📘 সংশয়বাদী > 📄 সুইজারল্যান্ডে হাতাহাতি!

📄 সুইজারল্যান্ডে হাতাহাতি!


সুইয়ারল্যান্ড মুসলিম ছাত্রদের জরিমানা করা শুরু করে ২০১৬-তে। তাদের অপরাধ, শিক্ষিকার সাথে হাত মেলাতে অস্বীকার করা। এই ‘গুরুতর’ অপরাধের কারণে মুসলিম ছাত্রদের ৫০০০ ডলার পর্যন্ত ফাইন করার আইন হয়।

আচ্ছা, মানুষকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আরেকজনের শারীরিক সংস্পর্শে আসতে বাধ্য করা কি একধরনের যৌন হয়রানি না? নারীবাদীরা তো ক্রমাগত পারস্পরিক সম্মতির গুরুত্ব নিয়ে চেঁচামেচি করে, কিন্তু এ বিষয়ে তারা মুখে কুলুপ এঁটে রইল কেন? সম্ভবত মুসলিম পুরুষের ক্ষেত্রে এসবের কোনো মূল্য নেই। একজন মুসলিম পুরুষ যখন অমুসলিম কোনো নারীর সাথে হাতে মেলাতে অস্বীকার করে তখন সে সম্ভবত সেই নারীকে শোষণ করার চেষ্টা করছে, যেভাবে সে নিজের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাকে শোষণ করে-তাই না?

পশ্চিমা বিশ্বে এমনও মহিলা আছে, কথা বলার সময় চোখে চোখ রেখে না হাসলে যারা রীতিমতো অপমানিত বোধ করে। এটা নাকি অপমান, অশ্রদ্ধা! কী অদ্ভুত! তুমি যে ধরনের সামাজিক রীতিনীতিতে অভ্যস্ত কোনো কিছু সেটার সাথে না মেলা মানেই সেটা অশ্রদ্ধা? অপমান?
এই পশ্চিমারা একদিকে সহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ আর বৈচিত্র্যকে সম্মান করার কথা বলে। অন্যদিকে কোনো মুসলিম তার ধর্মের বিধান মেনে চললে সেটাকে অসহিষ্ণুতা বলে গলা ফাটায়। একজন মুসলিম আদৌ অসম্মান করতে চাচ্ছে কি না, সেটা ধর্তব্য না। আমার সংস্কৃতি অনুযায়ী আমার কাছে একে অসম্মান মনে হচ্ছে, তাই আমি এটাকে অসহিষ্ণুতা বলে চালিয়ে দেবো। আসলে সহিষ্ণুতা বলতে ওরা কী বোঝায়? মাঝে মাঝে ইন্ডিয়ান কারী কিংবা অ্যারাবিয়ান শর্মা খাওয়া? হ্যালোউইনের সময় বিভিন্ন দেশের পোশাক পরে যেমন খুশি তেমন সাজো খেলা?

শিক্ষিকার হাত মেলাতে অস্বীকার করা কেন বেআইনি, তার পক্ষে সেক্যুলারদের পছন্দের আরেকটা যুক্তি আছে—
এর মাধ্যমে জেন্ডার রোল আর জেন্ডার সেগ্রেগেশানের ধারণাগুলো আরও পোক্ত হয়।

হ্যাঁ, তা তো হয়ই। সমাজে নারী-পুরুষের মেলামেশার ব্যাপারে ইসলামী বিধানগুলোর উদ্দেশ্যই হলো নারীপুরুষের মেলামেশা সীমিত করা। তুমি মুসলিম না, তুমি কাফের, তাই নারী-পুরুষের মেলামেশা সীমিত করার ব্যাপারটা তোমার কাছে খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে আমাকেও কেন সেটা খারাপ বলে মানতে হবে? তুমি অজ্ঞ, তোমার অজ্ঞতাকে আমার কেন মানতে হবে? হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো, এটা তোমাদের দেশ। তাই ইচ্ছেমতো আইন বানানোর অধিকার তোমাদের আছে। তোমাদের দেশে থাকতে হলে তোমাদের মূল্যবোধ আর তোমাদের নৈতিকতা মেনে নিয়েই থাকতে হবে।

ঠিক আছে, মানলাম। তাহলে সৌদি আরব, ইরান কিংবা আফগানিস্তান যখন তাদের দেশে, তাদের পছন্দমতো আইন বানায় তখন কেন তোমাদের এত আপত্তি? তারা যখন তাদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস আর নৈতিকতা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ড্রেস কোড কিংবা জেন্ডার সেগ্রেগেশানের নিয়ম করে তখন কেন তোমাদের এত চেঁচামেচি? এটা কি ভণ্ডামি না? ডাবলস্ট্যান্ডার্ড না? একই কাজ তোমরা করলে উদারতা-সহিষ্ণুতা আর আমরা করলে সাম্প্রদায়িকতা? তোমরা তোমাদের পশ্চিমা মূল্যবোধ আর সংস্কৃতি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চাও। মুসলিমরা তাদের ইসলামী মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা বাস্তবায়ন করতে চায়। একমাত্র পার্থক্য হলো, মুসলিমরা লুকোচুরি করে না। তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আর ধর্মীয় স্বাধীনতার দোহাই দেয় না। নিজেদের বিশ্বাস আর উদ্দেশ্যের কথা আমরা সোজাসুজি স্বীকার করি।

ধর্মনিরপেক্ষতা আর ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি আওড়ালেও পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের ইসলামের বিধান মানতে বাধা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিধান অমান্য করতে বাধ্য করে। এটাই প্রমাণ করে সেক্যুলারিসমের নিরপেক্ষতা আসলে মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই না। এমন অনেক উদাহরণ আছে। সুইজারল্যান্ডের 'হ্যান্ডশেইক আইন' সেই লিস্টে নতুন এক সংযোজন কেবল।

আসলে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। নিরপেক্ষতার নামে পশ্চিমারা তাদের মূল্যবোধ আর সাংস্কৃতিক রীতিনীতি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এ কারণেই ধর্মীয় স্বাধীনতার যুক্তি আওড়ে ইসলামের পক্ষে কথা বলার মানে হয় না। ধর্মীয় স্বাধীনতার পুরো ধারণাটাই এসেছে একটা নির্দিষ্ট পশ্চিমা প্রেক্ষাপট ও দর্শন থেকে। যেখানে ধর্মের নির্দিষ্ট একটা সংজ্ঞা আর ব্যাখ্যা আছে। আর এই সংজ্ঞার জন্মও নির্দিষ্ট পশ্চিমা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণার অবধারিত ফলাফল হলো কালচারের পরিবর্তনের সাথে সাথে যেকোনো কিছু ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে চালিয়ে দেয়া।

সমকামিতার কথাই ধরুন না। প্রথমে এটা ছিল সর্বজনীনভাবে নিন্দনীয় কাজ। তারপর কালচার যখন একটু বদলাল, তখন এটা হয়ে গেল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের প্রশ্ন। কিছু ধার্মিক লোক এটাকে পাপ মনে করে আর কিছু মুক্তমনা টাইপের ধার্মিক এতে খারাপ কিছু দেখে না। তারপর এটা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন। এখানে ভিন্নমতের সুযোগ আছে। এটা ইখতিলাফি বিষয়। ইজতিহাদের বিষয়। তারপর এল আরেকটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। সমকামিতা এখন সর্বজনীনভাবে নন্দিত। যারা এর বিপক্ষে, যারা সমকামিতার অধিকার নিয়ে উচ্ছ্বসিত না তারা গোঁড়া, ধর্মান্ধ। তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না। কারণ, এটা তাদের ঘৃণা, বিদ্বেষ, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতার ফসল। আর এগুলো খুব ক্ষতিকর বিষয়। তাই এগুলো এখন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন ধর্মীয় অবস্থান সঠিক সেটা এখন থেকে রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে। কোনো সমকামী এসে তার 'বিয়ের' জন্য আপনাকে কেক বানাতে বললে, চান বান আর চান, আপনাকে সেটা বানাতেই হবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেন না।

অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময়জুড়ে অনেক মুসলিম পশ্চিমা-বিশ্বে পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে অবস্থান করে সীমিতভাবে মোটামুটি ইসলাম পালন করতে পেরেছে। কিন্তু সেটা ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে না। একেবারেই না। যারা আজও এটা বিশ্বাস করে বসে আছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। মুসলিমরা মোটামুটিভাবে ইসলামের কিছু অংশ এতদিন পালন করতে পেরেছে, কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর মূল সাংস্কৃতিক শেকড় ছিল খ্রিষ্টধর্মে। খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদীধর্ম এবং ইসলামের নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে বেশ অনেকটুকু মিল আছে। যেহেতু ইসলামী মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা খ্রিষ্টধর্মের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো কালচারের সাথে অনেক দিক থেকে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল তাই মুসলিমদের এতদিন অতটা সমস্যা হয়নি।

কিন্তু এখন সেটা বদলাচ্ছে। ইহুদী ও খ্রিষ্টধর্মীয় শেকড় ত্যাগ করে পশ্চিমা সমাজ আজ ক্রমেই গ্রহণ করছে পৌত্তলিক এবং স্যাইটানিক চিন্তা ও সংস্কৃতি। খুব শীঘ্রই এমন অবস্থা আসবে যখন পশ্চিমা দেশগুলোর আইন ইসলামের একেবারে 'নির্দোষ' ফরয বিধানগুলো মানাও অসম্ভব করে তুলবে। এই আইনগুলো যখন বানানো হবে তখন পশ্চিমাদের কাছে সেগুলোকে ধর্মীয় স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ বলে মনে হবে না; বরং তারা মনে করবে, এসব আইনের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে আরও মজবুত করা হচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধান পালনকে বেআইনি করার আইন তৈরি করা হবে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে।

কিন্তু তখনো এমন একদল মুসলিম থাকবে, যারা বোকার মতো বিশ্বাস করবে, মুসলিমরা পশ্চিমে 'স্বাধীনভাবে' দ্বীন পালন করতে পারবে। আর ওই পর্যায়ে তারা এমন এক 'ইসলাম' আবিষ্কার করবে, যার সাথে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইসলাম এর কোনো মিল নেই।
আর যে মুসলিমরা কল্পনার জগৎ থেকে বের হয়ে প্রকৃত ইসলাম আঁকড়ে ধরতে চাইবে তাদের মোকাবিলা করতে হবে কঠিন পরীক্ষা আর দুর্দশার। গত দশ বছরে আমেরিকা আর ইউরোপে যেভাবে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়েছে, তা চলতে থাকলে এমন হওয়াটা সময়ের ব্যাপারমাত্র। ওয়াল্লাহু 'আলাম।

টিকাঃ
[১৫] In Switzerland, Muslim schoolchildren who refuse to shake their teacher's hand may be fined $5,000. May 25, 2016. The Washington Post
[১৬] সমকামী বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য কেক বা ফুলের ডেকোরেশান করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে আইনী হয়রানি এবং জরিমানার বেশ অনেকগুলো ঘটনা পশ্চিমে ঘটেছে। আগ্রহী পাঠক দেখুন, Klein, dba Sweet Cakes by Melissa, v. Oregon Bureau of Labor and Industries, Masterpiece Cakeshop v. Colorado Civil Rights Commission, এবং Arlene's Flowers lawsuit. ~ অনুবাদক
[১৭] 'পশ্চিমা ইসলামের' এমন অনেক বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 স্বৈরাচারই ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে শরীয়াকে প্রতিস্থাপন করতে চায়

📄 স্বৈরাচারই ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে শরীয়াকে প্রতিস্থাপন করতে চায়


অর্থনীতিবিদ মার্ক কোয়োমা তার 'আইডিয়াস আর নট ইনাফ' প্রবন্ধে সরল স্বীকারোক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এমন কোনো বৈপ্লবিক ধারণা না, যেটা তার অন্তর্নিহিত শক্তি আর অপ্রতিরোধ্য যুক্তির জোরে পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; বরং অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি সহিষ্ণু হওয়া ছিল ইউরোপের জন্য সময়ের দাবি। এটা কোনো আদর্শিক অবস্থান ছিল না, এটা ছিল প্র্যাকটিকাল সিদ্ধান্ত।

এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো? কোয়োমার মতে- একসময় ইউরোপের শাসকদের জন্য চার্চ বা পাদরিদের সাথে সম্পর্ক রাখা অপরিহার্য ছিল। জনসাধারণের কাছে বৈধতা আর গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য চার্চের অনুমোদন লাগত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে জনগণের কাছে বৈধতা পেতে হবে। আর শাসকদের কাছে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত দামি। তাই শাসকরা চার্চের সাথে মৈত্রী করত। তবে এই মৈত্রীর কারণে শাসকদের 'সহিষ্ণুতা' বিসর্জন দিতে হতো। অনেক সময়ে চার্চের হয়ে ভিন্ন মতবাদে বিশ্বাসীদের শাস্তি দিতে হতো।

কিন্তু আধুনিকতার যুগের প্রথম দিক থেকে নানা কারণে রাজনৈতিক বৈধতার জন্য চার্চের ওপর শাসকদের নির্ভরতা কমতে থাকে। জনপরিসরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যেও একসময় শাসকদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো। শিক্ষা, গরিবদের সাহায্য, বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজসহ নানা ক্ষেত্রে চার্চ ছিল দুর্বল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। আইন এবং সামাজিক নিয়মগুলো আজ জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের (নাগরিকত্ব) ওপর নির্ভর করে। সেই সময়ে এগুলো নির্ভর করত ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর। ফলে ওই সময়কার সমাজে তেমন একটা ধর্মীয় বৈচিত্র্য দেখা যেত না। এমন প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণাই ছিল অকল্পনীয়।

তাহলে অতীত থেকে বর্তমানের এই বিশাল পরিবর্তন কীভাবে এল?
কোয়োমার মতে-প্রথমত, রাষ্ট্র ট্যাক্স নেয়া বাড়িয়ে দিলো। বেশি টাকা পেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতে শুরু করল। শক্তি বাড়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব হারাতে শুরু করল চার্চ। রাষ্ট্রের শক্তি যত বাড়ল তত বাড়ল আইন এবং সামাজিক বিধান প্রয়োগের ক্ষমতা। ধর্মীয় পরিচিতির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন ফুরাল। রাষ্ট্রের কাছে ইহুদী, ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট-সবাই এখন সমান। ধর্মীয় পরিচিতি অনুযায়ী আলাদা আলাদা নিয়ম করার প্রয়োজন রইল না। সবার একটাই পরিচয়-ট্যাক্সদাতা। নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রকে যেহেতু আর ধর্মের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে না, তাই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস আর অবস্থান বাস্তবায়নেরও প্রয়োজন থাকল না। জন্ম নিল, 'ধর্মীয় স্বাধীনতা'। নীতি, আদর্শ বা মূল্যবোধ হিসেবে না। বাস্তববাদিতা আর সুবিধার জন্যে।

কেউ হয়তো বলতে পারেন-ঠিক যাছে, জন্ম যেভাবেই হোক না কেন, জিনিসটা তো ভালো, তাই না?
আসলে না। একটু খতিয়ে দেখলে ধরা পড়ে যে ব্যাপারটা আসলে ভালো কিছু না। দেখুন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী?
নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের কাছ থেকে সম্পদ আহরণ করা। আর এর জন্যে যেভাবে দরকার সেভাবে মানুষকে চলতে বাধ্য করা। প্রথম দিকে এ উদ্দেশ্য পূরণে চার্চ কার্যকর ছিল। তাই রাষ্ট্র চার্চের সাথে মৈত্রী করেছে। পরে আরও কার্যকর পথ পাওয়া গেছে, তাই চার্চের মূল্য ফুরিয়েছে। চার্চ সেকেলে হয়ে গেছে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিমে চার্চের গুরুত্ব ও ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমেছে। একই সময়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক যে প্রতিষ্ঠান-সেই সামরিক বাহিনী শক্তি, সামর্থ্য, সম্পদ, জনবল এবং প্রযুক্তির দিক দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে। জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য জান্তব সামরিক শক্তির চেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি আর কী হতে পারে? রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য এখন আর স্রষ্টার দোহাই দিতে হয় না। সামরিক শক্তি ব্যবহার করলেই চলে।

কিন্তু এই পরিবর্তনকে কি উন্নতি বলা যায়? পশ্চিমা বিশ্বে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমেছে, সত্য। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের স্বাধীনতা কি আসলেই বেড়েছে? নাকি বদলেছে শুধু কর্তৃত্বের উৎস? আগে পাদরির বাইবেলকে ব্যবহৃত হতো, এখন ব্যবহৃত হয় জেনারেলের বন্দুক। ইউরোপের ইহুদী এবং খ্রিষ্টানদের জন্য নির্মম চার্চের চেয়ে আজকের নিষ্ঠুর সামরিক বাহিনী সমর্থিত রাষ্ট্র উত্তম হতে পারে। সব হিসেবেনিকেশের পর লাভের পাল্লাটাই হয়তো তাদের দিকে ভারী। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি এখনো ওদের জন্য আবেদন রাখে।

কিন্তু একই কথা ইসলাম এবং মুসলিমদের জন্য খাটে না। মধ্যযুগের ইউরোপের গির্জার ক্ষেত্রে যে কথাগুলো সত্য, ইসলামী শাসনের জন্য সেগুলো সত্য না। ইসলামী শাসনের অধীনে মুসলিমরা কখনোই ওইভাবে শোষিত হয়নি যেভাবে চার্চের কর্তৃত্বের সময়ে ইউরোপিয়ানরা হয়েছে। হ্যাঁ, মুসলিম-বিশ্বে বিভিন্ন সময়ে শাসকদের মাধ্যমে শোষণ, সহিংসতা এবং নির্মমতা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা হয়েছে ইসলামী শরীয়াহ এবং ইসলামী আলিমদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে। শাসকগোষ্ঠীর অধীনস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে মুসলিম উলামায়ে কেরাম এর ঐতিহ্য প্রসিদ্ধ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে আলিমগণ নির্যাতিত হয়েছেন। উম্মাহর ইতিহাসের অধিকাংশ সময় শাসক ও শাসনক্ষমতার সাথে সংস্পর্শের ব্যাপারে আলিমগণ অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে শাসকদের দরজায় যায় সে ফিতনায় পতিত হয়। শাসকের সঙ্গে যার নৈকট্য যত বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর থেকে তার দূরত্ব তত বেশি বেড়ে যায়।'
এ কারণে শাসকদের সাথে ঐতিহাসিকভাবে উলামায়ে কেরামের একধরনের অস্বস্তিকর সম্পর্ক ছিল। অনেক সময় দ্বীনের বিষয়ে দ্বন্দ্বও হয়েছে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ ছিল শাসক কর্তৃক শরীয়াহর সীমালঙ্ঘন। শরীয়াহ বরাবরই ছিল আদল, ইনসাফ এবং রাহমাহর উৎস। আর তাই কেবল স্বৈরাচারই শরীয়াহকে সরিয়ে রাখতে চায়।

টিকাঃ
[১৮] Ideas were not enough, Mark Koyama, Aeon.co
[১৯] মুসনাদ আহমাদ

📘 সংশয়বাদী > 📄 লিবারেলিসমের মোড়কে ইসলামের প্রচার ক্ষতিকর

📄 লিবারেলিসমের মোড়কে ইসলামের প্রচার ক্ষতিকর


শাসক আর সরকারকে আমরা বিচার করি তাদের কাজ দিয়ে। তাদের কাজগুলো আল্লাহর নাযিল করা শরীয়াহ এবং ইনসাফের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা দিয়ে। কোনটা গণতান্ত্রিক আর কোনটা অগণতান্ত্রিক-সেই অর্থহীন পার্থক্যের কোনো মূল্য আমাদের কাছে নেই। গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিকের বিভাজনের আড়ালে আমরা আমাদের বিশ্বাস গোপন করি না। আমাদের মাপকাঠি ওয়াহি।

এসব বুলি যে আসলেই অর্থহীন তা নিয়ে কারও সন্দেহ থাকলে ২০১৩-তে মিসর এবং ২০১৬-তে তুরস্কের সামরিক অভ্যুত্থানের প্রতি পশ্চিমা প্রতিক্রিয়া সে বিশ্লেষণ করতে পারে।
মিসর আর তুরস্ক-দু-জায়গাতেই সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল। রাজনৈতিক মতাদর্শ আর ধর্মীয় অবস্থানভেদে অভ্যুত্থান দুটোর ব্যাপারে মুসলিমদের মধ্যেই দু-ধরনের বক্তব্য পাওয়া যায়। তবে দু-পক্ষের অবস্থানে কিছু মিল আছে। দু-পক্ষই মনে করে অভ্যুত্থান দুটোর মধ্যে একটা ছিল গণতান্ত্রিক' আর অন্যটা 'অগণতান্ত্রিক'। একটা অভ্যুত্থানে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে, অন্যটাতে ঘটেনি। এক অভ্যুত্থানে মারা পড়া মানুষেরা বিশ্বাসঘাতক, আর অন্য অভ্যুত্থানে মারা পড়া মানুষেরা শহীদ। দু-পক্ষই এটা মনে করে। তফাত হলো এক দল একটাকে গণতান্ত্রিক মনে করে অন্য দল অপরটাকে।

কোনটা কতটা গণতান্ত্রিক ছিল তা নিয়ে সারাদিন তর্ক করা যাবে, কিন্তু শেষমেশ সমাধান আসবে না। কারণ, গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিকের এই ধারণাগুলো ফাঁপা এবং আপেক্ষিক। যেকোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কিংবা সরকারি কাঠামোর ওপর এগুলো ইচ্ছেমতো আরোপ করা যায়।

ইসলামের অবস্থানগুলোকে লিবারেলিসমের ভাষা আর গণতন্ত্রের মতো ধারণাগুলোর সাথে জুড়ে উপস্থাপন করা ক্ষতিকর। এভাবে আমরা আসলে মূল আলোচনাকে বিলম্বিত করছি। প্রকৃত প্রশ্নগুলো এড়িয়ে যাচ্ছি।

মূল আলোচনা হলো-জনগণের প্রতি সরকারের (যেকোনো সরকারের) আর সরকারের প্রতি জনগণের দায়িত্বগুলো কী কী? তারচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই প্রশ্নের উত্তরগুলোর মধ্য থেকে শুদ্ধ-অশুদ্ধ আমরা কীভাবে সনাক্ত করব?
আমরা কি নায়ালিস্টদের মতো করে ধরে নেব এসব প্রশ্নের কোনো সঠিক উত্তর নেই, সবই আপেক্ষিক? নাকি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর আছে? যদি থাকে, তাহলে সেই উত্তর খুঁজে বের করার উপায় কী? মাপকাঠি কী?

এ ধরনের প্রশ্নগুলো মানব অস্তিত্ব নিয়ে আমাদের চিন্তা করতে বাধ্য করে। বাধ্য করে মানবজীবনের উদ্দেশ্য এবং স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে। কিন্তু লিবারেল-সেক্যুলারিসম এই প্রশ্ন এবং চিন্তাগুলো থেকে আমাদের দূরে রাখতে চায়। মানুষ এ প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবুক, আল্লাহর কথা চিন্তা করুক-এটা লিবারেল সেক্যুলারিসম চায় না। এই কাঠামো তাই আমাদের বলে-
স্রষ্টা অপ্রাসঙ্গিক, অগুরুত্বপূর্ণ। অস্তিত্ব, জীবনের উদ্দেশ্য-এসব অর্থহীন, গুরুত্বহীন প্রশ্ন। এসব বাদ দাও, আর আমাদের ঠিক করে দেয়া কিছু ফাঁপা বুলি আওড়ে যাও। অন্তঃসারশূন্য এ বুলিগুলো কোনো সরকার আর কোনো শাসনব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা নিয়ে ফালতু তর্কে ব্যস্ত থাকো। এমন বিতর্কে নিজেদের মগ্ন রাখো, যার কোনো শেষ নেই। যার কোনো অর্থবোধক ফলাফল নেই। আর মনে রেখো, আর যাই করো না কেন, স্রষ্টাকে নিয়ে কথা বলা যাবে না। এটা অস্বস্তিকর, শিশুতোষ বিষয়। এ নিয়ে কথা বলা আর ঠাকুমার ঝুলি নিয়ে কথা বলা একই কথা। যদি সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী মহলের অংশ হতে চাও, যদি চাও তোমার কথা গুরুত্বের সাথে নেয়া হোক, তাহলে এসব বাদ দিয়ে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষবাদের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলো যাও।

না, আমাদের এমন বুদ্ধি-জীবিতার প্রয়োজন নেই।

টিকাঃ
[২০] নায়ালিসম (Nihilism)—বাংলায় ধ্বংসবাদ বা নিরর্থবাদ। নায়ালিসম শব্দটি এসেছে ল্যাটিন-nihil-থেকে। যার অর্থে ‘কিছুই না/nothing। নায়ালিসম একধরনের দার্শনিক অবস্থান, যা মনে করে সব মূল্যবোধ এবং নীতিনৈতিকতা দিনশেষে ভিত্তিহীন। মহাবিশ্ব এবং মানব-অস্তিত্ব উদ্দেশ্যহীন এবং অর্থহীন। সব অর্থ আর নৈতিকতার আলোচনা মানুষের বানানো, অর্থহীন এবং অকার্যকর। নায়ালিসম সব ধরনের ধর্মীয়, সামাজিক, নৈতিক রীতিনীতি অস্বীকার করে। নায়ালিস্ট-নায়ালিসমে বিশ্বাসী ব্যক্তি। - অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 গণতন্ত্র কি ইসলামী শাসনের চেয়ে উত্তম?

📄 গণতন্ত্র কি ইসলামী শাসনের চেয়ে উত্তম?


গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই কি আদর্শ সরকার ব্যবস্থা? প্রশ্নটা নিয়ে মুসলিমদের সতর্কতার সাথে চিন্তা করা দরকার। আজ আমরা নানা দিক থেকে বারবার শুনি গণতন্ত্রই শ্রেষ্ঠ সরকার-ব্যবস্থা। সবচেয়ে ন্যায্য ব্যবস্থা। কিন্তু এ দাবির সাথে ইসলামের ঘোরতর সংঘর্ষ আছে।

কেন? কারণ, কুরআন এবং সুন্নাহতে আমরা গণতন্ত্রের কথা পাই না। স্পষ্টভাবে না, ইঙ্গিতেও না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদীনাতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেননি। মদীনার শাসনব্যবস্থা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র ছিল না। খুলাফায়ে রাশেদীন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেননি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো করে সরকারকে বিভিন্ন শাখায় ভাগ করে তাঁরা রাষ্ট্র চালাননি।
গণতন্ত্র যদি শ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা হয় তাহলে আল্লাহ্ কেন গণতন্ত্রের কথা বললেন না? কেন আসমানি নির্দেশনায় গণতন্ত্রের কথা এল না? মানুষ নিজে নিজে এমন একটা সরকার-ব্যবস্থা বানিয়ে ফেলল, যা আল্লাহর ওয়াহি আর তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশনার চেয়ে উত্তম—এটা কীভাবে সম্ভব? এমন সংশয় এবং সন্দেহ মানুষের মনে সৃষ্টি হতেই পারে। কীভাবে আমরা এর মোকাবিলা করব?

আমার মতে, মৌলিক একটা প্রশ্ন দিয়ে প্রথমে শুরু করা উচিত। আমরা কেন আজ গণতন্ত্রকে শ্রেষ্ঠ সরকার-ব্যবস্থা মনে করছি? গণতন্ত্রের শক্তি হিসেবে এর প্রচারকরা প্রথম যে বৈশিষ্ট্যের কথা বলে তা হলো—চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স বা রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার বিভাজন। এই বৈশিষ্ট্য নাকি গণতন্ত্রকে অন্য সব ব্যবস্থার ওপর শ্রেষ্ঠত্ব এনে দেয়।

চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের ব্যাপারটা আসলে কী?
মূল বিষয়টা হলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা সরকারের তিন বিভাগের মধ্যে ভাগ করে দেয় থাকবে। প্রতিটি বিভাগ অন্য দুটি বিভাগের ক্ষমতার ওপর একধরনের বাঁধ হিসেবে কাজ করবে। ফলে কোনো ব্যাক্তি, দল বা গোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারবে না। একচেটিয়া ক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে না।
যেমন অ্যামেরিকাতে নির্বাহী শাখা, আইনসভা এবং বিচার বিভাগ আছে-প্রেসিডেন্ট, কংগ্রেস এবং সুপ্রিম কোর্ট। এই তিন শাখা একে অপরের ওপর নজরদারি করবে। কোনো এক বিভাগের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হবে না, কারও একক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না, বরং তিনটি স্বতন্ত্র এবং স্বাধীন বিভাগের মাধ্যমে একধরনের ভারসাম্য তৈরি হয়ে।। দেশের আইন, যুদ্ধের সিদ্ধান্তের মতো বিভিন্ন বিষয়ে কোনো শাখা এককভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। সব গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সিদ্ধান্ত হতে হবে তিন শাখার সমন্বয়ে।

চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের এই ব্যবস্থা তাত্ত্বিকভাবে খুব চমৎকার মনে হয়। ইসলামেও একধরনের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের ধারণা আছে। তবে পার্থক্য হলো গণতন্ত্রে এ ধারণা কেবল বাহ্যিকভাবে আছে। ভাসাভাসা কিছু প্রয়োগ ছাড়া এর কোনো প্রকৃত বাস্তবতা নেই। অন্যদিকে ইসলামের চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের ব্যবস্থা বাস্তব এবং প্রকৃত অর্থে ভারসাম্য তৈরি করে।
কী বিশ্বাস হচ্ছে না? দাঁড়ান, ব্যাখ্যা করছি।

অ্যামেরিকা কিংবা অন্য কোনো পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দিকে তাকালে ব্যাপক দুর্নীতি দেখা যায়। বিভিন্ন লবি, পলিটিকাল অ্যাকশন গ্রুপ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সরকারের বিভিন্ন শাখাকে প্রভাবিত করে। যেমন, অ্যামেরিকাতে হেলথ ইন্সুরেন্স (স্বাস্থ্যবীমা) কোম্পানিগুলো কংগ্রেস আর প্রেসিডেন্টকে টার্গেট করে লবিয়িং করে। সহজ ভাষায় বললে, প্রচুর টাকার বিনিময়ে এই দুই শাখার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে তারা এমন আইন পাশ করিয়ে নেয়, যেটা তাদের ব্যবসার জন্য লাভজনক হবে। এটা অবশ্যই একধরনের দুর্নীতি। কংগ্রেস সদস্য এবং প্রেসিডেন্টের কর্তব্য সাধারণ মানুষের স্বার্থ রক্ষা করা। জনগণের জন্য কোনটা সবচেয়ে ভালো তা দেখা। কিন্তু টাকার কারণে জনগণের স্বার্থের বদলে তারা মনোযোগ দিচ্ছে কর্পোরেশানগুলোর স্বার্থ রক্ষায়। এভাবে বিভিন্ন স্বার্থবাদী অ্যাডভোকেসি গ্রুপ এবং লবিগুলো সরকারের বিভিন্ন অংশের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। অ্যামেরিকার ইতিহাসজুড়ে এমন অনেক উদাহরণ আছে। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব নেতিবাচক। এ কারনেই অ্যামেরিকার ইতিহাসে আমরা এত যুলুম দেখতে পাই।

উত্তর অ্যামেরিকার 'রেড ইন্ডিয়ান' আদিবাসীদের ওপর চালানো গণহত্যা, আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে আনা মানুষের ওপর শোষণ, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আণবিক বোমা হামলার মতো অবিশ্বাস্য নিষ্ঠুরতা, সাম্প্রতিক সময়ে ইরাক এবং আফগানিস্তানে চালানো আগ্রাসন-অনেক দৃষ্টান্ত আছে। এ সব বিশাল মাপের অপরাধের সিদ্ধান্ত কিন্তু রাষ্ট্রের সব শাখার ঐকমত্যেই হয়েছে। তাই গণতন্ত্রের এই চেক অ্যান্ড ব্যালেন্সের মাধ্যমে অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার বন্ধ হবার কিংবা কমে যাবার দাবি আসলে করা যায় না। এমন দাবির বিরুদ্ধে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। জেনোসাইডের চেয়ে মারাত্মক অপরাধ কয়টা আছে? কিন্তু অ্যামেরিকার মতো সেক্যুলার গণতন্ত্রগুলো এ ধরনের অপরাধ বারবার করেছে। তাদের মৌন সম্মতি নিয়ে এমন অপরাধ হয়েছে এবং হচ্ছে। চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থার ভেতর, রাষ্ট্রের সব বিভাগের ঐকমত্যেই এসব অপরাধ হয়েছে।

গণতন্ত্রের পক্ষের লোকজন বলতে পারে, এ ঘটনাগুলোর জন্য গণতন্ত্রকে দোষী করা উচিত না। এগুলো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার 'ভুল প্রয়োগ'-এর উদাহরণ। গণতন্ত্র যখন সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়, তখন এ ধরনের কিছু হয় না। হ্যাঁ, বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে, কিন্তু এগুলো গণতন্ত্রের কারণে না। গণতন্ত্র যদি আদর্শভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, দুর্নীতিবিরোধী শক্ত আইন তৈরি হয়, যদি আমরা অ্যান্টি-লবিয়িং আইন বানাই, তাহলে এসব সমস্যা দূর হয়ে যাবে।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অপরাধের কথা বললে এটা হবে গণতন্ত্রের পক্ষে কাউন্টার আরগুমেন্ট। সেই কাউন্টার আরগুমেন্টের উত্তর কী হবে?
আমার মতে-গণতন্ত্রের মধ্যে মৌলিক একটা সমস্যা আছে। সমস্যাটা আইনের উৎস নিয়ে। গণতন্ত্রে আইনের ভিত্তি কী হবে? অধিকাংশের মতামত? অধিকাংশ মানুষ ভোট দিয়ে সাংসদ বা কংগ্রেস সদস্য নির্বাচন করবে, তারপর জনপ্রতিনিধিরা অধিকাংশের মতের ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করবে?

যদি তাই হয় তাহলে এখানে বড় ধরনের একটা সমস্যা থেকে যায়। জনপ্রিয়তা কখনো সঠিকত্বের মাপকাঠি হতে পারে না। অধিকাংশ মানুষ যে নৈতিকভাবে সঠিক অবস্থান গ্রহণ করবে তার গ্যারান্টি কী? অধিকাংশের মতামত যে সত্যিকারের ইনসাফের অবস্থান হবে তার নিশ্চয়তা কী? আমরা কেন ধরে নিচ্ছি ভোটদাতাদের অধিকাংশ নৈতিকভাবে সঠিক অবস্থানের পক্ষেই ভোট দেবেন? মানুষ তার নিজ নিজ স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে, এমন ধরে নেয়াই তো যৌক্তিক। যদি এমনই হয় তাহলে কীভাবে এই প্রক্রিয়া থেকে নৈতিক এবং ইনসাফপূর্ণ ফলাফল আসবে? উল্টোটাই তো আসার কথা।

আরেকটা বাস্তবতা হলো, জনমত প্রভাবিত করা এবং ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করা বেশ সহজ। অ্যামেরিকার ইতিহাসে এর অনেক উদাহরণ আমরা দেখতে পাই এবং আজও দেখতে পাচ্ছি। ম্যাস মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনমতকে গভীরভাবে প্রভাবিত করা যায়। এই প্রভাবের মাত্রা সম্পর্কে সামান্য পরিমাণ ধারণা কারও থেকে থাকলে সে সহজেই বুঝবে, অধিকাংশের মত দিয়ে মানুষের কুপ্রবৃত্তির ওপর কোনো ধরনের বাঁধ দেয়া সম্ভব না; বরং অধিকাংশের মতামত, অধিকাংশ সময় জাতিকে ইনসাফ ও নৈতিকতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।

গণতন্ত্র কখনো নৈতিকতার বিকল্প হতে পারে না। আর এ কারণেই ধর্ম গুরুত্বপূর্ণ, এ কারণেই সত্য ধর্ম-ইসলাম-গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সত্যিকারের নৈতিকতার ধারণা দেয় ইসলাম। ইসলামে নৈতিকতার মাপকাঠি মানুষের খেয়ালখুশি না। মাপকাঠি হলো ওয়াহি এবং রিসালাত। ইসলামে ভালোমন্দের বাছবিচারের জন্য মহান আল্লাহর নির্দেশকে গ্রহণ করা হয়, যিনি মানবজাতিসহ সবকিছুর স্রষ্টা। আর ইসলামের এই নৈতিকতা কার্যকরী নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করে। আমাদের কাছে যদি ভালোমন্দের পরম মাপকাঠি থাকে তাহলে সরকার কিংবা শাসক সঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নাকি ভুল করছে, ন্যায়বিচার করছে নাকি যুলুম করছে, সেই মাপকাঠির মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারব। এমন একটি পরম মানদণ্ড থাকা অত্যন্ত জরুরি। এই মানদণ্ড যদি না থাকে; যেমন আজকের সেক্যুলার-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নেই, তাহলে সত্যিকার অর্থে ক্ষমতার ওপর কোনো চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকতে পারে না।

এর বাস্তব প্রমাণ আমাদের সামনেই আছে। কোনটা নৈতিক কোনটা ন্যায্য-এ প্রশ্নগুলোর ব্যাপারে অ্যামেরিকা রাষ্ট্রের সব শাখার অবস্থান মোটামুটি একই। যখন যে অবস্থান সমাজে জনপ্রিয়তা পায়, রাষ্ট্রের শাখাগুলো সেই অবস্থানই গ্রহণ করে। ভালোমন্দ, নৈতিক-অনৈতিক, ন্যায়-অন্যায় বিচার করার স্বাধীন কোনো মাপকাঠি এখানে নেই। তাই সত্যিকার অর্থে এখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো ভারসাম্য নেই।
রাষ্ট্রে যদিও বিভিন্ন শাখা আছে, কিন্তু তারা খুব সহজে নিজেদের মধ্যে আঁতাত করতে পারে। কেউ চাইলে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য অনুযায়ী সবগুলো শাখাকে একই অবস্থানে নিয়ে আসতে পারে। আর এমন কোনো স্বতন্ত্র, স্বাধীন মাপকাঠিও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নেই, যার ভিত্তিতে তাদের কর্মকাণ্ডের বিচার করা যাবে। এ কারনেই সেক্যুলার-লিবারেল গণতন্ত্রগুলোর জন্য এত ভয়ংকর মাত্রার অপরাধ করা এতটা সহজ। এ জন্যই তাদের ইতিহাসজুড়ে এত নৃশংসতা।

কিন্তু ইসলামী ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি নৈতিকতার পরম মাপকাঠি যখন গ্রহণ করা হয় তখন এমন ঘটে না। ইসলামী আইন আর নৈতিকতার এই মাপকাঠির হেফাযতকারী হলেন আলিমগণ। ইসলামী ইতিহাসজুড়ে উলামায়ে কেরাম সতর্কতার সাথে শাসকদের (সুলতান, আমির, খলিফা) সাথে দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। কারণ, তারা জানতেন ক্ষমতা মানুষকে কলুষিত করতে পারে। আলিম যখন শাসকের কাছাকাছি হয়ে যান তখন শাসক সেই আলিমের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। শাসক তাকে দিয়ে এমন ফতোয়া দেয়ায়, যেটা তার স্বার্থসিদ্ধি করবে।

আর আলিম ও শাসকের মধ্যে এই দূরত্বের বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্টভাবে তার হাদীসে উল্লেখ করেছেন।
যে শাসকদের দরজায় যায়, সে ফিতনায় পতিত হয়। শাসকের সঙ্গে যার নৈকট্য যত বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর থেকে তার দূরত্ব তত বেশি বেড়ে যায়।

এই হাদীস, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সীরাতের শিক্ষা, সাহাবায়ে কেরামের (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুম) দৃষ্টান্ত এবং উম্মাহর পূর্ববর্তী কল্যাণময় প্রজন্মের অধিকাংশের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আলিমগণদের একটি অংশ সব সময় শাসকদের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রেখেছেন এবং তাদের নিয়ন্ত্রণমুক্ত থাকার চেষ্টা করেছেন।
এটা হলো একটা সত্যিকারের নৈতিকতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত প্রকৃত চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স ব্যবস্থা। সুলতান কিংবা খলিফা দুর্নীতিবাজ হতে পারে। সে জনগণকে কিংবা অর্থনীতিকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। কিছু আলিমকেও সে নিজের আয়ত্তে আনতে পারে। কিন্তু সব সময় এমন কিছু আলেম থাকবেন, যারা দুর্নীতি এবং বিচ্যুতির বিরুদ্ধে কথা বলবেন। শাসকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার কারণে অনেক আলিম নির্যাতিত হয়েছেন, তাঁদের বন্দী করা হয়েছে, হত্যাও করা হয়েছে। এটি ইসলামী ইতিহাসের এবং ইসলামী শাসনের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এখান থেকে এটাও বোঝা যায় যে রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের পশ্চিমা যে ধারণা, সেটা ইসলামে নেই। জনগণের সাথে শাসকের চুক্তি হলো, শাসক ইসলামী শরীয়াহ বাস্তবায়ন করবে, ইসলামী মূল্যবোধ ও বিধান অনুযায়ী শাসন করবে। এই কাজগুলো সে যতদিন করবে ততদিন জনগণ তার আনুগত্য করবে। এই হলো শাসনব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু যে চূড়ান্ত নৈতিক মানদণ্ড পুরো শাসনব্যবস্থার ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে তার ধারক-বাহকেরা-অর্থাৎ আলিমরা- সরাসরি শাসকের সাথে যুক্ত নন। আর এ কারণেই তাঁরা ক্ষমতা ও সম্পদের কলুষিত করার প্রভাব থেকে মুক্ত।

সেক্যুলার গণতন্ত্রের মৌলিক ত্রুটি হলো তারা ধরে নেয় জনমত সঠিক সমাধান দেবে। বাস্তবতা বলে অধিকাংশের মত অধিকাংশ সময় ভুল হয়। এমন নড়বড়ে, নৈতিক ভিত্তির ওপর আসলে ভরসা করা যায় না। এ কারণেই আধুনিক পশ্চিমের ইতিহাসে ভালোমন্দের সংজ্ঞা আমরা বারবার বদলাতে দেখি। সংজ্ঞা বদলায়, কারণ জনমত বদলায়। যা ঘৃণ্য ছিল, একসময় সেটার বিরোধিতা করা ঘৃণ্য হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের বাস্তবতা বোঝা উচিত। গণতন্ত্রের চেয়ে অনেক শক্তিশালী এবং নিখুঁত ব্যবস্থা ইসলামে আছে, এটা আমাদের উপলব্ধি করা দরকার। হ্যাঁ, আমাদের ইতিহাসে যুদ্ধ হয়েছে। আমাদের ইতিহাসে এমন শাসক ছিল, যারা যালিম, দুর্নীতিবাজ, যারা অনেক ভয়ংকর অপরাধ করেছে। কিন্তু এ পুরোটা সময়জুড়ে আমাদের সুনির্দিষ্ট এবং সুসংগত নৈতিকতা ছিল-শরীয়াহ। এমন এক কম্পাস ছিল, যা শত ঝড়ের মাঝেও আমাদের সঠিক পথের ওপর রেখেছে। শত যুলুমের পরও ন্যায়-অন্যায়ের বোধ আমাদের মাঝে জাগ্রত রেখেছে। উম্মাহ কখনো এই অপরাধগুলোকে বৈধতা দেয়নি। এটাই হলো আল্লাহর কাছ থেকে আসা প্রকৃত নির্দেশনা।
কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আজ আমরা ইসলাম এবং আমাদের মুসলিম পরিচয় নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভুগি। আর তাই ভাবি নৈতিকতা আর শাসন-ব্যবস্থাকে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর চেয়ে দুনিয়ার একটা নির্দিষ্ট অঞ্চলের কিছু দার্শনিক ভালোভাবে বুঝেছে।

টিকাঃ
[২১] চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স: একে সেপারেশন অফ পাওয়ার (ক্ষমতার বিভাজন) বলা হয়ে থাকে। নির্বাহী, আইনসভা এবং বিচার বিভাগ-রাষ্ট্রের এ তিন অঙ্গের স্বাধীন উপস্থিতি এবং ক্ষমতার বিভাজন থাকবে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরস্পর থেকে আলাদা থাকবে এবং তাদের নির্ধারিত ভূমিকা স্বাধীনভাবে পালন করবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে একটি আরেকটির ওপরে কার্যত নজরদারি করবে। নিবন্ধী বিভাগ যেন ইচ্ছেমতো চলতে না পারে, তা আইনপ্রণেতারা (অর্থাৎ আইনসভা) এবং বিচার বিভাগ দেখবে। আইনপ্রণেতারা যেন এমন আইন তৈরি করতে না পারেন, যা নাগরিকের অধিকারকে সীমিত করে, তা দেখার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। একেই 'চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স' বলে অভিহিত করা হয়। স্বাধীনভাবে এগুলো চলার অর্থ হচ্ছে কেউ কারও মুখাপেক্ষী হবে না, কেউ কারও সঙ্গে আলাপ- আলোচনা করে পদক্ষেপ নেবে না। এর উদ্দেশ্য ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ নিয়ন্ত্রণ এবং ক্ষমতার একক ব্যবহার নিরোধ। রাষ্ট্রের সর্বময় ক্ষমতা যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে সার্বিকভাবে ন্যস্ত না হয় তা নিশ্চিত করা, এই তত্ত্বের মূল কথা। - অনুবাদক
[২২] মুসনাদ আহমাদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00