📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 নতুন প্রজন্মের তারবিয়াত ও দীক্ষাদান

📄 নতুন প্রজন্মের তারবিয়াত ও দীক্ষাদান


এ কারণেই কুরআন মাজীদ ও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম প্রত্যেক ব্যক্তির উপর এই দায়িত্ব অর্পণ করেছে যে, সে যেমনিভাবে নিজ আমল সংশোধনের ফিকির করবে, আপন পরিবার-পরিজন ও খাস বন্ধু- বান্ধবেরও সংশোধনের চেষ্টা করবে। কুরআন মাজীদে ইরশাদ হয়েছে-
قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ
‘তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবারবর্গকে রক্ষা করো সেই আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।
আর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-
الا كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ.
'তোমরা সকলেই (তোমাদের পরিবারের উপর) দায়িত্বশীল এবং (কিয়ামতের দিন) সকলেই (নিজ আমলের পাশাপাশি) তার পরিবারের (আমল) সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।
নতুন প্রজন্মের তারবিয়াত ও দীক্ষাদান
পরিবার-পরিজনের সংশোধনের প্রথম ধাপ এও যে, নব প্রজন্মকে এমনভাবে গড়ে তোলা হবে, যাতে শুরু থেকেই তার মন-মস্তিষ্ক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বড়ত্ব ও মহব্বতে সমৃদ্ধ ও পরিপুষ্ট হয়। বাচ্চাদের শিক্ষার জন্য নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন, তা এতটাই স্বভাবজাত ও প্রভাববিস্তারী যে, বাচ্চার দৈহিক বৃদ্ধির পাশাপাশি কোনো ধরনের কষ্ট-মেহনত ছাড়া আপনা আপনিই মানসিক ও চারিত্রিক উন্নতি হতে থাকে।
বাচ্চা জন্মের পর পরই পিতা-মাতার উপর সর্বপ্রথম যে দায়িত্ব অর্পিত হয় তা হলো, বাচ্চার ডান কানে আযান ও বাম কানে ইকামত দেওয়া। তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা তো বলবে, এটা অনর্থক কাজ। যে বাচ্চা এখনো মাতৃভাষা বোঝে না তার কানে ،حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ এসব আরবী বাক্য শোনানোর কী লাভ? কিন্তু বাস্তব জ্ঞানের অধিকারী লোকেরা এটা বোঝেন যে, এ শব্দাবলী মূলত ঈমানের বীজ, যা কর্ণপথ দিয়ে বাচ্চার অন্তরে রোপণ করা হচ্ছে। এই বীজ লালিত-পালিত হয়ে একসময় (ঈমানের) কাণ্ড ও গাছে পরিণত হবে।
দ্বিতীয় কাজ এই যে, যখন বাচ্চার কথা ফোটে তখন তাকে সর্বপ্রথম আল্লাহর নাম শিক্ষা দাও। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বাচ্চাদের জবান ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এই কালিমা দিয়ে উদ্বোধন করবে। মৃত্যুর সময়ও তাকে এই কালেমা স্মরণ করিয়ে দেবে। ১৬
যেন দুনিয়াতে আসা ও যাওয়া এই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ-এর কালিমার সাথেই হয়।
এরপর বাচ্চা যখন কিছু বোঝার উপযুক্ত হয় তখন তার অন্তরে আল্লাহ তাআলার মহত্ত্ব ও বড়ত্বের কথা বসিয়ে দেবে। সুন্নত মোতাবেক আদব ও সভ্যতা শিক্ষা দেবে। বাচ্চার সামনে মিথ্যা বলা ও পরনিন্দা থেকে বেঁচে থাকবে। যাতে বাচ্চা এই খারাপ অভ্যাসগুলোতে অভ্যস্ত না হয়ে যায়। কল্যাণের খাতগুলোতে বাচ্চার হাত দিয়ে খরচ করাবে, যেন তার স্বভাবে কৃপণতা স্থান না পায়।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বাবার পক্ষ থেকে সন্তানের প্রতি উত্তম চরিত্রের চেয়ে শ্রেষ্ঠ উপহার আর কিছু হতে পারে না।
তিনি আরও বলেছেন, কোনো বাবা তার বাচ্চাকে আদব ও সভ্যতা শিক্ষা দেওয়া প্রতিদিন মিসকীনদের এক ফিতরা পরিমাণ সদাকা করা থেকে উত্তম।
কুরআনে কারীমে রহমানের বান্দাদের এই দুআ বর্ণিত হয়েছে-
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে আমাদের স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ হতে দান করো নয়নপ্রীতি।
হযরত হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, চোখের শীতলতা হলো তাদেরকে আল্লাহ তাআলার আনুগত্যে লিপ্ত অবস্থায় দেখা।
এভাবে প্রত্যেক ব্যক্তির উপর তার সংশ্লিষ্টদের সংশোধনের দায়িত্ব দিয়ে এবং তাকে সংশোধন ও অনুশাসনের সহজ মূলনীতি শিখিয়ে দিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি ঘরকে একেকটি পাঠশালায় পরিণত করেছেন। যেখানে অবচেতন মনে ছোট-বড় সকলেই সুস্থ মানবিকতা ও উত্তম শিষ্টাচারের কেবল শিক্ষাই পায় না; বরং তা বাস্তবায়নে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের সংশোধনের এই দ্বিতীয় পদক্ষেপও কোনো সমাবেশ, কনফারেন্স অথবা সামাজিক আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে করেননি; বরং স্বভাবজাত পদ্ধতি অনুযায়ী দুটি বুনিয়াদের উপর দাঁড় করিয়েছেন।
প্রথমত এই যে, প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পরিবেশ ও অঙ্গনে ইসলামী মতাদর্শকে হেকমতের সাথে উপস্থাপন করবে। ঈমান ও আমলে- সালেহের যে নেয়ামত সে অর্জন করেছে, যা তাকে সঠিক অর্থে মানুষ বানিয়েছে, নিজ পরিবার-পরিজন বন্ধু-বান্ধবদেরকেও এর থেকে বঞ্চিত থাকতে দেবে না। কেননা তাদের জন্য এর থেকে উত্তম কল্যাণকামিতা আরেকটি হতে পারে না। অবশ্য তাদের মন-মননকে এর জন্য উপযোগী করতে কুরআনী শিক্ষা মোতাবেক সমস্ত হেকমত-কৌশল, কল্যাণকামিতা ও সহমর্মিতা কাজে লাগাবে। তারা জিদ ধরলে কিংবা বেঁকে বসতে চাইলে উত্তম পন্থায় আলোচনার মাধ্যমে অর্থাৎ দলিল-প্রমাণ দিয়ে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। সে কথাই কুরআন মাজীদে এভাবে ইরশাদ হয়েছে-

টিকাঃ
১৪. সূরা তাহরীম, আয়াত ৬
১৫. সহীহ বুখারী ৭১৩৮
১৬. হাদীসটি মুস্তাদরাকে হাকেমে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত হয়েছে। দ্রষ্টব্য: ইবনুল কায়্যিম রহ.-কৃত তুহফাতুল ওয়াদুদ
১৭. তুহফাতুল ওয়াদুদ, মুজামে তাবারানীর সূত্রে
১৮. সূরা ফুরকান, আয়াত ৭৪

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 দাওয়াতের ব্যাপক প্রসার

📄 দাওয়াতের ব্যাপক প্রসার


ادْعُ إِلى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ
'তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে আর (যদি কখনো বিতর্কের দরকার পড়ে, তবে) তাদের সাথে বিতর্ক করবে উৎকৃষ্ট পন্থায়।
এই সংস্কার কার্যক্রমের দ্বিতীয় পদক্ষেপ হলো, যদি সে কোনো ধরনের সংশোধন গ্রহণ না করে, বরং নিজ অজ্ঞতা ও হঠকারিতায় অটল থাকে, তাহলে তার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করবে। পরিবেশকে তার প্রভাব থেকে মুক্ত করবে। এ ক্ষেত্রে এটা পরোয়া করবে না যে, ওই বিরোধিতাকারী আপন পিতা বা ছেলে বা স্ববংশীয় অন্য কোনো সদস্য। কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে-
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ
'যেসব লোক আল্লাহ ও আখেরাত দিবসে ঈমান রাখে, তাদেরকে তুমি এমন পাবে না যে, যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে, তাদের সাথে বন্ধুত্ব রাখছে। হোক না তারা তাদের পিতা বা তাদের পুত্র বা তাদের ভাই কিংবা তাদের স্বগোত্রীয়।
এই ত্যাগ ও কুরবানীর ফলে কুরআনুল কারীম এরকম লোকদেরকে হিযবুল্লাহ (আল্লাহর দল) বলে আখ্যায়িত করেছে এবং তাঁদেরকে সফলতার সুসংবাদ প্রদান করেছে। কুরআন মাজীদের আয়াত-
أُولَبِكَ حِزْبُ اللهِ الَّا إِنَّ حِزْبَ اللَّهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
'তারা আল্লাহর দল। স্মরণ রেখো, আল্লাহর দলই কৃতকার্য হয়।
দাওয়াতের ব্যাপক প্রসার
উপরিউক্ত নববী কর্মকৌশল ও স্বভাবজাত উন্নয়নপদ্ধতি অবলম্বনের ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা গেল অগ্রগতির এ ধারা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। এই দল কেবল মক্কা মুকাররমার ঘরে ঘরে প্রবেশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং মক্কার বাইরেও তৈরি হয়েছে এ জামাতের সদস্যবৃন্দ। এই পবিত্র জামাতের সামনে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ এবং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্যই পরম আরাধনা ছিল। এর বাইরে না কোনো লোভ-লালসা তাদের পদস্খলন ঘটাতে পেরেছে, না কোনো ভয়-ভীতি তাদের সংকল্পে ন্যূনতম চিড় ধরাতে পেরেছে।
گو مخالف ہوں زمین و آسمان کچھ غم نہیں
سب گوارا ہے مزاج یار گر برہم نہیں
'আসমান-যমীন বিরোধী হলেও চিন্তার কিছু নেই।
বন্ধুর মেজায যদি রুষ্ট নয়, তো সবকিছুই মেনে নেওয়ার মতো।'
আল্লাহর এই দল যখন আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ এবং মাখলুকের কল্যাণকামিতার চেতনা নিয়ে নিজেদের অর্জিত মনুষ্যত্বের দৌলতকে পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য সত্যের পয়গাম নিয়ে বের হলো, তখন কোনো পাহাড়-পর্বত, সাগর-নদী তাদের রাস্তায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি।
মক্কা মুকাররমায় শত্রুদের আধিক্য ও ক্ষমতার কারণে এই দাওয়াত কঠিন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল। আল্লাহ তাআলা তা সমাধানের ব্যবস্থা করলেন এভাবে যে, মদীনায়ে তায়্যিবার সৌভাগ্যবান কিছু লোক ইসলাম গ্রহণে ধন্য হলেন। তাঁরা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তাঁদের দেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেন। তারা জানতেন, এই পদক্ষেপ মক্কার কুরাইশ গোত্র বরং পুরো আরবের বিরুদ্ধাচরণ কিনে নেওয়ার শামিল। তারপরও তারা খুব জেনেবুঝেই এই পাহাড়কে নিজেদের মাথায় তুলে নিয়েছিলেন।

টিকাঃ
১৯. সূরা নাহল, আয়াত ১২৫
২০. সূরা মুজাদালা, আয়াত ২২
২১. সূরা মুজাদালা, আয়াত ২২

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 মদীনায় হিজরত

📄 মদীনায় হিজরত


এ পুস্তিকায় হিজরতের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাসমূহ উদ্ধৃত করার সুযোগ নেই। আমার উদ্দেশ্যের সাথে এর সম্পর্কও নেই। আমি শুধু এটুকু দেখাতে চাচ্ছি যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুরো বিশ্বের হেদায়াত, সংশোধন এবং সমগ্র পৃথিবীতে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার যে মহান উদ্দেশ্য নিয়ে আগমন করেছিলেন, তা তিনি কোন মূলনীতি এবং কোন পদ্ধতির আলোকে এই দায়িত্ব সম্পাদন করেছিলেন। যার ফলে সারা বিশ্ব হতবাক হয়ে গিয়েছিল।
মদীনা তায়্যিবায় আগমনের ফলে হকের দাওয়াতের পথ থেকে একটি বড় বাধা তো সরে গিয়েছিল। কারণ সেখানে (মক্কায়) মুসলমান হয়ে বসবাস করা নিজের ধ্বংস ডেকে আনার নামান্তর ছিল। পক্ষান্তরে এখানে (মদীনায়) মুসলমানদের মোটামুটি নিরাপত্তা ছিল এবং সেই সাথে দিন দিন মুসলমানদের সংখ্যাও এখানে বৃদ্ধি পাচ্ছিল।
এটাই নবুওতের সেই মাদানী যুগ, যে যুগে ইসলামের সমস্ত গঠনমূলক কাজের সূচনা হয়েছিল এবং ইসলামের সর্বপ্রথম ছোট্ট একটি রাষ্ট্র মদীনা তায়্যিবায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু যেমনিভাবে তাঁর সংস্কার কার্যক্রমের প্রাথমিক কীর্তিগুলো পৃথিবীর সাধারণ রীতিনীতি থেকে ভিন্ন, সাধাসিধা এবং সহজ ও স্বভাবজাত ছিল, ঠিক তেমনি এই বিরল ইসলামী রাষ্ট্রের সংবিধান, আইনকানুন এবং তা প্রয়োগের ব্যবস্থাপনাও পুরো পৃথিবী থেকে ভিন্ন ছিল।
সেখানে ন্যায়বিচার ছিল অত্যন্ত সহজলভ্য, তাৎক্ষণিক ও বিনামূল্যে; বরং তা ছিল বাধ্যতামূলক। আইন বাস্তবায়নের জন্য পুলিশ ও আইন- শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রয়োজন ছিল না। যে আইন কুরআনে অবতীর্ণ হয়েছে অথবা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জবান মুবারক থেকে বের হয়েছে এবং তা মানুষের কানে পৌঁছেছে, ব্যস, মানুষের এই শোনাই তা বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট ছিল। কারণ মক্কার তেরো বছর সময়কালে যেই পবিত্র জামাত তৈরি করা হয়েছিল, তাদের প্রতিটি নারী- পুরুষ শরীআতের হুকুমের জন্য কান পেতে থাকত। হুকুম শোনার পর তার বরখেলাপ করার চিন্তাই করা যেত না তাদের থেকে। এর একটি দৃষ্টান্ত দেখুন-
জাহেলী যুগ থেকেই আরবের ঘরগুলো মদে ভরা থাকত। প্রায় পুরো আরবই এতে অভ্যস্ত ছিল এবং ইসলামের প্রাথমিক যুগে এটাকে নিষিদ্ধও করা হয়নি। তাই মুসলমানদেরও এ থেকে দূরে থাকার কোনো কারণ ছিল না। কেবল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সিদ্দীকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং গুটি কয়েক সাহাবী—যাদের স্বভাব আল্লাহ তাআলা সৃষ্টিগতভাবেই এমন বানিয়েছেন যে, যে বস্তু ভবিষ্যতে ঘৃণার বিষয় ও নিষিদ্ধ হবে, তাদের পবিত্র স্বভাব আগে থেকেই ওই বস্তুকে ঘৃণা করত। এজন্যই মদের বৈধতাযুগেও তারা কখনো মদে হাত লাগাননি। তারা ছাড়া সাধারণ সাহাবায়ে কেরাম এবং সমস্ত মুসলমান ওই সময় পর্যন্ত মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিলেন।
এটা জানাকথা যে, সকল পাপের মূল নামে অভিহিত মদ্যপানে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়ার পর কারও পক্ষে তা ত্যাগ করা নিজের জীবন বিলিয়ে দেওয়ার মতো কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ভিত্তির উপর নিজের মিশনকে দাঁড় করিয়েছিলেন তার উপর যে-কোনো ভবন অত্যন্ত সহজে মজবুতভাবে স্থাপিত হতে পারে।
যখন কুরআন মাজীদে অকাট্যভাবে মদ্যপানের নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হলো তখন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সাহাবী, সম্ভবত হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুকে নির্দেশ দিলেন, মদীনার অলিতে-গলিতে গিয়ে ঘোষণা করে দাও যে,
أَلَا إِنَّ الْخَمْرَ قَدْ حُرِّمَتْ
'শোনো! মদকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।'
আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর এ ঘোষণা পুরো মদীনায় যে বিস্ময়কর বিপ্লব সৃষ্টি করেছিল, পৃথিবীর ইতিহাসে এর দ্বিতীয় কোনো নজীর নেই। এই ঘোষণার সময় ঘরে ঘরে মদের আসর চলছিল। পরিস্থিতি এই দাঁড়ায় যে, যার হাতে মদের পেয়ালা ছিল, যে মদের পেয়ালায় চুমুক দিচ্ছিল, সে তৎক্ষণাৎ তা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল। যার কাছে মদের সুরাহী, পিপা (ড্রাম), মশক ছিল, সে তৎক্ষণাৎ তা ভেঙ্গে ফেলেছিল। অল্প সময়েই মদীনার অলিগলি বৃষ্টির পানির ন্যায় মদে ভেসে গেল। এক মাস পর্যন্ত সেই অলিগলি থেকে মদের দুর্গন্ধ দূর হয়নি।
কতিপয় সাহাবায়ে কেরাম বিপুল পরিমাণে মদ আমদানির উদ্দেশ্যে শামে গিয়েছিলেন। যখন উট বোঝাই শতশত পিপা (ড্রাম) মদ নিয়ে মদীনায় প্রবেশ করছিলেন তখন কেউ তাদেরকে মদ নিষিদ্ধের সংবাদ শোনায়। এই সাহাবীগণ যদিও নিজেদের বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করে এগুলো ক্রয় করেছিলেন এবং এখন এটা নিষিদ্ধ হলে তাদের দেউলিয়া হবার উপক্রম ছিল। কিন্তু—
از محبت تلخ با شیرین شود
'ভালোবাসার কারণে সকল তিতা মিষ্টি হয়ে যায়।'
রাসূলের আনুগত্যের সামনে সকল অভিপ্রায় ও পরিকল্পনা তাৎক্ষণিকভাবে স্থগিত করে মদের পিপেগুলো একটি ফাঁড়িতে নামিয়ে তারা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলেন। এবং নিজেদের ঘটনা বর্ণনা করে ‘এখন এটা বিক্রি করা যাবে কি’ এ ব্যাপারে নবীজির নির্দেশনা জানতে চাইলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যেমনিভাবে মদ পান করা নিষিদ্ধ, তেমনি তা বিক্রয় করাও নিষিদ্ধ। এর বিনিময়ে যে সম্পদ অর্জিত হবে তা হারাম।
আত্মোৎসর্গকারী সাহাবা এই কথা শোনার সাথে সাথে আমদানিকৃত মদের ভাণ্ডারের কাছে গেলেন। একটি একটি করে সবগুলো মদের পিপে ভেঙে ফেললেন। সেই পাহাড়ের উপরই মদগুলো ভাসিয়ে দিলেন।
আজকের পৃথিবীতে এটা কল্পনাও করা যায় না যে, রাষ্ট্রের কোনো আইন এভাবে বাস্তবায়িত হতে পারে। বেশি দিন আগের কথা নয়, আমেরিকায় মদ্যপান নিষিদ্ধের জন্য আন্দোলন হয়েছে, পরিশেষে মদ্যপান নিষিদ্ধ মর্মে আইন প্রণীত হয়েছে। এরপর মদের ধ্বংসাত্মক প্রভাব ও ভয়াবহ ক্ষতি জানানো ও প্রচারের জন্য সরকারী তত্ত্বাবধানে হাজার হাজার প্রবন্ধ, পত্রিকা ও লিফলেট সারা দেশে প্রচার করা হয়েছে, যাতে এই আইনের পক্ষে জনমত গঠন হয়। কিন্তু আমেরিকায় এই আইনের যে ফলাফল হয়েছিল তা এখন পর্যন্ত মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যায়নি। গবেষকদের সমীক্ষায় উঠে এসেছে, এই বছর আমেরিকায় মদের পেছনে ব্যয় পূর্ববর্তী বছরের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
ইসলামে মদের নিষেধাজ্ঞা এবং আমেরিকায় মদ বন্ধের পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ও চিত্র তো সবাই দেখল, কিন্তু চিত্রের এই ভিন্নতার ও নেপথ্যে প্রকৃত কারণ গভীরভাবে চিন্তা করার লোক কোথায়, যারা ভাববে— ইসলামে এই কানুন কীভাবে সফল হলো, আর আমেরিকায় কেন ব্যর্থ হলো? বাস্তবতা সেটাই যা পূর্বে আলোচনা করেছি। দুনিয়ার কোনো আইন স্বয়ংক্রিয় মেশিন নয়; বরং মানুষ তাকে পরিচালিত করে। তাই মানুষ যখন আর মানুষ থাকে না তখন আইনের ফলাফল কী হবে তা তো সহজেই অনুমেয়।
আজকের পৃথিবী তো আইন প্রণয়ন এবং আইন বাস্তবায়নের জন্য নতুন নতুন সংস্থা গঠনে তৎপর। আইন ও আইন সংস্থার জালে পুরো মানবসমাজকে আবদ্ধ করে রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদের এই দিকে মনোযোগ দেওয়ার ফুরসত নেই যে, আমাদের এই সমস্ত প্রচেষ্টা কেন ব্যর্থ হচ্ছে। যত বেশি পুলিশ ও বিশেষ আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে অপরাধও তত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ইউরোপের বস্তুপূজারি চিন্তা-মস্তিষ্ক এ বাস্তবতা কীভাবে উপলব্ধি করবে যে, মানুষকে সঠিক অর্থে মানুষ বানানোর প্রথম ও সর্বশেষ পদ্ধতি হলো—বস্তু ও বস্তুজগতের সৃষ্টিকারী আল্লাহ তাআলাকে চেনা। তাঁর সাথে সম্পর্ককে ঠিক করা। এটি ব্যতিরেকে কোনো মানুষ প্রকৃত মানুষ হতে পারে না। আর যখন মানুষ প্রকৃত অর্থে মানুষ হয় না তখন সমস্ত ব্যবস্থাপনাই নিষ্ফল। ওগুলো দিয়ে কোনোভাবেই পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।
আরেকটি ঘটনা আলোচনা করা যাক। সুদ ও জুয়ার কারবারকে আজকাল যেমন ব্যবসা-বাণিজ্যের মূল চালিকাশক্তি বিবেচনা করা হয়, ইসলামপূর্ব জাহেলী আরবেও এগুলোর ঠিক তেমন ব্যাপক প্রচলন ছিল। কিন্তু কুরআন মাজীদে এর নিষেধাজ্ঞা অবতীর্ণ হলো; পাশাপাশি এই হুকুমও দেওয়া হলো যে, নিষেধাজ্ঞার পূর্বে সুদের যে লেনদেন করা হয়েছিল তা থেকে কেবল মূলপুঁজিটুকু আদান-প্রদান করা যাবে। পূর্ববর্তী সুদের অর্থ গ্রহণ ও প্রদান কোনোটিই বৈধ হবে না।
এই বিধান নবীজীর শেষ জীবনে মক্কাবিজয়ের পর অবতীর্ণ হয়েছিল। যখন ইসলাম প্রায় পুরো আরব-উপদ্বীপে বিস্তার লাভ করেছিল। এই বিধান অবতীর্ণ হতে না হতেই পুরো আরব এ জাতীয় লেনদেন থেকে এমনভাবে পাক-পবিত্র হয়ে গেল, যেন পূর্বে কখনো এ কারবারের অস্তিত্বই ছিল না।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানিত চাচা হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহুর সুদের একটি বড় অংক অন্যদের কাছে পাওনা ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের ভাষণে সর্বপ্রথম সেই অর্থ বাতিলের ঘোষণা দিলে হযরত আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু অত্যন্ত সন্তুষ্ট চিত্তে তা মেনে নেন। তৎকালীন যুগে যে ব্যক্তি জুয়া-বাজিতে অংশগ্রহণ করত না, তাকে হীন ও ছোট মনে করা হতো। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার বিধান অবতীর্ণ হবার সাথে সাথেই বিষয়টি সম্পূর্ণ উল্টে যায়। এই আইন বাস্তবায়ন ও তদারকি করার জন্য কোনো ম্যাজিস্ট্রেট পুলিশ বা গোয়েন্দাবাহিনী গঠন করতে হয়েছে—এমন ঘটনা কোথাও ঘটেনি। এমনকি নিষেধাজ্ঞা জারির পর তা ভঙ্গের একটি ঘটনাও নববী দরবারে উত্থাপিত হয়নি।
পৃথিবীর জ্ঞানী ও বিদ্বান শ্রেণির এ বিষয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত যে, ইসলামী আইনে কী এমন জাদু রয়েছে, যা সারা জীবনের অভ্যাসকে মুহূর্তের মধ্যে খতম করে দিতে পারে। ধনসম্পদের বড় বড় পুঁজি মানুষ এক মুহূর্তে ত্যাগ করতে পারে। চিন্তা করলে ফলাফল সেটিই আসবে যেটি পূর্বে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ইসলাম কেবল আইন প্রয়োগ করেনি; বরং আইন প্রয়োগের পূর্বেই মানুষকে এমন মানুষ বানিয়েছে যে, সে নিজেই সমস্ত মন্দ কর্মকে ঘৃণা করতে থাকে এবং সমস্ত ভালো কাজের জন্য প্রস্তুত হয়ে থাকে, চাই তাতে তার ব্যক্তিস্বার্থ যতই ক্ষতিগ্রস্ত হোক না কেন।
সারকথা হলো, সমস্ত দার্শনিকদের দার্শনিক, নবীগণের সরদার, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা পৃথিবীতে বিস্তার লাভের ভিত্তি ছিল দুটি।
প্রথমটি হলো, চরিত্র ও মানসিকতা গঠন।
দ্বিতীয়টি হলো, কুরআনের ইনসাফ ও ন্যায়বিচার। যাতে কেবল শাসকসুলভ নয়, বরং প্রজ্ঞাপূর্ণ ও দয়াপরবশ পদ্ধতিতে উম্মতকে আইন পালনে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে এবং আইন ভঙ্গের ক্ষেত্রে শাস্তির বিধান শোনানো হয়েছে।
আজকের পৃথিবী তো আইন প্রণয়ন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার পেছনে সরকারের পুরো শক্তি ব্যয় করে থাকে। কিন্তু চারিত্রিক ও মানসিক সংশোধনের প্রতি প্রথমত মনোযোগই দেয় না, যতটুকু দেয় সেটাও এত নিষ্ফল যে, এর দ্বারা চরিত্র সংশোধনের পরিবর্তে চরিত্র বিগড়ানো ও নষ্ট হবার ফলাফল বয়ে আনে। কেননা দুনিয়াদারদের সংশোধন ও অনুশাসনেরও সর্বশেষ গন্তব্য দাঁড়ায় কেবল বস্তু ও বস্তুবাদ। জানাকথা, যখন মানুষের পার্থিব স্বার্থই সর্বশেষ গন্তব্য হয়, তখন কোনো আইনের কারণে নিজের পার্থিব স্বার্থ কেউ কেন ত্যাগ করবে? নিজের জান ও মালের উৎসর্গ কার জন্য করবে? এই কাজ তো তখনই সম্ভব যখন বস্তুবাদ থেকে ঊর্ধ্বে কোনো সত্তাকে সমস্ত পৃথিবীর সৃষ্টিকর্তা ও অধিপতি এবং সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান মনে করে তার সন্তুষ্টি লাভের ফিকির ও তার অসন্তুষ্টি থেকে বেঁচে থাকাই হবে সর্বশেষ গন্তব্য।
এখানে এ দিকটির বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। বলতে চেয়েছিলাম—মদীনায় হিজরতের পর যখন ইসলামের সামাজিক ও নগর-জীবন শুরু হলো এবং এর জন্য একটি জীবনব্যবস্থা চালু করা হলো, তখন সেটাও পৃথিবীর সাধারণ রাষ্ট্রগুলোর বিপরীত একেবারে সহজ ও স্বভাবজাত ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা হলো। যার জন্য আজকালের দাপ্তরিক নিয়ম-কানুনের আনুষ্ঠানিকতার কোনো প্রয়োজন পড়েনি। যেমন এই কিছুক্ষণ পূর্বে বলা হলো যে, ইসলামী জীবনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য দুটি মূলনীতি রয়েছে। এক. আইন। দুই. চারিত্র ও চিন্তাগত তারবিয়াত ও দীক্ষাদান।
এ যেন গাড়ির দুটি চাকা। যার উপর ভর করে তা চলাচল করে।
আইন বাস্তবায়নের সহজ-সরল পদ্ধতি তো আপনারা কিছুটা দেখতে পেলেন, এবার শিক্ষাদীক্ষার ব্যবস্থাপনা দেখুন।
তালীম ও তারবিয়াতের ব্যবস্থাপনা
ইসলামের শিক্ষা ও দীক্ষা ব্যবস্থায় দৃষ্টি দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষাবোর্ড ও এর দপ্তরসমূহ, এতে কর্মরত লোকদের সংখ্যা এবং প্রাইমারি স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত যেই অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তার বিশালতা ও এর পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং এই ব্যয়বহুল খরচে শিক্ষা গ্রহণকারীদের লেখাপড়াকেন্দ্রিক খরচের দীর্ঘ ফিরিস্তির প্রতি চোখ রাখুন। এরপর এত কিছু সত্ত্বেও এর ফলাফল তুলনা করুন। যে জ্ঞান ও শাস্ত্র তাদের পাঠ দান করা হয়, সেগুলোতে তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা গড়ে কত শতাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে এবং এই শিক্ষা তাদের চরিত্র ও কার্যক্রমকে কেমন বানাচ্ছে।
এরপর দার্শনিকদের সরদার সায়্যিদুল আম্বিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা দেখুন, সেটি কত স্বভাবজাত ও সহজ-সরল মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সরকারের বড় ধরনের কোনো ব্যয় নেই, আবার ছাত্রের উপরও এক পয়সার বোঝা চাপানো নেই। যেমনটি বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কয়েক পৃষ্ঠা পূর্বে আপনি নতুন প্রজন্ম এবং বাচ্চাদের শিক্ষাদীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ তুলনা থেকে প্রত্যেক পাঠক এই ফলাফলে পৌঁছে যাবেন যে, প্রতিটি মুসলমানের ঘর বাচ্চাদের জন্য প্রাইমারি স্কুল (প্রাথমিক বিদ্যালয়)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ঘরগুলোকে একেকটি প্রাইমারি স্কুলে পরিণত করেছেন। যেখানে অবচেতন মনে ছোট ছোট শিশুরা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন হবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করতে পারে। বাচ্চার বয়স যখন সাতে পড়বে তখন সহজাতভাবেই সে পাক-নাপাকের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। এ সময় পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ হলো, তাকে নামায পড়া শেখাও, সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাও। কারণ মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে।
যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষালয়ের ভূমিকা পালন করে। যেখানে সব ধরনের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা একত্রিত হয় এবং তাদের ওয়ায-নসীহত অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সান্নিধ্য-সংশ্রবে শিশুর মনে অবচেতনেই এমনসব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্বার উম্মোচিত হতে থাকে, যা বহু গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমেও সম্ভব হয় না।
এই শিক্ষা তো জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য ও আলোচনার দ্বারা অর্জিত হয়। এছাড়া সাধারণ মুসলমানদের উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম ভাইকে ভুল কাজ করতে দেখো, তাহলে তাকে সেটা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো। যদি সক্ষম হও তাহলে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দাও। আর তা সম্ভব না হলে মৌখিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করো। এটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সর্বনিম্ন স্তর হলো, তুমি তার কৃতকর্মকে অন্তর থেকে মন্দ মনে করো।
হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার পদ্ধতি দুটি। একটি শাসকদের জন্য, যারা আইনের বলে মন্দ কাজ থেকে বাধা দিতে পারে। দ্বিতীয়টি স্বীয় আত্মীয়-বন্ধু অথবা সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। আর মৌখিক বারণ সহমর্মিতার সাথে সকলের ক্ষেত্রেই করা যায়।
একটু ভাবুন, যখন প্রতিটি মুসলমান এই নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছে যে, দ্বীনের যে মাসআলা সম্পর্কে সে অবগত রয়েছে, তার বিপরীত কাউকে কিছু করতে দেখলে সেই কাজ থেকে বিরত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করবে।
তাহলে এই নির্দেশনার উপর আমলের বরকতে কত সহজে একেবারে বিনামূল্যে; বরং আবশ্যিকভাবে দ্বীনী শিক্ষার প্রসার হয়ে যায়।
নামায তো ঘরেও আদায় করা যেত। কিন্তু তার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়ার মাঝে শিক্ষাদীক্ষার একটি বড় উপকারিতা নিহিত রয়েছে যে, এর ফলে প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের পক্ষে আয়নার ভূমিকা রেখে ভুলগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পারবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুরো জাতির তাত্ত্বিকশিক্ষা ও পাশাপাশি তার বাস্তব অনুশীলন কতটা সহজেই সম্ভব হচ্ছে। যা না কোনো স্কুলে সম্ভব হতো, না কোনো মাদরাসায়।
তবে এই হুকুমের পাশাপাশি এ কথাটিও খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, অপরকে তার ভুল সম্পর্কে অবহিত করার ক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও কল্যাণকামী মনোভাব থাকতে হবে। নম্রতার সাথে একাকিত্বে বোঝাতে হবে। যাতে তার মনে আঘাত না লাগে এবং সে জিদ করে না বসে।
কুরআনুল কারীম যেখানেই মুসলমানদের সত্যের পথে দাওয়াতের নির্দেশ করেছে, সেখানেই এই শর্তগুলো আরোপ করেছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে।
অর্থাৎ প্রভুর পথের দিকে মানুষকে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের সাথে আহ্বান করো। প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য—কথা বলার পূর্বে এটি ভাবা যে, শ্রোতাকে এই কথা কোন সময়, কোন অবস্থায়, কোন শিরোনামে বললে তার অন্তরে সাড়া পড়বে। এরপর বিষয়টি কল্যাণকামিতার সাথে উপস্থাপন করা উচিত, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ বা অন্যকে অপমান করা উদ্দেশ্য হতে পারবে না। এজন্য আয়াতে مَوْعِظَة (উপদেশ) এর সাথে حَسَنَة (উত্তম) এর শর্তটি বৃদ্ধি করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মুসলমানদের ব্যাপক মূর্খতা ও গাফিলতি ইসলামের যে মূলনীতিগুলোকে অকেজো করে দিয়েছে, তার একটি এও যে, একতো কেউ কাউকে মন্দ কাজে সতর্ক করে না। আর কেউ সতর্ক করতে উদ্যোগী হলেও উল্লিখিত আদব ও শর্তাবলী রক্ষা করা হয় না। ফলে শিক্ষা ও সংশোধনের এই সোনালী মূলনীতিগুলো মসজিদ ও মাহফিলসমূহে উল্টো ঝগড়া বিবাদ, অনৈক্য ও বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এটা কেবল দ্বীনী বিষয়গুলোর সাথেই সম্পৃক্ত নয়; বরং সমস্ত পার্থিব বিষয়েও সবসময়ের অভিজ্ঞতা এই যে, উত্তম থেকে উত্তম বলবর্ধক খাবার অথবা ওষুধ যদি ভুল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা উপকারের পরিবর্তে আরও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
সারকথা, দোজাহানের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী যদি যথাযথ আমল করা হয়, তাহলে শিশুর জন্য মায়ের কোল ও তার ঘরই সর্বোত্তম প্রাথমিক শিক্ষালয়ে পরিণত হবে এবং প্রতিটি মসজিদ নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষার আদর্শ বিদ্যালয় হবে, যেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি তার প্রয়োগ এবং শিক্ষার পাশাপাশি চারিত্রিক ও মানসিক গঠনও সম্পন্ন হয়ে যাবে। এবং শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো, সে পথের ধাপগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হওয়া আরম্ভ হয়।
উচ্চশিক্ষা
বাকি রইল কেবল উচ্চশিক্ষা, যার জন্য শুরুর শতাব্দীগুলোতে প্রতি শহর-উপশহরে উলামায়ে কেরামের মজলিসসমূহ, দরস ও পাঠদানের আসরসমূহ প্রচলিত ছিল। এই শিক্ষাও ছিল একেবারে অবৈতনিক। পরবর্তীকালে এ লক্ষ্যে স্বতন্ত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার রীতি চালু হয়।
জাগতিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিদেশি ভাষা শিক্ষা
শিক্ষার মূলনীতিসমূহ পুরোটাই আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহয় বিদ্যমান রয়েছে। জাগতিক ও অর্থনৈতিক, কিংবা যুগের চাহিদা পূরণের জন্য যে কাজ শেখা আবশ্যক, সে ব্যবস্থাও তখনকার যুগে সাধাসিধা ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্পন্ন হতো।
বদর যুদ্ধের বন্দীদের যারা লেখাপড়া জানত, তাদের কাঁধে এই দায়িত্ব দেওয়া হলো যে, তারা সাহাবায়ে কেরামকে লেখাপড়া শেখাবে। ভিনদেশি ভাষা শেখা ও জানারও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল। রোমীয়, পারসিক ও আবিসিনীয় ভাষায় দক্ষ লোকও সাহাবায়ে কেরামের মাঝে ছিলেন।
শিল্প ও কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাপনা
প্রয়োজন মোতাবেক শিল্প ও কারিগরি শিক্ষাও প্রচলিত ছিল। এর জন্য কখনো কখনো বিদেশে গিয়ে শিক্ষালাভেরও অবকাশ ঘটেছে।
যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণশিল্প রপ্তকরণে সাহাবায়ে কেরামের গুরুত্ব
হাফিযুল হাদীস আল্লামা ইবনে কাছীর রহ. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া' গ্রন্থে লেখেন, হযরত উরওয়া ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু ও হযরত গায়লান ইবনে সালামাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হুনাইনের যুদ্ধে এজন্য অংশগ্রহণ করতে পারেননি যে, তারা কিছু যুদ্ধাস্ত্র নির্মাণ শেখার জন্য 'জারাস' নামক স্থানে ছিলেন। সেখানে তারা ট্যাংক ও মিনজানিক নির্মাণ শিক্ষালাভ করেন।
ওই যুগের ট্যাংক হলো, কেল্লা অবরোধের সময় তিরবৃষ্টি এড়িয়ে কেল্লা পর্যন্ত পৌঁছানোর এক ধরনের গাড়ি। সেটারই উন্নত সংস্করণ বর্তমানের ট্যাংক। কতিপয় গবেষকদের কাছে শুনেছি, ইংরেজরা মহীশুরের কেল্লা বিজয়ের সময় এটি ব্যবহার করেছিল।
মিনজানিক হলো এমন যন্ত্র, যার মাধ্যমে ভারী পাথর নিক্ষেপ করা হতো। কেল্লা বিধ্বংসী কামান আবিষ্কারের পূর্বে এটি ব্যবহার হতো। মুহাম্মদ ইবনে কাসিম সিন্ধু বিজয়ের সময় দেবল কেল্লায় সর্বপ্রথম এটি ব্যবহার করেন।
লক্ষ করুন, কতইনা সহজ-সরল, অবৈতনিক শিক্ষাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে জ্ঞানগত যোগ্যতার পূর্ণতা, চরিত্র ও মননশীলতার উন্নতির পাশাপাশি কাজ ও কর্মদক্ষতা অর্জিত হয় এবং শিক্ষার যে মূল লক্ষ্য তথা মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানানো, সেটা কত সহজেই পূরণ হয়।
এখানে কারও মনে এ প্রশ্ন হতে পারে যে, ওই সময় পুরো পৃথিবীতেই সাদাসিধে জীবনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল; এর জন্য অধিক শিক্ষার প্রয়োজন ছিল না। বরং উল্লিখিত শিক্ষাব্যবস্থাই ওই পরিমাণ শিক্ষার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আজকের পৃথিবী তো বহুদূর এগিয়ে গেছে। জ্ঞান-বিজ্ঞানের অসংখ্য শাখা-প্রশাখা তৈরি হয়েছে, যেগুলো অর্জন করার জন্য প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়।
কিন্তু কোনো ব্যক্তি যদি এই সাধাসিধে ও সংক্ষিপ্ত শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গের অবদানের প্রতি নজর বুলায়, তাহলে বুঝতে পারবে যে, ওই সাধাসিধে শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষিত লোকেরা রাষ্ট্র, রাজনীতি ও কর্মকৌশলে এমন স্থান অর্জন করতে পেরেছিলেন, যার দরুন তাদের সামনে পুরো পৃথিবী মাথানত করতে বাধ্য হয়েছিল।
সিদ্দীকে আকবর রাদিয়াল্লাহু আনহু, উমর ফারূক রাদিয়াল্লাহু আনহু কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন না। উসমান গনী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বিদেশ থেকে শিক্ষালাভ করে আসেননি। খালিদ বিন ওয়ালিদ, আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, আমর ইবনুল আস, আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, আবদুল্লাহ ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুম এই সাধাসিধে শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়া অন্য কোথাও শিক্ষা লাভ করেননি।
বরং বাস্তবতা হলো, যদি কুরআনের শিক্ষাকে যথাযথ অর্জন করা যায়, তাহলে দেখা যাবে—মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক এমন কোনো প্রয়োজন নেই যা পূরণের জন্য কুরআনে উত্তম ও সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের সকল ক্ষেত্র থেকে শুরু করে গোত্রীয়, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যাপারগুলোর এমন উত্তম দিকনির্দেশনা রয়েছে যে, যদি এর উপর আমল করা হয়, তাহলে পুরো দুনিয়া শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার কেন্দ্রে পরিণত হবে। আর এ এমন এক বাস্তবতা যাকে কেবল আমরা মুসলমানরাই নই; বরং যারা সর্বদা ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে এক পায়ে খাড়া থাকে, তাদেরও এর স্বীকৃতি প্রদান ছাড়া উপায় নেই।
একজন ফরাসি খ্রিষ্টান চিন্তাবিদের সাক্ষ্য
এ ক্ষেত্রে অসংখ্য সাক্ষ্য থেকে এখন কেবল একজন খ্রিষ্টান ব্যক্তির সাক্ষ্য উপস্থাপন করা হচ্ছে, যিনি ফ্রান্সের একজন প্রসিদ্ধ রাজনৈতিক চিন্তাবিদ। তিনি মুসলমানদের সার্বিক অবস্থা ও কর্মকাণ্ড পুরোপুরি বোঝার জন্য একটি ইসলামী রাষ্ট্রে মুসলিম পরিচয়ে ত্রিশ বছর কাটিয়েছেন এবং আলজেরিয়া, তিউনিসিয়া, ইস্তাম্বুল, মিশর ও হিজাজে বসবাস করে আরবি ভাষা এবং সমস্ত ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা করেছেন। এরপর ফিরে এসে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম- ثَلَاثُونَ عَامًا فِي الْإِسْلَامِ
এই রাজনৈতিক চিন্তাবিদের নাম 'সোলিভ্যান রুশ'। তার গ্রন্থের কিছু অংশ আরবী থেকে অনুবাদ করে পেশ করা হচ্ছে। তিনি বলেন,
'আমি দীর্ঘ একটি সময় ইসলামকে আঁকড়ে ধরে ছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল, আমি যে-কোনো উপায়ে আমির আবদুল কাদেরের ঘনিষ্ঠ হব এবং তার রহস্য উন্মোচন করব। আমি এতে সফল হয়েছি। আমির সাহেব আমার উপর পুরোপুরি ভরসা করেছেন এবং আমাকে তার সহকারী হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। আমি এই ধর্মকে—অধিকাংশ মানুষ যার নিন্দা করে—নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী সমস্ত ধর্ম ও মতাদর্শ থেকে উত্তম পেয়েছি।
বাস্তবতা হলো, এটাই একমাত্র ধর্ম, যাকে মানবিক, স্বভাবজাত, অর্থনীতিবান্ধব ও চারিত্রিক উপাদান সমৃদ্ধ বলার উপযুক্ত।
আমি আপনার রাষ্ট্রের সমস্ত আইনের মধ্যে এমন কোনো আইন পাইনি, যা ইসলামে পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল না। বরং আমি ওই সংবিধান অধ্যয়ন করেছি, যাকে 'জল সিমন' স্বভাবজাত আইন বলে থাকেন। সেটা পুরোটাই ইসলাম থেকে নেওয়া হয়েছে।
এরপর আমি গবেষণা করেছি যে, এই ধর্ম মুসলমানদের অন্তরে কী প্রভাব সৃষ্টি করে? তো আমি দেখেছি এই ধর্ম তাদের অন্তরে বীরত্ব, দানশীলতা, ভদ্রতা ও বুজুর্গী দিয়ে ভরে দেয়। বরং আমি উপলব্ধি করেছি যে, তাদের অন্তর ওই সকল উঁচুমাপের বিষয়ে পারদর্শী যা দার্শনিকগণ নিজ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মাধ্যমে লাভ করে থাকে। তারা এমন এক পৃথিবীতে বাস করে, যেখানে মন্দকর্ম ও অনর্থক কাজকর্ম ও মিথ্যা কথা কেউ বলতে জানে না।
মুসলমানগণ সাদামাটা দিলের মানুষ হয়ে থাকেন। তারা কারও প্রতি খারাপ ধারণা করেন না। তারা জীবিকা অন্বেষণের ক্ষেত্রে কোনো অবৈধ ও নিষিদ্ধ পন্থা অবলম্বন করেন না। এ কারণে তারা ধনসম্পদের ক্ষেত্রে ইহুদী ও কতিপয় খ্রিষ্টানদের থেকে কম ধনী হয়ে থাকেন।
আমি ইসলামে দুটি বিষয়ের উত্তম সমাধান পেয়েছি, যে দু বিষয়ে পুরো পৃথিবী চরম সঙ্কটের শিকার। প্রথমটি হলো কুরআনের বাণী-
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
'প্রকৃতপক্ষে সমস্ত মুসলিম ভাই-ভাই।
এটি সাম্যের একটি মহান নীতি। দ্বিতীয়টি হলো সকল ধনাঢ্য ব্যক্তির উপর যাকাত আবশ্যক করা এবং তাদের সম্পদে দরিদ্রদের এমন অধিকার সাব্যস্ত করা, যদি ধনীরা তা প্রদান না করে, তাহলে বাধ্যতামূলকভাবে সেটা আদায় করা হবে।
জোরপূর্বক যাকাতের মাল আদায় করার দ্বারা এ লেখকের উদ্দেশ্য সম্ভবত এটা যে, ইসলামী রাষ্ট্র বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত উসূল করে দরিদ্রদের অধিকার তাদেরকে বুঝিয়ে দিতে বাধ্য।
বর্তমানে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, মুসলমানরা নিজেদের ঘরের হিরে-জহরত ছেড়ে অন্যদের পাথরচূর্ণ ভিক্ষা করতে প্রস্তুত। আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহের শিক্ষা থেকে বিমুখ হয়ে নিজেদের প্রতিটি কাজে অন্যদের দিকে তাকিয়ে থাকা এবং তাদের অনুসরণ করার মাঝে গর্ববোধ করে। এটা তাদের সমস্ত কাজ ও জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রকে একটি অসমাধানযোগ্য জটিল ধাঁধায় পরিণত করেছে।
সারকথা
সারকথা হলো, ইসলামী জীবনব্যবস্থা স্বভাবজাত ও সহজ-সরল ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং জীবনের প্রতিটি শাখায় ব্যাপৃত শতভাগ সফল একটি ব্যবস্থা। যার ভিত্তি আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের সুন্নাহের শিক্ষা। সাময়িক ও পার্থিব প্রয়োজনে শিল্প, কারিগরি, কৃষি ও ব্যবসা-বাণিজ্য সবকিছুই প্রয়োজন পরিমাণ শেখা ও শেখানোর সুযোগ ইসলামে রয়েছে।
কথা ভিন্ন প্রসঙ্গে চলে গেল। এখানে রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা নয়; বরং শুধু এটুকু বোঝানো উদ্দেশ্য ছিল যে, দার্শনিকদের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি কাজ ও প্রতিটি বিষয়ের যে ব্যবস্থাপনা মানুষদের দান করেছেন, তা পূর্ণাঙ্গ, উপকারী ও সফল হওয়ার পাশাপাশি সহজ-সরল ও সাশ্রয়ী। পৃথিবী যখন থেকে এ জীবনব্যবস্থা ত্যাগ করেছে, তখন থেকে বিভিন্ন আইনি সংস্থা ও লম্বা লম্বা দাপ্তরিক ব্যবস্থাপনার আনুষ্ঠানিকতা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বটে, যা স্থূলদৃষ্টির মানুষকে আকর্ষিত ও প্রতারিত করার জন্য যথেষ্টও, কিন্তু ফলাফল ও পরিণামের বিচারে পৃথিবী প্রত্যক্ষ করেছে যে, এসব একেবারেই ব্যর্থ প্রমাণিত হয়েছে।
আজকের পৃথিবীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ দমন এবং সমাজে জ্ঞানবিজ্ঞান ও এর মাধ্যমে উন্নত চরিত্রের বিস্তার করার জন্য হাজার হাজার স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত ও দক্ষ ব্যক্তি সেখানে কাজ করছে। বিপুল পরিমাণ অর্থ তাদের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু ফলাফলের দিকে তাকালে দেখা যাবে, দিন দিন ন্যায়বিচার বিলুপ্ত হচ্ছে। অপরাধ প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্ঞান ও শিক্ষার মান দিন দিন অবনতি হচ্ছে।
রাষ্ট্রের কর্তা ব্যক্তিরা যখন এই দুর্দশা দেখেছেন, তখন পুলিশের উপর স্পেশাল পুলিশ, এক গোয়েন্দা বিভাগের উপর আরেক গোয়েন্দা বিভাগ, একটি প্রতিষ্ঠান সংশোধনের জন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান গঠন করতে লাগল। কিন্তু ফলাফল সেই আগেরটাই রয়ে গেল। কবির ভাষায়—
مرض بڑھتا گیا جوں جوں دوا کی
'দাওয়াই যত ব্যবহার করল রোগ ততই বেড়ে চলল।'
এর কারণ সেটাই যা পূর্বে বার বার উল্লেখ করা হয়েছে, আইন ও আইনী সংস্থা কোনো স্বয়ংক্রিয় মেশিন নয়; বরং এসব পরিচালনার জন্য মানুষের প্রয়োজন। আর এখন তারই দুর্ভিক্ষ। বাদশা আলমগীরের বক্তব্য অনুযায়ী পৃথিবীতে যে জিনিসটি সর্বত্র বিরাজমান হওয়া সত্ত্বেও দুষ্প্রাপ্য, সেটি হলো মানুষ। আর ইসলামের তাওহীদ ও আখেরাতের বিশ্বাস ছাড়া প্রকৃত মানুষ হবার কোনো পথ নেই। ইসলামী মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থার ফলাফলই হলো শান্তি ও নিরাপত্তা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার, প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা।
পূর্বে আলোচিত হয়েছে যে, নবীকুল শিরোমণি দোজাহানের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে মতাদর্শ ও জীবনব্যবস্থা মানুষকে দান করেছেন, তার দুটি বুনিয়াদি মূলনীতি ছিল—
এক. মানুষকে আল্লাহ ও পরকালের ভয়ের মাধ্যমে চারিত্রিক ও মানসিকভাবে পূর্ণ মানুষে পরিণত করা। যে ধনদৌলত, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও প্রবৃত্তির চাহিদা পূরণে এভাবে মত্ত হবে না যে, সব ধরনের বৈধ-অবৈধ পন্থায় তা অর্জনের চেষ্টা করবে। অন্যদের অধিকার ছিনিয়ে নেবে এবং মানুষদেরকে কষ্ট দেবে। বরং তার তো আদর্শ হবে অন্যের অধিকার আদায়ের প্রবল জযবা এবং নিজ অধিকার বিসর্জন দিয়ে ক্ষমা করার মানসিকতা। জানাকথা, যেই পৃথিবীতে এ ধরনের মানুষ বসবাস করবে, সেখানে জুলুম-অত্যাচার, দ্বন্দ্ব-হত্যা, অপরাধ-পাপাচারের অস্তিত্ব কল্পনা করাই যায় না।
দ্বিতীয় বুনিয়াদি মূলনীতি ছিল, প্রতিটি কাজে ভালো-মন্দ, ভুল-শুদ্ধ, উপকারী-অপকারী নির্ণয় মানুষ নিজ মস্তিষ্কপ্রসূত বিধানের মাধ্যমে নয়; বরং সৃষ্টিজগতের প্রতিপালক ও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বর্ণিত মূলনীতির আলোকে করবে। তার সমস্ত আইনের ভিত্তি হবে আল্লাহর হুকুম ও রাসূলের নির্দেশ এবং প্রতিটি কাজের লক্ষ্য হতে হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।
সারকথা হলো, নবীগণের সরদার—তাঁর প্রতি আমাদের পিতা-মাতা উৎসর্গ হোন—পুরো পৃথিবীর জন্য শান্তি ও নিরাপত্তার দূত হিসেবে আগমন করেছেন। যতদিন পর্যন্ত পৃথিবী তাঁর নির্দেশনা অনুযায়ী আমল করেছে, ততদিন শান্তি ও নিরাপত্তার যুগ ছিল। যখন তা পরিত্যাগ করেছে, ফিতনা-ফাসাদ, জুলুম-অত্যাচার ও নানা ধরনের অপরাধ ছড়িয়ে পড়েছে।
বর্তমান পৃথিবী শান্তি ও নিরাপত্তা, ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং অপরাধ দমনের জন্য হাজার রকমের পদ্ধতি বাস্তবায়ন করেছে। ফলাফল সবার সামনে এই এসেছে যে, যতই ব্যবস্থাপনা বেড়েছে, অপরাধের ঝড় আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনসাফ বিদায় নিয়েছে। আর শান্তি ও স্থিতিশীলতার তো নামগন্ধও নেই।
এবার এ পথে আর অগ্রসর হওয়ার পরিবর্তে কিছুটা পেছনে ফিরে চলুন। দোজাহানের সরদার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদত্ত জীবনব্যবস্থাকে বেশি নয়, কিছুদিনের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে হলেও বাস্তবায়ন করে এর ফলাফল দেখুন—পৃথিবীর শান্তি ও নিরাপত্তা কেবল শান্তি ও নিরাপত্তার দূত নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত জীবনব্যবস্থার মধ্যেই নিহিত রয়েছে। এর ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হলো নববী যুগ, তারপর খোলাফায়ে রাশেদীন, সাহাবা ও তাবেঈনের শাসনামলে ধারাবাহিকভাবে এবং পরবর্তী যুগে যখনই এই ব্যবস্থাপনাকে পরিপূর্ণভাবে কার্যকর করা হয়েছে, তখন তা এতটাই প্রজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান হয়েছিল যে, কট্টর বিরোধীদেরও তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ হতো না।
ইচ্ছে ছিল ইসলামের ইতিহাস থেকে এর কিছু দৃষ্টান্ত এখানে উপস্থাপন করব। কিন্তু বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধকে অতিরিক্ত দীর্ঘ করা এখন সময়, সুযোগ ও ব্যস্ততার বিচারে সহজ নয়। তাছাড়া ইসলামের ইতিহাসে এগুলোর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত থাকার কারণে এর প্রয়োজনও নেই। তাই এখানেই প্রবন্ধটি সমাপ্ত করছি।
فَتَقَبَّلْ مِنَّا إِنَّكَ أَنْتَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ وَأَنْتَ الْمُسْتَعَانُ وَعَلَيْكَ التَّكْلَانُ.

টিকাঃ
২২. সূরা নাহ্, আয়াত ১২৫
২৩. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ৪/৩৪৫, হুনাইন যুদ্ধের বর্ণনা।
২৪. সূরা হুজুরাত, আয়াত ১০
২৫. বৈরুতের বিচারক মুস্তফা গোলামীনী রচিত ইসলাম মদীনার রূহ, ৩৯-৪০ পৃষ্ঠা

📘 শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় মহানবী ﷺ > 📄 তালীম ও তারবিয়াতের ব্যবস্থাপনা

📄 তালীম ও তারবিয়াতের ব্যবস্থাপনা


ইসলামের শিক্ষা ও দীক্ষা ব্যবস্থায় দৃষ্টি দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষাবোর্ড ও এর দপ্তরসমূহ, এতে কর্মরত লোকদের সংখ্যা এবং প্রাইমারি স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত যেই অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তার বিশালতা ও এর পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং এই ব্যয়বহুল খরচে শিক্ষা গ্রহণকারীদের লেখাপড়াকেন্দ্রিক খরচের দীর্ঘ ফিরিস্তির প্রতি চোখ রাখুন। এরপর এত কিছু সত্ত্বেও এর ফলাফল তুলনা করুন। যে জ্ঞান ও শাস্ত্র তাদের পাঠ দান করা হয়, সেগুলোতে তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা গড়ে কত শতাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে এবং এই শিক্ষা তাদের চরিত্র ও কার্যক্রমকে কেমন বানাচ্ছে।
এরপর দার্শনিকদের সরদার সায়্যিদুল আম্বিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা দেখুন, সেটি কত স্বভাবজাত ও সহজ-সরল মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সরকারের বড় ধরনের কোনো ব্যয় নেই, আবার ছাত্রের উপরও এক পয়সার বোঝা চাপানো নেই। যেমনটি বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কয়েক পৃষ্ঠা পূর্বে আপনি নতুন প্রজন্ম এবং বাচ্চাদের শিক্ষাদীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ তুলনা থেকে প্রত্যেক পাঠক এই ফলাফলে পৌঁছে যাবেন যে, প্রতিটি মুসলমানের ঘর বাচ্চাদের জন্য প্রাইমারি স্কুল (প্রাথমিক বিদ্যালয়)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ঘরগুলোকে একেকটি প্রাইমারি স্কুলে পরিণত করেছেন। যেখানে অবচেতন মনে ছোট ছোট শিশুরা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন হবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করতে পারে। বাচ্চার বয়স যখন সাতে পড়বে তখন সহজাতভাবেই সে পাক-নাপাকের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। এ সময় পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ হলো, তাকে নামায পড়া শেখাও, সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাও। কারণ মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে।
যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষালয়ের ভূমিকা পালন করে। যেখানে সব ধরনের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা একত্রিত হয় এবং তাদের ওয়ায-নসীহত অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সান্নিধ্য-সংশ্রবে শিশুর মনে অবচেতনেই এমনসব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্বার উম্মোচিত হতে থাকে, যা বহু গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমেও সম্ভব হয় না।
এই শিক্ষা তো জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য ও আলোচনার দ্বারা অর্জিত হয়। এছাড়া সাধারণ মুসলমানদের উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম ভাইকে ভুল কাজ করতে দেখো, তাহলে তাকে সেটা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো। যদি সক্ষম হও তাহলে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দাও। আর তা সম্ভব না হলে মৌখিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করো। এটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সর্বনিম্ন স্তর হলো, তুমি তার কৃতকর্মকে অন্তর থেকে মন্দ মনে করো।
হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার পদ্ধতি দুটি। একটি শাসকদের জন্য, যারা আইনের বলে মন্দ কাজ থেকে বাধা দিতে পারে। দ্বিতীয়টি স্বীয় আত্মীয়-বন্ধু অথবা সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। আর মৌখিক বারণ সহমর্মিতার সাথে সকলের ক্ষেত্রেই করা যায়।
একটু ভাবুন, যখন প্রতিটি মুসলমান এই নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছে যে, দ্বীনের যে মাসআলা সম্পর্কে সে অবগত রয়েছে, তার বিপরীত কাউকে কিছু করতে দেখলে সেই কাজ থেকে বিরত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করবে।
তাহলে এই নির্দেশনার উপর আমলের বরকতে কত সহজে একেবারে বিনামূল্যে; বরং আবশ্যিকভাবে দ্বীনী শিক্ষার প্রসার হয়ে যায়।
নামায তো ঘরেও আদায় করা যেত। কিন্তু তার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়ার মাঝে শিক্ষাদীক্ষার একটি বড় উপকারিতা নিহিত রয়েছে যে, এর ফলে প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের পক্ষে আয়নার ভূমিকা রেখে ভুলগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পারবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুরো জাতির তাত্ত্বিকশিক্ষা ও পাশাপাশি তার বাস্তব অনুশীলন কতটা সহজেই সম্ভব হচ্ছে। যা না কোনো স্কুলে সম্ভব হতো, না কোনো মাদরাসায়।
তবে এই হুকুমের পাশাপাশি এ কথাটিও খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, অপরকে তার ভুল সম্পর্কে অবহিত করার ক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও কল্যাণকামী মনোভাব থাকতে হবে। নম্রতার সাথে একাকিত্বে বোঝাতে হবে। যাতে তার মনে আঘাত না লাগে এবং সে জিদ করে না বসে।
কুরআনুল কারীম যেখানেই মুসলমানদের সত্যের পথে দাওয়াতের নির্দেশ করেছে, সেখানেই এই শর্তগুলো আরোপ করেছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে।'
অর্থাৎ প্রভুর পথের দিকে মানুষকে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের সাথে আহ্বান করো। প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য—কথা বলার পূর্বে এটি ভাবা যে, শ্রোতাকে এই কথা কোন সময়, কোন অবস্থায়, কোন শিরোনামে বললে তার অন্তরে সাড়া পড়বে। এরপর বিষয়টি কল্যাণকামিতার সাথে উপস্থাপন করা উচিত, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ বা অন্যকে অপমান করা উদ্দেশ্য হতে পারবে না। এজন্য আয়াতে مَوْعِظَة (উপদেশ) এর সাথে حَسَنَة (উত্তম) এর শর্তটি বৃদ্ধি করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মুসলমানদের ব্যাপক মূর্খতা ও গাফিলতি ইসলামের যে মূলনীতিগুলোকে অকেজো করে দিয়েছে, তার একটি এও যে, একতো কেউ কাউকে মন্দ কাজে সতর্ক করে না। আর কেউ সতর্ক করতে উদ্যোগী হলেও উল্লিখিত আদব ও শর্তাবলী রক্ষা করা হয় না। ফলে শিক্ষা ও সংশোধনের এই সোনালী মূলনীতিগুলো মসজিদ ও মাহফিলসমূহে উল্টো ঝগড়া বিবাদ, অনৈক্য ও বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এটা কেবল দ্বীনী বিষয়গুলোর সাথেই সম্পৃক্ত নয়; বরং সমস্ত পার্থিব বিষয়েও সবসময়ের অভিজ্ঞতা এই যে, উত্তম থেকে উত্তম বলবর্ধক খাবার অথবা ওষুধ যদি ভুল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা উপকারের পরিবর্তে আরও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
সারকথা, দোজাহানের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী যদি যথাযথ আমল করা হয়, তাহলে শিশুর জন্য মায়ের কোল ও তার ঘরই সর্বোত্তম প্রাথমিক শিক্ষালয়ে পরিণত হবে এবং প্রতিটি মসজিদ নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষার আদর্শ বিদ্যালয় হবে, যেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি তার প্রয়োগ এবং শিক্ষার পাশাপাশি চারিত্রিক ও মানসিক গঠনও সম্পন্ন হয়ে যাবে। এবং শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো, সে পথের ধাপগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হওয়া আরম্ভ হয়।

টিকাঃ
২২. সূরা নাহ্‌ল, আয়াত ১২৫

ইসলামের শিক্ষা ও দীক্ষা ব্যবস্থায় দৃষ্টি দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষাবোর্ড ও এর দপ্তরসমূহ, এতে কর্মরত লোকদের সংখ্যা এবং প্রাইমারি স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত যেই অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তার বিশালতা ও এর পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং এই ব্যয়বহুল খরচে শিক্ষা গ্রহণকারীদের লেখাপড়াকেন্দ্রিক খরচের দীর্ঘ ফিরিস্তির প্রতি চোখ রাখুন। এরপর এত কিছু সত্ত্বেও এর ফলাফল তুলনা করুন। যে জ্ঞান ও শাস্ত্র তাদের পাঠ দান করা হয়, সেগুলোতে তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা গড়ে কত শতাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে এবং এই শিক্ষা তাদের চরিত্র ও কার্যক্রমকে কেমন বানাচ্ছে।
এরপর দার্শনিকদের সরদার সায়্যিদুল আম্বিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা দেখুন, সেটি কত স্বভাবজাত ও সহজ-সরল মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সরকারের বড় ধরনের কোনো ব্যয় নেই, আবার ছাত্রের উপরও এক পয়সার বোঝা চাপানো নেই। যেমনটি বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কয়েক পৃষ্ঠা পূর্বে আপনি নতুন প্রজন্ম এবং বাচ্চাদের শিক্ষাদীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ তুলনা থেকে প্রত্যেক পাঠক এই ফলাফলে পৌঁছে যাবেন যে, প্রতিটি মুসলমানের ঘর বাচ্চাদের জন্য প্রাইমারি স্কুল (প্রাথমিক বিদ্যালয়)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ঘরগুলোকে একেকটি প্রাইমারি স্কুলে পরিণত করেছেন। যেখানে অবচেতন মনে ছোট ছোট শিশুরা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন হবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করতে পারে। বাচ্চার বয়স যখন সাতে পড়বে তখন সহজাতভাবেই সে পাক-নাপাকের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। এ সময় পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ হলো, তাকে নামায পড়া শেখাও, সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাও। কারণ মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে।
যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষালয়ের ভূমিকা পালন করে। যেখানে সব ধরনের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা একত্রিত হয় এবং তাদের ওয়ায-নসীহত অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সান্নিধ্য-সংশ্রবে শিশুর মনে অবচেতনেই এমনসব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্বার উম্মোচিত হতে থাকে, যা বহু গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমেও সম্ভব হয় না।
এই শিক্ষা তো জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য ও আলোচনার দ্বারা অর্জিত হয়। এছাড়া সাধারণ মুসলমানদের উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম ভাইকে ভুল কাজ করতে দেখো, তাহলে তাকে সেটা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো। যদি সক্ষম হও তাহলে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দাও। আর তা সম্ভব না হলে মৌখিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করো। এটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সর্বনিম্ন স্তর হলো, তুমি তার কৃতকর্মকে অন্তর থেকে মন্দ মনে করো।
হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার পদ্ধতি দুটি। একটি শাসকদের জন্য, যারা আইনের বলে মন্দ কাজ থেকে বাধা দিতে পারে। দ্বিতীয়টি স্বীয় আত্মীয়-বন্ধু অথবা সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। আর মৌখিক বারণ সহমর্মিতার সাথে সকলের ক্ষেত্রেই করা যায়।
একটু ভাবুন, যখন প্রতিটি মুসলমান এই নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছে যে, দ্বীনের যে মাসআলা সম্পর্কে সে অবগত রয়েছে, তার বিপরীত কাউকে কিছু করতে দেখলে সেই কাজ থেকে বিরত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করবে।
তাহলে এই নির্দেশনার উপর আমলের বরকতে কত সহজে একেবারে বিনামূল্যে; বরং আবশ্যিকভাবে দ্বীনী শিক্ষার প্রসার হয়ে যায়।
নামায তো ঘরেও আদায় করা যেত। কিন্তু তার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়ার মাঝে শিক্ষাদীক্ষার একটি বড় উপকারিতা নিহিত রয়েছে যে, এর ফলে প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের পক্ষে আয়নার ভূমিকা রেখে ভুলগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পারবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুরো জাতির তাত্ত্বিকশিক্ষা ও পাশাপাশি তার বাস্তব অনুশীলন কতটা সহজেই সম্ভব হচ্ছে। যা না কোনো স্কুলে সম্ভব হতো, না কোনো মাদরাসায়।
তবে এই হুকুমের পাশাপাশি এ কথাটিও খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, অপরকে তার ভুল সম্পর্কে অবহিত করার ক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও কল্যাণকামী মনোভাব থাকতে হবে। নম্রতার সাথে একাকিত্বে বোঝাতে হবে। যাতে তার মনে আঘাত না লাগে এবং সে জিদ করে না বসে।
কুরআনুল কারীম যেখানেই মুসলমানদের সত্যের পথে দাওয়াতের নির্দেশ করেছে, সেখানেই এই শর্তগুলো আরোপ করেছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে।'
অর্থাৎ প্রভুর পথের দিকে মানুষকে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের সাথে আহ্বান করো। প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য—কথা বলার পূর্বে এটি ভাবা যে, শ্রোতাকে এই কথা কোন সময়, কোন অবস্থায়, কোন শিরোনামে বললে তার অন্তরে সাড়া পড়বে। এরপর বিষয়টি কল্যাণকামিতার সাথে উপস্থাপন করা উচিত, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ বা অন্যকে অপমান করা উদ্দেশ্য হতে পারবে না। এজন্য আয়াতে مَوْعِظَة (উপদেশ) এর সাথে حَسَنَة (উত্তম) এর শর্তটি বৃদ্ধি করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মুসলমানদের ব্যাপক মূর্খতা ও গাফিলতি ইসলামের যে মূলনীতিগুলোকে অকেজো করে দিয়েছে, তার একটি এও যে, একতো কেউ কাউকে মন্দ কাজে সতর্ক করে না। আর কেউ সতর্ক করতে উদ্যোগী হলেও উল্লিখিত আদব ও শর্তাবলী রক্ষা করা হয় না। ফলে শিক্ষা ও সংশোধনের এই সোনালী মূলনীতিগুলো মসজিদ ও মাহফিলসমূহে উল্টো ঝগড়া বিবাদ, অনৈক্য ও বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এটা কেবল দ্বীনী বিষয়গুলোর সাথেই সম্পৃক্ত নয়; বরং সমস্ত পার্থিব বিষয়েও সবসময়ের অভিজ্ঞতা এই যে, উত্তম থেকে উত্তম বলবর্ধক খাবার অথবা ওষুধ যদি ভুল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা উপকারের পরিবর্তে আরও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
সারকথা, দোজাহানের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী যদি যথাযথ আমল করা হয়, তাহলে শিশুর জন্য মায়ের কোল ও তার ঘরই সর্বোত্তম প্রাথমিক শিক্ষালয়ে পরিণত হবে এবং প্রতিটি মসজিদ নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষার আদর্শ বিদ্যালয় হবে, যেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি তার প্রয়োগ এবং শিক্ষার পাশাপাশি চারিত্রিক ও মানসিক গঠনও সম্পন্ন হয়ে যাবে। এবং শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো, সে পথের ধাপগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হওয়া আরম্ভ হয়।

টিকাঃ
২২. সূরা নাহ্‌ল, আয়াত ১২৫

ইসলামের শিক্ষা ও দীক্ষা ব্যবস্থায় দৃষ্টি দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষাবোর্ড ও এর দপ্তরসমূহ, এতে কর্মরত লোকদের সংখ্যা এবং প্রাইমারি স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত যেই অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তার বিশালতা ও এর পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং এই ব্যয়বহুল খরচে শিক্ষা গ্রহণকারীদের লেখাপড়াকেন্দ্রিক খরচের দীর্ঘ ফিরিস্তির প্রতি চোখ রাখুন। এরপর এত কিছু সত্ত্বেও এর ফলাফল তুলনা করুন। যে জ্ঞান ও শাস্ত্র তাদের পাঠ দান করা হয়, সেগুলোতে তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা গড়ে কত শতাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে এবং এই শিক্ষা তাদের চরিত্র ও কার্যক্রমকে কেমন বানাচ্ছে।
এরপর দার্শনিকদের সরদার সায়্যিদুল আম্বিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা দেখুন, সেটি কত স্বভাবজাত ও সহজ-সরল মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সরকারের বড় ধরনের কোনো ব্যয় নেই, আবার ছাত্রের উপরও এক পয়সার বোঝা চাপানো নেই। যেমনটি বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কয়েক পৃষ্ঠা পূর্বে আপনি নতুন প্রজন্ম এবং বাচ্চাদের শিক্ষাদীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ তুলনা থেকে প্রত্যেক পাঠক এই ফলাফলে পৌঁছে যাবেন যে, প্রতিটি মুসলমানের ঘর বাচ্চাদের জন্য প্রাইমারি স্কুল (প্রাথমিক বিদ্যালয়)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ঘরগুলোকে একেকটি প্রাইমারি স্কুলে পরিণত করেছেন। যেখানে অবচেতন মনে ছোট ছোট শিশুরা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন হবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করতে পারে। বাচ্চার বয়স যখন সাতে পড়বে তখন সহজাতভাবেই সে পাক-নাপাকের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। এ সময় পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ হলো, তাকে নামায পড়া শেখাও, সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাও। কারণ মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে।
যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষালয়ের ভূমিকা পালন করে। যেখানে সব ধরনের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা একত্রিত হয় এবং তাদের ওয়ায-নসীহত অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সান্নিধ্য-সংশ্রবে শিশুর মনে অবচেতনেই এমনসব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্বার উম্মোচিত হতে থাকে, যা বহু গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমেও সম্ভব হয় না।
এই শিক্ষা তো জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য ও আলোচনার দ্বারা অর্জিত হয়। এছাড়া সাধারণ মুসলমানদের উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম ভাইকে ভুল কাজ করতে দেখো, তাহলে তাকে সেটা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো। যদি সক্ষম হও তাহলে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দাও। আর তা সম্ভব না হলে মৌখিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করো। এটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সর্বনিম্ন স্তর হলো, তুমি তার কৃতকর্মকে অন্তর থেকে মন্দ মনে করো।
হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার পদ্ধতি দুটি। একটি শাসকদের জন্য, যারা আইনের বলে মন্দ কাজ থেকে বাধা দিতে পারে। দ্বিতীয়টি স্বীয় আত্মীয়-বন্ধু অথবা সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। আর মৌখিক বারণ সহমর্মিতার সাথে সকলের ক্ষেত্রেই করা যায়।
একটু ভাবুন, যখন প্রতিটি মুসলমান এই নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছে যে, দ্বীনের যে মাসআলা সম্পর্কে সে অবগত রয়েছে, তার বিপরীত কাউকে কিছু করতে দেখলে সেই কাজ থেকে বিরত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করবে।
তাহলে এই নির্দেশনার উপর আমলের বরকতে কত সহজে একেবারে বিনামূল্যে; বরং আবশ্যিকভাবে দ্বীনী শিক্ষার প্রসার হয়ে যায়।
নামায তো ঘরেও আদায় করা যেত। কিন্তু তার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়ার মাঝে শিক্ষাদীক্ষার একটি বড় উপকারিতা নিহিত রয়েছে যে, এর ফলে প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের পক্ষে আয়নার ভূমিকা রেখে ভুলগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পারবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুরো জাতির তাত্ত্বিকশিক্ষা ও পাশাপাশি তার বাস্তব অনুশীলন কতটা সহজেই সম্ভব হচ্ছে। যা না কোনো স্কুলে সম্ভব হতো, না কোনো মাদরাসায়।
তবে এই হুকুমের পাশাপাশি এ কথাটিও খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, অপরকে তার ভুল সম্পর্কে অবহিত করার ক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও কল্যাণকামী মনোভাব থাকতে হবে। নম্রতার সাথে একাকিত্বে বোঝাতে হবে। যাতে তার মনে আঘাত না লাগে এবং সে জিদ করে না বসে।
কুরআনুল কারীম যেখানেই মুসলমানদের সত্যের পথে দাওয়াতের নির্দেশ করেছে, সেখানেই এই শর্তগুলো আরোপ করেছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে।'
অর্থাৎ প্রভুর পথের দিকে মানুষকে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের সাথে আহ্বান করো। প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য—কথা বলার পূর্বে এটি ভাবা যে, শ্রোতাকে এই কথা কোন সময়, কোন অবস্থায়, কোন শিরোনামে বললে তার অন্তরে সাড়া পড়বে। এরপর বিষয়টি কল্যাণকামিতার সাথে উপস্থাপন করা উচিত, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ বা অন্যকে অপমান করা উদ্দেশ্য হতে পারবে না। এজন্য আয়াতে مَوْعِظَة (উপদেশ) এর সাথে حَسَنَة (উত্তম) এর শর্তটি বৃদ্ধি করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মুসলমানদের ব্যাপক মূর্খতা ও গাফিলতি ইসলামের যে মূলনীতিগুলোকে অকেজো করে দিয়েছে, তার একটি এও যে, একতো কেউ কাউকে মন্দ কাজে সতর্ক করে না। আর কেউ সতর্ক করতে উদ্যোগী হলেও উল্লিখিত আদব ও শর্তাবলী রক্ষা করা হয় না। ফলে শিক্ষা ও সংশোধনের এই সোনালী মূলনীতিগুলো মসজিদ ও মাহফিলসমূহে উল্টো ঝগড়া বিবাদ, অনৈক্য ও বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এটা কেবল দ্বীনী বিষয়গুলোর সাথেই সম্পৃক্ত নয়; বরং সমস্ত পার্থিব বিষয়েও সবসময়ের অভিজ্ঞতা এই যে, উত্তম থেকে উত্তম বলবর্ধক খাবার অথবা ওষুধ যদি ভুল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা উপকারের পরিবর্তে আরও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
সারকথা, দোজাহানের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী যদি যথাযথ আমল করা হয়, তাহলে শিশুর জন্য মায়ের কোল ও তার ঘরই সর্বোত্তম প্রাথমিক শিক্ষালয়ে পরিণত হবে এবং প্রতিটি মসজিদ নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষার আদর্শ বিদ্যালয় হবে, যেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি তার প্রয়োগ এবং শিক্ষার পাশাপাশি চারিত্রিক ও মানসিক গঠনও সম্পন্ন হয়ে যাবে। এবং শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো, সে পথের ধাপগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হওয়া আরম্ভ হয়।

টিকাঃ
২২. সূরা নাহ্‌ল, আয়াত ১২৫

ইসলামের শিক্ষা ও দীক্ষা ব্যবস্থায় দৃষ্টি দেওয়ার পূর্বে বর্তমান বিশ্বের শিক্ষাবোর্ড ও এর দপ্তরসমূহ, এতে কর্মরত লোকদের সংখ্যা এবং প্রাইমারি স্কুল থেকে ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত যেই অবকাঠামো দাঁড়িয়ে আছে, তার বিশালতা ও এর পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় এবং এই ব্যয়বহুল খরচে শিক্ষা গ্রহণকারীদের লেখাপড়াকেন্দ্রিক খরচের দীর্ঘ ফিরিস্তির প্রতি চোখ রাখুন। এরপর এত কিছু সত্ত্বেও এর ফলাফল তুলনা করুন। যে জ্ঞান ও শাস্ত্র তাদের পাঠ দান করা হয়, সেগুলোতে তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা গড়ে কত শতাংশ শিক্ষার্থীর মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে এবং এই শিক্ষা তাদের চরিত্র ও কার্যক্রমকে কেমন বানাচ্ছে।
এরপর দার্শনিকদের সরদার সায়্যিদুল আম্বিয়া নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থা দেখুন, সেটি কত স্বভাবজাত ও সহজ-সরল মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যেখানে সরকারের বড় ধরনের কোনো ব্যয় নেই, আবার ছাত্রের উপরও এক পয়সার বোঝা চাপানো নেই। যেমনটি বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে কয়েক পৃষ্ঠা পূর্বে আপনি নতুন প্রজন্ম এবং বাচ্চাদের শিক্ষাদীক্ষার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন।
এ তুলনা থেকে প্রত্যেক পাঠক এই ফলাফলে পৌঁছে যাবেন যে, প্রতিটি মুসলমানের ঘর বাচ্চাদের জন্য প্রাইমারি স্কুল (প্রাথমিক বিদ্যালয়)। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলমানদের ঘরগুলোকে একেকটি প্রাইমারি স্কুলে পরিণত করেছেন। যেখানে অবচেতন মনে ছোট ছোট শিশুরা বোধবুদ্ধিসম্পন্ন হবার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় শিক্ষা লাভ করতে পারে। বাচ্চার বয়স যখন সাতে পড়বে তখন সহজাতভাবেই সে পাক-নাপাকের পার্থক্য বুঝতে শুরু করে। এ সময় পিতা-মাতার প্রতি নির্দেশ হলো, তাকে নামায পড়া শেখাও, সাথে করে মসজিদে নিয়ে যাও। কারণ মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা পালন করে।
যদি আমরা চিন্তা করি, তাহলে দেখতে পাব যে, আমাদের মসজিদগুলো নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষালয়ের ভূমিকা পালন করে। যেখানে সব ধরনের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিরা একত্রিত হয় এবং তাদের ওয়ায-নসীহত অনুষ্ঠিত হয়। তাদের সান্নিধ্য-সংশ্রবে শিশুর মনে অবচেতনেই এমনসব জ্ঞান ও প্রজ্ঞার দ্বার উম্মোচিত হতে থাকে, যা বহু গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমেও সম্ভব হয় না।
এই শিক্ষা তো জ্ঞানী-গুণীদের সান্নিধ্য ও আলোচনার দ্বারা অর্জিত হয়। এছাড়া সাধারণ মুসলমানদের উপর নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দায়িত্ব অর্পণ করেছেন যে, যদি কোনো মুসলিম ভাইকে ভুল কাজ করতে দেখো, তাহলে তাকে সেটা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করো। যদি সক্ষম হও তাহলে হাত তথা শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বাধা দাও। আর তা সম্ভব না হলে মৌখিকভাবে বোঝানোর চেষ্টা করো। এটাও যদি সম্ভব না হয়, তাহলে সর্বনিম্ন স্তর হলো, তুমি তার কৃতকর্মকে অন্তর থেকে মন্দ মনে করো।
হাত দিয়ে বাধা দেওয়ার পদ্ধতি দুটি। একটি শাসকদের জন্য, যারা আইনের বলে মন্দ কাজ থেকে বাধা দিতে পারে। দ্বিতীয়টি স্বীয় আত্মীয়-বন্ধু অথবা সন্তান-সন্ততির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাদের উপর তার কর্তৃত্ব রয়েছে। আর মৌখিক বারণ সহমর্মিতার সাথে সকলের ক্ষেত্রেই করা যায়।
একটু ভাবুন, যখন প্রতিটি মুসলমান এই নির্দেশপ্রাপ্ত হয়েছে যে, দ্বীনের যে মাসআলা সম্পর্কে সে অবগত রয়েছে, তার বিপরীত কাউকে কিছু করতে দেখলে সেই কাজ থেকে বিরত রাখার যথাসম্ভব চেষ্টা করবে।
তাহলে এই নির্দেশনার উপর আমলের বরকতে কত সহজে একেবারে বিনামূল্যে; বরং আবশ্যিকভাবে দ্বীনী শিক্ষার প্রসার হয়ে যায়।
নামায তো ঘরেও আদায় করা যেত। কিন্তু তার জন্য মসজিদে একত্রিত হওয়ার মাঝে শিক্ষাদীক্ষার একটি বড় উপকারিতা নিহিত রয়েছে যে, এর ফলে প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের পক্ষে আয়নার ভূমিকা রেখে ভুলগুলো সম্পর্কে অবহিত করতে পারবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, পুরো জাতির তাত্ত্বিকশিক্ষা ও পাশাপাশি তার বাস্তব অনুশীলন কতটা সহজেই সম্ভব হচ্ছে। যা না কোনো স্কুলে সম্ভব হতো, না কোনো মাদরাসায়।
তবে এই হুকুমের পাশাপাশি এ কথাটিও খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরী যে, অপরকে তার ভুল সম্পর্কে অবহিত করার ক্ষেত্রে সহমর্মিতা ও কল্যাণকামী মনোভাব থাকতে হবে। নম্রতার সাথে একাকিত্বে বোঝাতে হবে। যাতে তার মনে আঘাত না লাগে এবং সে জিদ করে না বসে।
কুরআনুল কারীম যেখানেই মুসলমানদের সত্যের পথে দাওয়াতের নির্দেশ করেছে, সেখানেই এই শর্তগুলো আরোপ করেছে—
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ
'তুমি নিজ প্রতিপালকের পথে মানুষকে ডাকবে হিকমত ও সদুপদেশের মাধ্যমে।'
অর্থাৎ প্রভুর পথের দিকে মানুষকে প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের সাথে আহ্বান করো। প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য—কথা বলার পূর্বে এটি ভাবা যে, শ্রোতাকে এই কথা কোন সময়, কোন অবস্থায়, কোন শিরোনামে বললে তার অন্তরে সাড়া পড়বে। এরপর বিষয়টি কল্যাণকামিতার সাথে উপস্থাপন করা উচিত, নিজের বড়ত্ব প্রকাশ বা অন্যকে অপমান করা উদ্দেশ্য হতে পারবে না। এজন্য আয়াতে مَوْعِظَة (উপদেশ) এর সাথে حَسَنَة (উত্তম) এর শর্তটি বৃদ্ধি করে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
মুসলমানদের ব্যাপক মূর্খতা ও গাফিলতি ইসলামের যে মূলনীতিগুলোকে অকেজো করে দিয়েছে, তার একটি এও যে, একতো কেউ কাউকে মন্দ কাজে সতর্ক করে না। আর কেউ সতর্ক করতে উদ্যোগী হলেও উল্লিখিত আদব ও শর্তাবলী রক্ষা করা হয় না। ফলে শিক্ষা ও সংশোধনের এই সোনালী মূলনীতিগুলো মসজিদ ও মাহফিলসমূহে উল্টো ঝগড়া বিবাদ, অনৈক্য ও বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর এটা কেবল দ্বীনী বিষয়গুলোর সাথেই সম্পৃক্ত নয়; বরং সমস্ত পার্থিব বিষয়েও সবসময়ের অভিজ্ঞতা এই যে, উত্তম থেকে উত্তম বলবর্ধক খাবার অথবা ওষুধ যদি ভুল পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা উপকারের পরিবর্তে আরও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
সারকথা, দোজাহানের সর্দার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা অনুযায়ী যদি যথাযথ আমল করা হয়, তাহলে শিশুর জন্য মায়ের কোল ও তার ঘরই সর্বোত্তম প্রাথমিক শিক্ষালয়ে পরিণত হবে এবং প্রতিটি মসজিদ নিম্নমাধ্যমিক শিক্ষার আদর্শ বিদ্যালয় হবে, যেখানে জ্ঞানের পাশাপাশি তার প্রয়োগ এবং শিক্ষার পাশাপাশি চারিত্রিক ও মানসিক গঠনও সম্পন্ন হয়ে যাবে। এবং শিক্ষার আসল যে উদ্দেশ্য অর্থাৎ মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ বানানো, সে পথের ধাপগুলো ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হওয়া আরম্ভ হয়।

টিকাঃ
২২. সূরা নাহ্‌ল, আয়াত ১২৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00