📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 দুই: মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম প্রসঙ্গে

📄 দুই: মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নাম প্রসঙ্গে


প্রাচ্যবিদগণ একইভাবে মহানবী-এর নাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করিয়াছেন। এই ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টিকারী প্রথম আধুনিক পণ্ডিত সম্ভবত এ্যালয় স্প্রেংগার (Aloy Sprenger)।৩০ স্প্রেংগার আস-সীরাতুল হালাবিয়্যা গ্রন্থে ৩১ পুনরুল্লিখিত একটি বর্ণনা হইতে তাঁহার সূত্র আবিষ্কার করিয়া বলেন যে, মহানবী-এর প্রথম নাম ছিল "কুছাম", কিন্তু পরবর্তীতে উহা পরিবর্তন করিয়া রাখা হয় 'মুহাম্মাদ'। স্প্রেংগার তাঁহার এই উক্তি এমনভাবে করিয়াছেন যেন এইরূপ ধারণার উদ্রেক হয় যে, প্রথম ও দ্বিতীয় নাম গ্রহণের মধ্যে বেশ কিছু সময় অতিবাহিত হইয়া গিয়াছিল।
এখন ইহা উল্লেখযোগ্য যে, আল-হালাবী তাঁহার গ্রন্থের একই অধ্যায়ের প্রথমদিকে অপর কয়েকটি বর্ণনার পুনরুল্লেখ করিয়াছেন যাহাতে দেখা যায় যে, "মুহাম্মাদ" নামটি শিশুর মাতা (আমিনা) ও পিতামহ (আবদুল মুত্তালিব) কর্তৃক সর্বসম্মত ছিল এবং শেষোক্তজন শিশুর জন্মের সপ্তম দিনে এক ভোজের আয়োজন করেন এবং প্রকাশ্যে শিশুর নাম "মুহাম্মাদ” বলিয়া ঘোষণা করেন। ৩২ এমনকি স্প্রেংগার যে বর্ণনার উপর নির্ভর করিয়াছেন উহাতেও স্পষ্টরূপে দেখা যায় যে, মুহাম্মাদ নামটি শিশুর জন্মের সর্বশেষ মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে চূড়ান্তরূপে গৃহীত হইয়াছিল। উক্ত বর্ণনাটি নিম্নরূপ: ৩৩
'ইমতাউল আসমা' গ্রন্থে ৩৪ বর্ণিত হইয়াছে যে, যখন মহানবী-এর জন্মের তিন বৎসর পূর্বে নয় বৎসর বয়সে কুছাম ইব্‌ন 'আবদুল মুত্তালিব-এর মৃত্যু হয়.. তখন আবদুল মুত্তালিব গভীরভাবে শোকাহত হন। সুতরাং যখন মহানবী জন্মগ্রহণ করেন তিনি তাঁহার নাম রাখিলেন 'কুছাম' যতক্ষণ না তাঁহার মাতা 'আমিনা 'আবদুল মুত্তালিবকে জানাইলেন যে, তিনি স্বপ্নে শিশুর নাম 'মুহাম্মাদ' রাখিতে আদিষ্ট হইয়াছেন। অতঃপর তিনি (আবদুল মুত্তালিব) তাঁহার নাম রাখিলেন 'মুহাম্মাদ'।
সুতরাং ইহা স্পষ্ট যে, বর্ণনাটিতে শিশুর জন্মের অব্যবহিত পর এবং নিশ্চিতভাবে তাঁহার জীবনের সপ্তম দিনের, যখন 'আকীকা অনুষ্ঠিত হইয়াছিল এবং তাঁহার নামের প্রকাশ্য ও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা প্রদান করা হইয়াছিল, পূর্বে যাহা ঘটিয়াছিল কেবল তাহার বর্ণনা রহিয়াছে।
স্প্রেংগারের সহিত প্রায় একই সঙ্গে মুইর (Muir) মহানবী -এর নাম সম্পর্কে তাঁহার মন্তব্য প্রদান করিয়াছেন। তিনি অবশ্য 'কুছাম' নামের উল্লেখ করেন নাই, তবে অন্যভাবে নাম সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টির পাঁয়তারা করিয়াছেন, বিশেষ করিয়া 'আহমাদ' নাম সম্পর্কে। তিনি অভিমত প্রকাশ করেন যে, এই শেষোক্ত নামটি মুসলিমগণ কর্তৃক গৃহীত ও তাহাদের নিকট সমাদৃত হইয়াছিল খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের সহিত তাহাদের মুকাবিলার কারণে। কেননা বাইবেলে তাহাদের নবী সম্পর্কে "কথিত ভবিষ্যদ্বাণী"র সহিত ইহা মিলিয়া যায়। মুইর লিখিয়াছেন:
"এই নামটি (মুহাম্মাদ) আরবদের মধ্যে বিরল ছিল, তবে অজ্ঞাত ছিল না। আরেকটি রূপ আহমাদ, যাহা নিউ টেস্টামেন্টের কোন কোন আরবীরূপে 'The Paraclete'-এর ভুল অনুবাদরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে, মুসলমানদের নিকট প্রিয় শব্দে পরিণত হইয়াছিল, বিশেষ করিয়া ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সম্বোধনের ক্ষেত্রে। কারণ মহানবী সম্পর্কে এই নামে (তাহারা বলে) তাহাদের গ্রন্থে ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছিল”। ৩৫
এই উক্তির সহিত সংযুক্ত এক টীকায় মুইর আরও বলেন, "আহমাদ শব্দটি জন-এর গসপেলের (John's Gospel) কোন কোন প্রাথমিক আরবী অনুবাদে 'সান্ত্বনাদাতা' (The comforter)-এর সূত্রে ভুলক্রমে ব্যবহৃত হইয়া থাকিবে.... অথবা মুহাম্মাদের সময়ে কোন মূর্খ বা ফন্দিবাজ ধর্মযাজক উহা মিথ্যা রচনা করিয়া থাকিবে। এই জন্যই এই নামের প্রতি পক্ষপাতিত্ব, যাহা মুহাম্মাদের জন্য প্রতিশ্রুতি বা ভবিষ্যদ্বাণীরূপে মনে করা হয়”। ৩৬
মহানবী সম্পর্কে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয় পৃথকভাবে আলোচিত হওয়া প্রয়োজন। এখানে কেবল মুইরের মন্তব্যের প্রধান প্রধান দুর্বলতাগুলি উল্লেখ করা যাইতে পারে। ইহা সুবিদিত যে, মুসলিম ঐতিহাসিকগণ 'মুহাম্মাদ' নামের নূতনত্ব সম্পর্কে আলোচনা করিতে গিয়া ইহা উল্লেখ করিতে ভুলেন নাই যে, আরও কয়েক ব্যক্তির নাম 'মুহাম্মাদ' রাখা হইয়াছিল। কারণ তাহাদের পিতা-মাতাগণ ঘটনাক্রমে উত্তমরূপে ওয়াকিফহাল কোন খৃস্টান ধর্মযাজকের নিকট হইতে জানিতে পারিয়াছিল যে, একজন নবীর আগমন সম্পর্কে বাইবেলে ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে এবং তিনি শীঘ্রই আবির্ভূত হইবেন এবং তাঁহার নাম হইবে 'মুহাম্মাদ'।
এই কারণে প্রত্যেক পিতা-মাতাই তাহাদের পুত্রের নাম রাখে 'মুহাম্মাদ' এই আশায় যে, তাহাদের পুত্রই হয়ত একদিন প্রত্যাশিত নবীরূপে আবির্ভূত হইবে। ৩৭ ইহাও উল্লেখ করা হইয়াছে যে, অনুরূপ নামকরণকৃত ব্যক্তিগণ সকলেই মহানবী -এর সমসাময়িক ছিল এবং তাহাদের গরিষ্ঠ সংখ্যক মহানবী-এর নবৃওয়াত প্রাপ্তির কাছাকাছি সময়ে জন্মগ্রহণ করিয়াছিল। ৩৮ মুইর এই বিষয়ে এবং পিতা-মাতাগণ কর্তৃক তাহাদের সন্তানদের এইরূপ নামকরণের ঐতিহাসিকগণ প্রদত্ত কারণ সম্পর্কে অবহিত; কিন্তু তিনি ইহাকে "নবীর পূর্বাভাস প্রদর্শনের" জন্য "মুসলমানদের সাধারণভাবে অতি বিশ্বাস ও আকাঙ্খা” হিসাবে নাকচ করিয়া দিয়াছেন। ৩৯
মুইর এইভাবে প্রকৃতপক্ষে মুসলিম ঐতিহাসিকদের সরবরাহকৃত তথ্যের একদিকের প্রতি নির্ভর করিয়াছেন এবং একই তথ্যের অন্য দিককে প্রত্যাখ্যান ও বিদ্রূপ করিয়াছেন। সুতরাং তিনি সরাসরি উল্লেখ করা হইতে বিরত রহিয়াছেন যে, ঐতিহাসিকগণ বলেন যে, মহানবী-এর উভয় নাম মুহাম্মাদ ও আহমাদ তাঁহার শৈশব হইতেই রাখা হইয়াছে এবং পরোক্ষভাবে 'আহ্মাদ' নামের উল্লেখ করিয়াছেন এই বলিয়া যে, ইহা "মুসলমানদের নিকট একটি প্রিয় শব্দে পরিণত হইয়াছিল, বিশেষ করিয়া ইয়াহুদী ও খৃস্টানদিগকে সম্ভোধন করিয়া বলার ক্ষেত্রে", কারণ শেষোক্তদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থে নামটি উল্লিখিত হইয়াছে বলিয়া কথিত হয়।
কিন্তু যেহেতু আহমাদ নামটি প্রকৃতই তৎকালীন বাইবেলের আরবী অনুবাদে উল্লিখিত ছিল, তাই মুইর ইহার ব্যাখ্যা করিতে গিয়া আরও দুইটি অবাস্তব ধারণার অবতারণা করিয়াছেন। যথাঃ ইহা (আহমাদ) নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখিত "দি প্যারাক্লেট" (The Paraclete)-এর 'ভ্রমাত্মক' অনুবাদ এবং "মুহাম্মাদের সময়ে কোন মূর্খ বা ফন্দিবাজ ধর্মযাজক কর্তৃক ইহা মিথ্যা রচিত”।
স্পষ্টতই মুইর এখানে তাঁহার ধারণার দুর্বলতা প্রকাশ করিয়া দিয়াছেন। প্রথম ক্ষেত্রে যদি ইহা কেবল বাইবেলের আরবী পাঠের ভুল অনুবাদই হইত তাহা হইলে উক্ত ভুলের নির্দেশকরণই এই বিষয়ে চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইত। কিন্তু মুইর স্পষ্টত নিশ্চিত নহেন। তাই তিনি "মুহাম্মাদের সময়ে কোন মূর্খ বা ফন্দিবাজ ধর্মযাজকের" জালিয়াতির বিকল্প দাবি লইয়া হাজির হইয়াছেন। কিন্তু কেন উক্তরূপ ধর্মযাজক (যদি আদৌ কেহ ছিলেন) মহানবী-এর সময়ে বাইবেল অনুবাদ করিতে গিয়া জালিয়াতি করার প্রশ্নসাপেক্ষ সুযোগ গ্রহণ করিয়াছিলেন, মুইর তাহা ব্যাখ্যা করেন নাই। তাঁহার নিজ দাবি অনুসারে অপরিহার্যরূপে এই অনুসিদ্ধান্তে পৌঁছিতে হয় যে, তথাকথিত ফন্দিবাজ ধর্মযাজক আহমাদ নামের সহিত মূল পাঠের মিল দেখাইবার জন্য কথিত অনুবাদে উক্ত নামটি কেবল তখনই সন্নিবেশিত করিয়া থাকিবেন যদি পূর্বেই মহানবী উক্ত নাম ধারণ করিয়া থাকেন। অন্য কথায়, মুইরের নিজ ধারণা অনুসারেই মানিয়া লইতে হয় যে, মহানবী ঐ সময় উক্ত নাম ধারণ করিয়াছিলেন।
মুইরের অপর ধারণা যে, আহমাদ শব্দটি মুসলমানদের নিকট প্রিয় হইয়াছিল এই কারণে যে, ইহা বাইবেলের কথিত ভ্রান্ত অনুবাদে পাওয়া গিয়াছিল, যাহার অর্থ এই যে, আলোচ্য নামটি পরবর্তীতে গৃহীত হইয়াছিল যখন তাহারা বাইবেলে উহার উপস্থিতি সম্পর্কে জানিতে পারে। অথচ জ্ঞাত তথ্য বা যুক্তি দ্বারা এইরূপ অর্থ কোনক্রমেই সমর্থিত নহে। সহজ কথায় মুইরের দ্বিবিধ ধারণা উহাদের ভাবার্থসহ নিম্নরূপ দাঁড়ায়: মহানবী আহমাদ নামটি তাঁহার শৈশবকাল হইতেই ধারণ করিয়াছিলেন এবং সেই কারণে কোন এক ফন্দিবাজ ধর্মযাজক নিউ টেস্টামেন্টে উল্লিখিত প্যারাক্লেট (Paraclete) শব্দটির বানোয়াট ও ভ্রান্ত অনুবাদ করেন 'আহমাদ' হিসাবে এবং যেহেতু 'আহ্মাদ' শব্দটি নিউ টেস্টামেন্টের আরবী অনুবাদে পাওয়া গিয়াছে, তাই শব্দটি মুসলমানদের নিকট প্রিয় হইয়াছে। এইরূপ গোলকধাঁধার সূত্রে একটি ভ্রান্ত যুক্তি দেখান অপেক্ষা বিভ্রান্তিকর আর কিছুই হইতে পারে না।
আসলে মুইরের ধারণার প্রকৃত উদ্দেশ্য হইতেছে, মহানবী সম্পর্কে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীকে নাকচ ও নিরপেক্ষ করা। উক্ত ভবিষ্যদ্বাণী কোন ভ্রান্ত অনুবাদও নহে কিংবা পরবর্তী কালের সৃষ্টও নহে। কুরআনে দাবি করা হইয়াছে যে, মহানবী -এর আগমন সম্পর্কে পূর্ববর্তী কালের নাযিলকৃত ধর্মগ্রন্থসমূহে ভবিষ্যদ্বাণী করা হইয়াছিল এবং "গ্রন্থের লোকদের (আহলে কিতাব) তাহা জানা ছিল”। ৪০ মহানবী -এর সমসাময়িক খৃস্টান ও ইয়াহুদীগণ অথবা মক্কার অবিশ্বাসিগণ, যাহারা মহানবী -এর বিরোধিতার ক্ষেত্রে শেষোক্তদের সহিত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখিত, উক্ত দাবিকে তখন মিথ্যা বলিয়া অভিযোগ করে নাই। মহানবী -এর মুহাম্মাদ ও আহমাদ উভয় নাম কুরআনে উল্লিখিত রহিয়াছে। সুতরাং ইহা বলা মোটেও সঠিক নহে যে, ইহাদের যে কোন একটি নাম পরবর্তী কালে গৃহীত হইয়াছে যখন মুসলমানগণ ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সহিত মুকাবিলায় অবতীর্ণ হয়। অথবা এই অভিমত যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রদান করা যায় না যে, মহানবী ইহাদের যে কোন একটি নাম তাঁহার জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে, যখন তিনি নবৃওয়াত প্রাপ্তির দাবি করিয়াছিলেন অথবা মদীনার জীবনে যখন তাঁহার জীবনের লক্ষ্য সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল, গ্রহণ করিয়াছেন। কারণ জীবনের ঐ পর্যায়ে বাইবেলের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ নামকরণের জন্য তাঁহার ব্যক্তিগত নাম পরিবর্তনের প্রশ্নসাপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণের কোন কারণ ছিল না। ঐ পর্যায়ে এইরূপ পদক্ষেপ তাঁহার দাবির প্রতি শক্তি যোগানোর পরিবর্তে কেবল তাঁহার দুর্বলতাই প্রকাশ করিত এবং খুব সম্ভব তাঁহার অনুসারীদের মধ্যে মারাত্মক ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি করিত, যদি অনেকের ধর্মত্যাগেরও কারণ না হইত। অধিকন্তু, ইহা তাঁহার প্রতিপক্ষ ও কুৎসা রটনাকারীদের জন্য তাঁহাকে আক্রমণের একটি অতি কার্যকর বিষয়েও পরিণত হইত।
মুইরের এই দুইটি ধারণা : 'আহমদ' নিউ টেস্টামেন্টের পাঠের ভ্রান্ত অনুবাদ এবং নামটি পরবর্তী কালের গ্রহণ অথবা ইয়াহুদী ও খৃস্টানদের সহিত প্রতিপক্ষীয় হওয়ার সময় মুসলমানগণ কর্তৃক জনসাধারণ্যে প্রচলিতকরণ, পরবর্তী কালের খৃস্টান ত্রুটি স্বীকারকারী ও প্রাচ্যবিদগণ কর্তৃক কোন না কোনভাবে গৃহীত হইয়াছে। তাই একদিকে প্রমাণের চেষ্টা করা হইয়াছে যে, বাইবেলে আসলে ইসলামের নবী সম্পর্কে কোন ভবিষ্যদ্বাণী নাই ৪১ এবং অন্যদিকে মন্তব্য করা হইয়াছে যে, কুরআনের ৬১: ৬ নং আয়াতের উক্তি "তাঁহার নাম আহমদ" (اسمه احمد) পরবর্তী কালের সংযোজন ৪২ অথবা ঐ অংশের আহমাদ অভিব্যক্তিটিকে প্রক্ষেপণ বা সংযোজন মনে না করিয়া বিশেষণিক অর্থে গ্রহণ করিতে হইবে"। ৪৩
এখানে মুহাম্মাদ সম্পর্কে বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রশ্নে অবতীর্ণ হওয়া নিষ্প্রয়োজন। তবে ইহা অবশ্যই উল্লেখ করিতে হয় যে, শেষোক্ত দুইটি ধারণা সম্পর্কে যতদূর বলা যায় ঐগুলি মুইরের নিম্নোক্ত মন্তব্যেরই সম্প্রসারণ মাত্র' যে, আহমাদ নামটি পরবর্তী পর্যায়ে মুসলমানদের নিকট প্রিয় হইয়াছিল।
কুরআনের ৬১: ৬ নং আয়াত "তাহার নাম আহমাদ", পরবর্তী কালে সংযোজিত হইবার ধারণা প্রধানত দুইটি বিষয়ের উপর স্থাপিতঃ
(১) ইব্‌ন ইসহাক (ইবন হিশাম) যখন বলেন যে, সিরিয়াক (সুরয়ানী) অভিব্যক্তি 'আল-মুনহামান্না' অর্থ "মুহাম্মাদ" তখন তিনি কুরআনের এই বর্ণনার উল্লেখ করেন নাই, যদিও তিনি তাঁহার গ্রন্থের সর্বত্র যথাযথ প্রাসঙ্গিক স্থানসমূহে স্বাধীনভাবে কুরআনের উদ্ধৃতি প্রদান করিয়াছেন।
(২) ইবন ইসহাকের বর্ণনার বিস্তারিত বিষয়গুলি কুরআনের বর্ণনা হইতে ভিন্নতর। উদাহরণস্বরূপ, কুরআনে শব্দগুলি 'ইসরাঈলের সন্তানদের' উদ্দেশ্যে সম্বোধিত, কিন্তু ইব্‌ন হিশামের গ্রন্থে উহা 'ইনজীলের লোকদের' উদ্দেশ্যে নিবেদিত। ৪৪
এখন এইরূপ উল্লিখিত যুক্তিগুলির সুস্পষ্ট অসারতাসূচক বৈশিষ্ট্য ছাড়াও ইহা সম্পূর্ণ অবাস্তব ধারণা যে, মুসলমানগণ (আহমাদ নামটি) ইসলামের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতাব্দীতে ইবন ইসহাক (মৃ. ১৫০-১৫৩) বা ইব্‌ন হিশাম (মৃ. ২১৩-২১৮) হইতে ইঙ্গিত গ্রহণপূর্বক কুরআনের বর্ণনায় সংযোজন করিবে। অধিকন্তু এইরূপ কথিত সংযোজন করার ক্ষেত্রে তাহারা নিশ্চয়ই এমন কোন নাম ব্যবহার করিবে না, যে নামে মহানবী তাঁহার সমসাময়িকগণের নিকট পরিচিত ছিলেন না এবং তাহাও ইবন ইসহাক / ইব্‌ন হিশাম কর্তৃক 'আল-মুনহামান্না-র অর্থ হিসাবে প্রদত্ত শব্দের পরিবর্তে।
গুথেরী-বিশপ (Gutherie-Bishop) মতের এই সকল বাহ্যিক ত্রুটি অনুভব করিতে পারিয়া ওয়াট দ্রুত তাহার বিকল্প মত লইয়া হাজির হইয়াছেন। তিনি বলেন, 'আহমাদ' শব্দটি ৬১: ৬ নং আয়াতে নামের পরিবর্তে বরং বিশেষণিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং আরও বলেন যে, গুথেরী-বিশপ যে উদ্দেশ্য পূরণের আশায় "চেষ্টারত তাহা আরও সহজতর অনুমান দ্বারা পূরণ হইতে পারে। যথা ইসলামের প্রথম শতাব্দীর জন্য আহমাদ শব্দটি নামবাচক বিশেষ্য নহে, বরং বিশেষণ হিসাবে মনে করা হইত"। ৪৫ ইবন সা'দ-এর 'তাবাকাত', ইবনুল আছীরের 'উসদুল গাবাহ' এবং ইবন হাজার-এর 'তাহযীবুত তাহযীব'-এর ন্যায় গ্রন্থগুলি হইতে প্রাপ্ত ব্যক্তিদের নামের জরিপ করিয়া ওয়াট বলেন, "প্রায় ১২৫ সনের পূর্বে মুসলিম শিশুগণকে বাস্তবে কখনও আহমাদ বলা হইত না”। তিনি তাহার বিষয়কে "আরও জোরালো করিয়া" এইভাবে পেশ করিয়াছেন, "ইহা প্রমাণ করা অসম্ভব যে, মহানবী -এর পরে প্রায় ১২৫ সনের পূর্বে কোন মুসলিম শিশুকে আহমাদ বলা হইত”।৪৬
ওয়াট উল্লেখ করেন যে, "মুহাম্মাদ নামের ন্যায় আহ্‌মাদ নামটি জাহিলিয়্যা যুগে বিদ্যমান ছিল”। কিন্তু তিনি বলেন, মহানবী -এর সহিত ইহার কোন সংশ্লিষ্টতা থাকিতে পারে না। ৪৭ অনুরূপভাবে তিনি উল্লেখ করেন যে, হাসসান ইবন ছাবিত (রা)-এর রচিত বলিয়া কথিত একটি কবিতায় কোন এক আহমাদের উল্লেখ রহিয়াছে যাহার মু'তা যুদ্ধে পতন হইয়াছিল এবং "জনৈকা অখ্যাত মহিলা কবি" এক ব্যক্তির উল্লেখ করিয়াছেন যে আল্লাহ্র এবং "মানুষ আহমাদ"-এর ধর্মকে মিথ্যা বলিয়া গণ্য করিত। ৪৮
কিন্তু ওয়াট সাহেব হাসসান (রা)-এর কবিতাকে নির্ভরযোগ্য বলিয়া মনে করেন না এবং "অখ্যাত" মহিলা কবির বর্ণনার ব্যাখ্যা করিয়াছেন এইভাবে যে, উহাতে কেবল "মহানবী -কে সর্বাপেক্ষা প্রশংসিত" বলিয়া ডাকা হইয়াছে এবং আবশ্যিকভাবে নাম দ্বারা নহে। তাহার ভাষায়, "আহমাদ-এর ব্যবহারের সম্ভাব্য প্রাথমিক উদাহরণ" হইতে নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য ওয়াট শর্ত জুড়িয়া দিয়াছেন যে, "প্রতিপক্ষীয় কেহ যদি তাহার মতকে খণ্ডন করিতে চায় তাহা হইলে তাহাকে কেবল প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমদিকে কিছু আহমাদ নাম পেশ করিলেই চলিবে না, বরং ইহাও দেখাইতে হইবে অথবা অন্ততপক্ষে সম্ভব বলিয়া প্রমাণ করিতে হইবে যে, প্রত্যেক ক্ষেত্রে মহানবী -এর প্রসঙ্গে নাম হইয়াছে এবং উহা প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহারের ধারাবাহিকতা মাত্র নহে”। ৪৯
শর্তটি স্পষ্টরূপে ব্যতিক্রমধর্মী, যাহা সম্ভবত সামগ্রিকভাবে উক্ত মতের ত্রিবিধ মৌলিক দুর্বলতা সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ করে।
প্রথমত: মনে হয় ইহাতে স্বীকৃতি রহিয়াছে যে, আলোচিত গ্রন্থগুলি কেবল নির্দিষ্ট কিছু শ্রেণীর লোকদের সম্পর্কে বিরচিত এবং ঐগুলি ইসলামের প্রথম শতাব্দী ও দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথম চতুর্থাংশে জীবিত সকল মুসলমানের নামের নিবন্ধন পুস্তক নহে। স্পষ্টতই কেবল এই গ্রন্থগুলি পাঠ করিয়া এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া কষ্টকর যে, প্রায় ১২৫ সনের পূর্বে মুসলিম শিশুদেরকে কখনও আহমাদ বলা হইত না।
দ্বিতীয়ত: শর্তটিতে মনে হয় এইরূপ ধারণার অযৌক্তিকতার স্বীকৃতি রহিয়াছে যে, যেখানে আহমাদ নামটি প্রাক-ইসলামী যুগে প্রচলিত ছিল সেখানে ইসলামের প্রথম শতাব্দী বা অনুরূপ সময়ের জন্য আহমাদ শব্দটি কোন ব্যক্তির নাম হিসাবে নহে বরং সাধারণ বিশেষণ গণ্য হইত।
ইহা বোধগম্য নহে যে, যদি আহমাদ প্রাক-ইসলামী যুগে একটি নাম হইয়া থাকে তাহা হইলে উহাকে কেন ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে কেবল বিশেষণিক অর্থে গ্রহণ করিতে হইবে অথবা প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহারের ধারাবাহিকতা মাত্র মনে করিতে হইবে! ধারণাটি মনে হয় অপর ধারণার উপর প্রতিষ্ঠিত যে, শব্দটি কুরআনের ৬১ : ৬ নং আয়াতে বিশেষণিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। কিন্তু ওয়াট প্রথম ইহা প্রমাণ করেন নাই। পক্ষান্তরে তিনি বিপরীত দিক হইতে যুক্তি প্রদর্শন করেন বলিয়া মনে হয়। তিনি প্রথম মনে করেন যে, শব্দটি ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে একটি সাধারণ বিশেষণরূপে পরিগণিত ছিল এবং তারপর এই অনুমানকে তাহার অপর ধারণার ভিত্তিস্বরূপ ধরিয়া বলেন যে, সুতরাং কুরআনে শব্দটির ব্যবহারও বিশেষণিক। উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, যদি ইহা প্রমাণিতও হয় যে, কুরআনে শব্দটির ব্যবহার বিশেষণিক অর্থে করা হইয়াছে তাহার অর্থ আবশ্যিকভাবে এই নহে যে, প্রথম শতাব্দীতে উহার ব্যবহার অবশ্যই একমাত্র সেই অর্থে হইবে, অথবা অন্যভাবে ইহাকে প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহারের ধারাবাহিকতারূপে গণ্য করিতে হইবে।
'আব্দুল্লাহ, খালিদ, আল-'আস ইত্যাদির ন্যায় নামসমূহ প্রাক-ইসলামী যুগেও সমভাবে প্রচলিত ছিল এবং এই নামগুলি পরবর্তী কালে মুসলিম শিশুদেরকেও দেওয়া হয়, কিন্তু তাহা প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহারের ধারাবাহিকতারূপে নহে, বরং উহাদের অর্থ ইসলামী বিশ্বাসের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ বলিয়া। অধিকন্তু সা'ঈদ, খালিদ, আল-'আস এবং অনুরূপ অধিকাংশ 'মুসলিম নাম' শব্দ হিসাবে "বিশেষণ" কিন্তু তাহা প্রতিবন্ধক হওয়া দূরের কথা, বরং ব্যক্তিগত নাম হিসাবে উহাদের ব্যবহারের যৌক্তিকতা প্রমাণ করে। ইহা আমাদিগকে ওয়াটের শর্তের তৃতীয় অন্তর্নিহিত দুর্বলতায় নিয়া আসে। যখনই কোন মুসলিম শিশুর নাম রাখা হয় আহমাদ কিংবা মুহাম্মাদ, ইহা পরোক্ষভাবে স্বীকৃত যে, মহানবী -এর নামের প্রতি শ্রদ্ধাস্বরূপ এইরূপ করা হয়। কদাচিৎ স্পষ্টভাবে বলা হয় বা লিপিবদ্ধ করা হয় যে, এই হইতেছে নাম নির্বাচনের কারণ। ওয়াট মনে হয় এই স্বাভাবিক অনুমান স্বীকার করেন এবং উপরোল্লিখিত অস্বাভাবিক শর্ত দ্বারা ইহাকে এড়াইয়া যাওয়ার প্রয়াস পাইয়াছেন।
উপরে যাহা উল্লিখিত হইয়াছে তাহা ছাড়াও ওয়াট তাহার তিনটি মতের সবকয়টিতেই ভুল করিয়াছেন। যথা (ক) মহানবী-এর পরে প্রায় ১২৫ সনের পূর্বে কোন মুসলিম শিশুকে আহমাদ বলা হইত না; (খ) এই সমগ্র সময়ব্যাপী শব্দটি কেবল বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হইত; এবং (গ) কুরআনের ৬১: ৬ নং আয়াতে ইহা বিশেষণিক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।
প্রথম চ্যালেঞ্জ দানকারী ধারণার ভ্রান্তি সম্পর্কে উল্লেখ্য যে, আরবী ভাষার প্রত্যেক আন্তরিক ছাত্র মাত্রই বিখ্যাত বৈয়াকরণিক ও আরবী ছন্দশাস্ত্রের ('আরূদ) প্রতিষ্ঠাতা আল-খালীল ইব্‌ন আহমাদ ইবন 'আমর-এর নামের সহিত পরিচিত। তিনি ১০০ হি. সনে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭০ বা ১৭৫ হি. সনে ইনতিকাল করেন। তাহার জীবনী আলোচনাকালে ইব্‌ন খাল্লিকান বিশেষভাবে উল্লেখ করেন যে, আল-খালীলের পিতা আহমাদ প্রথম ব্যক্তি বলিয়া কথিত, মহানবী -এর পর উক্ত নামে যাহার নামকরণ করা হয়। ৫০ মহানবী -এর পর তাহার প্রথম উক্ত নামধারী ব্যক্তি হইবার দাবি সম্পূর্ণ সঠিক বলিয়া মনে হয় না। তবে ইহাতে কোন সন্দেহ নাই যে, মহানবী -এর নামানুসারেই তাঁহার উক্তরূপ নামকরণ করা হইয়াছিল এবং যেহেতু তাহার পুত্র আল-খালীল ১০০ হি. সনে জন্মগ্রহণ করেন, তিনি (আহমাদ) সর্বশেষ ইসলামের প্রথম শতাব্দীর সত্তর দশকে জন্মগ্রহণ করিয়া থাকিবেন।
আহমাদ নামধারী প্রথম মুসলিম শিশুদের একজন, যদি তিনি সেই প্রথম শিশুটিই না হন, ছিলেন আহমাদ ইব্‌ন জা'ফার ইব্‌ন আবী তালিব (আল-হাশিমী)। জা'ফার এবং তাঁহার স্ত্রী 'আসমা' বিনত 'উমায়স উভয়ই ছিলেন প্রথম পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণকারী মুসলমানদের অন্তর্ভুক্ত এবং উভয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করিয়াছিলেন, যেখানে 'আসমার' গর্ভে চারটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। তাহাদের নাম রাখা হয় যথাক্রমে 'আব্দুল্লাহ, 'আওন, মুহাম্মাদ ও আহমাদ। ৫১ ইসলামে প্রাথমিক যুগের দীক্ষা গ্রহণকারীদের বৈশিষ্ট্যসূচক ভাবাবেগ ও চেতনার প্রেক্ষিতে এইরূপ ধারণা করা যায় না যে, তাহাদের সন্তানদের 'আব্দুল্লাহ, মুহাম্মাদ ও আহমাদরূপে নামকরণ কেবল প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহারের ধারাবাহিকতা মাত্র ছিল। এমনও বলা চলে না যে, এই ক্ষেত্রে আহমাদ-এর ব্যবহার কেবল বিশেষণরূপে ছিল। পক্ষান্তরে ইহা বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে যে, তাহারা এই নামগুলি নির্বাচন করিয়াছিলেন। কারণ এইগুলি তাঁহাদের নূতন গৃহীত ইসলামী বিশ্বাসের সহিত সঙ্গতিপূর্ণ ছিল। বিশেষ করিয়া কনিষ্ঠ দুই পুত্রের নামকরণ যথাক্রমে মুহাম্মাদ ও আহমাদ হইতে ইহাই প্রতীয়মান হয় যে, এই নাম দুইটি মহানবী -এর নামানুসারেই রাখা হইয়াছিল।
অপর একটি অতি প্রাথমিক যুগের উদাহরণ হইল 'আব্দ ইব্‌ন জাহল-এর পুত্রের আহমাদরূপে নামকরণ। 'আব্দ এবং তাঁহার স্ত্রী ফুরায়'আহ বিন্ত আবী সুফয়ান প্রাথমিক কালের মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তাঁহারা আবিসিনিয়ায় হিজরত করিয়াছিলেন কিনা সেই সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতপার্থক্য রহিয়াছে। কিন্তু এই বিষয়ে কোন সন্দেহ নাই যে, মদীনায় হিজরতকারী প্রথম কয়েকজন মুসলমানের মধ্যে 'আব্দ ছিলেন অন্যতম। তাঁহারা যে শিশুর নাম মহানবী -এর নামানুসারে রাখিয়াছিলেন তাহা এই ঘটনা হইতে স্পষ্ট যে, ফুরায়'আহ যখন মহানবী -এর প্রশংসাগাথা গাহিতেছিলেন তখন তিনি 'উম্মু আহমাদরূপে (আহমাদের মাতা) নিজের পরিচিত হইবার বিষয়টিকে বিশেষ গর্বের সহিত উল্লেখ করিয়াছিলেন। একইরূপে 'আব্দও আবূ আহমাদরূপে অধিকতর পরিচিত ছিলেন এবং এই উপনামেই 'আল-ইসাবাহ্' গ্রন্থে তাঁহার নাম অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে। ৫২
সময়ের হিসাবে অল্প কিছুদিন পরে, কিন্তু নিশ্চিতভাবে ইসলামের প্রথম শতাব্দীতে জন্মগ্রহণকারী অপর এক আহমাদকে আমরা দেখিতে পাই, যিনি তাহার উপনাম (কুনয়া) আবূ সাখররূপে বেশী পরিচিত ছিলেন। তিনি ইয়াযীদ আর-রাকাশীর নিকট হইতে হাদীছ গ্রহণ করিতেন। ৫৩ এই শেষোক্ত ব্যক্তি ১১০ বা ১২০ হি. সনে ইনতিকাল করেন। ৫৪ এইরূপে আরও নাম পাওয়া যাইতে পারে যদি উৎসগুলিতে সতর্কতার সহিত সন্ধান করা হয়। উল্লিখিত উদাহরণসমূহ হইতে ইহা স্পষ্ট যে, প্রায় ১২৫ হি. সনের পূর্বে মহানবী -এর নামানুসারে কদাচিৎ কেবল মুসলিম শিশুর নাম 'আহমাদ' রাখা হইয়াছে এইরূপ দাবি কতখানি অসমর্থনযোগ্য।
হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা)-এর কবিতায় ৫৫ মহানবী -কে আহমাদরূপে উল্লেখ করার বিষয়টি ওয়াট এই বলিয়া নাকচ করিয়া দেন যে, উক্ত কবিতা প্রামাণ্য নহে। সীরাত সাহিত্যে কাব্যসামগ্রী অবশ্যই সন্দেহজনক। ৫৬ কিন্তু ওয়াট স্বয়ং অন্যত্র উক্ত সামগ্রী হইতে প্রাপ্ত তথ্য সঠিক বলিয়া এই কারণে গ্রহণ করিয়াছেন যে, অনুরূপ কবিতার যথার্থতার প্রশ্ন ছাড়াও উহাতে বিষয়াদির প্রকৃত অবস্থা প্রতিফলিত হইয়া থাকে। ৫৭ একই কারণে ইহা বলা যাইতে পারে যে, উল্লিখিত হাসসান (রা)-এর কবিতায় মহানবী -কে সেই নামেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে নাম তিনি প্রকৃতপক্ষে ধারণ করিয়াছিলেন। কারণ এইরূপ মনে করা আদৌ যুক্তিসঙ্গত নহে যে, মহানবী -এর জন্য নূতন ও তখন পর্যন্ত অজ্ঞাত নাম প্রচলনের উদ্দেশ্যে কবিতা জাল করা হইয়াছিল। উল্লেখিত কবিতার ক্ষেত্রে ইহা একেবারেই অসম্ভব। কারণ যেমন ওয়াট বলেন, ইহাতে মহানবী -কে "মর্যাদাহানিকর স্থান দেওয়া হইয়াছে”। ৫৮ ইহা নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, এইরূপ রচনায় তাঁহাকে এমন কোন নূতন নাম দেওয়া হইবে না যাহার অর্থ তিনি একজন অতিশয় প্রশংসিত ব্যক্তি।
অপর তথ্যকণিকা অর্থাৎ একজন "অখ্যাত মহিলা কবি"র, যেরূপ তিনি অভিহিত হইয়াছেন, ৫৯ কবিতা প্রসঙ্গে, ওয়াট উহাকে অপ্রামাণ্য মনে করার কোন "স্পষ্ট কারণ" খুঁজিয়া পান নাই। কিন্তু তিনি ইহাকে নিম্নরূপ ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পাইয়াছেন, "সুতরাং দেখা যাইতেছে যে, মহানবী -এর সময় হইতেই কবিতায়, ছন্দের খাতিরে তাঁহাকে আহমাদরূপে সময় সময় উল্লেখ করার বিষয়টি আমাদেরকে যেন মানিয়া লইতে হইতেছে। আহমাদ অর্থ 'অধিকতর বা সর্বাধিক প্রশংসিত' কিন্তু মুহাম্মাদ অর্থ শুধু 'প্রশংসিত'। একজন কবির পক্ষে মহানবী -কে 'সর্বাধিক প্রশংসিত' বলা অযৌক্তিক কিছু নহে”। ৬০
'সুতরাং ওয়াট স্বীকার করিয়াছেন যে, ইহা কবিতায় মহানবী -এর আহমাদরূপে সমকালীন উল্লেখ। কিন্তু তিনি বলেন যে, "ছন্দের খাতিরে” এই অভিব্যক্তিটিকে "ব্যক্তির” (عليه) বিশেষণরূপে এখানে সংযোজন করা হইয়াছে। সাধারণ বৈয়াকরণিক কারণে এই ব্যাখ্যা অগ্রহণযোগ্য। কারণ যদি ইহাকে বিশেষণরূপে ব্যবহারেরই ইচ্ছা থাকিত তাহা হইলে ইহার পূর্বে 'আল (ال) যুক্ত করিয়া ইহাকে "নির্দিষ্ট" করা হইত, যেরূপ বিশেষ্য আল-মার'-এর ক্ষেত্রে, যাহাকে বিশেষায়িত করা হইয়াছে বলা হইতেছে, নির্দিষ্ট আকারে উল্লেখ করা হইয়াছে। কারণ আরবী ভাষায় মাওসূফ ও সিফাত উভয়ের নির্দিষ্টতা ও অনির্দিষ্টতার ক্ষেত্রে সঙ্গতি রক্ষার নিয়ম অপরিহার্য। অতএব আলোচ্য কবিতায় 'আহ্মাদ' শব্দটিকে মহানবী -এর নাম হিসাবেই গ্রহণ করিতে হইবে।
ওয়াট বিষয়টিকে "আহমাদ রূপে মহানবী -এর মাঝেমধ্যে উল্লেখ বলিয়াও বিশিষ্টতা দান করিয়াছেন এবং বলিয়াছেন যে, ইহা "তাঁহার নিজ সময় হইতেই" প্রচলিত ছিল। মহানবী -এর জন্য আহমাদ "তাহার নিজ সময় হইতেই" ব্যবহৃত হইত এবং ইহা তাঁহার নাম হিসাবে ব্যবহৃত হইত, তাঁহার জন্য বিশেষণ হিসাবে নহে। ওয়াট ইহা দেখাইবার কষ্ট স্বীকার করেন নাই যে, মহানবী -এর সময় হইতে পরবর্তী কাল পর্যন্ত আহমাদ শব্দের অনুরূপ সকল ব্যবহারই ছন্দের প্রয়োজনে এবং বিশেষণরূপে করা হইয়াছে।
ইহাও সঠিক নহে যে, ইবন হিশামের গ্রন্থে কেবল দুইটি স্থানে কবিতায় মহানবীর নাম হিসাবে 'আহমাদ' ব্যবহৃত হইয়াছে, যেমনটি ওয়াট ভাবিয়াছেন বলিয়া মনে হয়। মহানবী -এর নাম কবিতায় অন্ততপক্ষে নয়টি ভিন্ন স্থানে অনুরূপভাবে উল্লিখিত হইয়াছে:
(১) মহানবীকে তাহাদের নিকট সমর্পণের জন্য আবু তালিবের উপর কুরায়শ নেতৃবৃন্দের চাপ প্রয়োগ সম্পর্কে আবূ তালিবের কবিতা। ৬১
(২) নিজের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে 'আমর ইবনুল-জামূহ-এর কবিতা। ৬২
(৩) বানু নাযীর সম্পর্কে একটি কবিতা যাহা ইবন ইসহাকের মতে আলী ইব্‌ন আবী তালিব (রা) কর্তৃক রচিত, কিন্তু ইব্‌ন্ন হিশাম যাহাকে অন্য কাহারও রচিত বলিয়া মনে করেন। ৬৩
(৪ ও ৫) 'আব্দুল্লাহ ইবনুয যি'আরা কর্তৃক উহুদের যুদ্ধ এবং তাঁহাদের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে রচিত দুইটি কবিতার প্রতিটিতে একবার করিয়া মোট দুইবার। ৬৪
(৬, ৭, ৮) কা'ব ইবন মালিক আল-আনসারী (রা) কর্তৃক হামযার শাহাদাত, খন্দকের যুদ্ধ এবং খায়বারের যুদ্ধ সম্পর্কে রচিত তিনটি কবিতার প্রতিটিতে একবার করিয়া মোট তিনবার। ৬৫ শেষোক্ত ক্ষেত্রে তিনি কবিতায় আহমাদ ও মুহাম্মাদ উভয় নাম উল্লেখ করিয়াছেন।
(৯) হারিছা এবং ইন্ন রাওয়াহা (রা)-এর শাহাদাত সম্পর্কে হাসসান ইব্‌ন্ন ছাবিত আল-আনসারী (রা)-এর কবিতা। ৬৬
পুনরায়, কেবল কবিতায়ই নহে, ইবন ইসহাকের মূল গ্রন্থেও অন্তত দুইটি স্থানে মহানবী -এর নাম আহমাদরূপে উল্লিখিত হইয়াছে: একটি ইন ইসহাক কর্তৃক উদ্ধৃত হাসসান ইব্‌ন ছাবিত (রা)-এর বর্ণনায় ৬৭ এবং অপরটি কুরআনের ২: ৪০ নং আয়াত সম্পর্কে তাঁহার নিজ ভাষ্যে। ৬৮ এই আয়াতে ইসরাঈলের সন্তানদের সম্পাদিত 'চুক্তির' কথা বর্ণিত হইয়াছে। ইন্ন ইসহাক এই আয়াতের ভাষ্যে যেভাবে আহমাদ নামটি ব্যবহার করিয়াছেন তাহাতে সন্দেহের অবকাশ নাই যে, তিনি কুরআনের ৬১: ৬ আয়াত হইতে নামটি গ্রহণ করিয়াছেন। উল্লেখ্য যে, উক্ত আয়াতে মহানবী-এর আগমন সম্পর্কে "যাহার নাম আহমাদ" ইসরাঈলীদের অবগতি সম্পর্কে বিধৃত হইয়াছে। ঘটনাক্রমে ইবন ইসহাক কর্তৃক তাহার গ্রন্থে 'আহ্মাদ' নামের এই ব্যবহার গুথেরী বিশপের স্বকপোলকল্পিত ধারণা: 'আহমাদ নামটি ইবন ইসহাক বা ইন্ন হিশাম কেহই ব্যবহার করেন নাই', যাহা ওয়াট সমর্থন ও গ্রহণ করিয়াছেন, নাকচ করিয়া দেয়। ৬৯
এইরূপে 'প্রায় ১২৫ হি. সন পর্যন্ত মহানবী-এর নাম অনুসারে কাহারও নাম আহমাদ রাখা হয় নাই এবং ঐ সময় পর্যন্ত শব্দটি সাধারণত বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হইত' এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ পূর্বক ওয়াট কুরআনের ৬১: ৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পাইয়াছেন। তিনি ইহার সংশ্লিষ্ট অংশের অনুবাদ নিম্নরূপ করেন: "একজন দূতের সুসংবাদ ঘোষণা করিতেছি যিনি আমার পরে আসিবেন এবং যাঁহার নাম প্রশংসার অধিকতর যোগ্য”। ৭০ ওয়াট বলেন, "ইসমুহু আহমাদ" শব্দগুলির মানসম্পন্ন ব্যাখ্যা দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রথমার্ধের অবসান না হওয়া পর্যন্ত সাধারণভাবে মুসলমানগণ কর্তৃক গৃহীত হয় নাই। ৭১ উপরিউক্ত বক্তব্যের সমর্থনে ওয়াট দুইটি কারণ পেশ করেন।
(এক) তিনি বলেন, ইবন ইসহাক মহানবী-এর নাম হিসাবে আহমাদ-এর উল্লেখ করেন নাই এবং মন্তব্য করেন যে, ইহা ধারণা করা যায় না যে, উক্ত ঐতিহাসিক এই নাম সম্পর্কে অনবহিত ছিলেন। কারণ তাঁহার সমসাময়িক মূসা ইব্‌ন ইয়া'কূব আল-জামি' (মৃ. ১৫৩-১৫৮ হি.) কর্তৃক বর্ণিত ও ইবন সা'দ কর্তৃক উল্লিখিত একটি হাদীছে মহানবী -এর নাম হিসাবে আহমাদ-এর উল্লেখ রহিয়াছে। ওয়াট যুক্তি দেখান যে, "সুতরাং ইহা বোধগম্য যে, ইবন ইসহাক আহমাদ নামের উল্লেখে হঠাৎ বিরত রহিয়াছেন এই কারণে নহে যে, তিনি সে সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন, বরং এই কারণে যে, তিনি কুরআনের আয়াতের এই ব্যাখ্যা অনুমোদন করেন নাই”। ৭২
(দুই) ওয়াটের দ্বিতীয় যুক্তি এই যে, আত-তাবারী (২২৪-৩১০ হি.) ৬১ : ৬ আয়াতের তাঁহার ব্যাখ্যায় "যদিও তিনি পুরাতন ধারণাসম্পন্ন ব্যাখ্যাই দিয়াছেন, কিন্তু উহার প্রমাণস্বরূপ পূর্ববর্তী কোন ভাষ্যকারকে উদ্ধৃত করিতে পারেন নাই", যদিও "প্রতিটি সামান্য বিষয়েও অজস্র প্রামাণ্য ব্যক্তির গ্রন্থ উদ্ধৃত করা তাঁহার অভ্যাস,” ওয়াট বলেন, ইহার অর্থ "তিনি এমন কোন খ্যাতনামা ভাষ্যকারের কথা জানিতেন না যিনি তাঁহার সময়ে যাহা মানসম্পন্ন ও স্পষ্ট মত ছিল তাহা পোষণ করিতেন”। ৭৩
ওয়াট এখন গুথেরী বিশপকে অনুসরণ করিতে গিয়া এবং ইবন ইসহাক মহানবী -এর নাম হিসাবে আহমাদ-এর উল্লেখ করা হইতে বিরত রহিয়াছেন মনে করিয়া মারাত্মক ভুল করিয়াছেন। যেরূপ উপরে উল্লিখিত হইয়াছে ৭৪ ইবন ইসহাক আহমাদ নামটি ব্যবহার করিয়াছেন এবং তাহাও কুরআনের আয়াতের (২:৪০) ব্যাখ্যায় যাহা ইয়াহুদীদিগকে আগমনকারী নবী সম্পর্কে তাহাদের প্রতিশ্রুতি ও তাহাদের অবগতির কথা স্মরণ করাইয়া দেয়। সুতরাং ইহাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই যে, ইবন ইসহাক নামটি ব্যবহার করিয়াছেন এবং মহানবী সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী প্রসঙ্গে উহা বর্ণনা করিয়াছেন।
আত-তাবারী সম্পর্কে যুক্তি প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ওয়াটের চিন্তাধারা স্পষ্টরূপে দুইটি পারস্পরিক স্বতন্ত্র মতের ভিত্তিতে গঠিত। তিনি বলেন যে, আত-তাবারী পুরাতন ধারণাসম্পন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন। কারণ উহাই "তাহার সময়ে মানসম্পন্ন এবং স্পষ্টরূপে বোধগম্য মত ছিল"। কিন্তু তিনি যেহেতু কোন প্রামাণ্য ব্যক্তি বা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেন নাই, তাই "কোন খ্যাতনামা ভাষ্যকার এই মতের সমর্থক ছিলেন না”।
বলা নিষ্প্রয়োজন যে, কোন বিশেষ ব্যাখ্যা মানসম্পন্ন এবং স্পষ্টরূপে বোধগম্য বলিয়া গৃহীত হইতে পারে না যদি সেই যুগের অথবা পূর্ববর্তী যুগের "খ্যাতনামা" ভাষ্যকারগণ উহা পোষণ না করেন অথবা যদি তাহারা কোন ভিন্নতর বা বিপরীত মত পোষণ করেন। আরও উল্লেখ্য যে, আত-তাবারী প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রামাণ্য ব্যক্তি বা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেন নাই। কেবল যেখানে কোন বিষয়ে একাধিক মত বিদ্যমান অথবা যেখানে পাঠ এত দুরুহ যে, উহার কয়েকটি ব্যাখ্যা হইতে পারে সেখানেই তিনি অনুরূপ উদ্ধৃতি দিয়াছেন। তিনি যে বর্তমান আলোচ্য বিষয়ে কোন প্রামাণ্য ব্যক্তি বা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দেন নাই তাহার অর্থ একমাত্র এই যে, আলোচনাধীন আয়াতের অর্থের ব্যাপারে তাঁহার নিজ যুগে কিংবা পূর্ববর্তী যুগে কোন মতপার্থক্য ছিল না এবং পাঠ এতো পরিষ্কার ও স্পষ্ট যে, উহার অন্য কোন ব্যাখ্যা হইতেই পারে না।
আত-তাবারী কর্তৃক কোন প্রামাণ্য ব্যক্তি বা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দান হইতে বিরত থাকা এই কথার প্রমাণ বহন করে না যে, বিষয়টিতে পূর্বে মতপার্থক্য ছিল। উক্ত মনীষীর প্রতি সুবিচার এবং নিজ দাবির প্রতি ন্যায়বিচারের স্বার্থে ওয়াটের নিজ ব্যাখ্যার সমর্থনে পূর্ববর্তী কোন প্রামাণ্য ব্যক্তি বা গ্রন্থের উদ্ধতি দান করা উচিত ছিল। কিন্তু তিনি তাহা করেন নাই, বরং নেতিবাচক দিক হইতে তাঁহার দাবি প্রমাণের চেষ্টা করিয়াছেন। কিন্তু সেখানেও তিনি ভ্রান্ত প্রমাণিত হইয়াছেন। "কুরআন ব্যাখ্যার আদিপুরুষ" হযরত আবদুল্লাহ ইবন 'আব্বাস (মৃ. ৬৮ হি.) আত-তাবারীর প্রায় দুই শতাব্দী পূর্বে প্রকৃতপক্ষে 'ইসমুহু আহম্মাদ' অভিব্যক্তির ব্যাখ্যা করিয়াছেন "তাঁহার নাম আহমাদ"। ৭৬
প্রকৃতপক্ষে 'ইসমুহু' )اسمه( 'তাঁহার নাম' অভিব্যক্তিটি এত পরিষ্কার ও স্পষ্ট যে, উহার অন্য কোন অর্থ হইতে পারে না। ওয়াটই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি এক অদ্ভূত মতের অবতারণা করিয়াছেন যে, আহমাদ শব্দটি এখানে বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং অভিব্যক্তিটির অনুবাদ হইবে এইরূপ: "যাহার/ তাঁহার নাম প্রশংসার অধিকতর যোগ্য”। এই অনুবাদ ইংরেজী ও আরবী উভয় ভাষার প্রতি চরম অবমাননাকর। কেবল কোন ব্যক্তি (বা তাহার কার্য বা আচরণ)-কেই সাধারণত "প্রশংসার যোগ্য বা "প্রশংসার অধিকতর যোগ্য" বলা হয়, তাঁহার নামকে নহে। সুতরাং সাধারণত এইরূপ বলা হইবে, "তিনি প্রশংসার যোগ্য" অথবা "প্রশংসার অধিকতর যোগ্য”। কেহই এইরূপ বলিবে না, "তাহার নাম প্রশংসার যোগ্য”। যদি এইরূপ বলা হয় তাহা হইলে বুঝিতে হইবে যে, তাহার নামই "প্রশংসার যোগ্য" অর্থাৎ "তিনি জনাব প্রশংসার যোগ্য অথবা জনাব অধিকতর প্রশংসার যোগ্য”। সুতরাং বাক্যটিকে ব্যক্তির নাম প্রদানকারী হিসাবে ধরিতে হইবে, যদিও সেই নাম শব্দ হিসাবে একটি বিশেষণও।
ইংরেজী ব্যবহার রীতির প্রশ্ন ছাড়াও ওয়াটের অনুবাদে আরবী ব্যাকরণের স্বীকৃত নীতিমালা চরমভাবে লঙ্ঘিত হইয়াছে। আরবী ভাষায় দুই বা ততোধিকের মধ্যে তুলনামূলক বিশেষণ নিম্নের তিনটির যে কোন একটি রূপ গ্রহণ করে। যথা: (ক) ইদাফাহ্ রূপ, উদাহরণ-হুওয়া আফদালুহুম' (সে তাহাদের মধ্যে সর্বোত্তম), (খ) 'মিন' ব্যবহারযোগে সাধারণ তুলনার রূপ, উদাহরণ-'হুওয়া আফদালু মিনহু' (সে তাহার অপেক্ষা ভাল) এবং (গ) বিশেষণের পূর্বে 'আল' যোগ করিয়া নির্দিষ্টকরণের রূপ, উদাহরণ-হুওয়া আল-আফদালু' (তিনিই সর্বোত্তম)। এই সবকয়টি রূপের অন্তর্নিহিত নীতি এই যে, যাহার সহিত তুলনা করা হইবে তাহাকে হয় প্রকাশ্য অথবা প্রসঙ্গ হইতে বোধ্য হইতে হইবে। যেক্ষেত্রে 'আল' ব্যবহৃত হয় সেই ক্ষেত্রে সাধারণত দুইয়ের অধিকের মধ্যে তুলনা করা হয় এবং সেখানে যাহার সহিত তুলনা করা হয় তাহা প্রকাশ্য বা পরোক্ষ হইতে পারে। যে সকল ক্ষেত্রে উল্লিখিত নীতিমালার ব্যতিক্রম করা হয় সেই সকল ক্ষেত্রে, যাহার সহিত তুলনা করা হয় তাহা হয় সার্বজনীনভাবে জ্ঞাত অথবা প্রসঙ্গ হইতে এত স্পষ্ট যে, উহার কোন উল্লেখের প্রয়োজন হয় না।
আলোচ্য বাক্যে বিষয়টি এইরূপ নহে। ওয়াটের অনুবাদে এইভাবে ভাষায় স্বীকৃত নীতিমালা উপেক্ষিত ও লঙ্ঘিত হইয়াছে এবং ব্যাকরণগতভাবে উহা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং তাহা এই ক্ষেত্রে আরও অধিক প্রযোজ্য যেখানে তিনি উহাকে দুইয়ের মধ্যে তুলনামূলকরূপে উল্লেখ করিয়াছেন- "তাহার 'নাম প্রশংসার অধিকতর যোগ্য"। 'অধিকতর' কাহার বা কাহার নাম অপেক্ষা? আল্লাহ্ কোন পূর্ববর্তী নবী বা কোন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব "প্রশংসাযোগ্য” নাম বহন করেন নাই। আসলে ওয়াট বাক্যটির অর্থের সহিত আহমাদ নামের অর্থের সম্পূর্ণ তালগোল পাকাইয়া ফেলিয়াছেন। যদি বাক্যটিতে 'আহমাদ' বিশেষণরূপে ব্যবহৃত হইত এবং নাম হিসাবে না হইত, তাহা হইলে উহার পূর্বে নির্দিষ্টসূচক প্রত্যয় 'আল' যুক্ত হইত অথবা পরে 'মিন' ও তৎসহ একটি কর্ম যুক্ত হইত অথবা বাক্যটি 'ইদাফাহ' আকারে গঠিত হইত এবং বিশেষণের সহিত কিছু অভিব্যক্তি 'মুদাফ ইলায়হি' রূপে যুক্ত হইত।
ওয়াট তাহার অগ্রহণযোগ্য ধারণা ও ভ্রান্ত অনুবাদের ভিত্তিতে তিনি যাহাকে "ঘটনার ক্রমধারা" বলেন তাহা এইভাবে পুনর্নিমাণ করিয়াছেন। তিনি বলেন, "খৃস্টানগণ কর্তৃক ইসলামের সমালোচনার জবাবে কিছু মুসলমান খৃস্টান ধর্মগ্রন্থসমূহে মুহাম্মাদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী খুঁজিতেছিলেন" এবং জন (সুসমাচারের) ১৪-১৬ অংশটি তাহাদের নজরে পড়ে। ওয়াট আরও বলেন যে, সম্ভবত কুরআনের আয়াত নং ৬১ঃ ৬-এর উপর গভীর অভিনিবেশ "খৃধর্ম হইতে একজন ধর্মান্তরিতকে, যিনি সামান্য গ্রীক ভাষা জানিতেন, অর্থের মিল সম্পর্কে প্রথম যুক্তি-প্রমাণের দিকে ধাবিত করে" যাহার ভিত্তি "Periklutos-এর সহিত Parakletos-এর বিভ্রান্তির উপর স্থাপিত। ফলে যদিও কুরআনের আয়াতে 'আহমাদ'-কে এই পর্যন্ত "সাধারণত বিশেষণরূপে ধরা হইত", এখন উহাকে নাম হিসাবে ধরা হইল। কারণ উহা একটি সুপরিচিত প্রাক-ইসলামী নাম ছিল এবং আরও কারণ, এইরূপে খৃস্টান ধর্মগ্রন্থের সহিত একটি সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হইবে। যুক্তিটি বিশেষভাবে মুসলমানদের জন্য দৃঢ় প্রত্যয় সৃষ্টিকারক হইল যাহারা "তাহাদের নিজ ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে অধিকতর পরিচিত" ছিল এবং একবার গৃহীত হইলে নামটি শীঘ্রই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ৭৭
এখানে আমাদের parakletos এবং periklutos সম্পর্কে বিতর্কে অবতীর্ণ হইবার প্রয়োজন নাই, ওয়াটের উপরে উল্লিখিত বক্তব্যের ত্রুটিসমূহ চিহ্নিত করাই যথেষ্ট। কুরআন বারবার দাবি করিয়াছে যে, একজন নবী আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ববর্তী ধর্মগ্রন্থসমূহে করা হইয়াছিল এবং হযরত মুহাম্মাদ সেই অতি প্রতীক্ষিত নবী ছিলেন। সুতরাং মুসলমানদেরকে খৃষ্ট ধর্মগ্রন্থের সেই সকল ভবিষ্যদ্বাণী দেখার জন্য উৎসাহী হইতে ইসলামের দ্বিতীয় শতাব্দীতে দৃশ্যপটে খৃস্টানগণ কর্তৃক ইসলামের সমালোচনার সূত্রপাতের জন্য অপেক্ষা করিতে হয় নাই। স্বাভাবিক অনুসন্ধিৎসা এবং কুরআনের ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয়তা হইতেই উক্ত ধর্মগ্রন্থে সমর্থন খোঁজার প্রক্রিয়া শুরু হইয়া থাকিবে। খৃস্টানদের দ্বারা ইসলামের সমালোচনাও প্রকাশিত হইতে ইসলামের দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত দেরী হয় নাই। এবং যেহেতু, যেমন ওয়াট নিজেই বলেন, "মুহাম্মাদ Periklutos-এর তেমনই বিশুদ্ধ অনুবাদ যেমন আহমাদ" এবং যেহেতু শেষোক্ত শব্দটি, যদি বিশেষণ হিসাবেও ধরা হয়, সমভাবে মহানবী -এর বর্ণনার সুন্দর প্রতিফলন ঘটায়, তাই নাম হিসাবে শব্দটির প্রাক-ইসলামী যুগের ব্যবহার হইতে ধারণা গ্রহণের এবং আহমাদও মহানবী -এর নাম ছিল এই বলিয়া অভিনব ঘোষণা সহকারে আগাইয়া আসিবার মুসলমানদের প্রয়োজন ছিল না। এইরূপ নূতন ধারণা মুসলমানদের মধ্যে মারাত্মক বিতর্কের সৃষ্টি করিত, বিশেষ করিয়া যদি, যেমন ওয়াট আমাদিগকে বিশ্বাস করিতে বলেন, ৬১৪ ৬ আয়াতের অভিব্যক্তিকে এই পর্যন্ত "সাধারণভাবে বিশেষণরূপে ধরা হইত”। ওয়াটের বহু পরিশ্রমের ফসল এই ধারণা ও ব্যাখ্যা উপরে উল্লিখিত মুইরের দীর্ঘ দিনের পরিত্যক্ত ধারণার অন্যভাবে সম্পূর্ণ পুনরুক্তি মাত্র। যথা মহানবী-এর জন্য আহমাদ নামটি মুসলমানদের নিকট খৃস্টান ও ইয়াহুদীদের সহিত মুকাবিলার সময় জনপ্রিয় হইয়া উঠে।

📘 সীরাত বিশ্বকোষ > 📄 তিন: মৃগীরোগের অপবাদ ও অন্যান্য মন্তব্য

📄 তিন: মৃগীরোগের অপবাদ ও অন্যান্য মন্তব্য


শাক্কস-সাদর (বক্ষবিদারণ)-এর ঘটনা সম্পর্কে কতিপয় প্রাচ্যবিদ এইরূপ উদ্ভট কটাক্ষ করিয়াছেন যে, মহানবী তাঁহার বাল্যকাল হইতে আজীবন "মৃগী বা মূর্ছা রোগে" আক্রান্ত ছিলেন। এই কটাক্ষ গ্রীকদের দ্বারা শুরু হয় এবং তারপর পরবর্তী লেখকগণ কর্তৃক উহা গৃহীত হয়। তাহাদের কেহ কেহ এমনকি, যেরূপ সায়্যিদ আহমাদ খান উল্লেখ করিয়াছেন, ঘটনার বিবরণে উল্লিখিত 'ফালহিকীহি' (فالحقيه) অভিব্যক্তিকে 'বি-আলহাক্কিয়্যাহ' (بالحقية) রূপে ভুল পাঠ করিয়াছেন এবং তারপর উহার অদ্ভূত অনুবাদ করিয়াছেন "অমূলক আতঙ্কগ্রস্ততা বা উদ্বিগ্নতা রোগ" (Hy-Pochondriacal disease) বলিয়া। ৭৮ উইলিয়াম মুইর যখন তাহার গ্রন্থ রচনা করেন স্পষ্টতই তাহার পূর্বসূরীদের ভ্রান্ত ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হইয়াছিলেন। তাই এই ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ করিয়া তিনি বলেন, ইহা "সম্ভবত মৃগীরোগের খিচুনি" ছিল এবং লিখেন: ৭৯
"আমরা যদি আক্রমণগুলিকে সঠিকভাবে বুঝিতে সম্মত হই যাহা হালীমাকে স্নায়বিক বা মৃগী প্রকৃতির খিচুনিরূপে শংকিত করিয়াছিল তাহা হইলে ঐগুলি মুহাম্মাদ-এর গঠনে সেই সকল উত্তেজক অবস্থার ভাবাবেশকর মূর্ছার স্বাভাবিক চিহ্ন প্রদর্শন করে, যাহা সম্ভবত তাঁহার মনে প্রেরণার ধারণা প্রদান করিয়াছিল, যেরূপ তাঁহার অনুসারিগণ উহাকে নিঃসন্দেহে তাহার প্রমাণ স্বরূপ গ্রহণ করিয়াছে"।
মুইর এই মৃগীরোগের তত্ত্বের সমর্থনে তাহার পুস্তকের পাদটীকায় ইব্‌ন হিশাম (ইবন ইসহাক)-এর গ্রন্থের উল্লেখ করিয়াছেন। কিন্তু উক্ত গ্রন্থের উসটেনফিল্ড (Wustenfeld) সংস্করণে৮০ এবং অন্য সকল সংস্করণেও, বর্ণনায় প্রকৃত অভিব্যক্তি উল্লিখিত হইয়াছে 'উসীবা' (اصيب), অথচ মুইর উহাকে পুনরুল্লেখ করিয়াছেন 'উমীবা' (امیبه) বলিয়া, যাহা স্পষ্টতই একটি অদ্ভূত ও অর্থহীন অভিব্যক্তি। অতঃপর তিনি উহার অর্থ করিয়াছেন "খিচুনিতে আক্রান্ত হইয়াছিলেন" ৮১ বলিয়া। প্রকৃতপক্ষে তিনি যদি উক্ত গ্রন্থের কোন ত্রুটিপূর্ণ পাণ্ডুলিপি বা মুদ্রিত কপি অনুসরণ করিয়া থাকেন তাহা হইলে উহার উল্লেখ করা উচিত ছিল। কিন্তু মুইর তাহা করেন নাই। বিপরীতক্রমে সায়্যিদ আহমাদ খান যখন ১৮৭০ খৃ. মুইরের এই মারাত্মক ভুলের কথা উল্লেখ করেন ৮২, শেষোক্তজন তখন মাত্র তাহার পুস্তকের পরবর্তী সংস্করণ হইতে আলোচ্য পাদটীকাটি বাদ দিয়া দেন। কিন্তু তাহার যে তত্ত্বের সমর্থনে প্রমাণস্বরূপ উক্ত পাদটীকা প্রথমে দেওয়া হইয়াছিল তিনি উহার কোন পরিবর্তন বা সংশোধন করেন নাই। এইভাবে উৎসের ভুল ও অপব্যবহার নির্দেশ করা সত্ত্বেও অভিযোগ অব্যাহতভাবে চালাইয়া যাওয়া হয়। ৮৩
উল্লেখ্য যে, 'শাকুস সাদর' (شق الصدر) (বক্ষ বিদারণ) ঘটনা সংক্রান্ত কোন বর্ণনাতেই উল্লেখ নাই যে, বালক মুহাম্মাদ-কে অচেতন বা মৃগীর খিচুনিগ্রস্ত দেখা গিয়াছিল। পুনরায় কোন বর্ণনাতেই ঘটনাটিকে শারীরিক পীড়ন ও নিষ্পেষণসহ উল্লেখ করা হয় নাই, যাহা মহানবী-এর জীবনে অনেক পরবর্তী কালে তাঁহার নিকট ওহী আগমনের সময় কখনও কখনও থাকিত। এতদসত্বেও মুইর তাহার পূর্বসূরীদের অনুসরণে উহাই করিয়াছেন এবং নিম্নরূপ অননুমোদিত মন্তব্য করিয়াছেন যে, "স্নায়বিক বা মৃগী প্রকৃতির খিচুনি" মুহাম্মাদ-এর গঠনে "সেই সকল উত্তেজনাকর অবস্থা ও ভাবাবেশকর মূর্ছা"র স্বাভাবিক চিহ্ন” ছিল যাহা সম্ভবত তাঁহার মনে প্রেরণার ধারণা প্রদান করিয়াছিল, যেরূপ তাঁহার অনুসারিগণ উহাকে নিঃসন্দেহে তাহার প্রমাণস্বরূপ গ্রহণ করিয়াছেন"।
এইরূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইটি বিষয়ের মিশ্রণ কোনক্রমেই উৎস গ্রন্থের দ্বারা সমর্থিত নহে, বরং দুইটি স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গীর ইঙ্গিত বহনকারী। ইহাতে একদিকে মৃগীরোগের ধারণার ভিত্তি হিসাবে 'শাকুস সাদর' সম্পর্কে বিভিন্ন বর্ণনার অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে সচেতনতা প্রকাশ পায়। তাই মহানবী-এর নিকট ওহী আগমনকালীন কোন কোন সময়কার অবস্থার বিকৃতি সাধন দ্বারা এক প্রকার সহায়ক প্রমাণের অবতারণা করা হইয়াছে। অন্যদিকে ইহাতে ওহীর প্রকৃতি এবং তদ্দ্বারা মুহাম্মাদ-এর নবুওয়াতের প্রকৃতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অভিপ্রায় প্রকাশিত হয়। প্রকৃতপক্ষে, এই শেষোক্ত আচরণ বিষয়টির প্রতি সমগ্র দৃষ্টিভঙ্গীতে অধিকতর মৌলিক বলিয়া মনে হয়। তাই পরবর্তী প্রাচ্যবিদদের অনেকে মৃগীরোগের মতবাদ গ্রহণ না করিলেও মুইরের উপরোল্লিখিত মন্তব্যের তাৎপর্য গ্রহণ করিয়াছেন এবং ওহীকালীন (وحی) অবস্থার ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পাইয়াছেন, যাহাকে বলা হয় মুহাম্মাদ-এর "সচেতনতা" বলিয়া অর্থাৎ যাহা তিনি "প্রেরণা” মনে করিতেন বা "আন্তরিকভাবে" বিশ্বাস করিতেন, কিন্তু যাহা কোনভাবেই আল্লাহ্র নিকট হইতে ছিল না। ৮৪ এই বিষয়টি সম্পর্কে আরও আলোচনা এই পুস্তকের পরবর্তী পর্যায়ে করা হইবে। ৮৫ তবে এখানে এতটুকু অবশ্যই উল্লেখ করিতে হয় যে, মুসলমানগণ তথাকথিত "উত্তেজনাকর অবস্থা ও ভাবাবেশকর মূর্ছা"কে প্রেরণার প্রমাণস্বরূপ গ্রহণ করে না, যেরূপ মুইর দাবি করিয়াছেন।
মৃগীরোগ কিংবা অনুরূপ অন্য কোন রোগের মতবাদ ঐতিহাসিক অথবা যৌক্তিক ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কারণেই টিকিতে পারে না। প্রাপ্ত সকল বিবরণ হইতে ইহা স্পষ্ট যে, মহানবী আমৃত্যু এক অসাধারণ দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ও কর্মতৎপরতার অধিকারী ছিলেন। তিনি কখনও দেহ ও মনের দৌর্বল্য ও বৈকল্যের কোন লক্ষণ প্রদর্শন করেন নাই যাহা অতীত ও বর্তমান চিকিৎসা বিজ্ঞানের অভিন্ন মতানুযায়ী মৃগীরোগ বা হিষ্টিরিয়ার অপরিহার্য পরিণতি। এমনও নহে যে, ইহা কটাক্ষের প্রবক্তাদের সম্পূর্ণ অজানা ছিল। মুইর নিজেই বলেন, "ইহা সম্ভব যে, অন্যান্য দিক দিয়া মুহাম্মাদ-এর দৈহিক গঠন অধিকতর শক্ত-সমর্থ ছিল”। ৮৬ ইহা সত্বেও মুইর ও তাহার অনুসারিগণ কটাক্ষ অব্যাহত রাখিতে বদ্ধপরিকর।
মার্গোলিয়থ মহানবী-এর মধ্যে মস্তিষ্ক-শক্তির হ্রাসসহ মৃগীরোগের কিছু কিছু লক্ষণ অনুপস্থিত ছিল বলিয়া স্বীকার করিলেও, উল্লিখিত অভিযোগ পুনরাবৃত্তির ক্ষেত্রেই শুধু নহে, ওহী আগমন প্রক্রিয়ার সহিত কথিত মৃগীরোগের খিঁচুনির সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রেও মুইরের প্রতিধ্বনি করিয়াছেন। মার্গোলিয়থ এমনও বলেন যে, মহানবী ওহী "সৃষ্টি"র উদ্দেশ্যে "কৃত্রিমভাবে" উহার লক্ষণ তৈরির কৌশল উদ্ভাবন করিয়াছিলেন। তিনি লিখিয়াছেন: "...... খৃস্টান লেখদের ৮৭ মধ্যে প্রচলিত ধারণা যে, তিনি মৃগীরোগে আক্রান্ত ছিলেন, ওহী নাযিল প্রক্রিয়ায় তাঁহার অভিজ্ঞতার লিপিবদ্ধ বর্ণনাসমূহে উহার অদ্ভূত সমর্থন পাওয়া যায় এবং উক্ত প্রক্রিয়ার লক্ষণসমূহ প্রায়শ কৃত্রিমভাবে সৃষ্টির সম্ভাবনা থাকিলেও উক্ত ধারণার গুরুত্ব হ্রাস পায় না”। ৮৮
এইরূপে মুইর ও মার্গোলিয়থের উদ্ভাবিত কটাক্ষের পুনরাবৃত্তি পরবর্তী লেখকদের অনেকেই করিয়াছেন। তাহাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য রিচার্ড বেল (Richard Bell), যিনি উক্ত অভিযোগের প্রতি তাহার সমর্থন ব্যক্ত করিয়া সকল প্রধান প্রধান প্রাচ্যবিদের তালিকা প্রদান করিয়াছেন যাহারা উক্ত অভিযোগ উত্থাপন ও প্রধানত ওহী নাযিল প্রক্রিয়ার সহিত উহার সম্পর্ক স্থাপন করিয়াছেন। ৮৯ যেহেতু আধুনিক কালে মুইর এই অপবাদের প্রধান প্রবক্তা এবং অন্যরা শুধু তাহাকে অনুসরণ করিয়াছেন ধারণার পক্ষে কোন বৈধ যুক্তির উল্লেখ ছাড়াই, তাই তাহাদের মতামতের পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করার প্রয়োজন নাই।
মহানবী -এর শৈশবের অন্যান্য ঘটনার মধ্যে তাঁহার চাচার সহিত সিরিয়া ভ্রমণের সময় বাহীরার (বুহায়রা) সহিত তাঁহার সাক্ষাতের বিষয়টি প্রাচ্যবিদগণের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছে। কারণ ইহাতে মহানবী -এর প্রথম জীবনে একজন খৃস্টান ধর্মযাজকের সহিত তাঁহার এক প্রকার যোগাযোগ প্রমাণিত হয় এবং তাহা তাহাদের এই মতবাদের প্রতি সমর্থন যোগায় বলিয়া ধারণা করা হয় যে, তিনি পূর্বেই নানাভাবে খৃস্টধর্মের জ্ঞান অর্জন করিয়াছিলেন এবং যখন তিনি নিজেকে নবী বলিয়া ঘোষণা করেন তখন সেই জ্ঞানের ব্যবহার করেন। তাহারা বাহীরার সহিত এই কথিত সাক্ষাতের, এমনকি খৃস্টধর্মের বিধান ও ধর্মগ্রন্থের পাঠ ও শিক্ষা গ্রহণের কয়েকটি অধিবেশন অতিরঞ্জিত করিয়াছেন, যদিও সংশ্লিষ্ট বিবরণে কোন আকারেই একটি অতি সংক্ষিপ্ত সাক্ষাতকার এবং প্রধানত প্রত্যাশিত নবী সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থীয় ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয়ে আনুষঙ্গিক আলোচনার অতিরিক্ত কোন কিছুর ধারণা পাওয়া যায় না।
কথিত খৃস্টান ও ইয়াহুদী উৎস হইতে মহানবী -এর তথ্য ধার করার প্রশ্ন এই পুস্তকের পরবর্তী পর্যায়ে আলোচিত হইবে। ৯০ এখানে এইটুকু মাত্র উল্লেখ করা যায় যে, বাহীরার সহিত সাক্ষাতের এই ঘটনাকে প্রাচ্যবিদগণ কর্তৃক ব্যবহার দুইটি প্রধান বিষয়ে ত্রুটিপূর্ণ।
(এক) তাহারা ঘটনা সংক্রান্ত বিবরণের একটি অংশ মাত্র গ্রহণ করেন এবং অপর অংশটি প্রত্যাখ্যান করেন। কারণ সেই অংশটি তাহাদের মতের বিরুদ্ধে যায়। বিবরণের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়, তথা কুরায়শ দলকে বাহীরা কর্তৃক আপ্যায়ন, বালক মুহাম্মাদ -এর সহিত তাহার কথোপকথন এবং বালককে লইয়া গৃহে প্রত্যাবর্তনের জন্য আবূ তালিবের প্রতি তাহার আহবান-এর পিছনে সমগ্র কারণ ছিল প্রত্যাশিত নবী সম্পর্কে ধর্মগ্রন্থীয় ভবিষ্যদ্বাণীর বিষয়ে তাহার (বাহীরার) জ্ঞান এবং বালকের মধ্যে উক্ত নবীর "চিহ্নসমূহ" তাহার শনাক্ত করিতে পারা। সমগ্র বিবরণটিকে গ্রহণ করিলে উহার অর্থ খৃস্টান ধর্মগ্রন্থে অনুরূপ ভবিষ্যদ্বাণীর শুধু উপস্থিতিই স্বীকার করা হয় না, বরং তদানীন্তন আরবজগতে খৃস্টান যাজকীয় মহলে অনুরূপ ভবিষ্যদ্বাণীর জ্ঞান প্রচলিত ছিল তাহাও স্বীকার করা হয়। এতদসত্ত্বেও বাহীরা ও তাহার ন্যায় অনেকের যে অনুরূপ সচেতনতা ও জ্ঞান থাকিতে পারে প্রাচ্যবিদগণ তাহাও মানিতে নারাজ। মুইর এই ঘটনাকে, যেরূপে পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে, কোন ফন্দিবাজ ধর্মযাজকের ভ্রান্তি বা জালিয়াতি বলিয়া একতরফা ধারণা দ্বারা ব্যাখ্যা করারও প্রয়াস পাইয়াছেন। তাহারা এইভাবে ঘটনার মূল অংশ বা সারকথা অগ্রাহ্য বা প্রত্যাখ্যান করিয়া আনুষঙ্গিক একটি বিষয় অর্থাৎ বাহীরার সহিত বালক হিসাবে মহানবী-এর কথোপকথনের প্রতি গুরুত্ব প্রদান এবং উহার ভিত্তিতে শেষোক্তজনের খৃষ্টধর্মের জ্ঞানের সংস্পর্শে আগমন ও উহা অর্জনের মতবাদ নির্মাণের প্রয়াস পাইয়াছেন।
(দুই) যেরূপ শাকুস সাদর সংক্রান্ত বিবরণের ক্ষেত্রে সেইরূপ এই ক্ষেত্রেও প্রাচ্যবিদগণ, বিশেষ করিয়া মুইর, বিবরণটি ব্যবহার করিয়াছেন, যদিও উহার বিশুদ্ধতা সম্পর্কে তাহারা সন্দেহ পোষণ করেন। সুতরাং মুইর তাহার পুস্তকের প্রথম সংস্করণের এক দীর্ঘ পাদটীকায় কাল্পনিক ও "অনেক বেশী অবাস্তবতায়" পরিপূর্ণ বলিয়া বাহীরা সংক্রান্ত বিবরণের নিন্দা করিয়াছেন।৯১ কিন্তু তারপর সম্ভবত ইহা বুঝিতে পারিয়া যে, পাদটীকায় তিনি যাহা লিখিয়াছেন তাহা মূল পুস্তকে বর্ণিত তাহার ধারণার পরিপন্থী, তাহার পুস্তকের পরবর্তী সংস্করণে পাদটীকাটি বাদ দেন, কিন্তু মূল পুস্তকের বক্তব্য অসংশোধিতই থাকিয়া যায়।
এমনকি মুইর এই সফরকে মহানবী-এর পূর্ণাঙ্গ শিক্ষাসফর বা আবিষ্কারমূলক অভিযান বলিয়াও কল্পনার ফানুস উড়াইয়াছেন। একজন শিক্ষিত পূর্ণ বয়স্ক পর্যটক পাইতে পারেন এইরূপ ধারণা মনের সামনে তুলিয়া ধরিয়া মুইর কল্পনার চিত্র আঁকিয়াছেন এইভাবে যে, মহানবী আরবজগতের ও রাষ্ট্রসমূহের সেই অংশের সকল ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান পর্যবেক্ষণ করিয়াছেন।৯২
"এই অভিযান..... তরুণ মুহাম্মাদ-কে পর্যবেক্ষণের যে সুযোগ দান করিয়াছিল তাঁহার উপর উহার প্রভাব ব্যর্থ হয় নাই। তিনি পেট্রা, জেরাশ, আম্মন ও প্রাচীন বাণিজ্যিক জাঁকজমকের অন্যান্য ধ্বংসপ্রাপ্ত স্থানসমূহের নিকট দিয়া অতিক্রম করেন এবং উহাদের দৃশ্য নিঃসন্দেহে তাঁহার চিন্তাশীল মনের উপর পার্থিব শ্রেষ্ঠত্বের অস্থায়িত্ব গভীর রেখাপাত করে...। এই সফরকালে তিনি কয়েকটি ইয়াহুদী বসতী এলাকার মধ্য দিয়াও গমন করেন এবং সিরিয়ার জাতীয় ধর্ম খৃষ্টধর্মের সংস্পর্শে আসেন....। সিরিয়ায় তৎকালের খৃস্টধর্ম যতই পতিত ও বস্তুবাদী হউক না কেন, ইহা চিন্তাশীল পর্যবেক্ষকের মনে অনুকূল এবং মক্কার স্কুল ও অধ্যাত্মিকতাহীন পৌত্তলিকতার বিস্ময়কর বিপরীত রেখাপাপ করিয়া থাকিবে।
উল্লিখিত বর্ণনা নিঃসন্দেহে একটি উপভোগ্য সাহিত্যের অংশ, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে যাহা ঘটিয়াছে তাহার পরিমিত ও বিশ্বাস্য বিবরণ উহাতে অনুপস্থিত। আমরা বরং এইরূপ মনে করার পক্ষে যে, যেহেতু ইহা একটি বেশ দীর্ঘ ও কষ্টকর স্থলপথে বাণিজ্যদলের সফর ছিল, তাই দলটি পরিত্যক্ত নিবাস, বিধ্বস্ত নগরী কিংবা নিরানন্দ গীর্জা সমাবেশ-এর ন্যায় বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক স্থানসমূহের ভ্রমণ সতর্কতার সহিত পরিহার করিয়া থাকিবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00