📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (ক) পৃথিবীর আকৃতি

📄 (ক) পৃথিবীর আকৃতি


অবশ্য আধুনিক মুসলমানের সেই প্রকার ধারণা করিয়া শান্তিলাভের প্রয়োজন নাই। কারণ পবিত্র কুরআনের কোন বক্তব্যের সহিত বৈজ্ঞানিক তথ্যের বিরোধ নাই, তাহাই এই স্থলে দেখানো হইবে। ওয়াট তাহার বক্তব্যের পক্ষে কুরআনের যে সকল আয়াতের ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন তাহা সঠিক নহে। অতি আশ্চর্যের বিষয় এই যে, তিনি তাহার ধারণাকে উপস্থাপন করিতে গিয়া এই বিষয়ে যে২৫ কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ রহিয়াছে তাহা তো বিবেচনায় আনেনই নাই, এমনকি ইউরোপে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বহুল পরিচিত গ্রন্থ মরিস বুকাইলির "বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান" গ্রন্থটিও বিবেচনায় আনয়ন করেন নাই। এই গ্রন্থটি সর্বপ্রথম ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হইয়া দশ বৎসরের মধ্যে ১২টি সংস্করণ মুদ্রিত হইয়াছে২৬: ইংরেজিসহ তিনটি ইউরোপীয় ভাষায় এবং সাতটি এশীয় ভাষায় অনূদিত হইয়া প্রকাশিত হইয়াছে। অথচ ওয়াট তাহার গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন এই সকল প্রকাশনার পরে।
উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ওয়াট তাহার অনুমান বা ধারণার সমর্থনে যে সকল আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন তাহাতে স্বীকার করিয়াছেন যে, পৃথিবী বুঝাইতে বিভিন্ন শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে এবং 'সমতল' কথাটির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই; কিন্তু তিনি বলেন, যাহারা শ্রবণ করিবে তাহারা তাহাদিগের বিশ্বাস অনুযায়ী অর্থ করিবে যে, 'পৃথিবী সমতল'।
ইহা পক্ষান্তরে স্বীকার করিয়া লওয়া যে, আলোচ্য আয়াতসমূহে বস্তুগত প্রকাশ দ্বারা সেই অর্থই ধরা যাইতে পারে যিনি যে ধারণা লইয়া পাঠ করিবেন অর্থাৎ পূর্ব ধারণা লইয়া পাঠ করিলে উহার অর্থ তাহাই মনে হইবে। ইহার অর্থ তাহারা জানিত পৃথিবী সমতল, ফলে তাহাদিগের নিকট সেই সকল শব্দের অর্থ সমতল মনে হইবে। অপরপক্ষে যদি পূর্বধারণা ব্যতীত অগ্রসর হওয়া যায় তাহা হইলে ওয়াটের কথামত মনে হইবে সমগ্র পৃথিবীর প্রেক্ষিতে 'সমতল কথাটির উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় নাই'। কারণ 'কেহই জানিত না পৃথিবী তাহা নহে'। অন্যদিকে ওয়াট সাহেবের মূল বক্তব্যের যুক্তিযুক্ত অনুসিদ্ধান্ত যে, আধুনিক মানুষ যদি তাহার আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান লইয়া আয়াতগুলি পাঠ করেন তাহা হইলে তিনি উহাকে বিজ্ঞানসম্মত না বলিয়া পারিবেন না। যদি তাহাই হয়, প্রকৃতপক্ষে তাহাই হওয়া উচিত, তাহা হইলে দেখা যাইবে পৃথিবী নহে, বরং অন্যান্য বিষয়েও ওয়াট কর্তৃক উদ্ধৃত আয়াতগুলি অসাধারণ বৈজ্ঞানিক সত্য সমর্থিত।
পবিত্র কুরআনে 'আরদ' শব্দটি ৪৬১ বার ব্যবহৃত হইয়াছে। উহার অধিকাংশ ব্যবহার সমগ্র মহাবিশ্বের উপর আল্লাহ তাআলার চরম ক্ষমতার বিবরণ সংক্রান্ত এবং তাঁহার সৃষ্টিশক্তি সংক্রান্ত। কোন কোন স্থলে এই শব্দটি স্পষ্টই ব্যবহৃত হইয়াছে দেশ অথবা এলাকা ২৭ বুঝাইতে, আবার অন্যত্র উপমা হিসাবে পার্থিব জীবন বুঝাইতে ব্যবহৃত হইয়াছে। ২৬ যে সকল আয়াতে ইহার আকৃতি ও প্রকৃতি বর্ণনা করিতে ব্যবহৃত হইয়াছে তাহা দুই শ্রেণীর। এক শ্রেণীতে ইহা উদ্ধৃত হইয়াছে মিশ্রিত হইয়া অথবা পর্বত ও নদীর সহিত তুলনা করিতে গিয়া। এই স্থলে পৃথিবী মানুষের জন্য ও অন্যান্য প্রাণীর জন্য কিরূপ উপযুক্ত ও বাসযোগ্য তাহার উদাহরণ দেওয়া হইয়াছে। এখানে 'শ্রোতা অথবা পাঠক'-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে তাহার প্রতি এবং প্রকৃতির সেই সকল বস্তুর প্রতি এবং ভূতলের প্রতি যাহা তাহার সম্মুখে দৃশ্যমান। অন্যভাবে যদি বলা যায় যে, এই আয়াতে 'আরদ' বা পৃথিবী বলিতে বুঝানো হইয়াছে ভূমি বা ভূপৃষ্ঠ যাহা দর্শকের সম্মুখে রহিয়াছে পর্বত ও নদীর বিপরীত, সমগ্র পৃথিবী নহে। দ্বিতীয় শ্রেণীর আয়াতে আরদ বা পৃথিবী শব্দটি সাধারণভাবে সূর্য, চন্দ্র, আকাশ এবং সমগ্র মহাবিশ্বের প্রেক্ষিতে রহিয়াছে। এখানে পৃথিবীকে একটি একক হিসাবে বলা হইয়াছে এবং বর্ণনায় ইহার আকৃতি সম্পর্কে, অবস্থান সম্পর্কে, এমনকি মহাশূন্যে ইহার চলাচল সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হইয়াছে।
পবিত্র কুরআনে 'আরদ' শব্দটি যে প্রকারে সাধারণ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে সেই প্রেক্ষিতে ওয়াট সাহেব বিষয়টি যে প্রকারে বিবেচনা করিয়াছেন তাহা ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। তিনটি প্রধান বিষয়ে এই অসম্পূর্ণতা ও ত্রুটি রহিয়াছে। প্রথমত, তিনি প্রথম শ্রেণীর আয়াতগুলির প্রতি দৃষ্টি দিয়াছেন এবং 'আরদ' শব্দকে একক পৃথিবী হিসেবে বিবেচনা করিয়াছেন। অথচ এই স্থলে আরদের প্রকৃত অর্থ হইবে সম্মুখস্থ ভূমি, প্রান্তর বা মাটি।
দ্বিতীয়ত, এই আয়াতগুলির বর্ণনামূলক অভিব্যক্তির মধ্যে যে ভিন্ন ভিন্ন ও ব্যাপক অর্থ রহিয়াছে তাহা বিবেচনা না করিয়া তিনি একই প্রকার অর্থ চাপাইয়া দিয়াছেন। কারণ তিনি মনে করেন, পবিত্র কুরআনের 'প্রথম পর্যায়ের শ্রোতা' ভাবিতেই পারিত না যে, পৃথিবী সমতল ব্যতীত অন্য কোনরূপ হইতে পারে। যদি তিনি সত্যই বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি লইয়া অগ্রসর হইতেন তাহা হইলে আয়াতগুলির প্রকৃত অর্থ অনুধাবনের ক্ষেত্রে শব্দ ব্যবহারে যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রহিয়াছে তাহা বুঝিতে পারিতেন। ওয়াট তাহা তো করেনই নাই, এমনকি একটি আয়াতের সামগ্রিক অর্থ বিবেচনা না করিয়া, আসল অংশের অনুবাদ না করিয়া চরম অবহেলা প্রদর্শন করিয়াছেন এবং অর্থকে বিকৃত করিয়া প্রকাশ করিয়াছেন।
তৃতীয়ত, সবশেষে যাহা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সেই দ্বিতীয় শ্রেণীর আয়াতগুলি মোটেই বিবেচনা করেন নাই। অথচ সেখানেই পৃথিবীকে একটি একক ধরিয়া উহার আকার ও অবস্থান বলা হইয়াছে। অবশ্য মহাশূন্যে অন্যান্য গ্রহ- নক্ষত্রের কথাও বলা হইয়াছে। তাহাতে এমন কিছু বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক তথ্য রহিয়াছে যাহা সে যুগের মানুষের জানা ছিল না।
অধিকাংশ আয়াতে যে 'আরদ' শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে তাহার অর্থ দর্শকের দৃষ্টির ভিতরে যে ভূপৃষ্ট তাহা, পৃথিবী নামক গ্রহ নহে। ওয়াট যে আয়াত দুইটি ৮৮: ১৯-২০ ও ৭৮: ৬-৭ উল্লেখ করিয়াছেন উহাতে ইহা সুস্পষ্ট। আয়াত দুইটি এইরূপ:
وَإِلَى الْجِبَالِ كَيْفَ نُصِبَتْ ، وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ .
"এবং পর্বতমালার দিকে, কিভাবে উহাকে স্থাপন করা হইয়াছে এবং ভূতলের দিকে, কিভাবে উহাকে বিস্তৃত করা হইয়াছে" (৮৮: ১৯-২০)?
أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مهداً . وَالْجِبَالَ أَوْتَاداً . "আমি কি করি নাই ভূমিকে শয্যা ও পর্বতসমূহকে কীলক” (৭৮ঃ ৬-৭)?
এখানে সুস্পষ্টভাবেই প্রতীয়মান হয় যে, 'আরদ' বলিতে সম্মুখস্থ সমতল ভূভাগ বোঝান হইয়াছে যাহার বিপরীতে রহিয়াছে 'পর্বত'। যদি আরদ বলিতে পৃথিবী নামক গ্রহ বুঝাইত তাহা হইলে 'পর্বত' শব্দ সামঞ্জস্যহীন ও অতিরিক্ত হইয়া যাইত।
উদ্ধৃত আয়াতে আরদ শব্দটির সঙ্গে সম্পর্কিত যে বাস্তবিক শব্দসমূহ ব্যবহৃত হইয়াছে তাহা বিবেচনা করা যাইতে পারে। সেইগুলি ওয়াটের ইংরেজি অনুবাদসহ দেওয়া গেল: ৭৯: ৩০ দাহাহা... spread out وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَلِكَ دَحْهَا ৮৮ : ২০ সুতিহাত... spread out وَإِلَى الْأَرْضِ كَيْفَ سُطِحَتْ ৭৮: ৬ মিহাদা...make an expanse أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مِهْدًا ৫১:৪৮ ফারাশনাহা... laid flat وَالْأَرْضَ فَرَشْنَهَا ৭১: ১৯ বিসাতা... Made an expanse وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ بِسَاطًا ২০:৫৩ মাহাদা... made bed جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا ১৩: ৩ মাদ্দা ... spread out وَهُوَ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ ২: ২২ ফিরাশা...made a carpet الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فَرَاشًا
এই কথা না বলিলেও চলে যে, প্রতিটি অভিব্যক্তি যেমন দাহাহা, সুতিহাত ইত্যাদি বিভিন্ন অর্থ বহন করে। ওয়াট সাহেব এই কথা নিজেই সকল আয়াত প্রসঙ্গে সাধারণভাবে স্বীকার করিয়াছেন; এমনকি তাহার রচনার প্রারম্ভেই অন্যান্য আয়াত উদ্ধৃতির প্রসঙ্গেও স্বীকার করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, 'আলোচ্য বিষয়ের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত হিসাবে উদ্ধৃত'। ২৯
এখন বিবেচনা করা যাইতে পারে যে, এই সিরিজের প্রথম শব্দ বা অভিব্যক্তি দাহাহা; এই অভিব্যক্তিটি অন্যান্যগুলি হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন গোত্রের। ইহার রুট (ধাতুমূল) ধরিয়া অর্থ নির্ণয় করিতে হইবে। ওয়াট সাহেব অন্যান্য অনেক অনুবাদ অনুসরণ করিয়া ইহার অর্থ করিয়াছেন SPREAD OUT কিন্তু ধাতুমূল বিবেচনা করিয়া অর্থ করিলে ইহার অর্থ হইবে 'ডিম্বাকৃতি' যাহা দ্বারা পৃথিবী যে গোলাকার তাহার প্রমাণ পবিত্র কুরআন হইতেই পাওয়া যায়। দাহাহা শব্দের বিশেষ্য হইতেছে 'দাহিয়াহা' যাহা অদ্যাবধি আরবগণ ডিম অর্থে ব্যবহার করে। ৩০
দ্বিতীয় শব্দ বা অভিব্যক্তি হইতেছে সুতিহাত; ইহাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই শব্দটির উৎপত্তি হইতেছে সাতহ (سطح) ধাতু হইতে, যাহার অর্থ হইতেছে উপরিভাগ, আবরণ, খোসা, ঢাকনা ইত্যাদি। যেমন সাতহুল বাহর অর্থ সমুদ্র-পৃষ্ঠ, সাতহ মাইল অর্থ ঢাল, সাতহী অর্থ বহির্ভাগ। ধাতুমূলের অর্থ বিবেচনা করিলে এবং পৃথিবীর অভ্যন্তর বায়বীয় বাষ্প ও গলিত লাভায় পরিপূর্ণ এই আধুনিক জ্ঞান লইয়া যদি পবিত্র কুরআনের ৮৮: ২০ আয়াত পাঠ করা যায় তাহা হইলে উহার অর্থ মনে হইবে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ ডিমের খোশার মত এবং উহা সমতল। প্রকৃতই সুতিহাত শব্দ দ্বারা ভূপৃষ্ঠকে যথাযথরূপে বৈজ্ঞানিকভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। বিশেষ করিয়া পূর্ববর্তী আয়াতে (৮৮: ১৯) যখন পর্বত কিভাবে রাখা হইয়াছে তাহা বলা হইয়াছে তাহার পর সুতিহাত ব্যবহার সঠিক হইয়াছে। পবিত্র কুরআনের ৮০: ২০ আয়াত যাদ "(Do they not look) to the earh how it has been surfaced and planed." এইভাবে অনুবাদ করা হয় (তাহারা কি দেখে না) ভূতলের দিকে কিভাবে উহাকে সমতল করা হইয়াছে? তাহা হইলে উহা হইত যথোপযুক্ত।
এই সিরিজের তৃতীয় শব্দ মিহাদ, ইহার সহিত সিরিজের ষষ্ঠ শব্দ মাহ্দ (২০ : ৫৩) বিবেচনা করা যাইতে পারে। কারণ উভয় শব্দই এক মূল হইতে উৎপন্ন। প্রথমটির অর্থ বিশ্রাম-স্থল, আশ্রয়, দোলনা, বক্ষস্থল এবং আকৃতিগতভাবে কোল (যাহার মধ্যে কিছু স্থাপন করা যায়)। এ. জে. আরবেরি ৭৮: ৬ আয়াত যথাযথভাবেই অনুবাদ করিয়াছেন "Have we not made the earth as a cradle."৩১ প্রকৃতপক্ষে এই মিহাদ শব্দটি পবিত্র কুরআনের আরও ছয়টি স্থলে ব্যবহৃত হইয়াছে ৩২ এবং প্রতিটি স্থলে এইভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, ইহার অর্থ বাসস্থান, আবাসস্থল, বিশ্রামাগার ইত্যাদি। যাহা হউক, আমরা পৃথিবীর অভ্যন্তরে কি আছে তাহা জানি অথবা না জানি, আলোচ্য অভিব্যক্তির অনুবাদ যদি করা হয় made an expanse, তাহা হইলে উহা হইবে মূল হইতে বহু দূরের এবং এই প্রসঙ্গের সহিত সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যহীন।
অনুরূপভাবে মাহ্দ অর্থ বিছানা বা দোলনা। ইহাও পবিত্র কুরআনে চার স্থলে ব্যবহৃত হইয়াছে; একবার হইয়াছে আরদ প্রসঙ্গে (৪৩: ১০) এবং তিনবার ঈসা ('আ) যখন দোলনায় থাকা অবস্থায় মানুষের সঙ্গে কথা বলিয়াছিলেন সেই প্রসঙ্গে। ৩৩ এইবারও এ.জে. আরবেরি ৪৩: ১০ ও ২০: ৫৩ আয়াতের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে শব্দটির অনুবাদ করিয়াছেন দোলনা বলিয়া। প্রকৃতপক্ষে তিনি দুইটি স্থলেই একই প্রকার অনুবাদ করিয়াছেন, যেমন— He who appointed the earth to be a cradle for you." ৩৪ কিন্তু ওয়াট সাহেব সেই কথাই ভিন্নভাবে অনুবাদ করিয়াছেন ৭৮: ৬ আয়াতের ক্ষেত্রে make an expanse এবং ২০: ৫৩ আয়াতের ক্ষেত্রে made a bed.
অনুরূপভাবে সিরিজের চতুর্থ ও অষ্টম শব্দ ফারাশনাহা (فَرَشَهًا) ও ফিরাশা (فراشا) তিনি সামঞ্জস্যহীনভাবে অনুবাদ করিয়াছেন। ফারাশা শব্দের প্রাথমিক অর্থ বিছাইয়া দেওয়া, বিছানা বিছাইয়া দেওয়া, আস্তরণ দেওয়া, আবৃত করা ইত্যাদি। অপরপক্ষে ফিরাশ অর্থ বিছানা, শয্যা, চাদর, কার্পেট ইত্যাদি। যাহা হউক ওয়াট সাহেব এই সর্বশেষ অভিব্যক্তির অর্থ করিয়াছেন ২: ২২ আয়াতে made a bed বিছানা তৈরি করিয়াছেন, ৫১৪ ৪৮ আয়াতে অনুবাদ করিয়াছেন laid flat সমতল করিয়াছেন, অনেক টানা-হেঁচড়া করিয়াও যদি করা হইত spread out as a bed অথবা laid out as a bed, তাহা হইলে কিছুটা যুক্তিসঙ্গত হইত। কিন্তু তিনি তাহা না করিয়া করিয়াছেন laid flat।
অতঃপর এই সিরিজে অবশিষ্ট রহিয়াছে আর দুইটি শব্দ বিসাত (بساط) ও মাদ্দা (مد), যথাক্রমে সিরিজের পঞ্চম ও সপ্তম শব্দ। বিসাতের উপযুক্ত অর্থ বিছাইয়া দেওয়া; এ.জে. আরবেরি তাহাই করিয়াছেন। তিনি ৭১: ১৯ সমগ্র আয়াতটির অনুবাদ করিয়াছেন And God has laid the earth for you as a carpet.৩৫ ওয়াট অবশ্য এই স্থলে অনুবাদ করিয়াছেন made an expanse। অপরদিকে মাদ্দা কথার প্রাথমিক অর্থ he expanded প্রসারিত অথবা বিস্তার করা। ইহার অর্থ আরও হইতে পারে। তিনি বিস্তারিত করিয়াছেন, ওয়াট এমনই করিয়াছিলেন। পবিত্র কুরআনে এই শব্দটি আরও কয়েক স্থলে বিভিন্ন অভিব্যক্তিতে ব্যবহৃত হইয়াছে। ৮৪: ৩-৪ আয়াতে অভিব্যক্তিটির কর্মবাচ্যমূলক রূপ হইতেছে 'মুদ্দাত'; ইহার স্পষ্ট অর্থ দাঁড়াইতেছে 'চেপ্টা হইয়া যাওয়া'।
وَاِذَا الْاَرْضُ مُدَّتْ ، وَاَلْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْ .
"এবং পৃথিবীকে যখন সম্প্রসারিত করা হইবে ও পৃথিবী তাহার অভ্যন্তরে যাহা আছে তাহা বাহিরে নিক্ষেপ করিবে ও শূন্যগর্ভ হইবে" (বাংলা অনুবাদ ইসলামিক ফাউণ্ডেশন)।
ইহা সেই সময়ের বিবরণ যখন কিয়ামত সংঘটিত হইবে এবং পৃথিবী শেষ পর্যায়ে আসিবে। অতএব 'মুদ্দাত' শব্দটি এই স্থলে যে অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে তাহা অন্যত্র হইতে পারে না। পৃথিবীর স্বাভাবিক অবস্থায় এই শব্দটি অথবা ইহা হইতে উৎপন্ন কোন শব্দ যে অর্থ প্রকাশ করে সেই সময় তাহা করে না। এমতাবস্থায় অন্য ক্ষেত্রে ভিন্ন অর্থ বহন করিবে ইহাই স্বাভাবিক। বিপরীত উপাত্ত হিসাবে বলা যায়, এই আয়াতটি পৃথিবীর সমাপ্তিকালের পূর্ব-মুহূর্তে পরোক্ষভাবে নির্দেশ করিতেছে যে, পৃথিবী সামগ্রিকভাবে সমতল নহে।
উল্লিখিত শব্দগুলির বিভিন্ন অভিব্যক্তি থাকিলেও সেইগুলি বিবেচনায় না আনিলেও এবং তিনি spread out অর্থ ধরিয়াছেন তাহা গ্রহণ করিলেও উদ্ধৃত আটটি পরিভাষার কোন একটিও বলে না যে, পৃথিবী নামক গ্রহ সমতল। কারণ আয়াতগুলি সম্মুখে যে ভূভাগ দৃষ্টিগোচর হয় তাহার কথাই বলিতেছে। তদুপরি শব্দটির ভাবার্থ সমান করা বা সমতল তাহা হইলেও ইহা দ্বারা পৃথিবী যে গোলাকার তাহা অস্বীকার করে না। জ্যামিতিক ও গাণিতিক সংজ্ঞায় সমান বা সমতল বলিতে বুঝায় সরল রেখা ইহার সকল বিন্দু স্পর্শ করে। ৩৬ অতএব পৃথিবী গোলাকার হইলেও ইহার যে কোন স্থান কমবেশি সমান বা সমতল। আট শত বছর পূর্বে ইমাম ফখরুদ্দীন আল-রাযী (৫৪-৬০৬ হিজরী/১১৫০-১২১০ খৃ.) দেখাইয়াছেন যে, পৃথিবী গোলাকার এবং সে বিষয়ে তিনি সচেতন ছিলেন। সেই কারণে তিনি মাদ্দা শব্দের অভিব্যক্তি যে তুলনামূলকভাবে আপেক্ষিক সে বিষয়ে বক্তব্য রাখিয়াছেন। ১৩: ৩ ও ১৫: ১৯ আয়াতে মাদ্দা শব্দের অভিব্যক্তি সম্পর্কে তিনি দুইটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, এই আয়াতের উদ্দেশ্য স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পর্কিত বিষয় উত্থাপন করা। সেই কারণে এইরূপ বস্তুকে বরাত দেওয়া যাহা দেখা যায়, অনুভব করা যায়। ৩৭ দ্বিতীয়ত, তিনি পৃথিবী সম্পর্কে বলেন, 'ইহা একটি বিশাল গোলক বা বলঃ বিশাল গোলকের অংশও বিশাল, যখন ইহার প্রতি দৃষ্টিপাত করা যায় উহাকে সমতলই মনে হয়। এইরূপ ঘটনার প্রেক্ষিতে তাহারা যে সমস্যার কথা উত্থাপন করিতেছেন তাহার অস্তিত্বই থাকে না। এই ব্যাখ্যার প্রমাণ আল্লাহরই কথা : وَالْجَبَالَ أَوْتَادًا "আমরা পর্বতকে কীলকরূপে স্থাপন করিয়াছি"। তিনি ইহাকে গোঁজ বা কীলক আখ্যা দিয়াছেন যদিও প্রকৃত সত্য হইতেছে তাহার উপরিভাগে অনেক সমতল ভূমি রহিয়াছে। এখানেও ঘটনা ইহাই।
সপ্তম শতাব্দীর আরবে প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণাকে পুনরুল্লেখ করা দূরে থাক, পবিত্র কুরআনে তদানীন্তন, বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে অতিক্রম করিয়া প্রকৃত বৈজ্ঞানিক সত্য তুলিয়া ধরিয়াছে যাহার সত্যতা কেবল সাম্প্রতিক কালে মানুষ আবিষ্কার করিয়াছে। প্রকৃত প্রস্তাবে ওয়াট সাহেব যদি আরও একটু যত্নবান হইতেন এবং যত্ন সহকারে বিচার-বিবেচনা করিতেন তাহা হইলে দেখিতে পাইতেন যে, তিনি যে সকল আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন তাহাদের কমপক্ষে তিনটি আয়াতে পৃথিবীর আকৃতিগত বিষয়ে এইরূপ অসাধারণ ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রহিয়াছে যাহা কাহারও পক্ষে তখন কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। দুর্ভাগ্যক্রমে তিনি অনুবাদের মাধ্যমে যখন এই আয়াতগুলি উল্লেখ করেন তখন তিনটির যে দুইটির মধ্যে পৃথিবী গোলাকার হওয়ার বৈজ্ঞানিক তথ্য রহিয়াছে সেই অংশটি তিনি বাদ দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন। তাহার একটি আয়াত হইতেছে ১৩:৩।
وَهُوَ الَّذِي مَدَّ الْأَرْضَ فِيهَا رَوَاسِيَ وَأَنْهَارًا وَمِنْ كُلَّ الثَّمَرَاتِ جَعَلَ فِيْهَا زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ يَغْشَى اليْلَ النَّهَارَ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَأُيَتِ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ
"তিনিই ভূতলকে বিস্তৃত করিয়াছেন এবং উহাতে পর্বত ও নদী সৃষ্টি করিয়াছেন এবং প্রত্যেক প্রকারের ফল সৃষ্টি করিয়াছেন জোড়ায় জোড়ায়। তিনি দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। ইহাতে অবশ্যই নিদর্শন রহিয়াছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য" (১৩: ৩)।
এই আয়াতে দুইটি গুরুত্বপূর্ণ কথা রহিয়াছে। প্রথমটি হইতেছে, 'প্রত্যেক প্রকারের ফল তিনি সৃষ্টি করিয়াছেন জোড়ায় জোড়ায়'। এই কথার বা বাক্যের অর্থ সাম্প্রতিক কালেই বোধগম্য হইয়াছে যখন আবিষ্কৃত হইয়াছে যে, উদ্ভিদ ও ফলের মধ্যে পুং ও স্ত্রী লিঙ্গ আছে। প্রকৃতই সকলের মধ্যেই আছে জোড়া। এ প্রকৃতই এই বক্তব্য দীর্ঘকাল যাবত এইভাবেই অনূদিত হইয়া আসিয়াছে। ৪০ বলার অপেক্ষা রাখে না যে, খৃস্টীয় সপ্তম শতকে এই বিষয়ে কাহারও বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না যে, উদ্ভিদ, ফল-ফলাদি ও অন্যান্যের জোড়া বা লিঙ্গভেদ থাকিতে পারে। এই বিষয়ে আধুনিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের পূর্ব পর্যন্ত পবিত্র কুরআন আলোচ্য বাক্যের দ্বারা কি বলিতে চাহিতেছিল তাহা কেহই অনুধাবন করিতে পারে নাই।
১৩: ৩ আয়াতের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য, 'তিনি দিবসকে রাত্রি দ্বারা আবৃত করেন'। ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, এই বক্তব্যের অর্থ রাত্রি ধীরে ধীরে দিবসের স্থান গ্রহণ করে—ইহা এমন একটি ঘটনা যাহা পৃথিবীর গোলাকার আকৃতি ও ঘুর্ণায়মান অবস্থা হইতেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। ৪১ কারণ পৃথিবীকে যদি সমতল বলা হইত তাহা হইলে রাত্রি ও দিন পর্যায়ক্রমে আসে সেই অর্থে বলা হইত; বলা হইত না, 'দিবসকে রাত্রি আচ্ছাদিত করে'। এ.জে. আরবেরি যথার্থই অনুবাদ করিয়াছেন। ৪২
দ্বিতীয় আয়াত হইতেছে ২০:৫৩
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ مَهْدًا وَسَلَكَ لَكُمْ فِيهَا سُبُلًا وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجْنَا بِهِ أَزْوَاجًا مِّنْ نَّبَاتِ شَتَّى .
"যিনি তোমাদের জন্য পৃথিবীকে করিয়াছেন বিছানা এবং উহাতে করিয়া দিয়াছেন তোমাদের চলিবার পথ। তিনি আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করেন এবং আমি উহা দ্বারা বিভিন্ন প্রকারের উদ্ভিদ উৎপন্ন করি" (২০:৫৩)।
এই স্থলে উদ্ভিদের লিঙ্গ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক সত্য অধিকতর স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হইয়াছে; ইহা ১৩: ৩ আয়াতের সম্পূরক তথ্য হিসাবে বর্ণিত হইয়াছে।
ইহার তৃতীয় অংশ ৫১: ৪৭-৪৮; ইহাতে বলা হইয়াছে:
وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بَايْدِ وَانَّا لَمُوسِعُونَ . وَالْأَرْضَ فَرَشْنَهَا فَنِعْمَ الْمُهْدُونَ .
"আমি আকাশ নির্মাণ করিয়াছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই মহা সম্প্রসারণকারী। আর ভূমি, আমি উহাকে বিছাইয়া দিয়াছি, আমি কত সুন্দর প্রসারণকারী" (৫১:৪৭-৪৮)।
এই স্থলে অভিব্যক্তিটি হইতেছে وَأَنَّا لَمُوسِعُونَ 'নিশ্চয় আমরা সম্প্রসারণকারী'। ইহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওয়াট সাহেব এই অংশের অনুবাদ করিয়াছেন "ইহা আমরাই, যাহারা ইহাকে বিশাল ব্যপ্ত করে"। ৪৩ কিন্তু লক্ষণীয় যে, বাক্যের গঠনটি কর্তৃবাচক অথচ পূর্ববর্তী বাক্যাংশ ক্রিয়াবাচক এবং তাহাও অতীত কাল। সকলেই জানেন যে, আরবী বাক্য গঠনের রীতি অনুসারে কর্তৃবাচকের (اسمیه) সহিত যদি লাম (ل) অক্ষর ব্যবহৃত হয় তাহা হইলে উহা গুরুত্ব বুঝাইবার জন্যই ব্যবহৃত হইয়া থাকে, তাহা হইলে উহা চলমান বা ঘটমান অর্থবোধক হয়। এমতাবস্থায় ইহার অর্থ হইবে 'নিশ্চয়ই আমরা সম্প্রসারণকারী অথবা সম্প্রসারিত করি অথবা আমরা সম্প্রসারণের কাজে নিয়োজিত'। এ.জে. আরবেরি যথার্থই অনুবাদ করিয়াছেন, 'আমরা ইহাকে সম্প্রসারিত করি'। ৪৪
আধুনিক বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী আমরা জানিতে পারিতেছি যে, মহাবিশ্ব এক হতবুদ্ধিকর গতিতে সম্প্রসারিত হইতেছে। এই তথ্যের প্রেক্ষিতে উপরিউক্ত বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব লাভ করিয়াছে। ইহাতে বলা হইতেছে যে, মহাশূন্যে যাহা কিছু আছে— গ্রহ, নক্ষত্র, সূর্যসহ ছায়াপথ ও অন্যান্য যাহা কিছু সবকিছু অকল্পনীয় গতিতে ছুটিয়া চলিতেছে। সূর্য উহার গ্রহ-উপগ্রহসহ প্রায় দৈনিক দশ লক্ষ মাইল বেগে নক্ষত্রপুঞ্জ লিরার দিকে ছুটিয়া চলিতেছে, স্বয়ং লিরা অনুরূপ বেগে অজানা লক্ষ্যের দিকে ছুটিয়া যাইতেছে। এই প্রকারে আসমান (السَّمَاءُ) অর্থাৎ মহাশূন্য ক্রমান্বয়ে সম্প্রসারিত হইতেছে। আধুনিক জ্ঞানের প্রেক্ষিতে পবিত্র কুরআনের বক্তব্য, 'আমরা সৃষ্টি করিয়াছি আসমান এবং নিশ্চয়ই উহাকে সম্প্রসারিত করি' সত্যই অভাবিতভাবে চমকপ্রদ ও আশ্চর্যজনকভাবে নির্ভুল।
ওয়াট সাহেব যে আটটি আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন তাহার মধ্যে তিনটি দ্বারা তিনি প্রমাণ করিতে চাহিয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনে বৈজ্ঞানিকভাবে ভ্রান্ত তথ্য দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু সেইগুলি তিনি যাহা অনুমান করিয়াছেন সেই অনুমানের সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থ বহন করে। প্রকৃত সত্য এই যে, (ক) আল্লাহ তা'আলা পৃথিবীকে ডিম্বাকৃতির (دُحَا) করিয়া সৃষ্টি করিয়াছেন (৭৯:৩০) এবং তিনি দিবসকে রাত্রি দ্বারা আচ্ছাদিত করেন (১৩:৩)। এই বক্তব্য দ্বারা আরও প্রমাণিত হয় যে, পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার। (খ) অন্যান্য বস্তু ছাড়াও উদ্ভিদ ও ফল সৃষ্টি করিয়াছেন জোড়ায় জোড়ায় (১৩: ৩) এবং (গ) আকাশ ক্রমাগত সম্প্রসারিত হইতেছে (৫১:৪৭)। এইগুলি তো আছেই, তদুপরি পবিত্র কুরআনের আরও অনেক আয়াতে বৈজ্ঞানিক সত্য তথ্য রহিয়াছে, যেমন মানুষ, প্রকৃতি ও বিশ্বের সৃষ্টি রহস্য। ৪৫ সংক্ষেপেও সেই সকল বিষয় এই স্থলে বর্ণনা করা সম্ভব নহে। পৃথিবীর আকৃতি কী প্রকারের সেই প্রশ্নে পবিত্র কুরআনে কি বলা হইয়াছে তাহার কিছু উল্লেখ করা হইল।
এই বিষয়ে সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ আয়াত হইতেছে ৯১:৬। এই আয়াতে বলা হইতেছে যে, পৃথিবীকে নিক্ষেপ করা হইল (উহার কক্ষপথে) একটি বলের ন্যায়। বাক্যটি এইরূপ وَالْأَرْضِ وَمَا طَحَهَا "শপথ পৃথিবীর এবং যিনি উহাকে নিক্ষেপ করিয়াছেন তাঁহার"। লক্ষ্য করার বিষয় যে, 'দাহাহা' শব্দটির ন্যায় পূর্ববর্তী অনেক পণ্ডিত 'তাহাহা' শব্দটির অর্থ করিয়াছেন 'বিস্তৃত করা', প্রসারিত করা' ইত্যাদি। আশ্চর্যের বিষয়, আল-কুরতুবী ও আশ-শাওকানী পূর্ববর্তী তাফসীরকারগণের তাফসীর দেখিয়া বলিয়াছেন যে, আরবগণ এই শব্দটি দ্বারা বুঝিতে পারে কোন কিছুর চলিয়া যাওয়া বা দূরে সরিয়া যাওয়া। ৪৬ ইহার অর্থ আরও ব্যাখ্যা করিয়া স্পষ্ট করিয়াছেন তাজুল আরূসের রচয়িতা। তিনি পূর্ববর্তী তাফসীরকারগণ এই শব্দটির যে অর্থ বা ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন তাহা লক্ষ্য করিয়া বলিয়াছেন যে, শব্দটির প্রকৃত অর্থ কোন কিছু 'নিক্ষেপ করা' (وَطَحًا بِالْكُرَّةِ رَمَى بِهَا), যেমন বল নিক্ষেপ করা। ৪৭ এই অভিব্যক্তি উপরে বর্ণিত 'দাহাহা' শব্দের অর্থের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। উভয়ই পৃথিবীর গোলাকার আকৃতির প্রতি এবং শূন্যে ঘূর্ণায়মান অবস্থা নির্দেশ করে। আরও একটু অগ্রসর হইলে আমরা লক্ষ করি যে, ৯১ : ৬ আয়াতের ঠিক পূর্বেই ৯১: ৩-৪ আয়াত রহিয়াছে, সেখানে যেভাবে সংক্ষেপে শব্দগুলি অভিব্যক্ত হইয়াছে তাহাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, সূর্যের সহিত দিন ও রাত্রির গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রহিয়াছে। বলা হইতেছে وَالنَّهَارِ إِذَا جَلَّهَا . وَالَّيْلِ إِذَا يَغْشُهَا "দিনের শপথ! যখন উহা সূর্যকে প্রকাশিত করে এবং রাত্রির শপথ! যখন সে উহা আচ্ছাদিত করে"।
এই দুই বাক্য স্পষ্ট করিয়া দেয় যে, দিন ও রাত্রির কার্য দ্বারাই সূর্য প্রকাশিত ও লুক্কায়িত হয়, সূর্যের কোনরূপ চলাচলের দ্বারা দিন ও রাত্রি সংঘটিত হয় না।
বাক্যটির অভিব্যক্তি সূক্ষ্মভাবে নির্ভুল হয় যদি ৯১ : ১ আয়াতের প্রতি নজর দেওয়া যায়, সেখানে সূর্যের কথা আছে। সেখানে কেবল বলা হইয়াছে : وَالشَّمْسِ وَضُحُهَا "শপথ সূর্যের এবং ইহার কিরণের"। কোন কর্ম বা ক্রিয়াপদ এখানে নাই। এই সূক্ষ্মভাবে নির্ভুল প্রয়োগ করা শব্দের প্রতি যদি একটু দৃষ্টি দেওয়া যায় তাহা হইলে উহা স্পষ্টভাবে পৃথিবীর গোলাকৃতি ও ঘূর্ণন সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক সত্য তুলিয়া ধরে।
পৃথিবীকে 'ছুঁড়িয়া' ফেলা (তাহাহা) কথাটির গুরুত্ব আরও স্পষ্টভাবে অর্থবহ হয় যখন ইহাকে কুরআনের অপর একটি বাক্যের সহিত সম্পর্কিত করিয়া বিবেচনা করা যায়, যেখানে পৃথিবীর জন্ম এবং প্রাণের উদ্ভব সম্পর্কে বর্ণনা আছে। ইহাতে বলা হইয়াছে, 'প্রথমে আসমান ও যমীন একত্র ছিল, পরবর্তী কালে তাহাদিগেকে পৃথক করা হয় এবং পৃথিবীর সকল প্রাণী পানি হইতে উৎপন্ন হয়'। বাক্যটি নিম্নরূপ:
أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنُهُمَا وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلِّ شَيْ حَيٍّ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ .
"যাহারা কুফরী করে তাহারা কি ভাবিয়া দেখে না যে, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী ছিল ওতপ্রোতভাবে; অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করিয়া দিলাম; এবং প্রাণবান সমস্ত কিছু সৃষ্টি করিলাম পানি হইতে। তবুও কি উহারা ঈমান আনিবে না" (২১ : ৩০)?
আধুনিক কালে বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে যখন আমরা জানিতে পারিতেছি যে, গ্রহ-নক্ষত্র, পৃথিবী এবং পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি কি প্রকারে হইয়াছে তখনই কেবল পবিত্র কুরআনের এই আয়াতের প্রকৃত অর্থ বোধগম্য হইতেছে। পবিত্র কুরআনের অপর একটি আয়াত সরাসরি পৃথিবীর সহিত সম্পর্কিত। উহা ১৩:৪১ আয়াত। সেখানে বলা হইতেছে যে, পৃথিবী ক্রমান্বয়ে সঙ্কুচিত হইতেছে, ইহা আধুনিক গবেষণায় প্রতিষ্ঠিত হইয়াছে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
أَوَلَمْ يَرَوْا أَنَّا نَأْتِي الْأَرْضَ نَنْقُصُهَا مِنْ أَطْرَافِهَا
"উহারা কি দেখে না যে, আমি উহাদের দেশকে চতুর্দিক হইতে সংকুচিত করিয়া আনিতেছি” (১৩: ৪১)?
পবিত্র কুরআনে আরও কয়েকটি আয়াতে দিন ও রাত্রি সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, দিন প্রবেশ করে রাত্রির মধ্যে এবং রাত্রি প্রবেশ করে দিনের মধ্যে। এইরূপ আয়াতগুলি নিম্নে উদ্ধৃত করা গেল:
تُولِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَتُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ (ক) "তুমিই রাত্রিকে দিবসে পরিণত এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত কর" (৩: ২৭)।
ذلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ يُولِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ (খ) "উহা এইজন্য যে, আল্লাহ রাত্রিকে প্রবিষ্ট করান দিবসের মধ্যে এবং দিবসকে প্রবিষ্ট করান রাত্রির মধ্যে” (২২: ৬১)।
أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُولِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ (গ) "তুমি কি দেখ না আল্লাহ রাত্রিকে দিবসে এবং দিবসকে রাত্রিতে পরিণত করেন" (৩১: ২৯)?
يُولِجُ الَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي الَّيْلِ (ঘ) "তিনি রাত্রিকে দিবসে পরিণত করেন এবং দিবসকে পরিণত করেন রাত্রিতে" (৩৫: ১৩ ও ৫৭: ৬)।
وَايَةٌ لَهُمُ الَّيْلُ نَسْلَخُ مِنْهُ النَّهَارَ (ঙ) "উহাদের জন্য এক নিদর্শন রাত্রি, উহা হইতে আমি দিবালোক অপসারিত করি" (৩৬: ৩৭)।
পবিত্র কুর’আনে বারংবার এইরূপ বলা হইতেছে যে, ক্রমান্বয়ে দিন ও রাত্রি একে অপরের মধ্যে মিশিয়া যায়, কেহই হঠাৎ করিয়া আবির্ভূত হয় না। পৃথিবী যদি সমতল হইত তাহা হইলে উহা ক্রমান্বয়ে হইত না; হঠাৎ আলোকিত হইত অথবা হঠাৎ অন্ধকার হইত। ইহা দ্বারা নির্দেশ করা বা ইঙ্গিত করা হইতেছে যে, পৃথিবী গোলাকার।
৩৯: ৫ আয়াতটি আরও স্পষ্ট
يُكَوِّرُ الَّيْلَ عَلَى النَّهَارِ وَيُكَوِّرُ النَّهَارَ عَلَى الَّيْلِ . "তিনি রাত্রি দ্বারা দিবসকে আচ্ছাদিত করেন এবং রাত্রিকে আচ্ছাদিত করেন দিবস দ্বারা"।
টিকাঃ
২৫. For isntance Muhammad Wafa al-Amiri, al-Isharat al-Ilmiyyah Fi al-Quran, Second impression, Cairo 1401 (1981), and Hanafi Ahmad, al-Tafsir al-Ilmi li al-Ayat al-kawniyyah Fi al-Qura, Cairo, n.d.
২৬. এয়োদশ সংস্করণ ১৯৮৭ সালে প্যারিসে প্রকাশিত হয়।
২৭. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. কুরআনের ৭ : ১১০; ১৪ : ১৩; ২০ : ৫৭; ২০ : ৬৩; ২৬ : ৩৫; ২৮ : ৫৭।
২৮. যেমন কুরআনের ৯৪ : ৩৮।
২৯. Watt, M's M 2।
৩০. M. Fathi Uthman, "Al-ard fi al-Quran al-Karim," Proceedings of the First Islamic Geographical Conference, Riyadh, 1404 (1984), Vol IV, 127 (117-271); Α. Μ. Soliman, Scientific Trends in the Quran, London (Taha Publication), 1985, p. 16.
৩১. A. J. Arberry, প্রাগুক্ত, পৃ. ৬২৬।
৩২. Quran, ২: ২০৬; ৩ঃ ১২; ৩: ১৯৭; ৭: ১৪১; ১৩: ১৮; ৩৮: ৫৬।
৩৩. Quran 3: 40; 3: 110 এবং 19: 29।
৩৪. A. J. Arberry, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫০৫ এবং ৩১৪।
৩৫. ঐ, পৃ. ৬০৯।
৩৬. Oxford Advanced Learners Dictionary of current English, ed. A.S. Hornby, 19th impression, 1984, p. 636.
৩৭. আত-তাফসীরুল কাবীর, ১৯ খ, পৃ. ৩।
৩৮. ঐ, ১৯খ., পৃ. ১৭০, মূল পাঠ নিম্নরূপ : فَهِيَ كُرَّةً غَايَةُ العَظِيمَةِ وَالكُرَّةُ العَظِيمَةُ يَكُونُ كُلُّ قطعة صَغِيرَةٌ مِّنْهَا إِذَا نَظَرَ إِلَيْهَا فَإِنَّهَا تَرى كَالسَّطْحِ الْمُسْتَوَى وَإِذَا كَانَ كَذَالِكَ زَالَ مَا ذَكَرُوهُ مِنَ الْأَشْكَالِ وَالدَّلِيلُ عَلَيْهِ قَوْلُهُ تَعَالَى (وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا ) سَمَاهَا أَوْتَادًا مَعَ أَنَّهُ قَدْ يَحْصِلُ عَلَيْهَا سَطُوحٍ عَظِيمَةُ مُسْتَوِيَةٌ فَكَذَا هُهُنَا .
৩৯. এ বিষয়ে আরও দ্র. কুরআন ৩৯: ৩৬ এবং ৫১: ৪৯।
৪০. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. পিকথল এবং A. Yusuf Ali-র এই আয়াতের অনুবাদ ও ব্যাখ্যা।
৪১. এই বিষয়ে কুরআনে অন্য উল্লেখের জন্য নিম্নে দ্র.।
৪২. আরবেরী, প্রাগুক্ত, পৃ. ২৩৯।
৪৩. Watt, M's M, 6.
৪৪. A. g. Araberry. প্রাগুক্ত, পৃ. ৫৪৫।
৪৫. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. M. Bucaille, প্রাগুক্ত।
৪৬. আল-কুরতুবী, তাফসীর, ২০খ; আশ-শাওকানী, তাফসীর, ৫খ, পৃ. ৪৪৯।
৪৭. তাজুল আরূস, ১০খ, ২২১; আরও দ্র. E.W. Lane, Arabic-English Laxicon طحو ও طحی শিরোনামে যেখানে অন্যান্য অর্থ ছাড়াও উল্লেখ করা হইয়াছে طحا বলা হয় তখন যখন কাহাকেও উপুড় করিয়া ফেলা হয় (Cambridge Islamic Text Society print, 1984. vol. II, p 1839.

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 (খ) আকাশ

📄 (খ) আকাশ


এই স্থলে গুরুত্ব আরোপ করিতে হইবে কাওয়ারা শব্দটির উপর। কারণ এই শব্দের অর্থ বল গড়াইয়া যাওয়া বা বৃত্ত করা। 'অন্যভাবে বলা যায়, এই আয়াতের অর্থ রাত্রি ও দিন পৃথিবীকে ঘিরিয়া এক চলমান প্রক্রিয়া।
পবিত্র কুরআন কেবল পৃথিবী ও উহাতে আল্লাহর ইচ্ছায় যাহা উৎপন্ন হয় তাহার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে নাই; বরং দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়াছে আকাশের প্রতি, মহাবিশ্বের প্রতি-যাহাতে আল্লাহ্ অস্তিত্ব ও তাঁহার সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি এবং তাহা করিতে গিয়া এইরূপ বক্তব্য রাখা হইয়াছে যাহার অর্থ বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উন্মোচিত হইতেছে। পৃথিবী সম্পর্কে বলিতে গিয়া ওয়াট সাহেব যাহা বলিয়াছিলেন তেমনি আকাশ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের বক্তব্যকে তিনি সেকালের ভ্রান্ত ধারণার পুনরুল্লেখ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন যে, আকাশ এইরূপ কঠিন কোন বস্তু দ্বারা নির্মিত; 'সম্ভবত প্রস্তর'। ৪৮ তিনি তাহার অনুমানের সপক্ষে পবিত্র কুরআনের যে আটটি আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন তাহার তিনটি আয়াতকে নিজের মনের মত অনুবাদ করিয়া বলিয়াছেন যে, পবিত্র কুরআনে বৈজ্ঞানিক ভ্রান্তি রহিয়াছে। নিম্নে সেই আয়াত তিনটি ও তিনি যে অনুবাদ করিয়াছেন তাহা দেওয়া গেল:
(ক) أَنْتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ بَنْهَا . رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوهَا
"Are you harder to create or the heaven he built? He raised up its roof and ordered it".
"তোমাদের সৃষ্টি করা কঠিনতর, না আকাশ সৃষ্টি? তিনিই ইহা নির্মাণ করিয়াছেন, তিনি ইহার ছাদকে সুউচ্চ ও সুবিন্যস্ত করিয়াছেন" (৭৯: ২৭-২৮)।
(খ) أَفَلا يَنْظُرُونَ إِلَى الْإِبِلِ كَيْفَ خُلِقَتْ ، وَإِلَى السَّمَاءِ كَيْفَ رُفِعَتْ .
"Will they not regard the camels, how they are formed? And the heaven how it is raised"?
"তবে কি উহারা দৃষ্টিপাত করে না উটের দিকে, কিভাবে উহাকে সৃষ্টি করা হইয়াছে? এবং আকাশের দিকে, কিভাবে উহাকে ঊর্ধ্বে স্থাপন করা হইয়াছে" (৮৮:১৭-১৮)।
(গ) وَالسَّمَاءَ بَنَيْنَهَا بِأَيْدٍ وَإِنَّا لَمُوسِعُونَ .
"The heaven we have built with hands, and it is we who make it of vast extent".
"আমি আকাশ নির্মাণ করিয়াছি আমার ক্ষমতাবলে এবং আমি অবশ্যই মহা সম্প্রসারণকারী” (৫১:৪৭)।
الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً .(7) "(your Lord) made for you the earth a carpet and the heaven an edifice..."
"যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য বিছানা এবং আকাশকে ছাদ করিয়াছেন" (২:২২)।
উপরিউক্ত (ক), (গ) ও (ঘ) আয়াত তিনটিতে যথাক্রমে তিনটি শব্দ রহিয়াছে : بَنهَا / بَنَيْنِهَا وَبَنَاءَ - বানাহা, বানায়নাহা ও বিনা। ওয়াট তাহার নিজের মনের মতই অনুবাদ করিয়াছেন। কারণ তাহা দ্বারা তিনি যাহা বলিতে চাহিতেছেন তাহাই বোঝা যায়। তাহার অনুবাদ যদি গ্রহণ করা হয় তাহা হইলেও দেখিতে হইবে যে, বিল্ড ও এডিফিস কেবল কঠিন বস্তুর ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় না। এইগুলি কঠিন নহে অথবা বিমূর্ত এইরূপ বস্তুর ক্ষেত্রেও প্রযুক্ত। যাহা হউক তিনি ওয়াইন্না লা-মূসি'ঊন )وَأَنا لَمُوسِعُونَ( -এর অনুবাদ করিয়াছেন 'এবং আমরা ইহাকে বিশাল আয়তন করি', ইহা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর। এই স্থলে যাহাকে 'বিশাল আয়তন করা' বলা হইয়াছে তাহার প্রকৃত অর্থ হইবে 'ক্রমসম্প্রসারমান' অথবা 'ক্রমবিস্তারমান'। ইহা পূর্বেও বলা হইয়াছে।
বর্তমান কালে আমরা অবগত আছি যে, একটি পরমাণু ও একটি 'গঠিত কাঠামো' কতকগুলি মৌলিক উপাদান লইয়া গঠিত। অনুরূপভাবে সমগ্র মহাবিশ্ব এবং ইহার বিভিন্ন অংশ যাহার মধ্যে রহিয়াছে চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, উপগ্রহ, বিভিন্ন সিস্টেম, যেমন সোলার সিস্টেম-এই সকল কিছুই সুসংগঠিত কাঠামো অথবা প্রাণীসত্তা অথবা আলঙ্কারিক অর্থে একটি স্বপ্নসৌধও হইতে পারে। এমতাবস্থায় নির্মিত, সৃষ্ট বা গঠিত-এই শব্দগুলি তাহাদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হইতে পারে। এমনকি সৌরমণ্ডলের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হইতে পারে, যদিও তাহার মধ্যে পৃথিবী ও অন্যান্য গ্রহ রহিয়াছে। প্রশ্ন হইতেছে কোন দৃষ্টিতে আমরা বিষয়টিকে দেখি, যেমন ওয়াট সাহেব তার নিজের দৃষ্টিতে দেখিয়াছেন। যে শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে তাহা দ্বারা প্রমাণিত হয় না যে, পবিত্র কুরআন অনুযায়ী আকাশ কোন কঠিন বস্তু।
অনুরূপভাবে 'সাঙ্ক' (سَمَاء) শব্দটিকে ওয়াট সাহেব অনুবাদ করিয়াছেন 'ছাদ', অথচ ইহার অন্যান্য অর্থ হইতে পারে উচ্চতা, প্রসারিত, ব্যাপকতা এবং বুরুজ অথবা নক্ষত্রপুঞ্জের এলাকা। ৪৯ অবশ্য পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হইয়াছে اَلسَّقْف المرفوع 'উন্নীত ছাদ' (৫২:৫) এবং سَقْفًا مَّحْفُوظ “রক্ষাকারী ছাদ" (২১ঃ ৩২)। মূল আরবী সাক্ফ অর্থ আচ্ছাদন অথবা কোন কিছুর উপর ছাদ। এই শব্দটি যথাযথই ব্যবহৃত হইয়াছে-কারণ আমাদের নিকটস্থ পৃথিবীর চারপাশে যে মণ্ডল সেগুলি আমাদেরকে রক্ষা করার জন্যই। এই চারটি আয়াত ছাড়াও কুরআনে আরও অনেক আয়াত রহিয়াছে যেগুলি আকাশ সংক্রান্ত, কিন্তু ওয়াট সেগুলি বিবেচনায় আনেননি।
এই আয়াতগুলিকে বৃহৎ তিন ভাগে বিভক্ত করা যায়। যেমন, (ক) যেগুলিতে সৃষ্টির প্রথমাবস্থায় আকাশের অবস্থা বলা হইয়াছে; (খ) যেগুলিতে আকাশের প্রকৃতি ও তাহাতে কি আছে অথবা আকাশ এখন কি প্রকার তাহা বলা হইয়াছে; (গ) পরিশেষে যেগুলিতে আকাশের অবস্থা কি তাহা বলা হইয়াছে।
সৃষ্টির প্রথমাবস্থায় আকাশের অবস্থা কিরূপ ছিল তাহা বর্ণনার ক্ষেত্রে দুইটি আয়াত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি ৪১: ১১ আয়াত। উহা বলে যে, প্রথমে আকাশ ছিল 'ধোঁয়া' (অথবা বাষ্পীভূত বা গ্যাসের মত); ৫০ অপরটি ২১: ৩০। উহা বলে, আকাশ ও পৃথিবী প্রথমাবস্থায় একীভূত বা একত্র পুঞ্জীভূত ভর ছিল, পরে উহা বিভক্ত হইয়া পৃথক হইয়া গিয়াছে। ৫১ আধুনিক বৈজ্ঞানিকগণ এই বিষয়ে বিভিন্ন মত পোষণ করেন। তাহাদের এক একজনের এক এক তত্ত্ব। বর্তমান লেখক এই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নন এবং এই বিষয়ে মন্তব্য করার মত পারদর্শীও নন। তদুপরি এই স্থলে উক্ত বিষয়ে আলোচনার তেমন সুযোগও নাই। তবে একজন সাধারণ পাঠক হিসাবে এই বিষয়ে নিরাপদে দুইটি মন্তব্য করা যাইতে পারে। (এক) আধুনিক কালে মহাবিশ্বের সৃষ্টি সম্পর্কিত যে সকল থিওরি বা তত্ত্ব দাঁড় করানো হইয়াছে উহা পবিত্র কুরআনের বক্তব্যের অনেক কাছাকাছি। (দুই) পবিত্র কুরআনের এই সকল বক্তব্য ষষ্ঠ ও সপ্তম শতকে প্রচলিত ধারণা হইতে বহু দূরবর্তী।
আকাশের প্রকৃতি ও উহাতে কি আছে এই বিষয়ে পবিত্র কুরআনে বহু আয়াত রহিয়াছে। এই সকল আয়াতের সর্বাপেক্ষা আশ্চর্যের বিষয় যে, ইহাতে আকাশ কথাটি বহুবচনে (السموت) বলা হইয়াছে এবং পবিত্র কুরআনে ১৯০ বার বলা হইয়াছে এবং একবচনে (السَّمَاء) ১২০ বার বলা হইয়াছে। আরও মজার বিষয়, কমপক্ষে ৯ বার বলা হইয়াছে যে, 'সাত আসমান'। ৫২ একটির পর আর একটি (طباق), যাহাকে বলা যায় পরত পরত। ৫৩ বিজ্ঞানীদের সঙ্গে অনেকেই এই মত পোষণ করেন যে, মহাশূন্য কতকগুলি সম্প্রসারমান স্তর দ্বারা গঠিত এবং প্রতিটি স্তরে তাহার নিজস্ব ছায়াপথ, নক্ষত্রপুঞ্জ ও সূর্য রহিয়াছে। পবিত্র কুরআনে ২০০ বার 'আকাশগুলি' ও 'সাত আকাশ' বলা হইয়াছে। ইহা আধুনিক জ্ঞানের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করিতে পারে। তবে একটি বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, সপ্তম শতকের কোন মানুষ খালি চোখে আকাশের দিকে তাকাইয়া এবং আকাশকে কঠিন প্রস্তর নির্মিত প্রাসাদ কল্পনা করিয়া বলিতে সাহস করিবে এবং বারবার বলিবে সেখানে তেমন সাতটি প্রাসাদ আছে। এইরূপ উদ্ভট কথা বলা তো কখনই সম্ভব নহে, মহানবী -এর পক্ষে তো সম্ভব নয়ই। এই ক্ষেত্রেই পবিত্র কুরআনে সপ্তম শতকের প্রচলিত ধারণা হইতে বহু দূরে। ৫৪
আসমানসমূহ ও আসমানের অন্যান্য বস্তু তাহাদের নিজ নিজ অবস্থানে অবস্থিত রহিয়াছে কি প্রকারে সেই বিষয়ে পবিত্র কুরআন যে সকল বক্তব্য রাখিয়াছে তাহা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনে স্পষ্টই বলা হইয়াছে, আসমানকে 'উন্নীত' করিতে গিয়া আল্লাহ ইহার 'ভারসাম্য' নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন। ৫৫ ইহাও বলা হইয়াছে যে, আসমান এইরূপ কোন কাঠামো নহে যাহা দৃশ্যমান স্তম্ভের উপর রক্ষিত। ৫৬ সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলা হইয়াছে যে, আসমানসমূহ এবং পৃথিবী আল্লাহ্র ইচ্ছায় ধারণকৃত হইয়া আছে। আয়াতটি নিম্নরূপ:
إِنَّ اللَّهَ يُمْسِكُ السَّمَوتِ وَالْأَرْضَ أَنْ تَزُولاً وَلَئِنْ زَالَتَا إِنْ أَمْسَكَهُمَا مِنْ أَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ .
"আল্লাহই আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে সংরক্ষণ করেন, যাহাতে উহারা স্থানচ্যুত না হয়। উহারা স্থানচ্যুত হইলে তিনি ব্যতীত কে উহাদিগকে সংরক্ষণ করিবে" (৩৫:৪১)?
'আসামানের' ক্ষেত্রে, সেই সঙ্গে পৃথিবীর ক্ষেত্রে 'ধারণ করা' অভিব্যক্তিটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ইহার অর্থ পৃথিবী অথবা আসমান কোনটিই কোন নিরেট বস্তুর উপর রক্ষিত নয়। অন্যভাবে বলিলে হয়, আয়াতে বলা হইতেছে যে, আসমান বা আসমানসমূহ এবং পৃথিবী মহাশূন্যে তাহাদের নিজস্ব অবস্থানে আল্লাহ্র ইচ্ছামাফিক ও পরিকল্পনামত রহিয়াছে, কোন কিছুই কোন কঠিন বস্তুর উপর স্থাপিত নাই।
আসমান সম্পর্কিত তৃতীয় ও সর্বাধিক আশ্চর্যের বিষয় হইতেছে যে, ইহা ক্রমাগত ক্রমবর্ধমান পদ্ধতিতে সম্প্রসারণশীল। পূর্বেও এই বিষয়ে বলা হইয়াছে। ৫৭ মহাবিশ্ব সম্পর্কিত আধুনিক বৈজ্ঞানিক মতবাদ অনেকাংশে পবিত্র কুরআনের বক্তব্যের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রসঙ্গে আরও বলা যাইতে পারে যে, পবিত্র কুরআন সপ্ত আকাশকে 'সাতটি পথ' হিসাবেও বর্ণনা করিয়াছে। যেমন আয়াত ২৩:১৭
وَلَقَدْ خَلَقْنَا فَوْقَكُمْ سَبْعَ طَرَائِقَ وَمَا كُنَّا عَنِ الْخَلْقِ غَافِلِينَ . "আমি তো তোমাদের উর্ধ্বে সৃষ্টি করিয়াছি সপ্ত স্তর এবং আমি সৃষ্টি বিষয়ে অসতর্ক নহি"।
পবিত্র কুরআনের এই বক্তব্যের সঠিক অর্থ সেইদিন আমরা জানিতে পারিব যেদিন আধুনিক বিজ্ঞান পরিপূর্ণভাবে মহাশূন্যে ভাসমান বস্তুর চলাচল সম্পর্কে জানিতে পারিবে।
আকাশ সম্পর্কে আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য পবিত্র কুরআনে রহিয়াছে যে, আমাদের গ্রহে যেমন প্রাণসম্পন্ন বস্তু রহিয়াছে তেমনি অন্যত্রও আছে। কারণ ৪২: ২৯ আয়াতে পরিষ্কারভাবে বলা হইয়াছে:
وَمِنْ أَيْتِهِ خَلْقُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَثَّ فِيهِمَا مِنْ دَابَّةٍ . "তাঁহার অন্যতম নিদর্শন আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং এই দুইয়ের মধ্যে তিনি যে সকল জীব-জন্তু ছড়াইয়া দিয়াছেন সেইগুলি" (৪২ঃ ২৯)।
এইরূপ আরও অনেক আয়াত আছে যেখানে অনুরূপ ধারণা দেওয়া হয়। অবশেষে বলিতে হয়, সাত আসমানের মধ্যে আমাদের সবচাইতে নিকটবর্তী আসমান সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে বলা হইয়াছে আস-সামাউদ-দুয়া বা 'নিম্নস্থ আসমান'। অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হইয়াছে:
وَلَقَدْ زَيَّنَّا السَّمَاءَ الدُّنْيَا بِمَصَابِيحَ . "আমি নিম্নস্থ আসমানকে নক্ষত্র (কাওয়াকিব) এবং ভাস্বর আলোক (মাসাবীহ) দ্বারা সুসজ্জিত করিয়াছি" (৬৭:৫)।
এইরূপে ৪১: ১২ আয়াতে আল্লাহ তা'আলা সাত আসমান সৃষ্টি করার পর প্রতিটি আসমানের ক্রম নির্ধারণের বর্ণনা করেন: وَأَوْحَى فِي كُلِّ سَمَاءِ أَمْرَهَا "এবং তিনি প্রতিটি আকাশে উহার বিধান ব্যক্ত করিলেন"।
انَّا زَيَّنَّا السَّمَاءِ الدُّنْيَا بزينة الكواكب . অতঃপর একই কথা ৬৭: ৫ আয়াতে বলিবার পর ৩৭: ৬ আয়াতে বলেন: "আমি নিকটবর্তী আকাশকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করিয়াছি” (৩৭ঃ ৬)। নিকটবর্তী আকাশের বৈশিষ্ট্যগুলি ইহাই। স্বাভাবিকভাবেই এই আকাশের বৈশিষ্ট্য বলা হইয়াছে। কারণ ইহাতেই রহিয়াছে আমাদের সৌরজগৎ ও নিকটবর্তী নক্ষত্রপুঞ্জ। আধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান কেবল নিকটবর্তী আকাশ ও উহার বৈশিষ্ট্য ও প্রকৃতি সম্পর্কে তথ্যানুসন্ধানে নিয়োজিত। এই আকাশের উপরে 'ছাদ' হিসাবে রহিয়াছে 'ছায়াপথ', যে ছায়াপথে রহিয়াছে এক হাজার লক্ষ কোটির অধিক নক্ষত্র। আকাশের কথা বলিতে গিয়া মহাশূন্যের ধারণাকে ব্যক্ত করিতে চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদি সম্পর্কে বলা হইয়াছে যে, উহাদিগকে আকাশেও স্থাপন করা হইয়াছে এবং উহাদিগকে নির্দিষ্ট পথে চলাচলের জন্যও নির্ধারিত করা হইয়াছে। ৫৯ যেমন ১৩: ২ আয়াতে বলা হয়েছে: وَسَخَّرَ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ كُلٌّ يَجْرِي لِأَجَلٍ مُّسَمًّى "তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে নিয়মাধীন করিলেন, প্রত্যেকে নির্দিষ্টকাল পর্যন্ত আবর্তন করে...."। অনুরূপভাবে ৩৬: ৩৮-৪০ আয়াতে বলা হইয়াছে: وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٌّ لَهَا ذَلِكَ تَقْدِيرُ الْعَزِيزِ الْعَلِيمِ ، وَالْقَمَرَ قَدَّرْتُهُ مَنَازِلَ حَتَّى عَادَ كَالْعُرْجُونِ الْقَدِيمِ . لا الشَّمْسُ يَنْبَغِي لَهَا أَنْ تُدْرِكَ الْقَمَرَ وَلَا الَّيْلُ سَابِقُ النَّهَارِ وَكُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ . "এবং সূর্য ভ্রমণ করে উহার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে; ইহা পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ। এবং চন্দ্রের জন্য আমি নির্দিষ্ট করিয়াছি বিভিন্ন মনযিল; অবশেষে উহা শুষ্ক বক্র পুরাতন খর্জুর শাখার আকার ধারণ করে। সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চন্দ্রের নাগাল পাওয়া এবং রজনীর পক্ষে সম্ভব নয় দিবসকে অতিক্রম করা; এবং প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সন্তরণ করে"। উপরিউক্ত আয়াতের 'মুসতাকারর' ও 'ফালাক' শব্দের যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হউক না কেন এক দিকে এক প্রকার গতি ও চলাচলের ধারণা এবং অন্যদিকে মহাশূন্যের ধারণা 'ইয়াজরী, তাজরী ও ইয়াসবাহুন' শব্দের অভিব্যক্তিতে অত্যন্ত স্পষ্ট।
সামাওয়াত শব্দটির অর্থের মধ্যে আমাদের চারিপাশে ও উপরে শূন্যস্থানের যে ধারণা রহিয়াছে তাহাও ১৬: ৭৯ ও ৩০:৪৮ আয়াতে স্পষ্ট। প্রথম আয়াতটিতে বলা হইতেছে: أَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ مُسَخَّرَاتٍ فِي جَوِّ السَّمَاءِ .
"তাহারা কি লক্ষ্য করে না আকাশের শূন্য গর্ভে নিয়ন্ত্রানাধীন বিহংগের প্রতি” (১৬:৭৯)? দ্বিতীয় আয়াতে বলা হইতেছে: اللَّهُ الَّذِي يُرْسِلُ الرِّيحَ فَتُثِيرُ سَحَابًا فَيَبْسُطُهُ فِي السَّمَاءِ .
"আল্লাহ, তিনি বায়ু প্রেরণ করেন, ফলে ইহা মেঘমালাকে সঞ্চালিত করে, অতঃপর তিনি ইহাকে যেমন ইচ্ছা আকাশে ছড়াইয়া দেন" (৩০:৪৮)।৬০
যে আয়াতগুলিতে শেষ দিনের কথা বলা হইতেছে সেইগুলি পরীক্ষা করিলে দেখা যায় উহা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে বলা হইতেছে, আকাশসহ সকল গ্রহ-নক্ষত্র ও সকল সৃষ্ট জগত শেষ হইয়া যাইবে। সেদিন আকাশমণ্ডলীকে গুটাইয়া ফেলিবে যেমন গুটান হয় লিখিত দফতর (স্ক্রল)। যেভাবে আমি সৃষ্টির সূচনা করিয়াছিলাম সেইভাবে পুনরায় সৃষ্টি করিব... ৬১ সেই দিন আকাশ মেঘপুঞ্জসহ বিদীর্ণ হইবে; স্পষ্ট ধুম্রাচ্ছন্ন হইবে আকাশ; ৬৩ যেদিন আকাশ আন্দোলিত হইবে প্রবলভাবে ৬৪; আকাশ বিদীর্ণ হইবে... উহা রক্তবর্ণে রঞ্জিত হইবে; আকাশ গলিত ধাতুর মত হইবে; আকাশ যখন বিদীর্ণ হইবে যখন নক্ষত্রমণ্ডলী বিক্ষিপ্তভাবে ঝরিয়া পড়িবে ৬৭; যখন সূর্য ও চন্দ্রকে একত্র করা হইবে; অবশেষে পুনরায় একটি নূতন পৃথিবী এবং নূতন আকাশ সৃষ্ট হইবে। يَوْمَ تُبَدِّلُ الْأَرْضُ غَيْرَ الْأَرْضِ وَالسَّمَوَاتُ .
"যেদিন এই পৃথিবী পরিবর্তীত হইয়া অন্য পৃথিবী হইবে এবং আকাশমণ্ডলীও” (১৪:৪৮)। এমনিভাবে বর্তমান পৃথিবী, মহাবিশ্ব নিঃশেষ হইবে, অতঃপর সূচনা হইবে নূতন বিশ্ব ও নূতন প্রাণের পরজগৎ।
এইভাবে বর্ণিত পদ্ধতি ও প্রক্রিয়া নিহিত রহিয়াছে দূর ভবিষ্যতের গর্ভে এবং একমাত্র মহামহিম আল্লাহ তাআলাই জানেন উহা কখন, কবে সংঘটিত হইবে। আধুনিক বিজ্ঞান কেবল অনুমান করিতে পারে যে, একদিন এই বিশ্ব লোপ পাইবে কোন মারাত্মক বিপর্যয়ের কারণে এবং সৌরজগতের ও গ্রহমণ্ডলীর স্থানচ্যুতির কারণে। এমতাবস্থায় আমরা সহজেই অনুধাবন করিতে পারি ইহার সহিত উপরে উল্লিখিত পবিত্র কুরআনের বক্তব্যর কোনই অসামঞ্জস্যতা নাই।
'গুটাইয়া ফেলা' অথবা 'বিক্ষিপ্তভাবে ঝরিয়া পড়া' প্রভৃতি শব্দ ও অভিব্যক্তি আকাশের আয়ুষ্কাল নিঃশেষ হওয়ার সহিত জড়িত। এই সকল অভিব্যক্তি দ্বারা ধারণা হয় যে, কোন কিছু ভাঙ্গিয়া যাইতে পারে। তেমনিভাবে, প্রাসাদ' বা 'ছাদ' শব্দের ন্যায় আকাশকেও কঠিন বস্তু বিবেচনা না করিয়াও এই সকল অভিব্যক্তিগুলিকেও ব্যাখ্যা করা যাইতে পারে, বিশেষ করিয়া যে প্রক্রিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে উহার মধ্যে রহিয়াছে নক্ষত্ররাজি, গ্রহ, সৌরজগৎ ইত্যাদি। অনুরূপ ভাবে আকাশ জীবনের অস্তিত্বের অর্থ ইহা নহে যে, সেই পৃথিবীর ন্যায় কঠিন বস্তু হইবে। কারণ যেমন পৃথিবী আকাশের (মহাশূন্যে) মধ্যে স্থিত তেমনি আরও অনেক পৃথিবী এই আকাশে অবস্থান করিতেছে। পবিত্র কুরআন ৬৫: ১২ আয়াতে স্পষ্টই বলিতেছে:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمُوتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ .
"আল্লাহই সৃষ্টি করিয়াছেন সপ্ত আকাশ এবং উহাদের অনুরূপ পৃথিবীও” (৬৫: ১২)।
এই প্রসঙ্গে মনে রাখিতে হইবে যে, অন্যান্য জীবনের গঠন প্রকৃতি ও গঠনের উপাদান সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির হইতে পারে, হইতে পারে ভিন্ন মাত্রার আবাসস্থল, সেই আবাসস্থল আমাদের আবাসস্থলের ন্যায় নাও হইতে পারে। আবার পৃথিবী হইতে কিছু দূরে আকাশে মানুষের অবস্থা ওজনহীন হইয়া পড়ে এবং তখন তাহার চলাচল বা দাঁড়াইবার জন্য কোন প্রকার স্কুল বস্তুর সাহায্য লাগে না, তেমনি মহাশূন্যে যে সকল প্রাণসম্পন্ন বস্তু রহিয়াছে তাহারাও কঠিন বস্তু নাও হইতে পারে; তাহারা আমাদের স্পর্শের বা ধরা-ছোয়ার বাহিরে থাকিতে পারে।
উপরিউক্ত আলোচনা হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, পবিত্র কুরআনে এমন সকল শব্দ বা অভিব্যক্তি রহিয়াছে তাহা যদি আকাশ সম্পর্কিত সেই পুরাতন আদিম যুগের ধারণা লইয়া পাঠ করা যায় তাহা হইলে উহার অর্থ তেমনই হইবে। কিন্তু যদি আধুনিক কালের আকাশ ও মহাশূন্য সম্পর্কিত জ্ঞান লইয়া পাঠ করা যায় তাহা হইলে অবশ্যই যথাযথ মনে হইবে। তদুপরি মনে রাখিতে হইবে, আমাদের আধুনিক কালে বৈজ্ঞানিক জ্ঞানও আজও সীমাবদ্ধ। বৈজ্ঞানিকগণ অদ্যাবধি কেবল নিকটস্থ আকাশের সংবাদ সংগ্রহ করিতে সমর্থ হইয়াছেন। এই নিকটস্থ আকাশের পরে যে সীমাহীন মহাশূন্য রহিয়াছে তাহার তেমন কোন সঠিক তথ্য আজও আমরা লাভ করিতে পারি নাই। উহা আজও আমাদের ধারণার অতীত। বিজ্ঞানীরাও স্বীকার করেন যে, এই নিকট-আকাশের যে তথ্য তাহারা লাভ করিয়াছেন তাহাও প্রকৃত অবস্থার তুলনায় বিন্দু পরিমাণ মাত্র। দৃশ্যমান এই নিকটস্থ আকাশ, যেখানে রহিয়াছে গ্রহ-নক্ষত্র, তাহাকে অতিক্রম করিয়া যে মহাজগৎ তাহা আজও আমাদের জ্ঞান জগতের বাহিরে রহিয়াছে। এমনকি বিজ্ঞানীগণও স্বীকার করেন যে, তাহারা আকাশের বিস্তার ও প্রকৃতি সম্পর্কে আজ পর্যন্ত যাহা জানিয়াছেন উহা অজানা জগতের তুলনায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র অণুর সমানও নহে। আমাদের জ্ঞাত জগতের বাহিরে যাহা আছে উহা আমাদের নিকট সম্পূর্ণ অন্ধকার। এই সকল আলোচনার প্রেক্ষিতে যদি অনুমান করা হয় যে, পবিত্র কুরআনের বক্তব্য আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত নহে তাহা হইলে উহাকে চরম হঠকারিতা ব্যতীত আর কিছুই বলা চলে না।
যাহা হউক, ওয়াট সাহেবের অনুমান যে, আকাশ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের বক্তব্য মধ্যযুগীয়, উহাতে সপ্তম শতকের জ্ঞান ধারণ করা হইয়াছে, তাহার সেই অনুমান তিনটি কারণে সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।
(এক) তিনি মাত্র কয়েকটি আয়াত নির্বাচন করিয়াছেন এবং মধ্যযুগীয় ধারণা লইয়া বিশ্লেষণ করিতে অগ্রসর হইয়াছেন এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ মন লইয়া বিচার করিয়াছেন।
(দুই) আকাশ সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের যে সকল আয়াত আধুনিক বিজ্ঞানের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে সংগতিপূর্ণ সেই সকল আয়াত তিনি সম্পূর্ণ পরিহার করিয়াছেন এবং আকাশ সম্পর্কিত সেই সকল বক্তব্য কেবল বিজ্ঞানের আরও অগ্রগতির পর বোধগম্য হইবে।
(তিন) তিনি মনে করেন বা ধরিয়া লইয়াছেন যে, আকাশ বা মহাকাশ সম্পর্কে আজ অবধি বিজ্ঞান যাহা জানিয়াছে উহাই চূড়ান্ত এবং মহাকাশ সম্পর্কে আর কিছুই জানার নাই। কিন্তু সত্য তাহা নহে। কারণ বিজ্ঞানীগণ নিজেরাই স্বীকার করিয়াছেন, বিশেষ করিয়া মহাকাশ ও মহাবিশ্ব সম্পর্কে তাহারা যাহা জানিয়াছেন এবং যাহা অনুসন্ধান করিতে পারিয়াছেন উহা মহাকাশের তুলনায় কণামাত্র।
টিকাঃ
৪৮. Watt, M's, M. 5.
৪৯. দ্র. লিসানুল আরাব, সাম্ফ শিরোনামে এবং তাজুল আরূস, ৭খ, পৃ. ১৪৫। ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانُ .
৫০. মূল পাঠ নিম্নরূপ : اِنَّ السَّمٰوَتِ وَالْاَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنٰهُمَا .
৫১. মূল পাঠ নিম্নরূপ : اِنَّ السَّمٰوَتِ وَالْاَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنٰهُمَا .
৫২. কুরআন ২:২৯; ১৭:৪৪; ২৩:১৭; ২৩:৮৬; ৪১:১২; ৬৫:১২; ৬৭:৩; ৭১:১৫; ৭৮:১২
৫৩. কুরআন ৬৭:৩ এবং ৭১:১৫ র্ট শব্দটির যদিও প্রায় অনুবাদ করা হয় একের উপর অন্যটি, তবে বিশুদ্ধতর অর্থ হইল স্তরে স্তরে অথবা একটির সহিত অন্যটি সম্পর্কিত। দ্র. Lane-এর Lexicon.
৫৪. ওয়াট এই মূল পাঠ এই বলিয়া দ্রুত অতিক্রম করিয়া যান যে, এখানে সাতটি আসমানের কথাও বলা হইয়াছে (Muhammads Mecca, 5).
৫৫. কুরআন ৫৫ : ৯ وَالسَّمَاءَ رَفَعَهَا وَوَضَعَ الْمِيزَانَ .
৫৬. কুরআন ১৩: ২ এবং ৩১: ১০।
৫৭. নিম্নে দ্র.পৃ. ৩১৩; আরও দ্র. কুরআন ৫১:৪৭।
৫৮. দৃষ্টান্তস্বরূপ দ্র. কুরআন ১৬ : ৪৯; ১৭:৪৪; ১৭:৫৫; ১৯:৪০; ২১:৩৩; ২৩: ৭১; ২৪:৪১; ২৭:৬৫; ২৮: ১৮; ৩০: ২৬।
৫৯. আরও দ্র. কুরআন ১৪: ৩৩; ১৬: ১২; ২৯:৬১; ৩১:২০; ৩৫: ১৩; ৩৯:৫; ৪৫:১৩; ৭:৫৪; ১৬: ১২।
৬০. কুরআনে অবশ্য রূপক অর্থে কোন কোন ক্ষেত্রে 'সামা' শব্দটি বৃষ্টির অর্থেও ব্যবহৃত হইয়াছে, তবে তাহা আলোচ্য বিষয়ের জন্য প্রাসঙ্গিক নহে।
৬১. কুরআন ২১: ১০৪ يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَى السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ .
৬২. কুরআন ২৫:২৫ يَوْمَ تَشَقَّقُ السَّمَاءُ بِالْغَمَامِ .
৬৩. কুরআন ৪৪: ১০ يَوْمَ تَأْتِي السَّمَاءُ بِدُخَانٍ مُّبِينٍ .
৬৪. কুরআন ৫২:৯ يَوْمَ تَمُورُ السَّمَاءُ مَوْرًا .
৬৫. কুরআন ৫৫ : ৩৭ فَإِذَا انْشَقَّتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ وَرْدَةً كَالدِّهَان .
৬৬. কুরআন ৭০ : ৮ يَوْمَ تَكُونُ السَّمَاءُ كَالْمُهْلِ .
৬৭. কুরআন ৮২ : ১-২ إِذَا السَّمَاءُ انْفَطَرَتْ ، وَإِذَا الكَوَاكِبُ انْتَشَرَتْ .
৬৮. কুরআন ৭৫ : ৯ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ ; আরও দ্র. কুরআন ৩৯: ৬৭; ৬৯ : ১৬; ৭০:১৮; ৭৭:৯; ৭৮:১৯; ৮১:১১ এবং ৮৪: ১।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00