📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 আমরা কারা

📄 আমরা কারা


‘অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।’ সূরা ত্বীন: ৪
‘আমি জিন ও মানবকে এজন্য সৃষ্টি করেছি যে, তারা আমার ইবাদত করবে।’ সূরা জারিয়াত: ৫৬

আপনি এক ত্রুটিমুক্ত স্রষ্টার পরিকল্পিত সৃষ্টি। খামখেয়ালিভাবে অথবা আচমকা আপনাকে সৃষ্টি করা হয়নি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আসমান, জমিন আর এ দুয়ের মধ্যে যা কিছু আছে-তা আমি খেলাচ্ছলে সৃষ্টি করিনি।' সূরা আম্বিয়া : ১৬

জগতের কোনো প্রাণী দুর্ঘটনার মাধ্যমে প্রাণলাভ করেনি। আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহের কলম দিয়ে আপনার জীবনের গল্প লিখেছেন। আপনার প্রতিটি কোষে তিনি নিজের ভালোবাসা সযত্নে ঢেলে দিয়েছেন; যে ভালোবাসা আপনার ভেতরে নেচে চলেছে। আপনার কাদামাটির শরীরে তিনি তাঁর দম ফুঁকে দিয়েছেন। আপনাকে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যকার সেতুবন্ধন বানিয়েছেন। আপনার কাদামাটির শরীরে ফুঁকে দেওয়া আল্লাহর দম যেন মৃদুমন্দ বাতাসের মতো, যা মৃত জমিতে প্রাণের সঞ্চার করে।
আয়না আপনাকে যতখানি সুন্দর দেখায়, আপনি তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। আপনি এতই জটিল যে, কোনো ভাষার কোনো শব্দ আপনার বর্ণনা দিতে পারে না। আপনি আল্লাহর ভালোবাসার কারখানায় উৎপাদিত পণ্য। এ ভালোবাসা এতই অসীম ও পবিত্র যে, মানুষের এই সীমিত আকারের হাত সে ভালোবাসাকে ভাষায় বা রংতুলিতে ফোটাতে অক্ষম। আল্লাহর উপচে পড়া ভালোবাসার ঝরনা থেকে আপনি এবং জগতের সবকিছু অস্তিত্বশীল হয়েছে।
যে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তারকারাজি, সমুদ্র, পাহাড়, বিশ্বজগৎ ও গ্যালাক্সি, সেই আল্লাহর কাছে আপনি ও আমি ছাড়া এ বিশ্ব অসম্পূর্ণ। আপনার শরীর শুধু মাটির একটি তাঁবু নয়-যেখানে আপনি বসবাস করেন; বরং আপনার শরীর হলো আপনাকে দেওয়া একটি ক্ষুদ্র আকারের বিশ্বজগৎ। আপনি একটি ছোটো তারকা নন; আপনি সমগ্র মহাজগতের প্রতিফলন। আপনি কি আপনার হৃদয়ের বিগব্যাং শুনতে পান? প্রতি মিনিটে আশিবার করে আল্লাহ আপনার হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়েন এ কথা মনে করিয়ে দিতে যে, তিনি আপনাকে পরিত্যাগ করেননি এবং তিনি আপনার গ্রীবার ধমনির চাইতেও নিকটে অবস্থান করেন।
'আপনার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর অনুগ্রহে ধন্য। কারণ, আল্লাহ প্রতিটি মুহূর্তে আট বিলিয়ন মানুষের ফুসফুসে দম ফুঁকে চলেছেন। আপনি শুধু ধুলোবালির মানুষ নন; বরং আপনি পৃথিবীতে আল্লাহর সৌন্দর্যের প্রতিফলন। আপনি কেবল মরণশীল কোনো শরীর নন-যা একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। আপনি মানুষ, আপনাকে আধ্যাত্মিক হতে হবে-ব্যাপারটি এমন নয়; বরং আপনি নিজেই এক আধ্যাত্মিক সত্তা, শুধু মানবীয় শরীরে বসবাস করেন মাত্র।' -কবি আরু বারজাক

আল্লাহর কাছে আমরা কারা
আপনি আপনার সাফল্যগুলোর যোগফল নন, নন আপনার ব্যর্থতাগুলোর বিয়োগফল। আপনি এ জগৎকে কতখানি দিতে পারেন, তার সমীকরণই আপনার সম্পদ নয়। আপনি যা দেন, বলেন বা করেন, তা থেকে আপনার মূল্য নির্ধারণ হয় না; আপনার মূল্য এগুলোর চেয়ে অনেক বেশি। তবে আপনি এজন্য মূল্যবান নন যে অতীতে আপনি নিষ্পাপ জীবনযাপন করেছেন। আপনার কর্ম আপনাকে মূল্যবান করেনি; আপনাকে মূল্যবান করেছে সেই ত্রুটিমুক্ত আল্লাহ, যিনি আপনাকে সৃষ্টি করেছেন।
সসীম সংখ্যা দিয়ে নিজের মূল্য গণনা বন্ধ করুন। কারণ, আপনি এমন এক অসীম স্রষ্টার সৃষ্টি, যিনি তাঁর চিরন্তন আলো দিয়ে আপনার ভেতরে জীবনের প্রদীপ জ্বেলেছেন। অন্য লোকের বিভাজক দিয়ে নিজেকে ভাগ করবেন না। মনে রাখুন, অসীমকে যেকোনো সংখ্যা দিলে তার ফলাফল অসীমই থাকে। মনে রাখুন, আপনি যত সময়ই বিয়োগ করেন না কেন, চিরকাল থেকে কোনো কিছুই কমবে না। মনে রাখুন, আপনি কোনো মুদ্রা নন যে, আপনার মান উঠা-নামা করবে।
আপনি নিজের মালিক নন। বিক্রির জন্য নিজের মূল্য নির্ধারণের অধিকার আপনার নেই। তাই আল্লাহর পণ্যের মূল্য হাঁকানো বন্ধ করুন।
একটি নিটোল পান্নার যেমন নিজের মূল্য নির্ধারণের জন্য সুন্দরভাবে সাজার প্রয়োজন নেই, তেমনি আপনার মূল্য নির্ধারণের জন্যেও সাজার প্রয়োজন নেই। আপনার মূল্য আপনার ভেতরে সহজাতভাবে বিদ্যমান। কারণ, আপনার মালিক স্বয়ং আল্লাহ। অপরের মতামত, অপরের চোখের আয়না কিংবা অপরের পরামর্শের ভিত্তিতে আপনার মূল্য নির্ধারণ হয় না।
আপনার পাপগুলো হয়তো আপনার হৃদয়ের ওপর এমন আস্তরণ ফেলেছে যে, আপনি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু নিশ্চিত জেনে রাখুন, আল্লাহর দেখার চোখের সামনে কোনো পর্দা নেই। তিনি ঠিকই আপনার ভেতর-বাহির স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। আপনার পাপ ও ত্রুটিগুলো আপনার হৃদয়ের ভেতরে থাকা আল্লাহর উপস্থিতিকে মুছে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না। কারণ, আপনি যে-ই হন না কেন, আল্লাহর অনুগ্রহ সব সময় আপনাকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে। দুনিয়ার কোনো মাপকাঠিতে আপনাকে ওজন করা সম্ভব নয়। কারণ, এ দুনিয়া আপনার জন্য সৃষ্টি হয়েছে, আর আপনি সৃষ্টি হয়েছেন আল্লাহর জন্য। আল্লাহ তা'য়ালা বলেন-
'আমি তোমাকে নিজের জন্য তৈরি করেছি।' সূরা ত্ব-হা: ৪১
কর্ম আমাদের আলাদা করে না; বরং কর্ম আমাদের এই মোহ থেকে মুক্তি দেয়-যা চাই, তা থেকে আমরা আলাদা। আমাদের ভেতর ঈমান ইতোমধ্যেই নিহিত রয়েছে। আমাদের চেতনা সব সময়ই আল্লাহর সাথে যুক্ত। মানুষের আত্মাকে এজন্য সৃষ্টি করা হয়নি যে, এটি সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত থাকবে; বরং এ জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, এটি ইবাদত ও সর্বময় ক্ষমতাশীলের সাথে সংযোগ স্থাপনের প্রতি সতর্ক থাকবে।
'প্রজ্ঞার শুরুর মুহূর্ত সেটাই-যখন একটি তরঙ্গ বুঝতে পারে, সে মূলত একটি সমুদ্র!'-ভিয়েতনামের বৌদ্ধ ভিক্ষু থ্যাচ নাহট হান

আল্লাহর পথে যাত্রা শুরু করার সাথে সাথেই আমরা অনুভব করতে পারি- আমরা যা হতে চাই, ইতোমধ্যে তা হয়ে গেছি। খুব দ্রুতই আমরা নিজেদের চারপাশে আল্লাহর ভালোবাসা অনুভব করতে পারি, যে ভালোবাসা ইতোমধ্যেই আমাদের মধ্যে বিদ্যমান।
'আপনি এ ঘর থেকে ও ঘর পর্যন্ত তন্নতন্ন করে যে নেকলেস খুঁজে বেড়াচ্ছেন, খেয়াল করে দেখুন-সে নেকলেস আপনার গলায় শোভা পাচ্ছে!' -জালালুদ্দিন রুমি
'মানুষ'-এর আরবি প্রতিশব্দ 'ইনসান'। অনেক স্কলারের মতে, ইনসান শব্দটি এসেছে 'নিসইয়ান' ধাতু থেকে, যার অর্থ-বিস্মৃতিপরায়ণ বা ভুলে যাওয়া প্রকৃতির। আবার অনেকের মতে, ইনসান শব্দটি এসেছে 'আনসিয়াহ' ধাতু থেকে, যার অর্থ-আন্তরিকতা, ভালোবাসা, হৃদ্যতা, কাছে আসা। এ অর্থগুলোর দিকে লক্ষ করলে বোঝা যায়, আল্লাহকে খুঁজে বের করার জন্য আমাদের সৃষ্টি করা হয়নি; বরং সেই আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এবং সেই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যে আল্লাহর সাথে আমাদের অন্তরঙ্গ সম্পর্ক ইতোমধ্যেই বিদ্যমান। দুনিয়াতে আমাদের ভ্রমণ শুধু আল্লাহর দিকে নয়; বরং আল্লাহর কাছ থেকে, আল্লাহর সাথে এবং আল্লাহর ভালোবাসার মধ্যে। আল্লাহর পথ যতটা না আধ্যাত্মিক, তার চেয়ে বেশি আধ্যাত্মিকতার উন্মোচন। ঠিক এই মুহূর্তে আপনি যেখানেই থাকুন না কেন, আল্লাহ যে আপনার সাথে আছেন-এই অনুভূতির উন্মোচন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন। তোমরা যে কাজই করো না কেন, আল্লাহ তা দেখতে পাচ্ছেন।' সূরা হাদিদ: ৪

আল্লাহর অসীম চেহারা
জগতের সবকিছুর দিক আল্লাহর অভিমুখে নিবিষ্ট। সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর সুগন্ধ। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আমি তাদের আমার নিদর্শনাবলি দেখাব দূর দিগন্তে, আর তাদের নিজেদের মধ্যে, যাতে তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠে-এটি সত্য।' সূরা ফুসসিলাত: ৫৩
এ আয়াত নিশ্চিত করে, সকল সৃষ্টির ভেতর আল্লাহর নিদর্শন (সাইনপোস্ট) রয়েছে এবং সকল অভিব্যক্তি বহুত্বের ভেতর রয়েছে একটি একতা।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আকাশ ও জমিন একসঙ্গে সংযুক্ত ছিল, অতঃপর আমি উভয়কে আলাদা করে দিলাম।' সূরা আম্বিয়া: ৩০
কুরআনে আরও বলা হয়েছে- 'একক মানবসত্তা হিসেবে অস্তিত্ব লাভের পূর্বে সকল মানুষ একজন মানুষের ভেতর একীভূত ছিল।' সূরা জুমার: ৬
অর্থাৎ আল্লাহ আমাদের বলছেন, জগতের দৃশ্য-অদৃশ্য সবকিছু অস্তিত্বশীল হয়েছে একটি একক উৎস থেকে। আপনার রক্ত তৈরি হয়েছে তারকারাজির সংমিশ্রণে, আপনার হাড়গুলো তৈরি হয়েছে নক্ষত্রপুঞ্জের চূর্ণ দিয়ে। আপনাকে শুধু আকাশে তৈরি করা হয়নি; বরং আকাশ থেকে তৈরি করা হয়েছে। আপনি এ বিশ্বজগতের শুধু একজন বাসিন্দা নন; বরং আপনি বিশ্বজগতের একটি অংশ।
'একটি সূর্য থেকে যেমন অসীম আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে, তেমনি পরমাণু বা আদম-সবকিছুই একসময় একটি একক ছিল।' - কবি আরু বারজাক
মানুষ হলো নিখিল বিশ্বজগতের (ম্যাক্রোকজম) ভেতরে একটি ক্ষুদ্র বিশ্বজগৎ (মাইক্রোকজম), আকাশ ও পৃথিবীর সংযোগ সেতু। এ সেতুর উভয় প্রান্তে রয়েছে ধ্বংসশীল শরীর, কিন্তু চিরস্থায়ী চেতনা। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'সেই সফলকাম হয়েছে, যে নিজ আত্মাকে পবিত্র করেছে। সেই ব্যর্থ হয়েছে, যে নিজ আত্মাকে কলুষিত করেছে।' সূরা শামস: ১০
মানুষের মধ্যে যে দ্বৈত প্রকৃতি রয়েছে, তা ব্যক্তিকে আল্লাহর গুণগুলো ধারণ করতে উৎসাহ জোগায়; ঠিক যে কারণে আল্লাহ মানুষকে তাঁর ভালোবাসার প্রতিনিধি করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। যদিও ফেরেশতরা অবিরতভাবে আল্লাহর ইবাদত করে চলেছেন, তবুও তাঁদের মাঝে ত্রুটিহীনতা ও ইচ্ছার স্বাধীনতা অনুপস্থিতির কারণে তাঁরা আল্লাহর সমগ্রতাকে ধারণ করতে অক্ষম। যেখানে কোনো ভুল করারই সুযোগ নেই, সেখানে কী করে তারা ক্ষমার স্বাদ অনুভব করবে?
'যদি তোমরা পাপ না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের স্থলে অন্য লোকদের দুনিয়াতে প্রেরণ করতেন, যারা পাপ করত এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইত এবং আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতেন।'
মানুষকে কর্ম, বিশ্বাস, ইচ্ছা ও চিন্তার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে, যাতে এই স্বাধীনতার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারে। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেন-
'নিশ্চয়ই আমি আসমানসমূহ, জমিন ও পর্বতমালার প্রতি এ আমানত অর্পণ করেছিলাম, অতঃপর তারা তা বহন করতে অস্বীকার করেছিল এবং ভীত হয়েছিল; কিন্তু মানুষ তা বহন করল। নিশ্চয়ই সে ছিল অতিশয় জালিম, অজ্ঞ।' সূরা আহজাব : ৭২
আল্লাহ সম্পর্কে অজ্ঞতা ও লোভ আমাদের এমন মানুষে পরিণত করেছে যে, আমরা প্রায়শই জুলুম করি, দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিই। আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা তা নয়, যে মর্যাদার প্রাপ্য বলে আমরা নিজেদের মনে করি; বরং আমাদের মর্যাদা আল্লাহ প্রদত্ত উপহার, যে উপহারের জন্য আল্লাহর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

মানুষের সম্মান
আল্লাহ মানুষকে কেমন শ্রদ্ধার চোখে দেখেন, তা কুরআন থেকে জানা যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমরা কি দেখ না, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলে যা কিছু আছে-সবই আল্লাহ তোমাদের জন্য নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য নিয়ামতসমূহ পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন?' সূরা লোকমান : ২০
আল্লাহর এত নিয়ামত সত্ত্বেও আমাদের প্রাপ্ত স্বাধীনতা প্রায়ই আমাদের হতাশায় নিক্ষেপ করে। যখন আমরা আল্লাহর ইচ্ছার বিপরীত স্রোতে সাঁতার কাটি, তখনই সাধারণত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমরা কী চাই এবং আমাদের কী দরকার-এ দুটির ভেতর একটি সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি হয়, পরিণামে নৈরাশ্য আমাদের ঘিরে ধরে। সব অর্জন ও সাফল্য সত্ত্বে আমাদের মনে হয়-কোথায় যেন একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে, ফলে কাঙ্ক্ষিত সুখ অধরা থেকে যায়।
আমরা প্রায়ই সত্যিকার শান্তি ও পূর্ণ সন্তুষ্টির সন্ধান না পেয়ে মর্মবেদনায় ভুগি। যে মহাসত্য আমরা ভুলে যাই, তা হলো-আমাদের কর্ম নয়, আল্লাহর কাছে ফিরে আসার মধ্যেই রয়েছে প্রকৃত শান্তির ঝরনাধারা। হৃদয়ের ভেতরে থাকা যে শূন্যতার জন্য আমরা অশান্তির দাবানলে পুড়ছি, তা একসময় আল্লাহর অস্তিত্ব দিয়ে পূর্ণ ছিল। আল্লাহকে সরিয়ে সেই শূন্যতার গহ্বর তো আমরাই সৃষ্টি করেছি। আপনার শরীরের ভেতর যদি কেবল শরীরই থাকে, তাহলে কী করে আপন আত্মার অভিজ্ঞতা লাভ করবেন? কী করে আপনি আল্লাহর সর্বব্যাপী ভালোবাসার স্বাদের মূল্য বুঝবেন, যেখানে সে স্বাদ আপনি কখনো অনুভব করেননি?
'যদি কোনো কয়েদি কখনো স্বাধীন জীবনে বাস না করে, তাহলে সে কখনো বন্দিত্বের অন্ধ কূপকে অপছন্দ করবে না।' -জালালুদ্দিন রুমি
আমাদের সবারই এমন কিছুর আকাঙ্ক্ষা থাকে, যা এ জগতে কখনো পূরণ হবে না। এ বিষয়টিই শক্ত প্রমাণ বহন করে-বর্তমান জগতের বাইরে অবশ্যই আরেকটি জগতের অস্তিত্ব রয়েছে। পবিত্র কুরআন আমাদের সেই রুহের জগতের কথা মনে করিয়ে দেয়, যেখানে আল্লাহ আমাদের সকলের মনের উর্বর জমিতে বিশ্বাস ও ভালোবাসার বীজ বপন করেছিলেন। আল্লাহ সকল আত্মাকে (রুহ) সৃষ্টির পর তাদের রুহের জগতে রেখে দেন। সেখান থেকে একে একে রুহগুলো মানব শরীরের মাধ্যমে দুনিয়াতে পদার্পণ করতে থাকে। দুনিয়াতে আসার আগে একদিন আল্লাহ সকল রুহকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন-
'আমি কি তোমাদের প্রভু নই?' সকল রুহ জবাবে বলেছিল-'হ্যাঁ, অবশ্যই। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি।' সূরা আ'রাফ : ১৭২
এ ঘটনা থেকে প্রমাণ হয়, দুনিয়াতে কেউ সচেতনভাবে ঈমান আনুক আর না-ই আনুক, সকল আত্মাই আল্লাহর সাথে একটি চুক্তিতে আবদ্ধ।
আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসার কারণে ঈমান আমাদের ভেতরে প্রোথিত একটি জন্মগত বিষয়। আমরা পানি সিঞ্চন করি বা না করি, আমাদের হৃদয়ের গহিনে রোপিত আল্লাহর বীজ তরতাজা থেকেই যায়। আল্লাহর একত্ববাদ মানুষের হৃদয়ের ভেতরে সহজাতভাবে রোপিত থাকে। এ কারণে ঈমানের ঘোষণার মানে হলো-আমরা যে লক্ষ্যে পৃথিবীতে প্রেরিত হয়েছি, সে অভিমুখে আমাদের যাত্রার সূচনাবিন্দু।

ফিতরাত ও মানুষের সহজাত কল্যাণকর বৈশিষ্ট্য
মানুষের হৃদয়ে প্রোথিত আল্লাহর ভালোবাসাকে আরবিতে বলা হয় ফিতরাত, যার অর্থ-মানুষের আদি ও অকৃত্রিম সহজাত বৈশিষ্ট্য। ফিতরাত শব্দটি যে মূল শব্দ থেকে এসেছে, তার অর্থ হলো-কোনো কিছুকে চিরে ফেলা বা কোনো কিছুকে সামনে নিয়ে আসা। অর্থাৎ এর অর্থ দাঁড়ায়-দুনিয়াতে আমাদের কাজ হলো আমাদের ভেতরের অহংয়ের খোলস চিরে সেখানে আল্লাহর রোপিত ভালোবাসার বীজকে বাইরে বের করে আনা।
ফিতরাত হলো এক আল্লাহর ওপর বিশ্বাস এবং তাঁর ইবাদতের সহজাত স্বাভাবিক প্রবণতা। মুহাম্মাদ বলেছেন-
'সকল শিশু আল্লাহর ইবাদতের প্রতি ঝোঁক প্রবণতা এবং আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের জীবন নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।'
যদি কোনো শিশুকে একাকী ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তার মধ্যে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসের প্রাকৃতিক ঝোঁক প্রবণতা ক্রমাগতভাবে দৃশ্যমাণ হবে। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ভালোবাসাকে দিনের পর দিন প্রত্যাখ্যান করে চললে বুঝে নিতে হবে-এটি তার স্বাভাবিক প্রকৃতি নয়; বরং তার বাবা-মা অথবা যে পরিবেশে সে বড়ো হয়েছে, তার প্রভাবে সে শয়তানের পথ বেছে নিয়েছে।
কুরআনে বারবার ঈমানদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বাবা-মার প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করার জন্য। কিন্তু পাশাপাশি এও বলা হয়েছে, বাবা-মা যদি আল্লাহর নির্দেশের বিপরীত কাজের নির্দেশ দেয়, তাহলে সন্তানরা যেন তা মান্য না করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করার জন্য আমি মানুষের প্রতি ফরমান জারি করেছি। তাঁরা যদি এমন কিছুকে আমার সাথে শরিক করার জন্য তোমার ওপর বল প্রয়োগ করে-যে সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাঁদের মান্য করো না। আমার কাছেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর, আমি তোমাদের জানিয়ে দেবো-যা তোমরা করছিলে।' সূরা আনকাবুত : ৮
আমাদের পিতা-মাতা বা অন্যরা যা-ই বিশ্বাস করুক না কেন, ফিতরাত বা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস (তাওহিদ) হলো মানুষের জীবনের হার্ডওয়‍্যারের মতো। এই হার্ডওয়‍্যারের ভেতর যে হৃদয় বাস করে, তাতে একেক মানুষের ক্ষেত্রে একেক সফটওয়‍্যার ইন্সটল হয়ে থাকে তার বাবা-মা, বেড়ে উঠা, পারিপার্শ্বিক পরিবেশ ইত্যাদির ওপর ভিত্তি করে। এই সফটওয়্যার পরিবর্তনশীল, কিন্তু ফিতরাত নামক হার্ডওয়‍্যার অপরিবর্তনীয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'কাজেই দ্বীনের প্রতি তোমার চেহারা নিবদ্ধ করো একনিষ্ঠভাবে। এটাই আল্লাহর প্রকৃতি (ফিতরাত), যে প্রকৃতি তিনি মানুষকে দিয়েছেন। আল্লাহর সৃষ্টিকার্যে কোনো পরিবর্তন নেই; এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।' সূরা রূম: ৩০
কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী, আমরা হৃদয়ের ভেতর প্রাকৃতিকভাবে আল্লাহর আলো বহন করে চলেছি। কারণ, আল্লাহ স্বয়ং তাঁর ফিতরাতকে আমাদের ভেতর প্রোথিত করে দিয়েছেন। এর সারকথা হলো-আপনি যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছেন, তাঁর জন্য আপনার বিচার-বুদ্ধিকে একপাশে সরিয়ে রেখেছেন- বিষয়টি এমন নয়; বরং ঈমান আনার মাধ্যমে আপনি সত্যিকারের আপনার কাছে ফিরে এসেছেন। এ কারণেই অতীতের সুফি-সাধকরা বলতেন-
'পরাবাস্তব আধ্যাত্মিকতার পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছা আমাদের লক্ষ্য নয়; বরং আমাদের লক্ষ্য হলো, আমাদের ভেতরের পবিত্র প্রাকৃতিক ফিতরাতর দিকে ফিরে আসা।'
আমাদের সহজাত ঈমানের বিকাশ ও দুনিয়াতের আমাদের আগমনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জালালুদ্দিন রুমি খুব সুন্দরভাবে বলেছেন-
'একটি বিষয় কখনো ভুলে যাবে না। অন্য সব ভুলে যাও, কিন্তু এটি অবশ্যই মনে রেখ-তোমার কোনো অনুশোচনা হবে না। জগতের সবকিছু মনে রাখতে পারো, সবকিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারো; কিন্তু ওই একটি বিষয় যদি অগ্রাহ্য করো, তাহলে মূলত তুমি কিছুই করলে না। বিষয়টা অনেকটা এ রকম-এক বাদশাহ তোমাকে একটি কাজ দিয়ে অন্য এক দেশে পাঠালেন। তুমি সে দেশে গেলে এবং অন্য বহু কাজ করলে, কিন্তু সেই নির্দিষ্ট কাজটি করলে না। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, তুমি মূলত কিছুই করোনি।'
আমাদের কাজ হলো ভালোবাসা ও মায়ার সেই বৃক্ষে পরিণত হওয়া, যার ফিতরাতের সুমিষ্ট ফল জগতের সবাই উপভোগ করবে। এটি কেবল তখনই ঘটবে, যখন আমরা সত্যিকার অর্থে আল্লাহর ওপর ঈমান আনতে পারব এবং তাঁর ইচ্ছা-অনিচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারব। কারণ, এ দুটি কাজের মাধ্যমেই আমরা আল্লাহর ভালোবাসার মহান প্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব পালন করতে পারি।

আদম, মা হাওয়া ও শয়তান
আদম ও মা হাওয়া -এর ঘটনা কোনো রূপকথার গল্প নয়; এটি আমাদের ইতিহাস। আমাদের মাটি ও পানি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। দুনিয়াতে কেবল এ উদ্দেশ্যে আমাদের প্রেরণ করা হয়নি যে, আমরা আল্লাহর ইবাদত করার মাধ্যমে জান্নাতে ফিরে যাব; বরং আমাদের সৃষ্টির পেছনে এ উদ্দেশ্যও নিহিত রয়েছে, আমরা যেন আল্লাহর ভালোবাসা ও অনুগ্রহের গুণগুলো সকল সৃষ্টির ওপর প্রয়োগ করে এ দুনিয়াকেই জান্নাতে পরিণত করি। এ প্রসঙ্গে মুহাম্মাদ বলেছেন-
'আল্লাহর গুণগুলো দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে নাও।'
নারী ও পুরুষ উভয়কে দুনিয়াতে আল্লাহর আয়না হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, জগতের সকল মানুষের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির ঐক্যতান সৃষ্টির জন্য তারা যেন একত্রে কাজ করে। একটি ডালিম গাছের বীজ যেমন মাটি ছাড়া অঙ্কুরিত হতে পারে না, আবার মাটি যেমন বীজ ছাড়া ডালিম গাছের জন্ম দিতে পারে না, তেমনি নারী ও পুরুষকে তাদের আত্মার বিকাশের জন্য একত্রে কাজ করতে হবে।
নারী ও পুরুষ শারীরিকভাবে অভিন্ন হলেও আল্লাহর চোখে তারা সমান মর্যাদার। কারণ, আত্মার কোনো লিঙ্গভেদ নেই। হিব্রু ভাষায় 'হাওয়া' শব্দটি যে ধাতু থেকে এসেছে, তার অর্থ-জীবনের উৎস। এর মানে হলো-আমরা যখনই মা হাওয়ার কথা বলি, তখনই এ কথা স্মরণ করি-সকল নবি পুরুষ ছিলেন এ কথা যেমন সত্য, তেমনি কোনো নারী ছাড়া ওই পুরুষগণ দুনিয়াতে জন্মলাভ করতে পারতেন না-এ কথাও সত্য। এ কারণে নারীদের আসমান ও জমিনের মধ্যকার সৃষ্টির সেতু বলা হয়।
পবিত্র কুরআনে কেবল নারী-পুরুষের মর্যাদা ও আল্লাহর প্রতিনিধিত্বের কথাই বলা হয়নি; শয়তানকে পরাজিত করার শিক্ষাও দেওয়া হয়েছে। শয়তানের আসল নাম ছিল ইবলিস। হিব্রু ভাষায় ইবলিস শব্দটি যে ধাতু থেকে এসেছে, তার অর্থ-আশা পরিত্যাগ করা, হতাশ হওয়া, নিরাশ হওয়া। এর মানে ইবলিস এমন একজন, যে আমাদের ভেতরে নৈরাশ্যের বীজ রোপণ করে দেয়। আমরা মন্দ লোক এবং আমাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহ আমাদের ভালোবাসেন না, এমন ধারণা আমাদের ভেতর প্রোথিত করে দেয়। অন্যান্য ধর্মে ইবলিসকে 'বহিষ্কৃত ফেরেশতা' (ফলেন অ্যানজেল) বলা হয়, কিন্তু ইসলামে তা বলা হয় না। কারণ, ফেরেশতাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি নেই। পাপ করার বা আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার ক্ষমতা তাঁদের দেওয়া হয়নি।
পবিত্র কুরআনে শয়তানকে জিন বলা হয়েছে; যে জিনকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াবিহীন আগুনের শিখা থেকে। জিন হলো গায়েব বা অদৃশ্য জগতের একটি অংশ। যদিও আমরা জিনকে সশরীরে দেখতে পাই না, তবুও মানুষের মতো জিনকেও ইচ্ছার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে। অন্য কথায়, জিনদের মধ্যে ভালো ও মন্দ জিন রয়েছে। শয়তান আল্লাহর সমকক্ষ কেউ নয়; বরং শয়তান নিজেই আল্লাহর সৃষ্টি। কিছু ধর্মীয় মতানুসারে, আলো ও অন্ধকারের জন্য ভিন্ন ভিন্ন খোদার অস্তিত্ব রয়েছে-যারা একে অপরের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করে চলে। কিন্তু কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে-আল্লাহ একজনই, তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই এবং তাঁর গুণগুলো একে অপরের পরিপূরক।
শয়তানের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। ততটুকুই রয়েছে, যতটুকু আল্লাহ তাকে দিয়েছেন। শয়তানকে মানুষের প্রকাশ্য দুশমন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও শয়তানকে সৃষ্টি করা হয়েছে কিন্তু ভালো উদ্দেশ্যেই। নৌকার তলে একটি ছিদ্রপথ খুঁজে পাওয়া আশীর্বাদস্বরূপ। কেননা, ওই ছিদ্র দেখেই আমরা বুঝতে পারি, নৌকার ঠিক কোন জায়গায় মেরামত করা দরকার। তেমনি শয়তানের প্ররোচনায় পড়ার পর আমরা বুঝতে পারি-আমাদের হৃদয় ঠিক কখন ও কোন জায়গায় আল্লাহকে ভুলে বিপথে যাত্রা শুরু করেছে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'শয়তান তোমাদের দরিদ্রতার ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তোমাদের তাঁর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অনুগ্রহের প্রতিশ্রুতি দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।' সূরা বাকারা: ২৬৮
কোনো কোনো সুফি সাধক শয়তানকে অন্ধকারের পথপ্রদর্শক অথবা জান্নাতের দারোয়ান বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, শয়তানের কণ্ঠস্বর আমাদের হিংসা, লোভ, লালসা ও অহংকারের দিকে প্রলুব্ধ করে এবং আমাদের সেই জায়গাকে চিনিয়ে দেয়, যার মেরামত ও বিশুদ্ধিকরণ প্রয়োজন। শয়তানের প্ররোচনা আমাদের সাথে আল্লাহর দূরত্বের পরিমাপ জানিয়ে দেয়। বুঝিয়ে দেয়-আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য আমাদের কতখানি পথ পাড়ি দিতে হবে। যদিও সৃষ্টিজগতে শয়তানের একটি অবস্থান আছে, তবুও মনে রাখতে হবে-শয়তান জঘন্য মিথ্যাবাদী। তাই শয়তানের অস্তিত্বকে কখনো হালকাভাবে নেওয়া ঠিক হবে না।
ইবলিস একজন সাধারণ জিন ছিল না। ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, ইবলিস এক হাজার বছর ধরে এত আন্তরিক ও মগ্ন হয়ে আল্লাহর ইবাদত করেছিল যে, তাকে ফেরেশতাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফেরেশতা না হওয়া সত্ত্বেও ইবলিস ফেরেশতাদের সমান মর্যাদা পায়। একদিন আল্লাহ ঘোষণা করলেন-তিনি দুনিয়াতে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করার জন্য একটি নতুন প্রাণী সৃষ্টি করেছেন, যার নাম আদম। আল্লাহর তাঁর নিজের রুহ আদমের ভেতর ফুঁকে দিলেন এবং ফেরেশতাদের ও ইবলিসকে নির্দেশ দিলেন নতুন সৃষ্টি আদমকে সিজদা দিতে। ইবলিস কাদামাটি দিয়ে তৈরি আদম-কে দেখে তাচ্ছিল্য করল এবং আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করল। বলল-
'আমি তাঁর চেয়ে উত্তম। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে।' সূরা আ'রাফ: ১২
একটি দিয়াশলাইয়ের ভেতর যেমন আগুন সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং পর্যাপ্ত ঘর্ষণের ফলেই কেবল আগুন জ্বলে ওঠে, তেমনি ইবলিসের ভেতর অহংকারের আগুন সুপ্ত অবস্থায় ছিল। আদমকে সৃষ্টির মাধ্যমে তৈরি হওয়া ঘর্ষণের ফলে ইবলিসের ভেতরে অহংকারের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। অন্যদিকে ফেরেশতারা আল্লাহর নির্দেশে আদমকে সিজদার জন্য আল্লাহর দমের সামনে সিজদায় অবনত হলেন, যে দম আল্লাহ স্বয়ং আদম-এর ভেতর ফুঁকে দিয়েছেন। অন্যদিকে ইবলিস আদম-এর শারীরিক কাঠামোর ভেতর আল্লাহর প্রতিফলনকে দেখতে পেল না, ফলে সে অহংকারবশত তাঁকে সিজদা করতে অস্বীকার করল।
শয়তানের ভুল ধারণা ছিল-কারও মূল্য নির্ধারিত হয় তার শারীরিক কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে, যে ভুল আজ আমরাও করে চলেছি। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, শয়তান হলো বিশ্বজগতের প্রথম প্রমাণিত বর্ণবাদী। বাস্তবিক অর্থে সম্পদ, সুনাম, গায়ের রং, বাহ্যিক সৌন্দর্য ইত্যাদির ভিত্তিতে নয়; বরং আমাদের মূল্য নির্ধারিত হয় সৎকর্মের ভিত্তিতে এবং জীবনের বাগানে কল্যাণের যে বীজ আমরা রোপণ করেছি, তার ভিত্তিতে। আল্লাহ সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা এবং আমাদের পুরো জগৎ কেমন হবে-তা নির্ভর করে নিজেদের হৃদয়ের পরিশুদ্ধতার ওপর। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যে আল্লাহকে ভয় করবে, আল্লাহ তার পাপ মোচন করে দেবেন আর তাকে দান করবেন মহা পুরস্কার।' সূরা তালাক : ৫
অন্যকথায়, আমাদের মূল্য জন্মগত, কিন্তু আমাদের গভীর মূল্য নিজদের সৎকর্মের মাধ্যমেই কেবল অনুভব করতে পারি।
কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তি বেশি সম্মানিত, যে অধিক তাকওয়াসম্পন্ন।' সূরা হুজুরাত : ১৩
ওপরের আয়াত থেকে আমরা বুঝতে পারি, আমরা যখন সৎকর্ম করি, তখন আমাদের সেই সম্মান ও মর্যাদা আল্লাহর কাছে উন্মোচিত হয়-যা আল্লাহ তায়ালা আগেই আমাদের কাছে গচ্ছিত রেখেছেন।
শয়তান বুঝতে পারেনি, আল্লাহ আদম-কে যে মর্যাদা দান করেছেন, তা কখনো তাঁর পাপের কারণে ধ্বংস হবে না। কারণ, মানুষের মর্যাদা সহজাত এবং তা মানুষের সৎকর্মের মাধ্যমে অর্জিত নয়। আদম একটি সৎকর্মও না করে সম্মানিত হয়েছেন, ফেরেশতাদের সম্মানসূচক সিজদা লাভ করেছেন। কারণ, তাঁর প্রাথমিক সম্মান তাঁর কর্মের ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়নি। তাঁর সম্মানের মূল কারণ ছিল তাঁর ভেতর ফুঁকে দেওয়ার আল্লাহর রুহ এবং তাঁর ভেতরে আল্লাহর রোপিত সহজাত কল্যাণ (ফিতরাত)। ফেরেশতারা আদম -কে সিজদা করার পর আল্লাহ তায়ালা বললেন-
'হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো এবং যেখানে যা ইচ্ছা খাও, কিন্তু ওই গাছের নিকটে যেয়ো না; গেলে তোমরা সীমালঙ্ঘনকারীদের দলে শামিল হবে।' সূরা বাকারা : ৩৫
আদম ও মা হাওয়া-কে জান্নাতে সবকিছু দান করা হলো। কিন্তু শয়তান সংকল্প করল, সে প্রমাণ করে ছাড়বে-আদম-কে যে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, তাঁর উপযুক্ত তিনি নন। অতএব, সে আদম-এর কানে কুমন্ত্রণা দিলো এভাবে-
'তোমাদের রব তোমাদের কেবল এজন্য এ গাছ থেকে নিষেধ করেছেন যে, তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা তোমরা চিরস্থায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (শুধু তা-ই নয়) সে তাঁদের উভয়ের কাছে শপথ করে বলল- “নিশ্চয়ই আমি তোমাদের শুভাকাঙ্ক্ষীদের একজন।"' সূরা আ'রাফ: ২১-২২
আদম ও হাওয়া যখন নিষিদ্ধ গাছের ফল খেলেন, তখন আল্লাহ বললেন-
'তোমরা নেমে যাও, তোমরা একে অন্যের (শয়তান ও মানুষ) শত্রু; তোমাদের জন্য পৃথিবীতে ক্ষণস্থায়ী আবাস ও ভোগ-উপকরণ রয়েছে।' সূরা আ'রাফ: ২৪
কুরআনের এই বর্ণনাগুলো থেকে বোঝা যায়, শয়তান ও আদমের প্রকৃত পার্থক্য সূচিত হয়েছে দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে। আদম ও মা হাওয়া আল্লাহর নির্দেশ লঙ্ঘনের পর নিজের ভুল বুঝতে পারা মাত্রই অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। তাঁদের ক্ষমা চাওয়ার ভাষা এতই অনবদ্য ছিল যে, যুগ যুগ ধরে মুসলিমরা এ ভাষায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে চলেছেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা ও দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্য অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।' সূরা আ'রাফ: ২৩
আদম ও মা হাওয়া-এর জন্য নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়া ছিল অনুশোচনা শিক্ষার একটি মাধ্যম। অহংকার প্রদর্শনের পরিণামে শয়তান আল্লাহর রোষানলে পতিত হলো, অন্যদিকে বিনয় ও অনুশোচনা প্রকাশের মাধ্যমে আদম আল্লাহর অনুগ্রহ, ক্ষমা ও পথনির্দেশপ্রাপ্ত হলেন।
শয়তান যখন আল্লাহর নিদেশ লঙ্ঘন করল, তখন সে আল্লাহকে দোষারোপ করল এবং মানবজাতির ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করল। সে বলল-
'যেহেতু তাঁর কারণেই আমাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছেন, কাজেই আমি অবশ্যই আপনার সরল পথে মানুষদের জন্য ওত পেতে বসে থাকব। তারপর আমি তাদের সামনে দিয়ে, পেছন দিয়ে, ডান দিয়ে, বাম দিয়ে তাদের কাছে অবশ্যই আসব। আপনি তাদের অধিকাংশকেই শোকর আদায়কারী পাবেন না।' সূরা আ'রাফ: ১৬-১৭
শয়তানের এ বক্তব্যের মধ্যে শুধু তার অহংকার ও ঔদ্ধত্যই প্রকাশ পায়নি; বরং এটও পরিষ্কার হয়েছে-তার পদস্খলনের পেছনের মূল নিয়ামক কারণ ছিল তার অকৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তায়ালা ওই আয়াতটির মাধ্যমে শয়তানের কূটকৌশলের গোপনীয়তা আমাদের কাছে ফাঁস করে দিয়েছেন এবং আমাদের শিক্ষা দিয়েছেন, শয়তানের প্রলোভনের ফাঁদ থেকে বাঁচার উপায় হলো-আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।
লক্ষ করুন, শয়তান কীভাবে বলছে-সে সরল-সোজা পথে ওত পেতে বসে থাকবে। চোর যেমন সেই বাড়িতেই হানা দেয়-যে বাড়িতে মূল্যবান সম্পদরাজি থাকে। শয়তানও তেমনি তাদের পথেই ওত পেতে বসে থাকে, যারা ঈমানের সম্বল নিয়ে সরল-সোজা পথে যাত্রা করে। ওই আয়াতটির অন্য একটি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, শয়তান যখন বলল-সে আমাদের পেছন থেকে আসবে, তখন মূলত সে এটাই বলেছে যে, সে আমাদের আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করবে। বিচ্যুত করবে এই বুঝিয়ে যে, আমরা স্রষ্টাহীন বিশ্বের এক দুর্ঘটনার ফসল মাত্র। সে আমাদের বর্তমান থেকে অতীতের দিকে টেনে নিয়ে যাবে; অথচ অতীতকে বদলানোর সুযোগ নেই। সে আমাদের অনুশোচনা ও হতাশার আগুনে ঘি ঢেলে আল্লাহর অনুগ্রহ থেকে নিরাশ করে তুলবে। 'সামনে থেকে আসবে' বলে শয়তান বুঝিয়েছে-সে আমাদের বিচার দিবস সম্পর্কে বিভ্রান্ত করবে। আমাদের মিথ্যা প্রবোধ দেবে যে, ভালো বা মন্দ কর্মের জন্য ভবিষ্যতে আমাদের কোনো জবাবদিহি করতে হবে না।
'ডান ও বাম দিক থেকে আসবে'-এ কথা বলার মাধ্যমে শয়তান বলেছে, আমাদের মনের ভেতরের কুপ্রবৃত্তি ও লোভ-লালসার মাধ্যমে সে আমাদের ভ্রান্ত পথের দিকে প্রলুব্ধ করবে। লক্ষ করুন, শয়তান বলেনি-সে ওপর দিক থেকে আসবে। এর কারণ হলো-ওপর দিকে থেকে কেবল ওহি-ই অবতীর্ণ হয়; অন্য কিছু অবতীর্ণ হতে পারে না। শয়তান নিচ থেকেও আসতে পারে না। কারণ, আমরা যখন জমিনের দিকে মাথা নোয়াই, তখন আমরা আত্মসমর্পণ ও নিরহংকারতারই প্রদর্শন করে থাকি। অন্যদিকে শয়তান অহংকার প্রদর্শন করে থাকে। এখান থেকে একটি গভীর শিক্ষা পাওয়া যায়। যখন আমরা ওহির দিকে প্রত্যাবর্তন করি এবং বিনীত ও নম্র থাকি, তখন শয়তানের প্ররোচনা থেকে রক্ষা পাই। কারণ, শয়তান নিজেই আল্লাহকে বলেছে-
'আপনার ক্ষমতার কসম! আমি ওদের সবাইকে অবশ্যই পথভ্রষ্ট করব। তবে তাদের মধ্যে যারা আপনার খাঁটি বান্দা, তাদের ছাড়া।' সূরা সাদ : ৮২-৮৩
এই 'খাঁটি বান্দা' তারাই, যাদের আল্লাহ ঈমান, দায়িত্বশীলতা, বিনয় ও কৃতজ্ঞতার গুণে ধন্য করেছেন।

কৃতজ্ঞতার শক্তি
কৃতজ্ঞতা সরাসরি আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত। কৃতজ্ঞতার দরজা দিয়েই কেবল আমরা আল্লাহর কৃপা ও দয়ার স্বাদ অনুভব করতে পারি।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো, তাহলে আমি অবশ্যই আরও বাড়িয়ে দেবো।' সূরা ইবরাহিম: ৭
সত্যিকারের কৃতজ্ঞতা বা শোকর আমাদের পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে আমাদের মনের অবস্থার ওপর। ব্যাপারটি এমন নয় যে, আমাদের কৃতজ্ঞতা আল্লাহকে আরও বেশি দয়ালু করে তোলে; বরং ব্যাপার হলো-আল্লাহ আমাদের যা দান করে চলেছেন, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তা গ্রহণে আমাদের আরও বেশি প্রস্তুত করে তোলে। কৃতজ্ঞচিত্তে থাকার মানে হলো-এই কথা স্মরণ করা, আমরা আল্লাহকে ভালোবাসার আগে থেকেই তিনি আমাদের ভালোবাসেন। আমরা যখন কৃতজ্ঞ থাকি, তখন আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সহজাত সম্পর্কটি পৌনঃপুনিকভাবে কম্পিত হতে থাকে।
কৃতজ্ঞতা শুধু একটি আবেগের নাম নয়; এটি হৃদয়-মনের একটি উচ্চতর অনুভূতির নাম। মনের অনুভূতিগুলো আবেগের চেয়ে আলাদা। কারণ, এগুলো হলো রেডিও চ্যানেলের মতো, যা আমরা সচেতনভাবে বদলাই। কাঙ্ক্ষিত বস্তুটি পাওয়ার পর আমরা যখন কৃতজ্ঞ হই, তখন সেই কৃতজ্ঞতা মূলত আমাদের অহং-এর ফলাফল। সত্যিকারের কৃতজ্ঞতার ফুল তখনই ফোটে, যখন আমরা কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাই বা না পাই-উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর প্রশংসায় নিজেকে বিলীন করে দিই। বিশুদ্ধ কৃতজ্ঞতা জন্মলাভ করে নম্রতার মাতৃগর্ভ থেকে। যখন আমরা সত্যিকার অর্থে এ বিশ্বাস করতে সক্ষম হই যে, 'আল্লাহ সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী', তখন আমাদের কৃতজ্ঞতা আর পারিপার্শ্বিক কোনো কিছুর ওপর নির্ভরশীল থাকে না-যা প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল। আমাদের কৃতজ্ঞতা তখন অপরিবর্তিত রূপ লাভ করে। যেমন-আল্লাহ অপরিবর্তনীয় ও চিরঞ্জীব।
ইউনুস যদি মাছের পেটে গিয়েও আল্লাহর প্রশংসা করতে পারেন, তাহলে আমরা কেন আল্লাহর অসীম দয়া ও অনুগ্রহ পেয়েও তাঁর প্রশংসাকে পরিস্থিতির শর্তাধীন করে ফেলছি? সে যদি আল্লাহর তাসবিহকারী না হতো, তাহলে নিশ্চিতই তাঁকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত মাছের পেটে থাকতে হতো।
এমনকী মনীষীরা এও বলতেন- 'আমরা যে কৃতজ্ঞ হয়েছি, এজন্যই আমাদের কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। কারণ, আমাদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ আছে বলেই আমরা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ হয়েছি।'
আমরা যখন শোকর বা কৃতজ্ঞ অবস্থায় থাকি, তখন আল্লাহর নাম আশ-শাকুর-এর সাথে নিজেদের সংযোগ স্থাপন করি, যার অর্থ-অতি মর্যাদা দানকারী, গুণগ্রাহী, সুবিবেচক ইত্যাদি (দ্যা মোস্ট গ্রেটফুল)। আমরা যখন কৃতজ্ঞ থাকি, তখন আল্লাহর কাছাকাছি অবস্থান করি। আমাদের হৃদয়-মন যখন কৃতজ্ঞতায় অবিষ্ট হয়ে থাকে, তখন যে কারণে আমরা কৃতজ্ঞ, তার চেয়ে আমাদের কৃতজ্ঞতাবোধের মূল্য অনেক বেশি হয়ে দাঁড়ায়। কারণ, উপহার ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু উপহারদাতার কোনো ধ্বংস নেই; তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। এ কারণে মুহাম্মাদ-এর একজন স্ত্রী যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, কেন তিনি এত কঠোরভাবে ইবাদত-বন্দেগি করেন-যেখানে ইতোমধ্যেই আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে দিয়েছেন? তখন মহানবি জবাবে বলেছিলেন-'আফালা আকুনা আবদান শাকুরা; অর্থাৎ আমি কি কৃতজ্ঞ বান্দা হব না?'
মহানবি-এর এ কথার আরেকটি অর্থ হলো-তিনি কোনো কিছু পাওয়ার আশায় আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ ছিলেন না; বরং তিনি জানতেন, আল্লাহর অসীম দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসার জবাবে কৃতজ্ঞতা প্রদর্শনের একমাত্র পথ হলো ইবাদত করা। যেমনটি জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'উপহারের চেয়ে ধন্যবাদ বেশি মিষ্টি। যে নিজের ভেতর কৃতজ্ঞতা লালন করে, সে উপহারের জন্য লালায়িত থাকে না। ধন্যবাদ হলো আল্লাহর উপহারের ভেতরের শরীর, স্বয়ং উপহারের খোলস মাত্র। কারণ, ধন্যবাদ আপনার কাছে আপনার প্রিয়তমের হৃদয়কে হাজির করে দেয়।'
কৃতজ্ঞতার স্বাদ অনুভবের মাধ্যম হলো-আল্লাহ যে উপহার আমাদের দিয়েছেন, তার স্বীকৃতি ও প্রশংসা। আমরা যখন আল্লাহর দেওয়া নিয়ামত ও উপহারগুলোর জন্য এমনভাবে তাঁর প্রশংসা করি-তিনি তাতে সন্তুষ্ট হন, তখনই কেবল আমরা আল্লাহ ও আল্লাহর সুন্দরতম নামসমূহের স্বাদ অনুভব করতে পারি। আমরা যখন চোখ দিয়ে আল্লাহর নিদর্শন দেখি, কান দিয়ে তাঁর কথা শুনি, জিভ দিয়ে তাঁর স্মরণে তাসবিহ পাঠ করি, হাত দিয়ে দান করি, পা দিয়ে সত্য, ভালোবাসা, দয়া, ন্যায়বিচার ও অনুগ্রহের পথে চলি, তখনই আল্লাহর প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশিত হয়ে থাকে। এ প্রসঙ্গে আলি বলেছেন-'যখন তোমার কাছে আল্লাহর কোনো অনুগ্রহ আসে, অকৃতজ্ঞতা দিয়ে সে অনুগ্রহকে দূরে ঠেলে দিয়ো না।' অকৃতজ্ঞতা হলো অধিকার ও স্বার্থপরতার বিপরীত। সত্যিকারের কৃতজ্ঞতার ফুল প্রস্ফুটিত হয় আল্লাহর ইচ্ছার কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও পূর্ণাঙ্গ নির্ভরতার মাটির ওপর।
আদম -এর প্রথম কথাটি ছিল-'আলহামদুলিল্লাহ, অর্থাৎ সকল প্রশংসা ও মহিমা কেবল আল্লাহর জন্য।' আর জান্নাতবাসীরা প্রথম যে কথা উচ্চারণ করবে, সেটাও হবে আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহর নৈকট্য অর্জন ও তাঁর দাসত্বের পথ যদি হয় কৃতজ্ঞতা, তাহলে অকৃতজ্ঞতাকে ঈমানের সবচেয়ে বড়ো শত্রু বলা যায়। এ কারণে আমাদের আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব নির্ণয়ের মাপকাঠি হলো আমাদের কৃতজ্ঞতার স্তর। আমাদের কৃতজ্ঞতার মান যতটা উঁচু, আমরা আধ্যাত্মিকভাবে ততখানি শ্রেষ্ঠ।
পবিত্র কুরআনে অকৃতজ্ঞতার পরিণামের কথা উল্লেখ করে আমাদের কৃতজ্ঞতার গুরুত্ব বোঝানো হয়েছে। শয়তানের অবাধ্যতার উল্লেখ করে দেখানো হয়েছে, কেউ যদি বাহ্যিকভাবে আল্লাহর ইবাদত করে, কিন্তু অন্তরে অহংকার লালন করে, তাহলে সে জান্নাতের সর্বোচ্চ শিখর থেকে জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে যেতে পারে। অহংকার ও ঔদ্ধত্য শয়তানের মনোযোগকে চিরস্থায়ী উপহারদাতার কাছ থেকে অস্থায়ী উপহারের দিকে টেনে নিয়ে গেছে। আল্লাহর আনুগত্যকে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল করে ফেলেছে। ইবলিস ইতোমধ্যেই বাগানে ছিল। সে আল্লাহর নিকটেই বাস করত, কিন্তু তার অকৃতজ্ঞতা এবং আদম -এর প্রতি হিংসা তাকে জান্নাত থেকে বের করে দিলো। মুহাম্মাদ বলেন-
'যে ব্যক্তির অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে, সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।'
যেহেতু আল্লাহ তায়ালা হলেন সকল সম্রাটের সম্রাট, রাজাধিরাজ এবং সৃষ্টিজগতের একমাত্র মালিক ও অধিপতি, সেহেতু অহংকার ও শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র দাবিদার তিনিই। কাজেই তাঁর পবিত্র ও রাজকীয় সত্তার সামনে কোনো অহংকারী ব্যক্তির অস্তিত্ব থাকতে পারে না।

পাপ ও বিস্মরণ
যেহেতু আল্লাহ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহর স্মরণই সর্বশেষ্ঠ', সেহেতু আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ থাকাকে বড়ো ধরনের ভ্রান্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আলি বলেন-
'তোমার অসুস্থতা তোমার কাছ থেকেই আসে, কিন্তু তুমি তা অনুধাবন করতে পারো না। তোমার সুস্থতা তোমার ভেতরেই রয়েছে, কিন্তু তুমি তা অনুভব করতে পারো না। তুমি নিজেকে ছোট্ট কিছু ভাবো, কিন্তু তোমার মধ্যে পুরো বিশ্বজগৎ বাস করছে।... যা কিছু তুমি কামনা করো, তা তোমার ভেতরেই রয়েছে-যদি তুমি তার প্রতিফলন ঘটাতে পারো।'
এখানে আলি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, মানবীয় সত্তার মৌলিক সমস্যা হলো-মানুষের ভেতরের সহজাত কল্যাণকামিতা (ফিতরাত) ও আল্লাহর ভালোবাসার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকা।
আমরা যখন পাপ করি কিংবা আল্লাহর কাছ থেকে দূরে চলে যাই, তখন মূলত মানুষ হওয়ার অর্থকেই ভুলে বসি। অন্য কথায়, মানুষ যখন তার স্বাভাবিক কল্যাণময়ী (ফিতরাত) দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে, তখন তার উপসর্গ হিসেবে পাপ করে থাকে। যেহেতু মানুষের কল্যাণময়তা আল্লাহর চিরন্তন ও নিখাদ কল্যাণময়তারই প্রতিফলন, সেহেতু পাপের মাধ্যমে মানুষের ফিতরাতে কোনো পরিবর্তন হতে পারে না।
মেঘ সূর্যের আলোর উপস্থিতি ও ক্ষমতাকে কমিয়ে দিতে পারে না; শুধু আলোর তীব্রতাকে খানিক সময়ের জন্য ঢেকে রাখতে পারে। তেমনি পাপ আমাদের ভেতরের কল্যাণময়তাকে কমিয়ে দিতে পারে না; পারে শুধু খানিক সময়ের জন্য একে ঢেকে রাখতে।
আল্লাহ প্রতিটি মানুষকে আধ্যাত্মিক চোখ দিয়েছেন, যাতে মানুষ আল্লাহর নিদর্শন দেখতে পায়। আল্লাহর বিধিবিধানের প্রতি আনুগত্য নয়; আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়াই আমাদের আধ্যাত্মিক দৃষ্টির নেপথ্য কারণ। আমাদের পাপগুলোর এমন ক্ষমতা নেই যে, তা আমাদের সেই মর্যাদার অবনয়ন ঘটাবে-যা আমাদের অর্জিত নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত। তবে আমাদের কর্মগুলোর সেই ক্ষমতা রয়েছে, যা আমাদের অন্তরকে এমনভাবে ঢেকে রাখে, যেন আল্লাহর দেওয়া উপহারগুলো আমাদের কাছে পৌঁছতে না পারে। আমাদের পাপগুলো আমাদের আধ্যাত্মিক চক্ষুর ওপর পর্দা টানিয়ে দেয়। তওবা ও অনুশোচনা না করে অব্যাহতভাবে পাপ করতে থাকলে সেই পাপগুলো আমাদের দৃষ্টির সামনে একটি আবরণ স্থাপন করে দেয়। ফলে আমরা আল্লাহর সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারি না।
এমন লোকদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমার স্মরণ থেকে যাদের চোখ ছিল আবরণে ঢাকা এবং যারা শুনতেও ছিল অক্ষম।' সূরা কাহাফ: ১০১
পাপ আমাদের আল্লাহর চিরস্থায়ী ভালোবাসার আলো থেকে দূরে সরিয়ে রাখে এবং আমাদের কৃতকর্মের দ্বারা সৃষ্ট অন্ধকারে নিমজ্জিত করে রাখে। সূর্যের আলো থেকে আড়ালে চলে গেলে যেমন অন্ধকারে নিমজ্জিত হই, তেমনি পাপাচার ও আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা থেকে আড়ালে চলে গেলেও আমরা আল্লাহর রোষানলের অন্ধকারে নিমজ্জিত হই। সংক্ষেপে এটাই সে কারণ, যেজন্য পবিত্র কুরআনে বারবার বলা হয়েছে-আল্লাহ আমাদের ওপর জুলুম করেন না; বরং আমরাই নিজেদের ওপর জুলুম করি।
এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মানুষের মতো আল্লাহর আবেগ পরিবর্তনশীল নয়। তাই আল্লাহর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের যে তারতম্য সৃষ্টি হয়, সেজন্য আল্লাহ দায়ী নন; বরং আমরা কী উপায়ে এবং কী পরিমাণে আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ আস্বাদন করছি, তা-ই এ তারতম্যের জন্য দায়ী। যদিও আল্লাহর নির্দেশের আনুগত্য ও সৎকর্ম আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ আস্বাদনের একটি দ্বিমুখী পথ, তবুও আমাদের কর্মগুলো আল্লাহর কাছে আমাদের যোগ্য বান্দা হিসেবে উপস্থিত করে না। কারণ, যিনি আমাদের সবকিছু দান করেন এবং যাঁর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই, তাঁর কাছে কোনো কিছুই যোগ্যতাসম্পন্ন হতে পারে না। সত্যি বলতে কী, আমরা আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার যোগ্য হয়েছি কেবল তাঁর অসীম কৃপা ও অনুগ্রহের কারণেই। আমাদের এ যোগ্যতার একমাত্র উৎস স্বয়ং আল্লাহ; আমাদের সিদ্ধান্ত ও কর্ম হলো আল্লাহর উপহার গ্রহণের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার মাধ্যম মাত্র। পবিত্র কুরআনে পরিষ্কারভাবে বলা হয়েছে-
'মানুষ তা-ই পায়, যা সে পাওয়ার চেষ্টা করে।' সূরা নাজম : ৩৯
আমাদের আখিরাত নির্ধারিত হয় নিজেদের কর্মের ওপর ভিত্তি করে। কারণ, কর্ম আমাদের হৃদয়ের আয়নার প্রতিফলন, যে আয়না আল্লাহ প্রদত্ত উপহারগুলোকে হয় গ্রহণ করে, না নয় প্রত্যাখ্যান করে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন- 'সৎ কাজে একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করো।' সূরা বাকারা: ১৪৮ 'যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তারাই জান্নাতের অধিবাসী। তারা সেখানে থাকবে চিরকাল।' সূরা বাকারা: ৮২
আমাদের সৎকর্ম ও মানুষের সেবা আমাদের অন্তরকে আল্লাহর দিকে রুজু করে দেয়। তাই অন্তরকে বিশুদ্ধ না করলে এর ওপর পড়ে যাওয়া আবরণের কারণে আমরা নিজের সৎকর্ম থেকে ফসল সংগ্রহ করতে পারি না। যেমনটি মহানবি বলেছেন-
'আল্লাহ তোমাদের বাহ্যিক বেশভূষা বা সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কর্মের দিকে তাকান।'
পবিত্র কুরআন আমাদের শুধু বাহ্যিকভাবে ইসলামের বিধিবিধান অনুসরণ করতে বলেনি; বরং অন্তরের অন্তস্তল থেকে আল্লাহকে স্মরণ করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। কুরআন বলেছে-
'সে-ই সফলকাম হবে, যে বিশুদ্ধ হৃদয় নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।' সূরা শুআরা : ৮৯
যখন বাহ্যিক আনুগত্য আন্তরিক আত্মসমর্পণের সাথে যূথবদ্ধ হয়, তখনই কেবল আমাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসাকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত হয়ে ওঠে।
'যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, দয়াময় তাদের ভালোবাসা দিয়ে ধন্য করবেন। সূরা মারইয়াম: ৯৬
আল্লাহর দিকে ফিরে আসা, মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করা এবং নিজের আত্ম-অহমের আবরণকে সরিয়ে ফেলার মাধ্যমেই কেবল আমরা আল্লাহর সেই ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি, যে ভালোবাসার বৃষ্টি দিয়ে আল্লাহ সর্বদা আমাদের সিক্ত করে চলেছেন।

প্রবৃত্তি
পাপ করা বা আল্লাহবিমুখ হওয়া যেহেতু আমাদের কুপ্রবৃত্তির (নফস) ফসল, সেহেতু প্রবৃত্তি কী-তা আমাদের ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। অনেকে বলেন-প্রবৃত্তি তখনই সৃষ্টি হয়েছে, যখন আল্লাহ তাঁর দম (রুহ) আমাদের শরীরে ফুঁকে দিয়েছেন। আবার অনেকে বলেন-আমাদের আত্মাকে যদি সূর্যের সঙ্গে এবং শরীরকে যদি কাদামাটির সঙ্গে তুলনা করা হয়, তাহলে প্রবৃত্তিকে তুলনা করা যায় স্বচ্ছ বাষ্পের সঙ্গে। আত্মার আলো যখন কাদামাটির শরীর স্পর্শ করে, তখন সেখানে এ বাষ্প সৃষ্টি হয়। অন্য কথায়, কুয়াশা যেমন আমাদের দৃষ্টিতে ঘোলাটে করে দেয়, তেমনি প্রবৃত্তি আমাদের আত্মা ও বিবেকের দৃষ্টিকে ঘোলাটে করে দেয়। ইসলামে প্রবৃত্তির বিশুদ্ধিকরণ ও প্রবৃত্তির বশীকরণের গুরুত্ব অনেক বেশি এ কারণে যে, আমরা নিজের প্রবৃত্তিকে যতই বিশুদ্ধ করব, আল্লাহর নুরকে ততই পরিষ্কার দেখতে পাব।
গাঢ় অন্ধকার আছে বলেই আমরা আকাশের নক্ষত্র দেখতে পাই। ঠিক তেমনি কুপ্রবৃত্তি আছে বলেই আমরা আমাদের আত্মার স্বাদ সঠিকভাবে অনুভব করতে পারি। কবি আহমাদ সামানি দুটি বিপরীত জিনিসের ভারসাম্যমূলক প্রভাব প্রসঙ্গে লিখেছেন-
'যেকোনো উঁচু প্রাসাদের পাশেই থাকে একটি গভীর গর্ত। প্রাসাদে জমা হওয়া অপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও আবর্জনাগুলোকে সেখানে নিক্ষেপ করা হয়। একইভাবে আল্লাহ যখন বিশুদ্ধতার নুর দিয়ে হৃদয় তৈরি করলেন, তখন সেখানে কুপ্রবৃত্তিকেও রেখে দিলেন ডাস্টবিন হিসেবে। কুপ্রবৃত্তির কালো দাগ নিয়েই আমাদের হৃদয় ডানা মেলে উড়তে থাকে। একটি সোজা তিরের জন্য প্রয়োজন হয় একটি বাঁকানো ধনুকের। হে হৃদয়! তুমি তিরের মতো সোজা থেকো, হে প্রবৃত্তি! তুমি বাঁকা ধনুকের আকৃতি ধারণ করো!'
আল্লাহ আমাদের এজন্য পরীক্ষা নেন না যে, তিনি আমাদের ঘৃণা করেন; বরং তিনি আমাদের ভালোবাসেন এবং পরীক্ষার আগুনে পুড়ে খাঁটি সোনা হওয়ার যোগ্যতা আছে বলেই তিনি আমাদের পরীক্ষায় ফেলেন। মাংসপেশির বৃদ্ধির জন্য এর কোষগুলো যেমন ছিঁড়ে যায়, তেমনি আমাদের পাপ ও ভেতরের পবিত্রতা ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে আমাদের আধ্যাত্মিক বৃদ্ধি সাধিত হয়। নক্ষত্রকে দেখার জন্য যেমন রাত্রির আবরণ প্রয়োজন, তেমনি এ জগতের স্বাদ ঠিকমতো পাওয়ার জন্য ব্যথা ও আনন্দের সহাবস্থান প্রয়োজন।
এমনকী জগতে মানুষের অস্তিত্বও এমন একটি মুদ্রা, যার দুটি পিঠ রয়েছে। মুদ্রার এক পিঠে আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
'নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম গঠনে।' সূরা তিন : ৪
অন্যত্র বলছেন- ‘যখন আমি তাঁকে সঠিকভাবে বানিয়ে ফেলব এবং তাতে আমার রুহ সঞ্চার করব, তখন তোমরা তাঁর প্রতি সিজদাবনত হয়ো।’ সূরা সোয়াদ: ৭২
আরও বলা হচ্ছে- ‘স্মরণ করো, তোমার প্রতিপালক যখন ফেরেশতাদের বললেন, আমি জমিনে প্রতিনিধি সৃষ্টি করছি।’ সূরা বাকারা: ৩০)
এ তিনটি আয়াত থেকে মানুষের মর্যাদার তিনটি রূপ জানা যায়; মানুষের গঠন সর্বোত্তম, মানুষের ভেতর আল্লাহর রুহ রয়েছে এবং মানুষ আল্লাহর প্রতিনিধি। মুদ্রার অপর পিঠে মানুষের মর্যাদার ভঙ্গুর রূপ দেখা যায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি।’ সূরা মুমিনুন: ১২
অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা বলেন- ‘মানুষ এত দুর্বল যে, মাছি যদি কোনো কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায়, মাছির কাছ থেকে তা উদ্ধার করতেও পারে না।’ সূরা হজ: ৭৩
‘মানুষ আল্লাহর চিরন্তন বাস্তবতার সামনে এক ক্ষুদ্র, ভঙ্গুর ও মরণশীল সত্তা। সে কোথায় মৃত্যুবরণ করবে, তা সে জানে না।’ সূরা লোকমান: ৩৪
প্রবৃত্তি হলো এমন এক আবরণ, যা আল্লাহর কাছ থেকে আমাদের পৃথক করে। কোনো কোনো স্কলারের মতে-যখন আদম ও মা হাওয়া জান্নাতে ছিলেন, তখন আল্লাহর কাছ থেকে পৃথক থাকা এবং তাঁর নৈকট্য সম্পর্কে কোনো বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁদের ছিল না; যতক্ষণ না তাঁরা আল্লাহর সঙ্গে তৈরি হওয়া দূরত্বের সম্মুখীন হন। কিছু স্কলার মনে করেন-আদম ও মা হাওয়া-কে শাস্তি হিসেবে দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়নি; বরং তাঁদের দুনিয়াতে প্রেরণের উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর কাছ থেকে তাঁদের পৃথক করা। কারণ, মানবীয় অভিজ্ঞতার ঝুলিতে আল্লাহর কাছ থেকে দূরে থাকার বিষয়টি যুক্ত করার প্রয়োজন ছিল। আবরণের উপস্থিতি ছাড়া দর্শক ও দর্শনীয় বস্তু এক হয়ে যায়। আল্লাহ ও আমাদের মাঝে থাকা আবরণ সম্ভবত আল্লাহর অনুগ্রহেরই একটি ফসল। কারণ, এ আবরণ আছে বলেই আমরা আল্লাহকে ঠিকমতো অনুভব করতে পারি।
বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার জন্য নিচের উদাহরণটিকে বিবেচনায় নিন: মহাকাশচারীর হেলমেট এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে সূর্যের আলোর তীব্রতা তার চক্ষুকে অন্ধ করে দিতে না পারে। যদিও এ আবরণ তাকে সূর্যের প্রকৃত উজ্জ্বলতা থেকে বঞ্চিত করে, তবুও এ আবরণ তার জন্য আশীর্বাদ হয়ে দাঁড়ায়। কেননা, এ আবরণের কারণেই সে তার চোখ দিয়ে সূর্যের আলো উপভোগ করতে পারে। তেমনিভাবে আল্লাহর সামনে থাকা আমাদের প্রবৃত্তির পর্দাকে যদি আমরা মহাকাশচারীর হেলমেটের মতো সাজাই; অর্থাৎ একে ঠিকমতো বিশুদ্ধ করি, তাহলে এর মাধ্যমে আমরা আল্লাহকে সত্যিকারভাবে অনুভব করতে পারি।
যদি প্রবৃত্তির আল্লাহকে ভুলে থাকার প্রবণতাকে আল্লাহকে স্মরণের প্রবণতায় রূপান্তর করতে পারি, তাহলে পুরো পরিস্থিতি মুহূর্তেই পালটে যায়। ত্রয়োদশ শতকে সুফি সাধক মোল্লা নাসিরুদ্দিন খুব সুন্দরভাবে এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন-
'একবার এক লোক মোল্লা নাসিরুদ্দিনের কাছে এসে বলল- “আমি খুব ধনী, কিন্তু হতাশ। আমি সুখের সন্ধানে বহু টাকা ব্যয় করেও সুখের দেখা পাইনি।" লোকটি যখন বিমর্ষ হয়ে আকাশের দিকে তাকাল, তখন মোল্লা সাহেব লোকটির হাতে থাকা টাকার থলেটি টান দিয়ে ছিনিয়ে নিল এবং দৌড়াতে শুরু করল।
লোকটি মোল্লার পিছু দৌড়াতে শুরু করল এবং চিৎকার করতে থাকল-“চোর! চোর!” মোল্লা দৌড়াতে দৌড়াতে বাঁক নেওয়ার সময় পথের মাঝে ব্যাগটি ফেলে একটি গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। লোকটি যখন পিছু পিছু এসে তার ব্যাগ খুঁজে পেল, তখন তার বিমর্ষ চেহারা আনন্দে ঝলমল করে উঠল। তখন মোল্লা গাছের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে বলল- “কখনো কখনো তোমার যা আছে তা হারিয়ে ফেলা উচিত। যখন তুমি পুনরায় তোমার হারানো জিনিস খুঁজে পাবে, তখনই কেবল বুঝবে-কত মূল্যবান সম্পদ তোমাকে দেওয়া হয়েছে।"'
আদম ও মা হাওয়া-কে জান্নাত থেকে নেমে যেতে হয়েছিল, যাতে তাঁরা জান্নাতের মর্যাদা অনুধাবন করতে পারেন। আমাদের শাস্তিস্বরূপ দুনিয়াতে পাঠানো হয়নি; বরং আল্লাহ আমাদের যা দান করেছেন, তার কতটুকু কৃতজ্ঞতা আমরা প্রকাশ করি, তার পরীক্ষা নিতেই আমাদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। আমাদের সামনে দুটি পথ খোলা; হয় আমরা আল্লাহকে ভুলে গিয়ে ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে চূড়ান্ত ধ্বংসের পথে এগিয়ে যাব অথবা আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করে চূড়ান্ত সাফল্য লাভ করব।

ইসলামে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই
আল্লাহ কেন আমাদের ভেতর সুপ্রবৃত্তি ও কুপ্রবৃত্তিকে পাশাপাশি দান করলেন, যার একটি আমাদের সুপথে এবং অন্যটি কুপথে পরিচালিত করে? এ প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে-জগতের সব জিনিসের শুরু ও শেষ হয় ভালোবাসার মধ্য দিয়ে। আল্লাহর ভালোবাসার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু। আমরা ভালোবাসার আদি উৎস-'আল ওয়াদুদ' (আল্লাহর একটি নাম)-এর দাসানুদাস। আল্লাহকে ভালোবাসা এবং আল্লাহর ভালোবাসায় সিক্ত হওয়াই আমাদের সৃষ্টির প্রধান কারণ। আমরা যদি মেঘাচ্ছন্ন আকাশের নিচে কিংবা বৃষ্টিস্নাত দিনে বসবাস করি, তাহলেও আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসার রোদ আমাদের জীবনকে রাঙিয়ে দেয়।
আল্লাহর ভালোবাসা প্রতিটি মুহূর্তকে মহাকালের গর্ভে নিক্ষেপ করে এবং অতীতকে অপরিবর্তনীয় ও চিরস্থায়ী রূপ দান করে। তাঁর ভালোবাসার মাধ্যমে আমরা অসীমের স্বাদ অনুভব করি। আল্লাহর ভালোবাসার মাধ্যমেই আমরা সেই আধ্যাত্মিক রসায়নের ভেতর দিয়ে যাই, যার মাধ্যমে আমাদের পাথরের হৃদয় স্বর্ণে পরিণত হয়। তাঁর ভালোবাসা কাঁটার সমুদ্র থেকে গোলাপ তুলে আনে, শুঁয়াপোকার শরীরে ডানার অস্তিত্ব এনে দেয়, শক্ত গ্রানাইট পাথরকে মূল্যবান রুবিতে পরিণত করে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয়-আমরা সাধারণ মাটির মানুষের চাইতেও অনেক বেশি অসীম। ভালোবাসার পিঠে চড়েই আমাদের হৃদয় আল্লাহর কাছে পৌঁছায়।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, শূন্যতার ভেতর সবকিছুর অস্তিত্বশীল হওয়ার পেছনের প্রধান কারণ ভালোবাসা। কারণ, আল্লাহর ভালোবাসার ঝরনাধারায় সিক্ত হওয়ার জন্যই আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ এ ভালোবাসার কথা এভাবে বলেছেন-
'আর জিন ও মানুষকে কেবল এজন্য সৃষ্টি করেছি, তারা আমার ইবাদত করবে।' সূরা আজ-জারিয়াত: ৫৬
এ কথার নির্যাস হলো-আল্লাহর ইবাদতই ভালোবাসার সর্বোচ্চ শিখর। কারণ, আপনি ততক্ষণ পর্যন্ত কারও ইবাদত করতে পারবেন না, যতক্ষণ না তাকে ভালোবাসেন। কিন্তু ভালোবাসার অস্তিত্বের জন্য স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয়। কারণ, ভালোবাসা কখনো জোর করে হয় না। এজন্যই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।' সূরা বাকারা: ২৫৬
আল্লাহ আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি এই জন্য দেননি, আমরা মন্দ কাজ করব এবং পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করব; বরং আমাদের ইচ্ছার স্বাধীনতা এজন্যই দেওয়া হয়েছে, যেন আল্লাহর ভালোবাসার পথকে নিজেরাই বাছাই করে নিই এবং আল্লাহর প্রেমে মত্ত হয়ে জীবন কাটিয়ে দিই। আল্লাহ যদি তাঁর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা আমাদের না দিতেন, তাহলে আমরা নিজেদের স্বাধীনতার প্রকাশ ঘটাতে পারতাম না, আমাদের জন্য একটি ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ থাকত না। ফলে সেই বিকল্পকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগও থাকত না। আল্লাহ তাঁর কাছ থেকে দূরে চলে যাওয়ার স্বাধীনতা আমাদের এ কারণেই দিয়েছেন, যেন আমাদের স্বাধীনতাকে তাঁর কাছে আসার কাজে ব্যবহার করি এবং প্রমাণ করি, আমরা তাঁকে ভালোবাসি।

আল্লাহর ভালোবাসার উপহারের মোড়ক উন্মোচন
দুনিয়াতে আমাদের কাজ হলো-আল্লাহর দেওয়া ভালোবাসার উপহারের মোড়ক উন্মোচনের প্রচেষ্টা অব্যহত রাখা। আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করতে হয় না; বরং তাঁর ভালোবাসার স্রোতঃস্বিনী আমাদের হৃদয়ে সদা প্রবহমান। আল্লাহর ভালোবাসা বিশাল সমুদ্র শুধু মানুষ নয়; সৃষ্টিজগতের সমস্ত কিছুর ওপরই প্রবহমান। আমাদের সৎকর্ম কেবল আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ গ্রহণের মাধ্যম।
আল্লাহর দেওয়া 'স্বাধীন ইচ্ছা' নামক উপহার তাঁকে জানতে ও ভালোবাসতে পথ দেখায় এবং হৃদয়ের ভেতর কৃতজ্ঞতাবোধের জন্য একটি জায়গা নির্মাণ করে। ফলে তাঁর ইবাদত করা আমাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
মানুষের মাধ্যমেই মহাবিশ্ব পরিচিতি লাভ করেছে। কারণ, আল্লাহ বিশ্বজগৎ সৃষ্টির অনেক রহস্যই আমাদের জানিয়েছেন উপহার হিসেবে। আল্লাহ যখন আদম-কে সৃষ্টি করলেন, তখন ফেরেশতারা আল্লাহকে জিজ্ঞেস করলেন- কেন তিনি এমন জীবকে সৃষ্টি করতে চান, যারা দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা ও রক্তপাত করবে? আল্লাহ জবাবে বললেন- 'আমি যা জানি, তা তোমরা জানো না।' এরপর আল্লাহ ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলেন আদম-এর ভেতর ফুঁকে দেওয়া আল্লাহর রুহকে সিজদা করার জন্য। আদম-এর সৃষ্টি প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি যখন তাঁকে সঠিকভাবে বানিয়ে ফেলব আর তাঁর ভেতর আমার রুহ ফুঁকে দেবো, তখন তোমরা তাঁর সামনে সিজদায় পড়ে যাবে।' সূরা ছোয়াদ: ৭২
এরপর কুরআন আদম ও ফেরেশতাদের মধ্যকার আরেকটি রহস্যময় ঘটনার কথা উল্লেখ করেছে-
'এবং তিনি আদমকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দিলেন।' সূরা বাকারা: ৩১
এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ আদম ও তাঁর সকল বংশধরকে সৃষ্টিজগতের সবকিছুকে পৃথকভাবে চেনার এবং এগুলোর ভেতরে সংযোগ স্থাপনের সক্ষমতা দিয়েছেন। অন্যরা বলেন, সৃষ্টিজগতের সকল বস্তুকে অনুভব করার যোগ্যতা আদম-কে দেওয়া হয়েছে। আবার কেউ কেউ বলেন, আল্লাহ আদম-কে তাঁর সকল নাম শিখিয়ে দিয়েছেন, যে নামগুলো সকল সৃষ্টির ওপর প্রতিফলিত হয়েছে। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন-'আদমকে আমার রূপে সৃষ্টি করা হয়েছে।' এজন্যই যুগে যুগে ইসলামিক স্কলাররা বলেছেন- 'যে নিজেকে চেনে, সে তার রবকে চেনে।'
আমাদের ভেতর আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন আছে-এর মানে এই নয় যে, আমরাই আল্লাহ। 'নিজেকে চেনা মানে আল্লাহকে চেনা'-এ কথাটির অর্থ হলো, যখন আমরা নিজেদের মানবীয় বৈশিষ্ট্য, সীমাবদ্ধতা ও ভুল করার প্রবণতাকে আন্তরিকভাবে উপলব্ধি করতে পারি, তখনই কেবল আল্লাহর অসীম ও নির্ভুল প্রকৃতির স্বাদ আস্বাদন করতে পারি। বিষয়টি অনেকটা এ রকম-খুব সুন্দর ও চিন্তার খোরাক আছে এমন বই যখন আমরা পড়ি, তখন লেখকের বুদ্ধিমত্তা ও মেধার প্রতি একটা টান অনুভব করি। ঠিক তেমনি যখন আমরা সৃষ্টিজগতের নিগূঢ় রহস্যের প্রতি মনোযোগ নিবদ্ধ করি, তখন এর স্রষ্টার নির্ভুলতা, মেধা, প্রজ্ঞা সম্পর্কে কিছুটা ধারণা লাভ করতে পারি।
আল্লাহকে চিনতে হলে আমাদের অবশ্যই জীবনের মুখোমুখি হতে হবে; জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়া চলবে না। আল্লাহ আমাদের সঙ্গে কথা বলেন তাঁর অনুগ্রহের মাধ্যমে কিংবা তাঁর পরীক্ষার মাধ্যমে। যখন আল্লাহ আমাদের সম্পদ ও প্রাচুর্য দান করেন, তখন তিনি তাঁর নাম আল কারিম (মহা দয়ালু) ও আশ-শাকুর (গুণগ্রাহী, সুবিবেচক)-এর দিকে আহ্বান করেন। যখন আমরা নিজের দুঃসময়েও অবিচল ঈমান রাখি এবং আল্লাহর দয়ার প্রতি আশাবাদী থাকি, তখন আমরা আল্লাহর আস-সাবুর (অত্যধিক ধৈর্যশীল) গুণের দিকে ধাবিত হই। মহানবি ﷺ বলেছেন-
'মুমিনের ব্যাপারখানা কতই না বিস্ময়কর! নিশ্চয়ই তার সবকিছুই কল্যাণকর। তবে মুমিন ছাড়া আর কারও জন্য এটি সত্য নয়। যদি তার ওপর ভালো কোনো কিছু আপতিত হয়, তাহলে সে কৃতজ্ঞ হয় এবং এটি তার জন্য কল্যাণকর হয়। যদি তার ওপর খারাপ কোনো কিছু আপতিত হয়, তাহলে সে ধৈর্যধারণ করে এবং এটিও তার জন্য কল্যাণকর হয়। '
আমাদের হৃদয়ের গহিনে ও মহাশূন্যে আল্লাহ আমাদের জন্য তাঁর দরজা খুলে বসে আছেন, যেন তাঁর নামসমূহের মাধ্যমে আমরা তাঁর কাছে পৌঁছতে পারি।
'আমরা নিজেদের যে দৃষ্টিতে দেখি, তার প্রতিফলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হওয়া দৃষ্টিতেই আমরা আল্লাহকে দেখি।' -শামস তাবরিজি
ভালোবাসা এমন কিছু নয়, যা আমরা সৃষ্টি করি বা দুনিয়াতে খুঁজে পাই। ভালোবাসা আমাদের সত্তারই একটি অংশ। আমরা সাধারণত আপন ও কাছের ব্যক্তির ভালো বৈশিষ্ট্যের প্রতি টান অনুভব করি। যদি আল্লাহকে সবচেয়ে আপন হিসেবে বেছে নিই, তাহলে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতিও টান অনুভব করব।
আমরা যত বেশি এমন ব্যক্তির সংস্পর্শে আসব-যারা আল্লাহকে ভালোবাসে এবং যত বেশি আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ, মমতা, ক্ষমা ও শান্তিময়তার গুণগুলো ধারণ করব, তত বেশি আল্লাহর ভালোবাসার ভেতর নিজেকে আবিষ্কার করব। আমরা চাঁদের মতো; অন্ধকারাচ্ছন্ন কুপ্রবৃত্তি থেকে আমরা যত দূরে সরে আসব, আল্লাহর ভালোবাসার আলোয় তত বেশি সিক্ত হব।
ইবাদত হলো ভালোবাসারই চূড়ান্ত স্তর। যখন আমরা আল্লাহকে ঠিকমতো জানতে পারব এবং অনুভব করতে পারব-আল্লাহর ভালোবাসা কীভাবে আমাদের আচ্ছন্ন করে রাখে এবং কীভাবে তিনি আমাদের ভুলগুলো অগ্রাহ্য করে চলেন, তখন তাঁর ইবাদতের মধ্যে এক অনাবিল শান্তি খুঁজে পাব। আন্তরিক ইবাদত কখনো বাধ্যবাধকতার পাটাতনে জন্মলাভ করতে পারে না; এর জন্ম ও বিকাশ ঘটে কৃতজ্ঞতাবোধের উর্বর জমিতে।
আমাদের ভেতরের কৃতজ্ঞতাবোধকে উজ্জীবিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো-কত নিখুঁতভাবে আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, সেদিকে মনোযোগ নিবদ্ধ করা। যখন আমরা সৃষ্টিজগতের নিগূঢ়তা ও নির্ভুলতার দিকে দৃষ্টি দিই, তখন এমনিতেই আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতায় মাথা নুয়ে আসে। প্রতিবার নিশ্বাস নেওয়ার সময় যদি খেয়াল করি-আল্লাহর অনুমতি আছে বলেই আমরা নিশ্বাস নিতে পারছি, তাহলে বুঝতে পারব-আল্লাহর ভালোবাসার দৃষ্টি আমাদের ওপর সর্বদা বিরাজমান। যখন আমাদের দুশ্চিন্তাগুলোকে প্রার্থনা, অনুশোচনা, ক্ষমা ভিক্ষা ও আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে ইবাদতে রূপান্তর করতে পারব, তখন আমাদের মনোযোগ আমাদের সমস্যা কত বড়ো তা থেকে আল্লাহ কত বড়ো-সেদিকে নিবদ্ধ হবে।

জীবন একটি পরীক্ষার নাম
পবিত্র কুরআনে জীবনকে একটি পরীক্ষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। আল্লাহ আমাদের পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এজন্য যে, আমরা যেন নিজেদের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই এবং আপন সক্ষমতার পর্দা উন্মোচন করি। শুধু জান্নাত ও জাহান্নাম নিয়েই জীবন নয়; বরং জীবন হলো নিজেকে চেনা-যাতে আল্লাহকে চেনা যায়।
আল্লাহর পথের শুরুটা হয় মানবীয় গুণাবলির প্রকাশ ঘটানোর মধ্য দিয়ে। কারণ, যা আপনার নিজের মধ্যে নেই, তার চূড়ান্ত স্তরের প্রতীক আপনি হবেন কী করে?
আল্লাহ আমাদের সঙ্গে কী করছেন তা নয়; বরং আল্লাহ আমাদের জন্য কী করছেন-তার ওপর যখন লক্ষপাত করি, তখনই কেবল এক মহাসত্য অনুধাবন করতে পারি। এটি হলো আমরা যা চাই, তা আল্লাহ সব সময় আমাদের না দিলেও সেই সব জিনিস ঠিকই দিয়ে চলেছেন, যা আমাদের প্রয়োজন।
'এবং হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করো, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর।' সূরা বাকারা: ২১৬
আল্লাহ জানেন, আপনার আত্মার চারাগাছ বেড়ে উঠার জন্য কোন মাটি প্রয়োজন। তিনি আপনার আশেপাশে এমন সব লোকের সমাগম ঘটান-যারা হয় আপনাকে ভালোবাসে অথবা পরিত্যাগ করে, উৎসাহ দেয় অথবা নিরুসাহিত করে, সন্দেহ করে অথবা বিশ্বাস করে। আপনার প্রতি ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও জগতের অনেককেই আল্লাহ আপনাকে আঘাত করার বা কষ্ট দেওয়ার সুযোগ দেন। এর কারণ এই নয় যে তিনি আপনাকে ধ্বংস করতে চান; বরং তিনি আপনার ভেতরের লুকোনো শক্তিকে আপনার সামনে তুলে ধরতে চান। এজন্যই মুহাম্মাদ বলেছেন-
'যদি আল্লাহ কারও কল্যাণ চান, তাহলে তাকে বিপদাপদের পরীক্ষায় নিপতিত করেন।'
আল্লাহ যখন আমাদের বিপদ ও বেদনার কঠিন পরীক্ষার গুহায় ডেকে নেন, তখন তিনি মূলত আমাদের জন্য সেখানে মূল্যবান মণি-মুক্তার ভান্ডার রেখে দেন। আল্লাহ তখনই আমাদের ধাক্কা দিয়ে গিরিখাদের কিনারায় নিয়ে যান, যখন তিনি চান-আমরা যেন উড়তে শিখি। আমাদের ওপর আসা বিপদগুলো মূলত আমাদের আত্ম-উন্মোচন ও বেড়ে উঠার ক্ষেত্রে অনুঘটকের কাজ করে।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন-'নিশ্চয়ই কষ্টের সাথেই রয়েছে সুখ।' সূরা ইনশিরাহ : ৫
একটি ছোট্ট ছেলে ও প্রজাপতির গল্পে এ বিষয়ে খুব মূল্যবান শিক্ষা পাওয়া যায়।
'একদিন একটি ছোট্ট ছেলে অনেকক্ষণ ধরে পর্যবেক্ষণ করছিল, কীভাবে প্রজাপতি নিজের খোলস ভেঙে ডানা তৈরি করে। একসময় ছেলেটি মনে করল, প্রজাপতিটাকে তার সাহায্য করা উচিত। কাজেই সে একটি কাঁচি নিয়ে এসে খুব সযত্নে খোলসটি কেটে দিলো এবং প্রজাপতিটি বাইরে বেরিয়ে এলো। কিন্তু ছেলেটি অবাক হয়ে লক্ষ করল, প্রজাপতির ডানা দুটি কুঁচকে আছে এবং এটি উড়তে পারছে না। পরবর্তী পুরো জীবন এটিকে মাটির ওপর বুক দিয়ে চলতে হয়েছে।'
মূলত ছেলেটি জানত না-খোলস ভাঙতে প্রজাপতিকে যে সংগ্রাম করতে হয়, সেটাই তার পাখা দুটিকে উড়ার মতো সামর্থ্যবান করে তোলে; তার সংগ্রামই তার ডানায় শক্তি জোগায়। তাই সংগ্রাম থেকে প্রজাপতিকে বিরত রাখার মানে হলো, তার উড়ার শক্তিকে ধ্বংস করা। একইভাবে কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিবেকের লড়াই আমাদের বিবেকের পেশিগুলোকে শক্তিশালী করে তোলে। লড়াই ছাড়া বিবেক দুর্বল হয়ে পড়ে। যেমনটি জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'যদি প্রতিবার ঘষার সময় তুমি বিরক্ত হও, তাহলে কী করে তোমার আয়না পরিষ্কার হবে?'
আমরা যখন পরীক্ষার মুখোমুখি হই, তখন মূলত আমাদের ভেতর থাকা সম্ভাবনাকে প্রয়োগের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করি, যে সম্ভাবনা আমাদের স্বস্তি ও আরামের খোলসের নিচে লুকিয়ে থাকে। মানুষ যেন একটি ফটোগ্রাফ, যা ডেভেলপ করা হয় পরীক্ষার ডার্করুমে।
আরবিতে 'ফিতনা' শব্দটির অর্থ হলো কষ্ট। এ শব্দটি এসেছে ফাতানাহ থেকে, যার অর্থ-স্বর্ণকে পরীক্ষা করার জন্য আগুনে পোড়ানো। একজন প্রেমময় ও দয়াময় প্রভু পরীক্ষায় ফেলার মাধ্যমে আমাদের খোলস ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করেন। ধৈর্য ও প্রার্থনার মাধ্যমে বিপদের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালে আমাদের ভেতরের কালো বর্ণের কয়লা ঝকমকে হিরায় পরিণত হয়।
'যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো না কোনো পথ বের করে দেবেন। আর তাকে রিজিক দেবেন এমন উৎস থেকে, যা সে ধারণাও করতে পারে না। যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।' সূরা তালাক: ২-৩
জগতের সবকিছু আপনার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, যাতে ভালোবাসার সাথে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হতে পারেন। যখন সত্যিকার অর্থে আপনার সৃষ্টির উদ্দেশ্যের মধ্যে নিজেকে বিলীন করতে পারবেন, তখন আপনার ওপর আপতিত আল্লাহর পরীক্ষা; যাকে আপনি বিপদ বলে থাকেন এবং আল্লাহর অনুগ্রহ; যাকে আপনার স্বাভাবিকভাবে প্রাপ্ত বিষয় বলে মনে হয়-দুটোই মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে। আপনার প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি চিন্তার মাধ্যমে আল্লাহ আপনার সাথে কথা বলবেন এবং তাঁর প্রেমের সাগরের দিকে আপনাকে ফিরে আসার আহ্বান জানাবেন। যেমনটি পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি তাদের পরীক্ষা করেছি ভালো ও মন্দ দ্বারা, হয়তো তারা ফিরে আসবে।' সূরা আ'রাফ: ১৬৮
এটি মানুষের জন্য খুব আনন্দের খবর যে, আমাদের সুখ ও দুঃখ উভয় সময়েই আল্লাহ আমাদের পাশে সমানভাবে উপস্থিত থাকেন এবং তাঁর করুণাধারার দিকে অবিরত ডেকে চলেন।

শান্তির জন্য জিহাদ
আমাদের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিবেকের যে লড়াই, এটাকে বড়ো জিহাদ বলা হয়ে থাকে। জিহাদ শব্দটি এসেছে জাহাদা থেকে, যার অর্থ-প্রচেষ্টা চালানো, সংগ্রাম করা। রাসূল -এর বিভিন্ন বক্তব্য থেকে মুসলিম স্কলারগণ জিহাদের দুটি অংশের কথা বলেছেন: ছোটো জিহাদ ও বড়ো জিহাদ।
আত্মরক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার জন্য যুদ্ধকে ছোটো জিহাদ বলা হয় এবং নিজের কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে বিবেকের সংগ্রামকে বড়ো জিহাদ বা আধ্যাত্মিক জিহাদ বলা হয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের কী হয়েছে যে, তোমরা আল্লাহর পথে এবং অসহায় নারী-পুরুষ আর শিশুদের (রক্ষার) জন্য লড়াই করবে না, যারা দুআ করছে-“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের এ জালিম অধ্যুষিত জনপদ থেকে মুক্তি দাও, তোমার পক্ষ থেকে কাউকে আমাদের বন্ধু বানিয়ে দাও এবং তোমার পক্ষ থেকে কাউকে আমাদের সাহায্যকারী করে দাও।” সূরা নিসা: ৭৫
এখানে পবিত্র কুরআন খুব স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, নিপীড়িত ব্যক্তি যে-ই হোক এবং যেখানেই থাকুক, তাকে সাহায্য করা মুসলিমদের জন্য বাধ্যতামূলক। অবশ্য ছোটো জিহাদ আত্মরক্ষামূলক এবং কেনো সাধারণ নাগরিক এ জিহাদের ঘোষণা দিতে পারে না। প্রতিষ্ঠিত কর্তৃপক্ষই কেবল ছোটো জিহাদের ঘোষণা দিতে পারে, যা মহানবি ﷺ-এর রেখে যাওয়া উদাহরণ ও কুরআনের আয়াত দ্বারা সমর্থিত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর পথে লড়াই করো, যারা তোমাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে; কিন্তু সীমা অতিক্রম করো না। আল্লাহ সীমা অতিক্রমকারীদের ভালোবাসেন না।' সূরা বাকারা : ১৯০
জিহাদ কোনো গন্তব্য নয়; বরং জিহাদ হলো অন্যায়কে দূর করে সেখান শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামের পথ।
রোমানরা বলত, 'যুদ্ধের সময় আইন ও নীতি স্থগিত থাকে।' কিন্তু আল্লাহ এর বিপরীত ধারণা মানুষের সামনে উপস্থিত করেছেন। ইসলামে যুদ্ধের সময় কঠোরভাবে নীতি-নৈতিকতা ও আইন-কানুন মেনে চলতে বলা হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মানুষের জীবনকে খুব মর্যাদাপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইসলামে আত্মরক্ষামূলক সশস্ত্র যুদ্ধের নীতিমালা বহু আধুনিক রাষ্ট্রের চাইতেও কঠোর। উদাহরণস্বরূপ যুদ্ধের সময় নারী, উপাসনাকারী, অসুস্থ, বয়স্ক, শিশু, যুদ্ধে লিপ্ত নয়-এমন নাগরিক বা সিভিলিয়ানকে হত্যা করতে মুসলিম সেনাদের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। নগর ধ্বংস করা, গাছ কেটে ফেলা এবং অগ্নিসংযোগ করা থেকে বিরত থাকার আদেশ দেওয়া হয়েছে। এর মানে হলো-পৃথিবীকে সংরক্ষণ করতে হবে এবং সাধারণ নাগরিকের কোনো ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা যাবে না।
সশস্ত্র জিহাদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে এর সমাপ্তি ঘটে। কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-
'তারা যদি সন্ধি করতে আগ্রহ প্রকাশ করে, তাহলে তুমিও সেদিকে আগ্রহী হও এবং আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিঃসন্দেহে তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।' সূরা আনফাল : ৬১
অন্যদিকে তাদের সাথে সদয় ব্যবহার করতে বলা হয়েছে, যারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেনি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের সাথে সদয় ব্যবহার করতে আর ন্যায়নিষ্ঠ আচরণ করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি। আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন।' সূরা মুমতাহিনা : ৮
মুহাম্মাদ খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন-
'সাবধান! যারা সংখ্যালঘু অমুসলিমের প্রতি নিষ্ঠুর ও কঠোর আচরণ করবে, তাদের অধিকার কেড়ে নেবে, তাদের ওপর সাধ্যের অতিরিক্ত বোঝা চাপাবে কিংবা ইচ্ছার বাইরে তাদের থেকে কোনো কিছু ছিনিয়ে নেবে, বিচার দিবসে আমি তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে অভিযোগ দায়ের করব।'
ছোটো বা সশস্ত্র জিহাদ অনেক শর্তের অধীন এবং সুনির্দিষ্ট সময়, ঘটনা ও স্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সংঘটিত হয়। অন্যদিকে বড়ো বা আধ্যাত্মিক জিহাদ সময় বা স্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর কোনো শেষ নেই। নির্বিশেষে সকল যুগের সকল স্থানের সকল মুসলিমের জন্য এটি প্রযোজ্য। ছোটো জিহাদ সংঘটিত হয় দৃশ্যমান অত্যাচারী শাসক ও নিপীড়নকারী শত্রুর বিরুদ্ধে। বড়ো জিহাদ সংঘটিত হয় প্রবৃত্তির আকাঙ্ক্ষা, অহংকার, অজ্ঞতা, হিংসা, ক্রোধ, লালসা ইত্যাদির মতো অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে।
মুহাম্মাদ বড়ো জিহাদ সম্পর্কে বলেছেন-
'আমি কি তোমাদের বলিনি, সেই ব্যক্তি ঈমানদার-যার কাছে অন্যের জীবন ও সম্পদ নিরাপদ? সেই মুসলিম, যার জিভ ও হাত থেকে অন্য লোকেরা নিরাপদ? সেই আল্লাহর পথে জিহাদকারী, যে আল্লাহর আনুগত্য করার জন্য নিজের বিরুদ্ধে জিহাদ করে? সেই হিজরতকারী, যে পাপাচার ও মন্দ কর্ম থেকে হিজরত করে?'
আমাদের ওপর আল্লাহর বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলির প্রতিফলন ঘটাতে বলা হয়েছে, তা যত কঠিনই হোক না কেন। যখন আমরা ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে জাগি, তখন সেটা জিহাদ। যখন অন্যের গোপনীয় বিষয় গোপন রাখি; যদিও সে আমাদের গোপন বিষয় প্রকাশ করে দেয়, তখন তা জিহাদ। যখন আমরা অন্ধকার ও ঘৃণার বিপরীতে আলো ও ভালোবাসার প্রকাশ ঘটাই, তখন সেটা জিহাদ। আল্লাহর জন্য কল্যাণ প্রতিষ্ঠা ও প্রকাশ ঘটানোর যেকোনো প্রচেষ্টাই জিহাদ।
সশস্ত্র সামরিক অভিযানই যে একমাত্র জিহাদ নয়, তার প্রমাণ নিম্নোক্ত হাদিস- ‘এক লোক রাসূল -এর কাছে এসে জিহাদে গমনের অনুমতি চাইল। রাসূল তাকে জিজ্ঞেস করলেন- “তোমারা বাবা-মা কি জীবিত আছেন?” লোকটি বলল- “হ্যাঁ।” তখন রাসূল বললেন- "তাহলে যাও, তাঁদের সেবায় নিয়োজিত হও।”’
জিহাদ হলো কোনো জিনিসকে তার সঠিক স্থানে রাখা। জিহাদ শুধু কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের নাম নয়; বরং মানুষকে আল্লাহর দেওয়া অধিকারগুলোর সুরক্ষার মাধ্যমে আল্লাহর প্রতিনিধি হওয়ার সাধনা করার নামও জিহাদ।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আমরা শান্তির জন্য যে সংগ্রাম করি, তার জন্ম ভালোবাসা থেকে; ঘৃণা থেকে নয়। আমরা যদি আল্লাহর ন্যায়বিচার, অনুগ্রহ ও ক্ষমার প্রতিফলন অন্যান্য সৃষ্টির ওপর ঘটাতে চাই, তাহলে আগে আমাদের হৃদয়ের আয়নাকে ঘষে পরিষ্কার করে নিতে হবে।

হৃদয়ের আয়নাকে পরিষ্কার করা
আয়না পরিষ্কার না করলে যেমন তাতে ময়লার স্তর পড়ে, তেমনি আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে হৃদয়ের আয়না পরিষ্কার করতে ব্যর্থ হলেও সেখানে ময়লার স্তর পড়ে। অবশ্য আমাদের মনকে হৃদয়ের ভেতর স্থানান্তর করা এবং আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করা সহজ নয়। বলা হয়ে থাকে, আমাদের মাথা থেকে হৃৎপিণ্ডের দূরত্ব মাত্র আঠারো ইঞ্চি হলেও এ দুটির আধ্যাত্মিক দূরত্ব অনেক বেশি। আধ্যাত্মিক পথ মনের গুরুত্বকে অস্বীকার করে না। কিন্তু মন যদি শরীরের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে, তাহলে হৃদয় ও আত্মা কুপ্রবৃত্তির দাসে পরিণত হয়। অবশ্য আল্লাহর প্রতি অনুগত হৃদয় যখন শরীরের ওপর প্রভাব বিস্তার করে এবং মন যখন সেই হৃদয়ের দাসত্ব শুরু করে, তখন আমরা প্রকৃত শান্তি অনুভব করি।
দুনিয়ার তত্ত্বাবধায়ক হতে হলে বা দুনিয়াতে আল্লাহর আয়না হতে হলে শুধু আমাদের আচরণের পরিবর্তন করলেই চলবে না; বরং কৃপ্রবৃত্তি ও হৃদয়কেও বশে আনতে হবে। ইসলামি ধর্মতত্ত্ব মতে, হৃদয় হলো অনুধাবনের একটি অংশ। কারণ, মানুষ পুরো জগৎকে দেখে হৃদয়ের ফিল্টার দিয়ে; চোখ দিয়ে নয়।
'বস্তুত চোখ তো অন্ধ হয় না; অন্ধ হয় বক্ষস্থিত হৃদয়।' সূরা হজ: ৪৬
আমরা জগৎকে জগতের দৃষ্টিতে দেখি না; দেখি আমাদের হৃদয়ের নির্মাণ করা দৃষ্টিতে। যখন আমাদের হৃদয় হিংসা, লোভ, ক্রোধ, অহংকার ইত্যাদির পর্দা দিয়ে আবৃত থাকে, তখন আমরা বাস্তবতার বিকৃত রূপকে অবলোকন করি। সূরা মুতাফফিফিন-এর ১৪ নং আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তাদের কৃতকর্মই তাদের অন্তরে মরিচা ধরিয়ে দিয়েছে।'
অন্ধকারে নুড়ি পাথর ও সোনার টুকরোকে একই রকম দেখায়। আমাদের কপট হৃদয় যখন পাপের মেঘে আচ্ছন্ন হয়ে অন্ধকার হয়ে যায়, তখন সে হৃদয় সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য চিনতে পারে না। বুখারি শরিফে বর্ণিত হয়েছে-
'প্রত্যেক মানুষের ভেতরে গোশতের একটি টুকরো থাকে। এটি যদি সুস্থ থাকে, তাহলে পুরো শরীরই সুস্থ থাকে এবং এটি যদি অসুস্থ থাকে, তাহলে পুরো শরীরই অসুস্থ হয়ে পড়ে!'
একটি হৃৎপিণ্ডের আকার হয়তো হাতের মুষ্টির চাইতেও ছোটো, এটির ওজন হয়তো এক পাউন্ডেরও কম, কিন্তু একটি হৃৎপিণ্ড ঘণ্টায় প্রায় ৪০ গ্যালন রক্ত পাম্প করতে পারে। আল্লাহর ইচ্ছায় এই ছোট্ট পেশিটি মানুষের দেহে বছরে প্রায় ৪ কোটিবার এবং পুরো জীবনে প্রায় ৩০০ কোটিবার স্পন্দিত হয়। 'আল্লাহ' শব্দটি উচ্চারণের সময় আমাদের জিভ যেভাবে সংকুচিত ও প্রসারিত হয়, আমাদের হৃৎপিণ্ডও তেমনি একটি নির্দিষ্ট ছন্দে সংকোচন-প্রসারণের মাধ্যমে রক্ত পাম্প করে। হৃৎপিণ্ড জানে-তার রব কে। ভোগবিলাসের প্রতি আকৃষ্ট করার মাধ্যমে আল্লাহকে যেটি ভুলিয়ে দেয়, সে হলো কুপ্রবৃত্তি।
এ দুনিয়ার পূর্ববর্তী (জগৎ আত্মার) জগতে আমরা আল্লাহকে বাহ্যিকভাবে দেখেছিলাম এবং সাক্ষ্য দিয়েছিলাম-তিনি আমাদের রব। দুনিয়ার জগতে আমরা আল্লাহকে দেখি অন্তর দিয়ে। তাঁর গুণাবলি যেভাবে সৃষ্টিজগতের ওপর আপতিত হয়, সেই পথ ধরে। যে হৃদয়গুলো পরিশুদ্ধ, সেগুলো মূলত সৃষ্টিকে দেখে না; দেখে আল্লাহর নিদর্শন। এ কারণে যখন আলি-কে প্রশ্ন করা হলো- 'সৃষ্টি কী?' তিনি জবাবে বললেন-'এটি হলো বাতাসে মিশে থাকা ধূলিকণার মতো। আমরা তখনই ধূলিকণাকে দেখতে পাই, যখন এর ওপর আলো পড়ে।'
মন আমাদের হৃদয়কে শাসন করে না। কারণ, হৃদয়ের নিজস্ব আধ্যাত্মিক বোধ রয়েছে। এ কারণে মহানবি -কে যখন প্রশ্ন করা হলো-'ন্যায়পরায়ণতা কী?' তখন তিনি জবাবে বললেন- 'তোমার হৃদয়ের সাথে পরামর্শ করো!'
হার্টম্যাথ ইনস্টিটিউটের একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, আমাদের হৃৎপিণ্ডের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড কয়েক ফিট লম্বা এবং এটি আমাদের মস্তিষ্ক-তরঙ্গের চেয়ে ৬০ গুণ বেশি শক্তিশালী। এমনকী মানবভ্রূণের মস্তিষ্ক বা কেন্দ্রীয় নার্ভাস সিস্টেম তৈরি হওয়ার আগেই এটির (হৃৎপিণ্ডের) স্পন্দন শুরু হয়। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোতে পাওয়া গেছে, হৃৎপিণ্ডের নিজস্ব নিউরন সেট রয়েছে, যেগুলোর কোনো কোনোটি স্বল্পমেয়াদি, কোনো কোনোটি দীর্ঘমেয়াদি এবং এগুলো মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে এবং আমাদের আবেগকে প্রভাবিত করতে পারে।
আমাদের কর্মের মাধ্যমে হৃদয় প্রভাবিত হয়। মুহাম্মাদ বলেছেন- 'ন্যায়পরায়ণতা সেখানে, যেখানে আমাদের আত্মা প্রশান্তি অনুভব করে এবং আমাদের হৃদয়ও প্রশান্তি অনুভব করে। পাপ সেখানে, যেখানে আত্মা অস্থিরতা অনুভব করে এবং বুকের ভেতর ইতস্তত নড়াচড়া করে।'
আল্লাহর ওহি প্রেরণের অন্যতম মৌলিক একটি উদ্দেশ্য হলো-হৃদয়ের রূপান্তর ও প্রবৃত্তির বিশুদ্ধিকরণ। ইসলামের প্রতিটি স্তম্ভ ও অনুশীলন (ইবাদত) প্রবৃত্তি বিশুদ্ধিকরণে সাহায্য করে এবং হৃদয়কে দুনিয়ার দিক থেকে বিমুখ করে চিরঞ্জীব আল্লাহর দিকে এগিয়ে দেয়। কুরআনের বক্তব্য অনুযায়ী হৃদয়ের রূপান্তর ও প্রবৃত্তির বিশুদ্ধিকরণের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম হলো তওবা ও জিকির।

তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
তওবা আমাদের ভেতরের সেই অংশের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসে, পাপ ও ভুলের কারণে যে অংশটির প্রতি আমরা এতদিন দৃষ্টি দিতে পারিনি। আমাদেরকে সবচেয়ে সুন্দর এবং আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ মাস্টারপিস হিসেবে এই দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের সামনে এমন এক আবরণ সৃষ্টি করে, আমরা আল্লাহর করুণাধারা সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়ি। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেন-'আল্লাহ এক ব্যক্তির ভেতর দুটি হৃদয় সৃষ্টি করেননি।' এ আয়াতের অর্থ হলো-আমাদের হৃদয়কে হয় তো সৃষ্টির দিকে, নয়তো স্রষ্টার দিকে মুখ ফেরাতে হবে; একই সঙ্গে দুই দিকে মুখ ফেরানো যাবে না। হৃদয় শব্দটির আরবি প্রতিশব্দ হলো ক্বলব। শব্দটি যে মূল শব্দ থেকে এসেছে, তার অর্থ হলো-ঘোরা, দিক পরিবর্তন করা, ফিরে আসা ইত্যাদি।
মানুষ যখন পাপ করে, তখন তার মুখ আল্লাহর কাছ থেকে ঘুরে যায়। মানুষের হৃদয়ের প্রকৃতি হলো-এটি সব সময় সংকোচন-প্রসারণ, সৃষ্টি-স্রষ্টা, কুপ্রবৃত্তি-বিবেক দুই দিকে দোদুল্যমান থাকে। শয়তান কখনো ক্বলব বা হৃদয়কে সরাসরি বিকৃত করতে পারে না। কারণ, মানুষের হৃদয় বিশুদ্ধ এবং এর মালিক কেবলই আল্লাহ। শয়তান কেবল মনের একটি অংশে কুমন্ত্রণা দিতে পারে। আরবিতে এর নাম সাদর। এটি অনেকটা দুর্গের দেয়ালের মতো, যে দুর্গ ভেতরের হৃদয়কে রক্ষা করে। তওবা, জিকির ও আত্মসমর্পণের মাধ্যমে হৃদয় যতই শক্তিশালী হয়, শয়তানের কুমন্ত্রণার কণ্ঠস্বরও ততই নিচু হতে থাকে। এজন্য মহানবি দুআ করতেন-'হে হৃদয় পরিবর্তনকারী! আমার হৃদয়কে আপনার দ্বীনের ওপর দৃঢ় করে দিন।'
আমরা যখন তওবা করি, তখন মূলত আমরা আমাদের প্রবৃত্তিকে বিশুদ্ধ করি। আমরা আমাদের জ্ঞান বা দুনিয়াবি অর্জনের কারণে আল্লাহর প্রতিনিধি হতে পারি না। আল্লাহর প্রতিনিধি হতে পারি এই স্বীকৃতি দানের মাধ্যমে যে, আল্লাহর অনুগ্রহ ছাড়া আমরা কতটা অসহায় ও অক্ষম। এজন্যই জ্ঞানবানরা তাঁর প্রার্থনা করে-
'হে আমাদের প্রতিপালক! সৎপথ প্রদর্শনের পর আপনি আমাদের অন্তরগুলোকে বক্র করে দেবেন না। আমাদের আপনার নিকট হতে রহমত প্রদান করুন, মূলত আপনিই মহান দাতা।' সূরা আলে ইমরান: ৮
আমরা যখন তওবা করি, তখন মূলত আল্লাহর রহমত যেন আমাদের ওপর বিনা বাধায় আপতিত হতে পারে-তার জন্য একটু জায়গা করে দিই। যখন আমরা আমাদের দুর্বলতা ও অক্ষমতার স্বীকৃতি দিই এবং আল্লাহর কাছে পূর্ণ আতাসমর্পণ করি, তখন মূলত আমাদের হৃদয়কে আল্লাহর উপস্থিতির জন্য প্রস্তুত করে তুলি।
আল্লাহর কাছে ফিরে আসার একটি চমৎকার গল্প নিচে তুলে ধরা হলো-
একদিন এক ব্যক্তি আধ্যাত্মিক পথের সন্ধানে ইরানের পাহাড়ে বসবাসরত ইসিজান নামে এক নারী সাধকের কাছে গেল। ইসিজান লোকটির কথা মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। জানলেন, লোকটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চায়। ইসিজান বললেন- 'তোমার সাথে আলাপ করার আগে এসো চা পান করি।' চা তৈরি হয়ে গেলে ইসিজান লোকটির পেয়ালায় চা ঢালতে শুরু করলেন। একটু পরেই পেয়ালা উপচে পড়ল, কিন্তু তিনি চা ঢালা বন্ধ করলেন না। লোকটি বলল-'এ কী করছেন আপনি! পেয়ালায় তো আর জায়গা নেই। এটি সম্পূর্ণ ভরে গেছে।' ইসিজান তখন হেসে বললেন- 'পেয়ালা আর তোমার অবস্থা একই রকম। আমি কী করে তোমাকে নতুন কিছু শেখাব, যেখানে তোমার পেয়ালা ইতোমধ্যে পূর্ণ হয়ে আছে! তোমাকে আগে তোমার পেয়ালাকে খালি করতে হবে। তুমি যদি সত্যিই আল্লাহকে তোমার হৃদয়ের ভেতর প্রবেশ করাতে চাও, তাহলে তোমার পুরোনো বিবেচনাবোধ, পুরোনো ভুল, পুরোনো মতামত, তুমি যা জানো বলে মনে করো ইত্যাদি সবকিছুকেই তোমার ভেতর থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।'
তওবার সারকথাই হলো- 'হৃদয়ের পেয়ালা খালি করা', যাতে আল্লাহর জিকিরের আলো দিয়ে মানুষ সে পেয়ালা পূর্ণ করতে পারে। হৃদয়ের পেয়ালাকে খালি করার সর্বোত্তম উপায় হলো 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পড়া, যার অর্থ-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।' আল্লাহর জিকিরের মানে শুধু তাঁর নামগুলো উচ্চারণ করে তাঁকে স্মরণ করাই নয়; বরং এও মনে রাখা যে, আল্লাহ আমাদের কখনো ভুলে যান না। মৃত্যুর পর জান্নাতে যাওয়াই জীবন নয়; বরং চিরঞ্জীব আল্লাহর উপস্থিতির ভেতর বাস করাই জীবন।
হৃদয়ের পেয়ালাকে খালি করতে হলে আমাদের ভেতরের বোধকে আল্লাহর প্রতি নিবদ্ধ করতে হবে এবং আমাদের ধ্বংসাত্মক প্রবৃত্তিকে (নফসে আম্মারা) সন্তুষ্ট ও শান্তিপূর্ণ প্রবৃত্তিতে (নফসে মুতমাইন্নাহ) পরিণত করতে হবে। এরপর সেই খালি হৃদয়কে আল্লাহর জিকির দিয়ে পূর্ণ করতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণ দ্বারাই অন্তরসমূহ প্রশান্ত হয়।' সূরা আর রা'দ: ২৮
বুখারি শরিফে বর্ণিত আছে- 'সবকিছু পরিষ্কার করার মাজুনি রয়েছে; আর হৃদয় পরিষ্কার করার মাজুনি হলো আল্লাহর জিকির।'
সমুদ্র নিয়ে ভাবলে যেমন মানুষের শরীর ভেজে না, তেমনি আন্তরিক ভালোবাসার মিশ্রণ ছাড়া কেবল আল্লাহর নাম উচ্চারণ করলে তা নিষ্ফল হয়ে যায়। পঞ্চদশ শতকের ভারতীয় কবি কবির বলেছেন-
'যদি আল্লাহ শব্দটি উচ্চারণ করলে মুক্তি পাওয়া যেত, চকলেট উচ্চারণ করলে মুখ মিষ্টি হয়ে যেত, আগুন উচ্চারণ করলে পা পুড়ে যেত, পানি উচ্চারণ করলে তেষ্টা নিবারণ হতো, খাবার উচ্চারণ করলে ক্ষুধা নিবারণ হতো, তাহলে কতই না ভালো হতো।'
আল্লাহর জিকির জিভ দিয়ে আল্লাহর নাম উচ্চারণের চেয়ে অনেক বেশি বড়ো। জিকির হলো-আপনার চেতনাকে সক্রিয়, সচেতনভাবে আল্লাহর দিকে রুজু করার নাম।

জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে ফিরে আসা
আরবি শব্দ জিকিরের অর্থ 'স্মরণ' হলেও এটি মননশীলতার একটি হাতিয়ারও। জিকির শব্দটি যে মূল শব্দ থেকে এসেছে, তার অর্থ প্রশংসা করা, মনের ভেতর বহন করা, মননশীল হওয়া ইত্যাদি। ইসলামি ঐতিহ্য অনুসারে জিকিরের অনুশীলন ও আল্লাহর নাম জপার মাধ্যমে মানুষ নিজেকে দৃঢ় ও আধ্যাত্মিক পরমানন্দ অনুভব করে এবং নিজের হৃদয়ে মহামহিম আল্লাহকে ধারণের অভ্যাস গড়ে তোলে।
আল্লাহর জিকিরের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো-এটি আমাদের বোধকে বর্তমান মুহূর্তের সাথে সংযুক্ত করে দেয়, আল্লাহকে আন্তরিকভাবে অনুভব করার শক্তি জোগায়। জিকির মানে কেবল আল্লাহর দিকেই ফেরা নয়; বরং নিজের শেকড়ের কাছে ফেরা। আলো যেমন অন্ধকারে মিলিয়ে যায়, জিকির তেমনি মনের অন্ধকারকে মিটিয়ে দেয়। আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা আমাদের হৃদয়ের আয়নায় মরিচার আস্তরণ ফেলে। আল্লাহর জিকির এ আস্তরণকে তুলে আয়নাকে ঝকমকে করে দেয়।
চোখের ডাক্তার যেমন আমাদের দৃষ্টিশক্তি অনুযায়ী লেন্স ঠিক করে দেয়-যাতে আমরা সবকিছু ঠিকমতো দেখতে পাই, আল্লাহর জিকিরও তেমনি হৃদয়ের চক্ষুর দৃষ্টিশক্তি ঠিক করে দেয়-যাতে হৃদয় ঠিকমতো সত্যকে চিনতে পারে।
ইসলামে আল্লাহর জিকির খুব শক্তিশালী ইবাদতগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। কারণ, এটি আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসাকে গ্রহণ করার জন্য আমাদের হৃদয়কে উপযুক্ত করে তোলে, যে ভালোবাসা ইতোমধ্যেই আমাদের ওপর বর্ষিত হয়ে চলেছে। একটি শক্তিশালী জিকির হলো—ইয়া আল্লাহ বা হে আল্লাহ! এর সাথে আল্লাহর ৯৯টি নামের যেকোনো একটিকে যুক্ত করা যায়। আপনি কতবার এ নামগুলো জপছেন তা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো—আপনি কতখানি হৃদ্যতার সাথে, কতখানি প্রেমময়তার সাথে আল্লাহর কথা স্মরণ করছেন। আপনার ব্যথাতুর হৃদয়ে আল্লাহর জন্য কতটা ঠাঁই করে দিচ্ছেন—সেটাই আসল কথা।
আল্লাহকে আরও গভীরভাবে অনুভব করতে হলে আমাদের জিকির, দুআ, নামাজ ও তওবার মাধ্যমে আল্লাহর আরও ঘনিষ্ঠ হওয়ার চেষ্টা করে যেতে হবে। লজ্জা পাবেন না, আপনার দুঃখ-ক্লেশ, পাপ, অনুশোচনা, মনের খেদ ও ভাঙা হৃদয় নিয়েই আল্লাহর কাছে আসুন। মনে রাখুন, আমাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও শূন্যতাই আমাদের ভেতর আধ্যাত্মিক খাদ্য গ্রহণের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করে। আমরা তৃপ্ত হলে তো আর কোনো কিছুর প্রয়োজন বোধ করতাম না। আপনি যখন শূন্য হাতে, অভাবগ্রস্ত ও অতৃপ্ত অবস্থায় রয়েছেন, তখনই বরং আল্লাহ আপনাকে বেশি করে তাঁর দিকে ডাকেন। আল্লাহর নামগুলো আমাদের হৃদয় ও আত্মার অভাব ও ক্ষতের উপশমের কাজ করে। আমরা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহ বা তাঁর কোনো একটি নাম উচ্চারণ করি, তখন যে কম্পন সৃষ্টি হয়—তা আমাদের হৃদয়কে আল্লাহকে গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করে তোলে।
আমরা আল্লাহর ভালোবাসা পেতে তাঁর কাছে প্রার্থনা করি না; তাঁর ভালোবাসা প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা থেকেই তাঁর কাছে প্রার্থনা করি। আমরা কীভাবে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করব, যেখানে আমরা যা তাঁকে দিতে পারি তার সবকিছুরই তিনি মালিক?
রুমি কাব্যিকভাবে এটাই বলেছেন—
‘আমি আল্লাহকে দেবো বলে একটি উপহার খুঁজতে বেরিয়েছিলাম। কিন্তু দিবানিশি অনেক খুঁজেও এমন কিছু পেলাম না, যা আল্লাহকে দেওয়া যায়। কোনো কিছুকেই জুতসই মনে হলো না। স্বর্ণের খনির কাছে এক টুকরো স্বর্ণের কী এমন মূল্য আছে? সমুদ্রের কাছে সামান্য পানির কী এমন গুরুত্ব আছে? ভাবি, আমার আত্মা যেহেতু আমার কাছে সবচেয়ে মূল্যবান, সেহেতু আল্লাহকে আমার আত্মাটাই দিয়ে দেওয়া উচিত। কিন্তু পরক্ষণে মনে হয়, এ আত্মারও তো মালিক আমি নই, এর মালিক তো স্বয়ং আল্লাহ। মালিকের নিজস্ব জিনিস কী করে মালিককে উপহার হিসেবে দিই? অতএব, আমি আল্লাহর জন্য একটি আয়না নিয়ে এলাম। হে দয়াময়! আপনি এ আয়নার দিকে তাকান আর এ দাসকে স্মরণ করুন।'
আল্লাহর সাথে সম্পর্ক তৈরির জন্য যোগ্যতা অর্জনের চেষ্টা মানুষের কাজ নয়। কেননা, রুমি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, আল্লাহর কাছে স্বয়ং তিনি ছাড়া আর কেউ যোগ্যতাসম্পন্ন নয়। কী করে আমরা আমাদের সসীম কর্ম দিয়ে অসীম আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার দাবি করি? আমরা যে সৃষ্টি হয়েছি, তার বিনিময় দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ইবাদত, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা কি আমরা আল্লাহকে দিতে পারি? সৎকর্ম, বিনয়, দয়া, হৃদয়ের বিশুদ্ধি ও আল্লাহর স্মরণ হলো এমন যানবাহন, যাতে চড়লে আমরা আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ অনুভব করতে পারি। কিন্তু মনে রাখতে হবে, আমাদের কর্ম দিয়ে আমরা আল্লাহর ভালোবাসা পাই না; বরং আল্লাহর নিঃশর্ত ভালোবাসা আমাদের ওপর এমনিতেই সদা প্রবহমান। আল্লাহর ভালোবাসার সন্ধান করা আমাদের কাজ নয়; বরং আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর রোপণ করা ভালোবাসার চারাগাছে পানি সিঞ্চন করাই আমাদের কাজ।
'তিনিই তোমাদের পৃথিবীতে প্রতিনিধি বানিয়েছেন এবং তোমাদের কতককে কতকের ওপর মর্যাদা দিয়েছেন, যাতে তিনি তোমাদের যা প্রদান করেছেন, তাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন। নিশ্চয়ই তোমার রব দ্রুত শাস্তি দানকারী এবং নিশ্চয়ই তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। সূরা আনআম: ১৬৫
আল্লাহ আমাদের জিজ্ঞাসা করবেন—তাঁর দেওয়া উপহার আমরা কতটা প্রকাশ করেছি, কতটা কার্যকর করেছি। তাঁর দেওয়া বুদ্ধি আমরা সমাজের কল্যাণের জন্য ব্যয় করেছি, নাকি সমাজে ক্ষতির কাজে ব্যয় করেছি। আমাদের হাত দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার কাজ করেছি, নাকি যুদ্ধ-সংঘাত সৃষ্টির কাজ করেছি। আল্লাহর দেওয়া অনুগ্রহগুলো বস্তুবাদী কাজে লাগিয়েছি, নাকি আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করেছি। আল্লাহ আমাদের প্রত্যেককে পৃথকভাবে কোনো না কোনো সক্ষমতা ও মেধা দান করেছেন। তাঁর দেওয়া সেই অনুগ্রহের ভিত্তিতে তিনি আমাদের মূল্যায়ন করবেন। দুনিয়াতে আমাদের কাজ হলো আল্লাহর দেওয়া উপহারগুলো সমগ্র সৃষ্টিজগতের কল্যাণে গ্রহণ করা এবং সেগুলোর চাষাবাদ করা।
'জীবনের মানে হলো—তোমার উপহার খুঁজে বের করা, আর জীবনের উদ্দেশ্য হলো—সেই উপহারকে অন্যের কাছে বিলিয়ে দেওয়া।' - পাবলো পিকাসো

আমাদের সম্ভাবনার বিকাশে আল্লাহর ভূমিকা
হৃদয়ের ভেতরে যেখানে ভালোবাসার বসবাস, সেখানে আল্লাহকে গ্রহণ করার জন্য আমাদের হৃদয়কে প্রস্তুত করতে হয়। দুনিয়াতে আমাদের কাজ হলো আল্লাহর ইবাদতের সাথে নিজের আত্মা ও হৃদয়কে যুক্ত করা। একবার এটি করতে সক্ষম হলে এটি এমন একটি নল হিসেবে কাজ করবে, যে নল দিয়ে আমাদের মধ্যে থাকা আল্লাহর ভালোবাসা আমরা সহজেই সৃষ্টিজগতের অন্যান্য সৃষ্টির কাছে নির্গত করতে পারব। মানুষ মাটি ও পানি দিয়ে তৈরি কোনো মৃৎশিল্প নয়; মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহর চক্ষু হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে। দুনিয়ার অন্যান্য সৃষ্টির ওপর, এমনকী সমগ্র সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর ভালোবাসা ও মমতার প্রতিফলন ঘটানোর জন্যই মানুষের সৃষ্টি।
নবম শতকের পারস্য সাধক জুনায়েদ বলেছেন-'মুসলিমরা মাটির মতো। মাটিতে ময়লা-আবর্জনা ফেললেও সেখানে সবুজ তৃণভূমি প্রস্ফুটিত হয়।' মানুষকে বলা হয় ফলবান গাছের মতো। গাছের শেকড় এমনভাবে আল্লাহর ভালোবাসার মাটিতে গাঁথা থাকে যে, কেউ গাছে পাথর ছুড়লে জবাবে গাছ তাকে সুমিষ্ট ফল উপহার দেয়। লোকে আপনার সাথে কী করল-তা নিয়ে জীবনযাপন করবেন না; আল্লাহ আপনাকে যে উপহার দিয়েছেন, তার কৃতজ্ঞতার ভেতরে জীবনযাপন করুন।
'রহমানের বান্দা তো তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং অজ্ঞ লোকেরা যখন তাদের সম্বোধন করে, তখন তারা বলে-সালাম।' সূরা ফুরকান: ৬৩
নির্বোধ লোকদের অজ্ঞতার প্রতিক্রিয়া দেখাতে আমাদের নিষেধ করা হয়েছে। আল্লাহর ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রজ্ঞার প্রতিফলন ঘটানোর দিকেই আমাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার স্বাভাবিক ফল হলো-তাঁর সৃষ্টির প্রতি ভালোবাসা। কী করে আল্লাহকে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসবেন, যেখানে তাঁর সৃষ্টিকে আপনি গভীরভাবে ভালোবাসতে পারেন না? আমাদের সৃষ্টির মা হতে হবে। বিশ্বজগতের সকল সৃষ্টিকে নিজের ভালোবাসার পাখার নিচে টেনে নিতে হবে, যেন সবাই আমাদের সন্তান। স্কলার সাইয়্যেদ হোসেইন নাসর বলেন-
'মানুষ হলো জান্নাত ও পৃথিবীর মধ্যকার একটি সেতুর মতো। একদিকে সে পৃথিবী ত্যাগ করে জান্নাতে যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়, আবার অন্যদিকে পৃথিবীকেই জান্নাত বানানোর কাজে মনোনিবেশ করে।'
সৃষ্টিজগতের ওপর আল্লাহর ভালোবাসার প্রতিফলনের ক্ষেত্রে কোনো পূর্বশর্ত নেই। আল্লাহ আপনাকে সেভাবেই ব্যবহার করবেন-আপনি যেমন। যদি রাখাল, ইয়াতিম, বন্দি ও শরণার্থীকে তিনি নবি বানাতে পারেন, তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহ যেকোনো সময় আপনাকে যেকোনো মর্যাদায় অভিষিক্ত করতে পারেন।
একটি বীজকে সূর্যের আলো চুমু দেওয়া মাত্র এটি অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। আমরাও তেমনি আল্লাহর ভালোবাসার সংস্পর্শে আসা মাত্র রূপান্তরিত হতে শুরু করি। আমরা যখন আল্লাহর কাছে পূর্ণ আত্মসমর্পণ করি, তখন শুধু আমরা রূপান্তরিতই হই না; আমাদের ভেতর এমন এক জাদুকরি শক্তি সৃষ্টি হয় যে, আমাদের হৃদয়ে সৃষ্টিজগতের সকলের ওপর নির্বিশেষে অনুগ্রহ, দয়া, প্রেম ও ভালোবাসার সমুদ্র সৃষ্টি হয়। আমাদের যোগ্যতার কারণে এটি ঘটে না; ঘটে আল্লাহর রহমতের কারণে।
মরুভূমির ওপর এক বৃদ্ধ নবি নুহ-এর হাতে গড়া কাঠের নৌকা জগতের সব সৎ লোকদের রক্ষা করেছিল; অথচ জগতের সেরা প্রকৌশলীদের তৈরি বিশাল জাহাজ টাইটানিক তার প্রথম ভ্রমণেই ডুবে যায়। যখন আমাদের চেষ্টা ও সংগ্রামের ভিত্তি রচিত হয় বিশ্বাসের ওপর, তখন আমাদের কর্ম যে ফল বয়ে আনে-তা হয় আমাদের কল্পনার অতীত। আমাদের কর্ম জগৎকে বদলে দেয় না; আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার ভিত্তিতে যখন আমরা ভালোবাসা দিয়ে জগদ্বাসীর সেবায় আত্মনিয়োগ করি, তখনই জগৎ বদলে যেতে শুরু করে। যখন অন্যের প্রয়োজন আমাদের কাছে ততটা গুরুত্বপূর্ণ মনে হবে-যতটা গুরুত্বপূর্ণ আমরা নিজের প্রয়োজনকে মনে করি, তখনই আমরা ঈমানের প্রকৃত স্বাদ অনুভব করতে পারি।
'তোমাদের কেউ পূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য তা-ই পছন্দ করে, নিজের জন্য যা পছন্দ করে।'
যখন আকাশে সূর্য ওঠে, তখন সূর্যের আলো নির্বিশেষে সৃষ্টিজগতের সকলের ওপর আপতিত হয়। যখন বৃষ্টি পড়ে, তখনও তা নির্বিশেষে সকলের ওপরই পড়ে। আল্লাহ আমাদের তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন, যেন আমরা আল্লাহর মহিমা, অনুগ্রহ, দয়া, প্রেম, ভালোবাসা ও মমতা জগতের সকলের ওপর প্রয়োগ করি। মহানবি বলেন-'সমগ্র মানবজাতি এসেছে আদম ও মা হাওয়া থেকে। আরবের ওপর অনারবের এবং অনারবের ওপর আরবের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। কালোর ওপর সাদার বা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় আল্লাহর নৈকট্যশীলতা ও সৎকর্মের ভিত্তিতে।' সত্যিকার মুসলিম হতে হলে সৃষ্টিজগতের সকলের প্রতি ভালোবাসা লালন করতে হবে।
আল্লাহ আমাদের জগতের সকল মন্দের বিপরীতে দাঁড়ানোর জন্য সৃষ্টি করেননি, অন্যের ভালো-মন্দের বিচার করতে অথবা কে আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার উপযুক্ত এবং কে উপযুক্ত নয়-তা ঠিক করতেই আমরা আমাদের অমূল্য জীবনটাকে ব্যয় করে ফেলব। আমাদের বলা হয়েছে, আমরা যেন সহানুভূতি ও মমতার সাথে, ভালোবাসার জায়গা থেকে মানুষকে উপদেশ দিই। কিন্তু কাউকে বিচার করার একমাত্র অধিকার রয়েছে আল্লাহর। দুনিয়াতে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যের একটি অংশ হলো কোনো সীমা ও সীমানা ছাড়া সকল সৃষ্টিকে ভালোবাসা। যেমনটি রুমি বলেছেন- 'সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার হলো, জগতের কোনো কিছুরই মালিক আমরা নই। তাহলে আমরা কীসের প্রতিযোগিতা করি, যেখানে আমাদের সকলকে একই দরজা (মৃত্যু) দিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে?'
আমরা সবাই একই উৎস থেকে এসেছি এবং একই আল্লাহর কাছে ফিরে যাব। যদি আমরা অন্যের ভুল-ত্রুটি খুঁজে বেড়াতেই পুরো জীবন ব্যয় করি, তাহলে নিজেরাই ভুলের গহ্বরে পড়ে যাব। আমরা তো এ জগতেরই একটি অংশ। কাজেই নিজেকে বদলানো মানে জগৎকে বদলানো। আমরা অপরকে সেটাই দিতে পারি, যা আমাদের নিজেদের কাছে আছে। জগৎকে আমরা কীভাবে জবাব দেবো-তাতে জগতের কিছুই যায় আসে না। কারণ, আমরা তা-ই করি, যা আমরা হৃদয়ের ভেতর ধারণ করি। কোনো কিছুরই আমাদের রাগিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নেই। জগৎ কেবল আমাদের সেই রাগের উন্মোচন ঘটায় মাত্র, যা আমরা নিজেদের ভেতর বহন করে চলেছি। আমরা যখন আল্লাহর গুণাবলি দিয়ে নিজের হৃদয়ের বাগান সাজাতে পারব, তখন সে বাগানে ভালোবাসা, দয়া, স্নেহ, মমতা ও শান্তির ফুল ফুটবে।

আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য
আপনার সাফল্য, ব্যর্থতা, পরীক্ষা, উত্তরণ, উত্থান, পতন, উপহার, মেধা- সবকিছুই একটি অপরটির সাথে যুক্ত। আল্লাহ আপনাকে ভাঙেন গড়ার জন্যই। আপনার পথ যত বিপদসংকুল হোক না কেন, তা ভবিষ্যতের আপনাকে তৈরির প্রক্রিয়াকেই দৃঢ় করে। কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌছার পর নয়; বরং এই মুহূর্তে আপনি যে অবস্থায় রয়েছেন, সে অবস্থাতেই আল্লাহ আপনাকে চান।
আপনার হৃৎস্পন্দন যতক্ষণ চালু আছে, ততক্ষণ আপনার একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। আল্লাহর সবকিছুই পরিকল্পিত। তিনি জগতে কাউকেই অস্তিত্বশীল রাখেন না-যার অস্তিত্বের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে। আমরা জীবিত আছি এর মানে হলো-জগতে কারও না কারও আমাদের প্রয়োজন এবং যে কাজে আমাদের দুনিয়াতে প্রেরণ করা হয়েছে, তা এখনও সমাপ্ত হয়নি। অষ্টাদশ শতকের একজন সাধক বলেছেন- 'যেদিন তুমি জন্মগ্রহণ করেছ, সেদিন আল্লাহ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তোমাকে ছাড়া এ জগৎ অস্তিত্বশীল থাকবে না।'
আপনাকে জগতের প্রয়োজন। কোনো ভাষা দিয়ে এ প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা যায় না। সমগ্র সৃষ্টিজগতের যিনি স্রষ্টা, তিনি আপনাকে সৃষ্টির জন্য পছন্দ করেছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি আকাশ, জমিন ও এ দুয়ের মাঝে যা কিছু আছে তা যথাযথভাবে এবং একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি।' সূরা আহকাফ : ৩
সৃষ্টিজগতের কোনো কিছুই উদ্দেশ্যহীন সৃষ্টি হয়নি।
আল্লাহ যখন কোনো কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তিনি কেবল বলেন- 'হও! আর তা হয়ে যায়।' আমাদের যা প্রয়োজন, আল্লাহ ইতোমধ্যে তা দিয়েছেন। আমাদের কাজ হলো-যে পথ তিনি আমাদের জন্য নির্মাণ করে দিয়েছেন, তা অনুসরণ করা। যে নির্দেশনা তিনি আমাদের দিয়েছেন, তাতে মনোযোগ নিবদ্ধ করা। যে ফুল তিনি আমাদের দান করেছেন, তার পাপড়ি মেলে ধরা। যে ভালোবাসার আলো তিনি আমাদের সামনে দৃশ্যমান করেছেন, তার সামনে আত্মসমর্পণ করা।
'আল্লাহকে ভুলে থাকা লোকেরা সকালে উঠে ভাবে, সে সারাদিন কী করবে। বুদ্ধিমান লোকেরা সকালে উঠে ভাবে, আল্লাহ সারাদিন তাকে নিয়ে কী করবেন।' -ইবনে আতা আল্লাহ

টিকাঃ
৩৬. সূরা হিজর : ২৯
৩৭. সূরা রূম: ১৯
৩৮. সূরা ক্বাফ: ১৬
৩৯. মুসলিম। এ হাদিস থেকে এ ইঙ্গিত পাওয়া যায়, আল্লাহ মানুষকে কর্মের স্বাধীনতার উপহার দিয়ে পৃথিবীতে প্রেরণ করেছেন। তিনি চান আমরা যেন ভুল করার স্বাধীনতা ভোগ করি, কিন্তু ভুল করে ফেললে সাথে সাথে অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করি। যেহেতু আমাদের ভুল করার প্রবণতা আমাদের কর্মের স্বাধীনতারই ফল, সেহেতু যদি আমরা ভুল না করতাম, তাহলে আল্লাহ দুনিয়াতে এমন সৃষ্টিকে পাঠাতেন, যারা ভুল করত। কারণ, আমাদের ভুল করার প্রবণতাই আমাদের আল্লাহর অসীম অনুগ্রহ ও ক্ষমার স্বাদ পাইয়ে দেয়।
৪০. বুখারি, মুসলিম
৪১. আল্লাহ আমাদের তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে এ দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন (সূরা বাকারা: ৩০)। আমাদের কাজের একটি অংশ হলো, এই দুনিয়ার দেখাশোনা করা এবং সকল সৃষ্টির ওপর আল্লাহর গুণাবলির প্রতিফলন ঘটানো। যেহেতু আসমানের জগতে আল্লাহ প্রকাশমান থাকে, সেহেতু আমরা যখন দুনিয়ার জগতে আল্লাহর নামের প্রতিফলন ঘটাই, তখন মূলত আমরা নিজেরাই দুনিয়াতে আসমানের প্রতিফলন হিসেবে আবির্ভূত হই।
৪২. যেমনটি মুহাম্মাদ বলেছেন-'আল্লাহ তোমাদের চেহারা বা সম্পদের দিকে তাকান না; বরং তিনি তাকান তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে।' মুসলিম
৪৩. মহানবি নারীদের উচ্চ মর্যাদার কথা এভাবে বলেছেন- 'তোমার মায়ের পদতলে তোমার জান্নাত।' আহমদ, নাসায়ি
৪৪. Leaman, Oliver. The Qur'an: An Encyclopedia. Routledge, 2010.
৪৫. কোনো কোনো স্কলার বলেছেন, ইবলিস ফেরেশতা ছিল। কারণ, সে ফেরেশতাদের সাথে বসে আল্লাহর ইবাদত করত। এ স্কলারগণ তাঁদের দাবির প্রমাণ হিসেবে কুরআনের এই আয়াতের উল্লেখ করেন-'এবং স্মরণ করো, যখন আমরা ফেরেশতাদের বললাম-আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলিস ছাড়া সকলেই সিজদা করল (সূরা কাহাফ: ৫০)।' কিন্তু এ আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ বলেছেন-'সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত। সে তার প্রতিপালকের নির্দেশ লঙ্ঘন করেছিল (সূরা কাহাফ: ৫০)।' আদম-এর ব্যাপারে ইবলিস নিজেই বলেছিল-'আমি তাঁর চাইতে উত্তম। আমাকে আপনি সৃষ্টি করেছেন আগুন থেকে আর তাঁকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে (সূরা আ'রাফ: ১২)।' জিনদের সম্পর্কে কুরআনে বলা হয়েছে-'আর তিনি জিনকে সৃষ্টি করেছেন ধোঁয়াবিহীন অগ্নিশিখা থেকে (সূরা আর-রহমান: ১৫)।' মহানবি বলেছেন-'ফেরেশতাদের সৃষ্টি করা হয়েছে আলো থেকে, জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে ধোঁয়াবিহীন অগ্নিশিখা থেকে এবং আদমকে যা থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, তা তোমাদের কাছে বর্ণিত হয়েছে।' মুসলিম, আহমদ, বায়হাকি
৪৬. সূরা সাদ : ৮২-৮৩
৪৭. সূরা বনি ইসরাইল: ৫৩
৪৮. Wheeler, Brannon M. Prophets in the Qur'an: An Introduction to the Qur'an and Muslim Exegesis. Continuum, 2002
৪৯. আল্লাহ তায়ালা বলেন-'অতঃপর তাঁরা (আদম ও হাওয়া) দুজনে যখন তা (সেই গাছ) থেকে খেল, তখন তাঁদের সামনে তাঁদের লজ্জাস্থান খুলে গেল আর তাঁরা জান্নাতের গাছের পাতা দিয়ে নিজেদের ঢাকতে লাগল। আদম তাঁর প্রতিপালকের অবাধ্যতা করল, ফলে সে প্রথভ্রষ্ট হয়ে গেল। অতঃপর তাঁর রব তাঁকে মনোনীত করলেন, তাঁর প্রতি মনোযোগী হলেন এবং তাঁকে সুপথে আনয়ন করলেন।' সূরা ত্ব-হা: ১২১-১২২
৫০. সূরা সাফফাত: ১৪৩-১৪৪
৫১. বুখারি
৫২. বুখারি
৫৩. সূরা আ'রাফ: ৪৩
৫৪. মুসলিম
৫৫. সূরা আনকাবুত : ৪৫
৫৬. মুসলিম
৫৭. Bin Younis, Imam. 'Question and Answer.' 2017, California
৫৮. গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আমরা জান্নাতে থাকব একটি নতুন সৃষ্টি হিসেবে নতুন বাস্তবতায় এবং সে জগৎটি হবে দুনিয়াবি জগতের চাইতে আলাদা। দুনিয়াতে যে পর্দার অস্তিত্বের কারণে আমরা আল্লাহকে দেখতে পাই না, জান্নাতে তেমন কোনো পর্দা থাকবে না। ফলে আমরা আল্লাহকে সেখানে সরাসরি দেখতে পাব। কুরআনে আল্লাহ বলেন-'কতক মুখ সেদিন উজ্জ্বল হবে। তারা তাদের প্রতিপালকের দিকে তাকিয়ে থাকবে (সূরা কিয়ামাহ : ২২-২৩)।' মুহাম্মাদ বলেন-'নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবে, যেমনটি তোমরা চাঁদকে দেখতে পাও।'
৫৯. পবিত্র কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-মানুষকে দুনিয়াতে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টি করা হয়েছে। এমনকী আদম ও হাওয়া জা জান্নাতের নিষিদ্ধ গাছের ফল খাওয়ার আগেই আল্লাহ এ ঘোষণা দিয়েছেন-'স্মরণ করো, তোমার প্রতিপালক যখন ফেরেশতাদের ডেকে বললেন, 'আমি জমিনে প্রতিনিধি সৃষ্টি করতে যাচ্ছি।' সূরা বাকারা : ৩০
৬০. সূরা বাকারা: ৩০
৬১. বুখারি, মুসলিম
৬২. এমন অর্থবোধক কথা মহানবি, আলি এবং ইতিহাসের অনেক স্কলার বলে গেছেন।
৬৩. মুসলিম
৬৪. বুখারি। এক সাহাবি একবার রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করলেন-'কাদের ওপর সবচাইতে কঠিন পরীক্ষা নেওয়া হয়?' রাসূলুল্লাহ জবাবে বললেন-'নবিদের ওপর, এরপর পরের প্রজন্মের ওপর, তারপর তার পরের প্রজন্মের ওপর।' তিরমিজি
৬৪. [৬৫] সূরা নিসা: ৫৯
৬৫. সূরা মায়েদা: ৩২
৬৭. আবু দাউদ
৬৮. আহমাদ
৬৯. বুখারি, মুসলিম
৭০. আল দারিমি
৭১. https://www.heartmath.org/articles-of-the-heart/science-of-the-heart/the-energetic-heart-is-unfolding/
৭৩. সূরা আহজাব: ৪
৭৪. তিরমিযি
৭৫. Chittick, William C. The Inner Journey: Views from the Islamic Tradition. Morning Light Press, 2007
৭৬. বখারি
৭৭. বুখারি, মুসলিম, আবু দাউদ, আহমাদ
৭৮. সূরা ইয়াসিন: ৮২

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 কুরআনের রহস্যময় জগৎ

📄 কুরআনের রহস্যময় জগৎ


আলিফ-লাম-র। এই কিতাব-যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো পরাক্রমশালী সর্বপ্রশংসিতের পথের দিকে। সূরা ইবরাহিম : ১
কুরআন হলো আমার হৃদয়ের বসন্ত, অন্তরের আলো, দুঃখ দূরকারী, হতাশার উপশমকারী।৭৯

কুরআন আল্লাহর প্রেরণ করা এক ঐশী প্রেমপত্র। আল্লাহকে জানা ও ভালোবাসার আগেই তিনি আমাদের সামনে তাঁর ভালোবাসার পথ দেখিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহর প্রতিটি কথা তাঁর অনুগ্রহের রঙে রাঙানো, তাঁর নিঃশর্ত ভালোবাসার সুগন্ধি দিয়ে সাজানো। তাঁর প্রতিটি কথায় যে করুণাধারা রয়েছে, তার প্রভাব মানুষের কর্মের ওপর নির্ভরশীল নয়। কুরআন কোনো দেয়াল নয়; বরং জানালা। কুরআন আমাদের তার দিকে ডাকে না; বরং আল্লাহ আমাদের কুরআনের জানালা দিয়ে তাঁর রহস্যময়তার দিকে ডাকেন। কুরআন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—যেহেতু সৃষ্টিজগতের সবকিছুতে আল্লাহর ভালোবাসা দীপ্যমান, সেহেতু আমরাও তাঁর ভালোবাসা ও দয়ার সাগরের বাইরে নই।
কুরআন এমন এক অনন্য গ্রন্থ—যার পরতে পরতে পাঠকের প্রতি রচয়িতার প্রেমের প্রকাশ ঘটেছে। মানবসৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ মানুষকে শান্তির পথের দিশা দিতে ওহি প্রেরণ করেছেন। তাই কুরআন শুধু বিধিবিধানসংবলিত কোনো গ্রন্থ নয়; বরং একে বলা হয় আল ফুরকান বা মানদণ্ড। কারণ, কুরআন হলো মান নির্ণায়ক এমন এক আলো, যা আমাদের প্রেমময় (আল ওয়াদুদ) আল্লাহর পথ এবং ধ্বংস ও স্খলনের পথকে আলাদাভাবে চেনার শক্তি জোগায়।

কুরআন তিলাওয়াতের রহস্যময় শক্তি
কুরআন আমাদের আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমানতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এক আল্লাহর সামনে সকল আত্মার জড়ো হওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
কুরআন শব্দটি এসেছে কফ-রা-হামজা থেকে-যার অর্থ পাঠ করা, আবৃতি করা, জড়ো করা, সংগ্রহ করা, যোগ দেওয়া ইত্যাদি। সমগ্র কুরআন যে কেন্দ্রবিন্দুর ওপর ফোকাস করে রচিত, তা হলো তাওহিদ; যার শাব্দিক অর্থ-কোনো কিছুকে এক বানানো। কুরআন তিলাওয়াত এমন এক চাবির ভূমিকা পালন করে, দুনিয়ার মোহ হৃদয়ের ওপর যে তালা স্থাপন করে দেয়।
পবিত্র কুরআনকে আল্লাহ এমনভাবে ডিজাইন করেছেন যে, এটি আপনার কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে দাঁড়াবে, আপনার বৈষয়িকতার মুখোমুখি হবে, আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণের ক্ষেত্রে আপনার সংকোচকে তিরোহিত করবে, আল্লাহর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আপনার ভেতরের সীমাবদ্ধতাগুলোকে চূর্ণ করবে এবং আল্লাহর পথে চলতে আপনাকে উজ্জীবিত করবে। কুরআন একটি আয়নার মতো-যা আপনি বহন করে চলেছেন, কুরআনে আপনি তা-ই দেখতে পাবেন। আপনি যদি হৃদয়ে ঘৃণা ও বিচ্ছেদ নিয়ে কুরআন পড়েন, তাহলে আপনার ঘৃণা আপনার ওপরই আপতিত হবে। আপনি যদি ভালোবাসা, অনুগ্রহ, দয়া ও মাহাত্ম্য নিয়ে কুরআন পাঠ করেন, তাহলে আপনি আল্লাহর সৌন্দর্যের স্বাদ আস্বাদন করতে পারবেন।
'বৃষ্টির একটি ফোঁটা ঝিনুকের মুখে পড়তে পারে কিংবা পড়তে পারে সাপের মুখে। ঝিনুকের মুখে পড়লে তা মুক্তোয় পরিণত হয়, সাপের মুখে পড়লে তা বিষে পরিণত হয়।'-আলি
কুরআনে আপনি যা-ই পড়েন, তা আপনার চেতনার বর্তমান অবস্থার দিকে ইঙ্গিত করে। কুরআনের প্রতিটি শব্দ এমন এক প্রদীপের কাজ করে-যা আপনার ভয় ও সংশয়ের অন্ধকারকে দূরীভূত করে দেয়। কুরআনের শব্দগুলো আপনার অবচেতন মনের গুহায় প্রবেশ করে এবং গুহাকে আলোকিত করে দেয়।
পবিত্র কুরআন আমাদের হৃদয়ের সেই ক্ষতের উপশম করে, আল্লাহকে হৃদয় থেকে সরিয়ে যে ক্ষত আমরা নিজেরাই সৃষ্টি করেছি। বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী কার্ল জাং বলেন-
'আলোর কল্পনা করলে কেউ আলোকিত হয় না, তবে অন্ধকার সম্পর্কে সচেতন হয়।'
কুরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন ইবাদতের উদ্দেশ্য হলো-আমাদের হৃদয়ের গোপন অন্ধকার কুঠুরিগুলোর পর্দা উন্মোচন করা এবং সেগুলোকে আল্লাহর ক্ষমা ও ভালোবাসার আলো দিয়ে পূর্ণ করা। মহানবি মুহাম্মাদ -এর কন্যা ফাতিমা বলেছেন-
'কুরআনের প্রজ্ঞা মানুষকে অজ্ঞতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোর দিকে নিয়ে যায়।'

কুরআন আসল কোনো গ্রন্থ নয়
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ ‘উম্মুল কিতাব’ বলে যা বুঝিয়েছেন, সেটিকে কুরআনের অন্যত্র ‘লাওহে মাহফুজ’ বলা হয়েছে। লাওহে মাহফুজ হলো এমন গ্রন্থ, যা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তরে সংরক্ষিত রয়েছে। সেখান থেকে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ ও বক্তব্যসমূহ পবিত্র কুরআনের রহস্যময় পাতায় ঠাঁই পেয়েছে। যদিও আমরা কুরআনকে গ্রন্থ বলে থাকি, তবুও এটি কোনো লিখিত গ্রন্থ নয়; বরং আল্লাহর বক্তব্যগুলোর পঠিত রূপ।
কাগজে লিখিত শব্দমালার একটি নির্দিষ্ট ফোকাল পয়েন্ট থাকে, কিন্তু উচ্চারিত শব্দমালার কম্পনের তরঙ্গ সবগুলো দিকে প্রবাহিত হয়। কাগজে লিখিত শব্দমালাকে পাঠকের কাছ থেকে পৃথক করা যায়, কিন্তু উচ্চারিত শব্দমালা থেকে শ্রোতাকে পৃথক করা যায় না। কুরআন যেহেতু পঠিত শব্দের লিখিত রূপ, সেহেতু কুরআনের কথা বুঝতে হলে, কুরআনের সাথে নিজেকে সংযুক্ত করতে হলে প্রথমে আল্লাহর কথাগুলো নিজের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে হবে, এরপর তা সশব্দে উচ্চারণ করতে হবে। এর পেছনে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু পড়ার চেয়ে সশব্দে বলা ও শ্রবণ করার সম্মিলিত কর্ম মানুষের স্মৃতিতে বেশি সময় স্থায়ী হয়ে থাকে।৮০
আল্লাহর কাছ থেকে মহানবি মুহাম্মাদ -এর ওপর অবতীর্ণ কুরআনের কথাগুলোকে লিখে গ্রন্থের রূপ দেওয়া হয়। একে মুসহাফ বলা হয়, যার অর্থ-আল্লাহর বার্তা সংরক্ষণ করা ও ছড়িয়ে দেওয়া। একেবারে সূচনা থেকে মহানবি -এর সাহাবিরা কুরআনের বাণীগুলোকে চামড়া, পাথর, পশুর হাড়, গাছের বাকলে লিখে রাখতেন। প্রিয়নবির মৃত্যুর বিশ বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কুরআন সংকলনের কাজ সমাপ্ত হয় এবং এটির অনুলিপি সমগ্র মুসলিম বিশ্বে প্রেরণ করা হয়। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কুরআনের সূরাগুলো সেই ধারাবাহিকতা অনুযায়ী সাজানো হয়নি, যে ধারবাহিকতায় কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। বিভিন্ন বর্ণনা থেকে জানা যায়, প্রতি রমজান মাসে মহানবি মুহাম্মাদ তখন পর্যন্ত অবতীর্ণ সমগ্র কুরআন জিবরাইল-কে পাঠ করে শোনাতেন এবং জিবরাইল রাসূল-কে বলে দিতেন, কুরআনের কোন অংশের পর কোন অংশ বসবে। অর্থাৎ কুরআনের বর্তমান ধারাবাহিকতা জিবরাইল-এর মাধ্যমে আল্লাহর কাছ থেকে অনুমোদিত। কোনো কোনো স্কলারের মতে, কুরআনকে আল্লাহর নির্দেশে এ কারণে ভিন্ন ধারাবাহিকতা মোতাবেক সাজানো হয়েছে-যাতে মানুষ এটিকে কোনো গল্পের বই হিসেবে বিবেচনা না করে। আরও গভীর অর্থে, কুরআনের বর্তমান ধারাবাহিকতা, যেটি অবতীর্ণের ধারাবাহিকতা নয়-তা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ক একরৈখিক বা একমাত্রিক নয়। কেননা, আল্লাহর অবস্থান সময় ও স্থানের অনেক ঊর্ধ্বে।
যদিও লিখিত কুরআনের সম্মান ও মর্যাদা অনেক বেশি, তবুও কুরআনের কোনো কথার সাথে দুনিয়ার কোনো মানুষ যা-ই করুক না কেন, কুরআনের মর্যাদার ওপর তার কোনো প্রভাব পড়ে না। হাজারো সমুদ্র যেমন চাঁদের আলোকে নেভাতে পারে না (কারণ, চাঁদের আলোর উৎস চাঁদ নয়; সূর্য), তেমনি দুনিয়ার সব মানুষ মিলেও কুরআনের আলোকে নেভাতে পারে না। কারণ, কুরআনের আলোর উৎস কুরআন নয়; আল্লাহ। আয়নায় আঘাত করলে আয়না ভেঙে যায়; কিন্তু আয়নায় যার প্রতিবিম্ব পড়েছে, তার কোনো ক্ষতি হয় না। তেমনি দুনিয়াতে কুরআনকে পুড়িয়ে ফেলা যায়, ধ্বংস করা যায়, কিন্তু কুরআনে যার প্রতিবিম্ব পড়েছে, তাঁর কোনো ক্ষতি করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'বলো, সমুদ্রগুলো যদি আমার প্রতিপালকের কথা লেখার জন্য কালি হয়ে যায়, তবে আমার প্রতিপালকের কথা লেখা শেষ হওয়ার আগেই সমুদ্র অবশ্যই নিঃশেষ হয়ে যাবে; আমি যদি এর সাহায্যের জন্য আরও অনুরূপ পরিমাণ সমুদ্র নিয়ে আসি তবুও।' সূরা কাহাফ: ১০৯

প্রথম ওহি : ইকরা
আসমানের সর্বোচ্চ স্তর থেকে আল্লাহর বাণীসমূহ কুরআন আকারে জিবরাইল-এর মাধ্যমে মহানবি-এর হৃদয়ের ভেতর প্রেরণ করা হয়েছে। ৬১০ সালে নবিজির বয়স যখন ৪০ বছর, তখন তাঁর ওপর প্রথম আল্লাহর ওহি অবতীর্ণ হয়। সেদিন তিনি আলোর পাহাড়ের (জাবাল আন-নুর) একটি গুহায় বসে ধ্যান করছিলেন। এমন সময় জিবরাইল ওহির আলোকবর্তিকা নিয়ে তাঁর কাছে এলেন। জিবরাইল বললেন-'পড়ন', দ্বিতীয়বার বললেন-'পড়ুন' এবং অবশেষে তৃতীয়বার বললেন-
'পড়ুন আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট বাঁধা রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ুন, আপনার রব বড়োই অনুগ্রহশীল; যিনি শিক্ষা দিয়েছেন কলম দিয়ে। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে-যা সে জানত না।' সূরা আলাক : ১-৫
রাসূল ঐশী কম্পনে প্রকম্পিত হলেন। তাঁর হৃদয়ের চক্ষু খুলে গেল। ধীরে ধীরে তিনি বুঝতে পারলেন-এমন কিছু অপার্থিব বাণীসমষ্টি তাঁর চেতনার ভেতর গভীর ছাপ অঙ্কন করেছে, যা ঐশী আলোতে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'এই কিতাব যা আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি, যাতে তুমি মানুষকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনো, পরাক্রমশালী সর্ব প্রশংসিতের পথের দিকে।' সূরা ইবরাহিম : ১
পবিত্র কুরআন হলো মানুষের ভেতরের সহজাত কল্যাণময়তার বীজের পরিচর্যার পথ। কিছু স্কলারের মতে, আল্লাহ কুরআনের যেখানে বৃষ্টির কথা বলেছেন, সেখানে তিনি তা বলেছেন রূপক অর্থে; যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহর অনুগ্রহ এবং যেখানে শুষ্কতার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি প্রকৃতপক্ষে মানুষের হৃদয়ের শুষ্কতার কথা বুঝিয়েছেন। মেঘ থেকে পড়া বৃষ্টি যেমন মৃত ভূমিতে প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি আল্লাহর কাছ থেকে আগত কুরআন মানুষের মৃত হৃদয়ে জীবনে সঞ্চার করে।
'তোমরা ভূমিকে দেখ শুষ্ক, মৃত। অতঃপর আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তাতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়, আর তা উদ্‌গত করে সকল নয়ন জুড়ানো উদ্ভিদ।' সূরা হজ: ৫

কুরআনের বার্তা
কুরআনের মূল বক্তব্য হলো-তাওহিদ তথা নিরেট একেশ্বরবাদ। আল্লাহর একত্ববাদ হলো ওহির বাগানের ভিত্তি, যার ওপর সমগ্র কুরআন দাঁড়িয়ে আছে। যুগে যুগে নবিদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে দুটি কাজ দিয়ে; আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দুনিয়াতে আল্লাহর বাণীর বাস্তব সাক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। তাই দেখা যায়, সব নবির বক্তব্যগুলো ছিল একই রকম; যদিও তাঁরা জন্ম নিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন যুগে, দুনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে।
যদিও কুরআনের সবকিছু আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তবুও এখানে আরও কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে— আল্লাহ কে, মানুষ সৃষ্টির ঘটনা, শয়তানের ভূমিকা, অদৃশ্য জগৎ, ফেরেশতা, আখিরাতের জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম, বিভিন্ন নবির ঘটনা, ওহির গভীরতম অর্থ, ইসলামের স্তম্ভসমূহ, প্রকৃতিতে আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের পদ্ধতি, আত্মশুদ্ধি, হৃদয় ও আত্মার পরিচর্যা, নৈতকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, পেশায় নৈতিকতা, সমাজবদ্ধ জীবন এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জীবনযাপনের উপায় ইত্যাদি।
কুরআনে শুধু তত্ত্ব ও ধারণা উল্লেখিত হয়নি; বরং বাস্তব জীবনের নানা ঘটনা, জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন, পাপ-মুক্তি, নিপীড়ন-ন্যায়বিচার, অন্ধকার-আলো, দুনিয়ার ধ্বংসশীলতা ও আখিরাতের স্থায়িত্ব ইত্যাদির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, কুরআন তাদের জন্য সুসংবাদ দান করেছে। আর যারা দুনিয়াতে মতে, আল্লাহ কুরআনের যেখানে বৃষ্টির কথা বলেছেন, সেখানে তিনি তা বলেছেন রূপক অর্থে; যার প্রকৃত অর্থ আল্লাহর অনুগ্রহ এবং যেখানে শুষ্কতার কথা বলেছেন, সেখানে তিনি প্রকৃতপক্ষে মানুষের হৃদয়ের শুষ্কতার কথা বুঝিয়েছেন। মেঘ থেকে পড়া বৃষ্টি যেমন মৃত ভূমিতে প্রাণের সঞ্চার করে, তেমনি আল্লাহর কাছ থেকে আগত কুরআন মানুষের মৃত হৃদয়ে জীবনে সঞ্চার করে।
'তোমরা ভূমিকে দেখ শুষ্ক, মৃত। অতঃপর আমি যখন তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তাতে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়, তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়, আর তা উদ্‌গত করে সকল নয়ন জুড়ানো উদ্ভিদ।' সূরা হজ: ৫

কুরআনের বার্তা
কুরআনের মূল বক্তব্য হলো-তাওহিদ তথা নিরেট একেশ্বরবাদ। আল্লাহর একত্ববাদ হলো ওহির বাগানের ভিত্তি, যার ওপর সমগ্র কুরআন দাঁড়িয়ে আছে। যুগে যুগে নবিদের দুনিয়াতে পাঠানো হয়েছে দুটি কাজ দিয়ে; আল্লাহর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া এবং দুনিয়াতে আল্লাহর বাণীর বাস্তব সাক্ষী হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করা। তাই দেখা যায়, সব নবির বক্তব্যগুলো ছিল একই রকম; যদিও তাঁরা জন্ম নিয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন যুগে, দুনিয়ার ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে।
যদিও কুরআনের সবকিছু আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ও একত্ববাদকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে, তবুও এখানে আরও কিছু বিষয়ের ওপর আলোকপাত করা হয়েছে— আল্লাহ কে, মানুষ সৃষ্টির ঘটনা, শয়তানের ভূমিকা, অদৃশ্য জগৎ, ফেরেশতা, আখিরাতের জীবন, জান্নাত, জাহান্নাম, বিভিন্ন নবির ঘটনা, ওহির গভীরতম অর্থ, ইসলামের স্তম্ভসমূহ, প্রকৃতিতে আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের পদ্ধতি, আত্মশুদ্ধি, হৃদয় ও আত্মার পরিচর্যা, নৈতকতা, পরিবারের প্রতি দায়িত্ব, পেশায় নৈতিকতা, সমাজবদ্ধ জীবন এবং আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে জীবনযাপনের উপায় ইত্যাদি।
কুরআনে শুধু তত্ত্ব ও ধারণা উল্লেখিত হয়নি; বরং বাস্তব জীবনের নানা ঘটনা, জয়-পরাজয়, উত্থান-পতন, পাপ-মুক্তি, নিপীড়ন-ন্যায়বিচার, অন্ধকার-আলো, দুনিয়ার ধ্বংসশীলতা ও আখিরাতের স্থায়িত্ব ইত্যাদির ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। যারা বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, কুরআন তাদের জন্য সুসংবাদ দান করেছে। আর যারা দুনিয়াতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, কুরআনে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
'রাসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী, যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।' সূরা নিসা: ১৬৫
কুরআন আমাদের দেখায়, কেবল আল্লাহর ইবাদতই হলো আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা ও মুক্তির একমাত্র পথ।
ওহি আমাদের কেবল আল্লাহকে অনুভবের শিক্ষা দেয় না; বরং আল্লাহর সাথে সংযুক্ত হওয়ার পথ দেখায়। কুরআন আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করে। ফলে একদিকে তা আমাদের মহৎ গুণাবলির ধারক হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে সত্য প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয় দেখায়।
পবিত্র কুরআনে যুগ-যুগান্তরের সেই সব মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যারা বহু বিপদাপদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার হাতিয়ার দিয়ে সে বিপদগুলোকে জয় করেছেন। ওই ঘটনাগুলো আমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়—বিপদ যত কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর ওপর আস্থা ও নির্ভরতা সকল বিপদ দূর করার জন্য যথেষ্ট। কুরআন আমাদের দেখায়, দুনিয়াতে সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা মাফিক ঘটে না। আমাদের নিয়ে আল্লাহরও একটি পরিকল্পনা থাকে এবং সে পরিকল্পনার ভেতর কুরআনে নবি ইউসুফ-এর জীবন পরিক্রমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইউসুফ-কে তাঁর হিংসুক ভাইয়েরা একটি কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এরপর সেখান থেকে তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়, মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং অবশেষে তিনি সেখান থেকে মিশরের বাদশার সবচেয়ে ক্ষমতাবান উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করেন। ইউসুফ কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁকে নিয়ে রচিত আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনা তাঁকে কোথায় নিয়ে চলেছে। কুরআনে নবি ইবরাহিম-এর ঘটনা পাওয়া যায়। ইবরাহিম-কে ভয়াবহ আগুনের ভেতর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে সে আগুনের শিখা শীতল হয়ে যায় এবং জায়গাটি তাঁর জন্য বাগানে পরিণত হয়। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আমি বললাম-হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।' সূরা আম্বিয়া: ৬৯
মুসা-এর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে পাওয়া যায়। মুসা-এর সামনে যখন লোহিত সাগর এবং পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, তখন আল্লাহ মুসা-কে রক্ষা করলেন। কারণ, মুসা তাঁর চক্ষু নিবদ্ধ করেছিল আল্লাহর দিকে; প্রতিবন্ধকতার দিকে নয়। আল্লাহ লোহিত সাগরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিলেন এবং মুসা-কে রক্ষা করলেন। আর সেই সাগরে ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে মারা গেল। কুরআনে কুমারী মাতা মরিয়ম-এর কথা বলা হয়েছে; গর্ভধারণ যার জীবনকে বিপদসংকুল করে তুলেছিল এবং তাঁর চরিত্রের সুনামকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে মরিয়ম আল্লাহর ওপর নির্ভর করলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিন দিন পর্যন্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকলেন। ঈসা জন্মগ্রহণ করলেন এবং দোলনা থেকে তাঁর মায়ের পক্ষে কথা বললেন।
প্রতিটি ভাঙা হৃদয়, প্রতিটি ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে কুরআন মনে করিয়ে দেয়, তার জন্য আল্লাহর আশ্রয় ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনা অপেক্ষা করছে।
'যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে তোমাদের ওপর কেউ-ই বিজয়ী হতে পারবে না এবং যদি তিনি তোমাদের সাহায্য না করেন, সে অবস্থায় এমন কে আছে-যে তোমাদের সাহায্য করবে? মুমিনদের আল্লাহর ওপর নির্ভর করা উচিত।' সূরা আলে ইমরান : ১৬০

যে কারণে কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে
একটি বীজের ভেতর বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। ইসলামের অনেক স্কলার মনে করেন, সমগ্র কুরআনের বীজ লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত রজনিতে (লাইলাতুল কদর), যে রাতে কুরআন সর্বোচ্চ আসমান থেকে সর্বনিম্ন আসমানে অবতীর্ণ হয়। একটি বীজের যেমন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতে সময় লাগে, তেমনি সর্বনিম্ন আসমান থেকে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে কুরআনকে এ পার্থিব জগতে প্রেরণ করা হয়। অবশ্য শুধু কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়নি; বরং জগতের সবকিছুকে আল্লাহ অস্তিত্বশীল করেছেন পর্যায়ক্রমে। এটি পবিত্র কুরআনে খুব সুন্দরভাবে উল্লেখিত হয়েছে-
'আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লালিমার আর রাত্রির এবং তা যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার; আর চাঁদের, যখন তা পূর্ণ চাঁদে পরিণত হয়। নিশ্চয়ই তোমরা (আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সর্বক্ষেত্রে) স্তরে স্তরে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ঊর্ধ্বে উঠে আসবে।' সূরা ইনশিক্বাক : ১৬-১৯
মুহাম্মাদ -এর জীবনে সংঘটিত নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অথবা লোকদের নানা প্রশ্নের জবাবে পবিত্র কুরআন একটু একটু করে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মানে হলো, পবিত্র কুরআন সুসংগঠিত অবস্থায় প্রথম আসমানে সংরক্ষিত ছিল; বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঘটনায় তা অবতীর্ণ হয়েছে মাত্র। মহানবি -কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-'কেন কুরআন একত্রে অবতীর্ণ হলো না?' জবাবে কুরআন বলেছে-'তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করার জন্য।' সূরা ফুরকান: ৩২
পর্বতারোহণের সময় আরোহীকে যেমন নতুন উচ্চতার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, ডুবুরিকে যেমন গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, তেমনি কুরআনের গভীর অর্থবোধক কথাগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে মহানবি এবং জগতের সকল মানুষের অবকাশের প্রয়োজন ছিল।
তাহলে এও বলা যায়-ওহির বিরতির যে সময়, সেটাও ওহিরই অংশ। কারণ, ওই নীরবতা ছাড়া আমরা ওহির প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারতাম না। একটি বাক্যের শব্দগুলোর মাঝে যেমন ফাঁকা জায়গা থাকে, কথা বলার সময় যেমন আমরা একটু করে থামি, তেমনি কুরআনের বাণীগুলোর মাঝেও এমন নীরবতা অপরিহার্য ছিল। ওহির বিরতির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের আরও একটি বার্তা দিয়েছেন এমন যে, নীরবতার ভেতরেও তাঁর করুণাধারা আমাদের জন্য সদা উপস্থিত।

আলিফ-লাম-মিমের গোপন রহস্য
কুরআনের প্রতিটি কথা আল্লাহর পরিকল্পিত বক্তব্য, আমরা তা বুঝতে পারি বা না পারি। কুরআনের অনেক সূরা শুরু হয়েছে কিছু আরবি বর্ণসমষ্টি দিয়ে। যেমন-আলিফ-লাম-মিম। শত শত বছর ধরে স্কলাররা এগুলোর বিষয়ে নানা মত দিয়েছেন। কিছু স্কলার মনে করেন, এ বর্ণগুলোর ভেতর কিছু গাণিতিক মান রয়েছে-যার ভেতর অলৌকিক রহস্য লুকিয়ে আছে। কিছু স্কলার মনে করেন, ওই বর্ণগুলো কিছু শব্দের আদ্যাক্ষর। তাঁরা বলতে চান, 'আলিফ' বর্ণ দিয়ে আল্লাহ, 'মিম' বর্ণ দিয়ে মুহাম্মাদ, 'নুন' বর্ণ দিয়ে নুর (আল্লাহর আলো)-এ রকম বোঝানো হয়েছে।
অবশ্য বেশিরভাগ স্কলারের মতে, এ বর্ণসমষ্টির অর্থ কেবল আল্লাহই জানেন এবং এগুলোর অর্থ আমাদের কাছে অজ্ঞাত রেখে আল্লাহ তাঁর সর্বজ্ঞ গুণের নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন। সারকথা হলো-একেবারে শুরু থেকে আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সঠিক পথের দিশা পেতে হলে আমাদের বিনয়ের সাথে নিজের অজ্ঞতা ও জ্ঞানের স্বল্পতার স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই দেখা যায়, কুরআনের যেখানেই আল্লাহ এমন বিচ্ছিন্ন বর্ণসমষ্টি প্রকাশ করেছেন, ঠিক তারপরেই তাঁর প্রজ্ঞা, ক্ষমতা, ও ওহির রহস্যময়তার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আলিফ-লাম-মিম। এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত।' সূরা বাকারা: ১-২
মজার ব্যাপার হলো, পবিত্র কুরআনের ২৯টি জায়গায় এমন রহস্যময় বর্ণসমষ্টির উল্লেখ আছে, অন্যদিকে আরবি ভাষার মোট বর্ণ সংখ্যাও ২৯টি। দুটি সংখ্যার এমন মিলকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি ব্যাখ্যা এমন-একজন মানুষের শরীরের সবগুলো উপাদান কাউকে দিয়ে যদি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে বলা হয়-তাহলে সে যেমন ব্যর্থ হবে, তেমনি ২৯টি আরবির বর্ণ সবার সামনে থাকা সত্ত্বেও কুরআনের মতো কোনো গ্রন্থ রচনা করতে মানুষ ব্যর্থ হবে। মানুষের ভেতরে যে প্রাণ রয়েছে-তা সৃষ্টির একমাত্র সক্ষমতা যেমন কেবল আল্লাহর রয়েছে, তেমনি কুরআন সৃষ্টির সক্ষমতাও কেবল আল্লাহরই রয়েছে।
কুরআনের ভাষাগত নির্ভুলতা সত্ত্বেও আল্লাহ আমাদের পরোক্ষভাবে নয়; বরং সরাসরি কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। যারা কুরআনকে মুহাম্মাদ -এর রচিত গ্রন্থ বলত, তাদের জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কেনো সূরা এনে দাও। আর যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান করো।' সূরা বাকারা : ২৩
১৪০০ বছর আগে আল্লাহ যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, আজ পর্যন্ত কেউ তা গ্রহণ করতে পারেনি। কুরআনের ভাষাশৈলী এত অনন্য যে, আরবি ভাষাবিদরাও এর গভীরতা দেখে হতবাক হয়ে যান। এমনকী কুরআনের আবৃত্তি বা তিলাওয়াত এতই শক্তিশালী যে, এর ঐশীগ্রন্থ হওয়ার প্রমাণ শবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
কুরআনের শক্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি আল্লাহর ভয়ে তাকে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। এসব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' সূরা হাশর: ২১
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশাল পাহাড় আল্লাহর বাণীর ভারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়কে আল্লাহ এতখানি শক্তিশালী করে তৈরি করেছেন যে, তা ঠিকই আল্লাহর বাণীর ভার বইতে পারে।

হৃদয় দিয়ে কুরআন পাঠ
আমরা যখন কুরআনের সংস্পর্শে আসি, তখন মূলত বিশ্বজগতের স্রষ্টার সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হই। কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহের বারিধারায় সিক্ত হয়। মহানবি বলেছেন-
'যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি বর্ণ পাঠ করল, সে যেন একটি সৎকর্ম করল এবং একটি সৎকর্মের পুরস্কার হবে দশগুণ বেশি। আমি বলছি না যে আলিফ-লাম-মিম একটি শব্দ; বরং আলিফ একটি শব্দ, লাম একটি শব্দ এবং মিম একটি শব্দ।'
কুরআনের কথাগুলো এত শক্তিশালী ছিল-যখন মহানবি -এর ওপর তা অবতীর্ণ হতো, তখন তিনি ঘেমে-নেয়ে উঠতেন। উটের পিঠে চেপে সফরের সময় মহানবি -এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হলে ওহির ভারে তাঁর উট মাটিতে নুয়ে পড়ত।
দুনিয়াবাসীর জন্য অনুগ্রহ ও আলোকবর্তিকা হিসেবে কুরআনকে প্রেরণ করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব।' সূরা মায়েদা : ১৫
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আলোকে সাথে নিয়ে। কেননা, অন্ধকারে কুরআন পড়া যায় না। কোনো কিছু দেখার জন্য যেমন আলো প্রয়োজন, তেমনি আল্লাহর কথাকে অনুভব করতে হলে আধ্যাত্মিক আলোর প্রয়োজন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আমাদের কাছে একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক হিসেবে রাসূল এসেছিলেন; যিনি ওহির রহস্যময়তার ব্যাখ্যা আমাদের সামনে উপস্থাপন করে গেছেন, যাতে আমরা সহজে তা অনুধাবন করতে পারি। যেকোনো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কুরআন পড়তে পারে, কিন্তু সবাই কুরআনের গভীরতম অর্থ উপলব্ধি করতে পারে না। কুরআন আল্লাহর জীবন্ত কথামালা। কুরআনের একই আয়াতের অর্থ এর পাঠকের কাছে একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ধরা দেয় না। কুরআনের উচ্চ প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য এর আগ্রহী পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পাঠকের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়।
আমরা মূলত কুরআন পড়ি না, কুরআনই আমাদের পড়ে। কুরআন আমাদের হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত প্রবেশ করে এবং আমাদের সংকল্পের বিশুদ্ধতা ও চেতনার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের রহস্যময়তার উন্মোচন ঘটনায় বা গোপন করে।
জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'কুরআন হলো লজ্জাশীলা কনের মতো। আপনাকে এর কাছে আসতে হবে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সাথে, যাতে এটি সহজে আপনার কাছে নিজেকে উন্মোচিত করে।'
মহানবি মুহাম্মাদ -এর অধিকাংশ সাহাবি অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন না। আপনি কতটা দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করেছেন, কুরআনের গভীরতম অর্থ বোঝার জন্য তা জরুরি বিষয় নয়; জরুরি বিষয় হলো-আপনি কতটা আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে কুরআনের সংস্পর্শে এসেছেন। এ কারণে সুফি সাধকরা জিহ্বার জ্ঞান থেকে হৃদয়ের জ্ঞানের দিকে যাত্রা করতে বলেছেন। কেননা, মন কখনো আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে না। আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে কেবল সেই হৃদয়, যার দুয়ার আল্লাহর মহত্ত্বকে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত। সম্ভবত এ কারণে আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে বলেছেন- 'যে ভয় করে, তার জন্য উপদেশস্বরূপ।' সূরা ত্ব-হা: ৩
হৃদয় থেকে কুরআন পাঠের যাত্রা শুরু হয় অনুশোচনাপূর্ণ অন্তর থেকে। আমাদের ব্যক্তিগত মতামত ও পক্ষপাতিত্বকে বিসর্জন না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কুরআনকে কুরআনের রূপে দেখতে পারব না; বরং নিজ ভুল চিন্তা-কাঠামোর ফিল্টারেই কুরআন আমাদের সামনে প্রতিভাত হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক।' সূরা বাকারা: ২
কুরআন সব রকম ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কুরআন সম্পর্কে মানুষের ব্যাখ্যার মধ্যে ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু কুরআনে কোনো ত্রুটি নেই। এ কারণে কুরআন খোলার আগেই কুরআন আমাদের শুধু বাহ্যিকভাবেই পবিত্রতা অর্জন করতে বলেনি; বরং হৃদয়কেও বিশুদ্ধ করতে বলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'অবশ্যই তা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত গ্রন্থে। যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।' সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯
কুরআনের সংস্পর্শে আসতে হলে আপনাকে অবশ্যই বিশুদ্ধ হৃদয়, পবিত্র-বিনয়ী অন্তর ও শূন্যচিত্ত নিয়ে আসতে হবে। কারণ, বহুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে এক আল্লাহকে অনুভব করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর কুরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে, সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে।' সূরা মুজ্জাম্মিল: ৪
আমরা যদি কুরআন পাঠ থেকে লাভবান হতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই আল্লাহকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ করো আর নীরবতা বজায় রাখো, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।' সূরা আ'রাফ: ২০৪
'নিশ্চয়ই যে সুন্দরভাবে ও ধীরে ধীরে কুরআন পাঠ করবে, সে থাকবে আনুগত্যপরায়ণ মহান ফেরেশতাদের সাথে এবং যে ব্যক্তি অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও তোতলাতে তোতলাতে কিংবা ভেঙে ভেঙে কুরআন পাঠ করবে, সে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে।'
একটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের চেতনা কিন্তু ওহির সাথে পূর্বপরিচিত। কারণ, দুটোই এসেছে একই উৎস থেকে; আল্লাহ থেকে। তাই এটি আল্লাহর-ই মহিমা যে, কুরআন পাঠের সময় আমাদের বিক্ষিপ্ত হৃদয় অবশেষে বিশ্রাম ও শান্তির জায়গা খুঁজে পায়। যখন আমরা আরবি ভাষায় কুরআন পাঠের ভেতর ডুবে যাই, তখন আমাদের সমগ্র সত্তা আল্লাহর জ্যোতির চাদরের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আমাদের হৃদয়ের সাথে আল্লাহর যোগাযোগ সর্বদা অব্যাহত থাকে। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের শোরগোল এ যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। বৃষ্টির ফোঁটাকে গ্রহণ করার জন্য যেমন একটি বীজকে ফেটে যেতে হয়, তেমনি আল্লাহর বার্তাকে আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে আমাদের কুপ্রবৃত্তির খোলসকে ভেঙে ফেলতে হয়।

কুরআনের রূপান্তরের শক্তি
কুরআনের অনন্য শক্তি বুঝতে একটি গল্পের কথা উল্লেখ করা যাক-
এক লোক একদিন এক সুফির কাছে এসে প্রশ্ন করল- 'কুরআনের সবটা তো আমরা বুঝতে পারি না, তাহলে শুধু শুধু এটি পড়ে কী লাভ? একই কুরআন বারবার পড়ার তো কোনো মানে হয় না!' জবাবে সুফি কিছু না বলে একটি কয়লা ভরা কাপড়ের ব্যাগ নিলেন এবং লোকটিকে সাথে নিয়ে একটি কুয়ার কাছে গেলেন। এরপর কয়লাগুলো মাটিতে ফেলে তিনি ব্যাগটি খালি করলেন। এবার লোকটিকে বললেন-'কুয়ার পানি দিয়ে কাপড়ের ব্যাগটি ভরে ফেলো।' লোকটি বলল-'কিন্তু এটি তো কাপড়ের ব্যাগ। এখানে পানি ঢাললে তো সব পানি গড়িয়ে পড়ে যাবে।' সুফি বললেন- 'আমি যা বলি, তা-ই করো।' এ কথা বলে সুফি চলে গেলেন।
পরের কয়েক ঘণ্টা লোকটি ব্যাগটির ভেতর বালতির পর বালতি পানি ঢেলে চলল, কিন্তু ব্যাগ ভর্তি হওয়ার নাম নেই; সব পানি পড়ে যেতে থাকল ব্যাগ থেকে। কিছু সময় পর সুফি ফিরে এলেন। দেখলেন, লোকটি পানি ঢালতে ঢালতে ক্লান্ত-শ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছে। সুফি তাকে দেখে মৃদু হাসলেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল- 'আপনি হাসছেন কেন? আমি তো ব্যাগে একটুও পানি ভরতে পারিনি।'
জবাবে সুফি বললেন-'তুমি হয়তো ব্যাগে পানি ভরতে পারোনি, কিন্তু বারবার পানি ঢালার কারণে কয়লার ময়লা লেগে যাওয়া ব্যাগটি ধবধবে পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং এখন ব্যাগটিকে নতুনের মতো লাগছে। প্রথম যেদিন ব্যাগটি কিনেছিলাম, সেদিনের মতো এটি সুন্দর হয়ে গেছে। কুরআনের বিষয়টিও ঠিক এ রকম। তুমি হয়তো সমগ্র কুরআন ধারণ করতে পারবে না, কিন্তু যতই কুরআন পাঠ করবে, ততই এটি তোমার হৃদয়কে প্রকম্পিত করবে এবং হৃদয় ততই পরিুদ্ধ হবে। কুরআন তোমাকে এমন কিছু দেওয়ার জন্য আসেনি, যা তোমার ভেতর নেই; বরং কুরআন তোমার হৃদয়ের চক্ষুর সামনের সেই আবরণকে সরাতে এসেছে, যে আবরণ সরালে তোমার হৃদয় বিশুদ্ধ হবে এবং তুমি আল্লাহকে ঠিকমতো অনুভব করতে পারবে।'
আমরা হৃদয়ের ভেতর জান্নাতের পথকে বহন করে চলেছি। ওহি হলো সেই আলোকবর্তিকা, যা আমাদের হৃদয়ের সেই গোপন অধ্যায়ের সন্ধান দেয়। ১৪০০ বছর ধরে কুরআনের কথাগুলো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে, কুরআনে তাদের সতর্ক করা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন—
'রাসূলগণ ছিলেন সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী, যাতে রাসূলদের আগমনের পর আল্লাহর বিরুদ্ধে কোনো অজুহাতের সুযোগ না থাকে। আল্লাহ মহাপরাক্রমশালী, বিজ্ঞানময়।' সূরা নিসা: ১৬৫
কুরআন আমাদের দেখায়, কেবল আল্লাহর ইবাদতই হলো আল্লাহর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা ও মুক্তির একমাত্র পথ।
ওহি আমাদের কেবল আল্লাহকে অনুভবের শিক্ষা দেয় না; বরং আল্লাহর সাথে সংযুক্ত হওয়ার পথ দেখায়। কুরআন আল্লাহর করুণা, ক্ষমা ও ন্যায়বিচারের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করে। ফলে একদিকে তা আমাদের মহৎ গুণাবলির ধারক হতে উদ্বুদ্ধ করে, অন্যদিকে সত্য প্রত্যাখ্যান করলে শাস্তির মুখোমুখি হওয়ার ভয় দেখায়।
পবিত্র কুরআনে যুগ-যুগান্তরের সেই সব মানুষের গল্প বলা হয়েছে, যারা বহু বিপদাপদের মুখোমুখি হয়েছেন এবং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আস্থার হাতিয়ার দিয়ে সে বিপদগুলোকে জয় করেছেন। ওই ঘটনাগুলো আমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মনে করিয়ে দেয়—বিপদ যত কঠিন হোক না কেন, আল্লাহর ওপর আস্থা ও নির্ভরতা সকল বিপদ দূর করার জন্য যথেষ্ট। কুরআন আমাদের দেখায়, দুনিয়াতে সবকিছু আমাদের পরিকল্পনা মাফিক ঘটে না। আমাদের নিয়ে আল্লাহরও একটি পরিকল্পনা থাকে এবং সে পরিকল্পনার ভেতর কুরআনে নবি ইউসুফ-এর জীবন পরিক্রমার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ইউসুফ-কে তাঁর হিংসুক ভাইয়েরা একটি কুয়ার মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এরপর সেখান থেকে তাঁকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়া হয়, মিথ্যা অভিযোগে তাঁকে কারাগারে নিক্ষেপ করা হয় এবং অবশেষে তিনি সেখান থেকে মিশরের বাদশার সবচেয়ে ক্ষমতাবান উপদেষ্টার পদ অলংকৃত করেন। ইউসুফ কল্পনাও করতে পারেননি, তাঁকে নিয়ে রচিত আল্লাহর বিশেষ পরিকল্পনা তাঁকে কোথায় নিয়ে চলেছে।৮১ কুরআনে নবি ইবরাহিম-এর ঘটনা পাওয়া যায়। ইবরাহিম-কে ভয়াবহ আগুনের ভেতর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে সে আগুনের শিখা শীতল হয়ে যায় এবং জায়গাটি তাঁর জন্য বাগানে পরিণত হয়। কুরআনে বলা হয়েছে-
'আমি বললাম-হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শীতল ও শান্তিময় হয়ে যাও।' সূরা আম্বিয়া: ৬৯
মুসা-এর ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ কুরআনে পাওয়া যায়। মুসা-এর সামনে যখন লোহিত সাগর এবং পেছনে সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী, তখন আল্লাহ মুসা-কে রক্ষা করলেন। কারণ, মুসা তাঁর চক্ষু নিবদ্ধ করেছিল আল্লাহর দিকে; প্রতিবন্ধকতার দিকে নয়। আল্লাহ লোহিত সাগরকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিলেন এবং মুসা-কে রক্ষা করলেন। আর সেই সাগরে ফেরাউন ও তার বাহিনী ডুবে মারা গেল।৮২ কুরআনে কুমারী মাতা মরিয়ম-এর কথা বলা হয়েছে; গর্ভধারণ যার জীবনকে বিপদসংকুল করে তুলেছিল এবং তাঁর চরিত্রের সুনামকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। এমন ভয়ানক পরিস্থিতিতে মরিয়ম আল্লাহর ওপর নির্ভর করলেন এবং আল্লাহর নির্দেশে তিন দিন পর্যন্ত কথা বলা থেকে বিরত থাকলেন। ঈসা জন্মগ্রহণ করলেন এবং দোলনা থেকে তাঁর মায়ের পক্ষে কথা বললেন।৮৩
প্রতিটি ভাঙা হৃদয়, প্রতিটি ক্ষতবিক্ষত আত্মাকে কুরআন মনে করিয়ে দেয়, তার জন্য আল্লাহর আশ্রয় ও আল্লাহর শ্রেষ্ঠ পরিকল্পনা অপেক্ষা করছে।
'যদি আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেন, তবে তোমাদের ওপর কেউ-ই বিজয়ী হতে পারবে না এবং যদি তিনি তোমাদের সাহায্য না করেন, সে অবস্থায় এমন কে আছে-যে তোমাদের সাহায্য করবে? মুমিনদের আল্লাহর ওপর নির্ভর করা উচিত।' সূরা আলে ইমরান : ১৬০

যে কারণে কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়েছে
একটি বীজের ভেতর বিশাল বৃক্ষের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। ইসলামের অনেক স্কলার মনে করেন, সমগ্র কুরআনের বীজ লুকিয়ে আছে মহিমান্বিত রজনিতে (লাইলাতুল কদর), যে রাতে কুরআন সর্বোচ্চ আসমান থেকে সর্বনিম্ন আসমানে অবতীর্ণ হয়। একটি বীজের যেমন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হতে সময় লাগে, তেমনি সর্বনিম্ন আসমান থেকে ২৩ বছর ধরে ধীরে ধীরে কুরআনকে এ পার্থিব জগতে প্রেরণ করা হয়। অবশ্য শুধু কুরআন পর্যায়ক্রমে অবতীর্ণ হয়নি; বরং জগতের সবকিছুকে আল্লাহ অস্তিত্বশীল করেছেন পর্যায়ক্রমে। এটি পবিত্র কুরআনে খুব সুন্দরভাবে উল্লেখিত হয়েছে-
'আমি শপথ করি সন্ধ্যাকালীন লালিমার আর রাত্রির এবং তা যা কিছুর সমাবেশ ঘটায় তার; আর চাঁদের, যখন তা পূর্ণ চাঁদে পরিণত হয়। নিশ্চয়ই তোমরা (আধ্যাত্মিক ও জাগতিক সর্বক্ষেত্রে) স্তরে স্তরে উন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ঊর্ধ্বে উঠে আসবে।' সূরা ইনশিক্বাক : ১৬-১৯
মুহাম্মাদ -এর জীবনে সংঘটিত নানা ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে অথবা লোকদের নানা প্রশ্নের জবাবে পবিত্র কুরআন একটু একটু করে অবতীর্ণ হয়েছে। এর মানে হলো, পবিত্র কুরআন সুসংগঠিত অবস্থায় প্রথম আসমানে সংরক্ষিত ছিল; বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন ঘটনায় তা অবতীর্ণ হয়েছে মাত্র। মহানবি -কে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল-'কেন কুরআন একত্রে অবতীর্ণ হলো না?' জবাবে কুরআন বলেছে-'তোমার হৃদয়কে সুদৃঢ় করার জন্য।' সূরা ফুরকান: ৩২
পর্বতারোহণের সময় আরোহীকে যেমন নতুন উচ্চতার আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, ডুবুরিকে যেমন গভীর সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে একটু সময় নিতে হয়, তেমনি কুরআনের গভীর অর্থবোধক কথাগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে মহানবি এবং জগতের সকল মানুষের অবকাশের প্রয়োজন ছিল।
তাহলে এও বলা যায়-ওহির বিরতির যে সময়, সেটাও ওহিরই অংশ। কারণ, ওই নীরবতা ছাড়া আমরা ওহির প্রকৃত মর্ম বুঝতে পারতাম না। একটি বাক্যের শব্দগুলোর মাঝে যেমন ফাঁকা জায়গা থাকে, কথা বলার সময় যেমন আমরা একটু করে থামি, তেমনি কুরআনের বাণীগুলোর মাঝেও এমন নীরবতা অপরিহার্য ছিল। ওহির বিরতির মাধ্যমে আল্লাহ আমাদের আরও একটি বার্তা দিয়েছেন এমন যে, নীরবতার ভেতরেও তাঁর করুণাধারা আমাদের জন্য সদা উপস্থিত।

আলিফ-লাম-মিমের গোপন রহস্য
কুরআনের প্রতিটি কথা আল্লাহর পরিকল্পিত বক্তব্য, আমরা তা বুঝতে পারি বা না পারি। কুরআনের অনেক সূরা শুরু হয়েছে কিছু আরবি বর্ণসমষ্টি দিয়ে। যেমন-আলিফ-লাম-মিম। শত শত বছর ধরে স্কলাররা এগুলোর বিষয়ে নানা মত দিয়েছেন। কিছু স্কলার মনে করেন, এ বর্ণগুলোর ভেতর কিছু গাণিতিক মান রয়েছে-যার ভেতর অলৌকিক রহস্য লুকিয়ে আছে। কিছু স্কলার মনে করেন, ওই বর্ণগুলো কিছু শব্দের আদ্যাক্ষর। তাঁরা বলতে চান, 'আলিফ' বর্ণ দিয়ে আল্লাহ, 'মিম' বর্ণ দিয়ে মুহাম্মাদ, 'নুন' বর্ণ দিয়ে নুর (আল্লাহর আলো)-এ রকম বোঝানো হয়েছে।
অবশ্য বেশিরভাগ স্কলারের মতে, এ বর্ণসমষ্টির অর্থ কেবল আল্লাহই জানেন এবং এগুলোর অর্থ আমাদের কাছে অজ্ঞাত রেখে আল্লাহ তাঁর সর্বজ্ঞ গুণের নিদর্শন প্রদর্শন করেছেন।৮৪ সারকথা হলো-একেবারে শুরু থেকে আল্লাহ আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, সঠিক পথের দিশা পেতে হলে আমাদের বিনয়ের সাথে নিজের অজ্ঞতা ও জ্ঞানের স্বল্পতার স্বীকৃতি দিতে হবে। তাই দেখা যায়, কুরআনের যেখানেই আল্লাহ এমন বিচ্ছিন্ন বর্ণসমষ্টি প্রকাশ করেছেন, ঠিক তারপরেই তাঁর প্রজ্ঞা, ক্ষমতা, ও ওহির রহস্যময়তার কথা উল্লেখ করেছেন। যেমন: আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আলিফ-লাম-মিম। এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য হিদায়াত।' সূরা বাকারা: ১-২
মজার ব্যাপার হলো, পবিত্র কুরআনের ২৯টি জায়গায় এমন রহস্যময় বর্ণসমষ্টির উল্লেখ আছে, অন্যদিকে আরবি ভাষার মোট বর্ণ সংখ্যাও ২৯টি। দুটি সংখ্যার এমন মিলকে অনেকভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। একটি ব্যাখ্যা এমন-একজন মানুষের শরীরের সবগুলো উপাদান কাউকে দিয়ে যদি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে বলা হয়-তাহলে সে যেমন ব্যর্থ হবে, তেমনি ২৯টি আরবির বর্ণ সবার সামনে থাকা সত্ত্বেও কুরআনের মতো কোনো গ্রন্থ রচনা করতে মানুষ ব্যর্থ হবে। মানুষের ভেতরে যে প্রাণ রয়েছে-তা সৃষ্টির একমাত্র সক্ষমতা যেমন কেবল আল্লাহর রয়েছে, তেমনি কুরআন সৃষ্টির সক্ষমতাও কেবল আল্লাহরই রয়েছে।৮৫

কুরআনের ভাষাগত নির্ভুলতা সত্ত্বেও আল্লাহ আমাদের পরোক্ষভাবে নয়; বরং সরাসরি কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। যারা কুরআনকে মুহাম্মাদ -এর রচিত গ্রন্থ বলত, তাদের জবাবে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি আমার বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি, তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার মতো কেনো সূরা এনে দাও। আর যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তাহলে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান করো।' সূরা বাকারা : ২৩
১৪০০ বছর আগে আল্লাহ যে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন, আজ পর্যন্ত কেউ তা গ্রহণ করতে পারেনি। কুরআনের ভাষাশৈলী এত অনন্য যে, আরবি ভাষাবিদরাও এর গভীরতা দেখে হতবাক হয়ে যান। এমনকী কুরআনের আবৃত্তি বা তিলাওয়াত এতই শক্তিশালী যে, এর ঐশীগ্রন্থ হওয়ার প্রমাণ শবণেন্দ্রিয়ের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যায়।
কুরআনের শক্তি সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'আমি যদি এ কুরআনকে পাহাড়ের ওপর অবতীর্ণ করতাম, তাহলে তুমি আল্লাহর ভয়ে তাকে বিনীত ও বিদীর্ণ দেখতে। এসব উদাহরণ আমি মানুষের জন্য বর্ণনা করি, যাতে তারা চিন্তা-ভাবনা করে।' সূরা হাশর: ২১
বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, বিশাল পাহাড় আল্লাহর বাণীর ভারে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেলেও মানুষের হৃদয়কে আল্লাহ এতখানি শক্তিশালী করে তৈরি করেছেন যে, তা ঠিকই আল্লাহর বাণীর ভার বইতে পারে।

হৃদয় দিয়ে কুরআন পাঠ
আমরা যখন কুরআনের সংস্পর্শে আসি, তখন মূলত বিশ্বজগতের স্রষ্টার সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হই। কুরআন পাঠের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহের বারিধারায় সিক্ত হয়। মহানবি বলেছেন-
'যে ব্যক্তি পবিত্র কুরআনের একটি বর্ণ পাঠ করল, সে যেন একটি সৎকর্ম করল এবং একটি সৎকর্মের পুরস্কার হবে দশগুণ বেশি। আমি বলছি না যে আলিফ-লাম-মিম একটি শব্দ; বরং আলিফ একটি শব্দ, লাম একটি শব্দ এবং মিম একটি শব্দ।'৮৬
কুরআনের কথাগুলো এত শক্তিশালী ছিল-যখন মহানবি -এর ওপর তা অবতীর্ণ হতো, তখন তিনি ঘেমে-নেয়ে উঠতেন। উটের পিঠে চেপে সফরের সময় মহানবি -এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হলে ওহির ভারে তাঁর উট মাটিতে নুয়ে পড়ত।৮৭
দুনিয়াবাসীর জন্য অনুগ্রহ ও আলোকবর্তিকা হিসেবে কুরআনকে প্রেরণ করা হয়েছে। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তোমাদের নিকট আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে জ্যোতি ও স্পষ্ট কিতাব।' সূরা মায়েদা : ১৫
পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে আলোকে সাথে নিয়ে। কেননা, অন্ধকারে কুরআন পড়া যায় না। কোনো কিছু দেখার জন্য যেমন আলো প্রয়োজন, তেমনি আল্লাহর কথাকে অনুভব করতে হলে আধ্যাত্মিক আলোর প্রয়োজন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আমাদের কাছে একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শক হিসেবে রাসূল এসেছিলেন; যিনি ওহির রহস্যময়তার ব্যাখ্যা আমাদের সামনে উপস্থাপন করে গেছেন, যাতে আমরা সহজে তা অনুধাবন করতে পারি। যেকোনো অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন মানুষ কুরআন পড়তে পারে, কিন্তু সবাই কুরআনের গভীরতম অর্থ উপলব্ধি করতে পারে না। কুরআন আল্লাহর জীবন্ত কথামালা। কুরআনের একই আয়াতের অর্থ এর পাঠকের কাছে একই রকমভাবে দ্বিতীয়বার ধরা দেয় না। কুরআনের উচ্চ প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য এর আগ্রহী পাঠকের হৃদয়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে এবং পাঠকের সাথে মিথস্ক্রিয়ায় লিপ্ত হয়।
আমরা মূলত কুরআন পড়ি না, কুরআনই আমাদের পড়ে। কুরআন আমাদের হৃদয়ের তলদেশ পর্যন্ত প্রবেশ করে এবং আমাদের সংকল্পের বিশুদ্ধতা ও চেতনার সামর্থ্যের ওপর ভিত্তি করে নিজের রহস্যময়তার উন্মোচন ঘটনায় বা গোপন করে।
জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-
'কুরআন হলো লজ্জাশীলা কনের মতো। আপনাকে এর কাছে আসতে হবে শ্রদ্ধা ও সম্ভ্রমের সাথে, যাতে এটি সহজে আপনার কাছে নিজেকে উন্মোচিত করে।'
মহানবি মুহাম্মাদ -এর অধিকাংশ সাহাবি অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ছিলেন না। আপনি কতটা দুনিয়াবি জ্ঞান অর্জন করেছেন, কুরআনের গভীরতম অর্থ বোঝার জন্য তা জরুরি বিষয় নয়; জরুরি বিষয় হলো-আপনি কতটা আন্তরিকতা ও বিনয়ের সাথে কুরআনের সংস্পর্শে এসেছেন। এ কারণে সুফি সাধকরা জিহ্বার জ্ঞান থেকে হৃদয়ের জ্ঞানের দিকে যাত্রা করতে বলেছেন। কেননা, মন কখনো আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে না। আল্লাহর নুর অনুভব করতে পারে কেবল সেই হৃদয়, যার দুয়ার আল্লাহর মহত্ত্বকে ধারণ করার জন্য প্রস্তুত। সম্ভবত এ কারণে আল্লাহ তায়ালা কুরআনকে বলেছেন- 'যে ভয় করে, তার জন্য উপদেশস্বরূপ।' সূরা ত্ব-হা: ৩
হৃদয় দিয়ে কুরআন পড়তে হলে কুরআনের প্রতি আপনার শ্রদ্ধা ও সংকল্পের ব্যাপারটি আগে ঠিক করে নিতে হবে। যখন কেউ অন্যদের সঙ্গে বিতর্ক করার বাসনা থেকে কুরআন পাঠ করে, তখন সে মূলত কুরআনে সেই জিনিসই খুঁজে পায়-যা তার মন চায়; আল্লাহ যা বলতে চান, সেদিকে তখন তার দৃষ্টি পড়ে না। কুরআনের যে অংশগুলোর প্রতি আপনার সমর্থন রয়েছে, কেবল সেগুলো পড়লে এবং যে অংশগুলোর প্রতি আপনার সমর্থন নেই, সেগুলোকে অগ্রাহ্য করে চললে বিষয়টি এমন দাঁড়ায়-আপনাকে গড়ে তোলার সুযোগ আপনি কুরআনকে দিচ্ছেন না; বরং আপনি আপনার পছন্দ-অপছন্দ মাফিক কুরআনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন!
কুরআনের বক্তব্য সেই হৃদয় গ্রহণ করতে পারে না, যে হৃদয় আত্মপূজা ও আত্ম-অহংয়ের চেতনায় বুঁদ হয়ে থাকে। জাগ্রত ও বিনয়ী হৃদয়ই কেবল কুরআনের বার্তা গ্রহণের জন্য উপযুক্ততা অর্জন করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'এতে উপদেশ রয়েছে তার জন্য, যার অনুধাবন করার মতো হৃদয় রয়েছে অথবা যে নিবিষ্ট চিত্তে শ্রবণ করে।' সূরা ক্বাফ: ৩৭
হৃদয় থেকে কুরআন পাঠের যাত্রা শুরু হয় অনুশোচনাপূর্ণ অন্তর থেকে। আমাদের ব্যক্তিগত মতামত ও পক্ষপাতিত্বকে বিসর্জন না দেওয়া পর্যন্ত আমরা কুরআনকে কুরআনের রূপে দেখতে পারব না; বরং নিজ ভুল চিন্তা-কাঠামোর ফিল্টারেই কুরআন আমাদের সামনে প্রতিভাত হবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'এটি সেই গ্রন্থ, যাতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যা মুত্তাকিদের জন্য পথপ্রদর্শক।' সূরা বাকারা: ২
কুরআন সব রকম ত্রুটির ঊর্ধ্বে। কুরআন সম্পর্কে মানুষের ব্যাখ্যার মধ্যে ত্রুটি থাকতে পারে, কিন্তু কুরআনে কোনো ত্রুটি নেই। এ কারণে কুরআন খোলার আগেই কুরআন আমাদের শুধু বাহ্যিকভাবেই পবিত্রতা অর্জন করতে বলেনি; বরং হৃদয়কেও বিশুদ্ধ করতে বলেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'অবশ্যই তা সম্মানিত কুরআন, যা আছে এক সুরক্ষিত গ্রন্থে। যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।' সূরা ওয়াকিয়া: ৭৭-৭৯
কুরআনের সংস্পর্শে আসতে হলে আপনাকে অবশ্যই বিশুদ্ধ হৃদয়, পবিত্র-বিনয়ী অন্তর ও শূন্যচিত্ত নিয়ে আসতে হবে। কারণ, বহুত্বকে হৃদয়ে ধারণ করে এক আল্লাহকে অনুভব করা যায় না। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর কুরআন পাঠ করো ধীরে ধীরে, সুবিন্যস্ত ও স্পষ্টভাবে।' সূরা মুজ্জাম্মিল: ৪
আমরা যদি কুরআন পাঠ থেকে লাভবান হতে চাই, তাহলে আমাদের অবশ্যই আল্লাহকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'যখন কুরআন পাঠ করা হয়, তখন তোমরা তা মনোযোগের সাথে শ্রবণ করো আর নীরবতা বজায় রাখো, যাতে তোমাদের প্রতি রহম করা হয়।' সূরা আ'রাফ: ২০৪
'নিশ্চয়ই যে সুন্দরভাবে ও ধীরে ধীরে কুরআন পাঠ করবে, সে থাকবে আনুগত্যপরায়ণ মহান ফেরেশতাদের সাথে এবং যে ব্যক্তি অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও তোতলাতে তোতলাতে কিংবা ভেঙে ভেঙে কুরআন পাঠ করবে, সে দ্বিগুণ পুরস্কার পাবে।'৮৮
একটি বিষয় মনে রাখা গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের চেতনা কিন্তু ওহির সাথে পূর্বপরিচিত। কারণ, দুটোই এসেছে একই উৎস থেকে; আল্লাহ থেকে। তাই এটি আল্লাহর-ই মহিমা যে, কুরআন পাঠের সময় আমাদের বিক্ষিপ্ত হৃদয় অবশেষে বিশ্রাম ও শান্তির জায়গা খুঁজে পায়। যখন আমরা আরবি ভাষায় কুরআন পাঠের ভেতর ডুবে যাই, তখন আমাদের সমগ্র সত্তা আল্লাহর জ্যোতির চাদরের নিচে আশ্রয় গ্রহণ করে।
আমাদের হৃদয়ের সাথে আল্লাহর যোগাযোগ সর্বদা অব্যাহত থাকে। কিন্তু আমাদের মনের ভেতরের শোরগোল এ যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায়। বৃষ্টির ফোঁটাকে গ্রহণ করার জন্য যেমন একটি বীজকে ফেটে যেতে হয়, তেমনি আল্লাহর বার্তাকে আমাদের হৃদয়ে প্রবেশ করাতে আমাদের কুপ্রবৃত্তির খোলসকে ভেঙে ফেলতে হয়।

কুরআনের রূপান্তরের শক্তি
কুরআনের অনন্য শক্তি বুঝতে একটি গল্পের কথা উল্লেখ করা যাক-
এক লোক একদিন এক সুফির কাছে এসে প্রশ্ন করল- 'কুরআনের সবটা তো আমরা বুঝতে পারি না, তাহলে শুধু শুধু এটি পড়ে কী লাভ? একই কুরআন বারবার পড়ার তো কোনো মানে হয় না!' জবাবে সুফি কিছু না বলে একটি কয়লা ভরা কাপড়ের ব্যাগ নিলেন এবং লোকটিকে সাথে নিয়ে একটি কুয়ার কাছে গেলেন। এরপর কয়লাগুলো মাটিতে ফেলে তিনি ব্যাগটি খালি করলেন। এবার লোকটিকে বললেন-'কুয়ার পানি দিয়ে কাপড়ের ব্যাগটি ভরে ফেলো।' লোকটি বলল-'কিন্তু এটি তো কাপড়ের ব্যাগ। এখানে পানি ঢাললে তো সব পানি গড়িয়ে পড়ে যাবে।' সুফি বললেন- 'আমি যা বলি, তা-ই করো।' এ কথা বলে সুফি চলে গেলেন।
পরের কয়েক ঘণ্টা লোকটি ব্যাগটির ভেতর বালতির পর বালতি পানি ঢেলে চলল, কিন্তু ব্যাগ ভর্তি হওয়ার নাম নেই; সব পানি পড়ে যেতে থাকল ব্যাগ থেকে। কিছু সময় পর সুফি ফিরে এলেন। দেখলেন, লোকটি পানি ঢালতে ঢালতে ক্লান্ত-শ্রান্ত ও হতাশ হয়ে পড়েছে। সুফি তাকে দেখে মৃদু হাসলেন। লোকটি জিজ্ঞেস করল- 'আপনি হাসছেন কেন? আমি তো ব্যাগে একটুও পানি ভরতে পারিনি।'
জবাবে সুফি বললেন-'তুমি হয়তো ব্যাগে পানি ভরতে পারোনি, কিন্তু বারবার পানি ঢালার কারণে কয়লার ময়লা লেগে যাওয়া ব্যাগটি ধবধবে পরিষ্কার হয়ে গেছে এবং এখন ব্যাগটিকে নতুনের মতো লাগছে। প্রথম যেদিন ব্যাগটি কিনেছিলাম, সেদিনের মতো এটি সুন্দর হয়ে গেছে। কুরআনের বিষয়টিও ঠিক এ রকম। তুমি হয়তো সমগ্র কুরআন ধারণ করতে পারবে না, কিন্তু যতই কুরআন পাঠ করবে, ততই এটি তোমার হৃদয়কে প্রকম্পিত একই রকম রয়েছে এবং আজও আমরা জীবনের যে পর্যায়ে থাকি না কেন, কুরআন আমাদের সাথে বিভিন্নভাবে সংযুক্ত হয়ে থাকে।
আমাদের বারবার কুরআন পড়তে বলা হয়েছে এ কারণে নয় যে, কুরআনের কথাগুলো বদলে যায়; বরং এ কারণে, আমরাই বদলে যাই। তাই কুরআনের একই বার্তা আল্লাহর পথে আধ্যাত্মিক যাত্রাপথে আমাদের অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে ভিন্ন ভিন্নভাবে সংযুক্ত হয়। এজন্যই বলা হয়, কুরআনের সৌন্দর্য হলো-আপনি এর বক্তব্যকে বদলাতে পারবেন না, কিন্তু এর বক্তব্য আপনাকে পুরোপুরি বদলে দিতে পারে।

আপনি যেখানেই থাকুন, কুরআন আপনার প্রয়োজন পূর্ণ করবে
কুরআন নির্দিষ্ট কোনো সময়ের মানুষের সাথে কথা বলে না; এটি কথা বলে সময়ের সীমা ছাড়ানো সকল মানুষের সাথে। কুরআন কেবল অতীতের ঘটনাবলি আমাদের সামনে উপস্থিত করে না; বর্তমানের জরুরি বিষয়গুলোও আমাদের সামনে তুলে ধরে এবং ভবিষ্যতের কর্মের জন্য আমাদের সচেতন করে তোলে।
কুরআন কোনো সুনির্দিষ্ট সময়ের জন্য অবতীর্ণ হয়নি। এটি যুগ-যুগান্তরের মানুষের জন্য পথনির্দেশ। রূপক অর্থ ও অলংকারপূর্ণ ভাষার মাধ্যমে প্রতিটি ঘটনা, যুদ্ধ, বিজয় ইত্যাদির বর্ণনাতে কুরআন আমাদের সাথে সরাসরি কথা বলে। তাই কুরআনকে সাধারণভাবে পাঠ করবেন না; বরং কুরআনে উল্লেখিত প্রতিটি চরিত্রের ভেতর ডুব দিন। কুরআনকে শুধু বোঝার চেষ্টা করবেন না; বরং আপনার সকল অনুভূতি দিয়ে এর স্বাদ নেওয়ার চেষ্টা করুন। এভাবেই জীবন্ত কুরআন জাগ্রত হয় এবং আপনার দৃষ্টির সাথে একাত্ম হয়ে যায়। এভাবে কুরআন পাঠ আপনার জীবনে পরোক্ষ থেকে প্রত্যক্ষ ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। কুরআনের স্বাদ পেতে হলে আপনাকে ওহির ইকোসিস্টেমের ভেতর প্রবেশ করতে হবে, এর সমুদ্রে ডুব দিয়ে মণি-মুক্তোর সন্ধান করতে হবে।
কুরআন পড়ার সময় খেয়াল রাখুন, কুরআনের প্রতিটি আয়াত আপনার সাথে সরাসরি কথা বলছে। মনোযোগ দিয়ে শুনুন, এ গ্রন্থে আপনার কথাই বলা হয়েছে। কুরআন যার বিরোধিতা করে, যার দিকে আহবান করে, যা মনে করিয়ে দেয়—সবই আপনি একসময় জানতেন, কিন্তু হয়তো ভুলে গেছেন।
কুরআন কথা বলে সবার সাথে। বিজ্ঞানী থেকে রাখাল পর্যন্ত, শিল্পী থেকে ব্যবসায়ী পর্যন্ত, কবি থেকে রাজনীতিবিদ পর্যন্ত এ গ্রন্থে সকলের জন্য রয়েছে বার্তা। প্রত্যেক মানুষ এই মুহূর্তে তার আধ্যাত্মিক যাত্রাপথের ঠিক যে বিন্দুতে অবস্থান করছে, কুরআন ঠিক সে বিন্দুতে তার ক্ষুধা মেটানোর জন্য অপেক্ষমাণ। তবে কিছু স্কলারের মতে—কুরআনের প্রতিটি আয়াতের রয়েছে সাত স্তরের গভীরতা এবং এর সর্বশেষ স্তরের অর্থ কেবল আল্লাহ জানেন; যেটিকে কুরআনে এভাবে বলা হয়েছে—
'আল্লাহ ছাড়া এর মর্ম কেউ জানে না।' সূরা আলে ইমরান: ৭

রূপক ও প্রতীকী আয়াতের শক্তি
কুরআনের বেশিরভাগ আয়াত সরাসরি ও সুস্পষ্ট। এগুলোকে মুহকামাত বলা হয়। আবার কুরআনের অনেক অস্পষ্ট আয়াত রয়েছে—যা রূপক ও প্রতীকী অর্থসংবলিত। এগুলোকে বলা হয় মুতাশাবিহাত (সূরা আলে ইমরান: ৭)। এ অস্পষ্ট আয়াতগুলো কুরআনকে সময়ের সীমাকে অতিক্রম করিয়েছে। কারণ, কুরআন এমন এক গ্রন্থ—যা প্রতীকীকরণের মাধ্যমে সর্বযুগের এবং জ্ঞানের সর্বস্তরের মানুষের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে।
কুরআনে প্রচুর প্রতীক, উদাহরণ ও শক্তিশালী গদ্যের পাশাপাশি রয়েছে অনেক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সূত্র। কিন্তু কুরআন বিজ্ঞানের (Science) কোনো গ্রন্থ নয়; বরং এটি নিদর্শনের (Signs) গ্রন্থ। স্রষ্টার কাছে আমাদের ফিরে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে কুরআন তার সৌন্দর্য ও মহিমা আমাদের সামনে মেলে ধরে।
দুনিয়ার অন্যান্য গ্রন্থসমূহ লেখা হয় দুনিয়ার বাস্তবতা সম্পর্কে লেখকের দৃষ্টি ও অনুধাবনের ভিত্তিতে। কিন্তু কুরআন যেহেতু নিরেট আল্লাহর বাণী, সেহেতু কুরআনে নিখুঁতভাবে আল্লাহর পরম সত্য ও গভীর মমতার প্রতিফলন ঘটেছে।
'আল্লাহর কথা অন্যান্যদের কথার চেয়ে তেমনই শ্রেষ্ঠ, যেমন আল্লাহ অন্যান্য সৃষ্টির তুলনায় শ্রেষ্ঠ।'
কুরআনের কথাগুলো মানুষের ব্যাখ্যা থেকে রচিত নয়। কুরআনে সরাসরি আল্লাহর কথা বর্ণিত হয়েছে মানুষের বোধগম্য ভাষায়। কুরআনের প্রতিটি পঙক্তিকে 'আয়াত' বলা হয়, যার অর্থ-নিদর্শন। কুরআনের প্রতিটি শব্দ একেকটি সাইনপোস্ট, যা আল্লাহর দিকনির্দেশক। যদিও আমরা আল্লাহকে সরাসরি দেখতে পাই না, তবুও সমগ্র সৃষ্টিজগতে তাঁর নামের প্রতিফলন দেখে আমরা তাঁকে অনুভব করতে পারি। সমগ্র সৃষ্টিজগৎকে যদি আল্লাহর পাণ্ডুলিপি হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে কুরআনকে সৃষ্টি রহস্যের আধ্যাত্মিক সূত্র বলা যেতে পারে। এ কারণে আমাদের কুরআনকে শুধু পড়তে বলা হয়নি; এর নিদর্শনের ভেতর ডুব দিতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি তোমার প্রতি অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় কিতাব, যাতে তারা এর আয়াতসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে এবং যাতে বুদ্ধিমানগণ উপদেশ গ্রহণ করে।' সূরা সোয়াদ: ২৯
কুরআনের কোনো আয়াতকে বুঝতে হলে সমগ্র কুরআনে বর্ণিত আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসার বার্তার সাথে মিলিয়ে তা বুঝতে হবে। একজন মানুষের হৃৎপিণ্ডকে যদি সমগ্র শরীর থেকে আলাদা করে নিয়ে বোঝার চেষ্টা করা হয়, তাহলে যেমন তা অসম্পূর্ণ হবে, তেমনি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সামগ্রিক বার্তাকে অগ্রাহ্য করে কুরআন থেকে পছন্দমতো একটি আয়াত বাছাই করে সেটিকে বোঝার চেষ্টা করলেও তা আমাদের কাছে অসম্পূর্ণ হয়ে ধরা দেবে।

কুরআনের উপশম ক্ষমতা
কীভাবে আল্লাহকে পাওয়া যায়? আত্মার এমন প্রশ্নের উত্তর রয়েছে কুরআনের ভেতর। কুরআন কেবল বিধিবিধানসংবলিত কোনো গ্রন্থ নয়। আলি -এর মতে, কুরআন হলো-
'একটি মহাসাগর, যার গভীরতার সীমাহীন; একটি ঝরনা, যার ভান্ডার অফুরন্ত। কুরআন তার জন্য শান্তি, যে কুরআনের ভেতর বসবাস করে। তার জন্য পথপ্রদর্শক, যে এটির অনুসরণ করে। কুরআন এমন এক নিরাময়, যার সংস্পর্শে এলেই মানুষ আরোগ্য লাভ করে। প্রত্যেক আশ্রয়প্রার্থীর জন্য কুরআন একটি আশ্রয়। কুরআন এমন আলো, যা অন্ধকার দিয়ে প্রতিস্থাপিত হয় না।'
কুরআনের কথা আমাদের চেতনাকে প্রশান্ত ও সন্তুষ্ট করে দেয়। এটি আমাদের প্রবৃত্তির জন্য একটি জাগরণী ডাক হিসেবে কাজ করে। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক আলোর ঝলকানি, যা আমাদের হৃদয়ের অলিগলি থেকে সব অন্ধকারকে দূর করে দেয়। একটি বীজ চারাগাছে রূপান্তরিত হওয়ার আগে যেমন খোলস ভেঙে এর ভেতর আলো প্রবেশের সুযোগ দেয়, তেমনি আমাদের হৃদয়ের আবরণকে সরিয়ে সেখানে কুরআনের আলো প্রবেশের সুযোগ করে দিলেই কেবল আমরা প্রকৃত মানুষ হতে পারব।
কুরআন হলো দৃশ্যমান জগতের সাথে সর্বোচ্চ আসমানি জগতের একটি সেতুবন্ধন। কুরআন হলো দুনিয়ার সকল মানুষের কাছে লেখা আল্লাহর খোলাচিঠি, যে চিঠির মাধ্যমে তিনি মানুষকে তাঁর কাছে আসার আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কুরআনের কথাগুলো কেবল অর্থবহ কিছু শব্দসমষ্টি নয়; বরং কুরআন হলো মহান আল্লাহর বলা কথার কম্পনের ধারক, যা রহস্যময়ভাবে মানুষের চেতনাকে উন্মোচিত করে এবং প্রেমময় আল্লাহর (আল ওয়াদুদ) সাথে বান্দার মিলনের সকল বাধা অপসারণ করে।
মানুষের ওপর কুরআনের গভীর প্রভাবের বিষয়টি নিচের ঘটনায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে-
'এক ধনী বণিকের কন্যা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তিনি কন্যার জন্য একজন ডাক্তার ও একজন শাইখকে ডেকে আনলেন। বণিক প্রথমে শাইখকে তার কন্যার জন্য দুআ করতে বললেন। শাইখ বললেন-“আমি আপনার মেয়ের জন্য কুরআন পাঠ করব এবং তারপর আল্লাহর কাছে তার আরোগ্যের জন্য দুআ করব, যাতে সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।” এ কথা শুনে ডাক্তার বললেন-“আপনি কি পাগল? বিজ্ঞান কোথায় গেছে, সে সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে? কথা দিয়ে কারও রোগ ভালো হয় না; রোগ ভালো হয় ওষুধ দিয়ে।” জবাবে শাইখ চিৎকার করে বললেন- “আপনি একটা স্টুপিড লোক। আল্লাহর কথার উপশম ক্ষমতা সম্পর্কে আপনার কোনো ধারণা আছে?" ডাক্তার শাইখের এমন জবাবে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। চেহারা তার রাগে লাল বর্ণ ধারণ করল। প্রচন্ড ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে চিৎকার করে বললেন-“আপনি কোন সাহসে আমাকে স্টুপিড বললেন?"
এবার শাইখ নরম হয়ে বললেন-“দয়া করে আমাকে ক্ষমা করে দিন। কিন্তু আপনি কি লক্ষ করছেন, একটি সাধারণ কথা আপনাকে কীভাবে রাগিয়ে দিয়েছে? যদি একজন অপরিচিত লোকের কথা আপনার চোখকে লাল করে দিতে পারে, আপনার হৃৎস্পন্দনকে দ্রুত করতে পারে, রক্তনালিগুলোকে সংকুচিত করতে পারে এবং আপনার রক্তচাপ বৃদ্ধি করতে পারে, তাহলে নিশ্চিত থাকুন, আল্লাহর ত্রুটিহীন ঐশী বাণীরও উপশমের ক্ষমতা রয়েছে।”
কুরআন যেহেতু এসেছে মহামহিম আল্লাহর নিকট থেকে, সেহেতু এর কথামালা আমাদের কল্পনার চাইতেও বেশি শক্তিশালী। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আল্লাহর কথার মাধ্যমেই মানবসৃষ্টির সূচনা হয়েছে এবং জগতের সকল সৃষ্টি অস্তিত্বশীল হয়েছে তাঁর কথাতেই। কাজেই মহান আল্লাহর কথার সরাসরি ও প্রত্যক্ষ প্রভাব না থাকার কোনো কারণ নেই।

হও! এবং তা হয়ে যায়
ওহির ক্ষমতার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় কুরআন থেকে, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, সবকিছু সৃষ্টি হয়েছে তাঁর একটি কথা দিয়ে-
كُنْ فَيَكُونُ 'হও! আর তা হয়ে যায়।' সূরা ইয়াসিন: ৮২
আল্লাহ একটি মাত্র শব্দ 'কুন' বলা মাত্র জগতের সবকিছু অস্তিত্বশীল হয়েছে। কুন; আমরা এখানে। কুন; আমরা নেই। কুন বলার মাধ্যমেই সৃষ্টি, কুন বলার মাধ্যমেই ধ্বংস। এটিই ওহির গোপন ক্ষমতা। কুরআনের কথাগুলো সূর্যের আলোকরশ্মির মতো; যার ওপরই এটি আপতিত হয়, সেটিই রূপান্তরিত হয়ে যায়।
যদিও বিভিন্ন ভাষায় কুরআনের অনুবাদ থাকায় আমরা লাভবান হয়েছি, তবুও গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি মনে রাখতে হবে তা হলো-আরবি ভাষায় অবতীর্ণ মূল কুরআনের ছন্দ, সুর, ভাষার লালিত্য ও সৌন্দর্যের যে স্বাদ, তা কুরআনের কোনো অনুবাদের ভেতর পাওয়া সম্ভব নয়। আমাদের বুঝতে হবে-কুরআন কেবল কিছু বর্ণ ও শব্দসমষ্টি নয়; বরং কুরআন হলো এমন কিছু শব্দ-তরঙ্গের মেলা, যা আরবি বর্ণসমষ্টি দিয়ে সাজিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। তাই কুরআন আত্মার ক্ষতের এক অব্যর্থ ওষুধ।
কখনো কখনো জিবরাইল মানুষের বেশে এসে রাসূল-এর কাছে ওহি পৌঁছে দিতেন। আবার কখনো কখনো রাসূল-এর কাছে ওহি আসত 'ঘণ্টাধ্বনির মতো কণ্ঠস্বর' আকারে। ঘণ্টাধ্বনির কম্পন শুধু শব্দসমষ্টির চাইতেও অনেক বেশি কিছু ছিল। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর আমি কুরআন অবতীর্ণ করি, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত; কিন্তু জালিমদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।' সূরা বনি ইসরাইল: ৮২
আজ বিজ্ঞানীরা কথার কম্পনের অবিশ্বাস্য ক্ষমতার বিষয়টি আবিষ্কার করেছেন। বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন E=MC2 সূত্রের মাধ্যমে কম্পনের ক্ষমতার বিষয়টি উন্মোচন করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে শক্তি ও বস্তু একে অপরের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়। আইনস্টাইনের আবিষ্কৃত তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে কেউ কেউ বলেছেন, কথার কম্পমান ও শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য তাত্ত্বিকভাবে বস্তুকে প্রভাবিত করতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব হেলসিংকি ইন ফিনল্যান্ডের সাড়া জাগানো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, তরঙ্গ ও কম্পন মানুষের DNA বদলে দিতে পারে।
আমরা যখন কুরআনের সূরার মূর্ছনা কান পেতে শুনি, তখন আমাদের মাথায় থাকা অগ্নিস্ফুলিঙ্গগুলো স্থান ত্যাগ করে এবং আমাদের হৃদয় আল্লাহর সাথে সংযোগের পথ খুঁজে পেয়ে শান্তি অনুভব করে। আলি-এর মতে- 'আল্লাহর কথাগুলো হলো হৃদয়ের ওষুধ।'
আমাদের হৃদয় হলো সৌরবিদ্যুতের মতো। সৌরবিদ্যুৎ যেমন সূর্য থেকে বিদ্যুৎ সংগ্রহ করে, আমাদের হৃদয়ও তেমনি কুরআন থেকে আলো সংগ্রহ করে।

জগতের সর্বত্র আল্লাহর কথার প্রতিফলন বিদ্যমান
আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আমি তাদেরকে আমার নির্দশনাবলি দেখাব দূর দিগন্তে আর তাদের নিজেদের মধ্যেও-যখন তাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, এ কুরআন সত্য। এটি কি যথেষ্ট নয় যে তোমার প্রতিপালক সবকিছুরই সাক্ষী?' সূরা হা-মিম সিজদা : ৫৩
আমাদের শুধু কুরআনের কথাগুলোর দিকে দৃষ্টি দিতে বলা হয়নি; বরং জগতে দৃশ্যমান সকল কিছুর ওপর কুরআনের প্রতিফলনের দিকে দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে। বহির্জগতের কুরআনের পৃষ্ঠায় উল্লেখিত আল্লাহর করুণাধারার দিকে শুধু নয়; বরং আমাদের হৃদয়ের অন্তর্জগতে লুকায়িত আল্লাহর প্রেমের দিকেও দৃষ্টি নিবদ্ধ করতে হবে। মহাসাগরের প্রতিটি ঢেউকে আল্লাহর নিদর্শন, প্রতিটি বায়ু প্রবাহকে আল্লাহর আয়াত, প্রতিটি মানুষকে একেকটি সূরা, প্রতিটি মুহূর্তকে আল্লাহকে জানার সুযোগ হিসেবে কল্পনা করলে আল্লাহকে অনুভব করা সহজ হয়ে যায়। কারণ, জগতের সবকিছুই মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর সৃষ্টিকুশলতার একেকটি অংশ মাত্র।

কুরআন একটি অলৌকিক গ্রন্থ
কুরআন লিখিত আকারে মহানবি মুহাম্মাদ-এর ওপর অবতীর্ণ হয়নি, কিন্তু এটিকে বিস্ময়করভাবে নির্ভুল ও সুসংগঠিত আকারে সংকলন করা হয়েছে। অনেক উৎস থেকে জানা যায়-রাসূল যেভাবে কুরআন পাঠ করতেন, সেভাবে তা লেখকদের লিখে রাখার নির্দেশ দিতেন। তবে অধিকাংশ স্কলারের মতে, রাসূল নিজে পড়তে জানতেন না। এটির সত্যতা পবিত্র কুরআন নিশ্চিত করে-
'কাজেই তোমরা ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর প্রেরিত সেই উম্মি (অক্ষরজ্ঞানহীন) নবির প্রতি, যে নিজে আল্লাহর প্রতি ও তাঁর যাবতীয় বাণীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। আর তোমরা তাঁর অনুসরণ করো। আশা করা যায়, তোমরা হিদায়াত লাভ করবে।' সূরা আ'রাফ: ১৫৮
আজকের যুগে অক্ষরজ্ঞান না থাকলে বেশ অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু মহানবি-এর অক্ষজ্ঞানহীনতা ছিল তাঁর জন্য একটি সুবিধা-যা এ কারণে যে, তিনি ওহির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিলেন। তাঁর পড়ার অক্ষমতার কারণে তিনি বহির্বিশ্বের জ্ঞানের জগতে প্রবেশ করতে ছিলেন অপারগ। আইডিয়ালস অ্যান্ড রিয়েলিটিজ অব ইসলাম গ্রন্থে সাঈদ হোসেন নাসর প্রিয় নবিজির অক্ষরজ্ঞান না থাকার বিষয়টিকে চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করেছেন-'ইসলামে আল্লাহর কথা হলো কুরআন। খ্রিষ্টধর্মে আল্লাহর কথা হলো ঈসা। খ্রিষ্টধর্মে ঐশী বাণীর বাহক ছিলেন কুমারী মাতা মরিয়ম। ইসলামে ঐশী বাণীর বাহক ছিলেন মুহাম্মাদ-এর হৃদয়। যে কারণে কুমারী মাতা মরিয়ম-এর কুমারী থাকা ছিল অনিবার্য; একই কারণে মুহাম্মাদ-এর অক্ষরজ্ঞানহীন থাকা ছিল অনিবার্য। আল্লাহর বার্তার বাহককে অবশ্যই বিশুদ্ধ ও অমলিন হতে হবে। কেননা, আল্লাহর বাণী কেবল খাঁটি ও বিশুদ্ধ মানুষই গ্রহণ করতে পারে।' মুহাম্মাদ মানবীয় জ্ঞান ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ দ্বারা প্রভাবিত হননি। কারণ, তিনি সরাসরি আল্লহর জ্ঞানের ঝরনা থেকে পানি পান করেছেন।
যদি কুরআন কোনো মানুষের লেখা গ্রন্থ হতো, তাহলে ২৩ বছর ধরে নির্মিত কুরআনে ২৩ বছরের পরিপক্বতার পর্যায়গুলো একে একে দৃশ্যমান হতো; যেমনটি দুনিয়ার লেখকদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। কিন্তু কুরআনের কথাগুলো সময়ের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে এবং একটির সঙ্গে অপর যেকোনো আয়াত বা প্রথম দিকের আয়াতের সঙ্গে শেষ দিকের যেকোনো আয়াত এতই সামঞ্জস্যশীল ও সুসংগঠিত যে, এটিকে কোনো মানুষের লেখা বলার সুযোগ নেই।
রাসূল-এর যুগে কোনো অনলাইন ডাটাবেজ ছিল না, ছিল না কোনো সার্চ ইঞ্জিন, তবুও কুরআনে ডজন ডজন পরস্পর সামঞ্জস্যশীল শব্দসমষ্টি বা আয়াতসমষ্টি পাওয়া যায়। কোনো মানুষের পক্ষে তথ্যভান্ডার ব্যবহার করা ছাড়া ২৩ বছর ধরে পরস্পর সাযুজ্যপূর্ণ কথা জাগদ্বাসীর সামনে উপস্থাপন করা অসম্ভব। কুরআনের আয়াতগুলোর পরস্পরের সাথে সামঞ্জস্যশীলতার কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক: কুরআনে 'এই জীবন' কথাটি উল্লেখিত হয়েছে ১১৫ বার। 'পরবর্তী জীবন' কথাটিও উল্লেখিত হয়েছে ১১৫ বার। 'ফেরেশতা' শব্দটির উল্লেখ আছে ৮৮ বার। 'শয়তান' শব্দটির উল্লেখ আছে ৮৮ বার। কুরআনে 'তারা বলল' কথাটি ৩৩২ বার এসেছে এবং '(তুমি) বলো' শব্দটিও ৩৩২ বার করে এসেছে। সমগ্র কুরআনে এমন কয়েক ডজন গাণিতিক সাযুজ্যতা রয়েছে, যেখানে আল্লাহর কথার গভীরতা ও নির্ভুলতার অলৌকিক প্রকাশ ঘটেছে।
২৩ বছর ধরে একটু একটু করে অবতীর্ণ কুরআন এমন ভারসাম্যপূর্ণ ও সাযুজ্যতাপূর্ণ অবস্থায় সুসংগঠিত হয়েছে যে, যে কেউ সহজেই বুঝতে পারে- কোনো একক বা বহু মানুষের পক্ষে এমন গ্রন্থ তৈরি করা অসম্ভব এবং একমাত্র মহাবিজ্ঞানী আল্লাহর জ্ঞানকুশলতাই কুরআনের পেছনের মূল কারিগর।
কুরআন মানবজাতির কাছে নতুন কোনে বার্তা নিয়ে আসেনি; বরং কুরআন হলো এমন এক আলো, যে আলো আল্লাহ আমাদের আগেই দান করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তিনি সত্য সহকারে তোমার ওপর কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যা পূর্বতন কিতাবের সমর্থক এবং তিনি তাওরাত ও ইনজিল অবতীর্ণ করেছেন।' সূরা আলে ইমরান: ৩
মহানবি -কে যেমন 'বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবে' প্রেরণ করা হয়েছে, তেমনি কুরআনকেও শুধু মুসলিমদের জন্য নয়; বরং 'বিশ্বজগতের জন্য উপদেশবাণী' (সূরা সোয়াদ: ৮৭) হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে।
ইনজিল, তাওরাত বা অন্যান্য আসমানি কিতাবকে প্রতিস্থাপন করার জন্য কুরআন অবতীর্ণ হয়নি; বরং কুরআন হলো ওহির ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ও চূড়ান্ত সংস্করণ। নবিরা হলেন ভিন্ন ভিন্ন নদীর মতো, যে নদীগুলো একই সমুদ্রে মিলিত হয়েছে।
কুরআনে মহান আল্লাহ বলেন-
'বলো, আমরা আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছি এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে আমাদের ওপর এবং যা অবতীর্ণ হয়েছে ইবরাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাঁদের বংশধরদের ওপর। আর যা প্রদান করা হয়েছে মুসা ও ঈসাকে এবং যা প্রদান করা হয়েছে তাঁদের রবের পক্ষ থেকে নবিগণকে। আমরা তাঁদের মধ্যে তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই অনুগত।' সূরা বাকারা: ১৩৬
বিভিন্ন নবির ওপর অবতীর্ণ কিতাবগুলোর মধ্যকার প্রধান পার্থক্য এর বার্তার ভেতর নয়; রয়েছে বিভিন্ন যুগের মানুষের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় ও ব্যাখ্যার যোগ্যতায়। কুরআন নিজেকে ইবরাহিম-এর ওপর অবতীর্ণ বার্তার প্রতিস্থাপন হিসেবে দাবি করেনি; বরং ইবরাহিম, মুসা ও ঈসা-এর ওপর অবতীর্ণ বার্তার রিমাইন্ডার হিসেবে দাবি করেছে।
মহান আল্লাহ বলেন- 'আমি সত্য বিধানসহ তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সংরক্ষক।' সূরা মায়েদা : ৪৮
কুরআনের অতুলনীয় ভাষাগত সম্পূর্ণতা, অসংখ্য গাণিতিক ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, গভীরভাবে ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ এবং মানুষের আত্মার ক্ষুধা মেটানোর সক্ষমতা দেখে এটিকে অলৌকিক ঐশীগ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে পারা যায় না। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-আল্লাহ তাঁর নবিদের কাছে অপরিকল্পিতভাবে ওহি প্রেরণ করেননি; বরং বিভিন্ন নবির যুগে সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এবং শ্রোতাদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে একটু একটু করে ওহি প্রেরণ করেছেন।
এর একটি উদাহরণ মুসা। ফেরাউনের যুগটি ছিল জাদুর যুগ। সে সময়ের লোকেরা জাদুবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। তাই মুসা-কে যে নিদর্শন দিয়ে প্রেরণ করা হয়, তা সেই জাদুর ক্ষমতাকে ম্লান করে দিয়েছিল। লাঠি সাপে পরিণত হওয়া এবং লোহিত সাগরকে দ্বিখণ্ডিত করা ছিল মুসা-কে দেওয়া আল্লাহর সেই নিদর্শনেরই অংশ। ঈসা-কে যে নিদর্শনগুলো দিয়ে প্রেরণ করা হয়েছিল, সেগুলো ছিল অসুস্থকে সুস্থ করা, মৃতকে জীবিত করা, কুষ্ঠরোগীকে আরোগ্য দান করা, অন্ধকে দৃষ্টিশক্তি দান করা ইত্যাদি। ঈসা-এর যুগের লোকেরা ছিল ওষুধ ও চিকিৎসাশাস্ত্রে অনেক উন্নত। তাই ঈসা-কে আল্লাহ ওই বিষয়ের দক্ষতা দান করেছিলেন।
মহানবি মুহাম্মাদ-এর যুগের লোকেরা জাদুবিদ্যা বা চিকিৎসাশাস্ত্রে পারদর্শী ছিল না, তারা ছিল ভাষার ওপর অসাধারণ দক্ষ। তাই আল্লাহ নবিজিকে যে অলৌকিক কিতাব দান করেন, তা ছিল অসাধারণ ভাষাশৈলীর জীবন্ত প্রকাশ। এটি না গদ্য, না পদ্য। কুরআন এমন এক অপ্রচলিত সাহিত্য নিয়ে আরববাসীর সামনে উপস্থিত হলো, যার সৌন্দর্যকে অস্বীকার করার কোনো উপায় তাদের সামনে ছিল না। যেখানে কুরআন পঠিত হতো, লোকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো কান পেতে কুরআন শুনত। কবিদের লিখিত কবিতায় থাকে আবেগ, স্বপ্ন ও কল্পনা। অথচ কুরআনের উপস্থাপিত সাহিত্য ছিল নিরেট সত্যের ওপর দাঁড়ানো। আরব কবিরা যে সাহিত্য রচনা করত, কুরআনের সাহিত্যের সামনে সেগুলোর দাঁড়ানোর যোগ্যতা ছিল না। কুরআনের সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব হলো- এটির অবস্থান সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে। কুরআন তার সময়ের শ্রোতাদের মনে যে আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম ছিল, আজকের কিংবা ভবিষ্যতের যেকোনো শ্রোতার মনেও একই আলোড়ন সৃষ্টি করতে সক্ষম।

টিকাঃ
৭৯. আহমাদ
৮০. Forrin, Noah D., and Colin M. Macleod. "This Time It's Personal: The Memory Benefit of Hearing Oneself.' Memory. vol. 26. no. 4, 2017, pp. 574-579. Doi: 10.1080/09658211.2017.1383434
৮১. সূরা ইউসুফ: ৪-১০১
৮২. সূরা শুআরা: ৬৩-৬৬
৮৩. সূরা মারইয়াম: ১৬-৩৩
৮৪. Khan, Nouman Ali. 'Alif Lam Mim.' 2012
৮৫. Naik, Zakir. 'What Is the Meaning of Alif Laam Meem?' 2011
৮৬. তিরমিজি
৮৭. Zakariya, Abu. The Eternal Challenge: A Journey through the Miraculous Qur'an. One Reason, 2015
৮৮. বুখারি, মুসলিম
৮৯. আবু দাউদ
৯০. বুখারি
৯১. Koberlein, Brian. 'How Are Energy and Matter the Same?' Universe Today, December 23, 2015. www.universetoday.com/116615/how-are-energy-and-matterthe-same/
৯২. 'Scientist Proves DNA Can Be Reprogrammed by Words and Frequencies.' Collective Evolution, August 27, 2013
৯৩. Nasr, Seyyed Hossein. Ideals and Realities of Islam. The Islamic Texts Society, 2006
৯৪. Khan, Nouman Ali. ‘Miracle Word Count’. 2014
৯৫. সূরা আম্বিয়া: ১০৭

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 ইসলামের আধ্যাত্মিক মাত্রা

📄 ইসলামের আধ্যাত্মিক মাত্রা


ইসলামকে সংক্ষেপে তিনটি বাক্যে বর্ণনা করা যায়: সৃষ্টিকে বাদ দিয়ে স্রষ্টার সাথে মিলিত হওয়া। অহং পরিত্যাগ করে সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ করা। অন্যদের জন্য তা-ই কামনা করা, যা নিজের জন্য পছন্দনীয়।
-শাইখ জাকারিয়া আল সিদ্দিকি

ইসলাম কেবল একটি ধর্ম নয়; এটি একটি জীবনাচার-যা একজন মানুষকে শারীরিক, মানসিক ও আধ্যাত্মিকভাবে বদলে দেয়। আল্লাহ মহানবি (সা)-কে নতুন কোনো ধর্ম প্রবর্তনের জন্য প্রেরণ করেননি; বরং আল্লাহর সাথে আমাদের সম্পর্ককে নতুন করে সচল করার জন্য তাঁকে প্রেরণ করা হয়েছিল। অবশ্য কুরআন আমাদের শুধু আল্লাহর সাথে সম্পর্কের কথাই বলে না; বরং সৃষ্টিজগতের সকল সৃষ্টির সাথে আমাদের কেমন সম্পর্ক থাকা চাই-সে ব্যাপারেও পথনির্দেশ করে। কুরআন আমাদের দয়ার গুণাবলি অর্জনের শিক্ষা দেয়, অন্যদের প্রতি অনুগ্রহের হাত বাড়িয়ে দিতে বলে, সকল সৃষ্টির প্রতি মমতা প্রদর্শনে উদ্বুদ্ধ করে এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার পরামর্শ দেয়।

'তোমার প্রতি আল্লাহ যেরূপ অনুগ্রহ করেছেন, তুমিও সেরূপ অনুগ্রহ করো।' সূরা কাসাস : ৭৭

ইসলাম হলো ভালোবাসার সাথে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হওয়ার একটি ভ্রমণপথ। কেননা, আল্লাহ আমাদের যে জীবন দিয়ে ধন্য করেছেন, তা আমরা অর্জন করে নিইনি। আমাদের জীবন হলো আল্লাহর দেওয়া ঋণস্বরূপ। আরবি ‘দ্বীন’ শব্দটি এসেছে যে মূল শব্দ থেকে, তার অর্থ হলো ঋণ। দ্বীন অর্থ ধর্ম বা জীবনব্যবস্থা। দ্বীন ইসলামের পথে চলাকে তাই বলা যেতে পারে-আল্লাহর ঋণ পরিশোধের চেষ্টা। আল্লাহ আমাদের জীবন দান করে ঋণী করেছেন। [৯৬]

অবশ্য আল্লাহ এ কারণে তাঁর ইবাদত করার জন্য আমাদের বলেন না যে, আল্লাহর কোনো কিছুর অভাব রয়েছে; বরং তিনি আমাদের চেতনার প্লাগকে আল্লাহর স্মরণের সকেটে এ কারণে প্রবেশ করাতে বলেন, যাতে আমাদের চেতনার ব্যাটারি রিচার্জ হয়।

অনেকেই এই ভুল করে থাকেন-ধর্ম হলো এমন এক পথ, যার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহকে খুঁজে পায়। কিন্তু সত্য হলো-ইসলাম এমন এক ভ্রমণপথ, যার মাধ্যমে মানুষ তার সাথে ইতোমধ্যে থাকা আল্লাহর অস্তিত্বের ওপর পড়া আবরণকে সরিয়ে আল্লাহর দেখা পায়। আমরা হয়তো সরাসরি আল্লাহকে অনুধাবন করতে পারি না, কিন্তু জগতের সবকিছুর ওপর তাঁর প্রতিফলন রয়েছে।

ইসলাম আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের কোনো পথ নয়; বরং ইসলাম হলো ইতোমধ্যে আমাদের ভেতর যা রয়েছে তা আবিষ্কারের পথ। ইসলাম একগুচ্ছ ইবাদত ও অনুশীলনের নাম নয়। ইসলাম হলো এমন এক আলো, যে আলোতে আমাদের হৃদয়ের ভেতরে থাকা বীজের অঙ্কুরোদ্গম ঘটে। ইসলাম কেবল কিছু বিধিবিধানের প্রতি বাহ্যিক আনুগত্যের নাম নয়, এটি হলো আমাদের ভেতরে থাকা ঈমানের পরিচর্যার নাম। কেবল সঠিকের উদ্যাপন ও ভুলের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নাম ইসলাম নয়; বরং ইসলাম হলো আমাদের কথা, কাজ ও চিন্তায় দয়া, অনুগ্রহ, সৌন্দর্য ও শ্রেষ্ঠত্ব আনয়ন। ইসলাম আপনাকে দেখিয়ে দেবে-কীভাবে আপনি আপনার আপনাতে পরিণত হবেন।

আমরা প্রত্যেকেই আধ্যাত্মিকতার পাখা নিয়ে জন্ম নিই; ইসলাম কেবল আমাদের মনে করিয়ে দেয়-কীভাবে উড়তে হবে।

মানুষ সহজাতভাবেই উত্তম
বাহ্যিক কিছু ইবাদতসমষ্টির নাম ইসলাম নয়। আমাদের ওপর আল্লাহর সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্যের প্রতিফলনের পর্দা উন্মোচনের নাম ইসলাম। কুরআন বলেছে, সকল মানুষের ভেতর সহজাতভাবে ভালো বা কল্যাণের বীজ রোপিত থাকে, আরবিতে একে ফিতরাত বলা হয়। এই উত্তম বা কল্যাণময়তার প্রকৃতি সব সময় আমাদের ভালো, উত্তম ও সঠিক কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে। সুপ্ত অবস্থায় থাকা একটি বীজ যেমন অঙ্কুরোদ্গমের জন্য অপেক্ষমাণ থাকে, আমাদের চেতনার ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকা আল্লাহর ভালোবাসাও তেমনি বিকাশের জন্য অপেক্ষমাণ থাকে। ইসলাম আমাদের শেখায়-আল্লাহর ভালোবাসার সুপ্ত বীজের অঙ্কুরোদ্গমের জন্য কীভাবে পানি সিঞ্চন করতে হয়।

ইসলামের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি হলো-আমাদের ভেতরের সহজাত কল্যাণময়তার উন্মোচন ঘটানো। আমাদের এ কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য দুনিয়াতে নবি-রাসূলদের পাঠানো হয়েছিল যে, আমরা ইতোমধ্যে তা হয়ে গেছি- যা আমরা হতে চাই। আল্লাহর পথে প্রতিটি পদক্ষেপই গন্তব্য। আমাদের যে সংস্করণটি আল্লাহর নৈকট্যশীল, তার আবাস বাইরের দুনিয়াতে নয়; বরং আমাদের ভুল ধারণার চাদরের নিচে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা সংক্ষেপে বলেছেন-
'নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট দ্বীন হচ্ছে ইসলাম-আত্মসমর্পণ।' সূরা আলে ইমরান: ১৯

কেননা, কেবল তখনই আমরা আল্লাহর ভালোবাসাকে উপলব্ধি করার যোগ্যতা অর্জন করি, যখন আমরা আমাদের সবকিছু নিয়ে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি।

পবিত্র কুরআনে মুসা (আ)-এর বহুল পরিচিত সেই ঘটনা থেকেও এ বিষয়টির ইঙ্গিত পাওয়া যায়, যেখানে মুসা (আ)-কে আল্লাহ বললেন-আল্লাহর ওহিকে গ্রহণ করতে হলে তাঁকে অবশ্যই দুনিয়াবি অনুরাগগুলোকে পরিত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ মুসা (আ)-কে বললেন-
'হে মুসা! নিশ্চয়ই আমি তোমার রব; সুতরাং তোমার জুতা জোড়া খুলে ফেলো, নিশ্চয়ই তুমি পবিত্র তুওয়া উপত্যকায় রয়েছ। আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি; কাজেই যা ওহি হিসেবে তোমাকে পাঠানো হচ্ছে, তা মনোযোগ দিয়ে শোনো।' সূরা ত্ব-হা: ১১-১৩

ইসলামের প্রথিতযশা অনেক স্কলার মনে করেন, মুসা (আ)-কে জুতা খুলতে বলা হয়েছে রূপক অর্থে। যার মানে হলো-মুসা (আ)-কে দুনিয়াবি সকল সংশ্লিষ্টতা পরিহার করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আমাদের ইসলামের ইবাদত করতে বলা হয়নি; একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করতে বলা হয়েছে। আমাদের ধর্ম আমাদের গন্তব্য নয়; বরং আমাদের ইবাদত ও ইসলামের শিক্ষাগুলো হলো আল্লাহর পথের একেকটি বন্দোবস্ত মাত্র।

ইসলাম: শান্তির প্রতি আত্মসমর্পণ
ইসলামে আত্মসমর্পণের তিনটি পর্যায় রয়েছে: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। ইসলামের প্রাথমিক ফোকাস হলো সেই সব কর্মকাণ্ড, যা আল্লাহর বিধানের (শরিয়াহ) সাথে সম্পৃক্ত। ইসলাম শরিয়াহর ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শরিয়াহ মানে কেবল বিধিবিধান বা আইন-কানুন নয়।

শরিয়াহর আভিধানিক অর্থ হলো-কোনো গর্তকে পানি দিয়ে পূরণের পথ। এ অর্থে শরিয়াহর মানে হলো-মানুষকে সেই পথ দেখানো, যে পথ তাকে অজ্ঞতার মরুভূমি থেকে ঈমানের মরূদ্যানের দিকে নিয়ে যায়।

শরিয়াহকে দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমটি হলো-ইসলামের স্তম্ভগুলোর অনুশীলনসংক্রান্ত বিধান। দ্বিতীয়টি হলো-মুসলিমের দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রের বিধান। যদিও শরিয়াহর অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও ব্যাখ্যা রয়েছে, তবুও শরিয়াহর মৌলিক কয়েকটি নীতিমালা হলো-দ্বীনের সংরক্ষণ, জীবনের পবিত্রতার সুরক্ষা, জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার প্রতিপালন, পরিবারের পবিত্রতার সংরক্ষণ এবং সম্পদের সুরক্ষা।

শরিয়াহর ভিত্তি হলো কুরআন, রাসূল (সা)-এর হাদিস এবং যুগে যুগে জন্ম নেওয়া ইসলামের প্রথিতযশা আলিমগণের ব্যাখ্যা, যাদের পরস্পরের ব্যাখ্যার মধ্যে কোনো কোনো ক্ষেত্রে পার্থক্য রয়েছে। তবে সকল আলিমের উদ্দেশ্য একটাই আর তা হলো-যা কিছু ভালো তা গ্রহণ করা এবং যা কিছু মন্দ তা পরিত্যাগ করা। শরিয়াহ হলো একটি ফ্লাশলাইটের মতো, যা আমাদের সংশয় ও অনিশ্চয়তার অন্ধকারে সোজা পথ প্রদর্শন করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে-আমরা যেমন মানচিত্র অনুসরণ করি; কিন্তু মানচিত্রের ইবাদত করি না, তেমনি আমরা শরিয়াহ অনুসরণ করি, কিন্তু শরিয়াহর ইবাদত করি না। শরিয়াহ হলো আল্লাহর বিছিয়ে দেওয়া পথ, যে পথ ধরে চললে আমরা পথভ্রষ্ট ও বিচ্যুত হব না।

ইসলামের যাত্রা শুরু হয় আল্লাহর নির্দেশের প্রতি বাহ্যিক ও শারীরিক আত্মসমর্পণের মাধ্যমে!
'ইসলাম হলো এই সাক্ষ্য দেওয়া-আল্লাহ ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, নামাজ পড়া, যাকাত প্রদান করা, রমজান মাসে রোজা রাখা এবং সামর্থ্য থাকলে হজ করা।' [৯৭]

ইসলাম শব্দটির অর্থ হলো-আত্মসমর্পণ করা, নিজেকে নিবেদন করা। ইসলাম শব্দটি এসেছে তিন বর্ণের ধাতু সিন-লাম-মিম থেকে, যার অর্থ হলো-কল্যাণ, সম্পূর্ণতা, স্বাধীনতা, শান্তি ইত্যাদি। আভিধানিক অর্থে ইসলাম শব্দের অর্থ হলো-শান্তির প্রতি আত্মসমর্পণ। কারণ, যখন আমরা দাস হিসেবে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করি, কেবল তখনই কুপ্রবৃত্তির শৃঙ্খল থেকে স্বাধীনতার স্বাদ অনুভব করি।

আত্মসমর্পণের মানে কোনো কিছু দেওয়া বা পরিত্যাগ করা বা হারানো নয়; বরং এর মানে হলো-আল্লাহ আপনার জন্য যা লিখে রেখেছেন, সন্তুষ্টচিত্তে, কৃতজ্ঞতা ও পূর্ণ আস্থা নিয়ে তার সাথে একাত্ম হওয়া। কেননা, 'আল্লাহ সর্বোত্তম কৌশলী (সূরা আলে ইমরান: ৫৪)।' আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণের যাত্রা শুরু হয় আমাদের সেই চেতনা দিয়ে, যে চেতনা সন্তুষ্টচিত্তে এ স্বীকৃতি দেয়-আমাদের দেওয়া প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার।

'যা কিছু তোমার, তা তোমার কাছে পৌঁছাবে; যদিও তা দুই পর্বতের নিচে লুকায়িত থাকে। যা কিছু তোমার নয়, তা তোমার কাছে পৌঁছাবে না; যদিও তা তোমার দুই ঠোঁটের মাঝখানে থাকে।' -ইমাম আল গাজালি

আল্লাহই সর্বময় কর্তৃত্বের অধিকারী-এটিকে পূর্ণভাবে বিশ্বাস করার মানে এই নয় যে, আমরা নিজেকে উন্নত পর্যায়ে উন্নীত করার চেষ্টা বন্ধ করে দেবো। রাসূল বলেছেন-'আল্লাহর ওপর ভরসা করো, কিন্তু তোমার উটটি বেঁধে রাখো।' [৯৮] এর মানে হলো-আমাদের আল্লাহর ওপর ভরসা করতে বলা হয়েছে, কিন্তু আমাদের সাধারণ জ্ঞান-বুদ্ধিকে অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে, দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বান্তকরণে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মহানবি স্পষ্টভাবে নিপীড়কের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়ে বলেছেন-
'যদি কোনো অন্যায় হতে দেখ, তাহলে তোমার হাত দিয়ে তা বদলে দাও। যদি তা করতে সক্ষম না হও, তাহলে নিজ জিহ্বা দিয়ে তার প্রতিবাদ করো। যদি তাও করতে না পারো, তাহলে মন থেকে তার প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন করো এবং এটি হলো ঈমানের সর্বনিম্ন স্তর।' [৯৯]

আল্লাহর ওপর নির্ভর করা ও আত্মসমর্পণ করার মানে এই না যে, আমরা ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের প্রতিরোধের কাজ বন্ধ করে দেবো, সকল প্রচেষ্টা থেকে নিজের হাত গুটিয়ে নেবো; বরং এর মানে হলো-এমন দৃঢ় বিশ্বাস লালন করা যে, আমাদের গৃহীত পদক্ষেপের ফলাফল সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে আল্লাহর ইচ্ছার ওপর। আত্মসমর্পণের মাধ্যমে কোনো জিনিস কেমন হওয়া উচিত ছিল-সে চিন্তা আমরা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলি। কেননা, যা কিছু ঘটে, তা তো আল্লাহর সিদ্ধান্তে ঘটে থাকে। ফলে সংঘটিত কোনো কিছু নিয়ে আমাদের মনে আর কোনো খেদ থাকে না। এটাই আল্লাহর প্রতি নির্ভরতা।

আপনার আত্মসমর্পণের মানে হলো, আপনি এমন এক বালুকণা, যা পাহাড়ে পরিণত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ অথবা এমন এক বৃষ্টির ফোঁটা, যা সমুদ্রে পরিণত হওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ।

ঈমান: বিশ্বাসের পথে যাত্রা
ইসলাম কর্মের জগৎ নিয়ে কাজ করে, কিন্তু ঈমান কাজ করে আল্লাহ ও পরকাল সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানগত অনুধাবন নিয়ে। ইসলামের অবস্থান বাহ্যিক, দৃশ্যমান ও স্পষ্ট। ঈমানের অবস্থান অভ্যন্তরীণ, অদৃশ্য ও গোপনীয়। ঈমান হলো ইবাদতের অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য। ঈমান হলো আমাদের হৃদয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব ও প্রজ্ঞার চর্চা, যা আমাদের বাহ্যিক কর্মকে মহিমান্বিত করে। ঈমান আল্লাহর ভালোবাসার জন্য আমাদের হৃদয়ের দরজাকে উন্মুক্ত করে দেয়।

'আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, বিচার দিবস এবং ভালো ও মন্দ ভাগ্যের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করার নাম ঈমান।' [১০০]

ঈমান হলো অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের নাম ঈমান। ঈমান মানে আন্তরিকভাবে এই বিশ্বাস লালন করা—আল্লাহ আমার জন্য যা কিছু ঠিক করে রেখেছেন, সেটা তাঁর রহমত হোক বা পরীক্ষা হোক, তা আমাকে নিয়ে আল্লাহর মহাপরিকল্পনারই একটি অংশ মাত্র। আল্লাহর প্রতি ভরসার ওপর ভিত্তি করে আমাদের ঈমানের বীজ বিকশিত হয়। আল্লাহর জিকির ও ধ্যানের মাধ্যমে আমরা আমাদের ঈমানের বীজে পানি সিঞ্চন করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ, আমরা কুরআনের এই আয়াতটি বারবার পড়তে পারি: 'হাসবুনাল্লাহি ওয়া নি'মাল ওয়াকিল (সূরা আলে ইমরান: ১৭৩)।' যার অর্থ—'আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম কর্মবিধায়ক।' এই জিকিরটিকে নিয়মিত অনুশীলন করলে আমাদের হৃদয় আল্লাহর ভালোবাসা ও নুরকে ধারণ করার জন্য ক্রমেই প্রশস্ত হতে থাকবে এবং ফলে আমাদের ভেতরে ঈমানের বীজের পরিচর্যার কাজও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে।

ইসলামের প্রাজ্ঞ মনীষীরা বলেছেন—'ঈমানের অর্ধেক হলো ধৈর্য, অপর অর্ধেক হলো কৃতজ্ঞতা।' ঈমানের পরিচর্যার জন্য ধৈর্যের প্রয়োজন। কেননা, অনেক সময় আল্লাহর ইচ্ছার পূর্ণ প্রকাশ ঘটতে সময় লাগে। ধৈর্য ও আল্লাহর ওপর ঐকান্তিক নির্ভরতা আমাদের আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতার দিকে নিয়ে যায়। কারণ, যখন আমরা অনুভব করতে পারি-আল্লাহ সব সময় আমাদের কল্যাণ চান, তখন আমাদের হৃদয় এমনিতেই কৃতজ্ঞতার দিকে ঝুঁকে পড়ে। ঈমানের মানে হলো-এই বিশ্বাস করা, আমরা হয়তো ভবিষ্যৎ জানি না, কিন্তু আল্লাহকে তো জানি। ঈমানের ঘোষণার মধ্যে এই বার্তা লুকিয়ে আছে-যদিও আমরা জানি না আগামীকাল কী ঘটবে, কিন্তু এটি ঠিকই জানি, আগামীকালও আল্লাহ থাকবেন; যেমনটি অতীতে তিনি ছিলেন এবং বর্তমানে তিনি আছেন এবং আমাদের অবিরত রক্ষা করে চলেছেন।

'তোমরা যদি প্রকৃতভাবেই আল্লাহ তায়ালার ওপর নির্ভরশীল হতে, তাহলে পাখিদের যেভাবে রিজিক দেওয়া হয়, সেভাবে তোমাদেরও রিজিক দেওয়া হতো। পাখিরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যাবেলা ভরা পেটে ফিরে আসে।' [১০১]

কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'আর যে তাঁর অভিমুখী হয়, তাকে তিনি পথ প্রদর্শন করেন।' সূরা আশ-শূরা: ১৩

ঈমানের চর্চার যাত্রা শুরু হয় আল্লাহর কাছে তাঁর ভালোবাসা অনুভবের প্রার্থনার মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তাকেই কেবল পথ প্রদর্শন করেন, যাকে তিনি পথ দেখাবেন বলে ইচ্ছা করেন এবং যে আল্লাহর কাছে পথের দিশা চায়। আমাদের ঈমানের সামনে আল্লাহ নন; আমাদের কুপ্রবৃত্তিই প্রধান বাধা। আল্লাহর ওপর আস্থা রাখা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায় এ কারণে যে, আমরা আল্লাহর ওপর নয়; নিজের কিংবা অপর কোনো মানুষের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করি।

ঈমানের পরিচর্যা করতে হলে আমাদের লক্ষ করতে হবে যে, আমরা অতীতের পক্ষপাতমূলক অনুধাবন, বর্তমানের অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি এবং অজানা ভবিষ্যতের ভিত্তিতে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকি। অথচ আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'আর তোমাদের অতি সামান্য জ্ঞানই দান করা হয়েছে।' সূরা বনি ইসরাইল : ৮৫

যেহেতু আল্লাহর জ্ঞান সময় ও স্থানের সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে, সেহেতু তিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবকিছু জানেন। আমরা যখন এ কথা উপলব্ধি করতে পারি, আল্লাহর জ্ঞানের তুলনায় আমাদের জ্ঞান অতি সামান্য, তখন অবধারিতভাবেই আমরা আল্লাহর নির্ভুল জ্ঞানের কাছে নিজের তুচ্ছতাকে অনুভব করতে পারি। ঈমান এমনিতেই বিকশিত হয় তখন, যখন আমরা কুপ্রবৃত্তির দেয়ালকে সরাতে সক্ষম হই। ঈমান এমন কিছু নয়-যাকে খুঁজে পেতে হয়; বরং ঈমান হলো এমন কিছু, যা বিকশিত হওয়ার অপেক্ষায় আমাদের ভেতরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে।

আমার যখন এই স্বীকৃতি দিই-আল্লাহ আমার জন্য যা করেছেন, তা আমার ভালোর জন্যই করেছেন, তখন আমাদের ঈমান বেড়ে উঠতে শুরু করে। আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এ কথা বলতে শিখিয়েছেন-
'আল্লাহই আমার জন্য যথেষ্ট, তিনি ছাড়া সত্যিকারের কোনো উপাস্য নেই, তাঁর ওপরই আমি ভরসা করি, তিনি হলেন মহান আরশের মালিক।' সূরা তাওবা : ১২৯

হৃদয়ের গভীর থেকে আল্লাহর ওপর নির্ভর করা শুরু করলেই কেবল ঈমান তার স্বরূপে বেড়ে উঠতে শুরু করে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ একদল বেদুইনের ঈমান সম্পর্কে বলেছেন-
'বেদুইনরা বলল-আমরা ঈমান এনেছি। বলো-তোমরা ঈমান আনোনি; বরং তোমরা বলো-আমরা আত্মসমর্পণ করেছি। আর এখন পর্যন্ত তোমাদের অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি।' সূরা হুজুরাত : ১৪

কুরআনের এ আয়াত থেকে প্রমাণিত হয়, বাহ্যিক ঘোষণা দিলেই কেবল ঈমান আনা হয় না। অন্তর থেকে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সর্বান্তকরণে সঁপে দিলেই কেবল ঈমানের বীজ অঙ্কুরিত হতে শুরু করে। আন্তরিকতাপূর্ণ হৃদয় ও ভালোবাসাহীন অন্তর ছাড়া আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করলে তা যেমন নিষ্ফল হয়ে যায়, তেমনি কেউ যদি বলে যে সে আল্লাহকে ভালোবাসে, কিন্তু আল্লাহ যা করতে বলেছেন তা করতে অস্বীকার করে, তাহলেও এটি তার কপট চরিত্রের পরিচায়ক হয়ে দাঁড়ায়।

আমাদের বাহ্যিক কর্মকাণ্ড আমাদের ভেতরের প্রকৃত অবস্থার লিটমাস টেস্ট, আবার ভেতরের অবস্থা বাহ্যিক কাজের লিটমাস টেস্ট। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে, আধ্যাত্মিকতার পথে আমাদের ভ্রমণের মধ্যে চড়াই-উতরাই ও আপ-ডাউন থাকে। আমাদের নিশ্বাস যেমন বেরিয়ে যায় আবার প্রবেশ করে এবং সমুদ্রের ঢেউ যেমন ফুলে উঠে আবার পড়ে যায়, তেমনি আমাদের ঈমানেরও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটে। প্রতিটি পাহাড়ের একটি পাদদেশ ও একটি শীর্ষবিন্দু থাকে। আপনি যতদিন জীবিত আছেন, আপনার ঈমানের যাত্রাপথেও তেমনি চূড়া ও খাদ থাকবে। আপনার ঈমান যদি চির অপরিবর্তিত থেকে যায়, তাহলে ধরে নেবেন-আপনি আল্লাহর সঙ্গে যথার্থভাবে একাত্ম হতে পারেননি। কুরআনে আল্লাহ তায়ালা স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমাদের ঈমানের পরীক্ষা নেওয়া হবে।
'লোকেরা কি মনে করে, "আমরা ঈমান এনেছি” বললেই তাদের অব্যাহতি দেওয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না?' সূরা আনকাবুত : ২

মুসলিম হওয়ার প্রথম পদক্ষেপ হলো ঈমানের ঘোষণা। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার বিশ্বাসকে কর্মে পরিণত না করবেন, ততক্ষণ পর্যন্ত আপনি প্রকৃত অর্থে ঈমানদার নন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'প্রত্যেকের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তার কৃতকর্ম অনুসারে।' সূরা আহকাফ : ১৯

ঈমান এমন কোনো জিনিস নয়, যেটিকে ব্যাংকের লকারে তালাবদ্ধ করে রাখা যায়। ঈমান আবদ্ধ ও স্থির কোনো বস্তু নয়; বরং এটি জীবন্ত ও নদীর মতো প্রবহমান। আল্লাহ যেমন অসীম, ঈমানের পথে যাত্রাও তেমনি সীমাহীন। ঈমানের পথে যাত্রার দুটি বিধান হলো: শুরু করুন এবং চলতে থাকুন।

দুনিয়াতে এমন কোনো সীমারেখা নেই, যেটি স্পর্শ করলে ঈমানের যাত্রা শেষ বলে গণ্য হয়। এমন কোনো লক্ষ্যবিন্দু নেই, যেখানে পৌঁছলে সামনে এগোনোর জন্য কোনো প্রচেষ্টার প্রয়োজন নেই। একজন বডিবিল্ডার যেমন ব্যায়াম বন্ধ করে দিলে তার মাংশপেশি হারাতে থাকে, (যা সে দীর্ঘ সময় ধরে অর্জন করেছিল) তেমনি ঈমানের চর্চা বন্ধ করে দিলে ঈমানও দুর্বল হতে থাকে। শরীর গঠনের জন্য যেমন কোনো জাদুকরি ওষুধ নেই-যা খেলে আপনাআপনি শরীর সুগঠিত হয়ে যাবে, ঈমানকে শক্তিশালী করারও তেমনি কোনো সংক্ষিপ্ত পথ নেই।

ইসলামের পথে যাত্রা শুরুর মানে এই না যে, আপনাকে সম্পূর্ণ নির্ভুল হতে হবে। ইসলামের পথে যাত্রা শুরুর মানে হলো, আল্লাহর সামনে নিজ ভুলের স্বীকৃতি দেওয়া। যখন আপনি বুঝবেন-আপনার ত্রুটির কারণেই আপনি আল্লাহর ভালোবাসা অনুভব করতে পারছেন না, তখন আপনি এও বুঝবেন যে, আপনার মানবীয় বৈশিষ্ট্য ও ত্রুটি প্রবণতার মধ্য দিয়েই আল্লাহ আপনাকে তাঁর দিকে ডাকছেন। হৃদয়ের কারিগরের দেখা পেতে হলে কখনো কখনো হৃদয়ের ভেতর ফাটল সৃষ্টি হওয়া উচিত। ডাক্তারের দেখা পেতে হলো তো অসুস্থ হওয়া চাই। আপনার রব আপনাকে পরিত্যাগ করবেন না, তিনি আপনাকে ভুলে যাবেন না; বরং আপনার রব আপনার দুঃখ-ক্লেশ ও সংগ্রামের মাধ্যমেই আপনাকে তাঁর দিকে ডেকে চলেছেন।

ঈমান শব্দটির আভিধানিক অর্থ 'বিশ্বাস' বলা হলেও এটির আমানা মূল শব্দ থেকে, যার অর্থ কোনো কিছুকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত করা। এ দৃষ্টিতে ঈমানের মানে হলো-আল্লাহর নিরাপত্তা ও সুরক্ষার ভেতর নিজের অবস্থান নিশ্চিত করা।
আলি বলেছেন-
'ঈমান হলো জিহ্বা দিয়ে স্বীকৃতি, হৃদয় দিয়ে নিশ্চিতকরণ এবং শরীর দিয়ে কাজে প্রমাণের নাম।'
শুধু বিশ্বাসের পরোক্ষ ঘোষণা নয়; বরং শারীরিক কাজের প্রত্যক্ষ প্রমাণের মাধ্যমে ঈমান নিশ্চিত হয়। প্রকৃত ঈমানের প্রকাশ ঘটে মানুষের সেই আচরণের মাধ্যমে, যা সে কেবল স্রষ্টাকেই নয়, বরং মানুষকেও উপহার দেয়।
'তোমাদের মধ্যে সেই লোকই শ্রেষ্ঠ, যে অপর লোকদের কল্যাণে কাজ করে।' [১০২]

আমরা যতই দুনিয়াতে আল্লাহর বিধান মেনে চলব, আমাদের ঈমানের ধারণক্ষমতা ততই বৃদ্ধি পাবে। ইসলাম ছাড়া যেমন ঈমানকে ধারণ করা যায় না, তেমনি ঈমান ছাড়া ইসলাম হলো একটি প্রাণহীন শরীর। ইসলাম বা বাহ্যিক আনুগত্য এবং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস বা ঈমান একে অপরকে শক্তিশালী করে; একটি ছাড়া অপরটির কোনো মূল্য নেই।

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটি ঘটনায় আমাদের হৃদয়ের ভেতর ঈমানের মণি-মুক্তা বহন করার বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
এক রাতে মোল্লা নাসিরুদ্দিন তাঁর বাড়ির সামনের রাস্তার আলোর নিচে হাঁটু গেড়ে কী যেন খুঁজছিলেন। কয়েকজন প্রতিবেশী এ দৃশ্য দেখে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল- 'আপনি কী খুঁজছেন এখানে?' মোল্লা নাসিরুদ্দিন জবাবে বললেন-'আমার চাবি হারিয়ে গেছে, সেটাই এখানে খুঁজছি।' লোকেরা তাঁর সাহায্যে এগিয়ে এলো। সবাই মিলে চাবি খুঁজতে লাগল, কিন্ত চাবি খুঁজে পাওয়া গেল না। অবশেষে একজন মোল্লাকে জিজ্ঞেস করল-'শেষ যখন চাবিটি দেখেছিলেন, তখন সেটি কোথায় ছিল?' মোল্লা জবাবে বলল-'আমার বাড়িতে।' লোকগুলো মোল্লার জবাব শুনে থমকে গেল। একজন জিজ্ঞেস করল-'তাহলে এখানে বাড়ির বাইরে চাবি খুঁজছেন কেন আপনি?'
মোল্লা জবাবে বললেন-'কারণ, এখানে আলো আছে। আমার বাড়ি এখন রাতের অন্ধকারে নিমজ্জিত।' প্রতিবেশীরা এ কথা শুনে হতভম্ব হয়ে গেল। এবার মোল্লা উঠে দাঁড়িয়ে বললেন-'যে চাবি আপনার ভেতরেই আছে, সেটি খোঁজার জন্য কেন আপনি দুনিয়ায় হন্যে হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? যে প্রশ্নের উত্তর আপনার হৃদয়ের ভেতর রয়েছে, তার সন্ধানে দুনিয়াতে বেরিয়ে পড়ার কোনো মানে হয় না। প্রশ্ন ও উত্তর উভয়ের উৎস একই জায়গা। আপনি সাহস করে ভেতরে ডুব দিয়েই দেখুন, অনেক চাবি ও মূল্যবান মণি-মুক্তো আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।'

আমরা যা চাই, তা আমাদের ভেতরেই রয়েছে। এটি বাহ্যিক দুনিয়াতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। যেমনটি রুমি বলেছেন- 'কেন তুমি সব দরজায় টোকা দিয়ে চলেছ? যাও, নিজের হৃদয়ের দরজায় টোকা দাও।'

ইহসান: সর্বত্র আল্লাহর দর্শন
আমাদের বাহ্যিক ইবাদতের (ইসলাম) সাথে অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস (ঈমান) যথার্থভাবে যুক্ত হলে আমরা ইহসানের রহস্যময় জগতে প্রবেশ করি। ইহসানকে আধ্যাত্মিকতার উচ্চতর পর্যায় বলা হয়। যখন আমরা আমাদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় অংশকে যুগপৎভাবে উন্নত অবস্থানে নেওয়ার কাজে আত্মনিয়োগ করি, তখনই কেবল ইহসান অর্জন করতে পারি এবং সর্বত্র এক আল্লাহর উপস্থিতিকে অনুভব করতে পারি।

এটি তখনই ঘটে, যখন আমাদের কুপ্রবৃত্তির সূর্য অস্ত যায় এবং আত্মার সহজাত সৌন্দর্যের সূর্যের উদয় হয়। ইহসান সম্পর্কে রাসূল বলেছেন-
'এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করো, যেন তুমি আল্লাহকে দেখতে পাচ্ছ। যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তাহলে যেন তিনি তোমাকে দেখতে পাচ্ছেন।' [১০৩]

আধ্যাত্মিকতার উন্নততর স্তরের আমাদের দৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। কিন্তু আমাদের ত্রুটি প্রবণতা থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাওয়ার মানে হলো- আমরা সেই আল্লাহর ওপর নির্ভর করছি, যার দৃষ্টি ত্রুটিপূর্ণ নয় এবং যিনি সর্বাবস্থায় আমাদের দেখতে পাচ্ছেন। আপনি তখনই ইহসানের পর্যায়ে আছেন বলে বুঝতে পারবেন, যখন আল্লাহর সর্বত্র বিরাজমান ভালোবাসার প্রতি সার্বক্ষণিক সচেতন থাকতে সক্ষম হবেন। যখন আমরা অনুভব করতে পারি- আমরা আল্লাহকে দেখতে না পেলেও তিনি ঠিকই আমাদের দেখতে পাচ্ছেন, তখন মূলত আমরা এই স্বীকৃতি দিই-আল্লাহর দয়া, অনুগ্রহ ও ভালোবাসা মূলত তাঁর সর্বদ্রষ্টা (আল বাসির) গুণেরই অনিবার্য ফল।

ইহসানের স্তরের অনুগ্রহপ্রার্থী যেন এক দয়ার্দ্র বাদশাহর বিশ্বস্ত গোলাম, যে প্রতিটি পদক্ষেপ ফেলে হিসাব করে, প্রতিটি কথা বলে ভেবে-চিন্তে, বাদশাহর প্রাসাদে আমন্ত্রণ পেয়ে যার হৃদয় কৃতজ্ঞতায় নত হয়ে আসে, ফলে সে প্রতিটি কাজকে সর্বোচ্চ সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার চেষ্টা করে। আভিধানিকভাবে ইহসান মানে হলো- 'কোনো কিছুকে সুন্দর করা'। আমরা যখন আল্লাহর সর্বব্যাপী কল্যাণময়তার বিষয়টি ঠিকমতো অনুধাবন করতে পারি, তখন আমরা আল্লাহর সৌন্দর্যের প্রতিফলন ঘটানোর জন্য যোগ্য হয়ে উঠি।

ইহসান হলো কল্যাণময়তার সেই স্তর, যেখানে মানুষ সৃষ্টিজগতের কারও ওপর নির্ভরশীলতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হয়ে যায়। যারা ইহসানের স্তরে উন্নীত হয়। তারা বিশ্বজগতের সবকিছুকে দেখে স্রষ্টার প্রতিফলন হিসেবে।

একজন মুহসিন (যিনি ইহসান স্তরে রয়েছেন) পথের দিশা পাওয়ার উদ্দেশ্যে নামাজ ও জিকিরের মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরতে থাকেন এবং সৃষ্টির সেবা করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন।
অষ্টম শতকের বিশিষ্ট সাধক ও রাসূল (সা)-এর বংশধর জাফর আস-সাদিক (রহ.) তাঁর ছাত্রদের বলতেন- 'মানুষ তিন রকমভাবে আল্লাহর ইবাদত করে। একদল লোক আল্লাহর শাস্তির ভয়ে তাঁর ইবাদত করে; এটি হলো দাসের ইবাদত। আরেক একদল লোক পুরস্কারের আশায় আল্লাহর ইবাদত করে; এটি হলো ব্যবসায়ীর ইবাদত। আরেক একদল লোক ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা থেকে আল্লাহর ইবাদত করে, এটি হলো মুক্ত ইবাদত এবং এটিই শ্রেষ্ঠ ইবাদত।' যখন আমরা আল্লাহর ভালোবাসায় উদ্বেলিত হয়ে তাঁর ইবাদতে মগ্ন হতে পারব, কেবল তখনই আমাদের ইবাদত আমাদের সমগ্র সত্তায় প্রবাহিত হবে। আধ্যাত্মিকতার এই পর্যায়টি হলো ইহসান।

ইসলামের ফোকাস হলো আমাদের বাহ্যিক কর্মকাণ্ডের ওপর, ঈমানের ফোকাস হলো আমাদের হৃদয়ের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের ওপর, কিন্তু ইহসানের ফোকাস হলো আমাদের সংকল্পের ওপর। যা কিছুই আমরা করি না কেন, তা হতে হবে আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালোবাসা থেকে উৎসারিত। যেমনটি মহানবি বলেছেন-'প্রতিটি কাজের প্রতিদান দেওয়া হবে কাজটির পেছনের সংকল্পের ভিত্তিতে।' [১০৪] এ কথাটির অর্থ হলো-আমাদের সংকল্প যত আন্তরিক ও পবিত্র হবে, আল্লাহর ইচ্ছার কাছে আমাদের আত্মসমর্পণও তত মূল্যবান হিসেবে গণ্য হবে।

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে-
'যে নিজেকে আল্লাহর কাছে সোপর্দ করেছে, সে সৎকর্মশীল (মুহসিন), তার জন্য রয়েছে তার রবের নিকট প্রতিদান। আর তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা দুঃখিতও হবে না।' সূরা বাকারা: ১১২

দুনিয়াতে না পাওয়ার দুঃখ ও ভবিষ্যতের ভয় আমাদের জীবনকে গ্রাস করে এবং আল্লাহর পথে এগোতে বাধা দেয়। দুনিয়াতে একজন মুহসিন যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করে দেয় এবং আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করে জীবনযাপন করে, সেহেতু মৃত্যুপরবর্তী জীবনে তাকে কোনো দুঃখ ও ভয় স্পর্শ করবে না।

ইসলামের প্রকাশ ঘটে বস্তুগত জগতে, ঈমান অবস্থান করে হৃদয়ে এবং ইহসান কাজ করে আধ্যাত্মিক মাত্রায়। আরও সহজ করে বলতে গেলে- ইসলাম হলো এমন কাজ, যা চোখ দিয়ে দেখা যায়। ঈমান হলো এমন বিশ্বাস- যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু হৃদয়ে ধারণ করতে হয়। আর ইহসান হলো বাহ্যিকতা ও অভ্যন্তরীণতাকে ছাড়িয়ে আল্লাহর ভালোবাসার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়ার নাম।

টিকাঃ
৯৬. আল্লাহর ঋণ পরিশোধ এককালীন কোনো ঘটনা নয়। আল্লাহর পথে ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কেননা, আল্লাহর ততখানি ইবাদত আমরা কখনোই করতে পারব না, তাঁর ঋণ পরিশোধের জন্য যতখানি ইবাদত আমাদের করা উচিত।
৯৭. বুখারি, মুসলিম
৯৮. তিরমিজি
৯৯. মুসলিম
১০০. মুসলিম
১০১. তিরমিজি
১০২. দারে কুতনি
১০৩. বুখারি
১০৪. বুখারি, মুসলিম

📘 সিক্রেটস অব ডিভাইন লাভ > 📄 তওবা : ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা

📄 তওবা : ক্ষমা প্রার্থনা এবং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা


আর তোমরা তোমাদের রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর তাঁরই নিকট ফিরে এসো। নিশ্চয়ই আমার রব পরম দয়ালু, অতীব স্নেহময়। সূরা হুদ: ৯০

হে আদমসন্তান! আমাকে বেশি বেশি করে ডাকো এবং আমার কাছে চাও, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেবো এবং কিছু মনে করব না। হে আদমসন্তান! তোমার পাপ যদি আকাশের মেঘ পর্যন্ত পৌঁছে যায় আর আমার কাছে ক্ষমা চাও, তবুও তোমাকে ক্ষমা করে দেবো। এমনকী যদি এক পৃথিবী সমান পাপ নিয়েও আমার কাছে আসো এবং এমন অবস্থায় আসো—তুমি আমার সাথে কাউকে শরিক করোনি, তাহলে তোমার সামনে আমি এক পৃথিবী সমান ক্ষমা নিয়ে হাজির হব। [১০৫]

আমরা যতই নষ্ট হয়ে যাই না কেন, আল্লাহর কাছ থেকে যত দূরেই চলে যাই না কেন, অতীতে যা-ই করে থাকি না কেন, আমাদের পাপের বোঝা যত ভারীই হোক না কেন, আল্লাহর সীমাহীন ক্ষমা ও অনুগ্রহ আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তওবার চর্চা আমাদের জন্য দেওয়া আল্লাহর সবচেয়ে বড়ো উপহার। তওবা শব্দের অর্থ অনুশোচনা হলেও শব্দটির আভিধানিক অর্থ- ফিরে আসা। তওবা হলো প্রত্যাশার সাথে এ কথা স্মরণ করা-আমাদের অমর আত্মা পার্থিব কোনো ভুলের মাধ্যমে বিকৃত হতে পারে না।

আমরা যখন ক্ষমা প্রার্থনার জন্য আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন আমাদের হৃদয় সেই অবস্থানে চলে যায়, পাপের কারণে যে অবস্থানের ওপর আবরণ পড়ে গিয়েছিল। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেছেন-
'চক্ষু অন্ধ হয় না; বরং বক্ষস্থিত অন্তরই অন্ধ হয়ে যায়।' সূরা হজ: ৪৬

তওবা আমাদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে দেয়, যাতে আল্লাহর নুর সেখানে প্রবেশ করতে পারে। তওবা আমাদের ভেতরে ঐশী অন্তর্দৃষ্টি এনে দেয়। ফলে আমাদের চেতনার দৃষ্টি সৃষ্টিজগৎ থেকে সরে এসে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি নিবদ্ধ হয়।

আমরা যখন আন্তরিকভাবে তওবা করি, তখন আল্লাহর কাছে পৌঁছে যাই এবং আমাদের পাপগুলো আল্লাহর অনুগ্রহ দিয়ে মুছে দেওয়ার প্রার্থনা জানাই। অর্থাৎ তওবা আমাদের আল্লাহর অনুগ্রহ ও ভালোবাসার সাথে যুক্ত করে দেয়।

ক্ষমার মাধ্যমে আল্লাহর পথনির্দেশের শুরু ও সমাপ্তি
মানুষের প্রথম প্রার্থনা ছিল আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। আদম ও মা হাওয়া (আ) যখন নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খেলেন এবং বুঝতে পারলেন তাঁরা ভুল করেছেন, তখন প্রার্থনা করলেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি অন্যায় করে ফেলেছি। যদি আপনি আমাদের ক্ষমা না করেন আর দয়া না করেন, তাহলে আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।' সূরা আ'রাফ: ২৩

আল্লাহ তাঁদের ডাকে সাড়া দিলেন এবং তাঁদের ক্ষমা করে দিলেন। কুরআনে বিষয়টি এভাবে এসেছে-
'অতঃপর আদম তাঁর রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তাঁর তওবা কবুল করলেন। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী, অতি দয়ালু।' সূরা বাকারা: ৩৭

মানব সৃষ্টির সূচনা থেকে আমাদের যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, তা হলো- আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা এবং পরকালের বিচার দিবসেও আমরা আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাই করব। জান্নাতে প্রবেশের সময় আমরা এভাবে প্রার্থনা করব-
'হে আমাদের রব! আমাদের জন্য আমাদের আলো পূর্ণ করে দিন এবং আমাদের ক্ষমা করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান।' সূরা আত-তাহরিম : ৮

আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে লজ্জার কিছু নেই; বরং আল্লাহ চান, আমরা যেন তাঁর কাছে ক্ষমা চাই।
'তোমার যে ভালো কর্ম তোমাকে অহংকারী করে, তার চেয়ে হাজারগুণ ভালো তোমার সেই মন্দ কর্ম, যা জন্য তোমাকে অনুতপ্ত করে।' -আলি (রা)

ক্ষমা প্রার্থনার আরবি হলো ইস্তেগফার এবং এটি 'আল মিগফার' শব্দের সাথে সংশ্লিষ্ট, যার অর্থ-ক্ষতিকর কোনো কিছু থেকে মাথা ঢেকে রাখা। অন্য কথায়, ইস্তেগফার আপনার পাপগুলোকে আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহ দিয়ে ঢেকে রাখে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তুমি তাদের মাঝে থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না এবং যখন তারা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে-এরূপ অবস্থায়ও আল্লাহ তাদের শাস্তি দেবেন না।' সূরা আনফাল : ৩৩

আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা আমাদের কৃতকর্মের পরিণাম থেকে আল্লাহর সুরক্ষা নিশ্চিত করে। ইস্তেগফার কেবল পাপের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনাই নয়; বরং আমরা যথেষ্ট ইবাদত করতে পারছি না- সেজন্যও আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা। মানুষ হিসেবে আমরা আল্লাহর যত ইবাদতই করি না কেন, তা আল্লাহর অনুগ্রহের সাথে তুলনা করলে কোনো মতেই যথেষ্ট নয়। তাই আমরা আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি ও ইবাদতের অসম্পূর্ণতার কারণে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।

'তোমরা কেন আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করো না, যাতে তোমরা অনুগ্রহপ্রাপ্ত হও?' সূরা নামল: ৪৬

আমরা যখন আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি, তখন আল্লাহ আমাদের উচ্চতর স্থানে উন্নীত করেন। যেমনটি নুহ (আ) বলেছিলেন-
'হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো, অতঃপর অনুশোচনাভরে তাঁর দিকেই ফিরে যাও। তিনি তোমাদের জন্য প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, তোমাদের শক্তিকে আরও শক্তি দিয়ে বৃদ্ধি করে দেবেন; আর অপরাধী হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়ো না।' সূরা হুদ: ৫২

আমরা যখন ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহর দিকে ফিরি, তখন আল্লাহ জবাবে তাঁর ক্ষমা, করুণা ও দয়ার বৃষ্টি দিয়ে আমাদের সিক্ত করেন। ত্রুটিমুক্ত হয়ে নয়; ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমেই কেবল আল্লাহর অনুগ্রহের সমুদ্রের সন্ধান পাওয়া সম্ভব।

আল্লাহর এককত্বের কাছে ফেরা
আমাদের হৃদয়ের ভেতরে এক আল্লাহর সামনে যে মিথ্যা খোদাগুলোকে আমরা স্থাপন করেছি, ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো- সেগুলোর অপসারণ। আমরা পাপ করি যা কিছু পাওয়ার বাসনা থেকে, তা একমাত্র আল্লাহই আমাদের দিতে পারেন। তাই এক একটা পাপ করার সাথে সাথে আমাদের হৃদয়ে এক একটি মিথ্যা খোদা তৈরি হয়। ক্ষমা প্রার্থনা মিথ্যা খোদাগুলোকে একে একে সরিয়ে দেয়।

আল্লাহ যখন আমাদের কোনো পাপের কথা মনে করিয়ে দেন, তখন এর মাধ্যমে মূলত তিনি আমাদের শাস্তি দেন না; বরং তাঁর দিকে আমাদের আহ্বান করেন। অষ্টম শতকের সাধক রাবেয়া বসরিকে এক লোক প্রশ্ন করেছিল- 'আমি অনেক পাপ করেছি। যদি আমি তওবা করি, আল্লাহ কি আমাকে ক্ষমা করবেন?'
রাবেয়া বসরি জবাবে বলেছিলেন- 'বিষয়টি এর ঠিক উলটো। আল্লাহ যদি তোমাকে ক্ষমা করেন, তবেই তুমি তওবা করতে সক্ষম হবে।'

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তিনি তোমাদের আহ্বান করেন তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করার জন্য।' সূরা ইবরাহিম: ১০

তওবা অর্থ ফিরে আসা। এর মানে হলো, প্রতিটি মুহূর্তেই আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হবে। তওবা আমাদের হৃদয়ের ভেতর আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহকে ধারণ করার জন্য জায়গা তৈরি করে দেয়।

শুরু করুন এখনই
আল্লাহর দিকে ফিরে আসার যাত্রা সেখান থেকে শুরু হয়, যেখানে আমরা আছি। ঈমানে ফিরে আসার জন্য অন্য কোনো যোগ্যতা অর্জনের প্রয়োজন নেই; আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্তিই হলো এর জন্য প্রয়োজনীয় একমাত্র যোগ্যতা। অন্যকথায়, কোনো কিছুই এতখানি ভেঙে যায় না বা এতখানি নষ্ট হয় না যে, সেই আল্লাহ একে শুধরে দিতে বা মেরামত করতে পারবেন না; যিনি জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। জালালুদ্দিন রুমি বলেছেন-'পানি ময়লাকে বলল, আমার কাছে এসো। ময়লা বলল-আমি লজ্জা পাচ্ছি। পানি বলল-আমি ছাড়া কে আছে তোমার লজ্জা ধুয়ে দেবে?' এমনকী যদি আমরা একই অপরাধ বারবারও করি, তবুও আল্লাহ বারবার তাঁর অনুগ্রহের পানি দিয়ে আমাদের অপরাধগুলো ধৌত করে দেওয়ার অপেক্ষায় থাকেন। জেনে রাখুন, আপনার পাপের বোঝা যত বড়োই হোক না কেন, তা আল্লাহর করুণার চেয়ে বড়ো নয়।

'হে আমার বান্দাগণ! যারা নিজেদের ওপর বাড়াবাড়ি করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। আল্লাহ সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' সূরা জুমার: ৫৩

মুহাম্মাদ (সা) বলেছেন- 'শয়তান বলল-"আপনার সত্তার শপথ হে প্রভু! আমি আদমের সন্তানদের বিভ্রান্ত করেই যাব, যতক্ষণ না তাদের আত্মা তাদের শরীর ত্যাগ করবে।” আল্লাহ বললেন- “আমার সত্তা ও গৌরবের শপথ! আমি তাদের ক্ষমা করেই যাব, যতক্ষণ তারা আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে থাকবে। "' [১০৬]

প্রকৃতপক্ষে সে-ই সবচেয়ে বড়ো দুর্ভাগা, যে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনাহীন জীবনযাপন করে। আল্লাহ হলেন 'আফউ' বা ক্ষমাকারী, যাঁর ক্ষমাশীলতা মহাসাগরের চাইতেও বিশাল। তিনি আমাদের পাপের সকল রেকর্ড এমনভাবে মুছে দেন, যেন ওই রেকর্ডে কোনো কালে কিছুই ছিল না।

'তোমার রবের সপ্রশংস তাসবিহ পাঠ করো এবং তাঁর কাছে ক্ষমা চাও। নিশ্চয়ই তিনি তওবা কবুলকারী।' সূরা নাসর: ৩

যদি আপনি দেখেন-আপনি কুপ্রবৃত্তির সেই প্ররোচনায় আবার পড়েছেন, যে প্ররোচনাকে আপনি আগেই জয় করেছেন বলে ভেবেছিলেন, তাহলে হতাশ হবেন না। ভুল করা ও ফিরে আসার প্রক্রিয়াটি অনেকটা স্পাইরালের মতো। আপনি হয়তো ভাবছেন, আপনি পেছনে চলে গেছেন; কিন্তু আপনি জানেন না, আপনি আরও গভীরে প্রবেশ করেছেন। তওবার চর্চা হলো আপনার ভেতকার এমন আধ্যাত্মিক সংশোধন, যার মাধ্যমে আপনি আপনার হৃদয় ও সংকল্পকে আবার আল্লাহর সাথে যুক্ত করতে পারেন।

অন্তরের কুপ্ররোচনাকে প্রার্থনায় পরিণত করুন
আধ্যাত্মিকতার পথে এগিয়ে যাওয়া ও আল্লাহওয়ালা (মুত্তাকি) হয়ে যাওয়ার মানে এই নয় যে, আমাদের আর পরীক্ষা করা হবে না এবং আমরা আর মনের কুপ্ররোচনার শিকার হব না; বরং বিষয় হলো-আপনি আধ্যাত্মিকতার পথে যতই এগিয়ে যাবেন, অন্ধকার ও পাপ ততই আপনাকে চুম্বকের মতো আকর্ষণ করতে থাকবে। আকাশে নক্ষত্র সব সময় থাকে, কেবল রাতের অন্ধকারেই আমরা সেগুলো দেখতে পাই। কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানের ডাক তেমন সব সময়ই বিরাজ করে। কুপ্ররোচনার শিকার হওয়া না হওয়ার মধ্যে আল্লাহর নিকটবর্তী বান্দা ও আল্লাহর দূরবর্তী বান্দার মধ্যকার পার্থক্য সূচিত হয় না; পার্থক্য সূচিত হয় উভয়ের মনোযোগ নিবদ্ধের স্থান নির্বাচনের মধ্যে।

আমরা যতই আল্লাহর নুরের দিকে ফিরি, আমাদের মনের আকাশ ততই উজ্জ্বল হতে থাকে এবং কুপ্রবৃত্তির নক্ষত্রগুলো ততই নিষ্প্রভ ও বিলীন হতে থাকে। কুপ্ররোচনাকে জয় করার জন্য নিজের ওপর নির্ভর করতে নয়, আল্লাহর দিকে ঝুঁকে পড়তে বলা হয়েছে। শয়তান আমাদের ত্রুটি প্রবণতাকে ব্যবহার করে বোঝায় যে, আমরা আল্লাহর সাথে সম্পর্ক গড়ার জন্য উপযুক্ত নই। তাই মনে রাখতে হবে, আমরা যদি শয়তানের সাথে একা লড়াই করি, তাহলে আমরা সব সময় পরাজিত হব। শয়তানকে পরাজিত করার একমাত্র উপায় হলো আল্লাহর সাহায্য নেওয়া।

'নিশ্চয়ই যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, শয়তানের স্পর্শে তাদের মনে কুমন্ত্রণা জাগলে তারা আল্লাহকে স্মরণ করে, তখন তাদের দৃষ্টি খুলে যায়।' সূরা আ'রাফ: ২০১

শয়তানের কুমন্ত্রণার বিরুদ্ধে লড়াই করার পূর্বে আপনার কর্তব্য হলো-আগে আল্লাহর কাছে ধরনা দেওয়া। যখনই আপনি কোনো কুমন্ত্রণা অনুভব করবেন, আপনার মন যখন আপনাকে এমন কোনো কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করবে-যা আল্লাহর নির্দেশের লঙ্ঘন কিংবা আপনি যে কাজটি করার সংকল্প করেছেন, কিন্তু আপনি দ্বিধাগ্রস্ত যে কাজটি সঠিক কি না, এমতাবস্থায় সাথে সাথে আল্লাহর কাছে দুআ করুন, শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে আল্লাহর কাছে সুরক্ষা কামনা করুন।

শয়তানের কথাগুলো সাধারণত এমন হয়-তুমি তো যথেষ্ট আল্লাহওয়ালা মানুষ নও... ত্রুটি-বিচ্যুতি তো তোমার হয়েই থাকে... তুমি তো পাপী লোক... কাজটি তেমন বড়ো কোনো পাপের কাজ নয়... একবার শুধু কাজটি করো, পরে কখনো আর এমনটি করো না... আল্লাহ এতে তেমন কিছু মনে করবেন না... তুমি যত খারাপ কাজই করো না কেন, তিনি তোমার কোনো ক্ষতি করবেন না... অতএব, তোমার মন যা চায় তা করো।

আপনি শয়তানের কুমন্ত্রণা অনুভব করলে এর বিরুদ্ধে লড়তে যাবেন না কিংবা এর ভেতর ডুবে যাবেন না; বরং আল্লাহর কাছে দুআ করুন এবং লড়াইটা আল্লাহর জন্য ছেড়ে দিন। শয়তান যদি আপনাকে কোনো কিছুর প্রলোভন দেখায়, আপনার প্রার্থণাকে আরও গভীর করুন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য কামনা করুন। শয়তান যদি আপনাকে প্রার্থনা বন্ধ করতে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহকে বলুন, তিনি যেন নামাজে আপনার মনোযোগ বৃদ্ধি করে দেন। শয়তান যদি আপনার ত্রুটিগুলোর কারণে আপনাকে লজ্জা দেয়, তাহলে আল্লাহর কাছে আপনার সংকল্পকে পবিত্র করার সাহায্য প্রার্থনা করুন। শয়তান যখনই আপনার দুর্বল জায়গায় আঘাত হানবে, তখনই আপনি ঈমান মজবুত করার বাসনায় আল্লাহর কাছে আসার চেষ্টা করবেন।

আমরা যখন আল্লাহর নুর থেকে আড়ালে চলে যাই (যেমনটি সূর্যের আলো থেকে পৃথিবী আড়ালে চলে যায়), তখন আমরা আধ্যাত্মিকভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাই। আল্লাহর শাস্তির কারণে অন্ধকার আমাদের গ্রাস করে না। অন্ধকার গ্রাস করে এ কারণে যে, ইচ্ছার স্বাধীনতা থাকা সত্ত্বেও আমরা সত্যের আলো থেকে দূরে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অবশ্য এ অন্ধকার একটি মায়া বা বিভ্রম মাত্র। আল্লাহ আমাদের ফুসফুসের ভেতরের নিশ্বাসের চাইতেও নিকটে অবস্থান করেন।

তওবার সবচেয়ে বড়ো মহিমা হলো তওবার মাধ্যমে পাপগুলো পুণ্যে পরিণত হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'তারা ছাড়া; যারা তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে। পরিণামে আল্লাহ তাদের পাপগুলোকে পুণ্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।' সূরা ফুরকান: ৭০

আল্লাহ ক্ষমা করতে পছন্দ করেন। তিনি চান আমরা তাঁর কাছে ক্ষমা চাই। তওবা হলো আল্লাহর সীমাহীন দয়ার মহাসমুদ্রে প্রবেশের একমাত্র পথ।

'আমাদের প্রতিপালক প্রতিরাতের শেষ তৃতীয়াংশে সর্বনিম্ন আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন- “কে আছ আমাকে ডাকার, যার ডাকে আমি সাড়া দেবো? কে আছ আমার কাছে কোনো কিছু চাওয়ার, যা আমি তাকে দান করব? কে আছ আমার ক্ষমা চাওয়ার, যাকে আমি ক্ষমা করব?” [১০৭]

আল্লাহর দিকে ফেরা
আমরা যখন তওবা করি, তখন আমরা একদিকে আমাদের পাপসমূহ থেকে ফিরে আসি এবং অন্যদিকে আল্লাহর সরল-সঠিক পথের সাথে নিজেকে একাত্ম করে দিই। আমাদের অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য কামনা করতে হবে, তবে সাথে সাথে অবশ্যই নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যেতে হবে।

'আল্লাহ কোনো জাতির অবস্থার পরিবর্তন করেন না, যে পর্যন্ত না তারা নিজেদের অবস্থা পরিবর্তন করে।' সূরা রা'দ: ১১

পাপ থেকে ফিরে এসে আল্লাহর নুরের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে সবকিছুই বদলে যায়। আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছিলেন-
'যে দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যার সৃষ্টি, একই দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্যাটির সমাধান অসম্ভব।'

তওবা আমাদের হৃদয়ের অবস্থান বদলে দেয়, আমাদের চেতনাকে নিজের অহং থেকে সরিয়ে আল্লাহর স্মরণের সাথে যুক্ত করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন, ভালোবাসেন অধিক পবিত্রতা অর্জনকারীদেরও।' সূরা বাকারা: ২২২

তওবা পাপের মায়াজাল ছিন্ন করে আমাদের আল্লাহর ভালোবাসার স্বাদ পাইয়ে দেয়।

আল্লাহর ক্ষমার অসীম ক্ষমতা
মুহাম্মাদ (সা) আল্লাহর ক্ষমার একটি বিস্ময়কর ঘটনা তাঁর সাহাবিদের শুনিয়েছেন-
'এক লোক ৯৯ জন মানুষকে হত্যার পর হঠাৎ অনুশোচনা বোধ করল এবং আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ সন্ধান করতে শুরু করল। একজন আলিম ব্যক্তিকে খুঁজে পেয়ে সে তাকে জিজ্ঞেস করল-যদি সে তওবা করে, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করবেন কি না। আলিম ভুল করে জবাবে বলল-তার ক্ষমা পাওয়ার কোনো উপায় নেই। লোকটি রাগান্বিত হয়ে তাকেও হত্যা করল।
এরপর লোকটি একজন বিখ্যাত আলিমকে খুঁজে বের করে বলল-সে ১০০ জন মানুষকে হত্যা করেছে, তার কি ক্ষমা পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কি না। আলিম ব্যক্তিটি জানতেন, ওই লোকটির পরিবর্তনের জন্য তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিবর্তনের প্রয়োজন। অতএব, সে জবাবে বলল- “তুমি ও তোমার তওবার মাঝে কে আছে? তুমি ওই জায়াগায় যাও, যেখানকার লোকেরা আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে। তাদের সাথে যোগ দিয়ে ইবাদত করতে থাকো। আর তোমার নিজ ভূমিতে ফিরে এসো না। কেননা, এ জায়গা নষ্ট হয়ে গেছে।"
লোকটি আন্তরিকভাবে তওবা করল এবং ঈমানদার লোকদের পবিত্র ভূমির উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল, কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছার আগেই লোকটি মারা গেল। তার মৃত্যুর পর রহমতের ফেরেশতা ও শাস্তির ফেরেশতা উভয়ই এলো এবং তার আত্মা নেওয়ার জন্য বিতর্কে লিপ্ত হলো। রহমতের ফেরেশতা বলল-"লোকটি আল্লাহর কাছে এসেছে তওবাযুক্ত হৃদয় নিয়ে।" শাস্তির ফেরেশতা বলল-“সে তার সারাজীবনে একটি পুণ্যের কাজও করেনি।"
তখন আল্লাহ বিষয়টির মীমাংসা করার জন্য মানুষের বেশে তৃতীয় একজন ফেরেশতাকে সেখানে পাঠালেন। মধ্যস্থতাকারী ফেরেশতা বললেন-“দুটি ভূমির মধ্যকার দূরত্ব মাপো। লোকটির মৃতদেহ থেকে যে ভূমির দূরত্ব কম হবে, সে অনুযায়ী তার ভাগ্য নির্ধারিত হবে।” ফেরেশতার দূরত্ব মেপে দেখলেন, লোকটির অবস্থান পুণ্যময় ভূমির নিকটে। অতএব, রহমতের ফেরেশতা তার আত্মা নিয়ে গেল (কোনো কোনো বিশ্লেষকের মতে-দূরত্বের পরিমাপ প্রথমে লোকটির বিপক্ষে গিয়েছিল, কিন্তু আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহ দিয়ে লোকটির পক্ষে জমিনকে প্রসারিত করে দিয়েছেন)।' [১০৮]

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-শেষ বিচারের দিবসে যারা অন্যায় করেছে, অপরকে কষ্ট দিয়েছে বা হত্যা করেছে, তাদের ওপর পূর্ণ ন্যায়বিচার করা হবে। উপরিউক্ত ঘটনা থেকে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ঠিক হবে না যে, আমরা যা ইচ্ছা করব এবং এরপর পরোক্ষভাবে ক্ষমা চেয়ে নেব; বরং এ ঘটনার শিক্ষা হলো-আমরা যদি আন্তরিকভাবে ফিরে আসি, তাহলে আল্লাহর ক্ষমা ও অনুগ্রহপ্রাপ্ত হব এবং চরম মাত্রার অপরাধ করার পরও আল্লাহর কাছে ফিরে এলে তিনি আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। আরও শিক্ষা হলো, আমাদের মানুষকে আশার আলো দেখাতে হবে, হতাশ করা যাবে না। ভয় দেখিয়ে বা লজ্জা দিয়ে কোনোদিন কাউকে বদলানো যায় না। মানুষকে বদলে দেওয়া যায় তার সামনের পথকে সহজ করে উপস্থাপনের মাধ্যমে। আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রেমের দিকে মানুষকে আকৃষ্ট করেই মানুষকে বদলে দিতে হয়।

ইমাম গাজালি বলেছেন-
'ধর্মে মানুষের অবিশ্বাসের অর্ধেক কারণ হলো-সেই সব ধার্মিক মানুষ, যারা নিজেদের ভয়ানক আচরণ ও বিপজ্জনক কথাবার্তার মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার প্রতি মানুষের মনে ঘৃণার চাষাবাদ করে চলেছে।'

মানুষের বিচার করা আমাদের কাজ নয়; বরং ভালোবাসার মাধ্যমে মানুষের ভেতরের সম্ভাবনা বিকাশের চেষ্টা করাই আমাদের কাজ।
'সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও বীতশ্রদ্ধ করো না।' [১০৯]

নিজেকে মুক্ত করার জন্য অপরকে ক্ষমা করুন
তওবা মানে আল্লাহর কাছে ফিরে আসাই নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টির কাছেও আল্লাহর দয়া, করুণা, অনুগ্রহ ও ক্ষমার প্রতিবিম্ব হিসেবে ফিরে আসা। আপনি যখন অপরকে ক্ষমা করেন, তখন আপনার আয়নায় একটি ফ্লাশলাইট জ্বলে ওঠে। ফলে যে রহমত আপনি অপরের প্রতি প্রেরণ করছেন, একই রহমত আপনি নিজের জন্যও ফিরে আসছে।

'আর ভালো ও মন্দ সমান হতে পারে না। মন্দ প্রতিহত করো তা দ্বারা, যা উৎকৃষ্টতর। ফলে তোমারও যার মধ্যে শত্রুতা রয়েছে, সে যেন হয়ে যাবে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।' সূরা হা-মিম সিজদা : ৩৪

ক্ষমা তখনই করা সম্ভব হয়, যখন আপনি মানুষের ভেতকার সহজাত কল্যাণময়তার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেন এবং মানুষের অসৎকর্মের বিষয়গুলোকে অগ্রাহ্য করে চলেন। যে আপনার সাথে মন্দ আচরণ করেছে, তার প্রতি মন্দ আচরণ উপহার দেওয়া হলো জঙ্গলে জ্বলে উঠা আগুন নেভানোর জন্য সে আগুনে পেট্রোল ঢালার মতো। বিশ্ববিখ্যাত মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র বলেছিলেন-
'অন্ধকার কখনো অন্ধকার দূর করতে পারে না; একমাত্র আলোই পারে অন্ধকার দূর করতে। ঘৃণা কখনো ঘৃণাকে মিটিয়ে দিতে পারে না; একমাত্র ভালোবাসাই পারে ঘৃণাকে মিটিয়ে দিতে।' [১১০]

ক্ষমা একদিকে অপরকে তার ভুলের খাঁচা থেকে মুক্ত করে দেয়, অন্যদিকে আমাদের নিজেদেরও দোষারোপের কারাগার থেকে মুক্ত করে দেয়। যখন আমরা অপরকে ক্ষমা করে দিই, তখন আমাদের মাথার ওপর চেপে বসা অপরের সীমালঙ্ঘনের বোঝা নামিয়ে দিয়ে হালকা হয়ে যাই।

মহানবি (সা) বলেছেন-
'যে তোমার সাথে মন্দ আচরণ করে, তার সাথে মন্দ আচরণ করো না; বরং তার সাথে ক্ষমাশীলতা ও দয়ার্দ্র আচরণ করো।' [১১১]

এমনকী কেউ যদি ক্ষমা না চায়, 'স্যরি' না বলে কিংবা ক্ষমা চাইলেও তা যদি আন্তরিক না হয়, তবুও তাকে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে। এ কারণে ক্ষমা করতে বলা হয়নি যে, তার ক্ষমা প্রয়োজন; বরং এ কারণে ক্ষমা করতে বলা হয়েছে, আমাদের নিজেদের হৃদয়ের শান্তি প্রয়োজন। আমরা যখন অপরকে শান্তি দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে নিজের ভেতর ক্রোধ ও রাগ পুষে রাখি, তখন আমরা অপরের চেয়ে নিজেরই বেশি ক্ষতি করি। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন-'অপরের প্রতি রাগ পুষে রাখার মানে হলো-নিজে বিষ পান করা এবং আশা করা যে, অপর লোকটি মারা যাবে।' অপরকে ক্ষমা করে দেওয়ার মানে হলো-নিজের রাগের শৃঙ্খল থেকে নিজেকে মুক্ত করে দেওয়া। আধ্যাত্মিক পথের বেলায় অপরের প্রতি অনুগ্রহশীল হওয়া হলো আল্লাহর অনুগ্রহ প্রাপ্তির সবচেয়ে দ্রুতগতিসম্পন্ন মাধ্যম।

'যে অপরের প্রতি দয়া করে, দয়ময় আল্লাহও তার প্রতি দয়া করেন।' [১১২]

অপরের প্রতি ক্ষমা করার সুযোগ হলো, আল্লাহর তরফ থেকে আমাদের দেওয়া উপহারস্বরূপ। কেননা, সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাঁর ক্ষমাশীলতা, ধৈর্য, স্নেহ-মমতা ও দয়াশীলতার গুণাবলি দিয়ে আমাদের তাঁর নিকটস্থ হওয়ার আহ্বান জানান। অপরকে ক্ষমা করলে একদিকে যেমন আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া যায়, অন্যদিকে তেমনি বিনিময়ে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া যায়। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা বলেন- 'অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয়, সে পাপ থেকে পবিত্র হয়ে যায়।' সূরা মায়েদা : ৪৫

আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যখন আমরা অপরকে ক্ষমা করে দিই, তখন বিনিময়ে আল্লাহ আমাদের সেই সব পাপ ক্ষমা করে দেন, যেগুলো আমাদের হৃদয়কে ভারী করে রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
'তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি উপেক্ষা করে। তোমরা কি পছন্দ করো না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিক? আল্লাহ বড়োই ক্ষমাশীল, বড়োই দয়ালু।' সূরা নুর: ২২

এখানে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো, আল্লাহ আমাদের ন্যায়বিচার চাওয়ার অধিকার দিয়েছেন। তবুও আমাদের সাথে অন্যায় করা হলে আমরা নিজেকে প্রশ্ন করে দেখতে পারি-ক্ষমা না করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাধ্যমে আমরা নিজেরা আল্লাহর ক্ষমার স্বাদ পাওয়া থেকে দূরে সরে যাচ্ছি না তো? আল্লাহ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকেও ক্ষমা করতে বলেছেন। কেননা, আল্লাহ স্বয়ং ক্ষমার অযোগ্য অপরাধগুলোকে অবিরতভাবে ক্ষমা করে চলেছেন।

একজন সুফি সাধক বলেছেন- 'ফুলের মতো হও, ফুল সবার কাছে তার সুগন্ধ ছড়িয়ে চলেছে; এমনকী তার কাছেও, যে নিজ হাতে ফুলকে নষ্ট করে।' আমাদের সাথে কেউ অন্যায় করলেও বিনিময়ে আমরা তার প্রতি অন্যায় করব না। কেননা, আল্লাহর প্রেমিক হিসেবে আমাদের আল্লাহর প্রেমের গুণাবলি নির্বিশেষে সকল সৃষ্টির প্রতি প্রদর্শন করতে বলা হয়েছে। ক্ষমা মানে এই নয় যে, আমরা অপরের কাছ থেকে তার দায়িত্ব বুঝে নেব না; বরং ক্ষমা মানে হলো-দয়া, স্নেহ, মমতা ও অনুগ্রহের চর্চা।

সার্বক্ষণিক ক্ষমা প্রার্থনা
মহানবি দিনে বহুবার আসতাগফিরুল্লাহ পাঠ করতেন, যার অর্থ-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি।' রাসূল বলেছেন-
'যদি কেউ অবিরতভাবে ক্ষমা চেয়ে থাকে, আল্লাহ তার প্রতিটি হতাশা দূর করার জন্য এবং প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য পথ বের করে দেন এবং এমন জায়গা থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না। [১১৩]

যদিও আসতাগফিরুল্লাহ হলো ক্ষমা চাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ দুআ, তবুও ক্ষমা চাওয়ার আরও একটি গভীর ও সুপরিচিত দুআ রয়েছে। এটি হলো- 'আসতাগফিরুল্লাহিল আজিম আল লাজি লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হাইয়ুল কাইয়ুম ওয়া আতুবু ইলাইহি।' এর অর্থ হলো-'আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইছি, তিনি সর্বশক্তিমান। তিনি ছাড়া আর কোনো উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব ও চিরস্থায়ী। আমি ক্ষমার জন্য তাঁর দিকেই ফিরে আসি।'

মহানবি বলেছেন-
'আমরা যদি এ দুআ পাঠ করাকে আমাদের অভ্যাসে পরিণত করতে পারি, তাহলে আমাদের পাপগুলো যদি দুনিয়ার সমুদ্রের ফেনারাশির মতো বেশিও হয়, তবুও আল্লাহ তাঁর অসীম রহমত দিয়ে আমাদের ক্ষমা করে দেবেন। ' [১১৪]

আল্লাহর ভালোবাসার দিকে ফিরে আসা
ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো, আল্লাহর ভালোবাসার পথে ফিরে আসা। ক্ষমার মাধ্যমে আমরা অনুতাপের আগুনে পুড়ে নিজেকে পরিশুদ্ধ করে তুলি, যাতে একই অপরাধ দ্বিতীয়বার আমাদের আকৃষ্ট করতে না পারে।

'খাঁটি তওবা হলো-হৃদয় থেকে অনুশোচনা অনুভব করা, জিহ্বা দিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং অপরাধটির পুনরাবৃত্তি না করার দৃঢ় সংকল্প করা।'

প্রতিটি মুহূর্তই আল্লাহর কাছে ফিরে আসার এক একটি সুযোগ। রাসূল বলেছেন-
'আল্লাহর শপথ! আমি প্রতিদিন সত্তরবারেরও বেশি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর দিকে ফিরে আসি।' [১১৫]

ক্ষমা প্রার্থনা ও জিকির আমাদের হৃদয়ের আয়নার ওপর পরা মরিচাকে পরিষ্কার করে দেয়। আমাদের হৃদয়ে প্রতিনিয়ত বর্ষিত আল্লাহর সৌন্দর্যকে অবলোকনের সুযোগ করে দেয়। ক্ষমা প্রার্থনার মানে হলো, হৃদয়ের ভার মুক্তি এবং আল্লাহর সীমাহীন করুণার স্বাদ আস্বাদন। এক সুফি-সাধক বলেছেন-
'সমুদ্র কোনো নদীকেই ফিরিয়ে দেয় না। অসীম দয়ার আধার আল্লাহ কী করে পাপীকে ফিরিয়ে দেবেন?'

আল্লাহ এভাবে ক্ষমা চেয়ে শিখিয়েছেন-
'হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি ক্ষমা করুন এবং দয়া করুন। আর আপনিই তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।' সূরা মুমিনুন: ১১৮

টিকাঃ
১০৫. হাদিসে কুদসি
১০৬. আহমাদ
১০৭. বুখারি
১০৮. বুখারি, মুসলিম
১০৯. বুখারি
১১০. King, Martin Luther. 'Love Your Enemies.' November 17, 1957, Dexter Baptist Church, 'Dexter Baptist Church'
১১১. বুখারি
১১২. তিরমিজি
১১৩. আবু দাউদ
১১৪. আবু দাউদ, তিরমিজি
১১৫. বুখারি

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00