📄 কোন সালাত গ্রহণযোগ্য
الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ.
"যারা তাদের সালাতে আন্তরিকভাবে বিনীত ও বিনম্র"।১৪
এই আয়াতে সালাতে একাগ্রতার (খুশুর) কথা বলা হয়েছে। নিঃসন্দেহে শয়তান হল মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু। সে সর্বক্ষণ সালাতে মুমিনদের মনোযোগ ও একাগ্রতা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। যখন মুমিন সালাতে দাঁড়ায় সাথে সাথে সে দেখতে পায় তার মনে বিভিন্ন চিন্তা, বিপদ, আশঙ্কা, কাজ, পরিবার প্রভৃতি বিষয় ঘুরপাক খাচ্ছে। এতে মাঝে মাঝে সালাতরত ব্যক্তি এমন চিন্তায় ডুবে যায় যে, সে এখন কোথায় আছে কি করছে কিছুই তার মনে থাকে না। সে অবচেতন মনে কিরাত পাঠ করে, রুকু সিজদাসহ সালাতের বিভিন্ন আহকাম পালন করতে থাকে। হঠাৎ তার মন আবারো সচল হলে সে বিস্মিত হয়ে ভাবে-সে কি তিন রাকাত পড়েছে না চার রাকাত। এভাবেই শয়তান সালাতকে নষ্ট করে।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা বলেছিলেন-যে সালাতের খুব অল্প অংশ, সম্ভবত এক-দশমাংশ অথবা এক-অষ্টমাংশ আল্লাহ গ্রহণ করেন, বাকি অংশ শয়তানের প্ররোচনায় নষ্ট হয়ে যায়।
হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ দেখেন এক ব্যক্তি সালাতরত অবস্থায় তার দাঁড়ি নিয়ে খেলছে। এতে তিনি মন্তব্য করেন, “যদি তার মনে খুশু (একাগ্রতা) থাকত, তাহলে তার দেহের অন্যান্য অঙ্গও সালাতের প্রতি মনোযোগী হত।"
সূরা মাউনে প্রাণহীন সালাত সম্পর্কে বলা হয়েছে-
فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ.
“সুতরাং বড় দুর্ভোগ আছে সেই নামাযীদের, যারা তাদের নামাযে গাফলতি করে”। ১৫
একজন ইবাদতকারী সালাত সম্পর্কে গাফেল হয় যখন সে সালাত পড়তে বিলম্ব করে একদম শেষ ওয়াক্তে সালাত আদায় করে এবং যখন সে সালাতে মনোযোগ এবং একাগ্রতা ধরে রাখতে পারে না।
عن أبي هريرة، قال: دخل رجل المسجد فصلى، والنبي صلى الله عليه وسلم في المسجد، ثم جاء إلى النبي صلى الله عليه وسلم فسلم، فرد عليه السلام، وقال: " ارجع فصل فإنك لم تصل "، فرجع ففعل ذلك ثلاث مرات، قال: فقال: والذي بعثك بالحق، ما أحسن غير هذا، فعلمني، قال: " إذا قمت إلى الصلاة فكبر، ثم اقرأ ما تيسر معك من القرآن، ثم اركع حتى تطمئن راكعا، ثم ارفع حتى تعتدل قائما، ثم اسجد حتى تطمئن ساجدا، ثم ارفع حتى تطمئن جالسا، ثم افعل ذلك في صلاتك كلها ".
“আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে প্রবেশ করার পর এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করে সালাত আদায় করল। অত:পর এসে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিল। নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সালামের জওয়াব দিয়ে বললেন, ফিরে যাও। আবার সালাত পড়। কেননা তুমি তো সালাত আদায় করোনি। সে পুনরায় সালাত পড়ার পর এসে নবি কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিল। তিনি বললেন, ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর কেননা তুমি তো সালাত পড়নি। (তিনবার এরূপ হল)। সে বলল, যে সত্তা আপনাকে সত্য দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন তাঁর শপথ, আমি এরচে' উত্তম তরিকায় সালাত আদায় করতে জানি না। প্রিয় রাসুল, আমাকে শিখিয়ে দিন। তিনি বললেন, যখন তুমি সালাতে দাঁড়াবে তখন তাকবীর বলবে, অত:পর কুরআনের যতটুকু তিলাওয়াত করা তোমার জন্য সম্ভব ততটুকু তিলাওয়াত কর। তারপর ধীরস্থিরভাবে রুকু কর। অত:পর সোজা স্থির হয়ে দাঁড়াও। অত:পর ধীরস্থিরভাবে সিজদা কর, এরপর ধীরস্থির হয়ে বস, তারপর ধীরস্থিরভাবে সিজদা কর, তোমার পুরো সালাত এভাবেই আদায় কর। "১৬
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ সময় নিয়ে সালাত পড়তেন। সালাতে প্রতিটি পরিবর্তন খুব ধীরস্থির এবং যথাযথভাবে করতেন, সালাতে কোনো তাড়াহুড়ো করতেন না।
رسول الله صلى الله عليه وسلم: أفضل الصلاة طول القنوت.
“উত্তম সালাত হলো, সালাতে কেরাত লম্বা করে পড়া।”১৭
টিকাঃ
১৩ সুনানু তিরমিযি: ৪১৩; সুনানু ইবনু মাজাহ: ৮৬৪ [সনদ সহিহ]।
১৪ সুরা মুমিনুন: ২-৩।
১৫ সূরা মাউন: ৪-৫।
১৬ সহিহ বুখারি: ৭৫৭; সহিহ মুসলিম: ৩৯৭; মুসনাদু আহমাদ: ৯৬৩৫।
১৭ সহিহ মুসলিম: ৭৫৬; মুসনাদু আহমাদ ইবনু হাম্বল: ১৪৩৬৮।
📄 সালাত : একটি অস্ত্রের মত
পবিত্র কুর'আনে আল্লাহ ইরশাদ করেছেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ.
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের সাথে রয়েছেন। "১৮
প্রকৃতপক্ষে, মানুষ সত্তাগতভাবে দুর্বল। দুর্ভোগ ও কষ্টের সময় তার সাহায্যের প্রয়োজন হয়। দুঃখ ও যন্ত্রণার সময় সর্বাপেক্ষা উত্তম সাহায্য হয় ধৈর্য, যা আমরা সালাতের মাধ্যমে পেতে পারি। আমাদের উচিত শান্ত স্থির থেকে বিচক্ষণতার সাথে প্রত্যেক বিপদ, দুঃখ, যন্ত্রণা, লোকসানের মোকাবিলা করা। কেননা তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া অথবা মূর্খতাপূর্ণ কোনো অবিবেচক মন্তব্য আরো বিপদ ডেকে আনতে পারে। কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের মাধ্যমে উত্তরণের পথ খুঁজতেন। সালাতে ব্যক্তি আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করে, কেনইবা করবে না, আল্লাহর চাইতে অধিক সাহায্যকারী আর কে আছে?
সালাত হল একটি অস্ত্রের মত। এটা এমন অস্ত্র যা বিভিন্ন বিপদ, যন্ত্রণা, কষ্টে আমাদের রক্ষা করে। এই অস্ত্রের মাধ্যমে আমরা ব্যাথা-বেদনার উপশম করি, অজস্র বিপদে শান্তি ও স্বস্তিতে থাকি।
একবার রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিলাল রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন-
قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: يا بلال أقم الصلاة أرحنا بها.
“হে বিলাল! সালাত কায়েম করো। আমরা এর মাধ্যমে স্বস্তি লাভ করতে পারবো"। ১৯
টিকাঃ
১৮ সূরা বাকারা: ১৫৩।
১৯ সুনানু আবু দাউদ: ৪৯৮৫। [সনদ সহিহ]
📄 সালাত : একটি রিমাইন্ডার
একবার একজন অমুসলিম প্রশ্ন করেছিল, "আমি বুঝতে পেরেছি ইসলামের প্রথমযুগে মুসলিমদের কেন প্রতিদিন ৫ বার সালাত পড়তে হত। সে দিনগুলোতে তাদের তেমন কাজ থাকত না, তাই নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের সালাতের মাধ্যমে ব্যস্ত রাখতেন। কিন্তু আমাদের বর্তমান কর্মব্যস্ত আধুনিক জীবনে মানুষ খুব কম অবসর সময় পায়। তাই এই ব্যস্ততার মাঝে কী করে ৫ বার সালাত পড়ার বিধানকে কেউ গ্রহণ করবে?
আমাদের সালাতের প্রথমিক উদ্দেশ্য জানা থাকলে সহজেই উপরের প্রশ্নের উত্তর দেয়া যাবে। আল্লাহ পবিত্র কুর'আনুল কারিমে ইরশাদ করেন-
وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي.
"অতএব আমার ইবাদত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর"। ২০
স্বভাবগতভাবেই মানুষ বিস্মরণশীল, ভুলো মনের অধিকারী। সালাত মানুষকে বার বার তার সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তার প্রতি আনুগত্যের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। যদি নামায ১৪শ বছর আগে ওই সকল মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় ছিল, যারা আজকের মত কর্মব্যস্ত জীবনযাপন করত না, তাহলে সালাত আজকের কর্ম-কোলাহলময় যুগে বসবাসকারী মানুষের জন্য আরো বেশি জরুরি। কেননা, আজকের মানুষ শিক্ষা ও কর্মে খুব ব্যস্ত সময় কাটায়, এবং যখন একটু অবসর সময় পায় তখন শয়তান বিভিন্ন মন্দ কর্ম, সিনেমা, ভিডিও, টিভি, গেমস, ইন্টারনেটসহ প্রভৃতি বিষয়ের অশ্লীল-বেহায়াপনা ও অন্যায়-অবিচারমূলক চিন্তা মানুষের মনে ঢুকিয়ে দেয় এবং আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে রাখে।
মানুষ আজ তার কর্মজীবনে এতটাই নিমজ্জিত ও ব্যতিব্যস্ত যে তারা আল্লাহ ও পরকালের কথা একদম ভুলেই গেছে। এই যুগে মানুষের অস্তিত্বের বাস্তবতা বুঝা, চিন্তা করা ও স্মরণ করা আরো বেশি প্রয়োজন। আমাদের হাইটেক আধুনিক জীবনেও সালাত ততটাই গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারি যতটা ইসলামের সূচনালগ্নে ছিল।
টিকাঃ
২০ সূরা তোয়াহা: ১৪।
📄 সালাত : শয়তানের বিরুদ্ধে একটি ঢালস্বরূপ
মহান আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুর'আনুল কারিমে ইরশাদ করেন-
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ.
"নিশ্চয় সালাত আল ফাহশা (অর্থাৎ প্রত্যেক কবিরা গুনাহ, যিনা, অশ্লীলতা ইত্যাদি) এবং আল মুনকার (অর্থাৎ কুফর, শিরক এবং প্রত্যেক শয়তানী কর্ম ইত্যাদি) থেকে বিরত রাখে”।”২১
নিম্নোক্ত ঘটনায় বিষয়টি আরো সহজে বুঝা যাবে-
একদা মদ্যপান, জুয়া ও চুরি-ডাকাতিতে অভ্যস্ত একজন ব্যক্তি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন। তাঁর নিকট কিছু উপদেশ চাইলেন, যাতে নিজ চরিত্রে পরিবর্তন আনতে পারেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে খুব সাধারণ এক উপদেশ দেন; “কখনো মিথ্যা বলবে না"। তারপর তাকে পরের দিন এসে অবস্থা জানাতে বলা হল। লোকটি চলে গেলেন। তিনি খুব আনন্দ অনুভব করছিলেন। তার নিকট এই সাধারণ নির্দেশ পালন করা খুব সহজ মনে হচ্ছিল। বাসায় এসে ব্যক্তিটি গ্লাসে মদ ঢাললেন এবং গ্লাসটি ঠোঁটে লাগালেন, হঠাৎ তার স্মরণ হল আগামীকালকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পুরো রিপোর্ট দিতে হবে। তাকে আজকের দিনের সব কাজের কথা জিজ্ঞেস করা হবে। যদি তিনি সকল সাহাবাদের সামনে মদ পানের কথা স্বীকার করেন তাহলে তা তার জন্য অত্যন্ত লজ্জাকর হবে।
আর তিনি যদি মদ পান করার কথা অস্বীকার করেন, তাহলে তা হবে মিথ্যা কথা। তাই তিনি মদের গ্লাস রেখে দেন। একই ঘটনা ঘটে অন্যান্য বিষয়ের ক্ষেত্রেও। যখন তিনি জুয়ার আসরে বসেন এবং ডাকাতি করতে যান একই চিন্তা তার মাথায় আসে, এবং তিনি তা থেকে বিরত থাকেন। এটা ছিল ওই ব্যক্তির নফসের বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রথম পদক্ষেপ। এভাবে তিনি দ্রুত নিজের চরিত্রে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হন।
সালাতেরও রয়েছে একই রকম প্রভাব। যদি একজন ব্যক্তির স্মরণে থাকে যে তাকে দিনে ৫ বার 'মুসল্লায়' দাঁড়াতে হবে এবং প্রার্থনা করতে হবে, তাহলে তা তাকে শয়তান প্ররোচনা দেয় এমন সকল পাপকর্ম থেকে হিফাজত করবে।
অবশ্যই সালাতের মান ভালো হতে হবে। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবহেলায় নামায পড়লে তা থেকে কোনো উপকার পাওয়া যায় না। একটি দালানের কথা ভাবুন—যার স্থাপনা খুব শক্ত, তৈরি হয়েছে উন্নত কাঁচামাল দিয়ে, রয়েছে চারটি শক্ত দেয়াল ও মজবুত ছাঁদ। এমন দালান যেকোনো বৈরী আবহাওয়ায়, ঝড়-তুফানে টিকে থাকতে সক্ষম। সর্বোপরি ইমারত বানানোর উদ্দেশ্যেই তো হল নিরাপদ আশ্রয় এবং প্রতিকূল পরিবেশ থেকে রক্ষা পাওয়া। অন্যদিকে যদি ইমারতের ভিত্তি দুর্বল হয়, তাহলে তা এমন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে পারবে না।
এখন সালাতের কথা ভাবুন। যদি সালাত নিয়মিত, যথাযথ সময়ে, কিরাত বুঝে বুঝে, সম্পূর্ণ মনোযোগ ও একাগ্রতার সাথে পড়া হয় তাহলে তা মানুষের ঈমানকে মজবুত ও দৃঢ় করবে, বিপদের সময়ে তা শক্তি যোগাবে, চক্ষু শীতল করবে, অন্তর শান্তি ও স্বস্তিতে ভরে উঠবে।
অন্যদিকে অনিয়মিত, অবহেলায় পড়া সালাত বিপদের সময়ে মানুষের তেমন কাজে আসবে না। এমন সালাত তার মনে প্রশান্তি বয়ে আনতে পারবে না। মনে রাখতে হবে, স্বাস্থ্যবান দেহ দুর্বল দেহের তুলনায় খুব সহজে ভাইরাস প্রতিরোধ করতে পারে।
টিকাঃ
২১ সূরা আনকাবুত : ৪৫।