📄 ধ্বংসের গুরুত্ব
যখন আমি ছোট ছিলাম বাসায় বিভিন্ন হোম প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে হতো। ঘর রং করা, নতুন করে মেঝে বসানো, ঘরের টুকটাক মেরামত, এসব আরকি। বাবা এসব করতে খুব ভালোবাসতেন, আর অবধারিতভাবে আমারও হাত লাগাতে হতো। কাজগুলো যে খুব একটা উপভোগ করতাম তা না, তবে এগুলো করতে গিয়ে অনেক কিছু শিখেছি।
একদম প্রথম দিকে বাবা একটা জিনিস শিখিয়েছিলেন। নতুন যেকোনো প্রজেক্ট শুরু করতে হয় পরিষ্কার, খালি জায়গা থেকে। ধরুন, বাসার কোনো একটা দেয়ালে নতুন করে রং করবেন। প্রথমে ঘষে ঘষে পুরোনো রং তুলে ফেলতে হবে। দেয়ালের ফুটো, ভাঙাচোরা, এসব ঠিক করতে হবে। তারপর নতুন রং লাগাতে পারবেন। এই কাজগুলো না করে পুরোনো রঙের ওপর নতুন করে রং চড়িয়ে দিলে অল্প ক'দিন পরই তা খসে পড়তে শুরু করবে। জায়গায় জায়গায় চলটা উঠবে। দেখবেন দেয়ালটা দেখতে আগের চেয়েও বাজে দেখাচ্ছে।
অ্যামেরিকা অনেক বাসাতে মেঝে হয় কাঠের। এগুলোকে 'ডেক' বলা হয়। রং করার মতো নতুন ডেক বসানোর সময়ও একই নিয়ম। প্রথম কাজ হলো পুরোনো কাঠামো ভেঙেচুরে, টুকরো টুকরো করে, প্রয়োজনে ধ্বংস করে জায়গাটা পরিষ্কার করা। সমান করে নেয়া। তারপরই কেবল নতুন করে শক্তপোক্ত, দীর্ঘস্থায়ী কিছু বানাতে পারবেন। আগের নড়বড়ে কাঠামো রেখে দিয়ে সেটার ওপর নতুন কিছু তৈরির যৌক্তিকতা নেই। এতে তেমন কোনো লাভও হবে না। পুরোনো কাঠামোর ওপর নতুন করে যা বানাবেন তা আগের মতোই নড়বড়ে হবে। যেকোনো সময় ধসে পড়া আশঙ্কা থাকবে।
পুরোনো কাঠামোর ওপর নতুন করে কিছু বানানোর আরও ঝামেলা আছে। যা-ই বানাবেন, পুরোনো কাঠামোর দৈর্ঘ্য-প্রস্থ, মাপ ইত্যাদি মাথায় রেখে বানাতে হবে। নিজের পছন্দ আর প্রয়োজনের চেয়ে আগের কাঠামোর সীমানাগুলোকে প্রাধান্য দিতে হবে। কারণ, আপনাকে এমন কিছু একটা বানাতে হবে, যা আগের কাঠামোর সাথে খাপ খাবে। কাজেই আগের কাঠামোর সীমানার মধ্যেই আপনাকে থাকতে হবে।
আধুনিক সময়ের বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় বর্তমানের আলিমদের যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সে ক্ষেত্রেও ওপরের কথাগুলো খাটে। পুরোনো, রংওঠা, জীর্ণশীর্ণ কাঠামো হলো মডার্নিসম এবং এর সাথে যুক্ত বিভিন্ন মতবাদ-লিবারেলিসম, সায়েন্টিসম, নারীবাদ, সেক্যুলারিসম ইত্যাদি। এ মতবাদগুলোকে ভেঙেচুরে ঝেটিয়ে বিদায় করে তারপর পরিষ্কার, সমান মাটিতে নতুন কাঠামো বানাতে হবে। এগুলোর ওপর নতুন কিছু বানালে, সেই কাঠামো যতই মুনশিয়ানার সাথে তৈরি করা হোক না কেন, দিনশেষে সেটা হবে নড়বড়ে এবং পতনোন্মুখ। কিন্তু পচন ধরা, পুরোনো কাঠামো বাদ দিয়ে নতুন করে যদি শুরু করা হয়, তাহলে দীর্ঘস্থায়ী, সত্যিকারের মাস্টারপিস বানানো সম্ভব, বিইযনিল্লাহ।
এ জন্যই পূর্ববর্তী আলিমদের কাজে এত বারাকাহ ছিল। তারা নির্মাণ করেছিলেন শক্ত মাটির ওপর। তাদের ভিত্তি ছিল সালাফুস সালেহিনের রেখে যাওয়া জ্ঞান, আর সেই জ্ঞানের উৎস ছিল কুরআন ও সুন্নাহ। যা অটল, অবিচল, নিখুঁত, পরিপূর্ণ। এ জন্যই তারা তৈরি করতে পেরেছিলেন ইসলামী জ্ঞানের বুদ্ধিবৃত্তিক আর আত্মিক অর্জনের তুলনাহীন মনুমেন্ট।
আধুনিক যুগের শুরুর দিকে মুসলিমরা রাজনৈতিক শক্তি হারিয়ে ফেলে। ইউরোপীয় মডার্নিস্ট দর্শনের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে বিশ্বজুড়ে। মুসলিম-বিশ্বেও এর প্রভাব পড়ে। মুসলিম আলিমদের আলোচনা এবং কাজ এ সময় থেকেই প্রতিক্রিয়াশীল হতে শুরু করে। একদিকে এসব মতবাদের জবাব দেয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়। অন্যদিকে সামাজিক, রাজনৈতিক চাপ, কিংবা দখলদার ইউরোপিয়ান আর তাদের এজেন্টদের জবরদস্তির কারণে এসব মতবাদের আলোকে অনেকে নিজেদের বক্তব্য উপস্থাপন করতে শুরু করেন। এভাবে জ্ঞাতসারে কিংবা অজ্ঞাতে, একসময় এই মতবাদগুলো প্রভাবিত করতে শুরু করে ইসলামী স্কলারশিপকে। ফলে এই পচন ধরা কাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে ওঠে ইসলাম আর মুসলিম-বিশ্বের পুনরুত্থানের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে অনেক চিন্তাধারা।
এই পচন ধরা ক্ষয়ে যাওয়া কাঠামোকে ভেঙেচুরে, টুকরো টুকরো করতে হবে। ঝেটিয়ে বিদায় করতে হবে আবর্জনা। তারপর আমরা নতুন করে আত্মবিশ্বাসের সাথে তৈরি করতে পারব। বিশ্বকে দেখাতে পারব, কোনো কিছুই দ্বীন ইসলামের রাজকীয় সৌন্দর্য আর বিস্ময়কর দীপ্তির সমকক্ষ হতে পারে না।
টিকাঃ
📄 পরিশুদ্ধি
অন্তরের অসুখের মতো চিন্তার অসুখও মানুষের মধ্যে বাসা বাঁধে। ইসলামী চিন্তায় অন্তর এবং আক্কল অবিচ্ছেদ্য এবং অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। একটি অন্যটিকে প্রভাবিত করে। যেমন, ঔদ্ধত্য আর অহংকারকে সাধারণভাবে অন্তরের অসুখ মনে করা হয়। কিন্তু অহংকার মানুষের চিন্তাকেও প্রভাবিত করতে পারে। ঔদ্ধত্য আর অহংকার সত্য চেনা এবং অনুধাবনের ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। দেখার সক্ষমতাকেও প্রভাবিত করে। সত্য একদম সামনে থাকার পরও মানুষ অনেক সময় তা চিনতে পারে না। ঔদ্ধত্য আর অহংকার তার দৃষ্টিকে অন্ধ করে দেয়। আমাদের চারপাশের অনেক মানুষ এ কারনেই মৌলিক কিছু সত্যকে চিনতে পারে না।
একই কথা প্রযোজ্য হিংসা, লোভ এবং ঘৃণার ক্ষেত্রেও। এ অসুখগুলো শুধু মানুষের মনকে দূষিত করে না; বরং গ্রাস করে ফেলে মানুষের পুরো সত্তাকে। একসময় দূষিত করে ফেলে মানুষের চিন্তা করার ক্ষমতাকে। অনেক কথিত মুসলিম 'সংস্কারক' এর কথা আর কাজে এই অসুখগুলোর স্পষ্ট চিহ্ন দেখা যায়। আল্লাহ আমাদের এই অসুখ থেকে হেফাযত করুন।
বিশুদ্ধ অন্তর মানুষকে প্রস্তুত করে সত্য এবং হিদায়াতের আলো ধারণ করার জন্যে। কিন্তু অন্তরের মতো আক্কলও অসুস্থ হতে পারে। তাই সত্য এবং হিদায়াতের আলোকে পুরোপুরিভাবে ধারণ করার জন্য অন্তরের মতো আকলকেও পরিশুদ্ধ করা জরুরি।
টিকাঃ
📄 আধুনিকতার মাঝে ইসলামকে বোঝার মূলনীতি
আধুনিকতার মাঝে ইসলামকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হলে একটা মূলনীতি বোঝা জরুরি। বিস্তর সেক্যুলার জ্ঞান এবং অনেক সময় ইসলামী জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও খুব কম মানুষ এই নীতিটা ঠিক মতো বোঝেন। এই নীতি হলো— মানুষ যা কিছুকে সত্য আর বাস্তব বলে দাবি করে, তার সবকিছু আসলে সত্য বা বাস্তব না।
অনেক মানুষ মিলে কোনো বিষয়কে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে। সেটা ব্যাপকভাবে প্রচার করে। নিজেরাও সেটাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে। অথচ আদতে সেটা সত্য না; বরং তাদের কল্পনাজাত সৃষ্টি।
এটা কীভাবে ঘটে?
ইতিহাসে আসলে অনেকবার অনেকভাবে এ ব্যাপারটা ঘটেছে। অসংখ্য উদাহরণ আছে। সবচেয়ে সহজ উদাহরণ হলো ধর্ম। অনেক সমাজ, জাতি এবং সভ্যতা মিথ্যা উপাস্যদের ওপর ঈমান এনেছে। মিথ্যা বিশ্বাসের ওপর বিভিন্ন ধর্ম গড়ে উঠেছে। অথচ এই বিশ্বাসগুলোর পেছনে কুসংস্কার আর খেয়ালখুশি ছাড়া অন্য কিছু নেই।
তবে এ ধরনের ভুল বিশ্বাস শুধু ধর্মের মধ্যে সীমাবদ্ধ না। অন্যান্য ক্ষেত্রেও এমন ঘটে। একটা উদাহরণ দেখা যাক, যা ধর্মের বলয়ের বাইরে। পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানের কথা চিন্তা করুন। এমন অনেক তত্ত্ব আছে পরীক্ষালব্ধ বিজ্ঞানের ভিত্তিতে যেগুলো একসময় সত্য মনে করা হতো। কিন্তু কিছুদিন পর সেগুলো বাদ দেয়া হয়। আমাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজির ক্ষেত্রে এমন অনেক উদাহরণ আছে।
ইথারের[১০০] কথা শুনেছেন? কিংবা ফ্লোজিস্টন? অথবা করপাস্কলস?
এগুলোর অস্তিত্ব কিন্তু একসময় 'পরীক্ষালব্ধ'ভাবে প্রমাণিত ছিল। অর্থাৎ এ ধরনের কিছু আছে বলে থিওরি কিংবা হাইপোথিসিস তৈরি হয়েছিল। তারপর সেই থিওরি বা হাইপোথিসিসের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। পরীক্ষার ফলাফল দেখে উপসংহার টানা হয়েছিল, এই এনটিটিগুলোর অস্তিত্ব আছে। কিন্তু পরে একসময় এগুলোকে অস্তিত্বহীন বলে বাদ দেয়া হয়। তত্ত্ব দেয়া, পরীক্ষা করা, উপসংহার টানা, আবার তত্ত্ব-উপসংহার বাদ দেয়া, সবকিছু করেছিল বিজ্ঞানীরাই।
গবেষণা আর পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা সামষ্টিকভাবে উপসংহার টানল- ইথারের কিংবা ফ্লোজিস্টনের অস্তিত্ব আছে। কিন্তু একসময় দেখা গেল, এ রকম কিছু আসলে নেই। এগুলো আসলে কিছু মানুষের কল্পনাজাত সৃষ্টি কেবল। এটা কীভাবে ঘটল?
এ প্রশ্নের বিস্তারিত উত্তর নিয়ে আলোচনার সুযোগ এখানে নেই। তবে ঐতিহাসিক এ বাস্তবতা থেকে আমাদের বোঝা উচিত যে কোনো ভুলকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করার ব্যাপারটা মানব-ইতিহাসে নিয়মিত ঘটে। বিস্ময়কর রকমের ধারাবাহিকতার সাথে ঘটে। আর বিজ্ঞান আর গবেষণার 'যৌক্তিক' ও 'পরীক্ষালব্ধ' জগতেও ঘটে।
আসুন এ শিক্ষাটা অন্য কিছু ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যাক। রাজনীতি, নৈতিকতা এবং ন্যায়বিচারের আলোচনায় কিছু মূল্যবোধকে বাস্তব ও সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কিন্তু গবেষণালব্ধ বিজ্ঞানের মতো নিরেট জায়গাতেও যেখানে সামষ্টিকভাবে ভুল হতে পারে সেখানে নৈতিকতার মতো বিমূর্ত বিষয়ে ভুল হবার সম্ভাবনা কি আরও বেশি না? আজ ইসলামকে আক্রমণ করা হয় কারণ ইসলামের শিক্ষা আর বিধান এমন কিছু মূল্যবোধ আর ধ্যানধারণার সাথে খাপ খায় না, যেগুলোকে আধুনিক মানুষ চিরাচরিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করেছে।
• ইসলাম বাকস্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না।
• ইসলাম মুক্তচিন্তার স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম গণতন্ত্রের স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম যৌন স্বাধীনতার স্বীকৃতি দেয় না
• ইসলাম লিঙ্গ পরিবর্তন আর লৈঙ্গিক পরিচয় বদলানোর সুযোগ দেয় না!
এ রকম অনেক অভিযোগ আমরা শুনি।
কিন্তু এই ধ্যানধারণাগুলো যে সঠিক, এগুলোর যে বাস্তব ভিত্তি আছে তার প্রমাণ কী? এগুলোর যদি কোনো নৈতিক বৈধতা না থাকে, তাহলে কী হবে? হয়তো এ ধারণাগুলোও পশ্চিমা অ্যাকাডেমিয়া আর বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্যের অধীনে থাকা আধুনিক মানুষের সামষ্টিক কল্পনার ফসল মাত্র?
এই প্রশ্ন করতে শেখা এবং এসব ধারণার ব্যাপারে সংশয়বাদিতার অবস্থান গ্রহণ করা হলো সন্দেহ এবং সংশয় সমাধানের প্রথম ধাপ। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক মুসলিম আলিম এবং বুদ্ধিজীবী সংশয়বাদিতার এই অবস্থান একবারেই উপেক্ষা করে যান।
তারা আলোচনা শুরু করেন আসা এসব ধ্যানধারণা, মূল্যবোধ এবং নৈতিকতাকে বিনা প্রশ্নে মেনে নিয়ে। আর এটা একটা চরম পর্যায়ের বিপর্যয়।
কেন?
কারণ, তখন অবধারিতভাবে কিছু প্রশ্ন চলে আসবে। যেমন-মুক্তচিন্তা যদি সত্য, সঠিক হয়, এত ভালো কিছু হয়, তাহলে কুরআন এবং সুন্নাহতে কেন আমরা মুক্তচিন্তার কথা পাই না?
এ প্রশ্নের জবাবে, মুসলিম বুদ্ধিজীবীরা বলবে-হ্যাঁ, কুরআন-সুন্নাহয় মুক্তচিন্তার কথা আছে তো!
তারপর কুরআন, হাদীস এবং ক্ল্যাসিকাল আলিমদের রচনাবলি চষে ছোটবড় এমন সবকিছু তারা একসাথে করবে, যেগুলোকে কোনো-না-কোনোভাবে ব্যাখ্যা করে মুক্তচিন্তার পক্ষে দলীল হিসেবে দেখানো যায়। অথবা মুক্তচিন্তার উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করা যায়।
কিন্তু তাদের এ পদ্ধতি ত্রুটিপূর্ণ। তারা বেছে-বেছে শুধু এই জিনিসগুলো আনছেন যেগুলো তাদের উপসংহারকে সমর্থন করে। কিন্তু তাদের আনা প্রত্যেকটা উদাহরণের বিপরীতে এমন দশটা উদাহরণ দেখানো যাবে যেখানে মুক্তচিন্তার ধ্যানধারণাকে নাকচ করা হয়েছে। কিন্তু সেই দশটা উদাহরণকে বাদ দিয়ে তারা ওই একটা উদাহরণকেই তুলে ধরবেন।
এটা যে সব সময় ইচ্ছাকৃতভাবে, কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা নিয়ে করা হয়, তা না। অনেক সময় হয়তো ওই আলিম বা বুদ্ধিজীবীর চোখে বিপরীত উদাহরণগুলো আসলেই ধরা পড়ে না। কারণ, তারা একটা নির্দিষ্ট লেন্সের ভেতর দিয়ে কুরআন ও সুন্নাহকে পড়তে এবং ব্যাখ্যা করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। এমন এক লেন্স চোখে দিয়ে তারা পড়ছেন যেটা ওইসব ধ্যানধারণা আর মূল্যবোধেরই রঙে রাঙানো, যেগুলো তারা কুরআন-সুন্নাহতে খুঁজছেন। ফলে একটা দুষ্টচক্র তৈরি হচ্ছে যেখান থেকে বের হয়ে আসা বেশ কঠিন। লেখা শেষ করার আগে শেষ একটা পয়েন্ট নিয়ে কিছু কথা বলি।
ওপরে আমি যা বলেছি তার বিপরীতে একটা কাউন্টার আরগুমেন্ট আসতে পারে।
একই ধরনের সংশয়বাদী অবস্থান তো ইসলাম আর ইসলামী মূল্যবোধের ব্যাপারেও নেয়া যেতে পারে। ইসলাম আর ইসলামী মূল্যবোধ যে সত্য, সঠিক, এগুলো যে বাস্তবতার ভিত্তির ওপর গড়ে ওঠা সেটা কেন আমরা ধরে নেব?
এ প্রশ্নের সহজ উত্তর হলো-আমরা আপনা-আপনি এটা ধরে নেব না। আমরা অনুসন্ধান করব। বিশ্লেষণ করব। চিন্তা করব। তবে আমাদের চিন্তার ভিত্তি হবে বৈধ বুদ্ধিবৃত্তিক উৎসগুলো। অর্থাৎ কুরআন, সুন্নাহ এবং পূর্ববর্তী আলিমদের অবস্থান। আমরা সতর্ক থাকব, যাতে ত্রুটিপূর্ণ কোনো ধ্যানধারণা বা বায়াস আমাদের চিন্তার জগতে ঢুকে না পড়ে। এটা হলো একদম প্রাথমিক ধাপ। এর সাথে অনুভব এবং অনুধাবন করারও প্রয়োজন আছে। এই অনুভূতি এবং অনুধাবন অর্জিত হয় ইবাদাত, যিকর, তিলাওয়াতের মতো ওই আমলগুলোর মাধ্যমে যেগুলো ইসলাম আমাদের পালন করতে বলে। ইসলাম একটি সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা, যা যৌক্তিকভাবে, আত্মিকভাবে এবং প্রামাণিকভাবে সত্য। পাশাপাশি যা বাস্তবতাকে চেনার সুযোগ দেয়। কারণ, জ্ঞানের এই তিনটি উৎস পরস্পর-সংযুক্ত।
তবে এখানে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ ধাপ আছে। আধুনিক বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি যারা গ্রহণ করে তারাও নিজেদের ধ্যানধারণার সত্যতা অনুধাবন আর অনুভব করার দাবি করে। প্রগাঢ় আবেগ নিয়ে তারা তাদের মূল্যবোধগুলো প্রচার করে। যেহেতু তারাও সত্যের স্বাদ পাবার দাবি করছে, তাহলে তাদের দাবিকে আমরা কীভাবে নাকচ করব? ব্যাপারটা আসলে খুব সহজ।
আমরা তাদের সযত্নে লালিত মূল্যবোধগুলোর ব্যবচ্ছেদ করব। এগুলোর অসামঞ্জস্য, অসংলগ্নতা, দ্বিমুখিতা তুলে ধরব। ধাপে ধাপে এগুলোর বাস্তবতা খুলে খুলে দেখাব, যাতে একসময় সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায় যে এই ধ্যানধারণাগুলো আসলে অন্তঃসারশূন্য। এসব ধারণা এবং মূল্যবোধ কোনো ধরনের সম্মান এবং গ্রহণযোগ্যতা পাবার যোগ্য না। অবশ্য এ কাজটা করার ক্ষেত্রে সবার দক্ষতা একইরকম হবে না। এই পদ্ধতির অনুপম, অনুকরণীয় আদর্শ হলেন আমাদের প্রিয় ইব্রাহীম আলাইহিস সালাম।
একবার যখন এ পদ্ধতিটা বুঝতে পারবেন তখন এর বিপরীত পথটাও চিনতে পারবেন। যেটা হলো অ্যাপোলোজেটিকস বা কৈফিয়তবাদী পদ্ধতি। এ পদ্ধতিতে মডার্নিস্ট ধ্যানধারণা এবং মূল্যবোধগুলোকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। তারপর কুরআন-সুন্নাহ আর আলিমদের রচনাবলি থেকে বেছে বেছে এমন কিছু অংশ নেয়া হয় যেগুলোকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে মডার্নিস্ট ধ্যানধারণা আর মূল্যবোধের পক্ষে দাঁড় করানো যায়।
ইন শা আল্লাহ এই দুই পদ্ধতিকে পাশাপাশি রাখলে আপনি বুঝতে পারবেন কৈফিয়তবাদী পদ্ধতি কতটা দুর্বল এবং অকার্যকর।
আল্লাহ আমাদের আন্তরিকভাবে সত্যসন্ধানী হবার তাউফিক দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
[১০০] ইথার (aether)-একসময় ধারণা করা হতো সমগ্র মহাবিশ্বজুড়ে ইথার নামক একটি পদার্থ আছে। ইথার শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন অ্যারিস্টটল। অ্যারিস্টটলের ধারণা ছিল ভূগোলকের বাইরে সমগ্র মহাবিশ্ব ইথারে পরিপূর্ণ। আলো যাকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে এক জায়গা থেকে অন্য যায়গায় চলাফেরা করে। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, আলো যেহেতু একধরনের তরঙ্গ, তাই আলো নিশ্চয় কোনো মাধ্যমের মধ্যে দিয়ে একস্থান থেকে অন্যস্থানে পৌঁছোয়। এই মাধ্যম হলো ইথার। যেভাবে বাতাসের মধ্য দিয়ে শব্দ সঞ্চারিত হয় ঠিক তেমনিভাবে ইথারের মধ্য দিয়ে আলো সঞ্চারিত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত ইথার তত্ত্ব অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী উইলিয়াম থম্পসন (কেলভিন) ১৮৮৪ সালে মন্তব্য করেন, 'ইথার হলো একমাত্র পদার্থ, যার ব্যাপারে গতিবিদ্যায় আমরা নিসংশয়। আমরা আলোকবাহী ইথারের বাস্তবতা এবং প্রকৃত অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত।' বলা হয়ে থাকে ১৯৮৭ সালের মাইকেলসন-মর্লি পরীক্ষার মাধ্যমে ইথার তত্ত্বের অবসান ঘটে।
ফ্লোজিস্টন (Phlogiston)-প্রাচীন গ্রিকদের ধারণা ছিল সব বস্তু ৪টি মূল উপাদান দিয়ে গঠিত : মাটি, বাতাস, পানি ও আগুন। দীর্ঘদিন এ ধারণা বৈজ্ঞানিক সত্য হিসেবে স্বীকৃত ছিল। ধারণা করা হতো দাহ্য বস্তুতে পথন একটি উপাদান থাকে, ফ্লোজিস্টন। দহনের সময় দাহ্য বস্তু থেকে ফ্লোজিস্টন বেরিয়ে যায়। বিজ্ঞানী অ্যান্টন ল্যাভয়সিয়ে ফ্লোজিস্টন তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করেন।
করপাস্কুলস (Corpuscles) - অষ্টাদশ শতাব্দীতে আইযাক নিউটন আলোর করপাসকুলার তত্ত্ব প্রস্তাব করেছিলেন। নিউটনের বক্তব্য ছিল আলো ছোট ছোট কণা বা করপাসকল দিয়ে তৈরি। এই করপাসকলের বা কনার ভর আছে। পরবর্তী ১০০ বছর আলোর প্রতিফলন, প্রতিসরণ, সরল পথে গমন, রংধনু সৃষ্টিসহ বেশ কয়েকটি আলোকীয় ঘটনাকে এ তত্ত্বের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা সম্ভব সম্ভবপর হয়।
📄 মুসলিম সংশয়বাদী হবার অর্থ কী?
একজন পশ্চিমা সংশয়বাদী কী করে? সে প্রশ্ন করে। যা কিছু তার নিজস্ব ধ্যানধারণার সাথে খাপ খায় না তার বিরুদ্ধে সে প্রশ্ন তোলে। আপত্তি করে। সে বিশ্বাস করে তার মন, বিবেক আর বুদ্ধি সত্যমিথ্যা এবং ভালো-মন্দ বিচারের চূড়ান্ত মাপকাঠি।
বলাবাহুল্য, এ ধারণা ভুল।
একজন মুসলিম সংশয়বাদী কী করে? সে প্রশ্ন করে। সে নিজেকে প্রশ্ন করে। নিজের কাজ, চিন্তা-ভাবনা এবং অনুভূতির যা কিছু ইসলামের সাথে খাপ খায় না, সেটার বিরুদ্ধে সে প্রশ্ন তোলে। আপত্তি করে। কারণ, সে জানে তার মন সীমিত। তার বুদ্ধিমত্তা সীমিত। তাই এগুলো কখনো সত্যের চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে না। সত্যের পরম, চূড়ান্ত মাপকাঠি হতে পারে কেবল ইসলামই।
মানুষ আজ বিভিন্ন ধ্বংসাত্মক, ভ্রান্ত ধ্যানধারণা আর মতবাদকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। যত্ন করে লালন করে, সেগুলোর জন্য লড়াই করে। এগুলোই হলো সত্যিকারের ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্র-উইপেনস অফ ম্যাস ডেস্ট্রাকশান। এ ধরনের 'সত্য'-এ বিশ্বাসী হবার চেয়ে সংশয়বাদী হওয়া হাজার গুণে ভালো।
টিকাঃ