📄 উসমানি মুসহাফের অর্থোগ্রাফি
উসমানি মুসহাফের বানানের বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক বই-পুস্তক আছে। বানানের ব্যতিক্রম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনাও আছে অনেক গ্রন্থে। যেমন: আল-মুকনি গ্রন্থে 'বানানে স্বরবর্ণ উহ্য রাখার উদাহরণ' অধ্যায়ের মধ্যে আলিফের উহ্য থাকার উদাহরণ দেখানো হয়েছে। বিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত শুধু উদাহরণই পেশ করে গেছেন লেখক।
তাই সেখান থেকে মাত্র তিনটি উপস্থাপন করছি—
সুরা ও আয়াত উসমানি মুসহাফের বানান মূল উচ্চারণ
২:৯ وما يخادعون وما يخدعون
২:৫১ وإذ واعدنا موسى وإذ وعدنا موسى
২০:৮০ ووعدنكم ووعدنكم
এছাড়া উসমানি মুসহাফে সর্বজনীনভাবে (১৯০টি স্থানে) السموت এবং سموت বানানে আলিফ উহ্য আছে। শুধু সুরা ফুসসিলাতের ১২ নং আয়াতে তা লিখিতরূপে (السموات) প্রকাশ পেয়েছে।[১] বর্তমান মদিনার কিং ফাহাদ কমপ্লেক্স থেকে মুদ্রিত মুসহাফের সাথে আমি এই ব্যতিক্রম উদাহরণটি মিলিয়ে দেখেছি। আমার এই ক্ষুদ্র অনুসন্ধানে নাফি ইবনু আবি নুআইমের উপরিউক্ত তালিকার সাথে কোনো অমিল সেখানে পাইনি।[২] হামজা (,)—সহ বাকি দুটি স্বরবর্ণের ক্ষেত্রেও শক্তিশালী পরিবর্তনের ঝোঁক দেখা যায়। তবে ব্যাপারটি শুধু উসমানি মুসহাফেই সীমাবদ্ধ নয়। সাহাবিদের অনেকেই নিজস্ব মুসহাফ তৈরির ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বানান অনুসরণ করেছেন। দুটি উদাহরণ দেখানো যাক—
» আব্দুল ফাত্তাহ শালাবি কর্তৃক আবিষ্কৃত কুরআনের একটি পুরোনো পান্ডুলিপিতে একই পৃষ্ঠায় ১০ শব্দের দুটি বানান ব্যবহৃত হয়েছে।[৩]
» ভারতের রামপুরের রাযা লাইব্রেরিতে কুফীয় লিপিতে রচিত একটি মুসহাফ রয়েছে। এটি আলি রাযিয়াল্লাহু আনহুর মালিকানাধীন ছিল বলে ধরা হয়। সেখানেও যথারীতি علي-কে علا এবং حتى-এর স্থলে ﺣ ব্যবহার করা হয়েছে। একটি নমুনা দেখাচ্ছি।[৪]
চিত্র: নমুনা পৃষ্ঠা। সূত্র: রামপুর রাযা লাইব্রেরি, ভারত।
মালিক ইবনু দিনার থেকে বর্ণিত, ইকরিমা রাহিমাহুল্লাহ সুরা বনি ইসরাইলের ১০১ নং আয়াতে 'ফাসআল' (فاسأل) উচ্চারণ করতেন। অথচ এর বানান রূপ ছিল ফাসল (فسل)। বর্ণনাকারীর মতে এটি 'কল' (قل) বানানকে কলা (قال) উচ্চারণ করার অনুরূপ।[১] এটি হিজাযি মুসহাফের একটি সংক্ষিপ্তকরণের নমুনা।[২] পড়া ও তিলাওয়াত সম্পূর্ণ মৌখিক পদ্ধতিতে শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল ছিল। এভাবে সংক্ষিপ্ত করার ফলে পবিত্র কিতাবে কোনো বিকৃত আসার প্রশ্নই ওঠে না। শিক্ষকের 'কলু' (قالو) উচ্চারণ শুনে কেউ নিজস্ব রীতি অনুযায়ী 'কলু' (قلوا) লিখল; কিন্তু বলার বেলায় ঠিকই বলল 'ক্কলু' (قالوا)। তাহলে বানানের ক্ষেত্রে বাদ পড়া স্বরবর্ণটি উচ্চারণের ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটায় না।
ইবনু আবি দাউদ এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন, ইয়াজিদ ফারসি বলেছেন, 'উবাইদুল্লাহ ইবনু যিয়াদ মুসহাফে ২ হাজার অতিরিক্ত হরফ যুক্ত করেন। বসরায় এসে এ কথা হাজ্জাজ ইবনু ইউসুফের কানে যায়। তলব করলেন—উবাইদুল্লাহকে কে এগুলো
লেখে দিয়েছে। উত্তর ছিল—ইয়াজিদ ফারসি। হাজ্জাজ ডেকে পাঠালে আমি উপস্থিত হলাম। তিনি যে আমাকে হত্যা করতে চান, এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলাম। উবাইদুল্লাহ কেন অতিরিক্ত ২ হাজার বর্ণ যুক্ত করতে চাইলেন, তা জিজ্ঞেস করা হলো আমাকে। উত্তর দিলাম, “আল্লাহ আপনাকে সঠিক পথে রাখুক। তিনি বসরার অনুন্নত এলাকায় বড় হয়েছেন।” (অর্থাৎ শিক্ষিত এলাকা থেকে দূরে)। সত্য বলেছি বিধায় হাজ্জাজ আমাকে ছেড়ে দেন। উবাইদুল্লাহ মূলত তার মুসহাফের অপ্রমিত বানানগুলো পালটে প্রমিত রূপ লেখানোর ফলে বর্ণ বেড়ে যায়। যথা: قلو থেকে قالوا এবং کنو থেকে كانوا [১]
এখানে সংক্ষেপণের জন্য বাদ দেওয়া স্বরধ্বনিকে পুনঃস্থাপিত করা হয়েছে মাত্র। মূললিপির কোনো বিকৃতি হয়নি। তাই হাজ্জাজের সামনে থেকে ইয়াজিদ ফারসি জীবিত ফিরে আসতে পেরেছিলেন। কুরআনে টি শব্দটি ৩৩১ বার এবং کانوا শব্দটি ২৬৭ বার এসেছে। অর্থাৎ মোট ৫৯৮ বার। উবাইদুল্লাহ যদি উভয় শব্দে দুটি করে আলিফ যুক্ত করেন তবে প্রায় ১২শ অতিরিক্ত বর্ণ যোগ করা হয়। আনুমানিকভাবে এটাকেই ২ হাজার বলা হয়েছে।
ইবনু আবি দাউদের উক্ত বর্ণনায় কিছু সমস্যা রয়েছে। এছাড়া ইসনাদও দুর্বল।[২] তাই আলিমগণের পক্ষ থেকে এই সনদটা প্রত্যাখ্যান করার যথেষ্ট কারণ আছে। তবে তা আসল হলেও উবাইদুল্লাহর বিরুদ্ধে তেমন কোনো অভিযোগ আনা যায় না। বড়জোর নিজের মুসহাফের বানানকে প্রচলিত বানান দিয়ে প্রতিস্থাপিত করেছেন বলা চলে।
আরেকটি উদাহরণ দেখালে ভালো হবে। ৩৯১ হিজরির (১০০০ খ্রিষ্টাব্দ) ইবনুল বাওয়াবের মুসহাফের সাথে ১৪০৭ হিজরির (১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) মদিনার মুসহাফের একটি তুলনা দেখাচ্ছি।
ইবনুল বাওয়াবের মুসহাফ মুসহাফে মদিনা
أبصارهم أبصرهم
شيإطينهم شياطينهم
طفيا نهم طفينهم
ظلمات ظلمت
সুরা বাকারার শুরুতেই এই চারটি উদাহরণ পরিলক্ষিত হয়। বর্তমানে সকল মুসহাফ উসমানি বানানরীতি অনুসরণ করে। যেমন: এ শব্দটিকে উসমানি অর্থোগ্রাফি অনুযায়ী এ লেখা হয়। তবে 'মিম'-এর পর একটি ছোট 'আলিফ' দ্বারা বর্তমান পাঠকের জন্য উচ্চারণ পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। একইভাবে কিছু আয়াতে এখনও এা-কে লেখা হয়।[১] এর দ্বারা বোঝা যায় উসমানি শাসনকালে এ রীতির প্রচলন ছিল। উভয় প্রকার সংক্ষেপণকে অন্তর্ভুক্তির সুযোগ করে দিয়েছিলেন খলিফা।
আধুনিক যুগেও অনুলিপি ছাপানো হয় উসমানি অর্থোগ্রাফির ভিত্তিতে। ফলে ইসলামের প্রথম শতাব্দীর বানানরীতির প্রচুর দলিল পাওয়া যায়। উসমানি অর্থোগ্রাফি থেকে বিচ্যুত না হওয়ার এ প্রবণতা অবশ্য নতুন কিছু নয়।
ইমাম মালিকের (মৃত্যু: ১৭৯ হিজরি) কাছে ফতোয়া চাওয়া হয়েছিল নতুন বানান অনুযায়ী মুসহাফ পুনঃসজ্জিত করা যায় কি না, এ বিষয়ে। তিনি এর বিরোধিতা করেন। শুধু বাচ্চাদের ক্ষেত্রে বানান শেখানোর জন্য এর অনুমতি দেন। আরেক জায়গায় ইমাম আদ-দানিও বলেছেন, ইমাম মালিকের যুগ থেকে তার যুগ পর্যন্ত সকল আলিম একই মতাদর্শ লালন করেছেন।[২]
سئل مالك عن الحروف تكون في القرآن مثل الواو والألف أترى أن تغير من المصحف إذا [0] وجدت فيه كذلك؟ قال: لا. قال أبو عمرو : يعني الواو والألف الزائدتين في الرسم، المعدومتين في اللفظ، نحو الواو في «الربوا وشبهه، ونحو الألف في ... أو لا أذبحنه ... وشبهه، وكذلك الياء في نحو ... «أفاين مت» وما أشبهه.
উহ্য থাকা কিছু স্বরধ্বনি সরিয়ে ফেলা প্রসঙ্গেও ফতোয়া চাওয়া হয় ইমাম মালিকের কাছে। তিনি নিষেধ করে দেন। ইমাম আবু আমর আদ-দানি বলেছেন, 'এখানে উহ্য ও অতিরিক্ত ওয়াও এবং আলিফের কথা বলা হচ্ছে। যেমন: الربوا-এর و )ওয়াও(,
১- أو لا أذبحنه (আলিফ) এবং مت أفاين-এর ইয়া)। এর দ্বারা বোঝা যায়, ইমাম মালিক প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে কোনো ধরনের সংস্কারের পক্ষপাতী ছিলেন না। নিজেদের প্রতিলিপিতে লিপিকাররা বিভিন্ন নিয়ম অনুসরণ করলেও তা উসমানি রীতির ওপরে কখনোই প্রাধান্য পায়নি।
টিকাঃ
১. আদ-দানি, আল-মুকনি, পৃষ্ঠা: ২২, ২৭
২. বিশ্বজোড়া প্রসিদ্ধ অনুলিপিটি উসমানি মুসহাফের একটি অন্যতম বিশুদ্ধ মুদ্রণ। এর জন্য কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন এবং একান্ত কৃতজ্ঞতা।
৩. আশ-শালাবি, রাসমুল মুসহাফ, পৃষ্ঠা: ৭২-৭৩। একইভাবে আলকামার মুসহাফে অনেক ক্ষেত্রে আলিফের পাশাপাশি ইয়া ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন: حتا এবং حتى)। আমি নিজেও প্রথম শতাব্দীর একটি মুসহাফে একই পৃষ্ঠায় অভিন্ন শব্দের দুটি ভিন্ন বানান লক্ষ করেছি।
৪. একই মুসহাফে আরও নমুনা রয়েছে। সেগুলোর জন্য দেখতে হবে—Dr. W.H. Siddiqui and A.S. Islahi, Hindi-Urdu Catalogue of the exhibition held on the occasion of the celebration of the 50th Anniversary of India's Independence and 200 years of Rampur Raza Library, 2000, Plate No. 1.
৫. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১০৫। শিক্ষক ও ছাত্ররা ইসনাদ বা সরাসরি নবিজির কাছ থেকে প্রাপ্ত বর্ণনা অনুযায়ী পড়াতে, পড়তে এবং শিখতে বাধ্য ছিল। উসমানি টেক্সটের বাইরেও পড়ার উপায় ছিল না।
৬. E. Deroche and S.N. Noseda, Sources de La transmission manuscrite du texte Coranique, Les manuscrits de style higazi, Volume 2, tome 1. Le manuscrit Or. 2165 (f. 1 a 61) de La British library, Lesa, 2001, p. 54a.
৭. ইবনু আবি দাউদ, আল-মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ১১৭
৮. দ্বাদশ অধ্যায়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে।
৯. সুরা মুমিনিন, আয়াত: ১১২, ১১৪; সুরা যুখরুখ, আয়াত : ২৪ দ্রষ্টব্য
১০. আদ-দানি, আল-মুকনি, পৃষ্ঠা: ১৯; তবে যুগের বানানরীতির অনুসরণে মুসহাফ লিপিবদ্ধ করার ব্যাপারে কিছু আলিম মত দিয়েছেন। যেমন: ইমাম ইয ইবনু আব্দিস সালাম (যারকাশি, বুরহান, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৩৭৯)। ইবনু খালদুনও পরিবর্তনের পক্ষে বলেছেন (শালাবি, রাসমুল মুসহাফ, পৃষ্ঠা : ১১৯); আবার হিফনি নাসিফ কোনো পরিবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন না (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১৮); আল-আযহার ফতোয়া বোর্ডও উসমানি অর্থোগ্রাফি অনুসরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে (প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা: ১১৮); সৌদি আরবের প্রধান কমিটি ১৯৭৯ সালে পূর্ববর্তী নিয়মের পক্ষে থেকেছেন; ওয়ার্ল্ড মুসলিম লিগও অনুরূপ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে (আল-ফিনাইসান (সম্পাদিত), আল-বাদি, ভূমিকা, পৃষ্ঠা: ৪১)।
১১. আদ-দানি, আল-মুকনি, পৃষ্ঠা: ৩৬
📄 গাঠনিক নুকাত এবং উচ্চারণ চিহ্ন পদ্ধতির উৎস
বর্ণমালা ও সহায়ক চিহ্নের ইতিহাস বিশেষজ্ঞ ফাদার ইউসুফ সাইদের ধারণা মতে নুকাতের প্রচলন সিরিয়াকরা শুরু করে।[১] মূলত এখানে গাঠনিক নুকাতের কথা বলা হয়েছে। উচ্চারণ চিহ্নের ক্ষেত্রে এটি প্রযোজ্য নয়। কিন্তু আল-মুহকাম ফি নাকতিল মাসাহিফ গ্রন্থে ড. ইজ্জাত হাসান উচ্চারণ চিহ্নকেও সিরিয়াকদের সাথে জুড়ে দেন। তার মতে সিরিয়াকরা ব্যাকরণ ও নুকাতের ব্যবহার আগে এনেছে। আরবরা সব গ্রহণ করেছে তাদের কাছ থেকে।[২] এর জন্য তিনি ইতালীয় প্রাচ্যবিদ গুইদি, আর্চবিশপ ইউসুফ দাউদ, ইজরাইল উইলফিনসন এবং আলি আব্দুল ওয়াহিদ আল-ওয়াফির মতও উদ্ধৃত করেন। শেষের জন কেবল আগের ব্যক্তিবর্গের কথা পুনরায় আওড়িয়ে গেছেন। ড. ইবরাহিম জুমাও উইলফিনসনকে উদ্ধৃত করার সময় সিরিয়াকদের কাছ থেকে আরবদের ধার করার সুরে কথা বলেন।[৩]
অনেকেই একই পথে হেঁটেছেন, যাদের মধ্যে আছেন রেভারেন্ড মিঙ্গানাও। তার মতে, 'আরবি স্বরবর্ণের সর্বপ্রথম উদ্ভাবক সম্পর্কে ইতিহাসে কিছু জানা যায় না। এ প্রসঙ্গে আরবীয় লেখকদের বক্তব্য এতটাই মূল্যহীন—তা উল্লেখের উপযোগী নয়।'[৪]
৪৫০-৭০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে সিরিয়াক শিক্ষা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো একটি পদ্ধতির অনুসরণে চলত। এ কথা উল্লেখপূর্বক তিনি বলেন, 'আরামীয় স্বরবর্ণকে ভিত্তি করে আরবি স্বরবর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। স্বরবর্ণগুলোর নামই এ কথার অকাট্যতার প্রমাণ। যেমন: ফাতহ এবং ফাতাহা।'[৫] তার মতে, অষ্টম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের আগে আরবদের মাঝে উক্ত পদ্ধতির প্রচলন ছিল না এবং[৬] বাগদাদের বিখ্যাত হুনাইন রচিত সিরিয়াক ব্যাকরণ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আরবরা এর সাথে পরিচিত হয়।[৭]
সিরিয়াক বর্ণমালায় শুধু দুটি বর্ণে গঠনগত নুক্তা রয়েছে—দলাথ (দাল) ও রিশ (রা)। অথচ আরবি ভাষায় নুক্তাযুক্ত বর্ণ রয়েছে মোট ১৫টি। এতগুলো নুক্তা সিরিয়াক থেকে আমদানি করার দাবি আসলে খুব একটা যুক্তিযুক্ত নয়। প্রাক-ইসলামি যুগ থেকেই স্পষ্ট নুক্তার ব্যবহারের প্রমাণ আমরা পেয়েছি। খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতক থেকেই এর প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি তৃতীয় শতাব্দীতেও হয়ে থাকতে পারে তা।[১]
এখন সিরিয়াকের উচ্চারণ চিহ্নের দিকে লক্ষ করা যাক। এর দুটি সেট রয়েছে। দামেশকের বিশপের মতে—
'ইয়াকুব (Jacob of Raha) বেঁচে থাকাকালীন সিরিয়াকে কোনো প্রকার উচ্চারণ চিহ্ন ছিল না। এ কথা নিশ্চিত। তিনি অষ্টম খ্রিষ্টীয় শতকের শুরুর দিকে মারা যান। গ্রিক স্বরধ্বনি এবং নুকাত পদ্ধতিও তাতে অনুপস্থিত ছিল।'[২]
আবার ডেভিডসনের মতে[৩] সপ্তম খ্রিষ্টীয় শতকে ইয়াকুব (মৃত্যু : ৭০৮ খ্রিষ্টাব্দ) প্রথম সেট এবং অষ্টম শতকে থিওফিলাস দ্বিতীয় সেটটি (গ্রিক স্বরবর্ণ) উদ্ভাবন করেন। সপ্তম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর শেষ মানে ৮১ হিজরি এবং অষ্টম শতাব্দীর শেষ মানে ১৮৪ হিজরি। তাহলে কে কার থেকে ধার করেছে? ডেভিডসনের মত অনুযায়ী পাল্লা দুদিকেই ঝোঁকার সম্ভাবনা আছে। কয়েকটি লিপি যাচাই-বাছাই করে ব্যাপারটা খোলাসা করা সম্ভব। নিচের চিত্রে কয়েকটি সিরিয়াক স্বরবর্ণের উদাহরণ উপস্থাপন করা হলো।[৪]
ইয়াকুবের ব্যবহৃত চিহ্নগুলো কুরআনের উচ্চারণ চিহ্নের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এদিকে আরবি তাশকিলের উদ্ভাবক আবুল আসওয়াদ দুয়ালি ৬৯ হিজরি অর্থাৎ ৬৮৮ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান। মুয়াবিয়ার খিলাফতকালে (৫০ হিজরি/৬৭০ খ্রিষ্টাব্দ) সম্পূর্ণ মুসহাফে তাশকিল যুক্ত করার কাজ সম্পন্ন করেন তিনি। তাহলে ধার মূলত কে কার থেকে করেছে তা পরিষ্কার বোধগম্য হওয়ার কথা।
প্রায় ৬০০ বছর ধরে সিরিয়াকরা কোনো উচ্চারণ চিহ্ন ছাড়াই বাইবেল লিপিবদ্ধ করত। তারা ৪৫০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে চালু থাকা নিসিবিস বিদ্যাপীঠ এবং অন্যান্য শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বড়াই করে। অথচ সপ্তম শতাব্দীর শেষভাগ/অষ্টমের শুরুর আগে তাদের নিজস্ব কোনো উচ্চারণ চিহ্ন ছিল না। আর আবুল আসওয়াদ দুয়ালি তার কাজ সমাপ্ত করেন সপ্তম শতকের তিন-চতুর্থাংশের মধ্যেই। রাহার ইয়াকুব যে মুসলিমদের কাছ থেকে চিহ্নপদ্ধতি ধার করেছেন, তা যৌক্তিক বিবেচনায় ধরা পড়ে যায়। ডেভিডসনের মত গ্রহণ করলে এ যুক্তি খাটে। আর দামেশকের বিশপের মত অনুসরণ করলে তো সেটারও প্রয়োজন নেই।
আরবরা খ্রিষ্টীয় অষ্টম শতাব্দীর অর্ধেক পর্যন্ত এ পদ্ধতি জানত না বলে মিঙ্গানা যে মত দিয়েছেন, তার বিপরীতে নিচের পয়েন্টগুলো লক্ষণীয়-
> ইবনু সিরিনের (মৃত্যু: ১১০ হিজরি/৭২৮ খ্রিষ্টাব্দ) কাছে ইয়াহইয়া ইবনু ইয়ামারের (মৃত্যু: ৯০ হিজরি/৭০৮ খ্রিষ্টাব্দ) নুকাত যুক্ত মূল মুসহাফ ছিল।[১]
> ইবনু সিরিনের কিরাত অনুসরণ করে খালিদ আল-হাজ্জা একটি নুকাতযুক্ত মুসহাফ থেকে তিলাওয়াত করতেন। [২]
এদিকে সিরিয়াক ব্যাকরণ গড়ে উঠেছে হুনাইন ইবনু ইসহাকের (১৯৪-২৬০ হিজরি/৮১০-৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দ)[৩] হাত ধরে। আরবি ব্যাকরণের ওপর হুনাইনের গবেষণাগ্রন্থের কোনো প্রভাব ছিল না। কারণ হুনাইনের জন্মের বহু আগে আরবির সবচেয়ে বড় ব্যাকরণবিদ সিবাওয়াইহ (মৃত্যু: ১৮০ হিজরি/৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) মৃত্যুবরণ
করেনাম। মূলত হুনাইন নিজেই ছিলেন ইসলামি সভ্যতার ফসল। তিনি বসরা থেকে আরবি শিখেছেন। তার শিক্ষক বিখ্যাত মুসলিম অভিধানবিদ খলিল ইবনু আহমাদ ফারাহিদির (১০০-১৭০ হিজরি/৭১৮-৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দ) ছাত্র ছিলেন।[২]
টিকাঃ
১. S. al-Munaggid, Etudes de Paleographic Arabe, p. 128. উল্লেখ্য, সিরিয়াকদেরকে গাঠনিক নুকাতের প্রচলনকারী হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানে মুনাজ্জিদ আপত্তি জানিয়েছেন।
২. ইজ্জাত হাসান (সম্পাদিত), আল-মুহকাম ফি নাকতিল মাসাহিফ, পৃষ্ঠা: ২৮-২৯
৩. ইবরাহিম জুমা, দিরাসাতুন ফি তাতাউয়িরিল কিতাবাতিল কুফিইয়া, পৃষ্ঠা : ১৭, ২৭, ৩৭২, প্রকাশকাল : ১৯৬৯
৪. A. Mingana and A.S. Lewis, Leaves from Three Ancient Qurans Possibly Pre-Othmanic: with a list of their variants, Cambridge Univ. Press, 1914, p. xxxi.
৫. ibid, p. xxx.
৬. অর্থাৎ ১৫০ হিজরি থেকে এর পরবর্তীকাল। কারণ ৭০০-৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দ মানে ৮১-১৮৪ হিজরি।
৭. Mingana and Lewis (eds.), Leaves from Three Ancient Qurans, p. xxxi.
৮. নবম অধ্যায়ে এ নিয়ে আলোচনা হয়ে গেছে।
৯. ইবনু সিরিন, তার নুকাতযুক্ত মূল মুসহাফ (আদ-দানি, আন-নাক্ত, পৃষ্ঠা : ১২৯) ইয়াকুব (Jacob of Raha) বেঁচে থাকাকালীন সিরিয়াকে কোনো প্রকার উচ্চারণ চিহ্ন ছিল না। এ কথা নিশ্চিত। তিনি অষ্টম খ্রিষ্টীয় শতকের শুরুর দিকে মারা যান। গ্রিক স্বরধ্বনি এবং নুকাত পদ্ধতিও তাতে অনুপস্থিত ছিল। (B. Metzger, The Text of the New Testament, p. 12.) আবার ডেভিডসনের মতে সপ্তম খ্রিষ্টীয় শতকে ইয়াকুব (Jacob of Raha, মৃত্যু : ৭০৮ খ্রি.) প্রথম সেট এবং অষ্টম শতকে থিওফিলাস দ্বিতীয় সেটটি (গ্রিক স্বরবর্ণ) উদ্ভাবন করেন। (I. F. Davidson, ‘The Arabic Language and Its Relation to the Hebrew and Aramaic’, in G. Birman (ed.), The Encyclopaedia of Islam, vol. 1, p. 384.)
১০. আদ-দানি, আন-নাক্ত, পৃষ্ঠা : ১২৯
১১. আদ-দানি, আল-মুহকাম, পৃষ্ঠা : ১৩
১২. হুনাইন ইবন ইসহাক হিরায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার ছিল খ্রিষ্টান এবং সিরিয়াক ভাষী। প্রথাবিরোধী স্বভাবের হওয়ায় তাকে বিশপ থিওডোসিয়াস ঈশ্বর বিরোধী সন্দেহে গির্জা থেকে বহিষ্কার করেন... (J. Rusfa, 'Hunain bin Ishak', Encyclopaedia of Islam, First edition, EJ. Brill, 1927. p. 336)
১৩. সিবাওয়াইহ (আনুমানিক ১৩৫-১৮০ হিজরি/৭৫২-৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দ) আরবি ব্যাকরণের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ছিলেন। আল-কিতাব নামক বিশাল গ্রন্থটি তারই রচিত। (কাহহালা, মুজামুল মুওয়াল্লিফিন, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৫৮৪)
১৪. কাহহালা, মুজামুল মুওয়াল্লিফিন, খন্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৬৬২
📄 সাধারণ আরবি লিপিতে তথাকথিত অর্থো এবং পালিওগ্রাফিক ব্যতিক্রম
সাধারণ আরবি এবং কুরআনের আরবির জন্য কীভাবে দুটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করা হতো, তা আগেই দেখান হয়েছে। উভয় লিপির মধ্যকার পার্থক্য এবং উসমানি মুসহাফে আধুনিক বানান প্রয়োগের বিরুদ্ধে ফতোয়া জানতে পেরেছি; কিন্তু অন্যান্য গ্রন্থগুলোর কী হলো? আরবি পালিওগ্রাফি এবং অর্থোগ্রাফির পরিবর্তন কী প্রভাব ফেলেছিল সেগুলোর ওপর?
চিত্র: ২২৭ হিজরির একটি সাধারণ আরবি লিপি। সূত্র: R.G. Khoury, Wahb b. Munabbih, Plate PB 9.
এই পাণ্ডুলিপি[৩] থেকে খোওরি কিছু বৈচিত্র্যময় বানান খুঁজে পেয়েছেন। যেমন:
| প্রাপ্ত লিপি | আধুনিক বানান | প্রাপ্ত লিপি | আধুনিক বানান | প্রাপ্ত লিপি | আধুনিক বানান |
|---|---|---|---|---|---|
| اعدى | أعداء | سفهاء | سفها | المرأة | المرة |
| نساكم | نساءكم | هولاء | هولی | جاءك | جاك |
তلا تلی
أوحى اوحا
اقرأ اقری
البلاء البلى
ضلت ظلت
ضحی ظحا
আরও কিছু উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা আছে। যেমন: -এর স্থলে لِ লেখা হয়েছে। আবার ا-এর স্থলে قُری বানান করা হয়েছে। প্রথম ক্ষেত্রে 'ق' এবং দ্বিতীয়টিতে নুকাতের ব্যবহার অনুপস্থিত।
চিত্র: ২৫২ হিজরির একটি সাধারণ আরবি লিপি। সূত্র: Leined University Library, manuscript no. Or. 298, f. 239b.
চিত্রে আবু উবাইদের গারিবুল হাদিস গ্রন্থের একটি পৃষ্ঠা দেখা যাচ্ছে। এই পাণ্ডুলিপির মধ্যে অসংখ্য তথাকথিত ব্যতিক্রম নুকাত রয়েছে। [১] -এর ওপর ১ম, ২য় এবং ৪র্থ লাইনে কোনো নুক্তা নেই; ৩ ও ৪র্থ লাইনে আবার এর নিচে নুক্তা রয়েছে; শেষ লাইনে এর ওপর দুটি নুক্তা দেওয়া। আবার ي [২]- বর্ণে তৃতীয় লাইনে কোনো নুক্তা নেই; শেষ লাইনে এর আকার কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে; অষ্টম লাইনে নিচে দেখা যাচ্ছে দুটি নুক্তা। একই পাতায় তিনটি 'ব্যতিক্রম'। এর অনুলেখক কেবল একজন। একই বর্ণকে
একেকবার একেক রূপে লেখার দ্বারা সবগুলোর গ্রহণযোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আগেও আমরা و , /-এর ক্ষেত্রে এমনটি দেখেছি। মূলত পুরো বিষয়টিকে ব্যতিক্রম মনে করাটাই ধারণাপ্রসূত। কারণ উভয়টিই যদি তখনকার প্রচলিত পদ্ধতি হয়ে থাকে, তাহলে লেখকের ওপর কোনোভাবেই অসামঞ্জস্যতার অভিযোগ আরোপ করা যায় না। এই উদার লিখনরীতির কারণ খোঁজাটাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। ইসলামি নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি শিক্ষার্থীকে অবশ্যই একজন শিক্ষকের সান্নিধ্যে শিক্ষার্জন করতে হবে। শিক্ষকের কাছে না গিয়ে নিজে নিজে অধ্যয়ন করে আলিম হওয়ার সুযোগ নেই। এই মৌখিক শিক্ষা পদ্ধতিতে শিক্ষক নিজেই তার লেখার অনিয়মিত অংশের ব্যাখ্যা প্রদান করতেন। কাজেই বিকৃতির কোনো সুযোগই ছিল না তাতে।
মুসহাফের বানান এবং নুকাত পদ্ধতি-সংক্রান্ত অসাধারণ সব দলিল-প্রমাণ রয়েছে। এর মধ্যে বিশেষ কয়েকটি হলো—
> আবু আমর আদ-দানি (৩৭১-৪৪৪ হিজরি), কিতাবুন নাক্ত, আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো
> আল-মুহকাম ফি নাক্তিল মাসাহিফ, আদ-দানি, ড. ইযযাত হাসান সম্পাদিত, দামেশক, ১৩৭৯ (১৯৬০)
আগ্রহী পাঠকগণ আল-ফুনাইসান সম্পাদিত আল-বাদি ফি রসমি মাসাহিফি উসমান (পৃষ্ঠা: ৪৩-৫৪) গ্রন্থের ভূমিকা পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে ৮০টি দলিল উপস্থাপন করা হয়েছে আলোচ্য বিষয়ের ওপর। এর মূল উদ্দেশ্য হলো উসমানি রীতি সম্পর্কে পাঠকদের ধারণা দেওয়া। তারা যেন এগুলোকে ত্রুটিযুক্ত বা অপূর্ণ মনে না করে। আধুনিক এবং সপ্তদশ শতাব্দীর ইংরেজির অবস্থা আমরা দেখেছি। বিশাল ব্যবধান রয়েছে দুইয়ের মধ্যে। সেটিকে যদি স্বাভাবিক পরিবর্তন বলি এবং ত্রুটি হিসেবে না ধরি, তাহলে একই নীতি আরবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
টিকাঃ
১. Raif G. Khoury, Wahb b. Munabbih, Otto Harrassowitz-Wiesbaden, 1972, p. 22-27.
২. এগুলো আংশিক কিছু উদাহরণ। আরও বহু রয়েছে। ডা গোয়ে এই পান্ডুলিপিতে আরও অনেক ব্যতিক্রম খুঁজে পেয়েছেন (MJ. de Goeje, 'Beschreibung einer alten Handschrift von Abu 'Obaida's Garib-al-hadit', ZDMG, xviii: 781-8007 as quoted in Levinus Warner and His Legacy (Catalogue of the commemorative exhibition held in the Bibliotheca Thysiana from April 27th till May 15th 1970), El. Brill. Leiden, 1970, p. 75-76)
৩. এই "ইয়া লেখার ক্ষেত্রে লেখক দুই রকমের গঠন ব্যবহার করেছেন। তৃতীয় এবং শেষ লাইন দ্রষ্টব্য।
📄 অধ্যায় শেষে
নুকাতের ব্যবহার প্রাক-ইসলামি আরবে প্রচলিত ছিল। আর উচ্চারণ চিহ্ন মুসলিমদেরই আবিষ্কার। কিন্তু উসমানি মুসহাফে কোনোটিই নেই। সম্পূর্ণ নুকাত এবং হরকতবিহীন থাকায় তা মনোনীত শিক্ষক ছাড়া নিজে নিজে পড়া অসম্ভব ছিল। এতে করে এমন একটি পদ্ধতি দাঁড়িয়ে যায়, কেউ নিজস্ব তরিকায় পড়তে গেলেই জনসম্মুখে ধরা পড়ে যাবে। মুসহাফে এসব অতিরিক্ত বিষয়াদি যুক্ত না করার ব্যাপারে ইবন মাসউদও সম্মতি দেন। পরে ইবরাহিম নাখয়িও একই পথ অনুসরণ করেন। তিনি একবার
একটি সুরার শুরুতে 'অমুক সুরার শুরু' লেখা দেখে তা অপসারণের নির্দেশ দেন। ইয়াহইয়া ইবনু কাসির বলেছেন, 'মুসলিমরা সর্বপ্রথম নুকাতকে মুসহাফের সাথে যুক্ত করে। তাদের মতে এতে করে পাঠ্য আরও সহজে পঠনযোগ্য হয়। তারপর এল আয়াত পৃথকীকরণ চিহ্ন এবং সবশেষে সুরার শুরু ও শেষ নির্দেশক।'[১]
সম্প্রতি কুরআনি অর্থোগ্রাফি সম্পর্কে একটি বিরূপ মন্তব্য চোখে পড়ে। আগের নিয়মের পরিবর্তে বর্তমান আরবি গঠনপ্রণালি গ্রহণ করতে বলা হয়েছে সেখানে। আর উসমানি মুসহাফের লিপিকারদের রীতিকে বলা হয়েছে মূর্খদের নির্বুদ্ধিতা। আমি এর সাথে পুরোপুরো অসম্মতি জ্ঞাপন করছি। এটি বরং মন্তব্যকারী এবং কিছু প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের নির্বুদ্ধিতা।
কারণ তারা ভুলে গেছে-ভাষা সময়ের সাথে রূপান্তরিত হয়। বর্তমান আরবি গঠনপ্রণালি গ্রহণ করার কয়েক শতাব্দী পর অন্যরাও যে তাদের অবদানকে মূর্খদের নির্বুদ্ধিতা বলে অভিহিত করবে না-এর নিশ্চয়তা কী? অথচ মহাবিশ্বের ১৪শ বছরের কোনো পরিবর্তন একটি কিতাবের মৌলিকতায় কোনো আঁচড়ই কাটতে পারল না। এটি যে আল্লাহর প্রেরিত শব্দ সমাহার এবং তিনিই যে এর রক্ষাকর্তা, তার প্রমাণ কুরআন নিজেই। এত দীর্ঘ সময় ধরে এর বিশুদ্ধতা এবং পবিত্রতা অটুট রয়েছে, বাইবেলের মতো টানাহ্যাঁচড়া [২] এর সাথে করা যায়নি।
টিকাঃ
১. ইবনু কাসির, ফাযায়িল, খণ্ড: ৭, পৃষ্ঠা: ৪৬৭
২. বাইবেলের বিকৃতি সম্পর্কে ১৫ এবং ১৭ অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।