📄 রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও চারিত্রিক শুদ্ধতা
তাই এ সকল রাজনৈতিক চেষ্টা ও পরিশ্রমের প্রথম শর্ত হল মানুষের আমল ও চরিত্রের পরিশুদ্ধি এবং চিন্তা ও চেতনায় মধ্যপন্থা ধারণ করা। ঠিক এ কারণেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ২৩ বছরের নবুয়তকালের প্রথম ১৩ বছর শুধু প্রাথমিক এই প্রস্তুতিতেই গিয়েছে। এ সময়ে না কোনো যুদ্ধ- জিহাদ ছিল, না ছিল রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসন সংক্রান্ত কোনো পদক্ষেপ। প্রতিপক্ষ যদি আঘাতও করত, পীড়ন ও যন্ত্রণায় জর্জরিত করত, তবু পালটা হাত ওঠানোর অনুমতি ছিল না। কেবলই সবর ও সয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে বারবার। এই ১৩ বছর ছিল শিক্ষা, পরিচর্যা, আত্মশুদ্ধি ও দীক্ষার কাল।
আত্মশুদ্ধি ও চরিত্র গঠনের সুদীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিয়ে তারা যখন বলীয়ান হয়ে উঠলেন, তখন মাদানি জীবনে গিয়ে যুদ্ধ ও জিহাদ, রাষ্ট্রগঠন ও প্রশাসন পরিচালনার ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে।
হাকিমুল উম্মত রহ. এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে গিয়ে বলেন: দেখুন, এ বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য আমি খুব সূক্ষ্ম একটি কথা বলি। মক্কায় থাকতে মুসলমানদের জিহাদের অনুমতি দেওয়া হল না, অনুমতি দেওয়া হয়েছে মদিনায় যাওয়ার পর। কেন? যারা গভীর থেকে ভাবতে জানে না তারা বলবে, তখন মুসলমান সংখ্যায় কম ছিল, যুদ্ধের হাতিয়ারও ছিল না তেমন। কিন্তু, এ কথা বাস্তবতাবিরোধী। কারণ, মদিনায় গিয়েই কি তাদের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল? কাফেররা তখনো তো প্রবলই ছিল। সমগ্র আরবের বিপরীতে মদিনার সকল মুসলিম মিলিয়ে কজনই বা হবে? বরং শুধু আরব কেন, ইসলামের এ যুদ্ধ তো ছিল পৃথিবীর সকল কাফেরের বিরুদ্ধে। তখন মদিনা কেন, পুরো আরবকেও যদি মুসলমান ধরা হত, তবু তো সংখ্যায় তা নিতান্ত অল্প।
এমনিভাবে মদিনায় গিয়েই কি অস্ত্রশস্ত্র বেড়ে গিয়েছিল? স্বয়ং কুরআন-হাদিসের বক্তব্য থেকেই আমরা দেখি, বেশির ভাগ যুদ্ধেই মুসলিমদের সংখ্যা এত কম ছিল যে, ফেরেশতাদের এসে সাহায্য করতে হয়েছে। এই যে, ফেরেশতা দিয়ে সাহায্য করা, এটা তো মক্কায় থাকতেও সম্ভব ছিল, তবু কেন সেখানে জিহাদের অনুমতি দেওয়া হল না? এ জায়গাটি ভাবনার বিষয়। আমাদের এমন কোনো কারণ বের করতে হবে, যা দিয়ে এ প্রশ্নের উত্তর বের করা সম্ভব। যারা শুধু বাহ্যিক অবস্থা দিয়ে সবকিছু বিচার করেন, তাদের কাছে এর কোনো সদুত্তর নেই।
কিন্তু গভীর জ্ঞানের অধিকারী যারা, তারা বলেছেন, আসল কথা হল—মক্কায় অবস্থানের সময়টিতে সাধারণ মুসলমান তখন পর্যন্ত উত্তম আখলাক, ইখলাস, সবর ও তাকওয়ার সেই কাঙ্ক্ষিত গভীরতাটি লাভ করে উঠতে পারেননি। ফলে, সে সময় যদি জিহাদের অনুমতি দেওয়া হত, তবে পুরো যুদ্ধটিই হত ক্রোধ চরিতার্থ করা ও ব্যক্তিগত প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে। সেখানে ইখলাস থাকত না, আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করার চেতনাও থাকত না। ফলে, তখন তারা আল্লাহর গায়েবি সাহায্য ও যুদ্ধের ময়দানে ফেরেশতাদের সরাসরি সঙ্গ পাওয়ার যোগ্য হতে পারতেন না।
কুরআনুল কারিমে বলা হয়েছে—'হ্যাঁ, অবশ্যই, যদি তোমরা সবর করো এবং তাকওয়ার অধিকারী হও।' এই আয়াতে এ কথাটিই বলা হয়েছে। অর্থাৎ, আল্লাহর সাহায্য তখনই পাওয়া যাবে, যখন মুসলমান গভীরভাবে নিজেদের জীবনে সবর ও তাকওয়া ধারণ করবে। (তাকওয়া মানে কী? মানে হল: আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকা এবং যা করতে আদেশ করেছেন, তা পালন করা। এসবের মধ্যে ইখলাসও অন্তর্ভুক্ত এবং প্রসিদ্ধি, খ্যাতির মোহ, লোক দেখানো ও প্রবৃত্তির আহ্বান থেকে বেঁচে থাকার নির্দেশও অন্তর্ভুক্ত।) মদিনায় যাওয়ার পর তারা নিজেদের চরিত্রে এ ব্যাপারগুলো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। মক্কায় থাকাকালে মুহাজিররা কাফের কর্তৃক যে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন, এর দ্বারা কাফেরদের মোকাবেলায় যুদ্ধ করা তাদের জন্য সহজ হয়ে গিয়েছিল এবং ব্যক্তিগত ক্রোধের বিষয়টিকেও অতিক্রম করে এসেছিলেন খুব ভালোভাবে। তাদের জীবনে আমরা দেখতে পাই মানবিক এই দুর্বলতাটি শুধু শক্তিহীন নয়, বলতে গেলে পুরোপুরিই দূরীভূত হয়ে গিয়েছিল।
এমনিভাবে হিজরত করতে গিয়ে তারা যখন ধনদৌলত, ঘরসংসার, পরিবার পরিজন সবকিছু কোনো ধরনের দ্বিধা ছাড়াই পরিত্যাগ করতে পারলেন, তখন তাদের আল্লাহ-প্রেম পূর্ণ হয়ে আপনরূপে বিকশিত হল। পার্থিব জীবনটি তাদের হৃদয় থেকে বেরিয়ে গেল চিরদিনের জন্য, সম্পূর্ণভাবে। এমনিভাবে মদিনার আনসাররা মুহাজিরদের সাথে যে তুলনাহীন উদার ও সহমর্মিতার আচরণ করলেন, এর দ্বারা আল্লাহর ভালোবাসায় তাদের হৃদয় ভরে উঠতে পেরেছেন এবং পূতপবিত্র হয়ে উঠতে পেরেছেন পার্থিব সমস্ত লোভলালসা থেকে। আমরা দেখি, আনসাররা হাসতে হাসতে নিজেদের জায়গা-জমি, ধন-সম্পদ সব মুহাজিরদের মাঝে বিলিয়ে দিচ্ছেন। বংশীয় ওয়ারিসের মতো আপন করে নিচ্ছেন তাদের।
মোটকথা, হিজরতের ঘটনার মধ্য দিয়ে মুহাজির ও আনসার-দুদলেরই পরীক্ষা হয়ে গিয়েছিল এবং এতে তারা শত ভাগ পাশ করে এসেছিলেন। এরপরই তাদের জিহাদের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কারণ, নিজেকে পরিশুদ্ধ করার এই সুদীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার পর এখন তারা যা করবে, কেবল আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই করবে। ব্যক্তিগত ক্রোধ ও প্রতিশোধপরায়ণতা থেকে নয়। এবং তারা আল্লাহর গায়েবি সাহায্য ও নানা সংকটপূর্ণ সময়ে সরাসরি রহমতের ফেরেশতাদের সঙ্গ লাভের যোগ্য হয়ে উঠবে। সাহাবায়ে কেরামের জীবন দেখলে আমরা এটিই দেখতে পাই—তারা ছোটবড় যা-কিছু করতেন, আল্লাহকে পাওয়ার জন্যই। মসনবি শরিফে আলি রা.-এর একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে: যুদ্ধের ময়দানে তিনি একবার এক কাফেরকে জমিনে ফেলে হত্যা করতে উদ্যত হলেন। এমন সময় লোকটা কী করবে দিশা না পেয়ে তার মুখে থুথু মেরে বসল।
আমাদের সাধারণ বুদ্ধি কী বলে? তিনি লোকটাকে আরও দ্রুত হত্যা করবেন। কিন্তু থুতু দেওয়ার পর হজরত আলি সাথে সাথে লোকটাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। এতে ইহুদি লোকটা খুবই অবাক হল। জিজ্ঞেস করল—এমনটি কেন করলেন? তিনি বললেন, প্রথম যখন তোমাকে হত্যা করতে চাইলাম, তখন আল্লাহ তায়ালাকে সন্তুষ্ট করা ছাড়া আমার আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু যখন তুমি থুতু দিলে, তখন আমার মনের ভেতরে ভীষণ রাগ ও প্রতিশোধের নেশা তৈরি হল। ভেবে দেখলাম এখন যদি তোমাকে হত্যা করি, তাহলে শুধু আল্লাহ তায়ালাকে খুশি করার জন্য হবে না; এখানে ব্যক্তিগত রাগ মেটানোর বিষয়টিও কাজ করবে। আমি চাইনি আমার কোনো কাজ আল্লাহর সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছুর জন্য হোক। তাই তোমাকে ছেড়ে দিলাম। এ কথা শুনে ইহুদি লোকটা সাথে সাথে মুসলমান হয়ে গেল। কারণ, সে বুঝে গেছে সত্য দীন এটিই। এখানে অনুসারীদের হৃদয়ে শিরকের প্রতি এত প্রবল ঘৃণা তৈরি করা হয় এবং এত সূক্ষ্মভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় বিষয়টি যে, এরপর তারা আর কোনো কাজই নফসের তাড়নায় করে না। এমনকি বন্ধুত্ব ও শত্রুতার মধ্যেও নফসের পছন্দ ও অপছন্দকে এড়িয়ে চলে।
কিন্তু বর্তমানে আমাদের অবস্থা কী? যে লোকগুলো দাবি করে আমরা ইসলামের সেবার জন্যই কাজ করছি—অন্য কোনো উদ্দেশ্যে নয়, এদের বেশির ভাগই প্রবৃত্তিপূজায় আক্রান্ত। নিজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজও ফলাও করে প্রচার করে, পত্রিকায়, টেলিভিশনে, বক্তৃতায়। আল্লাহর বিধিবিধানের পরোয়া করে না। তাদের কথা একটাই—কাজ হোক। তা কি আল্লাহর জন্য হচ্ছে নাকি শরিয়তের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, দেখার সময় নেই। চাঁদা কালেকশন করতে গিয়ে জায়েজ নাজায়েজের তোয়াক্কা নেই, আয়-ব্যয়ে নেই হালাল-হারামের বাছবিচার। আমাকে বলুন, এরপরও আল্লাহর সাহায্য কীভাবে আসবে? বড় অদ্ভুত এক মানসিকতা গড়ে উঠেছে যে, আজকাল মানুষ প্রকাশ্যেই বলে—ভাই, এখন কাজ হওয়া দরকার, তা হতে দেন, এত মাসলা-টাসলা নিয়ে আসবেন না। এসব মাসলা-মাসায়েল পরে দেখা যাবে। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই লোকগুলোর খবর নেই যে, মাসআলা-মাসায়েল ছাড়া তো মুসলমানদের না জাগতিক উন্নতি হওয়া সম্ভব, না পরকালীন। আর সবচেয়ে বড় বিষয় হল ইখলাস ও নিয়তের শুদ্ধতা। এখানে তা একেবারেই শূন্যের কোঠায়।¹⁵
এ কথা প্রসিদ্ধ, হাকিমুল উম্মত রহ. হিন্দুস্তানের রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে আলাদা হয়ে থেকেছেন। সে সময়ে এক লোক এসে প্রস্তাব করল—আমরা আপনাকে আমিরুল মুমিনিন হিসেবে মেনে নিলাম। এবার আপনি আমাদের নেতৃত্ব দিন। তিনি প্রথমে স্বাভাবিক যে জবাব দেওয়ার ছিল, তা দিলেন, এরপর বললেন, আমিরুল মুমিনিন হয়ে সর্বপ্রথম যে নির্দেশটি দেব, তা হল—আগামি ১০ বছর সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ। এ সময়ে শুধু মুসলমানদের আত্মিক উন্নতির জন্য প্রচেষ্টা চালানো হবে। এরপর যখন সন্তোষজনক পরিবেশ তৈরি হবে, তখন পরবর্তী নির্দেশ দেব।¹⁶
আমরা যদি বাস্তবতার নিরিখে নিজেদের যাচাই করি, টের পাব হাকিমুল উম্মত রহ. এ কথার মাধ্যমে আমাদের একদম মূল শিরাটিতে হাত দিয়েছেন। বর্তমানে রাজনীতির ময়দানে আমরা যে ব্যর্থ হচ্ছি, এর মূল কারণ এটিই। আমরা মক্কি-জীবনের ১৩ বছর বাদ দিয়ে প্রথম দিন থেকেই মাদানি-জীবনের অনুশীলন শুরু করে দিতে চাই। নিজেদের ঠিক করার আগেই জাতিকে সংশোধনের কাজে কোমর বেঁধে নেমে পড়ি। অথচ, আমরা এটুকুও জানি না এই শুদ্ধি অভিযানের পতাকাটি কীভাবে বহন করতে হবে এবং কীভাবে একে মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরতে হবে। এ কাজের জন্য আমাদের কোনো ধরনের তরবিয়ত ও অনুশীলন পর্যন্ত নেই। আমরা দেখলাম অন্যান্য জনগোষ্ঠী নিজেদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য ঝান্ডা উঁচিয়েছে, অমনি তাদের দেখাদেখি নিজেদেরও উঁচিয়ে ধরেছি। ফলে, পরিণতি দাঁড়িয়েছে এই—আমাদের রাজনৈতিক সকল কর্মকাণ্ড, চেষ্টা ও কর্মপন্থা, পছন্দ ও অপছন্দ বলতে গেলে সবকিছু অন্যদের থেকে ধার করে নেওয়া এবং এগুলো শরিয়তের মানদণ্ডে না মেপেই এই বিভ্রান্তিতে পতিত হয়েছি, ধর্মহীন রাজনীতি যদি এই পন্থায় সফল হতে পারে, ইসলামি রাজনীতিও আপন গন্তব্যে উপনীত হতে পারবে। অথচ বাস্তবতা হল ইসলামি রাজনীতিকে ধর্মহীন রাজনীতির সাথে তুলনা করা খেজুরগাছকে কুয়ার সাথে তুলনা করার মতো!
টিকাঃ
১৫. মাহাসিনে ইসলাম বয়ানসমগ্র: ২৮০, মুলতান সংস্করণ
১৬. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৩: ৭৬, মালফুজ নং: ৮৯
📄 রাজনৈতিক কৌশল ও কিছু কথা
হজরত হাকিমুল উম্মত রহ. নিজের গ্রন্থ ও বিভিন্ন আলোচনায় বারবার এ কথার ওপর জোর দিয়েছেন—ইসলামি রাজনীতিতে শুধুমাত্র উদ্দেশ্যটি নেক ও শরিয়তসম্মত হলেই হবে না; বরং কর্মপদ্ধতি এবং কৌশলগুলোও শরিয়তের নির্দেশনা অনুযায়ী হতে হবে। কেউ যদি শরিয়তের বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে, কুরআন ও হাদিসের বিরুদ্ধাচরণ করে ইসলামি হুকুমত কায়েম করে ফেলবে মনে করে, তাহলে তা নিছক খামখেয়ালিপূর্ণ কাজ। নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছু নয়। এর পরিণতি শুধুই বঞ্চনা। ঘটনাক্রমে যদি ক্ষমতা পেয়েও যায়, তাহলে সেটি ইসলামি হুকুমত হবে না, ইসলামি হুকুমতের নামে বিভ্রান্তি শুধু।
ইসলামে রাজনীতি ও রাষ্ট্রশাসন মৌলিক কোনো উদ্দেশ্য নয়; বরং মূল বিষয় হল শরিয়তের অনুসরণ এবং এর মধ্য দিয়ে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি লাভ। এ বিষয়ে পুস্তিকার শুরুতে থানবি রহ.-এর বিস্তারিত বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে তিনি অত্যন্ত মজবুত দলিল দিয়ে একে প্রমাণ করেছেন। সুতরাং ইসলামি হুকুমত কায়েম করার চেষ্টা করতে গিয়ে শরিয়তের কিছু বিধান উপেক্ষা করাতে কোনো সমস্যা নেই এবং রাষ্ট্রশাসনকে সর্বোচ্চ লক্ষ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তা অর্জনের জন্য শরিয়তের শাখাগত বিভিন্ন বিধানকে কুরবানি করা জায়েজ আছে—এমন চিন্তা কোনোভাবেই ইসলামের সাথে যায় না; বরং সকল মুসলমানের জন্য উচিত হল শরিয়তের গণ্ডির ভেতরে থেকেই চেষ্টা ও সাধনা চালিয়ে যাওয়া এবং সেসব কৌশলই গ্রহণ করা, যেসবের কারণে শরিয়ত লঙ্ঘন করতে না হয়। মুসলমানদের সফলতার গোপন রহস্য শরিয়তকে অনুসরণ করার মধ্যেই নিহিত। এ পথে চললেই আল্লাহ তায়ালা সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। সুতরাং সফলতাও ইনশাআল্লাহ এ পথেই আসবে।
আর যদি ধরেও নেওয়া হয়—শরিয়তের কোনো বিধান পালন করতে গেলে বাহ্যিক কোনো সফলতা হাতছাড়া হয়ে যাবে, তাহলে হোক। মুসলমান এর চেয়ে বেশি কিছু করার জন্য আদিষ্ট নয়। জাগতিক এই ব্যর্থতার দায়ভার তার ওপর বর্তাবে না। আখেরাতেও এর জন্য তাকে কোনো জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হবে না। এদিক-সেদিক না তাকিয়ে সে যদি পূর্ণরূপে শরিয়ত অনুসরণ করে চলতে পারে, এটুকুই তার জন্য পরিপূর্ণ সফলতা। সে প্রতিদানের জন্য যোগ্য হয়ে উঠবে এবং তার জীবনের যে মূল লক্ষ্য তা সর্ব অর্থে অর্জিত হবে।
এজন্য রাজনীতির ময়দানে কাজ করতে গেলে প্রতিটি কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণের আগে সুনিশ্চিত হয়ে নিতে হবে—শরিয়তের দৃষ্টিতে তা জায়েজ নাকি নাজায়েজ? কোনো কৌশল গ্রহণের জন্য শুধু এটুকু যথেষ্ট নয় যে, এটি রাজনীতিতে বিশ্বজুড়ে প্রচলিত ও সমাদৃত। বা এটি রাজনীতিতে অব্যর্থ এক অস্ত্র। বর্তমানে এ ছাড়া রাজনীতি কল্পনাও করা যায় না।
শরিয়তের মূলনীতির আলোকে বিষয়টি যদি নাজায়েজ হয় বা শরয়ি বিশ্লেষণের আলোকে এর মধ্যে অনিষ্টতা ও আপত্তি থাকে, তাহলে বর্তমান রাজনীতি বিশেষজ্ঞগণ একে যতই আবশ্যক ও অবিকল্প হিসেবে দেখুন না কেন, কোনোভাবেই তা গ্রহণ করা যাবে না। কারণ, রাজনীতি আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়; মূল উদ্দেশ্য হল শরিয়তের আনুগত্য ও অনুসরণ। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র জীবন এবং সাহাবায়ে কেরামের ঘটনাবলিতে এমন অনেক উদাহরণ পাওয়া যায়, যেখানে তাঁরা ভীষণ কার্যকরী অনেক কৌশলও পরিত্যাগ করেছেন শুধু এ কারণে যে, এটি শরিয়তের সাথে সাংঘর্ষিক।
বদরের যুদ্ধটি ছিল ইসলামি ইতিহাসের প্রথম যুদ্ধ, যেখানে সত্য ও মিথ্যা যুদ্ধের ময়দানে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল। মুসলমানদের পক্ষে ছিলেন সাকুল্যে তিনশ তেরোজন সৈনিক, অস্ত্র বলতে যাদের তেমন কিছুই ছিল না। এমন ভীষণ পরিস্থিতিতে একজন সৈনিকের মূল্যও অনেক। ঘটনাক্রমে সামান্য একটু শক্তিও যদি বাহিনীতে বৃদ্ধি পেত, তাহলে বিজয় লাভের ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারত। এমন সংকটময় মুহূর্তে হুজায়ফা ইবনে ইয়ামান রা.-এর মতো লড়াকু যোদ্ধা ও তার পিতা এসে মুসলিমবাহিনীতে যোগদানের আবেদন করলেন। কিন্তু নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু এ কারণে তাদের যোগ দিতে বারণ করলেন, মদিনায় আসার পথে কাফেররা তাদের আটক করে ফেলেছিল এবং এ শর্তে মুক্তি দিয়েছিল যে, তারা যুদ্ধে মুসলমানদের সাহায্য করবে না। নবিজি তাদের আবেদন ফিরিয়ে দিয়ে বললেন : আমরা তাদের সাথে কৃত ওয়াদা রক্ষা করব এবং তাদের বিরুদ্ধে আল্লাহ তায়ালার কাছে সাহায্য চাইব।¹⁷
এই যুদ্ধেই একজন মুশরিক নবিজির সাথে যুদ্ধে শরিক হতে চাইল। সে ছিল খুবই অভিজ্ঞ এক যোদ্ধা। লড়াইয়ের কৌশল ও বাহাদুরিতে সবার মাঝে তার প্রসিদ্ধি ছিল। কিন্তু এটা ছিল সত্য-মিথ্যার প্রথম লড়াই। এ লড়াইয়ে কোনো কাফের থেকে সাহায্য নেওয়া ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। সে সময় নির্দেশনা এমনই ছিল—কোনো কাফের থেকে সাহায্য নেওয়া যাবে না। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিলেন। বললেন, ফিরে যাও; আমরা কোনো মুশরিক থেকে সাহায্য নেব না।¹⁸
খোলাফায়ে রাশেদিনের অবস্থান তো অনেক ওপরে, পরবর্তী সাহাবায়ে কেরামও সর্বদা এই মূলনীতিটি অনুসরণ করে चलेছেন। হজরত মুআবিয়া রা.-এর শাসনামলে রোমকদের সাথে একবার শান্তিচুক্তি চলছিল। মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেভাগেই হজরত মুআবিয়া সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করে ফেললেন। এরপর সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথে হামলা শুরু করলেন। রোমকরা আচানক এ আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাই পিছু হটতে লাগল। মুআবিয়া রা. এলাকার পর এলাকা জয় করে সামনে এগোতে লাগলেন। ইত্যবসরে সাহাবি আমর ইবনে আবাসা রা. পেছন থেকে দ্রুত বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে এসে মুআবিয়া রা.-এর পথরোধ করে দাঁড়ালেন। এরপর একটি হাদিস শোনালেন, যার আলোকে এই হামলা বৈধ হয় না। মুআবিয়া রা.-এর ধারণা ছিল, আক্রমণটি যেহেতু শান্তিচুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরই করা হয়েছে, তাই এটা চুক্তিভঙ্গের আওতায় পড়ে না। কিন্তু আবাসা রা.-এর থেকে হাদিসটি শোনামাত্রই কোনো ব্যাখ্যা ও তাবিলের আশ্রয় না নিয়ে বিজিত এলাকা ছেড়ে পুরো বাহিনী নিয়ে সোজা ফিরে এলেন।¹⁹
যে সেনাপতি নিজের সফল একটি কৌশল নিয়ে বিজয়ের নেশায় সামনে এগিয়ে যায়, তার জন্য আক্রমণ থামানোই তো মহা মুশকিল, সে জায়গায় বিজিত এলাকা ছেড়ে দিয়ে পিছু হটা তো অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু মূল লক্ষ্য যেহেতু সিয়াসাত ও রাষ্ট্রশাসন নয়, বরং শরিয়তের আনুগত্য ও অনুসরণ, তাই এ অভিযান অবৈধ হওয়ার বিষয়টি জানামাত্রই তিনি ফিরে এসেছিলেন।
তো, আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এমন অভাবনীয় অতুলনীয় সব উদাহরণে ভরপুর, যাতে মুসলমানরা যত কার্যকর কৌশলই হোক না কেন, এর কারণে শরিয়তের ক্ষুদ্র একটি বিধান লঙ্ঘন করতেও সম্মত হয়নি; বরং সে কৌশলটিই ছুড়ে ফেলেছে।
এজন্য ইসলামি রাজনীতিতে সকল কর্মকাণ্ড শরিয়তের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হওয়া জরুরি। কিন্তু দুঃখজনক হল বর্তমানে এ বিষয়টি কীভাবে যেন সকলের চোখের আড়ালে চলে গেছে। ধর্মের সাথে সম্পর্কহীন প্রচলিত রাজনীতির চিন্তক ও বিশেষজ্ঞরা যে পদ্ধতি ও কৌশল ঠিক করে দেন এবং যেগুলো বিশ্বজুড়ে সমাদৃত রেওয়াজে পরিণত হয়েছে, সেগুলোই ইসলামি রাজনীতিতে গ্রহণ করা হচ্ছে, অথচ এটা দেখার প্রয়োজন মনে করা হচ্ছে না—এ ব্যাপারে শরিয়ত কী বলে? কৌশলটি এবং এর সাথে আবশ্যকীয়ভাবে যুক্ত অন্য সকল বিষয় শরিয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ নাকি নাজায়েজ?
টিকাঃ
১৭. সহিহ মুসলিম, ২:১০৬; সিয়ার, ২:৩৬২-৩৬৩; ইসাবা, ২:২২৩
১৮. জামে তিরমিজি, কিতাবুস সিয়ার, আহলুষ যিম্মাহ ইয়াকযুনা অধ্যায়
১৯. তিরমিজি, আবওয়াবুস সিয়ার, মা জা-আ ফিল গাদরি অধ্যায়।
📄 বয়কট ও হরতাল
উদাহরণত সরকার থেকে নিজেদের দাবি-দাওয়া আদায়ের জন্য আজকাল হরতাল পালন করা হয়। ব্যাপার যদি শুধু এতটুকু হত যে, লোকজন দাবি আদায়ের জন্য স্বেচ্ছায় নিজেদের ব্যবসাবাণিজ্য ও গাড়িঘোড়া বন্ধ করে রাখে, তাহলে অন্যান্য ক্ষতিকর দিক না থাকার শর্তে একে একটি বৈধ কৌশল বলা যেত। এ প্রসঙ্গে হাকিমুল উম্মত রহ. বলেন, বয়কট বা নন কো-অপারেশন—শরিয়তের চোখে একে জিহাদের অংশ বলার সুযোগ নেই। (প্রমাণবিষয়ক আলোচনায় বিষয়টি দেখে নেবেন।) এ বরং স্বতন্ত্র একটি প্রতিবাদ পদ্ধতি, যা মৌলিকভাবে বৈধ।²⁰
কিন্তু এমন হরতাল বা বয়কট, যা সকলে খুশি মনে পালন করে, দুনিয়ায় এর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বেশির ভাগ সময়ই মানুষকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এসবে অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। কেউ অস্বীকৃতি জানালে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়, আর্থিকভাবেও ক্ষতির মুখে ফেলা হয়। পাশাপাশি মারামারি ও বোমাবাজি তো হরতালের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পথঘাটে মানুষ ও গাড়ি চলাচল আটকে দেওয়া হয়, গাড়ি ভাঙচুর হয় অনেক, ব্যবসায়ীরা হামলার ভয়ে দোকানপাট বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়, আর বিশেষ প্রয়োজনে যাদের বাইরে বের হতেই হয়, তারাও সবসময় ভয়ে থাকে কখন কী হয়ে যায়। হরতাল চলাকালীন অনেক নিরীহ মানুষ মারা যায়, অনেক রোগী হসপিটালে যেতে না পেরে কাতরাতে কাতরাতে মারা যায় এবং অনেক দিনমজুর-দরিদ্র মানুষের জীবন অর্থ ও খাদ্য সংকটে পড়ে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে।
এসব বর্তমানে হরতালের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এসব ছাড়া একটি সফল হরতালের কল্পনাও করা যায় না। বোঝাই যাচ্ছে, এগুলো শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ হারাম। আর যে জিনিসটির কারণে এত সব হারাম কাজ করতে হয়, তা জায়েজ হয় কীভাবে? এজন্য হাকিমুল উম্মত রহ. প্রচলিত হরতালকে নাজায়েজ বলতেন। খেলাফত আন্দোলনের সময় যে 'অনশন আন্দোলন' চলছিল, এর মধ্যে হরতালও ছিল। এ আন্দোলনের একটি সিদ্ধান্ত ছিল ব্রিটিশ পণ্য বয়কট করা। ফলে, ব্রিটিশ পণ্য বিক্রি করে এমন দোকানগুলোতে আন্দোলনের পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবক নিযুক্ত করে দেওয়া হত, যাদের কাজ ছিল যেভাবেই হোক ক্রেতাদের সেসব দোকান থেকে ফিরিয়ে রাখতে হবে। একান্ত কিনেই যদি ফেলত কেউ, তখন পণ্য ফেরত দিয়ে আসতে বাধ্য করা হত। এমনকি দোকানদারদেরও বাধ্য করা হত তারা যেন ব্রিটিশ পণ্য না রাখে। যদি কেউ অমান্য করত, তাকে নানাভাবে শায়েস্তা করা হত, লোকটার জীবিকা নির্বাহের অন্য কোনো মাধ্যম আছে কি নেই তা দেখার প্রয়োজন বোধ করা হত না। তার পরিবার কি না খেয়ে মরল, সে নিয়েও কারও ভাবনা ছিল না।
হাকিমুল উম্মত রহ. এমন পদ্ধতির বয়কট নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, এই ঘটনার মধ্যেও অনেকগুলো গুনাহের কাজ জড়িয়ে আছে। এক হল— একটি বৈধ কাজ পরিত্যাগ করতে বাধ্য করা। কারণ, বিশেষ কিছু জিনিস ছাড়া বাকি সকল পণ্য বেচাকেনা আহলে হারব তথা যুদ্ধে লিপ্ত শত্রুদের সাথেও করা জায়েজ, চুক্তির আওতাধীন লোকদের সাথে তো বটেই।
দ্বিতীয়ত, ক্রয়-বিক্রয় চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পর পণ্য ফেরত দিতে বাধ্য করা আরও বড় গুনাহ। কারণ, ‘খেয়ারের শর্ত’ বা পণ্য ফেরত দেওয়ার স্বাধীনতা থাকার শর্ত না থাকলে ফেরত দেওয়াটা মূলত নতুন করে কেনাবেচার মতোই। ফলে, এখানে উভয় পক্ষের সম্মতি আবশ্যক। এ ছাড়া তা জায়েজ হবে না। কিন্তু তৃতীয় পক্ষ এসে বাধ্য করলে সে সম্মতি পাওয়া গেল কীভাবে?
তৃতীয়ত, কেউ এই জবরদস্তি মানতে অস্বীকার করলে তাকে নানাভাবে কষ্টে ফেলা জুলুম। এটা আরেকটা অপরাধ। চতুর্থত, ক্রেতা বা ব্যবসায়ীর পরিবার-পরিজনকে অসুবিধায় ফেলাও গুনাহের কাজ। এটাও জুলুম। পঞ্চমত, একে শরিয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব বলে ঘোষণা করা হলে তা শরিয়ত বিকৃতি হবে।²¹
বয়কটের আলোচনার পর তিনি হরতাল বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, এর মধ্যেও ওপরে তিন নম্বরে উল্লেখিত আপত্তিটি রয়েছে। এবং যদি এই আন্দোলনে শরিক না হলে শারীরিকভাবে কষ্ট দেওয়া হয়, তাহলে এটি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার চেয়েও বড় অপরাধ। ইসলামের রুচি ও দাবির সাথে এ কোনোভাবেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। তা ছাড়া বয়কট ও হরতালে অংশ নিতে বাধ্য করার দ্বারা এই বলপ্রয়োগকারী লোকগুলো নিজেদের পছন্দ করা 'স্বাধীনতানীতি' নিজেরাই ভঙ্গ করে বসে আছে। আর না হয় নিজেদের জন্য স্বাধীনতা চাইতে গিয়ে অন্যের স্বাধীনতায় হাত দেওয়ার কী অর্থ!²²
টিকাঃ
২০. আর-রাওজাতুন নাজিরা, ইফাদাতে আশরাফিয়া দর মাসায়িলে সিয়াসিয়া: ১০
২১. মুআমালাতুল মুসলিমিন, ইফাদাতে আশরাফিয়া: ২৭-২৮
২২. দেখুন-ইমদাদুল ফাতাওয়া, ৬:২০১
📄 আমরণ অনশন
এমনিভাবে দাবিদাওয়া আদায় করার জন্য আরেকটি বিশেষ পদ্ধতি পালন করা হয়—আমরণ অনশন। হাকিমুল উম্মত রহ. এ ব্যাপারে বলেন, গ্রেফতার হয়ে জেলে যাওয়ার পর অনেকে আমরণ অনশন শুরু করে। এটি করতে গিয়ে কেউ কেউ এমনকি জীবন পর্যন্ত দিয়ে দেয় এবং জনগণ তাদের এই প্রাণ উৎসর্গের প্রশংসা করে।
হজরত থানবি রহ.-এর শরয়ি বিধান বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, এ যে আত্মহত্যা এবং নাজায়েজ এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, তোমরা নিজেদের হত্যা কোরো না। হিদায়া গ্রন্থের 'ইকরাহ' অধ্যায়ে বলা হয়েছে : সে গুনাহগার হবে, যেমনটি হয় নিতান্ত ক্ষুধার্ত অবস্থায়। এবং ইনায়া গ্রন্থে বলা হয়েছে : সুতরাং, আহার থেকে বিরত থাকাটি হল হালাল খাবার থেকে বিরত থেকে মারা যাওয়া বা অঙ্গহানি ঘটানোর মতো। ফলে, সে গুনাহগার হবে...
এই বিবরণ থেকে জানা গেল, জান বাঁচানো এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি ফরজ যে, একদম নিরুপায় অবস্থায় যদি মারা যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয় এবং মৃত জন্তু খেলে বেঁচে যাবে বলে মনে করে, তাহলে এমন সময়ে তা না খেয়ে মরে যাওয়া গুনাহের কাজ। সে জায়গায় হালাল খাবার না খেয়ে জীবন দিয়ে দেওয়া তো অবশ্যই গুনাহ। আর, এমন গুনাহের একটি কাজের প্রশংসা করলে তো ইমান চলে যাওয়ারই আশঙ্কা হয়। কারণ, এর দ্বারা স্পষ্টভাবেই শরিয়তকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা হয়। কেননা শরিয়ত যে কাজকে নিন্দনীয় বলেছে, প্রশংসাকারীরা একেই ভালো কাজ বলে প্রশংসায় মেতে উঠছে।²³
অন্য এক জায়গায় বলেন, এই (আমরণ অনশন) আত্মহত্যার নামান্তর। এতে সত্যিই যদি মারা যায়, তাহলে সে মৃত্যু হারাম হবে।²⁴
টিকাঃ
২৩. ইফাদাতে আশরাফিয়া দর মাসায়েলে সিয়াসিয়া: ২৮-২৯
২৪. আল-ইফাদাতুল ইয়াউমিয়া, ৩:৩০, মালফুজ নং: ১৪