📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ক্রুসেডারদের সাথে সালাহউদ্দীনের আচরণ

📄 ক্রুসেডারদের সাথে সালাহউদ্দীনের আচরণ


জেরুজালেম ত্যাগ করা ও মুক্তিপণ পরিশোধ করার জন্য সালাহউদ্দীন ক্রুসেডারদেরকে কাগজে-কলমে কঠোর কিছু শর্ত দিয়েছিলেন ঠিকই; কিন্তু বাস্তবে সেই যালিম-লুটেরা ক্রুসেডারদের সাথে দয়ালু আচরণ করে ইসলামী সদাচরণের ব্যবহারিক শিক্ষা দিয়ে দিয়েছেন। কোনো যিম্মি (মুসলিম শাসনাধীনের অনুগত অমুসলিম) বা সাধারণ জনগণের উপর অন্যায়ভাবে তলোয়ার চালানোর কোনো ঘটনা পাওয়া যায় না।

সালাহউদ্দীন যখন দেখলেন বিপুল সংখ্যক মানুষ তাদের বৃদ্ধ পিতামাতাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে যাচ্ছে, বিশাল বিশাল মালামাল কষ্ট করে বহন করছে, তাঁর তা সহ্য হয়নি। তিনি তাদের জন্য যাতায়াত খরচ ও সওয়ারির ব্যবস্থা করে দেন।

নারীদের প্রতি সালাহউদ্দীন সম্মানসূচক আচরণ করেন। বাইজেন্টাইন সম্রাটের এক ধনাঢ্য স্ত্রী সেখানে এক আল্লাহর জন্য উপাসনালয় স্থাপন করে সন্ন্যাসজীবন যাপন করতেন। তাঁর প্রচুর অনুসারী ছিলো। সালাহউদ্দীন তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদেরকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে দেন। রাণী সিবিল তাঁর অনুসারীদের সহ যাত্রা করার অনুমতি চাইলে সালাহউদ্দীন সে ব্যবস্থা করে দেন। তাঁর স্বামী নাবলুসে কারাবন্দী ছিলেন। সালাহউদ্দীন তাঁকে স্ত্রীর সাথে সঙ্গ দেওয়ার অনুমতি দেন। সন্তান কোলে অসংখ্য নারী রাণীর পেছন পেছন আসে। তারা তাদের কারাবন্দী পুরুষ অভিভাবকদের ব্যাপারে মিনতি করে বলে, “হে সুলতান! আপনি তো দেখতেই পাচ্ছেন আমরা চলে যাচ্ছি। আমরা ওই বন্দীদের কারো মা, কারো স্ত্রী, কারো কন্যা। আমরা এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি আর আমাদের অভিভাবকদের ওই কারাগারের আঁধার প্রকোষ্ঠে ফেলে রেখে যাচ্ছি। আপনি যদি তাদের হত্যা করে ফেলেন, তাহলে তো আমাদের জীবন ধ্বংস হয়ে গেলো। আর আপনি যদি তাদের মুক্তি দিয়ে দেন, তাহলে আমাদেরকে অনুগ্রহ করলেন এবং দারিদ্র্য ও দুঃখ-কষ্ট থেকে উদ্ধার করলেন।”

এ কথায় সালাহউদ্দীন প্রচণ্ড আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি মায়েদের পুত্রদেরকে, স্ত্রীদের স্বামীদেরকে এবং কন্যাদের পিতাদেরকে মুক্ত করে দেন। সেই সাথে বাদ বাকি বন্দীদের সাথে সদাচরণের প্রতিশ্রুতি দেন।

স্টিভেনসনের বর্ণনামতে, সুলতান বিপুল সংখ্যক মানুষকে মুক্তিপণ ছাড়াই যেতে দেন। আর্নল্ডের সূত্রে পুল বর্ণনা করেন যে, বিকলাঙ্গ ও গরীবদেরকে মুক্তিপণ ছাড়াই সুলতান বেরিয়ে যেতে দেন। ধর্মগুরু ও ধনীদেরকে সাধ্যমতো সম্পদ সাথে করে নেওয়ার অনুমতি দেন। তারা যতটুকু বহন করতে পারছিলো না, মুসলিমরা তা বহন করতে সাহায্য করে।

সালাহউদ্দীনের ভাই আল-মালিক আল 'আদিল সাত হাজার বিকলাঙ্গ ও গরীব লোকের পক্ষে মুক্তিপণ মওকুফের সুপারিশ করেন। সালাহউদ্দীন দশ হাজারের জন্য অনুমতি দিয়ে দেন।

হাত্তিনের বিজয়ের পর সালাহউদ্দীন ফ্র্যাংকদের সাথে যে আচরণ করলেন তা তাদের নিজেদের মধ্যকার সংঘর্ষ ও প্রথম ক্রুসেডে মুসলিমদের উপর চালানো তাদের পাশবিকতার সাথে অতুলনীয়।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ মিলের সূত্রে প্রিন্স 'আলী বর্ণনা করেন যে, জেরুজালেম ত্যাগ করে অনেকে আশ্রয়ের সন্ধানে খ্রিষ্টান শাসিত এন্টাকিয়ায় যায়। সেখানকার সম্রাট তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করে তাড়িয়ে দেয়। তারা অবশেষে মুসলিম ভূমিগুলোর দিকে যাত্রা করে এবং মুসলিমরা তাদের অভূতপূর্ব আদর-আপ্যায়ন করে। প্রিন্স 'আলী আরো বলেন:
“জেরুজালেম ত্যাগ করে তাদের খ্রিষ্টান ভাইদের কাছে আশ্রয় চাওয়ার পর তাদের কেমন শোচনীয় অবস্থা হয়, তা জানা যায় মিশহুদের বর্ণনা থেকে। তারা শামে গিয়ে অনাহার ও দারিদ্র্যক্লিষ্ট হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করে। ত্রিপোলিও তাদের মুখের উপর দরজা বন্ধ করে দেয়। এক নারী অভাবের তাড়নায় তার সন্তানকে সাগরে ছুঁড়ে ফেলতে বাধ্য হয় আর এরকম বিপদের সময় এতটুকু এগিয়ে না আসায় খ্রিষ্টানদেরকে লা'নত দিতে থাকে।”

ধনাঢ্য প্যাট্রিয়ার্ক তাঁর বিপুল সম্পদ ও গাট্টিবোঁচকা নিয়ে কেটে পড়েন, অথচ গরীব ক্রুসেডারদের মুক্তিপণের কোনো ব্যবস্থা করলেন না। পুল তাঁকে একজন কাণ্ডজ্ঞানহীন লোক বলে অভিহিত করেন। সালাহউদ্দীনকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, “আপনি তাঁর সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে তা মুসলিমদের শক্তিবৃদ্ধিতে কাজে লাগালেন না কেন?” তিনি জবাব দেন, “(চুক্তি ভেঙে) তাঁর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা (বিপুল সম্পদ লুট) করার চেয়ে (চুক্তির শর্তানুযায়ী) দশটি দিনার নেওয়াই আমার বেশি পছন্দের।” এ ব্যাপারে পুলের মূল্যায়ন, “মুসলিম সুলতান খ্রিষ্টান যাজককে সত্যিকারের নৈতিকতা ও সততার সবক দিয়ে ছাড়লেন।"

প্রথম ক্রুসেডে মুসলিম ও ইসলামের সাথে ক্রুসেডারদের আচরণ, গণহত্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও রক্তবন্যার বর্ণনা তো পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলোতেই আলোচিত। হয়েছে। ৪৯২ হিজরি তথা ১০৯৯ খ্রিষ্টাব্দে তাদের হাতে চলা এসব নির্মমতার কথা ইতিহাসে লিপিবদ্ধ আছে। তারা জেরুসালেমে প্রবেশের পর কী ঘটেছে, তা মিশহুদের বর্ণনা থেকে মিলের সূত্রে বর্ণনা করেন প্রিন্স 'আলী:
“মুসলিমদেরকে রাস্তাঘাটে ও ঘরের ভেতর হত্যা করা হয়। কেউ কেউ গণহত্যা থেকে বাঁচার জন্য উঁচু দালানের ছাদ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যরা কেল্লা, প্রাসাদ, এমনকি মাসজিদেও লুকিয়ে আশ্রয় নেয়। কিন্তু খ্রিষ্টানরা খুঁজে খুঁজে তাদেরকে বের করে আনে। পদাতিক ও অশ্বারোহীরা মুসলিমদের লাশের উপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে আশ্রয়সন্ধানী পলাতকদের খুঁজে বেড়ায়।”

মিশহুদের সূত্রে প্রিন্স 'আলী আরো বর্ণনা করেন:
“যেসব মুসলিমদের সম্পদ লুট করার জন্য জীবিত রাখা হয়েছিলো, তাদেরকে পরে হত্যা করা হয়। অন্যদেরকে জীবিত পুড়িয়ে মারা হচ্ছিলো। অনেকে আতংকে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পড়ে যায়। অন্যদেরকে লুকানোর জায়গা থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে প্রকাশ্যে অন্যান্য লাশের উপর এনে মারা হয়। যেই স্থানে ঈসা (আলাইহিস সালাম) তাঁর শত্রুদেরকে ক্ষমা করেছিলেন, তা নারী-শিশুর কান্না ও লাশে ভরপুর হয়ে যায়।”

মিল আরো বলেন, “বিনা অপরাধে নিহতদের প্রতি কোনো দয়া করা হয়নি। সত্তর হাজার নিরীহ লোককে হত্যা করা হয়।”

সালাহউদ্দীনের মতো করে শত্রুদেরকে ক্ষমা ও দয়া কি আর কোনো বিজয়ী বীর করেছে? ক্রুসেডারদের মতো ভয়াল আচরণ কি সালাহউদ্দীনের মধ্যে আছে? আল্লাহ সেই কবিকে রহম করুন যিনি বলেছেন:
জেরুজালেমে আমাদের শাসন ছড়িয়েছে ন্যায়বিচার,
তোমাদের (ক্রুসেডারদের) শাসনে হয়েছে সেথায় হত্যা- বলাৎকার।
তোমরা করেছো বন্দী হত্যা, আমরা করেছি দয়া,
ফারাক বোঝাতে লাগে না কোনো উপমা নয়া।

আটাশি বছরের ব্যবধানে সাধারণ মুসলিমদের প্রতি ক্রুসেডারদের আচরণ আর সাধারণ ক্রুসেডারদের প্রতি মুসলিমদের আচরণ ইতিহাসের শিক্ষার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

টিকাঃ
[৩০] পুরো নাম জোসেফ স্টিভেনসন। সালাহউদ্দীনকে নিয়ে লেখা তার বইয়ের নাম 'De Expugatione Terrae Sanctae per Saladinum: Capture of Jerusalem by Saladin, ১১৮৭'- সম্পাদক
[৩১]. লেন পুল, স্টেনলে লিখিত 'Saladin and the Fall of the Kingdom of Jerusalem' একটি বিখ্যাত বই। সাইয়্যেদ আবুল হাসান আলী নদভী (রহঃ) সালাহউদ্দীনের জীবনীতে (সংগ্রামী সাধকদের ইতিহাস, ১ম খণ্ড) এই বই থেকে অনেক উদ্ধৃতি দিয়েছেন। -সম্পাদক
[৩২] পুরো নাম জেমস মিল। তিনি একাধারে ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ এবং দার্শনিক ছিলেন। 'The History of British India' মিলের লেখা একটি বিখ্যাত বই। -সম্পাদক

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 অ্যাকর অবরোধ ও তৃতীয় ক্রুসেড

📄 অ্যাকর অবরোধ ও তৃতীয় ক্রুসেড


আগেই বলা হয়েছে যে ক্রুসেডাররা জেরুজালেম ও অ্যাকর ছেড়ে মুসলিম সেনাদের তত্ত্বাবধানে লেবাননের টায়ারে চলে যায়। ক্রুসেডাররা শান্তিচুক্তি করেও পরে তা ভঙ্গ করে। তারা টায়ারে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সালাহউদ্দীনের সাথে করা সমঝোতা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপ থেকে আসা মিত্রবাহিনী ও রসদের উপর নির্ভর করে তারা অ্যাকর অবরোধ করে। উভয় পক্ষের অভূতপূর্ব সাহসিকতা ও দৃঢ়তার কারণে দুই বছর স্থায়ী এই অবরোধ ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

৭ই রজব ৫৮৫ হিজরি মোতাবেক ১১৮৯ খ্রিষ্টাব্দে ক্রুসেডাররা অ্যাকরের দিকে অগ্রসর হয় এবং স্থল ও জলপথে একে অবরোধ দিয়ে রাখে। মুসলিম সেনাবাহিনী পরে এসে ক্রুসেডারদের উপর স্থলপথে অবরোধ বসায়। তাল কিসান নামক এক পাহাড়ে সালাহউদ্দীন শিবির স্থাপন করেন। উভয় পক্ষের মধ্যে দাঙ্গা ও সম্মুখযুদ্ধ লেগে পরিস্থিতি আস্তে আস্তে উত্তপ্ত হতে থাকে। সালাহউদ্দীন কিছু সৈনিককে তাঁর রাজ্যের সীমান্তে পাঠিয়ে জনগণকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করার নির্দেশ দেন। এদিকে জেরুজালেম হাতছাড়া হওয়ার খবরে হতাশ ইউরোপ ক্রুসেডারদের জন্য নতুন উদ্যমে রসদ পাঠায়।

ক্রুসেডাররা অ্যাকর অবরোধ করে রাখার সময় ইউরোপ তৃতীয় ক্রুসেডের প্রস্তুতি নেয়। বিশেষত একের পর এক পরাজয় তাদেরকে অস্থির করে তুলেছিলো। তৃতীয় ক্রুসেডে নেতৃত্বদাতা রাজাদের কারণে এই যুদ্ধ আলাদা গুরুত্ব লাভ করে। তাঁরা হলেন জার্মান সম্রাট ফ্রেডেরিক বারবারোসা, ফ্রেঞ্চ রাজা ফিলিপ অগাস্টাস এবং ইংলিশ রাজা রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 জার্মান প্রচেষ্টা

📄 জার্মান প্রচেষ্টা


জার্মান সম্রাট এবং তাঁর এক লক্ষ সেনা হাঙ্গেরি হয়ে কন্সটান্টিনোপলের দিকে যাত্রা করে। বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় আইজ্যাক প্রবল ভীত হয়ে পড়েন এবং তাঁদেরকে সাহায্য করতে ও পথ দেখাতে অস্বীকৃতি জানান। দ্বিতীয় আইজ্যাক সালাহউদ্দীনকে জার্মানদের অগসর হওয়ার কথা জানিয়ে দেন এবং তাদেরকে সাহায্য করতে নিজের অস্বীকৃতির কথা জানান। জার্মান বাহিনী এশিয়া মাইনর দিয়ে পার হয়। আর্মেনিয়া পর্বতমালায় অবস্থানকালে সালিফ নদীতে ডুবে সম্রাটের মৃত্যু হয়। ফলে জার্মান বাহিনী ছন্নছাড়া হয়ে যায়। কেউ জার্মানিতে ফিরে যায় আর কেউ সম্রাটের ছেলে ফ্রেডেরিকের নেতৃত্বে জাহাজে করে অ্যাকর ও টায়ারে আসে। পথিমধ্যে ফ্রেডেরিকের মৃত্যু হলেও অল্প কিছু জার্মান সেনা অ্যাকরে পৌঁছায়। পূর্ণশক্তি নিয়ে তারা আসতে পারলে লড়াই ভীষণ জমে উঠতো।

📘 সালাহউদ্দীন আইয়ুবী > 📄 ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজ সেনাবাহিনী

📄 ফ্রেঞ্চ ও ইংরেজ সেনাবাহিনী


ফ্রেঞ্চ ও ইংলিশ সেনাবাহিনী সিসিলিতে মিলিত হয়। উভয় দলের মতানৈক্যের কারণে তারা সেখানে দীর্ঘসময় অবস্থান করে। এদিকে অ্যাকরে অবস্থানরত ক্রুসেডাররা তাদের অপেক্ষায় থাকে। অবশেষে ক্রুসেডাররা সিসিলি ছেড়ে অ্যাকরের দিকে যাত্রা করে। দশ দিনের ব্যবধানে ইংরেজরাও রওনা দেয়। অ্যাকরের ক্রুসেডাররা ফ্রেঞ্চদের আগমনে বেশ আনন্দিত হয়।

ইংরেজ রাজা রিচার্ডের বাহিনী ঝড়ের কবলে পড়ে বাইজেন্টাইন সম্রাটের নিয়ন্ত্রণাধীন সাইপ্রাসে গিয়ে পড়ে। রিচার্ড দ্য লায়ন-হার্ট বাইজেন্টাইনদের সাথে লড়াই করে সাইপ্রাস দখল করে নেন এবং সেখানে কিছুদিন অবস্থান করেন। সালাহউদ্দীনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া জেরুজালেমের রাজা রিচার্ডের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে তিনি অ্যাকরে জাহাজ ভেড়ান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00