📘 সংশয়বাদী > 📄 পরিশুদ্ধি

📄 পরিশুদ্ধি


অন্তরের অসুখের মতো চিন্তার অসুখও মানুষের মধ্যে বাসা বাঁধে। ইসলামী চিন্তায় অন্তর এবং আক্কল অবিচ্ছেদ্য এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি অন্যটিকে প্রভাবিত করে। যেমন, ঔদ্ধত্য আর অহংকারকে সাধারণভাবে অন্তরের অসুখ মনে করা হয়। কিন্তু অহংকার মানুষের চিন্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ঔদ্ধত্য আর অহংকার সত্য চেনা এবং অনুধাবনের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। দেখার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। সত্য একদম সামনে থাকার পরও মানুষ অনেক সময় তা চিনতে পারে না। ঔদ্ধত্য আর অহংকার তার দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়। আমাদের চারপাশের অনেক মানুষ এ কারনেই মৌলিক কিছু সত্যকে চিনতে পারে না।
একই কথা প্রযোজ্য হিংসা, লোভ এবং ঘৃণার ক্ষেত্রেও। এ অসুখগুলো শুধু মানুষের মনকে দূষিত করে না; বরং গ্রাস করে ফেলে মানুষের পুরো সত্তাকে। একসময় দূষিত করে ফেলে মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাকে। অনেক কথিত মুসলিম 'সংস্কারক' এর কথা আর কাজে এই অসুখগুলোর স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়। আল্লাহ আমাদের এই অসুখ থেকে হেফাযত করুন।
বিশুদ্ধ অন্তর মানুষকে প্রস্তুত করে সত্য এবং হিদায়াতের আলো ধারণ করার জন্যে। কিন্তু অন্তরের মতো আক্কলও অসুস্থ হতে পারে। তাই সত্য এবং হিদায়াতের আলোকে পুরোপুরিভাবে ধারণ করার জন্য অন্তরের মতো আকলকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি।

টিকাঃ

📘 সংশয়বাদী > 📄 আধুনিকতার মাঝে ইসলামকে বোঝার মূলনীতি

📄 আধুনিকতার মাঝে ইসলামকে বোঝার মূলনীতি


আধুনিকতার মাঝে ইসলামকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে একটা মূলনীতি বোঝা জরুরি। বিস্তর সেক্যুলার জ্ঞান এবং অনেক সময় ইসলামী জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও খুব কম মানুষ এই নীতিটা ঠিক মতো বোঝেন। এই নীতি হলো— মানুষ যা কিছুকে সত্য আর বাস্তব বলে দাবি করে, তার সবকিছু আসলে সত্য বা বাস্তব না।
অনেক মানুষ মিলে কোনো বিষয়কে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে। সেটা ব্যাপকভাবে প্রচার করে। নিজেরাও সেটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। অথচ আদতে সেটা সত্য না; বরং তাদের কল্পনাজাত সৃষ্টি।
এটা কীভাবে ঘটে?
ইতিহাসে আসলে অনেকবার অনেকভাবে এ ব্যাপারটা ঘটেছে। অসংখ্য উদাহরণ আছে। সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো ধর্ম। অনেক সমাজ, জাতি এবং সভ্যতা মিথ্যা উপাস্যদের ওপর ঈমান এনেছে। মিথ্যা বিশ্বাসের ওপর বিভিন্ন ধর্ম গড়ে উঠেছে। অথচ এই বিশ্বাসগুলোর পেছনে কুসংস্কার আর খেয়ালখুশি ছাড়া অন্য কিছু নেই।
তবে এ ধরনের ভুল বিশ্বাস শুধু ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমন ঘটে। একটা উদাহরণ দেখা যাক, যা ধর্মের বলয়ের বাইরে। পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানের কথা চিন্তা করুন। এমন অনেক তত্ত্ব আছে পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানের ভিত্তিতে যেগুলো একসময় সত্য মনে করা হতো। কিন্তু কিছুদিন পর সেগুলো বাদ দেয়া হয়। আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজির ক্ষেত্রে এমন অনেক উদাহরণ আছে।
ইথারের[১০০] কথা শুনেছেন? কিংবা ফ্লোজিস্টন? অথবা করপাস্কলস?
এগুলোর অস্তিত্ব কিন্তু একসময় 'পরীক্ষালব্ধ'ভাবে প্রমাণিত ছিল। অর্থাৎ এ ধরনের কিছু আছে বলে থিওরি কিংবা হাইপোথিসিস তৈরি হয়েছিল। তারপর সেই থিওরি বা হাইপোথিসিসের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফল দেখে উপসংহার টানা হয়েছিল, এই এনটিটিগুলোর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু পরে একসময় এগুলোকে অস্তিত্বহীন বলে বাদ দেয়া হয়। তত্ত্ব দেয়া, পরীক্ষা করা, উপসংহার টানা, আবার তত্ত্ব-উপসংহার বাদ দেয়া, সবকিছু করেছিল বিজ্ঞানীরাই।
গবেষণা আর পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সামষ্টিকভাবে উপসংহার টানল- ইথারের কিংবা ফ্লোজিস্টনের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু একসময় দেখা গেল, এ রকম কিছু আসলে নেই। এগুলো আসলে কিছু মানুষের কল্পনাজাত সৃষ্টি কেবল। এটা কীভাবে ঘটল?
এ প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। তবে ঐতিহাসিক এ বাস্তবতা থেকে আমাদের বোঝা উচিত যে কোনো ভুলকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারটা মানব-ইতিহাসে নিয়মিত ঘটে। বিস্ময়কর রকমের ধারাবাহিকতার সাথে ঘটে। আর বিজ্ঞান আর গবেষণার 'যৌক্তিক' ও 'পরীক্ষালব্ধ' জগতেও ঘটে।
আসুন এ শিক্ষাটা অন্য কিছু ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যাক। রাজনীতি, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারের আলোচনায় কিছু মূল্যবোধকে বাস্তব ও সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু গবেষণালব্ধ বিজ্ঞানের মতো নিরেট জায়গাতেও যেখানে সামষ্টিকভাবে ভুল হতে পারে সেখানে নৈতিকতার মতো বিমূর্ত বিষয়ে ভুল হবার সম্ভাবনা কি আরও বেশি না? আজ ইসলামকে আক্রমণ করা হয় কারণ ইসলামের শিক্ষা আর বিধান এমন কিছু মূল্যবোধ আর ধ্যানধারণার সাথে খাপ খায় না, যেগুলোকে আধুনিক মানুষ চিরাচরিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
• ইসলাম বাকস্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না।
• ইসলাম মুক্তচিন্তার স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম গণতন্ত্রের স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম যৌন স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম লিঙ্গ পরিবর্তন আর লৈঙ্গিক পরিচয় বদলানোর সুযোগ দেয় না!
এ রকম অনেক অভিযোগ আমরা শুনি।
কিন্তু এই ধ্যানধারণাগুলো যে সঠিক, এগুলোর যে বাস্তব ভিত্তি আছে তার প্রমাণ কী? এগুলোর যদি কোনো নৈতিক বৈধতা না থাকে, তাহলে কী হবে? হয়তো এ ধারণাগুলোও পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়া আর বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের অধীনে থাকা আধুনিক মানুষের সামষ্টিক কল্পনার ফসল মাত্র?
এই প্রশ্ন করতে শেখা এবং এসব ধারণার ব্যাপারে সংশয়বাদিতার অবস্থান গ্রহণ করা হলো সন্দেহ এবং সংশয় সমাধানের প্রথম ধাপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মুসলিম আলিম এবং বুদ্ধিজীবী সংশয়বাদিতার এই অবস্থান একবারেই উপেক্ষা করে যান।
তারা আলোচনা শুরু করেন আসা এসব ধ্যানধারণা, মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়ে। আর এটা একটা চরম পর্যায়ের বিপর্যয়।
কেন?
কারণ, তখন অবধারিতভাবে কিছু প্রশ্ন চলে আসবে। যেমন-মুক্তচিন্তা যদি সত্য, সঠিক হয়, এত ভালো কিছু হয়, তাহলে কুরআন এবং সুন্নাহতে কেন আমরা মুক্তচিন্তার কথা পাই না?
এ প্রশ্নের জবাবে, মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বলবে-হ্যাঁ, কুরআন-সুন্নাহয় মুক্তচিন্তার কথা আছে তো!
তারপর কুরআন, হাদীস এবং ক্ল্যাসিকাল আলিমদের রচনাবলি চষে ছোটবড় এমন সবকিছু তারা একসাথে করবে, যেগুলোকে কোনো-না-কোনোভাবে ব্যাখ্যা করে মুক্তচিন্তার পক্ষে দলীল হিসেবে দেখানো যায়। অথবা মুক্তচিন্তার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কিন্তু তাদের এ পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। তারা বেছে-বেছে শুধু এই জিনিসগুলো আনছেন যেগুলো তাদের উপসংহারকে সমর্থন করে। কিন্তু তাদের আনা প্রত্যেকটা উদাহরণের বিপরীতে এমন দশটা উদাহরণ দেখানো যাবে যেখানে মুক্তচিন্তার ধ্যানধারণাকে নাকচ করা হয়েছে। কিন্তু সেই দশটা উদাহরণকে বাদ দিয়ে তারা ওই একটা উদাহরণকেই তুলে ধরবেন।
এটা যে সব সময় ইচ্ছাকৃতভাবে, কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে করা হয়, তা না। অনেক সময় হয়তো ওই আলিম বা বুদ্ধিজীবীর চোখে বিপরীত উদাহরণগুলো আসলেই ধরা পড়ে না। কারণ, তারা একটা নির্দিষ্ট লেন্সের ভেতর দিয়ে কুরআন ও সুন্নাহকে পড়তে এবং ব্যাখ্যা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এমন এক লেন্স চোখে দিয়ে তারা পড়ছেন যেটা ওইসব ধ্যানধারণা আর মূল্যবোধেরই রঙে রাঙানো, যেগুলো তারা কুরআন-সুন্নাহতে খুঁজছেন। ফলে একটা দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে যেখান থেকে বের হয়ে আসা বেশ কঠিন। লেখা শেষ করার আগে শেষ একটা পয়েন্ট নিয়ে কিছু কথা বলি।
ওপরে আমি যা বলেছি তার বিপরীতে একটা কাউন্টার আরগুমেন্ট আসতে পারে।
একই ধরনের সংশয়বাদী অবস্থান তো ইসলাম আর ইসলামী মূল্যবোধের ব্যাপারেও নেয়া যেতে পারে। ইসলাম আর ইসলামী মূল্যবোধ যে সত্য, সঠিক, এগুলো যে বাস্তবতার ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা সেটা কেন আমরা ধরে নেব?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো-আমরা আপনা-আপনি এটা ধরে নেব না। আমরা অনুসন্ধান করব। বিশ্লেষণ করব। চিন্তা করব। তবে আমাদের চিন্তার ভিত্তি হবে বৈধ বুদ্ধিবৃত্তিক উৎসগুলো। অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী আলিমদের অবস্থান। আমরা সতর্ক থাকব, যাতে ত্রুটিপূর্ণ কোনো ধ্যানধারণা বা বায়াস আমাদের চিন্তার জগতে ঢুকে না পড়ে। এটা হলো একদম প্রাথমিক ধাপ। এর সাথে অনুভব এবং অনুধাবন করারও প্রয়োজন আছে। এই অনুভূতি এবং অনুধাবন অর্জিত হয় ইবাদাত, যিকর, তিলাওয়াতের মতো ওই আমলগুলোর মাধ্যমে যেগুলো ইসলাম আমাদের পালন করতে বলে। ইসলাম একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা, যা যৌক্তিকভাবে, আত্মিকভাবে এবং প্রামাণিকভাবে সত্য। পাশাপাশি যা বাস্তবতাকে চেনার সুযোগ দেয়। কারণ, জ্ঞানের এই তিনটি উৎস পরস্পর-সংযুক্ত।
তবে এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আছে। আধুনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি যারা গ্রহণ করে তারাও নিজেদের ধ্যানধারণার সত্যতা অনুধাবন আর অনুভব করার দাবি করে। প্রগাঢ় আবেগ নিয়ে তারা তাদের মূল্যবোধগুলো প্রচার করে। যেহেতু তারাও সত্যের স্বাদ পাবার দাবি করছে, তাহলে তাদের দাবিকে আমরা কীভাবে নাকচ করব? ব্যাপারটা আসলে খুব সহজ।
আমরা তাদের সযত্নে লালিত মূল্যবোধগুলোর ব্যবচ্ছেদ করব। এগুলোর অসামঞ্জস্য, অসংলগ্নতা, দ্বিমুখিতা তুলে ধরব। ধাপে ধাপে এগুলোর বাস্তবতা খুলে খুলে দেখাব, যাতে একসময় সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই ধ্যানধারণাগুলো আসলে অন্তঃসারশূন্য। এসব ধারণা এবং মূল্যবোধ কোনো ধরনের সম্মান এবং গ্রহণযোগ্যতা পাবার যোগ্য না। অবশ্য এ কাজটা করার ক্ষেত্রে সবার দক্ষতা একইরকম হবে না। এই পদ্ধতির অনুপম, অনুকরণীয় আদর্শ হলেন আমাদের প্রিয় ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম।
একবার যখন এ পদ্ধতিটা বুঝতে পারবেন তখন এর বিপরীত পথটাও চিনতে পারবেন। যেটা হলো অ্যাপোলোজেটিকস বা কৈফিয়তবাদী পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে মডার্নিস্ট ধ্যানধারণা এবং মূল্যবোধগুলোকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তারপর কুরআন-সুন্নাহ আর আলিমদের রচনাবলি থেকে বেছে বেছে এমন কিছু অংশ নেয়া হয় যেগুলোকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে মডার্নিস্ট ধ্যানধারণা আর মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড় করানো যায়।
ইন শা আল্লাহ এই দুই পদ্ধতিকে পাশাপাশি রাখলে আপনি বুঝতে পারবেন কৈফিয়তবাদী পদ্ধতি কতটা দুর্বল এবং অকার্যকর।
আল্লাহ আমাদের আন্তরিকভাবে সত্যসন্ধানী হবার তাউফিক দান করুন। আমীন।

টিকাঃ
[১০০] ইথার (aether)-একসময় ধারণা করা হতো সমগ্র মহাবিশ্বজুড়ে ইথার নামক একটি পদার্থ আছে। ইথার শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন অ্যারিস্টটল। অ্যারিস্টটলের ধারণা ছিল ভূগোলকের বাইরে সমগ্র মহাবিশ্ব ইথারে পরিপূর্ণ। আলো যাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এক জায়গা থেকে অন্য যায়গায় চলাফেরা করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, আলো যেহেতু একধরনের তরঙ্গ, তাই আলো নিশ্চয় কোনো মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছোয়। এই মাধ্যম হলো ইথার। যেভাবে বাতাসের মধ্য দিয়ে শব্দ সঞ্চারিত হয় ঠিক তেমনিভাবে ইথারের মধ্য দিয়ে আলো সঞ্চারিত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ইথার তত্ত্ব অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী উইলিয়াম থম্পসন (কেলভিন) ১৮৮৪ সালে মন্তব্য করেন, 'ইথার হলো একমাত্র পদার্থ, যার ব্যাপারে গতিবিদ্যায় আমরা নিসংশয়। আমরা আলোকবাহী ইথারের বাস্তবতা এবং প্রকৃত অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত।' বলা হয়ে থাকে ১৯৮৭ সালের মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার তত্ত্বের অবসান ঘটে।
ফ্লোজিস্টন (Phlogiston)-প্রাচীন গ্রিকদের ধারণা ছিল সব বস্তু ৪টি মূল উপাদান দিয়ে গঠিত : মাটি, বাতাস, পানি ও আগুন। দীর্ঘদিন এ ধারণা বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ধারণা করা হতো দাহ্য বস্তুতে পথন একটি উপাদান থাকে, ফ্লোজিস্টন। দহনের সময় দাহ্য বস্তু থেকে ফ্লোজিস্টন বেরিয়ে যায়। বিজ্ঞানী অ্যান্টন ল্যাভয়সিয়ে ফ্লোজিস্টন তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেন।
করপাস্কুলস (Corpuscles) - অষ্টাদশ শতাব্দীতে আইযাক নিউটন আলোর করপাসকুলার তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন। নিউটনের বক্তব্য ছিল আলো ছোট ছোট কণা বা করপাসকল দিয়ে তৈরি। এই করপাসকলের বা কনার ভর আছে। পরবর্তী ১০০ বছর আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, সরল পথে গমন, রংধনু সৃষ্টিসহ বেশ কয়েকটি আলোকীয় ঘটনাকে এ তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব সম্ভবপর হয়।

📘 সংশয়বাদী > 📄 মুসলিম সংশয়বাদী হবার অর্থ কী?

📄 মুসলিম সংশয়বাদী হবার অর্থ কী?


একজন পশ্চিমা সংশয়বাদী কী করে? সে প্রশ্ন করে। যা কিছু তার নিজস্ব ধ্যানধারণার সাথে খাপ খায় না তার বিরুদ্ধে সে প্রশ্ন তোলে। আপত্তি করে। সে বিশ্বাস করে তার মন, বিবেক আর বুদ্ধি সত্যমিথ্যা এবং ভালো-মন্দ বিচারের চূড়ান্ত মাপকাঠি।
বলাবাহুল্য, এ ধারণা ভুল।
একজন মুসলিম সংশয়বাদী কী করে? সে প্রশ্ন করে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে। নিজের কাজ, চিন্তা-ভাবনা এবং অনুভূতির যা কিছু ইসলামের সাথে খাপ খায় না, সেটার বিরুদ্ধে সে প্রশ্ন তোলে। আপত্তি করে। কারণ, সে জানে তার মন সীমিত। তার বুদ্ধিমত্তা সীমিত। তাই এগুলো কখনো সত্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। সত্যের পরম, চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে কেবল ইসলামই।
মানুষ আজ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক, ভ্রান্ত ধ্যানধারণা আর মতবাদকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। যত্ন করে লালন করে, সেগুলোর জন্য লড়াই করে। এগুলোই হলো সত্যিকারের ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র-উইপেনস অফ ম্যাস ডেস্ট্রাকশান। এ ধরনের 'সত্য'-এ বিশ্বাসী হবার চেয়ে সংশয়বাদী হওয়া হাজার গুণে ভালো।

টিকাঃ

📘 সংশয়বাদী > 📄 একজন মুসলিম সংশয়বাদীর জবানবন্দী

📄 একজন মুসলিম সংশয়বাদীর জবানবন্দী


সেদিন এক মুসলিম কিশোর আমাকে প্রশ্ন করল— সালাতের উদ্দেশ্য কী? আল্লাহর ওপর কেন বিশ্বাস করতে হবে? ভালো ভালো মানুষের জীবনে কেন খারাপ খারাপ ঘটনা ঘটে?
এ ধরনের প্রশ্ন অনেক মুসলিমের মধ্যে আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে এই প্রশ্নগুলো তাদের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট তৈরি করে। এ ধরনের প্রশ্নগুলোর কারণে অনেকে ইসলাম ত্যাগও করে। সমাজে ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা কমার কারণে এই প্রবণতা আরও গতিশীল হয়েছে।
প্রশ্ন অনেক, কিন্তু উত্তর কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা কীভাবে করা উচিত? কীভাবে আমরা এই চ্যালেঞ্জগুলোর মোকাবিলা করব?
আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা অ্যামেরিকায়। কিশোর বয়স কেটেছে নব্বইয়ের দশকের অ্যামেরিকাতে। টুকটাক কিছু প্রশ্ন আমার মাথাতেও যে তখন আসেনি তা না, কিন্তু আজকের মুসলিম তরুণদের যেসব প্রশ্নের মোকাবিলা করতে হচ্ছে, তার তুলনায় ওগুলোকে শিশুতোষ বলা যায়। সমকামী অধিকার, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, স্রষ্টার অস্তিত্বের বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, নারী অধিকার, শালীনতা ও যৌন সংযমের মূলা, বিবর্তনবাদ, পরিবারের গুরুত্বসহ অনেক বিষয়ে আজকের মুসলিম তরুণদের সংশয়ের মোকাবিলা করতে হচ্ছে। কোনোকিছুই যেন প্রশ্ন, সন্দেহ আর শেষ পর্যন্ত প্রত্যাখ্যানের উর্ধ্বে না।
সারকথা হলো, আজ মানুষ মনে করে ধর্মের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। সন্দেহগ্রস্ত জনসাধারণের মনে এই গ্রহণযোগ্যতা ফিরিয়ে আনার উপায় হলো সরাসরি এ প্রশ্নগুলোর মোকাবিলা করা।
সংশয়বাদ
অ্যাকাডেমিক কিংবা পেশাদার জগতে জটিল এবং বিতর্কিত প্রশ্ন মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হলো প্রশ্নের পেছনে থাকা পূর্বধারণা এবং অনুমানগুলোকে চিহ্নিত করা। মানুষ কিছু পূর্বধারণা আর পূর্বানুমানের ওপর ভিত্তি করে প্রশ্ন করে। সেই ধারণা এবং অনুমানগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে। একবার তা করতে পারলে প্রশ্নের ভিত নাড়িয়ে দেয়া সহজ। প্রশ্ন তখন নিজেই সংকটে পড়ে যায়। আর তখন নিজের মতো করে প্রশ্নের উত্তর দেয়া যায়।
প্রচলিত বিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দেয়া এবং সংকট তৈরির এ প্রবণতাকে সচরাচর যুক্ত করা হয় সংশয়বাদের সাথে। 'সংশয়বাদী' শব্দটা যে অর্থে আমি ব্যবহার করছি সেটা অনুযায়ী, কোনো চিন্তাব্যবস্থার ভালো-মন্দ যাচাইয়ের আগে সংশয়বাদী ব্যক্তির কাজ হলো সেটার ব্যবচ্ছেদ এবং ক্রিটিক করা।[১০১]
সাধারণত সংশয়বাদী প্রশ্নের নিশানা বানানো হয় ধর্মকে : স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে এটা কেন বিশ্বাস করতে হবে? কুরআন আল্লাহর কথা, এটা কেন মানতে হবে? মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাস কেন করতে হবে?
মূলত এসব সংশয়বাদী প্রশ্নের উদ্ভব হয়েছিল নাস্তিক এবং ধর্মবিরোধীদের মধ্যে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এ প্রশ্নগুলো আজ পৃথিবীজুড়ে ছড়িয়ে গেছে। অনেক বিশ্বাসীও আজকাল এসব প্রশ্ন করে। যখন উত্তর খুঁজে পায় না, তখন ধর্ম ত্যাগ করে অথবা প্রশ্নগুলো উপেক্ষা করে যায়।
কিন্তু আমি মনে করি, আরেকটা পথ আছে।
লিবারেল-সেক্যুলার ডাবলস্ট্যান্ডার্ডের বিরুদ্ধে মুসলিম সংশয়বাদ
আমার অভিজ্ঞতা বলে, ধর্মের ব্যাপারে যারা সংশয়বাদী তাদের মধ্যে ডাবলস্ট্যান্ডার্ড আছে। সব ধরনের বিশ্বাসকে তারা একইভাবে আক্রমণ করে না। তাদের সবচেয়ে তীব্র সমালোচনাগুলো বরাদ্দ থাকে ধর্মের জন্য, বিশেষ করে ইসলামের জন্যে। কিন্তু ধর্মীয় না, এমন অনেক বিশ্বাসকে তারা বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়।
বিল মা'রের[১০২] কথা ধরুন। সে একজন স্ব-ঘোষিত লিবারেল। ইসলামের সমালোচনার সময় তার মধ্যে বিদ্বেষের কোনো কমতি দেখা যায় না। কিন্তু লিবারেলিসমের মূল্যায়ন করার সময় সে একই ধরনের ক্রিটিকাল, সংশয়বাদী মনোভাব গ্রহণ করে না। লিবারেল দর্শন নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে, সমালোচনা আছে। এগুলো নিয়ে সে কখনো আলোচনা করে না। আধুনিক লিবারেলিসম বিশ্বজুড়ে অবিশ্বাস্য মাত্রার সহিংসতা, ধ্বংস আর মৃত্যুর কারণ। এগুলোও তার আলোচনায় কখনো উঠে আসে না। মা'র নিজেকে উপস্থাপন করে একজন বস্তুনিষ্ঠ, নিরপেক্ষ বিশ্লেষক হিসেবে। যৌক্তিক চিন্তার শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যে সত্যকে আবিষ্কার করতে চায়। কিন্তু আসলে সে একজন প্রোপাগ্যান্ডিস্ট। বাইবেল হাতে চিৎকার করা যেসব কট্টর খ্রিষ্টানের সমালোচনা মা'র করে, সে নিজেও তাদের মতোই বস্তুনিষ্ঠতা এবং যৌক্তিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন। একমাত্র পার্থক্য হলো ক্রিশ্চিয়ানিটির বদলে মা'র লিবারেলিসমের দীক্ষা প্রচার করে।
একজন মুসলিম সংশয়বাদী এ ধরনের ভণ্ডদের অস্ত্র তাদের ওপরই ব্যবহার করে। লিবারেলিসম, জাতি-রাষ্ট্রের প্যারাডাইম, বিজ্ঞানবাদ, মানবতাবাদ, প্রগতিবাদের মতো মডার্নিস্ট বিশ্বাস আর মতবাদগুলোকে আজ বিনা প্রশ্নে মেনে নেয়া হয়। কিন্তু একজন মুসলিম কি এগুলো নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারে না? এগুলোর ব্যাপারে সংশয়বাদী হতে পারে না?
দান উল্টে দেয়া
ইসলামকে নিয়ে কিছু 'বিতর্কিত' এবং 'কঠিন' প্রশ্ন দেখা যাক—
* আল্লাহ, ফেরেশতা কিংবা আখিরাতের অস্তিত্বের কি কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে?
* ইসলামে নারীদের পর্দা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে কিন্তু পুরুষদের জন্য করা হয়নি কেন?
* আল্লাহ যদি পরম করুণাময় হন তাহলে পৃথিবীতে কেন মন্দ জিনিস ঘটে?
* আমাদের কি নিজের মতো করে সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি আছে?
* ইসলামী আইনে সমকামিতা কেন অবৈধ?
* মানুষের আদি উৎসের ব্যাপারে বিবর্তনবাদকে কেন অনেক মুসলিম মেনে নেয় না?
এসব প্রশ্নের ব্যাপারে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমরা অনেকেই বুঝি না। এই প্রশ্নগুলো শূন্য থেকে আসেনি। আজ থেকে ত্রিশ, পঞ্চাশ কিংবা পাঁচ শ বছর আগে এই প্রশ্নগুলো নিয়ে মুসলিমরা সমস্যায় ভুগত না। তাদের মনে এসব প্রশ্নের উদয়ও হতো না। এ প্রশ্নগুলো পনেরো শ থেকে একবিংশ শতাব্দীর বুদ্ধিবৃত্তিক সংস্কৃতির অংশ। এগুলোর পেছনে আছে গভীরে প্রোথিত পরস্পর সম্পর্কিত বিভিন্ন ধ্যানধারণা। আমাদের কাছে এসব প্রশ্ন 'কঠিন' মনে হয় কারণ প্রশ্নের পেছনের ধারণাগুলোকে আমরা দেখি না। এ ধারণাগুলোকে আমরা স্বতঃসিদ্ধ এবং স্বপ্রমাণিত সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছি।
মুসলিম সংশয়বাদীর কাজ হলো মাটি খুঁড়ে এই পূর্বধারণাগুলোকে বের করে আনা। সেগুলোকে প্রশ্ন করা, ব্যবচ্ছেদ করা। এসব প্রশ্নের হিসেব মেলানোর বদলে মুসলিম সংশয়বাদী চায় ভেঙে টুকরো টুকরো করে এগুলোকে অর্থহীন করে দিতে। এসব প্রশ্ন যেহেতু অনেক মুসলিমের ঈমানের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই এ ধরনের সংশয়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা একান্ত জরুরি।
প্রয়োগ
একটা সংক্ষিপ্ত উদাহরণ দেখা যাক।
আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্নের কথাই ধরুন। এ প্রশ্নের মুখোমুখি হলে আধুনিক সময়ের কিছু মুসলিম বক্তা বলবে আল্লাহর অস্তিত্বের পক্ষে কোনো অবজেক্টিভ প্রমাণ নেই।[১০৩] দিনশেষে ব্যাপারটা বিশ্বাসের। এখানে লিপ অফ ফেইথ আছে। বিশ্বাসের একটা ব্যাপার আছে।
কিন্তু মুসলিম সংশয়বাদীর এ প্রশ্নের মোকাবিলা করার ধরনটা আলাদা। প্রথম কাজ হবে 'অবজেক্টিভ' শব্দটাকে খুঁটিয়ে দেখা। অবজেক্টিভ বলতে কী বোঝানো হচ্ছে? অবজেক্টিভিটির যে ধারণা আজ গ্রহণ করা হয় সেটার পেছনে বেশ জটিল এবং ইন্ট্রেস্টিং ইতিহাস আছে। কাজেই অবজেক্টিভিটির প্রচলিত সংজ্ঞাকে বিনা প্রশ্নে স্বতঃসিদ্ধ এবং স্বপ্রমাণিত হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
মুসলিম সংশয়বাদী তারপর প্রমাণের ওই মাপকাঠিগুলো নিয়ে চিন্তা করবে স্রষ্টায় বিশ্বাস নাকচ করার জন্য যেগুলো আজ ব্যাপকভাবে গৃহীত-যেমন বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। এই মাপকাঠিগুলোর ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয় কি না, সেটা সে পর্যালোচনা করবে। যেমন- বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকার কারণে আমরা যদি স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করি, তাহলে আমরা কি সময়ের ধারা (passage of time), মানবীয় চেতনা (human consciousness), আর বিমূর্ত বিভিন্ন গাণিতিক বস্তুকে (abstract mathematical entities) অস্বীকার করব? যেহেতু এগুলোরও কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই? কিংবা দৈর্ঘ্য-প্রস্থ-উচ্চতার বাস্তবতা নেই?
কেবল বৈজ্ঞানিক প্রমাণ না থাকার কারণে এসব জিনিসকে অস্বীকার করার মতো চরম অবস্থান অধিকাংশ মানুষ গ্রহণ করবে না। তার মানে হলো বৈজ্ঞানিক প্রমাণের মাপকাঠি সবক্ষেত্রে প্রযোজ্য না, এটাকে আসলে খুব সীমিত পরিসরে কাজে লাগানো যায়। অতএব, এ ধরনের মাপকাঠির ভিত্তিতে স্রষ্টার অস্তিত্বের ব্যাপারে টানা উপসংহার গ্রহণযোগ্য না।
বিজ্ঞানের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের মতো ব্যাপকভাবে গৃহীত এবং সযত্নে লালিত বিশ্বাসগুলোর ব্যবচ্ছেদ করতে একজন মুসলিম সংশয়বাদী দ্বিধাবোধ করে না। আর এভাবে প্রশ্নের পেছনে থাকা পূর্বধারণা আর পূর্বানুমানগুলোকে সে সামনে নিয়ে আসে।
উপসংহার
নিঃসন্দেহে সংশয়বাদ একটা নেতিবাচক এবং ব্যবচ্ছেদমূলক প্রক্রিয়া। এর উদ্দেশ্য যুক্তির আঘাতে আধুনিক যুগের মূর্তিগুলো ভাঙা। যাতে মানুষ সত্যের আলো দেখতে পায়। এই অর্থে সবচেয়ে বড় মুসলিম 'সংশয়বাদীদের' একজন ছিলেন ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম। তিনি অত্যন্ত চমৎকারভাবে মুশরিকদের বিশ্বাসের অসাড়তা তুলে ধরেছিলেন। নক্ষত্রপূজারি মুশরিকের বিশ্বাসের অসামঞ্জস্যতা এবং অর্থহীনতা তুলে ধরার জন্য তিনি তাদের কথোপকথনের ধাঁচ কিছুটা অনুকরণ করেছিলেন।
মহান আল্লাহ কুরআনে আমাদের জানিয়েছেন- আর এভাবেই আমি ইবরাহীমকে আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব দেখাই এবং যাতে সে দৃঢ় বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়। রাতের আঁধার যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন সে নক্ষত্র দেখতে পেল, (তখন) বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক। কিন্তু যখন তা অস্তমিত হলো, সে বলল, যা অস্তমিত হয়ে যায় তার প্রতি আমার কোনো অনুরাগ নেই। অতঃপর সে যখন চন্দ্রকে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে দেখল তখন বলল, এটা হচ্ছে আমার প্রতিপালক। কিন্তু যখন তা অস্তমিত হলো তখন সে বলল, আমার প্রতিপালক যদি আমাকে সঠিক পথের দিশা না দেন তাহলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব। অতঃপর যখন সে সূর্যকে অতি উজ্জ্বল হয়ে উদিত হতে দেখল তখন বলল, এটাই হচ্ছে আমার প্রতিপালক, এটাই হচ্ছে সব থেকে বড়। অতঃপর যখন তা অস্তমিত হলো তখন সে বলল, হে আমার জাতির লোকেরা, তোমরা যেগুলোকে (আল্লাহর) অংশীদার স্থির করো সেগুলোর সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি একনিষ্ঠ হয়ে তাঁর দিকে আমার মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছি, যিনি আকাশমণ্ডলী আর পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছেন। আর আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। আর তার কওম তার সাথে বাদানুবাদ করল। সে বলল, তোমরা কি বাদানুবাদ করছ আমার সাথে আল্লাহর ব্যাপারে, অথচ তিনি আমাকে হিদায়াত দিয়েছেন? তোমরা তাঁর সাথে যা শরীক করো, আমি তাকে ভয় করি না, তবে আমার রব যদি কিছু করতে চান। আমার রব ইলম দ্বারা সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে আছেন। অতঃপর তোমরা কি উপদেশ গ্রহণ করবে না?' তোমরা যা শরীক করেছ কীভাবে আমি তাকে ভয় করব? অথচ তোমরা ভয় করছ না যে, তোমরা শরীক করেছ আল্লাহর সাথে এমন কিছু, যার পক্ষে তিনি তোমাদের ওপর কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। অতএব কোন দল নিরাপত্তার বেশি হকদার, যদি তোমরা জানো?' যারা ঈমান এনেছে এবং নিজ ঈমানকে যুলমের সাথে সংমিশ্রণ করেনি, তাদের জন্যই নিরাপত্তা এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। আর এ হচ্ছে আমার দলীল, আমি তা ইবরাহীমকে তার কওমের ওপর দান করেছি। আমি যাকে চাই, তাকে মর্যাদায় উঁচু করি। নিশ্চয় তোমার রব প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ। [তরজমা, সূরা আল-আন'আম, ৭৫-৮৩]
মুশরিকদের বিশ্বাসের অসংলগ্নতা প্রমাণের জন্য ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম নক্ষত্র, চাঁদ এবং সূর্যের ব্যাপারে তাদের কথার বলার ধাঁচ অনুকরণ করেছিলেন। মুসলিম ইতিহাসে এমন অনেক মুসলিম সংশয়বাদী ছিলেন, যারা বিপজ্জনক নানা দর্শনের পর্যালোচনা, সমালোচনা, ব্যবচ্ছেদ এবং ভিত ধ্বংস করার জন্য নানান যৌক্তিক কৌশল কাজে লাগিয়েছিলেন। হারিয়ে যাওয়া এই শিল্পকে আমাদের পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। বিশেষ করে আমরা যখন এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে আছি, যা ইসলামের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন।
হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু রেটোরিকালি প্রশ্ন করেছিলেন—
আমরা কি হকের ওপর নই?
নিঃসন্দেহে আমরাই হকের ওপর আছি। সময় এসেছে সে আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করার।

টিকাঃ
[১০১] উল্লেখ্য, আমি এখানে ফিলোসফিকাল স্কেপটিকদের কথা বলছি না, যারা কোনো কিছু আসলে জানা সম্ভব কি না, সেটা নিয়েই প্রশ্ন তোলে।
[১০২] বিল মা'র (Bill Maher)-বিখ্যাত মার্কিন কমেডিয়ান, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং টকশো উপস্থাপক।
[১০৩] অর্থাৎ তাদের বক্তব্য হলো-আল্লাহর অস্তিত্বের পক্ষে এমন কোনো প্রমাণ নেই, যা স্থান-কাল-পাত্রের সীমানা থেকে মুক্ত। যা সর্বজনীন ও স্বতন্ত্রভাবে সত্য। যেমন, অনেকে বলতে পারে, সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে, এটা স্বতন্ত্রভাবে সত্য। এটা প্রমাণ করে দেখানো সম্ভব। এখানে ব্যক্তিগত মতামত আবার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আল্লাহর অস্তিত্বের এমন কোনো স্বতন্ত্র, স্বাধীন প্রমাণ নেই।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00