📄 ওহী: আল্লাহর পক্ষ থেকে আগত ঐশী বাণীর বিভিন্ন রূপ
ইবনুল কায়্যিম ওয়াহীর বিভিন্ন প্রকার নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি অসাধারণ একজন আলিম, ইবনে তাইমিয়ার ছাত্রদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত। তিনি বলেন, প্রথম প্রকারের ওয়াহী হলো সত্য স্বপ্ন। এই উপায়েই রাসূল ﷺ প্রথম ওয়াহী লাভ করা শুরু করেন। জিবরীল কর্তৃক ওয়াহী নাযিলের পূর্বে টানা ছয় মাস ধরে রাসূল ﷺ নিয়মিত স্বপ্ন দেখতেন। রাতের বেলায় যে স্বপ্ন দেখতেন, পরদিন দিনের বেলায় সে স্বপ্ন সত্যি হতো, এইভাবে চলেছিল প্রায় ছয় মাস!
ওয়াহীর প্রথম প্রকার: স্বপ্ন
রাসূল ﷺ বলেছেন, যেসব স্বপ্ন সত্য, সেগুলো নবুওয়াতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। রাসূল ﷺ এর নবুওয়াতের জীবন ছিল তেইশ বছর দীর্ঘ, আর তিনি সত্য স্বপ্ন দেখেছেন ছয় মাস ধরে। তেইশ বছর সময়টাকে ছয় মাস দিয়ে ভাগ করলে অনুপাত দাঁড়ায় ১: ৪৬, ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ। স্বপ্ন কেবল নবীরা নন, যে কেউই দেখে থাকে। পার্থক্য হলো এই-নবীদের স্বপ্ন এক ধরনের ওয়াহী হিসেবে বিবেচিত, অন্যদেরটা তা নয়। সাধারণ মানুষদের দেখা স্বপ্নের ব্যাপারে রাসূল ﷺ তিনটি প্রকারভেদ বলেছেন,
১) সত্য স্বপ্ন: এ ধরনের স্বপ্ন সত্যি হয় অথবা যে ব্যাখ্যা দেওয়া হয় সে ব্যাখ্যা অনুসারে এই স্বপ্ন সত্যি হয়।
২) শয়তানের পক্ষ থেকে স্বপ্ন: রাসূল ﷺ বলেন, 'এই স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে এবং সে তোমাদের ক্ষতি করতে চায়।' রাসূল ﷺ বলেন, 'যদি এমন স্বপ্ন দেখ, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা কর এবং এই স্বপ্নের কথা কাউকে বলবে না।' কারণ, শয়তান চায় আমরা খারাপ স্বপ্ন দেখে চিন্তিত হয়ে পড়ি আর মানুষকে বলে বেড়াই। রাসূল ﷺ বলেছেন এসব স্বপ্নের কথা কাউকে না বলতে, আর সেগুলো ভুলে যেতে।
৩) সাধারণ স্বপ্ন: এমন স্বপ্ন যা নিয়ে মানুষ দিনের বেলা ভাবে এবং রাতের বেলায় তা স্বপ্নে দেখতে পায়, এ স্বপ্নগুলো বস্তুত নিজের ভাবনার প্রতিফলন, যা নফস থেকে আসে।
ওয়াহীর দ্বিতীয় প্রকার
এই প্রকার হলো ফেরেশতাদের মাধ্যমে রাসূলের ওপর ওয়াহী নাযিল হয় কিন্তু জিবরীল সরাসরি মুহাম্মাদের সামনে হাজির হন না। যেমন রাসূল ﷺ বলেন, সেই মহান আত্মা (জিবরীল) আমাকে জানিয়েছেন, 'নির্দিষ্ট করে রাখা সময়ের আগে কারো মৃত্যু ঘটবে না। তাই আল্লাহকে ভয় করো এবং বিনীতভাবে তাঁর কাছে চাও। অধৈর্য হয়ে আল্লাহর অবাধ্যতার দিকে চলে যেও না। আল্লাহর আনুগত্য করা ছাড়া আল্লাহর নিআমত অর্জন করা সম্ভব নয়।'
ওয়াহীর তৃতীয় প্রকার
এই প্রকারের ওয়াহী নাযিলের সময় ফেরেশতা মুহাম্মাদের সামনে মানুষের আকৃতি নিয়ে হাজির হন। এর উদাহরণ হলো হাদীসে জিবরীল, জিবরীল মানুষের বেশে এসেছিলেন আর তাঁকে মুহাম্মাদ এবং অন্যরা দেখেছিলেন।
ওয়াহীর চতুর্থ প্রকার
ফেরেশতা ঘন্টার মতো শব্দ করে আসতেন। এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন আবির্ভাব। জিবরীল তখন রাসূলকে শক্ত করে চেপে ধরতেন, শীতের দিনেও নবীজির ঘাম ছুটে যেতো। জিবরীল তাঁর ওপরে উঠে বসতেন, তাই রাসূল অস্বাভাবিক ভার অনুভব করতেন। আর সেই সাথে শুনতেন ঘন্টা বাজার আওয়াজ পেতেন, সম্ভবত সেটি ছিল জিবরীলের পাখার কম্পনের শব্দ। একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, 'যখন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর আদেশ প্রেরণ করেন, তখন ফেরেশতারা এতটাই বিনয়াবত হয়ে পড়ে যে তাদের পাখাগুলো কাঁপতে থাকে এবং সেই পাখা কাঁপার শব্দ শুনতে পাথরের ওপর চেইন টেনে নিয়ে যাওয়ার আওয়াজের মতো শোনায়।'
জিবরীল যখন এই রূপে রাসূলুল্লাহর ﷺ নিকটে আসতেন, তখন রাসূলুল্লাহর ﷺ ওজন বেড়ে যেতো। দেখা যেতো, তিনি উটের উপর বসে আছেন, আর জিবরীল এসেছেন, তখন প্রবল চাপের ফলে বাধ্য হয়ে উট পর্যন্ত হাঁটু গেড়ে মাটিতে বসে পড়ত। যাইদ ইবন হারিসা বলেন, "একদিন নবীজি বসে ছিলেন। আমার পায়ের উপর তাঁর হাঁটু রাখা ছিল। এমতাবস্থায় ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়। আমি তখন নবীজির হাঁটুর তীব্র চাপ অনুভব করি। আমার উরু যেন প্রচণ্ড চাপে দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল।"
ওয়াহীর পঞ্চম প্রকার
এই প্রকারের ওয়াহী নাযিলের সময় ফেরেশতা তার স্বরূপে আগমন করেন। এরকম দু'বার হয়েছিল। সূরা নাজমে এর উল্লেখ আছে।
“নিশ্চয় সে তাঁকে আরেকবার দেখেছিল, দূরদিগন্তের সিদরাহ-গাছের কাছে..." (সূরা নাজম, ৫৩: ১৩-১৪)
জিবরীলের পাখা এত বড় ছিল যে সেগুলো দিগন্ত ছেয়ে ফেলত, রাসূল ﷺ বলেছেন, যখন জিবরীল তার স্বরূপে আসতেন, 'তিনি যেদিকেই তাকাতেন, সেদিকেই জিবরীলের পাখা দেখতে পেতেন।'
ওয়াহীর ষষ্ঠ প্রকার
এই প্রকারের ওয়াহীতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নিজে সরাসরি রাসূলুল্লাহর ﷺ সাথে কথা বলেছেন, কোনো মাধ্যম ছাড়াই। এটা হয়েছিল আল-মিরাজের সময়। মুসার সাথেও আল্লাহ এভাবে কথা বলেছিলেন। এই ছয় ভাবেই নবীজির কাছে ওয়াহী নাযিল হয়েছে। এক এক সময় এক এক ভাবে। নবীজির কাছে জিবরীল তাঁর নিজ রূপে কেবল দুবারই এসেছিলেন।
📄 অগ্রগামী মুসলিমগণ
খাদিজা ছিলেন ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে সর্বপ্রথম। তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত নবীজিকে সাহায্য-সহযোগিতা করে যান। ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম দাস হলেন যাইদ ইবন হারিসা, ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম শিশু হলেন আলী ইবন আবি তালিব এবং ইসলাম গ্রহণকারী সর্বপ্রথম পুরুষ হলেন আবু বকর সিদ্দীক্ব। তবে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম পুরুষ কে তা নিয়ে আলিমদের মধ্যে মতবিরোধ আছে। কেউ বলেন আবু বকর, কেউ বলেন আলী ইবন আবি তালিব। ইবন হাজার আল-আসকালানী এ মতবিরোধটি সমাধানের চেষ্টা করেন, তাঁর মতে, ইসলাম গ্রহণকারী সর্বপ্রথম পুরুষ আবু বকর, কেননা, আলী ইবন আবি তালিব বড়ই হয়েছেন নবুওয়াতের ঘরে, তিনি মক্কার কুরাইশদের ধর্ম গ্রহণই করেননি। ছোটবেলা থেকেই তিনি মুসলিম হিসেবে বড় হয়েছেন, তাই তাঁর অমুসলিম অবস্থা থেকে মুসলিম হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
আবু বকর দাসদেরকে মুক্ত করা ছাড়াও নানানভাবে ইসলামের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন, তিনি ছিলেন অনেক ধনী এবং কুরাইশদের মধ্যে একজন সম্মানিত ব্যক্তি। আল্লাহর রাস্তায় সম্পদ দান করার জন্য তিনি অনেক নন্দিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সমাজের প্রভাবশালী লোকেদের একজন। সমস্ত সম্পদ ইসলামের উপকারে ব্যয় করে দিয়েছিলেন। তাঁর সব সম্পদ, জ্ঞান ঢেলে দিয়েছিলেন নবী করীমের সেবায়। তিনি ছিলেন ইসলামের একজন মিশনারী। আর এ কারণেই তাঁকে বলা হয় 'সিদ্দীক', তিনি ছিলেন মু'মিন পুরুষদের মধ্যে প্রথম জন। সিদ্দীক মানে যে বিশ্বাস করেছে। লোকেরা রাসূলুল্লাহকে অবিশ্বাস করেছিল, আর আবু বকর তাঁকে বিশ্বাস করেছেন। বলা হয়ে থাকে, ইসলাম গ্রহণের সময়ে প্রত্যেকেই অন্তত মুহূর্তের জন্যে হলেও দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছে, কিন্তু আবু বকরের ক্ষেত্রে এমনটি হয়নি। যখনই তাঁর সামনে ইসলামকে উপস্থাপন করা হয়, তিনি সেটা সাথে সাথে গ্রহণ করেন, তাঁকে ইসলাম গ্রহণের পূর্বে দ্বিতীয়বার চিন্তা করতে হয়নি। তিনি তাঁর সমস্ত সম্পদ নিয়ে আল্লাহর রাসূলের সামনে হাজির হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন সেই স্বাধীন পুরুষ যিনি সর্বাগ্রে মুহাম্মাদকে আল্লাহর রাসূল হিসেবে দ্বিধাহীন চিত্তে মেনে নেন, তিনি হলেন সেই ব্যক্তি যিনি মিরাজের ঘটনায় সর্বপ্রথম বিশ্বাস স্থাপন করেন, তিনি হলেন সেই মুসলিম যিনি রাসূলের হিজরতের বিপদসংকুল সময়ে তাঁকে সঙ্গ দিয়েছিলেন।
রাসূলুল্লাহর সাহাবীদের মধ্যে কে সবচেয়ে বেশি আপন ছিলেন তা নিয়ে একটি হাদীস আছে: আবু দারদা বর্ণনা করেন, একবার আবু বকর এবং উমারের মধ্যে ঝগড়া হয়। এই দুইজন ছিলেন রাসূলুল্লাহর সবচে কাছের মানুষ, তাঁর উপদেষ্টা। আলী ইবন আবি তালিব বলেন, 'আমি দেখেছি, রাসূল ﷺ যখনই কোথাও যেতেন, আবু বকর ও উমারকে সাথে করে যেতেন, কোথাও থেকে আসলে তাদের সাথে করে আসতেন, যখন তিনি বসতেন তাঁর এক পাশে থাকতো আবু বকর আর আরেক পাশে উমার।'
কিন্তু তারপরেও রাসূলুল্লাহর বিশেষ টান ছিল তাদের প্রতি যারা ইসলামের একেবারে প্রথম যুগে মুসলিম হয়েছিলেন। কাজেই যখন আবু বকরের সাথে উমারের ঝগড়া হলো, রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, 'আল্লাহ তোমাদের নিকট আমাকে পাঠিয়েছেন আর তোমরা আমাকে বলেছিলে-আপনি মিথ্যা বলছেন, কিন্তু তোমাদের মধ্যে ব্যতিক্রম ছিল আবু বকর, সে আমাকে বলেছিল-আপনি সত্য বলছেন, সে নিজেকে ও তার ভাগ্যকে আমার হাতে সঁপে দিয়েছিল, এরপরেও কি তোমরা আমার এই বন্ধুকে শান্তিতে থাকতে দেবে না? দেবে না শান্তিতে থাকতে?'
📄 প্রকাশ্য দাওয়াতের শুরু
ইসলামের প্রারম্ভিক দাওয়াহ ছিল গোপন পর্যায়ে, কুরআনে আল্লাহ এই আদেশ করেছেন।
"আপনি নিকটতম আত্মীয়দেরকে সতর্ক করে দিন।” (সূরা আশ-শুআরা, ২৬: ২১৪)
এই আয়াতটি যখন নাযিল হলো তখন মুহামাদ বেরিয়ে পড়লেন এবং আস-সাফা পাহাড়ে উঠে বলে উঠলেন, "ইয়া সাবাহা!” ইয়া সাবাহা বলাটা সে যুগে ঘন্টা বা সাইরেন বাজানোর মতো একটি বিষয় ছিল। খুব গুরুতর কোনো ঘটনা হলে এই কথাটি বলা হয়। কাজেই যারাই তাঁর ডাক শুনতে পেল, তারা তার দিকে চলে গেল এবং যারা যেতে পারছিল না তারা অন্য কাউকে পাঠিয়ে দিল তিনি কী বলেন তা শুনে আসার জন্য।
যখন সবাই একত্রিত হলো, রাসূল তাদেকে জিজ্ঞেস করলেন,
-আমি যদি তোমাদেরকে বলি, এই পাহাড়ের পেছনে এক সৈন্যবাহিনী অপেক্ষা করছে তোমাদের অতর্কিতে হামলা করার জন্য, তোমরা কি তা বিশ্বাস করবে?
-আমরা তো কখনো আপনাকে মিথ্যা বলতে শুনিনি।
-আমি এসেছি তোমাদেরকে এক কঠিন শাস্তির ব্যাপারে সতর্ক করতে, যদি তোমরা বিশ্বাস না করো, তাহলে তা তোমাদের উপর আপতিত হবে।¹⁸
রাসূলুল্লাহর ﷺ এই কথাগুলোই ছিল কুরাইশদের প্রতি ইসলামের প্রথম দাওয়াহ। লক্ষণীয়, তাঁর কথাগুলো খুব সোজাসাপ্টা এবং পরিমিত। এভাবে কথা বলার কারণ হলো আল্লাহ নবীদেরকে আদেশ করেছেন স্পষ্ট বার্তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে। তাদের দায়িত্ব হলো 'বালাঘুল মুবীন', এর অর্থ হলো, ইসলামকে মানুষের সামনে অস্পষ্টভাবে, ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে, এদিক-ওদিক করে, রাখ-ঢাক রেখে, কিছুটা গোপন করে, কিছুটা প্রকাশ করে, মধু-মাখাভাবে উপস্থাপন করা যাবে না। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আজকে আমরা যখন মানুষের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দিচ্ছি, আমাদের দাওয়াতে শ্রোতাদের মনে বিভ্রান্তির জন্ম হয়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর দাওয়াতে সন্দেহের কোনো অবকাশ রাখেননি। তাঁর কথা শুনে শ্রোতারা পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল যে, যদি তারা তাঁকে বিশ্বাস করে তাহলে তারা জান্নাতে যাবে আর অবিশ্বাস করলে জাহান্নাম।
যাই হোক, রাসূলুল্লাহ ﷺ সবাইকে ডাকলেন এবং তারা ভাবলো নিশ্চয়ই খুব জরুরি এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে ডাকা হচ্ছে। বিষয়টি আসলেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল কিন্তু তা অনুধাবনের ক্ষমতা সকলের ছিল না। তাঁর আপন চাচা আবু লাহাব বলে উঠলো, 'তোমার সারা দিন মাটি হোক, এই কথা বলতে তুমি আমাদের ডেকেছ?' আবু লাহাব খুবই বিরক্ত ও রাগান্বিত হলো। কারণ তাকে তার কাজ ছেড়ে এসে এসব কথা শুনতে হয়েছিল। ব্যবসার ব্যস্ত সময়ে কেনাবেচা ছেড়ে রাসূলের কথা শোনা ছিল তার জন্য নিতান্তই গুরুত্বহীন একটি ব্যাপার। আবু লাহাবদের মতো লোকদের কাছে কাজ ফেলে জীবন, মৃত্যু, ধর্ম এবং আধ্যাত্মিকতা নিয়ে কথা শোনা সময় নষ্ট ছাড়া আর কিছুই নয়। সে ছিল প্রচণ্ড দুনিয়াবী, ওই সময়টা তার কাছে নিছকই টাকা কামানোর সময়। এমন ভাবনা তার একার নয়, মুসলিমদের মধ্যেও তার মতো অনেকেই আছে। তারা ধর্মীয় বিষয়ে কথা বলাকে স্রেফ সময় নষ্ট জ্ঞান করে, তারা শুধু সেই কাজে ও কথায় মন দেয় যা তাদেরকে দুনিয়াতে উপকার করবে। কিন্তু দুনিয়ার পরের জীবনে কী তাদের উপকারে আসবে সেটা জানার সময় তাদের হয়ে ওঠে না।
সূরা লাহাবের প্রথম দুই আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন,
"ধ্বংস হোক আবু লাহাবের উভয় হাত, আর সে নিজেও ধ্বংস হোক! তার ধন-সম্পদ ও যা সে অর্জন করেছে তা তার কোনো কাজে আসবে না।” (সূরা লাহাব, ১১১: ১-২)
আল্লাহ তাআলা বলছেন তার এই সম্পদ, অর্থ কোনো কাজেই আসবে না। যারা দুনিয়ার পেছনে ছুটে বেড়ায়, দুনিয়া তাদের কোনো কাজে আসবে না, যদি না তারা ইসলামের আলোকে জীবনযাপন করে। এই সূরাটি কুরআনের অলৌকিকত্বের একটি প্রমাণও বটে। কেননা, এই আয়াতে বলছে, আবু লাহাব ও তার স্ত্রী জাহান্নামে যাবে। এই আয়াত যখন নাযিল হয় তখন তারা বেঁচে ছিল, যদি তারা কুরআনকে ভুল প্রমাণ করতে চাইতো, তারা মুসলিম হয়ে গেলেই তা করে ফেলতে পারতো, কেননা কুরআন বলেছে তারা জাহান্নামী হবে আর তারা মুসলিম হয়ে গেলে এই কথা মিথ্যা হয়ে যায়। কিন্তু না, তারা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কাফের ছিল আর সে অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে।
টিকাঃ
১৮. 'আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭৬।
📄 ইকরা, কুম, কুম
মুহাম্মাদের উপর নাযিলকৃত সর্বপ্রথম আয়াতগুলো হলো সূরা আল আলাকের এই ক'টি আয়াত (৯৬: ১-৬)
"পড়ুন আপনার রবের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্ত থেকে। পড়ুন আপনার প্রতিপালক মহা দয়ালু। যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে (এমন জ্ঞানের), যা সে জানতো না।"
এগুলো হলো কুরআনের নাযিল হওয়া প্রথম আয়াতসমূহ। এই একটি ঘটনা রাসূলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এর পর কিছুদিন ওয়াহী আসা বন্ধ হয়ে যায়। আল্লাহর রাসূল যেন তাঁর ওপর ওয়াহী নাযিলের এই বিষয়টিকে ভালবাসতে পারেন, যেন এর অভাব বোধ করতে থাকেন-সেজন্য এই কিছুদিনের বিরতির দরকার ছিল। বাস্তবিকও তার এই অভাববোধ এতটা তীব্র আকার ধারণ করে যে, তিনি পাহাড়ের চূড়ায় গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। সূরা আল আলাকের আয়াতগুলো অবতীর্ণ হওয়ার পর নাযিল হয় সূরা মুযযাম্মিল এবং সূরা আল মুদ্দাসসিরের কিছু আয়াত। যদিও এ ব্যাপারে মতভেদ আছে যে, এ সূরা দুটির মধ্যে কোনটি আগে নাযিল হয়েছে, তবে এ ব্যাপারে সবাই একমত যে দ্বিতীয় ও তৃতীয়বারের ওয়াহীতে এ দুটো সূরা থেকেই আয়াত নাযিল হয়েছে।
দাঈ-যারা ইসলামের দিকে আহ্বান করেন, তাদের জন্য এই আয়াতগুলো একটি নির্দেশিকা বা ম্যানুয়াল বুক হিসেবে কাজ করে। এই তিনটি ওয়াহীকে সংক্ষেপে বলা যেতে পারে ইকুরা, কুম, কুম। এই আয়াতগুলোই প্রথম যুগের মুসলিমদেরকে দাওয়াহর ব্যাপারে প্রশিক্ষণ দেয়।
প্রথম আদেশটি হলো "ইকুরা"। এর মাধ্যমে তিলাওয়াত ও শেখার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। পরবর্তী আদেশটি এসেছে সূরা আল মুযযাম্মিলের দুই নম্বর আয়াতে, কুমিল লাইলা ইল্লা কুলীল-রাত্রে নামাজ পড়ো। আর সবশেষে সূরা আল মুদ্দাসসিরের দ্বিতীয় আয়াত, কুম ফা আনযির-যা রাসূলুল্লাহকে আদেশ দিচ্ছে, উঠে দাঁড়ান এবং অন্যদেরকে সতর্ক করুন। কাজেই প্রথম শিক্ষা হলো, পড়াশুনা করা, দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা। পরবর্তী ধাপ নিজের জীবনে তা বাস্তবায়িত করা, এবং তার পরের ধাপ হলো অন্যদেরকে জানানো।
ইবনুল কায়্যিম বলেন, 'দ্বীন নিজে শেখা, অন্যকে শেখানো আর আল্লাহ আযযা ওয়াজালের বার্তা প্রচার-এই তিনটি ধাপ পার না করে কেউ পরিপূর্ণ ঈমান অর্জন করতে পারে না।' প্রথম ধাপ হলো "ইক্বরা”, অর্থাৎ জানা, আর নিজে জানার পরেই কেবল অন্যকে শিক্ষা দেওয়া সম্ভব। এর পরের ধাপ "কুম ফা আনযির” উঠুন, সতর্ক করুন। আর নিজে শেখা ও অন্যকে শেখানোর সাথে সাথে যে বিষয়টি অত্যাবশ্যক, তা হলো ইবাদাহ-নফল ইবাদাহ, যেমন কিয়ামুল লাইল। প্রথম যুগের মুসলিমদের জন্য বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত কিয়ামুল লাইল বাধ্যতামূলক ছিল। পরবর্তীতে এই আদেশ মুহাম্মাদ ছাড়া অন্য সকলের জন্যে রদ বা রহিত করে দেওয়া হয়। রাসূলুল্লাহর ওপর আমরণ কিয়ামুল লাইল বাধ্যতামূলক ছিল। নিজে শেখা, অপরকে শেখানো এবং ইবাদত করা, প্রতিটি বিষয় একে অপরের পরিপূরক। একটি পরিপূর্ণ মুসলিম ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এই তিনটি বিষয় একত্রে সহায়ক হিসেবে কাজ করে।
ইসলামের বার্তা মানুষের কাছে প্রচার করা, তাদেরকে দ্বীনের শিক্ষা দেওয়া বেশ শ্রমসাধ্য ব্যাপার, এ ধরনের কাজ অন্তরকে নিঃশেষ করে ফেলতে পারে, আর তাই প্রয়োজন হয় অতিরিক্ত ইবাদত-বন্দেগীর, মধ্যরাতে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হওয়া, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা। এই ইবাদত-বন্দেগীই একজন দাঈর অন্তরকে নরম করে, আর তাকে পরবর্তী দিনের জন্য প্রস্তুত করে তোলে। যিকরের ব্যাপারেও একই কথা বলা যায়। ইবনুল কায়্যিম তাঁর শিক্ষক শাইখ ইবন তাইমিয়্যা সম্পর্কে বলেন, 'প্রতিদিন ফজর সালাতের পর তিনি বের হয়ে পড়তেন, চলে যেতেন দামাস্কাসের সীমান্তবর্তী বিস্তৃত মাঠগুলোতে। সেখানে বসে তিনি আল্লাহর নাম নিতেন-সূর্যোদয় হওয়ার আগ পর্যন্ত যিকর করতে থাকতেন। আমরা একদিন কৌতূহল মেটাতে তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি কেন প্রতিদিন এমন করেন? জবাবে ইবন তাইমিয়্যা বললেন, এটা হলো আমার সকালের নাস্তা, আমার আত্মার খাদ্য, এটা ছাড়া আমার শরীর অবসন্ন হয়ে যাবে। এটাই আমাকে সারাদিনে চলার শক্তি যোগায়-যদি সকালে আমি আমার রসদ না পাই, তাহলে সারাটা দিন আমি দুর্বল হয়ে থাকবো।'
রাসূলুল্লাহ ﷺ এই কিয়ামুল লাইলের মাধ্যমেই দৃঢ়তা লাভ করেছিলেন। আর আল্লাহ তাআলা প্রথম যুগের মুসলিমদের ওপরেও এটি ফরয করে দিয়েছিলেন, কেননা তাদেরকে এমন কিছু পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিক্রম করতে হয়েছিল, যা আর কাউকে করতে হয়নি। তাদেরকে যে তীব্র বাধা-বিপত্তির মুখোমুখি হতে হয়েছিল তা উম্মাহর পরবর্তী আর কাউকে ভোগ করতে হয়নি। এজন্যই তাদেরকে এই নিবিড় প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তারা ছিলেন ইসলামের নিউক্লিয়াস বা কেন্দ্রীয় দল-দ্বীন ইসলামের ভিত্তিপ্রস্তর। তাদের ওপর ভিত্তি করে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সুতরাং তাদের দৃঢ় হওয়া জরুরি ছিল। এই প্রশিক্ষণ যারা লাভ করেছেন তারা সংখ্যায় ছিলেন অল্প, একশো'রও কম। কিন্তু এই প্রশিক্ষণ ও তারবিয়াহ তাদেরকে এমন প্রভাবশালী ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বে পরিণত করে যে, তারা যেখানেই যেতেন, সেখানেই প্রভাব বিস্তার করে ফেলতেন। মানুষের মনে তৎক্ষণাৎ তাদের ছাপ পড়তো। আনসারগণ মুসলিম হয়েছিলেন রাসূলুল্লাহর ﷺ দাওয়াহর শেষার্ধে, কিন্তু যেহেতু মুহাজিররা প্রথম থেকেই তাদের সাথে ছিলেন, আনসাররা তাদের সাহচর্যে এসে অনেক কিছু দ্রুত শিখে ফেলেন। মুহাম্মাদ ﷺ আনসার ও মুহাজিরের মাঝে ভ্রাতৃত্বের যে বন্ধন তৈরি করে দেন, তার মাধ্যমে দুইপক্ষই লাভবান হয়, আনসাররা মুহাজিরদের কাছ থেকে দ্বীনের আদর্শ ও জ্ঞান লাভ করেন এবং অপরদিকে মুহাজিররা আনসারদের কাছে থেকে তাদের প্রয়োজনীয় আর্থিক এবং সামাজিক সহায়তা পান। মুহাজিরদের ভেতর এমন একটি আলো ছিল, যা দ্বারা চারপাশের সবাই আলোকিত ও প্রভাবিত হতো। সুতরাং দাওয়াতের পাথেয় হিসাবে অবশ্যই এ তিনটি শব্দ মনে রাখতে হবে: ইকরা, কুম, কুম।