📄 হযরত ঈসা (আ)-এর জন্মকাল হইতে নবুওয়াত পূর্ব জীবন
জন্মকাল হইতে নবুওয়াত লাভ পর্যন্ত হযরত ঈসা (আ) কোথায় কিভাবে জীবন অতিবাহিত করেন সেই সম্পর্কে কুরআন ও হাদীছে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না। এই বিষয়ে কুরআনে শুধু জন্মের পর তাঁহার তত্ত্বাবধান ও তাঁহার মায়ের পবিত্রতার ঘোষণাসহ নিজের পরিচয় প্রদান সম্পর্কে আলোকপাত করা হইয়াছে, ধারাবাহিক ঘটনাপঞ্জির বিস্তারিত উল্লেখ নাই। তবে আল-কুরআনে উক্ত বর্ণনাসহ বাইবেলে কিছু কিছু তথ্য, কিছু ইসরাঈলী রিওয়ায়াত এবং অধুনা প্রাপ্ত কিছু প্রাচীন দলীল-দস্তাবেয-এর ভিত্তিতে ঈসা (আ)-এর জন্মকাল হইতে নবুওয়াত পর্যন্ত অবস্থাদির এক সংক্ষিপ্ত আলেখ্য এখানে পেশ করা হইল।
আল্লাহর কুদরতে শুষ্ক খর্জুর বৃক্ষ হইতে তাহাদের জন্য অসময়ে খেজুর সরবরাহসহ সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। অপরদিকে শিশু ঈসাকে দেখিয়া তিনি চক্ষু জুড়াইতেন। এই মর্মে আল-কুরআনে উল্লিখিত হইয়াছে: فَنَادُهَا مِنْ تَحْتِهَا أَلَا تَحْزَنِي قَدْ جَعَلَ رَبُّكَ تَحْتَكِ سَرِيًّا . وَهُزَى إِلَيْكِ بِجِذْعِ النَّخْلَةِ تُسَقِطَ عَلَيْكِ رُطَبًا جَنِيًّا . فَكُلِي وَاشْرَبِي وَقَرَى عَيْنًا "ফেরেশতা তাহার নিম্ন পার্শ্ব হইতে আহ্বান করিয়া তাহাকে বলিল, তুমি দুঃখ করিও না, তোমার পাদদেশে তোমার প্রতিপালক এক ঝর্ণাধারা সৃষ্টি করিয়াছেন। তুমি তোমার দিকে খর্জুর বৃক্ষের কাণ্ড নাড়া দাও। উহা তোমাকে সুপক্ক তাজা খর্জুর দান করিবে। সুতরাং আহার কর, পান কর ও চক্ষু জুড়াও” (১৯: ২৪-২৬)।
বার্নাবাসের বাইবেলে উল্লিখিত হইয়াছে যে, ফেরেশতাদের নিকট হইতে অবগত হইয়া বেথেলহামের নিকটস্থ মাঠের রাখালেরা আসিয়া মারয়ামকে বিবিধ উপঢৌকন দিয়া নবজাতকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিয়াছিল (বার্নাবাসের বাইবেল)। কোন কোন বর্ণনায় দেখা যায় যে, হযরত মারয়াম পূর্ব হইতেই বেথেলহাম শহরতলীতে ছাউনিতে আশ্রয় লইয়াছিলেন (প্রাগুক্ত)। মথি সুসমাচারের বর্ণনামতে পারস্য দেশীয় একদল পণ্ডিতও ঈসা (আ)-কে কিছু উপহার দিয়াছিলেন (মথি সুসমাচার, ২: ১২)। এই সমস্ত বর্ণনা হইতে প্রতীয়মান হয় যে, থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্তসহ অন্যান্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদিরও বিভিন্ন পন্থায় ব্যবস্থা করা হইয়াছিল। জন্মোত্তরকালে শিশু ঈসার অলৌকিকভাবে মাতার পবিত্রতা ঘোষণায় তাঁহাকে সান্ত্বনা দান প্রভৃতি বিস্তারিত তথ্যের জন্য দ্র. মারয়াম নিবন্ধ।
আল্লামা নাসাফী বর্ণনা করেন যে, ঈসা (আ) তাঁহার জন্ম দিনেই কিংবা চল্লিশ দিন বয়সে কথা বলিয়াছিলেন (তাফসীরে নাসাফী, ২খ., page ৩৮)। দাহহাকের বর্ণনামতে তিনি ছেচল্লিশ দিন বয়সে কথা বলিয়াছিলেন (তাফসীরে মাওয়ারদী, ৩খ., page ৩৭০)। বর্ণিত আছে যে, তিনি তখন স্তন্য পান করিতেছিলেন। তাহাদের কথা শুনিয়া তিনি মাতৃস্তন ছাড়িয়া তাহাদের দিকে মুখ ফিরাইয়া এবং বাম দিকে ভর করিয়া বৃদ্ধাঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করিতে করিতে তাঁহার বক্তব্য প্রদান করিয়াছিলেন। কাহারও মতে হযরত যাকারিয়া (আ) তাঁহার কাছে আসিয়া কথা বলিয়াছিলেন (আলুসী, প্রাগুক্ত ১৬খ, page ৮৯)। যাহাই হউক, কাহার মাধ্যমে কখন কথা বলিয়াছিলেন আল-কুরাআনে তাহা উল্লেখ নাই, তবে দোলনায় থাকা অবস্থায় তিনি কথা বলিয়াছিলেন তাহা বলা হইয়াছে।
হযরত ঈসা (আ)-এর ইহা এক মু'জিযা। কিন্তু পরম আশ্চর্যের বিষয় হইল, খৃস্টান সম্প্রদায় ঈসা (আ)-এর দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলিবার বিষয়টিকে বরাবরই অস্বীকার করিয়া আসিতেছে। আল্লামা আলুসী উল্লেখ করেন যে, নাসারাগণ ধারণা করে ঈসা (আ) শিশু থাকা অবস্থায় কথা বলেন নাই, শৈশবে তাঁহার মাতার পবিত্রতার কথা বলেন নাই এবং এইভাবেই ত্রিশ বৎসর কাটিয়া যায় (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ, page ৬৩)। নাসারাগণ যুক্তি প্রদর্শন করিয়া থাকে যে, দোলনায় থাকা অবস্থায় ঈসা (আ)-এর কথা বলিবার বিষয়টি অত্যাশ্চর্যজনক বিষয়। এই ধরনের যদি কিছু ঘটিত, লোকজন অবশ্যই তাহা বর্ণনা করিত। আর এই ধরনের বর্ণনা থাকিলে নাসারাগণেরই সকলের আগে জানার কথা।
তাহাদের এই যুক্তি খণ্ডনে বলা হয়, বর্ণিত আছে যে, ঈসা (আ) সেইবার কথা বলিয়াই চুপ হইয়া যান। স্বাভাবিক শিশুরা যখন কথা বলিতে শিখে তখনই ঈসা (আ) পরবর্তীতে কথা বলিতে শুরু করিয়াছিলেন। ইহা ইব্ন আব্বাস (রা) হইতেও বর্ণিত (প্রাগুক্ত)। সুতরাং ঈসা (আ) যখন কথা বলিয়াছিলেন তখন শ্রোতাদের সংখ্যা হয়তো এমন পর্যায়ে ছিল না যাহাকে মুতাওয়াতির বলা যায়, যাহাকে কেহ মিথ্যা বলিয়া ধারণাও করিতে পারে না।
ঈসা (আ)-এর কথা বলার ঘটনাটি ছিল তাৎক্ষণিক। এমনও হইতে পারে যে, সেইখানকার শ্রোতাগণ তাহা বর্ণনা করিয়াছিলেন, কিন্তু লোকজন তাহাদিগকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করিতে শুরু করিয়াছিল। অতঃপর বর্ণনাকারিগণ নিরব হইয়া যান। আর এইভাবে বিষয়টি চাপা পড়িয়া যায়। তাহা ছাড়া যদি ধরিয়াও লওয়া হয় যে, ঈসা (আ) দোলনায় থাকা অবস্থায় অনেক বার কথা বলিয়াছেন বা অনবরত কথা বলিতেইছিলেন কিন্তু লোকজন এই বিষয়টি বর্ণনার প্রতি তেমন গুরুত্বই দেন নাই। কারণ ইহার চাইতে আরও গুরুত্বপূর্ণ আলৌকিক ঘটনা ঈসা (আ)-এর মাধ্যমে ঘটিয়াছিল। যেমন মৃতকে জীবিত করা, জন্মান্ধ ও কুষ্ঠরোগীকে নিরাময় করা, গায়েবী খবর দেওয়া, মাটি দ্বারা পাখি তৈরি করা ইত্যাদি। এইগুলিই লোকমুখে বেশী বেশী আলোচিত হইয়া আসিতেছিল (প্রাগুক্ত)। অবশ্য মারয়াম (আ)-এর পবিত্রতা প্রমাণের দিক হইতে উক্ত বিষয়টি শুধু প্রাসংগিকই নহে, বরং খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
ইহা ছাড়া শুধু হযরত ঈসা (আ) যে দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলিয়াছেন তাহা নহে, বরং বর্ণিত আছে যে, তিনি ব্যতীত আরও অনেকে দোলনায় শিশু অবস্থায় কথা বলিয়াছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা) হইতে বর্ণিত আছে, মহানবী (সা) বলিয়াছেনঃ তিনজন দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলেন, তাহারা হইলেন ঈসা ইবন মারয়াম, জুরায়জের পবিত্রতার সাক্ষী শিশু ও জাব্বার প্রসঙ্গে দুগ্ধপোষ্য শিশু (সহীহ মুসলিম, ২খ, page ২৭৬)। অন্যান্য বর্ণনায় রহিয়াছে, ঈসা (আ), ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষ্যদাতা নবজাতক ও সাহেবে জুরায়াজ।
আসহাবুল উখদূদের ঘটনায় আসিয়াছে, এক ঈমানদার মহিলাকে ঈমান আনার অপরাধে আগুনে নিক্ষেপের সময় তাহার সাথে নবজাতক এক শিশু ছিল। সেই দুগ্ধপোষ্য শিশুকে ফেলিয়া আগুনে ঝাঁপ দিবে কিনা এই ব্যাপারে এ মহিলা ইতস্তত করিতেছিল। আর তখন হঠাৎ করিয়া শিশুটি বলিয়া উঠিল, ওহে মাতা! আপনি ধৈর্য ধরুন, আপনি সত্যের উপরই আছেন (কুরতুবী, প্রাগুক্ত, ৪খ, page ৯১)।
দাহহাক হইতে বর্ণিত আছে যে, ছয়জন নবজাতক দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলিয়াছেন। তাহারা হইলেন, ইউসুফ (আ)-এর পক্ষে সাক্ষীদাতা নবজাতক, ফেরাউনের স্ত্রীর মাথা আঁচড়ানো কাজে নিয়োজিত মহিলার শিশু, ঈসা (আ), ইয়াহ্ইয়া (আ), সাহেবে জুরায়জ ও সাহেবুল জাব্বার (প্রাগুক্ত)। উপরিউক্ত বর্ণনাসমূহে দেখা যায়, যুগে যুগে অনেক নবজাতক শিশু বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কথা বলিয়াছেন, যাহা ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছে। তাই ঈসা (আ) মায়ের পক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অবশ্যই কথা বলিয়াছিলেন, কেননা তাহার প্রয়োজন ছিল।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর দাওয়াতী মিশন
হযরত ঈসা (আ) বানু ইসরাঈলের হেদায়েতের জন্য প্রেরিত হইয়াছিলেন। পূর্বেই উল্লেখ করা হইয়াছে যে, বানু ইসরাঈল তাহাদের আসল শিক্ষ প্রায় ভুলিয়াই গিয়াছিল। মূসা (আ)-এর শরীআত পরিবর্তন পরিবর্ধনের মাধ্যমে তাহা হইতে তাহারা অনেক দূরে চলিয়া গিয়াছিল। ধর্মীয় পণ্ডিত হইতে শুরু করিয়া সাধারণ মানুষ সকলেই চরম গোমরাহিতে লিপ্ত হইয়া গিয়াছিল। কালক্রমে মূসা (আ)-এর শরীআত বিস্তৃত ও বিকৃত হইয়া গিয়াছিল। তাহা ছাড়া দলাদলি এবং দীন ও শরীআতের ব্যাপারে বিভিন্ন রকম মতানৈক্যের সৃষ্টি হইয়াছিল। এই পরিস্থিতিতে হযরত ঈসা (আ) তাঁহার মিশন বা পয়গামে দুইটি বিষয়কে প্রাধান্য দান করেন।
(ক) তাওরাত এবং তাহার শিক্ষাকে তাসদীক বা সত্যায়িতকরণ।
(খ) মূসা (আ)-এর শরীআতকে পূর্ণাঙ্গতায় পৌঁছাইয়া দেওয়া এবং ইয়াহুদীদের মধ্যে মতানৈক্যের অবসান ঘটানো (জামীল আহমদ, প্রাগুক্ত, page ৩৫২-৩৫৩)।
কুরআন কারীমেও হযরত ঈসা (আ)-এর সেই মৌলিক পয়গামের কথা স্পষ্টভাবে উদ্ধৃত হইয়াছে। তিনি বলিতেন:
وَمُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَى مِنَ التَّوْرَةِ وَلَأُحِلَّ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُمْ بِآيَةٍ مِّنْ رَّبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمُ
"আমি আসিয়াছি আমার সম্মুখে তাওরাতের যাহা রহিয়াছে উহার সমর্থকরূপে ও তোমাদের জন্য যাহা নিষিদ্ধ ছিল উহার কতক গুলিকে বৈধ করিতে এবং আমি তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে তোমাদের নিকট নিদর্শন লইয়া আসিয়াছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর আর আমাকে অনুসরণ কর। আল্লাহ আমার প্রতিপালক এবং তোমাদের প্রতিপালক, সুতরাং তোমরা তাহার ইবাদত করিবে। তাহাই সরল পথ।" আল-কুরআনের অন্য স্থানে আরও উল্লেখ করা হয় যে,
وَلَمَّا جَاءَ عِيسَى بِالْبَيِّنَتِ قَالَ قَدْ جِئْتُكُمْ بِالحِكْمَةِ وَلِأُبَيِّنَ لَكُمْ بَعْضَ الَّذِي تَخْتَلِفُونَ فِيهِ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ إِنَّ اللَّهَ هُوَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمُ.
"ঈসা যখন স্পষ্ট নিদর্শনসহ আসিল সে বলিয়াছিল, আমি তো তোমাদিগের নিকট আসিয়াছি হেকমত তথা প্রজ্ঞাসহ এবং তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ করিতেছ তাহা স্পষ্ট করিয়া দিবার জন্য। সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর। আল্লাহই তো আমার প্রতিপালক এবং তোমাদিগেরও প্রতিপালক। অতএব তোমরা তাঁহার ইবাদত কর; ইহাই সরল পথ" (৪৩: ৬৩-৬৪)।
প্রচলিত সুসমাচারসমূহেও হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গামের উপরিউক্ত দুইটি দিক দিয়া বিষয়টি খুব জোরালোভাবেই উল্লেখ করা হইয়াছে।
মথি সুসমাচারে হযরত ঈসার বাণীরূপে নিম্নোক্ত কথাটি উল্লেখ আছে। তিনি বলিয়াছেন, "মনে করিও না যে, আমি ব্যবস্থা কি ভাববাদি গ্রন্থ লোপ করিতে আসিয়াছি; আমি লোপ করিতে আসি নাই, কিন্তু পূর্ণ করিতে আসিয়াছি। কেননা আমি তোমাদিগকে সত্য কহিতেছি, যে পর্যন্ত আকাশ ও পৃথিবী লুপ্ত না হইবে, সে পর্যন্ত ব্যবস্থার এক মাত্রা কি এক বিন্দুও লুপ্ত হইবে না। সমস্তই সফল হইবে" (মথি, ৫: ১৭-১৮)।
মথি সুসমাচারের অন্যত্র আরও বলা হইয়াছে, তিনি তাহাকে বলিয়াছিলেন: “তোমার সমস্ত অন্তঃকরণ, তোমার সমস্ত প্রাণ ও তোমার সমস্ত মন দিয়া তোমার ঈশ্বর প্রভুকে প্রেম করিবে। এইটি মহৎ ও প্রথম আজ্ঞা। আর দ্বিতীয়টি ইহার তুল্য; তোমার প্রতিবেশীকে আপনার মত প্রেম করিবে। এই দুইটি আজ্ঞাতেই সমস্ত ব্যবস্থা এবং ভাববাদি গ্রন্থও ঝুলিতেছে" (মথি, ২২: ৩৭-৪০)।
মথি সুসমাচারের অন্য জায়গায় আরও বলা হয়, "অধ্যাপক ও ফরীশীরা মোশির আসনে বসে। অতএব তাহারা তোমাদিগকে যাহা কিছু বলে তাহা পালন করিও, মানিও, কিন্তু তাহাদের কর্মের মত কর্ম করিও না; কেননা, তাহারা বলে, কিন্তু করে না" (মথি, ২৩: ২-৩)।
ইহা ছাড়াও হযরত ঈসা (আ) ঘোষণা দিতেন যে, তাঁহার পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্যই সীমাবদ্ধ। আর পরবর্তী পয়গাম্বর হযরত মুহাম্মাদ (স)-এর আগমনের সুসংবাদ দেওয়াও তাঁহার পয়গামের লক্ষ্য ছিল।
📄 পিতাবিহীন জন্মের হিকমত
হযরত আদম (আ)-এর পর আল্লাহ পাক যত মানুষ সৃষ্টি করিয়াছেন তাহাদিগকে পিতা-মাতার মাধ্যমেই সৃষ্টি করিয়াছেন। কিন্তু আল্লাহ্র নবী ঈসা (আ)-এর ব্যাপারে এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটিয়াছে। মহান আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া তা'আলা তাঁহাকে পিতার মাধ্যম ছাড়া শুধু মাতার মাধ্যমেই সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহার পিছনে হিকমত বা রহস্য কি? আর ইহা সম্ভব কিনা? এই সম্পর্কে উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ব্যাখ্যা প্রদান করিয়াছেন।
(১) পিতাবিহীনভাবে ঈসা (আ)-এর জন্মলাভের দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ সর্বশক্তিমান। কার্যকারণ বা উপকরণ ব্যতীত তিনি যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করিতে পারেন। কেননা বিশ্বজগতে প্রচলিত নিয়ম-কানুন যিনি প্রবর্তন করিয়াছেন তিনি ইচ্ছা করিলে স্বীয় ব্যবস্থাপনায় ইহার ব্যতিক্রমও ঘটাইতে পারেন। ঈসা (আ)-এর জন্ম আল্লাহ পাকের সেই ক্ষমতা ও শাশ্বত ইচ্ছার প্রতিফলন স্বরূপ।
উল্লেখ্য, ঈসা (আ)-এর জন্ম এমন সম্প্রদায়ে হইয়াছিল যাহারা বস্তুগত উপকরণকেই সবকিছু হওয়ার মাধ্যম মনে করিত। এমন এক যুগে তাঁহার জন্ম যখন সকল কিছুর সৃষ্টির ব্যাপারে কার্যকারণ তত্ত্বের দর্শনকেই একমাত্র সত্য বলিয়া প্রচার করা হইতেছিল। আর প্রাকৃতিক উপকরণ ব্যতীত ঈসা (আ)-এর জন্মলাভ করায় সৃষ্টিজগতে তিনি আল্লাহর আলৌকিক নিদর্শন হিসাবে প্রতিভাত হইয়াছিলেন। বলা হইয়াছে,
وَلِنَجْعَلَهُ آيَةً لِلنَّاسِ وَرَحْمَةً مِّنَّا وَكَانَ أَمْرًا مَقْضِيًّا
"আর আমি উহাকে এইজন্য সৃষ্টি করিব যেন সে হয় মানুষের জন্য এক নিদর্শন ও আমার নিকট হইতে এক অনুগ্রহ; ইহাতো এক স্থিরীকৃত ব্যাপার" (১৯: ২১)।
(২) ঈসা (আ)-এর পিতাবিহীন জন্ম ছিল এক রূহানী জগতের অস্তিত্বের সুস্পষ্ট ঘোষণা। এই ঘোষণা এমন এক সম্প্রদায়ের মাঝে যাহারা রূহানী জগতের অস্তিত্বকে স্বীকার করিত না। তাহারা মনে করিত মানুষ দেহ সর্বস্ব প্রাণী। তাহার রূহ বলিতে কিছু নাই। বলা হয় যে, মানুষ যে দেহ ও আত্মার সমষ্টি তাহা ইয়াহুদীরাও স্বীকার করিত না। দার্শনিক রেনান উল্লেখ করেন যে, গ্রীকরা মনে করিত, মানুষ দেহ ও রূহ সর্বস্ব জীব। তাই ইসরাঈলিরা গ্রীক শিক্ষার প্রতি বিদ্বেষবশত রূহের স্বতন্ত্র অস্তিত্বকে প্রত্যাখ্যান করে (শায়খ আবু যাহরা, মুহাদিরাতু ফিন্ নাসরানিয়্যা, page ১৭-১৮)।
সুতরাং আল্লাহ পাক একটি রূহ সৃষ্টির মাধ্যমে এবং সেই রূহকে পুরুষের স্পর্শ ব্যতীত মারয়ামের গর্ভে প্রদান করিয়া তথা পিতা বিহীনভাবে ঈসা (আ)-কে সৃষ্টি করেন। ইরশাদ হইয়াছেঃ
"এবং স্মরণ কর সেই নারীকে যে নিজ সতীত্বকে রক্ষা করিয়াছিল, অতঃপর আমি তাহার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকিয়া দিয়াছিলাম এবং তাহাকে ও তাহার পুত্রকে করিয়াছিলাম বিশ্ববাসীর জন্য এক নিদর্শন" (৬৬:১২)।
এই সৃষ্টিকর্মে এক ফেরেশতা কর্তৃক মারয়ামের জামার ফাঁকে রূহ ফুঁকিয়া দেওয়া ব্যতীত আর কোন উপকরণই ছিল না।
৩। আল্লাহ পাকের সৃষ্টিকর্মের পূর্ণাঙ্গতা বিধানের জন্যই ঈসা (আ)-এর পিতাবিহীন জন্মলাভ। কেননা মানুষ চারটি প্রক্রিয়ায় সৃষ্টি হইতে পারে।
(ক) পিতা-মাতাবিহীন: যেমন আদমকে সৃষ্টি। (খ) মাতাবিহীন: যেমন হাওয়া (আ)-কে সৃষ্টি। (গ) পিতা-মাতার মাধ্যমে সৃষ্টি: যেমন সাধারণ মানুষ সৃষ্টি। (ঘ) পিতাবিহীন সৃষ্টি। তাই এই প্রকারের সৃষ্টি কৌশলের বহিঃপ্রকাশ হযরত ঈসা (আ)-এর জন্ম। প্রথমোক্ত তিন প্রকারের সৃষ্টির কথা আল্লাহ পাক কুরআন মজীদে বর্ণনা করিয়াছেন নিম্নোক্ত আয়াতে:
"হে মানব! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকে ভয় কর যিনি তোমাদিগকে এক ব্যক্তি হইতেই সৃষ্টি করিয়াছেন ও যিনি তাহা হইতে তাহার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেন, যিনি তাহাদের দুইজন হইতে বহু নর-নারী ছড়াইয়াছেন" (৪:১)।
আর চতুর্থ প্রকার মানুষ সৃষ্টির বিষয়টি পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে সুস্পষ্ট। বলা হইয়াছে:
قَالَتْ رَبِّ أَنِّي يَكُونُ لِي وَلَدٌ وَلَمْ يَمْسَسْنِي بَشَرٌ قَالَ كَذَلِكِ اللَّهُ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ إِذَا قَضَى أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ
"সে (মারয়াম) বলিল, হে আমার পালনকর্তা। আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করে নাই, আমার সন্তান হইবে কিভাবে? তিনি বলিলেন, এইভাবেই; আল্লাহ যাহা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, 'হও' এবং উহা হইয়া যায়" (৩:৪৭)।
সুতরাং আল্লাহ্ পক্ষে ঈসা (আ)-কে পিতাবিহীন সৃষ্টি করা সম্ভব। তিনি সর্বশক্তির আধার। বর্ণিত আছে যে, নাজরানের খৃস্টান প্রতিনিধি দল মহানবী (স)-এর কাছে আসিয়া বলিয়াছিল, আপনার কি হইল যে, আমাদের সাহেব তথা প্রাণপুরুষকে গালি দিতেছেন? মহানবী (স) বলিলেন, আমি কি বলিলাম? তাহারা বলিল, আপনি বলেন যে, তিনি আল্লাহর বান্দা। তখন মহানবী (স) বলিলেন, হাঁ, তিনি তো আল্লাহর বান্দা ও রাসূল এবং সেই কলেমা যাহাকে কুমারী মারয়াম (আ)-এর প্রতি ঢালিয়া দেওয়া হইয়াছিল। ইহা শুনিয়া তাহারা রাগান্বিত হইল এবং বলিল, আপনি কি দেখিয়াছেন, কোন মানুষ পিতাবিহীন জন্মলাভ করিয়াছে? যদি আপনার দাবিতে সত্যবাদী হন তবে এইরূপ সৃষ্টির কোন নজীর দেখান। তখন আল্লাহ পাক নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেন। إِنْ مَثَلَ عِيسَى عِنْدَ اللَّهِ كَمَثَلِ أَدَمَ خَلَقَهُ مِنْ تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُنْ فَيَكُونُ "আল্লাহ্র নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের দৃষ্টান্ত সদৃশ। তিনি তাহাকে মৃত্তিকা হইতে সৃষ্টি করিয়াছিলেন, অতঃপর তাহাকে বলিয়াছিলেন, 'হও', ফলে সে হইয়া গেল" (৩ঃ ৫৯) (আলুসী, প্রাগুক্ত, ৩খ., page ১৮৫-১৮৬)।
উল্লেখ্য যে, আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয়, যাহার পিতা-মাতা কিছুই ছিল না। ইহা কি করিয়া সম্ভব হইল? যাহারা এই ধরনের সন্দেহ পোষণ করেন, তাহাদের সন্দেহ নিরসনে ঈসা (আ)-এর পিতাবিহীন জন্মটিও একটি নিদর্শনস্বরূপ। এই হিকমতের কারণেও আল্লাহ্ পাক ঈসাকে ঐভাবে সৃষ্টি করিলেন।
অপরদিকে আদম (আ)-এর সৃষ্টিতে তাঁহার কোন পিতা-মাতা ছিল না। কিন্তু ঈসা (আ)-এর সৃষ্টিতে পিতা না থাকিলেও মাতা ছিলেন। তাই ঈসা (আ)-এর সৃষ্টিকর্ম আরও সহজসাধ্য। তাহা ছাড়া উলামায়ে কেরাম নিম্নোক্ত যুক্তিও প্রদর্শন করিয়া থাকেন। যথা: পুরুষের সকল শুক্রকীট নারীর গর্ভে প্রবেশের মাধ্যমে গর্ভধারণ সম্পন্ন হইয়া যায় না। আল্লাহ্র ইচ্ছায় কোন একটি শুক্রকীট নারীর ডিম্বকোষের সহিত মিশ্রিত হওয়ার পরই ইহার প্রক্রিয়া শুরু হয় এবং কয়েকটি স্তর অতিক্রম করার পর তাহাতে রূহ প্রবেশ করে। ইহা দ্বারা বুঝা যাইতেছে, শুক্রকীটের অনুপ্রবেশ ও রূহের অনুপ্রবেশের পর্যায় হইল ভিন্ন ভিন্ন।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রজনন বিদ্যার বিভিন্ন কলাকৌশল, তত্ত্বাদি ও তথ্যাদি এবং সর্বপরি এই ক্ষেত্রে সফলতা উপরিউক্ত বিষয়টিকে আরও সম্ভাবনাময় করিয়া তুলিয়াছে।
📄 হযরত ঈসা (আ)-এর পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্য নির্দিষ্ট ছিল
হযরত ঈসা (আ) ছিলেন বানু ইসরাঈলের শেষ নবী ও রাসূল। তাঁহার পয়গাম ইসরাঈল জাতির জন্য নির্দিষ্ট ছিল। কুরআন কারীমের বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (আ) কেবল বানু ইসরাঈলের জন্য নবীরূপে প্রেরিত হইয়াছিলেন, সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য নহে। বলা হইয়াছে:
"ঈসাকে বানু ইসরাঈলের জন্য রাসূল করিয়া প্রেরণ করা হইয়াছিল"।
অনত্র বলা হইয়াছে: وَرَسُولاً إِلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ. "স্মরণ কর যখন মারয়াম তনয় ঈসা বলিয়াছিল, হে বানু ইসরাঈল! আমি তোমাদের জন্য রাসূল রূপে প্রেরিত হইয়াছি” (৬১:৬)।
উল্লেখ্য যে, হযরত ঈসা (আ) তাঁহার দাওয়াতী কার্যক্রম বানু ইসরাঈলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখিলেও পরবর্তীতে তাঁহার অনুসারী হিসাবে দাবিদার কিছু কিছু ব্যক্তি, যেমন পৌল, ঈসা (আ)-এর সেই দাওয়াতী কার্যক্রম ইসরাঈল বহির্ভূতদের মধ্যেও প্রসারিত করেন। ইহা ছিল খৃস্টানদের প্রাথমিক যুগে ইয়াহুদীদের একটি ষড়যন্ত্রের অংশবিশেষ। তাই যাহারা ইসরাঈলী সমাজের বাহিরে খৃস্ট ধর্ম প্রচারে আগ্রহী ছিল তাহাদেরকে ঐ ইয়াহূদী ষড়যন্ত্রকারীরা বিভিন্নভাবে সমর্থন ও সহযোগিতাও করিয়াছে। ঐ ধরনের ষড়যন্ত্রকারীরা হযরত ঈসার বাণীর অপব্যাখ্যা দিতেও কুণ্ঠা বোধ করে নাই, এমনকি তাঁহার বাণী বিকৃত করিয়া খৃস্টানদিগের কাছে প্রচলিত সুসমাচারে সংযুক্ত করিতেও সক্ষম হয়। এই প্রেক্ষিতে মথি সুসমাচারে আসিয়াছে, ঈসা নাকি বলিয়াছেন, "স্বর্গে ও পৃথিবীতে সমস্ত কর্তৃত্ব আমাকে দত্ত হইয়াছে। অতএব তোমার গিয়া সমুদয় জাতিকে শিষ্য কর" (মথি, ২৮: ১৮-১৯)।
স্মর্তব্য, সম্ভবত সমুদয় জাতি বলিতে বানু ইসরাঈলের সকল গোত্র বুঝানো হইয়াছে। কিন্তু খৃস্টানগণ ইহাকে সারা বিশ্বের মানুষ বুঝাইতে চেষ্টা করিয়া থাকে (আরো দ্র. মার্ক, ১৬: ১৫)।
মথি সুসমাচারে সমুদয় জাতির কাছে ঈসা (আ)-এর বাণী প্রচারের কথা বলা হইলেও সেই একই সুসমচারে আসিয়াছে যে, তিনি তাঁহার ১২ জন প্রেরিতকে উদ্দেশ্য করিয়া বলিতেছেন, "তোমরা পর জাতিগণের পথে যাইও না এবং শমরীয়দের কোন নগরে প্রবেশ করিও না, বরং ইস্রায়েল কুলের হারান মেষগণের কাছে যাও। আর তোমরা যাইতে যাইতে এই কথা প্রচার কর, স্বর্গরাজ্য সন্নিকট হইল" (মথি ১০: ৬-৭)। একই সুসমাচারে অন্যত্র বলা হয়ঃ "ইসরাঈল কুলের হারান মেষ ছাড়া আর কাহারও নিকটে আমি প্রেরিত হই নাই" (প্রাগুক্ত, ১৫: ২৪)।
অতএব একই গ্রন্থের উভয় তথ্যের মধ্যে বৈপরীত্য বিদ্যমান। কিন্তু শেষোক্ত তথ্যের সহিত আল-কুরআনের মিল রহিয়াছে (দ্র. ৩: ৪৯ ও ৬১: ৪৬)। তিনি ছিলেন শুধু বানু ইসরাঈলের জন্য। প্রেরিত। এই কথাটি এমনকি বার্নাবাসের বাইবেলেও স্পষ্টভাবে আসিয়াছে। ঈসা (আ) বলিয়াছিলেন, আমি বানু ইসরাঈল ছাড়া আর কোনো সম্প্রদায়ের জন্য প্রেরিত নাই (বার্নাবাসের বাইবেল, page ২২)। অতঃএব ঈসা (আ)-এর পয়গামকে বিশ্বজনীন করার প্রচেষ্টা হযরত ঈসা (আ)-এর পরবর্তী সময়ের।