📘 রূহের রহস্য > 📄 পবিত্র কুরআনে কবরের আযাব সম্পর্কে কোন উল্লেখ আছে কিনা

📄 পবিত্র কুরআনে কবরের আযাব সম্পর্কে কোন উল্লেখ আছে কিনা


পবিত্র কুরআনে কবরের আযাবের কোন উল্লেখ নেই কেন? অথচ এ সম্পর্কে জানা ও ঈমান আনা খুবই প্রয়োজন, যেন মানুষের মনে ভয়-ভীতি জাগে ও তারা পরহেযগারীর পথে চলে। এর উত্তর সংক্ষেপে ও সবিস্তারে দু'ভাবে দেওয়া যেতে পারে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো—আল্লাহ তা'আলা তাঁর রাসূলের নিকট দু'ধরনের ওহী পাঠিয়েছেন এবং উভয় প্রকারের ওহীর উপর ঈমান আনা ও আমল করা মানুষের জন্য অপরিহার্য।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেছেন, "আল্লাহ তা'আলা আপনার উপর কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন এবং আপনাকে এমন বিষয় শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনি জানতেন না। আপনার প্রতি আল্লাহর করুণা অপরিসীম।" (সূরা আন নিসা : আয়াত-১১৩)

"আল্লাহ ঈমানদারদের উপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে একজন নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতসমূহ পাঠ করেন। তাদেরকে পরিশুদ্ধ করেন এবং তাদেরকে কিতাব ও কাজের কথা শিক্ষা দেন। বস্তুত তারা ছিল পূর্ব থেকেই পথভ্রষ্ট।” (সূরা আলে ইমরান: আয়াত-১৬৪)

"তিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, তাদেরকে পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত। ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায় লিপ্ত।” (সূরা জুমুআ: আয়াত-২)

"আল্লাহর আয়াত ও জ্ঞানগর্ভ কথা, যা তোমাদের গৃহে পাঠ করা হয় তোমরা সেগুলো স্মরণ করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্ববিষয়ে খবর রাখেন।” (সূরা আল আহযাব: আয়াত-৩৪)

আগেকার অভিজ্ঞ আলিমগণের ঐকমত্য হলো, কিতাব অর্থ কুরআন এবং হিকমত অর্থ সুন্নাহ। আল্লাহর রাসূল আল্লাহর পক্ষ থেকে যে বিষয়গুলো সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, সেগুলোর উপর ঈমান আনা বা সেগুলোকে বিশ্বাস করা সেরূপ ওয়াজিব, যেরূপ ওয়াজিব আল্লাহর ঐসব বাণীর উপর ঈমান আনা, যা তিনি তাঁর রাসূলের ভাষায় আমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন। এটা মুসলমানদের একটি সর্ববাদী সম্মত মূলনীতি। এটাকে একমাত্র ঐ ব্যক্তি অস্বীকার করতে পারে যে সত্যিকারের মুসলমান নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমাকে কিতাবের সাথে সাথে তারই সদৃশ আর একটি জিনিস অর্থাৎ সুন্নাহও দেওয়া হয়েছে। কাজেই কোন মাসয়ালা যদি কুরআনে না থাকে আর হাদীসে থাকে, তাহলে মনে করতে হবে যেন এটি কুরআনেই আছে। কেননা হাদীস মূলত কুরআনেরই মতো।

প্রকৃতপক্ষে, পবিত্র কুরআনের মধ্যেও একাধিক স্থানে বিস্তারিতভাবে বরযখের আযাব ও আরামের উল্লেখ আছে। যেমন “ঐ ব্যক্তির চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর প্রতি মিথ্যা আরোপ করে অথবা বলে, আমার প্রতি ওহী অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ তার প্রতি কোন ওহী আসেনি এবং যে দাবী করে যে, আমিও নাযিল করে দেখাচ্ছি, যেমন আল্লাহ নাযিল করেছেন। যদি আপনি দেখেন যখন যালিমরা মৃত্যু-যন্ত্রণায় থাকে এবং ফেরেশতারা স্বীয় হস্ত প্রসারিত করে বলে, বের করো স্বীয় আত্মা! অদ্য তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে। কারণ, তোমরা আল্লাহ সম্বন্ধে অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতসমূহ থেকে অহঙ্কার করতে।” (সূরা আল-আন'আম: আয়াত-৯৩)

ফেরেশতারা একথাগুলো মৃত্যুপথযাত্রীকে ঠিক মৃত্যুর সময় বলেন। আর ফেরেশতারা সতত সত্যবাদী। যদি মানুষের এই শাস্তি ইহকালে মৃত্যুবরণের সাথে সাথেই শেষ হয়ে যায়, তাহলে তো 'আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি প্রদান করা হবে' একথা সত্যে পরিণত হয় না।

আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে আরও ইরশাদ করেছেন, "অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের চক্রান্তের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করলেন এবং ফিরআউন গোত্রকে শোচনীয় আযাব গ্রাস করল। সকাল ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সামনে পেশ করা হয় এবং যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে, সেদিন আদেশ করা হবে, ফিরআউন গোত্রকে কঠিনতর আযাবে দাখিল করো।" (সূরা আল মু'মিন: আয়াত ৪৫-৪৬)

উপরোক্ত আয়াতসমূহে স্পষ্ট ভাষায় বরযখ ও আখিরাতের আযাবের কথা উল্লেখ আছে। পবিত্র কুরআনে আরো ইরশাদ হয়েছে: "তাদেরকে সেদিন পর্যন্ত ছেড়ে দিন, যেদিন তাদের উপর বজ্রাঘাত পড়বে। সেদিন তাদের চক্রান্ত তাদের কোন উপকারে আসবে না এবং তারা কোন সাহায্যও পাবে না। গুনাহগারদের জন্য এছাড়াও আরো শাস্তি রয়েছে, কিন্তু তাদের অধিকাংশ তা জানে না।” (সূরা আততুর: আয়াত ৪৫-৪৭)

এখানে শাস্তির অর্থ হবে পার্থিব অথবা বরযখের শাস্তি। দ্বিতীয় অর্থই এখানে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা অনেক যালিম মৃত্যুবরণ করেছে কিন্তু দুনিয়ায় এদের কোন প্রকার শাস্তি দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ বলেছেন, যে মরে গেছে তাকে বরযখের শাস্তি দেওয়া হবে আর যে জীবিত আছে তার জন্য হত্যা ইত্যাদি ধরনের শাস্তি রয়েছে। সুতরাং এটা হলো তাদের জন্য পার্থিব ও বরযখী আযাবের সতর্কবাণী।

পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে: “গুরুতর শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাবো, যাতে তারা প্রত্যাবর্তন করে।” (সূরা সিজদাহ: আয়াত-২১)

এই আয়াতের দ্বারা কবরে যে আযাব হয় সেটার প্রমাণ রয়েছে। যেসব বুযুর্গ ব্যক্তি এই অভিমত পোষণ ও সমর্থন করেন, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন হযরত ইবনে আব্বাস (রা)। কিন্তু এটা হচ্ছে গ্রন্থকারের মতে পার্থিব আযাব যা তাদেরকে কুফুরী থেকে ফিরে আসার ও সতর্ক করার জন্য দেওয়া হয়। তবে মুসলিম বিশ্বের বিশিষ্ট জ্ঞানী ও তাফসীর বিশেষজ্ঞ হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা)-এর সূক্ষ্ম জ্ঞানে এই বিষয়টা ধরা না পড়ার কথা নয়, যেহেতু কুরআন বুঝার ব্যাপারে তিনি এক বিশেষ ধরনের জ্ঞান ও দক্ষতার অধিকারী ছিলেন। সেই বিশেষ জ্ঞান ও পারদর্শিতার সাহায্যে তিনি উক্ত আয়াত দ্বারা কবরে যে আযাব হয় তা বুঝতে পেরেছিলেন এবং সেটা প্রমাণ করেছেন। আল্লাহ তা'আলা এই আয়াতের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন যে, কবরবাসীদের উপর দু'ধরনের আযাব হয়ে থাকে একটি কঠিন শাস্তি অপরটি লঘু শাস্তি। তিনি আরো বলেছেন, কোন কোন মানুষকে পার্থিব জীবনে ছোট শাস্তি দেওয়া হয়, যাতে তারা সত্যের দিকে ফিরে আসে। অতএব জানা গেল যে, লঘু শাস্তি পুরোপুরি দেওয়া হয় না, কিছু অংশ বাকি থেকে যায়, যা পার্থিব জীবনের পরে দেওয়া হয়। এ জন্যই "মিনাল আযাবিল আদনা" শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এখানে 'মিন' শব্দটি আংশিক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। 'আযাবুল আদনা'কে মিন ব্যতীত সরাসরি কর্মকারক হিসাবে প্রয়োগ করা হয়নি। যেমন, হাদীস শরীফে উল্লেখ আছে— “অতঃপর তার জন্য অর্থাৎ কবরবাসীর জন্য জাহান্নামের একটি ছিদ্র খুলে দেওয়া হয় যার মধ্য দিয়ে জাহান্নামের কিছু উত্তাপ ও আযাব আসতে থাকে,” সেহেতু আযাবের অধিক অংশ আখিরাতের জন্য থেকে যায়। তদ্রূপ কাফিরেরা বরযখী জীবনেও কিছু আযাব ভোগ করে থাকে, আর তাদের প্রাপ্য আযাবের বেশির ভাগ আখিরাতের জন্য অবশিষ্ট থাকে।

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেন, "অতঃপর যখন কারো প্রাণ কণ্ঠাগত হয় এবং তোমরা তার দিকে তাকিয়ে থাকো, তখন আমি তোমাদের থেকে তার অধিক নিকটে থাকি, কিন্তু তোমরা তা দেখতে পাওনা। যদি তোমাদের হিসাব-কিতাব না নেওয়াই ঠিক হয়, তাহলে তোমরা এ আত্মাকে ফিরিয়ে নাও না কেন? যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকো? সে যদি নৈকট্যপ্রাপ্তদের একজন হয়, তাহলে তার জন্য রয়েছে সুখ, উত্তম রিযক এবং নিআমতে পরিপূর্ণ উদ্যান। আর যদি সে ডান পার্শ্বস্থদের একজন হয়, তবে তাকে বলা হবে, তোমার জন্য ডানপার্শ্বস্থদের পক্ষ থেকে সালাম। আর যদি সে পথভ্রষ্ট মিথ্যারোপকারীদের একজন হয়, তবে তার আপ্যায়ন হবে উত্তপ্ত পানি দ্বারা এবং সে নিক্ষিপ্ত হবে অগ্নিতে। এটা ধ্রুব সত্য। অতএব আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের পবিত্রতা ঘোষণা করুন।” (সূরা ওয়াকিয়াহ: আয়াত ৮৩-৯৬)

উপরোক্ত আয়াতে মৃত্যুর সময় রূহের অবস্থা কী হবে সেটা বর্ণিত হয়েছে। আর মৃত্যু পরবর্তী জীবনের অবস্থানও উল্লেখ করা হয়েছে। মৃত্যুর সময়, মৃত্যুর পরে ও হাশরের দিনের অবস্থা পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন: “হে প্রশান্ত চিত্ত! তুমি তোমার রবের নিকট ফিরে এসো সন্তুষ্ট ও সন্তোষভাজন হয়ে, আর আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।” (সূরা আল ফজর: আয়াত ২৭-৩০)

রূহকে এরূপভাবে কখন সম্বোধন করা হয়, এ বিষয়ে মতবিরোধ আছে। একদলের মতে মৃত্যুকালীন সময়েই একথা বলা হয়। প্রকাশ্যভাবে আয়াতে শব্দাবলীর দ্বারা এ অর্থই বুঝা যায়। এরূপ সম্বোধন ঐ নেক রূহকে করা হয় যে রূহ দেহ থেকে বের হয়ে এসেছে। হযরত বারা (রা) কর্তৃক বর্ণিত: নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ রয়েছে যে, রূহকে বলা হয়, তুমি সন্তুষ্টচিত্তে বের হও। তোমার রবও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট আছেন। "রূহ বরযখে অবস্থান করে” নামক অধ্যায়ে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করা হবে, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তা'আলা উপরোক্ত আয়াতে আরো বলেন, "আমার বান্দাদের মধ্যে শামিল হয়ে যাও।” নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর অন্তিম অবস্থায় বলেছিলেন, “হে আল্লাহ! আমাকে সবচেয়ে উঁচু সাথীদের সাথে শামিল করো।" এছাড়াও আযাব বা আরাম সম্পর্কিত হাদীসগুলো নিয়ে পর্যালোচনা করলে উপরোক্ত আয়াতের বিশদ ব্যাখ্যা জানা যায়। পবিত্র হাদীস অধ্যয়ন করে তার মর্মবাণী উপলব্ধি করার তাওফীক আল্লাহ আমাদেরকে দান করুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00