📄 তাওবা
সমস্ত অদৃশ্য সম্পর্কে সম্মক অবগত, বান্দার গুনাহসমূহ গোপনকারী আল্লাহ্ তায়ালার দিকে গুনাহ ত্যাগ করে ফিরে যাওয়ার নামই হলো তাওবা। আল্লাহওয়ালাদের পথচলা শুরু হয় এখান থেকেই। তাওবাই সফল লোকদের মূল পুঁজি। আল্লাহপ্রেমী ব্যক্তিদের প্রথম পদক্ষেপ। বিপথগামীদের পথে ফেরার কুঞ্চিকা। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত হিসেবে মনোনীত ও নির্বাচিত হওয়ার প্রথম অরুণরশ্মি।
তাওবা আল্লাহর পথের পথিকদের প্রথম, মধ্যম ও সর্বশেষ- মোট কথা একমাত্র অবস্থা। খোদাপ্রেমী বান্দা আমৃত্যু তাওবা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। নিজের আবাস ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমালে তাওবাও তার সাথে সাথে পাড়ি জমায়। সবসময়ের পথচলার সঙ্গী। তার সাথেই তাওবার জীবন যাপন। সুতরাং বান্দার জীবনের সূচনা ও পরিসমাপ্তি তাওবা এবং তাওবা। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَتُوبُوا إِلَى الله جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো’। [১]
উক্ত আয়াতটি একটি মাদানি সুরার আয়াত। সেসময় মদিনায় অবস্থানরত মুসলমানগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান ও আল্লাহ্ তায়ালার সর্বোচ্চ পর্যায়ের বান্দা ও নৈকট্যপ্রাপ্ত মানুষ; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী। তাঁরা ঈমান এনেছেন, অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন, হিজরত করেছেন এবং জিহাদ করেছেন। এমন মানুষদের লক্ষ করে আল্লাহ্ তায়ালা বলছেন তাওবা করতে! উপরন্তু সফলতাকে সংযুক্ত করে দিয়েছেন তাওবার সাথে। অর্থাৎ যদি তোমরা তাওবা করো, তাহলে সফলতা অর্জন করতে পারবে; তাওবাকারি ব্যতীত কেউ সফল হতে পারবে না। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ مَنْ لَّمْ يَتُبْ فَأُولِّيكَ هُمُ الظَّلِمُوْنَ
'যারা তাওবা করবে না, তারাই হলো জালিম'।[২]
আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তাওবাকারি ও জালেম। জালেম তাকে বলা হয় যে তাওবা করে না, যে নিজের রব সম্পর্কে অজ্ঞ, তাঁর হক সম্পর্কে উদাসীন এবং নিজের দোষ ত্রুটি ও এর ফলাফলের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'হে লোক সকল, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো। আল্লাহর শপথ, আমি দিনে সত্তর বারের চেয়েও বেশি তাওবা করি'। [৩]
বান্দা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের রাস্তা ত্যাগ করা- এটাই তাওবা।
বান্দার গুনাহ যদি আল্লাহ্ তায়ালার হক সম্পৃক্ত হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে তাওবার তিনটি শর্ত রয়েছেঃ অনুতপ্ত হওয়া, চিরতরে গুনাহ পরিহার করা এবং পুনরায় না করার বদ্ধমূল প্রতিজ্ঞা করা।
অনুতপ্ত ও লাঞ্ছিত হওয়া ব্যতীত তাওবা সংঘটিত হওয়া সম্ভব না। কেউ যদি অন্যায় ও মন্দের ওপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত না হয়, তাহলে সে গুনাহের ওপর সন্তুষ্ট আছে, এটা তারই প্রমাণ বহন করে। ভবিষ্যতেও সে একই পদ্ধতিতে পুনরায় তা করবে বলে অনুমিত হয়। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'অনুতপ্ত হওয়াই তাওবা'। [৪]
গুনাহকে পরিহার না করে, গুনাহ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়ে তাওবা করার কোনো মানে হয় না।
তৃতীয় শর্ত হলো, পুনরায় গুনাহ না করার বদ্ধমূল প্রতিজ্ঞা করা। তাওবার একনিষ্ঠতা ও সত্যতা এর ওপরই নির্ভরশীল।
পক্ষান্তরে যদি গুনাহ বান্দার হক সংক্রান্ত হয়। তাহলে তাওবাকারীকে অবশ্যই বান্দার যে হক নষ্ট করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বা যার হক নষ্ট করেছে তাকে সন্তুষ্ট করে নিতে হবে। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন—
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে সে যেন তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়, তার ভাই এর জন্য তার নিকট থেকে পুণ্য কেটে নেওয়ার আগেই। কেননা সেখানে (আখিরাতে) কোনো দীনার দিরহাম পাওয়া যাবে না; তার কাছে যদি পুণ্য না থাকে, তাহলে তার (মাজলুম) ভাইয়ের গুনাহ এনে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে'। [e]
উক্ত গুনাহের মধ্যে দুটি হক অন্তর্ভুক্ত। একটি আল্লাহর হক, অপরটি বান্দার হক। বান্দার হক ফিরিয়ে দেওয়ার দ্বারা তাওবার অর্ধেক আদায় হয়। বাকি অর্ধেক অবশিষ্ট থাকে অনুতপ্ত হওয়ার ওপর।
কিছু গুনাহের তাওবার জন্য কিছু বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উল্লখ করছি—
কেউ যদি কারও গীবত বা অপবাদের দ্বারা কারও সম্মানে আঘাত করে, তাহলে কি ওই ব্যক্তিকে জানিয়ে তাওবা করা শর্ত?
ইমাম আবু হানিফা ও মালিক রাহিমাহুমাল্লাহু'র মাজহাব হলো, 'জানিয়ে দিতে হবে'। তাঁরা উপরোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেন।
তবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন-'জানিয়ে দেওয়া শর্ত নয়; বরং তার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে তাওবা করে নেওয়াই যথেষ্ট। অথবা যে স্থানে অন্যের গীবত করেছিল বা কাউকে অপবাদ দিয়েছিল, সে স্থানে তার সুনাম নিয়ে আলোচনা করা এবং তার জন্য ক্ষমার দোয়া করাও তাওবার একটি মাধ্যম'।
কেউ যদি অন্যের মাল আত্মসাৎ করে, তাহলে তা মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি মালিক-অজ্ঞতার দরুন অথবা জীবিত না থাকার কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ওই সম্পদ মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। তাহলে কিয়ামতের দিন পাওনাদাররা চাইলে তাদের জন্য দান কৃত সম্পদের সওয়াব নিয়ে নেবে অথবা চাইলে আত্মসাৎকারীদের পাকড়াও করে তাদের থেকে সওয়াব নিয়ে নেবে। দ্বিতীয় সূরতে আত্মসাৎকারীরা নিজেদের দানকৃত সম্পদের সওয়াব দিয়ে তা বরাবর করে নিতে পারবে; কেননা আল্লাহ্ তায়ালা তার দানের সওয়াব অযথা বরবাদ করবেন না।
বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু একবার একটি দাসী ক্রয় করলেন। যখন তার মূল্য ওজন করতে বসলেন, দাসীর মালিক চলে গেলো। তিনি তার জন্য অনেক দিন অপেক্ষা করলেন। কিন্তু সে আর ফিরে এলো না। অগত্যা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু দাসীর মূল্য সদকা করে দিলেন এবং বললেন, 'হে আল্লাহ্, এটি দাসীর মালিকের পক্ষ থেকে দান। যদি সে এতে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে এর সওয়াব তার ভাগে যাবে। আর যদি অস্বীকার করে, তাহলে এর সওয়াব আমার ভাগে আসবে। আর সে আমার সওয়াব থেকে সে অনুপাতে নিয়ে নেবে'।
কারও সম্পদ যদি হালাল-হারাম মিশ্রিত হয়ে যায় এবং আলাদা করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে হারাম সম্পদ পরিমাণ মাল সদকা করতে হবে। তাহলে অবশিষ্ট সম্পদ তার জন্য হালাল হবে। আল্লাহ্ তায়ালাই ভালো জানেন।
প্রশ্ন-বান্দা যখন গুনাহ থেকে তাওবা করবে, তখন কি সে গুনাহের কারণে হারানো মর্যাদা ফিরে পাবে নাকি ফিরে পাবে না?
উত্তর-একদল উলামায়ে কেরাম বলেন, সে নিজ মর্যাদা ফিরে পাবে; কেননা তাওবা সব ধরণের গুনাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কেমন যেন সে গুনাহই করে নি।
আরেকদল বলেন, সে আগের মর্যাদায় ফিরে যাবে না। কেননা সে গুনাহ করাকালীন নিম্নগামী ছিল। এর আগে সে ওপরের দিকে উঠছিল। গুনাহের মাধ্যমে নিম্নে অধঃপতন শুরু হয়েছে। নামতে নামতে যখন তাওবা করে ফেলবে, এই পরিমাণ মর্যাদা তার কমে যাবে এবং সে এখান থেকে নতুন করে ঊর্ধ্বগমনের প্রস্তুতি নেবে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সহিহ কথা হলো, কতক তাওবাকারি আগের মর্যাদা ফিরে পাবে না, আবার অনেকে গুনাহের পূর্বে যে মর্যাদায় ছিল, তাওবার পর তার চেয়ে উন্নত মর্যাদায় উন্নীত হবে। দাউদ আলাইহিস সালাম তাওবা করার পর ভুল করার আগের চেয়ে বেশি মর্যাদাশীল হয়ে ছিলেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে'।
'একজন পথিক নিশ্চিন্ত মনে নিরাপদে পথ চলছে। কিছুক্ষণ হেঁটে যাচ্ছে, কিছুক্ষণ আরোহণ করে যাচ্ছে। মাঝে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছে। আবার কখনো ঘুমুচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে এক সময় অদূরে একটি বিস্তৃত ছায়াময় ঠাণ্ডা ও তৃপ্তিদায়ক পানিবিশিষ্ট একটি সুন্দর বাগান দেখতে পেলো। তার অন্তর তাকে সে স্থানে যাত্রা বিরতি করতে উদ্বুদ্ধ করলো। সে বাগানে গিয়ে যাত্রা বিরতি করলো। কিছুক্ষণ পর এক ডাকাত তাকে আক্রমণ করলো। তাকে ধরে বেঁধে ফেললো এবং তার যাত্রা শেষ করে দিলো। পথিক এখন চোখের সামনে শুধু মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে। বিশ্বাস করে নিয়েছে, সে এখন মরতে যাচ্ছে, পরিণত হতে যাচ্ছে কীট পতঙ্গের খাদ্যে। এখন আর তার গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব নয়। যখন তার মাথায় এমন চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, হঠাৎ সে দেখল, তার মাথার কাছে তার শক্তিশালী সম্মানীয় পিতা দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তার বাঁধন খুলে দিলেন, তাকে শিকল মুক্ত করলেন। তারপর তাকে বললেন, গন্তব্য পানে এগিয়ে যাও। আর সাবধানে থেকো এসব শত্রুদের থেকে; পথের বাকে বাকে এরা তোমার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে। মনে রেখো, যতক্ষণ তুমি সতর্ক সজাগ থাকবে, সে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যখনই তুমি উদাসীন ও আনমনা হয়ে যাবে, তখনই সে তোমার ওপর আক্রমণ করে বসবে। আমি তোমার আগে আগে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি। পথনির্দেশকও মানতে পারো; আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করো'।
'এখন যদি এই পথিক চালাক, বুদ্ধিমান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সে আগের চেয়ে শক্তিশালী একটি যাত্রা শুরু করবে। সতর্কতার চূড়ান্ত দিয়ে এগিয়ে যাবে গন্তব্যের দিকে। শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য সদা প্রস্তুত ও সজাগ থাকবে। তাহলে তার দ্বিতীয়বারের পথচলা প্রথম বারের চেয়ে জবরদস্ত হবে এবং সে অতিদ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যাবে'।
'পক্ষান্তরে যদি সে শত্রুর ব্যাপারে উদাসীন থাকে। আগের মতই কোনো প্রস্তুতি, সতর্কতা ছাড়াই পথ চলতে থাকে, তাহলে তার অবস্থা আগের মতই হবে। সে আবার শত্রুর ফাঁদে পা দেবে'।
'আর যদি এখন তার যাত্রায় কোনো অনীহা ও দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, ওই বাগানের স্নিগ্ধ ছায়া, মিষ্ট পানি ও সৌন্দর্যের কথা স্মরণ করতে থাকে, তাহলে সে আগের মতোও চলতে পারবে না; এখন তার যাত্রা আরও মন্থর হয়ে যাবে'। তাওবাকারির অবস্থাও এমন তিন রকম হতে পারে।
খাঁটি তাওবা
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ تُوبُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّـَٔاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّٰتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ
'হে মুমিনগণ, আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো। অসম্ভব নয় যে, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মিটিয়ে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত'। [৬]
খাঁটি ও বিশুদ্ধ তাওবা মানে হলো, তাওবাকে যাবতীয় ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা ও ধোঁয়াশা থেকে পরিষ্কার রাখা। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'খাঁটি তাওবা হলো, ব্যক্তি অতীতের কৃতকর্মের ওপর লজ্জিত হওয়া এবং পুনরায় তা না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া'।
কালবি বলেন—'জিহ্বা দ্বারা ইসতিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা, অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া এবং শরীর দিয়ে সংযত থাকা- এই তিনের সম্মেলনেই খাঁটি তাওবা হয়।
সাইদ বিন মুসাইয়াব রহিমাহুল্লাহ বলেন-'খাঁটি তাওবা হলো, তাওবার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করে নেওয়া'।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাওবা বিশুদ্ধ হতে হলে তিনটি উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যক-
এক, তাওবার সময় সমস্ত গুনাহকে ব্যাপকভাবে শামিল করা, যেন এমন কোনো গুনাহ নেই যা তার দ্বারা সংঘটিত হয় নি।
দুই, এবার সমস্ত গুনাহ পরিত্যাগ করার ওপর সংকল্প বদ্ধ হওয়া, যেন কোনো গুনাহের ব্যাপারে কোনো ধরণের সংশয়, দোটানা ও ধীরতা না থাকে; বরং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া যে, সব ধরণের গুনাহই পরিত্যাগ করবে।
তিন, আল্লাহ্ তায়ালার ভীতি, তার আজাবের ভয় এবং তাঁর প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা রেখে তাওবাকে সমস্ত কলুষতা ও বিশুদ্ধতায় ছেদ তৈরি করে এমন যাবতীয় বিষয় থেকে নির্মল রাখা।
নিজের প্রয়োজন, সম্মান, পদ ও পদবী অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বা সম্পদ ও জনবল নিরাপদের রাখার জন্য অথবা মানুষের প্রশংসা অর্জন ও তাদের নিন্দা থেকে বেঁচে থাকা এবং মূর্খদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য কিংবা পার্থিব কোনো কামনা পূরণ করা এবং দারিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্য তাওবা না করা; এসব কিছুই তাওবার বিশুদ্ধতা এবং তা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক'।
বান্দা তখনই তাওবা করতে পারবে, যখন আল্লাহ্ তায়ালা তাকে তাওফিক দান করবেন এবং তা কার্যকর হবে তখন, যখন আল্লাহ্ তায়ালা তার তাওবা কবুল করবেন। অতএব বান্দার তাওবা আল্লাহ্ তায়ালার তাওফিক ও কবুল করার ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَ عَلَى الثَّلَثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَ ضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَّا مَلْجَا مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
'এবং সেই তিনজনের প্রতিও (আল্লাহ্ সদয় হলেন), যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হয়েছিল। যখন প্রশস্ত পৃথিবী তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের নিজেদের জীবন তাদের কাছে দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহর শাস্তি থেকে (পালানোর জন্য) তাঁর কাছে ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহশীল হলেন, যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অনুগ্রহশীল, করুণাময়। [৭]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওই তিনজন তাওবা করার পূর্বে তিনি তাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তাঁর অনুগ্রহের কারণেই তারা তাওবা করতে পেরেছেন। তাঁর অনুগ্রহই তাদের তাওবার মূল সোপান। আল্লাহ্ তায়ালার দুটি নাম 'আওয়াল এবং আখির' শুরু এবং শেষ- এর রহস্যই এটা যে, তিনিই সৃষ্টিকর্তা তিনিই সাহায্যকারী। তিনিই উপায় তৈরি করে দেন তিনিই উপায় গ্রহণ করেন। সুতরাং বান্দাও তাওবা করে, আল্লাহ্ তায়ালাও তাওবা করেন; বান্দার তাওবা হলো, বখে যাওয়ার পর পুনরায় নিজের মালিকের কাছে প্রত্যাবর্তন করা। আর আল্লাহর তাওবা হলো, অনুমতি, সক্ষমতা, সহযোগিতা দান ও কবুল করা।
তাওবার যেমন একটি সূচনা রয়েছে, তেমনি একটি পরিসমাপ্তিও রয়েছে। তাওবার সূচনা হলো, সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলে আল্লাহ্ তায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন করা। আল্লাহ্ তায়ালা সিরাতে মুস্তাকিমে চলার আদেশ দিয়ে বলেন-
وَ أَنَّ هَذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوْهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِه
'আর এই হচ্ছে আমার সরল পথ। তোমরা এ পথই অনুসরণ করবে। অন্যান্য পথ অনুসরণ করবে না; তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। [৮]
আর তাওবার পরিসমাপ্তি হলো, সময় মতো তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং জান্নাতে যাওয়ার পথে অবগাহন করা। অতএব জীবন থাকতে থাকতে তাওবা করলে পরিশেষে জান্নাতে যাওয়া যাবে। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে প্রতিদান স্বরূপ জান্নাত দান করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَ مَنْ تَابَ وَ عَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّه يَتُوْبُ إِلَى اللَّهُ مَتَابًا
'আর যে তাওবা করে এবং সৎকাজ করে, সে তো পুরোপুরি আল্লাহর দিকেই ফিরে আসে'। [৯]
তাওবার রহস্য ও তাৎপর্য
বুঝমান ধীসম্পন্ন বান্দা থেকে যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়, তখন তার কয়েকটি বিষয়ের প্রতি মনযোগী হওয়া আবশ্যক—
এক- উক্ত কাজের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ ও নিষেধ পর্যালোচনা করা। তাহলে এই কাজটা যে ভুল তা নিশ্চিত হতে পারবে এবং নিজের গুনাহকেও স্বীকার করতে পারবে।
দুই- আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতি ও ধমকিগুলোর দিকে মনোনিবেশ করা। তাহলে তার অন্তরে অস্থিরতা ও ভয় তৈরি হবে, যা তাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
তিন- তার ওপর আল্লাহ্ তায়ালার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও তাঁর ভাগ্য নির্ধারণের অপরিহার্যতা নিয়ে চিন্তা করবে। তিনি চাইলে তাকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন, এ কথা ভেবে দেখবে। তাহলে বান্দার অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা, নামসমূহ, গুণাবলী, প্রজ্ঞা, রহমত, সহিষ্ণুতা ও উদারতার জ্ঞান লাভ হবে। ফলে আল্লাহ্ তায়ালার দাসত্বের প্রতি আগ্রহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। আল্লাহ্ তায়ালার নাম ও গুণাবলীসংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতি, সুসংবাদ ও ধমকি সম্পর্কে জানতে পারবে। পৃথিবীতে আল্লাহ্ তায়ালার কর্ম ও কর্মপন্থা সম্পর্কে সম্মক ধারণা লাভ হবে। এভাবে তার অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালার মারেফত জন্ম লাভ করবে, ঈমান মজবুত হবে এবং আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয় ও ফয়সালা নত মস্তকে মেনে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন হবে।
চার- ভাগ্যের ক্ষেত্রে বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার মহত্ত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। পরাক্রমশালী চির পবিত্র আল্লাহ্ তায়ালা যা ইচ্ছা ফয়সালা করেন। তিনি নিজ উন্নত ক্ষমতার বলে বান্দার কলবকে নিজ ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করেন, বান্দার কামনা বাসনার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
ভাগ্য-নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব উপলব্ধি করার আরেকটি মাধ্যম হলো এটা অনুভব করা যে, বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত, তাঁর চাহিদার সামনে অসহায় দুর্বল, তার বাগডোর আল্লাহরই হাতে। তিনি রক্ষা না করলে রক্ষা করার কেউ নেই। তিনি সাহায্য না করলে সক্ষমতা দান করার কেউ নেই। সে প্রশংসিত পরাক্রমশালী সত্ত্বার কবজায় তুচ্ছ ও নিঃস্ব।
আল্লাহর বড়ত্ব অন্তরে স্থাপন করার জন্য বান্দা এই সাক্ষ্য দেবে যে, পরিপূর্ণতা, প্রশংসা এবং সমস্ত বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। ত্রুটি, দোষ, জুলুম, গুনাহ ও প্রয়োজনের কারণে বান্দা নিজেই নিন্দা ও তিরস্কারের হকদার। এভাবে সে যত বেশি আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব এবং নিজের ক্ষুদ্রতা, মুখাপেক্ষিতা ও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার সাক্ষ্য দিতে থাকবে, ততই আল্লাহর বড়ত্ব, পরিপূর্ণতা, ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির বিশ্বাস তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।
পাঁচ- বান্দা যখন গুনাহ করে আল্লাহ্ তায়ালা তা দেখেন। তিনি চাইলেই তা প্রকাশ করে দিয়ে তাকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করতে পারেন। কিন্তু তিনি তো সাত্তার, গুনাহ গোপন কারী। তিনি অনুগ্রহ করে বান্দার গুনাহগুলো লুকিয়ে রাখেন। তদ্রূপ চাইলেই নগদে তাকে শাস্তি দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা মায়া করে তাকে সময় সুযোগ দেন- এসব কথা চিন্তা করলে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
ছয়- আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমা ও অনুগ্রহ নিয়ে ধ্যান করা। ক্ষমা আল্লাহ্ তায়ালার একটি অপার অনুগ্রহ। তিনি যদি বান্দাকে যথাযথভাবে পাকড়াও করেন, তাহলে তিনি ন্যায়পরায়ণ এবং প্রশংসিতই থাকবেন। কিন্তু তিনি নিজ অনুগ্রহে শাস্তির যোগ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন- এসব নিয়ে ভাবলে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, বিনয় এবং তাঁর পরিচিতি বহুত বৃদ্ধি পাবে।
সাত- বান্দার তুচ্ছতা, মুখাপেক্ষিতা, অভাবগ্রস্ততা এবং দাসত্বের চারটি ধাপ আছে-
১- প্রয়োজন ও অভাবের তুচ্ছতা। এক্ষেত্রে তাবৎ সৃষ্টি একই সমান্তরালে।
২- দাসত্ব ও আনুগত্যের তুচ্ছতা। এটা শুধু অনুগত বান্দাদের জন্য খাস।
৩- ভালোবাসার বিনয়। ভালোবাসার পরিমাণ অনুযায়ী প্রেমিক প্রেমাস্পদের কাছে বিনয়ী হয়।
৪- গুনাহ ও অপরাধের তুচ্ছতা।
চারটি তুচ্ছতা যখন বান্দা নিজের মধ্যে দেখতে পাবে, তখন পরিপূর্ণ ও যথাযথভাবে আল্লাহর সামনে নত হতে পারবে।
আট- আল্লাহ্ তায়ালা রিজিকদাতা, তাহলে রিজিকপ্রাপ্তের উপস্থিতি আবশ্যক। আল্লাহ্ তায়ালা সবকিছু দেখেন ও শুনেন, তাহলে দেখা ও শোনার মতো কেউ থাকা অপরিহার্য। তদ্রুপ আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল, তাওবা কবুলকারী, তাহলে যাকে ক্ষমা করবেন, যার তাওবা কবুল করবেন তাঁরও অস্তিত্ব অপরিহার্য। অন্যথায় আল্লাহ্ তায়ালার এসব নাম ও গুণাবলী অকেজো হয়ে যাবে, যা অসম্ভব।
আল্লাহ্ তায়ালা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জ্ঞানী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই বলেন-
'যদি তোমরা গুনাহ না করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের উঠিয়ে নিয়ে এমন এক জাতি প্রেরণ করবেন, যারা গুনাহ করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে; তিনি তাদের ক্ষমা করবেন'। [১০]
আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'মুমিন বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে আল্লাহ্ তায়ালা ভীষণ আনন্দিত হন। ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক আনন্দিত হন, যে ব্যক্তি ছায়া পানিহীন আশংকাপূর্ণ বিজন মরুভূমিতে ঘুমিয়ে পড়ে এবং তার সাথে থাকে খাদ্য পানীয় সহ একটি সওয়ারি। ঘুম থেকে উঠে দেখে সওয়ারি হাতছাড়া হয়ে গেছে। সে নিরাশ হয়ে একটি গাছের ছায়ায় এসে আশ্রয় নেয়। সে তার সওয়ারির ব্যাপারে একদম হতাশ। এমন সময় দেখে যে, তার সওয়ারি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার লাগام ধরে আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠে, 'হে আল্লাহ্, আপনি আমার বান্দার আমি আপনার রব; আনন্দের তিব্রতায় সে ভুল করে বসে। [১১]
প্রিয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন তো, একটি জন্তুকে আপনি ছোট থেকে লালন পালন করে বড় করেছেন। তার ভালোবাসা আপনার অন্তরে প্রোথিত। তাকে আপনি অনেক ভালোবাসেন। আপনার শত্রু তাকে বন্দী করে ফেলেছে। আপনি এখন তার নাগাল পাচ্ছেন না। আপনি জানেন যে, শত্রু তাকে ভীষণ শাস্তি দেবে। তাকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবে। আপনি এখন তার ব্যাপারে হতাশ। কিন্তু অভূতপূর্বভাবে সে শত্রুর হাত থেকে পালিয়ে আপনার দরজায় এসে আপনাকে চমকে দিলো। আপনার গোবরাটের মাটিতে গাল ঘষে ঘষে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে লাগলো। এমন সময় আপনার আনন্দের পরিমাণটা কেমন হবে! আপনি যাকে লালন পালন করেছেন, নিজের মায়া মমতা দিয়ে যাকে গড়ে তুলেছেন, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে যাকে ভালবেসেছেন, তার জন্য যদি আপনার এ পরিমাণ মায়া ও ভালোবাসা হয়, তাহলে যে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্ব দান করেছেন এবং তার ওপর ঢেলে দিয়েছেন নিজ অপার অনুগ্রহের ফল্গুধারা, সে বান্দার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও মমতা কী পরিমাণ হতে পারে!
পাঠক একটু ভেবে দেখবেন!
টিকাঃ
[১] সুরা আন নূর ৩১
[২] সূরা হুজুরাত ১১
[৩] সহিহ বুখারি ৬৩০৭
[৪] মুসনাদ, আহমদ ৩৫৫৬৮; ইবনে মাজাহ ৪২৫২
[৫] সহিহ বুখারি ৬৫৩৪
[৬] সুরা তাহরিম ৮
[৭] সুরা তাওবা ১১৮
[৮] সুরা আনআম ১৫৩
[৯] সূরা ফুরকান ৭১
[১০] সহিহ মুসলিম ৬৮৫৮
[১১] সহিহ মুসলিম ৬৮৪৮