📄 আমাদের কি ব্যক্তিস্বাধীনতাকে সমর্থন করা উচিত না?
প্রশ্ন-ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ব্যক্তিঅধিকার লিবারেল দর্শনের মূল ভিত্তির অংশ। কিন্তু এগুলো কোনো ধরাবাঁধা মাপকাঠি নেই। যেহেতু এগুলো লিবারেলিসমের মূল ভিত্তি তাই সংখ্যালঘু হিসেবে পশ্চিমা দেশে থাকা মুসলিমদের কি উচিত না ব্যক্তিস্বাধীনতার আর ব্যক্তিঅধিকারের এই প্যারাডাইম সমর্থন করা?
উত্তর-ব্যক্তিস্বাধীনতা আর অধিকারের কথা শুনতে ভালোই লাগে। কিন্তু আইন এই স্বাধীনতা আর অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে। এটা সব সমাজের ক্ষেত্রে সত্য। সব আইনের ক্ষেত্রে সত্য। আইনমাত্রই স্বাধীনতা খর্ব করে, মানুষের সিদ্ধান্তকে একটা নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে আটকে ফেলে। প্রত্যেকের ইচ্ছা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ।
কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারিসম বলে, কেউ যেন নিজ স্বার্থ কিংবা সুখের জন্য আরেকজনের ক্ষতি করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করাই আইনের উদ্দেশ্য। কোনো আইন তখনই বৈধ হবে যখন তা অন্যের ক্ষতিকে নিবারণ করে। তাই ধর্মীয় এবং সেক্যুলার আইন-দুটোই মানুষের অবাধ স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করলেও সেক্যুলার আইন গ্রহণযোগ্য আর ধর্মীয় আইন অগ্রহণযোগ্য। সেক্যুলার আইনের উদ্দেশ্য ক্ষতি নিবারণ করা। আর এটা সর্বজনীনভাবে সব মানুষের স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। অন্যদিকে ধর্মীয় আইনের ভিত্তি হলো ধর্মীয় ভক্তি, যা শুধু ওই নির্দিষ্ট ধর্মের অনুসারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ; বাকিদের জন্য না।
এটা লিবারেল-সেক্যুলারিসমের বক্তব্য।
সেক্যুলার আর ধর্মীয় আইন এর ব্যাপারে এই যে পার্থক্য দেখানো হচ্ছে, তার মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা আছে। ফাঁকফোকর আছে।
প্রথম সমস্যা, ক্ষতির সংজ্ঞা কী? লাভক্ষতির হিসেব কিসের ভিত্তিতে হচ্ছে? এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ এবং বিতর্কের জায়গা থাকে। সেক্যুলার দর্শনের দেয়া 'ক্ষতি'র সংজ্ঞাই কি চূড়ান্ত? এটাই কি একমাত্র বৈধ সংজ্ঞা?
কোনটা ক্ষতিকর আর কোনটা ক্ষতিকর না সেটা নির্ভর করে মানবপ্রকৃতি এবং বিশ্বের ব্যাপারে একজন মানুষের মেটাফিযিকাল অবস্থানের ওপর। এই অবস্থানগুলোকে সব সময় ধর্ম হিসেবে ধরা করা হয় না, কিন্তু মৌলিকভাবে এগুলো ধর্মের চেয়ে খুব একটা আলাদা না।
সেক্যুলার লিবারেলিসম আসলে ভালোমন্দ, লাভক্ষতির ব্যাপারে নিজের ধ্যানধারণাকে সর্বজনীন হিসেবে উপস্থাপন করে। সর্বজনীন সত্য বা স্বার্থের নাম দিয়ে নিজস্ব কিছু মেটাফিযিকাল অবস্থান সে চালান করে দেয়।
একটা উদাহরণ দিয়ে বোঝানো যাক।
গর্ভপাত নিয়ে তর্ককে বেশির ভাগ সময় দেখানো হয় সেক্যুলার আর ধার্মিকদের মধ্যেকার ঝগড়া হিসেবে।
গর্ভপাত কি নৈতিক নাকি অনৈতিক? একে আইনের আওতায় আনা উচিত কি না? এ ব্যাপারে আইনের অবস্থান কী হওয়া উচিত?
এ প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে ব্যক্তির উত্তর নির্ভর করবে ভ্রূণের ব্যাপারে তার ধারণা, ভ্রূণকে 'মানুষ' গণ্য করা হবে কি না, পিতামাতার নৈতিক দায়িত্ব কী- ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে তার বিশ্বাসের ওপর।
যারা গর্ভপাতের বিরোধিতা করে তারা ধর্মীয় মূল্যবোধ দ্বারা চালিত। অন্যদিকে গর্ভপাতের পক্ষে যারা প্রচারণা চালায় তারা চালিত হয় ব্যক্তিস্বাধীনতা আর ব্যক্তিঅধিকারের মতো বিভিন্ন সেক্যুলার চিন্তা দিয়ে। এভাবেই বিতর্কটা উপস্থাপন করা হয়।
কিন্তু ভ্রূণ এবং নারীদেহের ব্যাপারে সেক্যুলারদের অবস্থানও কিন্তু তাদের ধার্মিক প্রতিপক্ষের অবস্থানের মতোই মেটাফিযিকাল। অর্থাৎ বিশ্বাসজাত। কিন্তু এ বিতর্ককে এক মেটাফিযিকাল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আরেক মেটাফিযিকাল বিশ্বাসের দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখানো হয় না; বরং একে দেখানো হয় ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বনাম সেক্যুলার উদারতার লড়াই হিসেবে। ধর্মীয় ভক্তি বনাম স্বাধীনতার দ্বন্দ্ব হিসেবে।
কেন এমন হয়?
কারণ, দুটি মেটাফিযিকাল অবস্থানের দ্বন্দ্ব হিসেবে উপস্থাপন করা হলে শুরুতেই কেন একটা অবস্থানকে অন্যটার ওপর প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে তা নিয়ে মানুষ প্রশ্ন করবে। মানুষের মাথায় এই প্রশ্নটা আসুক, সেটা লিবারেল সেক্যুলারিস্টরা চায় না। আর সেক্যুলার আইনের ব্যাপারে এ প্রশ্নটাই আমাদের করা উচিত।
সেক্যুলার নৈতিকতা থেকে শুরু করে সেক্যুলার আইন-সবকিছুর ভিত্তি হলো এমন কিছু মেটাফিজিক্যাল বিশ্বাস, যেগুলো ধর্মীয় বিশ্বাসের মতো। মৌলিকভাবে এ বিশ্বাসগুলোর ধরন 'ধর্মীয়'। যদিও এগুলোকে তা মনে করা হয় না। এই বিশ্বাসগুলোর ভিত্তিতে সেক্যুলার আইন প্রণয়ন করা হয়। সেগুলো চাপিয়ে দেয়া হয় বাকি সবার ওপর। তারপর আমাদের বাধ্য করা হয় সেক্যুলারিসমের ধর্ম আর বিধান মেনে চলতে। বাধ্য করা হয় সেক্যুলার ধর্মের শাসন মেনে নিতে।
টিকাঃ
[৩১] মেটাফিযিক্স-বাংলায় অধিবিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা প্রাথমিক মূলনীতিসমূহ (first principles) এবং সত্তা, অস্তিত্ব, জানা, পরিচয়, মন, সময়, বস্তু, সময়, স্থান, সম্ভাবনা এর মতো বিভিন্ন বিমূর্ত ধারণা নিয়ে কাজ করে। - অনুবাদক
📄 ইসলাম কি সমতা শেখায়?
ইসলাম কি সমানাধিকার সমর্থন করে? এ প্রশ্নের উত্তর নিয়ে বড় ধরনের বিভ্রান্তি আছে। এক অর্থে বলা যায়, মুসলিমরা সমতার নীতিতে বিশ্বাসী, কারণ সমতা সব ধরনের মৌলিকতার ভিত্তি।
সব নৈতিকতার কাঠামোতে একটা প্রচ্ছন্ন নীতি থাকে-
একই জাতীয় দুটো বিষয়কে সমানভাবে বিচার করা উচিত।
ব্যক্তি 'ক' দোকান থেকে চুরি করলে সেটাকে যদি অপরাধ গণ্য করা হয়, তাহলে একই কাজ 'খ' কিংবা 'গ' করলে সেটাকেও অপরাধ গণ্য করা উচিত-যদি বাকি সবকিছু অপরিবর্তিত থাকে। 'বাকি সবকিছু অপরিবর্তিত থাকা'র এই শর্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, 'ক' আর 'খ' কখনো হুবহু একইরকম হবে না। দুটো মানুষ কখনো এক হয় না। তাদের পরিস্থিতি, প্রেক্ষাপট, ব্যাকগ্রাউন্ড সবই আলাদা। এসব পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও নৈতিকতার দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চুরির ক্ষেত্রে 'ক' ও 'খ' পর্যাপ্ত পরিমাণে একইরকম হওয়া। অর্থাৎ তাদের অবস্থা ওইসব দিক থেকে একইরকম হতে হবে যেগুলো এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। এই কাজের নৈতিকতার প্রশ্নের মীমাংসায় যেগুলো দরকারি।
যেমন ধরুন, 'ক' এর চোখের মণি কালো। 'খ' এর চোখের মণি নীল। এটা একটা পার্থক্য। কিন্তু এই পার্থক্য এখানে গুরুত্বপূর্ণ না। চুরির প্রশ্নে এই পার্থক্য প্রাসঙ্গিক না। তাই এই পার্থক্য সত্ত্বেও আইনের চোখে তারা সমান গণ্য হবে।
কিন্তু 'ক' যদি কোটিপতি হয় আর 'খ' যদি হয় দুর্ভিক্ষপীড়িত অঞ্চলের মানুষ, কিংবা অনাহারে থাকা রিফিউজি-তাহলে সেটা প্রাসঙ্গিক। চুরির নৈতিকতার প্রশ্নে এই পার্থক্য তখন বিবেচনা করতে হবে। 'ক' আর 'খ' এর কাজকে তখন মূল্যায়ন ও বিচার করতে হবে আলাদা আলাদাভাবে।
এখান থেকে আমরা কী পেলাম? আমরা বুঝলাম সমানাধিকারের ব্যাপারে আমাদের ধারণা নির্ভর করে 'নৈতিকভাবে 'প্রাসঙ্গিক' কিছু ফ্যাক্টরের ওপর। এই বিষয়টা বোঝা জরুরি।
অনেক মানুষ আছে যারা ইসলামী আইনের দিকে তাকিয়ে বলে, 'দেখো, ইসলাম নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্য করে। মুসলিমরা তো সমানাধিকারে বিশ্বাসী না।' দুঃখজনকভাবে, কাফিরদের পাশাপাশি আজ অনেক মুসলিমও এ ধরনের মনোভাব পোষণ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে এমন কিছু পার্থক্য আছে যা নৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক। ইসলামী আইন এই পার্থক্যগুলো আমলে নেয়। তাই ইসলামী আইন বৈষম্যমূলক কিংবা শোষণমূলক না; বরং যেসব আইন বা নৈতিকতার কাঠামো নারী ও পুরুষের বাস্তব পার্থক্যগুলো আমলে নেয় না সেগুলোই অন্যায্য এবং শোষণমূলক।
সমানাধিকারের কথা বলে লিবারেলিসম দেখাতে চায় সমতার ধারণা যেন তারাই আবিষ্কার করেছে। কিন্তু তারা আসলে এমন একটা ধারণার ব্যাপারে ক্রেডিট নিতে চাচ্ছে, যেটা সবার মধ্যেই আছে। সব ধরনের নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে সমতার ধারণা থাকে। সবাই মনে করে একইরকমের দুটো জিনিসকে সমানভাবে বিচার করা উচিত। যে জায়গাটায় গিয়ে নৈতিক কাঠামোগুলোর মধ্যে পার্থক্য হয় তা হলো, কোন কোন ফ্যাক্টরগুলোকে তারা প্রাসঙ্গিক ধরছে, কেন ধরছে, কীভাবে ধরছে। আর এই আলোচনাটা একটা মেটা-এথিকাল, মেটাফিযিকাল আলোচনা।
তাই লিবারেল সেক্যুলারিসম আর ইসলামের মধ্যে সমানাধিকারের মূলনীতির প্রতি কে বেশি শ্রদ্ধাশীল তা নিয়ে অর্থহীন তর্ক বাদ দিয়ে নিচের প্রশ্নগুলো নিয়ে কি চিন্তা করা যায় না-
আদর্শ মানবজীবন কেমন?
একটা আদর্শ সমাজে কী কী থাকবে?
কোন জিনিসগুলো মানবজীবনের সমৃদ্ধির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত?
এগুলো হলো সত্যিকার অর্থে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে গেলে এমন অনেক কিছু সামনে আসবে যেগুলোর আলোচনা সেক্যুলারিসম এড়িয়ে যায়। একই সাথে কোন ফ্যাক্টরগুলো নৈতিকভাবে প্রাসঙ্গিক সেটাও আমরা বুঝতে পারব। কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারিসম এ প্রশ্নগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করে। এগুলোর আলোচনা থেকে বাঁচার জন্য সে গিয়ে লুকায় স্বাধীনতা আর সমতার ফাঁপা স্লোগানের পেছনে। সে বলে, এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। সঠিক উত্তর নেই, ভুল উত্তরও নেই। মানুষ নিজেই নিজের উত্তর খুঁজে নেবে। আর সে যে উত্তর খুঁজে নেবে সেটাই তার জন্য সঠিক। লিবারেল-সেক্যুলারিসমের এ অবস্থান উন্মাদনা ছাড়া আর কিছুই না।
টিকাঃ
[৩২] মেটা-এথিক্স-বাংলায় পরা-নীতিবিদ্যা। নীতিশাস্ত্রের ওই শাখা যা নৈতিক ধারণা উৎস, বৈশিষ্ট্য, তাৎপর্য, প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করে। নীতিশাস্ত্র প্রশ্ন করে 'মানুষের কী করা উচিত'? পরানীতিবিদা প্রশ্ন করে, 'ভালো হবার অর্থ কী?', 'মন্দ হবার অর্থ কী?', ইত্যাদি। - অনুবাদক
📄 শরিয়াহসম্মত বাকস্বাধীনতা
বিভিন্ন সময় আমি বাকস্বাধীনতার সমালোচনা করেছি। আমি মনে করি কিছু কিছু ধরনের কথা নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। কিছু বক্তব্য এতই ক্ষতিকর যে এগুলোর কারণে অপরাধীদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া উচিত। এ ধরনের সীমা এবং আইন ইসলামে আছে। আর আমি বিশ্বাস করি এটা শুধু যৌক্তিক এবং নৈতিকভাবে সঠিক না; বরং এ ধরনের নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের উদাহরণ সেক্যুলার রাষ্ট্রেও আছে। পার্থক্য হলো ইসলামে কিছু বিষয়কে পবিত্র গণ্য করা হয়, আর লিবারেল রাষ্ট্রে অন্য কিছু বিষয়কে পবিত্র গণ্য করা হয়। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই 'পবিত্র বিষয়গুলো' রক্ষার জন্য সামাজিক এবং আইনি নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
কিন্তু বিষয়গুলোকে আমরা এভাবে দেখি না। দেখি না বলেই পশ্চিমারা আজও ছোট্ট শিশুর মতো বিশ্বাস করে, তাদের সমাজে চূড়ান্ত বাকস্বাধীনতা আছে অন্যদিকে ইসলামী সমাজে-যে সমাজ ও শাসন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম ১৪০০ বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন-বাকস্বাধীনতার গলা টিপে ধরা হয়।
যাই হোক, বাকস্বাধীনতার একটি দিক আছে, যা মুসলিমদের গ্রহণ করা উচিত। আর তা হলো, শাসকদের ভুল কিংবা অপরাধের সমালোচনা করার অধিকার। এই অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। লিবারেল দর্শন (তাত্ত্বিকভাবে হলেও) এই অবস্থানকে সমর্থন করে। আর মুসলিম শাসনের ইতিহাস থেকেও আমরা এমন অনেক উদাহরণ, পাই যা এ অবস্থানকে সমর্থন করে। আমরা এমন উদাহরণ দেখি যেখানে খুলাফায়ে রাশেদীনের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) প্রত্যেকের প্রকাশ্য সমালোচনা করা হয়েছে। সমালোচনাগুলো ন্যায্য ছিল না, ভুল ছিল। কিন্তু খুলাফায়ে রাশেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) তাঁদের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করেননি। সমালোচকদের বন্দী করেননি, নির্যাতন করেননি, হত্যা করেননি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পর খুলাফায়ে রাশেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) হলেন ন্যায়পরায়ণ শাসনের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত। তাঁরাও যদি সমালোচিত হন এবং সমালোচকদের সহ্য করেন তাহলে আজকের মুসলিম-বিশ্বের শাসকদের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কেমন হবার কথা?
মানবপ্রকৃতির একটা বাস্তবতা হলো, যারা আন্তরিক, সত্যবাদী, সৎ, এবং ন্যায়পরায়ণ-তারা সমালোচিত হলে ক্রুদ্ধ হয় না। একে নেতিবাচকভাবে নেয় না; বরং কেউ সংশোধন করে দিলে তারা কৃতজ্ঞবোধ করে। কারণ, সমালোচনা সঠিক হলে এর দ্বারা নিজের ভুল শোধরানোর সুযোগ পাওয়া যায়।
কিন্তু যারা ন্যায়পরায়ণ না, সমালোচনাকে তারা ঘৃণা করে। তারা কেবল নিজেদের ক্ষমতা আর স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। সত্য ও ন্যায়বিচার নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাই সর্বশক্তি দিয়ে তারা সমালোচনা আর সমালোচকদের দমিয়ে রাখতে চায়।
একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেছেন, মুনাফিকের একটি বৈশিষ্ট্য হলো বিবাদে লিপ্ত হলে সে অশ্লীল গালি দেয়। মুনাফিক যখন তর্ক করে তখন সত্য নিয়ে চিন্তা করে না। তার লক্ষ্য যেকোনো মূল্যে তর্কে জেতা, সত্য যা-ই হোক না কেন।
তাহলে ওই সব শাসকদের কী বলা হবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলে ঠিক-বেঠিক যাচাই করার বদলে তারা সমালোচকদের বন্দী করে, গ্রেপ্তার করে, নির্যাতন করে কিংবা হত্যা করে? আর সমালোচকের ভাগ্য নিতান্ত ভালো হলে সমালোচনা উপেক্ষা করে?
তাই এই ক্ষেত্রে বাকস্বাধীনতার ধারণাকে ইসলাম সমর্থন করে এবং এ ধরনের বাকস্বাধীনতা ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেকোনো যৌক্তিক এবং বিবেচক ব্যক্তি এই ধরনের বাকস্বাধীনতার গুরুত্ব বুঝতে পারবে। প্রত্যেক সমাজে যা পবিত্র গণ্য করা হয়, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে রক্ষা করা হয়। ইসলামী সমাজ ও শাসনে সত্যিকার অর্থে পবিত্র কী? আল্লাহ্, তাঁর রাসূল এবং দ্বীন ইসলাম। আল্লাহ্, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম এবং দ্বীন ইসলামের ওপর আক্রমণ করা পুরো ইসলামী সমাজের ওপর আক্রমণ করার শামিল। কারণ, এগুলো ইসলামী শাসন ও সমাজের ভিত্তি। কল্যাণ ও ন্যায়বিচারের উৎস। কিন্তু আজ এমন কোনো রাষ্ট্র নেই, যা এই বিষয়গুলোকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পবিত্র মনে করে। আজকের শাসকদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র তাদের ক্ষমতা, তাদের গদি। আর হাতেগোনা অন্য কিছু বিষয়। একদিকে নিজেদের ক্ষমতার বিরুদ্ধে উচ্চারিত প্রতিটি শব্দকে তারা সর্বশক্তি দিয়ে দমন করার চেষ্টা করে, অন্যদিকে 'বাকস্বাধীনতার' বুলি প্রচার করে।
টিকাঃ
[৩৩] কাবীসা ইবনু 'উকবা (রহ.)... আবদুল্লাহ ইবনু 'আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, চারটি স্বভাব যার মধ্যে থাকে সে হবে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খেয়ানত করে ২. কথা বললে মিথ্যা বলে ৩. চুক্তি করলে ভঙ্গ করে এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীল গালি দেয়।-সহীহ বুখারী