📄 মৃত্যুর পর পুনরুত্থান অস্বীকারকারীদের ওপর শয়তানের ফাঁদ
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, ইবলিস বহু মানষের মনে এমন প্ররোচনা দিয়েছে যে, তারা মৃত্যুর পর পুনরুত্থানকে অস্বীকার করে বসেছে এবং এটাকে অসম্ভব ভেবে নিয়েছে। ইবলিস তাদেরকে দুইভাবে ধোঁকা দিয়েছে। প্রথমত মানুষের মূল উৎসের দুর্বলতা, দ্বিতীয়ত শরীরের বিক্ষিপ্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ মাটি থেকে জড়ো করা অসম্ভব বলে ধারণা করা। তারা অভিযোগ তুলেছে এই বলে যে, কখনো কখনো বিভিন্ন পশুকে হিংস্র পশুরা খেয়ে ফেলে, তাহলে তাকে কীভাবে পুনরায় জীবিত করা হবে? কোরআন শরিফ তাদের উপরোক্ত দু'টি ভিত্তিহীন অভিযোগের জবাব বলেছে :
أَيَعِدُكُمْ أَنَّكُمْ إِذَا مِتُّمْ وَكُنْتُمْ تُرَاباً وَعِظَاماً أَنَّكُمْ مُخْرَجُونَ * هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ لِمَا تُوعَدُونَ
'সে কি তোমাদেরকে একথা জানায় যে, যখন তোমরা সবার পরে মাটিতে মিশে যাবে এবং হাড়গোড়ে পরিণত হবে তখন তোমাদেরকে (কবর থেকে) বের করা হবে? অসম্ভব, তোমাদের সাথে এই যে অঙ্গীকার করা হচ্ছে এটা একেবারেই অসম্ভব।" আর দ্বিতীয় সন্দেহের দিকে ইশারা করে আল্লাহ বলেন,
أَئِذَا ضَلَلْنَا فِي الْأَرْضِ أَئِنَّا لَفِي خَلْقٍ جَدِيدٍ
"আমরা যখন মাটিতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলাম, তারপর কি আমাদেরকে আবার নতুনভাবে সৃষ্টি করা হবে?" এটাই ছিল জাহেলি যুগে অধিকাংশ লোকের মাযহাব, যা তাদের একটি কবিতার পঙক্তিতে ফুটে ওঠে :
يخبرنا الرسول بأن سنحيا * كيف حياة أصداء وهام
"আমাদেরকে রাসুল খবর দেয়, আমাদেরকে নাকি মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে। আচ্ছা, ক্ষয়ে যাওয়া নিশ্চিহ্ন বস্তু ফের কী করে জীবিত হতে পারে?” আরেক অজ্ঞ আবুল আলা আলমুয়াররার কবিতা :
حياة ثم موت ثم بعث " حديث خرافة يا أم عمرو
"জীবন আছে, এরপর মৃত্যুও আছে। তারপর আবার জীবন! হে উম্মে আমর, এটা বিবেকপরিপন্থী কথা।"
প্রথম সন্দেহের জবাব হচ্ছে, মৃত্যুর পর আবার জীবিত হওয়ার যে উপকরণ অর্থাৎ মাটিকে তোমরা দুর্বল ও তুচ্ছজ্ঞান করছ, এটা ভুল। কেননা মানুষ তো শুরুতে ছিল কেবল এক ফোঁটা বীর্য, অতঃপর জমাট রক্ত—এভাবে বিভিন্ন পরিক্রমা শেষে মানুষ সৃষ্টি হয়েছে। তথাপি মানুষের যিনি উৎস—অর্থাৎ আদম আলাইহিস সালাম-কে তো মাটি দ্বারাই সৃষ্টি করা হয়েছে। এছাড়া যে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা অতি সুন্দর আকৃতিতে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি নিশ্চয় যে-কোনো হীন ও দুর্বল উৎস থেকেও তা সৃষ্টি করতে পারেন। যেহেতু তিনি মানুষকে বীর্য দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর মুরগিকে ডিম থেকে সৃষ্টি করেছেন, একটি ছোট কলি বা বীজ থেকে দারুণ দারুণ বৃক্ষ-তরু-গুল্ম সৃষ্টি করছেন, তাই তার শক্তি ও ক্ষমতার দিকে তাকালে দ্বিতীয় সন্দেহের উত্তরও অনায়াসে বেরিয়ে আসে। অনুরূপভাবে আল্লাহ তায়ালা বিক্ষিপ্ত বস্তুকে সমবেত করে দেখিয়েছেন। স্বর্ণের উপাদান বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে থাকে। তাকে সুনির্দিষ্ট একটি ডালাতে প্রক্রিয়াজাত করা হলে আর বিক্ষিপ্ত থাকে না, একত্রে সব স্বর্ণ জমাট হয়ে যায়। সুতরাং আল্লাহর ক্ষমতায় কী অন্তরায় থাকতে পারে? যেখানে তিনি চাইলেই সবকিছু হয়ে যায়। এছাড়াও যদি এটা মেনেও নেয়া হয় যে, দ্বিতীয়বার সৃষ্টি করার সময় এই মৃত্তিকা ব্যতীত অন্য মৃত্তিকা দিয়ে শরীর সৃষ্টি করতে হবে। তারপরও এর কোনো প্রয়োজন পড়বে না। কেননা মানুষ রুহ বা আত্মার নাম; শরীরের নাম নয়। কেননা সে মানুষ হিসেবে ঠিকই গণ্য হয় যদিও সে এককালে মোটা হয়, একসময় দুর্বল হয়ে পড়ে, আবার বৃদ্ধ হয়ে যায়। অথচ সে যে-মানুষ সে-মানুষই থাকে। যা দ্বারা মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে তার সবচেয়ে আশ্চর্য প্রমাণ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা হযরাতে আম্বিয়া আলাইহিস সালাম এর মাধ্যমে এমন কর্মকাণ্ডের প্রকাশ ঘটিয়েছেন, যা পুনরায় জীবিত হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চয়তা দিতে যথেষ্ট। হযরত মুসা আলাইহিস সালাম-এর লাঠিকে বিশালাকায় সাপে রূপান্তর, পাহাড়ের অভ্যন্তর হতে বলিষ্ঠ উটনী বের করা, ঈসা আলাইহিস সালাম-এর হাতে মৃত ব্যক্তি পুনরায় জীবিত হওয়ার ঘটনাবলি এ কথারই সাক্ষ্য দেয়।
গ্রন্থকার বলেন, আমরা দার্শনিকদের মতবাদ খণ্ডনে বিস্তারিত আলোকপাত করে এলাম। কিছু কিছু লোক আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতায়ালার ক্ষমতা প্রত্যক্ষ করতে পারলে তাদের সন্দেহ দূরীভূত হয়। তাদের মধ্যে একজন বলে ওঠে,
وَلَئِنْ رُدِدْتُ إِلَى رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْراً مِنْهَا مُنْقَلَباً
"সন্দেহের বশীভূত হয়ে বলল, আমাকে কি পুনরায় আল্লাহর কাছে ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে এখানকার চেয়ে উত্তম বিনিময় দান করা হবে?” আস ইবনে ওয়ায়েল বলল, 'সেখানেও আমার জন্য সম্পদ ও সন্তান দান করা হবে।" এ কথা সে সন্দেহের বশীভূত হয়ে বলেছে। ইবলিস তাকে প্ররোচিত করলে সে বলতে থাকে, যদি মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হয় তবে সেখানেও আমরা ভালো ও সুখে থাকব। কেননা যিনি আমাদেরকে পৃথিবীতে সুখে-শান্তিতে রাখছেন, তিনি মৃত্যুর পর জীবিত হওয়ার পরও সুখে-শান্তিতে রাখবেন। গ্রন্থকার বলেন, এটা তাদের ভুল ধারণা। কেননা তারা এটা কেন বুঝছে না যে, হতে পারে পৃথিবীতে এগুলো আমাদেরকে ছাড় দেয়া বা সাজাস্বরূপ প্রদান করা হয়েছে। কখনো কখনো মানুষ সন্তান থেকে দূরে থাকতে চায়, আবার কখনো দাস-দাসীকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করে।
টিকাঃ
১. সুরা মুমিনূন: আয়াত ৩৫-৩৬
২. সুরা সাজদাহ: আয়াত ১০
৩. সুরা কাহাফ: আয়াত ৩৬
৪. সুরা মারইয়াম: আয়াত ৭৭
📄 আল্লাহ দেহান্তরে বিশ্বাসীদের ওপর ইবলিসের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, ইবলিস কিছু লোককে প্ররোচনা দিলে তারা এই পৃথিবীতেই দেহান্তর মতবাদে বিশ্বাসী হয়ে যায়। এদের ধারণা—উত্তম আত্মা শরীরে থেকে বেরিয়ে গেলে অন্য একটি শরীরে প্রবেশ করে। তখন সে ধন-সম্পত্তি দ্বারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। আর অসৎ ব্যক্তিদের আত্মা শরীর থেকে বের হয়ে মন্দ শরীরে প্রবেশ করে, তখন তার দুঃখ-দুর্দশা আরও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এই ধর্মতত্ত্ব ফেরাউন ও মুসা আলাইহিস সালাম এর যুগে প্রকাশ পায়।
আবুল কাসেম বলখি উল্লেখ করছেন, তারা এ-জন্য উক্ত ধর্মতত্ত্ব আবিষ্কার করেছে যখন তারা দেখল যে, শিশু ও পশু-পাখিরা দুঃখ-কষ্ট পেয়ে থাকে, তখন তারা বুঝে নিল এগুলো তাদের ওপর অন্যদের জন্য পরীক্ষাস্বরূপ। অথবা তাদেরকে এর বিনিময়ে বদলা ও বিনিময় প্রদান করা হবে। কিংবা কোনো অহেতুক কারণে হয়ে থাকবে। সুতরাং তারা এ ব্যাপারে দৃঢ় বিশ্বাস করে নিল যে এটা তাদের পাপের ফসল, যার শাস্তি এরা ভোগ করছে।
ইয়াহইয়া ইবনে বিশির ইবনে উমাইর নাহাভান্দি বলেন, হিন্দুরা বলে থাকে, মানবস্বভাব চার প্রকার। ১. সমন্বিত গঠন, ২. মন, ৩. বুদ্ধি ও ৪. সাধারণ স্বভাবপ্রকৃতি। সমন্বিত গঠন হচ্ছে ছোট রব বা প্রতিপালক, মন হচ্ছে খুব ছোট রব, বুদ্ধি হচ্ছে বড় রব। আর এটাই সর্বোচ্চ স্বভাব। মন বা আত্মা পৃথিবী ছেড়ে ছোট রবের সান্নিধ্যে চলে যায়। সুতরাং এই মন ও আত্মা যদি পবিত্র হয় তাহলে তাকে মূল স্বভাব গ্রহণ করে নেয়। পরে এটাকে পরিচর্যা করে ছোট গঠনের দিকে পাঠানো হয়। আর সেটা হচ্ছে মন বা আত্মা। এভাবে সে বড় প্রতিপালকের কাছে গিয়ে পৌঁছে। পরে একে যদি পুণ্য দ্বারা পরিপুষ্ট দেখে তাহলে ভূমণ্ডলে তার কাছে থেকে যায়। যদি পুণ্যে ত্রুটি থাকে তাকে বড় প্রতিপালকের কাছে পাঠানো হয়। পরে সে তাকে ছোট গঠনের দিকে পাঠায়, পরে তাকে আলো দ্বারা ঢেকে ফেলা হয়। পরে সে বিভিন্ন তরি-তরকারিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, যা মানুষ আহার করে থাকে। এবং সে মানুষের রূপ ধারণ করে। দ্বিতীয়বার সে এই জগতে সৃষ্টি লাভ করে। একই অবস্থা তার প্রত্যেক মৃত্যুর সময় ঘটে থাকে।
অন্যদিকে অসৎ ব্যক্তিদের আত্মা ছোট গঠনের কাছে পাঠানো হয়। তখন সেটা রূপান্তরিত হয়ে ঘাসের আকৃতি ধারণ করে। কিন্তু এ ধরনের ঘাস-পাতা জীবজন্তুরা ভক্ষণ করলে, তার আকৃতি কোনো জীব-জন্তুর আকার ধারণ করে। পরে এই জন্তু মারা গেলে আরেক জন্তুর আকার ধারণ করে। এভাবে প্রতিনিয়ত জন্মান্তর ঘটতে থাকে এবং একেক আকৃতিতে রূপান্তরিত হতে থাকে। প্রতি এক হাজার বছর অন্তর অন্তর সে মানুষের আকৃতিতে জন্ম লাভ করে। শেষে সে সৎ ও ভালো হয়ে জীবন যাপন করলে পুণ্যাত্মার সাথে গিয়ে মিলিত হয়।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, দেখুন, এই পথভ্রষ্টদের জন্য ইবলিস কী দারুণ ফাঁদ সাজিয়ে রেখেছে! কোনো ধরনের দলিল-প্রমাণ ব্যতিরেকে তারা এ-সব মতবাদ অবলীলায় মেনে নিয়েছে। অথচ বিবেকপ্রসূত ও উদ্ধৃতিনির্ভর সকল ধরনের প্রমাণের আলোকে এ ধর্মতত্ত্ব বাতিল বলে সাব্যস্ত।
আবুল হাসান আলী ইবনে নাযিফ আলমুতাকাল্লিম বর্ণনা করেন, ইমামিয়া (শিয়া) সম্প্রদায়ের ধর্মবেত্তা আবু বকর ইবনুল ফুলাস বাগদাদে আমাদের কাছে আসা-যাওয়া করত; তাকে আমি শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত মনে করতাম। এক সময় তাকে দেখলাম, সে পৃথিবীতে পুনর্জন্মে বিশ্বাসী। একদিন আমাদের সামনে একটি কালো বিড়াল বসে থাকলে তাকে দেখলাম, বিড়ালটি সে আদর-সোহাগ করছে এবং শীতল চক্ষু কচলাচ্ছে। বিড়ালের চোখে স্বাভাবিকভাবে পানি দেখা যাচ্ছিল, যেমন সব সময় তার চোখে দেখা যায়। বেচারা খুব কান্নাকাটি করছে। আমি তাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে জবাবে বলল, তুমি কি দেখছ, আমি তার শরীরে হাত বোলালে সে কীভাবে কান্না করছে? এ নিশ্চিত আমার মা। মাতৃস্নেহে সে আমার দিকে তাকিয়ে কাঁদছে। বিড়াল আস্তে আস্তে মিউ মিউ চিৎকার আরম্ভ করলে আমি বললাম, তুমি যা বলছ বিড়ালটি তা বুঝছে? সে বলল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমিও কি তার বুলির অর্থ বোঝো? সে বলল, না।
📄 মুসলিম উম্মাহর আকিদা ও ধর্মবিশ্বাসে ইবলিসের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, এই উম্মতের আকিদায় দু'ভাবে ইবলিসের অনুপ্রবেশ ঘটে। ১. বাপ-দাদা ও পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণ ২. অনিষ্পত্তিযোগ্য বিষয়ে মনোনিবেশ করা
শয়তান দ্বিতীয় প্রকার লোকদেরকে বিভিন্নভাবে প্ররোচনা দিতে থাকে। আর প্রথম শ্রেণির লোকদের অন্তরে এ বিষয়টি ভালোভাবে গেঁথে দেয় যে, পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণ করতে থাকো। কেননা এর বিপরীত যুক্তি- প্রমাণগুলো অনেক সময় সন্দেহযুক্ত ও ত্রুটিপূর্ণ হয়ে থাকে। এতে সঠিক পথ আড়াল হয়ে যায়। সুতরাং আগেকার লোকদের অনুসরণ করাই নিরাপদ। এভাবে অনুসরণ-অনুকরণ করতে গিয়ে বহু মানুষ গোমরাহ হয়ে গেছে। সাধারণত এ কারণেই মানুষের মাঝে ধ্বংসযজ্ঞ নেমে এসেছিল। অবশ্য ইহুদি-খ্রিষ্টানরা তাদের মাতা-পিতার পাশাপাশি পাদ্রি ও পোপদের অন্ধ অনুকরণ করে চলেছে। ইসলামপূর্ব যুগ তথা জাহেলি যুগের লোকজনও এ ধরনের অনুসরণ-অনুকরণের পেছনে পড়েছিল। স্মর্তব্য, তারা যে প্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণ করত, এর ভেতর থেকেই তাদের ধর্মের উন্মেষ ঘটেছে। কেননা যখন দলিল-প্রমাণ সন্দেহযুক্ত হয়ে পড়ে এবং সঠিক পথ আড়ালে থেকে যায় তখন নিশ্চয় সেই অনুসরণ-অনুকরণ ছেড়ে দেয়া কাম্য। যাতে পথভ্রষ্ট হতে না হয়। আল্লাহ তায়ালা এসব পূর্বসূরিদের অনুসরণ-অনুকরণের পেছনে পড়া লোকের ভ্রান্ত ধারণার প্রতি আলোকপাত করে বলেন,
بَلْ قَالُوا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَى أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَى آثَارِهِمْ مُهْتَدُونَ
"কাফেররা বলল, না। আমরা আমাদের বাপ-দাদাদেরকে এ পথে পেয়েছি। আমরা তাদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করছি।”
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমরা কি এর চেয়ে ভালো ও উত্তম হেদায়াতের পথ পাওয়া সত্ত্বেও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে যাবে? অর্থাৎ এরপরও কি তোমরা পথভ্রষ্ট থাকবে? আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّهُمْ أَلْفَوْا آبَاءَهُمْ ضَالِّينَ * فَهُمْ عَلَى آثَارِهِمْ يُهْرَعُونَ
“কাফেররা তাদের বাপ-দাদাদেরকে পথভ্রষ্ট পেয়েছে, সুতরাং তারাও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে থাকবে।”
গ্রন্থকার বলেন, জেনে রাখা দরকার, অনুসরণকারী যে বিষয়ে অনুসরণ করছে তাতে পূর্ণ আস্থা রাখা যায় না। আর অনুসরণ করার ক্ষেত্রে বিবেক-বুদ্ধিরও প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি সাধিত হয়। কেননা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এজন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে চিন্তা-গবেষণা করা হয়। আর আল্লাহ তায়ালা ব্যক্তিকে বিবেক নামক বাতি দিয়েছেন যা দ্বারা সে আলোক্তি হতে পারে, সেটা যদি সে নিভিয়ে দেয় এবং অন্ধকারে চলতে চায়, তাহলে এটা খুবই নিকৃষ্ট কাজ বলে বিবেচিত হতে বাধ্য।
আরো জেনে রাখা চাই, অধিকাংশ মাযহাবপন্থীদের মন-মানসিকতা যে ব্যক্তির প্রতি ঝুঁকেছে বা আকৃষ্ট হয়েছে, তার কথা কোনো চিন্তা-ভাবনা ছাড়া মান্য করতে থাকে এবং তার অনুসরণ করতে থাকে। এটাই মূল পথভ্রষ্টতা। কেননা দৃষ্টি ও মনোযোগ প্রকৃতপক্ষে কথার প্রতি রাখা উচিত; কোনো ব্যক্তির ওপর নয়। হারেস ইবনে হুত হজরত আলী রা.-কে বলেছিলেন, আপনি কি মনে করেন যে, আমরা ভেবে রেখেছি হজরত তালহা রা. ও হজরত যুবাইর রা. বাতিলের ওপর ছিলেন? এ কথা শুনে হজরত আলী রা. তাকে বললেন, হে হারেস! ব্যাপারটি তোমার কাছে স্পষ্ট নয়। সত্যের পরিচয় মানুষের দ্বারা সাব্যস্ত হয় না; বরং মানুষের পরিচয় সত্যের দ্বারা চেনা যায়।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলতেন, মানুষের জ্ঞানস্বল্পতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সে দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে মানুষের অনুসরণ করতে থাকে। এ কারণে ইমাম আহমদ রহ. 'মিরাস' এর জিদ-সংক্রান্ত মাসআলায় হজরত আবু বকর রা. এর অভিমত ছেড়ে দিয়ে হজরত যায়দ ইবনে সাবিত রা. এর অভিমত গ্রহণ করেছেন। প্রশ্ন উত্থাপন করে কেউ যদি বলে, সাধারণ মানুষজন তো দলিল-প্রমাণ সম্পর্কে অজ্ঞ, অতএব তারা কেন তাকলিদ বা অনুসরণ করবে না? উত্তরে বলা হবে, আকিদা ও বিশ্বাসগত দলিল-প্রমাণ একেবারে স্পষ্ট, যেমন আমরা দাহরিয়া বা নাস্তিক সম্প্রদায়ের খণ্ডন করতে গিয়ে ইঙ্গিত দিয়ে এসেছি। বিবেক-বোধসম্পন্ন কোনো ব্যক্তির কাছে এমন স্পষ্ট দলিল-প্রমাণ অস্বচ্ছ বা অস্পষ্ট হতে পারে না। বৈষয়িক মাসআলার ব্যাপারটি এ ক্ষেত্রে ভিন্ন। এমন মাসআলা যেহেতু একেক সময়ে একেক আঙ্গিকে উদ্ভাবিত হয় তাই এতে সাধারণ মানুষের নিষ্কৃতি দুষ্কর হয়ে দাঁড়ায়। ধোঁকায় পতিত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেয়। সুতরাং এ সব মাসআলার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জন্য তাকলিদ তথা বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ কোনো আলেমের অনুসরণ করা উত্তম। এছাড়া সাধারণ মানুষের এ ব্যাপারে এখতেয়ার রয়েছে যে, সে যে কোনো বিশ্বস্ত ও অভিজ্ঞ আলেমের অনুসরণ করতে পারে।
গ্রন্থকার বলেন, মুসলিম উম্মতের আকিদায় ইবলিসের অনুপ্রবেশের দ্বিতীয় রাস্তায় যাওয়ার প্রাক্কালে প্রথম রাস্তায় সে যেভাবে আহমক ও বেকুবদের নিয়ন্ত্রণ করতে গিয়ে কেবল তাকলিদ বা অনুসরণের জাল বিছিয়েছে এবং জানোয়ারের মতো তাদেরকে একজনের পিছে পিছে হাঁকিয়েছে, তার বিপরীতে যাদেরকে শয়তান দেখল যে, তাদের মন-মস্তিস্ক বেশ প্রখর, বুদ্ধি বেশ তীক্ষ্ণ, তাদেরকেও যখন যেভাবে পেরেছে কাবু করছে। কারও মনে অনুসরণের প্রতি বিরাগ-বিতৃষ্ণ হওয়ার প্ররোচনা দিয়েছে। তাদের বলেছে, ইসলামি আকিদায় চিন্তা করো। শয়তান এতে একেক গোত্রকে একেক পন্থায় পথভ্রষ্ট করে ছেড়েছে। কেউ কেউ দেখল, শরিয়তের প্রকাশ্য বিষয়ে মনোযোগ দেয়া বিরাট দুর্বলতা। ইবলিস তখন তাদেরকে হাজির করালো দার্শনিকদের কাতারে। পর্যায়ক্রমের তাদের মতাদর্শ ছড়িয়ে দিতে সচেষ্ট হলো। এভাবে একসময় তারা ইসলাম থেকেই বেরিয়ে পড়ে। দার্শনিকদের আলোচনায় এ বিষয়ে বিশদ আলোচনা গত হয়েছে।
কারো কারো মনমুকুরে শয়তান কেবল পঞ্চইন্দ্রিয়ের স্পর্শ ও অনুধাবনযোগ্য বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে প্রণোদিত করল। তাদের যদি বলা হয়, আচ্ছা, তোমরা কি নিজেদের মতবাদকে বিশুদ্ধ মনে করো? তারা হ্যাঁ-সূচক কিছু বললে বুঝতে হবে তারা মিথ্যুক ও ঝগড়াটে। কেননা আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়কে তো আমরা বিশুদ্ধ পাইনি। কেননা পঞ্চইন্দ্রিয় দ্বারা যে-সকল বিষয় জানা ও চেনা যায়, সেখানে মানুষ বিশেষে তারতম্য পরিলক্ষিত হয়। তাহলে একজনের পঞ্চইন্দ্রিয়ের স্পর্শ ও অনুধাবনযোগ্য বিষয়গুলো অন্যের ক্ষেত্রে সমানভাবে কী করে প্রযোজ্য হতে পারে? বোঝা গেল তারা তাদের মতবাদে স্থির থাকতে পারবে না।
কিছুসংখ্যক লোককে ইবলিস তাকলিদ তথা অনুসরণের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করে ইলমে কালামের দিকে মনোযোগী করে। তারা দার্শনিকদের দোষ-ত্রুটির সন্ধানে নেমে পড়ে। তারা তখন মনে করতে থাকে আমরা মানুষের মনের কথাগুলো তুলে ধরছি। মুতাকাল্লিম সম্প্রদায়ের অবস্থা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়। অধিকাংশের অবস্থা এতই করুণ হয়ে দাঁড়ায়, তারা একসময় সত্য দীন সম্পর্কেও দ্বিধায় পড়ে যেতে থাকে। কেউ কেউ মুলহিদ ও মুরতাদ হয়ে যায়।
স্মর্তব্য, দীন ইসলামের পূর্বেকার যে-সকল আলেম-ওলামা ইলমে কালামের ব্যাপারে নীরবতা দেখিয়ে এসেছে, তারা কোনো দুর্বলতার কারণে এমনটি করেননি; বরং তাঁরা তীক্ষ্ণ আকল ও পরিপূর্ণ দেমাগ ব্যয় করে দেখেছেন, এ দ্বারা রোগীর আরোগ্য সম্ভব নয়, না নিবারণ সম্ভব তৃষ্ণার্তের পিপাসা। সুতরাং তাঁরা নিজেরাও এ শাস্ত্র থেকে বিরত থেকেছেন এবং অন্যদেরও দূরে রেখেছেন। ইমাম শাফেয়ি রহ. বলেন, মানুষ যদি শিরক ছাড়া অবশিষ্ট সকল প্রকার পাপ কাজ করে, তাও ইলমে কালামে মনোনিবেশ করার চেয়ে অনেক ভালো। আহলে কালামপন্থীদের ব্যাপারে তিনি লাঠি দিয়ে আঘাত করা এবং তাদেরকে পাড়ায়-পাড়ায় ঘোরানো উচিত বলে মনে করেন। যারা কুরআন-হাদিস বাদ দিয়ে যুক্তি-তর্কের পেছনে পড়ে তাদের এমন শাস্তি হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি। ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. বলেন, কালাম-শাস্ত্রের লোকেরা কখনো সফল হতে পারবে না। আর এ শাস্ত্রে ব্যুৎপত্তি অজর্নকারীরা মুরতাদ ও যিন্দীক হয়ে থাকে।
লেখক আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, কী করে কালাম-শাস্ত্রের ক্ষতির কথা উল্লেখ না করে থাকতে পারি! তোমরা দেখো, মুতাযিলারা এ শাস্ত্রের কারণে বলতে পারে যে, আল্লাহ তায়ালা সম্মিলিত বস্তু সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন, বিক্ষিপ্ত বস্তুর বিস্তারিত সম্পর্কে তার জ্ঞান নেই। (নাঊযুবিল্লাহ)। জাহাম ইবনে সাফওয়ান বলেন, আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান, ক্ষমতা ও হায়াত সবকিছু অনাদি ও সৃষ্ট। আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি রহ. জাহামের এই অভিমত বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা কিছুই নয়।
আবু আলী জুব্বায়ী, আবু হাশেম ও তার অনুসারী মুতাযিলারা বলে, অদৃশ্য একটি বস্তু। সত্তা, প্রাণ ও গুণের মধ্যে এবং সাদা, লাল ও হলুদের মধ্যে। আল্লাহ তায়ালার এই ক্ষমতা নেই যে, তিনি সত্তাকে সত্তা এবং গঠনকে গঠন বা গুণকে গুণ হিসেবে সৃষ্টি করবেন। তিনি কেবল সত্তাকে অদৃশ্য থেকে দৃশ্যালোকে উপস্থাপন করতে পারেন।
'মুকতাবিস' গ্রন্থে কাজী আবু ইয়ালা উল্লেখ করেছেন, আমাকে আল্লাফ মুতাযিলী বলেছে, জান্নাতীদের নেয়ামত আর জাহান্নামিদের সাজা তাদের শেষ কর্মফল। এটা আল্লাহ তায়ালার সিফাত হতে পারে না। তিনি এতে ব্যত্যয় ঘটানোর ক্ষমতা রাখেন না। এমতাবস্থায় তার দিকে মনোযোগী হওয়া ঠিক নয় এবং তাকে ভয় করা অনুচিত। কেননা তিনি মানুষের এমন পরিস্থিতিতে ভালো-মন্দ কোনো কিছু করবার ক্ষমতা রাখেন না। কাউকে তিনি ক্ষতি বা উপকার করতে পারেন না। তার মতে, জান্নাতবাসী সকলে চুপ থাকবে। কোনো কথা বলতে পারবে না। নড়াচড়া করতে পারবে না। কোনো ক্ষমতা থাকবে না তাদের। তাদের প্রতিপালক তাদেরকে কিছুই করতে পারবে না। কেননা সকল প্রকার নশ্বর বস্তুর শেষ পরিণতি হচ্ছে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া, যার পর আর কোনো কিছুর অস্তিত্ব বাকি থাকবে না।
গ্রন্থকার বলেন, 'কিতাবুল মাকালাত' এ আবুল কাসেম আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ আলবলখি লেখেন, আবুল হুযাইল মুহাম্মাদ বিন হুযাইল আল্লাফ—যিনি বসরা অধিবাসী আবদুল কায়স গোত্রের গোলাম ছিলেন এবং মুতাযিলা অনুসারী ছিলেন—একাকী এ-কথা উদ্ভাবন করেন যে, জান্নাতবাসীর কার্যক্রম ফুরিয়ে গেলে শেষে তারা নিশ্চুপ হয়ে সব সময়ের জন্য মূর্তি আকারে পড়ে থাকবে। তার যদি অসীম ক্ষমতা থাকে তাহলে এমন হতে পারে না। এদিকে, অনন্তের ওপর তার ক্ষমতাবান হওয়াও অসম্ভব। এ ব্যক্তি আরও বলে, আল্লাহর ইলম কেবলই আল্লাহ।
আবু হাশেম বলেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক গুনাহ থেকে তাওবা করেছে, কিন্তু সে এক চুমুক মদ পান করেছে, এমন ব্যক্তি কাফেরের মতো চিরদিনের জন্য জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হতে থাকবে। নিযাম মুতাযিলী বলেন, আল্লাহ তায়ালা মন্দ কোনো বিষয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারেন না। অন্যদিকে ইবলিস ভালো-মন্দ উভয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে। হিশাম আলকুতী বলতেন, অসীম ও অনন্ত আল্লাহর গুণ হতে পারে না। মুতাযিলাদের কারো কারো মতে, আল্লাহর পক্ষ থেকে মিথ্যা প্রকাশ হওয়া সম্ভব। কিন্তু এমন বিষয় তার থেকে প্রকাশ হয় না।
মুরজিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে থাকে, মানুষের কোনো ক্ষমতা নেই; বরং তারা উদ্ভিদের মতো। না তারা কিছু করতে পারে, না করার অধিকার আছে। মুরজিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন বলে থাকে, যারা কালিমা শাহাদাত মুখে উচ্চারণ করেছে, তারা যত পাপ করুক না কেন কখনো জাহান্নামে যাবে না। এ-সব লোক সহিহ হাদিস অস্বীকার করেছে, যেখানে আল্লাহর একত্ববাদ স্বীকারকারীদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে মর্মে বিবরণ আছে।
ইমাম ইবনে আকিল বলেন, মনে হয় যারা মুরজিয়া মাযহাব উদ্ভাবন করেছে, তাদের মধ্যে কেউ যিন্দীক ছিল। কেননা সাধারণ বিবেচনায় যে- কোনো ব্যক্তির আযাবের আয়াত দ্বারা ভীত হওয়া ও সাওয়াবের আশাবাদী হওয়া উচিত। মুরজিয়ারা যখন দেখল, সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই, কেননা মানুষে এসব শুনে ঘৃণা করে এবং তা বিবেক-বুদ্ধিরও বিপরীত। তাই তারা সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব দ্বারা যে ফলাফল বেরিয়েছে তা মিটিয়ে দিতে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। অর্থাৎ তাকে ভয় করা এবং পাপ কাজে পতিত হওয়ার সময় তাকে উপস্থিত জানা। তারা এ ক্ষেত্রে শরয়ি দৃষ্টিকোণ ও বিধি-বিধান দূষিত করার পাঁয়তারা করতে থাকে।' এভাবে তারা ইসলামের সর্বনিকৃষ্ট দলে পরিণত হয়।
গ্রন্থকার বলেন, আবু আবদুল্লাহ ইবনে কাররাম তাকলিদ শুরু করলে সে একটি নিকৃষ্ট মাযহাবের আবির্ভাব ঘটায়। সে হাদিস থেকে সবচেয়ে 'যঈফ' হাদিস দ্বারা প্রমাণসূত্র আবিষ্কার করতে থাকে। সে সৃষ্টিকর্তার তুলনাকে সম্ভব মনে করে; এমনকি মহান আল্লাহ তায়ালার সত্তায় সৃষ্টির সাদৃশ্য বৈধ বলে মনে করে বলে, শরীর ও মৌল উপাদান পুনরায় সৃষ্টির ক্ষমতা আল্লাহ তায়ালার নেই। শুরুতেই কেবল তিনি সৃষ্টি করতে পারেন। সালেমিয়া সম্প্রদায়ের মতাদর্শ হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন প্রত্যেক জাতি ও প্রতিটি বস্তুর সামনে তাদের আকৃতিতে দৃশ্যমান হবেন। সুতরাং মানুষ তাঁকে মানুষের আকৃতিতে দেখবে, জিনেরা জিনের আকৃতিতে দেখবে। এদের ধারণা-আল্লাহ তায়ালার এটা একটি রহস্য যে, যদি তিনি তাঁর প্রকৃত রূপ প্রকাশ করেন তাহলে এ বাহ্যিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়ে যাবে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি র. বলেন, আমি আল্লাহ তায়ালার কাছে এমন ইলম হতে পানাহ চাই যা এই ধরনের ভয়ংকর ও ক্ষতিকর মাযহাবের দিকে নিয়ে যায়। মুতাকাল্লিম তথা তার্কিকরা তাদের ধারণামতে বলে বেড়ায়, যতক্ষণ সৃষ্টিকর্তাকে তার বেষ্টিত সকল নিয়ম-কানুন সহযোগে চেনা না হবে ততক্ষণ ঈমান পূর্ণতা পাবে না। এরা সম্পূর্ণ ভ্রান্তিতে নিমজ্জিত। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামগণকে ঈমানের নির্দেশ দিয়েছেন, মুতাকাল্লিমদের এ সকল আলোচনার নির্দেশ দেননি। সাহাবারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কথার ওপরই ছিলেন-যাঁদের মর্যাদা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ঘোষণামতে পূর্বাপর সকলের চেয়ে উঁচু। অন্যদিকে কালাম-শাস্ত্র তিরস্কারযোগ্য। যেদিকে আমরা ইঙ্গিত দিয়ে এসেছি যে, মুতাকাল্লিমরা নিজেদের মত ও পথের অনুসরণ করতে গিয়ে একসময় হীনম্মন্যতায় ভোগার কারণে দীন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। তারা স্বচক্ষে এর অশুভ পরিণতি দেখে নেন।
ইবনুল আশআস বর্ণনা করেন, আমি আহমদ ইবনে সিনান থেকে শুনে বলছি, ওয়ালিদ ইবনে আব্বান আল কারাবিসী আমার মামা হন। তার মৃত্যুক্ষণ এলে তিনি তার পুত্রদের বলেন, তোমরা কি ইলমে কালামের ব্যাপারে আমার চেয়ে পারদর্শী কাউকে চেনো? তারা বলল, না। তোমরা কি আমাকে আপত্তিজনক কথাবার্তার কারণে অভিযুক্ত করো? তারা বলল, হ্যাঁ। পরে তিনি বললেন, হাদিসে পারদর্শী আলেমদের পথ ও মত অবলম্বন করা তোমাদের জন্য অত্যাবশ্যক। কেননা আমি তাঁদেরকে হকের অনুসারী হিসেবে দেখেছি।
আবুল মায়ালি জুয়াইনি (যিনি ইমাম গাযালির উস্তাদ) বলতেন, আফসোস! আমি আহলে ইসলাম ও তাঁদের ইলম ছেড়ে অতল সমুদ্রে পা ফেলেছি। আর সেদিকে সাঁতার কেটেছি, যেদিকে যেতে আমাকে বারণ করা হচ্ছে। এ সব এজন্য করেছি যাতে আমি সত্যের দেখা পাই এবং তাকলিদ থেকে দূরে থাকতে পারি। এখন ওসব থেকে মুখ ফিরিয়ে সত্য কালিমাকে গ্রহণ করলাম। তোমাদের উচিত বুড়ি মহিলাদের কথাকে আঁকড়ে ধরবে। আল্লাহ তায়ালা যদি তাঁর অপার অনুগ্রহে আমাকে বাঁচিয়ে রাখেন তাহলে আমি বুড়োদের দীনের ওপর মরব। তাহলে আশা করা যায় মৃত্যুকালে আমার কালিমা নসিব হবে। তিনি তার শাগরেদদের বলতেন, তোমরা ইলমে কালামে মত্ত হয়ো না। কেননা আমি যদি এর এমন ভয়ংকর নিকৃষ্ট পরিণতির কথা আঁচ করতে পারতাম তাহলে কখনো এ শাস্ত্রে লিপ্ত হতাম না।
আবুল ওয়াফা ইবনে আকিল তার কিছু শাগরেদকে বলেছেন, আমি নিশ্চিতভাবে জানি সাহাবায়ে কেরাম ইন্তেকাল করেছেন। অথচ জানতে পারিনি 'জাওহার' (অনু) কী, 'আরয' (প্রস্তুতা- কী? তোমরা যদি দেখো তোমাদের রায় হজরত আবু বকর রা. ও হজরত ওমর রা. এর সাথে সাংঘর্ষিক, তাহলে তোমার এই মুতাকাল্লিমপন্থীদের রায় প্রত্যাখ্যান করো। কেননা মুতাকাল্লিমদের মতো তোমার রায় অসম্পূর্ণ।
ইবনে আকিল বলেন, আমি অধিকাংশ মুতাকাল্লিমপন্থীদের শেষ পরিণতি অবলোকন করে দেখেছি, তারা শেষ সময়ে সন্দেহ বাতিকগ্রস্ততায় নিমজ্জিত হয়ে পড়ে। অনেকেই মুলহিদ ও নাস্তিক হয়ে যায়। তারা শরিয়তের নির্ধারিত সীমানা পেরিয়ে নিজেদের স্পর্শ ও অনুধাবনশক্তি দ্বারা বস্তুর হাকিকতের সন্ধানে পড়ে থাকে। অথচ তাদের আকলের সেই ক্ষমতা ও শক্তি নেই যা আল্লাহ তায়ালার রয়েছে। তাদের বলে দাও সেই শক্তি ও ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তায়ালার নিয়ন্ত্রণে। তিনি বস্তুর যে হাকিকত জানেন মানুষকে তিনি সে বিষয়ে জানার সুযোগ দেননি।
ইবনে আকিল বলেন, শুরুতে দীর্ঘ সময় আমি কালাম-শাস্ত্রে অত্যুক্তি করেছি। শেষে কিতাবের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে বাধ্য হয়েছি। আর বুড়ি মহিলার নিরাপদ দীন গ্রহণের যে কথা বলা হলো তা এ জন্য যে, মুতাকাল্লিম শাস্ত্রের বোদ্ধারা নিজেদের বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আলোচনার এতো প্রান্তসীমায় আরোহণ করে, যেখানে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দিতে গিয়ে আকল তথা বিবেক-বুদ্ধি ও বোধশক্তি থমকে যায়। সুতরাং শরিয়তের বিধি-বিধানে বিনা বাক্যব্যয়ে মনোযোগী হবে এবং হেতুর সন্ধানে পড়বে না। বুদ্ধি যখন এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছে যে, তার চেয়ে মহান আল্লাহ তায়ালা হেকমত ও প্রজ্ঞা অনেক ঊর্ধ্বে, তখন সে নির্দ্বিধায় আল্লাহর নির্দেশের কাছে অবনত হতে বাধ্য। আল্লাহ তায়ালার পবিত্র সত্তা অবিনশ্বর গুণে গুণান্বিত। তিনি কারও মুখোপেক্ষী নন। তাঁর সত্তা একক। তার কোনো বাড়তি বা সহায়ক শক্তির প্রয়োজন নেই।
টিকাঃ
১. সুরা যুখরুফ: আয়াত ২২
২. সুরা সাফফাত: আয়াত ৬৯-৭০
১. কোনো ধর্ম বা মতাদর্শ যখন প্রতিষ্ঠা পেয়ে যায় এবং তার অনুসারীরা শক্তিশালী হয়ে ওঠে, তখন এমন লোকেরাও স্বার্থ হাসিলের অভিপ্রায়ে সেই ধর্মের বা মতাদর্শের অনুসারীদের সঙ্গে ভিড়ে যায় যারা সেই ধর্মে বা মতাদর্শে আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করে না। এই ধরনের স্বার্থবাদীরা ক্রমে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব দখলের চেষ্টা করে।
📄 উম্মতে মুহাম্মদির আকিদা-বিশ্বাসে শয়তানের ধোঁকা
উম্মতের কিছু লোক কুরআন ও হাদিসের বাহ্যিক দিককে গ্রহণ করেছে এবং তাদের স্পর্শ ও অনুধাবনশক্তির নিরিখে তা মূল্যায়ন করতে থাকে। কারো কারো মতে, আল্লাহ তায়ালা একটি শরীরের নাম। এটা হিশাম ইবনুল হিকাম, আলাম ইবনে মনসুর, মুহাম্মাদ ইবনুল খলিল ও ইউনুস ইবনে আবদুর রহমানের মাযহাব। অতঃপর তাদের মধ্যে পরস্পর মতানৈক্য দেখা দেয়। কেউ বলে সেই শরীর অন্যান্য শরীরের অনুরূপ। কেউ বলল, না; বরং তা অন্যান্য শরীরের মতো নয়। তারপর আল্লাহর শরীর যদি অন্যান্য শরীরের অনুরূপ না হয় তাহলে কার শরীরের মতো? এখানেও মতানৈক্য দেখা দেয়। কারও মতে, সেটা হচ্ছে 'নূর'। কেউ বলেছে, তা সাদা রুপার মতো। এটা হিশাম ইবনুল হিকামের অভিমত। তিনি বলেন, তিনি তার আয়তনের সাতগুণ বড়। তার দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা 'তাহতুসসারা' পর্যন্ত সমুদয় বস্তুতে বেষ্টিত এবং তিনি সবকিছু দেখছেন।
আবু মুহাম্মাদ নাওবখতি জাহিয থেকে, তিনি নিজাম থেকে বর্ণনা করেছেন, হিশাম ইবনুল হিকাম প্রতি বছর পাঁচটি করে মতবাদ বের করতেন। শেষে তিনি যে মতবাদে স্থির হন তা হচ্ছে, আল্লাহ তাঁর স্বীয় ব্যপ্তির সাতগুণ বড়। একদল বলে, তিনি রুপার মতো। কেউ বলেছে, তিনি একটি বলের মতো গোলাকার। যেদিক থেকেই দেখা যাক একই রকম তার আকৃতি। হিশাম বলেন, তার সত্তা সীমিত ও পরিমাপযোগ্য। এমনকি তার চেয়ে ঘোড়াকে বড় বলা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, তার আসল স্বরূপ ও আকৃতি সম্পর্কে তিনিই অবগত।
গ্রন্থকার বলেন, আকৃতি বলার কারণে বোঝা যাচ্ছে তাঁর পরিমাপ ও পরিমাণও আছে। যদি কেউ এমন দাবি করে তাহলে সে তো তাওহিদের ক্ষেত্রে প্রশ্ন উত্থাপন করল। কারণ এটা জানা কথা—বস্তু সত্তা হলেই তা পরিমাপযোগ্য হয়। এর বহু সাদৃশ্য ও উপমা রয়েছে। অথচ আল্লাহ তায়ালা বস্তু নন। তার কোনো সাদৃশ্য ও উপমা নেই। তার গুণ ইচ্ছার সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। সুতরাং মানতে হবে, তার শরীর নেই, জাওহার নেই—যা সীমার গণ্ডিতে আবদ্ধ। নাওবখতি রহ. বর্ণনা করেছেন, মুকাতিল ইবনে সুলাইমান, নুয়াইম ইবনে হাম্মাদ ও দাউদ আলহাওয়ারীও বলে থাকে যে, আল্লাহ তায়ালার আকার ও অঙ্গ আছে।
গ্রন্থকার আল্লামা ইবনুল জাওযি রহ. বলেন, তোমরা দেখে আসছে, এরা কীভাবে আল্লাহ তায়ালাকে অবিনশ্বর প্রমাণ করছে এবং তা মানুষের জন্য বলছে না। রোগ-শোক ইত্যাদি যা মানুষের জন্য সম্ভব তা আল্লাহর জন্য সম্ভব মনে করছে না। অতঃপর এদের প্রত্যেকে যারা আল্লাহর শরীর থাকার দাবি করে আসছে, তাদের যদি বলা হয় তোমরা কোন্ দলিলের ভিত্তিতে শরীর নশ্বর হওয়া সাব্যস্ত করো? এর পরিণতি কী হবে? শেষে তারা বলতে বাধ্য হয়ে পড়বে, যে মাবুদের জন্য তার শরীর হওয়া সাব্যস্ত করা হচ্ছে তিনি নশ্বর; অবিনশ্বর নন। মুজাসসিমা সম্প্রদায়ের একটি অভিমত হচ্ছে, আল্লাহ তায়ালাকে ছোঁয়া যায়। তাদের কথামতো তো বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালার সাথে কোলাকুলিও করা যেতে পারে! মুজাসসিমারা আরো বলে, আল্লাহর শরীর শূন্য। (যেমন আকাশ ও মাটির মাঝখানের শূন্যভূমি)। আর জগতের সকল শরীর তার মাঝে অবস্থিত। বায়ান ইবনে সামআন ইবনে ইমরান বলতেন, তার মাবুদ সম্পূর্ণ নূর এবং তিনি একজন পুরুষের আকৃতিতে রয়েছেন। তিনি চেহারা ছাড়া তার সমুদয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ধ্বংস করে দিতে পারেন। তাকে খালিদ ইবনে আবদুল্লাহ খুন করে।
মুগিরা ইবনে সাআদ আলআজলী বলতেন, তার মাবুদ একজন নূরানী পুরুষ। যার মাথার ওপর রয়েছে নূরের একটি তাজ। রয়েছে তার শরীরও। তার অন্তর থেকে ঝর্ণার মতো হেকমত গড়িয়ে পড়ে।
উপরোক্ত মতটি ব্যক্ত করতেন মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে হাসান। যারাহ ইবনে আ'ইয়ুন কুফি বলতেন, শুরুতে আল্লাহ তায়ালার জ্ঞান, ক্ষমতা ও জীবনের গুণ ছিল না। পরে তিনি নিজের জন্য গুণগুলো সৃষ্টি করে নেন। দাউদ আলহাওয়ারী বলেন, তিনি শরীরসর্বস্ব। তার গোস্ত ও রক্ত আছে। আছে অস্থি ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। তার মুখ থেকে সিনা পর্যন্ত ফাঁপা আর শরীরের বাকি অংশ কঠিন।
মোটকথা, যারা আল্লাহ তায়ালাকে স্পর্শ ও অনুভূতিযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করছে, তাদের কেউ কেউ মনে করে তিনি তাঁর আরশে বসে আছেন। আর সেখান থেকে বের হলে তিনি আরশ ছেড়ে বের হন এবং নড়াচড়া করেন। তারা আল্লাহর সত্তাকে একটি পরিমাপযোগ্য সীমারেখায় আবদ্ধ বলে মনে করেছে। তারা প্রমাণস্বরূপ বলে থাকে-
يَنْزِلُ اللَّهُ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا
“আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন।” তাদের যুক্তি- অবতরণ সে-ই করতে পারে যিনি উপরে অবস্থান করছেন। তারা অবতরণকে অনুভবযোগ্য বিষয়ের সাথে তুলনা করছে, যা দ্বারা তার শরীরের বর্ণনা আবিষ্কার করা হয়েছে। এই 'মুশাব্বাহ' গোষ্ঠীটি আল্লাহ তায়ালার সিফাতকে অনুভব ও অনুধাবনযোগ্য বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করে থাকে। আমি এদের অধিকাংশ মতবাদের জবাব 'মিনহাজুল উসুল ইলা ইলমিল উসূল' গ্রন্থে উল্লেখ করেছি।
মুশাব্বাহ্ সম্প্রদায়ের কিছু লোক কেয়ামতের দিন আল্লাহ তায়ালার দিদারকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যেন সে সম্মুখে উপস্থিত বিশেষ একজন ব্যক্তিকে দেখছে। হাদিসের বাণী-"আল্লাহ তায়ালা মুমিন বান্দাকে নিজের দিকে ডাকবেন”-ব্যস, এটুকু শুনে তারা এটাকে প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করছে। তাদের এই অজ্ঞতা প্রকাশের কারণ হচ্ছে তারা আল্লাহ তায়ালা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। তাদের কেউ কেউ বলে, আল্লাহ তায়ালার চেহারা আছে। আর এটাকে তারা আল্লাহর সত্তা ও সিফাত থেকে পৃথক মনে করে। প্রমাণস্বরূপ এ আয়াতটি উপস্থাপন করে- وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرامِ) ‘এবং তোমার মহীয়ান ও দয়াবান রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে'।' তারা আল্লাহ তায়ালার জন্য হাত ও আঙ্গুলও সাব্যস্ত করে। কেননা হাদিসে এসেছে-يَضِعُ السَّموات على أَصْبَع ‘আল্লাহ আকাশমণ্ডলী তাঁর আঙ্গুলে রাখবেন।” তারা আল্লাহর পা আছে বলেও দাবি করে। এভাবে অন্যান্য অঙ্গের কথাও প্রমাণ করে, যার উল্লেখ হাদিসে উদ্ধৃত হয়েছে। অর্থাৎ সেগুলো থেকে তারা মনগড়া মতবাদ সৃষ্টি করেছে। অথচ বিশুদ্ধ ও বাঞ্ছিত পন্থা ছিল, তারা যেন আয়াত ও হাদিসগুলো পড়ে এবং এর ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নিজের অনুভব ও অনুধাবন ক্ষমতার আলোকে কোনো মতামত না দেয়। শেষে তাদেরকে কে নিষেধ করল যে, তোমরা চেহারা দ্বারা আল্লাহর সত্তা মেনে নাও। এটাকে অতিরিক্ত সিফাত হিসেবে সাব্যস্ত কোরো না! এর ভিত্তিতেই অনুসন্ধিৎসু ব্যক্তিরা وَيَبْقَى وَجْهُ رَبِّكَ ذُو الْجَلَالِ وَالْإِكْرامِ) অবশিষ্ট থাকবে” দ্বারা উপরোক্ত অর্থই ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ কেবল তোমার রবের সত্তাই অবশিষ্ট থাকবে। يُرِيدُونَ وَجْهَهُ অর্থাৎ তাকে চায়। আল্লাহ তায়ালার বাণী-
"قُلُوبُ العِبَادِ بَيْنَ إصبعين" তাঁর দুই আঙ্গুলে বান্দার কলব" দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, আঙ্গুল দ্বারা যেহেতু কোনো বস্তুকে পাল্টে দেয়া হয়, আর যে বস্তু দুই আঙ্গুলের মাঝে থাকবে, আঙ্গুলওয়ালা যেভাবে চাইবেন সেভাবে তাকে ব্যবহার করতে পারবেন। এ জন্য এ শব্দটি উল্লেখ করেছেন। এটি তার কোনো বাড়তি সিফাত নয়।
গ্রন্থকার বলেন, আমার মতে এমন ব্যাখ্যা থেকেও চুপ থাকা উচিত। যদিও হতে পারে এ ব্যাখ্যাটিই উদ্দেশ্য। আর তার এমন সত্তা যার বিভিন্ন অংশ বিক্ষিপ্তভাবে রয়েছে—এমন বলা বৈধ নয়।
জাহেরিয়াদের সবচেয়ে আশ্চর্য অবস্থার মধ্যে এটি একটি যে, সালেমিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বলে থাকে, কবরের মধ্যে মৃত ব্যক্তি পানাহার ও বিয়ে-শাদি করে। এমন ধারণার নেপথ্যে কারণ হচ্ছে, তারা শুনেছে, নেককার ব্যক্তিদের জন্য কবরে বহু নেয়ামত রয়েছে। এ সব লোক যদি কেবল এটুকুতে বিশ্বাস করত যেটুকু হাদিসে এসেছে—
"মুমিনের রুহসমূহ পাখির ডানায় রাখা হয় এবং এরা জান্নাতের বৃক্ষ হতে আহার করে থাকে।” তাহলে তারা এই নিকৃষ্ট আকিদা হতে বাঁচতে পারত। কিন্তু এর সাথে তারা শরীরকেও মিলিয়ে ফেলেছে।
ইবনে আকিল রহ. বলেন, এই মাযহাবের মাঝে সেই ব্যাধি বিদ্যমান, যা জাহেলি জমানার লোকদের মাঝে ছিল। হাম ও সুদ্দার ব্যাপারে জাহেলি জমানার লোকজন যেমন বলত, তাদের কথাও তেমন। এ সকল লোকদের সাথে মুনাজারা ও বিতর্ক করা উচিত, যাতে জাহেলি জমানার কুসংস্কার সম্পর্কে অবগত হয়ে তা থেকে বিরত থাকার প্রয়াস পাওয়া যায়। এদের সাথে রাগ করে বিরোধিতা করা উচিত নয়। কেননা এতে তারা বিগড়ে যেতে পারে। ইবলিস এদের ওপর এমন স্থূলভাবে ফাঁদ পেতেছে যে, তারা শরিয়তসম্মত ও বিবেকসিদ্ধ আলোচনা ছেড়ে দিয়েছে। যেহেতু মৃত ব্যক্তির জন্য শান্তি বা শাস্তির ব্যবস্থার কথা এসেছে, তো বোঝা গেল কবর বা শরীরের দিকে সাব্যস্ত করে কেবল এ জন্য বয়ান করা হয়েছে, যাতে মৃত ব্যক্তির অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞাত হওয়া যায়। যেন এমন বলেছেন, কবরে দাফনকৃত ব্যক্তি এবং সেই রুহ যা তার শরীরে ছিল, তা জান্নাতের নেয়ামত দ্বারা আরাম ভোগ করছে কিংবা জাহান্নামের শাস্তি দ্বারা কষ্ট ভোগ করছে।
গ্রন্থকার বলেন, যদি প্রশ্ন করা হয়, তোমরা বিশ্বাসের ব্যাপারে অনুসরণকারীদের ওপরও দোষ চাপিয়ে দিচ্ছ, আবার অপাত্রে মুতাকাল্লিমদের ওপর দোষ দিচ্ছ। এখন বলো এক্ষেত্রে ইবলিসের কুমন্ত্রণা থেকে রেহাই পাওয়ার পন্থা কী? এর সহজ উত্তর হচ্ছে সেটা, যার ওপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম অটল ছিলেন। অর্থাৎ তাঁরা ঈমান এনেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা হক। তাঁর সমুদয় সিফাত, যা কুরআন ও হাদিসে এসেছে তা হক। আমরা এর কোনো অর্থ বিগড়াতে পারি না। অপাত্রে পর্যালোচনা করে এমন বিষয়ের মানুষের বোধশক্তি বহির্ভূত কোনো বিষয়ের অবতারণা করা যাবে না। হজরত আলী রা. বলেন, আল্লাহর কসম! আমি কোনো মাখলুককে নিজের এবং মুয়াবিয়া রা.-এর মাঝে বিচারক সাব্যস্ত করিনি; বরং কুরআনকে বিচারক সাব্যস্ত করেছি। (আর কুরআন মাখলুক নয়)। আরও বিশ্বাস করতে হবে যে, এরপরও কুরআনকে শোনা হয়। প্রমাণ- حَتَّى يَسْمَعَ كَلَامَ اللَّه “যদি কোনো মুশরিক আশ্রয় চায়, তাহলে তাকে আশ্রয় দাও, যতক্ষণ পর্যন্ত সে আল্লাহর কালাম শোনে।”” আল্লাহর কালাম আসমানী গ্রন্থের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা বলেন, فِي رَقٌّ مَّنشُورٍ 'যা সূক্ষ্ম চামড়ার ওপর লিখিত'।' জাগতিক চামড়ার সাথে এর কোনো তুলনা করা চলে না। এর কোনো উপমা উপস্থাপন অসম্ভব বলে বিশ্বাস করতে হবে। এর তাফসীরে নিজের মনগড়া কোনো মতামত দেয়া যাবে না।
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. এ ব্যাপারে নিষেধ করে বলতেন, তোমরা কুরআনের সাথে নিজের কথাকে মাখলুক বা গাইরে মাখলুক বলো না। এতে সালফে সালেহীনের অনুসরণ থেকে ছিটকে পড়বে। আর এখন! এমন লোকদের দেখে আশ্চর্য লাগে যারা কোনো ইমামের অনুসরণ করে আবার এ জাতীয় বদয়ী মাসআলার ব্যাপারে কথা বলে।
আমর ইবনে দিনার রহ. হতে বর্ণিত, আমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এমন নয়জন সাহাবিকে দেখেছি, যারা বলতেন, যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলে আখ্যায়িত করবে সে কাফের। ইমাম মালেক ইবনে আনাস রহ. বলেন, যে ব্যক্তি কুরআনকে মাখলুক বলবে, তাকে তাওবা করাতে হবে। যদি সে তাওবা করে তাহলে তো ভালো। আর যদি তাওবা না করে তবে তাকে কতল করা হবে।
জাফর ইবনে বুরকান বলেন, উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. এর কাছে জনৈক বিদয়াতি ব্যক্তি কিছু বলতে চাইলে তিনি তাকে বলেন, তোমার জন্য আকিদার ওপর এমনভাবে দৃঢ় হওয়া আবশ্যক, যেমন মকতবের বালক ও গ্রামের সাধারণ লোক হয়ে থাকে। আর সেই দিন থেকে বাকি দিনের ব্যাপারে গাফেল হয়ে যাও। উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা যখন দেখবে, কোনো দল সাধারণ মানুষের আড়ালে দীনের ব্যাপারে গোপন কোনো পরামর্শ বা কার্যক্রম চালাচ্ছে, তখন জেনে নেবে এরা কোনো ভ্রষ্ট পথের ভিত গড়ার চিন্তা-ভাবনা করছে।
সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, আমার কাছে হজরত উমর রা. এর এই উক্তি পৌঁছেছে, তিনি তাঁর কিছু কর্মকর্তাকে লিখে পাঠিয়েছেন, আমি তোমাদের উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং সুন্নাতের অনুসরণ করো। যে সব বিদয়াত পরবর্তী লোকেরা আবিষ্কার করেছে তা থেকে দূরে থাকো। তোমরা জেনে রাখো, যে সুন্নাতের ইলম সম্পর্কে অবগত, সে খুব ভালোভাবে জানে সুন্নাতের বিরোধিতা ও এর ভেতর বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়ি করার দ্বারা কী ধরনের ভ্রান্তি ও ভ্রষ্টতার মুখে পতিত হতে হয়। পূর্ববর্তী মনীষীগণ ইলম ও মারেফত থাকা সত্ত্বেও চুপ থেকেছেন। অন্য বর্ণনায় আছে, উমর ইবনে আবদুল আযিয রহ. বলেছেন, পূর্ববর্তী মনীষীরা এ সব ব্যাপার খোলাসা ও ব্যাখ্যা দেয়ার ব্যাপারে অধিক যোগ্য ছিলেন। যে ব্যক্তি কোনো বিদয়াত আবিষ্কার করল, সে ওই ব্যক্তি হবে যে তার বাতানো পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করেছে এবং নিজেই তার পথে বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছে। সুন্নাতে অবহেলা করে অনেকে নিজের ওপর জুলুম করেছে। অন্যদিকে বহু লোক এতে বাড়াবাড়ি করে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে।
সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন, তোমাদের জন্য ঘরের মহিলা এবং মকতবের বালকদের মতো আকিদা ও একিনেও অটল থাকা আবশ্যক। তারা বলে, ঈমান মুখে স্বীকার করা এবং আমল করার নাম।
গ্রন্থকার বলেন, যদি কেউ বলে, এটা তো স্বল্পবুদ্ধি ও দুর্বল লোকদের কাজ, পুরুষের কাজ নয়। উত্তরে আমরা বলব, আমরা শুরুতে এটা লিখে দিয়েছি এবং বলে দিয়েছি যে, আমলের ওপর স্থির থাকা আবশ্যক। কেননা যে সকল মুকাতাকাল্লিম সমুদ্রে সাঁতার কেটে ডুবে গেছেন, তারা কখনো এর প্রান্তসীমায় পৌঁছতে পারেননি, যা দ্বারা পিপাসার্তের তৃষ্ণা নিবারণ হয়। এ জন্য তিনি সবাইকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন, তীরে অবস্থান করো। আমরা সে কথাই উল্লেখ করে এসেছি।
টিকাঃ
১. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ১১৪৫
১. সুরা আররাহমান: আয়াত ২৭
২. সহিহ বুখারি: হাদিস নং ৭৪১৪
৩. সুরা আররাহমান: আয়াত ২৭
৪. সুরা আনআম: আয়াত ৫২
৫. সহিহ মুসলিম: হাদিস নং ৬৭৫০
৬. সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদিস নং ১৪৪৯
১. সুরা তাওবাহ: আয়াত ৬
২. সুরা তৃর: আয়াত ৩