📄 জ্বিনের আছর কীভাবে বুঝবেন
সাধারণত জিন যাকে আছর করে তার মাঝে একাধিক ধরনের লক্ষণপাওয়া যায়, তবে সবগুলো লক্ষণএকসাথে পাওয়া জরুরী নয় কোনো কোনো সময় দু একটি লক্ষণপ্রকাশ পেয়ে থাকে। তবে একটি জরুরী বিষয় হলো, বদনজর জাদু, এবং জিনের প্রেসেন্টের লক্ষণসমূহ প্রায় সাদৃশ্যপূর্ণ তবে কিছু কিছু বিষয় ব্যতিক্রম।
লক্ষণসমূহ:
✓ ঘুমন্ত অবস্থায় হঠাৎ করে কেঁদে উঠা, উচ্চস্বরে কথা বলা, জোরে নিঃশ্বাস ফেলা এবং ঘুম হতে আতংকিত অবস্থায় বসে পড়া বা দাঁড়িয়ে যাওয়া।
✓ জাগ্রত অবস্থায় এমন কিছু দেখা, যা তার স্বপ্ন বলে মনে হয়।
✓ কখনো কিছুক্ষণের জন্য বেহুঁশ হয়ে যায়।
✓ কখনো মুখ থেকে ফেনা বের হয় দাঁতে খিল লেগে যায়।
✓ সবসময় ভীতু ভীতু ভাব থাকে।
✓ কখনো কখনো ভিন্ন ভাষায়, এবং বিভিন্ন ভঙ্গিতে কথা বলে।
✓ অনেক সময় তার থেকে আশ্চর্যজনক বিষয় প্রকাশ হয়ে থাকে। যেমন অল্প সময়ে সে বহুদূরে চলে যায় ইত্যাদি।
✓ অনেক সময় মেয়েদের কাছে স্বামী ঘর-সংসার সন্তানদের ভালো লাগে না।
✓ সে ইবাদাত তিলাওয়াত, জিকির ইত্যাদি পছন্দ করে না, বরং এগুলো তার অস্থিরতা বাড়িয়ে দেয়।
✓ আক্রমণাত্বক ও ভয়ংকর স্বপ্ন দেখা। যেমন: কালো কুকুর, কালো সাপ, কালো বিড়াল, অথবা পাহাড় বা উঁচু স্থান থেকে পড়ে যাওয়া অথবা পানিতে পড়ে যাওয়া।
✓ এককানে বা উভয় কানে শো শো আওয়াজ শোনা বা শরীরের ভারসাম্য না থাকার অনুভব হওয়া।
✓ সামান্য কারণে ভীষণ রেগে যাওয়া।
✓ সর্বদা ঘুমের ভাব লেগে থাকা এবং গভীর ঘুম থেকে জেগে কষ্ট অনুভব হওয়া।
✓ কোন কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করা।
✓ কেউ কথা বললে বিরক্ত মনে করা।
✓ একাকী ও নির্জনে থাকতে পছন্দ করা।
✓ এমন কোনো আশ্চর্য ধরনের দুর্গন্ধ পাওয়া যা আশেপাশে কেউ পায় না।
✓ এমন কাজ করেছে মনে হওয়া যা সে করেনি।
✓ কাজ-কর্মে বেশি বেশি ভুল হওয়া।
✓ সর্বদা মনের মধ্যে সন্দেহ ও সংশয় জাগ্রত হওয়া।
✓ দীর্ঘসময় টয়লেটে অবস্থান করা এবং কারো সঙ্গে কথা বলা।
✓ স্পষ্ট কোনো কারণ ছাড়াই দ্রুত রেগে যাওয়া ও কান্না করা।
✓ আরো বিভিন্ন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন লক্ষণ রয়েছে, যেমন- বিবাহ চেষ্টায় সফল না হওয়া বা বিবাহ আটকে থাকা ইত্যাদি।
এখানে একটি জরুরী কথা এই যে, পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া ব্যতীত দু একটি সিকনেস দেখলেই তাকে জিনে ধরেছে বলা যাবে না।
📄 জ্বিনের আছরের মেয়াদ কতদিন
মানুষের উপর জিনের আছর করার মেয়াদ চার রকমের হতে পারে-
১) জিন মানুষের পুরো শরীরের উপর প্রভাব বিস্তার করে স্বল্প সময়ের জন্য।
২) পুরো শরীর নয়, আংশিকভাবে শরীরের এক বা একাধিক অঙ্গে প্রভাব বিস্তার করে সেটাও স্বল্প সময়ের জন্যে।
৩) জিন মানুষের মস্তিষ্কের উপর প্রভাব বিস্তার করে, স্বল্প সময়ের জন্য। সেটা দূর থেকে ওয়াসওয়াসার মাধ্যমেও হতে পারে।
৪) জিন মানুষের শরীরের উপর স্থায়ীভাবে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। এর মেয়াদ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে পারে।
📄 কীভাবে জ্বিনের আছর থেকে নিরাপদ থাকবেন
আমরা এই প্রবাদ বাক্যটি জানি যে, চিকিৎসার চেয়ে সাবধান থাকাই ভালো। তো জিন আছর করার পর ট্রিটমেন্টের চেয়ে যদি পূর্ব থেকেই একটু সচেতন হওয়া যায় তবে জিনের আছর থেকে বেঁচে থাকতে পারব। ইনশাআল্লাহ আমলগুলো এই:
(এক) পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করতে হবে ও ইসলামী শরীয়াহ অনুযায়ী চলতে হবে।
(দুই) ঘরে ঢোকা ও বের হওয়ার সময় দুয়া পাঠ করতে হবে।
(তিন) প্রসাব-পায়খানাতে যাওয়ার সময় মাসনুন দুয়া পাঠ করা।
(চার) ঘরে নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত করা বিশেষ করে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করা।
(পাঁচ) নিয়মিত প্রত্যেক নামাজের পরে ও ঘুমানোর পূর্বে আয়াতুল কুরসী পাঠ করা।
(ছয়) সর্বদা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকা।
(সাত) খাবার সময় মাছনুন দুয়া আদায় করা।
(আট) নারীরা সর্বদা শরয়ী পর্দা অনুযায়ী চলা।
(নয়) নারী এবং বাচ্চারা ভর-দুপুরে ও সন্ধ্যায় বাহিরে নির্জন স্থানে বা ছাঁদে না থাকা।
(দশ) কোন গর্তে প্রসাব পায়খানা না করা।
(এগারো) ঘরে কোন মূর্তি, প্রাণীর কঙ্কাল বা এ জাতীয় কিছু না রাখা।
(বারো) কখনো যদি কোনো জিন বা এরকম কিছুর খপ্পরে পড়ে যায়, তৎক্ষণাৎ আয়াতুল কুরসী পাঠ করে আযান দিয়ে দেওয়া।
(তেরো) ঘরে আসা কোনো সাপকে মারতে বিলম্ব করা।
(চৌদ্দ) নির্জন স্থানে কোনো ময়লার স্তূপ বা আগুনের কুন্ডলির কাছে একাকী না যাওয়া।
(পনেরো) গ্রামে বা জনমানবহীন স্থানে, গভীর জঙ্গলে বা কোথাও রাতে একাকী সফর না করা।
📄 কারও বাড়িতে জ্বিনের উপদ্রব মনে হলে করণীয় কী
প্রায়শই বিভিন্ন এলাকায় নতুন বা পুরাতন কোন বাড়িঘর, ফ্লাট বা গোডাউনে অস্বাভাবিক কোন সমস্যার উপদ্রব হয় এবং অশরীরী কোন বিষয় অনুভূত হয়, যার কিছু নমুনা নিচে উল্লেখ করা হল, যেমন-
(ক) ১} কোনো টিনসেট ঘরে দিনে বা রাতে, চালে বা মাচানের উপর ঢিল ছোঁড়ার শব্দ শুনতে পাওয়া।
২} মাঝরাতে ঘরের ভেতরে বা বাহিরে করুণ কান্নার শব্দ ভেসে আসা।
৩} রাতে ঘরের বারান্দায় বা কার্নিশে অস্বাভাবিক কোন প্রাণী দেখা। যেমন বিড়াল, কুকুর সাপ ইত্যাদি।
৪} খালি ঘরে কারও উপস্থিতি টের পাওয়া কিন্তু কাউকে দেখা যায়না।
৫} ছাঁদে বা বাড়ির অন্য কক্ষে কারো হেঁটে যাওয়ার শব্দ শুনতে পাওয়া।
৬} ঘুমের মধ্যে পায়ের কাছে বা মাথার কাছে অদৃশ্য কারও স্পর্শ অনুভব হওয়া।
৭} মাঝরাতে অথবা যে কোন সময় থালাবাটি বা কোন তৈজসপত্র অকারণে পড়ে যাওয়ার শব্দ হওয়া।।
৮} মাঝেমাঝে গুমগুম চাপা শব্দ শুনতে পাওয়া।
৯} অনেকসময় ঘরের জিনিষপত্র স্থানান্তরিত হওয়া লক্ষ্য করা। যেমন, আপনি একটি জিনিষ এক জায়গায় রেখেছেন সেটি অন্যত্র দেখতে পাওয়া অথচ আপনি নিশ্চিত যে সেটি অন্য কেউ সরায়নি।। এরকম আরো অনেক সমস্যা অনুভূত হওয়া।
(খ) সর্বপ্রথম আপনাকে যে কাজটি করতে হবে তা হলো, ১} সেই বাড়ি বা ঘরের মধ্যে পুরনো তাবিজ-কবজ, মূর্তি বা মুর্তি সাদৃশ কোন বস্তু থাকলে সরিয়ে ফেলতে হবে।
২} কোন প্রাণির ছবি বা শরয়ী আপত্তিকর কোন কিছু থাকলে তৎক্ষণাৎ সরিয়ে ফেলতে হবে।
৩) সেই বাড়িতে অন্য কোন জিনের রোগী আছে কিনা জানতে হবে যদি থেকে থাকে তবে তার চিকিৎসা আগে করাতে হবে। (কেননা, কারও সাথে আসরকৃত দ্রুত জিন অনেক সময় বাড়িঘরে উৎপাত বা অন্য ব্যক্তির সমস্যা সৃষ্টি করে।)
৪) আক্রান্ত বাড়িটির কোন কামরা কখনোই বিরান ঘরের মত অন্ধকারাচ্ছন্ন রাখবেন না।
(গ) শেখ ওয়াহিদ, ওকাইয়াতুল ইনসান গ্রন্থে বলেন, আপনি যদি নিশ্চিত হন যে, বাড়িতে আসলেই কোন জিন বা কিছুর একটা আসর রয়েছে এবং এটা কারও কোন চালাকি বা কৌশল নয়, তবে মন্দ জিন বিতাড়িত করার উপায় হবে এরকম-
প্রথমত: "আপনার সাথে অন্তত দুজন লোক নিয়ে প্রথমে আপনি আক্রান্ত বাড়িতে যাবেন এবং উচ্চস্বরে একথাগুলো তিনবার বলবেন, "আমি তোমাকে ঐ শর্তে এই বাড়ি থেকে বের হওয়ার আহবান জানাচ্ছি, যেই শর্ত সুলায়মান আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। আমি আল্লাহর কছম করে তোমাকে বের হতে বলছি এবং কারও কোন ক্ষতি না করার জন্য বলছি"।
দ্বিতীয়ত: আপনার পরবর্তী কাজ হবে একটি পাত্র বা ছোট বালতিতে পরিষ্কার পানি নিয়ে তাতে এই দুয়া পাঠ করে ঘরের প্রতি কোনে কোনে ছিটিয়ে দিন। এবং অবশিষ্ট পানি প্রতি কোনে অল্প অল্প করে রেখে দিন। আপনি ঘরের মধ্যে কিছু টের পান বা না পান এতে আল্লাহ্র আদেশে তারা ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাবে। ইনশাআল্লাহ্
(ঘ) এরপর সেখানে বসে কুরআন তিলাওয়াত শুরু করে দিবেন। তিলাওয়াতের বিষয়বস্তু যে কোন সূরা বা আয়াত হতে পারে তবে বিশেষ করে সূরা বাকারা তিলাওয়াত করবেন এবং সবশেষে সূরা ফালাক নাছ পড়ে তিলাওয়াত শেষ করবেন। অবশ্য যেদিন এই আয়োজন করবেন সেদিন সেই আক্রান্ত বাড়ি বা কামরায় রাতে অবস্থান করবেন। সেখানে বিভিন্ন ইবাদাত-বন্দেগী অর্থাৎ, নফল সলাত, জিকির, তিলাওয়াত, দুয়া কান্নাকাটি ইত্যাদি করবেন। মোটকথা সেখানে একটি ইবাদাতের পরিবেশ কায়েম করে ফেলবেন।
(ঙ) পরের দিন থেকে সেই ঘরের অধিবাসী বা সদস্যদের জরুরি কিছু বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। যদি এগুলো মেনে চলা যায়, তবে আশা করা যায় আর কখনোই কোন ধরনের জিন সেখানে উৎপাত করবে না। বিষয়গুলি হলো-
১} নারী পুরুষ প্রত্যেকেই সলাতের পাবন্দি করতে হবে। কিছু কিছু নফলের অভ্যাস করতে হবে।
২} প্রতিদিন এই বাড়িতে অল্প অল্প করে হলেও কুরআন তিলাওয়াত চালু করতে হবে।
৪} বাড়ির আঙ্গিনা, বেলকুনি, বারান্দাসহ কামরা সবসময় পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
৫} ঘরের দেয়ালে কোন রকমের ছবি, প্রতিকৃতি, বা প্রানীর শিং থাকলে তা ঘর থেকে সরিয়ে ফেলতে হবে।
৬} কষ্টকর হলেও সর্বদা অযু অবস্থায় থাকতে পারলে খুবই ভালো হয়।
৭} খাওয়া-দাওয়ার পর খেয়াল রাখতে হবে ছোটবড় মাছের কাঁটা, মাংসের হাড় এবং উচ্ছিষ্ট খাবার যেন নির্দিষ্ট স্থান ব্যতীত যত্রতত্র ফেলে দেয়া না হয়।
৮} বিশেষ করে সন্ধ্যায় বা মাঝরাতে মেয়েরা এবং ছোট বাচ্চারা যেন বাড়ির ছাঁদে, নিরব জায়গায়, বাগান বা অন্ধকারচ্ছন্ন কোন কামরায় একাকী না থাকে।
৯ কোন প্রাণীকে প্রহার করা যাবে না। যেমন, কুকুর বিড়াল সাপ ইত্যাদি।
১০} ঘরের প্রত্যেক সদস্য প্রতিদিন মাসনুন দুয়া পাঠ করে ঘুমাবে।
১১} পায়খানা প্রসাবের সময় অবশ্যই দুয়া পড়ে টয়লেটে ঢুকতে হবে।