📄 প্রতিমা পূজার ভিত্তি মূর্তি ও ভাস্কর্য, তা ভেবে হতে হয় আশ্চর্য
আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপসংস্কৃতির একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। এ ময়দানে তো আছেই, আমাদের প্রত্যেকের ড্রয়িংরুমেও প্রবেশ করেছে রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে। পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্যেও চলছে অপসংস্কৃতির রাজত্ব। অপসংস্কৃতির চতুর্মুখী হামলার মোকাবিলায় ইসলামী সংস্কৃতির অবস্থান কোথায়, তা রীতিমতো গবেষণা সাপেক্ষ।
বাংলাদেশে অগ্নিউপাসকরাই মূর্তিপূজক। ভাস্কর্য শিল্পের নামে এখানে রাস্তার মোড়ে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে প্রচুর বিশালকায় পাথরের মূর্তি। এরা অস্ত্রহাতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছে। আর আমরা ওদের নমস্কার জানাচ্ছি। 'অপরাজেয় বাংলা', 'সাবাশ বাংলাদেশ', 'দুরন্ত' প্রভৃতি বাহারী নাম দিয়ে এ সব মূর্তি খাড়া করা হয়েছে। এদের বেদীতে ফুল, ফুলের তোড়া দেয়া হয়। আবার বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্যমূর্তি খাড়া করানো হয়েছে বিভিন্ন প্রাঙ্গনে। সেসব জায়গায় তো রীতিমত ঐসব ব্যক্তিদের পূজা হচ্ছে। তাছাড়া বাঙালিরা (?) বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি দিয়ে এখন তাদের ড্রইং-রুমের শোভাবর্ধন করছে। আমাদের শোকেসগুলো মূর্তি প্রদর্শনের কেস-এ পরিণত হয়েছে। আমরা এককালে কাবাঘর থেকে মূর্তি সরিয়ে দিয়েছি আর এখন ফেলে দেয়া মূর্তিই আবার তুলে নিচ্ছি নিজেদের ঘরে। মুর্তিপূজায় মনোনিবেশ করার জন্য এর চেয়ে সহজ পন্থা আর নেই।
মূর্তি ও ভাস্কর্যকে যেসব মুসলিম শিল্প-সংস্কৃতি বলে মনে করেন, তারা যদি এ সম্পর্কে ইসলামী কোন ধারণাই না রাখেন, ইসলাম এ বিষয়ে কি কথা বলে, তাও না জানেন, আরবের আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ সম্পর্কে বেখবর থাকেন, এমনকি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জীবনী পাঠ না করে থাকেন, না শুনে থাকেন, তাহলে মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির রূপ দেখতে পারেন, নিজেদের জড়াতে পারেন, এর চিন্তা ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করতে পারেন, এমনকি এর উৎকর্ষ সাধনে ব্রতীও হতে পারেন।
এ অজ্ঞতা যেসব মুসলিমের নেই, তারা যেমন মূর্তিপূজারী হতে পারেন না, তেমনি পারেন না 'মূর্তি সংস্কৃতি'র প্রচার-প্রসার ও উৎকর্ষতার জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন ও সহায়তা করতে। তবে মূর্তিকে ও মূর্তি পূজাকে যেসব অমুসলিম 'ধর্ম' বানিয়ে ফেলেছেন, তাদের এ ধর্মাচরণকে কোনভাবে বাধা দেয়া যাবে না, তাদের পূজার বিরোধিতা করা যাবে না, তাদের ধর্মানুভূতিকে কোন আঘাত করা যাবে না; মন্দির, পুরোহিত আর জুজারীদের নিরাপত্তার জন্য সব রকমের সহায়তা করতে হবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। সূরা কাফিরুনই এ ব্যাপারে মুসলিমদের গাইড লাইন।
মুসলিমদের মধ্যে যারা অজ্ঞতা, প্রগতি আর বিজ্ঞতার পর্দা ঝুলিয়ে নানা ব্যাখ্যার ধূম্রজাল সৃষ্টি করে মূর্তি সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, তাদের অজ্ঞতা বাহানা মাত্র।
সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইবাদাতের জন্য মাটি, কাঠ, পাথর ইত্যাদি দ্বারা তাঁর কাল্পনিক আকার দেয়ার কোন স্থান বা কল্পনা ইসলামে নেই। এ ধারণার ব্যাখ্যা হয়ত সবিস্তারে প্রত্যেকের কাছে নেই, কিন্তু এতটুকু ধারণা প্রত্যেকের কাছেই আছে যে, ইসলামে মূর্তিপূজা নেই, মূর্তি তৈরিও নিষেধ; বিভিন্ন সময়ের আলোচনা, ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে প্রত্যেকেরই এ ধারণাটি হয়ে গেছে যে, মূর্তি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম তথা নিষিদ্ধ। ইসলাম মূর্তি পূজার বিরোধী। মুসলিম মূর্তি পূজা করে না। মূর্তিকে তারা ঘৃণা করে। প্রতিমা, স্মৃতিচিহ্ন, স্মৃতিসৌধ, কোন মহাপুরুষের প্রতিকৃতি ও যাবতীয় ছায়ামূর্তি স্থাপন করা, এর প্রতি ভক্তি-শদ্ধা পোষণ করা ইসলামে শির্ক ও মূর্তি পূজার সমান পাপ মনে করা হয়। আর এ পাপের জন্য আল্লাহ্র নিকটে কোন ক্ষমা অবশিষ্ট নেই। যারা প্রগতি আর বিজ্ঞতার দোহাই দেয়, তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে বিতর্কে যেতে চাই না। ইবলিস তো আল্লাহ্র সঙ্গে বিতর্ক করতেও পিছপা হয়নি। আমরা আদমের সন্তান, আল্লাহ্র ফয়সালাই আমাদের জন্য চূড়ান্ত।
মূর্তি ও ভাস্কর্য সমার্থক। মূর্তি ও ভাস্কর্যের কুরআনের পরিভাষা হচ্ছে,' 'আত-তামাছিল'। ইব্রাহীম (আ:) তাঁর স্বজাতিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
﴿قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ﴾ (سورة الأنبياء: ٥٣) অর্থ: 'এ প্রতিকৃতিগুলো কি? যাদের তোমরা উপাসনা করছ?' [সূরা আল আম্বিয়া (২১): ৫৩।
এ আয়াতে মূর্তি বা তাদের উপাস্য দেবতাগুলোকে 'তামাছিল' বলা হয়েছে। অভিধানে 'মূর্তি, ভাস্কর্য ও ছবি'- এ তিনটির অর্থই 'তামাছিল' শব্দটি বহন করে। কোন ব্যক্তি বা জাতি যদি উপাস্য হিসেবে অথবা জাতীয় নিদর্শন হিসেবে কিংবা সম্মান প্রদর্শনের জন্য কোন জীবজন্তু, গাছ-পাথর, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, দেব-দেবতা, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, নেতা-নেত্রী প্রভৃতির ছবি বা আকৃতি মূর্তির ন্যায় নির্মাণ করে ও তা প্রকাশ্য স্থানে স্থাপন করে কিংবা নিজ গৃহে লটকিয়ে রাখে, তাহলে তা শির্ক হিসেবে গণ্য হবে।
এককালে আরব জাতি মূর্তি পূজারীতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তারা লাত্, মানাত, হুবলসহ বহু দেব-দেবতার প্রতিকৃতি আরব ভূমির বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে স্থাপন করেছিল এবং সেখানে সমবেত হয়ে এদের বেদীতে বিভিন্ন পর্ব বা উপলক্ষে 'অর্ঘ্য' ও পুষ্প নিবেদন করত। মুশরিক আরব জাতির এদের প্রতি ছিল প্রচণ্ড রকমের বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধানুভূতি। এ কাজটি তাদের বিশ্বাসের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটা পর্যায়ক্রমে তাদের জাতীয় জীবনে ও তাদের জাতীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মক্কার মূর্তি পূজারীরা মক্কা নগরীর উপকণ্ঠে মিনা বাজারের সন্নিকটে একটি বিশাল হুবল দেবতার মূর্তি স্থাপন করেছিল। কাবা গৃহের অভ্যন্তরেও বহু কল্পিত দেবতার প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিল।
কুরআন নাযিল শুরু হলে সূচনাতেই রাসূল ﷺ-কে লক্ষ্য করে মুসলিম জাতিকে মূর্তি পূজার নাপাকি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। যেমন, রাসূল ﷺ-কে বলা হয়,
﴿وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ﴾ (سورة المدثر : ٤) অর্থাৎ '(হে রাসূল! আপনি মূর্তি পূজার অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।' [সূরা মুদ্দাস্সির (৭৪): ৪]
বিখ্যাত তাফসীরবিদ মুজাহিদ, ইকরামা, কাতাদা, যুহুরী, ইবনে যায়েদ প্রমুখ মনীষীগণ এ আয়াতের অর্থ করেছেন প্রতিমা ও ভাস্কর্যের অপবিত্রতা।
৮ম হিজরী সনে মুসলিমগণ সুদীর্ঘ ৮টি বছর নির্বাসিত জীবন যাপনের পর বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। ইতোপূর্বে মক্কার মুশরিকরা মহানবী ﷺ এবং তাঁর সাথী সাহাবীগণকে বহু কষ্ট ও নির্যাতন করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছিল। সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে মুসলিমগণ রাতের আঁধারে দেশ ত্যাগ করে মদীনায় আশ্রয় নেন। এতেই মুশরিকরা ক্ষান্ত হয়নি। তাঁরা মদীনায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুহাজির এবং আনসারদের বিরুদ্ধেও একের পর এক ১০/১২টি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। মুসলিমরা যখন মক্কা বিজয় করেন তখন তাদের দুশমনদের প্রতিশোধ গ্রহণ করা এবং নিজেদের বিজয়ের আনন্দকে অম্লান করে রাখার জন্য বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ও ভাস্কর্য নির্মাণ করাই ছিল অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহানবী ﷺ সেদিন মূর্তি পূজারী মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি এবং বিজয়ের আনন্দে কোন ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধও নির্মাণ করেননি। বদর, ওহুদ, খন্দক, মুতাসহ বহু যুদ্ধে হাজার হাজার সহকর্মী-সাহাবীদের আত্মত্যাগ ও কুরবানির পর যে ইসলাম আরবের বুকে কায়েম করেছিলেন, সেই রণপ্রান্তরগুলোতে তিনি একটিও ভাস্কর্য নির্মাণ করেননি, এমনকি বড় বড় সাহাবীদের কবরগুলোর পরিচয় পর্যন্ত নেই।
মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মূল করার জন্যই ইসলামের আগমন ঘটেছে। রাসূল ﷺ-এর নির্দেশে এবং নেতৃত্বে মক্কাসহ আরব ভূমি থেকে সকল মূর্তি ও জাহেলী যুগের স্মৃতিসৌধগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা হয়। বিজয়ী বেশে রাসূল ﷺ যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন পর্যন্ত মুশরিকদের ধারণা ছিল, কাবাগৃহের মূর্তিগুলো তাদের রক্ষা করবে এবং সে জন্য কাবার মূর্তিগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত তারা ইসলাম গ্রহণে অপেক্ষা করতে থাকে। মক্কায় প্রবেশের পর সর্বপ্রথম আল্লাহ্ নাবী () কাবাগৃহের আশেপাশের সকল মূর্তি ও তৈলচিত্র অপসারণের কাজটি সম্পন্ন করেন। তিনি নিজ হাতে কয়েকটি মূর্তির গায়ে আঘাত করেন এবং বাকিগুলো আলী ও অন্য কতিপয় সাহাবী ভেঙ্গে ফেলেন। এ সময় পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি নাযিল হয়-
﴿قُلْ كُلٌّ يَعْمَلُ عَلَى شَاكِلَتِهِ فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَنْ هُوَ أَهْدَى سَبِيلاً ﴾ (سورة الإسراء: ٨٤) "বল, সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই।" [সূরা আল-ইসরা (১৭): ৮১]
তিনি () এ আয়াত পাঠ করতে করতে তাঁর হাতের বর্শা দ্বারা কাবা ঘরের আশপাশ ও ছাদের উপরে স্থাপিত মুশরিকদের নির্মিত মূর্তি ও ভাস্কর্যগুলোকে লক্ষ্য করে এদের বুকে আঘাত করলেন আর সাথে সাথে মূর্তিগুলো উল্টে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল।
জাবের বলেন, মক্কা বিজয়ের সময় যখন আমরা নিকটবর্তী 'বাত্বহা' উপত্যকায় ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ () উমার ইবনুল খাত্ত্বাব -কে নির্দেশ দেন যেন কাবা গৃহের সকল ছবি (মূর্তি) নিশ্চিহ্ন করে দেন। তারপর উক্ত মূর্তিসমূহ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ () কাবা গৃহে প্রবেশ করলেন না।
তাছাড়া, শিকের গন্ধযুক্ত নিদর্শন ধ্বংসে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমার এর পদক্ষেপ কম উল্লেখযোগ্য নয়। মুসলিম সমাজে যাতে শির্ক কোন চোরা পথে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে উমার ছিলেন অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন। তিনি তাঁর খিলাফতকালে শিকের সন্দেহযুক্ত কোন কাজ হতে দেখলে তা সাথে সাথে বন্ধ করার নির্দেশ দিতেন। এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনার বিবরণ আমরা উদাহরণস্বরূপ বর্ণনা করতে পারি। নিম্নে এ রকম একটি ঘটনা উল্লেখ করা হল:
মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় একটা গাছের নিচে রাসূল () কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পর দেখা গেল যে, কিছু সাধারণ লোকজন এ গাছটিকে বুজুর্গ মনে করতে শুরু করে এবং এর নিচে বিশ্রাম গ্রহণ করা পূণ্যের কাজ মনে করতে থাকে। উমার -এর কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি গাছটিকে কেটে ফেলার নির্দেশ দেন এবং সেখানে অবস্থান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'আমি এ গাছের মধ্যে শিক্কের গন্ধ পেয়েছি।'
এ ঘটনা থেকে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইসলাম শিকের গন্ধযুক্ত কোন কাজকে শুধু বর্জনই করে না, একে সমূলে ধ্বংস করারও হুকুম দেয়।
ইসলামে প্রাণীর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ হওয়ার অন্যতম তাৎপর্য হল, মুসলিমদের চিন্তা-চেতনা এবং মন-মানসকে শিরকের কলুষ থেকে পবিত্র রাখা। তাওহীদের বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটা অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। কেননা, অতীত জাতিসমূহে মূর্তির পথেই শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।
পৃথিবীর কোন সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) মুসলিম দেশের সরকার যদি মূর্তি ও ভাস্কার্য নির্মাণ শিল্পে জড়িয়েও পড়েন, তাহলেও তা মুসলিমদের জন্য আদর্শ হতে পারে না। আমাদের এ দেশ পৃথিবীর একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এ দেশের বুকে ঘুমিয়ে আছেন এমন অনেক পুণ্যবান আলিম-মাশায়েখ যারা বাংলাদেশে তাওহীদের পতাকা উড়িয়েছেন। মুশরিকদের 'সংস্কৃতি-আচার-আচরণ'-এর পরিবর্তে এ দেশে তারা কায়েম করেছিলেন ইসলামী সংস্কৃতি ও নিয়ম-নীতি। তারা চেয়েছিলেন শির্ক বর্জিত জীবন ব্যবস্থা কায়েম করতে এবং ইসলামী সংস্কৃতিকে সমাজের সকল স্তরে উজ্জীবিত করতে। অথচ আজ আমরা দেখছি বিপরীত অবস্থা, বিপরীত দৃশ্য। তাওহীদের চাষাবাদ করা এ ভূখণ্ডের দর্শনীয় স্থানগুলো মূর্তি প্রদর্শনীর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, শহরের প্রধান প্রধান রাস্তার মোড়, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ও চত্ত্বরসমূহ। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। এ বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে, জগন্নাথ হলের ভিতরে ও সামনে পুকুরপাড়ে, মহসীন হলে গেটে বসুনিয়া তোরণের পাশে, মধুর ক্যান্টিনের সামনে, শামসুন্নাহার হলের সামনে, আনোয়ার পাশা (পুরাতন জাদুঘর) ভবনের সামনে, চারুকলার বকুলতলার সামনে ছাড়াও বিভিন্ন ভবনের সামনে রয়েছে নানা ব্যক্তির প্রতিকৃতি। জগন্নাথ হল, এসএম হল এবং উদয়ন স্কুলের মোহনায় ফুলার রোডে বিরাট এলাকা জুড়ে বহু মূর্তির সমন্বয়ে একটি ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। মূলত চারুকলা ও আনোয়ার পাশা ভবনের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলো এনে বসানো হয়েছে এখানে। একসাথে প্রায় ৮০টির মতো মূর্তি বিভিন্ন ভঙ্গিতে বসানো হয়েছে। কাজ নিখুঁত না হওয়ায় এদের সনাক্ত করা কষ্টকর।
মূর্তি, মূর্তি এবং মূর্তি। শুধু মূর্তি আর মূর্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে এখন মূর্তির ছড়াছড়ি। গাছের তলে ঝোঁপের আড়ালে মূর্তি। ভাস্কর্যের নামে শিল্প সৌকর্যবিহীন অগণিত মূর্তি এলোমেলোভাবেও ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। এ সবের মধ্যে যুবক-যুবতীর মূর্তিও রয়েছে, রয়েছে হিন্দু অবতার কৃষ্ণ ও তার প্রেমসঙ্গিনী রাধার যুগল মূর্তি। টিএসসি সড়ক দ্বীপেও মূর্তি। ডাসের পিছনে 'স্বোপার্জিত স্বাধীনতা' মূর্তি। যৌন আবেদনময় রুচিহীন অনেক মূর্তি যত্রতত্র পড়ে আছে। শিল্পের নামে শত শত মূর্তি ও মূর্যাল চিত্র তৈরি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আজ পৌত্তলিক সংস্কৃতি চর্চার আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক জাহিলিয়াতের যুগের ৩৬০টি মূর্তির রেকর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অনেক আগেই ভঙ্গ করেছে। এখন মূর্তি সংস্কৃতিপন্থীদের লক্ষ্য দেশের প্রত্যেক শহর, নগর, বন্দর এমনকি থানা সদর পর্যন্ত মূর্তি দিয়ে ভরে তোলা। কোন কোনটা হবে চেনা-জানাদের মূর্তি (ভাস্কর্য নামে) আর কোন কোনটা হবে অচেনা ও অজানাদের মূর্তি। ভাস্কর্য নামে আন্দোলন করে মূর্তির প্রতিষ্ঠা, কি চমৎকার কৌশল!
বাংলাদেশে মূর্তি তৈরির প্রথম ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৫ সালের ৮ই এপ্রিল। ১৯৬৪ সালে মাত্র দু'জন ছাত্র নিয়ে তৎকালীন আর্ট কলেজে ভাস্কর্য বিভাগের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে এ বিভাগে ছাত্রের অভাব নেই। প্রচুর ছাত্র। মূর্তি-ভাস্কর্যের ছড়াছড়িই প্রমাণ করে বিভাগটি কত সরগরম।
১৯৮৩ সালের মে মাসে জনৈক পুলিশ কর্মকর্তা কুষ্টিয়ার একটি থানার মালখানা থেকে ৬টি মূর্তি এনে এলিফ্যান্ট রোডে পুলিশ অফিসার্স মেসে স্থাপন করেন। অফিসার্স মেসের 'শোভা বর্ধনের' জন্যই স্থাপন করা হয় বলে কর্মকর্তা অভিমত ব্যক্ত করেন। মসজিদ নগরী ঢাকাকে মূর্তি নগরীতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন চলছে।
মূর্তি পূজা, মূর্তি নির্মাণ, মূর্তির প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মুসলিম নামের মূর্তিপন্থীরা বলছেন, আমরা তো মূর্তি তৈরি করছি না, ভাস্কর্য তৈরি করছি। ভাস্কর্য দিয়ে রাজধানী সাজাচ্ছি। এটা তো দোষের কিছু নয়। মুসলিম নামের একজন ভাস্কর বলেছেন, মূর্তি আর ভাস্কর্য এক বস্তু নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এ সব ধারণা তারা কোথায় পেলেন, তা তারাই ভাল জানেন। অভিধান থেকে আমরা জানতে পারি যে, মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে কেবল শব্দের পার্থক্য ছাড়া বিশেষ আর কোন পার্থক্য নেই। অতি হালকা একটা পার্থক্য অবশ্য আছে তা পরে আলোচিত হবে।
মূর্তি মানে দেহ, শরীর, আকৃতি, চেহারা, রূপ, প্রতিমা অর্থাৎ মূর্তিমান, মূর্তিপুজা, অশরীরীর দেহ ধারণ, বাস্তব বা কাল্পনিক দেহ গড়ন ইত্যাদি। মূর্তিকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় Idle। এ আইডল সম্পর্কে সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য পুস্তকে বিভিন্ন সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা রয়েছে। এখানে মাত্র তিনটি উদ্ধৃত করা হল:
1. An image of God of Goddess. 2. An object of worship 3. An object of love of deem devotion or admiration
অর্থাৎ: ১. দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি ২. পূজার বস্তু ৩. ভালবাসা বা পরমভক্তির পাত্র বা বস্তু
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রামাণ্য পুস্তকে মূর্তির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, 'শুধু দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরির নামই মূর্তি নয়, বরং কোন ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর আমাদের শ্রদ্ধা-ভালবাসা এমন গভীর থাকে, যার ফলে আমরা তাতে সীমালংঘন করে এবং কখনো অযৌক্তিকভাবে যুক্ত হয়ে সেই ব্যক্তি বা বস্তুর আকৃতি গড়ে তুলি, তাও মূর্তি।'
ভাস্কর্য ও মূর্তিকে কেউ কেউ পৃথক অর্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে শব্দ দু'টির মধ্যে প্রায়োগিক অর্থে কোন পার্থক্য নেই, বরং দু'টিই অভিন্ন শব্দ। মূর্তি বা ভাস্কর্য গড়ার কলাকৌশল প্রায় একই। মূর্তি নামে যা গড়া হয়, তার মধ্যে মুখ্য থাকে ধর্মীয় মনোযোগ আর বিশ্বাস। কিন্তু ভাস্কর্য গড়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মনোযোগ বা বিশ্বাস মুখ্য থাকে না বটে, কিন্তু একেবারে যে বাদ যায়, তাও বলা যায় না। ভাস্কর্যে যখন ভাস্করের বা বিশেষ মহলের অথবা উদ্যোক্তাদের প্রিয় ব্যক্তির প্রতিকৃতি খোদায় হয়ে দর্শকদের সামনে ভাসে আর তাতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, তখন আর একে ভাস্কর্য বলা যাবে না, সেটা মূর্তি হয়ে যায়; এমনকি যে ছবির ফ্রেমের উপরে তারকাঁটা (পেরেক) বসিয়ে জন্ম ও মৃত্যু দিবসে ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়, সে ছবিটিও মূর্তির চরিত্র ধারণ করে। অতএব, যারা মূর্তি ও ভাস্কর্যকে পৃথক ব্যাখ্যা করেন এবং উপাসনার জন্য নির্মিত না হলে দোষণীয় নয় বলার চেষ্টা করেন, তারা হয় মূর্খতার মধ্যে নিপতিত, নয়তো জ্ঞানপাপী। কেননা, এ বিষয়ে ইসলামের বিধিবিধান এবং মূর্তি তৈরি সম্পর্কে অসংখ্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত মর্মান্তিক পরিণতির বিবরণই জ্ঞানী মহলের জন্য যথেষ্ট।
মূলত, স্মারক মূর্তি থেকেই পূজার মূর্তির সূচনা হয়েছে। তাছাড়া, বাংলা পিডিয়ায় ভাস্কর্যের যে প্রবন্ধটি রয়েছে তার সারকথাই হল, এ শিল্পের সূচনা ও বিকাশ পুরোটাই ঘটেছে মূর্তিকে কেন্দ্র করে। বিখ্যাত ও প্রাচীন সকল ভাস্কর্যই বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। যেমন, কিছু উদ্ধৃতি তুলে দেয়া হল:
১. এ শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরা। এখানে সে সময় মূলত ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ ও জৈন-এ প্রধান তিনটি কেন্দ্রের অনুসারীরা পূজার নিমিত্তে মূর্তি বানাতে গিয়ে এর সূচনা করেছিল।
২. গুপ্ত শাসকগণ ছিলেন একনিষ্ঠ বৈষ্ণব। প্রাথমিক গুপ্তমূর্তিগুলোর বেশিরভাগই বিষ্ণু অথবা বিষ্ণু সংশ্লিষ্ট অন্য যেকোন মূর্তি। এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যটি বিহারের ভাগলপুরের শাহকুণ্ড থেকে আবিষ্কৃত নরসিংহ মূর্তি।
৩. বাংলার গুপ্ত ভাস্কর্যগুলো বেশিরভাগই প্রতীকী এবং এগুলোর আকৃতি নির্ধারিত হয়েছে মধ্যদেশ বা মধ্যভারতের পুরোহিত কর্তৃক বর্ণিত দেবতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে।
৪. অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং এ ধর্মের মহাযান মতবাদটি তাদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। পাল রাজাদের সর্বপ্রাচীন নমুনাটি ধর্মপালের ২৬ রাজ্যাঙ্কের (আনুমানিক ৭৭৫-৮১০ খ্রি.) যা বিহারের গয়া থেকে পাওয়া গেছে। দেবপালের সময়ের তারিখ সম্বলিত বলরামের দুটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ও তারার একটি প্রস্তর ভাস্কর্য এ অঞ্চল থেকেই পাওয়া গেছে।
৫. বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দশম শতকে যে সকল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে বৌদ্ধ মূর্তির সঙ্গে অনেক ব্রাহ্মণ্যমূর্তিও অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ হিসেবে প্রতীকী চিহ্ন সম্বলিত বেশ কিছু মনসা মূর্তির কথা বলা যায়, যেগুলো এ অঞ্চলের প্রথম পর্যায়ের ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত।
৬. পশ্চিম দিনাজপুরের এহনাইল থেকে প্রাপ্ত লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল মূর্তিটি (২৪.৪ সে.মি.) তাদের কমনীয় আলিঙ্গনভঙ্গির জন্য শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য হিসেবে প্রতীয়মান।
এ ছাড়াও আরো অনেক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলা পিডিয়ায় 'মূর্তিতত্ত্ব' শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে দেয়া হল:
'মহাজাগতিক বা পঞ্চবোধিসত্ত্ব বাংলায় পৃথকভাবে পূজিত হতেন। মান্দার (নওগাঁ জেলা) ভারসন থেকে প্রাপ্ত ও বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত মস্তকবিহীন কালো পাথরে খোদিত ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্যের এ অনিন্দসুন্দর ভাস্কর্যটি পঞ্চবোধিসত্ত্ব ভাস্কর্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।'
জৈন ধর্মীয় মূর্তি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নিবন্ধকার বলেন, 'শুধু বর্ধমানেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলাগুলোতে প্রচুর সংখ্যক পাথরের জৈন ভাস্কর্য ও অন্যান্য পুরাবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু এখনো সেখানে পূজিত হচ্ছে, আবার কিছু কিছু জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।'
মোটকথা, ভাস্কর্য থেকে মূর্তি এবং মূর্তি থেকে ভাস্কর্য- এ চলাচলই হল মূর্তি ও ভাস্কর্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সারকথা। একে অস্বীকার করা বাস্তবতাকেই অস্বীকার করার নামান্তর।
> ইসলামের মূল আদর্শ ও চেতনার সঙ্গে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিরোধ হল: কোন কোন ভাস্কর তার নির্মিত বস্তুর ব্যাপারে এতই মুগ্ধতার শিকার হয়ে যায় যে, যেন ওই প্রস্তরমূর্তি এখনই জীবন্ত হয়ে উঠবে! এখনই তার মুখে বাক্যের স্ফূরণ ঘটবে! বলাবাহুল্য, এ মুগ্ধতা ও আচ্ছন্নতা তাকে এক অলীক বোধের শিকার করে দেয়। যেন সে মাটি দিয়ে একটি জীবন্ত প্রাণী সৃষ্টি করে ফেলেছে! এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কোন সীমারেখার পরোয়া করে না। নগ্ন অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি, মূর্তিপূজার বিভিন্ন চিত্র ও নিদর্শন ইত্যাদি সবকিছুই নির্মাণ করে থাকে। এ শিল্প হচ্ছে অপচয় ও বিলাসিতার পরিচয়-চিহ্ন। বিলাসী লোকেরা বিভিন্ন উপাদানে নির্মিত প্রতিকৃতিসমূহের মাধ্যমে তাদের কক্ষ, অট্টালিকা ইত্যাদির 'সৌন্দর্য বর্ধন' করে থাকে। ইসলামের সঙ্গে এ অপচয় ও বিলাসিতার কোন সম্পর্ক নেই। মূর্তি ও ভাস্কর্যের মতো স্থূল উপকরণের মাধ্যমে স্মৃতিরক্ষার প্রয়াস প্রকৃতপক্ষে পশ্চাৎপদতা। প্রাচীন গ্রীক ও পারস্য সভ্যতায় এটা বিদ্যমান ছিল। পরে ইউরোপীয়রা তা অনুসরণ করেছে। এরা স্বভাবগতভাবেই ছিল মূর্তির পূজারী। তাদের পক্ষে মানুষের প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ণ করা সম্ভব হয়নি। ত্যাগ ও বীরত্বের সমুন্নত দৃষ্টান্তরূপে মানুষের সম্ভাবনাকে অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি বলেই তাদের বীর পুরুষদেরকে উপাস্য হিসেবে এবং উপাস্যদেরকে বীর যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করেছে।
যাহোক, আমরা সাধারণত জানি, দেব-দেবীর মূর্তি হয়। কিন্তু শত শত বছর ধরে এ ধারণাও প্রত্যাখ্যাত। কারণ একটাই, আর তা হচ্ছে, দেব-দেবীদের অস্তিত্ব আছে কিনা সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, কেউ কি কখনো দেব-দেবীদের দেখেছেন? কেউ দেখেননি। কোন শিল্পীর নজরে তাদের ছায়াও পড়েনি। এখানে প্রশ্ন, তাহলে তাদের চেহারা একমাত্র কল্পনার রূপ দেয়া ছাড়া কি সম্ভব? সুতরাং বলা যায়, কাল্পনিক হোক বা বাস্তব হোক, সবই মূর্তি। আর এ মূর্তিগুলোর অধিকাংশেরই নতুন নামকরণ হয়েছে ভাস্কর্য। নর্তকীর নতুন নাম যেমন নৃত্যশিল্পী।
মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ হয়ে উঠেছে মূর্তিময়। মূর্তি স্থাপনের এলাকা ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক সময় ঢাকাকে বলা হতো মসজিদের নগরী। তারপর লোকে রিকশার নগরীও বলত, এখনো বলে। বস্তির নগরীও বলে থাকে। দু'দিন পর মূর্তির নগরীও বলবে, সে সময় দ্রুত আসছে। তখন হয়ত মসজিদ আর মূর্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব জাগবে। তখন যদি মূর্তিপ্রেমিকরা মসজিদের উচ্ছেদ চায়, তাহলে অবাক হওয়ার কোন কারণ থাকবে না। মূর্তির দেশে মসজিদের সংখ্যা এ সব কারণেই কমে।
কালে কালে আমরা অনেক পরিবর্তনই দেখছি। বেশ্যারা সমাজের কতিপয় বুদ্ধিজীবীর নিকট থেকে 'সেফটি ভাল্ব' উপাধী পেয়ে হয়েছে যৌন কর্মী, নর্তকীকে দেখছি নৃত্যশিল্পী হিসেবে, রাহাজানি করে যেসব দস্যু তারা হয়েছে ছিনতাইকারী। আর ভারতীয় মূর্তি সভ্যতা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ভাস্কর্য নামে। কারণ, মূর্তির মর্মবাণী আর দর্শন বাংলাদেশীদের শোনাতে গেলে বা সে শিক্ষা বাংলাদেশীদের অন্তরে স্থাপন করতে হলে ভাস্কর্যের মুখোশ তো অত্যন্ত জরুরী। বর্তমানে বাংলাদেশে মূর্তি ও ভাস্কর্য সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। যা মূর্তি তাই ভাস্কর্য। পূজার মূর্তি কল্পিত, ভাস্কর্যরূপ মূর্তি পরিচিত, মাঝে মাঝে কিন্তু আছে বিমূর্ত। ফারাক শুধু এই। আজকাল মিছিলেও মুখোশ মূর্তি লাগান হয়।
এক আল্লাহতে বিশ্বাসী তাওহীদবাদীদের কাছে ব্যক্তি বা বস্তু পূজার কোন কানাকড়ি মূল্য নেই। এ পূজার ধারণা প্রত্যেক মু'মিনের মগজ থেকে, মন থেকে বিলকুল মাইনাস। এখন যদি এ মাইনাসকে মাইনাস করা সম্ভব হয়, আর সে স্থানে স্থাপন বা প্রতিস্থাপন করা যায় মূর্তির ধ্যান-ধারণা, চিন্তা ও ভালবাসাকে, তাহলে এ মগজে বহু স্রষ্টার রাজত্ব কায়েম হবে, শয়তান হবে সে রাজত্বের গভর্নর। বিনা হামলায় কৌশলে কাবু। এ জন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গন সুকৌশলে দখলের চিন্তা করে কুশলী শিকারীরা। কখনো নীরবে আবার কখনো সরবে এবং সাড়ম্বরে শিকার পরিকল্পনা বাস্ত বায়ন করছে।
মূর্তির ব্যাপার-স্যাপার বিশ্বের নেতৃস্থানীয় কোন ধর্মে নেই এবং কখনো ছিল না। মূর্তির পূজা একান্তভাবে কাল্পনিক এবং এ ধারণা অবৈজ্ঞানিকও। ধর্মের সঙ্গে মূর্তির কোন সম্পর্কও নেই। মূর্তিপূজা বিশ্বের একটি মাত্র ধর্মের মূলধারায় এবং তার শাখা-প্রশাখায় রয়েছে, অন্য কোন ধর্মে মূর্তি পূজা নেই। আরবে এক সময় মূর্তিপূজা ছিল না, আবার এক সময় ছিল, তারপর মূর্তিপূজা ও মূর্তি চিরতরে নির্বাসিত হয়। মূর্তি পূজার স্বপক্ষে কোন দলিল নেই। দলিল থাকবেই বা কেমন করে। দেব-দেবীর মূর্তি গড়ে যারা মূর্তিকে সামনে নিয়ে পূজা করে, তারা কি বলতে পারে যে, এ মূর্তির চেহারা অমুক দেব বা দেবীর? দেব-দেবীর অস্তিত্ব আছে বলে যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, তাদের এ ধর্মীয় বিশ্বাসকে মেনে নিলেও এ প্রশ্ন কি করা যায় না যে, দেব-দেবীরা কি দৃশ্যমান? মানুষ কি তাদের দেখতে পায়? না, দেখা যায় না, মানুষ দেখতে পায় না, তারা দৃশ্যমান নয়, তারা কায়াহীন, অদৃশ্য। যাদের দেখা যায় না, অদৃশ্য তাদের প্রকৃত চেহারা মাটি, পাথর বা কাঠের মূর্তিতে রূপ দেয়া কি সম্ভব? মোটেই সম্ভব নয়, শুধু কল্পনা করা যায়। সুতরাং ধর্মীয় কোন ভিত্তি ছাড়া শুধু কল্পনায় গড়া মূর্তি আর মূর্তি সামনে নিয়ে পূজা কখনো ধর্মীয় পূজা হতে পারে না, সংস্কৃতি তো নয়ই। সংস্কৃতি তো সংস্কার থেকে উদ্ভূত। যে সংস্কারে ধর্মীয় ভিত্তি নেই তা সংস্কার হয় কেমন করে, সংস্কারের তো একটা ভিত্তি থাকতে হবে? ভিত্তিটা কি? সংস্কার ছাড়া সংস্কৃতি হয় না।
ধর্মে যে প্রথার স্বীকৃতি নেই, সে প্রথাকে পূজায় আনা যায় না। সনাতন পূজা মূর্তি পূজা নয়। হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক চিন্তা রাজ্যে দু'টি প্রধান ধারা লক্ষ্য করা যায়। একটি হচ্ছে বৈদিক অপরটি তান্ত্রিক। বৈদিক ধারার মূল ভিত্তি হচ্ছে বেদ ও উপনিষদ, আর তান্ত্রিক ধারা হচ্ছে অসংখ্য তন্ত্রগ্রন্থ। দেব-দেবীর পূজা কিংবা মূর্তিপূজা তান্ত্রিক মতানুসারে সম্পন্ন হয়। বৈদিক যুগে মূর্তিপূজা ছিল না। সেই যুগে আরাধনার মাধ্যম ছিল যজ্ঞকর্ম। ঈশ্বর বা ভগবানকে সকার রূপে আরাধনা করা, অসীমকে সীমার মাঝে, অপরূপকে রূপ দিয়ে মূর্তি পূজার বা পূজা পদ্ধতির আবিষ্কার বৈদিক পরবর্তী যুগে হিন্দু মুণি-ঋষির দ্বারা প্রবর্তিত হয়। আর মূর্তি গড়ার ইতিহাস যখন এই, তখন মূর্তিকে মুসলিম নামের বাবু-মুসলিমরা কোন্ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এত ভালবাসতে শুরু করলেন, তা বোঝা যায় না। হিন্দু ধর্মে মূর্তি যদি নানা সংস্কারে গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতিও পায়, তাহলে তা তাদের পূজায় থাক্ না, এ নিয়ে এক শ্রেণীর মুসলিমদের কাড়াকাড়ি কেন? এ কি অনধিকার চর্চা হয় না?
দুর্ভাগ্য যে, মূর্তি পূজারীদের ন্যায় বর্তমান যুগের নামধারী মুসলিমরাও মূর্তি বা মৃতব্যক্তির স্মরণে নির্মিত পিলারকে সম্মান করে, নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা করে, যা আরো জঘন্য। ঐ সকল মুশরিক ও এ মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? অতএব সাবধান!
কবি শফিকুল ইসলামের কবিতায় মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:
যুক্তিবাদের যুক্তিতে হায় জাহেলিয়াতের আগমন ফের আজরের মূর্তি আবার মোদের হাতেই উত্তোলন। সাভারের মিনার কেমনে শাহাদাতেরই সাক্ষ্য হয়? এদেশের ভার্সিটিতে কিসের মূর্তি দেখা যায়? যুগে যুগে এমনি করে মূর্তিপূজক এসেছে। স্বাধীনতার দোহাই পেড়ে মূর্তি ওরা গড়েছে। মিনারে নিরবতা এই বিধান কি ইসলামের মুসলমান নতজানু, খাম্বা দেখে সিমেন্টের। বিশ্বে শহীদ কে আছে রে, তাদের চেয়ে সম্মানী? বদর, ওহুদ খন্দকে যারা করল জীবন কুরবানী। হয় না কেন মিনার তাদের, হয় না কেন অনুষ্ঠান? মুসলমানের করছ দাবী কেমন তুমি মুসলমান! যুক্তিবাদের যুক্তিতে হায় জাহেলিয়াতের আগমন ফের আজরের মূর্তি আবার মোদের হাতেই উত্তোলন।
টিকাঃ
১. মূর্তি বা ভাস্কর্যের আরবী শব্দ হচ্ছে 'তিমছাল' (تمثال), 'ছানাম' (صنم), 'নাহত' (نحت) প্রভৃতি। - মূলত ভাস্কর্য হচ্ছে একটি শিল্পের নাম। যে শিল্পে পাথর, মাটি বা কোন ধাতব বস্তু খোদাই করে মূর্তি নির্মাণ করা হয়। আর যিনি ভাস্কর্য তৈরি করেন তাকে বলা হয় ভাস্কর বা মূর্তি নির্মাণকারী।
২. Tafsir Ibn Kathir, vol. 10, p. 172; At-Tabari, 24:13.
৩. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বুখারী, হা/২৪৭৮ ও ৪২৮৭; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃঃ ২৭২।
৪. সহীহ আবু দাউদ, হা/৩৫0২ 'ছবিসমূহ' অনুচ্ছেদ।
৫. জহুরী, অপসংস্কৃতির বিভীষিকা, পৃষ্ঠা ৩৪-৫৫।
৬. Any person or thing on which we strongly set our affettion; that to which we are excessively, often improperly attached. ভাস্কর্যকে ইংরেজি ভাষায় বলে, Sculpture -এর মানে ও ব্যাখ্যা হচ্ছে, 'The Art of carving, cutting or hewing stone or other materials into images of men, beasts. The Art of imitating natural objects in solid substances representation some real or imaginary objects.'
৭. বিস্তারিত দেখুন এ বইয়ের ১৯ পৃষ্ঠায়।
৮. বাংলা পিডিয়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৩-৫, ৩৩৭-৯।
৯. প্রাগুক্ত, ৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৪।
১০. প্রাগুক্ত, ৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৮।
📄 শিখা চিরন্তন-অনির্বাণ, দয়াল আর অস্ত্রধারী এ সকল নিয়ে কেড়ে মুসলিমের ঈমান প্রদীপ
শহীদ মিনার সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরাই জ্বালিয়েছে শিখা অনির্বাণ। অগ্নিউপাসকদের সংস্কৃতি এখন লালন করছে মুসলিমরা। জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ এবং শিখা অনির্বাণ নামে একটি শিখা প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এ অবস্থিত এ শিখার সামনে জাতীয় দিবসগুলোতে অভিবাদন জ্ঞাপন করা হয়।
অথচ, প্রত্যেক জাতিই মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং শেষ কৃত্য সম্পাদন করে। কেউ মরদেহের অপমান করে না। অসম্মান করে না। তবে বোধ- বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুযায়ী এ সম্মান প্রদর্শনে ও শেষ কৃত্য সম্পাদনে পার্থক্য হয়। কেউ সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে, নতুন কাপড় পড়িয়ে, সলাতে জানাযা আদায় করে দাফন করে। কেউবা গোবর ছিটিয়ে এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য পন্থা শেষে অগ্নি প্রজ্বলন করে দেহকে দাহ করে ছাই-ভষ্ম পানিতে নিক্ষেপ করে; কেউবা পাহাড়ে- পর্বতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়, কেউবা সেই ভষ্ম নির্দিষ্ট আঁধারে সযত্নে সংরক্ষণ করে।
আবার মৃত্যুর পরে মৃতের রূহের মাগফিরাতের জন্য, বিদেহী আত্মার সদাতির জন্য, প্রশান্তির জন্য কৃত কর্মকাণ্ডে জাতি ভেদে, বোধ-বিশ্বাস ভেদে পার্থক্য হয়। আমরা মুসলিম, তাই মৃতব্যক্তির রূহের মাগফিরাতের জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত নিয়মসমূহ পালন করি। আবার হিন্দু ধর্মবলাম্বীরা তাদের গুরুজনের বিদেহী আত্মার সদাতির জন্য, প্রশান্তির জন্য হোম, যজ্ঞ, তর্পণ পিণ্ডদান ইত্যাদি করেন। দেশ, ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্নতার জন্য পদ্ধতি ভিন্ন হয়েছে এবং তাই স্বাভাবিক। এ পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে কেউ সম্মান করছে না, এ কথা বলা যাবে না।
কারণ, সম্মান প্রদর্শনের একটাই মাত্র পন্থা বা পদ্ধতি নয়; বহু পন্থা, বহু পদ্ধতি রয়েছে। দেশে ভেদে, জাতি ভেদে, বোধ-বিশ্বাস ভেদে এ সম্মান প্রদর্শনের পন্থা ও পদ্ধতিতে পার্থক্য হতে পারে, হয়ে থাকে। এটাই স্বাভাবিক। সম্মান প্রদর্শনের পন্থা ও পদ্ধতির সাথে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের একটা সম্পর্ক আছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি সম্পর্ক আছে। কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি সম্পর্ক আছে। প্রতিটি ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্মের বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্রতা রক্ষার অধিকার আছে। এটা সাম্প্রদায়িকতা নয়।
কোন পদ্ধতির বিরোধিতা করা মানে মূল লক্ষ্যের বিরোধিতা করা নয়। লক্ষ্য আর উপায় তো এক নয়, তাই শিখা চিরন্তনের বিরোধিতা মানে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা নয়। স্বাধীনতার প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বা শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা নয়। যারা শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ বা প্রজ্বলিত অগ্নির মাধ্যমে বা প্রতীকে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা করছেন, তার কারণটাও ঐ পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের এক শ্রেণীর আঁতেল, বুদ্ধিজীবী লক্ষ্য আর উপায়টাকে উদ্দেশ্য- প্রণোদিতভাবে এক করে ফেলছেন। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ আর প্রজ্বলিত আগুন বা শিখা চিরন্তন এক করে ফেলতে চাইছেন। প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার বিরোধিতাকে, মুক্তিযুদ্ধের, শহীদদের, স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা রূপেই চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্নতার দরুন অনেকেই শিখা চিরন্তন বা অগ্নি প্রজ্বলনের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধী হতে পারেন, তাই বলে তিনি বা তারা যে স্বাধীনতার বিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী- এ কথা সত্য নয়। প্রজ্বলিত অগ্নির মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতার কারণ বিশ্বাসগত, ঐতিহ্যগত, ধর্মীয়।
অগ্নিকে সম্মান প্রদর্শন বা অগ্নির মাধ্যমে অথবা অগ্নিকে প্রতীক বানিয়ে অন্য কাউকে বা অন্য কিছুকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর এ পদ্ধতিটি মুসলিমদের নয়। এটা মুসলিমদের ঈমান-আকীদা, বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। এটা পারসিক, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সামঞ্জস্যশীল। এটা কারো অজানা বিষয় নয়, কম-বেশি সকলেই জানেন। যেসব লোক এর বিরোধীদের গালাগাল করছেন, তারা জানেন আরো ভালোভাবেই।
অগ্নি বা আগুন হিন্দুদের অন্যতম প্রধান দেবতা। বঙ্গীয় শব্দকোষে শ্রী হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, 'অগ্নি অগ্নি-অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে- যাহা যজ্ঞে প্রথমে প্রণীত হয়। অগ্নি ঋগবেদের দেবতাগণের অন্যতম। ইনি অমর রত্নদাতা, যজ্ঞের দেবতা হোতা ঋত্বিক সম্পাদক রক্ষাকর্তা ও হব্যবাহক। আকাশে সূর্য, বায়ুমণ্ডলে বজ্র এবং পৃথিবীতে অগ্নি- এর তিন রূপ। উপাসকরা এর প্রসাদে দীর্ঘজীবন ধন ও সমৃদ্ধি লাভ করেন। খাদ্য প্রাপ্তি এবং ক্ষুধা, দৈন্য শত্রু ও বিপদ হইতে রক্ষার নিমিত্ত এর স্তব করেন। ইনি দেবগণের মুখ এবং জিহ্বা। দেবতারা অগ্নিমুখে হুতদ্রব্য ভক্ষণ ও অগ্নি জিহ্বায় যজ্ঞবহ্নি আস্বাদন করেন। পুরানে অগ্নি ধর্মপত্নী বসুর গর্ভজাত। তার পত্নী স্বাহা এবং পাবক, পদমান ও শুচি তিন পুত্র; তিন পুত্রের পঞ্চাতারিংশ্যপুত্র। পঞ্চশী ঋগবেদের ১০.৯০.১ শ্লোকে আছে, পরম পুরুষের মুখে অগ্নির জন্ম। অগ্নি দেবতার প্রতিমা হচ্ছে স্থূলকায়, লম্বোদর, রক্তবর্ণ। কেশ-শ্মশ্রু ও চক্ষু পিঙ্গলবর্ণ। শক্তি ও অক্ষ সূত্র, বাহন ছাগ। পুরানে এর অন্যান্য প্রকার মূর্তির বর্ণনা আছে। কোথাও তার তিন পা, সাত হাত, দুই মুখ এবং বালার্কের ন্যায় বর্ণ। ইনি দক্ষিণ-পূর্ব কোণের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। ঋগবেদের এক-চতুর্থাংশেরও অধিক শ্লোকে কেবল অগ্নির স্তব করা হয়েছে।'
প্রাচীনকালে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই অগ্নিদেবের পূজা হতো। এখন ভারতবর্ষের হিন্দু ও পার্সীরাই কেবল এর অর্চনা করেন। তৈত্তরীয় সহিংসতায় আছে, প্রজাপতি অগ্নির সৃষ্টি করে দেবতাগণকে বিশ্রাম ভূমি স্বরূপ দান করেন। হিন্দু, পারস্য, কালডিয়া, মিসর, ইয়াহুদী, গ্রীক, রোমক, চীন প্রভৃতি সকল জাতির শাস্ত্রেই দেখা যায় যে, তাদের দেবমন্দিরে রাত-দিন অগ্নি প্রজ্বলিত থাকত।
হিন্দুদের অসংখ্য যাগযজ্ঞ আছে। যজ্ঞের জন্য হোম অপরিহার্য। হোমের জন্য অপরিহার্য অগ্নি। হোমের অর্থই হচ্ছে দেবোদ্দেশ্যে অগ্নিতে মন্ত্রপূর্বক ঘৃতাদি প্রক্ষেপ। এ হোমই এ জগৎ রক্ষা ও স্থিতির মূল। হোমের সম্যক অনুষ্ঠান না করলে বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টি না হলে শস্য জন্মে না, শস্যের অভাবে প্রজা উৎফুল্ল হয় না, সুতরাং ক্রমে জগৎ ধ্বংস হয়ে থাকে।
অতি প্রাচীনকাল হতেই পারস্যে অগ্নি উপাসনার প্রচলন ছিল। প্রাচীন পারসিকদের ধর্মগুরু ছিলেন জরান্তর (Zoraster) এবং তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম ছিল জিন্দাবেস্তা। জরথুস্ত্র প্রচার করেন যে, দু'জন দেবতার দ্বারা জগতের সমুদয় মঙ্গল-অমঙ্গল সাধিত হচ্ছে। মঙ্গলের দেবতা হচ্ছেন, 'আহরমাজদ' অথবা 'হরমজদ' আর অমঙ্গলের দেবতা হচ্ছেন 'আহরিমান'। মঙ্গলের দেবতা আহরমাজদ অগ্নিতে অবস্থান করেন। তাই মঙ্গল লাভের জন্য অনির্বাণ অগ্নিশিখার পূজা করতে হবে। পারস্যে পারসিকদের মন্দিরে যে অগ্নিশিখা স্থাপন করা হয় তা ছিল অনির্বাণ। হাজার বছরের অধিককাল ধরে তা একনাগাড়ে জ্বলে আসছিল।
সুতরাং, শহীদদের প্রতি, জাতির কৃতী সন্তানদের প্রতি, বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এটা পদ্ধতি নয়। অগ্নি প্রজ্বলিত করে, অগ্নিশিখা স্থাপন করে বা অগ্নি প্রতীকের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন মুসলিমদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। বাংলাদেশের অধিবাসীদের প্রায় ৯০% মুসলিম। আক্বীদা-বিশ্বাস, আচার-আচরণে এঁরা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে খ্যাত। তাঁদের বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী একটা পদ্ধতি জাতীয়ভাবে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা সমীচীন কি-না, তা অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের ভেবে দেখা দরকার। এভাবে অগ্নিকে সম্মান প্রদর্শন করা এক ধরনের অতি অবাঞ্ছিত শির্ক, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটা হবে অতীতের পারসিক ধর্ম তথা মজুসীদের অনুসরণ যা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।
প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি তার জাতিসত্তার ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে। সংস্কৃতি কতগুলো অপরিবর্তনীয় মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করে। ধর্মবোধ, রুচিবোধ এবং বিশ্বাসের ভিন্নতার জন্য জাতির উৎসব-অনুষ্ঠানের প্রকাশ ভঙ্গিতেও বিভিন্নতা দেখা দেয়। ভারতের সংখ্যাগুরু মানুষ হিন্দু। তারা বহু দেবতায় বিশ্বাস করে। তাদের সাংস্কৃতিক আচার-আচরণের প্রকাশভঙ্গিও তাই বহু অবতারবাদী। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম এক আল্লাহর উপাসক। সুতরাং মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং বহু অবতারবাদী ভারতীয় সংস্কৃতি কখনো এক হতে পারে না। কিছু মানুষ স্বীকার না করলেও এটাই স্বীকৃত সত্য যে, ধর্মবোধই আমাদের জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কল্যাণবোধ, শ্রেয়বোধ ধর্মের কারণেই জাগ্রত হয়। ধর্মের কারণেই আমরা বুঝতে পারি, কোন্টা শালীন বা অশালীন।
অগ্নিপূজারী ভারতীয় সংস্কৃতিতে অগ্নি কালচারের প্রাধান্য তাদের ধর্মবোধ থেকেই নিঃসৃত। ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী 'অগ্নি' হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যক্ষ দেবতারূপী ভগবান। হিন্দুদের কাছে পূজা, প্রদীপ, মশাল এবং অগ্নি এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। এর একটা ছাড়া অন্যটা অসম্পূর্ণ, অচল, অর্থহীন। জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে একটি হিন্দু সংস্থা কর্তৃক শিখা চিরন্তনে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয় এবং ঐ স্থানে 'অগ্নি দেবতার মন্দির' নির্মাণের দাবী জানানো হয়। এ দাবী তাদের খুবই প্রাসঙ্গিক।
হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ সংহিতায় অগ্নিকে ২০০ সুক্তে স্তব করা হয়েছে, যা দেবরাজ ইন্দ্র ভিন্ন অন্য কোন দেবতা সম্বন্ধে করা হয়নি। ঋগ্বেদে অগ্নিকে এতই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে যে, ঋগ্বেদ শুরু হয়েছে অগ্নি বন্দনা দিয়ে (১/১ সুক্ত) এবং শেষ হয়েছে অগ্নি বন্দনার মাধ্যমেই (১০/১৯১ সুক্ত)। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, অগ্নি পার্থিব দেবতাদের মধ্যে প্রধান। অগ্নি স্বর্গবাসী দেবতা এবং মর্ত্যলোকের মানবের মধ্যে যোগাযোগ বা মধ্যস্থতাকারী। অগ্নি দেবকূলের যজ্ঞের সারথি। ইনি আপন রথে দেবতাদের বহন করে যজ্ঞস্থলে নিয়ে আসেন। যার ফলে অগ্নি ছাড়া কোন যজ্ঞ হয় না। কোন শুভ কাজ শুরু হয় না। চালক না থাকলে যেমন মহামন্ত্রীও কোন শুভ কাজে উপস্থিত হতে পারেন না, তেমনি অগ্নি সারথি ব্যতীত দেবতাগণও যজ্ঞস্থলে বা শুভ কাজে উপস্থিত হতে পারেন না। সে জন্য অগ্নিকে হিন্দু ধর্মে পুরোহিত বলা হয়ে থাকে। আগুনের পরশ মণি ছাড়া কোন কাজই শুভ হয় না।
প্রায় প্রতিটি ধর্মপ্রাণ হিন্দু বাড়িতে তুলসী গাছের কাছে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যারতি করা হয়। মঙ্গল প্রদীপের উৎস মঙ্গল আরতি থেকেই, যা অগ্নি দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
হিন্দুদের বাহ্যপূজার আর একটা প্রধান অঙ্গ হোম। মাটিতে বালি দিয়ে একটা চতুষ্কোণ বেদী তৈরি করা হয়। সেই বেদীর মাঝখানে 'কুশ' বা খড় দিয়ে একটা পদ্ম তৈরি করে তার উপর 'ওঁ' অক্ষরটি লিখতে হয়। পরে গব্যঘৃত কপূর ইত্যাদির মাধ্যমে 'হোমানল' অর্থাৎ আগুন জ্বালিয়ে, আতপ চাল, চিনি, যব-কপূর ইত্যাদি সহযোগে 'চরু' তৈরি করে সেই আগুনে আহুতি দিতে হয়। পরে সেই অগ্নিকে প্রণাম করে প্রার্থনা করা হয় এভাবে, 'হে মহান দেবতা অগ্নি! তুমি আমাদের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে দাও। তোমার জ্যোতিতে হৃদয় পূর্ণ করে দাও। আমাদের যত কু-গ্রহ, বাইরের ও অন্তরের যত প্রবল শত্রু, তাদের তোমার হোমানলে দগ্ধ করে দাও।'
হিন্দুদের নিকট অগ্নি সদামঙ্গলময় বিধায় তাদের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, পূজা-অর্চনা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অগ্নির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। হিন্দু কাব্য সাহিত্যেও অগ্নি এসেছে পূজার হাত ধরেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূজা পর্বের গানে বহুবার পূজার সঙ্গে প্রদীপের উপমা ব্যবহার করেছেন, যেমন-
'আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে করব নিবেদন আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন।'
কিংবা, 'আমার এই দেহখানি তুলে ধর তোমার ঐ দেবালয়ের প্রদীপ কর।'
অথবা, 'যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে, একে একে তারা আকাশ পানে ছুটবে বাঁধন হারা।'
এভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পূজা এবং অগ্নি সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। আগুন ছাড়া পূজা হয় না। কারণ, আগুনের রথ ছাড়া দেবতা আসেন না।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মঙ্গল প্রদীপের মধ্যে মঙ্গল অনুসন্ধান করেন। কারণ, তাদের বিশ্বাস, অগ্নি দেব বহনকারী সারথি। স্বর্গের দেবতারা যাগ, যজ্ঞ, পূজা, বিবাহ প্রভৃতি শুভ কাজে অগ্নি ছাড়া আবির্ভূত হতে পারেন না। এ বিশ্বাস থেকেই এসেছে রাজঘাটের গান্ধী সমাধির চিতা অনির্বাণ বা ইন্ডিয়া গেটের চিতা চিরন্তন। একই বিশ্বাস থেকে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে তারা শুভ কাজ উদ্বোধন করে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন, শিখা কিংবা প্রদীপের আগুনের মাধ্যমে দেবতা মর্ত্যে আবির্ভূত হবেন এবং তিনিই কাজটিকে শুভ পথে পরিচালিত করবেন। অগ্নি দেবতার প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা থেকেই ভারতে শিখা কালচারের প্রচলন হয়েছে। বাংলাদেশেও কি তবে অগ্নি দেবতার বিশ্বাস নিয়ে শিখা কালচার শুরু করা হল?
বাংলাদেশ সাড়ে ১৩ কোটির বেশি মুসলিমের দেশ। এ দেশের জনগণের জীবন চিন্তা ভিন্ন ধরনের। তারা বিশ্বাস করে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। তিনিই একমাত্র চিরন্তন, চিরঞ্জীব, তিনিই রক্ষাকর্তা। আসমান এবং জমিনের সবকিছু একমাত্র তাঁরই। আল্লাহর সাথে যেকোন বস্তু বা প্রাণীর শরীক স্থাপনের পশ্চাদমুখী প্রবণতার বিরুদ্ধেই ইসলামের অবস্থান।
অতএব, যারা আজ শিখা জ্বালিয়ে দেবলোকের দেবতাকে মর্ত্যে আনার চেষ্টা করছেন, মঙ্গল সারথির মতো মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে শুভ কাজ উদ্বোধন করে বাঙালিপনার কথা বলছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে কোন্ বাঙালি কালচারের কথা বলছেন? সে কি বিগ্রহ পূজারী বাঙালি, না কি আল্লাহর একত্ববাদী বাঙালি, সেটাই পরিস্কারভাবে বুঝতে হবে। এ মুসলিম জাতি জানতে চায়, এ শিখা কালচার কাদের জন্য এবং কিসের জন্য?
আল্লাহর একত্ববাদী বাঙালি মুসলিমরা তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে না। অন্য কারো কাছে মঙ্গল (কল্যাণ) প্রত্যাশীও সে নয়। প্রতিটি মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল (স) এবং আল্লাহর প্রেরিত বাণী সম্বলিত আল-কুরআনে বিশ্বাসী। সেই কুরআনই তাদেরকে শেখায়, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর যিনি পরম করুণাময়, দয়াময়। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।' যেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, তার প্রধান হল আল্লাহর একত্ব, ক্ষমতা, করুণা ও সর্বোচ্চ ভালবাসার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে 'অগ্নিশিখা' কালচারকে, কিংবা কবরের মাটি দিয়ে বেদী গড়ার কালচারকে অথবা স্থাপত্যের নামে মূর্তি কালচারকে দেশের বুকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তারা কি মুসলিমদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কোন খোঁজখবর রাখেন না?
যে দেশের সংখ্যাগুরু মানুষ যে সংস্কৃতির ধারক, সে দেশের সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে সেই সংখ্যাগুরু মানুষের সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংখ্যাগুরুর ওপর চাপিয়ে দিলে অন্য ব্লাড গ্রুপের রক্ত যেমন শরীর ধারণ করতে পারে না, তেমনি জাতিও বিসদৃশ সংস্কৃতি ধারণ করতে পারবে না। ফলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে বাধ্য।
বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষ মুসলিম। মুসলিমরা অগ্নি দেবতায় বিশ্বাস করে না, তারা একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। মুসলিমরা যখন কোন শুভ কাজ শুরু করে তখন অগ্নিদেবের শরণাপন্ন হয় না। তারা আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁর প্রশংসা করার মাধ্যমে তাঁর কাছে কল্যাণের প্রার্থনা জ্ঞাপন ক'রে কাজ শুরু করে। মুসলিমরা ক্ষণস্থায়ী অগ্নিশিখাকে চিরন্তন মনে করতে পারে না, তাদের কাছে একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই চিরন্তন। মুসলিমরা আগুন জ্বালে অন্ধকার দূর করার জন্য এবং রান্নাবান্নার জন্য। জীবনের কোন শুভ বা কল্যাণ বয়ে আনার অলৌকিক ক্ষমতা অগ্নির কাছে, এ ধারণায় মুসলিমরা বিশ্বাস করে না।
অতএব, সার্বিক বিচারে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, শিখা অনির্বাণ ও চিরন্তনের চিন্তাধারা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী, পৌত্তলিক চিন্তা-সঞ্জাত এবং ভারতীয় শিখা কালচার থেকে আহরিত পরাশ্রয়ী চিন্তাপ্রসূত। এ অগ্নি পূজা সম্পূর্ণ শির্ক ও আল্লাহদ্রোহী কাজ। 'শিখা চিরন্তন' বা 'শিখা অনিবার্ণের' নামে অগ্নি মশালকে সারা দেশে ঘুরিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং ওগুলোর প্রজ্জ্বলনকে অব্যাহত রাখার জন্য বিশেষ ধরনের বেদীর ওপর এগুলো স্থাপন করা হয়, অলিম্পিক মশাল সহ বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানের মশাল প্রজ্জ্বলনও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। এ কালচারের সাথে এ দেশের মাটি ও মানুষের কোন সংস্রব নেই। বরং শিখা চিরন্তনের অগ্নিকুণ্ড যতদিন এ দেশের বুকে জ্বলতে থাকবে, ততদিন আল্লাহর একত্ববাদকে খর্ব করার, আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করার অভিশপ্ত মশাল জ্বলতে থাকবে বাংলাদেশের বুকে।
টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন, ঋগবেদের মহা ১.৫.২৩ শ্লোক, পুরানের ৬৪.১.৫.৯ শ্লোকসহ আরো অন্যান্য শ্লোক।
২. বিস্তারিত দেখুন, বাংলা বিশ্বকোষের 'অগ্নি' অনুচ্ছেদ।
৩. বিস্তারিত দেখুন, ঋগবেদের মনু ৩/৭/৫-৬, ৩/৮৪/৭ শ্লোক।
📄 কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক শিক্ষা, সালাফীনের থেকেই নিতে হবে দীক্ষা
পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সাথে একসঙ্গে খাবার খাওয়ার সময় কথা বলার মধ্যে একবার বেদম বিষম খেলো শামীম। নাকে-মুখে একাকার অবস্থা। সামাল দেয়ার জন্য যখন সে প্রাণান্ত প্রয়াসে রত, তখন শামীমের মা বললেন, 'কীরে তোকে বুঝি কেউ মনে করছে। তোর কথা বলছে।' তখনও সামলে উঠতে পারেনি সে। খাবারের এক পর্যায়ে ওর দুলাভাইকে দেখে সালাম দিল। এবার বোনের ধমক, 'খেতে খেতে সালাম দিতে নেই, সেটাও কী শহরে গিয়ে ভুলে গেছিস?' দুলাভাই তাকে 'ঠিক আছে আগে খেয়ে নাও পরে কথা হবে' বলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সচেষ্ট হলেন।
এরপর সবাই আবার খাবারে মনোনিবেশ করল। জাদীদা খাচ্ছিল চুপচাপ। ওদের সঙ্গে মামাও খাচ্ছিল। হঠাৎ ওর প্লেটের দিকে নজর পড়ল মামার। দেখে যে, প্লেটের একদিকে সামান্য একটুখানি ভাঙা। পুরনো প্লেট। জাদীদাকে উদ্দেশ্য করে বাবা বলল, 'কীরে জাদীদা বেছে বেছে তুই ভাঙা প্লেটে খাস কেন!? তোর কপালে কি ভালোটি জোটে না? ভাঙা প্লেটে খেলে যে তোর কপালটাও ভাঙাই হবে। কপালে জোড়া লাগবে না।' জাদীদা অবশ্য এটা কখনো খেয়াল করেনি বা এভাবে ভেবেও দেখেনি। সে হ্যাঁ- না কিছু না বলে ফ্যালফ্যাল করে কেবল চেয়ে রইল। মামা বলল, 'দেখছিস কী আজ ওতেই সেরে ফেলো। কিন্তু কথাটা মনে রাখিস বলে দিলাম।' নিরীহ ভঙ্গীতে মাথা নেড়ে জাদীদা পুনরায় খাদ্য গিলতে নিয়োজিত হল। ওর খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। বাকিটুকু শেষ করে উঠে পড়ল। প্লেট হাতে নিয়ে সামনে এগুতেই একটা পাতিলের সঙ্গে ওর পা ঠুকে গেল। আর সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে পাতিলে হাত ছুঁয়ে তিনবার সালাম করল। বসা থেকে মামা এটা দেখে বলে, 'করিস কী, করিস কী! ধাতুর প্রাণহীন পাতিলটি কী তোর সালাম নিল, না বুঝল! তোর পা না মাথা ওটিকে ছুঁয়েছে তাও কি ওটা বুঝেছে?' জাদীদা এ সব কিছুই বুঝল না। ছোটবেলা থেকে তো এ রকমই দেখে আসছে। দেখে যা শিখেছে তাই তো পালনীয়! এতে কি দোষ করল তা ওর মাথায় ঢুকল না।
খাবার নিয়ে এতক্ষণ যেসব নিয়মের কথা জানলাম, এগুলো দীর্ঘকাল ধরে যে এ পরিবারকে শাসন করছে তা তো নয়। আমাদের সমাজের বেশিরভাগ বাড়ির বেশিরভাগ লোকজনকেই নির্বিচারে শাসন করে চলেছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মামাদেরও বাগে রেখেছে। নির্বিচারে পালনীয় এ সব আচারের সঙ্গে যুক্ত আছে কুসংস্কার এবং অজ্ঞানতা। হ্যাঁ, শাসন একটা মানা দরকার। সেটা হবে কোন শাসন? সেটা হবে আল্লাহর শাসন। আল্লাহ্র বিধান কুরআন ও সহীহ হাদীসের শাসন।
উপরোক্ত নিয়মগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, খেতে বসে মুখে খাবার রেখে কথা বললে বা তাড়াহুড়ো করে খেলে গলনালীতে খাবার আটকে যায়। তারপর গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়ে খাবার পাকস্থলী অভিমুখে না এগিয়ে উল্টোদিকে মানে মুখের দিকে আসতে থাকে। বিষমটা তখনই লেগে যায়। সুতরাং বিষম খাওয়ার সঙ্গে কারো মনে করার কোন সম্পর্ক নেই। থাকতেও পারে না। গরীব-দুঃখী পরিবারের লোকজন ভাঙা থালায় খায় বলে এতে আবার কিসের দৈন্যের ছাপ থাকতে পারে? খাবার রান্নাবান্না করতে হাঁড়ি-পাতিলের ওপরই নির্ভর করতে হয়, এ পর্যন্তই। তাই বলে নিষ্প্রাণ পাতিলে পা লাগলে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে সালাম করার কোনই অর্থ নেই।
অন্যদিকে, কাককে সাধারণত অশুভ বলে মনে করা হয়। এ বিশ্বাসটি মূলত বাইবেল থেকে উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। কারণ বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী, পাখিদের মধ্যে শুধুমাত্র কাকই নূহ (আঃ)-এর নৌকায় আরোহণ করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করেছিল। কালো রঙ মানেই ভয়ার্ত, বিপজ্জনক বা অমঙ্গল! কাক যেহেতু কালো, কুৎসিত তাই এ প্রাণীটির সবকিছুই কুৎসিত; ভাল, আনন্দ বা মঙ্গলের যোগ নেই। এমনি ধারণা থেকেই তো কাকের ডাকের সঙ্গে অমঙ্গল বা অশুভ ভাবনা যুক্ত হয়ে গিয়েছে। অথচ, চীনে কাককে সৌভাগ্যের প্রতীক রূপে গণ্য করা হয় বলে কাক হত্যা করা নিষিদ্ধ।
বিড়াল একটি আদুরে ও নিরীহ প্রাণী। মিউ মিউ করে আর এর ওর কাছে ঘুর ঘুর করে আদর পেতে চাইবে। এ প্রাণীর পা বা পেট চাটাচাটিতে কী আসে যায়, অবুঝ প্রাণী অতিথির খবর পাবে কোত্থেকে? এগুলো সবই আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রচলিত হাজারো অন্ধ সংস্কারের দু-চারটা নমুনা। যুক্তিহীন সংস্কার মেনে চলায় গৌরব নেই, উন্নতিও নেই। উন্নতি কিছু আসবে এগুলো না-মানাতেই। কুরআন-সহীহ হাদীস-যুক্তি-বুদ্ধিতে পরখ করে মানামানিটা ঠিক করে নিতে পারলে নিজের এবং দেশের উন্নতি হবেই।
ইংল্যান্ডের লোকজন বিশ্বাস করে যে, কালো বিড়াল হচ্ছে সৌভাগ্য আনয়নকারী। বিশেষ করে যদি কালো বিড়াল কারো চলার পথকে অতিক্রম করে যায়। অর্থাৎ সামনে দিয়ে কোন কালো বিড়াল অতিক্রম করাকে দুর্ভাগ্য আগমনের পূর্বআলামত হিসেবে গণ্য করে থাকে। এ বিশ্বাসটির উৎপত্তি হয় মধ্যযুগে। তখনকার যুগে কালো বিড়ালকে লোকজন ডাইনীদের প্রাণী বলে বিশ্বাস করত। তারা মনে করত যে, কালো বিড়ালের মাথার মগজের সঙ্গে ব্যাঙ, সাপ এবং পোকামাকড়ের শরীরের অংশের সংমিশ্রণ ঘটিয়ে ডাইনীরা যাদুর পাঁচন তৈরি করে। যাদুর পাঁচনের সংস্পর্শ ব্যতীত কোন বিড়াল সাত বছর বেঁচে থাকলে কালো বিড়ালটি ডাইনীতে রূপান্তরিত হতো বলে ধারণা করত। বিপরীত দিকে, আমেরিকাসহ ইউরোপের অন্যান্য দেশগুলোতে কালো বিড়ালকে অশুভ বলে গণ্য করা হয়। আমেরিকাতে সাদা রঙের বিড়ালকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়। আবার এই সাদা বিড়ালই ইংল্যান্ডে অশুভ বা দুর্ভাগ্যের প্রতীক।
কোন ব্যক্তি কোন কিছুর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়ে যখন সে চায় যে তার সৌভাগ্য যেন পরিবর্তন না হয়, তখন সে বলে 'কাঠে টোকা দাও' এবং এ সময় সে তার চতুর্দিকে খুঁজে দেখে কোন কাঠ পাওয়া যায় কি না যেখানে সে টোকা দিতে পারে। এ বিশ্বাসের উৎস বের করতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সুদূর অতীতে, যখন ইউরোপের জনগণ বিশ্বাস করত যে, দেবতারা সাধারণত গাছের মধ্যে বাস করে। গাছে বসবাসকারী দেবতার নিকট থেকে কোন অনুগ্রহ লাভ করতে তারা গাছ স্পর্শ করত। তাদের এ প্রার্থনা যদি গৃহীত হতো, তাহলে দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে তারা পুনরায় গাছ স্পর্শ করত।
লবণ পড়ে গেলে বেশিরভাগ মানুষ ভাবে যে তাদের জন্য দুর্ভাগ্যের বা অশুভ কিছুর আগমন অবশ্যম্ভাবী। তাই তারা সেই পড়ে যাওয়া লবণকে বাম কাঁধের উপরে নিক্ষেপ করে দুর্ভাগ্যকে প্রতিহত করার লক্ষ্যে। লবণ যেহেতু কোন কিছুকে তাজা রাখতে পারে, অনুরূপভাবে এটি দুর্ভাগ্য প্রতিহত করে তাদেরকে রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হয়। লবণের আল্লাহ্ প্রদত্ত স্বাভাবিক কার্যকারিতা শক্তির কারণে প্রাচীনকালের মানুষেরা এ বিশ্বাস করত। এভাবে লবন পড়ে যাওয়াকে কোন অশুভ আলামতের অশনি সংকেত হিসেবে ধরা হয়। আবার যেহেতু তারা এটাও বিশ্বাস করত যে, শয়তানী আত্মা বা অশুভ শক্তি মানুষের বামপার্শ্বে অবস্থান করে; তাই পড়ে যাওয়া লবণ বাম কাঁধে নিক্ষেপ করার মাধ্যমে অশুভ শক্তিকে সন্তুষ্ট করা হয়। লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি কর্তৃক আঁকা বাইবেলে বর্ণিত শেষ নৈশ ভোজের ছবিতে দেখা যায় যে, লবনের তাকে যিশুর বিশ্বাসঘাতক জুডাস আঘাত করছিল।
অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে, হঠাৎ করে একটি আয়না ভেঙ্গে যাওয়া বা ফেঁটে যাওয়া বা ভাঙ্গা আয়না সাত বছরের জন্য দুর্ভাগ্য আগমনের আলামত। প্রাচীনকালের মানুষেরা মনে করত যে, পানির উপরে কোন ব্যক্তির আত্মার প্রতিবিম্বের সৃষ্টি হয়। ফলে, কেউ পানিতে ঢিল ছুঁড়লে বা অন্য কোনভাবে যদি তাদের আত্মার প্রতিবিম্ব চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়, তাহলে আত্মাও চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাবে। আর আয়না আবিষ্কারের পর থেকে এ বিশ্বাস আয়নাতে স্থানান্তরিত হয়। ধারণা করা হয়, এ বিশ্বাসটি একটি প্রাচীন বিশ্বাস থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এ প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের বা কারও বা কোন প্রাণীর প্রতিবিম্ব বা প্রতিফলন বা ছায়া মূলত তার আত্মার প্রতিচ্ছবি ব্যতীত আর কিছুই না। অতএব যা কারো প্রতিবিম্ব বা ছায়াকে পরিবর্তন করে তা দুর্ভাগ্য বয়ে আনতে পারে। এ দুভাগ্যের সময়কালের ধারণা রোমানদের নিকট থেকে আগত বলে মনে করা হয়। রোমানদের ধারণা হচ্ছে, মানুষের জীবন প্রতি সাত বছর অন্তর নূতন রূপ পরিগ্রহ করে।
কোন দেয়ালের সাথে হেলান দেয়া মই ত্রিভুজের সৃষ্টি করে। কেউ কেউ বিশ্বাস করে যে, এ মইয়ের নিচ দিয়ে হাঁটা অসম্মানজনক, অমঙ্গলজনক, অকল্যাণকর; এক কথায় অশুভ। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, ত্রিভুজ মূলত পবিত্র ত্রিত্ববাদকেই প্রতীকায়িত করে। এ অবস্থায় রাখা মইয়ের নিচে অবস্থান করার সময় কোন বিষয়ে বাঞ্ছা করা বা আকাঙ্ক্ষা পোষণ করা অথবা হাত বা পায়ের আঙুল অতিক্রম করিয়ে অশুভ বা দুর্ভাগ্য থেকে আত্মরক্ষা করা যায়।
ডিম ও আলু মানে তো সহজে বোঝায় যায় গোল্লা, মানে শূন্য! আর কলা! কলা দেখা মানে বা দেখানো মানে তো জানই। সেটাও এক শূন্যেরই ব্যাপার। কোন পরীক্ষার আগে ডিম, কলা, আলু খাওয়া মানেই হল পরীক্ষায় গোল্লা পাওয়া! আবার কেউ সাঁতার না শিখলেও তার ব্যবস্থাপত্র আমাদের সমাজের এখানে-সেখানে সর্বত্রই পাওয়া যায়। ছোট পিঁপড়া কোনভাবে খেতে পারলে অবশ্যই সাঁতার শিখতে বেগ পেতে হবে না। তাছাড়া, পচা বা পোক ধরা ফল খেলেও তাড়াতাড়ি সাঁতার শেখা যায়।
এগুলো নিয়ম বলে চলে আসলেও বস্তুত অনিয়ম বৈ কিছু নয়। এ সব নিয়মের অসারতা একটু পরীক্ষা বা পর্যবেক্ষণ করলে সহজেই ধরা পড়ে। পিঁপড়ে ভালো সাঁতারু বলে তা খেয়ে সাঁতার শেখা যাবে এমন কথা নেই। কারণ মানুষ তো কত পাখি খায় তার জীবনে, কিন্তু কেউ কি আকাশে ওড়া শিখেছে? পচা ফল বা পোকা-ফল খেলে সাঁতার শেখা যাবে এমন কোন কথা নেই। ডিম ও আলুর আকৃতি শূন্যের মতো বলে ফলাফল শূন্য জুটবে, তা কী কোন কথা হল? কলার সঙ্গে শূন্য লাভের কী সম্পর্ক!
মূলত এ সব যুক্তি-বুদ্ধি-জ্ঞানহীন অন্ধ-অসার ধারণা বা বিশ্বাস। পুরোনো আমলের ভ্রান্ত ধারণা। এমনই অনেক অচল ধারণা সচল রয়েছে আমাদের সমাজে কেবল ওহীর সত্য জ্ঞানের অভাবে। এ ধরনের সচল নিয়মগুলো অচল করা শুধু নয়, বাতিলই করতে হবে আজ, এখনই। সে জন্য আমাদের সকলকে ওহীর অমোঘ বিধানের নিকট আত্মসমর্পণ করতে হবে। কুরআন ও সহীহ হাদীসের পাঠ নিতে হবে। চেতনাটা সহীহ আক্বীদার কষ্টি পাথরে যাচাই-বাছাই করতে হবে।
টিকাঃ
১. ভাগ্য সংক্রান্ত বিষয়ে কপাল শব্দটি মূলত হিন্দু সংস্কৃতি থেকে আমাদের মুসলিমদের বিশ্বাসে অনুপ্রবেশ করেছে। হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থানুযায়ী, কোন সন্তান জন্মের ৬ষ্ঠ দিনে ভাগ্যের দেবতা এসে এ শিশুটির জীবনে সংঘটিতব্য ঘটনাসমূহ অর্থাৎ হায়াত, মৃত্যু, রিযিক, ধন-দৌলত ইত্যাদি তার [শিশুটির] কপালে লিখে যায়। আর এ বিশ্বাস থেকেই প্রচলিত হয়েছে- 'কপালের লিখন না যায় খণ্ডণ।' কিন্তু আমরা মুসলিম হিসেবে এ ধরনের আক্বীদা-বিশ্বাস পোষণ করি না। আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের ভাগ্য লিখে রাখা হয়েছে লাওহে মাহফুজে, যা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ওয়াকিবহাল। তাই আমরা বলি, 'ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডণ।' অতএব, প্রতিটি মুসলিমের উচিত ভাগ্য সম্পর্কিত ব্যাপারে আলোচনায় 'কপাল' শব্দটির ব্যবহার করা থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা। কারণ, সামান্য একটি মাত্র শব্দই আমাদের বিশুদ্ধ ঈমান-আক্বীদায় আঘাত করতে যথেষ্ট।
📄 লটারী-জুয়া-হাউজি, সবই হল হারাম পুঁজি
লেগে যাবার সম্ভাবনার কথা শুনি আমরা। ভাগ্য ভাল হলে অথবা ভাগ্যে থাকলে না লেগে যাবে কোথায়? বলা হয় এ রকমও, 'কপাল যদি না হয় ফাঁকা, ঘুরতে পারে ভাগ্যের চাকা।' চাকা থাকলে তো ঘুরবেই। যদি তাকে আটকে না রাখা হয়। আর যদি কপাল বলে কিছু থাকে এবং তারও যদি চাকা থাকে তাহলে তার না ঘুরে উপায় কী! কপাল যে কারো ফাঁকা- এ অপবাদ তো কেউ মাথা পেতে নিতে চাইবেন না। কপাল ফাঁকা, মাথা ফাঁকা- এগুলো মানব জীবনের জন্য খুব খারাপ ব্যাপার বলে মনে করা হয়। সুতরাং কপাল ফাঁকা অর্থাৎ ভাগ্যহীন অলক্ষ্মী (!?) বলে পরিচিত হতে চাইবেন না কেউ। কপাল পরিপূর্ণ না হোক ফাঁকা নয় কারো। এম কপালে ভাগ্যের চাকা ঘুরতে পারে বৈকি!
কপাল ফাঁকা না হলে, ভাগ্য সহায় হলে লটারি কুপনের ক্রেতা রাতারাতি বড়লোক হয়ে যেতে পারেন। পেয়ে যেতে পারেন তিনি কয়েক লক্ষ টাকার পুরস্কার।
আমরা জুয়া খেলার কথা জানি। খেলাটা দেখেছিও অনেকে, গোল রঙচঙে বোর্ড। তার পুরোটা জুড়ে আঁকা থাকে বিভিন্ন জিনিসের ছবি। ঠিক মাঝ বরাবর থাকে চারদিকে ঘুরতে থাকা একটা তীর। তীরটিকে ঘুরিয়ে দেয়া হয়। কোন জুয়াড়ীর ধরা নম্বরে তীর আটকালে সে হয় বিজয়ী। দেখা যায়, একটি জুয়ার বোর্ডে ৩০ থেকে ৪০টি ঘর থাকে। এক একটি ঘরে এক একটি ছবি বা নম্বর আঁকা থাকে। একজন যখন জুয়ার বোর্ডে বাজী ধরে তখন তার বাজীতে জেতার সম্ভাবনা থাকে ৪০ ভাগের এক ভাগ। অর্থাৎ নিতান্তই সামান্য।
লটারিতে পুরস্কার জেতার ব্যাপারটিও অনেকটা একই রকম। কী রকম! ব্যাপারটি খতিয়ে দেখলে লটারিকে জুয়া খেলা বলে সবাই মেনে নিতে কোনই দ্বিধা করবেন না। জুয়া খেলার তো বোর্ডে ঘর থাকে ৪০টি। আর লটারির কুপন ছাড়া হয় কয়েক কোটি। হয়তো প্রথম পুরস্কার ৫০ লক্ষ, দ্বিতীয় ৪০ লক্ষ, তৃতীয় ৩০ লক্ষ টাকা এবং সবগুলো মিলে হয়তো আরো ৫০ লক্ষ টাকার পুরস্কার। সব মিলিয়ে হয়তো ২ কোটি টাকার পুরস্কার। এছাড়া কুপন ছাপা, প্রচার চালানো ও অন্যান্য খাতে খরচ করে ১০ লক্ষ টাকা। এই মাত্র দুই, আড়াই বা তিন কোটি টাকা খরচ হয় একেকটি লটারি পরিচালনায়। লটারি যারা করে সেই সংস্থা তো খরচ বাদ দিয়ে কিছু লাভ করবেই। সেই হিসেবে হয়তো পাঁচ কোটি টাকার কুপন বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়। একটি কুপনের দাম যদি ১০ টাকা হয়, তাহলে মোট কুপন ছাড়া হয় হয়তো ৫০ লক্ষ। তাহলে এখন দেখা যাচ্ছে, একজন একটি কুপন কিনলে তার পুরস্কার পাবার সম্ভাবনা হয় ৫০ লক্ষের এক ভাগ। দুটো কিনলে ৫০ লক্ষের দুই ভাগ। এভাবে ১০টি কুপনে সম্ভাবনা ৫০ লক্ষের ১০ ভাগ।
এখন দেখা যাক, লটারির কুপন কেনে কারা। সচরাচর যারা নিজের অবস্থা রদলাতে চান কিন্তু কোন উপায় খুঁজে পাচ্ছেন না। যারা উচ্চাশা পোষণকারী, যেকোনভাবে রাতারাতি অবস্থা বদলে ফেলতে চান- তারাই কেনেন লটারির কুপন। অর্থাৎ গরিব অথবা স্বল্পআয়ের লোকজনই কুপনের অধিক ক্রেতা। নিজেদের জীবনে উন্নতি ঘটানোর জন্য লটারির আশ্রয় নেন তারা। লটারির প্রচারে যে ভাষায় লোভ দেখানো হয়, তাতে তারা বশীভূত হন। আর এরা যদি একবার সামান্য টাকার পুরস্কার পেয়েও যান তাহলে তো কথাই নেই। লোভে লোভে বার বার কুপন কেনার প্রতিযোগিতা চালাবেন। অনেক মানুষকে দেখা যায়, মাস শেষে বেতন হাতে পেয়ে প্রথমেই দু'-পাঁচটি লটারির কুপন কিনে ফেলেন। ভাগ্যের ফের ফেরাতে সহজ-সরল, সাধারণ মানুষ লটারির কুপন কিনে এভাবে প্রতারিত হয়েই চলেছেন।