📄 ত্রিবিংশ পদক্ষেপ : অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ সম্পাদন
“প্রবৃত্তির অনুসরণের নিদর্শন হচ্ছে ওয়াজিব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলস্য করে নফলের দিকে দ্রুতধাবন করা।"
নবী বলেছেন, “আল্লাহ যার কল্যাণ চান তাকে দীনের ফিকহ দান করেন।" (বুখারী)
এখানে 'ফিকহ' অর্থ দীনের বুঝ বা সমঝ, যাকে ফাহমও বলা হয়ে থাকে। তবে এখানে বুঝ বা ফিকহ-এর দ্বারা প্রচলিত অর্থে কেবল শাখাগত কিছু মাসআলা- মাসায়েল জানাই উদ্দিষ্ট নয়; বরং এর মূল মর্ম, তত্ত্ব সম্পর্কেও জানা, গভীরভাবে দীনের হাকীকত উপলব্ধি করতে পারাও উদ্দিষ্ট। এই হাকীকত উপলব্ধির একটি অংশ দীনের বিভিন্ন বিধানের পারস্পরিক সম্পর্ক এবং এদের ক্রমধারা সম্পর্কে জানা। কোনটি আগে কোনটি পরে, কোন বিধানটি বিলম্বে পালন করা যেতে পারে, কোনটির মাঝে কোনো প্রকারেই বিলম্বের সুযোগ নেই ইত্যাদি সম্পর্কে জানা।
আমাদের দীন সর্বক্ষেত্রেই ক্রমধারার প্রতি লক্ষ রাখে এবং প্রত্যাশা করে যে এর অনুসারীরাও এ ব্যাপারে সজাগ থাকবে। আগে মূল তারপর শাখা, আগে উসূল তারপর ফুরু, বাহ্যিকতার আগে অভ্যন্তর, বহিঃস্থের পূর্বে অন্তঃস্থ, নফলের আগে ওয়াজিব, সুন্নাতের আগে ফরয, সবার আগে ঈমান-এর সবগুলোই ক্রমধারা। ক্রমধারার ভিত্তিতে আমলসমূহকে প্রাধান্য ও অগ্রাধিকার দেওয়া দীনের সঠিক ও যুৎসই বুঝের জন্য একান্তই জরুরী বিবেচ্য।
নফলের ফযীলত যতই বর্ণিত থাক তা কখনোই একটি ফরযের সমানও নয়। যেমন-কেউ তাহিয়্যাতুল মসজিদের ফযীলতের কথা জানতে পারলো। ফরযের সময় ইমাম সাহেব মুক্তাদীদেরকে নিয়ে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলো, আর এই সাহেব তাহিয়্যাতুল মসজিদের ফযীলত লাভের আশায় তাহিয়্যাতুল মসজিদ পড়ে ফরয পড়তে গেলো। নিঃসন্দেহে এমনটা করা জায়েজ নয়। কেননা, সাধারণাবস্থায় ফরয সালাতের ইকামত হয়ে গেলে আর ওই নির্দিষ্ট ফরয ছাড়া কোনো প্রকার সালাত পড়া জায়েজ নয়।
প্রত্যেক শাখা মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করে মূল শাখার দিকে নয়। যেমন-শাখাগত মাসআলার সাথে সম্পৃক্ত দলীল বা নস অবশ্যই সংশ্লিষ্ট মূলনীতি ও ইসলানে সামগ্রিক মাকসাদ বা উদ্দেশ্যের আলোকেই বুঝতে হবে। শাখাকে মূল থেকে পৃথক করে কিংবা শাখাকে মূল ধরে, ফুরু-কে উসূল ধরে দীন বুঝতে গেলে মূলের সাথে সাংঘর্ষিক হয়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। যার ফলে দীনের সঠিক বুঝ যেমন সম্ভব নয় তেমনি মানুষের কাছে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের সম্ভাবনা তৈরী হয়। তাই ইসলামের প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রাধান্যতা হবে ক্রমধারা অনুযায়ী, (তথা প্রথমে মূলনীতি বুঝতে হবে এরপর শাখাগত বিষয়গুলো একেরপর এক আসবে।) এটাই দীনে ফিতরাতের মৌলিকতা ও এর সাধারণ দাবী।
কিন্তু আমরা উম্মাহকে অনেকক্ষেত্রেই এই ক্রমধারার দিকে লক্ষ রাখতে দেখি না। তারা অন্তরের পরিবর্তন ও অন্তরে ঈমানের যথাযথ বিকাশের আগে পাঞ্জাবী-টুপির দিকে অধিক মনোযোগ দেখায়; বাহ্যিক পোষাক-পরিচ্ছদও গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেটা অবশ্যই অন্তরের ঈমান পরিস্ফুটনের আগে স্থান পাবে না। অনেককে দেখা যায় দীনের মাকসাদ বা উদ্দেশ্যের চাইতে বাহ্যিকতার দিকেই অধিক নিবিষ্ট। অনেকে ফরয পালন না করেই নফল পালন করতে ব্যস্ত হয়ে যায়। অনেকে সুস্পষ্ট হারামে লিপ্ত, রাতদিন আমানতের খেয়ানত করে, দিবানিশি মা-বাবার সাথে খারাপ আচরণ করে, তাদের সাথে সম্পর্ক ভালো নয়, বোনদের সম্পত্তি নষ্ট করে, অধিকারীকে যথাযথ অধিকার দেয় না কিন্তু তারা মসজিদের কমিটির সভাপতি, ওয়াজ-মাহফিলে আয়োজনে তাদের অত্যধিক আগ্রহ। এগুলো ভালো কাজ নিঃসন্দেহে, কিন্তু হারাম ত্যাগ না করে বা সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে এসব নফল কাজ করে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া সম্ভব নয়। আবার কেউ কেউ পাঁচ ওয়াক্ত সালাত জীবনেও পড়ে না, কিন্তু শবে বরাত, শবে কদর আর ঈদের সালাতের দিন তারা খুব আগ্রহভরে সালাত পড়ে, রাত জাগরণ করে। এগুলো নফল সালাত, ফযীলতও আছে, কিন্তু তা নিঃসন্দেহে ফরয সালাতের মত নয়।
ক্রমধারার দিকে মনোযোগী না হওয়া সকল মুসলিমের জন্যই কমবেশি ক্ষতিকর, কিন্তু আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য এটা আরও বেশি ক্ষতিকর। ইবনু আতা এ কারণেই বলেছেন, “প্রবৃত্তির অনুসরণের নিদর্শন হচ্ছে ওয়াজিব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আলস্য করে নফলের দিকে দ্রুতধাবন করা।" কারণ, যে শরীয়তের অনুসারী তার জানার কথা ফরয/ওয়াজিব আমলই আল্লাহর কাছে সর্বাগ্রাধিকার পাবে। আল্লাহ এগুলোর হিসাবই আগে নেবেন। এগুলোই আসল, বাকীগুলো অতিরিক্ত। তারপরেও যে এমনটা না করে ক্রমধারাকে উল্টে দিয়ে ফরয/ওয়াজিবের আগেই নফল বা অতিরিক্ত নিয়ে মাতামাতি করে, সে নিঃসন্দেহে পবিত্র শরীয়তের নয় বরং নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করছে। একটি বিখ্যাত হাদীছে কুদসীতে এসেছে,
"বান্দা আমার নির্ধারিত ফরয বা আবশ্যক দায়িত্ব পালন করার মত আর কোনোভাবেই আমার নিকটবর্তী হতে পারে না। এরপর বান্দা নফল আমলের মাধ্যমে আমার নিকটবর্তী হতেই থাকে, এমনকি আমি তাঁকে ভালোবেসে ফেলি। এক সময় আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, হাত হয়ে যাই যে হাত দিয়ে সে ধরে, তার পা হয়ে যাই যা দিয়ে সে চলাফেরা করে। সে আমার কাছে চাইলে আমি তাকে তা দেই। সে আশ্রয় চাইলে তাকে আশ্রয় দেই।"১
টিকাঃ
১. (বুখারী)
📄 চতুর্বিংশ পদক্ষেপ : সন্তুষ্টি
আল্লাহর ওপর তোমার নিআমতের পরিপূর্ণতা হচ্ছে তিনি তোমাকে যথেষ্ট পরিমাণ রিযক দান করবেন এবং তোমাকে (সম্ভাব্য) সীমালঙ্ঘন থেকে বাঁচাবেন। আনন্দের জিনিস যত কম পাওয়া যায় তার বিপরীতে দুঃখও তত কম পাওয়া যায়।
জীবনধারণের জন্য রিযক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রিযক দেওয়া ও সংকোচনের ক্ষেত্রে আল্লাহর সুন্নাত ভালোভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারা আরও জরুরী, বিশেষত আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য। আল্লাহ যখন বান্দাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে - না বেশি আর না কম- রিযক দেন সেটা আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ নিআমতের একটি। কেননা, মানবেতিহাস থেকে প্রমাণিত মানুষের অধিকাংশ সীমালঙ্ঘন অর্থ ও রিযকের প্রাচুর্য থেকেই উৎসরিত হয়েছে। মানুষের স্বভাবই এমন যে, সে যখন অতিরিক্ত সম্পদ পায় আকাশকুসুম চিন্তায় বিভোর থাকে, অর্থ ব্যয়ের নতুন নতুন কৌশল তার মাথায় গিজগিজ করতে থাকে, দুই থেকে চার ও চার থেকে আট করে অর্থবৃদ্ধির চিন্তা তাকে ব্যতিব্যস্ত রাখে, মানসিক পীড়া দিতে থাকে। এই অর্থপ্রাচুর্যই তার দ্বারা অনেক সীমালঙ্ঘন ও গুনাহ ঘটায়।
অন্যদিকে প্রয়োজনের চাইতে কম জীবিকা, যার কারণে টানাপোড়েন ও দারিদ্র্য লেগেই থাকে, এই অবস্থাও ভালো নয়। হতদরিদ্ররা উদরের চিন্তা করতে করতেই দিনাতিপাত করে, অন্য কিছু ভাবার সময় পায় না। দীন-ধর্ম, সত্য-অসত্য এগুলো সম্পর্কে তারা থাকে বেখবর, তাদের কাছে এসব কোনো মূল্যই রাখে না।
এ দুই অবস্থার মধ্যবর্তীতে যথেষ্ট পরিমাণ রিযক পাওয়া আল্লাহর অনেক বড় এক নিআমত। ইবনু আতা বলছেন, "আল্লাহর ওপর তোমার নিআমতের পরিপূর্ণতা হচ্ছে তিনি তোমাকে যথেষ্ট পরিমাণ রিযক দান করবেন এবং তোমাকে (সম্ভাব্য) সীমালঙ্ঘন থেকে বাঁচাবেন।"
রিযকের আগমণে মানুষ আনন্দিত হয়, খুশি হয়, উৎফুল্লতায় মেতে ওঠে। সম্পদ বিয়োগে শোকে মূহ্যমান, শোকে বিহ্বল ও বেদনায় লীন হয়। সাধারণভাবে এমনটাই মানুষের স্বভাব। সম্পদের প্রতি মানুষের টান-আকর্ষণ-সংযুক্তি এত সহজে ত্যাগ করাটা সহজ কথা নয়। এরূপ আনন্দের বস্তু মানুষের যত কম থাকবে ততই মঙ্গল। অধিক পরিমাণ অর্থকড়ি তাকে ইহজগতে আনন্দের ভেলায় ঠিকই ভাসাবে, কিন্তু প্রবল সম্ভাবনা আছে এই সম্পদই তাকে আখিরাতে দুঃখের কন্টকশয্যায় নিয়ে ফেলবে, সম্পদজাত সীমালঙ্ঘন ও পাপাচারের কারণে। এমতাবস্থায় অর্থসম্পদ যত কম হবে ততই তা সম্ভাব্য দুঃখের পরিমাণও হ্রাস করবে। আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য সর্বাবস্থায় সন্তুষ্টি বা রিদা অবলম্বন করা কর্তব্য। কারণ, দুনিয়া নিতান্তই ক্ষণস্থায়ী ও আখিরাত চিরস্থায়ী।
টিকাঃ
১. (সূরা শুরা, ৪২:২৭)
📄 পঞ্চবিংশ পদক্ষেপ : বিনয়
“যে নিজের প্রদর্শনকৃত বিনয় থেকে নিজেকে উঁচু ভাবে সে বিনয়ী নয়, বরং বিনয়ী সে-ই যে নিজেকে নিজের প্রদর্শনকৃত বিনয় থেকে নিচু ভাবে।”
বিনয় আল্লাহর প্রকৃত বান্দাদের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য। মানুষ হিসেবে আমরা সবাই বান্দা, দাস। আমরা কেউই মালিক নই, অধিপতিও নই। তাই আমাদের গর্ব করার মত আসলে কিছুই নেই। আমরা সবাই আল্লাহর দয়ার ভিখারী, তাঁর করুণার কাঙ্গাল। বিনয়ের বিপরীত হলো অহংকার। অহংকার মানবস্বভাবের বিপরীত। মন্দ নফসের বৈশিষ্ট্য। মানুষ যখন নিজেকে ভুলে যায়, নিজের সম্পর্কে ভুলধারণা পোষণ করে, তখনই সে নিজেকে বিরাট কিছু ভাবতে শুরু করে। আল্লাহর কাছে এই মানসিকতা অত্যন্ত অপছন্দের ও ঘৃণ্য। নবী ﷺ বলেছেন, “যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকারও থাকবে সে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।” কেউ একজন বললো, একজন ব্যক্তি সুন্দর কাপড় ও জুতা পছন্দ করে (এটাও কি অহংকার বলে গণ্য হবে?) তিনি বললেন, “আল্লাহ সুন্দর, তিনি সৌন্দর্যকে পছন্দ করেন। অহংকার হচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করা ও মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা।”
মনোরম কাপড়-চোপড় পরা কখনো কখনো অহংকারবশতও হতে পারে। তবে সবাই সুন্দর কাপড়-চোপড় পরাকে অহংকার ভাবে না, সবাই দম্ভ করেও তা পরে না। যদি নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য কেউ সুন্দর কাপড় পরে তবে তা অহংকার বলে গণ্য হবে না। বরং অহংকার হচ্ছে সত্যকে অস্বীকার করা, সত্যকে ভুলে যাওয়া, জেনে বুঝে সত্যকে উপেক্ষা করে যাওয়া। অহংকার হচ্ছে মানুষকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা, নিজের সাথে তুলনা করে অন্যকে অগ্রাহ্য করা, অপমান করা, নিজেকে উঁচু আর অন্যকে নিচু বলে জানা।
আসলে অহংকারের নানা স্তর ও রকমফের আছে। একেকজনের জন্য অহংকার একেকরকম। আলিম, তালিবে ইলম-শিক্ষার্থী, মূর্খ-জাহিল, সাধারণ মানুষ, ধনী এদের প্রত্যেকেরই অহংকার থাকতে পারে; তবে এর প্রকার ভিন্ন। আল্লাহর পথের পথিকদেরও অহংকার হতে পারে। সে ভাবতে পারে আমি অনেকের চাইতে উত্তম, আমি তো হেদায়াতপ্রাপ্ত, আমি তো প্রায় মুক্তিপ্রাপ্ত, আমি তো অমুক, আমি তো তমুক ইত্যাদি ইত্যাদি। আল্লাহর পথের পথিকদের অহংকার অত্যন্ত সূক্ষ্ম। এ কারণে কোনো কোনো সাধক বলেছেন মানুষের অন্তর থেকে সর্বশেষ যেই মন্দ স্বভাব দূর হয় তা হলো অহংকার। পথিক যখন নিজেকে সত্যের পথে, আল্লাহর সামনে-নিজেকে, নিজের ব্যক্তিত্বকে পরিপূর্ণ বিলীন করে দিতে পারে তখনই সকলপ্রকার অহংকার দূরীভূত হয়। এ কারণেই নবীজী অতি সূক্ষ্ম পরিমাণ অহংকারকেও জান্নাতে যাওয়ার প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অনেক সময় আমরা বিনয় দেখাই, মুখেও প্রকাশ করি, কিন্তু তা আসলে আন্তরিক হয় না। সেই বিনয়ভাব অন্তর থেকে উঠে আসে না। মুখে বিনয়সুলভ কথা উচ্চারণ করি, কিন্তু আমাদের অন্তর সেই কথার সাথে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যশীল হয় না, অন্তর আর মুখের কথা পুরোপুরি এক হয় না। বিনয় প্রকাশের সময়কার অন্তরের অবস্থা বিষয়েই ইবনু আতা বলছেন, “যে নিজের প্রদর্শনকৃত বিনয় থেকে নিজেকে উঁচু ভাবে সে বিনয়ী নয়, বরং বিনয়ী সে-ই যে নিজেকে নিজের প্রদর্শনকৃত বিনয় থেকে নিচু ভাবে।” যে বিনয় প্রকাশ করে কিন্তু যার সাথে বিনয় দেখানো হচ্ছে তার থেকে নিজেকে সত্যিকারার্থেই ক্ষুদ্র ও নিচু ভাবতে পারে না, সে আসলে আন্তরিকভাবে বিনয়ী হতে পারেনি, তার অন্তর প্রকৃতার্থে এখনও বিনয়ী হতে পারেনি। কারণ, হয়ত অন্তর থেকে সূক্ষ্ম অহংকার পরিপূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়নি। এ কারণে মুখে বিনয় প্রকাশের চাইতে অধিক প্রয়োজন অন্তরকে বিনীত করা, বিনয়ের ভাব দেখানোর চাইতে বেশি গুরুত্বপূর্ণ অন্তরাত্মাকে বিনয়ী করার পেছনে সময় ও পরিশ্রম বিনিয়োগ করা।
টিকাঃ
১. মুসলিম ১৪৭-(৯১)
📄 ষষ্ঠবিংশ পদক্ষেপ : আশির্বাদপুষ্ট জীবন
“কত দীর্ঘ জীবনের রসদ অতি সামান্য! কোনো কোনো স্বল্পায়ুর পাথেয় কতই-না সমৃদ্ধ! জীবনে বারাকাহ পেলে সে শীঘ্রই আল্লাহর এমন অনুগ্রহে ভূষিত হয় যা না ভাষায় বর্ণনা করা যায় আর না ইশারায় প্রকাশ করা যায়!”
আল্লাহ আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, এই জীবন দিয়েছেন, নানা নিআমতে ধন্য করেছেন। মানুষ আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষকে সৃষ্টি ও তাদেরকে পৃথিবীতে আবাদ করার পেছনে এক মহা সৃষ্টিপরিকল্পনা রয়েছে। আল্লাহ চান মানুষ আল্লাহকে চিনে নিক, তাঁকে জানুক, তাঁর নিদর্শন-বড়ত্ব-মহত্ত্ব দেখে তাঁর প্রশংসা করুক। আল্লাহ চান মানুষ তাঁর প্রতি স্বেচ্ছায় ঈমান আনুক, তার ধ্যানে-জ্ঞানে-উপাসনায় কেবলমাত্র তাঁকেই স্থান করে নিক। আল্লাহ চান মানুষ তাঁর এই সৃষ্ট পৃথিবী আবাদ করুক, ঈমান ও সৎকর্ম দিয়ে এই পৃথিবীকে বিনির্মাণ করুক, পৃথিবীকে সুন্দরভাবে গড়ে তুলুক, সবাইকে সত্য ও সুন্দরের দিকে আহ্বান করুক।
কিন্তু অনেক সময় মানুষ জীবনের উদ্দেশ্য, মর্ম থেকে বিস্মৃত থাকে। ভুলে যায় জীবনের অর্থ। কোথায় সাফল্য আর কোথায় ব্যর্থতা সে সম্পর্কে জ্ঞান রহিত হয়ে পড়ে। ক্ষুধা-মদ-মাৎসর্যই তার জীবনের কিবলায় পরিণত হয়। আত্মোপলব্ধি, আত্মজ্ঞান, ১ নীতি-নৈতিকতা, আত্মিক-আধ্যাত্মিক বিকাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সে কয়েক ফুট উচ্চতার এক মাংসপিণ্ডে পরিণত হয়। দৈনন্দিন জীবনের সংগ্রাম তাকে উদাসীন করে দেয় উচ্চতর সত্য থেকে, ভৌতিক চাহিদার নিম্নগামী চাপ তাকে নিজের মানবীয় সত্তার অনুভূতি থেকে কর্তিত করে এক না-মানুষে পরিণত করে।
তার জীবনে নেই কোনো উদ্দেশ্য, উদ্দেশ্যের সাথে জীবনের নেই কোনো সামঞ্জস্য, উর্ধ্বতন কোনো তাড়না তাকে সামনে আগাতে প্ররোচিত করে না, মহৎ কোনো পরিকল্পনা তাকে ব্যস্ত রাখে না, সত্যের সেবা তার ব্রত হয় না, মানবতা তার দ্বারা কোনো উপকার পায় না। বয়স বৃদ্ধি পায় আর জীবনের ব্যর্থতার ঝুলিও ভারী হয়।
চুলে পাক ধরার সাথে সাথে জীবনরূপী অভিশাপ বিভীষিকার মত ধেয়ে আসে। মৃত্যু এসে গ্রাস করার পূর্ব পর্যন্ত তাকে সংশয়-দ্বিধা-দুঃখ-জরা-জীর্ণময় এই জীবনের ভার বহন করে চলতে হয়।
অন্যদিকে যারা সত্যকে চেনে, সত্য-মিথ্যার পার্থক্য জানে, বক্রতামুক্ত সঠিক পথের অনুসরণ করে তাদের জীবনই সাফল্যমণ্ডিত। তাদের জীবন আশীর্বাদপুষ্ট। এ ধরণের লোকেরা স্বল্পায়ু হলেও তারা সফল। কেননা, তারা মৃতের মত কোনোরকমে জীবনকে কাটিয়ে দেয়নি, তারা জীবনকে সত্যিকারার্থেই 'যাপন' করেছে, ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমে, উপকারী জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানের বিতরণের মাধ্যমে, মানবতার উপকারের মাধ্যমে। তাদের জীবন দ্বারা মানুষ উপকৃত হয়। তাদের কথায় মানুষ সঠিক পথের সন্ধান পায়। তাদের আচার-আচরণে মানুষের উচ্চ নৈতিকতার সুবাস পায়। তাদের জীবনাদর্শ মৃত্যুর পরেও মানুষের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকে। জাগতিক শরীর ত্যাগের পরেও তাদের জীবনচরিত মানুষকে পথ দেখায়, অনুপ্রাণিত করে, উজ্জীবিত করে, প্রাণবন্ত করে, সাহস যোগায়, আশায় বুক বাঁধতে শেখায়।
ইবনু আতা এদিকেই ইশারা করে বলেছেন, “কত দীর্ঘ জীবনের রসদ অতি সামান্য! কোনো কোনো স্বল্পায়ুর পাথেয় কতই-না সমৃদ্ধ! জীবনে বারাকাহ পেলে সে শীঘ্রই আল্লাহর এমন অনুগ্রহে ভূষিত হয় যা না ভাষায় বর্ণনা করা যায় আর না ইশারায় প্রকাশ করা যায়!”
নবী ﷺ এর দিকেই লক্ষ করুন। মাত্র ২৩ বছরের নবুওয়াতী জীবন, কিন্তু এই অল্প সময়েই তিনি আরবের বুকে বিপ্লব ঘটিয়ে গিয়েছেন, ভবিষ্যত বিপ্লবের সৈনিকদের তৈরী করেছেন। ইতিহাসের পদরেখা পরিবর্তন করে দিয়েছেন, পৃথিবী অবাক বিস্ময়ে দেখেছে একা একজন ব্যক্তি কীভাবে শত বছরের মূর্তিপূজা-পৌত্তলিকতা-কুসংস্কার- অনৈতিকতার জঞ্জালকে এত অল্প সময়ে পরিবর্তন করেছেন। কেবল তা-ই নয় কীভাবে বিভ্রান্তির অন্ধকারাচ্ছন্ন পঙ্কিল থেকে এক জাতিকে তিনি আলোকোজ্জ্বল বিস্তীর্ণ ভূমিতে নিয়ে এসেছেন। হতোদ্যম, অশিক্ষিত এক জাতিকে ঈমানের আলোয় আলোকিত করে তাদেরকে প্রস্তুত করেছেন ইতিহাস পরিবর্তনের গুটি হিসেবে। নিজের আখলাকী শক্তির সাথে নবুওয়্যাতের নূর ও আল্লাহর সাহায্য যুক্ত হয়ে তাঁকে আরবের একজন সাধারণ মেষপালক থেকে পরিণত করেছে সত্যের মশালবাহী সমগ্র জগতের জন্য রহমতরূপী নবী ও রাসূলে।
সাহাবীদের দিকে তাকালেই আমরা একই চিত্র দেখতে পারি। তাঁরাই রাসূলের যোগ্য উত্তরসূরী। ইসলামের মহানায়ক। তাদের গোটা জীবনই ঈমান ও নেক আমলের বারাকাহয় পরিপূর্ণ। সেই বারাকাহর প্রভাব আমরা আজও লক্ষ করতে পারি। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ আমরা মুসলিম। আরবের ভূমি থেকে ইসলাম তাঁদের মাধ্যমেই ছড়িয়েছে। তাঁরাই রাসূলের তিরোধানের পর সত্যের পতাকাকে উঁচিয়ে রেখেছেন। দিকে দিকে ছুটে গেছেন সত্যের বার্তা নিয়ে, হকের দাওয়াতের আহ্বান নিয়ে। মাইলের পর মাইল ভূমি জয় করেছেন, সাথে জয় করেছেন মানুষের মনও। হাজার হাজার মানুষের ইসলাম গ্রহণের মাধ্যম হয়েছিলেন, ফলে তাঁদের জীবন বারাকাহয় পরিপূর্ণ হয়েছিলো।
এমন অনেক আলিমের কথা ইতিহাস আমাদেরকে জানায় যাদের বয়সের কোঠা পঞ্চাশও পার করতে পারেনি, কিন্তু তাঁদের বিশাল কীর্তি দেখলে মানুষ আপনমনে বলে উঠতে বাধ্য হয় 'এটা কীভাবে হলো?' কারণ তাঁরা ইসলামের আলোকে আলোকিত ছিলেন। ঈমান-ইলম-আমলের নূর তাঁদের গোটা জীবনকে এমনভাবে পরিবেষ্টিত করেছিলো যে তাঁরা তাঁদের জীবনকে এক অনন্য দৃষ্টান্তে রূপান্তর করতে পেরেছিলেন।
ইমাম গাযালীর দিকে তাকান, মাত্র ৫১ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে গেলেও তাঁর দ্বারা কীভাবে মানুষ উপকৃত হয়েছে। এমনকি অনেক মানুষ ইসলামের যেই ব্যাখ্যা মানে সেটা গাযালীরই দেওয়া, তাঁরা সেটাকেই আল্লাহর দীন ভেবে মান্য করে আসছে। তাঁর লেখা 'ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন' গ্রন্থ হাজার বছর যাবত মানুষকে পথ দেখিয়ে আসছে, অন্তরকে বিগলিত করে আসছে, সামনেও এর ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে।
ইমাম নববীর দিকে তাকান, মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যু হলেও তাঁর কীর্তি তাঁকে শতায়ুধারী বলে ভ্রমে ফেলতে বাধ্য করে। এত অল্প সময়ে এত এত গ্রন্থ লেখা আল্লাহর বিশেষ সাহায্য ছাড়া কোনোভাবেই সম্ভব ছিলো না।
সমসাময়িক যুগের ইমাম আব্দুল হাই লাখনবীর কথাই ভেবে দেখুন, মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ধরাধাম ত্যাগ করলেও তাঁর লিখিত গ্রন্থের বিষয়বস্তুর জটিলতা, দৈর্ঘ্য, আলোচনার গভীরতায় যে কেউই আশ্চর্য হতে বাধ্য। মাত্র ৩৯ বছর বয়সে ১১৫টা বই, যার কোনো কোনোটা একাধিক খণ্ডের!
ইবনু আতা এদিকে ইশারা করে বলেছেন, “জীবনে বারাকাহ পেলে সে শীঘ্রই আল্লাহর এমন অনুগ্রহে ভূষিত হয় যা না ভাষায় বর্ণনা করা যায় আর না ইশারায় প্রকাশ করা যায়!” আমরা এসব মহান ব্যক্তিদের আলোচনা ও প্রশংসাই করতে পারি, কিন্তু তাঁদের বারাকাহ-কে ভাষায় প্রকাশ করতে পারি না। এটা সুস্বাদু খাবারের স্বাদের মত। স্বাদ চাখা ছাড়া এর প্রকৃত মর্ম অন্যের কাছে ব্যাখ্যা করে বোঝানো যায় না।
ইসলামের ইতিহাস এরকম মুবারক ব্যক্তিদের কীর্তি ও প্রশস্তিতে পরিপূর্ণ। তবে অতীতের আলোচনা ও রোমন্থন আমাদের বিন্দুমাত্রও উপকার দেবে না যদি এর থেকে আমরা শিক্ষা না নেই। আল্লাহর পথের পথিকদের এ থেকে আরও বেশি অনুপ্রাণিত হওয়া উচিত, তারা যাতে সত্য ও ন্যায়ের পথে, ঈমান ও আমলের পথে, ইলম ও দাওয়াতের পথে নিজেদেরকে বিলীন করে দেয়। বেশি বেশি উপকারী ইলম, মহৎ কীর্তি রেখে যায়, যা মৃত্যুর পর তাঁদের স্মরণিকা হয়ে থাকবে, কবরের অন্ধকারে আলোর বাতি হয়ে থাকবে, কিয়ামতের ময়দানে মিযানের পাল্লাকে ভারী করবে।
তবেই না সেটা জীবন!
টিকাঃ
১. প্রসঙ্গত আত্মজ্ঞান বা আত্মোপলব্ধি সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। 'আত্মোপলব্ধি' এর সাধারণ ধারণার ব্যাপারে কিছু বলার নেই, এর অর্থ নিজেকে চেনা, নিজের সম্পর্কে জানা। তবে আজকাল বিভিন্ন জনই শব্দটিকে হাতিয়ার করে অনৈসলামী চিন্তা ও দর্শনের বিস্তৃতি ঘটাচ্ছে, জেনেবুঝে বা অজ্ঞাতসারে। ভারতীয় দর্শন 'বেদান্ত'-এ আত্মোপলব্ধির ব্যাপারে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। এর সারসংক্ষেপ হচ্ছে- ব্রহ্ম তাঁর নিজের 'মাকে'ই এই গোটা ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছেন। এই পৃথিবী এক মায়ামাত্র। এই মায়ার কারণেই ব্রহ্ম ও সৃষ্টির মাঝে এক দ্বৈততা তৈরী হয়ে আছে। মায়ারূপ অজ্ঞানতার (ignorance) কারণেই মানুষ অদ্বৈততার বোধ হারিয়ে ফেলে। ফলে সে এই জগতকেই ভাবে পরম সত্য ও বাস্তব। আদতে তা নয়। পরম সত্য কেবল ব্রহ্মই। গোটা সৃষ্টিই ব্রহ্ম। গোটা ব্রহ্মাণ্ডই ব্রহ্ম। তিনি আছেন এর প্রতিটি কণায় কণায়। কিন্তু মানুষ যখন এই সত্যকে জানতে ও বুঝতে পারে না তখন সে মুক্তিলাভ করতে পারে না, সে সংসারের জন্ম-মৃত্যুর শৃঙ্খলে আটকে পড়ে, বারে বারে জন্ম নিতে থাকে। জন্মান্তর ঘটতেই থাক, যতক্ষণ সে মুক্তি পাচ্ছে না ততক্ষণ এরকমটা চলতেই থাকে।
মুক্তির একমাত্র পথ অজ্ঞানতাকে দূর করা। অজ্ঞানতা রহিত হলেই কেবল সম্ভব মুক্তি (মোক্ষ) লাভ করা। অজ্ঞানতা দূর হওয়া অর্থ হচ্ছে সে নিজেই যে ব্রহ্মের একটি অংশ, এদের মাঝে কোনো তফাৎ নেই, এরা দ্বৈত নয়, অদ্বৈত, পৃথক পৃথক কোনো সত্তা নয় একই সভার প্রকাশমাত্র-এ 'পরম সত্য' সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা। এরূপ জ্ঞানলাভ ঘটলেই দ্বৈততারূপ সকল প্রকার অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়, মায়ার পর্দা উঠে যায়, মানুষ নিজের 'স্বরূপ'কে চিনতে পারে। তাঁর আত্মোপলব্ধি ঘটে। এই 'আত্মোপলব্ধি' (self-realization)-ই তার মুক্তির একক ও বিকল্পহীন পথ। গোটা উপনিষদের ভিত্তি এই আত্মোপলব্ধির জ্ঞান। কীভাবে মানুষ অজ্ঞানতার মায়ায় জড়িয়ে আছে, কীভাবে এই সংসার তাকে সত্যোপলব্ধি থেকে দূরে রাখছে, কীভাবে মানুষের এই অজ্ঞানতা দূর হবে আর কীভাবেই-বা সে মুক্তি লাভ করবে-উপনিষদ বারংবার এই আলোচনাই করে এসেছে, হাজার বছর যাবত। বেদান্ত দর্শনের মূলভিত্তি উপনিষদসমূহ, যেহেতু উপনিষদ হচ্ছে 'বেদের অন্ত বা পরিসমাপ্তি', দার্শনিক আলোচনা ও আধ্যাত্মিকতার চরম পর্যায়। এক কথায় উপনিষদ হচ্ছে 'আত্মজ্ঞান'।
বাংলাদেশে বিশেষত কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন আত্মজ্ঞান নিয়ে অনেক কিছু লিখেছে, বলেছে। তারা মানুষকে মানুষের প্রকৃত স্বরূপ বোঝাতে চায়। তারা চায় মানুষের মাঝে যে 'অপার' সম্ভাবনা আছে সেগুলো মানুষ জানুক ও বুঝুক, তাহলেই মানুষ ইহজগতে মানসিকভাবে সুখী জীবনযাপন করতে পারবে। কিন্তু তাদের কথাবার্তায় উপনিষদীয় 'আত্মজ্ঞান'-এর প্রভাব বেশ ভালোভাবেই দৃশ্যমান। তারা মেডিটেশন, ধ্যানের সাথে আত্মোপলব্ধির দর্শনের মিশ্রণ ঘটিয়ে আকর্ষণীয় করে তুলেছে এবং সাধারণ মানুষের কাছে তা দিনদিন জনপ্রিয় হচ্ছে, যেহেতু নিজেকে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভাবছে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এই মহতী উদ্যোগের মাধ্যমে তাদেরকে সাহায্য করছে। আর সবচেয়ে বড় আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে তারা এগুলোকে ইসলামের সাথে মিশ্রিত করে পেশ করার চেষ্টা করছে। যার ফলে মুসলিম দেশের সাধারণ জনগণের কাছে তা অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর কিছু বলে মনে হচ্ছে।
কিন্তু ইসলাম ও কি আত্মজ্ঞানের কথা বলে? যদি বলে থাকে তবে তা কোন ধরণের আত্মজ্ঞান?
ইসলাম গোটা জগতকেই আল্লাহর নিদর্শন বলে মানে এবং মানুষ এই সৃষ্টিজগতের মধ্যে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তাঁরাই আল্লাহর সবচেয়ে বড় নিদর্শন।
وَفِي الْأَرْضِ أَيَاتٌ لِلْمُوْقِنِينَ. وَفِي أَنْفُسِكُمْ أَفَلَا تُبْصِرُونَ.
"পৃথিবীতে অসংখ্য নিদর্শন আছে দৃঢ়বিশ্বাসীদের জন্য এবং (হে মানুষ) তোমাদের নিজেদের মাঝেও (আছে নিদর্শন), তোমরা কি দৃকপাত করো না?" (সূরা যারিআত, ৫১:২০-২১)
মানুষ আল্লাহর নিদর্শন কীভাবে? কারণ এই মানুষই সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। মানুষকেই আল্লাহ তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। এই মানুষকেই আল্লাহ অতি মহৎ, অত্যন্ত ভারী এক আমানত দিয়েছেন যা বহন করতে আকাশ, যমীন ও শক্তিশালী পাহাড়ও অস্বীকার করেছে। এই মানুষের মাঝেই সম্ভাবনা আছে সে ফেরেশতাতুল্য হবে, আবার এই মানুষের মাঝেই পাশবিক ইচ্ছা-কামনা-বাসনা আছে যা তাকে মুহূর্তেই নিম্নতম খাদে নিয়ে ফেলতে পারে; তখন সে পশুর চাইতেও নীচ ও অধম বলে গণ্য হবে।
রূহ-ফিতরাত-আকল-চেতনা-স্বাধীনতা এবং ক্রোধ-দ্বেষ-দন্ত-কামনা-বাসনার এক অপূর্ব ও অদ্ভূত বিপরীতধর্মী গুণের সংমিশ্রন এই মানুষ। আল্লাহর দেওয়া পবিত্র আমানতকে যথাযথভাবে বহন করে, নিজেকে আল্লাহর প্রকৃত প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, নিজের অন্তরাত্মাকে পরিশুদ্ধির মাধ্যমে ওপরে আরোহণের সম্ভাবনা যেমন মানুষের মাঝে আছে তেমনি নিজেকে স্রেফ বস্তু ও মাংশের টুকরা বিবেচনা করে, কামনা-বাসনা-অর্থের দাস হয়ে, নিজের আকল ও বিবেককে নির্বাসনে পাঠিয়ে, ঊর্ধ্বতন চেতনাবোধকে পিষে ফেলে খুব সহজেই নিজেকে অধমের চাইতে অধম করার ক্ষমতাও মানুষের আছে। কি অপূর্ব ও বিস্ময়কারী এক সৃষ্টি! নিঃসন্দেহে এরকম সৃষ্টি আল্লাহর অবারিত কুদরত ও শক্তির নিদর্শন ও পরিচায়ক। মানুষ যখন নিজের দুর্বলতার সাথে মিশে থাকা সক্ষমতা, নিম্নবাসনার সাথে জড়িয়ে থাকা উচ্চাকাঙ্খা, পাশবিকতার সাথে সম্পৃক্ত ফেরেশতাতুল্যতা চিনতে সক্ষম হয় সে প্রকৃতার্থেই 'আত্মজ্ঞান' লাভ করে।
কিন্তু এই আত্মজ্ঞান কখনোই স্রষ্টাকে সৃষ্টির কিংবা সৃষ্টিকে স্রষ্টার সমতুল্য জ্ঞান করে না। এই আত্মজ্ঞান কখনোই নিজেকে পরমেশ্বর হিসেবে আবিষ্কার করা নয়। এই আত্মজ্ঞান কখনোই প্রতিটি কণার মাঝে নিজেকে খুঁজে পাবার অন্বেষা নয়, অজ্ঞানতা দূর করার নামে অনন্ত অসীম সত্তার সাথে সীমাবদ্ধ ও সসীম সত্তাকে মিলিয়ে ফেলার প্রচেষ্টা নয়, নিজের মাঝে 'অপার' সম্ভাবনা খোঁজার নামে নিজেকে স্রষ্টার স্থানে আসীন করানো নয়। হ্যাঁ, যদি অজ্ঞানতা দূর করা বলতে দম্ভ-অহংকার-দ্বেষ- ক্রোধ-শিশ্লোদরবৃত্তি থেকে মুক্ত হয়ে নিজের মাঝে থাকা 'আল্লাহপ্রদত্ত' বা 'ঐশীপ্রদত্ত' (ঐশীধর্মী নয়) সম্ভাবনাকে চিনে নিয়ে আল্লাহর পথে নিজেকে এগিয়ে নেওয়া বলে ধরে নেওয়া হয়, তবে সেই অজ্ঞানতা দূর করা ইসলামের পরম আকাঙ্খিত। কেননা, এটাই মানুষের পরিশুদ্ধির একমাত্র রাস্তা। আর পরিশুদ্ধি (তাতহীর) ইসলামের চরম লক্ষ্য। প্রথম প্রকারের আত্মোপলব্ধি কুফর, আর দ্বিতীয় প্রকারের আত্মোপলব্ধি একান্ত জরুরী।
এ প্রসঙ্গে অনেকে নবীজী ﷺ এর দিকে সম্পৃক্ত করে একটি বর্ণনা উল্লেখ করে, 'যে নিজেকে চিনলো, সে তার প্রভুকেও চিনলো'। কিন্তু এই বর্ণনাটি মোটেও প্রমাণিত নয়। এমনকি অনেক আলিম একে নবীজীর নামে বানোয়াট বর্ণনা বলেও মত দিয়েছেন। তাই এই হাদীছ দিয়ে উপরোক্ত পয়েন্ট প্রমাণ করা যায় না। হাদীছটি সহীহ হলেও তার সঠিক অর্থ তা-ই যা ওপরে বর্ণনা করা হয়েছে। তার অর্থ কখনোই এমন নয় যে, স্রষ্টা ও সৃষ্টি এক হয়ে গেছে, সৃষ্টি নিজেকে চিনলে নিজেকেই স্রষ্টা হিসেবে আবিষ্কার করবে (আল্লাহর কাছে পানাহ চাই এমন ধারণা থেকেও)।
এর সাথে ধ্যান ও মেডিটেশন সম্পর্কেও কিছু বলা দরকার আছে বলে মনে হয়। অনেকের ধারণা মেডিটেশন বুঝি সালাতের চাইতেও উত্তমমানের উপাসনা! ধ্যান মানে হচ্ছে নির্দিষ্ট একটি বিষয়ে গভীর চিন্তা-অনুধ্যান করা। 'ধ্যান'-এর ধারণা ভারত থেকে উদ্ভূত। আস্তিক কিংবা নাস্তিক, উভয় ঘরানার দার্শনিকদের কাছেই (একমাত্র 'চার্বাক' কিংবা 'লোকায়ত' নামক নিখাঁদ বস্তুবাদী নাস্তিক ঘরানা ব্যতিরেকে) ধ্যান সত্য পর্যন্ত পৌঁছার একটি মাধ্যম বলে বিবেচিত হয়ে আসছে। ভারত থেকে আস্তে আস্তে অন্যান্য স্থানেও এর প্রচলন ঘটেছে।
ধ্যান বা মেডিটেশনের সাথে যোগ দর্শনের অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান। বর্তমান সময়কার প্রাতিষ্ঠানিক ইয়োগা প্রাচীন ভারতের যোগদর্শনের কিছু কিছু অনুষঙ্গ গ্রহণ করলেও এর দার্শনিক অনুষঙ্গ গ্রহণ করেনি, কমপক্ষে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নয়। কিন্তু এখনও ইয়োগার সাথে মেডিটেশনের অনুষঙ্গটি যুক্ত আছে।
বস্তুত ধ্যান বা মেডিটেশন এক প্রকারের উপকরণ, কোন উদ্দেশ্যে এই উপকরণকে ব্যয় করা হবে এর ওপর নির্ভর করছে এই মেডিটেশন কোন ধরণের ও কেমন ফলাফল দেবে। মেডিটেশনের সময় মনকে একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করা হয় কিংবা চিন্তার গোটা প্রবাহকে নির্দিষ্ট একটি দিকে প্রবাহিত করানো হয়, এসময় কথা বলা যায় না, যার ফলে বাহ্যিকভাবে মেডিটেশন করলে কিছু উপকারীতা পাওয়া যায়, যেমন-মন চিত্তবিক্ষেপ, অকারণ উদ্বেগ থেকে মুক্ত হয়, মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, চিন্তা করার সামর্থ্য বাড়ে এবং সাথে সাথে কিছু শরীরবৃত্তীয় উপকারীতাও হাসিল হয়। এ কারণে আধুনিক যুগের ব্যতিব্যস্ত মানুষদের কাছে টেনশন থেকে বাঁচা ও মানসিক প্রশান্তি লাভের এক অনন্য মাধ্যম হচ্ছে মেডিটেশন।
আগেই বলেছি ধ্যান বা মেডিটেশন একটি উপকরণ। ব্যক্তির বিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গির ওপর এর ফলাফল (outcome) নির্ভর করে। ব্যক্তি যেই ধরণের ও যেমন বিশ্বাস লালন করবে, ধ্যানের মাধ্যমে সে তেমন চিন্তার ফসলই লাভ করবে। ব্যক্তি যদি বিশ্বাস করে সে 'স্বয়ংব্রহ্ম' তবে সে ধ্যানের মাধ্যমে এই চিন্তার প্রতি একনিবিষ্ট হবার মাধ্যমে এই বিশ্বাসকেই দৃঢ় করবে। আর এ কারণে ধ্যান কখনোই সত্য পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম হতে পারে না, তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধ্যানের মাধ্যমে যেই বাহ্যিক উপকারীতা পাওয়া যায় তা ব্যক্তিকে সত্য বোঝার জন্য মানসিকভাবে যোগ্য করে তোলে। কিন্তু চিন্তাকে পরিশুদ্ধ না করে ধ্যান করলে তা সত্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা দেয় না। আর চিন্তাকে ধ্যানমুক্ত অবস্থায় পরিশুদ্ধ করতে হয়। ধ্যান উপাসনার সহায়ক মাত্র, স্বয়ং কোনো উপাসনা নয়। এটা একটা মাধ্যম কেবল, চূড়ান্ত গন্তব্য নয়।
ইসলামে যোগ-দর্শনবিমুক্ত ধ্যানের সুযোগ আছে। এটাকে অনেক আলিম মুরাকাবার সাথে তুলনা দিয়েছেন। নিজেকে জগতের ব্যস্ততা থেকে মুক্ত করে দৈনন্দিন কিছু সময় নিজের কর্ম-আমল, নিজের আখিরাতের ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা, একমনে আল্লাহর যিকর করা, তাঁর সৃষ্টির ব্যাপারে চিন্তা করা, নিজের ওপর তাঁর বর্ষিত নিআমতের ব্যাপারে অনুধ্যান করাই মুরাকাবা, একে কুরআনী পরিভাষায় 'তাফাক্কুর'ও বলা যায়, আর তাফাকুর এক প্রকারের ইবাদাত এবং ইবাদাতের প্রকৃত উদ্দেশ্য-আল্লাহর প্রতি ইখলাস, তাঁর প্রতি আন্তরিক অভিমুখ, একনিবিষ্টতা, আল্লাহর সাথে সার্বক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক সংযোগ বজায় রাখা-পালনে সহায়ক। এটাও এক প্রকারের ধ্যান-ই বটে। এর মাধ্যমেও বাহ্যিকভাবে মানসিক প্রফুল্লতা আসে, চিত্তবিক্ষেপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়, উদ্বেগ কম হতে থাকে, বিষন্নতা হ্রাস পায়, আচরণে পরিশুদ্ধি আসে, চিন্তার ক্ষমতা বাড়ে। কারণ, মন যখন একনিবিষ্ট মনে কোনো কিছুর ব্যাপারে ভাবতে থাকে বাহ্যিকভাবে প্রায় তা একই ফলাফল দেয়, কিন্তু দেখার বিষয় হচ্ছে 'কি' ভাবা হচ্ছে, চিন্তার 'কোন' বীজ মনের ভূমিতে রোপণ করা হচ্ছে। ধ্যান ও মুরাকাবার মূল উদ্দেশ্য অন্তরকে একমুখী (one-pointed) করা। কিন্তু দেখার বিষয় মনকে কোনদিকে মুখ করানো হচ্ছে, কোন অভিমুখে অন্তরকে যাত্রা করানো হচ্ছে, তা কি আল্লাহর দিকে? সত্যের দিকে? নাকি সত্যের অপলাপের দিকে? বিভ্রান্তির দিকে?
মনকে আল্লাহর দিকে গভীরভাবে অভিনিবিষ্ট করা। আত্মসমর্পণ ও সঠিক জ্ঞানের সাথে শরীয়তের ওপর আমল করা। আন্তরিকতার সাথে নিজের দায়িত্বাদি পালন করার জন্য চেষ্টা করা। সর্বক্ষণ নিজেকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যে, আল্লাহ আমাকে দেখছেন, আমার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন, আমার কথা শুনছেন, আমার সকল কর্ম লিপিবদ্ধ হচ্ছে, তিনি একদিন আমাকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন। মন ও মনের ঝোঁক ও প্রবণতা যেসব ভুল স্থানে আটকে রয়েছে সেগুলোকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে এসে সঠিক স্থানে প্রতিস্থাপন করা। আশা-আকাঙ্খাকে সার্বক্ষণিকভাবে বিবেক দ্বারা বিদ্ধ করে রাখা। কামনা-বাসনাকে সর্বক্ষণ পাহারায় রাখা। চিন্তার ময়লা দূর করে চিন্তাকে পরিশুদ্ধ করা। অন্তরকে সত্য ও সুন্দর দিয়ে সজ্জিত রাখা এবং এসবের মাঝেই অন্তরকে ব্যস্ত রাখা। কামনার চোখকে চেতনার আলো প্রদান করা। নিজের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সতর্কভাবে ব্যবহার করা যাতে এর মাধ্যমে কোনোপ্রকার অন্যায় বা অপব্যবহার না হয়-এই যদি হয় ধ্যানের অর্থ তবে কোনো সমস্যা নেই। বরং এই প্রকারের ধ্যান ইসলামের একান্ত কাম্য। ইসলাম চায় এ ধরণের ধ্যানস্থ মানুষ তৈরী করতে।
আর যদি ধ্যান মানে হয় আরাম করে বসে আকাশ-কুসুম ভাবনায় মনকে ব্যস্ত রাখা, একমনে ‘ওঁ’ ধ্বনি উচ্চারণ করা, যোগীক চক্রের উর্ধ্বমুখী গতির কল্পনায় বিভোর থাকা-তবে এ ধরণের ধ্যানে ইসলামের আপত্তি আছে। কারণ এগুলোর মূলে রয়েছে ভিত্তিহীন ও ভ্রান্ত বিশ্বাস।