📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 উদ্দেশ্য বা নিয়তের যথার্থতা

📄 উদ্দেশ্য বা নিয়তের যথার্থতা


কোরআনের পর্যালোচনার ব্যাপারে সর্বপ্রথম বিষয়- যেমন পূর্ববর্তী আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে- তা হল নিয়ত বা ইচ্ছার যথার্থতা। নিয়তের যথার্থতা বলতে বর্তমান যুগে সাধারণত যা বুঝা যায়, এখানে আমি তার চেয়ে কিছুটা বিস্তৃত অর্থ উপস্থাপন করব। সুতরাং এখানেই তার একটা মোটামুটি বিশ্লেষণ দিয়ে দেয়া প্রয়োজন।
বর্তমান যুগে যেকোন জ্ঞানের চর্চা কিংবা পর্যালোচনার একটা বিশেষ রীতি রয়েছে, যার সর্বজনসমাদৃত একটা রূপও আছে। তাকে আমরা 'রিসার্চ' নামে অভিহিত করি। যদিও এটি শুধু এ যুগের সাথেই বিশেষভাবে সম্পৃক্ত নয়, সব যুগেই জ্ঞানী-গবেষকদের পন্থা এ-ই ছিল, কিন্তু আমাদের বর্তমান দুরবস্থা আমাদের সাহস এমনভাবে ভেঙ্গে দিয়েছে যে, আমাদের মাঝে পূর্ববর্তী মনীষীদের প্রতি না আছে কোন শ্রদ্ধা, না আছে বর্তমানের পথে চলতে গিয়ে বন্ধুরতাকে অতিক্রম করার সৎসাহস। এমতাবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্যে কোরআন মজীদের পর্যালোচনা করতে গিয়ে বর্তমান যুগের সাধারণ রিসার্চের ঊর্ধ্বেও কোন কিছুর প্রয়োজন আছে বলে মনে করা একান্তই অদ্ভুত দেখাবে। কিন্তু যেহেতু প্রকৃত সত্য তা-ই, কাজেই সেই অদ্ভুত বিষয়টিও বলে দেয়া একান্ত প্রয়োজন। এ সময় যদিও এসব বিষয়ের সঠিক মূল্য দেয়ার মত লোকের যথেষ্ট অভাব রয়েছে, কিন্তু তথাপি যদি সামান্য লোকও এমন পাওয়া যায়, যারা এসব বিষয়ের মূল্য দেবেন এবং কোরআনের পর্যালোচনা করতে গিয়ে এসব বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন, তাহলে ইনশাআল্লাহ্ এতে যথেষ্ট সুফল লাভ হবে।
কোরআন মজীদ যে যথেষ্ট চিন্তা-গবেষণার ক্ষেত্র, এ প্রশ্নে তর্কের মোটেই অবকাশ নেই। সামান্যতম ধর্মজ্ঞানও যাদের রয়েছে, তারা সবাই একমত যে, কোরআনের রহস্য চিন্তা-গবেষণা ছাড়া উদঘাটিত হতে পারে না। কিন্তু কোরআন মজীদের ব্যাপারে শুধুমাত্র চিন্তা-গবেষণাই যথেষ্ট নয়, বরং এই চিন্তা-গবেষণার জন্যেও কতিপয় বিশেষ শর্ত এবং নিয়ম-নীতির অনুশীলন প্রয়োজন। যদি এসব নিয়ম-নীতি বাস্তবায়িত না হয়, তাহলে সাধারণত যাবতীয় চিন্তা-গবেষণাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়, আর সে কারণেই হয়ত বর্তমান যুগে কোরআন সম্পর্কিত চিন্তা-গবেষণা যথেষ্ট বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও আমাদের অবস্থার কোন সংস্কার হচ্ছে না। বরং গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আশার সামান্যতম আলোটুকুও ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে যাচ্ছে, যা সাধারণ নৈরাশ্যের অন্ধকারে কখনো কখনো আমাদের সামনে ভেসে উঠত। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের ব্যাপার এই যে, আজকাল অধিকাংশ ফেতনা-ফাসাদই কোরআনকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হচ্ছে। পক্ষান্তরে কোরআনের আবির্ভাব হয়েছিল যাবতীয় ফেতনা-ফাসাদের মীমাংসার জন্যে; ফেতনা সৃষ্টি করার কিংবা ফেতনাকে জিইয়ে রাখার জন্যে নয়। কিন্তু এটা এক অদ্ভুত বাস্তব যে, অতীতে অথবা বর্তমানে যত রকম ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি হয়েছে এবং হচ্ছে, তার প্রায় সবই এই কোরআনকে কেন্দ্র করেই।
খারেজী সম্প্রদায়ের উদ্ভব তাদের ধারণায় কোরআন মজীদের আশ্রয়েই ঘটেছে। বাতেনী সম্প্রদায়ের ধারণা মতে কোরআনই তাদের যাবতীয় যুক্তি-প্রমাণের উৎস মূল। বাবী এবং বাহায়ী সম্প্রদায়ও যা কিছু বলেছে, তাদের মতে কোরআন অনুযায়ীই বলেছে। কাদিয়ানীদের নবুয়তের ভিত্তিও তাদের দাবী অনুযায়ী কোরআনই। তাছাড়া চাড়ালভী তো কোরআন ছাড়া কিছুই বলে না। এই হাজারো সম্প্রদায়ের মধ্যে এই তো মাত্র কয়েকটির নাম উল্লেখ করলাম। ইসলামী ইতিহাসের সমস্ত সম্প্রদায়ের অবস্থা এবং তাদের ভিত্তির ব্যাপারে জানতে গেলে দেখা যাবে, তাদের সবার হাতেই রয়েছে কোরআন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর কারণ কি? কোরআন তো হেদায়াত এবং পথ প্রদর্শনের জন্যে আলোর মশাল; পথভ্রষ্টতার আঁধারের সাথে তার কি সম্পর্ক? অথচ উচিত তো ছিল, যে কেউ তা অনুসরণ করবে এবং পড়বে, সে পাবে সঠিক পথের সন্ধান, সরল যে পথ তাই ভেসে উঠবে, হেদায়াত ও ঈমানের আলোয় ভরে উঠবে তার হৃদয়-মন, সব দিকে একত্ব ও একাগ্রতার মহান পথ প্রশস্ত হয়ে উঠবে তার সামনে, বিভেদ-বিভ্রান্তির যাবতীয় বক্রতা দূর হয়ে যাবে, আর তার শিক্ষা ও আমন্ত্রণের সমর্থনে সুস্পষ্ট এবং বলিষ্ঠ প্রতিধ্বনিতে তার মন-প্রাণ এমনিভাবে ভরে উঠবে, যা ছাড়া সে আর অন্য কোন কিছুই ভাবতে পারবে না, কিছুই সে উপলব্ধি করতে পারবে না। কিন্তু হচ্ছে তার সম্পূর্ণ বিপরীত। তাকে একটি তলোয়ারের মত শত্রু-মিত্র উভয়েই সমানভাবে ব্যবহার করছে। ঈমানদার মুমিন এরই সাহায্যে সত্য ও ন্যায়ের প্রতি সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। আর অপর দিকে প্রতারক, মুনাফিক এরই মাধ্যমে সত্য ও বাস্তবকে পরাজিত করতে চাইছে।
কোরআন কেন সবার সামনে সম্পূর্ণভাবে বিকশিত হচ্ছে না? তার পরিষ্কার ও প্রকৃষ্ট শিক্ষা প্রত্যেকটি মানুষের হৃদয়কে কেন স্পর্শ করছে না? অথচ তার প্রকৃত সংজ্ঞা তো এ-ই যে, সে যেকোন রকম বক্রতা, গরলতা এবং দুর্বোধ্যতা থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। নিজ শিক্ষা এবং বিশ্লেষণে সে সম্পূর্ণ সন্দেহাতীত ও প্রকৃষ্ট। তার প্রতিটি ক্ষেত্রে রয়েছে পূর্ণ একত্ব এবং প্রকৃষ্ট সামঞ্জস্য। তবুও এর বিভিন্ন পাঠক বিভিন্ন পথে বিক্ষিপ্ত হয়ে যায় কেন? কেন সে সবাইকে টেনে এনে ঈমান ও বিশ্বাসের একটিমাত্র পতাকা তলে সমবেত করে না?
এসব প্রশ্নের উত্তর এই যে, কোরআন পাঠ ও পর্যালোচনার জন্যে বিশেষ কিছু নিয়ম-পদ্ধতি রয়েছে, যার প্রতি যথার্থভাবে লক্ষ্য রাখা এবং সঠিকভাবে অনুশীলন করা অপরিহার্য। এছাড়া কোরআনের সঠিক পথ উন্মোচিত হতে পারে না। এগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম হল নিয়ত বা ইচ্ছার যথার্থতা। এটা আল্লাহ্ কালাম এবং সৃষ্টির হেদায়াতের জন্যে অবতীর্ণ হয়েছে। কাজেই সর্বপ্রথম নিয়ম হল এই যে, পাঠক যাবতীয় প্রভাবমুক্ত হয়ে একমাত্র হেদায়াতপ্রাপ্তির আশায় একে পাঠ করবে এবং নিজের মন ও মস্তিষ্ককে সম্পূর্ণভাবে এর উপর ন্যস্ত করে দেবে। নিজের মনের বল্লা তারই হাতে তুলে দেবে। যাবতীয় চিন্তা-ধারণা ও ভক্তি-বিশ্বাস থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে এ ব্যাপারে প্রস্তুত করে নেবে যে, কোরআনের মাঝে নিজের আশা-আকাঙক্ষার বৈধতার সনদ, নিজের ভক্তি-বিশ্বাসের উপকরণ এবং নিজের রিপুর আশ্রয় অনুসন্ধান করবে না। বক্র যুক্তি-তর্কের সন্ধান করবে না, বরং তার মাঝে সন্ধান করবে শান্তি এবং মনস্তুষ্টি। তার আলো যেদিকে পথ প্রদর্শন করবে সে দিকেই চলবে। এমন কোন প্রচেষ্টা চালাবে না, যা কোরআনকে নিজের বৈষয়িক কামনার পেছনে লাগাবে। কারণ, হেদায়াতপ্রাপ্তি যে ব্যক্তির উদ্দেশ্য নয়, বরং বক্র তর্ক আর প্রশ্নই যার উদ্দেশ্য এবং তার রিপুসমূহ তার মনে যেসব সন্দেহ সৃষ্টি করেছে, কোরআনকে যে সেসবের সমর্থনে মিলিয়ে নিতে চায়, তার জন্যে কোরআনে শুধুমাত্র নৈরাশ্য ছাড়া আর কিছুই নেই। স্বয়ং কোরআনই নিজের এই বৈশিষ্ট্যের প্রতি ইঙ্গিত করছে:
هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمِّ الْكِتَابِ وَأخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهُ مِنْهُ أَبْتَغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ وَمَا يَعْلَمُ تَأْوِيلَهُ إِلَّا اللهُ وَالرَّسِخُونَ فِي الْعِلْمِ يَقُولُونَ أَمَنَّا بِهِ كُلٌّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا وَمَا يَذْكُرُ إِلَّا أُولُوا الْأَلْبَابِ .
অর্থাৎ, তিনিই সেই মহান সত্তা, যিনি তোমাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করেছেন, যাতে কিছু আয়াত রয়েছে বিধান সংক্রান্ত আর কিছু রয়েছে দ্ব্যর্থবোধক। কাজেই যাদের মনে বক্রতা রয়েছে, তারা কোরআনের সেসব দ্ব্যর্থবোধক আয়াতের পেছনে লেগে যায়; ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করার উদ্দেশে এবং তার মূল রহস্য জানবার জন্যে, অথচ আল্লাহ্ ছাড়া তার মূল রহস্য কারও জানা নেই। আর যাঁরা জ্ঞানে পরিপক্ক তাঁরা বলেন, আমরা এর উপর ঈমান এনেছি। সবই আমাদের পরওয়ারদেগারের তরফ থেকে। একমাত্র বুদ্ধিমানদের ছাড়া অন্য কেউ তা বুঝে না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআনের আয়ত দু’রকম

📄 কোরআনের আয়ত দু’রকম


মোটামুটিভাবে উল্লিখিত আয়াতের অর্থ এই যে, কোরআনে দু'রকমের আয়াত রয়েছে। প্রথমত আহকাম বা বিধান সম্বলিত আর দ্বিতীয়ত দ্ব্যর্থবোধক; মুহকামাত এবং মুতাশাবেহাত। মুহকামাত নিজ অর্থে এবং উদ্দেশে সম্পূর্ণ পরিষ্কার। সেগুলোতে কোন দিক দিয়েই কোন রকম দ্বিবিধতার সন্দেহ নেই, সেগুলোর সম্পর্ক আমাদের প্রচ্ছন্ন বিশ্বাস এবং বৈষয়িক জীবনের সাথে। কাজেই আমরা সেগুলোর সমস্ত দিককেই নিজেদের আওতায় নিতে পারি এবং যুক্তি-প্রমাণের কষ্টি পাথরে যাচাই করে নিয়ে সেগুলোর ব্যাপারে সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি।
মুতাশাবেহাতের অবস্থা এর থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম। নিয়মানুসারে যেহেতু সেগুলো যুক্তি-প্রমাণের সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত; কাজেই সেগুলোর ব্যাপারে বিশ্বাস স্থাপন করতে বিবেককে কোন রকম সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় না, কিন্তু সেগুলোর যোগসূত্র যেহেতু এই অনুভূতির জগত থেকে অনেক ঊর্ধ্বে, কাজেই সেগুলোর বিস্তারিত বিশ্লেষণ আমাদের যুক্তি-বুদ্ধিতে সংকুলান হয় না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 কোরআনের পাঠক দু’রকম

📄 কোরআনের পাঠক দু’রকম


কোরআনের আয়াত যেমন দু'রকমের, তেমনিভাবে কোরআনের পাঠকও দু'রকমের। প্রথমত সেসব লোক, যারা নিজের নিয়ত এবং উদ্দেশ্য স্থির করে নিয়ে সেদিকে অগ্রসর হয় এবং তাদের উদ্দেশ্য কল্যাণ ও হেদায়াতলাভ ছাড়া আর কিছুই থাকে না। কোরআন সঙ্গে সঙ্গে এসব লোকের হাত ধরে নিজের পরিচর্যায় টেনে নেয়। তারা কোরআনের আয়াতে মুহকামাতসমূহের মাঝে নিজের আত্মার পূর্ণ পরিতৃপ্তি এবং বিশ্বাস ও বৈষয়িক জীবনের পক্ষে পরিপূর্ণ দিশা লাভ করতে পারে। দীর্ঘ পথভ্রষ্টতার পর তাদের মনে হয়, যেন তারা মন-মস্তিষ্কের পরম প্রশান্তির বেহেশতে আরোহণ করেছে। তাদের মনের সমস্ত জ্বালা নিবারিত হয়ে যায়। ধন্দ-সন্দেহের কাঁটা একে একে খসে যেতে থাকে। মুতাশাবেহাতের কোন ভয়-ভীতি আর তাদের মনকে ভীত করতে পারে না। কারণ, সেগুলোও নিয়ম-নীতির দিক দিয়ে যুক্তি-বুদ্ধির ওপরই প্রতিষ্ঠিত। আর মোটামুটিভাবে সেগুলোর প্রতি ঈমান আনতে কিংবা বিশ্বাস স্থাপন করতে বিবেককে কোন রকম বাধার সম্মুখীন হতে হয় না। শুধু এটুকু যে, সেগুলোর খুঁটিনাটি বিষয় সম্পর্কে কোন বিস্তারিত ধারণা বিবেকের আওতায় আসে না। কিন্তু এটা এমন কোন বিষয় নয়, যা অস্বীকৃতি কিংবা অনীহার কারণ হতে পারে। আমাদের কাছে যদি ৯৯ টাকা থাকে তাহলে তা বেড়ে একশত হয়ে গেলে উত্তম, কিন্তু তা না হলে কি আমরা সে ৯৯ টাকা পকেট থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেব? কাজেই এসব আয়াতের বেলায় তারা আল্লাহর প্রতি ধাবিত হয় এবং বলে,
امَنَّا بِهِ كُلُّ مِّنْ عِنْدِ رَبِّنَا
অর্থাৎ আমরা এগুলোর ওপর ঈমান এনেছি- এগুলো সবই আমাদের পরওয়ারদেগার কর্তৃক অবতীর্ণ। আর তাদের এ উক্তি তাদের নির্বুদ্ধিতাপ্রসূত নয়, বরং তাদের বুদ্ধি-বিবেকের পরিপক্বতারই ফল। বস্তুতঃ কোরআন তাদেরকে الرُّسِخُونَ فِي الْعِلْمِ )জ্ঞান পক্ক)-এর মহান উপাধিতে ভূষিত করেছে।
কারণ, আয়াতে মুতাশাবেহাত বা দ্ব্যর্থবোধক আয়াতসমূহ সম্পর্কে তাদের এই নিরঙ্কুশ স্বীকারোক্তি প্রকৃতপক্ষে তাদের বুদ্ধির পরাকাষ্ঠা, বিবেচনা শক্তির চরম উৎকর্ষ এবং জ্ঞানের পরিপক্বতারই সর্ববৃহৎ প্রমাণ বহন করে। এর অর্থ এই যে, তারা সন্দেহ-সংশয়ের বিষয়টিকে অমূলক বলে উপলব্ধি করতে পেরেছেন। এ সম্পর্কে তাদের কোন রকম দ্বিধা-দ্বন্দু অবশিষ্ট নেই। শুধুমাত্র এর বিশেষ বিশেষ দিক সম্পর্কে প্রকৃষ্ট ধারণার অপেক্ষা। আর এ ব্যাপারেও তারা আশান্বিত যে, শীঘ্রই আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন তাদের মনস্তুষ্টি বিধান করবেন। আর কখনও যদি এসব সন্দেহ, অস্থিরতা এবং উত্তেজনার কারণ হয়ে দাঁড়ায় আর তাতে মানসিক প্রশান্তিতে কোনরূপ বিঘ্ন সৃষ্টি হয়, তখন সাথে সাথে তাদের কণ্ঠে এই প্রার্থনা আবৃত্ত হতে থাকে যা এ আয়াতের পরেই অবতীর্ণ হয়েছে -
ربنا لا تزغ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ط إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ .
অর্থাৎ, হে আমাদের পরওয়ারদেগার! আমাদেরকে হেদায়াত দান করার পর আমাদের অন্তরকে বিপথগামী করো না। তোমার কাছ থেকে আমাদের রহমত দান কর। তুমিই মহান দাতা।
দ্বিতীয় দল হল তাদের, যারা নিজেদের নিয়তের সুষ্ঠুতা ছাড়াই নিজেদের ইচ্ছা ও চাহিদার সমর্থন যোগাবার জন্যে কোরআন পাঠ করে এবং কোরআনের ওপর নিজেদের যাবতীয় ইচ্ছাকে ন্যস্ত করার পরিবর্তে কোরআনকে নিজেদের ইচ্ছার বশীভূত করে নিয়ে তাকে যথেচ্ছ ব্যবহার করতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য থাকে সুপথপ্রাপ্তির পরিবর্তে নিজেদের স্থিরীকৃত কোন বিশেষ মতবাদের পক্ষে সমর্থন লাভ করা। অর্থাৎ, যাদের সাথে তাদের মতবিরোধ তাদের জব্দ করার জন্যে তাতে বিভিন্ন প্রশ্ন এবং উল্টা-সিধা বিতর্কের পথ খুঁজে বের করাই থাকে তাদের লক্ষ্য। কাজেই এটাই স্বাভাবিক যে, এরা যখন কোরআন পাঠ করবে, তখন 'মুহকামাত'-এর পরোয়া না করাই এদের পক্ষে স্বাভাবিক। কারণ, তাতে তাদের মতলব সাধিত হবার নয়। শান্তি কিংবা আমল বা অনুসরণের পথপ্রাপ্তি তাদের উদ্দেশ্য নয়, যার ফলে মানসিক প্রশান্তি লাভ সম্ভব। বরং আসলে তাদের উদ্দেশ্য থাকে ত্রুটি-বিচ্যুতির অনুসন্ধান। কাজেই গোটা কোরআনে শুধুমাত্র সে বিষয়গুলোই তাদের মনঃপূত যা তাদের মনস্কামনা এবং কামনা-বাসনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিংবা নিজেদের প্রতিপক্ষের মুখ বন্ধ করার জন্যে বিশেষ উপযোগী।
যাদের গবেষণা-অনুসন্ধানের এহেন প্রকৃতি, কোরআনের মুহকামাতের প্রতি তাদের কোনরূপ আগ্রহ থাকতে পারে না। তারা শুধুমাত্র মুতাশাবেহাতের দিকেই এগিয়ে যাবে এবং যেসব ব্যাপার মোটামুটি মেনে নেয়াই তাদের জন্যে যথেষ্ট ছিল, তারা সেগুলোর খুঁটিনাটির প্রতি অধিকতর আগ্রহান্বিত হয়ে যাবে। আর একান্ত ইহুদীদের মত যাদের মনে এ ব্যাপারে প্রশ্ন ছিল যে, দোযখের আগুনের মাঝে আবার গাছ কেমন করে থাকতে পারে। (আর এ প্রশ্নের কারণেই তারা নিজেদের জন্যে আল্লাহ্ হেদায়াতের দ্বার চিরতরে বন্ধ করে নিয়েছিল।) এরাও নানা রকম সন্দেহ সৃষ্টি করবে আর এভাবে নিজেদেরকে আল্লাহ্র হেদায়াত থেকে বঞ্চিত করে রাখবে।
এ ধরনের লোকদের একটি বৈশিষ্ট্য হল এই যে, এরা নিজেদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধির একক ধারক-বাহক বলে মনে করে। কিন্তু কোরআনে বর্ণিত আয়াতে তাদেরকে একান্ত নির্বোধ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। বস্তুতঃ এদের চেয়ে বেশী নির্বোধ হবেই বা কে, যাদের সবচেয়ে বড় বাসনা এই যে, সমগ্র কোরআনে এমন কোন বিষয় প্রাপ্ত হবে, যা তাদের মনোবাসনার সাথে সুসমঞ্জস হবে অথবা যার ভিত্তিতে কোরআনের বিরুদ্ধে নানারূপ প্রশ্ন করতে পারবে? যেকোন লোক যদি বিজ্ঞানের নয়শত নিরানব্বইটি নীতিকে এজন্যে প্রত্যাখ্যান করে যে, তার হাজারতম নীতিটি তার খুঁটিনাটি বিষয়কে 'সম্পূর্ণভাবে' পরিবেষ্টিত করতে পারেনি, তাহলে তার চেয়ে নির্বোধ আর কে হতে পারে? এখানে 'সম্পূর্ণভাবে' কথাটার উপর আমি বিশেষভাবে জোর দিতে চাই এ জন্যে যে, মুতাশাবেহাত বা বিতর্কিত আয়াত জ্ঞান-বুদ্ধি বহির্ভূত কোন বিষয় নয়, বরং সেগুলো জ্ঞান-বুদ্ধির সীমানারই অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য এগুলোর সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ আমরা বুঝতে পারি না। কারণ, আমাদের জ্ঞান ও শিক্ষার যাবতীয় অভিজ্ঞতাই সেসবের উপস্থাপনে অসমর্থ।
প্রকৃতপক্ষে এটা কোরআন অবতীর্ণ হওয়ার সময়ে উপস্থিত বঞ্চিতদেরই কথা। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এ আয়াত সর্বযুগের পরিপক্ক জ্ঞানী এবং ব্যক্তিত্বের অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করেছে। ইতিহাসের সব যুগেই কোরআনের পাঠকেরা এই দুটি দলে বিভক্ত ছিল। একটি পরিপক্ক জ্ঞান ও যথার্থ চিন্তাশীল; দ্বিতীয়টি ফাসাদ সৃষ্টিকারী ও দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন। এক দলের দৃষ্টির কেন্দ্রবিন্দু ছিল কোরআনের মুহামাত সম্পর্কিত অংশ। কারণ, হেদায়াত প্রাপ্তিই ছিল তাদের মুখ্য উদ্দেশ্য। এ দলটি কোরআনের দ্বারা বিপুল উপকার ও সৎ-সরল পথের সন্ধান পেয়েছে। দ্বিতীয় দলটি হল দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন ও অপব্যাখ্যাকারীদের। কোরআনকে এরা হেদায়াতপ্রাপ্তির জন্যে নয়, বরং ফাসাদ সৃষ্টির জন্যেই পাঠ-পর্যালোচনা করেছে। তাদের উদ্দেশ্য অসৎ এবং ইচ্ছা ছিল কুটিল। ফলে স্বভাবতই এরা কোরআনের সে অংশটুকুই খুঁজে বের করেছে, যা মুতাশাবেহাত সম্পর্কিত এবং যাতে মানব বুদ্ধিকে একান্তভাবে সংযত রাখতে না পারলে এবং আল্লাহ্ একান্ত মেহেরবানী সাথে না থাকলে প্রতি পদে পদেই হোঁচট খাবার সম্ভাবনা থাকে।
আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন কোরআন অবতীর্ণ করেছেন ঈমান ও আমলের শিক্ষা এবং আত্মা ও মন-মানসের পরিশুদ্ধির জন্যে; মস্তিষ্কের উদ্‌ভ্রান্তি কিংবা বাঁকা বিতর্কের জন্যে নয়। সুতরাং তার আশীষ বা উপকারিতা সে-ই লাভ করতে পারে, যে পবিত্র মন এবং মুক্ত কান নিয়ে এর নিকটবর্তী হবে; বিবাদ সৃষ্টিকারী মস্তিষ্ক এবং জটিলতা সৃষ্টিকারী বুদ্ধি নিয়ে নয়। সূরা কাফ-এ এরশাদ হচ্ছেঃ إِنَّ فِي ذَالِكَ لَذِكْرَى لِمَنْ كَانَ لَهُ قَلْبَ أَوْ الْقَى السَّمْعَ وَ هُوَ شَهِيدٌ অর্থাৎ, এর মাঝে সে ব্যক্তির জন্যে স্মারক বাণী রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সজাগ হৃদয় অথবা এমন শ্রবণশক্তি, যা শ্রবণানুরাগী। আর সূরা 'সাফফাতে' হৃদয় সম্পর্কে বিশ্লেষণ করা হয়েছে যে, তা হবে 'সালীম'- (সালীম অর্থ সুস্থ)। বলা হয়েছে إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهُ بِقَلْبِ سَلِيمٍ (কিন্তু যে লোক আল্লাহর নিকট সুস্থ বিবেক নিয়ে প্রত্যাবর্তন করেছে।) সূরা 'কাফ'-এ এরশাদ হয়েছে وَجَاءَ بِقَلْبٍ مُنِيبٍ )যে লোক আগ্রহান্বিত হৃদয় নিয়ে এসেছে)। এ দুটি শব্দের (سَلِمٍ এবং مُنِيِّبٍ) দ্বারা একথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আল্লাহর কালাম যারা শুনতে আসবে, তারা সুস্থ বিবেক এবং আগ্রহান্বিত হৃদয় নিয়ে আসবে। দাম্ভিক এবং উগ্র হৃদয় নিয়ে নয়। কারণ, এহেন হৃদয়ের উপর আল্লাহ্র তরফ থেকে মোহর আঁটা থাকে। ফলে এরা আল্লাহর বাণীর মর্ম উপলব্ধি করতে পারে না। الَّذِينَ يُجَادِلُونَ فِي أَيَاتِ اللَّهِ بِغَيْرِ سُلْطَانٍ أَتَاهُمُ كَبُرَ مَقْتًا عِنْدِ اللَّهِ وَ عِنْدَ الَّذِينَ آمَنُوا كَذَا لِكَ يَطْبَعُ اللَّهُ عَلَى كُلِّ قَلْبِ مُتَكَبِّرٍ جَبَّارٍ
কোরআন সম্পর্কিত চিন্তা-গবেষণার প্রথম পর্যায়েই যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়, তা হল এই যে, এদিকে শুধুমাত্র সে পদক্ষেপই শুভ ও কল্যাণকর হবে, যা ঈমান এবং সৎকাজের সামর্থ্য লাভের জন্যে হবে। এই একটি মাত্র বাসনা ছাড়া কারো মাঝে অন্য যেকোন বাসনার যৎসামান্য সংমিশ্রণ থাকলে তার জন্যে কোরআনের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যাবে। বস্তুত মানব প্রচেষ্টার কোন চাবিকাঠিই সে রুদ্ধ দুয়ার উন্মুক্ত করতে পারে না। কথা শুনে সাথে সাথে তার অনুসরণ এবং কার্যকরী করার জন্যে প্রচেষ্টা চালালেই কোরআন অতি উত্তম। আর ধাপে ধাপে ঈমান ও আমলের পথে আমরা যতটা দৃঢ়তা অবলম্বন করতে থাকব, ততটাই তার বরকত বৃদ্ধি পেতে থাকবে। অন্যথায় তা হবে না। আমরা কোরআনের বাণী জানতে চাই সত্য, কিন্তু সক্রিয় সাহস কিংবা কার্যকরী মনোবল অর্জন করতে পারি না। অথবা নিজেদের মনোবাসনাকে তার মোকাবিলায় বর্জন করতে পারি না কিংবা শুধুমাত্র এজন্যে তা পড়তে চাই যাতে আমাদের মাঝে অনুসন্ধান এবং গবেষণার যে আগ্রহ বিদ্যমান অথবা আমাদের যেসব নিজস্ব চিন্তাধারা রয়েছে, তার পক্ষে কোরআন থেকে কিছু প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারি। তা হলে, কোরআন আমাদের জন্যে বঞ্চিতি ছাড়া আর কিছুই সরবরাহ করবে না।

📘 কুরআন গবেষণার মূলনীতি > 📄 হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি

📄 হেদায়েত ও পথভ্রষ্টতা সম্পর্কে কোরআনের দৃষ্টিভঙ্গি


ওপরে আমরা যে দুটি দলের কথা উল্লেখ করেছি, তা একান্তভাবেই ছিল নীতিগত বিভক্তি। কোরআন মজীদ নিজে আমাদেরকে বিস্তারিতভাবে বলে দিয়েছে কোন্ ধরনের লোক কোরআন থেকে হেদায়াত হাসিল করতে পারবে, আর কারা তা থেকে কোন রকম ফায়দালাভে বঞ্চিত থাকবে।
হেদায়াত ও পথভ্রষ্টতার ব্যাপারে একটি নীতিগত সত্য এই যে, এটা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ প্রদত্ত সামর্থ্য ও অসামর্থ্যের ওপর নির্ভরশীল। যাদেরকে আল্লাহ্ সামর্থ্য দান করেন, তারাই এই কিতাব থেকে যথাযথ ফায়দা হাসিল করতে পারে। আর যাদেরকে আল্লাহ্ এই সামর্থ্য থেকে বঞ্চিত করেছেন, তারা এই কিতাবের ফায়দা লাভ থেকে বঞ্চিতই থেকে যায়। কোরআন এই নীতির বর্ণনা প্রসঙ্গেই বলেছে:
كِتَابٌ أَنْزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمُ إِلَى صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ .
অর্থাৎ, এই কিতাব, যেটি আমি তোমার ওপর অবতীর্ণ করেছি, তোমাদেরকে (অজ্ঞানতার) অন্ধকার থেকে মুক্ত করে (জ্ঞানের) আলোর দিকে নিয়ে যেতে। তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে মহাপ্রশংসিত আল্লাহর পথের দিকে। অর্থাৎ, কোরআনের উদ্দেশ্য হল মানুষকে গোমরাহী এবং পথভ্রষ্টতার অন্ধকার থেকে মুক্ত করে ঈমান ও হেদায়াতের আলোর দিকে নিয়ে আসা। আর এ কাজ একটি নির্দিষ্ট নিয়মের মাধ্যমে সম্পাদিত হয়। বর্ণিত হয়েছে- با ذن ربهم অর্থাৎ, এতে নবীর কোন হাত নেই যে, তিনি যাকে চাইবেন তাকেই ঈমান ও হেদায়াত দান করতে পারবেন। বরং এটা আল্লাহর হাতে- তিনি যাকে ইচ্ছা ঈমান ও হেদায়াত দান করে ধন্য করেন, আর যাকে ইচ্ছা ভ্রষ্টতার খাদে নিক্ষেপ করেন। তার এই ইচ্ছাটাও আবার একটা বিশেষ নীতি অনুযায়ী হয়ে থাকে। কি সে নীতি? এর উত্তর কোরআন বিভিন্ন জায়গায় দিয়েছে। বিশেষত সূরা বাকারার জ্ঞান শিক্ষা বিষয়ক পরিচ্ছেদে তুলনামূলকভাবে বেশী বিশ্লেষিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এ ব্যাপারে আমরা বিষয়টির ব্যাখ্যাকল্পে তারই উদ্ধৃতি তুলে ধরছি। এরশাদ হচ্ছেঃ
اللهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُمُ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَالَّذِينَ كَفَرُوا اللهُ الَّذِينَ النُّورِ أولِيا مُهُمُ الطَّاغُوتِ يُخْرِجُونَهُمْ مِنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ أُولَئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ هُمْ فِيهَا خَالِدُونَ -
অর্থাৎ, যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ্ তাদের সহায়। তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান। পক্ষান্তরে যারা কুফরের আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সহায় হল তাগুত, যা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। বস্তুত ওরাই হল জাহান্নামের অধিবাসী। সেখানেই থাকবে ওরা অনন্তকাল।
অর্থাৎ, আল্লাহ্ এবং তাঁর কিতাবের পথ-নির্দেশ শুধুমাত্র ঈমানদারদের জন্যেই নির্দিষ্ট; কাফেররা এ থেকে বঞ্চিত। কাফেরদের সহায় হল তাগুত। সে তাদেরকে আলোর পথে চলতে বাধার সৃষ্টি করে। কখনও কোন আলোর ছটা তাদের মস্তিষ্কে বিকিরিত হলেও সাথে সাথে সেই তাগুত ওদেরকে ঠেলে নিয়ে অন্ধকারের যবনিকায় লুকিয়ে রাখে, যাতে করে আলোর রহস্য সম্পর্কে তারা অবহিত হতে না পারে।
অতঃপর আল্লাহ্ তাদের উদাহরণ বর্ণনা করেছেন, যাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন কিংবা যাদেরকে অন্ধকারেই ছেড়ে দেয়া হয়। সে জন্যে তিন শ্রেণীর লোক নির্ধারণ করা হয়েছে। এরশাদ হচ্ছে:
أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَّ إِبْرَاهِيمَ فِي رَبِّهِ أَنْ أَتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ إِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّيَ الَّذِي يُحْيِ وَيُمِيتُ قَالَ أَنَا أَحْيِ وَأُمِيتُ قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللهَ يَا تِى بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ وَاللهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ أَوْ كَالَّذِي مَرَّ عَلَى قَرْيَةٍ وَهِيَ خَاوِيَةً عَلَى عُرُوشِهَا - قَالَ أَنَّى يُحْيِ هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا فَا مَاتَهُ * اللهُ مِانَةَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَهُ قَالَ كَمْ لَبِثْتَ ، قَالَ لَبِثْتُ يَوْمًا أَوْ بَعْضَ يَوْمٍ . قَالَ بَلْ لَبِثْتَ مِائَةَ عَامٍ فَا نُظُرُ إِلَى طَعَامِكَ وَ شَرَا بِكَ لَمْ يَتَسَنَهُ وَانْظُرُ إلَى حِمَارِكَ وَ لِنَجْعَلَكَ أَيَةٌ لِلنَّاسِ وَانْظُرُ إِلَى الْعِظَامِ كَيْفَ نُنْشِزُهَا ثُمَّ نَكْسُوهَا لَحْمًا فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيءٍ قَدِيرٌ - وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ رَبِّ أَرِنِي كَيْفَ تُحْيِ الْمَوْتَى قَالَ أَوَلَمْ تُؤْمِنُ قَالَ بَلَى وَلكِنْ لِيَطْمَئِنَّ قَلْبِي - قَالَ فَخُذُ أَرْبَعَةٌ مِّنَ الطَّيْرِ فَصُرْهُنَّ إِلَيْكَ ثُمَّ اجْعَلَ عَلَى كُلِّ جَبَلٍ مِّنْهُنَّ جُزْءًا ثُمَّ ادْعُوهُنَّ يَأْتِينَكَ سَعيًا - وَأَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ .
অর্থাৎ, তুমি কি সে লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করনি, যে লোক ইব্রাহীমের সাথে তার পালনকর্তা সম্পর্কে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছিল এ জন্যে যে, আল্লাহ্ তাকে সাম্রাজ্য দিয়ে রেখেছিলেন? যখন ইব্রাহীম (আঃ) বললেন, আমার পালনকর্তা তো তিনিই, যিনি জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দান করেন। তখন সে বললঃ আমিই তো বাঁচাই এবং মারি। ইব্রাহীম বললেনঃ (আচ্ছা তা হলে) আল্লাহ্ তো সূর্যকে পূর্ব দিক দিয়ে উদিত করেন, তুমি তাকে পশ্চিম দিক দিয়ে উদিত কর দেখি। এ প্রশ্নে সে অবিশ্বাসী কাফের হতভম্ব হয়ে গেল। বস্তুত আল্লাহ্ অত্যাচারী যালেম জাতিকে হেদায়াত দান করেন না।
কিংবা তোমরা কি সে লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করেছ, যে লোক এক বিধ্বস্ত জনপদের উপর দিয়ে যাচ্ছিল (আর) বলছিল, এ জনপদের মৃত্যুর পর আল্লাহ্ কেমন করে তা পুনরুজ্জীবিত করবেন? তখন আল্লাহ্ তাকে একশত বছরকাল মৃত অবস্থায় রাখলেন (এবং) তারপর তাকে পুনরায় জীবিত করলেন এবং জিজ্ঞাসা করলেন, (এ অবস্থায়) তুমি কত দিন ছিলে? সে বলল— একদিন কিংবা একদিনেরও কিছু কম সময়। তিনি বললেন, বরং তুমি (এ অবস্থায়) একশত বছর ছিলে। এখন তোমার খাদ্য বস্তুগুলোর প্রতি লক্ষ্য কর, কোন কিছুই বিনষ্ট হয়নি। পক্ষান্তরে তোমার (বাহন) সে গাধাটির দিকে লক্ষ্য কর। আর আমি এমন করেছি এ জন্যে যাতে করে তোমার বিশ্বাস বদ্ধমূল হয় এবং তোমাকে মানুষের জন্যে, উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারি। অতঃপর (তোমার সে গাধার) হাড়গুলোর প্রতি লক্ষ্য কর— দেখ, কেমন করে আমি সেগুলোকে জুড়ে খাড়া করি এবং কেমন করে তাতে মাংসের আস্তরণ পরাই। অতএব, যখন তার সামনে প্রকৃত সত্য বিকশিত হয়ে গেল, তখন সে বলল, আমি নিশ্চিত বিশ্বাস করি, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সবকিছুর উপরে শক্তিমান।
তাছাড়া স্মরণ কর, যখন ইবরাহীম (আঃ) বলেছিলেন, হে পরওয়ারদেগার! কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত কর তা আমাকে প্রত্যক্ষ দেখিয়ে দাও। (আল্লাহ) বললেন, তুমি কি তা বিশ্বাস কর না? ইবরাহীম বললেন, অবশ্যই বিশ্বাস করি, তবুও আমার মনের স্থিরতার জন্যে (এ আবেদন)। তখন আল্লাহ্ বললেন, তা হলে চারটি পাখীকে জবাই করে (সেগুলোর গোস্ত ভাল করে) নিজ হাতে মিলিয়ে নাও। অতঃপর এক এক অংশ গোস্ত বিভিন্ন পাহাড়ে রেখে দাও আর তাদের চেহারা চিনে রেখো। তারপর তাদেরকে ডাক, (দেখবে), সেগুলো তোমার কাছে ছুটে আসবে। আর বিশ্বাস করো, আল্লাহ্ নিশ্চয়ই মহাপরাক্রমশালী ও সুবিজ্ঞ।
এসব আয়াত যেসব ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে, সেসব বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই। এখানে আমরা শুধু এ সত্যটিই জানতে চাই, যা এসব আয়াতে নিহিত রয়েছে এবং যে বিষয়ের বর্ণনাভঙ্গি পথ প্রদর্শন করে। এসব আয়াত পূর্ববর্তী আয়াত اَللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا এর পরেই বর্ণিত হয়েছে। এতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলছেন যে, তারা কারা, যারা আঁধার থেকে আলোর দিকে আসতে আগ্রহী? আর তারাই বা কারা, যারা আলো থেকে আঁধারে লুকাতে চায়। কাজেই বর্ণনাভঙ্গি এবং বাক্যধারা-
ا لَمْ تَرَ إِلَى الَّذِي حَاجَ إِبْرَاهِيمَ (তুমি কি সে লোকের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করনি, যে লোক ইবরাহীম (আঃ)-এর সাথে বিতর্কে প্রবৃত্ত হয়েছে?) অনুযায়ী দুটি বাক্যই পূর্ববর্ণিত আয়াতের সাথে সম্পৃক্ত বলে বুঝা যায়। তারপর আমরা যখন এসব আয়াতের বিষয়বস্তুর প্রতি লক্ষ্য করি, তখন বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পূর্ববর্তী আয়াতে যে বিষয়টি সংক্ষিপ্তভাবে বলা হয়েছিল, এসব আয়াতে তাই বিশদ ব্যাখ্যা ও উদাহরণ সহকারে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে যে, কি ধরনের লোকেরা আল্লাহ প্রদত্ত আলো থেকে বঞ্চিত থেকে যায় আর কি ধরনের লোক হেদায়াতপ্রাপ্ত হতে পারে। তাহলে আসুন, আয়াতগুলোকে যথার্থভাবে বিশ্লেষণ করে বুঝতে চেষ্টা করা যাক। আয়াতগুলোর প্রতি লক্ষ্য করলে তিন ধরনের লোকের প্রকৃতির বর্ণনা পাওয়া যায়।
প্রথমত, সেসব লোক, যারা ধন-সম্পদ আর রাষ্ট্র ও সাম্রাজ্যের নেশায় উন্মত্ত হয়ে পড়েছে। হযরত ইবরাহীম (আঃ) তার সামনে আল্লাহর হেদায়াতের আলো উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু সে দাম্ভিক প্রমত্ততার দরুন কোন বিষয়েই চিন্তা করতে চায়নি। ইবরাহীম (আঃ)-এর কথার সাথে সাথেই তাঁর সাথে কূট তর্কে প্রবৃত্ত হয়েছে। হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তার বিতর্কের যথার্থ জওয়াবও দেন এবং সে জওয়াবে সে সম্পূর্ণ হতভম্বও হয়ে পড়ে, কিন্তু তথাপি সে ঈমান ও হেদায়াতের পথ খুঁজে পায় না। কারণ, আল্লাহর যে আলো তা একান্তভাবেই অনুসন্ধানকারীর জন্যে। যারা এ ব্যাপারে কূট তর্কে লিপ্ত হয়, যদিও সে আলোতে তাদের চোখ ধাঁধিয়ে যায়, তথাপি তারা ঈমানের পথ হাতড়ে পায় না। কারণ, اللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْفَاسِقِينَ -(আল্লাহ যালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দান করেন না)।
দ্বিতীয় শ্রেণীর লোক হল তারা, যারা জ্ঞান, ঈমান, বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের সন্ধানী। আর এসব বিষয় লাভ করার জন্যে তারা সত্যান্বেষীদের পথই অনুসরণ করে। তারা জ্ঞানের মিথ্যা দাবীদারদের মত এবং তর্কবাজদের মত গ্রামে-গঞ্জে, মসজিদে-মাদ্রাসায় এবং দরগা-আখড়ায় বিতর্ক সভার আয়োজন করে বেড়ায় না। না মনে সাধারণ সন্দেহ উপস্থিত হলে সেগুলোকে কয়েক পাতায় ছেপে সারা দেশময় নিজের জ্ঞানের ঢোল পিটিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করে। বরং চিন্তাশীল মস্তিষ্ক এবং বিবেচনাশীল মানসের ন্যায় তারা নির্জনতা আর নীরবতার অনুরাগী হয়ে পড়ে। তারা গ্রাম-গঞ্জের ভিড় থেকে বহুদূরে চলে যেতে চায়। নগরীর কোলাহলকে তারা ভয় পায়। তারা মনে করে, শিক্ষানুশীলনের কোন জায়গা খুঁজে পেলে নিজের সেসব প্রশ্নের সমাধানকল্পে সেখানেই বসে পড়বে, যে জন্যে সে সর্বক্ষণ ব্যাকুল। সুতরাং নীরব-নির্জনতার সন্ধান করতে গিয়ে এক সময় হয়ত বা যেকোন বিধ্বস্ত নগরীর উপর দিয়ে চলে যেতে থাকে আর তার বিধ্বস্ত দেয়াল-প্রাচীর, তার ভাঙ্গাচোরা দ্বার-খিলান, তার অবনত মস্তক মেহরাব, তার বিক্ষিপ্ত ইট-গাঁথুনি আর তার ভয়াবহ নীরবতা তার জন্যে শিক্ষা এবং অন্তর্জানের এক বিপুল দিগন্ত উন্মোচিত করে দেয়। তার মনের অন্বেষা সাথে সাথেই সেখানে কাঙিক্ষত বিষয়বস্তু খুঁজে পায়। যে প্রশ্নের সমাধান চিন্তায় তার মন-মস্কিষ্ক বহু ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত হয়েও সমাধান খুঁজে পায়নি, স্থান ও পরিবেশের প্রভাবে তার মনের প্রশ্ন আবার দাগ কাটে, দোদুল্যমান অনিশ্চয়তার জ্বালা আর অস্থিরতার কাঁটা আবার সজীব হয়ে উঠে আর তখন অস্বীকৃতি ও হটকারিতার দম্ভের সাথে নয়, বরং একান্ত অন্বেষা এবং আপাদমস্তক আবেগ ও আর্তচিৎকার করে উঠে : أَنَّى يُحْيِي هَذِهِ اللَّهُ بَعْدَ مَوْتِهَا তা কি করে হবে যে, আল্লাহ্ একে পুনরায় জীবিত করে দেবেন!
যদিও প্রশ্নটা একই রকম, যা মক্কার দাম্ভিকেরা এবং তায়েফের উগ্রপন্থী কৃতঘ্নরা করেছিল এবং যার প্রত্যুত্তরে কোরআন তাদেরকে ভর্ৎসনা করেছিল, কিন্তু এখানে প্রশ্নকারীর অভ্যন্তরীণ চিন্তাধারা সম্পূর্ণ বিপরীত। সেখানে তাদের প্রশ্নের হোতা ছিল তাদের দম্ভ, আর এখানে নম্রতা আর অসহায়তা। সেখানে বিবাদ-বিতর্কের মত্ততা, আর এখানে রয়েছে প্রশ্নের জ্বালা এবং অস্থিরতার কাঁটা। সেখানে ছিল প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দেয়ার বিকট উগ্রতা, আর এখানে আছে ব্যথা এবং ক্ষতের উপশম স্পৃহা। অর্থাৎ, সেটা ছিল মিথ্যারোপ আর এটা হল প্রশ্ন। সেটা ছিল অস্বীকৃতি আর এটা হল সন্দেহ। আর এ দুয়ের পার্থক্য আকাশ পাতালের।
সুতরাং এর সাথে সম্পূর্ণ অন্য রকম ব্যবহার করা হয়। এর সন্দেহ অপনোদনের জন্য বিষয়ের যাবতীয় যবনিকা সরিয়ে দেয়া হয় এবং এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করা হয় যাতে তার দেহ-মন পরিপূর্ণ বিশ্বাসের আলোয় ভরপুর হয়ে চিৎকার করে উঠে- নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাশীল
فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ قَالَ أَعْلَمُ أَنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
তারপর তৃতীয় ব্যক্তি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) অবতীর্ণ হন। তিনি বলেন: হে পরওয়ারদেগার! আমাকে একটিবার তা দেখিয়ে দাও কিভাবে তুমি মৃতকে জীবিত করবে? প্রশ্ন হল, তা হলে কি এ বিষয়ে তোমার ঈমান ও বিশ্বাস নেই? তিনি বলেন, ঈমান কেন থাকবে না! ঈমান-বিশ্বাস অবশ্যই আছে। তোমার জ্ঞান আর তোমার ক্ষমতার বাইরে কিছুই নেই। তুমি সব কিছুই করতে পার। কিন্তু ইয়া পরওয়ারদেগার! আমি যে ঈমান এবং বিশ্বাসের চেয়েও বেশী কিছু চাই। আমার অন্বেষা যে আরও অনন্ত জ্ঞানের। আমি অন্তর্দৃষ্টির আলোর সাগরে ডুবে যেতে চাই। আমি চাই আমার বুক বিশ্বাস ও শান্তির সূর্যের অনাদি-অনন্ত উদয়াচলে পরিণত হোক। আমি জ্ঞানের আলোকে যা কিছু অনুভব করি তাকে চোখেও যেন দেখতে পাই। তার পরিচয়ে যেন সম্পূর্ণভাবে ডুবে যেতে পারি। তার রঙ্গে যেন সম্পূর্ণ রঙ্গে উঠি। বলে উঠেন- (لِيُطْمَنِنَ قُلْبِى ) (আমার অন্তরের পরিপূর্ণ সান্ত্বনার জন্যে)।
এ অবস্থাটা উল্লিখিত দুটি অবস্থা থেকেই স্বতন্ত্র। এখানে না আছে দাম্ভিকতা ও অস্বীকৃতি, না সন্দেহ-সংশয়। বরং এটা হল অধিকতর প্রত্যয়ের একান্ত অন্বেষা। সুতরাং এক্ষেত্রে আল্লাহর আচরণও তেমনি। তিনি হযরত ইব্রাহীমের অন্তরাত্মাকে শান্তি ও বিশ্বাসের নূরে ভরপুর করে দেন আর তাঁর দৃষ্টির সামনে থেকে যাবতীয় যবনিকা সম্পূর্ণভাবে উন্মোচিত করে দেন।
আলোচ্য তিন ব্যক্তি তিন দলের অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর আলো এই তিন দলের প্রতি তিন রকম আচরণ করে। এক দল দাম্ভিকদের। আল্লাহর নূর তাদের দৃষ্টিকে শুধু ধাঁধিয়েই দেয়, ঈমান ও অন্তর্দৃষ্টি দান করে না। দ্বিতীয় দল হল সন্দিহান ও অস্থির চিত্তদের। আল্লাহর আলো তাদেরকে স্থিরতা ও শান্তি দান করে। আর তৃতীয় দল হল অধিকতর প্রত্যয়ান্বেষীদের। আল্লাহ তাদের হৃদয়ের দুয়ার উন্মুক্ত করে দেন।
এটা আল্লাহ তাআলার সাধারণ নিয়মের বর্ণনা। কল্যাণ ও অকল্যাণ, হেদায়াত ও ভ্রষ্টতার সেই নিয়ম-রীতি, যা সব সময় ছিল এবং সব সময়েই থাকবে। আর হুবহু এই অবস্থাই কোরআন মজীদে মনোনিবেশকারীর সামনেও উপস্থিত হয়। কেউ যদি কোরআনের ব্যাপারে বিতর্কে অবতীর্ণ হতে চায়, আর স্থির করে নেয় যে, তার দলিল-প্রমাণ দ্বারা অন্যের সাথে ঝগড়া-বিবাদে প্রবৃত্ত হবে এবং তার উপদেশাবলীর সাথে বিরোধ করবে, তবে আল্লাহ সে লোকের জন্যে কোরআনের হেদায়াতের সমস্ত দ্বার রুদ্ধ করে দেন। পক্ষান্তরে যে লোক সন্দেহের জ্বালায় অস্থির হয়ে কামনা করছে, কোরআন যেন তার সন্দেহ দূর করে দিয়ে তার পথ প্রদর্শন করে এবং ধীরে ধীরে তাকে বিশ্বাস ও অন্তর্জানের লক্ষ্যে পৌঁছে দেয়। তার প্রতি তেমনি আচরণ করা হয় যা তার জন্য উপযোগী। তিনি তাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করেন।
কোরআন মজীদ এবং ওহীর বাহক হুযূরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রাথমিক অবস্থাই এ সত্যের ব্যাখ্যার জন্যে যথেষ্ট। নবুয়তপ্রাপ্তির সময় যখন ঘনিয়ে আসে, তখন হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অবস্থা কি ছিল? পথভ্রষ্ট উদভ্রান্ত এক পৃথিবী, যার চারদিকে ছেয়ে ছিল আঁধার আর আঁধার- তিনি ব্যাকুল হয়ে উঠেছিলেন একটু আলোর জন্যে। এমন এক আলো, যাতে গোটা দুনিয়ার সামনে মুক্তি এবং হেদায়াতের রুদ্ধ সব পথ উন্মুক্ত হবে। যা হৃদয়-মনের সমস্ত দৃষ্টিকে আলোকিত করে দেবে। যা সন্দেহের সমস্ত অন্ধকারকে মুছে দেবে এবং এ বিশ্বের সে জটিল রহস্যের সমাধান করে দেবে যার উপর সহস্র যবনিকা পড়ে আছে। অভ্যন্তরীণ জ্বালা আর মানসিক তাকে আপাদমস্তক ব্যথায় পরিণত করে দিয়েছিল। তিনি আপাদমস্তক অন্বেষা, অনুসন্ধান আর আকাঙ্ক্ষার উদ্দীপনার প্রতিমূর্তি হয়ে লোকালয়ের প্রতি বিষণ্ণ-বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েছিলেন। এক মরুপ্রান্তরে এক পাহাড় গহ্বরে ধ্যানমগ্ন হয়ে অপেক্ষা করছিলেন সামনের যবনিকা অপসারণের জন্যে। অপেক্ষা করছিলেন সত্যোদ্ঘাটনের জন্যে। অন্বেষা আর অনুসন্ধান-প্রচেষ্টার এই নিষ্ঠা, আগ্রহ আর আকাঙ্ক্ষার এই একাগ্রতা, চিন্তা-গবেষণার এই নিরবচ্ছিন্নতা এবং গুহাবাসের পরেই এসেছিল 'ইকরা'-এর পয়গাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর ধ্যানমগ্ন বান্দাকে তুলে নিলেন আর তার উপর নিজ অনুগ্রহের প্রকাশ এভাবে করলেন। বললেন- وَوَجَدَكَ ضَآلًّا فَهَدٰى )আমি তোমাকে সত্যান্বেষণে নিষ্ঠাবান পেয়েছি। কাজেই তোমাকে দান করেছি হেদায়াত)।
সুতরাং কোরআন শিক্ষার্থীদের শুরু ও শেষ উভয়টাই নির্ভর করে জ্ঞানান্বেষা এবং নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশের উপর। অনির্ভরতা, দম্ভ, বিবাদ ও বিতর্কের মাধ্যমে এ পথের একটি সোপানও অতিক্রম করা সম্ভব নয়। কোরআনের দিকে মানুষকে শুধু সত্যের অন্বেষণ করার উদ্দেশে এগিয়ে যেতে হবে এবং সত্যের সন্ধান না পাওয়া পর্যন্ত কোরআনের গবেষণায় নিয়োজিত থাকতে হবে। চালিয়ে যেতে হবে চিন্তা-ভাবনার জেহাদ। সন্দেহ যতই কঠিন হোক, জটিলতা যতই প্রবল হোক, এক মুহূর্তের জন্যেও নিরাশ হবে না। যে লোক নিষ্কলুষ ইচ্ছা নিয়ে জ্ঞান লাভের চেষ্টা করছে এবং সত্য, ন্যায় ও হেদায়াতের পথে সংগ্রাম করে চলছে, তার পক্ষে সফলতা অনিবার্য। এরশাদ হয়েছে: وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا
(যারা আমার পথে চেষ্টা চালিয়ে যাবে আমি তাদের জন্যে আমার পথ অবশ্যই মুক্ত করে দেব।) তার শান্তি-সান্ত্বনার জন্যে মহান পরওয়ারদেগার কঠিনকে সহজ বরং অসম্ভবকে সম্ভব করে দেবেন এবং এমন জায়গা থেকে সে হেদায়াতের উপাদান লাভ করবে, যার কল্পনাও সে করেনি। يَرْزُقُهُمْ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ .
সুতরাং দেখা যাচ্ছে, মানুষ যদি কোরআনের উপর সুদৃঢ় আস্থা স্থাপন করে, তাতে অনড় থাকে, তাহলে সে সেই মহা নেয়ামতও প্রাপ্ত হয়, যাকে আমরা 'জ্ঞানের বিকাশ' বলে অভিহিত করেছি এবং যার জন্যে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) বিপুল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করছিলেন। সুতরাং কোরআনের বিকাশ ও পূর্ণতার পর আল্লাহ তাআলা হুযুরে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলেন- أَلَمْ نَشْرَحْ لَكَ صَدْرَكَ (আমি কি তোমার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেইনি?)
এ প্রসঙ্গে অতি সূক্ষ্ম তথ্য সূরা মুজাদালায় বর্ণিত হয়েছে। সেখানে আল্লাহ্ তাআলা দুটি দলের উল্লেখ করেছেন। এক দলের অবস্থা হল এই যে, যখন ধর্মীয় কোন ব্যাপারে তাদের সামনে কোন জটিলতা, কোন সন্দেহ অথবা কোন বাধা উপস্থিত হয়, তখন তারা আল্লাহর সাথে ঝগড়া করে এবং রসূলের প্রতি অভিযোগ উত্থাপন করে। 'মুজাদালাহ' শব্দটি আরবী। এর অর্থ হল ঝগড়া করা। তবে জেদ ধরা এবং একগুঁয়েমি অর্থেও শব্দটির ব্যবহার হয়, যা মূলত প্রেম, বিশ্বাস ও নিষ্ঠার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। অর্থাৎ, যে দল আল্লাহ এবং রসূলের প্রতি বিরূপ ভাবাপন্ন হয়ে আপত্তি কিংবা সমালোচনা করে না অথবা কোরআন-হাদীস নিয়ে উপহাস করে না, বরং নিজেদের সন্দেহ বা দ্বিধা-সংশয় একান্ত প্রেম ও ভক্তি সহকারে উত্থাপন করে এবং তার সমাধান কামনা করে। দ্বিতীয় দলের বৈশিষ্ট্য হল বিরোধিতা করা। অর্থাৎ, তাদের প্রকৃত বাসনাই হল আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করা। তাঁদের যেকোন কথার বিরূপ সমালোচনা করা এবং নানা রকম সন্দেহ উত্থাপন করা।
প্রথমোক্ত দলের অন্তর্ভুক্ত হল একজন মহিলা। সে কোন একটি বিশেষ ধর্মীয় ব্যাপারে কঠিন সংশয়ের সম্মুখীন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু নিজ সংশয়ের জন্যে ধর্মের প্রতি দোষারোপ বা বিরূপ সমালোচনার পরিবর্তে নিজের জটিলতাকে একান্ত বিনয় সহকারে আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের দরবারে উপস্থাপন করে। আল্লাহ তার সবিনয় নিবেদন শোনেন এবং তার জটিলতার সমাধান করে দেন। এরশাদ হচ্ছেঃ
قَدْ سَمِعَ اللَّهُ قَوْلَ الَّتِي تُجَادِلُكَ فِي زَوْجِهَا وَتَشْتَكِيُّ إِلَى اللَّهِ وَاللَّهُ يَسْمَعُ تَحَاوُرَكُمَا إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ .
অর্থাৎ, আল্লাহ সে মহিলার কথা শুনেছেন, যে নিজের স্বামীর ব্যাপারে তোমার সাথে 'ঝগড়া' করছিল, আল্লাহর প্রতি অভিযোগ করছিল এবং আল্লাহ তোমাদের উভয়ের কথাবার্তা শুনছিলেন। আর আল্লাহ শ্রবণকারী ও দর্শনকারী।
দ্বিতীয় দলটি হল মুনাফিকদের, যারা সব সময়ই শুধু এই সুযোগের সন্ধানে নিয়োজিত থাকে যে, এমন কোন বিষয়ের সন্ধান পাওয়া যায় কিনা যাতে কূট প্রশ্ন কিংবা সমালোচনা করা যাবে। তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
إِنَّ الَّذِينَ يُحَادُّونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ كُبِتُوا كَمَا كُبِتَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ وَقَدْ أَنْزَلْنَا آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ وَلِلْكَفِرِينَ عَذَابٌ مُّهِينَ .
অর্থাৎ, যারা আল্লাহ এবং তাঁর রসূলের সাথে ঝগড়া করে, তাদেরকে অপদস্থ করে দেয়া হয়েছে। যেমন করে তাদের আগেও এ ধরনের লোকদেরকে অপদস্থ করা হয়েছে। আর আমি প্রকাশ্য ও সুস্পষ্ট নিদর্শন অবতীর্ণ করেছি। কাফেরদের জন্যে নির্ধারিত রয়েছে অপমানজনক আযাব।
সূরা মুজাদালায় এই দুটি দলের আলোচনা দুটি বিপরীতধর্মী দল হিসেবে করা হয়েছে এবং মানুষকে শিক্ষা দান করাই এর উদ্দেশ্য যে, আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যে আচরণ করা হবে, তা হবে একান্তই সবিনয় নিবেদন ও প্রার্থনার আকারে। তর্ক কিংবা যুক্তির বলে নয়। সুতরাং আল্লাহর দ্বীন কিংবা তাঁর কিতাবের পর্যালোচনা করতে গিয়েও যদি কোন জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে তার সমাধানের একমাত্র পথ হল, যাবতীয় সমস্যা এবং জটিলতা, আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা। তাঁর কাছেই সমাধান এবং সান্ত্বনার আশা করা। পক্ষান্তরে সহসাই এই জটিলতা বা কূট প্রশ্নের অথবা সমালোচনার উপকরণ তৈরী করে নতুন মতবাদ দাঁড় করাতে চেষ্টা করবে না। কিংবা একে কাটছাঁট করে নিজের চাহিদা অনুযায়ী ঢেলে সাজাতে চেষ্টা করবে না। যারা এমন করে তাদের জন্যে কোরআনী জ্ঞান লাভের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে অথবা সমালোচনা করতে করতে তা থেকে এতই দূরে সরে পড়বে যে, পরে আর সে দিকে ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। অথবা কোরআনের ছাঁটকাটের ব্যাপারে এমনই সিদ্ধহস্ত হয়ে দাঁড়াবে যে, ক্রমান্বয়ে কোরআনের প্রতিটি কথাকেই নিজের ইচ্ছানুরূপ ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে শুরু করবে। ফলে তাদের অবস্থাও তেমনি হয়ে দাঁড়াবে যেমন হয়েছিল ইহুদীদের। তারা আল্লাহর সমস্ত গ্রন্থরাজিকে নিজেদেরই কামনা-বাসনার সংকলনে পরিণত করে ছেড়েছিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00