📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 এক: সাধারণভাবে উচ্চাভিলাষ সম্পর্কিত বিষয়ে

📄 এক: সাধারণভাবে উচ্চাভিলাষ সম্পর্কিত বিষয়ে


মুইর ও মার্গোলিয়থ উভয়ে মহানবী -এর উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই অভিযোগ করিয়া বক্তব্য রাখিয়াছেন। মুইর লিখিয়াছেন, "মেহোমেটের বাহ্যিক প্রশান্ত ও দুশ্চিন্তাহীন চেহারার পশ্চাতে লুকাইয়াছিল এক উচ্চ সিদ্ধান্ত, একনিষ্ঠতা ও উদ্দেশ্যের প্রতি একাগ্রতা, ছিল এক মহিমাময় দৃঢ় সঙ্কল্প, ছিল সমগ্র আরবের হৃদয়কে একীভূত করিয়া একটি মানুষের হৃদয়ে পরিণত করিয়া উহাকে আপনার প্রতি নতজানু করিবার কার্যকর বিস্ময়কর অদম্য স্পৃহা"।' মুইর আরও বলিয়াছেন, যখন কা'বাগৃহ পুনর্নির্মাণের সময় হাজরে আসওয়াদ (কালো প্রস্তর) স্থাপনের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ যে মধ্যস্থতা করিয়াছিলেন তখন তাঁহার এই উচ্চাভিলাষ অধিকতর উদ্দীপ্ত হইয়াছিল, যাহার কারণে "তিনি যে ঈশ্বর কর্তৃক তাঁহার জনগণের জন্য পয়গাম্বর হিসাবে নির্বাচিত হইয়াছেন এই ধারণা বদ্ধমূল হইয়াছিল"।২
একই সূরে বলিতে গিয়া মার্গোলিয়থও দাবি করিয়াছেন, "আমরা কুরআন হইতে জানিতে পারি যে, মুহাম্মাদ ছিলেন এরূপ একজন যুবক যাঁহার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল" এবং "তাঁহার উচ্চাভিলাষ সম্পর্কে আমাদের নিকট প্রমাণ রহিয়াছে যে, তাঁহার অপযশ তাঁহাকে সান্ত্বনা দিয়াছিল এমন এক সময় যখন তাহাদের পরিকল্পনা অল্পই অগ্রসর হইতেছিল: 'আমি কি তোমার বক্ষ তোমার কল্যাণে প্রশস্ত করিয়া দেই নাই এবং তোমার খ্যাতিকে উচ্চ মর্যাদা দান করি নাই'? পয়গাম্বর যখন সমস্যার মধ্যে পতিত তখন এইরূপ ঐশ্বরিক সান্ত্বনা আসিতেছে। বক্ষ প্রশস্তকরণ, একটি নূতন কেন্দ্রকে অবলম্বন করিয়া জীবন সংগঠন... সুউচ্চ সম্মানজনক স্থান লাভের জন্যই তাঁহার ছিল আগ্রহ”। মারগোলিয়থ সাহেব আর এক ধাপ অগ্রসর হইয়া বলিতে চাহিয়াছেন, পয়গম্বরের আকাঙ্খা ও উচ্চাভিলাষ ছিল ব্যক্তিগত সম্মান অর্জন। সেই কারণে তিনি নাকি ফিজার যুদ্ধে যোগদান করিয়াছিলেন। ৪
ওয়াট সাহেবও অনুরূপ অভিমত পোষণ করিতেন, যদিও তিনি বিশেষভাবে "উচ্চাভিলাষ" শব্দটি তাহার বক্তব্যে ব্যবহার করেন নাই। তাহার পরিবর্তে তিনি উল্লেখ করিয়াছেন পয়গাম্বরের "বিরাট সাংগঠিক দক্ষতা" সম্পর্কে তাঁহার "সচেতনতা" এবং সেই সঙ্গে তিনি সংযোগ করিয়াছেন সেই সচেতনতার প্রতি মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা। ওয়াট বলিতে চাহিয়াছেন যে, পয়গাম্বর প্রণোদিত হইয়াছিলেন এক প্রকার "বঞ্চনাবোধ" হইতে যে, প্রথমত শৈশবে তিনি তাঁহার পিতাকে লাভ করেন নাই এবং দ্বিতীয়ত "তাঁহাকে সর্বাপেক্ষা আকর্ষণীয় বাণিজ্য হইতে দূরে সরাইয়া রাখা হইয়াছে"। মহানবী -এর এই তথাকথিত বঞ্চনাবোধ সম্পর্কিত ধারণার ইঙ্গিত মার্গোলিয়থ দিয়াছেন। কারণ তিনি তাঁহার পিতার মৃত্যুর পর জন্মগ্রহণ করেন। সেই কারণে তিনি মহানবীর শৈশবকাল বর্ণনা প্রসঙ্গে বলিয়াছেন যে, "পিতৃহীন বালকের অবস্থা মোটেই কাঙ্খিত ছিল না"।৬
যাহাই হউক না কেন, ওয়াট সাহেবও নিশ্চিতভাবে মার্গোলিয়থকে অনুসরণ করিয়া কুরআন ভিত্তিক ঐশ্বরিক সান্ত্বনাকেই "ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হিসাবে কাজ করিবার প্রস্তুতি" গ্রহণের প্রমাণস্বরূপ পেশ করিয়াছেন। পার্থক্য এইটুকু যে, মারগোলিয়থ সূরা ৯৪ (ইনশিরাহ)-কে সাক্ষ্য হিসাবে উপস্থাপিত করিয়াছেন, অন্যদিকে ওয়াট সেই ক্ষেত্রে সূরা ৯৩ (দুহা)-কে উপস্থাপন করিয়াছেন। এইভাবে "সম্মুখে যে কাজ রহিয়াছে তাহার জন্য বৎসরাধিক কালের প্রস্তুতি" হিসাবে মহানবী -এর সহিত হযরত খাদীজার বিবাহের পরবর্তী কয়েক বৎসরকে প্রস্তুতির বৎসর হিসাবে বর্ণনা করিয়াছেন এবং ওয়াট সাহেব সূরা ৯৩-এর আয়াত ৬-৮ এর একটি অনুবাদ দিয়াছেন এবং বলিতেছেন যে, এই আলোচ্য অংশে "অনুমিত হয় যে, ইহা দ্বারা মুহাম্মাদের প্রাথমিক অভিজ্ঞতার" কথাই বলা হইয়াছে এবং ইহা হইতে "আমরা সম্ভবত ধরিয়া লইতে পারি যে, তাঁহার এক পর্যায়ে তিনি অনুধাবন কারিতে পারিয়াছিলেন যে, সকল প্রকার দুর্ভাগ্য সত্ত্বেও ঈশ্বরের সমর্থন তাঁহার প্রতি রহিয়াছে”। একই উদ্ধৃতির বরাত দিয়া, অবশ্য সামান্য ভিন্নরূপ অনুবাদ করিয়া, ওয়াট তাহার পরবর্তী কালের রচনায়, যেখানে অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ-এর প্রথম জীবন সম্পর্কে বলিতে গিয়া এবং "ঈশ্বরের প্রেরিত পুরুষ হিসাবে কাজ করিবার প্রস্তুতি" হিসাবে বর্ণনা করিতে গিয়া বলিয়াছেন, "পিতার অবর্তমান অবস্থা মুহাম্মদের মনে অবশ্যই এক প্রকার বঞ্চনাবোধের সৃষ্টি করিয়াছিল এবং একজন যুবক হিসাবে দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা হয়ত এই বঞ্চনাবোধকে লালন করিয়াছিল”। অতঃপর ওয়াট এই বলিয়া সমাপ্তি করিয়াছেন, "সম্ভবত ইহা সর্বাধিক আকর্ষণীয় বাণিজ্য কার্যক্রম হইতে তিনি যে বাদ পড়িয়াছিলেন"। "এই সঙ্গে তাঁহার বিশাল সাংগঠনিক ক্ষমতা সম্পর্কে তাঁহার সচেতনতা মুহাম্মাদকে মক্কার সাধারণ অবস্থা সম্পর্কে চিন্তিত করিয়া তুলিয়াছিল"। ১০
এভাবেই প্রাচ্যবিদ পণ্ডিতগণ মহানবী-এর উচ্চাভিলাষ এবং প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পর্কে অনুমান করিয়াছেন। অবশ্য এই প্রসঙ্গে ইহাও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, মহানবী-এর ব্যক্তিগত উচ্চাভিলাষ সম্পর্কিত তাহাদের অনুমান সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। রাসূলে করীম-এর পয়গাম্বর বা সংস্কারকের ভূমিকা গ্রহণের প্রস্তুতি বিষয়ে তাহাদের অনুমানও সম্পূর্ণরূপে ভিত্তিহীন এবং কোনরূপ তথ্য দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করা যায় না, কুরআন শরীফের কোন আয়াত বা হাদীছ দ্বারা তো ইহা দাঁড় করানো যায়ই না। মার্গোলিয়থের কটাক্ষ যে, মহানবী ফিজার যুদ্ধে যোগদান করিয়াছিলেন ব্যক্তিগত সম্মান লাভের জন্য, ইহাও যুক্তিতে টিকে না এবং এই বিষয়ে যুক্তি-তর্কেরও অবকাশ নাই। এখানে তিনি তাঁহার উচ্চাভিলাষের অভিযোগ বিষয়ে কুরআন শরীফের যে সাক্ষ্য দাঁড় করাইয়াছেন তাহা লক্ষণীয়। মার্গোলিয়থ তাহার বক্তব্যে উল্লেখ করিয়াছেন, "মুহাম্মাদ একজন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের যুবক" এবং ইহার সমর্থনে সূরা হূদের যে (১১:৬৫) আয়াত উল্লেখ করিয়াছেন ১১ তাহা সম্পূর্ণ ভুল এবং অপ্রাসঙ্গিক। আয়াতটি এইরূপ :
فَعَقَرُوهَا فَقَالَ تَمَتَّعُوا فِي دَارِكُمْ ثَلْثَةَ أَيَّامٍ ذَلِكَ وَعْدٌ غَيْرُ مَكْذُوبٌ .
"কিন্তু উহারা উহাকে বধ করিল। অতঃপর সে বলিল, তোমরা তোমাদিগের গৃহে তিন দিন জীবন উপভোগ করিয়া লও। ইহা একটি প্রতিশ্রুতি যাহা মিথ্যা হইবার নহে” (১১ঃ ৬৫)।
এই আয়াত তথা সম্পূর্ণ অংশই পয়গাম্বর সালিহ (আ) এবং তাঁহার জনগণকে উদ্দেশ্য করিয়া। সালিহ (আ)-এর জনগণ ক্রমাগত তাঁহার আদেশ-নির্দেশ অমান্য করিতেছিল। ইহা ছিল তাহাদের প্রতি সাবধান বাণী। সত্যই অবশেষে তাহাদের উপর দুর্যোগ আপতিত হইয়াছিল। এই আয়াতের "প্রতিশ্রুতি" ছিল পরোক্ষভাবে তাহাদের প্রতি সেই দুর্যোগের সংবাদ যাহা মিথ্যা হয় নাই। ইহাকে কল্পনা করিয়া কোনক্রমেই এইরূপ ব্যাখ্যা প্রদান করা সম্ভব নহে যে, ইহা মহানবী হযরত মুহাম্মাদ-এর প্রতি প্রতিশ্রুতি ছিল। মার্গোলিয়থ এই প্রসঙ্গে সূরা ৯৪ হইতে ১নং ও ৪ নং আয়াত দুইটিকে একটি বাক্য হিসাবে ধরিয়া এবং মূল উল্লেখ না করিয়া মাঝের দুইটি আয়াত বাদ দিয়া উল্লেখ করিয়াছেন: "আমি কি তোমার বক্ষ সম্প্রসারিত করি নাই এবং তোমার নামকে উন্নত করি নাই"? ১২
আলোচ্য অংশকে মহানবী -এর মানসিক দুশ্চিন্তার সময়ে তাঁহার প্রতি আল্লাহ্ সান্ত্বনা হিসাবে স্বীকার করিবার পর ইহাকে কীরূপে তাঁহার উচ্চাভিলাষের সহিত সম্পৃক্ত করা যায় তাহা ভাবিয়া পাওয়া কঠিন। ইহার দ্বারা মহানবী-এর যে সম্মান অর্জনের প্রতি আকাঙ্খা ছিল এবং প্রথম জীবনের সিদ্ধান্তের প্রতি নির্দেশ করা হইয়াছে তাহাও কাহারও বোধগম্য নয়। মার্গোলিয়থ উক্ত বক্তব্য দ্বারা তাহাই বলিতে চাহিয়াছেন। স্পষ্টত নবীর পক্ষ হইতে "প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি"র অভিযোগের সমর্থনে তিনি সূরা ১১৪ ৬৫ আয়াত যেভাবে উল্লেখ করিয়াছেন তাহা রীতিমত বিভ্রান্তিকর। সূরা ৯৪-এর আলোচ্য অংশ তিনি যেভাবে ব্যাখ্যা করিয়াছেন তাহাও অযৌক্তিক ও ত্রুটিপূর্ণ।
এই প্রসঙ্গে ওয়াট সাহেব সূরা আদ-দুহা (৯৩ঃ ৬-৮)-কেও সেইভাবে দাঁড় করাইয়াছেন যাহা বহু দূর অধিগম্য ও অযৌক্তিক। এই বিষযে কোন সন্দেহ নাই যে, কুরআন শরীফের আলোচ্য অংশটিতে মহানবী-এর সহিত হযরত খাদীজা (রা)-র বিবাহের পূর্ব কালের অবস্থা নির্দেশ করা হইয়াছে। ইহা আরও স্পষ্ট যে, ইহা দ্বারা প্রতীয়মান হয়, "তাঁহার অনুধাবন যে, দুর্যোগ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্ সাহায্য তাঁহার প্রতি রহিয়াছে"। কিন্তু সেই অনুধাবন নিঃসন্দেহে নবুওয়াত লাভের পরবর্তী সময়ের এবং উহাকে কোনক্রমেই পূর্ববর্তী সময়ের মানসিক অবস্থার প্রেক্ষিতে বলিয়া গ্রহণযোগ্য হইতে পারে না।
পরবর্তী কালের সান্ত্বনা বাক্য নবুওয়াত লাভের পূর্বেকার মানসিক অবস্থার জন্য প্রযোজ্য হইতে পারে না। ইহা দ্বারা নবুওয়াত লাভের পূর্বের তাঁহার মানসিক প্রস্তুতি বুঝানো যায় না। এই আলোচ্য আয়াতে এমন কোন বক্তব্য নাই যাহা দ্বারা মনে হইতে পারে যে, নবী করীম-এর কোনরূপ বঞ্চনাবোধ ছিল। অন্যদিকে যে বিষয়টি পরিস্ফুটিত হইয়া উঠিয়াছে তাহা আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতাবোধ ও তৃপ্তিবোধ। নবী করীম-এর দিক হইতে কোন প্রকার বঞ্চনাবোধ সম্পর্কিত অনুমান বা ধারণা উক্ত আলোচ্য অংশে থাকিতে পারে না। আল্লাহ তাঁহার অবস্থা তাঁহার মঙ্গলের দিকে লইয়া গিয়াছেন, এইজন্য তাঁহার এক প্রকার কৃতজ্ঞতাবোধ ছিল। যদি ধরিয়া লওয়াও হয় যে, তিনি কোন এক প্রকার বঞ্চনাবোধের কারণে কষ্ট পাইতেছিলেন সেই ক্ষেত্রে খাদীজা (রা)-র সহিত বিবাহ হইবার পর স্পষ্টতই স্থান পাইয়াছিল দ্ব্যর্থহীন তৃপ্তিবোধ ও কৃতজ্ঞতাবোধ এবং সেই পরিবর্তিত অবস্থা ও সুখের দিন দীর্ঘ প্রায় ১৫ বৎসর কাল অব্যাহত ছিল-যতদিন না ওহী নাযিল হইতে আরম্ভ করিল অর্থাৎ ওয়াট যে সময়কালকে "প্রস্তুতির" সময় বলিয়া চিহ্নিত করিতে চাহিয়াছেন সেই সময়কাল।
পুনরায়, "অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাণিজ্য হইতে সরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল" বলিয়া যে ধারণা দেওয়া হয় ইহাও সঠিক নহে। ওয়াট অবশ্য এই সম্পর্কে কুরআন শরীফের সর্বজনবিদিত ৪৩ : ৩১ আয়াতের উল্লেখ করিয়াছেন: "এই কুরআন কেন অবতীর্ণ হইল না দুই জনপদের (কারয়াতায়ন) কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর"? ১৩ সকলেই স্বীকার করেন আলোচ্য আয়াত দ্বারা বুঝানো হইয়াছে যে, যখন ওহী নাযিল হইতে আরম্ভ করিয়াছিল তখন তিনি মক্কা ও তায়েফের কোন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ছিলেন না। তাহার অর্থ এই নহে যে, "অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাণিজ্য হইতে সরাইয়া দেওয়া হইয়াছিল"। প্রকৃতপক্ষে বনূ হাশিম এবং অপর কয়েকটি কুরায়শ গোত্রের মধ্যে বাণিজ্য লইয়া প্রতিদ্বন্দ্বিতার তত্ত্ব এবং সম্ভাব্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় বাণিজ্য হইতে মুহাম্মাদ -কে সরাইয়া দেওয়া, যাহার উপর ভিত্তি করিয়া ওয়াট তাহার উপসংহার টানিয়াছেন, তাহা ভিত্তিহীন ও অযৌক্তিক। ১৪ এই বিষয়ে ইতোপূর্বে আলোচনা করা হইয়াছে।
অন্যদিকে ৯৩: ৮ আয়াতের আলোচ্য অংশের মূল শব্দ 'আগনা'; ওয়াট নিজেই স্বীকার করিয়াছেন যে, ইহার অর্থ কেবল যথেষ্ট পরিমাণের সম্পদ যাহার রহিয়াছে তিনিই নহেন, বরং ওয়াটের নিজের ভাষায় 'এমন একটি অবস্থান যাহা তুলনামূলকভাবে স্বাধীন এবং সমাজে যাহার বেশ প্রভাব রহিয়াছে'। ইহা সর্বজনবিদিত সত্য, ওয়াট নিজেও স্বীকার করিয়াছেন যে, নবী করীম যখন নবুওয়াত লাভ করিলেন তখন তিনি একদিকে ধনী ও প্রভাবশালী আবু লাহাবের সহিত, অন্যদিকে মাখযূম গোত্রের অত্যন্ত ধনী সদস্যের সহিত বৈবাহিক সূত্রে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ হইয়াছেন। এমতাবস্থায় খাদীজা (রা)-র সহিত বিবাহ হইবার পর হইতে পরবর্তী পনের বৎসর ওহী নাযিল হওয়া পর্যন্ত তিনি দারিদ্র্যের কারণে বঞ্চনাবোধ এবং লোভনীয় বাণিজ্য হইতে সরিয়া যাওয়ায়, "মুহাম্মাদকে মক্কার সাধারণ অবস্থা লইয়া চিন্তায় ফেলিয়াছিল" এবং অবশেষে তিনি পয়গাম্বর বা সংস্কারকের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন—উভয়ই সূরা ৯৩-এর সাধারণ অর্থের সম্পূর্ণ বিপরীত এবং সেই সময়ের বাস্তব ও সর্বজন স্বীকৃত তথ্যের বিপরীতধর্মী বক্তব্য।
ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, হযরত মুহাম্মাদ -এর নবুওয়াত লাভের পূর্ব পর্যন্ত বৎসরগুলিতে মনের অবস্থা যেমনই থাকুক না কেন, তিনি কোন প্রকার বঞ্চনাবোধে কষ্ট পান নাই। তদুপরি তিনি পয়গাম্বর হইবার জন্য কোন প্রকার পরিকল্পনা বা প্রস্তুতিও গ্রহণ করেন নাই। ইহা স্পষ্টভাবে কুরআনের আয়াতে পরিলক্ষিত হয় যেখানে বলা হইয়াছে:
وَمَا كُنْتَ تَرْجُوا أَنْ يُلْقَى إِلَيْكَ الكتبُ الأَ رَحْمَةً مِّنْ رَّبِّكَ ....
"তুমি আশা কর নাই যে, তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হইবে। ইহা তো কেবল তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ..." (২৮ঃ ৮৬)।
কুরআন শরীফের এই সন্দেহাতীত বাক্য চূড়ান্তরূপে রদ করে যে, তাঁহার নবী হইবার কোন আকাঙ্খা ছিল অথবা তিনি কোন অভিলাষ পোষণ করিতেন, যদিও নবুওয়াত লাভের পূর্বে তিনি মাঝে মাঝে নির্জন জায়গায় ধ্যান করিতেন। কিন্তু তিনি কখনও কোন কাজ বা আচরণের মাধ্যমে এমন ভাব প্রদর্শন করেন নাই যাহাতে মনে হইতে পারে যে, তাঁহার পয়গাম্বর হওয়া তো দূরে থাক, স্বজাতির নেতা হইবার কোন বাসনা ছিল।
ইহাই স্বাভাবিক এবং সাধারণত ইহাই হইয়া থাকে যে, কোন নেতা হঠাৎ করিয়া আবির্ভূত হন না, বরং একটি ক্রম-অগ্রসরমান পদ্ধতির মাধ্যমে ধীরে ধীরে আপন জনগণের নিকট পরিদৃশ্যমান হইয়া উঠেন যাহা আশেপাশের নিকটজনের নিকট হইতে লুকাইয়া রাখা যায় না। যিনি ভবিষ্যতে নেতৃত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করিবেন তিনি তাহার আচরণ ও কার্যকলাপের মাধ্যমে সমাজের নিকট আপন অভিলাষ ফুটাইয়া তোলেন। তথাপি মুহাম্মাদ -এর ক্ষেত্রে এইরূপ কোন তথ্য পাওয়া যায় নাই যদ্‌দ্বারা অনুমিত হইতে পারে যে, তিনি ভবিষ্যতে তাঁহার স্বজনের নেতৃত্ব গ্রহণ করিবেন। তাঁহার যদি এইরূপ কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা থাকিত অথবা তিনি স্বীয় জাতির নেতা হইবার কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে উহা অবশ্যই তাঁহার আপনজনের নিকট প্রকাশ পাইত। নেতা হইবার যদি কোন পরিকল্পনা তিনি করিতেন অথবা প্রস্তুতি গ্রহণ করিতেন তাহা হইলে উহা অবশ্যই কোন না কোন প্রকারে জানাজানি হইয়া যাইত এবং পরবর্তী কালে ইহা তাহার বিরুদ্ধাচারীদের জন্য সমালোচনা করিবার সুযোগ করিয়া দিত। কিন্তু এইরূপ কোন তথ্যই পাওয়া যায় নাই। ওহী নাযিল হইবার পূর্ব পর্যন্ত তিনি কোন প্রকার চিহ্ন প্রদর্শন করেন নাই, কার্যকলাপে বা আচরণে কেহই অনুমান করিতে পারে নাই যে, ভবিষ্যতে স্বীয় জাতির নেতা হইবার তাঁহার কোন ইচ্ছা বা পরিকল্পনা ছিল। তাঁহার প্রতিপক্ষরা সত্যই দেখাইয়াছে, যেমন কুরআনের ৪৩: ৩১ আয়াতে বলা হইয়াছে যে, দু'টি শহরের মধ্যে তিনি এমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন না যে, তাঁহাকে পয়গাম্বর করা যাইবে। তাঁহার যে কোন উচ্চাভিলাষ অথবা প্রস্তুতি ছিল না ইহার সর্বাধিক শক্তিশালী প্রমাণ পবিত্র কুরআনের এই আয়াত। ইহা অপেক্ষা আর কোন প্রমাণ অধিকতর শক্তিশালী হইতে পারে না।
ওহী নাযিল হইবার ফলে তাৎক্ষণিকভাবে তাঁহার মধ্যে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হইয়াছিল সেই ঘটনার বিবরণ যে বিখ্যাত হাদীছে উল্লেখ রহিয়াছে উহাতে প্রতীয়মান হয় যে, মুহাম্মাদ -এর নিকট ওহী নাযিল হওয়া ছিল সম্পূর্ণ আকস্মিক ও অজানা ঘটনা। তিনি হেরা পর্বত হইতে হতভম্ব ও ভীত অবস্থায় দ্রুত কাঁপিতে কাঁপিতে বাড়ি ফিরিয়া আসিলেন এবং স্ত্রীকে বলিলেন তাঁহাকে একটি কম্বলে আচ্ছাদিত করিতে। অতঃপর তিনি পর্বত গুহায় কি ঘটিয়াছে তাহা বর্ণনা করিতে গিয়া বলিলেন যে, তাঁহার জীবনে সাংঘাতিক কিছু একটা ঘটিতে যাইতেছে বলিয়া তাঁহার ভয় হইতেছে, সম্ভবত তিনি মারা যাইতেছেন। স্ত্রী তাঁহাকে সান্ত্বনা দিলেন, অভয় দিলেন এবং আশ্বস্ত করিলেন যে, আল্লাহ নিশ্চয় তাঁহার কোন ক্ষতি হইতে দিবেন না। কারণ তিনি অত্যন্ত ভাল মানুষ, সৎ মানুষ; তিনি কাহারও কোন অনিষ্ট করেন নাই; সদাসর্বদা সত্য কথা বলিয়াছেন, অতিথি আপ্যায়ন করিয়াছেন, আত্মীয়-স্বজনকে ও দরিদ্রকে সাহায্য করিয়াছেন।
প্রাথমিক ধাক্কা সামলাইয়া ওঠার পর কিছুটা স্থির হইলে খাদীজা (রা) তাঁহাকে ওয়ারাকা নামক এক আত্মীয়ের বাড়িতে লইয়া গিয়াছিলেন। ওয়ারাকা ইবন নাওফাল এমন একজন পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন যিনি অনেক কিছু জানিতেন। হেরা গুহায় তাঁহার স্বামীর যে অভিজ্ঞতা হইয়াছিল সে সম্পর্কে তিনি ওয়ারাকা ইবন নাওফালের নিকট হইতে জানিতে চাহিয়াছিলেন। ওয়ারাকা সমস্ত বৃত্তান্ত শুনিয়া তাহার অধীত বিদ্যার ভিত্তিতে মুহাম্মাদ সম্পর্কে এই অভিমত দিয়াছিলেন যে, ইতোপূর্বে মূসা ('আ) যেরূপ আল্লাহ্র নির্দেশ লাভ করিয়াছিলেন তিনিও সেইরূপ আল্লাহ্র নির্দেশ লাভ করিবেন। ইহার ফলে স্বজাতির সহিত তাঁহার কলহ হইবে এবং তাঁহার অনেক কষ্ট হইবে। শেষের কথায় তিনি আরও আশ্চর্য হইয়াছিলেন। ১৫
সায়্যিদ আবুল আ'লা মওদূদী এই বিষয়টির কয়েকটি দিক তুলিয়া ধরিয়াছেন। ১৬ উহা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। প্রথমত, আমরা এই স্থলে নবী করীম -এর অবস্থার যে দৃশ্য দেখিতে পাই তাহা রীতিমত এইরূপ যে, নবী করীম তখন বিভ্রান্ত ও হতভম্ব অবস্থায় রহিয়াছেন। একটি অকল্পনীয় অভাবিত অবস্থায় তিনি হতভম্ব। তাঁহার যদি কোন সময় কোন দিন এই অভিলাষ থাকিত অথবা পয়গাম্বর বা ধর্মীয় নেতার ভূমিকায় ভবিষ্যতে অবতীর্ণ হইবেন এইরূপ কোন প্রস্তুতি থাকিত অথবা এমন কোন আকাঙ্খা বা ইচ্ছা থাকিত যে, তাঁহার নিকট কোন ঐশী বাণী আসিবে তাহা হইলে তাঁহার প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকারের হইত। তাহা হইলে তিনি হতভম্ব হইতেন না, হতবুদ্ধি হইতেন না, ভয়ে কাঁপিতে থাকিতেন না, বরং হেরা পর্বত হইতে প্রত্যাশা পূরণের আনন্দে সফল ও হৃষ্টচিত্তে গৃহে প্রত্যাবর্তন করিতেন। কাহারও সান্ত্বনা বাক্যের প্রয়োজন হইত না। তিনি সরাসরি তাঁহার উদ্দেশ্য ঘোষণা করিতেন।
দ্বিতীয়ত খাদীজা (রা)-এর মধ্যে যে প্রতিক্রিয়া হইয়াছিল তাহাও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁহার স্বামীর যদি অনুরূপ কোন অভিলাষ থাকিত যে, তিনি একদিন সামাজিক ও ধর্মীয় সংস্কারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হইবেন তাহা হইলে দুনিয়ায় অপর কেহ না জানিলেও তিনি তাহা অবশ্যই জানিতেন। অতএব তিনি যখন হেরা পর্বত হইতে তাঁহার এই নূতন অভিজ্ঞতা লইয়া প্রত্যাবর্তন করিলেন তখন তাঁহাকে অভিনন্দন জানাইতেন, তাঁহার এত দিনের প্রত্যাশা ও প্রস্তুতির সফলতায় খুশি হইতেন এবং তাঁহার আত্মীয় ওয়ারাকার নিকট পরামর্শের জন্য যাইতেন না, বরং তাঁহার স্বামীর নূতন কর্মসূচী কি প্রকারে বাস্তবায়িত করা যায় তাহার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে অগ্রসর হইতেন।
তৃতীয়ত ওয়ারাকার দৃষ্টিভঙ্গিও অনুরূপভাবে লক্ষণীয়। তিনি নবী করীম-এর একজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। শৈশবকাল হইতেই তিনি নবী করীম-কে জানিতেন। ওয়ারাকা খৃষ্ট ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে উত্তমরূপে অবহিত ছিলেন। ওহী সম্পর্কেও তাহার জ্ঞান ছিল। ওহী ও নবুওয়াত সম্পর্কে ওয়ারাকার জ্ঞান থাকার কারণে তিনি অতি সত্বর বুঝিতে পারিলেন যে, হেরা গুহায় মুহাম্মাদ -এর নিকট যিনি উপস্থিত হইয়াছিলেন তিনি নবী মূসা ('আ)-এর নিকট যিনি ওহী লইয়া আসিতেন আল্লাহ্ সেই ফেরেশতা ব্যতীত আর কেহই নহেন। নবী করীম যদি উচ্চাভিলাষী হইতেন এবং তাঁহার ধর্মীয় নেতা হইবার আকাঙ্খা থাকিত, তদুপরি যদি তিনি তাহাদের অভিযোগ অনুযায়ী ওয়ারাকার নিকট হইতে নিয়মিত খৃষ্ট ধর্মের অনুশাসন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করিতেন তাহা হইলে ওয়ারাকার প্রতিক্রিয়া ও মনোভঙ্গি হইত সম্পূর্ণ ভিন্ন। হয় তিনি মুহাম্মাদ-কে জানাইতেন যে, এতদিন তিনি যাহা চাহিতেছিলেন এবং যাহার অপেক্ষায় দিন গণনা করিতেছিলেন তাহা তিনি লাভ করিয়াছেন অথবা ইহাও করিতে পারিতেন যে, তিনি তাঁহার মিথ্যা ভান ও প্রস্তুতির সংবাদ প্রচার করিয়া দিতেন। কিন্তু ওয়ারাকা সেইরূপ কিছুই করিলেন না। তিনি যে সেইরূপ কিছু করিলেন না ইহাই বড় প্রমাণ যে, তাহার নিকট হইতে মহানবী খৃষ্ট ধর্মের অনুশাসন বিষয়ে শিক্ষা লাভ করেন নাই অথবা তাঁহার যে কোন ধর্মীয়-সামাজিক নেতা হইবার ইচ্ছা ছিল তাহা তিনি জানিতেন না।
অন্যদিকে ওয়ারাকার প্রতিক্রিয়া হইতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, তিনি পূর্বকালের ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করিয়া জানিতে পারিয়াছিলেন যে, ওই সকল গ্রন্থে একজন পয়গাম্বরের আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছে এবং মুহাম্মাদের মধ্যেই সেই পয়গাম্বরের চিহ্ন দেখা যাইতেছে। এই সকল প্রাচ্যবিদ, বিশেষ করিয়া ওয়াট আরও দেখাইয়াছেন যে, ওয়ারাকার এই উৎসাহব্যঞ্জক বাক্য নবী করীম -এর মনে তাঁহার লক্ষ্য সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস দৃঢ়তর করিয়াছিল। ১৭ তাঁহার প্রস্তুতি গ্রহণ এবং উচ্চাভিলাষ ছিল এইরূপ ধারণা যে মিথ্যা তাহা স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যখন দেখা যায়, আদর্শ বাস্তবায়নের সূচনালগ্নেই তাঁহার মধ্যে আস্থার অভাব রহিয়াছে। এই সঙ্গে আরও যোগ করা যায় সর্বজনবিদিত সত্য ঘটনা যে, তিনি সকল প্রকার পার্থিব মূল্যবান বস্তু প্রত্যাখ্যান করিয়াছিলেন কিন্তু আপন আদর্শ ও লক্ষ্য হইতে বিচ্যুত হন নাই। আমরা জানি কুরায়শ নেতৃবৃন্দ তাঁহাকে বারংবার তাঁহার আদর্শ ত্যাগ করিয়া তাহার বিনিময়ে ক্ষমতা, নেতৃত্ব ও সম্পদ গ্রহণের প্রস্তাব প্রদান করিয়াছিল।
প্রসঙ্গত বর্তমান অধ্যায়ের সমাপ্তি টানিবার পূর্বে উল্লেখ করা যায় যে, নবী করীম শেষ পর্যন্ত তাঁহার জনগণ ও সকল সাধারণ ঈমানদারদের নেতা হইয়াছিলেন। এই ঘটনার কারণে প্রাচ্যবিদগণ তাঁহার নবুওয়াত লাভের পূর্ব জীবনে উচ্চাভিলাষ ও প্রস্তুতি গ্রহণকে অন্তর্গত করিয়া তাহার জীবনী নির্মাণ করিতে চান। প্রকৃত ঘটনা ও সূত্রের প্রতি বিশ্বস্ত থাকিয়া এবং ঐতিহাসিক রীতি অনুসরণ করিয়া এইটুকু বলা যায় যে, কোন নেতা আকস্মিকভাবে দৃশ্যপটে আবির্ভূত হইতে পারেন না। সেই বিবেচনায় হযরত মুহাম্মাদ-এর ক্ষেত্রে বলা চলে যে, তিনি যখন ওহী লাভ করিতে আরম্ভ করিলেন তখন হইতে প্রকৃতপক্ষে সেই প্রক্রিয়ার সূচনা হইয়াছিল এবং অবশেষে তাঁহাকে নেতৃত্ব গ্রহণ করিতে হইয়াছিল। ইহা নহে যে, তিনি প্রথম জীবন হইতেই যে প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং যে উচ্চাভিলাষ পোষণ করিতেন তাহার কারণেই তিনি নেতৃত্ব লাভ করিয়াছিলেন। যখন তিনি নবুওয়াত লাভের আহবান পাইলেন তখন তিনি নেতৃত্ব লাভের আশা করার মত কোন সম্ভাব্য ব্যক্তি ছিলেন না।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: কাব্যচর্চার অভিযোগ

📄 দুই: কাব্যচর্চার অভিযোগ


তাঁহার সম্পর্কে যেমন অভিযোগ উত্থাপিত হইয়াছে যে, তিনি জীবনের প্রথম হইতেই প্রস্তুতি গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং তাঁহার নেতা হইবার উচ্চাভিলাষ ছিল; তেমনি এইরূপ অভিযোগও উত্থাপিত হইয়াছে যে, তিনি ভাষাগত দক্ষতা ও কাব্যচর্চায় দক্ষতা লাভের জন্য প্রথম হইতে দুইটি বিষয়ে অনুশীলন ও চর্চা করিয়াছিলেন, যাহার ফলে পরবর্তী কালে তিনি কুরআন 'রচনা' করিতে সক্ষম হইয়াছিলেন। ডবলিউ মুইর বলেন, উকায মেলায় কবিতা ও সাহিত্য প্রতিযোগিতার দৃশ্য মুহাম্মাদ -এর অন্তরে উত্তেজনার সৃষ্টি করিয়াছিল, "ব্যক্তিগত সাফল্যের আকাঙ্খা উদ্দীপ্ত" করিয়াছিল এবং সেই মেলায় তিনি "প্রধান কবিদের নিকট হইতে প্রতিভা উৎকর্ষ সাধনের ও শিক্ষা লাভের দুর্লভ সুযোগ লাভ করিয়াছিলেন এবং পাইয়াছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ কবিতার শিল্পশৈলী ও ছন্দপ্রকরণের আদর্শ রূপ”। ১৮
মুইরের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলাইয়া মার্গোলিয়থ মন্তব্য করেন যে, মুহাম্মাদ সম্ভবত সুললিত বাকপটুতার অনুশীলনও করিয়াছিলেন, "যে ক্ষেত্রে তিনি পরবর্তী কালে চরম উৎকর্ষ অর্জন করিয়াছিলেন"। ১৯ তিনি আরও বলেন, যদিও পয়গাম্বরের কবিতার প্রতি কিছুটা বিরাগ ছিল, "বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কুরআনের ভাষার সঙ্গে" আরবের প্রাচীন কবিতার "বিস্ময়কর সাযুজ্য" দেখা যায়। স্পষ্টত ইঙ্গিত করা হইয়াছে উকাযের মেলার কবিতা প্রতিযোগিতার প্রতি, যেখানে মুইর এই বিষয়ে সরাসরি বরাত দিয়াছেন, সেখানে মারগোলিয়থ মন্তব্য করেন যে, "সেখানে সেই আনন্দ উৎসবের মধ্যে যে সকল কবিতা আবৃত্তি হইত তাহা হইতে কোন কোন কবিতা তাঁহার স্মৃতিতে ভাস্বর হইয়া রহিয়াছিল এবং পরবর্তী কালে উহাই ভবিষ্যতের ওহীর আকৃতি লাভ করিয়াছিল"। ২০
এই ক্ষেত্রে স্পষ্টই বলা আবশ্যক যে, যে কোন জ্ঞানী ব্যক্তি স্বীকার করিবেন যে, কুরআন কোন কাব্যগ্রন্থ নহে। নবী করীম -ও কখনও ছন্দ মিলাইয়া কাব্য রচনা করেন নাই। অবিশ্বাসী কুরায়শগণ তাহাদের বিরোধিতার প্রথমদিকে যখন ওহী নাযিল হইতে আরম্ভ করিয়াছিল তখন উহার বিরোধিতা করিয়া বলিত যে, মুহাম্মাদ কবি হইয়া গিয়াছেন। কিন্তু শীঘ্রই যখন তাহারা তাহাদের ভুল বুঝিতে পারিল যে, তাহাদের আক্রমণ সঠিক হইতেছে না তখন তাহাদের আক্রমণের ভাষা পরিবর্তিত করিল। কারণ যেহেতু মহানবী ছিলেন সম্পূর্ণ উম্মী, যাঁহার কাব্যচর্চার কোন অভ্যাস ছিল না, তখন তাহারা বলিতে আরম্ভ করিল যে, অপর কেহ তাঁহাকে কবিতা লিখিতে শিখাইয়া দিয়াছিল। আবার বলা হইল, 'প্রাচীন যুগের কাহিনী' অপর কেহ তাহার হইয়া লিখিয়া দিয়াছে এবং সকাল-সন্ধ্যায় পাঠ করিয়া শুনাইয়াছে। ২১ এই অভিযোগ পবিত্র কুরআনে সম্পূর্ণরূপে খণ্ডন করা হইয়াছে। কবিতা রচনা অথবা কুরআন কোন এক প্রকার কবিতা—এই অভিযোগের ক্ষেত্রে কুরআন স্পষ্টভাবে অস্বীকার করিয়াছে:
وَمَا عَلَّمْتُهُ الشِّعْرَ وَمَا يَنْبَغِي لَهُ أَنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ وَقُرْآنٌ مُّبِينٌ .
"আমি রাসূলকে কাব্য রচনা করিতে শিখাই নাই এবং ইহা তাহার পক্ষে শোভনীয়ও নহে। ইহা তো কেবল এক উপদেশ ও সুস্পষ্ট কুরআন" (৩৬: ৬৯)।
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ قَلِيْلاً مَّا تُؤْمِنُونَ .
"এবং ইহা কোন কবির রচনা নহে; তোমরা অল্পই বিশ্বাস কর" (৬৯:৪১)।
প্রকৃতপক্ষে পরিমাণগতভাবে বিচার করিলে কুরআনের এক-চতুর্থাংশও সাজ' বা ছন্দবদ্ধ গদ্যও নহে। মার্গোলিয়থ নিজেই আপন কটাক্ষের প্রতি দুই প্রকারে বিরুদ্ধ মত প্রকাশ করিয়াছেন। তিনি তাহার রচনার পরের দিকে বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ -এর সুললিত বাচনভঙ্গীর অভাৎ ছিল এবং তিনি উপস্থিত বিতর্কে পটু ছিলেন না, তাই কুরায়শদের "পরিষদ সভায়" কখনও তর্কের "সুযোগ" গ্রহণ করিতেন না। ২২
দ্বিতীয়ত, অতি যত্ন সহকারে মার্গোলিয়থ যেখানে এই বিষয়ে মতামতের দায়িত্ব বিশেষজ্ঞদের স্কন্ধে অর্পণ করেন সেই মার্গোলিয়থ নিজেই যখন পরবর্তী কালে আরবী কবিতার উৎপত্তি বিষয়ে পৃথক গ্রন্থ রচনা করিলেন তখন কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্নমত প্রকাশ করিয়া তত্ত্ব উপস্থাপন করিলেন যে, ইসলাম-পূর্ব যুগের কবিতা হিসাবে যে কবিতাসমূহ পরিচিত তাহা প্রকৃতপক্ষে কুরআনের ‘সাজ’ (ছন্দ)-এর ধাঁচে রচিত ইসলাম-পরবর্তী যুগের কবিতার আদর্শে রচিত। ২৩ এই তত্ত্ব স্বাভাবিকভাবেই যথেষ্ট আলোচনার উদ্ভব ঘটাইয়াছে। ২৪ কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই তত্ত্ব উপস্থাপন করার ফলে তিনি ইতোপূর্বে যে বলিয়াছিলেন, ইসলাম-পূর্ব যুগের কবিতা “হইতেই ভবিষ্যতের ওহী কিরূপ হইবে তাহা স্থির হইয়াছিল”—এই বক্তব্যকে সরাসরি খণ্ডন করিয়াছে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: ওয়াটের তত্ত্ব: সাক্ষরতার প্রশ্ন

📄 তিন: ওয়াটের তত্ত্ব: সাক্ষরতার প্রশ্ন


মুইর ও মারগোলিয়থ যদিও অভিযোগ করিয়াছেন যে, নবী করীম ভাষাগত ও কাব্য দক্ষতা চর্চা করিয়াছিলেন, কিন্তু তাহারা উৎসসমূহের সঙ্গে একমত পোষণ করেন যে, তিনি একজন সাক্ষরতা বর্জিত ব্যক্তি ছিলেন। মার্গোলিয়থ স্পষ্ট ভাষায় বলিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ “শৈশবকালে পঠন ও লিখনবিদ্যা শিক্ষালাভ করেন নাই, যদিও ইহা সেকালের অধিকাংশ মক্কাবাসীর আয়ত্তে ছিল” এবং “ব্যবসা-বাণিজ্যে উহার প্রয়োগ ছিল প্রচুর”। ২৫ মজার বিষয়, এই স্থলে মারগোলিয়থ দুইটি সত্য বিষয়ের উপর গুরুত্ব আরোপ করিয়াছেন। (এক) মক্কাবাসীর মধ্যে লেখা-পড়ার যথেষ্ট প্রচলন ছিল। (দুই) ব্যবসা-বাণিজ্যে ইহার বহুল ব্যবহার ও উপযোগিতা ছিল। ওয়াট এই বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষিতে বলিতে চাহিয়াছেন যে, মুহাম্মাদ একেবারে অশিক্ষিত ছিলেন না, কিছুটা লিখিতে ও পড়িতে পারিতেন। “কারণ তাঁহাকে ব্যবসায়িক হিসাবপত্র রাখিতে হইত”। ২৬ এই প্রসঙ্গে ওয়াট কুরআন শরীফের ২৯ : ৪৮ ও ২৫ : ৫ আয়াতের কিয়দংশ উল্লেখ করিয়াছেন। সেখানে যথাক্রমে বলা হইয়াছে, “তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই” এবং “এইগুলি তো সেকালের উপকথা, যাহা সে লিখাইয়া লইয়াছে”। ২৭ ওয়াট ইহার ব্যাখ্যা করিয়া বলেন, প্রথম অংশের অর্থ “মুহাম্মাদ নিজে কোন ধর্মগ্রন্থ পূর্বে পাঠ করেন নাই” কিন্তু ওয়ারাকার ন্যায় কোন ব্যক্তি অথবা তাহার কোন সংবাদদাতা সম্ভবত সিরিয়াক ভাষার বাইবেল পাঠ করিয়া তাঁহাকে শুনাইয়াছিল। কারণ তখন পর্যন্ত আরবী ভাষায় বাইবেল অনূদিত হয় নাই। দ্বিতীয় আয়াতের ক্ষেত্রে ওয়াট বলেন, “ইহার অর্থ” মুহাম্মাদের জন্য তাঁহার কোন “সচিব” প্রাচীন কাহিনী লিখিয়া দিত। এইভাবে ওয়াট তাহার যুক্তি প্রদান করিয়া বলেন, “ব্যবসায়ের কারণে মুহাম্মাদ প্রয়োজনীয় লিখিতে ও পড়িতে জানিতেন সেইরূপ সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু ইহা নিশ্চিত যে, নিজে কোন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন নাই”। ২৮
ওয়াট এই প্রসঙ্গে কুরআন শরীফে ব্যবহৃত শব্দ ‘উম্মী’-এর অর্থ লইয়া আরও আলোচনা করিয়াছেন। যাহা হউক, এই বিষয়ে আলোচনার পূর্বে ওয়াট উপরে যে যুক্তি প্রদর্শন করিয়াছেন তাহার আলোচনা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। ইহা সর্বজনবিদিত যে, সেই সময় মক্কার কিছু সংখ্যক অধিবাসী অবশ্যই লিখিতে ও পড়িতে জানিত। ইহা একটি সর্বজনগ্রাহ্য নীতি যে, যখন কোন একটি বিশেষ অবস্থা বা বৈশিষ্ট্য সাধারণভাবে কোন একটি সমাজে বা দেশে বিদ্যমান থাকে তখন সেই দেশের বা সমাজের কোন বিশেষ ব্যক্তি সম্পর্কে সেই সাধারণ বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে বলিয়া ধরিয়া লওয়া হয়। কিন্তু আমাদের নিকট যে সকল তথ্যসূত্র রহিয়াছে অথবা ওয়াট যে উদাহরণ উল্লেখ করিয়াছেন তাহা হইতে এই ধারণার সৃষ্টি হয় না যে, তৎকালে অর্থাৎ মহানবী-এর আবির্ভাব কালে মক্কা নগরীতে লেখা-পড়ার বিষয়টি ছিল সেই সময়কার সাধারণ বিষয় অথবা নগরীর অধিকাংশ জনগণ দূরে থাকুক, একটি বিপুল সংখ্যক অধিবাসী ছিল শিক্ষিত। এমতাবস্থায় মহানবী যে শিক্ষিত ছিলেন, লিখিতে ও পড়িতে জানিতেন এইরূপ ধারণা সৃষ্টির কোনরূপ কারণ থাকিতে পারে না। অপরপক্ষে তাঁহার প্রথম জীবনের যে সর্বজনবিদিত স্বাভাবিক অবস্থা বিদ্যমান ছিল তাহা হইতে স্বাভাবিকভাবেই যে ধারণার সৃষ্টি হয় তাহা এই যে, তিনি বাল্যকালে কোনরূপ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভের সুযোগ পান নাই।
দ্বিতীয়ত, এই প্রসঙ্গে ওয়াট কুরআন শরীফের যে দুইটি আয়াত ২৯:৪৮ এবং ২৫:৫ উল্লেখ করিয়াছেন তাহা আংশিক মাত্র। দুইটি আয়াতেরই মূল বক্তব্যের বাহিরে এবং আয়াতদ্বয়ের উপর ভুল ও পক্ষপাতযুক্ত ব্যাখ্যা চাপাইয়া দেওয়া হইয়াছে এবং যাহার পিছনে কোন পরিপ্রেক্ষিত নাই, এমনকি সমগ্র বক্তব্যর সহিত সামঞ্জস্য পর্যন্ত অনুপস্থিত। তিনি কী প্রকারে ইহা করিয়াছেন তাহা দেখিবার জন্য মূল আয়াত পূর্ণভাবে পাঠ করা প্রয়োজন। ২৯:৪৮ আয়াত নিম্নরূপঃ
وَمَا كُنْتَ تَتْلُوا مِنْ قَبْلِهِ مِنْ كِتَابٍ وَلَا تَخْطُهُ بِيَمِينِكَ إِذَا لَأَرْتَابَ الْمُبْطِلُونَ .
"তুমি তো ইহার পূর্বে কোন কিতাব পাঠ কর নাই এবং স্বহস্তে কোন কিতাব লিখ নাই যে, মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে” (২৯:৪৮)।
এই বক্তব্যে ইহা স্পষ্ট যে, নবী করীম যখন আল্লাহ্র নিকট হইতে প্রাপ্ত ওহী প্রচার করিতেছিলেন তখন অবিশ্বাসিগণ অভিযোগ করিয়াছিল যে, তিনি উক্ত ওহী নিজেই রচনা করিয়াছেন, তাহার প্রেক্ষিতে এই ওহী নাযিল হইয়াছিল। আলোচ্য অংশে মক্কাবাসীর অভিযোগকে সোজা কথায় অবাস্তব বলা হইয়াছে। কারণ তখনকার মক্কার সকল ব্যক্তি জানিত যে, নবী করীম ইতোপূর্বে কখনও লিখিতে বা পড়িতে পারেন নাই। যিনি কোন দিন লিখেন নাই বা পাঠ করেন নাই তিনি আকস্মিকভাবে অসাধারণ সাহিত্য গুণসম্পন্ন সৃষ্টি লইয়া জনসমক্ষে উপস্থিত হইবেন তাহা ছিল কল্পনাতীত। ইহার অর্থ আরও স্পষ্ট হয় যখন বাক্যের শেষ অংশে বলা হয়, "মিথ্যাচারীরা সন্দেহ পোষণ করিবে”। এই প্রসঙ্গে আরও লক্ষণীয়, যে শব্দ দ্বারা উহা প্রকাশ করা হইয়াছে তাহা 'মা কুনতা' যাহার অর্থ অভ্যস্ত না হওয়ার অবস্থা অথবা (পড়িতে ও লিখিতে) অক্ষম হওয়া। তদুপরি কিতাব শব্দটি যেরূপ অনির্দিষ্টভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে স্পষ্টতই তাহার অর্থ 'যে কোন কিতাব', নির্দিষ্ট কোন কিতাব নহে। কুরআন শরীফ অবশ্যই নির্দিষ্ট কিতাব বলিতে বাইবেলকে বুঝাইয়াছে।
আলোচ্য অংশ অনুবাদ করিতে গিয়া ওয়াট অবশ্য 'যে কোন গ্রন্থ' বুঝাইয়াছেন। তিনি অবশ্য এই বিষয়টি আলোচনা করিতে গিয়া বলিয়াছেন যে, "চিন্তা করিবার আরও অনেক কারণ রহিয়াছে” যে, পয়গাম্বর “কখনও বাইবেল অথবা অন্য কোন গ্রন্থ পাঠ করেন নাই”। কিন্তু এই কথা বলিবার পরক্ষণেই তিনি আলোচ্য অংশের অর্থ সীমাবদ্ধ করিয়া বলেন যে, নবী করীম “কোন ধর্মগ্রন্থ” পাঠ করেন নাই। তারপর যোগ করিতেছেন, যদিও “তিনি নিজে” বাইবেল পাঠ করেন নাই অথবা লিখিয়া লন নাই কিন্তু ওয়ারাকা ইবন নাওফাল ও নবী করীম-এর অপর কয়েকজন “নাম না জানা তথ্য সরবরাহকারী” সিরিয়াক বাইবেল পাঠ করিয়াছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আলোচ্য অংশের অনুরূপ ব্যাখ্যা যুক্তিগ্রাহ্য নহে। ওয়ারাকা অথবা অপর কেহ সিরিয়াক বাইবেল অথবা অন্য কোন ভাষার বাইবেল পাঠ করিয়াছিল কিনা তাহা আলোচ্য অংশের সহিত সম্পূর্ণ সম্পর্কহীন। আলোচ্য অংশের অন্তর্নিহিত অর্থ কেবল মহানবীর পূর্ববর্তী অবস্থা বুঝাইবার জন্য, অন্য কিছু নহে। ওয়াট চালাকি করিয়া এইরূপ ব্যাখ্যা করিতে চাহিতেছেন যে, মনে হয় মহানবী অপরের মাধ্যমে বাইবেলের ঘটনা ও ধারণা লাভ করিয়াছিলেন এবং পরে তাহা কুরআন শরীফের অন্তর্গত করিয়াছেন। অবশ্য এই বিষয়ে পরবর্তী পর্যায়ে আলোচনা করা হইবে।
ওয়াট কুরআন শরীফের ২৫: ৫ আয়াতের যে ব্যাখ্যা দিয়াছেন তাহা সর্বাধিক উদ্ভট ব্যাখ্যা। তিনি যে কতখানি যুক্তিহীন ব্যাখ্যা দিতে পারেন তাহা সহজেই বোধগম্য হইবে যখন আমরা এই আয়াতের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আয়াত পাঠ করিব। সেখানে বলা হইয়াছে:
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِنْ هَذَا الأَ افْكُ افْتَرَهُ وَأَعَانَهُ عَلَيْهِ قَوْمُ اخَرُونَ فَقَدْ جَاءُوْ ظُلْمًا وَزُورًا. وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكتتبها فهي تُملى عَلَيْهِ بَكْرَةً وَأَصِيلاً. قُلْ أَنزَلَهُ الَّذِي يَعْلَمُ السِّرَّ في السموت والأَرْضِ..
"কাফিরগণ বলে, ‘ইহা মিথ্যা ব্যতীত কিছুই নহে, সে ইহা উদ্ভাবন করিয়াছে এবং ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোক তাহাকে এই ব্যাপারে সাহায্য করিয়াছে’। এইরূপে উহারা অবশ্যই জুলুম ও মিথ্যায় উপনীত হইয়াছে। উহারা বলে, ‘এইগুলি তো সে কালের উপকথা যাহা সে লিখাইয়া লইয়াছে; এইগুলি সকাল-সন্ধ্যা তাহার নিকট পাঠ করা হয়’। বল, ‘ইহা তিনিই অবতীর্ণ করিয়াছেন যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন’; নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (২৫:৪-৬)।
৪ নং আয়াতে অবিশ্বাসিগণ যে অভিযোগ আনিয়াছে এবং উহা খণ্ডন করিয়া যে বক্তব্য দেওয়া হইয়াছে উহার ধারাবাহিকতায় পঞ্চম আয়াতের বক্তব্য, ইহাই স্বাভাবিক। এই আয়াতে বলা হইয়াছে যে, অবিশ্বাসিগণ বলিভ যে, ওহী মিথ্যা এবং উহার পাঠ অপর কয়েকজনের সহায়তায় নবী করীম তৈরি করিয়াছিলেন। আয়াতে এই বক্তব্যকে সরাসরি মিথ্যা ও অন্যায় )ظلمًا وزوراً( হিসাবে অভিহিত করা হইয়াছে। এই অভিযোগ খণ্ডন করিতে গিয়া পঞ্চম আয়াত অবিশ্বাসীদের অন্যান্য অভিযোগ উল্লেখ করিয়াছে যেমন অন্যদের দিয়া লিখাইয়া লওয়া, প্রাচীন কালের কাহিনী যাহা সকালে ও সন্ধ্যায় পয়গাম্বর পাঠ করাইয়া লইতেন, তাহা ব্যতীত ওহী আর কিছুই নহে ইত্যাদি। অভিযোগের সারাংশ হইতেছে, নবী করীম অপরের সাহায্য লইয়াছিলেন। ইহাও অস্বীকার করা হইয়াছে এই কথা বলিয়া যে, যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন তিনি ওহী নাযিল করিয়াছেন। তিনিই অবতীর্ণ করিয়াছেন "যিনি আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন" এই বরাত দেওয়া হইয়াছে যথাযথ। কারণ ওহী হইতেছে আল্লাহ ও রাসূলের মধ্যে একান্ত আপন বিষয় যাহা অপর কেহ জানিবে না বা দেখিবে না। প্রকৃতপক্ষে কুরআন শরীফের বহু স্থানে যথার্থই বলা হইয়াছে যে, রাসূল ও তাঁহার নিন্দুকদের মধ্যে একমাত্র আল্লাহই সর্বোত্তম সাক্ষী।
পকিত্র কুরআনের ২৫ : ৫ আয়াত লইয়া আলোচনা করিতে গিয়া ওয়াট অবশ্য স্বীকার করিয়াছেন যে, উহা মহানবী -এর বিরুদ্ধে তাঁহার বিরুদ্ধাচারী অবিশ্বাসীদের অভিযোগ ছিল। তাহারা বলিয়াছিল যে, তাঁহার নিকট যে ওহী অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহা ছিল "প্রাচীন কাহিনী" এবং ওই সকল কাহিনী তিনি অপর কাহাকেও দিয়া লিখাইয়া লইয়াছিলেন। কিন্তু ওয়াট সামগ্রিকভাবে উহার অর্থ ও তাৎপর্য অনুধাবন করিতে পারেন নাই। তিনি অভিযোগ অস্বীকারের বিষয় পাশ কাটাইয়া গিয়াছেন, অথচ উহাই ছিল আলোচ্য আয়াতের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। অন্যদিকে তিনি অভিযোগকে একটি বিচ্ছিন্ন বক্তব্য হিসাবে বিবেচনা করিয়াছেন। অতঃপর তিনি অনুমান করিয়া লইয়াছেন, "তাহার অর্থ হইল মহানবী "নিজে” লিখেন নাই, তিনি তাঁহার "সচিবদের" দ্বারা লিখাইয়া লইয়াছিলেন। এমনিভাবে ওয়াট মহানবী -এর বিরুদ্ধে অবিশ্বাসিগণের অভিযোগগুলি গ্রহণ করিয়াছেন এবং ধরিয়া লইয়াছেন, ওহী হিসাবে তিনি যে বাণী দিয়াছেন উহা ছিল অপরের রচনা, একই সঙ্গে তাঁহার বিরুদ্ধাচারীর প্রতি জবাবে যে তিনি উহা নিজে রচনা করেন নাই এই মূল বক্তব্যকে অগ্রাহ্য করিয়াছেন-ইহা অপেক্ষা উদ্ভট ব্যাখ্যা আর কী হইতে পারে?
ওয়াট যদি তাহার ব্যাখ্যা লইয়া অগ্রসর হইবার পূর্বে আরও একটু সতর্ক হইতেন এবং নিজেকে প্রশ্ন করিতেন যে, প্রকৃত অবস্থার চাবিকাঠি কোথায় অবস্থিত, যেমন কেন তাঁহার বিরুদ্ধাচারিগণ এমন অভিযোগ করিবে যে, তিনি অপরকে দিয়া প্রাচীন কাহিনী লিখাইয়া ও অসাধারণ কাব্যগুণ সম্পন্ন শিল্প রচনা করাইয়া তাহাকে ওহী বলিতেছেন? একটুখানি চিন্তা করিলেই ওয়াট ইহার সদুত্তর পাইতেন। কারণ তাহারা এবং সেকালের সকলেই উত্তমরূপে জানিত যে, মুহাম্মাদ ছিলেন উম্মী-লিখিতে ও পড়িতে অক্ষম, তাঁহার পক্ষে কাব্যগুণ সম্পন্ন কোন কিছুই রচনা করা সম্ভব ছিল না, বিশেষ করিয়া ওহীর মত অসাধারণ সাহিত্যগুণ সম্পন্ন ভাষায় কিছু রচনা করা তাঁহার পক্ষে মোটেও সম্ভব নহে। তাঁহার জন্য অপর কেহ প্রাচীন কালের কাহিনী রচনা করিয়া দিয়াছিল-এই কথা বলিয়া তাহারা ক্ষান্ত হয় নাই। তাহারা আরও বলিয়াছে যে, সেই সকল কাহিনী সকাল-সন্ধ্যা তাঁহাকে শুনানো হইত। ইহার স্বাভাবিক অর্থ দাঁড়ায় এই যে, তাহারা জানিত যে, কেবল সেই কাহিনীগুলি লিখিয়া দিলেই চলিবে না, সেইগুলি তাঁহাকে উত্তমরূপে শুনাইতে হইবে যাহাতে তিনি সেইগুলি যথাযথভাবে মুখস্থ করিয়া জনগণকে শুনাইতে পারেন।
অবিশ্বাসিগণ তাঁহার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনিয়াছিল, আয়াতের সেই মূল অংশটুকু বাদ দিয়া ওয়াট এই সম্পূর্ণ আয়াত ব্যাখ্যা করার যে চেষ্টা করিয়াছেন ইহা তাহার দ্বিতীয় ত্রুটি। তিনি ইহা সচেতনভাবেই করিয়াছেন। কারণ তাহা না হইলে তিনি যে তত্ত্ব দাঁড় করাইতে চাহিয়াছেন সেই তত্ত্ব যুক্তিতে টিকে না। এমনিভাবে তিনি আয়াতের পরিপ্রেক্ষিত ও সামগ্রিক অর্থকে অবহেলা করিয়া এবং একটি অংশমাত্র ব্যবহার করিয়া ও ইহার দ্বিতীয় অংশ, তাহার ব্যাখ্যার জন্য মারাত্মকরূপে ক্ষতিকারক, তাহা বাদ দিয়া কুরআন শরীফের বাক্য দ্বারাই তিনি তাহার সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী তত্ত্ব দাঁড় করাইতে চাহিয়াছেন যে, নবী করীম নিরক্ষর ছিলেন না। ওয়াট খেয়াল করেন নাই যে, তিনি যে ধারণার সৃষ্টি করিতে চাহিয়াছেন যে, নবী করীম কয়েকজন সাহায্যকারী বা সচিবের সহায়তায় ওহীর বাণী রচনা করাইয়া লইয়াছিলেন, তাহার অর্থ কী দাঁড়াইয়া পারে। নবী করীম যদি সত্যই অপর কোন ব্যক্তিকে দিয়া উহা লিখাইয়া লইতেন তাহা হইলে তাহারাই তাহা সকলের নিকট প্রকাশ করিয়া দিত। কারণ তাঁহার নবুওয়াতের দাবির ভিত্তি ছিল সেই বাণী এবং তাহার ফলে সমগ্র জাতির নেতৃত্ব। মারগোলিয়থ সম্ভবত এই বিষয়ে সচেতন ছিলেন, তাই তিনি এই কথা বলেন নাই। এমনভাবে ওয়াট কুরআন শরীফের আয়াতের অপব্যাখ্যা করিয়া শেষে বলিতেছেন:
"মুহাম্মাদ ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রয়োজনে যতটুকু লেখাপড়া জানা আবশ্যক ততটুকু লেখাপড়া সম্ভবত জানিতেন। তবে নিশ্চিত সম্ভাবনা যে, তিনি কোন ধর্মগ্রন্থ পাঠ করেন নাই"। ওয়াট আরও বলেন যে, এই সিদ্ধান্ত "মুসলমান পণ্ডিতগণকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ করিয়া দিয়াছে"। ২৯
অতঃপর তিনি 'উম্মী' শব্দের ব্যাখ্যা করিয়াছেন। কুরআন শরীফে এই শব্দটি কয়েকবার আসিয়াছে। তিনি বলিতেছেন যে, মুসলমান পণ্ডিতগণ 'উম্মী' শব্দের অর্থ করেন, 'সম্পূর্ণ নিরক্ষর-লিখিতে ও পড়িতে না পারা'। কিন্তু তাহার মতে উম্মী অর্থ "যাহাদের লিখিত কিতাব নাই"। এই প্রসঙ্গে তিনি কুরআন শরীফের ২ঃ ৭৮, ৩: ২০, ৩৪ ৭৫ ও ৬২: ২ সংখ্যক আয়াতের উল্লেখ করিয়াছেন যে, উহার অর্থ একই অর্থাৎ উম্মী নবী বলিতে ইয়াহুদী নহেন, কিতাবহীন নবী। অর্থাৎ তিনি বাইবেল সম্পর্কে প্রত্যক্ষভাবে কিছু জানিতেন না।৩০ এই কথা বলিয়া তিনি সমাপ্তি টানিয়াছেন।
ওয়াটের ঘোষণার বক্রোক্তি যে, মুসলমান পণ্ডিতগণকে আত্মপক্ষ সমর্থন করার সুযোগ করিয়া দিয়াছে—এই বক্তব্যকে হয়তো তেমন গুরুত্ব না দিলেও চলে। তবে আসল কথা এই যে, মুসলমান বিশেষজ্ঞগণ 'উম্মী' শব্দের অর্থ কেবল অশিক্ষিত বা লেখাপড়া না জানা ব্যক্তি বুঝান না। প্রাচীন ও আধুনিক মুসলিম বিশেষজ্ঞ উভয় দলই স্পষ্ট ভাষায় জানাইয়াছেন যে, আলোচ্য শব্দ দ্বারা "ইয়াহুদী নন এমন এবং কিতাবী নহেন" ইহাও বুঝাইত। ৩১ ওয়াট অভিযোগ করিয়াছেন, মুসলিম বিশেষজ্ঞগণ "উম্মী" বলিতে কেবল একটি অর্থ বুঝাইয়াছেন। অথচ তিনি নিজে দেখাইতে চেষ্টা করিয়াছেন যে, কুরআন শরীফের সর্বত্র 'উম্মী' শব্দের একই অর্থ এবং তাহা 'ইয়াহুদী নহে ও কিতাবী নহে'।
কুরআন শরীফের ২ঃ ৭৮ আয়াত সম্পর্কে তিনি যে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করিয়াছেন তাহাও গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ সমগ্র বিবরণই ইয়াহূদী সম্প্রদায় সম্পর্কিত। অথচ তিনি সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় ইহাই বুঝাইতে চাহিতেছেন যে, "ভালভাবে পাঠ করিলে বুঝা যায় উহা দ্বারা যাহাদের কিতাব নাই তাহাদিগকে বুঝাইয়াছে"। ৩২ একটুখানি সতর্কতার সহিত আমরা যদি সেই আয়াত যথাযথ প্রেক্ষিতে পাঠ করি তাহা হইলে স্পষ্ট হইবে যে, তাহার বক্তব্য সত্য নহে। উক্ত আয়াত:
وَمِنْهُمْ أُمِّيُّونَ لَا يَعْلَمُونَ الْكِتَبَ إِلا أَمَانِي وَإِنْ هُمْ إِلا يَظُنُّونَ .
"তাহাদের মধ্যে এমন কতক নিরক্ষর লোক আছে যাহাদের মিথ্যা আশা ব্যতীত কিতাব সম্বন্ধে কোন জ্ঞান নাই; তাহারা শুধু অমূলক ধারণা পোষণ করে" (২ঃ ৭৮)।
ওয়াট আয়াতটির 'ইল্লা আমানিয়্যা' পর্যন্ত অনুবাদ দিয়াছেন, "তাহারা উম্মিয়্যূন যাহারা লোক-পরম্পরায় শোনা ব্যতীত কিতাব সম্পর্কে কিছুই জানে না" এবং 'ইল্লা আমানিয়্যা' অনুবাদ করিয়াছেন 'লোক-পরম্পরায় শোনা ব্যতীত'। ইহা পিকথলের অনুবাদ যাহা "যথেষ্ট বিতর্কিত, কিন্তু যুক্তির প্রতিকূল নহে”। পিকথলের উদ্ধৃতি দিয়া ওয়াট বলেন যে, কিতাবের অনুবাদ হওয়া উচিৎ আসমানী কিতাব। ৬৩
ওয়াটের বক্তব্য সঠিক যে, পিকথলের 'ইল্লা আমানিয়্যা'-র ভাষান্তর 'যথেষ্ট বিতর্কিত'। প্রকৃতপক্ষে উহা সঠিক নহে; কারণ কোন মানসম্পন্ন অভিধানে উহার অনুরূপ অর্থ করা হয় নাই। সাধারণভাবে ইহার অর্থ 'বাসনা' বা 'খেয়াল' অথবা অনুরূপ ভাব প্রকাশক শব্দ। কিন্তু ওয়াট যদি আল্লামা ইউসুফ আলীর ১৯৩৪ সালে প্রথম প্রকাশিত কুরআন শরীফের ইংরাজি অনুবাদ বিবেচনা করিতেন তাহা হইলে দেখিতে পাইতেন যে, সেই অনুবাদে ইহার অর্থ 'বাসনা' করা হইয়াছে। পিকথলের অনুবাদের মাত্র চার বৎসর পর উহা প্রকাশিত হইয়াছিল। এমনকি এ.জে. আরবারি উহার অর্থ দিয়াছেন 'কল্পনা'। ৩৪ মনে হয় ওয়াট ইচ্ছা করিয়াই পিকথলের অনুবাদ গ্রহণ করিয়াছেন। কারণ তাহা হইলে তিনি যে ব্যাখ্যা দিতে চান তাহা দেওয়া যায়। 'উম্মিয়্যূন' অর্থ 'যাহাদের কিতাব নাই'-এই ভাষ্যটি তাহার মনের মত ভাষ্য। আমানিয়্যা-র বিতর্কিত অর্থ ব্যতীত আয়াতটি ওয়াট যে উম্মিয়্যূন-এর ব্যাখ্যা দিতে চান তাহা সমর্থন করে না। সমগ্র আয়াত সে কালে ইয়াহুদীরা যে আচরণ করিয়াছিল তাহার বিবরণের প্রেক্ষিতে উপস্থাপিত। আয়াত ৭৬-এ তাহারা যে ওহী লাভ করিয়াছিল সেই ওহীর গুরুত্বপূর্ণ অংশ তাহারা নিজেরাই গোপন করিয়াছিল বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। সেখানে তাহাদিগকে সতর্ক করিয়া আয়াত ৭৭-এ বলা হইয়াছে: "তাহারা কি জানে না যে, যাহা তাহারা গোপন রাখে কিংবা ঘোষণা করে নিশ্চিতভাবে আল্লাহ তাহা জানেন"? অতঃপর আয়াত ৭৮ আরম্ভ হইতেছে এইরূপে, "তাহাদের মধ্যে এমন কতক....", তারপর বিবরণ বর্ণিত হইতেছে, অতঃপর পরবর্তী ৭৯ আয়াতে তাহারা নিজেরাই যে রচনা করিয়া ওহী বলিয়া চালাইতেছে তাহার বর্ণনা করা হইয়াছে। এমনিভাবে তাহারা যে আল্লাহ্‌র ওহী লইয়া ‘আমানিয়্যা’ বা যাহা ইচ্ছা তাহা করে, বিশ্লেষণ করা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে এই বর্ণনা এবং সতর্ক করা ৮২ আয়াত পর্যন্ত চলে। স্পষ্টতই ৭৮ আয়াতে ইয়াহুদীদের উম্মিয়্যূন সম্পর্কেই বলা হইয়াছে অর্থাৎ তাহাদের মধ্যে যাহারা অজ্ঞ ও বে-খবর তাহাদের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে। যদি আরব বা কিতাবী নহে এমন কাহাকেও বলা হইত তাহা হইলে ‘ওয়া মিনহুম )ومنهم( তাহাদের মধ্যে এমন কতক’.... কথা অপ্রাসঙ্গিক হইত। কারণ ‘আরব ও অন্যান্য’ যাহারা ইয়াহুদী নহে তাহারা সকলেই ছিল কিতাবহীন। পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা না করিয়া যদি কেবল নিছক আয়াতটিকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা হয় তাহা হইলেও ওয়াটের ব্যাখ্যার সঙ্গে আয়াতের কোন সঙ্গতি পাওয়া যায় না।
ওয়াটের মনমত ইংরাজি সমার্থক প্রতিশব্দ ব্যবহার করিয়াও আয়াতের যে অনুবাদ হয় তাহা এইরূপঃ "তাহাদের মধ্যে এমন কতক লোক যাহারা অ-কিতাবী এবং কিতাব কী ‘আমানিয়্যা’ ছাড়া, তাহা তাহারা জানে, না।” ইহা অর্থহীন অভিযোগ যে, অ-কিতাবী লোকেরা জানে না যে, কিতাব কি! অ-কিতাবী লোকেরা কিতাব সম্পর্কে অজ্ঞ হইবে ইহাই স্বাভাবিক। এমন বক্তব্য কেবল নির্বোধরাই পেশ করিতে পারে। তাহার এই ব্যাখ্যা যে কত অদ্ভুত ও উদ্ভট হইতে পারে তাহা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যখন আয়াতের শেষ অংশ আমরা বিবেচনা করি। এই অংশ তিনি যেন সচেতনভাবে অনুল্লেখ করিয়া অগ্রসর হইয়াছেন। শেষ অংশে রহিয়াছে পাঁচটি শব্দ )وان هم الا يَظُنُّونَ( "এবং তাহারা অনুমান ব্যতীত আর কিছুই করে না”। এই বাক্যাংশটি সতর্ক বার্ণীর সঙ্গে সংযুক্ত ও তাহারই ধারাবাহিকতায় বলা হইয়াছে এবং পূর্ববর্তী আয়াতে যে ‘আমানিয়্যা’ শব্দ ব্যবহৃত হইয়াছে সেই শব্দেরই ব্যাখ্যামূলক অবস্থা। অতএব আয়াতের এই শেষাংশের উম্মিয়্যূন শব্দের অর্থ যদি ধরা হয় ‘যে জনগোষ্ঠী কিতাব লাভ করে নাই’ তাহা হইলে আলোচ্য বক্তব্যের মধ্যে সতর্ক করার যে শক্তি থাকা আবশ্যক তাহা পাওয়া যায় না এবং কোন কার্যকর বক্তব্য বলিয়াও মনে হয় না। কারণ তাহা হইলে তাহারা যদি কিতাবে কি আছে তাহা লইয়া জল্পনা-কল্পনা করিয়াও থাকে তবে তাহাদিগকে দোষ দেওয়া যায় না। যদি আয়াতের আলোচ্য অংশকে আমরা পৃথকভাবে বিবেচনা করি অথবা সামগ্রিক পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করি তাহা হইলেও উহার অর্থ একই যে, ‘তাহাদের মধ্যে’ অর্থাৎ ইয়াহুদীদের মধ্যে যাহারা কিতাব সম্পর্কে অজ্ঞ অর্থাৎ যে ইয়াহুদীগণ নিজেদের কিতাব সম্পর্কে অবহিত নয় তাহাদের লইয়াই সমগ্র আলোচনা চলিতেছিল। তাহারা নিজেদের কিতাবও যত্ন সহকারে পাঠ করে না, খেয়াল-খুশিমত অনুসরণ করে এবং অনুমানের উপর নির্ভর করিয়া চলে। কেবল তাহাই নহে, তাহারা নিজেদের তৈরী বক্তব্যকে আল্লাহ্‌ কিতাবের বাণী বলিয়া চালায় যেমন পরবর্তী ৭৯ আয়াতে সেই কথাই উল্লেখ করা হইয়াছে। উম্মিয্যূন বলিতে যাহাদের কথা বলা হইয়াছে তাহারা যদি কিতাবহীন জনগোষ্ঠী হইয়া থাকে তাহা হইলে এই পরবর্তী আয়াতের বক্তব্যও অর্থহীন বিবেচিত হইবে। কারণ ওই সকল লোকের ক্ষেত্রে প্রশ্নই ওঠে না যে, তাহারা কোন কিছুকে কিতাবের বাণী বলিয়া প্রচার করিত।
ওয়াট মনে করেন যে, উম্মী কথাটির উৎপত্তি হইয়াছে হিবরু 'উম্মত হা ওলাম' কথা হইতে যাহার অর্থ বিশ্বের অ-ইয়াহুদী জনগোষ্ঠী। হয়ত তাহা সঠিক হইতে পারিত; কিন্তু বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন, ইহা আরবী শব্দ 'উম্ম' হইতে আসিয়াছে যাহার অর্থ মাতা। অতএব উম্মী অর্থ হইতেছে যাহার কোন অর্জিত জ্ঞান নাই, সে কেবল মাতৃক্রোড়ে যে জ্ঞান লাভ করিয়াছে তাহাই তাহার একমাত্র জ্ঞান। যাহা হউক, ইহা অনেকাংশে নিশ্চিত যে, ইয়াহুদীগণ যাহারা ইয়াহুদী নহে তাহদিগকে উম্মীয্য অথবা কিতাবহীন জাতি বলিত। তাহারা অবজ্ঞাপূর্ণভাবে ইহা বলিত, কারণ অন্যান্য লোকদের বা জাতির কোন আসমানী কিতাব ছিল না। অতএব তাহারা সকলেই জ্ঞান বিবর্জিত, অশিক্ষিত, মূর্খ, এক কথায় অজ্ঞ। এমনিভাবে ইয়াহুদীদের আচরণেও শব্দটির অর্থ অশিক্ষিত অথবা অজ্ঞ। এই প্রসঙ্গে স্মরণ করা যাইতে পারে যে, প্রাচীন গ্রীকরা যাহারা গ্রীক নয় তাহদিগকে অসভ্য বর্বর জাতি বলিয়া অভিহিত করিত। এই শব্দের অর্থ শুধু গ্রীক নহে এমন নয়, বরং মূলত এমন এক ব্যক্তিকে বুঝাইত যে সভ্যতা ও সংস্কৃতির অঙ্গনের বাইরের লোক এবং এই পরবর্তী কালের অর্থই টিকিয়া থাকিল এবং মূল অর্থ বাদ পড়িল।
অনুরূপভাবে অন-আরবগণকে আরবরা আজামী বলিয়া থাকে। তাহার অর্থ, যে ব্যক্তি সহজভাবে আপন বক্তব্য প্রকাশ করিতে পারে না। প্রকৃত আরব শব্দের অর্থ এক সময় ছিল যে ব্যক্তি সাবলীলভাবে আপনাকে প্রকাশ করিতে পারে। পরবর্তী কালে আ'জাম শব্দের এই অর্থ আর রহিল না, তাহার পরিবর্তে 'আজম শব্দের অর্থ দাঁড়াইল অনারব বা বিদেশী। অনুরূপভাবে প্রাচীন কালে হিন্দুগণ যাহারা আর্য নহে তাহাদিগকে যবন বলিত। কিন্তু পরবর্তী কালে যবন শব্দের অর্থ হইল কেবল 'আর্য নহে' এমন জাতি নহে, বরং অহিন্দু, বিশেষত মুসলমান। এইভাবে আমরা বুঝিতে পারি যে, বহু শব্দ আছে যাহার মূল অর্থ লুপ্ত হইয়া যায় এবং তাহার পরিবর্তে নূতন অর্থ অর্জন করে এবং ক্রান্তিকালে দুইটি অর্থই বিদ্যমান থাকে। ইহা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, যখন কুরআন শরীফ নাযিল হইয়াছিল সেই সময় উম্মী শব্দটির দুইটি অর্থই চালু ছিল। সেই কারণে কুরআন শরীফে উম্মী শব্দটি দুইটি অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে। অতএব প্রকৃত অর্থ অনুধাবন করিতে হইলে শব্দটি কোন প্রেক্ষিতে কোথায় কিভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে তাহা বিবেচনা করিয়া অনুধাবন করিতে হইবে। সেই সঙ্গে আরও একটি বিষয় আমরা সকলেই জানি যে, প্রত্যেক ভাষায় এইরূপ বহু শব্দ রহিয়াছে যাহার অর্থ একাধিক এবং সেই অর্থ বুঝিতে হইলে শব্দটি কোন প্রেক্ষিতে কোন অবস্থায় ব্যবহৃত হইয়াছে তাহাও বিবেচনায় আনিতে হইবে।
উপরে দেখানো হইয়াছে যে, উম্মী শব্দটি ২ঃ ৭৮ আয়াতে নিশ্চিতভাবে 'অশিক্ষিত' অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। কুরআন শরীফের আরও পাঁচ জায়গায় শব্দটি আসিয়াছে, যেমন ৩: ২০, ৩ঃ ৭৫ এবং ৬২: ২ আয়াতে শব্দটি বহুবচনরূপে আসিয়াছে এবং অভিযোগের আকারে আসিয়াছে। প্রতিটি স্থলে শব্দটির অর্থ অশিক্ষিত' ধরা যাইতে পারে, আবার অজ্ঞ জাতি হিসাবেও ধরা যাইতে পারে অথবা যাহাদের কিতাব নাই সেই অর্থেও ধরা যাইতে পারে। অপর দুইটি ক্ষেত্রে, যথা ৭: ১৫৭ এবং ৭: ১৫৮ আয়াতে শব্দটির একবচন ব্যবহৃত হইয়াছে এবং পয়গাম্বরের বিশেষণ হিসাবে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহার প্রতিটি ক্ষেত্রেই ইহা দ্বারা একজন লেখাপড়া না জানা ব্যক্তিকে বুঝানো হইয়াছে। কোন প্রকারেই ইহা দ্বারা কিতাবহীন ব্যক্তি অথবা ইয়াহুদী নহে এমন ব্যক্তি বুঝানো হয় নাই। আমরা যদি আয়াতের সংশ্লিষ্ট অংশ পাঠ করি তাহা হইলেই ইহা সুস্পষ্ট হইবে।
الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مُكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَة وَالْإِنْجِيلِ ... فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أَوْلَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
"যাহারা অনুসরণ করে উম্মী নবীর, যাহার উল্লেখ তাওরাত ও ইনজীল, যাহা তাহাদের নিকট আছে, তাহাতে লিপিবদ্ধ পায়... সুতরাং যাহারা তাহার প্রতি ঈমান আনে, তাহাকে সম্মান করে, তাহাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাহার সঙ্গে অবতীর্ণ হইয়াছে উহার অনুসরণ করে তাহারাই সফলকাম" (৭: ১৫৭)।
قُلْ لِأَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ الله إِلَيْكُمْ جَمِيعًا ... فَأَمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولُهُ النَّبِيِّ الْأُمِّيِّ الَّذِي يُؤْمِنُ بِالله وَكَلِمَته وَاتَّبِعُوهُ لَعَلَّكُمْ تَهْتَدُونَ
"বল, হে মানুষ! আমি তোমাদের সকলের জন্য রাসূল... সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্ প্রতি ও তাঁহার বার্তাবাহক উম্মী নবীর প্রতি যে আল্লাহ ও তাঁহার বাণীতে ঈমান আনে এবং তোমরা তাহার অনুসরণ কর যাহাতে তোমারা সঠিক পথ পাও" (৭: ১৫৮)।
এই দুইটি আয়াতের দুইটি বিষয়ের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা প্রয়োজন। সর্বপ্রথম দেখা যাইতেছে, প্রথম আয়াতে গুরুত্ব প্রদান করা হইতেছে যে, নবী করীম -কে আল্লাহ্ রাসূল হিসাবে ইয়াহুদীদের নিকট এবং একই সঙ্গে খৃস্টানদের নিকট প্রেরণ করা হইয়াছে যাহার বিষয়ে তাওরাত ও ইনজীল কিতাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। দ্বিতীয় আয়াতে বলা হইয়াছে যে, তাঁহাকে বিশ্বের সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রেরণ করা হইয়াছে। ইহা আয়াত দুইটির প্রধান গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়ায় তিনি জাতিগতভাবে আরব ছিলেন কিনা অথবা তিনি ইয়াহুদী বংশ উদ্ভূত ছিলেন না তাহা বিবেচনায় আনার কোনই প্রয়োজন নাই। প্রকৃতপক্ষে ইহা হইবে আত্মহননকারী বক্তব্য যে, অ-ইয়াহুদী ও অ-কিতাবধারী এক রসূলকে ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের প্রতি প্রেরণ করা হইয়াছিল যাহাদের নিকট কিতাব ছিল, বরং অবিশ্বাসিগণের বারংবারের অভিযোগ যে, হযরত মুহাম্মাদ ওহী হিসাবে যাহা প্রচার করিতেছিলেন উহা তাঁহার নিজের তৈরী রচনা এই কথা স্মরণে রাখিয়া এবং এই সত্যও স্মরণ রাখিয়া যে, উহা বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উদ্দেশে আবেদন হিসাবে করা হইয়াছিল যাহাতে সেই অভিযোগ খণ্ডন করা যায়। বিষয়টি এইভাবে সাজানোই ছিল একান্ত স্বাভাবিক। দ্বিতীয়ত, দুইটি আয়াতই পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে এই কথাই বলে যে, পয়গম্বরের নিকট কিতাব নাযিল হইয়াছে এবং এই কথা তিনি নিজে যেমন বিশ্বাস করেন (ٱلَّذِي يُؤْمِنْ بِاللَّهِ وَكَلِمَتِهٖ) তেমনি তাঁহার শ্রোতাগণকে তিনি বিশ্বাস করিতে বলেন।
(وَاتَّبِعُوا النُّوْرَ الَّذِيْٓ اُنْزِلَ مَعَهٗ)
নিরক্ষর এবং তাঁহাকে কেহ পড়াইয়া দেয় নাই, তিনি 'অ-ইয়াহুদী ও অ-কিতাবী' ছিলেন কখনও এই অর্থ নহে। তিনি নিজেই যখন বিশ্বের সকল মানুষকে মক্কাবাসী, আরববাসী, ইয়াহুদী ও খৃস্টান সকলকেই বিশ্বাস করিতে বলিতেছেন যে, তিনি কিতাব লাভ করিয়াছেন, তাঁহার নিকট ওহী নাযিল হইয়াছে, সেই ক্ষেত্রে পয়গাম্বরকে 'অ-কিতাবী বলা সম্পূর্ণ পরস্পর বিরোধী। যেখানে তিনি আল্লাহ্র নিকট হইতে আসমানী কিতাব লাভ করিয়াছেন তাঁহার এই দাবিই বিশ্বাস করা হইবে কি না তাহাই হইতেছে মূল আলোচ্য বিষয়, সেই স্থলে তিনি বলিতে পারেন না যে, তিনি একজন কিতাবহীন পয়গাম্বর।
আলোচ্য শব্দের যে অর্থই দেওয়া হউক না কেন, এই প্রসঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করিতে হইবে যে, নবী করীম নিরক্ষর ছিলেন, তাহার প্রমাণস্বরূপ এই আলোচ্য শব্দই কেবল কুরআনের একমাত্র প্রমাণ নহে। ইতোমধ্যে আমরা দেখিয়াছি যে, কুরআন শরীফে এইরূপ অনেকগুলি আয়াত রহিয়াছে যেগুলি অবিশ্বাসিগণের বিভিন্ন সময়ে উত্থাপিত অভিযোগের উত্তরে বলা হইয়াছে যে, মহানবী মোটেই লিখিতে বা পড়িতে জানিতেন না, যে কারণে অবিশ্বাসিগণ তাহাদের আক্রমণের ধারা এই কথা বলিয়া পরিবর্তিত করিয়াছিল যে, তিনি যে ওহী প্রচার করিতেন উহা অপর কেহ লিখিয়া তাঁহাকে শুনাইত।৩৫
বিষয়ান্তরে যাইবার পূর্বে একটি উল্লেখযোগ্য বক্তব্য স্মরণ করা যায় যে, ওয়াট তাহার আলোচনার সূত্রপাতকালে বলিয়াছিলেন যে, "পরবর্তী কালের অধিকাংশ মুসলমান এই বলিয়া যুক্তি প্রদর্শন করেন যে, কুরআন অনেক বেশী অলৌকিক। কারণ মুহাম্মাদ লিখিতে বা পড়িতে সক্ষম ছিলেন না"...।৩৬ এই কথার উত্তরে সঙ্গে সঙ্গে বলা যায় যে, কুরআনের অলৌকিকতা প্রমাণের জন্য 'পরবর্তী কালের অধিকাংশ মুসলমান এই বলিয়া যুক্তি প্রদর্শন' করেন বলিয়াই মুসলমানগণ মনে করে না মহানবী নিরক্ষর ছিলেন বরং কুরআন নিজেই স্পষ্টভাবে প্রমাণ করিয়াছে যে, তিনি নিরক্ষর ছিলেন এবং বারংবার বলিয়াছে যে, যদি কেহ সক্ষম হয় আগাইয়া আসুক এবং কুরআনের ন্যায় ছোট বা বড় সূরা রচনা করিয়া দেখাক যে, উহা কোন মানুষ রচনা করিতে সক্ষম।
ওয়াট যেভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিতে চান এবং কুরআনের বক্তব্যকে বিকৃত করিয়া বিপরীত অর্থকে যে প্রকারে প্রতিষ্ঠিত করিতে চান তাহাতে মনে হয় তিনি উহা করিবেনই। তিনি বলিতে চান যে, মহানবী কিছুটা হইলেও লিখিতে ও পড়িতে জানিতেন। ওয়াট উহার দ্বারা পরোক্ষভাবে এই কথাই বলিতে চান যে, কুরআন তেমন কোন অলৌকিক কিছু নহে। অতঃপর এইসব কঠিন আয়াসসাধ্য ব্যাখ্যা দিবার পর তিনি পরিশেষে বলেন, 'মুহাম্মাদ ব্যবসার প্রয়োজনে যথেষ্ট লেখাপড়া শিখিয়াছিলেন'। স্বাভাবিকভাবে ওয়াটের এই অনুমানের ক্ষেত্রে প্রশ্ন আসে: কাহারও পক্ষে কি ইহা সম্ভব বা স্বাভাবিক যে, মোটামুটি পড়া-লেখা ও অংক (তিনটি আর)-এর দক্ষতা লইয়া কেহ দীর্ঘ চল্লিশ বৎসর পর্যন্ত কোন কিছুই না করিয়া হঠাৎ আকস্মিকভাবে এইরূপ কিছু রচনা করিলেন যাহা সকলেই স্বীকার করেন 'আরবী সাহিত্যের চরম উৎকর্ষ'? ৩৭ দুর্ভাগ্যবশত ওয়াট নিজেকে প্রশ্ন করেন নাই, কোন জবাব দেওয়ার চেষ্টা করাতো দূরের কথা।
সবশেষে সাধারণভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ তত্ত্ব বিষয়ে দুই-একটি কথা বলা আবশ্যক। কারণ উহা মহানবী যে নিরক্ষর ছিলেন তাহার সহিত স্পষ্টতই সম্পর্কিত। একজন ধর্মনিরপেক্ষ ঐতিহাসিকের পক্ষে কোন একজন নেতার আবির্ভাব অথবা প্রকৃতপক্ষে যে কোন ঘটনার ব্যাখ্যা করা সত্যই কঠিন যদি না তিনি সেই সময়ের অবস্থা, পটভূমি ও প্রস্তুতি বিবেচনায় না আনেন, বিশেষ করিয়া ঘটনাটি যদি কোন ঐতিহাসিক চরিত্রকে কেন্দ্র করিয়া ঘটিয়া থাকে, সেই ঘটনা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে প্রকারেই হউক না কেন। এক অর্থে ইতিহাসের অপর একটি সমস্যার সহিত প্রশ্নটি জড়িত। প্রশ্নটি হইতেছে, ইতিহাস ব্যক্তিকে সৃষ্টি করে না কি ব্যক্তি ইতিহাস নির্মাণ করে সেই বিতর্কে জড়িত না হইয়াও এই কথা বলা চলে, বিশেষ করিয়া হযরত মুহাম্মাদ-এর সম্পর্কে যখন কিছু বলিতে হয় তখন অতি গুরুত্বের সঙ্গেই বলিতে হয়, তিনি কেবল একজন সাদামাটা ঐতিহাসিক চরিত্র বা ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন না। সর্বপ্রথম এবং প্রধানত তিনি ছিলেন একজন পয়গাম্বর, আল্লাহ্র একজন প্রেরিত পুরুষ। ইহা বিশ্বাসের বিষয় তাহাতে কোন সন্দেহ নাই; কিন্তু সেই বিশ্বাসকে অবজ্ঞা না করাই প্রয়োজন।
ঘটনা যখন এই প্রকার তখন হযরত মুহাম্মাদ-কে মূল্যায়ন করিতে হইলে কেবল বাঁধাধরা প্রচলিত ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের মানদণ্ড দ্বারা মূল্যায়ন করিলে পয়গম্বরের অনন্যসাধারণ মাত্রাকে ভুল বুঝার যথেষ্ট আশংকা থাকিয়া যায়। তিনি একজন ঐতিহাসিক চরিত্র হওয়া সত্ত্বেও তাঁহার এই 'অসাধারণত্ব' সম্পর্কে সচেতন হওয়া তাঁহার যথার্থ মূল্যায়নের জন্য একান্ত আবশ্যক। তিনি প্রকৃতই কোন প্রেরিত পুরুষ ছিলেন না অথবা 'পশ্চিমা জগতের' জন্য ইসলাম বিপদজনক এই সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য যে গবেষণা বা অধ্যয়ন তখন সেই অধ্যয়ন প্রকৃত প্রস্তাবে বিপ্রতিপত্তিকতায় পরিভ্রষ্ট হয়।
ইহা অবশ্যই স্বীকার করিতে হয় যে, একজন অমুসলিম বিশ্বাস করিতে জ্ঞানত বাধ্য নহে যে, হযরত মুহাম্মাদ একজন আল্লাহ প্রেরিত রাসূল। কিন্তু যখন কোন অধ্যয়ন আপন স্বীকারোক্তি অনুযায়ী প্রধানত পরিচালিত হয় যে, তিনি প্রেরিত ছিলেন না অথবা ইহা প্রদর্শন করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়, যে পশ্চিমা সভ্যতার জন্য ইসলাম একটি বিপদজনক বিষয়, সেই ক্ষেত্রে গবেষকের বিপরীত ইচ্ছা থাকিলেও তাহা নিরপেক্ষ হয় না। ওয়াট সেইরূপ ইচ্ছাই প্রদর্শন করিয়াছেন। Mohammad at Mecca (মক্কা নগরীতে মুহাম্মাদ) নামক গ্রন্থ লিখিতে গিয়া তিনি একজন স্বঘোষিত খৃস্টান হিসাবে বলেন, "ইসলামের সঙ্গে খৃস্ট ধর্মের যে সম্পর্ক সেই সম্পর্কের ভিত্তিতে একজন খৃস্টান মুহাম্মাদ-এর প্রতি এক প্রকার দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করিবে আর সেই দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তি হইবে ধার্মিক আদর্শ"। কিন্তু তিনি 'ধর্মীয় প্রশ্নে' চেষ্টা করিয়াছেন নিরপেক্ষতা বজায় রাখিতে। তিনি দাবি করিয়াছেন যে, তিনি সর্বপ্রথম ঐতিহাসিকের প্রতি তাহার দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করিয়াছেন যে, তাহার গবেষণায় তিনি খৃস্টানদের নিকট ঐতিহাসিক তথ্য উপস্থাপন করিয়াছেন যাহা ইসলামের প্রতি ধর্মীয় বিচারে বিবেচিত হইবে। ৩ তিনি বলিয়াছেন যে, তিনি ধর্মীয় বিষয়ের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা বজায় রাখিবেন, কিন্তু সেই নিরপেক্ষতা সর্বত্র রক্ষা করিতে পারেন নাই। মহানবী-এর জীবনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করিতে গিয়া সর্বত্রই তাহার দুইটি উদ্দেশ্য স্পষ্টতই পরস্পর বিরোধী ছিল। তিনি ঐতিহাসিক আদর্শকে ইভানজেলিস্টের বেদীতে বিসর্জন দিয়াছেন।
হযরত মুহাম্মাদ-এর 'আসাধরণত্ব' স্বীকার করার অর্থ এই নহে যে, তাঁহার জীবনকে সমালোচনা ও ঐতিহাসিকের দৃষ্টিতে অধ্যয়ন করা যাইবে না। ইহার অর্থ প্রকৃত তথ্যের প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বস্ত থাকার প্রতি গুরুত্ব প্রদান করা এবং কোন প্রকারেই মূল পাঠকে বিকৃত না করার চেষ্টা করা অথবা মূল পাঠকে প্রকৃত বিষয় হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া ভুল ব্যাখ্যা না করা। ইহার অধিকতর স্পষ্ট অর্থ হইতেছে—সম্পূর্ণ পরিষ্কার সাক্ষ্য-প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কোন প্রকার অনুমান নির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা। অন্যরূপ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত 'অপরাধী নহে' ধরিয়া লইতে হইবে; এইরূপ নহে যে, অন্যরূপ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত 'অপরাধী' ধরিয়া লইতে হইবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00