📄 এক: অনুমানসমূহের সারসংক্ষেপ
মুইর বলেন যে, মুহাম্মাদ মক্কা, মদীনা ও উকায মেলায় ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্মের অনুসারী যে সকল ব্যক্তির সংস্পর্শে আসিয়াছিলেন তাহাদের নিকট হইতে ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। তিনি যে বাণিজ্য সফরে সিরিয়া গিয়াছিলেন সেই স্থান হইতেও ওই জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। এমনকি শৈশব কালেই তিনি নাকি মদীনায় ইয়াহুদীদের দেখিয়াছেন, 'তাহাদের সিনাগগের কথা, তাহাদের প্রার্থনার কথা শুনিয়াছিলেন এবং তাহাদিগকে আল্লাহভীরু মানুষ হিসাবে সম্মান করিতে শিখিয়াছিলেন'। খাদীজা (রা)-এর বাণিজ্য কাফেলা লইয়া যখন দ্বিতীয়বার সিরিয়া গমন করেন তখন মহানবী -এর সহিত যে নেসতোরিয়াসের সাক্ষাতের 'বাল সুলভ' কাহিনীর কথা বলা হয় মুইর অবশ্য তাহা বাতিল করিয়া দিয়াছেন। তথাপি মুইর বলেন, 'আমরা অবশ্য নিশ্চিত যে, মোহামেট যখনই কোন পাদ্রী অথবা যাজকের দেখা পাইতেন তখন তাহাদের নিকট হইতে সিরিয়ান খৃস্টানদের উপাসনা পদ্ধতি ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের বিষয়ে জানিবার সুযোগ হারাইতেন না'। ৪
উদাহরণ হিসাবে মুইর মাত্র তিনটি ঘটনার উল্লেখ করিয়াছেন। যেমন: (ক) বালক অবস্থায় তিনি উকায মেলায় কুস ইবন সাইদা-এর কথা শুনিয়াছিলেন। ৫ (খ) যায়দ ইবন হারিছার সঙ্গে পরিচয়। যায়দের পূর্বপুরুষ খৃস্টান ছিল এবং বাল্যকালে তাহাকে ক্রীতদাস হিসাবে বিক্রয় করা হইয়াছিল। তিনি নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ-এর নিকট তাহার খৃষ্ট ধর্ম সম্পর্কে যাহা জানা ছিল তাহা বলিয়াছিলেন। (গ) ওয়ারাকা ইবন নাওফালের সঙ্গে পরিচয়। মুইর এই পরিচয়কে বর্ণনা করিয়াছেন যে, 'মুহাম্মাদ এক ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য লইয়া আসিয়াছেন এই কথা বলিয়া তাঁহাকে মানসিক তৃপ্তি দিয়াছিলেন'। মুইর আরও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ নিশ্চয়ই খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের মতপার্থক্য ও বিরোধ লক্ষ্য করিয়াছিলেন। তবে তিনি তাহাদের নিকট হইতেই এক ঈশ্বর সম্পর্কে ধারণা, ঐশ্বরিক বাণী ও কিতাব সম্পর্কে ধারণা এবং আবরাহাম-এর নাম সম্পর্কে ধারণা লাভ করিয়াছিলেন। ইয়াহুদী ও খৃস্টান উভয় সম্প্রদায়ই আবরাহামকে অত্যন্ত সম্মান করে, যিনি কা'বাগৃহ নির্মাণ করিয়াছিলেন এবং প্রতিটি আরব গোত্র কা'বাগৃহে যে সকল আচার-অনুষ্ঠান করিয়া থাকে তাহা আবরাহামই সৃষ্টি করিয়াছেন-এই সকল কথা তিনি তাহাদের নিকট হইতে শুনিয়া থাকিবেন। মুইর আরও বলেন যে, মহানবী যখন সিরিয়ায় ছিলেন তখন তিনি নিশ্চয়ই লক্ষ্য করিয়াছিলেন যে, 'সেখানে খৃস্ট ধর্ম অবলম্বন করাই জাতীয় ধর্ম বা পেশা'। এই প্রকারে মুইর সমাপ্তি টানিয়াছেন যে, 'মুহাম্মাদ সম্ভবত মনে করিয়াছিলেন, তিনি বিশপের দায়িত্ব পালন করিবেন এবং তাহা হইবে আরও ব্যাপক ও সর্বজনীন পর্যায়ের'।
মুইর দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সঙ্গে মহানবী -এর যোগাযোগ ঘটিয়াছিল, বিশেষ করিয়া খৃস্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপিত হইয়াছিল। এই কথা বলিয়া মুইর যোগ করিয়াছেন, যেহেতু তাঁহার যোগাযোগ ছিল খৃস্টান 'গোঁড়া বা মৌলবাদী দলের' সঙ্গে যাহারা ছিল সিরিয়ার সন্ন্যাসী ও যাজক, ফলে তিনি খৃষ্ট ধর্ম সম্পর্কে 'বিকৃত' তথ্য, বিশেষ করিয়া মেরী ও যীশু সম্পর্কে ভুল তথ্য লাভ করিয়াছিলেন। মুইর বলিতে চাহিয়াছেন যে, 'তিনি যদি সঠিক তথ্য লাভ করিতেন তাহা হইলে তিনি নূতন ধর্ম প্রচার না করিয়া নিজেই খৃস্ট ধর্ম গ্রহণ করিতেন'। অতঃপর মুইর দুঃখ করিয়া বলিয়াছেন, 'সাম্রাজ্যের ক্যাথোলিক নামের অপনাম সেই যুগের অনন্য প্রতিভাধর মেধাকে আকৃষ্ট করিতে ব্যর্থ হইল। কেবল তাহাই নহে, ফলে সমগ্র পূর্ব গোলার্ধের অধিকাংশ তাহাদের হাতছাড়া হইল'। ১০
মুইর যে ধারণা পোষণ করিয়া বক্তব্য উপস্থাপন করিয়াছেন তাহাই মারগোলিয়থ গ্রহণ করিয়া নিজের মত করিয়া পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে যে, মারগোলিয়থ ধরিয়া লইয়াছেন যে, মহানবী -এর ব্যবসা সংক্রান্ত কাজ ছিল অত্যন্ত ব্যাপক। তাঁহার এই ব্যাপক কর্মকাণ্ডে তিনি বহু মানুষের সঙ্গে মিলিত হইতেন এবং কথা প্রসঙ্গে টুকরা টুকরা তথ্য গ্রহণ করিতেন। মারগোলিয়থ বিষয়টি এইভাবে লিখিয়াছেন, মদের দোকানে আলাপ-আলোচনা হইতে অথবা গল্প-বলিয়ের গল্প শুনিয়া, যাহাদের মধ্যে অনেকেই থাকিত ইয়াহুদী কাপড় ব্যবসায়ী, ১১ তিনি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করিতেন। আরব ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সঙ্গে আলাপচারিতা ও যোগাযোগের ফলে, বলা হইয়াছে যে, মহানবী “এক প্রকার বাইবেলীয় বাগধারা আয়ত্ত করিয়াছিলেন"। ১২ আরও বলা হইয়াছে যে, তিনি নাকি ব্যবসায়িক কাজে এতই নিমগ্ন ছিলেন যে, "তাঁহার পবিত্র গ্রন্থের সর্বত্র তাঁহার এই পেশার চিহ্ন চোখে পড়ে"। ১৩ মুইরের মতই পুনরায় মারগোলিয়থ বলেন যে, এই দুই পদ্ধতি সম্পর্কে মহানবী-এর জ্ঞান নাকি ছিল ত্রুটিপূর্ণ এবং "ভাসা ভাসা"। ১৪ মারগোলিয়থ অবশ্য আরও যোগ করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, দিনে দিনে নাকি বাইবেলীয় কাহিনী সম্পর্কে মহানবী-এর জ্ঞান উন্নতি লাভ করিয়াছিল। মারগোলিয়থ লিখিয়াছেন, "কুরআনের কলেবর যতই বৃদ্ধি পাইতেছিল ততই" নাকি "তাঁহার বাইবেলীয় জ্ঞান ত্রুটিমুক্ত হইতেছিল ইহাতে কোনই সন্দেহ নাই, যদিও এই ক্রমান্বয়ে অধিকতর সঠিক তথ্য পরিবেশনের কারণ মহানবীর স্মৃতিশক্তি। সম্ভবত তিনি সময়ের সঙ্গে অধিক তথ্য সংগ্রহের সুযোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন"। ১৫
কিন্তু মুইর যে স্থানে ক্ষেদোক্তি করিয়াছেন যে, খৃষ্ট ধর্ম বিষয়ে 'বিকৃত' তথ্য প্রাপ্তির কারণে তিনি খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন নাই, সেই স্থানে মারগোলিয়থ ব্যাখ্যা করিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, উহা ছিল মহানবী-এর পরিকল্পনা ও ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ। মারগোলিয়থ বলেন, মহানবী যে ভূমিকা পালন করিয়াছেন উহার ধারণা "দীর্ঘ কাল হইতেই ইয়াহুদী, খৃস্টান ও পারসিকদের সঙ্গে আলাপচারিতা হইতেই" তাঁহার মনে উপস্থিত ছিল। তিনি যাহাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করিতেন তাহাদের "সকলেরই একটি জিনিস ছিল যাহা আরবদের ছিল না: উহা হইল আইন প্রণয়নকারী যিনি ঐশ্বরিকভাবে আদিষ্ট.... প্রত্যেক জাতির অনুরূপ একজন নেতা থাকা আবশ্যক। এই স্থানেই ছিল একজন পয়গাম্বরের জন্য সুযোগ”। ১৬
মুইরের বক্তব্যের প্রতিধ্বনি করিয়া মারগোলিয়থ বলেন যে, মহানবী সিরিয়ায় লক্ষ্য করিয়াছিলেন যে, "খৃস্টবাদের জাতীয় পেশা” এবং মহানবী যে সকল দেশ পরিভ্রমণ করিয়াছিলেন সেখানেই দেখিয়াছিলেন "সকলেই ঈশ্বরের আইনের অধীন”। ইহা দ্বারা তিনি তাঁহার দেশের পশ্চাদগামিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হইয়াছিলেন এবং সেজন্য যে সংস্কার প্রয়োজন সে সম্পর্কেও নিশ্চিত হইয়াছিলেন। সেই সংস্কার তিনি পয়গম্বর হইয়া ওহীর মাধ্যমে সাধন করার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারণ উহাই তাঁহার মতে ছিল উন্নয়নের প্রাথমিক শর্ত। ১৭
তিনি খৃস্ট ধর্ম অথবা ইয়াহুদী ধর্ম গ্রহণ করা যুক্তিসঙ্গত মনে করেন নাই। কারণ মারগোলিয়থের মতে, খৃষ্ট ধর্মকে "বায়যান্টাইন নাগপাশ হইতে মুক্ত করা সম্ভব ছিল না। তাহা ছাড়া মুহাম্মাদ অনেক বড় দেশপ্রেমিক ছিলেন, তিনি কখনও আপন জাতির উপর পরাধীনতার জোয়াল চাপাইয়া দিতে পারেন না"। অনন্তর তিনি যদি খৃস্ট ধর্ম গ্রহণও করিতেন তাহা হইলেও তিনি "যাহারা পুরাতন খৃস্টান তাহাদিগের তুলনায় সেই ধর্ম সম্পর্কে অধিক জ্ঞানী বলিয়া নিজেকে জাহির করিতে পারিতেন না”। ১৮ তিনি "ঠাণ্ডা মস্তিষ্কের মানব প্রকৃতির ছাত্র" হিসাবে স্থির করিলেন যে, তিনি মূসা (আ) অথবা যীশুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবেন। মারগোলিয়থ আরও বলেন, মুহাম্মাদ দেখিলেন, তাহারাও মানুষ ছিল, অতএব তাহারা যাহা পারিয়াছে তিনিও তাহা করিতে পারিবেন। ১৯ তাহার মতে, তদানীন্তন খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের মধ্যে বিদ্যমান বিবাদ ও মতপার্থক্য নাকি তাঁহার পরিকল্পনার জন্য সুবিধাজনক হইয়াছিল, বিশেষ করিয়া খৃস্টানদের পরবর্তী কালের বিভিন্ন উপদলের মধ্যে বিদ্যমান প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাঁহার জন্য সুযোগ সৃষ্টি করিয়া দিয়াছিল এবং তিনি মদীনায় দাবি "করিয়াছিলেন যে, তাহারা যে সকল ক্ষেত্রে একমত পোষণ করে না সেইগুলিকে ঠিক করার জন্যই তাঁহার আগমন ঘটিয়াছে"। ২০
মুইর ও মারগোলিয়থের এই ধারণাই ওয়াট গ্রহণ করিয়া সম্প্রসারিত করিয়াছেন। তাহার রচিত গ্রন্থ Muhammad at Mekka ("মক্কায় মুহাম্মাদ")-তে। সেই গ্রন্থের অন্যতম প্রতিপাদ্য বিষয় হইল : "ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সূত্রের সহিত ইসলামের শিক্ষার সম্পর্ক"। বিষয়টিকে তিনি ব্যাপকভারে আলোচনা করিয়াছেন। গ্রন্থের অন্যতম তত্ত্ব হিসাবে তিনি বলিয়াছেন, ইসলামের মহানুভবতার অন্যতম কারণ কতকগুলি আরব বৈশিষ্ট্যের সহিত বিশেষ কয়েকটি ইয়াহুদী-খৃস্টান ধারণার সংমিশ্রণ। ২১ তিনি একটি বিস্তৃত পরিসরে তাহার বক্তব্যকে উপস্থাপন করিয়াছেন, অতঃপর সাধারণভাবে আরবদের উপর অথবা মুহাম্মাদ-এর পারিপার্শ্বিক অবস্থার উপর, সেইসঙ্গে মুহাম্মাদ -এর উপর এই সকল সূত্রের প্রভাবের কথা বর্ণনা করিয়াছেন। ২২ ওয়াটও তাহার পূর্বসূরীদের ন্যায় বলিতে চাহিয়াছেন যে, খৃষ্টান ও ইয়াহুদীদের নিকট হইতে মুহাম্মাদ একেশ্বরবাদ সম্পর্কিত ধারণা গ্রহণ করিয়াছেন। অবশ্য তিনি সেই সময়ের হানীফ নামক একেশ্বরবাদী সম্প্রদায়ের প্রভাবের সম্ভাবনার কথাও বলিয়াছেন। ২৩ তদুপরি তিনি আরও গুরুত্ব সহকারে বলিয়াছেন যে, "একেশ্বরবাদ সম্পর্কে আরবদের মধ্যে এক প্রকার আশঙ্কাবোধ জন্মলাভ করিয়াছিল। তাহার কারণ অবশ্যই ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রভাব"। ২৪ মুইর ও মারগোলিয়থের ন্যায় ওয়াটও এই সকল প্রভাবের উৎস সন্ধান করিয়াছেন আরবদের সহিত ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সংস্পর্শের মধ্যে, বায়যান্টাইন সাম্রাজ্যের সহিত যোগাযোগের মাধ্যমে। বায়যান্টাইনদের শক্তি ও সভ্যতার প্রতি আরবদের গভীর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। আবিসিনিয়া, এমনকি হীরার সহিত যে যোগাযোগ ছিল তাহার মাধ্যমে এই সকল প্রভাব আসিয়াছিল বলিয়া তিনি মনে করেন। হীরা ছিল পূর্ব সিরিয়া অথবা নেস্টোরিয়ান খৃস্টানদের দূরবর্তী বসতি বা উপনিবেশ। ২৫ কেবল তাহাই নহে, মুইর ও মারগোলিয়থ যে অনুমান করিয়াছিলেন ওয়াটও সেই একই অনুমান পোষণ করিয়াছেন। তিনিও মনে করেন যে, নবুওয়াতের ধারণাও নাকি তিনি খৃষ্ট ধর্ম ও ইয়াহূদী ধর্ম হইতেই লাভ করিয়াছিলেন। ওয়াট লিখিয়াছেন, "আদ ও ছামূদ জাতির পয়গাম্বর ছিলেন হৃদ (আ) ও সালিহ (আ), এই ধারণাও সম্ভবত ইয়াহুদী-খৃস্টান ধারণার প্রয়োগের একটি কুরআন-পূর্ব যুগের উদাহরণ"। ২৬
"পরোক্ষ পারিপার্শ্বিক প্রভাব" সম্পর্কে লিখিবার পর ওয়াট "প্রত্যক্ষ" প্রভাবের প্রশ্ন উত্থাপন করিয়াছেন। তিনি বলেন, সেখানে "যথেষ্ট পরিমাণে অনেক ভাল প্রমাণ" রহিয়াছে যাহাতে দৃষ্ট হয় যে, মহানবী-এর "একজন একেশ্বরবাদী তথ্য সরবরাহকারী" ছিল। ২৭ এই "অনেক ভাল প্রমাণ" তিনি কুরআনের বাণী হইতেই দিতে চেষ্টা করিয়াছেন ১৬: ১০৩ আয়াত দ্বারা। বলা প্রয়োজন যে, মারগোলিয়থও এই একই উদ্ধৃতি উল্লেখ করিয়া বলিতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী -এর একজন তথ্য সরবরাহকারী ছিল। ২৮ উক্ত উদ্ধৃতি অবিশ্বাসিগণের অভিযোগকে যেরূপ মিথ্যা বলিয়াছে সেইরূপ ইহাও দেখাইয়াছে যে, যে ব্যক্তির প্রতি ইংগিত করা হইয়াছে সে ভিন্ন ভাষায় কথা বলিত এবং পবিত্র কুরআন স্পষ্টই আরবী ভাষায়। ২৯ ওয়াট অবশ্য মারগোলিয়থের উল্লেখ না করিয়া তাহার পরিবর্তে সি.সি. টোরির উক্ত আয়াতের অদ্ভুত ব্যাখ্যা গ্রহণ করিয়াছেন। ৩০ অতঃপর তিনি বলিয়াছেন, মহানবী -এর যে একজন মানব শিক্ষক ছিল তাহা নাকি তিনি অস্বীকার করেন নাই। তিনি নাকি কেবল জোর দিয়াছেন যে, তিনি নাকি আসমানী উৎস হইতে শিক্ষা লাভ করিয়াছেন। ৩১
"সময়ের সাথে সাথে বাইবেলের কাহিনী সম্পর্কে মহানবী -এর জ্ঞান বৃদ্ধি পাইতেছিল এবং সঠিক হইতেছিল"—এইরূপ ধারণা করিয়াছেন মারগোলিয়থ। মারগোলিয়থের সেই ধারণাকেই ওয়াট তাহার পূর্ববর্তী অনুমানের উপর ভিত্তি করিয়া নির্মাণ করিতে অগ্রসর হইলেন। ওয়াট কুরআন শরীফের মোট সাতটি বাক্যাংশ উল্লেখ করিয়াছেন যেইগুলি আমরা অচিরেই দেখিতে পাইব। সেখানে তিনি দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, "ক্রমান্বয়ে পুরাতন নিয়মের কাহিনীর সহিত তাঁহার পরিচিতি বৃদ্ধি পাইতেছিল, বিশেষ করিয়া আবরাহাম ও লোত সম্পর্কে”। ৩২ ওয়াট আরও যোগ করিয়াছেন, "এইরূপ আরও অনেক" উদাহরণ দেওয়া যায় যাহা ক্রমান্বয়ে সঠিক হইতেছিল। কিন্তু তিনি উদাহরণগুলি দেন নাই। তিনি আবার বলিয়াছেন যে, এই সকল কারণে "পাশ্চাত্যের সমালোচকদের" পক্ষে এই সিদ্ধান্তে উপনীত না হওয়া কঠিন ছিল যে, নবীর "এই সকল কাহিনী সম্পর্কিত জ্ঞান বৃদ্ধি পাইতেছিল এবং তিনি কোন একজন অথবা একাধিক ব্যক্তির নিকট হইতে তথ্য লাভ করিতেছিলেন যিনি বা যাহারা এই বিষয়ে পরিচিত ছিলেন”। ৩৩ এই সম্পর্কে ওয়াট কুরআনের ১১৪ ৫১ আয়াতের বরাত দিয়াছেন যেখানে বলা হইয়াছে যে, নবী করীম ও তাঁহার জাতি ইতোপূর্বে নবীদের এই সকল কাহিনী সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না যাহা তাঁহার নিকট অবতীর্ণ করা হইয়াছিল। ওয়াট তখন বলেন, "যাহারা নবীর আন্তরিকতায় বিশ্বাসী তাহাদের জন্য এই আয়াত বিব্রতকর"। ইহার সমাধান এই যে, ইহার অন্তর্গত শব্দ নূহী (আমরা প্রত্যাদেশ করি)-এর ব্যাখ্যা হিসাবে ধরিয়া লওয়া হয় যে, কাহিনী ও শিক্ষার মধ্যে কোন পার্থক্য নাই এবং তাহার প্রকৃত অর্থ "ইহার মধ্যে যে শিক্ষণীয় বিষয় রহিয়াছে তাহা বুঝাইয়া দেই" ইত্যাদি। ৩৪
ওয়াট তাহার পরবর্তী সর্বশেষ রচনায় সেই একই মনোভাব পোষণ করিয়া কুরআনের ২৫: ৪ আয়াত উল্লেখ করিয়া বলেন যে, সম্ভবত মুহাম্মাদ -এর একাধিক তথ্য সরবরাহকারী ছিল এবং কুরআনও "অস্বীকার করে না যে, তিনি এই প্রকারেই সংবাদ পাইতেন"। কিন্তু সেখানে কেবল বলা হইয়াছে যে, এইভাবে যে তথ্য তিনি লাভ করিতেন তাহা কুরআন নহে। "কারণ একজন বিদেশী স্পষ্ট ভাষায় আপন বক্তব্য ব্যক্ত করিতে সমর্থ নহে”। এইভাবে ওয়াট পুনরায় বলেন যে, "পয়গাম্বর যে তথ্য কোন্ তথ্য সরবরাহকারীর নিকট হইতে লাভ করিতেন তাহা নিছক সত্য তথ্যভিত্তিক জ্ঞান", কিন্তু ইহার অর্থ ও ব্যাখ্যা তাঁহার নিকট আসিত "স্বাভাবিক প্রত্যাদেশ হিসাবে"। ৩৫
এমনিভাবে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃষ্ট ধর্ম হইতে ধার করার বিষয় লইয়া ওয়াট যখন পুনরায় পর্যালোচনা করেন এবং মারগোলিয়থের অনুমান পুনরাবৃত্তি করেন যে, মহানবী তাঁহাদের এই দুই ধর্ম সম্পর্কে কিছু বিকৃত ও ভুল তথ্য লাভ করিয়াছিলেন যাহা পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হইয়াছে। মুইরের "গোঁড়া সম্প্রদায়ের" ও সিরিয়ান চার্চ-এর বিরুদ্ধে বক্রোক্তিকে পরিহার করিয়া ওয়াট বলেন যে, "খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের যে বিশেষ সম্প্রদায় আরবদিগকে প্রভাবিত করিয়াছিল তাহাদের নানা প্রকার অদ্ভুত ধারণা ছিল"। ওয়াট গুরুত্ব সহকারে ওই সকল অদ্ভুত ধারণার উদাহরণ হিসাবে বলেন যে, সেগুলি কুরআনের কথা যেখানে বলা হইয়াছে, "ত্রিত্ববাদ হইতেছে পিতা, পুত্র ও মেরি"। ওয়াটের মতে এই সকল কথা সন্দেহাতীতভাবে নামমাত্র খৃস্টান আরবদের সমালোচনা। তাহারাই এইরূপ ধারণা পোষণ করিত। ওয়াট আরও বলেন যে, ইয়াহুদীদের দিকেরও "অনেক বিস্তারিত বিবরণ” কুরআনে সন্নিবেশিত করা হইয়াছে যাহা "পবিত্র গ্রন্থ" হইতে আসে নাই, বরং "বিভিন্ন দ্বিতীয় পর্যায়ের সূত্র হইতে আসিয়াছে"। ৩৬
একই কথা তিনি তাহার সর্বশেষ গ্রন্থে পুনরাবৃত্তি করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, "মক্কার কিছু লোক অজ্ঞতাবশত ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিশ্বাস সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করিত"। যেমন "খৃস্টানরা যীশু ও মেরিকে দুই ঈশ্বর মনে করে তাহা ছাড়াও একজন ঈশ্বর আছেন এবং ইয়াহুদীরা মনে করে 'উযায়র (এযরা) ঈশ্বরের পুত্র”"। ৩৭
ওয়াট বলেন যে, কুরআনের এই বক্তব্য "সম্ভবত ভুল”, “এইগুলি মক্কাবাসীর বিশ্বাস" এবং তাহার মতে, "ঈশ্বরের জন্য ইহা আবশ্যক নহে যে, তিনি এই সকল ভুল ধারণা সংশোধন করিয়া দিবেন"। কারণ ঈশ্বর প্রধানত আরবদিগকেই "তাহাদের বর্তমান বিশ্বাসের প্রেক্ষিতে সম্বোধন করিতেছেন" এবং কুরআনের বাণী এই সকল বিশ্বাস সংশোধন না করিয়াই প্রচার করা যায়। ৩৮ একই অনুমানকে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করিতে গিয়া ওয়াট বলেন, "কুরআন সর্বপ্রথম আরবদিগকেই সম্বোধন করে তাহাদের যে জগত সেই জগতের প্রেক্ষিতে", এমনকি সেই ক্ষেত্রে "যদি ভুলও হয়”। এই বক্তব্যের পক্ষে তিনি পৃথিবী যে সমতল এইরূপ তৎকালীন ধারণার উল্লেখ করিয়াছেন এবং কুরআন শরীফ হইতে প্রায় সাতটি আয়াত উদ্ধৃত করিয়া দেখাইতে চাহিয়াছেন যে, কুরআনে সেই ভুল তথ্যই দেওয়া হইয়াছে। ৩৯
পুনরায় মুইর ও মারগোলিয়থ, বিশেষ করিয়া মারগোলিয়থের মতই ওয়াট বলেন যে, মুহাম্মাদ তাঁহার দেশ ও জাতির অসন্তোষজনক সামাজিক অবস্থা দেখিয়া বুঝিতে পারিলেন যে, সংস্কার প্রয়োজন এবং চিন্তা করিলেন যে, ইহা ধর্ম ও প্রত্যাদেশের মাধ্যমেই সম্ভবপর। ওয়াট সেই কথা এরূপভাবে দিয়াছেন, মুহাম্মাদ "হয়তো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন যে, এই অসন্তোষজনক অবস্থা হইতে মুক্তি পাইতে হইলে কোন এক প্রকারের ধর্মীয় বিশ্বাসের দ্বারাই সম্ভব”। ৪০ আবার মারগোলিয়থের সঙ্গে সুর মিলাইয়া চমৎকারভাবে ওয়াট আরও অনুমান করেন, অবশ্য অতি সাবধানতার সহিত মুহাম্মাদ একটি নূতন একেশ্বরবাদী ধর্মের সূচনা করিলেন যাহাতে কোন প্রকার রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা না থাকে, সে কারণে ইয়াহুদী ধর্ম বা খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করিলেন না। কারণ "বায়যান্টাইন ও আবিসিনিয়া সাম্রাজ্যের সহিত খৃষ্ট ধর্ম জড়িত ছিল এবং পারস্য সাম্রাজ্যের প্রতি ইয়াহুদী ধর্মের সমর্থন ছিল। ৪১ প্রকৃতপক্ষে ওয়াট তাহার আলোচনার উপসংহার বেলের মন্তব্য গ্রহণ করিয়াই টানিয়াছেন, সেখানে বলিয়াছেন, "মুহাম্মাদের জীবনী অধ্যয়ন করিতে হইলে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের পারস্পরিক সম্পর্ক চিত্রায়িত করার খুব কমই প্রয়োজন। কারণ তিনি স্বীকার করিয়াছেন, "খুটিনাটি অনেক বিষয় বিতর্কিত"। তিনি অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলেন, "ইহা অনুধাবন করাই প্রকৃত প্রয়োজন যে, মুহাম্মাদের নিকট কুরআন আগমনের পূর্বেই তেমন বিষয় সেখানকার বাতাসে বিদ্যমান ছিল এবং উদ্দেশ্য হাসিলের উহাই ছিল তাঁহার নিজের ও পরিবেশের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের অংশ"।
পাশ্চাত্যের এই পণ্ডিতবর্গ প্রায় সকলেই একই প্রকার যুক্তি ও একই প্রকার মতামত উপস্থাপন করিয়াছেন। তাহাদের এই সকল যুক্তি ও মতামত প্রধানত নিম্নলিখিত পাঁচটি অনুমান বা ধারণাকে কেন্দ্র করিয়া বিবর্তিত হইয়াছে:
১. ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্মের অবস্থাগত বা পরিবেশগত প্রভাব।
২. কোন কোন খৃস্টান ব্যক্তির সহিত হযরত মুহাম্মাদ-এর যোগাযোগ ছিল বলিয়া অভিযোগ।
৩. সেই খৃস্টান ব্যক্তির / ব্যক্তিবর্গের তথ্যকে তথাকথিত কুরআনের সাক্ষ্য বলিয়া ধরিয়া লওয়া।
৪. ধরিয়া লওয়া যে, বাইবেলের কাহিনী নাকি সময়ের সাথে সাথে ক্রমান্বয়ে কুরআনে সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
৫. অভিযোগ করা যে, সেকালের ভুলগুলি কুরআনে ভুল হিসাবেই উদ্ধৃত।
নিম্নে প্রথম চারটি বিষয়ে আলোচনা করা হইবে এবং পঞ্চম বিষয়টি লইয়া পরবর্তী অধ্যায়ে আলোচনা করা হইবে।
📄 দুই: সাধারণভাবে পরিবেশগত প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা
ইহা সর্বজন স্বীকৃত সত্য যে, আরবদেশে কিছু সংখ্যক ইয়াহুদী ও খৃস্টান বসবাস করিত। ইয়াহুদীগণ প্রধানত মদীনায় এবং খৃস্টানগণ নাজরানে থাকিত। যতদূর জানা যায়, মহানবী -এর জন্মভূমি মক্কা এবং তাঁহার কর্মজীবনের অবস্থা যেখানে সেখানে মুষ্টিমেয় কয়েকজন খৃস্টান বসবাস করিত এবং তাহাদের অবস্থা সামাজিক ও বিদ্যাবুদ্ধির দিক হইতে অতিশয় নিম্নমানের ছিল। কারণ তাহারা ছিল ক্রীতদাস অথবা সামান্য ফেরিওয়ালা এবং অধিকাংশই ছিল প্রবাসী। দুই-একজন ছিলেন মক্কার আদিবাসী, যেমন উছমান ইদুল হুওয়ায়রিছ ও ওয়ারাকা ইব্ন নাওফাল। প্রথমজন ব্যক্তিগত অথবা রাজনৈতিক কারণে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং নাওফাল উন্নততর ধর্মবিশ্বাস অন্বেষণ করিতে গিয়া খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন। তদুপরি মক্কাবাসীরা খৃস্টান অধ্যুষিত সিরিয়া ও আবিসিনিয়ার সহিত বাণিজ্য করিত। অতএব ইহা সহজেই বোধগম্য যে, মুহাম্মাদ-সহ মক্কার ওয়াকিফহাল মহল ধর্ম হিসাবে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্ম সম্পর্কে কিছু অবশ্যই জানিত। তাহারা ইহাও জানিত যে, উভয় ধর্মেই বিশ্বাসের দিক হইতে কিছু মিল রহিয়াছে, তাহাদের পূজারীরা যে সকল পূজা ও আচার-অনুষ্ঠান করিত তাহাও কিছুটা জানিত। ইহাও সত্য যে, আমাদের এই তিন পণ্ডিত মুইর, মারগোলিয়থ ও ওয়াট একটি বিষয়ে একমত যে, মুহাম্মাদ-এর ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃষ্ট ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান খুব বেশি হইলেও তাহা ছিল গৌণ, 'ভাসাভাসা' ও ভ্রান্তিপূর্ণ। মারগোলিয়থ আরও বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ যে কারণে এই দুই ধর্মের কোন একটিও গ্রহণ করেন নাই তাহা এই যে, তিনি অনুধাবন করিতে পারিয়াছিলেন যে, এই সকল ধর্ম সম্পর্কে তাঁহার যে জ্ঞান আছে বলিয়া তিনি ভান করিবেন তাহা অপেক্ষা ওই সকল ধর্মের পুরাতন অনুসারীরা অনেক বেশি জ্ঞাত। অবস্থা যখন এমনই হয় যাহা প্রাচ্যবিশারদগণ মনে করেন যে, মুহাম্মাদ-এর জ্ঞানের পরিধি এই পর্যন্ত ছিল, তাহা হইলে সাধারণ পাঠক প্রশ্ন তুলিতে পারেন, ইহা কি ধরিয়া লওয়া বা অনুমান করা যুক্তিসংগত যে, মুহাম্মাদ-এর মত বুদ্ধিমান ও সাধারণ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ সর্বজনস্বীকৃত একটি নূতন ধর্ম প্রচারে অগ্রসর হইবেন এবং ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্মের মত দুইটি প্রতিষ্ঠিত ধর্ম সম্পর্কে কেবল সেই শোনা কথা ও ভাসাভাসা জ্ঞান লইয়া সেই ধর্মের ভুল-ত্রুটি দেখাইতে অগ্রসর হইবেন?
প্রাচ্যবিশারদগণ যদিও মুহাম্মাদ যে ভূমিকা পালন করিয়াছিলেন সেজন্য তাঁহার উচ্চাভিলাষ ও প্রস্তুতি ছিল এই কথা প্রমাণ করিবার জন্য চেষ্টার ত্রুটি করেন নাই, অথচ নিজেদেরকে সেই প্রশ্ন করেন নাই। প্রাচ্যবিশারদগণের সহজাত দুর্বলতা ও স্ববিরোধিতা এই স্থানে চোখে পড়ে যে, তাহারা একদিকে বলিতেছেন, মহানবী ছিলেন উচ্চাভিলাষী এবং সেই কারণে তিনি ইয়াহুদী ধর্ম বা খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণের ক্ষেত্রে রাজনীতিকে জড়ানোর ফলাফল সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন; অন্যদিকে তিনি এমনই উদাসীন ছিলেন যে, বাজারের গল্প ও মদের দোকানের ইয়াহূদী গল্প কথকের নিকট হইতে দ্রুত কাহিনী হইতে তথ্য সংগ্রহ করিয়া একটি নূতন ধর্ম প্রতিষ্ঠা ও প্রচারে অগ্রসর হইয়াছিলেন।
প্রকৃত তথ্য এই যে, যেমন অর্বাচীনের বক্তব্যের মত এই কথা বলা যে, ইসলাম হইতেছে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্ম সম্পর্কিত গৌণ তথ্যের সহিত কিছু আরব উপাদান সংমিশ্রণজাত ধর্ম। অনুরূপ অবাস্তব বক্তব্য হইতেছে তাহাদের অনুমান যে, মহানবী ওই দুইটি ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন না। এই বিষয়ে কোনই সন্দেহ নাই যে, ইসলাম-পূর্ব যুগে নবুওয়াত, ওহী এবং আল্লাহ সম্পর্কিত ধারণা আরবদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এই সকল ধারণার অস্তিত্ব থাকার অর্থ এই নহে যে, সেই ধারণা খৃস্টধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্ম হইতেই আসিয়াছিল, যদিও নিঃসন্দেহে তাহাদের মধ্যে উহা বিদ্যমান ছিল। প্রত্যাদেশ প্রাপ্তি বা রিসালাত সম্পর্কীয় ধারণা অবিসংবাদিতভাবে ইয়াহুদী-পূর্বকালীন ও খৃস্ট-পূর্বকালীন। ইবরাহীম ('আ) নবী ছিলেন, তিনি কা'বাঘর প্রতিষ্ঠা করিয়াছিলেন। ইবরাহীম ('আ)-এর সময় হইতে কা'বাঘরকে কেন্দ্র করিয়া হজ্জ পালন আরবদের চিরকালের আপন বিষয় বলিয়া তাহারা সেইগুলি ধরিয়া রাখিয়াছিল। তদুপরি খৃস্টান ও ইয়াহুদী প্রভাব ব্যতিরেকেই আরবদের নিকট আল্লাহ যে একমাত্র মহাপ্রভু এই ধারণা পরিচিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে এই ধারণাগুলি ইবরাহীম ('আ)-এর শিক্ষারই অবশিষ্টাংশ এবং ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্ম আগমনের পূর্বেই সমগ্র আরবভূমিতে ছড়াইয়া ছিল, তেমনি এক আল্লাহ্ পূজারী হানীফ-এর ধারণাও যাহার উল্লেখ পবিত্র কুরআনেও আছে। ৪৩ অবশ্য প্রাচ্যবিশারদগণ স্বীকার করেন যে, ইসলাম-পূর্ব কালে আরববাসিগণের মধ্যে আল্লাহ্র ধারণা বিদ্যমান ছিল। সবশেষে ওয়াট এই বিষয়ে বিশেষ মনোযোগী হইয়াছেন। ৪৪ কিন্তু তিনি কুরআন শরীফের কয়েকটি অতি পরিচিত আয়াত, যেখানে ইসলাম-পূর্ব যুগের আরবদের মধ্যে আল্লাহ সম্পর্কে এইরূপ ধারণা বিদ্যমান ছিল বলিয়া দেখানো হইয়াছে তাহা উল্লেখ করিতে গিয়া টেক্সিডোরের উৎকীর্ণ লিপি অধ্যয়নের উল্লেখ করিয়াছেন যেখানে গ্রীক-রোমান সময়ে নিকট-প্রাচ্যে মহামহিম এক সর্বোচ্চ আল্লাহ্ ধারণা বিদ্যমান ছিল তাহা দেখাইয়াছেন। ৪৫ এবং এইভাবে তিনি চেষ্টা করিয়াছেন যে, মহানবী তৎকালে বিদ্যমান ধারণা হইতে প্রভাবান্বিত হইয়াছিলেন, তখন তিনি অতি সাবধানতার সহিত ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃষ্ট ধর্মে "মহামহিম এক সর্বোচ্চ আল্লাহ্র" প্রভাবের বিষয় পরিহার করিয়া গিয়াছেন। তিনি ইহাও ব্যাখ্যা করেন নাই যে, কি প্রকারে এই বিশেষ প্রকৃতির ধারণার উৎপত্তি হইয়াছিল এবং তাহা বহু-ঈশ্বরবাদী আরবদের মধ্যে বিদ্যমান ছিল। তিনি অবশ্য ধারণা দিতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, এই পুরাতন ধর্ম বা পৌত্তলিকতা (প্যাগানিজম) তখন ধ্বংসোন্মুখ ছিল। কারণ তাহার মতে, দেব-দেবীর যে কোন শক্তি নাই সেই বিষয়ে তাহাদের মধ্যে ক্রমাগত ধারণা জন্মলাভ করিতেছিল। ৪৬ সেইসঙ্গে অন্যান্যদের অনুসরণ করিয়া তিনি "আল্লাহ" শব্দের উপাদান সম্পর্কে ব্যাখ্যা প্রদান করিতে চেষ্টা করিয়াছেন। ৪৭ তথাপি না তাহার এই ব্যাখ্যা, না সেই অনুমিত প্যাগানিজমের অবক্ষয়, কোন প্রকারেই "সুমহান প্রভু” আল্লাহ্র ধারণার উৎপত্তির কোন ব্যাখ্যা দিতে পারে নাই।
একত্ববাদের ধারণা সম্পর্কে পবিত্র কুরআন তথা মহানবী সমকালীন আরব, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছেন যে, তাহারা সকলেই মৌলিক একত্ববাদ হইতে বিচ্যুত হইয়াছে, সকলেই তাহাদের নবীর মূল শিক্ষা হইতে সরিয়া গিয়াছে এবং বিকৃত হইয়া বহু-ঈশ্বরবাদে পরিণত হইয়াছে। সেই ক্ষেত্রে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের নিকট হইতে একত্ববাদের ধারণা গ্রহণ করার কোন প্রশ্নই ওঠে না। কারণ তাহারা নিজেরাই নিজেদের পবিত্র গ্রন্থ একত্ববাদের যে শিক্ষা দিয়াছে সেই শিক্ষাকে বিতর্কিত করিয়া ফেলিয়াছে এবং সন্দেহাতীতভাবে প্রকৃত একত্ববাদকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে।
প্রকৃতপক্ষে কুরআন শরীফের প্রতি যদি হালকাভাবেও দৃষ্টি সঞ্চালন করা যায় তাহা হইলে দুইটি সত্য ধরা পড়ে। প্রথমত, কুরআন কোথাও কোন মৌলিকত্বের দাবি করে না ও বলে না যে, উহা এক নূতন ধর্ম প্রবর্তন করিয়াছে। ইহার একমাত্র দাবি যে, আল্লাহ যুগে যুগে দেশে দেশে বিভিন্ন জাতির নবীগণকে যে বাণী দিয়াছেন ইহা সেই একই বাণীকে কেবল পুনর্জীবিত করিয়াছে। এবং উহাকেই সংরক্ষণ করিয়াছে। এখানেই কুরআনের বৈশিষ্ট্য ও মৌলিকত্ব। আরও সঠিকভাবে বলিলে বলিতে হয়, কুরআন সেই একই শিক্ষা দিতেছে যাহা ইবরাহীম (আবরাহাম), মূসা ও ঈসা ('আ)-এর মাধ্যমে দেওয়া হইয়াছিল। তাঁহাদের সকলের সম্পর্কে কুরআন অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে বক্তব্য উচ্চারণ করিয়াছে। দ্বিতীয়ত, কুরআন সমকালীন আরব, ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মধ্যে প্রচলিত সকল প্রকার বহু-ঈশ্বরবাদী আচার-আচরণ ও বিশ্বাসকে দ্বিধাহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে। কুরআনের এই দ্বিমাত্রিক বক্তব্য প্রাচ্যবিশারদগণ যাহা বলিতে চাহিতেছেন তাহার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাহারা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলিয়া থাকেন যে, তাহাদের পবিত্র গ্রন্থ সম্পর্কে সরাসরি মুহাম্মাদ-এর ধারণা ছিল না। কারণ তিনি উহা নিজেও পাঠ করেন নাই এবং তখন আরবী ভাষায় উহা অনূদিতও হয় নাই।
অপরপক্ষে পবিত্র কুরআন এবং একই প্রসঙ্গে মহানবী নিজে বারংবার অত্যন্ত জোরের সঙ্গে বলিয়াছেন যে, মূলত তাঁহাদের শিক্ষা এবং ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের মূল গ্রন্থের শিক্ষা এক ও অভিন্ন। দ্বিতীয়ত, প্রাচ্যবিশারদগণ বলেন যে, মুহাম্মাদ সমকালীন যে সকল ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সহিত মিলিত হইয়াছিলেন তাহাদের নিকট হইতেই জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। কুরআন এবং মুহাম্মাদ বলেন যে, সমকালীন ইয়াহুদী ও খৃস্টানগণ বিভ্রান্ত ও ভুল ছিল এবং তাহারা তাহাদের নিজেদের পবিত্র কিতাব হইতে দূরে সরিয়া গিয়াছিল, বিশেষ করিয়া একত্ববাদ বিষয়ে তাহারা মোটেই সঠিক পথে ছিল না।
এমতাবস্থায় যে কোন বিচার-বুদ্ধিসম্পন্ন ও নিরপেক্ষ ব্যক্তি এই পরিস্থিতি বিবেচনা করিয়া অবশ্যই বলিবেন যে, মুহাম্মাদ যেখান-সেখান হইতে শোনা কথার ভিত্তিতে আপন বক্তব্য নির্মাণ করেন নাই। তাহা হইলে তিনি মৌলিকতার ভান করিতেন, পূর্ববর্তী গ্রন্থে আপন উপদেশসমূহ অন্বেষণ করিতেন না অথবা এমন শ্রোতা বাছিয়া লইতেন যাহারা তাঁহার তথ্যের সূত্র খুঁজিয়া বাহির করিতে সক্ষম হইত না। দ্বিতীয়ত, তিনি তাঁহার কোন সমকালীন ব্যক্তির নিকট হইতে কোন তথ্য সংগ্রহ করেন নাই। কারণ তিনি স্পষ্টতই তাহাদের মধ্যে ত্রুটি দেখিতে পাইয়াছিলেন, তাহাদিগকে সংশোধন করিতে চাহিয়াছিলেন, তাহাদিগকে সঠিক পথে ফিরাইয়া আনিবার জন্য সচেষ্ট হইয়াছিলেন এবং তাহাদিগকে পূর্ববর্তী নবী-রাসূলগণের প্রদর্শিত পথে ফিরাইয়া আনিতে চেষ্টা করিয়াছিলেন। তৃতীয়ত, যখন তিনি বলিয়াছেন যে, তাঁহার বক্তব্য ও শিক্ষা এবং তাঁহার পূর্ববর্তী কিতাবের বক্তব্য ও শিক্ষা একই, সেই সাথে তিনি একথাও বলিয়াছেন যে, তিনি সেই কিতাবগুলি পাঠ করেন নাই এবং এই ব্যাপারে প্রাচ্যবিদগণও একমত, সেই ক্ষেত্রে তাঁহার জ্ঞানের উৎস উহা নিজেই পাঠ করা অথবা অন্যের মাধ্যমে সমকালীন কাহারও নিকট হইতে প্রাপ্ত হইতে পারে না, বরং ইহার উৎস নিশ্চয়ই ভিন্নতর কোথাও রহিয়াছে।
কয়েকজন প্রাচ্যবিশারদ, বিশেষ করিয়া ওয়াট অবশ্য ধারণা করেন যে, কোন তৃতীয় পক্ষের সম্ভাবনা থাকিতে পারে এবং উহা কোন একত্ববাদী তথ্য সরবরাহকারী অথবা মহানবীর কোন তথ্য সরবরাহকারী। এই অনুমান সমস্যা সমাধান অপেক্ষা অনেক বেশি প্রশ্ন উত্থাপন করে। বর্তমানে তিনি যে কুরআন ভিত্তিক প্রমাণ খাড়া করিয়াছেন তাহা পর্যালোচনা করা যাইতে পারে।
📄 তিন: ইয়াহুদী-খৃস্টান বিশেষজ্ঞদের সংস্পর্শে আসার তথাকথিত অভিযোগের উদাহরণ
হযরত মুহাম্মাদ দুইবার সিরিয়া গিয়াছিলেন। একবার তাঁহার বার বৎসর বয়সে তাঁহার চাচার সঙ্গে এবং পুনরায় পঁচিশ বৎসর বয়সে খাদীজা (রা)-র বাণিজ্য বহরের নেতা হিসাবে। প্রাচ্যবিশারদগণ হযরত মুহাম্মাদ-এর সর্বজনবিদিত এই দুই ভ্রমণ সম্পর্কে গুরুত্ব আরোপ করেন। বলা হইয়া থাকে যে, এই দুইবার ভ্রমণকালে প্রথমবার বাহীরা নামক একজন খৃস্টান পাদ্রী এবং দ্বিতীয়বার একজন নেস্তোরিয়ান খৃস্টান সন্ন্যাসীর সঙ্গে তাঁহার সাক্ষাত হইয়াছিল। ইতোপূর্বে বলা হইয়াছে যে, এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া যথেষ্ট সন্দেহ এবং সম্ভাবনাহীনতা রহিয়াছে।
বিশেষ করিয়া মুইর-সহ অনেক প্রাচ্যবিশারদ এই ঘটনাকে তুচ্ছ হিসাবে বাতিল করিয়া দিয়াছেন। যাহা হউক, তিনি অনুমান করিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ 'যখনই চলার পথে কোন খৃস্টান পাদ্রী বা সন্ন্যাসীর সহিত বাক্যালাপের বা যোগাযোগের সুযোগ পাইতেন তিনি সেই সুযোগ ত্যাগ করিতেন না'। মারগোলিয়থ সেই একই অনুমানকে আরও বাড়াইয়া বলিয়াছেন এবং মুইর সম্ভবত সিরিয়ায় বাণিজ্য তাহার সহিত ঐকমত্য পোষণ করিয়া বলিয়াছেন, 'মুহাম্মাদ সফরকালে খৃষ্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করিয়াছিলেন'। ৫০ ইহাতে কোনও সন্দেহ নাই যে, তিনি যে বাণিজ্য সফরে গিয়াছিলেন উহা খৃস্টানদের দেশেই বাণিজ্য সফর ছিল। সেই দেশের অধিকাংশ অথবা সকল অধিবাসী ছিল খৃষ্টান। সেখানে খৃস্টানদের সঙ্গে যোগাযোগ হইবেই, সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই। কিন্তু মহানবী বাণিজ্য করিতে গিয়া কোন খৃস্টান ব্যক্তি অথবা কোন খৃস্টান পাদ্রীর নিকট হইতে খৃস্ট ধর্ম সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহের সুযোগ গ্রহণ করিতেন এমন কোন তথ্য-প্রমাণ উৎসগ্রন্থসমূহে নাই এবং দলীল হিসাবে উপস্থাপনও করা হয় নাই-ইহা লক্ষণীয়। এমনকি বাহীরা ও নেস্তোরিয়াসের সহিত সাক্ষাতের যে সন্দেহজনক বিবরণের উল্লেখ করা হয় সেখানেও দেখা যায় যে, তাহারাই অর্থাৎ বাহীরা ও নেস্তোরিয়াস তাঁহার সম্পর্কে জানিতে চাহিয়াছিলেন এবং তাঁহার সম্পর্কে মতামত দিয়াছিলেন। মহানবী নিজে কিছুই করেন নাই।
তদুপরি বাহীরার সহিত মহানবী -এর যে সাক্ষাতের উল্লেখ করা হইয়াছে সেই ক্ষেত্রে মহানবী -এর সহিত তাহার কোন প্রকার গভীর জ্ঞানগর্ভ আলোচনার প্রশ্নই উঠিতে পারে না। কারণ তখন বালক মহানবীর বয়স মাত্র বার বৎসর। তাহাছাড়া তিনি যে প্রকার বাণিজ্যকর্ম উপলক্ষে সেখানে গমন করিয়াছিলেন তখন তাহার এইরূপ কোন অবসর পাওয়ার কথা নয় যখন তিনি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী ঐরূপ শিক্ষণীয় বিষয় লইয়া নিয়োজিত হইবেন। তিনি যদি সত্যই ঐরূপ শিক্ষণীয় বিষয় লইয়া ব্যাপৃত হইতেন তাহা হইলে উহা অবশ্য তাঁহার সহিত আগত বহু সংখ্যক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির দৃষ্টি আকর্ষণ করিত। দুইবারই তাহারা তাঁহার সঙ্গে বাণিজ্যে আসিয়াছিলেন এবং তাহাদের অনেকেই পরবর্তী কালে তাঁহার বিরোধিতা করিয়াছেন। তথাপি আমরা পবিত্র কুরআনে দেখিতে পাই যে, অবিশ্বাসী কুরায়শ নেতৃবৃন্দ তাঁহার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ উত্থাপন করে যে, তিনি নাকি কেবল একজন বিদেশীর নিকট হইতে পরামর্শ গ্রহণ করিতেন যে মক্কায় অবস্থান করিত এবং আরও অভিযোগ করা হইয়াছে যে, সম্ভবত মক্কায় বসবাসরত একদল লোক তাঁহার ওহী রচনা করিয়া দিত এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁহাকে পাঠ করিয়া শুনাইত। মুহাম্মাদ যদি তাঁহার সিরিয়ায় বাণিজ্য সফরকালে কোন খৃস্টান পাদ্রীর সহিত অথবা সাধারণ কোন খৃস্টানের সহিত তথ্য সংগ্রহের জন্য অথবা নিছক আলোচনার জন্য যোগাযোগ করিতেন তাহা হইলে তাঁহার সহিত যাহারা সিরিয়ায় গমন করিয়াছিল সেই সকল বিরোধী কুরায়শগণ ইহাকে তাঁহার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করিতে কাজে না লাগাইয়া ছাড়িত না। তাহারা যে অনুরূপ কোন অভিযোগ তাঁহার বিরুদ্ধে আনে নাই ইহাই সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ যে, সিরিয়া গমনকালে কাহারও নিকট হইতে তিনি খৃষ্ট ধর্ম ও ইয়াহুদী ধর্ম বিষয়ে কোন প্রকার তথ্য গ্রহণ করেন নাই।
দ্বিতীয়ত, তথাকথিত উদাহরণ, কুস ইব্ন সাইদা সংক্রান্ত হাদীছ বর্ণনা, মুইর যাহা বিশেষ করিয়া উল্লেখ করিয়াছেন এবং মারগোলিয়থ পরোক্ষভাবে ইংগিত করিয়াছেন: উক্ত বর্ণনায় বলা হইয়াছে যে, মহানবী শুনিয়াছিলেন, কুস নাকি উকায মেলায় প্রচার কাজ করিয়াছিলেন। ৫১ এই বর্ণনাটি সর্বজনসম্মতভাবে স্বীকৃত যে, উহা বাতিল ও মিথ্যা বর্ণনা। ৫২ বিশেষ করিয়া এই বর্ণনার অন্যতম রাবী মুহাম্মাদ ইবনুল হাল্লাজ আল-লাখমী একজন ডাহা মিথ্যাবাদী (কাযযাব)।৫৩ এই বানোয়াট বর্ণনা সম্পর্কে যে কথা বলা হইয়াছে তাহা হইতে জানা যায় যে, মহানবী এই কথার প্রথম শ্রোতা এবং ইহার বক্তাকে সে সম্পর্কে তিনি কোন প্রশ্ন করেন নাই। প্রাচ্যবিশারদগণ এই প্রতিবেদনটি, ইহার দুর্বলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পর্কে যে সন্দেহ রহিয়াছে তাহা উল্লেখ না করিয়াই ব্যবহার করিয়াছেন। কোন অনুমানের সপক্ষে ইহাকে ব্যবহার করিতে হইলে ইহা কতটুকু ব্যবহারযোগ্য তাহা পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা না করিয়াই যে ইহা ব্যবহার করা হইয়াছে তাহার প্রতিই ইংগিত করে।
যায়দ ইবন হারিছার উদাহরণও অনুরূপ দুর্বল। এই উদাহরণটি মুইর বিশেষভাবে উল্লেখ করিয়াছেন। লক্ষণীয় বিষয় এই যে, মুইর অত্যন্ত চালাকির সঙ্গে যায়দ অথবা তাহার পিতা-মাতা যে খৃস্টান ছিলেন ইহা সরাসরি উল্লেখ করা পরিহার করিয়াছেন, কিন্তু পরোক্ষভাবে বিষয়টি উপস্থাপন করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, খৃস্ট ধর্ম যায়দের পূর্বপুরুষের মধ্যে প্রবেশ করিয়াছিল। অতঃপর তিনি বুঝাইতে গিয়া বলেন যে, যদিও যায়দকে যখন বিক্রয় করা হয় তখন তিনি বালক তবুও নাকি তিনি খৃস্ট ধর্ম বিষয়ে অনেক কিছুই মনে রাখিয়াছিলেন এবং তিনি নিশ্চয় তাঁহার পালক-পিতা মুহাম্মাদ -কে ঐ সকল তথ্য সরবরাহ করিয়াছিলেন। ইহা অপেক্ষা কষ্ট-কল্পনা আর কি হইতে পারে? বালক বয়সে হয়ত যায়দ খৃষ্ট ধর্ম সম্পর্কে সামান্য কিছু জ্ঞান লাভ করিয়া থাকিতে পারেন। কিন্তু বালক বয়সে লব্ধ সেই জ্ঞান পরবর্তী পচিশ বৎসর ধরিয়া স্মরণ রাখা যথেষ্ট কঠিন। তাহার পরও যদি কিছু স্মরণ থাকেও তথাপি সেই তথ্য ও জ্ঞান একজন গভীর অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তি, যিনি ভবিষ্যতে একজন সংস্কারক হইবেন, তাঁহার অতি সামান্যই কোন কাজে লাগিতে পারে। তদুপরি যায়দ যদি সত্যই খৃস্ট ধর্ম বিষয়ে মহানবী -এর শিক্ষক হইতেন এবং যায়দের নিকট হইতে প্রাপ্ত সেই শিক্ষার ভিত্তিতে মহানবী তাঁহার মতাদর্শ নির্মাণ করিতেন তাহা হইলে মহানবী -এর প্রতি যায়দের কোন প্রকার প্রকৃত শ্রদ্ধাবোধ থাকিত না, মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মুহাম্মাদ -কে একনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করিতেন না এবং কোনক্রমেই তাঁহার প্রতি প্রকৃত বিশ্বাস রাখিতে পারিতেন না।
উদাহরণ হিসাবে প্রাচ্যবিশারদগণ বিশেষ গুরুত্ব সহকারে ওয়ারাকা ইন্ন নাওফাল-এর উল্লেখ করেন। সন্দেহ নাই যে, সর্বপ্রথম ওহীপ্রাপ্তির পর খাদীজা (রা) মহানবী -কে ওয়ারাকার নিকট পরামর্শ গ্রহণের জন্য লইয়া যান। পূর্বেই বলা হইয়াছে যে, একদিকে এই ঘটনা হইতে জানা যায়, নবী বা রাসূলের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার আদৌ কোন অভিলাষ বা উচ্চাভিলাষ মহানবী -এর ছিল না। অন্যদিকে ওয়ারাকা মুহাম্মাদ -কে একজন আন্তরিক ও অকপট চিত্তের অধিকারী বলিয়াই জানিতেন। প্রকৃতপক্ষে ওয়ারাকার সহিত হযরত মুহাম্মাদ -এর ইতোপূর্বে খৃস্টধর্ম সম্পর্কে যদি আলোচনা হইত তাহা হইলে অবশ্যই উহার সম্পর্কে অভিমত ব্যক্ত করিতেন। কোন প্রকার তথ্যসূত্র হইতে এইরূপ কোন নিদর্শন পাওয়া যায় নাই যাহা হইতে অনুমিত হইতে পারে যে, ইতোপূর্বে তিনি কখনও কোন বিষয়ে ওয়ারাকার সহিত আলোচনা করিয়াছেন, যদিও বর্তমান প্রেক্ষিতে স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায় উভয়ে উভয়কে অতি নিকটজনের মাধ্যমেই জানিতেন। মহানবী -এর সিরিয়া গমন এবং সেখানে খৃষ্ট ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানলাভ বিষয়ে অভিযোগের ক্ষেত্রে যে যুক্তি পেশ করা হয়, বর্তমান ক্ষেত্রে সেই একই যুক্তি অধিকতর জোরালোভাবে উপস্থাপন করা হয়। মহানবী যদি ওয়ারাকার নিকট হইতে নিয়মিতভাবে খৃষ্ট ধর্ম বিষয়ে জ্ঞান লাভ করিতেন তাহা হইলে মক্কার কুরায়শগণ মহানবী -কে অধিকতর কঠোরভাবে সমালোচনা ও আক্রমণ করিবার সুযোগ পাইত।
📄 চার: একত্ববাদী এক বা একাধিক তথ্য সরবরাহকারী সম্পর্কিত পবিত্র কুরআনের তথাকথিত সাক্ষ্য
মক্কার পৌত্তিলিক নেতৃবৃন্দের অভিযোগ যে, মহানবী অন্যের নিকট হইতে পরামর্শ বা উপদেশ লাভ করিতেন। এই বিষয়ে কুরআনের যে বক্তব্য ইহা আমাদের বর্তমান আলোচ্য বিষয়। ইহা প্রধানত কাফিরদের সেই অভিযোগ যে বিষয়ে ওয়াট ও তাহার পূর্ববর্তীগণ তাহাদের অনুমানের ভিত্তি রচনা করিয়াছেন যে, রাসূল মুহাম্মাদের এক বা একাধিক সংবাদদাতা ছিল যাহারা তাঁহাকে একত্ববাদ সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করিত। এই কাজ করিতে গিয়া ওয়াট অথবা সি.সি.টোরি কুরআনের বক্তব্যের মারাত্মকভাবে ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছেন। ইহা কি প্রকারে করা হইয়াছে তাহা দেখিবার জন্য আমাদের প্রয়োজন-ওয়াট তাহার অনুমানের সমর্থনে কুরআন শরীফের যে দুইটি আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন সেই দুইটি আয়াতের মূল আরবীসহ ওয়াটকৃত অনুবাদ নিম্নে দেওয়া হইল :
وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ إِنَّمَا يُعَلِّمُ بِشَرٌ لِسَانُ الَّذِي يُلْحِدُوْنَ إِلَيْهِ أَعْجَمِيٌّ وَهُذَا لِسَانُ عَرَبِيُّ مُّبِينٌ . (نحل : ١٦: ١٠٣)
"We know they say, It is only a person teaches him. The tongue of the one they hint at is foreign, but this (the Quran) is (in) a clear Arabic tongue" (Muhammad's Mecca, 45).
"আমি তো জানি, তাহারা বলে, ইহা ত এক ব্যক্তি তাহাকে শিক্ষা দেয়। তাহারা যাহার প্রতি ইহা আরোপ করে তাহার ভাষা বিদেশী, কিন্তু ইহা (কুরআন) তো স্পষ্ট আরবী ভাষা" (১৬: ১০৩)।
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هذا الا افْكُ افْتَرَهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمٌ أَخَرُونَ ، فَقَدْ جَاءُوْ ظُلْمًا وَزُورًا ، وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلَيْنَ اكْتَتَبَهَا فَهى تُمْلَى عَلَيْهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً .
"The unbelievers say: This is only a folsehood he invented; other people helped him with it... They said, Old-World fables, he has had written down; they are dictated to him morning and evening".
"অবিশ্বাসীরা বলে, ইহা তো একটি মিথ্যা মাত্র, সে উহা উদ্ভাবন করিয়াছে। অন্য লোকজন ইহাতে সাহায্য করিয়াছে; এইরূপে উহারা অবশ্যই যুলুম ও মিথ্যায় উপনীত হইয়াছে। তাহারা বলিল, প্রাচীন বিশ্বপৌরাণিক কাহিনী, যে উহা লিখাইয়া লইয়াছে; এইগুলি সকাল-বিকাল তাহার নিকট পাঠ করা হয়") ২৫:৪-৫)।
টোরি-কে ৫৪ অনুসরণ করিয়া ওয়াট এই দুইটি বক্তব্য, বিশেষ করিয়া প্রথম বক্তব্য এইভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন যে, 'মুহাম্মাদ অস্বীকার করেন না যে, তাহার এক মানব শিক্ষক ছিল কিন্তু কেবল দাবি করেন যে, উহা আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল'। ৫৫ ওয়াট তাহার সর্বশেষ গ্রন্থে সেই বক্তব্যকে বিশদ ব্যাখ্যা করিতে গিয়া বলেন, "কুরআন অস্বীকার করে না যে, মুহাম্মাদ এইভাবে তথ্য লাভ করিতেন" কিন্তু কেবল "দাবি করেন যে, তিনি যে সকল তথ্য লাভ করিতেন সেইগুলিই কুরআন নহে, কারণ একজন বিদেশী স্পষ্ট আরবী ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করিতে পারে না"। অতএব সংবাদ সরবরাহকারী যে সকল তথ্য সরবরাহ করিত তাহা "সত্য ঘটনা সম্পর্কিত জ্ঞান", অথচ "সত্য ঘটনার অর্থ ও ব্যাখ্যা তাহার নিকট আগমন করে স্বাভাবিক প্রত্যাদেশ যে প্রকারে আসে সেই প্রকারে"। ৫৬ ওয়াটের এবং টোরীর এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভুল।
ওয়াটের পক্ষ হইতে ইহা ছিল এমন একটি প্রচেষ্টা যাহাতে এই পাঠে, বিশেষ করিয়া প্রথম অনুচ্ছেদে ওহী সম্পর্কিত তাহার ধারণাকে কাজে লাগানো যায়, যাহাকে তিনি প্রফেটিক ইনটিউশন বা এক প্রকার পয়গাম্বর সুলভ নিজস্ব চেতনা বলিয়াছেন। অর্থাৎ এমন কিছু যাহা 'অর্থ' ও 'ব্যাখ্যা'সূচক যাহা বাস্তবতা ও শব্দ হইতে ভিন্ন। ওয়াটের সেই ধারণা সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হইবে যখন আমরা 'ওহী' সম্পর্কে আলোচনা করিব। ৫৭ লক্ষণীয় যে, উক্ত আয়াত হইতে সর্বাধিক যে অর্থ বাহির করা যাইতে পারে তাহা হইতেছে, মক্কা নগরীতে একজন বিদেশী ছিল, সম্ভবত তাহার ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্ম বিষয়ে কিছু জ্ঞান ছিল এবং তাহার সহিত মহানবী -এর পরিচয় ছিল। স্বাভাবিক কারণেই মহানবীর বিরুদ্ধাচারিগণ ইহার সুযোগ গ্রহণ করিয়া তাঁহার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছিল যে, তিনি যে প্রত্যাদেশ লাভ করিয়াছেন উহা রচনা করিতে সেই ব্যক্তিই তাঁহাকে "শিক্ষা" দিয়াছিল। পবিত্র কুরআন এই অভিযোগকে অস্বীকার ও মিথ্যা বলিয়া উল্লেখ করিয়াছে। কল্পনাকে যতই দীর্ঘ করা হউক না কেন তাহা দ্বারা ইহা অনুমান করা সম্ভব নহে যে, পবিত্র কুরআন অস্বীকার করে না যে, তিনি সেই ব্যক্তির নিকট হইতে ইঙ্গিতবহ তথ্য প্রাপ্ত হইয়াছিলেন এবং ইহা নিছক "দাবি" করে যে, তিনি যে সকল বস্তু এই প্রকারে লাভ করিতেন তাহা "কুরআন হইতে পারে না। কারণ একজন বিদেশী নিজেকে স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করিতে সক্ষম নহে" ইহা ওয়াটের নিজের ব্যাখ্যা অথবা "উদ্দেশ্যমূলক" আকার প্রদান। কুরআন স্পষ্টভাবেই বলিতেছে যে, সেই কটাক্ষপাতকারী ব্যক্তির ভাষা 'আজমী' অর্থাৎ "বিদেশী"। কিন্তু অর্থের যতই প্যাঁচ খাটানো হউক না কেন ইহা কি যুক্তিসঙ্গত যখন বলা হয়, একজন বিদেশী, যে স্পষ্ট আরবী ভাষায় নিজেকে প্রকাশ করিতে পারে না, সে মহানবী -কে ইয়াহুদী ধর্ম ও খৃস্ট ধর্মের বিস্তারিত ও সূক্ষ্ম বিষয়ের শিক্ষা দান করিতে সক্ষম হইবে, যখন তিনি নিজে কোন প্রকারেই কোন বিদেশী ভাষা জানেন না?
প্রকৃতপক্ষে ইহা মারাত্মক বিভ্রান্তিমূলক এবং বেশ কিছুটা স্ববিরোধীও বটে। টোরি ও ওয়াট বলেন যে, মুহাম্মাদ অস্বীকার করেন না যে, "তাঁহার এক মানব শিক্ষক ছিল, কিন্তু কেবল দাবি করেন যে, উহা আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল"। তাঁহার দাবি যদি কেবল তাহাই হইত যে, শিক্ষা "আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল" তাহা হইলে উহা কি অস্বীকার করা নয় যে, তাহার একজন মানব শিক্ষক ছিল? কিন্তু শিক্ষা "আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছিল” ইহাই কেবল বলা হয় নাই, তাহা অপেক্ষা অনেক জোরালোভাবে এবং বারংবার বলা হইয়াছে যে, প্রত্যাদিষ্ট গ্রন্থের "মূল পাঠ”-ও আসমান হইতে অবতীর্ণ হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে কুরআন শরীফের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল যে, কেহ আসিয়া সূরার অনুরূপ একটি পাঠ রচনা করুক। সেই চ্যালেঞ্জ আজও রহিয়াছে।
অবিশ্বাসিগণের অভিযোগের মধ্যে আরও রহিয়াছে যে, গ্রন্থের "মূল পাঠ"ও সুকৌশলে প্রবিষ্ট সেই ব্যক্তি নাকি রচনা করিয়া দিয়াছিল। শব্দটি ছিল 'ইয়ু'আল্লিমু', সমকালীন আরবী বাচনভঙ্গির দিক হইতে ইহার অর্থ কেবল তথ্য সরবরাহ করা নহে, বরং একটি পাঠ পৌঁছাইয়া দেওয়া অর্থে ব্যবহৃত হইত যাহা সাধারণত মুখস্ত করিয়া করা হইত। সেকালে জ্ঞান বা তথ্য সম্পূর্ণরূপে মুখে মুখে স্থানান্তরিত হইত এবং যেহেতু অভিযোগে ওহীর মূল পাঠের কথা বলা হইয়াছে, ইহার অস্বীকৃতি অধিকতর শক্তিশালী হইয়াছে যখন কেবল দেখানো হইয়াছে সুকৌশলে প্রবিষ্ট সেই ব্যক্তি স্পষ্ট আরবী পাঠ উচ্চারণ করিতে অক্ষম তখন ইহা একেবারেই অযৌক্তিক। অস্বীকৃতির মধ্যে কিছু পরিমাণে সুকৌশলে প্রবিষ্ট সেই ব্যক্তির প্রতি বক্রোক্তিও রহিয়াছে। প্রকৃতই ওয়াট যে উদ্ধৃতি দিয়াছেন সেই দ্বিতীয় আয়াতে অবিশ্বাসিগণের অভিযোগের প্রকৃতি অধিকতর স্পষ্টরূপে বর্ণিত হইয়াছে। বর্তমানে আমরা ইহার প্রতি মনোযোগ দিব।
ওয়াট প্রথম আয়াতের (১৬: ১০৩) যে ব্যাখ্যা দিয়াছেন উহা তিন দিক হইতে ত্রুটিপূর্ণ। (এক) উহা সম্পূর্ণরূপে যে প্রেক্ষিতে বলা হইয়াছে তাহা মোটেই গ্রাহ্য করা হয় নাই। উহা অবিশ্বাসিগণের অভিযোগকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করার জন্যই বলা হইয়াছে। ৫৮ ইহার পরিপ্রেক্ষিত অত্যন্ত স্পষ্ট, আয়াতটি এমনিতেই পরিষ্কার, আবার ইহার পূর্ববর্তী দুইটি আয়াতও (১০১ ও ১০২) স্পষ্ট। যেমন ১০১ আয়াত অবিশ্বাসিগণের অভিযোগ যে, মহানবী "জালিয়াতি” করিয়াছেন সেই সম্পর্কিত এবং অতঃপর এই কথা বলিয়া অভিযোগ খণ্ডন করা হয় যে, যাহারা এই সকল অভিযোগ উত্থাপন করে তাহারা প্রকৃতই কিছু জানে না।
قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مُفْتَرٍ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْلَمُونَ . "তাহারা বলে, তুমি তো কেবল মিথ্যা উদ্ভাবনকারী, কিন্তু উহাদিগের অধিকাংশই জানে না” (১৬৪ ১০১)।
একই অস্বীকৃতি অব্যাহত রহিয়াছে এবং ১০২ আয়াতে ইতিবাচকরূপে বলা হইয়াছে, যেখানে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বলা হইয়াছে প্রত্যাদেশ "তোমার প্রতিপালকের" নিকট হইতে ফেরেশতা জিবরাঈল কর্তৃক অবতীর্ণ হইয়াছে।
قُلْ نَزَّلَهُ رُوحُ الْقُدُسِ مِنْ رَّبِّكَ بِالْحَقِّ . "বল, তোমার প্রতিপালকের নিকট হইতে রূহুল কুদুস (জিবরাঈল) সত্যসহ কুরআন অবতীর্ণ করিয়াছে"।
ওয়াট ১০৩ আয়াত উদ্ধৃত করিয়াছেন উহাও অবিশ্বাসিগণের অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ের অনুবর্তন মাত্র এবং একই জোরালো অস্বীকৃতি। প্রকৃতপক্ষে وَلَقَدْ نَعْلَمُ أَنَّهُمْ يَقُولُونَ "আমি তো জানিই, তাহারা বলে," এই বক্তব্য বিশেষ করিয়া অপ্রধান পদ ও সর্বনাম 'আন্নাহুম' স্পষ্ট পূর্ববর্তী আয়াতের সহিত সংযুক্তি বুঝায়। অথচ ওয়াট তাহার ব্যাখ্যায় পরিপ্রেক্ষিতকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করিয়াছেন এবং মহানবী-এর প্রতিপক্ষের অভিযোগগুলি নিশ্চিন্তে গ্রহণ করিয়াছেন।
(দুই) ওয়াট আর একটি ভুল করিয়াছেন যখন তিনি বলেন যে, কুরআন অস্বীকার করে না, যাহাকে তিনি বলেন, বিদেশীর নিকট হইতে তথ্যপ্রাপ্তি। যে প্রেক্ষিতে আয়াত নাযিল হইয়াছিল সেই প্রেক্ষিতকে যদি বিবেচনা করা নাও হয় তাহা হইলেও এই ১০৩ আয়াতের 'ইউলহিদূনা' (يُلْحِدُونَ) শব্দের মধ্যে রহিয়াছে নির্ভেজাল ও নির্ভুল অস্বীকৃতি। ইহাতে রহিয়াছে অবমাননাকর ভর্ৎসনা, যথা সত্য হইতে এবং সঠিক পথ হইতে বিচ্যুত হওয়া অথবা বিকৃতি ঘটানো।
সকল পারদর্শী বিশেষজ্ঞ স্বীকার করেন যে, ইলহাদ (اَلْحَاد) শব্দের অর্থ "মিথ্যা বর্ণনা" অথবা "অসত্যভাবে তুলিয়া ধরা, তাকযীব" (التَّكْذِيْبُ)। ৫৯ প্রকৃতপক্ষে 'ইউলহিদূনা' শব্দটি কুরআন শরীফে আর মাত্র দুইটি জায়গায় ব্যবহৃত হইয়াছে, যেমন ৭ : ১৮০ ও ৪১ : ৪০ আয়াতে; এবং উভয় ক্ষেত্রে ইহার স্পষ্ট অর্থ অন্যায় ও অবাঞ্ছিত আচরণ। ৬০ লক্ষণীয় যে, এ.জে. আরবেরি তাহার কুরআন অনুবাদে এই দুই ক্ষেত্রেই blaspheming কথাটি ব্যবহার করিয়াছেন leave those who blaspheme His names (যাহারা তাহার নাম বিকৃত করে) and those who blaspheme Our signs (যাহারা আমাদের নিদর্শন বিকৃত করে)। ৬১ আরও উল্লেখযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যে, কুরআন শরীফে যুলম-অবিচার (ظُلْم) ২২: ২৫ শব্দের ব্যাখ্যাকারী শব্দ হিসাবে এই শব্দের মূল শব্দ ইলহাদ (اِلْحَاد) ব্যবহৃত হইয়াছে এবং আরবেরি ইহা যথাযথভাবেই অনুবাদ করিয়াছেন :
وَمَنْ يُرِدْ فِيهِ بِإِلْحَادِ بِظُلْمِ نُذِقْهُ مِنْ عَذَابِ أَلِيْم . "আর যে ইচ্ছা করে সীমালঙ্ঘন করিয়া ইহাতে পাপকার্যের" (২২ : ২৫)।
And whosoever purposes to violate it wrongfully ইত্যাদি। ৬২ যদিও প্রাচ্যবিদগণ ১৬ : ১০৩ আয়াতের বক্তব্যকে সাদামাটাভাবে অনুবাদ করিয়া বলিতেছেন They hint at
(তাহারা ইংগিত করে) অথচ ইহার সঠিক অনুবাদ হওয়া উচিত, 'তাহারা অন্যায়ভাবে ইঙ্গিত করে' (They wrongfully suggest) অথবা 'তাহারা অবিবেচকের মত ইশারা করে' (They unjustly hint at) অথবা অনুরূপ শব্দ ব্যবহার করা উচিত ছিল। প্রসঙ্গত আরও বলা যায় যে, They hint at -এর আরবী হয় 'ইউশিরূনা ইলা', 'ইউলহিদূনা' নহে। আয়াত ১৬: ১০৩-এর প্রকৃত অর্থ হইবেঃ "আমরা তো জানিই, তাহারা বলে, 'তাহাকে শিক্ষা দেয় এক মানুষ'। উহারা যাহার প্রতি ইহা আরোপ করে তাহার ভাষা তো আরবী নহে, কিন্তু কুরআনের ভাষা স্পষ্ট আরবী ভাষা"। অভিযোগ অস্বীকার না করা তো দূরের কথা, বরং আয়াতের পাঠে ইহাকে স্পষ্ট বলা হইতেছে যে, উহা ইলহাদ বা অন্যায় বক্রোক্তি।
(তিন) ওয়াট নিষ্পত্তিকারক অথবা বলা চলে অভিযোগ খণ্ডনকারী শব্দাবলী যাহা আয়াতের শেষাংশে রহিয়াছে তাহাকে অবজ্ঞা করিয়াছেন। অথচ উহাতে জোরের সঙ্গে বলা হইয়াছে, যে ব্যক্তির প্রতি অন্যায়ভাবে ইংগিত করা হইয়াছে তাহার ভাষা বিদেশী।
প্রকৃতপক্ষে এই স্থলে একই বক্তব্যের মধ্যে অভিযোগের প্রতি দুই প্রকার অস্বীকৃতি বুঝানো হইয়াছে। প্রথমে বলা হইয়াছে, যেহেতু সেই ব্যক্তির ভাষা বিদেশী সেই ক্ষেত্রে মহানবী -এর পক্ষে, যিনি বিদেশী ভাষা জানিতেন না, পরামর্শ অনুধাবন করা ছিল অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, কুরআনের ভাষা যেহেতু আরবী সেহেতু বিদেশী ব্যক্তি উহা মহানবীকে শুনাইতে সক্ষম হইতে পারে না।
এমতাবস্থায় 'তথ্য' বা 'উপাত্ত' যাহাই বলা হউক না কেন অথবা ওহীর পাঠ রচনা ও শব্দ চয়ন, কোন কিছুতেই একজন বিদেশীর পক্ষে মহানবী-এর প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করা সম্ভব ছিল না।
অবিশ্বাসীগণের কটাক্ষপাতকে খণ্ডন ও প্রত্যাখ্যান কুরআন শরীফের পরবর্তী দুই আয়াতেও আছে (১৬ : ১০৪-১০৫)। আয়াত ১০৪, সেখানেও আল্লাহ্ নিদর্শনকে অস্বীকার করার কুফল সম্পর্কে অবিশ্বাসীগণকে সতর্ক ও সাবধান করা হইয়াছে। ১০৫ আয়াতে সমুচিত জবাব দিয়া বলা হইয়াছে :
إِنَّمَا يَفْتَرِي الْكَذِبَ الَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِأَيْتِ اللَّهِ وَأُولَئِكَ هُمُ الْكَذِبُونَ . "যাহারা আল্লাহ্ নিদর্শনে বিশ্বাস করে না তাহারা তো কেবল মিথ্যা উদ্ভাবন করে এবং তাহারাই মিথ্যাবাদী" (১৬ঃ ১০৫)।
এই প্রকারে আমরা দেখিতে পাইতেছি, আয়াত ১৬: ১০-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াতসমূহে মিলিতভাবে একটি পরিপূর্ণ পৃথক স্পষ্ট বক্তব্য নির্মিত হইয়াছে যাহার উদ্দেশ্য অবিশ্বাসীগণের বানোয়াট অভিযোগ ইতিবাচক, জোরালো ও নিঃসংশয়ভাবে খণ্ডন ও প্রত্যাখ্যান
করা। এই প্রসঙ্গে আরও লক্ষণীয় যে, এই আয়াতে এইরূপ কিছুই নাই যাহা হইতে অবিশ্বাসীগণ এমন ধারণা দিতে সচেষ্ট হইয়াছে যেমনটি ওয়াট আমাদিগকে বিশ্বাস করাইতে চাহিতেছেন অর্থ ও ব্যাখ্যা হইতে সম্পূর্ণ ভিন্ন তথ্য ও সংবাদ গ্রহণ বিষয়ে। অন্যদিকে প্রত্যাখ্যানের প্রকৃতি ও শব্দ ব্যবহার, বিশেষ করিয়া যে মানুষটিকে আনা হইয়াছে তাহার ভাষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ ইহাই স্পষ্ট করিয়া তোলে যে, ওহীর পাঠ নির্মাণে মহানবী-এর নিজের অক্ষমতার প্রতি নির্দেশ করাই ছিল অভিযোগের লক্ষ্য।
২৫:৪-৫ আয়াতে অবিশ্বাসীগণের অভিযোগের এই প্রকৃতি অনেক বেশী সুনির্দিষ্টভাবে বর্ণিত হইয়াছে। ওয়াট এই আয়াতই উল্লেখ করিয়াছেন। এই আয়াত ১৬: ১০৩ আয়াতের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ২৫:৪-৫ আয়াত বলে, অবিশ্বাসীগণের অভিযোগ ছিল যে, মহানবী এইরূপ ওহী লাভ করিয়াছিলেন যাহা তাহাদের নিকট “প্রাচীন কালের রূপকথা”, যাহা মহানবী-এর জন্য লিখিত হইয়াছিল এবং সকাল-সন্ধ্যা পাঠ করিয়া শোনানো হইত। লক্ষণীয় যে, ওয়াট অনুবাদ করিতে গিয়া আয়াত ৪-এর শেষ অংশ বাদ দিয়া গিয়াছেন, যেখানে বলা হইয়াছে:
فَقَدْ جَاءُو ظُلْمًا وَزُورًا
"এইরূপে উহারা অবশ্যই জুলুম ও মিথ্যায় উপনীত হইয়াছে" (২৫:৪)।
বাদ দেওয়ার কারণ এই যে, অবিশ্বাসীগণ কর্তৃক আনীত অভিযোগ খণ্ডন করা হয় নাই বলিয়া তাহাদিগের এই ধারণাকে যাহাতে সহজেই উপস্থাপন করা যায়।
আয়াত ২৫:৪-৫ বা এই সূরা সর্বজন স্বীকৃত যে, ১৬ সূরার আগে অবতীর্ণ সূরা। ৬৩ এই আর একটি কারণ যে কারণে ১৬: ১০৩ আয়াতটির অভিযোগের সহিত ২৫:৪-৫ আয়াতের অভিযোগ একত্রে বিবেচনা করিতে হইবে। কারণ ইহার ফলে স্বাভাবিকভাবেই অবিশ্বাসীগণের পক্ষে এই কথা বলা অসম্ভব হইয়া পড়িবে যে, মহানবী-এর জন্য অন্য কেহ ওহী লিখিয়া দিত এবং সকাল-সন্ধ্যা তাঁহাকে পাঠ করিয়া শুনাইত এবং তাহার পর একথা বলা যে, তিনি একজনের নিকট হইতে কেবল তথ্য ও সংবাদ লাভ করিতেন। ইহাই স্বাভাবিক যে, তাহাদের অভিযোগ যে, মহানবী-এর নিজের পক্ষে ওহী রচনা করা সম্ভব নহে তাহাও তথ্য ও সংবাদের উল্লেখ যেমন রহিয়াছে তেমনি ওহীর পাঠ ও ভাষারও উল্লেখ আছে। কিন্তু কেহ যদি ধরিয়া লয় যে, কেবল তথ্য ও সংবাদের উল্লেখ আছে অথবা কেহ যদি স্বীকারও করে যে, স্বাভাবিক সত্য হইতেছে অভিযোগে উভয়ের উল্লেখ রহিয়াছে সেই ক্ষেত্রে ২৫:৪ আয়াত, যে আয়াত ওয়াট পাঠকের নিকট হইতে অগোচরে রাখিয়াছেন, তাহাতে অবিশ্বাসীগণের অভিযোগকে বলা হইয়াছে অন্যায় বা জুলম (ظُلْمًا) এবং সরাসরি মিথ্যার (زُورًا) বহিপ্রকাশ। ইহা অপেক্ষা অধিকতর ও জোরালো অস্বীকৃতি আর কিছুই হইতে পারে না।
ওয়াট যথার্থই বলিয়াছেন যে, মুসলমান তফসীরকারগণ, অবিশ্বাসিগণ যে ব্যক্তি বা ব্যক্তিগণ সম্পর্কে ইঙ্গিত করিয়াছেন তাহাদের পরিচয় সম্পর্কে একমত পোষণ করেন না, বরং একাধিক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করিয়াছেন, মক্কায় বসবাসকারী তাহারা অধিকাংশই খৃস্টান দাস। ৬৪ কিন্তু তিনি কাহিনী সমাপ্তও করেন নাই, আবার তাহার ধারণা হইতে উদ্ভুত বিষয় লইয়া আলোচনার অগ্রগতিও সাধন করেন নাই। স্বাভাবিকভাবেই তাহার ধারণা লইয়া কিছু প্রশ্ন উঠিতে পারে। কিন্তু তিনি এই বিষয় লইয়া অগ্রসর হন নাই। প্রশ্নগুলি এইরূপ হইতে পারে:
(ক) মুহাম্মাদ যখন রিসালাতের দাবি করিলেন এবং প্রকাশ্যে তিনি মক্কাবাসীকে তাঁহাকে বিশ্বাস করিতে বলিলেন ও বেশ কিছু দিন অতিবাহিত হইল, তখন কি কারণে কোন ইয়াহুদী ও খৃস্টান বিজ্ঞ ব্যক্তি ইয়াহুদী ও খৃষ্ট ধর্ম সম্পর্কে তাঁহাকে তথ্য সরবরাহ করিয়া তাঁহার দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করিতে সাহায্য করিবার নিমিত্ত আগাইয়া আসিয়াছিলেন?
(খ) কুরায়শ নেতৃবৃন্দ তাহাদের ক্ষমতা, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও তাহাদের জ্ঞান ও মক্কার ন্যায় খুব বড় নয় এমন একটি নগরীর নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাসহ, বিশেষ করিয়া যখন তাহারা মহানবী -এর চলাফেরার সর্বক্ষণ নজরদারি করিতে সক্ষম তখন কেন তাহারা মহানবীর তথাকথিত 'সংবাদদাতা' সম্পর্কে তথ্যকে কাজে লাগাইয়া মহানবীর 'বানোয়াট' রিসালাতকে প্রকাশ করিয়া দেয় নাই?
(গ) তাহা ব্যতীত যদি সত্যই 'সংবাদদাতা' বা 'সংবাদদাতাগণ' খৃস্টধর্ম অথবা ইয়াহুদী ধর্ম হইতে আসিয়া ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিবার পর যখন জানিতে পারিয়াছিল যে, মুহাম্মাদ ওহী হিসাবে যে বাণী ও মতবাদকে আল্লাহ্ ওহী হিসাবে প্রচার করিতেছিলেন উহা রচনা করিবার জন্য তাহাদের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন, তখন তাঁহারা কেন তাঁহার উপর বিশ্বাস অব্যাহত রাখিয়াছিল?
অধিকতর উল্লেখযোগ্য বিষয় যে, অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত এইসব অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন ওয়াট উত্থাপন তো করেনই নাই, অধিকন্তু এই সকল প্রশ্নের জবাবও অন্বেষণ করেন নাই। তিনি যদি কোন একটি কাজও করিতেন তাহা হইলে দেখিতে পাইতেন, মুসলমান তাফসীরকারগণ স্পষ্ট করিয়া প্রদর্শন করিয়াছেন যে, কুরায়শ নেতৃবৃন্দ যখন দেখিতে পাইল যে, কয়েকজন খৃস্টান ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছে তখন আলোচ্য এইসব প্রশ্নসহ অভিযোগ উত্থাপন করিয়াছিল। মক্কার নেতৃবৃন্দ অভিযোগ উত্থাপন করিয়াই ক্ষান্ত হয় নাই, তাহারা তাহাদিগের উপর এই মর্মে চরম নির্যাতন চালাইয়াছিল যে, তাহারা যেন বলে যে, তিনি তাহাদের নিকট হইতে সাহায্য লাভ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ আছে, অনুরূপভাবে নির্যাতিত জাবর নামক এক মুসলিম যখন চরমভাবে নির্যাতিত হইয়াছিলেন তখন তিনি যে উত্তর প্রদান করিয়াছিলেন তাহা প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলিয়াছিলেন, 'আমি মুহাম্মাদকে শিক্ষা দেই নাই, বরং তিনিই আমাকে শিক্ষা দিয়াছেন এবং পথপ্রদর্শন করিয়াছেন'। ৬৫