📄 বন্দীদ্বয়ের পরিচয় ও তাহাদের কারাগারে কারারুদ্ধ হওয়ার কারণ
বাগাবী ও ইবন কাছীর প্রমুখের বর্ণনামতে এই যুবকদ্বয় ছিল মিসর সম্রাট ওয়ালীদ ইবন ছারাওয়ানের কর্মচারী। ইহাদের একজন ছিল সম্রাটের সাকী (পানীয় পরিবেশনকারী) এবং তাহার নাম 'বানু'; অপরজন ছিল রাজভবনের প্রধান পাচক এবং তাহার নাম মিজলাছ (বিদায়া, ১খ, ২০৬; মাজহারী, ৫খ, ১৬)। সম্রাটের শত্রুপক্ষের লোকেরা তাহাকে হত্যা করিবার ষড়যন্ত্র কার্যকর করার জন্য এই দুই কর্মচারীর সহিত যোগ-সাজশ করিয়াছিল। তাহারা সম্রাটের খাদ্য ও শরাবে বিষ মিশাইয়া দেওয়ার জন্য এই দুই রাজকর্মচারীকে বড় ধরনের উৎকোচ প্রদানের প্রলোভন দিলে ইহারা ইহাতে সম্মত হয়। পরে কোন কারণে সাকী উহাতে অস্বীকৃত হইল এবং পাচক উৎকোচ গ্রহণ করিয়া সম্রাটের খাবারে বিষ মিশ্রিত করিয়া দিল। অতঃপর সম্রাটের সম্মুখে খাদ্য-পানীয় উপস্থিত করা হইলে সাকী বলিল, মহারাজ! এই খাবার খাইবেন না, উহাতে বিষ আছে। পাচক বলিল, পানীয় পান করিবেন না, উহাতে বিষ দেওয়া হইয়াছে। তখন সম্রাট সাকীকে বলিলেন, তুমি পানীয় পান কর। সে উহা পান করিল এবং উহাতে তাহার কোন ক্ষতি হইল না। সম্রাট পাচককে খাদ্য ভক্ষণ করিতে বলিলে সে তাহাতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করিল। সেই খাদ্য কোন পশুকে খাওয়ানো হইলে পশুটি মরিয়া গেল। সম্রাট দুইজনকেই বন্দী করিবার আদেশ দিলেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাহাদের বিচার সম্পন্ন করিবার ফরমান জারী করিলেন (মাজহারী, ৫খ, ১৬১)।
ইউসুফ (আ)-এর অপূর্ব রূপ ও অসাধারণ গুণাবলী জেলখানায়ও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করিল। তাঁহার বিশ্বস্ততা, সত্যবাদিতা, সেবা ও মানবপ্রেম, ইবাদত-বন্দেগী ও স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে পারদর্শিতা এবং কারাবন্দীদের সহিত সদ্ব্যবহারের কথা জেলের অভ্যন্তরে ছড়াইয়া পড়িল এবং কারাবন্দীরা তাঁহার প্রতি মুগ্ধ হইয়া তাঁহার ভক্তে পরিণত হইল (ইবন কাছীর, তাফসীর, ২খ, ২৪৯; বিদায়া, ১খ, ২০৬)। ইউসুফ (আ) জেলের সকল বন্দীর খোঁজ-খবর নিতেন এবং তাহাদের প্রতি মর্মবেদনা প্রকাশ করিয়া তাহাদিগকে সান্ত্বনা দিতেন ও আশ্বাসবাণী শুনাইতেন। কেহ অসুস্থ হইয়া পড়িলে তাহার সেবা-শুশ্রূষা করিতেন, কাহাকেও ধৈর্যহারা ও চিন্তামগ্ন দেখিতে পাইলে তাহাকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতেন এবং মুক্তির আশ্বাসবাণী শুনাইয়া তাহার অন্তরে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাস ফিরাইয়া আনিতেন। নিজে কষ্ট স্বীকার করিয়া অপরকে শান্তি দিতে চেষ্টা করিতেন। তদুপরি রাতভর আল্লাহ তা'আলার ইবাদতে নিমগ্ন থাকিতেন। তাঁহার এই গুণাবলী দেখিয়া জেলের সকল কয়েদী তাঁহার শ্রেষ্ঠত্বের ও মহত্ত্বের স্বীকৃতি দিল, এমনকি প্রধান জেলকর্তাও তাঁহার ভক্ত হইয়া গেল। সে বলিল, আমার ক্ষমতা থাকিলে আমি আপনাকে মুক্ত করিয়া দিতাম। এখন আমার সাধ্য এতটুকুই যে, এখানে আপনার কোন প্রকার কষ্ট হইবে না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৬)।
বাইবেলের বর্ণনায়ও বিষয়টির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত হইয়াছে। ইউসুফ (আ)-এর জ্ঞান-গরিমা ও সদাচারের পরিচয় জেলখানার অভ্যন্তরেও গোপন রহিল না এমন কি কারা অধ্যক্ষও তাহার ভক্ত হইয়া গেল এবং জেলখানার সকল বন্দীকে তাঁহার তত্ত্বাবধানে প্রদান করিয়া জেলের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা তাঁহার হাতে ন্যস্ত করিল। ফলে ইউসুফ (আ)-ই জেলখানার প্রকৃত কর্মকর্তা হইয়া গেলেন। আল্লাহ এই স্থানেও তাঁহাকে ভাগ্যবান করিয়া রাখিলেন" (আদিপুস্তক, ২০: ২১-২৩)।
পবিত্র কুরআনের বর্ণনাধারায়ও বিষয়টির প্রতি স্পষ্ট ইংগিত রহিয়াছে। কেননা সমসাময়িক কয়েদখানাসমূহের নিবর্তনমূলক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে জেলের অভ্যন্তরে বন্দীদের ইউসুফ (আ)-এর কাছে অবাধ গমনাগমন এবং তাহাদের সাবলীল ও স্বতঃস্ফূর্ত আলাপচারিতা এবং যুবক বন্দীদ্বয়ের মুখে ইউসুফ (আ)-এর মাহাত্ম্য ও সদাচারের স্বীকৃতিমূলক উচ্চারণ প্রমাণ করে যে, জেলখানায়ও তাঁহার গুণাবলী সর্বজনবিদিত হইয়া গিয়াছিল এবং ইউসুফ (আ) সেখানে সসম্মানে অবস্থান করিতেছিলেন (হিফজুর রহমান, ১খ, পৃ.; ৩০০ ই. বিশ্বকোষ, ২২খ, ১১৯)।
📄 বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের বিবরণ
ইউসুফ (আ) কারাগারে আবদ্ধ হওয়ার পর তাঁহার নবুওয়াতী কর্তব্য পালনের অংশরূপে দাওয়াতের কাজ করিতেছিলেন। তিনি স্বপ্নের তা'বীর জানিতেন বলিয়া লোকজন অবহিত ছিল। তরুণ বন্দীদ্বয়ও তাঁহার স্বপ্নব্যাখ্যা বিশারদ হওয়ার কথা অবগত হয়। ইহা ছাড়া বিভিন্ন কারণে ইউসুফ (আ)-এর সহিত বন্দীদ্বয়ের ঘনিষ্ঠতা জন্মিয়াছিল। ইতোমধ্যে বন্দীদ্বয়ের প্রত্যেকে তাহার পেশা অনুযায়ী এক একটি স্বপ্ন দেখিল। সাকী দেখিল যে, সে সম্রাটের জন্য আংগুর নিংড়াইয়া মদ তৈরি করিতেছে। ইকরিমা প্রমুখের বর্ণনামতে সাকী ও বাবুর্চী ইউসুফ (আ)-এর কাছে আসিয়া বিনয়ের সহিত আরয করিল, আমরা প্রত্যেকে এক একটি স্বপ্ন দেখিয়াছি। আপনি মেহেরবানী করিয়া আমাদিগকে ইহার তা'বীর বলিয়া দিন। সাকী বলিল, আমি দেখিলাম যে, আমি একটি আংগুর-বীজ বপণ করিলাম এবং তাহা হইতে চারা গজাইয়া উঠিল এবং তাহাতে আংগুরের থোকা দেখা দিল। বর্ণনান্তরে আমি একটি বাগিচায় ছিলাম এবং আমি নিজেকে একটি আংগুর লতার গোড়ায় দেখিতে পাইলাম, যার মাথায় তিন থোকা আংগুর ছিল। সম্রাটের পানপাত্র আমার হাতে ছিল। আমি সেই পাত্রে আংগুরের রস নিংড়াইয়া সম্রাটকে পরিবেশন করিলে তিনি তাহা পান করিলেন।
দ্বিতীয় বন্দী বাবুর্চী তাহার স্বপ্নের বিবরণে বলিল, আমি দেখিলাম আমি মাথায় করিয়া তিনটি ঝুড়ি বহন করিতেছি, ইহাতে রুটি ও বিভিন্ন প্রকারের খাদ্য রহিয়াছে এবং হিংস্র পাখীরা ইহা হইতে ছো মারিয়া খাবার নিয়া যাইতেছে (মাজহারী, ৫খ, ১৬১; ইবন কাছীর, মুখতাসার, ২খ, ২৪৯)। এখানে উল্লেখ্য যে, ইবন আব্বাস (রা) ও অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে বন্দীদ্বয় বাস্তবেই এইরূপ স্বপ্ন দেখিয়া উহার তা'বীর জানিতে চাহিয়াছিল। তবে ইবন জারীর আবদুল্লাহ ইবম মাসউদ (রা) হইতে এ প্রসংগে ভিন্ন মত উদ্ধৃত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, বন্দীরা বাস্তবে কোন স্বপ্ন দেখে নাই, বরং তাহারা ইউসুফ (আ)-এর তাবীরের জ্ঞান পরীক্ষা করিবার উদ্দেশে নিজেদের তৈরি স্বপ্নের বিবরণ দিয়াছিল (মুখতাসার তাফসীরে ইবন কাছীর, ২খ ২৪৯; মাজহারী, ৫খ ১৬২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৬; বিদায়া, ১খ, ২০৬)। বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর অবগত হওয়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ ও তাঁহার প্রতি তাহাদের ভক্তি লক্ষ্য করিয়া ইউসুফ (আ) ইহাকে দীনের দা'ওয়াত প্রদানের সুবর্ণ সুযোগ মনে করিলেন এবং তা'বীর প্রদানের পূর্বে দীনের দা'ওয়াত পেশ করিলেন। স্বপ্নের ব্যাখ্য সম্পর্কে তিনি একটি সুন্দর ভূমিকা উপস্থাপন করিলেন, যাহাতে তাহাদের আগ্রহ ও ভক্তি আরও বৃদ্ধি পাইয়া দীনের দা'ওয়াত অধিক হৃদয়গ্রাহী হয়। তিনি বলিলেন:
قَالَ لَا يَأْتِيْكُمَا طَعَامٌ تُرْزَقْهِ إِلَّا نَبَاتُكُمَا بِتَأْوِيلِهِ قَبْلَ أَنْ يَأْتِيَكُمَا ذَلِكُمَا مِمَّا عَلَّمَنِي رَبِّي إِنِّي تَرَكْتُ مِلَّةَ قَوْمٍ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَهُمْ بِالآخِرَةِ هُمْ كَفَرُونَ ...... يصاحِبَي السِّجْنِ أَمَّا أَحَدُكُمَا فَيَسْقِي رَبُّهُ خَمْرًا وَأَمَّا لآخَرُ فَيُصْلَبُ فَتَأْكُلُ الطَّيْرُ مِنْ رَأْسِهِ قُضِيَ الْأَمْرُ الَّذِي فِيهِ تَسْتَفْتِيَانِ .
"ইউসুফ বলিল, তোমাদিগকে যে খাদ্য দেওয়া হয় তাহা আসিবার পূর্বেই আমি তোমাদিগবে স্বপ্নের তাৎপর্য জানাইয়া দিব। আমি তোমাদিগকে যাহা বলিব তাহা আমার প্রতিপালক আমাবে যাহা শিক্ষা দিয়াছেন তাহা হইতে বলিব, যে সম্প্রদায় আল্লাহতে বিশ্বাস করে না ও আখিরাতে অবিশ্বাসী আমি তাহাদের মতবাদ বর্জন করিয়াছি।..... হে কারাসংগীদ্বয়। তোমাদের দুইজনের একজন তাহার প্রভুকে মদ্য পান করাইবে এবং অপরজন শুলবিদ্ধ হইবে; অতঃপর তাহার মস্তব হইতে পাখি আহার করিবে। যে বিষয়ে তোমরা জানিতে চাহিয়াছ তাহার সিদ্ধান্ত হইয়া গিয়াছে' (১২ঃ ৩৭-৪১)।
এখন আমার কিছু কথা শোন। এই কথা বলিয়া তিনি তাহাদিগকে দীনের দাওয়াত পেশ করিলেন। মনে রাখিবে, আমার এই যোগ্যতা কোন প্রকার জ্যোতিষী বিদ্যা বা রেখা বিদ্যা নয়, বরং ইহা আল্লাহ্ প্রদত্ত আসামান্য ইল্ম। এই ইল্ম তিনি আমাকে দান করিয়াছেন এই কারণে যে, আল্লাহকে ও আখিরাতকে অবিশ্বাসকারীদের ধর্ম ও মতবাদ বর্জন করিয়া আমি আমার পূর্বপুরুষের অনুসৃত তাওহীদের ধর্ম অনুসরণ করিয়াছি। সুতরাং এইসব বিষয় আমাকে আমার মালিক প্রতিপালক আল্লাহ ওহীর মাধ্যমে অবহিত করেন (মাজহারী, ৫খ, ১৬৩; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৬)। তোমাদের স্বপ্নের তা'বীর শোন হে আমর জেলের বন্ধুদ্বয়! তোমাদের কোন একজন এই হত্যা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ হইতে মুক্তি পাইয়া তাহার চাকুরীতে বহাল হইবে এবং সে তাহার মালিককে মদ পান করাইবে। অপরজন দোষী সাব্যস্ত হইবে এবং তাহাকে শূলে চাড়ানো হইবে। পাখিরা তাহার মাথা ঠোকরাইয়া তাহার মগজ ও গোশ্ত খাইবে। আংগুরের তিনটি থোকা ও খাবারের তিনটি ঝুড়ির মর্ম হইল, তিন দিনের ব্যবধানে তোমাদের বিচারকার্য সম্পন্ন হইবে। তোমাদের জিজ্ঞাসিত বিষয়ের ইহাই চূড়ান্ত ফয়সালা। ইহার কোন নড়চড় হইবে না। কেননা (হাদীছের বর্ণনামতে) মানুষের স্বপ্ন ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, যখনই উহার তা'বীর প্রদান করা হয়, তখনই ইহা বাস্তবে সংঘটিত হয় (ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১; মা'আরিফ, ৫খ, ৫৭-৫৮; বিদায়া, ১খ, ২০৭)।
মুফাসসিরগণের যে দলটি বন্দীদ্বয়ের স্বপ্ন ষানোয়াট হওয়ার মত পোষণ করিয়াছেন তাহারা এই ক্ষেত্রে বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ) কর্তৃক স্বপ্নের তা'বীর ব্যক্ত করিবার পর বন্দীদ্বয় বলিল, আমরা তো বাস্তবে কোন স্বপ্ন দেখি নাই। আপনাকে পরীক্ষা করিবার জন্য তৈরী স্বপ্ন বর্ণনা করিয়াছিলাম। ইউসুফ (আ) বলিলেন, তোমরা কোন স্বপ্ন দেখিয়া থাক কিংবা না দেখিয়া থাক, এখন বাস্তব ঘটনা সেইভাবেই ঘটিবে যেরূপ আমি বলিয়াছি। কেননা উহা আমি নবুওয়াত সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞানের মাধ্যমে বলিয়াছি (মা'আরিফ, ৫খ, ৫৮; ইবন কাছীর, ২খ., ২৫১; মাজহারী, ৫খ, ১৬৫)।
এখানে ইউসুফ (আ)-এর অন্যতম নবুওয়াতী গুণ লক্ষণীয়। তাহা এই যে, মানুষের প্রতি নবীগণের অত্যন্ত মমত্ববোধের কারণে তাহারা কোন মানুষের মনে প্রত্যক্ষরূপে আঘাত সৃষ্টি হইতে দেন না। আলোচ্য ক্ষেত্রেও বন্দীদ্বয়ের মধ্যে কে মুক্তি পাইবে এবং কে অপরাধী সাব্যস্ত হইবে তাহা প্রায় স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও ইউসুফ (আ) সরাসরি সাকীকে বলিলেন না যে, তুমি মুক্তি পাইবে এবং বাবুর্চীকে বলিলেন না, যে তোমাকে শূলে দেওয়া হইবে। বরং তিনি নির্দিষ্টরূপে একজনের মুক্তিলাভ ও অপরজনের শূলিবিদ্ধ হওয়ার কথা বলিলেন, যাহাতে মৃত্যুদণ্ডের অপরাধী ব্যক্তি দণ্ড লাভের নির্ধারিত সময়ের পূর্ব হইতে সার্বক্ষণিক যাতনা ভোগ না করিয়া আশাবাদী থাকিতে পারে। জীবনের সর্বক্ষেত্রেই মানুষের প্রতি নবী-রাসূলগণের মমত্ববোধ এইরূপ হইয়া থাকে (মা'আরিফ, ৫খ, ৫৭; ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১)।
পরবর্তী সময়ে মামলার তদন্তে সম্রাটকে হত্যার ষড়যন্ত্রে সাকী নিদোর্ষ ও বাবুর্চী অভিযুক্ত সাব্যস্ত হইল এবং তিন দিন পরে তাহাদিগকে আদালতে উপস্থিত করিয়া বিচারের রায় শুনাইয়া দেওয়া হইল। বিচারে সাকীকে মুক্তি প্রদান করিয়া তাহার পূর্বপদে বহাল করা হইল এবং বাবুর্চীকে শূলীকাষ্ঠে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইল। এই ঘটনা ইউসুফ (আ)-এর প্রতি কারাবাসীদের ভক্তি-বিশ্বাস আরও বৃদ্ধি করিয়া দিল এবং পরবর্তীতে ইহাই ইউসুফ (আ)-এর জেল হইতে মুক্তি লাভের অন্যতম কারণ হইয়াছিল (কাসাসুল কুরআন, ১খ, ৩০২; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ, ৫৪)।
📄 হযরত ইউসুফ (আ)-এর দাওয়াত ও তাবলীগ
হযরত ইউসুফ (আ) ছিলেন পুরুষানুক্রমে নবুওয়াত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। সুতরাং দীনের দাওয়াত এবং এক আল্লাহ ও আখিরাতের বিশ্বাসের প্রতি আহবান করা ছিল তাঁহার জীবনের প্রধান ও সার্বক্ষণিক ব্রত। জেলখানার নিয়ন্ত্রিত পরিসরেও তিনি যথারীতি তাঁহার দায়িত্ব পালন করিতেছিলেন। বিশেষ করিয়া তাঁহার সময়ে কারাগারে আগত রাজকর্মচারীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর জানিতে চাওয়ার পরিস্থিতিকে তিনি দীনের দাওয়াতের একটি বিশেষ সুযোগ মনে করিলেন। তাঁহার এইরূপ ধারণা করাও বিচিত্র নয় যে, মুক্তিপ্রাপ্ত রাজকর্মচারীর মাধ্যমে দীনের দাওয়াত রাজ-দরবারেও পৌছিয়া যাইবে। সুতরাং বন্দীদ্বয়ের স্বপ্নের তা'বীর প্রদানকে উপলক্ষ করিয়া তিনি দীনের দাওয়াতের এক অনন্য সারগর্ভ ও নাতিদীর্ঘ ভাষণ কহিলেন। এই ভাষণে তিনি দীনি দাওয়াতের জন্য অপরিহার্য ও আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত নবীসুলভ প্রজ্ঞার মাধ্যমে বক্তব্য উপস্থাপন করিলেন। প্রথমত তিনি শ্রেতার মূল কাংখিত বিষয় স্বপ্নের তা'বীরকে উপলক্ষ করিয়া স্বপ্নের ব্যাখ্যা প্রদানে তাঁহার যোগ্যতাকে 'আল্লাহ প্রদত্ত ইল্ম হওয়ার )ذالكما مِمَّا عَلَّمَنِى رَبِّى( কথা প্রমাণ করিলেন। এইভাবে তিনি দাওয়াতের সুফল প্রাপ্তির জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজনীয় বিষয় শ্রোতার অন্তরে আস্থা ও বিশ্বাস সৃষ্টির পথ উন্মুক্ত করিলেন। আবার স্বপ্নের তা'বীর প্রদানে অহেতুক বিলম্বের কারণে শ্রোতার অন্তরে বিরক্তিভাব সৃষ্টির সুযোগ না দিয়া তিনি স্বপ্ন ব্যাখ্যার অনুরূপ একটি বিষয় অর্থাৎ শ্রোতাদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যের আগাম সংবাদ প্রদানের ব্যাপারে তাঁহাকে আল্লাহ তা'আলা প্রদত্ত মু'জিযার কথা উল্লেখ করিলেন। যাহাতে বিলম্বে হইলে আল্লাহ প্রদত্ত ইল্মের মাধ্যমে নিশ্চিত তা'বীর পাওয়া যাইবে এই কথা ভাবিয়া বিলম্ব সহনীয় হইয়া যায় এবং বক্তার অন্য কথাগুলিও মনোযোগ সহকারে শুনিবার ইচ্ছা জাগ্রত হয়। এইভাবে শ্রোতাদের হৃদয়ের গভীরে রেখাপাত করিবার পরিবেশ সৃষ্টি করিয়া তিনি দাওয়াতের মূল বক্তব্য উপস্থাপনে উদ্যোগী হইলেন। হিকমত ও কুশলতার প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তাঁহার বক্তব্যের কোথাও তিনি শ্রোতাকে প্রত্যক্ষ আহ্বান, সরাসরি আক্রমণ বা কটাক্ষপাত করিলেন না। বরং সম্পূর্ণ বক্তব্যটি তিনি যেন প্রসঙ্গত ও কথার পিঠে কথারূপে উপস্থাপন করিলেন। প্রথম কথা তিনি বলিলেন, 'আমি সেই সম্প্রদায়ের ধর্ম পরিত্যাগ করিয়াছি যাহারা আল্লাহকে বিশ্বাস করে না এবং বিশেষ করিয়া আখিরাতকে যাহারা অস্বীকার করে। ইউসুফ (আ) তাঁহার এই বক্তব্য দ্বারা বন্দীদ্বয়কে বুঝাইয়া দিলেন যে, স্বপ্নের সঠিক তা'বীর প্রদান ও আসন্ন খাদ্য সম্পর্কে আগাম সংবাদ প্রদানের যোগ্যতার পিছনে আল্লাহকে অবিশ্বাস না করা ও আখিরাতকে অস্বীকার করিবার মতবাদ বর্জনের বিশেষ কার্যকারিতা রহিয়াছে (ইবন কাছীর, ২খ., ২৫০; ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ.)। অতঃপর দীনের দা'ওয়াত প্রদানের মূল বক্তব্যে তিনি যাহা বলিলেন তাহা কুরআনের ভাষায়:
وَاتَّبَعْتُ مِلَّةَ أَبَائِي إِبْرَاهِيمَ وَاسْحَقَ وَيَعْقُوبَ مَا كَانَ لَنَا أَنْ تُشْرِكَ بِاللَّهِ مِنْ شَيْءٍ ذَلِكَ مِنْ فَضْلِ اللَّهِ عَلَيْنَا وَعَلَى النَّاسِ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَشْكُرُونَ . يُصَاحِبَى السَّجْنِ أَرْبَابٌ مُتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ القَهَّارُ . مَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِهِ إِلَّا أَسْمَاء سَمِيْتُمُوهَا أَنْتُمْ وَآبَاءَكُم مَا أَنْزَلَ اللَّهُ بِهَا مِنْ سُلْطنِ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ أَمَرَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ .
"ইউসুফ বলিল, আমি আমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক এবং ইয়া'কূবের মতবাদ অনুসরণ করি। আল্লাহর সহিত কোন বস্তুকে শরীক করা আমাদের কাজ নহে। ইহা আমাদের ও সমস্ত মানুষের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ, কিন্তু অধিকাংশ মানুষই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। হে কারা সংগীদ্বয়! ভিন্ন ভিন্ন বহু প্রতিপালক শ্রেয়, না পরাক্রমশালী এক আল্লাহ? তাঁহাকে ছাড়িয়া তোমরা কেবল কতকগুলি নামের 'ইবাদত করিতেছ, যেই নামগুলি তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রাখিয়াছ; এইগুলির কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠান নাই। বিধান দিবার অধিকার কেবল আল্লাহ্রই। তিনি আদেশ দিয়াছেন তিনি ব্যতীত অন্য কাহারও ইবাদত না করিতে; ইহাই শাশ্বত দীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ ইহা অবগত নহে” (১২: ৩৮-৪০)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই সংক্ষিপ্ত সারগর্ভ ভাষণের বিশ্লেষণ করিয়া মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, মিসরের পরিবেশ ছিল আল্লাহর শাশ্বত বিধান তাওহীদ ও আখিরাতের বিশ্বাস বিরোধী শিরক, কুফরী ও পৌত্তলিকতায় পরিপূর্ণ। তখনকার ক্ষমতাসীন শাসকবর্গ ও রাজা-বাদশাহ্রা নিজেদেরকে রব ও ইলাহ্ বা ইলাহের প্রতিভূ মনে করিত এবং প্রজাসাধারণ ও জনগণ রাজা-বাদশাহদের ইলাহের আসনে অধিষ্ঠিত করিয়া রাখিয়াছিল। তাহারা ক্ষমতার সম্রাটকে সিজদা করিত এবং তাহাকেই নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা মনে করিত। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর যুগে নমরূদ খোদায়ী দাবি করিয়াছিল। আর এই মিসরেই পরবর্তী কালে মূসা (আ)-এর যুগের ক্ষমতাসীন ফিরআওন নিজেকে 'বড় খোদা' (أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى) দাবি করিয়াছিল। স্বভাবত কারাগারে আগত রাজকর্মচারী বন্দীদ্বয়ও প্রচলিত কুফরী মতবাদের অনুসারী ছিল। হযরত ইউসুফ (আ) প্রথমেই এই বিষয়টি স্পষ্ট করিয়াছিলেন যে, তিনি দাসরূপে মিসরে আগমন করিলেও এবং রাজ-দরবারের প্রধান নির্বাহী আযীয মিসরের বাড়িতে অবস্থান করিলেও পারিপার্শ্বিক কুফরী মতবাদ তাঁহাকে গ্রাস করিতে পারে নাই। আযীযের রাজকীয় ভবনের পরিবেশেও তিনি এক আল্লাহকে অস্বীকার করা ও আখিরাতকে অবিশ্বাস করার কুফরী মতবাদ হইতে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করিয়াছেন।
দীনের দা'ওয়াতে হিকমত অবলম্বনের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া তিনি তাঁহার শ্রোতাদের 'কাফির' আখ্যায়িত করিলেন না কিংবা তাহাদিগকে বাতিল ধর্মের অনুসারী হওয়ার অভিযোগে সরাসরি অভিযুক্ত করিলেন না। অতঃপর তিনি বন্দীদ্বয়ের সম্ভাব্য প্রশ্ন, "তবে আপনি কোন ধর্মমতের অনুসারী?” এর জবাব প্রদানের উদ্দেশে বলিলেন, 'আমি তো আমার পূর্বপুরুষ ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবের ধর্মমতের অনুসারী। প্রসঙ্গত তিনি আত্মপরিচয় তুলিয়া ধরিলেন। যেহেতু তিনি তাঁহার প্রতি বন্দীদ্বয়ের আস্থা ও বিশ্বাসের বিষয়টি আঁচ করিতে পারিয়াছিলেন। তাহাদের এই আস্থা ও বিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করিয়া দীনের দা'ওয়াত গ্রহণে শ্রোতার হৃদয়কে উদ্বুদ্ধ করিবার মহান লক্ষ্য অর্জনে তিনি অন্তত চার পুরুষ ধরিয়া তাঁহার বংশধারায় নবুওয়ত থাকিবার অর্থাৎ প্রকৃত ইলাহ ও একমাত্র মা'বুদের পক্ষ হইতে মনোনীত ও প্রেরিতরূপে দীনের প্রতি আহ্বানকারী হওয়ার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত থাকিবার কথাটি প্রমাণ করিয়া দিলেন। কেননা শ্রোতারা অজ্ঞ হইলে তাহাদের জ্ঞাতার্থে আহ্বানকারীর জন্য নিজের বিজ্ঞতা ও যোগ্যতার পরিচয় প্রদানও একটি অপরিহার্য বিষয় যাহাতে শ্রোতার অন্তরে আহ্বানে সাড়া দেওয়ার প্রতি উৎসাহ সৃষ্টি হয়। ইহা আত্মপরিশুদ্ধির প্রচারণা নহে।
ইহা ছাড়া বংশধারার আভিজাত্যের বিষয়টিও মানুষের মনকে স্বভাবত আকৃষ্ট ও আস্থাবান করিয়া তোলে (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭৩১)। অতঃপর তিনি পিতৃপুরুষের ধর্মমতের মৌলিক পরিচয়রূপে বলিলেন, এই ধর্মমতের মূল বৈশিষ্ট্য হইল আল্লাহ তা'আলার সহিত তাঁহার সত্তায় ও গুণাবলীতে কোন কিছুকে শরীক না করা। "আমাদের জন্য সমীচীন ও বৈধ নয় তাঁহার সহিত কোন কিছুকে শরীক করা"। ইহাতে কোন কিছু (من شيئ) বলিয়া পৃথিবীর সর্বকালের সর্বসম্প্রদায়ের পৌত্তলিকতা বর্জনের কথা বলা হইয়াছে। এই বিষয়টিতেও তিনি "তোমরা তো মুশরিক অথবা মূর্তিপূজারী" ধরনের দোষারোপমূলক কোন বাক্য না বলিয়া তিনি কথাটি নিজের উপর রাখিলেন। এই উক্তি দ্বারা তিনি ইহাও বুঝাইয়া দিলেন যে, একত্ববাদ মানুষের স্বভাবগত চাহিদার বিষয়। তাওহীদের মূল কথা গ্রথিত রহিয়াছে মানব হৃদয়ের গভীরে এবং উহার অনুকূল বহুবিধ নিদর্শন ও প্রমাণ বিশ্বচরাচরে ছড়াইয়া রহিয়াছে।
আর সর্বযুগের নবী-রাসূলগণ বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাইয়াছেন উহার অভিন্ন আহ্বান। তিনি বলিলেন, একত্ববাদের এই সত্য ধর্ম গ্রহণ করার তাওফীক প্রদান আমাদের প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ করুণা। কেননা তিনি নবী-রাসূল প্রেরণ ও ওহীর ধারা প্রবর্তন করিয়া মানুষের জন্য সত্য ধর্ম গ্রহণকে সহজ করিয়া দিয়াছেন। কিন্তু আক্ষেপের বিষয় এই যে, অধিকাংশ মানুষ নিদর্শনাবলীতে মনোযোগ প্রদান করে না, আল্লাহ প্রদত্ত 'ফিতরাত' ও সত্য গ্রহণের ক্ষমতাকে কাজে লাগায় না এবং আল্লাহ্ তা'আলার নি'মাতের শুকরিয়া আদায়স্বরূপ তাওহীদকে গ্রহণ করে না বরং তাহারা কুফর ও শিরকে নিমগ্ন হয়। অতঃপর তিনি মূল আহ্বান পেশ করিলেন। ইহাতে তিনি 'তোমরা শিরক বর্জন করিয়া এক আল্লাহ্র প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর'-এইরূপে সরাসরি না বলিয়া আহ্বানটি একটি প্রশ্নের আকারে উত্থাপন করিলেন, যাহাতে প্রশ্নের যথার্থ উত্তররূপে তাহারা একত্ববাদের স্বীকারোক্তি স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রদান করে। ইহা ছাড়া তিনি সম্বোধন করিবার জন্য 'এমন একটি শব্দ চয়ন করিলেন যাহা যে কোন কঠোর প্রকৃতির শ্রোতার হৃদয়কেও কোমল করিয়া তাহাকে আহ্বানে সাড়া দিতে উদ্বুদ্ধ করিয়া তোলে। তিনি বলিলেন, 'হে জেলখানার বন্ধুদ্বয়'! অর্থাৎ আমি ও তোমরা বাহ্যত নির্যাতিত অবস্থায় একত্র হইয়াছি। এইরূপ পরিস্থিতিতে সংগীদের মধ্যে পারস্পরিক মমত্ববোধ ও সহমর্মিতা পূর্ণরূপে জাগরুক থাকে এবং সুখে-দুঃখে ও সুযোগে-দুর্যোগে একে অপরের অন্তরঙ্গ বন্ধু হইয়া যায়। সেই অন্তরঙ্গতার দাবিতে তোমাদের কল্যাণ কামনায় আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি, মানুষের স্বভাবে যেহেতু এই চাহিদা বিদ্যমান যে, বিপদে শরণাপন্ন হওয়ার জন্য সে একটি আশ্রয় ক্ষেত্র পাইতে চায় এবং সে এমন একটি নির্ভরযোগ্য স্থান চায় যাহাতে নির্ভর করিয়া সে নিজের সার্বিক ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হইতে পারে এবং এমন কিছু পাইলে সে পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়া নিজেকে অনুগত রাখিতেও প্রস্তুত থাকে। মানুষের এই স্বভাব-চাহিদার কারণেই সে কাহাকেও তাহার মা'বৃদরূপে বরণ করে এবং তাহাকে নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ ও মঙ্গলামঙ্গলের নিয়ন্ত্রণকর্তা মালিক ও 'প্রভু'-র আসনে আসীন করিয়া তাঁহার 'ইবাদতে' নিমগ্ন হওয়াকে নিজের জন্য পরম সার্থকতা মনে করে। এখন তোমরা বল তো, এইরূপ ত্রাণকর্তারূপে মা'বৃদ ও প্রভুর আসনে আসীন করিবার জন্য একাধিক 'রব্ব' ও বিভিন্ন কাজের জন্য বিভিন্ন 'প্রভু'-যাহারা মূলত অনিত্য ও অসক্ষমও বটে-তাহারা স্বর্ণ, রৌপ্য, লৌহ প্রভৃতি ধাতবের তৈরী কিংবা-মাটি পাথরের তৈরী মূর্তি-প্রতিমাই হউক অথবা মানব-জিন্ন-ফেরেশতা কিংবা তাহাদের কথিত প্রতিকৃতিই হউক অথবা অসুর, দৈত্য-দানব কিংবা যিনি অনাদি অনন্ত অক্ষয় অব্যয় সত্তা ও গুণাবলীতে একক; অস্তিত্ব, গুণাবলী ও কর্মে যিনি তুলনাহীন উপমাহীন এবং যিনি 'কাহ্হার'-সার্বভৌম শক্তি, প্রতিপত্তি ও পরাক্রমশীলতায় যিনি সকল শক্তির আধার মা'বুদ, ইলাহ ও প্রভুরূপে বরণ করিবার জন্য তিনিই উত্তম?
এই প্রশ্নের জবাব একক সত্তার স্বীকারোক্তি ব্যতীত অন্য কিছু হইতে পারে না। কেননা যে কোন সাধারণ বুদ্ধির মানুষও এই সহজ কথাটি বুঝে যে, দশজনের গোলামী করার চাইতে একজনের গোলামী করা, বিশেষত যদি তিনি সব মালিকের সেরা মালিক ও সকলের উপর একচ্ছত্র নিরংকুশ ক্ষমতার অধিকারী হন, ইহাই কল্যাণ ও নিরাপত্তার সহজ ও একমাত্র পথ।
পরবর্তী বাক্যে হযরত ইউসুফ (আ) শ্রোতার সত্য গ্রহেণে আগ্রহী মনের অবশিষ্ট সংশয় ও দ্বিধা-দন্দু দূর করিবার জন্য যৌক্তিক ভাষায় সরাসরি সম্বোধন করিয়া বাতিলের বিরুদ্ধে বক্তব্য পেশ করিলেন। মানুষের স্বভাব এই যে, কোন কিছুর প্রতি দীর্ঘ দিনের ঘনিষ্ঠতা ও পুরুষানুক্রমিক সম্পৃক্তি বাতিল ও অসার হইলেও উহার প্রতি একটি আসক্তি জন্মিয়া যায় এবং এই আসক্তি অগ্রাহ্য করিয়া উহা পরিত্যাগ করিতে সে শেষ মুহূর্তের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে দুলিতে থাকে। তখনকার জন্য কুশলী প্রাজ্ঞ আহবানকারীর কর্তব্য হইল বাতিলের বিরুদ্ধে সবল যুক্তি প্রদর্শন করিয়া সত্য গ্রহেণে উন্মুখ হৃদয়ের কাছে বাতিলের অন্ধকারাচ্ছন্নতা ও সত্যের আলোকোজ্জ্বলতা তুলিয়া ধরা। তাই ইউসুফ (আ) বলিলেন, পুরুষানুক্রমে যাহাদের পূজা-অর্চনা করা হইতেছে উহাতে কি কোন সত্যতা নাই? এই দ্বিধা-দ্বন্দ্বের অবসানকল্পে ইউসুফ (আ) সুস্পষ্টভাবে বলেন, প্রকৃত বিচারেই উহাতে কোন সত্যতা নাই। কেননা আমার বক্তব্যে বিঘোষিত পরাক্রমশালী এক আল্লাহ ব্যতীত আর যাহা কিছুকে তোমরা মা'বুদ বানাইয়া রাখিয়াছ উহাদের স্বরূপ আমার কাছে শোন। ঐগুলি শুধুই নাম, যেসব নামের ধারকরূপে কোন কিছুরই অস্তিত্ব নাই এবং আরও মজার ব্যাপার এই যে, ঐ নামগুলিও তোমাদের ও তোমাদের পূর্বপুরুষের রচিত। তোমরাই নিজেদের হাতে মূর্তি তৈয়ার করিয়া উহাদের এক একটিকে এক এক নামে আখ্যায়িত করিয়াছ। এখন এই দাবি যে, উহারা তো মূল খোদা নয়, উহারা আল্লাহ্ কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করিবে মাত্র অথবা এই ধারণা যে, হয়তো আল্লাহই উহাদিগকে তাঁহার প্রতিভূ মনোনীত করিয়াছেন, এই সম্পর্কে আমার বক্তব্য যে, আল্লাহ উহাদের সপক্ষে কোন প্রমাণ পাঠান নাই। সুতরাং যুক্তি ও বিবেক-বুদ্ধির বিচারে ইহাদের মা'বুদ হওয়া স্বীকৃত হইতে পারে না।
আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করিয়াছেন যে, হুকুম ও হুকুমত, রাজত্ব, ক্ষমতা, সার্বভৌমত্ব ও বিধান প্রদানের অধিকার একমাত্র আল্লাহর জন্যই সংরক্ষিত। কেননা অনাদি অনন্ত চিরঞ্জীব সত্তারূপে নিরংকুশ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হওয়ার কারণে এবং গুণাবলীর বিচারেও একমাত্র তিনি সমগ্র সৃষ্টির ইবাদত প্রাপ্তির অধিকার রাখেন। অর্থাৎ তিনি শুধু হুকুম প্রদানের অধিকার সংরক্ষণের ঘোষণা প্রদান করিয়াই ক্ষান্ত হন নাই, বরং সকল সংশয় ও সম্ভাবনার অবসান ঘটাইয়া একমাত্র তাঁহাকেই মা'বুদ বানাইবার আদেশও জারী করিয়াছেন এবং ইহাকেই একমাত্র সঠিক দীন সাব্যস্ত করিয়াছেন। আর যাহারা ইহার বিপরীত করিবে তাহাদিগকে 'অজ্ঞ' বলিয়াছেন— যাহারা হক ও বাতিলের পার্থক্য নির্ণয়ে অক্ষম হওয়ার কারণে অজ্ঞতার অন্ধকারে হাবুডুবু খায়।
হযরত ইউসুফ (আ) তাঁহার এই দা'ওয়াতী ভাষণে দীনেরস্বরূপ তুলিয়া ধরিয়াছেন। ইহাতে তিনি দীনের মৌলিক আকীদা উপস্থাপন করিয়াছেন, কুফরী ও অংশীবাদের বিরুদ্ধে প্রবল যুক্তি উত্থাপন করিয়া বাতিলের ভিত নড়াইয়া দিয়াছেন। বায়দাবী বলিয়াছেন, এই ভাষণে দা'ওয়াত প্রদান ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠার ক্রমোন্নতির পন্থা অবলম্বন করা হইয়াছে। প্রথমে তিনি অংশীবাদের বিপরীতে একত্ববাদের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব উপস্থাপন করিয়াছেন। অতঃপর কথিত মা'বুদদের অসারতার প্রমাণ পেশ করিয়াছেন। কেননা সত্তাগত অথবা গুণাবলীর বিচারে এই কথিত মা'বুদদের মধ্যে ইবাদত প্রাপ্তির কোন যোগ্যতা নাই। অতঃপর তিনি স্পষ্ট ভাষায় যুক্তিগ্রাহ্য ও বুদ্ধি সমর্থিত একমাত্র সঠিক দীনের পরিচয় প্রদান করিলেন (ফী জিলালিল কুরআন, উরদু, ৪খ., ৭২৭...; মা'আরিফ, ৫খ., ৫৭; মাজহারী, ৫খ., ১৬৩, ১৬৪)। দীনের দা'ওয়াত সম্পর্কে এই সারগর্ভ ভাষণের পর ইউসুফ (আ) বন্দীদ্বয়ের মধ্যে একজনের আসন্ন জীবনাবসনের কথা বুঝিতে পারিয়াও উভয়ের নিকট দাওয়াত পেশ করিলেন। কেননা আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া ছিল অস্থায়ী পার্থিব জীবনের ব্যাপার। আর এক আল্লাহ্র প্রতি ঈমান আনিয়া মৃত্যুর কোলে আশ্রয় নেওয়া ছিল চিরস্থায়ী জীবনে পরম সাফল্য লাভের ব্যাপার। নবী-রাসূলগণ ও তাঁহাদের অনুসারী দীনের দা'ঈগণের কাছে ব্যক্তির পরকালীন কল্যাণই মুখ্য বিষয়। এই কারণে ইউসুফ (আ) লোকটির আসন্ন মৃত্যু অবধারিত জানিয়াও তাহাকে দীনের দাওয়াত দিয়াছিলেন।
📄 বাদশাহর স্বপ্ন ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির সূত্র
হযরত ইউসুফ (আ) সমাজের উচ্চ শ্রেণীর ষড়যন্ত্রের শিকার হইয়া কারা জীবন ত্যাগ করিতেছিলেন। অন্য কথায় তিনি পাপকর্ম হইতে আত্মরক্ষা করিবার জন্য কারাজীবনকেই অগ্রাধিকার দিয়াছিলেন। আর প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তা'আলা তাঁহাকে মিসরের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় সমাসীন করিবার পথ সুগম করিতেছিলেন। ইউসুফ (আ) নিজের নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন এবং তিনি নিশ্চিতরূপে জানিতেন যে, এক 'বড় লোকের' স্ত্রীর বদনাম ঘুচানো ও সমাজের দৃষ্টিতে তাহার অপদস্থতা রহিত করিবার জন্যই তাঁহাকে জেলে পাঠানো হইয়াছে। সুতরাং এইরূপ ধারণা সৃষ্টি হওয়া সঙ্গত ছিল যে, হয়তো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বাদশাহকে তাঁহার এই মোকদ্দমার ব্যাপারে অবহিত করা হয় নাই এবং ক্ষমতাব ত্যাগকারীয়া ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া তাঁহাকে কারারুদ্ধ করিয়াছে অথবা মিথ্যা মামলা সাজাইয়া এবং ইউসুফ (আঃ) -কে অভিযুক্ত সাব্যস্ত করিয়া সমর্থনের সুযোগ না দিয়া বাদশাহের নিকট অভিযুক্তকে অপরাধী সাব্যস্ত করিয়া তাঁহার কারাবাসের পক্ষে বাদশাহের ফরমান আদায় করা হইয়াছে। ইউসুফ (আঃ) যখন দেখিলেন যে, এই বন্দীঘরের একজন (সাকী) নির্দোষ সাব্যস্ত হইয়া পুনরায় রাজ-দরবারে তাহার সাবেক দায়িত্ব বহাল হইবে এবং বাদশাহের সহিত তাহার একান্ত কথা বলিবার সুযোগ ঘটিবে তখন তিনি সাকীকে বাদশাহের নিকট তাঁহার বিষয়টি উত্থাপন করিবার অনুরোধ করিলেন। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
وَقَالَ لِلَّذِي ظَنَّ اَنَّهُ نَاجٍ مِّنْهُمَا اَذْكُرْنِيْ عِنْدَ رَبِّكَ ۚ فَاَنْسٰهُ الشَّيْطٰنُ ذِكْرَ رَبِّهٖ فَلَبِثَ فِي السِّجْنِ بِضْعَ سِنِيْنَۙ
“ইউসুফ তাঁহাদের মধ্যে যে মুক্তি পাইবে মনে করিল, তাহাকে বলিল, তোমার মনিবের নিকট আমার কথা বলিও; কিন্তু শয়তান তাহাকে উহার মনিবের নিকট তাহার বিষয়টি বলিবার কথা ভুলাইয়া দিল। সুতরাং ইউসুফ কয়েক বৎসর কারাগারে রহিল” (১২ : ৪২)।
অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে এই আয়াতের ব্যাখ্যা উহার সাবলীল তরজমার অনুরূপ। অর্থাৎ ইউসুফ (আ) অন্যায় ও জুলুমের শিকাররূপে সারাজীবন বন্দী জীবন যাপন হইতে মুক্তির জন্য সম্ভাব্য মুক্তি লাভকারী বন্দীকে তাঁহার বিষয়ে আলোচনা করিবার অনুরোধ করিয়াছিলেন। এই অনুরোধ শরী’আতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বৈধ ছিল। তবে শয়তান কর্তৃক বন্দীকে ভুলাইয়া দেওয়ার পিছনে আল্লাহ্ তা’আলার নির্ধারিত অদৃশ্য হিকমতও কার্যকর ছিল। এই হিকমতেরও ছিল দুইটি ধারা। প্রথমটি প্রত্যক্ষ এবং উহা এই যে, ইউসুফ (আ)-এর এই অনুরোধ কারামুক্তি এবং একটি বৈধ প্রচেষ্টা হইলেও আল্লাহ্ তা’আলা তাঁহার বিশিষ্ট বান্দা ও রাসূলগণের জন্য কোন মাধ্যমরূপে মুক্তির সূত্র ও মাধ্যমরূপে গ্রহণ করা পছন্দ করেন না। কেননা আল্লাহ্ ও বান্দার মধ্যে কোন মধ্যসূত্র অবশিষ্ট না থাকা এবং পূর্ণাঙ্গ প্রত্যক্ষ সংযোগ সৃষ্টি হওয়াই তাওহীদের সর্বোচ্চ মাকাম। নবীগণকে আল্লাহ্ তা’আলা এই মাকামে উন্নীত করেন। সুতরাং আল্লাহ্ ইউসুফ (আ)-এর দৃষ্টি হইতে সকল ‘উসীলা’ ও মধ্যসূত্রকে বিলীন করিয়া প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহ্র উপর নির্ভর করার শিক্ষা দিতে চাহিলেন। ফলে শয়তানের পক্ষে ভুলাইয়া দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হইল। বন্দীও অবিলম্বে কারাগারের এমন প্রকার পাত্র ও স্নেহভাজন ‘বন্ধু’র কথা ভুলিয়া গেল। হিকমতের দ্বিতীয় ধারাটি ছিল এই যে, কুদরতী কর্মপরিকল্পনায় ইউসুফ (আ)-এর জীবনের পরবর্তী স্তর ছিল মিসরের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় সমাসীন হওয়া। উহার সুষ্ঠু পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া ও ইউসুফ (আ)-এর রাষ্ট্রনায়কসুলভ যোগ্যতা অর্জনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার জন্য আরও কিছুকালের কারাবাস কুদরতী পরিকল্পনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। কুদরতী পরিকল্পনায় ইউসুফ (আ)-এর জন্য কারামুক্তির পর রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া নির্ধারিত ছিল। অতএব এই সময় সাকী কর্তৃক বাদশাহের সকাশে ইউসুফ (আ)-এর বিষয়টি উত্থাপিত হইলে বাহ্যত তাঁহার মিসরের মসনদাসীন হওয়ার সম্ভাবনা থাকিত না (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ, ৭৩২, ৭৩৩; ইবন কাছীর, ২খ, ২৫১)।
আয়াতের এইরূপ ব্যাখ্যা মুজাহিদ প্রমুখ হইতে উদ্ধৃত হইয়াছে এবং ইবন কাছীরও ইহাই সমর্থন করিয়াছেন। তবে ইবন জারীর ও বাগাবী প্রমুখ আয়াতের فَأَنْشَهُ الشَّيْطَنُ অংশের ব্যাখ্যায় ভিন্নমত পোষণ করিয়াছেন এবং তাঁহারা ইবন আব্বাস (রা)-র বক্তব্য মুজাহিদ হইতে উদ্ধৃত করিয়া বলিয়াছেন, শয়তান তাহাকে ভুলাইয়া দিল বাক্যে 'তাহাকে' সর্বনাম দ্বারা মুক্তিপ্রাপ্ত সাকী উদ্দেশ্য নহে, বরং ইউসুফ (আ) উদ্দেশ্য এবং আয়াতের মর্ম এই যে, শয়তানের কারসাজিতে ইউসুফ (আ) ক্ষণিকের জন্য অমনোযোগিতার শিকার হইলেন এবং কারামুক্তির ব্যাপারে শয়তান তাঁহাকে তাঁহার রব্ব আল্লাহ তা'আলার শরণাপন্ন হওয়ার কথা ভুলাইয়া দিল। ফলে তিনি আল্লাহ ব্যতীত মাখলুকের নিকট সহায়তা কামনা করিলেন।
নবীগণের ক্ষেত্রে এরূপ সাময়িক অমনযোগিতা অত্যন্ত বিরলরূপে সম্ভাব্য হইলেও আয়াতের বর্ণনাধারা এই ব্যাখ্যার যথেষ্ট অনুকূল নহে। ইবন কাছীর প্রমুখ শ্রেষ্ঠ মুফাসসিরগণ এই ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন। তবে ব্যাখ্যা যাহাই হউক, এ প্রসংগে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, ইউসুফ (আ) 'তোমার মালিকের নিকট আমার বিষয়ে আলোচনা করিও' না বলিতেন তবে অত দীর্ঘকাল তাঁহাকে কারাগারে অবস্থান করিতে হইত না (ইবনুল মুনযির, ইবন আবী হাতিম ও ইবন মারদুয়া বর্ণিত)।
এই ঘটনা প্রসঙ্গে তাওরাত প্রদত্ত বিবরণ। নিম্নরূপঃ "তখন ইউসুফ (যোশেফ) বলিল, উহার ব্যাখ্যা এই যে, তিনটি ছড়ার অর্থ তিন দিন এবং অদ্য হইতে তিন দিনের ব্যবধানে ফিরআউন তোমার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিবে এবং তোমাকে তোমার পদ ফিরাইয়া দিবে। এবং পূর্বের ন্যায় যখন তুমি ফিরআউনের সাকী ছিলে- তাহার হাতে পুনরায় মদিরাপাত্র তুলিয়া দিবে। কিন্তু যখন তুমি স্বঅবস্থায় ফিরিয়া যাইবে তখন আমার কথা স্মরণ রাখিও এবং আমাকে মুক্তি দেওয়াইও। কেননা উহারা আমাকে ইব্রীয়দের অধিকার হইতে চুরি করিয়া আনিয়াছে এবং এখানেও আমি এমন কোন কর্ম করি নাই যাহার কারণে তাহারা আমাকে কয়েদ করিয়া রাখিবে" (আদিপুস্তক, ৪০:১২-১৫)।
মোটকথা, সাকী রাজভবনের কোলাহলপূর্ণ জীবনে পৌঁছিয়া ইউসুফ (আ)-এর কথা বিস্মৃত হইয়া থাকিল এবং ইউসুফ (আ) আরও কয়েক বৎসরের জন্য কারাজীবনের মেয়াদ পূর্ণ করিলেন। এই কয়েক বৎসরের পরিমাণ ছিল অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে সাত বৎসর। ওয়াহ্ব ইবন মুনাব্বিহ বলিয়াছেন, হযরত আইয়ুব (আ) মারাত্মক ব্যাধিগ্রস্ত ছিলেন সাত বৎসর এবং হযরত ইউসুফ (আ)-ও কারাজীবন কাটাইয়াছিলেন সাত বৎসর। ইবন জুরায়জও সেই সময়কালে সাত বৎসরের অভিমতকে সমর্থন করিয়াছেন। দাহ্হাকের মতে সেই সময়কাল চৌদ্দ বৎসর। ইবন আব্বাস (রা)-এর মতে বার বৎসর। কালবী বলিয়াছেন, পাঁচ বৎসর এই ঘটনার পূর্বে এবং সাত বৎসর ইহার পরে। মূলত মতভেদ সৃষ্টি হইয়াছে بضع শব্দের অর্থে মতভেদের কারণে। কাতাদার মতে بضع শব্দ তিন হইতে নয় এবং মুজাহিদদের মতে তিন হইতে সাত বুঝায়। মুকাতিল মুজাহিদ সূত্রে ইবন আব্বাস (রা) হইতে পাঁচ বৎসরের পরে অর্থাৎ সাত বা নয় বৎসর হওয়ার বর্ণনা উদ্ধৃত করিয়াছেন। এ প্রসঙ্গে তাফসীরে মাজহারীর গ্রন্থকারের আপত্তি উল্লেখযোগ্য। তিনি বলিয়াছেন, وَدَخَلَ مَعَهُ السِّجْنَ فَسَيَنِ, বুঝা যায় আয়াত দ্বারা রাজকর্মচারীদ্বয় ও হযরত ইউসুফ (আ)-এর জেলে আগমন সমসাময়িক হওয়া বুঝা যায়। রাজকর্মচারীদ্বয়ের কারabাস ছিল তিন দিনের (কিংবা উহার কাছাকাছি সংক্ষিপ্ত সময়ের) জন্য। সুতরাং ইউসুফ (আ)-এর ইহার পূর্বে পাঁচ বৎসর অবস্থান বোধগম্য নয়। এই আপত্তির ব্যাপারে রাজকর্মচারীদ্বয়ের স্বপ্ন দেখিবার পরে তিন দিন এবং উহার (মাজহারী ৫খ., ১৬৬) পূর্বে দীর্ঘদিন থাকিবার কথা অথবা শব্দের ভিন্ন ব্যাখ্যার কথা বলা যায়। তবে তদন্ত সাপেক্ষে মামলার রাজকর্মচারীদের দীর্ঘ দিনের অবস্থানের কথা তত যুক্তিসঙ্গত নহে (কুরতুবী, ৫খ, ১৬৭; মাজহারী, ৫খ., ১৬৬)।
আল্লাহ্ তা’আলার মর্জি অনুসারে ইউসুফ (আ)-এর কারাবাসের মেয়াদ পূর্ণ হইয়া আসিলে তাঁহার মুক্তি ও রাজকীয় ক্ষমতা লাভের ব্যাপারে কুদরতী কর্মপ্রক্রিয়া সচল হইয়া উঠিল। তৎকালীন মিসর সম্রাট ফিরাওন এক রাত্রে একটি অদ্ভূত স্বপ্ন দেখিল যাহা তাহাকে অতিশয় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ করিয়া ফেলিল। পবিত্র কুরআনের ভাষায় :
وَقَالَ الْمَلِكُ إِنِّي أَرَى سَبْعَ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعُ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنُبُلٍ خُضْرٍ وَأُخَرَ يَابِسَاتٍ يَا أَيُّهَا الْمَلَأُ أَفْتُونِي فِي رُؤْيَايَ إِنْ كُنْتُمْ لِلرُّؤْيَا تَعْبُرُونَ
“রাজা বলিল, আমি স্বপ্নে দেখিলাম, সাতটি হুলকায় গাভী, উহাদিগকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করিতেছে এবং দেখিলাম সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক। হে প্রধানগণ! যদি তোমরা স্বপ্নের ব্যাখ্যা করিতে পার তবে আমার স্বপ্ন সম্বন্ধে অভিমত দাও” (১২:৪৩)।
ঐতিহাসিকগণ লিখিয়াছেন, হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই ঘটনাবলীর সময় মিসরের রাজন্যবর্গের অধিকারীরা ফিরাওন (বহুবচনে 'ফারা'ইনা) নামে অভিহিত হইত। তখনকার ঐ রাজবংশটি ইতিহাস প্রসিদ্ধ 'আমালিকা' গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। মিসরের ইতিহাসে ইহারা 'হেকসোস' নামে উল্লিখিত হইয়াছে। তাহাদের মৌলিক পরিচয় উদ্ঘাটন করিয়া তাহাদিগকে একটি পশুপালনকারী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত সাব্যস্ত করা হইয়াছে। পরবর্তী গবেষণায় এই তথ্য সংয়ুক্ত হইয়াছে যে, এই গোষ্ঠী আরব অঞ্চল হইতে যাযাবররুপে মিসরে আগমন করিয়াছিল এবং তাহারা প্রাচীন আরবগোষ্ঠী 'আল-আরাবুল আরিবা'-র একটি শাখা ছিল। তৎকালে মিসরে প্রচলিত ধর্মীয় মতবাদ অনুসারে ক্ষমতাসীন সম্রাটকে ‘ফারা’ (فراع ফিৎ'আওন) উপাধিতে ভূষিত করা হইত। কেননা মিসরীরা তখন বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজা করিত এবং এই দেবতাদের মধ্যে ‘আমান রা’ امن را (সূর্য দেবতা) ছিল সকলের উর্ধ্বে। সাধারণ জনতা ক্ষমতাসীন বাদশাহকে সূর্য দেবতার অবতার মনে করিত এবং রাজা-বাদশাহরা ‘ছোট খোদা’র মর্যাদা ভোগ করিত। বাদশাহকে সূর্য দেবতার অবতাররুপে ‘ফারা’ (فراع) বলা হইত এবং এই শব্দটি রূপান্তরিত হইয়া হিব্রু ভাষায় ‘ফারআওন’ (ফারেন) এবং আরবীতে ফির'আওন (فرعون) হইয়াছে (সুতরাং ফিরআওন অর্থ সূর্য দেবতার অবতার)। হযরত ইউসুফ (আ)-এর সমকালীন স্বপ্নদ্রষ্টা ফির'আওনের নাম রায়্যান (ইবনুল ওয়ালীদ; বর্ণনান্তরে ওয়ালীদ ইব্ন রায়্যান) ইবন হারাওয়ান ইবন আরাশাঃ (আরাছিয়্যাঃ) ইবন সারান ইবন 'আম্র ইবন 'ইমলাক ইবন লাওষ (১,১) ইবন সাম (শম) ইবন নূহ বলা হইয়াছে। মিসরীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিবরণে - তাহার নাম 'আয়ূনী' রহিয়াছে (কাসাসুল কুরআন, ১খ., পৃ. ৩০-৫, বরাত, তরজমানুল কুরআন, ২খ, পৃ. ৩৬৬, ৪৬২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., পৃ. ২০৮)।
বাদশাহের স্বপ্নের বিবরণ: ইসরাঈলী বর্ণনায় রহিয়াছে, স্বপ্নে বাদশাহ নিজেকে একটি নদীর তীরে দেখিতে পাইলেন। তিনি দেখিলেন যে, নদী হইতে সাতটি মোটাতাজা গরু বাহির হইয়া সেখানকার একটি বাগানে চরিতে লাগিল। অতঃপর নদী হইতে সাতটি অতিশয় শীর্ণ ও দুর্বল গরু উঠিয়া আসিয়া পূর্বের গরুগুলির সহিত চরিতে লাগিল। অতঃপর শীর্ণ গরুগুলি সবল গরুগুলিকে আক্রমণ করিল এবং সেগুলিকে গিলিয়া ফেলিল। বাদশাহ স্বপ্ন দেখিয়া ঘাবড়ানো অবস্থায় জাগ্রত হইল। বাদশাহ পুনরায় ঘুমাইয়া পড়িল এবং দেখিল যে, একটি গোছায় সাতটি সবুজ শীষ রহিয়াছে যেগুলির দানা পোক্ত হইয়াছে। হঠাৎ দেখা গেল আরও সাতটি শুষ্ক শীষ এবং এই শুষ্ক শীষগুলি সবুজ শীষগুলিকে পেচাইয়া ধরিল এবং সেগুলি আর সবুজ থাকিল না। বর্ণনান্তরে শুষ্কগুলি সবুজগুলিকে খাইয়া ফেলিল। ইহা দেখিয়া বাদশাহ ভয় পাইল এবং তাহার ঘুম ভাংগিয়া গেল। (বিদায়া, ১খ., পৃ. ২০৮; মাজহারী, ৫খ., পৃ. ১৬৬)। সকালে বাদশাহ দরবারের যাদুকর, জ্যোতিষী, বুদ্ধিজীবী ও স্বপ্ন ব্যাখ্যাকারদের একত্র করিয়া তাহাদের নিকট স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানিতে চাহিলে তাহারা বলিল, আমাদের দৃষ্টিতে এই স্বপ্ন অর্থহীন।
قَالُوا أَضْغَاتُ أَحْلَامٍ وَمَا نَحْنُ بِتَأْوِيلِ الأَحْلامِ بِعَالِمِينَ .
"উহারা বলিল, 'ইহা অর্থহীন স্বপ্ন এবং আমরা এইরূপ স্বপ্ন ব্যাখ্যায় অভিজ্ঞ নই” (১২: ৪৪)। স্বপ্ন এবং ইহা বাদশাহ্ দুশ্চিন্তার ফসল। সুতরাং ইহার কোন ব্যাখ্যা হইতে পারে না এবং ইহাতে আপনার পেরেশান হওয়ার কোন কারণ নাই। আর মূলত আমরা রাষ্ট্রীয় জটিল কর্মকাণ্ডের বিশেষজ্ঞ হইলেও এই ধরনের স্বপ্নের ব্যাখ্যা অবগত নই। সায়ি্যদ কুতব লিখিয়াছেন, হযরত ইউসুফ (আ)-এর জীবন-চরিতে কয়েকটি স্বপ্নের উল্লেখ রহিয়াছে। ইহাতে বুঝা যায় যে, সমসাময়িক কালে স্বপ্ন ও উহার ব্যাখ্যা একটি বিশেষ বিষয়রূপে স্বীকৃত ছিল এবং তখনকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পরিবেশেও স্বপ্ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়রূপে বিবেচিত হইত। পবিত্র কুরআনের বর্ণনায় ইউসুফ (আ)- কর্তৃক স্বপ্নের তা'বীর প্রদানকে আল্লাহ প্রদত্ত 'ইলমরূপে উল্লেখ করাতে ইহা তাঁহার জন্য মু'জিযা বলা যায় (ফী জিলালিল কুরআন, উরদু তরজমা, ৪খ., পৃ. ৭৩৪)। হাদীছ শরীফে সত্য স্বপ্নকে নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ বলা হইয়াছে। ফিরআওনের দরবারীরা তাহার স্বপ্ন সম্পর্কে যে মন্তব্য করিয়াছিল উহার কারণ এই হইতে পারে যে, প্রকৃতপক্ষে তাহারা স্বপ্নের তা'বীর বিষয়ে অভিজ্ঞ ছিল না অথবা তাহাদের দৃষ্টিতে ইহা দুশ্চিন্তা প্রসূত স্বপ্ন ছিল অথবা তাহারা দরবারী মোসাহেবীর রীতি অনুসারে বাদশাহকে দুশ্চিন্তামুক্ত রাখিবার জন্য এইরূপ বলিয়াছিল (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., পৃ. ৭৩৪)।
ইউসুফ (আ)-এর কথা মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দীর মনে পড়িল। আল্লাহ্র ইচ্ছায় মিসর সম্রাটের স্বপ্নকে কারাগার হইতে ইউসুফ (আ)-এর সসম্মানে মুক্তির কারণ হইয়া দেখা দিল এবং দরবারীরা উহার তা'বীরে অপারগতা প্রকাশ করিল। ইউসুফ (আ)-এর সহবন্দী মুক্তিপ্রাপ্ত সাকী দরবারীদের সহিত সম্রাটের স্বপ্ন নিয়া আলোচনার সময় উপস্থিত ছিল। শয়তানের কারসাজিতে নিত্য দিনের আনন্দ-স্ফূর্তি ও রাজপ্রাসাদের কর্ম কোলাহলে সে ইউসুফ (আ)-এর কথা ভুলিয়া গিয়াছিল। সাত বৎসরের ব্যবধানে সম্রাটের স্বপ্নের তা'বীর প্রদানে দরবারী পণ্ডিতদের অপারগতা ও সম্রাটের দুশ্চিন্তা সাকীকে স্মরণ করাইয়া দিল। তাহার মনে পড়িল যে, জেলখানার ইউসুফ নামের এক বন্দী তাহাদের দুই সংগীর স্বপ্নের তা'বীর দিয়াছিলেন এবং তাহা বাস্তবে পরিণত হইয়াছিল। সম্রাটের নিকট তাঁহার বিষয়ে আলোচনা করিবার অনুরোধের কথাও তাহার মনে পড়িল এবং এহেন মহান ব্যক্তির অনুরোধ সম্পূর্ণ ভুলিয়া যাওয়ার জন্য সে অতিশয় অনুতপ্ত ও লজ্জিত হইল। সুতরাং ঐ মুহূর্তে সে বাদশাহের নিকট নিবেদন করিল, আমাকে অনুমতি প্রদান করা হইলে আমি এই স্বপ্নের সঠিক ব্যাখ্যা সংগ্রহ করিতে পারি। জেলখানায় এমন এক বন্দী রহিয়াছেন যিনি স্বপ্নের সঠিক তা'বীর বলিতে পারেন।
وَقَالَ الَّذِي نَجَا مِنْهُمَا وَاذْكَ بَعْدَ أُمَّةٍ أَنَا أُنَبِّئُكُمْ بِتَأْوِيلِهِ فَأَرْسِلُونَ
"দুইজন কারারুদ্ধের মধ্যে যে মুক্তি পাইয়াছিল এবং দীর্ঘকাল পরে যাহার স্মরণ হইল সে বলিল, আমি ইহার তাৎপর্য তোমাদিগকে জানাইয়া দিব। সুতরাং তোমরা আমাকে পাঠাও” (১২:৪৫)।
অর্থাৎ দুই বন্দীর মধ্যে যে মুক্তি পাইয়াছিল সে দরবারে উপস্থিত ছিল। দরবারীদের অক্ষমতা দেখিয়া সে বলিল, এবং দীর্ঘ সাত বৎসর সময়কাল পরে ইউসুফ (আ)-এর তা'বীর প্রদান এবং বিদায়কালে তাঁহার অনুরোধের কথা তাহার স্মরণ হইল, আমি এই স্বপ্নের তা'বীর আনিয়া দিতে পারি। তবে সেজন্য আমাকে জেলখানায় যাইতে হইবে। সুতরাং আমাকে জেলখানায় ইউসুফ (আ)-এর নিকট পাঠাইবার ব্যবস্থা করিয়া দিন। তৎক্ষণাৎ তাহাকে কারাগারে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হইল। সাকী জেলখানায় পৌছিয়া ইউসুফ (আ)-এর সহিত সাক্ষাত করিয়া বলিল:
يُوسُفُ أَيُّهَا الصِّدِّيقُ أَفْتِنَا فِي سَبْعِ بَقَرَاتٍ سِمَانٍ يَأْكُلُهُنَّ سَبْعٌ عِجَافٌ وَسَبْعَ سُنْبُلَت خُضْرٍ وَآخَرُ يُبِسْت لعَلَى ارْجِعُ إِلَى النَّاسِ لَعَلَّهُمْ يَعْلَمُونَ
"সে বলিল, হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী। সাতটি স্থূলকায় গাভী, উহাদিগকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী ভক্ষণ করিতেছে এবং সাতটি সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক শীষ সম্বন্ধে তুমি আমাদিগকে ব্যাখ্যা দাও, যাহাতে আমি লোকদের নিকট ফিরিয়া যাইতে পারি ও যাহাতে তাহারা অবগত হইতে পারে" (১২:৪৬)।
বাদশাহর স্বপ্নের বিবরণ শুনিয়া তিনি স্পষ্ট বুঝিতে পারিলেন যে, মিসরবাসীদের উপর এক মহাদুর্ভিক্ষ অত্যাসন্ন। কেননা সাতটি মোটাতাজা গরু ও সাতটি সতেজ শীষ দ্বারা এমন সাত বৎসর বুঝানো হইয়াছে যখন দেশে বিপুল পরিমাণ ফল-ফসল উৎপাদিত হইবে। ভূমি কর্ষণ ও চাষাবাদ এবং শস্য উৎপাদনের কাজে গরুর বিশেষ ভূমিকা রহিয়াছে। তদ্রূপ সাতটি জীর্ণশীর্ণ গরু ও সাতটি শুষ্ক শীষের মর্ম এই যে, বিপুল উৎপাদনের সাত বৎসর পরের সাত বৎসর দেশে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দিবে এবং সাতটি সবল গরুকে সাতটি দুর্বল গরুর খাইয়া ফেলার এবং শুষ্ক শীষগুলির সজীব শীষগুলিকে গ্রাস করিবার ব্যাখ্যা এই যে, উৎপাদনের সাত বৎসরের উদ্বৃত্ত ফসল দুর্ভিক্ষের সাত বৎসরে নিঃশেষ হইয়া যাইবে। শুধু পরবর্তী উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বীজস্বরূপ সামান্য কিছু শস্য থাকিবে। সুতরাং ইউসুফ (আ) সাকীকে বলিলেন (কুরআন পাকের বর্ণনায়):
قَالَ تَزْرَعُونَ سَبْعَ سِنِينَ دَابًا فَمَا حَصَدتُمْ فَذَرُوهُ فِي سُنْبُلِهِ إِلَّا قَلِيلًا مِمَّا تَأْكُلُونَ ، ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذلِكَ سَبْعُ شِدَادٌ يَأْكُلْنَ مَا قَدَّمْتُمْ لَهُنَّ إِلا قَلِيلًا مِّمَّا تُحْصِنُونَ . ثُمَّ يَأْتِي مِنْ بَعْدِ ذلِكَ عَامٌ فِيْهِ يُغَاتُ النَّاسُ وَفِيهِ يَعْصِرُونَ .
"ইউসুফ বলিল, তোমরা সাত বৎসর একাদিক্রমে চাষ করিবে, অতঃপর তোমরা যে শস্য কর্তন করিবে উহার মধ্যে যে সামান্য পরিমাণ তোমরা ভক্ষণ করিবে, তাহা ব্যতীত সমস্ত শীষসমেত রাখিয়া দিবে। ইহার পর আসিবে সাতটি কঠিন বৎসর, এই সাত বৎসর যাহা পূর্বে সঞ্চয় করিয়া রাখিবে, লোকে তাহা খাইবে, কেবল সামান্য কিছু যাহা তোমরা সংরক্ষণ করিবে, তাহা ব্যতীত। অতঃপর আসিবে এক বৎসর, সেই বৎসর মানুষের জন্য প্রচুর বৃষ্টিপাত হইবে এবং সেই বৎসর মানুষ প্রচুর ফলের রস নিংড়াইবে" (১২:৪৭-৪৯)।
পবিত্র কুরআন উহার অলংকারপূর্ণ ভাষায় ইউসুফ (আ) কর্তৃক প্রদত্ত স্বপ্নের তা'বীর ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের বর্ণনা মাত্র একটি বাক্য দ্বারা সম্পন্ন করিয়াছে। এখানে ইউসুফ (আ) কর্তৃক দুর্ভিক্ষকালের জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থার দিকনির্দেশনা ছাড়াও একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বাদশাহের স্বপ্নে সাত বৎসর প্রচুর উৎপাদনের পর সাত বৎসর দুর্ভিক্ষকাল থাকিবার প্রতি বাহ্য ইংগিত থাকিলেও উহার পরে একটি ভাল উৎপাদনের বৎসর আসিবার প্রতি কোন ইংগিত ছিল না। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান দ্বারা ইউসুফ (আ) বিষয়টি বুঝিতে পারিয়াছিলেন। বায়দাবী বলিয়াছেন, সম্ভবত ওহী সূত্রে তিনি বিষয়টি অবগত হইয়াছিলেন অথবা আল্লাহ তা'আলার বিশ্বপরিচালন সংক্রান্ত এই নীতি দ্বারা উহা উপলব্ধি করিয়াছিলেন যে, আল্লাহ বান্দাদের সংকটকালের পর পুনরায় স্বচ্ছলতা দান করেন। অনেক মুফাসসিরের মতে সাতটি দুর্বল গরু, তথা দুর্ভিক্ষ সাত বৎসরে সীমিত থাকা দ্বারা তিনি পরবর্তী বৎসর প্রচুর বৃষ্টি ও উৎপাদনের কথা বুঝিতে পারিয়াছিলেন। কেননা, তেমন না হইলে দুর্ভিক্ষকাল সাত বৎসরের অধিক হইত। হযরত কাতাদা (র) বলিয়াছেন, আল্লাহ তা'আলা ওহীর মাধ্যমেই ইউসুফ (আ)-কে বিষয়টি অবহিত করিয়াছিলেন যাহাতে স্বপ্নের তা'বীরের অতিরিক্ত কিছু জ্ঞানগর্ভ বিষয় সম্রাট ও দরবারীদের কানে পৌছিয়া যায় এবং উহাতে তাহাদের অন্তরে ইউসুফ (আ)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তাঁহার সসম্মান মুক্তিলাভ ত্বরান্বিত হয়। স্বপ্নের ব্যাখ্যার সহিত উৎপাদিত ফসল শীষ সহকারে সংরক্ষণের পরামর্শ দান ছিল ইউসুফ (আ)-এর বিজ্ঞতার পরিচায়ক। কেননা ফসল পুরাতন হইলে উহাতে পোকা লাগিয়া থাকে এবং অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রমাণিত হইয়াছে যে, শীষসহ সংরক্ষিত ফসল সাধারণত পোকা দ্বারা আক্রান্ত হয় না।
ইউসুফ (আ)-এর মুক্তির ঘটনার ধারাবাহিকতায় অনুমিত হয় যে, সাকী ইউসুফ (আ)-এর নিকট স্বপ্নের তা'বীর শুনিবামাত্র অবিলম্বে শাহী দরবারে প্রত্যাবর্তন করিয়া বাদশাহকে উহা অবহিত করিল এবং প্রসঙ্গত ইউসুফ (আ)-এর জ্ঞানবত্তা, বুদ্ধিমত্তা ও অতুলনীয় গুণাবলীর কথাও বাদশাহকে শুনাইল। বাদশাহ এই গুণাবলীর কথা শুনিয়া, বিশেষত জটিল স্বপ্নের সাবলীল ব্যাখ্যা ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ সংক্রান্ত দিকনির্দেশনা বাদশাহকে চিন্তামুক্ত করিবার সাথে সাথে ইউসুফ (আ)-এর সাক্ষাত লাভ ও তাঁহার সহিত প্রত্যক্ষ আলাপচারিতার জন্য তাহাকে উদগ্রীব করিয়া তুলিল। সুতরাং তৎক্ষণাৎ ইউসুফ (আ)-এর কারামুক্তির শাহী ফরমান জারী করা হইল।
وَقَالَ الْمَلِكُ ائْتُونِي بِهِ فَلَمَّا جَاءَهُ الرَّسُولُ قَالَ ارْجِعْ إِلى رَبِّكَ فَاسْتَلْهُ مَا بَالُ النِّسْوَةِ الَّتِي قَطَعْنَ أَيْدِيَهُنَّ إِنَّ رَبِّي بِكَيْدِهِنَّ عَلِيمٌ .
"রাজা বলিল, তোমরা ইউসুফকে আমার নিকট লইয়া আইস। যখন দূত তাহার নিকট উপস্থিত হইল তখন সে বলিল, তুমি তোমার প্রভুর নিকট ফিরিয়া যাও এবং তাহাকে জিজ্ঞাসা কর, যে নারীগণ হাত কাটিয়া ফেলিয়াছিল তাহাদের অবস্থা কী? নিশ্চয় আমার প্রতিপালক তাহাদের ছলনা সম্যক অবগত" (১২:৫০)।
সেই নারীদের তলব করিয়া আমাকে কারারুদ্ধ করিবার অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করিয়া উহার সত্যাসত্য নিরূপণ করা হউক। সেই নারীদের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করিবার কারণ এই হইতে পারে যে, যুলায়খা তাহাদের সম্মুখেই وَلَقَدْ رَأَوْدَتْهُ عَنْ نَفْسِمِ (আমিই তাহাকে ফুসলাইয়াছি এবং সে নিজেকে পবিত্র রাখিয়াছে) বলিয়া নিজের অপরাধ ও ইউসুফ (আ)-এর নির্দোষ থাকিবার স্বীকারোক্তি করিয়াছিল। ইহার পরও নারীরা যুলায়খার পক্ষাবলম্বন করিয়াছিল এবং তাহারাও ইউসুফ (আ)-কে পদস্খলিত করিবার ফন্দি করিয়াছিল। আল্লাহ তা'আলা অবহিত আছেন কথাটির মর্ম এই যে, যুলায়খার অপবাদ যে চক্রান্ত ছিল তাহা আমার পালনকর্তা আল্লাহ তো জানেনই, তবে সংশ্লিষ্ট সকলের নিকটও বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া বাঞ্ছনীয়। নিরাপরাধ ইউসুফ (আ) দীর্ঘকাল ধরিয়া কারারুদ্ধ জীবন যাপন করিতেছিলেন। বিদেশ বিভূঁইয়ে মাঝে মধ্যে জেলখানায় গিয়া তাঁহার অবস্থা অবগত হওয়ার এবং সান্ত্বনা দেওয়ার কোন আপনজনও তাঁহার ছিল না। মানুষের দৃষ্টিতে তিনি একজন কয়েদী মাত্র। বাহ্যত এহেন পরিস্থিতিতে জেলখানার জীবনে অতিষ্ঠ হওয়ার কারণে মুক্তির যে কোন উপায় অন্বেষণ করা এবং মুক্তির ফরমানের সুসংবাদ শুনিবামাত্র আনন্দে উদ্বেলিত হইয়া বাহিরের মুক্ত বাতাসে ছুটিয়া আসাই ছিল তাঁহার জন্য স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আ) ছিলেন ইহার সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বার্তাবাহকের নিকট তাঁহার কারামুক্তির ব্যাপারে বাদশাহের সাগ্রহ ও স্বতঃপ্রবৃত্ত ফরমানের কথা শুনিয়া তিনি ধীরস্থির জবাব দিলেন, মুক্তি অবশ্যই আমার কাম্য তবে তাহা সরকারী ফরমান বলে নয়, বরং তদন্ত সাপেক্ষে অভিযোগ হইতে এবং নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার মাধ্যমে বিগত কারাবাসকে ক্ষমতাসীনদের জুলুম সাব্যস্ত করিয়া মুক্তি লাভই আমার কাম্য। ইতোপূর্বে তাঁহার আত্মপক্ষ সমর্থনের কোন সুযোগ আসে নাই। যেহেতু ক্ষমতাসীনরা নারীর মন রক্ষার জন্য ক্ষমতার দাপট দেখাইয়া বিচারের নামে প্রহসন করিয়া তাঁহাকে কারাবাসে নির্যাতিত করিয়াছিল এবং সমাজে তাঁহার নামে মিথ্যা অপবাদ রটাইয়াছিল। এখন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ লাভ করিয়া সমগ্র ঘটনার তদন্ত দাবি করিলেন এবং মুক্তির বার্তাবাহক রাজকীয় দূতকে এই বলিয়া রাজদরবারে ফেরত পাঠাইলেন যে, তুমি বাদশাহের নিকট গিয়া আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের সহিত সংশ্লিষ্ট নারীদের উপস্থিত করিয়া আমার সম্পর্কে তাহাদের বক্তব্য শ্রবণ করিতে বল। তাহাদের বক্তব্য, সাক্ষ্যপ্রমাণ ও রাজকীয় তদন্তে নির্দোষ সাব্যস্ত হইবার পরই কেবল আমি কারাগারের বাহিরে পা রাখিতে চাই। হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই অবিচলিত জবাব দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, মিথ্যা অপবাদ প্রতিহত করা এবং উহা হইতে দায়মুক্ত হওয়ার জন্য প্রচেষ্টা চালানো অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য, বিশেষত বিশিষ্ট ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির জন্য বাঞ্ছনীয়।
সায়্যিদ কুতবের মতে, যদি ইউসুফ (আ) বাদশাহের আহ্বানে সাড়া দিয়া আযীযের স্ত্রী ও অভিজাত নারী সমাজ এবং তাঁহার মধ্যকার ঘটনার আবরণ উন্মুক্ত না করিয়াই (তাঁহার নির্দোষ হওয়া প্রমাণিত না করিয়া) কারাগার হইতে বাহির হইয়া আসিতেন তবে অনেক মানুষের মনে এই সংশয় অবশিষ্ট থাকিবার আশংকা ছিল যে, হয়তো বা তাহাকে কোন অপরাধ ও পাপের শাস্তিস্বরূপ কারারুদ্ধ করা হইয়াছিল। সুতরাং শাহী ফরমানের পরেও ইউসুফ (আ) এই দাবি উত্থাপন করিলেন যে, আমার বিরুদ্ধে যে ভিত্তিহীন অভিযোগ ছিল, যাহার শাস্তিস্বরূপ আমাকে এই দীর্ঘকাল কয়েদীর জীবন কাটাইতে হইল আমি উহার তদন্ত হওয়া জরুরী মনে করিতেছি। তাঁহার এই তদন্তের দাবি ছিল সমকালীন প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি একটি প্রচণ্ড চপেটাঘাত এবং সাথে সাথে উহা ছিল মিসরের সামাজিক পরিবেশ, বিশেষত তথাকার অভিজাত শ্রেণী ও তাহাদের বেগমদের লাগামহীন বেলেল্লাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ, যাহাতে সমগ্র দেশ, নগর ও নগর সমাজ প্রকম্পিত হইয়া থাকিবে এবং তাহাদের এই উপলব্ধি জাগ্রত হইয়া থাকিবে যে, জুলুম, স্বৈরশাসন ও অসভ্যতার বিরুদ্ধে স্থৈর্য, অবিচলতা, নৈতিকতা ও আদর্শের বিজয় একটু বিলম্ব হইলেও অবশ্যম্ভাবী। আল্লাহ তা'আলার প্রত্যক্ষ তরবিয়াত ইউসুফ (আ)কে নৈতিকতা ও চারিত্রিক দৃঢ়তার এক সমুচ্চ স্তরে উন্নীত করিয়া তাঁহাকে সবর, স্থৈর্য, আল্লাহতে নির্ভরতা, আত্মবিশ্বাস ও আত্মিক প্রশান্তির প্রতীকে পরিণত করিয়াছিল। এই কারণে বাদশাহর পক্ষ হইতে আহ্বান আসা সত্ত্বেও তিনি তদন্তের পূর্বশর্ত আরোপ করিতে পারিয়াছিলেন। তদন্তের মাধ্যমে নির্দোষ প্রমাণিত না হইলে পরবর্তী কালে জনসাধারণের মুখে এই সমালোচনা উচ্চারিত হইতে পারিত যে, একজন কারাভোগী ও দোষীকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পদে আসীন করা হইয়াছে। অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ এবং রাজভবনের একান্ত কর্মচারীদের মধ্যে তাহাদের উর্ধতন সর্বোচ্চ নির্বাহীর প্রতি সম্ভ্রম ও শ্রদ্ধার অভাব দেখা দিত। বিশেষত মন্ত্রীবর্গ ও উচ্চপদস্থ গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীদের মধ্যে এক ধরনের ক্ষোভ ও ঈর্ষা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকিত। এসব কারণে পূর্বাহ্নেই এ বিষয়টির চূড়ান্ত ফয়সালা জরুরী ছিল (ফী জিলালিল কুরআন, ৪খ., ৭৩৬)।
এখানে এই প্রশ্ন উত্থাপিত হইতে পারে যে, হযরত ইউসুফ (আ) বাদশাহর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করিয়া মুক্তির পূর্বেই তাঁহার মোকদ্দমার তদন্তের জন্য ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন কেন? কারাগারের বাহিরে আসিয়াও তো তদন্তের দাবি করিতে পারিতেন। ইহার জবাব এই যে, ইহা ছিল হযরত ইউসুফ (আ)-এর প্রজ্ঞা ও নবীসুলভ দূরদর্শিতার পরিচায়ক। মূলত আল্লাহ তাআলা তাঁহার নবীগণকে যেরূপ পূর্ণাঙ্গ দীন দান করিয়া থাকেন তদ্রূপ তাঁহাদিগকে পূর্ণাঙ্গ পার্থিব বুদ্ধিমত্তাও দান করিয়া থাকেন। ইউসুফ (আ) শাহী ফরমান দ্বারা এই বিষয়টি আঁচ করিতে পারিয়াছিলেন যে, কারাগার হইতে ডাকিয়া মুক্তি প্রদানের পর মিসর সম্রাট আমাকে কোন সম্মাননা প্রদান কিংবা কোন রাজকীয় পদে বহাল করিতে পারেন। এইরূপ পরিস্থিতিতে বুদ্ধিমত্তার দাবি ইহাই যে, তাঁহার বিরুদ্ধে যেই অভিযোগ উত্থাপন করা হইয়াছিল এবং যাহার অজুহাতে তাঁহাকে কারারুদ্ধ করা হইয়াছিল উহার অসারতা বাদশাহ ও সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট পরিপূর্ণরূপে প্রমাণিত হউক এবং তাঁহার দায়মুক্ত ও নির্দোষ হওয়ার ব্যাপারে কোন সন্দেহ অবশিষ্ট না থাকুক। মুক্তি লাভের পর কোন রাজকীয় মর্যাদায় ভূষিত হওয়ার কারণে মানুষের মুখ তো বন্ধ হইয়া যাইত। কিন্তু তাহাদের অন্তরে এইরূপ ধারণা আনাগোনা করিত যে, এই উচ্চপদের অধিকারী লোকটি সেই লোক যে তাহার মনিবের সম্ভ্রমে আঘাত করিয়াছিল।
এই প্রসঙ্গে হযরত ইউসুফ (আ)-এর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে একাধিক হাদীছ বর্ণিত হইয়াছে। সহীহ বুখারী, মুসলিম ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত হইয়াছে, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন : لو لبثت في السجن ما لبث يوسف لاجبت الداعي . "ইউসুফ (আ)-এর ন্যায় দীর্ঘকাল আমি কারাগারে থাকিলে আহ্বান পাওয়া মাত্র উহাতে সাড়া দিতাম"। মুসনাদে আহমাদের একটি বর্ণনায় আছে .... فاسئله ما بال النسوة
এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন, لو كنت انا لاسرعت الاجابة وما ابتغيت العذر "আমি হইলে তো অবিলম্বে আহ্বানে সাড়া দিতাম এবং ওজর-আপত্তি করিতাম না" (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ., পৃ. ২৫২, ২৫৩)। ইসহাক ইবন রাহাওয়ায়হ তাঁহার মুসনাদে, তাবারানী তাঁহার মু'জামে এবং ইবন মারদাওয়ায়হ ইবন 'আব্বাস (রা) সূত্রের হাদীছরূপে নবী (স) হইতে বর্ণনা করিয়াছেন : عجبت لصبر اخي يوسف وكرمه والله يغفر له حيث ارسل اليه ليستفتى في الرؤيا ولو كنت انا لم افعل حتى اخرج وعجبت لصبره وكرمه والله يغفر له اتى ليخرج فلم يخرج حتي اخبرهم بعذره ولو كنت انا لبادرت الباب ولولا الكلمة لما لبث في السجن حيث يبتغى الفرج من عند غير الله عز وجل .
"আমার ভাই ইউসুফের (আ) সবর ও অভিজাত্য দেখিয়া আমি অভিভূত হইয়া পড়ি! আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করুন (তাঁহার মর্যাদায় উন্নীত করুন)। যখন স্বপ্নের তা'বীরের জন্য তাঁহার কাছে দূত পাঠানো হইয়াছিল; আমি হইলে বাহির না হওয়া পর্যন্ত (তা'বীর প্রদান) করিতাম না। আমি অভিভূত হই তাঁহার সবর ও বদান্যতা দেখিয়া! আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করুন। তাঁহার নিকট কারাগার হইতে বাহির হওয়ার পয়গাম আসিল, কিন্তু তিনি তাঁহার নির্দোষিতা প্রতিষ্ঠিত না করিয়া বাহির হইলেন না। আমি হইলে তো কারা তোরণের দিকে ছুটিয়া যাইতাম। আর সেই কথাটি না হইলে-তিনি যে মহান মহিয়ান আল্লাহ ব্যতীত অন্যের নিকট সংকটমুক্তি অন্বেষণ করিয়াছিলেন-কারাগারে থাকিতে হইত না” (মাজহারী, ৫খ., ১৬৯)।
'ইকরিমা (র) হইতে মুরসাল হাদীছরূপে বর্ণিত হইয়াছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (স) বলিয়াছেন:
لقد عجبت من يوسف وبره وكرمه والله يغفر له حسين سئل عن البقرات العجاف والسمان ولو كنت مكانه ما اجبتهم حتى اشرط ان يخرجونى ولقد عجبت من يوسف وصبره وكرمه والله يغفر له حين اتاه الرسول فقال ارجع الي ربك ولو كنت مكانه ولبثت في السجن ما لبث لاسرعت الاجابة لبادرتهم الباب ولكنه اراد ان يكون له العذر ولما ابتغيت العذر ان كان الحليما ذا اتاه
"আমি অভিভূত হইয়া যাই ইউসুফ (আ) এবং তাঁহার বদান্যতা ও সবর দেখিয়া। আল্লাহ তাঁহাকে মাফ করুন- যখন তাঁহাকে দুর্বল ও সবল গরু সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হইল। আমি তাঁহার স্থানে থাকিলে পূর্বে আমাকে বাহির করিয়া আনিবার শর্ত আরোপ করিতাম। আমি পুনরায় অভিভূত হই ইউসুফ (আ) এবং তাঁহার সবর ও মর্যাদায় যখন (রাজকীয়) দূত তাঁহার নিকট আসিল (তখন তিনি বলিলেন, তোমার মালিকের নিকট ফিরিয়া যাও)। আমি তাহার স্থানে থাকিলে (এবং তাঁহার মত কারাভোগ করিলে দ্রুত সাড়া দিতাম এবং) দরজার দিকে ছুটিয়া যাইতাম, কিন্তু তিনি নিজের আপত্তি প্রকাশ করিতে ইচ্ছা করিলেন (আমি অবশ্যই আপত্তি করিতাম না; তিনি ছিলেন সহনশীল ও স্থৈর্যবান) (মুখতাসার ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; মাজহারী, ৫খ., ১৬৯)। নবী (স)-এর এই উক্তি মূলত তাঁহার অতুলনীয় বিনয়, ইউসুফ (আ)-এর ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রশংসা এবং তাঁহার উম্মত ও সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষামূলক (মajহারী, ৫খ., ১৬৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৫, ৬৬)।
ইউসুফ (আ) তাঁহার তদন্ত দাবির বক্তব্য পেশ করিয়াছিলেন آن ربي بكيدهن علیم বলিয়া। ইহাতে নারীদের প্রতি প্রচ্ছন্ন সতর্কবাণী ছিল যাহাতে তাহারা পুনরায় মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণের সাহস না পায় (মাজহারী, ৫খ., ১৭০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৫)। কেহ কেহ বলিয়াছেন, এখানে আমার মনিব বলিতে আযীযে মিসরকে বুঝানো হইয়াছে, যিনি নারীদের চক্রান্তের কথা অবগত ছিলেন (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, ১খ., ২০৯)।
হযরত ইউসুফ (আ)-এর জবাব নিয়া শাহী দূত বাদশাহর নিকট প্রত্যাবর্তন করিল এবং কারাগারের বাহিরে আসিবার পূর্বে বিষয়টি তদন্তের দাবির কথা তাহাকে অবহিত করিল। বাদশাহ ইউসুফ (আ)-এর দৃঢ়তা ব্যঞ্জক ও স্পষ্ট জবাব শুনিয়া স্বভাবতই তাঁহার প্রতি আরও অধিক আকৃষ্ট ও তাঁহার যোগ্যতার প্রতি অধিক আস্থাবান হইলেন। তিনি আযীয পত্নীসহ নারীদিগকে দরবারে তলব করিয়া এই ব্যাপারে তাহাদের বক্তব্য পেশ করিতে বলিলেন। এই প্রসঙ্গে কুরআনুল করীমের বর্ণনা নিম্নরূপ:
قَالَ مَا خَطْبُكُنَّ إِذْ رَاوَدْتُنَّ يُوسُفَ عَنْ نَفْسِهِ قُلْنَ حَاشَ لِلَّهِ مَا عَلِمْنَا عَلَيْهِ مِنْ سُوْءٍ قَالَتِ امْرَأَتُ الْعَزِيزِ التن حَصْحَصَ الْحَقُّ أَنَا رَاوَدَتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَإِنَّهُ لَمِنَ الصَّادِقِينَ . ذَلِكَ لِيَعْلَمَ أَنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ وَأَنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي كَيْدَ الْخَائِنِينَ. وَمَا أَبْرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسَّوْءِ إِلا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنْ رَبِّي رَغَفُورٌ رَّحِيمٌ .
"রাজা নারিগণকে বলিল, যখন তোমরা ইউসুফ হইতে অসৎ কর্ম কামনা করিয়াছিলে, তখন তোমাদিগের কী হইয়াছিল? তাহারা বলিল, অদ্ভূত আল্লাহর মাহাত্ম্য! আমরা উহার মধ্যে কোন দোষ দেখি নাই। আযীযের স্ত্রী বলিল, এক্ষণে সত্য প্রকাশ হইল, আমিই তাহাকে ফুসলাইয়াছিলাম, সে তো সত্যবাদী। (সে বলিল) ইহা এইজন্য যে, যাহাতে সে জানিতে পারে যে, তাহার অনুপস্থিতিতে আমি তাহার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই এবং নিশ্চয় আল্লাহ বিশ্বাসঘাতকদের ষড়যন্ত্র সফল করেন না। (সে বলিল,) আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্মপ্রবণ, কিন্তু সে নহে, যাহার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু" (১২ঃ ৫১-৫৩)।
বাদশাহ্ দরবারে উপস্থিত আযীযের স্ত্রী ও তাহার বাড়িতে আমন্ত্রিত নারীদের সকলকেই সম্বোধন করিয়া তাহার প্রশ্নটি রাখিলেন এবং 'তোমরা অসৎকর্ম কামনা করিয়াছিলে' বলিয়া সম্বোধন করিলেন (ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; মাজহারী, ৫খ., ১৭০; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৭)।
মোটকথা, বাদশাহ নারীদের জিজ্ঞাসা করিলেন যে, তোমরা যখন ইউসুফ (আ)-কে ফুসলাইয়াছিলে তখন কি তোমরা তাঁহার পক্ষ হইতে তোমাদের কাহারো প্রতি কোন আকর্ষণ অনুভব করিয়াছিলে (মাজহারী, ৫খ., ১৭০)? তখন নারীদের সকলে একবাক্যে ও সম্মিলিতরূপে বলিল, আল্লাহ্রই মহিমা ও মাহাত্ম্য! আমরা তো তাঁহার মধ্যে কোনই দোষ দেখিতে পাই নাই। কোন পাপ বা বিশ্বাসঘাতকতা দেখি নাই (মাজহারী, ৫খ., ১৭০; ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩। নারীরা ইউসুফ (আ)-এর পূত পবিত্র হওয়ার স্বীকৃতি দিল, তবে তাহারা যুলায়খার পূর্ব স্বীকারোক্তি উল্লেখ করিল না। ইহার কারণ এই হইতে পারে যে, উদ্দেশ্য ছিল ইউসুফ (আ)-এর পবিত্রতা প্রকাশ করা এবং সেজন্য যুলায়খার স্বীকারোক্তি উল্লেখের প্রয়োজন ছিল না অথবা যুলায়খা সম্মুখে উপস্থিত থাকার কারণে তাহার নাম উল্লেখ তাহারা লজ্জাবোধ করিয়াছিল (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৭); (ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; বিদায়া, ২খ., ২০৯; মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৬৭)।
তাঁহার পরবর্তী উক্তিতে ইউসুফ (আ) আরও বলিলেন, আমি যে নিজের নির্দোষ হওয়ার ও বিশ্বাসঘাতকতা না করিবার দাবি করিলাম এবং তদন্তের দাবি করিয়া'শক্ত অবস্থান গ্রহণ করিলাম, ইহা আমি শুধু আত্মরক্ষার জন্য করিতে বাধ্য হইয়াছি, কাহাকেও আঘাত করার জন্য কিংবা আত্মগতির জন্য নহে। 'আমি প্রত্যক্ষ ও স্বকীয়রূপে নিজেকে পবিত্র দাবি করিতেছি না। কেননা, প্রত্যেক মানুষের মন ও প্রবৃত্তি মন্দ কাজেই অতিশয় উদ্বুদ্ধকারী। তবে যখন আমার পালনকর্তা আল্লাহ কাহারও প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাহার ভিতরে বিদ্যমান মন্দের মৌলিক উপকরণকে বিলুপ্ত ও অথবা প্রদর্শিত করিয়া দেন- যেরূপ অবস্থা নবীগণের প্রবৃত্তির হইয়া থাকে যে, আল্লাহ তাআলার বিশেষ রহমতে উহা স্থির ও প্রশান্ত (মুতমাইন্নাঃ) হইয়া যায় এবং তাঁহাদের সত্তায় মানবসুলভ প্রবৃত্তির সহিত নবীসুলভ সুপ্রবৃত্তি সহঅবস্থান করে, তখনই সে পাপ ও অপবিত্রতা হইতে সুরক্ষা লাভ করিয়া থাকে [বলা অনাবশ্যক যে, ইউসুফ (আ)-এর প্রবৃত্তিও স্থির ও প্রশান্ত পর্যায়ের ছিল। (মা'আরিফুল কুরআন ৫খ., ৭২, তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৭)।
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলিলেন, আমার প্রতিপালক অতিশয় ক্ষমাশীল ও দয়াবান অর্থাৎ কেহ ভুল ভ্রান্তি করিয়া অপরাধ স্বীকার করিলে এবং তওবা করিলে আল্লাহ তাহাকে ক্ষমা করিয়া দেন। আর যাহারা পূর্ব হইতেই নিষ্পাপ থাকে তাঁহাদিগকে মনে রাখিতে হইবে যে উহা তাঁহার নিজস্ব ও ব্যক্তিগত কোন গুণ বা অর্জন নহে, বরং উহা আল্লাহর রহমতেরই বহিঃপ্রকাশ (মা'আরিফ, ঐ মাজহারী, ৫খ., ১৭২)।
মুফাসসিরগণ লিখিয়াছেন, হযরত ইউসুফ (আ)-এর এই উক্তির কারণস্বরূপ হাদীছে বর্ণিত হইয়াছে যে, ইউসুফ (আ) যখন বলিলেন, ذَلِكَ لِيَعْلَمَ তখন জিবরীল (আ) বলিলেন, إِنِّي لَمْ أَخُنْهُ بِالْغَيْبِ যখন আপনার মনে আকর্ষণ সৃষ্টি হইয়াছিল তখনও নয় কি ولا يوم هممت بما هممت به ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩(?
হাদীছটি ইবন মারদাওয়ায়হ আনাস (রা) হইতে মারফু'রূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন এবং বায়দাবী ইবন 'আব্বাস (রা) হইতে মাওকূফরূপে রিওয়ায়াত করিয়াছেন (দ্র. ইবন কাছীর, ২খ., ২৫৩; রূহুল মা'আনী, ১৩ পারা, ২; মাজহারী, ৫খ., ১৭১)।
তখন ইউসুফ (আ) বলিয়াছিলেন, وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي হাদীছটি প্রামাণ্য হইলে উহাতে 'আকর্ষণ'-এর অর্থ হইবে মানবের স্বভাব সুলভ অনিচ্ছাকৃত দোদুল্যমানতা; কোনক্রমেই উহা ইচ্ছা ও সংকল্প (عزم) স্তরের ছিল না। অনেকের মতে ইহা ছিল ইউসুফ (আ)-এর নবুওয়াত-পূর্ব সময়ের ঘটনা (রূহুল মা'আনী, ঐ)। তবে মুফাসসিরগণের বৃহদাংশ হাদীছটির উল্লেখ হইতে বিরত থাকিয়া ইউসুফ (আ)-এর উক্তির মর্ম সম্পর্কে বলিয়াছেন যে, ইউসুফ (আ) তাঁহার ذَلِكَ لِيَعْلَمَ উক্তিতে আত্মস্তুতি ও আত্মপরিশুদ্ধির দাবির (যাহা আল্লাহ তা'আলার বিধান فلا تزكوا انفسكم তোমরা নিজেদের পরিশুদ্ধি ঘোষণা করিও না” দ্বারা নিষিদ্ধ করা হইয়াছে) ধারণা নিরসনকল্পে বলিলেন, وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي আমার পূর্বোক্ত বক্তব্য শুধু পবিত্র থাকিবার বাস্তব কথাটি প্রকাশ করিবার উদ্দেশে বলিয়াছি, উহা আমার তাকওয়া ও আত্মপরিশুদ্ধির ঘোষণা হিসাবে বলি নাই। এইরূপ মহা সঙ্কটকালে পাপের কলুষতা হইতে রক্ষা পাওয়া আমার ব্যক্তিগত ও স্বকীয় কোন যোগ্যতা নয়, বরং আল্লাহ তা'আলার দয়া, তাওফীক ও সাহায্যের ফলশ্রুতিতেই উহা সম্ভব। হইয়াছে। কাজেই আমি যে নিজের পবিত্রতার কথা বলিতেছি উহা আমার প্রতি আল্লাহ তা'আলার বিশেষ অনুগ্রহ ও নি'মাতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশস্বরূপ বলিতেছি যে, তিনি পাপ-পংকিলতা হইতে পূর্ণরূপে রক্ষা করিবার সাথে সাথে আমাকে গৌরব, অহং ও আত্মম্ভরিতার বদগুণ হইতেও রক্ষা করিয়াছেন (মাজহারী, ৫খ., ১৭১; মুফতী শফী, মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৩, ৭৪; তাফসীরে মাজেদী, পৃ. ৪৯৭; কান্ধলাবী, মা'আরিফুল কুরআন, ৪খ., ৪০-৪১, বরাত কুরতুবী, ৯খ., ২১; তাফসীরে কাবীর, ৫খ., ১৪২)। কোন কোন রিওয়ায়াত দ্বারা জানা যায় যে, ইউসুফ (আ)-এর অন্তরে এক ধরনের আকর্ষণের দোলা লাগিয়াছিল, যদিও উহা অনিচ্ছাকৃত ও মনের উস্ উস্ (ওয়াস্তয়াসা) পর্যায়ে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু নবুওয়াত মর্যাদার বিপরীতে উহাকে এক ধরনের বিচ্যুতি বিবেচনা করিয়া তিনি নিজের সম্পর্কে প্রকাশ করিয়া দিলেন যে, আমি আমার মনকে সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ ও পবিত্র মনে করি না (মা'আরিফুল কুরআন, ৫খ., ৭৪)। পবিত্র কুরআনের সূরা ইউসুফের এই আয়াতদ্বয় (৫২-৫৩) হযরত ইউসুফ (আ)-এর উক্তি হওয়ার অভিমতই সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ গ্রহণ করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে, এই ধরনের ঈমানদীপ্ত ও তাকওয়াপূর্ণ উক্তি ইউসুফ (আ)-এর ন্যায় একজন পয়গম্বরের মুখেই শোভা পায় এবং ইহার পূর্বের উক্তিটি জুলায়খার হওয়ার কারণে এবং বাদশাহ্ দরবারে সে সময় ইউসুফ (আ) উপস্থিত না থাকার কারণে পরবর্তী উক্তি ইউসুফ (আ)-এর হইতে না হওয়ার দাবি গ্রহণযোগ্য নহে। কেননা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উহ্য রহিয়াছে। পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে এই ধরনের উহ্য রাখিবার নজীর রহিয়াছে। পক্ষান্তরে কয়েকজন বিশিষ্ট মুফাসসির উক্ত আয়াতদ্বয়কে ইউসুফ (আ)-এর উক্তি বলিয়া ভিন্ন মত পোষণ করিয়াছেন। তাঁহাদের মতে আয়াতের অর্থ হইবে, ইহা এইজন্য করিয়াছি যাহাতে বাদশাহও জানিতে পারেন যে, আমি (ইউসুফ) তাহার উযীর আযীযের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই অথবা বাদশাহর সহিত বিশ্বাসঘাতকতা করি নাই।
ইমাম রাযী (র) এ প্রসঙ্গটির চমৎকার ও তাৎপর্যপূর্ণ বিশ্লেষণে বলিয়াছেন, "ইউসুফ (আ) আল্লাহ তা'আলার সত্য পয়গাম্বর ও নিষ্পাপ নবী ছিলেন। সুতরাং তাঁহার পবিত্রতা সর্বপ্রকার পঙ্কিলতা হইতে মুক্ত ছিল এবং তাঁহার জীবনের কোন মুহূর্তই কালিমালিপ্ত হয় নাই। এই কারণেই আল্লাহ তা'আলার কুদরতের মহিমায় ইউসুফ (আ)-এর ঘটনার সহিত সংশ্লিষ্ট প্রতিটি চরিত্রের মুখ হইতে তাঁহার পবিত্রতা ও অপাপবিদ্ধতার স্বীকারোক্তি উচ্চারিত হইয়াছে। কেননা আরবীতে একটি প্রবাদ আছে (افضل ماشهد به الاعداء শত্রুর সাক্ষ্য বড় সাক্ষ্য)। ইউসুফ (আ)-এর ঘটনায় তিনি ব্যতীত আর যাহারা ছিল তাহাদের তালিকায় ছিল আযীযে মিসরের স্ত্রী-জুলায়খা, তাহার বান্ধবী নগরীর অভিজীত বেগমগণ, আযীযে মিসর স্বয়ং এবং আযীয পত্নীর (অথবা মতান্তরে আযীযের) আত্মীয় (বয়স্ক অথবা দুগ্ধপোষ্য শিশু)। সর্বাগ্রে আযীয পত্নীর আত্মীয় উপস্থিত হইল এবং জামা ছিঁড়িবার ব্যাপারে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত প্রদান করিয়া নারীকে অপরাধী ও ইউসুফ (আ)-কে নির্দোষ সাব্যস্ত করিল। বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করিয়া আযীযও ইউসুফ (আ)-এর নির্দোষ ও নিষ্পাপ হওয়ার স্বীকারোক্তি করিলেন। কেননা তিনি বলিলেন, 'ইহা নারী চক্রান্ত (জুলায়খা!) তুমি পাপের জন্য 'ইসতিগফার কর'! এবং সাথে সাথে ইউসুফকে বলিলেন, 'বিষয়টি উপেক্ষা কর' এই বলিয়া... তিনি নিজের মান-সম্ভ্রম রক্ষার খাতিরে ব্যাপারটি সেখানেই শেষ করিয়া দেওয়ার অনুরোধ করিলেন।
اَلْنَ حَصْحَصَ الْحَقُّ اَنَا رَاوَدَتُهُ عَنْ نَفْسِهِ وَاَنَّهُ لَمِنَ الصَّدِقِيْنَ . (কাসাসুল কুরআন, ১খ., ৩১০, ৩১১; বরাত তাফসীরে কাবীর, সূরা ইউসুফ)।