📄 তিন: খাদীজা (রা)-র সহিত মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর বিবাহ প্রসঙ্গে
খাদীজা (রা)-র সহিত মহানবী-এর বিবাহ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মন্তব্য তিনটি বিষয়ে কেন্দ্রীভূত: (ক) খাদীজা (রা)-কে বিবাহ করার পিছনে মহানবী-এর উদ্দেশ্য; (খ) বিবাহের সময় খাদীজা (রা)-র বয়স এবং (গ) যে পদ্ধতিতে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
মহানবী -এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রধান কটাক্ষ করিয়াছেন মার্গোলিয়থ। তাহার অভিযোগ, মহানবী তাঁহার বয়স পঁচিশ বৎসরে উন্নীত হওয়া পর্যন্ত বিবাহ করিতে বিলম্ব করেন। কারণ তিনি একজন বিচক্ষণ ও উচ্চাভিলাষী ব্যক্তি ছিলেন এবং বিবাহের মাধ্যমে নিজের বস্তুগত অবস্থান উন্নয়নের জন্য অপেক্ষায় ছিলেন। এই প্রসঙ্গে মার্গোলিয়থ শুধু মহানবী -এর তীব্র নিন্দাই করেন নাই, বরং সাধারণভাবে সমগ্র আরবজাতির নিন্দা করিয়াছেন তাহাদের কথিত কামাসক্তির জন্য। তাহার ভাষায়, "মুহাম্মাদ, যদিও সেই কামাসক্তিতে অংশীদার ছিলেন যে সম্পর্কে তালমুদ যথার্থই বলিয়াছে যে, উহার নয় ভাগ আরবজাতিকে দেওয়া হইয়াছে এবং কেবল একভাগ অবশিষ্ট পৃথিবীকে প্রদান করা হইয়াছে, যতক্ষণ বিবাহের মাধ্যমে নিজের অবস্থার উন্নতি করিতে সক্ষম না হন ততক্ষণ পর্যন্ত বিবাহের জন্য অপেক্ষা করিয়াছিলেন"। ২৫
উপরে উল্লিখিত বক্তব্য এক জ্বলন্ত বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য। ইহা স্বীকৃত সত্য যে, খাদীজা (রা) একজন অতি ধনশালী মহিলা ছিলেন এবং মহানবী -এর বস্তুগত অবস্থান এই বিবাহের ফলে নিঃসন্দেহে উন্নত হইয়াছিল। ইহার সত্যতা কুরআন কর্তৃক স্বীকৃত। ইহাও সত্য যে, খাদীজা (রা)-র প্রতিনিধি নাফীসা যখন মহানবী -কে তখনও পর্যন্ত বিবাহ না করার কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করিলেন তখন তিনি সরল মনে জানাইলেন, বিবাহিত জীবনের দায়িত্ব পালনে তাঁহার অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কথা। কিন্তু এই সত্যগুলিকে বিকৃত করিয়া এইরূপ অভিমত ব্যক্ত করা যায় না যে, তিনি একজন সম্পদশালী মহিলাকে, তিনি খাদীজা (রা)-ই হউন কিংবা অন্য কেহ, বিবাহ করার মাধ্যমে তাঁহার অর্থনৈতিক অবস্থা উন্নয়নের পরিকল্পনা করিয়াছিলেন। তিনি যে তাঁহাকে বিবাহ করিবার স্বপ্ন দেখেন নাই তাহা ইহা হইতে স্পষ্ট যে, সকল উৎসই এই ব্যাপারে একমত যে, মহানবী নহেন, বরং খাদীজা (রা) নিজেই এই বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন এবং বিবাহের প্রস্তাব দিয়াছিলেন। দ্বিতীয়ত, প্রতিনিধি নাফীসার বক্তব্যে দেখা যায়, মহানবী নিঃসন্দেহে বিস্মিত হইয়াছিলেন যখন তিনি (নাফীসা) প্রস্তাবিত কণে হিসাবে খাদীজা (রা)-র নাম প্রকাশ করেন। নাফীসার কথা শুনিয়া মহানবী মন্তব্য করিয়াছিলেন, "তাহা আমার জন্য কি করিয়া হইতে পারে?" অবশেষে তিনি নাফীসাকে বিষয়টি লইয়া অগ্রসর হইতে তাঁহার সম্মতি দান করেন কেবল যখন নাফীসা ইহা স্পষ্ট করেন যে, তিনি স্বয়ং খাদীজা (রা)-র নির্দেশেই এই কাজ করিতেছেন। ২৬ এই সকল অকাট্য তথ্য খাদীজা (রা)-র ন্যায় কোন সম্পদশালী মহিলাকে বিবাহ করিয়া নিজের বস্তুগত অবস্থা উন্নয়নের মহানবী -এর পূর্ব পরিকল্পনার ধারণা নাকচ করিয়া দেয়।
একইভাবে মহানবী -এর সহিত বিবাহের সময় খাদীজা (রা)-র বয়স সম্পর্কে সংশয় সৃষ্টির কারণ অগ্রহণযোগ্য। মার্গোলিয়থ লিখিয়াছেন, "তিনি (খাদীজা) মুহাম্মাদ অপেক্ষা কয়েক বৎসরের বড় ছিলেন, কিন্তু নিশ্চয়ই চল্লিশ বৎসর বয়সের ছিলেন না, যেরূপ মুহাম্মাদ -এর জীবনীকারগণ দাবি করেন। যদিও লোককাহিনীতে উল্লেখ আছে যে, কোন কোন বেদুঈন মহিলা তাহাদের সৌন্দর্য আশি কিংবা এমনকি এক শত বৎসর বয়স পর্যন্ত অটুট রাখে। আর কুরায়শ বংশীয় মহিলাগণকে একটি নিয়মের ব্যতিক্রম মনে করা হইত, যে নিয়ম অনুসারে ষাট বৎসর বয়সের পর মহিলাদের পক্ষে সন্তান ধারণ অসম্ভব”। ২৭ এবং তাহার প্রায় প্রতিধ্বনি করিয়া ওয়াট বলেন, "খাদীজার বয়স সম্ভবত অতিরঞ্জিত করা হইয়াছে। তাঁহার গর্ভে মুহাম্মাদ -এর ঔরসে জন্মগ্রহণকারী সাতজন সন্তানের নাম উৎসসমূহে উল্লেখ করা হইয়াছে... এমনকি যদি, যেরূপ ইবন সা'দের কোন এক উৎস বলিয়াছে, তাহারা নিয়মিত এক বৎসর অন্তর অন্তর জন্মগ্রহণ করিয়া থাকে তাহা হইল সর্বশেষজনের জন্মের পূর্বে তাঁহার (খাদীজার) বয়স হয় আটচল্লিশ বৎসর। ইহা কোনক্রমেই অসম্ভব নহে, তবে যে কেহ ইহাকে মন্তব্যের যোগ্য ভাবিতে যথেষ্ট অস্বাভাবিক মনে করিবে। ইহা এমনকি এইরূপ ব্যাপার যাহাকে অলৌকিক বলিয়া গণ্য করা যাইতে পারে। তাহা সত্ত্বেও ইবন হিশাম, ইবন সা'দ বা আত-তাবারীর পৃষ্ঠাসমূহে একটি শব্দ বা মন্তব্যও স্থান পায় নাই”। ২৮
সীরাত বিষয়ক পরবর্তী কালের কোন কোন গ্রন্থে অবশ্য মহানবী -এর সহিত খাদীজা (রা)-র বিবাহের সময় তাঁহার বয়স সম্পর্কে কিছু ভিন্নমত রহিয়াছে। ২৯ কিন্তু ইবন সা'দ ও আত-তাবারীর ন্যায় প্রাথমিক উৎসসমূহ সেই বর্ণনাকেই গ্রহণ করিয়াছে যেখানে উক্ত হইয়াছে যে, তিনি সেই সময় চল্লিশ বৎসর বয়সের ছিলেন। এই বিষয়ে সংশয় সৃষ্টির জন্য মার্গোলিয়থ ও ওয়াট কর্তৃক উত্থাপিত যুক্তি যে, 'সন্তান ধারণের জন্য বয়সসীমা' এবং তাঁহার বয়স "সম্ভবত অতিরঞ্জিত করা হইয়াছে" এই অনুমান উভয়টিই ভিত্তিহীন। মার্গোলিয়থ বলেন, ষাট বৎসর সন্তান ধারণের জন্য অস্বাভাবিক বিবেচিত হওয়া উচিত; কিন্তু সেই বয়সসীমা বর্তমান ক্ষেত্রে স্পষ্টতই প্রযোজ্য নহে। অপরপক্ষে ওয়াট এই সম্পর্কে মার্গোলিয়থকে সংশোধন করিতে চাহিয়াছেন বলিয়া মনে হয়। কিন্তু উহা করিতে গিয়া তিনিও (ওয়াট) কিছুটা ভুল করিয়াছেন। কারণ (যেরূপ তিনি করিয়াছেন) বাৎসরিক জন্মের ভিত্তিতে হিসাব করিলে সপ্তম শিশুর জন্ম তাঁহার (খাদীজার) বয়সের সাতচল্লিশতম বর্ষে হইয়া থাকিবে এবং আটচল্লিশতম বর্ষে নহে। কিন্তু তারপরও, কোন কোন মত অনুসারে, তাঁহার সন্তান সংখ্যা ছিল ছয়জন, তায়্যিব এবং তাহির উভয়ই এক ও অভিন্ন সন্তানের নামরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। ৩০ সুতরাং বয়সসীমা আরও এক বৎসর কম অর্থাৎ ছেচল্লিশ বৎসর হইবে। এমনকি কিছু বিরতি মানিয়া লইলে এবং ওয়াটের হিসাব গ্রহণ করিলে যে, তাঁহার সর্বশেষ সন্তান তাঁহার বয়সের আটচল্লিশতম বর্ষে জন্মগ্রহণ করিয়াছে, প্রাচীন বা আধুনিক যুগের কোন সুস্বাস্থ্যবতী মহিলার পক্ষেই উক্ত বয়সে সন্তান ধারণ সম্পূর্ণ অসম্ভব বা অস্বাভাবিক নহে। ৩১
ওয়াট নিজেই স্বীকার করিয়াছেন যে, ইহা "কোনক্রমেই অসম্ভব নহে”। তারপরও তিনি প্রমাণ করিতে চাহেন যে, এইরূপ ঘটনা "মন্তব্যের জন্য যথেষ্ট অস্বাভাবিক" এবং ইহা "এইরূপ ব্যাপার ছিল যাহাকে অলৌকিক হিসাবে গণ্য করা যাইতে পারে”। কিন্তু ইবন হিশাম, ইবন সা'দ এবং আত-তাবারী কোন মন্তব্য ব্যতীতই ইহার উল্লেখ করিয়াছেন। কটাক্ষ এই যে, এই প্রাথমিক মুসলিম পণ্ডিতগণ প্রতিটি অস্বাভাবিক ঘটনা আঁকড়াইয়া ধরিতে এবং উহাকে তাহাদের নবীর অলৌকিক কর্ম হিসাবে উল্লেখ করিতে আগ্রহী ছিলেন। তাঁহারা যদি প্রকৃতই প্রতিটি অস্বাভাবিক ঘটনাকে অলৌকিক কর্ম হিসাবে বিকৃত করার প্রবণতা সম্পন্ন হইতেন তাহা হইলে বর্তমান ক্ষেত্রেও নিশ্চিতভাবেই অনুরূপ করিবার প্রয়াস পাইতেন। আসলে এই ঐতিহাসিক অথবা তাহাদের উৎসসমূহ তাঁহার (খাদীজার) বয়স অতিরঞ্জিত করিতেন না যদি তদ্দ্বারা তাহাদের কোন স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্য না থাকিত। তাই তাহারা যে এই বিষয়ে কোন বিস্ময় প্রকাশ করেন নাই উহার অর্থ, একদিকে মায়ের আটচল্লিশতম বৎসর বয়সে সন্তান জন্মদান তাহারা আদৌ অস্বাভাবিক কিছু মনে করেন নাই এবং অন্যদিকে, তাঁহার বয়স অতিরঞ্জিত করেন নাই। কারণ তাহাদের অনুরূপ করার পশ্চাতে কোন উদ্দেশ্য ছিল না। স্পষ্টত প্রথমে উক্ত পণ্ডিতগণ খাদীজা (রা)-র বয়স অতিরঞ্জিত করিয়াছেন বলিয়া ধারণা করা এবং তারপর তাঁহার সন্তানের কথিত অস্বাভাবিক জন্ম সম্পর্কে তাহাদের নীরবতাকে অতিরঞ্জন অভিযোগের সপক্ষে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত নহে।
সর্বশেষে, যেভাবে বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় তৎসম্পর্কে। ডব্লিউ মুইর ওয়েইল (Weil) ও স্প্রেংগার (Sprenger) ৩২-এর অনুসরণে আল-ওয়াকিদী কর্তৃক এই বিষয়ে অপর কয়েকটি বর্ণনার সহিত উল্লিখিত একটি বর্ণনা গ্রহণ করিয়াছেন যেখানে উক্ত হইয়াছে যে, খাদীজা (রা) এই ভয়ে যে, তাঁহার পিতা খুওয়ায়লিদ প্রস্তাবিত বিবাহে সম্মত হইবেন না, একটি কৌশল অবলম্বন করেন। তিনি তাঁহার পিতার জন্য একটি বিরাট ভোজের আয়োজন করেন এবং যখন তাঁহার পিতা বেশ "মদোন্মত্ত উৎফুল্ল" হন তখন তাহাকে দিয়া "মহানবী এর চাচা হামযার উপস্থিতিতে" মহানবী-এর সহিত তাঁহার বিবাহ সম্পন্ন করান, আর যখন বৃদ্ধ লোকটি জ্ঞান ফিরিয়া পান তখন তিনি ক্রোধে ফাটিয়া পড়েন এবং বিবাহ বাতিল করিয়া দিতে উদ্যত হন। কিন্তু পরিশেষে যাহা হইয়াছে তাহা তাহাকে মানিয়া লইতে রাজী করান হয়। ৩৩
উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আল-ওয়াকিদী অন্যান্য বর্ণনার ভিত্তিতে বিবাহের বিবরণ দানকালে উপরিউক্ত বর্ণনা এই বলিয়া উল্লেখ করেন যে, ইহা ভ্রান্ত ও অনির্ভরযোগ্য বিবরণ। ৩৪ আত-তাবারীও একইরূপ করিয়াছেন অর্থাৎ তিনি ইহার উল্লেখ করিয়াছেন এবং তারপর এই বলিয়া নিজের মন্তব্য সংযোজন করিয়াছেন যে, ইহা অসত্য এবং অনির্ভরযোগ্য। ৩৫ উল্লিখিত মনীষীদ্বয় আরও উল্লেখ করিয়াছেন যে, খাদীজা (রা)-এর পিতা খুওয়ায়লিদ ফিজার যুদ্ধের পূর্বেই মারা যান এবং তাঁহার চাচা আমর ইব্ন আসাদ তাঁহার বিবাহে অভিভাবকত্ব করেন। আর যদিও ইবন ইসহাক প্রথমে বলিয়াছিলেন যে, খুওয়ায়লিদ তাঁহাকে বিবাহ দিয়াছেন, কিন্তু তিনি (ইবন ইসহাক) পরবর্তী সময়ে তাহার গ্রন্থে তাহার ভুল সংশোধন করেন এবং বলেন যে, 'আমর তাঁহাকে বিবাহ দিয়াছেন। ৩৬
আল-ওয়াকিদী, যাহাকে মুইর উক্ত বর্ণনার উৎস হিসাবে উদ্ধৃত করিয়াছেন, দ্ব্যর্থহীনভাবে উহাকে অসত্য ও অনির্ভরযোগ্য বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। অথচ মুইর এই সত্যটি গোপন করিয়া তাহার পাঠকদেরকে স্পষ্টভাবে বিভ্রান্ত করিয়াছেন। মুইর বলিতে চাহেন যে, তাহার ভাষায়, মুসলিম মনীষীদের তাহাদের নবীর প্রতি অসম্মানজনক প্রতিটি বর্ণনা গোপন করার প্রবণতা সত্ত্বেও যেহেতু বর্ণনাটি চালু হইয়া গিয়াছে, তাই উহাকে "সত্য বলিয়াই” গ্রহণ করিতে হইবে। ৩৭ এই বক্তব্যেও মুইর ভুল করিয়াছেন। মুসলিম মনীষিগণ মহানবী-এর প্রতি অসম্মানজনক কোন বর্ণনাই গোপন করেন নাই, অন্ততপক্ষে বর্তমানটি ত নহেই। বিপরীতক্রমে তাহারা মহানবী সম্পর্কে প্রাপ্ত প্রতিটি তথ্য সংরক্ষণের জন্য তাহাদের আগ্রহের কারণে, যাহা কিছু পাইয়াছেন তাহাই যত্নের সহিত লিখিয়া রাখিয়াছেন, কখনও কখনও কোন বিশেষ বর্ণনা সম্পর্কে তাহাদের নিজেদের মন্তব্য ও বক্তব্যও যোগ করিয়াছেন। বর্তমান ক্ষেত্রে আল-ওয়াকিদী ও আত-তাবারী ঠিক তাহাই করিয়াছেন।
মুইর যদি মহানবী-এর প্রতি যাহা কিছু অসম্মানজনক বলিয়া মনে হয় তাহার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনে ঈষৎ কম অনুরাগী হইতেন এবং যদি সমালোচনামূলক মন প্রয়োগ করিতেন তাহা হইলে তিনি খোদ বর্ণনাটিতেই উহার কৃত্রিমতার উপাদানসমূহ দেখিতে পাইতেন। কথিত হইয়াছে যে, খাদীজা (রা) তাঁহার পিতাকে মাতাল করিয়াছিলেন, তারপর একটি গরু যবেহ করিয়াছেন, বিবাহভোজের আয়োজন করিয়াছেন, মুহাম্মাদ-এর চাচা ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করিয়াছেন এবং বিবাহকার্য সম্পন্ন করিয়াছেন ইত্যাদি। এইরূপ একটি বিরাট আয়োজনের জন্য একটি সমগ্র রাত বা সমগ্র দিনের প্রয়োজন এবং ইহা দৃশ্যতই অকল্পনীয় যে, তাঁহার পিতা খুওয়ায়লিদ এত দীর্ঘ সময়ব্যাপী মদের প্রভাবাধীন ছিলেন। ইহাও অসম্ভব যে, তাঁহার ভাই ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন সম্পূর্ণ নীরব ছিলেন এবং তাঁহার কাজের প্রতি নীরব সমর্থন জানাইয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র ঘটনাটি এইরূপ অবাস্তব যে, ইহার কল্পনাই করা যায় না যদি আমরা একই সঙ্গে খাদীজা (রা) ও তাঁহার আত্মীয়-স্বজন কর্তৃক তাঁহার পিতার বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রের অনুমান না করি, যাহা উৎসসমূহে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। অধিকন্তু ইহাও সমভাবে অকল্পনীয় যে, মহানবী-এর চাচাগণ ও অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন, যাহারা সকল বর্ণনা মতেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, খুওয়ায়লিদের বাড়িতে তাহার আমন্ত্রণ ব্যতীত এবং কেবল তাহার কন্যার গোপন আহবানের ভিত্তিতে উপস্থিত থাকিবেন। সুতরাং এমনকি, যদি আল-ওয়াকিদী ঘটনাটির অনির্ভরযোগ্যতা সম্বন্ধে কিছু নাও বলিতেন তবুও উহার প্রতি সামান্য একটু সমালোচনামূলক দৃষ্টি উহার অসারতা প্রমাণে যথেষ্ট হইত।
আরও উল্লেখযোগ্য যে, বর্ণনাটির উৎপত্তি আবূ মিজলায (লাহিক ইবন হুমায়দ আদ-দাওসী) হইতে, যিনি একজন তাবিঈ ছিলেন এবং যিনি ১০৬ বা ১০৯ হি. সনে ইনতিকাল করেন। ৩৮ তিনি বলেন যে, খাদীজা (রা) তাহাকে বলিয়াছেন ইত্যাদি। আবূ মিজলায খাদীজার (রা)-র ইনতিকালের অনেক পরে জন্মগ্রহণ করে। সুতরাং তিনি কোনক্রমেই খাদীজা (রা)-র নিকট হইতে বর্ণনা শুনিতে পারেন না। কাজেই ঘটনাটি স্পষ্টরূপে পরবর্তী কালের বানানো এবং উহার উপর নির্ভর করা যায় না, যেরূপ ওয়াকিদী যথার্থই বলিয়াছেন।
📄 চার: মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ধর্মীয় বিশ্বাস প্রসঙ্গে
মহানবী-এর ওহী প্রাপ্তির পূর্ববর্তী সময়ের তাঁহার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী ও আচরণ সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের মন্তব্য আরও গুরুতর। বলা হইয়াছে যে, তিনি তাঁহার সমাজের অন্যদের মতই কম বা বেশী বহু ঈশ্বরবাদী ছিলেন এবং কিছু দেবতার উপাসনা বা তাহাদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করিতেন। এই অভিযোগ তাঁহার নবুওয়াত-পূর্ব যুগের ধর্মীয় অবস্থা সম্পর্কে পূর্বে উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের সম্পূর্ণ বিরোধী। ৩৯ এই অভিযোগ প্রধানত মার্গোলিয়থ করিয়াছেন, যদিও কিছু বিষয় তিনি তাহার পূর্বসূরীদের নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন, যেরূপ তাহার পরবর্তীগণ তাহার নিকট হইতে গ্রহণ করিয়াছেন। মার্গোলিয়থের যুক্তিসমূহ নিম্নরূপ:
(ক) "কিছু সংখ্যক শিশুর নাম হইতে দেখা যায় যে, তাহাদের পিতা-মাতা যখন তাহাদের নামকরণ করেন তখন তাহারা পৌত্তলিক ছিলেন। ৪০
(খ) "খাদীজাসহ তিনি (মহানবী) প্রত্যেক রাত্রে নিদ্রা গ্রহণের পূর্বে কোন এক দেবীর সম্মানে কিছু ঘরোয়া অনুষ্ঠান পালন করিতেন”। ৪১
(গ) "তিনি স্বীকার করিয়াছেন যে, তিনি এক সময় একটি ধূসর বর্ণের মেষ আল-'উযযার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ৪২
(ঘ) যিনি দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত মাংস অপছন্দ করিতে মুহাম্মাদ -কে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন তিনি ছিলেন একেশ্বরবাদী যায়দ ইবন 'আমর। ৪৩
(ঙ) যদিও মহানবী পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করিয়াছেন, কিন্তু “তৎপ্রতি তাঁহার সেইরূপ দৈহিক বিরোধিতা ছিল না যেরূপ প্রায়শ লোকদের থাকে। অন্যথায় কালো পাথর চুম্বন একটি অনুষ্ঠানে পরিণত হইত না যে জন্য তিনি শিরক হইতে বঞ্চিত হইয়া আকুল আকাঙ্খা পোষণ করিতেন এবং যাহা তিনি স্থায়ীভাবে বহাল রাখিয়াছিলেন”। ৪৪
প্রথম যুক্তি সম্পর্কে উল্লেখ্য যে, মার্গোলিয়থ উহার কোন প্রমাণ উল্লেখ করেন নাই অথবা তাহার উল্লিখিত গ্রন্থে উহার কোন বিশদ ব্যাখ্যাও প্রদান করেন নাই। যাহা হউক, বিষয়টি পরবর্তী একজন লেখক কর্তৃক পুনরুল্লিখিত হইয়াছে যিনি বক্তব্যের সমর্থনে প্রমাণ উল্লেখ করিয়াছেন। সুতরাং আমরা যখন বিষয়টি সম্পর্কে উক্ত লেখকের মতামত বিবেচনা করিব তখন এই প্রশ্নটি আলোচিত হইবে। ৪৫
(খ)-এ বর্ণিত যুক্তি সম্পর্কে উল্লেখ্য যে, মার্গোলিয়থ প্রমাণস্বরূপ মুসনাদের একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। ৪৬ কিভাবে এই বিশেষ হাদীছটির ভুল ব্যাখ্যা বা ভুল ব্যবহার করা হইয়াছে তাহা দেখার জন্য মূল হাদীছটি উদ্ধৃত করা প্রয়োজন, যাহা নিম্নরূপ:
حدثنا هشام يعنى ابن عروة عن أبيه قال حدثنى جار لخديجة بنت خويلد انه سمع النبي وهو يقول الخديجة اى خديجة والله لا اعبد اللات ابدا والله لا اعبد العزى ابدا قال فتقول خديجة خل اللات خل العزى قال كانت صنمهم التي كانوا يعبدون ثم يضطجعون
"হিশাম ইবন 'উরওয়াহ (র) হইতে তাহার পিতার সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদ (র)-এর জনৈক প্রতিবেশী আমার নিকট বর্ণনা করিয়াছেন যে, তিনি মহানবী -কে খাদীজাকে বলিতে শুনিয়াছেন: হে খাদীজা! আল্লাহর শপথ, আমি কখনও লাত-এর উপাসনা করি না, আল্লাহর শপথ, আমি কখনও উয্যার উপাসনা করি না।' তিনি (উক্ত প্রতিবেশী) বলেন, ইহাতে খাদীজা বলিলেন, 'সেই লাতের কথা ছাড়ুন, সেই 'উয্যার কথা ছাড়ুন'। তিনি (উক্ত প্রতিবেশী) বলিলেন, 'উহারা ছিল সেই সকল দেবতা, তাহারা (লোকেরা) রাত্রে নিদ্রা গ্রহণের পূর্বে যাহাদের উপাসনা করিত" (মুসনাদ আহমাদ, ৩খ., পৃ. ২২২, নং ১৮১১১; ৫খ., পৃ. ৩৬২, নং ২৩৪৫৫)।
ইহা স্পষ্ট যে, মার্গোলিয়থ হাদীছটির সর্বশেষ বাক্যের উপর তাহার ধারণার ভিত্তি রচনা করিয়াছেন। তবে ইহা করিতে গিয়া তিনি উক্ত বাক্যটি সঠিকভাবে বুঝিতে অসমর্থ হইয়াছেন অথবা ইচ্ছাকৃতভাবে ইহার বিকৃতি সাধন করিয়াছেন। ইহা স্পষ্ট যে, "উহারা ছিল সেই সকল দেবতা, তাহারা রাত্রে নিদ্রা গ্রহণের পূর্বে যাহাদের উপাসনা করিত" অভিব্যক্তিটিতে, যাহা খাদীজার প্রতিবেশীর উক্তি ছিল, সাধারণভাবে কুরায়শ জনগোষ্ঠীর অভ্যাসের কথা উল্লেখ করা হইয়াছে এবং মহানবী ও খাদীজা (রা)-র অভ্যাসের কথা আদৌ উল্লেখ করা হয় নাই। ইহা প্রসঙ্গ হইতেও এবং বাক্যটির প্রতি প্রযোজ্য ব্যাকরণগত নিয়ম হইতেও সুস্পষ্ট। প্রসঙ্গ সম্পর্কে উল্লেখ্য যে, বর্ণনাকারীর পক্ষে ইহা বলা যেরূপ তিনি বলিয়াছেন, বেমানান ও স্ব-বিরোধী হইবে যে, তিনি মহানবী কর্তৃক তাঁহার স্ত্রীকে বলিতে শুনিয়াছেন যে, তিনি কখনও মূর্তিপূজা করেন নাই এবং তারপর একই সময়ে ইহা বলা যে, মহানবী ও তাঁহার স্ত্রী ঐ সকল মূর্তির পূজা করিতেন। প্রকৃতপক্ষে বর্ণনাকারীর এইরূপ উক্তি করার কোন কারণ নাই। তবে যদি তিনি মহানবী -এর বিরোধিতা ও তাঁহাকে অসম্মান করার কোন ইচ্ছা পোষণ করিয়া থাকেন তাহা হইলেই কেবল এইরূপ হইতে পারে যাহা বর্তমান ক্ষেত্রে বর্ণনাকারীর অভিপ্রায় ছিল বলিয়া ধারণা করা কল্পনারও অতীত।
ব্যাকরণগত নিয়ম প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, বাক্যটির শেষ অংশে তিনটি ক্রিয়াপদ রহিয়াছে কানু (كانوا), ইয়া'বুদূনা (يعبدون) ও ইয়াদতাজি'ঊনা (يضطجعون), সব কয়টিই দ্বি-বচনের পরিবর্তে বহুবচনরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। এই ক্রিয়াপদগুলি যদি আদৌ মহানবী ও তাঁহার স্ত্রীকে নির্দেশ করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হইত তাহা হইলে ঐগুলি অবশ্যম্ভাবীরূপে দ্বি-বচন আকারে ব্যবহৃত হইত অর্থাৎ কানা (کانا), ইয়া'বুদানে (یعبدان) ও ইয়াস্তাজি'আনে (يضطجعان), যেরূপ আরবী ব্যাকরণগত নিয়ম দাবি করে। ৪৯ অভিব্যক্তিটির স্পষ্ট অর্থ এই যে, বর্ণনাকারী মহানবী কর্তৃক তাঁহার স্ত্রীকে যাহা বলিতে শুনিয়াছেন তাহা বর্ণনা করার পর নিজের পক্ষ হইতে মূর্তিসমূহের বিবরণ এই বলিয়া সংযোজন করিয়াছেন যে, ঐগুলি সেই মূর্তি ছিল যাহাদেরকে "তাহারা" অর্থাৎ কুরায়শের লোকেরা রাত্রে শয্যা গ্রহণের পূর্বে উপাসনা করিত। আরও উল্লেখযোগ্য যে, তাহাদের মূর্তি বলিয়া মূর্তিগুলির বর্ণনাই অন্য কোন সিদ্ধান্তে পৌছিতে বারণ করে। কারণ এখানে উল্লিখিত দুইটি দেবতা মহানবী ও তাঁহার স্ত্রী কর্তৃক প্রবর্তিত ও অভিষিক্ত করা হয় নাই অথবা তাহারা (দুই দেবতা) একান্তভাবে মহানবী বা খাদীজা (রা)-র পরিবারেরও ছিল না। সেইজন্যই বর্ণনাকারী কোনভাবেই আলোচ্য দেবতাদেরকে তাহাদের অর্থাৎ মহানবী ও খাদীজা (রা)-র দেবতা বলিতে পারেন না। ব্যাকরণগত ও ভাষাগত উভয়ভাবেই অভ্রান্তরূপে সাধারণভাবে কুরায়শ লোকদের কথা বুঝান হইয়াছে। সুতরাং মার্গোলিয়থ তাহার অভিযোগের সমর্থনে যে দলীল পেশ করিয়াছেন উহা বিপরীত তথ্য প্রমাণ করে মাত্র। উহা হইতে দেখা যাইতেছে যে, মহানবী জোরের সহিত বলিতেছেন এবং তাহাও তাঁহার স্ত্রীর নিকট, যাঁহার নিকট তাঁহার অভ্যাস সম্পর্কে কোন কিছু লুকাইবার কোন কারণ ছিল না যে, তিনি কখনও দেবতার উপাসনা করেন নাই।
(গ)-এ প্রদত্ত তাহার বক্তব্য, যথা 'মহানবী একবার আল-উযযার উদ্দেশ্যে একটি ধূসর বর্ণের মেষ উৎসর্গ করার কথা স্বীকার করিয়াছেন'-এর সমর্থনে মার্গোলিয়থ জে. ওয়েলহৌসেন (J.Wellhausen)-এর Reste৪৮ প্রমাণস্বরূপ উল্লেখ করেন। এই শেষোক্ত পণ্ডিত প্রকৃতপক্ষে তাহার দাবি একটি বর্ণনার ভিত্তিতে করিয়াছেন যাহা ইয়াকৃতের গ্রন্থে এবং আবুল মুনযির (ইবনুল কালবী)-এর গ্রন্থেও উল্লিখিত হইয়াছে। ইয়াকৃত তাহার মু'জামুল বুলদান গ্রন্থে আল-উযযার বিবরণ দিতে গিয়া লিখিয়াছেন, "আবুল মুনযির বলিয়াছেন, আমরা শুনিয়াছি (وقد بلغنا) যে, মহানবী (আল্লাহ্ শান্তি ও করুণা তাঁহার উপর বর্ষিত হউক) তাহার (আল-উযযা) কথা একবার উল্লেখ করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন: আমি যখন আমার লোকদের ধর্ম পালন করিতেছিলাম তখন আমি আল-'উযযার উদ্দেশ্যে একটি ধূসর বর্ণের মেষ উৎসর্গ করিয়াছিলাম"। ইহা স্পষ্ট যে, ইয়াকৃত বর্ণনাটি আবুল মুনযিরের নিকট হইতে পাইয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে শুধু এই বর্ণনাটিই নহে, বরং ইয়াকৃত প্রদত্ত আল-'উযযার ৫০ সমগ্র বর্ণনাটিই আবুল মুনযির উক্ত প্রতিমা সম্পর্কে তাহার প্রতিমা গ্রন্থে (কিতাবুল আসনাম) যাহা লিখিয়াছেন তাহারই হুবহু নকল বা খোলাখুলি চৌর্যবৃত্তি।
এখন এই আবুল মুনযিরকে হাদীছ শাস্ত্রের সকল স্বীকৃত বিশেষজ্ঞই একজন কুখ্যাত মিথ্যুক ও জাল হাদীছ রচনাকারী হিসাবে গণ্য করেন এবং মহানবী -এর চরিত্র এবং আইনগত ও ধর্মীয় বিধি-বিধান প্রশ্ন সম্পর্কিত বিষয়ে তাহাকে বিশ্বাস ও নির্ভর না করার জন্য সর্বসম্মতভাবে ঘোষণা করিয়াছেন। সুতরাং হাদীছের অন্যতম প্রাথমিক যুগের বিশেষজ্ঞ ইব্ন হিব্বান আবুল মুনযিরকে চরম শীঈরূপে চিত্রিত করিয়াছেন, যে অদ্ভুত কাহিনী ও ঘটনার সুদীর্ঘ বর্ণনাদানে পারঙ্গম, যেইগুলির বাস্তবে কোন ভিত্তি নাই। ইবন হিব্বান আরও বলেন যে, আবুল মুনযিরের ভ্রান্তি ও মিথ্যা উদ্ভাবন এত কুখ্যাতিপূর্ণ যে, উহাদের কোন বিবরণ প্রদানের প্রয়োজন করে না। ৫১
অনুরূপভাবে ইবন হাজার আবুল মুনযিরের তীব্র নিন্দা করিয়াছেন এবং আহমাদ ইবন হাম্বলের উক্তির উদ্ধৃতি দিয়াছেন যে, সে (আবুল মুনযির) একজন সস্তা গল্পকার ও খোশগল্পপ্রিয় লোক ছিল। ইব্ন হাজার আদ-দারা কুতনীর এই উক্তিও উদ্ধৃত করিয়াছেন যে, আবুল মুনযিরকে সর্বদা পরিহার করিতে হইবে। ৫২ একইভাবে আয-যাহাবীর অভিমতও তাহার অনুকূলে নহে। তিনি উল্লেখ করিয়াছেন যে, ইবন 'আসাকির তাহাকে রাফিদী হিসাবে চিত্রিত করিয়াছেন। ৫৩ এইগুলি শুধু উদাহরণ মাত্র। ৫৪ আবুল মুনযির স্বয়ং অনেক সময় ভুয়া বর্ণনা প্রণয়নের ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশনের কথা স্বীকার করিয়াছে। ৫৫ এমনকি বিবেচ্য বর্ণনাটি তাহার নিজের কথায় জনশ্রুতি (فقد بلغنا) মাত্র। সুতরাং যে বর্ণনাটি প্রাচ্যবিদগণ বারবার উল্লেখ করিয়াছেন তাহা তাহাদের লেখার আবির্ভাবের অনেক পূর্বেই বানোয়াট ও অনির্ভরযোগ্য বলিয়া প্রত্যাখ্যাত হইয়াছে। স্বয়ং ইবনুল কালবীর স্বীকারোক্তি মতেই ইহা জনশ্রুতি হিসাবে নিন্দিত।
(ঘ)-তে প্রদত্ত তাহার যুক্তি, যথা 'তাওহীদবাদী যায়দ ইবন 'আমর মহানবীকে দেবদেবীর উদ্দেশ্যে প্রদত্ত মাংস অপছন্দ করিতে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন বলিয়া বর্ণিত আছে' সম্পর্কে মার্গোলিয়থ অবশ্য মুসনাদে সংকলিত একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন। ৫৬ ইহাতে উক্ত হইয়াছে যে, যায়দ ইব্ন আমর ইবন নুফায়ল ৫৭ একদা মহানবী ও যায়দ ইবন হারিছার নিকট দিয়া যাইতেছিলেন। এই সময় যায়দ ইবন 'আমরকে অপর দুইজনের জন্য প্রস্তুতকৃত খাদ্যে অংশগ্রহণ করার জন্য আহবান জানান হয়। কিন্তু যায়দ ইবন 'আমর এই বলিয়া উহাতে অংশগ্রহণ করিতে অস্বীকার করিলেন যে, তিনি বেদীতে (নুসুব) হত্যাকৃত কোন কিছু ভক্ষণ করেন না। বর্ণনাকারী বলেন যে, অতঃপর মহানবীকে বেদীতে হত্যাকৃত কোন কিছু খাইতে দেখা যায় নাই।
মহানবী ও যায়দ ইবন 'আমর ইব্ নুফায়ল-এর মধ্যে সাক্ষাৎকার এবং খাদ্যের ঘটনা সংক্রান্ত এই হাদীছ বিভিন্ন বর্ণনাকারীর মাধ্যমে এবং অনেক সংযোজন ও পরিবর্তনসহ বিভিন্ন আকারে আমাদের নিকট আসিয়াছে। ৫৮ স্বয়ং ঘটনাটিই ইহার পরিষ্কার প্রমাণ যে, হাদীছটি বর্ণনাকালে ইহাতে অনেক কিছু মিশ্রিত হইয়া গিয়াছে। যতদূর মুসনাদের বর্ণনা সম্পর্কে বলা যায়, কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। প্রথমত, ইহার বর্ণনাকারিগণের মধ্যে আল-মাসউদী নামক একজন বর্ণনাকারী রহিয়াছেন যাহার সম্পর্কে সাধারণ অভিমত এই যে, তিনি বিভিন্ন বিষয় মিশ্রিত করিয়া থাকেন। সুতরাং তাহার মাধ্যমে আগত কোন বর্ণনা প্রমাণ হিসাবে উল্লেখ করা যাইবে না। ৫৯ এতদ্ব্যতীত অপর দুইজন বর্ণনাকারী নুফায়ল ইবন হিশাম এবং তাহার পিতা হিশাম (ইবন সা'ঈদ) সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য নহেন। ৬০ হাদীছটির অপর এক বর্ণনায় মুহাম্মাদ ইবন 'আমর ইবন 'আলকামা অন্যতম বর্ণনাকারী। তাহাকেও অবিশ্বাসযোগ্য বলিয়া গণ্য করা হয়। ৬১ এইজন্য মুসনাদের এই বিশেষ বর্ণনাটিকে 'দুর্বল' বলিয়া মনে করা হয়। ৬২ প্রকৃতপক্ষে "যায়দ তাহাদের নিকট দিয়া যাইতেছিলেন" (فمر بهما زيد) হইতে তাহার বর্ণনাকৃত মন্তব্যের শেষ পর্যন্ত বর্ণনাটির সমগ্র অংশই প্রকৃতপক্ষে যাহা ঘটিয়াছিল উহার মিশ্রিত রূপ। ৬৩ ইহা এই ঘটনা হইতেও স্পষ্ট যে, আল-বায়হাকী উক্ত একই মাসউদীর মাধ্যমে হাদীছটি বর্ণনা করিয়াছেন, কিন্তু উহাতে এই অংশটির উল্লেখ নাই। ৬৪
দ্বিতীয়ত, এমনকি মুসনাদের বর্ণনা সঠিক ধরা হইলেও ইহা কোনক্রমেই দেখানো সম্ভব নহে যে, মহানবী নিজে প্রাণীটি হত্যা করিয়াছিলেন এবং খাদ্য প্রস্তুত করিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে বর্ণনাটির ভিন্ন ভিন্ন রূপের কোনটিই এইরূপ ধারণা প্রদান করে না। বিপরীতক্রমে বর্ণনার বিভিন্ন রূপের শব্দ প্রয়োগ ও মর্ম হইতে সুস্পষ্টরূপে প্রতীয়মান হয় যে, খাদ্য অন্যরা প্রস্তুত করিয়াছিল এবং তাহারাই মহানবী ও তাঁহার সঙ্গীদিগকে প্রদান করিয়াছিল। এবং খাদ্য ভক্ষণ প্রশ্নে উল্লেখ্য যে, বুখারী কর্তৃক প্রদত্ত সঠিক ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় উক্ত হইয়াছে যে, একবার যায়দ ইবন 'আমর ইবন নুফায়ল-এর মহানবী-এর সহিত, তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে, বালদাহ (মক্কার নিকটবর্তী) নামক স্থানে সাক্ষাত হয় যখন অনুরূপ খাদ্য মহানদী-কে দেওয়া হইয়াছিল। তিনি উহা গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানান। যায়দ ইবন 'আমরও তাহাই করেন এবং বলেন, "তোমরা যাহা বেদীতে হত্যা কর আমি তাহা খাই না' ইত্যাদি। ৬৫ স্পষ্টত যায়দের এই উক্তি, যাহা প্রথমে মহানবী কর্তৃক খাদ্য গ্রহণে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনের পরবর্তী ঘটনা এবং যাহা যায়দকে তাহার পালা অনুযায়ী খাদ্য প্রদান করা হইলে তিনি বলিয়াছিলেন, কোন কোন বর্ণনাকারী মিশাইয়া ফেলিয়াছেন এবং এইরূপ ধারণার জন্ম দিয়াছেন যে, তিনিই প্রথম উক্ত খাদ্য গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানাইয়াছেন। ৬৬ বর্ণনার বিষয়গুলি যে তালগোল পাকাইয়া ফেলা হইয়াছে তাহা ইহা হইতেও পরিষ্কার বুঝা যায় যে, এই বর্ণনার একটি রূপে একই দল বর্ণনাকারী তাহাদের বর্ণনায় সংযোজন করিয়াছেন যে, মহানবী সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সা'ঈ করার সময় ঐ দুইটি স্থানে স্থাপিত 'ঈসাফ ও নাইলা নামক দুইটি মূর্তির নিকট গমন ও উহাদের স্পর্শ করিতে তাঁহার সঙ্গী তাঁহার দত্তক পুত্র যায়দ ইবন হারিছাকে কঠোরভাবে নিষেধ করিয়াছিলেন। অন্যান্য মক্কাবাসী সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সা'ঈ করার সময় ঐ মূর্তি দুইটি স্পর্শ করিতে অভ্যস্ত ছিল। স্পষ্টত বর্ণনাকারিগণের উদ্দেশ্য এই বিষয়ে গুরুত্ব প্রদান করা যে, মহানবী এমনকি তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বেও পৌত্তলিকতা হইতে মুক্ত ছিলেন। পুনরায় একই দল বর্ণনাকারী এই শেষোক্ত ঘটনাটিকে খাদ্যের ঘটনার উল্লেখ ব্যতীত একটি পৃথক বর্ণনারূপে উল্লেখ করিয়াছেন। ৬৭
সুতরাং বর্ণনাটির বিভিন্ন রূপের মধ্যে তুলনা ও উহাদের একত্র করা হইলে দেখা যাইবে যে, মহানবী প্রাণীটি হত্যা ও খাদ্য প্রস্তুতও করেন নাই অথবা তিনি উহা গ্রহণও করেন নাই; যদিও বিবাহ-নিষিদ্ধজনদের মধ্যে বিবাহের ন্যায় কেবল অনুরূপ খাদ্য গ্রহণ, এই দুইটি বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হইবার পূর্বে, বেঠিক বলিয়া বিবেচিত হইত না। অন্যদিকে বুখারীতে প্রদত্ত বর্ণনার একটি রূপে, যাহা প্রশ্নাতীতভাবে অধিকতর নির্ভরযোগ্য, স্পষ্টভাবে উক্ত হইয়াছে যে, মহানবী ছিলেন প্রথম ব্যক্তি যিনি উক্ত খাদ্য গ্রহণ করিতে অস্বীকৃতি জানান। অধিকন্তু একই দল বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত বর্ণনাটির অপর দুইটি রূপে এতদভিন্ন গুরুত্বের সহিত উল্লেখ করা হইয়াছে যে, মহানবী সাফা ও মারওয়ার মধ্যে দৌড়াইবার সময় ঐ দুইটি স্থানে স্থাপিত মূর্তিগুলিকে কঠোরভাবে এড়াইয়া গিয়াছেন। বর্ণনাটির বিভিন্ন রূপ হইতে ইহাও স্পষ্ট যে, যায়দ ইবন 'আমর ও মহানবী -এর মধ্যকার বর্ণিত সাক্ষাৎকার শেষোক্তজনের নবুওয়াত প্রাপ্তির বেশী দিন পূর্বে সংঘটিত হয় নাই, যখন তাঁহার ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গী, বিশেষ করিয়া পৌত্তলিকতার প্রতি তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গী নির্দিষ্ট রূপ ধারণ করিয়া থাকিবে, বিশেষ করিয়া যেরূপ আমরা জানি যে, তিনি তাঁহার স্ত্রীকে স্পষ্টত তাঁহাদের দাম্পত্য জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে জোরের সহিত বলিয়াছিলেন যে, তিনি কখনও আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করেন নাই। ৬৮ স্পষ্টরূপেই বলা যায় যে, আলোচ্য বর্ণনাটি যে সময় সংক্রান্ত সেই সময়ে মূর্তিকে ঘৃণা ও উহার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত গোল্ড পরিহার করার জন্য মহানবী -কে যায়দ ইবন 'আমর ও তাহার ন্যায় অন্যদের দ্বারা প্রথম বারের মত "অনুপ্রাণিত" হইবার প্রয়োজন ছিল না।
সর্বশেষ, উপরে (ঙ)-তে উল্লিখিত মার্গোলিয়থের মন্তব্য সম্পর্কে, যথা 'পৌত্তলিকতার প্রতি মহানবী -এর খুব বেশী দৈহিক বিরোধিতা ছিল না, কারণ তিনি কালো পাথর চুম্বনের রীতি ইসলামে বহাল রাখিয়াছেন- মার্গোলিয়থ এইরূপ মন্তব্য করিয়া তিনটি ভুল করিয়াছেন। যথা (ক) কালো পাথরের মূল প্রকৃতি সম্পর্কে ভুল; (খ) তাহার ভাষায় উহা চুম্বনের জন্য মহানবী -এর আকুল আকাঙ্খা সম্পর্কে ভুল এবং (গ) উহা চুম্বন/স্পর্শ করার রীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কে ভুল।
কালো পাথরের উৎপত্তি সম্পর্কে অনেকগুলি হাদীছ বিদ্যমান রহিয়াছে। ৬৯ ইবনুল আহীর-এর বর্ণনানুসারে নবী ইবরাহীম (আ) কা'বাঘর নির্মাণের সময় এই পাথরটি নিকটবর্তী আবূ কুবায়স পর্বত হইতে সংগ্রহ করেন এবং কা'বা ঘরের এক কোণে উহাকে স্থাপন করেন যাহাতে উহা কা'বাঘর প্রদক্ষিণের (তাওয়াফ) শুরু ও শেষ বিন্দু নির্দেশক হইতে পারে। ৭০ ইবনুল আছীরের এই বক্তব্যে পাথরটির উৎপত্তি সম্পর্কে প্রকৃতপক্ষে কোন ব্যাখ্যা নাই। তবুও ইহা আমাদিগকে তথ্য প্রদান করে যে, কিভাবে এবং কেন নবী ইবরাহীম (আ) উহা লাভ করিয়াছেন এবং ব্যবহার করিয়াছেন। পরবর্তী সকল যুগে কালো পাথরের এই প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য দৃষ্টি হইতে লোপ পায় নাই। ইবরাহীম (আ)-এর ঐতিহ্য অনুসরণ করিয়া প্রাক-ইসলামী যুগের মক্কার অধিবাসী ও অন্যান্য আরবগণ কালো পাথরের প্রান্ত হইতে কা'বা ঘরের প্রদক্ষিণ শুরু করিত এবং উহা চুম্বন করিত। কিন্তু উৎসসমূহে এইরূপ মনে করার মত কিছু নাই যে, তাহারা তাহাদের দেবতাদের সহিত উহার উপাসনা করিত অথবা উহার কোন স্বর্গীয় গুণ কিংবা কল্যাণ বা অকল্যাণ করার কোন ক্ষমতা ছিল বলিয়া মনে করিত। অথবা এইরূপ কোন ইঙ্গিতও নাই যে, চুম্বনকর্ম কোন প্রকার উপাসনা ছিল কিংবা দেব-দেবীর উপাসনার সহিত সম্পর্কিত কোন ধর্মীয় আচার ছিল। বস্তুত কালো পাথর চুম্বন আরবদের জন্য ইবরাহীমী ঐতিহ্যের সহিত তাহাদের পরিচিতির নির্দেশক এক প্রকার জাতীয় প্রথা ছিল। ইহা তখনও পৌত্তলিক উপাসনার কোন অংশ ছিল না। সুতরাং এই অভিমত ব্যক্ত করা যে, কালো পাথর চুম্বনরীতি বহাল রাখার অর্থ পৌত্তলিকতার অবশেষ টিকাইয়া রাখা—উক্ত পাথরের উৎপত্তি ও প্রকৃতির অপব্যাখ্যা মাত্র।
দ্বিতীয়ত, কালো পাথর চুম্বনের জন্য মহানবী-এর কথিত "আকুল আকাঙ্খা” সম্পর্কে মার্গোলিয়থের উল্লেখ বাস্তব তথ্যের বিকৃতি। হিজরতের পর মহানবী ‘উমরা ও হজ্জ পালনের জন্য প্রকৃতই আকুল আকাঙ্খা পোষণ করিতেন। কিন্তু উহাতে ইহা বুঝায় না যে, তিনি কেবল কালো পাথর চুম্বনের জন্য আকুল আকাঙ্খা করিতেন অথবা উক্ত পাথরকে ভক্তি বা অনুরক্তির বস্তু হিসাবে দেখিতেন।
তৃতীয়ত, কালো পাথর প্রান্ত হইতে কা'বা ঘরের তাওয়াফ শুরু ও শেষ করার ইবরাহীম (আ) প্রতিষ্ঠিত রীতি ইসলামে বহাল রাখা হইয়াছে। প্রকৃতপক্ষে হজ্জ ও 'উমরা দীন ইসলামে ইবরাহীমী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। এই ঐতিহ্যের পৌত্তলিক উপাসনার সহিত কোন সম্পর্ক নাই। হজ্জ ও 'উমরা সঠিকভাবে পালনের একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত হইতেছে কা'বাঘর প্রদক্ষিণ করিতে হইবে। আর ইহাও একটি অত্যাবশ্যকীয় শর্ত যে, প্রদক্ষিণ কাজ কালো পাথর বরাবর শুরু ও শেষ হইতে হইবে। উহার স্পর্শ ও চুম্বন হজ্জ বা 'উমরার জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য নহে। মহানবী স্বয়ং কখনও উহা চুম্বন করিয়াছেন, আবার কখনও করেন নাই। চুম্বন কাজটি করা হয় কা'বার জন্য কাহারও ভালোবাসা ও আবেগ প্রদর্শনস্বরূপ, আর এই কা'বাই হইতেছে সমগ্র মুসলিম উম্মাহ্র জন্য দিকনির্দেশনার অনুভূতি দানকারী কেন্দ্র। কালো পাথর চুম্বন সেই মহান পরিবার ও ভ্রাতৃত্বের প্রতি ঐক্য ও আনুগত্যের অনুভূতির অভিব্যক্তি মাত্র যাহার উৎপত্তির অনুসন্ধান করা হয় ইবরাহীম (আ)-এর মধ্যে। এমন একজন মুসলমানও পাওয়া যাইবে না যে মনে করে যে, সে কালো পাথরের উপাসনা করে অথবা উহা কোন কল্যাণ বা অকল্যাণ করার ক্ষমতা রাখে বলিয়া মনে করে। একজন মুসলমান কালো পাথর বা কা'বা ঘরের উপাসনা করে না, বরং উহার ও বিশ্বজগতের একমাত্র প্রভুর উপাসনা করে। কালো পাথর সংক্রান্ত রীতি কোন অন্ধ ভক্তির বিষয় বা পৌত্তলিকতার অবশিষ্টাংশ কোনটিই নহে।
মার্গোলিয়থকে তাহার যুক্তি ও উপসংহারের ক্ষেত্রে পরবর্তী কালের অনেক লেখক অনুসরণ করিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে আর্থার জেফারী (Arthar Jeffery)-র নাম উল্লেখযোগ্য, যিনি মার্গোলিয়থের গ্রন্থ প্রকাশের প্রায় সিকি শতাব্দী পর "মুহাম্মাদ কি তাঁহার শৈশব হইতেই নবী ছিলেন" শীর্ষক নিবন্ধে এই বিষয়ে প্রাচ্যবিদদের যুক্তিসমূহ তুলিয়া ধরিয়াছেন। ৭১ জেফারী শুরু করিয়াছেন এই মন্তব্য দ্বারা যে, "প্রথম জীবনে মুহাম্মাদ -এর পৌত্তলিকতামুক্ত থাকার গোটা প্রশ্নটাই" অত্যন্ত বোকামীপূর্ণ। কারণ ইহা "যে কোন শিক্ষিত বোধশক্তির নিকট স্পষ্ট যে, প্রত্যেক নবী তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে স্বীয় জনগণের ধর্ম অনুসরণ করিতেন এবং একজন শিশু নবীর ধারণা মানসিকভাবে কিম্ভুত জীবের ধারণামাত্র”। ৭২
সুতরাং বিষয়টি সম্পর্কে মুসলিম দৃষ্টিভঙ্গীর তীব্র নিন্দা করিয়া জেফারী পূর্বেই সেই সকল আপত্তির জবাব দান করিয়াছেন যাহা তাহার উল্লিখিত হাদীছ সম্পর্কে উত্থাপন করা যায়। তিনি বলেন যে, হাদীছ সম্পর্কে মুসলমান সমালোচনা "সম্পূর্ণরূপে সনদ পরীক্ষার সহিত" সংশ্লিষ্ট এবং "হাদীছের মতন বা বিষয়বস্তুর উপর খুব সামান্য মনোযোগই" প্রদান করা হয়। অথচ শেষোক্ত বিষয়ের প্রতি মনোযোগ প্রদান "বিস্ময়কর সুফল" বহিয়া আনে। তাই আধুনিক পণ্ডিতগণ কেবল ইসনাদের উপর মনোযোগ সীমাবদ্ধ রাখাকে অর্থহীন বলিয়া গণ্য করেন। তিনি আরও বলেন যে, যেরূপ যিশু, বুদ্ধ বা এমনকি আলোকজাণ্ডারের ক্ষেত্রে ঘটিয়াছে, সেইরূপ মুহাম্মাদ -এর ক্ষেত্রেও পরবর্তী কালে এইরূপ অনেক হাদীছ সৃষ্টির মাধ্যমে আদর্শস্বরূপ প্রতিষ্ঠার প্রবণতার উদ্ভব ঘটিয়াছে। "সুতরাং ইহা সেই সকল হাদীছ যাহা এই আদর্শ স্বরূপ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা হইতে দূরতম অবস্থানে এবং যাহা খুব সম্ভব নির্ভুল"। কারণ "আদর্শ স্বরূপ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হইবার পর" এইগুলি আবিষ্কার করা সম্ভব হয় নাই এবং ইহারা যদি প্রাচীন ও প্রশ্নাতীতরূপে "নির্ভুল হইত" তাহা হইলে সকল সম্ভাবনা অনুযায়ী ইহাদিগকে তখন গোপন রাখা হইত। ৭৩ তিনি আরও বলেন যে, কুরআনের আয়াত ৯৪: ৬-৭ হইতে দেখা যায় যে, আল্লাহ মুহাম্মাদ -কে "একটি মিথ্যা ধর্মে" পাইয়াছেন এবং তারপর তাঁহাকে সত্যধর্মে পরিচালিত করিয়াছেন এবং কুরআনে তাঁহার সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গিই একজন মানুষের যিনি তাঁহার স্বীয় জনগণের পুরাতন ধর্ম পরিত্যাগ করিয়াছেন এবং তাহাদিগকে একটি নূতন ও শ্রেয়তর ধর্ম গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্বারোপ করিতেছেন। জেফারী অতঃপর তাহার মতের সমর্থনে নিম্নবর্ণিত ছয়টি কারণ উল্লেখ করেন:
(১) আল-মাকদিসী তাঁহার 'কিতাবুল বাদ' ওয়াত-তারীখ' গ্রন্থে কাতাদার ৭৪ বরাতে একটি হাদীছ উল্লেখ করিয়াছেন যাহাতে বর্ণিত হইয়াছে যে, জাহিলিয়্যা যুগে খাদীজা (রা)-র গর্ভে জন্মগ্রহণকারী মহানবী -এর প্রথম পুত্রের তিনি নাম রাখিয়াছিলেন 'আব্দ মানাফ অর্থাৎ মানাফের ভৃত্য। প্রাচীন কালের এবং এক সময়ের মক্কার প্রধান দেবতার নাম ছিল মানাফ এবং যেহেতু মুহাম্মাদ "নবুওয়াত প্রাপ্তির পর" "তাঁহার অনুসারীদের প্রাচীন পৌত্তলিকতার স্মৃতিবাহী নামসমূহ" পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়াছিলেন, তাই ইহা স্পষ্ট যে, "তিনি যদি সেই সময় ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম অনুসরণ করিতেন, যাহা তিনি পরবর্তীতে করিয়াছেন, তাহা হইলে তাঁহার প্রথম সন্তানের নাম 'আব্দ মানাফ রাখিতেন না"। ৭৫
(২) মহানবী নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে তাঁহার তিন কন্যাকে তিনজন পৌত্তলিক পুরুষের সহিত বিবাহ দেন (দুইজনকে আবু লাহাবের দুই পুত্রের নিকট এবং জ্যেষ্ঠতমাকে আবুল আস ইনুর রাবী'-র নিকট) এবং সেই সময় "মুহাম্মাদের ধর্ম ও তাঁহার মক্কাবাসী সমসাময়িকগণের ধর্মের মধ্যে কোনরূপ পার্থক্য সম্পর্কে কাহারও কিছু জানা ছিল না"। ৭৬
(৩) কা'বাঘর পুনর্নির্মাণের সময় কালো পাথরকে উহার স্থানে স্থাপনের জন্য মহানবী -এর সালিসীর কথা উল্লেখ করিয়া জেফারী বলেন, যেই আল-লাত, আল-'উযযা ও মানাতের বিরুদ্ধে তিনি পরবর্তী কালে "কুরআনে তীব্র নিন্দা জ্ঞাপন করিয়াছেন" তাহাদের গৃহ কা'বার পুনর্নির্মাণে মুহাম্মাদ-এর অংশগ্রহণেই প্রমাণ করে যে, তিনি তখন "তাঁহার জনগণের ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে অনুসরণ করিতেন"। ৭৭
(৪) জেফারী মার্গোলিয়থ কর্তৃক পূর্বেই উল্লিখিত মুসনাদের (৪খ., পৃ. ২২২) হাদীছটির উল্লেখ করিয়াছেন যেখানে উক্ত হইয়াছে যে, আল-লাত ও আল-উযযার উপাসনা করিতে মহানবী -এর অস্বীকৃতি তাঁহার স্ত্রীকে জানান এবং একজন প্রতিবেশীর উহা শোনা ও প্রতিবেশীর মন্তব্য যে, "ঐগুলি ছিল সেই প্রতিমা যাহাদের তাহারা উপাসনা করিত এবং তারপর শয্যা গ্রহণ করিত”। জেফারী উক্ত হাদীছের মার্গোলিয়থের ব্যাখ্যা সমর্থনের জন্য তাহার নিজ কারণসমূহ সংযোজন করেন। ৭৮ এই কারণগুলি এখন বিবেচনা করা হইবে।
(৫) জেফারী মুসনাদের (১খ., পৃ. ১৮৯) সেই হাদীছটিও উল্লেখ করিয়াছেন যাহা মার্গোলিয়থও পূর্বে উল্লেখ করিয়াছেন এবং যাহা দ্বারা প্রমাণের চেষ্টা করা হইয়াছে যে, যায়দ ইব্ন 'আমর ইবন নুফায়ল দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত মাংস ভক্ষণ ত্যাগ করিতে মহানবী -কে অনুপ্রাণিত করিয়াছিলেন। ৭৯ জেফারী তাহার নিজস্ব কারণ সংযোজন করিয়াছেন যাহা এখন আলোচনা করা হইবে।
(৬) সর্বশেষ, জেফারী সেই হাদীছও উল্লেখ করিয়াছেন যাহা ইতোপূর্বে মার্গোলিয়থও উল্লেখ করিয়াছেন এবং যাহা দ্বারা প্রমাণের চেষ্টা করা হইয়াছে যে, মহানবী একবার একটি মেষ আল-'উযযার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করিয়াছিলেন। ৮০
উল্লেখ্য যে, এই যুক্তিসমূহের প্রথমটিতে জেফারী মহানবী -এর কোন কোন সন্তানের নামের পৌত্তলিক চরিত্র সম্পর্কে মার্গোলিয়থের বক্তব্যের ভুক্তিকরণ করিয়াছেন মাত্র। কালো পাথর পুনস্থাপনে মহানবী -এর ভূমিকা সম্পর্কে (৩)-এ প্রদত্ত যুক্তিও কালো পাথর সম্পর্কে মার্গোলিয়থের মন্তব্যের এক প্রকার সম্প্রসারণ মাত্র এবং (৪), (৫) ও (৬)-এ প্রদত্ত যুক্তিসমূহ মার্গোলিয়থের উল্লিখিত যুক্তিসমূহেরই পুনরাবৃত্তি। সুতরাং একমাত্র অতিরিক্ত যুক্তি যাহা আবশ্যিকভাবে জেফারীর নিজস্ব বলা যাইতে পারে তাহা হইল (২)-এ প্রদত্ত যুক্তি। কিন্তু যেহেতু তিনি এই সকল যুক্তিকে শক্তিশালী করার জন্য নিজস্ব যুক্তির উল্লেখ করিয়াছেন তাই উহাদের সবগুলিকেই এক এক করিয়া বিবেচনায় আনা হইবে। উহা করিবার পূর্বে অবশ্য জেফারীর প্রাথমিক মন্তব্যকে সামান্য ঘনিষ্ঠভাবে পরীক্ষা করা সময়োপযোগী হইবে।
শুরুতেই উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, জেফারী তাহার যুক্তিকে গ্রহণযোগ্য করার উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে কিছুটা স্ফীত করিয়াছেন। মুসলমানগণ কখনও দাবি করে না যে, মুহাম্মাদ তাঁহার শৈশব হইতেই নবী ছিলেন, যেমন জেফারী বলিয়া থাকেন অথবা তাঁহারা ইহাও বলে না যে, মহানবী তাঁহার বাল্যকাল হইতে ইবরাহীম (আ)-এর ধর্ম অনুসরণ করিয়াছেন। তাহারা শুধু এইটুকু বলে যে, মহানবী এমনকি তাঁহার নবুওয়াত-পূর্ব জীবনেও আল্লাহর সহিত অংশীদারিত্বের (শিরক) কলঙ্ক হইতে মুক্ত ছিলেন। ইহা এবং তিনি তাঁহার শৈশবকাল "হইতে" নবী ছিলেন বলা এক কথা নহে। পুনরায়, জেফারীর উক্তি যে, "যে কোন শিক্ষিত বুদ্ধিমত্তার নিকট ইহা যথেষ্ট স্পষ্ট যে, প্রত্যেক নবী তাঁহার নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে তাঁহার জনগণের ধর্ম অনুসরণ করিতেন" তর্কসাপেক্ষ। অথবা কোন ব্যক্তি সম্পর্কে এইরূপ মনে করা আদৌ "বোকামী" নহে যে, কোন নির্দিষ্ট ধর্মীয় পরিবেশে জন্ম ও লালিত-পালিত হইলেও সে উক্ত ধর্ম ব্যবস্থার ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে না। মক্কার গোত্রীয় সমাজের ন্যায়, যেখানে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন ব্যক্তিগত চর্চা অপেক্ষা অনেকাংশে সম্প্রদায়গত চর্চার বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, সেখানে ইহা আরও সহজ ব্যাপার। বস্তুতপক্ষে এইরূপ সমাজে কোন ব্যক্তির সম্প্রদায়গত ধর্মীয় অনুষ্ঠানদিতে অনুপস্থিতি দ্বারা উক্ত সামাজিক-ধর্মীয় ব্যবস্থায় কোন লক্ষণীয় ভাঙ্গন অপেক্ষা বরং উক্ত ব্যক্তির পক্ষে কৌতূহলশূন্য ও লোকচক্ষুর নজর এড়াইবার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝাইবে। উদাহরণস্বরূপ কোন খৃস্টান সমাজে "ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে না এইরূপ খৃস্টানের" নজীর বিরল নহে এবং যদি এই বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয় যে, এইরূপ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন হইতে বিরত ব্যক্তিগণ সঠিক অর্থে কী বিশ্বাস করেন, তাহা হইলে তাহাদের অনেককেই বুদ্ধিগত শূন্যতায় বিরাজ করিতে অথবা নাস্তিক বা মার্কসবাদীরূপে দেখা যাইবে, যদিও তাহারা সাধারণত তাহাদের নিজ নিজ ধর্মীয় সম্প্রদায়ের স্বাভাবিক সদস্য হিসাবেই দিনাতিপাত করে।
বিষয়টি ইহাকেও ছাড়াইয়া যায়। যে কোন শিক্ষিত বুদ্ধিমত্তার নিকট ইহা অতি স্পষ্ট যে, অনেক মহান ব্যক্তির ক্ষেত্রেই তাহার পরবর্তী মহত্ত্বের লক্ষণ তাহার প্রথম জীবনেই ফুটিয়া উঠে এবং একজন মহান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে যতদূর বলা যায়, ইহা মোটেও অসম্ভব নহে যে, আল্লাহ তাঁহার মনকে তাঁহার বাল্যকাল হইতেই সঠিক পথে পরিচালিত করিবেন। কোন তাওহীদবাদী ধর্ম নূতন গ্রহণকারী কিন্তু পূর্বে অন্য কোন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত ছিল এইরূপ লোকদের মধ্যে অনুসন্ধান করিয়া দেখা গিয়াছে যে, অনেক ক্ষেত্রে তাহারা তাহাদের জীবনের প্রাথমিক পর্যায় হইতে তাহাদের সম্প্রদায়ের শেরেকী কর্মকাণ্ডের প্রতি ঘৃণাভাব পোষণ করিত এবং ঐ সকল কর্মকাণ্ড পরিহার করিয়া চলিত। বর্তমান লেখক মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ইসলামে নব দীক্ষিত একজন তরুণ বাঙালী হিন্দুর সাক্ষাৎকার গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন যে, তাহার বয়স যখন ৮ কিংবা ৯ বৎসর তখন হইতে তিনি মূর্তিপূজা অপছন্দ ও পরিহার করিতে শুরু করেন, যখন তাহার বয়স প্রায় ১২ বৎসর তখন ইসলাম গ্রহণ করেন, গৃহ ত্যাগ করেন, একজন পরোপকারীর সাহায্যে পাকিস্তান গমন করেন এবং সেখানে তাহার মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং এই বৎসর (১৯৯১) গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করেন। ৮১ ইসলামে দীক্ষিত অপর এক তরুণ, যিনি পূর্বে ইংল্যান্ডের লেইসেস্টারের এক খৃস্টান পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং যিনি কিছু দিনের জন্য মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়াছিলেন, খৃস্টীয় পদ্ধতির উপাসনা হইতে তাঁহার প্রথম জীবন হইতেই অনুপস্থিত থাকার অভিন্ন কাহিনী লেখকের নিকট বর্ণনা করিয়াছেন। সুতরাং মুশরিক সমাজের অন্তর্ভুক্ত কোন বালকের শেরেকী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করার ধারণা আদৌ "বোকামী" নহে, যেরূপ জেফারী অত্যন্ত আস্থার সহিত দাবি করেন।
মুসলিম পণ্ডিতগণ কর্তৃক হাদীছের বিশুদ্ধতা যাচাইয়ের প্রকৃতি সম্পর্কে তাহার বক্তব্যও সমর্থনযোগ্য নহে। মুসলমান সমালোচনা "একমাত্র” সনদসূত্র পরীক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; এবং এমনকি যদি তাহাই হইত, তবুও যে উৎসকে নির্দিষ্ট কোন হাদীছের ভিত্তিস্বরূপ ধরা হয় উহার পরীক্ষা সম্পূর্ণ ত্যাগ করার কোন যৌক্তিকতা নাই, যেরূপ প্রাচ্যবিদগণ মনে করেন বলিয়া প্রতীয়মান হয়। প্রথমে মুইর কর্তৃক আনীত এবং তারপর জেফারীসহ অনেকেরই পুনঃউচ্চারিত অভিযোগ যে, প্রাথমিক যুগের মুসলমান পণ্ডিতগণ তাঁহাদের নবীর প্রতি অবমাননাকর কোন বর্ণনা গোপন রাখিতে উৎসাহী ছিলেন- সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। কোন কিছু গোপন করার কোন প্রয়াস কখনও ছিল না, পক্ষান্তরে প্রাপ্ত এবং প্রচলিত সবকিছু সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করার প্রয়াস ছিল। প্রকৃতপক্ষে কোন কিছু গোপন করার কোন প্রয়াস এমনিতেও হইতে পারিত না। কারণ হাদীছের লিখন বা প্রচার কোন কেন্দ্রীভূত বিষয় ছিল না এবং কোন ব্যক্তিকে তাহার সংগৃহীত কোন বর্ণনা ও তথ্য লিখন ও বর্ণনা হইতে বিরত রাখার কোন ব্যবস্থার কথা কল্পনা করা যায় না। এইরূপ অবস্থায় কোন কিছু গোপন করা প্রশ্নের অতীত ছিল। হাদীছ বর্ণনার তদারকী ও নিয়ন্ত্রণের কোন পরিকল্পনা বা সম্ভাব্যতার অনুপস্থিতির কারণে এবং স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক অনেক জাল হাদীছ প্রচারিত হইতে প্রত্যক্ষ করার কারণে মুসলমান হাদীছবেত্তাগণ জাল হাদীছ হইতে আসল হাদীছ চিহ্নিত করার নীতিমালা প্রণয়নে আগাইয়া আসেন। খাঁটি ঐতিহাসিক তথ্য এই যে, যখন জাল হাদীছের ছড়াছড়ি ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে উহার উদ্ভব হইতেছিল তখন হাদীছ প্রচারের কোন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছিল না। ইসনাদের উপর গুরুত্বারোপ এই ঐতিহাসিক তথ্যেরই ফলমাত্র; এবং এই তথ্যই কঠোর পরীক্ষাকে সম্পূর্ণরূপে আবশ্যকীয় করিয়া তোলে, বিশেষ করিয়া সেই সকল হাদীছ যাহা মহানবী -এর জীবন সম্পর্কে সাধারণভাবে স্বীকৃত তথ্যের বিরোধী অথবা কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের পরিপন্থী ও অসঙ্গতিপূর্ণ তথ্য সরবরাহ করে বলিয়া মনে হয়।
মুসলমানদের মধ্যে তাহাদের নবীর প্রতি অবমাননাকর যে কোন বর্ণনা গোপন করার প্রবণতা ছিল-এই মৌলিক ত্রুটিপূর্ণ ধারণার কারণে প্রাচ্যবিদগণ সাধারণত উহার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করেন এবং মহানবী-এর প্রতি অবমাননাকর তথ্য প্রকাশকারী যে কোন কিছুকেই চরম সত্যরূপে গ্রহণ করার প্রবণতা প্রদর্শন করেন। জেফারীর উক্তি যে, আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠার প্রবণতা হইতে দূরতম অবস্থানের হাদীছগুলি বিশুদ্ধ হইবার সম্ভাবনা সর্বাধিক-উক্ত দৃষ্টিভঙ্গিরই লক্ষণ। এমনকি আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠার প্রবণতার উপস্থিতি এবং উহার বিপরীতধর্মী হাদীছ বিশুদ্ধ হইবার সম্ভাবনাও ইসনাদ ও অন্যান্য ব্যাপারে শেষোক্তদের সমালোচনামূলক পরীক্ষা বর্জন করার পক্ষে যথেষ্ট কারণ নহে। মোটের উপর মুসলমানগণ তথাকথিত আদর্শরূপে প্রতিষ্ঠাকারী হাদীছগুলিকে কোন প্রকার পরীক্ষা ব্যতীত এমনিতেই তাৎক্ষণিকভাবে গ্রহণ করে না। জেফারী কর্তৃক তাহার মতের সমর্থনে উল্লিখিত হাদীছগুলির ইসনাদ ও মতন উভয় বিষয়ে একটু সতর্ক পরীক্ষা করিলে উহাদের দুর্বলতা ধরা পড়িবে এবং বিবেচ্য বিষয়ে সেইগুলিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসাবে গণ্য করার বিপদ সম্পর্কে বর্তমানে আলোচিত হইবে।
জেফারীর প্রথম প্রমাণ হইল আল-মাকদিসী ৮২ কর্তৃক উল্লিখিত এবং খাদীজা (রা)-র গর্ভে জন্মগ্রহণকারী মহানবী -এর প্রথম পুত্রের নাম সম্পর্কে কাতাদার বর্ণনা। ইহা অনেকভাবেই ত্রুটিপূর্ণ। এই কাতাদা ইব্ন দি'আমাহ্, (মৃ. ১১৭/১১৮ হি.) সাধারণত একজন প্রতারণাপূর্ণ (মুদাল্লিস) বর্ণনাকারী হিসাবে বিবেচিত, যিনি সুস্পষ্ট প্রমাণ অনুযায়ী প্রায় ত্রিশজন ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিকে তাহার তথ্যদাতা হিসাবে উদ্ধৃত করিয়াছেন, কিন্তু তাহাদের নিকট হইতে তিনি কখনও কোন কিছু শোনেন নাই। ৮৩ বর্তমান ক্ষেত্রে ইহারও উল্লেখ নাই যে, তিনি কাহার নিকট হইতে এই বিশেষ তথ্যটি পাইয়াছেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, আল-মাকদিসী (মৃ. ৩৫৫ হি.) এবং সাঈদ ইব্ন আবী 'আরূবা (মৃ. ১৫৬/১৫৭ হি.), যিনি কাতাদার নিকট হইতে এই তথ্য লাভ করিয়াছেন বলিয়া কথিত আছে, উভয়ের মধ্যে প্রায় দুই শত বৎসরের ব্যবধান বিদ্যমান। তারপরও আল-মাকদিসী কিভাবে বা কোন্ উৎসের মাধ্যমে শেষোক্তজনের বর্ণনা লাভ করিয়াছেন তাহা উল্লেখ করেন নাই। ইহা আরও লক্ষণীয়, কারণ তিনি ইন্ন ইসহাকের পুস্তককে উৎস হিসাবে উল্লেখ করিয়াছেন অথচ তিনি বলেন যে, বিষয়টিতে শেষোক্ত জনের উক্তি এবং সাঈদ ইব্ন আবী 'আরূবার উক্তির মধ্যে পার্থক্য বিদ্যমান। ৮৪ ইসনাদের এই বিবেচনা ছাড়াও মূল বর্ণনাতেও দুর্বলতা রহিয়াছে। আল-মাকদিসী লিখিয়াছেন, "কাতাদার নিকট হইতে প্রাপ্ত সাঈদ ইব্ন আবী 'আরূবার এক বর্ণনা অনুসারে, তিনি অর্থাৎ (খাদীজা রা) জাহিলিয়্যা যুগে আল্লাহ্ রাসূল-এর জন্য 'আব্দ মানাফকে জন্ম দেন এবং ইসলাম-পরবর্তী যুগে তাঁহার দুই পুত্র ও চার কন্যাকে জন্ম দান করেন। পুত্রদ্বয়ের নাম আল-কাসিম ও 'আবদুল্লাহ এবং তাঁহারা শৈশবেই ইনতিকাল করেন। এবং ইবন ইসহাকের গ্রন্থে উক্ত হইয়াছে যে, তাঁহার দুই পুত্র জাহিলিয়্যা যুগে ইনতিকাল করেন। ৮৫
এখন এই বর্ণনা সম্পর্কে উল্লেখ করার সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই যে, যেখানে ইহা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করে যে, দুই পুত্র আল-কাসিম ও 'আবদুল্লাহ, যাঁহারা ইসলাম-পরবর্তী যুগে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন বলিয়া উক্ত হইয়াছে, শৈশবেই ইনতিকাল করিয়াছেন, সেখানে ইহা তথাকথিত 'আব্দ মানাফ সম্পর্কে, যে তাহাদের পূর্বে জাহিলিয়্যা যুগে জন্মগ্রহণ করিয়াছে বলিয়া উক্ত হইয়াছে সে সম্পর্কে কিছুই উল্লেখ নাই। অপর দুই পুত্রের শৈশবে মৃত্যুর উপর গুরুত্বারোপ হইতে বুঝা যায় যে, তথাকথিত 'আব্দ মানাফের অনুরূপ মৃত্যু হয় নাই। কিন্তু ইতিহাস মহানবী -এর এইরূপ কোন পুত্রের কথা জানে না যিনি বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন কিংবা তাঁহার পরেও জীবিত ছিলেন। সুতরাং যে ব্যক্তি প্রতিবেদনটির বিবরণ প্রস্তুত বা বর্ণনা করিয়াছেন তাহা তাহার সুস্পষ্ট ভুল বা বিভ্রান্তি।
কিছু বিভ্রান্তি বা ভুল যে রহিয়াছে তাহা ইহা হইতে আরও স্পষ্ট যে, সীরাত মুগালতাঈ গ্রন্থে দ্ব্যর্থহীনভাবে উক্ত হইয়াছে যে, খাদীজা (রা) 'আবদ মানাফ (বা 'আবদুল্লাহ) নামের এক পুত্রের জন্ম দিয়াছেন তাঁহার প্রথম স্বামী 'আতীক ইব্ন 'আইদের ঔরসে। ৮৭ বিবেচ্য বর্ণনাটি সম্ভবত এই 'আব্দ মানাফকে মহানবী -এর প্রথম পুত্র হিসাবে উপস্থাপনের বিভ্রান্তিতে পড়িয়াছে। কারণ তিনি পরবর্তীতে খাদীজা (রা)-কে বিবাহ করিয়াছেন। এই প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, ইবন 'আসাকির (মৃ. ৫৭১) একই কাতাদা হইতে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন যেখানে উক্ত হইয়াছে যে, মহানবী -এর মাত্র চারজন পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন যাঁহাদের মধ্যে সর্বজ্যেষ্ঠজনের নাম ছিল আল-কাসিম। ৮৮ এই বর্ণনায় 'আব্দ মানাফের আদৌ কোন উল্লেখ নাই।
অতএব সংক্ষেপে বলিতে গেলে, কাতাদার কল্পিত বরাতে আল-মাকদিসী প্রদত্ত বর্ণনা এবং ইবন 'আসাকির কর্তৃক উল্লিখিত একই বিষয়ে একই কাতাদার অপর একটি বর্ণনার মধ্যে মিল নাই।
দ্বিতীয়ত, কাতাদাকে কে তথ্য সরবরাহ করিয়াছে তাহার উল্লেখ নাই কিংবা আল-মাকদিসী কিভাবে সা'ঈদ ইব্ন আবী 'আরূবাহ্ কর্তৃক বর্ণিত বলিয়া কথিত বর্ণনা পাইলেন, যিনি তাহার প্রায় দুই শতাব্দী পূর্বে ইনতিকাল করিয়াছেন, আল-মাকদিসী তাহারও কোন উল্লেখ করেন নাই।
তৃতীয়ত, বর্ণনাটি হইতে মনে হয় যে, তথাকথিত 'আব্দ মানাফ শৈশবে ইনতিকাল করেন নাই, কিন্তু মহানবী -এর অপর দুই পুত্র শৈশবেই ইনতিকাল করেন। অথচ ইতিহাসে মহানবী -এর এইরূপ কোন পুত্রের উল্লেখ নাই যিনি পূর্ণ বয়ঃপ্রাপ্ত হইয়াছিলেন অথবা তাঁহার ইনতিকালের পরও জীবিত ছিলেন।
চতুর্থত, আল-মাকদিসীর তথ্য ইব্ন ইসহাকসহ পূর্ববর্তী সকল বিশেষজ্ঞ কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যের পরিপন্থী। এইরূপ ধারণা করা স্বেচ্ছাচারী ও অন্যায় উভয়ই হইবে যে, উল্লিখিত পূর্ববর্তী বিশেষজ্ঞগণের সকলেই মহানবী -এর অপর এক পুত্রের অস্তিত্ব ও নামের ন্যায় গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য গোপন করার পক্ষে ছিলেন।
সর্বশেষ কিন্তু কম গুরুত্বপূর্ণ নহে, যদি আল-কাসিম ভিন্ন অপর কোন জ্যেষ্ঠ পুত্র থাকিত তাহা হইলে মহানবী -এর উপনাম (কুনয়া) হইত "আবুল কাসিম"-এর পরিবর্তে "আবূ "অমুক-তমুক"। কারণ কোন ব্যক্তির উপনাম অবশ্যম্ভাবীরূপে তাহার প্রথম জন্মগ্রহণকারী সন্তানের নাম অনুসারে হইত। এমনকি আল-মাকদিসীও উল্লেখ করিয়াছেন যে, আবুল কাসিম ছিলেন মহানবী-এর উপনাম। ৮৯ এই সকল কারণে আলোচনাধীন বর্ণনাটি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নহে। ৯০
জেফারীর দ্বিতীয় যুক্তি যে, মহানবী নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে তাঁহার তিন কন্যাকে তিনজন পৌত্তলিক স্বামীর নিকট বিবাহ দিয়াছিলেন, তখন কেহই তাঁহার বিশ্বাসে কোন পার্থক্য লক্ষ্য করে নাই-সমভাবে অকার্যকর। কারণ প্রাক-ইসলামী আরব সমাজে ভিন্ন ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের লোক বা পরিবারের মধ্যে আন্ত-বিবাহ নিষিদ্ধ ছিল না। ইসলামে এই নিষেধাজ্ঞা অনেক পরে আরোপিত হয়। ইহার পূর্বে কোন মহলের লক্ষণীয় কোন আপত্তি উত্থাপন বা বিবেকের কোন তাড়না প্রদর্শন ব্যতীতই আরব সমাজে এইরূপ বিবাহ অনুষ্ঠিত হইত। উদাহরণস্বরূপ ইয়াছরিবের নেতা কা'ব ইবনুল আশরাফের মাতা বানু নাযীর গোত্রের একজন ইয়াহুদী ছিলেন, কিন্তু তাহার পিতা আশরাফ ছিলেন বানু নাবহান গোত্রের একজন মুশরিক। ৯১ অনুরূপভাবে যদিও যায়দ ইব্ন 'আমর ইব্ নুফায়ল একজন শিরক বর্জনকারী তাওহীদবাদী (হানীফ) ছিলেন, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে, তাহার পুত্র সাঈদকে মুশরিক আল-খাত্তাবের কন্যা (উমার ইবনুল খাত্তাবের বোন) ফাতিমার সহিত বিবাহ প্রদানে কেহই আপত্তি করে নাই। পুনরায় ওয়ারাকা ইবন নাওফাল যদিও একজন তাওহীদবাদী ও খৃস্টান ছিলেন, কিন্তু তাহা সত্ত্বেও তিনি তাহার মুশরিক পরিবার ও গোত্রের একজন স্বাভাবিক সদস্য হিসাবে তাহাদের সহিত শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করিতে কোন অসুবিধা বোধ করেন নাই। আবু লাহাব ও তাহার স্ত্রী যে তাহার পুত্রগণকে মহানবী-এর কন্যাদের সহিত তাহাদের বিবাহ ভাঙ্গিয়া দিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল তাহা আসলে তাহার ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তনের জন্য ছিল না, বরং এইজন্য ছিল যে, তিনি প্রকাশ্যে পুরাতন ধর্মকে দোষারোপ করিতেন এবং নূতন ধর্ম প্রচার ও উহা গ্রহণের জন্য তাঁহার জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে আহবান জানাইতেন। আবু লাহাব ও অন্যদের বৈরিতা মহানবী-এর কর্মকাণ্ডের এই শেষোক্ত দিকের জন্যই বৃদ্ধি পায়। তিনি যদি তাঁহার নিজ ধর্মের ব্যাপারে নীরব থাকিতেন এবং তাঁহার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর ধর্ম পরিবর্তনের চেষ্টা না করিতেন তাহা হইলে সম্ভবত তাঁহার বিরুদ্ধে আদৌ কোন আপত্তি উত্থাপিত হইত না, আবু লাহাব কর্তৃকও নহে কিংবা অন্যদের দ্বারাও নহে। জেফারীর যুক্তিতে এই বিষয়টি ও প্রাক-ইসলামী আরবের অভিনব বৈবাহিক রীতিনীতি অস্বীকৃত, হইয়াছে। ইহা একদিকে কোন ব্যক্তির নীরবে ও অস্পষ্টরূপে মুশরিকী আচার-অনুষ্ঠান পালন না করা, অন্যদিকে কোন ব্যক্তির প্রকাশ্যে ও বিরোধিতাক্রমে জনগণের ধর্ম বর্জন করা এবং সেই সঙ্গে নূতন ধর্ম প্রবর্তন ও উহাতে দীক্ষিত করার চেষ্টার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয়ে ব্যর্থ হইয়াছে।
তৃতীয় যুক্তি সম্পর্কে যে, মুহাম্মাদ কালো পাথর পুনঃস্থাপনে তাঁহার সালিশী ও কার্য দ্বারা কা'বাঘর পুনর্নির্মাণে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন, আর এই কা'বাঘর ছিল "আল-লাত, আল-'উযযা ও মানাতের গৃহ" যাহাদের বিরুদ্ধে তিনি পরবর্তী কালে "অত্যন্ত সোচ্চার ছিলেন", জেফারী দুইটি ভুল করিয়াছেন। বস্তুত কা'বাঘর আল-লাত, আল-'উযযা ও মানাতের গৃহ ছিল না। ইহারা ও ইহাদের মন্দির যথাক্রমে তাইফ, নাখলা ও কুদায়দ (লোহিত সাগর উপকূলের নিকট মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী স্থান)-এ অবস্থিত ছিল, যদিও কুরায়শরা ইহাদিগকে শ্রদ্ধা করিত। ৯২ আর মক্কাবাসী ও সাধারণভাবে আরবগণও মক্কার কা'বাকে তাহাদের দেবতাদের গৃহরূপে পবিত্র জ্ঞান ও শ্রদ্ধা করিত না, যদিও উহাদের অনেকগুলি সেখানে ও উহার আশপাশে স্থাপিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত তাহাদের দেবতাদের অনেক মন্দিরও কা'বা নামে অভিহিত ছিল। যথা নাজরানের কা'বা, সিনদাদ (কূফা ও বসরার মধ্যবর্তী)-এর কা'বা এবং যুল-খালাসার কা'বা আল-ইয়ামানিয়্যা। ১৯৪ মক্কার কা'বা সম্পর্কে যতদূর বলা যায়, আরবগণ ইহাকে বিশেষ সম্মান ও বিশিষ্টতম মর্যাদা দান করিত এইজন্য নহে যে, ইহা কোন বিশেষ দেবতার মন্দির ছিল অথবা সাধারণভাবে তাহাদের দেবতাদের গৃহ ছিল, বরং এইজন্য যে, ইহা আল্লাহ্ গৃহ ছিল এবং নবী ইবরাহীম (আ) ও নবী ইসমাঈল (আ)-এর স্মৃতি বিজড়িত ছিল। একমাত্র এই কা'বাতেই আরবগণ পৌত্তলিকতায় নিমগ্ন থাকা সত্ত্বেও, ইবরাহীমী ঐতিহ্য অনুসরণে 'উমরা ও হজ্জ পালন করিত। সুতরাং কা'বাগৃহে কালো পাথর পুনস্থাপনে মহানবী-এর সালিশী ও কর্ম কোন দেবতা গৃহ নির্মাণে অংশগ্রহণ ছিল না অথবা ইহা কোনক্রমেই সেই সময় "নিজ জনগণের ধর্ম শান্তিপূর্ণভাবে" তাঁহার অনুসরণের প্রমাণও নহে।
জেফারীর চতুর্থ যুক্তি মুসনাদের বর্ণনা (৪খ., পৃ. ২২২) যাহা মার্গোলিয়থ উল্লেখ করিয়াছেন এবং যাহাতে খাদীজা (রা)-র সহিত মহানবী-এর কথোপকথন জনৈক প্রতিবেশী কর্তৃক শ্রুত হইবার উল্লেখ রহিয়াছে, যেখানে তিনি (মহানবী) আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করিতে অস্বীকার করিয়াছেন। এই বর্ণনা সম্পর্কে মার্গোলিয়থের উপসংহারের ত্রুটিপূর্ণ বৈশিষ্ট্য, বিশেষ করিয়া প্রতিবেশীর মন্তব্য, "ঐগুলি ছিল সেই প্রতিমা যাহাদের তাহারা উপাসনা করিত এবং তারপর শয্যা গ্রহণ করিত", মহানবী ও তাঁহার স্ত্রীর প্রতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাকরণগত আপত্তির কথা পূর্বেই উল্লিখিত হইয়াছে। ৯৫ জেফারী তিনভাবে মর্গোলিয়থের উপসংহার সমর্থনের প্রয়াস পাইয়াছেন:
(ক) তাহার উপসংহারের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য বর্ণনায় উল্লিখিত মহানবী-এর উক্তির তিনি ভুল অনুবাদ করিয়াছেন;
(খ) প্রতিবেশীর উক্তি মহানবী ও তাঁহার স্ত্রীর প্রতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাকরণগত আপত্তি এড়াইবার জন্য তিনি একটি অজুহাতের অবতারণা করিয়াছেন; এবং
(গ) তাহার উপসংহার সমর্থনের জন্য সামগ্রিকভাবে বর্ণনাটির তাৎপর্য সম্পর্কে তিনি কিছু মন্তব্য করিয়াছেন।
اى خديجة والله لا اعبد اللات والعزى والله - জেফফারী মহানবী -এর উক্তি - لا اعبد ابدا -এর নিম্নরূপ অনুবাদ করিয়াছেন :
"Oh Khadijah! by Allah, I will not worship al-Lat nor al-Uzza; by Allah I will not perform worship again".
"হে খাদীজা! আল্লাহ্র শপথ, আমি আল-লাত বা আল 'উযযার উপাসনা করিব না। আল্লাহ্র শপথ! আমি পুনরায় উপাসনা করিব না"। ৯২ এই অনুবাদ তিন প্রকারে ত্রুটিপূর্ণ।
ঐ উক্তির দুই স্থানে উল্লেখিত 'লা' আ'বুদু' (لا اعبد) ক্রিয়াপদটিকে তিনি ভবিষ্যত কাল নির্দেশকরূপে ধরিয়াছেন, যাহা ব্যাকরণগত নিয়মের পরিপন্থী। উল্লেখ্য যে, এই উক্তিটিতে আ'বুদু (اعبد) ক্রিয়াটি দুইবার ব্যবহৃত হইয়াছে এবং উভয়বারই ঘটমান (মুদারি مضارع) আকারে। আরবী ভাষায় এই আকারটি বর্তমান (হাল حال) বা ভবিষ্যৎ (মুসতাকবিল مستقبل) কাল বুঝাইতে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সাধারণ নিয়ম এই যে, যেখানে ক্রিয়াটি একই বাক্যে একই মুদারি' আকারে দুইবার ব্যবহৃত হয়, সেখানে প্রথম ব্যবহারে বর্তমান কাল (حال) এবং দ্বিতীয় ব্যবহার ভবিষ্যৎ কাল (مستقبل) বুঝিতে হইবে। এই সাধারণ নিয়ম ছাড়াও যেখানে ক্রিয়াটির দ্বিতীয়বারের ব্যবহারে ভবিষ্যৎ কাল বুঝিতে হইবে বলিয়া সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বিদ্যমান সেখানে বিশেষভাবে ও অবশ্যম্ভাবীরূপে এই নিয়ম অনুসৃত হইবে। আলোচনাধীন উক্তিটিতে দ্বিতীয়বারের আ'বুদু ক্রিয়াটির পরেই 'আবাদান (أبدا) শব্দটি ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা অভ্রান্তরূপে ইঙ্গিত প্রদান করে যে, এখানে ক্রিয়াটি দ্বারা ভবিষ্যৎ কাল বুঝান হইয়াছে। অতএব উক্তিটিতে প্রথমবার ব্যবহৃত ক্রিয়াটিকে বর্তমান কালের (حال) বুঝিতে হইবে। এই সকল সাধারণ নিয়ম অনুসারে মহানবী -এর উক্তির والله لا اعبد اللات والعزى والله لا اعبد أبدا (নির্ভুল অনুবাদ হইবে :
"By Allah! I do not worship al-Lat and al-Uzza; by Allah! I will never worship (them)".
"আল্লাহ্র শপথ, আমি আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা করি না; আল্লাহ্র শপথ, আমি কখনও (তাহাদের) উপাসনা করিব না।"
প্রথমবার ব্যবহৃত ক্রিয়াটিকে সাধারণ বর্তমান কাল অর্থে বুঝিতে হইবে। কারণ দ্বিতীয়বারের ব্যবহারে ক্রিয়াটির সহিত 'আবদান' (أبدا) শব্দটি ব্যবহৃত হওয়ায় ক্রিয়াটি ভবিষ্যৎ কালের জন্য চিহ্নিত হইয়াছে এবং যেহেতু এইরূপ ধারণা করা সম্ভব নহে যে, মহানবী শুধু এইটুকু বলিতেছিলেন যে, তিনি সেই মুহূর্তে ঐ সকল প্রতিমার উপাসনায় নিয়োজিত ছিলেন না, তাই উক্তিটির প্রথমার্ধ তাঁহার অভ্যাস ও কর্মের ঘোষণাস্বরূপ এবং দ্বিতীয়ার্ধ ভবিষ্যতে অনুরূপ করার জোরালো অস্বীকৃতিস্বরূপ মনে করিতে হইবে। অন্য কথায়, মহানবী বলিয়াছেন যে, ঐ সকল প্রতিমার উপাসনা করা তাঁহার কাজ নহে কিংবা তিনি কখনও উহাদের উপাসনা করিবেন না।
জেফারীর অনুবাদের দ্বিতীয় ত্রুটি 'লা...'আবদান' (لا ... أبدا) অভিব্যক্তিটির অর্থ উপেক্ষা করা বা এড়াইয়া যাওয়া যাহার অর্থ "কখনও নহে”। এই অভিব্যক্তিটির নির্ভুল অর্থ করার পরিবর্তে জেফারী এখানে "পুনরায়" শব্দটি আমদানী করিয়াছেন এবং ইহা অনুবাদের তৃতীয় ত্রুটি। সুতরাং তিনি ইহার অনুবাদ করিয়াছেন : "আমি পুনরায় উপাসনা করিব না"। আরবী ভাষায় 'আবাদান' শব্দের সহিত 'লা' শব্দ ব্যবহৃত হইলে উহার অবশ্যম্ভাবী অর্থ দাঁড়ায় "কখনও নহে”, ইহার অর্থ কখনও "পুনরায়” হয় না। জেফারী এই তিন ধরনের অশুদ্ধ অনুবাদ করিয়াছেন—উভয় স্থানে ক্রিয়াপদকে ভবিষ্যত কাল অর্থে গণ্য করিয়াছেন, 'লা... আবাদান' অভিব্যক্তির অর্থ এড়াইয়া গিয়াছেন এবং উহার স্থলে "পুনরায়” শব্দটি আমদানী করিয়াছেন। ইহা দ্বারা তিনি স্পষ্টরূপে বুঝাইতে চাহিয়াছেন যে, মহানবী পূর্বে ঐ সকল প্রতিমার উপাসনা করিতেন। এখন তিনি ঘোষণা করিলেন যে, এখন হইতে তিনি "পুনরায়” উহা করিবেন না। মূল বাক্যের এইরূপ অর্থ সম্পূর্ণরূপে অযৌক্তিক।
মূলের অনুবাদে এই বিকৃতি সাধন ছাড়াও জেফারী বর্ণনার সর্বশেষ বাক্য, প্রতিবেশীর মন্তব্যঃ "ঐগুলি ছিল সেই প্রতিমা যাহাদের তাহারা উপাসনা করিত এবং তারপর শয্যা গ্রহণ করিত" মহানবী ও তাঁহার স্ত্রীর প্রতি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ব্যাকরণগত আপত্তি এড়াইবার জন্য এক কৈফিয়তের অবতারণা করিয়াছেন। তিনি বলেন যে, একজন আধুনিক লেখক দ্বি-বচন ও বহুবচন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করিতে পারেন, "কিন্তু প্রাচীন কালে ইহা এইরূপ ছিল না”। তিনি আরও বলেন যে, সম্পূর্ণ হাদীছটিই অর্থহীন হইবে "যদি ইহা মুহাম্মাদ ও খাদীজার পরিবারের প্রতি নির্দেশ না করে এবং যদি চাপ প্রয়োগ করা হয় তাহা হইলে আমরা সর্বদাই বলিতে পারি যে, বহুবচন পরিবার বুঝাইতেই ব্যবহৃত হইয়াছে”। ৯৭
ব্যাকরণগত আপত্তি উপেক্ষা করার জন্য জেফারী প্রদত্ত কৈফিয়ত একেবারে দুর্বল এবং অগ্রহণযোগ্য। হাদীছ বর্ণনাকারিগণ আরবী ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে মোটেও এত দুর্বল নহেন যে, তাহারা ক্রিয়াপদের দ্বি-বচন ও বহুবচন সংক্রান্ত নিয়মাবলীর ব্যাপারে অমনোযোগী হইবেন। জেফারী নিজেই তাহার অজ্ঞাতসারে তাহার অবস্থানের দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ করিয়াছেন যখন তিনি বলেন, "যদি চাপ প্রয়োগ করা হয় তাহা হইলে আমরা সর্বদাই বলিতে পারি যে, বহুবচন পরিবার বুঝাইতেই ব্যবহৃত হইয়াছে"। হাঁ, বহুবচন পরিবার বুঝাইতেই ব্যবহৃত হইয়াছে, তবে তাহাতে খাদীজার পিতৃ-পরিবার অথবা সাধারণভাবে কুরায়শ পরিবার বুঝান হইয়াছে, বিবাহের পর খাদীজা ও তাঁহার স্বামী লইয়া গঠিত পরিবার নহে।
এবং ইহা প্রকৃতপক্ষে আমাদিগকে সঠিকভাবে হাদীছটির তাৎপর্য সম্পর্কে জেফারীর মন্তব্যের নিকট আনয়ন করে। তিনি বলেন যে, হাদীছটি এক মুহূর্তের জন্য মুহাম্মাদ -এর পরিবারিক জীবনের পর্দা উন্মোচন করে এবং তখন হইতে তাঁহার "আধ্যাত্মিক উন্নয়ন সাধিত হইতে থাকে যখন তাঁহার চারপাশের বিশুদ্ধতর ধর্ম অথবা হানীফ নামের সেই সকল ছায়াবৎ ব্যক্তিবর্গের প্রভাবে তিনি প্রতিমা উপাসনার অকার্যকারিতা অনুভব করিতে লাগিলেন”। ৯৮
হাদীছটি মুহাম্মাদ-এর পারিবারিক জীবনের পর্দা মুহূর্তের জন্য উন্মোচন করিতে পারে, কিন্তু ইহা বর্ণিত প্রভাবের অধীন তাঁহার কথিত বিশেষ আধ্যাত্মিক উন্নয়নের সময় হইতে আসে নাই। কারণ যদি মহানবী যে কোন সময়ের জন্য খাদীজার সহিত প্রতিমা উপাসনা করার পর পরবর্তীতে উহার প্রতি কোন নূতন দৃষ্টিভঙ্গীর জন্ম হইত তাহা হইলে তিনি (খাদীজা) তৎসম্পর্কে ভালভাবেই অবহিত থাকিতেন এবং বিষয়টি সম্পর্কে কথোপকথন ভিন্নরূপ ধারণ করিত। অন্ততপক্ষে খাদীজা (রা) এই বলিয়া বিষয়টি শেষ করিতেন না যে, "সেই আল-লাতের কথা ছাড়ুন, সেই আল-'উযযার কথা ছাড়ুন", বরং তাঁহার স্বামীর নূতন দৃষ্টিভঙ্গীর কিছু ব্যাখ্যা জানিতে চাহিতেন। আর মহানবী-ও যেভাবে উত্তর দিয়াছেন সেভাবে দিতেন না, বরং তাঁহার নূতন দৃষ্টিভঙ্গীর কারণ উল্লেখ করিয়া অন্য কিছু শব্দের ব্যবহার করিতেন, বিশেষ করিয়া তিনি যখন তাঁহার স্ত্রীর সহিত কথা বলিতেছিলেন। সুতরাং কথোপকথনের ধারা ও মর্ম হইতে ইহা সম্পূর্ণ স্পষ্ট যে, ইহা তাঁহাদের বিবাহিত জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটিয়াছিল, যদি আদৌ ঘটিয়া থাকে, যখন মহানবী প্রথমবারের মত এইরূপ এক পরিস্থিতির সম্মুখীন হইয়াছিলেন যখন দেবদেবীর প্রতি তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গী সম্পর্কে বক্তব্য প্রদান জরুরী হইয়া পড়িয়াছিল। খুব সম্ভব ইহা এমন এক সময় ঘটিয়াছিল যখন তিনি খাদীজার পৈত্রিক পরিবারের সহিত প্রথমবারের মত রাত্রি যাপন করিয়াছিলেন অথবা ইহা তাঁহাদের বিবাহের পর প্রথম এমন কোন বার্ষিকী ছিল যখন কুরায়শরা ঐসকল দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করিত। ঘটনার এই ব্যাখ্যা যে, উহা তাঁহাদের বিবাহিত জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে ঘটিয়াছিল, বর্ণনটির অন্য সবকিছুর সহিত সুন্দররূপে মিলিয়া যায়। ইহা, যেরূপ উপরে উক্ত হইয়াছে, মহানবী-এর উক্তির সঠিক অর্থের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ হইবে এবং পূর্বাহ্নে কৃত নির্দিষ্ট কোন ধারণার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ করার জন্য নিজের সুবিধামত ব্যবহারের প্রয়োজন হইবে না। প্রাথমিক যুগের হাদীছ বর্ণনাকারিগণকে ব্যাকরণগত জ্ঞানের অজ্ঞতা সম্পর্কে দোষারোপ করার প্রয়োজন হইবে না অথবা বর্ণনাটি অন্যভাবে অর্থহীনও হইবে না যেরূপ জেফারী কল্পনা করিয়াছেন। বিবেচনার সকল নিয়ম অনুসারে বর্ণনাটি খাদীজার সহিত মহানবী-এর বিবাহিত জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ের কোন এক পরিস্থিতির সহিত সম্পর্কিত হইবে।
হাদীছটি এমন এক সময়কার যখন মুহাম্মাদ দেবদেবীর উপাসনাকে অর্থহীন বলিয়া ভাবিতে শুরু করিয়াছিলেন- জেফারী এইরূপ মন্তব্য দ্বারা কার্যত স্বীকার করিয়াছেন যে, এই বিশেষ বর্ণনাটি সম্পর্কে যতদূর বলা যায়, ইহা প্রমাণ করে যে, মহানবী তখন হইতে দেব-দেবীকে ভক্তি করিতেন না এবং উহাদের উপাসনা পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। এই স্বীকারোক্তি এবং সেই সঙ্গে এই বাস্তবতা যে, ঘটনাটি খাদীজার সহিত মহানবী-এর বিবাহের খুব বেশী দিন পরের ছিল না-জেফারীর পূর্ববর্তী তিনটি যুক্তিকেও নাকচ করিয়া দেয়। কারণ যখন ইহা স্বীকার করা হইয়াছে যে, মহানবী অন্ততপক্ষে তাঁহার বিবাহিত জীবনের প্রাথমিক পর্যায় হইতে দেবদেবীর উপাসনা অর্থহীন বলিয়া দেখিতে পাইয়াছিলেন এবং উক্ত উপাসনা ত্যাগ করিয়াছিলেন তখন সঙ্গতিপূর্ণভাবে এই দাবি করা যায় না যে, তিনি তৎসত্ত্বেও তাঁহার সন্তানদের জন্মের পর দেবদেবীর নাম অনুসারে নামকরণ করিয়াছেন অথবা তিনি নবুওয়াত প্রাপ্তির মাত্র পাঁচ বৎসর পূর্বে কা'বাঘরে কালো পাথর পুনস্থাপনে মধ্যস্থতা করিয়া দেবদেবীর জন্য গৃহ নির্মাণে অংশগ্রহণ করিয়াছিলেন অথবা তিনি তখনও একজন মুশরিক ছিলেন যখন নিজ কন্যাদিগকে মুশরিকদের সহিত বিবাহ দিয়াছিলেন।
অবশিষ্ট দুইটি বিষয় সম্পর্কে (ঙ ও চ) অর্থাৎ দেবদেবীকে প্রদত্ত মাংস গ্রহণে যায়দ ইবন 'আমর ইব্ন নুফায়লের অস্বীকৃতি সংক্রান্ত হাদীছ এবং যে হাদীছটিতে উল্লেখ রহিয়াছে যে, মহানবী একবার আল-'উযযার উদ্দেশ্যে একটি ধূসর বর্ণের মেষ উৎসর্গ করিয়াছিলেন সেই হাদীছটির বিষয়ে জেফারী নূতন কোন প্রমাণ বা মন্তব্য প্রদান করেন নাই। এই হাদীছ দুইটি ইতোপূর্বে বিশদভাবে আলোচনা করা হইয়াছে। ৯৯ সুতরাং উহাদের সম্পর্কে আর কোন আলোচনা নিষ্প্রয়োজন।
এই অধ্যায় শেষ করার পূর্বে এই বিষয়ে ওয়াট-এর মতামত উল্লেখ করা দরকার। তিনি সম্ভবত তাহার পূর্বসূরীদের মতামতের ভিত্তিতে নিজের মত গঠন করিয়াছেন এবং উহাদের সংমিশ্রণ ঘটাইয়াছেন। তৎকর্তৃক বিষয়টির আলোচনায় মোটামুটি তিনটি সুনির্দিষ্ট চিন্তাধারা, যাহার সব কয়টিই তাহার পূর্বসূরীদের, শনাক্ত করা যায়। তিনি সম্ভবত মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে কম বা বেশী পৌত্তলিক ছিলেন-এই ভ্রান্ত মতকে প্রতিষ্ঠিত সত্য বলিয়া গ্রহণ করিয়াছেন। তিনি এই মতও গ্রহণ করেন যে, ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবে প্রচলিত "অস্পষ্ট একত্ববাদ”, বিশেষ করিয়া হানীফদের উত্থান ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্মের প্রভাবের ফল ছিল এবং মুহাম্মাদ সেই একত্ববাদ দ্বারা একেবারে অপ্রভাবিত ছিলেন না। তৃতীয়ত এবং আরও স্পষ্টত, ওয়াট তাহার গুরু আর. বেল (R. Bell)-এর মত গ্রহণ করেন, যিনি যে আয়াতগুলিকে কুরআনের প্রাথমিক আয়াতসমূহের বাণী বলিয়া মনে করেন সেইগুলির ভিত্তিতে, এই মত পোষণ করেন যে, এমনকি নবুওয়াতের প্রথম কয়েক বৎসর মুহাম্মাদ প্রকাশ্যে অন্যান্য দেবতাদের বিরুদ্ধে কিছু বলেন নাই, বরং আল্লাহ্র "দয়া” ও দানের উপর জোর দিয়া তাঁহার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিতে চাহিতেন মাত্র। ১০০
ওয়াট এই সকল চিন্তাধারাকে একত্র করিয়া মন্তব্য করেন যে, মহানবী "শয়তানের কবিতা"র ঘটনা ও উহার বাতিলকরণ পর্যন্ত পৌত্তলিকতার সহিত সম্পূর্ণ সম্পর্কচ্ছেদ করেন নাই। তিনি যাহাকে মুহাম্মাদ-এর ধর্মীয় চিন্তাধারার ক্ষেত্রে "ক্রমবিকাশের আধুনিক পাশ্চাত্য ধারণা" বলিয়া অভিহিত করেন সেই সম্পর্কে মুসলিম পণ্ডিতগণের বোধশক্তির অভাবের ব্যাপারে গভীর দুঃখ প্রকাশ করিয়া ওয়াট লিখিয়াছেন, "সত্য কথা এই যে, তাঁহার অধিকতর আলোকপ্রাপ্ত সমসাময়িকগণের ন্যায় তাঁহার একত্ববাদ মূলত কিছুটা অস্পষ্ট ছিল এবং বিশেষ করিয়া এতখানি কঠোর ছিল না যে, নিকৃষ্টতর সত্তার স্বীকৃতি উহার সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া বিবেচিত হইত। তিনি সম্ভবত আল-লাত, আল-'উযযা ও মানাতকে আল্লাহ অপেক্ষা নিম্নমানের স্বর্গীয় সত্তারূপে মনে করিতেন—অনেকাংশে ঠিক যেরূপ ইয়াহুদী ও খৃস্টধর্ম ফেরেশতাদের অস্তিত্বের স্বীকৃতি দান করে”। ইহার পূর্বে, "মুহাম্মাদের নবুওয়াত ও প্রথম ওহী প্রাপ্তির পূর্বে কী ঘটিয়াছিল" সে সম্পর্কে বলিতে গিয়া ওয়াট লিখিয়াছেন, "ধর্মের ক্ষেত্রে তাঁহার দৃষ্টিভঙ্গী সম্ভবত অস্পষ্ট একত্ববাদ ছিল যাহা সর্বাধিক আলোকিত মক্কাবাসীর মধ্যে দৃষ্ট হইত, তবে ইহার অতিরিক্ত তিনি সম্ভবত মক্কায় কোন প্রকার সংস্কারের প্রত্যাশী ছিলেন”। ১০২ ওয়াট তাহার নিজ স্বীকারোক্তি অনুযায়ী ১০৩ এই কথাগুলি লিখিবার সময় এতখানি সতর্ক ছিলেন না যেরূপ পরবর্তীতে তিনি সতর্ক হইয়াছিলেন যে, সর্বোচ্চ সত্তা হিসাবে আল্লাহ্র ধারণা প্রাক-ইসলামী যুগের আরবে প্রচলিত ছিল। তাই তাহার সর্বশেষ গ্রন্থে তাহার বক্তব্য নিম্নরূপে কিছুটা সংশোধন করেন: ১০৪
"প্রাক-ইসলামী যুগের ধর্ম সম্পর্কে কুরআনের সাক্ষ্য এবং শয়তানের কবিতার কাহিনী হইতে বিচার করিলে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহতে মুহাম্মাদের মূল বিশ্বাস সম্ভবত 'প্রধান গড' বা সর্বোচ্চ দেবতা হিসাবে ছিল, সেই সঙ্গে নিম্নমানের স্থানীয় দেবতাদের প্রতিও তাঁহার বিশ্বাস ছিল যাহাদিগকে তিনি ফেরেশতা বলিয়া মনে করিতে পারেন, যাহারা সর্বোচ্চ সত্তার সহিত দেনদরবার করিতে পারিত। এমনকি এইরূপ একটি বর্ণনাও রহিয়াছে যে, তিনি বলিয়াছেন যে, তিনি একবার আল-'উযযার উদ্দেশ্যে একটি মেষ উৎসর্গ করিয়াছিলেন"।
ওয়াট-এর এই মন্তব্যসমূহ নবী হিসাবে মুহাম্মাদ -এর কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক পর্যায়ের সহিত আরও স্পষ্টরূপে সম্পর্কিত। সুতরাং একটু পরেই সেই প্রসঙ্গে ঐগুলি বিশদভাবে আলোচিত হইবে। ১০৫ এখানে শুধু এতটুকু বলা যাইতে পারে যে, উক্ত মন্তব্যসমূহ ক্রমবিকাশ তত্ত্বের সহিত সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ নহে যে সম্পর্কে ওয়াট এতো সুপরিচিত।
প্রথমত, তিনি বলেন যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ধর্মের ক্ষেত্রে মুহাম্মাদ -এর দৃষ্টিভঙ্গী ছিল "অস্পষ্ট একত্ববাদ যাহা সর্বাধিক আলোকিত মক্কাবাসীর মধ্যে দৃষ্ট হইত”। একই সঙ্গে ওয়াট আরও বলেন যে, তথাকথিত "শয়তানের কবিতা"-র ঘটনা অর্থাৎ নবী হিসাবে তাঁহার ভূমিকার ৩-৪ বৎসর পর্যন্ত মুহাম্মাদ কেবল নিম্নতর দেবতাদের স্বীকৃতিসহ অস্পষ্ট একত্ববাদ সম্পর্কে বলিতেন। ইহা ক্রমবিকাশ ধারণার সহিত সম্পূর্ণ সঙ্গতিহীন। কারণ নবী হিসাবে মুহাম্মাদের আবির্ভাব ইতোপূর্বে যাহা কিছু জ্ঞাত ছিল তদপেক্ষা তাঁহার পক্ষে নূতন ও উন্নততর কিছু চিহ্নিত হইয়া থাকিবে। কেহই তাঁহার প্রতি কোন বিশেষ মনোযোগ প্রদান করিত না এবং তাঁহার অনুসারী হইত না যদি তাঁহার ভাবধারা আলোকিত মক্কাবাসীদের তুলনায় সুস্পষ্টরূপে অগ্রগামী না হইত।
দ্বিতীয়ত, "সর্বাধিক আলোকিত মক্কাবাসী" বলিতে ওয়াট স্পষ্টত হানীফদের বুঝাইয়াছেন। কিন্তু তিনি শুধু বিভ্রান্তই হন যখন তিনি বলেন যে, তাহাদের একত্ববাদ "এতো কঠোর ছিল না যে, নিম্নতর সত্তাদের স্বীকৃতি উহার সহিত অসঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া ভাবা হইত”। হানীফ নামের উক্ত আলোকিত ব্যক্তিগণের একত্ববাদ অস্পষ্ট হইতে পারে, কিন্তু উহা সুস্পষ্ট ও অভ্রান্তরূপে প্রচলিত পৌত্তলিকতার একটি প্রতিক্রিয়া ও বিযুক্তি ছিল। উহা পৌত্তলিকতার কোন প্রশাখা ছিল না অথবা কোনভাবেই "নিম্নতর সত্তাদের” ক্ষমতাও স্বীকার করিত না। ওয়াট হানীফদের অবস্থানের অপব্যাখ্যা করিয়াছেন মহানবী-এর প্রতি উক্ত অবস্থান স্থানান্তর করার উদ্দেশ্যে, আর এই উভয় প্রচেষ্টাই ক্রমবিকাশ ধারণার সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নহে—হানীফদের সম্পর্কেও নহে অথবা মহানবী সম্পর্কেও নহে।
তৃতীয়ত, ওয়াটের উপরে উদ্ধৃত উক্তিটির শেষ বাক্যে মহানবী কর্তৃক আল-'উযযার উদ্দেশ্যে কথিত মেষ উৎসর্গ সম্পর্কিত হাদীছটির উল্লেখ রহিয়াছে যাহা ওয়াটের পূর্বসূরিগণও কিছু অন্যান্য বর্ণনার সহিত উল্লেখ করিয়াছেন। যেরূপ পূর্বে উল্লিখিত হইয়াছে, এই বর্ণনাটি বানোয়াট এবং বিশ্বাসের অযোগ্য। ১০৬ কিন্তু সেই কথা বাদ দিয়া, এমনকি বর্ণনার ভাষাও স্পষ্টত মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির অনেক পূর্বের অবস্থার বর্ণনা করে। এই বর্ণনার উল্লেখ করিয়া ওয়াটের পূর্বসূরিগণ, বিশেষ করিয়া জেফারী অন্ততপক্ষে স্বীকার করিয়াছেন যে, নবুওয়াতের পূর্বে মুহাম্মাদ-এর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গীর এতখানি পরিবর্তন সাধিত হয় যে, তিনি তাঁহার স্ত্রীর সহিত কথা বলার সময় দ্ব্যর্থহীনভাবে আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনা প্রত্যাখ্যান করেন। সুতরাং নবুওয়াত প্রাপ্তির পরেও মহানবী আল-লাত ও আল-'উযযাকে স্বীকৃতি দান অব্যাহত রাখিয়াছিলেন—এই দাবি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ওয়াট কর্তৃক এই বর্ণনাটির উল্লেখকরণ কাল নিরূপণের নিরিখে ভ্রান্তিমূলক এবং অন্যদের ক্রমবিকাশ তত্ত্বের সহিত সঙ্গতিবিহীন উভয়ই। ইহাও উদ্দেশ্যমূলক যে, ওয়াট মহানবী কর্তৃক আল-লাত ও আল-'উযযার উপাসনায় অস্বীকৃতি জ্ঞাপন সংক্রান্ত অপর বর্ণনাটি আদৌ উল্লেখ করেন নাই যাহা ওয়াটের পূর্বসূরিগণ সুনির্দিষ্টরূপে উল্লেখ করিয়াছেন।