📄 শেষরাত্রির গল্পগুলো
শেষ রাত্রির গল্পের আসরে আপনাকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা গল্প করবো, ফাঁকে ফাঁকে কিছু কথাও বলবো।
প্রথম গল্প শোনার আগে
এক
ধরুন, আপনি কাউকে ভালোবাসেন। খুব, খুউব ভালোবাসেন। আবেগসিক্ত অনুরাগে হৃদয়ে প্রীতিময় দ্যোতনা সৃষ্টি করেন। ভেবে দেখুন তো, আপনার অনেক অনেক প্রিয় ভালোবাসার মানুষটির সাথে আপনি কখন কথা বলবেন? হৃদয়ের অব্যক্ত অনুভূতিগুলো কখন ব্যক্ত করবেন? নিশ্চয়ই একান্তে! তাই না? কোলাহলমুক্ত নিভৃত কোন সময়ে আপনি মন উজাড় করে দিতে পারেন তাকে।
দুই
আপনি বলে থাকেন, 'আমি আল্লাহকে সবকিছুর চেয়ে বেশি ভালোবাসি'। তা-ই যদি হয়, সমস্ত বিশ্ব চরাচর যখন নিঝুম রজনীতে ঘুমের কোলে ঢলে পড়ে, নিঃশব্দের ঢেউ খেলে যায় প্রকৃতির বুকে, নীরবতার ছায়া নেমে আসে পৃথিবীর আঙিনায়; তখন কি ইচ্ছে করে আপনার প্রিয়তম মালিকের সাথে একটু নিভৃতে কথা বলার? হৃদয়ের জমানো ব্যথাগুলো তাঁর কাছে পেশ করার? ইচ্ছে করে। আপনার প্রেমাস্পদকে ভালোবাসার দু-ফোঁটা অশ্রু নিবেদন করার? সমস্ত সৃষ্টি যখন সুখনিদ্রায় বিভোর, তখনই তো প্রিয়তম স্রষ্টার সাথে একান্ত আলাপনের সুবর্ণ সুযোগ!
প্রথম গল্পটি: গল্পটি আমার এবং আপনার মতোই দু জন ব্যক্তির! আমাদের মতোই রক্তে-মাংসে গড়া দু জন বিশ্বাসী মানুষের! শুনুন তবে:
হুসাইন ইবন আল-হাসান রাত্রিকালীন সালাতের ব্যাপারে একটু উদাসীন ছিলেন। তাই ফুদাইল ইবন 'ইয়াদ একবার হুসাইনের হাত ধরে দৃষ্টি আকর্ষণ করে কথা বলেছিলেন। সে কথা হৃদয়ের খুব গভীরে রেখাপাত করার মতো।
শোনো হুসাইন! আল্লাহ পূর্ববর্তী অনেক কিতাবে বলেছেন, "যে আমার ভালোবাসা দাবী করে, সে মিথ্যা বলে। যখন রাত নেমে আসে, সে আমাকে ফেলে (কিভাবে) ঘুমিয়ে থাকে! আচ্ছা, প্রত্যেক প্রেমিকই কি তার প্রেমাস্পদকে নিভৃতে পেতে চায় না?"
আপনার অবস্থান? আপনি ইতোমধ্যেই বুঝতে পেরেছেন, আপনার দাবিতে আপনি সত্যবাদী কি-না। যদি ইতিবাচক উত্তর হয়, আপনি আল্লাহর কৃতজ্ঞতা ও শুকরিয়া আদায় করুন এবং ধারাবাহিকতা ঠিক থাকার জন্যে আল্লাহর কাছে দু'আ করুন।
যদি নেতিবাচক উত্তর হয়, চলুন না, আজ থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি, আমি আমার ভালোবাসার দাবীকে সত্য প্রমাণ করবোই ইনশা-আল্লাহ!
আল্লাহ আপনাকে তাওফিক দিন। থামুন, আপনার জন্যে আরো কিছু গল্প এখনো বাকী!
দ্বিতীয় গল্প বলার আগে আপনি এরই মধ্যে একটি হাদিস প্রায় সময়ই শুনে আসছেন। হ্যাঁ, ঠিক ধরেছেন, আবু হুরায়রার [রা.] বর্ণিত হাদিসটার কথাই বলছিলাম!
রাসূলুল্লাহ [] বলেন:
“ ফরয সালাতের পরে (মর্যাদা ও ফযিলতের দিক থেকে) সর্বোত্তম হোল শেষ রাতের সালাত। [১]
অতঃপর কী হলো?
হাদিসটি শোনার পর আপনার বিশ্বাসের জমিনে ইচ্ছার বীজ বপন করে ফেললেন। 'আমাকেও এই সালাতে শামিল হওয়া দরকার!'
এর সাথে সাথে জেনে ফেলেছেন শেষ রাতের সালাতে অভ্যস্তদের জন্যে আল্লাহর কাছে সুমহান মর্যাদার কথাটাও। ঐ যে, ইবন 'আব্বাস [রা.] যে হাদিসটা বর্ণনা করেছিলেন!
রাসূলুল্লাহ [] বলেছেন:
“ আমার উম্মতের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত হোল কুরআনের ধারক-বাহক এবং রাত্রিতে 'ইবাদাতকারীগণ। [২]
এবার তো আরো চমৎকার একটা হাদিস পড়ে ফেললেন! জাবির [রা.] বর্ণনা করেছেন যেটা! রাসূলুল্লাহ [] বলেছেন:
“ তোমাদের উচিত রাত্রিকালীন সালাত (তাহাজ্জুদ) আদায় করা। কারণ, তা-
* তোমাদের পূর্ববর্তী সালিহ বান্দাহদের অভ্যাস,
* আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যম,
* পাপ থেকে রক্ষাকারী,
* মন্দ 'আমাল সমূহের অপনোদনকারী,
* শরীর থেকে রোগ-ব্যাধি উপশমকারী।"
তারপর?
আপনার সুপ্ত বাসনার অঙ্কুরোদগম হলো। মোটামুটি স্থির হলেন। আত্মবিশ্বাসের পারদ হয়ে গেলো ঊর্ধ্বগামী। কিন্তু বাধ সাধলো আরেকটা সমস্যা। আপনি ঘুম থেকে জাগতে পারছেন না!
আপনার জন্যে দ্বিতীয় গল্পটা ঠিক এমনই অভিযোগ নিয়ে একজন ব্যক্তি হাসান আল-বাসরী'র [র.] কাছে এসেছিলেন। লোকটি বলেছিলেন, 'আমি অনেক চেষ্টা করেও রাত্রে তাহাজ্জুদের জন্যে ঘুম থেকে জাগতে পারি না। আমার জন্যে কী প্রতিষেধকের পরামর্শ দেবেন?'
হাসান আল-বাসরী খুব অল্প কথায় তাকে সমাধান দিয়েছিলেন: তুমি দিনের বেলায় পাপ কাজ থেকে দূরে থাকো, তাহলে রাতের বেলা সালাতের জন্যে জাগ্রত হতে পারবে। রাত্রে সালাতে দন্ডায়মান হওয়াটা অনেক বড়ো মর্যাদার ব্যাপার। আর পাপীকে কখনো এই মর্যাদা দেওয়া হয় না।
অল্প কথা। কিন্তু ওজনটা কতটুকু ভারী, চোখ বন্ধ করে কেবল অনুভব করা যায়। নয় কি?
চূড়ান্ত গল্পগুলো
আপনি মানসিকভাবে প্রস্তুত। আপনার দিনটি আল্লাহর সীমারেখা অতিক্রমের কোনো ছোট উপলক্ষেরও সাক্ষাৎ পায় নি। আলহামদুলিল্লাহ।
এই তো! এ-ই তোওও! আপনি সফল। অভিনন্দন! আপনার জন্যে চূড়ান্ত গল্পের ডালি নিয়ে আমরা অপেক্ষমাণ। তার আগে কিছু পরামর্শ আপনার জন্যে,
> খুব বেশি নয়, আপনি মাত্র আধ ঘন্টার প্ল্যান নিয়ে শুরু করুন।
> মনটাকে শক্ত করে ফেলুন। আত্মবিশ্বাস রাখুন। আল্লাহর ওপর আস্থা রাখুন।
> প্রাথমিকভাবে প্রতিদিন হয়তো সম্ভব হবে না। কোন্ কোন্ দিন আপনার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে, আগেই তা ঠিক করে ফেলুন।
> ব্লগ বা ফেসবুকে অধিক আসক্তি থাকলে আপনার নিজের কল্যাণের জন্যেই সেসবের নিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে অভ্যস্ত হওয়া অনেক বেশি প্রয়োজন। তাহাজ্জুদের সুমহান নেয়ামত পেতে হলে তো সময় অপচয়কারী এ বিষয়গুলো কড়া নিয়ন্ত্রণে সুমহান নেয়ামত পেতে হলে তো সময় অপচয়কারী এ বিষয়গুলো কড়া নিয়ন্ত্রণে আনার বিকল্পই নেই।
» অযু করে যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ুন। আল্লাহর ওপর ভরসা করে অ্যালার্ম দিয়ে রাখুন।
» পর্যায়ক্রমে (ইন শা-আল্লাহ) নিয়মিত অভ্যস্ত হবার চেষ্টা করুন।
তৃতীয় গল্পটি
এই গল্পটা অনেক অ-নে-ক বেশি প্রেরণাদায়ক। আপনার সাথেও হয়তো মিলে যেতে পারে!
‘আব্দুল ‘আযীয ইবন আবি রাওয়াদ ছিলেন আমাদের মতোই আরেকজন বিশ্বাসী মানুষ। তিনি শেষরাত্রে সালাতের জন্যে উঠতে চাইলে কোমল ও আরামদায়ক বিছানার পরশে কিছুটা পিছুটান অনুভব করতেন।
তারপর কী করতেন জানেন?
বিছানায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতেন,
ওহ! কতো নরম আর আরামদায়ক তুমি! কিন্তু জান্নাতের বিছানাটা যে তোমার চেয়েও অধিক কোমল আর আরামদায়ক!
অতঃপর তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে যেতেন।
সর্বশেষ গল্প শোনার আগে
আচ্ছা, আপনি অনেক খুশি না? আরে আরে, মুচকি হেসে কী লাভ? বলেই ফেলুন, আমরাও একটু শুনি! আপনার হৃদয়ে প্রশান্তির সুশীতল বাতাস স্পর্শ করে যাচ্ছে কী নির্মল স্নিগ্ধতায়!
কিন্তু আমি আপনাকে স্বার্থপর বলি, তা নিশ্চয়ই চান না!
আপনি যদি ভাইয়া হয়ে থাকেন, তাহলে আপুকে বঞ্চতি করবেন কেনো? আর আপুরাই বা কেনো ভাইয়াকে ফেলে সৌভাগ্যের অংশীদার হবেন? চলুন না, দুজনের ভালোবাসার পদ্ম দুটো আল-ওয়াদূদের চূড়ান্ত ভালোবাসার মৃণালেই ফুটিয়ে তুলি!
রাজি তো? আপনাদের জন্যে সুসংবাদ! না, আমার নয়। প্রিয় নবীজির কাছেই শুনুন তবে:
আল্লাহ ঐ লোকের উপর রহম করুন, যে রাতে ওঠে, সালাত আদায় করে, তার স্ত্রীকে জাগায় এবং সে-ও সালাত আদায় করে। যদি সে উঠতে না চায়, তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। আল্লাহ ঐ মহিলার উপর রহম করুন, যে রাতে ওঠে, সালাত আদায় করে, তার স্বামীকে জাগায় এবং সে-ও সালাত আদায় করে। যদি সে ওঠতে না চায়, তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে দেয়। [১]
প্রিয়তম মালিকের রহমের ছায়ায় আদৃত হবার এমন সুযোগ হাতছাড়া করে কেউ? আপনি যদি অবিবাহিত হয়ে থাকেন, আপনার জন্যেও দুশ্চিন্তার কোন কারণ নেই! আল্লাহর রহমের চাদরে আবৃত হবার সুযোগ আপনার জন্যেও অবারিত! আপনি যেখানে পড়ছেন, যেখানে থাকছেন - মোটের ওপর আপনার আয়ত্ত্বের ভেতরে, হাতের চারপাশের পরিবেশটাকেই জান্নাতী সাজে সাজিয়ে তুলতে পারেন। খুব প্রিয় বন্ধুটির হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে তাকেও আপনার পবিত্রতম অনুভূতিটির কথা জানাতে পারেন। অথবা আপনার পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যিনি বা যারা আপনার খুব কাছের, তার সাথে এই অনুভব ব্যক্ত করতে পারেন। আপনার রুমমেটদেরকে পর্যায়ক্রমে অভ্যস্ত হওয়ার প্রেরণা দিতে পারেন। দেখবেন, ঠিকঠাক মত এক ডোজ পেয়ে গেলে হয়তো আপনার চেয়েও তারা অধিক যত্নবান হয়ে উঠবেন ইন শা-আল্লাহ। এতে করে হবে কেউ, আপনার কখনো তাহাজ্জুদের সুযোগ ছুটে গেলে তাঁরা আপনাকে জাগিয়ে তুলতে সহায়তা করবেন। অথবা কখনো পিছুটান অনুভব করলে আপনাকে টেনে নেবেন তাঁদেরই কেউ।
চতুর্থ গল্পটি
গল্প নয় শুধু, আমরা প্রেরণা-উজ্জীবনী ও প্রাণনা-সঞ্জীবনী চমৎকার একটি কবিতার সাথে পরিচিত হবো ইনশা-আল্লাহ।
আল্লাহর ভালোবাসায় নিবেদিতপ্রাণ আরেকজন মানুষ, যিনি তাহাজ্জুদের সালাতের জন্যে নিজেকে প্রায়ই স্মরণ করিয়ে দিতেন একটি কবিতা আবৃত্তি করে; আমরা সেটার কাব্যানুবাদ করবো। মাত্রাবৃত্ত ছন্দের তালে আমরা কবিতাটি উপভোগ করবো।
ঘুমের তৃপ্তি তোমাকে ভুলিয়ে রেখেছে প্রকৃত আয়েশ থেকে
জান্নাতী ফুলবাগে শয্যার সুখ থেকে ঠিক গাফেল রেখে
অনন্তকাল বাঁচবে যেখানে, মৃত্যু পাবে না তোমার ছোঁয়া
প্রভুর পক্ষ থেকে নেয়ামত, যাবে না তা থেকে একটু খোয়া!
তাই বলি, জেগে ওঠো তাড়াতাড়ি, অশ্রু ঝরাও, তোলো দু হাত
ঘুমে নয় ভাই, আজকে না হয় কুরআন বুকেই কাটুক রাত!
সুবহানাল্লাহ! কতো সুন্দর ‘সেলফ রিমাইন্ডার’! আমরাও কি পারি না নিজের সাথে এভাবে কথা বলতে?
আসর এখানেই শেষ!
শেষ রাত্রির গল্পের আসরের পর্দা আজ এখানেই নামলো! এবার গল্প বলার পালা আপনার।
আপনার ভালোবাসার গল্পটি সোনালি হরফে লিখিত হোক আরশের খাতায়।
টিকাঃ
১ আল-মুজালাসাহ: ১৩২
১ মুসনাদ আহমাদ: ৮৪৮৮
২ শু'আব আল-ঈমান: ২৯৭৭
৩ সুনান আত-তিরমিযী: ৩৫৪৯
১ সুনান আবু দাউদ: ১৩১০; সুনান নাসাঈ: ১৬১০; মুসনাদ আহমাদ: ৭৪০৪
১ মূল কবিতা: ফাদ্বলু কিয়ামিললাইল, আবূ বাকর আল-আজুররী, পৃ.৯
📄 আক্ষেপের গল্প
আজকের আসরে শুধুই আক্ষেপের গল্প। আসর শুরু করার আগে জেনে নেই, [এক] অংশে আমরা কিছু গল্প শোনাবো, [দুই] অংশে তার বাস্তব রূপ দেখবো, [তিন] অংশে পূর্বোক্ত দুই অংশ নিয়ে আমাদের অনুভূতি ব্যক্ত করবো।
এক
শুরুতেই আপনার যাপিত জীবনে চিরাচরিত এবং চিরপরিচিত কিছু আক্ষেপ ও খেদোক্তির সাথে একটু নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেই।
(ক) দুই বছর ধরে ব্যবসায় ক্রমাগত 'লস' খেতে হচ্ছে শফিক সাহেবকে। সবাই এ-কথা ও-কথা বলেন। কিন্তু সবই কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো লাগে তাঁর কাছে। ছোট ছেলের সাথে এ নিয়ে একটু কথা বলার জন্যে বসলেন তিনি। কিন্তু ছেলেটাও নির্লিপ্ত। শফিক সাহেব সেই মুহূর্তে চরম হতাশায় আচ্ছন্ন, ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে তাঁর মেজাজ একেবারে সপ্তমে চড়লো। সহসা সোফা থেকে ছলকে দাঁড়িয়ে খুব আক্ষেপের সাথেই বললেন
'আর পারি না! মনডায় কয় মাটি দুইভাগ কইরা আমি এখনি মাটির ভিত্রে ঢুইকা যাই!'
(খ) এই এলাকায় রাজু এবং সাব্বির অন্তরঙ্গ বন্ধু হিসেবে সবার কাছে পরিচিত। তাদের প্রাণোচ্ছল বন্ধুত্বে কেউ কেউ ঈর্ষাও করে। সুখ ও শোক পরস্পরে ভাগাভাগি করে নেয় দুজনে। ইদানীং অবশ্য রাজুর মধ্যে কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করছে সাব্বির। ছেলেটা হঠাৎ করে ধূমপায়ী হয়ে ওঠছে, আচার-আচরণেও অস্বাভাবিকতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। সাব্বির খুব করে বোঝাতে চেষ্টা করে তাকে। সুস্থ-সুন্দর জীবনাচারে ফিরে যাবার তাগাদা দেয়। কিন্তু পেরে ওঠে না। আবার বন্ধুত্বের বন্ধনও সে ছিন্ন করতে পারে না। এদিকে রাজু মাদকাসক্ত-ই হয় নি শুধু, এলাকায় মাদক সরবরাহের কাজটাও খুব দক্ষতার সাথে করছে। সাব্বির বন্ধুর এই পরিণতিতে মর্মাহত হয়। ঠিক এমন সময়েই রাজু হাঁপাতে হাঁপাতে দৌড়ে আসে, 'সাব্বির, দোস্ত! আমারে একটু হেল্প করবি?' কিছুক্ষণ কী জানি ভেবে সাব্বির মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। রাজু ভরসা পায়, 'দোস্ত! এই বড়িগুলা তোর কাছে একটু লুকায় রাখবি। আব্বা আমারে দৌড়ানি দিতাছে।' বন্ধুর বিপদে সাব্বির না করতে পারে না। পরদিন বিকেলে মাদক সহ পুলিশের হাতে ধরা খেল রাজু। পুলিশ ইনভেস্টিগেশনে রাজুর মাদকচক্রের ব্যাপারে যেসব তথ্য-উপাত্ত উদ্ধার হয়েছে, তাতে সাব্বিরের নামটাও চলে এসেছে। পুলিশ তাকেও খোঁজাখুঁজি করছে। খবরটা শোনার পর থেকে গা-ঢাকা দেবার চেষ্টা করছে সে। নিজেকে এতটাই অসহায় বোধ করে নি কখনো। বাবা-মাকেও বলা যাচ্ছে না। রাগে-ক্ষোভে-অপমানে মাথার চুল ছিঁড়তে ছিঁড়তে তার মুখ থেকে বেরোয় খেদোক্তি:
'ধুর শালার! উজবুকটার লগে দোস্তি না করলেই হইত! হালার লগে বন্ধুত্ব করতে যায়া আমি এহন মাইনকা চিপায়!'
(গ) খানবাড়ির ছোট ছেলেটা হঠাৎ করেই পক্ষাঘাতে আক্রান্ত হবার উপক্রম। এলাকায় উঠতি এক কবিরাজ ছিটু মিয়া, খান সাহেবকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে স্থিতধী করলো যে, তার নির্দেশনামত নিয়মিত চিকিৎসা করালে রোগী সুস্থ হয়ে যাবে। অদ্ভুত সব চিকিৎসা পদ্ধতি ছিটু মিয়ার। ঝাড়ু দিয়ে পেটানো, মাটি খুঁড়ে অর্ধদেহ তাতে পুঁতে রাখা, আরো আরো কত কী! মোল্লাবাড়ির মুঈন সাহেব এই খবর পেয়ে শুরু থেকেই খান সাহেবকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন এ জাতীয় কুসংস্কার ও বায়বীয় চিকিৎসায় বিশ্বাস না করতে। সময়ক্ষেপণ না করে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে ছেলেকে নেয়ার জন্যে তাগাদা দিতে থাকেন প্রায় সময়ই। খান সাহেবের কানে পানি ঢোকে না, তাঁর মন-মগজে ভালো করে গেঁথে আছে বিবি সাহেবার সেদিনকার কথা, 'হুইনছেন নি! আমগো ছিটু কবিরাজ স্বপ্নের মইদ্যে অষুধ পাইছে! পাগলা-ছাগলা হইলেও মানুষডা কিন্তু কামেল!' খান সাহেবের মনে কথাটা কেন জানি ধরেছে খুব করে! স্বপ্নে পাওয়া ঐশ্বরিক অথবা মহাজাগতিক ওষুধের কারিশমায় ছেলের দ্রুত সুস্থতার স্বপ্ন দেখেন তিনি। কিছুদিন যেতে না যেতে ছেলের অবস্থা ক্রমাগত অবনতির দিকেই যেতে থাকে। খান সাহেব দিশেহারা হয়ে পড়েন। ছিট মিয়ার ওপর আস্থাটা ক্রমশ ফিকে হতে থাকে। প্রতিবেশীর গোবেচারা ছেলেটার এই মর্মন্তুদ অবস্থায় মুঈন সাহেব আর ধৈর্য ধরতে পারেন না, একপ্রকার জোর করেই খান সাহেবকে সাথে নিয়ে ছেলেটাকে নিয়ে ছুটে যান পাশের হাসপাতালে। ডা. হাসান এলাকায় খুব নামকরা চিকিৎসক। এমবিবিএস পাশ করে সেই যে চেম্বার বসিয়েছেন এখানে, গ্রামের মায়া আর ছাড়তে পারেন নি। মুঈন সাহেব সবকিছু খুলে বললেন। ডাক্তার খুব অবাক হলেন। খান সাহেবকে এরূপ নির্বুদ্ধিতার জন্যে ভৎসনা করলেন। হাতে ধরে ছেলেটাকে এমন পরিণতির দিকে নিয়ে যাবার জন্যে উষ্মা প্রকাশ করলেন তিনি। এক পর্যায়ে কালবিলম্বের দরুন রোগীর অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতির আশঙ্কাটা যখন জানালেন, খান সাহেব তখন টেবিলে মাথা খুঁটতে থাকেন। অনেক দূর থেকে তার সশব্দ রোদনধ্বনি শোনা যায়,
'হায় হায় রে! আমি যদি শুরু থেকেই মুঈন সাহেবের কথা শুনতাআআআম....!'
(ঘ) এই ক্লাসে সম্পূর্ণ বিপরীতধর্মী দুটো চিত্র দেখা যায়। এই যেমন, এখন টিফিন ব্রেক চলছে। হালকা নাস্তা করেই বেশিরভাগ ছাত্র ক্লাসে চলে এসেছে। আবিদ, শরিফ এবং মেসবাহ তিন বন্ধু; ওরা এক কোণায় বসে কথা বলছিলো بأنفسهم মধ্যে। তিনজনে প্রায়-ই গ্রুপ স্টাডি করে। আজকে কথা হচ্ছিলো বাংলা দ্বিতীয় পত্র নিয়ে। 'সমাস' নিয়ে শরিফের কিছু অস্পষ্টতা আছে। আবিদ আর মেসবাহ মিলে বিষয়গুলো খোলাসা করছে। আরেক কোণায় রাফি, আসিফ এবং ইশতিয়াক; এই তিনজন সারাক্ষণই ভিডিও গেম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এখনও তার ব্যত্যয় হচ্ছে না। কানে ইয়ারফোন গুঁজে দিয়ে রাফি ইতোমধ্যে ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করছে, তার প্রিয় চ্যানেলে নতুন কোনো মিউজিক ভিডিও আপলোড হোল কি-না খুঁজে দেখছে। ইশতিয়াক ঝুঁকে দেখার চেষ্টা করে। আসিফ ইয়ারফোনের এক প্রান্ত নিজের কানের কাছে নেয়।
এই দুই বিপরীতধর্মী দৃশ্য নজরে পড়ে দুজন নবাগত ছাত্রের। এদের একজন রাতুল, আরেকজন সিয়াম। রাতুল বরাবরই রাফিকে শুরু থেকে খেয়াল করে আসছে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করার পরিকল্পনাও নিয়ে রেখেছে। যথারীতি কদিনের মধ্যেই সে তাদের অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে ওঠলো। সিয়ামের ওসবে আগ্রহ নেই। আবিদ, শরিফ আর মেসবাহ'র পড়াশোনাকেন্দ্রিক ব্যস্ততা তাকে বরাবরই চমৎকৃত ও অনুপ্রাণিত করে। এই কিছুদিন আগেও সে Right Form of Verbs এর কিছু নিয়ম খুব কঠিন মনে করতো, ওরা তিনজন কী সুন্দর করেই না বুঝিয়ে দিলো! ওদের হৃদয়ের শস্ত্য সিয়ামকে আশ্বস্ত করে। ওরাও নতুন একজন পড়ুয়া বন্ধু পেয়ে ভীষণ * ইতোমধ্যে ফার্স্ট সেমিস্টার পরীক্ষার রেজাল্ট এসেছে। একই স্কুল থেকে পড়ে আসা, প্রায় কাছাকাছি মার্কস নিয়ে রেজাল্ট করে আসা দুই বন্ধু- রাতুল এবং সিয়ামের প্রাপ্ত মার্কসে এবার বিশাল পার্থক্য। রাতুল কোনো কোনো বিষয়ে 'পাস মার্ক'ও তুলতে পারে নি। সিয়াম অর্থনীতি প্রথম পত্র ছাড়া বাকি সব বিষয়েই ৯০ এর অধিক নাম্বার পেয়েছে। নোটিশ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে রাতুল নিজের এবং বন্ধুর নাম্বার পাশাপাশি মিলিয়ে দেখে বুকের বাম পাশে একটা ধাক্কা খেলো। মাথাটা কেমন ঘুরে ওঠে তার! মুখ ফুটে বলে ফেলে:
'আহারে! আমিও যদি ওদের সাথে থাকতাম! আজকে রেজাল্টটা কত্ত ভালো হতো আমার!'
(ঙ) সাকিব এবং আকিব- দুইজন জমজ ভাই। উভয়ের মধ্যে কিছু মিল যেমন আছে, অমিলও কম নয়। মিলটা কেমন? যেমন, দুইজনেই প্রচণ্ড স্বাধীনচেতা। এমনকি চাকরি-বাকরিতেও আস্থা নেই, এটাকে 'সভ্য দাসত্ব' বলে উড়িয়ে দেয়। দুইজনেই ঠিক করেছে, পড়াশোনা শেষ করে স্বাধীনভাবে এবং সততার সাথে ব্যবসা করে জীবিকা নির্বাহ করবে। এ তো গেলো মিলের কথা। অমিলও আছে। প্রথমজন বেশ বুদ্ধিমান। অহেতুক সময় অপচয় যেমন করে না, দুইহাতে পয়সাও খরচ করে না। আবার কার্পণ্যতেও সে নেই। এক কথায় সবকিছুতেই হিসাবী। কিন্তু দ্বিতীয়জন কিছুটা উড়নচন্ডী। জীবন নিয়ে অতকিছু সে ভাবে না। টিউশনি করিয়ে যে টাকা পায়, খাওয়া-দাওয়া আর ঘোরাঘুরিতে সে তার পুরোটাই উড়িয়ে দেয়। দুজনে ছাত্রজীবন শেষ করেই যখন ব্যবসায় নামার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন সাকিব জমানো টাকা হিসেব করে বুঝতে পারে, একটা ভালো পরিমাণ মূলধন দিয়ে সে সুন্দর মতো ব্যবসা শুরু করবে। কিন্তু আকিবের হাত শূন্য। ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে তার আক্ষেপ ঝরে পড়ে,
'ইশশশ! জীবনের এই পর্যায়টার জন্য কিছু টাকা যদি জমিয়ে রাখতাম!'
দুই
এবার যে আক্ষেপের গল্পগুলো আপনার সামনে উপস্থাপন করবো, প্রতিটি আক্ষেপ এবং আফসোসের উক্তি উপরের ঘটনাগুলোর সাথে ক্রমানুপাতে মিলিয়ে নেবেন। এতক্ষণ আমরা এপারের আক্ষেপগুলোর কথা জানলাম। এবার ওপারের আক্ষেপগুলোর কথাও একটু জেনে নেই। কেমন হবে সেই খেদোক্তিগুলো? সেই আফসোসগুলো? আমরা গল্প বলবো না, আল-কুরআনের কাছ থেকেই শুনবো সেসব। উপরের গল্প পুনরায় একটা একটা করে পড়ুন, আর তার সাথে নিচেরগুলো মিলিয়ে নিন।
(ক) শফিক সাহেবের মতো আরো অনেকেই নিজেদের শোচনীয় পরিণতির মুখোমুখি হয়ে সেদিন এমন আক্ষেপ করবে। তাঁরা বলবে:
يَا لَيْتَنِي كُنْتُ تَرَابًا
"হায়, আফসোস! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম!!”
(খ) সাব্বিরের মতোই সেদিন আরো কিছু লোক অসৎসঙ্গের পাল্লায় পড়ে স্বকীয়তা হারিয়ে, বিশ্বাসের শুভ্রতায় কালিমা লেপনের কলঙ্কে দিশেহারা হয়ে বিপথগামী হবার আক্ষেপকে প্রকাশ করবে:
يَا وَيْلَتَى لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذْ فُلَانًا خَلِيلًا
“হায় আমার দুর্ভাগ্য, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম।”
(গ) মুঈন সাহেব বারবার সতর্ক করার পরও গা-ছাড়া মনোভাব নিয়ে নিজের বিপদ ডেকে এনে খান সাহেব যেমন মর্মযাতনায় ভুগেছেন, তেমনিভাবে পার্থিব জীবনের মরীচিকার পেছনে ছুটতে ছুটতে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের [ﷺ] পথনির্দেশনা কানে না নেওয়ার দরুন সেদিন অনেকেই নিজের মর্মযাতনা নিশ্চিত করবে। সেই মর্মযাতনার সাথে আবার যুক্ত হবে দৈহিক শাস্তি ও যাতনা। বৃথা আক্ষেপে তারা বলবে:
يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَا لَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا
“যেদিন অগ্নিতে তাদের মুখমন্ডল ওলট পালট করা হবে; সেদিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য করতাম ও রাসূলের আনুগত্য করতাম!”
(ঘ) অধ্যবসায়ী ও নিয়মানুবর্তী সহচরদের সাথে থেকে সিয়াম ভালো রেজাল্ট করেছিলো, অমনোযোগী ও অনিয়মানুবর্তী সহচরদের সাথে সময় কাটানোর কারণে রাতুলের রেজাল্ট হয়েছিলো খারাপ। রাতুল যে আক্ষেপটা করেছিলো, সেদিনও কিছু মানুষ এমন আক্ষেপ করবে:
يَا لَيْتَنِي كُنْتُ مَعَهُمْ فَأَفُوزَ فَوْزًا عَظِيمًا
[“হায়! আমি যদি তাদের সাথে থাকতাম, তাহলে আমিও যে দারুণ সাফল্য পেতাম!!১]”
(১) জীবনের সঙ্গিন মুহূর্তের জন্যে আগেভাগে সঞ্চয় না করায় আকিবের মনে যে দুঃখবোধ ও আক্ষেপের জন্ম হয়েছে, সেদিনও কিছু মানুষের মুখ থেকে আসল গন্তব্যের জন্যে কিছু সঞ্চয় না করার আক্ষেপবোধ এভাবেই প্রকাশিত হবে:
يَقُولُ يَا لَيْتَنِي قَدَّمْتُ لِحَيَاتِي
“সে বলবে: হায়! এ জীবনের জন্যে আমি আগেই যদি কিছু পাঠিয়ে রাখতাম!"
তিন
দুটো অংশ আরেকবার একটু মিলিয়ে পড়ুন। একটা জিনিস খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন, দুই ধরনের আক্ষেপ প্রকাশের উক্তি কিন্তু একই। কিন্তু দুটোর মাঝে মৌলিক যে পার্থক্যটা, সেটা হচ্ছে, প্রথম দিকের আক্ষেপগুলোর মূল্য আছে, দ্বিতীয় অংশের আক্ষেপগুলোর কোনো মূল্য নেই। এক পয়সারও না! এ আবার কেমন কথা? আচ্ছা, খোলাসা করে বলা যাক।
» শফিক সাহেব যখন আক্ষেপ করে এই উক্তিটা করছেন, তখন কিন্তু তার সামনে এখনো সুযোগ আছে ব্যবসার 'পলিসি ডেভেলপ' করে এই 'লস খাওয়া' থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার।
» সাব্বির যখন তার অসৎ বন্ধুর সাথে বন্ধুত্বের জন্যে আক্ষেপ করছে, তখন তারও সুযোগ আছে, সামনে থেকে বন্ধু নির্বাচনে সতর্ক হবার।
" খান সাহেব যে শিক্ষাটা পেয়েছেন এবার, সামনে থেকে সে ব্যাপারে সাবধান থাকার জন্যে নিশ্চয়ই তিনি প্রতিজ্ঞ হতে পারেন, সে সুযোগ তার আছে। আবার আল্লাহ চাইলে ওই পরিস্থিতিতেও তাঁর ছেলেকে সারিয়ে তুলতে পারেন।
" রাতুল এবার খারাপ রেজাল্ট করে যে আক্ষেপ প্রকাশ করছে, তারপরে কিন্তু সুযোগ আছে, সিয়ামের মতোই পড়ুয়াদের সাথে সময় কাটিয়ে পরের সেমিস্টারে রেজাল্টটা ভালো করার।
আকিবের জন্যেও সুযোগ ও সময়ের দরোজা খোলা আছে, এখন থেকেই জীবনটাকে নিয়ন্ত্রিত ও হিসেবী করে, সামনের সময়ের জন্যে সঞ্চয় করার যথেষ্ট সুযোগ আছে তার।
কিন্তু!
" কিয়ামতের দিন মাটি হয়ে যাবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করলেও কোনো পাপীর সুযোগ নেই মাটি হয়ে যাবার। কিংবা ফিরে এসে জীবনটাকে বদলে ফেলার! আছে সুযোগ? নেই!
" একইভাবে, অসৎ ও পঙ্কিলতাপূর্ণ বন্ধুত্বের দরুন জান্নাতের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া মানুষগুলো যখন তার বন্ধুত্বের জন্যে লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে, তখন তারও সুযোগ নেই সংশোধনের! আছে কি? নেই!
" আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের কথাগুলো না মানার ফলস্বরূপ মর্মযাতনা ও দৈহিক যাতনার শাস্তি থেকেও ফিরে আসার কোনো সুযোগ নেই সেদিনের আক্ষেপকারীদের। তা-ই নয় কি! হ্যাঁ, তা-ই!
" দ্বীনের পথে সহযোগী, দ্বীনের পথে সহচর, দ্বীনের জ্ঞানে সমৃদ্ধ অথবা দ্বীন পালনের প্রচেষ্টারত মানুষগুলোর সংস্পর্শকে তুচ্ছজ্ঞান করার পর অন্ধকারের যাত্রীদের সহযাত্রী হয়ে সেদিন যাঁরা আক্ষেপ করবে, তাঁদেরও কিন্তু কোন সুযোগ নেই আবার আলোকিত মানুষগুলোর সঙ্গী হবার! আছে বলে মনে হয়? না, একটু-ও না!
" চূড়ান্ত গন্তব্যের জন্যে নিজের সঞ্চয়ের ঝুলি খালি রেখে যাওয়া মানুষগুলোরও একই অবস্থা! অতটুকু আক্ষেপ তাঁকে পুনরায় নতুন করে সঞ্চয়ের সুযোগ করে দেবে না!
এই আক্ষেপগুলো তাহলে কেন আল-কুরআনে বলা হোল? যদি এসবের কোন মূল্য-ই না থাকে!?
কে বলেছে কোনো মূল্য নেই!?
দেখুন.. শফিক সাহেব, সাব্বির, খান সাহেব, রাতুল, আকিব - এদের কাউকেই কিন্তু আগেভাগে কেউ তাদের পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দেয় নি। কাজেই তারা যে শিক্ষাটা পেয়েছেন, তা থেকে নিজেকে সংশোধনের সুযোগ গ্রহণ করে নিতে পারছেন।
কিন্তু আল্লাহ আপনাকে ভালোবেসে আগেভাগেই এমন আক্ষেপ ও অনিবার্য পরিণতির কথা বলে দিচ্ছেন! সাবধান হয়ে যাবার সুযোগ করে দিচ্ছেন আগে থেকেই! তবুও যদি সেই আক্ষেপটা আপনাকে সেদিন করতেই হয়, তবে আপনার চে’ দুর্ভাগা আর কে আছে? আপনাকে যেহেতু আক্ষেপ করা থেকে মুক্ত থাকার সব রকম সুযোগ ও সময় দেয়া হয়েছে, প্রস্তুতির উপায়-উপকরণ বাতলে দেয়া হয়েছে, কাজেই সেদিন আপনার সুযোগ ও সময়ের দরোজাটা অনিবার্যভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে!
চলুন, তাহলে ভাবি।
নিজের সাথে কথা বলি।
টিকাঃ
১ সূরা আন-নাবা ৭৮:৪০
২ সূরা আল-ফুরকান ২৫:২৮
৩ সূরা আল-আহযাব ৩৩:৬৬
১ সূরা আন-নিসা ৪:৭৩
২ সূরা আল-ফাজর ৮৯:২৪
📄 জাগো গো ভগিনী
আম্মু একবার প্রসঙ্গক্রমে বলেছিলেন, 'আমার ছেলে পাগল হলেও মাথা ঠিক আছে।' কথাটা একেবারে অস্বীকার করবার মতো নয়। মাঝে মাঝে মাথায় যে বিচিত্র ঝোঁক হঠাৎ চাপে, তাতে আম্মুর মন্তব্য ঠিক না হয়ে যাবে কই?
ডায়েরিতে ভালোবাসার মানুষদের একটা তালিকা আছে আমার কাছে। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-সংখ্যক মানুষের সাথে আমার কখনো সাক্ষাত হয় নি, কিংবা কথাও হয় নি! অনেককে তো জানানোই হয় নি ভালোবাসার কথা। তালিকায় মাঝে মাঝে সংযোজন হয়, তবে বিয়োজনের কোন 'অপশন' খোলা নেই এখানে।
একবার মাথায় আসলো কী, আমার ঈর্ষার মানুষদেরও একটা তালিকা হওয়া প্রয়োজন। যেই ভাবা সেই কাজ। তখন দশম শ্রেণিতে পড়ি। ডায়েরিতে একটা পাতার উপর সাইন পেন দিয়ে শিরোনাম লিখলাম: 'আমি যাঁদের ঈর্ষা করি'। ইতিহাস ক্লাসে স্যার সীরাতের ওপর আলোচনা করছিলেন। বেশ কিছুক্ষণ অতিবাহিত হবার পর আমি খুব তাড়াতাড়ি ডায়েরি খুলে সেই পাতার শুরুতে লিখে ফেললাম:
১। খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ [রা.]
সামনের সারিতেই ছিলাম আমি। স্যার এদিকে খেয়াল করে কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। এতক্ষণ যে খাতায় নোট করছিলাম, সেটা বাদ দিয়ে হঠাৎ ডায়েরি খুলতে দেখে স্যার মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, 'দেখতে পারি কবি সাহেব?' আমি এগিয়ে দিলাম। স্যার পড়ে শোনালেন:
আমি যাঁদের ঈর্ষা করি
১। খাদীজা বিনতু খুয়াইলিদ [রা.]
কেনো এই ঈর্ষা?
বলছি!
তার আগে একটু গল্প করি। জীবনের গল্প। সত্য গল্প।
তখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ি আমি। আবুব্বরের স্বপ্নের স্কুল 'আল-ইহসান একাডেমি' তখন ফুল্ল-ফুলেল হতে শুরু করেছে। চারপাশের জগৎটাকে কিভাবে দেখতে হয়, শেখাতে শুরু করেছেন আবুব। বিকেল বেলা বাড়ির ছাদে আবুব, আমি আর রুবাইয়া - তিনজনের আড্ডা হতো। পিঁয়াজ-তেলে মুড়ি ভাজা নিয়ে এসে আম্মুও যোগ দিতেন মাঝেমধ্যে। আড্ডা বলতে আব্বর গল্প বলা, সাথে নিয়ে আসা নতুন কোনো ম্যাগাজিন বা বইয়ের চমকপ্রদ অংশটা আমাদের পড়ে শোনানো- এই তো। দুয়েকটা বাড়ি ছাড়া তেমন কোথাও টিভি ছিলো না। মোবাইল ফোন আগমনের কথাবার্তা আশেপাশে শোনা যাচ্ছিলো, তবে আমাদের বাড়িতে আসে নি তখনো। অবসর কাটানোর জন্যে বই ছাড়া অন্য কোন উপায়-উপকরণের সাথে আমাদের তখনো পরিচয় ঘটে নি। কত চমৎকার ছিলো আমাদের সেই সুনির্মল-সুবিমল বিকেলগুলো!
যা-ই হোক, সেই আসরে একটু একটু করে প্রিয় নবীজিকে [] জানতে শুরু করেছি। জন্মের আগে বাবা হারানো, খুব শৈশবে প্রিয়তমা মায়ের বিদায়, তারপর দাদা-কে হারানো, একে একে চাচা-ও! আবুব যখন এসব গল্প আমাদের শোনাতেন, তখন ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গন্ডদেশ বেয়ে গড়িয়ে যেতো আপনাতেই। প্রিয় নবীজির [*] প্রতি অন্য রকম ভালোবাসার অঙ্কুরোদগম হচ্ছিলো হৃদয়ে। টেপরেকর্ডারে আমাদের খুব গান শোনার বাতিক ছিলো। আমি আর রুবাইয়া কতবার টাকা জমিয়ে সেই ফিতাওয়ালা ক্যাসেটগুলো কিনেছি! ক্যাসেটের দুই দিকে কলম ঢুকিয়ে ফিতা ঘোরানোর স্মৃতিগুলো সহসা ভুলে যাবার মত নয়! তখন আশেপাশে সব পিচ্চিদের কাছে প্রিয় ছিলো শিশুশিল্পী হাসনা হেনা আফরিনের গান। সাইফুল্লাহ মানছুরকেও শোনা হতো প্রচুর। এরই মধ্যে ছোটাচ্চু নিয়ে এলেন নতুন এক অ্যালবাম। খুব আগ্রহ ভরে শুনলাম সবাই মিলে। ছোটদের কণ্ঠে গাওয়া একটা গানা কিভাবে যেন বুকের অনেক গভীরে বিঁধে গেলো:
জন্ম যদি হতো মোদের রাসূল পাকের কালে
আহা, রাসূল পাকের দেশে!
মোদের তিনি কাছে টেনে চুমু দিতেন গালে
আহা, কতই ভালোবেসে!
গুণগুণ করে সারাদিন শুধু এই গান গেয়েছি গভীর অনুরাগে। নামটা ঠিক স্মরণ নেই, তখন কী যেন একটা মাসিক পত্রিকায় সিরিজ লেখা চলছিলো: 'মহানবীর [] বাড়িতে একদিন'। আব্বু আমাকে সাথে নিয়ে পড়তেন সেই লেখাগুলো।
রাসূলুল্লাহর [] সুন্নাহর সাথে একটা নিবিড় সম্পর্ক তৈরি করে দিতে আব্বুর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে জীবনে। পরিচিত-অপরিচিত সবাইকে আগে সালাম দেয়া, মুচকি হাসা, হাঁচির জবাব দেওয়া- এরকম অনেক চমৎকার অভ্যাসগুলোতে অভ্যস্ত হয়েছি তাঁর হাত ধরে। খাবারের ক্ষেত্রেও তা-ই। পানি পাত্রে দেখে নিয়ে তিনবারে বসে খাওয়া, পেটভর্তি করে খাবার না খাওয়া- শৈশব থেকে এসব সুন্নাহ'র সাথে পথচলা শুরু হয়েছিলো, আলহামদুলিল্লাহ। একদিন প্রিয় নবীজির পোষাকের প্রসঙ্গ এলো। আমি তখন কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়ি, প্রচলিত পোষাক পরিধানেই অভ্যস্ত। নবীজির [] পোষাকের কথা জানার পর খুব শখ করে আব্বকে আবদার করলাম লম্বা জামা বানিয়ে দিতে।
সব ঠিক আছে, বিপত্তি অন্য জায়গায়। আমার যে দাড়ি নেই! কী হবে এখন? রুবাইয়ার সাথে গোপনে পরামর্শ করে স্থির করলাম, কলম দিয়ে মুখে দাড়ি আঁকা হবে! ব্যস, যেমন ভাবা তেমন কাজ; আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভালোভাবে দাঁড়ি আঁকা হলো। স্কুলে তো সবাই হেসে কুটি কুটি! আমার এমন পাগলামোতে দুজন মানুষ হাসতে হাসতেই উৎসাহ যুগিয়ে যেতেন- শামসুল ইসলাম স্যার এবং তাজুল ইসলাম স্যার। বাড়িতেও একই অবস্থা, কারো হাসি থামে না। ব্যতিক্রম আম্মু আর দাদা। আব্বু প্রাণ খুলে হাসেন। ভালোবাসার পরিমাণটা মধ্যে একবার এতোই বেড়েছিলো, যখন শুনলাম প্রিয়নবীজি [] জুতো সেলাই করেছেন, আমিও একবার সেলাই করেছি নিজ হাতে! আব্বু অবশ্য পরে বুঝিয়ে দিয়েছেন, আমাদের জন্যে কোন্ কোন্ সুন্নাহ অবশ্যপালনীয়, কোনটা পালন করা ঐচ্ছিক এবং কোনটা পালন করতে প্রিয়নবী [] নিজেই নিষেধ করেছেন।
এসবের মধ্য দিয়ে ক্রমান্বয়ে জীবনের 'রোল মডেল' হিসেবে রাসূলুল্লাহকে গ্রহণ করার সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে আমি প্রশিক্ষণ পেয়েছি শৈশবে, লিল্লাহিল হামদ। সেই যে আমার ভালোবাসা, ভালো লাগা আর আবেগ-অনুরাগের পাত্র বানিয়েছি চর্মচোখে না দেখা এই প্রিয় মানুষটিকে, একটু বড় হয়ে যেখানে যা পেয়েছি সীরাত বিষয়ে, বুকে জড়িয়ে নিয়েছি পরম মমতায়।
আমার সীরাত পাঠের একটা দিক হোল, রাসূলুল্লাহর [] জীবনের কোনো অংশের সাথে কোনোভাবে জড়িত সৌভাগ্যবান মানুষগুলোর প্রতি ক্রমশ দুর্বলতা অনুভব করি এবং ভালোবাসা মিশ্রিত একটা অস্ফূট ঈর্ষা জেগে ওঠে। আর আমার গুনগুন করে গাওয়া গানটা বারবার তাড়া কওে ফেরে মন-মুকুরে: 'জন্ম যদি হতো মোদের...'!
ক্লাসে সীরাত আলোচনার সময় খাদীজাহ'র [রা.] প্রসঙ্গটা এভাবে হৃদয়তন্ত্রীতে এসে বাজছিলো। প্রথম ওয়াহি অবতরণের ঘটনায় প্রিয় নবীজি কতটা অপ্রস্তুত এবং শঙ্কিত হয়েছিলেন, আমরা তো জানি-ই। চিন্তা করুন, খাদীজা কত সুন্দর ভাবে তাঁকে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন! ভরসা এবং অভয় দিয়েছিলেন! আপনি ভাবতে পারবেন না, রাসূলুল্লাহ [] এমনকি সে সময় প্রাণনাশেরও আশঙ্কা করেছিলেন [বুখারী]। কিন্তু কী যাদু ছিলো এই রমণীর কথায়, কেমন নিশ্চেতন করা অনুভবের সহযোগ ছিলো তাঁর ভরসায়, যে কথা ও ভরসার পাখায় ভর করে আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব নিশ্চিন্ত মনে কাঁধে তুলে নেওয়ার আত্মবিশ্বাস ফিরে পেলেন রাসূলুল্লাহ []?
শুধু তা-ই নয়, নিজের সঞ্চিত সমস্ত বৈভব নবুওয়তি মিশনের জন্যে চোখ বন্ধ করেই বিলিয়ে দিলেন! কতটুকু প্রশস্ত হৃদয়ের অধিকারী হলে মানুষ এমনটি পারে, বলুন? সবচে' বড়ো কথা, ঘোর তমসার বুক চিরে যেই মশালটি উন্মেষের অপেক্ষায় ছিলো, দমকা হাওয়ায় সেই মশালটিকে প্রথম শক্ত হাতে ধরেছিলেন এই সাহসী রমণী-ই! তাঁকে না করে আর কাকে ঈর্ষা করবো আমি?
আমার ঈর্ষার তালিকায় দু নম্বরে ছিলেন আবূ বাকর আস-সিদ্দীক [রা.]। কতটুকু দুর্বিনীত প্রত্যয়ের অধিকারী হলে বিনীত বিশ্বাসে এভাবে কেউ মস্তক অবনত করতে পারে, ভেবে দেখেছেন? হিজরতের সেই সময়টার কথা ভাবুন! সাওর গুহার অনিশ্চিত রাত্রিগুলো! ভাবা যায়? প্রিয়নবীর [] ভালোবাসায় বিষাক্ত নাগিনীর দংশন নীরবেই সয়ে যাওয়া! আহ! শুধু কি আমিই ঈর্ষা করি? 'উমার রা.-ও কিন্তু তাঁকে ঈর্ষা করতেন। ঐ যে, এক তাঁবুতে সুজনহারা বৃদ্ধার সেবা করতে দুজনের প্রতিযোগিতা! জানেন-ই তো!
সাওর গুহার বিপদসংকুল সময়গুলোতে আরেকটি গল্প আমরা জানি। চারিদিকে শত্রুর আনাগোনা। শত্রু আবার কী? রক্ত-পিপাসার নেশায় উন্মত্ত হিংস্র হায়েনা যেন! শিকার পেলে যে কি না এক্ষুণি ঝাঁপিয়ে পড়বে জান্তব উল্লাসে। তার ওপর আবার গোপন নজরদারি। চিন্তা করুন, সেই কঠিন থেকে কঠিনতর সময়গুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নবীজি [] এবং আবু বাকর কে খাবার পৌঁছিয়ে দিতেন একজন নারী! বাইরের পরিস্থিতিও তাঁদেরকে কৌশলে জানিয়ে দিতেন তিনি। শুধু কি তা-ই? রাসুলুল্লাহ এবং আবু বাকরের অবস্থান সম্পর্কে তাঁকে আবু জাহেলের মতো বীভৎস ভয়ঙ্কর নরপশু জিজ্ঞাসাবাদ করলেও তিনি মুখের উপর সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, 'আল্লাহর কসম! আমি জানি না!' নির্দয় আবু জাহেলের হাতে তিনি প্রহৃতা হলেন, তবু মুখ খোলেন নি। কে তিনি?
ঠিক ধরেছেন, তিনি আসমা বিনতু আবি বাকর [রা.]! ইনি আমার ঈর্ষার তালিকায় তৃতীয়।
মদিনায় আগমনের পর ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা হেলেদুলে প্রিয়নবীজিকে [] স্বাগত জানাচ্ছিলো। গলা ছেড়ে গাইতে থাকে: তালা'আল বাদরু 'আলাইনা...। আহ, আমি যদি থাকতাম মদিনার সেই কিশোরদের দলে!
তারপর... তারপর... সবার মনেই সুপ্ত বাসনা, নবীজি [] যদি আমার বাড়িতে আতিথেয়তা গ্রহণ করতেন! নিজেকে ধন্য করার জন্যে সবাই উৎসুক। সেই প্রতীক্ষারও কত পবিত্র অনুভূতি! অবশেষে কী হোল? সেই সৌভাগ্যের অধিকারী হলেন সাহাবী আবু আইয়ুব আল-আনসারী [রা.]। কত না ভাগ্যবান তিনি! না, শুধু তিনি নন, তাঁর প্রিয়তমা স্ত্রীও রাসূলকে নিজেদের ঘরে অতিথি হিসেবে পেয়ে যারপরনাই উদ্বেল হয়েছিলেন। প্রিয়নবীজির [] ইচ্ছে অনুযায়ী তাঁকে নিচতলায় শোয়ার ব্যবস্থা করে তাঁরা দুজন দোতলায় শুয়েছিলেন। মজার বিষয় হোল, তাঁরা কিন্তু একরত্তি ঘুমোতে পারেন নি রাত্রে। কেন? দুজনেই খুব অস্বস্তিতে ছিলেন, ভাবছিলেন, প্রিয়নবীকে নিচ তলায় রেখে তাঁদের এখানে অবস্থান করাটা তাঁর শানে কোন গোস্তাকি হচ্ছে না তো! আরেকবার ভাবলেন, দুজনের অবস্থানটা ঠিক বরাবর রাসূলের মাথার উপরেই হচ্ছে না তো! এ জন্যে বারবার বিছানাটা এদিক ওদিক করেছেন। এরই মধ্যে ঘটে গেল আরেক ব্যাপার, এই অস্বস্তিকর সময়ে অস্থিরতায় তাদের পানির কলসটা হঠাৎ হেলে পড়লো। আর যায় কই, সব পানি গড়িয়ে যেতে লাগলো। দুজন তো ভয়ে, শঙ্কায় আরো অস্থির হয়ে উঠলেন! কী আর করবেন, নিজেদের কম্বলটাই পানির উপর দিয়ে দিলেন, যাতে কম্বল পানি চুষে নেয় এবং গড়িয়ে নিচ তলায় না যায়; ওখানে যে প্রিয়নবী শুয়ে আছেন! আহারে, পুরো রাত তাঁরা ঠক্ ঠক্ করে কাঁপলেন। সকালে এই ব্যাপার রাসূলুল্লাহ [ﷺ] শুনতে পেলেন এবং সেদিন থেকে তিনি তাদের নিচতলায় পাঠিয়ে দিয়ে নিজে দোতলায় অবস্থান গ্রহণ করলেন।
গল্প তো শুনে ফেলেছেন! ব্যাপার হোল, আমার ঈর্ষার তালিকায় চতুর্থ এবং পঞ্চম হলেন ইনারা দুজন!
সেই হিজরতের সময়কারই আরেকটি চমৎকার গল্প বলি।
প্রিয়নবীকে পেয়ে সবার মনেই খুশির জোয়ার। কে কী গিফট করবেন রাসূলকে, কূল-কিনারা পাচ্ছেন না। আবেগঘন আনন্দের সময় যা হয় আর কি! কেউ তাঁকে কবিতা নিবেদন করছেন, কেউ তাঁর নিজ বাগান থেকে খেজুরের থোকা নিয়ে আসছেন... এই এই আরো কত কী!
কিন্তু একজনের নিবেদন ছিল একেবারেই ব্যতিক্রম! তাঁর সাধ্যে এমন কিছু ছিলো না, যা তিনি প্রিয়তম রাসূলকে নিবেদন করবেন। অবশেষে নিজের কিশোর পুত্রকেই প্রিয়নবীর [ﷺ] কাছে পেশ করলেন। পুত্রও যারপরনাই খুশি হয়ে রাসূলের [ﷺ] ছায়ায় নিজেকে ধন্য মনে করলেন! বলুন, এর চে' বড়ো আন্তরিক নিবেদন আর কী হতে পারে?
কে তিনি? তিনি ধন্য রমণী গুমাইছা বিনত মিলহান [রা.]। আর কে সেই ভাগ্যবান কিশোর? তিনি আনাস ইবন মালিক [রা.]।
অতঃপর তালিকার ষষ্ঠ ও সপ্তম অবস্থানে থাকা দুজন ভাগ্যবতী ও ভাগ্যবানের সাথে আপনারা পরিচিত হলেন।
এবারের গল্প শুনে তো আপনি নিজেই ঈর্ষায় জ্বলে পুড়ে মরে যেতে চাইবেন!
চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন তো, রক্তে-মাংসে গড়া একজন মানুষের কাছে স্বয়ং জিবরীল [আ.] এসে সালাম পৌঁছাবেন; তিনি কী দুর্দান্ত সৌভাগ্যের অধিকারী! পৃথিবীতে তো বটেই, জান্নাতেও রাসূলুল্লাহর [ﷺ] সাহচর্যের সুসংবাদ পেয়েছেন আল্লাহর কাছ থেকেই!
আপনি ভাবছেন, ইনি মানুষ না অন্য কিছু!?
হুমম! তিনি হলেন 'আয়িশা বিনত আবি বাকর [রা.]। আক্ষরিক অর্থেই একজন Polymath ছিলেন তিনি। কবিতা ও কাব্যতত্ত্বে অগাধ পান্ডিত্য তাঁর। চিকিৎসাবিদ্যায় ছিলেন পারদর্শী। ভাষার বিশুদ্ধ উচ্চারণের ব্যাপারে কানাকড়ি পরিমাণ ছাড় দিতেন না তিনি। হাদিসশাস্ত্রেও তাঁর অবদান অনবদ্য। সাহাবী আবূ মূসা আল-আশ'আরীর [রা.] স্বীকৃতি শুনুন, 'আমাদের কোনো হাদিসের ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ হত, তখন 'আয়িশাকে জিজ্ঞেস করে নিশ্চিত হতে পারতাম।'
মাদরাসার ছাত্ররা জানেন 'ইলমুল ফারায়িদ্ব (ইসলামী উত্তরাধিকার বণ্টন নীতি) কত জটিল এবং সূক্ষ্ণ বিষয়। বিষয়টা যদি কারো কাছে কঠিন মনে হয়, চিন্তিত হবেন না, সাহাবীরাও [রা.] কিন্তু মাঝে মাঝে সমস্যায় পড়ে যেতেন এই বিষয়টিতে। তখন তাঁরা কী করতেন জানেন? 'আয়িশার [রা.] কাছে চলে আসতেন সমাধানের জন্যে!
সর্বাধিক হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে তো আছেন-ই তিনি (মোট ২২১০টি)।
জীবনের অন্তিম সময়ে প্রিয়নবীকে [ﷺ] আগলে রেখেছিলেন তিনি। তাঁর সান্নিধ্যেই প্রিয়নবী আল্লাহর কাছে চলে গিয়েছেন। তাঁর কক্ষেই প্রিয়নবী-কে [ﷺ] সমাহিত করা হয়েছে। কত না সৌভাগ্যবতী তিনি! তিনি আমার অষ্টম ঈর্ষা।
আচ্ছা বলুন তো, প্রিয়নবীকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে তাঁর চে' বেশি কে পারঙ্গম? রাসূলের এমনই কাছের মানুষটিই তো ভালো বলতে পারবেন, কেমন ছিলেন তিনি! আবার প্রিয়নবীর চরিত্র, স্বভাব ইত্যাদির সাথে কার বেশি মিল আছে, সেটাও অন্যদের চে' নিশ্চয় তিনি ভালো বলতে পারবেন! তাই না?
তবে শুনুন তাঁর কথা: 'আমি কথাবার্তা, আচার-আচরণে রাসূলের [ﷺ] সাথে সাদৃশ্যময় ফাতিমার চে' আর কাউকে দেখি নি। এমনকি তাঁর হাঁটা-চলাও ছিলো রাসূলের হাঁটা চলার মত। [বুখারী]
কখনো কোনো পুরুষ সাহাবীর ব্যাপারে এমনটি শুনেছেন আপনারা কেউ? ভগিনীগণ গর্ব করতে পারেন এটা নিয়ে! আর হ্যাঁ, চুপিসারে বলে রাখি, নবীজির [ﷺ] ভাষ্যমতে জান্নাতে আপনাদের মধ্যমণি হবেন কিন্তু ফাতিমা [রা.]! প্রিয়নবী এতোটাই ভালোবাসতেন তাঁকে, কখনো কোনো সফর থেকে ফিরলে প্রথমেই মসজিদে ঢুকে দু রাকাত সালাত আদায় করতেন, এরপর ফাতিমার গৃহে গিয়ে তাঁর খোঁজ-খবর নিতেন, তারপর উম্মাহাতুল মুমিনীনদের খোঁজ নিতেন।
ঈর্ষা রে ঈর্ষা! কী আর করা, তালিকার নয় নম্বরে তাঁকে নিয়ে নিলাম।
আমরা শেষ পর্যায়ে এসে পড়লাম। দশম ঈর্ষার কথা বলবো। এবার একটু পেছন ফিরে তাকাই। আপনাদের মনে আছে, মাক্কী জীবনের সেই আগুনঝরা দিনগুলোর কথা? সেই রক্তপিচ্ছিল পথের যাত্রীদের তেজোদ্দীপ্ত ঈমান! কল্পনা করতে পারেন? একজন স্বাধীন মানুষ যেখানে ঈমানের ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথেই পাশবিক নির্যাতন আর লাঞ্ছনার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হতেন, সেখানে একজন ক্রীতদাসী কতটুকু ঈমানের জোর হলে কালিমার দৃপ্ত উচ্চারণের সাহস করতে পারেন? ভেবেছেন কখনো?
বলছিলাম আম্মার [রা.]-এর স্নেহময়ী জননী সুমাইয়ার [রা.] কথা। চিন্তা করুন, অমানুষিক নির্যাতনের মুখে এই মহিলা যদি একটিবার শুধু বলতেন, 'আমি দ্বীন ত্যাগ করলাম', তাহলেই নিষ্কৃতি পেতেন। কিন্তু এই একটি বাক্য উচ্চারণ করা তাঁর কাছে পাশবিক নিষ্পেষণ সহ্য করার চেয়েও বেশি ভয়ানক কঠিন মনে হয়েছিল! নরপিশাচ আবু জাহল নির্মম ভাবে বল্লমের আঘাতে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আমাদের বোনটিকে শহীদ করেছিলো! গ্রহণযোগ্য ইতিহাসগ্রন্থ সমূহের অন্যতম 'তাবাকাত ইবন সাদ'-এর ভাষ্যমতে, দ্বীনের জন্যে এটিই ছিল ইতিহাসের প্রথম আত্মত্যাগ।
লক্ষ্য করেছেন নিশ্চয়ই, আপনাদের জানাশোনা অনেক সাহাবীর কথা-ই এখানে আসে নি, তাই না? আমার অধ্যয়নবিচ্ছিন্নতার কারণে একেক জায়গায় একেকজনের কথা লিপিবদ্ধ করেছি। কখনো কখনো এমন হয়েছে, কোনো কোনো সাহাবীর জীবনকাহিনী খুব ছুঁয়ে গেছে আমাকে, কিন্তু ঐ সময়টাতে লেখার সুযোগ করে নিতে পারি নি। তবে এই দশজনের কথা একটি ডায়েরিতেই লিখেছিলাম। আমার ঈর্ষাপ্রবণতার যখন সূচনালগ্ন, তখন এঁদের সাথে আমার পরিচয়। তাই সেই ডায়েরির দশটা নাম আমার কাছে অত্যুজ্জ্বল অনুক্ষণ। এই যে তাঁদের দশজনকে নিয়ে এতক্ষণ গল্প করলাম, তার কারণ হচ্ছে, আজকে হঠাৎ করে ডায়েরিটা উল্টাতে উল্টাতে আবিষ্কার করলাম, এখানে পুরুষ সাহাবী ও নারী সাহাবীর অনুপাত হচ্ছে ৩:৭। কী আশ্চর্য, আমার ঈর্ষার প্রথম তালিকায় প্রথম দশজনের সাতজন-ই নারী সাহাবী! খুব উৎফুল্লচিত্তে ছোটবোনকে দেখালাম। অনেকক্ষণ ধরে গল্প করলাম আমাদের মুগ্ধতা ও অনুপ্রেরণার এই মানুষগুলোকে নিয়ে। সদ্য-আবিষ্কৃত অনুপাতটা ওকে দেখিয়ে সহসা-ই আমার মুখ থেকে উচ্চারিত হল আপনাতেই: ‘জাগো গো ভগিনী!’ সেই শব্দবন্ধ দিয়েই এই প্রবন্ধগল্পের শিরোনাম বাছাই করলাম। এই বইয়ের নারী পাঠকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, সম্ভব হলে লেখাটা আরেকবার পড়বেন, জেগে ওঠার বিশুদ্ধ প্রাণনায় প্রাণিত হবেন।
টিকাঃ
১ গানটির গীতিকার ও সুরকার আবুল আলা মাসুম
📄 আমি নিষ্পাপ হতে চাই
ইশশ! সেই নিষ্পাপ শৈশবে যদি একটু ফিরে যেতে পারতাম! দুধেল সাদা শৈশব! শুভ্র-সফেদ শৈশব! পঙ্কিলতাহীন শৈশব! পবিত্রতার আবেশ জড়ানো শৈশব!
কে না চায়, নিজের সব ভুল-ভ্রান্তিকে পেছনে ফেলে অনাবিল স্নিগ্ধতায় ভরপুর সেই শৈশবে ফিরে যেতে?
এই যে আমরা, তারুণ্যের উচ্ছ্বলতায় ভরপুর জীবন যাদের, পথ চলতে চলতে হঠাৎ করেই ইচ্ছে হয়, সব মায়া-মরীচিকার জটিল অঙ্ক বাদ দিয়ে আলোয় আলোয় ভরা সরল-ঋজু দিনগুলো আরেকবার আপন করে পেতে!
বিশ্বাসী হৃদয় এই বাসনায় উদগ্রীব থাকে একটু বেশি-ই। এই বাসনার সাথে জড়িয়ে আছে মহাসমুদ্ররূপী মহাকালের ঠিক মাঝখানে হাবুডুবু খাওয়ার গ্লানি থেকে পরিত্রাণ পাবার সুতীব্র আকাঙ্ক্ষা।
তারুণ্য বা বার্ধক্যকে পেছনে ফেলে শৈশব ফিরে পাওয়া আদৌ সম্ভব নয়, তবুও এই কল্পনার জগতে পরিভ্রমণের সময় নিজেকে বিশুদ্ধতার সফেদ উত্তরীয়তে জড়াবার যে স্বপ্ন লুকিয়ে থাকে অন্তরে, সেই স্বপ্নের মুখে একটু আলোর ঝলক দেয়ার জন্যে আমাদের এবারের আসর। আসর শুরু করার আগে আমরা এই ধরনের ভাবনা-পরিবাহী একটি কবিতার সাথে পরিচিত হয়ে যাই।
ইংরেজি সাহিত্যে মেটাফিজিক্যাল ধারার কবিদের একজন হেনরি ভন (Henry Vaughan); তাঁর বিখ্যাত The Retreat[১] কবিতাটি আমরা এখানে কাব্যানুবাদের চেষ্টা করেছি, প্রবহমান মাত্রাবৃত্ত ছন্দে।
কত না স্নিগ্ধ ছিলো পেছনের ফেলে আসা দিন সব!
ফেরেশতাদের মতো আলোকিত ছিলো সেই শৈশব!
হয় নি যখন এই পৃথিবীকে গভীর দেখা,
এবং ধরার জীবনে নিজের নামটি লেখা;
সস্তা এসব তত্ত্বীয় প্যাঁচ আমার যখন হয় নি শেখা-
তখন আমার শুভ্র ভাবনা জুড়ে ছিল এক অপার্থিব সৌরভ!
আমার প্রভুর ভালোবাসা থেকে আসি নি তখনো অনেক দূরে,
ওখানে দাঁড়িয়ে দেখতে পেতাম তাঁর আলোটাকে দৃষ্টি জুড়ে,
ঘণ্টাখানেক সময় ধরেই আমার আত্মা এক নিমেশে-
মিশে যেতো সেই স্বর্ণালী মেঘ কিংবা পুষ্পরাজির দেশে!
কিছু অনন্ত ছায়া-ই মূলত আসত এসব খুব সাধারণ জ্যোতির বেশে!
তখন আমার ভাষায় ছিলো না রুক্ষ-কঠিন ছাপ,
আমার হৃদয়ে সরব হয় নি তখনও কোনো পাপ!
এমন কলুষ স্বভাব ছিলো না, ইন্দ্রিয়কে যা দিয়ে প্ররোচিত করা যায়
অনুক্ষণ পাপের কাছেই নিয়ে।
বরং আমার দেহ-মনে শুধু অনুভব হতো সেই-
অনন্ত থেকে আসা উজ্জ্বল জ্যোতির দীপ্তিকেই!
জানি না এখন কিভাবে যে আমি এতদূর যাবো ফিরে!
সেই সে পুরনো পথে-প্রান্তরে হাঁটতে আবার ধীরে!
যেখানে ছিলাম ভাসুর আমি প্রাণে আর প্রাণনায়,
প্রথম সোনালি শৈশব রেখে এসেছি যেখানে হায়,
দেখতো শহর আলোর মনন তাল-তমালের ছায়!
কিন্তু আমার আত্মা এখানে কাটিয়েছে আহা অনেক কাল!
হয়ে গেছে তাই উন্মাদ-সম, চলতে গেলেই টালমাটাল!
মানুষেরা নাকি সামনে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্য খুঁজে পায়
কিন্তু আমার হৃদয়টা আজ কেবল পেছনে ফিরে যেতে শুধু চায়!
আরেকবার পড়ুন তো! আমাদের অব্যক্ত অনুভূতিগুলো কী অপূর্ব ব্যঞ্জনায় ব্যক্ত করেছেন কবি! তাই না?
চলুন, এবার আমরা আমাদের সেই স্বপ্নিল পথে হাঁটা শুরু করবো। খুব কঠিন কিছু ভাবছেন? আরে নাআআ, একদম সহজ, দেখুন না!
আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন, হ্যাঁ!
এই পথে হাঁটতে গিয়ে পথিকদের কাছ থেকে আমরা কিছু প্রশ্নের মুখোমুখি হবো-
> আমি কিভাবে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হবো? নিষ্পাপ হওয়া কি সম্ভব?
> আমার এত্ত এত্ত পাপ! আল্লাহ ক্ষমা করবেন তো!?
> আমি বারবার ফিরে আসি, কিন্তু নিজেকে টিকিয়ে রাখতে পারি না। পাপে জড়িয়ে যাই!
এই তিনটি মৌলিক প্রশ্ন / সংশয় / জড়তা- যাই বলুন- এগুলো আমাদের স্বপ্নিল পথে হাঁটার সামনে কাঁটা হয়ে থাকে। আমরা এই কাঁটাগুলো একটি একটি করে তুলে ফেলতে চাই। চলুন তাহলে... বুকে হিম্মত রেখে সন্তর্পণে শুরু হোক যাত্রা!
আমি কিভাবে পাপ-পঙ্কিলতামুক্ত হবো? নিষ্পাপ হওয়া কি সম্ভব?
আমরা অত থিওলজিক্যাল কথাবার্তায় যেয়ে কী করবো? চলুন, গল্প করতে করতে এগিয়ে যাই!
ক
ছোটভাই নাফিস অনেকক্ষণ ধরে পেন্সিল দিয়ে কি জানি আঁকছিলো খাতায়। আঁকা শেষ হবার পর বোধহয় ওর মনঃপুত হয় নি, অঙ্কিত দৃশ্যের প্রতি একরাশ বিরক্তি ঝরিয়ে সে রাবার দিয়ে মুছে ফেললো, পুরো পৃষ্ঠাটাই পুনরায় সাদা হয়ে গেলো। চাচ্চু আর আমি গপ্পো করছিলাম, দুইজনেই কথা থামিয়ে ওর কান্ডকারখানা দেখছিলাম। চাচ্চু যথারীতি ভাবুক হয়ে ওঠলেন,
আচ্ছা, নজীব! আমাদের জীবনটাও এমন হলে কেমন হতো! জীবনের ভুলগুলো যদি এক নিমেষেই মুছে ফেলা যেতো! কিংবা জীবনের কোনো একটা অধ্যায়কে যদি ঠিক এভাবেই দৃশ্যপট থেকে আড়াল করে দিয়ে ধবধবে সাদা করে দেয়া যেতো! আহ! সেরকম একটা রাবার থাকলেই হতো!
কম্পোজে আমার হাত মোটামুটি দ্রুত চলে। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই এম এস ওয়ার্ডে একটা প্রবন্ধের ফরম্যাট খসড়া করছিলাম। কিন্তু প্রতিবারই পরিবর্তন-পরিবর্ধন করার পরও মনে ধরছিলো না। রুমমেট খুব মনোযোগ দিয়ে আমার টাইপিং দেখছিলো। সবার জানার কথা, লেখার সময় Ctrl+Z প্রেস করলে বর্তমান অবস্থা থেকে পুরনো অবস্থায় ফিরে যাওয়া যায়, যেটাকে কম্পিউটারের পরিভাষায় আমরা 'undo' বলে থাকি। রুমমেট একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বলছিলো,
জীবনে যদি একবার একটা Ctrl+Z অপশন পাইতাম, নতুন করে জীবনটারে সাজাইতাম! আমার পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য একটা Ctrl+Z অপশন থাকতো যদি...!
গ
আমরা যাঁরা নিষ্পাপ হতে চাই, আমরা তো ঠিক এমনটাই কল্পনা করি, নাকি? আপনিও কি সেরকম একটা রাবার খুঁজছেন? অথবা একটা Ctrl+Z অপশন খুঁজে বেড়াচ্ছেন? চিন্তার কারণ নেই, আমিই খুঁজে দিচ্ছি আপনাকে। সেই রাবার অথবা Ctrl+Z অপশন-এর আল্লাহ প্রদত্ত নাম হচ্ছে: 'আত-তাওবাহ'!
: কী বলছেন!? রাবার কিংবা Ctrl+Z অপশন এর মতো তাওবাহ কি আমাকে একেবারে সাফ-সুতরো করে দিতে পারবে? আমার এত্ত এত্ত পাপ আর ভুল-ভ্রান্তিকে কিভাবে মুছে দেবে?
: বুঝছি, আপনি তাহলে আশ্বস্ত হতে পারছেন না! এই নিন, আপনার জন্যে এক্কেবারে প্রিয়নবীজি [] থেকেই আশ্বাসবাণী নিয়ে এলাম:
"পাপ থেকে তাওবাহকারী ব্যক্তি সেই ব্যক্তির মতোই, যার কোন পাপ-ই নেই!!১।"
ঘ
: চাচ্চু, রাবার পেয়ে গেছেন? ঝটপট মুছে ফেলেন তাইলে!
: ভাইয়া, Ctrl+Z অপশন পেয়েছো!? তাইলে তাড়াতাড়ি প্রেস করো!
চাচ্চু রাবার নিয়ে মেতে ওঠলেন। ভাইয়াটা সেই শবু প্রেস করে ফেললো।
আপনি পেরেছেন তো? না পারলে জলদি সেরে ফেলুন!
একটা কাঁটা সরে গেলো, আলহামদুলিল্লাহ। এবার আরেকটি কাঁটার সাথে বোঝাপড়া করবো আমরা। সেই কাঁটাটি হচ্ছে, তাওবাহ করার ক্ষেত্রে একটা সংশয় আপনাকে এসে বারবার খোঁচাতে থাকবে,
আমার এত্ত এত্ত পাপ! আল্লাহ ক্ষমা করবেন তো!
এই সংশয় অমূলক কিছু নয়। তবে একইসাথে, এই সংশয় কিন্তু একেবারেই বালির বাঁধ! কেনো জানেন? উত্তরটা আল্লাহর কাছ থেকেই শুনে নেই:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
"আপনি বলে দিন যে, (আল্লাহ বলেন) আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর যুলম করেছো, তোমরা আল্লাহ তা'আলার রহমত হতে নিরাশ হয়ো না। নিঃসন্দেহে আল্লাহ (অতীতের) সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করবেন; নিশ্চয়ই তিনি বড়ই ক্ষমাশীল, দয়ালু।১৯”
গভীর অনুভূতি দিয়ে একটু অনুভব করতে চেষ্টা করুন। এটা আমার নিজস্ব কোনো সান্ত্বনা নয়, বরং স্বয়ং আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা কর্তৃক নিশ্চিত সত্য প্রতিশ্রুতি!
আপনার হতাশ হবার সুযোগ থাকে আর?
এবার একটা গল্প শোনাই।
বানানো গল্প নয়, আমরা নবীজির []-এর কাছ থেকেই গল্পটা শুনবো:
“তোমাদের পূর্বেকার জাতির একটি লোক নিরানব্বই জনকে হত্যা করে, এরপর সে সবচেয়ে বড় একজন জ্ঞানী লোকের (‘আলিমের) খোঁজ করে, তখন তাকে একজন ইবাদতগুজার ব্যক্তির কথা বলা হয়। সে তাকে গিয়ে বলে, আমি নিরানব্বই জন মানুষকে খুন করেছি, আমার তাওবাহ হবে? তিনি বললেন: না। অতঃপর তাকে হত্যা করে সে একশো জন লোক পূর্ণ করলো। অতঃপর সে একজন বিজ্ঞ ব্যক্তির খোঁজ করলে আরেকজন ‘আলিমের খোঁজ দেয়া হয়। সে তাঁকে গিয়ে বলে, আমি একশোজন লোক হত্যা করেছি, আমার কি তাওবা করার সুযোগ আছে? তিনি বললেন: ‘হ্যাঁ, আছে। কে তোমার ও তাওবার মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে?’ তুমি অমুক স্থানে যাও, সেখানে কিছু মানুষ রয়েছে যারা আল্লাহর ইবাদত করে, তুমি তাদের সাথে গিয়ে আল্লাহর ইবাদত কর। আর তুমি তোমার এলাকায় ফিরে যেও না। কেননা তোমার এলাকাটা খুব খারাপ। সে তখন যাত্রা শুরু করে। অর্ধেক পথ অতিক্রম করার সময় তার মৃত্যু এসে উপস্থিত হয়। অতঃপর তার ব্যাপারে রহমত ও আযাবের ফেরেশতারা বিবাদে লিপ্ত হন। রহমতের ফেরেশতারা বলেন: সে তাওবা করে আল্লাহর পানে ছুটে এসেছে। পক্ষান্তরে আযাবের ফেরেশতারা বলেন: সে কখনো কোনো ভালো কাজই করে নি। অতঃপর সেখানে মানুষের বেশে একজন ফেরেশতা আসেন। তারা তাকে বিচারক মানেন। তিনি বলেন: তোমরা দুদিকটা মেপে দেখ। সে যেদিকে অধিক নিকটবর্তী হবে, তাকে সেদিকের বলে ধরে নেয়া হবে। অতঃপর মেপে দেখা গেল যে, সে যেদিকে যাচ্ছিল সে দিকটাই নিকটে। এর ফলে তাকে রহমতের ফেরেশতারা নিয়ে যায়।”
এবার আমাকে বলুন, আপনার যাপিত জীবনে সঞ্চিত পাপগুলো কি এই লোকটার চেয়েও বেশি ভয়ানক? পরিমাণে অধিক?
একশোটা লোক হত্যা করার মত বিশাল পাপের বোঝা আপনার কাঁধে বর্তমান? এতো বড়ো ও অকল্পনীয় পাপের বোঝা নিয়েও কেউ যদি আল্লাহর অপরিসীম করুণার ছায়ায় জায়গা করে নিতে পারে, আমি বা আপনি কেন পারবো না? হাদিসের গল্পে দেখলেন তো! আল্লাহ্ কত বেশি করুণার আধার, চিন্তা করা যায়! বান্দাহকে ক্ষমা করার জন্যে কত বেশি উদগ্রীব, ভাবা যায়!
শুধু কি তা-ই? তাওবাহ করার পর আল্লাহ্ আপনার সমস্ত পাপকে পুণ্যে 'কনভার্ট' করে দেবেন! এই যে, আল্লাহ বলছেন:
وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا . يُضَاعَفْ لَهُ الْعَذَابُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَيَخْلُدْ فِيهِ مُهَانًا . إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللَّهُ سَيِّئَاتِهِمْ حَسَنَاتٍ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا
"আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোন মা'বুদের ইবাদত করে না এবং আল্লাহ যাকে (হত্যা করা) হারাম করে দিয়েছেন, তাকে হত্যা করে না শরীয়ত সম্মত কারণ ব্যতীত, এবং তারা ব্যভিচার করে না। আর যে ব্যক্তি এরূপ কাজ করবে, তাকে শাস্তির সম্মুখীন হতে হবে। কিয়ামাতের দিন তার শাস্তি বৃদ্ধি পেতে থাকবে এবং সে তাতে অনন্তকাল লাঞ্ছিত অবস্থায় থাকবে। কিন্তু যারা তাওবা করবে এবং ঈমান আনবে আর নেক কাজ করতে থাকবে, আল্লাহ তাদের পাপসমূহকে পুণ্যে পরিবর্তন করে দেবেন। আর আল্লাহ বড়ই করুণাময়।১৯”
এত্ত বড় সুযোগ কি হাতছাড়া করা যায়, আপনিই বলুন?
তাহলে আর দেরি কেন?
সব দ্বিধা-সংশয় ঝেড়ে ফেলে এক্ষুণি দুই হাত সঁপে দিন প্রিয়তম প্রভুর কাছে। অশ্রুর ফোঁটা নিবেদন করুন গভীর অনুরাগে।
দুইটি কাঁটার তো হিল্লে হোল! এবার আপনার মনে আরেকটা সংশয়ের আগমন:
তাওবাহ তো করেছি। প্রায়-ই করি। কিন্তু নিজেকে যে ধরে রাখতে পারি না!
একদমই চিন্তা করবেন না। আপনি ইতোমধ্যে দুটো স্তর পার হয়ে এসেছেন। এবারের স্তর পার হওয়ার চ্যালেঞ্জ আরো সোজা, ইন শা-আল্লাহ!
কিভাবে?
চলুন একজন ভাইয়ার গল্প বলি। তিনি বলছিলেন,
এইবার শেষ! নিজেকে এবার শক্ত করে শাসালাম, কোনভাবেই আর পাপে জড়ানো যাবে না। তাওবাহ করলাম, কয়দিন ভালো মতোই কাটলো। নাহ, শেষমেষ কিভাবে যে পাপটাতে আবার জড়িয়ে গেলাম! এমনটা প্রায়-ই হচ্ছে, ভাই! আমি মনে-প্রাণে চাই এই অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে। কিছু একটা বল ভাই!
আপনার এই সমস্যাটা যদি আমি একটু ব্যাখ্যা করে বলি, তাহলে দাঁড়ায়:
আপনি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অবাধ্যতাকে খুবই গর্হিত এবং নিন্দনীয় কাজ মনে করেন। আপনার প্রিয়তম স্রষ্টা কর্তৃক নিষিদ্ধ কোনো বিষয়কে আপন করে নিতে আপনার মন সায় দেয় না। তবুও লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে, সময়ে-অসময়ে আপনি তাতে জড়িয়ে পড়ছেন। তার জন্যে আবার প্রচণ্ড অনুশোচনাও হচ্ছে। তাওবাহ করে ফিরে আসার পর আপনার প্রতিজ্ঞা নড়বড়ে হয়ে যাচ্ছে; যার কারণে আবারো পুরনো পথেই হাঁটছেন। তারপর আবারও অনুশোচনায় পুড়ছেন!
মোটামুটি এই অস্বস্তিকর চক্র থেকে এখন আপনি মুক্তি পেতে চান। ঠিক ধরেছি না?
আপনার কিন্তু হতাশ হবার কিচ্ছু নেই!
আরেহ, আপনি নিজেই জানেন না, স্বয়ং আল্লাহ আপনাকে নিশ্চিন্ত থাকতে বলেছেন! বিশ্বাস হয় না?
বুঝেছি, আপনাকে চাক্ষুষ দেখাতে হবে আর কি! দেখুন, আল্লাহ আপনার জন্যে কী বলছেন:
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ
"নিশ্চয় আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।"
চাট্টিখানি কথা?
খুব গভীরভাবে খেয়াল করে দেখুন, আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন!
চোখ বন্ধ করে আবার কল্পনায় আনুন, আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসেন!
হ্যাঁ, ভালোবাসেন! স্বয়ং আল্লাহ! আরশের মালিক! জ্বী, আপনাকেই!
এই যে পাপে জড়িয়ে যাবার পরই আপনি ফিরে আসছেন, আল্লাহ এ জন্যে আপনাকে ভালবাসেন।
তাওবাহ করার পর যখন আপনার প্রতিজ্ঞা নড়বড়ে হয়ে যায়, চোখ বন্ধ করে নিজেকে একটু স্মরণ করিয়ে দিন,
হে আমার আত্মা!
তুমি চেনো নিজেকে?
তোমাকে যে আল্লাহ ভালোবাসেন!
তুমি এই পবিত্র ভালোবাসার অমর্যাদা কিভাবে করবে?
তুমি অভিশপ্ত শাইত্বানকে সন্তুষ্ট করতে আরশের মালিকের ভালোবাসাকে পায়ে ঠেলে দিতে পারো না!
তুমি আমার প্রিয়তম স্রষ্টার ভালোবাসায় অবিশ্বাস ও অবাধ্যতার কালো ছাপ ফেলতে পারো না!
না, তুমি অত নীচ হও নি, হে প্রিয় আত্মা!
তোমার প্রভুর ভালোবাসাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোন্ মুখে তাঁর সামনে দাঁড়াবে, বলো?
দেখুন তো, এরপর চোখটা ছলছল করে ওঠে কি না! অনুভব করলে দেখবেন, চোখের এই জল আপনার হৃদয়ের কালিমা-মলিন পঙ্কিলতাকে ধুয়ে মুছে শুভ্র করে দিয়েছে কখন, আপনিই টের পান নি!
এবার বলুন, আপনার কি কোনো সুযোগ থাকে আর? পাপে জড়াবার? আল্লাহর অবাধ্যতার? নাফসের গোলামির?
খুব সাধারণ, সাদামাটা ও সহজ সমাধান, যদি আপনি আন্তরিকভাবে প্রয়োগ করতে পারেন।
একইসাথে, আপনি আপনার প্রিয়তম প্রভুর একটি মর্মভেদী আহŹানকে স্মরণ রাখতে পারেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا
“মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবাহ করো, আন্তরিক তাওবাহ!!”
এই যে আমরা বললাম, ‘আন্তরিক তাওবাহ’- এটা ঠিক কী রকম? এই অনুবাদ মূল আরবি শব্দবন্ধ ‘তাওবাতান নাসূহা’কে পুরোপুরি বিম্বিত করে নি, এই শব্দবন্ধের যথার্থ আবেদন কী, জানতে হলে আমাদেরকে যেতে হবে তাফসীরকারদের কাছে। দেখে আসি, তাঁরা কী বলেন। ‘তাফসীর শাওকানী’ আমাদের জানাচ্ছে, ‘তাওবাতান নাসূহা’ বলা হয় এমন তাওবাহ-কে, যে তাওবাহটি তাওবাহকারীকে প্রণোদনা যোগায় পূর্বেকার পাপের দিকে ফিরে না যেতে।[২]
আয়াতটা আবার পড়ুন। কথাটা কিন্তু আল্লাহর! বলা হচ্ছে আপনাকে লক্ষ করে! আপনার প্রিয়তম প্রভুর কথা আপনি রাখবেন না, এমনটা কী হয়, বলুন? কথাটা রাখতে হলে কী করা চাই? কিচ্ছু করতে হবে না, আজকের তাওবাহটাকেই ‘তাওবাতান নাসূহা’ করে ফেলতে হবে। ব্যস, আপনার কাজ শেষ!
এবার আপনার খুব পরিচিত একটি দু'আকে পুনর্বার স্মরণ করিয়ে দেই। আপনার মনোবল বৃদ্ধি করা, অটল থাকার স্পৃহা জাগ্রত রাখা এবং মানসিক সুস্থিরতার জন্যে আল্লাহর কাছে চাওয়া চাই অনবরত! প্রিয়নবীজি-ও [ ] তা-ই করতেন। তাঁর প্রিয় দু'আগুলোর মধ্যে একটি ছিলো এটি, যা আপনিও জানেন, কিন্তু ততবেশি গুরুত্ব দিয়ে কখনো ভাবেন নি। যদি মুখস্থ না থাকে, তবে আমার বিশ্বাস, দুই মিনিটের বেশি আপনার লাগবে না এটাকে 'ঠোঁটস্থ' করে ফেলতে! চলুন দেখি, কী সেই দু'আ!
اللَّهُمَّ مُصَرِّفَ القُلُوبِ صَرِّفْ قُلُوبَنا على طاعَتِكَ
“হে আল্লাহ! হে অন্তরসমূহ পরিবর্তনকারী! আমাদের হৃদয়গুলো তোমার আনুগত্যের ওপর অবিচল রাখো!”
আপনি আপনার প্রিয়তম প্রভুকে ভালোবাসেন। তাঁর অবাধ্য না হবার জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করেন। আবার মাঝে মাঝে সুযোগ হলেই তাঁর কাছে আবেগভরা কণ্ঠে আবদার জানান, যেনো আপনার এই প্রচেষ্টায় তিনি সহায় হন, বারাকাহ ঢেলে দেন।
ব্যস, আপনার দিনগুলো আপনার প্রভুর সাথে অকৃত্রিম ভালোবাসা ও ভালো লাগায় কেটে যাবে। এই ভালোবাসায় চিড় ধরাতে পারবে না কেউ। কেউ-ই না!
যখন আল্লাহ আপনাকে ভালোবাসছেন, আপনিও তাঁর ভালোবাসার মূল্য দিচ্ছেন, তাঁর কাছে চাচ্ছেন, তিনিও অকাতরে ঢেলে দিচ্ছেন- বুঝতেই পারছেন, কী গভীর প্রীতির বন্ধনে আপনাকে জড়িয়ে নিয়েছেন আপনারই প্রভু! এই বন্ধন ছিন্ন করে কে?
চোখ বন্ধ করে দেখুন, দ্বীনের পথে আপনার অবিচল পথযাত্রার এই আনন্দকে আরো কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফেরেশতাগণ চলে এসেছেন ইতোমধ্যে! তাঁরা আপনার জন্যে জান্নাতের সুসংবাদ নিয়ে এসেছেন! এই দেখুন, কুরআন বলছে:
إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا تَتَنَزَّلُ عَلَيْهِمُ الْمَلَائِكَةُ أَلَّا تَخَافُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَبْشِرُوا بِالْجَنَّةِ الَّتِي كُنتُمْ تُوعَدُونَ
"নিশ্চয় যাঁরা বলে, আমাদের রব্ব আল্লাহ এবং তার ওপরেই অটল অবিচল থাকে, তাঁদের প্রতি ফেরেশতাগণ অবতীর্ণ হন এই বার্তা নিয়ে: তোমরা ভয় করো না, দুশ্চিন্তা করো না, তোমাদের জন্যে প্রতিশ্রুত জান্নাতের সুসংবাদ নাও!”
এবার 'আলহামদুলিল্লাহ' বলে একটি মুচকি হাসি দিয়ে ফেলুন দেখি! অতঃপর নিজের সাথে কথা বলা শুরু করুন...!
তিনটি ধাপ আপনি পার হয়ে এসেছেন। আপনি কিভাবে সেই সুপ্নিল পথে সফলভাবে হেঁটে যাবেন, সেসবকিছু জেনে ফেললেন। এবার একটা সিরিয়াস কথা আপনার জন্যে!
সেটা শুনবার আগে চলুন একটা সুন্দর গান শুনে ফেলি। গানটির গীতিকার আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব, সুরারোপ করেছেন আবুল আলা মাসুম এবং কণ্ঠ দিয়েছেন মারুফ আল্লাম।
শুনেছি তোমার দয়ার পাথার নেই তার কোন কূল
সে পাথারে হোক বিলীন আমার জীবনের যত ভুল ॥
তোমার পাথার থেকে সবটুকু না-ই যদি দাও আমায়,
এক ফোঁটা জল দাও না ঝরিয়ে আমার আমলনামায়!
সেই জলে প্রভু বুকের কালিমা ধুয়ে মুছে হোক সাফ-
পোড়া হৃদয়ের গ্লানি ভুলে আমি হতে চাই নিষ্পাপ।
আমার হৃদয়-কাননে ফোটাও ফিরদাউসের ফুল ॥
প্রতিটি ক্ষণেই আমি তো কেবল পাপই করেছি জমা
তুমিই বলেছো না হতে হতাশ, চাইতে তোমার ক্ষমা!
ডাকলে তোমায় সাড়া দেবে তুমি- কোরানে দিয়েছো বলে;
বুকে নিয়ে সেই আশা দুই চোখে দুফোঁটা অশ্রু গলে।
তোমার ওয়াদা রাখবে তুমি-ই, তুমি যে প্রভু অতুল ॥
শোনা শেষ? একটা হাসি দেন তাইলে!
চলেন, এবার 'সিরিয়াস' কথাটা বলে ফেলি। কথাটা আমার নয়, বিশ শতকের অন্যতম স্মরণীয় মণীষী আশ-শা'রাওয়ী [র.]-এর। তিনি তাঁর তাফসিরগ্রন্থের একটা স্থানে খুব চিন্তা জাগানিয়া কথা বলেছেন:
"আপনার কাছে তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারি থেকে কী লাভ, যদি সেই তরবারি দিয়ে আঘাত করার মতো শক্ত হাত আপনার না থাকে?"
এবার আপনার কাছে আসি।
ধরুন, এই যে পাপ-পঙ্কিলতা-কদর্যতা, এ-সবকিছুই আপনার দুশমন। আপনি এতক্ষণ ধরে যা জানলেন, সেগুলো তরবারি, এই শত্রুর বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে। কিন্তু... তরবারি পেয়ে যদি আপনি বসে থাকেন, আঘাত করার মতো শক্ত হাতের অধিকারী না হোন, তাহলে কিন্তু এই তরবারি কিছুতেই কাজে দেবে না! 'মাইন্ড ইট!'
শক্ত হাত মানে আপনার সুদৃঢ় ও সুসংহত একটি হৃদয়, যেটা সর্বক্ষণ পাপের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকবে, পাপের মুখোমুখি হলেই তার সাথে তাওবাহ'র তরবারি দিয়ে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে লড়বে।
আপনার সেই শক্তিমত্তা অর্জনের জন্যে চাই অনুভব-অনুভূতির জমিনে দৃঢ়তার চাষ করা। সেই জমিনকে উর্বর করার জন্যে তাফসির ইবন কাসিরে উল্লিখিত এই কবিতা দিতে পারে সারের যোগান:
تصل الذنوب إلى الذنوب وترتجي * درج الجنان ونيل فوز العابد
أنسيت ربك حين أخرج آدما * منها إلى الدنيا بذنب واحد
আমরা কাব্যানুবাদ করে ফেলি:
আমলনামায় হাজারও পাপ জমিয়ে চলেছো প্রতি ক্ষণে ক্ষণে,
'আবিদ এবং জান্নাতী হবো'- এমন স্বপ্ন দেখছো তবু?
আচ্ছা, তুমি কি ভুলেই গিয়েছো সেই জান্নাত থেকেই প্রভু-
আদমকে বের করে দিয়েছেন একটি মাত্র পাপের কারণে?
খুব স্পষ্ট বার্তা!
জান্নাত থেকে আদম [আ.]-কে আল্লাহ্ তা'আলা বের করে দিয়েছিলেন শুধু একটি অবাধ্যতার কারণে। আমরা একটি দুটি নয়, অসংখ্য পাপ সাথে নিয়ে সেই জান্নাতেই যাবার স্বপ্ন দেখছি!
পাপের মুখোমুখি হলেই আপনি নিজেকে এই কবিতাটা দিয়ে 'রিমাইন্ডার' দেবেন। নিজের সাথে কথা বলবেন। বেশ, ইন শা-আল্লাহ্ আপনি উদ্দীষ্ট শক্তিমত্তা অর্জন করবেন খুব সহজেই!
তাহলে, আমরা শত্রুকে চিনলাম। তরবারি হাতে পেলাম। তরবারি দিয়ে আঘাত করার মতো শক্তিমত্তাও অর্জন করলাম।
এবার? এবার আর কী? লড়াই শুরু হোক... পাপের বিরুদ্ধে, পঙ্কিলতার বিরুদ্ধে, কদর্যতার বিরুদ্ধে। এই লড়াইয়ের একটি শ্লোগান, একটি ইশতেহার... 'আমি নিষ্পাপ হতে চাই!'
টিকাঃ
১ Poems of Henry Vaughan, Vol. 1, P. 59-60.
১ সুনান ইবন মাজাহ: ৪২৫০; সুনান আল-কুবরা (বায়হাক্বী): ২১০৭০
১ সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩.
১. সহীহ মুসলিম: ২৭৬৬
১ সূরা আল-ফুরকান ২৫:৬৮-৭০
১ সূরা আল-বাক্বারাহ ২:২২২
১ সূরা আত-তাহরীম ৬৬:৮
২ তাফসীর শাওকানী, খ. ৭ পৃ. ২৫৭
১ সাহীহ মুসলিম: ২৬৫৪
২ সূরা ফুসসিলাত ৪১:৩০
১ তাফসীর ইবন কাসীর: খ. ১ পৃ. ২৭৬