📄 একাদশ পদক্ষেপ : আত্ম-সমালোচনা
"সকল পাপ, উদাসীনতা ও কামনা-বাসনার মূল হচ্ছে আত্মতুষ্টি এবং সকল সৎকর্ম, সতর্কতা ও পবিত্রতার উৎস আত্ম-সমালোচনা।"
নিজেদের দোষত্রুটি খোঁজার পর আমাদের এসকল দোষত্রুটির উৎস সম্পর্কে জানার চেষ্টা চালাতে হবে, জানতে হবে এগুলো কোন জায়গা থেকে আসছে, যাতে আমরা এসকল দোষত্রুটিকে দূর করতে পারি। এ কারণে ইবনু আতা বলছেন, “সকল পাপ, উদাসীনতা ও কামনা-বাসনার মূল হচ্ছে আত্মতুষ্টি এবং সকল সৎকর্ম, সতর্কতা ও পবিত্রতার উৎস আত্ম-সমালোচনা।"
আমাদের দোষত্রুটির-তা পাপাচার, উদাসীনতা কিংবা কামনাবাসনা যাই হোক না কেন-সাধারণ উৎস নিজের প্রতি সন্তুষ্টিভাব। নিজের প্রতি মিথ্যা তুষ্টিই মানুষকে ধোঁকায় ফেলে রাখে, প্রতারণায় ভুলিয়ে রাখে। সে নিজেকে বলে, "আমি তো এই, আমি সেই, আমি ভালো আমল করছি, অন্যরা তো সব ধ্বংসের মুখে, সব পথভ্রষ্ট, আমিই হেদায়াতের পথে আছি। তারা সব খারাপ, আমিই কেবল ভালো। আমার কোনো চিন্তা নেই, আমি প্রায় মুক্তিপ্রাপ্ত।"
আল্লাহ বলছেন,
وَلَا أُقْسِمُ بِالنَّفْسِ التَّوَّامَةِ
"আরও শপথ করছি তিরস্কারকারী আত্মার।”১
মানুষের অভ্যন্তরে বাস করা এই তিরস্কারকারী আত্মা মুমিনকে নিজের ওপর সন্তুষ্ট হতে দেয় না। কখনোই সে ধোঁকায় পড়ে না যে পাপ করলেও আল্লাহ তাকে মাফ করে দেবে। বরং সে সর্বদাই নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে, নিজের সমালোচনা করতে ব্যতিব্যস্ত থাকে। এমনকি নবী ইউসুফ আলাইহিস সালামও নিজেকে দোষারোপ করেছেন যা কুরআনে এভাবে এসেছে,
وَمَا أُبْرِئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةٌ بِالسُّوءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي ، إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
"সে বললো, 'আমি নিজেকে নির্দোষ মনে করি না, মানুষের মন অবশ্যই মন্দ কর্ম প্রবণ, কিন্তু সে নয়, যার প্রতি আমার প্রতিপালক দয়া করেন। আমার প্রতিপালক অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”১
নবী ইউসুফের মত এমন পূতপবিত্র ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদাবান নবী পর্যন্ত নিজেকে সমালোচনার উর্ধ্বে মনে করেননি, সেখানে আমরা কে? তাঁর মর্যাদা ও পবিত্রতার তুলনায় আমাদের অবস্থান কোথায়?
ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ বিবেক, যা তাকে তিরস্কার করে, কিয়ামতের দিন তাকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। যার মাঝে এই বিবেক নিষ্ক্রিয় সে সমূহ বিপদের মধ্যে আছে। কুরআনে দুই বাগানের অধিকারী’র গল্প থেকেও আমরা এই শিক্ষা পাই। দুজন ব্যক্তির একজন ছিলো অত্যন্ত দাম্ভিক ও নিজের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী। এমনকি সে বলত,
وَمَا أَظُنُّ السَّاعَةَ قَائِمَةً وَلَئِن رُّدِدتُّ إِلَىٰ رَبِّي لَأَجِدَنَّ خَيْرًا مِّنْهَا مُنقَلَبًا
"আমি মনে করি না যে, কিয়ামত হবে, আর আমাকে যদি আমার প্রতিপালকের নিকট ফিরিয়ে নেয়া হয়ই, তবে আমি নিশ্চয়ই এটা অপেক্ষা উৎকৃষ্ট স্থান পাবো।”২
কুরআন ও সুন্নাহর শিক্ষা এটাই যে, মুমিনের সাধারণ মানসিকতা কখনোই আত্মতুষ্টি হবে না। নবী ﷺ এর সাহাবী হুযাইফা ইবনুল ইয়ামানের কাছে মদীনার মুনাফিকদের নাম ছিলো, যা অন্যান্য সাহাবীদের জানা ছিলো না। উমার ইবনুল খাত্তাব হানযালার কাছে এসে জানতে চাইতেন তাঁর নাম সেই তালিকায় আছে কিনা! উমারের মত ব্যক্তিত্ব এই প্রশ্ন কেন করতেন? কারণ তিনি আন্তরিকভাবে কখনোই নিজেকে নিরাপদ মনে করতেন না, নিজের প্রতি তৃষ্ট হতে পারতেন না, নিজেকে তিনি কোনো দৃষ্টিতেই ধার্মিকতার উচ্চ শিখরে অধিষ্ঠিত বলে বিবেচনা করতে পারতেন না। তিনি কঠোর ও নির্দয়ভাবে নিজেকে সমালোচনা করতেন, যার তুলনা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
আবু বকর সিদ্দীক রাদিআল্লাহু আনহু বলতেন, "আমার এক পা জান্নাতে আরেক পা জান্নাতের বাহিরে থাকলেও আমি আল্লাহর থেকে নিজেকে নিরাপদ মনে করবো না।” কেন তিনি এমনটা বলতেন? কারণ জান্নাতকে নিজের আমলের বদৌলতে অর্জিতব্য বলে মনে করতেই পারতেন না। হাজারো উত্তম আমল সত্ত্বেও তিনি নিজেকে জান্নাতের যোগ্য ও আল্লাহর শাস্তি থেকে নিরাপদ বলে ভাবতে পারতেন না। এই আবু বকরের ব্যাপারে উমার ইবনুল খাত্তাব বলেছিলেন,
لَوْ وُزْنَ إِيْمَانَ أَبِي بَكْرٍ بِإِيْمَانِ أَهْلِ الْأَرْضِ لَرَبِّحَ بِهِمْ.
"পৃথিবীবাসীর আমলের সাথে যদি একা আবু বকরের ঈমানের ওজন করা হয় তবে আবু বকরের ঈমানই অধিক ভারী হবে!"১
ব্যক্তি যদি নিজেকে বিশেষ মর্যাদার অধিকারী মনে করে তবে এই ভাবনাই তাকে এক সময় অহংকারের দিকে ঠেলে দেয়, তখন তার নেক আমলই তার ধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু যদি সে নিজেকে সর্বনিম্ন স্তরের মুমিন বলে মনে করে, তবে সর্বদা নিজেকে উন্নত করার, নিজের আমল ও আখলাককে বিকশিত করার এবং আল্লাহকে বেশি বেশি সন্তুষ্ট করার চিন্তায় বিভোর থাকবে। নিজের ব্যাপারে সে কখনোই সন্তুষ্ট হতে পারবে না। এমনটাই নবী, সাহাবী ও পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলদের দৃষ্টান্তের অনুসরণ।
তবে আত্ম-সমালোচনা যেন আত্ম-ধ্বংসের দিকে ঠেলে না দেয় সেদিকেও নজর রাখা জরুরী। ব্যক্তি নিজেকে এতটাই সমালোচনা করবে না যে সে নিজের প্রতি সকল প্রকার আত্মবিশ্বাস ও ভরসা হারিয়ে ফেলে নিদারুণ হতাশায় পতিত হবে-এমনটা মোটেও কাম্য নয়। সে সর্বদা নিজেকে বলতে থাকবে সে ভালো না, সে কখনোই কোনো ভালো কাজ করেনি, তার দ্বারা ভালো কাজ হওয়া সম্ভব না, তার জন্য আযাব অপেক্ষা করছে এবং এসব ভেবে ভেবে সে নৈরাশ্যের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে চলে যাচ্ছে-আত্মতৃপ্তি না ভোগার অর্থ মোটেও এটা নয়। এটা আত্মতৃপ্তির বিপরীত পক্ষে আরেক প্রান্তিকতা। আমরা আগেই বলে এসেছি ইসলাম ভারসাম্যের দীন, পরিমিতির ধর্ম। সবকিছুতে পরিমিতিবোধ অত্যন্ত জরুরী, এর মাঝেই আছে মুক্তি। এক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিজের ঈমান ও আমলের প্রতি বিস্ময়াবিষ্ট না হওয়া, নিজেকে পবিত্র না ভাবা, আত্মতুষ্টিতে না ভোগা, নিজের সমালোচনা অত্যন্ত জরুরী, তবে তা যেন নিজের প্রতি হতাশা ও নৈরাশ্যে পরিণত না হয় সেদিকেও লক্ষ রাখা একান্ত দরকারী। আত্ম-সমালোচনা না করে নিজের ব্যাপারে ধোঁকায় পড়ে যাওয়া এবং সমালোচনা করতে করতে নিজেকে ফুরিয়ে ফেলা উভয় রকমের প্রান্তিকতা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন এবং ভারসাম্যের সাথে নিজের অবস্থান বিবেচনা করে আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়াই মুমিনের কর্তব্য।
টিকাঃ
১. (সূরা কিয়ামাহ, ৭৫:২)
১. (সূরা ইউসুফ, ১২:৫৩)
২. (সূরা কাহাফ, ১৮:৩৬)
১. (শুআবুল ঈমান)
📄 দ্বাদশ পদক্ষেপ : সৎ বন্ধু
"এমন কাউকে বন্ধু বানিও না যে নিজের অবস্থার মাধ্যমে তোমাকে উন্নত করে না কিংবা কথাবার্তার মাধ্যমে তোমাকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করতে পারে না। তুমি পাপ করছ, তারপরেও তুমি ভাবছ তুমি ভালো কাজ করছ, কেননা তুমি যাদেরকে সঙ্গী বানিয়েছ তারা তোমার চাইতেও নিকৃষ্ট।"
আমরা জেনেছি নিজের দোষ কীভাবে খুঁজতে হয়, নিজেদের দোষত্রুটির উৎস কি। অবগত হয়েছি যে, আত্মতুষ্টিই আমাদের সকল পাপাচারের সাধারণ উৎস। এক্ষেত্রে ইবনু আতা আমাদেরকে আরেকটি দোষের দিকে নির্দেশ করছেন, তা হলো-অসং বন্ধু নির্বাচন। তাঁর ভাষায়, “এমন কাউকে বন্ধু বানিও না যে নিজের অবস্থার মাধ্যমে তোমাকে উন্নত করে না কিংবা কথাবার্তার মাধ্যমে তোমাকে আল্লাহর দিকে পরিচালিত করতে পারে না। তুমি পাপ করছ, তারপরেও তুমি ভাবছ তুমি ভালো কাজ করছ, কেননা তুমি যাদেরকে সঙ্গী বানিয়েছ তারা তোমার চাইতেও নিকৃষ্ট।"
মানুষ সাধারণত নিজেকে আপন সঙ্গীদের সাথে তুলনা করে। মানুষের সঙ্গী যদি তার চাইতেও নিকৃষ্ট কেউ হয় তবে সে নিজের সামান্য দোষত্রুটি তো দূর বড় বড় পাপাচারও ছোট মনে করতে থাকবে, কেননা সে তার চারপাশে দেখবে এর চেয়েও বড় খারাপ অবস্থা বিদ্যমান। তখন এটা স্বাভাবিক যে সে নিজেকে উন্নত করার কোনো প্রকার তাড়না অনুভব করবে না। কিন্তু যদি তার সঙ্গী এমন কেউ হয় যারা তার চাইতে উন্নত, তারা তাকে ভালো কাজ ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে সঠিক পথের দিকে নির্দেশ করে তখন সে নিজেকে সঙ্গীদের সাথে তুলনা করলে নিজেকে অন্যদের চাইতে তুলনামূলক নিচু স্তরের বলে আবিষ্কার করবে। তখন সে নিজের প্রতি মনোযোগী হবে, নিজেকে উন্নত করার জন্য ভেতর থেকে প্রেরণা পাবে। নবী সঙ্গীদের ব্যাপারে বলেছেন,
"উত্তম সঙ্গী ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ সুগন্ধি বিক্রেতা ও কামারের মত। সুগন্ধি বিক্রেতা হয় তোমাকে কোনো সুগন্ধি উপহার দেবে অথবা তুমি তার থেকে সুগন্ধি পাবে। আর কামার হয় তোমার কাপড় পুড়িয়ে দেবে কিংবা তুমি তার থেকে দুর্গন্ধ পাবে।”১
উত্তম আচরণের কাউকে বন্ধু বানালে আপনি তার থেকে সুগন্ধি পাবেন। কেননা, মুমিন স্বাভাবিকভাবেই পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করে, সুগন্ধি পরিচ্ছন্নতার একটি অংশ, এ কারণে মুমিন সুগন্ধিযুক্তই থাকে। অন্যদিকে ঈমান, আমল, সত্যাশ্রিত চিন্তা, যথার্থ বচনের কারণে (আত্মিকভাবেও সে) সুগন্ধিযুক্ত থাকে। আর তাই উত্তম মুমিনকে বন্ধু বানালে আপনি তার সঙ্গের কারণে সুবাসবেষ্টিত থাকবেন এবং উপদেশ, স্মরণিকা, কুরআন, উত্তম নির্দেশনা এমনকি মুচকি হাসির মাধ্যমে আপনি নৈতিক সুগন্ধিও পাবেন। আপনি তাকে দেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করতে, সাদাকা করতে, উত্তম কথা বলতে, সালাত পড়তে, উত্তমভাবে কথা বলতে, উন্নত চিন্তা করতে অনুপ্রেরিত হবেন।
অন্যদিকে কামারের মত মন্দ কোনো মানুষকে নিজের সঙ্গী বানিয়ে নিলে আপনি তার থেকে হয়ত অপরিচ্ছন্নতা ও ধুমপানের দুর্গন্ধ পাবেন। তেমনি মন্দ কথা বলা, গালি দেওয়া, চোখের খিয়ানত করা, সালাত না পড়া, গীবত, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, আল্লাহর ব্যাপারে মন্দ ধারণার মত নানা নৈতিক দুর্গন্ধ ও পাপাচার আপনি তার থেকে লাভ করবেন।
ইবনু আতার কথায় একটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে যা আদতে ক্ষুদ্র মনে হলেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইবনু আতা বলেছেন, "এমন কাউকে বন্ধু বানিও না, যে নিজের অবস্থার মাধ্যমে..." অবস্থা কেন বলা হলো? অবস্থা বলতে কি বোঝানো হয়েছে? অবস্থা, যাকে আরবীতে 'হাল বা হালাত' বলা হয়, হচ্ছে ব্যক্তির আধ্যাত্মিক, অভ্যন্তরীণ, আত্মিক, নৈতিক অবস্থা। নবী ﷺ বলেছেন, "এক দিরহাম হাজার দিরহামের চাইতে ভারী হয়ে গিয়েছে।” সাহাবীরা জিজ্ঞাসা করলেন, "হে আল্লাহর রাসূল! এরকমটা কীভাবে হলো?” তিনি উত্তরে বললেন,
"একজন ধনী ব্যক্তি নিজের অঢেল সম্পদ থেকে এক হাজার দিরহাম নিয়ে দান করে দিলো, অন্যদিকে এক ব্যক্তির কাছে আছেই দুই দিরহাম, সে সেখান থেকে এক দিরহাম নিয়ে দান করে দিলো (এভাবে এক দিরহাম হাজার দিরহামের চাইতে আল্লাহর দৃষ্টিতে অধিক মূল্যবান হয়ে গেলো)।"
একটি মাত্র দিরহাম এক হাজার দিরহামের চাইতে ভারী এ কারণেই হয়েছে যে, একজন ব্যক্তি তার গোটা সম্পত্তি থেকে অর্ধেক দিয়ে দিয়েছে, আরেকজন তার অঢেল সম্পত্তি থেকে এক হাজার দিরহাম দান করেছে, এখানে প্রথমোক্ত ব্যক্তির অন্তরের অবস্থা বা হালাতের কারণেই তার দানকৃত এক দিরহাম এক হাজার দিরহামের চাইতে অধিক মূল্যবান হয়ে গেছে। অর্থাৎ, এখানে মূল পার্থক্য দানকারীর আন্তরিক অবস্থা। এই আত্মিক অবস্থাই দৃশ্যত একই আমলের মাঝে আকাশ ও যমীনের মত পার্থক্য সূচিত করতে পারে।
এরূপ আত্মিক প্রশান্তি, সত্যের প্রতি অনুরক্তি ও অভ্যন্তরীণ দৃঢ়তার ভিত্তিতেই এক মানুষের প্রতি আরেক মানুষের প্রভাব পড়ে। যার আত্মিক শক্তি, যা ঈমান ও সৎকর্মের মাধ্যমেই হাসিল হয়ে থাকে, উচ্চমানের হয় তার পারিপার্শ্বিক লোকেরা তার দ্বারা অধিক প্রভাবিত হয়। এ কারণেই দেখা যায় কোনো কোনো পবিত্র আত্মার একটি কথাতেই মানুষ পরিবর্তন হয়ে যায়। একটিমাত্র বাক্যই হাজারো অন্তরে ঝড় তুলে দিতে পারে, বিপ্লবের প্রারম্ভ করতে পারে, বহু বছরের মিথ্যার জঞ্জাল দূর করে দিতে পারে। এমনকি কোনো কোনো সময় কথা না বলেও তিনি অন্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারেন, কেবলমাত্র নিজের অভ্যন্তরীণ পরিশুদ্ধির মাধ্যমে।
টিকাঃ
১. (বুখারী ও মুসলিম)
১. (ইবনু হিব্বান ও নাসাঈ)
📄 ত্রয়োদশ পদক্ষেপ : উদাসীনতা
"অন্তর উপস্থিত না হওয়ার কারণে আল্লাহর স্মরণ করা বন্ধ করে দিও না। কেননা তাঁর ব্যাপারে অমনোযোগী হওয়ার চাইতে তাঁকে ভুলে যাওয়া আরও মন্দ। (মৌখিকভাবে যিকর করতে থাকলে) হতে পারে আল্লাহ তোমার অমনোযোগীতার অবস্থাকে মনোযোগীতার অবস্থায় পরিবর্তন করে দেবেন এবং মনোযোগীতার অবস্থা থেকে তাঁর ব্যাপারে পূর্ণ একনিবিষ্টতার অবস্থায় নিয়ে যাবেন। তাঁর ব্যাপারে একনিবিষ্টতা অর্থ তিনি ছাড়া আর সকলকিছুর ব্যাপারে অমনোযোগী হয়ে যাওয়া।"
উদাসীনতা মানুষের অনেক বড় একটি ত্রুটি, আল্লাহর পথের পথিকদের জন্য তা আরও বেশি ভয়ানক ও মারাত্মক। আমরা নিজেদের ধর্মীয় দায়িত্বকে ভুলে যাই, বিস্মৃত হয়ে যাই আমাদের দ্বীনি কর্তব্যের ব্যাপারে, এর মূল কারণ উদাসীনতা। এই উদাসীনতা দূর করার উপায় বেশি বেশি করে আল্লাহকে স্মরণ করা। কুরআন ও সুন্নাহয় যিকর বা আল্লাহকে স্মরণ করার ব্যাপারে অসংখ্য নির্দেশনা এসেছে,
وَاذْكُرْ رَّبَّكَ فِي نَفْسِكَ تَضَرُّعًا وَخِيفَةً وَدُونَ الْجَهْرِ مِنَ الْقَوْلِ بِالْغُدُةِ وَالْأَصَالِ وَلَا تَكُن مِّنَ الْغُفِلِينَ.
“তোমার প্রতিপালককে মনে মনে বিনয়ের সঙ্গে ভয়-ভীতি সহকারে অনুচ্চস্বরে সকাল-সন্ধ্যায় স্মরণ করো, আর উদাসীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।”১
الَّذِينَ يَذْكُرُونَ اللَّهَ قِيمًا وَقُعُودًا وَعَلَى جُنُوبِهِمْ وَيَتَفَكَّرُونَ فِي خَلْقِ السَّمَاتِ وَالْأَرْضِ رَبَّنَا مَا خَلَقْتَ هَذَا بُطِلًا سُبْحَنَكَ فَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
“যারা দণ্ডায়মান, বসা ও শায়িত অবস্থায় আল্লাহকে স্মরণ করে এবং আসমান ও যমীনের সৃষ্টি বিষয়ে চিন্তা করে (বলে), হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তা বৃথা সৃষ্টি করেননি, আমরা আপনারই পবিত্রতা বর্ণনা করি, অতএব আমাদেরকে জাহান্নাম হতে রক্ষা করুন।”১
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اذْكُرُوا اللَّهَ ذِكْرًا كَثِيرًا، وَسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا.
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা বেশি বেশি আল্লাহকে স্মরণ করো। এবং সকালে ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা বর্ণনা করো।”২
রাসূলুল্লাহ বলেছেন,
لَا يَزالُ لِسَانُكَ رَطْبًا مِّنْ ذِكْرِ اللَّهِ
“তোমার জিহ্বা যেন সর্বদা আল্লাহর স্মরণে সিক্ত থাকে।”
আমরা আল্লাহকে স্মরণ করলে আল্লাহও আমাদেরকে স্মরণ করেন
فَاذْكُرُونِي أَذْكُرُكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ
“সুতরাং তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদেরকে স্মরণ করবো আর তোমরা আমার শুকরিয়া আদায় করো ও অকৃতজ্ঞ হোয়ো না।”
আল্লাহকে স্মরণ করা অন্তরের প্রশান্তির কারণ,
الَّذِينَ ءَامَنُوا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوْبُهُمْ بِذِكْرِ اللَّهِ أَلَا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ.
“যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহর স্মরণে যাদের অন্তর প্রশান্ত হয়; জেনে রেখো! আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।”১
আল্লাহর স্মরণ করাই ইবাদাতের মূল উদ্দেশ্য,
فَاعْبُدُنِي وَأَقِمِ الصَّلُوةَ لِذِكْرِى
“অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম করো।"২
কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যিকর করা হলেও অন্তর মনোযোগী হয় না। হৃদয় অমনোযোগী থাকে, কিন্তু জিহ্বা নড়তে থাকে। ফলে যিকরের সাথে আত্মিক সংযোগ ঘটে না, আধ্যাত্মিক যোগাযোগ স্থাপিত হয় না। ইবনু আতা বলছেন, “অন্তর উপস্থিত না হওয়ার কারণে আল্লাহর স্মরণ করা বন্ধ করে দিও না। কেননা, তাঁর ব্যাপারে অমনোযোগী হওয়ার চাইতে তাঁকে ভুলে যাওয়া আরও মন্দ। (মৌখিকভাবে যিকর করতে থাকলে) হতে পারে আল্লাহ তোমার অমনোযোগীতার অবস্থাকে মনোযোগীতার অবস্থায় পরিবর্তন করে দেবেন এবং মনোযোগীতার অবস্থা থেকে তাঁর ব্যাপারে পূর্ণ একনিবিষ্টতার অবস্থায় নিয়ে যাবেন। তাঁর ব্যাপারে একনিবিষ্টতা অর্থ তিনি ছাড়া আর সকল কিছুর ব্যাপারে অমনোযোগী হয়ে যাওয়া।"
কুরআন পড়ছেন কিন্তু কুরআনের দাবী ও চাহিদা মোতাবেক কুরআনের ব্যাপারে চিন্তাভাবনা ও তাদাব্বুর করতে পারছেন না, সালাত পড়ছেন কিন্তু মনোযোগ আসছে না, মুখে যিকর করলেও অন্তরে তার প্রভাব পড়ছে না-এ কারণে ইবাদাত ও যিকর করা বন্ধ করে দেবেন না। কেননা, বাহ্যিকভাবে এসকল আমল যখন অভ্যাসে পরিণত হবে আশা করা যায় একসময় এর সাথে অন্তরের মনোযোগও সংযুক্ত হয়ে যাবে। বান্দার চেষ্টা দেখে আল্লাহ বান্দার বাহ্যিক আমলের সাথে অন্তরকেও জুড়ে দেবেন। হতে পারে এক সময় মুমিনের মাঝে উচ্চতর মনোযোগ ও পূর্ণ একনিবিষ্টতা চলে আসবে যার কারণে আমলের সাথে অন্তর সর্বদা উপস্থিত থাকবে।
অন্তরে সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি সাধারণ মনোযোগীতা থেকে উচ্চতর স্তর। অন্তরের উপস্থিতির মানে আল্লাহর কথা স্মরণ করা হলে সে অন্তরে আল্লাহর বড়ত্ব, মহত্ত্ব, ঐশ্বর্য ও নিআমত অনুভব করতে পারে: জান্নাতের কথা ওঠানো হলে সে মনে মনে জান্নাতকে উপলব্ধি করতে পারে। আলী ইবনু আবি তালিব এমন অন্তরের বর্ণনা দিয়ে বলেছেন, "তাদের সামনে আযাবের কোনো আয়াত আসলে তাদের অন্তর ভীত হয়, তাদের কর্ণ সজাগ হয়ে যায়, যেন তারা নিজেদের কানে জাহান্নামের চিৎকার ও ক্রন্দন শুনতে পাচ্ছে। জান্নাতের বর্ণনা শুনলে তাদের মাঝে ব্যাকুলতা সৃষ্টি হয়, তারা হন্যে হয়ে জান্নাতকে খুঁজতে থাকে, তারা জান্নাতের প্রতি ঝুঁকে পড়ে, যেন তারা জান্নাতকে স্বচক্ষে দর্শন করছে।"
এমতাবস্থায় আল্লাহর নাম স্মরণ করা মাত্রই তারা আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছু থেকে আন্তরিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো কিছুই তার চেতনায় বিরাজ করতে পারে না। এটা অন্তরের বিশেষ এক অবস্থা। সবার এরকম হালত হয় না। আল্লাহর বিশেষ এই নিআমত যদি দিনে বা সপ্তাহে এক দু'বারও আসে তবুও তা বান্দার জন্য বিরাট সৌভাগ্য। এক মুহূর্তের জন্য হলেও গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক অভিনিবেশ ও আত্মিকভাবে আল্লাহর সাথে নিজেকে জুড়ে রাখা, অতএব অন্তরে সর্বদা আল্লাহর উপস্থিতি ও সাধারণ মনযোগের বিষয়টি একই নয়, এদের মাঝে পার্থক্য আছে।
যেমন-আব্দুল্লাহ ইবনু যুবাঈর রাদিআল্লাহু আনহু সালাত পড়তে দাঁড়ালে নিজের ঘরের দেয়াল পতিত হওয়ার শব্দও অনুভব করতে পারতেন না। পাখি তাঁর মাথায় এসে দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু তিনি নিশ্চলভাবে সালাত পড়তেই থাকতেন। মানুষজন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি উত্তরে বলতেন 'আমি কোনো শব্দই শুনতে পাইনি।' এটা কীভাবে হত? কারণ তিনি সালাতে দাঁড়িয়ে সত্যিকারার্থেই আল্লাহর দরবারে হাজির হতেন। তিনি দুনিয়া থেকে নিজেকে পরিপূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে নিজেকে মহামহিম আল্লাহর সামনে পেশ করতেন। নিজের অন্তরকে আল্লাহর স্মরণের সাথে এমনভাবে জুড়ে রাখতেন যে, তিনি জগতের কোনো কিছুই অনুভব করতে পারতেন না।
তবে প্রাসঙ্গিকভাবে একটি কথা বলে রাখা উচিত, আসলে উদাসীনতা স্বয়ং কিন্তু কোনো সমস্যা নয়। কেন? উদাসীনতা আসলে কি? উদাসীনতা হচ্ছে মনোযোগীতার বিপরীত। মনোযোগ মানে হলো concentration বা মনকে একটি বিশেষ বিষয়ের প্রতি নিবদ্ধ করা। আর মনকে বিশেষ একটি বিষয়ের প্রতি নিবদ্ধ করা মানে হলো অন্যান্য যেসব জায়গায় মন ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সেখান থেকে তাকে মুক্ত করা। মনকে বিভিন্ন জায়গা থেকে মুক্ত করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই তা concentrated বা ঘণীভূত হয়ে ওঠে। নির্দিষ্ট কিছুর ওপর মনোযোগ দিতে হলে কিছু না কিছুর ওপর থেকে মনোযোেগ সরিয়ে নিতেই হয়, অর্থাৎ, এক প্রকার উদাসীন হয়ে যেতে হয়। উদাসীনতা মনের এক প্রকার স্বাভাবিকতাই বটে। এমন কোনো মন নেই যেখানে উদাসীনতা নেই। যেখানেই মন আছে সেখানেই উদাসীনতা আছে।
এ কারণে উদাসীনতা স্বয়ং মন্দ কিছু নয়। তাই মন থেকে উদাসীনতা পুরোপুরি নির্মূল করাও কারো পক্ষে সম্ভব নয়। বরং কিছু কিছু উদাসীনতা অন্তরের ব্যাধি এবং আত্মিক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে ক্ষতিকর। দেখার বিষয় হচ্ছে আমি-আপনি কিসের প্রতি মনোযোগী আর কিসের প্রতি উদাসীন। হয় আপনি জগতের প্রতি উদাসীন থাকবেন এবং সত্যের প্রতি মনোযোগী হবেন অন্যথায় জগতের প্রতি মনোযোগী হয়ে সত্যের দিকে মনোযোগ হারাবেন। যদি সত্যের প্রতি উদাসীন থাকা হয় এবং মিথ্যার প্রতি আগ্রহ থেকে থাকে তবে নিঃসন্দেহে সেই উদাসীনতা নেতিবাচক ও আধ্যাত্মিক দিক থেকে ক্ষতিকারক। তখনই তা আত্মঘাতী ব্যাধিতে পরিণত হবে। ধীরে ধীরে তা প্রাণশক্তিকে নিঃশেষ করে ফেলবে, যতক্ষণ না তাওবা ও তাকওয়া নামক উদাসীনতাবিনাশী শক্তিগুলো দ্রুত তাকে গ্রাস না করে নিচ্ছে।
আর আমরা যদি উদাসীনতাকে সত্যিকারার্থেই ব্যবহার করতে পারি, সত্যের প্রতি মনোযোগী থাকি, সৎকর্ম ও তাকওয়ার প্রতি মনোযোগ আবদ্ধ রাখি, সত্যের প্রতি অন্তরের চোখ সবসময় খোলা রাখতে পারি এবং মিথ্যা, অস্থায়ীত্ব, অর্থহীনতা ইত্যাদি থেকে উদাসীন থাকতে পারি-তখন আমরা প্রকৃতার্থেই জেগে উঠতে পারবো, হতে পারবো মনোযোগী, হতে পারবো মুক্ত-ব্যাধিরূপ উদাসীনতা থেকে।
আশা রাখি যে, একদিন উদাসীনতা ও বিস্মৃতির সুড়ঙ্গ থেকে আমরা আত্মিক নিশ্চলতা ও প্রশান্তির আলোর পথে হাঁটবো। এক নতুন 'আমি'তে পরিণত হবো। যেই 'আমি' নিজের স্রষ্টা ও প্রতিপালককে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে স্মরণ ও উপলব্ধি করতে পারবে।
টিকাঃ
১. (সূরা আ'রাফ, ৭:২০৫)
১. (সূরা আলে-ইমরান, ৩:১৯১)
২. (সূরা আহযাব, ৩৩:৪১-৪২)
৩. (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ)
৪. (সূরা বাকারাহ, ২:১৫২)
১. (সূরা রাদ, ১৩:২৮)
২. (সূরা ত্বহা, ২০:১৪)
📄 চতুর্দশ পদক্ষেপ : অপমান, মুখাপেক্ষীতা ও ধোঁকা থেকে মুক্ত হওয়া
"(মানুষের কাছ থেকে) অপমানের বৃক্ষ আসলে (তাদের প্রতি) মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকে উদগত।"
অন্তরকে পরিশুদ্ধ করা নিজের দোষত্রুটি অন্বেষণ প্রক্রিয়ারই একটি অংশ। ইবনু আতা এখানে আরেকটি দোষের কথা উল্লেখ করছেন, তা হলো- অপমান। প্রশ্ন আসতে পারে যে অপমান ভোগ করছে তার দোষ কীভাবে হয়, দোষ তো হওয়ার কথা যে অপমান করেছে তার? অপমান এ কারণে দোষ কেননা, এই অপমান আসলে অন্তরে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজের বহিঃপ্রকাশ। অত্যন্ত আলঙ্কারিকভাবে ইবনু আতা দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলছেন, "(মানুষের কাছ থেকে) অপমানের বৃক্ষ আসলে (তাদের প্রতি) মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকে উদগত।”
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজই এক সময় মানুষের কাছ থেকে আগত অপমানের বৃক্ষে রূপান্তরিত হয়। এই বৃক্ষ কথা ও কাজের মাধ্যমে সিঞ্চিত হয়, যার মাধ্যমে মানুষ আরেক মানুষের কাছে নিজের প্রয়োজন ও আর্জি পেশ করে।
এই মুখাপেক্ষীতার কারণ কি? ইবনু আতার ভাষায় এর কারণ হলো 'ধোঁকা”, “আর কোনো কিছুই তোমাকে এরূপ ধোঁকা দিতে পারে না যতটা এই ধারণা যে, তুমি যা ছেড়ে দাও সেক্ষেত্রে তুমি স্বাধীন, কিন্তু তোমার যা প্রয়োজন সে ব্যাপারে তুমি দাসানুদাস।” যারা মানুষের কাছে এই ভেবে ধরনা দেয় যে তারা মনে হয় তার প্রকৃত উপকার সাধন করতে পারবে-তবে এটা এক বিশাল ধোঁকা। কেননা প্রতিপালক আল্লাহ ছাড়া আর কেউই প্রকৃত উপকার করতে পারে না। মানুষের প্রতি এরূপ মুখাপেক্ষীতা অনুভব করাই অপমানের কারণ, মানুষ কারো উপকার করতে পারে এই ধোঁকাই মুখাপেক্ষীতার কারণ। এই বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়াই সমাধান এবং আল্লাহর পথে এগিয়ে যাওয়ার অনেক বড় একটি পন্থা।
জীবনে চলতে হলে মানুষের সাহায্য নেওয়া মাঝে মাঝে একান্ত জরুরী হয়ে পড়ে। তাতে কোনো সমস্যা নেই, যতক্ষণ এই সাহায্য নেওয়া সাহায্যকারীর প্রতি মুখাপেক্ষীতার সৃষ্টি না করছে, যা বিনিময়ে অপমান ও দাসত্ব সৃষ্টি করে।
নবী বলেছেন,
أَطْلُبُوا الْحَوَائِجَ بِعِزَّةِ الْأَنْفُسِ
"নিজের প্রয়োজন চাইতে হলে মর্যাদার সাথে চাও।”
প্রয়োজনের সময় মানুষের কাছে চাইতে বাধা নেই, তবে মর্যাদা ও গাম্ভীর্যের সাথে চাইতে হবে, অন্তরে মুখাপেক্ষীতা ও নিচুতার ভাব রাখা যাবে না। অন্তরে মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার বীজ রোপণ করতে দেওয়া যাবে না, যাতে তা অপমানের বৃক্ষে পরিণত না হতে পারে। মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার ভাব থেকে নিজেকে মুক্ত করে নিতে পারলে ভারসাম্যপূর্ণ উপায়ে মানুষের সাথে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে আচরণ করা সম্ভবপর হয়। নবী ইবনু আব্বাসকে উপদেশ দিতে যেয়ে বলেছেন,
“হে বৎস! যদি গোটা জাতি একত্রিত হয়ে তোমার উপকার করার চেষ্টা করে তবে তারা তোমার কোনো উপকার করতে পারবে না যতটুকু তোমার ভাগ্যে লেখা আছে তা বাদে। গোটা জাতি যদি তোমার বিরুদ্ধে একত্র হয়ে তোমার ক্ষতি করার চেষ্টা করে, তারা তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না যতটুকু তোমার জন্য লিখিত হয়ে আছে।”১
প্রকৃত স্বাধীনতা আল্লাহর দাসত্বেই, স্বাধীনতার এটাই প্রকৃত ইসলামী দৃষ্টিকোণ। আপনি যখন আল্লাহর দাস হবেন তখন আল্লাহ ভিন্ন সকল কিছু থেকে আপনি মুক্ত হয়ে যাবেন; মানুষ, বস্তু, নিজের কামনা-বাসনা, সামাজিক, রাজনৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক চাপ যাই হোক না কেন।
মানুষের প্রতি মুখাপেক্ষীতার ভাব থেকে যেমন অপমান উদ্ভূত, আল্লাহর প্রতি প্রকৃত দাসত্বের বৃক্ষ আল্লাহর প্রতি আন্তরিক মুখাপেক্ষীতার বীজ থেকেই উদগত। আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত অন্যদের (প্রতি মুখাপেক্ষীতা) বর্জন করে আল্লাহর প্রতি দাসানুভূতির সঠিক পরিচর্যা করা। যা আমাদেরকে আল্লাহর পথের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে পরিচালিত করবে।
টিকাঃ
¹ (তিরমিযী)