📘 সংশয়বাদী > 📄 জার্মানি ও হিজাব

📄 জার্মানি ও হিজাব


হিজাব নিষিদ্ধ করা নিয়ে জার্মানির পরিস্থিতি সেক্যুলারিসমের অন্তর্নিহিত সাংঘর্ষিকতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ২০১৬ এর এক রিপোর্টে এসেছে:
জার্মানীর প্রভাবশালী দুটি সংস্থা জার্মান বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে হেডস্কার্ফ/হিজাবের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে আদালতের 'নিরপেক্ষতা' বজায় রাখার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি।
অ্যাসোসিয়েশন অফ জার্মান অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ জাজেস এর চেয়ারম্যান রবার্ট সিগমুলারের মতে-বিচারের ফলাফল কেবল আইনের ওপর নির্ভরশীল, কোনো ব্যক্তির ওপর না-তা দেখানোর জন্য বিচারক ও আইনজীবীদের নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরা উচিত। সেই নির্ধারিত ইউনিফর্ম হলো কালো আলখেল্লা, সাদা শার্ট, সাদা বো-টাই এবং গলবন্ধ কিংবা নেকারচিফ।

এই কালো আলখেল্লার উৎস কী জানেন?
নিউইয়র্ক টাইমসের গবেষকদের মতে,
'বিচারিক পোশাকের (judicial robe) আদি উৎস যদিও সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে অনেকেই মনে করেন এটি এসেছে গির্জার পাদরিদের কালো আলখেল্লা থেকে। অতীতে গির্জা আর বিচারবিভাগ আজকের মতো আলাদা ছিল না। ব্রিটেনের বিচার বিভাগে কালো আলখেল্লার ব্যবহার শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে'।

এমন কি হতে পারে যে ইউরোপের ধর্মগুরুরা আলখেল্লা পরার এই রীতি গ্রহণ করেছিল মুসলিমদের জুব্বার অনুকরণে? আরব ও মুসলিম সমাজে জুব্বাকে দেখা হতো সম্মান, ধর্মীয় মর্যাদা এবং পাণ্ডিত্যের চিহ্নবাহী পোশাক হিসেবে। সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। যাই হোক, যে কালো আলখেল্লা নিয়ে জার্মান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা 'নিরপেক্ষতা' প্রমাণ করতে চাচ্ছে, তার উৎস ধর্মীয়—এটুকু পরিষ্কার।

পোশাক হিসেবে লম্বা আলখেল্লা মুসলিমদের কাছে আজও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। মুসলিম নারী ও পুরুষ-উভয়ই এটা পরে। মুসলিম-বিশ্বের অনেক নারী কালো আলখেল্লা পরেন, যেটাকে জিলবাব বলা হয়। ইহুদী এবং খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরাও কালো আলখেল্লা পরে থাকে। কালো আলখেল্লার একটা ধর্মীয় গুরুত্ব সব সময়ই ছিল।

যেসব সেক্যুলারিস্ট হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা বলে, অন্যান্য আরও ধর্মীয় চিহ্ন জনজীবন থেকে মুছে ফেলার কথা বলে, তাদের একটা প্রিয় যুক্তি হলো নিরপেক্ষতা। তারা বলে, জনপরিসরের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হলে ধর্মীয় পোশাক আর ধর্মীয় চিহ্ন বাদ দিতে হবে। এ যুক্তির বিরুদ্ধে সহজ-সরল এবং যৌক্তিক আপত্তি হলো: কোন পোশাক নিরপেক্ষ, সেটা কে ঠিক করবে?

আসলে এটা সেক্যুলারিসমের মৌলিক প্রতারণাগুলোর একটা। যা কিছু ধর্মীয় তাঁর সবটুকুই যদি সমাজ, রাষ্ট্র থেকে বাদ দেয়া হয়ে তাহলে বাকি কী থাকে? সেক্যুলারিসমের বক্তব্য হলো, যা কিছু ধর্মীয় তা বাদ দেয়ার পর সমাজ ও রাষ্ট্র সত্যিকারভাবে নিরপেক্ষ হবে। আর এ অবস্থা থেকেই সেক্যুলারিসমের যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন কোনো নিরপেক্ষ কেন্দ্র নেই, যা মেটাফিযিকালিটি কিংবা নরম্যাটিভিটি থেকে মুক্ত। ধর্মের যে মেটাফিযিকালিটি এবং নরম্যাটিভিটি নিয়ে সেক্যুলারিসমের এত আপত্তি তা থেকে মুক্ত কোনো অবস্থান নেই।

একমাত্র সমাধান হলো নিজে থেকে একটা নিরপেক্ষ, সেক্যুলার কেন্দ্র বানিয়ে নেয়া। সেটা কীভাবে হবে? আপনি স্রেফ বলে দেবেন কোনো একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতি, চেতনা, নৈতিকতা আর নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক সেক্যুলার। আর বাকি সবকিছু ধর্মপ্রভাবিত, সাম্প্রদায়িক।
কোনো কিছুকে সেক্যুলার সাব্যস্ত করার এই প্রক্রিয়া বৈধতা পায় মানুষের সামষ্টিক সাংস্কৃতিক প্রথাপ্রচলনের কারণে। মুসলিমদের আচার আচরণ এবং পোশাক যেহেতু ইউরোপের কাছে 'বিজাতীয়' তাই খুব সহজেই ইউরোপীয়ানদের চোখে এগুলো 'ধর্মীয়' হিসেবে ধরা পড়ে। কিন্তু খ্রিষ্টধর্মীয় উৎস থেকে আসা পশ্চিমা নানান পোশাক, প্রথা এবং নৈতিকতা যেহেতু ইউরোপের 'পরিচিত' তাই সেগুলোকে সংস্কৃতি বলা যায়, সেক্যুলার আর নিরপেক্ষ ধরা যায়। এ হলো নিছক কথার খেলা।

একদিকে কালো আলখেল্লাকে সেক্যুলার সাব্যস্ত করা আর অন্যদিকে হেডস্কার্ফকে ধর্মীয় আখ্যা দেয়ার পুরো ব্যাপারটাই সেক্যুলারিসমের কথিত নিরপেক্ষতার অন্তঃসারহীনতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এভাবেই সেক্যুলারিসম এক বানোয়াট 'নিরপেক্ষতা' তৈরি করে কৃত্রিমভাবে নিজের 'পক্ষপাতশূন্যতা' বজায় রাখার জন্য।

এখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়েও কিছু কথা বলা দরকার। সেক্যুলারদের আক্রমণের মোকাবিলায় ধর্মীয় স্বাধীনতার যুক্তি ব্যবহার করা উচিত না; বরং আমাদের উচিত সেক্যুলারিসমের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য আর সাংঘর্ষিকতাগুলো তুলে ধরা। মুসলিমদের হিজাব নিয়ে তাদের আপত্তি যে কালচারাল বায়াস ছাড়া আর কিছু না এটা তাদের স্বীকার করতে বাধ্য করা। তারা এটা মেনে নিলে ভালো। কিন্তু নিজেদের বায়াসকে তারা নিরপেক্ষতা, যৌক্তিকতা আর ন্যায়পরায়ণতা বলে চালাবে-এটা হবে না।

যদি তারা স্বীকার করে নেয় কালচারাল বায়াসের কারণে তারা হিজাবের বিরোধিতা করে, তাহলে আমরা সেটা মেনে নিতে রাজি আছি। কারণ, আমরা মুসলিমরাও আমাদের নিজস্ব মাপকাঠি অনুযায়ী পোশাকের নিয়ম ঠিক করতে চাই। তবে আমাদের মাপকাঠি পপ কালচার বা সাংস্কৃতিক খেয়ালখুশি দ্বারা প্রভাবিত না; বরং আমাদের মাপকাঠির ভিত্তি ইসলামী মূল্যবোধ এবং শালীনতার ব্যাপারে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা।
ধর্মীয় স্বাধীনতার সেক্যুলার যুক্তির বদলে আমাদের উচিত আলোচনা এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মাপকাঠির তর্কে নিয়ে আসা।

টিকাঃ
[১০] German judges call for headscarf ban in court to show 'neutrality', August 09, 2016. Independent, UK.
[১১] Behind the Gavel, a Sense of Style, September 5, 2008, The New York Times.
[১২] মেটাফিযিক্স-বাংলায় অধিবিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা প্রাথমিক মূলনীতিসমূহ (first principles) এবং সত্তা, অস্তিত্ব, জানা, পরিচয়, মন, সময়, বস্তু, সময়, স্থান, সম্ভাবনা এর মতো বিভিন্ন বিমূর্ত ধারণা নিয়ে কাজ করে। - অনুবাদক
[১৩] নরম্যাটিভ- মানবসমাজগুলোতে কিছু কাজ ও ফলাফল ভালো, আকাঙ্ক্ষিত কিংবা বৈধ সাব্যস্ত করা হয়। আবার কিছু কাজ ও ফলাফলকে মন্দ, অনাকাঙ্ক্ষিত কিংবা অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়। একে নরম্যাটিভিটি বলা হয়। নরম্যাটিভিটি দ্বারা কোনো-না-কোনো ধরনের উচিত-অনুচিতের ধারণা প্রকাশ পায়। নরম্যাটিভিটির মূল আলোচনা নৈতিকতা নিয়ে। প্রায় প্রত্যেক নৈতিকতার কাঠামো কোনো-না-কোনো ধরনের নরম্যাটিভিটির ওপর নির্ভরশীল।
[১৪] ওপরে কথা দ্বারা লেখকের উদ্দেশ্য হলো সেক্যুলারিসম যেটাকে নিরপেক্ষ কেন্দ্র বলছে, সেই কেন্দ্রও দাঁড়িয়ে আছে কোনো একটি নির্দিষ্ট মেটাফিযিকাল এবং নরম্যাটিভ অবস্থানের ওপর। কাজেই সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ কোনো কেন্দ্র সেক্যুলারিসম দিতে পারে না। এমন কোনো ক্যানভাস নেই, যা রংহীন। - অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের ধাপ্পাবাজি

📄 রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের ধাপ্পাবাজি


রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের ধারণাটা কি আসলে সামঞ্জস্যপূর্ণ? সভ্য আর অসভ্য সমাজের মধ্যে পার্থক্য ধরা হয় আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাবকে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে আমরা কী দেখি? যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয় তখন ট্রাম্প থেকে শুরু করে উগ্র বামপন্থী, সবাই আইনের শাসনের কথা বলে। কিন্তু কোনো কিছু যখন তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তখন তারা আইন বদলানোর কথা বলা শুরু করে।

এ ক্ষেত্রে তারা একটা পূর্ব-ধারণার ওপর ভিত্তি করে কথা বলে। সেই ধারণাটা হলো, কোনো কিছু বৈধ হওয়া আর নৈতিকভাবে ভালো হওয়া এক না। অনেক কিছু বৈধ হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই না যে সেটা ভালো। আবার অনেক কিছু আইন অনুযায়ী অবৈধ হতে পারে। তার মানে এই না যে সেটা খারাপ। অর্থাৎ ভালোমন্দের চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয় নৈতিকতা, আইনের শাসন না।

প্রশ্ন হলো, এই নৈতিকতার ভিত্তি কী হবে? নৈতিকতা এত গুরুত্বপূর্ণ হলে, নৈতিকতা আর এর ভিত্তি নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া দরকার না? ভালোমন্দ, মানবজীবনের লক্ষ, পবিত্রতা, শুদ্ধাচার আর ভ্রষ্টাচার-এগুলো নিয়ে আরও কথা হওয়া দরকার না?

কিন্তু আমরা এ ধরনের আলোচনা দেখি না। কারণ, নৈতিকতা হলো ধর্মের আলোচনার জায়গা। নৈতিকতার আলোচনা আনতে গেলে ধর্মকে আনতে হবে। আর সেক্যুলার রাষ্ট্রে যেহেতু আইনকে ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হতে দেয়া যাবে না, তাই ধর্মকে দূরে রাখার জন্য এই আলোচনাকেও দূরে রাখতে হয়।

কিন্তু তাহলে আবার সেই পুরোনো প্রশ্নে ফিরে যেতে হয়। আইনের ভিত্তি অন্তর্নিহিত নৈতিকতা। কিন্তু সেই নৈতিকতার ভিত্তি কী?
কোনো-না-কোনো নৈতিকতা, কোনো-না-কোনো মাপকাঠি তো লাগবেই। কিন্তু এ প্রশ্নগুলো শুধু 'অন্যায্য আইন' নিয়ে প্রতিবাদ করার সময় আলোচিত হয়। আর তখনো আলোচনা সীমাবদ্ধ থেকে যায় 'ন্যায়বিচার কী', এ প্রায়ই। কিন্তু ন্যায়বিচার কী-তার জবাব দিতে হলেও আগে ভালো-মন্দ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, শুদ্ধাচার-ভ্রষ্টাচারের কাঠামো ঠিক করে নিতে হবে। এমন কোনো কাঠামো কি আছে?

অবশ্যই আছে। অনেকগুলো আছে। সেগুলোকে আমরা ধর্ম বলি। অবশ্য এমন কিছু কাঠামোও আছে, যেগুলো তৈরি হয়েছে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। তবে স্রষ্টার দোহাই না দিলেও মানুষ কী করবে আর কী করবে না, কীভাবে তার জীবনযাপন করা উচিত-ধর্মের মতোই এই কাঠামোগুলোও সেটা নির্ধারণ করে দিতে চায়। এগুলোকেও ধর্মগুলোর মতোই সত্য বলে ধরে নেয়া হয়, অনুসরণ করা হয়।

ধর্মীয় কাঠামো আর স্রষ্টাকে অস্বীকার করা কাঠামো; অর্থাৎ নৈতিকতার সেক্যুলার কাঠামো-আইন প্রণয়নের প্রশ্নে এ দুই ধরনের কাঠামোর মধ্যে কি কার্যত কোনো পার্থক্য আছে? আমি মনে করি আইনের ভিত্তি হওয়া উচিত ধর্মীয় মূল্যবোধ। আমি জানি অনেকে আইনের ভিত্তি হিসেবে সেক্যুলার মূল্যবোধকে পছন্দ করে। আমি যখন সেক্যুলার রাষ্ট্রে বসবাস করি, এই সেক্যুলার-নাস্তিক নৈতিকতাকে তখন আমার মেনে নিতে হয়। আসলে মেনে নিতে হয়, বলাটা ভুল হবে। আমাকে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। নৈতিকতার এ কাঠামো নিয়ে যদিও আমার অনেক আপত্তি, অনেক বিরোধিতা আছে, তবুও সেক্যুলার রাষ্ট্র জোর করে তার পছন্দের নৈতিকতা আমার ওপর চাপিয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো এই অভিযোগ তুলেই সেক্যুলার রাষ্ট্র ক্রমাগত ধর্মরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে, অথচ ঠিক একই কাজ সেক্যুলার রাষ্ট্রও করে।

এ কথা স্বীকার করার মতো সততা কি সেক্যুলারদের আছে?
এই বাস্তবতাকে যদি মেনে নেয়া হয় তাহলে ধর্মীয় স্বাধীনতা নামক অন্তঃসারশূন্য বুলি নিয়ে আদিখ্যেতা বাদ দেয়া যায়। মুসলিমরা যখন শরীয়াহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে, শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা জানায় তখন ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি দিয়ে হাতুড়ির মতো বারবার মুসলিমদের ওপর ঘা দেয়া হয়। কিন্তু এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অস্তিত্ব সেকুলার রাষ্ট্রেই নেই।

ধর্ম আর রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ একটা ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই না।

📘 সংশয়বাদী > 📄 সুইজারল্যান্ডে হাতাহাতি!

📄 সুইজারল্যান্ডে হাতাহাতি!


সুইয়ারল্যান্ড মুসলিম ছাত্রদের জরিমানা করা শুরু করে ২০১৬-তে। তাদের অপরাধ, শিক্ষিকার সাথে হাত মেলাতে অস্বীকার করা। এই ‘গুরুতর’ অপরাধের কারণে মুসলিম ছাত্রদের ৫০০০ ডলার পর্যন্ত ফাইন করার আইন হয়।

আচ্ছা, মানুষকে তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আরেকজনের শারীরিক সংস্পর্শে আসতে বাধ্য করা কি একধরনের যৌন হয়রানি না? নারীবাদীরা তো ক্রমাগত পারস্পরিক সম্মতির গুরুত্ব নিয়ে চেঁচামেচি করে, কিন্তু এ বিষয়ে তারা মুখে কুলুপ এঁটে রইল কেন? সম্ভবত মুসলিম পুরুষের ক্ষেত্রে এসবের কোনো মূল্য নেই। একজন মুসলিম পুরুষ যখন অমুসলিম কোনো নারীর সাথে হাতে মেলাতে অস্বীকার করে তখন সে সম্ভবত সেই নারীকে শোষণ করার চেষ্টা করছে, যেভাবে সে নিজের মা-বোন-স্ত্রী-কন্যাকে শোষণ করে-তাই না?

পশ্চিমা বিশ্বে এমনও মহিলা আছে, কথা বলার সময় চোখে চোখ রেখে না হাসলে যারা রীতিমতো অপমানিত বোধ করে। এটা নাকি অপমান, অশ্রদ্ধা! কী অদ্ভুত! তুমি যে ধরনের সামাজিক রীতিনীতিতে অভ্যস্ত কোনো কিছু সেটার সাথে না মেলা মানেই সেটা অশ্রদ্ধা? অপমান?
এই পশ্চিমারা একদিকে সহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ আর বৈচিত্র্যকে সম্মান করার কথা বলে। অন্যদিকে কোনো মুসলিম তার ধর্মের বিধান মেনে চললে সেটাকে অসহিষ্ণুতা বলে গলা ফাটায়। একজন মুসলিম আদৌ অসম্মান করতে চাচ্ছে কি না, সেটা ধর্তব্য না। আমার সংস্কৃতি অনুযায়ী আমার কাছে একে অসম্মান মনে হচ্ছে, তাই আমি এটাকে অসহিষ্ণুতা বলে চালিয়ে দেবো। আসলে সহিষ্ণুতা বলতে ওরা কী বোঝায়? মাঝে মাঝে ইন্ডিয়ান কারী কিংবা অ্যারাবিয়ান শর্মা খাওয়া? হ্যালোউইনের সময় বিভিন্ন দেশের পোশাক পরে যেমন খুশি তেমন সাজো খেলা?

শিক্ষিকার হাত মেলাতে অস্বীকার করা কেন বেআইনি, তার পক্ষে সেক্যুলারদের পছন্দের আরেকটা যুক্তি আছে—
এর মাধ্যমে জেন্ডার রোল আর জেন্ডার সেগ্রেগেশানের ধারণাগুলো আরও পোক্ত হয়।

হ্যাঁ, তা তো হয়ই। সমাজে নারী-পুরুষের মেলামেশার ব্যাপারে ইসলামী বিধানগুলোর উদ্দেশ্যই হলো নারীপুরুষের মেলামেশা সীমিত করা। তুমি মুসলিম না, তুমি কাফের, তাই নারী-পুরুষের মেলামেশা সীমিত করার ব্যাপারটা তোমার কাছে খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু তাই বলে আমাকেও কেন সেটা খারাপ বলে মানতে হবে? তুমি অজ্ঞ, তোমার অজ্ঞতাকে আমার কেন মানতে হবে? হ্যাঁ, তুমি বলতে পারো, এটা তোমাদের দেশ। তাই ইচ্ছেমতো আইন বানানোর অধিকার তোমাদের আছে। তোমাদের দেশে থাকতে হলে তোমাদের মূল্যবোধ আর তোমাদের নৈতিকতা মেনে নিয়েই থাকতে হবে।

ঠিক আছে, মানলাম। তাহলে সৌদি আরব, ইরান কিংবা আফগানিস্তান যখন তাদের দেশে, তাদের পছন্দমতো আইন বানায় তখন কেন তোমাদের এত আপত্তি? তারা যখন তাদের মূল্যবোধ, বিশ্বাস আর নৈতিকতা অনুযায়ী বাধ্যতামূলক ড্রেস কোড কিংবা জেন্ডার সেগ্রেগেশানের নিয়ম করে তখন কেন তোমাদের এত চেঁচামেচি? এটা কি ভণ্ডামি না? ডাবলস্ট্যান্ডার্ড না? একই কাজ তোমরা করলে উদারতা-সহিষ্ণুতা আর আমরা করলে সাম্প্রদায়িকতা? তোমরা তোমাদের পশ্চিমা মূল্যবোধ আর সংস্কৃতি অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে চাও। মুসলিমরা তাদের ইসলামী মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা বাস্তবায়ন করতে চায়। একমাত্র পার্থক্য হলো, মুসলিমরা লুকোচুরি করে না। তারা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র আর ধর্মীয় স্বাধীনতার দোহাই দেয় না। নিজেদের বিশ্বাস আর উদ্দেশ্যের কথা আমরা সোজাসুজি স্বীকার করি।

ধর্মনিরপেক্ষতা আর ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি আওড়ালেও পশ্চিমা বিশ্ব মুসলিমদের ইসলামের বিধান মানতে বাধা দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে বিধান অমান্য করতে বাধ্য করে। এটাই প্রমাণ করে সেক্যুলারিসমের নিরপেক্ষতা আসলে মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই না। এমন অনেক উদাহরণ আছে। সুইজারল্যান্ডের 'হ্যান্ডশেইক আইন' সেই লিস্টে নতুন এক সংযোজন কেবল।

আসলে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই। নিরপেক্ষতার নামে পশ্চিমারা তাদের মূল্যবোধ আর সাংস্কৃতিক রীতিনীতি অন্যদের ওপর চাপিয়ে দেয়। এ কারণেই ধর্মীয় স্বাধীনতার যুক্তি আওড়ে ইসলামের পক্ষে কথা বলার মানে হয় না। ধর্মীয় স্বাধীনতার পুরো ধারণাটাই এসেছে একটা নির্দিষ্ট পশ্চিমা প্রেক্ষাপট ও দর্শন থেকে। যেখানে ধর্মের নির্দিষ্ট একটা সংজ্ঞা আর ব্যাখ্যা আছে। আর এই সংজ্ঞার জন্মও নির্দিষ্ট পশ্চিমা সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে। ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণার অবধারিত ফলাফল হলো কালচারের পরিবর্তনের সাথে সাথে যেকোনো কিছু ধর্মীয় স্বাধীনতার নামে চালিয়ে দেয়া।

সমকামিতার কথাই ধরুন না। প্রথমে এটা ছিল সর্বজনীনভাবে নিন্দনীয় কাজ। তারপর কালচার যখন একটু বদলাল, তখন এটা হয়ে গেল ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের প্রশ্ন। কিছু ধার্মিক লোক এটাকে পাপ মনে করে আর কিছু মুক্তমনা টাইপের ধার্মিক এতে খারাপ কিছু দেখে না। তারপর এটা হলো ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রশ্ন। এখানে ভিন্নমতের সুযোগ আছে। এটা ইখতিলাফি বিষয়। ইজতিহাদের বিষয়। তারপর এল আরেকটা সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। সমকামিতা এখন সর্বজনীনভাবে নন্দিত। যারা এর বিপক্ষে, যারা সমকামিতার অধিকার নিয়ে উচ্ছ্বসিত না তারা গোঁড়া, ধর্মান্ধ। তাদের ধর্মীয় ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য না। কারণ, এটা তাদের ঘৃণা, বিদ্বেষ, গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতা আর ধর্মান্ধতার ফসল। আর এগুলো খুব ক্ষতিকর বিষয়। তাই এগুলো এখন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কোন ধর্মীয় অবস্থান সঠিক সেটা এখন থেকে রাষ্ট্র ঠিক করে দেবে। কোনো সমকামী এসে তার 'বিয়ের' জন্য আপনাকে কেক বানাতে বললে, চান বান আর চান, আপনাকে সেটা বানাতেই হবে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কথা বলে অস্বীকৃতি জানাতে পারবেন না।

অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময়জুড়ে অনেক মুসলিম পশ্চিমা-বিশ্বে পাড়ি জমিয়েছে। সেখানে অবস্থান করে সীমিতভাবে মোটামুটি ইসলাম পালন করতে পেরেছে। কিন্তু সেটা ধর্মীয় স্বাধীনতা, সহিষ্ণুতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার কারণে না। একেবারেই না। যারা আজও এটা বিশ্বাস করে বসে আছেন তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। মুসলিমরা মোটামুটিভাবে ইসলামের কিছু অংশ এতদিন পালন করতে পেরেছে, কারণ পশ্চিমা দেশগুলোর মূল সাংস্কৃতিক শেকড় ছিল খ্রিষ্টধর্মে। খ্রিষ্টধর্ম, ইহুদীধর্ম এবং ইসলামের নৈতিকতার কাঠামোর মধ্যে বেশ অনেকটুকু মিল আছে। যেহেতু ইসলামী মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা খ্রিষ্টধর্মের ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো কালচারের সাথে অনেক দিক থেকে মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল তাই মুসলিমদের এতদিন অতটা সমস্যা হয়নি।

কিন্তু এখন সেটা বদলাচ্ছে। ইহুদী ও খ্রিষ্টধর্মীয় শেকড় ত্যাগ করে পশ্চিমা সমাজ আজ ক্রমেই গ্রহণ করছে পৌত্তলিক এবং স্যাইটানিক চিন্তা ও সংস্কৃতি। খুব শীঘ্রই এমন অবস্থা আসবে যখন পশ্চিমা দেশগুলোর আইন ইসলামের একেবারে 'নির্দোষ' ফরয বিধানগুলো মানাও অসম্ভব করে তুলবে। এই আইনগুলো যখন বানানো হবে তখন পশ্চিমাদের কাছে সেগুলোকে ধর্মীয় স্বাধীনতা হস্তক্ষেপ বলে মনে হবে না; বরং তারা মনে করবে, এসব আইনের মাধ্যমে ধর্মীয় স্বাধীনতাকে আরও মজবুত করা হচ্ছে। অর্থাৎ ধর্মীয় বিধান পালনকে বেআইনি করার আইন তৈরি করা হবে ধর্মীয় স্বাধীনতার কথা বলে।

কিন্তু তখনো এমন একদল মুসলিম থাকবে, যারা বোকার মতো বিশ্বাস করবে, মুসলিমরা পশ্চিমে 'স্বাধীনভাবে' দ্বীন পালন করতে পারবে। আর ওই পর্যায়ে তারা এমন এক 'ইসলাম' আবিষ্কার করবে, যার সাথে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ইসলাম এর কোনো মিল নেই।
আর যে মুসলিমরা কল্পনার জগৎ থেকে বের হয়ে প্রকৃত ইসলাম আঁকড়ে ধরতে চাইবে তাদের মোকাবিলা করতে হবে কঠিন পরীক্ষা আর দুর্দশার। গত দশ বছরে আমেরিকা আর ইউরোপে যেভাবে ঘটনাপ্রবাহ এগিয়েছে, তা চলতে থাকলে এমন হওয়াটা সময়ের ব্যাপারমাত্র। ওয়াল্লাহু 'আলাম।

টিকাঃ
[১৫] In Switzerland, Muslim schoolchildren who refuse to shake their teacher's hand may be fined $5,000. May 25, 2016. The Washington Post
[১৬] সমকামী বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য কেক বা ফুলের ডেকোরেশান করতে অস্বীকৃতি জানানোর কারণে আইনী হয়রানি এবং জরিমানার বেশ অনেকগুলো ঘটনা পশ্চিমে ঘটেছে। আগ্রহী পাঠক দেখুন, Klein, dba Sweet Cakes by Melissa, v. Oregon Bureau of Labor and Industries, Masterpiece Cakeshop v. Colorado Civil Rights Commission, এবং Arlene's Flowers lawsuit. ~ অনুবাদক
[১৭] 'পশ্চিমা ইসলামের' এমন অনেক বৈশিষ্ট্য ইতিমধ্যে দেখা যাচ্ছে। অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 স্বৈরাচারই ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে শরীয়াকে প্রতিস্থাপন করতে চায়

📄 স্বৈরাচারই ধর্মীয় স্বাধীনতা দিয়ে শরীয়াকে প্রতিস্থাপন করতে চায়


অর্থনীতিবিদ মার্ক কোয়োমা তার 'আইডিয়াস আর নট ইনাফ' প্রবন্ধে সরল স্বীকারোক্তি করেছেন। তিনি বলেছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতা এমন কোনো বৈপ্লবিক ধারণা না, যেটা তার অন্তর্নিহিত শক্তি আর অপ্রতিরোধ্য যুক্তির জোরে পশ্চিমা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; বরং অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি সহিষ্ণু হওয়া ছিল ইউরোপের জন্য সময়ের দাবি। এটা কোনো আদর্শিক অবস্থান ছিল না, এটা ছিল প্র্যাকটিকাল সিদ্ধান্ত।

এই পরিস্থিতি কীভাবে তৈরি হলো? কোয়োমার মতে- একসময় ইউরোপের শাসকদের জন্য চার্চ বা পাদরিদের সাথে সম্পর্ক রাখা অপরিহার্য ছিল। জনসাধারণের কাছে বৈধতা আর গ্রহণযোগ্যতা অর্জনের জন্য চার্চের অনুমোদন লাগত। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হলে জনগণের কাছে বৈধতা পেতে হবে। আর শাসকদের কাছে স্থিতিশীলতা অত্যন্ত দামি। তাই শাসকরা চার্চের সাথে মৈত্রী করত। তবে এই মৈত্রীর কারণে শাসকদের 'সহিষ্ণুতা' বিসর্জন দিতে হতো। অনেক সময়ে চার্চের হয়ে ভিন্ন মতবাদে বিশ্বাসীদের শাস্তি দিতে হতো।

কিন্তু আধুনিকতার যুগের প্রথম দিক থেকে নানা কারণে রাজনৈতিক বৈধতার জন্য চার্চের ওপর শাসকদের নির্ভরতা কমতে থাকে। জনপরিসরে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্যেও একসময় শাসকদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নির্ভর করতে হতো। শিক্ষা, গরিবদের সাহায্য, বিভিন্ন জনসেবামূলক কাজসহ নানা ক্ষেত্রে চার্চ ছিল দুর্বল রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর। আইন এবং সামাজিক নিয়মগুলো আজ জাতীয়তাবাদী পরিচয়ের (নাগরিকত্ব) ওপর নির্ভর করে। সেই সময়ে এগুলো নির্ভর করত ধর্মীয় পরিচয়ের ওপর। ফলে ওই সময়কার সমাজে তেমন একটা ধর্মীয় বৈচিত্র্য দেখা যেত না। এমন প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় স্বাধীনতার ধারণাই ছিল অকল্পনীয়।

তাহলে অতীত থেকে বর্তমানের এই বিশাল পরিবর্তন কীভাবে এল?
কোয়োমার মতে-প্রথমত, রাষ্ট্র ট্যাক্স নেয়া বাড়িয়ে দিলো। বেশি টাকা পেয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী হতে শুরু করল। শক্তি বাড়ার সাথে সাথে রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্ব হারাতে শুরু করল চার্চ। রাষ্ট্রের শক্তি যত বাড়ল তত বাড়ল আইন এবং সামাজিক বিধান প্রয়োগের ক্ষমতা। ধর্মীয় পরিচিতির ওপর নির্ভর করার প্রয়োজন ফুরাল। রাষ্ট্রের কাছে ইহুদী, ক্যাথলিক, প্রটেস্ট্যান্ট-সবাই এখন সমান। ধর্মীয় পরিচিতি অনুযায়ী আলাদা আলাদা নিয়ম করার প্রয়োজন রইল না। সবার একটাই পরিচয়-ট্যাক্সদাতা। নিজের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য রাষ্ট্রকে যেহেতু আর ধর্মের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে না, তাই নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় বিশ্বাস আর অবস্থান বাস্তবায়নেরও প্রয়োজন থাকল না। জন্ম নিল, 'ধর্মীয় স্বাধীনতা'। নীতি, আদর্শ বা মূল্যবোধ হিসেবে না। বাস্তববাদিতা আর সুবিধার জন্যে।

কেউ হয়তো বলতে পারেন-ঠিক যাছে, জন্ম যেভাবেই হোক না কেন, জিনিসটা তো ভালো, তাই না?
আসলে না। একটু খতিয়ে দেখলে ধরা পড়ে যে ব্যাপারটা আসলে ভালো কিছু না। দেখুন, শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য কী?
নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী জনগণের কাছ থেকে সম্পদ আহরণ করা। আর এর জন্যে যেভাবে দরকার সেভাবে মানুষকে চলতে বাধ্য করা। প্রথম দিকে এ উদ্দেশ্য পূরণে চার্চ কার্যকর ছিল। তাই রাষ্ট্র চার্চের সাথে মৈত্রী করেছে। পরে আরও কার্যকর পথ পাওয়া গেছে, তাই চার্চের মূল্য ফুরিয়েছে। চার্চ সেকেলে হয়ে গেছে। গত কয়েক শতাব্দী ধরে পশ্চিমে চার্চের গুরুত্ব ও ক্ষমতা ব্যাপকভাবে কমেছে। একই সময়ে রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড়, সবচেয়ে শক্তিশালী এবং বিপজ্জনক যে প্রতিষ্ঠান-সেই সামরিক বাহিনী শক্তি, সামর্থ্য, সম্পদ, জনবল এবং প্রযুক্তির দিক দিয়ে শক্তিশালী হয়েছে। জনগণকে নিয়ন্ত্রণের জন্য জান্তব সামরিক শক্তির চেয়ে কার্যকরী পদ্ধতি আর কী হতে পারে? রাষ্ট্রের ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য এখন আর স্রষ্টার দোহাই দিতে হয় না। সামরিক শক্তি ব্যবহার করলেই চলে।

কিন্তু এই পরিবর্তনকে কি উন্নতি বলা যায়? পশ্চিমা বিশ্বে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রভাব কমেছে, সত্য। কিন্তু সাধারণ নাগরিকের স্বাধীনতা কি আসলেই বেড়েছে? নাকি বদলেছে শুধু কর্তৃত্বের উৎস? আগে পাদরির বাইবেলকে ব্যবহৃত হতো, এখন ব্যবহৃত হয় জেনারেলের বন্দুক। ইউরোপের ইহুদী এবং খ্রিষ্টানদের জন্য নির্মম চার্চের চেয়ে আজকের নিষ্ঠুর সামরিক বাহিনী সমর্থিত রাষ্ট্র উত্তম হতে পারে। সব হিসেবেনিকেশের পর লাভের পাল্লাটাই হয়তো তাদের দিকে ভারী। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি এখনো ওদের জন্য আবেদন রাখে।

কিন্তু একই কথা ইসলাম এবং মুসলিমদের জন্য খাটে না। মধ্যযুগের ইউরোপের গির্জার ক্ষেত্রে যে কথাগুলো সত্য, ইসলামী শাসনের জন্য সেগুলো সত্য না। ইসলামী শাসনের অধীনে মুসলিমরা কখনোই ওইভাবে শোষিত হয়নি যেভাবে চার্চের কর্তৃত্বের সময়ে ইউরোপিয়ানরা হয়েছে। হ্যাঁ, মুসলিম-বিশ্বে বিভিন্ন সময়ে শাসকদের মাধ্যমে শোষণ, সহিংসতা এবং নির্মমতা হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেটা হয়েছে ইসলামী শরীয়াহ এবং ইসলামী আলিমদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে। শাসকগোষ্ঠীর অধীনস্থ হওয়া থেকে বিরত থাকার ক্ষেত্রে মুসলিম উলামায়ে কেরাম এর ঐতিহ্য প্রসিদ্ধ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে, ইসলামের পক্ষে অবস্থান নেয়ার কারণে আলিমগণ নির্যাতিত হয়েছেন। উম্মাহর ইতিহাসের অধিকাংশ সময় শাসক ও শাসনক্ষমতার সাথে সংস্পর্শের ব্যাপারে আলিমগণ অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে শাসকদের দরজায় যায় সে ফিতনায় পতিত হয়। শাসকের সঙ্গে যার নৈকট্য যত বৃদ্ধি পায়, আল্লাহর থেকে তার দূরত্ব তত বেশি বেড়ে যায়।'
এ কারণে শাসকদের সাথে ঐতিহাসিকভাবে উলামায়ে কেরামের একধরনের অস্বস্তিকর সম্পর্ক ছিল। অনেক সময় দ্বীনের বিষয়ে দ্বন্দ্বও হয়েছে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ ছিল শাসক কর্তৃক শরীয়াহর সীমালঙ্ঘন। শরীয়াহ বরাবরই ছিল আদল, ইনসাফ এবং রাহমাহর উৎস। আর তাই কেবল স্বৈরাচারই শরীয়াহকে সরিয়ে রাখতে চায়।

টিকাঃ
[১৮] Ideas were not enough, Mark Koyama, Aeon.co
[১৯] মুসনাদ আহমাদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00