📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক: মুইর-এর ধারণা

📄 এক: মুইর-এর ধারণা


মুহাম্মাদ উচ্চাকাংখী ছিলেন এবং তাঁহার স্বগোত্রীয় লোকদের হীনমন্যতার দ্বারা হতোদ্যম হইয়া তিনি হেরা পর্বতে অবস্থান করিয়া গভীর ধ্যান ও মানসিক চেতনার মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করিতে চাহিয়াছিলেন—এই মূল ধারণা লইয়া মুইর সম্মুখে অগ্রসর হইয়াছেন। মুইর বর্ণনা করেন যে, ক্রমান্বয়ে তাঁহার (মুহাম্মাদ) আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল মন বিক্ষুব্ধ হইয়া উত্তেজনার চরমে পৌঁছে এবং এমন সময় তাঁহার মনে একটি চমৎকার ভাবের উদয় হয়। তাহা হইতেছে, আল্লাহ্ই একমাত্র স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক। ধর্মহীনতা ও প্রতিমা পূজার জঘন্যতা, পুনরুত্থান, বিচার অনুষ্ঠান, ভাল ও মন্দ কাজের তুল্য বিনিময় প্রদান এবং মৃত্যুর পর জীবন প্রভৃতি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ও সুনিশ্চিত চিত্র তাঁহার নিকট স্পষ্ট হইয়া উঠে। এক "অদ্ভূত কল্পনাপূর্ণ ও আবেগমণ্ডিত ভাষায়" তিনি তাঁহার এই উপলব্ধির ও "সত্যের প্রতি তাঁহার অভ্যন্তরীণ" সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তাঁহার এই ভাষা প্রয়োগ প্রায়শই অসংলগ্ন শপথ দ্বারা জোরদার করা হয় যাহাতে "কবিতার অসম্পূর্ণ অংশ" এবং "মানবজাতির অবস্থা ও ভবিষ্যৎ উন্নতির হতাশাময় অভিব্যক্তি” ও “পরিপূর্ণ স্বগতোক্তি" রহিয়াছে এবং তিনি পথনির্দেশনার জন্য তাহা উপাসনায় ব্যবহার করিয়াছেন। প্রথম দিকের নাযিলকৃত সূরাসমূহের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়াতকে মুইর খণ্ডাংশ নামে অভিহিত করেন এবং উদাহরণ হিসাবে তিনি তাঁহার অনূদিত সূরাতুল আসর (১০৩ নং) ও সূরাতুল 'আদিয়াত (১০০ নং)- এর উল্লেখ করেন। আর স্বগতোক্তি ও উপাসনার উদাহরণ দিতে গিয়া তিনি যথাক্রমে সূরাতুল কারি'আহ (১০১ নং) ও সূরাতুল ফাতিহা (১ নং)-এর উদ্ধৃতি দেন। ১ মুইর অবশ্য স্বীকার করেন যে, এইগুলি "অসাধারণ শক্তিতে ও সৌন্দর্যে পূর্ণ শব্দাবলী” দ্বারা রচিত হইয়াছে। মুইর আরও বলেন যে, কখনও কখনও এই "দৈববাণী" সরাসরি ঈশ্বরের নিকট হইতে অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ঈশ্বর নিজেকে "আমরা" এবং মুহাম্মাদকে "তুমি" হিসাবে সম্বোধন করিয়াছেন। এই সম্বোধন সম্পর্কে একটি উদাহরণ হিসাবে তিনি সূরা আত-তীন (৯৫ নং)-এর অনুবাদের উদ্ধৃতি দিয়াছেন।
তবুও মুইর মনে করেন যে, মুহাম্মাদ অনুপ্রেরণা দ্বারা এই দৃঢ় প্রত্যয় অর্জন করেন নাই, "একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা" ভোগের পর তিনি ইহা লাভ করিয়াছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি "ভর্ৎসনা ও ভীতির বাণী", যেমন সূরাতুল হুমাযাতে রহিয়াছে (১০৪), উচ্চারণ করেন বলিয়া কথিত হয়। তিনি আরব ও ইয়াহুদীদের প্রাচীন কাহিনী এবং তৎসহ "জাতীয় অলৌকিক
ঘটনাবলী” ও ভাবপ্রবণতা সম্পর্কে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেন। ইহাদের উদাহরণ দিতে গিয়া সূরাতুল ফা (৮৯ নং)-এর অংশবিশেষ এবং সূরাতুল ফীল (১০৫ নং) ও সূরাতুল কুরায়শ (১০৬ নং)-এর সম্পূর্ণটাই অনুবাদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করিয়াছেন। মুইর বলেন, মুহাম্মাদ তখনও অন্ধের ন্যায় সত্য খুঁজিয়া ফিরিতেছিলেন এবং এই তথ্যের সমর্থনে সূরাতুল বালাদ (৯০ নং)-এর সম্পূর্ণটাই অনুবাদ সহকারে উল্লেখ করিয়াছেন।
মুইর-এর মতানুসারে মুহাম্মাদ-এর একজন “ঐশী শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বভার" গ্রহণের পূর্বে তিনি বেশ কয়েক বৎসর ধরিয়া তাঁহার "ভাবাবেগকে কবিতার মাধ্যমে” প্রকাশ করিতে থাকেন। এই সময়কালে একটি ক্ষুদ্র দল, যেমন ওয়ারাকা, আলী, খাদীজা ও আবূ বাক্র (রা) তাঁহার অনুসারী হিসাবে পরিগণিত হন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়া থাকে। যেহেতু "মুহাম্মাদ নিজে লিখিতে জানিতেন না" তাই প্রথমোক্ত তিনজন একেবারে গোড়ার দিকের নাযিলকৃত সূরাগুলি লিখিয়া রাখিতেন। মুইর আরও বলেন যে, এই ক্ষুদ্র দলটির বাহিরে তাঁহার "সতর্কতাসূচক বাণী ও মৃদু ভর্ৎসনা লজ্জাকর অজ্ঞতা ও বিরক্তির অন্ধকারে" তলাইয়া যাইত। তাঁহার স্নেহশীল চাচা আবূ তালিব তাঁহার এইরূপ উৎসাহ দেখিয়া মৃদু হাসিতেন, তাঁহার আর এক চাচা আবু লাহাব তাঁহাকে উপহাস করিত। পক্ষান্তরে কুরায়শ সর্দার আবূ জাহল্ ও তাহার অনুচরবর্গ তাঁহাকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিত। আর সাধারণভাবে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা ছিল তাঁহার প্রতি "অমনোযোগী ও উদাসীন"।
মূইরের বর্ণনামতে, এইরূপ অবস্থায় একজন নবী হিসাবে আবির্ভূত হইবার প্রয়োজনীয়তার নিরীখে মুহাম্মাদ-কে আনয়ন করা হয় যখন তাঁহার ধর্মোপদেশ শুনিতে গিয়া জনগণের মধ্যে "অধিকতর সংবেদনশীল ব্যক্তিবর্গ উল্লেখ করে যে, তাহারা পবিত্র জীবনযাপন করিবে যদি তাহাদের মধ্যে একজন নবীকে প্রেরণ করা হয়, যেমন পূর্বে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছিল। এই বর্ণনার সমর্থনে মুইর কুরআনের ৩৫৪ ৪২ নং আয়াতের উদ্ধৃতি প্রদান করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ "প্রত্যুত্তর দানের" তাড়না অনুভব করেন। তিনি স্বীয় অন্তরে ইহার গভীর অনুসন্ধানে রত থাকেন যাহার দ্বারা তাঁহার দৃঢ় প্রত্যয়ের সৃষ্টি হয় যে, এই "দহনকর চিন্তার ধারা," "বাকপটুতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ এবং পবিত্র বক্তৃতা" যাহা তিনি এই যাবত প্রচার করিয়া আসিতেছিলেন তাহার সব কিছুই "একটি অলৌকিক আহ্বান, একটি ঐশী মিশন" পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা হয়। নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক মানসিক বিক্ষেপের ও গভীর বিষণ্ণতার এইরূপ একটি অবস্থায় মুহাম্মাদ আল্লাহ্র নিকট হইতে পুনঃ নিশ্চয়তা লাভের জন্য প্রার্থনা করেন যাহা আল্লাহ তা'আলা অতীতে তাঁহাকে দান করিয়াছিলেন এবং ইহা সূরা আদ-দুহা (৯৩ নং) ও সূরা ইনশিরাহ (৯৪ নং)-তে স্পষ্টীকৃত হইয়াছে। তৎসত্ত্বেও তাঁহার মানসিক পীড়ন এতই অসহনীয় হইয়া উঠে যে, তিনি কয়েকবার আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন। কারণ কুরআন ঘোষণা করিয়াছে যে, "আল্লাহ্ নামে মিথ্যা বলার" চাইতে ভয়ংকর পাপ আর কিছুই নাই। তাই
একদিন তিনি একটি খাড়া পাহাড়ের চূড়া হইতে নিজকে নিক্ষেপ করিবার এক হঠকারী চিন্তা করেন, কিন্তু কোন এক "অদৃশ্য" প্রভাব তাঁহাকে ইহা হইতে নিবৃত্ত করে। তিনি তখনও নিশ্চিত ছিলেন না যে, ঐ অদৃশ্য প্রভাবটি ঐশী অথবা শয়তানসুলভ ছিল কিনা। কিন্তু তাঁহার স্ত্রী খাদীজা (রা) "আত্মাকে পরীক্ষা করিয়া" তাঁহাকে নিশ্চয়তা দান করেন যে, তাঁহার "আগন্তুক” কোন দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন না, বরং 'নিষ্পাপ ও ধার্মিক' ছিলেন। ইহার পর ঐশী মিশনের প্রতি "উচ্চাকাঙ্খা মিশ্রিত বিশ্বাস" তাঁহার অন্তরে পুনঃ জাগরিত হয় এবং তিনি একটি একতাবদ্ধ জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন দেখিতে থাকেন যাহারা শপথ গ্রহণ পূর্বক প্রতিমা পূজা ত্যাগ করিবে। ১০ তিনি অবশ্য মূসা (আ) ও অন্যান্য ইয়াহুদী গোষ্ঠীপতিদের উদাহরণ সম্পর্কেও চিন্তা করেন এবং নিজের মধ্যে এই প্রত্যয় সৃষ্টি করেন যে, "শত্রুতা ও বিরোধে ক্লান্ত" সিরিয়া, পারস্য, মিসর, আবিসিনিয়া প্রভৃতি দেশের জনগণ তাঁহার নিকট দলে দলে আসিয়া মিলিত হইবে যদি তিনি নিজকে আল্লাহর নবী হিসাবে ঘোষণা করেন যাহা তিনি নিশ্চিতভাবে অনুভব করিতেছিলেন। ১১ শেষ পর্যন্ত তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস, যেমন মুইর বলেন, এক "পরম আনন্দদায়ক ভাবাবেশ” দ্বারা নিশ্চিত হয় এবং তিনি "কল্পনায় দেখিতে পান" যে, তিনি একটি মিশন প্রত্যক্ষ করিতেছেন। ১২ পবিত্র আত্মার প্রণোদনা দানকারী প্রভাবের জন্য তিনি অপেক্ষা করিতে থাকেন।
এইরূপ মানসিক অবস্থায় তিনি যখন হেরা পর্বতের চূড়ায় বসিয়া অথবা ইতস্তত ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলেন তখন তাঁহার সম্মুখে "এক ছায়ামূর্তির আবির্ভাব ঘটে”। তাঁহার খুব "নিকটে ও স্পষ্টভাবে দৃষ্টির সম্মুখে" আসিয়া জিবরাঈল (আ) দাঁড়াইলেন এবং তাঁহার ও মুহাম্মাদ-এর মধ্যকার দূরত্ব "দুইটি ধনুকের সমান" ছিল। জিবরাঈল (আ) তাঁহার প্রভুর (আল্লাহ তা'আলা) নিকট হইতে সূরা আল-'আলাক-এর সেই স্মরণীয় নির্দেশ লইয়া আসেন। ১৩ মুইর "এইভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে" , এইভাবে মুহাম্মাদ সন্দেহ ও দ্বিধার একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করিবার পর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে সরাসরি প্রতিবিধানাদির ব্যবস্থাসমূহ লাভ করেন। এখন হইতে ভবিষ্যতে তিনি আক্ষরিক অর্থে আল্লাহ্ নামে কথা বলিতে শুরু করেন। তিনি এই বিষয়ে এতই সতর্ক ছিলেন যে, কুরআনের প্রতিটি বাক্যের প্রারম্ভে আল্লাহ্র আদেশের বিষয়টি যুক্ত করা হইয়াছে এই বলিয়া: বলুন অথবা বল। এই আদেশ উল্লিখিত না হইলেও ইহা রহিয়াছে বলিয়া ধারণা করিয়া লওয়া হয়"। ১৪ ইহার পরও তাঁহাকে কবি, যাদুকর অথবা অপদেবতা ভর করিয়াছে বলিয়া উপহাস করা হয়। অতঃপর শেষ পন্থা হিসেবে তিনি তাঁহার উপর আরোপিত দায়িত্বের প্রতি নির্ভর করেন এবং হতবুদ্ধি হইয়া তিনি নিজে মোহগ্রস্ত হইয়া পড়েন। তাঁহার পোশাকাদি গায়ে জড়াইয়া তিনি পরম ভাব-বিহ্বল অবস্থায় আবিষ্ট হন। জিবরাঈল ফেরেশতা "নিকটেই” ছিলেন এবং সূরাতুল মুদ্দাছছির-এর পুনঃ সঞ্জীবিতকারী বাণী দ্বারা তিনি মহানবী-কে নৈরাশ্য হইতে জাগ্রত করিয়া "কর্ম উদ্দীপনায়” যুক্ত করেন। ১৫
মুইর দাবি করেন যে, কুরআন হইতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি মহানবী-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে উল্লেখ করিয়াছেন। ১৬ তারপর আল-ওয়াকিদী প্রধানত
যে বিবরণ প্রদান করিয়াছেন মুইর তাহা পুনঃ উপস্থাপন করিয়া একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করিয়াছেন। আর তিনি ইহাকে প্রথাগত বিবরণ হিসাবে অভিহিত করিয়াছেন। উপসংহারে তিনি ওহী অবতীর্ণ হওয়ার ধরন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে মতামত দান করেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময়কার অবস্থা সম্পর্কে বলিতে গিয়া তিনি ইহাকে মহানবী-এর "ভাবাবেশকর সময়” বলিয়া উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, তাহা ছিল গভীর ধ্যানের ভাবাচ্ছন্নতা অথবা মুর্ছা যাওয়া যাহার সহিত শারীরিক বা মানসিক ধাচের এক অস্বাস্থ্যকর উত্তেজনা সম্পৃক্ত আছে। বিভিন্ন সময় বা অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থার তারতম্য ঘটে। ১৭
এই সকল বিষয়ের নিহিতার্থ হইতেছে, মহানবী-এর স্বীয় মনন ও চিন্তা হইতে ওহী উদ্ভূত হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইহার সহিত তাঁহার মানসিক চেতনা ও গভীর ধ্যানের ফলাফল যুক্ত রহিয়াছে। ইহা মোটামুটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। মুইর তাই জিবরাঈল (আ)-এর দর্শনের বিষয়টিকে 'অপচ্ছায়া'১৮ অথবা 'ছায়ামূর্তি' হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি মহানবী -এর ওহী প্রাপ্তিকে "ভাবাচ্ছন্নতা” ১৯ এবং ওহী গ্রহণকালে মহানবী কখনও কখনও যে শারীরিক কঠিন চাপ অনুভব করিতেন তাহাকে "ভাববিহ্বলতা" ২০ অথবা "মূর্ছা” ২১ ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন।
মুইর কর্তৃক ব্যক্ত মতামতের শেষ উল্লিখিত এই বিষয়টি তাহার অন্যান্য ধারণার একটি সম্প্রসারণ মাত্র। মহানবী-এর শৈশবকালের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি উপরিউক্ত ধারণা পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, শৈশবকালে মহানবী সন্যাসরোগ অথবা মুর্ছারোগে আক্রান্ত হন। এই বিষয়টি লইয়া ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে। ২২ এইখানে শুধু ইহাই উল্লেখ কর। যাইতে পারে যে, পরবর্তী কালের লেখকগণ যদিও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গে সন্যাসরোগ বা মৃগী রোগের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া সম্পর্কিত ভাষা প্রয়োগ এড়াইয়া গিয়াছেন বলিয়া অনুমিত হয় তবুও মূল উপাদান হিসাবে ঈষৎ পরিবর্তিত আকারে তাহারা মতামত গ্রহণ করিয়াছেন। এই পরিবর্তিত বিন্যাসে তাহারা "আত্ম-সম্মোহন", "প্রত্যাদেশের জন্য প্ররোচনা" ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করিয়াছেন।
আরও একটি অভিমত এইরূপ যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়া মহানবী-এর নিকট বাহির হইতে আসা কোন বিষয় নহে, বরং ইহা মহানবী-এর সচেতনতা ও ব্যক্তিত্ব হইতে উদ্ভূত হইয়াছে- সকল প্রাচ্যবিদের লেখনীতে এই অভিমত সাধারণভাবে প্রকাশ লাভ করিয়াছে। অতএব এই বিষয়টি লইয়া আলোচনা করা যাইবে যখন অন্যান্যদের মতামত ও যুক্তিসমূহ পর্যালোচিত হইবে। এখানে মুইর-এর অন্যান্য মতামতসমূহ আলোচিত হইতে পারে।
মুইর-এর প্রাথমিক ধারণা হইতেছে, মুহাম্মাদ উচ্চাকাংখী ছিলেন এবং একজন নবীর ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তবুও ইহা বলা হয় যে, অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য তাঁহার মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি হয় নাই যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ সময় ব্যাপী
"মানসিক যন্ত্রণায়” ভুগিয়াছেন এবং "সত্যানুসন্ধানে কঠোর সংগ্রামে" লিপ্ত হইয়াছেন। আরও বলা হয় যে, ঐশী শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি কয়েক বৎসর ধরিয়া তাঁহার 'ভাবাচ্ছন্নতার' প্রকাশ ঘটান। স্পষ্টত এই দুইটি প্রবল প্রচেষ্টাই পরস্পর বিরোধী। যদি মহানবী প্রকৃতপক্ষে উচ্চাকাংখী হইতেন এবং নবী হইবার জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে তাঁহার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হইবার এবং স্বীয় কার্যক্রমে নিজকে স্থির করিবার পর পর্যন্ত তিনি তাঁহার পরিকল্পনা মাফিক কাজ করিতেন না। পক্ষান্তরে তাঁহার গভীর ধ্যান, ভাবাবেশ ও সত্যের জন্য সৎ প্রচেষ্টার কারণে যদি কোন মহৎ চিন্তা তাঁহার সম্মুখে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আকার ধারণ করিত তাহা হইলে মহানবী পূর্ব-পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি অনুসারে স্পষ্টতই কোন কাজ করিতেন না। বস্তুত মুহাম্মাদ-এর ধর্মোপদেশ শ্রবণকারী কিছু সংখ্যক অনুসারী যখন তাঁহাকে বলেন যে, যদি একজন নবী তাঁহাদের মধ্যে প্রেরণ করা হইত তাহা হইলে তাহারা এক বিশুদ্ধতর জীবনযাপন করিতে পারিত—মুইর-এর এই তত্ত্ব তাহার নিজেরই প্রদত্ত মহানবী-এর উচ্চাকাংখা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত তত্ত্বের পরস্পর বিরোধী।
প্রকৃত সত্য হইতেছে, বিষয়টি যেমন মোটেই কোন পূর্ব-পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফলাফল ছিল না, তেমনি তাহা গভীর ধ্যান ও ভাবাবেশপ্রসূত বিষয়ও ছিল না। অবশ্য মহানবী অবশ্যই নির্জনে ইবাদত ও গভীর ধ্যানে নিজকে নিয়োজিত রাখিতেন। তবে তিনি নাযিলকৃত ওহীর যে বিষয়বস্তু তাঁহার লোকদিগকে শুনাইতেন তাহা তাঁহার ধ্যানের কোন ফল ছিল না। তাঁহার নিকট ইহা ছিল সম্পূর্ণভাবে বাহিরের আরোপিত বিষয় এবং তিনি ইহার সম্বন্ধে পূর্বে যেমন কোনভাবে চিন্তা করেননি তেমনি তাঁহার কোন প্রত্যাশাও ছিল না। এই কারণে ঘটনার আকস্মিক পরিবর্তনে তিনি হতভম্ব ও ভীত-বিহ্বল হইয়া পড়েন এবং প্রথামিক পর্যায়ে তাঁহার এই নূতন অবস্থানের জন্য তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাঁহার এই অনিশ্চয়তা সুস্পষ্টভাবে তাঁহার পক্ষে কোন পরিকল্পনা এবং উচ্চাকাঙ্খার অনুপস্থিতির কারণে ঘটিয়াছিল এবং ঘটনাবলীর আকস্মিকতায় ও অপ্রত্যাশিত অবস্থায় ইহার অভ্যুদয় ঘটে। ইহা আরও প্রমাণ করে যে, ওহী হিসাবে তিনি যে ঐশী আদেশ লাভ করেন তাহা তাঁহার চিন্তা বা গভীর ধ্যানের ফল ছিল না। কিন্তু তাঁহার প্রাথমিক অনিশ্চয়তা ও হতবুদ্ধিতার প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন সেই অবস্থা সুনিশ্চিতভাবে "কয়েক বৎসর” ধরিয়া স্থায়ী ছিল না এবং ইহা ছিল প্রকৃতপক্ষে তাঁহার উপর প্রথম ওহী নাযিলের ফল এবং সেই সময়কার অবস্থার প্রতিফলন মাত্র। মহানবী-এর নিকট ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ও ইহার প্রাক-অবস্থা হিসাবে মুইর এই ফলাফলকে ব্যবহার করিয়াছেন। এইরূপে সকল উৎস গ্রন্থে ঘটনা সম্পর্কে যেভাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহা সম্পূর্ণভাবে উল্টাইয়া দেওয়া হইয়াছে।
মুইর বলেন যে, মহানবী অনুপ্রাণিত হইবার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় অর্জন করেন নাই যতক্ষণ পর্যন্ত না মানসিক অশান্তি ও অনিশ্চয়তার এক প্রলম্বিত সময় অতিবাহিত করেন এবং কয়েক বৎসর ধরিয়া “ঐশী শিক্ষক" হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নাই। তবুও মুইর আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চেষ্টা করেন যে, মহানবী তৎসত্ত্বেও "তাঁহার ভাবধারা” অদ্ভূত কল্পনাশ্রয়ী ও
আবেগপূর্ণ ভাষায়, কবিতা ও অন্যবদ্ধ আবেগ বিহ্বল সঙ্গীতের "খণ্ড খণ্ড” রচনার মাধ্যমে প্রচার করেন এবং তাঁহার লোকদিগকে আল্লাহর বাণী গ্রহণের জন্য এমনভাবে আহ্বান জানান যে, কিছু সংখ্যক লোক তাঁহার অনুসারী হন। কিন্তু সাধারণভাবে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা তাঁহাকে বিদ্রুপ ও তাঁহার বিরোধিতা করে। এখন এই বিবরণের যে কোন পাঠকের নিকট যে সকল প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উত্থাপিত হয় তাহা হইতেছে:
(ক) ইহা কি কল্পনীয় যে, একজন ব্যক্তি যিনি তাঁহার স্বীয় অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নন এবং এমনকি তাঁহার প্রদত্ত বাণীর প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁহার কোন ধারণা নাই, তিনি একই সময়ে কিভাবে প্রকাশ্যে ধর্মান্তরণের জন্য আহ্বান জানান এবং ইহার ফলে অপমান ও বিরোধিতার মুখামুখি হন?
(খ) ইহা ধারণা করা কি যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, একদল লোক তাহারা যতই সংখ্যায় নগণ্য হউক না কেন তাঁহার আহ্বানে সাড়া দিবে যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁহার প্রচারিত বাণীর সত্যতা ও ঐশী উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হইবে এবং ধর্ম প্রচারকারী নিজেই বাণী ও ইহার প্রকৃতি সম্পর্কে যেখানে নিশ্চিত নন বলিয়া ধরা হয় সেখানে সেই ক্ষুদ্র দলটি কিভাবে সন্দেহের নিরসন করিবে?
(গ) এইরূপ চিন্তা করা কি যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, কুরায়শ গোত্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ধর্ম প্রচারকের বিরদ্ধে চলিয়া যাইবে যদি না তিনি তাঁহার নবুওয়াতের দাবি ও ধর্ম প্রচারের বিষয়ে আন্তরিক হন?
মুইর অবশ্য নিজেকে এই সকল স্বাভাবিক প্রশ্নের মুখামুখি দাঁড় করান নাই, কিন্তু তাহার পাঠকবর্গ এই সকল অযৌক্তিকতা গ্রহণ করিবেন বলিয়া তিনি আশা করেন।
একদিকে এই মতামতে অসঙ্গতির চূড়ান্ত পরিণতি এইভাবে বিদ্যমান যে, মুহাম্মাদ বেশ কয়েক বৎসর ধরিয়া দ্বিধান্বিত অবস্থায় এবং সত্যানুসন্ধানে রত না থাকা পর্যন্ত 'প্রভুর নামে' কোন আহ্বানের ঘোষণা প্রদান করেন নাই। অন্যদিকে এই বিবরণীতে সেই প্রারম্ভিক পর্যায়ে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে কখনও কখনও "ওহী” অবতীর্ণ হইয়াছে এবং সেখানে নিজকে 'আমরা' ও মুহাম্মাদকে 'তুমি' বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে। এখন যে কেহ স্পষ্টতই বুঝিতে সক্ষম হইবে না যে, কিভাবে এই ধরনের মতামত পরবর্তীতে "প্রভুর নামে" প্রদত্ত মতামত হইতে ভিন্নতর হয়? বাস্তবিকপক্ষে মুইর-এর মূল অসঙ্গতি এই তথ্যের মধ্যে এমনভাবে অন্তর্নিহিত রহিয়াছে যে, উদাহরণ দিতে গিয়া তিনি সর্বাধিক ১৮টি সূরার উদ্ধৃতি দিয়াছেন যেইগুলি সম্পর্কে তিনি ধারণা করিয়া লইয়াছেন যে, ঐগুলি ওহী-পূর্ব অথবা মহানবী-এর প্রতি কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বেকার প্রদত্ত মতামত!
এই কাহিনীর মূল অযৌক্তিকতাকে বজায় রাখিবার উদ্দেশ্যে প্রকৃতপক্ষে এই সকল অসঙ্গতিকে লইয়া ভেলকিবাজি করা হইয়াছে। যেমন নবী হিসাবে নিজকে ঘোষণাদানের প্রয়োজনীয়তা মুহাম্মাদ-এর স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যখন তাঁহার ধর্ম প্রচারকালে প্রচারব "সবচাইতে
সন্দেহবাতিকগ্রস্ত লোক" সকল উল্লেখ করে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের নিকট পূর্বে যেমন নবী আসিয়াছে তেমনি কোন নবী আবির্ভূত হইলে তাহারা বিশুদ্ধ জীবন যাপন করিবে। তাহার পর আমাদিগকে বলা হইয়াছে যে, মুহাম্মাদ তখন তাঁহার অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করেন এবং গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত হন যে, তিনি এমনিভাবে অনুপ্রাণিত এবং শেষ পর্যন্ত জিবরাঈল (আ)-কে 'ধারণায়' আনয়ন করিতে সক্ষম হন যিনি তাঁহাকে "প্রভুর নামে" আবৃত্তি অর্থাৎ প্রচারের জন্য নির্দেশ দিতেছেন।
এখন একজন ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে চিন্তা করুন যিনি তাঁহার লোকদের নিকট একজন ধর্মপ্রচারক হিসাবে উপস্থিত হইয়াছেন এবং কয়েক বৎসর ধরিয়া ধর্ম প্রচারের পর, তাঁহার অধিকাংশ লোকদের বিরোধিতা ও উপহাস সহ্য করিবার পর তাহাদের কাহারও মন্তব্য শুনিতে হইয়াছে যে, যদি তাহাদের নিকট একজন নবী প্রেরিত হন তাহা হইলে তাহারা তাঁহার উপদেশ শুনিবে। সেই কারণে ধর্ম প্রচারক তাঁহার ভূমিকার পুনর্বিন্যাস সাধন করেন এবং তাঁহার লোকদের নিকট পুনঃ উপস্থিত হইয়া বলিতে থাকেন যে, তিনি আল্লাহ্র নিকট হইতে নবুওয়াত লাভ করিয়াছেন, তাই তাঁহাকে তাহাদের অনুসরণ করা উচিত। যাহার মধ্যে এক বিন্দু পরিমাণ সাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধি আছে সে কখনও এইরূপ বোকার মত কাজ করিয়া নিজকে হাস্যস্পদ করিয়া তুলিবে না। তবুও মুইর মহানবী-এর উপর এইরূপ অর্বাচীন ভাব আরোপ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, তিনি বরং পাঠকদিগকে ইহা বিশ্বাসও করাইতে চাহিয়াছেন।
একদিকে প্রকৃত তথ্যের বিকৃতি সাধন ও ইহার সহিত অসত্যের মিশ্রণ ঘটাইয়া হাস্যকর গল্পের অবতারণা করা হয়, অন্যদিকে মূল পাঠের অপব্যাখ্যা করা হয়। প্রথমত, মুইর সুস্পষ্টভাবে সর্বজনবিদিত মূল বিষয়ের বিকৃতি সাধন করিয়াছেন। বিষয়টি হইতেছে, একটি বিশেষ অবস্থায় মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন তিনি যেভাবে বিস্ময়াভিভূত, শঙ্কিত ও অনিশ্চিত হইয়া পড়িয়াছিলেন তাহা মুইর বিকৃত করেন। তিনি মহানবী-এর বিস্ময়ে হতবাক হইয়াও অনিশ্চয়তার আশংকাকে ওহী নাযিলের বিরতি বা 'ফাতরাহ'-এর সময়ের সহিত ঘোলাইয়া ফেলিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে তাহার দ্বিতীয় বিকৃতি সাধন এই তথ্য সম্পর্কে সম্পন্ন হইয়াছে। তিনি এমন একটি ধারণা প্রদান করেন যে পর্যায়ে মহানবী তাঁহার নিজের মধ্যে সংগ্রামে রত ছিলেন বলিয়া দাবি করা হয় সেই পর্যায়কালের সহিত 'ফাতরাহ'-এর কালকে একই সময়ের আওতার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি সেই সময় এক প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে কালাতিপাত করিতেছিলেন যে, তিনি নিজকে নবী হিসাবে ঘোষণা করিবেন এবং প্রভুর নামে কথা বলিবেন কিনা তাহা লইয়া সংশয় ছিল। উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, অন্যান্য সকল বিবরণীতে ফাতরাহ-এর প্রকৃতি সম্পর্কে যেইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে এবং মুইর আমাদিগকে যাহা বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। যদিও ইহার স্থিতিকাল লইয়া বিবরণীসমূহে বিভিন্নতা রহিয়াছে, তবুও তাহা এক কথায় বলা যায় যে, এই সময়ে ওহী অবতীর্ণ হইবার একটি বিরতি ছিল
এবং ইহা ওহী অবতীর্ণ হইবার পূর্বেকার কোন সময় ছিল না। মহানবী এই সময়ে অবশ্যই ব্যাকুল ও অস্থির ছিলেন। কিন্তু সূত্র গ্রন্থসমূহে এমন কোন অভিমত ব্যক্ত করা হয় নাই যে, তাঁহার এই অস্থিরতা মানসিক উদ্বেগের কারণে সৃষ্টি হইয়াছিল এবং এই উদ্বেগ তিনি প্রভুর নামোল্লেখ করিয়া কোন প্রচার করিবেন কিনা তাহার সহিত সম্পর্কিত ছিল। তবুও মুইর এই বিষয়টির উপর অনধিকারযুক্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই। তিনি ধরিয়া লইয়াছেন যে, এই সময়ে মহানবী মানসিকভাবে নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করেন। তাঁহার মধ্যে এইরূপ চিন্তার উদয় হয় যে, আল্লাহ্ নামে মিথ্যা বলিবার মত ভীষণ পাপ কাজে তিনি রত হইবেন কিনা এবং তিনি বেশ কয়েকবার আত্মহত্যা করিবার জন্য চিন্তাও করেন। মুইর এখানে এই প্রকৃত ঘটনারও বিকৃতি সাধন করেন।
কথিত আত্মহত্যার প্রচেষ্টা সম্পর্কিত বর্ণনা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নহে, যেমন পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে। কিন্তু গল্পটি সত্য বলিয়া ধরিয়া লইলেও উৎস গ্রন্থসমূহে অথবা পণ্ডিতগণের মধ্যে এমন কোন অভিমত পাওয়া যায় না যে, কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কারণ নিহিত ছিল মহানবী-এর এইরূপ মানসিক উদ্বেগের মধ্যে যে, তিনি আল্লাহ্ নামে কোন মিথ্যা আরোপ করিয়া প্রচার করিবেন কিনা। তাঁহার উদ্বেগ ও মানসিক পীড়নের কারণ এই ছিল যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যে যে স্বাভাবিক বিরতি থাকিত তাহা হইতে দীর্ঘতর বিরতি হইবার ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। ঘটনাক্রমে 'ফাতরাহ' সম্পর্কিত বিবরণী এবং মহানবী -এর এই বিষয়ে ব্যাকুলতা ও মানসিক চাপের সমগ্র বিষয়টি প্রকৃত তথ্যের চূড়ান্ত প্রমাণ যে, ওহীর বিষয়টি মহানবী -এর নিজের মধ্য হইতে উদ্ভূত হয় নাই অথবা ইহা সকপোল কল্পিত ছিল না।
প্রকৃত ঘটনার এইরূপ বিকৃতি সাধনের সহিত মূল পাঠের অপব্যাখ্যাকে মিশ্রিত করা হইয়াছে এবং এইরূপ বিভ্রান্তিকর বর্ণনা দ্বারা সিদ্ধান্ত টানা হইয়াছে যে, মহানবী -এর নবুওয়াত লাভ করিবার যেইসব পর্যায়ের বর্ণনা রহিয়াছে তাহা কুরআন হইতে "বিভিন্ন ইঙ্গিত” গ্রহণের দ্বারা সংগৃহীত হইয়াছে। ইহা অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় হইবে যে, মুইর যে সকল 'পদক্ষেপের' সন্ধান পাইয়াছেন মহানবী এর উদ্বেগ ও হতবুদ্ধিতা, কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কাহিনী এবং 'ফাতরাহ'-এর ঘটনা অথবা ওহী অবতীর্ণ হইবার বিরতি ইত্যাদি, এই বর্ণনাসমূহে শুধু যাহা উল্লিখিত হইয়াছে তাহা আদৌ কুরআনের নহে। আর কুরআনের বর্ণনাসমূহ যাহা মুইর তাহার কল্পিত ধারণার সমর্থনমূলক সাক্ষ্য হিসাবে উল্লেখ করেন, তাহা মুইর-এর অপব্যাখ্যা ব্যতীত আর কিছুই নহে। মুইর-এর পক্ষে কুরআনের প্রথম উল্লেখযোগ্য অপব্যবহার হইতেছে-আল্লাহ তা'আলার নামে মিথ্যা বলার পাপ সম্পর্কিত বিবরণী। কুরআন অবশ্য সবচাইতে জঘন্য পাপ হিসাবে প্রকাশ্যে ইহার নিন্দা করিয়াছে এবং তাহা শুধু একবার নহে, কমপক্ষে দশটি স্থানে ইহার উল্লেখ রহিয়াছে। ২৩ এই সকল আয়াতের প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টি দিলে ইহা স্পষ্ট হইবে যে, কাফিরদের অভিযোগ খণ্ডন করিবার জন্য এই বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে
যেমন তাহারা বলিত, মহানবী তাঁহার লোকদের নিকট যাহা ঘোষণা করিতেন তাহা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র নিকট হইতে আসে নাই কিংবা কিতাবধারী কিছু লোকের রীতিকে প্রকাশ্যে নিন্দা করিয়াছেন যাহারা আল্লাহ্র আদেশ বলিয়া প্রচার করেন। মুইর ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের এই বর্ণনা হইতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, মহানবী তাঁহার জীবনের একেবারে গোড়ার দিকে একটি প্রশ্ন সম্পর্কে নিজের মধ্যে সংগ্রাম করিয়া থাকিবেন। তাহা হইতেছে, তিনি আল্লাহ্ নামে কোন মিথ্যাচার করিবেন কিনা। কুরআনে এইরূপ ধারণা পোষণ করার কোন বিষয়ই নাই। এই ধারণা পোষণ করিয়া কার্যত মুইর কাফিরদের অভিযোগকেই গ্রহণ করিয়াছেন এবং পরোক্ষভাবে বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী যাহা ঘোষণা করিয়াছেন তাহা বাস্তবিকপক্ষে আল্লাহ্র নিকট হইতে অবতীর্ণ হয় নাই, যদিও তিনি নিজকে বিশ্বাস করাইয়াছেন যে, ইহা প্রকৃতপক্ষে তাহাই ছিল।
মুইর-এর দ্বিতীয় মারাত্মক অপব্যাখ্যাটি করা হইয়াছে ৯৩ নং (সূরা আদ-দুহা) ও নং ৯৪ (সূরা ইনশিরাহ) সূরাকে লইয়া। তিনি প্রমাণ হিসাবে হেরার উদ্ধৃতি দিয়াছেন যেখানে তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার মানসিক উদ্বেগ হইতে পরিত্রাণ লাভের জন্য যে কথিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন তাহা হইতেছে-তিনি আল্লাহর নামে জনগণের মধ্যে মিথ্যাভাবে কোন প্রচার কার্য চালাইবেন কিনা এবং তিনি নিজকে এইভাবে নিশ্চিত করিয়াছেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহপ্রাপ্ত হইয়াছেন। উপরে উল্লিখিত দুইটি সূরা অবশ্য মহানবী-এর উপর আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ রহিয়াছে ইহা স্মরণ করাইয়া দেয়। কিন্তু সূরা দুইটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সূরা দুইটিতে অথবা বিবরণীতে কোন উল্লেখ নাই। অবশ্য ইহাতে বলিবার কিছু নাই যে, মহানবী তাঁহার উপর আল্লাহ তা'আলার অতীত অনুগ্রহের কথা স্মরণ করেন এবং তিনি মানসিক উদ্বেগ হইতে নিজকে মুক্ত করেন যাহাতে আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা বলিতে না হয় অথবা নিজের মধ্যে এই প্রত্যয়ের সৃষ্টি করা যে, তিনি জনগণকে যাহা বলিতেছেন তাহা আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে লাভ করিয়াছেন। এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণভাবে মুইর-এর কল্পনাপ্রসূত যাহার কোন ভিত্তি কুরআন অথবা বিবরণীতে নাই।
কুরআনের ৩৫: ৪২ সংখ্যক আয়াত প্রসঙ্গে তৃতীয় অপব্যাখ্যাটি করা হইয়াছে। আয়াতে বলা হইয়াছে: "ইহারা দৃঢ়তার সহিত আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিত যে, ইহাদের নিকট কোন সতর্ককারী আসিলে ইহারা অন্য সকল সম্প্রদায় অপেক্ষা সৎপথের অধিকতর অনুসারী হইবে...."। ২৪ মুইর ইহা ধরিয়া লইয়াছেন যে, মহানবী যখন ধর্ম প্রচার করিতেছিলেন তখন কাফিররা তাঁহার নিকট এই প্রস্তাব করে এবং কাফিরদের এইরূপ মন্তব্যের কারণে তিনি নিজকে নবী হিসাবে ঘোষণা দানের বিষয় চিন্তা করেন। এইরূপ ধারণার প্রতি কোন সমর্থন কুরআন বা হাদীছে নাই। মহানবী -এর নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হইবার পূর্বেই কোন ধর্ম প্রচারের কাজ চালাইয়া যাওয়ার চরম অযৌক্তিকতা সম্পর্কে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে উল্লেখ্য যে, উদ্ধৃত বিবরণীটি কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় কুরায়শ কর্তৃক বর্ণিত
হইয়াছে এবং তাহা মহানবী-এর প্রতি আরোপ করা হয় নাই, বরং এই দৃশ্যপটে তাঁহার উপস্থিত হইবার বহু পূর্বেই এবং এইরূপ বর্ণনার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইহা তাহাদের নিকট পৌঁছিয়াছিল যেখানে ইয়াহুদী ও খৃস্ট সম্প্রদায়ের লোকেরা তাহাদের নবীদের সহিত মিথ্যাচার এবং নবীদিগকে অমান্য করিয়াছিল। ২৫
সর্বশেষে মুইর সম্পূর্ণরূপে ভুল বুঝিয়াছেন অথবা সূরা আল-'আলাক-এর প্রথম আয়াতকে ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি ধরিয়া লইয়াছেন যে, যেহেতু এই আয়াত মহানবী-এর প্রতি আদেশ, “পড় তোমার প্রভুর নামে", ইহার পূর্বে তিনি নিশ্চয়ই তাঁহার মতবাদ প্রচার করিয়া থাকিবেন এবং তাহা প্রভুর নামে ছিল না! বাস্তবিকই ইহা এই আয়াতের এবং উপরোল্লিখিত ৩৫ ৪২ নং আয়াতের একটি মস্তবড় অপব্যাখ্যা। ইহার উপর ভিত্তি করিয়া মুইর তাহার তত্ত্ব দাঁড় করাইয়াছেন যাহাকে তিনি পর্যায় বা পদক্ষেপ নামে অভিহিত করিয়াছেন। তাহার মতে, মুহাম্মাদ ইহার প্রেক্ষিতে একজন ঐশী শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। আর এই তত্ত্বকে টিকাইয়া রাখিবার জন্য তিনি ধারণা করিয়া লইয়াছেন যে, আল্লাহর নিকট হইতে নবুওয়াত লাভ ও ওহী প্রাপ্তির দাবি করিবার পূর্বে মুহাম্মাদ অন্যূন ১৮টি অথবা ততোধিক সংখ্যক সূরার ঘোষণা প্রদান করেন।
মুইর উদ্ধৃত কুরআনের আয়াতসমূহ সম্পর্কে কোন ব্যক্তি যে ধারণাই পোষণ করুন না কেন ইতোপূর্বে উল্লেখিত তাহার তত্ত্বের নানা বিষয়ের চরম অসামঞ্জস্যতা ও অসঙ্গতিসমূহ সম্পূর্ণরূপে অসমর্থনীয় বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও মুইর-এর মতামতসমূহ তাহার উত্তরাধিকারী প্রাচ্যবিদগণ কর্তৃক যে কোন একটি রীতিতে গৃহীত হইয়াছে। এখানে লক্ষণীয় যে, ওহী-পূর্ব আমলের অথবা মহানবী কর্তৃক প্রাক-কুরআন মতামত প্রদানের সময়কার তাহার তত্ত্ব বেল পুনর্ব্যক্ত করিয়াছেন, যদিও তাহা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে মুইর তত্ত্বের মূল মুখবন্ধের সহিত মহানবী-এর কর্মজীবনের ধারা ও মতবাদের ক্রমান্বয় অগ্রগতিকে ওয়াট গ্রহণ করিয়া একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে লইয়া গিয়াছেন। কিছু পরেই ইহা দেখা যাইবে যে, ওয়াটের মতে মহানবী এক আল্লাহ্ ইবাদত সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ধারণা লইয়া প্রথমে আরম্ভ করেন নাই, বরং চার অথবা পাঁচ বৎসর ধরিয়া একটানা প্রচারকার্য চালাইবার পর ইহা ক্রমান্বয়ে তাঁহার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু মুইর-এর অব্যবহিত পরের বুদ্ধিজীবী উত্তরাধিকারী মারগোলিয়থ কি মতামত পোষণ করেন তাহা প্রথমে বিবেচনা করা যাইতে পারে।

টিকাঃ
১. Muir, Life etc. ৩য় সংস্করণ, পৃ. ৩৫-৩৯.
২. ঐ, পৃ. ৩৯.
৩. ঐ. পৃ. ৩৯-৪০.
৪. ঐ. পৃ. ৪১.
৫. ঐ.
৬. ঐ.
৭. পৃ. ৪২.
৮. ঐ, পৃ. ৪২-৪৩.
৯. ঐ. পৃ. ৪৩, এইখানে পূর্ণ উদ্ধৃতি দেওয়া হইয়াছে.
১০. ঐ, পৃ. ৪৪। মুইর ১১০ নং সূরা উদ্ধৃত করিয়া এই বর্ণনা সমর্থন করেন.
১১. ঐ, পৃ. ৪৪-৪৫.
১২. ঐ, পৃ.৪৫.
১৩. ঐ, পৃ. ৪৫-৪৬। মুইর সমগ্র সূরাটি অনুবাদ করিয়া ইহার উদ্ধৃতি দিয়াছেন.
১৪. ঐ, পৃ. ৪৬। মুইর সূরাতুল ইখলাস (১১২ নং) পাদটীকায় উল্লেখ করিয়া উদ্ধৃতি দিয়াছেন.
১৫. ঐ, পৃ. ৪৭-৪৮। মুইর সূরাটির কিছু অংশ বাদ দিয়া ইহার অনুবাদ উদ্ধৃত করেন.
১৬. ঐ, ৪৮.
১৭. ঐ, পৃ. ৫১.
১৮. "দৃষ্টিপথে আসা, বিশেষ করিয়া একটি প্রেতাত্মা বা মৃত ব্যক্তির আত্মা"-এর অর্থ। Oxford Advanced Learner's Dictionary of Current English (সম্পা. A.S. Hornby), ১৯শ মু., ১৯৮৪.
১৯. "স্বপ্নময় আনন্দদায়ক চিন্তার মধ্যে হারাইয়া যাওয়ার অবস্থা"-এর অর্থ, ঐ.
২০. "ঘুম ঘুম অবস্থা; অস্বাভাবিক স্বাপ্নিক অবস্থা, সম্মোহিত অবস্থা"-এর অর্থ, ঐ.
২১. "মৃগীরোগের আক্রমণ"-এর অর্থ, ঐ.
২২. পৃ. গ্র., পৃ. ১৫৬-১৫৯.
২৩. উদাহরণস্বরূপ দ্র. ৩:৯৪, ৬:২১, ৬:৯৩, ৬:১৪৪, ৭:৩৭, ১০:১৭, ১১:১৮, ১৮:১৫, ২৯:৬৪ ও ৬১:৭। বর্ণনার সাধারণ স্বরূপ ছিল:
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنِ افْتَرَى عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ .
২৪. মূল পাঠ নিম্নরূপঃ
وَأَقْسِمُوا بِاللَّهِ جَهْدَ أَيْمَانِهِمْ لَيْنْ جَاءَهُمْ نَذِيرٌ لَيَكُونُنَّ أَهْدَى مِنْ إِحْدَى الْأُمَمِ....
২৫. দ্র. আল-কুরতুবী, তাফসীর, ১৪খ., ৩৫৬; আল-বায়দাবী, তাফসীর, ২খ., ২৭৫; আস-শাওকানী, তাফসীর, ৪খ., ৩৫৫-৩৫৬.

মুহাম্মাদ উচ্চাকাংখী ছিলেন এবং তাঁহার স্বগোত্রীয় লোকদের হীনমন্যতার দ্বারা হতোদ্যম হইয়া তিনি হেরা পর্বতে অবস্থান করিয়া গভীর ধ্যান ও মানসিক চেতনার মাধ্যমে প্রশান্তি লাভ করিতে চাহিয়াছিলেন—এই মূল ধারণা লইয়া মুইর সম্মুখে অগ্রসর হইয়াছেন। মুইর বর্ণনা করেন যে, ক্রমান্বয়ে তাঁহার (মুহাম্মাদ) আবেগপ্রবণ ও সংবেদনশীল মন বিক্ষুব্ধ হইয়া উত্তেজনার চরমে পৌঁছে এবং এমন সময় তাঁহার মনে একটি চমৎকার ভাবের উদয় হয়। তাহা হইতেছে, আল্লাহ্ই একমাত্র স্রষ্টা ও নিয়ন্ত্রক। ধর্মহীনতা ও প্রতিমা পূজার জঘন্যতা, পুনরুত্থান, বিচার অনুষ্ঠান, ভাল ও মন্দ কাজের তুল্য বিনিময় প্রদান এবং মৃত্যুর পর জীবন প্রভৃতি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ও সুনিশ্চিত চিত্র তাঁহার নিকট স্পষ্ট হইয়া উঠে। এক "অদ্ভূত কল্পনাপূর্ণ ও আবেগমণ্ডিত ভাষায়" তিনি তাঁহার এই উপলব্ধির ও "সত্যের প্রতি তাঁহার অভ্যন্তরীণ" সংগ্রামের বহিঃপ্রকাশ ঘটান। তাঁহার এই ভাষা প্রয়োগ প্রায়শই অসংলগ্ন শপথ দ্বারা জোরদার করা হয় যাহাতে "কবিতার অসম্পূর্ণ অংশ" এবং "মানবজাতির অবস্থা ও ভবিষ্যৎ উন্নতির হতাশাময় অভিব্যক্তি” ও “পরিপূর্ণ স্বগতোক্তি" রহিয়াছে এবং তিনি পথনির্দেশনার জন্য তাহা উপাসনায় ব্যবহার করিয়াছেন। প্রথম দিকের নাযিলকৃত সূরাসমূহের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আয়াতকে মুইর খণ্ডাংশ নামে অভিহিত করেন এবং উদাহরণ হিসাবে তিনি তাঁহার অনূদিত সূরাতুল আসর (১০৩ নং) ও সূরাতুল 'আদিয়াত (১০০ নং)- এর উল্লেখ করেন। আর স্বগতোক্তি ও উপাসনার উদাহরণ দিতে গিয়া তিনি যথাক্রমে সূরাতুল কারি'আহ (১০১ নং) ও সূরাতুল ফাতিহা (১ নং)-এর উদ্ধৃতি দেন। ১ মুইর অবশ্য স্বীকার করেন যে, এইগুলি "অসাধারণ শক্তিতে ও সৌন্দর্যে পূর্ণ শব্দাবলী” দ্বারা রচিত হইয়াছে। মুইর আরও বলেন যে, কখনও কখনও এই "দৈববাণী" সরাসরি ঈশ্বরের নিকট হইতে অবতীর্ণ হইয়াছে এবং ঈশ্বর নিজেকে "আমরা" এবং মুহাম্মাদকে "তুমি" হিসাবে সম্বোধন করিয়াছেন। এই সম্বোধন সম্পর্কে একটি উদাহরণ হিসাবে তিনি সূরা আত-তীন (৯৫ নং)-এর অনুবাদের উদ্ধৃতি দিয়াছেন।

তবুও মুইর মনে করেন যে, মুহাম্মাদ অনুপ্রেরণা দ্বারা এই দৃঢ় প্রত্যয় অর্জন করেন নাই, "একটি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক যন্ত্রণা" ভোগের পর তিনি ইহা লাভ করিয়াছিলেন। ইতোমধ্যে তিনি "ভর্ৎসনা ও ভীতির বাণী", যেমন সূরাতুল হুমাযাতে রহিয়াছে (১০৪), উচ্চারণ করেন বলিয়া কথিত হয়। তিনি আরব ও ইয়াহুদীদের প্রাচীন কাহিনী এবং তৎসহ "জাতীয় অলৌকিক

ঘটনাবলী” ও ভাবপ্রবণতা সম্পর্কে পরোক্ষভাবে উল্লেখ করেন। ইহাদের উদাহরণ দিতে গিয়া সূরাতুল ফা (৮৯ নং)-এর অংশবিশেষ এবং সূরাতুল ফীল (১০৫ নং) ও সূরাতুল কুরায়শ (১০৬ নং)-এর সম্পূর্ণটাই অনুবাদের মাধ্যমে উদ্ধৃত করিয়াছেন। মুইর বলেন, মুহাম্মাদ তখনও অন্ধের ন্যায় সত্য খুঁজিয়া ফিরিতেছিলেন এবং এই তথ্যের সমর্থনে সূরাতুল বালাদ (৯০ নং)-এর সম্পূর্ণটাই অনুবাদ সহকারে উল্লেখ করিয়াছেন।

মুইর-এর মতানুসারে মুহাম্মাদ-এর একজন “ঐশী শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বভার" গ্রহণের পূর্বে তিনি বেশ কয়েক বৎসর ধরিয়া তাঁহার "ভাবাবেগকে কবিতার মাধ্যমে” প্রকাশ করিতে থাকেন। এই সময়কালে একটি ক্ষুদ্র দল, যেমন ওয়ারাকা, আলী, খাদীজা ও আবূ বাক্র (রা) তাঁহার অনুসারী হিসাবে পরিগণিত হন বলিয়া উল্লেখ করা হইয়া থাকে। যেহেতু "মুহাম্মাদ নিজে লিখিতে জানিতেন না" তাই প্রথমোক্ত তিনজন একেবারে গোড়ার দিকের নাযিলকৃত সূরাগুলি লিখিয়া রাখিতেন। মুইর আরও বলেন যে, এই ক্ষুদ্র দলটির বাহিরে তাঁহার "সতর্কতাসূচক বাণী ও মৃদু ভর্ৎসনা লজ্জাকর অজ্ঞতা ও বিরক্তির অন্ধকারে" তলাইয়া যাইত। তাঁহার স্নেহশীল চাচা আবূ তালিব তাঁহার এইরূপ উৎসাহ দেখিয়া মৃদু হাসিতেন, তাঁহার আর এক চাচা আবু লাহাব তাঁহাকে উপহাস করিত। পক্ষান্তরে কুরায়শ সর্দার আবূ জাহল্ ও তাহার অনুচরবর্গ তাঁহাকে অবজ্ঞা প্রদর্শন করিত। আর সাধারণভাবে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা ছিল তাঁহার প্রতি "অমনোযোগী ও উদাসীন"।

মূইরের বর্ণনামতে, এইরূপ অবস্থায় একজন নবী হিসাবে আবির্ভূত হইবার প্রয়োজনীয়তার নিরীখে মুহাম্মাদ-কে আনয়ন করা হয় যখন তাঁহার ধর্মোপদেশ শুনিতে গিয়া জনগণের মধ্যে "অধিকতর সংবেদনশীল ব্যক্তিবর্গ উল্লেখ করে যে, তাহারা পবিত্র জীবনযাপন করিবে যদি তাহাদের মধ্যে একজন নবীকে প্রেরণ করা হয়, যেমন পূর্বে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছিল। এই বর্ণনার সমর্থনে মুইর কুরআনের ৩৫৪ ৪২ নং আয়াতের উদ্ধৃতি প্রদান করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ "প্রত্যুত্তর দানের" তাড়না অনুভব করেন। তিনি স্বীয় অন্তরে ইহার গভীর অনুসন্ধানে রত থাকেন যাহার দ্বারা তাঁহার দৃঢ় প্রত্যয়ের সৃষ্টি হয় যে, এই "দহনকর চিন্তার ধারা," "বাকপটুতার স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ এবং পবিত্র বক্তৃতা" যাহা তিনি এই যাবত প্রচার করিয়া আসিতেছিলেন তাহার সব কিছুই "একটি অলৌকিক আহ্বান, একটি ঐশী মিশন" পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা হয়। নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক মানসিক বিক্ষেপের ও গভীর বিষণ্ণতার এইরূপ একটি অবস্থায় মুহাম্মাদ আল্লাহ্র নিকট হইতে পুনঃ নিশ্চয়তা লাভের জন্য প্রার্থনা করেন যাহা আল্লাহ তা'আলা অতীতে তাঁহাকে দান করিয়াছিলেন এবং ইহা সূরা আদ-দুহা (৯৩ নং) ও সূরা ইনশিরাহ (৯৪ নং)-তে স্পষ্টীকৃত হইয়াছে। তৎসত্ত্বেও তাঁহার মানসিক পীড়ন এতই অসহনীয় হইয়া উঠে যে, তিনি কয়েকবার আত্মহত্যা করিবার ইচ্ছা পোষণ করেন। কারণ কুরআন ঘোষণা করিয়াছে যে, "আল্লাহ্ নামে মিথ্যা বলার" চাইতে ভয়ংকর পাপ আর কিছুই নাই। তাই

একদিন তিনি একটি খাড়া পাহাড়ের চূড়া হইতে নিজকে নিক্ষেপ করিবার এক হঠকারী চিন্তা করেন, কিন্তু কোন এক "অদৃশ্য" প্রভাব তাঁহাকে ইহা হইতে নিবৃত্ত করে। তিনি তখনও নিশ্চিত ছিলেন না যে, ঐ অদৃশ্য প্রভাবটি ঐশী অথবা শয়তানসুলভ ছিল কিনা। কিন্তু তাঁহার স্ত্রী খাদীজা (রা) "আত্মাকে পরীক্ষা করিয়া" তাঁহাকে নিশ্চয়তা দান করেন যে, তাঁহার "আগন্তুক” কোন দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন না, বরং 'নিষ্পাপ ও ধার্মিক' ছিলেন। ইহার পর ঐশী মিশনের প্রতি "উচ্চাকাঙ্খা মিশ্রিত বিশ্বাস" তাঁহার অন্তরে পুনঃ জাগরিত হয় এবং তিনি একটি একতাবদ্ধ জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন দেখিতে থাকেন যাহারা শপথ গ্রহণ পূর্বক প্রতিমা পূজা ত্যাগ করিবে। ১০ তিনি অবশ্য মূসা (আ) ও অন্যান্য ইয়াহুদী গোষ্ঠীপতিদের উদাহরণ সম্পর্কেও চিন্তা করেন এবং নিজের মধ্যে এই প্রত্যয় সৃষ্টি করেন যে, "শত্রুতা ও বিরোধে ক্লান্ত" সিরিয়া, পারস্য, মিসর, আবিসিনিয়া প্রভৃতি দেশের জনগণ তাঁহার নিকট দলে দলে আসিয়া মিলিত হইবে যদি তিনি নিজকে আল্লাহর নবী হিসাবে ঘোষণা করেন যাহা তিনি নিশ্চিতভাবে অনুভব করিতেছিলেন। ১১ শেষ পর্যন্ত তাঁহার দৃঢ় বিশ্বাস, যেমন মুইর বলেন, এক "পরম আনন্দদায়ক ভাবাবেশ” দ্বারা নিশ্চিত হয় এবং তিনি "কল্পনায় দেখিতে পান" যে, তিনি একটি মিশন প্রত্যক্ষ করিতেছেন। ১২ পবিত্র আত্মার প্রণোদনা দানকারী প্রভাবের জন্য তিনি অপেক্ষা করিতে থাকেন।

এইরূপ মানসিক অবস্থায় তিনি যখন হেরা পর্বতের চূড়ায় বসিয়া অথবা ইতস্তত ঘুরিয়া বেড়াইতেছিলেন তখন তাঁহার সম্মুখে "এক ছায়ামূর্তির আবির্ভাব ঘটে”। তাঁহার খুব "নিকটে ও স্পষ্টভাবে দৃষ্টির সম্মুখে" আসিয়া জিবরাঈল (আ) দাঁড়াইলেন এবং তাঁহার ও মুহাম্মাদ-এর মধ্যকার দূরত্ব "দুইটি ধনুকের সমান" ছিল। জিবরাঈল (আ) তাঁহার প্রভুর (আল্লাহ তা'আলা) নিকট হইতে সূরা আল-'আলাক-এর সেই স্মরণীয় নির্দেশ লইয়া আসেন। ১৩ মুইর "এইভাবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে", এইভাবে মুহাম্মাদ সন্দেহ ও দ্বিধার একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করিবার পর সর্বশক্তিমান আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে সরাসরি প্রতিবিধানাদির ব্যবস্থাসমূহ লাভ করেন। এখন হইতে ভবিষ্যতে তিনি আক্ষরিক অর্থে আল্লাহ্ নামে কথা বলিতে শুরু করেন। তিনি এই বিষয়ে এতই সতর্ক ছিলেন যে, কুরআনের প্রতিটি বাক্যের প্রারম্ভে আল্লাহ্র আদেশের বিষয়টি যুক্ত করা হইয়াছে এই বলিয়া: বলুন অথবা বল। এই আদেশ উল্লিখিত না হইলেও ইহা রহিয়াছে বলিয়া ধারণা করিয়া লওয়া হয়"। ১৪ ইহার পরও তাঁহাকে কবি, যাদুকর অথবা অপদেবতা ভর করিয়াছে বলিয়া উপহাস করা হয়। অতঃপর শেষ পন্থা হিসেবে তিনি তাঁহার উপর আরোপিত দায়িত্বের প্রতি নির্ভর করেন এবং হতবুদ্ধি হইয়া তিনি নিজে মোহগ্রস্ত হইয়া পড়েন। তাঁহার পোশাকাদি গায়ে জড়াইয়া তিনি পরম ভাব-বিহ্বল অবস্থায় আবিষ্ট হন। জিবরাঈল ফেরেশতা "নিকটেই” ছিলেন এবং সূরাতুল মুদ্দাছছির-এর পুনঃ সঞ্জীবিতকারী বাণী দ্বারা তিনি মহানবী-কে নৈরাশ্য হইতে জাগ্রত করিয়া "কর্ম উদ্দীপনায়” যুক্ত করেন। ১৫

মুইর দাবি করেন যে, কুরআন হইতে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে তিনি মহানবী-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে উল্লেখ করিয়াছেন। ১৬ তারপর আল-ওয়াকিদী প্রধানত

যে বিবরণ প্রদান করিয়াছেন মুইর তাহা পুনঃ উপস্থাপন করিয়া একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করিয়াছেন। আর তিনি ইহাকে প্রথাগত বিবরণ হিসাবে অভিহিত করিয়াছেন। উপসংহারে তিনি ওহী অবতীর্ণ হওয়ার ধরন ও প্রক্রিয়া সম্পর্কে মতামত দান করেন। ওহী অবতীর্ণ হওয়ার সময়কার অবস্থা সম্পর্কে বলিতে গিয়া তিনি ইহাকে মহানবী-এর "ভাবাবেশকর সময়” বলিয়া উল্লেখ করেন এবং বলেন যে, তাহা ছিল গভীর ধ্যানের ভাবাচ্ছন্নতা অথবা মুর্ছা যাওয়া যাহার সহিত শারীরিক বা মানসিক ধাচের এক অস্বাস্থ্যকর উত্তেজনা সম্পৃক্ত আছে। বিভিন্ন সময় বা অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই অবস্থার তারতম্য ঘটে। ১৭

এই সকল বিষয়ের নিহিতার্থ হইতেছে, মহানবী-এর স্বীয় মনন ও চিন্তা হইতে ওহী উদ্ভূত হইয়াছে। শুধু তাহাই নহে, ইহার সহিত তাঁহার মানসিক চেতনা ও গভীর ধ্যানের ফলাফল যুক্ত রহিয়াছে। ইহা মোটামুটি একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয়। মুইর তাই জিবরাঈল (আ)-এর দর্শনের বিষয়টিকে 'অপচ্ছায়া'১৮ অথবা 'ছায়ামূর্তি' হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন। তিনি মহানবী -এর ওহী প্রাপ্তিকে "ভাবাচ্ছন্নতা” ১৯ এবং ওহী গ্রহণকালে মহানবী কখনও কখনও যে শারীরিক কঠিন চাপ অনুভব করিতেন তাহাকে "ভাববিহ্বলতা" ২০ অথবা "মূর্ছা” ২১ ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন।

মুইর কর্তৃক ব্যক্ত মতামতের শেষ উল্লিখিত এই বিষয়টি তাহার অন্যান্য ধারণার একটি সম্প্রসারণ মাত্র। মহানবী-এর শৈশবকালের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি উপরিউক্ত ধারণা পোষণ করেন। তিনি বলেন যে, শৈশবকালে মহানবী সন্যাসরোগ অথবা মুর্ছারোগে আক্রান্ত হন। এই বিষয়টি লইয়া ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে। ২২ এইখানে শুধু ইহাই উল্লেখ কর। যাইতে পারে যে, পরবর্তী কালের লেখকগণ যদিও ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রসঙ্গে সন্যাসরোগ বা মৃগী রোগের দ্বারা আক্রান্ত হওয়া সম্পর্কিত ভাষা প্রয়োগ এড়াইয়া গিয়াছেন বলিয়া অনুমিত হয় তবুও মূল উপাদান হিসাবে ঈষৎ পরিবর্তিত আকারে তাহারা মতামত গ্রহণ করিয়াছেন। এই পরিবর্তিত বিন্যাসে তাহারা "আত্ম-সম্মোহন", "প্রত্যাদেশের জন্য প্ররোচনা" ইত্যাদি শব্দ প্রয়োগ করিয়াছেন।

আরও একটি অভিমত এইরূপ যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়া মহানবী-এর নিকট বাহির হইতে আসা কোন বিষয় নহে, বরং ইহা মহানবী-এর সচেতনতা ও ব্যক্তিত্ব হইতে উদ্ভূত হইয়াছে- সকল প্রাচ্যবিদের লেখনীতে এই অভিমত সাধারণভাবে প্রকাশ লাভ করিয়াছে। অতএব এই বিষয়টি লইয়া আলোচনা করা যাইবে যখন অন্যান্যদের মতামত ও যুক্তিসমূহ পর্যালোচিত হইবে। এখানে মুইর-এর অন্যান্য মতামতসমূহ আলোচিত হইতে পারে।

মুইর-এর প্রাথমিক ধারণা হইতেছে, মুহাম্মাদ উচ্চাকাংখী ছিলেন এবং একজন নবীর ভূমিকা পালনের জন্য তিনি সকল প্রকার প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিলেন। তবুও ইহা বলা হয় যে, অনুপ্রাণিত হওয়ার জন্য তাঁহার মধ্যে দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টি হয় নাই যতক্ষণ পর্যন্ত তিনি দীর্ঘ সময় ব্যাপী

"মানসিক যন্ত্রণায়” ভুগিয়াছেন এবং "সত্যানুসন্ধানে কঠোর সংগ্রামে" লিপ্ত হইয়াছেন। আরও বলা হয় যে, ঐশী শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে তিনি কয়েক বৎসর ধরিয়া তাঁহার 'ভাবাচ্ছন্নতার' প্রকাশ ঘটান। স্পষ্টত এই দুইটি প্রবল প্রচেষ্টাই পরস্পর বিরোধী। যদি মহানবী প্রকৃতপক্ষে উচ্চাকাংখী হইতেন এবং নবী হইবার জন্য পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে তাঁহার পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হইবার এবং স্বীয় কার্যক্রমে নিজকে স্থির করিবার পর পর্যন্ত তিনি তাঁহার পরিকল্পনা মাফিক কাজ করিতেন না। পক্ষান্তরে তাঁহার গভীর ধ্যান, ভাবাবেশ ও সত্যের জন্য সৎ প্রচেষ্টার কারণে যদি কোন মহৎ চিন্তা তাঁহার সম্মুখে স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট আকার ধারণ করিত তাহা হইলে মহানবী পূর্ব-পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি অনুসারে স্পষ্টতই কোন কাজ করিতেন না। বস্তুত মুহাম্মাদ-এর ধর্মোপদেশ শ্রবণকারী কিছু সংখ্যক অনুসারী যখন তাঁহাকে বলেন যে, যদি একজন নবী তাঁহাদের মধ্যে প্রেরণ করা হইত তাহা হইলে তাহারা এক বিশুদ্ধতর জীবন যাপন করিতে পারিত—মুইর-এর এই তত্ত্ব তাহার নিজেরই প্রদত্ত মহানবী-এর উচ্চাকাংখা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত তত্ত্বের পরস্পর বিরোধী।

প্রকৃত সত্য হইতেছে, বিষয়টি যেমন মোটেই কোন পূর্ব-পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির ফলাফল ছিল না, তেমনি তাহা গভীর ধ্যান ও ভাবাবেশপ্রসূত বিষয়ও ছিল না। অবশ্য মহানবী অবশ্যই নির্জনে ইবাদত ও গভীর ধ্যানে নিজকে নিয়োজিত রাখিতেন। তবে তিনি নাযিলকৃত ওহীর যে বিষয়বস্তু তাঁহার লোকদিগকে শুনাইতেন তাহা তাঁহার ধ্যানের কোন ফল ছিল না। তাঁহার নিকট ইহা ছিল সম্পূর্ণভাবে বাহিরের আরোপিত বিষয় এবং তিনি ইহার সম্বন্ধে পূর্বে যেমন কোনভাবে চিন্তা করেননি তেমনি তাঁহার কোন প্রত্যাশাও ছিল না। এই কারণে ঘটনার আকস্মিক পরিবর্তনে তিনি হতভম্ব ও ভীত-বিহ্বল হইয়া পড়েন এবং প্রথামিক পর্যায়ে তাঁহার এই নূতন অবস্থানের জন্য তিনি নিশ্চিত ছিলেন না। তাঁহার এই অনিশ্চয়তা সুস্পষ্টভাবে তাঁহার পক্ষে কোন পরিকল্পনা এবং উচ্চাকাঙ্খার অনুপস্থিতির কারণে ঘটিয়াছিল এবং ঘটনাবলীর আকস্মিকতায় ও অপ্রত্যাশিত অবস্থায় ইহার অভ্যুদয় ঘটে। ইহা আরও প্রমাণ করে যে, ওহী হিসাবে তিনি যে ঐশী আদেশ লাভ করেন তাহা তাঁহার চিন্তা বা গভীর ধ্যানের ফল ছিল না। কিন্তু তাঁহার প্রাথমিক অনিশ্চয়তা ও হতবুদ্ধিতার প্রকৃতি যাহাই হউক না কেন সেই অবস্থা সুনিশ্চিতভাবে "কয়েক বৎসর” ধরিয়া স্থায়ী ছিল না এবং ইহা ছিল প্রকৃতপক্ষে তাঁহার উপর প্রথম ওহী নাযিলের ফল এবং সেই সময়কার অবস্থার প্রতিফলন মাত্র। মহানবী-এর নিকট ওহী অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ও ইহার প্রাক-অবস্থা হিসাবে মুইর এই ফলাফলকে ব্যবহার করিয়াছেন। এইরূপে সকল উৎস গ্রন্থে ঘটনা সম্পর্কে যেভাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে তাহা সম্পূর্ণভাবে উল্টাইয়া দেওয়া হইয়াছে।

মুইর বলেন যে, মহানবী অনুপ্রাণিত হইবার জন্য দৃঢ় প্রত্যয় অর্জন করেন নাই যতক্ষণ পর্যন্ত না মানসিক অশান্তি ও অনিশ্চয়তার এক প্রলম্বিত সময় অতিবাহিত করেন এবং কয়েক বৎসর ধরিয়া “ঐশী শিক্ষক" হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন নাই। তবুও মুইর আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চেষ্টা করেন যে, মহানবী তৎসত্ত্বেও "তাঁহার ভাবধারা” অদ্ভূত কল্পনাশ্রয়ী ও

আবেগপূর্ণ ভাষায়, কবিতা ও অন্যবদ্ধ আবেগ বিহ্বল সঙ্গীতের "খণ্ড খণ্ড” রচনার মাধ্যমে প্রচার করেন এবং তাঁহার লোকদিগকে আল্লাহর বাণী গ্রহণের জন্য এমনভাবে আহ্বান জানান যে, কিছু সংখ্যক লোক তাঁহার অনুসারী হন। কিন্তু সাধারণভাবে কুরায়শ গোত্রের লোকেরা তাঁহাকে বিদ্রুপ ও তাঁহার বিরোধিতা করে। এখন এই বিবরণের যে কোন পাঠকের নিকট যে সকল প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবে উত্থাপিত হয় তাহা হইতেছে:

(ক) ইহা কি কল্পনীয় যে, একজন ব্যক্তি যিনি তাঁহার স্বীয় অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত নন এবং এমনকি তাঁহার প্রদত্ত বাণীর প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁহার কোন ধারণা নাই, তিনি একই সময়ে কিভাবে প্রকাশ্যে ধর্মান্তরণের জন্য আহ্বান জানান এবং ইহার ফলে অপমান ও বিরোধিতার মুখামুখি হন?

(খ) ইহা ধারণা করা কি যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, একদল লোক তাহারা যতই সংখ্যায় নগণ্য হউক না কেন তাঁহার আহ্বানে সাড়া দিবে যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁহার প্রচারিত বাণীর সত্যতা ও ঐশী উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হইবে এবং ধর্ম প্রচারকারী নিজেই বাণী ও ইহার প্রকৃতি সম্পর্কে যেখানে নিশ্চিত নন বলিয়া ধরা হয় সেখানে সেই ক্ষুদ্র দলটি কিভাবে সন্দেহের নিরসন করিবে?

(গ) এইরূপ চিন্তা করা কি যুক্তিসঙ্গত হইবে যে, কুরায়শ গোত্রের বৃহৎ জনগোষ্ঠী ধর্ম প্রচারকের বিরদ্ধে চলিয়া যাইবে যদি না তিনি তাঁহার নবুওয়াতের দাবি ও ধর্ম প্রচারের বিষয়ে আন্তরিক হন?

মুইর অবশ্য নিজেকে এই সকল স্বাভাবিক প্রশ্নের মুখামুখি দাঁড় করান নাই, কিন্তু তাহার পাঠকবর্গ এই সকল অযৌক্তিকতা গ্রহণ করিবেন বলিয়া তিনি আশা করেন।

একদিকে এই মতামতে অসঙ্গতির চূড়ান্ত পরিণতি এইভাবে বিদ্যমান যে, মুহাম্মাদ বেশ কয়েক বৎসর ধরিয়া দ্বিধান্বিত অবস্থায় এবং সত্যানুসন্ধানে রত না থাকা পর্যন্ত 'প্রভুর নামে' কোন আহ্বানের ঘোষণা প্রদান করেন নাই। অন্যদিকে এই বিবরণীতে সেই প্রারম্ভিক পর্যায়ে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে কখনও কখনও "ওহী” অবতীর্ণ হইয়াছে এবং সেখানে নিজকে 'আমরা' ও মুহাম্মাদকে 'তুমি' বলিয়া সম্বোধন করা হইয়াছে। এখন যে কেহ স্পষ্টতই বুঝিতে সক্ষম হইবে না যে, কিভাবে এই ধরনের মতামত পরবর্তীতে "প্রভুর নামে" প্রদত্ত মতামত হইতে ভিন্নতর হয়? বাস্তবিকপক্ষে মুইর-এর মূল অসঙ্গতি এই তথ্যের মধ্যে এমনভাবে অন্তর্নিহিত রহিয়াছে যে, উদাহরণ দিতে গিয়া তিনি সর্বাধিক ১৮টি সূরার উদ্ধৃতি দিয়াছেন যেইগুলি সম্পর্কে তিনি ধারণা করিয়া লইয়াছেন যে, ঐগুলি ওহী-পূর্ব অথবা মহানবী-এর প্রতি কুরআন নাযিল হওয়ার পূর্বেকার প্রদত্ত মতামত!

এই কাহিনীর মূল অযৌক্তিকতাকে বজায় রাখিবার উদ্দেশ্যে প্রকৃতপক্ষে এই সকল অসঙ্গতিকে লইয়া ভেলকিবাজি করা হইয়াছে। যেমন নবী হিসাবে নিজকে ঘোষণাদানের প্রয়োজনীয়তা মুহাম্মাদ-এর স্পষ্টত প্রতীয়মান হয় যখন তাঁহার ধর্ম প্রচারকালে প্রচারব "সবচাইতে

সন্দেহবাতিকগ্রস্ত লোক" সকল উল্লেখ করে যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টান সম্প্রদায়ের নিকট পূর্বে যেমন নবী আসিয়াছে তেমনি কোন নবী আবির্ভূত হইলে তাহারা বিশুদ্ধ জীবন যাপন করিবে। তাহার পর আমাদিগকে বলা হইয়াছে যে, মুহাম্মাদ তখন তাঁহার অবস্থানকে পুনর্বিবেচনা করেন এবং গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষার একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই দৃঢ় বিশ্বাসে উপনীত হন যে, তিনি এমনিভাবে অনুপ্রাণিত এবং শেষ পর্যন্ত জিবরাঈল (আ)-কে 'ধারণায়' আনয়ন করিতে সক্ষম হন যিনি তাঁহাকে "প্রভুর নামে" আবৃত্তি অর্থাৎ প্রচারের জন্য নির্দেশ দিতেছেন।

এখন একজন ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে চিন্তা করুন যিনি তাঁহার লোকদের নিকট একজন ধর্মপ্রচারক হিসাবে উপস্থিত হইয়াছেন এবং কয়েক বৎসর ধরিয়া ধর্ম প্রচারের পর, তাঁহার অধিকাংশ লোকদের বিরোধিতা ও উপহাস সহ্য করিবার পর তাহাদের কাহারও মন্তব্য শুনিতে হইয়াছে যে, যদি তাহাদের নিকট একজন নবী প্রেরিত হন তাহা হইলে তাহারা তাঁহার উপদেশ শুনিবে। সেই কারণে ধর্ম প্রচারক তাঁহার ভূমিকার পুনর্বিন্যাস সাধন করেন এবং তাঁহার লোকদের নিকট পুনঃ উপস্থিত হইয়া বলিতে থাকেন যে, তিনি আল্লাহ্র নিকট হইতে নবুওয়াত লাভ করিয়াছেন, তাই তাঁহাকে তাহাদের অনুসরণ করা উচিত। যাহার মধ্যে এক বিন্দু পরিমাণ সাধারণ জ্ঞান ও বুদ্ধি আছে সে কখনও এইরূপ বোকার মত কাজ করিয়া নিজকে হাস্যস্পদ করিয়া তুলিবে না। তবুও মুইর মহানবী-এর উপর এইরূপ অর্বাচীন ভাব আরোপ করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, তিনি বরং পাঠকদিগকে ইহা বিশ্বাসও করাইতে চাহিয়াছেন।

একদিকে প্রকৃত তথ্যের বিকৃতি সাধন ও ইহার সহিত অসত্যের মিশ্রণ ঘটাইয়া হাস্যকর গল্পের অবতারণা করা হয়, অন্যদিকে মূল পাঠের অপব্যাখ্যা করা হয়। প্রথমত, মুইর সুস্পষ্টভাবে সর্বজনবিদিত মূল বিষয়ের বিকৃতি সাধন করিয়াছেন। বিষয়টি হইতেছে, একটি বিশেষ অবস্থায় মহানবী যখন প্রথম ওহী লাভ করেন তখন তিনি যেভাবে বিস্ময়াভিভূত, শঙ্কিত ও অনিশ্চিত হইয়া পড়িয়াছিলেন তাহা মুইর বিকৃত করেন। তিনি মহানবী-এর বিস্ময়ে হতবাক হইয়াও অনিশ্চয়তার আশংকাকে ওহী নাযিলের বিরতি বা 'ফাতরাহ'-এর সময়ের সহিত ঘোলাইয়া ফেলিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে তাহার দ্বিতীয় বিকৃতি সাধন এই তথ্য সম্পর্কে সম্পন্ন হইয়াছে। তিনি এমন একটি ধারণা প্রদান করেন যে পর্যায়ে মহানবী তাঁহার নিজের মধ্যে সংগ্রামে রত ছিলেন বলিয়া দাবি করা হয় সেই পর্যায়কালের সহিত 'ফাতরাহ'-এর কালকে একই সময়ের আওতার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি সেই সময় এক প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে কালাতিপাত করিতেছিলেন যে, তিনি নিজকে নবী হিসাবে ঘোষণা করিবেন এবং প্রভুর নামে কথা বলিবেন কিনা তাহা লইয়া সংশয় ছিল। উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, অন্যান্য সকল বিবরণীতে ফাতরাহ-এর প্রকৃতি সম্পর্কে যেইভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে এবং মুইর আমাদিগকে যাহা বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন তাহা সম্পূর্ণরূপে ভিন্ন। যদিও ইহার স্থিতিকাল লইয়া বিবরণীসমূহে বিভিন্নতা রহিয়াছে, তবুও তাহা এক কথায় বলা যায় যে, এই সময়ে ওহী অবতীর্ণ হইবার একটি বিরতি ছিল

এবং ইহা ওহী অবতীর্ণ হইবার পূর্বেকার কোন সময় ছিল না। মহানবী এই সময়ে অবশ্যই ব্যাকুল ও অস্থির ছিলেন। কিন্তু সূত্র গ্রন্থসমূহে এমন কোন অভিমত ব্যক্ত করা হয় নাই যে, তাঁহার এই অস্থিরতা মানসিক উদ্বেগের কারণে সৃষ্টি হইয়াছিল এবং এই উদ্বেগ তিনি প্রভুর নামোল্লেখ করিয়া কোন প্রচার করিবেন কিনা তাহার সহিত সম্পর্কিত ছিল। তবুও মুইর এই বিষয়টির উপর অনধিকারযুক্ত ব্যাখ্যা দাঁড় করাইয়াই ক্ষান্ত হন নাই। তিনি ধরিয়া লইয়াছেন যে, এই সময়ে মহানবী মানসিকভাবে নিদারুণ যন্ত্রণা ভোগ করেন। তাঁহার মধ্যে এইরূপ চিন্তার উদয় হয় যে, আল্লাহ্ নামে কোন মিথ্যা বলিবার মত ভীষণ পাপ কাজে তিনি রত হইবেন কিনা এবং তিনি বেশ কয়েকবার আত্মহত্যা করিবার জন্য চিন্তাও করেন। মুইর এখানে এই প্রকৃত ঘটনারও বিকৃতি সাধন করেন।

কথিত আত্মহত্যার প্রচেষ্টা সম্পর্কিত বর্ণনা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য নহে, যেমন পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে। কিন্তু গল্পটি সত্য বলিয়া ধরিয়া লইলেও উৎস গ্রন্থসমূহে অথবা পণ্ডিতগণের মধ্যে এমন কোন অভিমত পাওয়া যায় না যে, কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কারণ নিহিত ছিল মহানবী-এর এইরূপ মানসিক উদ্বেগের মধ্যে যে, তিনি আল্লাহ্ নামে কোন মিথ্যা আরোপ করিয়া প্রচার করিবেন কিনা। তাঁহার উদ্বেগ ও মানসিক পীড়নের কারণ এই ছিল যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার মধ্যে যে স্বাভাবিক বিরতি থাকিত তাহা হইতে দীর্ঘতর বিরতি হইবার ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। ঘটনাক্রমে 'ফাতরাহ' সম্পর্কিত বিবরণী এবং মহানবী -এর এই বিষয়ে ব্যাকুলতা ও মানসিক চাপের সমগ্র বিষয়টি প্রকৃত তথ্যের চূড়ান্ত প্রমাণ যে, ওহীর বিষয়টি মহানবী -এর নিজের মধ্য হইতে উদ্ভূত হয় নাই অথবা ইহা সকপোল কল্পিত ছিল না।

প্রকৃত ঘটনার এইরূপ বিকৃতি সাধনের সহিত মূল পাঠের অপব্যাখ্যাকে মিশ্রিত করা হইয়াছে এবং এইরূপ বিভ্রান্তিকর বর্ণনা দ্বারা সিদ্ধান্ত টানা হইয়াছে যে, মহানবী -এর নবুওয়াত লাভ করিবার যেইসব পর্যায়ের বর্ণনা রহিয়াছে তাহা কুরআন হইতে "বিভিন্ন ইঙ্গিত” গ্রহণের দ্বারা সংগৃহীত হইয়াছে। ইহা অবশ্যই তাৎক্ষণিকভাবে উল্লেখ করা বাঞ্ছনীয় হইবে যে, মুইর যে সকল 'পদক্ষেপের' সন্ধান পাইয়াছেন মহানবী এর উদ্বেগ ও হতবুদ্ধিতা, কথিত আত্মহত্যা প্রচেষ্টার কাহিনী এবং 'ফাতরাহ'-এর ঘটনা অথবা ওহী অবতীর্ণ হইবার বিরতি ইত্যাদি, এই বর্ণনাসমূহে শুধু যাহা উল্লিখিত হইয়াছে তাহা আদৌ কুরআনের নহে। আর কুরআনের বর্ণনাসমূহ যাহা মুইর তাহার কল্পিত ধারণার সমর্থনমূলক সাক্ষ্য হিসাবে উল্লেখ করেন, তাহা মুইর-এর অপব্যাখ্যা ব্যতীত আর কিছুই নহে। মুইর-এর পক্ষে কুরআনের প্রথম উল্লেখযোগ্য অপব্যবহার হইতেছে-আল্লাহ তা'আলার নামে মিথ্যা বলার পাপ সম্পর্কিত বিবরণী। কুরআন অবশ্য সবচাইতে জঘন্য পাপ হিসাবে প্রকাশ্যে ইহার নিন্দা করিয়াছে এবং তাহা শুধু একবার নহে, কমপক্ষে দশটি স্থানে ইহার উল্লেখ রহিয়াছে। ২৩ এই সকল আয়াতের প্রতি সাধারণভাবে দৃষ্টি দিলে ইহা স্পষ্ট হইবে যে, কাফিরদের অভিযোগ খণ্ডন করিবার জন্য এই বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে

যেমন তাহারা বলিত, মহানবী তাঁহার লোকদের নিকট যাহা ঘোষণা করিতেন তাহা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ্র নিকট হইতে আসে নাই কিংবা কিতাবধারী কিছু লোকের রীতিকে প্রকাশ্যে নিন্দা করিয়াছেন যাহারা আল্লাহ্র আদেশ বলিয়া প্রচার করেন। মুইর ইচ্ছাকৃতভাবে কুরআনের এই বর্ণনা হইতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, মহানবী তাঁহার জীবনের একেবারে গোড়ার দিকে একটি প্রশ্ন সম্পর্কে নিজের মধ্যে সংগ্রাম করিয়া থাকিবেন। তাহা হইতেছে, তিনি আল্লাহ্ নামে কোন মিথ্যাচার করিবেন কিনা। কুরআনে এইরূপ ধারণা পোষণ করার কোন বিষয়ই নাই। এই ধারণা পোষণ করিয়া কার্যত মুইর কাফিরদের অভিযোগকেই গ্রহণ করিয়াছেন এবং পরোক্ষভাবে বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী যাহা ঘোষণা করিয়াছেন তাহা বাস্তবিকপক্ষে আল্লাহ্র নিকট হইতে অবতীর্ণ হয় নাই, যদিও তিনি নিজকে বিশ্বাস করাইয়াছেন যে, ইহা প্রকৃতপক্ষে তাহাই ছিল।

মুইর-এর দ্বিতীয় মারাত্মক অপব্যাখ্যাটি করা হইয়াছে ৯৩ নং (সূরা আদ-দুহা) ও নং ৯৪ (সূরা ইনশিরাহ) সূরাকে লইয়া। তিনি প্রমাণ হিসাবে হেরার উদ্ধৃতি দিয়াছেন যেখানে তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার মানসিক উদ্বেগ হইতে পরিত্রাণ লাভের জন্য যে কথিত প্রচেষ্টা গ্রহণ করেন তাহা হইতেছে-তিনি আল্লাহর নামে জনগণের মধ্যে মিথ্যাভাবে কোন প্রচার কার্য চালাইবেন কিনা এবং তিনি নিজকে এইভাবে নিশ্চিত করিয়াছেন যে, তিনি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহপ্রাপ্ত হইয়াছেন। উপরে উল্লিখিত দুইটি সূরা অবশ্য মহানবী-এর উপর আল্লাহ তা'আলার অনুগ্রহ রহিয়াছে ইহা স্মরণ করাইয়া দেয়। কিন্তু সূরা দুইটি নাযিল হওয়ার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে সূরা দুইটিতে অথবা বিবরণীতে কোন উল্লেখ নাই। অবশ্য ইহাতে বলিবার কিছু নাই যে, মহানবী তাঁহার উপর আল্লাহ তা'আলার অতীত অনুগ্রহের কথা স্মরণ করেন এবং তিনি মানসিক উদ্বেগ হইতে নিজকে মুক্ত করেন যাহাতে আল্লাহর নামে মিথ্যা কথা বলিতে না হয় অথবা নিজের মধ্যে এই প্রত্যয়ের সৃষ্টি করা যে, তিনি জনগণকে যাহা বলিতেছেন তাহা আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে লাভ করিয়াছেন। এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণভাবে মুইর-এর কল্পনাপ্রসূত যাহার কোন ভিত্তি কুরআন অথবা বিবরণীতে নাই।

কুরআনের ৩৫: ৪২ সংখ্যক আয়াত প্রসঙ্গে তৃতীয় অপব্যাখ্যাটি করা হইয়াছে। আয়াতে বলা হইয়াছে: "ইহারা দৃঢ়তার সহিত আল্লাহ্র শপথ করিয়া বলিত যে, ইহাদের নিকট কোন সতর্ককারী আসিলে ইহারা অন্য সকল সম্প্রদায় অপেক্ষা সৎপথের অধিকতর অনুসারী হইবে...."। ২৪ মুইর ইহা ধরিয়া লইয়াছেন যে, মহানবী যখন ধর্ম প্রচার করিতেছিলেন তখন কাফিররা তাঁহার নিকট এই প্রস্তাব করে এবং কাফিরদের এইরূপ মন্তব্যের কারণে তিনি নিজকে নবী হিসাবে ঘোষণা দানের বিষয় চিন্তা করেন। এইরূপ ধারণার প্রতি কোন সমর্থন কুরআন বা হাদীছে নাই। মহানবী -এর নিজের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হইবার পূর্বেই কোন ধর্ম প্রচারের কাজ চালাইয়া যাওয়ার চরম অযৌক্তিকতা সম্পর্কে ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। এখানে উল্লেখ্য যে, উদ্ধৃত বিবরণীটি কিছু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় কুরায়শ কর্তৃক বর্ণিত

হইয়াছে এবং তাহা মহানবী-এর প্রতি আরোপ করা হয় নাই, বরং এই দৃশ্যপটে তাঁহার উপস্থিত হইবার বহু পূর্বেই এবং এইরূপ বর্ণনার প্রতিক্রিয়াস্বরূপ ইহা তাহাদের নিকট পৌঁছিয়াছিল যেখানে ইয়াহুদী ও খৃস্ট সম্প্রদায়ের লোকেরা তাহাদের নবীদের সহিত মিথ্যাচার এবং নবীদিগকে অমান্য করিয়াছিল। ২৫

সর্বশেষে মুইর সম্পূর্ণরূপে ভুল বুঝিয়াছেন অথবা সূরা আল-'আলাক-এর প্রথম আয়াতকে ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছেন। তিনি ধরিয়া লইয়াছেন যে, যেহেতু এই আয়াত মহানবী-এর প্রতি আদেশ, “পড় তোমার প্রভুর নামে", ইহার পূর্বে তিনি নিশ্চয়ই তাঁহার মতবাদ প্রচার করিয়া থাকিবেন এবং তাহা প্রভুর নামে ছিল না! বাস্তবিকই ইহা এই আয়াতের এবং উপরোল্লিখিত ৩৫ ৪২ নং আয়াতের একটি মস্তবড় অপব্যাখ্যা। ইহার উপর ভিত্তি করিয়া মুইর তাহার তত্ত্ব দাঁড় করাইয়াছেন যাহাকে তিনি পর্যায় বা পদক্ষেপ নামে অভিহিত করিয়াছেন। তাহার মতে, মুহাম্মাদ ইহার প্রেক্ষিতে একজন ঐশী শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেন। আর এই তত্ত্বকে টিকাইয়া রাখিবার জন্য তিনি ধারণা করিয়া লইয়াছেন যে, আল্লাহর নিকট হইতে নবুওয়াত লাভ ও ওহী প্রাপ্তির দাবি করিবার পূর্বে মুহাম্মাদ অন্যূন ১৮টি অথবা ততোধিক সংখ্যক সূরার ঘোষণা প্রদান করেন।

মুইর উদ্ধৃত কুরআনের আয়াতসমূহ সম্পর্কে কোন ব্যক্তি যে ধারণাই পোষণ করুন না কেন ইতোপূর্বে উল্লেখিত তাহার তত্ত্বের নানা বিষয়ের চরম অসামঞ্জস্যতা ও অসঙ্গতিসমূহ সম্পূর্ণরূপে অসমর্থনীয় বলিয়া প্রতিপন্ন হইয়াছে। তাহা সত্ত্বেও মুইর-এর মতামতসমূহ তাহার উত্তরাধিকারী প্রাচ্যবিদগণ কর্তৃক যে কোন একটি রীতিতে গৃহীত হইয়াছে। এখানে লক্ষণীয় যে, ওহী-পূর্ব আমলের অথবা মহানবী কর্তৃক প্রাক-কুরআন মতামত প্রদানের সময়কার তাহার তত্ত্ব বেল পুনর্ব্যক্ত করিয়াছেন, যদিও তাহা ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে করা হইয়াছে। পক্ষান্তরে মুইর তত্ত্বের মূল মুখবন্ধের সহিত মহানবী-এর কর্মজীবনের ধারা ও মতবাদের ক্রমান্বয় অগ্রগতিকে ওয়াট গ্রহণ করিয়া একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে লইয়া গিয়াছেন। কিছু পরেই ইহা দেখা যাইবে যে, ওয়াটের মতে মহানবী এক আল্লাহ্ ইবাদত সম্পর্কে কোন সুস্পষ্ট ধারণা লইয়া প্রথমে আরম্ভ করেন নাই, বরং চার অথবা পাঁচ বৎসর ধরিয়া একটানা প্রচারকার্য চালাইবার পর ইহা ক্রমান্বয়ে তাঁহার নিকট গৃহীত হয়। কিন্তু মুইর-এর অব্যবহিত পরের বুদ্ধিজীবী উত্তরাধিকারী মারগোলিয়থ কি মতামত পোষণ করেন তাহা প্রথমে বিবেচনা করা যাইতে পারে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: মারগোলিয়থের ধারণাসমূহ

📄 দুই: মারগোলিয়থের ধারণাসমূহ


মুইর-এর ন্যায় মারগোলিয়থ ওহী সম্পর্কিত বিষয়ের উপর যে আলোচনা করিয়াছেন তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ-এর উচ্চাকাংখা ও পরিকল্পনার একটি সম্প্রসারিত মূল ভাবধারা মাত্র। কিন্তু মারগোলিয়থ সম্ভবত মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ লক্ষ্য করিয়া তাহা পরিহার করেন যদিও এই বিষয়টির উপর আলোচনাকালে তিনি নূতন করিয়া অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতার মধ্যে নিজকে
নিপতিত করিয়াছেন। তিনি সরাসরি ধারণা করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ অতিমাত্রায় উচ্চাকাংখী হইয়া যে ভূমিকা পালন করিতে চাহেন তাহার জন্য নিজকে সতর্কতার সহিত প্রস্তুত করেন এবং যখন তাঁহার পরিকল্পনাসমূহ সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় তখন তিনি খুবই দক্ষতার সহিত তাহা বাস্তবায়ন করেন। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, ওহী সংক্রান্ত সমগ্র বিষয়টি ছিল প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত "ছলনা" ও "প্রতারণা” মাত্র। এইরূপ দাবি করা হয় যে, মুহাম্মাদ তাঁহার পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য জগত হইতে বাণী সংগ্রহ করিয়া তাহা প্রচারের একটি "মাধ্যম" ২৬ হিসাবে স্বীয় ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁহার সাফল্য নিশ্চিত করিবার জন্য তিনি ঐ সকল সংগৃহীত বাণীর "আকার" ও "বিন্যাস" এবং প্রক্রিয়াকে এমন কৌশলে উপস্থাপন করেন যে, তাহা যেন কোন "অতিপ্রাকৃতিক উৎস" হইতে আবির্ভূত হইয়াছে। ২৭ এইরূপে একটি ঐশী প্রত্যাদেশ উপস্থাপন করিতে গিয়া, মারগোলিয়থের ভাষায, তিনি সহজাত প্রেরণায় এক “প্রচণ্ড উত্তেজনার” মধ্যে পতিত হইতেন। তখন তাঁহার মুখমণ্ডল নীল বর্ণ ধারণ করিত২৮ এবং তিনি কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃত করিয়া ফেলিতেন। ইহার ফলে তাঁহার শরীরে প্রচুর ঘাম সৃষ্টি হইত এবং তাঁহার এই অবস্থায় বাণী প্রস্তুত থাকিত। ২৯ কম্বল দ্বারা নিজকে এইভাবে আবৃত করার অভ্যাস তিনি "প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত" বজায় রাখিয়াছেন বলিয়া বলা হইয়া থাকে। ৩০ আরও দাবি করা হয় যে, মহানবী "কোন এক সময়ে" মৃগী রোগের খিচুনি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, কোন প্রকার "সামান্যতম প্রস্তুতি" ব্যতিরেকে "নাক ডাকা ও মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ” করিয়া তিনি "কৃত্রিমভাবে" এই খিচুনি তৈয়ারী করিতেন। ৩১
মারগোলিয়থ বলেন যে, এইরূপ অবস্থাকে প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির "স্বাভাবিক অবস্থা হিসাবে স্বীকার করিয়া" লওয়া হইয়াছে। ৩২ মহানবী এই বিষয়ে এতই সুদক্ষ ছিলেন বলিয়া কথিত হয় যে, মারগোলিয়থের মতে "তিনি যখন আহার করিতেন সেই সময়ে তাঁহাকে সম্বোধনকৃত কোন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার কালে তিনি ঐশী আদেশ লাভ করিতেন। জবাব দেওয়া সমাপ্ত হইলে তিনি আহার পর্ব সমাধা করিবার জন্য অগ্রসর হইতেন। কিন্তু তিনি বাধাগ্রস্ত হইলে এই খাবার তাঁহার হাতে ধরা থাকিত অথবা তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়ান অবস্থায় তাঁহাকে কোন প্রশ্নের জবাব দানকালে ওহী অবতীর্ণ হইত"। ৩৩
ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থ তাহার প্রিয় পক্ষপাতপূর্ণ তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি করেন যে, মহানবী -এর প্রচুর পরিমাণে কথা বলিবার না থাকিলে তিনি "ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের উপর নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের" সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৩৪ কথিত হয় যে, তিনি ইহাকে মু'জিযা হিসাবে দাবি করেন-তিনি যে কিতাব কখনও পাঠ করেন নাই তাহার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি অবহিত আছেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি বলিয়াছেন যে, "তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতার মধ্যে এই মু'জিযার রহস্য নিহিত রহিয়াছে"। ৩৫ যাহা হউক, মারগোলিয়থ বলেন যে, একেবারে গোড়ার দিকে অবতীর্ণ ওহীর খণ্ডাংশসমূহ কুস্স ইবন সাইদা-এর ন্যায় ধর্মীয় বিষয়ে পুনরভ্যুদয়ের সমর্থকদের ধর্মীয় বাণী উচ্চারণের অনুকরণ ভিন্ন আর কিছুই নহে। ৩৬ আরও দাবি করা হয় যে,
মহানবী স্বাভাবিক আরবী বাগ্মিতার ধরনকে অনুকরণ করেন যাহা কিছু পরিমাণে কবিতার অনুরূপ কিন্তু ইহার প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁহার কমই জানা ছিল। ৩৯
ছলনা ও প্রতারণার মূল সুরটিকে বিশদ করিবার জন্য মারগোলিয়থ মহানবী-এর চরিত্র ও সততার স্বীকৃত বিশুদ্ধতাকে হেয় করিবার অপচেষ্টা গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি আধ্যাত্মিকতার উপর লিখিত F. Podmore-এর গ্রন্থের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, একজন সম্মানিত ব্যক্তি একই সময়ে তাহার অনুসারীদিগকে ধাঁধাঁ লাগাইয়া দিতে এবং তারপর তাহার "কৌশল” দেখাইতে পারে। মারগোলিয়থ বলেন, "Podmore-এর অবধারণা অনুযায়ী মুহাম্মাদ একই প্রকার সুবিধা লাভ করিয়াছেন এবং তাহার ফলে অনুগামীদের হৃদয় জয় করিয়াছেন"। ৩৮ তৎসত্ত্বেও মারগোলিয়থ বলিতে থাকেন যে, মহানবী-এর একজন ওহী লেখক "এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, সে ইহাকে প্রতারণা বলে এবং ফলে ইসলাম ধর্ম প্রত্যাখ্যান করে"। ৩৯ যাহাই ঘটুক না কেন মারগোলিয়থ উপসংহারে বলেন যে, "অতিপ্রাকৃত প্রত্যাদেশের রাজনৈতিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে কোন মাধ্যমের আন্তরিকতা"র খুব কমই গুরুত্ব রহিয়াছে। ৪০
ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভ প্রসঙ্গে মারগোলিয়থ বলেন যে, অনুকূল মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকা মহানবী-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই অধিকাংশ "মাধ্যমের" ন্যায় তিনি "পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যস্থিত ক্রান্তিকালের সদ্ব্যবহার করেন"। ৪১ মর্মন (Mormon) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা যোসেফ স্মিথ-এর সহিত একটি উপমা উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়, তিনি প্রথমে বনে-জঙ্গলে পরিভ্রমণরত ছিলেন। তারপর লোকালয়ে উপস্থিত হইয়া ভাবাবিষ্ট অবস্থায় তিনি বিভিন্ন বাণী উচ্চারণ করেন এবং ঘোষণা দান করেন যে, দেবদূত কর্তৃক এই ঐশীবাণী তাহার নিকট প্রেরিত হইয়াছে। মারগোলিয়থ ইহা উল্লেখ করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির জীবন নির্জনতার মাধ্যমেই শুরু হইয়াছিল। মারগোলিয়থ বলেন যে, বৎসরের একটি নির্দিষ্ট মাস ধরিয়া মক্কাবাসিগণ 'তাহান্নুছ' নামে অভিহিত একটি ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত। ইহা ছিল এক ধরনের কঠোর তপশ্চর্যা। এই মাসে "মুহাম্মাদ হেরা পর্বতের একটি গুহায় অবস্থানের একটি নিয়ম পালন করিতেন"। উক্ত মাসের কোন এক সময়ে তিনি যখন হেরা পর্বতে একাকী অবস্থান করিতেছিলেন তখন "দেবদূতের (অথবা ইহার তুল্য কোন কিছুর) আবির্ভাব ঘটে” যাহাকে তিনি ঐশীদূত বলিয়া আখ্যায়িত করেন। মারগোলিয়থ আরও বলেন যে, এই বিষয়ে হাদীছের বর্ণনানুযায়ী জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ ঘটে। এই ফেরেশতাই বার্তা প্রদান করিতেন বলিয়া নিউ টেস্টামেন্টে (New Testament) উল্লেখ আছে। কিন্তু "কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নিজেই পৃথিবীতে নামিয়া আসেন” বলিয়া প্রতীয়মান হয় এবং তিনি মহানবী হইতে দুইটি ধনুকের পাল্লারও কম দূরত্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারপর তিনি মহানবীকে সম্বোধন করেন। মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী -এর ধর্মতত্ত্বের উন্নয়নের কারণে পরবর্তী কালে জিবরাঈল স্থলাভিষিক্ত হন। ৪২
ওহী এবং মহানবী-এর একজন ধর্মীয় শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ সম্পর্কে মারগোলিয়থের ইহাই প্রধান অভিমত। মহানবী-এর উচ্চাকাংখা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত মূল ভাবধারা হিসাবে মুইর যাহা উল্লেখ করেন মারগোলিয়থ তাহাই স্পষ্টভাবে গ্রহণ করিয়াছেন এবং মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ পরিহার করিয়া তাহার পরবর্তীতে ব্যাপ্তি দান করেন। তিনি মৃগীরোগ ও "ভাবাবেশ” সংক্রান্ত দাবিকেও গ্রহণ করেন এবং ইহাকে তিনি মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণা তত্ত্বের সহিত সংযুক্ত করিবার প্রয়াস পান। ইহা করিতে গিয়া তিনি বলেন যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে এই সকল লক্ষণ তৈয়ার করিতেন। সর্বোপরি মুইর যেভাবে স্বীয় মতামত পেশ করিয়াছেন মারগোলিয়থও তেমনি জোর দিয়া বলিয়াছেন যে, কুরআনের মূল পাঠ অথবা সাধারণভাবে ঐশী প্রত্যাদেশসমূহ মহানবী-এর নিজস্ব রচনা। সকল প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনায় মারগোলিয়থের পূর্বসূরী যে পথ তৈয়ার করিয়া গিয়াছেন তাহা হইতে তিনি সরিয়া আসেন নাই। তবে তিনি অবশ্যই তাহার কিছু নূতন ধারণা ইহার সহিত সংযুক্ত করিয়াছেন যাহা বর্তমানে বিবেচনা করা হইবে।
যাহা পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, একদিকে উচ্চাকাংখা ও নবীর প্রস্তুতির এবং অন্যদিকে মৃগীরোগের অভিযোগ। এই দুইটি অভিযোগের কথা বাদ দিলেও মারগোলিয়থের প্রধান অভিযোগ হইতেছে মহানবী-এর প্রতারণা। তাহার মতে মহানবী প্রত্যাদেশের গঠন, বিন্যাস ও ধরনকে এমনভাবে পরিকল্পনা করিয়াছেন যে, ইহা যেন কোন অতিপ্রাকৃত উৎস হইতে উদ্ভূত হইয়াছে বলিয়া মনে হইবে। এমনকি ইহাও বলা হইয়াছে যে, মহানবী-এর জীবনের গোড়ার দিকে কথিত মৃগীরোগের যে খিচুনি হইত সেই দৃশ্য হইতে মহানবী তাঁহার সংকেতসূত্র গ্রহণ করিয়াছেন এবং তারপর তিনি ঐ সকল দৃশ্য-যেমন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় পতিত হওয়া, নাক ডাকা ও মুখমণ্ডলের রক্তিমবর্ণ ধারণ, প্রচুর পরিমাণ ঘাম নিঃসরণ অথবা কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃতকরণ প্রভৃতির পুনর্গঠন করিয়াছেন। আরও বলা হইয়াছে যে, "অনুপ্রেরণার স্বাভাবিক ধরন হিসাবে ইহাকে স্বীকৃতি দানের" জন্য আনয়ন করা হইয়াছে। কিন্তু মারগোলিয়থ যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেইগুলির মধ্যে পারস্পরিক সঙ্গতি নাই, বরং মহানবী-এর নিকট ওহী নাযিল হওয়ার বিভিন্ন ধরনের উল্লেখ রহিয়াছে। এই সকল প্রক্রিয়ার (ধরনের) অধিকাংশ স্পষ্টতই প্রতারণার তত্ত্বের সহিত খাপ খায় না। তাই:
(ক) ওহী নাযিল হওয়ার আরম্ভ সম্পর্কে এবং তত্ত্বটি প্রমাণ করার জন্য ইহা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারিত বলিয়া মারগোলিয়থ স্বীকার করেন যে, মহানবী হেরা উপত্যকায় সম্পূর্ণ একাকী থাকিবার অবস্থায় ওহী লাভ করেন। সেখানে ওহী নাযিল হওয়ার ধরন ও প্রণালী সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার আর কেহই উপস্থিত ছিল না। অবশ্য মারগোলিয়থ যেমন দাবি করেন নাই তেমনি উৎস গ্রন্থসমূহেও কোন ইঙ্গিত নাই যে, ওহী নাযিল হওয়ার সময় ভাবাবিষ্ট ইত্যাদি হওয়ার ন্যায় কোন লক্ষণ দেখা যায় নাই।
(খ) মহানবী যখন আহার করেন অথবা মসজিদের মিম্বরে দাঁড়াইয়া যখন ভাষণ দেন সেই অবস্থায় তাঁহার উপর ওহী নাযিল হওয়ার উদাহরণের উল্লেখ করেন। এই সকল ক্ষেত্রে উদ্ধৃত বর্ণনাসমূহে প্রকৃতপক্ষে উল্লেখ পাওয়া যায় না যে, মহানবী নাক ডাকা, মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ, ভাবাবেশে মগ্ন হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলেন।৪৩ অধিকন্তু এই সকল উদাহরণের সহিত কুরআনের ওহী নাযিলের কোন সম্পর্ক নাই। মহানবী সময়ে সময়ে অন্যান্য ধরনের যে সকল ওহী লাভ করিতেন তাহার সহিত কুরআনের ওহীকে সর্বদা স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করিতে হইবে।
. (গ) মারগোলিয়থ আরও দাবি করেন যে, মহানবী তাঁহার মিত্রদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালন অথবা তাঁহার অনুসারীদের কিছু সংখ্যককে তাঁহার পক্ষে জিবরাঈলের সহিত আলোচনাকারীর ভূমিকা পালনের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।৪৪ এইরূপ দাবি সম্পূর্ণরূপে অসমর্থনীয়। কিন্তু জিবরাঈল সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি রহিয়াছে তাহাতে সুস্পষ্টভাবে এই পরোক্ষ উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হইয়াছে যে, জিবরাঈল কখনও কখনও মানুষের অবয়বে আবির্ভূত হইয়া মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেন। তিনি যেমন একজন বহিরাগত ব্যক্তি অথবা মহানবী-এর সাহাবী দিয়া আল-কালবীর বেশে উপস্থিত হন। যাহাই হউক না কেন, জিবরাঈলের এই অবয়ব ধারণ কুরআনের মূল পাঠের অতিপ্রাকৃত উৎস সম্পর্কে দর্শনকারীদের কোনমতেই সন্তুষ্ট করিতে পারে না। ইহা ছিল কথিত প্রতারণা তত্ত্বকে প্রকাশের একটি কৌশল মাত্র। কারণ জibraঈল যে ব্যক্তির কথিত রূপ ধারণ করিবেন তাহাকে মহানবী-এর সহিত অধিকাংশ সময় অবস্থানকারী সাহাবীগণ (অনুসারীবৃন্দ) ছাড়িয়া দিবেন না, ইহাই স্বাভাবিক ছিল। এই সকল ক্ষেত্রেই মহানবী-এর কৃত্রিমভাবে মুর্ছা যাওয়াকে ভাবাবিষ্ট হইবার "স্বাভাবিক আচরণ বলিয়া দাবি করা হয়"। এইভাবে মারগোলিয়থ নিজে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন তাহা কোন মতেই মহানবী -এর পক্ষে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণের দাবিকে সত্য বলিয়া প্রমাণ করে না।
দ্বিতীয়ত, মহানবী-এর নির্জনে ইবাদত ও হেরা পর্বতের গুহায় একাকী অবস্থান (তাহান্নুছ) সম্পর্কে মারগোলিয়থ যে ধারণা পোষণ করেন তাহাতে অসঙ্গতি রহিয়াছে। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, অধিকাংশ “মাধ্যমের" ন্যায় মহানবী ইহাকে পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যবর্তী একটি ক্রান্তিকাল হিসাবে পরিকল্পনা করেন। যাহা হউক, একই তত্ত্বে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মক্কাবাসীরা প্রতি বৎসর রমযান মাসে এই ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত এবং এই মাসে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে অবস্থান করা মুহাম্মাদের অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। এখন মক্কাবাসীদের রমযান মাসে তাহান্নুছ পালন সম্পর্কিত বর্ণনা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে।৪৫ কিন্তু এই প্রশ্নকে একপাশে সরাইয়া রাখিয়া মারগোলিয়থের ন্যায় এইরূপ ধারণা পোষণ করা স্পষ্টতই পুরাতন জীবন পরিত্যাগ করিয়া নূতন ধরনের জীবনে সন্নিবিষ্ট হইবার জন্য তাহান্নুছ -এর সময়কে একটি পরিকল্পিত ক্রান্তিকাল হিসাবে অভিহিত করা অসঙ্গত হইবে। একই সঙ্গে
ইহাও বলা সঙ্গত হইবে না যে, হেরার গুহায় তাহানুছ পালনকালে মহানবী প্রতি বৎসর মক্কাবাসীদের পালনকৃত ধর্মানুষ্ঠানকে অনুসরণ করিয়া চলিতেন। প্রকৃত ঘটনা এই যে, মারগোলিয়থ এখানে আর একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারণা দ্বারা নিজকে আবদ্ধ করিয়া ফেলিয়াছেন। যেমন, মহানবী নবুওয়াত লাভের পূর্বেই পৌত্তলিক মক্কাবাসীদের ধর্মকে অনুসরণ করিতেন এবং এমনকি তিনি তাহাদের দেব-দেবীদের উপাসনা পর্যন্ত করিতেন। ৪৬ মারগোলিয়থ এই ভ্রান্ত ধারণায় এতই মুগ্ধ হইয়া পড়েন যে, তিনি অসতর্কভাবে ইহা এখানে উপস্থাপন করেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করিয়া দেখেন নাই যে, তাহার ধারণামতে মহানবী কর্তৃক পরিকল্পিত ক্রান্তিকালের মতবাদের সহিত ইহা সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গতিপূর্ণ। মারগোলিয়থ তাহার উপরোল্লিখিত ধারণামতে এখানে যে কষ্ট কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন তাহা তাহার সংযোজনকৃত তথ্য হইতে স্পষ্ট হইয়া উঠে। তিনি বলেন, "মহানবী তাঁহার পরিবারবর্গকে তাঁহার সহিত লইয়া যাইতেন বলিা অনুমিত হয়; তবুও সম্ভবত তাহাদের আল-লাত অথবা আল-'উযযা-এর দৈনন্দিন পূজা-অর্চনার কাজটি এইরূপ অবস্থায় সম্পাদিত হইত না"। ৪৭ ইহাতে অবশ্যই পুনর্বার জোর দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী এবং তাঁহার পত্নী কখনও তথাকথিত আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করেন নাই এবং পূর্বে যেভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে৪৮ তাহা এই প্রসঙ্গে মারগোলিয়থের বর্ণনা সংশ্লিষ্ট হাদীছের অর্থ না বুঝিয়া একটি চরম ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যাহা হউক, এখানে তিনি কার্যত তাহার একটি ভ্রান্ত ধারণাকে আর একটির বিপক্ষে দাঁড় করাইয়াছেন।
ওহীর ভাষা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুরূপ অসঙ্গতি মারগোলিয়থের ধারণাকে পরিব্যাপ্ত করিয়া ফেলিয়াছে। এইভাবে তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতাকে একটি মু'জিযা ৪৯ হিসাবে দাবি করেন। ইহার পর মারগোলিয়থ আরও কিছু দূর অগ্রসর হইয়া বর্ণনা করেন যে, সাধারণ আরববাসী কবিতার ছন্দে যে বাকপটুতা প্রদর্শন করিত তিনি (মহানবী )কেবল তাহারই অনুকরণ করিতেন, "যদিও তিনি ইহার অর্থ বুঝিতেন না"। ৫০ পুনশ্চ ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থের পর্যবক্ষেণ এই যে, মহানবীকে ইহার জন্য ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের আসমানী কিতাবের উপর নির্ভর করিতে হইত এবং এই বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ না করা পর্যন্ত তিনি উক্ত কিতাবসমূহের সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৫১ মারগোলিয়থ তাহার ধারণাকে বিশদীকৃত করিয়া আরও বলেন, "মুহাম্মাদ যখন রাষ্ট্রের কর্ণধার তখন তাঁহার অনেক কিছুই বলিবার ছিল, কিন্তু তাঁহার জীবনের প্রারম্ভে বিদ্যমান অবস্থা তাঁহাকে অনুরূপ কোন ভূমিকা গ্রহণ করিতে দেয় নাই"। অতএব "তিনি পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে তথ্য ধার করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন"। ৫২
* ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য ধার করিবার অভিযোগটি পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৩ এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থ কার্যত আর একটি চরম অসঙ্গতি দ্বারা এখানে তাঁহার স্বীয় অভিমতকে বাতিল করিয়াছেন। এইরূপে
উপরিউল্লিখিত মন্তব্য করিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁহার সম্পূর্ণ মত পরিবর্তন করেন এবং বলেন যে, মহানবী ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য আহরণের এই "নিরাপদ পদ্ধতি” অবলম্বন করেন যখন তিনি ক্রমবৃদ্ধিগত পরিমাণে প্রত্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করিতে অবস্থাগত কারণে বাধ্য হন। কিন্তু একেবারে গোড়ার দিকের প্রত্যাদেশের টুকরা টুকরা অংশসমূহ কুস্স ইবন সা'ইদা ৫৪-এর ন্যায় পুনরুজ্জীবনবাদী ধর্মপ্রচারকের উক্তিসমূহের অনুকরণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। এইরূপে এক নিঃশ্বাসে মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে প্রয়াস পাইয়াছেন যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে যখন মহানবী-এর তেমন বেশি কিছু বলিবার ছিল না তখন তিনি ইয়াহুদী -খৃস্টানদের কিতাব হইতে প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত বিষয়ে সাহায্য গ্রহণ করিতে পারেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং তিনি যথেষ্ট পরিমাণে কথা বলিতে পারেন। তারপর পুনঃ আমাদের বিশ্বাস করিতে হয় যে, মহানবী হয়ত এই "নিরাপদ পদ্ধতি" অবলম্বন করেন যখন অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং ইহা তাঁহার জন্য আবশ্যক হয় যে, তিনি বেশি পরিমাণে প্রত্যাদেশ প্রকাশ করিতে পারেন! মারগোলিয়থের পক্ষে একটি সতর্কতা অবলম্বনের কারণে এই অসঙ্গতির সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে যে, তথাকথিত একেবারে প্রথম প্রত্যাদেশের "খণ্ডাংশসমূহ” প্রকৃতপক্ষে পুরাতন ও নূতন বাইবেলের বিষয়বস্তুর সহিত তেমন কোন সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না এবং কুরআনের যে অংশসমূহের সহিত ইহাদের যে কোনভাবে একটি মিল রহিয়াছে তাহা মহানবী -এর নিকট প্রাথমিক পর্যায়ের ওহী ছিল না। কুস্স সম্পর্কিত ক্ষুদ্র কাহিনী প্রসঙ্গে এবং উকায মেলায় তাহার সহিত মহানবী-এর কথিত বাক্যালাপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে যাহা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৫৫ কিন্তু এমনকি এই বর্ণনাটিকে যদি সত্য বলিয়া গ্রহণ করা হয় তাহা হইলেও তাহার এই কথিত কথাবার্তার সহিত প্রথমদিকে নাযিলকৃত সূরাসমূহের সাদৃশ্য খুবই ক্ষীণ। পক্ষান্তরে প্রাথমিক পর্যায়ের সূরাসমূহের বিষয়বস্তুর একটি ক্ষুদ্র অংশেরও তাহাদের আলোচনার সহিত সাদৃশ্য দেখা যায় না।
প্রচুর পরিমাণে তথ্য বিকৃতি দ্বারা এই সকল অসঙ্গতির উপর প্রলেপ দেওয়া হইয়াছে এইভাবে মহানবী-এর উপর লিখিত উৎস গ্রন্থসমূহের যে সকল উদাহরণ দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী ওহী লাভ করিবার সময় শারীরিক কষ্টের অভিজ্ঞতা লাভ করেন-এই তথ্যটি তাঁহার মধ্যে মৃগীরোগের লক্ষণ রহিয়াছে বলিয়া বিকৃত করা হইয়াছে। এই রোগ সম্পর্কে যাহাদের ধারণা আছে তাহারা অবগত আছেন যে, ইহা রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর কিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। তাহারা তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিবেন যে, মহানবী-এর বিষয়টি ঐ রোগ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই একই বিষয়ের উপর দ্বিতীয় বিকৃতি সাধন হইতেছে পূর্ব অনুমান অর্থাৎ মহানবী কৃত্রিমভাবে মৃগীরোগের লক্ষণ সৃষ্টি করিতেন যদিও উৎস গ্রন্থসমূহে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, তিনি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন অথবা বহু সংখ্যক অনুসারী ও সাহাবী যাঁহারা বহু বৎসর ধরিয়া খুবই ঘনিষ্ঠভাবে তাঁহাকে ঘিরিয়া রাখিতেন তাঁহারা কখনও এইরূপ কোন ঘটনার কথা চিন্তাও করিতে পারেন না। একই বিষয়ের উপর তৃতীয় বিকৃতিসাধন
হইতেছে দৃঢ় দাবির যাহাতে বলা হইয়াছে যে, কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট কথিত উপসর্গসমূহ তাঁহার ভাবাবেশের স্বাভাবিক ধরন; যদিও বিভিন্ন সূত্র হইতে আহূত তথ্যানুযায়ী ইহা নিতান্তই স্পষ্ট যে, শারীরিক যন্ত্রণার ঘটনা তৎসহ ওহী প্রাপ্তি ছিল এক বিরল ও অনন্যসাধারণ বিষয় যাহা কদাচিৎ ঘটিত।
অনুরূপভাবে জিবরাঈলের ঘটনাটি যিনি কখনও কখনও মানুষের অবয়বে মহানবী -এর নিকট উপস্থিত হইতেন, বিকৃত করা হইয়াছে এই বলিয়া যে, মহানবী তাঁহার সঙ্গীদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। ইতোপূর্বে যেভাবে আলোচিত হইয়াছে যে, এইরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ কেবল প্রতারণাটিকেই প্রকাশ করিয়া দেয় এবং ওহী নাযিলের সময় উপস্থিত জনতার উপর যে ঐশী প্রভাব পড়ে তাহা প্রতারণা দ্বারা সম্ভবপর হয় না। মারগোলিয়থের পক্ষে এই নির্দিষ্টকর বিকৃতির প্রয়াস বেশ অস্বাভাবিক। কারণ তিনি একই সাথে উল্লেখ করেন যে, জিবরাঈল একজন ঐশীদূত, "তিনি নূতন নিয়মে (বাইবেল) বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত” । ৫৬ কেহ হয়ত প্রশ্ন করিবার জন্য প্ররোচনা বোধ করিতে পারেন : নূতন বাইবেলের ক্ষেত্রে নবীদের জন্য জিবরাঈল কর্তৃক বার্তা বহনের বিষয়টি যদি অস্বাভাবিক না হয় তাহা হইলে অন্য নবীর ক্ষেত্রে তাহা অস্বাভাবিক হইবে কেন? পরবর্তীজনের ক্ষেত্রে প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণ করিবার জন্য নূতন বাইবেলের নবীদের উদ্দেশ্যে ঐশীদূত কর্তৃক বার্তা বহনের প্রকৃত পদ্ধতির উল্লেখ করা আবশ্যক। মারগোলিয়থ অথবা তাহার বুদ্ধিজীবী শিষ্যদের মধ্যে যাহারা তাহার মতামত গ্রহণ করেন তাহারা কেহই ইহা সম্পাদন করেন নাই।
মূল গ্রন্থ বা পাঠের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া সাধারণ তথ্যের বিকৃতি ঘটানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ দুইটি অপব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য একটি রেখা টানিয়া দেওয়া প্রায়শ কঠিন হইয়া পড়ে। কমপক্ষে একজন ওহী লেখকের এইরূপ একটি ঘটনা আছে যে শপথপূর্বক ইসলাম ধর্মকে পরিত্যাগ করিয়াছে বলিয়া দাবি করা হয়। কারণ তাহার এইরূপ প্রতীতি জন্মায় যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিষয় হইতেছে একটি জালিয়াতি। ৫৭ বস্তুত মারগোলিয়থ কর্তৃক উদ্ধৃত হাদীছটিতে বলা হইয়াছে যে, মহানবীর জন্য যে ব্যক্তি ওহী লিখিবে এবং পরে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া মক্কার বিরোধী দলের সাথে যোগদান করিবে তাহার জন্য রহিয়াছে জঘন্য পরিণাম। তাহার ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগের কারণ বর্ণনা করিতে গিয়া মার্গোলিয়থ বলেন যে, মহানবী নিজে ওহী লেখককে ওহী লিখিবার নির্দেশ প্রদান করিতেন কিন্তু ওহী লেখক তাহা ভিন্নভাবে লিখিত। তাহাকে ভুল সংশোধনের জন্য বলা হইলে সে যাহা লিখিয়াছে তাহা পরিবর্তন করিতে অস্বীকৃতি জানাইত। সুতরাং মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী উক্ত ওহী লেখককে তাহার ইচ্ছানুযায়ী ওহী লিখিবার অনুমতি প্রদান করিতেন। এইরূপ একাধিকবার ঘটিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা হয়। ৫৮
এখন ইহা স্পষ্ট যে, এই বর্ণনা এইরূপ এক ব্যক্তির যে শত্রুতে পরিণত হয়। ইহাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ইহা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে। বর্ণনার মূল বিষয়বস্তু পরীক্ষা করিলে
ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি এক ছদ্মবেশী শত্রু যে ইসলামের নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়া মুসলমানদের দলে অনুপ্রবেশ করিয়াছিল। ইসলাম ও ওহীর মূল পাঠকে ধ্বংস করাই তাহার উদ্দেশ্য ছিল। যাহাই হউক না কেন, সাধারণ জ্ঞান ও যুক্তিতে উক্ত ব্যক্তির ঘোষণাকে কখনও সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। কারণ কোন যুক্তিবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কখনও তাহার কর্মচারী বা অনুসারিগণকে তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী লিখিবার অনুমতি দিতে এবং তাহাদের লিখিত বিষয়কে ওহী হিসাবে ঘোষণা করিতে পারেন না। আর একজন ধূর্ত ও সুনির্দিষ্ট ভণ্ড ব্যক্তির বেলায় তো ইহার প্রশ্নই উঠে না। এই বিবরণী সুস্পষ্টভাবে ইহাকে একটি মিথ্যা অভিযোগ হিসাবে উল্লেখ করে এবং ইহার ক্ষতিকর ফলাফলের বর্ণনা দেয় যাহা ইহার কুৎসা রটনাকারীর উপরই বর্তায়। মারগোলিয়থ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার উপর মিথ্যা আরোপ করিয়া ইহাকে সাক্ষ্য হিসাবে ভূয়া অভিযোগ দাঁড় করাইয়াছেন এবং তারপর ইহার বিকৃতি সাধনে রত হইয়াছেন। অধিকন্তু বিবরণীটিতে কোথাও উল্লেখ নাই যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে রোগের উপসর্গ তৈয়ার করিয়াছেন যাহা মারগোলিয়থ কথিত প্রতারণার চিহ্ন হিসাবে উদ্ধৃতি দিয়াছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মহানবী-এর হাজার হাজার বুদ্ধিমান ও সুবুদ্ধিপূর্ণ অনুসারীদের উদাহরণ হইতে তিনি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারেন নাই। এই সকল অনুসারী তাহাদের সারা জীবন মহানবী-এর প্রতি ছিলেন চির অনুগত ও উৎসর্গীকৃত। আর মারগোলিয়থের দৃষ্টিতে ইহারা হইয়া গেলেন মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণার শিকার!

টিকাঃ
২৬. 'মাধ্যম' হিসাবে মহানবী -এর এইরূপ চরিত্রায়ণ Tor Andrae এবং Maxim Rodinson-এর মত ব্যক্তিগণও গ্রহণ করেন। M. Rodinson মাধ্যমকে "মেগাফোন”-এ বিস্তৃত করেন.
২৭. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৮৪.
২৮. ঐ, ৮৫ (উদ্ধৃতি আত-তাবারী, তাফসীর, ২৮ খ., ৪).
২৯. ঐ.
৩০. ঐ, ৮৬.
৩১. ঐ (উদ্ধৃতি মুসনাদ, ৪খ., ২২২).
৩২. ঐ.
৩৩. ঐ (উদ্ধৃতি মুসনাদ, ৬খ., ৫৬ ও ৩খ., ২১).
৩৪. ঐ, পৃ. ৮০, ৮৬.
৩৫. ঐ, ৮৭.
৩৬. ঐ.
৩৭. ঐ. ৮৮.
৩৮. ঐ, পৃ. ৮৮-৮৯.
৩৯. ঐ, ৮৯.
৪০. ঐ.
৪১. ঐ, পৃ. ৯০.
৪২. ঐ, পৃ. ৯০-৯১.
৪৩. দ্র. মুসনাদ, ৩খ., ২১ এবং ৬ খ., ৫৬ (যথাক্রমে আয়েশা (রা) ও আবু সাঈদ আল-খুদরী (রা) -এর হাদীছ দ্র.).
৪৪. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৮৮ (উদ্ধৃতি ইব্‌ন সাদ, ২খ., পৃ. ৫২০).
৪৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ৩৭৬, ৩৭৯-৩৮০.
৪৬. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৫-২০৩.
৪৭. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৯১। মারগোলিয়থ এখানে মুসনাদ-এর উদ্ধৃতি দিয়াছেন, ৪খ., পৃ. ২২২.
৪৮. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯৫-২০৩.
৪৯. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৮৭.
৫০. ঐ, ৮৮.
৫১. ঐ, ৮০.
৫২. ঐ, ৮৬.
৫৩. প্রাগুক্ত, পরিচ্ছেদ ১১.
৫৪. মারগোলিয়থ, পূ. গ্র., ৮৭.
৫৫. প্রাগুক্ত, পৃ. ২৪০-২৪১.
৫৬. মারগোলিয়থ, পৃ. গ্র., ৯১.
৫৭. ঐ.
৫৮. মুসনাদ, ৩খ., ১২০-১২১.

মুইর-এর ন্যায় মারগোলিয়থ ওহী সম্পর্কিত বিষয়ের উপর যে আলোচনা করিয়াছেন তাহা হইতেছে মুহাম্মাদ-এর উচ্চাকাংখা ও পরিকল্পনার একটি সম্প্রসারিত মূল ভাবধারা মাত্র। কিন্তু মারগোলিয়থ সম্ভবত মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ লক্ষ্য করিয়া তাহা পরিহার করেন যদিও এই বিষয়টির উপর আলোচনাকালে তিনি নূতন করিয়া অসঙ্গতি ও অসামঞ্জস্যতার মধ্যে নিজকে

নিপতিত করিয়াছেন। তিনি সরাসরি ধারণা করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ অতিমাত্রায় উচ্চাকাংখী হইয়া যে ভূমিকা পালন করিতে চাহেন তাহার জন্য নিজকে সতর্কতার সহিত প্রস্তুত করেন এবং যখন তাঁহার পরিকল্পনাসমূহ সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় তখন তিনি খুবই দক্ষতার সহিত তাহা বাস্তবায়ন করেন। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, ওহী সংক্রান্ত সমগ্র বিষয়টি ছিল প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত "ছলনা" ও "প্রতারণা” মাত্র। এইরূপ দাবি করা হয় যে, মুহাম্মাদ তাঁহার পরিকল্পনা অনুযায়ী অন্য জগত হইতে বাণী সংগ্রহ করিয়া তাহা প্রচারের একটি "মাধ্যম" ২৬ হিসাবে স্বীয় ভূমিকা পালন করেন এবং তাঁহার সাফল্য নিশ্চিত করিবার জন্য তিনি ঐ সকল সংগৃহীত বাণীর "আকার" ও "বিন্যাস" এবং প্রক্রিয়াকে এমন কৌশলে উপস্থাপন করেন যে, তাহা যেন কোন "অতিপ্রাকৃতিক উৎস" হইতে আবির্ভূত হইয়াছে। ২৭ এইরূপে একটি ঐশী প্রত্যাদেশ উপস্থাপন করিতে গিয়া, মারগোলিয়থের ভাষায, তিনি সহজাত প্রেরণায় এক “প্রচণ্ড উত্তেজনার” মধ্যে পতিত হইতেন। তখন তাঁহার মুখমণ্ডল নীল বর্ণ ধারণ করিত২৮ এবং তিনি কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃত করিয়া ফেলিতেন। ইহার ফলে তাঁহার শরীরে প্রচুর ঘাম সৃষ্টি হইত এবং তাঁহার এই অবস্থায় বাণী প্রস্তুত থাকিত। ২৯ কম্বল দ্বারা নিজকে এইভাবে আবৃত করার অভ্যাস তিনি "প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত" বজায় রাখিয়াছেন বলিয়া বলা হইয়া থাকে। ৩০ আরও দাবি করা হয় যে, মহানবী "কোন এক সময়ে" মৃগী রোগের খিচুনি সম্পর্কে অভিজ্ঞতা লাভ করেন এবং অভিমত প্রকাশ করা হয় যে, কোন প্রকার "সামান্যতম প্রস্তুতি" ব্যতিরেকে "নাক ডাকা ও মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ” করিয়া তিনি "কৃত্রিমভাবে" এই খিচুনি তৈয়ারী করিতেন। ৩১

মারগোলিয়থ বলেন যে, এইরূপ অবস্থাকে প্রত্যাদেশ প্রাপ্তির "স্বাভাবিক অবস্থা হিসাবে স্বীকার করিয়া" লওয়া হইয়াছে। ৩২ মহানবী এই বিষয়ে এতই সুদক্ষ ছিলেন বলিয়া কথিত হয় যে, মারগোলিয়থের মতে "তিনি যখন আহার করিতেন সেই সময়ে তাঁহাকে সম্বোধনকৃত কোন প্রশ্নের তাৎক্ষণিক জবাব দেওয়ার কালে তিনি ঐশী আদেশ লাভ করিতেন। জবাব দেওয়া সমাপ্ত হইলে তিনি আহার পর্ব সমাধা করিবার জন্য অগ্রসর হইতেন। কিন্তু তিনি বাধাগ্রস্ত হইলে এই খাবার তাঁহার হাতে ধরা থাকিত অথবা তিনি মসজিদের মিম্বরে দাঁড়ান অবস্থায় তাঁহাকে কোন প্রশ্নের জবাব দানকালে ওহী অবতীর্ণ হইত"। ৩৩

ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থ তাহার প্রিয় পক্ষপাতপূর্ণ তত্ত্বের পুনরাবৃত্তি করেন যে, মহানবী-এর প্রচুর পরিমাণে কথা বলিবার না থাকিলে তিনি "ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের উপর নাযিলকৃত আসমানী কিতাবের" সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৩৪ কথিত হয় যে, তিনি ইহাকে মু'জিযা হিসাবে দাবি করেন-তিনি যে কিতাব কখনও পাঠ করেন নাই তাহার বিষয়বস্তু সম্পর্কে তিনি অবহিত আছেন। কিন্তু পরবর্তী কালে তিনি বলিয়াছেন যে, "তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতার মধ্যে এই মু'জিযার রহস্য নিহিত রহিয়াছে"। ৩৫ যাহা হউক, মারগোলিয়থ বলেন যে, একেবারে গোড়ার দিকে অবতীর্ণ ওহীর খণ্ডাংশসমূহ কুস্স ইবন সাইদা-এর ন্যায় ধর্মীয় বিষয়ে পুনরভ্যুদয়ের সমর্থকদের ধর্মীয় বাণী উচ্চারণের অনুকরণ ভিন্ন আর কিছুই নহে। ৩৬ আরও দাবি করা হয় যে,

মহানবী স্বাভাবিক আরবী বাগ্মিতার ধরনকে অনুকরণ করেন যাহা কিছু পরিমাণে কবিতার অনুরূপ কিন্তু ইহার প্রকৃতি সম্পর্কে তাঁহার কমই জানা ছিল। ৩৯

ছলনা ও প্রতারণার মূল সুরটিকে বিশদ করিবার জন্য মারগোলিয়থ মহানবী-এর চরিত্র ও সততার স্বীকৃত বিশুদ্ধতাকে হেয় করিবার অপচেষ্টা গ্রহণ করেন। এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তিনি আধ্যাত্মিকতার উপর লিখিত F. Podmore-এর গ্রন্থের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেন। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, একজন সম্মানিত ব্যক্তি একই সময়ে তাহার অনুসারীদিগকে ধাঁধাঁ লাগাইয়া দিতে এবং তারপর তাহার "কৌশল” দেখাইতে পারে। মারগোলিয়থ বলেন, "Podmore-এর অবধারণা অনুযায়ী মুহাম্মাদ একই প্রকার সুবিধা লাভ করিয়াছেন এবং তাহার ফলে অনুগামীদের হৃদয় জয় করিয়াছেন"। ৩৮ তৎসত্ত্বেও মারগোলিয়থ বলিতে থাকেন যে, মহানবী-এর একজন ওহী লেখক "এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, সে ইহাকে প্রতারণা বলে এবং ফলে ইসলাম ধর্ম প্রত্যাখ্যান করে"। ৩৯ যাহাই ঘটুক না কেন মারগোলিয়থ উপসংহারে বলেন যে, "অতিপ্রাকৃত প্রত্যাদেশের রাজনৈতিক কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে কোন মাধ্যমের আন্তরিকতা"র খুব কমই গুরুত্ব রহিয়াছে। ৪০

ওহী অবতীর্ণ হওয়ার প্রারম্ভ প্রসঙ্গে মারগোলিয়থ বলেন যে, অনুকূল মুহূর্ত না আসা পর্যন্ত সুযোগের প্রতীক্ষায় থাকা মহানবী-এর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই অধিকাংশ "মাধ্যমের" ন্যায় তিনি "পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যস্থিত ক্রান্তিকালের সদ্ব্যবহার করেন"। ৪১ মর্মন (Mormon) সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা যোসেফ স্মিথ-এর সহিত একটি উপমা উপস্থাপন করা হয় এবং বলা হয়, তিনি প্রথমে বনে-জঙ্গলে পরিভ্রমণরত ছিলেন। তারপর লোকালয়ে উপস্থিত হইয়া ভাবাবিষ্ট অবস্থায় তিনি বিভিন্ন বাণী উচ্চারণ করেন এবং ঘোষণা দান করেন যে, দেবদূত কর্তৃক এই ঐশীবাণী তাহার নিকট প্রেরিত হইয়াছে। মারগোলিয়থ ইহা উল্লেখ করিয়া বলেন যে, মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির জীবন নির্জনতার মাধ্যমেই শুরু হইয়াছিল। মারগোলিয়থ বলেন যে, বৎসরের একটি নির্দিষ্ট মাস ধরিয়া মক্কাবাসিগণ 'তাহান্নুছ' নামে অভিহিত একটি ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত। ইহা ছিল এক ধরনের কঠোর তপশ্চর্যা। এই মাসে "মুহাম্মাদ হেরা পর্বতের একটি গুহায় অবস্থানের একটি নিয়ম পালন করিতেন"। উক্ত মাসের কোন এক সময়ে তিনি যখন হেরা পর্বতে একাকী অবস্থান করিতেছিলেন তখন "দেবদূতের (অথবা ইহার তুল্য কোন কিছুর) আবির্ভাব ঘটে” যাহাকে তিনি ঐশীদূত বলিয়া আখ্যায়িত করেন। মারগোলিয়থ আরও বলেন যে, এই বিষয়ে হাদীছের বর্ণনানুযায়ী জিবরাঈল (আ)-এর মাধ্যমে যোগাযোগ ঘটে। এই ফেরেশতাই বার্তা প্রদান করিতেন বলিয়া নিউ টেস্টামেন্টে (New Testament) উল্লেখ আছে। কিন্তু "কুরআনে আল্লাহ তা'আলা নিজেই পৃথিবীতে নামিয়া আসেন” বলিয়া প্রতীয়মান হয় এবং তিনি মহানবী হইতে দুইটি ধনুকের পাল্লারও কম দূরত্বে অবস্থান গ্রহণ করেন। তারপর তিনি মহানবীকে সম্বোধন করেন। মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী -এর ধর্মতত্ত্বের উন্নয়নের কারণে পরবর্তী কালে জিবরাঈল স্থলাভিষিক্ত হন। ৪২

ওহী এবং মহানবী-এর একজন ধর্মীয় শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ সম্পর্কে মারগোলিয়থের ইহাই প্রধান অভিমত। মহানবী-এর উচ্চাকাংখা ও প্রস্তুতি সম্পর্কিত মূল ভাবধারা হিসাবে মুইর যাহা উল্লেখ করেন মারগোলিয়থ তাহাই স্পষ্টভাবে গ্রহণ করিয়াছেন এবং মুইর-এর অসঙ্গতিসমূহ পরিহার করিয়া তাহার পরবর্তীতে ব্যাপ্তি দান করেন। তিনি মৃগীরোগ ও "ভাবাবেশ” সংক্রান্ত দাবিকেও গ্রহণ করেন এবং ইহাকে তিনি মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণা তত্ত্বের সহিত সংযুক্ত করিবার প্রয়াস পান। ইহা করিতে গিয়া তিনি বলেন যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে এই সকল লক্ষণ তৈয়ার করিতেন। সর্বোপরি মুইর যেভাবে স্বীয় মতামত পেশ করিয়াছেন মারগোলিয়থও তেমনি জোর দিয়া বলিয়াছেন যে, কুরআনের মূল পাঠ অথবা সাধারণভাবে ঐশী প্রত্যাদেশসমূহ মহানবী-এর নিজস্ব রচনা। সকল প্রয়োজনীয় বিষয় বিবেচনায় মারগোলিয়থের পূর্বসূরী যে পথ তৈয়ার করিয়া গিয়াছেন তাহা হইতে তিনি সরিয়া আসেন নাই। তবে তিনি অবশ্যই তাহার কিছু নূতন ধারণা ইহার সহিত সংযুক্ত করিয়াছেন যাহা বর্তমানে বিবেচনা করা হইবে।

যাহা পূর্বেই আলোচিত হইয়াছে, একদিকে উচ্চাকাংখা ও নবীর প্রস্তুতির এবং অন্যদিকে মৃগীরোগের অভিযোগ। এই দুইটি অভিযোগের কথা বাদ দিলেও মারগোলিয়থের প্রধান অভিযোগ হইতেছে মহানবী-এর প্রতারণা। তাহার মতে মহানবী প্রত্যাদেশের গঠন, বিন্যাস ও ধরনকে এমনভাবে পরিকল্পনা করিয়াছেন যে, ইহা যেন কোন অতিপ্রাকৃত উৎস হইতে উদ্ভূত হইয়াছে বলিয়া মনে হইবে। এমনকি ইহাও বলা হইয়াছে যে, মহানবী-এর জীবনের গোড়ার দিকে কথিত মৃগীরোগের যে খিচুনি হইত সেই দৃশ্য হইতে মহানবী তাঁহার সংকেতসূত্র গ্রহণ করিয়াছেন এবং তারপর তিনি ঐ সকল দৃশ্য-যেমন ভাবাবিষ্ট অবস্থায় পতিত হওয়া, নাক ডাকা ও মুখমণ্ডলের রক্তিমবর্ণ ধারণ, প্রচুর পরিমাণ ঘাম নিঃসরণ অথবা কম্বল দ্বারা নিজকে আবৃতকরণ প্রভৃতির পুনর্গঠন করিয়াছেন। আরও বলা হইয়াছে যে, "অনুপ্রেরণার স্বাভাবিক ধরন হিসাবে ইহাকে স্বীকৃতি দানের" জন্য আনয়ন করা হইয়াছে। কিন্তু মারগোলিয়থ যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেইগুলির মধ্যে পারস্পরিক সঙ্গতি নাই, বরং মহানবী-এর নিকট ওহী নাযিল হওয়ার বিভিন্ন ধরনের উল্লেখ রহিয়াছে। এই সকল প্রক্রিয়ার (ধরনের) অধিকাংশ স্পষ্টতই প্রতারণার তত্ত্বের সহিত খাপ খায় না। তাই:

(ক) ওহী নাযিল হওয়ার আরম্ভ সম্পর্কে এবং তত্ত্বটি প্রমাণ করার জন্য ইহা সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত উদাহরণ হিসাবে বিবেচিত হইতে পারিত বলিয়া মারগোলিয়থ স্বীকার করেন যে, মহানবী হেরা উপত্যকায় সম্পূর্ণ একাকী থাকিবার অবস্থায় ওহী লাভ করেন। সেখানে ওহী নাযিল হওয়ার ধরন ও প্রণালী সম্পর্কে সাক্ষ্য দেওয়ার আর কেহই উপস্থিত ছিল না। অবশ্য মারগোলিয়থ যেমন দাবি করেন নাই তেমনি উৎস গ্রন্থসমূহেও কোন ইঙ্গিত নাই যে, ওহী নাযিল হওয়ার সময় ভাবাবিষ্ট ইত্যাদি হওয়ার ন্যায় কোন লক্ষণ দেখা যায় নাই।

(খ) মহানবী যখন আহার করেন অথবা মসজিদের মিম্বরে দাঁড়াইয়া যখন ভাষণ দেন সেই অবস্থায় তাঁহার উপর ওহী নাযিল হওয়ার উদাহরণের উল্লেখ করেন। এই সকল ক্ষেত্রে উদ্ধৃত বর্ণনাসমূহে প্রকৃতপক্ষে উল্লেখ পাওয়া যায় না যে, মহানবী নাক ডাকা, মুখমণ্ডল রক্তিম বর্ণ ধারণ, ভাবাবেশে মগ্ন হওয়া প্রভৃতি লক্ষণ দ্বারা আক্রান্ত হইয়াছিলেন।৪৩ অধিকন্তু এই সকল উদাহরণের সহিত কুরআনের ওহী নাযিলের কোন সম্পর্ক নাই। মহানবী সময়ে সময়ে অন্যান্য ধরনের যে সকল ওহী লাভ করিতেন তাহার সহিত কুরআনের ওহীকে সর্বদা স্বতন্ত্রভাবে চিহ্নিত করিতে হইবে।

. (গ) মারগোলিয়থ আরও দাবি করেন যে, মহানবী তাঁহার মিত্রদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালন অথবা তাঁহার অনুসারীদের কিছু সংখ্যককে তাঁহার পক্ষে জিবরাঈলের সহিত আলোচনাকারীর ভূমিকা পালনের জন্য নির্দেশ প্রদান করেন।৪৪ এইরূপ দাবি সম্পূর্ণরূপে অসমর্থনীয়। কিন্তু জিবরাঈল সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি রহিয়াছে তাহাতে সুস্পষ্টভাবে এই পরোক্ষ উল্লেখ দেখিতে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হইয়াছে যে, জিবরাঈল কখনও কখনও মানুষের অবয়বে আবির্ভূত হইয়া মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেন। তিনি যেমন একজন বহিরাগত ব্যক্তি অথবা মহানবী-এর সাহাবী দিয়া আল-কালবীর বেশে উপস্থিত হন। যাহাই হউক না কেন, জিবরাঈলের এই অবয়ব ধারণ কুরআনের মূল পাঠের অতিপ্রাকৃত উৎস সম্পর্কে দর্শনকারীদের কোনমতেই সন্তুষ্ট করিতে পারে না। ইহা ছিল কথিত প্রতারণা তত্ত্বকে প্রকাশের একটি কৌশল মাত্র। কারণ জিবরাঈল যে ব্যক্তির কথিত রূপ ধারণ করিবেন তাহাকে মহানবী-এর সহিত অধিকাংশ সময় অবস্থানকারী সাহাবীগণ (অনুসারীবৃন্দ) ছাড়িয়া দিবেন না, ইহাই স্বাভাবিক ছিল। এই সকল ক্ষেত্রেই মহানবী-এর কৃত্রিমভাবে মুর্ছা যাওয়াকে ভাবাবিষ্ট হইবার "স্বাভাবিক আচরণ বলিয়া দাবি করা হয়"। এইভাবে মারগোলিয়থ নিজে যে সকল উদাহরণের উদ্ধৃতি দিয়াছেন তাহা কোন মতেই মহানবী -এর পক্ষে প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণের দাবিকে সত্য বলিয়া প্রমাণ করে না।

দ্বিতীয়ত, মহানবী-এর নির্জনে ইবাদত ও হেরা পর্বতের গুহায় একাকী অবস্থান (তাহান্নুছ) সম্পর্কে মারগোলিয়থ যে ধারণা পোষণ করেন তাহাতে অসঙ্গতি রহিয়াছে। মারগোলিয়থ মনে করেন যে, অধিকাংশ “মাধ্যমের" ন্যায় মহানবী ইহাকে পুরাতন ও নূতন জীবনের মধ্যবর্তী একটি ক্রান্তিকাল হিসাবে পরিকল্পনা করেন। যাহা হউক, একই তত্ত্বে ইহা উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মক্কাবাসীরা প্রতি বৎসর রমযান মাসে এই ধর্মানুষ্ঠান পালন করিত এবং এই মাসে হেরা পর্বতের গুহায় নির্জনে অবস্থান করা মুহাম্মাদের অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল। এখন মক্কাবাসীদের রমযান মাসে তাহান্নুছ পালন সম্পর্কিত বর্ণনা ইতোপূর্বে আলোচিত হইয়াছে।৪৫ কিন্তু এই প্রশ্নকে একপাশে সরাইয়া রাখিয়া মারগোলিয়থের ন্যায় এইরূপ ধারণা পোষণ করা স্পষ্টতই পুরাতন জীবন পরিত্যাগ করিয়া নূতন ধরনের জীবনে সন্নিবিষ্ট হইবার জন্য তাহান্নুছ -এর সময়কে একটি পরিকল্পিত ক্রান্তিকাল হিসাবে অভিহিত করা অসঙ্গত হইবে। একই সঙ্গে

ইহাও বলা সঙ্গত হইবে না যে, হেরার গুহায় তাহানুছ পালনকালে মহানবী প্রতি বৎসর মক্কাবাসীদের পালনকৃত ধর্মানুষ্ঠানকে অনুসরণ করিয়া চলিতেন। প্রকৃত ঘটনা এই যে, মারগোলিয়থ এখানে আর একটি ত্রুটিপূর্ণ ধারণা দ্বারা নিজকে আবদ্ধ করিয়া ফেলিয়াছেন। যেমন, মহানবী নবুওয়াত লাভের পূর্বেই পৌত্তলিক মক্কাবাসীদের ধর্মকে অনুসরণ করিতেন এবং এমনকি তিনি তাহাদের দেব-দেবীদের উপাসনা পর্যন্ত করিতেন। ৪৬ মারগোলিয়থ এই ভ্রান্ত ধারণায় এতই মুগ্ধ হইয়া পড়েন যে, তিনি অসতর্কভাবে ইহা এখানে উপস্থাপন করেন। কিন্তু তিনি খেয়াল করিয়া দেখেন নাই যে, তাহার ধারণামতে মহানবী কর্তৃক পরিকল্পিত ক্রান্তিকালের মতবাদের সহিত ইহা সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গতিপূর্ণ। মারগোলিয়থ তাহার উপরোল্লিখিত ধারণামতে এখানে যে কষ্ট কল্পনার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছেন তাহা তাহার সংযোজনকৃত তথ্য হইতে স্পষ্ট হইয়া উঠে। তিনি বলেন, "মহানবী তাঁহার পরিবারবর্গকে তাঁহার সহিত লইয়া যাইতেন বলিা অনুমিত হয়; তবুও সম্ভবত তাহাদের আল-লাত অথবা আল-'উযযা-এর দৈনন্দিন পূজা-অর্চনার কাজটি এইরূপ অবস্থায় সম্পাদিত হইত না"। ৪৭ ইহাতে অবশ্যই পুনর্বার জোর দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী এবং তাঁহার পত্নী কখনও তথাকথিত আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করেন নাই এবং পূর্বে যেভাবে উপস্থাপিত হইয়াছে৪৮ তাহা এই প্রসঙ্গে মারগোলিয়থের বর্ণনা সংশ্লিষ্ট হাদীছের অর্থ না বুঝিয়া একটি চরম ভ্রান্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। যাহা হউক, এখানে তিনি কার্যত তাহার একটি ভ্রান্ত ধারণাকে আর একটির বিপক্ষে দাঁড় করাইয়াছেন।

ওহীর ভাষা ও বিষয়বস্তু সম্পর্কে অনুরূপ অসঙ্গতি মারগোলিয়থের ধারণাকে পরিব্যাপ্ত করিয়া ফেলিয়াছে। এইভাবে তিনি বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার অপ্রতিদ্বন্দ্বী বাগ্মিতাকে একটি মু'জিযা ৪৯ হিসাবে দাবি করেন। ইহার পর মারগোলিয়থ আরও কিছু দূর অগ্রসর হইয়া বর্ণনা করেন যে, সাধারণ আরববাসী কবিতার ছন্দে যে বাকপটুতা প্রদর্শন করিত তিনি (মহানবী )কেবল তাহারই অনুকরণ করিতেন, "যদিও তিনি ইহার অর্থ বুঝিতেন না” ৫০ পুনশ্চ ওহীর বিষয়বস্তু সম্পর্কে মারগোলিয়থের পর্যবক্ষেণ এই যে, মহানবীকে ইহার জন্য ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের আসমানী কিতাবের উপর নির্ভর করিতে হইত এবং এই বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান লাভ না করা পর্যন্ত তিনি উক্ত কিতাবসমূহের সাহায্য গ্রহণ করিতেন। ৫১ মারগোলিয়থ তাহার ধারণাকে বিশদীকৃত করিয়া আরও বলেন, "মুহাম্মাদ যখন রাষ্ট্রের কর্ণধার তখন তাঁহার অনেক কিছুই বলিবার ছিল, কিন্তু তাঁহার জীবনের প্রারম্ভে বিদ্যমান অবস্থা তাঁহাকে অনুরূপ কোন ভূমিকা গ্রহণ করিতে দেয় নাই"। অতএব "তিনি পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে তথ্য ধার করিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন"। ৫২

* ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য ধার করিবার অভিযোগটি পূর্ববর্তী পরিচ্ছেদে আলোচনা করা হইয়াছে। ৫৩ এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থ কার্যত আর একটি চরম অসঙ্গতি দ্বারা এখানে তাঁহার স্বীয় অভিমতকে বাতিল করিয়াছেন। এইরূপে

উপরিউল্লিখিত মন্তব্য করিয়া তিনি তৎক্ষণাৎ তাঁহার সম্পূর্ণ মত পরিবর্তন করেন এবং বলেন যে, মহানবী ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের কিতাব হইতে তথ্য আহরণের এই "নিরাপদ পদ্ধতি” অবলম্বন করেন যখন তিনি ক্রমবৃদ্ধিগত পরিমাণে প্রত্যাদেশসমূহ উপস্থাপন করিতে অবস্থাগত কারণে বাধ্য হন। কিন্তু একেবারে গোড়ার দিকের প্রত্যাদেশের টুকরা টুকরা অংশসমূহ কুস্স ইবন সা'ইদা ৫৪-এর ন্যায় পুনরুজ্জীবনবাদী ধর্মপ্রচারকের উক্তিসমূহের অনুকরণ বলিয়া প্রতীয়মান হয়। এইরূপে এক নিঃশ্বাসে মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে প্রয়াস পাইয়াছেন যে, প্রারম্ভিক পর্যায়ে যখন মহানবী-এর তেমন বেশি কিছু বলিবার ছিল না তখন তিনি ইয়াহুদী -খৃস্টানদের কিতাব হইতে প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত বিষয়ে সাহায্য গ্রহণ করিতে পারেন যতক্ষণ পর্যন্ত না অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং তিনি যথেষ্ট পরিমাণে কথা বলিতে পারেন। তারপর পুনঃ আমাদের বিশ্বাস করিতে হয় যে, মহানবী হয়ত এই "নিরাপদ পদ্ধতি" অবলম্বন করেন যখন অবস্থার উন্নতি ঘটে এবং ইহা তাঁহার জন্য আবশ্যক হয় যে, তিনি বেশি পরিমাণে প্রত্যাদেশ প্রকাশ করিতে পারেন! মারগোলিয়থের পক্ষে একটি সতর্কতা অবলম্বনের কারণে এই অসঙ্গতির সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে যে, তথাকথিত একেবারে প্রথম প্রত্যাদেশের "খণ্ডাংশসমূহ” প্রকৃতপক্ষে পুরাতন ও নূতন বাইবেলের বিষয়বস্তুর সহিত তেমন কোন সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয় না এবং কুরআনের যে অংশসমূহের সহিত ইহাদের যে কোনভাবে একটি মিল রহিয়াছে তাহা মহানবী -এর নিকট প্রাথমিক পর্যায়ের ওহী ছিল না। কুস্স সম্পর্কিত ক্ষুদ্র কাহিনী প্রসঙ্গে এবং উকায মেলায় তাহার সহিত মহানবী-এর কথিত বাক্যালাপ আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে যাহা ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হইয়াছে। ৫৫ কিন্তু এমনকি এই বর্ণনাটিকে যদি সত্য বলিয়া গ্রহণ করা হয় তাহা হইলেও তাহার এই কথিত কথাবার্তার সহিত প্রথমদিকে নাযিলকৃত সূরাসমূহের সাদৃশ্য খুবই ক্ষীণ। পক্ষান্তরে প্রাথমিক পর্যায়ের সূরাসমূহের বিষয়বস্তুর একটি ক্ষুদ্র অংশেরও তাহাদের আলোচনার সহিত সাদৃশ্য দেখা যায় না।

প্রচুর পরিমাণে তথ্য বিকৃতি দ্বারা এই সকল অসঙ্গতির উপর প্রলেপ দেওয়া হইয়াছে এইভাবে মহানবী-এর উপর লিখিত উৎস গ্রন্থসমূহের যে সকল উদাহরণ দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী ওহী লাভ করিবার সময় শারীরিক কষ্টের অভিজ্ঞতা লাভ করেন-এই তথ্যটি তাঁহার মধ্যে মৃগীরোগের লক্ষণ রহিয়াছে বলিয়া বিকৃত করা হইয়াছে। এই রোগ সম্পর্কে যাহাদের ধারণা আছে তাহারা অবগত আছেন যে, ইহা রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর কিরূপ প্রভাব বিস্তার করে। তাহারা তৎক্ষণাৎ বুঝিতে পারিবেন যে, মহানবী-এর বিষয়টি ঐ রোগ হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই একই বিষয়ের উপর দ্বিতীয় বিকৃতি সাধন হইতেছে পূর্ব অনুমান অর্থাৎ মহানবী কৃত্রিমভাবে মৃগীরোগের লক্ষণ সৃষ্টি করিতেন যদিও উৎস গ্রন্থসমূহে এমন কোন ইঙ্গিত নাই যে, তিনি প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন অথবা বহু সংখ্যক অনুসারী ও সাহাবী যাঁহারা বহু বৎসর ধরিয়া খুবই ঘনিষ্ঠভাবে তাঁহাকে ঘিরিয়া রাখিতেন তাঁহারা কখনও এইরূপ কোন ঘটনার কথা চিন্তাও করিতে পারেন না। একই বিষয়ের উপর তৃতীয় বিকৃতিসাধন

হইতেছে দৃঢ় দাবির যাহাতে বলা হইয়াছে যে, কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট কথিত উপসর্গসমূহ তাঁহার ভাবাবেশের স্বাভাবিক ধরন; যদিও বিভিন্ন সূত্র হইতে আহূত তথ্যানুযায়ী ইহা নিতান্তই স্পষ্ট যে, শারীরিক যন্ত্রণার ঘটনা তৎসহ ওহী প্রাপ্তি ছিল এক বিরল ও অনন্যসাধারণ বিষয় যাহা কদাচিৎ ঘটিত।

অনুরূপভাবে জিবরাঈলের ঘটনাটি যিনি কখনও কখনও মানুষের অবয়বে মহানবী -এর নিকট উপস্থিত হইতেন, বিকৃত করা হইয়াছে এই বলিয়া যে, মহানবী তাঁহার সঙ্গীদিগকে জিবরাঈলের ভূমিকা পালনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। ইতোপূর্বে যেভাবে আলোচিত হইয়াছে যে, এইরূপ প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ কেবল প্রতারণাটিকেই প্রকাশ করিয়া দেয় এবং ওহী নাযিলের সময় উপস্থিত জনতার উপর যে ঐশী প্রভাব পড়ে তাহা প্রতারণা দ্বারা সম্ভবপর হয় না। মারগোলিয়থের পক্ষে এই নির্দিষ্টকর বিকৃতির প্রয়াস বেশ অস্বাভাবিক। কারণ তিনি একই সাথে উল্লেখ করেন যে, জিবরাঈল একজন ঐশীদূত, "তিনি নূতন নিয়মে (বাইবেল) বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত” ৫৬ কেহ হয়ত প্রশ্ন করিবার জন্য প্ররোচনা বোধ করিতে পারেন : নূতন বাইবেলের ক্ষেত্রে নবীদের জন্য জিবরাঈল কর্তৃক বার্তা বহনের বিষয়টি যদি অস্বাভাবিক না হয় তাহা হইলে অন্য নবীর ক্ষেত্রে তাহা অস্বাভাবিক হইবে কেন? পরবর্তীজনের ক্ষেত্রে প্রতারণার বিষয়টি প্রমাণ করিবার জন্য নূতন বাইবেলের নবীদের উদ্দেশ্যে ঐশীদূত কর্তৃক বার্তা বহনের প্রকৃত পদ্ধতির উল্লেখ করা আবশ্যক। মারগোলিয়থ অথবা তাহার বুদ্ধিজীবী শিষ্যদের মধ্যে যাহারা তাহার মতামত গ্রহণ করেন তাহারা কেহই ইহা সম্পাদন করেন নাই।

মূল গ্রন্থ বা পাঠের ভুল ব্যাখ্যা করিয়া সাধারণ তথ্যের বিকৃতি ঘটানো হয়। প্রকৃতপক্ষে এইরূপ দুইটি অপব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য নিরূপণের জন্য একটি রেখা টানিয়া দেওয়া প্রায়শ কঠিন হইয়া পড়ে। কমপক্ষে একজন ওহী লেখকের এইরূপ একটি ঘটনা আছে যে শপথপূর্বক ইসলাম ধর্মকে পরিত্যাগ করিয়াছে বলিয়া দাবি করা হয়। কারণ তাহার এইরূপ প্রতীতি জন্মায় যে, ওহী অবতীর্ণ হওয়ার বিষয় হইতেছে একটি জালিয়াতি। ৫৭ বস্তুত মারগোলিয়থ কর্তৃক উদ্ধৃত হাদীছটিতে বলা হইয়াছে যে, মহানবীর জন্য যে ব্যক্তি ওহী লিখিবে এবং পরে ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগ করিয়া মক্কার বিরোধী দলের সাথে যোগদান করিবে তাহার জন্য রহিয়াছে জঘন্য পরিণাম। তাহার ইসলাম ধর্ম পরিত্যাগের কারণ বর্ণনা করিতে গিয়া মার্গোলিয়থ বলেন যে, মহানবী নিজে ওহী লেখককে ওহী লিখিবার নির্দেশ প্রদান করিতেন কিন্তু ওহী লেখক তাহা ভিন্নভাবে লিখিত। তাহাকে ভুল সংশোধনের জন্য বলা হইলে সে যাহা লিখিয়াছে তাহা পরিবর্তন করিতে অস্বীকৃতি জানাইত। সুতরাং মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী উক্ত ওহী লেখককে তাহার ইচ্ছানুযায়ী ওহী লিখিবার অনুমতি প্রদান করিতেন। এইরূপ একাধিকবার ঘটিয়াছে বলিয়া উল্লেখ করা হয়। ৫৮

এখন ইহা স্পষ্ট যে, এই বর্ণনা এইরূপ এক ব্যক্তির যে শত্রুতে পরিণত হয়। ইহাতে স্পষ্টতই প্রতীয়মান হয় যে, ইহা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে। বর্ণনার মূল বিষয়বস্তু পরীক্ষা করিলে

ইহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি এক ছদ্মবেশী শত্রু যে ইসলামের নামে মিথ্যা ঘোষণা দিয়া মুসলমানদের দলে অনুপ্রবেশ করিয়াছিল। ইসলাম ও ওহীর মূল পাঠকে ধ্বংস করাই তাহার উদ্দেশ্য ছিল। যাহাই হউক না কেন, সাধারণ জ্ঞান ও যুক্তিতে উক্ত ব্যক্তির ঘোষণাকে কখনও সত্য বলিয়া গ্রহণ করা যাইতে পারে না। কারণ কোন যুক্তিবোধসম্পন্ন ব্যক্তি কখনও তাহার কর্মচারী বা অনুসারিগণকে তাহাদের ইচ্ছানুযায়ী লিখিবার অনুমতি দিতে এবং তাহাদের লিখিত বিষয়কে ওহী হিসাবে ঘোষণা করিতে পারেন না। আর একজন ধূর্ত ও সুনির্দিষ্ট ভণ্ড ব্যক্তির বেলায় তো ইহার প্রশ্নই উঠে না। এই বিবরণী সুস্পষ্টভাবে ইহাকে একটি মিথ্যা অভিযোগ হিসাবে উল্লেখ করে এবং ইহার ক্ষতিকর ফলাফলের বর্ণনা দেয় যাহা ইহার কুৎসা রটনাকারীর উপরই বর্তায়। মারগোলিয়থ ওহী অবতীর্ণ হওয়ার উপর মিথ্যা আরোপ করিয়া ইহাকে সাক্ষ্য হিসাবে ভূয়া অভিযোগ দাঁড় করাইয়াছেন এবং তারপর ইহার বিকৃতি সাধনে রত হইয়াছেন। অধিকন্তু বিবরণীটিতে কোথাও উল্লেখ নাই যে, মহানবী কৃত্রিমভাবে রোগের উপসর্গ তৈয়ার করিয়াছেন যাহা মারগোলিয়থ কথিত প্রতারণার চিহ্ন হিসাবে উদ্ধৃতি দিয়াছেন। আশ্চর্যের বিষয়, মহানবী-এর হাজার হাজার বুদ্ধিমান ও সুবুদ্ধিপূর্ণ অনুসারীদের উদাহরণ হইতে তিনি কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে পারেন নাই। এই সকল অনুসারী তাহাদের সারা জীবন মহানবী-এর প্রতি ছিলেন চির অনুগত ও উৎসর্গীকৃত। আর মারগোলিয়থের দৃষ্টিতে ইহারা হইয়া গেলেন মহানবী-এর ছলনা ও প্রতারণার শিকার!

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: সূরা আন-নাজমের আয়াত ৫৩ঃ ৪-১০-এর মারগোলিয়থের অপব্যাখ্যা

📄 তিন: সূরা আন-নাজমের আয়াত ৫৩ঃ ৪-১০-এর মারগোলিয়থের অপব্যাখ্যা


মারগোলিয়থের আনুপূর্বিক বর্ণনা হইতেছে তাহার সবচাইতে বড় ভুল ব্যাখ্যা এবং তাহা হইতেছে মুইর-এর অনুমানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আর ইহা হইতেছে, কুরআনে বলা হইয়াছে দুইটি ধনুকের পাল্লা হইতেও কম দূরত্বে অবস্থান করিয়া আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জিবরাঈল ওহী প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন। মারগোলিয়থ যদিও সুনির্দিষ্টভাবে ইহা উদ্ধৃত করেন নাই, তবুও কুরআনের আয়াত ৫৩:৪-১০ (সূরাতুন নাজম)-এর প্রসঙ্গে ইহা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এই আয়াতটি বিবেচনা করিবার পূর্বে ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থের এই অনুমানও তাহার সাধারণ মতবাদের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সব সময় প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার পূর্ববর্তী নবীদের কেবল অনুকরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার সকল ভাবধারা ও তথ্য পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে আহরণ করিয়াছেন। আর তিনি যোসেফ স্মিথ (Joseph Smith)-এর ন্যায় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন যিনি "দেবদূতগণের পথ-নির্দেশনায়" মর্মনদের কিতাব (Book of Mormon) উদ্ধার করিয়াছেন। তারপর নূতন বাইবেলেই জিবরাঈলের কথা বলা হইয়াছে, যিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী লইয়া তাঁহার নবীদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করিয়া মারগোলিয়থ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন
যে, কুরআনের প্রমাণকে ভিত্তি করিয়া দাবি করা হয় যে, মহানবী প্রারম্ভে সরাসরি আল্লাহ্ নিকট হইতে ওহী লাভ করেন বলিয়া উক্তি করেন। কিন্তু ইহা ব্যাখ্যা করা হয় নাই কেন? মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবীর রীতি হইতে অস্বাভাবিকভাবে দূরে সরিয়া যাইবেন? পূর্ববর্তী নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী লাভ করেন এবং তিনি তাহাদিগকে শুধু অনুকরণ করেন বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। অন্য কাহারও কর্তৃক অদৃশ্য ও অলক্ষ্যভাবে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে বাণী লাভ এবং ওহী প্রদানকারী ফেরেশতার দীর্ঘকালব্যাপী দৃশ্যপট হইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিতি সবচাইতে সঠিক পদ্ধতি হইবে কিনা তাহা মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মহানবী তাঁহার শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর ধর্মোপদেশের অতি প্রাকৃত উৎস সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার ও ইহা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।
বরং কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটি লইয়া আলোচনা করা যাইতে পারে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মারগোলিয়থ তাহার অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। আলোচ্য আয়াতগুলি এইভাবে অগ্রসর হইয়াছে:
مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوَى . وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى . عَلَّمَهُ شَدِيدُ القُوى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى . وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى . ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ، فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى .
"তোমাদিগের সংগী (Prophet বা রাসূল) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিবার তাহা প্রত্যাদেশ করিলেন" (৫৩: ২-১০)।
যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আয়াতগুলি নাযিল হয় তাহা বুঝিতে হইবে এবং কুরআনের অন্য আয়াতসমূহে (আয়াত নং ৮১: ১৯-২৮; সূরাতুত তাকবীর) ইহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে, যাহাতে একই বিষয় আলোচিত হইয়াছে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন রচনাবলীর পণ্ডিতবর্গ, তৎসহ প্রাচ্যবিদগণের মতানুসারে এই পরবর্তী আয়াতগুলি (৮১: ১৯-২৮) ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে ৫৩: ২-১০ আয়াতসমূহের পূর্বেকার। ৫৯ এই উভয় সূরার আয়াতসমূহ মহানবী যে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ওহী লাভ করেন কাফিররা তাহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। কাফিররা দাবি করে যে, মহানবী একটি দুষ্ট আত্মার প্রভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এই আয়াতসমূহ নাযিল হইয়াছিল। সূরাতুত তাকবীর-এর আয়াতসমূহের বর্ণনা নিম্নরূপ:
إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ ، مُطَاعٍ ثُمَّ أَمِينِ . وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ . وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْنِ . وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّحِيمٍ ، فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ . إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَلَمِينَ .
"নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। এবং তোমাদিগের সাথী (রাসূল) উন্মাদ নহে, সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে, সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে। এবং ইহা অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নহে। সুতরাং তোমরা কোথায় চলিয়াছ? ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ” (৮১: ১৯-২৭)।
এইভাবে উভয় সূরার মধ্যকার সাধারণ বিষয়টি উল্লিখিত হইতে পারে। প্রথমত, উভয় সূরাই মহানবী -এর দিগন্তে একটি সত্তার দৃশ্য দেখিবার বর্ণনা প্রদান করিয়াছে। ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে অধিকতর পূর্বের ৮১: ২৩ নং আয়াতে এই সত্তাকে সুস্পষ্টভাবে একজন সম্মানিত বার্তাবাহক হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে অর্থাৎ তিনি আল্লাহ তা'আলার বার্তাবাহক একজন ফেরেশতা। তিনি নিজে আল্লাহ নহেন।
দ্বিতীয়ত, এই সূরাতে (৫৩: ২-১০) ইহা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় নাই যে, এই সত্তা একজন "বার্তাবাহক”, তবুও সেখানে যে বিবরণ দেওয়া হইয়াছে তাহা সূরা ৮১: ১৯-২৭-এ প্রদত্ত বিবরণের প্রায় অনুরূপ। পক্ষান্তরে সূরা আত-তাকবীরে যখন তাহাকে একজন শক্তিশালী (ذِي قُوَّةٍ) ও আল্লাহ্র আরশের নিকটে অবস্থানকারী একজন সত্তা হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে তখন সূরা ৫৩: ২-১০-এ তাহাকে খুবই শক্তিশালী (شَدِيدُ الْقُوى) এবং শারীরিক ও মানসিক তেজসম্পন্ন ব্যক্তি (ذو مرة) হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে।
তৃতীয়ত, উভয় সূরাই মক্কার কাফিরদের অভিযোগ খণ্ডন করিয়া মহানবী -কে "তোমাদের সাথী (صاحبكم) বলিয়া উল্লেখ করে"। কারণ তিনি প্রকৃতই তাহাদের একজন ছিলেন এবং তাহাদের নিকট এক অতি সুপরিচিত ব্যক্তি হিসাবে বিবেচিত হইতেন।
চতুর্থত, উভয় সূরাতে জোর দিয়া বলা হইয়াছে যে, মহানবী -কে কোন অপশক্তি আচ্ছন্ন করিতে পারে নাই (৮১: ২২) কিংবা তিনি সঠিক পথ বিচ্যুত হইয়া বিচার-বুদ্ধিহীনের কাজ করেন নাই (৫৩ঃ ২)।
পঞ্চমত, উভয় সূরাতেই বলা হইয়াছে যে, মহানবী তাঁহার জনগণের মধ্যে যাহা ঘোষণা করিতেছিলেন তাহা একজন সম্মানিত বার্তাবাহক কর্তৃক তাঁহাকে প্রদত্ত বাণী (قول) বিশেষ ছিল এবং "সে একটি শক্তিশালী সত্তা” (৫৩ঃ ৫) ইহা তাঁহাকে শিখাইয়া দিয়াছিলেন।
সর্বশেষে, এই উভয় সূরাতেই পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে যে, মহানবী -এর নিকট ইহা ছিল আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত ওহী (৫৩: ৪) এবং তাহা কোন অপশক্তির কথা ছিল না, বরং সারা পৃথিবীর সমস্ত লোকের জন্য তাহা ছিল আল্লাহ্র বাণীর বর্ণনা (৮১: ২৫, ২৭)।
এইভাবে উভয় সূরাতে একই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং মক্কার কাফিরদের একই অভিযোগের একই জবাব দেওয়া হইয়াছে। আর একইরূপ বাক্যাংশ ও বিশেষণ দ্বারা দিগন্তে দৃশ্যমান সত্তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির প্রতিটিই ব্যাখ্যামূলক ও একে অপরের সম্পূরক এবং যেহেতু প্রথম উল্লিখিত (৮১) সূরাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দৃষ্ট সত্তাকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে, তাই ইহা ধারণা করা যাইতে পারে না যে, পরবর্তী সূরাতে এই বার্তাবাহককে স্বয়ং আল্লাহ হিসাবে দাবি করা হইবে যিনি নিচে অবতরণ করিয়া আসিয়া মহানবীকে কুরআনের বাণী হস্তান্তর করিবেন। এই একই বিষয়টি সত্য হইবে এমন কি যদি এই দুইটি সূরার নাযিল হওয়ার ক্রমটি পাল্টাইয়া দেওয়া হয়। কারণ মহানবী যদি এতই আত্মবিরোধী হইয়া পড়েন যে, তিনি কোন একটি সূরাতে আল্লাহ্ বাণী বহনকারীকে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত করিবেন এবং তাহাকে অন্যত্র ফেরেশতা বলিবেন তাহা হইলে কাফিরদের দ্বারা তিনি নিদারুণভাবে অপদস্ত হইতেন এবং তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি সংশোধনাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত।
এমনকি যদি ৫৩:২ - ১০ আয়াতসমূহকে ৮১: ১৯ - ২৭ আয়াতসমূহের প্রতি কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যাইত না যে, এই প্রসঙ্গটি আল্লাহ সম্পর্কিত। কারণ এই আয়াতে ইহার বিপরীতে চূড়ান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। এইভাবে এই সত্তাকে প্রচুর শক্তির অধিকারী (شديد القوى) হিসাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এখন আল্লাহ তো অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহাক্ষমতাশালী, কিন্তু কুরআনে তাঁহাকে কোথায়ও 'শাদীদুল কুওয়া' বা 'খুবই শক্তিশালী' বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে আপেক্ষিক শক্তির নির্দেশক এবং সর্বোচ্চ শক্তির নহে। অতএব, ইহা কখনও আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা হইতে পারে না। অনুরূপভাবে 'যু-মিররাহ' শব্দটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ অথবা শারীরিক ক্ষমতা কিংবা উভয় প্রকাশ করে। এই শব্দটি কেবল সৃষ্টিজীবের বেলায় প্রযোজ্য হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে নহে। তাহা ছাড়া কুরআনের কোথাও ইহাকে আল্লাহ্র বর্ণনা অথবা তাঁহার গুণের উল্লেখরূপে বর্ণনা করা হয় নাই। তৃতীয়ত, এই একই সূরার আরও কিছু পরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী ঐ একই সত্তার প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করেন এবং তারপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, তিনি যাহা দিগন্তে অবলোকন করেন তাহা তাঁহার মহান প্রভুর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল (مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) ৬০ অতঃপর মহানবী এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে যাহা অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ছিল একটি নিদর্শন অর্থাৎ তাঁহার প্রভুর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি—জিবরাঈল ফেরেশতা এবং তিনি মানুষের প্রকৃত অবয়ব ও গঠনে হাজির ছিলেন। আর তিনি স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন না।
আয়াত নং ৫৩ : ১০ (فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى)-এর বর্ণনা দ্বারা মারগোলিয়থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে। এই আয়াতের অর্থ বুঝিবার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:
প্রথমত, আরবী হরফ 'ফা' দিয়া আয়াতটি শুরু হইয়াছে এবং ইহার দুইটি ভাবার্থ রহিয়াছে-ইসতিকবালিয়াহ অর্থাৎ অনুবর্তিতা যাহার অর্থ করা হয় 'তখন' শব্দটি দ্বারা; এবং তাফসীরিয়াহ অর্থাৎ ব্যাখ্যামূলক; ইহার অর্থ 'এইরূপে' অথবা 'অতএব' কিংবা 'সুতরাং'।
দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করিতে হয় তাহা হইতেছে আয়াতের 'আবদিহি' শব্দটি। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার অর্থাৎ আল্লাহ্র বান্দাকে বুঝায় এবং ইহা হয় মহানবী-কে অথবা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রসঙ্গে গ্রহণ করা যাইতে পারে।
তৃতীয়ত, ইহা স্মরণে রাখা আবশ্যক যে, আরবী ভাষায় একটি সর্বনাম হয় স্পষ্ট অথবা একটি ক্রিয়াপদের সহিত উহ্য থাকিতে পারে এবং তাহা সব সময় অব্যবহিত পূর্ববর্তী সর্বনাম-এর (বিশেষ্য পদের পরিবর্তে ব্যবহৃত) সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে না। কিন্তু ইংরেজিতে বরং কর্তৃকারকের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে অথবা বিষয়বস্তুটি রচনার কোন অংশের বর্ণনা হইতে বোধগম্য হয়।
মনের মধ্যে এই তিনটি বিষয় ধারণ করিয়া ৫৩: ১০ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করা যাইতে পারিবে। 'ফা' হরফটি যাহার সহিত শুরু হইয়াছে তাহা যদি অনুবর্তিতার ভাবধারায় গৃহীত হয় তাহা হইলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে: "তখন তিনি (ফেরেশতা) তাঁহার (আল্লাহ তা'আলার) বান্দার (অর্থাৎ মহানবী) সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবেন যাহা তিনি (আল্লাহ অথবা মহানবী) প্রকাশ করিয়াছিলেন"। পক্ষান্তরে, ফা হরফটিকে যদি ব্যাখ্যামূলক ভাবধারায় গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে অর্থ হইবে: "এইরূপে অথবা সুতরাং (ফেরেশতার সহায়তায়) যিনি (আল্লাহ) নিশ্চয়ই তাঁহার বান্দার সহিত যোগাযোগ করেন যাহা তিনি প্রকাশ করিতে চাহেন"।
উপরে যে সকল অভ্যন্তরীণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা অস্বীকার করা স্পষ্টতই ভুল হইবে। তাহা ছাড়া বিষয়বস্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গ ও একটি আয়াতের সহিত অন্য আয়াতের সম্পর্ক, ৮১ : ১৯ - ২৭, এবং 'আবদিহি' (عبده) শব্দের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ইহা ধরিয়া লওয়া যে, আয়াতটিতে দিগন্তে দৃশ্যমান আল্লাহ নিজেই কথা বলিতেছেন অতঃপর মহানবী-এর নিকট অবতরণ করিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করিতেছেন-প্রভৃতি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধারণা।
মারগোলিয়থ ধারণা পোষণ করেন যে, মহানবী-এর প্রথমদিকের দাবি-আল্লাহ নিজেই তাঁহাকে কুরআনের বাণী প্রদান করেন-ইহা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ইহার অগ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও মারগোলিয়থের ধারণা তাহার উত্তরসুরি কর্তৃক গৃহীত ও পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। ফলে তাহারা মারগোলিয়থের অন্যান্য ধারণার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন যে, পরবর্তী কোন এক সময়ে ওহীর বাহক হিসাবে জিবরাঈল স্থলবর্তী হন। মারগোলিয়থের প্রধান তত্ত্ব যে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ও চক্রান্তপরায়ণতার সহিত একজন নবীর ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি যে অন্যভাবে একজন প্রতারক তাহা নূতন কিছুই নহে। ইসলাম সম্পর্কে মধ্যযুগের ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গের এই যে
ধারণা তাহা বাস্তবিকপক্ষে পুনরাবৃত্তি। সাম্প্রতিক কালের ইউরোপীয় পাণ্ডিত্য অবশ্য মহানবী -এর বিরুদ্ধে এইরূপ গায়ে পড়িয়া অভিযোগ করিবার ব্যাপারে কিছু পরিমাণ লজ্জাবোধ করে। কিছু পরেই দৃশ্যমান হইবে এইরূপ সাম্প্রতিক কালের কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন মহানবী -এর প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত লক্ষণাদির ৬১ প্রবর্তনের উপর কথা বলেন তখন তাহা বস্তুতপক্ষে মধ্যযুগীয় মনোভাবের প্রতিধ্বনি হিসাবেই বিবেচিত হয়।
আরেকটি ক্ষেত্রে মারগোলিয়থকে একটি নূতন পথের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তাহা হইতেছে ইসলামী প্রত্যাদেশের দৃশ্য ব্যাখ্যাকল্পে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন অথবা অতীন্দ্রিয়বাদের উপর প্রণীত আধুনিক গ্রন্থাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা। এইভাবে তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার উপর Podmore-এর গ্রন্থকে ব্যবহার করিয়া এই ধারণা দেন যে, মহানবী সৎ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হইলেও তিনি তবুও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওয়াট অতীন্দ্রিয়বাদের উপর A. Poulin-এর গ্রন্থের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর পক্ষে ওহী হইতেছে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাচনভঙ্গি। ৬২

টিকাঃ
৫৯. মুসলিম পণ্ডিতবর্গের মতানুসারে আত-তাকবীর ও আন-নাজম সূরা দুইটি ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে যথাক্রমে ৭ম ও ২৩তম অবস্থানে রহিয়াছে। Rodwell, Jeffery, Muir ও Nöldeke ইহাদিগকে যথাক্রমে ৩২তম ও ৪৬তম, ২৪তম ও ২৭তম, ২৭তম ও ৪৩তম এবং ২৭তম ও ২৮তম অবস্থানের বলিয়া মনে করেন.
৬০. কুরআন, ৫৩: ১৩, ১৮.
৬১. নিম্নে দ্র., অধ্যায় ২০, ২য় অংশ.
৬২. ঐ, ১ম ও ২য় অংশ.

মারগোলিয়থের আনুপূর্বিক বর্ণনা হইতেছে তাহার সবচাইতে বড় ভুল ব্যাখ্যা এবং তাহা হইতেছে মুইর-এর অনুমানের উল্লেখযোগ্য সংযোজন। আর ইহা হইতেছে, কুরআনে বলা হইয়াছে দুইটি ধনুকের পাল্লা হইতেও কম দূরত্বে অবস্থান করিয়া আল্লাহ তা'আলা স্বয়ং মহানবী -কে ওহী প্রদান করিতেছেন এবং পরবর্তী সময়ে জিবরাঈল ওহী প্রদানকারীর ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছেন। মারগোলিয়থ যদিও সুনির্দিষ্টভাবে ইহা উদ্ধৃত করেন নাই, তবুও কুরআনের আয়াত ৫৩:৪-১০ (সূরাতুন নাজম)-এর প্রসঙ্গে ইহা স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করা হইয়াছে। এই আয়াতটি বিবেচনা করিবার পূর্বে ইহা উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, মারগোলিয়থের এই অনুমানও তাহার সাধারণ মতবাদের সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ। তিনি সব সময় প্রমাণ করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার পূর্ববর্তী নবীদের কেবল অনুকরণ করিয়াছেন এবং তিনি তাঁহার সকল ভাবধারা ও তথ্য পুরাতন ও নূতন বাইবেল হইতে আহরণ করিয়াছেন। আর তিনি যোসেফ স্মিথ (Joseph Smith)-এর ন্যায় দায়িত্ব পালন করিয়াছেন যিনি "দেবদূতগণের পথ-নির্দেশনায়" মর্মনদের কিতাব (Book of Mormon) উদ্ধার করিয়াছেন। তারপর নূতন বাইবেলেই জিবরাঈলের কথা বলা হইয়াছে, যিনি আল্লাহ তা'আলার বাণী লইয়া তাঁহার নবীদের নিকট পৌঁছাইয়া দিয়াছেন। এই সকল বিষয়ের উল্লেখ করিয়া মারগোলিয়থ মতামত প্রকাশ করিয়াছেন

যে, কুরআনের প্রমাণকে ভিত্তি করিয়া দাবি করা হয় যে, মহানবী প্রারম্ভে সরাসরি আল্লাহ্ নিকট হইতে ওহী লাভ করেন বলিয়া উক্তি করেন। কিন্তু ইহা ব্যাখ্যা করা হয় নাই কেন? মুহাম্মাদ পূর্ববর্তী সকল নবীর রীতি হইতে অস্বাভাবিকভাবে দূরে সরিয়া যাইবেন? পূর্ববর্তী নবীগণ ফেরেশতার মাধ্যমে ওহী লাভ করেন এবং তিনি তাহাদিগকে শুধু অনুকরণ করেন বলিয়া অভিযোগ করা হইয়াছে। অন্য কাহারও কর্তৃক অদৃশ্য ও অলক্ষ্যভাবে সরাসরি আল্লাহ্র নিকট হইতে বাণী লাভ এবং ওহী প্রদানকারী ফেরেশতার দীর্ঘকালব্যাপী দৃশ্যপট হইতে সম্পূর্ণরূপে অনুপস্থিতি সবচাইতে সঠিক পদ্ধতি হইবে কিনা তাহা মারগোলিয়থ আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিয়াছেন। তিনি বলেন যে, মহানবী তাঁহার শ্রোতৃমণ্ডলীর উপর ধর্মোপদেশের অতি প্রাকৃত উৎস সম্পর্কে প্রভাব বিস্তার ও ইহা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক ছিলেন।

বরং কুরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াতটি লইয়া আলোচনা করা যাইতে পারে যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মারগোলিয়থ তাহার অনুমান দাঁড় করাইয়াছেন। আলোচ্য আয়াতগুলি এইভাবে অগ্রসর হইয়াছে:

مَا ضَلَّ صَاحِبُكُمْ وَمَا غَوى . وَمَا يَنْطِقُ عَنِ الْهَوَى . إِنْ هُوَ إِلا وَحْيٌ يُوحَى . عَلَّمَهُ شَدِيدُ القُوى . ذُو مِرَّةٍ فَاسْتَوى . وَهُوَ بِالْأُفُقِ الْأَعْلَى . ثُمَّ دَنَا فَتَدَلَّى . فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى ، فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى .

"তোমাদিগের সংগী (Prophet বা রাসূল) বিভ্রান্ত নয়, বিপথগামীও নয় এবং সে মনগড়া কথাও বলে না। ইহা তো ওহী, যাহা তাহার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তাহাকে শিক্ষাদান করে শক্তিশালী, প্রজ্ঞাসম্পন্ন, সে নিজ আকৃতিতে স্থির হইয়াছিল, তখন সে ঊর্ধ্বদিগন্তে, অতঃপর সে তাহার নিকটবর্তী হইল, অতি নিকটবর্তী। ফলে তাহাদিগের মধ্যে দুই ধনুকের ব্যবধান রহিল অথবা উহারও কম। তখন আল্লাহ তাঁহার বান্দার প্রতি যাহা প্রত্যাদেশ করিবার তাহা প্রত্যাদেশ করিলেন" (৫৩: ২-১০)।

যে অবস্থার প্রেক্ষাপটে এই আয়াতগুলি নাযিল হয় তাহা বুঝিতে হইবে এবং কুরআনের অন্য আয়াতসমূহে (আয়াত নং ৮১: ১৯-২৮; সূরাতুত তাকবীর) ইহার প্রসঙ্গ আসিয়াছে, যাহাতে একই বিষয় আলোচিত হইয়াছে। মুসলমানদের শ্রেষ্ঠ প্রাচীন রচনাবলীর পণ্ডিতবর্গ, তৎসহ প্রাচ্যবিদগণের মতানুসারে এই পরবর্তী আয়াতগুলি (৮১: ১৯-২৮) ওহী নাযিলের ক্রমানুসারে ৫৩: ২-১০ আয়াতসমূহের পূর্বেকার। ৫৯ এই উভয় সূরার আয়াতসমূহ মহানবী যে আল্লাহ তা'আলার নিকট হইতে ওহী লাভ করেন কাফিররা তাহা বিশ্বাস করিতে অস্বীকৃতি জানাইবার প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়। কাফিররা দাবি করে যে, মহানবী একটি দুষ্ট আত্মার প্রভাবে মোহাবিষ্ট ছিলেন অথবা তিনি উন্মাদ হইয়া গিয়াছিলেন। এই অভিযোগ খণ্ডনের জন্য এই আয়াতসমূহ নাযিল হইয়াছিল। সূরাতুত তাকবীর-এর আয়াতসমূহের বর্ণনা নিম্নরূপ:

إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُولٍ كَرِيمٍ . ذِي قُوَّةٍ عِنْدَ ذِي الْعَرْشِ مَكِينِ ، مُطَاعٍ ثُمَّ أَمِينِ . وَمَا صَاحِبُكُمْ بِمَجْنُونٍ . وَلَقَدْ رَأَهُ بِالْأُفُقِ الْمُبِينِ . وَمَا هُوَ عَلَى الْغَيْبِ بِضَنِيْنِ . وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَانٍ رَّحِيمٍ ، فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ . إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَلَمِينَ .

"নিশ্চয়ই এই কুরআন সম্মানিত বার্তাবহের আনীত বাণী যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের নিকট মর্যাদাসম্পন্ন, যাহাকে সেথায় মান্য করা হয় এবং যে বিশ্বাসভাজন। এবং তোমাদিগের সাথী (রাসূল) উন্মাদ নহে, সে তো তাহাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখিয়াছে, সে অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নহে। এবং ইহা অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নহে। সুতরাং তোমরা কোথায় চলিয়াছ? ইহা তো শুধু বিশ্বজগতের জন্য উপদেশ” (৮১: ১৯-২৭)।

এইভাবে উভয় সূরাতে একই বিষয় বর্ণিত হইয়াছে এবং মক্কার কাফিরদের একই অভিযোগের একই জবাব দেওয়া হইয়াছে। আর একইরূপ বাক্যাংশ ও বিশেষণ দ্বারা দিগন্তে দৃশ্যমান সত্তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে। এই সূরা দুইটির প্রতিটিই ব্যাখ্যামূলক ও একে অপরের সম্পূরক এবং যেহেতু প্রথম উল্লিখিত (৮১) সূরাটিতে সুনির্দিষ্টভাবে দৃষ্ট সত্তাকে আল্লাহর বার্তাবাহক হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে, তাই ইহা ধারণা করা যাইতে পারে না যে, পরবর্তী সূরাতে এই বার্তাবাহককে স্বয়ং আল্লাহ হিসাবে দাবি করা হইবে যিনি নিচে অবতরণ করিয়া আসিয়া মহানবীকে কুরআনের বাণী হস্তান্তর করিবেন। এই একই বিষয়টি সত্য হইবে এমন কি যদি এই দুইটি সূরার নাযিল হওয়ার ক্রমটি পাল্টাইয়া দেওয়া হয়। কারণ মহানবী যদি এতই আত্মবিরোধী হইয়া পড়েন যে, তিনি কোন একটি সূরাতে আল্লাহ্ বাণী বহনকারীকে আল্লাহ হিসাবে অভিহিত করিবেন এবং তাহাকে অন্যত্র ফেরেশতা বলিবেন তাহা হইলে কাফিরদের দ্বারা তিনি নিদারুণভাবে অপদস্ত হইতেন এবং তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির বিষয়টি সংশোধনাতীতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হইত।

এমনকি যদি ৫৩:২ - ১০ আয়াতসমূহকে ৮১: ১৯ - ২৭ আয়াতসমূহের প্রতি কোন প্রসঙ্গ উত্থাপন না করিয়া স্বাধীনভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলে ইহা ধরিয়া লওয়া যাইত না যে, এই প্রসঙ্গটি আল্লাহ সম্পর্কিত। কারণ এই আয়াতে ইহার বিপরীতে চূড়ান্ত অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হইয়াছে। এইভাবে এই সত্তাকে প্রচুর শক্তির অধিকারী (شديد القوى) হিসাবে বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। এখন আল্লাহ তো অবশ্যই সর্বশক্তিমান ও মহাক্ষমতাশালী, কিন্তু কুরআনে তাঁহাকে কোথায়ও 'শাদীদুল কুওয়া' বা 'খুবই শক্তিশালী' বলিয়া উল্লেখ করা হয় নাই। এই বাক্যাংশটি স্পষ্টভাবে আপেক্ষিক শক্তির নির্দেশক এবং সর্বোচ্চ শক্তির নহে। অতএব, ইহা কখনও আল্লাহ তা'আলার বর্ণনা হইতে পারে না। অনুরূপভাবে 'যু-মিররাহ' শব্দটি মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক গুণ অথবা শারীরিক ক্ষমতা কিংবা উভয় প্রকাশ করে। এই শব্দটি কেবল সৃষ্টিজীবের বেলায় প্রযোজ্য হয়, স্রষ্টার ক্ষেত্রে নহে। তাহা ছাড়া কুরআনের কোথাও ইহাকে আল্লাহ্র বর্ণনা অথবা তাঁহার গুণের উল্লেখরূপে বর্ণনা করা হয় নাই। তৃতীয়ত, এই একই সূরার আরও কিছু পরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী ঐ একই সত্তার প্রতি দ্বিতীয়বার দৃষ্টিপাত করেন এবং তারপর গুরুত্বারোপ করা হইয়াছে যে, তিনি যাহা দিগন্তে অবলোকন করেন তাহা তাঁহার মহান প্রভুর শ্রেষ্ঠতম নিদর্শন ছিল (مِنْ آيَاتِ رَبِّهِ الْكُبْرَى) ৬০ অতঃপর মহানবী এই উভয় ঘটনার ক্ষেত্রে যাহা অবলোকন করিয়াছিলেন তাহা ছিল একটি নিদর্শন অর্থাৎ তাঁহার প্রভুর এক বিস্ময়কর সৃষ্টি—জিবরাঈল ফেরেশতা এবং তিনি মানুষের প্রকৃত অবয়ব ও গঠনে হাজির ছিলেন। আর তিনি স্বয়ং আল্লাহ ছিলেন না।

আয়াত নং ৫৩ : ১০ (فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى)-এর বর্ণনা দ্বারা মারগোলিয়থের বিভ্রান্তি সৃষ্টি হইয়া থাকিতে পারে। এই আয়াতের অর্থ বুঝিবার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন:

প্রথমত, আরবী হরফ 'ফা' দিয়া আয়াতটি শুরু হইয়াছে এবং ইহার দুইটি ভাবার্থ রহিয়াছে-ইসতিকবালিয়াহ অর্থাৎ অনুবর্তিতা যাহার অর্থ করা হয় 'তখন' শব্দটি দ্বারা; এবং তাফসীরিয়াহ অর্থাৎ ব্যাখ্যামূলক; ইহার অর্থ 'এইরূপে' অথবা 'অতএব' কিংবা 'সুতরাং'।

দ্বিতীয় যে বিষয়টির উল্লেখ করিতে হয় তাহা হইতেছে আয়াতের 'আবদিহি' শব্দটি। ইহা নিশ্চয়ই তাঁহার অর্থাৎ আল্লাহ্র বান্দাকে বুঝায় এবং ইহা হয় মহানবী-কে অথবা ফেরেশতা জিবরাঈলের প্রসঙ্গে গ্রহণ করা যাইতে পারে।

তৃতীয়ত, ইহা স্মরণে রাখা আবশ্যক যে, আরবী ভাষায় একটি সর্বনাম হয় স্পষ্ট অথবা একটি ক্রিয়াপদের সহিত উহ্য থাকিতে পারে এবং তাহা সব সময় অব্যবহিত পূর্ববর্তী সর্বনাম-এর (বিশেষ্য পদের পরিবর্তে ব্যবহৃত) সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে না। কিন্তু ইংরেজিতে বরং কর্তৃকারকের সহিত সম্বন্ধ স্থাপন করে অথবা বিষয়বস্তুটি রচনার কোন অংশের বর্ণনা হইতে বোধগম্য হয়।

মনের মধ্যে এই তিনটি বিষয় ধারণ করিয়া ৫৩: ১০ নং আয়াতের মর্ম অনুধাবন করা যাইতে পারিবে। 'ফা' হরফটি যাহার সহিত শুরু হইয়াছে তাহা যদি অনুবর্তিতার ভাবধারায় গৃহীত হয় তাহা হইলে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে: "তখন তিনি (ফেরেশতা) তাঁহার (আল্লাহ তা'আলার) বান্দার (অর্থাৎ মহানবী) সহিত যোগাযোগ স্থাপন করিবেন যাহা তিনি (আল্লাহ অথবা মহানবী) প্রকাশ করিয়াছিলেন"। পক্ষান্তরে, ফা হরফটিকে যদি ব্যাখ্যামূলক ভাবধারায় গ্রহণ করা হয় তাহা হইলে অর্থ হইবে: "এইরূপে অথবা সুতরাং (ফেরেশতার সহায়তায়) যিনি (আল্লাহ) নিশ্চয়ই তাঁহার বান্দার সহিত যোগাযোগ করেন যাহা তিনি প্রকাশ করিতে চাহেন"।

উপরে যে সকল অভ্যন্তরীণ প্রমাণ উপস্থাপন করা হইয়াছে তাহা অস্বীকার করা স্পষ্টতই ভুল হইবে। তাহা ছাড়া বিষয়বস্তুর বর্ণনা প্রসঙ্গ ও একটি আয়াতের সহিত অন্য আয়াতের সম্পর্ক, ৮১ : ১৯ - ২৭, এবং 'আবদিহি' (عبده) শব্দের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করিয়া ইহা ধরিয়া লওয়া যে, আয়াতটিতে দিগন্তে দৃশ্যমান আল্লাহ নিজেই কথা বলিতেছেন অতঃপর মহানবী-এর নিকট অবতরণ করিয়া তাঁহাকে ওহী প্রদান করিতেছেন-প্রভৃতি সুস্পষ্ট ভ্রান্ত ধারণা।

মারগোলিয়থ ধারণা পোষণ করেন যে, মহানবী-এর প্রথমদিকের দাবি-আল্লাহ নিজেই তাঁহাকে কুরআনের বাণী প্রদান করেন-ইহা সম্পূর্ণরূপে অগ্রহণযোগ্য। ইহার অগ্রহণযোগ্যতা সত্ত্বেও মারগোলিয়থের ধারণা তাহার উত্তরসুরি কর্তৃক গৃহীত ও পুনরাবৃত্ত হইয়াছে। ফলে তাহারা মারগোলিয়থের অন্যান্য ধারণার পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন যে, পরবর্তী কোন এক সময়ে ওহীর বাহক হিসাবে জিবরাঈল স্থলবর্তী হন। মারগোলিয়থের প্রধান তত্ত্ব যে মুহাম্মাদ উদ্দেশ্যমূলকভাবে ও চক্রান্তপরায়ণতার সহিত একজন নবীর ভূমিকা পালন করেন এবং তিনি যে অন্যভাবে একজন প্রতারক তাহা নূতন কিছুই নহে। ইসলাম সম্পর্কে মধ্যযুগের ইউরোপীয় পণ্ডিতবর্গের এই যে

ধারণা তাহা বাস্তবিকপক্ষে পুনরাবৃত্তি। সাম্প্রতিক কালের ইউরোপীয় পাণ্ডিত্য অবশ্য মহানবী -এর বিরুদ্ধে এইরূপ গায়ে পড়িয়া অভিযোগ করিবার ব্যাপারে কিছু পরিমাণ লজ্জাবোধ করে। কিছু পরেই দৃশ্যমান হইবে এইরূপ সাম্প্রতিক কালের কোন পণ্ডিত ব্যক্তি যখন মহানবী -এর প্রত্যাদেশ সম্পর্কিত লক্ষণাদির ৬১ প্রবর্তনের উপর কথা বলেন তখন তাহা বস্তুতপক্ষে মধ্যযুগীয় মনোভাবের প্রতিধ্বনি হিসাবেই বিবেচিত হয়।

আরেকটি ক্ষেত্রে মারগোলিয়থকে একটি নূতন পথের নির্দেশ দিতে দেখা যায়। তাহা হইতেছে ইসলামী প্রত্যাদেশের দৃশ্য ব্যাখ্যাকল্পে ধর্মতত্ত্ব, দর্শন অথবা অতীন্দ্রিয়বাদের উপর প্রণীত আধুনিক গ্রন্থাবলীর সাহায্য গ্রহণ করা। এইভাবে তিনি যখন আধ্যাত্মিকতার উপর Podmore-এর গ্রন্থকে ব্যবহার করিয়া এই ধারণা দেন যে, মহানবী সৎ ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত হইলেও তিনি তবুও প্রতারণার আশ্রয় গ্রহণ করেন। ওয়াট অতীন্দ্রিয়বাদের উপর A. Poulin-এর গ্রন্থের আশ্রয় গ্রহণ করেন এবং বলেন যে, মুহাম্মাদ -এর পক্ষে ওহী হইতেছে এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বাচনভঙ্গি। ৬২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00