📘 রূহের রহস্য > 📄 কতিপয় পরিভাষার ব্যাখ্যা

📄 কতিপয় পরিভাষার ব্যাখ্যা


ঈমানের একাগ্রতা ও নিফাকের একাগ্রতার মধ্যে পার্থক্য

ঈমানের একাগ্রতা হলো, আল্লাহ তাআলার মহিমা, মহান শান-শওকতের কাছে লজ্জাবনত হওয়া, ভয়-ভীতি, মহব্বত ও শালীনতাসহ আল্লাহর দরবারে পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পণ করা। এছাড়া আল্লাহ তাআলার নি'আমতসমূহ আর নিজ গুনাহের মাত্রা দেখে একজন বান্দার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। যখন একজন খাঁটি ঈমানদার ব্যক্তি এভাবে উদ্বেলিত হয়ে পড়েন, তখন তাঁর সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও আল্লাহর মহান দরবারে অবনমিত হয়ে পড়ে।

পক্ষান্তরে, একজন মুনাফিক ব্যক্তির একাগ্রতা হলো, যেটা কৃত্রিম সেটাকে সে অতিরঞ্জিত করে প্রকাশ করে। আসলে, সেটা তার মনের কথা নয়। জনৈক সাহাবী নিফাকের একাগ্রতা থেকে আল্লাহ তাআলার নিকট পানাহ চাইতেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো, মুনাফিকের একাগ্রতা কী? তিনি বলেছিলেন, "যার দেহ অবনত হয়, কিন্তু দিল অবনত হয় না।" আল্লাহ তাআলার সম্মুখে ঐ ব্যক্তির হৃদয় অবনত হয়, যার লোভ-লালসা নিঃশেষ হয়ে গিয়েছে এবং এর কু-প্রভাব তার হৃদয় থেকে বের হয়ে গিয়েছে। এভাবেই তার হৃদয় পরিমার্জিত হয়ে তার মধ্যে নূর ও মহত্ত্ব ঝলসে উঠে এবং আল্লাহর ভয়ে সে সদা সন্ত্রস্ত ও শঙ্কিত থাকে। অর্থাৎ তার নাফসের তাড়না লোপ পেয়ে তার হৃদয়ে প্রশান্তি ও গাম্ভীর্য স্থান লাভ করেছে। এভাবে আল্লাহ তাআলার যিকরের দ্বারা সে ব্যক্তি প্রশান্তি লাভ করে, তার রবের পক্ষ থেকে তার উপর শান্তি বর্ষিত হয়, যার দ্বারা সে পরিতৃপ্ত থাকে।

আরবি 'মুখবিত' শব্দের অর্থ হলো— অনুগত ও প্রশান্ত। 'খাবত' ঐ নিচু জমিনকে বলা হয়, যার মধ্যে পানি জমে, 'কালবে মুখবিত' বলতে প্রশান্ত হৃদয়কে বুঝায়। এর চিহ্ন হলো, সে রবের মহা শান ও শওকতের সম্মুখে নিজের হীনতা, নম্রতা প্রকাশ করে এবং তাঁর সান্নিধ্যে আজীবন সিজদারত থাকে। অপরপক্ষে, 'কালবে মুতাকাব্বির' বা অহঙ্কারী হৃদয় নিজ অহঙ্কার হেতু উগ্রভাবাপন্ন থাকে, যেমন— উঁচু জমিন যেখানে কোনো পানি থাকে না।

নিফাকের একাগ্রতা মূলত খুশু বা একাগ্রতা নয় বরং খুশুর বাহানামাত্র। সে লোক দেখানোর জন্য কৃত্রিমভাবে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঝুঁকিয়ে দেয়, আর তার দিলে কোনো প্রকারের খুশু ও খুযূ বিদ্যমান থাকে না বরং তার হৃদয় লোভ-লালসা ও কুচিন্তায় ভরপুর থাকে, সে আসলে অজগর সাপ সদৃশ এবং অরণ্যের সিংহের ন্যায়। এরা সুযোগ পেলেই শিকারের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

আত্মসম্মানবোধ হলো একজন মানুষ নিচতা, মন্দস্বভাব, লোভ-লালসা থেকে বিরত থাকবে এবং নাফসকে ঐসব হীন কাজ থেকে সংযত রাখবে। নিজেকে বড় মনে করা ও অন্যকে ছোট মনে করা হলো অহঙ্কার। মানুষের আত্মসম্মানবোধ উত্তম স্বভাব থেকে সৃষ্টি হয়। ভালো নাফসের বৈশিষ্ট্য হলো— ইজ্জত ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা আর আল্লাহর সম্মান ও সম্ভ্রম রক্ষা করা, যেন তাঁর বান্দা নিচ ও হীন না হয়। এই ভালো নাফসের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে যেন সে কোনো মন্দ স্বভাবে জড়িত হয়ে না পড়ে। এটা নাফসের প্রক্রিয়া ও আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভর করে। যে মানুষের অন্তঃকরণ কর্মশক্তি ও আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত, সে যাবতীয় মঙ্গল ও কল্যাণ থেকেও বঞ্চিত।

হামিয়ত ও জাফার মধ্যে পার্থক্য: হামিয়ত হলো নাফসের নিচতা ও অপবিত্রতার উৎস। মানুষ সেদিকেই অধিক আকৃষ্ট হয়, তাই সেটাকে ত্যাগ করে আল্লাহর বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। এ ব্যাপারে বিলম্ব বা গাফলতি করলে আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হতে হবে। পক্ষান্তরে, নাফসের কঠোরতা, অন্তরের অপবিত্রতা ও স্বভাবের অপরিচ্ছন্নতা একসঙ্গে মিলিত হয়ে এক প্রকার মন্দ স্বভাবের জন্ম দেয়, সেটাকে জাফা বা জুলুম বলা হয়।

বিনয় ও হীনতার মধ্যে পার্থক্য: আল্লাহর পরিচিতি ও গুণাবলি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান, আল্লাহর প্রতি মহব্বত, তাঁর প্রদত্ত শিক্ষা, জ্ঞান, ভালো-মন্দ বুঝ শক্তি এগুলোর মাধ্যমে এক সুন্দর স্বচ্ছ-স্বভাব জন্ম নেয়, এসবকে বিনয় বলা হয়। একজন বিনয়ী ব্যক্তির হৃদয় আল্লাহর মহব্বতের কারণে খণ্ড-বিখণ্ড হয়ে যায় এবং সে তার স্রষ্টার সাথে একাত্মবোধ করে আর নিজেকে অন্য কারো চেয়ে উত্তম মনে করে না, অন্যের হককে নিজের হকের উপর প্রাধান্য দেয় এবং অন্যের হক আদায় করাকে অপরিহার্য মনে করে। আল্লাহ তাঁর প্রিয় ও পছন্দনীয় বান্দাদেরকে এই অনন্য সুন্দর স্বভাব দান করে থাকেন।

এর বিপরীত হলো— হীনতা, নিচতা, মনের সংকীর্ণতা, লোভ-লালসা একজন মানুষকে হঠকারিতায় লিপ্ত করে অপমানিত, লাঞ্ছিত ও ক্ষতিগ্রস্ত করে, যেমন নিম্ন শ্রেণীর লোকেরা স্বীয় স্বার্থে বিনয় অবলম্বন করে, এরা কর্তার ইচ্ছা পূরণে ব্যবহৃত হয়, এটা সত্যিকার অর্থে বিনয় নয়। আল্লাহ তাআলার নিকট বিনয় পছন্দনীয়, আর হীনতা অপছন্দনীয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার নিকট প্রত্যাদেশ এসেছে যে, তোমরা বিনয় অবলম্বন করো, কেউ কারো সাথে গর্ব করো না, আর অন্যায়ভাবে কারো বিরোধিতা করো না।

বিনয়ের রকমফের: বিনয় দুই প্রকার। এক. আল্লাহ তাআলার নির্দেশকে বাস্তবায়িত করা ও তিনি যেসব বিষয়কে নিষেধ করেছেন সেগুলোকে পরিহার করে চলাকে বিনয় বলা হয়। নাফস হলো আরামপ্রিয়। সে আল্লাহর নির্দেশ মানার ব্যাপারে গড়িমসি করে। এভাবে সে নাফস আল্লাহকে অস্বীকার করে ও তাঁর বন্দেগি থেকে দূরে থাকে। এছাড়া সকল নিষিদ্ধ কাজ করার জন্য তৎপর থাকে। একজন নেককার বান্দা যখন আল্লাহর হুকুম পালনে ও তাঁর নিষিদ্ধ আদেশ থেকে বাঁচার জন্য নিজের নাফসকে সংযত করে, তখন আল্লাহর বন্দেগির জন্য তার বিনয় প্রকাশ পায়।

দুই. মহান রবের মাহাত্ম্য ও মহিমার জন্য তাঁর ইজ্জত ও শানের কাছে আত্মসমর্পণ করাই হলো বিনয়। নাফস যখন বিদ্রোহ করতে চায়, তখন বান্দা রবের মাহাত্ম্য, একত্ব ও তাঁর ক্রোধকে স্মরণ করে নিজেকে দমন ও সংযত করে বিনয়ী হয়। এমনিভাবে আল্লাহ তাআলার মাহাত্ম্যের দরুন তার হৃদয় চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। আর সে আল্লাহ তাআলার ভয়ে ভীত হয়ে পড়ে, আল্লাহর ক্ষমতা ও আধিপত্যের কাছে অবনমিত হয়ে যায়। এটাই হলো প্রকৃত বিনয়। এটা প্রথম প্রকারের বিনয়ের জন্য অত্যাবশ্যক। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের বিনয়ের জন্য প্রথম প্রকারের বিনয় অত্যাবশ্যক নয়। প্রকৃত বিনয়ী সে ব্যক্তি যার মধ্যে উভয় প্রকার বিনয় বিদ্যমান।

দিন প্রতিষ্ঠায় প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন ও গর্ব করার মধ্যে পার্থক্য: আল্লাহ তাআলার দিনকে সমুন্নত করার লক্ষ্যে প্রভাব-প্রতিপত্তি অর্জন করার অর্থ হলো শরিয়তের নির্দেশাবলিকে সংরক্ষণ ও সচল রাখা। শরিয়তের বিধি-বিধান বলবৎ রেখে সেটা থেকে উপকৃত হওয়া। আর এর সাথে সাথে শরিয়তের সুমহান আদর্শকে অক্ষুণ্ণ রাখা।

দিনকে প্রতিষ্ঠা করার ব্যাপারে গর্ব বা অহঙ্কার করার অর্থ হলো, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা লাভের লক্ষ্যে আগ্রহী হওয়া, ব্যক্তিস্বার্থে আইন-কানুন জারি করা, এতে যদি কেউ কোনো বাধার সৃষ্টি করে, তাহলে জোর-জবরদস্তি করে তাকে প্রতিহত করা ও ব্যক্তিস্বার্থকে শরিয়তের উপর প্রাধান্য দেওয়া।

ব্যক্তিগত সহানুভূতি ও দ্বীনি সহানুভূতির মধ্যে পার্থক্য: দ্বীনি সহানুভূতি হলো শরিয়তের বিধি-বিধান অনুযায়ী মানুষের সাথে সদ্ব্যবহার করা। আর ব্যক্তিগত সহানুভূতি হলো দ্বীনের পরিবর্তে নাফসের প্ররোচনায় লোক দেখানো প্রতিপত্তি ও সম্মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কাজ করা। দ্বীনি সহানুভূতির মধ্যে আল্লাহ তাআলার হকে মাহাত্ম্য সুপ্রতিষ্ঠিত করার জন্য ঐ ব্যক্তির হৃদয়ে ক্রোধের সঞ্চার হয়ে থাকে। তবে এই ক্রোধ ব্যক্তিস্বার্থে নয় আর সেই ব্যক্তির হৃদয়ে আল্লাহ তাআলার সার্বভৌমত্বের আলো ঝলসে উঠে ও সে আলোয় তার অন্তর পরিপূর্ণতা লাভ করে।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন ক্রোধের সঞ্চার হতো তখন তাঁর চেহারা মুবারক লাল রঙ ধারণ করতো এবং পবিত্র ললাটে ঘাম দেখা দিতো যা তাঁর ক্রোধকে কমিয়ে দিতো। দ্বীনের সহানুভূতির কারণেই তাঁর ক্রোধ দেখা দিতো। হযরত জায়েদ ইবনে আসলাম (রা) কর্তৃক বর্ণিত আছে যে, যখন হযরত মূসা (আ)-এর ক্রোধ আসতো তখন তাঁর মাথার টুপি পর্যন্ত গরম হয়ে যেতো। আসলে ব্যক্তিগত সহানুভূতির মধ্যে আনন্দ উপভোগের জন্য অথবা হারানো আনন্দের জন্য নাফসের মধ্যে একটি স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি হয়। কেননা নাফসের মধ্যে ফিতনা নিহিত আছে আর এই ফিতনাই হলো স্ফুলিঙ্গস্বরূপ। এছাড়া নাফস লালসার অগ্নি ও ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে পড়ে। কেননা লালসা ও ক্রোধ এমনি এক ধরনের আগুন যেটা মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মধ্যে তাপ সৃষ্টি করে। আল্লাহ তাআলার হকের জন্য এ তাপ নাফসে মুতমায়িন্নাহর পক্ষ থেকে হতে পারে অথবা ব্যক্তিস্বার্থে নাফসে আম্মারাহর পক্ষ থেকে হতে পারে।

বদান্যতা ও অপচয়ের মধ্যে পার্থক্য: একজন দানশীল ব্যক্তি সাধারণত বিচক্ষণ ও যুক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকেন। তিনি কোনো না কোনো কল্যাণের স্বার্থে উপযুক্ত স্থানেই দান করে থাকেন। আর একজন অপব্যয়ী ব্যক্তি প্রায়শ অযথা ও অপাত্রে ব্যয় করে থাকে, আবার কোনো কোনো সময় যথাস্থানেও ব্যয় করে থাকে। আল্লাহ তাআলা তাঁর হিকমতের মাধ্যমে ধনসম্পদে যার যার ন্যায্য পাওনা ঠিক করে দিয়েছেন। সেগুলো দুই প্রকার— নির্ধারিত হক ও অনির্ধারিত হক। এক. নির্ধারিত হক হলো যাকাত, সাদকায়ে ফিতর যেগুলো আদায় করা অত্যাবশ্যক। দুই. অনির্ধারিত হক হলো— মেহমানের হক আদায় করা, একজন উপকারীর উপকার শোধ করা আর ঐ খাতে ব্যয় করা যার দ্বারা নিজের ইজ্জত ও সম্ভ্রম রক্ষা পায়। যে কোনো দানকারী এসব ন্যায্য পাওনা আনন্দচিত্তে ও এই আশায় আদায় করে যে, আল্লাহ তাকে দুনিয়াতে ও আখিরাতে এর প্রতিদান দেবেন। কাজেই ঐ ব্যক্তি বদান্যতার সাথে ও খোলামনে এবং নাফসে মুতমায়িন্নাহর অনুপ্রেরণায় তার ধনসম্পদ ব্যয় করে। কিন্তু একজন অপব্যয়ী ব্যক্তির লোভ-লালসার কারণে তার হাত খোলা থাকে এবং অন্ধ ও অন্যায়ভাবে ব্যয় করে, তার ব্যয়ের কোনো পরিকল্পনা বা হিসাব থাকে না, কোনো সুযোগ-সুবিধার প্রতিও সে লক্ষ্য করে না। যদি ঘটনাচক্রে কোনো ভালো কাজে ব্যয় করার তার কোনো সুযোগ-সুবিধা এসে যায়, তাহলে সেটা হবে একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা।

আর একজন সখী বা দাতা ব্যক্তির উদাহরণ হলো, যে উর্বর জমিতে বীজ বপন করে এবং ঐ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে যাতে সেখানে প্রচুর ফুল ও ফল জন্মে। একজন অপব্যয়ী ব্যক্তির উদাহরণ হলো শক্ত ও অনুর্বর লোনা জমিতে সে যেন বীজ বপন করলো। ঘটনাক্রমে তার বপন করা বীজ যদি অঙ্কুরিতও হয় এবং ফলও জন্মে, তবে সেই বীজ সাধারণত কোনো কাজে লাগে না। একজন দানশীল ব্যক্তির ব্যাপার তার ঠিক উল্টো, তার বীজ ফলে ফুলে সুশোভিত হয় ও উৎকর্ষ লাভ করে। তবে কখনো কখনো বেশি চারা গাছগুলো ভালোভাবে বর্ধিত হয় এবং জমিন সে গাছগুলোকে পুরোপুরি লালন করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে, সত্যিকারের দাতা তো হলেন আল্লাহ তাআলা। বিশ্বজাহানের যাবতীয় দান আল্লাহ তাআলার দানের তুলনায় এমন যেমন সমুদ্রের তুলনায় একবিন্দু পানি, বরং এর চেয়েও কম। ঐ পানির কাতরা বা বিন্দুও তাঁরই দান। আর আল্লাহ যতোটুকু ইচ্ছা ততোটুকু বর্ষণ করেন। আল্লাহর যে কোনো দান তাঁর হিকমত অনুযায়ীই স্থান-কাল-পাত্রভেদে হয়ে থাকে, যদিও মানুষ সেটা অনুধাবন বা উপলব্ধি করতে পারে না। আল্লাহ তাআলা তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণ সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত। তিনি এটাও জানেন, কোন স্থান তাঁর অনুগ্রহ পেতে পারে আর কোন স্থান তা পেতে পারে না।

ভয় ও অহঙ্কারের মধ্যে পার্থক্য: যখন একজন বান্দার হৃদয় আল্লাহ তাআলার মাহাত্ম্য ও মহিমায় ভরে ওঠে তখন তার উপর শান্তি বর্ষিত হয়। আর একটি নূর তার হৃদয়েও ছড়িয়ে পড়ে। তারপর সে আল্লাহর ভয়-ভীতিতে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। আর তার চেহারা থেকে লাবণ্য ও গাম্ভীর্য প্রকাশ পায়। আর তার হৃদয়ের গভীরে আল্লাহ তাআলার ইশক ও মহব্বত জন্ম নেয়। তারপর তার দিকে জনগণের হৃদয় আকৃষ্ট ও আগ্রহান্বিত হতে থাকে এবং তাকে দেখে মানুষ শান্তি ও তৃপ্তি অনুভব করে। এমনকি তার সব বক্তব্য আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর হয়ে থাকে। আর তার আমলও নূরানী হয়ে যায়। সে চুপ থাকলেও তার পরিবেশ অতীব সুন্দর, মোহনীয় ও ভাবগম্ভীর পরিদৃষ্ট হয়। সে যখন কথা বলে, তখন মানুষ সেটা অতি মনোযোগের সাথে শ্রবণ করে।

পক্ষান্তরে, কারো অন্তর যদি মূর্খতা ও জুলুমের দ্বারা ভরে যায়, তাহলে তার থেকে ইবাদত বন্দেগি বিদায় নেয়। অসন্তোষ তাকে ছেয়ে ফেলে, তখন সে লোকজনকে বাঁকা চোখে দেখে, গর্ব করে চলে, নিজেকে অন্যদের উপর প্রাধান্য দেয়। আর কাউকে অগ্রাধিকারের উপযুক্ত মনে করে না। নিজেকে নিজে বড় মনে করে। কারো সঙ্গে হাসিমুখে দেখা-সাক্ষাৎ করে না বরং ম্লান ও বিমর্ষ মুখে দেখা করে আর মনে করে অন্য সকলের উপর আমার অধিকার আছে, কিন্তু আমার উপর কারো কোনো অধিকার নেই। আমি সবার চেয়ে উত্তম কিন্তু আমার চেয়ে কেউ বড় বা উত্তম নয়। এরূপ ব্যক্তি ক্রমশ আল্লাহ তাআলার নিকট থেকে দূরে সরে যায়, জনগণের দৃষ্টিতে ধিকৃত ও নিন্দিত হয়ে যায়, সবাই তাকে ঘৃণা করে। প্রকৃতপক্ষে, ভয়-ভীতি হলো মাহাত্ম্যের চিহ্ন। আর অহঙ্কার ও জুলুম হলো মূর্খতার লক্ষণ।

সম্মান রক্ষা করা ও অহঙ্কারের মধ্যে পার্থক্য: ইজ্জত ও সম্ভ্রম হিফাযতকারীর উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তির মতো যে নতুন, পরিষ্কার ও মূল্যবান পোশাক-পরিচ্ছদ পরে শাহী দরবারে গমন করে এবং প্রশাসক ও নেতৃবর্গের সাথে মিলিত হতে চায়। বাহ্যত এ ব্যক্তি নিজের জামা-কাপড় ময়লা, ধুলাবালি, দাগ ইত্যাদি থেকে পাকসাফ রাখার প্রবল চেষ্টা করে, যাতে পোশাক-পরিচ্ছদ শাহী দরবারে গমনের উপযুক্ত হয়। আর সে এ ব্যাপারে খুবই সতর্ক থাকে। আর সে এই জায়গা থেকে সতর্কভাবে বের হয়ে আসে যাতে তার পোশাকে ময়লার কোনো চিহ্ন বা দাগ লাগতে না পারে। দুর্ঘটনাবশত ময়লার কোনো দাগ যদি লেগে যায় তাহলে সে সঙ্গে সঙ্গে উত্তমরূপে তা ধুয়ে নেয়, যেন ময়লার কোনো চিহ্নও অবশিষ্ট না থাকে। একজন দিল ও দ্বীনের হিফাযতকারীর অবস্থা ঠিক এমনি হয়ে থাকে। তবে মানুষের চোখ কাপড়ের ময়লা দাগগুলো দেখতে পায় কিন্তু দিলের দাগ দেখতে পায় না। কেননা তাকে অলসতা ও অজ্ঞতার পর্দা ছেয়ে আছে। আল্লাহ তাআলা এসব বান্দাদেরকে অপবাদের স্থান থেকে ও জনগণ থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন, যেন তাদের দিলের মিহিন ও সাদা কাপড়ের উপর কোনো গুনাহের ছিঁটা না পড়ে। একজন অহঙ্কারী ব্যক্তি এরূপ সতর্কতার ক্ষেত্রে এই পর্যায়ভুক্ত। তবে ঐ অহঙ্কারী ব্যক্তি মানুষের ঘাড়ে চড়তে চায়, তাদেরকে হেয় ও পদদলিত করতে চায়। এই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা প্রথমোক্ত ব্যক্তির জন্য এক ধরনের আর দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য অন্য ধরনের।

বীরত্ব ও অপরিণামদর্শিতার মধ্যে পার্থক্য: বীরত্বের সম্পর্ক হলো অন্তরের সাথে। নাজুক ও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে অটল থাকাকে শাজাআত বা বীরত্ব বলা হয়। এই বৈশিষ্ট্য ধৈর্য ও সুধারণা থেকে জন্ম নেয়। একজন মানুষ যখন বিজয় লাভের আশায় ধৈর্যধারণ করে, তখন সে অতিশয় নাজুক পরিস্থিতিতেও অটল ও অবিচল থাকে। ভুল ধারণা, অধৈর্য ও অসহিষ্ণুতা থেকে কাপুরুষতা জন্ম নেয়। এ অবস্থায় একজন মানুষ হয় বিজয় সম্পর্কে আশাবাদী, না হয় সবর অবলম্বনকারী। ভীরুতার মূল কারণ হলো, অবিশ্বাস ও ভুল ধারণা। ভীরু ব্যক্তির অন্তর কুমন্ত্রণায় পরিপূর্ণ থাকে, যার উৎসস্থল হলো ফুসফুস। কুধারণা ও কুমন্ত্রণার সময় তার ফুসফুস ফুলে যায়। আর হৃদয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করে, তাকে অস্থির ও অশান্ত করে তোলে। এভাবে তার অন্তরে অস্থিরতা ও অশান্তির উদ্ভব হয়। তাই নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "মানুষের ভেতরে মন্দ স্বভাব অন্তর থেকে বের হয়ে আসে, যা কাপুরুষতা, অনুশোচনা ও লোভের সৃষ্টি করে।" কাপুরুষতাকে আরবি ভাষায় 'খালে' বলা হয় কেননা ফুসফুস ফুলে যাওয়ার দরুন দিল তার স্থান থেকে সরে যায়। তাই বদরের যুদ্ধে আবু জাহল তার সাথী উতবাকে বলেছিলো, তোমার ফুসফুস ফুলে গিয়েছে। অর্থাৎ তুমি কাপুরুষ হয়ে গিয়েছো। যখন কারো দিল বা অন্তঃকরণ স্বস্থান থেকে সরে যায়, তখন তার বুদ্ধির কার্যকারিতাও কমে যায়। অবশেষে তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অবসন্নতা দেখা দেয়। অন্তর তখন সঠিকভাবে কাজ করে না। একজন মানুষের অন্তরের তাপ তার বীরত্বকে দৃঢ়পদে দাঁড় করিয়ে দেয়, সে তখন অটল ও অবিচল থেকে তার কাজ সমাধা করে। তারপর যখন তার অন্তর তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সুদৃঢ় দেখে, তখন সে ঐ ব্যক্তির সাহায্যে এগিয়ে আসে। মানুষের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ হলো দিলের খাদিম বা সেবক। এ কারণেই দিল যখন পলায়নপর হয়, তখন তার সেবকরাও দ্রুত পালিয়ে যায়।

অপরপক্ষে, জুরয়াত কোনো ব্যক্তির অপরিণামদর্শিতা সহকারে অগ্রসর হওয়াকে বুঝায়, যার কারণ হলো উগ্রতা ও মনের অস্থিরতা। জুরয়াতে নাফস অর্থাৎ নাফসের অপরিণামদর্শিতা একজন মানুষকে যেখানে পদক্ষেপ করা উচিত নয়, সেখানে পদক্ষেপ করতে অনুপ্রাণিত করে। এর পরিণাম ফল কি লাভজনক না অলাভজনক সেদিকে সে কোনো ভ্রূক্ষেপ করে না।

দৃঢ়তা ও কাপুরুষতার মধ্যে পার্থক্য: দৃঢ় ও দূরদর্শী ঐ ব্যক্তি যে ভেবেচিন্তে সাহসের সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের গভীরতা পর্যন্ত পৌঁছার চেষ্টা করে। আর তার ভালো-মন্দ বিবেচনা করে প্রত্যেকটি বিষয়ের যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। আরবি 'হাযম' শব্দটি শক্তি ও দৃঢ়তাকে বুঝায়। 'হাযমাতুন' লাকড়ির বোঝাকে বলা হয়। একজন দূরদর্শী ব্যক্তি যে কোনো বিষয়ের সকল দিক সম্পর্কে চিন্তা-ভাবনা করে। আর তার ধ্যান-ধারণার আলোকে যেখানে-সেখানে অগ্রসর হওয়া অনুচিত বলে মনে করে। এই ভীরুতা তার দুর্বলতার কারণে নয়। অপর পক্ষে, কাপুরুষতা হলো এর ঠিক বিপরীত অবস্থা।

মিতব্যয়িতা ও কৃপণতার মধ্যে পার্থক্য: আরবি 'ইকতিসাদ' শব্দটির অর্থ হলো মিতব্যয়িতা। কোনো আয়-ব্যয়কে নীতিগতভাবে সমন্বিত করা, কোনো বিষয় সম্পর্কে কীভাবে ব্যয় করা হবে বা না হবে তা চিন্তা করে নির্ধারণ করা। এটাকে মিতব্যয়িতা বলে। তবে কোনো খরচ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না করে মধ্যবর্তী নিয়ম অনুসরণ করাই শ্রেয় ও যুক্তিযুক্ত। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "আর নিজের হাতকে (কৃপণতাবশত) কাঁধের দিকে সঙ্কুচিত করে রেখো না, আর একেবারে প্রসারিতও করে দিও না, অন্যথায় তিরস্কৃত ও রিক্তহস্ত হয়ে বসে পড়বে।” (সূরা বনী ইসরাইল: আয়াত-২৯)

"আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয়ও করে না আর কার্পণ্যও করে না, আর তাদের ব্যয় করা এর মধ্যস্থ মাঝামাঝি পন্থা হয়ে থাকে।” (সূরা ফুরকান: আয়াত-৬৭)

"খাও ও পান করো আর অপচয় করো না।" (সূরা আ'রাফ: আয়াত-৩১)

আরবি 'শুহহুন' শব্দটির অর্থ হলো কৃপণতা। লোভ-লালসা ও কৃপণতা মন্দ স্বভাব, যা হীনমন্যতা ও নাফসের কুপ্রবৃত্তি ও শয়তানি কুমন্ত্রণা থেকে সৃষ্টি হয়। এভাবে মানুষ অতি লোভী হয়ে যায়। এমনকি কোনো সৎকাজে এক কপর্দকও ব্যয় করতে ইতস্তত করে এভাবে যে আবার সে গরীব না হয়ে পড়ে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "মানুষকে অস্থিরচিত্ত করে সৃষ্টি করা হয়েছে। যখন তাকে দুঃখ স্পর্শ করে তখন সে হাহুতাশ করতে থাকে। আর যখন সে স্বচ্ছল থাকে, তখন কার্পণ্য করতে আরম্ভ করে।” (সূরা মাআরিজ: আয়াত ১৯-২১)

সতর্কতা ও কুধারণার মধ্যে পার্থক্য: একজন সতর্কতা অবলম্বনকারী ব্যক্তিকে ঐ লোকের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে, যে বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মাল-সামান ও বাহন নিয়ে খুব সাবধানে পথ অতিক্রম করে এবং বিপজ্জনক জায়গা থেকে আত্মরক্ষার জন্য নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। এছাড়া চলার পথে অন্যান্য বিপদাপদের মুকাবিলার জন্য অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও প্রস্তুত থেকে নিজেকে সুরক্ষিত রাখে। তার এই সাহস ও সাবধানতা তাকে মনের দুর্বলতা থেকে রক্ষা করে। কুধারণা অর্থাৎ মানুষের প্রতি অহেতুক খারাপ ধারণা পোষণ করা এক শ্রেণীর লোকের সহজাত অভ্যাস। তারা কাউকে বিশ্বাস করে না এবং অবিশ্বাসের বশবর্তী হয়ে লোকের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে চলে। মানুষ এই শ্রেণীর লোককে পছন্দ করে না। সতর্কতা অবলম্বনকারী ব্যক্তি লোকজনের সাথে মেলামেশা করে বটে কিন্তু সে তাদেরকে এড়িয়ে চলে। অপরপক্ষে, একজন কুধারণা পোষণকারী ব্যক্তি কারো সঙ্গে মেলামেশাই করে না, সে অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ ও কপটতা পোষণ করে নিজের হীনমন্যতাকে প্রশ্রয় দেয়।

মানুষের অন্তর্দৃষ্টি ও ধারণার মধ্যে তফাৎ: যে কোনো ধারণা সঠিক হতে পারে, বেঠিকও হতে পারে। স্বচ্ছ অন্তরের আলোর সাথে হতে পারে বা কোনো ব্যক্তির অন্তরের অন্ধকারের সাথেও হতে পারে। এমনিভাবে অন্তরের পবিত্রতার সাথে হতে পারে অথবা অন্তরের অপবিত্রতার সাথেও হতে পারে। যে কোনো মানুষকে প্রত্যক্ষ করলে তার সম্বন্ধে মোটামুটি একটি ধারণা লাভ করা যায়। তাই আল্লাহ তাআলা অধিক সন্দেহজনক ধারণা থেকে আত্মরক্ষার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন এবং বলেছেন, "কোনো কোনো ধারণা পোষণ করাই গুনাহের কাজ।" ইরশাদ হয়েছে, "নিঃসন্দেহে এর মধ্যে অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে।" (সূরা হিজর: আয়াত-৭৫)

আরো বলা হয়েছে, "না চাওয়ার কারণে এদেরকে মূর্খ ব্যক্তিরা মালদার মনে করে, তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে।" (সূরা আল-বারাকাহ: আয়াত-২৭৩)

আরো বলা হয়েছে, "আমি ইচ্ছা করলে তোমাকে তাদের পরিচয় দিতাম। তবে তুমি তাদের চেহারা ও কথন পদ্ধতি দেখে অবশ্যই চিনতে পারবে।” (সূরা মুহাম্মদ: আয়াত-৩০)

আসল ফিরাসত বা অন্তর্দৃষ্টি হলো, অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট, যে অন্তর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ময়লা-আবর্জনা থেকে মুক্ত। আর এটা হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়। একজন মুমিন ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার ঐ নূর দিয়ে দেখে, যা আল্লাহ তাআলা তার অন্তরের মধ্যে নিহিত রেখেছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, "মুমিনের ফিরাসত বা অন্তর্দৃষ্টি থেকে সাবধান। কেননা সে আল্লাহ তাআলার নূর দিয়ে সবকিছু দেখতে পায়।” আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের কারণে একজন মুমিন বান্দার অন্তর্দৃষ্টি লাভ হয়। কোন মুমিনের অন্তর যখন আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভ করে, তখন আল্লাহ তাআলাকে উপলব্ধি করার ও জানার সকল প্রতিবন্ধকতা তার দূর হয়ে যায়। সে অবস্থায় তার যোগ্যতা দ্বারা আল্লাহ তাআলার বিশেষ অনুগ্রহে ঐ ধরনের যে রৌশনি সে লাভ করে, যে রৌশনির দ্বারা সে ঐসব জিনিস দেখতে পায় যা আড়ালে বা অনেক দূরে থাকার কারণে দেখা যায় না। তাই একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "আমার নৈকট্য লাভের জন্য ফরয আমলসমূহ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আর একজন বান্দা তার নফল ইবাদত দ্বারা আমার নিকটবর্তী হতে পারে। এমনকি তার সাথে আমার মহব্বত পয়দা হয়ে যায়, তারপর আমি যখন তাকে ভালোবাসতে শুরু করি, তখন আমি তার কান হয়ে যাই, যার দ্বারা সে শুনতে পায়, চোখ হয়ে যাই, যার দ্বারা সে দেখতে পায়, হাত হয়ে যাই, যার দ্বারা সে ধরতে পারে, আর পা হয়ে যাই, যার দ্বারা সে চলাফেরা করে। তারপর সে আমারই কথা শুনে, আমারই সৃষ্ট বস্তুসমূহ দেখে, আমারই নির্দেশ অনুযায়ী কোনো কিছু ধরে। আর আমার নির্দেশ অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে।" এই হাদীসের দ্বারা জানা গেলো, আল্লাহর নৈকট্য লাভের দ্বারা তাঁর মহব্বত লাভ করা যায়। আর যখন আল্লাহ তাআলা চান, তখন বান্দার সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তাঁর হুকুম অনুযায়ী সক্রিয় ও সচল হয়ে পড়ে। সে অবস্থায় তার দিল একটি পরিষ্কার আয়নার মতো হয়ে যায়। তার মধ্যে যা প্রকৃত সত্য সেটা দৃষ্টিগোচর হয়, সে অন্তরই আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে যাঁর অন্তর আল্লাহর নূরে আলোকিত, আর সন্দেহ ও কুমন্ত্রণা থেকে নিরাপদ। যে অন্তরের উপর আল্লাহ নূরের প্রাধান্য বেড়ে যায়, সে অন্তরের আলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। এ নূরই অন্তর থেকে চোখে আসে এবং তা সত্য উদঘাটনকারী হয়।

অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে জানা কিছু ঘটনা: নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযরত সাহাবাদেরকে অন্তরের চোখে অথবা নূরে ফিরাসাতে নামাযের মধ্যে দেখে নিতেন। একদা তিনি মক্কা শরীফ থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর একবার মদীনা মুনাওয়ারায় পরিখা খনন করতে গিয়ে সিরিয়ার মহলসমূহ, সানা শহরের ফটক এবং পারস্য সম্রাটের শহর প্রত্যক্ষ করেছিলেন। একবার মদীনা মুনাওয়ারা থেকে মৃতায় যুদ্ধরত সেনাপতির শহীদ হওয়া প্রত্যক্ষ করেছিলেন। আর একবার আবিসিনিয়ার নাজ্জাশীকে সেখানে মৃত্যুবরণ করতে দেখেছিলেন। অথচ তখন তিনি মদীনা মুনাওয়ারায়ই ছিলেন। তারপর তিনি ময়দানে গিয়ে সবাইকে সাথে নিয়ে নাজ্জাশীর জানাযার নামায আদায় করেছিলেন।

হযরত উমর (রা) পারস্যের নেহাওয়ান্দ নামক স্থানে সিপাহসালার ও মুসলিম সেনাবাহিনীকে শত্রুর মুকাবিলা করতে দেখতে পেলেন এবং তাদেরকে সাবধান করে দিয়ে বলেছিলেন, পাহাড় পেছনে রেখে যুদ্ধ করো। অথচ তিনি সে সময়ে মদীনা মুনাওয়ারায় ছিলেন। একবার তাঁর নিকট মুজহাজ নামক স্থান থেকে কয়েকজন লোক আসলেন, তাদের মধ্যে আশতার নাখয়ীও ছিলেন। হযরত উমর (রা) তাকে অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এই লোকটি কে? উত্তরে বলা হলো, ইনি হলেন— মালিক ইবনে হারিস। তখন তিনি বললেন, এর উপর আল্লাহ তাআলার ধ্বংস নেমে আসুক। আমি মুসলমানদের জন্য এর থেকে একটি ভীষণ ফিতনা প্রত্যক্ষ করছি। একবার আমর ইবনে উবায়েদ (রা) হযরত হাসান (রা)-এর নিকট এসেছিলেন। তিনি হযরত হাসান (রা)-কে লক্ষ্য করে বলেছিলেন, "ইনি হলেন নওজোয়ানদের সর্দার, যদিও তিনি মুহাদ্দিস নন।"

হযরত ইমাম শাফেয়ী (র)-এর অন্তর্দৃষ্টি: কথিত আছে যে, একবার ইমাম শাফিয়ী (র) এবং হযরত মুহাম্মদ ইবনে হাসান (র) মসজিদে হারামে বসা ছিলেন। এমন সময় একজন লোক সেখানে আসলো। মুহাম্মদ ইবনে হাসান (র) বললেন, আমার মনে হয় লোকটি কাঠমিস্ত্রী। ইমাম শাফিয়ী (র) বললেন, আমার মনে হয়, লোকটি কর্মকার। লোকটিকে জিজ্ঞেস করে জানা গেলো যে, সে আগে কর্মকার ছিলো, বর্তমানে সে কাঠমিস্ত্রী।

হযরত আবুল কাসেম মুনাদী (র)-এর অন্তর্দৃষ্টি: একবার অসুস্থ হযরত আবুল কাসেম মুনাদী (র)-এর সেবা-শুশ্রূষার জন্য হযরত আবুল হাসান বুশঞ্জী (র) ও হযরত হাদ্দাদ হাসান (র) তাঁর নিকট আসলেন। তাঁরা আসার সময় পথিমধ্যে ধারে কিছু আপেল ক্রয় করেছিলেন। যখন তাঁরা হযরত আবুল কাসেম মুনাদী (র)-এর নিকট আসলেন, তখন ধারে আপেল ক্রয় করার বিষয়টি আবুল কাসেম মুনাদী (র)-এর কাছে তাঁর অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছিলো এবং তিনি তাদেরকে বলেছিলেন, “এটা কেমন একটি অশুভ ব্যাপার।” তাঁরা মনে করলেন, তাঁরা যে ধারে আপেল ক্রয় করেছিলেন, হয়তো সে জন্য তিনি এরূপ মন্তব্য করেছেন। তাই তাঁরা ফিরে গিয়ে আপেলের দাম পরিশোধ করে আসলেন। তিনি আবার তাঁদেরকে দেখেই বলে উঠলেন, মানুষের পক্ষে এতো তাড়াতাড়ি অন্ধকার থেকে আলোয় আসা কীভাবে সম্ভব? এবং তিনি তাদের কাছে ঘটনাটি জানতে চাইলেন। তখন তাঁরা ধারে আপেল ক্রয় করার বিষয়টি বর্ণনা করলেন। সব শুনে তিনি বললেন, যদিও তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের কোনো অভাব ছিলো না যে তারা যে কেউ একজন আপেলের মূল্য পরিশোধ করে দেবে। দোকানদার দু'জনের মধ্যে কার কাছ থেকে আপেলের মূল্য চেয়ে নেবেন এ বিষয়ে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন।

হযরত আবু উসমান হীরী (র)-এর অন্তর্দৃষ্টি: হযরত আবূ যাকারিয়া নখশবী (র)-এর সাথে একজন মহিলার বিবাদ-বিসম্বাদ ছিলো। তিনি একদিন হযরত আবূ উসমান হীরী (র)-এর নিকট দাঁড়িয়ে ছিলেন। এসময়ে সে বেগানা মহিলার কথা তাঁর মনে পড়লো। হযরত আবূ উসমান (র) মাথা তুলে বললেন, তোমার কি লজ্জা হয় না যে, তুমি একজন বেগানা মহিলার কথা স্মরণ করছো।

হযরত শাহ কিরমানী (র)-এর অন্তর্দৃষ্টি: কথিত আছে যে, হযরত শাহ কিরমানী (র) সূক্ষ্ম ও সুনিপুণ অন্তর্দৃষ্টির অধিকারী ছিলেন। আর তাঁর বেশির ভাগ অন্তর্দৃষ্টি সঠিক হতো। হযরত শাহ কিরমানী (র) বলতেন, যে ব্যক্তি হারাম দৃষ্টি থেকে চক্ষু বন্ধ রাখবে, লোভ-লালসা থেকে নিজের দিলকে রক্ষা করবে, দিলকে সবসময় মুরাকাবায় নিয়োজিত রাখবে, সুন্নাতের পাবন্দ থাকবে, আর হালাল খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত থাকবে, এমন ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি কখনো ভুল হয় না।

এক নওজোয়ানের অন্তর্দৃষ্টি: জনৈক নওজোয়ান হযরত জুনায়েদ (র)-এর সাথে উঠাবসা করতেন। আর নিজের অন্তরের খেয়ালের ব্যাখ্যা পেশ করতেন। একদিন হযরত জুনায়েদ (র)-এর নিকট তাঁর বিষয়ে আলোচনা হয়। তিনি নওজোয়ানকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বিষয়ে মানুষের এমনি সব ধারণা। নওজোয়ান বললেন, আপনি এখন আপনার দিলে কোনো বিষয় খেয়াল করুন। হযরত জুনায়েদ (র) বললেন, আমি চিন্তা করেছি। নওজোয়ান তা বলে দিলেন। হযরত জুনায়েদ (র) বললেন, ভুল। নওজোয়ান বললেন, আচ্ছা আবার চিন্তা করুন। তিনি বললেন, চিন্তা করেছি। নওজোয়ান তা বলে দিলেন। তিনি বললেন, ভুল। নওজোয়ান বললেন, আপনি আবার চিন্তা করুন। তিনি বললেন, আশ্চর্যের বিষয়, আপনি ঠিকই বলেছেন আর আমার অন্তরের কথাও সত্য। হযরত জুনায়েদ (র) তখন বললেন, তুমি তিনবারই ঠিক বলেছো। আমি তোমাকে পরীক্ষা করেছিলাম মাত্র যে, তোমার দিলের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয় কি না?

এক ফকীরের অন্তর্দৃষ্টি: হযরত আবু সায়ীদ খারায (র) বর্ণনা করেছেন যে, আমি একবার মসজিদে হারামে গেলাম। এমন সময় একজন ফকীর সেখানে আসলেন। তিনি দু'টি দরবেশী পোশাক পরিহিত ছিলেন। এ অবস্থায় তিনি ভিক্ষা চাইতে লাগলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, এই ধরনের লোকই মানুষের জন্য বোঝাস্বরূপ। সেই ফকীর তখন আমাকে লক্ষ্য করে এ পবিত্র আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন, "ভালো করে জেনে নাও, তোমাদের মনের অবস্থা আল্লাহ খুব ভালো করেই জানেন। কাজেই তাঁকে ভয় করো।" (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-২৩৫) আমি তাঁর একথা শুনে মনে মনে আল্লাহ তাআলার কাছে মাগফিরাত কামনা করলাম। পরক্ষণেই তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন, "তিনিই তাঁর বান্দাদের নিকট থেকে তাওবাহ কবুল করেন এবং সব রকমের খারাবি ক্ষমা ও মার্জনা করেন। অথচ তোমাদের সব কাজ-কর্ম সম্পর্কে তিনি অবহিত।” (সূরা শূরা : আয়াত-২৫)

হযরত ইবরাহীম খাওয়াস (র)-এর অন্তর্দৃষ্টি: হযরত ইবরাহীম খাওয়াস (র) বর্ণনা করেছেন যে, একবার আমি এক জামে মসজিদে ছিলাম। এমন সময় একজন সৌম্য ও সুন্দর নওজোয়ান সেখানে আসলেন। তাঁর থেকে খুশবু ছড়িয়ে পড়ছিলো। আমি আমার সাথীদেরকে বললাম, "আমার মনে হয় এ লোকটি ইয়াহুদী।" কিন্তু তারা কেউ আমার কথা বিশ্বাস করলো না। আমি সেখান থেকে চলে এলাম, আর সেই নওজোয়ানও চলে গেলো। পরবর্তীতে ঐ নওজোয়ান আমার সাথীদের সাথে দেখা করে জানতে চাইতো, তার সম্পর্কে আমি কী বলেছি, আমার সাথীরা তাকে তা জানাতে লজ্জাবোধ করলেন। কিন্তু সে নাছোড়বান্দা। অগত্যা তাঁরা বললেন যে, তিনি আপনাকে একজন ইয়াহুদী বলে মন্তব্য করেছেন। অতঃপর সে আমার কাছে এসে হাত ধরে যথারীতি মুসলমান হয়ে গেলো। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কেন মুসলমান হলে? নওজোয়ান বললো, আমাদের (আসমানী) কিতাবে পড়েছি যে, সিদ্দীক ব্যক্তির অন্তর্দৃষ্টি ভুল হয় না। তাই ভাবলাম, কেউ যদি সিদ্দীক হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি আল্লাহ প্রেমিকদের মধ্যে থাকবেন। সুতরাং আমি আপনার নিকট আসলাম, আর আপনি আমাকে দেখেই বুঝতে পারলেন আমি একজন ইয়াহুদী। কাজেই আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না যে, আপনি অবশ্যই একজন সিদ্দীক।

হযরত উসমান (রা)-এর অন্তর্দৃষ্টি: একবার হযরত উসমান (রা)-এর নিকট জনৈক সাহাবী আসলেন। তিনি পথিমধ্যে একজন বেগানা মহিলাকে দেখে এসেছিলেন এবং তার শোভা ও সৌন্দর্য নিয়ে ভাবছিলেন। তাঁকে দেখে হযরত উসমান (রা) বললেন, "কোনো কোনো লোক এমন অবস্থায় আমার নিকট আসে যে, ব্যভিচারের চিহ্ন ও প্রতিক্রিয়া তার চেহারায় ফুটে ওঠে।” সে সাহাবী তখন বললেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরবর্তীকালেও কি ওহী জারি আছে? তিনি বললেন, 'না'। এটা হলো নিরেট ফিরাসত বা অন্তর্দৃষ্টি।

উপদেশ দেয়া ও পরনিন্দার মধ্যে পার্থক্য: উপদেশ দেয়া বা মঙ্গলকামনার উদ্দেশ্য হলো, মুসলমানদেরকে কোনো বিদআতী, ফিতনাবাজ, প্রতারক বা ক্ষতিকারকের থেকে সাবধান করা। যখন কেউ কোনো মুসলমানের সাথে যোগাযোগ করার জন্য বা লেনদেন করার জন্য বা তার সাথে উঠাবসার লক্ষ্যে কোনো উপদেশদাতার পরামর্শ চায়, তখন তাকে ঐ ব্যক্তি সম্পর্কে তার সঠিক অবস্থা অবহিত করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ এখানে বলা যায় যে, হযরত ফাতিমা বিনতে কায়েস (রা) যখন হযরত মুআবিয়া (রা) অথবা হযরত আবূ জাহাম (রা)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পরামর্শ চেয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, "মুআবিয়া (রা) হলেন একজন গরিব মানুষ, আর আবু জাহাম (রা) এমন এক ব্যক্তি যে স্ত্রীকে মারধর করে।"

সবর ও অন্তরের কঠোরতার মধ্যে পার্থক্য: সবর হচ্ছে এমন একটি গুণ যা মানুষকে অর্জন করতে হয় এবং মানুষ তার অন্তরকে সকল ভয়-ভীতি ও অশান্তি থেকে মুক্ত রাখে। একজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি বিপদ-আপদে পড়লে কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকে এবং হাহুতাশ করে না। এভাবে একজন নেককার বান্দা সবরের মাধ্যমে তার অন্তরকে শঙ্কামুক্ত রাখেন। তাঁর জিহ্বাকে কোনো প্রকার অভিযোগ করা থেকে ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে অসঙ্গত ও অশুভ আচরণ থেকে সংযত রাখেন। আসলে অন্তরকে তাকদীর ও শরিয়তের নির্দেশাবলির উপর সুদৃঢ় ও অবিচল রাখার নামই হলো সবর।

অন্তরের কঠোরতাকে আরবিতে কাসওয়া বলে। অন্তরের কঠোরতার দরুন একজন মানুষের মধ্যে কোনো কিছুই কোনো প্রকার প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। অন্য কথায় রুক্ষতা ও কঠোরতার কারণে একজন মানুষ পাষাণ হৃদয়ে পরিণত হয়। মানুষের অন্তর তিন প্রকার। এক. কঠিন হৃদয় যেটা পাথরের মতো শক্ত ও অপবিত্র। দুই. যেটা অতিশয় নরম। কঠিন হৃদয় কোনো ভালো গুণ গ্রহণ করে না। আর নরম হৃদয় হয় পানির মতো স্বচ্ছ। তিন. কালবে রাকীক, এটাই হচ্ছে আদর্শ হৃদয়। যেটা পাথরের মতো শক্ত নয় আবার পানির মতো স্বচ্ছও নয়। আসলে, এটা হচ্ছে এক ধরনের স্বচ্ছ ও নির্মল হৃদয়। এই হৃদয় তার নির্মলতার কারণে ন্যায় ও অন্যায়, সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সক্ষম। সে অন্তর তার নম্রতার দরুন সত্যকে গ্রহণ করে সংরক্ষণও করে। ন্যায় ও সত্যের খাতিরে নরম দিলও কঠিন হতে পারে। সে অবস্থায় নরম হৃদয় শত্রুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। হাদীসে বর্ণিত আছে যে, মানুষের হৃদয় হচ্ছে আল্লাহর জমিনে তাঁর পবিত্র পাত্রস্বরূপ। সে হৃদয়কে কালবে যুজাজী বলা হয়। 'যুজাজ' শব্দের অর্থ হলো কাঁচ। কাঁচের মধ্যে উপরোক্ত তিনটি গুণ বিদ্যমান আছে। আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট অন্তর হলো কালবে কাসী বা পাথরের মতো কঠিন হৃদয়। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন— "দুর্ভোগ সেই কঠোর হৃদয় ব্যক্তিদের জন্য যারা আল্লাহর স্মরণে পরাঙ্মুখ তারা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।” (সূরা আয-যুমার: আয়াত-২২)

“এসব নিদর্শন দেখার পরও শেষ পর্যন্ত তোমাদের অন্তর কঠিন হয়ে গেলো, পাথরের ন্যায় কঠিন কিম্বা এর চেয়েও কঠিনতর।” (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-৭৪)

"এ কারণে যে, শয়তান যা প্রক্ষিপ্ত করে, তিনি তা পরীক্ষাস্বরূপ করে দেন, তাদের জন্য যাদের অন্তরে ব্যাধি রয়েছে এবং যারা পাষাণ হৃদয়।" (সূরা হজ্জ: আয়াত-৫৩)

এই আয়াতগুলোতে বক্র হৃদয়ের কথা বর্ণিত হয়েছে। একটি হৃদয় হলো অসুস্থতার কারণে বক্র, অপরটি হলো কঠিন পাথরের মতো শক্ত হওয়ার কারণে বক্র। আর শয়তানের প্ররোচনা, উপরে উল্লেখিত দু'প্রকারের হৃদয়ের অধিকারীদের জন্য ফিতনা-ফাসাদস্বরূপ। তৃতীয় প্রকারের হৃদয় স্বচ্ছতা ও পরিচ্ছন্নতার কারণে শয়তানের প্ররোচনা ও ফেরেশতাদের প্রদত্ত কথার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে পারে। একটি কোমল হৃদয় আনুগত্য ও নম্রতার কারণে সত্যকে গ্রহণ করতে পারে ও দৃঢ়তার কারণে মন্দ নাফসের মুকাবিলা করতে পারে। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, “এবং এ কারণে যে, যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, তারা যেন জানতে পারে যে, এটা আপনার পালনকর্তার পক্ষ থেকে প্রেরিত সত্য, অতঃপর তারা যেন এতে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাদের অন্তর যেন এর প্রতি অনুগত হয়। আল্লাহই বিশ্বাস স্থাপনকারীকে সরল পথ প্রদর্শন করেন। (সূরা হজ্জ: আয়াত-৫৪)

মার্জনা ও লাঞ্ছনার মধ্যে পার্থক্য: প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উদারতা, বদান্যতা ও পরোপকারার্থে নিজের অধিকার ও ক্ষমতা ছেড়ে দেয়াকে আরবি ভাষায় 'আফু' বলা হয়। একজন মানুষ এইসব অধিকারকে পরিত্যাগ করার মাধ্যমে জনগণকে ইহসান ও সুন্দর স্বভাবের প্রতি অনুপ্রাণিত ও আকৃষ্ট করে। পক্ষান্তরে, একজন হীন ও দুর্বল ব্যক্তি অক্ষমতা, ভয়-ভীতি ও দুর্বলতার কারণে প্রতিশোধ গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। এটি একটি মন্দ ও হীন স্বভাব, যদিও তার জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করা শ্রেয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আর মন্দের প্রতিফল তো অনুরূপ মন্দই। যে ক্ষমা করে দেয় ও আপোষ করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে, নিশ্চয় তিনি অত্যাচারীদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা শূরা: আয়াত-৪০)

উপরোক্ত আয়াতগুলোর মধ্যে তিনটি স্তরের কথা বলা হয়েছে। যেমন— আদল বা ন্যায়বিচার ও তার বৈধতা, ফযল বা উৎকৃষ্টতা ও তার মর্যাদা এবং জুলুম ও তার অবৈধতা। যদি একথা বলা হয়, প্রতিশোধ গ্রহণ বা মার্জনা করা একটি অপরটির বিপরীত, তাহলে এ দু'টি কীভাবে প্রশংসাযোগ্য হতে পারে? এর জবাব হলো, এখানে প্রশংসা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য নয় বরং শক্তি ও ক্ষমতার জন্য। কারো ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধ গ্রহণ করার দু'টি উপায় আছে, আর তাহলো, সমান সমান প্রতিশোধ গ্রহণ করা কিম্বা মাফ করে দেওয়া। আগেকার দিনের এক শ্রেণীর আলিম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোনো মানুষকে কারো কাছে লাঞ্ছিত হওয়া একটি অপছন্দনীয় ব্যাপার। কিন্তু যারা প্রতিশোধ গ্রহণ করার ক্ষমতা রাখতো, তারা ক্ষমা করে দিতো। এটাই হলো সেই বৈশিষ্ট্য যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁর মহান সত্তাকে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, ক্ষমতাশালী আর আল্লাহ অত্যন্ত মার্জনাকারী, পরম দয়ালু।"

একটি প্রসিদ্ধ হাদীসে উল্লেখ আছে যে, আল্লাহর আরশ বহনকারী ফেরেশতা হচ্ছে চারজন। এঁদের মধ্যে দু'জন ফেরেশতা বলেন, হে আল্লাহ, তুমি মহান ও পবিত্র, হে আমাদের রব! মহাজ্ঞানী হওয়া সত্ত্বেও তুমি সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করো, সে জন্য তুমি যাবতীয় প্রশংসার যোগ্য। অপর দু'জন ফেরেশতা বলেন, হে আল্লাহ! তুমি মহান ও পবিত্র, হে আমাদের রব! ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে তুমি মাফ করো সেজন্য তুমি সকল প্রশংসার অধিকারী। এ প্রসঙ্গে হযরত ঈসা (আ) আল্লাহর দরবারে আরয করেছিলেন, "যদি আপনি তাদেরকে শাস্তি দেন, তবে তারা তো আপনার বান্দা, আর যদি তাদেরকে মাফ করে দেন, তবে আপনিই তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা মায়িদা: আয়াত-১১৮)

অর্থাৎ, হে আল্লাহ! তুমি যদি তোমার বান্দার গুনাহ মাফ করে দাও, তাহলে সেটা হবে তোমার উচ্চমর্যাদা ও সম্মানের নিদর্শন। কেননা পূর্ণ ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তুমি তাদেরকে মাফ করে দিয়েছো। সেটা তোমার সর্বোচ্চ জ্ঞান ও প্রজ্ঞারই চিহ্ন। তাদের গুনাহ ও আমল সম্পর্কে তুমি ওয়াকিফহাল, তাদেরকে শাস্তি দেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তুমি মাফ করে দিয়েছো। মানুষ সাধারণত প্রতিশোধ গ্রহণে অক্ষম হলে দৃশ্যত মাফ করে দেয়। আবার কখনো যালিমের জুলুমের প্রকৃতস্বরূপ সম্পর্কে অবহিত না থাকার কারণে তাকেও মাফ করে দেয়। মানুষ যখন কাউকে ক্ষমা করে তখন সে ক্ষমার বাহ্যিক দিক হলো, জুলুম ও লাঞ্ছনা এবং অভ্যন্তরীণ দিক হলো ইজ্জত ও দুর্বলতা। আর প্রতিশোধ গ্রহণের বাহ্যিক দিক হলো ইজ্জত আর অভ্যন্তরীণ দিক হলো লাঞ্ছনা। কেউ যদি কাউকে মাফ করে দেন তখন আল্লাহ সন্তুষ্ট হন ও তাঁর সম্মান বৃদ্ধি করেন। অপরপক্ষে, কেউ যদি নিজের নাফসের তাড়নায় কারো প্রতি প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাহলে সে লাঞ্ছিত ও অপমানিত হয়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সঙ্গে যারা শত্রুতা করতো তাদের বিরুদ্ধে কখনো প্রতিশোধ গ্রহণ করতেন না। এখানে পবিত্র কুরআনের নিম্নের আয়াতটি প্রণিধানযোগ্য। "নিশ্চয় যে অত্যাচারিত হলে পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে।" এর দ্বারা বুঝা যায়, যাদের ক্ষমতা আছে তারা অত্যাচারিত হলে প্রতিশোধ গ্রহণ করে, এটা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আর এ সকল লোক প্রতিশোধ গ্রহণ করার ব্যাপারে কারো সাহায্যপ্রার্থী হয় না। কারণ এরূপ প্রতিশোধ গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করার কোনো অবকাশ নেই। সুবিচার মানুষের একটি মহৎ গুণ। আর প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে মানুষ ন্যায়-অন্যায়ের কোনো তোয়াক্কা করে না। একজন লোক অন্যের প্রতি যতোটুকু অন্যায় আচরণ করে থাকে তার বিরুদ্ধে ততোটুকু ব্যবস্থা গ্রহণ করা বৈধ, তবে সীমা লঙ্ঘন করা যায় না। প্রকৃতপক্ষে, আফু বা ক্ষমা প্রদর্শন করা নাফসে মুতমায়িন্নাহর একটি গুণ। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিশোধ গ্রহণ করা নাফসে আম্মারাহর হীন প্রবণতা ছাড়া আর কিছু নয়।

ইনতিকাম ও ইনতিসার দু'টি আলাদা বিষয়। ইনতিসারের বৈশিষ্ট্য হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে কামনা-বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত থাকা। একজন লোক অনেক দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে সম্মান অর্জন করে, সে সম্মানকে কেউ যদি বিনষ্ট করতে চায় তাহলে তাকে অবশ্যই প্রতিরোধ ও প্রতিহত করতে হবে। কারণ তার ইজ্জত ও মর্যাদাকে কেউ ক্ষুণ্ণ করুক বা কেউ তাকে দাবিয়ে রাখুক এটা সে সহ্য করতে পারে না। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা সকল প্রশংসার অধিকারী, আল্লাহর কোনো বান্দা লাঞ্ছিত বা অত্যাচারিত হলে সে বলে যে আমি আল্লাহর একজন অনুগত বান্দা। আল্লাহর কোনো সেবক কখনো লাঞ্ছিত হয় না এবং আল্লাহও তা সহ্য করেন না। নাফসে আম্মারাহ তার কর্মকাণ্ডের উপর দৃঢ় থাকে এবং তার আত্মতৃপ্তির জন্য প্রতিশোধ গ্রহণ করে বান্দাকে লাঞ্ছিত ও হেয় করতে চায়। কিন্তু নাফসে মুতমায়িন্নাহ সকল কামনা-বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত। সে তাওহীদ ও ইনাবত বা আল্লাহর প্রতি আকর্ষণের মাধ্যমে যে সম্মান ও মর্যাদা লাভ করে সেটা যখন বিপন্ন হয়, তখন তা রক্ষা করার জন্য প্রতিশোধ গ্রহণে সচেষ্ট ও সক্রিয় হয়। আল্লাহর এই যে সাহায্য ও সহায়তা সেটা তার ঈমানের কারণেই লাভ হয়ে থাকে।

এখানে উল্লেখ্য যে, দু'জন ভৃত্য তাদের মুনীবের ক্ষেতে কৃষিকাজ করতো। একদিন একজন অপর জনকে প্রহার করলো। প্রহৃত ভৃত্যটি তার মালিকের শুভকামনায় এবং প্রহারকারীর উপর দয়ার্দ্র চিত্ত হয়ে তাকে মাফ করে দিলো এই ভেবে যে, তা না হলে মুনীব তাকে শাস্তি দেবে। ঘটনাটি মালিকের কর্ণগোচর হলে তিনি ক্ষমাকারী ভৃত্যকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার পদমর্যাদা বাড়িয়ে দিলেন। ফলে ভৃত্যটি হলো মুনীবের পেশকার। মালিক তাকে সুন্দর ও উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ দান করলেন, যাতে দায়িত্ব পালনের সময় ঐ পোশাক সে পরিধান করে। এই অবস্থায় মুনীবের কোনো পশুচালক ঐ পোশাকের উপর ধুলাবালি, ময়লা ফেলে দিয়ে নষ্ট করে দিলো। সেই অবস্থায় ঐ ভৃত্য যদি কাপড় বিনষ্টকারী লোকটিকে মাফ করে দেয়, তাহলে তার মুনীব খুশি হবে না, তাকে সাজা দিয়েই সন্তুষ্ট হবেন। কেননা ঐ ভৃত্য তার মুনীবের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছে ও তাঁর ইজ্জতকে ক্ষুণ্ণ করেছে। তাই সে শাস্তি পাওয়ার যোগ্য, যাতে মালিকের মর্যাদা রক্ষা পায়। এই অবস্থায় অনুগত ভৃত্য দ্বারা কোনো প্রতিশোধ গ্রহণ করা হবে তার মুনীবের সম্মান রক্ষা করা, তার নিজের সম্মান রক্ষা করা নয়।

এই প্রসঙ্গে হযরত আলী (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার তিনি কোনো এক ব্যক্তির নিকট দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন লোকটি তাঁর কাছে অভিযোগ করলো যে, কোনো এক ব্যক্তি আমার পাওনা ফেরত দেয়নি, সে আমার হক নষ্ট করেছে। হযরত আলী (রা) ওখান থেকে চলে যাওয়ার পর ঐ যালিম ব্যক্তি বিবাদ শুরু করলো এবং পাওনাদারকে এক থাপ্পড় মেরে দিল। এ অবস্থায় পাওনাদার ব্যক্তি আবার হযরত আলী (রা)-এর খিদমতে গিয়ে যালিম লোকটির বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ করলো। হযরত আলী (রা) ঐ ব্যক্তিকে ডেকে আনলেন এবং বললেন, তুমি এর প্রতি বাড়াবাড়ি করেছো। তখন পাওনাদার ব্যক্তি বললো, হে আমীরুল মুমিনীন, আমি তাকে মাফ করে দিলাম। কিন্তু হযরত আলী (রা) ঐ যালিম ব্যক্তিটিকে নয়টি চাবুক মারলেন এবং বললেন, তোমাকে মজলূম ব্যক্তি মাফ করে দিয়েছে বটে, তবে এটা হচ্ছে খলীফার হক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যে জন্য তোমাকে শাস্তি দেয়া হলো।

একবার হযরত আবূ বকর (রা)-এর খিদমতে জনৈক ব্যক্তি এসে একটি সওয়ারী চাইলো আর বললো, আমি আপনার ও আপনার ছেলের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ভালো ঘোড়সওয়ার। তখন হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট হযরত মুগীরা ইবনে শু'বা উপস্থিত ছিলেন। ঐ লোকটির ঔদ্ধত্যপূর্ণ ব্যবহারে হযরত মুগীরা (রা) তাঁর জামার হাতা গুটিয়ে ঐ ব্যক্তির নাকের উপর ঘুষি মারলেন, যার ফলে তার নাক থেকে রক্ত ঝরতে লাগলো। তখন ঐ লোকটির গোত্রের লোকেরা হযরত আবূ বকর (রা)-এর নিকট হযরত মুগীরা (রা)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো এবং এর প্রতিকার চাইলো। তখন হযরত আবূ বকর (রা) বললেন, আমি কি আল্লাহর বিধানের বিপরীত প্রতিশোধ নেবো? এটা কিছুতেই হতে পারে না। অর্থাৎ হযরত মুগীরা (রা) যে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন তা ছিলো শুধু আল্লাহর ওয়াস্তে। যে ইজ্জত দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূলের খলীফাকে সম্মানিত করেছেন, তিনি যাতে সম্মান ও মর্যাদা দ্বারা তাঁর খিলাফতের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে পালন করতে ও আল্লাহর দিনকে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, সেটাই ছিল হযরত মুগীরা (রা)-এর আসল উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। তাই তিনি হযরত মুগীরা (রা)-এর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।

হৃদয়ের নির্মলতা, অজ্ঞতা ও গাফলতির মধ্যে পার্থক্য: হৃদয়ের নির্মলতা হলো কোনো অন্যায় কাজকে জানার পর সে অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা। কিন্তু অজ্ঞতা ও গাফলতি হলো এর বিপরীত। কেননা এটা মূর্খতা ও অজ্ঞতা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা কোনো প্রশংসনীয় গুণও নয়। মানুষ সে লোকেরই প্রশংসা করে, যে জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও কারো সাথে অন্যায় ও খারাপ ব্যবহার করে না, বরং সদয় ও সুন্দর ব্যবহার করে। একজন মানুষ তার অন্তরের সকল খারাপ গুণ সম্পর্কে অবহিত থেকে অন্যায় কাজ থেকে বেঁচে থাকতে পারলে সেটি হবে তার মহৎ গুণ। হযরত উমর (রা) একবার বলেছিলেন, “আমি নিজে প্রতারক নই আর কেউ আমার সাথে প্রতারণাও করতে পারে না।” বস্তুত হযরত উমর (রা) ছিলেন একজন খোদাভীরু, বিচক্ষণ ও সতর্ক ব্যক্তি। তাই তিনি কাউকে ধোঁকা দিতেন না। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “যেদিন না ধন-সম্পদ কোনো কাজে আসবে, না সন্তান-সন্ততি; কেবল সেই ব্যক্তিই উপকৃত হবে, যে বিশুদ্ধ অন্তর নিয়ে আল্লাহর দরবারে হাযির হবে।” (সূরা শু'আরা : আয়াত ৮৮-৮৯) কালবে সলীম বা নির্মল হৃদয় হচ্ছে সেই হৃদয়, যে হৃদয় সব রকমের কলুষ ও কালিমা থেকে মুক্ত। এরূপ হৃদয়ে সন্দেহপ্রবণতার কোনো ব্যাধি থাকে না। এরূপ নির্মল হৃদয়ে কোনো লোভ-লালসাও স্থান পায় না। তাই কালবে সলীম রিপুর তাড়না থেকে মুক্ত। যে হৃদয়ে লোভ-লালসা বিরাজ করে সে হৃদয় রিপুর অনুগামী হয়।

ভরসা ও প্রবঞ্চনার মধ্যে পার্থক্য: ভরসা হচ্ছে মানুষের এক ধরনের বিশেষ গুণ। বিশ্বাসযোগ্য কর্মকাণ্ড এবং উত্তম আচার-আচরণের মাধ্যমে মানুষ তা অর্জন করে। এতে মানুষের অন্তর শান্তি ও স্বস্তি লাভ করে। একজন বিশ্বস্ত ব্যক্তি প্রজ্ঞা ও অভিজ্ঞতার দ্বারা মানুষের বিশ্বাসভাজন হয়ে থাকেন এবং লোকেরা তার দ্বারা উপকৃত হয়। 'সিকাহ' একটি আরবি শব্দ। এটা 'ওয়াসাক' শব্দ থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর অর্থ হলো ভরসা ও বিশ্বস্ততা। এই বিরল গুণ মানুষের সাথে ভালোবাসার সুসম্পর্কের মাধ্যমে অর্জিত হয়। যখন কোনো বান্দার হৃদয় সবকিছুর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে, তখন সে আল্লাহর বন্দেগির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। আর কখনো গায়রুল্লাহর দিকে আকৃষ্ট হয় না। এই অবস্থায় আল্লাহ হয়ে যান তাঁর হাতিয়ার ও শক্তির উৎস এবং একমাত্র সম্বল। এরূপ ক্ষেত্রে বান্দা তার যাবতীয় প্রয়োজনের কথা আল্লাহর কাছেই পেশ করে। গুররাহ বা প্রগলভতা হলো— ঐ প্রবঞ্চিত ব্যক্তির অবস্থা, যাকে নাফস, শয়তান এবং মিথ্যা আশা-আকাঙ্ক্ষা ধোঁকার মধ্যে ফেলে রেখেছে। আর সে এ আশা পোষণ করে যে, তার অনেক গুনাহ থাকা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দেবেন। ধোঁকা মানুষকে এই বলে প্রলোভন দেখায় তুমি তার উপর ভরসা করো যার উপর ভরসা করা যায় না, তুমি তার উপরই আস্থা রাখো, যেখান থেকে উপকার লাভ করা যায় না, তুমি মরীচিকার প্রতারণায় পতিত ব্যক্তির ন্যায় মরীচিকার কাছ থেকে পানি পাওয়ার আশা রাখো। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যারা কুফরী করেছে, তাদের আমলের দৃষ্টান্ত এরূপ, যেমন শুষ্ক পানিহীন মরুভূমির বুকে মরীচিকা, পিপাসু ব্যক্তি ওটাকেই পানি মনে করেছিলো, কিন্তু যখন সেখানে পৌঁছলো তখন কিছুই পেলো না। বরং সেখানে আল্লাহকেই পেলো যিনি তার পুরোপুরি হিসাব সম্পন্ন করে দিয়েছেন। আর আল্লাহ হিসাব গ্রহণে তৎপর।” (সূরা নূর: আয়াত-৩৯)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "বলুন, আমি কি তোমাদেরকে বলবো নিজেদের আমলের দিক দিয়ে সবচেয়ে ব্যর্থ ও অসফল লোক কারা? তারা হচ্ছে— ঐ সকল লোক দুনিয়ার জীবনে যাদের যাবতীয় চেষ্টা ও সাধনা সঠিক পথ থেকে বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। আর তাদের ধারণা, তারা সবকিছু ঠিক মতো করছে।" (সূরা কাহাফ: আয়াত ১০৩-১০৪) "যদি গুনাহগারদের কাছে পৃথিবীর সবকিছু থাকে এবং তার সাথে এর সমপরিমাণ সম্পদও থাকে, তবে অবশ্যই কেয়ামতের দিন কঠিন শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য মুক্তিপণ হিসেবে তা দিয়ে দেবে। অথচ তারা দেখতে পাবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন শাস্তি, যা তারা কল্পনা করতো না।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪৭) একটি হাদীসে উল্লেখ আছে যে, কোনো গুনাহগার ব্যক্তি তার অনেক গুনাহ থাকা সত্ত্বেও যদি তার প্রতি আল্লাহর নিআমতের ছড়াছড়ি দেখে তবে সে যেন আল্লাহকে ভয় করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "অতঃপর তারা যখন ঐ উপদেশ ভুলে গেলো, যা তাদেরকে দেয়া হয়েছিলো, তখন আমি তাদের সামনে সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। এমনকি, যখন তাদের প্রদত্ত বিষয়াদির জন্য তারা খুব গর্বিত হয়ে পড়লো, তখন আমি তাদেরকে অকস্মাৎ পাকড়াও করলাম। তখন তারা নিরাশ হয়ে গেলো।” (সূরা আন'আম : আয়াত-৪৪)

এটা সবচেয়ে বড় একটি প্রবঞ্চনা যে, একদিকে নি'আমতের ছড়াছড়ি এবং অন্যদিকে গুনাহের বাড়াবাড়ি। এই প্রবঞ্চনার জন্য শয়তানকে মোতায়েন করা হয়েছে এবং নাফসে আম্মারাহ শয়তানের ধোঁকায় পতিত হয়েছে। যখন আল্লাহর প্রতি মানুষের বিদ্রোহী মন, গুনাহের প্ররোচনা, ধোঁকাবাজ শয়তান এবং প্রতারিত নাফস একত্রিত হয়ে যায়, তখন আল্লাহর নাফরমানীর কাজ করতে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকে না। এই অবস্থায় আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করতে শয়তান মানুষকে প্রলুব্ধ করে। কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ক্রোধ সঞ্চয়কারী গুনাহ করা সত্ত্বেও শয়তান আল্লাহর ক্ষমা ও মার্জনার লোভ দেখায় এবং শান্তির জন্য তাওবাহ করার আশ্বাসও দেয়। অর্থাৎ শয়তান বলে, এখন তুমি মনের মতো সব কামনা বাসনা পূর্ণ করে নাও, পরে তাওবাহ করলে চলবে। এভাবে শয়তান মানুষকে তাওবাহর দরজার নিকট পৌঁছতে দেয় না। আর এভাবেই বিভ্রান্ত মানুষ তাওবাহ করা থেকে বিরত থাকে। শেষ পর্যন্ত এক সময় আকস্মিকভাবে মৃত্যুর ফেরেশতা আযরাঈল (আ) এসে তার জান কবয করে নেন। শয়তান মানুষকে খুবই শোচনীয় অবস্থার মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "এবং অলীক আশার পেছনে বিভ্রান্ত হয়েছো অবশেষে আল্লাহর আদেশ পৌঁছেছে। এসবই তোমাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারিত করেছে।" (সূরা হাদীদ : আয়াত-১৪) পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে, “হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের পালনকর্তাকে ভয় করো এবং ভয় করো এমন এক দিবসকে, যখন পিতা পুত্রের কোনো কাজে আসবে না এবং পুত্রও তার পিতার কোনো উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য। অতএব পার্থিব জীবন যেন তোমাদেরকে ধোঁকা না দেয় এবং আল্লাহ সম্পর্কে প্রতারক শয়তানও যেন তোমাদেরকে প্রতারিত না করে।” (সূরা লোকমান: আয়াত-৩৩) সে লোক বড়ই ধোঁকার মধ্যে নিপতিত যাকে আল্লাহ প্রচুর নি'আমত দান করেছেন, আর সে মনে করে আমিই এর হকদার। সে আরো মনে করে হাশরের দিন তাকে কোনো হিসাব দিতে হবে না আর সেদিন কখনো আসবে না। কাজেই যতো খুশি আনন্দ উল্লাস করতে থাকো। তবে যখন সে ধোঁকার গহীন অন্ধকারে প্রবেশ করে তখন সে বলে উঠে, আমি আমার রবের সান্নিধ্যে পৌঁছলে বেহেশতেও সম্মান লাভ করতে পারবো। এভাবে শয়তানের প্রতিশ্রুতি ও আশার প্রলোভনে পড়ে সে ব্যক্তি প্রতারিত হয়। এভাবেই দুনিয়ার নি'আমত ও নাফসে আম্মারাহ শয়তানকে সহায়তা করে। এর ফলশ্রুতিতে সে ব্যক্তি গুনাহের কাজে অটল থাকে। অবশেষে সে ধ্বংস হয়ে যায়।

রায়জা ও তামান্নার মধ্যে পার্থক্য: কোনো বিষয়ে সফলতার উপকরণ সংগ্রহ করার মাধ্যমে সর্বশক্তি নিয়োগ করে চেষ্টা করা ও আশা পোষণ করাকে 'রায়জা' বা প্রত্যাশা বলা হয়। পক্ষান্তরে, কোনো উপকরণ ছাড়া কোনো কিছু পাওয়ার জন্য আশা পোষণ করাকে 'তামান্না' বা আশান্বিত হওয়া বলা হয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যারা ঈমান এনেছে, যারা আল্লাহর উদ্দেশ্যে ঘর-বাড়ি পরিত্যাগ করেছে এবং আল্লাহর পথে জিহাদ করেছে তারাই আল্লাহর অনুগ্রহ লাভের আশা করার সঙ্গত অধিকারী। আল্লাহ তাআলা তাদের ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন এবং নিজের অনুগ্রহ দানে তাদেরকে ধন্য করবেন।" (সূরা আল-বারাকাহ: আয়াত-২১৮)

জানা গেলো যে, উপরোক্ত গুণসম্পন্ন লোক ছাড়া আল্লাহ তাআলা অন্য সব লোকের কাছ থেকে সকল প্রত্যাশা রুদ্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু যারা আল্লাহর ঐ নিআমত থেকে বঞ্চিত তারা বলে থাকে যে, "পাপীগণ ঐসব জিনিস অনুসরণ করে, যেটা আল্লাহ তাআলার ক্রোধের কারণ হয়ে থাকে, যদিও তারা আল্লাহর অসীম রহমতের আশা করতে পারে।" এটা কোনো নতুন কথা নয়। নাফস ও শয়তান তাদের অনুগতদেরকে ঐ ধোঁকার মধ্যে ফেলে রাখে। আসলে, ঐ ব্যক্তিই কেবল প্রত্যাশা করতে পারে যে আল্লাহ ও আখিরাত সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহর সব প্রতিশ্রুতিকে স্মরণ রেখে উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে এবং পরিশুদ্ধ চিত্তে নেককাজ করতে থাকে। সেই ব্যক্তির উদাহরণ হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে কোনো লক্ষ্য সামনে রেখে তা অর্জন করার জন্য অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যায়। খাঁটি প্রত্যাশার চিহ্ন হলো এই যে, প্রত্যাশী ব্যক্তি সব সময় ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে যাতে সে জান্নাত ও তার অফুরন্ত নিআমত থেকে বঞ্চিত না হয়ে পড়ে। একজন প্রত্যাশী ব্যক্তির অবস্থা হলো ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারের কোনো মহিলার জন্য বিবাহের প্রস্তাব পেশ করলো। তারপর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহকারে সুন্দর পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করে, সুগন্ধি মেখে বিবাহের অনুষ্ঠানের জন্য রওয়ানা হলো। এই বরযাত্রী বরসহ যদি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে ও ভদ্রজনিতভাবে পাত্রীর বাড়িতে পৌঁছে, তাহলে বরকে ও বরযাত্রীকে তারা সসম্মানে বরণ করে উত্তম স্থানে বসার ব্যবস্থা করবেন। আর যদি অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন ও নোংরাভাবে এই বরযাত্রী পাত্রীর বাড়িতে উপস্থিত হয় তাহলে তাদেরকে ঘৃণা ও অবজ্ঞা ভরে ফিরিয়ে দেয়া হবে। এখানে প্রথম দলটির অবস্থা হলো যথাযথ উপকরণসহ একজন আশাবাদী ব্যক্তির ন্যায়, যে সফলতা অর্জনে সমর্থ। এ সম্পর্কে আরো একটি উদাহরণ এখানে দেয়া হলো। একজন বিরাট ধনাঢ্য ব্যক্তি ছিলেন। দু'জন ব্যবসায়ী তাঁর কাছে আবশ্যকীয় জিনিসপত্র বিক্রয় করতো। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন খুবই সৎ ও ঈমানদার। তিনি তাঁর দ্রব্য-সামগ্রীর মধ্যে কোনো হেরফের করতেন না। ধনাঢ্য ব্যক্তিটিকে তিনি খুব সম্মান ও শ্রদ্ধা করতেন। তবে ধনাঢ্য ব্যক্তিটি কাউকে দেখা দিতেন না। তিনি আড়ালে থেকে জিনিসপত্র খরিদ করতেন। অপর ব্যবসায়ী লোকটি ছিল শঠ ও অসৎ। সে জিনিসপত্রের মধ্যে ভেজাল মিশাতো। একবার ধনাঢ্য ব্যক্তি বললেন, তিনি ব্যবসায়ীদের সম্মুখে উপস্থিত হবেন ও তাদের থেকে হিসাব-নিকাশ বুঝে নেবেন ও তাদের পাওনা মিটিয়ে দেবেন। এখানে যে ব্যক্তি ঈমানদারী ও সততার সাথে ব্যবসা করছিলেন, তাঁর প্রত্যাশা ছিল দুনিয়া-আখিরাতের মঙ্গল লাভ এবং তিনি সেভাবেই তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়েছিলেন। ফলে তিনি নাফসে মুতমায়িন্নাহর দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন। আর যে ব্যবসায়ী শঠতা ও প্রতারণার মাধ্যমে ব্যবসা চালিয়েছিলো তাকে নাফসে আম্মারাহ পরিচালিত ও প্রভাবিত করেছিলো। এরূপ অসৎ ব্যবসায়ী দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে এবং সব সময় শঙ্কিত থাকে। 'রায়জা' শব্দের আরেক অর্থ হলো কোনো মন্দ থেকে পিছিয়ে বা সরে যাওয়া। অর্থাৎ সকল মোহমায়া ত্যাগ করে আল্লাহর দিকে নিজেকে মনে প্রাণে সমর্পণ করা। আর নাফসে আম্মারাহ ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে মুক্ত ও নিরাপদ থাকা। এটা হলো নাফসে মুতমায়িন্নাহর বৈশিষ্ট্য। যখন একজন নেক বান্দার অন্তর্দৃষ্টি খুলে যায়, আল্লাহ তাআলা ও আখিরাতের কল্যাণের দিকে চলতে থাকে। তাঁর সে যাত্রা হয় ভীতিপ্রদ ও ধীরগতি সম্পন্ন। এভাবে সে দুনিয়ায় লোভ-লালসার জাল ছিন্ন করে ও নাফসে আম্মারাহর প্ররোচনা থেকে মুক্ত হয়ে নিআমতে পরিপূর্ণ জান্নাতের দিকে পরাক্রমশালী ও রাহমানুর রাহীম আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য অগ্রসর হয়। অতএব জানা গেলো যে, যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে সে-ই হয় মুত্তাকী ও খোদাভীরু। এছাড়া একজন আল্লাহর দয়া ও করুণা প্রত্যাশী ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকে। তাই আরবি 'খায়িফ' শব্দের স্থানে মুত্তাকী আর মুত্তাকী শব্দের স্থানে খায়িফ শব্দ ব্যবহার হয়ে থাকে। একজন আল্লাহর করুণা প্রত্যাশী ব্যক্তির হৃদয় সাধারণত একজন ভীত-সন্ত্রস্ত ব্যক্তির অন্তরের নিকটবর্তী হয়ে থাকে। একজন প্রত্যাশী ব্যক্তির অন্তর নাফসে আম্মারাহ ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে নিরাপদ থাকে এবং আল্লাহর দিকে এগিয়ে যায়। তার সামনে জান্নাতের পতাকা উড্ডীন থাকে এবং সে সেদিকে অগ্রসর হয়। একজন খোদাভীরু ব্যক্তি এই অবস্থায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে শয়তান ও নাফসে আম্মারাহর প্ররোচনা থেকে দূরে থাকে। আর সেজন্য আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করে। একজন মানুষ দুনিয়া ও আখিরাতে শয়তান ও নাফসে আম্মারাহর সাথে সহাবস্থান করে। শয়তান ও নাফসে আম্মারাহর থেকে সতর্ক ব্যক্তিই হলো খোদাভীরু। আর যখন সে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির কথা শুনে তখন অত্যন্ত আনন্দিত চিত্তে ও উৎসাহ উদ্দীপনার সাথে সফলতার আশায় আল্লাহর বন্দিগীর দিকে দ্রুত ধাবিত হয়। তাই তাকে একজন আল্লাহর করুণা প্রত্যাশী ব্যক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তোমাদের কী হলো যে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বকে স্বীকার করতে চাও না।" (সূরা নূহ: আয়াত-১৩) ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, একজন মুমিন ব্যক্তি সাধারণত আল্লাহর ওয়াস্তে হিজরতকারী জিহাদকারী হয়ে থাকে। ঈমানের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে, ঈমান হলো একটি শাখা-প্রশাখা বিশিষ্ট জাহিরী ও বাতিনি আমল। তিনি হিজরত করার প্রসঙ্গে বলেছেন, "পাপকাজ ত্যাগ করা এক ধরনের হিজরত।" জিহাদ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন যে, "আসল জিহাদ হলো আল্লাহর নির্দেশ পালনে নাফসের সাথে যুদ্ধ করা।” দুনিয়ার আশা-আকাঙ্ক্ষা এক শ্রেণীর গরিব লোকের পুঁজিস্বরূপ, যেটাকে তারা প্রত্যাশার অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছে। অথচ এটা শুধু কুহেলিকা মাত্র। এসব এমন প্রত্যাশা যা ঐসব অন্তর থেকে বের হয়ে আসে যেসব অন্তরে নাফসে আম্মারাহর প্ররোচনা ও প্রবণতা পুঞ্জিভূত হয়ে আছে। কুমন্ত্রণার প্রভাবে একজন লোকের অন্তর সংকীর্ণ হয়ে যায় এবং নাফসে আম্মারাহ একজন বান্দাকে কামনা-বাসনার পেছনে লাগিয়ে দেয়। নাফসে আম্মারাহ একজন বান্দাকে এই বলে আশ্বস্ত করে যে, আল্লাহ কোনো বান্দার ঈমান ও আমল বিনষ্ট করেন না। যেমন কোনো মহান দয়ালু দাতা কারো কাছ থেকে তাঁর সম্পূর্ণ পাওনা আদায় করে নেন না। সুতরাং আল্লাহর দরবারে কোনো গুনাহ খাতা করলেও তোমার চিন্তাভাবনার কোনো কারণ নেই, যেহেতু পরম করুণাময় আল্লাহ তাআলা তোমার যাবতীয় গুনাহ মাফ করে দেবেন। তাই এই আশাকে প্রত্যাশা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। অথচ এটা একটি শয়তানি প্ররোচনা, প্রবণতা ও অমূলক আশ্বাস ছাড়া আর কিছু নয়। নাফসে আম্মারাহ মূর্খদের দিলে যে অমূলক আশা আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে দেয় এবং যে সবের দ্বারা তাদের অন্তর আনন্দে ভরে যায় সেসব সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "শেষ পরিণতি না তোমাদের আকাঙ্ক্ষার উপর নির্ভর করছে, না আহলে কিতাবের মনস্কামনার উপর। যে পাপ করবে সেই তার প্রতিফল ভোগ করবে এবং আল্লাহর বিরুদ্ধে নিজের জন্য কোনো বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না।” (সূরা নিসা: আয়াত-১২৩) যখন কোনো বান্দা আল্লাহর বন্ধুত্ব ও তাঁর সাহায্যকে উপেক্ষা করে, তখন তাকে তার নাফসের কাছে ছেড়ে দেয়া হয়, আর নাফস ও শয়তান তার বন্ধু হয়ে যায়। তখন সে আল্লাহর সাহায্য ও অভিভাবকত্বের পরিবর্তে নাফস ও শয়তানের অভিভাবকত্ব ও সাহায্য গ্রহণ করে। তখন নেক প্রত্যাশার জন্য তার অন্তরে কোনো জায়গা শূন্য থাকে না। এ অবস্থায় নাফস তাকে বলে যে, সে প্রত্যাশার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছে গিয়েছে, যদিও এটা অমূলক আশা ছাড়া আর কিছুই নয়। একজন সতর্ক ব্যক্তি সবসময় প্রত্যাশা ও আশার উপর নির্ভর করে নেককাজ করতে থাকে। আর বুদ্ধিহীন ও দুর্বলচিত্ত ব্যক্তি নেককাজ ছেড়ে দিয়ে আশা-আকাঙ্ক্ষার উপর ভরসা করে বসে থাকে এবং এসবকে প্রত্যাশা হিসেবে মনে করে।

আল্লাহর নি'আমত প্রকাশ ও গর্ব করার মধ্যে পার্থক্য: একজন আল্লাহর নি'আমত প্রাপ্ত ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর নি'আমতের প্রশংসা করে। সে আল্লাহর দান ও অনুগ্রহ স্বীকার করে তাঁর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে। আর আল্লাহর সমস্ত নি'আমতের কথা প্রচার ও প্রকাশ করে। তার এরূপ করার উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহ তাআলার মহান গুণাবলীকে প্রকাশ করা, তাঁর প্রশংসা করা, আল্লাহর ইবাদত করার জন্য নাফসকে উদ্বুদ্ধ করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া। আর আল্লাহর সাথে প্রেম ও ভালোবাসার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য নাফসকে অনুপ্রাণিত করা। আল্লাহর নি'আমত সম্পর্কে গর্ব করার অর্থ হলো, এসব নি'আমতের কারণে অন্য মানুষের উপর নিজেকে শ্রেষ্ঠ জ্ঞান করা, লোকদেরকে এটা দেখিয়ে দেয়া যে, সে অন্য সকলের চেয়ে সম্মানিত ও শ্রেষ্ঠ। এভাবে তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে তাদের অন্তরকে অনুগত ও বাধ্য করে এবং তাদেরকে নিজের তা'জীম ও খিদমতের জন্য আকৃষ্ট করে। হযরত নু'মান ইবনে বশীর (রা) বলেছেন, শয়তানের অনেক কৌশল এবং ফাঁদ আছে। তার একটি হলো এই যে, সে আল্লাহ তাআলার নি'আমতের মাধ্যমে মানুষকে আবদ্ধ করে যাতে মানুষ সেই নি'আমতের কারণে আল্লাহ তাআলার অন্য বান্দাদের উপর গর্ব করে ও গায়রুল্লাহর কাছে নিজের মস্তক অবনত করে।

হৃদয়ের আনন্দ ও নাফসের আনন্দের মধ্যে পার্থক্য: আল্লাহ তাআলার প্রতি কারো ঈমান থাকলে সেটা তার হৃদয়ে মারিফত ও মহব্বত সৃষ্টি করে। আর আল্লাহর কালাম পাঠ করলে সেই বান্দা তার অন্তরে পরম তৃপ্তি লাভ করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “হে নবী, যাদেরকে আমরা ইতিপূর্বে কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এই কিতাব যা আমরা আপনাকে দিয়েছি তা পেয়ে সন্তুষ্ট।” (সূরা রা'দ: আয়াত-৩৬) যখন কিতাবধারীগণ ওহী দ্বারা সন্তুষ্ট হয়, তখন আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ তাদের চেয়ে বেশি আনন্দিত হওয়ার কথা। আল্লাহ পাক আরো ইরশাদ করেছেন, “যখন কোনো (নতুন) সূরা নাযিল হয়, তখন তাদের মধ্যে কিছু লোক বিদ্রূপ ছলে মুসলমানদের নিকট জিজ্ঞেস করে, বলো, তোমাদের মধ্যে কার ঈমান এতো বৃদ্ধি পেলো? যারা ঈমান এনেছে (প্রত্যেক অবতীর্ণ সূরাই) তাদের ঈমান সত্যিই বৃদ্ধি করে দেয়, আর তারা এর দ্বারা খুবই সন্তুষ্টচিত্ত হয়।” (সূরা তাওবাহ: আয়াত-১২৪) আরো ইরশাদ হয়েছে, “হে নবী, বলুন এটা আল্লাহর অনুগ্রহ ও অপার করুণা যে, তিনি এটা পাঠিয়েছেন। এজন্য তো লোকদের আনন্দ উল্লাস করা উচিত। এটা সেসব জিনিস হতে উত্তম যা লোকেরা সংগ্রহ ও আয়ত্ত করছে।” (সূরা ইউনুস: আয়াত-৫৮) হযরত আবু সায়ীদ খুদরী (রা)-এর অভিমত অনুযায়ী উপরোক্ত আয়াতে ফযল শব্দের অর্থ হলো আল্লাহর অনুগ্রহ ও পবিত্র কুরআন। আর আল্লাহ দয়া পরবশ হয়ে কুরআন শরীফকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে উপস্থাপন করেছেন। হযরত হিলাল ইবনে ইয়াসাফ (র)-এর মতে ফযল শব্দের অর্থ হলো, আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে যে হিদায়াত দান করেছেন এবং কুরআন শিখিয়েছেন, সে কুরআন তোমাদের সঞ্চিত সোনা-রূপা থেকে অধিক মূল্যবান। হযরত ইবনে আব্বাস (রা) ও এক শ্রেণীর আলিমের মতে ফযল শব্দের অর্থ হলো— ইসলাম, আর রহমত শব্দের অর্থ হলো— আল কুরআন। এছাড়া ঈমানের দ্বারাও হৃদয়ের আনন্দ লাভ করা যায় এবং সওয়াবও পাওয়া যায়। যখন কোনো বান্দা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে তখনই সে তার হৃদয়ে প্রকৃত আনন্দ লাভ করতে পারে। এই যে ফারাহ বা আনন্দ ও মহব্বত এটা একটি বিশেষ অবস্থার সাথে সম্পর্কিত। এই বিরল আনন্দ কেবল কোনো মাহবুবের সাথে মিলনের মাধ্যমে, আল্লাহর পবিত্র নাম ও গুণাবলীর প্রতি, তাঁর রাসূল ও রাসূলের সুন্নাতের প্রতি একনিষ্ঠ বিশ্বাস রেখে অর্জন করা যায়। বান্দার হৃদয়ে ঐ আনন্দের মাধ্যমে এক দুর্লভ আনুগত্য সৃষ্টি হয়, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কাজেই এই অনাবিল আনন্দ আল্লাহর অন্য সকল নি'আমতের চেয়ে অধিক উত্তম, না, সে আনন্দ সমস্ত নি'আমতের জন্য এক সুগন্ধি বিশেষ। আর এই আনন্দের মধ্যেই রয়েছে আখিরাতের শান্তি ও আনন্দ। তবে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আনন্দ, মহব্বতের তারতম্যের উপর নির্ভরশীল। মনে সত্যিকার আনন্দের জন্য এটা এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। বান্দার জন্য আরেক রকমের আনন্দ আছে, আর সেটা হলো আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে পুরস্কার লাভ। সেই আনন্দ আল্লাহর সাথে সুসম্পর্ক, ইখলাস, তাওয়াক্কুল, ভয় ও আশার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়ে থাকে। এছাড়া আল্লাহর প্রতি এসব গুণ যখন একজন বান্দার হৃদয়ে দৃঢ়ভাবে শিকড় গাড়ে, তখন সেই আনন্দ বৃদ্ধি পায় ও ব্যাপ্তি লাভ করে। আরেক রকমের আনন্দ আছে, যেটা তাওবাহর মাধ্যমে লাভ করা যায়। তাওবাহর দ্বারা যে অফুরন্ত আনন্দ লাভ করা যায়, গুনাহের দ্বারা সেটা অর্জন করা যায় না। যদি কোনো গুনাহগার বান্দা জানতে পারতো, তাওবাহর আনন্দ গুনাহের কাজ করার আনন্দের চেয়ে শত সহস্র গুণ বেশি, তাহলে সে গুনাহের কাজের চেয়ে তাওবাহ করার জন্য যতো শীঘ্র সম্ভব ধাবিত হতো। একজন গুনাহগার বান্দা তাওবাহ করে যে আনন্দ লাভ করে, তজ্জন্য আল্লাহ তাবারাক তাআলা আরো বেশি আনন্দিত হন।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে একটি উদাহরণ পেশ করেছেন, যার মধ্যে মানুষের ঐ আনন্দের কথা ব্যক্ত করেছেন, যার চেয়ে অধিক কোনো আনন্দ দুনিয়ায় লাভ করা যায় না। জনৈক ব্যক্তি তার পানাহারের দ্রব্য-সামগ্রীসহ সওয়ারীতে আরোহণ করে সফরে বের হলো। যেতে যেতে একস্থানে বিশ্রামের জন্য থামলো এবং সওয়ারীটি বেঁধে রেখে শুয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ পর সে ঘুমিয়ে পড়লো। যখন ঘুম ভাঙলো, তখন দেখলো তার সওয়ারীটি সেখানে নেই। চারদিকে কেবল ধূ ধূ মরু প্রান্তর এবং তার জীবন যে বিপন্ন সেটা সে বুঝতে পারলো। এ অবস্থায় লোকটি খুবই অস্থির ও চিন্তিত হয়ে তার সওয়ারীটি খুঁজতে লাগলো। কিন্তু সওয়ারীটির কোনো পাত্তা পাওয়া গেলো না। অবশেষে নিরাশ হয়ে লোকটি মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। পরে আকাশে চাঁদ দেখা দিলো, দূর-দূরান্ত পর্যন্ত চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়লো। এই অবস্থায় সে বিশেষ মনোযোগসহকারে তার সওয়ারীটির আশায় চারদিকে দেখতে লাগলো। হঠাৎ চাঁদের আলোতে সওয়ারীটি তার নজরে পড়লো। সে দেখতে পেলো তার সওয়ারীটি একটি গাছের সাথে আটকে আছে। তখন সে খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো, চরম আত্মভোলা অবস্থায় লোকটির মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, “হে আল্লাহ, তুমি আমার বান্দা, আর আমি তোমার রব।” বেচারা আনন্দের আতিশয্যে কী বলেছে সেদিকে তার কোনো খেয়াল ছিলো না। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, একজন বান্দার তাওবাহ করার দরুন আল্লাহ তাআলা এর চেয়েও বেশি আনন্দিত হন। কাজেই এটা ধ্রুব সত্য ও অনস্বীকার্য যে, তাওবাহর দ্বারা মানুষ চরম ও পরম তৃপ্তি লাভ করে। এখানে একথা স্মরণ রাখতে হবে যে, কঠিন দুশ্চিন্তা ও দুঃখকষ্ট এবং বিপদ-আপদ সহ্য করার পর এই ধরনের পরম আনন্দ অর্জিত হয়। মানুষ যদি দুঃখ কষ্ট ও বিপদ-আপদে পতিত হয়ে সবর করে, তাহলেই তার এরূপ আনন্দ লাভের সৌভাগ্য হয়। একজন গুনাহগার বান্দা যখন গুনাহ থেকে তাওবাহ করে, তখন তার আনন্দ গুনাহের কাজ করার আনন্দের চেয়ে অধিক হয়ে যায় এবং সে অবস্থার স্বাদ সে ব্যক্তি চাটনীর মতো উপভোগ করে।

এমন এক ধরনের আনন্দ আছে যেটা সকল আনন্দ ও সুখের ঊর্ধ্বে এবং সকল আনন্দের সার নির্যাসস্বরূপ। আর সেটা তখনই অর্জিত হয়, যখন কোনো বান্দা দুনিয়ার সবকিছু ত্যাগ করে আল্লাহ তাআলার দিকে অগ্রসর হয়। ঐ শুভ মুহূর্তে তার নিকট ফেরেশতারা এসে আল্লাহ তাআলার দীদারের শুভ সংবাদ দেন। আর মালাকুল মাউত তার রূহকে বের হয়ে আসার জন্য আহবান জানান এবং তাকে আল্লাহ তাআলার রহমত, রিযক ও সন্তুষ্টির শুভ সংবাদ দান করেন। কোনো তাওবাহকারীর সামনে যদি তার তাওবাহ করার আনন্দ উপস্থাপন করা হয়, তাহলে সে সেটাকেই সবচেয়ে অধিক প্রাধান্য দেবে। আল্লাহই মহান। এই অবস্থায় একদিকে এই সম্মানিত রূহকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য সুন্দর আকৃতিধারী ফেরেশতারা জমিন থেকে আসমান পর্যন্ত ভিড় করেন, অপরদিকে এই নেক রূহের জন্য আকাশের দরজা খুলে দেয়া হয়। ফেরেশতাগণ ঐ নেক রূহের জন্য দুআ করতে থাকেন আর এই রূহকে প্রত্যেক আকাশে আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত ফেরেশতারা বিদায় অভ্যর্থনা জানান। সুবহানাল্লাহ, এই নেক রূহের কতোই না সৌভাগ্য। এভাবে এ সৌভাগ্যবান রূহ তার প্রিয়জনদের সাথে মিলিত হওয়ার সুযোগ লাভ করে। আল্লাহর মহান দরবারে হাযির হওয়ার পর আল্লাহকে সিজদাহ করার অনুমতি লাভ করে। এ ভাগ্যবান রূহ তার রবের বাণী শুনবার সৌভাগ্যও লাভ করে, সে বাণী হলো, "হে ফেরেশতাগণ! আমার এই বান্দার আমলনামা ইল্লিয়্যীনে রেখে দাও।” এরপর তাকে জান্নাতে ভ্রমণ করানো হয়। আল্লাহ তাআলার সকল নি'আমতও তাকে দেখানো হয় যা তার জন্য সেখানে নির্দিষ্ট করা আছে। বন্ধুবান্ধব ও নিকট আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ হয়। এ অবস্থায় সবাই তখন সন্তুষ্ট হন, যেমন— দীর্ঘদিনের বিরহের পর কোনো বন্ধু তার প্রিয়জনের সাথে মিলিত হয়ে আনন্দবোধ করে। এ ব্যক্তি সেখানে সবাইকে ভালো অবস্থায় দেখতে পেয়ে আনন্দিত হয়, তার এইসব আনন্দ আল্লাহর দীদার লাভের চরম আনন্দের আগেই ঘটে থাকে। আল্লাহর নেক বান্দাদের জন্য হাশরের দিনের আনন্দ যে কী তা বলে শেষ করা যায় না। তাঁরা আরশে পাকের শীতল ছায়া লাভ করবেন এবং হাউযে কাউসারের পরিপূর্ণ পানপাত্র তাঁদেরকে পরিবেশন করা হবে। তাঁদের ডান হাতে থাকবে আমলনামা, তাঁদের নেকীর পাল্লা হবে ভারী, তাঁদের চেহারা আনন্দ উছ্বাসে গোলাপকেও হার মানাবে। একটি অতুলনীয় উজ্জ্বল আলো তাঁদের সামনে থাকবে। তারা অনায়াসে পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। এছাড়া তাঁদের জন্য জান্নাতের ফটক খোলা থাকবে এবং তাঁদের সম্বর্ধনার স্থান থাকবে অতি নিকটে। সে সময় রিযওয়ান ও অন্যান্য ফেরেশতাগণ তাঁদেরকে সালাম ও খোশ আমদেদ জানাবেন। আর তারা তাঁদেরকে হুর-গেলমান ও অন্যান্য বেহেশতী নিআমতের শুভ সংবাদ দান করবেন। আল্লাহর প্রিয় এবং তাঁর খাস বান্দাগণ আল্লাহর দীদার লাভ সম্পর্কে যে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করেছিলেন, তাঁদেরকে তাঁদের মা'বুদ সেজন্য নিজের চেহারা প্রদর্শন করবেন এবং শান্তির বাণী শুনাবেন। তাঁদের সাথে কথাও বলবেন। আল্লাহর নেক বান্দাদের জন্য এটা কতোই না উচ্চ মর্যাদা ও সৌভাগ্যের বিষয়।

হৃদয়ের নম্রতা ও ভীতির মধ্যে পার্থক্য: নাফসানি দুর্বলতা ও হৃদয়ের ভয়কে আরবিতে জাযা বলা হয়, যেটাকে অতি লোভ-লালসা শক্তিশালী করে তোলে। এ অবস্থা তাকদীর সম্বন্ধে ঈমানের দুর্বলতার কারণে সৃষ্টি হয়। কেউ যদি অদৃষ্টের লিখনকে পরিপূর্ণভাবে বিশ্বাস করে, তাহলে সে বিপদ-আপদে পড়লে হায়-হায় করে না, কারণ সে জানে যে, এটা অলঙ্ঘনীয় বিধিলিপি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “এমন কোনো বিপদ নেই যা পৃথিবীতে কিংবা তোমাদের নিজেদের উপর আপতিত হয় আর আমরা ওটা সৃষ্টি করার পূর্বে একটি কিতাবে বা ভাগ্য লিপিতে লিখে রাখিনি। এরূপ করা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ কাজ। (এসব কেবল এজন্য) যেন যা কিছু তোমাদের ক্ষতি হয় সেজন্য তোমরা হতাশাগ্রস্ত না হয়ে পড়ো, আর যা কিছু আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে দান করেন, তা পেয়ে তোমরা গৌরবে স্ফীত না হয়ে পড়ো। আল্লাহ উদ্ধত ও অহঙ্কারীদেরকে পছন্দ করেন না।" (সূরা হাদীদ: আয়াত ২২-২৩) হৃদয়ের নম্রতা শরিয়তের পরিপন্থী নয়। কেননা এ নম্রতা আল্লাহর রহমত থেকে সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তাআলা নরম মেজাজ ও বিনয়ী বান্দাদের প্রতি রহম করেন। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন এবং অত্যন্ত ধৈর্যশীল ছিলেন। তাই বুঝা গেলো নম্র হৃদয়ের অধিকারী হওয়া আল্লাহর রহমত ছাড়া কিছু নয়। হায় হায় করা মানুষের এক প্রকার রোগ ও হৃদয়ের দুর্বলতা, এটা হলো দুনিয়ার রুগ্ন হৃদয়ের পরিচায়ক, যাকে নাফসে আম্মারাহ-এর ধোঁয়া কালো করে তার শ্বাস-প্রশ্বাসকে কলুষিত করে দেয়। আর দুর্বলচিত্ত ব্যক্তির জন্য আখিরাতের পথ রুদ্ধ করে দেয়। আর নাফস ও লোভ লালসার সংকীর্ণ জালে সে আবদ্ধ হয়ে যায়। তাই সে সামান্য মুসীবতও সহ্য করতে পারে না এবং তাতে সে ঘাবড়িয়ে যায়। আর যদি তার দিলে আল্লাহর প্রতিশ্রুতির উপর ঈমান ও ইয়াকীনের নূর বিদ্যমান থাকে, আর তার দিল আল্লাহর মহিমা ও ইশক মহব্বতের দ্বারা সিক্ত হয়, তাহলে সে অন্তর নম্র হয়ে যায় এবং তার মধ্যে আল্লাহর অনুকম্পা ও শান্তির ঝলক দেখা দেয়। সে ব্যক্তি প্রিয়জন ও সকল মুসলমানের প্রতি দয়ার্দ্রচিত্ত ও অনুগ্রহকারী হয়। এমনকি সে মানুষ ছাড়াও গর্তের পিপীলিকার প্রতি এবং নীড়ের পক্ষীকুলের প্রতিও মেহেরবান হয়ে যায়। মানুষের এরূপ অন্তরই আল্লাহ তাআলার অতি প্রিয়, পছন্দনীয় ও নিকটবর্তী। হযরত আনাস (রা) কর্তৃক বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিশুদের প্রতিও অতিশয় মেহেরবান ছিলেন। যখন আল্লাহ তাআলা কারো প্রতি রহম করতে চান, তখন তার দিলে রহম ও বিনয়ের উছ্বাস পয়দা করে দেন। আর যদি তাকে আযাবে ফেলতে চান, তাহলে তার দিল থেকে রহম ও নম্রতার উছ্বাস বের করে দেন। আর এসবের পরিবর্তে তার দিলকে পাষাণের মতো কঠিন করে দেন। একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, “যে ব্যক্তি রহম করে না, তার প্রতিও রহম করা হয় না। দুনিয়াবাসীদের উপর রহম করো, তাহলে আকাশবাসী তোমার উপর রহম করবেন।” জান্নাতবাসীরা তিন শ্রেণীতে বিভক্ত হবে। এক. সুবিচারক ও দানশীল বাদশাহ। দুই. প্রত্যেক প্রিয়জন ও মুসলমানের প্রতি মেহেরবান ও নরম দিলের অধিকারী ব্যক্তি। তিন. অন্যের নিকট সাহায্য কামনায় হাত প্রসারিত করে না এমন ব্যক্তি এবং পূত-পবিত্র চরিত্রের অধিকারী ব্যক্তি। হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-এর সমস্ত উম্মতের উপর এজন্য অধিক মর্যাদা যে, তাঁর দিলের মধ্যে অপরিসীম দয়া নিহিত ছিলো, যা তাঁর সত্যবাদিতার চেয়েও ছিলো অধিক। এজন্যই প্রত্যেক ব্যাপারে তাঁর দয়া প্রতিফলিত হতো। এরই ফলশ্রুতিতে বদরের যুদ্ধবন্দীদের মুক্তি দানের প্রস্তাব তাঁর পরামর্শেই গৃহীত হয়েছিলো। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে হযরত ঈসা (আ) ও হযরত ইবরাহীম (আ)-এর সাথে তুলনা করেছেন।

অসন্তোষ ও ঈর্ষার মধ্যে পার্থক্য: কেউ কোনো কিছু পাওয়ার আশা থেকে বঞ্চিত হলে তার মনের মধ্যে অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। ঈর্ষা হলো কেউ কারো ভালো দেখলে তার মনে যে কষ্ট হয় এবং অন্যের মধ্যে মন্দ জিনিস দেখলে খুশি হওয়া এবং অন্যের মধ্যে মন্দ পরিলক্ষিত হোক, এই ধারণা পোষণ করা। একজন ঈর্ষাপরায়ণ ব্যক্তি সব সময় কামনা করে যে, ঐসব মন্দ জিনিস সবসময় ঐ লোকটির মধ্যে বিদ্যমান থাকুক। অসন্তোষের আরেক প্রকার হলো— অন্যের দ্বারা কোনোভাবে মনে আঘাত পাওয়া। ঈর্ষার আরেক রূপ হলো, অন্যের অমঙ্গল বা ক্ষতিকর কোনো কিছু কামনা করা। তুলনামূলকভাবে অসন্তোষ অল্প সময়ের মধ্যে দূর হয়ে যায়, আর ঈর্ষা মনের মধ্যে দানা বেঁধে থাকে, এটা সহজে দূর হতে চায় না। ঈর্ষা অসৎ দিলের সংকীর্ণতা ও রিপুর তাড়নায় সৃষ্টি হয়। অপরপক্ষে, অসন্তোষ দিলের সচেতনতা ও অনুভূতি থেকে সৃষ্টি হয়।

মুনাফাসাত ও হাসাদের মধ্যে পার্থক্য: অন্য লোকদের মধ্যে যে পূর্ণতা ও সাফল্য দেখা যায়, তা অথবা তার চেয়ে অধিক পাওয়ার এক প্রতিযোগিতা ও প্রচেষ্টাকে আরবি ভাষায় মুনাফাসাত বলে। এটি হলো আত্মমর্যাদা, উচ্চাভিলাষ ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভের অন্যতম উপায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, “যেসব লোক অন্যান্যদের উপর প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চায় তারা যেন এ জিনিস লাভের জন্য প্রতিযোগিতায় জয়ী হতে চেষ্টা করে।” (সূরা মুতাফফিফীন : আয়াত-২৬) আরবি 'মুনাফাসাত' শব্দটি 'নাফীস' শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়েছে। উত্তম জিনিস লাভ করার জন্য সকলেরই আগ্রহ থাকে, আর সেটা অর্জন করার জন্য প্রতিযোগিতার প্রয়োজন হয়। যদি কয়েকজন মিলে সেসব জিনিস অর্জন করতে চায়, তাহলে প্রত্যেকেই আগে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং এই প্রতিযোগিতায় আনন্দ লাভ করে। সাহাবায়ে কেরাম নেককাজে প্রতিযোগিতা করতেন, আর তাতে অংশগ্রহণ করে তাঁরা আনন্দ পেতেন, একে অন্যকে এজন্য উৎসাহও দান করতেন। 'মুনাফাসাত' বা 'মুসাবাকাত' হলো এক ধরনের প্রতিযোগিতামূলক দৌড়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "কাজেই তোমরা সৎকাজে প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হও।” (সূরা আল-বারাকাহ: আয়াত-১৪৮) "তোমরা অগ্রে ধাবিত হও তোমাদের পালনকর্তার ক্ষমা ও সেই জান্নাতের দিকে যার বিশালতা ও বিস্তৃতি আকাশ ও পৃথিবীর মতো।" (সূরা হাদীদ: আয়াত-২১) হযরত উমর (রা) নেককাজে হযরত আবূ বকর (রা) থেকে অগ্রগামী হওয়ার জন্য সব সময় চেষ্টা করতেন। কিন্তু কখনো তিনি তাঁর আগে যেতে পারেননি। তারপর যখন হযরত আবু বকর (রা) খলীফা হলেন, তখন হযরত উমর (রা) তাঁকে বললেন, আমি আর কখনো আপনার সাথে কোনো প্রতিযোগিতায় নামবো না। হযরত উমর (রা) আরো বললেন, আমি যখনই নেককাজে আবূ বকর (রা)-এর সাথে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়েছি, সবসময় হেরে গেছি, প্রত্যেক বারই তিনি জয়ী হয়েছেন। দু'জন মুতানাফিস বা প্রতিযোগী এমন দু'জন ভৃত্যের ন্যায় যারা তাদের মুনীবের কোনো পছন্দনীয় এবং প্রিয় জিনিসের সম্পর্কে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয় এরূপ মুনীব উভয় ভৃত্যের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে থাকেন, আর এরাও একে অপরের প্রতি সৎভাব বজায় রাখে। হাসাদ বা হিংসা একটি নিন্দনীয় ও নীচ স্বভাব। এর মধ্যে পুণ্য সঞ্চয়ের কোনো মনোভাব নিহিত থাকে না। কোনো ব্যক্তির নাফস নিজের অলসতা ও অপারগতার দরুন ঐ ব্যক্তির প্রতি হিংসার আগুনে জ্বলে যিনি প্রশংসনীয় নেক কাজে অগ্রগামী হন। আর ঐ ব্যক্তি মন্দ বাসনা পোষণ করে এই বলে যে, হায়, যদি এই ব্যক্তি নেককাজ করা থেকে বিরত থাকতো তাহলে সে তারই সমকক্ষ হতে পারতো। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "তারা তো এটাই চায় যে, তারা নিজেরা যেমন কাফির, তোমরাও তেমনিভাবে কাফির হয়ে যাও, যেন তোমরা একেবারে তাদের সমান হয়ে যাও।" (সূরা নিসা: আয়াত-৮৯) এর দ্বারা জানা গেলো, একজন হিংসুক ব্যক্তি যে কোনো নিআমত বা ভালো জিনিসের শত্রু। আর অন্যদের থেকে তা চলে যাওয়া সে পছন্দ ও কামনা করে। আমার নিকট যে ভালো জিনিসটি নেই সেটা তার থেকেও ছিন্ন হয়ে যাক। আর একজন মুতানাফিস নি'আমত প্রাপ্তির জন্য সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে, আর সে কামনা করে যে, এ নি'আমত আমার ও আমার সাথীদের মধ্যে পরিপূর্ণ হয়ে যাক। তার এ ইচ্ছা হয় যে, অন্যান্যদের চেয়ে তা বেড়ে যাক অথবা কমপক্ষে তাদের সমান হয়ে যাক। আর একজন হিংসুক ব্যক্তি নিআমতের ধ্বংস কামনা করে। বেশির ভাগ সৎ ও যোগ্য ব্যক্তি মুনাফাসাতের দ্বারা উপকৃত হন। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো যোগ্য ব্যক্তিকে সামনে রেখে কোনো নেকী বা নি'আমতের দিকে প্রতিযোগিতায় অগ্রসর হন, তাহলে তাঁর অনেক উপকার সাধিত হয়; কেননা তাঁর ইচ্ছা হয় যে, আমি তার সমান হই। কোনো কোনো সময় মুনাফাসাত মাহমুদাহ বা প্রশংসিত আগ্রহকেও হিংসা বলা হয়। একটি হাদীসে উল্লেখ আছে, দু'ব্যক্তির সাথে হিংসা বা মুনাফাসাত বৈধ। প্রথমত সেই ব্যক্তির সাথে যাঁকে আল্লাহ তাআলা কুরআনের জ্ঞান দান করেছেন, আর তিনি সে অনুযায়ী দিন-রাত আমল করেন। দ্বিতীয়ত সেই ব্যক্তির সাথে যাঁকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দান করেছেন, আর তিনি তা আল্লাহর রাস্তায় দান করেছেন। এটাকে আরবি ভাষায় 'গিবতা' বলা হয়ে থাকে।

রাষ্ট্রের ও নেতৃত্বের প্রতি ভালোবাসার মধ্যে পার্থক্য: রাষ্ট্রের প্রতি ভালোবাসা ও দেশপ্রেম ঈমানের একটি অঙ্গ। মাতৃভূমির জন্য যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করা একটি মহৎ গুণ। মানুষ সাধারণত পার্থিব প্রতিপত্তি ও যশের জন্য নেতৃত্ব লাভ করতে চায়। কিন্তু যারা খাঁটি ঈমানদার বান্দা তাঁরা নেতৃত্বকে জনগণের খিদমত করার একটি উপায় হিসেবে মনে করেন। জনগণের সার্বিক ও সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সাধনই তাঁদের নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য। তাঁরা এটাকে দুনিয়া ও আখিরাতের উৎকর্ষ সাধনের একটি উপলক্ষ বা উপায় মনে করেন। খাঁটি দেশপ্রেম ও নিখাদ নেতৃত্বের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই। তবে দেশপ্রেম লোক দেখানো হতে পারে, স্বার্থ সিদ্ধির একটি উপায়ও হতে পারে। ঠিক তেমনি নেতৃত্ব দুনিয়ার মান-সম্মান অর্জনের লক্ষ্যেও হতে পারে। এছাড়া যিনি দ্বীনের মাহাত্ম্যকে সমুন্নত রাখতে চান, আল্লাহ তাআলার আনুগত্যের মাধ্যমে গুনাহ থেকে বিরত থাকতে চান, যাঁর লক্ষ্য হলো আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রসার করা। যিনি শরিয়তের বিধি-বিধান অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থাকে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তিনি ইবাদত বন্দেগীতে থাকেন নিষ্ঠাবান। জনগণের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছানোর লক্ষ্যে থাকেন সচেষ্ট ও সচেতন। আর এরূপ ব্যক্তিই কেবল দ্বীনি নেতৃত্ব কামনা করেন। এমনকি এরূপ ব্যক্তিরা আল্লাহ তাআলার কাছে দুআও করেন যে, আল্লাহ তাআলা যেন তাঁদেরকে সৎ ও নেককার মানুষের নেতা বানিয়ে দেন। এঁরাই আল্লাহ ও রাসূলের দিকে লোকদেরকে আহ্বান করার উদ্দেশ্যে জনপ্রিয়তা ও নেতৃত্ব লাভ করতে চান। এরকম নেক প্রচেষ্টা প্রশংসার দাবিদার। এঁরাই প্রকৃতপক্ষে, সৎ ও সফলকাম বান্দা। এঁরাই আল্লাহ তাআলার দিনকে প্রচার ও প্রসারের উৎসাহী। তাঁরা চান আল্লাহর ইবাদত ও তাওহীদ প্রতিষ্ঠা লাভ করুক। জনগণ তাঁদেরকেই সমর্থন করুক যাতে তাঁরা সকল নেককাজ সহজে সম্পন্ন করতে পারেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাঁর খাস ও প্রিয় বান্দাদের উত্তম আমল ও গুণাবলীর কথা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন, "যারা দুআ করতে থাকে, হে আমাদের রব! আমাদের স্ত্রীদের ও আমাদের সন্তানদের দ্বারা আমাদের চোখের শীতলতা দাও এবং আমাদেরকে পরহেযগার লোকদের ইমাম বানাও।" (সূরা ফুরকান : আয়াত-৭৪) অর্থাৎ ঐ নেককার বান্দাদের আন্তরিক ইচ্ছা, তাঁদের স্ত্রীগণ ও সন্তান-সন্ততিগণ আল্লাহ তাআলা অনুগত বান্দা হয়ে যান, তাহলে তাদের চোখ জুড়াবে। আর আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও দাসত্বে নেককার বান্দাগণ তাঁদের অনুসরণ করবে, তাহলে তাঁদের হৃদয়ে আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভূত হবে। কেননা আনুগত্যের ক্ষেত্রে নেতা ও তাঁর অনুসারীগণ একে অন্যের সহায়ক শক্তি। তাঁরা আল্লাহর কাছে এমন এক জিনিস চান, যার দ্বারা আল্লাহ তাআলার আনুগত্য ও সন্তুষ্টির ব্যাপারে নেককার লোকদেরকে সহযোগিতা করতে পারেন। এছাড়া তাঁরা নেতৃত্বের মাধ্যমে আল্লাহর বাণী তাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারেন। নেতৃত্বের মূল ভিত্তি হলো সবর, সততা, ন্যায়নিষ্ঠা ও আল্লাহর পবিত্র বাণীর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আর তারা যখন সবর করে এবং আমাদের আয়াতসমূহের প্রতি বিশ্বাস রাখতে শুরু করে, তখন তাদের মধ্যে আমরা এমন সব অগ্রনেতা পয়দা করলাম, যারা আমাদেরই নির্দেশ মতো হিদায়াত দান করতো।” (সূরা সাজদাহ : আয়াত-২৪) তাঁদের নেতৃত্ব প্রাপ্তির যে দুআ তার তাৎপর্য হলো, আল্লাহ যেন তাঁদেরকে নেতৃত্ব করার হিদায়াত দান করেন, নেক আমলের তাওফীক দান করেন, উপকারী জ্ঞান ও নেক আমলের দ্বারা তাঁদের ভেতর ও বাইরের জীবন সুন্দর ও সুসজ্জিত করেন যা ছাড়া নেতৃত্ব পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারে না। এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ তাআলা উপরোক্ত আয়াতগুলোতে তাঁর পবিত্র নাম রহমান সংযুক্ত করেছেন, যাতে তাঁরা জানতে পারেন যে এসব নিআমত শুধু আল্লাহ তাআলার দয়া ও অনুগ্রহের দ্বারা তাঁদের নসীব হয়েছে। কাজেই লক্ষণীয় যে, এই অবস্থায় তাঁদের প্রতিদান হবে জান্নাতের আলীশান মহল। কেননা দ্বীন ইসলামের মধ্যে নেতৃত্বের স্থান অনেক উচ্চ ও গুরুত্বপূর্ণ। তাই এর প্রতিদানও সেরূপ হওয়া উচিত। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও নেতৃত্ব এ জন্য চাওয়া হয় না যাতে প্রশাসক ও নেতৃবৃন্দ জনগণের ঘাড়ে উঠে বসবে আর তাদের মন তাদের দিকে আকৃষ্ট করবে। তাহলে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে নেতাদের সাহায্যকারী হবে আর ক্ষমতাশীলগণ এদের উপর আধিপত্য বিস্তার করবে ও সফলতা অর্জন করবে। তবে এসবের দ্বারা বহু অনর্থের সৃষ্টি হয়, যেমন— পরস্পর দলাদলি, হিংসা, বিদ্বেষ, অবাধ্যতা, ঈর্ষা, জুলুম, ফিতনা, সন্ত্রাস, পক্ষপাতিত্ব, শরিয়তের প্রতি তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, অধম ও হীন লোকদেরকে সম্মান প্রদর্শন, আর সম্মানিত দ্বীনদার ব্যক্তিদেরকে অবমাননা করা ইত্যাদি। আসলে, এটাই হলো দুনিয়ার নেতৃত্বের ভিত্তি। দুনিয়ার নেতৃত্ব এসবের মাধ্যমে এমনকি এর চেয়েও অধিক নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো সময় নেতারা এসব বাহ্যিক মন্দ কার্যকলাপ উপলব্ধি করতে পারেন না। তবে দুনিয়ার জীবন যখন শেষ হয়ে যাবে, তখন এসব মন্দ কার্যকলাপ অবশ্যই তাঁদের দৃষ্টিগোচর হবে। হাশরের ময়দানে এসব লোকের অবস্থা পিপীলিকার মতো, তাঁদেরকে মানুষ পদদলিত করে যাবে, যাতে তারা চরমভাবে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হয়। যেহেতু এরা দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর দিনকে লাঞ্ছিত ও অপমানিত করেছিলো। আর তারা আল্লাহর বান্দাদেরকে নগণ্য ও দুর্বল মনে করে তাদের উপর জুলুম করেছিলো।

আল্লাহর প্রতি মহব্বত ও অন্যদের সঙ্গে মহব্বতের মধ্যে পার্থক্য: এটা একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। প্রত্যেকেরই এ সম্পর্কে জানা একান্ত প্রয়োজন। কাজেই এই বিশ্বাস মনের মধ্যে দৃঢ়ভাবে পোষণ করতে হবে যে, আল্লাহ তাআলার প্রতি মহব্বত পোষণ করা পরিপূর্ণ ঈমানের অন্যতম শর্ত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে আল্লাহর মতো ভালোবাসা শিরকের সমতুল্য। তবে আল্লাহ প্রেমিকদের সাথে মহব্বত রাখা আল্লাহর সাথে মহব্বত রাখারই সমতুল্য। যখন মানুষের অন্তরে আল্লাহর মহব্বত সুদৃঢ় হয়ে যায়, তখন তাঁদেরকে মানুষ ভালো না বেসে পারে না। যখন কোনো বান্দা আল্লাহর অন্যান্য প্রিয় বান্দাকে ভালোবাসতে শুরু করে, তখন এই ভালোবাসা একমাত্র আল্লাহর তাআলার জন্যই হয়ে থাকে। যেমন— একজন মুসলমান আল্লাহ তাআলার মহব্বতের জন্য আম্বিয়ায়ে কেরাম, আওলিয়ায়ে ইযাম ও ফেরেশতাদের সাথে মহব্বত রাখে, ঠিক তেমনি আল্লাহর সাথে দুশমনির কারণে তাঁর দুশমনের সাথে দুশমনি রাখে। এ ধরনের মহব্বত ও দুশমনির চিহ্ন এই যে, আল্লাহ তাআলার এরূপ দুশমন একজন বান্দার যতোই উপকার করুক না কেন, তার সেই দুশমনি মহব্বতের দ্বারা পরিবর্তিত হবে না। এভাবে যদি আল্লাহর কোনো প্রিয় বান্দার কাছ থেকে কেউ সাময়িকভাবে কোনো কষ্ট পায়, তাহলে তাদের সেই সম্পর্ক অটুট থাকবে, সে কষ্ট জেনে-শুনে বা ভুলক্রমে অথবা ইজতিহাদের মাধ্যমে দেয়া হোক। দ্বীন ইসলাম চারটি মূলনীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। যথা— মহব্বত, শত্রুতা, নির্দেশ পালন আর নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা। তাই যার মহব্বত, শত্রুতা, নির্দেশ পালন ও নিষিদ্ধ বিষয় থেকে বিরত থাকা আল্লাহ তাআলার জন্য হয়, তার ঈমান হলো পরিপূর্ণ। আর যে ব্যক্তি এ চারটি মূলনীতিকে অবহেলা বা অগ্রাহ্য করলো, তার ঈমান হবে দুর্বল ও অপরিপূর্ণ।

আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো প্রতি মহব্বত হলো দুই প্রকার— এক প্রকার মহব্বত হলো কারো প্রতি এমন কোনো মহব্বত রাখা যেটা মূল তাওহীদকে আঘাত করে, আর এটা হলো শিরক। আর দ্বিতীয় প্রকারের মহব্বত হলো যা পরিপূর্ণ ইখলাসের ক্ষতি সাধন করে, কিন্তু তাই বলে সেই ব্যক্তি ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায় না। প্রথম প্রকারের উদাহরণ হলো ঐ ভালোবাসা যেটা মুশরিকগণ তাদের মূর্তি ও দেবতার প্রতি পোষণ করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "কিছু লোক এমন আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অপরকে আল্লাহর প্রতিদ্বন্দ্বী ও সমতুল্য মনে করে এবং তাদেরকে ঠিক এরূপ ভালোবাসে যেরূপ ভালোবাসা উচিত একমাত্র আল্লাহকে।” (সূরা আল-বারাকাহ: আয়াত-১৬৫) এরা হলো মুশরিক। তারা আল্লাহ তাআলার মহব্বতের পাশাপাশি মূর্তির সাথেও মহব্বত রাখে। এটা হলো তাদের প্রভুত্ব ও দাসত্বের মহব্বত। এই কারণে তারা এদের থেকে ভয় ও আশা করে। তাদের কাছে সওয়াল এবং দুআ করা শুরু করে, তাদের ইবাদতও করে। এরূপ মহব্বত হলো নিরেট শিরক। এসব শিরকের কাজ আল্লাহ তাআলা তাওবাহ ছাড়া মাফ করবেন না। মূর্তির প্রতি চরম ঘৃণা পোষণ ছাড়া ঈমানদার হওয়া যায় না। এ কাজের জন্যই আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে কেরাম ও রাসূলগণকে যুগে যুগে দুনিয়ায় পাঠিয়েছিলেন ও আসমানী কিতাব নাযিল করেছিলেন। আর এ ধরনের মুশরিকদের জন্য জাহান্নাম তৈরি করা হয়েছে। আর যারা মুশরিকদের সাথে আপোষহীন, তাদের জন্য তৈরি করা হয়েছে জান্নাত। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ছাড়া অন্য কোনো বস্তুকে মাবুদ জ্ঞান করে, তার ইবাদত করে ও তাকে অভিভাবক মনে করে, তার সাথে একজন তাওহীদবাদী ঈমানদার বান্দা কোনোক্রমেই দ্বীনি সম্পর্ক রাখতে পারে না।

দ্বিতীয় প্রকারের মহব্বত হলো, পরিবার-পরিজন, ক্ষেত-খামার, ব্যবসা-বাণিজ্য, পশুসম্পদ, ধনসম্পদ ইত্যাদির সাথে মহব্বত রাখা। এটা হলো একটা স্বভাবজাত ও প্রবৃত্তিজনিত মহব্বত, যেমন— একজন ক্ষুধার্ত ব্যক্তি খানা খেলে ও একজন পিপাসার্ত ব্যক্তি পানি পান করলে তৃপ্তি লাভ করে। এই মহব্বত আবার তিন প্রকারের। এক. যদি এ মহব্বতের দ্বারা আল্লাহর মহব্বত ও আনুগত্য অর্জিত হয়, আর আল্লাহর রেযামন্দির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি এজন্য সওয়াব পাবে, আর এটা হবে একটি নেকীর কাজ। আল্লাহকে ভালোবাসার এটাও একটি উপায়। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছিলো এরূপ ভালোবাসা। পরিবার-পরিজনের প্রতি ছিলো তাঁর গভীর ভালোবাসা ও মমত্ববোধ। এছাড়া তিনি খুশবুও খুব পছন্দ করতেন। আল্লাহর প্রতি মহব্বত, রিসালাতের দায়িত্ব পালন ও আল্লাহর হুকুম-আহকাম বাস্তবায়ন করা ছিলো তাঁর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। দুই. কোনো ভালোবাসা যদি নির্মোহ হয় ও আল্লাহ তাআলার পছন্দনীয় কাজে কোনো বাধার সৃষ্টি না করে, কারো সাথে কোনো সংঘাত বাঁধলে শরিয়তের বিধি-বিধানকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়, তাহলে সেই ভালোবাসা হবে মুবাহ বা বৈধ। এরূপ ভালোবাসা কোনো গুনাহের কাজ নয়। তবে এরূপ ভালোবাসা কোনো কোনো সময় আল্লাহর সাথে মহব্বতের প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। তিন. আর যদি কেউ কারো ভালোবাসায় উদ্ভ্রান্ত হয়ে পড়ে ও সেটাকে শরিয়তের বিধি-বিধানের উপর অগ্রাধিকার দেয়, তাহলে এরূপ ব্যক্তি লোভ-লালসার দাস বলে গণ্য হবে। তাই প্রথম প্রকারের ভালোবাসা নেক কাজে অগ্রগামীদের জন্য, দ্বিতীয় প্রকারের ভালোবাসা মধ্যমপন্থী লোকদের জন্য, আর তৃতীয় প্রকারের ভালোবাসা হলো যালিম ও সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য। এসব বিষয়ের তাৎপর্য হৃদয়ঙ্গম করা আমাদের একান্ত প্রয়োজন। আর এই ভালোবাসার মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য বিদ্যমান সে বিষয়ও লক্ষ্য রাখতে হবে। কেননা এই ভালোবাসা হলো নাফসে আম্মারাহ ও নাফসে মুতমায়িন্নাহর সংঘাতের প্রধান ক্ষেত্র।

তাওয়াক্কুল ও উদাসীনতার মধ্যে পার্থক্য: তাওয়াক্কুল হলো কালবের একটি মহৎ গুণ ও অন্তরের ইবাদতস্বরূপ। এর মধ্যে করুণাময় আল্লাহর প্রতি গভীর ভরসা থাকে। একজন নেকবান্দা আল্লাহ তাআলার আশ্রয়ে এসে নিজের যাবতীয় বিষয়াদি তাঁর দরবারে সমর্পণ করে দেয়। আর আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত তাকদীরেরর প্রতি সন্তুষ্ট থাকে। তার দৃঢ় বিশ্বাস আছে যে, তার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি হলেন উত্তম ব্যবস্থাপক। পাশাপাশি সে লোকটি যাবতীয় বাহ্যিক উপকরণের ব্যবস্থাও করে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর উপর সর্বাধিক নির্ভরশীল ছিলেন। তবে তিনি যুদ্ধে বর্ম পরিধান করতেন। তিনি উহুদের যুদ্ধে দুটি বর্ম পরিধান করেছিলেন। আর হিজরতের সময় তিনি তিনদিন পর্যন্ত সওর পাহাড়ের গুহায় আত্মরক্ষার জন্য লুকিয়ে ছিলেন। তাই জানা গেলো যে, রাসূলে মকবুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহ্যিক উপকরণের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্যের উপর নির্ভর করতেন।<sup>১</sup> পক্ষান্তরে, বাহ্যিক সাজ-সরঞ্জামের উপর পুরোপুরি নির্ভর করা, আর আল্লাহ তাআলাকে ভুলে যাওয়া এবং হঠাৎ করে আল্লাহর কথা মনে পড়লেও সে বিষয় কোনো গুরুত্ব না দেয়াকে তাওয়াক্কুলহীনতা বা উদাসীনতা বলা হয়। এরূপ অবস্থায় মন থাকে উপকরণের দিকে, আল্লাহর দিকে নয়। এ পর্যায়ে মানুষ তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। প্রথম শ্রেণীর তাওয়াক্কুলকারী কোনো সাজ-সরঞ্জাম বা উপকরণের ব্যবস্থা করে না। দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক প্রকৃত তাওয়াক্কুলের অধিকারী। তাঁরা বুঝতে পারেন যে, বিনা উপকরণের তাওয়াক্কুল অর্জিত হয় না। সুতরাং তাঁরা বাহ্যিক উপকরণ যোগাড় করে উপকরণের যোগদানদাতা আল্লাহর উপর ভরসা করেন। তৃতীয় শ্রেণীর লোক হলো, যারা সাজ-সরঞ্জাম ও উপকরণ পরিত্যাগ করে। আসলে তাঁরা খাঁটি তাওয়াক্কুলকারী নয়। এরূপ ব্যক্তির উদাহরণ হলো বিবাহ না করে সন্তান লাভের আশা পোষণ করা, পানাহার না করে ক্ষুধা নিবৃত্তি ও তৃপ্তি লাভের আশা করা। তাওয়াক্কুল হলো আশা-আকাঙ্ক্ষার সাথে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ। তাওয়াক্কুলের হাকীকত হলো এই যে, ইনসান আল্লাহ তাআলাকে নিজের অভিভাবক মনে করবে। কোনো ব্যক্তির উকীল তাঁর ভালোমন্দ সম্পর্কে যেমন ওয়াকিফহাল থাকেন, তার সম্যক কল্যাণ কামনা করেন, আল্লাহ তাআলা ও তাঁর বান্দার অবস্থা এর চেয়েও অধিক পরিজ্ঞাত। আর বান্দার চাহিদা অনুযায়ী আল্লাহ তাআলা তাকে তা দান করেন। আল্লাহ তাঁর খাস বান্দাকে উসীলা অন্বেষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আর এই মর্মে নিশ্চয়তা দিয়েছেন যে, বান্দা চেষ্টা সাধনা করলে আল্লাহ তার প্রয়োজনীয় রিযক দান করবেন। সুতরাং জমিনকে চাষের উপযোগী করে বীজ বপন ও সময় মতো পানি সেচনের নির্দেশ দিয়েছেন। এভাবে আল্লাহ তাআলা যথাসময়ে তাঁর বান্দার প্রয়োজনীয় রিযকের ব্যবস্থা করে দেন। আল্লাহ তাআলা এই প্রসঙ্গে আরো নির্দেশ দিয়েছেন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলো না। আর আল্লাহর উপরই ভরসা রেখো। একমাত্র তাঁর কাছেই প্রত্যাশা করো। আল্লাহ তাআলা আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর বান্দাদের অভিভাবক। দুর্ভাগ্য ঐ ব্যক্তির যে এসব বিষয়কে উপেক্ষা করে অলস হয়ে বসে থাকে, আর বলে আমার অদৃষ্টে যা নির্ধারিত আছে, সেটা এমনি আমার কাছে এসে যাবে। আমি যদি মৃত্যু থেকে পালিয়ে যেতে চেষ্টা করি তবুও মৃত্যু আমাকে পাকড়াও করবে। ঠিক তদ্রূপ আমার ভাগ্যে যে রিযক নির্ধারিত আছে সেটা আপনা-আপনি আমার কাছে এসে যাবে। যে এরূপ চিন্তাভাবনা পোষণ করে, এটা তাকে বুঝতে হবে যে, শত চেষ্টা তদবীর করলেও তা লাভ করা যাবে না। তার অদৃষ্টে যে রিযক নির্ধারিত আছে সেটা তার জানা নেই, তার চেষ্টার দ্বারা পাওয়া যাবে, না অন্যের উসীলার দ্বারা পাওয়া যাবে, তার রিযক কীভাবে বা কোন পন্থায় আসবে সেটাও তার জানা নেই। প্রকৃতপক্ষে, এসব বিষয় লুকায়িত আছে। তবে এটা কী করে সে জানতে পারবে যে, কোনো চেষ্টা তদবীর ছাড়াই তার নির্দিষ্ট রিযক সে লাভ করতে পারবে। এছাড়া এমন অনেক বিষয় আছে, সেসব অন্যের মাধ্যমে সমাধা হয়ে থাকে এবং তা অদৃষ্টের সাথে সম্পর্কিত। আর অনেক বিষয় এর বিপরীতও আছে। এটা উক্ত অলস ব্যক্তি স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করছে, তাহলে এটা কী করে জানা যাবে যে, যাবতীয় রিযক অন্যের প্রচেষ্টার সাথে সংশ্লিষ্ট। এই মূলনীতি প্রত্যেক অবস্থার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আমাদেরকে কি জান্নাত লাভের উপকরণ ও জাহান্নাম থেকে বাঁচার উপকরণ যোগাড় করতে হবে না? কেউ যদি অলস হয়ে বসে থাকে, তাহলে তার অদৃষ্টে যেটা লেখা আছে, সেটা কি সে এমনি পেয়ে যাবে? এরূপ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। এটা তাওয়াক্কুলেরও পরিপন্থী। তাওয়াক্কুলের পাশাপাশি উপকরণ যোগাড় করাও অপরিহার্য। অবশ্য আরেক শ্রেণীর তাওয়াক্কুলকারী আছে, যাঁরা কোনো কিছু লাভের জন্য কোনো উপকরণের তোয়াক্কা করেন না। তাঁরা সবকিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দেন। (যেমন— আসহাবে সুফফা) এই শ্রেণীর লোক আল্লাহর অনুগ্রহের মাধ্যমেই সবকিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। এঁরা সাধারণ মানুষ থেকে ভিন্ন। সেই অবস্থা অনেক উঁচু স্তরের এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। তাঁরা সবসময় আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকেন। এরূপ তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা আল্লাহর খাস বান্দাদের পক্ষেই কেবল সম্ভব। তবে উপকরণের মাধ্যমে তাওয়াক্কুল অবলম্বন করা সবচেয়ে উত্তম ও আদর্শস্থানীয়। উপকরণের মাধ্যমে যে তাওয়াক্কুল হাসিল করা হয়, সেটাই মহান আম্বিয়া ও সাহাবায়ে কেরাম অনুসরণ করে গিয়েছেন। হযরত যাকারিয়া (আ) কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। হযরত নূহ (আ)-কে আল্লাহ নৌকা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এমন কোনো সাহাবী ছিলেন না যিনি তাওয়াক্কুলের অর্থকে বাহ্যিক উপকরণ ছেড়ে দেয়া মনে করতেন, বরং তিনি বাহ্যিক উপকরণ যোগাড় করার জন্য তৎপর থাকতেন। আর এর পাশাপাশি আল্লাহর উপর ভরসাও রাখতেন। মহান সাহাবাগণ ভাগ্যের উপর নির্ভর না করে যুদ্ধের ময়দানে স্বহস্তে দুশমনের মুকাবিলা করতেন। তবুও তাঁরা তাওয়াক্কুলের হাকীকতের উপর কায়িম ছিলেন। এভাবে তাঁরা সংসার ধর্ম পুরোপুরি পালন করে গিয়েছেন। এছাড়াও তাঁদের কাজ কারবারকে তাঁরা উন্নত ও সমৃদ্ধ করতেন। তাওয়াক্কুলের ক্ষেত্রে তাঁরা সাইয়্যিদুল মুতাওয়াক্কিলীন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পদাঙ্ক অনুসরণ করতেন।

সতর্কতা ও সন্দেহপ্রবণতার মধ্যে পার্থক্য: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতকে সঠিকভাবে অনুসরণ করা, আল্লাহ ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সন্তুষ্ট রাখা, কোনো বিষয়ে সীমালঙ্ঘন না করা, এসব নীতিমালাকে যথাযথভাবে অনুসরণ করার নামই হলো সতর্কতা। ওয়াসওয়াসা বা সন্দেহপ্রবণতা বলতে ঐ আমলকে বুঝায় যেটা রাসূল (সা)-এর সুন্নাত বা কোনো সাহাবীর আমল দ্বারা প্রমাণিত নয়, আর সেটা দ্বীন ইসলামের অংশও নয়। যদি কোনো ব্যক্তি ওজু করার সময় কোনো অঙ্গকে তিনবারের অধিক ধৌত করে, ওজু বা গোসলের নিয়ম বহির্ভূত বাড়াবাড়ি করে, নামাযের নিয়ত মুখে উচ্চারণ করাকে জরুরি মনে করে, যে পোশাক-পরিচ্ছদ সম্পর্কে নাপাক হওয়া সম্বন্ধে মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস না হয়, তা সতর্কতার জন্য ধৌত করে, এসবই হলো সন্দেহপ্রবণতা। এভাবে ঐসব মাসয়ালা-মাসায়েল যেসব একজন মানুষের সন্দেহপ্রবণ মন দ্বীন হিসেবে গ্রহণ করেছে, সেসব সুন্নাতের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে সম্পর্কে তাকে সন্দেহ ও সংশয়মুক্ত থাকতে হবে। কারণ একজন মানুষ যদি সতর্কতার পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে যায়, তাহলে অবশ্যই সে সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়বে। সুতরাং কোনো বিষয় যাতে সুন্নাতের বরখেলাফ না হয়, সে সম্বন্ধে সকলকে সাবধান ও সতর্ক থাকতে হবে, সারা দুনিয়ার মানুষও যদি তাঁদের বিরুদ্ধাচরণ করে।

ইলহামে ফেরেশতা ও ইলহামে শয়তানের মধ্যে পার্থক্য: এক. যে ইলহাম ফেরেশতা কর্তৃক আল্লাহর ইচ্ছা অনুযায়ী এবং আল্লাহর রাসূলের হিদায়াত অনুযায়ী হয়, সেটা ফেরেশতাদের পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে। আর যেটা গায়রুল্লাহর জন্য ও আল্লাহর ইচ্ছা বিরোধী হয়, সেটা শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। দুই. যে ইলহাম আল্লাহর তাআলার প্রতি আগ্রহ ও আকর্ষণ, যিকির ও ফিকিরের সৃষ্টি করে, তা হয় ফেরেশতাদের পক্ষ থেকে আর এর উল্টোটা হয় শয়তানের পক্ষ থেকে। তিন. যে ইলহাম মানুষের দিলে নূর, অনুরাগ ও প্রশস্ততা সৃষ্টি করে সেটা হলো ফেরেশতার ইলহাম, আর যা এর বিপরীত তা হলো, শয়তানের ইলহাম। চার. যে ইলহাম সুখ-শান্তি বয়ে আনে তা হলো ফেরেশতার ইলহাম, অন্যথায় সেটা হবে শয়তানের ইলহাম। ইলহামে ফেরেশতা বলতে কী বুঝায়? একজন নেককার বান্দার পরিচ্ছন্ন দিলে আল্লাহর নূর ঝলমল করতে থাকে। এই ইলহামের সাথে ফেরেশতাদের সম্পর্ক থাকে, তাই এই ইলহামকে ইলহামে মালাকী বলা হয়। ফেরেশতারা পূত-পবিত্র, কাজেই পূত-পবিত্র দিলের সাথেই তাঁদের সুসম্পর্ক থাকে। এজন্য এরূপ দিলের উপর ফেরেশতার প্রভাব শয়তানের প্রভাবের থেকে অধিক হয়। কিন্তু যে দিল কলুষিত ও যে দিল লোভ-লালসা ও সন্দেহপ্রবণতায় বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে, ঐসব দিলে শয়তানের প্রভাব প্রবল হয়ে থাকে।

ইকতিসাদ ও তাকসীরের মধ্যে পার্থক্য: ইকতিসাদের অর্থ হলো বাড়াবাড়ি ও সংকীর্ণতর মধ্যবর্তী পথ। একটি অপরটির বিপরীত। আবার ইকতিসাদ বলতে কম করা বা সীমালঙ্ঘন করাকেও বুঝায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "আর যখন তারা ব্যয় করে তখন অপব্যয় করে না এবং কার্পণ্যও করে না এবং তাঁদের ব্যয় করার অবস্থা মাঝামাঝি পন্থা হয়ে থাকে।" (সূরা ফুরকান: আয়াত-৬৭) "আর নিজের হাতকে আপনি কাঁধের দিকে সংকুচিত করে রাখবেন না আর একবারে প্রসারিতও করে দেবেন না। অন্যথায় তিরস্কৃত ও রিক্তহস্ত হয়ে পড়বেন।” (সূরা বনী ইসরাঈল: আয়াত-২৯) "আর খুব খাও ও পান করো, তবে সীমালঙ্ঘন করো না।" (সূরা আ'রাফ: আয়াত-৩১) গোটা ইসলাম মধ্যবর্তী নিয়ম-নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। অন্যান্য প্রচলিত ধর্মের তুলনায় একমাত্র ইসলামই মধ্যবর্তী ধর্ম। ইসলামের নামে যেসব আচার অনুষ্ঠান প্রচলিত, সেসবের তুলনায় সুন্নাতই হলো মধ্যবর্তী তরীকা। এছাড়া আল্লাহর দিন হলো বাড়াবাড়ি থেকে মুক্ত। আর এটাই হলো মধ্যবর্তী দিন। দ্বীনের সহায়তার লক্ষ্যে যে গবেষণা করা হয়, সেটাকে ইজতিহাদ বলা হয়। আরবি "গুলু” শব্দের অর্থ হলো সীমালঙ্ঘন বা বাড়াবাড়ি করা। আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নির্দেশের মধ্যে শয়তান দুটো বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার সুযোগ পায়। শয়তান মানুষকে সীমা লঙ্ঘন ও বাড়াবাড়ি করতে প্ররোচিত ও উৎসাহিত করে, অথবা উদাসীনতায় জড়িয়ে ফেলে। এসব হলো এক প্রকার ব্যাধির ন্যায়। ঈমান, ইবাদত ও সকল ধরনের দ্বীনি লেনদেনের ক্ষেত্রে শয়তান বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। বিভ্রান্তি থেকে তারাই কেবল রক্ষা পেতে পারে যারা পূত-পবিত্র নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সঠিক ও সুষ্ঠুভাবে অনুসরণ করে। সময়ের পরিক্রমায় যেসব নতুন নতুন ভাবধারা কর্মকাণ্ড ও ভ্রান্ত আকীদা উদ্ভাবিত হয়েছে, সেসব থেকে তাঁরা দূরে থেকে রাসূলের সুন্নাতকে অগ্রাধিকার ও প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। আর এঁরাই আছেন সঠিক পথে। এ দু'টি মারাত্মক ব্যাধি অধিকাংশ আদম সন্তানকে বিভ্রান্ত করে। এজন্য আগেকার দিনের আলিম সমাজ এসব ভ্রান্ত মতবাদ থেকে দূরে থাকার জন্য মুসলমানদেরকে সাবধান ও সতর্ক করে গিয়েছেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, এদের খপ্পরে পড়লে ধ্বংস অনিবার্য। কোনো কোনো সময় এ দু'টি ব্যাধি একই ব্যক্তির মধ্যে যুক্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা মুসলমানদেরকে এসব ব্যাধি থেকে রক্ষা করুন এবং সরল পথের উপর কায়িম রাখুন।

নিঃস্বার্থ উপদেশদাতা ও স্বার্থপর উপদেশদাতার মধ্যে পার্থক্য: নিঃস্বার্থ উপদেশ দান এক ধরনের মহৎ কাজ। যেটা কারো প্রতি দয়া, করুণা, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ থেকে প্রকাশ পায়। উপদেশদাতার উপদেশের আসল উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর তাআলার সন্তুষ্টি লাভ ও জনগণের সাথে ইহসান বা সদয় ব্যবহার করা। তাই একজন উপদেশদাতা উপদেশ দেয়ার ক্ষেত্রে গভীর ভালোবাসা ও নম্রতা অবলম্বন করে থাকেন। কেউ যদি উপদেশদাতাকে দুঃখ বা কষ্ট দেয় বা তাঁর সাথে মন্দ ব্যবহার করে তাহলে তিনি তা অম্লান বদনে সহ্য করেন এবং ঐসব লোকদের সঙ্গে ঐ রকম ব্যবহার করেন, যে রকম ব্যবহার একজন দয়ালু ও অভিজ্ঞ চিকিৎসক একজন মুমূর্ষু রোগীর সাথে করে থাকেন। ঐ রোগী যদি তার চিকিৎসকের সাথে কোনো দুর্ব্যবহার করে, তাহলে তিনি খুশি মনে তা সহ্য করেন ও তার যথাযথ যত্ন নেন। একজন নিঃস্বার্থ উপদেশদাতার অবস্থাও ঠিক তদ্রূপ। তবে কিছু কিছু স্বার্থপর উপদেশদাতা আছেন, যাঁরা লোকদেরকে উপদেশের ছলে তিরস্কার করেন, লজ্জা দেন, তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও অপমান করেন। এছাড়া একজন উপদেশদাতা তাঁর প্রিয়জন বা তাঁর কোনো উপকারী ব্যক্তিকে কোনো খারাপ কাজে লিপ্ত দেখলেও তাকে কোনো কিছুই বলেন না, বরং আবশ্যক বোধে সেই অবস্থায় মন্দ কাজে লিপ্ত লোকদের পক্ষ নেন এবং বলেন যে এরাও মানুষ, তাদেরও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। এছাড়া তার পাপের চেয়ে নেকীর পরিমাণ বেশি, আর আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল ও দয়ালু। অপরপক্ষে, কেউ যদি একজন নিঃস্বার্থ উপদেশদাতার উপদেশ না মানেন, তাহলে তিনি মনে দুঃখ পান, তবে সেটা প্রকাশ করেন না। এরূপ উপদেশদাতা আরো বলে থাকেন আল্লাহ তাআলা আমাকে এর প্রতিদান দেবেন আমার কথা কেউ শুনুক বা না শুনুক। তিনি তাদের জন্য দুআ করতে থাকেন, আর লোকের দোষ-ত্রুটি কারো কাছে প্রকাশ করেন না। কিন্তু একজন স্বার্থপর উপদেশদাতার অবস্থা হলো ঠিক এর বিপরীত।

মুবাদারাত ও উজলতের মধ্যে পার্থক্য: মুবাদারাত বা তাড়াহুড়া করা বলতে বুঝায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রাপ্ত সুযোগকে মূল্যবান মনে করা ও সেটাকে কাজে লাগানো। সুতরাং একজন তাড়াহুড়াকারী ব্যক্তি সময়ের পূর্বে বা পরে কোনো কাজ করে না। বরং সঠিক সময়ের মধ্যেই সে তার কাজ দ্রুত সম্পন্ন করে তার কাজ শেষ করার চেষ্টা করে, ঠিক একটি সিংহ যেমন শিকার দেখলেই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। আর উজলত শব্দের অর্থ হলো, সময়ের পূর্বে কোনো কাজ শেষ করা। যেমন কেউ কাঁচা ফল পাকার আগে পেড়ে আনলো। সুতরাং মুবাদারাত বা তাড়াহুড়া হলো দুটি মন্দ অভ্যাসের মধ্যবর্তী সময় বা অবস্থা। একটি হলো উদাসীনতা, অপরটি হলো উজলত, অর্থাৎ সময়ের পূর্বে কোনো কাজ শেষ করা। উজলত শয়তানের প্ররোচনায় সংঘটিত হয়। উজলত বা অসময়ে তাড়াহুড়া করার ফলে অনেক অহেতুক জটিলতার সৃষ্টি হয় এবং মঙ্গল ও কল্যাণ থেকে সে ব্যক্তি বঞ্চিত হয়। উজলত আসলে মাত্রাতিরিক্ত অনুশোচনার কারণ হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে, অলসতা ও উদাসীনতা সময়ের অপচয় ঘটায় ও সুযোগ-সুবিধা হাত ছাড়া করে দেয়।

মানুষ পরিস্থিতির শিকার। সুখ-দুঃখ মানুষের নিত্যনৈমিত্তিক সাথী। দুঃখ-বেদনা ও আনন্দ নিয়ে মানুষের জীবন। তাই সুখ ও আনন্দকে যেমন আমরা সানন্দে গ্রহণ করি, তেমনি দুঃখ ও বেদনাকেও একইভাবে গ্রহণ করতে হবে। এটাই আল্লাহর বিধান। তাই মানুষকে সর্বাবস্থায় ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং আল্লাহর উপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করতে হবে। আর এই দুঃখ-বেদনা ও অশান্তিকে কারো কাছে প্রকাশ করা যাবে না। এটাই সবর করার প্রধান শর্ত। যে আল্লাহ দুঃখ-কষ্টের মধ্যে ফেলেন, তাঁর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে, কোনো মানুষের কাছে নয়। তাহলেই একজন মানুষ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। এভাবেই আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ আল্লাহর দেয়া দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-আপদ সানন্দচিত্তে সহ্য করে আমাদের জন্য উজ্জ্বল আদর্শ স্থাপন করে গিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আহমদ ইবনে কায়স (র) থেকে একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো। জনৈক ব্যক্তি একবার তাঁর কাছে এসে তার নিজের দুঃখকষ্ট সম্পর্কে অভিযোগ পেশ করলো। তখন তিনি তাকে বলেছিলেন, হে আমার প্রিয়, বহু বছর হলো আমি আমার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছি, কিন্তু এখনো আমি সেকথা কাউকে জানাইনি। সুতরাং তোমাকে ধৈর্যধারণ করতে হবে এবং আল্লাহর উপর নির্ভর করতে হবে। হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর শির মুবারকে একবার ভীষণ ব্যথা দেখা দিলো। তখন তিনি সেই ব্যথা আর সহ্য করতে পারছিলেন না। তিনি বললেন, হায়, আমার মাথায় তীব্র অসহনীয় যন্ত্রণা হচ্ছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হযরত আয়িশা সিদ্দীকা (রা)-এর কথা শুনে তিনি খুবই মর্মাহত হলেন এবং গভীর সমবেদনায় বলে উঠলেন, আমার মাথায়ও ভীষণ ব্যথা অনুভূত হচ্ছে, তবুও আমি তা সহ্য করছি। তুমি আমাকে অনুসরণ করো, তোমার মাথার যন্ত্রণার জন্য কোনো অনুযোগ না করে সহ্য ও সবর করো। তোমাকে এই ভীষণ মাথাব্যথার কোনো অনুযোগ না করেই সহ্য করতে হবে। এখানে এটা ছিলো সহমর্মিতার এক অতুলনীয় বহিঃপ্রকাশ। একটি আরবি কবিতার পঙ্ক্তির বাংলা অনুবাদ এখানে উল্লেখ করা হলো। “যে ব্যক্তি তোমার দুঃখ-কষ্টের সময় ব্যথিত হয়েছিলো, তুমি তার দুঃখ-কষ্টের সময় আনন্দিত না হয়ে ব্যথিত হও।" মানুষের কাছে কেউ কোনো অভিযোগ করলে সেটা অভিযোগ হিসেবে গণ্য হয়, আর এটার উদ্দেশ্য হলো অসন্তোষ প্রকাশ করা। তবে আল্লাহ তাআলার কাছে কোনো দুঃখ-বেদনা জানালে সেটা অভিযোগ হিসেবে বিবেচিত হয় না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এই প্রসঙ্গে কয়েকজন নবী রাসূলের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। হযরত আইয়ূব (আ) আল্লাহ তাআলার অনুগ্রহ কামনা করে তাঁর রবের কাছে আবেদন করেছিলেন, "আমার এই কষ্ট হচ্ছে, আর আপনি সকলের চেয়ে অধিক দয়ালু।” (সূরা আম্বিয়া: আয়াত-৮৩) হযরত ইয়াকূব (আ) আরয করেছিলেন, "আমি আমার শোক ও দুঃখের অভিযোগ কেবল আপনার সমীপেই পেশ করেছি।” (সূরা ইউসুফ: আয়াত-৮৬) এমনিভাবে হযরত মূসা (আ) ও আরয করেছিলেন, "হে আল্লাহ! তোমার জন্যই সমস্ত প্রশংসা, আর তোমার নিকট ফরিয়াদ করছি, তুমিই সাহায্যকারী, আর তোমার কাছে সাহায্য চাই আর তোমার কাছে নিবেদন করছি আমার অসুবিধা, তোমার সাহায্য ছাড়া ভালো-মন্দ কিছুই করার কোনো ক্ষমতা আমার নেই।" সাইয়্যিদুল মুরসালীন হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর মহান দরবারে একবার আবেদন করেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছেই আমার দুর্বলতা ও চেষ্টা তদবীরের ত্রুটি এবং লোকদের কাছে হেয় হওয়ার অভিযোগ করছি। তুমি দুর্বলের রব এবং আমারও রব। হে আল্লাহ! আমাকে কার কাছে সোপর্দ করছো? এমনসব লোকদের কাছে কি যারা আমার সাথে মলিন মুখে দেখা দেয়, অথবা এমন শত্রুর কাছে যাদেরকে তুমি আমার উপর আধিপত্য দান করেছো? যদি আমার উপর তোমার কোনো অসন্তোষ না থাকে তাহলে আমার কোনো চিন্তাভাবনা নেই। তোমার নিরাপত্তাই আমার সহায়ক। তোমার চেহারার নূরের দ্বারা যে অন্ধকার দূর হয় এবং তোমার উপর দুনিয়া ও আখিরাতের মঙ্গল নির্ভর করে, সেই নূরের উসীলায় আমাকে তোমার গযব ও অসন্তুষ্টি থেকে রক্ষা করো। আমি তোমার সন্তুষ্টি কামনা করতে থাকবো যে পর্যন্ত না তুমি আমার প্রতি রাযী হও। আর সার্বভৌম ক্ষমতা একমাত্র তোমারই।" এসব ঘটনা থেকে জানা যায় যে, মহান আল্লাহর দরবারে দুঃখ-বেদনা পেশ করা ধৈর্য ধারণের পরিপন্থী নয়। আল্লাহ তাআলা হযরত আইয়ুব (আ) সম্পর্কে বলেছেন, "আমি তাঁকে ধৈর্যশীল পেয়েছি।” যদিও তিনি আল্লাহর দরবারে তাঁর দুঃখ-বেদনা "আমি দুঃখ-কষ্টে আক্রান্ত” এই বলে জানিয়েছিলেন। এমনিভাবে ইয়াকূব (আ)-এর সম্বন্ধে আল্লাহ তাআলা বলেছেন যে, "সবরে জামীল বা উত্তম ধৈর্যের যে ওয়াদা করেছিলে তার উপর তুমি প্রতিষ্ঠিত আছো।" কোনো নবী যখন কোনো বিষয়ে ওয়াদা বা অঙ্গীকার করতেন, তখন তা অবশ্যই পূরণ করতেন। আর ইয়াকূব (আ) একথাও উল্লেখ করেছেন যে, "আমি আমার পেরেশানীর অনুযোগ একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই উপস্থাপন করছি।" এ অনুযোগের দ্বারা তার ধৈর্যে কোনো ত্রুটি পরিলক্ষিত হয়নি।

উপরোক্ত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা সম্পর্কে বিভিন্ন অভিমত রয়েছে। কেউ কেউ বলেছেন, আইয়ূব (আ) তাঁর বিপদাপদের সময় অনুযোগ করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাঁকে ধৈর্যশীল বলে আখ্যায়িত করেছেন, কিন্তু তাঁকে চরম ধৈর্যশীল বলেননি। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, আইয়ূব (আ) আল্লাহ তাআলাকে লক্ষ্য করে 'আন্তা রাহমানুর রাহীম' অর্থাৎ তুমি সকল দয়ালুর চেয়ে অধিক দয়ালু, বলেছিলেন। তিনি 'আরহিমনী' অর্থাৎ আমার প্রতি রহম করো, একথা বলেননি। অর্থাৎ তিনি তাঁর দুঃখের কথা উল্লেখ করেছিলেন, আর আল্লাহর গুণাবলীও উল্লেখ করেছেন। কেউ কেউ বলেছেন, যখন আইয়ূব (আ)-এর জিহ্বা অসুস্থতার কারণে আল্লাহর যিকর করা থেকে অক্ষম হয়ে পড়লো, তখন তিনি এই অনুযোগ করেছিলেন যে, আল্লাহর যিকরের মধ্যে দুর্বলতাজনিত আপদ দেখা দিয়েছে, এটা রোগ যন্ত্রণার কোনো অভিযোগ ছিলো না। আবার কেউ কেউ বলেছেন, আল্লাহর নিকট এই অভিযোগ উত্থাপন করার উদ্দেশ্য ছিলো, যেন তিনি দুর্বল উম্মতের জন্য একটি আদর্শ স্থাপন করতে পারেন। যাঁরা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন তাঁরা মনে করেছিলেন, আল্লাহ তাআলার নিকট কোনো অনুযোগ করা সবর করার পরিপন্থী। অথচ এটা একটি ভ্রান্ত ধারণা। আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে বিপদগ্রস্ত করেন এই কারণে যে তারা যেন তাঁর কাছে আশ্রয় চায় ও আহাজারি এবং প্রার্থনা করে। এসব বিপদের সময় বান্দা চুপ থাকুক এটা আল্লাহ পছন্দ করেন না। বরং তাঁর বান্দা আল্লাহর মহান দরবারে সব প্রকারের ত্রুটিবিচ্যুতি, দুর্বলতা ও অক্ষমতা প্রকাশ করুক তা তিনি পছন্দ করেন। তাই একজন বান্দাকে এটা স্মরণ রাখা অতি জরুরি যে, একজন মানুষের হাত তার মুখের যতো নিকটবর্তী, তার চেয়ে আল্লাহর তাআলার রহমত তার হৃদয়ের অধিক নিকটবর্তী, একজন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান ব্যক্তির জন্য এটুকুই যথেষ্ট। ইসলামে অজ্ঞ লোকদের জন্য অনেক বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের মতপার্থক্যের সৃষ্টি হয়, যার ফলশ্রুতিতে সমাজে বিভিন্ন দল, উপদল ও সংঘাত দেখা দেয়। যদিও আল্লাহ তাআলার কিতাব হক ও বাতিলের মধ্যে পার্থক্যকারী। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মানুষের মধ্যে সত্য ও অসত্যের সীমারেখা স্বরূপ। যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তাআলা তাঁর জন্য সঠিক ও বেঠিকের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করে দেন। তাই আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "হে ঈমানদারগণ, যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদেরকে হক ও বাতিলের পার্থক্যকারী একটি বস্তু দান করবেন।” (সূরা আনফাল: আয়াত-২৯) বদরের যুদ্ধের দিনকে ইয়াওমুল ফুরকান বলা হয় এজন্য যে, এর দ্বারা আল্লাহ তাআলার শত্রু ও মিত্রদের মধ্যে পার্থক্য সূচিত হয়েছিলো। এই দিনটিকে সত্য ও অসত্যের মধ্যে পার্থক্যকারী এবং হিদায়াত বা পথপ্রদর্শনকারীও বলা হয়। সত্য ও সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হওয়াকে পথভ্রষ্ট বলে, যেমন— মুশরিকরা আল্লাহ তাআলার ইবাদত ও মূর্তির উপাসনাকে, আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়কে, আর অদৃষ্টের বিষয়কে একীভূত করে ফেলেছিলো। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেছেন, "তারা বলেছে, ক্রয়-বিক্রয়ও তো সুদ নেয়ার মতো। অথচ আল্লাহ তাআলা ক্রয়-বিক্রয়কে বৈধ করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।” (সূরা আল-বাকারাহ: আয়াত-২৭৫) তারা হালাল ব্যবসা ও হারাম সুদকে এক সঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে। তারা এটাও বলে যে, ব্যবসা ও সুদের মধ্যে পার্থক্য কী? তারা জবাইকৃত পশু ও মৃত পশুকে হালাল হিসেবে আখ্যায়িত করে। তারা এও বলে যে এটা একটি অদ্ভুত ব্যাপার নয় কি, আমরা যে পশু হত্যা করি সে পশুর মাংস হালাল আর আল্লাহর ইচ্ছায় যে পশু মারা যায় সেটার মাংস হারাম। তাদের বক্তব্য হলো সব জানোয়ারই আল্লাহর সৃষ্টি, তবে কিছু সংখ্যক হারাম কেন, আর কিছু সংখ্যক হালাল কেন? মহিলাদের ক্ষেত্রে হালাল হারামের ব্যাপারেও তারা প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। তাদের মতে সমস্ত নারীদেরকে আল্লাহ মানুষ হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তাহলে এটা কেমন ব্যাপার যে, নারীদের কিছু সংখ্যক পুরুষদের জন্য হালাল ও কিছু সংখ্যক হারাম করা হয়েছে। এই ভ্রান্ত আকীদার অনুসারীরা আল্লাহর ওলীদেরকে এবং শয়তানের বন্ধুদেরকে এক পর্যায়ভুক্ত করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে।

ইত্তেহাদিয়া ফিরকার কী কী বিষয় শিরকের অন্তর্ভুক্ত: এটা এমন একটি ফিরকা যে ফিরকা বিরাট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। এই ফিরকার অনুসারীরা সমস্ত জগৎকে এক মনে করে এবং দাবি করে যে এসবই হলো আল্লাহর সত্তা, এ সত্তা ছাড়া অন্য কেউ ইবাদতের যোগ্য নয়। আর তারা আরও দাবি করে যে, সমস্ত জিনিস এক সত্তা, পৃথক কোনো কিছু নয়। এছাড়া সুনাম, দুর্নাম, ভালো-মন্দ, উত্তম-অধম বলতে কোনো কিছু নেই। তারা সহজাত প্রবৃত্তি ও ধর্মীয় বিধি-বিধান এসবের উপর বিশেষ নিয়মকানুন প্রবর্তন করেছে। যারা পার্থক্যে ও সাদৃশ্যে বিশ্বাসী, তাঁরা মনে করে তারাই বিচক্ষণ ও দূরদর্শী, তারাই সঠিক পথে আছে। এই যে সাদৃশ্য, মতপার্থক্য, ধনসম্পদ ইত্যাদি ব্যক্তি বিশেষকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়ে থাকে, অধিকাংশ জ্ঞানী ব্যক্তি এইসব সাদৃশ্যপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে বিভ্রান্তিতে আছেন। এই অন্ধকার ও অজ্ঞতা থেকে ঐ নূরই তাঁদেরকে উদ্ধার করতে পারে, যে নূর আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দার হৃদয়ে দান করেছেন। এই নূরের দ্বারাই তাঁরা বাস্তবতাকে উপলব্ধি করে থাকেন, আর হক ও বাতিল, শুদ্ধ ও অশুদ্ধের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করতে সমর্থ হন। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেছেন, "যার জন্য আল্লাহ তাআলা নূর নির্ধারিত করেননি, তার আর কোনো নূর নেই।” (সূরা নূর: আয়াত-৪০) এ ব্যাপারে এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে, এসব আলোচনার মধ্যে আল্লাহ তাআলার তাওহীদ বা একত্ব সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদি আল্লাহ তাআলা মানুষকে সে জ্ঞান চক্ষু দান করতেন, তাহলে তারা এর মধ্যে বিরাট পার্থক্য অনুধাবন করতে পারতো। যেমন আম্বিয়ায়ে কেরামের তাওহীদের মধ্যে এবং যারা আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকার করে তাদের তাওহীদের মধ্যে পার্থক্য, আল্লাহর গুণাবলীর শ্রেষ্ঠত্ব ও কোনো উপমা বা উদাহরণের মধ্যে যে পার্থক্য, খাঁটি তাওহীদে এবং সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্মানহানির মধ্যে যে পার্থক্য, পূত-পবিত্র রাসূলের একনিষ্ঠ অনুসরণের মধ্যে ও আলিমদের অভিমত ও যুক্তির মধ্যে যে পার্থক্য, আলিমদের অনুসরণের মধ্যে ও তাঁদের ইলম ও জ্ঞানের মধ্যে যে পার্থক্য, আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের ও তাঁর দুশমনদের মধ্যে যে পার্থক্য, ঈমানদারী ও রহমানী অবস্থার মধ্যে আর শয়তানী ও নাফসানি অবস্থার মধ্যে যে পার্থক্য, অবশ্য পালনীয় আসমানী কিতাবের ও বিকল্প আদেশের মধ্যে যে পার্থক্য তা নির্ণয় করতে হবে।

আম্বিয়ায়ে কেরামের তাওহীদ ও আল্লাহর গুণাবলীকে অস্বীকারকারীদের মধ্যে পার্থক্য: আম্বিয়ায়ে কেরামের অনুসৃত তাওহীদ আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ গুণাবলীকে বিশদভাবে উপস্থাপন করে। তাওহীদের অর্থ হলো, একমাত্র আল্লাহকে মা'বৃদ জানা, তাঁর ইবাদত বন্দেগী করা, তিনি যে এক ও অদ্বিতীয়, তাঁর কোনো শরীক নেই, এটা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করা। এখানে আল্লাহর কোনো শরীক বলতে বুঝায় আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে মা'বুদ হিসেবে গণ্য করে তাঁকে ভালোবাসা, ভয় করা, তাঁর নামে শপথ ও মানত করা। তাই আল্লাহর অস্তিত্বের সাথে অন্য কোনো বস্তুর অস্তিত্বের তুলনা করা যাবে না, মনে বা মুখেও আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না। এটাই হলো তাওহীদের মর্মবাণী।

বাতিল ফিরকার অনুসারীদের তাওহীদ সম্পর্কে ধারণা: বাতিল ফিরকার অনুসারীদের নিয়ম-নীতি ও বৈশিষ্ট্য হলো, তারা আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলীর বাস্তবতাকে অস্বীকার করে এবং আল্লাহ তাআলা যে এসব গুণের অধিকারী নন, সেটাও মনে করে, তারা আল্লাহর সেসব নাম ও গুণাবলী মুখে পর্যন্ত উচ্চারণ করে না, এমনকি কুরআন শরীফের কোনো আয়াতও তারা পাঠ করে না যেখানে আল্লাহর নামের উল্লেখ আছে। আল্লাহর নাম ও গুণাবলী সম্পর্কিত হাদীসগুলো তারা বর্ণনা করে না। এছাড়া বাতিল ফিরকার অনুসারীরা আল্লাহর নাম ও তাঁর পবিত্র গুণ ও মাহাত্ম্যকে বিকৃত করার অপকৌশল অবলম্বন করে। তারা আল্লাহকে অর্থহীন শব্দের দ্বারা উল্লেখ করে। কেউ এসব প্রতিবন্ধকতা দূর করার চেষ্টা করলে, তারা পবিত্র কুরআনের বা রাসূলের হাদীসের তাওহীদ সম্পর্কিত বিষয়ের মধ্যে বিকৃত অর্থ বের করার অপচেষ্টা করে। বাতিলপন্থীরা আল্লাহর গুণাবলীকে অর্থহীন করার এহেন অপচেষ্টাকে তাদের তাওহীদ হিসেবে নামকরণ করেছে। এটা আল্লাহ তাআলার নাম ও গুণাবলীর অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করা এবং ধর্মদ্রোহিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

আম্বিয়ায়ে কেরাম ও বাতিলপন্থীদের আল্লাহকে পবিত্র ঘোষণার মধ্যে পার্থক্য: আম্বিয়ায়ে কেরাম আল্লাহ তাআলাকে যাবতীয় ত্রুটিবিচ্যুতি থেকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তাঁর পবিত্র সত্তাকে সব দোষত্রুটি থেকে মুক্ত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি যেসব বিষয় থেকে মুক্ত সেগুলো হলো— তন্দ্রা, নিদ্রা, অলসতা, মৃত্যু, ক্লান্তি, জুলুম করার ইচ্ছা, তাঁর স্ত্রী, সন্তানাদি ও সাহায্যকারী থাকা, তাঁর বিনা অনুমতিতে তাঁর কাছে সুপারিশ করতে পারা, কোনো বান্দাকে বিনা বিচারে ছেড়ে দেয়ার ইচ্ছা, তাঁদেরকে উদ্দেশ্যহীনভাবে পয়দা করা, আসমান জমিন এবং দুনিয়ার যাবতীয় জিনিস বিনা প্রয়োজনে পয়দা করা, আযাব ও সওয়াবের ব্যাপারে এসবের কোনো সম্পর্ক না থাকা, আর তাঁর আদেশ-নিষেধের অনুসারী না হওয়া, দোস্ত, দুশমন, ভালো-মন্দ এবং কাফির মুমিনগণকে একই সমান মনে করা, আল্লাহর ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছু সম্পন্ন হওয়া, আল্লাহকে কোনো বিষয়ে কারো মুখাপেক্ষী হওয়া, কোনো বিষয়ে আল্লাহর সাথে কারো শরীক থাকা, আল্লাহর প্রতি অলসতা আরোপ করা, তিনি ভুলভ্রান্তিতে নিপতিত হন মনে করা, আল্লাহ কর্তৃক কোনো অঙ্গীকার ভঙ্গ করা, তাঁর কোনো কালাম পরিবর্তন হয় মনে করা, তাঁর প্রতি আপত্তিকর কোনো কিছু সম্বোধন করা, সেটা তাঁর নাম, গুণ বা কর্মের সাথে যুক্ত হোক বা না হোক। এসব কিছুই আল্লাহ তাআলার শান ও সম্মানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী। আল্লাহর যাবতীয় নাম ও গুণ অতি সুন্দর ও পরিপূর্ণ। আল্লাহর যাবতীয় কর্মকাণ্ড তাঁর সৃষ্টির সামগ্রিক কল্যাণে নিয়োজিত। এভাবেই আম্বিয়ায়ে কেরাম আল্লাহ তাআলার পবিত্রতা ও পূর্ণতা ঘোষণা করেছেন। যেসব গুণ দ্বারা আল্লাহ তাআলা তাঁর পবিত্র সত্তাকে বিভূষিত ও মহিমান্বিত করেছেন, ভ্রান্ত ও বাতিলপন্থীরা সেসব গুণকে স্বীকার করে না। বাতিল পন্থীরা বলে যে, আল্লাহ তাআলা নিজেও কথা বলেন না এবং কাউকে তাঁর সাথে কথা বলারও সুযোগ দেন না। তিনি পবিত্র আরশের উপর প্রতিষ্ঠিত নন, তাঁর দিকে প্রার্থনার হাত উত্তোলন করা অর্থহীন, তাঁর কাছে কোনো পবিত্র বাণী পৌঁছে না, তাঁর নিকট থেকে কোনো কিছু আসে না, তাঁর নিকট ফেরেশতারা যান না, রূহ উপরে উঠে না, তিনি বান্দাদের প্রতি ক্ষমাশীল নন, তিনি সমস্ত সৃষ্টির উপর পরাক্রমশালী নন, তিনি এক মুষ্টিতে আসমান ও অন্য মুষ্টিতে জমিন গ্রহণ করবেন না, তিনি প্রথম অঙ্গুলিতে আকাশ, দ্বিতীয় অঙ্গুলিতে জমিন, তৃতীয় অঙ্গুলিতে পাহাড় এবং চতুর্থ অঙ্গুলির দ্বারা গাছপালা ধারণ করবেন না। তাঁর কোনো চেহারা নেই যে, মুমিন বান্দারা জান্নাতে তাঁকে নিজ চোখে দেখতে পাবেন। তিনি তাদের সাথে কথা বলবেন না, তাঁদেরকে সালাম করবেন না, তাঁদের সাথে হাসিমুখে দেখা দেবেন না, তিনি প্রত্যেক রাত্রে প্রথম আকাশে অবতরণ করে এ আহ্বান করেন যে, কেউ কি মাগফিরাত কামনাকারী আছে, আমি তাকে মাফ করে দেবো, কেউ কি কোনো কিছুর প্রত্যাশী আছে, আমি তার আশা পূরণ করে দেবো। তিনি কোনো কাজ কোনো উদ্দেশ্যে করেন না, বরং তাঁর সমস্ত কর্মকাণ্ড উদ্দেশ্যহীন ও যুক্তিহীন। তাঁর ইচ্ছা সর্বব্যাপী নয়। আল্লাহর ইচ্ছা কার্যকর হয় না, বরং বান্দার ইচ্ছা কার্যকর হয়। তিনি কোনো ইচ্ছা করেন না, তাঁর ইচ্ছা ছাড়াই সবকিছু হয়। বাতিলপন্থীরা একটার নাম রেখেছে ন্যায়বিচার, অপরটির নাম রেখেছে তাওহীদ। এভাবে তারা আরও বলে থাকে, আল্লাহ তাআলা কাউকে ভালোবাসেন না, তাঁকেও কেউ ভালোবাসে না। তাঁর মধ্যে কোনো দয়া বা অনুরাগ নেই, তাঁর মধ্যে ক্রোধ বা সন্তুষ্টিও নেই। এছাড়া বাতিলপন্থীদের মতে আল্লাহ তাআলা সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা নন। তাদের কারো কারো মতে তিনি সর্বজ্ঞাতও নন। এমনকি তাদের কারো কারো মতে আল্লাহর কোনো অস্তিত্বই নেই। কেননা আল্লাহর অস্তিত্ব স্বীকার করলে তাঁর সমতুল্য ও সমকক্ষ অন্য কাউকে মানতে হবে। এসবই হলো, বাতিলপন্থী ও ভ্রান্ত আকীদার লোকদের বিশ্বাস ও ধারণা যা হলো ঈমানের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

আল্লাহর গুণবাচক নামের হাকীকত, উপমা ও দৃষ্টান্তের মধ্যে পার্থক্য: হযরত ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) ও অন্যান্য মহান ইমামগণ আল্লাহর গুণবাচক নামের হাকীকতের পার্থক্য সম্পর্কে তাঁদের অভিমত ব্যক্ত করেছেন। তাঁরা বলেছেন, আল্লাহর হাত আমার হাতের ন্যায়, তাঁর কান আমার কানের ন্যায়, তাঁর চোখ আমার চোখের ন্যায়, এভাবে আল্লাহর সাথে তাঁর সৃষ্টির তুলনা করা হয়। তবে যদি বলা হয় যে, আল্লাহ তাআলার কান, চোখ, হাত এবং চেহারা আছে, তাঁর স্থিতি আছে, তাহলে এসবের কোনোটির সাথে মাখলুকের কোনো সাদৃশ্য বুঝায় না। বরং সৃষ্টির গুণের মধ্যে ও স্রষ্টার গুণের মধ্যে যে বিরাট পার্থক্য রয়েছে, সেই অবস্থায় আল্লাহর উপমা বা সাদৃশ্যের কোনো অবকাশ নেই। এসব ধ্যান-ধারণা কেবল ধর্ম বিরোধীদের ভ্রান্তি ও শয়তানের চক্রান্ত ছাড়া আর কিছু নয়। এই বিষয়ে সকল নবী ও রাসূলগণের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর রাসূলগণ যেসব গুণে আল্লাহ তাআলার সত্তাকে গুণান্বিত ও বিভূষিত করেছেন, ঐসব গুণকে বিনা দ্বিধায় অবিকৃতভাবে মেনে নিতে হবে। এসবকে বিকৃত করার বা বাতিল করার কারো কোনো অবকাশ নেই। এসব বিষয়কে মেনে নিতে হবে এবং মাখলুকের সাথে আল্লাহর সকল সাদৃশ্যকে অস্বীকার করতে হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলাকে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করে ও আল্লাহর নামসমূহ ও গুণাবলীকে অস্বীকার করে, সে কুফরী কাজ করলো। তবে তাঁরাই সঠিক পথে আছেন, যাঁরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলীকে স্বীকার করেন ও তা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন। আর আল্লাহর সাথে কোনো মাখলুকের সাদৃশ্য আছে, এটাকে স্বীকার করেন না।

আল্লাহর খাঁটি তাওহীদ ও মর্যাদাবান ব্যক্তিবর্গকে তাঁদের মর্যাদা থেকে বিচ্যুত করার মধ্যে পার্থক্য: আল্লাহর একত্ববাদের সাথে অপর কাউকে সমমর্যাদা জ্ঞান করা। যাঁরা আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী তাঁরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত বন্দেগী করেন না, আল্লাহ যে এক ও অদ্বিতীয় তাঁর কোনো শরীক নেই এটা তাঁরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন। একজন খাঁটি তাওহীদবাদী আল্লাহ ছাড়া কারো শপথ করেন না, মানত করেন না, কারো উপর ভরসা করেন না, আল্লাহ তাআলার নৈকট্য লাভের জন্য অন্য কারো ইবাদত করেন না, কাউকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সমতুল্য মনে করেন না। যারা আল্লাহর ইচ্ছাকে মানুষের ইচ্ছার সমান সমান মনে করে, যারা বলে, আল্লাহর ইচ্ছায় ও তোমার সাহায্যে সফলকাম হয়েছি, তোমার উপর ও আল্লাহর উপর আমরা ভরসা করি, আমাদের জন্য আকাশে আল্লাহ আর জমিনে তুমি, এই সাদকা হলো তোমার ও আল্লাহর ওয়াস্তে, তোমার কাছেও ও আল্লাহর কাছে আমরা তাওবাহ করছি, আমরা তোমার ও আল্লাহর হিফাযতে আছি; মুশরিকদের ন্যায় কাউকে সিজদাহ করা, কারো উদ্দেশ্যে মাথা ন্যাড়া করা, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা, মানত করা, মৃত্যুর পর কারো কবরে সিজদাহ করা, বিপদের সময়ে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাহায্য কামনা করা, আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে প্রার্থনা করা, আল্লাহর সন্তুষ্টির পরিবর্তে অন্য কারো সন্তুষ্টি কামনা করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের পরিবর্তে অন্য কারো সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য করা, আল্লাহ ছাড়া অন্যের সাথে আল্লাহর সমান ভালোবাসা রাখা, আল্লাহকে যেভাবে ভয় করা উচিত ও প্রয়োজন, সেভাবে অন্য কাউকে ভয় করা, আল্লাহকে যে রকম সম্মান করা উচিত সে রকম সম্মান অন্য কাউকে প্রদর্শন করা— এগুলো তাওহীদের পরিপন্থী। কেউ যদি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ভালোমন্দ, লাভ-লোকসান, হায়াত-মাউতের মালিক মনে করে, এতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কোনো কিছু যায় আসে না। এই প্রসঙ্গে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, "আমাকে সীমার অতিরিক্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করো না, যেমন— খ্রিস্টান সম্প্রদায় হযরত ঈসা (আ)-কে সীমাতিরিক্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করেছিলো। আমি শুধু একজন আল্লাহর বান্দা, আমাকে আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূলই মনে করো। হে লোক সকল! এটা আমার মোটেই পছন্দ নয় যে, তোমরা আমাকে আমার মর্যাদার চেয়ে অধিক উচ্চস্থান দান করো এবং আমার কবরকে মেলা বা উৎসবের স্থানে পরিণত করো, যেটা মোটেই আমার কাম্য নয়। হে আল্লাহ! আমার কবরকে মূর্তি পূজার স্থান বানাইও না।”

একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপস্থিতিতে এক গুনাহগার ব্যক্তি বলেছিলো, হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে তাওবাহ করছি, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে নয়। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছিলেন, "এ ব্যক্তি সত্যের সঠিক পরিচয় লাভ করেছে।” আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে ইরশাদ করেছেন, "এ ব্যাপারে আপনার কোনো করণীয় নেই।" (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১২৮) "আপনি বলুন, সবকিছুই আল্লাহর হাতে।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৫৪) "বলুন, আমি তোমাদের ক্ষতি সাধন করার ও সুপথে আনয়ন করার মালিক নই। বলুন, আল্লাহ তাআলার কবল থেকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না এবং তিনি ব্যতীত আমি কোনো আশ্রয়স্থল পাবো না।” (সূরা জিন: আয়াত-২১-২২) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত ফাতিমা (রা), হযরত আব্বাস (রা) ও সুফিয়া (রা)-কে বলেছিলেন যে, "আমি আল্লাহ তাআলার আযাব থেকে রক্ষা করার ব্যাপারে তোমাদের কোনো কাজে আসবো না।" কিন্তু মুশরিকরা তাদের বরেণ্য ও মহৎ ব্যক্তিদেরকে অন্যায়ভাবে সম্মান প্রদর্শন করে এবং মূর্তিকে পূজা করে। মুশরিকরা তাদের ধর্মীয় গুরু ও দেবদেবীকে মাবুদ মনে করে পূজা করে। তাদের এই ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের প্রতি যারা বিরূপ আচরণ করে, তারা তাঁদেরকে দুশমন মনে করে। তারা আরো বলে থাকে যে, আসলে তাওহীদবাদীরা মুশরিকদের দেবদেবীর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ ও হেয় প্রতিপন্ন করছেন না, তাদের দৃষ্টিতে তাওহীদবাদীরাই সৃষ্টিকর্তার বিরুদ্ধাচরণ করে তাঁর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "যখন সঠিকভাবে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়, তখন যারা পরকালে বিশ্বাস করে না, তাদের অন্তর সংকুচিত হয়ে যায়, আর যখন আল্লাহ ব্যতীত অন্য উপাস্যদের নাম উচ্চারণ করা হয় তখন তারা আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠে।" (সূরা আয-যুমার: আয়াত-৪৫)

রাসূলের সর্বাত্মক অনুসরণ ও আলিমদের অনুসরণের মধ্যে পার্থক্য: পূত-পবিত্র রাসূলের সঠিকভাবে অনুসরণ করার অর্থ হলো— তাঁর হাদীসের উপর অন্য কোনো ব্যক্তির কথা বা অভিমতকে অগ্রাধিকার বা প্রাধান্য না দেয়া, সে যে কেউ হোক না কেন। তবে সবার আগে ঐ হাদীসের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে হবে এবং দুনিয়ার সকলেই এর বিরোধিতা করলেও এসব হাদীসকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে হবে। তবে এটা সম্ভব নয় যে, দুনিয়াবাসী সকলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসের বিরোধিতায় ঐক্যবদ্ধ হবে। সকল মুসলমানকেই সহীহ হাদীসের নির্দেশ পালন করতে হবে। এ বিষয়ে কোনো অবহেলা করা যাবে না, এরই পাশাপাশি হাক্কানী আলিমদের মর্যাদা, ভালোবাসা ও ইসলামের রক্ষণাবেক্ষণে তাঁদের ইজতিহাদকে সকল বিতর্কের ঊর্ধ্বে স্থান দিতে হবে। বলা বাহুল্য, ইজতিহাদ হলো একটি পুণ্যময় কাজ। মুজতাহিদগণ ইজতিহাদের কারণে এক গুণ বা দ্বিগুণ সওয়াব পেয়ে থাকেন। তবে হাক্কানী আলিমদের এহেন ইজতিহাদের দরুন কোনো সহীহ হাদীসকে বাদ দেয়া যাবে না। তাঁরা বড় আলিম এই ভেবে তাঁদের অভিমতকে হাদীসের উপর অগ্রাধিকার দেয়া যাবে না। যাঁরা সহীহ ও সঠিক হাদীসের অনুসারী তাঁরাও তো বড় আলিম, তাঁদেরকেও সহযোগিতা করা উচিত। যাঁরা হাদীসবিদদের জন্য মাপকাঠি নির্দিষ্ট করে, আর তাঁদের যেসব অভিমত উক্ত মাপকাঠির অনুযায়ী হয়, সেগুলো গ্রহণীয় আর যেগুলো মাপকাঠির বিপরীত সেগুলো বর্জনীয়। সবাইকে নির্বিধায় রাসূলের অনুসরণ করতে হবে, তাঁরাই রাসূলের সত্যিকার অনুসারী যাঁরা রাসূলের শিক্ষা ও উপদেশ অনুযায়ী আমল করে থাকেন। এ আলোচনা দ্বারা জানা গেল যে, আলিমদের অন্ধ অনুকরণ ও তাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান লাভ করার মধ্যে পার্থক্য কী।

তাকলীদ ও প্রজ্ঞার মধ্যে পার্থক্য: তাকলীদের অর্থ হলো কোনো প্রমাণ বা দলীল ছাড়া কারো অভিমত মেনে নেয়া। কিন্তু একজন মুহাক্কিক আলিম তাকলীদের এই সংজ্ঞাকে গ্রহণ না করে তাঁর সহজাত জ্ঞান ও ইলমের আলোকে সেটা বিশ্লেষণ করেন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শকে সামনে রেখে সে বিষয়ে জানার চেষ্টা করেন। তবে কোনো ধর্মীয় বিষয়ে দ্বিমত দেখা দিলে দলীলের দ্বারা প্রমাণিত অভিমতকেই অগ্রাধিকার দেয়া হয়ে থাকে। পরে উক্ত বিষয়ে অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে সেটা গ্রহণযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একজন লোক নক্ষত্রের সাহায্যে কিবলার দিক ঠিক করলো, পরে যদি তিনি কিবলার সঠিক দিক জানতে পারেন তখন তাঁকে আর নক্ষত্রের সাহায্যে কিবলার দিক ঠিক করতে হবে না। এ সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ী (র)-এর অভিমত হলো, কেউ যদি রাসূলুল্লাহ-এর কোনো সুন্নাত সম্পর্কে অবহিত হন, তাঁর জন্য কোনো অজুহাতেই ঐ সুন্নাত পরিত্যাগ করা ঠিক হবে না।

আল্লাহর বন্ধু ও শয়তানের বন্ধুর মধ্যে পার্থক্য: এ প্রসঙ্গে এখানে পবিত্র কুরআনের কিছু উদ্ধৃতি পেশ করা হলো। পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। "আলিফ লাম মীম। এ সেই কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই, পথপ্রদর্শনকারী পরহেযগারদের জন্য, যারা অদৃশ্য বিষয়ের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে এবং নামায প্রতিষ্ঠা করে। আর আমি তাঁদেরকে যে রুযী দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে এবং যারা বিশ্বাস স্থাপন করেছে সেসব বিষয়ের উপর যা কিছু আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং সেসব বিষয়ের উপর যা আপনার পূর্ববর্তীদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে আর আখিরাতকে যারা নিশ্চিত বলে বিশ্বাস করে। তারাই নিজেদের পালনকর্তার কাছ থেকে সুপথপ্রাপ্ত, আর তারাই যথার্থ সফলকাম।” (সূরা আল-বারাকাহ: আয়াত ১-৫)

"সৎকর্ম শুধু এটা নয় যে, পূর্ব কিম্বা পশ্চিম দিকে মুখ করবে, বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে, ঈমান আনবে আল্লাহর উপর, কিয়ামত দিবসের উপর, ফেরেশতাদের উপর এবং সমস্ত নবী রাসূলগণের উপর, আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম-মিসকীন, মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্য। আর যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দান করে এবং যারা কৃত প্রতিজ্ঞা সম্পাদনকারী এবং অভাবে, রোগে-শোকে ও যুদ্ধের সময় ধৈর্যধারণকারী, তারাই হলো সত্যাশ্রয়ী, আর তারাই পরহেযগার।” (সূরা আল-বারাকাহ: আয়াত-১৭৭)

"তারা আপনার কাছে জিজ্ঞেস করে, গণীমতের হুকুম। বলে দিন, গণীমতের মাল হলো আল্লাহর এবং রাসূলের। অতএব তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের অবস্থা সংশোধন করে নাও। আর আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের হুকুম মান্য করো যদি ঈমানদার হয়ে থাকো। যারা ঈমানদার, তারা এমন যে, যখন আল্লাহর নাম নেয়া হয় তখন ভীত হয়ে পড়ে তাদের অন্তর। আর যখন তাদের সামনে পাঠ করা হয় কালাম, তখন তাদের ঈমান বেড়ে যায় এবং তারা তাদের পরওয়ারদিগারের উপর ভরসা রাখে। সে সমস্ত লোক যারা নামায প্রতিষ্ঠা করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। তারাই হলো সত্যিকার ঈমানদার। তাদের জন্য রয়েছে স্বীয় পরওয়ারদিগারের নিকট মর্যাদা, ক্ষমা এবং সম্মানজনক রিযক।” (সূরা আনফাল : আয়াত-১-৪)

“মুমিনগণ সফলকাম হয়ে গেছে, যারা নিজেদের নামাযে বিনয়ী ও নম্র, যারা অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হয় না, যারা যাকাত দান করে থাকে এবং যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে সংযত রাখে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাভুক্ত দাসীদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্কৃত হবে না। অতঃপর কেউ এদেরকে ছাড়া অন্যকে কামনা করলে তারা সীমালঙ্ঘনকারী হবে এবং যারা আমানত ও অঙ্গীকার সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকে এবং যারা তাদের নামাযের খবর রাখে, তারাই উত্তরাধিকার লাভ করবে, তারাই শীতল ছায়াযুক্ত উদ্যানের উত্তরাধিকার লাভ করবে। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।” (সূরা মুমিনূন : আয়াত-১-১১)

“এবং যারা বলে, হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানদের পক্ষ থেকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা দান করো এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্য আদর্শ স্বরূপ করো। তাদেরকে তাদের সবরের প্রতিদানে জান্নাতে কক্ষ দেয়া হবে এবং তাদেরকে তথায় দুআ ও সালাম সহকারে অভ্যর্থনা করা হবে। তথায় তারা চিরকাল বসবাস করবে। অবস্থানস্থল ও বাসস্থান হিসেবে তা কতোই না উত্তম। বলুন, আমার পালনকর্তার কিছুই আসে যায় না, তোমরা যদি তাঁকে না ডাকো। তোমরা মিথ্যা বলেছো। অতএব সত্বর নেমে আসবে অনিবার্য শাস্তি।” (সূরা ফুরকান : আয়াত ৭৪-৭৭)

"নিশ্চয় মুসলমান পুরুষ, মুসলমান নারী, ঈমানদার পুরুষ, ঈমানদার নারী, অনুগত পুরুষ, অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ, সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ, ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ, বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ, দানশীল নারী, রোযা পালনকারী পুরুষ, রোযা পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারী পুরুষ, যৌনাঙ্গ হিফাযতকারিণী নারী, আল্লাহর অধিক যিকরকারী পুরুষ ও নারী তাদের জন্য আল্লাহ প্রস্তুত রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।" (সূরা আহযাব: আয়াত-৩৫)

"মনে রেখো, যারা আল্লাহর বন্ধু তাদের না কোনো ভয়-ভীতি আছে, না তারা চিন্তান্বিত হবে। যারা ঈমান এনেছে এবং তাকওয়া অবলম্বন করেছে।” (সূরা ইউনুস: আয়াত-৬২-৬৩)

"যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে আল্লাহকে ভয় করে ও তাঁর শাস্তি থেকে বেঁচে থাকে, তারাই কৃতকার্য।” (সূরা নূর: আয়াত-৫২)

"তবে তারা স্বতন্ত্র, যারা নামায আদায়কারী। যারা তাদের নামাযে সার্বক্ষণিক কায়িম থাকে এবং যাদের ধন-সম্পদে নির্ধারিত হক আছে যাঞ্ছাকারী ও বঞ্চিতদের এবং যারা কিয়ামতের দিনকে সত্য বলে বিশ্বাস করে।” (সূরা মা'আরিজ: আয়াত-২২-২৬)

"তারা তাওবাহকারী, ইবাদতকারী, আল্লাহর প্রশংসাকারী, সিয়াম পালনকারী, রুকু ও সিজদাহকারী, সৎকাজের আদেশ দানকারী ও মন্দ কাজ থেকে নিবৃতকারী এবং আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা হিফাযতকারী। এই ঈমানদারকে আপনি শুভ সংবাদ দিন।” (সূরা তাওবাহ: আয়াত-১১২)

আল্লাহর ওলীগণ হলেন তাঁদের রবের খাঁটি বান্দা। তাঁরা প্রত্যেক ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলকে বিচারক হিসেবে মান্য করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কোনো নির্দেশ বিদ্যমান থাকা অবস্থায় হাদীসের পরিপন্থী অন্য কারো নির্দেশ তাঁরা পালন করেন না। কোনো অবস্থায়ই তাঁরা কোনো বিদআতের দিকে কাউকে আহ্বানও করেন না। এছাড়া তাঁরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের এবং আল্লাহ প্রেমিকদের দল ছাড়া অন্য কোনো দলের সাথে সম্পর্ক রাখেন না। আর দ্বীন ইসলামকে তাঁরা খেল-তামাশার কোনো ব্যাপারে মনে করেন না। অশ্লীল গান-বাজনাকে তাঁরা ঘৃণা করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য তাঁরা অসৎ ও খারাপ লোকদের সঙ্গে মেলামেশা করেন না। পবিত্র কুরআনের ঊর্ধ্বে নিছক আমোদ-আহলাদকে তাঁরা কোনো স্থান দেন না। যারা শয়তানের বন্ধু তারা লোকদেরকে গানবাজনা আমোদ-আহলাদ ইত্যাদি বিষয়ের দিকে আহ্বান জানায়। ঐ লোকেরা খুব আনন্দের সাথে তাদের ডাকে সাড়া দেয়। অপরপক্ষে, আল্লাহ প্রেমিকগণ যা আল্লাহ পছন্দ করেন, সেদিকে লোকদেরকে আহ্বান জানান। যারা নেককাজে বিরোধিতা করে, তাদের মুকাবিলা করেন। যারা শয়তানের বন্ধু তারা শয়তানের ইচ্ছা মতো কাজ করে এবং লোকদেরকে সেদিকে আহ্বান করে। আর যিনি নেক বান্দা তিনি লোকদেরকে শয়তানের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেন। শয়তানের দলের লোকেরা তাঁদেরকে শত্রু মনে করে তাঁদেরকে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। বহু নিরীহ ও অজ্ঞ লোক শয়তানের এহেন চক্রান্তে পড়ে পথভ্রষ্ট হয়, যদিও তাদের উদ্দেশ্য মন্দ বা খারাপ নয়, এভাবেই শয়তান দ্বীন থেকে অজ্ঞ লোকদেরকে পথভ্রষ্ট করে ও তাদের উপর চেপে বসে। ঐসব পথভ্রষ্ট লোক মানুষকে আল্লাহর নাফরমানি কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দান করে। আর এরাই হলো শয়তানের বন্ধু। সাধারণত একজন মানুষ তিনটি অবস্থায় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সম্মুখীন হয়। এক. নামাযের সময়। দুই. যাঁরা সুন্নাতের পায়রবি করেন ও আহলে সুন্নাতের সাথে বন্ধুত্ব রাখেন। তিন. আল্লাহর প্রিয় বান্দা যখন লোকদেরকে তাওহীদের দাওয়াত দেন। এই তিনটি অবস্থায় মানুষ শয়তানের ওয়াসওয়াসার সম্মুখীন হয়ে থাকে।

ঈমানদারদের কারামত ও শয়তানের ভেলকীবাজীর মধ্যে পার্থক্য: একজন ঈমানদার ব্যক্তি রাসূলে পাকের অনুসরণের দ্বারা, খাঁটি নেক আমল এবং খাঁটি তাওহীদের মাধ্যমে কারামত বা অলৌকিক শক্তি লাভ করেন। কারামত লাভের উদ্দেশ্য হলো দুনিয়া ও আখিরাতের উপকার ও উন্নতি সাধন করা। সুন্নাতের উপর অটল থেকে, আল্লাহর আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে নেক আমলের মাধ্যমে এই আধ্যাত্মিক শক্তি অর্জিত হয়। অপরপক্ষে, শয়তানি ভেলকীবাজী শিরক ও পাপাচারের দ্বারা সৃষ্টি হয়। যারা শয়তানের বন্ধু তারা তাদের খারাপ আমলের মাধ্যমে শয়তানের সাথে এক ধরনের বিশেষ সম্পর্ক স্থাপন করে, যার ফলশ্রুতিতে অস্বাভাবিক ঘটনাবলি প্রকাশ পায়। এছাড়া মূর্তি পূজা, ক্রুশধারী, অগ্নিউপাসক এবং শয়তানের পূজারী ও অন্যান্য বাতিল ফিরকার অনুসারীদের মধ্য থেকে এরূপ শয়তানি কর্মকাণ্ড প্রকাশ পেয়ে থাকে। একজন শয়তানের পূজারী যখন উপাসনার মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করে, তখন শয়তান তাকে ইসতিদরাজ বা শয়তানি শক্তি দ্বারা পুরস্কৃত করে। শয়তান সে শক্তির দ্বারা স্বল্পজ্ঞান ও দুর্বল ঈমানের অধিকারীকে বিপথগামী করে ও তার ঈমান নষ্ট করে। অনেক নিরীহ ও সহজ-সরল মানুষ শয়তানের ধোঁকায় পড়ে যায়। কুরআন ও সুন্নাতের পরিপন্থী সকল কাজই শয়তানি কাজ বলে গণ্য হয়। এভাবেই অনেক জাদুকর, অগ্নিউপাসক, এমনকি মুসলমান নামধারী ব্যক্তিকে শয়তানের বন্ধু হতে দেখা যায়। একজন খাঁটি মুসলমান অজ্ঞতা ও মূর্খতার দরুন সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ পার্থক্য করতে না পেরে শয়তানের ধোঁকায় পড়ে নিজের ঈমান নষ্ট করেন। আসলে ভালো-মন্দের মধ্যে পার্থক্যকারী হলো পবিত্র কুরআন মজীদ, যেটা হলো সবচেয়ে শক্তিশালী মহা সম্মানিত রক্ষাকবচ। এই রক্ষাকবচ অর্থাৎ পবিত্র কুরআনই সকল ভালো-মন্দের মাপকাঠি। আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে একজন নেককার বান্দার হৃদয়ে নূর দান করা হয়। সে নূরই কোনটা সঠিক বা কোনটা বেঠিক সে ব্যাপারে সাহায্য করে। যে ব্যক্তি এই পবিত্র নূর থেকে বঞ্চিত, সে অতি সহজে শয়তানের ফাঁদে পড়ে যায়।

আল্লাহর হুকুম পালন ও ইজতিহাদের সিদ্ধান্তের মধ্যে পার্থক্য: আসমানী হুকুম-আহকাম আল্লাহর তরফ থেকে অবতীর্ণ ও নির্ধারিত। যেটা আল্লাহ তাঁর রাসূলকে বিস্তারিতভাবে জ্ঞাত করেছেন এবং মানুষকে সেটা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করার নির্দেশও দিয়েছেন। মহান মুজতাহিদগণ তাঁদের ইজতিহাদ ও গবেষণার মাধ্যমে শরিয়তের হুকুম-আহকামের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন— সেসব যদি কুরআন ও হাদীসের পরিপন্থী না হয় তবে তা ইজতিহাদ। ইজতিহাদকে যারা স্বীকার ও মান্য করে না, তাঁদেরকে ফাসিক ও কাফির বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। আর যেসব মাসয়ালা-মাসায়েল কুরআন ও হাদীস মুতাবিক, সেসব অবশ্যই মানতে হবে ও পালন করতে হবে। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইমাম হযরত আবূ হানিফা (র)-এর অভিমত হলো, "কুরআন ও হাদীসের আলোকে কোনো বিষয়ে তিনি যে অভিমত ও সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন, তার চেয়ে যদি উত্তম অভিমত কেউ পেশ করতে পারেন, তাহলে তিনি সেটা গ্রহণ করতে প্রস্তুত।" তাই তিনি বলেছেন, যদি কোনো ইমামের অভিমত হুবহু আল্লাহর হুকুম হতো, তাহলে ইমাম আবু ইউসূফ (র) ও ইমাম মুহাম্মদ (র) প্রমুখ কর্তৃক আমার কোনো কোনো মাসয়ালা-মাসায়েলের ব্যাপারে বিরোধিতা করার সাহস হতো না। একবার ইমাম মালিক (র)-কে খলীফা হারুনুর রশীদ পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে তিনি তাঁর রচিত 'মুয়াত্তা' গ্রন্থের মাসয়ালা-মাসায়েল অনুসরণ করার জন্য জনসাধারণকে নির্দেশ দান করবেন। কিন্তু ইমাম মালিক (র) এ বিষয়ে খলীফাকে বাধা দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, "ইতিমধ্যে সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়েছেন এবং প্রত্যেক গোত্রের নিকট বিভিন্নমুখী ইলম পৌঁছে গিয়েছে।" ইমাম শাফিয়ী (র) তাঁর শাগরিদদেরকে তাঁর তাকলীদ করতে নিষেধ করে গিয়েছেন এবং অসিয়ত করে গিয়েছেন, "আমার কোনো অভিমত হাদীসের পরিপন্থী হলে তা পরিত্যাগ করবে।" ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (র) তাঁর সকল অভিমত সম্পর্কে সুনিশ্চিত ছিলেন না। তিনি বলতেন যে, আমার বা অন্য কোনো মুজতাহিদদের তাকলীদ করবে না। বরং তাঁরা যেখান থেকে মাসয়ালা-মাসায়েল সংগ্রহ করেছেন, তোমরা সেখান থেকেই তা সংগ্রহ করবে। যদি সম্মানিত ইমামগণের বিশ্বাস এরূপ হতো যে তাঁদের অভিমত অবশ্যই অনুসরণীয়, তাহলে তাঁদের অনুসারীগণকে ঐ সবের বিরোধিতা করা অবৈধ বলে জানিয়ে দিতেন। আর তাঁদের অনুসারীরা কোনো মাসয়ালা-মাসায়েলের ব্যাপারে তাঁদের বিরোধিতা করা জায়েয মনে করতেন না। এছাড়া ইমামগণের অভিমত প্রত্যাহারের সুযোগও থাকতো। এজন্যই একই ইমামের কোনো একটি মাসয়ালায় একাধিক অভিমত দৃষ্ট হয়। এতে জানা গেলো যে, ইজতিহাদী মাসয়ালা-মাসায়েলের ব্যাপারে ভিন্ন ভিন্ন আমল করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু আসমানী গ্রন্থ আল কুরআনের নির্দেশের বিরোধিতা করা মুসলমানদের জন্য বৈধ নয় এবং এর কোনো সুযোগও নেই। পবিত্র কুরআনের কোনো আদেশ থেকে একচুল পরিমাণ সরে আসা যাবে না।

পরিশেষে নাফসে মুতমায়িন্নাহ, নাফসে আম্মারাহ এবং নাফসে লাউয়ামাহর কিছু বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো। এ তিনটি নাফসের বিভিন্ন রকমের অবস্থাও রয়েছে। একই নাফস কখনো মুতমায়িন্নাহর, কখনো আম্মারাহর আবার কখনো লাউয়ামাহর রূপ ধারণ করে। অধিকাংশ লোকের উপর নাফসে আম্মারাহই আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছে। নাফসে মুতমায়িন্নাহ ধারণকারী লোকের সংখ্যা খুবই কম। কিন্তু এর মর্যাদা আল্লাহ তাআলার নিকট সবচেয়ে বেশি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, "হে প্রশান্ত চিত্ত! সন্তুষ্ট হয়ে তোমার রবের দিকে ফিরে যাও। আল্লাহ তোমার প্রতি সন্তুষ্ট আর তুমি আমার বান্দাদের মধ্যেও আমার জান্নাতে দাখিল হয়ে যাও।” (সূরা আল-ফাজর: আয়াত ২৭-৩০) হে আল্লাহ! আমাদের সকল নাফসকে নাফসে মুতমায়িন্নাহ করে দাও, যাতে আমরা তোমার দ্বীনের উপর অটল থাকতে পারি, তোমাকেই ভয় করি আর তোমার প্রতি আগ্রহী, অনুগত ও অবিচল থাকি। আর আমাদেরকে নাফসের সকল অন্যায় ও মন্দ আমল থেকে রক্ষা করো। আমাদের হৃদয় থেকে অলসতা দূর করে দাও আমাদেরকে লোভ-লালসার অনুসারী বানাইও না এবং সীমালঙ্ঘনকারী করো না। কেয়ামতের দিন আমাদের নিঃস্ব ও দেউলিয়া করো না। আমাদের জন্য সত্যকে স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট করে দাও। আমরা যেন আত্মপ্রসাদে ও আত্মতৃপ্তিতে লিপ্ত হয়ে কেয়ামতের দিন শূন্য ও রিক্ত হয়ে না যাই। হে পরম করুণাময় আল্লাহ! তুমি আমাদের দুআ কবুল করো ও আমাদেরকে নাজাত দান করো। আমীন। হাসবুনাল্লাহ ওয়া নি'মাল ওয়াকীল নি'মাল মাওলা ওয়া নি'মান্নাসীর।

টিকাঃ
১. এছাড়া সাহাবায়ে কেরাম ও পূর্বেকার মুসলিম উম্মাহ সকলেই ব্যবস্থা, পেশা ও শ্রমের বিনিময়ে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করতেন। হযরত আলী (রা) বন-জঙ্গল থেকে ঘাস-লতাপাতা উটের পিঠে বহন করে এনে বিক্রয় করতেন। কোনো কোনো সময় খুরমা খেজুরের বিনিময়ে তিনি ইয়াহুদীদেরকে পানীয় সরবরাহ করতেন। হযরত উমর (রা) একজন সার্থক ও সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত মাইমূনাহ (রা) চামড়া রঙ করার ব্যবসা করতেন এবং আয়ের অধিকাংশ গরিব-দুঃখীদের মধ্যে দান করে দিতেন। হযরত সা'দ ইবনুল ওক্কাস ও হযরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা) তীর-ধনুক তৈরি করে বিক্রয় করতেন। হযরত আমর ইবনুল আস (রা) মাংস ব্যবসায়ী ছিলেন। হযরত আবু সুফিয়ান (রা) খাদ্য-দ্রব্যের ব্যবসা করতেন। হযরত উতবা ইবনু আবী ওক্কাস (রা) একজন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা) মদীনার বাজারে উট ক্রয় বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন। তাঁরা কেউই কর্মবিমুখ ছিলেন না এবং শ্রমের মর্যাদাকে হেয় চোখে দেখতেন না। -অনুবাদক

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00