📄 বিশিষ্ট সব ব্যক্তিত্বের মাযার, শুনুন কিছু মজার সমাচার
যে স্থানে মুসলিমদের মৃতদেহ দাফন করা হয়, তা আমরা কবর বলি। আবার এ কবরই অনেক ক্ষেত্রে মাযার হিসেবে পরিচিত। মাযার একটি আরবি শব্দ। এর অর্থ হল দর্শনীয় স্থান। আজকাল আমরা মাযার নিয়ে যা শুরু করেছি তাতে শুধু শিকের বেসাতি ছড়াচ্ছে। ফলে তা আজ শির্ক প্রদর্শনীর স্থান হিসেবে রূপ পরিগ্রহ করেছে। হিন্দুদের যেমন তীর্থযাত্রা মুসলিমদের তেমন মাযার যাত্রা। হিন্দুরা তীর্থ মন্দিরে দেব- দেবীর পূজা করে আর মুসলিমরা মাযারে গিয়ে মাযার বা পীরপূজা করে।
অধুনা প্রচুর কবর কিংবা ভুয়া কবর মাযার পরিচিতি পেয়ে গেছে। অবশ্যই প্রতিটি মাযার এক একটি কবর কিন্তু প্রতিটি কবর অবশ্যই এক একটি মাযার নয়। কবর বা ভুয়া কবর মাযার পরিচিতি পেয়েছে। কারণ, মাযার আজকাল একটি চমৎকার ব্যবসার হাতিয়ার। তাই, মাযার বলতেই এখন চোখের পর্দায় ভেসে ওঠে একটি আজব প্রতিষ্ঠানের ছবি। কবরস্থান এবং প্রতিষ্ঠান এক বিষয় নয়। কবরস্থানের কোন প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেই। কিন্তু মাযারের তা আছে। মাযারে আছে ম্যানেজিং কমিটি বা গভর্নিং বডি, সৌধ, অফিস, খাদেম জাতীয় নানা কর্মচারী, দান বাক্স, আবাসস্থান, মসজিদ, খানকা, এতিমখানা, মাদ্রাসা, দোকানপাট, পুকুর, প্রস্রাবখানা, পায়খানা প্রভৃতি নানা কিছু। অর্থাৎ রীতিমতো একটি কমপ্লেক্স। পক্ষান্তরে, কবরস্থানের এত কিছু নেই। সেখানে শুধুই কবর, চতুর্দিকে বেড়াজাতীয় কিছু একটা সীমানা বা প্রাচীর এবং প্রাচীরগাত্রে কবরবাসীর নাম-পরিচিতি অথবা প্রাচীরের ওপর কবরবাসীর নাম-পরিচিতি যুক্ত সাইনবোর্ড। আর এ কারণেই কবরে কোন কমপ্লেক্স বা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না।
কবর ও মাযারপূজার উৎপত্তি ও ক্রমবিকাশ
মাযারে আর কবরে পার্থক্য থাকবে কেবল নামের মধ্যে এবং কবরবাসীর মর্যাদার কারণেই সেই পার্থক্য। বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুকরণের কারণেই এটা হয়েছে। মধ্যযুগে মুসলিমদের দ্বারা যে কবর পূজা তা খ্রিষ্টান বা ইয়াহুদীদের থেকে সে কালের মুসলিমদের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে।
ইসলামের বিরুদ্ধে বিশেষকরে আল্লাহ্র একত্বের চেতনাকে বিনষ্ট করার চক্রান্ত একদিনের জন্যও থেমে ছিল না। ইবলিশ শয়তানের কারসাজিতে একদল লোক সর্বদাই এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। যখনই মুসলিমদের মধ্যে অজ্ঞতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ঈমানের মধ্যে দুর্বলতা দেখা দিয়েছে তখনই শয়ত্বান ও তার দোসররা তাদের ওপর চড়াও হয়েছে এবং বিভিন্ন সংশয় ও সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। ইসলামের মধ্যে সর্বপ্রথম যে বিভেদ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছিল সে ছিল ইয়াহুদী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা। সে মুসলিম ছদ্মাবরণে ইসলামে প্রবেশ করে এবং সর্বপ্রথম 'সাবাইয়া' নামে একটি ফিরকার সৃষ্টি করে। তাদের ষড়যন্ত্রের কারণেই ইসলামের তৃতীয় খলীফা উসমান বিদ্রোহীদের হাতে শহীদ হন। এরাই আলী ও মুয়াবিয়া-এর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। আর এদের মধ্যে থেকেই শিয়াদের বিভিন্ন উপদল যেমন, খারেজী, রাফেজী ইত্যাদির উদ্ভব হয়েছে। এ দলগুলোই বংশানুক্রমে বিভিন্ন সময়ে ইসলামের মধ্যে নতুন নতুন আচার-অনুষ্ঠানের জন্ম দিতে থাকে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, এ আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার বংশধরেরাই ৪০০ হিজরী সনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন হয়। তারা 'ফাতেমী' নাম ধারণ করে, যাতে সাধারণ মানুষ তাদেরকে ফাতেমা-এর বংশধর বা উত্তরাধিকারী মনে করে। প্রকৃতপক্ষে এরা নাবী তনয়া ফাতিমা তথা আহলে বাইতের উত্তরাধিকারী তো ছিলই না বরং এরা ছিল ইয়াহুদী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবার অবৈধ বংশধর। বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরকারক ইবনু কাসীর তাদের সম্পর্কে বলেন, 'কাফির, ফাসিকু, পাপিষ্ঠ, ধর্মত্যাগী, যিন্দিক, মুনাফিক, আল্লাহ তা'আলার সিফাত অস্বীকারকারী এবং ইসলাম অস্বীকারকারী অগ্নিপূজকদের মতো তারা ছিল কাফির। তারা সালাত আদায়ও করত না এবং হজ্জও করত না। এরা ক্ষমতা গ্রহণের পর দেখতে পেল যে, মুসলিমরা ইবাদতের ব্যাপারে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান এবং মসজিদগুলো কানায় কানায় মুসল্লীতে ভরপুর। এরা তখন প্রমাদ শুনল। তারা তখন মুসলিমদেরকে মসজিদ হতে বিমুখ করার বিকল্প পন্থা খুঁজতে লাগল। তারা জানত যে, মানুষকে সরাসরি ইবাদাত থেকে ফিরানো যাবে না। তাই, ইবাদতের 'খোলস' ঠিক রেখেই তাদেরকে গোমরাহীতে নিক্ষিপ্ত করতে হবে। তারা এটাও জানত যে, মুসলিমদেরকে সরাসরি মূর্তিপূজায়ও লিপ্ত করানো যাবে না। তাই ইবাদতের নামে তাদেরকে এমন কাজের দিকে নিয়ে যেতে হবে যাতে পরিণতির দিক দিয়ে তাদের মধ্যে এবং মূর্তিপূজকদের মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য না থাকে।
প্রথমে এরা বিভিন্ন স্থানে সুপরিকল্পিতভাবে মাযার ও কোব্বা বানাতে শুরু করে। এরপর লোকদের মধ্যে প্রচারণা চালাতে থাকে যে, এটা হোসাইন-এর মাযার, এটা যয়নব-এর মাযার ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গে এ সব মাযারে বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে। মানুষের মাঝে এ ধারণাও দিতে থাকে যে, এ সব কবর যিয়ারত করা, তাতে মান্নত করা ইত্যাদি বড়ই বরকত ও সওয়াবের কাজ। সময়টা ছিল ইসলামের খুবই কঠিন ও পতনের যুগ। মানুষের মধ্যে ইসলাম সম্পর্কে দ্বিধা, সংশয়, সন্দেহ ও বিভ্রান্তি ছড়ানোর চতুর্মুখী ষড়যন্ত্র তখন সক্রিয় ছিল। আর সরকার বা রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা এ কাজকে আরও বেগবান করে যাচ্ছিল। অনেক লোক তাদের কথায় আকৃষ্ট হতে লাগল। ফলে তারা নিয়মিতভাবে মাযার যিয়ারতের কাজকে ইবাদত বানিয়ে নিল। আল্লাহর রাসূল (স) যে কাজকে সম্পূর্ণ উৎখাত করে গিয়েছিলেন তা-ই পুনরায় চালু হয়ে গেল।
সুফীবাদ ও সুফীদের উত্থানে এ কবর বা মাযার পূজা হালে জল পেয়ে গেল এবং তা দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। বিভিন্ন স্থানে সাহাবীদের এবং পূর্ববর্তী পূণ্যবান লোকদের কবরগুলোকে চিহ্নিত করা শুরু হল। সেগুলোকে পাকা করা, উঁচু করা থেকে শুরু করে সেখানে কবরের ওপর গম্বুজ নির্মাণ করা হতে লাগল। কবরের চারপাশে দেয়াল ঘিরে তার মধ্যে অতি আকর্ষণীয় মিনার তৈরি হতে লাগল। কোন সুফী বা তার পীর মারা গেলে তাকে কবরস্থ করার পরপরই তা পাকা মাযারে পরিণত করা হতো। এভাবে প্রতিটি এলাকায় নতুন নতুন মাযারের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে লাগল। এক পর্যায়ে মাযারের সংখ্যা মসজিদের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যেতে লাগল। কোন কোন স্থানে মসজিদ এবং মাযারকে সমান্তরালভাবে পাশাপাশি স্থাপন করা হতো, যাতে মানুষ দুটোকেই ইবাদতের স্থান মনে করতে পারে। এমনকি সাজসজ্জা ও আকর্ষণীয়তার দিক থেকে মসজিদের চেয়ে মাযারের চাকচিক্য অনেক বেশি প্রাধান্য পেল।
মসজিদগুলো যখন আলোর অভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকত, মাযারগুলোর আলোতে তখন চারিদিকে আলোকিত হয়ে যেত। তৎকালীন সুফী-দরবেশরা এ মাযারগুলোকে কেন্দ্র করে চিল্লাকাশী করত। এটা মানুষের মন-মগজে বিরাট প্রভাব বিস্তার করল। এবার মানুষ মসজিদে এবং মাযারে যাওয়ার মধ্যে তেমন পার্থক্য মনে করত না। তাই তারা মসজিদে যেমন সালাতের জন্য যেত তেমনি মাযারেও যিয়ারতের জন্য যেত, মসজিদে গিয়ে যেমন আল্লাহর কাছে চাইত তেমনি মাযারে গিয়ে কবরস্থ ব্যক্তির নিকট চাইত, মসজিদে গিয়ে যেমন আল্লাহ্র সন্তুষ্টি কামনা করত তেমনি মাযারে গিয়ে কবরস্থ ব্যক্তির সান্নিধ্য কামনা করত, আল্লাহ্র নামে যেমন যবেহ বা কুরবানী করত তেমনি মাযারের বা পীরের নামেও মান্নত করে তা যবেহ করত। এক কথায় আল্লাহ তা'আলা ও কবরস্থ ব্যক্তির মধ্যে তেমন একটা পার্থক্য বজায় রইল না। মূর্তিপূজার পরিবর্তে শুরু হয়ে গেল কবর পূজা। এ কবরপূজা হল মূর্তিপূজার নব্য সংস্করণ। পার্থক্য শুধু হচ্ছে- আগেরদিনে নেককার বান্দাদের মূর্তি তৈরি করে তার উপাসনা করা হতো। তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া হতো, তাদের নামে মান্নত মানা হতো। আর বর্তমানে ঐ নেককার ব্যক্তিদের 'মরদেহ'-এর উপাসনা করা হচ্ছে। তাদের নামে মান্নত মানা হচ্ছে, তাদের কাছে কাংখিত বস্তু চাওয়া হচ্ছে এই আর কি।
এ কবরভিত্তিক ইবাদত তথা কবরপূজার অভিশাপ সুফীদের আশির্বাদে সারা মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ল। এমনকি মক্কা, মদীনা, হেজায ও নজদ এলাকাও এর থেকে বাদ পড়েনি। এর ব্যাপকতা যে কত ভয়াবহ ছিল তা বর্ণনাতীত। মূলত তখনকার আরব জাহানের বিভিন্ন এলাকা অন্যান্য মুসলিম দেশগুলোর ন্যায় আক্বীদাগত অধঃপতন ও ভ্রান্তির সাগরে নিমজ্জিত ছিল এবং যা বিভিন্ন তরীক্বাপন্থী পীর-মাশায়েখ ও স্বার্থান্বেষী মহল দ্বারা পরিচালিত হতো। ইরাকের বাগদাদ, নজফ ও কারবালা ছিল মাযারপূজার তীর্থভূমি। এরপর ভারতবর্ষ (বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) হল এ কবর বা মাযারপূজার সবচেয়ে উর্বরভূমি। অধিকাংশ আলেম-উলামা সুফীবাদে প্রভাবিত হওয়ার কারণে এ তিনটি দেশে মাযার ও কবরভিত্তিক উপাসনালয়গুলো প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে এবং আজ অবধি তা অব্যাহত গতিতেই বেড়েই চলেছে। মূলত ইবলিশ শয়তানের প্ররোচনায়, ইসলাম বিরোধী অপশক্তির সহযোগিতায় এবং পীরতন্ত্রের পৃষ্ঠপোষকতায় সমাজে চালু রয়েছে মূর্তিপূজার নব-সংস্করণ কবর পূজা, মাযার পূজা। প্রকৃতপক্ষে, পীরতন্ত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে এ কবর পূজার সৃষ্টি হয়েছে।
এ কালের মুসলিমদের মধ্যে বিশেষত এ উপমহাদেশীয় মুসলিমদের মধ্যে কবর পূজা, পীর পূজা প্রভৃতি শিক্ জাতীয় অনাচার-কুসংস্কারের অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেই মধ্যযুগীয় ধ্যান-ধারণা ও ভারতীয় হিন্দু সংস্কৃতি থেকে। মূলত আজকের সংস্কৃতির পুরোটাই হিন্দু সংস্কৃতির প্রভাবে সৃষ্টি হয়েছে। হিন্দুদের মন্দিরের গতি-প্রকৃতি এবং মঠ-শ্মশানের প্রতি দৃষ্টিপাত করলই তা সহজে আঁচ করা যায়। হিন্দুদের তীর্থ মন্দিরে রয়েছে সেবাদাসী, সন্ন্যাসী, সৌধ, দান ব্যবস্থা, সংস্কৃত ভাষা ও ধর্মশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, আবাসস্থল, পূজা মন্দির, সেনিটেশন ব্যবস্থা, রন্ধনশালা, সেবায়েতরূপী কর্মচারী, অফিস, উদ্যান প্রভৃতি নানা কিছু।
আদি ভারতীয়দের মধ্যে সেকালে গাছ পূজা, পাথর পূজা, সূর্য পূজা, অগ্নি পূজা ইত্যাদি প্রচলিত ছিল। কালে কালে সেসব রূপান্তরিত হয়েছে। হিন্দু মুনি-ঋষিগণ জনমানবহীন স্থানে গাছতলায় বসে ধ্যান-সাধনা করতেন। সেই গাছতলা দিনে দিনে ধর্মতলা হয়ে উঠত। মুনি-ঋষিগণের আশ্রম তৈরি হতো সেখানে। মন্দির তৈরি হতো এবং পূজা চলত। এভাবেই সেই স্থান হয়ে উঠত থান (আশ্রম) বা তীর্থস্থান। জনমানবহীন প্রান্তর বা বন-বাদাড় এভাবেই হয়ে ওঠে লোকালয়। মুনি-ঋষিদের আস্তানায় জুটে সাধু, সন্ন্যাসী, সেবায়েত-সেবাদাসী ইত্যাদি। সাধু বা সন্ন্যাসী বাবারাই হয়ে ওঠেন মন্দিরের পুরোহিত। তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মন্দিরের পূজা হতে শুরু করে তীর্থ কমপ্লেক্সের যাবতীয় বিষয়াদি চলে।
মুনি-ঋষিদের অনুকরণে লোকালয়েও পূজাস্থান তৈরি হয়। বাড়ির আঙ্গিনায় তুলসী, শেওড়া প্রভৃতি পূজা চলতে থাকে। কখনো বাড়ির সদরে একটা উঁচু ভিটায় কখনো-বা পুকুর পাড়ে আবার বাড়ির বাইরে অশ্বত্থ গাছতলায় পূজাবেদী নির্মাণ ক'রে তৈরি হয় দেব-দেবীর প্রতিমা। তীর্থস্থানের তীর্থ-মন্দিরেও এ দেব-দেবীর প্রতিমাই মুখ্য। এদের ঘিরেই তীর্থস্থান। এখানে যেসব মুনি-ঋষি, সাধু ইত্যাদি রয়েছে তারা সবাই উঁচুবর্গের হিন্দু তথা ব্রাহ্মণ। এ ব্রাহ্মণ সাধু পুরোহিতরা ক্ষত্রিয় রাজাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। ব্রাহ্মণ পুরোহিতের লালন-পালনের জন্য এবং আশ্রমের জন্য ক্ষত্রিয় রাজা ভূ-সম্পত্তি দান করে। দেবালয় তথা তীর্থমন্দিরের রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচার-প্রসার এ সব সম্পত্তির আয় থেকেই হয়। আর এ সম্পত্তি দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত হয়।
বিশ্বের অন্যান্য স্থানের মতোই প্রাচীন ভারতের লোকজনেরা প্রাকৃতিক শক্তি নিচয়ের পূজা করত। এ সবের হাত থেকে নিজেদের বাঁচানোর জন্যই তারা এ পূজা দিত। কালক্রমে যখন হিন্দুধর্মের নানা দেব-দেবীর পূজা শুরু হয়, তখন নানা কুসংস্কারাচ্ছন্ন লোকাচারের সৃষ্টি হয়। রোগ-শোক, দ্বন্দ্ব-সমস্যা, বিবাহ, শস্য ও ধন- সম্পদের হেফাজত, অভাব-অনটন থেকে রেহাই, পুত্রলাভ, কন্যাদায় মুক্তি, চাকরি প্রাপ্তি, পরীক্ষা পাস, মামলায় জয় লাভ ইত্যাদি নানা খেয়ালে মানুষ দেবতার আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হবার জন্য এ দেব মন্দিরে এসে পূজা দিতে থাকে। তাদের এ নিয়াত- মানত পূরণের জন্য তারা দেবতার ভোগ নিয়ে আসত। তারা চাল-ডাল, হাঁস-মুরগি, পাঁঠা, শস্য-ফলাদি, দুধ, অর্থকড়ি নানা কিছু দেবতার ভোগ হিসেবে নিয়ে আসত। আর দেব মন্দিরের পুরোহিতরা জনগণকে এ সব আনার জন্য উদ্বুদ্ধ করত। তারা বলত, 'এ সব লাভ করতে হলে শিব বা দুর্গার পূজা দিতে হবে, দেবতার ভোগ দিতে হবে, তারপরই আশীর্বাদ পেয়ে ধন্য হবে, নানা সমস্যা মুক্তি ঘটবে, স্বর্গবাসের ব্যবস্থা হবে, নরকমুক্তি হবে, সামাজিক ও পারিবারিক জীবনে সুখ-সম্পদ-শান্তি আসবে।' অজ্ঞ-মূর্খ হিন্দুরা কুটবুদ্ধির ব্রাহ্মণের কথায় ভুলে গিয়ে দেব-দেবীর বর বা আশীর্বাদ লাভে ধন্য হতে নিজের সর্বস্ব নিয়ে দেবালয়ে বা মন্দিরে হাজির হতো। আর এ সব দেবতার ভোগ মন্দিরের পুরোহিত, সাধু, সন্ন্যাসী, সেবাদাস, সেবাদাসী ইত্যাদি সকলে মিলে ভোগ করত। সেই ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।
মুসলিমদের মাঝে কোন কালেই বৃক্ষপূজা বা প্রতিমা পূজা ছিল না। আজকের বাংলাদেশে ইসলাম প্রচার হয়েছে নানা ইসলাম প্রচারকের মাধ্যমে। প্রাথমিকভাবে উঁচু বর্ণের হিন্দুদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা ও অন্যান্যরা সেসব ইসলাম প্রচারকদের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম হয় এবং তাঁদের স্থায়ীভাবে থাকার ব্যবস্থা করে দেয়। এভাবেই তাঁদের পক্ষে স্থায়ীভাবে আস্তানা গেড়ে ইসলাম প্রচার করা সম্ভব হয়। ধর্মচর্চা ও প্রচারের জন্য তাঁদের আস্তানায় খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁরা। তাঁদের মৃত্যুর পর এখানেই তাঁদের দাফন-কাফন করা হতো। আর এ মানুষদের কবরসমূহ দরগা বা মাযার রূপে মানুষের কাছে পরিচিতি পায়।
ঐসব বিশিষ্ট ইসলাম প্রচারকগণ মারা যাবার পর তাঁদের ভক্তকূল সেই আস্তানা ছাড়ল না। তারা সেখানে পড়ে রইল। সেসব কবরসমূহ (মাযার) যিয়ারত করতে তাঁদের ভক্তগণ দূর-দূরান্ত থেকে আসতে লাগল। আর এ ভক্তদেরকে মাযারে আসতে উদ্বুদ্ধ করল সেসব তথাকথিত খাদেম বা খাদেম-পীরগণ। তারা যেন উত্তরাধিকারসূত্রে তাঁদের (কবরস্থ ব্যক্তিদের) স্থান দখল করে বসল। মাযারে দান-খয়রাত করতে ভক্ত-অনুরক্তদেরকে উৎসাহিত করতে লাগল। আর অজ্ঞ মুসলমানরা নানা নিয়াত-মানত করে দরগা বা মাযারে টাকা-কড়ি, শিরনী, মোমবাতি, চাল-ডাল, লাউ, কুমড়া, গরু, মহিষ, উট, দুম্বা, খাসি, দুধ, মুরগী, ডিম, ভাত, নারিকেল, কলা ইত্যাদি নানা কিছু মাযারের উদ্দেশ্যে দান করতে লাগল। আর হিন্দু পুরোহিত ও অন্যান্যদের মতো মাযারের খাদেম-পীরেরা তা ভোগ করতে লাগল। উভয় পক্ষই তথাকথিত পীর-ওলি-আওলিয়া ও দেবতার নামে অজ্ঞ-নিরীহ ও সহজ-সরল মানুষের অর্থ-সম্পদ সবকিছু ভোগ করছে। এ হচ্ছে জনগণের মাল-কড়ি ছিনতাইয়ের সবচেয়ে মোলায়েম কৌশল।
হিন্দুদের মুনি-ঋষিদের গড়া পূজা মন্দির যেমন এককালে তীর্থস্থানের মর্যাদা পেল এবং রাজা, জমিদারদের দান-অনুদানে পুষ্ট হতে লাগল, তেমনি তথাকথিত ওলি-আওলিয়াদের মাযারও সাধারণ মানুষ ও আমীর-সুলতানগণের অর্থাৎ মুসলিম শাসনামলে রাজকীয় বা সরকারী পৃষ্ঠপোষকতায় ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল। জনকল্যাণের একটা অঙ্গ মনে করেই মুসলিম শাসকগণ ও ধনবান ব্যক্তিগণ দরগার জন্য প্রচুর ভূ-সম্পত্তি লাখেরাজ সম্পত্তিরূপে বরাদ্দ করেন। প্রথমদিকে দরগার খাদেমগণ কর্তৃক মাযার রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচর্যার জন্য ঐ সম্পত্তি তাদের দ্বারাই ভোগ-দখল হতো। পরবর্তীতে মাযার পরিচালনা বা ম্যানেজিং কমিটি তৈরি করে তার অধীনে সেসব সম্পত্তি ন্যস্ত করা হয় এবং উক্ত সম্পত্তি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে দেশ ও দশের সম্পত্তিরূপে পরিগণিত হয়। প্রথমদিকে কেবল দরগায় বাতি দেয়ার জন্য দরগার পরিচর্যাকারী খাদেমকে যে নিষ্করভূমি দেয়া হতো তাকে বলা হতো চেরাগী বা চেরাগী মহল। আজকাল বিদেশী এনজিও নামের প্রতিষ্ঠানগুলোর যাত্রা যেভাবে শুরু হয়েছে, খাদেম ও মাযারের যাত্রাও সেভাবেই শুরু হয়েছে। শুধু কি দরগায় বাতি দেয়া? সেখানে এখন হরেক রকম এতিমখানা, মাদ্রাসা, মক্তব, পুকুর, দিঘী, মসজিদ, মাযার, সৌধ প্রভৃতি রয়েছে। অর্থাৎ মাযার কমপ্লেক্স। ওলি-আওলিয়া-দরবেশের মৃত্যু দিবসে ও অন্যান্য সময়ে এখানে হালকা জিকির ও দু’আর আয়োজন হয়। ওলিগণের মৃত্যু দিবসে উরস হয়, দু'আ-জিকির এবং ওয়াজ মাহফিল হয়। এভাবে ইসলামী জলসা ও উরসের মাধ্যমে দিনে দিনে মাযারের প্রধান খাদেম হয়ে ওঠেন মাননীয় পীর খাদেম এবং এক পর্যায়ে কেবলই পীর। খাদেম আর থাকেন না। তখন খাদেম হয়ে ওঠে অন্যান্য নিচু স্তরের সেবায়েতরা। ওদের কেউ একজন হয় প্রধান খাদেম, তারপর এক সময় সেও হয়ে যায় পীর। এ রকম করেই চলতে থাকে বংশধারার মতো। বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পূর্বকালের ওলি-দরবেশগণ ছাড়া এদেশে যেসব পীর-ফকির রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে খাদেম কখনও পীর হয় না। এ সব ক্ষেত্রে পীর হয় পীরের ছেলে (বা ছোট ভাই) এবং পীরের বংশ সৃষ্টি হয়। তবে এ সব মাযারে সরকার প্রদত্ত কোন সম্পত্তি নেই। এলাকার ব্যক্তি বিশেষের দানকৃত সম্পত্তি বা মুরীদানদের নজরানা, ভেট প্রভৃতির আয় দ্বারা খরিদকৃত সম্পত্তিই এ সব মাযারের সম্পত্তি। মুরীদগণের থেকে প্রাপ্ত অর্থের দ্বারাই এ সব মাযার কমপ্লেক্স গড়ে ওঠে।
হিন্দুদের দেবমন্দির বা দেবালয়ের পুরোহিত আর মুসলিমদের মাযারের পীর-খাদেমদের চরিত্র একই প্রকৃতির। উভয়ই শোষক ও প্রতারক। সহজ-সরল ধর্মপ্রাণ (অথচ ধর্মে অজ্ঞ) মানুষকে ঠকানোই এদের লক্ষ্য। পুরোহিত বা সন্ন্যাসীবাবা নেমেছেন কাদা-মাটি আর খড়-কুটোর তৈরি কল্পিত প্রতিমা নিয়ে আর পীর-খাদেমরা নেমেছেন মৃত পীর-ফকীর-ওলী-আওলিয়া ইত্যাদি নিয়ে। হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরা মক্কেল আকৃষ্ট করার জন্য অর্থাৎ বিশেষ বিশেষ দেব-দেবীর ভক্ত সংখ্যা বাড়ানোর জন্য তাদের গুণকীর্তন করে থাকে। তাদের ওপর নানা অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করে থাকে। তারা এক এক দেব-দেবীর এক এক রকম অলৌকিক ক্ষমতার কিচ্ছা-কাহিনী বলে বেড়ায়। মাঝে-মধ্যে কিছু উদ্ভট প্রচারও করে থাকে। একইভাবে মুসলিমদের মাযারের পীর-খাদেমরাও নানা অপপ্রচার করে থাকে। মুসলিমদের মৃত পীরেরা মৃত হলেও তারা অদৃশ্যে থেকে মানুষের তথা মুরীদের উপকার করতে পারে, জীবিত অবস্থায় তারা নানা অলৌকিক কাজ করেছেন বলে প্রচার করা হয়। মূলত মাযার ব্যবসাকে রমরমা ও জমজমাট করে তোলার জন্য এ দেশে নানা মাযারের নানা পীর-ফকিরকে নিয়ে ভণ্ড-প্রতারকের দল নানা কিস্সা-কাহিনীর জন্ম দিয়েছে এবং দিয়ে চলেছে। এটা তো হল ধর্মীয় আবরণে মাযার সৃষ্টি ও মাযার ব্যবসা। এ দেশে রাজনৈতিক মাযারও আছে।
অর্থাৎ 'মাযার' এখন ব্যাপক অর্থে ব্যবহার হয়। আজকাল আর ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে সম্মানিত ব্যক্তি হতে হয় না। কোন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব মারা গেলে তার কবরকে 'মাযার' খেতাব দেয়া হয়। এটা করা হয় রাজনীতি ব্যবসাকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য। এ জাতীয় খেয়ালেই এখানে গড়ে উঠেছে বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মাযার। এ সব রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মাযারে কেবল সেই বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরাই আসা-যাওয়া করে থাকেন। অন্যরা এ সব মাযারে যেতে তেমন একটা আগ্রহী হন না। লক্ষ্যণীয় ব্যাপার হল, এ সব মাযারে আর্থিক ব্যবসার কোন চিন্তা-চেতনা নেই। এখানে আছে রাজনৈতিক ব্যবসার চিন্তা-ভাবনা। পীর-আওলিয়ার মাযারে যেমন তাদের দোহাই দিয়ে খাদেম-পীরেরা অর্থ হাতিয়ে নেয়, তেমনি রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের মাযারে সেই বিশেষ ব্যক্তির দোহাই দিয়ে ভোট আদায়ের প্রচেষ্টা নেয়া হয়। ভক্ত-সমর্থকদের জন্য এরা হলেন রাজনৈতিক পীর।
সুদীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে অসংখ্য মাযার গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে কিছু মাযার সত্যিকার অর্থে কবরের উপরে নির্মিত মাযার, আর বাকিগুলো মিথ্যা মাযার। এখানে বেশকিছু কাল্পনিক মাযার দেখতে পাওয়া যায়। এগুলো পরিচিত-অপরিচিত নানা নামে গড়ে তোলা হয়েছে। পরিচিত নামের মাযারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বায়েজিদ বোস্তামীর মাযার, বার আওলিয়ার মাযার ইত্যাদি। মাযার নামক এ দুটি প্রতিষ্ঠানে বার আওলিয়া বা বায়েজিদ বোস্তামী কারুরই কোন কবর নেই। এগুলো হল কবরহীন মাযার বা সেসব ব্যক্তিবর্গের নামে এবং স্মরণে গড়ে তোলা হয়েছে।
আবার এ দেশে বেশকিছু মাযার নানা অপরিচিত নামে গড়ে উঠেছে এবং উঠছে এখনও, ভবিষ্যতেও গড়ে উঠবে। এ সব মাযার যেসব নামে গড়ে তোলা হয় সেসব নামের আগে বা পরে 'শাহ' শব্দটি জুড়ে দেয়া হয়। অনেক কৃর্তিমান ইসলাম প্রচারক ছিলেন যাঁদের নামের আগে বা পরে 'শাহ' শব্দটি ছিল। এ কারণেই যারা ভুয়া বা কাল্পনিক মাযার গড়ে তুলতে আগ্রহী হয়, তারা জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য এবং মাযারটিকে বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য কল্পিত নামের আগে বা পরে 'শাহ' শব্দটি জুড়ে দিয়ে বিভিন্ন নাম তৈরি করে সাইনবোর্ড লাগিয়ে, গেইট দিয়ে, দান বাক্স বসিয়ে, কবর নামক ভুয়া স্থানটি পাকা করে, ইমারত গড়ে, খাদেমের থাকার ঘর বানিয়ে, মজলিসের জায়গা (খানকাহ) তৈরি করে রীতিমতো একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। যেখানে কোন কবর ছিল না, জঙ্গল ভরা ছিল, মানুষ গরু-ছাগল চরাত অথবা কোন কারণে উঁচু ভিটা হয়ে গেছে। সাধারণত সে রকম স্থানে মাযার তৈরি হয়। রাস্তার পার্শ্বে যেখানে লোক চলাচল বেশি হয়, বেশিরভাগ সময়ে সেসব স্থানে মাযার গড়ে ওঠে। বলা নেই, কওয়া নেই হঠাৎ হয়ত দেখা গেল কেউ একজন রাতের আঁধারে লোকচক্ষুর অগোচরে কাউকে ওলি বানিয়ে তার নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছে। এর ব্যবস্থাপক, উদ্ভাবক ও তার অনুচরবৃন্দ এখন নানা স্থানে মানুষের কাছে আজগুবি কাহিনী বলে বেড়াচ্ছে সেই কাল্পনিক ওলি বা পীর সম্পর্কে। আর ধীরে ধীরে সেখানে বাতি দেয়া হতে শুরু করে ওরশ পর্যন্ত হতে থাকে।
এমন একটি ঘটনার কথা শুনুন (মিথ্যা পীরের সত্য কাহিনী): দেখুন! মানুষের বিবেক নিয়ে শয়তান কিভাবে খেলা করে। এমনকি আসমান-যমীনের স্রষ্টার ইবাদত থেকে মানুষের ইবাদত, মৃতের তা'যীম... বরং প্রাণী এবং জড়জন্তুর তা'যীমের দিকে আহ্বান করে।
কখনো একটি মিথ্যা কবর প্রতিষ্ঠা করে তার প্রচার করা হয়। মানুষের কাছে তার কারামতের কথা নানাভাবে উল্লেখ করা হয়। যাতে করে এ দ্বারা নির্দিষ্ট ব্যক্তিরা লাভবান হতে পারে। শেষ পর্যন্ত মানুষ তা বাস্তব মনে করে। অতঃপর শুরু হয় শির্কের খেলা। তাওয়াফ হয়, দু'আ চাওয়া হয়, নযর-মানত হয়... অন্যান্য কবরে যা হয় এখানেও তাই। চাই উক্ত কবর যার নামে প্রচার করা হয় তা সত্য হোক বা মিথ্যা। জনৈক ব্যক্তি শায়খ বরকতের এ রকমই একটি কিচ্ছা উল্লেখ করেছে। ঘটনাটির সূচনা হয় দু'জন যুবকের দ্বারা।
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া আদেল ও সাঈদ। পড়াশোনা শেষ করে একটি গ্রামে তারা স্কুলের শিক্ষকতা কর্মে নিয়োজিত। গ্রামটিতে কবর ও মাযার খুব বেশি। মানুষ ওগুলোর তা'যীম করে, নযর-নিয়ায পেশ করে, উরস করে...।
স্কুলে যেতে হয় বাসে চড়ে। একদিন বাসে চড়ে যাওয়ার সময় আদেল ও সাঈদ পারস্পরিক কথাবার্তায় লিপ্ত। এমন সময় জনৈক বৃদ্ধ বাসে উঠে ভিক্ষা চাইতে লাগল। গায়ে তার হাজার তালি লাগানো পোষাক। তাও ময়লা মাখা। বয়সের ভারে কাঁপছে। দেখে মনে হচ্ছে অর্ধপাগল, মুখের লালা বারবার মুছে ফেলছে হাতের আস্তিনে। গাড়িতে চড়ে সে যাত্রীদের নানাভাবে উদ্বুদ্ধ করছে, তাদেরকে ভয় দেখাচ্ছে, দাবী করছে তার দু'আ সর্বদা কবুল হয়ে থাকে, সে যদি বদ্দু'আ করে তবে বাস উল্টে যেতে পারে...।
সাঈদ এমন পরিবারে প্রতিপালিত হয়েছে যারা ওলী-আউলিয়া, তথাকথিত পীর-ফকীর, দরবেশ, কুতুব, আবদাল... দ্বারা প্রভাবিত। সে ভীত ও পেরেশান হয়ে সাথী আদেলকে অনুরোধ জানায়, ভাই কিছু দিয়ে দাও। কেননা, এ দরবেশ খুব বরকতময় লোক। সর্বদা তার দু'আ কবুল হয়। হতে পারে বাস্তবিকই তার বদ্দু'আয় বাস উল্টে যাবে।
আদেল তার কথায় খুবই আশ্চর্য হল। বলল, হ্যাঁ, আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের লোকেরা কারামতে বিশ্বাস করে; কিন্তু নেককার ও পরহেজগার লোকদের কারামত। যারা লোক দেখানোর জন্য আমল করে না। আল্লাহর সন্তুষ্টি কামানার্থে গোপনে সৎআমল করে। এ সমস্ত ভণ্ড ও ভবঘুরে লোকদের কারামত নয়। যারা নিজেদের দ্বীন বেচে অর্থ উপার্জন করে।
সাঈদ চিৎকার করে উঠল। কি তুমি আজেবাজে কথা বলছ! এই দরবেশের কারামতের কথা ছোট-বড় সব লোকেরই জানা! একটু পরেই দেখবে তিনি এখন বাস থেকে নেমে যাবেন। আর আমরা গ্রামে পৌঁছার আগেই তিনি হেঁটেই আমাদের আগে পৌঁছে যাবেন। এটা তাঁর কারামত। তুমি কি ওলীদের কারামতকে অস্বীকার কর?
আদেল: আমি কখনই কারামতের অস্বীকার করি না। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে থেকে যাকে ইচ্ছা সম্মানিত করতে পারেন। কিন্তু এটা হতে পারে না যে, এই কারামতের দরজা দিয়ে আমাদের মধ্যে শির্ক প্রবেশ করবে- আমরা এ সমস্ত মানুষকে, মৃত ওলীদেরকে আল্লাহর সাথে অংশীদার মনে করব? সৃষ্টি, নির্দেশ, জগতের পরিবর্তন ইত্যাদি ক্ষমতা আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন- এ বিশ্বাস করব? আর তাদেরকে আমরা ভয় করব, তাদের ক্রোধ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করব? এটা সম্ভব নয়।
সাঈদ: তুমি কি বিশ্বাস করা না যে, শায়খ 'আহমদ আবূ সারুদ' হজ্জে এসে আরাফাতের দিন (তুরস্কের) ইস্তাম্বুল গিয়ে নিজ পরিবারের সাথে খাদ্য খেয়ে আবার আরাফাতে ফিরে এসেছেন?
আদেল: সাঈদ! আল্লাহ তোমার বিবেকে বরকত দিন! তুমি কি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ কথাই শিখেছ?
সাঈদ: মনে হয় আমরা হাঁসি-ঠাট্টা শুরু করেছি।
আদেল: আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না। কিন্তু সাধারণ মানুষের অবান্তর কথা আর তাদের কুসংস্কারের কোন প্রতিবাদ করা যাবে না, এমন তো নয়।
সাঈদ: কিন্তু এ সমস্ত কারামতের কথা শুধু সাধারণ মানুষের মুখেই শোনা যায় না; বড় বড় আলেম ওলামগাণও এ সমস্ত মাযার ও দরবারের অলৌকিক ঘটনাবলী বর্ণনা করে থাকেন। বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে এ সমস্ত বিষয়ে ব্যাপকহারে আলোচনা হয়।
আদেল: ঠিক আছে সাঈদ, তোমার কি মত আমি যদি বাস্তবে প্রমাণ করে দিতে পারি যে, এ সমস্ত মাযার ও দরবারের অধিকাংশই মিথ্যা ও কাল্পনিক? এ সব মাযারের অধিকাংশের হাক্বীকত নেই- কবর নেই, লাশ নেই, কোন ওলী নেই। কিছু মিথ্যাচার ও অপপ্রচারের কারণে মানুষের কাছে তা সত্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
এ কথা শুনে সাঈদ ক্রোধে ফুঁসে উঠল এবং বলতে লাগল, নাউযুবিল্লাহ! নাউযুবিল্লাহ! উভয়ে কিছুক্ষণ নীরব থাকল। বাস তাদেরকে নিয়ে গ্রামে প্রবেশের আগে চৌরাস্তার মোড়ে যখন পৌঁছল তখন আদেল সাঈদকে লক্ষ্য করে বলল, সাঈদ! রাস্তার এ মোড়ে কি কোন ওলীর কবর বা দরবার বা মাযার আছে?
সাঈদ: না, এটা বোন যুক্তিসংগত কথা হল না কি, একজন ওলীকে চৌরাস্তায় বা রাস্তার মোড়ে দাফন করা হবে?
আদেল: তাহলে তোমার কি মত, যদি আমরা গ্রামে প্রচার করে দেই যে, এই চৌরাস্তার জনৈক নেক ব্যক্তির পুরাতন কবর আছে, যার চিহ্ন আজ মিটে গেছে এবং নষ্ট হয়ে গেছে? এরপর আমরা তার কারামতির কিছু ঘটনা, তার কাছে দু'আ কবুল হওয়ার কিছু গল্প মানুষের সামনে পেশ করব। দেখি মানুষ বিশ্বাস করে কি না? আমি দৃঢ় বিশ্বাস রাখি মানুষ এ ব্যাপারটিকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করবে; বরং হতে পারে পরবর্তী বছর তার এখানে একটি বিরাট মাযার বা দরবার প্রতিষ্ঠা করে ফেলবে। এরপর শুরু হবে সেখানে শির্ক। অথচ এখানে শুধু মাটিই মাটি; যদি ওরা যমীনের পাতাল পর্যন্ত খনন করে তো কিছুই পাবে না।
সাঈদ: কি সব আজেবাজে কথা বলছ? তুমি কি মনে করছ মানুষ এতই বোকা ও নির্বোধ?
আদেল: ঠিক আছে, তুমি যদি আমাকে এ ব্যাপারে সহযোগিতা কর এবং মত দাও তাতে তো তোমার কোন ক্ষতি নেই? নাকি তুমি ফলাফলের ব্যাপারে আশংকা করছ?
সাঈদ: না, ভয় করি না। তবে বিষয়টিতে আমি তেমন সন্তুষ্ট নই।
আদেল: বুঝা গেল তোমার মত আছে। তুমি কি মনে কর যদি আমরা প্রস্তাবিত ওলীর নাম রাখি 'শায়খ বরকত'?
সাঈদ: ঠিক আছে, তুমি যা চাও।
এরপর দু'বন্ধু বিষয়টি খুব ধীরে প্রচার করার সিদ্ধান্ত নিল। এ ক্ষেত্রে তারা প্রথমে চায়ের স্টল সেলুন প্রভৃতি দোকান থেকে শুরু করবে। কেননা, এ সব স্থান থেকেই যেকোন সংবাদ দ্রুত প্রসার হয়। তারা গ্রামে পৌঁছে সলিমের সেলুনে গেল। তার সামনে ওলী-আউলিয়াদের কথা আলোচনা করার পর বলল, জনৈক নেক ওলী অনেক বছর থেকে সমাধিস্থ আছেন। অথচ আল্লাহর দরবারে তাঁর মর্যাদা অনেক বেশি; কিন্তু তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করার লোকের সংখ্যা খুব কম।
সেলুনের নাপিত জিজ্ঞেস করল, কোথায় সে কবরটি? তারা বলল, গ্রামে প্রবেশের আগে যে চৌরাস্তা রয়েছে তার মোড়ে!
নাপিত: আল্লহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর সব তা'রীফ, তিনি আমাদের গ্রামে একজন ওলী দিয়ে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন। আমি বহুকাল থেকে এ রকম একটা আশা করছিলাম। এটা কি কোন যুক্তিসংগত কথা হতে পারে যে, পার্শ্ববর্তী 'নতুন গ্রামে', 'নারায়নপুর' গ্রামে দশ জনের বেশি ওলী-আউলিয়া আছেন, আর আমাদের গ্রামে একজনও থাকবে না?
আদেল: সলিম ভাই! 'শায়খ বরকত' খুব বড় মাপের ওলী ছিলেন। আল্লাহর দরবারে তাঁর খুব মান-মর্যাদা ছিল।
নাপিত চিৎকার করে উঠে বলল, শায়খ বরকত (ক্বাদ্দাসাল্লাহু) সম্পর্কে আপনি এত কিছু জানেন, তারপরও চুপ রয়েছেন?
এরপর শায়খ বরকতের খবর শুষ্ক ঘাসে আগুন দেয়ার মত গ্রামের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ল। মানুষের মুখে মুখে সে কথা আলোচনা হতে লাগল। এমনকি মানুষ স্বপ্নেও তা দেখতে লাগল।
বিভিন্ন চায়ের দোকানে, মজলিসে, বাজারে, মসজিদে... 'শায়খ বরকতের' নানা বরকতের কথা, তার মাথার চুল কত দীর্ঘ ছিল, পাগড়ী কত লম্বা ছিল, অসংখ্য-অগণিত কারামতির কথা- আযানের সময় হওয়ার সাথে সাথে মিনার নীচে নেমে আসত... ইত্যাদি... ইত্যাদি।
স্কুলের শিক্ষকদের মাঝেও বিষয়টি বাদ-প্রতিবাদের সাথে আলোচিত হতে লাগল। যখন সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন শিক্ষক সাঈদ ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে চিৎকার করে বলে উঠল, 'ওহে বিবেকবানের দল! আপানারা ছাড়ুন এ সমস্ত কুসংস্কার ও অমূলক বিশ্বাসের কথা!' শিক্ষকগণ সমস্বরে বলে উঠল, 'কুসংস্কার... তুমি বলতে চাও এখানে শায়খ বরকত নেই?'
সাঈদ: অবশ্যই নেই। এ ধরনের কোন কবর এখানে নেই। এটি একটি অপপ্রচার। চৌরাস্তার মোড়ে শুধু মাটি আর মাটি। না কোন শায়খ বা ওলী বা দরবার ছিল বা না আদৌ আছে।
শিক্ষকগণ যেন কেঁপে উঠলেন। একযোগে বললেন, 'কি বল তুমি? 'শায়খ বরকত' সম্পর্কে এমন কথা বলার স্পর্ধা তোমার হল কিভাবে? 'শায়ক বরকতের' বরকতে গ্রামের পশ্চিমের নদীটি ভরাট হয়েছে। তিনি...।'
তাদের চেঁচামেচীতে সাঈদ পেরেশান হয়ে উঠল। তারপরও সে তাদেরকে লক্ষ্য করে বলল, আপনারা নিজের বিবেক বিক্রয় করে দিবেন না। আপনারা শিক্ষিত ও বিবেকবান মানুষ। কোন কবর বা মাযার সম্পর্কে একজন এসে কিছু বলল বা স্বপ্নে শয়তান কিছু দেখাল আর তাই বিশ্বাস করে দিবেন?
এতক্ষণ স্কুলের প্রধান শিক্ষক নীরব ছিলেন। তিনি আলোচনায় যোগ দিলেন। বললেন, 'শায়খ বরকতের গুণাগুণ আছে এবং তা নিশ্চিত। তুমি কি গতকালের পত্রিকা পড়নি?' সাঈদ আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, 'পত্রিকাতেও! কি লেখা হয়েছে তাতে?'
প্রধান শিক্ষক পত্রিকা বের করে সকলের সামনে পাঠ করেছেন। পত্রিকার সবচেয়ে বড় শিরনাম হচ্ছে, 'শায়খ বরকতের দরবার আবিস্কার'। লেখা হয়েছে: 'শায়খ বরকত (দামাত বারাকাতুহু) ১১০০ হি. সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি খালেদ বিন ওয়ালীদের ৩৩তম অধঃস্তন সন্তান। অনেক উলামায়ে কেরামের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যেমন উমুক... উমুক... উমুক...। তিনি তুর্কী সৈন্য বাহিনীর সাথে খৃষ্টানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরীক হয়েছেন। যুদ্ধ যখন ভীষণ আকার ধারণ করে, তিনি খৃষ্টান বাহিনী লক্ষ্য করে একটি ফুঁ মারেন। সাথে সাথে ঘূর্ণিঝড় খৃষ্টান বাহিনীর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। ঝড় তাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে একশ মিটার দূরে নিক্ষেপ করে। সবাই আর্তচিৎকার করতে করতে রক্তাক্ত অবস্থায় ধূলায় লুটিয়ে পড়ে...।'
সাঈদ: মাশাআল্লাহ! শায়খ বারকত সম্পর্কে সাংবাদিক সাহেব এত সূক্ষ্ম বিবরণ পেলেন কোথায়?
প্রধান শিক্ষক: এগুলো সত্য কথা। তুমি কি মনে কর এ সব কথা তার বাপের বাড়ি থেকে নিয়ে এসেছে? এগুলো ইতিহাস...।
সাঈদ: কিন্তু এ সব দাবীর পক্ষে দলীল থাকা জরুরী। যেকোন দাবী এলেই তার বিশুদ্ধতা যাচাই করা আপনার উপর আবশ্যক। অন্যথা যে কেউ যা ইচ্ছা দাবী করতে পারে... কবর... ওলী-আউলিয়া, কারামাত...।
তারপর সাঈদ চিৎকার করে বলে উঠল, 'আপনারা আমার সুস্পষ্ট কথা শুনুন, শায়খ বরকত নামের এ দরবার বা মাযার একটি মিথ্যা ও অপপ্রচার মাত্র। আমি এবং স্যার আদেল মিলে এটি উদ্ভাবন করেছি। প্রকৃতপক্ষে এখানে কিছুই নেই। আমাদের উদ্দেশ্য হল, মানুষের মূর্খতা এবং ভ্রষ্টতা যাচাই করে দেখা। স্যার আদেল আপনাদের সামনে আছেন তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন!'
শিক্ষকগণ আদেলের দিকে দৃষ্টি ফিরিয়ে বললেন, এ লোকও তো তোমার মতো বিতর্ক পছন্দ করে। সব বিষয়ে দলীল চায়। সে তো ওলী-আউলিয়ার দুশমন। তুমি আর আদেল যা-ই বল না কেন, আমরা বিশ্বাস করি শায়খ বরকত (দামাত বারাকাতুহু) যুগ যুগ ধরে এখানে রয়েছেন। দুনিয়ার কোন স্থান ওলী-আউলিয়া, পীর-দরবেশ, গাউস-কুতুব থেকে খালি নয়। তোমার বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা থেকে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় কামনা করি।
সাঈদ ও আদেল নিশ্চুপ হয়ে গেলেন। ক্লাশের বেল বেজে উঠল। সবাই নিজ নিজ শ্রেণী কক্ষে চলে গেলেন।
শিক্ষক সাঈদ যা দেখছেন এবং শুনছেন তাতে অস্থির হয়ে উঠলেন। চিন্তা করছেন শায়খ বরকত... কারামতী... সম্ভব... অসম্ভব? এটা কি সম্ভব এত লোক সবাই ভুলের মধ্যে রয়েছে? পত্রিকার রিপোর্ট মিথ্যা?
আশ্চর্যের বিষয়, এলাকার বুযুর্গ, আলেম-ওলামাগণ তো কিছু দিন আগে চৌরাস্তার মোড়ে শায়খ বরকতের নামে উরস মোবারকও উদ্যাপন করলেন? কিন্তু শায়খ বরকত তো শিক্ষক আদেলের পক্ষ থেকে বানোয়াট একটি নাম... কিন্তু এটা কি করে সম্ভব যে, এত লোক সবাই প্রলাপ বকছে? অসম্ভব... আসম্ভব...।
ধীরে ধীরে সাঈদের মগজে নতুন চিন্তা প্রবেশ করতে লাগল। হয়তো শায়খ বরকত আছেনই। ওস্তাদ আদেল হয়তো আগে থেকেই ব্যাপারটা জানতেন। কিন্তু মানুষকে সন্দেহে ফেলার জন্য এখন হয়ত বলছেন, 'আমি নিজে 'শায়খ বরকত' নামে নতুন কিছু উদ্ভাবন করেছি।'
সাঈদ স্যার বিষয়টি নিয়ে খুব চিন্তা-গবেষণা করলেন। এ থেকে বের হওয়ার জন্য শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলেন। কিন্তু কোন কাজ হল না। তার মগজে বিষয়টি যেন ভালবাবেই স্থান পেয়েছে।
পরবর্তী দিন... পরের দিন... বিষয়টি নিয়ে স্কুলে আলোচনা-পর্যালোচনা হতে থাকল। তখন ছিল শিক্ষা বর্ষের শেষের দিক। বাৎসরিক ছুটি হল। শিক্ষকগণ নিজ নিজ এলাকায় ছুটি কাটাতে চলে গেলেন।
নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হল। শিক্ষকগণ দীর্ঘ ছুটি কাটিয়ে কর্মস্থলে ফিরে এসেছেন। আদেল ও সাঈদ আগের মত বাসে চড়ে গ্রামের স্কুলে যাচ্ছেন। আদেল স্যার 'শায়খ বরকতের' বিষয়টি বেমালুম ভুলেই গিয়েছেন। অথচ তিনিই এ ঘটনার জন্মদাতা।
কিন্তু বাস যখন গ্রামের প্রবেশ পথে সেই চৌরাস্তায় পৌঁছেছে, তখন আদেল লক্ষ্য করলেন, শিক্ষক সাঈদ যেন গুণগুণ করে কি কি দু'আ যিকির পাঠ করছেন।
ওদিকে স্যার আদেল বিস্ময়ে হা হয়ে গেলেন। তিনি একি দেখছেন? চৌরাস্তার মোড়ে কত সুন্দর মাযার বানানো হয়েছে। মাযারের উপর আকাশচুম্বী বিশাল গম্বুজ ঝলমল করছে। পাশে তুর্কী স্টাইলে বানানো সুবিশাল মসজিদ।
আদেল মুচকি হেঁসে মনে মনে বলল, মানুষ কত নির্বোধ! শয়তান তাদেরকে শিকে লিপ্ত করার ক্ষেত্রে কতই না কামিয়াব হয়েছে! তিনি স্যার সাঈদকে হাসিতে শরীক করার উদ্দেশ্যে তার দিকে নজর দিলেন, কিন্তু একি তিনি তো দু'আর জগতে ডুবে আছেন...। এক সময় তিনি চিৎকার করে বাস চালককে অনুরোধ করছেন, এখানে একটু থাম। তারপর তিনি দু'হাত উঠিয়ে শায়খ বরকতের রূহের উপর ফাতিহাখানি পাঠ করলেন...।
টিকাঃ
১. 'তীর্থযাত্রী', 'তীর্থযাত্রা' এ শব্দগুলো মুসলিমদের শব্দ নয়, মুসলিম সংস্কৃতির-কৃষ্টির কোন পরিভাষাও নয়। প্রকৃতপক্ষেই এ সংস্কৃত শব্দ 'তীর্থ' মুসলিম পরিভাষায় নেই। 'তীর্থ' যে ভাষার শব্দ সে ভাষার অভিধানে 'তীর্থ' শব্দের যে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, তার বাংলা করলে দাঁড়ায়, 'তীর্থ' মানে পূণ্যস্থান (মিলন তীর্থ), হিন্দু দেবতা বা মহাপুরুষদের লীলা ক্ষেত্র বা অধিষ্ঠানভূমি বা বাস ভূমি, পাপ মোচনের স্থান (A place for Pilgrimage)। 'তীর্থ' অর্থ গুরু, পণ্ডিত ইত্যাদি। ব্যাকরণ তীর্থ ও কাব্য তীর্থ প্রভৃতি শব্দ গুরু বা পণ্ডিত অর্থযুক্ত। ড. অ্যান্নাডেল তাঁর Concise English Dictionary-তে তীর্থযাত্রীর সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে, 'একজন ভ্রমণকারী, যে তার দেশ থেকে দূরে অবস্থিত কোন মন্দির, গীর্জা বা পবিত্র স্থান পরিদর্শন করতে আসে অথবা কবরস্থ কোন বিশেষ ব্যক্তিত্বের প্রতি তাদের শ্রদ্ধা জানাতে আসে, এ সংজ্ঞাগুলোর কোন একটিও মুসলিমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এদিকে বাংলা একাডেমী 'তীর্থ'-এর অর্থ লিখতে গিয়ে তীর্থ শব্দকে খতনা করে মুসলিম করেছেন, কিন্তু কালিমা পড়াননি। বাংলা একাডেমী 'তীর্থ' শব্দের অর্থ লিখেছে 'পাপ মোচন' আর ব্রাকেটে লিখেছেন (মক্কা তীর্থ)। নকল করতেও দক্ষতা লাগে, সে দক্ষতাও বাংলা একাডেমী দেখাতে পারেনি। মক্কায় মুসলিমরা তীর্থ করতে যান না, যান হজ্জ বা ওমরা করতে। মুসলিমদের অভিধানে তীর্থ শব্দই নেই, কোন মুসলিম যদি মক্কা তীর্থ, মদীনা তীর্থ বা হৃদয় তীর্থ লেখেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মক্কা, মদীনা ও হৃদয়কে তীর্থ অভিধায় অভিহিত করে অজ্ঞাতে একটা গুনাহের কাজ করা হয়। আবার, 'তীর্থের কাক'ও পরিত্যাজ্য। তীর্থকেই যখন স্বীকার করি না, তখন তীর্থের কাক আর চিলকে তো গ্রহণ করতে পারি না। যাহোক, 'তীর্থ' যাদের সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের জন্য যথার্থ শব্দই 'তীর্থ', আমাদের জন্য নয়।
২. হিন্দু বর্ণাশ্রম প্রথা অনুযায়ী চতুর্বর্ণের দ্বিতীয় বর্ণ।
📄 মানুষ যায় করতে কবর পূজা, সেখান থেকে জাহান্নাম খুব সোজা
সমাধিস্থকরণের সময়ে ও তৎপরবর্তীকালে মৃতকে সম্মান দেখাতে ভাবগাম্ভীর্যের সাথে ভক্তিমূলক ধর্মানুষ্ঠান সম্পাদন ও কবরকে বিশেষভাবে শোভিতকরণের মাধ্যমে সজ্জিত সমাধি নির্মাণের কারণে মানবীয় ইতিহাসের অধিকাংশ সময় সত্য ধর্মে বিভিন্ন ধরনের বিভ্রান্তির সূত্রপাত ঘটেছে। এর ফলস্বরূপ, মানবজাতির বেশিরভাগই কোন না কোন ধরনের কবর পূজার সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। পুরো মানবজাতির প্রায় এক চতুর্থাংশের এক তৃতীয়াংশ জুড়ে রয়েছে চীনদেশবাসী; আর এদের অধিকাংশের ধর্ম মূলত দেবতাজ্ঞানে পূর্বপুরুষদের পূজা করার ধর্ম। তাদের বেশিরভাগ ধর্মানুষ্ঠান কবরকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ও পূর্বপুরুষদের প্রতিনিধিত্বমূলক। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টান ধর্মের পুণ্যবান ব্যক্তিদের কবরসমূহ পবিত্র স্থান (মন্দির বা গীর্জা ইত্যাদি) হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। আর এ স্থানগুলোতে উপাসনাস্বরূপ ব্যাপকভাবে প্রার্থনা, বলিদান (দেবতার উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত বস্তু বা প্রাণী), তীর্থযাত্রা ইত্যাদি সম্পন্ন করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় মুসলমান শাসক শ্রেণী ও জনগণ ইসলামের মূল বিশুদ্ধ আক্বীদা-বিশ্বাস থেকে বিচ্যুতি লাভ করে। ফলে অমুসলিমদের পৌত্তলিক (শিক্কী) প্রথা ও চর্চাসমূহ এ সব নাম সর্বস্ব মুসলিম কর্তৃক সাদরে গৃহীত হয়। 'আলীর (রা.)-মতো সাহাবী, ইমাম আবূ হানীফা ও ইমাম আশ-শাফী' (রাহি.)-এর মতো প্রধান ফক্বীহগণ এবং সুফী হিসেবে খ্যাত জুনাইদ বাগদাদী ও 'আব্দুল কাদির জীলানীর মতো 'ওলীদের কবরের উপর বিশাল আকারের সৌধ (গম্বুজ) নির্মাণ করা হয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতা পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মাদ আলী জিন্নাহ এবং সুদানের তথাকথিত মাহ্দীর কবরের উপরও অতি সাম্প্রতিক প্রথাগত সেই সমাধি নির্মিত হয়েছে। এ সকল সৌধের চারদিকে তাওয়াফ করার উদ্দেশ্যে বর্তমানে অনেক অজ্ঞ মুসলিম জনসাধারণ বহুদূর থেকে আগমন করে থাকে। এমনকি অনেকেই এ সমাধি তথা মাযারগুলোর ভিতরে বা বাইরে অবস্থান করে মৃতের নিকটে প্রার্থনা নিবেদন করে। তাছাড়া, এ সব জায়গায় কেউ কেউ পশু-পাখি নিয়ে এসে ধর্মীয় বা মৃতের উদ্দেশ্যে তথা সংশ্লিষ্ট মৃত ব্যক্তিকে সন্তুষ্ট করার নিমিত্তে জবেহ্ করে। কবরে প্রার্থনাকারীর অধিকাংশই এ মিথ্যা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণ করে যে, সৎকর্মপরায়ণ মৃত ব্যক্তিরা যেহেতু আল্লাহ্র অতি নিকটবর্তী তাই অন্যান্য জায়গায় 'ইবাদাত করার চাইতে তাঁদের নিকটে বা আশেপাশে অবস্থান করে ইবাদাতের কর্ম সম্পাদন করলে তার গ্রহণযোগ্যতা আল্লাহ্ তা'আলার কাছে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এছাড়া, এ সকল বিশেষ মৃতব্যক্তিদের প্রতি সর্বদা শান্তি অবতীর্ণ হওয়ায় এদের আশেপাশের সব কিছু নিশ্চয়ই শান্তি লাভে ধন্য হয় বলেও দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করা হয়। এমনকি যে জমির উপর ঐ সমাধি বা মাযার নির্মিত হয়েছে তাতে আল্লাহ্র করুণাধারা প্রবাহিত হয়। এ সকল বিশ্বাসের জের ধরেই কুবর ও মাযার পূজারীরা কিছু অতিরিক্ত শান্তি বা করুণা লাভের আশায় কবর ও মাযারের দেয়ালে হাত মুছে তা নিজের শরীরের উপর বুলায়। কবরবাসীর উপর বর্ষীয়মান শান্তি ও করুণার কারণে এর আশেপাশের স্থানও প্রভাবিত এবং এ স্থানের মাটিতে রোগ আরোগ্যের ক্ষমতা রয়েছে- এ ভ্রান্ত বিশ্বাসে ভর করে কবর পূজারীরা প্রায়ই তাদের নির্দিষ্ট কবরের চারপার্শ্বের মাটি সংগ্রহ করে। ইমাম হুসাইন কারবালা প্রান্তরে যেখানে শহীদ হন সেখানকার কাদা মাটি শিয়া সম্প্রদায়ের বিশেষ কয়েকটি শাখার অধিকাংশই সংগ্রহ করে। তারপর মাটিকে আগুনে সেঁকে ছোট ছোট পাতখণ্ড তৈরি করে এবং সলাতের সময় তার উপর সিজদা করে।
মাযার ব্যবসা তথাকথিত আল্লাহর ওলিদের নিয়ে জমে ভাল। এ দেশের মানুষেরা নিজ ঘরের পাশে, পুকুর পাড়ে বা নিত্য আসা-যাওয়ার পথের ধারে যে কবর পড়ে আছে তাতে হয়ত শুয়ে আছেন মাতা, পিতা, চাচা, চাচী, ভাই, বোন, দাদা, দাদী, নানা, নানী, ছেলে, মেয়ে ইত্যাদি অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন কিংবা প্রতিবেশী কেউ; কিন্তু তাদের কবর যিয়ারত করায় মানুষের আগ্রহ নেই। অথচ যিয়ারত পাবার হক এদেরই সবচেয়ে বেশি। আর তারাই কিনা দৌড় দেয় কোন অজানা-অচেনা মাযার যিয়ারতের নিয়াত-মানত করে। এ আচরণ তো একজন মুসলিমের নয়। নিয়াত করে কোন মাযারে যাওয়া তথা মাযারের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করা বৈধ নয়। অথচ এ দেশের মূর্খ-বর্বর মানুষেরা পালে পালে শত-সহস্র মানুষ লঞ্চে-বাসে-মটরে-ট্রাকে-পদব্রজে গিয়ে সারা বৎসর ধরে বা বৎসরের একটা বিশেষ দিনে বিশেষকরে উরসের সময়ে বা মাহফিলের সময়ে মাযার যিয়ারত করে, যা জঘন্যতম কাজ এবং তাওহীদ বিরোধী ও জঘন্যতম পাপ।
এ দেশের মানুষ মাযারে গিয়ে পীরের আশ্রয় নেয়। ভক্তরা গান ধরে, 'খাজারে তোর দরবার হতে, কেউ ফেরে না খালি হাতে।' কোন কোন ভক্ত বলে, 'দয়াল বাবা...'। কোন ভক্ত হয়ত বলছে, 'দোহাই বদর বাবা'। আবার কেউ হয়ত গাঁজা খেতে খেতেও বলছে, 'দোহাই ল্যাংটার'। মাযারে যারা যায় তাদের মনে অজস্র কামনা-বাসনা থাকে। তাদের কেউ মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে, কেউ পুত্র সন্তান চায়, কেউ কন্যা সন্তান চায়, কেউ কেবল সন্তান প্রার্থনা করে বাবার কাছে, কেউ কেউ স্বামী-স্ত্রীর মিল মহব্বত প্রার্থনা করে, কেউ বিয়ের প্রার্থনা করে, কেউ বর চায়, কেউ কনে চায়। কেউ বাবার কাছে রোগমুক্তি চায়, কেউ চাকরি চায়, কেউ মোকদ্দমায় জিততে চায়, কেউ ব্যবসায় উন্নতি চায়, কেউ বিদেশ যেতে চায়, কেউ নির্বাচনে জিতে মেম্বার-চেয়ারম্যান-এমপি-মিনিস্টার-প্রাইম মিনিস্টার হতে চায়। এভাবে নানাজনে ভক্তিভরে দারুণ আকুতি নিয়ে পীর-আওলিয়ার দরবারে নানা কিছু প্রার্থনা করে। আর এভাবেই তারা পীর-ফকীর-দরবেশের মধ্যে স্রষ্টার গুণাবলী আরোপ করে থাকে।
মাযার শরীফ জিন্দাবাদ!! মাযার ব্যবসা চিরজীবী হউক!!! • মুরীদগণ যে শুধু মাযারে গিয়ে মনের কামনা-বাসনার কথা পীরবাবাদের কাছে পেশ করে তাই নয়, বরং তারা নিজ নিজ বাড়িতে বসে বা অন্যত্র থেকেও বিপদমুক্তি বা অন্যান্য মাকসূদের কথা পীরকে আহ্বান করে বলে। কারণ, তাদের ধারণা পীর অবশ্যই এ সব আবেদন শুনতে পায়। মৃত পীর-ওলী-আওলিয়ার কাছেও বলে আবার জীবিত পীর-ওলী-আওলিয়ার কাছেও বলে। দূর থেকে সাহায্য চাওয়ার পেছনে যে যুক্তিগুলো কাজ করে তার মধ্যে অন্যতম হল এ ধারণা যে, 'পীর-ওলী-আওলিয়াগণের 'পাক রূহু' (!?) সকল স্থানে সদাই হাজির-নাজির, তারা গায়েব জানে।'- এ ধারণাও তাদেরকে এ পথে পরিচালিত করে। আল্লাহকে ছাড়া 'পীর-বুযুর্গ-ওলী-আওলিয়াগণের সাহায্য চাওয়ার রীতিও বিজাতি থেকে ধার করা। প্রাচীন গ্রীক ও হিন্দুদের নানা দেব-দেবী রয়েছে। কেউ প্রেমের দেবতা, কেউ বিদ্যার দেবতা, কেউ ধনের দেবতা, কেউ শক্তির দেবতা ইত্যাদি নানা দেবতা তাদের আছে। তারা ধন-সম্পদ, প্রেম, আশীর্বাদ প্রভৃতির জন্য এ সব দেব-দেবীর আশ্রয় নিয়ে তাদের কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করে থাকে। বিজাতীদের দেখাদেখি মুসলিমগণও নানরকম পীরের কাছে নানা কিছু অথবা একই পীরের কাছে অনেক কিছুই চেয়ে থাকে।
• মাযারে নেশা করা হয়: যারা নেশাখোর তারা আড়ালে আবডালে গোপনে নেশা করে। আমাদের সামাজিক জীবনে আমরা এটাই প্রায়ই দেখি। এখন মাযারে কেন সেটা হয়? প্রথমত, মাযার সাধারণত লোকে লোকারণ্য থাকে। কিন্তু এটা মনে রাখা দরকার যে, মাযার বা কবর সাধারণত জনসমাগমমুক্ত স্থান হতে একটু নিরিবিলি আলাদা জায়গায় হয়। আর মাযারে নেশা করলেও সেটা মূল মাযারে হয় না, সেটা হয় মূল মাযারের ভীড় থেকে কিছুটা আড়ালে। এটা গোপন হলেও প্রকাশ পেয়ে যায়।
দ্বিতীয়ত, মাযারে ভণ্ড ও বর্বর লোকদের আনাগোনা বেশি হয় বলেই সেখানে নেশার আসর জমে।
গাঁজা সেবন বা গাঁজার আসর আমাদের মাযার সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য অংগ। বাংলাদেশে আজকাল এমন মাযার কমই আছে যেখানে গাঁজাখোর লোকেরা ভীড় জমায় না। কথায় বলে, 'যেখানেই আছে পীরের বাস, সেখানেই আছে মাযার খাস।' এবং 'না থাকলে গাঁজার আসর, সে আবার কিসের মাযার।' যারা গাঁজা সেবন করে তারা ধ্যানের জগতে, মারিফাততত্ত্ব বা আধ্যাত্মিকতার স্তরে এবং দেহতত্ত্ব বা শরীরতত্ত্বের অন্দরে-আলিন্দে বিচরণের জন্যই গাঁজা খায়। এ গাঁজা খাওয়ার দলে নারী ও পুরুষ উভয়েই অন্তর্ভূক্ত। বাইরের জগতে গাঁজা সেবন একটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু মাযারে মানুষ গাঁজা খায় হাজারে হাজারে, এতে একবারও অপরাধ হয় না। কেউ এদের বাধা দেয় না। গাঁজাখোর মানুষেরা দু'দলে বিভক্ত। একদল মাযারের সাথে জড়িত। এরা পীরের আশেকান খাদেম এবং ফকির। আরেকদল আছে, যারা মাযারের খাদেম বা ফকির নয়। তবে এরা গাঁজাখোর। নিশ্চিন্তে গাঁজা সেবনের জন্য এরা মাযারে এসে জড়ো হয়। এদের কেউ আলাদা থাকে, কেউ ফকিরদের দলে ভিড়ে যায়। এরা বেশিরভাগই চোর-ডাকাত, গুণ্ডা-মাস্তান অন্যেরা স্রেফ নেশাখোর।
এ গাঁজা বা মাদকদ্রব্য সেবনের রীতিটি হিন্দু সমাজ থেকে এসেছে। সেই অতীত থেকে হিন্দুরা তাদের পূজায় বা যজ্ঞে সোমরস নামক এক প্রকার মাদকদ্রব্য সেবন করত। পূজা মন্দিরের এ আচরণটিই মুসলিমদের মাযারে, উরসে প্রবেশ করেছে।
• মাযারে ফকিরেরা ভীড় করে: এ কালে মাযারে যে সমস্ত আউল-বাউল-ফকির দেখা যায় এরা আসলে পাগল। এদের মধ্যে একদল অসুস্থ এবং অন্যদল অসুস্থতার ভান করছে। ভণ্ড পাগলের সংখ্যাই বেশি। অসুস্থ পাগল দু'চারটা। অসুস্থ পাগল হচ্ছে সেগুলো যেগুলো ল্যাংটা হয়ে ভাষাহীন হয়ে, উদ্ভ্রান্ত হয়ে বোকা-হাবা হয়ে পথে-ঘাটে ঘুরে বেড়ায়। এদের কোন তাল থাকে না। আর যারা ভণ্ড বা স্বেচ্ছায় পাগলের অভিনয় করে, তারা মাযারে গিয়ে আড্ডা পাড়ে। বলা হয়, এ উপমহাদেশের আগের কালের ফকির-দরবেশরা দু'খণ্ড লাল বা নীল কাপড় পড়তেন। মাযারে যেসব ভণ্ড বা পাগল ফকির নামে পরিচিতি পেয়েছে ওদের দেহেও লাল কাপড় থাকে। আসল কথা হচ্ছে, মাযারের ফকিরেরা আল্লাহর পথের পথিক নয়, বরং এরা সবচেয়ে বড় শয়তানের একনিষ্ঠ অনুসারী। তারা শতচ্ছিন্ন ও অজস্র তালিযুক্ত রঙবেরঙের অদ্ভুত পোশাক পরে। এদের জটা চুল থাকে, বিভিন্ন ধরনের লাঠি থাকে, গায়ে শিকল জড়ানো থাকে। তাদের মাথার চুল এবং দেহের পোশাক দারুণ অপরিষ্কার। এরা প্রায় সময়ই নাপাক থাকে। গোঁফ বলতে গেলে কখনই ছাঁটে না। গলায় তাসবীহ দানা জাতীয় এক প্রকার মালা ঝুলানো থাকে। কাঁধে থাকে একটা ভিক্ষার ঝুলি, মাথায় থাকে অদ্ভুত টুপি, তবে সকলের মাথায় টুপি থাকে না। মাযার এদের আবাসস্থল এবং জীবিকার উৎস। মাযারের এ সব ফকিরেরা গাঁজাখোর। গাঁজা খেতে খেতে জিকির করে, মরমী গান গায়। এগুলো শয়তানের গান, লোকভুলানো গান। নেশার গান, নেশার জিকির। এরা ফকির-ফকিরণী অর্থাৎ বেগানা নারী ও পুরুষ একত্রেই উঠাবসা করে। এদের মেলামেশায় কোন পর্দা নেই। এদের পোশাক-পরিচ্ছদ যেমন নোংরা, দেহও তেমনি নোংরা। নৃত্য-গীত আর গাঁজা সেবনই এ সব ভণ্ড ফকিরের প্রধান ধর্ম-কর্ম। এদের নাচ শিল্পকলায় সুষমামণ্ডিত নয়। তারা যে লোকনৃত্য করে তাও নয়। এদের নাচ হল 'ফকিরা নাচ'। ঝাঁকড়া চুলের মাথা দোলানো লাল কাপড় পেঁচানো কোমর দোলানো গুংগুর বাঁধা পা মাটিতে ঘা মারা, হাতের ডুগডুগি খঞ্জুর ইত্যাদি বাজানো আর লোকগান, ভক্তিমূলক গান, গাঁজার গান প্রভৃতিই এদের নৃত্য-গীতের উপকরণ কৌশল। এরা মাযারে যেমন নাচের-গানের আসর বসায়, তেমনি নৌকায়, বাসে, ট্রাকে, রেলের ছাদে আসা-যাওয়ার পথে নৃত্য-গীত করে।
এ সব ভণ্ড ফকিরেরা মাযারের গমনাগমন পথের পাশে, গেইটের আশে-পাশে আসন করে বসে মক্কেল ধরার জন্য। দু'পয়সা কামাই করাই হল একমাত্র উদ্দেশ্য। নানা কৌশলে জিকির করে, হাতে তাসবীহ রাখে এবং তামা-পিতল-কাঁসা এসবে বাঁধানো লাঠিও রাখে। এক টুকরা কাপড় বিছিয়ে আসন করে। সে কাপড়ে ভক্তদের দেয়া পয়সা থাকে। অনেকেই আবার কুরআন পাঠ করার অভিনয় করে। মহিলা ফকিরদের অবস্থাও একই।
এদের কাছে ভক্তরা নানা মাকসূদ নিয়ে আসে, কারণ, তারা মনে করে যে, বাবার মধ্যে কিছু আছে, সাধনা কইরা কিছু পাইছে ইত্যাদি। এ জাতীয় ধারণার কারণেই যার যাকে পছন্দ হয়, সে তার কাছে গিয়ে কিছু দান-খয়রাত করে বাবার পায়ের ওপর পড়ে যায়। বাবার মায়া হয়। বাবা পিঠ চাপড়ে বলে, কিরে কি চাস? তখন ভক্ত তার মনের কথা বাবাকে বলে। বাবা কিছু ঝাড়-ফুঁক করে মুখে বিড় বিড় করে কিছু উচ্চারণ করে বলে, 'নে, ওঠ, বাড়ি যা- সব পাবি।' ভক্ত খুশী হয়ে চলে যায়। ফকির মায়েরাও তাই করে। ভক্তের কাছে কেউ মা আর কেউ বাবা। আর ফকির-ফকিরণীরাও মা-বাবার মতোই ফ্রী হয়ে যায়। এদের মধ্যে চলে মারফতী প্রেম, আধ্যাত্মিক ভাব আর গাঁজার নেশা জড়িত মাখামাখি।
মাযারে মেলা জমে: সব মাযারেই বাৎসরিক উরসের নির্ধারিত তারিখ থাকে। আবার, আমাবস্যা, পূর্ণিমা, পীরের জন্ম বা মৃত্যুর তারিখ নির্দিষ্ট করেও উরস হয়ে থাকে। মাযার ছোট ও বড় হওয়ার ভিত্তিতে দিবসের সংখ্যাও কম-বেশি হয়। ছোট ছোট মাযারগুলোতে দিন ব্যাপী উরস হয়। একটু বড় মাযারগুলোতে দু'দিন-তিন দিন ব্যাপী উরস হয়। আর বড় মাযারগুলোতে সপ্তাহ এমনকি পক্ষকালব্যাপী জমকালো উরস অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ সময় মাযারে ও পীরের দরবারে বিজলী বাতি, গেট, চকমকি কাগজ ইত্যাদি দিয়ে প্যান্ডেল, স্টেজ সাজানো হয়। বেপর্দা অবস্থায় নারী-পুরুষ একত্রে বসে জিকির করে, কাওয়ালী-সামা শোনে। ভণ্ড পীর, ফকীররা এ সব ওরশে ওয়াজ নসীহতের নামে শরী'য়াত বিরোধী আক্বীদা-বিশ্বাস প্রচার করে। শাহী তবারুক রান্না করা হয়। এ উরসের দিনগুলোতে সংঘঠিত অশ্লীলতা গোটা বৎসরের তামাম অশ্লীলতাকে ছাপিয়ে যায়। মাযারপূজারীদের বাঁধ ভাঙ্গা উচ্ছাসে খড়-কুটোর ন্যায় ভেসে যায় আল্লাহ্ ভীতি ও শরয়ী বিধি-বিধান। মাযারগুলো পরিণত হয় মন্দিরে। হিন্দুদের তীর্থযাত্রার অনুসরণে মাযার যাত্রায় অংশগ্রহণ করে অসংখ্য মানুষ। যেমন হিন্দুদের পূজা উপলক্ষে জমে মেলা, তেমনি মাযারে উরস উপলক্ষে মেলা বসে। মাযারকেন্দ্রিক উরস বা মেলার দিনগুলোতে সেখানে নানা শ্রেণীর প্রচুর মানুষের সমাগম হয়। ভক্ত, গায়ক, সাধক, দোকানদার, বাজিকর, জুয়ারী, বাইজী, গাঁজাখোর ও ভবঘুরে। মেলায় হরেক রকম অপকর্ম হয়। সব মিলিয়ে এ সময় মাযারগুলো পরিণত হয় পাপের স্বর্গরাজ্য। উরস নামের অন্তরালে দেদারসে চলে শির্ক-কুফরী থেকে শুরু করে জঘন্য পাপাচার। গাঁজা সেবন, জুয়া, পুতুল নাচ, হিজড়া নাচ, যাত্রা-সার্কাস ইত্যাদি মেলার আনুষঙ্গিক উপসর্গ। মেলায় নানা কিছুর সমাহার ঘটে। আসবাবপত্র, ঘরকন্যার জিনিসপত্র, নানান খাদ্যদ্রব্য, মিষ্টান্ন, পোশাক-আশাক, খেলনা, গাঁজার কল্কি, পুরিয়া, সিগারেট পাতা প্রভৃতি উপকরণ। এ ছাড়া মেলায় রয়েছে নারী-পুরুষের অবাধ চলাফেরা। সব তো সেখানে মারফতী লোক, আধ্যাত্মিক চেতনায় আচ্ছন্ন, বাবার আশেকান মাযার সমঝদার ও ভাবের কারবারী! উরসের পরে যে টাকা অবশিষ্ট থেকে যায়, তা পীর সাহেব ও তার খাদেমদের পকেটে চলে যায়। উরস মূলত আনন্দোৎসব ও টাকা উপার্জনের পন্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
• মাযারীরা অভিশপ্ত! কবরের উপর সৌধ নির্মাণ করার মাধ্যমে নির্মাণকারীদের ওপর আল্লাহর লা'নত নাজিলের সূত্রপাত ঘটে। তারপর যদি কবরের উপর মাযার স্থাপন করে সেখানে পূজা-অর্চনা করা হয়, তাহলে সেসব পূজারীদের কী হবে? এ হিসেবে বলা যায়, এখনকার সময়ে অধিকাংশ মুসলিম অভিশপ্ত। তাছাড়া, মিথ্যা কবর, দরগাহ প্রভৃতি যিয়ারত করা মূর্তিপূজার সমতুল্য।
• চাকরির বেতন/গাছের ফল/তরকারি ইত্যাদি মাযারে বিতরণ: এ দেশে কিছু মুসলিম রয়েছে যারা ক্ষেতের প্রথম তরকারী বা বাগানের প্রথম ফল বা চাকরির প্রথম মাসের বেতন অথবা সবচেয়ে বড় ফলটা নিয়াত করে মাযারে দান করে দেয়। তারা গাছ লাগিয়েই নিয়াত করে রাখে যে, অমুক গাছের প্রথম ফলটা বা অমুক ক্ষেতের প্রথম তরকারিটা অমুক মাযারে দিবে। এতে তারা সওয়াব যেমন প্রত্যাশা করে, তেমনি মনের মাকসূদ পূরণের আশাও রাখে এবং তারা এটা ধারণা করে যে, এভাবে দান করলে বাবার দু'আয় ফল বা তরকারীর উৎপাদন বেশি হবে এবং পশুপাখী ও মানুষের অনিষ্ট থেকে হিফাযাতে থাকবে। তাদের এ সব বিশ্বাস অর্থহীন। ভণ্ড পীরদের কিছু ভণ্ড সাগরেদ অছে যারা জনগণকে এ সব বিষয়ে উৎসাহিত করে। তারা বলে দেয়, 'তোর গাছের প্রথম ফলটা মাযারে দিয়া যাবি, বাবা খুশী হইব। তোর ফলও বেশি হইব।' অথবা বলে, 'তোর গাভীর প্রথম বিয়ানের দুধটা মাযারে দিবি, হুজুরের দু'আর বরকতে অনেক দুধ পাবি।' এভাবে তারা হাঁস-মুরগির ডিমও নিয়ে আসে মুরীদের বাড়ি থেকে। গৃহস্থের প্রথম দুধ, প্রথম ফল, প্রথম আণ্ডা (ডিম), প্রথম তরকারী তার পরিবারের সদস্যদেরও খেতে মন চায়। তাই এভাবে মাযারে দান করলে তা পরিবারের সদস্যদের মনবেদনার কারণ হয়। মাযারের উদরের তো সীমা-পরিসীমা নেই। 'যত পাই, তত খাই'- এটাই মূলনীতি। এ জাতীয় দান-খয়রাত সম্পূর্ণ বিজাতীয় অনুকরণ। প্রথম জাত পশু বা অন্যান্য কিছু যাজক বা গীর্জাকে দেয়ার নিয়ম খ্রিষ্টধর্মে আছে। অর্থাৎ প্রথম জাত পশু অপবিত্র। এটা পবিত্র করতে পারে একমাত্র গীর্জা বা তার যাজক। কাজেই তাকে সেটা দিয়ে দিতেহবে। অন্যেরা ভোগ করলে তা হবে অপবিত্র ভোগ। মুসলিমদের মাযার বা মাযারের পীরেরা কিন্তু এ সব কথা বলে না। তারা বলে বরকতের কথা, সওয়াবের কথা, খুশীর কথা ইত্যাদি।
• পীর-আওলিয়ার মাযার এখন নাচে-গানে গুলজার: গাঁজাখোর ফকির খাদেম ছাড়াও একদল নর-নারী আছে যারা মাযারে বাদ্যযন্ত্রযোগে আল্লাহ ও রাসূল এবং মুর্শীদ ও পীরবাবার নামে লোকগীতি, আধ্যাত্মিক ও মারফতী গান বা মরমী সংগীত করে থাকে। এদের হাতে থাকে হারমোনিয়াম, ঢাল, বাঁশি, তবলা, ডুগডুগি, দোতরা, খঞ্জর ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র। এরা সবাই ভাবের ও ভবের পাগল। পীর-মুর্শীদের আশির্বাদ লাভের জন্যই তাদের এ গান। গানের তালে তালে তারা নাচেও। আরেকদল নির্বোধ মুসলিম তাতে সান্তনা খুঁজে নেয় এ কথা ভেবে যে, আল্লাহ ও রাসূলের গুণকীর্তন হচ্ছে, অতএব চলতে থাকুক। এ সব বেওকুবেরা শয়তানের পাপবাদ্য ও সুর কান পেতে শুনে। হিন্দুরা বাদ্য- বাজনাযোগে ভগবান ও দেব-দেবীর বন্দনা করে থাকে। অজ্ঞ মুসলিমরা সেই কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথার অনুসরণ করে পীর-মুর্শীদ, আল্লাহ ও রাসূলের গুণকীর্তন করছে।
• মুসলিমগণ পীর-আওলিয়ার নামে পশু দান করে তার মাযারে নিয়ে যায় এবং পীরের উরসে সেগুলো জবাই করে মহা ধুমধামের সাথে ভক্ষণ করে। পীর-মুর্শীদ-আওলিয়ার নামে মান্নত করাটাই শির্কী ও সম্পূর্ণ হারাম। আর এ হারামের পশু মাযারের উরসে জবাই করে খাওয়াও হারাম। এ শিরকী ও হারাম কাজটি মুসলিমরা হিন্দুদের কাছ থেকে শিখেছে। হিন্দুরা মা কালীর মন্দিরে পূজার সময় পাঁঠা বলি দেয়। ওগুলো সব মান্নতের পাঁঠা এবং তারা সেগুলো ভক্ষণ করে। হিন্দুদের এ কর্মের দেখাদেখি মুসলিমরা মাযারে উরসের সময় গরু, মহিশ, ছাগল, ভেড়া, উট, দুম্বা ইত্যাদি জবাই করছে। কেউ মা কালী-দেবীর পূজায় আর কেউ পীর-মুর্শীদের উরসে। কারও বলি আর কারও জবাই। কেউ দেবী খুশী করে আর কেউ পীর খুশী করে। কেউ বলি দেয় মন্দিরে আর কেউ জবাই করে মাযারে। উদ্দেশ্য ও ধ্যান-ধারণা উভয় পক্ষেরই এক।
মুসলিমগণ পীর বা ওলীর নামে পশু উৎসর্গ করে ছেড়ে দেয়। এ সব পশু জনগণ খেয়ে ফেলে অথবা শেষতক তা মাযারে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকে নানা নিয়তে এভাবে পশু উৎসর্গ করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কারও সন্তান হয়ে মারা যায়, কারও পুত্র সন্তান হয় না, কারও কন্যা সন্তান হয় না, কারও রোগ-বালাই ছাড়ে না ইত্যাদি নানা কারণে তারা পশু উৎসর্গ করে গায়রুল্লাহর নামে। তারা মান্নত করে এভাবে যে, 'হে বড় পীর বা হে খাজাবাবা! আমার এ পুত্রটি যদি বাঁচে তবে আমি তোমার নামে একটি গরু দেব।' ইত্যাদি।
এ রীতিটিও হিন্দুদের থেকে মুসলিমদের মধ্যে প্রবেশ করেছে। হিন্দুদের মধ্যে ধর্মের ষাঁড় নামে একটি কথা আছে। হিন্দু মতে, ধর্মের নামে তথা দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ করা ষাঁড়ই ধর্মের ষাঁড়। হিন্দুগণ দেবতার বর বা আশীর্বাদ পেয়ে মনের নানা মাকসূদ পূরণের জন্যই দেব-দেবীর নামে ষাঁড় উৎসর্গ করে। হিন্দুদের দেখেই মুসলিমরা পীরের নামে উৎসর্গ করতে শিখেছে গরু, ছাগল, ভেড়া, মহিষ প্রভৃতি।
এটা মূলত পীরালদের একটা বদ খেয়াল। বাড়তি ধূমধাম করে মানুষকে মাযারমুখী করার একটা ষড়যন্ত্র। পীর-খাদেম ও অন্যান্য কর্মচারীগণের সপরিবারে গোস্ত খাওয়ার লোভ তো অবশ্যই বিচার্য। অতিরিক্ত পশুগুলো বিক্রি করে টাকা কামাই হয়। এটা হল টাকা ও গোস্ত খাওয়ার ফিকির।
দুনিয়ার অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তুলনায় মুসলিমগণ এখন খুবই গরীব। আর এ দেশের মাযারমুখী মুসলিমদের অনেকেই তো নিঃস্ব এবং দিনমজুর শ্রেণীর। তাদের শেষ সম্বল হল গরু-ছাগল। সারা বছর তারা এগুলোকে খাইয়ে-দাইয়ে তরতাজা করে নিয়ে যায় মাযারে পীরের পেট মোটা-তাজা করার জন্য। এটা হল 'পীর মোটা-তাজা করণ' প্রকল্প। পীরালদের যারা দোসর তারা এর পক্ষে ফতোয়া দেয়। এটা হল মুসলিমদের শেষ সম্বল গরু-ছাগলগুলোকে তাদের হাতছাড়া করে তাদেরকে নিঃস্ব করে দেয়ার একটা ষড়যন্ত্র। সাধারণ মানুষের ধারণা এমন যে, গরু-ছাগল যাক কিন্তু ঈমান থাক। গরু আর ঈমান নিয়ে মুসলিমরা উপত্যকায় বা জলাশয়ে পালিয়ে না গেলেও অন্তত মাযারে যে পালিয়ে যাচ্ছে তাতে আর সন্দেহ কি? পীরালরা গরু-ছাগলের ভোগলীলায় মত্ত হয়ে মানুষের দুর্গতি সৃষ্টি করছে। এ জন্যই তারা হল দাজ্জাল বা চোর-ডাকাতের সাথে তুল্য। পীরালদের ষড়যন্ত্রে আজ আর সহজ-সরল মুসলমানদের ঈমান ও গরু-ছাগল নিয়ে বেঁচে থাকার অধিকারও যেন নেই।
মুসলিমদের অনেকেই পীর-আওলিয়ার নামে সন্তানের মাথার চুল রেখে দেয় এবং মান্নতি মাযারে গিয়ে তা কাটিয়ে আনে বা কামিয়ে ফেলে। মাযার হল তাদের কাছে সেলুন। অনর্থক মাযারে গিয়ে চুল কাটার জন্য ভক্তরা প্রচুর অর্থ-কড়ি খরচ করে। হিন্দুরা মন্দিরে গিয়ে তাদের সন্তানের চুল ফেলে। তাদের দেখাদেখি মুসলিমরাও মাযারে গিয়ে চুল ফেলছে।
ভক্ত আশেকানরা অনেকেই মাযার তাওয়াফ করে। এ দেশীয় মুসলিমদের যারা মাযার ভক্ত তারা সম্ভবত মক্কাশরীফ যাওয়ার ঝামেলা ও খরচ এড়ানোর জন্য নতুন ও সংক্ষিপ্ত ব্যবস্থা হিসেবে মাযার তাওয়াফ আরম্ভ করে দিয়েছে। কাবাঘর তাওয়াফ করার জন্য মুসলিমদের প্রতি নির্দেশ থাকলেও কোন মাযার তাওয়াফ করার কোন বিধান নেই। মাযার তাওয়াফ করার পিছনে একটা কারণ অবশ্য আছে, তা হচ্ছে, পীরবাবা হল তাদের কাছে কেবলা কাবা।
মাযারীরা মাযার সিজদা ও চুম্বন করে। মাযারে গিয়ে তারা এর গায়ে বা উপরে চুমু খায়, মাথা ঠেকায় এবং দেয়ালের বাইরে মাটিতে সিজদা করে। দেয়াল স্পর্শ করে হাতে চুমু খায়। তারা একদিকে জিন্দাপীরের কদমবুচি করছে অন্যদিকে মৃত পীরেরও সিজদা করছে। এ দেশে পীর-আওলিয়াদের পূজা এভাবেই শুরু হয়েছে। হিন্দুরা মন্দিরে দেব-দেবীকে কিংবা ব্রাহ্মণকে ও অন্যান্য গুরুজনকে নত হয়ে ষষ্ঠাংঙ্গ প্রণাম করে। তারই দেখাদেখি মুসলিমরা জিন্দা ও মৃত পীরকে প্রণামরূপী সিজদা করছে। এ দেশের অধিকাংশ মাযারই রাস্তার পাশে গড়ে ওঠে বা কোথাও মাযার দেখা দিলে তার পাশ দিয়ে রাস্তা তৈরি হয়। যানবাহনে করে সেই পথ অতিক্রমকালে মাযার দেখা গেলে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকই নানা অংগভঙ্গি করে মাযারকে প্রণাম ও সালাম করে। এ দেশে এমন অনেক হিন্দু আছেন যারা কেবল মাযার নয়, মসজিদ দেখলেও সেটাকে প্রণাম করে।
মাযারে চুমু দেয়া সিজদার মতোই বাড়াবাড়ি। যিনি মাথা নত করে মাযারে চুমু খাবেন তিনি যে হিন্দুদের মতো নত হয়ে প্রণামের মতো সিজদা করতে যাবেন না, তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? মাযারে চুম্বন নিজেই একটি শির্ক। এ শির্ক মানুষকে নিয়ে যেতে পারে আরেকটি শিকের দিকে। মাযার সিজদা, চুম্বন ইত্যাদি মূর্তিপূজারই নামান্তর এবং কুফরী প্রথা। এ সবই মূলত গোমরাহির শেষ দরজা, যেখানে ভীড় জমিয়েছে এ দেশের লক্ষ-কোটি মুসলমান।
• মুসলিমগণ রোগ আরোগ্যকারী ও মনের মাকসুদ পূরণকারী হিসেবে মাযারের তবারুক অতি ভক্তি ও তাযিমের সাথে খেয়ে থাকে। আজকাল তবারুক পুরিয়া বানিয়ে বাড়ি বাড়ি বিতরণ করা হয়। ভাবখানা কিছুটা এ রকম যে, তোমাদের ডায়রিয়া হয়েছে বা হতে পারে, তোমরা সেলাইন (তবারুক) খাও অথবা ঘরে রাখ, কাজে লাগবে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, আজকাল পীরের বা মাযারের তবারুক হোমিওপ্যাথি ঔষধের পুরিয়ার ন্যায় ঘরে রাখা হচ্ছে। খেলে অসুখ ভাল হবে, মনের নানা মাকসূদ পূরণ হবে। এ তবারুক যে মুশকিল আসান করে শুধু তাই নয়, তবারুক সেবনে পুণ্য হয়- এ বিশ্বাসও আছে মাযার ভক্তদের। পীরের দরগায় ভক্তদের মাঝে যা বিতরণ করা হয় তাই তবারুক। সেটা কোন খাবার হতে পারে আবার গাছের ছাল-পাতা-শিকড় হতে পারে অথবা সুরমা জাতীয় ব্যবহার্য কোন কিছু হতে পারে। ধরে নেয়া হয় যে, ঐ দ্রব্য বা খাবারের প্রতি পীরের নেক দৃষ্টি রয়েছে অথবা পবিত্র স্পর্শ রয়েছে কিংবা সদা অনুমোদন রয়েছে। ভক্তরা এ তবারুক মাযারে খায় বা ব্যবহার করে, বাড়ি নিয়ে অন্যান্যদের মধ্যে বিতরণ করে আর মানুষ ভক্তির সাথে তা সেবন করে। সেবনের নানা পন্থাও বাতলে দেয়া হয়।
তবারুক বিতরণের এ কুসংস্কারটি হিন্দু সমাজ থেকে মুসলিম সমাজে প্রবেশ করেছে। আমাদের যা তবারুক হিন্দুদের তা প্রসাদ। পীরের হল তবারুক আর ব্রাহ্মণ বা দেব-দেবীরা হল প্রসাদ। তবারুক বিতরণ হয় মাযারে বা পীরের দরবারে আর প্রসাদ বিতরণ হয় মন্দিরে। তবারুক সেবনে বা ব্যবহারে মুসলিমদের বিশ্বাসের অনুরূপই হল প্রসাদ সেবনে হিন্দুদের বিশ্বাস।
• মুসলিমগণ কবরে ফুল, পাতা ইত্যাদি দেয়। এটা তারা পীর-মুর্শীদ-ওলি-আওলিয়ার প্রতি ভক্তি প্রদর্শনের জন্য করে থাকে। খ্রিষ্টানগণ মৃত আত্মীয়-স্বজনের সমাধিতে ফুল দেয়। এটা তাদের একটা সৌজন্য রীতি। হিন্দুগণ পূজায় ফুল ব্যবহার করে। হিন্দু ও খ্রিষ্টানদের দেখাদেখি মুসলিমগণ ফুল দিয়ে পীর-আওলিয়ার কবর পূজা করছেন। তাদের বোধ হয়, এ ধারণা হয়েছে যে, ফুলের গন্ধ গিয়ে মৃতপীরের নাগে লাগে আর তাতে ওলী বা পীর খুশী হন। হিন্দুরা দেবতা ঠাকুরের পূজায় কচি বেল পাতা, আমপাতা ও তুলসীপাতা এবং নানারকম ফুল ব্যবহার করে। হিন্দুদের ঠাকুর পূজার মতো করে মুসলিমরাও পীর পূজা শুরু করেছে ফুল ও পাতা ইত্যাদি দিয়ে। দেবতার আশীর্বাদ পাবার জন্য তাকে ফুল-পাতা দিয়ে পূজা করতে হয়, কিন্তু পীর-মুর্শীদেরা তো মৃত অবস্থায় আশীর্বাদ করতে পারেন না, তাহলে তাদেরকে ফুল-পাতা দিয়ে সন্তুষ্ট করার এ প্রয়াস কেন? পীরালরা এ সব পছন্দ করে। তারা জীবিত থাকতেই মৃত্যু পরবর্তী পূজা পেতে চান মুরীদদের কাছে।
• মুসলিমগণ মাযারে আগরবাতি পোড়ায়, গোলাপ পানি ছিটায় এবং মোমবাতি জ্বালায়। অন্যদিকে, হিন্দুগণ তাদের ঠাকুর পূজায় ফুলের পানি ছিটায়, ধূপ পোড়ায় এবং মঙ্গল প্রদীপ জ্বালায়। হিন্দুদের ন্যায় এ সব করে মুসলিমরা পীর পূজা করছে। সেই সঙ্গে মৃতিপূজার মহড়াও দিচ্ছে। মুসলিমদের তো আজ নিজ ঘরেই বাতি জ্বলছে না। ঘরের পরে তো মসজিদ। ঘর আর মসজিদ ফেলে কি তারা তেলের শিশি নিয়ে মাযারে দৌড়াবে?
• মুসলিমগণ মাযারে উরস করে থাকে। আরবী অভিধান মতে, বিবাহ ও বিবাহের পর যে খাওয়ার আয়োজন করা হয় তাই উরস। মজারে উরসপন্থীদের মতে, উরস অর্থ হল বুজুর্গানে দ্বীনের অর্থাৎ পীর-আওলিয়ার ওফাতের তারিখে তাদের রূহের প্রতি সওয়াব রেসানী করার জন্য যে খানা-মজলিশের ব্যবস্থা করা হয় তাই উরস। তারা আবার কবর জিয়ারত এবং সদকা-খয়রাতের সমষ্টিকেও উরস বলে থাকে।
প্রতি বছর পীরের ইন্তেকালের দিন উরস করা হয়। ঐ বিশেষ তারিখের বেশ কিছুদিন আগে থেকেই সাগরেদগণ বিভিন্ন এলাকায় চাল, নারিকেল, গরু-ছাগল ও টাকা-পয়সা সংগ্রহের কাজে নেমে যায়। এ সব সংগ্রহকারীরা গায়ে, মাথায় ও লাঠিতে লালসালু কাপড় বেঁধে নেয়। অর্থাৎ তারা লাল গিলাফ পরানো কবরের বেশ ধরে। তারা হয়ে যায় পীরের কবরের চলমান মূর্তি। জনসাধারণ গরীব হলেও পীর ও মাযার ভক্তির কারণে যে যার সামর্থ অনুযায়ী দান-খয়রাত করে। এটা কি সত্যিই দান-খয়রাত? ইসলামী বিধানানুযায়ী, দান-খয়রাত করতে হয় গরীব-দুঃখী, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও অন্যান্য ফকির-মিসকিনকে। কোন মাযারে তো দান-খয়রাত করার প্রশ্নই উঠে না। প্রতি বছর মানুষ মাযারে সাহায্য করে, সেখানে উরস হয় এবং মাযারগুলো বেঁচে থাকে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা পিকনিক করার জন্য বিখ্যাত ও দর্শনীয় স্থানে দল বেঁধে চলে যায়। যাওয়ার সময় খাওয়ার সকল উপকরণই সাথে নিয়ে যায়। যেতে যেতে তারা গান গায়। নৃত্য করে। মাযারে উরসও একটা পিকনিকের মতো। এ পিকনিক ভক্ত, আশেকান-মুরীদের। এরা পীরের ছাত্র-ছাত্রী। এরাও উরস পিকনিকে যেতে যেতে নানা রকম গান গায়, নৃত্য করে এবং এটা তারা নারী-পুরুষ মিলেই করে। খাদ্য (গরু ইত্যাদি) ও টাকা-পয়সাও সাথে নিয়ে যায়।
এ দেশের যেখানেই মাযার আছে, চাই সেটা বড় হোক বা ছোট হোক, প্রতি বছর সেখানে উরস হবেই। উরস ছাড়া মাযারের কথা কল্পনাই করা যায় না। উরস এলেই মৃত মাযার যেন জীবিত হয়ে ওঠে। উরসের সময় বসে যাবে নানা তেলেসমাতি কারবারের মেলা। দেশের আনাচে-কানাচে থেকে হাজার হাজার ভক্ত আশেকানের সমাগম ঘটে মাযারের আর শত শত সাজানো গরু-ছাগলের আগমনও ঘটে সেখানে। হিন্দুদের ন্যায় এ সময় গরু হয়ে যায় মাযার ভক্তদের দেবতা। তারা লালসালুতে গরু সাজায়, গরুকে মালা পরায়। গরুই যেন তাদের পীর।
• মুসলিমগণ মাযারে অর্থকড়ি দান করেন। অর্থ আয়ের জন্য মাযার সৃষ্টি এবং উরস-মাহফিলের আয়োজন ভক্ত, আশেকান, মুরীদ-পীর বিশ্বাসীদের যেভাবেই আখ্যায়িত করি না কেন, তারা মাযারে টাকা দিতেই আগ্রহী। টাকা দিয়ে তারা এ দুনিয়ার নানা মাকসুদ এবং পরকালের কল্যাণ হাসিল করতে চায়। তাই মাযার হল টাকার গাছ। একটা মাযার সৃষ্টি মানে একটা টাকার গাছ লাগানো। মাযার একটা জমজমাট ব্যবসা। পীর সাহেব গদীতে বসে থাকেন, মানুষ নজরানা দেয়। আর গদী ছেড়ে বাইরে গেলেও মানুষ দান-খয়রাত করে। কাঠের ও ইটের তৈরি দানবাক্সেও মানুষ প্রচুর দান-খয়রাত করে। রসিদ বই ছাপিয়ে তা দিয়েও টাকা-পয়সা উসুল করা হয়। খাদেমরা নানা স্থানে গিয়ে দান-খয়রাত সংগ্রহ করে কোন রিসিট ছাড়াই। মানুষ যেসব পশুপাখি দান করে সেগুলো থেকেও প্রচুর পয়সা আসে। কোন কোন মাযারে গাড়ি থামিয়ে দান-খয়রাত আদায় করা হয়। কোন ভক্ত মাযারে যেতে না পারলে টাকাকড়ি অন্যদের কাছে দিয়ে দেয়। এ দেশের যারা প্রবাসে রয়েছে তাদের ঠিকানা সংগ্রহ করে তাদের কাছে চিঠিপত্র মারফত মাযারের দালালরা সাহায্য প্রার্থনা করে, পীরের জন্য নজরানা পাঠিয়ে দিতে বলে। ডেগ অর্থাৎ গায়েবী ডেগ হল টাকা আদায়ের আরেকটি উপায়। মাহফিলের দিন কিংবা উরসের দিন এ গায়েবী ডেগ প্রকাশ করা হয়। অন্যান্য সময়ে এ ডেগ লুকিয়ে রাখা হয়। এমন অনেক ডেগ দেখতে পাওয়া যায় নানা মাযারে।
• মুসলিমগণ গরম মাযারের বেশি ভক্ত। পীর-আওলিয়ারা কিভাবে গরম হয় এটা সবাই জানে। যে পীরের মাযারে নিয়াত-মান্নত করে তড়িঘড়ি ফল পাওয়া যায় তাকেই গরম মাযার বলা হয়। এ সব মাযারে লোকজন বেশি বেশি দান-খয়রাত করে। এ দেশের হিন্দুরাও খবর রাখে কোন মাযার গরম অর কোন মাযার ঠাণ্ডা। মাযার ঠাণ্ডা-গরম হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আসলে কিছু কিছু খাদেম ও সাগরেদের প্রচারের কারণে এটা হয়েছে। দোকানদার ব্যবসায়ীরা বেশি কাস্টমার আকর্ষণের জন্য যেমন নান কথা বলে তেমনি খাদেম দালালরাও মাযারে বেশি ভক্ত যোগান দেয়ার জন্য প্রচার করে অমুক মাযার গরম, নিয়ত করবেন সাথে সাথে ফল পাবেন। আবার কিছু কিছু মুর্খ মানুষের কারণেও এটা হয়ে থাকে। যেমন, ধরুন প্রতিবেশী শত্রুর ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে কেউ মাযারে কিছু মান্নত করল। 'ঘটনারক্রমে' হয়ত ঐ প্রতিবেশীর একটা গরু মারা গেল বা তার পরিবারের কেউ অসুখে পড়ল, তখন মান্নতকারী মনে করে মাযার সত্যিই গরম। এভাবেই অজ্ঞ মূর্খ মানুষেরাও কোন মাযারকে গরম করে ফেলে।
• প্রতিটি মাযারের সৌধে প্রবেশ করার পূর্বে বাধ্যগতভাবেই জুতো খুলে প্রবেশ করতে হয়। অথচ আমরা জানি, আল্লাহর ঘর মসজিদে জুতো নিয়ে প্রবেশ সিদ্ধ। আর 'বাবা'(?)-এর লাশ সম্বলিত ঘরে জুতো নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ। তাহলে, কি বাবার (?) মর্যাদা আল্লাহর মর্যাদার চেয়েও বেশি? (না'উযুবিল্লাহ) মানুষের বাহ্যিক আমলে তো তাই প্রতিভাত হয়, সম্ভবত এ অতি ভক্তিতে ব্যধিগ্রস্থ হওয়ার ফলেই বিগত এক পুরুষ শাসকের আমলে ঢাকায় রাস্তা তৈরির অজুহাতে 'গোলাপ শাহ মসজিদ' ভাঙ্গা হলেও মাযার ভাঙ্গা হয়নি।
• কিছু কিছু মাযারের গেইটে লেখা থাকে, 'হাজত রাওয়া, মুশকিল কোশা। ফানাফিল্লাহ, বাকাবিল্লাহ গাউছে যমান মাহদূব শাহ...' অর্থাৎ আশা-আকাঙ্খা পূরণকারী, বিপদ-আপদ দূরকারী... যামানার সাহায্যকারী মাহদূব শাহ (প্রমুখের) মাযার।' আর এভাবে মৌখিক ও লিখিত উভয় পন্থায় মানুষের মাঝে শিক্বী বিশ্বাসকে বদ্ধমূল করে দেয়া হচ্ছে। ফলে তারা এ ভ্রান্ত বিশ্বাসে তাড়িত হয়ে মাযার পূজায় আকণ্ঠ ডুবে থাকছে।
মাযারগুলো মূলত হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির চর্চা ও লালন ক্ষেত্র। হিন্দুরা মুসলিমদের মাযারে যায় কোন বিশেষ ভক্তির কারণে নয়। তারা দেখতে পায়, সেখানে চলে পীর পূজা, গোর পূজা, পাথর পূজা, গাছ পূজা, মোমবাতি পূজা, দিঘী পূজা, ফুল পূজা, কবুতর পূজা, অগ্নি পূজা, কাছিম পূজা, মাছ পূজা, কুমীর পূজা, অশালীন নাচ-গান, মেলা, বাদ্য-বাজনা, নেশা পান ইত্যাদি যা তাদের সংস্কৃতির মহান দাবীদার। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই আমার এ কথার তাৎপর্য উপলব্ধি করা সহজ হয়ে যাবে। হিন্দুরা মুসলিমদের মাযারে যায় কিন্তু মসজিদে যায় না, কারণ মাযারে আর মন্দিরে তাদের কাছে কোন তফাৎ নেই। মাযারে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সংস্কৃতি বেগবান করার প্রক্রিয়া চলে। মাযারগুলোতে অনুষ্ঠিত কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয়, এ যেন বহুত্ববাদী হিন্দু সম্প্রদায় কর্তৃক নির্মম প্রতিশোধ। তারা যেন সেই সৎমানুষদের প্রতি উপহাস করে বলছে- 'দেখ, তোমরা শির্ক-বিদআত ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতি এদেশ থেকে বিতাড়িত করেছিলে আজ তোমাদের কবরকে কেন্দ্র করেই এগুলো চালু করেছি। তোমরা মন্দির উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলে, তাই তোমাদের প্রতিটি মাযারকে এক একটি মন্দিররূপে গড়ে তুলেছি। তোমরা মুশরিকদেরকে মুসলিম বানাচ্ছিলে অথচ তোমাদের কবরগুলোকে উপলক্ষ্য করেই আজ মুসলিমদেরকে মুশরিক বানাচ্ছি।'
প্রকৃতপক্ষে, ভণ্ড পীরেরা নজরানা ভোগের ব্যবসার জন্য মাযার গড়ে আর নির্বাচন এলে ধোঁকাবাজ রাজনীতিকেরা ভোটের জন্য মাযার যিয়ারত করে। সহজ-সরল মুসলিমরা মাযার-রাজনীতি ও মাযার ব্যবসার প্রতারণার শিকার, কেউ দিচ্ছে তবারুক আর কেউ দিচ্ছে রিলিফ, কেউ ঈমান-আক্বীদা লুটছে আর কেউ তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করছে। রাম-কৃষ্ণপন্থী কবি-সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবীরা হিন্দু রবীন্দ্রনাথকে পীর সাজিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির চর্চা করছে আর ভণ্ড পীর বুদ্ধিজীবীরা মাযার সংস্কৃতির চর্চা করে মূলত বাঙালি (হিন্দু) সংস্কৃতিরই যথার্থ বাস্তবায়ন করছে। এ বড় নিষ্ঠুর প্রতারণা।
মাযার পূজায় কেবল অনাচার বাড়ে। ভণ্ড পীরেরা যেদিন এ দেশ ছাড়বে এবং এ দেশের মানুষ যেদিন প্রকৃত ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত হবে সেদিন মুসলিমরা নিজেদের পরিচয় খুঁজে পাবে। আজ আমরা আত্ম-পরিচয় ভুলে অন্যদের মাঝে শামিল হয়ে গেছি। বর্তমান বাংলাদেশে পীর-ফকীরদের ধর্মের নামে ব্যাপক শির্কী ও বিদআতী কার্যক্রমের বাস্তবচিত্র তুলে ধরার উদ্দেশে কবি শফিউল আলম বলেন:
দেখরে চাহিয়া তোরা কে যায় গাহিয়া খাজা নামের গান পীর-মুর্শীদের আজ পাড়িয়াছে দোহাই আযাযীল শয়তান তামাম দুনিয়া গিয়াছে ভরিয়া শির্ক ও বিদআতে ইসলাম বুঝি দুনিয়া হতে বিদায় নিয়াছে কত কবরে জ্বলেরে প্রদীপ মসজিদে নেই বাতি, খানকাহ মাযারে শিরণী লয়ে উঠেছে সবাই মাতি। লুটেরার দল লুটল সবি আর কিছু নেই বাকী, কত লোকের ঈমান করছে হরণ ধর্মের নামে ডাকী সাধুর বেশে শয়তান এসে দিচ্ছে কুমন্ত্রণা, তাই না দেখে বিপথগামী হচ্ছে কত জনা। এখনও তোর ঘুমের ভান জাগরে যুবক নওজোয়ান উড়াও গগনে তাওহীদী নিশান... জাগরে যুবক নওজোয়ান...
টিকাঃ
১. চীনদেশীয় ধর্ম ও ঐতিহ্যবাহী সমাজে দেবতাজ্ঞানে পূর্বপুরুষদের (Pai Tsu) প্রতি পরম ভক্তি জ্ঞাপন করা একটি অতি প্রাচীন, অটল ও প্রভাবক্ষম তত্ত্ব। তাদের বিশ্বাস অনুসারে, মৃত ব্যক্তির Hun (পবিত্র আত্মা) এবং Po (অপবিত্র বা মন্দ আত্মা) সাধারণত নিজের অস্তিত্ব ও সুখের জন্য তাদের বংশধর কর্তৃক প্রেরিত আধ্যাত্মিক অর্থ-সম্পদ, ধূপধুনোর সুবাস, খাদ্য ও পানীয় সামগ্রীর দানের উপর নির্ভরশীল। ফলে যদি কেউ এ সকল বস্তুকে মৃতের প্রতি উৎসর্গ করে তবে এর প্রতিদান হিসেবে Hun (পবিত্র আত্মা) অলৌকিকভাবে সেই ব্যক্তির পরিবারের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে সক্ষম। তবে সাধারণ মানুষদের ক্ষেত্রে এ সম্পর্কটি কেবল তিন থেকে পাঁচ পুরুষ পর্যন্ত টিকে থাকে বলে ধারণা করা হয়। তারপর আত্মাসমূহ অতিসাম্প্রতিক আত্মার মাধ্যমে উত্তরাধিকারী হয়ে থাকে। (Dictionary of Religions, পৃ. ৩৮)
২. বুখারী, ১ম খণ্ড, ২৫৫ পৃ., হাদীস নং ৪২৭; মুসলিম কর্তৃক সংগৃহীত, ১ম খণ্ড, ২৬৯ পৃ., হাদীস নং ১০৮২; আবু দাউদ, সুনান আবি দাউদ, ২য় খণ্ড,৯১৭ পৃ., হাদীস নং ৩২২১ এবং আদ-দারিমি।
৩. ২৯:২৬ লেবীয় পুস্তক, বাইবেল।
৪. এ ক্ষেত্রে অনেকেই 'দৈবক্রমে' শব্দটি ব্যবহার করে থাকে। তবে, 'দৈব' শব্দকে সাধারণত অদৃষ্ট বা ভাগ্য অর্থে ব্যবহার করা হলেও শব্দটি দেব সম্পর্কিত। দৈব দুর্ঘটনা মানে যে ঘটনার পিছনে থাকে দেবতার হাত। দেবতা যখন ঘটনার নায়ক হন, তখন তা দৈব ঘটনাই হয়ে থাকে। 'দুর্বিপাক'-এর অর্থও অনুরূপ। যে ঘটনার জন্য মানুষ দায়ী নয়, দেবতা সৃষ্ট দুর্ঘটনা, তাই দুর্বিপাক। 'দৈববাণী' আসে অদৃশ্য থেকে, অদৃশ্য থেকে দেবতা যে বাণী শুনিয়ে থাকেন বা শোনা যায়, তাই দৈববাণী। দৈবাদেশ হচ্ছে দেবতার আদেশ। দিব্যি, দিব্য, দৈবাৎ, দৈবক্রমে, দুদৈব সবই দেবতা সম্বন্ধীয়, দেবতা থেকে সৃষ্ট। মুসলিম সমাজে এ সব শব্দ বেশ প্রচলিত। অনেক মুসলিম এ ধরণের বাক্য ব্যবহার করে থাকে, 'মুহাম্মাদ () হেরা গুহায় দৈববাণী শুনলেন, 'পড় তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন...' কুফরী ও শিরকী এ শব্দগুলো মুসলিম সমাজে প্রায়ই লেখায় বা কথাবার্তায় ব্যবহার হচ্ছে। যারা দেবতা সম্পর্কীয় শব্দ ব্যবহার করেন, তারা শব্দগুলোর বুৎপত্তিগত অর্থের কোন খবরই রাখেন না। মুসলিমদের দেবতা নেই, আছেন লা-শারীক এক আল্লাহ। 'তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও ঝরে না, মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোন শস্য কণাও অংকুরিত হয় না। এ হচ্ছে কুরআনের শিক্ষা। যদি তাতে আমাদের ঈমান থাকে, তাহলে দেবতাকে আমরা কিভাবে গ্রহণ করতে পারি? তাঁর শক্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে আসমান-জমিনে ও পাতালে কিছুই নেই। তার আর কখনো দৈববাণী নয়, নয় কোন ঐশীবাণী। এমনকি নয় দৈবক্রমে।
📄 প্রতিমা পূজার ভিত্তি মূর্তি ও ভাস্কর্য, তা ভেবে হতে হয় আশ্চর্য
আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অপসংস্কৃতির একচ্ছত্র আধিপত্য চলছে। এ ময়দানে তো আছেই, আমাদের প্রত্যেকের ড্রয়িংরুমেও প্রবেশ করেছে রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে। পত্র-পত্রিকা ও সাহিত্যেও চলছে অপসংস্কৃতির রাজত্ব। অপসংস্কৃতির চতুর্মুখী হামলার মোকাবিলায় ইসলামী সংস্কৃতির অবস্থান কোথায়, তা রীতিমতো গবেষণা সাপেক্ষ।
বাংলাদেশে অগ্নিউপাসকরাই মূর্তিপূজক। ভাস্কর্য শিল্পের নামে এখানে রাস্তার মোড়ে ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার স্মারক হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে প্রচুর বিশালকায় পাথরের মূর্তি। এরা অস্ত্রহাতে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ঘোষণা দিচ্ছে। আর আমরা ওদের নমস্কার জানাচ্ছি। 'অপরাজেয় বাংলা', 'সাবাশ বাংলাদেশ', 'দুরন্ত' প্রভৃতি বাহারী নাম দিয়ে এ সব মূর্তি খাড়া করা হয়েছে। এদের বেদীতে ফুল, ফুলের তোড়া দেয়া হয়। আবার বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের ভাস্কর্যমূর্তি খাড়া করানো হয়েছে বিভিন্ন প্রাঙ্গনে। সেসব জায়গায় তো রীতিমত ঐসব ব্যক্তিদের পূজা হচ্ছে। তাছাড়া বাঙালিরা (?) বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিকৃতি দিয়ে এখন তাদের ড্রইং-রুমের শোভাবর্ধন করছে। আমাদের শোকেসগুলো মূর্তি প্রদর্শনের কেস-এ পরিণত হয়েছে। আমরা এককালে কাবাঘর থেকে মূর্তি সরিয়ে দিয়েছি আর এখন ফেলে দেয়া মূর্তিই আবার তুলে নিচ্ছি নিজেদের ঘরে। মুর্তিপূজায় মনোনিবেশ করার জন্য এর চেয়ে সহজ পন্থা আর নেই।
মূর্তি ও ভাস্কর্যকে যেসব মুসলিম শিল্প-সংস্কৃতি বলে মনে করেন, তারা যদি এ সম্পর্কে ইসলামী কোন ধারণাই না রাখেন, ইসলাম এ বিষয়ে কি কথা বলে, তাও না জানেন, আরবের আইয়ামে জাহিলিয়াতের যুগ সম্পর্কে বেখবর থাকেন, এমনকি মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জীবনী পাঠ না করে থাকেন, না শুনে থাকেন, তাহলে মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির রূপ দেখতে পারেন, নিজেদের জড়াতে পারেন, এর চিন্তা ও দর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়ে এ শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা করতে পারেন, এমনকি এর উৎকর্ষ সাধনে ব্রতীও হতে পারেন।
এ অজ্ঞতা যেসব মুসলিমের নেই, তারা যেমন মূর্তিপূজারী হতে পারেন না, তেমনি পারেন না 'মূর্তি সংস্কৃতি'র প্রচার-প্রসার ও উৎকর্ষতার জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সমর্থন ও সহায়তা করতে। তবে মূর্তিকে ও মূর্তি পূজাকে যেসব অমুসলিম 'ধর্ম' বানিয়ে ফেলেছেন, তাদের এ ধর্মাচরণকে কোনভাবে বাধা দেয়া যাবে না, তাদের পূজার বিরোধিতা করা যাবে না, তাদের ধর্মানুভূতিকে কোন আঘাত করা যাবে না; মন্দির, পুরোহিত আর জুজারীদের নিরাপত্তার জন্য সব রকমের সহায়তা করতে হবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। সূরা কাফিরুনই এ ব্যাপারে মুসলিমদের গাইড লাইন।
মুসলিমদের মধ্যে যারা অজ্ঞতা, প্রগতি আর বিজ্ঞতার পর্দা ঝুলিয়ে নানা ব্যাখ্যার ধূম্রজাল সৃষ্টি করে মূর্তি সংস্কৃতিতে জড়িয়ে পড়েছেন, তাদের অজ্ঞতা বাহানা মাত্র।
সর্বশক্তিমান স্রষ্টা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইবাদাতের জন্য মাটি, কাঠ, পাথর ইত্যাদি দ্বারা তাঁর কাল্পনিক আকার দেয়ার কোন স্থান বা কল্পনা ইসলামে নেই। এ ধারণার ব্যাখ্যা হয়ত সবিস্তারে প্রত্যেকের কাছে নেই, কিন্তু এতটুকু ধারণা প্রত্যেকের কাছেই আছে যে, ইসলামে মূর্তিপূজা নেই, মূর্তি তৈরিও নিষেধ; বিভিন্ন সময়ের আলোচনা, ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে প্রত্যেকেরই এ ধারণাটি হয়ে গেছে যে, মূর্তি ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম তথা নিষিদ্ধ। ইসলাম মূর্তি পূজার বিরোধী। মুসলিম মূর্তি পূজা করে না। মূর্তিকে তারা ঘৃণা করে। প্রতিমা, স্মৃতিচিহ্ন, স্মৃতিসৌধ, কোন মহাপুরুষের প্রতিকৃতি ও যাবতীয় ছায়ামূর্তি স্থাপন করা, এর প্রতি ভক্তি-শদ্ধা পোষণ করা ইসলামে শির্ক ও মূর্তি পূজার সমান পাপ মনে করা হয়। আর এ পাপের জন্য আল্লাহ্র নিকটে কোন ক্ষমা অবশিষ্ট নেই। যারা প্রগতি আর বিজ্ঞতার দোহাই দেয়, তাদের সঙ্গে এ ব্যাপারে বিতর্কে যেতে চাই না। ইবলিস তো আল্লাহ্র সঙ্গে বিতর্ক করতেও পিছপা হয়নি। আমরা আদমের সন্তান, আল্লাহ্র ফয়সালাই আমাদের জন্য চূড়ান্ত।
মূর্তি ও ভাস্কর্য সমার্থক। মূর্তি ও ভাস্কর্যের কুরআনের পরিভাষা হচ্ছে,' 'আত-তামাছিল'। ইব্রাহীম (আ:) তাঁর স্বজাতিকে লক্ষ্য করে জিজ্ঞাসা করেছিলেন,
﴿قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ﴾ (سورة الأنبياء: ٥٣) অর্থ: 'এ প্রতিকৃতিগুলো কি? যাদের তোমরা উপাসনা করছ?' [সূরা আল আম্বিয়া (২১): ৫৩।
এ আয়াতে মূর্তি বা তাদের উপাস্য দেবতাগুলোকে 'তামাছিল' বলা হয়েছে। অভিধানে 'মূর্তি, ভাস্কর্য ও ছবি'- এ তিনটির অর্থই 'তামাছিল' শব্দটি বহন করে। কোন ব্যক্তি বা জাতি যদি উপাস্য হিসেবে অথবা জাতীয় নিদর্শন হিসেবে কিংবা সম্মান প্রদর্শনের জন্য কোন জীবজন্তু, গাছ-পাথর, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, দেব-দেবতা, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, নেতা-নেত্রী প্রভৃতির ছবি বা আকৃতি মূর্তির ন্যায় নির্মাণ করে ও তা প্রকাশ্য স্থানে স্থাপন করে কিংবা নিজ গৃহে লটকিয়ে রাখে, তাহলে তা শির্ক হিসেবে গণ্য হবে।
এককালে আরব জাতি মূর্তি পূজারীতে বিশ্বাসী হয়ে ওঠে। তারা লাত্, মানাত, হুবলসহ বহু দেব-দেবতার প্রতিকৃতি আরব ভূমির বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থানে স্থাপন করেছিল এবং সেখানে সমবেত হয়ে এদের বেদীতে বিভিন্ন পর্ব বা উপলক্ষে 'অর্ঘ্য' ও পুষ্প নিবেদন করত। মুশরিক আরব জাতির এদের প্রতি ছিল প্রচণ্ড রকমের বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধানুভূতি। এ কাজটি তাদের বিশ্বাসের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, এটা পর্যায়ক্রমে তাদের জাতীয় জীবনে ও তাদের জাতীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। মক্কার মূর্তি পূজারীরা মক্কা নগরীর উপকণ্ঠে মিনা বাজারের সন্নিকটে একটি বিশাল হুবল দেবতার মূর্তি স্থাপন করেছিল। কাবা গৃহের অভ্যন্তরেও বহু কল্পিত দেবতার প্রতিকৃতি স্থাপন করেছিল।
কুরআন নাযিল শুরু হলে সূচনাতেই রাসূল ﷺ-কে লক্ষ্য করে মুসলিম জাতিকে মূর্তি পূজার নাপাকি থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। যেমন, রাসূল ﷺ-কে বলা হয়,
﴿وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ﴾ (سورة المدثر : ٤) অর্থাৎ '(হে রাসূল! আপনি মূর্তি পূজার অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকুন।' [সূরা মুদ্দাস্সির (৭৪): ৪]
বিখ্যাত তাফসীরবিদ মুজাহিদ, ইকরামা, কাতাদা, যুহুরী, ইবনে যায়েদ প্রমুখ মনীষীগণ এ আয়াতের অর্থ করেছেন প্রতিমা ও ভাস্কর্যের অপবিত্রতা।
৮ম হিজরী সনে মুসলিমগণ সুদীর্ঘ ৮টি বছর নির্বাসিত জীবন যাপনের পর বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করেন। ইতোপূর্বে মক্কার মুশরিকরা মহানবী ﷺ এবং তাঁর সাথী সাহাবীগণকে বহু কষ্ট ও নির্যাতন করে দেশ ত্যাগে বাধ্য করেছিল। সম্পূর্ণ নিঃস্ব অবস্থায় নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে মুসলিমগণ রাতের আঁধারে দেশ ত্যাগ করে মদীনায় আশ্রয় নেন। এতেই মুশরিকরা ক্ষান্ত হয়নি। তাঁরা মদীনায় আশ্রয় গ্রহণকারী মুহাজির এবং আনসারদের বিরুদ্ধেও একের পর এক ১০/১২টি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। মুসলিমরা যখন মক্কা বিজয় করেন তখন তাদের দুশমনদের প্রতিশোধ গ্রহণ করা এবং নিজেদের বিজয়ের আনন্দকে অম্লান করে রাখার জন্য বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন ও ভাস্কর্য নির্মাণ করাই ছিল অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মহানবী ﷺ সেদিন মূর্তি পূজারী মক্কার কাফিরদের বিরুদ্ধে কোন প্রতিশোধ গ্রহণ করেননি এবং বিজয়ের আনন্দে কোন ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধও নির্মাণ করেননি। বদর, ওহুদ, খন্দক, মুতাসহ বহু যুদ্ধে হাজার হাজার সহকর্মী-সাহাবীদের আত্মত্যাগ ও কুরবানির পর যে ইসলাম আরবের বুকে কায়েম করেছিলেন, সেই রণপ্রান্তরগুলোতে তিনি একটিও ভাস্কর্য নির্মাণ করেননি, এমনকি বড় বড় সাহাবীদের কবরগুলোর পরিচয় পর্যন্ত নেই।
মূর্তি ও ভাস্কর্য নির্মূল করার জন্যই ইসলামের আগমন ঘটেছে। রাসূল ﷺ-এর নির্দেশে এবং নেতৃত্বে মক্কাসহ আরব ভূমি থেকে সকল মূর্তি ও জাহেলী যুগের স্মৃতিসৌধগুলোকে ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলা হয়। বিজয়ী বেশে রাসূল ﷺ যখন মক্কায় প্রবেশ করেন তখন পর্যন্ত মুশরিকদের ধারণা ছিল, কাবাগৃহের মূর্তিগুলো তাদের রক্ষা করবে এবং সে জন্য কাবার মূর্তিগুলো ধ্বংস না করা পর্যন্ত তারা ইসলাম গ্রহণে অপেক্ষা করতে থাকে। মক্কায় প্রবেশের পর সর্বপ্রথম আল্লাহ্ নাবী () কাবাগৃহের আশেপাশের সকল মূর্তি ও তৈলচিত্র অপসারণের কাজটি সম্পন্ন করেন। তিনি নিজ হাতে কয়েকটি মূর্তির গায়ে আঘাত করেন এবং বাকিগুলো আলী ও অন্য কতিপয় সাহাবী ভেঙ্গে ফেলেন। এ সময় পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি নাযিল হয়-
﴿قُلْ كُلٌّ يَعْمَلُ عَلَى شَاكِلَتِهِ فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَنْ هُوَ أَهْدَى سَبِيلاً ﴾ (سورة الإسراء: ٨٤) "বল, সত্য এসে গেছে আর মিথ্যা বিলুপ্ত হয়েছে, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হওয়ারই।" [সূরা আল-ইসরা (১৭): ৮১]
তিনি () এ আয়াত পাঠ করতে করতে তাঁর হাতের বর্শা দ্বারা কাবা ঘরের আশপাশ ও ছাদের উপরে স্থাপিত মুশরিকদের নির্মিত মূর্তি ও ভাস্কর্যগুলোকে লক্ষ্য করে এদের বুকে আঘাত করলেন আর সাথে সাথে মূর্তিগুলো উল্টে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছিল।
জাবের বলেন, মক্কা বিজয়ের সময় যখন আমরা নিকটবর্তী 'বাত্বহা' উপত্যকায় ছিলাম, তখন রাসূলুল্লাহ () উমার ইবনুল খাত্ত্বাব -কে নির্দেশ দেন যেন কাবা গৃহের সকল ছবি (মূর্তি) নিশ্চিহ্ন করে দেন। তারপর উক্ত মূর্তিসমূহ নিশ্চিহ্ন না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ () কাবা গৃহে প্রবেশ করলেন না।
তাছাড়া, শিকের গন্ধযুক্ত নিদর্শন ধ্বংসে ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা উমার এর পদক্ষেপ কম উল্লেখযোগ্য নয়। মুসলিম সমাজে যাতে শির্ক কোন চোরা পথে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যাপারে উমার ছিলেন অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন। তিনি তাঁর খিলাফতকালে শিকের সন্দেহযুক্ত কোন কাজ হতে দেখলে তা সাথে সাথে বন্ধ করার নির্দেশ দিতেন। এ প্রসঙ্গে অনেক ঘটনার বিবরণ আমরা উদাহরণস্বরূপ বর্ণনা করতে পারি। নিম্নে এ রকম একটি ঘটনা উল্লেখ করা হল:
মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার সময় একটা গাছের নিচে রাসূল () কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পর দেখা গেল যে, কিছু সাধারণ লোকজন এ গাছটিকে বুজুর্গ মনে করতে শুরু করে এবং এর নিচে বিশ্রাম গ্রহণ করা পূণ্যের কাজ মনে করতে থাকে। উমার -এর কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি গাছটিকে কেটে ফেলার নির্দেশ দেন এবং সেখানে অবস্থান করার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এর কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, 'আমি এ গাছের মধ্যে শিক্কের গন্ধ পেয়েছি।'
এ ঘটনা থেকে বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায় যে, ইসলাম শিকের গন্ধযুক্ত কোন কাজকে শুধু বর্জনই করে না, একে সমূলে ধ্বংস করারও হুকুম দেয়।
ইসলামে প্রাণীর প্রতিকৃতি নিষিদ্ধ হওয়ার অন্যতম তাৎপর্য হল, মুসলিমদের চিন্তা-চেতনা এবং মন-মানসকে শিরকের কলুষ থেকে পবিত্র রাখা। তাওহীদের বিষয়ে ইসলাম অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এটা অত্যন্ত যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত। কেননা, অতীত জাতিসমূহে মূর্তির পথেই শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।
পৃথিবীর কোন সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) মুসলিম দেশের সরকার যদি মূর্তি ও ভাস্কার্য নির্মাণ শিল্পে জড়িয়েও পড়েন, তাহলেও তা মুসলিমদের জন্য আদর্শ হতে পারে না। আমাদের এ দেশ পৃথিবীর একটি মুসলিম রাষ্ট্র। এ দেশের বুকে ঘুমিয়ে আছেন এমন অনেক পুণ্যবান আলিম-মাশায়েখ যারা বাংলাদেশে তাওহীদের পতাকা উড়িয়েছেন। মুশরিকদের 'সংস্কৃতি-আচার-আচরণ'-এর পরিবর্তে এ দেশে তারা কায়েম করেছিলেন ইসলামী সংস্কৃতি ও নিয়ম-নীতি। তারা চেয়েছিলেন শির্ক বর্জিত জীবন ব্যবস্থা কায়েম করতে এবং ইসলামী সংস্কৃতিকে সমাজের সকল স্তরে উজ্জীবিত করতে। অথচ আজ আমরা দেখছি বিপরীত অবস্থা, বিপরীত দৃশ্য। তাওহীদের চাষাবাদ করা এ ভূখণ্ডের দর্শনীয় স্থানগুলো মূর্তি প্রদর্শনীর কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, শহরের প্রধান প্রধান রাস্তার মোড়, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠ ও চত্ত্বরসমূহ। উদাহরণস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। এ বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে, জগন্নাথ হলের ভিতরে ও সামনে পুকুরপাড়ে, মহসীন হলে গেটে বসুনিয়া তোরণের পাশে, মধুর ক্যান্টিনের সামনে, শামসুন্নাহার হলের সামনে, আনোয়ার পাশা (পুরাতন জাদুঘর) ভবনের সামনে, চারুকলার বকুলতলার সামনে ছাড়াও বিভিন্ন ভবনের সামনে রয়েছে নানা ব্যক্তির প্রতিকৃতি। জগন্নাথ হল, এসএম হল এবং উদয়ন স্কুলের মোহনায় ফুলার রোডে বিরাট এলাকা জুড়ে বহু মূর্তির সমন্বয়ে একটি ভাস্কর্য নির্মিত হয়েছে। মূলত চারুকলা ও আনোয়ার পাশা ভবনের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা মূর্তিগুলো এনে বসানো হয়েছে এখানে। একসাথে প্রায় ৮০টির মতো মূর্তি বিভিন্ন ভঙ্গিতে বসানো হয়েছে। কাজ নিখুঁত না হওয়ায় এদের সনাক্ত করা কষ্টকর।
মূর্তি, মূর্তি এবং মূর্তি। শুধু মূর্তি আর মূর্তি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে এখন মূর্তির ছড়াছড়ি। গাছের তলে ঝোঁপের আড়ালে মূর্তি। ভাস্কর্যের নামে শিল্প সৌকর্যবিহীন অগণিত মূর্তি এলোমেলোভাবেও ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। এ সবের মধ্যে যুবক-যুবতীর মূর্তিও রয়েছে, রয়েছে হিন্দু অবতার কৃষ্ণ ও তার প্রেমসঙ্গিনী রাধার যুগল মূর্তি। টিএসসি সড়ক দ্বীপেও মূর্তি। ডাসের পিছনে 'স্বোপার্জিত স্বাধীনতা' মূর্তি। যৌন আবেদনময় রুচিহীন অনেক মূর্তি যত্রতত্র পড়ে আছে। শিল্পের নামে শত শত মূর্তি ও মূর্যাল চিত্র তৈরি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে আজ পৌত্তলিক সংস্কৃতি চর্চার আখড়ায় পরিণত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক জাহিলিয়াতের যুগের ৩৬০টি মূর্তির রেকর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস অনেক আগেই ভঙ্গ করেছে। এখন মূর্তি সংস্কৃতিপন্থীদের লক্ষ্য দেশের প্রত্যেক শহর, নগর, বন্দর এমনকি থানা সদর পর্যন্ত মূর্তি দিয়ে ভরে তোলা। কোন কোনটা হবে চেনা-জানাদের মূর্তি (ভাস্কর্য নামে) আর কোন কোনটা হবে অচেনা ও অজানাদের মূর্তি। ভাস্কর্য নামে আন্দোলন করে মূর্তির প্রতিষ্ঠা, কি চমৎকার কৌশল!
বাংলাদেশে মূর্তি তৈরির প্রথম ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯৫ সালের ৮ই এপ্রিল। ১৯৬৪ সালে মাত্র দু'জন ছাত্র নিয়ে তৎকালীন আর্ট কলেজে ভাস্কর্য বিভাগের কাজ শুরু হয়। বর্তমানে এ বিভাগে ছাত্রের অভাব নেই। প্রচুর ছাত্র। মূর্তি-ভাস্কর্যের ছড়াছড়িই প্রমাণ করে বিভাগটি কত সরগরম।
১৯৮৩ সালের মে মাসে জনৈক পুলিশ কর্মকর্তা কুষ্টিয়ার একটি থানার মালখানা থেকে ৬টি মূর্তি এনে এলিফ্যান্ট রোডে পুলিশ অফিসার্স মেসে স্থাপন করেন। অফিসার্স মেসের 'শোভা বর্ধনের' জন্যই স্থাপন করা হয় বলে কর্মকর্তা অভিমত ব্যক্ত করেন। মসজিদ নগরী ঢাকাকে মূর্তি নগরীতে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন চলছে।
মূর্তি পূজা, মূর্তি নির্মাণ, মূর্তির প্রতি ভালবাসা প্রদর্শন ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। মুসলিম নামের মূর্তিপন্থীরা বলছেন, আমরা তো মূর্তি তৈরি করছি না, ভাস্কর্য তৈরি করছি। ভাস্কর্য দিয়ে রাজধানী সাজাচ্ছি। এটা তো দোষের কিছু নয়। মুসলিম নামের একজন ভাস্কর বলেছেন, মূর্তি আর ভাস্কর্য এক বস্তু নয়, সম্পূর্ণ ভিন্ন।
এ সব ধারণা তারা কোথায় পেলেন, তা তারাই ভাল জানেন। অভিধান থেকে আমরা জানতে পারি যে, মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে কেবল শব্দের পার্থক্য ছাড়া বিশেষ আর কোন পার্থক্য নেই। অতি হালকা একটা পার্থক্য অবশ্য আছে তা পরে আলোচিত হবে।
মূর্তি মানে দেহ, শরীর, আকৃতি, চেহারা, রূপ, প্রতিমা অর্থাৎ মূর্তিমান, মূর্তিপুজা, অশরীরীর দেহ ধারণ, বাস্তব বা কাল্পনিক দেহ গড়ন ইত্যাদি। মূর্তিকে ইংরেজি ভাষায় বলা হয় Idle। এ আইডল সম্পর্কে সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং ভাস্কর্য সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রামাণ্য পুস্তকে বিভিন্ন সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা রয়েছে। এখানে মাত্র তিনটি উদ্ধৃত করা হল:
1. An image of God of Goddess. 2. An object of worship 3. An object of love of deem devotion or admiration
অর্থাৎ: ১. দেব-দেবীর প্রতিমূর্তি ২. পূজার বস্তু ৩. ভালবাসা বা পরমভক্তির পাত্র বা বস্তু
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রামাণ্য পুস্তকে মূর্তির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, 'শুধু দেব-দেবীর প্রতিমা তৈরির নামই মূর্তি নয়, বরং কোন ব্যক্তি বা বস্তুর ওপর আমাদের শ্রদ্ধা-ভালবাসা এমন গভীর থাকে, যার ফলে আমরা তাতে সীমালংঘন করে এবং কখনো অযৌক্তিকভাবে যুক্ত হয়ে সেই ব্যক্তি বা বস্তুর আকৃতি গড়ে তুলি, তাও মূর্তি।'
ভাস্কর্য ও মূর্তিকে কেউ কেউ পৃথক অর্থে ব্যবহারের চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে শব্দ দু'টির মধ্যে প্রায়োগিক অর্থে কোন পার্থক্য নেই, বরং দু'টিই অভিন্ন শব্দ। মূর্তি বা ভাস্কর্য গড়ার কলাকৌশল প্রায় একই। মূর্তি নামে যা গড়া হয়, তার মধ্যে মুখ্য থাকে ধর্মীয় মনোযোগ আর বিশ্বাস। কিন্তু ভাস্কর্য গড়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় মনোযোগ বা বিশ্বাস মুখ্য থাকে না বটে, কিন্তু একেবারে যে বাদ যায়, তাও বলা যায় না। ভাস্কর্যে যখন ভাস্করের বা বিশেষ মহলের অথবা উদ্যোক্তাদের প্রিয় ব্যক্তির প্রতিকৃতি খোদায় হয়ে দর্শকদের সামনে ভাসে আর তাতে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, তখন আর একে ভাস্কর্য বলা যাবে না, সেটা মূর্তি হয়ে যায়; এমনকি যে ছবির ফ্রেমের উপরে তারকাঁটা (পেরেক) বসিয়ে জন্ম ও মৃত্যু দিবসে ফুলের মালা দিয়ে সাজিয়ে তোলা হয়, সে ছবিটিও মূর্তির চরিত্র ধারণ করে। অতএব, যারা মূর্তি ও ভাস্কর্যকে পৃথক ব্যাখ্যা করেন এবং উপাসনার জন্য নির্মিত না হলে দোষণীয় নয় বলার চেষ্টা করেন, তারা হয় মূর্খতার মধ্যে নিপতিত, নয়তো জ্ঞানপাপী। কেননা, এ বিষয়ে ইসলামের বিধিবিধান এবং মূর্তি তৈরি সম্পর্কে অসংখ্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত মর্মান্তিক পরিণতির বিবরণই জ্ঞানী মহলের জন্য যথেষ্ট।
মূলত, স্মারক মূর্তি থেকেই পূজার মূর্তির সূচনা হয়েছে। তাছাড়া, বাংলা পিডিয়ায় ভাস্কর্যের যে প্রবন্ধটি রয়েছে তার সারকথাই হল, এ শিল্পের সূচনা ও বিকাশ পুরোটাই ঘটেছে মূর্তিকে কেন্দ্র করে। বিখ্যাত ও প্রাচীন সকল ভাস্কর্যই বিভিন্ন দেবদেবীর মূর্তি। যেমন, কিছু উদ্ধৃতি তুলে দেয়া হল:
১. এ শিল্পের কেন্দ্র ছিল মথুরা। এখানে সে সময় মূলত ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ ও জৈন-এ প্রধান তিনটি কেন্দ্রের অনুসারীরা পূজার নিমিত্তে মূর্তি বানাতে গিয়ে এর সূচনা করেছিল।
২. গুপ্ত শাসকগণ ছিলেন একনিষ্ঠ বৈষ্ণব। প্রাথমিক গুপ্তমূর্তিগুলোর বেশিরভাগই বিষ্ণু অথবা বিষ্ণু সংশ্লিষ্ট অন্য যেকোন মূর্তি। এ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্যটি বিহারের ভাগলপুরের শাহকুণ্ড থেকে আবিষ্কৃত নরসিংহ মূর্তি।
৩. বাংলার গুপ্ত ভাস্কর্যগুলো বেশিরভাগই প্রতীকী এবং এগুলোর আকৃতি নির্ধারিত হয়েছে মধ্যদেশ বা মধ্যভারতের পুরোহিত কর্তৃক বর্ণিত দেবতাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে।
৪. অষ্টম শতাব্দীর মাঝামাঝিতে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী ছিলেন এবং এ ধর্মের মহাযান মতবাদটি তাদের উদার পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে। পাল রাজাদের সর্বপ্রাচীন নমুনাটি ধর্মপালের ২৬ রাজ্যাঙ্কের (আনুমানিক ৭৭৫-৮১০ খ্রি.) যা বিহারের গয়া থেকে পাওয়া গেছে। দেবপালের সময়ের তারিখ সম্বলিত বলরামের দুটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য ও তারার একটি প্রস্তর ভাস্কর্য এ অঞ্চল থেকেই পাওয়া গেছে।
৫. বাংলার বিভিন্ন এলাকা থেকে দশম শতকে যে সকল ভাস্কর্য আবিষ্কৃত হয়েছে, তাতে বৌদ্ধ মূর্তির সঙ্গে অনেক ব্রাহ্মণ্যমূর্তিও অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণ হিসেবে প্রতীকী চিহ্ন সম্বলিত বেশ কিছু মনসা মূর্তির কথা বলা যায়, যেগুলো এ অঞ্চলের প্রথম পর্যায়ের ভাস্কর্য হিসেবে পরিচিত।
৬. পশ্চিম দিনাজপুরের এহনাইল থেকে প্রাপ্ত লক্ষ্মী-নারায়ণের যুগল মূর্তিটি (২৪.৪ সে.মি.) তাদের কমনীয় আলিঙ্গনভঙ্গির জন্য শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য হিসেবে প্রতীয়মান।
এ ছাড়াও আরো অনেক উদ্ধৃতি উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলা পিডিয়ায় 'মূর্তিতত্ত্ব' শীর্ষক প্রবন্ধ থেকে কিছু উদ্ধৃতি তুলে দেয়া হল:
'মহাজাগতিক বা পঞ্চবোধিসত্ত্ব বাংলায় পৃথকভাবে পূজিত হতেন। মান্দার (নওগাঁ জেলা) ভারসন থেকে প্রাপ্ত ও বরেন্দ্র জাদুঘরে রক্ষিত মস্তকবিহীন কালো পাথরে খোদিত ধ্যানীবুদ্ধ অক্ষোভ্যের এ অনিন্দসুন্দর ভাস্কর্যটি পঞ্চবোধিসত্ত্ব ভাস্কর্যের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ।'
জৈন ধর্মীয় মূর্তি প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে নিবন্ধকার বলেন, 'শুধু বর্ধমানেই নয়, পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, মেদিনীপুর ও বাঁকুড়া জেলাগুলোতে প্রচুর সংখ্যক পাথরের জৈন ভাস্কর্য ও অন্যান্য পুরাবস্তু আবিষ্কৃত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু কিছু এখনো সেখানে পূজিত হচ্ছে, আবার কিছু কিছু জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে।'
মোটকথা, ভাস্কর্য থেকে মূর্তি এবং মূর্তি থেকে ভাস্কর্য- এ চলাচলই হল মূর্তি ও ভাস্কর্যের সুদীর্ঘ ইতিহাসের সারকথা। একে অস্বীকার করা বাস্তবতাকেই অস্বীকার করার নামান্তর।
> ইসলামের মূল আদর্শ ও চেতনার সঙ্গে মূর্তি ও ভাস্কর্যের বিরোধ হল: কোন কোন ভাস্কর তার নির্মিত বস্তুর ব্যাপারে এতই মুগ্ধতার শিকার হয়ে যায় যে, যেন ওই প্রস্তরমূর্তি এখনই জীবন্ত হয়ে উঠবে! এখনই তার মুখে বাক্যের স্ফূরণ ঘটবে! বলাবাহুল্য, এ মুগ্ধতা ও আচ্ছন্নতা তাকে এক অলীক বোধের শিকার করে দেয়। যেন সে মাটি দিয়ে একটি জীবন্ত প্রাণী সৃষ্টি করে ফেলেছে! এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা কোন সীমারেখার পরোয়া করে না। নগ্ন অর্ধনগ্ন নারীমূর্তি, মূর্তিপূজার বিভিন্ন চিত্র ও নিদর্শন ইত্যাদি সবকিছুই নির্মাণ করে থাকে। এ শিল্প হচ্ছে অপচয় ও বিলাসিতার পরিচয়-চিহ্ন। বিলাসী লোকেরা বিভিন্ন উপাদানে নির্মিত প্রতিকৃতিসমূহের মাধ্যমে তাদের কক্ষ, অট্টালিকা ইত্যাদির 'সৌন্দর্য বর্ধন' করে থাকে। ইসলামের সঙ্গে এ অপচয় ও বিলাসিতার কোন সম্পর্ক নেই। মূর্তি ও ভাস্কর্যের মতো স্থূল উপকরণের মাধ্যমে স্মৃতিরক্ষার প্রয়াস প্রকৃতপক্ষে পশ্চাৎপদতা। প্রাচীন গ্রীক ও পারস্য সভ্যতায় এটা বিদ্যমান ছিল। পরে ইউরোপীয়রা তা অনুসরণ করেছে। এরা স্বভাবগতভাবেই ছিল মূর্তির পূজারী। তাদের পক্ষে মানুষের প্রতিভা ও বৈশিষ্ট্যের মূল্যায়ণ করা সম্ভব হয়নি। ত্যাগ ও বীরত্বের সমুন্নত দৃষ্টান্তরূপে মানুষের সম্ভাবনাকে অনুধাবন করা সম্ভব হয়নি বলেই তাদের বীর পুরুষদেরকে উপাস্য হিসেবে এবং উপাস্যদেরকে বীর যোদ্ধা হিসেবে কল্পনা করেছে।
যাহোক, আমরা সাধারণত জানি, দেব-দেবীর মূর্তি হয়। কিন্তু শত শত বছর ধরে এ ধারণাও প্রত্যাখ্যাত। কারণ একটাই, আর তা হচ্ছে, দেব-দেবীদের অস্তিত্ব আছে কিনা সে বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, কেউ কি কখনো দেব-দেবীদের দেখেছেন? কেউ দেখেননি। কোন শিল্পীর নজরে তাদের ছায়াও পড়েনি। এখানে প্রশ্ন, তাহলে তাদের চেহারা একমাত্র কল্পনার রূপ দেয়া ছাড়া কি সম্ভব? সুতরাং বলা যায়, কাল্পনিক হোক বা বাস্তব হোক, সবই মূর্তি। আর এ মূর্তিগুলোর অধিকাংশেরই নতুন নামকরণ হয়েছে ভাস্কর্য। নর্তকীর নতুন নাম যেমন নৃত্যশিল্পী।
মুসলিমদের জন্য প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ হয়ে উঠেছে মূর্তিময়। মূর্তি স্থাপনের এলাকা ক্রমশ সম্প্রসারিত হচ্ছে। এক সময় ঢাকাকে বলা হতো মসজিদের নগরী। তারপর লোকে রিকশার নগরীও বলত, এখনো বলে। বস্তির নগরীও বলে থাকে। দু'দিন পর মূর্তির নগরীও বলবে, সে সময় দ্রুত আসছে। তখন হয়ত মসজিদ আর মূর্তির মধ্যে দ্বন্দ্ব জাগবে। তখন যদি মূর্তিপ্রেমিকরা মসজিদের উচ্ছেদ চায়, তাহলে অবাক হওয়ার কোন কারণ থাকবে না। মূর্তির দেশে মসজিদের সংখ্যা এ সব কারণেই কমে।
কালে কালে আমরা অনেক পরিবর্তনই দেখছি। বেশ্যারা সমাজের কতিপয় বুদ্ধিজীবীর নিকট থেকে 'সেফটি ভাল্ব' উপাধী পেয়ে হয়েছে যৌন কর্মী, নর্তকীকে দেখছি নৃত্যশিল্পী হিসেবে, রাহাজানি করে যেসব দস্যু তারা হয়েছে ছিনতাইকারী। আর ভারতীয় মূর্তি সভ্যতা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে ভাস্কর্য নামে। কারণ, মূর্তির মর্মবাণী আর দর্শন বাংলাদেশীদের শোনাতে গেলে বা সে শিক্ষা বাংলাদেশীদের অন্তরে স্থাপন করতে হলে ভাস্কর্যের মুখোশ তো অত্যন্ত জরুরী। বর্তমানে বাংলাদেশে মূর্তি ও ভাস্কর্য সমার্থক শব্দ হয়ে গেছে। যা মূর্তি তাই ভাস্কর্য। পূজার মূর্তি কল্পিত, ভাস্কর্যরূপ মূর্তি পরিচিত, মাঝে মাঝে কিন্তু আছে বিমূর্ত। ফারাক শুধু এই। আজকাল মিছিলেও মুখোশ মূর্তি লাগান হয়।
এক আল্লাহতে বিশ্বাসী তাওহীদবাদীদের কাছে ব্যক্তি বা বস্তু পূজার কোন কানাকড়ি মূল্য নেই। এ পূজার ধারণা প্রত্যেক মু'মিনের মগজ থেকে, মন থেকে বিলকুল মাইনাস। এখন যদি এ মাইনাসকে মাইনাস করা সম্ভব হয়, আর সে স্থানে স্থাপন বা প্রতিস্থাপন করা যায় মূর্তির ধ্যান-ধারণা, চিন্তা ও ভালবাসাকে, তাহলে এ মগজে বহু স্রষ্টার রাজত্ব কায়েম হবে, শয়তান হবে সে রাজত্বের গভর্নর। বিনা হামলায় কৌশলে কাবু। এ জন্য সাংস্কৃতিক অঙ্গন সুকৌশলে দখলের চিন্তা করে কুশলী শিকারীরা। কখনো নীরবে আবার কখনো সরবে এবং সাড়ম্বরে শিকার পরিকল্পনা বাস্ত বায়ন করছে।
মূর্তির ব্যাপার-স্যাপার বিশ্বের নেতৃস্থানীয় কোন ধর্মে নেই এবং কখনো ছিল না। মূর্তির পূজা একান্তভাবে কাল্পনিক এবং এ ধারণা অবৈজ্ঞানিকও। ধর্মের সঙ্গে মূর্তির কোন সম্পর্কও নেই। মূর্তিপূজা বিশ্বের একটি মাত্র ধর্মের মূলধারায় এবং তার শাখা-প্রশাখায় রয়েছে, অন্য কোন ধর্মে মূর্তি পূজা নেই। আরবে এক সময় মূর্তিপূজা ছিল না, আবার এক সময় ছিল, তারপর মূর্তিপূজা ও মূর্তি চিরতরে নির্বাসিত হয়। মূর্তি পূজার স্বপক্ষে কোন দলিল নেই। দলিল থাকবেই বা কেমন করে। দেব-দেবীর মূর্তি গড়ে যারা মূর্তিকে সামনে নিয়ে পূজা করে, তারা কি বলতে পারে যে, এ মূর্তির চেহারা অমুক দেব বা দেবীর? দেব-দেবীর অস্তিত্ব আছে বলে যাদের ধর্মীয় বিশ্বাস, তাদের এ ধর্মীয় বিশ্বাসকে মেনে নিলেও এ প্রশ্ন কি করা যায় না যে, দেব-দেবীরা কি দৃশ্যমান? মানুষ কি তাদের দেখতে পায়? না, দেখা যায় না, মানুষ দেখতে পায় না, তারা দৃশ্যমান নয়, তারা কায়াহীন, অদৃশ্য। যাদের দেখা যায় না, অদৃশ্য তাদের প্রকৃত চেহারা মাটি, পাথর বা কাঠের মূর্তিতে রূপ দেয়া কি সম্ভব? মোটেই সম্ভব নয়, শুধু কল্পনা করা যায়। সুতরাং ধর্মীয় কোন ভিত্তি ছাড়া শুধু কল্পনায় গড়া মূর্তি আর মূর্তি সামনে নিয়ে পূজা কখনো ধর্মীয় পূজা হতে পারে না, সংস্কৃতি তো নয়ই। সংস্কৃতি তো সংস্কার থেকে উদ্ভূত। যে সংস্কারে ধর্মীয় ভিত্তি নেই তা সংস্কার হয় কেমন করে, সংস্কারের তো একটা ভিত্তি থাকতে হবে? ভিত্তিটা কি? সংস্কার ছাড়া সংস্কৃতি হয় না।
ধর্মে যে প্রথার স্বীকৃতি নেই, সে প্রথাকে পূজায় আনা যায় না। সনাতন পূজা মূর্তি পূজা নয়। হিন্দু ধর্মের আধ্যাত্মিক চিন্তা রাজ্যে দু'টি প্রধান ধারা লক্ষ্য করা যায়। একটি হচ্ছে বৈদিক অপরটি তান্ত্রিক। বৈদিক ধারার মূল ভিত্তি হচ্ছে বেদ ও উপনিষদ, আর তান্ত্রিক ধারা হচ্ছে অসংখ্য তন্ত্রগ্রন্থ। দেব-দেবীর পূজা কিংবা মূর্তিপূজা তান্ত্রিক মতানুসারে সম্পন্ন হয়। বৈদিক যুগে মূর্তিপূজা ছিল না। সেই যুগে আরাধনার মাধ্যম ছিল যজ্ঞকর্ম। ঈশ্বর বা ভগবানকে সকার রূপে আরাধনা করা, অসীমকে সীমার মাঝে, অপরূপকে রূপ দিয়ে মূর্তি পূজার বা পূজা পদ্ধতির আবিষ্কার বৈদিক পরবর্তী যুগে হিন্দু মুণি-ঋষির দ্বারা প্রবর্তিত হয়। আর মূর্তি গড়ার ইতিহাস যখন এই, তখন মূর্তিকে মুসলিম নামের বাবু-মুসলিমরা কোন্ ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে এত ভালবাসতে শুরু করলেন, তা বোঝা যায় না। হিন্দু ধর্মে মূর্তি যদি নানা সংস্কারে গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতিও পায়, তাহলে তা তাদের পূজায় থাক্ না, এ নিয়ে এক শ্রেণীর মুসলিমদের কাড়াকাড়ি কেন? এ কি অনধিকার চর্চা হয় না?
দুর্ভাগ্য যে, মূর্তি পূজারীদের ন্যায় বর্তমান যুগের নামধারী মুসলিমরাও মূর্তি বা মৃতব্যক্তির স্মরণে নির্মিত পিলারকে সম্মান করে, নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা করে, যা আরো জঘন্য। ঐ সকল মুশরিক ও এ মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? অতএব সাবধান!
কবি শফিকুল ইসলামের কবিতায় মূর্তি ও ভাস্কর্য সম্পর্কে বলা হয়েছে:
যুক্তিবাদের যুক্তিতে হায় জাহেলিয়াতের আগমন ফের আজরের মূর্তি আবার মোদের হাতেই উত্তোলন। সাভারের মিনার কেমনে শাহাদাতেরই সাক্ষ্য হয়? এদেশের ভার্সিটিতে কিসের মূর্তি দেখা যায়? যুগে যুগে এমনি করে মূর্তিপূজক এসেছে। স্বাধীনতার দোহাই পেড়ে মূর্তি ওরা গড়েছে। মিনারে নিরবতা এই বিধান কি ইসলামের মুসলমান নতজানু, খাম্বা দেখে সিমেন্টের। বিশ্বে শহীদ কে আছে রে, তাদের চেয়ে সম্মানী? বদর, ওহুদ খন্দকে যারা করল জীবন কুরবানী। হয় না কেন মিনার তাদের, হয় না কেন অনুষ্ঠান? মুসলমানের করছ দাবী কেমন তুমি মুসলমান! যুক্তিবাদের যুক্তিতে হায় জাহেলিয়াতের আগমন ফের আজরের মূর্তি আবার মোদের হাতেই উত্তোলন।
টিকাঃ
১. মূর্তি বা ভাস্কর্যের আরবী শব্দ হচ্ছে 'তিমছাল' (تمثال), 'ছানাম' (صنم), 'নাহত' (نحت) প্রভৃতি। - মূলত ভাস্কর্য হচ্ছে একটি শিল্পের নাম। যে শিল্পে পাথর, মাটি বা কোন ধাতব বস্তু খোদাই করে মূর্তি নির্মাণ করা হয়। আর যিনি ভাস্কর্য তৈরি করেন তাকে বলা হয় ভাস্কর বা মূর্তি নির্মাণকারী।
২. Tafsir Ibn Kathir, vol. 10, p. 172; At-Tabari, 24:13.
৩. মুত্তাফাক্ব আলাইহ, বুখারী, হা/২৪৭৮ ও ৪২৮৭; আর-রাহীকুল মাখতুম, পৃঃ ২৭২।
৪. সহীহ আবু দাউদ, হা/৩৫0২ 'ছবিসমূহ' অনুচ্ছেদ।
৫. জহুরী, অপসংস্কৃতির বিভীষিকা, পৃষ্ঠা ৩৪-৫৫।
৬. Any person or thing on which we strongly set our affettion; that to which we are excessively, often improperly attached. ভাস্কর্যকে ইংরেজি ভাষায় বলে, Sculpture -এর মানে ও ব্যাখ্যা হচ্ছে, 'The Art of carving, cutting or hewing stone or other materials into images of men, beasts. The Art of imitating natural objects in solid substances representation some real or imaginary objects.'
৭. বিস্তারিত দেখুন এ বইয়ের ১৯ পৃষ্ঠায়।
৮. বাংলা পিডিয়া, ৭ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৩৩-৫, ৩৩৭-৯।
৯. প্রাগুক্ত, ৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৪।
১০. প্রাগুক্ত, ৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩১৮।
📄 শিখা চিরন্তন-অনির্বাণ, দয়াল আর অস্ত্রধারী এ সকল নিয়ে কেড়ে মুসলিমের ঈমান প্রদীপ
শহীদ মিনার সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরাই জ্বালিয়েছে শিখা অনির্বাণ। অগ্নিউপাসকদের সংস্কৃতি এখন লালন করছে মুসলিমরা। জাতীয় স্মৃতিস্তম্ভ এবং শিখা অনির্বাণ নামে একটি শিখা প্রজ্জ্বলিত করা হয়েছে। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট-এ অবস্থিত এ শিখার সামনে জাতীয় দিবসগুলোতে অভিবাদন জ্ঞাপন করা হয়।
অথচ, প্রত্যেক জাতিই মৃতদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে এবং শেষ কৃত্য সম্পাদন করে। কেউ মরদেহের অপমান করে না। অসম্মান করে না। তবে বোধ- বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য অনুযায়ী এ সম্মান প্রদর্শনে ও শেষ কৃত্য সম্পাদনে পার্থক্য হয়। কেউ সুগন্ধি সাবান দিয়ে গোসল করিয়ে, নতুন কাপড় পড়িয়ে, সলাতে জানাযা আদায় করে দাফন করে। কেউবা গোবর ছিটিয়ে এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য পন্থা শেষে অগ্নি প্রজ্বলন করে দেহকে দাহ করে ছাই-ভষ্ম পানিতে নিক্ষেপ করে; কেউবা পাহাড়ে- পর্বতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দেয়, কেউবা সেই ভষ্ম নির্দিষ্ট আঁধারে সযত্নে সংরক্ষণ করে।
আবার মৃত্যুর পরে মৃতের রূহের মাগফিরাতের জন্য, বিদেহী আত্মার সদাতির জন্য, প্রশান্তির জন্য কৃত কর্মকাণ্ডে জাতি ভেদে, বোধ-বিশ্বাস ভেদে পার্থক্য হয়। আমরা মুসলিম, তাই মৃতব্যক্তির রূহের মাগফিরাতের জন্য কুরআন ও সহীহ হাদীসে বর্ণিত নিয়মসমূহ পালন করি। আবার হিন্দু ধর্মবলাম্বীরা তাদের গুরুজনের বিদেহী আত্মার সদাতির জন্য, প্রশান্তির জন্য হোম, যজ্ঞ, তর্পণ পিণ্ডদান ইত্যাদি করেন। দেশ, ধর্মবিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্নতার জন্য পদ্ধতি ভিন্ন হয়েছে এবং তাই স্বাভাবিক। এ পদ্ধতিগত পার্থক্যের কারণে কেউ সম্মান করছে না, এ কথা বলা যাবে না।
কারণ, সম্মান প্রদর্শনের একটাই মাত্র পন্থা বা পদ্ধতি নয়; বহু পন্থা, বহু পদ্ধতি রয়েছে। দেশে ভেদে, জাতি ভেদে, বোধ-বিশ্বাস ভেদে এ সম্মান প্রদর্শনের পন্থা ও পদ্ধতিতে পার্থক্য হতে পারে, হয়ে থাকে। এটাই স্বাভাবিক। সম্মান প্রদর্শনের পন্থা ও পদ্ধতির সাথে মানুষের ধর্মবিশ্বাসের একটা সম্পর্ক আছে। ইতিহাস-ঐতিহ্যের একটি সম্পর্ক আছে। কৃষ্টি ও সংস্কৃতির একটি সম্পর্ক আছে। প্রতিটি ধর্মের মানুষের নিজ নিজ ধর্মের বৈশিষ্ট্য, স্বাতন্ত্রতা রক্ষার অধিকার আছে। এটা সাম্প্রদায়িকতা নয়।
কোন পদ্ধতির বিরোধিতা করা মানে মূল লক্ষ্যের বিরোধিতা করা নয়। লক্ষ্য আর উপায় তো এক নয়, তাই শিখা চিরন্তনের বিরোধিতা মানে স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করা নয়। স্বাধীনতার প্রতি, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি বা শহীদদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা নয়। যারা শিখা চিরন্তন, শিখা অনির্বাণ বা প্রজ্বলিত অগ্নির মাধ্যমে বা প্রতীকে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা করছেন, তার কারণটাও ঐ পদ্ধতি। কিন্তু আমাদের এক শ্রেণীর আঁতেল, বুদ্ধিজীবী লক্ষ্য আর উপায়টাকে উদ্দেশ্য- প্রণোদিতভাবে এক করে ফেলছেন। স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ আর প্রজ্বলিত আগুন বা শিখা চিরন্তন এক করে ফেলতে চাইছেন। প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার বিরোধিতাকে, মুক্তিযুদ্ধের, শহীদদের, স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতা রূপেই চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির বিভিন্নতার দরুন অনেকেই শিখা চিরন্তন বা অগ্নি প্রজ্বলনের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধী হতে পারেন, তাই বলে তিনি বা তারা যে স্বাধীনতার বিরোধী বা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী- এ কথা সত্য নয়। প্রজ্বলিত অগ্নির মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শনের বিরোধিতার কারণ বিশ্বাসগত, ঐতিহ্যগত, ধর্মীয়।
অগ্নিকে সম্মান প্রদর্শন বা অগ্নির মাধ্যমে অথবা অগ্নিকে প্রতীক বানিয়ে অন্য কাউকে বা অন্য কিছুকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানানোর এ পদ্ধতিটি মুসলিমদের নয়। এটা মুসলিমদের ঈমান-আকীদা, বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। এটা পারসিক, হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীর বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, সামঞ্জস্যশীল। এটা কারো অজানা বিষয় নয়, কম-বেশি সকলেই জানেন। যেসব লোক এর বিরোধীদের গালাগাল করছেন, তারা জানেন আরো ভালোভাবেই।
অগ্নি বা আগুন হিন্দুদের অন্যতম প্রধান দেবতা। বঙ্গীয় শব্দকোষে শ্রী হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, 'অগ্নি অগ্নি-অগ্রং যজ্ঞেষু প্রণীয়তে- যাহা যজ্ঞে প্রথমে প্রণীত হয়। অগ্নি ঋগবেদের দেবতাগণের অন্যতম। ইনি অমর রত্নদাতা, যজ্ঞের দেবতা হোতা ঋত্বিক সম্পাদক রক্ষাকর্তা ও হব্যবাহক। আকাশে সূর্য, বায়ুমণ্ডলে বজ্র এবং পৃথিবীতে অগ্নি- এর তিন রূপ। উপাসকরা এর প্রসাদে দীর্ঘজীবন ধন ও সমৃদ্ধি লাভ করেন। খাদ্য প্রাপ্তি এবং ক্ষুধা, দৈন্য শত্রু ও বিপদ হইতে রক্ষার নিমিত্ত এর স্তব করেন। ইনি দেবগণের মুখ এবং জিহ্বা। দেবতারা অগ্নিমুখে হুতদ্রব্য ভক্ষণ ও অগ্নি জিহ্বায় যজ্ঞবহ্নি আস্বাদন করেন। পুরানে অগ্নি ধর্মপত্নী বসুর গর্ভজাত। তার পত্নী স্বাহা এবং পাবক, পদমান ও শুচি তিন পুত্র; তিন পুত্রের পঞ্চাতারিংশ্যপুত্র। পঞ্চশী ঋগবেদের ১০.৯০.১ শ্লোকে আছে, পরম পুরুষের মুখে অগ্নির জন্ম। অগ্নি দেবতার প্রতিমা হচ্ছে স্থূলকায়, লম্বোদর, রক্তবর্ণ। কেশ-শ্মশ্রু ও চক্ষু পিঙ্গলবর্ণ। শক্তি ও অক্ষ সূত্র, বাহন ছাগ। পুরানে এর অন্যান্য প্রকার মূর্তির বর্ণনা আছে। কোথাও তার তিন পা, সাত হাত, দুই মুখ এবং বালার্কের ন্যায় বর্ণ। ইনি দক্ষিণ-পূর্ব কোণের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা। ঋগবেদের এক-চতুর্থাংশেরও অধিক শ্লোকে কেবল অগ্নির স্তব করা হয়েছে।'
প্রাচীনকালে পৃথিবীর প্রায় সকল দেশেই অগ্নিদেবের পূজা হতো। এখন ভারতবর্ষের হিন্দু ও পার্সীরাই কেবল এর অর্চনা করেন। তৈত্তরীয় সহিংসতায় আছে, প্রজাপতি অগ্নির সৃষ্টি করে দেবতাগণকে বিশ্রাম ভূমি স্বরূপ দান করেন। হিন্দু, পারস্য, কালডিয়া, মিসর, ইয়াহুদী, গ্রীক, রোমক, চীন প্রভৃতি সকল জাতির শাস্ত্রেই দেখা যায় যে, তাদের দেবমন্দিরে রাত-দিন অগ্নি প্রজ্বলিত থাকত।
হিন্দুদের অসংখ্য যাগযজ্ঞ আছে। যজ্ঞের জন্য হোম অপরিহার্য। হোমের জন্য অপরিহার্য অগ্নি। হোমের অর্থই হচ্ছে দেবোদ্দেশ্যে অগ্নিতে মন্ত্রপূর্বক ঘৃতাদি প্রক্ষেপ। এ হোমই এ জগৎ রক্ষা ও স্থিতির মূল। হোমের সম্যক অনুষ্ঠান না করলে বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টি না হলে শস্য জন্মে না, শস্যের অভাবে প্রজা উৎফুল্ল হয় না, সুতরাং ক্রমে জগৎ ধ্বংস হয়ে থাকে।
অতি প্রাচীনকাল হতেই পারস্যে অগ্নি উপাসনার প্রচলন ছিল। প্রাচীন পারসিকদের ধর্মগুরু ছিলেন জরান্তর (Zoraster) এবং তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম ছিল জিন্দাবেস্তা। জরথুস্ত্র প্রচার করেন যে, দু'জন দেবতার দ্বারা জগতের সমুদয় মঙ্গল-অমঙ্গল সাধিত হচ্ছে। মঙ্গলের দেবতা হচ্ছেন, 'আহরমাজদ' অথবা 'হরমজদ' আর অমঙ্গলের দেবতা হচ্ছেন 'আহরিমান'। মঙ্গলের দেবতা আহরমাজদ অগ্নিতে অবস্থান করেন। তাই মঙ্গল লাভের জন্য অনির্বাণ অগ্নিশিখার পূজা করতে হবে। পারস্যে পারসিকদের মন্দিরে যে অগ্নিশিখা স্থাপন করা হয় তা ছিল অনির্বাণ। হাজার বছরের অধিককাল ধরে তা একনাগাড়ে জ্বলে আসছিল।
সুতরাং, শহীদদের প্রতি, জাতির কৃতী সন্তানদের প্রতি, বীরদের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের এটা পদ্ধতি নয়। অগ্নি প্রজ্বলিত করে, অগ্নিশিখা স্থাপন করে বা অগ্নি প্রতীকের মাধ্যমে সম্মান প্রদর্শন মুসলিমদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী। বাংলাদেশের অধিবাসীদের প্রায় ৯০% মুসলিম। আক্বীদা-বিশ্বাস, আচার-আচরণে এঁরা বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি রূপে খ্যাত। তাঁদের বোধ-বিশ্বাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য, কৃষ্টি-সংস্কৃতির পরিপন্থী একটা পদ্ধতি জাতীয়ভাবে স্থায়ীভাবে স্থাপন করা সমীচীন কি-না, তা অবশ্যই ক্ষমতাসীনদের ভেবে দেখা দরকার। এভাবে অগ্নিকে সম্মান প্রদর্শন করা এক ধরনের অতি অবাঞ্ছিত শির্ক, যা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ এবং এটা হবে অতীতের পারসিক ধর্ম তথা মজুসীদের অনুসরণ যা বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশ বাংলাদেশে কোন অবস্থাতেই কাম্য নয়।
প্রত্যেক জাতির নিজস্ব সংস্কৃতি তার জাতিসত্তার ঐতিহ্যকে প্রকাশ করে। সংস্কৃতি কতগুলো অপরিবর্তনীয় মূল্যবোধকে প্রতিষ্ঠিত করে। ধর্মবোধ, রুচিবোধ এবং বিশ্বাসের ভিন্নতার জন্য জাতির উৎসব-অনুষ্ঠানের প্রকাশ ভঙ্গিতেও বিভিন্নতা দেখা দেয়। ভারতের সংখ্যাগুরু মানুষ হিন্দু। তারা বহু দেবতায় বিশ্বাস করে। তাদের সাংস্কৃতিক আচার-আচরণের প্রকাশভঙ্গিও তাই বহু অবতারবাদী। বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মুসলিম এক আল্লাহর উপাসক। সুতরাং মুসলিমদের সংস্কৃতি এবং বহু অবতারবাদী ভারতীয় সংস্কৃতি কখনো এক হতে পারে না। কিছু মানুষ স্বীকার না করলেও এটাই স্বীকৃত সত্য যে, ধর্মবোধই আমাদের জীবনধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কল্যাণবোধ, শ্রেয়বোধ ধর্মের কারণেই জাগ্রত হয়। ধর্মের কারণেই আমরা বুঝতে পারি, কোন্টা শালীন বা অশালীন।
অগ্নিপূজারী ভারতীয় সংস্কৃতিতে অগ্নি কালচারের প্রাধান্য তাদের ধর্মবোধ থেকেই নিঃসৃত। ধর্মশাস্ত্র অনুযায়ী 'অগ্নি' হিন্দু সম্প্রদায়ের নিকট প্রত্যক্ষ দেবতারূপী ভগবান। হিন্দুদের কাছে পূজা, প্রদীপ, মশাল এবং অগ্নি এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে আবদ্ধ। এর একটা ছাড়া অন্যটা অসম্পূর্ণ, অচল, অর্থহীন। জন্মাষ্টমী উপলক্ষ্যে একটি হিন্দু সংস্থা কর্তৃক শিখা চিরন্তনে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হয় এবং ঐ স্থানে 'অগ্নি দেবতার মন্দির' নির্মাণের দাবী জানানো হয়। এ দাবী তাদের খুবই প্রাসঙ্গিক।
হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ঋগ্বেদ সংহিতায় অগ্নিকে ২০০ সুক্তে স্তব করা হয়েছে, যা দেবরাজ ইন্দ্র ভিন্ন অন্য কোন দেবতা সম্বন্ধে করা হয়নি। ঋগ্বেদে অগ্নিকে এতই প্রাধান্য দেয়া হয়েছে যে, ঋগ্বেদ শুরু হয়েছে অগ্নি বন্দনা দিয়ে (১/১ সুক্ত) এবং শেষ হয়েছে অগ্নি বন্দনার মাধ্যমেই (১০/১৯১ সুক্ত)। ঋগ্বেদে বলা হয়েছে, অগ্নি পার্থিব দেবতাদের মধ্যে প্রধান। অগ্নি স্বর্গবাসী দেবতা এবং মর্ত্যলোকের মানবের মধ্যে যোগাযোগ বা মধ্যস্থতাকারী। অগ্নি দেবকূলের যজ্ঞের সারথি। ইনি আপন রথে দেবতাদের বহন করে যজ্ঞস্থলে নিয়ে আসেন। যার ফলে অগ্নি ছাড়া কোন যজ্ঞ হয় না। কোন শুভ কাজ শুরু হয় না। চালক না থাকলে যেমন মহামন্ত্রীও কোন শুভ কাজে উপস্থিত হতে পারেন না, তেমনি অগ্নি সারথি ব্যতীত দেবতাগণও যজ্ঞস্থলে বা শুভ কাজে উপস্থিত হতে পারেন না। সে জন্য অগ্নিকে হিন্দু ধর্মে পুরোহিত বলা হয়ে থাকে। আগুনের পরশ মণি ছাড়া কোন কাজই শুভ হয় না।
প্রায় প্রতিটি ধর্মপ্রাণ হিন্দু বাড়িতে তুলসী গাছের কাছে সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে সন্ধ্যারতি করা হয়। মঙ্গল প্রদীপের উৎস মঙ্গল আরতি থেকেই, যা অগ্নি দেবতার সঙ্গে সম্পর্কিত।
হিন্দুদের বাহ্যপূজার আর একটা প্রধান অঙ্গ হোম। মাটিতে বালি দিয়ে একটা চতুষ্কোণ বেদী তৈরি করা হয়। সেই বেদীর মাঝখানে 'কুশ' বা খড় দিয়ে একটা পদ্ম তৈরি করে তার উপর 'ওঁ' অক্ষরটি লিখতে হয়। পরে গব্যঘৃত কপূর ইত্যাদির মাধ্যমে 'হোমানল' অর্থাৎ আগুন জ্বালিয়ে, আতপ চাল, চিনি, যব-কপূর ইত্যাদি সহযোগে 'চরু' তৈরি করে সেই আগুনে আহুতি দিতে হয়। পরে সেই অগ্নিকে প্রণাম করে প্রার্থনা করা হয় এভাবে, 'হে মহান দেবতা অগ্নি! তুমি আমাদের হৃদয়ের অন্ধকার দূর করে দাও। তোমার জ্যোতিতে হৃদয় পূর্ণ করে দাও। আমাদের যত কু-গ্রহ, বাইরের ও অন্তরের যত প্রবল শত্রু, তাদের তোমার হোমানলে দগ্ধ করে দাও।'
হিন্দুদের নিকট অগ্নি সদামঙ্গলময় বিধায় তাদের জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ, পূজা-অর্চনা প্রায় সকল ক্ষেত্রেই অগ্নির ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। হিন্দু কাব্য সাহিত্যেও অগ্নি এসেছে পূজার হাত ধরেই। রবীন্দ্রনাথ তাঁর পূজা পর্বের গানে বহুবার পূজার সঙ্গে প্রদীপের উপমা ব্যবহার করেছেন, যেমন-
'আমার সকল দুঃখের প্রদীপ জ্বেলে করব নিবেদন আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন।'
কিংবা, 'আমার এই দেহখানি তুলে ধর তোমার ঐ দেবালয়ের প্রদীপ কর।'
অথবা, 'যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে, একে একে তারা আকাশ পানে ছুটবে বাঁধন হারা।'
এভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পূজা এবং অগ্নি সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে। আগুন ছাড়া পূজা হয় না। কারণ, আগুনের রথ ছাড়া দেবতা আসেন না।
হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মঙ্গল প্রদীপের মধ্যে মঙ্গল অনুসন্ধান করেন। কারণ, তাদের বিশ্বাস, অগ্নি দেব বহনকারী সারথি। স্বর্গের দেবতারা যাগ, যজ্ঞ, পূজা, বিবাহ প্রভৃতি শুভ কাজে অগ্নি ছাড়া আবির্ভূত হতে পারেন না। এ বিশ্বাস থেকেই এসেছে রাজঘাটের গান্ধী সমাধির চিতা অনির্বাণ বা ইন্ডিয়া গেটের চিতা চিরন্তন। একই বিশ্বাস থেকে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে তারা শুভ কাজ উদ্বোধন করে থাকেন। তারা বিশ্বাস করেন, শিখা কিংবা প্রদীপের আগুনের মাধ্যমে দেবতা মর্ত্যে আবির্ভূত হবেন এবং তিনিই কাজটিকে শুভ পথে পরিচালিত করবেন। অগ্নি দেবতার প্রতি বিশ্বাস এবং আস্থা থেকেই ভারতে শিখা কালচারের প্রচলন হয়েছে। বাংলাদেশেও কি তবে অগ্নি দেবতার বিশ্বাস নিয়ে শিখা কালচার শুরু করা হল?
বাংলাদেশ সাড়ে ১৩ কোটির বেশি মুসলিমের দেশ। এ দেশের জনগণের জীবন চিন্তা ভিন্ন ধরনের। তারা বিশ্বাস করে, একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই। তিনিই একমাত্র চিরন্তন, চিরঞ্জীব, তিনিই রক্ষাকর্তা। আসমান এবং জমিনের সবকিছু একমাত্র তাঁরই। আল্লাহর সাথে যেকোন বস্তু বা প্রাণীর শরীক স্থাপনের পশ্চাদমুখী প্রবণতার বিরুদ্ধেই ইসলামের অবস্থান।
অতএব, যারা আজ শিখা জ্বালিয়ে দেবলোকের দেবতাকে মর্ত্যে আনার চেষ্টা করছেন, মঙ্গল সারথির মতো মঙ্গল প্রদীপ জ্বেলে শুভ কাজ উদ্বোধন করে বাঙালিপনার কথা বলছেন, তারা প্রকৃতপক্ষে কোন্ বাঙালি কালচারের কথা বলছেন? সে কি বিগ্রহ পূজারী বাঙালি, না কি আল্লাহর একত্ববাদী বাঙালি, সেটাই পরিস্কারভাবে বুঝতে হবে। এ মুসলিম জাতি জানতে চায়, এ শিখা কালচার কাদের জন্য এবং কিসের জন্য?
আল্লাহর একত্ববাদী বাঙালি মুসলিমরা তো আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে না। অন্য কারো কাছে মঙ্গল (কল্যাণ) প্রত্যাশীও সে নয়। প্রতিটি মুসলিম আল্লাহ, তাঁর রাসূল (স) এবং আল্লাহর প্রেরিত বাণী সম্বলিত আল-কুরআনে বিশ্বাসী। সেই কুরআনই তাদেরকে শেখায়, 'সকল প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর যিনি পরম করুণাময়, দয়াময়। যিনি বিচার দিনের মালিক। আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি।' যেসব মৌলিক ভিত্তির ওপর ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত, তার প্রধান হল আল্লাহর একত্ব, ক্ষমতা, করুণা ও সর্বোচ্চ ভালবাসার প্রতি অগাধ বিশ্বাস। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে 'অগ্নিশিখা' কালচারকে, কিংবা কবরের মাটি দিয়ে বেদী গড়ার কালচারকে অথবা স্থাপত্যের নামে মূর্তি কালচারকে দেশের বুকে চাপিয়ে দিতে চাচ্ছেন, তারা কি মুসলিমদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে কোন খোঁজখবর রাখেন না?
যে দেশের সংখ্যাগুরু মানুষ যে সংস্কৃতির ধারক, সে দেশের সংস্কৃতিও গড়ে উঠবে সেই সংখ্যাগুরু মানুষের সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি সংখ্যাগুরুর ওপর চাপিয়ে দিলে অন্য ব্লাড গ্রুপের রক্ত যেমন শরীর ধারণ করতে পারে না, তেমনি জাতিও বিসদৃশ সংস্কৃতি ধারণ করতে পারবে না। ফলে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে বাধ্য।
বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু মানুষ মুসলিম। মুসলিমরা অগ্নি দেবতায় বিশ্বাস করে না, তারা একমাত্র আল্লাহর ওপর নির্ভরশীল। মুসলিমরা যখন কোন শুভ কাজ শুরু করে তখন অগ্নিদেবের শরণাপন্ন হয় না। তারা আল্লাহর নাম নিয়ে তাঁর প্রশংসা করার মাধ্যমে তাঁর কাছে কল্যাণের প্রার্থনা জ্ঞাপন ক'রে কাজ শুরু করে। মুসলিমরা ক্ষণস্থায়ী অগ্নিশিখাকে চিরন্তন মনে করতে পারে না, তাদের কাছে একমাত্র আল্লাহর অস্তিত্বই চিরন্তন। মুসলিমরা আগুন জ্বালে অন্ধকার দূর করার জন্য এবং রান্নাবান্নার জন্য। জীবনের কোন শুভ বা কল্যাণ বয়ে আনার অলৌকিক ক্ষমতা অগ্নির কাছে, এ ধারণায় মুসলিমরা বিশ্বাস করে না।
অতএব, সার্বিক বিচারে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, শিখা অনির্বাণ ও চিরন্তনের চিন্তাধারা সম্পূর্ণরূপে ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী, পৌত্তলিক চিন্তা-সঞ্জাত এবং ভারতীয় শিখা কালচার থেকে আহরিত পরাশ্রয়ী চিন্তাপ্রসূত। এ অগ্নি পূজা সম্পূর্ণ শির্ক ও আল্লাহদ্রোহী কাজ। 'শিখা চিরন্তন' বা 'শিখা অনিবার্ণের' নামে অগ্নি মশালকে সারা দেশে ঘুরিয়ে ভক্তি শ্রদ্ধা জানানো হয় এবং ওগুলোর প্রজ্জ্বলনকে অব্যাহত রাখার জন্য বিশেষ ধরনের বেদীর ওপর এগুলো স্থাপন করা হয়, অলিম্পিক মশাল সহ বিভিন্ন ক্রীড়ানুষ্ঠানের মশাল প্রজ্জ্বলনও শিরকের অন্তর্ভূক্ত। এ কালচারের সাথে এ দেশের মাটি ও মানুষের কোন সংস্রব নেই। বরং শিখা চিরন্তনের অগ্নিকুণ্ড যতদিন এ দেশের বুকে জ্বলতে থাকবে, ততদিন আল্লাহর একত্ববাদকে খর্ব করার, আল্লাহর অসীম ক্ষমতাকে অস্বীকার করার অভিশপ্ত মশাল জ্বলতে থাকবে বাংলাদেশের বুকে।
টিকাঃ
১. বিস্তারিত দেখুন, ঋগবেদের মহা ১.৫.২৩ শ্লোক, পুরানের ৬৪.১.৫.৯ শ্লোকসহ আরো অন্যান্য শ্লোক।
২. বিস্তারিত দেখুন, বাংলা বিশ্বকোষের 'অগ্নি' অনুচ্ছেদ।
৩. বিস্তারিত দেখুন, ঋগবেদের মনু ৩/৭/৫-৬, ৩/৮৪/৭ শ্লোক।