📘 সংশয়বাদী > 📄 সেক্যুলারিসম নিরপেক্ষতা না; বরং ভিন্নমতের দমন

📄 সেক্যুলারিসম নিরপেক্ষতা না; বরং ভিন্নমতের দমন


বলা হয় সেক্যুলারিসম নিরপেক্ষ। সেক্যুলার রাষ্ট্র নাকি সবার জন্য এক নিরপেক্ষ স্থান তৈরি করে। এ দাবি ভুল। সেক্যুলারিসমের কোনো সংস্করণই নিরপেক্ষ না। এ বিষয়ে অন্য কোনো আলোচনাতে যাবার আগে এ বাস্তবতাকে স্বীকার করে নেয়া জরুরি।

সেক্যুলারিসমের ইতিহাস নিয়ে ২০১৫-তে লেখা এক প্রবন্ধে অ্যাংলিকান পাদরি জাইলস ফ্রেইযার লেখেন-
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ফ্রান্সে ক্যাথলিক চার্চের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ তুঙ্গে পৌঁছে। মুক্তচিন্তার নামে শুরু হওয়া বিপ্লব ১৭৯৪ এর ইস্টার আসতে আসতে ফ্রান্সের ৪০,০০০ এর বেশি গির্জার বেশির ভাগ জোরপূর্বক বন্ধ করে দেয়। শুরু হলো গির্জার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তকরণ, ক্রুশ আর পানপাত্র ভেঙে। শেষ হয় জোরপূর্বক ধর্মান্তকরণ আর গিলোটিনে পাদরি ও নানদের ঢালাও হত্যার মাধ্যমে। ইতিহাসে এ সময়টা পরিচিতি পায় 'ত্রাসের রাজত্ব' (Reign of Terror) নামে। 'টেরোরিসম' (সন্ত্রাসবাদ) বলে যে শব্দটা আজ আমরা ব্যবহার করি, সেক্যুলার ফরাসী বিপ্লবের সময়টাতেই ফ্রেঞ্চ 'terrorisme' শব্দ থেকে তার উৎপত্তি। ফরাসী বিপ্লবের রথীমহারথীদের অন্যতম ম্যাক্সেমিলিয়ান রবসপিয়ের এ সময় ঘোষণা করে, সন্ত্রাস হলো তাৎক্ষণিক, তীব্র এবং অনমনীয় বিচার। সন্ত্রাস হলো শুদ্ধির বিচ্ছুরণ
আজ যাদের জঙ্গী কিংবা সন্ত্রাসী বলা হয় তাদের কাছ থেকেও এ ধরনের কথা শোনা যায় না। যেসব খ্রিষ্টান তাদের শতাব্দীপুরোনো বিশ্বাস আঁকড়ে রেখেছিল, তাদের ম্যাসাকার করা হয় 'ভেন্ডি'তে (Vendée)। ঐতিহাসিক মার্ক লেভিনের মতে এ ছিল, 'আধুনিক গণহত্যার পূর্বসূরি'।
ফ্রান্সের এ নিয়মতান্ত্রিক বি-খ্রিষ্টকরণ কোনো অর্থেই এক 'কট্টর ধর্মের স্বাভাবিক পতন' ছিল না। এটা এনলাইটেনমেন্ট র‍্যাশনালিটির স্বাভাবিক এবং প্রাকৃতিক উত্থানও ছিল না; বরং এ ছিল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় খুনে দমনপীড়নের ফলাফল।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা মধ্যযুগের ধর্মরাষ্ট্র বা থিওক্রেসির সমালোচনা করে মুখে ফেনা তোলে। এমন রাষ্ট্রকে ওরা খারাপ বলে, কারণ এখানে নৈতিকতার নির্দিষ্ট কোনো ধ্যানধারণা জোর করে জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়া হতো। অথচ সেক্যুলার রাষ্ট্র ঠিক একই কাজটা করে।

২০১৭ সালে বেলজিয়ামের ওয়ালুন প্রদেশে রীতিমতো ভোট দিয়ে হালাল এবং কোশার মাংস নিষিদ্ধ করা হয়। এখন থেকে আর জবাই করা পশুর মাংস বিক্রি করা যাবে না। বিক্রি করতে হলে পশুকে ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যা করতে হবে। এখন পর্যন্ত ইউরোপের সাতটি দেশে একইভাবে হালাল এবং কোশার পদ্ধতিতে পশু জবাই নিষিদ্ধ করা হয়েছে—নরওয়ে, ডেনমার্ক, স্লোভেনিয়া, অস্ট্রিয়া, আইসল্যান্ড, এবং বেলজিয়াম।

এর যৌক্তিকতা কী? সেক্যুলার রাষ্ট্র এই অবস্থানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করে? তারা বলে, পশুকে ইলেকট্রিক শক না দিয়ে হত্যা করা অমানবিক। ইলেকট্রিক শকের বদলে অন্য কোনোভাবে হত্যা করলে পশু কষ্ট পেয়ে মারা যায়। তাই ইলেকট্রিক শকের বদলে জবাই করা নিষিদ্ধ।
এই হলো সেক্যুলার ইউরোপের যুক্তি।
এই দাবির ভিত্তি কী? কোনো প্রাণী কি এই মর্মে সাক্ষ্য দিয়ে গেছে? কোনো গরু বা ছাগল কি কোর্টে এসে বলেছে—প্লিজ, আমাদের ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে মারুন, অন্যভাবে মারলে ব্যথা বেশি লাগে!
পুরো ব্যাপারটাই ধারণাপ্রসূত। বোল্ট ব্ল্যাস্ট দিয়ে খুলি ফুটো করা কিংবা ইলেকট্রিক শক দিয়ে হত্যা করা হলে ব্যথা কম লাগে—এই তথ্য তারা কোথা থেকে পেল? কিসের ভিত্তিতে এ উপসংহার টানা হলো তা আদৌ স্পষ্ট না; বরং সাধারণ বিবেকবুদ্ধি বলে বোল্টব্ল্যাস্ট কিংবা ইলেকট্রিক শকে মৃত্যুর চেয়ে জবাই করে মৃত্যু কম কষ্টকর হবার কথা। যদিও বিষয়টা নিশ্চিতভাবে জানার কোনো উপায় আমাদের নেই।

তবু এই ঠুনকো যুক্তির ওপর ভিত্তি করে এই দেশগুলো জবাই নিষিদ্ধ করেছে। তাদের কাছে যেটা নৈতিক আর মানবিক মনে হয়েছে, সেটাকে তারা আইন বানিয়ে নিয়েছে। তারপর রাষ্ট্রের শক্তিবলে অন্যদের ওপর তা চাপিয়ে দিয়েছে। আইন আসলে এভাবেই তৈরি হয়। সেক্যুলার কিংবা ধর্মভিত্তিক-দুই ধরনের রাষ্ট্রেই এভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ সত্য অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

কিন্তু কোনো মুসলিম রাষ্ট্র ইসলামের অবস্থান অনুযায়ী আইন পাশ করলে পশ্চিমা বিশ্ব সেটার সমালোচনায় উঠেপড়ে লেগে যায়। তখন তারা ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি আওড়ায়। চিৎকার করে বলে-ইসলামী শরীয়াহর ভিত্তিতে আইন প্রণয়ন করা হলো বর্বর, এটা মধ্যযুগীয় ধর্মরাষ্ট্রের কাজ। কিন্তু লিবারেল বস্তুবাদী বিশ্বাস অনুযায়ী আইন তৈরি করা ন্যায্য এবং নিরপেক্ষ!
কী নির্লজ্জ প্রতারণা!

বেলজিয়ামসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর এ ধরনের আইনগুলোকে বর্ণবাদী, ইসলামবিদ্বেষী, সাম্প্রদায়িক, ইত্যাদি বলা আসলে কার্যকরী না। যদিও এসব আইনের পেছনে তাদের ইসলামবিদ্বেষের ভূমিকা আছে, এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়। তবু এগুলোকে বর্ণবাদী বা ইসলামবিদ্বেষী বলা কার্যকরী না, কারণ সেক্যুলার আইনপ্রণেতারা তখন বলবে 'আমরা তো যথাসম্ভব ক্ষতি কমানোর উদ্দেশ্যে আইন বানাচ্ছি, বৈষম্যে কিংবা বিদ্বেষের কারণে না।'

এ ধরনের আইনের বিরুদ্ধে কার্যকরী আরগুমেন্ট হবে অনেকটা এ রকম: বেলজিয়ানরা আইন বানিয়েছে ভালোমন্দের ব্যাপারে তাদের নিজস্ব বিশ্বাস অনুযায়ী। এ দিক থেকে তাদের দোষ দেয়া যায় না। তবে নৈতিকতার ব্যাপারে তাদের বিশ্বাসগুলোর সমালোচনা করা যায়। আমরা তাদের বলি-এ ব্যাপারে তোমাদের অবস্থান ভুল, আমাদের অবস্থান সঠিক। কারণ, আমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হলো গরু, ছাগল, মানুষসহ সব পশুপাখির সৃষ্টিকর্তা, মহান আল্লাহর কাছ থেকে আসা ওয়াহি। আর তোমাদের বিশ্বাসের ভিত্তি হলো কিছু ফাঁপা বুলি।
এই ধরনের যুক্তির মাধ্যমে যথাযথভাবে তাদের অবস্থানের মোকাবিলা করা যায় এবং কার্যকরী ডায়ালেকটিক তৈরি করা যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এ ধরনের আলোচনা তেমন একটা দেখা যায় না।

টিকাঃ
[৭] কোশার (Kosher)-ইহুদীদের জন্য যা খাওয়া অনুমোদিত, তাকে বলা হয় কোশার ও যা খাওয়া নিষিদ্ধ, তাকে বলা হয় ত্রেফা। গরু-ছাগল-ভেড়া ইত্যাদি পশুর মাংস মুসলিমদের ক্ষেত্রে 'হালাল' এবং ইহুদীদের ক্ষেত্রে 'কোশার' হবার জন্য নির্দিষ্ট নিয়মে জবাই অপরিহার্য। ~ অনুবাদক
[৮] All the European Countries Where Kosher and Halal Meat Production Are Now Forbidden, January 7, 2019. Forward.com
[৯] বোল্টব্ল্যাস্ট (বোল্ট পিস্তল, বোল্ট গান)-জবাইয়ের আগে পশুকে অচেতন করার জন্য ব্যবহৃত যন্ত্র। বোল্ট ব্ল্যাস্টে স্টেইনলেস স্টিল বা লোহার তৈরি ভারী রড (বোল্ট) থাকে। ট্রিগার চাপলে এই রড সজোরে প্রাণীর মাথায় আঘাত করে। এতে প্রাণী অচেতন হয়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে বোল্টের আঘাতে প্রাণীর খুলি এবং মস্তিষ্কের কিছু অংশ ফুটো হয়ে যায়। ~ অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 শূন্যগর্ভ সেক্যুলারিসম

📄 শূন্যগর্ভ সেক্যুলারিসম


সেক্যুলারিসম সব সময় মাধ্যমের কথা বলে, কিন্তু গন্তব্যের কথা বলে না। সেক্যুলারিসম মানুষকে গন্তব্যের কথা ভুলিয়ে রাখতে চায়। কারণ, গন্তব্যের আলোচনা করতে হলে ধর্মকে লাগবে। সেক্যুলারিসম আপনাকে কোনো কাজের গুরুত্বের কথা বলবে, কিন্তু কাজের ফলাফলের ব্যাপারে বলবে না। অস্পষ্ট কিছু দাবি ছাড়া আর কিছু তার কাছ থেকে পাওয়া যাবে না। কারণ, ফলাফলের আলোচনা করতে হলে ধর্মের কাছে যেতে হবে।

সেক্যুলারিসম আপনাকে ভোট দিতে বলবে। কিন্তু কোনো নৈতিকতা আর মূল্যবোধের ভিত্তিতে ভোট দিতে হবে, সেটা বলবে না। কারণ, সেটা ধর্মের জায়গা। সেক্যুলারিসম বলবে সবাইকে সমানভাবে সম্মান করতে। কিন্তু সম্মানযোগ্য হবার অর্থ কী, সেটা বলবে না। কারণ, সম্মান ও মর্যাদার কেন্দ্রকে বুঝতে হলে ধর্মের কাছে যেতে হবে।

অনেকে ভাবতে পারেন এর অর্থ হলো মানুষ যত সেক্যুলার হবে তত নিরপেক্ষ হবে। এটা ভুল ধারণা। মানুষের মন-মস্তিষ্ক কখনো খালি থাকে না। লিবারেল সেক্যুলারিসম যে শূন্যতা তৈরি করে কিছু না কিছু দিয়ে সেটা পূর্ণ হয়ে যায়। আমাদের ক্ষেত্রে আজ এই শূন্যস্থান পূরণ হচ্ছে বহুজাগতিক কর্পোরেশান আর অশ্লীলতা ও বিকৃতির প্রচারে সদাপ্রস্তুত মুনাফালোভী মিডিয়ার বানানো চটুল সাংস্কৃতিক আবর্জনা দিয়ে। একসময় এটাই হয়ে দাড়াচ্ছে জনগণের ধর্ম। মানুষের পরিচয় আর চরিত্রের কাঠামো। এটাই সেক্যুলারিসমের অবধারিত ফল এবং উদ্দেশ্য। এভাবে সেক্যুলারিসম মানুষকে পরিণত করে ক্ষমতার অনুগত গোলামে। এই বিষের প্রতিষেধক কী?

ইন্নামাল আমালু বিননিয়্যাতি
প্রতিষেধক হলো প্রতিনিয়ত নিজের কাজগুলোকে নিজের অস্তিত্বের উদ্দেশ্যের সাথে যুক্ত করা। নিজের গন্তব্য এবং পরিণতির প্রশ্নগুলো নিয়ে চিন্তা করা। আর এ প্রশ্নগুলোর উত্তর কেবল তিনিই দিতে পারেন যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। তাই নিজের হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে ভোগবাদী লিবারেল-সেক্যুলার সংস্কৃতির আবর্জনাগুলো দূর করুন। আর নিজেকে যুক্ত করুন চিরন্তন সত্য পথের সাথে।

📘 সংশয়বাদী > 📄 জার্মানি ও হিজাব

📄 জার্মানি ও হিজাব


হিজাব নিষিদ্ধ করা নিয়ে জার্মানির পরিস্থিতি সেক্যুলারিসমের অন্তর্নিহিত সাংঘর্ষিকতার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। ২০১৬ এর এক রিপোর্টে এসেছে:
জার্মানীর প্রভাবশালী দুটি সংস্থা জার্মান বিচারক ও আইনজীবীদের মধ্যে হেডস্কার্ফ/হিজাবের ব্যবহার নিষিদ্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তাদের মতে আদালতের 'নিরপেক্ষতা' বজায় রাখার জন্য এই নিষেধাজ্ঞা জরুরি।
অ্যাসোসিয়েশন অফ জার্মান অ্যাডমিনস্ট্রেটিভ জাজেস এর চেয়ারম্যান রবার্ট সিগমুলারের মতে-বিচারের ফলাফল কেবল আইনের ওপর নির্ভরশীল, কোনো ব্যক্তির ওপর না-তা দেখানোর জন্য বিচারক ও আইনজীবীদের নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরা উচিত। সেই নির্ধারিত ইউনিফর্ম হলো কালো আলখেল্লা, সাদা শার্ট, সাদা বো-টাই এবং গলবন্ধ কিংবা নেকারচিফ।

এই কালো আলখেল্লার উৎস কী জানেন?
নিউইয়র্ক টাইমসের গবেষকদের মতে,
'বিচারিক পোশাকের (judicial robe) আদি উৎস যদিও সুনিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে অনেকেই মনে করেন এটি এসেছে গির্জার পাদরিদের কালো আলখেল্লা থেকে। অতীতে গির্জা আর বিচারবিভাগ আজকের মতো আলাদা ছিল না। ব্রিটেনের বিচার বিভাগে কালো আলখেল্লার ব্যবহার শুরু হয় চতুর্দশ শতাব্দীতে'।

এমন কি হতে পারে যে ইউরোপের ধর্মগুরুরা আলখেল্লা পরার এই রীতি গ্রহণ করেছিল মুসলিমদের জুব্বার অনুকরণে? আরব ও মুসলিম সমাজে জুব্বাকে দেখা হতো সম্মান, ধর্মীয় মর্যাদা এবং পাণ্ডিত্যের চিহ্নবাহী পোশাক হিসেবে। সম্ভাবনাটা একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। যাই হোক, যে কালো আলখেল্লা নিয়ে জার্মান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা 'নিরপেক্ষতা' প্রমাণ করতে চাচ্ছে, তার উৎস ধর্মীয়—এটুকু পরিষ্কার।

পোশাক হিসেবে লম্বা আলখেল্লা মুসলিমদের কাছে আজও ধর্মীয় গুরুত্ব বহন করে। মুসলিম নারী ও পুরুষ-উভয়ই এটা পরে। মুসলিম-বিশ্বের অনেক নারী কালো আলখেল্লা পরেন, যেটাকে জিলবাব বলা হয়। ইহুদী এবং খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরাও কালো আলখেল্লা পরে থাকে। কালো আলখেল্লার একটা ধর্মীয় গুরুত্ব সব সময়ই ছিল।

যেসব সেক্যুলারিস্ট হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা বলে, অন্যান্য আরও ধর্মীয় চিহ্ন জনজীবন থেকে মুছে ফেলার কথা বলে, তাদের একটা প্রিয় যুক্তি হলো নিরপেক্ষতা। তারা বলে, জনপরিসরের নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে হলে ধর্মীয় পোশাক আর ধর্মীয় চিহ্ন বাদ দিতে হবে। এ যুক্তির বিরুদ্ধে সহজ-সরল এবং যৌক্তিক আপত্তি হলো: কোন পোশাক নিরপেক্ষ, সেটা কে ঠিক করবে?

আসলে এটা সেক্যুলারিসমের মৌলিক প্রতারণাগুলোর একটা। যা কিছু ধর্মীয় তাঁর সবটুকুই যদি সমাজ, রাষ্ট্র থেকে বাদ দেয়া হয়ে তাহলে বাকি কী থাকে? সেক্যুলারিসমের বক্তব্য হলো, যা কিছু ধর্মীয় তা বাদ দেয়ার পর সমাজ ও রাষ্ট্র সত্যিকারভাবে নিরপেক্ষ হবে। আর এ অবস্থা থেকেই সেক্যুলারিসমের যাত্রা শুরু হবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এমন কোনো নিরপেক্ষ কেন্দ্র নেই, যা মেটাফিযিকালিটি কিংবা নরম্যাটিভিটি থেকে মুক্ত। ধর্মের যে মেটাফিযিকালিটি এবং নরম্যাটিভিটি নিয়ে সেক্যুলারিসমের এত আপত্তি তা থেকে মুক্ত কোনো অবস্থান নেই।

একমাত্র সমাধান হলো নিজে থেকে একটা নিরপেক্ষ, সেক্যুলার কেন্দ্র বানিয়ে নেয়া। সেটা কীভাবে হবে? আপনি স্রেফ বলে দেবেন কোনো একটা নির্দিষ্ট সংস্কৃতি, চেতনা, নৈতিকতা আর নির্দিষ্ট ধরনের পোশাক সেক্যুলার। আর বাকি সবকিছু ধর্মপ্রভাবিত, সাম্প্রদায়িক।
কোনো কিছুকে সেক্যুলার সাব্যস্ত করার এই প্রক্রিয়া বৈধতা পায় মানুষের সামষ্টিক সাংস্কৃতিক প্রথাপ্রচলনের কারণে। মুসলিমদের আচার আচরণ এবং পোশাক যেহেতু ইউরোপের কাছে 'বিজাতীয়' তাই খুব সহজেই ইউরোপীয়ানদের চোখে এগুলো 'ধর্মীয়' হিসেবে ধরা পড়ে। কিন্তু খ্রিষ্টধর্মীয় উৎস থেকে আসা পশ্চিমা নানান পোশাক, প্রথা এবং নৈতিকতা যেহেতু ইউরোপের 'পরিচিত' তাই সেগুলোকে সংস্কৃতি বলা যায়, সেক্যুলার আর নিরপেক্ষ ধরা যায়। এ হলো নিছক কথার খেলা।

একদিকে কালো আলখেল্লাকে সেক্যুলার সাব্যস্ত করা আর অন্যদিকে হেডস্কার্ফকে ধর্মীয় আখ্যা দেয়ার পুরো ব্যাপারটাই সেক্যুলারিসমের কথিত নিরপেক্ষতার অন্তঃসারহীনতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এভাবেই সেক্যুলারিসম এক বানোয়াট 'নিরপেক্ষতা' তৈরি করে কৃত্রিমভাবে নিজের 'পক্ষপাতশূন্যতা' বজায় রাখার জন্য।

এখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়েও কিছু কথা বলা দরকার। সেক্যুলারদের আক্রমণের মোকাবিলায় ধর্মীয় স্বাধীনতার যুক্তি ব্যবহার করা উচিত না; বরং আমাদের উচিত সেক্যুলারিসমের অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য আর সাংঘর্ষিকতাগুলো তুলে ধরা। মুসলিমদের হিজাব নিয়ে তাদের আপত্তি যে কালচারাল বায়াস ছাড়া আর কিছু না এটা তাদের স্বীকার করতে বাধ্য করা। তারা এটা মেনে নিলে ভালো। কিন্তু নিজেদের বায়াসকে তারা নিরপেক্ষতা, যৌক্তিকতা আর ন্যায়পরায়ণতা বলে চালাবে-এটা হবে না।

যদি তারা স্বীকার করে নেয় কালচারাল বায়াসের কারণে তারা হিজাবের বিরোধিতা করে, তাহলে আমরা সেটা মেনে নিতে রাজি আছি। কারণ, আমরা মুসলিমরাও আমাদের নিজস্ব মাপকাঠি অনুযায়ী পোশাকের নিয়ম ঠিক করতে চাই। তবে আমাদের মাপকাঠি পপ কালচার বা সাংস্কৃতিক খেয়ালখুশি দ্বারা প্রভাবিত না; বরং আমাদের মাপকাঠির ভিত্তি ইসলামী মূল্যবোধ এবং শালীনতার ব্যাপারে মহান আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা।
ধর্মীয় স্বাধীনতার সেক্যুলার যুক্তির বদলে আমাদের উচিত আলোচনা এই দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মাপকাঠির তর্কে নিয়ে আসা।

টিকাঃ
[১০] German judges call for headscarf ban in court to show 'neutrality', August 09, 2016. Independent, UK.
[১১] Behind the Gavel, a Sense of Style, September 5, 2008, The New York Times.
[১২] মেটাফিযিক্স-বাংলায় অধিবিদ্যা। দর্শনের ওই শাখা, যা প্রাথমিক মূলনীতিসমূহ (first principles) এবং সত্তা, অস্তিত্ব, জানা, পরিচয়, মন, সময়, বস্তু, সময়, স্থান, সম্ভাবনা এর মতো বিভিন্ন বিমূর্ত ধারণা নিয়ে কাজ করে। - অনুবাদক
[১৩] নরম্যাটিভ- মানবসমাজগুলোতে কিছু কাজ ও ফলাফল ভালো, আকাঙ্ক্ষিত কিংবা বৈধ সাব্যস্ত করা হয়। আবার কিছু কাজ ও ফলাফলকে মন্দ, অনাকাঙ্ক্ষিত কিংবা অবৈধ সাব্যস্ত করা হয়। একে নরম্যাটিভিটি বলা হয়। নরম্যাটিভিটি দ্বারা কোনো-না-কোনো ধরনের উচিত-অনুচিতের ধারণা প্রকাশ পায়। নরম্যাটিভিটির মূল আলোচনা নৈতিকতা নিয়ে। প্রায় প্রত্যেক নৈতিকতার কাঠামো কোনো-না-কোনো ধরনের নরম্যাটিভিটির ওপর নির্ভরশীল।
[১৪] ওপরে কথা দ্বারা লেখকের উদ্দেশ্য হলো সেক্যুলারিসম যেটাকে নিরপেক্ষ কেন্দ্র বলছে, সেই কেন্দ্রও দাঁড়িয়ে আছে কোনো একটি নির্দিষ্ট মেটাফিযিকাল এবং নরম্যাটিভ অবস্থানের ওপর। কাজেই সত্যিকার অর্থে নিরপেক্ষ কোনো কেন্দ্র সেক্যুলারিসম দিতে পারে না। এমন কোনো ক্যানভাস নেই, যা রংহীন। - অনুবাদক

📘 সংশয়বাদী > 📄 রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের ধাপ্পাবাজি

📄 রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের ধাপ্পাবাজি


রাষ্ট্র ও ধর্মের বিচ্ছেদের ধারণাটা কি আসলে সামঞ্জস্যপূর্ণ? সভ্য আর অসভ্য সমাজের মধ্যে পার্থক্য ধরা হয় আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার মনোভাবকে। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্বে আমরা কী দেখি? যখন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য অর্জিত হয় তখন ট্রাম্প থেকে শুরু করে উগ্র বামপন্থী, সবাই আইনের শাসনের কথা বলে। কিন্তু কোনো কিছু যখন তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় তখন তারা আইন বদলানোর কথা বলা শুরু করে।

এ ক্ষেত্রে তারা একটা পূর্ব-ধারণার ওপর ভিত্তি করে কথা বলে। সেই ধারণাটা হলো, কোনো কিছু বৈধ হওয়া আর নৈতিকভাবে ভালো হওয়া এক না। অনেক কিছু বৈধ হতে পারে, কিন্তু তার মানে এই না যে সেটা ভালো। আবার অনেক কিছু আইন অনুযায়ী অবৈধ হতে পারে। তার মানে এই না যে সেটা খারাপ। অর্থাৎ ভালোমন্দের চূড়ান্ত ফায়সালা করে দেয় নৈতিকতা, আইনের শাসন না।

প্রশ্ন হলো, এই নৈতিকতার ভিত্তি কী হবে? নৈতিকতা এত গুরুত্বপূর্ণ হলে, নৈতিকতা আর এর ভিত্তি নিয়ে আরও বেশি আলোচনা হওয়া দরকার না? ভালোমন্দ, মানবজীবনের লক্ষ, পবিত্রতা, শুদ্ধাচার আর ভ্রষ্টাচার-এগুলো নিয়ে আরও কথা হওয়া দরকার না?

কিন্তু আমরা এ ধরনের আলোচনা দেখি না। কারণ, নৈতিকতা হলো ধর্মের আলোচনার জায়গা। নৈতিকতার আলোচনা আনতে গেলে ধর্মকে আনতে হবে। আর সেক্যুলার রাষ্ট্রে যেহেতু আইনকে ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত হতে দেয়া যাবে না, তাই ধর্মকে দূরে রাখার জন্য এই আলোচনাকেও দূরে রাখতে হয়।

কিন্তু তাহলে আবার সেই পুরোনো প্রশ্নে ফিরে যেতে হয়। আইনের ভিত্তি অন্তর্নিহিত নৈতিকতা। কিন্তু সেই নৈতিকতার ভিত্তি কী?
কোনো-না-কোনো নৈতিকতা, কোনো-না-কোনো মাপকাঠি তো লাগবেই। কিন্তু এ প্রশ্নগুলো শুধু 'অন্যায্য আইন' নিয়ে প্রতিবাদ করার সময় আলোচিত হয়। আর তখনো আলোচনা সীমাবদ্ধ থেকে যায় 'ন্যায়বিচার কী', এ প্রায়ই। কিন্তু ন্যায়বিচার কী-তার জবাব দিতে হলেও আগে ভালো-মন্দ, শুদ্ধ-অশুদ্ধ, শুদ্ধাচার-ভ্রষ্টাচারের কাঠামো ঠিক করে নিতে হবে। এমন কোনো কাঠামো কি আছে?

অবশ্যই আছে। অনেকগুলো আছে। সেগুলোকে আমরা ধর্ম বলি। অবশ্য এমন কিছু কাঠামোও আছে, যেগুলো তৈরি হয়েছে স্রষ্টাকে অস্বীকার করে। তবে স্রষ্টার দোহাই না দিলেও মানুষ কী করবে আর কী করবে না, কীভাবে তার জীবনযাপন করা উচিত-ধর্মের মতোই এই কাঠামোগুলোও সেটা নির্ধারণ করে দিতে চায়। এগুলোকেও ধর্মগুলোর মতোই সত্য বলে ধরে নেয়া হয়, অনুসরণ করা হয়।

ধর্মীয় কাঠামো আর স্রষ্টাকে অস্বীকার করা কাঠামো; অর্থাৎ নৈতিকতার সেক্যুলার কাঠামো-আইন প্রণয়নের প্রশ্নে এ দুই ধরনের কাঠামোর মধ্যে কি কার্যত কোনো পার্থক্য আছে? আমি মনে করি আইনের ভিত্তি হওয়া উচিত ধর্মীয় মূল্যবোধ। আমি জানি অনেকে আইনের ভিত্তি হিসেবে সেক্যুলার মূল্যবোধকে পছন্দ করে। আমি যখন সেক্যুলার রাষ্ট্রে বসবাস করি, এই সেক্যুলার-নাস্তিক নৈতিকতাকে তখন আমার মেনে নিতে হয়। আসলে মেনে নিতে হয়, বলাটা ভুল হবে। আমাকে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়। নৈতিকতার এ কাঠামো নিয়ে যদিও আমার অনেক আপত্তি, অনেক বিরোধিতা আছে, তবুও সেক্যুলার রাষ্ট্র জোর করে তার পছন্দের নৈতিকতা আমার ওপর চাপিয়ে দেয়। মজার ব্যাপার হলো এই অভিযোগ তুলেই সেক্যুলার রাষ্ট্র ক্রমাগত ধর্মরাষ্ট্রের বিরোধিতা করে, অথচ ঠিক একই কাজ সেক্যুলার রাষ্ট্রও করে।

এ কথা স্বীকার করার মতো সততা কি সেক্যুলারদের আছে?
এই বাস্তবতাকে যদি মেনে নেয়া হয় তাহলে ধর্মীয় স্বাধীনতা নামক অন্তঃসারশূন্য বুলি নিয়ে আদিখ্যেতা বাদ দেয়া যায়। মুসলিমরা যখন শরীয়াহর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করে, শরীয়াহ প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা জানায় তখন ধর্মীয় স্বাধীনতার বুলি দিয়ে হাতুড়ির মতো বারবার মুসলিমদের ওপর ঘা দেয়া হয়। কিন্তু এই ধর্মীয় স্বাধীনতার অস্তিত্ব সেকুলার রাষ্ট্রেই নেই।

ধর্ম আর রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ একটা ধাপ্পাবাজি ছাড়া আর কিছুই না।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00