📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 দুনিয়া

📄 দুনিয়া


কুরআন সুন্নাহয় দুনিয়া সম্পর্কে বর্ণিত নিন্দাবাদসমূহ, কিয়ামত পর্যন্ত পালাক্রমিক আগত দিবারাত্রির পরিবর্তন এবং কালকে উদ্যেশ্য করে করা হয় নি। কেননা আল্লাহ্ তায়ালা পরস্পরের অনুগামী করে দিন ও রাত সৃষ্টি করেছেন, যেন যারা উপদেশ গ্রহণের ইচ্ছা রাখে কিংবা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে চায়, তাদের উপকারে আসে, তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে। তাই দুনিয়ার নিন্দা দ্বারা দিন রাত কিংবা কালকে উদ্যেশ্য নেওয়া যায় না। বর্ণিত আছে, 'দিন ও রাত হলো দুটি খাজানা, তাই এ দুটোকে কোন কাজে ব্যয় করছো তা ভেবে দেখো'।
মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'প্রতিটি দিন বলে, “হে আদম সন্তান, আমি আজ তোমার কাছে আগমন করেছি, পরবর্তীতে আর কোনো দিন তোমার কাছে ফিরে আসব না। তাই আমার মাঝে কি করছো ভেবে দেখো"। অতঃপর দিন শেষ হয়ে গেলে তাকে ভাজ করা হয় এবং তার ওপর সিল মেরে দেওয়া হয়। কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তা খোলার আগে আর কখনো তা উন্মুক্ত হবে না'।
কেউ বলেছেন, 'দুনিয়া হলো জান্নাত ও জাহান্নামে যাওয়ার পথ। রাত মানুষের পণ্য আর দিন হলো বাজার'।
সুতরাং সময় হলো বান্দার মূল পুঁজি ও পাথেয়। জাবির রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে লোক একবার বলে 'সুবহানাল্লাহিল আযিম ওয়াবিহামদিহী', তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ লাগানো হয়'। [১]
অতএব যারা সময়কে অনর্থক কাজে ব্যয় করে, তারা ভেবে দেখুক, কত শত খেজুর গাছ হারিয়ে ফেলছে!
একজন আল্লাহওয়ালা এমন ছিলেন, যখন অনেক মানুষ তাঁর মজলিসে উপস্থিত হতো এবং দীর্ঘ সময় পেড়িয়ে যেতো, তখন তিনি বলতেন, 'তোমরা কি যাবে না? সূর্যের ফেরেশতা তাকে টেনে নিতে তো কোনো বিলম্ব করে না, ক্লান্ত হয় না!'
এক লোক একজন আলিমকে বলল, দাঁড়ান আপনার সাথে কথা বলবো। তিনি বললেন, 'প্রথমে সূর্যকে দাঁড় করাও'।
অনুরূপ কুরআন হাদিসে দুনিয়ার ব্যাপারে যে সমস্ত নিন্দা উচ্চারণ করা হয়েছে, সে সব দুনিয়ার স্থান তথা ভূমণ্ডলের জন্যও প্রযোজ্য নয়। জমিনে অবস্থিত পাহাড় পর্বত নদী নালা সমুদ্র ও খনিসমূহেরর সাথেও সংযুক্ত নয়। কেননা এ সব তো আল্লাহ্ তায়ালার পক্ষ থেক নিজ বান্দাদের জন্য নিয়ামত স্বরূপ দান করা হয়েছে। এতে তাদের জন্য যেমন উপকার রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষাগ্রহণের উপাদান এবং স্রষ্টার একত্ব, বড়ত্ব, বিশালত্ব এবং শক্তি সামর্থ্যের নিদর্শন। কাজেই কুরআন সুন্নাহয় বর্ণিত নিন্দাগুলো দুনিয়ায় সংঘটিত 'মানব বংশের কর্মের দিকেই ফিরবে। কারণ তাদের অধিকাংশ কাজই শেষ ফলাফলের ভিত্তিতে প্রশংসা যোগ্য নয়। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
اعْلَمُوا أَنَّمَا الْحَيُوةُ الدُّنْيَا لَعِبٌ وَ لَهُوُ وَ زِيْنَةٌ وَ تَفَاخُرُ بَيْنَكُمْ وَ تَكَاثُرُ فِي الْأَمْوَالِ وَالْأَوْلَادِ
'তোমরা জেনে রাখো, দুনিয়ার জীবন তো কেবল খেলাধুলা, বাহ্যিক সাজসজ্জা, তোমাদের পারস্পরিক অহংকার এবং ধন সম্পদ ও সন্তান সন্ততিতে একে অন্যের ওপরে থাকার প্রতিযোগিতা মাত্র'। [২]
আদম সন্তান দুই ভাগে বিভক্তঃ এক ভাগ হলো তারা, দুনিয়া পরবর্তী ভালো-মন্দের হিসাব নিকাশ এবং শান্তি ও প্রতিদান দেওয়ার জন্য একটি স্থান আছে, যারা এ কথাকে অস্বীকার করে। অর্থাৎ যারা পরকাল বা আখিরাতে অবিশ্বাসী। এদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
إِنَّ الَّذِينَ لَا يَرْجُوْنَ لِقَاءَنَا وَ رَضُوا بِالْحَيُوةِ الدُّنْيَا وَ اطْمَانُوْا بِهَا وَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ أَيْتِنَا غُفِلُوْنَ - أُولَيكَ مَأْوَتَهُمُ النَّارُ بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ
'যারা (আখিরাতে) আমার সাথে সাক্ষাৎ করার আশা রাখে না, পার্থিব জীবন নিয়েই সন্তুষ্ট ও তাতেই পরিতৃপ্ত হয়ে গেছে এবং আমার নিদর্শনাবলী সম্পর্কে উদাসীন, তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম; তাদের কৃতকর্মের বদলায়'। [৩]
এ সমস্ত লোকদের একমাত্র অভিলাষ হলো দুনিয়া উপভোগ করা এবং মৃত্যুর পূর্বে যতটুকু পারা যায় দুনিয়ার স্বাদ আস্বাদন করে নেওয়া। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ الَّذِينَ كَفَرُوا يَتَمَتَّعُوْنَ وَيَأْكُلُوْنَ كَمَا تَأْكُلُ الْأَنْعَامُ وَالنَّارُ مَثْوًى لَّهُمْ
'যারা কাফের, তারা ভোগ বিলাসে মত্ত থাকে এবং আহার করে চতুষ্পদ জন্তু যেভাবে আহার করে। তাদের ঠিকানা হলো জাহান্নাম'।
আর মানব বংশের দ্বিতীয় প্রকার হলো তারা, যারা মৃত্যুর পর শান্তি ও প্রতিদানের স্থানকে বিশ্বাস করে এবং নিজেদেরকে প্রেরিত পয়গম্বরদের সাথে সংশ্লিষ্ট রাখে। অর্থাৎ যারা আল্লাহ্ ও আখিরাতকে বিশ্বাস করে এবং নবী রাসুলের ওপর ঈমান রাখে। এরা আবার তিন ভাগে বিভক্তঃ নিজের প্রতি অত্যাচারী, মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং কল্যাণের পথে অগ্রগামী।
নিজের প্রতি অত্যাচারীঃ এই শ্রেণীর মানুষের সংখ্যাই অধিক। এদের অধিকাংশাই দুনিয়ার চাকচিক্য ও সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হয়ে পড়েছে। অন্যায়ভাবে দুনিয়া অর্জন করছে এবং অন্যায্য পথে ব্যবহার করছে। দুনিয়াই তাদের প্রধান চিন্তা। তাদের সন্তুষ্টি ক্ষোভ বন্ধুত্ব শত্রুতা ইত্যাদি দুনিয়াকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। দুনিয়ার জন্যই তাদের বন্ধুত্ব, শত্রুতাও এর জন্যই। এরা সবাই যদিও আখিরাতের ওপর মোটামুটি বিশ্বাসী, তথাপি দুনিয়ার ভোগ বিলাস ও আনন্দে মাতোয়ারা। দুনিয়ার উদ্যেশ্য সম্পর্কে তারা অসচেতন। দুনিয়া-পরবর্তী জীবনের জন্য পাথেয় অর্জন করার ক্ষেত্র স্বরূপ, এ কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে।
মধ্যপন্থা অবলম্বন কারিঃ এরা দুনিয়াকে গ্রহণ করে শরীয়ত অনুমোদিত পন্থায়। দুনিয়া সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে। নিজের কর্তব্য পালন করার পর অবশিষ্ট অংশটুকু রেখে দেয় দুনিয়ার হালাল ও শরীয়তবৈধ কামনা বাসনা ও অভিলাষগুলো পূরণ করার জন্য। এজন্য অবশ্য তাদের কোনো শাস্তি হবে না; তবে তাদের স্তর ও মান কিছুটা কমে যাবে।
কল্যাণের পথে অগ্রগামীঃ যারা দুনিয়ার উদ্যেশ্য ও হাকিকত অনুধাবন করে এবং সে অনুযায়ী আমল করে। তারা জানে যে, আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুনিয়ায় বসবাস করাচ্ছেন, ভূমিতে প্রেরণ করেছেন তাদের মধ্যে কে উত্তম ইবাদত করে তা যাচাই ও পরিক্ষা করার জন্য। যেমন আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
إِنَّا جَعَلْنَا مَا عَلَى الْأَرْضِ زِينَةً لَّهَا لِنَبْلُوَهُمْ أَيُّهُمْ أَحْسَنُ عَمَلًا
'পৃথিবীতে যা কিছু আছে আমি সেগুলোকে তার শোভা করেছি, মানুষকে এই পরীক্ষা করার জন্য যে, এদের মধ্যে কর্মে ও আমলে কে শ্রেষ্ঠ'। [৪]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুনিয়ার প্রতি অনুৎসাহিত করে আখিরাতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। এরপর আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَإِنَّا لَجَعِلُوْنَ مَا عَلَيْهَا صَعِيدًا جُرُزًا
‘নিশ্চয়ই ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে, আমি একদিন তা সমতল প্রান্তরে পরিণত করবো’।[৫]
এই প্রকারের মানুষজন দুনিয়া থেকে ততটুকুই গ্রহণ করে, অর্জন করে যা একজন মুসাফিরের পাথেয় হিসেবে যথেষ্ট। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
‘দুনিয়ার সাথে আমার কী সম্পর্ক! আমি তো ওই আরোহীর ন্যায়, যে কোনো এক গাছের নিচে বিশ্রাম গ্রহণ করে। পুনরায় চলা শুরু করে আর গাছটিকে ছেড়ে চলে যায়’।[৬]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমাকে অসিয়ত করেছেন—
‘তুমি দুনিয়াতে এমনভাবে থাকো, যেন তুমি একজন পথিক কিংবা প্রবাসী’।[৭]
এই প্রকারের লোকজন যদি তাদের বৈধ চাহিদা পূরণে আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতের জন্য শক্তি অর্জনের নিয়ত করে, তাহলে তাদের কামনাপূরণও ইবাদতে পরিণত হবে এবং এ জন্য তাদের প্রতিদানও দেওয়া হবে। মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি আমার নামায থেকে যেমন সওয়াবের আশা করি, আমার নিদ্রা থেকেও তেমন সওয়াবের আশা করি’।
সাইদ বিন জুবাইর রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘তোমাকে আখিরাত-অন্বেষণ থেকে উদাসীন ও গাফেল করে দেয় যা কিছু, তাই প্রবঞ্চনার পণ্য। আর যা তোমাকে আখিরাতের স্মরণ থেকে গাফেল করে না, তা প্রবঞ্চনার পণ্য না; বরং তার চেয়ে কল্যাণকর বস্তুর দিকে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যম’।
ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন—‘আমি দুনিয়াকে কেন পছন্দ করবো না? অথচ এখানে আমার জীবন যাপনের জন্য খাদ্য সরঞ্জাম আছে, যার মাধ্যমে আমি ইবাদত করার শক্তি অর্জন করি; যা আমাকে জান্নাতে নিয়ে যাবে’।
আবু সাফওয়ান রায়িনি রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, 'আল্লাহ তায়ালা কুরআনে যে দুনিয়ার নিন্দা করেছেন এবং বুদ্ধিমান মাত্রই যে দুনিয়া পরিহার করা উচিত, সেটা কোন দুনিয়া? তিনি জবাবে বললেন, 'দুনিয়ার যে উপাদান দিয়ে তুমি দুনিয়া কামনা করবে, তাই নিন্দিত ও তিরস্কৃত। আর যে উপাদান দিয়ে আখিরাত কামনা করবে, তা নিন্দিত নয়; বরং প্রশংসিত'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন-'মুমিনের জন্য দুনিয়া কতই না উত্তম বাসস্থান; সে অল্প কিছু আমল করে এবং জান্নাতের জন্য পাথেয় অর্জন করে নিয়ে যায়। পক্ষান্তরে কাফের ও মুনাফিকের জন্য দুনিয়া কতই না নিকৃষ্ট আবাস; সে দুনিয়ার রাতগুলো নষ্ট করে এবং জাহান্নামের জন্য পাথেয় অর্জন করে নিয়ে যায়'।
আবু মুসা আশআরি রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করে বলেন-'যে দুনিয়াকে ভালবাসবে তার আখিরাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর যে আখিরাতকে অগ্রাধিকার দেবে, তার দুনিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অতএব তোমরা যা অবশিষ্ট থাকবে তাকে প্রাধান্য দাও যা ফুরিয়ে যাবে তার ওপর।[৮]
আউন বিন আবদুল্লাহ বলেন-'অন্তরের মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাত হলো বাটখারার দুই পাল্লায় ন্যায়; একদিক ওপরে উঠলে অন্যদিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিচে নেমে যায়'।
ওয়াহাব বিন মুনাব্বিহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, দুনিয়া ও আখিরাতের দৃষ্টান্ত হলো-'এক ব্যক্তির দুইজন স্ত্রী আছে। সে একজনকে সন্তুষ্ট করলে অন্যজন বিক্ষুব্ধ হয়ে যায়'।
আবু দারদা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'তোমরা যদি কোনো ব্যক্তির ব্যাপারে হলফ করে বলতে পারো যে, সে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ, তাহলে আমিও হলফ করে বলতে পারবো, সে তোমাদের মাঝে সবচেয়ে ভালো ব্যক্তি'।
আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু তাবিয়িদের লক্ষ্য করে বললেন,
'তোমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবীদের চেয়ে বেশি সালাত আদায় করো, অধিক সিয়াম পালন করো এবং অনেক বেশি মেহনত করো, কিন্তু তাঁরা তোমাদের চেয়ে উত্তম লোক ছিলেন'। লোকেরা বলল, হে আব্দুর রহমানের পিতা, কেন এমনটা হলো? তিনি বললেন, 'তারা তোমাদের চেয়ে বেশি দুনিয়াবিমুখ এবং আখিরাতে অনুরক্ত ছিলেন'।
দুনিয়াপ্রীতির অপকারিতা
সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ঈসা বিন মারিয়াম আলাইহিস সালাম বলতেন, 'দুনিয়াপ্রীতি সমস্ত অনিষ্টের মূল। সম্পদে রয়েছে অনেক অসুখ'। জিজ্ঞেস করা হলো, সম্পদের অসুখ কি? তিনি বললেন, 'সম্পদশালী সাধারণত অহমিকা ও গৌরব থেকে নিরাপদ থাকে না'। তারা বলল, যদি নিরাপদ থাকতে পারে? তিনি বললেন, 'তাহলে তার ব্যস্ততা তাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়'। [৯]
দুনিয়ার ভালোবাসা দ্বারা জাহান্নাম আবাদ হয়। আর দুনিয়াবিমুখতা দ্বারা জান্নাত আবাদ হয়। মদের নেশার চেয়েও দুনিয়াসক্তির নেশা অনেক প্রবল। মদখোর তো কিছুক্ষণ পরেই সম্বিত ফিরে পায়; কিন্তু দুনিয়াসক্ত লোক গোরের অন্ধকারে না গিয়ে এই নেশা থেকে উঠে আসতে পারে না। ইয়াহিয়া বিন মুয়াজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'দুনিয়া হলো শয়তানের মাদক। যে তাতে আসক্ত হয়ে যায়, সে মৃত্যুর সৈন্যদের দেখে, নিজেকে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে আবিষ্কার করে, অনুতপ্ত হওয়ার পূর্বে এই নেশা থেকে মুক্ত হতে পারে না।
দুনিয়াপ্রীতির সবচেয়ে প্রধান অপকার হলো, তা আল্লাহর ভালোবাসা, স্মরণ ও জিকির থেকে গাফেল করে দেয়। সম্পদের কারণে যে আখিরাত থেকে উদাসীন হয়ে যায় সে ক্ষতিগ্রস্ত। অন্তর যখন আল্লাহর স্মরণ থেকে উজাড় হয়ে যায়, তখন শয়তান সেখানে ঘাঁটি স্থাপন করে নেয় এবং যাচ্ছেতাই তাকে পরিচালনা করে। দ্বীনি ক্ষতির ক্ষেত্রে তার এমন একটি মনোভাব তৈরি হয় যে, সে অল্পকিছু ভালো কজ করে সন্তুষ্ট ও তৃপ্তির ঢেকুর তোলে এবং ভাবে যে, আমি অনেক ভালো কাজ করে ফেলেছি।
ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'দুনিয়ায় আগত সকলেই মেহমান এবং তার সম্পদ সমস্ত ধারের বস্তু; কর্জ। সুতরাং মেহমান কিছুদিন পরেই চলে যাবে আর কর্জের সম্পদ ফিরিয়ে দিতে হবে'।
দুনিয়াপ্রীতি সমস্ত অনিষ্টের মূল এবং দ্বীনের জন্য হানিকারক, এ কথার বিশ্লেষণে আল্লাহওয়ালা উলামায়ে কেরাম কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন,
এক, দুনিয়ার ভালোবাসা দুনিয়াকে অন্তরের মাঝে সম্মানযোগ্য করে তোলে। অথচ আল্লাহ্ তায়ালার নিকট দুনিয়া বড়ই তুচ্ছ। আর আল্লাহ্ তায়ালার নিকট তুচ্ছ কোনো জিনিসকে সম্মান করা একটি বড় কবিরা গুনাহ।
দুই, দুনিয়ায় জীবন যাপন করতে যতটুকু প্রয়োজন, ততটুকু বাদে আল্লাহ্ তায়ালা দুনিয়াকে অভিসম্পাত করেছেন, নিন্দা করেছেন এবং এর প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করেছেন। আর আল্লাহ্ তায়ালার অভিশপ্ত নিন্দিত ও ঘৃণিত বিষয়কে যে ভালোবাসে সে আল্লাহ্ তায়ালার ঘৃণা, ক্রোধ এবং আজাবের সম্মুখীন হয়।
তিন, যখন কেউ দুনিয়াকে ভালবেসে ফেলে, তখন সে দুনিয়াকেই নিজের চূড়ান্ত গন্তব্য স্থির করে নেয়। ফলে আল্লাহ্ তায়ালা যে সমস্ত কাজকে তাঁর এবং আখিরাত পর্যন্ত পৌঁছার মাধ্যম বানিয়েছেন, সে এগুলোকে দুনিয়া অর্জনের পেছনে ব্যয় করে। কাজেই বিষয়টি হয়ে যায় একদম বিপরীত, পরিবর্তন হয়ে যায় পুরো দর্শন।
সাকুল্যে এখানে দুটি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছেঃ এক, মাধ্যম বা উপায়কে চূড়ান্ত লক্ষ্য বানিয়ে ফেলা। দুই, আখিরাতের কাজ দিয়ে দুনিয়া তালাশ করা। এই উভয়টিই সবদিক থেকে বিরাট নিকৃষ্ট এবং কুৎসিত ব্যাপার। দা কুমড়োর সম্পর্ককে তারা পরিবর্তন করে ফেলে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَنْ كَانَ يُرِيدُ الْحَيَوةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا نُوَفِّ إِلَيْهِمْ أَعْمَالَهُمْ فِيهَا وَهُمْ فِيهَا لَا يُبْخَسُوْنَ أُولَئِكَ الَّذِينَ لَيْسَ لَهُمْ فِي الْآخِرَةِ إِلَّا النَّارُ وَحَبِطَ مَا صَنَعُوا فِيهَا وَبُطِلٌ مَّا كَانُوا يَعْمَلُوْنَ
'যারা কেবল পার্থিব জীবন ও তার ঠাটবাট চায়, আমি তাদেরকে তাদের কর্মের পূর্ণ ফল এ দুনিয়াতেই ভোগ করতে দেবো এবং এতে তাদের কোনো কম দেওয়া হবে না। এরাই তারা যাদের জন্য আখেরাতে জাহান্নাম ছাড়া কিছুই নেই। যা কিছু কাজকর্ম তারা করেছে তা পরকালে নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তারা যা আমল করেছে তা বাতিল বলে গণ্য হবে'। [১০]
আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের মাঝে ফয়সালার জন্য অবতরণ করবেন। সকল উম্মত সেদিন নতজানু থাকবে। সর্বপ্রথম যাদের ডাকা হবে তারা হলো কুরআনের হাফিজ, আল্লাহর পথের শহীদ এবং প্রচুর ধনসম্পদের অধিকারী একব্যক্তি। আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনের হাফেজকে বলবেন, "আমি আমার রাসুলের ওপর যা নাযিল করেছিলাম, তোমাকে কি সেই বিষয়ের জ্ঞান দেই নি?”
সে বলবে, 'হাঁ, অবশ্যই দিয়েছিলেন, হে আমার রব'। আল্লাহ্ তায়ালা বলবেন, “যে জ্ঞান তুমি লাভ করেছিলে, তদনুসারে কী আমল করেছিলে?” সে বলবে, 'আমি দিন রাত তা তিলাওয়াত করেছি'। আল্লাহ্ তায়ালা বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ'। ফেরেশতাগণও বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলেছ'। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে বলবেন, "তুমি বরং পাঠ করেছো এ জন্য যে, মানুষ বলবে, অমুকে ক্বারি”। আর তা বলা হয়েছে।
অতঃপর নিয়ে আসা হবে ধনী ব্যক্তিকে। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে বলবেন, “তোমাকে কি প্রচুর বিত্ত দেই নি? তোমাকে তো অন্যের প্রতি মুখাপেক্ষী হতে হতো না?” সে বলবে, 'হাঁ অবশ্যই হে আমার রব'। আল্লাহ্ বলবেন,
"তোমাকে আমি যা দিয়ছিলাম তা দিয়ে কী আমল করেছো?" সে বলবে, 'তা দিয়ে আমি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রেখেছি এবং দান সাদকা করেছি'। আল্লাহ্ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'। ফেরেশতাগণও বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'।
এরপর আল্লাহ্ বলবেন, “তোমার নিয়ত ছিল তোমাকে যেন বলা হয় অমুক ব্যক্তি খুব দানশীল”। আর তা বলে হয়েছে।
তারপর আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ব্যক্তিকে আনা হবে। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে বলবেন, “কীজন্য তুমি নিহত হয়েছিলে?” সে বলবে, 'আমাকে আপনার রাস্তায় জিহাদের আদেশ দিয়েছেন। আমি জিহাদ করতে করতে শহীদ হয়ে গেছি'। আল্লাহ্ বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'। ফেরেশতাগণও বলবেন, 'তুমি মিথ্যা বলছো'। এরপর আল্লাহ্ বলবেন, “তুমি বরং যুদ্ধ করেছো এ জন্য যে, লোকে বলবে অমুক অনেক সাহসী”। আর তা বলা হয়েছে।
তারপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমার হাঁটুতে হাত চাপড়ে বললেন, 'আবু হুরাইরা, কিয়ামতের দিন আল্লাহ্ তায়ালার এই তিনজন সৃষ্টি দ্বারাই সর্ব প্রথম জাহান্নামের আগুন প্রজ্বলিত করা হবে'। [১১]
উক্ত হাদিসে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই। দুনিয়ার ভালোবাসা তাদেরকে উত্তম প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করে দিয়েছে। বরবাদ হয়ে গেছে তাদের যাবতীয় আমল। উপরন্তু তারা পরিণত হয়েছে জাহান্নামের উদ্বোধনপাত্রে।
চার, দুনিয়ার ভালোবাসা বান্দা এবং তার আখিরাতের জন্য উপকারী কাজের মাঝে প্রতিবন্ধক হিসেবে দাঁড়ায়। মানুষ তখন দুনিয়া ও তার প্রেমাস্পদ নিয়েই ব্যতিব্যস্ত থাকে। তবে এক্ষেত্রে মানুষের রয়েছে বিভিন্ন স্তরঃ দুনিয়ার ভালোবাসা কাউকে সরাসরি ঈমান এবং শরীয়ত থেকেই গাফেল করে দেয়। আবার অনেককে ওয়াজিব কোনো কর্তব্য পালন করতে বাধা দেয়, যদি তা দুনিয়ার স্বার্থের বিপরীত হয়; তবে কিছু ওয়াজিব কর্তব্য সে পালন করেও বটে। অনেকে আবার সময়মত ওয়াজিব পালন করতে পারে না। যেভাবে আদায় করা দরকার ছিল, সেভাবে পারে না; বরং সময় ও ন্যায্যতায় গড়িমসি করে। কেউ কেউ আবার ওয়াজিব আদায় করার সময় নিজের অন্তরকে আল্লাহ্ তায়ালার সামনে সোপর্দ করতে পারে না, বশে আনতে পারে না নিজের কলবকে। ফলে দেখা যায় অন্তসারশুন্য প্রকাশ্য কর্তব্য আদায় হচ্ছে। দুনিয়ার প্রেমিক ও অনুরাগীদের অবস্থা এতোটাই অশুভ যে, তারা আল্লাহর দাসত্বের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকে; আল্লাহ্ তায়ালার জন্য নিজের অন্তরকে একাগ্র একনিষ্ঠ করতে পারে না; তাঁর জিকিরে নিজের জিহ্বাকে সিক্ত করতে পারে না; না পারে অন্তর ও কলবকে এক সুতোয় গাঁথতে। সুতরাং দুনিয়ার মহব্বত ও ভালোবাসা অপরিহার্যভাবে আখিরাতের জন্য ক্ষতিকর; ঠিক যেভাবে আখিরাতের ভালোবাসা দুনিয়ার জন্য ক্ষতিকর।
পাঁচ, দুনিয়ার ভালবাসা দুনিয়াকে ব্যক্তির একমাত্র অভিলাষ ও মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে। আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে আখিরাত, আল্লাহ্ তায়ালা সেই ব্যক্তির অন্তরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন এবং তার যাবতীয় বিচ্ছিন্ন কাজ একত্রিত করে সুসংহত করে দিবেন, তখন তার নিকট দুনিয়া আগমন করবে বাধ্য হয়ে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তির একমাত্র চিন্তার বিষয় হবে দুনিয়া, আল্লাহ্ তায়ালা সেই ব্যক্তির দুচোখে অভাব অনটন লাগিয়ে দেবেন, তার যাবতীয় কাজ এলোমেলো করে দেবেন, আর তার জন্য দুনিয়ার যতটুকু নির্দিষ্ট সে তার চেয়ে বেশি কিছু ভোগ করতে পারবে না'। [১২]
ছয়, দুনিয়াপ্রেমী দুনিয়া নিয়েই কঠোর আজাবের সম্মুখীন হয়। দুনিয়া অর্জন করতে গিয়ে, সে জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করতে গিয়ে এবং দুনিয়াবাসির সাথে লেনদের করতে গিয়ে তাকে প্রচুর পরিমাণে আজাবের সম্মুখীন হতে হয়। তাছাড়া মৃত্যুর সাথে সাথে সবকিছু রেখে চলে যাওয়া, এটাও একটি আজাব। কবরজগতেও দুনিয়া হারানোর আক্ষেপ, তার বিপরীতে কোনো কিছু না পাওয়া এবং আখিরাতের জন্য কোনো কিছু সঞ্চয় না করার কারণে নির্মম আজাবের স্বীকার হতে হবে। পোকা মাকড় ও কীট পতঙ্গ তার শরীরে যে লীলাখেলা চালাবে, তার রুহ তা অনুভব করে দুশ্চিন্তা, বিষণ্ণতা ও আফসোসে টইটম্বুর হয়ে যাবে।
মোট কথা, দুনিয়া প্রেমিক দুনিয়াতেও আজাবের মধ্যে থাকবে, কবর জগতেও কঠিন আজাবের সম্মুখীন হবে এবং নিজ রবের সাথে সাক্ষাৎ কালেও আজাবের স্বীকার হতে হবে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
فَلَا تُعْجِبْكَ أَمْوَالُهُمْ وَلَا أَوْلَادُهُمْ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ بِهَا فِي الحيوةِ الدُّنْيَا وَ تَزْهَقَ أَنْفُسُهُمْ وَهُمْ كَفِرُوْنَ
'তাদের ধনসম্পদ ও সন্তানসন্ততি যেন আপনাকে বিমুগ্ধ না করে। আল্লাহ্ তো চান দুনিয়ার জীবনে তাদেরকে এসব জিনিষ দ্বারাই শাস্তি দিতে। আর যাতে কাফের অবস্থাতেই তাদের প্রাণ বের হয়'।
জনৈক সালাফ বলেন-'আল্লাহ্ তায়ালা তাদেরকে শাস্তি দিবেন ধন সম্পদ জমা করার দ্বারা, এসবের মায়া নিয়েই তাদের রুহ ত্যাগ করবে এবং এসবের ওপর আল্লাহ্ তায়ালার হক আদায় না করার ক্ষেত্রে তারা কুফরি ও অকৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করবে'।
মাত, দুনিয়াপ্রীতি ও আখিরাতের চেয়ে দুনিয়ার প্রতি অধিক অনুরাগীর চেয়ে নির্বোধ ও বোকা এই পৃথিবীতে দ্বিতীয় কেউ নেই। সে কল্পনাকে প্রাধান্য দেয় বাস্তবতার ওপর। স্বপ্নকে প্রাধান্য দেয় সত্যের ওপর। অস্থায়ী ছায়ামূর্তিকে অগ্রাধিকার দেয় চিরস্থায়ী শান্তির ওপর। নশ্বর পৃথিবীকে অবিনশ্বর জান্নাতের ওপর। আখিরাতের জীবনের স্নিগ্ধতা ও প্রশান্তিকে বিক্রি করে দেয় এমন এক জীবন দ্বারা যা অলীক স্বপ্ন কিংবা বৃক্ষছায়ার ন্যায় অস্থায়ী। বুদ্ধিমান ব্যক্তি কখনো এতো সরল ধোঁকা খেতে পারে না।
জনৈক সালাফ বলেন- 'দুনিয়ার ভোগে যারা ডুবে আছো, শুনে রাখো, দুনিয়ার কোনো স্থায়িত্ব নেই; অস্থায়ী ছায়া নিয়ে ধোঁকা খাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়'।
সূর্যের আলো কখনো কখনো ছায়ায় ঢেকে যায়। এই ছায়া হয় অস্থায়ী এবং ক্রমসংকুচিত। আপনি যদি তাকে ধরার লোভে তার পিছু নেন তাহলে মাঠে মারা যাবেন। এই ছায়াই হলো দুনিয়ার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
মরুভূমিতে তৃষ্ণার্ত ব্যক্তি দূর থেকে রেতচমক দেখে মনে করে পানি। দৌড়ে যায় সে দিকে। কিন্তু গিয়ে সেখানে কিছুই পায় না। শুধু বালু আর বালুই দেখতে পায়। এভাবে এক সময় তার জীবনটাই শেষ হয়ে যায়। এটা দুনিয়ার উত্তম দৃষ্টান্ত।
একজন বৃদ্ধা। তার চেহারা বড় বীভৎস। তার ওপর রয়েছে অনেক অপবাদ। তার স্বামীও তার ধোঁকা থেকে রেহাই পায় নি। সে বিয়ের প্রস্তুতি নিয়েছে। সাজসজ্জা গ্রহণ করেছে নতুন বৌয়ের। ঢেকে দিয়েছে তার চেহারার মলিনতা। প্রস্তাব দেওয়ার জন্য যারা এসেছে, তাদের অনেকেই তার বাহ্যিক চেহারা দেখে পছন্দ করে ফেলেছে; তাদের দৃষ্টি বাহ্যকে অতিক্রম করতে পারে নি। তারা প্রস্তাব দিয়ে দিলো। বৃদ্ধা বলল, মোহর হলো আখিরাত ত্যাগ করতে হবে। আমি ও আখিরাত দুই সতীন। এক সঙ্গে থাকা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। পাণিপ্রার্থী তাকেই প্রাধান্য দিলো। মেনে নিলো তার শর্ত। সে বলল, প্রেয়সীকে পাচ্ছি, আখিরাত হারালেও কোনো সমস্যা নেই। বাসর রাতে যখন ঘোমটা ওঠাল, সমস্ত অলংকার খুলে ফেলল, তখন তার সামনে বাস্তবতা জাহির হলো। তারা দেখল, এর চেয়ে ধোঁকা আর কিছু হতে পারে না। এমতাবস্থায় সে হয়তো তালাক দিয়ে পালিয়ে যাবে কিংবা অন্ধের মতো থেকে যাওয়াকেই প্রাধান্য দেবে; তার বাসর রাত অতিবাহিত হবে ফাঁপা কান্না, আর্ত চিৎকার ও বিলাপে।
আল্লাহর শপথ, দুনিয়া তার প্রেমিকদের আহ্বান করে আকর্ষক ভঙ্গিতে। অনুরাগী ও পাগলেরা দলে দলে ছুটে যায় তার দিকে। দিন রাত একাকার করে তা অর্জন করার চেষ্টা করে। কেউ এক নিমেষের জন্য ক্ষান্ত দেয় না। এক পর্যায়ে দুনিয়া তার জাল বিছিয়ে দেয়। তারা সকলেই দুনিয়ার পাতা জালে ও ফাঁদে আটকা পড়ে। তখন তাদেরকে জবাই দেওয়া হয় অসহায় পশুর ন্যায়।
আহ! দুনিয়াপ্রেমীর দল কতই না অভাগা!

টিকাঃ
[১] জামে তিরমিজি ৩৪৬৪
[২] সুরা হাদিদ ২০
[৩] সুরা ইউসুন ৭
[৪] সুরা কাহাফ ৭
[৫] সুরা কাহাফ ৮
[৬] জামে তিরমিজি ২৩৭৭
[৭] সহিহ বুখারি ৬৪১৬
[৮] মুসনাদ ৪/৪১২; ইবনে হিব্বان ৬১২
[৯] ফাতাওয়া মিসরিয়া, ইবনে তাইমিয়া ৪৮৩; তাখরিজুল ইহইয়া, ইরাকি ৯/১৭০৪; শরহুল আলফিয়া ১/১৩৩
[১০] সুরা হুদ ১৫-১৬
[১১] জামে তিরমিজি ২৩৮২
[১২] জামে তিরমিজি ২৪৬৫

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 তাওবা

📄 তাওবা


সমস্ত অদৃশ্য সম্পর্কে সম্মক অবগত, বান্দার গুনাহসমূহ গোপনকারী আল্লাহ্ তায়ালার দিকে গুনাহ ত্যাগ করে ফিরে যাওয়ার নামই হলো তাওবা। আল্লাহওয়ালাদের পথচলা শুরু হয় এখান থেকেই। তাওবাই সফল লোকদের মূল পুঁজি। আল্লাহপ্রেমী ব্যক্তিদের প্রথম পদক্ষেপ। বিপথগামীদের পথে ফেরার কুঞ্চিকা। আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত হিসেবে মনোনীত ও নির্বাচিত হওয়ার প্রথম অরুণরশ্মি।
তাওবা আল্লাহর পথের পথিকদের প্রথম, মধ্যম ও সর্বশেষ- মোট কথা একমাত্র অবস্থা। খোদাপ্রেমী বান্দা আমৃত্যু তাওবা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারে না। নিজের আবাস ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমালে তাওবাও তার সাথে সাথে পাড়ি জমায়। সবসময়ের পথচলার সঙ্গী। তার সাথেই তাওবার জীবন যাপন। সুতরাং বান্দার জীবনের সূচনা ও পরিসমাপ্তি তাওবা এবং তাওবা। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَتُوبُوا إِلَى الله جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُوْنَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর কাছে তাওবা করো, যাতে তোমরা সফলতা অর্জন করতে পারো’। [১]
উক্ত আয়াতটি একটি মাদানি সুরার আয়াত। সেসময় মদিনায় অবস্থানরত মুসলমানগণ ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মুসলমান ও আল্লাহ্ তায়ালার সর্বোচ্চ পর্যায়ের বান্দা ও নৈকট্যপ্রাপ্ত মানুষ; রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী। তাঁরা ঈমান এনেছেন, অবর্ণনীয় কষ্ট সহ্য করেছেন, হিজরত করেছেন এবং জিহাদ করেছেন। এমন মানুষদের লক্ষ করে আল্লাহ্ তায়ালা বলছেন তাওবা করতে! উপরন্তু সফলতাকে সংযুক্ত করে দিয়েছেন তাওবার সাথে। অর্থাৎ যদি তোমরা তাওবা করো, তাহলে সফলতা অর্জন করতে পারবে; তাওবাকারি ব্যতীত কেউ সফল হতে পারবে না। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ مَنْ لَّمْ يَتُبْ فَأُولِّيكَ هُمُ الظَّلِمُوْنَ
'যারা তাওবা করবে না, তারাই হলো জালিম'।[২]
আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন। তাওবাকারি ও জালেম। জালেম তাকে বলা হয় যে তাওবা করে না, যে নিজের রব সম্পর্কে অজ্ঞ, তাঁর হক সম্পর্কে উদাসীন এবং নিজের দোষ ত্রুটি ও এর ফলাফলের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'হে লোক সকল, তোমরা আল্লাহর কাছে তাওবা করো। আল্লাহর শপথ, আমি দিনে সত্তর বারের চেয়েও বেশি তাওবা করি'। [৩]
বান্দা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং অভিশপ্ত ও পথভ্রষ্টদের রাস্তা ত্যাগ করা- এটাই তাওবা।
বান্দার গুনাহ যদি আল্লাহ্ তায়ালার হক সম্পৃক্ত হয়, তাহলে সেক্ষেত্রে তাওবার তিনটি শর্ত রয়েছেঃ অনুতপ্ত হওয়া, চিরতরে গুনাহ পরিহার করা এবং পুনরায় না করার বদ্ধমূল প্রতিজ্ঞা করা।
অনুতপ্ত ও লাঞ্ছিত হওয়া ব্যতীত তাওবা সংঘটিত হওয়া সম্ভব না। কেউ যদি অন্যায় ও মন্দের ওপর অনুতপ্ত ও লজ্জিত না হয়, তাহলে সে গুনাহের ওপর সন্তুষ্ট আছে, এটা তারই প্রমাণ বহন করে। ভবিষ্যতেও সে একই পদ্ধতিতে পুনরায় তা করবে বলে অনুমিত হয়। আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন—
'অনুতপ্ত হওয়াই তাওবা'। [৪]
গুনাহকে পরিহার না করে, গুনাহ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না হয়ে তাওবা করার কোনো মানে হয় না।
তৃতীয় শর্ত হলো, পুনরায় গুনাহ না করার বদ্ধমূল প্রতিজ্ঞা করা। তাওবার একনিষ্ঠতা ও সত্যতা এর ওপরই নির্ভরশীল।
পক্ষান্তরে যদি গুনাহ বান্দার হক সংক্রান্ত হয়। তাহলে তাওবাকারীকে অবশ্যই বান্দার যে হক নষ্ট করেছে তার ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, বা যার হক নষ্ট করেছে তাকে সন্তুষ্ট করে নিতে হবে। আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন—
'যে ব্যক্তি তার ভাইয়ের ওপর জুলুম করেছে সে যেন তার কাছ থেকে ক্ষমা নিয়ে নেয়, তার ভাই এর জন্য তার নিকট থেকে পুণ্য কেটে নেওয়ার আগেই। কেননা সেখানে (আখিরাতে) কোনো দীনার দিরহাম পাওয়া যাবে না; তার কাছে যদি পুণ্য না থাকে, তাহলে তার (মাজলুম) ভাইয়ের গুনাহ এনে তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে'। [e]
উক্ত গুনাহের মধ্যে দুটি হক অন্তর্ভুক্ত। একটি আল্লাহর হক, অপরটি বান্দার হক। বান্দার হক ফিরিয়ে দেওয়ার দ্বারা তাওবার অর্ধেক আদায় হয়। বাকি অর্ধেক অবশিষ্ট থাকে অনুতপ্ত হওয়ার ওপর।
কিছু গুনাহের তাওবার জন্য কিছু বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি উল্লখ করছি—
কেউ যদি কারও গীবত বা অপবাদের দ্বারা কারও সম্মানে আঘাত করে, তাহলে কি ওই ব্যক্তিকে জানিয়ে তাওবা করা শর্ত?
ইমাম আবু হানিফা ও মালিক রাহিমাহুমাল্লাহু'র মাজহাব হলো, 'জানিয়ে দিতে হবে'। তাঁরা উপরোক্ত হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেন।
তবে শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন-'জানিয়ে দেওয়া শর্ত নয়; বরং তার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে তাওবা করে নেওয়াই যথেষ্ট। অথবা যে স্থানে অন্যের গীবত করেছিল বা কাউকে অপবাদ দিয়েছিল, সে স্থানে তার সুনাম নিয়ে আলোচনা করা এবং তার জন্য ক্ষমার দোয়া করাও তাওবার একটি মাধ্যম'।
কেউ যদি অন্যের মাল আত্মসাৎ করে, তাহলে তা মালিকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। যদি মালিক-অজ্ঞতার দরুন অথবা জীবিত না থাকার কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে ওই সম্পদ মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে দেওয়া ওয়াজিব। তাহলে কিয়ামতের দিন পাওনাদাররা চাইলে তাদের জন্য দান কৃত সম্পদের সওয়াব নিয়ে নেবে অথবা চাইলে আত্মসাৎকারীদের পাকড়াও করে তাদের থেকে সওয়াব নিয়ে নেবে। দ্বিতীয় সূরতে আত্মসাৎকারীরা নিজেদের দানকৃত সম্পদের সওয়াব দিয়ে তা বরাবর করে নিতে পারবে; কেননা আল্লাহ্ তায়ালা তার দানের সওয়াব অযথা বরবাদ করবেন না।
বর্ণিত আছে, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু একবার একটি দাসী ক্রয় করলেন। যখন তার মূল্য ওজন করতে বসলেন, দাসীর মালিক চলে গেলো। তিনি তার জন্য অনেক দিন অপেক্ষা করলেন। কিন্তু সে আর ফিরে এলো না। অগত্যা আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রদিয়াল্লাহু আনহু দাসীর মূল্য সদকা করে দিলেন এবং বললেন, 'হে আল্লাহ্, এটি দাসীর মালিকের পক্ষ থেকে দান। যদি সে এতে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে এর সওয়াব তার ভাগে যাবে। আর যদি অস্বীকার করে, তাহলে এর সওয়াব আমার ভাগে আসবে। আর সে আমার সওয়াব থেকে সে অনুপাতে নিয়ে নেবে'।
কারও সম্পদ যদি হালাল-হারাম মিশ্রিত হয়ে যায় এবং আলাদা করা সম্ভব না হয়, তাহলে তাকে হারাম সম্পদ পরিমাণ মাল সদকা করতে হবে। তাহলে অবশিষ্ট সম্পদ তার জন্য হালাল হবে। আল্লাহ্ তায়ালাই ভালো জানেন।
প্রশ্ন-বান্দা যখন গুনাহ থেকে তাওবা করবে, তখন কি সে গুনাহের কারণে হারানো মর্যাদা ফিরে পাবে নাকি ফিরে পাবে না?
উত্তর-একদল উলামায়ে কেরাম বলেন, সে নিজ মর্যাদা ফিরে পাবে; কেননা তাওবা সব ধরণের গুনাহকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়। কেমন যেন সে গুনাহই করে নি।
আরেকদল বলেন, সে আগের মর্যাদায় ফিরে যাবে না। কেননা সে গুনাহ করাকালীন নিম্নগামী ছিল। এর আগে সে ওপরের দিকে উঠছিল। গুনাহের মাধ্যমে নিম্নে অধঃপতন শুরু হয়েছে। নামতে নামতে যখন তাওবা করে ফেলবে, এই পরিমাণ মর্যাদা তার কমে যাবে এবং সে এখান থেকে নতুন করে ঊর্ধ্বগমনের প্রস্তুতি নেবে।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'সহিহ কথা হলো, কতক তাওবাকারি আগের মর্যাদা ফিরে পাবে না, আবার অনেকে গুনাহের পূর্বে যে মর্যাদায় ছিল, তাওবার পর তার চেয়ে উন্নত মর্যাদায় উন্নীত হবে। দাউদ আলাইহিস সালাম তাওবা করার পর ভুল করার আগের চেয়ে বেশি মর্যাদাশীল হয়ে ছিলেন। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে'।
'একজন পথিক নিশ্চিন্ত মনে নিরাপদে পথ চলছে। কিছুক্ষণ হেঁটে যাচ্ছে, কিছুক্ষণ আরোহণ করে যাচ্ছে। মাঝে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচ্ছে। আবার কখনো ঘুমুচ্ছে। এভাবে চলতে চলতে এক সময় অদূরে একটি বিস্তৃত ছায়াময় ঠাণ্ডা ও তৃপ্তিদায়ক পানিবিশিষ্ট একটি সুন্দর বাগান দেখতে পেলো। তার অন্তর তাকে সে স্থানে যাত্রা বিরতি করতে উদ্বুদ্ধ করলো। সে বাগানে গিয়ে যাত্রা বিরতি করলো। কিছুক্ষণ পর এক ডাকাত তাকে আক্রমণ করলো। তাকে ধরে বেঁধে ফেললো এবং তার যাত্রা শেষ করে দিলো। পথিক এখন চোখের সামনে শুধু মৃত্যু দেখতে পাচ্ছে। বিশ্বাস করে নিয়েছে, সে এখন মরতে যাচ্ছে, পরিণত হতে যাচ্ছে কীট পতঙ্গের খাদ্যে। এখন আর তার গন্তব্যে যাওয়া সম্ভব নয়। যখন তার মাথায় এমন চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে, হঠাৎ সে দেখল, তার মাথার কাছে তার শক্তিশালী সম্মানীয় পিতা দাঁড়িয়ে আছে। তিনি তার বাঁধন খুলে দিলেন, তাকে শিকল মুক্ত করলেন। তারপর তাকে বললেন, গন্তব্য পানে এগিয়ে যাও। আর সাবধানে থেকো এসব শত্রুদের থেকে; পথের বাকে বাকে এরা তোমার জন্য ওঁত পেতে বসে আছে। মনে রেখো, যতক্ষণ তুমি সতর্ক সজাগ থাকবে, সে তোমার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যখনই তুমি উদাসীন ও আনমনা হয়ে যাবে, তখনই সে তোমার ওপর আক্রমণ করে বসবে। আমি তোমার আগে আগে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছি। পথনির্দেশকও মানতে পারো; আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করো'।
'এখন যদি এই পথিক চালাক, বুদ্ধিমান ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাহলে সে আগের চেয়ে শক্তিশালী একটি যাত্রা শুরু করবে। সতর্কতার চূড়ান্ত দিয়ে এগিয়ে যাবে গন্তব্যের দিকে। শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য সদা প্রস্তুত ও সজাগ থাকবে। তাহলে তার দ্বিতীয়বারের পথচলা প্রথম বারের চেয়ে জবরদস্ত হবে এবং সে অতিদ্রুত গন্তব্যে পৌঁছে যাবে'।
'পক্ষান্তরে যদি সে শত্রুর ব্যাপারে উদাসীন থাকে। আগের মতই কোনো প্রস্তুতি, সতর্কতা ছাড়াই পথ চলতে থাকে, তাহলে তার অবস্থা আগের মতই হবে। সে আবার শত্রুর ফাঁদে পা দেবে'।
'আর যদি এখন তার যাত্রায় কোনো অনীহা ও দুর্বলতা সৃষ্টি হয়, ওই বাগানের স্নিগ্ধ ছায়া, মিষ্ট পানি ও সৌন্দর্যের কথা স্মরণ করতে থাকে, তাহলে সে আগের মতোও চলতে পারবে না; এখন তার যাত্রা আরও মন্থর হয়ে যাবে'। তাওবাকারির অবস্থাও এমন তিন রকম হতে পারে।
খাঁটি তাওবা
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ تُوبُوٓا۟ إِلَى ٱللَّهِ تَوْبَةً نَّصُوحًا عَسَىٰ رَبُّكُمْ أَن يُكَفِّرَ عَنكُمْ سَيِّـَٔاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّٰتٍ تَجْرِى مِن تَحْتِهَا ٱلْأَنْهَٰرُ
'হে মুমিনগণ, আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা করো। অসম্ভব নয় যে, তোমাদের রব তোমাদের পাপসমূহ মিটিয়ে দেবেন এবং তোমাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত'। [৬]
খাঁটি ও বিশুদ্ধ তাওবা মানে হলো, তাওবাকে যাবতীয় ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা ও ধোঁয়াশা থেকে পরিষ্কার রাখা। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'খাঁটি তাওবা হলো, ব্যক্তি অতীতের কৃতকর্মের ওপর লজ্জিত হওয়া এবং পুনরায় তা না করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া'।
কালবি বলেন—'জিহ্বা দ্বারা ইসতিগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করা, অন্তরে অনুতপ্ত হওয়া এবং শরীর দিয়ে সংযত থাকা- এই তিনের সম্মেলনেই খাঁটি তাওবা হয়।
সাইদ বিন মুসাইয়াব রহিমাহুল্লাহ বলেন-'খাঁটি তাওবা হলো, তাওবার মাধ্যমে নিজেকে সংশোধন করে নেওয়া'।
ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তাওবা বিশুদ্ধ হতে হলে তিনটি উপাদানের উপস্থিতি আবশ্যক-
এক, তাওবার সময় সমস্ত গুনাহকে ব্যাপকভাবে শামিল করা, যেন এমন কোনো গুনাহ নেই যা তার দ্বারা সংঘটিত হয় নি।
দুই, এবার সমস্ত গুনাহ পরিত্যাগ করার ওপর সংকল্প বদ্ধ হওয়া, যেন কোনো গুনাহের ব্যাপারে কোনো ধরণের সংশয়, দোটানা ও ধীরতা না থাকে; বরং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া যে, সব ধরণের গুনাহই পরিত্যাগ করবে।
তিন, আল্লাহ্ তায়ালার ভীতি, তার আজাবের ভয় এবং তাঁর প্রতিদানের আকাঙ্ক্ষা রেখে তাওবাকে সমস্ত কলুষতা ও বিশুদ্ধতায় ছেদ তৈরি করে এমন যাবতীয় বিষয় থেকে নির্মল রাখা।
নিজের প্রয়োজন, সম্মান, পদ ও পদবী অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য বা সম্পদ ও জনবল নিরাপদের রাখার জন্য অথবা মানুষের প্রশংসা অর্জন ও তাদের নিন্দা থেকে বেঁচে থাকা এবং মূর্খদের ধোঁকা দেওয়ার জন্য কিংবা পার্থিব কোনো কামনা পূরণ করা এবং দারিদ্রতা থেকে মুক্তির জন্য তাওবা না করা; এসব কিছুই তাওবার বিশুদ্ধতা এবং তা আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক'।
বান্দা তখনই তাওবা করতে পারবে, যখন আল্লাহ্ তায়ালা তাকে তাওফিক দান করবেন এবং তা কার্যকর হবে তখন, যখন আল্লাহ্ তায়ালা তার তাওবা কবুল করবেন। অতএব বান্দার তাওবা আল্লাহ্ তায়ালার তাওফিক ও কবুল করার ওপর নির্ভরশীল। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَ عَلَى الثَّلَثَةِ الَّذِينَ خُلِّفُوا حَتَّى إِذَا ضَاقَتْ عَلَيْهِمُ الْأَرْضُ بِمَا رَحُبَتْ وَ ضَاقَتْ عَلَيْهِمْ أَنْفُسُهُمْ وَظَنُّوا أَنْ لَّا مَلْجَا مِنَ اللَّهِ إِلَّا إِلَيْهِ ثُمَّ تَابَ عَلَيْهِمْ لِيَتُوْبُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ
'এবং সেই তিনজনের প্রতিও (আল্লাহ্ সদয় হলেন), যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত মূলতবী রাখা হয়েছিল। যখন প্রশস্ত পৃথিবী তাদের জন্য সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল আর তাদের নিজেদের জীবন তাদের কাছে দুর্বিষহ হয়ে গিয়েছিল এবং তাঁরা উপলব্ধি করেছিল যে, আল্লাহর শাস্তি থেকে (পালানোর জন্য) তাঁর কাছে ছাড়া কোনো আশ্রয়স্থল নেই। অতঃপর তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহশীল হলেন, যাতে তারা তাওবা করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অনুগ্রহশীল, করুণাময়। [৭]
উক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তায়ালা জানিয়ে দিয়েছেন যে, ওই তিনজন তাওবা করার পূর্বে তিনি তাদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন। তাঁর অনুগ্রহের কারণেই তারা তাওবা করতে পেরেছেন। তাঁর অনুগ্রহই তাদের তাওবার মূল সোপান। আল্লাহ্ তায়ালার দুটি নাম 'আওয়াল এবং আখির' শুরু এবং শেষ- এর রহস্যই এটা যে, তিনিই সৃষ্টিকর্তা তিনিই সাহায্যকারী। তিনিই উপায় তৈরি করে দেন তিনিই উপায় গ্রহণ করেন। সুতরাং বান্দাও তাওবা করে, আল্লাহ্ তায়ালাও তাওবা করেন; বান্দার তাওবা হলো, বখে যাওয়ার পর পুনরায় নিজের মালিকের কাছে প্রত্যাবর্তন করা। আর আল্লাহর তাওবা হলো, অনুমতি, সক্ষমতা, সহযোগিতা দান ও কবুল করা।
তাওবার যেমন একটি সূচনা রয়েছে, তেমনি একটি পরিসমাপ্তিও রয়েছে। তাওবার সূচনা হলো, সিরাতে মুস্তাকিমের ওপর চলে আল্লাহ্ তায়ালার দিকে প্রত্যাবর্তন করা। আল্লাহ্ তায়ালা সিরাতে মুস্তাকিমে চলার আদেশ দিয়ে বলেন-
وَ أَنَّ هَذَا صِرَاطِيْ مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوْهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِه
'আর এই হচ্ছে আমার সরল পথ। তোমরা এ পথই অনুসরণ করবে। অন্যান্য পথ অনুসরণ করবে না; তাহলে সেসব পথ তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলবে। [৮]
আর তাওবার পরিসমাপ্তি হলো, সময় মতো তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করা এবং জান্নাতে যাওয়ার পথে অবগাহন করা। অতএব জীবন থাকতে থাকতে তাওবা করলে পরিশেষে জান্নাতে যাওয়া যাবে। আল্লাহ্ তায়ালা তাকে প্রতিদান স্বরূপ জান্নাত দান করবেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَ مَنْ تَابَ وَ عَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّه يَتُوْبُ إِلَى اللَّهُ مَتَابًا
'আর যে তাওবা করে এবং সৎকাজ করে, সে তো পুরোপুরি আল্লাহর দিকেই ফিরে আসে'। [৯]
তাওবার রহস্য ও তাৎপর্য
বুঝমান ধীসম্পন্ন বান্দা থেকে যখন কোনো গুনাহ সংঘটিত হয়, তখন তার কয়েকটি বিষয়ের প্রতি মনযোগী হওয়া আবশ্যক—
এক- উক্ত কাজের ব্যাপারে আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ ও নিষেধ পর্যালোচনা করা। তাহলে এই কাজটা যে ভুল তা নিশ্চিত হতে পারবে এবং নিজের গুনাহকেও স্বীকার করতে পারবে।
দুই- আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতি ও ধমকিগুলোর দিকে মনোনিবেশ করা। তাহলে তার অন্তরে অস্থিরতা ও ভয় তৈরি হবে, যা তাকে তাওবা করতে উদ্বুদ্ধ করবে।
তিন- তার ওপর আল্লাহ্ তায়ালার একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ, তাঁর নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ও তাঁর ভাগ্য নির্ধারণের অপরিহার্যতা নিয়ে চিন্তা করবে। তিনি চাইলে তাকে গুনাহ থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন, এ কথা ভেবে দেখবে। তাহলে বান্দার অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা, নামসমূহ, গুণাবলী, প্রজ্ঞা, রহমত, সহিষ্ণুতা ও উদারতার জ্ঞান লাভ হবে। ফলে আল্লাহ্ তায়ালার দাসত্বের প্রতি আগ্রহ উদ্দীপনা সৃষ্টি হবে। আল্লাহ্ তায়ালার নাম ও গুণাবলীসংশ্লিষ্ট প্রতিশ্রুতি, সুসংবাদ ও ধমকি সম্পর্কে জানতে পারবে। পৃথিবীতে আল্লাহ্ তায়ালার কর্ম ও কর্মপন্থা সম্পর্কে সম্মক ধারণা লাভ হবে। এভাবে তার অন্তরে আল্লাহ্ তায়ালার মারেফত জন্ম লাভ করবে, ঈমান মজবুত হবে এবং আল্লাহ্ তায়ালার নির্ণয় ও ফয়সালা নত মস্তকে মেনে নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন হবে।
চার- ভাগ্যের ক্ষেত্রে বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার মহত্ত্ব অনুধাবন করার চেষ্টা করবে। পরাক্রমশালী চির পবিত্র আল্লাহ্ তায়ালা যা ইচ্ছা ফয়সালা করেন। তিনি নিজ উন্নত ক্ষমতার বলে বান্দার কলবকে নিজ ইচ্ছানুযায়ী পরিবর্তন করেন, বান্দার কামনা বাসনার সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়ে যান।
ভাগ্য-নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব উপলব্ধি করার আরেকটি মাধ্যম হলো এটা অনুভব করা যে, বান্দা আল্লাহ্ তায়ালার ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত, তাঁর চাহিদার সামনে অসহায় দুর্বল, তার বাগডোর আল্লাহরই হাতে। তিনি রক্ষা না করলে রক্ষা করার কেউ নেই। তিনি সাহায্য না করলে সক্ষমতা দান করার কেউ নেই। সে প্রশংসিত পরাক্রমশালী সত্ত্বার কবজায় তুচ্ছ ও নিঃস্ব।
আল্লাহর বড়ত্ব অন্তরে স্থাপন করার জন্য বান্দা এই সাক্ষ্য দেবে যে, পরিপূর্ণতা, প্রশংসা এবং সমস্ত বড়ত্ব একমাত্র আল্লাহ তায়ালার। ত্রুটি, দোষ, জুলুম, গুনাহ ও প্রয়োজনের কারণে বান্দা নিজেই নিন্দা ও তিরস্কারের হকদার। এভাবে সে যত বেশি আল্লাহ্ তায়ালার বড়ত্ব এবং নিজের ক্ষুদ্রতা, মুখাপেক্ষিতা ও ত্রুটিপূর্ণ হওয়ার সাক্ষ্য দিতে থাকবে, ততই আল্লাহর বড়ত্ব, পরিপূর্ণতা, ক্ষমতা ও সমৃদ্ধির বিশ্বাস তার অন্তরে বদ্ধমূল হবে।
পাঁচ- বান্দা যখন গুনাহ করে আল্লাহ্ তায়ালা তা দেখেন। তিনি চাইলেই তা প্রকাশ করে দিয়ে তাকে লাঞ্ছিত অপদস্থ করতে পারেন। কিন্তু তিনি তো সাত্তার, গুনাহ গোপন কারী। তিনি অনুগ্রহ করে বান্দার গুনাহগুলো লুকিয়ে রাখেন। তদ্রূপ চাইলেই নগদে তাকে শাস্তি দিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা মায়া করে তাকে সময় সুযোগ দেন- এসব কথা চিন্তা করলে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা অনেকাংশে বেড়ে যাবে।
ছয়- আল্লাহ্ তায়ালার ক্ষমা ও অনুগ্রহ নিয়ে ধ্যান করা। ক্ষমা আল্লাহ্ তায়ালার একটি অপার অনুগ্রহ। তিনি যদি বান্দাকে যথাযথভাবে পাকড়াও করেন, তাহলে তিনি ন্যায়পরায়ণ এবং প্রশংসিতই থাকবেন। কিন্তু তিনি নিজ অনুগ্রহে শাস্তির যোগ্য বান্দাকে ক্ষমা করে দেন- এসব নিয়ে ভাবলে আল্লাহ্ তায়ালার প্রতি ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা, বিনয় এবং তাঁর পরিচিতি বহুত বৃদ্ধি পাবে।
সাত- বান্দার তুচ্ছতা, মুখাপেক্ষিতা, অভাবগ্রস্ততা এবং দাসত্বের চারটি ধাপ আছে-
১- প্রয়োজন ও অভাবের তুচ্ছতা। এক্ষেত্রে তাবৎ সৃষ্টি একই সমান্তরালে।
২- দাসত্ব ও আনুগত্যের তুচ্ছতা। এটা শুধু অনুগত বান্দাদের জন্য খাস।
৩- ভালোবাসার বিনয়। ভালোবাসার পরিমাণ অনুযায়ী প্রেমিক প্রেমাস্পদের কাছে বিনয়ী হয়।
৪- গুনাহ ও অপরাধের তুচ্ছতা।
চারটি তুচ্ছতা যখন বান্দা নিজের মধ্যে দেখতে পাবে, তখন পরিপূর্ণ ও যথাযথভাবে আল্লাহর সামনে নত হতে পারবে।
আট- আল্লাহ্ তায়ালা রিজিকদাতা, তাহলে রিজিকপ্রাপ্তের উপস্থিতি আবশ্যক। আল্লাহ্ তায়ালা সবকিছু দেখেন ও শুনেন, তাহলে দেখা ও শোনার মতো কেউ থাকা অপরিহার্য। তদ্রুপ আল্লাহ্ তায়ালা ক্ষমাশীল, তাওবা কবুলকারী, তাহলে যাকে ক্ষমা করবেন, যার তাওবা কবুল করবেন তাঁরও অস্তিত্ব অপরিহার্য। অন্যথায় আল্লাহ্ তায়ালার এসব নাম ও গুণাবলী অকেজো হয়ে যাবে, যা অসম্ভব।
আল্লাহ্ তায়ালা সম্পর্কে সবচেয়ে ভালো জ্ঞানী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাই বলেন-
'যদি তোমরা গুনাহ না করো, তাহলে আল্লাহ তোমাদের উঠিয়ে নিয়ে এমন এক জাতি প্রেরণ করবেন, যারা গুনাহ করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে; তিনি তাদের ক্ষমা করবেন'। [১০]
আনাস বিন মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'মুমিন বান্দা যখন আল্লাহর কাছে তাওবা করে আল্লাহ্ তায়ালা ভীষণ আনন্দিত হন। ওই ব্যক্তির চেয়ে অধিক আনন্দিত হন, যে ব্যক্তি ছায়া পানিহীন আশংকাপূর্ণ বিজন মরুভূমিতে ঘুমিয়ে পড়ে এবং তার সাথে থাকে খাদ্য পানীয় সহ একটি সওয়ারি। ঘুম থেকে উঠে দেখে সওয়ারি হাতছাড়া হয়ে গেছে। সে নিরাশ হয়ে একটি গাছের ছায়ায় এসে আশ্রয় নেয়। সে তার সওয়ারির ব্যাপারে একদম হতাশ। এমন সময় দেখে যে, তার সওয়ারি তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। সে তার লাগام ধরে আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠে, 'হে আল্লাহ্, আপনি আমার বান্দার আমি আপনার রব; আনন্দের তিব্রতায় সে ভুল করে বসে। [১১]
প্রিয় পাঠক, একবার ভেবে দেখুন তো, একটি জন্তুকে আপনি ছোট থেকে লালন পালন করে বড় করেছেন। তার ভালোবাসা আপনার অন্তরে প্রোথিত। তাকে আপনি অনেক ভালোবাসেন। আপনার শত্রু তাকে বন্দী করে ফেলেছে। আপনি এখন তার নাগাল পাচ্ছেন না। আপনি জানেন যে, শত্রু তাকে ভীষণ শাস্তি দেবে। তাকে অন্যায়ভাবে ধ্বংস করে দেবে। আপনি এখন তার ব্যাপারে হতাশ। কিন্তু অভূতপূর্বভাবে সে শত্রুর হাত থেকে পালিয়ে আপনার দরজায় এসে আপনাকে চমকে দিলো। আপনার গোবরাটের মাটিতে গাল ঘষে ঘষে আপনাকে সন্তুষ্ট করতে লাগলো। এমন সময় আপনার আনন্দের পরিমাণটা কেমন হবে! আপনি যাকে লালন পালন করেছেন, নিজের মায়া মমতা দিয়ে যাকে গড়ে তুলেছেন, সর্বস্ব উজাড় করে দিয়ে যাকে ভালবেসেছেন, তার জন্য যদি আপনার এ পরিমাণ মায়া ও ভালোবাসা হয়, তাহলে যে আল্লাহ তাঁর বান্দাকে সৃষ্টি করেছেন, অস্তিত্ব দান করেছেন এবং তার ওপর ঢেলে দিয়েছেন নিজ অপার অনুগ্রহের ফল্গুধারা, সে বান্দার প্রতি তাঁর ভালোবাসা ও মমতা কী পরিমাণ হতে পারে!
পাঠক একটু ভেবে দেখবেন!

টিকাঃ
[১] সুরা আন নূর ৩১
[২] সূরা হুজুরাত ১১
[৩] সহিহ বুখারি ৬৩০৭
[৪] মুসনাদ, আহমদ ৩৫৫৬৮; ইবনে মাজাহ ৪২৫২
[৫] সহিহ বুখারি ৬৫৩৪
[৬] সুরা তাহরিম ৮
[৭] সুরা তাওবা ১১৮
[৮] সুরা আনআম ১৫৩
[৯] সূরা ফুরকান ৭১
[১০] সহিহ মুসলিম ৬৮৫৮
[১১] সহিহ মুসলিম ৬৮৪৮

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00