📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 শিখা চিরন্তন-অনির্বাণ, দয়াল আর অস্ত্রধারী এ সকল নিয়ে কেড়ে মুসলিমের ঈমান প্রদীপ

📄 শিখা চিরন্তন-অনির্বাণ, দয়াল আর অস্ত্রধারী এ সকল নিয়ে কেড়ে মুসলিমের ঈমান প্রদীপ


শহীদ মিনার সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরাই জ্বালিয়েছে শিখা অনির্বাণ। অগ্নিউপাসকদের সংস্কৃতি এখন লালন করছে মুসলিমরা। জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ এবং শিখা অনির্বাণ নামে একটি শিখা প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এ অবস্থিত এ শিখার সামনে জাতীয় দিবসগুলোতে অভিবাদন জ্ঞাপন করা হয়।
অথচ, প্রত্যেক জাতিই মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং শেষ কৃত্য সম্পাদন করে। কেউ মরদেহের অপমান করে না। অসম্মান করে না। তবে বোধ- বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুযায়ী এ সম্মান প্রদর্শনে ও শেষ কৃত্য সম্পাদনে পার্থক্য হয়। কেউ সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে, নতুন কাপড় পড়িয়ে, সলাতে জানাযা আদায় করে দাফন করে। কেউবা গোবর ছিটিয়ে এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য পন্থা শেষে অগ্নি প্রজ্বলন করে দেহকে দাহ করে ছাই-ভষ্ম পানিতে নিক্ষেপ করে; কেউবা পাহাড়ে- পর্বতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়, কেউবা সেই ভষ্ম নির্দিষ্ট আঁধারে সযত্নে সংরক্ষণ করে।
আবার মৃত্যুর পরে মৃতের রূহের মাগফিরাতের জন্য, বিদেহী আত্মার সদাতির জন্য, প্রশান্তির জন্য কৃত কর্মকাণ্ডে জাতি ভেদে, বোধ-বিশ্বাস ভেদে পার্থক্য হয়। আমরা মুসলিম, তাই মৃতব্যক্তির রূহের মাগফিরাতের জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত নিয়মসমূহ পালন করি। আবার হিন্দু ধর্মবলাম্বীরা তাদের গুরুজনের বিদেহী আত্মার সদাতির জন্য, প্রশান্তির জন্য হোম, যজ্ঞ, তর্পণ পিণ্ডদান ইত্যাদি করেন। দেশ, ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্নতার জন্য পদ্ধতি ভিন্ন হয়েছে এবং তাই স্বাভাবিক। এ পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে কেউ সম্মান করছে না, এ কথা বলা যাবে না।
কারণ, সম্মান প্রদর্শনের একটাই মাত্র পন্থা বা পদ্ধতি নয়; বহু পন্থা, বহু পদ্ধতি রয়েছে। দেশে ভেদে, জাতি ভেদে, বোধ-বিশ্বাস ভেদে এ সম্মান প্রদর্শনের পন্থা ও পদ্ধতিতে পার্থক্য হতে পারে, হয়ে থাকে। এটাই স্বাভাবিক। সম্মান প্রদর্শনের পন্থা ও পদ্ধতির সাথে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের একটা সম্পর্ক আছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি সম্পর্ক আছে। কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি সম্পর্ক আছে। প্রতিটি ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্মের বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্রতা রক্ষার অধিকার আছে। এটা সাম্প্রদায়িকতা নয়।
কোন পদ্ধতির বিরোধিতা করা মানে মূল লক্ষ্যের বিরোধিতা করা নয়। লক্ষ্য আর উপায় তো এক নয়, তাই শিখা চিরন্তনের বিরোধিতা মানে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা নয়। স্বাধীনতার প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বা শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা নয়। যারা শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ বা প্রজ্বলিত অগ্নির মাধ্যমে বা প্রতীকে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা করছেন, তার কারণটাও ঐ পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের এক শ্রেণীর আঁতেল, বুদ্ধিজীবী লক্ষ্য আর উপায়টাকে উদ্দেশ্য- প্রণোদিতভাবে এক করে ফেলছেন। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ আর প্রজ্বলিত আগুন বা শিখা চিরন্তন এক করে ফেলতে চাইছেন। প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার বিরোধিতাকে, মুক্তিযুদ্ধের, শহীদদের, স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা রূপেই চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্নতার দরুন অনেকেই শিখা চিরন্তন বা অগ্নি প্রজ্বলনের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধী হতে পারেন, তাই বলে তিনি বা তারা যে স্বাধীনতার বিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী- এ কথা সত্য নয়। প্রজ্বলিত অগ্নির মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতার কারণ বিশ্বাসগত, ঐতিহ্যগত, ধর্মীয়।
অগ্নিকে সম্মান প্রদর্শন বা অগ্নির মাধ্যমে অথবা অগ্নিকে প্রতীক বানিয়ে অন্য কাউকে বা অন্য কিছুকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর এ পদ্ধতিটি মুসলিমদের নয়। এটা মুসলিমদের ঈমান-আকীদা, বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। এটা পারসিক, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সামঞ্জস্যশীল। এটা কারো অজানা বিষয় নয়, কম-বেশি সকলেই জানেন। যেসব লোক এর বিরোধীদের গালাগাল করছেন, তারা জানেন আরো ভালোভাবেই।
অগ্নি বা আগুন হিন্দুদের অন্যতম প্রধান দেবতা। বঙ্গীয় শব্দকোষে শ্রী হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, 'অগ্নি অগ্নি-অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে- যাহা যজ্ঞে প্রথমে প্রণীত হয়। অগ্নি ঋগবেদের দেবতাগণের অন্যতম। ইনি অমর রত্নদাতা, যজ্ঞের দেবতা হোতা ঋত্বিক সম্পাদক রক্ষাকর্তা ও হব্যবাহক। আকাশে সূর্য, বায়ুমণ্ডলে বজ্র এবং পৃথিবীতে অগ্নি- এর তিন রূপ। উপাসকরা এর প্রসাদে দীর্ঘজীবন ধন ও সমৃদ্ধি লাভ করেন। খাদ্য প্রাপ্তি এবং ক্ষুধা, দৈন্য শত্রু ও বিপদ হইতে রক্ষার নিমিত্ত এর স্তব করেন। ইনি দেবগণের মুখ এবং জিহ্বা। দেবতারা অগ্নিমুখে হুতদ্রব্য ভক্ষণ ও অগ্নি জিহ্বায় যজ্ঞবহ্নি আস্বাদন করেন। পুরানে অগ্নি ধর্মপত্নী বসুর গর্ভজাত। তার পত্নী স্বাহা এবং পাবক, পদমান ও শুচি তিন পুত্র; তিন পুত্রের পঞ্চাতারিংশ্যপুত্র। পঞ্চশী ঋগবেদের ১০.৯০.১ শ্লোকে আছে, পরম পুরুষের মুখে অগ্নির জন্ম। অগ্নি দেবতার প্রতিমা হচ্ছে স্থূলকায়, লম্বোদর, রক্তবর্ণ। কেশ-শ্মশ্রু ও চক্ষু পিঙ্গলবর্ণ। শক্তি ও অক্ষ সূত্র, বাহন ছাগ। পুরানে এর অন্যান্য প্রকার মূর্তির বর্ণনা আছে। কোথাও তার তিন পা, সাত হাত, দুই মুখ এবং বালার্কের ন্যায় বর্ণ। ইনি দক্ষিণ-পূর্ব কোণের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। ঋগবেদের এক-চতুর্থাংশেরও অধিক শ্লোকে কেবল অগ্নির স্তব করা হয়েছে।'
প্রাচীনকালে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই অগ্নিদেবের পূজা হতো। এখন ভারতবর্ষের হিন্দু ও পার্সীরাই কেবল এর অর্চনা করেন। তৈত্তরীয় সহিংসতায় আছে, প্রজাপতি অগ্নির সৃষ্টি করে দেবতাগণকে বিশ্রাম ভূমি স্বরূপ দান করেন। হিন্দু, পারস্য, কালডিয়া, মিসর, ইয়াহুদী, গ্রীক, রোমক, চীন প্রভৃতি সকল জাতির শাস্ত্রেই দেখা যায় যে, তাদের দেবমন্দিরে রাত-দিন অগ্নি প্রজ্বলিত থাকত।
হিন্দুদের অসংখ্য যাগযজ্ঞ আছে। যজ্ঞের জন্য হোম অপরিহার্য। হোমের জন্য অপরিহার্য অগ্নি। হোমের অর্থই হচ্ছে দেবোদ্দেশ্যে অগ্নিতে মন্ত্রপূর্বক ঘৃতাদি প্রক্ষেপ। এ হোমই এ জগৎ রক্ষা ও স্থিতির মূল। হোমের সম্যক অনুষ্ঠান না করলে বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টি না হলে শস্য জন্মে না, শস্যের অভাবে প্রজা উৎফুল্ল হয় না, সুতরাং ক্রমে জগৎ ধ্বংস হয়ে থাকে।
অতি প্রাচীনকাল হতেই পারস্যে অগ্নি উপাসনার প্রচলন ছিল। প্রাচীন পারসিকদের ধর্মগুরু ছিলেন জরান্তর (Zoraster) এবং তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম ছিল জিন্দাবেস্তা। জরথুস্ত্র প্রচার করেন যে, দু'জন দেবতার দ্বারা জগতের সমুদয় মঙ্গল-অমঙ্গল সাধিত হচ্ছে। মঙ্গলের দেবতা হচ্ছেন, 'আহরমাজদ' অথবা 'হরমজদ' আর অমঙ্গলের দেবতা হচ্ছেন 'আহরিমান'। মঙ্গলের দেবতা আহরমাজদ অগ্নিতে অবস্থান করেন। তাই মঙ্গল লাভের জন্য অনির্বাণ অগ্নিশিখার পূজা করতে হবে। পারস্যে পারসিকদের মন্দিরে যে অগ্নিশিখা স্থাপন করা হয় তা ছিল অনির্বাণ। হাজার বছরের অধিককাল ধরে তা একনাগাড়ে জ্বলে আসছিল।
সুতরাং, শহীদদের প্রতি, জাতির কৃতী সন্তানদের প্রতি, বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এটা পদ্ধতি নয়। অগ্নি প্রজ্বলিত করে, অগ্নিশিখা স্থাপন করে বা অগ্নি প্রতীকের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন মুসলিমদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। বাংলাদেশের অধিবাসীদের প্রায় ৯০% মুসলিম। আক্বীদা-বিশ্বাস, আচার-আচরণে এঁরা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে খ্যাত। তাঁদের বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী একটা পদ্ধতি জাতীয়ভাবে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা সমীচীন কি-না, তা অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের ভেবে দেখা দরকার। এভাবে অগ্নিকে সম্মান প্রদর্শন করা এক ধরনের অতি অবাঞ্ছিত শির্ক, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটা হবে অতীতের পারসিক ধর্ম তথা মজুসীদের অনুসরণ যা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।
প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি তার জাতিসত্তার ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে। সংস্কৃতি কতগুলো অপরিবর্তনীয় মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করে। ধর্মবোধ, রুচিবোধ এবং বিশ্বাসের ভিন্নতার জন্য জাতির উৎসব-অনুষ্ঠানের প্রকাশ ভঙ্গিতেও বিভিন্নতা দেখা দেয়। ভারতের সংখ্যাগুরু মানুষ হিন্দু। তারা বহু দেবতায় বিশ্বাস করে। তাদের সাংস্কৃতিক আচার-আচরণের প্রকাশভঙ্গিও তাই বহু অবতারবাদী। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম এক আল্লাহর উপাসক। সুতরাং মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং বহু অবতারবাদী ভারতীয় সংস্কৃতি কখনো এক হতে পারে না। কিছু মানুষ স্বীকার না করলেও এটাই স্বীকৃত সত্য যে, ধর্মবোধই আমাদের জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কল্যাণবোধ, শ্রেয়বোধ ধর্মের কারণেই জাগ্রত হয়। ধর্মের কারণেই আমরা বুঝতে পারি, কোন্টা শালীন বা অশালীন।
অগ্নিপূজারী ভারতীয় সংস্কৃতিতে অগ্নি কালচারের প্রাধান্য তাদের ধর্মবোধ থেকেই নিঃসৃত। ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী 'অগ্নি' হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যক্ষ দেবতারূপী ভগবান। হিন্দুদের কাছে পূজা, প্রদীপ, মশাল এবং অগ্নি এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। এর একটা ছাড়া অন্যটা অসম্পূর্ণ, অচল, অর্থহীন। জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে একটি হিন্দু সংস্থা কর্তৃক শিখা চিরন্তনে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয় এবং ঐ স্থানে 'অগ্নি দেবতার মন্দির' নির্মাণের দাবী জানানো হয়। এ দাবী তাদের খুবই প্রাসঙ্গিক।
হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ সংহিতায় অগ্নিকে ২০০ সুক্তে স্তব করা হয়েছে, যা দেবরাজ ইন্দ্র ভিন্ন অন্য কোন দেবতা সম্বন্ধে করা হয়নি। ঋগ্বেদে অগ্নিকে এতই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে যে, ঋগ্বেদ শুরু হয়েছে অগ্নি বন্দনা দিয়ে (১/১ সুক্ত) এবং শেষ হয়েছে অগ্নি বন্দনার মাধ্যমেই (১০/১৯১ সুক্ত)। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, অগ্নি পার্থিব দেবতাদের মধ্যে প্রধান। অগ্নি স্বর্গবাসী দেবতা এবং মর্ত্যলোকের মানবের মধ্যে যোগাযোগ বা মধ্যস্থতাকারী। অগ্নি দেবকূলের যজ্ঞের সারথি। ইনি আপন রথে দেবতাদের বহন করে যজ্ঞস্থলে নিয়ে আসেন। যার ফলে অগ্নি ছাড়া কোন যজ্ঞ হয় না। কোন শুভ কাজ শুরু হয় না। চালক না থাকলে যেমন মহামন্ত্রীও কোন শুভ কাজে উপস্থিত হতে পারেন না, তেমনি অগ্নি সারথি ব্যতীত দেবতাগণও যজ্ঞস্থলে বা শুভ কাজে উপস্থিত হতে পারেন না। সে জন্য অগ্নিকে হিন্দু ধর্মে পুরোহিত বলা হয়ে থাকে। আগুনের পরশ মণি ছাড়া কোন কাজই শুভ হয় না।
প্রায় প্রতিটি ধর্মপ্রাণ হিন্দু বাড়িতে তুলসী গাছের কাছে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যারতি করা হয়। মঙ্গল প্রদীপের উৎস মঙ্গল আরতি থেকেই, যা অগ্নি দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
হিন্দুদের বাহ্যপূজার আর একটা প্রধান অঙ্গ হোম। মাটিতে বালি দিয়ে একটা চতুষ্কোণ বেদী তৈরি করা হয়। সেই বেদীর মাঝখানে 'কুশ' বা খড় দিয়ে একটা পদ্ম তৈরি করে তার উপর 'ওঁ' অক্ষরটি লিখতে হয়। পরে গব্যঘৃত কপূর ইত্যাদির মাধ্যমে 'হোমানল' অর্থাৎ আগুন জ্বালিয়ে, আতপ চাল, চিনি, যব-কপূর ইত্যাদি সহযোগে 'চরু' তৈরি করে সেই আগুনে আহুতি দিতে হয়। পরে সেই অগ্নিকে প্রণাম করে প্রার্থনা করা হয় এভাবে, 'হে মহান দেবতা অগ্নি! তুমি আমাদের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে দাও। তোমার জ্যোতিতে হৃদয় পূর্ণ করে দাও। আমাদের যত কু-গ্রহ, বাইরের ও অন্তরের যত প্রবল শত্রু, তাদের তোমার হোমানলে দগ্ধ করে দাও।'
হিন্দুদের নিকট অগ্নি সদামঙ্গলময় বিধায় তাদের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, পূজা-অর্চনা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অগ্নির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। হিন্দু কাব্য সাহিত্যেও অগ্নি এসেছে পূজার হাত ধরেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূজা পর্বের গানে বহুবার পূজার সঙ্গে প্রদীপের উপমা ব্যবহার করেছেন, যেমন-
'আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে করব নিবেদন আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন।'
কিংবা, 'আমার এই দেহখানি তুলে ধর তোমার ঐ দেবালয়ের প্রদীপ কর।'
অথবা, 'যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে, একে একে তারা আকাশ পানে ছুটবে বাঁধন হারা।'
এভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পূজা এবং অগ্নি সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। আগুন ছাড়া পূজা হয় না। কারণ, আগুনের রথ ছাড়া দেবতা আসেন না।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মঙ্গল প্রদীপের মধ্যে মঙ্গল অনুসন্ধান করেন। কারণ, তাদের বিশ্বাস, অগ্নি দেব বহনকারী সারথি। স্বর্গের দেবতারা যাগ, যজ্ঞ, পূজা, বিবাহ প্রভৃতি শুভ কাজে অগ্নি ছাড়া আবির্ভূত হতে পারেন না। এ বিশ্বাস থেকেই এসেছে রাজঘাটের গান্ধী সমাধির চিতা অনির্বাণ বা ইন্ডিয়া গেটের চিতা চিরন্তন। একই বিশ্বাস থেকে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে তারা শুভ কাজ উদ্বোধন করে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন, শিখা কিংবা প্রদীপের আগুনের মাধ্যমে দেবতা মর্ত্যে আবির্ভূত হবেন এবং তিনিই কাজটিকে শুভ পথে পরিচালিত করবেন। অগ্নি দেবতার প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা থেকেই ভারতে শিখা কালচারের প্রচলন হয়েছে। বাংলাদেশেও কি তবে অগ্নি দেবতার বিশ্বাস নিয়ে শিখা কালচার শুরু করা হল?
বাংলাদেশ সাড়ে ১৩ কোটির বেশি মুসলিমের দেশ। এ দেশের জনগণের জীবন চিন্তা ভিন্ন ধরনের। তারা বিশ্বাস করে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। তিনিই একমাত্র চিরন্তন, চিরঞ্জীব, তিনিই রক্ষাকর্তা। আসমান এবং জমিনের সবকিছু একমাত্র তাঁরই। আল্লাহর সাথে যেকোন বস্তু বা প্রাণীর শরীক স্থাপনের পশ্চাদমুখী প্রবণতার বিরুদ্ধেই ইসলামের অবস্থান।
অতএব, যারা আজ শিখা জ্বালিয়ে দেবলোকের দেবতাকে মর্ত্যে আনার চেষ্টা করছেন, মঙ্গল সারথির মতো মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে শুভ কাজ উদ্বোধন করে বাঙালিপনার কথা বলছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে কোন্ বাঙালি কালচারের কথা বলছেন? সে কি বিগ্রহ পূজারী বাঙালি, না কি আল্লাহর একত্ববাদী বাঙালি, সেটাই পরিস্কারভাবে বুঝতে হবে। এ মুসলিম জাতি জানতে চায়, এ শিখা কালচার কাদের জন্য এবং কিসের জন্য?
আল্লাহর একত্ববাদী বাঙালি মুসলিমরা তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে না। অন্য কারো কাছে মঙ্গল (কল্যাণ) প্রত্যাশীও সে নয়। প্রতিটি মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল (স) এবং আল্লাহর প্রেরিত বাণী সম্বলিত আল-কুরআনে বিশ্বাসী। সেই কুরআনই তাদেরকে শেখায়, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর যিনি পরম করুণাময়, দয়াময়। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।' যেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, তার প্রধান হল আল্লাহর একত্ব, ক্ষমতা, করুণা ও সর্বোচ্চ ভালবাসার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে 'অগ্নিশিখা' কালচারকে, কিংবা কবরের মাটি দিয়ে বেদী গড়ার কালচারকে অথবা স্থাপত্যের নামে মূর্তি কালচারকে দেশের বুকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তারা কি মুসলিমদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কোন খোঁজখবর রাখেন না?
যে দেশের সংখ্যাগুরু মানুষ যে সংস্কৃতির ধারক, সে দেশের সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে সেই সংখ্যাগুরু মানুষের সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংখ্যাগুরুর ওপর চাপিয়ে দিলে অন্য ব্লাড গ্রুপের রক্ত যেমন শরীর ধারণ করতে পারে না, তেমনি জাতিও বিসদৃশ সংস্কৃতি ধারণ করতে পারবে না। ফলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে বাধ্য।
বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষ মুসলিম। মুসলিমরা অগ্নি দেবতায় বিশ্বাস করে না, তারা একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। মুসলিমরা যখন কোন শুভ কাজ শুরু করে তখন অগ্নিদেবের শরণাপন্ন হয় না। তারা আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁর প্রশংসা করার মাধ্যমে তাঁর কাছে কল্যাণের প্রার্থনা জ্ঞাপন ক'রে কাজ শুরু করে। মুসলিমরা ক্ষণস্থায়ী অগ্নিশিখাকে চিরন্তন মনে করতে পারে না, তাদের কাছে একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই চিরন্তন। মুসলিমরা আগুন জ্বালে অন্ধকার দূর করার জন্য এবং রান্নাবান্নার জন্য। জীবনের কোন শুভ বা কল্যাণ বয়ে আনার অলৌকিক ক্ষমতা অগ্নির কাছে, এ ধারণায় মুসলিমরা বিশ্বাস করে না।
অতএব, সার্বিক বিচারে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, শিখা অনির্বাণ ও চিরন্তনের চিন্তাধারা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী, পৌত্তলিক চিন্তা-সঞ্জাত এবং ভারতীয় শিখা কালচার থেকে আহরিত পরাশ্রয়ী চিন্তাপ্রসূত। এ অগ্নি পূজা সম্পূর্ণ শির্ক ও আল্লাহদ্রোহী কাজ। 'শিখা চিরন্তন' বা 'শিখা অনিবার্ণের' নামে অগ্নি মশালকে সারা দেশে ঘুরিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং ওগুলোর প্রজ্জ্বলনকে অব্যাহত রাখার জন্য বিশেষ ধরনের বেদীর ওপর এগুলো স্থাপন করা হয়, অলিম্পিক মশাল সহ বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানের মশাল প্রজ্জ্বলনও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। এ কালচারের সাথে এ দেশের মাটি ও মানুষের কোন সংস্রব নেই। বরং শিখা চিরন্তনের অগ্নিকুণ্ড যতদিন এ দেশের বুকে জ্বলতে থাকবে, ততদিন আল্লাহর একত্ববাদকে খর্ব করার, আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করার অভিশপ্ত মশাল জ্বলতে থাকবে বাংলাদেশের বুকে।

টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন, ঋগবেদের মহা ১.৫.২৩ শ্লোক, পুরানের ৬৪.১.৫.৯ শ্লোকসহ আরো অন্যান্য শ্লোক।
২. বিস্তারিত দেখুন, বাংলা বিশ্বকোষের 'অগ্নি' অনুচ্ছেদ।
৩. বিস্তারিত দেখুন, ঋগবেদের মনু ৩/৭/৫-৬, ৩/৮৪/৭ শ্লোক।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা, সালাফীনের থেকেই নিতে হবে দীক্ষা

📄 কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা, সালাফীনের থেকেই নিতে হবে দীক্ষা


পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সময় কথা বলার মধ্যে একবার বেদম বিষম খেলো শামীম। নাকে-মুখে একাকার অবস্থা। সামাল দেয়ার জন্য যখন সে প্রাণান্ত প্রয়াসে রত, তখন শামীমের মা বললেন, 'কীরে তোকে বুঝি কেউ মনে করছে। তোর কথা বলছে।' তখনও সামলে উঠতে পারেনি সে। খাবারের এক পর্যায়ে ওর দুলাভাইকে দেখে সালাম দিল। এবার বোনের ধমক, 'খেতে খেতে সালাম দিতে নেই, সেটাও কী শহরে গিয়ে ভুলে গেছিস?' দুলাভাই তাকে 'ঠিক আছে আগে খেয়ে নাও পরে কথা হবে' বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সচেষ্ট হলেন।
এরপর সবাই আবার খাবারে মনোনিবেশ করল। জাদীদা খাচ্ছিল চুপচাপ। ওদের সঙ্গে মামাও খাচ্ছিল। হঠাৎ ওর প্লেটের দিকে নজর পড়ল মামার। দেখে যে, প্লেটের একদিকে সামান্য একটুখানি ভাঙা। পুরনো প্লেট। জাদীদাকে উদ্দেশ্য করে বাবা বলল, 'কীরে জাদীদা বেছে বেছে তুই ভাঙা প্লেটে খাস কেন!? তোর কপালে কি ভালোটি জোটে না? ভাঙা প্লেটে খেলে যে তোর কপালটাও ভাঙাই হবে। কপালে জোড়া লাগবে না।' জাদীদা অবশ্য এটা কখনো খেয়াল করেনি বা এভাবে ভেবেও দেখেনি। সে হ্যাঁ- না কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে কেবল চেয়ে রইল। মামা বলল, 'দেখছিস কী আজ ওতেই সেরে ফেলো। কিন্তু কথাটা মনে রাখিস বলে দিলাম।' নিরীহ ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে জাদীদা পুনরায় খাদ্য গিলতে নিয়োজিত হল। ওর খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। বাকিটুকু শেষ করে উঠে পড়ল। প্লেট হাতে নিয়ে সামনে এগুতেই একটা পাতিলের সঙ্গে ওর পা ঠুকে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পাতিলে হাত ছুঁয়ে তিনবার সালাম করল। বসা থেকে মামা এটা দেখে বলে, 'করিস কী, করিস কী! ধাতুর প্রাণহীন পাতিলটি কী তোর সালাম নিল, না বুঝল! তোর পা না মাথা ওটিকে ছুঁয়েছে তাও কি ওটা বুঝেছে?' জাদীদা এ সব কিছুই বুঝল না। ছোটবেলা থেকে তো এ রকমই দেখে আসছে। দেখে যা শিখেছে তাই তো পালনীয়! এতে কি দোষ করল তা ওর মাথায় ঢুকল না।
খাবার নিয়ে এতক্ষণ যেসব নিয়মের কথা জানলাম, এগুলো দীর্ঘকাল ধরে যে এ পরিবারকে শাসন করছে তা তো নয়। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ বাড়ির বেশিরভাগ লোকজনকেই নির্বিচারে শাসন করে চলেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মামাদেরও বাগে রেখেছে। নির্বিচারে পালনীয় এ সব আচারের সঙ্গে যুক্ত আছে কুসংস্কার এবং অজ্ঞানতা। হ্যাঁ, শাসন একটা মানা দরকার। সেটা হবে কোন শাসন? সেটা হবে আল্লাহর শাসন। আল্লাহ্র বিধান কুরআন ও সহীহ হাদীসের শাসন।
উপরোক্ত নিয়মগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খেতে বসে মুখে খাবার রেখে কথা বললে বা তাড়াহুড়ো করে খেলে গলনালীতে খাবার আটকে যায়। তারপর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে খাবার পাকস্থলী অভিমুখে না এগিয়ে উল্টোদিকে মানে মুখের দিকে আসতে থাকে। বিষমটা তখনই লেগে যায়। সুতরাং বিষম খাওয়ার সঙ্গে কারো মনে করার কোন সম্পর্ক নেই। থাকতেও পারে না। গরীব-দুঃখী পরিবারের লোকজন ভাঙা থালায় খায় বলে এতে আবার কিসের দৈন্যের ছাপ থাকতে পারে? খাবার রান্নাবান্না করতে হাঁড়ি-পাতিলের ওপরই নির্ভর করতে হয়, এ পর্যন্তই। তাই বলে নিষ্প্রাণ পাতিলে পা লাগলে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সালাম করার কোনই অর্থ নেই।
অন্যদিকে, কাককে সাধারণত অশুভ বলে মনে করা হয়। এ বিশ্বাসটি মূলত বাইবেল থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী, পাখিদের মধ্যে শুধুমাত্র কাকই নূহ (আঃ)-এর নৌকায় আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। কালো রঙ মানেই ভয়ার্ত, বিপজ্জনক বা অমঙ্গল! কাক যেহেতু কালো, কুৎসিত তাই এ প্রাণীটির সবকিছুই কুৎসিত; ভাল, আনন্দ বা মঙ্গলের যোগ নেই। এমনি ধারণা থেকেই তো কাকের ডাকের সঙ্গে অমঙ্গল বা অশুভ ভাবনা যুক্ত হয়ে গিয়েছে। অথচ, চীনে কাককে সৌভাগ্যের প্রতীক রূপে গণ্য করা হয় বলে কাক হত্যা করা নিষিদ্ধ।
বিড়াল একটি আদুরে ও নিরীহ প্রাণী। মিউ মিউ করে আর এর ওর কাছে ঘুর ঘুর করে আদর পেতে চাইবে। এ প্রাণীর পা বা পেট চাটাচাটিতে কী আসে যায়, অবুঝ প্রাণী অতিথির খবর পাবে কোত্থেকে? এগুলো সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত হাজারো অন্ধ সংস্কারের দু-চারটা নমুনা। যুক্তিহীন সংস্কার মেনে চলায় গৌরব নেই, উন্নতিও নেই। উন্নতি কিছু আসবে এগুলো না-মানাতেই। কুরআন-সহীহ হাদীস-যুক্তি-বুদ্ধিতে পরখ করে মানামানিটা ঠিক করে নিতে পারলে নিজের এবং দেশের উন্নতি হবেই।
ইংল্যান্ডের লোকজন বিশ্বাস করে যে, কালো বিড়াল হচ্ছে সৌভাগ্য আনয়নকারী। বিশেষ করে যদি কালো বিড়াল কারো চলার পথকে অতিক্রম করে যায়। অর্থাৎ সামনে দিয়ে কোন কালো বিড়াল অতিক্রম করাকে দুর্ভাগ্য আগমনের পূর্বআলামত হিসেবে গণ্য করে থাকে। এ বিশ্বাসটির উৎপত্তি হয় মধ্যযুগে। তখনকার যুগে কালো বিড়ালকে লোকজন ডাইনীদের প্রাণী বলে বিশ্বাস করত। তারা মনে করত যে, কালো বিড়ালের মাথার মগজের সঙ্গে ব্যাঙ, সাপ এবং পোকামাকড়ের শরীরের অংশের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ডাইনীরা যাদুর পাঁচন তৈরি করে। যাদুর পাঁচনের সংস্পর্শ ব্যতীত কোন বিড়াল সাত বছর বেঁচে থাকলে কালো বিড়ালটি ডাইনীতে রূপান্তরিত হতো বলে ধারণা করত। বিপরীত দিকে, আমেরিকাসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে কালো বিড়ালকে অশুভ বলে গণ্য করা হয়। আমেরিকাতে সাদা রঙের বিড়ালকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আবার এই সাদা বিড়ালই ইংল্যান্ডে অশুভ বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক।
কোন ব্যক্তি কোন কিছুর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে যখন সে চায় যে তার সৌভাগ্য যেন পরিবর্তন না হয়, তখন সে বলে 'কাঠে টোকা দাও' এবং এ সময় সে তার চতুর্দিকে খুঁজে দেখে কোন কাঠ পাওয়া যায় কি না যেখানে সে টোকা দিতে পারে। এ বিশ্বাসের উৎস বের করতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে, যখন ইউরোপের জনগণ বিশ্বাস করত যে, দেবতারা সাধারণত গাছের মধ্যে বাস করে। গাছে বসবাসকারী দেবতার নিকট থেকে কোন অনুগ্রহ লাভ করতে তারা গাছ স্পর্শ করত। তাদের এ প্রার্থনা যদি গৃহীত হতো, তাহলে দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তারা পুনরায় গাছ স্পর্শ করত।
লবণ পড়ে গেলে বেশিরভাগ মানুষ ভাবে যে তাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বা অশুভ কিছুর আগমন অবশ্যম্ভাবী। তাই তারা সেই পড়ে যাওয়া লবণকে বাম কাঁধের উপরে নিক্ষেপ করে দুর্ভাগ্যকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। লবণ যেহেতু কোন কিছুকে তাজা রাখতে পারে, অনুরূপভাবে এটি দুর্ভাগ্য প্রতিহত করে তাদেরকে রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হয়। লবণের আল্লাহ্ প্রদত্ত স্বাভাবিক কার্যকারিতা শক্তির কারণে প্রাচীনকালের মানুষেরা এ বিশ্বাস করত। এভাবে লবন পড়ে যাওয়াকে কোন অশুভ আলামতের অশনি সংকেত হিসেবে ধরা হয়। আবার যেহেতু তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, শয়তানী আত্মা বা অশুভ শক্তি মানুষের বামপার্শ্বে অবস্থান করে; তাই পড়ে যাওয়া লবণ বাম কাঁধে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে সন্তুষ্ট করা হয়। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি কর্তৃক আঁকা বাইবেলে বর্ণিত শেষ নৈশ ভোজের ছবিতে দেখা যায় যে, লবনের তাকে যিশুর বিশ্বাসঘাতক জুডাস আঘাত করছিল।
অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে, হঠাৎ করে একটি আয়না ভেঙ্গে যাওয়া বা ফেঁটে যাওয়া বা ভাঙ্গা আয়না সাত বছরের জন্য দুর্ভাগ্য আগমনের আলামত। প্রাচীনকালের মানুষেরা মনে করত যে, পানির উপরে কোন ব্যক্তির আত্মার প্রতিবিম্বের সৃষ্টি হয়। ফলে, কেউ পানিতে ঢিল ছুঁড়লে বা অন্য কোনভাবে যদি তাদের আত্মার প্রতিবিম্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে আত্মাও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর আয়না আবিষ্কারের পর থেকে এ বিশ্বাস আয়নাতে স্থানান্তরিত হয়। ধারণা করা হয়, এ বিশ্বাসটি একটি প্রাচীন বিশ্বাস থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এ প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের বা কারও বা কোন প্রাণীর প্রতিবিম্ব বা প্রতিফলন বা ছায়া মূলত তার আত্মার প্রতিচ্ছবি ব্যতীত আর কিছুই না। অতএব যা কারো প্রতিবিম্ব বা ছায়াকে পরিবর্তন করে তা দুর্ভাগ্য বয়ে আনতে পারে। এ দুভাগ্যের সময়কালের ধারণা রোমানদের নিকট থেকে আগত বলে মনে করা হয়। রোমানদের ধারণা হচ্ছে, মানুষের জীবন প্রতি সাত বছর অন্তর নূতন রূপ পরিগ্রহ করে।
কোন দেয়ালের সাথে হেলান দেয়া মই ত্রিভুজের সৃষ্টি করে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে, এ মইয়ের নিচ দিয়ে হাঁটা অসম্মানজনক, অমঙ্গলজনক, অকল্যাণকর; এক কথায় অশুভ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, ত্রিভুজ মূলত পবিত্র ত্রিত্ববাদকেই প্রতীকায়িত করে। এ অবস্থায় রাখা মইয়ের নিচে অবস্থান করার সময় কোন বিষয়ে বাঞ্ছা করা বা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা অথবা হাত বা পায়ের আঙুল অতিক্রম করিয়ে অশুভ বা দুর্ভাগ্য থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।
ডিম ও আলু মানে তো সহজে বোঝায় যায় গোল্লা, মানে শূন্য! আর কলা! কলা দেখা মানে বা দেখানো মানে তো জানই। সেটাও এক শূন্যেরই ব্যাপার। কোন পরীক্ষার আগে ডিম, কলা, আলু খাওয়া মানেই হল পরীক্ষায় গোল্লা পাওয়া! আবার কেউ সাঁতার না শিখলেও তার ব্যবস্থাপত্র আমাদের সমাজের এখানে-সেখানে সর্বত্রই পাওয়া যায়। ছোট পিঁপড়া কোনভাবে খেতে পারলে অবশ্যই সাঁতার শিখতে বেগ পেতে হবে না। তাছাড়া, পচা বা পোক ধরা ফল খেলেও তাড়াতাড়ি সাঁতার শেখা যায়।
এগুলো নিয়ম বলে চলে আসলেও বস্তুত অনিয়ম বৈ কিছু নয়। এ সব নিয়মের অসারতা একটু পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই ধরা পড়ে। পিঁপড়ে ভালো সাঁতারু বলে তা খেয়ে সাঁতার শেখা যাবে এমন কথা নেই। কারণ মানুষ তো কত পাখি খায় তার জীবনে, কিন্তু কেউ কি আকাশে ওড়া শিখেছে? পচা ফল বা পোকা-ফল খেলে সাঁতার শেখা যাবে এমন কোন কথা নেই। ডিম ও আলুর আকৃতি শূন্যের মতো বলে ফলাফল শূন্য জুটবে, তা কী কোন কথা হল? কলার সঙ্গে শূন্য লাভের কী সম্পর্ক!
মূলত এ সব যুক্তি-বুদ্ধি-জ্ঞানহীন অন্ধ-অসার ধারণা বা বিশ্বাস। পুরোনো আমলের ভ্রান্ত ধারণা। এমনই অনেক অচল ধারণা সচল রয়েছে আমাদের সমাজে কেবল ওহীর সত্য জ্ঞানের অভাবে। এ ধরনের সচল নিয়মগুলো অচল করা শুধু নয়, বাতিলই করতে হবে আজ, এখনই। সে জন্য আমাদের সকলকে ওহীর অমোঘ বিধানের নিকট আত্মসমর্পণ করতে হবে। কুরআন ও সহীহ হাদীসের পাঠ নিতে হবে। চেতনাটা সহীহ আক্বীদার কষ্টি পাথরে যাচাই-বাছাই করতে হবে।

টিকাঃ
১. ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কপাল শব্দটি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি থেকে আমাদের মুসলিমদের বিশ্বাসে অনুপ্রবেশ করেছে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থানুযায়ী, কোন সন্তান জন্মের ৬ষ্ঠ দিনে ভাগ্যের দেবতা এসে এ শিশুটির জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনাসমূহ অর্থাৎ হায়াত, মৃত্যু, রিযিক, ধন-দৌলত ইত্যাদি তার [শিশুটির] কপালে লিখে যায়। আর এ বিশ্বাস থেকেই প্রচলিত হয়েছে- 'কপালের লিখন না যায় খণ্ডণ।' কিন্তু আমরা মুসলিম হিসেবে এ ধরনের আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করি না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভাগ্য লিখে রাখা হয়েছে লাওহে মাহফুজে, যা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ওয়াকিবহাল। তাই আমরা বলি, 'ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডণ।' অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত ভাগ্য সম্পর্কিত ব্যাপারে আলোচনায় 'কপাল' শব্দটির ব্যবহার করা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা। কারণ, সামান্য একটি মাত্র শব্দই আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদায় আঘাত করতে যথেষ্ট।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 লটারী-জুয়া-হাউজি, সবই হল হারাম পুঁজি

📄 লটারী-জুয়া-হাউজি, সবই হল হারাম পুঁজি


লেগে যাবার সম্ভাবনার কথা শুনি আমরা। ভাগ্য ভাল হলে অথবা ভাগ্যে থাকলে না লেগে যাবে কোথায়? বলা হয় এ রকমও, 'কপাল যদি না হয় ফাঁকা, ঘুরতে পারে ভাগ্যের চাকা।' চাকা থাকলে তো ঘুরবেই। যদি তাকে আটকে না রাখা হয়। আর যদি কপাল বলে কিছু থাকে এবং তারও যদি চাকা থাকে তাহলে তার না ঘুরে উপায় কী! কপাল যে কারো ফাঁকা- এ অপবাদ তো কেউ মাথা পেতে নিতে চাইবেন না। কপাল ফাঁকা, মাথা ফাঁকা- এগুলো মানব জীবনের জন্য খুব খারাপ ব্যাপার বলে মনে করা হয়। সুতরাং কপাল ফাঁকা অর্থাৎ ভাগ্যহীন অলক্ষ্মী (!?) বলে পরিচিত হতে চাইবেন না কেউ। কপাল পরিপূর্ণ না হোক ফাঁকা নয় কারো। এম কপালে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে পারে বৈকি!
কপাল ফাঁকা না হলে, ভাগ্য সহায় হলে লটারি কুপনের ক্রেতা রাতারাতি বড়লোক হয়ে যেতে পারেন। পেয়ে যেতে পারেন তিনি কয়েক লক্ষ টাকার পুরস্কার।
আমরা জুয়া খেলার কথা জানি। খেলাটা দেখেছিও অনেকে, গোল রঙচঙে বোর্ড। তার পুরোটা জুড়ে আঁকা থাকে বিভিন্ন জিনিসের ছবি। ঠিক মাঝ বরাবর থাকে চারদিকে ঘুরতে থাকা একটা তীর। তীরটিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। কোন জুয়াড়ীর ধরা নম্বরে তীর আটকালে সে হয় বিজয়ী। দেখা যায়, একটি জুয়ার বোর্ডে ৩০ থেকে ৪০টি ঘর থাকে। এক একটি ঘরে এক একটি ছবি বা নম্বর আঁকা থাকে। একজন যখন জুয়ার বোর্ডে বাজী ধরে তখন তার বাজীতে জেতার সম্ভাবনা থাকে ৪০ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ নিতান্তই সামান্য।
লটারিতে পুরস্কার জেতার ব্যাপারটিও অনেকটা একই রকম। কী রকম! ব্যাপারটি খতিয়ে দেখলে লটারিকে জুয়া খেলা বলে সবাই মেনে নিতে কোনই দ্বিধা করবেন না। জুয়া খেলার তো বোর্ডে ঘর থাকে ৪০টি। আর লটারির কুপন ছাড়া হয় কয়েক কোটি। হয়তো প্রথম পুরস্কার ৫০ লক্ষ, দ্বিতীয় ৪০ লক্ষ, তৃতীয় ৩০ লক্ষ টাকা এবং সবগুলো মিলে হয়তো আরো ৫০ লক্ষ টাকার পুরস্কার। সব মিলিয়ে হয়তো ২ কোটি টাকার পুরস্কার। এছাড়া কুপন ছাপা, প্রচার চালানো ও অন্যান্য খাতে খরচ করে ১০ লক্ষ টাকা। এই মাত্র দুই, আড়াই বা তিন কোটি টাকা খরচ হয় একেকটি লটারি পরিচালনায়। লটারি যারা করে সেই সংস্থা তো খরচ বাদ দিয়ে কিছু লাভ করবেই। সেই হিসেবে হয়তো পাঁচ কোটি টাকার কুপন বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। একটি কুপনের দাম যদি ১০ টাকা হয়, তাহলে মোট কুপন ছাড়া হয় হয়তো ৫০ লক্ষ। তাহলে এখন দেখা যাচ্ছে, একজন একটি কুপন কিনলে তার পুরস্কার পাবার সম্ভাবনা হয় ৫০ লক্ষের এক ভাগ। দুটো কিনলে ৫০ লক্ষের দুই ভাগ। এভাবে ১০টি কুপনে সম্ভাবনা ৫০ লক্ষের ১০ ভাগ।
এখন দেখা যাক, লটারির কুপন কেনে কারা। সচরাচর যারা নিজের অবস্থা রদলাতে চান কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। যারা উচ্চাশা পোষণকারী, যেকোনভাবে রাতারাতি অবস্থা বদলে ফেলতে চান- তারাই কেনেন লটারির কুপন। অর্থাৎ গরিব অথবা স্বল্পআয়ের লোকজনই কুপনের অধিক ক্রেতা। নিজেদের জীবনে উন্নতি ঘটানোর জন্য লটারির আশ্রয় নেন তারা। লটারির প্রচারে যে ভাষায় লোভ দেখানো হয়, তাতে তারা বশীভূত হন। আর এরা যদি একবার সামান্য টাকার পুরস্কার পেয়েও যান তাহলে তো কথাই নেই। লোভে লোভে বার বার কুপন কেনার প্রতিযোগিতা চালাবেন। অনেক মানুষকে দেখা যায়, মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে প্রথমেই দু'-পাঁচটি লটারির কুপন কিনে ফেলেন। ভাগ্যের ফের ফেরাতে সহজ-সরল, সাধারণ মানুষ লটারির কুপন কিনে এভাবে প্রতারিত হয়েই চলেছেন।

📘 শিরকের বেড়াজালে উম্মত বেসামাল > 📄 যারা বলে দাঁতের পোকা, আসলে তারা বানায় বোকা

📄 যারা বলে দাঁতের পোকা, আসলে তারা বানায় বোকা


শহরের রাস্তাঘাটে, বাস, ট্রেন, লঞ্চে বা গ্রামের হাট-বাজারে দাঁতের মাজন বিক্রেতাদের দেখা যায়। 'পোকালাগা' দাঁতের ফুটো থেকে তারা 'পোকা' বের করে আনে। পোকা বের করা ও দাঁত ভাল রাখার জন্য তাদের মাজন অব্যর্থ বলে দাবী করে। বিক্রির সময় গোল হয়ে দাঁড়ানো লোকজনের মুখে মাজন লাগিয়ে কিছু পরে তারা পোকা বের করে এনে দেখায়। এ তো গেল মাজনওয়ালার কথা। এ ছাড়া, আমাদের সমাজে আর এক শ্রেণীর মানুষ আছে যাদের পেশা দাঁতের পোকা তোলা। গাছের ডাল বা শেকড় দিয়ে কিভাবে জানি দাঁত থেকে পোকা বের করে আনে। এ মানুষদের চেনেন অনেকে। নৌকার বহর সাজিয়ে নদীতে ভাসমান জীবন যাপন করেন এরা। ভাসতে ভাসতে কোন চর বা ভাললাগা গ্রামে গিয়ে নৌকার সারি ভেড়ায়। কিছুদিন এ তীর ঘিরেই এদের জীবন শুরু হয়। বেদে বলে পরিচিত এ মানুষদের অনেকে দাঁতের পোকা বাছা, দাঁতের অসুখ সারানো- এগুলো কাজ করেন। ঝোলা কাঁধে ফেলে গ্রামের পথ-ঘাটে হেঁটে-হেঁকে বেড়ায়, 'দাঁ-তের পোকা বাছা, পোকা তোলা।'
দাঁতের পোকা বের করার যে দু'শ্রেণীর লোকের কথা বললাম, এরা লেখাপড়া না-জানা অসচেতন মানুষ। কেউ মাজন দিয়ে আর কেউ গাছ-গাছড়ার সাহায্যে পোকা তোলেন। কিন্তু আধুনিক দাঁতের ডাক্তাররা কখনোই পোকার কথা বলেন না। পোকা বের করার কথাও তারা বলেন না কখনো। আসলে পোকা আছে বলেই তারা স্বীকার করেন না। দাঁতে যে কখনো পোকা হতে পারে, এটা তারা বিশ্বাসই করতে চান না। তাহলে কি দাঁতের পোকা বলে কিছু নেই! পোকা নিয়ে যে এত কাণ্ড তার সবই কি তবে মিথ্যা, বানানো কথা এগুলো!
আসলে কিন্তু তাই। দাঁতের পোকা নিয়ে যত কথা তার সবই বানানো। মিথ্যা কল্পকাহিনী। এর মধ্যে একবিন্দুও সত্য নেই। দাঁতে কখনো পোকা হয় না। তবে হ্যাঁ, আস্ত দাঁতে গর্ত হয় ঠিকই। এ গর্তের মধ্যে ব্যথা হয়। কখনো কখনো এ ব্যথা এত বেশি হয় যে, একে বলা হয় দাঁতে পোকা লেগে কামড় দিচ্ছে। তো এই গর্ত ও যন্ত্রণা হওয়া- এ সব কিন্তু পোকার কাজ নয়। এর কারণ ভিন্ন। এর কারণ হল এসিড বা অম্ল। বিভিন্ন কারণে দাঁতে এসিড হলে ধীরে ধীরে গর্ত হয়। গর্ত থেকে পরে ব্যথার সৃষ্টি হয়।
আমরা যতক্ষণ জেগে থাকি এর মধ্যে অনেকবারই ভাতসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খাই। খাওয়ার পর খাবারের ছোট ছোট টুকরো বা কণা দাঁতের ফাঁকে বা আশপাশে লেগে থাকে। খাওয়ার পর ভালভাবে মুখ পরিষ্কার না করার জন্য এগুলো থেকে যায়। আমাদের মুখের ভেতরে আছে জীবাণু। দাঁতের ক্ষতি করে এই এসিড। দাঁতের ওপরের দিকে যে ঝকমকে সাদা অংশ থাকে তার নাম এনামেল। ভেতরের নরম অংশকে পাতলা পর্দার এনামেল রক্ষা করে। শক্ত জিনিস খাওয়ার শক্তিও যোগায় এনামেল। এসিড দাঁতের জন্য খুব অপকারী। এই এনামেল নষ্ট করে ভেঙে গুঁড়ো গুঁড়ো করে এসিড। ফলে দাঁতের শক্তি কমে যায়। ঝকঝকে ভাবটা দূর করে দেয়। এতে দাঁতে ক্ষয় ধরে। ক্ষয় হতে হতে একসময় দাঁতে ফুটো তৈরি হয়ে যায়। দাঁতে যদি এনামেলের ওপর নোংড়া লাল বা হলুদ পর্দা জমে, তবে এসিড তৈরি হয় খুব তাড়াতাড়ি। প্রথমে কিন্তু এ সবের কিছুই টের পাওয়া যায় না। পরে যখন ক্ষয়টা বেশি হয়ে দাঁত ফুটো হয় তখন বোঝা যায়। কারণ, তখন ব্যথা শুরু হয়ে যায়। খাবারের কণা বা পান-সিগারেটের যে নোংড়া দাগ তা এসিডকে টেনে ধরে রাখে।
চিনি জাতীয় খাবার, চকলেট, আইসক্রীম এগুলো যেহেতু আঠালো জিনিস তাই এতে এসিড হয় বেশি। এখন এ জাতীয় খাবার আমরা হরহামেশা খাই বলে দাঁতের ক্ষয়ও হয় বেশি। আগে এ ধরনের খাবারের চল তেমন ছিল না বলে দাঁতের ক্ষয় বা রোগও তেমন বেশি হয়নি।
দাঁতের এ ক্ষয়রোগ থেকে মুক্ত থেকে দাঁতকে শক্ত ও সতেজ রাখার উপায় কি? প্রাথমিকভাবে উপায় দুটো:
১. প্রতিদিন খাবারের পর খুব ভালো করে দাঁত-মুখ পরিষ্কার করতে হবে, যাতে খাদ্যকণা কোনভাবেই দাঁতে লেগে থাকতে না পারে সেদিকে লক্ষ্য রেখে পরিষ্কার করা দরকার।
২. যে খাবারগুলো আঠালো এবং ওপরে লেগে গিয়ে দাঁতকে ময়লা নোংড়া করে, এমন খাবার কম খাওয়া। মিষ্টি বা চিনি দিয়ে বানানো খাবার, পান, সিগারেট, তামাক ইত্যাদি এর মধ্যে পড়ে। এ ছাড়া, কোথাও কোথাও পানিতে আয়রন (লোহা) ও লবণের ভাগ বেশি থাকে। এমন পানিও দাঁতের ক্ষতি করে। খাবার পানি সবসময় আগুনে ফুটিয়ে খেলে দাঁতের তেমন ক্ষতি হয় না।
ওপরের আলোচনা থেকে আমরা বুঝলাম, দাঁতের পোকা বলে কিছু নেই। দাঁতে কখনো পোকা হয় না। দাঁতে যে গর্ত বা ব্যথা হয় সেজন্য পোকা দায়ী নয়। আসলে আমরা দাঁত সম্পর্কে খুব কম জানি বা খোঁজখবর কম রাখি। এ না-জানার সুযোগ নিয়ে সমাজের এক শ্রেণীর মানুষ দিব্যি ঠকিয়ে চলেছে আমাদের। আমাদের অজ্ঞানতা, অসচেতনতা ও কুসংস্কারের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা ঠকিয়ে উপার্জন করছে।
অনেক সময়ই দেখা যায়, ওই মাজনওয়ালা বা বেদেরা মানুষকে ধরে তার মুখ থেকে পোকা বের করে। এ পোকা কোথেকে আসে এ প্রশ্ন হয়তো অনেকের। এটা আসলে হাতসাফাই বা ম্যাজিক। জাদুকররা হাতসাফাই করে খালি হাতে কত কি-ই না দেখান! খালি কলসী নিমেষে পানিতে ভরে ফেলেন। খালি পকেটে টাকা ভরিয়ে দেখান। এগুলো যদি সম্ভব হয় তবে দু'চারটে পোকা হাতের তালুতে এনে দেখানো খুব কঠিন কি! পুরনো চাল, পচা ফল বা গোবরের তাল থেকে পোকা সংগ্রহ করে এনে আগেভাগেই তারা আঙ্গুলের ফাঁকে লুকিয়ে রাখেন। আর এ পোকাগুলো মুখ থেকে বের করে আনার ভান করে দাঁতে লবঙ্গের তেল লাগিয়ে দেন। লবঙ্গের তেল কিছু সময়ের জন্য ব্যথা দূর করে। এক একজন একেকভাবে এ প্রতারণার খেলা দেখিয়ে মানুষকে বোকা বানান।
প্রতারণার আরেকটা পদ্ধতিও আছে। কুমড়োর শক্ত বিচির ওপরের পর্দা ব্লেড দিয়ে কেটে ফেলা হয়। বিচির ভেতরের নরম শাঁসটাকে চিকন করে কুচি কুচি করে টুকরো করা হয়। টুকরোগুলো রোদে শুকিয়ে দাঁতের মাজনের শিশির মধ্যে মিশিয়ে রাস্তায়-বাজারে মাজন বিক্রি করতে লেগে যায় মাজনওয়ালা। দাঁতের ব্যথায় ভুগছে এমন লোকজন ধরে মাজন লাগাতে দিয়ে দেয় শিশি থেকে। দু'পাঁচ মিনিট পর থুথু ফেলতে বলেন। সাথে সাথে বলে, 'এবার দেখুন, আমার মাজন কিভাবে পোকা ধরে বের করে আনছে।' কুমড়ো বিচির টুকরাগুলো থুথুর সাথে বের হয়ে এলে এগুলোই পোকা বলে সবাইকে ধোঁকা দেন। বিচির টুকরোগুলো মুখের মধ্যে থেকে রসালো হওয়াতে একটু ফুলে ওঠে। থুথুর মধ্যে এগুলো ফুলতে থাকে বলে মনে হয় যে, নড়াচড়া করছে। ব্যস, এগুলো আর দাঁতের পোকা না হয় কি করে!
আমাদের সমাজে এভাবে ভেল্কি দেখিয়ে, হাতসাফাই করে মানুষকে বোকা বানিয়ে কতই না লোক বেশ রুজি রোজগার করছে! এ জন্য দায়ী আমাদের অশিক্ষা, কুশিক্ষা আর অন্ধবিশ্বাস।
আর প্রতারণার কথা বলতে গেলে নির্দ্বিধায় বলা যায়, কত রকমের প্রতারণাই না ছড়িয়ে আছে আমাদের সমাজে, আমাদের জীবনে। গেঁথে আছে এগুলো আমাদের বোধে, বিশ্বাসে, চিন্তায়। মানুষের বিচার-বুদ্ধি পেছন অতীতে খুব কম ছিল। সবকিছু যাচাই-বাছাই করে তখন মানুষ দেখতে-বুঝতে শেখেনি। সে সময় সমাজের একশ্রেণীর স্বার্থপর মানুষ এগুলোর প্রচলন করেছে। নিজেদের স্বার্থ প্রতিষ্ঠা ও বহাল রাখার কারণে প্রতারণার দুষ্টবুদ্ধির আশ্রয় নিয়েছে। এর অনেক ধারণাই তারা ধর্মের সাথে সংযুক্ত করে পরিবেশন করেছে মনুষ্য সমাজে। এভাবে অনেক প্রতারণাপূর্ণ ধ্যান-ধারণা ধর্মীয় নীতি-নৈতিকতার সাথে মিলেমিশে যুগযুগ ধরে সচল রয়েছে আমাদের সমাজে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00