📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 সবর

📄 সবর


আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সবর বা ধৈর্যকে বানিয়েছেন হোঁচট না খাওয়া তুরঙ্গম, ভোঁতা না হওয়া তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারি, অপরাজেয় বিজয়ী সেনাদল এবং দুর্লঙ্ঘ মজবুত দুর্গ। সবর এবং বিজয় দুই সহোদর। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় কিতাবে ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন। তিনি তাদেরকে বেহিসাব প্রতিদান দিবেন, নিজ হিদায়েত, অমোঘ সহযোগিতা এবং সুস্পষ্ট বিজয় দিয়ে তাদের সুসজ্জিত করবেন, এমন সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ
'তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।' [১]
আল্লাহ্ তায়ালার এই সঙ্গ দ্বারা ধৈর্যশীলগণ দুনিয়া ও আখিরাতের প্রভৃত কল্যাণ অর্জন করতে পারবেন। ঋদ্ধ হতে পারবেন তাঁর প্রকাশ্য গোপনীয় অসংখ্য নিয়ামতে। আল্লাহ্ তায়ালা এই দ্বীনের নেতৃত্ব ন্যস্ত করেছেন ধৈর্য এবং বিশ্বাসের ওপর। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَ جَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُوْنَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوْا بِايْتِنَا يُوْقِنُوْنَ
'তাদের মধ্য থেকে আমি কিছু নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা। আমার নির্দেশ অনুযায়ী পথ প্রদর্শন করতো, যখন তারা ধৈর্যশীল হয়েছিল। তারা আমার নিদর্শনসমূহের ওপরও দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করতো'। [২]
ধৈর্য, ধৈর্যশীলদের জন্য কল্যাণকর, আল্লাহ্ তায়ালা এই সংবাদ দিয়েছেন খুব জোরালো ভাষায়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّبِرِينَ
'তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ কর, তাহলে অবশ্যই তা ধৈর্যশীলদের জন্য কল্যাণকর'। [৩]
শত্রু যদি খুব প্রতাপশালীও হয়, তবুও তার কোনো ষড়যন্ত্রই ক্ষতি করতে পারবে না, যদি ধৈর্য ও বিশ্বাস থাকে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُوْنَ محيط
'তোমরা যদি ধৈর্যধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড আল্লাহ্ তায়ালা আয়ত্তে রেখেছেন'। [৪]
সফলতাকে জুড়ে দিয়েছেন সবর ও তাকওয়ার সাথে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের সাথে শত্রুর মোকাবেলা করো এবং সর্বদা সতর্ক থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে’। [৫]
আল্লাহ্ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে নিজের ভালোবাসার সম্পর্কের কথা ব্যক্ত করেছেন। এর চেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক আর কি হতে পারে! আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ الله يُحِبُّ الصَّبِرِين
‘আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন’। [৬]
আল্লাহ্ তায়ালা ধৈর্যশীলদের তিনটি সুসংবাদ দিয়েছেন। প্রত্যেকটিই কল্যাণকর এবং দুনিয়াবাসির কাছে ঈষণীয়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ - ١٥٥ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَجِعُوْنَ - ١٥٦ أُولَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ رَحْمَةٌ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ
‘ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা কোনো বিপদে আক্রান্ত হলে বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে)। তাদের ওপর রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে করুণারাশি আর অনুগ্রহ এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত’। [৭]
জান্নাত লাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ারও একটি অন্যতম মাধ্যম হলো সবর। আল্লাহ্ জাল্লা জালালুহু বলেন—
إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَابِزُوْنَ
‘আজ আমি তাদেরকে তাদের ধৈর্যের এমন প্রতিদান দিয়েছি যে, তারাই সফলকাম’। [সুরা মুমিনুন ১১১]

টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল ৪৬
[২] সুরা সাজদা ২৪
[৩] সুরা নাহল ১২৬
[৪] সূরা আলে ইমরান ১২০
[৫] সুরা আলে ইমরান ২০০
[৬] সূরা আলে ইমরান ১৪৬
[৭] সুরা বাকারা ১৫৫-১৫৭

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 শোকর বা কৃতজ্ঞতা

📄 শোকর বা কৃতজ্ঞতা


শোকর বলা হয়, দানকৃত কল্যাণের জন্য নেয়ামত দাতার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।
বান্দার শোকর আদায়ের জন্য তিনটি উপাদান প্রয়োজন। এক সঙ্গে তিনটির সম্মেলন ব্যতীত শুকরিয়া আদায় করা সম্ভব নয়। এক, আন্তরিকভাবে নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া। দুই, প্রকাশ্যে তা নিয়ে আলোচনা করা এবং তৃতীয় হলো এই নিয়ামতকে আল্লাহ্ তায়ালার বাধ্যতার কাজে ব্যয় করা বা তার সহযোগিতা নেওয়া।
সুতরাং শোকরের সম্পর্ক একাদিক্রমে অন্তর, জিহ্বা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে। অন্তর হলো ভালোবাসা স্বীকৃতি এবং পরিচয়ের জন্য। জিহ্বা দ্বারা প্রশংসা ও স্তুতি গাওয়া হয়। আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে নিয়ামতকে ভালো কাজে ব্যয় করতে হয় এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। এই তিনের সম্মেলনেই শোকরের ষোল কলা পূর্ণ হয়।
আল্লাহ্ তায়ালা শোকরকে ঈমানের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন যে, বান্দা যদি তাঁর ওপর ঈমান স্থাপন করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার কোনও প্রয়োজন তাঁর নেই। কুরআনে কারিমে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَا يَفْعَلُ اللهُ بِعَذَابِكُمْ إِنْ شَكَرْتُمْ وَأَمَنْتُمْ
'তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো ও ঈমানদার হও, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন কেন?' [১]
যারা কৃতজ্ঞ বান্দা, শোকর গোজার, তারা আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য বিশিষ্ট হিসেবে পরিগণিত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-
وَ كَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَيَقُوْلُوْا أَمْ ؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّن بَيْنِنَا أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّكِرِينَ
'এভাবেই আমি কিছু লোককে কিছু লোক দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত করি। তারা যেন বলে যে, এরাই কি ওই সব লোক, আমাদের মধ্য থেকে যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ্ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত নন?' [২]
আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন। কৃতজ্ঞ ও অকৃতজ্ঞ। অকৃতজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞ লোকেরাই তাঁর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। আর সবচেয়ে পছন্দের হলো কৃতজ্ঞতা এবং কৃতজ্ঞ বান্দাগণ। আল্লাহ্ তায়ালা মানুষ সম্পর্কে বলেন—
إِنَّا هَدَيْنَهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُوْرًا
'আমি তাকে রাস্তা দেখিয়েছি। সে হয়তো কৃতজ্ঞ হবে কিংবা অকৃতজ্ঞ'। ৩
অন্যত্র বলেন-
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَا زِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
'স্মরণ করো, যখন তোমাদের প্রভু ঘোষণা করেছিলেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো তাহলে তোমাদেরকে বাড়িয়ে দেবো। কিন্তু যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (মনে রেখো) অবশ্যই আমার শাস্তি বড় কঠোর। [৪]
অতএব আল্লাহ্ তায়ালা নিয়ামত বৃদ্ধির ভার রেখেছেন শোকরের ওপর। শোকরের যেমন কোনও সমাপ্তি নেই তেমনি তাঁর নিয়ামতের প্রবৃদ্ধিরও কোনও সীমানা নেই। আল্লাহ্ তায়ালা অনেক দান প্রতিদানকে নিজের চাহিদা ও ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন-
فَسَوْفَ يُغْنِيْكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ
'আল্লাহ্ চাইলে নিজ অনুগ্রহে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন'। [৫]
অনুরূপ ক্ষমার ক্ষেত্রে বলেন,
وَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ
'তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন'। [৬]
তদ্রুপ তাওবার ক্ষেত্রে বলেন-
وَ يَتُوْبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ 1
'আল্লাহ্ যার ইচ্ছা তাওবা কবুল করেন'। [৭]
শোকরের প্রতিদান কী হবে, আল্লাহ্ তায়ালা তা নিদিষ্ট করে দেন নি; বরং রেখেছেন সাধারণ অনির্দিষ্ট, যা অমোঘ কিছু হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। যেমন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেন-
وَ سَنَجْزِي الشَّكِرِينَ
‘আমি অবশ্যই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবো'। ।৮।
আল্লাহ্ তায়ালার শত্রু ইবলিস। সে শোকরের সমুন্নত মর্যাদা এবং কৃতজ্ঞদের সম্মানিত অবস্থানের কথা উপলব্ধি করতে পেরেছিল বিধায় তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, মানুষকে শোকর থেকে দূরে রাখা। সে বলেছে—
ثُمَّ لَا تِيَنَّهُمْ مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَ عَنْ شَمَا بِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شُكِرِينَ
'অতঃপর আমি তাদের ওপর আক্রমণ করবো তাদের সামনের দিকে থেকে, তাদের পেছন দিক থেকে, তাদের ডান দিক থেকে, তাদের বাম দিক থেকে। এবং আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না। [৯]
কৃতজ্ঞ বান্দাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন—
وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
'আমার খুব স্বল্প সংখ্যক বান্দাই কৃতজ্ঞ'।[১০]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের বেলা এতো পরিমাণ ইবাদত করতেন যে, তাঁর পা মোবারক ফেটে যেতো। একবার তাকে বলা হলো, আপনি এতো ইবাদত করেন, অথচ আল্লাহ্ তায়ালা আপনার পূর্বাপরের যাবতীয় ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন—
'আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না'! [১১৷
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন,
'হে মুয়াজ, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালবাসি। প্রতি সালাতের পর তুমি এই দোয়া করতে ভুলো না—'আল্লাহুম্মা আয়িন্নি আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা' (হে আল্লাহ্, আপনার যিকির, শোকর এবং যথার্থ ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন)। [১২]
শোকর হলো নেয়ামতের জন্য কয়েদ কিংবা তালা স্বরূপ এবং এর দ্বারাই তার প্রবৃদ্ধি ঘটে। উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতগুলো আবদ্ধ করে ফেল তাঁর কৃতজ্ঞতা দ্বারা।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু হামযানের এক লোককে বলেছেন, 'নিয়ামত পৌঁছে শোকরের দ্বারা। শোকর বৃদ্ধি করে দেয় নিয়ামতকে। শোকর এবং প্রবৃদ্ধি এক সুতোয় গাঁথা। তাই যতদিন বান্দা থেকে শোকর বিচ্ছিন্ন না হয় আল্লাহ্ তায়ালা থেকেও প্রবৃদ্ধি বন্ধ হয় না'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তোমরা বেশি বেশি আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতগুলোর কথা আলোচনা করো; কেননা সেগুলোর আলোচনাও শোকরেরই অংশ। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীকে তাঁর রবের নিয়ামতের কথা ব্যক্ত করতে বলেছেন। 'আর আপনার রবের অনুগ্রহের কথা প্রকাশ্যে বলুন'।[১৩]
আমর বিন শুয়াইব রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছন-
'আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর নিয়ামতের চিহ্ন বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন'। [১৪]
অর্থাৎ যাকে যে রকম নিয়ামত প্রদান করা হয়েছে, সে সে অনুযায়ী জীবন যাপন করবে, এটাই আল্লাহ্ তায়ালার পছন্দনীয়।
আবুল মুগিরা রহিমাহুল্লাহকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো যে, হে আবু মুহাম্মাদ, কেমন কাটছে আপনার দিন? তিনি বলতেন, 'দিন কাটছে আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতে ডুবে, শোকর আদায়ে ব্যর্থ অবস্থায়। আমাদের রব আমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী, তবুও তিনি আমাদের কাছে প্রিয় হতে চান। আর আমরা তাঁর কাছে অপ্রিয় হয়ে যাই, যদিও আমরা তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী'।
শুরাইহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, কোনও বান্দার ওপর বিপদ আপতিত হলে তার মধ্যে আল্লাহ্ তায়ালার তিনটি অনুগ্রহ থাকে। এক, বিপদটা তার দ্বীনের ওপর না আসা। দুই, এর চেয়ে বড় কোনও বিপদ আসে নি। তিন, এটা হওয়া অপরিহার্য ছিল, তাই এখনি হয়ে গেলো।
ইউনুস বিন উবাইদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক লোক আবু গুনাইমাকে বলল, আপনার সকাল কেমন হলো? তিনি বললেন, 'আমার সকাল হলো দুটি নিয়ামতের মাঝে, আমি জানি না কোনটা উত্তম। এক, আমার অনেক গুনাহ রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা তা গোপন করে রেখেছেন। ফলে কেউ সে ব্যাপারে আমাকে নিন্দা কিংবা তিরস্কার করতে পারে না। দুই, আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় বান্দাদের অন্তরে আমার ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন, আমার আমল যে স্তরে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট নয়'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِايْتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُوْنَ
'আর যারা আমার নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবো যে, তারা জানতেও পারবে না'। [১৫]
উক্ত আয়াতের তাফসিরে সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা তাদের ওপর প্রচুর নিয়ামত দান করবেন অতঃপর তাদেরকে শুকরিয়া আদায় করা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা থেকে বঞ্চিত করে দেবেন। এভাবেই তারা আজাবের দিকে এগিয়ে যাবে'।
অনেকে এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, 'তারা যখনই কোনও গুনাহ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাদের জন্য একটি নিয়ামত বৃদ্ধি করে দেবেন। নিয়ামতের শোকর আদায় না করে তারা গুনাহ করতেই থাকবে এবং এক পর্যায়ে আজাবে পতিত হয়ে যাবে।
এক ব্যক্তি আবু হাজিম রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো, আবু হাজিম, চক্ষুদ্বয়ের শোকর কি? তিনি বললেন, ভালো কিছু দেখলে তা প্রকাশ করবে আর মন্দ কিছু দেখলে তা গোপন রাখবে। সে আবার জিজ্ঞেস করলো, তাহলে কর্ণদ্বয়ের শোকর কি? তিন বললেন, ভালো কিছু শ্রবণ করলে তা মুখস্থ করবে আর যদি মন্দ কিছু শ্রবণ করো তাহেল তা ঝেড়ে ফেলে দেবে। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, তাহলে হস্তদ্বয়ের শোকর কি? তিনি বললেন, তার মালিকানাধীন নয় এমন কিছু তা ধারা স্পর্শ করবে না আবার তার হক থেকে তাকে বঞ্চিতও করবে না। এবার সে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে উদরের শোকর কি? তিনি বললেন, তার নিম্নাংশ হবে খানা এবং ঊর্ধ্বাংশ হবে ইলম ও জ্ঞানের স্থান। সে বলল, লজ্জাস্থানের শোকর কি? তিনি বললেন, এর উত্তর তো আল্লাহ্ তায়ালাই দিয়েছেন-
وَ الَّذِينَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَفِظُوْنَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَيكَ هُمُ الْعُدُوْنَ
'আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসিদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্ক্রিত হবে না। কিন্তু এর বাইরে (অন্যদের) কামনা করলে তারা সীমালঙ্ঘনকারী হবে'। [১৬]
তাহলে পায়ের শোকর কি?, সে জিজ্ঞেস করলো। তিনি উত্তর দিলেন, যদি তোমার জ্ঞাতসারে কোনও এমন মৃত ব্যক্তি থাকে, যাকে তুমি ঈর্ষা করো, তাহলে তোমার পা দুটোকে তার মতো কাজে ব্যয় করো। (অর্থাৎমৃত আল্লাহ ওয়ালারা যেমন কাজ করে গেছেন, তুমিও তাদের মতো আমল করো, নিজের পা দুটোকে ইবাদতের দিকে গমন করাও।) আর যদি কাউকে ঘৃণা করো, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তার মতো কাজ করা থেকে বিরত থাকো। বস্তুত যে লোক জবানে আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করে কিন্তু তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা করে না, তার উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির ন্যায় যার একটি কাপড় আছে, সে তার এক দিক হাতে নিয়েছে কিন্তু পরিধান করে নি; এই কাপড় তাপে ঠান্ডায় বৃষ্টিতে কুয়াশায় তার কোনো কাজে আসবে না। ঠিক তেমনি শুধু মুখের শোকর তার জন্য উপাদেয় হবে না।
জনৈক আলিম তার ভাইয়ের কাছে নিম্নোক্ত পত্র লিখে প্রেরণ করেছেন, 'পর কথা, আমরা অধিক হারে আল্লাহ্ তায়ালার নাফরমানী করি, তথাপি তার অগণিত নিয়ামতে ডুবে আছি। আমার জানা নেই কীসের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করবো; যে সমস্ত ভালো কাজের তিনি তাওফিক দিয়েছেন তার জন্য নাকি ঘৃণিত যে কাজগুলো তিনি গোপনে রেখেছেন তার জন্য?!'

টিকাঃ
[১] সুরা নিসা ১৪৭
[২] সুরা আনআম ৫৩
[৩] সুরা ইনসান ৩
[৪] সুরা ইবরাহিম ৭
[৫] সুরা তাওবা ২৮
[৬] সুরা মাইদা ৪০
[৭] সুরা তাওবা ১৫
[৮] সূরা আলে ইমরান ১৪৫
[৯] সুরা আ'রাফ ১৭
[১০] সুরা সাবা ১৩
[১১] সহিহ বুখারি ৪৮৩৭
[১২] সুনানে আবু দাউদ ১৫২২
[১৩] সুরা দুহা ১১
[১৪] জামে তিরমিজি ২৮১৯
[১৫] সুরা আ'রাফ ১৮২
[১৬] সুরা মুমিনুন ৫-৭

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহ্ নির্ভরতা

📄 তাওয়াক্কুল তথা আল্লাহ্ নির্ভরতা


তাওয়াক্কুলঃ পার্থিব অপার্থিব সমস্ত কাজে লাভ অর্জন এবং ক্ষতি এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে সত্য দিলে আল্লাহ্ তায়ালার ওপর ভরসা রাখার নাম হলো তাওয়াক্কুল।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ مَنْ يَّتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَّهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُه
'যে আল্লাহেক ভয় করে, আল্লাহ্ তার জন্য (সংকট থেকে) বের হওয়ার পথ করে দেবেন এবং তাকে অভূতপূর্ব উৎস থেকে জীবিকার ব্যবস্থা করে দেবেন। আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট। [১]
সুতরাং যার মাঝে তাকওয়া ও তাওয়াক্কুলের সম্মেলন ঘটবে, তার দুনিয়া আখিরাত নিয়ে আর কোনো চিন্তা করতে হবে না; এগুলোই তার জন্য যথেষ্ট।
উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'যদি তোমরা আল্লাহর ওপর যথাযথ ভরসা করতে, তাহলে তিনি তোমাদের সেভাবে রিজিক দান করতেন, যেভাবে পাখিদের রিজিক দান করেন; এরা সকালবেলা খালি পেটে বের হয় এবং সন্ধ্যা বেলায় ভরপেটে ফিরে আসে। [২]
ইমাম আবু হারিম রাযি রহিমাহুল্লাহ বলেন-'উক্ত হাদিস তাওয়াক্কুলের মূল তাৎপর্য বর্ণনা করে দিয়েছে। তাওয়াক্কুল রিজিক আনয়নের সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম'।
সাইদ বিন জুবাইর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন—'তাওয়াক্কুল হলো ঈমানের মূল'।
তবে আল্লাহ্ তায়ালা যে সমস্ত উপায় কিংবা বস্তুর ওপর বিভিন্ন জিনিষের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন এবং আল্লাহ্ তায়ালার পরিচিত নিয়মানুযায়ী মাধ্যম গ্রহণ করাকে আবশ্যক করে দিয়েছেন, তা তাওয়াক্কুলের বিপরীত নয়। বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালাই তাঁর ওপর ভরসা করার পাশাপাশি মাধ্যম গ্রহণ করার আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে উপায় ও মাধ্যম গ্রহণ করার জন্য প্রচেষ্টা করাও আল্লাহ্ তায়ালার একটি ইবাদত। আর অন্তর দিয়ে তাঁর ওপর ভরসা করার নাম হলো ঈমান তথা বিশ্বাস। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوْا خُذُوا حِذْرَكُمْ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা তোমাদের সতর্কতা অবলম্বন করো'। ৩।
সাহল রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'যে চেষ্টা করা এবং উপার্জন করার ক্ষেত্রে ত্রুটি করবে সে সুন্নাহ মানার ক্ষেত্রে ত্রুটি করবে। আর যে তাওয়াক্কুলের মধ্যে ত্রুটি করবে তার ঈমানের মধ্যে ত্রুটি সৃষ্টি হবে'।
সুতরাং তাওয়াক্কুল হলো রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ব্যক্তিগত অবস্থা। আর কাজ করা হলো তাঁর সুন্নাহ। অতএব যে তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করবে, সে কখনো কাজ কর্ম ছেড়ে বসে থাকবে না।
কেউ কেউ বলেছেন—'উপায় ও মাধ্যম গ্রহণ না করলে তা শরীয়তের ওপর আঘাত হানার সমান। আবার কেউ যদি শুধু উপায় মাধ্যম ও বস্তুর ওপর বিশ্বাস জমিয়ে ফেলে, তাহলে সেটা হবে একত্মবাদের ওপর আঘাত'।
বান্দা যে সমস্ত কাজ করে সাকুল্যে তা তিন প্রকার।
প্রথম প্রকার—আল্লাহ্ তায়ালা যে সমস্ত ইবাদতের আদেশ দিয়েছেন এবং যেগুলোকে জাহান্নাম থেকে বেঁচে জান্নাতে প্রবেশ করার মাধ্যম বানিয়েছেন। এ সমস্ত কাজ অবশ্যই করতে হবে। তবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল রাখতে হবে এবং তাঁর কাছেই সহযোগিতা চাইতে হবে। কেননা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারও কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহ্ সুবহানাহু যা চাইবেন তা হবেই হবে। আর তিনি যা চাইবেন না, তা কস্মিনকালেও হবে না। অতএব যে এসমস্ত কাজ সম্পাদন করতে কোনো প্রকার ত্রুটি করবে সে দুনিয়া ও আখিরাতে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে এবং তাকদিরের ভিত্তিতে শাস্তির সম্মুখীন হবে।
ইউসুফ বিন আসবাত রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'বলা হয়, আমল করো ওই ব্যক্তির ন্যায়, আমল ব্যতীত যার মুক্তির কোনো পথ নেই। আর তাওয়াক্কুল করো ওই ব্যক্তির ন্যায়, যে তার ভাগ্যে যা লেখা আছে তাই পাবে'।
দ্বিতীয় প্রকার-দুনিয়ার জীবনে যা আভ্যাসিক ও স্বাভাবিক এবং আল্লাহ্ তায়ালা নিজ বান্দাদের যা গ্রহণ করার আদেশ দিয়েছেন। যেমন, ক্ষুধা লাগলে আহার করা, তৃষ্ণা লাগলে পান করা, রৌদ্রতাপ থেকে ছায়া গ্রহণ করা, শীতের কুয়াশা থেকে তাপ গ্রহণ করা ইত্যাদি। এ সমস্ত কাজের ক্ষেত্রেও ব্যক্তির জন্য তার মাধ্যম গ্রহণ করা ওয়াজিব ও অপরিহার্য। যদি কেউ তা ব্যবহার করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ত্রুটি করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেও সীমালঙ্ঘনকারী এবং শাস্তির উপযুক্ত।
তৃতীয় প্রকার যে সমস্ত কাজের জন্য দুনিয়ায় আল্লাহ্ তায়ালা সাধারণ অভ্যাস তৈরি করে দিয়েছেন এবং তাঁর কোনো বান্দা চাইলে এই অভ্যাস লঙ্ঘনও করতে পারে। যেমন ঔষধ গ্রহণ করা। এক্ষেত্রে উলামায়ে কেরাম দ্বিমত পোষণ করেন যে, কেউ রোগাক্রান্ত হলে, তার জন্য ঔষধ গ্রহণ করা উত্তম নাকি আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল সাব্যস্ত করার জন্য তা পরিহার করা উচিত। করা উত্তম?
এখানে দুটি প্রসিদ্ধ অভিমত আছে। তবে ইমাম আহমদের মত হলো, যে সক্ষম তার জন্য তাওয়াক্কুল করাই উত্তম। কেননা ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে,
আমার উম্মতের সত্তর হাজার লোক বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। তারা হলো সে সব লোক, যারা মন্ত্র পাঠ করে না, পাখির মাধ্যমে কোনো কাজের ভালো মন্দ নির্ণয় করে না এবং আগুন দিয়ে দাগ লাগায় না; বরং তারা নিজেদের রবের ওপর ভরসা করে থাকে। [৪]
পক্ষান্তরে যে সমস্ত উলামায়ে কেরাম চিকিৎসা গ্রহণকে প্রাধান্য দিয়েছেন তারা বলেন, এটা ছিল রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ধারাবাহিক আমল। আর তিনি সব সময় উত্তমের ওপরই আমল করে থাকেন।
আর উপরোক্ত হাদিসের ব্যাখ্যায় তারা বলেন, উক্ত হাদিসে নিষিদ্ধ ঝাড়ফুঁকের কথা বলা হয়েছে, যেখানে শিরকের আশংকা আছে। এর দলিল হলো, উক্ত হাদিসে ঝাড়ফুঁকের পাশাপাশি দাগ লাগানোর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। আর তা তো মাকরুহ। অতএব যেহেতু একই সাথে আলোচনা আনা হয়েছে তাই এটিও নাজায়েজ হবে না।
মুজাহিদ ইকরিমা নাখয়ি এবং আরও অনেক সালাফ (রাহিমাহুমুল্লাহ) বলেন যে, একেবারে উপায় ও মাধ্যম ত্যাগ করার অনুমতি দেওয়া যাবে না, তবে শুধু ওই ব্যক্তিকেই দেওয়া যাবে, যার অন্তর পরিপূর্ণভাবে মাখলুকের দিকে ধাবিত হয়ে যাওয়ার আশংকা আছে।
ইসহাক বিন রাহুয়াহ রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করা হলো, কারও জন্য কি পাথেয় অস্ত্র সরঞ্জাম ছাড়া যুদ্ধের ময়দানে যাওয়া জায়েজ হবে? তিনি বললেন, সে যদি আবদুল্লাহ বিন জুবাইরের মতো ব্যক্তি হয়, তাহলে সে অস্ত্র সরঞ্জাম ছাড়াই যুদ্ধের ময়দানে যেতে পারে। অন্যথায় এভাবে যাওয়ার অনুমতি তার নেই।

টিকাঃ
[১] সুরা তালাক ৩-৪
[২] জামে তিরমিজি ২৩৪৪
[৩] সুরা নয়িা ৭১
[৪] সহিহ বুখারি ৫৭০৫

📘 পরিশুদ্ধ ক্বলব > 📄 আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা

📄 আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা


আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা, সবচেয়ে উন্নত মর্যাদা এবং চূড়ান্ত স্তর। ভালোবাসা অর্জন হয়ে গেলে এর চেয়ে উন্নত কোনো অবস্থান নেই। আগ্রহ, ঘনিষ্ঠতা, সন্তুষ্টি ইত্যাদি যা কিছু আছে সবই ভালোবাসারই কোনো ফল এবং অনুগত বিষয়। তদ্রূপ ভালোবাসার আগেও কোনো স্থান নেই। তাওবা সবর যুহদ ইত্যাদি এসব তো এর ভূমিকা ও প্রেক্ষাপট মাত্র।
সবচেয়ে উপকারী, উন্নত, সমুজ্জ্বল ও কার্যকর ভালোবাসা হলো ওই ব্যক্তির ভালোবাসা, যার অন্তর আল্লাহর ভালোবাসায় টইটম্বুর এবং তার প্রকৃতি আল্লাহ্ তায়ালাকে স্রষ্টা ও ইলাহ হিসেবে মেনে নিয়েছে। কেননা স্রষ্টা ও প্রভু তো তিনিই, যাকে অন্তরসমূহ ভালোবাসা, সম্মান, মর্যাদা, বিনয়, আনুগত্য ও দাসত্ব দ্বারা প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং স্রষ্টা হিসেবে গ্রহণ করেছে। ইবাদত ও দাসত্ব আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারও জন্য হতে পারে না। আর এই দাসত্বই বিনয় ও আনুগত্যের পূর্ণতার পাশাপাশি ভালোবাসারও পূর্ণতা দান করে।
আল্লাহ্ তায়ালার সত্ত্বা সর্বদিক থেকে প্রেমময়। অন্য সব কিছু তার প্রেমের অনুগামী হয়ে প্রেম লাভ করে। আল্লাহ্ তায়ালার নাযিলকৃত সমস্ত কিতাবেই তাঁর ভালোবাসার কথা অকাট্যভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাবৎ নবী রাসুলগণ এর দাওয়াত দিয়েছেন নিজ নিজ উম্মতকে। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় বান্দাদের এই প্রকৃতি দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। তাদেরকে বিবেক দান করেছেন, অজস্র নেয়ামত দান করেছেন, নিজ ভালোবাসার প্রতি উদ্বুদ্ধ করার জন্যই। কেননা সাধারণ অনুগ্রহকারী এবং করুণাময়ের জন্য ভালোবাসা ও প্রেম লালন করা অন্তরসমূহের একটি বিবর্তনময় প্রকৃতি। তাহলে যিনি সর্ব দিক থেকে অনুগ্রহশীল, যিনি সমস্ত নিয়ামতের অদ্বিতীয় স্রষ্টা এবং একচ্ছত্র দাতা, তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও অনুরাগ কী পরিমাণ হতে পারে তা কল্পনাতীত। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَمَا بِكُمْ مِّنْ نِّعْمَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ثُمَّ إِذَا مَسَّكُمُ الضُّرُّ فَإِلَيْهِ تَجْهرُونَ
'তোমাদের কাছে যে নেয়ামত রয়েছে তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই। আবার যখন তোমরা কোনো কষ্টে পড় তখন তাঁর কাছেই ফরিয়াদ করো'।[১]
আল্লাহ্ তায়ালার আসমায়ে হুসনা থেকে, মহিমাময় গুণাবলী থেকে এবং তাঁর সৃষ্টির নিদর্শনাবলী থেকে তাঁর যে পরিপূর্ণতা, বড়ত্ব, মর্যাদা ও সম্মান বান্দার সামনে স্পষ্ট হয়, এর দ্বারা প্রেম আরও গাঢ় হয়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَتَّخِذُ مِنْ دُوْنِ اللَّهِ أَنْدَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ وَ الَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لله
'কিছু মানুষ আছে যারা আল্লাহেক ছাড়া (তাঁর) কতিপয় সমকক্ষেও মান্য করে, যাদেরকে তারা আল্লাহকে ভালোবাসার মতই ভালোবাসে। পক্ষান্তরে যারা ঈমানদার, আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসা আরও দৃঢ়তর। [২]
অন্যত্র বলেন-
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَنْ يَرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَه أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَفِرِينَ يُجَاهِدُوْنَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُوْنَ لَوْمَةَ لَا بِم
'হে ঈমানদারগণ, তোমাদের মধ্যে যারা স্বীয় ধর্ম ত্যাগ করবে, তাদের স্থলে আল্লাহ্ এমন একদল লোক নিয়ে আসবেন, যাদেরকে তিনি ভালবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালবাসবে; তারা মুমিনদের প্রতি নরম আর কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে এবং তারা আল্লাহর পথে জেহাদ করবে ও কোনো নিন্দুকের নিন্দায় ভীত হবে না'। [৩]
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অত্যন্ত দৃঢ়তার সহিত কসম করে বলেছেন-
কোনো ব্যক্তি মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না তিনি তার কাছে অধিকতর প্রিয় হন নিজ সন্তান, পিতা ও তাবৎ মানুষ থেকে। [৪]
অন্য হাদিসে উমর বিন খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহুকে লক্ষ্য করে বলেছেন-
তোমার কাছে আমি তোমার প্রাণের চেয়ে বেশি প্রিয় না হলে তুমি সত্যিকারে মুমিন হতে পারবে না। (অর্থাৎ তোমার ভালোবাসা ওই পর্যায়ে না পৌঁছলে তোমার ঈমান কার্যকরী হবে না।) [৫]
এখন ভাবার বিষয় হলো, যদি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের কাছে নিজ আত্মার চেয়ে বেশি প্রিয় হন, নিজের যাবতীয় অনুষঙ্গ থেকে অধিক ভালোবাসার পাত্র হন, তাহলে কি মহামহিয়ান প্রভু তাঁর চেয়ে আমাদের ভালোবাসা ও ইবাদতের বেশি হকদার হবেন না!
বান্দার প্রতি আল্লাহ্ তায়ালার যাবতীয় দান তাকে আল্লাহর ভালোবাসার প্রতি আহ্বান করে; চাই তা বান্দার পছন্দনীয় হোক বা অপছন্দনিয়। আল্লাহ্ তায়ালার দান ও নিষেধাজ্ঞা, নিরাপত্তা ও বিপদ, বিস্তৃতি ও সঙ্কীর্ণতা, ন্যায় ও অনুগ্রহ, মৃত্যুদান ও জীবিতকরণ, দয়া ও দানশীলতা, করুণা ও গুনাহ ঢেকে রাখা, ক্ষমা ও সহিষ্ণুতা, বান্দার ওপর সংযম, তার প্রার্থনার সাড়া দেওয়া, তার বিপদ দূর করা, তৃষ্ণা নিবারণ করা, সংকট নিরসন করা- বান্দার প্রয়োজনে হোক বা সর্ব দিক থেকে অমুখাপেক্ষিতার কালে হোক, এসব কিছু অন্তরসমূহকে আল্লাহর দাসত্ব ও ভালোবাসার দিকে আহ্বান ও উদ্বুদ্ধ করে। কোনো সৃষ্টি অপর সৃষ্টির প্রতি কোনো করুণা ও অনুগ্রহ করলে সে তাকে ভালো না বেসে পারে না। তাহলে যে সত্ত্বা বান্দাকে ধারাবাহিক অবাধ্যতা সত্ত্বেও নিরবচ্ছিন্ন অনুগ্রহ দিয়ে ভাসিয়ে রেখেছেন, তাঁকে বান্দা কীভাবে ভালবাসবে না!
বান্দার জন্য কল্যাণকর যা কিছু আছে তিনি অবতরণ করেন, অনিষ্টকর সবকিছু নিজের দিকে উঠিয়ে নেন। তিনি বান্দা থেকে চির অমুখাপেক্ষী হয়েও স্বীয় নিয়ামত দিয়ে তার কাছে প্রিয় হতে চান। কিন্তু বান্দা প্রতি লহমায় তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী হয়েও গুনাহ ও অবাধ্যতার মাধ্যমে তাঁর থেকে দূরে সরে যেতে চায়, তাঁর কাছে ঘৃণিত হতে চায়। তাঁর দান, অনুগ্রহ, কৃপা ও নিয়ামত তাকে অবাধ্যতা থেকে নিবৃত্ত করতে পারে না; কিন্তু তার অবাধ্যতার কারণে পরম দয়ালু প্রভু তাঁর দান অনুদান বন্ধ করে দেন না। তাহলে তাঁকে বান্দা কেন ভালবাসবে না!
দুনিয়ার যাকে বা যা কিছু আপনি ভালোবাসেন এবং যারা আপনাকে ভালোবাসে, এই ভালোবাসা মূলত নিজের জন্য, নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য। পক্ষান্তরে আল্লাহ্ তায়ালা আপনাকে ভালোবাসেন আপনার কল্যাণের জন্যই।
দুনিয়ার বাজারে যার সাথেই লেনদেন করবেন, যদি সে আপনার থেকে লাভ করতে না পারে, তাহলে আপনার সাথে লেনদেন করবে না; যে কোনো প্রকারের লাভ তার চাইই চাই। কিন্তু রাব্বল আলামিন আপনার সাথে লেনদেন করেন আপনাকে লাভবান করার জন্য, চির উন্নত এবং বৃহৎ মুনাফা আপনাকে দান করার জন্য। সুতরাং আপনি এক দিরহাম দান করলে তা দশ গুণ থেকে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি হয়ে যাবে। কিন্তু আপনি একটি গুনাহ করলে, তা একটি হিসেবেই পরিগণিত হবে; আবার গুনাহই এমন বস্তু যা সবচেয়ে দ্রুত মুছে ফেলা হয়। তাহলে এতো উদার রবকে বান্দা কেন ভালবাসবে না!
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আপনাকে সৃষ্টি করেছেন নিজের জন্য। আর দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় জিনিষ সৃষ্টি করেছেন আপনার জন্য। তাহলে তাঁর চেয়ে উত্তম কে আছে আপনার হৃদয়ের মণিকোঠায় জায়গা পাওয়ার মতো, সন্তুষ্টি অর্জন করার জন্য প্রচেষ্টা করার মতো!
আপনার এবং তাবৎ সৃষ্টিকুলের সমস্ত চাহিদা আকাঙ্ক্ষা ও মতলব একমাত্র তাঁর কাছেই বিদ্যমান। তিনি সবচেয়ে উদার। বড় দানশীল। বান্দা না চাইতেই তাকে আশাতীত অনেক দান করেন। অল্প আমল করলেও তা মূল্যায়ন করেন এবং তার প্রতিদান বৃদ্ধি করে দেন। অনেক গুনাহ ভুল ত্রুটি ক্ষমা করেন এবং মিটিয়ে দেন। আসমান জমিনে যা কিছু আছে, সবাই তাঁর কাছে প্রার্থনা করে। প্রতিদিনই তাঁর নতুন নতুন কর্মসূচি থাকে। এক জনের প্রার্থনা শুনতে গিয়ে তিনি অন্য জনের প্রার্থনা থেকে উদাসীন হয়ে যান না। প্রার্থনার আধিক্য তাকে ভুলে পতিত করতে পারে না। অনুনয়কারীদের অব্যহত তাগিদে তিনি বিচলিত কিংবা বিরক্ত হন না; বরং নাছোড় প্রার্থনাকারীদের পছন্দ করেন। তাঁর কাছে চাইলে তিনি খুশি হন। না চাইলে হন রুষ্ট। তিনি বান্দা থেকে লজ্জাবোধ করেন কিন্তু বান্দা তাঁর থেকে লজ্জাবোধ করে না। তিনি বান্দার দোষত্রুটি গোপন রাখেন কিন্তু বান্দা নিজের দোষত্রুটি তাঁর থেকে গোপন রাখতে পারে না। তিনি বান্দার ওপর দয়া করেন কিন্তু বান্দা নিজের ওপর দয়া করে না। নিজের নিয়ামত অনুগ্রহ ও সমর্থন দ্বারা বান্দাকে ডেকেছেন তাঁর সন্তুষ্টির পথে, কিন্তু বান্দা অস্বীকার করে। সে মিশন পূরণ করার জন্য তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন নবী রাসুল। তাদের সাথে পাঠিয়ে দিয়েছেন নিজের পত্র এবং অঙ্গীকারসমূহ। আবার বান্দার চাহিদা কামনা প্রার্থনা পূরণ করার জন্য তিনি নিজেই অবতরণ করেন প্রতিনিয়ত। মমতাভরে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন, 'কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দেবো। আছে কি কেউ আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আমি তাকে ক্ষমা করবো'। [৬]
যিনি সমস্ত কল্যাণের আঁধার, যিনি সবার ডাকে সাড়া দেন, যিনি ত্রুটি বিচ্যুটি সমীহ করেন, যিনি গুনাহগুলো ক্ষমা করেন, যিনি অন্যায়গুলো গোপন রাখেন, যিনি বিপদআপদ দূর করেন, যিনি সমস্ত আক্ষেপ মোচন করেন, সর্বোপরি যার কাছেই সমস্ত চাওয়া পাওয়া আকাঙ্ক্ষা অভিলাষের ভাণ্ডার, অন্তর সমূহ তাঁকে ভালো না বেসে কি করে থাকতে পারে?
তিনিই স্মরণের বরণের মূল্যায়নের কৃতজ্ঞতার দাসত্বের আনুগত্যের ও প্রশংসার সবচেয়ে বেশি হকদার। তিনিই বাঞ্ছিত সাহায্যকারী, সদয় প্রতাপশালী, উদার বদান্য, প্রশস্ত দানশীল। দয়া প্রার্থনা করলে তিনি দয়া করেন। তাঁর পথে যাত্রা করলে সম্মানিত করেন। তাঁর কাছে আশ্রয় নিলে মর্যাদাশীল করেন। তাঁর ওপর ভরসা করলে যথেষ্ট হয়ে যান। জন্মদাতা মা নিজ সন্তানের ওঁরপর যতটুকু দয়াবান, তিনি নিজ বান্দার ওপর তার চেয়েও অধিক দয়াবان। ধূসর মরুভূমিতে রসদপত্রসহ একমাত্র সম্বল উট হারিয়ে অস্থির এবং মৃত্যুমুখে পতিত ব্যক্তি হারানো উট ফিরে পেয়ে যে পরিমাণ আনন্দিত ও খুশি হয়, কোনো বান্দা তাওবা করে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করলে তিনি এর চেয়েও অধিক আনন্দিত হন। তিনিই সবকিছুর মালিক।
তাঁর কোনো শরিক নেই। তিনি একক। তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই।
সব জিনিষই ধ্বংসশীল, একমাত্র তিনি ছাড়া। তাঁর আদেশেই বান্দা ইবাদত করতে পারে। গুনাহ করলেও তাঁর জ্ঞান অনুযায়ীই করে। তাঁর ইবাদত করলে তিনি তা মূল্যায়ন করেন। তাঁর তাওফিক ও নিয়ামতের দ্বারাই বান্দা তাঁর ইবাদত করতে পারে। বান্দা যদি তাঁর অবাধ্যতা করে, তাঁর হক নষ্ট করে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, তিনি তাকে ক্ষমা করে দেন। তিনি নিকট থেকে সব কিছুই দেখেন। সবকিছুই সংরক্ষণ করেন। নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন। তিনি ন্যায়পরায়ণ। নফসগুলোর সামনে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ান, নিয়ন্ত্রণ করেন। পরিণাম লিখে রেখেছেন। সব কিছুর সময় নির্ধারণ করে দিয়েছেন। অন্তরসমূহ তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তন করে। সমস্ত গোপনই তাঁর কাছে প্রকাশ্য। সমস্ত অদৃশ্য তাঁর সামনে দৃশ্য। দুঃখ ভারাক্রান্ত সমস্ত হৃদয় তাঁর কাছেই সমর্পিত। তাঁর নূরের জ্যোতিতে ত্রিভুবন মাতোয়ারা। সমস্ত বিবেক বুদ্ধি তাঁর প্রকৃতি উদ্ধার করতে অক্ষম। সমস্ত দলিল ও আবিষ্কার তাঁর অনুরূপ কিংবা সমকক্ষ খুঁজতে ব্যর্থ। তাঁর আলোয় সমস্ত অন্ধকার আলোকিত। আসমান জমিন তাঁর কান্তিতে উজ্জ্বল। সমস্ত সৃষ্টি তাঁর দিকেই মুখাপেক্ষী। তিনি নিদ্রা যান না, নিদ্রার তাঁর কোনো প্রয়োজন নেই। নিজ ইচ্ছানুসারে দাঁড়িপাল্লা নামান ও উত্তোলন করেন।
রাত আগমনের পূর্বে দিনের, দিন উদিত হওয়ার পূর্বে রাতের সমস্ত আমল তাঁর কাছে উত্থাপন করা হয়। তাঁর পর্দা হলো নূর। যদি তিনি তা সরিয়ে দেন, তাহলে যাবতীয় সৃষ্টি পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাবে। সৃষ্টির কোনো চোখ তাঁর পর্যন্ত পৌঁছতে, তাকে অবলোকন করতে সক্ষম নয়।
আল্লাহ্ তায়ালার ভালোবাসা অন্তরের জন্য সঞ্জীবনী। রূহের জন্য হিতকর পথ্য। কলবের কোনো শান্তি, সুখ, স্বাদ, সফলতা ও জীবন নেই, যদি তাঁর ভালোবাসা তাতে না থাকে। চোখ জ্যোতি হারিয়ে ফেললে যতটুকু কষ্ট হয়, কান শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেললে যতটুকু দুঃখ হয়, অন্তর থেকে আল্লাহর ভালোবাসা হারিয়ে গেলে তার চেয়ে বেশি কষ্ট হয়। শরীর যেমন আত্মশুন্য হয়ে গেলে পচে গলে বিনষ্ট হয়ে যায়, অন্তরও যখন নিজ সৃষ্টিকর্তা, আবিষ্কর্তা ও সত্য প্রভুর ভালোবাসাশূন্য হয়, তখন তা পচে যায়, হয়ে যায় দুর্গন্ধী। এটা তারাই অনুভব করতে পারে, তারাই সত্যায়ন করে, যাদের অন্তর সজীব ও সজাগ। মৃতকে যতই আঘাত করা হোক সে অসাড়, অনুভূতিহীন।
ফাতাহ মুসেলি রহিমাহুল্লাহ বলেন-'প্রকৃত আল্লাহেপ্রমী দুনিয়া নিয়ে কখনো শান্তি পায় না। এক নিমেষ সে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল হতে পারে না'।
জনৈক সালাফ বলেছেন-'প্রেমিকের অন্তর পাখির ন্যায় উড়ন্ত। অধিক জিকিরকারী। স্বউদ্যোগে অনুরাগে ভর করে সম্ভাব্য ও সামর্থ্যের সমস্ত উপায় ও মাধ্যমে সে আল্লাহ্র সন্তুষ্টির পথে অবগাহন করে'।
কেউ বলেছেন-'তোমার রবের প্রেমিক হয়ে যাও, বনে যাও তাঁর সেবক; বস্তুত প্রেমিকের দল প্রেমাস্পদের সেবক হওয়াকেই নিজেদের জন্য গর্ব মনে করে'।
এক মহিলা নিজ সন্তানদের অসিয়ত করেন- 'তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা ও ইবাদতে অভ্যস্ত হয়ে যাও। কেননা মুত্তাকীগণ ইবাদতের মধ্যেই নিজেদের শূরা খুঁজে পেয়েছেন। তাই আল্লাহর দাসত্ব ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে তাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছেন। অভিশপ্ত ইবলিস যদি কখনো তাদের সামনে কোনো গুনাহ পেশ করে, স্বয়ং গুনাহই লজ্জায় তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়; কেননা মুত্তাকীগণ তা অপছন্দ করেন'।
ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন, তুমি আল্লাহর অবাধ্যতা করো আবার তাকে ভালোবাসার দাবীও করো। আমার জীবনের শপথ, ইনসাফের নিক্তিতে এটা বড়ই কদর্য দাবি। যদি তোমার ভালোবাসা সত্য হতো, তাহলে তুমি তাঁর অনুসরণ করতে; কেননা প্রেমিক সব সময় প্রেমাস্পদের অনুসারীই হয়ে থাকে।

টিকাঃ
[১] সূরা নাহল ৫৩
[২] সুরা বাকারা ১৬৫
[৩] সুরা মাইদা ৫৪
[৪] সহিহ মুসলিম ৭৩
[৫] সহিহ বুখারি ৬৬৩২
[৬] আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মহামহিম আল্লাহ্ তায়ালা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আছ এমন যে আমার নিকট চাইবে। আমি তাকে তা দেবো। কে আছে এমন যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করবো। (সহিহ বুখারি ১১৪৫)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00