত এবং এই বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ না করা পর্যন্ত তিনি উক্ত কিতাবসমূহের সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৫১ মারগোলিয়থ তাহার ধারণাকে বিশদীকৃত করিয়া আরও বলেন, "মুহাম্মাদ যখন রাষ্ট্রের কর্ণধার তখন তাঁহার অনেক কিছুই বলিবার ছিল, কিন্তু তাঁহার জীবনের প্রারম্ভে বিদ্যমান অবস্থা তাঁহাকে অনুরূপ কোন ভূমিকা গ্রহণ করিতে দেয় নাই"। অতএব "তিনি পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে তথ্য ধার করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন"। ৫২
* ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য ধার করিবার অভিযোগটি পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৩ এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থ কার্যত আর একটি চরম অসঙ্গতি দ্বারা এখানে তাঁহার স্বীয় অভিমতকে বাতিল করিয়াছেন। এইরূপে
উপরিউল্লিখিত মন্তব্য করিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁহার সম্পূর্ণ মত পরিবর্তন করেন এবং বলেন যে, মহানবী ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য আহরণের এই "নিরাপদ পদ্ধতি” অবলম্বন করেন যখন তিনি ক্রমবৃদ্ধিগত পরিমাণে প্রত্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করিতে অবস্থাগত কারণে বাধ্য হন। কিন্তু একেবারে গোড়ার দিকের প্রত্যাদেশের টুকরা টুকরা অংশসমূহ কুস্স ইবন সা'ইদা ৫৪-এর ন্যায় পুনরুজ্জীবনবাদী ধর্মপ্রচারকের উক্তিসমূহের অনুকরণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। এইরূপে এক নিঃশ্বাসে মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে প্রয়াস পাইয়াছেন যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে যখন মহানবী-এর তেমন বেশি কিছু বলিবার ছিল না তখন তিনি ইয়াহুদী -খৃস্টানদের কিতাব হইতে প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত বিষয়ে সাহায্য গ্রহণ করিতে পারেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং তিনি যথেষ্ট পরিমাণে কথা বলিতে পারেন। তারপর পুনঃ আমাদের বিশ্বাস করিতে হয় যে, মহানবী হয়ত এই "নিরাপদ পদ্ধতি" অবলম্বন করেন যখন অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং ইহা তাঁহার জন্য আবশ্যক হয় যে, তিনি বেশি পরিমাণে প্রত্যাদেশ প্রকাশ করিতে পারেন! মারগোলিয়থের পক্ষে একটি সতর্কতা অবলম্বনের কারণে এই অসঙ্গতির সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে যে, তথাকথিত একেবারে প্রথম প্রত্যাদেশের "খণ্ডাংশসমূহ” প্রকৃতপক্ষে পুরাতন ও নূতন বাইবেলের বিষয়বস্তুর সহিত তেমন কোন সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না এবং কুরআনের যে অংশসমূহের সহিত ইহাদের যে কোনভাবে একটি মিল রহিয়াছে তাহা মহানবী -এর নিকট প্রাথমিক পর্যায়ের ওহী ছিল না। কুস্স সম্পর্কিত ক্ষুদ্র কাহিনী প্রসঙ্গে এবং উকায মেলায় তাহার সহিত মহানবী-এর কথিত বাক্যালাপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে যাহা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৫৫ কিন্তু এমনকি এই বর্ণনাটিকে যদি সত্য বলিয়া গ্রহণ করা হয় তাহা হইলেও তাহার এই কথিত কথাবার্তার সহিত প্রথমদিকে নাযিলকৃত সূরাসমূহের সাদৃশ্য খুবই ক্ষীণ। পক্ষান্তরে প্রাথমিক পর্যায়ের সূরাসমূহের বিষয়বস্তুর একটি ক্ষুদ্র অংশেরও তাহাদের আলোচনার সহিত সাদৃশ্য দেখা যায় না।
প্রচুর পরিমাণে তথ্য বিকৃতি দ্বারা এই সকল অসঙ্গতির উপর প্রলেপ দেওয়া হইয়াছে এইভাবে মহানবী-এর উপর লিখিত উৎস গ্রন্থসমূহের যে সকল উদাহরণ দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী ওহী লাভ করিবার সময় শারীরিক কষ্টের অভিজ্ঞতা লাভ করেন-এই তথ্যটি তাঁহার মধ্যে মৃগীরোগের লক্ষণ রহিয়াছে বলিয়া বিকৃত করা হইয়াছে। এই রোগ সম্পর্কে যাহাদের ধারণা আছে তাহারা অবগত আছেন যে, ইহা রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর কিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। তাহারা তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিবেন যে, মহানবী-এর বিষয়টি ঐ রোগ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই একই বিষয়ের উপর দ্বিতীয় বিকৃতি সাধন হইতেছে পূর্ব অনুমান অর্থাৎ মহানবী কৃত্রিমভাবে মৃগীরোগের লক্ষণ সৃষ্টি করিতেন যদিও উৎস গ্রন্থসমূহে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, তিনি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন অথবা বহু সংখ্যক অনুসারী ও সাহাবী যাঁহারা বহু বৎসর ধরিয়া খুবই ঘনিষ্ঠভাবে তাঁহাকে ঘিরিয়া রাখিতেন তাঁহারা কখনও এইরূপ কোন ঘটনার কথা চিন্তাও করিতে পারেন না। একই বিষয়ের উপর তৃতীয় বিকৃতিসাধন
হইতেছে দৃঢ় দাবির যাহাতে বলা হইয়াছে যে, কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট কথিত উপসর্গসমূহ তাঁহার ভাবাবেশের স্বাভাবিক ধরন; যদিও বিভিন্ন সূত্র হইতে আহূত তথ্যানুযায়ী ইহা নিতান্তই স্পষ্ট যে, শারীরিক যন্ত্রণার ঘটনা তৎসহ ওহী প্রাপ্তি ছিল এক বিরল ও অনন্যসাধারণ বিষয় যাহা কদাচিৎ ঘটিত।
অনুরূপভাবে জিবরাঈলের ঘটনাটি যিনি কখনও কখনও মানুষের অবয়বে মহানবী -এর নিকট উপস্থিত হইতেন, বিকৃত করা হইয়াছে এই বলিয়া যে, মহানবী তাঁহার সঙ্গীদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। ইতোপূর্বে যেভাবে আলোচিত হইয়াছে যে, এইরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ কেবল প্রতারণাটিকেই প্রকাশ করিয়া দেয় এবং ওহী নাযিলের সময় উপস্থিত জনতার উপর যে ঐশী প্রভাব পড়ে তাহা প্রতারণা দ্বারা সম্ভবপর হয় না। মারগোলিয়থের পক্ষে এই নির্দিষ্টকর বিকৃতির প্রয়াস বেশ অস্বাভাবিক। কারণ তিনি একই সাথে উল্লেখ করেন যে, জিবরাঈল একজন ঐশীদূত, "তিনি নূতন নিয়মে (বাইবেল) বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত” ৫৬ কেহ হয়ত প্রশ্ন করিবার জন্য প্ররোচনা বোধ করিতে পারেন : নূতন বাইবেলের ক্ষেত্রে নবীদের জন্য জিবরাঈল কর্তৃক বার্তা বহনের বিষয়টি যদি অস্বাভাবিক না হয় তাহা হইলে অন্য নবীর ক্ষেত্রে তাহা অস্বাভাবিক হইবে কেন? পরবর্তীজনের ক্ষেত্রে প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণ করিবার জন্য নূতন বাইবেলের নবীদের উদ্দেশ্যে ঐশীদূত কর্তৃক বার্তা বহনের প্রকৃত পদ্ধতির উল্লেখ করা আবশ্যক। মারগোলিয়থ অথবা তাহার বুদ্ধিজীবী শিষ্যদের মধ্যে যাহারা তাহার মতামত গ্রহণ করেন তাহারা কেহই ইহা সম্পাদন করেন নাই।
মূল গ্রন্থ বা পাঠের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া সাধারণ তথ্যের বিকৃতি ঘটানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ দুইটি অপব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য একটি রেখা টানিয়া দেওয়া প্রায়শ কঠিন হইয়া পড়ে। কমপক্ষে একজন ওহী লেখকের এইরূপ একটি ঘটনা আছে যে শপথপূর্বক ইসলাম ধর্মকে পরিত্যাগ করিয়াছে বলিয়া দাবি করা হয়। কারণ তাহার এইরূপ প্রতীতি জন্মায় যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিষয় হইতেছে একটি জালিয়াতি। ৫৭ বস্তুত মারগোলিয়থ কর্তৃক উদ্ধৃত হাদীছটিতে বলা হইয়াছে যে, মহানবীর জন্য যে ব্যক্তি ওহী লিখিবে এবং পরে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া মক্কার বিরোধী দলের সাথে যোগদান করিবে তাহার জন্য রহিয়াছে জঘন্য পরিণাম। তাহার ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগের কারণ বর্ণনা করিতে গিয়া মার্গোলিয়থ বলেন যে, মহানবী নিজে ওহী লেখককে ওহী লিখিবার নির্দেশ প্রদান করিতেন কিন্তু ওহী লেখক তাহা ভিন্নভাবে লিখিত। তাহাকে ভুল সংশোধনের জন্য বলা হইলে সে যাহা লিখিয়াছে তাহা পরিবর্তন করিতে অস্বীকৃতি জানাইত। সুতরাং মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী উক্ত ওহী লেখককে তাহার ইচ্ছানুযায়ী ওহী লিখিবার অনুমতি প্রদান করিতেন। এইরূপ একাধিকবার ঘটিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা হয়। ৫৮
এখন ইহা স্পষ্ট যে, এই বর্ণনা এইরূপ এক ব্যক্তির যে শত্রুতে পরিণত হয়। ইহাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ইহা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে। বর্ণনার মূল বিষয়বস্তু পরীক্ষা করিলে
ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি এক ছদ্মবেশী শত্রু যে ইসলামের নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়া মুসলমানদের দলে অনুপ্রবেশ করিয়াছিল। ইসলাম ও ওহীর মূল পাঠকে ধ্বংস করাই তাহার উদ্দেশ্য ছিল। যাহাই হউক না কেন, সাধারণ জ্ঞান ও যুক্তিতে উক্ত ব্যক্তির ঘোষণাকে কখনও সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। কারণ কোন যুক্তিবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কখনও তাহার কর্মচারী বা অনুসারিগণকে তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী লিখিবার অনুমতি দিতে এবং তাহাদের লিখিত বিষয়কে ওহী হিসাবে ঘোষণা করিতে পারেন না। আর একজন ধূর্ত ও সুনির্দিষ্ট ভণ্ড ব্যক্তির বেলায় তো ইহার প্রশ্নই উঠে না। এই বিবরণী সুস্পষ্টভাবে ইহাকে একটি মিথ্যা অভিযোগ হিসাবে উল্লেখ করে এবং ইহার ক্ষতিকর ফলাফলের বর্ণনা দেয় যাহা ইহার কুৎসা রটনাকারীর উপরই বর্তায়। মারগোলিয়থ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার উপর মিথ্যা আরোপ করিয়া ইহাকে সাক্ষ্য হিসাবে ভূয়া অভিযোগ দাঁড় করাইয়াছেন এবং তারপর ইহার বিকৃতি সাধনে রত হইয়াছেন। অধিকন্তু বিবরণীটিতে কোথাও উল্লেখ নাই যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে রোগের উপসর্গ তৈয়ার করিয়াছেন যাহা মারগোলিয়থ কথিত প্রতারণার চিহ্ন হিসাবে উদ্ধৃতি দিয়াছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মহানবী-এর হাজার হাজার বুদ্ধিমান ও সুবুদ্ধিপূর্ণ অনুসারীদের উদাহরণ হইতে তিনি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারেন নাই। এই সকল অনুসারী তাহাদের সারা জীবন মহানবী-এর প্রতি ছিলেন চির অনুগত ও উৎসর্গীকৃত। আর মারগোলিয়থের দৃষ্টিতে ইহারা হইয়া গেলেন মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণার শিকার!
📄 তিন: সূরা আন-নাজমের আয়াত ৫৩ঃ ৪-১০-এর মারগোলিয়থের অপব্যাখ্যা
মারগোলিয়থের আনুপূর্বিক বর্ণনা হইতেছে তাহার সবচাইতে বড় ভুল ব্যাখ্যা এবং তাহা হইতেছে মুইর-এর অনুমানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আর ইহা হইতেছে, কুরআনে বলা হইয়াছে দুইটি ধনুকের পাল্লা হইতেও কম দূরত্বে অবস্থান করিয়া আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জিবরাঈল ওহী প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন। মারগোলিয়থ যদিও সুনির্দিষ্টভাবে ইহা উদ্ধৃত করেন নাই, তবুও কুরআনের আয়াত ৫৩:৪-১০ (সূরাতুন নাজম)-এর প্রসঙ্গে ইহা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এই আয়াতটি বিবেচনা করিবার পূর্বে ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থের এই অনুমানও তাহার সাধারণ মতবাদের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সব সময় প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার পূর্ববর্তী নবীদের কেবল অনুকরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার সকল ভাবধারা ও তথ্য পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে আহরণ করিয়াছেন। আর তিনি যোসেফ স্মিথ (Joseph Smith)-এর ন্যায় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন যিনি "দেবদূতগণের পথ-নির্দেশনায়" মর্মনদের কিতাব (Book of Mormon) উদ্ধার করিয়াছেন। তারপর নূতন বাইবেলেই জিবরাঈলের কথা বলা হইয়াছে, যিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী লইয়া তাঁহার নবীদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করিয়া মারগোলিয়থ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন
যে, কুরআনের প্রমাণকে ভিত্তি করিয়া দাবি করা হয় যে, মহানবী প্রারম্ভে সরাসরি আল্লাহ্ নিকট হইতে ওহী লাভ করেন বলিয়া উক্তি করেন। কিন্তু ইহা ব্যাখ্যা করা হয় নাই কেন? মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবীর রীতি হইতে অস্বাভাবিকভাবে দূরে সরিয়া যাইবেন? পূর্ববর্তী নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী লাভ করেন এবং তিনি তাহাদিগকে শুধু অনুকরণ করেন বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। অন্য কাহারও কর্তৃক অদৃশ্য ও অলক্ষ্যভাবে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে বাণী লাভ এবং ওহী প্রদানকারী ফেরেশতার দীর্ঘকালব্যাপী দৃশ্যপট হইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিতি সবচাইতে সঠিক পদ্ধতি হইবে কিনা তাহা মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মহানবী তাঁহার শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর ধর্মোপদেশের অতি প্রাকৃত উৎস সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার ও ইহা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।
বরং কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটি লইয়া আলোচনা করা যাইতে পারে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মারগোলিয়থ তাহার অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। আলোচ্য আয়াতগুলি এইভাবে অগ্রসর হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى . وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى . عَلَّمَهُ شَدِيدُ القُوى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى . وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى . ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ، فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى .
"তোমাদিগের সংগী (Prophet বা রাসূল) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিবার তাহা প্রত্যাদেশ করিলেন" (৫৩: ২-১০)।
যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আয়াতগুলি নাযিল হয় তাহা বুঝিতে হইবে এবং কুরআনের অন্য আয়াতসমূহে (আয়াত নং ৮১: ১৯-২৮; সূরাতুত তাকবীর) ইহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে, যাহাতে একই বিষয় আলোচিত হইয়াছে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন রচনাবলীর পণ্ডিতবর্গ, তৎসহ প্রাচ্যবিদগণের মতানুসারে এই পরবর্তী আয়াতগুলি (৮১: ১৯-২৮) ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে ৫৩: ২-১০ আয়াতসমূহের পূর্বেকার। ৫৯ এই উভয় সূরার আয়াতসমূহ মহানবী যে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ওহী লাভ করেন কাফিররা তাহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। কাফিররা দাবি করে যে, মহানবী একটি দুষ্ট আত্মার প্রভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এই আয়াতসমূহ নাযিল হইয়াছিল। সূরাতুত তাকবীর-এর আয়াতসমূহের বর্ণনা নিম্নরূপ:
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ ، مُطَاعٍ ثُمَّ أَمِينِ . وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ . وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْنِ . وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّحِيمٍ ، فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ . إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। এবং তোমাদিগের সাথী (রাসূল) উন্মাদ নহে, সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে, সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে। এবং ইহা অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নহে। সুতরাং তোমরা কোথায় চলিয়াছ? ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ” (৮১: ১৯-২৭)।
এইভাবে উভয় সূরার মধ্যকার সাধারণ বিষয়টি উল্লিখিত হইতে পারে। প্রথমত, উভয় সূরাই মহানবী -এর দিগন্তে একটি সত্তার দৃশ্য দেখিবার বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে অধিকতর পূর্বের ৮১: ২৩ নং আয়াতে এই সত্তাকে সুস্পষ্টভাবে একজন সম্মানিত বার্তাবাহক হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তা'আলার বার্তাবাহক একজন ফেরেশতা। তিনি নিজে আল্লাহ নহেন।
দ্বিতীয়ত, এই সূরাতে (৫৩: ২-১০) ইহা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নাই যে, এই সত্তা একজন "বার্তাবাহক”, তবুও সেখানে যে বিবরণ দেওয়া হইয়াছে তাহা সূরা ৮১: ১৯-২৭-এ প্রদত্ত বিবরণের প্রায় অনুরূপ। পক্ষান্তরে সূরা আত-তাকবীরে যখন তাহাকে একজন শক্তিশালী (ذِي قُوَّةٍ) ও আল্লাহ্র আরশের নিকটে অবস্থানকারী একজন সত্তা হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে তখন সূরা ৫৩: ২-১০-এ তাহাকে খুবই শক্তিশালী (شَدِيدُ الْقُوى) এবং শারীরিক ও মানসিক তেজসম্পন্ন ব্যক্তি (ذو مرة) হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে।
তৃতীয়ত, উভয় সূরাই মক্কার কাফিরদের অভিযোগ খণ্ডন করিয়া মহানবী -কে "তোমাদের সাথী (صاحبكم) বলিয়া উল্লেখ করে"। কারণ তিনি প্রকৃতই তাহাদের একজন ছিলেন এবং তাহাদের নিকট এক অতি সুপরিচিত ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত হইতেন।
চতুর্থত, উভয় সূরাতে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, মহানবী -কে কোন অপশক্তি আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই (৮১: ২২) কিংবা তিনি সঠিক পথ বিচ্যুত হইয়া বিচার-বুদ্ধিহীনের কাজ করেন নাই (৫৩ঃ ২)।
পঞ্চমত, উভয় সূরাতেই বলা হইয়াছে যে, মহানবী তাঁহার জনগণের মধ্যে যাহা ঘোষণা করিতেছিলেন তাহা একজন সম্মানিত বার্তাবাহক কর্তৃক তাঁহাকে প্রদত্ত বাণী (قول) বিশেষ ছিল এবং "সে একটি শক্তিশালী সত্তা” (৫৩ঃ ৫) ইহা তাঁহাকে শিখাইয়া দিয়াছিলেন।
সর্বশেষে, এই উভয় সূরাতেই পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে যে, মহানবী -এর নিকট ইহা ছিল আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত ওহী (৫৩: ৪) এবং তাহা কোন অপশক্তির কথা ছিল না, বরং সারা পৃথিবীর সমস্ত লোকের জন্য তাহা ছিল আল্লাহ্র বাণীর বর্ণনা (৮১: ২৫, ২৭)।
এইভাবে উভয় সূরাতে একই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং মক্কার কাফিরদের একই অভিযোগের একই জবাব দেওয়া হইয়াছে। আর একইরূপ বাক্যাংশ ও বিশেষণ দ্বারা দিগন্তে দৃশ্যমান সত্তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির প্রতিটিই ব্যাখ্যামূলক ও একে অপরের সম্পূরক এবং যেহেতু প্রথম উল্লিখিত (৮১) সূরাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দৃষ্ট সত্তাকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে, তাই ইহা ধারণা করা যাইতে পারে না যে, পরবর্তী সূরাতে এই বার্তাবাহককে স্বয়ং আল্লাহ হিসাবে দাবি করা হইবে যিনি নিচে অবতরণ করিয়া আসিয়া মহানবীকে কুরআনের বাণী হস্তান্তর করিবেন। এই একই বিষয়টি সত্য হইবে এমন কি যদি এই দুইটি সূরার নাযিল হওয়ার ক্রমটি পাল্টাইয়া দেওয়া হয়। কারণ মহানবী যদি এতই আত্মবিরোধী হইয়া পড়েন যে, তিনি কোন একটি সূরাতে আল্লাহ্ বাণী বহনকারীকে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত করিবেন এবং তাহাকে অন্যত্র ফেরেশতা বলিবেন তাহা হইলে কাফিরদের দ্বারা তিনি নিদারুণভাবে অপদস্ত হইতেন এবং তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি সংশোধনাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত।
এমনকি যদি ৫৩:২ - ১০ আয়াতসমূহকে ৮১: ১৯ - ২৭ আয়াতসমূহের প্রতি কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যাইত না যে, এই প্রসঙ্গটি আল্লাহ সম্পর্কিত। কারণ এই আয়াতে ইহার বিপরীতে চূড়ান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। এইভাবে এই সত্তাকে প্রচুর শক্তির অধিকারী (شديد القوى) হিসাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এখন আল্লাহ তো অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহাক্ষমতাশালী, কিন্তু কুরআনে তাঁহাকে কোথায়ও 'শাদীদুল কুওয়া' বা 'খুবই শক্তিশালী' বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে আপেক্ষিক শক্তির নির্দেশক এবং সর্বোচ্চ শক্তির নহে। অতএব, ইহা কখনও আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা হইতে পারে না। অনুরূপভাবে 'যু-মিররাহ' শব্দটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ অথবা শারীরিক ক্ষমতা কিংবা উভয় প্রকাশ করে। এই শব্দটি কেবল সৃষ্টিজীবের বেলায় প্রযোজ্য হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে নহে। তাহা ছাড়া কুরআনের কোথাও ইহাকে আল্লাহ্র বর্ণনা অথবা তাঁহার গুণের উল্লেখরূপে বর্ণনা করা হয় নাই। তৃতীয়ত, এই একই সূরার আরও কিছু পরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী ঐ একই সত্তার প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করেন এবং তারপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, তিনি যাহা দিগন্তে অবলোকন করেন তাহা তাঁহার মহান প্রভুর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল (مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) ৬০ অতঃপর মহানবী এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে যাহা অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ছিল একটি নিদর্শন অর্থাৎ তাঁহার প্রভুর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি—জিবরাঈল ফেরেশতা এবং তিনি মানুষের প্রকৃত অবয়ব ও গঠনে হাজির ছিলেন। আর তিনি স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন না।
আয়াত নং ৫৩ : ১০ (فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى)-এর বর্ণনা দ্বারা মারগোলিয়থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে। এই আয়াতের অর্থ বুঝিবার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:
প্রথমত, আরবী হরফ 'ফা' দিয়া আয়াতটি শুরু হইয়াছে এবং ইহার দুইটি ভাবার্থ রহিয়াছে-ইসতিকবালিয়াহ অর্থাৎ অনুবর্তিতা যাহার অর্থ করা হয় 'তখন' শব্দটি দ্বারা; এবং তাফসীরিয়াহ অর্থাৎ ব্যাখ্যামূলক; ইহার অর্থ 'এইরূপে' অথবা 'অতএব' কিংবা 'সুতরাং'।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করিতে হয় তাহা হইতেছে আয়াতের 'আবদিহি' শব্দটি। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার অর্থাৎ আল্লাহ্র বান্দাকে বুঝায় এবং ইহা হয় মহানবী-কে অথবা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রসঙ্গে গ্রহণ করা যাইতে পারে।
তৃতীয়ত, ইহা স্মরণে রাখা আবশ্যক যে, আরবী ভাষায় একটি সর্বনাম হয় স্পষ্ট অথবা একটি ক্রিয়াপদের সহিত উহ্য থাকিতে পারে এবং তাহা সব সময় অব্যবহিত পূর্ববর্তী সর্বনাম-এর (বিশেষ্য পদের পরিবর্তে ব্যবহৃত) সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে না। কিন্তু ইংরেজিতে বরং কর্তৃকারকের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে অথবা বিষয়বস্তুটি রচনার কোন অংশের বর্ণনা হইতে বোধগম্য হয়।
মনের মধ্যে এই তিনটি বিষয় ধারণ করিয়া ৫৩: ১০ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করা যাইতে পারিবে। 'ফা' হরফটি যাহার সহিত শুরু হইয়াছে তাহা যদি অনুবর্তিতার ভাবধারায় গৃহীত হয় তাহা হইলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে: "তখন তিনি (ফেরেশতা) তাঁহার (আল্লাহ তা'আলার) বান্দার (অর্থাৎ মহানবী) সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবেন যাহা তিনি (আল্লাহ অথবা মহানবী) প্রকাশ করিয়াছিলেন"। পক্ষান্তরে, ফা হরফটিকে যদি ব্যাখ্যামূলক ভাবধারায় গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে অর্থ হইবে: "এইরূপে অথবা সুতরাং (ফেরেশতার সহায়তায়) যিনি (আল্লাহ) নিশ্চয়ই তাঁহার বান্দার সহিত যোগাযোগ করেন যাহা তিনি প্রকাশ করিতে চাহেন"।
উপরে যে সকল অভ্যন্তরীণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা অস্বীকার করা স্পষ্টতই ভুল হইবে। তাহা ছাড়া বিষয়বস্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গ ও একটি আয়াতের সহিত অন্য আয়াতের সম্পর্ক, ৮১ : ১৯ - ২৭, এবং 'আবদিহি' (عبده) শব্দের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ইহা ধরিয়া লওয়া যে, আয়াতটিতে দিগন্তে দৃশ্যমান আল্লাহ নিজেই কথা বলিতেছেন অতঃপর মহানবী-এর নিকট অবতরণ করিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করিতেছেন-প্রভৃতি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধারণা।
মারগোলিয়থ ধারণা পোষণ করেন যে, মহানবী-এর প্রথমদিকের দাবি-আল্লাহ নিজেই তাঁহাকে কুরআনের বাণী প্রদান করেন-ইহা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ইহার অগ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও মারগোলিয়থের ধারণা তাহার উত্তরসুরি কর্তৃক গৃহীত ও পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। ফলে তাহারা মারগোলিয়থের অন্যান্য ধারণার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন যে, পরবর্তী কোন এক সময়ে ওহীর বাহক হিসাবে জিবরাঈল স্থলবর্তী হন। মারগোলিয়থের প্রধান তত্ত্ব যে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ও চক্রান্তপরায়ণতার সহিত একজন নবীর ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি যে অন্যভাবে একজন প্রতারক তাহা নূতন কিছুই নহে। ইসলাম সম্পর্কে মধ্যযুগের ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গের এই যে
ধারণা তাহা বাস্তবিকপক্ষে পুনরাবৃত্তি। সাম্প্রতিক কালের ইউরোপীয় পাণ্ডিত্য অবশ্য মহানবী -এর বিরুদ্ধে এইরূপ গায়ে পড়িয়া অভিযোগ করিবার ব্যাপারে কিছু পরিমাণ লজ্জাবোধ করে। কিছু পরেই দৃশ্যমান হইবে এইরূপ সাম্প্রতিক কালের কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন মহানবী -এর প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত লক্ষণাদির ৬১ প্রবর্তনের উপর কথা বলেন তখন তাহা বস্তুতপক্ষে মধ্যযুগীয় মনোভাবের প্রতিধ্বনি হিসাবেই বিবেচিত হয়।
আরেকটি ক্ষেত্রে মারগোলিয়থকে একটি নূতন পথের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তাহা হইতেছে ইসলামী প্রত্যাদেশের দৃশ্য ব্যাখ্যাকল্পে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন অথবা অতীন্দ্রিয়বাদের উপর প্রণীত আধুনিক গ্রন্থাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা। এইভাবে তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার উপর Podmore-এর গ্রন্থকে ব্যবহার করিয়া এই ধারণা দেন যে, মহানবী সৎ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হইলেও তিনি তবুও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওয়াট অতীন্দ্রিয়বাদের উপর A. Poulin-এর গ্রন্থের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর পক্ষে ওহী হইতেছে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাচনভঙ্গি। ৬২
টিকাঃ
৫৯. মুসলিম পণ্ডিতবর্গের মতানুসারে আত-তাকবীর ও আন-নাজম সূরা দুইটি ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে যথাক্রমে ৭ম ও ২৩তম অবস্থানে রহিয়াছে। Rodwell, Jeffery, Muir ও Nöldeke ইহাদিগকে যথাক্রমে ৩২তম ও ৪৬তম, ২৪তম ও ২৭তম, ২৭তম ও ৪৩তম এবং ২৭তম ও ২৮তম অবস্থানের বলিয়া মনে করেন.
৬০. কুরআন, ৫৩: ১৩, ১৮.
৬১. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ২০, ২য় অংশ.
৬২. ঐ, ১ম ও ২য় অংশ.
মারগোলিয়থের আনুপূর্বিক বর্ণনা হইতেছে তাহার সবচাইতে বড় ভুল ব্যাখ্যা এবং তাহা হইতেছে মুইর-এর অনুমানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আর ইহা হইতেছে, কুরআনে বলা হইয়াছে দুইটি ধনুকের পাল্লা হইতেও কম দূরত্বে অবস্থান করিয়া আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জিবরাঈল ওহী প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন। মারগোলিয়থ যদিও সুনির্দিষ্টভাবে ইহা উদ্ধৃত করেন নাই, তবুও কুরআনের আয়াত ৫৩:৪-১০ (সূরাতুন নাজম)-এর প্রসঙ্গে ইহা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এই আয়াতটি বিবেচনা করিবার পূর্বে ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থের এই অনুমানও তাহার সাধারণ মতবাদের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সব সময় প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার পূর্ববর্তী নবীদের কেবল অনুকরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার সকল ভাবধারা ও তথ্য পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে আহরণ করিয়াছেন। আর তিনি যোসেফ স্মিথ (Joseph Smith)-এর ন্যায় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন যিনি "দেবদূতগণের পথ-নির্দেশনায়" মর্মনদের কিতাব (Book of Mormon) উদ্ধার করিয়াছেন। তারপর নূতন বাইবেলেই জিবরাঈলের কথা বলা হইয়াছে, যিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী লইয়া তাঁহার নবীদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করিয়া মারগোলিয়থ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন
যে, কুরআনের প্রমাণকে ভিত্তি করিয়া দাবি করা হয় যে, মহানবী প্রারম্ভে সরাসরি আল্লাহ্ নিকট হইতে ওহী লাভ করেন বলিয়া উক্তি করেন। কিন্তু ইহা ব্যাখ্যা করা হয় নাই কেন? মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবীর রীতি হইতে অস্বাভাবিকভাবে দূরে সরিয়া যাইবেন? পূর্ববর্তী নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী লাভ করেন এবং তিনি তাহাদিগকে শুধু অনুকরণ করেন বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। অন্য কাহারও কর্তৃক অদৃশ্য ও অলক্ষ্যভাবে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে বাণী লাভ এবং ওহী প্রদানকারী ফেরেশতার দীর্ঘকালব্যাপী দৃশ্যপট হইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিতি সবচাইতে সঠিক পদ্ধতি হইবে কিনা তাহা মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মহানবী তাঁহার শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর ধর্মোপদেশের অতি প্রাকৃত উৎস সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার ও ইহা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।
বরং কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটি লইয়া আলোচনা করা যাইতে পারে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মারগোলিয়থ তাহার অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। আলোচ্য আয়াতগুলি এইভাবে অগ্রসর হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوى . وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى . عَلَّمَهُ شَدِيدُ القُوى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى . وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى . ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ، فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى .
"তোমাদিগের সংগী (Prophet বা রাসূল) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিবার তাহা প্রত্যাদেশ করিলেন" (৫৩: ২-১০)।
যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আয়াতগুলি নাযিল হয় তাহা বুঝিতে হইবে এবং কুরআনের অন্য আয়াতসমূহে (আয়াত নং ৮১: ১৯-২৮; সূরাতুত তাকবীর) ইহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে, যাহাতে একই বিষয় আলোচিত হইয়াছে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন রচনাবলীর পণ্ডিতবর্গ, তৎসহ প্রাচ্যবিদগণের মতানুসারে এই পরবর্তী আয়াতগুলি (৮১: ১৯-২৮) ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে ৫৩: ২-১০ আয়াতসমূহের পূর্বেকার। ৫৯ এই উভয় সূরার আয়াতসমূহ মহানবী যে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ওহী লাভ করেন কাফিররা তাহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। কাফিররা দাবি করে যে, মহানবী একটি দুষ্ট আত্মার প্রভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এই আয়াতসমূহ নাযিল হইয়াছিল। সূরাতুত তাকবীর-এর আয়াতসমূহের বর্ণনা নিম্নরূপ:
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ ، مُطَاعٍ ثُمَّ أَمِينِ . وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ . وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْنِ . وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّحِيمٍ ، فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ . إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। এবং তোমাদিগের সাথী (রাসূল) উন্মাদ নহে, সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে, সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে। এবং ইহা অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নহে। সুতরাং তোমরা কোথায় চলিয়াছ? ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ” (৮১: ১৯-২৭)।
এইভাবে উভয় সূরাতে একই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং মক্কার কাফিরদের একই অভিযোগের একই জবাব দেওয়া হইয়াছে। আর একইরূপ বাক্যাংশ ও বিশেষণ দ্বারা দিগন্তে দৃশ্যমান সত্তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির প্রতিটিই ব্যাখ্যামূলক ও একে অপরের সম্পূরক এবং যেহেতু প্রথম উল্লিখিত (৮১) সূরাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দৃষ্ট সত্তাকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে, তাই ইহা ধারণা করা যাইতে পারে না যে, পরবর্তী সূরাতে এই বার্তাবাহককে স্বয়ং আল্লাহ হিসাবে দাবি করা হইবে যিনি নিচে অবতরণ করিয়া আসিয়া মহানবীকে কুরআনের বাণী হস্তান্তর করিবেন। এই একই বিষয়টি সত্য হইবে এমন কি যদি এই দুইটি সূরার নাযিল হওয়ার ক্রমটি পাল্টাইয়া দেওয়া হয়। কারণ মহানবী যদি এতই আত্মবিরোধী হইয়া পড়েন যে, তিনি কোন একটি সূরাতে আল্লাহ্ বাণী বহনকারীকে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত করিবেন এবং তাহাকে অন্যত্র ফেরেশতা বলিবেন তাহা হইলে কাফিরদের দ্বারা তিনি নিদারুণভাবে অপদস্ত হইতেন এবং তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি সংশোধনাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত।
এমনকি যদি ৫৩:২ - ১০ আয়াতসমূহকে ৮১: ১৯ - ২৭ আয়াতসমূহের প্রতি কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যাইত না যে, এই প্রসঙ্গটি আল্লাহ সম্পর্কিত। কারণ এই আয়াতে ইহার বিপরীতে চূড়ান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। এইভাবে এই সত্তাকে প্রচুর শক্তির অধিকারী (شديد القوى) হিসাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এখন আল্লাহ তো অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহাক্ষমতাশালী, কিন্তু কুরআনে তাঁহাকে কোথায়ও 'শাদীদুল কুওয়া' বা 'খুবই শক্তিশালী' বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে আপেক্ষিক শক্তির নির্দেশক এবং সর্বোচ্চ শক্তির নহে। অতএব, ইহা কখনও আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা হইতে পারে না। অনুরূপভাবে 'যু-মিররাহ' শব্দটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ অথবা শারীরিক ক্ষমতা কিংবা উভয় প্রকাশ করে। এই শব্দটি কেবল সৃষ্টিজীবের বেলায় প্রযোজ্য হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে নহে। তাহা ছাড়া কুরআনের কোথাও ইহাকে আল্লাহ্র বর্ণনা অথবা তাঁহার গুণের উল্লেখরূপে বর্ণনা করা হয় নাই। তৃতীয়ত, এই একই সূরার আরও কিছু পরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী ঐ একই সত্তার প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করেন এবং তারপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, তিনি যাহা দিগন্তে অবলোকন করেন তাহা তাঁহার মহান প্রভুর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল (مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) ৬০ অতঃপর মহানবী এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে যাহা অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ছিল একটি নিদর্শন অর্থাৎ তাঁহার প্রভুর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি—জিবরাঈল ফেরেশতা এবং তিনি মানুষের প্রকৃত অবয়ব ও গঠনে হাজির ছিলেন। আর তিনি স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন না।
আয়াত নং ৫৩ : ১০ (فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى)-এর বর্ণনা দ্বারা মারগোলিয়থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে। এই আয়াতের অর্থ বুঝিবার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:
প্রথমত, আরবী হরফ 'ফা' দিয়া আয়াতটি শুরু হইয়াছে এবং ইহার দুইটি ভাবার্থ রহিয়াছে-ইসতিকবালিয়াহ অর্থাৎ অনুবর্তিতা যাহার অর্থ করা হয় 'তখন' শব্দটি দ্বারা; এবং তাফসীরিয়াহ অর্থাৎ ব্যাখ্যামূলক; ইহার অর্থ 'এইরূপে' অথবা 'অতএব' কিংবা 'সুতরাং'।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করিতে হয় তাহা হইতেছে আয়াতের 'আবদিহি' শব্দটি। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার অর্থাৎ আল্লাহ্র বান্দাকে বুঝায় এবং ইহা হয় মহানবী-কে অথবা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রসঙ্গে গ্রহণ করা যাইতে পারে।
তৃতীয়ত, ইহা স্মরণে রাখা আবশ্যক যে, আরবী ভাষায় একটি সর্বনাম হয় স্পষ্ট অথবা একটি ক্রিয়াপদের সহিত উহ্য থাকিতে পারে এবং তাহা সব সময় অব্যবহিত পূর্ববর্তী সর্বনাম-এর (বিশেষ্য পদের পরিবর্তে ব্যবহৃত) সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে না। কিন্তু ইংরেজিতে বরং কর্তৃকারকের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে অথবা বিষয়বস্তুটি রচনার কোন অংশের বর্ণনা হইতে বোধগম্য হয়।
মনের মধ্যে এই তিনটি বিষয় ধারণ করিয়া ৫৩: ১০ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করা যাইতে পারিবে। 'ফা' হরফটি যাহার সহিত শুরু হইয়াছে তাহা যদি অনুবর্তিতার ভাবধারায় গৃহীত হয় তাহা হইলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে: "তখন তিনি (ফেরেশতা) তাঁহার (আল্লাহ তা'আলার) বান্দার (অর্থাৎ মহানবী) সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবেন যাহা তিনি (আল্লাহ অথবা মহানবী) প্রকাশ করিয়াছিলেন"। পক্ষান্তরে, ফা হরফটিকে যদি ব্যাখ্যামূলক ভাবধারায় গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে অর্থ হইবে: "এইরূপে অথবা সুতরাং (ফেরেশতার সহায়তায়) যিনি (আল্লাহ) নিশ্চয়ই তাঁহার বান্দার সহিত যোগাযোগ করেন যাহা তিনি প্রকাশ করিতে চাহেন"।
উপরে যে সকল অভ্যন্তরীণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা অস্বীকার করা স্পষ্টতই ভুল হইবে। তাহা ছাড়া বিষয়বস্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গ ও একটি আয়াতের সহিত অন্য আয়াতের সম্পর্ক, ৮১ : ১৯ - ২৭, এবং 'আবদিহি' (عبده) শব্দের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ইহা ধরিয়া লওয়া যে, আয়াতটিতে দিগন্তে দৃশ্যমান আল্লাহ নিজেই কথা বলিতেছেন অতঃপর মহানবী-এর নিকট অবতরণ করিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করিতেছেন-প্রভৃতি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধারণা।
মারগোলিয়থ ধারণা পোষণ করেন যে, মহানবী-এর প্রথমদিকের দাবি-আল্লাহ নিজেই তাঁহাকে কুরআনের বাণী প্রদান করেন-ইহা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ইহার অগ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও মারগোলিয়থের ধারণা তাহার উত্তরসুরি কর্তৃক গৃহীত ও পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। ফলে তাহারা মারগোলিয়থের অন্যান্য ধারণার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন যে, পরবর্তী কোন এক সময়ে ওহীর বাহক হিসাবে জিবরাঈল স্থলবর্তী হন। মারগোলিয়থের প্রধান তত্ত্ব যে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ও চক্রান্তপরায়ণতার সহিত একজন নবীর ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি যে অন্যভাবে একজন প্রতারক তাহা নূতন কিছুই নহে। ইসলাম সম্পর্কে মধ্যযুগের ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গের এই যে
ধারণা তাহা বাস্তবিকপক্ষে পুনরাবৃত্তি। সাম্প্রতিক কালের ইউরোপীয় পাণ্ডিত্য অবশ্য মহানবী -এর বিরুদ্ধে এইরূপ গায়ে পড়িয়া অভিযোগ করিবার ব্যাপারে কিছু পরিমাণ লজ্জাবোধ করে। কিছু পরেই দৃশ্যমান হইবে এইরূপ সাম্প্রতিক কালের কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন মহানবী -এর প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত লক্ষণাদির ৬১ প্রবর্তনের উপর কথা বলেন তখন তাহা বস্তুতপক্ষে মধ্যযুগীয় মনোভাবের প্রতিধ্বনি হিসাবেই বিবেচিত হয়।
আরেকটি ক্ষেত্রে মারগোলিয়থকে একটি নূতন পথের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তাহা হইতেছে ইসলামী প্রত্যাদেশের দৃশ্য ব্যাখ্যাকল্পে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন অথবা অতীন্দ্রিয়বাদের উপর প্রণীত আধুনিক গ্রন্থাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা। এইভাবে তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার উপর Podmore-এর গ্রন্থকে ব্যবহার করিয়া এই ধারণা দেন যে, মহানবী সৎ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হইলেও তিনি তবুও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওয়াট অতীন্দ্রিয়বাদের উপর A. Poulin-এর গ্রন্থের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর পক্ষে ওহী হইতেছে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাচনভঙ্গি। ৬২