📄 রুকইয়াহ সাপ্লিমেন্টারি
এ পর্যায়ে আমরা কিছু ওষুধ এবং ঔষধি গুণসম্পন্ন লতা-পাতা ইত্যাদির সাথে পরিচিত হব, যা রুকইয়ার সাথে ব্যবহার হয়। তবে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, এগুলো রুকইয়াহ না; বরং রুকইয়ার সম্পূরক বা কার্যকারিতাবর্ধক বস্তু। রুকইয়াহ হচ্ছে সেসব কাজ, যা আমরা একটু আগে বর্ণনা করলাম। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, রুকইয়ার সাথে এসব ব্যবহার করতেই হবে, এটা আবশ্যক না। যদি এগুলো সহজলভ্য হয় এবং এর ব্যবহার সম্পর্কে আপনার যথেষ্ট ধারণা থাকে, তখন চাইলে রুকইয়ার সাপ্লিমেন্ট হিসেবে এসব ব্যবহার করতে পারেন। ১৫
১. রুকইয়ার পানি
ক. সবচেয়ে উত্তম হলো যমযমের পানি। যমযমের পানিতে শিফা রয়েছে; উপরন্তু এর ওপর রুকইয়ার আয়াত পড়া হলে তার উপকারিতা বেড়ে যায় আরও বহুগুণ।
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত
“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পৃথিবীর বুকে সর্বোত্তম পানি হচ্ছে যমযমের পানি, যাতে রয়েছে ক্ষুধার্তের জন্য খাদ্য এবং অসুস্থতার জন্য আরোগ্য।” ১৬
জাবের বিন আব্দুল্লাহ রা. কর্তৃক বর্ণিত,
“তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুনেছি, তিনি বলেছেন, 'যমযমের পানি যে নিয়তে পান করা হবে, তা তার জন্যই (কার্যকরী হবে)।” ১৭
খ. যমযমের পানির পর উত্তম হচ্ছে বৃষ্টির পানি। আল্লাহ তাআলা বলেছেন-
“আমি আকাশ থেকে বরকতময় বৃষ্টি বর্ষণ করি। আর তা দ্বারা বাগান ও ফসল উদগত করি, যা আহরণ করা হয়।” ১৮
এ ছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ঘটনা লক্ষণীয়:
“আনাস রা. বলেন, একবার আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম, তখন বৃষ্টি নামল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কাপড় প্রসারিত করলেন, যাতে সেটা পানি স্পর্শ করে। আমরা বললাম, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি বললেন, কারণ এটা তার মহান রবের নিকট থেকে এখনই এসেছে।” ১৯
গ. এই দুটোর কোনোটি না পেলে সাধারণ পানি হলেও চলবে। কিংবা বরকতের জন্য চাইলে সাধারণ পানির সাথে যমযম বা বৃষ্টির পানি মেশানো যেতে পারে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চিকিৎসার জন্য সাধারণ পানিও ব্যবহার করেছেন। (পূর্বের অনুচ্ছেদ দ্রষ্টব্য)
ব্যবহার: রুকইয়ার পানি সাধারণত পান করার জন্য এবং গোসলে ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া রুকইয়াহ চলাকালীন রোগীর ওপর তা ছিটিয়ে দেওয়া হয়। তাবীজ বা জাদুর কিছু পাওয়া গেলে সেটাকে রুকইয়ার পানিতে ডুবিয়ে নষ্ট করে ফেলা হয়। ২০
২. হিজামা (কাপিং থেরাপি)
"আনাস রা. থেকে বর্ণিত, তাকে হিজামার পারিশ্রমিক প্রদানের ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজামা করিয়েছেন। আবূ তায়বা রা. তাঁর হিজামা করেন। এরপর তিনি তাকে দুই সা' খাদ্যবস্তু প্রদান করেন। ২১ সে তার মালিকের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা বললে তার থেকে পারিশ্রমিক কমিয়ে দেয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন, তোমরা যেসব জিনিস দিয়ে চিকিৎসা করো, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে উত্তম হলো হিজামা এবং সামুদ্রিক কস্টাস।” ২২
“ইবনু আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মিরাজের রাতে আমি ফেরেশতাদের যে দলকেই অতিক্রম করেছি, তাদের সকলে আমাকে বলেছেন, হে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আপনি অবশ্যই হিজামা করবেন।” ২৩
ব্যবহার: রুকইয়ার পাশাপাশি হিজামা করানোর উপকারিতা অতুলনীয়। বিশেষতঃ জাদু বা বদনজর আক্রান্ত হওয়ার কারণে যদি অসুস্থ হয়, কিংবা অন্যান্য শারীরিক সমস্যা থাকে, তাহলে রুকইয়ার সাথে হিজামা খুবই ফলপ্রসূ। অনেকের ক্ষেত্রে হিজামা করানোর পরেই কেবল পূর্ণ সুস্থতা লাভ হয়। উল্লেখ্য যে, হিজামা একটি আরবী শব্দ, বাংলায় যাকে শিঙ্গা লাগানো বলে। আজকাল শিঙ্গার পরিবর্তে কাপের মাধ্যমেও হিজামা করানো হয়। একে কাপিং থেরাপি বলে।
৩. মধু
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"তার (মৌমাছির) পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় বের হয়, যাতে মানুষের জন্যে রয়েছে শিফা।” ২৪
"আবূ সাঈদ রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমার ভাইয়ের পেটে অসুখ হয়েছে। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে মধু পান করাও। এরপর দ্বিতীয়বার লোকটি আসলে তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। সে তৃতীয়বার আসলে তিনি বললেন, তাকে মধু পান করাও। এরপর লোকটি পুনরায় এসে বলল, আমি অনুরূপই করেছি (অন্য বর্ণনায় আছে: আমি অনুরূপই করেছি, কিন্তু সমস্যা তো বেড়ে যাচ্ছে)। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ সত্য বলেছেন, আর তোমার ভাইয়ের পেট মিথ্যা বলছে। তাকে মধু পান করাও। সে তাকে আবার মধু পান করালো। তখন সে আরোগ্য লাভ করল।” ২৫
ব্যবহার: মধু সাধারণত খাওয়ার জন্য ব্যবহার হয়, কালোজিরা আর মধু একত্রে খাওয়া প্রসিদ্ধ। তবে সুন্নাত হচ্ছে পান করা, অর্থাৎ পানিতে গুলিয়ে সেটা পান করা। এ ছাড়া বিভিন্ন ওষুধের সাথে মধু ব্যবহার হয়।
এই হাদীসের একটি বিষয় লক্ষণীয় তা হলো, 'মধু খাওয়ার পর প্রথমে সমস্যা বেড়ে গিয়েছিল'। অনুরূপভাবে রুকইয়াহ করার সময়েও অনেকের সমস্যা বাড়তে পারে, তখন চিকিৎসা বন্ধ করে দেওয়া যাবে না, নিয়ম মাফিক রুকইয়াহ করে যেতে হবে। আল্লাহর ইচ্ছায় এক সময় আরোগ্য পাওয়া যাবে।
৪. কালোজিরা
"আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত আছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা নিজেদের জন্য এই কালোজিরার ব্যবহারকে আবশ্যক করে নাও। কেননা, মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের নিরাময় এর মধ্যে রয়েছে।” ২৬
“আয়িশা রা. বর্ণনা করেছেন, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন, এই কালোজিরা মৃত্যু ব্যতীত সকল রোগের ওষুধ।” ২৭
ব্যবহার: রুকইয়াহর পাশাপাশি কালোজিরা সাধারণত মধুর সাথে খাওয়া হয়, শুধু কালোজিরাও চিবিয়ে বা পিষে খাওয়া হয়। এছাড়া কালোজিরার তেল মাথায় এবং শরীরে ব্যবহার করা হয়।
৫. অলিভ অয়েল (যাইতুনের তেল)
আল্লাহ তাআলা বলেছেন,
"..যেটি জ্বালানো হয়েছে বরকতময় যাইতুন গাছ থেকে, যা প্রাচ্যেরও নয়, পাশ্চাত্যেরও নয়।” ২৮
এই প্রসঙ্গে নিম্নোক্ত হাদীসটিও আমরা দেখতে পারি,
"আবূ উসাইদ রা. থেকে হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা যাইতুনের তেল খাও এবং সেটা শরীরে মালিশ করো। কেননা এটি বরকতময় গাছের তেল।” ২৯
ব্যবহার: রুকইয়ার সাথে অলিভ অয়েল সাধারণত শরীরে এবং মাথায় মাখার জন্য ব্যবহার হয়। ফিলিস্তিনের এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল হলে সবচেয়ে ভালো। নইলে শরীরে ব্যবহারের উপযোগী ভালো মানের যেকোনো অলিভ অয়েলই চলতে পারে।
৬. খেজুর
"সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সকাল বেলায় সাতটি আজওয়া খেজুর খাবে, সেদিন তাকে কোনো বিষ বা জাদু ক্ষতি করবে না।” ৩০
এ বিষয়ে আরেকটি হাদীস হলো,
“আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মদীনার উঁচু ভূমির অঞ্চলের আজওয়া খেজুরে আরোগ্য রয়েছে, অথবা প্রতিদিন সকালে এর আহার বিষনাশক (হিসেবে কাজ করে)।” ৩১
ব্যবহার: সিহরের অর্থাৎ জাদুর রুকইয়ার পর রোগীকে আজওয়া খেজুর খেতে পরামর্শ দেওয়া হয়। অনেক রাক্বী নিজের কাছে আজওয়া খেজুর রাখেন এবং রুকইয়ার পূর্বেই রোগীকে খেতে বলেন। ৩২
এখানে উল্লেখ্য বিষয় হলো, আজওয়া খেজুর সংক্রান্ত সব রকম হাদীস বিবেচনার পর আলিমদের মত হচ্ছে, সর্বোত্তম হলো মদীনার উঁচু অঞ্চলের আজওয়া খেজুর, এরপর মদীনার অন্য আজওয়া খেজুর, এরপর অন্যান্য এলাকার আজওয়া খেজুর। তারপর মদীনার অন্য খেজুর, শেষ বিকল্প হিসেবে উন্নতমানের যে কোনো খেজুর চিকিৎসার জন্য উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।
৭. বরই পাতা অথবা কপূর পাতা
বরই পাতা না পেলে তখন কপূর বা কপূর পাতা ব্যবহার করা যায়।
"আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আসমা রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এসে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের কেউ ঋতুস্রাব থেকে পবিত্র হয়ে কীভাবে গোসল করবে? তিনি বললেন, সে গোসলে বরই পাতা মিশ্রিত পানি ব্যবহার করবে।” ৩৩
“উম্মু আতিয়্যাহ্ আনসারী রা. থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কন্যা যাইনাব রা. ইন্তিকাল করলে তিনি আমাদের নিকট এসে বললেন, তোমরা তাকে তিনবার বা পাঁচবার বা প্রয়োজন মনে করলে তার চেয়ে অধিকবার বরই পাতা মিশ্রিত পানি দিয়ে গোসল দাও। শেষবারে কপূর (কিংবা বলেছেন: অল্প কিছু কপূর) ব্যবহার করবে।” ৩৪
ব্যবহার: বরই পাতা সাধারণত জাদুর চিকিৎসার জন্য রুকইয়ার গোসলে ব্যবহার হয়। এক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ নিয়ম হচ্ছে, ৭টি বরই পাতা বেটে পানিতে মিশ্রিত করবে, আর আয়াতুল কুরসী এবং সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ৩ বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিতে থাকবে। এরপর এই পানি থেকে কিছুটা খাবে এবং গোসল করবে। এভাবে কিছুদিন করলে ইনশাআল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবে।
৮. সোনাপাতা
"আসমা বিনতু উমায়স রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি রেচক (laxative) হিসেবে কী ব্যবহার করো? আমি বললাম, শুবরুম (ছোলার মত এক প্রকার দানা)। তিনি বলেন, তা তো খুব গরম। এরপর আমি সোনামুখী গাছের পাতার রেচক নিলাম (অর্থাৎ নেওয়ার কথা বললাম)। তখন তিনি বললেন, কোনো ওষুধ যদি মৃত্যু থেকে নিরাময় দিতে পারত, তবে তা হতো সোনামুখী।” ৩৫
ব্যবহার: সোনাপাতার সিরাপ বা ট্যাবলেট একবার খেলে সাধারণত এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত ডায়রিয়া থাকে, যার মাধ্যমে পেটে জাদুর কিছু থাকলে বের হয়ে যায়। ইয়েমেনে এই পদ্ধতির ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
আর এখন ইউনানি চিকিৎসালয়েও senna ট্যাবলেট পাওয়া যায়, এছাড়া বিকল্প হিসেবে অন্যান্য laxative মেডিসিন রয়েছে, যা ফার্মেসীতে পাওয়া যাবে। তবে পূর্ব ধারণা না থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতীত কোনো রেচকই গ্রহণ করা উচিত হবে না। আর অবশ্যই সতর্ক থাকবেন, যেন এটা অতিরিক্ত না খাওয়া হয়। বিশেষত যদি কিডনির সমস্যা, হৃদরোগ বা প্রেগনেন্সি থাকে তাহলে রেচক ব্যবহারের আগে অবশ্যই কোনো দ্বীনদার ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে নেবেন।
সিহরের চিকিৎসায় যদি ল্যাক্সেটিভ বা রেচক ব্যবহার করেন তাহলে সিহরের আয়াতগুলো (অর্থাৎ সূরা আরাফ: ১১৭-১২২, সূরা ইউনুস: ৮১-৮২, সূরা ত্বহা: ৬৯) এবং সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ে সেটার ওপর ফুঁ দেবেন, এরপর নিয়ম মাফিক সেবন করবেন। আর যতক্ষণ এটার প্রভাব থাকবে, সে পর্যন্ত বেশি বেশি পানি পান করবেন।
৯. ভারতীয়/সামুদ্রিক কস্টাস
"উন্মু কায়স বিনতে মিহসান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, তোমরা ভারতীয় কস্টাসের ব্যবহার আবশ্যক করে নাও। কেননা তার মাঝে সাত ধরনের শিফা রয়েছে। শ্বাসনালীর ব্যথায় এটা নাক দিয়ে (ড্রপ হিসেবে) নেওয়া যায়, নিউমোনিয়া দূর করার জন্যও তা সেবন করা যায়।” ৩৬
ব্যবহার: রুকইয়ার সাথে দুইভাবে কস্টাস ব্যবহার হয়- প্রথমতঃ জিনের রোগীর রুকইয়ার সময় অলিভ অয়েল এবং কস্টাস পাউডার একত্র করে ড্রপ হিসেবে নাকে দেওয়া হয়। তবে প্রথমে এর ওপর কিছু রুকইয়ার আয়াত এবং আয়াতুল হারক ৩৭ পড়তে হয়। দ্বিতীয়তঃ গরম পানি বা দুধের মধ্যে গুলিয়ে খাওয়া হয়। অথবা অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশিয়ে হালুয়া বা ওষুধ বানানো হয়। সামুদ্রিক কস্টাস এবং ভারতীয় কস্টাসের মাঝে দ্বিতীয়টি বেশি প্রসিদ্ধ।
১০. সদকা করা ও দুআ করা
"আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের সম্পদ হেফাজত করো যাকাত প্রদানের মাধ্যমে, তোমাদের রোগের চিকিৎসা করো সদকার মাধ্যমে, আর তোমাদের বিপদ দূর করো দুআর মাধ্যমে।” ৩৮
ব্যবহার: রুকইয়াহ চলাকালীন সময়ে রোগ থেকে মুক্তির জন্য কিছু দান-সদকা করা সুস্থতাকে ত্বরান্বিত করবে ইনশাআল্লাহ। আর দুআ তো অবশ্যই করতে হবে। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন জাদু আক্রান্ত হয়েছিলেন, তখন কয়েকদিন অনেক দুআ করেছেন, এরপরেই আল্লাহ তাআলা তাঁর চিকিৎসার জন্য সূরা ফালাক এবং সূরা নাস নাযিল করেছেন। সেই সাথে জানিয়ে দিয়েছেন কে জাদু করেছে, কীভাবে জাদু করেছে, জাদুর জিনিসগুলো কোথায় আছে। এই বিষয়ে বিস্তারিত বিবরণ আমরা জাদু সংক্রান্ত অধ্যায়ে দেখব। সুতরাং আমাদেরও উচিত বেশি বেশি দুআ করা। একটা একটা সমস্যার কথা উল্লেখ করে দুআ করা, আল্লাহর কাছে সুস্থতা প্রার্থনা করা এবং বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া।
১১. রাতের সালাত (তাহাজ্জুদ)
তাহাজ্জুদ সুস্থতা লাভের উসিলা এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়ার একটি চমৎকার সুযোগ। এজন্য রুকইয়ার পাশাপাশি প্রতিদিন রাতে অল্প কয়েক রাকআত নামায পড়ে আল্লাহর কাছে সুস্থতা এবং বিপদ থেকে মুক্তি চাওয়া অনেক ফলদায়ক।
“বিলাল রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা তাহাজ্জুদ পড়াকে আবশ্যক করে নাও। কারণ, এটা তোমাদের সালাফে সালেহীন (পূর্ববর্তী নেককার ব্যক্তিদের) অনুসৃত রীতি। রাতের নামায তোমাদের প্রতিপালকের নৈকট্য লাভের বিশেষ মাধ্যম, গুনাহ থেকে বারণকারী, পাপ মোচনকারী এবং শরীর থেকে রোগ-ব্যাধি দূরকারী।” ৩৯
"জাবির রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, রাতে এমন একটি সময় রয়েছে, কোনো মুসলমান ব্যক্তি আল্লাহর কাছে দুনিয়া- আখিরাতের কোনো কল্যাণ প্রার্থণারত অবস্থায় যদি সময়টি পেয়ে যায় তাহলে আল্লাহ অবশ্যই তাকে তা দান করবেন। আর এই সময় রয়েছে প্রতিটি রাতেই।” ৪০
"আবূ হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাদের বরকতময় ও মহান প্রতিপালক প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকার সময় পৃথিবীর আসমানে নেমে আসেন এবং বলতে থাকেন, কে আছে আমাকে ডাকবে তাহলে আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আছে আমার কাছে চাইবে, তবে আমি তাকে দিয়ে দেবো। কে আছে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, তবে আমি তাকে মাফ করে দেবো।” ৪১
ব্যবহার: রুকইয়ার শুরুতে এবং রুকইয়াহ চলাকালীন তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে বিপদ থেকে মুক্তি এবং আরোগ্য প্রার্থনা করা অনেক উপকারি প্রমাণিত হয়েছে। অনেকে বিশেষ কোনো কারণে নিজে নিজে রুকইয়াহ করতে পারেন না, অন্যকে দিয়ে বা কারও কাছে গিয়ে রুকইয়াহ করানোর সুযোগও থাকে না। এরকম ক্ষেত্রে তাহাজ্জুদ পড়ে আল্লাহর কাছে বেশি বেশি দুআ করা উচিত।
১২. তাওবা (ইস্তিগফার)
বেশি বেশি ইস্তিগফার করলে আয়রোজগার, বিয়ে অথবা সন্তান-সন্ততি বিষয়ক বিপদ, ডিপ্রেশন, দুশ্চিন্তা ইত্যাদি থেকে আল্লাহ্ তা'আলা সহজেই মুক্তি দেন। যদি কোন পাপের কারণে বিপদ এসে থাকে, তবে তো ইস্তিগফারের কোন বিকল্প নেই। আল্লাহ্ কুরআনে নূহ আলাইহিস সালামের ঘটনায় উল্লেখ করেছেন-
“এরপর আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের প্রভুর কাছে ক্ষমা চাও (ইস্তিগফার করো)। তিনি অত্যন্ত ক্ষমাশীল। তাহলে তোমাদের জন্য তিনি আসমান থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন; ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন, তোমাদের জন্য উদ্যান স্থাপন করবেন আর তোমাদের জন্য নদ-নদী প্রবাহিত করবেন।” ৪২
আবু হুরায়রা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “নিশ্চয় আমি আল্লাহর নিকট প্রতিদিন সত্তরবারের অধিক তাওবা – ইস্তিগফার করি।” ৫০
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে নিজের জন্য ইস্তিগফার করা আবশ্যক বানিয়ে নেয় (অন্য বর্ণনায় আছে, যে অধিক পরিমাণে ইস্তিগফার করে) আল্লাহ তার যেকোনো সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেন, সব দুশ্চিন্তা মিটিয়ে দেন এবং অকল্পনীয় উৎস থেকে তার রিজিকের ব্যবস্থা করে দেন। ৪৪
ব্যবহার: বিপদের সময় প্রচুর পরিমাণে ইস্তিগফার করা উচিত। পূর্বে কৃত অপরাধের জন্য ভালভাবে তাওবা করা উচিত। এছাড়াও অপেক্ষা কিংবা অবসরের সময়গুলো, জ্যামে অথবা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময়গুলোকে ইস্তিগফারের মাধ্যমে মূল্যবান বানানো যায়। এক্ষেত্রে মনোযোগের সাথে বারবার শুধু “আস্তাগফিরুল্লাহ” পড়লেও হবে।
টিকাঃ
১৫. সহযোগী পথ্য, চিকিৎসার গতি বাড়াতে, ঔষধ এর উপকারিতা বাড়াতে যা ব্যবহার হয়
১৬. আল-মুজামুল আওসাত: ৮১২৫, সনদ সহীহ
১৭. ইবনু মাজাহ : ৩০৬২
১৮. সূরা কাফ, আয়াত: ৯
১৯. মুসলিম: ৮৯৮
২০. রুকইয়ার পানি বিষয়ে আরও জানতে দেখুন: bd.org/blog/664
২১. এক সা' হল ৩ কেজি ১৮৪.২৭২ গ্রাম সমপরিমাণ।
২২. বুখারী: ৫৩৭১
২৩. ইবনু মাজাহ : ৩৪৭৬
২৪. সূরা নাহল, আয়াত: ৬৯
২৫. বুখারী: ৫৩৬০
২৬. তিরমিযী: ২০৪১
২৭. বুখারী: ৫৩৬৪
২৮. সূরা নূর, আয়াত: ৩৫
২৯. তিরমিযী: ১৮৫২
৩০. বুখারী: ৫৪৩৬
৩১. মুসলিম: ৩৮১৫
৩২. রুকইয়াহ প্রয়োগকারী চিকিৎসক অর্থাৎ যিনি রুকইয়াহ করেন।
৩৩. মুসলিম: ৫০৫
৩৪. বুখারী: ১১৯৫
৩৫. তিরমিযী: ২০৮১, সনদ হাসান
৩৬. বুখারী: ৫৩৬৮
৩৭. যেসব আয়াতে জাহান্নামের আগুন, আযাব, শাস্তি ইত্যাদির কথা আছে।
৩৮. আল-মুজামুল আওসাত ২০০৬, বাইহাকি ৩২৫৩
৩৯. তিরমিযী: ৩৫৪৯, বাইহাকী: ৪৫৩২
৪০. মুসলিম: ৭৫৭
৪১. বুখারী: ৫৯৬২
৪২. সূরা নূহ, আয়াত: ১০-১২
৫০. বুখারী: ৫৯৪৮
৪৪. আবূ দাউদ : ১৫১৮, মুসতাদরাকে হাকীম : ৪/২৬২
📄 রুকইয়ার অডিও নিয়ে জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর
সাধারণত রুকইয়ার অডিও বা অডিও রুকইয়াহ বলতে সেসব রেকর্ডিংকে বোঝানো হয়, যাতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত রুকইয়ার আয়াত এবং দুআ থাকে।
তবে ব্যাপারটা এমন না যে, আমরা মুসলমানরাই শুধু শরঈ রুকইয়ার অডিও শুনি; বরং অন্যান্য ধর্মের লোকেরাও এক্সোর্সিজমের অডিও ব্যবহার করে।
যেমন: বিখ্যাত একটি ডিসি কমিকসে একজনকে অডিও টেপ দিয়ে সেলফ-এক্সোর্সিজম করতে দেখা যায়, কিন্তু শক্তপোক্ত জিনের সমস্যা বিধায় নিজে নিজে করা রুকইয়াহ যথেষ্ট হয় না। এতো গেল খ্রিষ্টানদের গল্প। অনেকে ইউটিউব থেকে রুকইয়াহ শোনে, ইউটিউবেও বহু কিসিমের রুকইয়াহ আছে। মুসলমানদের রুকইয়াহ যেমন আছে, শিয়া ধর্মানুসারী বা বিদআতিদের শিরকি রুকইয়াও ভুরি ভুরি আছে। আবার অর্থ উপার্জনের জন্য প্রস্তুতকৃত আকর্ষণীয় শিরোনামের অনর্থক অডিওর অভাব নেই। অধিকাংশ মানুষ যেহেতু এত সব পার্থক্য বোঝে না, তাই আমরা কোনো বিজ্ঞ ব্যক্তিকে দিয়ে যাচাই না করিয়ে ইউটিউব থেকে ইচ্ছেমত রুকইয়াহ শোনার ব্যাপারে কঠোরভাবে নিষেধ করে থাকি।
রুকইয়ার অডিও নিয়ে প্রায়শ জিজ্ঞাসিত কিছু প্রশ্ন এবং তার উত্তর:
১. রুকইয়ার জন্য রুকইয়ার অডিও শোনাই কি যথেষ্ট?
- না, অডিও হচ্ছে রুকইয়ার একটা সাপ্লিমেন্ট মাত্র; এটাই সব নয়। বরং পাগলের মতো শুধু অডিও শুনতে থাকলে ফায়দা কম এবং কষ্ট অনেক বেশি হয়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, কেউ যদি নিজে তিলাওয়াত করতে পারে, তাহলে অডিও না শুনে নিজে পড়াটাই উত্তম। তিলাওয়াত করলে সোনার চেয়ে অনেক বেশি উপকার হয়।
২. তাহলে রুকইয়াহ অডিও কেন দরকার?
- ক্ষেত্র বিশেষে অডিওর বিকল্প নেই। যেমন: মেয়েদের পিরিয়ডের সময়; তখন তারা নিজেরা তিলাওয়াত করতে পারবে না। অন্য কেউ প্রতিদিন রুকইয়াহ করবে, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়াও তো মুশকিল ব্যাপার। তাই বাধ্য হয়েই এমন ক্ষেত্রে সেরা অপশন হচ্ছে রুকইয়ার অডিও। অনেকের কোরআন তিলাওয়াত একদমই শুদ্ধ না। তারা রুকইয়ার জন্য নিশ্চিন্তে রুকইয়ার অডিও ব্যবহার করতে পারেন।
এছাড়া সবসময় তিলাওয়াত করা সম্ভবও হয় না। যেমন: কেউ গাড়িতে করে সফরে যাচ্ছে, অথবা সারাদিন চাকরিতে সময় দিতে হচ্ছে। তার রুকইয়াহ করা দরকার প্রতিদিন ৩ ঘণ্টা। এক্ষেত্রে সময়ের সদ্ব্যবহার করতে চাইলে তার জন্য অডিওর বিকল্প নেই। ঘুমের সমস্যায় ঘুমের আগে এক ঘণ্টা ধরে লাইট জ্বালিয়ে সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিন তিলাওয়াত করা বেশির ভাগ মানুষের পক্ষেই সম্ভব না; তাই এক্ষেত্রেও অপশন হচ্ছে অডিও। কোন অমুসলিমের রুকইয়াহ করানো দরকার, কিন্তু সহায়তার জন্য কোন মুসলমানকে পাওয়া যাচ্ছে না। এক্ষেত্রেও অডিওর সহায়তা নেয়া যায়। অনেক সময় জিনের সমস্যার জন্য নিজে নিজে রুকইয়াহ করার প্রয়োজন পড়ে। তখন দেখা যায় শয়তান গলা চেপে ধরে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করে। এক্ষেত্রে অডিও চালু করে দিয়ে রুকইয়াহ করা যায়। মোটকথা, রুকইয়ার অডিও বিভিন্ন সময়ে আমাদের প্রয়োজন পড়ে এবং বলা যায়, এটি আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত।
লক্ষণীয়: ড্রাইভিং অথবা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করার সময় রুকইয়াহ শোনা উচিত না।
৩. অডিও তিলাওয়াত শোনা বিদআত হবে কি?
কখনোই নয়। অজ্ঞতার কারণে কেউ হয়তো এটাকে বিদআত বলে দিতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, রুকইয়াহ বিষয়ে তাদের না যথেষ্ট ধারণা আছে, আর না তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীস সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। একটু বিস্তারিত বলা যাক।
প্রথম বিষয়, এটা নামায-রোজা ইত্যাদির মতো নিরেট ইবাদাত (ইবাদাতে মাখসুসাহ) কিসিমের কিছু নয়। এটা একটা চিকিৎসা পদ্ধতি। সুতরাং অন্যান্য চিকিৎসার মতো এক্ষেত্রেও শরীয়তের নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘন না হলে এটা বৈধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
এ ব্যাপারে মূলনীতি পাওয়া যায় দু'টি হাদীসে-
"আওফ ইবনু মালিক আল-আশজায়ী রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা জাহিলিয়াতের সময়েও রুকইয়াহ করতাম। তাই এ ব্যাপারে আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনি এ বিষয়টা কীভাবে দেখেন? তখন তিনি বললেন, তোমাদের ঝাড়ফুঁকগুলো আমাকে দেখাও; রুকইয়াতে যদি শিরক না থাকে তাহলে কোনো সমস্যা নেই।" ৪৬
“আবূ দারদা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মহান আল্লাহ রোগ এবং ঔষধ নাযিল করেছেন। আর তিনি প্রত্যেক রোগের জন্য ঔষধ সৃষ্টি করেছেন। তাই তোমরা ঔষধ ব্যবহার করবে, তবে হারাম বস্তুর ঔষধ ব্যবহার করবে না।” ৪৭
সুতরাং এ ব্যাপারে মানদণ্ড হচ্ছে হারাম অথবা শিরকি কোনো কিছু না থাকা। শিরক না থাকলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাহিলি যুগের মন্ত্র দিয়েও রুকইয়ার অনুমতি দিয়েছেন। আর এটা তো সরাসরি কুরআনুল কারীম! সুতরাং রুকইয়াতে কোন সমস্যা নেই, যদি তাতে শিরক না থাকে, এটা হোক অডিও কিংবা প্রত্যক্ষ কোনো মাধ্যম। তবে হ্যাঁ, এর পাশাপাশি উলামায়ে কিরাম ঝাড়ফুঁক বৈধ হওয়ার জন্য যে শর্তগুলো বলেছেন, সেগুলোর প্রতি পুরোপুরি খেয়াল রাখা আবশ্যক। যেমন: কোনো কুফর- শিরকের সংমিশ্রণ না থাকা। বাক্যগুলো এমন স্পষ্ট হওয়া, যার অর্থ বোধগম্য। আর এই বিশ্বাস থাকা যে, ঝাড়ফুঁকের নিজস্ব কোনো প্রভাব নেই, আরোগ্য কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে। ইমাম সুয়ূতী রহ., ইমাম নববী রহ. এবং ইবনু হাজার রহ. এ ব্যাপারে উম্মতের ইজমা উদ্ধৃত করেছেন।
দ্বিতীয়ত: আমরা প্রথম অধ্যায়ে দীর্ঘ হাদীস উল্লেখ করেছি, যেখানে আমরা দেখেছি, সাহাবায়ে কিরাম রা. ঝাড়ফুঁক করে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানিয়েছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের অবগতির প্রত্যুত্তরে হেসে বলেছেন, 'তুমি কিভাবে জানলে সূরা ফাতিহা একটি রুকইয়াহ!' ৪৮ এছাড়া এই হাদীসটিও লক্ষণীয়:
"আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ঘরে প্রবেশ করলেন। তখন এক মহিলার চিকিৎসা বা ঝাড়ফুঁক করা হচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কুরআন দ্বারা তার চিকিৎসা করো।” ৪৯
এ থেকেও বোঝা যাচ্ছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকইয়াকে বিশেষ কিছু পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেননি; বরং তিনি মূলনীতি বলে গিয়েছেন। আর কুরআন দ্বারা রুকইয়াহ করতে উৎসাহিত করেছেন। সাহাবায়ে কিরামও সে অনুযায়ী রুকইয়াহ করেছেন, সন্দেহ লাগলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে নিশ্চিত হয়েছেন।
সুতরাং যেহেতু রুকইয়ার অডিও শরীয়তের মূলনীতি লঙ্ঘন করছে না, অতএব এটা বৈধ।
তৃতীয়ত: কুরআন তিলাওয়াত করা হচ্ছে সর্বোত্তম ইবাদাতগুলোর একটি। ৫০ আর আল্লাহ তাআলা নিজে কুরআন মনোযোগ দিয়ে শুনতে নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা.-এর হাদীসটি উল্লেখযোগ্য:
“আব্দুল্লাহ রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার উদ্দেশে বললেন, আমাকে কুরআন পড়ে শোনাও। তিনি বললেন, আপনার ওপরই তো কুরআন নাজিল হয়েছে, আর আমি কিনা আপনাকেই তিলাওয়াত করে শোনাবো! তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, নিশ্চয় আমি অন্যের থেকে তিলাওয়াত শুনতে পছন্দ করি।” ৫১
সুতরাং এ থেকে বুঝতে পারছি, কুরআন শোনাও একটি উত্তম আমল। কিন্তু বিজ্ঞ উলামায়ে কিরাম কখনোই বলেন না, ইলেকট্রনিক ডিভাইসে কুরআন শোনা বিদআত। এই একই কুরআন রুকইয়াহ হিসেবে শুনলে কোনোভাবেই বিদআত হবে না। যেখানে রুকইয়ার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতোটা প্রশস্ততা রেখেছেন, সেখানে এটাকে সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে সীমাবদ্ধ করার অধিকার আছে আর কার!
'আম' (ব্যাপক) বিষয়কে 'খাস' (সীমাবদ্ধ) করার অধিকার না ফিকহ কাউকে দেয়, আর না ইসলামের ভাবধারার সাথে এটা কোনো অবস্থায় মানানসই।
বিখ্যাত আরব শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদ হাফিযাহুল্লাহ-কে গাড়িতে কুরআন তিলাওয়াতের অডিও শোনার বৈধতার ব্যাপারে প্রশ্ন করা হয়েছিল। উত্তরে তিনি বলেছেন,
'কুরআন তিলাওয়াত শোনা মুস্তাহাব'। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কুরআন তিলাওয়াত শোনা বিষয়ক কিছু হাদীস উল্লেখ করে বলেছেন –
'হে প্রশ্নকারী ভাই, একইভাবে সিডি থেকে কুরআন শোনা-যেমনটা আপনি জিজ্ঞেস করেছেন-অথবা টেপরেকর্ডার, রেডিও বা টিভি থেকে কুরআন শোনা সব একই হুকুমে পড়বে। অর্থাৎ এসবই মুস্তাহাব। সেটা বাড়িতে শুনেন, অথবা কার, বাস কিংবা উপযুক্ত যেকোনো স্থানেই শুনেন, এসব কিছুর একই বিধান। তবে তিলাওয়াত এমন সময় শোনা উচিত নয়, যখন আপনি অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকেন। আর আপনি এভাবে (অডিও বা ভিডিও থেকে) তিলাওয়াত শুনলেও সওয়াব পাবেন। আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞাত।” ৫২
৪. মোবাইলে কুরআন শুনলে সওয়াব হবে?
একটু আগেই আমরা শাইখ সালিহ আল মুনাজ্জিদ হাফিজাহুল্লাহ-এর ফাতাওয়া উল্লেখ করেছি। কুরআনের আদব ঠিক রেখে অডিও তিলাওয়াত শুনলেও সওয়াব হবে। এ ছাড়া এই হাদীসটি খেয়াল করুন-
আবু যর গিফারি রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার অনেকগুলো সওয়াবের কাজ নিয়ে বলছিলেন। এক পর্যায়ে তিনি বললেন, '..আর তোমাদের নিজের স্ত্রীর সাথে সহবাস করাও সদকা।' সাহাবায়ে কিরাম অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, 'ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমাদের কারও যৌন আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত হলো, আর সে স্ত্রীর সাথে সহবাস করল, এতেও সওয়াব হবে! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, 'কেন? সে যদি এই চাহিদা হারাম পন্থায় (যিনার মাধ্যমে) পূরণ করত তবে কি তার গুনাহ হতো না?' ৫০
সুতরাং মোবাইলে গান কিংবা অশ্লীল কিছু শুনলে বা দেখলে যদি গুনাহ হয়, তবে আপনি নিশ্চিত থাকুন, কুরআন তিলাওয়াত শুনলে সওয়াবও হবে ইনশাআল্লাহ!
৫. কোন অডিওটা সবচেয়ে ভালো?
নির্দিষ্ট কোন অডিওকে সেরা বলা মুশকিল, উপরন্তু সবার ক্ষেত্রে একই অডিও সমান কার্যকরী হয় না। তবে এ বিষয়ের উসূল বা মূলনীতি বলা যায় এরকম -
এক. সবচেয়ে ভালো হচ্ছে, নিজের রুকইয়ার অডিও শোনা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনার ওপর রুকইয়াহ করা হলো, অথবা আপনি নিজেই রুকইয়ার জন্য তিলাওয়াত করলেন, পরবর্তীতে আপনি যদি সেটার অডিও রেকর্ডটা শোনেন, তবে ইনশাআল্লাহ সবচেয়ে বেশি উপকার হবে।
দুই. রুকইয়ার অডিও হিসেবেই যেটা রেকর্ড করা হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, www.ruqyahbd.org ওয়েবসাইটে শেয়ার করা 'বদনজর, সিহর এবং আয়াতুল হারকের অডিওগুলো। শাইখ লুহাইদান এবং খালিদ হিবশির অডিও।' এগুলোতে অন্য অডিওর চেয়ে তুলনামূলক বেশি প্রভাব হয়।
তিন. এছাড়াও অন্যান্য সাধারণ কুরআন তিলাওয়াতের অডিও, যেগুলো রুকইয়ার নিয়তে বিশেষভাবে রেকর্ড করা হয়নি, বরং স্বাভাবিক কুরআন তিলাওয়াত হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। আল্লাহর ইচ্ছায় সেগুলোতেও অনেক উপকার হবে। যেমন- সূরা তাগাবুনের অডিও, সূরা ইয়াসীন, সফফাত, দুখান, জিনের অডিও। এছাড়া সূরা বাক্কারার তিলাওয়াত অনেক শক্তিশালী রুকইয়াহ।
আল্লাহ যেন আমাদের রুকইয়ার অডিওর সদ্ব্যবহার করার তাওফীক দেন। আমীন।
টিকাঃ
৪৬. মুসলিম: ৪০৭৯। এছাড়া হাদীসটি আবূ দাউদ এবং আল-মুজামুল আওসাতেও বর্ণিত হয়েছে।
৪৭. আবূ দাউদ: ৩৮৭৪
৪৮. বুখারী: ৫৩৩৫
৪৯. ইবনু হিব্বান: ৬২৩২
৫০. শুআবুল ইমান; বাইহাকি: ১৮৬৯
৫১. বুখারী: ৪৭৬২
৫২. উৎসঃ ইসলাম কিউএ, ফাতাওয়া নং ১৪৫৯০
৫০. মুসলিম: ১৬৭৪
📄 রুকইয়ার গোসল
রুকইয়ার গোসল খুবই উপকারি এবং জরুরি অনুষঙ্গ। রুকইয়াহ শেষ করে রুকইয়ার গোসল করলে অনেকটা স্বস্তি পাওয়া যায়। এছাড়া জিনের রোগীর ক্ষেত্রে প্রতিদিন রুকইয়ার পর গোসল করিয়ে দিলে জিনের ওপর বেশ ধকল যায়, আর রোগী তাৎক্ষনিকভাবে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আর জাদু এবং বদনজরের চিকিৎসাতে তো রুকইয়ার গোসল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রুকইয়ার গোসলের বেশ কিছু পদ্ধতির বিবরণ হাদীস, আকাবির-আসলাফের বর্ণনা ও অন্যান্য আলিমদের থেকে পাওয়া যায়।
ক. হাদীসে নববীতে রুকইয়ার গোসল
১. বদনজর বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 'ভাগ্যের চেয়েও আগে বেড়ে যায় এমন কিছু যদি থাকত তবে সেটা হতো বদনজর। যদি (বদনজরের জন্য) তোমাদের গোসল করতে বলা হয়, তবে এর জন্য গোসল করো।' ৫৪
২. আয়িশা রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, যে ব্যক্তির বদনজর অন্যের ওপর লাগত, তাকে ওযু করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হতো। এরপর ওই পানি দিয়ে সেই ব্যক্তিকে গোসল করানো হতো, যার ওপর বদনজর লেগেছে। ৫৫ এভাবে একবার গোসল করলেই সাধারণত বদনজর দূর হয়ে যায়।
৩. অন্য দুআ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করার উদাহরণও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কিরাম থেকে পাওয়া যায়। যেমন: সাবিত ইবনু কাইস ইবনু শামমাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি একবার অসুস্থ ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে আসলেন। এরপর এই দুআটি পড়লেন:
اكْشِفِ الْبَاسَ رَبَّ النَّاسِ (হে মানুষের প্রভু, রোগমুক্ত করুন) এরপর একটি পাত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার বাত্বহান প্রান্তরের এক মুঠ মাটি রাখলেন, এরপর সেখানে পানি ঢাললেন এবং তাতে ফুঁ দিলেন। তারপর ওই পানি তার (সাবিত রা.-এর) ওপর ঢেলে দেওয়া হলো। ৫৬
বিন বায রহ. রুকইয়ার গোসলের নিয়ম বর্ণনা করার সময় উপরিউক্ত হাদীসটি উল্লেখ করেছেন দলিল হিসেবে।
খ. বিভিন্ন যুগের আলিমদের মতে রুকইয়ার গোসল
১. জাদুর চিকিৎসায় রুকইয়ার বিখ্যাত গোসল হচ্ছে, বরই পাতা বেটে পানিতে মিশ্রিত করা, এরপর কিছু দুআ পড়ে পানিতে ফুঁ দিয়ে সেটা খাওয়া এবং গোসল করা। পূর্ববর্তী আলিমদের অনেক বর্ণনাতে এই গোসলের কথা পাওয়া যায়। তবে এই গোসলের সময় পড়ার দুআগুলো কী হবে—সে বিষয়ে একাধিক মত রয়েছে। ইমাম কুরতুবী রহ. জাদুর চিকিৎসা বর্ণনা করতে গিয়ে এই গোসলে শুধু আয়াতুল কুরসী পড়তে বলেছেন। আর ইবনু কাসীর রহ. সূরা ফালাক, সূরা নাস পড়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। ৫৭
২. ওয়াহাব ইবনুল মুনাব্বিহ রহ. থেকে গোসলের নিয়মটি বর্ণিত আছে এরকমভাবে: সাতটি বরইয়ের পাতা পিষে পানিতে ঢেলে নাড়তে থাকুন এবং আয়াতুল কুরসী, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পড়ে পড়ে ফুঁ দিতে থাকুন। এরপর সেই পানি তিন ঢোক পান করুন এবং বাকিটা দিয়ে গোসল করুন। ৫৮
শাইখ ওয়াহিদ বিন আবদুস সালামও এভাবেই বলেছেন। তবে এর সাথে আরও বলেছেন, 'সেই পানি গরম করবে না বা সেখানে অন্য পানি মেশাবে না। আশা করা যায়, প্রথম গোসলেই জাদু নষ্ট হয়ে যাবে। আর এভাবে কয়েকদিন গোসল করলে ইনশাআল্লাহ রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে।' ৫৯
৩. শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ. এই বরই পাতার গোসলের নিয়ম বর্ণনা করেছেন শাইখ আবদুর রহমান বিন হাসানের ফাতহুল মাজীদ গ্রন্থ থেকে, তবে সেখানে পানিতে বরই পাতা গুলিয়ে অনেক কিছু পড়তে বলা হয়েছে। যথা:
১. সূরা ফাতিহা ২. আয়াতুল কুরসী ৩. সূরা আরাফের ১০৬-১২২ নং আয়াত ৪. সূরা ইউনুসের ৭৯-৮২ নং আয়াত ৫. সূরা ত্বহা এর ৬৫-৬৯ নং আয়াত ৬. সূরা কাফিরুন ৭. সূরা ইখলাস [৩বার] ৮. সূরা ফালাক [৩বার] ৯. সূরা নাস [৩বার]
সাথে কিছু দুআ যেমন-
১০. 'আল্লাহুম্মা রব্বান নাস, আযহিবিল বা'স। ওয়াশফি, আনতাশ শাফি। লা শিফাআ ইল্লা শিফাউক। শিফাআন লা ইয়ুগা-দিরু সাকামা।' [৩বার]
১১. 'বিসমিল্লাহি আরক্কীক মিন কুল্লি শাইয়িন ইয়ু'যীক। মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনিন হাসিদিন; আল্লাহু ইয়াশফীক। বিসমিল্লাহি আরক্বীক।' [৩ বার]
সেই ফাতাওয়াতে বিন বায রহ. অবশ্য একটি সহজ নিয়মের কথাও বলেছেন- জাদুতে আক্রান্ত রোগীর ওপর অথবা কোনো একটি পাত্রে পানি নিয়ে 'উপরে উল্লিখিত' আয়াত এবং দুআ সমূহ পড়ে ফুঁ দেবে। এরপর জাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি সে পানি পান করবে, আর অবশিষ্ট পানি দিয়ে গোসল করবে। প্রয়োজন মতো এক বা একাধিকবার এরকম করলে আল্লাহর ইচ্ছায় রোগী আরোগ্য লাভ করবে। ৬০
গ. আমরা আরও যেসব গোসলের পরামর্শ দিই
১. জাদুর সাধারণ রুকইয়াহ (এটি মূলত শাইখ ওয়াহিদ আব্দুস সালামের একটি পদ্ধতি এবং বিন বায রহ.-এর পদ্ধতির সারসংক্ষেপ)
'...একটি বোতলে পানি নিন, এরপর ক. সূরা আরাফ: ১১৭-১২২ খ. সূরা ইউনুস: ৮১-৮২ গ. সূরা ত্বহা: ৬৯ নম্বর আয়াত ঘ. সূরা ফালাক, সূরা নাস সব তিন বার করে পড়ে পানিতে ফুঁ দিন।
এই পানি দুই বেলা খাবেন, আর প্রতিদিন গোসলের পানিতে মিশিয়ে গোসল করবেন।' ৬১
তবে এভাবে একবারে বোতলে না পড়ে যদি প্রতি বার খাওয়া বা গোসলের পানিতে আয়াতগুলো পড়ে ফুঁ দেওয়া হয় তবে সেটা আরও উত্তম।
২. বদনজরের রুকইয়ার গোসল
'একটা বালতিতে পানি নিয়ে তাতে দুই হাত ডুবিয়ে যেকোনো দরুদ শরীফ, সূরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসী, সূরা কাফিরুন, ইখলাস, ফালাক, নাস শেষে আবার কোনো দরুদ শরীফ—সব ৭বার করে পড়া, এরপর এই পানি দিয়ে গোসল করা।'
এটা মুম্বাইয়ের মুফতী জুনাইদ সাহেবের লেকচার থেকে নেওয়া। তবে যদিও সাধারণত এটা বদনজরের রোগীকে করতে বলা হলেও জাদু ও জিনের রোগীর জন্যও এটা অনেক উপকারি।
তবে খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, এসব গোসলের হুবহু নিয়ম হাদীস থেকে নেওয়া নয়; বরং হাদীস থেকে মূলনীতি গ্রহণ করে আলিমদের অভিজ্ঞতালব্ধ গবেষণা থেকে উদ্ধৃত। তাই সময় কম থাকলে সংক্ষেপ করে সাত বারের জায়গায় তিন বার পড়তে পারে, দুরুদ শরীফ চাইলে এক বারও পড়তে পারে। চাইলে সূরা কাফিরুন বাদ দেওয়া যায়। চাইলে এসবের সাথে আরও কিছু দুআ এবং আয়াত পড়া যায়। আর পানিতে হাত ডুবিয়ে বসে থাকার সুযোগ না পাওয়া গেলে পড়ার পর পানিতে ফুঁ দিয়ে গোসল করলেই যথেষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ। বরই পাতার গোসলের ক্ষেত্রে ওই পানি খেতে না পারলে আলাদা গ্লাসে বিশুদ্ধ পানি নিয়ে সেখানে ফু দিয়ে পান করা যেতে পারে।
এখানে মূলনীতি হচ্ছে, যা সরাসরি হাদীস থেকে নেয়া হবে, সেটা হুবহু ওই সংখ্যাতেই বা ওই পরিমাণেই করতে হবে। আর যদি এটা ইজতিহাদ হয় তবে অভিজ্ঞ কাউকে জিজ্ঞেস করে সংখ্যা (এক, তিন, সাত এরকম) কমবেশি করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বেশি পড়লে বেশি ফায়দা, কম পড়লে কম। তবে আপনার জন্য সর্বনিম্ন কতটুকু পড়া উচিৎ, এ বিষয়ে অভিজ্ঞ কারও সাথে কথা বলে নেওয়া ভালো। উল্লেখ্য, রুকইয়ার গোসলের জন্য পানি স্বাভাবিক ঠাণ্ডা হওয়াই উত্তম, তবে একান্ত প্রয়োজন হলে গরম পানিও ব্যবহার করা যায়।
৩. এছাড়া রুকইয়ার গোসলে বাথ সল্ট ব্যবহার করা যায়।
এমনিতেই বাথ সল্ট বা গোসলের লবণের অনেক উপকারিতা রয়েছে। যেমন: ব্যথা কমানো, রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি, ঘুমের সমস্যা কমানো, ত্বকের দাগ দূর হওয়া, ইত্যাদি। এছাড়াও আমরা চাইলে এটাকে রুকইয়ার গোসলে ব্যবহার করতে পারি।
গোসলটা এভাবে হতে পারে: একটি ছোট পাত্রে গরম পানি নিয়ে সেখানে এক টেবিল চামচ বাথ সল্ট এবং (সম্ভব হলে) সাতটি বরই পাতা পিষে গুলিয়ে নিন। আর সুরা ফাতিহা, আয়াতুল কুরসি, ইখলাস, ফালাক, নাস তিন বার করে পড়ুন এবং ফুঁ দিন। (চাইলে আরও কিছু আয়াত বা দুআ পড়তে পারেন) পড়া শেষে এটা গোসলের হালকা গরম পানিতে মিশিয়ে গোসল করে নিন।
১৫. অন্যান্য
এ ছাড়া আরও কিছু সাপ্লিমেন্টারি আছে, যেগুলো রুকইয়ার সাথে বিভিন্নভাবে ব্যবহার হয়। যেমন: Tuffle (কন্দক জাতীয় ছত্রাক), Asafoetida (হিং), Rhubarb (রেউচিনি), আপেলের সিরকা, জিরাপানি, যষ্টিমধু, কড়া সুগন্ধি অথবা আতর, গোলাপজল, জাফরান ইত্যাদি। সবগুলো এখানে উল্লেখ করা মুশকিল, আর ভালোমতো না জেনে এতকিছু ব্যবহারের দরকারও নেই। শুধু সরাসরি রুকইয়াহ করা, রুকইয়ার পানি খাওয়া আর রুকইয়ার গোসল-এতটুকুই অনেক!
টিকাঃ
৫৪. মুসলিম: ৪০৬৫
৫৫. মুসলিম
৫৬. আবূ দাউদ: ৩৮৮৫
৫৭. তাফসীরে ইবনু কাসীর: ১/৬১৯
৫৮. ফাতহুল বারী: ১০/২৩৩
৫৯. আস-সারিমুল বাত্তার: ২১৪
৬০. মাজমুউল ফাতওয়া ওয়া মাক্কালাত: ৩:৮/১৪৪৩
৬১. ওয়াক্বাইয়াতুল ইনসান: ৮৮
📄 রুকইয়াহ শারইয়্যাহর গুরুত্ব এবং প্রয়োজনীয়তা
প্রশ্ন উঠতে পারে, এই রুকইয়াহ নিয়ে আলোচনার কী দরকার? এর পেছনে এতো সময়, পরিশ্রম আর মেধা ব্যয় করার লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য কী? আর এতে লাভটাই বা কী?
আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে, আল্লাহর কালিমাকে প্রতিষ্ঠিত করা, সমাজ থেকে কুফরী জাদু-ফিতনা নির্মূল করা, কবিরাজ নামের শয়তান জাদুকরদের থেকে উম্মাতকে দূরে রাখা এবং প্রায় ভুলে যাওয়া রুকইয়াহ শারইয়্যাহর সুন্নাতকে পনর্জীবিত করা। আর অবশ্যই এসবের পেছনে উদ্দেশ্য হচ্ছে, আমাদের রবের সন্তুষ্টি অর্জন!
এখানে ইবনুল কায়্যিম রহ.-এর কথাটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তিনি বলেন—
‘আল কুরআন হচ্ছে পরিপূর্ণ চিকিৎসা। মানসিক কিংবা শারীরিক; দুনিয়ার কিংবা আখিরাতের যাবতীয় রোগব্যাধির জন্য কুরআনে রয়েছে পরিপূর্ণ আরোগ্য।
তবে এ থেকে নিরাময় লাভের তাওফীক সবাইকে দেওয়া হয় না; সবাই এর উপযুক্তও নয়। রোগী সততা, আস্থা, পূর্ণ গ্রহণযোগ্যতা, অকাট্য বিশ্বাস এবং চিকিৎসার যাবতীয় শর্ত পূরণের মাধ্যমে যদি এই কুরআনকে কেউ তার রোগের ওপর উত্তমভাবে প্রয়োগ করে, তাহলে কোন ব্যাধিই এর মোকাবিলা করতে পারবে না। কীভাবে রোগ-ব্যাধি আসমান- জমিনের মালিকের ওই কথার মোকাবিলা করবে, যা তিনি পাহাড়ের ওপর নাজিল করলে তা পাহাড়কে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলত, ভূমির উপর নাজিল করলে ভূমিকে বিদীর্ণ করে দিত!
সুতরাং শরীর ও মনের এমন কোনো রোগ নেই, যার চিকিৎসা আল-কুরআনে নেই। উপরন্তু এর প্রতিকার এবং তা থেকে বেঁচে থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। যাকে আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবের বুঝ দান করেছেন, সেই কেবল এ থেকে সার্বিক সুস্থতা লাভ করে ধন্য হয়। কুরআন যাকে নিরাময় করবে না, আল্লাহও তাকে নিরাময় করবেন না। আর কুরআন যার জন্য যথেষ্ট নয়, আল্লাহও তার জন্য যথেষ্ট হবেন না।' ৬২
সেলফ রুকইয়ার প্রয়োজনীয়তা
সেলফ রুকইয়াহ অর্থাৎ নিজের জন্য বা নিজের পরিবারের জন্য নিজেই রুকইয়াহ করার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। যে কোনো সমস্যা শুরুর আগেই যদি এর সমাধান জানা থাকে, তাহলে এটা বেশি দূর গড়ায় না। কয়েক যুগ আগেও শুধু ডায়রিয়ায় কত মানুষ মারা গেছে; কিন্তু এখন? এখন আমরা সবাই জানি, কারও ডায়রিয়া হলে লবণ-পানির শরবত খেলেই যথেষ্ট উপকার পাওয়া যায়।
একইভাবে আমি যদি জানি আমার স্ত্রীকে কেউ জাদু করলে আমার কী করা উচিত, আমার বাচ্চার ওপর কারও নজর লাগলে অথবা শরীরের কোথাও ব্যথা হলে আমার কী করা উচিত তাহলে পরিবারের সাধারণ সমস্যাগুলোও ডিভোের্স পর্যন্ত গড়াবে না। বাচ্চাকে হয়তো অপ্রয়োজনীয় ওষুধপত্র খাওয়ানো লাগবে না।
আর নিজের জন্য রুকইয়াতে ভয়ের কিছু নেই। এর কারণ হচ্ছে-
প্রথমত: রুকইয়াহ করলে আপনি আর ডাক্তারের চিকিৎসা নিতে পারবেন না-বিষয়টা কিন্তু মোটেই এমন নয়। বরং প্রয়োজন মোতাবেক ওষুধ এবং রুকইয়াহ দুটোই গ্রহণ করা সুন্নাত।
দ্বিতীয়ত: কুরআনে ক্ষতিকর কিছু নেই-উপকার ছাড়া। কুরআন শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক রোগের প্রতিষেধক। আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রেখে যাওয়া জীবন্ত মুজিযা। এই মুজিযা আপনার হাতের কাছে থাকতেও কেন আপনি তার যথাযথ ব্যবহার করবেন না?
তৃতীয়ত: এজন্য আপনার সম্পূর্ণ কুরআন মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। আপনি দেখে দেখে তিলাওয়াত করতে পারবেন, অথবা শুধু সূরা ফাতিহা, ইখলাস, ফালাক, নাস দিয়েও রুকইয়াহ করতে পারবেন। আর আপনার তিলাওয়াত বিশ্ববিখ্যাত ক্বারীদের মতো হওয়ারও দরকার নেই। আপনার যতদূর সম্ভব হয় শুদ্ধ করে পড়বেন। আর একদমই শুদ্ধ না হলে ধীরে ধীরে শিখে নেবেন। কুরআন পড়তে জানা তো এমনিতেও আবশ্যক।
সেলফ রুকইয়াহকে ফার্স্ট এইড বা প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে নেয়া যায়, যেমনটা সাধারণ রোগের ক্ষেত্রে আমরা করে থাকি। কোনো সমস্যা হলে প্রথমে ফার্মেসী থেকে বা ঘরের ওষুধের বাক্স থেকে একটা ওষুধ নিয়ে খাই। এরপর প্রয়োজন হলে এলাকার ডাক্তার বা অন্য কারও পরামর্শ নিই। এরপরও ভালো না হলে তখন বড় ডাক্তার দেখাই।
একইভাবে রুকইয়ার ক্ষেত্রেও প্রথমে এই গ্রন্থের নিয়মকানুন দেখে নিজেই রুকইয়াহ করুন। এরপর প্রয়োজন হলে আপনার চেয়ে ভালো জানে-এমন কারও পরামর্শ নিন। এসব কিছু যথেষ্ট না হলে তখন অভিজ্ঞ কাউকে দিয়ে রুকইয়াহ করান।
টিকাঃ
৬২. যাদুল মাআদ, ইবনুল কায়্যিম, খণ্ড-৩, পৃ.১