📄 তিন: মৃগীরোগের অপবাদ ও অন্যান্য মন্তব্য
শাক্কস-সাদর (বক্ষবিদারণ)-এর ঘটনা সম্পর্কে কতিপয় প্রাচ্যবিদ এইরূপ উদ্ভট কটাক্ষ করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার বাল্যকাল হইতে আজীবন "মৃগী বা মূর্ছা রোগে" আক্রান্ত ছিলেন। এই কটাক্ষ গ্রীকদের দ্বারা শুরু হয় এবং তারপর পরবর্তী লেখকগণ কর্তৃক উহা গৃহীত হয়। তাহাদের কেহ কেহ এমনকি, যেরূপ সায়্যিদ আহমাদ খান উল্লেখ করিয়াছেন, ঘটনার বিবরণে উল্লিখিত 'ফালহিকীহি' (فالحقيه) অভিব্যক্তিকে 'বি-আলহাক্কিয়্যাহ' (بالحقية) রূপে ভুল পাঠ করিয়াছেন এবং তারপর উহার অদ্ভূত অনুবাদ করিয়াছেন "অমূলক আতঙ্কগ্রস্ততা বা উদ্বিগ্নতা রোগ" (Hy-Pochondriacal disease) বলিয়া। ৭৮ উইলিয়াম মুইর যখন তাহার গ্রন্থ রচনা করেন স্পষ্টতই তাহার পূর্বসূরীদের ভ্রান্ত ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হইয়াছিলেন। তাই এই ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন, ইহা "সম্ভবত মৃগীরোগের খিচুনি" ছিল এবং লিখেন: ৭৯
"আমরা যদি আক্রমণগুলিকে সঠিকভাবে বুঝিতে সম্মত হই যাহা হালীমাকে স্নায়বিক বা মৃগী প্রকৃতির খিচুনিরূপে শংকিত করিয়াছিল তাহা হইলে ঐগুলি মুহাম্মাদ-এর গঠনে সেই সকল উত্তেজক অবস্থার ভাবাবেশকর মূর্ছার স্বাভাবিক চিহ্ন প্রদর্শন করে, যাহা সম্ভবত তাঁহার মনে প্রেরণার ধারণা প্রদান করিয়াছিল, যেরূপ তাঁহার অনুসারিগণ উহাকে নিঃসন্দেহে তাহার প্রমাণ স্বরূপ গ্রহণ করিয়াছে"।
মুইর এই মৃগীরোগের তত্ত্বের সমর্থনে তাহার পুস্তকের পাদটীকায় ইব্ন হিশাম (ইবন ইসহাক)-এর গ্রন্থের উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু উক্ত গ্রন্থের উসটেনফিল্ড (Wustenfeld) সংস্করণে৮০ এবং অন্য সকল সংস্করণেও, বর্ণনায় প্রকৃত অভিব্যক্তি উল্লিখিত হইয়াছে 'উসীবা' (اصيب), অথচ মুইর উহাকে পুনরুল্লেখ করিয়াছেন 'উমীবা' (امیبه) বলিয়া, যাহা স্পষ্টতই একটি অদ্ভূত ও অর্থহীন অভিব্যক্তি। অতঃপর তিনি উহার অর্থ করিয়াছেন "খিচুনিতে আক্রান্ত হইয়াছিলেন" ৮১ বলিয়া। প্রকৃতপক্ষে তিনি যদি উক্ত গ্রন্থের কোন ত্রুটিপূর্ণ পাণ্ডুলিপি বা মুদ্রিত কপি অনুসরণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে উহার উল্লেখ করা উচিত ছিল। কিন্তু মুইর তাহা করেন নাই। বিপরীতক্রমে সায়্যিদ আহমাদ খান যখন ১৮৭০ খৃ. মুইরের এই মারাত্মক ভুলের কথা উল্লেখ করেন ৮২, শেষোক্তজন তখন মাত্র তাহার পুস্তকের পরবর্তী সংস্করণ হইতে আলোচ্য পাদটীকাটি বাদ দিয়া দেন। কিন্তু তাহার যে তত্ত্বের সমর্থনে প্রমাণস্বরূপ উক্ত পাদটীকা প্রথমে দেওয়া হইয়াছিল তিনি উহার কোন পরিবর্তন বা সংশোধন করেন নাই। এইভাবে উৎসের ভুল ও অপব্যবহার নির্দেশ করা সত্ত্বেও অভিযোগ অব্যাহতভাবে চালাইয়া যাওয়া হয়। ৮৩
উল্লেখ্য যে, 'শাকুস সাদর' (شق الصدر) (বক্ষ বিদারণ) ঘটনা সংক্রান্ত কোন বর্ণনাতেই উল্লেখ নাই যে, বালক মুহাম্মাদ-কে অচেতন বা মৃগীর খিচুনিগ্রস্ত দেখা গিয়াছিল। পুনরায় কোন বর্ণনাতেই ঘটনাটিকে শারীরিক পীড়ন ও নিষ্পেষণসহ উল্লেখ করা হয় নাই, যাহা মহানবী-এর জীবনে অনেক পরবর্তী কালে তাঁহার নিকট ওহী আগমনের সময় কখনও কখনও থাকিত। এতদসত্বেও মুইর তাহার পূর্বসূরীদের অনুসরণে উহাই করিয়াছেন এবং নিম্নরূপ অননুমোদিত মন্তব্য করিয়াছেন যে, "স্নায়বিক বা মৃগী প্রকৃতির খিচুনি" মুহাম্মাদ-এর গঠনে "সেই সকল উত্তেজনাকর অবস্থা ও ভাবাবেশকর মূর্ছা"র স্বাভাবিক চিহ্ন” ছিল যাহা সম্ভবত তাঁহার মনে প্রেরণার ধারণা প্রদান করিয়াছিল, যেরূপ তাঁহার অনুসারিগণ উহাকে নিঃসন্দেহে তাহার প্রমাণস্বরূপ গ্রহণ করিয়াছেন"।
এইরূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইটি বিষয়ের মিশ্রণ কোনক্রমেই উৎস গ্রন্থের দ্বারা সমর্থিত নহে, বরং দুইটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গীর ইঙ্গিত বহনকারী। ইহাতে একদিকে মৃগীরোগের ধারণার ভিত্তি হিসাবে 'শাকুস সাদর' সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনার অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ পায়। তাই মহানবী-এর নিকট ওহী আগমনকালীন কোন কোন সময়কার অবস্থার বিকৃতি সাধন দ্বারা এক প্রকার সহায়ক প্রমাণের অবতারণা করা হইয়াছে। অন্যদিকে ইহাতে ওহীর প্রকৃতি এবং তদ্দ্বারা মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াতের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই শেষোক্ত আচরণ বিষয়টির প্রতি সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গীতে অধিকতর মৌলিক বলিয়া মনে হয়। তাই পরবর্তী প্রাচ্যবিদদের অনেকে মৃগীরোগের মতবাদ গ্রহণ না করিলেও মুইরের উপরোল্লিখিত মন্তব্যের তাৎপর্য গ্রহণ করিয়াছেন এবং ওহীকালীন (وحی) অবস্থার ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পাইয়াছেন, যাহাকে বলা হয় মুহাম্মাদ-এর "সচেতনতা" বলিয়া অর্থাৎ যাহা তিনি "প্রেরণা” মনে করিতেন বা "আন্তরিকভাবে" বিশ্বাস করিতেন, কিন্তু যাহা কোনভাবেই আল্লাহ্র নিকট হইতে ছিল না। ৮৪ এই বিষয়টি সম্পর্কে আরও আলোচনা এই পুস্তকের পরবর্তী পর্যায়ে করা হইবে। ৮৫ তবে এখানে এতটুকু অবশ্যই উল্লেখ করিতে হয় যে, মুসলমানগণ তথাকথিত "উত্তেজনাকর অবস্থা ও ভাবাবেশকর মূর্ছা"কে প্রেরণার প্রমাণস্বরূপ গ্রহণ করে না, যেরূপ মুইর দাবি করিয়াছেন।
মৃগীরোগ কিংবা অনুরূপ অন্য কোন রোগের মতবাদ ঐতিহাসিক অথবা যৌক্তিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণেই টিকিতে পারে না। প্রাপ্ত সকল বিবরণ হইতে ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী আমৃত্যু এক অসাধারণ দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মতৎপরতার অধিকারী ছিলেন। তিনি কখনও দেহ ও মনের দৌর্বল্য ও বৈকল্যের কোন লক্ষণ প্রদর্শন করেন নাই যাহা অতীত ও বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিন্ন মতানুযায়ী মৃগীরোগ বা হিষ্টিরিয়ার অপরিহার্য পরিণতি। এমনও নহে যে, ইহা কটাক্ষের প্রবক্তাদের সম্পূর্ণ অজানা ছিল। মুইর নিজেই বলেন, "ইহা সম্ভব যে, অন্যান্য দিক দিয়া মুহাম্মাদ-এর দৈহিক গঠন অধিকতর শক্ত-সমর্থ ছিল”। ৮৬ ইহা সত্বেও মুইর ও তাহার অনুসারিগণ কটাক্ষ অব্যাহত রাখিতে বদ্ধপরিকর।
মার্গোলিয়থ মহানবী-এর মধ্যে মস্তিষ্ক-শক্তির হ্রাসসহ মৃগীরোগের কিছু কিছু লক্ষণ অনুপস্থিত ছিল বলিয়া স্বীকার করিলেও, উল্লিখিত অভিযোগ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রেই শুধু নহে, ওহী আগমন প্রক্রিয়ার সহিত কথিত মৃগীরোগের খিঁচুনির সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও মুইরের প্রতিধ্বনি করিয়াছেন। মার্গোলিয়থ এমনও বলেন যে, মহানবী ওহী "সৃষ্টি"র উদ্দেশ্যে "কৃত্রিমভাবে" উহার লক্ষণ তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন: "...... খৃস্টান লেখদের ৮৭ মধ্যে প্রচলিত ধারণা যে, তিনি মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন, ওহী নাযিল প্রক্রিয়ায় তাঁহার অভিজ্ঞতার লিপিবদ্ধ বর্ণনাসমূহে উহার অদ্ভূত সমর্থন পাওয়া যায় এবং উক্ত প্রক্রিয়ার লক্ষণসমূহ প্রায়শ কৃত্রিমভাবে সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকিলেও উক্ত ধারণার গুরুত্ব হ্রাস পায় না”। ৮৮
এইরূপে মুইর ও মার্গোলিয়থের উদ্ভাবিত কটাক্ষের পুনরাবৃত্তি পরবর্তী লেখকদের অনেকেই করিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রিচার্ড বেল (Richard Bell), যিনি উক্ত অভিযোগের প্রতি তাহার সমর্থন ব্যক্ত করিয়া সকল প্রধান প্রধান প্রাচ্যবিদের তালিকা প্রদান করিয়াছেন যাহারা উক্ত অভিযোগ উত্থাপন ও প্রধানত ওহী নাযিল প্রক্রিয়ার সহিত উহার সম্পর্ক স্থাপন করিয়াছেন। ৮৯ যেহেতু আধুনিক কালে মুইর এই অপবাদের প্রধান প্রবক্তা এবং অন্যরা শুধু তাহাকে অনুসরণ করিয়াছেন ধারণার পক্ষে কোন বৈধ যুক্তির উল্লেখ ছাড়াই, তাই তাহাদের মতামতের পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নাই।
মহানবী -এর শৈশবের অন্যান্য ঘটনার মধ্যে তাঁহার চাচার সহিত সিরিয়া ভ্রমণের সময় বাহীরার (বুহায়রা) সহিত তাঁহার সাক্ষাতের বিষয়টি প্রাচ্যবিদগণের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছে। কারণ ইহাতে মহানবী -এর প্রথম জীবনে একজন খৃস্টান ধর্মযাজকের সহিত তাঁহার এক প্রকার যোগাযোগ প্রমাণিত হয় এবং তাহা তাহাদের এই মতবাদের প্রতি সমর্থন যোগায় বলিয়া ধারণা করা হয় যে, তিনি পূর্বেই নানাভাবে খৃস্টধর্মের জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন এবং যখন তিনি নিজেকে নবী বলিয়া ঘোষণা করেন তখন সেই জ্ঞানের ব্যবহার করেন। তাহারা বাহীরার সহিত এই কথিত সাক্ষাতের, এমনকি খৃস্টধর্মের বিধান ও ধর্মগ্রন্থের পাঠ ও শিক্ষা গ্রহণের কয়েকটি অধিবেশন অতিরঞ্জিত করিয়াছেন, যদিও সংশ্লিষ্ট বিবরণে কোন আকারেই একটি অতি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতকার এবং প্রধানত প্রত্যাশিত নবী সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থীয় ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয়ে আনুষঙ্গিক আলোচনার অতিরিক্ত কোন কিছুর ধারণা পাওয়া যায় না।
কথিত খৃস্টান ও ইয়াহুদী উৎস হইতে মহানবী -এর তথ্য ধার করার প্রশ্ন এই পুস্তকের পরবর্তী পর্যায়ে আলোচিত হইবে। ৯০ এখানে এইটুকু মাত্র উল্লেখ করা যায় যে, বাহীরার সহিত সাক্ষাতের এই ঘটনাকে প্রাচ্যবিদগণ কর্তৃক ব্যবহার দুইটি প্রধান বিষয়ে ত্রুটিপূর্ণ।
(এক) তাহারা ঘটনা সংক্রান্ত বিবরণের একটি অংশ মাত্র গ্রহণ করেন এবং অপর অংশটি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ সেই অংশটি তাহাদের মতের বিরুদ্ধে যায়। বিবরণের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, তথা কুরায়শ দলকে বাহীরা কর্তৃক আপ্যায়ন, বালক মুহাম্মাদ -এর সহিত তাহার কথোপকথন এবং বালককে লইয়া গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য আবূ তালিবের প্রতি তাহার আহবান-এর পিছনে সমগ্র কারণ ছিল প্রত্যাশিত নবী সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থীয় ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয়ে তাহার (বাহীরার) জ্ঞান এবং বালকের মধ্যে উক্ত নবীর "চিহ্নসমূহ" তাহার শনাক্ত করিতে পারা। সমগ্র বিবরণটিকে গ্রহণ করিলে উহার অর্থ খৃস্টান ধর্মগ্রন্থে অনুরূপ ভবিষ্যদ্বাণীর শুধু উপস্থিতিই স্বীকার করা হয় না, বরং তদানীন্তন আরবজগতে খৃস্টান যাজকীয় মহলে অনুরূপ ভবিষ্যদ্বাণীর জ্ঞান প্রচলিত ছিল তাহাও স্বীকার করা হয়। এতদসত্ত্বেও বাহীরা ও তাহার ন্যায় অনেকের যে অনুরূপ সচেতনতা ও জ্ঞান থাকিতে পারে প্রাচ্যবিদগণ তাহাও মানিতে নারাজ। মুইর এই ঘটনাকে, যেরূপে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে, কোন ফন্দিবাজ ধর্মযাজকের ভ্রান্তি বা জালিয়াতি বলিয়া একতরফা ধারণা দ্বারা ব্যাখ্যা করারও প্রয়াস পাইয়াছেন। তাহারা এইভাবে ঘটনার মূল অংশ বা সারকথা অগ্রাহ্য বা প্রত্যাখ্যান করিয়া আনুষঙ্গিক একটি বিষয় অর্থাৎ বাহীরার সহিত বালক হিসাবে মহানবী-এর কথোপকথনের প্রতি গুরুত্ব প্রদান এবং উহার ভিত্তিতে শেষোক্তজনের খৃষ্টধর্মের জ্ঞানের সংস্পর্শে আগমন ও উহা অর্জনের মতবাদ নির্মাণের প্রয়াস পাইয়াছেন।
(দুই) যেরূপ শাকুস সাদর সংক্রান্ত বিবরণের ক্ষেত্রে সেইরূপ এই ক্ষেত্রেও প্রাচ্যবিদগণ, বিশেষ করিয়া মুইর, বিবরণটি ব্যবহার করিয়াছেন, যদিও উহার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তাহারা সন্দেহ পোষণ করেন। সুতরাং মুইর তাহার পুস্তকের প্রথম সংস্করণের এক দীর্ঘ পাদটীকায় কাল্পনিক ও "অনেক বেশী অবাস্তবতায়" পরিপূর্ণ বলিয়া বাহীরা সংক্রান্ত বিবরণের নিন্দা করিয়াছেন।৯১ কিন্তু তারপর সম্ভবত ইহা বুঝিতে পারিয়া যে, পাদটীকায় তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা মূল পুস্তকে বর্ণিত তাহার ধারণার পরিপন্থী, তাহার পুস্তকের পরবর্তী সংস্করণে পাদটীকাটি বাদ দেন, কিন্তু মূল পুস্তকের বক্তব্য অসংশোধিতই থাকিয়া যায়।
এমনকি মুইর এই সফরকে মহানবী-এর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাসফর বা আবিষ্কারমূলক অভিযান বলিয়াও কল্পনার ফানুস উড়াইয়াছেন। একজন শিক্ষিত পূর্ণ বয়স্ক পর্যটক পাইতে পারেন এইরূপ ধারণা মনের সামনে তুলিয়া ধরিয়া মুইর কল্পনার চিত্র আঁকিয়াছেন এইভাবে যে, মহানবী আরবজগতের ও রাষ্ট্রসমূহের সেই অংশের সকল ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন।৯২
"এই অভিযান..... তরুণ মুহাম্মাদ-কে পর্যবেক্ষণের যে সুযোগ দান করিয়াছিল তাঁহার উপর উহার প্রভাব ব্যর্থ হয় নাই। তিনি পেট্রা, জেরাশ, আম্মন ও প্রাচীন বাণিজ্যিক জাঁকজমকের অন্যান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানসমূহের নিকট দিয়া অতিক্রম করেন এবং উহাদের দৃশ্য নিঃসন্দেহে তাঁহার চিন্তাশীল মনের উপর পার্থিব শ্রেষ্ঠত্বের অস্থায়িত্ব গভীর রেখাপাত করে...। এই সফরকালে তিনি কয়েকটি ইয়াহুদী বসতী এলাকার মধ্য দিয়াও গমন করেন এবং সিরিয়ার জাতীয় ধর্ম খৃষ্টধর্মের সংস্পর্শে আসেন....। সিরিয়ায় তৎকালের খৃস্টধর্ম যতই পতিত ও বস্তুবাদী হউক না কেন, ইহা চিন্তাশীল পর্যবেক্ষকের মনে অনুকূল এবং মক্কার স্কুল ও অধ্যাত্মিকতাহীন পৌত্তলিকতার বিস্ময়কর বিপরীত রেখাপাপ করিয়া থাকিবে।
উল্লিখিত বর্ণনা নিঃসন্দেহে একটি উপভোগ্য সাহিত্যের অংশ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যাহা ঘটিয়াছে তাহার পরিমিত ও বিশ্বাস্য বিবরণ উহাতে অনুপস্থিত। আমরা বরং এইরূপ মনে করার পক্ষে যে, যেহেতু ইহা একটি বেশ দীর্ঘ ও কষ্টকর স্থলপথে বাণিজ্যদলের সফর ছিল, তাই দলটি পরিত্যক্ত নিবাস, বিধ্বস্ত নগরী কিংবা নিরানন্দ গীর্জা সমাবেশ-এর ন্যায় বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক স্থানসমূহের ভ্রমণ সতর্কতার সহিত পরিহার করিয়া থাকিবে।