📄 সুফিসততারিদের ওপর শয়তানের ধোঁকার বর্ণনা
গ্রন্থকার বলেন, সুফিসতায়ি এমন এক গোষ্ঠী, যারা সুফিসতা নামক ব্যক্তির অনুসারী। তাদের বিশ্বাস—বস্তুর কোনো হাকিকত বা বাস্তবতা নেই। কেননা যে-সব বস্তু আমরা দূর থেকে দেখে থাকি, তা হয়তো আমরা যেমন দেখছি তেমন, আবার এর বিপরীতও হতে পারে। আলেমরা তাদের ওপর অভিযোগ তুলে বলেছেন, তোমাদের এই কথার কোনো বাস্তবতা আছে? নাকি নেই? যদি তোমরা বলো যে, কোনো বাস্তবতা নেই, তাহলে তোমাদের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা একটা অবাস্তব ও অবান্তর কথা কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে? পক্ষান্তরে যদি এর বাস্তবতা আছে বলে স্বীকার করো, তাহলে তোমরা নিজেদের মত বর্জন করে আমাদের মত মেনে নিলে যে, বস্তুর হাকিকত বা বাস্তবতা আছে।
আবু মুহাম্মাদ হাসান ইবনে মুসা নাওবখতি রহ. তাঁর প্রণীত কিতাবুল আরা ওয়াদদিয়ানাত-এ এই গোষ্ঠীর মাযহাবের আলোচনা করে বলেছেন, আমি অধিকাংশ মুতাকাল্লিমিন তথা তার্কিক আলেমদের দেখেছি, তারা মাযহাবটি সম্পর্কে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে রয়েছেন। কেননা তারা এ গোষ্ঠীটির সাথে বিতর্ক ও মুবাহাসা করেছেন এবং বিস্তারিত প্রমাণপঞ্জি ও মুনাযারার মাধ্যমে তাদের যুক্তি খণ্ডন করেছেন। অথচ এরা কিছুতেই বস্তুর হাকিকত, নির্দেশ এবং প্রত্যক্ষকরণকে স্বীকার করতে রাজি নয়। তথাপি কীভাবে এসব ব্যক্তি তাদের সাথে কথা বলে? যারা বলে, আমরা জানি না তোমরা আমার সাথে কথা বলছ, নাকি বলছ না। এ সব লোক কী করে বিতর্ক করতে আসে? যে এটুকু জানে না যে, সে উপস্থিত আছে নাকি অনুপস্থিত! এমন লোকেরা কী করে কারও উদ্দেশ্যে কথা বলে? যারা উদ্দিষ্ট ব্যক্তিকে অদৃশ্যের দাবি করে! বিশুদ্ধকে বাতিল মনে করে!
নাওবখতি বলেন, বিতর্ক তাদের সাথে মানায়, যারা একটি স্থির লক্ষ্য নির্ণয় করে এবং নির্দিষ্ট একটি দাবিতে অটল থাকে। তার দাবি সাব্যস্তের লক্ষ্যে সে নানাবিধ প্রমাণ ও যুক্তি উপস্থাপন করবে। কিন্তু এদের তো কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা দাবি নেই, যাতে তারা স্থির থাকতে পারে। সুতরাং এদের সাথে বিতর্কে জড়ানোর কোনো মানে হয় না।
গ্রন্থকার বলেন, তার কথাটি আবুল ওয়াফা ইবনে আকিল খণ্ডন করে বলেছেন, একটি দলের অভিমত, আমরা সুফিসতায়িদের সাথে কী ব্যাপারে কথা বলব? কেননা সর্বোচ্চ তারা এমন করতে পারে যে, বিতার্কিকদের যুক্তিকে তারা স্পর্শযোগ্য বস্তুর সাথে তুলনা করবে এবং উপস্থিতকে অজ্ঞাত বা অনুপস্থিত বলে প্রমাণ দেবে। অথচ এসব লোক গোড়া থেকেই স্পর্শযোগ্য বিষয়ের অস্বীকারকারী। আবুল ওয়াফা বলেন, এ বিষয়টি খুবই হীনম্মন্যতার পরিচায়ক। তাদের সাথে বিতর্ক করে নিরাশ হয়ে ফেরার কোনো যুক্তি নেই। কেননা তারা যা কিছু ভাবনা লালন করছে, তা কেবল কুমন্ত্রণা; এর বেশি কিছু নয়। সুতরাং তাদের অযৌক্তিক যুক্তিতে ভগ্নমনোরথে ফেরার অবকাশ নেই। এদেরকে ঘাড়ত্যাড়া প্রকৃতির সাথে জুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমাদের এবং তাদের উপমা হচ্ছে, আল্লাহ একজন ট্যারা চক্ষুবিশিষ্ট লোক পাঠিয়েছেন, যে সর্বদা একটি চাঁদকে দু'টি দেখে।
সে তার ধারণায় কখনো সন্ধিগ্ধ হয় না। নিশ্চিতভাবে সে মনে করে, আকাশজুড়ে দু'টি চাঁদই আবহমান কাল ধরে বিদ্যমান। তার জন্মদাতা পিতা বলে, চাঁদ একটি। তোমার চক্ষুর সমস্যার কারণে দু'টি দেখছ। নিজের ট্যারা চোখটি বন্ধ করে দেখো তো! যখন সে এক চোখ করে, তখন বলে, জানো বাবা! এখন আমি একটি চাঁদ দেখছি, কারণ আমার একটি চোখ এখন বন্ধ! তাই আরেকটি অদৃশ্য হয়ে গেছে। এখন তার কথা দ্বারা আরও একটি সন্দেহ সৃষ্টি হয়ে গেল। পরে তার পিতা বলল, আচ্ছা যদি তোমার কথা মতে এ কারণেই একটি চাঁদ অদৃশ্য হয়ে যায়, তাহলে এক কাজ করো। তোমার যে চোখটি ভালো, সেটি একবার বন্ধ করে ট্যারা এক চোখে দেখো তো দেখি! ট্যারা ছেলে যখন এমনটি করে দেখল যে, কিরে এখন দেখি এক চোখে আবার দুই চাঁদ! এবার সে হাড়ে হাড়ে বাবার কথার সত্যতার প্রমাণ পায় যে, আসলে চাঁদ একটিই।
মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা নিযام বলেন, সুফিসতায়ি মতাদর্শী সালেহ ইবনে আবদুল কুদ্দুসের এক ছেলে মারা গেলে আবুল হুযাইল তার কাছে যান। আমিও তার সঙ্গী ছিলাম এবং সে সময় ছোট ছিলাম। সালেহ খুব শোকাপ্লুতস্বরে কথা বলছিল। তার পেরেশান অবস্থা প্রত্যক্ষ করে আবুল হুযাইল বললেন, আমি তোমার শোক ও দুঃখের কোনো কারণ দেখছি না। কেননা তোমাদের মতে তো মানুষ আর নিষ্প্রাণ বস্তুর মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। সালেহ উত্তরে বলল, হে আবুল হুযাইল! আমি ছেলের বিরহে কাঁদছি না। আমি তো কাঁদছি এ জন্য যে, সে 'কিতাবুশ শুকূক' বা সন্দেহের কিতাব পড়েনি। আবুল হুযাইল জানতে চাইলেন, 'কিতাবুশ শুকূক' আবার কী? সে বলল, ওটা সেই কিতাব—যা আমি লিখেছি। যে সেটা পড়বে, সে অতীতের কর্মকাণ্ড নিয়ে সন্ধিহান হয়ে যাবে। নিযাম বলেন, আমি সালেহকে বললাম, তাহলে তুমিও তোমার পুত্রের মৃত্যুতে সন্দেহ করো এবং তার ওপর আমল করো। ভাববে যে, সে মরেনি, কিংবা হয়তো মরে গেছে। সন্দেহে পতিত হয়ে যাও, সে কি কিতাবুশশুকুক পড়েছে? হয়তো পড়েছে, যদিও সে পড়েনি।
আবুল কামেস বলখি ঘটনা বর্ণনা করে বলেন, জনৈক সুফিসতায়ি একজন তার্কিক আলেমের কাছে আসা-যাওয়া করত। একবার উভয়ের মাঝে বিতর্ক হলো। তার্কিক আলেম এক লোককে বলে দিলেন যে, সুফিসতায়িরের বাহনটি কোথাও সরিয়ে নাও। তো, সুফিসতায়ি লোকটি ঘর থেকে বের হয়ে বাহন না পেয়ে আলেমের কাছে গিয়ে বলল, আমার বাহনটি কোথায়? আলেম উত্তর দিলেন, এটা কেমন কথা? তুমি হয়তো বাহনে করে আসনি। সে বলল, কেন বাহন নিয়ে আসব না? আলেম বললেন, সত্যি করে বলো। সে বলল, এটা আমি নিশ্চিত করেই বলছি। আলেম বারংবার বলতে থাকলেন যে, তুমি হয়তো বাহন নিয়ে আসোনি, মনে করে দেখো। সে বলল, আপনি কী বলতে চান? এটা মনে করার মতো কোনো বিষয় নয়। আমি নিশ্চিত যে, আমি বাহনে করেই এসেছি। আলেম বললেন, তাহলে তুমি কীভাবে দাবি করো যে, বস্তুর কোনো হাকিকত বা বাস্তবতা নেই? কেমন করে দাবি করো যে, নিদ্রা এবং সজাগ অবস্থা একই সমান? সুফতাসায়ি লাজবাব বনে গেল এবং স্বীয় মাযহাব ছেড়ে আসতে বাধ্য হলো।
📄 দার্শনিকদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
নাওবখতি' বলেন, অজ্ঞদের দল মনে করে, বস্তুর হাকিকত বা বাস্তবতা বিশেষ একটি নয়; বরং প্রত্যেক বস্তুর বাস্তবতা প্রত্যেক জাতি-গোষ্ঠীর নিকট তাদের বিশ্বাসের অনুরূপ। যেমন-মধু পিত্ত প্রকৃতি রোগীদের কাছে তিক্ত স্বাদের হয় আর অন্যদের কাছে তা খুবই মিষ্টি। অনুরূপভাবে পৃথিবীকেও যারা 'কাদিম' আদি মনে করে, তাদের মতে আদি। আবার যারা 'হাদেস' অনাদি ও অবিনশ্বর মনে করে, তাদের দৃষ্টিতে অনাদি। আর বিভিন্ন প্রকার রং-কে যারা শরীরী মনে করে, তাদের মতে তা 'আরেযি' তথা পরনির্ভরশীল। অর্থাৎ বস্তুর বাস্তবতা বিভিন্ন রকম।
নাওবখতি বলেন, এরাও সুফিসতায়িদের অন্তর্ভুক্ত। তাদের জবাবে বলা যায়, তোমাদের কথা সঠিক? তাহলে তারা বলবে, হ্যাঁ, আমাদের মতে সঠিক আর তোমাদের মতে ভুল। তখন আমরা বলব, তোমার এই স্বীকারোক্তি তোমাদের মাযহাব নিজেদের বিরুদ্ধেই বাতিল বলে গণ্য হলো। তোমাদের কাছে দলিল আছে। আর যে কোনো কারণে নিজের কথা বাতিল হওয়ার ওপর দলিল সাব্যস্ত করে, তাহলে তার বিপক্ষে তার মাযহাব বাতিল হিসেবে পরিগণিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট। দ্বিতীয় আরেকটি উত্তর তাদের ক্ষেত্রে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায়, তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমরা প্রত্যক্ষদর্শনের জন্য কোনো বাস্তবতা মানো কি না? যদি বলে, প্রত্যক্ষদর্শনের বাস্তবতা বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। তাহলে তারা মূল হাকিকত তথা বাস্তবতাকে অস্বীকার করল। এখন তাদের সাথে ওইভাবেই কথা হবে যেভাবে কথা হয়েছিল পূর্ববর্তী সম্প্রদায়ের সাথে।
নাওবখতি বলেন, এই গোষ্ঠীর কেউ কেউ এমন আছে, যারা বলে, পৃথিবী বিবর্তনশীল। তারা আরও বলে, মানুষ একটি বস্তু দ্বিতীয়বার মনে রাখতে পারে না। কেননা বস্তু সর্বদা বিবর্তিত ও পরিবর্তিত হতে থাকে। তার উত্তরে বলা যায়, তোমরা এই জ্ঞান কোথায় পেলে? অথচ তোমরা নিজেরাই ওই বাস্তবতাকে অস্বীকার করো, যার কারণে এই পৃথিবী অস্তিত্বে এসেছে। দ্বিতীয়বার আমরা যখন তোমাদের কাউকে জবাব দেবো, তখন সেই ব্যক্তি হবে না—যার সাথে আমরা কথা বলেছি।
টিকাঃ
১. তার পূর্ণ নাম: আবু মুহাম্মাদ আল হাসান ইবনে ইহাইয়া আন নাওবাখতি। তিনি একজন ইমামিয়া শিয়াপন্থী বিতার্কিক। নিজ মতবাদের ওপর লেখা তার গ্রন্থের নাম 'আল আরা ওয়াদ দিয়ানাত'।
📄 দাহরিয়াদের ওপর শয়তানের ধোঁকা
গ্রন্থকার বলেন, ইবলিস বহু মাখলুককে এই সংশয়ে নিমজ্জিত করেছে যে, নাউযুবিল্লাহ, কোনো সৃষ্টিকর্তা ও মাবুদ নেই। আর এই বস্তুজগৎ কোনো সৃষ্টিকর্তার মাধ্যম ছাড়াই অস্তিত্বে এসেছে। এসব লোক যেহেতু সৃষ্টিকর্তাকে কোনো কিছুর মাধ্যমে পাননি এবং তার পরিচয়ের জন্য জ্ঞান-বুদ্ধি খাটাননি, তাই তারা সৃষ্টিকর্তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করে যাচ্ছে। কোনো বুদ্ধিমান লোক কি এমন নাস্তিক্যবাদী চিন্তা-চেতনা লালন করতে পারে? মানুষের চলাচল যদি এমন কোনো মাঠের পাশ দিয়ে হয়, যেখানে কোনো দালান কোঠা নেই, পরে আবার কখনো সেখান দিয়ে অতিবাহিত হওয়ার সময় যদি কোনো দেয়াল বা দালানের অস্তিত্ব দেখে, তাহলে নিশ্চিত করে সে বলবে, এই দেয়াল বা দালানের কোনো নির্মাতা অবশ্যই রয়েছেন। তাহলে এই জমিনের বিছানা, ওই বিশাল আকাশ এবং এ সব আশ্চর্য বস্তুজগৎ কি এর সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্বের প্রমাণ দেয় না? কোনো এক আরব কবি কত সুন্দর করে বলেছেন:
إن البعرة تدل على البعير * فهيكل علوي بهذه اللطافة ومركز سفلي بهذه الكثافة * أما يدلان على اللطيف الخبير
"উটের বাহ্য তার উট হওয়ার ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত করে। তাহলে মহাকাশের ওই সূক্ষ্মজগৎ আর জমিনের এই সমুদয় বস্তুজগৎ কি মহান কুশলী এবং সর্বজ্ঞাত সৃষ্টিকর্তার প্রমাণ দেয় না?”
আবার মানুষ যদি তার নিজের সত্তা ও অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা-গবেষণা করে তাহলে এ ব্যাপারে সে যথেষ্ট প্রমাণ ও যুক্তি পেতে পারে। কেননা এই মানব শরীরে যে প্রজ্ঞা ও হেকমত বিদ্যমান, এখানে সবিস্তারে তা আলোকপাতের অবকাশ নেই। চিন্তা করুন, সামনের দাঁত এজন্য ধারালো করে সৃষ্টি করেছেন যাতে খাবার বা অন্যান্য বস্তু কাটা যায়। ভেতরের দাঁতগুলো প্রশস্ত করে সৃষ্টি করেছেন, যাতে খাবার পেষণ ও চূর্ণ করা যায়। জিহ্বাকে এমন নরম করেছেন যাতে খাবারকে ওলট-পালট করা যায়। আঙ্গুলে গিড়া সৃষ্টি করা হয়েছে যাতে তা খোলা এবং বন্ধ করা যায়। এতে করে তার জন্য কাজ করা সহজ হয়। আবার কোনো কোনো আঙ্গুল বড় আবার কোনোটা ছোট। আবার সবগুলো আঙ্গুল মেললে বরাবর সমান হয়ে যায়। এতেও রয়েছে অপরিসীম হেকমত। কে সৃষ্টি করল এই শরীর? মানবদেহে আল্লাহ তায়ালা কিছু অদৃশ্য শক্তি রেখেছেন। তন্মধ্যে একটি হলো প্রাণ। প্রাণ বের হয়ে গেলে মানবদেহ বেকার হয়ে পড়ে। আরেকটি হলো আকল বা বিবেক; যা মানুষকে কল্যাণজনক বিষয়ের প্রতি পথ প্রদর্শন করে। প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রত্যহ বলে, أفي الله شك "আল্লাহর অস্তিত্বে কি কোনো সন্দেহ আছে?” আসলে এরা আল্লাহকে প্রকাশ্য জাগতিক উপায়ে দেখার বৃথা চেষ্টা করে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
কিছু লোক আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে এ জন্য যে, আল্লাহ তায়ালার যে অস্তিত্ব 'ইজমালি' বা মিলিতভাবে সাব্যস্ত করা হয়েছে তারা তা বিস্তারিতভাবে উপলব্ধি করতে পারেনি। পক্ষান্তরে আমরা অনেক জিনিস এ-রূপ ইজমালি ও মোটামুটিভাবে উপলব্ধি করি; বিস্তারিত উপলব্ধি করতে পারি না। কিন্তু এর দরুন ওই জিনিসের অস্তিত্ব অস্বীকার করি না। যেমন বিবেক-বুদ্ধি আমরা ইজমালি ও মোটামুটিভাবেই উপলব্ধি করে থাকি। বিস্তারিতভাবে জ্ঞানেন্দ্রিয় দ্বারা উপলব্ধি করতে পারি না। তাই বলে কি আকল বা বিবেকের অস্তিত্বকে কেউ অস্বীকার করতে পারবে?
নাস্তিকেরা আমাদের উপরোক্ত যুক্তিতে প্রশ্ন উত্থাপন করে যে, তোমাদের কথা অনুযায়ী যেভাবে কোনো একটি নবঘটিত বস্তুর জন্য সৃষ্টিকর্তার প্রয়োজন, অদ্রূপ মূলধাতুরও প্রয়োজন; যা পূর্ব হতে ছিল। যেমন টেবিল তৈরি করতে হলে যেভাবে মিস্ত্রির প্রয়োজন, তেমনই কাঠেরও প্রয়োজন— যা মূলধাতু উপাদান। টেবিলের যে আকৃতি আমাদের সামনে দেখা যাচ্ছে, তার জন্য উক্ত উপাদান অপরিহার্য। এ হিসেবে জগৎ চিরন্তন ও অবিনশ্বরই প্রমাণিত হলো।
এ প্রশ্নের জবাবে বলা হবে, আল্লাহ তায়ালা কোনো বস্তু সৃষ্টি করার ব্যাপারে কোনো ধাতু ও উপাদানের মুখাপেক্ষী নন। কোনো প্রকার ধাতু ও উপাদান ব্যতীতই তিনি সবকিছু সৃষ্টি ও আবিষ্কারে সক্ষম। কোনো আকৃতির অস্তিত্বের জন্য ধাতু ও উপাদান অপরিহার্য নয়। যেমন চরকার একটি আসল আকৃতি আছে। কিন্তু চরকা যখন ঘুরতে থাকে তখন প্রতি মুহূর্তে তার আকৃতির পরিবর্তন হতে থাকে। আর সে আকৃতির জন্য কোনো ধরনের ভিন্ন উপাদান নেই। এ ক্ষেত্রে এমন এক আকৃতি পাওয়া যায়—যা উপাদানবিহীন। কিন্তু তোমরা সৃষ্টির এমন একটি উপমা দেখাও—যা সৃষ্টিকর্তাবিহীন অস্তিত্ব লাভ করেছে।
📄 প্রকৃতিবাদীদের ওপর শয়তানের ধোঁকার বর্ণনা
গ্রন্থকার বলেন, শয়তান যখন দেখল, নাস্তিক্যবাদ তথা সৃষ্টিকর্তার অস্বীকারকারীদের মধ্যে তার কথা কম মান্য করা হয়। কেননা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি এ কথার সাক্ষ্য দেয় যে, সৃষ্টিবস্তুর অবশ্যই সৃষ্টিকর্তা থাকা চাই। শয়তান এবার এই ধূম্রজাল ছড়াল যে, এই সৃষ্টিবস্তু প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি হয়েছে। মৌল চার উপাদানের মাধ্যমে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, এগুলো প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্ট।
তার উত্তর হচ্ছে, আমরা বলি, প্রকৃতির সমবেত হওয়া তো এ কথার প্রমাণ বহন করে যে, প্রকৃতি বিদ্যমান। না এটা নিজেই সৃষ্টিকর্তা। তথাপি এটাও প্রমাণিত যে, প্রকৃতি সমবেত ও সংমিশ্রণ ব্যতীত অস্তিত্বেই আসতে পারে না এবং এটা খোদ প্রকৃতিরই বিপরীত। সুতরাং বোঝা গেল প্রকৃতিও আদিষ্ট ও অপারগ। তাছাড়া এটাও স্বীকৃত যে, প্রকৃতির নিজস্ব কোনো জীবন, জ্ঞান ও শক্তি নেই। সুতরাং এটা কী করে সৃষ্টিকর্তা হতে পারে? একটি সুশৃঙ্খলিত ও সুনিয়ন্ত্রিত কর্মযজ্ঞ কোনো জ্ঞানী বা বুদ্ধিসম্পন্নই করতে পারে। কোনো বস্তু নিজেই যখন জ্ঞানী নয়, তখন কী করে সে আরেক জ্ঞানীর সৃষ্টিকর্তা হতে পারে? যার নিজস্ব কোনো শক্তি নেই সে অন্যকে শক্তি বিলাবে কীভাবে? বিরুদ্ধবাদীরা যদি বলে যে, সৃষ্টিকর্তা যদি জ্ঞানী ও বুদ্ধিমান হতো তাহলে এই সৃষ্টিবস্তুতে কোনো ত্রুটি থাকত না এবং কষ্টদায়ক কোনো জীবজন্তু সৃষ্টি হতো না। তাই এগুলো সব প্রাকৃতিকভাবেই সৃষ্টি। আমরা এর উত্তরে বলে থাকি, এই অভিযোগ তোমাদের ওপর পতিত হয়। মহান সৃষ্টিকর্তা যেভাবে সুনিপুণ ও সুশৃঙ্খলিতভাবে বিশ্বজগৎ ও জাগতিক বস্তু-সামগ্রী সৃষ্টি করেছেন, প্রকৃতির মাধ্যমে তা কখনো সম্ভব নয়।
আমরা দেখতে পাই, একই মৌসুমে সূর্যের প্রতিক্রিয়া বিভিন্ন ফলে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। কোনো শস্য বা ফলে রস আনয়ন করে আবার কোনোটিতে রস শোষণ করে। যদি প্রকৃতিই প্রকৃত কর্তা হতো তাহলে এ পার্থক্য ঘটত না। এর অবশ্যই একজন নিয়ন্তা ও কর্তা রয়েছেন। যিনি সূর্য দ্বারা ইচ্ছেমাফিক কাজ নেন। আরও লক্ষ করা যেতে পারে, যাকে সূর্যের কিরণ শুষ্ক করে সেটা থাকে আবরণমুক্ত। আর যাকে আর্দ্র ও রসালো করে সেটা থাকে আবরণযুক্ত। অথচ বাহ্যিক দৃষ্টিতে ক্রিয়া বিপরীত হওয়ার কথা ছিল।
আমরা আরও দেখতে পাই, একই পানি দ্বারা উৎপন্ন ফলমূলের কোনোটি টক হচ্ছে, আবার কোনোটি হচ্ছে মিষ্ট। এটা একমাত্র মহান সৃষ্টিকর্তারই কাজ, যিনি মহা প্রজ্ঞাবান, সক্ষম ও সক্রিয়। সেদিকে ইশারা করে পানি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন,
يُسْقَى بِمَاءٍ وَاحِدٍ وَنُفَضِّلُ بَعْضَهَا عَلَى بَعْضٍ فِي الْأُكُلِ
"সবই সিঞ্চিত একই পানিতে কিন্তু স্বাদের ক্ষেত্রে আমি করে দেই তাদের কোনোটাকে বেশি ভালো এবং কোনোটাকে কম ভালো।”
টিকাঃ
১. সুরা রা'আদ: ৪