📄 রাসূলুল্লাহ (স.)-এর শিক্ষানীতি
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে প্রথম বাণীটিই ছিল- “ইকরা বিইসমি রাব্বিকালরাজি খালাক।” “পড় তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন, পড় দিয়েই শুরু হয়েছে সর্বকালের সেরা মানুষ আমাদের প্রিয় নবী মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা. এর মিশনের যাত্রা। আল্লাহতায়ালা আদম থেকে শুরু করে সকল নবী এবং রাসূলকে শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত করেই তাদের পরিচয় তুলে ধরেছেন। আলৱাহ বলেন: 'হে নবী! আপনাকে আমি এমন সব জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছি যা আপনিও জানতেন না এবং আপনার পূর্বপুরুষও জানতো না।' (৬:৯২) আলৱাহপ্রদত্ত জ্ঞানদক্ষতায় রাসূল সা. এতই পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন যে, শিক্ষা সম্প্রসারণে বিশ্বমানবতার মহান শিক্ষকরূপে তার আবির্ভাব হয়েছিল। সে জন্য রাসূল সা. নিজেও এ পৃথিবীতে রাষ্ট্রপ্রধান, সেনাপতি কোন নামেই নিজের পরিচয় তুলে ধরেননি। বরং তিনি নিজেকে শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিতে এভাবে গর্ববোধ করেছেন। রাসূল সা. বলেন: 'বুয়িস্ত মোয়ালিৱমান' 'আমি মানবতার জন্য শিক্ষকরূপে প্রেরিত হয়েছি।' আলৱাহ্পাক রাসূলে করীম সা.-এর পরিচয় দেন এভাবে: "তিনি (আলৱাহ্) যিনি নিরবর লোকদের মধ্য হতে তাদেরই একজনকে নবী হিসেবে উন্নীত করেছেন, যিনি (নবী সা.) তাদের কাছে আবৃত্তি বা পাঠ করেন তার (আলৱাহ) নিদর্শনসমূহ, তাদের পূত-পবিত্র করেন এবং শিৰা দেন কিতাব ও জ্ঞান; যদিও তারা পূর্বে মিথ্যা বিশ্বাসের অনুসারী ছিল।” (৬২:২)
হযরত মুহাম্মদ সা. ছিলেন উম্মি। মানবরচিত কিতাব বা গ্রন্থজ্ঞান তিনি আহরণ করেননি। মানবরচিত গ্রন্থের শিৰা অর্জন না করার ফলে তিনি কোন লেখক বা গ্রন্থকারের মতবাদ দ্বারা পৰপাতদুষ্ট হওয়া থেকে ছিলেন পাক ও পবিত্র। কারণ সমগ্র বিশ্বের তথা বিশ্বমানবজাতির যিনি শিৰক, তিনি কী করে কোন মানুষবিশেষের নিকট শিক্ষা গ্রহণ করতে পারেন? তাহলে বিশ্বকে সার্বজনীন শিৰা দেবে কে? আর এ কারণেই আলক্বাহ পাক তাঁর প্রিয় রাসূল সা.- এর শিক্ষার ভার নিজেই গ্রহণ করেছেন। রাসূল সা.
শিক্ষকসুলভ আচরণের মাধ্যমে আরবদের মাঝে লুক্কায়িত সুপ্ত প্রতিভাকে বিকশিত করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার কর্মসূচিতে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, তিনি মানবকূলের শ্রেষ্ঠসম্পদ হিসেবে জ্ঞানকেই আখ্যায়িত করলেন। আলৱাহ্ বলেন: “কুল, রাব্বি জ্বিনি ইলমা”- "বল, হে রব আমার, আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর।"
কুরআনের বাণী: 'যাকে জ্ঞান-প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ করা হয়েছে তাকে' মহাকল্যাণে ভূষিত করা হয়েছে।' (২:২৬৯) 'যে ব্যক্তি জ্ঞান রাখে আর যে জ্ঞান রাখে না তারা উভয় কি সমান হতে পারে?' (সূরা জুমার: ৯) রাসূল সা.-এর হাদিসেও আমরা দেখতে পাই 'জ্ঞানান্বেষণ করা প্রত্যেক নর-নারীর ওপর ফরজ হিসেবে বিবেচ্য।' তিনি জ্ঞানান্বেষণে যুক্ত হতে এত বেশি অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিলেন যে তাঁর বাণী শিক্ষাদর্শনের কালোত্তীর্ণ উপমারূপে গণ্য হয়েছে। তিনি আরো বলেছেন: 'রাতের কিছু সময় জ্ঞানের অনুশীলন করা সারারাত জাগ্রত থেকে ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।' এভাবেই তিনি নিরক্ষরতামুক্ত সমাজ গঠন, শিক্ষা ও জ্ঞানদক্ষতার উন্নয়নের ধারণা সমগ্র মানবজাতির সামনে তুলে ধরে শিক্ষার মৌলিক নীতিমালা পেশ করেন।
মূলত রাসূল সা.-এর শিক্ষানীতিতে সমগ্র মানবজাতির পাঠক্রম হচ্ছে আল-কুরআন এবং এর ভিত্তিতে পাঠ্যসূচি বা Syllabus হচ্ছে রাসূলের জীবন ও. কর্মপদ্ধতি। মহান স্রষ্টা আলৱাৰ্তা'আলা এই মহান শিক্ষকের জন্য উপহারস্বরূপ প্রদান করেন মহাগ্রন্থ 'আল-কুরআন'। আল্লাহতায়লা মানবজাতিকে কোন একাডেমিক শিক্ষা দেয়ার জন্য রাসূল সা.-কে এ পৃথিবীতে পাঠাননি। এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, শিৰার জন্ম ও এর সার্বিক প্রসারে একমাত্র ইসলাম ছাড়া আর কোন মতবাদ বা ধর্মে অনুরূপ কোন ধারণাই ছিল না। বরং শিৰাসংক্রান্ত সব মতবাদ প্রকৃতপৰে ইসলামের শিৰা থেকেই প্রণীত। জাহিলিয়াতের যুগে এ কাবা শরীফই ছিল শিৰা-সাহিত্য ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। অধ্যাপক পি কে হিট্টির ভাষায় :
"The fair of Ukaz stood in pre-Islamic days for a kind of academic franchise of Arabia."
অনেকের মতে রাসূল সা. তাঁর নবুওয়তের অতি শৈশব অবস্থায় মক্কা নগরীতে ঐতিহাসিক সাফা পর্বতের পাদদেশে 'দারবল আরকাম' নামেও একটি প্রতিষ্ঠানের সূচনা করেন। বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এটিই
ইতিহাসের সর্বপ্রথম শিক্ষালয়। আজকের বেসরকারি উদ্যোগের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ধারণা আধুনিক পৃথিবী এখান থেকেই লাভ করেছে। এ স্থানে তিনি তাঁর নবদীৰিত শিষ্যদেরকে গোপনে নামাজ ও সংশিৱষ্ট বিষয়াদি শিৰা দিতেন। পরে তিনি মুদিনা শরীফে হিজরত করে 'কুব্বা' নামক স্থানে সর্বপ্রথম একটি ক্ষুদ্র মসজিদ স্বহস্তে স্থাপন করেন ও পরে তিনি মদিনায় মসজিদে নববী প্রতিষ্ঠা করেন। রাসূল সা. আসরের নামাজের পরেই অধিকাংশ সময় ও মসজিদে শিৰাদানে ব্রত থাকতেন। লৰণীয়, নারীদের মধ্যে শিৰা দান ও প্রচারের জন্য তিনি সপ্তাহের একটি দিনও ধার্য করে রেখেছিলেন। সে দিনটিতে মহিলাগণ নির্ধারিত কৰে জমায়েত হয়ে আল-কুরআনের অমিয় শিৰা গ্রহণ করতেন। রাসূলুলৱাহ সা.-এর সহধর্মিণী ও সিদ্দিক নন্দিনী হযরত আয়েশা রা.সহ অনেকেই নারীশিৰার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। নারীর ব্যক্তিসত্তার পরিচর্যা, আত্মিক উন্নয়ন ও নৈতিক গুণাবলীর উৎকর্ষ সাধনের জন্য নবী সা. পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও তিনি জ্ঞানার্জনের পরামর্শ দিতেন। হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, ২রা হিজরিতে (৬২৩ খ্রিষ্টাব্দে) মাকরামাহ ইবনে নাওফেল নামক জনৈক আনসারের গৃহে 'দারবল কারবাহ' নামে একটি শিৰাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এ প্রতিষ্ঠানটি ছিল আবাসিক ধরনের। সাহাবীগণ তাঁর গৃহে থেকে জ্ঞানার্জন করতেন।
এভাবে মদিনার আবু উসামা বিন যুবায়ের রা. বাড়িতে একটি শিক্ষালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হযরত মুসআব বিন উমায়ের রা. কে রাসূল সা. এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিযুক্ত করেন। আর এটিই মদিনায় প্রতিষ্ঠিত সর্বপ্রথম শিক্ষালয়। মদিনায় দ্বিতীয় শিক্ষালয়টি হচ্ছে হযরত আবু আইউব আনসারী রা. এর ব্যক্তিগত বাসভবন। আনসারী রা.-এর এই ভবনে রাসূল সা. দীর্ঘ আট মাস শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করেন। শিক্ষার আলো মানুষের দোড়গোড়ায় পৌঁছে দিতে রাসূল সা. এভাবে আলোকিত মানুষকে নিয়ে আলোকিত সমাজ গড়ার দৃপ্ত শপথ নেন। সাহাবীগণ কুরআন শরীফের আয়াত মুখস্থ করার জন্য তিনি তিনবার আবৃত্তি করতেন। আল-কুরআন শিৰা করা ছাড়াও সাহাবীগণ ধর্মীয় বিধান (rituals), কারবময় হস্তলিপি (calligraphy), বংশ ইতিহাস (geneology), ঘোড়দৌড়, বিদেশী ভাষা ও তীর নিৰেপ শিৰা করতেন। একযোগে দীন ও দুনিয়ার শিৰা প্রদানের পদ্ধতি ও প্রয়োগ আলৱাহর রাসূল সা. এভাবে প্রচলিত করেন। রাসূল করীম সা.-এর জীবদ্দশায় ৯টি মসজিদ মদিনায় ছিল। এসব মসজিদে মদিনা ও এর নিকটবর্তী অঞ্চলের
ছেলেমেয়েরা শিৰা গ্রহণের জন্য সমবেত হতো। আধুনিক শিৰাদান পদ্ধতির মত তখন ভর্তি পরীৰা ও বেতনের দ্বারা শিৰার দ্বার সংকুচিত ছিল না। মসজিদ ছিল তখন একটি উন্মুক্ত বিদ্যালয়, যা থেকে বর্তমান বিশ্ব Open University-এবং আবাসিক হলের ধারণা লাভ করেছে। শিৰাদানের বহু প্রজ্ঞাময় ও জ্ঞানী সাহাবী তখন ছিলেন শিৰকতায় নিবেদিত। তাঁদেরকে ঘিরে রাখতেন ছাত্ররা মৌমাছির মতো।
দূরবর্তী মেধাবী শিক্ষার্থীদের একত্রিত করে কেন্দ্রীয়ভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন। যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে উন্নত পাঠদানে পারদর্শী হতেন তাদের থেকে নির্বাচন করে গ্রুপভিত্তিক বিভিন্ন এলাকার শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রেরণ করতেন। হিজরি ১১ সনে হযরত মুআয বিন জাবাল রা.-কে ইয়েমেনের গভর্নর করে পাঠান। সেখানকার প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থার চিত্র পরিদর্শন করা এবং বিভিন্ন অঙ্গনের শিক্ষাবিষয়ক সমস্যাগুলো সমাধানের নিমিত্তে তিনি দায়িত্বপ্রাপ্ত সাহাবী ছিলেন।
বলা যারা সারা বিশ্বব্যাপী একটি নিরক্ষরতামুক্ত সমাজ গঠনে রাসূল সা.-এর এই ঐতিহাসিক ভূমিকা ছিল
রাসূল সা. পত্র-সাহিত্যের মাধ্যমে শিক্ষা প্রসারে ও নিরক্ষরতা দূরীকরণে যে নবধারা সৃষ্টি করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্বব্যাপী উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষার আইডিয়া লাভ করেছে। পত্রের মাধ্যমে শিক্ষা প্রসারের একটি উলেৱখযোগ্য হাদিস হচ্ছে- 'নবী সা. সিরিয়ার সেনাপ্রধানের হাতে পত্র দিয়ে বললেন, তুমি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছার পূর্বে এ পত্রটি পড়বে না। তোমার বাহিনীর জন্য এ পত্রে কিছু শিক্ষণীয় বিষয় আছে। নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে সেনাপ্রধান পত্রটি খুললেন।' (বুখারী, পৃ. ১৫) তৎকালীন পারস্য সম্রাট পারভেজ বিন হুরমুয বিন নৌশিরাওয়াঁর কাছে আলৱাহর একাত্ববাদে বিশ্বাস ও সত্য জ্ঞান উপলব্ধি করার আহ্বান জানানো হয়। হাদিসে এসেছে : 'রাসূল সা. এক ব্যক্তির হাতে পত্র দিয়ে বললেন, সে যেন পত্রটি পারস্য সম্রাট কর্তৃক নিয়োজিত বাহরাইনের গভর্নরের কাছে পৌঁছে দেয়। তিনি তার কথামত পত্রটি তার হাতে পৌছে দেন।' (বুখারী, পৃ. ১৫) এভাবে পত্রালাপ বা চিঠিপত্রের মাধ্যমে রাসূল সা. শিক্ষার আলো বিস্তারে সদা সচেষ্ট ছিলেন।
ঐতিহাসিক খোদা বকশ 'Islamic Civilization' গ্রন্থে মসজিদের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহার সম্পর্কে মন্তব্য করেন নিম্নোক্তভাবে: "For the Muslims the mosque does not bear the same exclusive character as does a church for the hristians. It is not merely a place of worship. The Muslim indeed honours the mosque but he does not hesitate to use it for any laudab purpose." রাসূল সা. কর্তৃক বিদ্যাপীঠ হিসেবে মসজিদের এই সার্বজনীন প্রশংসনীয় ব্যবহারই উত্তরকালে শিৰার গণমুখী প্রসার ও সম্প্রসারণে অতি ব্যাপক ও গভীর ভূমিকা পালন করেছে। ঐতিহাসিক ইয়াকুবের মতে, বাগদাদে ৩০ হাজার মসজিদ শিৰাদানের জন্য ব্যবহৃত হতো; বড় মসজিদগুলোতে পাঠ্যতালিকা ভাগ করা ছিল। শিৰকগণ সে পাঠ্যতালিকা অনুযায়ী বিশেষ পাঠ্যসূচির ওপর বক্তৃতা দিতেন। পরিব্রাজক নাসির খসরবর মতে (একাদশ শতাব্দীতে) মিসরের রাজধানী কায়রোর মসজিদে প্রত্যেহ প্রায় ৫ হাজার লোক দীন ইলম হাসিল করার জন্য সমবেত হতো। সাম্প্রতিককালের মিসরের 'জামে আযহার', দিলিব্রর 'জামেয়া মিলিরয়া' এবং 'দেওবন্দ মাদ্রাসা' মসজিদভিত্তিক শিৰারই উত্তর ফসল।
সাইয়েদ সুলায়মান নদভী 'পয়গামে মুহাম্মদী'তে বলেন, 'নবুয়াত বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ শিৰায়তনটিতে একই সময়ে এক লাখেরও বেশি ছাত্র দেখতে পারেন। তাঁর (রাসূল সা.) প্রত্যেকটি ছাত্রের নাম, পরিচয়, অবস্থা, জীবনচরিত, শিৰা ও অনুশীলনের ফলাফল, প্রত্যেকটি বিষয় ইসলামের ইতিহাসের পাতায় লিপিবদ্ধ আছে।' আধুনিক বিশ্বের শিৰা-বিজ্ঞানের পরিভাষায় : “Follow up study” বা “Cumulative Record" ও ছাত্রদের জীবন বৃত্তান্ত ততটুকু রাখতে সৰম হয়নি, যতটুকু আলরাহর রাসূল সা.-এর ছাত্রদের 'ইতিহাস বৃত্তান্ত' বর্তমানে সংরৰিত হয়ে আছে। হযরত উমর রা. থেকে হযরত বিলাল রা. পর্যন্ত খলিফা, ক্রীতদাস, আরব, অনারব, প্রতিপত্তিশালী, নিরীহ, সবাই এক কাতারে সমমর্যাদার আলৱাহর রাসূলের সা. নিকট বিদ্যাশিৰা লাভের সমান সুযোগ ও মর্যাদা পেয়েছিলেন। রাসূলুলৱাহ সা.-এর শিৰায়তনে সার্বজনীনতার এ দিকটি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। এর মধ্যে প্রবেশাধিকার লাভের জন্য বর্ণ ও আকৃতি, দেশ ও রাষ্ট্র, জাতি ও বংশ এবং ভাষা ও উচ্চারণ ভঙ্গিমার কোন প্রাচীরই ছিল না, বরং ঐ সময়ে দুনিয়ার সকল জাতি, সকল বংশ, সকল দেশ ও সকল ভাষাভাষীর জন্য শিৰার দ্বার ছিল উন্মুক্ত।
রাসূল সা. শিৰাকে বিশ্বজনীন করতে বিদেশী ভাষা বোঝার জন্য যায়েদ বিন সাবিত রা.-কে হিব্রব ভাষা শিৰার নির্দেশ দেন। জানা যায়, তিনি মাত্র সতের দিনে এ ভাষা শিখতে সৰম হয়েছিলেন। রাসূল সা. শিৰানীতির আরো একটি অনুষঙ্গ হচ্ছে- অমুসলিমদের জন্য স্বতন্ত্র শিৰাপ্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করা। মুসলমানদের জন্য নেয়া শিৰাকৰ্মসূচির পাশাপাশি তিনি অমুসলিমদের জন্যও শিৰার ব্যবস্থা করেন। কেননা এটা ছিল তাদের প্রাপ্য মৌলিক অধিকার। তাই দেখা যায় কখনো কখনো ইহুদিগণ রাসূল সা.-এর কাছে আসতো এবং ধর্মীয় জ্ঞানশিৰায় অংশগ্রহণ করতো। স্যার উইলিয়াম মুয়র : আলৱাহর রাসূলের চরিত্রের প্রভাব ও দীপ্তি তুলে ধরেন এই বলে: "তিনি মধ্যমাকৃতি অপেৰা ঈষৎ দীর্ঘকায় হলেও দেখতে রাজোপম ও তেজস্বী ছিলেন। তিনি মানবকুলের সর্বাপেৰা রূপবান, সর্বাপেৰা সাহসী, সর্বাপেৰা প্ৰতীপ্ত সুকান্তি বিশিষ্ট ও সর্বাপেৰা উদার ছিলেন। তাঁকে দেখলে অনুমিত হতো যেন তাঁর মুখমণ্ডল থেকে স্বর্গীয় জ্যোতি বিচ্ছুতির হচ্ছে।”
আমরা রাসূল সা.-এর শিক্ষানীতি ও শিক্ষাব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ ধারণা লাভ করতে পারি আসহাবে সুফফার ৭০ জন সাহাবীর সমষ্টির নিকট থেকে। তাঁরা কৃষ্ণতা সাধন ও জ্ঞান পিপাসা নিবৃত্তির জন্য যে ত্যাগ ও কুরবানির নজির রেখে গেছেন তা বিশ্বের প্রলয়দিন পর্যন্ত সমুজ্জ্বল আদর্শ হয়ে থাকবে। তাঁরা দিনের বেলায় জঙ্গলে কাঠ কাটতেন জীবিকা নির্বাহের জন্য, আর রাতভর ইবাদত করতেন আলৱাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিমিত্তে। অনাগত জ্ঞানপিপাসু নতুন প্রজন্মের জন্য এর থেকে বড় দৃষ্টান্ত এখনো অনাবিষ্কৃত।
তাই বলা যেতে পারে পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব আমাদের প্রিয় নবী মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ সা.-এর শিক্ষানীতি, ছাত্র-শিৰক সম্পর্ক, চিন্তা ও কর্মময় জীবনকীর্তি ও অবদান আমাদের জন্য অবিস্বরণীয়ও অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
📄 নৈতিক শিক্ষা ও আগামী প্রজন্ম
'Education' প্রত্যয়টির উদ্ভব, ঘটেছে ল্যাটিন শব্দ 'Educere' থেকে, ইংরেজিতে এর ভাবার্থ হচ্ছে 'to lead out' বা 'to draw out' শিক্ষার আরবি প্রতিশব্দ ইলম বা জ্ঞান। আবার কেউ কেউ বলেছেন, ইংরেজি 'Education' শব্দটি ল্যাটিন শব্দ 'Educere' থেকে উদ্ভূত হয়েছে যার ভাবার্থ হলো 'to bring up' অথবা 'to train' অথবা 'to mould.' অর্থাৎ 'শিক্ষা' বলতে বোঝায় শিক্ষার্থীকে 'লালন করা' অথবা 'প্রশিক্ষণ দেয়া' অথবা 'কোন কিছুর আদলে তৈরি করা।' শিক্ষা এমন একটি ধারবিহীন অস্ত্র যা দিয়ে চিন্তা জগতের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়ে থাকে। সৃষ্টির সূচনা হতেই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়ে আসছে। পৃথিবীর আদি পিতা হযরত আদম (আ) আল্লাহপাকের প্রদত্ত জ্ঞানের মাধ্যমেই ফেরেশতাকুলের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করেন। উপস্থিত ফেরেশতাকুল জ্ঞানরাজ্যে আদম (আ)-এর অভূতপূর্ব সাফল্য, লক্ষ্য করে তাকে শিক্ষক হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হন এবং আল্লাহর হুকুমে তাঁর নিকট চরম সম্মান প্রদর্শন করেন। একমাত্র শিক্ষার কারণেই আদম (আ) সকলের শ্রদ্ধা ও সম্মানের পাত্র হিসেবে বিবেচিত হন। তার ফলশ্রুতিতে আজ মানুষই সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পরিগণিত ও স্বীকৃত। শিক্ষা মূল্যায়নের মানদণ্ড, টিকে থাকা না থাকার মাপকাঠি।
ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বেই আরব জাহানের কথা চিন্তা করলে মানুষ আঁতকে ওঠে। ইমলাম তমসাচ্ছন্ন আরবকে সভ্য দুনিয়ার কাছে তুলে ধরে এবং আরববাসী সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বৈজ্ঞানিক উন্নতির অনেক উদাহরণ সভ্য দুনিয়ার সামনে উপস্থিত করেন। আর তা সম্ভব হয়েছিল একমাত্র তদানীন্তনকালের প্রচলিত শিক্ষা, যে শিক্ষা একমাত্র অলঙ্ঘনীয় শিক্ষা, আদর্শ শিক্ষা ও নির্ভুল শিক্ষা মাধ্যম। তখনই মানুষ সর্বোত্তম, মানুষে, পরিণত হয়। এই প্রসঙ্গে করি গোলাম মোস্তফা, তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'বিশ্বনবী'তে উল্লেখ করেছেন '... যুগ-যুগান্তর ধরিয়া যে মহাসত্যের জন্য, ধরণী প্রতীক্ষা করিয়া আসিতেছিল, যে, বাণী প্রেরণ করিবেন বলিয়া আল্লাহ বহুযুগ পূর্ব হইতেই প্রতিশ্রুতি দিয়া আসিতেছিলেন, সেই বাণী আজ অবতীর্ণ হইল। যে বাণীর আরম্ভই হইল: পাঠ কর অর্থাৎ জ্ঞান লাভ কর। সমগ্র কুরআনের সর্বপ্রথম বিষয়বস্তুই হইল জ্ঞান। (গোলাম মোস্তফা : ২০০:৭৯) বাংলাদেশের অন্যতম দার্শনিক শিক্ষাবিদ প্রফেসর সাইদুর রহমান তাঁর 'An Introduction to Islamic Culture and Philosophy' গ্রন্থে ইসলাম ধর্মে শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেয়ার দৃষ্টান্ত দেখাতে গিয়ে বলেছেন, 'Though himself unlettered (ummi) Muhammad (SM) was the first to realise the necessity of literacy.'
অধ্যাপক রেমন্টের মতে, 'Education means the process of development in which consists the passage of the human body from infancy to maturity, the process whereby he gradually adapts himself in various ways to the physical, social and spiritual environment' (Raymont: 1963:17) শিক্ষা সম্পর্কে ঋকবেদে বলা হয়েছে যে, শিক্ষা মানুষকে আত্মবিশ্বাসী করে তোলে এবং আত্ম-অভ্যাস ব্রতে উদ্বুদ্ধ করে। উপনিষদে বলা হয়েছে যে, শিক্ষা হলো এমনই একটি প্রক্রিয়া যার চূড়ান্ত অর্থ 'মানুষের মুক্তি'। চীনা দার্শনিক কনফুসিয়াসের শিক্ষাতত্ত্বের মূল কথা হলো শিক্ষা নানাগুণে গুণান্বিত উন্নত চরিত্রের 'ভদ্রলোক' তৈরি করবে, 'যে' হীনতা জয় করে সত্য অনুসন্ধানে নিয়োজিত থাকবে। (খাতুন : ১৯৯৯ : ১৪) সক্রেটিস ও প্লেটোর শিক্ষাদর্শনেও ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। সুস্থ দেহে সুস্থ মন তৈরি করার নামই শিক্ষা (Education is the creation of sound mind in a sound body) -অ্যারিস্টটল। শিক্ষা হচ্ছে সঠিক মুহূর্তে আনন্দ ও বেদনা অনুভব করতে পারার ক্ষমতা বা শক্তি (Education is the capacity to feel).
জাতিসংঘও শিক্ষার ধারণায় মানুষের জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে। শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক জাতিসংঘের সংস্থা ইউনেস্কো শিক্ষাকে মানুষের *সর্বজনীন 'গুণাবলির বিকাশ ও মানব উন্নয়নের উপায় হিসেবে গণ্য করে বলেছে, 'Education is the means for bringing about desired changes in behaviours, values and life style, and for promoting public support for the continuing and fundamental changes that will be required if humanity is to alter its course... Education, in short is humanity's best hope and most effective means to the quest to achieve sustainable human development' (উদ্ধৃতি : লতিফ : ২০০৫:৮-৯) সাথে সাথে ইউনেস্কো জীবনযাপনের সকল কর্মকাণ্ডের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান দক্ষতা ও উপলব্ধি অর্জনের নির্দেশনা হিসেবেও শিক্ষাকে গণ্য করেছে। এ প্রেক্ষিতে ইউনেস্কোর ভাষ্য হচ্ছে, 'Edücation is Organized and sustained instruction designed to communicate a combination of Knowledge, skills and understanding valuable for all the activities of life.' (UNESCO: 2002)
জোহান হেনরিকের মতে 'শিক্ষা হচ্ছে মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিসমূহের স্বাভাবিক, সুষম ও প্রগতিশীল বিকাশ।' (Education is natural, Harmonious and progressive development of man's innate power)- পেস্তালৎসি। জন ফেডারিক হারবার্ট বলেন, 'শিক্ষা হচ্ছে মানুষের নৈতিক চরিত্রের বিকাশ সাধন' (Education is the development of moral character) পার্সি নানের ভাষায়: 'শিক্ষা বলতে শিশুর ব্যক্তিসত্তার পরিপূর্ণ বিকাশকে বোঝায় যার সাহায্যে সে নিজের সর্বোত্তম ক্ষমতা অনুযায়ী মানুষের কল্যাণে স্বকীয় অবদান রাখতে পারে।' (Education is the complete development of the individuality of child, so that he can make original contribution to human life according to the best of capacity)
📄 জ্ঞানার্জনমূলক লক্ষ্য
শিক্ষা হচ্ছে মানসিক গুণাবলির অনুশীলন মাত্র। কেউবা মনে করেন, বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের অর্থ শিক্ষা। কিন্তু যারা সমাজের সাধারণ লোক তারা শিক্ষা বলতে বিদ্যার্জনকেই বুঝে থাকেন। অর্থাৎ পুঁথিগত বিদ্যাকে শিক্ষা বলে মনে করে থাকেন। শিক্ষাকে যেভাবেই সংজ্ঞায়িত করেন না কেন, কোনটাকেই যেমন একেবারে বাদ দেয়া যায় না বা উড়িয়ে দেয়া যায় না, তেমনি আবার সেগুলোকে শিক্ষার পরিপূর্ণ সংজ্ঞা বলে গ্রহণও করা যায় না; যেমন অ, আ, বা, তা, সা এগুলোকে আপাতদৃষ্টিতে শিক্ষা বলে ধারণা করা হয় বটে, কিন্তু তাই বলে তাকে সত্যিকারের শিক্ষা বলা যায় না। বরং সেগুলো শিক্ষার উপকরণ মাত্র। আবার কোন কোন জিনিসের নাম বা তার গুণাবলি জানাও পূর্ণ শিক্ষা নয়। কারণ তাকে ঠিকমত কাজে প্রয়োগ করার কৌশল জানা, তাকে প্রকাশ করা ও ভবিষ্যতে বাস্তবক্ষেত্রে তার প্রয়োগের সাফল্য ও নিশ্চয়তা দান করার নামই শিক্ষা। যেমন সেদিনের দিগম্বর যাযাবর বন্য মানুষ অজি পোশাকে-পরিচ্ছদে আর বিভিন্ন সাজ-সজ্জার মাধ্যমে হয়ে ওঠে স্বর্গীয় সুন্দর নর-নারী। সেদিনের গুহাবাসী আজ যার আলোকে চন্দ্রাভিযান, আর গ্রহ থেকে গ্রহতে ছোটাছুটি করছে, যার মাধ্যমে সেদিন যারা পাথরে পাথরে আঘাত করে আগুন জ্বালাত, আজ তারা এগুলোকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে চাকচিক্যময় দালান-কোঠার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করছে। আজ সেসব উপাদান দ্বারা নিজেদের ইচ্ছামত আরাম-আয়েশের সাথে বসবাসের জন্য মনোরম দালানকোঠা আর আকাশচুম্বী অট্টালিকা বানাচ্ছে।
সেদিন তারা চন্দ্র, সূর্যকে শক্তির আধার হিসেবে ঠুকেছে কুর্নিশ, তাকে আজ জয় করে করেছে পদানত দাসানুদাস। যাযাবররা কিভাবে গুহা ছেড়ে পরিপাটি অট্টালিকায় বসবাসে অভ্যস্ত হলো? এসব কিভাবে কী করে সম্ভব হলো? একদিন গাছের ছালই যাদের আভরণ আর পরিধেয় ছিল, গাছের ডালই ছিল যাদের আত্মরক্ষার ঢাল আর প্রতিরক্ষার একমাত্র অস্ত্র, আজ কী করে তা তাদের মিসাইল আর কামান বিধ্বংসী অস্ত্রে পরিণত হলো? কিভাবে স্তরে স্তরে আর ধাপে ধাপে কাকে আশ্রয় করে বৃহত্তম সংস্কৃতি ও সভ্যতা গড়ে তুলল, তাই হলো শিক্ষা। তাই বলা যায়, শিক্ষা হলো জাতির বিবর্তনের মূল উৎস, সজাগ সমাজ গঠনের শক্তিশালী হাতিয়ার। আর সভ্যতা হলো সংস্কৃতির বাহন। একমাত্র শিক্ষাকে কেন্দ্র করেই মানুষ এ পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
সক্রেটিসের মতে 'Knowledge is power by which things are done.' এ জন্য অনেকেই জ্ঞানার্জনকে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হিসেবে গণ্য করেছেন। সক্রেটিসের মতো বেকন ও কমেনিয়াসও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে শিক্ষা লাভের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তাঁরা জীবনের বস্তুগত, সামাজিক, নৈতিক, আত্মিক ও অর্থনৈতিক সকল জ্ঞানকে অপরিহার্য (Sine qua non) বলে বিবেচনা করেছেন। জ্ঞানকে নিছক 'জ্ঞানের জন্য জ্ঞান' হিসেবে না দেখে 'প্রকৃত জ্ঞান' (True knowledge) রূপে দেখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। সে জন্যই সক্রেটিস বলেন, 'One who had true knowledge could not be other than virtuous' (Tengja: 1990-29) সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত ধারণাকে সাধারণত প্রকৃত জ্ঞান হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
📄 নৈতিক চরিত্র গঠনই মূল লক্ষ্য
আজকের আধুনিক পৃথিবী এ কথাই প্রমাণ করছে যে মানুষের শান্তির জন্য প্রধান হুমকি অনুন্নয়ন ও দরিদ্রতাই নয় বরং অনৈতিকতাও একটি বড় সমস্যা। আর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্যই প্রয়োজন Morality, Manner বা Ethics. আর সেই জিনিস মানুষের মধ্যে কেবলমাত্র জাগ্রত করতে পারে ইসলামী শিক্ষা। এ জন্যই মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রথম নাজিলকৃত শব্দটিই ছিল 'ইক্রা'। পৃথিবীর সকল ধর্মই মানুষকে পড়ার ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে এতে কোন সন্দেহ নেই। রাসূল (সা) জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে বলেছেন, তোমরা দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত জ্ঞান অর্জন কর। নোবেল বিজয়ী লিও টলস্টয়কে বলা হয়েছিল, 'জাতীয় উন্নয়নের জন্য আপনি যুবসমাজের প্রতি কিছু বলুন। তিনি বলেছিলেন, আমার পরামর্শ তিনটি- পড়, পড় এবং পড়।'
প্রত্যেক মানুষই তিনটি সত্তার সমন্বয়- দেহ, মন ও আত্মা। এই তিনটি সত্তার সমন্বয়ে এক একজন মানুষের অস্তিত্ব। মানবশিশুর জন্মের পর থেকে ক্রমাগত এবং অব্যাহত পরিচর্যার মাধ্যমে তার দৈহিক বিকাশ ঘটে, নানা সামাজিক কার্যক্রমে তার মন বেড়ে ওঠে আর আত্মার শুদ্ধাশুদ্ধি নির্ভর করে নৈতিকতার পরিগঠনের ওপর। এ জন্যই কবি মিল্টন বলেছেন: Education is the harmonious development of body, mind & soul. দেহ, মন ও আত্মার সুসামঞ্জস্য বিকাশই শিক্ষা। রবীন্দ্রনাথও মিল্টনের কথার প্রতিধ্বনি করেছেন, “মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা।” কোন জাতির সন্তানকে সে জাতির উপযোগী, যোগ্য, দক্ষ, সার্থক ও কল্যাণকামী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার নামই শিক্ষা।
মিসরীয় দার্শনিক Professor Muhammad Kutub তার The Concept of Islamic Education প্রবন্ধে বলেছেন, 'শিক্ষার ক্ষেত্রে ইসলামের কাজ হলো পরিপূর্ণ মানবসত্তাকে লালন করা, গড়ে তোলা এমন একটি লালন কর্মসূচি যা মানুষের দেহ, তার বুদ্ধিবৃত্তি এবং আত্মা, তার বস্তুতগত ও আত্মিক জীবন এবং পার্থিব জীবনের প্রতিটি কার্যকলাপের একটিকেও পরিত্যাগ করে না, আর কোন একটির প্রতি অবহেলাও প্রদর্শন করে না।'
মানুষ বাইরে কিছু কিছু পরিবর্তনও ঘটাতে পারে, কিন্তু ভেতরের মানুষকে সুন্দরতম হিসেবে বিকশিত করতে পারে না। সারাটা দুনিয়া আজ পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার অনুকরণ ও অনুসরণ করে জাতে ওঠার চেষ্টা করছে অথচ পশ্চিম তার গগনচুম্বী উন্নতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দূরতিক্রম্য অগ্রযাত্রা সত্ত্বেও মানবিকতার এক করুণ সঙ্কট (Crisis) মোকাবেলা করছে। শিক্ষাব্যবস্থার অন্তসারশূন্য আয়োজন সেখানে ডিগ্রির পাশাপাশি নৈতিকতাকে স্থান না দেয়ায় দামি দামি ডিগ্রির অভাব হচ্ছে না, ভৌতিক উন্নতি (Physical development) ঘাটতি হচ্ছে না, অর্থবিত্তের অভাব হচ্ছে না। অভাব হচ্ছে চিত্তের, মেধা ও মননের, মানবতাবোধ ও কল্যাণকামিতার, আস্থা ও নির্ভরতার। অথচ শিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল এটা ছিল না। Education does not necessary mean mare acquisition of Degrees and Diplomas. It emphasizes he need for acquisition of knowledge to life a worthy life. শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধুমাত্র কিছু ডিগ্রি বা ডিপ্লোমা অর্জন নয় বরং সম্মানজক জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জন।'
আমরা শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্ম ও নৈতিকতাবিহীন একটি কারখানায় পরিণত করেছি। ফলে আমরা স্কুল-কলেজে এ কথা লিখে রাখলেও প্রকৃতপক্ষে আমরা কোন বাস্তব ফল পাচ্ছি না। মূলত যেখানে ধর্ম উপেক্ষিত সেখানে সকল মহৎ চিন্তা, সৎকর্ম, কল্যাণকামিতা ও কল্যাণধারা অনুপস্থিত। ধর্মবোধ তথা স্রষ্টার প্রতি আনুগত্যই মানুষকে দায়িত্ববোধসম্পন্ন, কর্তব্যনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ, সৎকর্মশীল, জবাবদিহিতা ও বিনীয় হতে শেখায়। বিখ্যাত মনীষী Sir Stanely Hull-এর মতে, 'If you teach your children three R's: Reading, Writing and Arithmetic and leave the fourth 'R' : Religion, then you will get a fifth 'R': Rascality.' অর্থাৎ 'যদি আপনি আপনার শিশুকে শুধু তিনটি 'R' (Reading, Writing, Arithmetic) তথা পঠন, 'লিখন ও গণিতই শেখান কিন্তু চতুর্থ 'R' (Religion) তথা ধর্ম না শেখান তাহলে এর মাধ্যমে আপনি একটি পঞ্চম 'R' (Rascality) তথা নিরেট অপদার্থই পাবেন।
এ ব্যাপারে বার্ট্রান্ড রাসেলের একটি উক্তি উল্লেখযোগ্য। 'তথ্য ও তত্ত্বভিত্তিক জ্ঞান (Informative knowledge) যদি বৃদ্ধি পায়, কিন্তু নৈতিক মানভিত্তিক জ্ঞান ও প্রজ্ঞা (Wisdom) যদি সে অনুপাতে বৃদ্ধি না পায় তাহলে সে জ্ঞান শুধু দুঃখকে বাড়িয়ে দেয়।'
অনেক শিক্ষাবিদই মনে করেন শিক্ষার্থীর নৈতিক চরিত্র গঠনই শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল আদর্শ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার জন্য চরিত্রবান শাসক ও বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিবর্গের সুশিক্ষার কথা বলেছেন, যার মূল লক্ষ্য হলো চরিত্র গঠন। আধুনিককালের অনেক দার্শনিক চরিত্র গঠনে শিক্ষার ভূমিকার ওপর সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। চরিত্রের বিষয়টি মূল্যবোধযুক্ত প্রপঞ্চ হওয়ায় দেশে দেশে চরিত্র গঠনের আদর্শ সম্পর্কে নানা মত রয়েছে। অ্যারিস্টটল মানুষের আচরণের প্রধান দু'টি প্রবণতা চিহ্নিত করেছেন। একটি হলো 'প্রবৃত্তিতাড়িত ও বর্বরতা' এবং অন্যটি হলো 'বুদ্ধিবৃত্তিক ও মানবতা'। তাঁর মতে শেষোক্তটি হলো নৈতিক চরিত্রের ভিত্তি এবং এর বিকাশ সাধন করা হচ্ছে শিক্ষার লক্ষ্য। জার্মান শিক্ষাবিদ জোহান ফ্রিডারিক হার্বার্টের (১৭৭৬-১৮৪১ খ্রিষ্টাব্দ) মতে শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠন হচ্ছে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য। তিনি 'Aesthetic Presentation' শীর্ষক তাঁর গবেষণা কর্মে উল্লেখ করেছেন, 'The one and the whole work of education may be summed up in the concept-morality.' তাঁর মতে আদিম ও নীচু প্রকৃতি অবদমন এবং উন্নত মানসিকতার উৎকর্ষ সাধনই হচ্ছে নৈতিকতা। এভাবে বিভিন্ন চিন্তাবিদ চরিত্রের ধারণা প্রদান করেছেন। তবে এ ক্ষেত্রে সর্বজনস্বীকৃত কোন ধারণা অথবা সংজ্ঞা নির্ধারিত হয়নি। সাধারণভাবে মানবআচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গির কতকগুলো দিককে নৈতিক চরিত্রের অন্তর্গত করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- (ক) জীবনে উচ্চ মূলবোধের উপলব্ধি ও চর্চা (Realization and practice of higher values in life), (খ) মনের প্রশিক্ষণ বা ইচ্ছাশক্তি (Training of mind or will-power), (গ) সুশৃঙ্খল সহজাত প্রবৃত্তি (discipline of instincts) এবং (ঘ) সহজাত প্রবৃত্তিমূলক আচরণকে নৈতিক আচরণে রূপান্তরিত করা (changing instinctive behaviour into moral behaviour)। পূর্বোক্ত শিক্ষাবিদগণ শিক্ষার লক্ষ্য হিসেবে এসব দিকের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন।