📘 প্রচলিত মানহাজ > 📄 মুসলমানরা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত

📄 মুসলমানরা তিন শ্রেণিতে বিভক্ত


ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখন থেকে ব্যক্তি অনুকরণের রীতি চালু হয়েছে, তখন থেকে জনসাধারণের মধ্যেও তিনটি দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টি হয়েছে。
এক. এই শ্রেণির লোক সব সময় তাকলিদ নিয়ে বাড়াবাড়ি করে। ছোটোখাটো প্রত্যেক মাসয়ালায় নিজের ইমামের অনুসরণ করা ওয়াজিব মনে করে। মাজহাবি গোঁড়ামিতে তারা গভীরভাবে নিমজ্জিত। মাজহাবের ইজতিহাদি বিষয়ও তারা অণু পরিমাণ ছাড় দিতে রাজি নয়। মাজহাব থেকে দূরে সরে যাওয়াকে তারা দ্বীন থেকে সরে যাওয়া মনে করে।
দুই. এই শ্রেণির লোক প্রথম শ্রেণির বিপরীত। তারা সব সময় ব্যক্তি অনুসরণের বিরোধিতা করে। তাদের মতে, সরাসরি কুরআন-হাদিসের অনুসরণ করা জরুরি। মাজহাবের অনুসরণ করা জায়েজ নেই। মাজহাব মানাকে তারা শিরক মনে করে। মাজহাবিদের নিন্দা ও কটূক্তি করে। এ শ্রেণির লোক অন্ধভাবে মাজহাবের বিরোধিতায় লিপ্ত।
তিন. সত্যাশ্রয়ী হকপন্থি কিছু আলিম এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। তাঁরা সব সময় মধ্যমপন্থা অবলম্বী। প্রথম শ্রেণির মতো সর্বক্ষেত্রে তাঁরা মাজহাব মানা ওয়াজিব মনে করে না। আবার দ্বিতীয় শ্রেণির মতো মাজহাবের অন্ধ বিরোধিতাও করে না। তাঁরা মনে করে—যারাই কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণ করে, তারাই আহলে সুন্নত ওয়াল জামায়াতের অন্তর্ভুক্ত; চাই তারা মাজহাবি হোক কিংবা আহলে হাদিস।

📘 প্রচলিত মানহাজ > 📄 হানাফিদের বাড়াবাড়ি

📄 হানাফিদের বাড়াবাড়ি


কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশ অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রত্যেকের দায়িত্ব। এজন্য প্রয়োজন কুরআন-সুন্নাহর যথার্থ জ্ঞান। যদি কেউ এই জ্ঞান লাভ করতে না পারে, তাহলে সে কোনো বিজ্ঞ আলিমকে জিজ্ঞেস করে সে অনুযায়ী আমল করবে। এ কারণেই আলিমদের অনেকে অজ্ঞদের জন্য মাজহাব মানা ওয়াজিব বলেছেন। তাদের এই ওয়াজিব বলার অর্থ হলো—মূলত কুরআর-সুন্নাহ মানা ফরজ। কুরআন-সুন্নাহ মানার উপকরণ হিসেবে মাজহাবের অনুসরণ জরুরি।
অনেক মাজহাবি ভাই মনে করেন, কুরআন-সুন্নাহ মানা একটি ইবাদত। আর মাজহাব মানা আরেকটি ইবাদত। তাই কেউ মাজহাব না মানলে তার বিরুদ্ধে ফতোয়ার বন্যা বইয়ে দেন। তাকে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি দেন।
জনৈক হানাফি আলিম বলেন—'নামাজে জোরে আমিন ও আস্তে আমিন দুটোই হাদিসে রয়েছে। তবে জোরে আমিনের হাদিস জায়েজ বোঝানোর জন্য, আর আস্তে আমিনের হাদিস সুন্নাহ বোঝানোর জন্য (প্রয়োগ করা হয়েছে)।৪৪
এখন প্রশ্ন হতে পারে-জোরে আমিন সুন্নাহ না হলেও নাজায়েজ নয়। তাহলে জোরে আমিন বললে অসুবিধা কোথায়? উত্তরে আমি বলব, এই পদ্ধতি তো স্ত্রীর বেলায়ও আছে। হাদিসে স্ত্রী তালাক দেওয়ার কথা আছে, আবার স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করার কথাও আছে। তালাক দেওয়ার হাদিস জায়েজ বোঝানোর জন্য, আর সংসার করার হাদিস সুন্নাহ বোঝানোর জন্য বর্ণিত হয়েছে। এখন নামাজে আমিন বলার ক্ষেত্রে সুন্নাহ বাদ দিয়ে যদি জায়েজটা গ্রহণ করো, তাহলে বিবির ক্ষেত্রেও সেটা করো। আগে ঘরের বউ তালাক দাও (জায়েজ আছে), তারপর মসজিদে এসে জোরে আমিন বলো (জায়েজ আছে)।'৪৫
তর্কের খাতিরে আমরা যদি তার যুক্তি মেনে নিই, তাহলে ইমাম শাফেয়ি ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর বউ তালাক দেওয়া উচিত ছিল। কারণ, তাঁরা সারাজীবন জোরে আমিন বলেছেন। শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবের সকলের বউ তালাক দেওয়া উচিত। মক্কা-মদিনায় যারা প্রতিদিন জোরে আমিন বলেন, তাদেরও বউ তালাক দেওয়ার পর হারামাইনের এসে জোরে আমিন বলা উচিত।
কওমি মাদরাসার একজন প্রখ্যাত আলিম মাওলানা মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক (হাফি.)। তিনি বলেন-'আমিন আস্তে বলা ও জোরে বলা দুটোই শরিয়তের দলিল দ্বারা প্রমাণিত।'৪৬
মাওলানা সাহেব এবার আব্দুল মালেকের ব্যাপারে কী বলবেন? তাঁকেও কি ফিতনা সৃষ্টিকারী বলবেন? তাঁকেও কি বলবেন-আপনার বউ তালাক দেওয়া উচিত?
আহলে হাদিস ভাইদের কোনো আমল কুরআন-সুন্নাহবহির্ভূত নয়। তাদের প্রত্যেক আমলই কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত। আমরাই বলি চার মাজহাব সঠিক। আবার কেউ অন্য মাজহাবমতো আমল করলে তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দিই। মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী (হাফি.) বলেন- 'চার মাজহাবের ইমামগণের কোনো একটা রায়কে বাতিল বলা যাবে না, কুফর বলা যাবে না, গোমরাহি বলা যাবে না; বরং সবগুলোতে সওয়াব আছে।'৪৭
যদি সবগুলোতে সওয়াব থাকে, তাহলে শাফেয়ি মাজহাবের নিয়ম মেনে জোরে আমিন বললে, বুকে হাত বাঁধলে তাকে মসজিদ থেকে বের করে দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? সে তো কোনো এক মাজহাবের ওপরই আমল করছে। নাকি ধরে নিতে হবে-চার মাজহাব চারটা দ্বীন। প্রথমে মাজহাবের ইমামের প্রতি ঈমান আনতে হবে, তারপর আমল করতে হবে (নাউজুবিল্লাহ)।
আহলে হাদিসের সব আমলই চার মাজহাবের সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই কারও জোরে আমিন বলা, রফউল ইয়াদাইন করা, বুকে হাত বাঁধা, ফজরের নামাজে দুআ কুনুত পড়া, ঈদের নামাজে ১২ তাকবির বলা ইত্যাদি আমলের কারণে তাকে গোমরাহ বলে ফতোয়া দেওয়ার অর্থ হচ্ছে-নিজে এক মাজহাবের অনুসারী হয়ে অন্য মাজহাবের বিরোধিতা করা।
নামাজে জোরে আমিন বলার বিধান দুই মাজহাবে (শাফেয়ি ও হাম্বলি) রয়েছে। ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়ার বিধান তিন মাজহাবে আছে।৪৮ নামাজে রফউল ইয়াদাইন করার বিধান (হস্তদ্বয় উত্তোলন) শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে রয়েছে। আমরা মুখ দিয়ে বলি চার মাজহাব হক, কিন্তু কার্যত শুধু নিজের মাজহাবকে হক মনে করি। আর বাকি তিন মাজহাবের আমলকে বাতিল বলি。
মূলত যারা নিজেকে মাজহাবের অনুসারী দাবি করে, অথচ অন্য মাজহাব মতো নামাজ আদায়কারীদের মসজিদ থেকে বের করে দেয়, তার বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়, তারা মূলত কোনো মাজহাবেরই লোক নয়। কারণ, নিজ মাজহাবের অনুসারী না হলে তাকে মসজিদ থেকে বের করে দিতে হবে-এমন কথা কোনো মাজহাবে নেই। অতীতের ইমামগণ অন্য মাজহাবের ইমামের পেছনেও নামাজ পড়েছেন। কখনো কখনো নিজের মাজহাব ছেড়ে অন্য মাজহাবের ওপরও আমল করেছেন। তাই যারা এসব করেন, তারা মূলত মাজহাবের নামে জালিয়াতি করেন।

টিকাঃ
৪৪. ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, এহইয়াউস-সুনান, (প্রকাশক: উসামা খোন্দকার, আস-সুন্নাহ পাবলিকেশন্স, ঝিনাইদহ, ৫ম সংস্করণ: ২০০৭), পৃষ্ঠা-৪৫৭
৪৫. বক্তব্যের ইউটিউব লিংক, Al-karim online media, শিরোনাম: নামাজে জোরে আমিন বলা যাবে না-ওলিপুরী। আপলোড তারিখ: ৪/২/২০১৭
৪৬. মাওলানা আবদুল মালেক, প্রচলিত ভুল, (প্রকাশনায়: রাহনুমা প্রকাশনী, বাংলাবাজার, ঢাকা, প্রথম প্রকাশ: ২০১২), পৃষ্ঠা-১৮৬
৪৭. মাওয়ায়েজে ওলিপুরী, পৃষ্ঠা-৩৫৫
৪৮. ইমাম মালেক (রহ.) ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)-এর মতে, মাগরিব, এশা ও ফজর নামাজে মুক্তাদি সূরা ফাতিহা পড়বে না, জোহর ও আসর নামাজে পড়তে হবে।

📘 প্রচলিত মানহাজ > 📄 আহলে হাদিসের বাড়াবাড়ি

📄 আহলে হাদিসের বাড়াবাড়ি


বাড়াবাড়ির ক্ষেত্রে আহলে হাদিসের অবস্থান হানাফিদের চেয়ে একটুও উন্নত নয়। তাদের কিছু কাজ ভালো। যেমন: তারা সহিহ হাদিস মানার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে শিরক-বিদআত থেকে দূরে থাকার; কিন্তু তাদেরও একটা ভয়ংকর দিক রয়েছে। তারা শরিয়াহর ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে বাড়াবাড়ি করাকে দ্বীন মনে করে।
সমাজে যে আমল যেভাবে প্রচলিত, সেটাকে সেভাবে করতে দেওয়া উচিত, যদি তা হাদিসসম্মত হয়। যেমন-আস্তে আমিন বলা, রফউল ইয়াদাইন একবার করা, নাভির নিচে বা ওপরে হাত বাঁধা, ঈদের নামাজে ছয় তাকবির বলা ইত্যাদি। এ সবই সুন্নত কর্ম। অথচ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য বজায় রাখা ফরজ, অনৈক্য সৃষ্টি করা হারাম। তারা সহিহ হাদিসের দোহাই দিয়ে এসবের বিরুদ্ধে কথা বলে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করে। মুসলমানদের ঐক্য নষ্ট করে। এই সব বিষয় নিয়ে ঝগড়া করে বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়ে 'আহলে হাদিস' নামে আলাদা মসজিদ তৈরি করে।
বাংলাদেশের যেসব আলিম ফিকহি বিষয়ে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে বলেন, তাদের সমালোচনা করে আহলে হাদিসের একজন প্রসিদ্ধ শাইখ বলেন- 'জোরে আমিন বলা, বুকে হাত বাঁধা, রফউল ইয়াদাইন করা, সালাতে সূরা ফাতিহা পড়া রাসূল -এর সুন্নাহ। কেন আমরা এর বিপরীত আমল করব? যারা নরম স্বরে বলেন-দুটোই সঠিক, তারা দ্বীনের দাওয়াতকে বাধাগ্রস্ত করছেন। যদি মসজিদে জোরে আমিন বলতে না দেয়, রফউল ইয়াদাইন করতে না দেয়, বুকে হাত বাঁধতে না দেয়, তাহলে প্রয়োজনে ঘরে সালাত আদায় করব, তবুও সুন্নতের হেফাজত করব।'৪৯
সুন্নতের হেফাজত করা অবশ্যই জরুরি। এটি প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানি দায়িত্বও বটে, কিন্তু একটা সুন্নতের হেফাজত করতে গিয়ে আরেকটা সুন্নতকে জীবন্ত কবর দেওয়া কি শরিয়াহ সমর্থন করে? নাকি সুন্নাহ হেফাজতের নামে ওয়াজিব ত্যাগ করে হারামে লিপ্ত হওয়া অনুমোদন করে?
জোরে কিংবা আস্তে আমিন বলা, রফউল ইয়াদাইন করা বা না করা, বুকে কিংবা নাভিতে হাত বাঁধা, ইমামের পেছনে সূরা ফাতিহা পড়া বা না পড়া, সবই হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সবই সাহাবি ও সালফে সালেহিনদের আমল। অতএব, এর প্রত্যেকটার হেফাজত করা মুমিনের কর্তব্য। এটাই সুন্নতের প্রকৃত হেফাজত। এগুলোর কোনো একটির বিরুদ্ধে কথা বলা, রাসূল -এর হাদিস, সাহাবি ও সালফে সালেহিনদের বিরুদ্ধাচরণ করার শামিল।
তা ছাড়া জামাতে নামাজ পড়া ওয়াজিব। ফেরকা সৃষ্টি করা হারাম। তাই এসব সুন্নত কর্মের জন্য জামাত বাদ দিয়ে ঘরে নামাজ পড়া, আলাদা মসজিদ তৈরি করে সমাজে ফিতনা সৃষ্টি করা কোনো মুসলমানের জন্য কি বৈধ হতে পারে?
ইতিহাসে এমন একটা ঘটনাও পাওয়া যাবে না, যেখানে সাহাবিগণ মাসয়ালাগত পার্থক্যের কারণে আলাদা মসজিদ তৈরি করেছেন। তাঁদের নামাজকে অন্যদের থেকে পৃথক করে নিয়েছেন কিংবা ঘরে সালাত আদায় করেছেন। নাভির নিচে হাত বাঁধলে, আস্তে আমিন বললে, ঈদের নামাজে ছয় তাকবির দিলে তাকে পুনরায় নামাজ পড়তে বলেছেন।
রাসূল এসব বিষয়ে গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন, নাকি সুদ-ঘুস না খাওয়া, মদ্যপান না করা, দ্বীন প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি বিষয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন? রাসূল যেটার গুরুত্ব বেশি দিয়েছেন, সেটার গুরুত্ব না দিয়ে যেটার প্রতি গুরুত্ব দেননি-সেটাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়াও একধরনের বিদআত। আহলে হাদিসের ভাইয়েরাও একইভাবে সহিহ হাদিসের নামে জালিয়াতি করে যাচ্ছেন।
মাজহাব মানা জায়েজ, এই ব্যাপারে সকল যুগের আলিম একমত। যারা মাজহাব মানা বা তাকলিদকে হারাম বলেছেন, তারা মূলত অন্ধ তাকলিদকে হারাম বলেছেন।৫০ অন্ধ তাকলিদ ও অন্ধ অনুসরণের বিরুদ্ধে আপনারা যতই নিন্দা করুন, তাতে সমস্যা নেই। সত্যাশ্রয়ী যে কেউ আপনাদের এই নিন্দাকে সমর্থন করবে। আপনারা এটাও বলতে পারেন, বেলায়েত, ইমামত, ইজতিহাদ এবং ইলম ও ফজিলত অতীত বুজুর্গদের মধ্যে শেষ হয়ে যায়নি।
যারা বলেন-চার মাজহাবের ইমামদের পরে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তাই নতুন করে আর কেউ ইজতিহাদ করতে পারবে না-তাদের এই কথা সঠিক নয়। ইজতিহাদের দরজা আজও লাভ করা যেতে পারে এবং তা লাভ করার জন্য প্রত্যেকের চেষ্টা করা উচিত, কিন্তু তা না করে কেউ যদি সম্পূর্ণরূপে তাকলিদের বিরোধিতা করেন। ইজতিহাদের শখ দেখিয়ে একগুঁয়েমিভাবে বিরোধিতা করেন অতীত বুজুর্গদের। নিজের বড়োত্ব জাহির করতে গিয়ে উপমহাদেশের বাঘা বাঘা আলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করেন, তাঁদের সমালোচনা করেন। কেবল নতুন নতুন পথ ও মত সৃষ্টির পন্থা হিসেবে 'আহলে হাদিস' নামে আরেকটা মাজহাব তৈরি করেন। প্রকৃত যোগ্যতা ছাড়া দু-চারটা বাংলা কিতাব দেখে ইজতিহাদ করা শুরু করেন। আল্লাহর কিতাব ও রাসূল -এর সুন্নাহকে শিশুদের খেলনাতুল্য বানিয়ে দেন, তাহলে এই গোমরাহি হবে অন্ধ তাকলিদের চেয়েও মারাত্মক এবং দ্বীনের জন্য অধিক ক্ষতিকর।
ওপরে আমরা শাইখ আলবানি ও শাইখ উসাইমিনের বক্তব্য দেখেছি। তাঁদের মতে অজ্ঞ লোকের জন্য বিজ্ঞ কোনো আলিমের তাকলিদ করা শুধু জায়েজই নয়; বরং জরুরি। আহলে হাদিসগণ শাইখ আলবানি ও শাইখ উসাইমিনকে ইমাম হিসেবে মানেন। তারা তাঁদের কথার একচুল বাইরে যেতেও নারাজ। অথচ অন্ধভাবে তাকলিদের বিরোধিতা করার ক্ষেত্রে তারাও নিজ শাইখদের উপেক্ষা করে যাচ্ছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে-তারা একদিকে তাকলিদের বিরোধিতা করছেন, অন্যদিকে নিজেরাই অন্যের তাকলিদ করছেন।

টিকাঃ
৪৯. বক্তব্য লিংক, www.youtube.com/c/BanglaLecture
৫০. দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ: ১/২৬৩

📘 প্রচলিত মানহাজ > 📄 উগ্রপন্থা নয়, মধ্যমপন্থাই কাম্য

📄 উগ্রপন্থা নয়, মধ্যমপন্থাই কাম্য


কুরআনের সকল বক্তব্য সুস্পষ্ট না হলেও, মানুষের হিদায়াতের জন্য যা জানা জরুরি, আল্লাহ তায়ালা তা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় কুরআনে বর্ণনা করেছেন। তা সত্ত্বেও আলিমদের মধ্যে মতবিরোধের কারণ হলো-
এক. কেউ যখন কুরআনি সত্য নিজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে প্রবৃত্ত হয় এবং কুরআনের সীমা অতিক্রম করে নিজের মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করে, তখন মতের পার্থক্য ও মতবিরোধিতা দেখা দেয়।
দুই. মানুষ যখন এমন ছোটোখাটো বিষয় নিয়ে ফতোয়াবাজি শুরু করে-যার দায়িত্ব আল্লাহ এবং রাসূল তার ওপর অর্পণ করেননি-ফলে ফিতনা-ফ্যাসাদের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়।
কিছু আহলে হাদিস ও হানাফি এই দুইটি কাজে খুব দক্ষ। তারা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সহিহ হাদিসকে জয়িফ আর জয়িফ হাদিসকে সহিহ বানিয়ে ফেলে। তাদের কাছে নিজের পক্ষের সবগুলো হাদিস সহিহ আর বিপক্ষের সবগুলো জয়িফ।
উদাহরণ হিসেবে ঈদের নামাজের তাকবিরসংক্রান্ত হাদিসের কথা বলা যায়। ঈদের নামাজের অতিরিক্ত তাকবির সংখ্যা নিয়ে বর্ণিত সব হাদিসই কমবেশি দুর্বল। নির্দিষ্ট সংখ্যার কোনো হাদিসই পরিপূর্ণ বিশুদ্ধ সনদে নবিজি থেকে বর্ণিত হয়নি; কিন্তু সাহাবিদের আমল থেকে ১৩, ১২, ৯ ও ৬ তাকবিরের হাদিসগুলো আবার বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হয়েছে।৫১
এক্ষেত্রে কিছু আহলে হাদিস ১২ তাকবিরের সব হাদিসকে সহিহ আর ছয় তাকবিরের সব হাদিসকে জয়িফ আখ্যায়িত করেন। আবার কিছু হানাফি শুধু ছয় তাকবিরের হাদিসগুলোকে সহিহ আর ১২ তাকবিরের হাদিসগুলো জয়িফ বলে বর্ণনা করেন।
তারাবির রাকাত সংখ্যা নিয়েও একই অবস্থা। আহলে হাদিসগণ বলে, উমর (রা.) কর্তৃক আট রাকাত তারাবি প্রমাণিত। ২০ রাকাতের হাদিস দুর্বল। আর হানাফিগণ বলে, তারাবি সম্পর্কে আট রাকাতের কোনো হাদিস নেই। ২০ রাকাতই উমর (রা.) কর্তৃক প্রমাণিত।
বিপরীত পক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে এভাবেই আমরা হাদিসের নামে জালিয়াতি করে যাচ্ছি। মূলত ইসলাম মানার চেয়ে আমরা ব্যক্তিপূজারি ও প্রবৃত্তির অনুসারী হয়ে উঠছি। তাই সংকীর্ণ মনের ঊর্ধ্বে উঠে বিপরীত মতকে সমর্থন করার সৎ সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَلَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيْلِ اللَّهِ إِنَّ الَّذِيْنَ يَضِلُّونَ عَنْ سَبِيْلِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ بِمَا نَسُوا يَوْمَ الْحِسَابِ
'প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। কারণ, তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী করে ফেলবে। যারা আল্লাহর পথ থেকে বিপথগামী হয়, তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি। কেননা, তারা বিচার দিবসকে ভুলে গেছে।' সূরা ছোয়াদ: ২৬

টিকাঃ
৫১. ড খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর স্যার রচিত হাদিসের আলোকে সালাতুল ঈদের অতিরিক্ত তাকবীর' বইটি দেখুন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00