📄 বিজ্ঞানে ‘বহুত্ববাদের’ স্থান নেই
এমন অনেক ক্ষেত্র আছে যেখানে মতবৈচিত্র্যের কোনো স্থান নেই। বহুত্ববাদের ধারণা সেখানে খাটে না। বিজ্ঞানের কথাই ধরুন। ধরে নেয়া হয়, বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রত্যেক প্রশ্নের কেবল একটা সঠিক উত্তর আছে। কোনো ব্যাপারে প্রাথমিক পর্যায়ে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী থিওরি থাকতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যেকোনো একটা থিওরিকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়। বিজ্ঞানীদের কাজ হলো বিশ্লেষণ, গবেষণা, অনুসন্ধানের মাধ্যমে সঠিক থিওরিটাকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করা।
কিন্তু ধর্মের ক্ষেত্রে আধুনিক মানুষের মনোভাব পুরোপুরি আলাদা। আমাদের শেখানো হয়, কোনো ধর্মকে পুরোপুরি সঠিক বা ভুল মনে করা যাবে না; বরং ধর্ম হলো ব্যক্তিগত পরিচয় আর অনুভূতির ব্যাপার। প্রত্যেক মানুষ নিজের মতো করে ধর্মকে অনুভব করে। ধর্ম তথ্যপ্রমাণ আর জ্ঞান নিয়ে কাজ করে না, তাই কোনো এক ধর্মকে সঠিক বা সত্য বলে বিবেচনা করা যায় না। ধর্মের ব্যাপারে কেউ এই 'সাবজেক্টিভিস্ট' দৃষ্টিভঙ্গি[৭১] গ্রহণ করলে তার মধ্যে কোনো-না-কোনোভাবে 'সব ধর্মই সত্য' মনে করার প্রবণতাও কাজ করতে পারে।
কিন্তু ধর্মের ব্যাপারে সব সময় এভাবে চিন্তা করা হতো না; বরং আজ যেভাবে বিজ্ঞানের ব্যাপারে মানুষ চিন্তা করে, ইতিহাসের অধিকাংশ সময়জুড়ে ধর্মকে দেখা হতো অনেকটা সেভাবে। মানুষ মনে করত, বাস্তবতাকে বোঝার মানে স্রষ্টাকে বোঝা, আর স্রষ্টাকে বোঝার মানে স্রষ্টা কী বলেছেন তা বোঝা জরুরি। এটা নিছক কাকতালীয় ব্যাপার না যে, সাধারণত অতীতে সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী এবং শিক্ষিত মানুষরা সবচেয়ে ধার্মিকও হতেন। আগেরকার যুগে বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে বিতর্কগুলো হত ধর্মতাত্ত্বিক বা আকীদাহগত বিষয়ে। যেমন খ্রিষ্টান এবং মুসলিমদের মধ্যে বিতর্ক হতো আল্লাহর প্রকৃতি, তাঁর বৈশিষ্ট্যসমূহ ইত্যাদি নিয়ে। কিন্তু আজকে যেসব বিতর্ক হয়, সেখানে বিতর্কের বিষয়বস্তু থাকে নৈতিকতার বিভিন্ন ধারণা, যেমন মানবাধিকার, নারী অধিকার, পরমতসহিষ্ণুতা ইত্যাদি।
এখানে একটা বিষয় বলে রাখা দরকার। ধর্মের ব্যাপারে অবজেক্টিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি[৭২] গ্রহণ করা মানে সহিষ্ণুতার বিরুদ্ধে যাওয়া না। কেউ যদি মনে করে তার ধর্মই সঠিক, অন্য সব ধর্ম ভুল, তার মানে এটা না যে সে অন্য ধর্মের লোকের প্রতি অসহিষ্ণু হবে।
দেখুন, আধুনিক সেক্যুলার সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপারে অবজেক্টিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে। কিন্তু তবুও ওইসব লোকের প্রতি সহিষ্ণুতা দেখানো হয় যারা বিজ্ঞানের ব্যাপারে অজ্ঞ অথবা একেবারে ভুল ধারণা রাখে। তবে কারও ভুল বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস অন্যের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ালে সমাজ সেখানে সীমা টানে। উল্লেখ্য, এখানে 'ক্ষতি'র সংজ্ঞা ঠিক করা হয় ওই সময়ে কোনো বৈজ্ঞানিক প্যারাডাইমকে সঠিক মনে করা হচ্ছে তার সাপেক্ষে। ভ্যাকসিন নিয়ে বিতর্ক এর একটা ভালো উদাহরণ। শিশুদের ওপর ভ্যাকসিনের প্রভাব ভালো নাকি মন্দ, এটা নিয়ে মানুষ যা ইচ্ছে তা-ই বিশ্বাস করতে পারে। কিন্তু একসময় সরকারকে টীকাদান বাধ্যতামূলক করার ম্যান্ডেট দেয়া হলো। সরকার বলল প্রত্যেক শিশুকে টীকা দিতে হবে। কারণ, তখন ধরে নেয়া হয়েছিল, মানুষ যদি ভ্যাকসিনের ব্যাপারে তাদের 'ভুল বৈজ্ঞানিক বিশ্বাস'গুলো আঁকড়ে ধরে রাখে, তাহলে একটা নির্দিষ্ট সীমার পর সমাজের ওপর সেটার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
হয়তো ইসলামের সহিষ্ণুতাকেও আমরা একইভাবে দেখতে পারি। ইহুদী, খ্রিষ্টান এবং অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি মুসলিম এবং ইসলামের সহিষ্ণুতার বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। কর্তৃত্বশালী প্যারাডাইমের-অর্থাৎ ইসলাম-অবস্থান থেকে ভুল মনে করা হয়, এমন কোনো বিশ্বাস বা অবস্থান নেয়ার সুযোগ ছিল। তবে সেই সহিষ্ণুতার একটা সীমা ছিল। আজকের সেক্যুলার সমাজের ব্যাপারটাও একইরকম। যদিও আমরা বিষয়টাকে ওইভাবে দেখি না।
টিকাঃ
[৭১] Subjective থেকে। বাংলায়-ব্যক্তিক, আত্মবাদী। ধর্মের ব্যাপারে সাবজেক্টিভিস্ট দৃষ্টিভঙ্গির উপসংহার হলো, কোন ধর্ম সঠিক (আর কোন ধর্ম ভুল) সেটা জানার কোনো সর্বজনীন, ধ্রুব, বস্তুনিষ্ঠ উপায় নেই অথবা এবং এ প্রশ্নের আদৌ কোনো সঠিক উত্তর নেই। স্থান-কাল-পাত্র-সমাজ-সভ্যতা ভেদে একেক সময় একেক ধর্মকে সঠিক হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সব একইভাবে সঠিক কিংবা ভুল। যে যেটাকে সত্য মনে করে তার জন্য সেটাই সঠিক। - অনুবাদক
[৭২] সাবজেক্টিভিস্ট অবস্থানের বিপরীত। অর্থাৎ ধর্মের ক্ষেত্রে অবজেক্টিভিস্ট অবস্থান হবে: সত্য ধর্ম আছে, কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্ম, নৈতিকতার মানদণ্ড, বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গি, স্বতন্ত্র ও স্বাধীনভাবে সঠিক, ইত্যাদি। - অনুবাদক
📄 বিজ্ঞানের বাস্তবতা
একজন অন্ধ, বধির, বোবা লোকের কথা চিন্তা করুন। তার জন্য দুনিয়াকে জানার একমাত্র মাধ্যম স্পর্শ। ধরুন, তার অবস্থা আরও খারাপ। চারপাশের দুনিয়াকে সে সরাসরি স্পর্শ করতে পারে না। তার হাতে একটা সুঁই ধরা। বিভিন্ন জিনিসের ওপর সুঁইয়ের ডগা ঘষে সে স্পর্শের অনুভূতি পায়। তার জন্য এই ছোট্ট সুইয়ের ছোট্ট ডগা হলো মহাবিশ্বের সুবিস্তৃত বাস্তবতাকে জানার একমাত্র উপায়। একমাত্র জানালা।
এই মানুষটা যদি তার নিজের মতো করে বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে তাহলে সেটা আমাদের কাছে কত অদ্ভুত শোনাবে চিন্তা করুন। নিজের কাছে থাকা অতি সীমিত তথ্য দিয়ে পৃথিবী, মহাবিশ্ব, মানবজাতির অস্তিত্বের অর্থের মতো বিষয়গুলো সে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবে। যদি সে দাবি করে, তার সুইয়ের ডগা দিয়ে যা অনুভব করা যায় শুধু ওই জিনিসগুলোরই অস্তিত্ব আছে-তাহলে সবাই খুব আমোদিত হবে।
আচ্ছা এবার চিন্তা করুন, লোকটার হাতে সুঁই নেই। তার হাতে একটা সুতো আছে। বিভিন্ন জিনিসের ওপর এই সুতো টেনে টেনে সে বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে। বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান আর পর্যবেক্ষণের অবস্থা হলো এই সুতো টানা মানুষের মতো।
কথাটা শোনাতে অদ্ভুত মনে হতে পারে, কিন্তু আমি একটুও বাড়িয়ে বলছি না। তড়িৎচৌম্বকীয় বর্ণালীর খুব অল্প এক ফালি মানুষের কাছে দৃশ্যমান। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে এমন কিছু তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ আমরা সনাক্ত করতে পারি, যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা পারতেন না, যেমন ইনফ্রারেড রশ্মি, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স রশ্মি, গামা রশ্মি ইত্যাদি। হয়তো তথ্যের এমন আরও অনেক পথ আছে বা অস্তিত্বের এমন অনেক স্তর আছে, প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে যেগুলোর ব্যাপারে আমাদের কোনো ধারণা নেই। আপনার কাছে অদ্ভুত মনে হলেও এমন কিছু যে আসলে নেই, সেটা আমরা কীভাবে নিশ্চিত হচ্ছি?
আমাদের উপলব্ধি করার ক্ষমতা নিয়ে ভেবে দেখুন। কী জানি না, সেটা জানার কোনো উপায়ও আমাদের নেই। ভাগ্য ভালো হলে পথ চলার সময় হোঁচট খেতে খেতে আমরা নতুন কিছু আবিষ্কার করি। জানতে পারি, মহাবিশ্বের বিশালতার তুলনায় আমাদের এই পৃথিবী অত্যন্ত ক্ষুদ্র। অথচ এই ছোট্ট পৃথিবীর ব্যাপারেও অনেক কিছু এখনো আমাদের অজানা। কাজেই আমরা যে এখনো বাস্তবতার ব্যাপারে মোটাদাগে অন্ধকারেই আছি, এটা মনে করা খুব একটা অযৌক্তিক হবে না।
এবার আমাদের মানসিক সক্ষমতার কথা ভাবুন। মানুষের উপলব্ধি করার ক্ষমতা অবধারিতভাবে তার মস্তিষ্কের তথ্য 'প্রক্রিয়াকরণের' ক্ষমতার সাথে যুক্ত। কোনো তথ্য সচেতনভাবে উপলব্ধি করার জন্য আগে সেটা প্রসেস করতে হবে। এমন কি হতে পারে যে আমাদের পঞ্চ-ইন্দ্রিয় কিছু কিছু জিনিসের অস্তিত্ব অনুভব করে বা সনাক্ত করতে পারে, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক সেগুলো 'দেখতে' পায় না? এ প্রশ্নের উত্তর দেয়াও আমাদের পক্ষে সম্ভব না, কারণ কোনো কিছু 'মিস' করছি কি না, মস্তিষ্কের 'বাইরে' বের হয়ে সেটা যাচাই করার ক্ষমতা আমাদের নেই।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই চরম সীমাবদ্ধতার কথা বিজ্ঞান পরোক্ষভাবে স্বীকার করে। আধুনিক বিজ্ঞানের ঐকমত্য অনুযায়ী মানুষ বিবর্তিত বানর (ape) ছাড়া আর কিছু না। আমাদের উপলব্ধি আর চিন্তাশক্তি নাকি বিবর্তিত হয়েছে খাবার উপযোগী ফল আর প্রজননের সম্ভাব্য সাথি খুঁজে বের করার জন্যে। এটা বিজ্ঞানেরই কথা। আবার সেই একই বিজ্ঞান ধরে নিচ্ছে বানর-জীবনের দৈনন্দিন কাজ চালানোর জন্য বিবর্তিত এই মস্তিষ্ক আর চিন্তাশক্তি নাকি মহাবিশ্বের গভীরতা অনুসন্ধান, অস্তিত্বের তাৎপর্য নিয়ে ভাবা, মানবপ্রকৃতি থেকে শুরু করে নৈতিকতার জৈবিক উৎস নিয়ে দার্শনিক আলাপে মেতে ওঠার জন্য উপযুক্ত।
ব্যাপারটা হাস্যকর রকমের ঔদ্ধত্যপূর্ণ না?
টিকাঃ
📄 বাস্তবতার বর্ণনায় ইসলাম ও বিজ্ঞানের সংঘাত
কুরআন এবং হাদীসে এমন বক্তব্য এসেছে যেগুলো থেকে মনে হয় পৃথিবী সূর্যের চারদিকে আবর্তিত হয় না। সূরা কাহফের এ আয়াতটির কথা চিন্তা করুন, চলতে চলতে যখন সে (যুলকারনাইন) সূর্যের অস্তগমন-স্থানে পৌঁছল তখন সে সূর্যকে এক পঙ্কিল পানিতে অস্ত যেতে দেখল এবং সে সেখানে এক সম্প্রদায়কে দেখতে পেল; আমি বললাম: হে যুলকারনাইন, তুমি তাদের শাস্তি দিতে পারো অথবা তাদের সদয়ভাবে গ্রহণ করতে পারো। [তরজমা, সূরা আল-কাহফ, ৮৬]
এবং নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এই হাদীসটি,
একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কি জানো, এ সূর্য কোথায় যায়? সাহাবীগণ বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন। তিনি বললেন: এ সূর্য চলতে থাকে এবং (আল্লাহ তা'আলার) আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত হয়ে পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও! অনন্তর সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল দিয়েই উদিত হয়। তা আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থানস্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই উদিত হয়।
সে আবার চলতে থাকে এবং আরশের নিচে অবস্থিত তার অবস্থান-স্থলে যায়। সেখানে সে সিজদাবনত অবস্থায় পড়ে থাকে। শেষে যখন তাকে বলা হয়, উঠো এবং যেখান থেকে এসেছিলে সেখানে ফিরে যাও। তখন সে ফিরে আসে এবং নির্ধারিত উদয়স্থল হয়েই সে উদিত হয়। এমনিভাবে চলতে থাকবে; মানুষ তার থেকে অস্বাভাবিক কিছু হতে দেখবে না। শেষে একদিন সূর্য যথারীতি আরশের নিচে তার নির্দিষ্ট-স্থলে যাবে। তাকে বলা হবে, উঠো এবং অস্তাচল থেকে উদিত হও। অনন্তর সেদিন সূর্য পশ্চিম গগনে উদিত হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোন দিন সে অবস্থা হবে তোমরা জানো? সে দিন ওই ব্যক্তির ঈমান কোনো কাজে আসবে না, যে ব্যক্তি পূর্বে ঈমান আনেনি কিংবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন করেনি।[৭৩]
এই আয়াত এবং হাদীসগুলোকে কীভাবে বোঝা উচিত? এগুলোকে রূপক বলে দেয়া সোজা। হয়তো আসলেই এই আয়াত এবং হাদীসে কিছুটা রূপকার্থে বলা হয়েছে। কিন্তু ঢালাওভাবে সবগুলোকে রূপক বলার সিদ্ধান্ত একটু নড়বড়ে বলে মনে হয়। আর কোনো বিকল্প কি নেই?
ধরুন, মহাবিশ্বের ব্যাপারে দুজন মানুষের জ্ঞান সমানভাবে সঠিক। দুজন দুইভাবে তাদের জ্ঞান প্রকাশ করে। একই জিনিসের বর্ণনা দেয়ার সময় দুজন আলাদা ধরনের ভাষা, ছবি এবং ধারণা ব্যবহার করে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে আক্ষরিকভাবে কোনো কিছু বর্ণনা দেয়ার সময়ও এ দুজনের ভাষা এবং বর্ণনা আলাদা হতে পারে।
একটা সহজ উদাহরণ দেখুন। সিংহের জন্য বেদুইন আরবদের অনেক নাম আছে। বরফ বোঝানোর জন্য এস্কিমোরা অনেক ধরনের শব্দ ব্যবহার করে। সিংহের ব্যাপারে আরব বেদুইন কিংবা বরফের ব্যাপারে একজন এস্কিমো যেভাবে কথা বলে, একজন প্রাণীবিদ কিংবা আবহাওয়াবিদ সেভাবে কথা বলে না। তার মানে কিন্তু এই না যে আরব বা এস্কিমো রূপক অর্থে কথা বলছে আর প্রাণীবিদ বা আবহাওয়াবিদ আক্ষরিকভাবে বর্ণনা দিচ্ছে। সবাই আক্ষরিকভাবে কথা বলছে, কিন্তু আরব-এস্কিমোদের ভাষায় এমন কিছু ধারণা আছে, যেগুলো আধুনিক বিজ্ঞানীদের ভাষা এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কাঠামোর মধ্যে অনুপস্থিত। আবার এর উল্টোটাও সত্য।
আধুনিক সময়ের মানুষ এটা ধরে নিতে অভ্যস্ত যে বিজ্ঞানের ভাষা পরিপূর্ণভাবে বাস্তবতার বর্ণনা দেয়। কিন্তু আমরা—মুসলিমরা এটা মেনে নিতে বাধ্য না। এটা মেনে নেয়া আবশ্যিক না এবং এটা মেনে নেয়া উচিতও না, কারণ বিজ্ঞানের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে।
ব্যাপারটার আরও গভীরে যাওয়া যায়। মনে করুন, দুজনের মানুষের মধ্যে প্রথম জন মহাবিশ্বের ব্যাপারে সঠিক জ্ঞান রাখে। দ্বিতীয় জন রাখে না, তবে সে মনে করে মহাবিশ্বের ব্যাপারে তার জ্ঞান সঠিক।
এবার আগের উদাহরণে ফিরে যাওয়া যাক। সিংহের ব্যাপারে বেদুইনের জ্ঞান শতাব্দীর পর শতাব্দী সিংহের সাথে একই পরিবেশে বসবাস করা অসংখ্য প্রজন্মের পুঞ্জীভূত অভিজ্ঞতার ফসল। অন্যদিকে প্রাণীবিদ ওই পরিবেশে আসে বাইরে থেকে, অল্প কিছুদিনের জন্য। কয়েক মাস ফিল্ডওয়ার্ক করে সে আবার বাড়ি ফিরে যায়। তাই এ দুজনের মধ্যে সিংহের ব্যাপারে বেদুইন যে আরও ভালো ধারণা রাখে সেটা বলা যেতে পারে। তা ছাড়া প্রাণীবিদ্যা তুলনামূলকভাবে নতুন শাস্ত্র। তাই এ দুজনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেদুইনের ভাষা আরও সমৃদ্ধ হবে যেহেতু এই ভাষায় বেদুইনের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ গভীর জ্ঞানের ছাপ আছে।
কিন্তু প্রাণীবিদ এ কথাটা মেনে নিতে চাইবে না। সে মনে করে বেদুইনরা অজ্ঞ। সে মনে করে সিংহের ব্যাপারে প্রাণীবিদদের জ্ঞানের তুলনায় বেদুইনের জানাশোনা তেমন কিছুই না। এই ধারণাকে সত্য প্রমাণের জন্য, বেদুইন কীভাবে সিংহের বর্ণনা দেয় সেটা প্রাণীবিদ তুলে ধরবে। তারপর বলবে বেদুইনের এই বর্ণনা ভুল। কিন্তু বেদুইনের বর্ণনাকে সে কিসের ভিত্তিতে 'ভুল' বলছে? তার নিজের জ্ঞানের ভিত্তিতে। আর আমরা ইতিমধ্যে ধরে নিয়েছি যে সিংহের ব্যাপারে প্রাণীবিদের চেয়ে বেদুইনের জ্ঞান আরও গভীর এবং সমৃদ্ধ। প্রাণীবিদ তবু আত্মবিশ্বাসের সাথে বলবে বেদুইনরা আসলে এ ব্যাপারে কিছুই জানে না।
এটা হলো আধুনিক বিজ্ঞানের অজ্ঞতাপূর্ণ, করুণ ঔদ্ধত্যের অবস্থা।
প্রথমে ধরে নেয়া হয়, বিজ্ঞানের ভাষাই বাস্তবতার বর্ণনা দেয়ার একমাত্র সঠিক, আক্ষরিক এবং গ্রহণযোগ্য ভাষা। তারপর বিজ্ঞান ধরে নেয় মহাবিশ্ব আসলে কেমন সেটা সে জানে। অথচ এ দুটোই ধারণা। দুটো ধারণাকেই প্রত্যাখ্যান করা যায় এবং আমরা প্রত্যাখ্যান করি।
একটা জিনিস ভেবে দেখুন। বিজ্ঞান নিয়ে স্কুলে যা যা শেখানো হয়, যেমন জ্যোতির্বিদ্যা, পৃথিবীসহ অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতিপথ, তার অধিকাংশ শেখানো হয় নিউটোনিয়ান ভাষা ব্যবহার করে। কিন্তু ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানীদের অনেকেই এ ধারণা ব্যক্ত করেছেন যে মহাবিশ্বের স্থানিক মাত্রার (spatial dimension) সংখ্যা তিনের চেয়ে বেশি। অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতার বাইরেও মাত্রা থাকতে পারে। অভিকর্ষের ক্ষেত্রে নন-ইউক্লিডিয়ান গণিত; যেমন রাইমেনিয়ান জ্যামিতি ব্যবহার করে পদার্থবিজ্ঞানের ব্যাপারে এভাবে চিন্তা করার শুরুটা করেছিলেন আইনস্টাইন।
গত কয়েক দশকে স্ট্রিং থিওরিতে বিশ্বাসী বিজ্ঞানীরা এমনও বলেছে যে মহাবিশ্বের ২১ টি মাত্রা থাকতে পারে। অবশ্য এ সবই তাদের জল্পনা-কল্পনা, কোনো কিছুই প্রমাণিত না। আসল বাস্তবতা কী, সেটা আল্লাহই ভালো জানেন। কিন্তু তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের যে সীমাকে আজ গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়, তার মধ্য থেকেই মহাবিশ্বের বর্ণনা দেয়ার জন্য 'সমতল' কিংবা 'আসমানকে গুটিয়ে নেয়া'র[৭৪] মতো কথাগুলো বলা যেতে পারে। চতুর্মাত্রিক জগতে কোনো ত্রিমাত্রিক বস্তুকে মুড়িয়ে নেয়া সম্ভব। ঠিক যেভাবে ত্রিমাত্রিক জগতে একটা দ্বিমাত্রিক বৃত্তকে মুড়িয়ে নেয়া সম্ভব।
বিজ্ঞানের ভাষা প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে। মহাবিশ্বের ব্যাপারে বিজ্ঞানের জ্ঞানও বদলাচ্ছে। এই ক্রমপরিবর্তনশীল ধ্যানধারণার মাপকাঠিতে কেন আমরা আল্লাহর কালামকে বিচার করতে যাব?
কুরআনের যে আয়াত এবং হাদীসগুলো আধুনিক বিজ্ঞানের বুঝের সাথে সাংঘর্ষিক ব্যক্তিগতভাবে সেগুলো আমার খুব পছন্দের। এগুলো আমার কাছে অমূল্য রত্নের মতো। যখনই এগুলো পড়ি তখন আমার ঈমান আরও শক্তিশালী হয়, হৃদয় প্রশান্ত হয়। কারণ, এখানে আল্লাহ আমাকে এমন কিছু জানাচ্ছেন, এমন কিছুর ব্যাপারে সচেতন করছেন, যা আধুনিক বিজ্ঞান এখনো জানতে পারেনি, বুঝতে পারেনি। ওপরে উল্লেখ করা সূরা আল-কাহফের আয়াত এবং হাদীসটি এ কারণে আমার খুব প্রিয়। এ আয়াত এবং হাদীসগুলো অত্যন্ত সুন্দর এবং শক্তিশালী। তড়িঘড়ি করে আধুনিক বিজ্ঞানের আলোকে এগুলোর ব্যাখ্যা করা কিংবা এগুলো রূপক সাব্যস্ত করার কোনো প্রয়োজন নেই। এগুলোকে বাস্তবতার বিশুদ্ধ, অবিকৃত এবং পূর্ণাঙ্গ বিবরণ হিসেবেই গ্রহণ করা উচিত, যে বিবরণ আমাদের জানাচ্ছেন আল্লাহ-বাস্তবতার স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র মালিক।
আল্লাহ আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দিন, তাঁর আয়াতসমূহের মাধ্যমে আমাদের হৃদয়গুলো আলোকিত করে দিন এবং শয়তানের কুমন্ত্রণার বিপরীতে সুরক্ষিত করে দিন।
টিকাঃ
[৭৩] সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান
[৭৪] আল্লাহ 'আযযা ওয়া জাল সূরা আম্বিয়ার ১০৪ নং আয়াতে বলেন (তরজমা): সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে নেব, যেভাবে গুটিয়ে রাখা হয় লিখিত দলীল-পত্রাদি। যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সূচনা করেছিলাম, সেভাবেই পুনরায় সৃষ্টি করব। ওয়াদা পালন করা আমার কর্তব্য। আমি তা পালন করবই।