📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 পারঘাটা পার হলে

📄 পারঘাটা পার হলে


এক
এই প্রথম নৌকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হোল আমার। কখনো নৌকা ভ্রমণ করি নি জানার পর থেকে মাসুম পরিকল্পনা করে বসে ছিলো আমাকে বুড়িগঙ্গা নদীতে নিয়ে যাবার। কোনো অজুহাতে কাজ হোল না, অবশেষে তিনি নিয়েই ছাড়লেন! এই নদী দূষিত হতে হতে পানির রঙ পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সদরঘাটের কাছেই একটা খেয়াঘাট থেকে আমরা নৌকায় চড়ে বসলাম। অন্য ধরনের পুলক অনুভূত হয়েছে। মৃদু ঢেউয়ের তালে তালে নৌকার দোদুল দুল বেশ উপভোগ্য, আসলেই! আমি প্রথমবার নৌকায় চড়ার কারণে হয়তো এত বেশি উৎফুল্ল ছিলাম।
সেদিন মোটামুটি মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হচ্ছিলো। আবার নৌকায় যাত্রীও ছিলো পূর্ণ। একে তো আমি ভীতু প্রকৃতির, তার ওপর সামান্য দুলতেই বুকের ভেতরটা কেমন আঁতকে ওঠে। দুরু দুরু কাঁপতে থাকি অজানা কোনো শঙ্কায়। মাঝ নদীতে এসে যখন ঢেউয়ের ভাঁজের সাথে নৌকার চলা খানিক বেঁকে যায়, তখন অনায়াসেই আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের চিন্তাটা মনে এসে যায়। অসহায়ত্বের ক্ষণগুলো বিমূর্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণ ও শরণ-প্রার্থনায়।

দুই
নৌকায় বসে ভাবছিলাম, আচ্ছা, এই যে আমি, ওপারে গিয়ে কি আল্লাহর স্মরণে বিগলিত হৃদয় আর তাঁর কাছে নিজের ক্ষুদ্রত্ব নিবেদনের কথা ঠিক এভাবে মনে থাকবে তো আমার?
জীবনচক্রের ঘূর্ণিতে কী ঘটছে আসলে? যাপিত জীবনের পথচলায় আমরা প্রতিটি ক্ষণেই আল্লাহকে ভুলে চলেছি। কিন্তু যখনই বিপদ-শঙ্কা আর অসহায়ত্বের কাছে হেরে যেতে বসি, তখন আবার আল্লাহর কাছেই ফিরে আসি। কিন্তু আল্লাহ তাঁর করুণায় যখন আমাদের উদ্ধার করেন সেই সঙ্গিন অবস্থা থেকে, আমরা বরাবরের মতোই অকৃতজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত হই।
কুরআনের এই আয়াতটি বারবার মনে পড়ছিলো আর নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবছিলাম:

فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ
"তারা যখন জলযানে আরোহণ করে, তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা আল্লাহর সাথে শরীক করতে থাকে।" [১]

তিন
ভাবছিলাম, এই বিপদসংকুল, ফেনিল স্রোতে উত্তাল মাঝনদীতে আমিও তো পরম আকুতির প্রেক্ষণে তাঁকে দেখছি, চরম অসহায়ত্ব নিবেদন করছি সপ্রীত স্মরণে। আল্লাহ্ তীরে পৌঁছে দেয়ার পর আমার সকৃতজ্ঞ হৃদয় কি ঠিক এভাবেই তাঁর স্মরণে বিগলিত হবে?
প্রভু! নদীপার হবার মতই জীবনের নানা পর্যায়ে পারঘাটা পার হলেও যেন তোমার স্মরণ থেকে গাফেল না হই।
'জলযানে আরোহী' আমি এবং 'স্থলে পৌঁছে যাওয়া' আমি- দুই 'আমি'কে তুমি এক করে দাও, মালিক।

টিকাঃ
১ সূরা আল-'আনকাবূত ২৯:৬৫

এক
এই প্রথম নৌকা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হোল আমার। কখনো নৌকা ভ্রমণ করি নি জানার পর থেকে মাসুম পরিকল্পনা করে বসে ছিলো আমাকে বুড়িগঙ্গা নদীতে নিয়ে যাবার। কোনো অজুহাতে কাজ হোল না, অবশেষে তিনি নিয়েই ছাড়লেন! এই নদী দূষিত হতে হতে পানির রঙ পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়ে গেছে। সদরঘাটের কাছেই একটা খেয়াঘাট থেকে আমরা নৌকায় চড়ে বসলাম। অন্য ধরনের পুলক অনুভূত হয়েছে। মৃদু ঢেউয়ের তালে তালে নৌকার দোদুল দুল বেশ উপভোগ্য, আসলেই! আমি প্রথমবার নৌকায় চড়ার কারণে হয়তো এত বেশি উৎফুল্ল ছিলাম।
সেদিন মোটামুটি মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হচ্ছিলো। আবার নৌকায় যাত্রীও ছিলো পূর্ণ। একে তো আমি ভীতু প্রকৃতির, তার ওপর সামান্য দুলতেই বুকের ভেতরটা কেমন আঁতকে ওঠে। দুরু দুরু কাঁপতে থাকি অজানা কোনো শঙ্কায়। মাঝ নদীতে এসে যখন ঢেউয়ের ভাঁজের সাথে নৌকার চলা খানিক বেঁকে যায়, তখন অনায়াসেই আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের চিন্তাটা মনে এসে যায়। অসহায়ত্বের ক্ষণগুলো বিমূর্ত হয়ে ওঠে আল্লাহর স্মরণ ও শরণ-প্রার্থনায়।

দুই
নৌকায় বসে ভাবছিলাম, আচ্ছা, এই যে আমি, ওপারে গিয়ে কি আল্লাহর স্মরণে বিগলিত হৃদয় আর তাঁর কাছে নিজের ক্ষুদ্রত্ব নিবেদনের কথা ঠিক এভাবে মনে থাকবে তো আমার?
জীবনচক্রের ঘূর্ণিতে কী ঘটছে আসলে? যাপিত জীবনের পথচলায় আমরা প্রতিটি ক্ষণেই আল্লাহকে ভুলে চলেছি। কিন্তু যখনই বিপদ-শঙ্কা আর অসহায়ত্বের কাছে হেরে যেতে বসি, তখন আবার আল্লাহর কাছেই ফিরে আসি। কিন্তু আল্লাহ তাঁর করুণায় যখন আমাদের উদ্ধার করেন সেই সঙ্গিন অবস্থা থেকে, আমরা বরাবরের মতোই অকৃতজ্ঞদের অন্তর্ভূক্ত হই।
কুরআনের এই আয়াতটি বারবার মনে পড়ছিলো আর নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবছিলাম:

فَإِذَا رَكِبُوا فِي الْفُلْكِ دَعَوُا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ فَلَمَّا نَجَاهُمْ إِلَى الْبَرِّ إِذَا هُمْ يُشْرِكُونَ
"তারা যখন জলযানে আরোহণ করে, তখন একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে ডাকে। অতঃপর তিনি যখন স্থলে এনে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখনই তারা আল্লাহর সাথে শরীক করতে থাকে।" [১]

তিন
ভাবছিলাম, এই বিপদসংকুল, ফেনিল স্রোতে উত্তাল মাঝনদীতে আমিও তো পরম আকুতির প্রেক্ষণে তাঁকে দেখছি, চরম অসহায়ত্ব নিবেদন করছি সপ্রীত স্মরণে। আল্লাহ্ তীরে পৌঁছে দেয়ার পর আমার সকৃতজ্ঞ হৃদয় কি ঠিক এভাবেই তাঁর স্মরণে বিগলিত হবে?
প্রভু! নদীপার হবার মতই জীবনের নানা পর্যায়ে পারঘাটা পার হলেও যেন তোমার স্মরণ থেকে গাফেল না হই।
'জলযানে আরোহী' আমি এবং 'স্থলে পৌঁছে যাওয়া' আমি- দুই 'আমি'কে তুমি এক করে দাও, মালিক।

টিকাঃ
১ সূরা আল-'আনকাবূত ২৯:৬৫

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 কল্পকথার গল্প নয়

📄 কল্পকথার গল্প নয়


সাহাবাদের প্রখর উপস্থিত বুদ্ধি এবং দ্বীনের জ্ঞানে তাঁদের পান্ডিত্যপূর্ণ প্রজ্ঞার কিছু গল্প পড়ছিলাম ‘তরীকুল ইসলাম’ থেকে। দুটো গল্প খুব চিন্তাজাগানিয়া বলে মনে হোল। আমরা সে দুটো গল্প অনুবাদের চেষ্টা করবো, ইন শা আল্লাহ।

এই ঘটনা দুটো থেকে বোঝা যায়, ইসলামের সূচনাপর্ব থেকেই আল-কুরআন এবং আস-সুন্নাহ'র নির্দেশনার ব্যাপারে কোন কোন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রান্তিকতা অবস্থান নিয়েছিলো। এখনো আমরা অনেককে দেখতে পাই, যাঁরা (১) কারো ঈমান-আমল নিয়ে বাহ্যিক বিচারে একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান, সুস্থির হয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পান না। (২) আবার অনেকেই খুব সহজে বলে ফেলেন: 'এই কথা কুরআনে কোথাও নাই, মানতে হবে কেন?'

আমি এই নিয়ে আমার কোন পর্যালোচনা বা মতামত পেশ করছি না। সাহাবাদের [রা.] জীবন থেকে ক্রমানুসারে দুটো গল্প শুধু উল্লেখ করছি। এই দুটো গল্প উপরিউক্ত দুই প্রান্তিকতা নিরসনে সহায়ক হবে, ইন শা-আল্লাহ।

এক
একজন রমণী বিবাহ করলেন এবং ছয় মাস পরে একজন শিশু জন্ম দিলেন। সবাই প্রধানত এটাই জানত যে, কোন রমণী সাধারণত গর্ভধারণের নয় মাস অথবা সাত মাস পরে সন্তান জন্ম দেন। সুতরাং, কিছু লোক ধারণা করলো যে ঐ রমণী তাঁর স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত নন এবং বিবাহের আগেই অন্য কারো সন্তান তিনি গর্ভে ধারণ করেছেন。
তারা সবাই মহিলাকে খলিফার কাছে নিয়ে চললো শাস্তি প্রদানের জন্যে। ঐ সময় খলিফা ছিলেন 'উসমান ইবন 'আফফান [রা.]। তাঁরা যখন খলিফার কাছে গেলেন, তখন 'আলী [রা.]-কে খলিফার কাছে বসা পেলেন। 'আলী [রা.] বললেন: এই ব্যাপারে তোমাদের তো মহিলাকে শাস্তি দেবার কিছুই নেই। তারা অবাক হলো এবং জিজ্ঞেস করলো: সেটা কিভাবে?

অতঃপর তিনি বললেন:
“আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا )'তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস')[১] অর্থাৎ, গর্ভ ধারণ ও দুগ্ধপ্রদানের মোট সময় হোল ত্রিশ মাস。
আবার আল্লাহ এ-ও বলেছেন: وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَا دَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ )'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু বছর দুধ খাওয়াবে')[২] অর্থাৎ, দুগ্ধপ্রদানের সময় হোল দুই বছর। মানে চব্বিশ মাস。
সুতরাং, গর্ভ ধারণের সময় তো মাত্র ছয় মাস হওয়াও সম্ভব!”

দুই
একজন মহিলা শুনলেন যে, 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ [রা.] ঐ মহিলাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা সৃষ্টিগত গঠনকে বদলে ফেলে, অতঃপর সৌন্দর্যের জন্যে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে এবং ভ্রু উপড়ে ফেলে। মহিলা তাঁর কাছে গেলেন এবং এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। তিনি মহিলাকে বললেন:
"স্বয়ং রাসূলুল্লাহ [ﷺ] যাকে অভিসম্পাত করেছেন, আমি তাকে কিভাবে অভিসম্পাত না করে পারি? এ যে আল্লাহর কিতাবেই আছে!"
মহিলা বিস্মিত এবং অবাক হয়ে বললেন, "আমি পুরো কুরআন পড়েছি, কিন্তু এমন কিছু পাই নি, যা এ সবকিছু সম্পাদনকারী মহিলাদের অভিসম্পাত করাকে নির্দেশ করে।"
এখানে ফাক্বীহ 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ [রা.]-এর প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়, যেহেতু তিনি দ্বীনকে ভালোভাবেই বুঝেছেন। তিনি মহিলাকে প্রশ্ন করলেন,
"আপনি কি কুরআনের এ আয়াতটি পড়েন নি, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا تَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো, এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকা?
মহিলা বললেন: বটে!
ইবন মাস'ঊদ [রা.] বললেন: তাহলে তো বোঝা যাচ্ছে, এ সব কাজ থেকে কুরআনও নিষেধ করে!

টিকাঃ
১ সূরা আল-আহক্বাফ ৪৬:১৫
২ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২৩৩
৩ 'আলী [রা.] এভাবে হিসেবটি করেছেন: কুরআনের দুইটি আয়াত অনুযায়ী, গর্ভ ধারণ + দুগ্ধপ্রদানের সময় = ৩০ মাস দুগ্ধপ্রদানের সময় = ২৪ মাস সুতরাং, গর্ভধারণের সময় = (৩০ - ২৪) = ৬ মাস
১ সূরা আল-হাশর ৫৯:৭

সাহাবাদের প্রখর উপস্থিত বুদ্ধি এবং দ্বীনের জ্ঞানে তাঁদের পান্ডিত্যপূর্ণ প্রজ্ঞার কিছু গল্প পড়ছিলাম ‘তরীকুল ইসলাম’ থেকে। দুটো গল্প খুব চিন্তাজাগানিয়া বলে মনে হোল। আমরা সে দুটো গল্প অনুবাদের চেষ্টা করবো, ইন শা আল্লাহ।

এই ঘটনা দুটো থেকে বোঝা যায়, ইসলামের সূচনাপর্ব থেকেই আল-কুরআন এবং আস-সুন্নাহ'র নির্দেশনার ব্যাপারে কোন কোন মুসলিমের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রান্তিকতা অবস্থান নিয়েছিলো। এখনো আমরা অনেককে দেখতে পাই, যাঁরা (১) কারো ঈমান-আমল নিয়ে বাহ্যিক বিচারে একটি নেতিবাচক সিদ্ধান্তে পৌঁছে যান, সুস্থির হয়ে চিন্তা-ভাবনা করার সুযোগ পান না। (২) আবার অনেকেই খুব সহজে বলে ফেলেন: 'এই কথা কুরআনে কোথাও নাই, মানতে হবে কেন?'

আমি এই নিয়ে আমার কোন পর্যালোচনা বা মতামত পেশ করছি না। সাহাবাদের [রা.] জীবন থেকে ক্রমানুসারে দুটো গল্প শুধু উল্লেখ করছি। এই দুটো গল্প উপরিউক্ত দুই প্রান্তিকতা নিরসনে সহায়ক হবে, ইন শা-আল্লাহ।

এক
একজন রমণী বিবাহ করলেন এবং ছয় মাস পরে একজন শিশু জন্ম দিলেন। সবাই প্রধানত এটাই জানত যে, কোন রমণী সাধারণত গর্ভধারণের নয় মাস অথবা সাত মাস পরে সন্তান জন্ম দেন। সুতরাং, কিছু লোক ধারণা করলো যে ঐ রমণী তাঁর স্বামীর প্রতি বিশ্বস্ত নন এবং বিবাহের আগেই অন্য কারো সন্তান তিনি গর্ভে ধারণ করেছেন。
তারা সবাই মহিলাকে খলিফার কাছে নিয়ে চললো শাস্তি প্রদানের জন্যে। ঐ সময় খলিফা ছিলেন 'উসমান ইবন 'আফফান [রা.]। তাঁরা যখন খলিফার কাছে গেলেন, তখন 'আলী [রা.]-কে খলিফার কাছে বসা পেলেন। 'আলী [রা.] বললেন: এই ব্যাপারে তোমাদের তো মহিলাকে শাস্তি দেবার কিছুই নেই। তারা অবাক হলো এবং জিজ্ঞেস করলো: সেটা কিভাবে?

অতঃপর তিনি বললেন:
“আল্লাহ তা'আলা বলেছেন: وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا )'তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লেগেছে ত্রিশ মাস')[১] অর্থাৎ, গর্ভ ধারণ ও দুগ্ধপ্রদানের মোট সময় হোল ত্রিশ মাস。
আবার আল্লাহ এ-ও বলেছেন: وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَا دَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ )'আর সন্তানবতী নারীরা তাদের সন্তানদেরকে পূর্ণ দু বছর দুধ খাওয়াবে')[২] অর্থাৎ, দুগ্ধপ্রদানের সময় হোল দুই বছর। মানে চব্বিশ মাস。
সুতরাং, গর্ভ ধারণের সময় তো মাত্র ছয় মাস হওয়াও সম্ভব!”

দুই
একজন মহিলা শুনলেন যে, 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'ঊদ [রা.] ঐ মহিলাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন, যারা সৃষ্টিগত গঠনকে বদলে ফেলে, অতঃপর সৌন্দর্যের জন্যে দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে এবং ভ্রু উপড়ে ফেলে। মহিলা তাঁর কাছে গেলেন এবং এ বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। তিনি মহিলাকে বললেন:
"স্বয়ং রাসূলুল্লাহ [ﷺ] যাকে অভিসম্পাত করেছেন, আমি তাকে কিভাবে অভিসম্পাত না করে পারি? এ যে আল্লাহর কিতাবেই আছে!"
মহিলা বিস্মিত এবং অবাক হয়ে বললেন, "আমি পুরো কুরআন পড়েছি, কিন্তু এমন কিছু পাই নি, যা এ সবকিছু সম্পাদনকারী মহিলাদের অভিসম্পাত করাকে নির্দেশ করে।"
এখানে ফাক্বীহ 'আব্দুল্লাহ ইবন মাস'উদ [রা.]-এর প্রজ্ঞা প্রকাশ পায়, যেহেতু তিনি দ্বীনকে ভালোভাবেই বুঝেছেন। তিনি মহিলাকে প্রশ্ন করলেন,
"আপনি কি কুরআনের এ আয়াতটি পড়েন নি, وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا تَهَاكُمْ عَنْهُ فَانْتَهُوا রাসূল তোমাদের যা দেন, তা গ্রহণ করো, এবং যা নিষেধ করেন, তা থেকে বিরত থাকা?
মহিলা বললেন: বটে!
ইবন মাস'ঊদ [রা.] বললেন: তাহলে তো বোঝা যাচ্ছে, এ সব কাজ থেকে কুরআনও নিষেধ করে!

টিকাঃ
১ সূরা আল-আহক্বাফ ৪৬:১৫
২ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২৩৩
৩ 'আলী [রা.] এভাবে হিসেবটি করেছেন: কুরআনের দুইটি আয়াত অনুযায়ী, গর্ভ ধারণ + দুগ্ধপ্রদানের সময় = ৩০ মাস দুগ্ধপ্রদানের সময় = ২৪ মাস সুতরাং, গর্ভধারণের সময় = (৩০ - ২৪) = ৬ মাস
১ সূরা আল-হাশর ৫৯:৭

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 একটি দিনলিপি অথবা কুকুর উপাখ্যান

📄 একটি দিনলিপি অথবা কুকুর উপাখ্যান


সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রধান ফটক খুলতে আরো বিশ মিনিট বাকি। অদূরে একটা কুকুর শুয়ে আছে। প্রাণীটার চোখের দিকে তাকিয়ে মায়া জন্মায়।

বিশ্বস্ততার কাব্যিক উদাহরণ হয়ে আছে এই চারপেয়ে। অথচ আমরা কতভাবে কতবার মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানি! কুকুরটা এখানে অনাদরে পড়ে আছে, পশ্চিমের কোনো দেশে হলে তার যত্ন-আত্তিতে একটুও কমতি হতো না। মানুষের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবি। পশ্চিমাদের কাছে কুকুর খুব সমাদৃত, আমাদের কাছে নয়। আবার আরবদের কাছে উট খুব সমাদৃত, কিন্তু পশ্চিমাদের কাছে নয়। স্থানিক ভেদ, অভিরুচির বৈচিত্র্য কিংবা প্রয়োজনীয়তার তারতম্যের কারণে এসব পার্থক্য ঘটে থাকে। স্টেইন-এর উপন্যাস 'দ্য আর্ট অব রেইসিং ইন দ্য রেইন'-এ একটা মজার বিষয় জেনেছিলাম। মঙ্গোলিয়ার অধিবাসীরা কুকুরের মৃতদেহ পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরটাতে গিয়ে কবর দিয়ে আসে, যেন কেউ কোনোভাবেই তার উপর হেঁটে যেতে না পারে! কতটুকু ভালোবাসা, চিন্তা করা যায়?

আম্মুর ফোন আসে। মোবাইলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে দেখে একজন অপরিচিত আগন্তুক এগিয়ে আসেন। পরিচয় পেলাম, আমাদের ছোটভাই, এবার নতুন ভর্তি হবে, 'ফার্স্ট চয়েস' রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাড়ি চট্টগ্রাম। পরিচয়পর্ব সেরে যখন কারো মুখেই কোনো কথা আসছে না, তখন বললাম, 'মঙ্গোলিয়ার কথা শুনেছো না ভাইয়া?' গলা উঁচিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললো, 'হ্যাঁ ভাইয়া। হঠাৎ এই প্রশ্ন যে?' আমি খানিক লজ্জা পেলাম। কী জবাব দেব এখন? কুকুর নিয়ে ভাবতে গিয়ে মঙ্গোলিয়ায় চলে গেছি, এ কথা বললে হাসবে না? ধুর, প্রশ্নটা না করলেই হতো! তবু বলে ফেললাম। সংকোচের কী আছে? আমি তো অন্যায় কিংবা অযাচিত কিছু বলি নি বা ভাবি নি। ছেলেটা মিটিমিটি হাসে। আমার সাথে কেউ একাত্ম হলে তাকে খুব তাড়াতাড়ি আপন করে ফেলি এবং অধিকার দেখিয়ে বসি। এটা অনেক ক্ষেত্রে ভোগালেও উপকারও কম করে নি। যথারীতি সময় কাটাতে ওকে প্রশ্ন করলাম, 'মঙ্গোলিয়ার একটা বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে পারো, ভাইয়া?'

'ল্যান্ডলকড?'
'ইয়াহ!'
লাইব্রেরি তখনো খোলা হয় নি। সময় তো কাটে না! ছেলেটাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আমি-ই কথা বাড়ালাম। 'আচ্ছা ভাইয়া, মঙ্গোলিয়ার কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বলতে পারো?'

জিব কাটে ছেলেটা। আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে প্রতিবেশী ডিপার্টমেন্টের একজন বড়ো ভাইয়া কথাবার্তা শুনছিলেন, আমি এতক্ষণ খেয়াল করি নি। উনি সোৎসাহে বললেন, 'আছে তো! চেঙ্গিস খান মঙ্গোলিয়ার না?' কথা বলার ভঙ্গিতে সিনিয়রিটির ছাপ ও আবেদন-কে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা খুব স্পষ্ট। গাম্ভীর্যের এই রূপটা মাঝেমধ্যে উপভোগ্য-ই বটে। তবে না থাকলেই সুন্দর লাগে বেশি। তরশুদিন চট্টগ্রামে আবরার ভাইয়া আর ওমর ভাইয়ার সাথে দুইটা প্রহর কাটিয়েছি, আন্তরিকতাপূর্ণ কথা-হাসি এবং সারল্যদীপ্ত মুখাবয়ব তাঁদেরকে কী দারুণ বাঙ্ময় করে তুলেছিলো আমার কাছে! ভাবি, দুনিয়ার সব জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকেই যদি এমন করে পেতাম, এমনভাবে দেখতাম!

চেঙ্গিস খানের নাম শোনার পরে ছেলেটা বললো, 'ভাইয়া, এই লোকটা মুসলমান হয়ে এমন অত্যাচার কিভাবে করলো?'

বুঝলাম, চেঙ্গিস খানকে নিয়ে ওর পড়াশোনা খুব গভীর নয়। চেঙ্গিস খান-এর উপর লেখা হ্যারল্ড ল্যাম্ব-এর বইটা পড়ার জন্যে পরামর্শ দিলাম। সেই সাথে চেঙ্গিস খানের আচরিত ধর্ম 'টেনগ্রিজম' নিয়ে অল্প আলোকপাত করলাম।

ও একটু সাহস করে বললো, 'ভাইয়া, একটা সামান্য প্রসঙ্গ থেকে কোথায় চলে এলেন!' প্রশ্নের সাথে হাসি ছিলো এবং সেই হাসিতে আরো কিছু জানতে চাওয়ার সধৈর্য কৌতুহল ছিলো। আরেকটু পরখ করে যখন নিশ্চিত হলাম, বকবক করা সে উপভোগ করছে, চালিয়ে গেলাম।

প্রসঙ্গ থেকে দূরে চলে যাওয়া আমার পুরাতন রোগ। এরকম বেশ কিছু মজার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কোনো একটা বিষয় সামনে এলে, কোনো শব্দ কোথাও শুনতে পেলে, কোন দৃশ্য চোখে দেখলে আমার মস্তিষ্ক 'বার্ড আই ভিউ' নিতে অনেক উপরে উঠে স্থির হয়ে যায়। তারপর এই প্রসঙ্গে কিংবা তার কাছাকাছি কোনো প্রসঙ্গে কী পড়েছি, কী ভেবেছি, কী দেখেছি কিংবা কী বুঝেছি— সেসব নিয়ে ভাবনা শুরু হয়ে যায়। সেই বিষয়টার সদৃশ কোনোকিছু খুঁজে পেলে ভালো লাগে, এমনকি একটা শব্দ হলেও। একটা উদাহরণ দেই। গেল বছর বান্দরবান বেড়াতে গিয়েছিলাম। পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে ছোটভাই জিজ্ঞেস করলো, 'ভাইয়া, বইয়ে যে পড়েছি, চাকমা মারমা এরকম অনেক উপজাতি এখানে থাকে, ওরা কই? এখনো কাউকে দেখি নি কেন?' আসলে দেখার কথা নয়। আমরা তো ঘুরছি বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে (মেঘলা, নীলাচল ইত্যাদি)। এখানে আদিবাসী কিংবা অন্য কেউ বাস করার কথা নয়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলার আগেই মাথায় ঘুরতে শুরু করলো 'মারমা' শব্দটা। মনে হচ্ছিলো, উপজাতির নাম ছাড়াও ভিন্ন কোনো অর্থে ভিন্ন কোনো জায়গায় শব্দটা আমি পড়েছি। কিন্তু ঠিক স্মরণে আসছিলো না। ব্যস, আমি ওটা নিয়েই ভাবতে শুরু করলাম। ছোটভাই জবাবের অপেক্ষায় হা করে আছে, আমার সেদিকে ভূক্ষেপ নেই। কয়েক মিনিট পর ধ্যান ভেঙ্গে হুররেএএ শব্দ করে ওকে বললাম, 'মনে পড়েছে!' সে তো অবাক! 'কী মনে পড়েছে ভাইয়া?' আমি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই জবাব দিলাম, 'মারমা মনে পড়েছে!'

কুঞ্চিত মুখাবয়ব দেখে ওকে আর প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে জ্ঞান দেওয়া শুরু করলাম,
'একটা নতুন শব্দ শেখাই তোমাকে। আরবি-তে 'মারমা' (مرمی) মানে কী, জানো? গোলপোস্ট। ঐ যে ফুটবল খেলায় গোলপোস্ট থাকে, ওইটা।'

[কেউ আবার ভেবে বসবেন না, 'মারমা' উপজাতিদের নামটা আরবি থেকে এসেছে। এটা নিরেট কাকতালীয় ও উচ্চারণগত মিল, ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে এতদুভয়ের মধ্যে কোনো যোগসাজেশ নেই।]

বেচারা খুব আশাহত হোল। ঘুরতে এসেও বড় ভাইয়ার পড়াশোনার অত্যাচার! ওর চেহারা দেখেই বুঝে নিলাম, এই অবস্থায় মাস্টারি করাটা নিরেট একটা নিরস ব্যাপার। ক্ষান্ত হলাম বটে, শান্ত হলাম না। মাথায় আবার ঘুরঘুর করতে লাগলো ৩০ শব্দটার শব্দমূল দিয়ে কুরআনে কোথায় জানি কী পড়েছিলাম! আবুব পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে কথা বলছিলেন ছোটখালুর সাথে। উনাদের কথার এক ফাঁকেই সাহস করে আব্বাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, 'আব্বু, এই যে می দিয়ে কুরআনে একটা আয়াত আছে না? বলতে পারবেন একটু?'

আবুব্ব অবশ্য এরকম আকস্মিক প্রশ্নে অবাক হন না। কারণ, এরকম আচম্বিৎ এবং অপ্রাসঙ্গিক বহু প্রশ্ন হুট করেই আমি করে বসি। আবুব নিশ্চয় বুঝে নিয়েছেন, কোনো একটা বিষয় অথবা শব্দ নিয়ে আমার মাথায় কিছু ঘোরাঘুরি করছে। একটা হাসি-ই দিলেন শুধু। খালুজান উচ্চৈঃস্বরে হেসে বললেন, 'হঠাৎ আয়াত নিয়ে..?' আমি বলি, 'ঐ যে মারমা! ওখান থেকে!' আগামাথা কিছু বুঝতে না পেরে তাঁর হাসির মাত্রা বেড়ে যায়। আমার ফ্যাকাশে মুখে তাঁর জন্যে করুণা ঝরে পড়ে। এতগুলো ক্যালরি খরচ করে দেয়া হাসি আমার কাছে কোনো মূল্য পাচ্ছে না দেখে বেচারা-ও আশাভঙ্গের বেদনায় কাতর হয়ে গেলেন। হাসি থেমে গেলো তার। শুরু হয়ে গেলো আমার হাসি। আয়াতটা যে মনে পড়ে গেছে! কিন্তু সেই হাসি দেখে পাছে উনারা পাগল ভাবেন কি-না, এই আশঙ্কায় একটু পেছনে ফিরে ছোটবোনের ওপরেই হাসিটা ঝেড়ে নিলাম। উদ্দেশ্য, হাসি দেখে সে কিছু একটা আমাকে জিজ্ঞেস করুক। তা-ই হোল। সবকিছু সংক্ষেপে বলে আয়াতটা শোনালাম ওকে:

وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
"আপনি যখন নিক্ষেপ করছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেন নি, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ।"

হাসাহাসি দেখে নাসিম একটু কাছে এসেছিলো, আবার আরবি শব্দটব্দ পড়ছি দেখে দূরত্ব বজায় রাখলো। আমি নিজে ওকে ডেকে বললাম, 'এবার আর কিছু শেখাবো না ভাই! এই আয়াতের সাথে মজার গল্প আছে! ঐটা শোনাবো।' অতঃপর ঘর্মসিক্ত দেহে পাহাড়ে চড়ার ক্লান্তি ভুলে ওদেরকে বদরের কাহিনী শোনাই, প্রিয় নবীজির [] সাহসিকতা, সাহাবাদের অবিচল ঈমান আর আসমানী মদদের গল্প শোনাই।

এবার খুব একটা রাগ করলো না। গোগ্রাসে কথা গিলছে দেখে আমিও শান্তি পেলাম।
দশম শ্রেণিতে ফার্স্ট সেমিস্টার পরীক্ষায় গণিতে এ+ পেলাম না। সব বিষয়ে ৯০+ নম্বর আছে, আর গণিতের এই দশা দেখে মাসুম বিল্লাহ স্যার ভীষণ রকম আশাহত হলেন, একইসাথে ক্ষুব্ধ-ও হলেন। আমার কী করার আছে? স্যার যখন ক্লাসে পিথাগোরাসের উপপাদ্য বোঝাচ্ছেন, তখন আমি সামনের সারিতে বসে থেকেও ক্লাসে নেই। আমার মন চলে গেছে বারট্রান্ড রাসেলের 'অ্যা হিস্টরি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি'- তে। এই বইয়ের 'পিথাগোরাস' চ্যাপ্টারে অনেক কথা-ই আমি বুঝি নি, অনেক শব্দের মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারি নি; ক্লাসের মধ্যে সারাক্ষণ সেই চিন্তায় অস্থির থাকতাম।
স্যার যখন হোয়াইটবোর্ডে কিছু আঁকতেন, তখন আমার মাথায় ঘুরতো জিওমেট্রির আঁতুড়ঘর প্রাচীন মিশরের মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার কথা। এতক্ষণ যেসব কথা পেটে চেপে রেখেছি, স্যার চলে গেলে কোন একটা ক্লাসমেটকে ধরে আচ্ছামতন বকবক করে যেতাম। ঈজিপশিয়ান গড আর মেসোপটেমিয়ান গড-এর পার্থক্য বোঝাতাম। কেউ হাসতো, কেউ আগ্রহ নিয়ে শুনতো।

আমার এই অপ্রাসঙ্গিকতাপ্রেমের মাশুল দুইটা সিমেস্টারের গণিত পরীক্ষায় দিয়েছি। স্যার অর্ধবছর আমার উপর খুব অসন্তুষ্ট ছিলেন, আমাকে মুখ ফুটে না বললেও কথায় এবং আচরণে বুঝে নিতাম। রিভিশন পর্বে যেদিন ত্রিকোণমিতি শুরু হচ্ছে, সেদিন ত্রিকোণমিতি'র ইংরেজি জিজ্ঞেস করলেন আতিক-কে। ও বললো 'ট্রিগোনোমেট্রি'। আমি হাত তুলে অনুমতি নিয়ে বললাম, 'স্যার, আমি এটার আরবি বলবো প্লিজ?' স্যার আচমকা রেগে গিয়ে ধমক দিলেন, 'আবুল কোথাকার! গণিত বোঝে না এক ফোঁটা, আবার পন্ডিতি করে!' চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে মুহূর্তেই চোখ অশ্রুসজল হতে দেখে (আমি ছিঁচকাদুনে ছিলাম কি না) স্যার একটু নরোম গলায় বললেন, 'বলে ফ্যালো।' আমি যখন 'حساب المثلثات' বলছিলাম, তখন সত্যিই গলা ধরে আসছিলো। স্যার বোধহয় মায়া অনুভব করলেন, একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন।
'বেশ তো! কিভাবে জানলে?'
আমার মুখ উজ্জ্বল হতে শুরু করলো।
'স্যার, আমি জানতাম, আজকে ত্রিকোণমিতি শুরু হবে। কাল ভাবছিলাম, এটার ইংরেজি তো জানি, আরবি কী তা জানি না। ডিকশনারি থেকে শিখে নিয়েছি।'

ঐ দিনটা ছিলো গণিতের ব্যাপারে আমার টার্নিং পয়েন্ট। ঐ ক্লাসের পরে স্যার ব্যক্তিগতভাবে ডেকে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে বুঝিয়েছেন, আউট বই পড়ার সাথে সাথে গণিত প্র্যাকটিসেও সময় দিতে উদ্বুদ্ধ করলেন। সাহস যোগালেন এবং উৎসাহ দিলেন। ক্লাসে খাওয়া তিক্ত ধমক এবং ক্লাসের বাইরে পাওয়া মিষ্ট চমক আমাকে বদলে দিলো। কবিতার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ফাঁকে ফাঁকে গণিতকেও সময় দিলাম। পরবর্তী পরীক্ষায় ছিয়ানব্বই পেলাম। স্যার ভীষণ ভীষণ খুশি হলেন।

এই আনকোরা গল্পগুলো দিনলিপি-তে লেখা হত না, যদি না লাইব্রেরিতে ঢোকার পরে বন্ধু শফিউল্লাহ-কে পুনরায় বলতাম। আমার ব্যক্তিগত পাঠ-দর্শন এবং পাঠ-পদ্ধতি নিয়ে ও যখন জানতে চাইলো, বিষয়গুলো তুলে ধরলাম। সেই সাথে আরেকটা ব্যাপারেও দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম, যেটা সবসময়ই পরিচিত 'স্টুডেন্ট অব নলেজ'দের বলার চেষ্টা করি; আর তা হোল: অর্জিত জ্ঞান এবং পঠিত বিষয়াদি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে নানা আঙ্গিকে যখন প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়, তখন সেটার স্থায়ীত্ব মজবুতি পায়, সেটার টেকসই হবার সম্ভাবনা নিঃশঙ্ক হয়। আমি দেখেছি, একই বিষয়, একই শব্দ কিংবা একই ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অথবা কাছাকাছি যা কিছু পড়েছি বা জেনেছি বা শুনেছি, সবকিছু যখন এক ঝলকে মাথায় এনে ব্রেইনস্টোর্মিং করি, তখনই বোঝা যায়, আমি যা জেনেছি বা পড়েছি তার আবেদন ভেতরে কতখানি আছে। সেখানে কোথাও যদি জং ধরতে দেখা যায়, সেটা পরিষ্কের ব্যবস্থা করা যায়। কোথাও পলেস্তরা খসে পড়লে মেরামতের চেষ্টা করা যায়। এভাবে করে জানা বিষয়গুলো নতুন মাত্রা পায়, শক্তভাবে গেঁথে বসে ভেতরে। শফিউল্লাহ-কে আমার প্যাডের পাতাটা দেখালাম, যেটা আমি কুকুরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লিখেছি। কী লিখেছি সেখানে? কুকুরটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার মনে যেসব বিষয় উঁকি দিয়েছে, সেসব লিখেছি। সেখান থেকে যেগুলো পুরোপুরি মনে পড়ে গেছে, সেগুলো তো বললাম। আবার অনেকগুলো আমার আবছা মনে আছে, বাসায় এসে দেখে নেয়ার প্রয়োজন আছে। যেমন:

» আমার মনে পড়লো, কুকুর এবং কুকুরের উচ্ছিষ্ট'র হুকম নিয়ে ফিকহে পড়েছি। কিন্তু শারী'আহর বিভিন্ন স্কুল অব থ্যট-এর মধ্যে এতদসংক্রান্ত যে মতপার্থক্য এবং দালীলিক আলোচনা আছে, সে সব আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ছিলো না। ব্যস, আমি নোট করে নিলাম, বাসায় এসে বিভিন্ন ফিকহ গ্রন্থ ঘেঁটে আমি এই বিষয়টা আজ আবার দেখে নেবো।
» আমার আবছা আবছা মনে পড়লো, লর্ড বায়রন-এর একটা কবিতা এবং বুডয়ার্ড কিপলিং-এর একটা কবিতায় কুকুরের প্রসঙ্গ ছিলো। কিন্তু কোনোটাই আমার ভালো মত স্মরণে আসছিলো না। এটাও আমি টুকে নিলাম। উদ্দেশ্য, স্মরণে আছে যেসব শব্দ বা বাক্য, সেগুলো দিয়ে ঘেঁটে কবিতা সংক্রান্ত সাইটগুলো থেকে কবিতা দুটো উদ্ধার করে পুনর্বার পড়বো।
» কুরআনে আসহাবুল কাহফ-এর ঘটনায় কুকুর-এর প্রসঙ্গ আছে। অথচ আয়াতটা আমার পুরো মনে নেই। এটাও লিখে রাখলাম, তাফসির ঘেঁটে আয়াত ও তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনাটা আবার যাতে জেনে নিই।

আমার যৎসামান্য পাঠাভিজ্ঞতা বলে, এভাবে যখনই কোনো বিষয় সামনে আসে, সেটার সাথে সম্পর্কিত যা কিছু মনে পড়ে, সেগুলো যখন ভাবি কিংবা পুনর্বার পড়ি, তখন মস্তিষ্কে ভালোভাবে গেঁথে যায়।

শফিউল্লাহ-কে লাইব্রেরির মধ্যেই ক্ষীণস্বরে সেসব কথা বলছিলাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, যেটা সে-ও বলেছে, এই যে কৌতূহল এবং জানার স্পৃহা, সেটা তো আগে অর্জন করা চাই! আমি বলি কি, এটা অর্জনের কোনো বিষয়-ই না। এই কৌতূহল-স্পৃহা আমাদের সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু আমরা অপাত্রে খরচ করে ফেলি। দৈনিক যত দিকে আমরা কৌতূহল-স্পৃহাকে কাজে লাগাই, দিনশেষে তার সবকিছুই কিন্তু অর্থবহ হয় না। সেই শক্তিটাকে জ্ঞানের কাজে লাগানো গেলে, উদ্ভাবনী স্পৃহা জাগ্রত করার কাজে লাগানো গেলে অর্থপূর্ণ হয়।

গেলবছর একটা ম্যাগাজিনে ফরমায়েশি লেখা প্রস্তুত করার জন্যে পোলিশ ফিজিসিস্ট মেরি কুরি সম্পর্কে পড়তে হয়েছিলো। এই বিদূষী নারী থেকে আমি দারুণ একটা জিনিস শিখেছি। একবার কিছু সাংবাদিক তাঁকে বারবার পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন। তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন: be less curious about people and more curious about ideas!

এই একটা 'থ্রেট' আমি নিজেকে দৈনিক কয়েকবার দেই।

কথাটা খুব মনে ধরেছিলো আমার। এরপর থেকে যে কারো সাথে কথায় ও আচরণে আমি এটা অনুসরণ করি। নিজেকে বলি, মানুষের এটা ওটা নিয়ে ভেবে সময় অপচয় করে কী লাভ, বরং ঐ কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা নতুন কিছু জানার জন্যে, নতুন কিছু ভাবার জন্যে ব্যয় করা-ই বেশি সঙ্গত।

আমরা হলের ক্যান্টিনে গিয়ে খেলাম, যোহর সারলাম সেখানেই। লাইব্রেরি তখন প্রায় ফাঁকা হতে শুরু করেছে। কেউ কেউ টেবিলেই মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

আমার চোখ বুজে আসে। একটা কবিতা লিখলাম। হাবিজাবি কিসব পড়লাম, বিচ্ছিন্নভাবে। আসর পড়লাম হলে গিয়ে। মাহবুব আনারস খাওয়ালো হলের সামনে।

দূরসম্পর্কীয় একজন আত্মীয় এসেছে নতুন সেশনে ভর্তি হতে, হলে গিয়েছিলাম তাঁর সাথে দেখা করতে। সহসা তাঁর দেখা পেলাম না। ফোন করে কালকে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচটার বাস ধরলাম।

যথারীতি নীড়ে ফেরা সান্ধ্যবিহগ আবারো আপন জগতে মত্ত হোল।

টিকাঃ
১ সূরা আনফাল ৮:১৭

সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। প্রধান ফটক খুলতে আরো বিশ মিনিট বাকি। অদূরে একটা কুকুর শুয়ে আছে। প্রাণীটার চোখের দিকে তাকিয়ে মায়া জন্মায়।

বিশ্বস্ততার কাব্যিক উদাহরণ হয়ে আছে এই চারপেয়ে। অথচ আমরা কতভাবে কতবার মানুষের বিশ্বাসে আঘাত হানি! কুকুরটা এখানে অনাদরে পড়ে আছে, পশ্চিমের কোনো দেশে হলে তার যত্ন-আত্তিতে একটুও কমতি হতো না। মানুষের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য নিয়ে ভাবি। পশ্চিমাদের কাছে কুকুর খুব সমাদৃত, আমাদের কাছে নয়। আবার আরবদের কাছে উট খুব সমাদৃত, কিন্তু পশ্চিমাদের কাছে নয়। স্থানিক ভেদ, অভিরুচির বৈচিত্র্য কিংবা প্রয়োজনীয়তার তারতম্যের কারণে এসব পার্থক্য ঘটে থাকে। স্টেইন-এর উপন্যাস 'দ্য আর্ট অব রেইসিং ইন দ্য রেইন'-এ একটা মজার বিষয় জেনেছিলাম। মঙ্গোলিয়ার অধিবাসীরা কুকুরের মৃতদেহ পাহাড়ের সর্বোচ্চ শিখরটাতে গিয়ে কবর দিয়ে আসে, যেন কেউ কোনোভাবেই তার উপর হেঁটে যেতে না পারে! কতটুকু ভালোবাসা, চিন্তা করা যায়?

আম্মুর ফোন আসে। মোবাইলে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে দেখে একজন অপরিচিত আগন্তুক এগিয়ে আসেন। পরিচয় পেলাম, আমাদের ছোটভাই, এবার নতুন ভর্তি হবে, 'ফার্স্ট চয়েস' রাষ্ট্রবিজ্ঞান, বাড়ি চট্টগ্রাম। পরিচয়পর্ব সেরে যখন কারো মুখেই কোনো কথা আসছে না, তখন বললাম, 'মঙ্গোলিয়ার কথা শুনেছো না ভাইয়া?' গলা উঁচিয়ে ক্ষীণকণ্ঠে বললো, 'হ্যাঁ ভাইয়া। হঠাৎ এই প্রশ্ন যে?' আমি খানিক লজ্জা পেলাম। কী জবাব দেব এখন? কুকুর নিয়ে ভাবতে গিয়ে মঙ্গোলিয়ায় চলে গেছি, এ কথা বললে হাসবে না? ধুর, প্রশ্নটা না করলেই হতো! তবু বলে ফেললাম। সংকোচের কী আছে? আমি তো অন্যায় কিংবা অযাচিত কিছু বলি নি বা ভাবি নি। ছেলেটা মিটিমিটি হাসে। আমার সাথে কেউ একাত্ম হলে তাকে খুব তাড়াতাড়ি আপন করে ফেলি এবং অধিকার দেখিয়ে বসি। এটা অনেক ক্ষেত্রে ভোগালেও উপকারও কম করে নি। যথারীতি সময় কাটাতে ওকে প্রশ্ন করলাম, 'মঙ্গোলিয়ার একটা বৈশিষ্ট্যের কথা বলতে পারো, ভাইয়া?'

'ল্যান্ডলকড?'
'ইয়াহ!'
লাইব্রেরি তখনো খোলা হয় নি। সময় তো কাটে না! ছেলেটাও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। আমি-ই কথা বাড়ালাম। 'আচ্ছা ভাইয়া, মঙ্গোলিয়ার কোনো ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের কথা বলতে পারো?'

জিব কাটে ছেলেটা। আমাদের পাশেই দাঁড়িয়ে প্রতিবেশী ডিপার্টমেন্টের একজন বড়ো ভাইয়া কথাবার্তা শুনছিলেন, আমি এতক্ষণ খেয়াল করি নি। উনি সোৎসাহে বললেন, 'আছে তো! চেঙ্গিস খান মঙ্গোলিয়ার না?' কথা বলার ভঙ্গিতে সিনিয়রিটির ছাপ ও আবেদন-কে ফুটিয়ে তোলার প্রচেষ্টা খুব স্পষ্ট। গাম্ভীর্যের এই রূপটা মাঝেমধ্যে উপভোগ্য-ই বটে। তবে না থাকলেই সুন্দর লাগে বেশি। তরশুদিন চট্টগ্রামে আবরার ভাইয়া আর ওমর ভাইয়ার সাথে দুইটা প্রহর কাটিয়েছি, আন্তরিকতাপূর্ণ কথা-হাসি এবং সারল্যদীপ্ত মুখাবয়ব তাঁদেরকে কী দারুণ বাঙ্ময় করে তুলেছিলো আমার কাছে! ভাবি, দুনিয়ার সব জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিকেই যদি এমন করে পেতাম, এমনভাবে দেখতাম!

চেঙ্গিস খানের নাম শোনার পরে ছেলেটা বললো, 'ভাইয়া, এই লোকটা মুসলমান হয়ে এমন অত্যাচার কিভাবে করলো?'

বুঝলাম, চেঙ্গিস খানকে নিয়ে ওর পড়াশোনা খুব গভীর নয়। চেঙ্গিস খান-এর উপর লেখা হ্যারল্ড ল্যাম্ব-এর বইটা পড়ার জন্যে পরামর্শ দিলাম। সেই সাথে চেঙ্গিস খানের আচরিত ধর্ম 'টেনগ্রিজম' নিয়ে অল্প আলোকপাত করলাম।

ও একটু সাহস করে বললো, 'ভাইয়া, একটা সামান্য প্রসঙ্গ থেকে কোথায় চলে এলেন!' প্রশ্নের সাথে হাসি ছিলো এবং সেই হাসিতে আরো কিছু জানতে চাওয়ার সধৈর্য কৌতুহল ছিলো। আরেকটু পরখ করে যখন নিশ্চিত হলাম, বকবক করা সে উপভোগ করছে, চালিয়ে গেলাম।

প্রসঙ্গ থেকে দূরে চলে যাওয়া আমার পুরাতন রোগ। এরকম বেশ কিছু মজার অভিজ্ঞতা আমার আছে। কোনো একটা বিষয় সামনে এলে, কোনো শব্দ কোথাও শুনতে পেলে, কোন দৃশ্য চোখে দেখলে আমার মস্তিষ্ক 'বার্ড আই ভিউ' নিতে অনেক উপরে উঠে স্থির হয়ে যায়। তারপর এই প্রসঙ্গে কিংবা তার কাছাকাছি কোনো প্রসঙ্গে কী পড়েছি, কী ভেবেছি, কী দেখেছি কিংবা কী বুঝেছি— সেসব নিয়ে ভাবনা শুরু হয়ে যায়। সেই বিষয়টার সদৃশ কোনোকিছু খুঁজে পেলে ভালো লাগে, এমনকি একটা শব্দ হলেও। একটা উদাহরণ দেই। গেল বছর বান্দরবান বেড়াতে গিয়েছিলাম। পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে ছোটভাই জিজ্ঞেস করলো, 'ভাইয়া, বইয়ে যে পড়েছি, চাকমা মারমা এরকম অনেক উপজাতি এখানে থাকে, ওরা কই? এখনো কাউকে দেখি নি কেন?' আসলে দেখার কথা নয়। আমরা তো ঘুরছি বিভিন্ন ট্যুরিস্ট স্পটে (মেঘলা, নীলাচল ইত্যাদি)। এখানে আদিবাসী কিংবা অন্য কেউ বাস করার কথা নয়। আমি তাকে বুঝিয়ে বলার আগেই মাথায় ঘুরতে শুরু করলো 'মারমা' শব্দটা। মনে হচ্ছিলো, উপজাতির নাম ছাড়াও ভিন্ন কোনো অর্থে ভিন্ন কোনো জায়গায় শব্দটা আমি পড়েছি। কিন্তু ঠিক স্মরণে আসছিলো না। ব্যস, আমি ওটা নিয়েই ভাবতে শুরু করলাম। ছোটভাই জবাবের অপেক্ষায় হা করে আছে, আমার সেদিকে ভূক্ষেপ নেই। কয়েক মিনিট পর ধ্যান ভেঙ্গে হুররেএএ শব্দ করে ওকে বললাম, 'মনে পড়েছে!' সে তো অবাক! 'কী মনে পড়েছে ভাইয়া?' আমি নির্লিপ্ত ভঙ্গিতেই জবাব দিলাম, 'মারমা মনে পড়েছে!'

কুঞ্চিত মুখাবয়ব দেখে ওকে আর প্রশ্ন করার সুযোগ না দিয়ে জ্ঞান দেওয়া শুরু করলাম,
'একটা নতুন শব্দ শেখাই তোমাকে। আরবি-তে 'মারমা' (مرمی) মানে কী, জানো? গোলপোস্ট। ঐ যে ফুটবল খেলায় গোলপোস্ট থাকে, ওইটা।'

[কেউ আবার ভেবে বসবেন না, 'মারমা' উপজাতিদের নামটা আরবি থেকে এসেছে। এটা নিরেট কাকতালীয় ও উচ্চারণগত মিল, ভাষাতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণে এতদুভয়ের মধ্যে কোনো যোগসাজেশ নেই।]

বেচারা খুব আশাহত হোল। ঘুরতে এসেও বড় ভাইয়ার পড়াশোনার অত্যাচার! ওর চেহারা দেখেই বুঝে নিলাম, এই অবস্থায় মাস্টারি করাটা নিরেট একটা নিরস ব্যাপার। ক্ষান্ত হলাম বটে, শান্ত হলাম না। মাথায় আবার ঘুরঘুর করতে লাগলো ৩০ শব্দটার শব্দমূল দিয়ে কুরআনে কোথায় জানি কী পড়েছিলাম! আবুব পাহাড় বেয়ে উঠতে উঠতে কথা বলছিলেন ছোটখালুর সাথে। উনাদের কথার এক ফাঁকেই সাহস করে আব্বাকে জিজ্ঞেস করে বসলাম, 'আব্বু, এই যে می দিয়ে কুরআনে একটা আয়াত আছে না? বলতে পারবেন একটু?'

আবুব্ব অবশ্য এরকম আকস্মিক প্রশ্নে অবাক হন না। কারণ, এরকম আচম্বিৎ এবং অপ্রাসঙ্গিক বহু প্রশ্ন হুট করেই আমি করে বসি। আবুব নিশ্চয় বুঝে নিয়েছেন, কোনো একটা বিষয় অথবা শব্দ নিয়ে আমার মাথায় কিছু ঘোরাঘুরি করছে। একটা হাসি-ই দিলেন শুধু। খালুজান উচ্চৈঃস্বরে হেসে বললেন, 'হঠাৎ আয়াত নিয়ে..?' আমি বলি, 'ঐ যে মারমা! ওখান থেকে!' আগামাথা কিছু বুঝতে না পেরে তাঁর হাসির মাত্রা বেড়ে যায়। আমার ফ্যাকাশে মুখে তাঁর জন্যে করুণা ঝরে পড়ে। এতগুলো ক্যালরি খরচ করে দেয়া হাসি আমার কাছে কোনো মূল্য পাচ্ছে না দেখে বেচারা-ও আশাভঙ্গের বেদনায় কাতর হয়ে গেলেন। হাসি থেমে গেলো তার। শুরু হয়ে গেলো আমার হাসি। আয়াতটা যে মনে পড়ে গেছে! কিন্তু সেই হাসি দেখে পাছে উনারা পাগল ভাবেন কি-না, এই আশঙ্কায় একটু পেছনে ফিরে ছোটবোনের ওপরেই হাসিটা ঝেড়ে নিলাম। উদ্দেশ্য, হাসি দেখে সে কিছু একটা আমাকে জিজ্ঞেস করুক। তা-ই হোল। সবকিছু সংক্ষেপে বলে আয়াতটা শোনালাম ওকে:

وَمَا رَمَيْتَ إِذْ رَمَيْتَ وَلَكِنَّ اللَّهَ رَمَى
"আপনি যখন নিক্ষেপ করছিলেন, তখন আপনি নিক্ষেপ করেন নি, বরং তা নিক্ষেপ করেছিলেন আল্লাহ।"

হাসাহাসি দেখে নাসিম একটু কাছে এসেছিলো, আবার আরবি শব্দটব্দ পড়ছি দেখে দূরত্ব বজায় রাখলো। আমি নিজে ওকে ডেকে বললাম, 'এবার আর কিছু শেখাবো না ভাই! এই আয়াতের সাথে মজার গল্প আছে! ঐটা শোনাবো।' অতঃপর ঘর্মসিক্ত দেহে পাহাড়ে চড়ার ক্লান্তি ভুলে ওদেরকে বদরের কাহিনী শোনাই, প্রিয় নবীজির [] সাহসিকতা, সাহাবাদের অবিচল ঈমান আর আসমানী মদদের গল্প শোনাই।

এবার খুব একটা রাগ করলো না। গোগ্রাসে কথা গিলছে দেখে আমিও শান্তি পেলাম।
দশম শ্রেণিতে ফার্স্ট সেমিস্টার পরীক্ষায় গণিতে এ+ পেলাম না। সব বিষয়ে ৯০+ নম্বর আছে, আর গণিতের এই দশা দেখে মাসুম বিল্লাহ স্যার ভীষণ রকম আশাহত হলেন, একইসাথে ক্ষুব্ধ-ও হলেন। আমার কী করার আছে? স্যার যখন ক্লাসে পিথাগোরাসের উপপাদ্য বোঝাচ্ছেন, তখন আমি সামনের সারিতে বসে থেকেও ক্লাসে নেই। আমার মন চলে গেছে বারট্রান্ড রাসেলের 'অ্যা হিস্টরি অব ওয়েস্টার্ন ফিলসফি'- তে। এই বইয়ের 'পিথাগোরাস' চ্যাপ্টারে অনেক কথা-ই আমি বুঝি নি, অনেক শব্দের মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারি নি; ক্লাসের মধ্যে সারাক্ষণ সেই চিন্তায় অস্থির থাকতাম।
স্যার যখন হোয়াইটবোর্ডে কিছু আঁকতেন, তখন আমার মাথায় ঘুরতো জিওমেট্রির আঁতুড়ঘর প্রাচীন মিশরের মেসোপটেমিয়ান সভ্যতার কথা। এতক্ষণ যেসব কথা পেটে চেপে রেখেছি, স্যার চলে গেলে কোন একটা ক্লাসমেটকে ধরে আচ্ছামতন বকবক করে যেতাম। ঈজিপশিয়ান গড আর মেসোপটেমিয়ান গড-এর পার্থক্য বোঝাতাম। কেউ হাসতো, কেউ আগ্রহ নিয়ে শুনতো।

আমার এই অপ্রাসঙ্গিকতাপ্রেমের মাশুল দুইটা সিমেস্টারের গণিত পরীক্ষায় দিয়েছি। স্যার অর্ধবছর আমার উপর খুব অসন্তুষ্ট ছিলেন, আমাকে মুখ ফুটে না বললেও কথায় এবং আচরণে বুঝে নিতাম। রিভিশন পর্বে যেদিন ত্রিকোণমিতি শুরু হচ্ছে, সেদিন ত্রিকোণমিতি'র ইংরেজি জিজ্ঞেস করলেন আতিক-কে। ও বললো 'ট্রিগোনোমেট্রি'। আমি হাত তুলে অনুমতি নিয়ে বললাম, 'স্যার, আমি এটার আরবি বলবো প্লিজ?' স্যার আচমকা রেগে গিয়ে ধমক দিলেন, 'আবুল কোথাকার! গণিত বোঝে না এক ফোঁটা, আবার পন্ডিতি করে!' চেহারার রঙ পরিবর্তন হয়ে মুহূর্তেই চোখ অশ্রুসজল হতে দেখে (আমি ছিঁচকাদুনে ছিলাম কি না) স্যার একটু নরোম গলায় বললেন, 'বলে ফ্যালো।' আমি যখন 'حساب المثلثات' বলছিলাম, তখন সত্যিই গলা ধরে আসছিলো। স্যার বোধহয় মায়া অনুভব করলেন, একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেন।
'বেশ তো! কিভাবে জানলে?'
আমার মুখ উজ্জ্বল হতে শুরু করলো।
'স্যার, আমি জানতাম, আজকে ত্রিকোণমিতি শুরু হবে। কাল ভাবছিলাম, এটার ইংরেজি তো জানি, আরবি কী তা জানি না। ডিকশনারি থেকে শিখে নিয়েছি।'

ঐ দিনটা ছিলো গণিতের ব্যাপারে আমার টার্নিং পয়েন্ট। ঐ ক্লাসের পরে স্যার ব্যক্তিগতভাবে ডেকে আমাকে অনেকক্ষণ ধরে বুঝিয়েছেন, আউট বই পড়ার সাথে সাথে গণিত প্র্যাকটিসেও সময় দিতে উদ্বুদ্ধ করলেন। সাহস যোগালেন এবং উৎসাহ দিলেন। ক্লাসে খাওয়া তিক্ত ধমক এবং ক্লাসের বাইরে পাওয়া মিষ্ট চমক আমাকে বদলে দিলো। কবিতার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ফাঁকে ফাঁকে গণিতকেও সময় দিলাম। পরবর্তী পরীক্ষায় ছিয়ানব্বই পেলাম। স্যার ভীষণ ভীষণ খুশি হলেন।

এই আনকোরা গল্পগুলো দিনলিপি-তে লেখা হত না, যদি না লাইব্রেরিতে ঢোকার পরে বন্ধু শফিউল্লাহ-কে পুনরায় বলতাম। আমার ব্যক্তিগত পাঠ-দর্শন এবং পাঠ-পদ্ধতি নিয়ে ও যখন জানতে চাইলো, বিষয়গুলো তুলে ধরলাম। সেই সাথে আরেকটা ব্যাপারেও দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম, যেটা সবসময়ই পরিচিত 'স্টুডেন্ট অব নলেজ'দের বলার চেষ্টা করি; আর তা হোল: অর্জিত জ্ঞান এবং পঠিত বিষয়াদি ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে নানা আঙ্গিকে যখন প্রয়োগের চেষ্টা করা হয়, তখন সেটার স্থায়ীত্ব মজবুতি পায়, সেটার টেকসই হবার সম্ভাবনা নিঃশঙ্ক হয়। আমি দেখেছি, একই বিষয়, একই শব্দ কিংবা একই ঘটনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অথবা কাছাকাছি যা কিছু পড়েছি বা জেনেছি বা শুনেছি, সবকিছু যখন এক ঝলকে মাথায় এনে ব্রেইনস্টোর্মিং করি, তখনই বোঝা যায়, আমি যা জেনেছি বা পড়েছি তার আবেদন ভেতরে কতখানি আছে। সেখানে কোথাও যদি জং ধরতে দেখা যায়, সেটা পরিষ্কের ব্যবস্থা করা যায়। কোথাও পলেস্তরা খসে পড়লে মেরামতের চেষ্টা করা যায়। এভাবে করে জানা বিষয়গুলো নতুন মাত্রা পায়, শক্তভাবে গেঁথে বসে ভেতরে। শফিউল্লাহ-কে আমার প্যাডের পাতাটা দেখালাম, যেটা আমি কুকুরের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে লিখেছি। কী লিখেছি সেখানে? কুকুরটার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে আমার মনে যেসব বিষয় উঁকি দিয়েছে, সেসব লিখেছি। সেখান থেকে যেগুলো পুরোপুরি মনে পড়ে গেছে, সেগুলো তো বললাম। আবার অনেকগুলো আমার আবছা মনে আছে, বাসায় এসে দেখে নেয়ার প্রয়োজন আছে। যেমন:

» আমার মনে পড়লো, কুকুর এবং কুকুরের উচ্ছিষ্ট'র হুকম নিয়ে ফিকহে পড়েছি। কিন্তু শারী'আহর বিভিন্ন স্কুল অব থ্যট-এর মধ্যে এতদসংক্রান্ত যে মতপার্থক্য এবং দালীলিক আলোচনা আছে, সে সব আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ছিলো না। ব্যস, আমি নোট করে নিলাম, বাসায় এসে বিভিন্ন ফিকহ গ্রন্থ ঘেঁটে আমি এই বিষয়টা আজ আবার দেখে নেবো।
» আমার আবছা আবছা মনে পড়লো, লর্ড বায়রন-এর একটা কবিতা এবং বুডয়ার্ড কিপলিং-এর একটা কবিতায় কুকুরের প্রসঙ্গ ছিলো। কিন্তু কোনোটাই আমার ভালো মত স্মরণে আসছিলো না। এটাও আমি টুকে নিলাম। উদ্দেশ্য, স্মরণে আছে যেসব শব্দ বা বাক্য, সেগুলো দিয়ে ঘেঁটে কবিতা সংক্রান্ত সাইটগুলো থেকে কবিতা দুটো উদ্ধার করে পুনর্বার পড়বো।
» কুরআনে আসহাবুল কাহফ-এর ঘটনায় কুকুর-এর প্রসঙ্গ আছে। অথচ আয়াতটা আমার পুরো মনে নেই। এটাও লিখে রাখলাম, তাফসির ঘেঁটে আয়াত ও তৎসংশ্লিষ্ট ঘটনাটা আবার যাতে জেনে নিই।

আমার যৎসামান্য পাঠাভিজ্ঞতা বলে, এভাবে যখনই কোনো বিষয় সামনে আসে, সেটার সাথে সম্পর্কিত যা কিছু মনে পড়ে, সেগুলো যখন ভাবি কিংবা পুনর্বার পড়ি, তখন মস্তিষ্কে ভালোভাবে গেঁথে যায়।

শফিউল্লাহ-কে লাইব্রেরির মধ্যেই ক্ষীণস্বরে সেসব কথা বলছিলাম। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়, যেটা সে-ও বলেছে, এই যে কৌতূহল এবং জানার স্পৃহা, সেটা তো আগে অর্জন করা চাই! আমি বলি কি, এটা অর্জনের কোনো বিষয়-ই না। এই কৌতূহল-স্পৃহা আমাদের সবার মধ্যেই আছে। কিন্তু আমরা অপাত্রে খরচ করে ফেলি। দৈনিক যত দিকে আমরা কৌতূহল-স্পৃহাকে কাজে লাগাই, দিনশেষে তার সবকিছুই কিন্তু অর্থবহ হয় না। সেই শক্তিটাকে জ্ঞানের কাজে লাগানো গেলে, উদ্ভাবনী স্পৃহা জাগ্রত করার কাজে লাগানো গেলে অর্থপূর্ণ হয়।

গেলবছর একটা ম্যাগাজিনে ফরমায়েশি লেখা প্রস্তুত করার জন্যে পোলিশ ফিজিসিস্ট মেরি কুরি সম্পর্কে পড়তে হয়েছিলো। এই বিদূষী নারী থেকে আমি দারুণ একটা জিনিস শিখেছি। একবার কিছু সাংবাদিক তাঁকে বারবার পারিবারিক বিষয়াদি নিয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন। তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন: be less curious about people and more curious about ideas!

এই একটা 'থ্রেট' আমি নিজেকে দৈনিক কয়েকবার দেই।

কথাটা খুব মনে ধরেছিলো আমার। এরপর থেকে যে কারো সাথে কথায় ও আচরণে আমি এটা অনুসরণ করি। নিজেকে বলি, মানুষের এটা ওটা নিয়ে ভেবে সময় অপচয় করে কী লাভ, বরং ঐ কৌতূহল ও অনুসন্ধিৎসা নতুন কিছু জানার জন্যে, নতুন কিছু ভাবার জন্যে ব্যয় করা-ই বেশি সঙ্গত।

আমরা হলের ক্যান্টিনে গিয়ে খেলাম, যোহর সারলাম সেখানেই। লাইব্রেরি তখন প্রায় ফাঁকা হতে শুরু করেছে। কেউ কেউ টেবিলেই মাথা রেখে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

আমার চোখ বুজে আসে। একটা কবিতা লিখলাম। হাবিজাবি কিসব পড়লাম, বিচ্ছিন্নভাবে। আসর পড়লাম হলে গিয়ে। মাহবুব আনারস খাওয়ালো হলের সামনে।

দূরসম্পর্কীয় একজন আত্মীয় এসেছে নতুন সেশনে ভর্তি হতে, হলে গিয়েছিলাম তাঁর সাথে দেখা করতে। সহসা তাঁর দেখা পেলাম না। ফোন করে কালকে দেখা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে পাঁচটার বাস ধরলাম।

যথারীতি নীড়ে ফেরা সান্ধ্যবিহগ আবারো আপন জগতে মত্ত হোল।

টিকাঃ
১ সূরা আনফাল ৮:১৭

📘 শেষরাত্রির গল্পগুলো > 📄 তোমাকে ভালোবাসি না, আম্মু

📄 তোমাকে ভালোবাসি না, আম্মু


الورع لابن أبي الدنيا পড়ছিলাম সুবিখ্যাত ও সমাদৃত গ্রন্থ
একটা গল্প খুব চিন্তা জাগিয়ে দিলো।

এতোদিন নিজের ব্যাপারে একটা আত্মবিশ্বাস ছিলো, আমি আব্বুম্মুকে অনেক অ-নে-ক ভালোবাসি। মনে হতো, পৃথিবীতে আমিই আব্বুম্মুকে সবচে' বেশি ভালোবাসি। সম্ভবত আমার ব্যাপারে তাঁদের অবস্থানও তাই। আলহামদুলিল্লাহ। একদম দুধে ধোয়া নই ঠিক, তবুও এই বাড়াবাড়ি রকম অনুভূতিটা প্রশ্রয় পায় উভয়পক্ষের ভালোবাসার সমীকরণ সমান্তরাল বলে।

কিন্তু আজকে ভাবছি, নাহ! এই দাবী মোটেও সত্য নয়। মনে হচ্ছে, হাসান ইবন 'আলীর [রা.] মতো মায়ের প্রতি এতো বেশি গভীর মমতা জড়ানো ভালোবাসা আর কে-ই বা দেখাতে পারে?

ঘটনা হোল, তিনি তাঁর আম্মুর সাথে কখনো খেতে বসতেন না। জিজ্ঞাসা করা হোল, 'আপনি এমনটি কেন করছেন?'

দেখুন, কী ছিলো তাঁর জবাব!

'ধরুন, আম্মুর সাথে খেতে বসলাম। এমন সময় কোনো খাবারের দিকে আম্মুর চোখ গেলো এবং সেটা তাঁর পছন্দ হওয়ায় খেতে মন চাইলো, কিন্তু মুখ ফুটে বললেন না। এমনও হতে পারে, আমি সেটা বেখেয়ালে বুঝতে না পেরে নিজেই খেয়ে ফেললাম। কী হোল এখন! আমি আম্মুর অবাধ্য হয়ে গেলাম না?

শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালোবাসার পরিমাণ কতটুকু হলে কেউ এভাবে ভাবতে পারে?

টিকাঃ
১ গ্রন্থটি আমার সংগ্রহে নেই। মাসজিদ নাবাওয়ির গ্রন্থাগারে বসে পড়েছিলাম। এই গল্পটা নোট করে নিয়েছিলাম, কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কত তম খন্ড কিংবা পৃষ্ঠা নম্বর কত, তা টুকে নেই নি।

الورع لابن أبي الدنيا পড়ছিলাম সুবিখ্যাত ও সমাদৃত গ্রন্থ
একটা গল্প খুব চিন্তা জাগিয়ে দিলো।

এতোদিন নিজের ব্যাপারে একটা আত্মবিশ্বাস ছিলো, আমি আব্বুম্মুকে অনেক অ-নে-ক ভালোবাসি। মনে হতো, পৃথিবীতে আমিই আব্বুম্মুকে সবচে' বেশি ভালোবাসি। সম্ভবত আমার ব্যাপারে তাঁদের অবস্থানও তাই। আলহামদুলিল্লাহ। একদম দুধে ধোয়া নই ঠিক, তবুও এই বাড়াবাড়ি রকম অনুভূতিটা প্রশ্রয় পায় উভয়পক্ষের ভালোবাসার সমীকরণ সমান্তরাল বলে।

কিন্তু আজকে ভাবছি, নাহ! এই দাবী মোটেও সত্য নয়। মনে হচ্ছে, হাসান ইবন 'আলীর [রা.] মতো মায়ের প্রতি এতো বেশি গভীর মমতা জড়ানো ভালোবাসা আর কে-ই বা দেখাতে পারে?

ঘটনা হোল, তিনি তাঁর আম্মুর সাথে কখনো খেতে বসতেন না। জিজ্ঞাসা করা হোল, 'আপনি এমনটি কেন করছেন?'

দেখুন, কী ছিলো তাঁর জবাব!

'ধরুন, আম্মুর সাথে খেতে বসলাম। এমন সময় কোনো খাবারের দিকে আম্মুর চোখ গেলো এবং সেটা তাঁর পছন্দ হওয়ায় খেতে মন চাইলো, কিন্তু মুখ ফুটে বললেন না। এমনও হতে পারে, আমি সেটা বেখেয়ালে বুঝতে না পেরে নিজেই খেয়ে ফেললাম। কী হোল এখন! আমি আম্মুর অবাধ্য হয়ে গেলাম না?

শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালোবাসার পরিমাণ কতটুকু হলে কেউ এভাবে ভাবতে পারে?

টিকাঃ
১ গ্রন্থটি আমার সংগ্রহে নেই। মাসজিদ নাবাওয়ির গ্রন্থাগারে বসে পড়েছিলাম। এই গল্পটা নোট করে নিয়েছিলাম, কিন্তু তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে কত তম খন্ড কিংবা পৃষ্ঠা নম্বর কত, তা টুকে নেই নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00