📄 যাদু: স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটানো
আমাদের সমাজে এমন মানুষ ও আছে যারা কারো সুখ-স্বাচ্ছন্দ, উন্নতি সহ্য করতে পারে না। তারা হিংসা ও বিদ্বেষ বশত দু ব্যক্তির মাঝে যাদু করে বিচ্ছেদ ঘটায়। এ প্রকারের যাদু কয়েক ধরনের হয়ে থাকে যেমন-
• পিতা ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছেদ।
• মা ও সন্তানের মাঝে বিচ্ছেদ।
• দু ভাইয়ের মাঝে বিচ্ছেদ।
• দু বোনের মাঝে বিচ্ছেদ।
• বন্ধু ও স্বজনদের মাঝে বিচ্ছেদ।
• স্বামী স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ।
শেষোক্ত প্রকারটি আমাদের সমাজে অধিক প্রচলিত, এবং এটাই এখনকার আমাদের আলোচ্য বিষয়।
এই যাদু যেভাবে করা হয়
নির্দিষ্ট ব্যক্তি যখন যাদুকরের কাছে গিয়ে বলে, অমুক দুই ব্যক্তির মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে হবে; তখন যাদুকর বলে, তাহলে তাদের মায়ের নাম, তাদের ব্যবহৃত পোষাক, চুল ইত্যাদি নিয়ে আস। আর যদি এসব না পাওয়া যায়, তবে তাদের খাদ্যদ্রব্যে যাদুমন্ত্র পড়ে ফুঁক দেয় বা তাদের চলাচলের পথে যাদুকৃত পানি ঢেলে দেয়া হয় যা অতিক্রম করা মাত্রই উক্ত ব্যক্তি যাদুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যায়। বা অভিনব অন্য কোন পন্থায় যাদু করা হয়।
এই যাদুর লক্ষণসমূহ:
• যাদুগ্রস্তের নিকটে অপরজনের প্রত্যেক কর্মই অপছন্দ হওয়া। যেমন স্বামী বাড়ির বাইরে অধিক ভালো থাকে, ঘরে ঢুকলেই অন্তরে সংকীর্ণতাবোধ অনুভব করে। [জগৎবিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ তাফসীরে ইবনে কাছীরের মুসান্নিফ আল্লামা ইবনে কাছির রহিমাহুল্লাহ বলেন, "স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছিন্নতার প্রতি কৃত যাদুর প্রতিক্রিয়ায়, যাদুগ্রস্ত অপরজনকে খারাপ নজরে দেখবে বা সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখবে বা এ জাতীয় অনান্য বিচ্ছেদ সৃষ্টিকারী বিষয়ে পতিত হবে,]
• স্বামী স্ত্রীর মাঝে সামান্য বিষয়কে কেন্দ্র করে অতিরিক্ত মতানৈক্য সৃষ্টি হওয়া।
• হঠাৎ করে ভালোবাসা শত্রুতায় পরিনত হওয়া।
• উভয়ের মধ্যে বেশি বেশি সন্দেহ সৃষ্টি হওয়া।
• কারো মাঝে ক্ষমা চাওয়ার মানষিকতা না থাকা।
• স্বামীর কাছে স্ত্রীর সৌন্দর্য অসুন্দরে পরিনত হওয়া। যদিও সে অত্যন্ত রূপসী হোক না কেন। এবং স্ত্রীর কাছে স্বামীকে নিকৃষ্ট মনে হওয়া।
এই যাদুর চিকিৎসা
শুরুতে যিনি চিকিৎসা করবেন তিনি রোগীর মাথায় ডান হাত রাখবেন এবং নিচের বুকইয়াহর আয়াতসমূহ রোগীর কানের কাছে উচ্চস্বরে সতর্কতার সাথে বিশুদ্ধ উচ্চারণে পড়তে হবে।
টিকাঃ
[১০১] তাফসীরে ইবনে কাসীর খণ্ড ১ পৃঃ ১৪৪
📄 যাদু: স্বামীকে বশ করা
এই ধরনের যাদু যে কারণে করা হয়- স্বামী স্ত্রীর মাঝে মনোমালিন্য হতে পারে। ভুল বুঝাবুঝি হতে পারে। যা পৃথিবীর সকল দেশের সকল সমাজের সকল মানুষের মাঝে রয়েছে। সংসার জীবনে চলতে গেলে একটু আধটু সমস্যা হতেই পারে। এবং এটা স্বাভাবিক।
কিন্তু কিছু কিছু নারী রয়েছে, যারা এই সামান্য সংকট কাটিয়ে উঠার মতো ধৈয্য ধারণ করতে পারে না। তারা চায়; স্বামী কেন আমার মতের বিরোধী হবে। তার মনে কুৎসিত চিন্তা ভেসে উঠে।
সে রঙিন স্বপ্ন দেখে, মনে মনে ফন্দি আটতে থাকে, স্বামীকে আমার বশে আনতে হবে। সে শুধু আমি যা বলবো তাই শুনবে। আমার কথায় চলবে। এর জন্য যা করা দরকার আমি তাই করবো। এরপর সে, কোনো যাদুকরের সন্ধানে ছুটে যায় স্বামীকে যাদু করে বশ করার জন্য। অথচ সে একথা চিন্তাও করে না যে এ কাজটি কি ঠিক হবে? ইসলাম এ কাজটিকে কি সমর্থন করে? হালাল, নাকি হারাম? এ বিষয়ে তার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। তার চিন্তা শুধু একটিই, কীভাবে স্বামীর ভালোবাসা অধিক মাত্রায় আদায় করা যায়। অনেক সময় স্বামীর সম্পদের প্রতি স্ত্রী লোভাতুর হয়েও স্বামীকে যাদু করে থাকে। আবার অনেক স্ত্রী ধারনা করে যে, স্বামী মনে হয় অন্যত্র বিয়ে করবে; স্বামী যেন শুধু তাকেই পছন্দ করে, এজন্য স্বামীকে বশে রাখার জন্য সে স্বামীকে যাদু করে।
এই যাদু যেভাবে করা হয়
যখন সে যাদুকরের কাছে যায়, যাদুকর তাকে বলে এটা তেমন কোনো কঠিন কাজ নয়। আপনি শুধু আপনার স্বামীর ব্যবহৃত কিছু একটা এনে দিন ব্যস।
এরপর সে স্বামীর ব্যবহৃত জামা, গেঞ্জি, বা টুপি বা এজাতীয় কিছু এনে দেয়, যাতে স্বামীর শরীরের স্পর্শ বা ঘামের গন্ধ থাকে। এরপর যাদুকর তা থেকে সূতা বের করে শিরকি মন্ত্র পাঠ করে, তাতে ফুঁক দিয়ে গিরা লাগিয়ে দেয়। এবং ওই নারীকে বলে, এই সুতা গুলো কোথা ও পূতে রাখবেন। অথবা সে কোনো খাদ্যদ্রব্য বা পানীয়তে শিরকী মন্ত্র পড়ে ফুঁক দিয়ে দেয়। এ যাদুর আরো একটি নিকৃষ্ট পদ্ধতি রয়েছে তা হল, মহিলাদের হায়েজের রক্ত দিয়ে যাদু করে। তারপর ঐ নারীকে বলা হয় স্বামীকে যে কোন উপায়ে খাইয়ে দিবে বা সুগন্ধির সাথে মিশিয়ে দিবে।
কখনো হিতে বিপরীত হয়
• কখনো এই যাদুর ক্রিয়ায় উল্টো ফল আসে। যেমনঃ ঐ নারী যাদু করেছিল স্বামী যেন সব নারীকে ঘৃনা করে, শুধু তাকেই ভালোবাসে। প্রতিক্রিয়ায় দেখা যায় স্বামী আপন মা বোন আত্মীয় স্বজন মহিলা এমন কি শাশুড়ি, শালীকেও ঘৃনা করতে থাকে।
• কখনোবা দ্বিমুখী যাদুর ক্রিয়ায় স্ত্রীকেও ভালোবাসার পরিবর্তে ঘৃনা করতে থাকে।
• কখনো বা যাদুর প্রচন্ডতায় স্বামী রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। এমন কি রোগের ধারাবাহিকতা অনেক দীর্ঘ মেয়াদী হয়ে থাকে। কখনো মৃতুও ঘটে।
এই প্রকার যাদুর লক্ষণ সমূহ:
• স্ত্রীকে দেখার জন্যে অস্থির হয়ে যাওয়া।
• স্ত্রীর বশীভূত ও অনুগামী হয়ে যাওয়া।
• সহবাস করার জন্য অধৈয্য হয়ে যাওয়া।
• সর্বদা অস্থির অস্থির ভাব লেগে থাকা।
• স্ত্রীর বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললে ক্ষেপে যাওয়া।
এই যাদুর চিকিৎসা
নিচের বুকইয়াহ রোগীর কাছে পাঠ করতে হবে। প্রথমবার ফলাফল ভালো না পাওয়া গেলে প্রয়োজনে একটানা সাতদিন বুকইয়াহর আমাল করতে হবে।
📄 যাদু: অবৈধ আসক্তিকরণ (মোহাসক্তি, পরকীয়া, পর্ণ আসক্তি, হস্তমৈথুন ইত্যাদি)
আমাদের সমাজে এমন মানুষের নজিরও পাওয়া যায়, যারা শত্রুতা বা হিংসার বশবর্তী হয়ে কারণে অকারণে নির্দিষ্ট পুরুষ বা নারীকে মানুষ বা সমাজের চোখে হেও প্রতিপন্ন করার মানসে এমন জঘন্যতম নিকৃষ্ট পন্থা অবলম্বন করে থাকে।
এই ধরনের যাদুর প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
এই ধরনের যাদুতে মাদকাসক্তি, পরকীয়া, পর্ণআসক্তি, হস্তমৈথুনসহ ভয়ঙ্কর সব বদাভ্যাসের প্রতি আসক্ত করা হয়। যিনি আক্রান্ত হন হয়ত এই বদাভ্যাস আগে থেকে একটু আধটু তার মধ্যে ছিল। যাদুকর এই সুযোগটিই কাজে লাগায়। সে শুধু এই এহেন দুষ্কর্ম ও ব্যক্তির মাঝে আসক্তি বা প্রেম লাগিয়ে দেয় ব্যস। এতে তার কাছে এহেন কুৎসিত কু-অভ্যাস অত্যন্ত ভালোবাসায় পরিণত হয়ে যায়। তখন তার হিতাহিত জ্ঞান লোপ পেয়ে যায়। এমনকি এই কঠিন ভয়ানক গুনাহর কাজের মধ্যে সে শান্তি অনুভব করে। অত্যাধিক আসক্তির কারণ সে ব্যক্তি নিজেই বুঝতে পারে না। কখনো যদি সে এই বদকর্মে বাধা প্রাপ্ত হয়, তখন সে দিশেহারা হয়ে যায়, এবং সে ততক্ষণপর্যন্ত স্বস্তি অনুভব করে না যতক্ষণ-না সে উক্ত পাপকাজে লিপ্ত হতে পারে। ফলশ্রুতিতে তার দ্বীন, ঈমান, স্বাস্থ্যের, যে অবনতি ঘটে সেটা তো সে ভূক্ষেপই করে না। অনেক সময় এই ধরনের রোগীর করুণ মৃত্যুও ঘটে।
এইসব যাদুর ধরণ এরকম হয়ে থাকে-
> হঠাৎ মাদকাসক্ত হয়ে পড়া। অত্যন্ত পরকীয়ায় আসক্তি। অত্যাধিক পর্ন দেখা বা হস্তমৈথুনের বদাভ্যাস। এবং কোন নেশাদ্রব্য বা বস্তুর প্রতি অত্যাধিক আসক্তি।
এ ধরনের রোগীর শারীরিক কিছু লক্ষণ হলো-
-চোখের নিচে কালচে দাগ পড়া।
-শরীর ভেঙ্গে যাওয়া।
-সর্বদা বুক ধড়ফর করা।
-নির্দিষ্ট আসক্তি ছাড়া কোন কিছু ভালো না লাগা।
-কোন কাজে কর্মে মন না বসা।
-অধিকাংশ সময় মাথা চক্রাকারে ঘুরতে থাকে এমন অনুভব হওয়া।
এই যাদু থেকে বেঁচে থাকার উপায়
এই যাদু থেকে বেঁচে থাকতে হলে- প্রথমে অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকতে হবে। এরপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত জামাতের সাথে আদায় করতে হবে। কোন গুনাহের বদাভ্যাসে লিপ্ত হওয়া যাবে না, লিপ্ত থাকলে তাওবা করতে হবে। কোন না মাহরাম নারীর প্রতি দৃষ্টি দেয়া যাবে না। একাকী থাকলে কোন দ্বীনী কাজ বা যিকর করতে হবে। অসৎ বন্ধুবান্ধব থেকে দূরে থাকতে হবে। মনে কুচিন্তা জাগলে ইসতেগফার পড়তে হবে। পরকালে আল্লাহর সামনে জবাবদিহিতার ভয় মনে জাগ্রত রাখতে হবে।
এই রোগীর ক্ষেত্রে প্রথমে সিহরের কমন রুকইয়াহ'র আয়াত পাঠ করতে হবে।
📄 রক্ত স্রাবের যাদু
এই ধরনের যাদু দ্বারা শুধু মাত্র নারীরাই আক্রান্ত হয়। যেসব নারীকে স্রাব প্রবাহিত করিয়ে যাদু করা হয়, যাদুকর সে নারীর শরীরে জিন প্রেরণ করে, সেই জিন তখন তার রগে রগে চলতে থাকে। হাদীসঃ নাবি সালাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "শয়তান আদম সন্তানের ভেতরে রক্ত প্রবাহের ন্যায় প্রবাহিত হয়,। জিন যখন নারীর জরায়ুর বিশেষ রগ পর্যন্ত পৌছে যায় তখন সেটাকে আঘাত করে; যার ফলে সেই রগ থেকে রক্ত প্রবাহিত হতে থাকে, নাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামনা বিনতে জাহাশের ইস্তেহাজা বিষয়ে প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, "এটাতো রগের রক্ত হায়েজ নয়,। হাদিসের উভয় বর্ণনা দ্বারা বুঝা যায় ইস্তেহাজা তখনই হয়ে থাকে যখন শয়তান নারীর জরায়ুর রগগুলোর কোন একটিতে আঘাত হানে। আল্লামা ইবনে আসীর রহিমাহুল্লাহ বলেন, "ইস্তেহাযা বলা হয় ঋতু স্রাবের নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময়ে রক্ত প্রবাহিত হলে,。
এই রোগের চিকিৎসা
[চিকিৎসা ১৪] এই রোগের রোগী কেবল নারীরাই হয়ে থাকে। তারা প্রতিদিন সকাল-সন্ধায় নিম্নোক্ত রুকইয়াহর তিলাওয়াত শুনবে। মাহরাম কেউ থাকলে সরাসরি বা অডিও শুনবে।
রক্তস্রাবের যাদুর রুকইয়াহ'র আয়াত
আল ইসরা
وَنُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْآنِ مَا هُوَ شِفَاءٌ وَرَحْمَةً لِلْمُؤْمِنِينَ وَلَا يَزِيدُ الظَّالِمِينَ إِلَّا خَسَارًا
অর্থ: ৮২) আমি কোরআনে এমন বিষয় নাযিল করি যা রোগের সুচিকিৎসা এবং মুমিনের জন্য রহমত। গোনাহগারদের তো এতে শুধু ক্ষতিই বৃদ্ধি পায়।
بِسْمِ اللهِ أَرْقِيكَ مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيْكَ مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ عَيْنِ حَاسِدٍ اللَّهُ يَشْفِيكَ بِسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ
দুয়া অর্থ: পরম করুণাময় আল্লাহ্ নামে রুকইয়াহ করছি, আপনার কাছে সমস্ত মন্দ জিনিষের খারাবি থেকে আশ্রয় চাচ্ছি! এবং হিংসাত্বক নযর থেকে আশ্রয় চাচ্ছি! হে আল্লাহ্ শিফা দান করুন পরম করুণাময় আল্লাহ্র নামে রুকইয়াহ করছি! শেষ পর্যন্ত পড়ে পানিতে ফুঁক দিয়ে সেই পানি অন্তত তিনদিন পান করবে ও তা দ্বারা গোছল করবে এরপরও যদি রক্ত প্রবাহ বন্ধ না হয় তবে “লিকুল্লি নাবিয়্যিন মুস্তাক্কর, এই আয়াতটিকে পরিচ্ছন্ন কালির মাধ্যমে লিখে পানিতে গুলিয়ে রোগী দুই অথবা তিন সপ্তাহ পান করবে ইনশাআল্লাহ্ রোগী নাজাত পেয়ে যাবে।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহিমাহুল্লাহ বৈধ কালিদ্বারা কুরআনের লিখিত আয়াতকে পানিতে মিশিয়ে সে পানি পান করা ও তা দ্বারা গোছল করার বিষয়ে স্বীয় তাফসীর গ্রন্থে জায়েজ বলেছেন।
টিকাঃ
[১০৫] নিহায়া খণ্ড ১/পৃষ্ঠা ৪৭৯
[১০৬] ফতোয়া ইবনে তাইমিয়্যাহ ১৯/৬৪