📄 নফসের প্রকারভেদ
আল্লাহওয়ালা আধ্যাত্মিক বুজুর্গগণ এ ব্যাপারে একমত যে, কলব এবং আল্লাহর মাঝে মেলবন্ধন সৃষ্টি করার পথে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হলো নফস। নফসকে ধরাশায়ী করা, তার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করা এবং তার বিরোধিতা করে তাকে পরিত্যজ্য করার পরই আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছা সম্ভব।
এক্ষেত্রে মানুষ দুই প্রকার। এক প্রকার মানুষ, তাদের নফস তাদের ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে নেয় এবং তাকে ধ্বংসের খাদে নিক্ষেপ করে। ফলে তারা নফসের হাতে অসহায় বন্দীতে পরিণত হয়। আরেক দল মানুষ, তারা নিজেদের নফসের ওপর কর্তৃত্ব লাভ করে এবং তাকে ভূপাতিত করে। ফলে নফস তার বাধ্য অনুগত দাসে পরিণত হয়।
জনৈক সালাফ বলেছেন, আত্মশুদ্ধির পথ অনুসারীদের সফর শেষ হয় নিজেদের নফসের ওপর বিজয় লাভ করার মাধ্যমে। যদি নফসের ওপর বিজয় লাভ করতে পারে, তাহলে সে সফল এবং কামিয়াব। আর যদি নফস তার ওপর কর্তৃত্ব স্থাপন করে নেয়, তাহলে সে ক্ষতিগ্রস্ত এবং ধ্বংস। আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন-
فَأَمَّا مَنْ طَغَى وَأَثَرَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى
'যে সীমালঙ্ঘন করেছে এবং পার্থিব জীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তার ঠিকানা হবে জাহান্নাম। পক্ষান্তরে যে তার প্রভুর সামনে দাঁড়ানোকে ভয় করে এবং নফসের কুপ্রবৃত্তি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, তার বাসস্থান হবে জান্নাত'। ১।
নফস, ব্যক্তিকে সীমালঙ্ঘন এবং দুনিয়ার জীবনকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আর আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর বান্দাদের ডাকেন, তার ভয় এবং নফসকে কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রাখার দিকে। কলব উভয় আহ্বানকারীর মাঝখানে অবস্থান করে। একবার সে নফসের দিকে ঝুঁকে যায়, আরেকবার রবের দিকে আকৃষ্ট হয়। এই স্থানটিই হলো সবচেয়ে কঠিন এবং বিপর্যয়কর।
আল্লাহ্ তায়ালা কুরআনে নফসের তিনটি বিশেষণ উল্লেখ করেছেনঃ মুতমাইন্নাহ তথা প্রশান্ত। লাওয়ামা তথা নিন্দুক। আম্মারা বিস সু' তথা কুমন্ত্রণা দাতা।
নফসে মুতমাইল্লাহ
যখন নফস আল্লাহ্ তায়ালার দিকে আকৃষ্ট হয়, তাঁর জিকিরে প্রশান্তি লাভ করে, তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করে, তাঁর সাক্ষাতের জন্য উদগ্রীব হয় এবং তাঁর নৈকট্য কামনা করে, তখন তা মুতমাইন্নায় পরিণত হয়। এই নফসকে মৃত্যুর সময় বলা হবেঃ 'হে প্রশান্ত আত্মা, সন্তুষ্ট এবং সন্তোষভাজন হয়ে তোমার রবের দিকে ফিরে এসো'।।২।
ইবনে আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'মুতমাইন্নাহ মানে হলো সত্যায়িত'।
কাতাদা রহিমাহুল্লাহ বলেন—'মুতমাইন্নাহ হলো ওই মুমিন যার অন্তর আল্লাহ্ তায়ালার প্রতিশ্রুতির প্রতি আস্থাশীল। ওই ব্যক্তি তার রবের নাম ও গুণাবলী এবং তিনি নিজের ব্যাপারে ও তাঁর রাসুলের ব্যাপারে যে সংবাদ দিয়েছেন সেগুলোর প্রতি প্রশান্ত বিশ্বাসী। মৃত্যু-পরবর্তী কবর জগতের জীবন সম্পর্কে এবং তারও পর কিয়ামতের অবস্থা সম্পর্কে তিনি যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন সেগুলোর ওপর সে স্থির বিশ্বাস স্থাপন করে, কেমন যেন সে স্বচক্ষে তা প্রত্যক্ষ্য করেছে। অতঃপর আল্লাহ্ তায়ালার নির্ধারণের ওপর অটল বিশ্বাস আরোপণ করে এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেয়। কখনও বিরাগভাজন হয় না, কোনো অভিযোগ করে না এবং তাঁর ঈমানেও কোনো চিড় ধরতে দেয় না। ফলে যা হাতছাড়া হয়ে যায় বা যা অপ্রাপ্য থেকে যায় তার জন্য নিরাশ হয় না এবং যা কিছু সে পেয়েছে তা নিয়ে অধিক উল্লসিত আনন্দিতও হয় না। কেননা সমস্ত মসিবত তার কাছে আসার আগে, তার সৃষ্টিরও পূর্বে, নির্ধারিত করে রাখা হয়েছে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَ مَنْ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَه
'তারা যেই মুসীবতের সম্মুখীন হোক না কেন, তা আল্লাহরই আদেশে। আর যে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তিনি তার অন্তরকে সঠিক পথের দিশা দান করবেন'।।৩।
উপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় একাধিক সালাফ বলেন- 'এখানে ওই বান্দার কথা বলা হয়েছে, যার ওপর কোনো মসিবত আপতিত হয় এবং সে বিশ্বাস করে যে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। তাই সে তাতে সন্তুষ্ট থাকে এবং নিজের রবের কাছে আত্মসমর্পণ করে'।
সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইতমিনান তথা প্রশান্তি হলো, বাধ্য অনুগত একনিষ্ঠ এবং সতর্কতার সহিত আল্লাহ্ তায়ালার আদেশ পালন করা। তাঁর আদেশের সামনে কোনো ইচ্ছা, প্রবৃত্তি, সংস্কৃতি কিংবা প্রথাকে প্রাধান্য না দেওয়া। তাঁর সংবাদবিরোধী কোনো সংশয় অন্তরে না রাখা। তাঁর আদেশবিরোধী কোনো কামনায় না জড়ানো। বরং কখনো যদি এসব বান্দার অন্তরে উদয় হয়, তাহলে সে এগুলোকে কুমন্ত্রণা আখ্যায়িত করবে, এগুলো গ্রহণ করার চেয়ে আকাশ থেকে জমিনে ভূপাতিত হওয়া তার কাছে অধিক প্রিয় হবে। অনুরূপ গুনাহের অস্থিরতা এবং বিরক্তি থেকে তাওবার প্রশান্তি এবং সুস্থিরতার দিকে ধেয়ে আসবে। কেউ এমন পর্যায়ে পৌঁছতে পারলে তার ক্ষেত্রে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই কথা প্রয়োগ হবে, 'এটাই স্পষ্ট ঈমান'।
যখন কোনো বান্দা সংশয় থেকে বিশ্বাসে, মূর্খতা থেকে জ্ঞানে, উদাসীনতা থেকে আল্লাহর স্মরনে, বিশ্বাসঘাতকতা থেকে তাওবার দিকে, দেখানোপনা থেকে ইখলাস ও একনিষ্ঠতার দিকে, মিথ্যা থেকে সত্যের দিকে, অক্ষমতা থেকে বিচক্ষণতার দিকে, আত্মঅহমিকার দাপট থেকে বাধ্যতার বশ্যতায় এবং ঔদ্ধত্য থেকে বিনয়ের দিকে প্রত্যাবর্তন করবে, আশ্রয় নেবে এবং বাসস্থান গড়ে তুলবে, তখন তার নফস নফসে মুতমাইন্নাহ বলে পরিগণিত হবে।
আর এসব কিছুর মূল হলো, মনোযোগ এবং সতর্কতা। এদুইয়ের মাধ্যমে তার অন্তর থেকে উদাসীনতার তন্দ্রা দূর হয়ে যাবে এবং তার জন্য জান্নাতের অট্টালিকা উজ্জ্বল করে দেবে। তখন সে চিৎকার করে বলবেঃ হে আমার নফস, রাতের এই অমানিশায় তোমার প্রচেষ্টায় আমাকে একটু সহযোগিতা করো; তাহলে কিয়ামতের দিন ওই সমস্ত সুউচ্চ প্রাসাদে আরামের জীবন লাভ করতে পারবে।
সতর্কতার আলোয় সে দেখতে পাবে তার জন্য যা কিছু সৃষ্টি করা হয়েছে সব। অনুধাবন করতে পারবে মৃত্যু থেকে চিরস্থির জান্নাতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত তার সাথে কী ব্যবহার করা হবে। দুনিয়ার ত্বরিত ক্ষয়, অধিবাসীদের প্রতি তার অবিশ্বস্ততা এবং প্রেমিকদের জন্য তার ঘাতকমূর্তি অনুভব করতে পারবে। উক্ত আলোয় সে উপলব্ধি করবে ওই ব্যক্তির কথা যে বলবেঃ 'হায় আফসোস, আল্লাহর প্রতি কর্তব্য পালনে অবহেলা করেছি!' [৪]
তখন সে বাকি জীবন বিগত জীবনের প্রায়শ্চিত্ত করতে ব্যয় করবে, যে জীবন সে নিষ্প্রাণ কাটিয়ে দিয়েছে সেখানে ফিরিয়ে আনবে প্রাণের সতেজতা, যত ভুল সে করেছে তার জন্য হবে অনুতপ্ত, যে সময়টুকু অবশিষ্ট আছে তাকে যথার্থ কাজে লাগাবে; এই সময়টুকু যদি বেহাত হয়ে যায়, তাহলে সমস্ত কল্যাণ থেকে সে বঞ্চিত হবে, এই অনুভূতি তার অন্তরে জাগরিত হবে।
সতর্কর্তা ও মননিবেশের প্রদীপ থেকে এবং তার ওপর তার রবের নিয়ামতের আলোক থেকে সে প্রত্যক্ষ্য করবে যে, সে তার রবের নিয়ামতসমূহ গণনা করে শেষ করার সক্ষমতা রাখে না; সেগুলোর পরিপূর্ণ হক আদায় করতে অক্ষম। উক্ত আলোয় সে নিজের নফসের দোষ-ত্রুটি, আমলের ঘাটতি, কৃত গুনাহ ও অপরাধ, অনেক হক ও কর্তব্য আদায় করা থেকে অনীহা ইত্যাদি স্পষ্ট দেখতে পাবে। তখন তার অন্তর নত হবে, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ হবে নম্র। ফলে সে নিজের দোষ ত্রুটি গুনাহ অপরাধ হিসেব করত তার রবের নিয়ামতের বারিধারা দেখে তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে অবনত মস্তকে।
উক্ত প্রদীপশিখায় সে দেখতে পাবে, তার সময় খুবই মূল্যবান এবং ভয়ানক। এটাই তার সৌভাগ্যের একমাত্র মূলধন। তখন থেকেই সে আল্লাহর অবাধ্যতায় তা ব্যয় করতে কুণ্ঠাবোধ করবে; কেননা তার এই সুমতি অর্জন হয়ে গিয়েছে যে, যদি সময় বিনষ্ট হয়, তাহলে সে ক্ষতি এবং পরিতাপের সম্মুখীন হবে। আর যদি সে তা কাজে লাগায়, তাহলে সে পাবে শান্তি ও সৌভাগ্যের পায়রার দেখা।
এসবই হলো সতর্কতা, মনোযোগ এবং অভিনিবেশের ফল ও প্রভাব। এটাই হলো নফসে মুতমাইন্নাহ'র প্রথম স্তর; এখান থেকেই আল্লাহ্ এবং পরকালের পথের যাত্রা শুরু হয়।
নফসে লাওয়ামা
একদল উলামায়ে কেরাম বলেন, 'নফসে লাওয়ামা হলো ওই নফস যা কখনো এক অবস্থার ওপর স্থির থাকে না। তার রয়েছে বিচিত্র রং ও ঢং। কখনো সে মনযোগী হয়, আবার কখনো হয়ে যায় উদাসীন। উপেক্ষা করে আবার আত্মনিয়োগ করে। ভালোবাসে আবার ঘৃণা করে। খুশি হয় আবার দুঃখিত হয়। সন্তুষ্ট হয় আবার ক্রোধান্বিত হয় এবং অনুসরণ করে আবার বিরত থাকে ইত্যাদি এসব তার গুণাবলী ও বৈশিষ্ট্য'।
আরেকদল উলামায়ে কেরাম বলেন, 'এটা মুমিনের অন্তর'। হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, 'তুমি মুমিন ব্যক্তিকে দেখবে সর্বদা নিজের নফসকে তিরস্কার করছে। সে বলে, আমি এমনটা চাই নি, আমি কেন এমনটা করলাম, এটা তো ওটার চেয়ে ভালো ছিল ইত্যাদি'।
আরও একদল বলেন, 'লাওম হলো কিয়ামত দিবস। কেননা ওই দিন যারা অন্যায় করেছে কিংবা কর্তব্য পালনে ত্রুটি করেছে তারা সকলেই নিজেকে তিরস্কার করবে'।
উলামায়ে কেরামের উপরোক্ত বিভিন্ন বক্তব্য উল্লেখ করত আল্লামা ইবনুল কাইয়িম রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'উক্ত সমস্ত মতই সঠিক। নফসে লাওয়ামা দুই প্রকারঃ নিন্দিত লাওয়ামা এবং অনিন্দিত লাওয়ামা'।
নিন্দিত লাওয়ামা
'নিন্দিত নফসে লাওয়ামা হলো ওই নফস, যা মূর্খ এবং জালেম। আল্লাহ্ এবং ফেরেশতাগণ এই নফসের নিন্দা করেছেন'।
অনিন্দিত লাওয়ামা
'এটা হলো ওই নফস, যা সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও আল্লাহর ইবাদতে ত্রুটি করার কারণে অবিচ্ছিন্নভাবে তার ধারককে তিরস্কার করতে থাকে। এই নফস নিন্দিত না। বরং যার নফস তাকে আল্লাহ্ তায়ালার ইবাদত না করার জন্য তিরস্কার করে, তাঁর সন্তুষ্টির পথে অন্যের নিন্দা সহ্য করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার জন্য কোনো নিন্দুকের নিন্দার পরোয়া না করে, তার নফসই তো হলো সর্বশ্রেষ্ঠ নফস এবং এই নফস আল্লাহ্ তায়ালার তিরস্কার ও নিন্দা থেকে নিরাপদ। পক্ষান্তরে যে নফস তার ধারকের কার্যক্রম নিয়ে সন্তুষ্ট থাকে, তাকে তিরস্কার না করে এবং আল্লাহর জন্য কোনো নিন্দা সহ্য না করে, এই নফস আল্লাহ্ তায়ালার নিন্দা ও তিরস্কারের পাত্র।
নফসে আম্মারা বিম মু'
এই নফস সমস্ত অন্যায় ও অশুভ কাজের মন্ত্রণা দেয়। এটাই তার তবিয়ত। আল্লাহ্ তায়ালার তাওফিক ব্যতীত কেউ তার অনিষ্ট থেকে নিরাপদ থাকতে পারে না। এই নফসই হলো চূড়ান্ত পর্যায়ের নিন্দিত এবং কলঙ্কিত। ইউসুফ আলাইহিস সালামের ঘটনায় আজিজের স্ত্রীর আলোচনা করতে গিয়ে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَمَا أُبَرِّئُ نَفْسِي إِنَّ النَّفْسَ لَأَمَّارَةُ بِالسُّوْءِ إِلَّا مَا رَحِمَ رَبِّي إِنَّ رَبِّي غَفُورٌ رَّحِيمٌ
'আমি আমার নফসকে দোষমুক্ত বলি না। নফস তো কুমন্ত্রণা দিয়েই থাকে। তবে আমার প্রভু অনুগ্রহ করলে তা ভিন্ন কথা। নিশ্চয়ই আমার প্রভু ক্ষমাশীল, দয়ালু। [৫]
অন্যত্র বলেন—
'তোমাদের ওপর যদি আল্লাহ্ তায়ালার দয়া ও অনুগ্রহ না থাকতো, তাহলে তোমাদের কেউ কখনো পবিত্র থাকতে পারতো না'। [৬]
আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে প্রয়োজন পূরণের খোতবা শিক্ষা দিতে গিয়ে এভাবে বলেছেন—
'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্ তায়ালার। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি, তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং তাঁর কাছেই আমাদের নফসের অনিষ্ট এবং মন্দ কাজের অনিষ্ট থেকে পানাহ চাই'। [৭]
মন্দ ও অনিষ্ট নফসের অভ্যন্তরে প্রোথিত। তার কারনেই মন্দ ও খারাপ কাজ সম্পাদিত হয়। আল্লাহ্ তায়ালা যদি বান্দাকে তার নফসের হাতে ছেড়ে দেন, সে তার অনিষ্ট এবং মন্দ কাজের কারণে হালাক হয়ে যাবে। আর যদি আল্লাহ্ তায়ালা তাকে সক্ষমতা দান করেন এবং সহযোগিতা করেন, তাহলে সে সব ধরণের অনিষ্ট থেকে মুক্ত থাকতে পারবে। আমরা আল্লাহ্ তায়ালার কাছে আমাদের নফস এবং মন্দ ও গুনাহের কাজের অনিষ্ট থেকে পানাহ ভিক্ষা চাই।
তো চূড়ান্ত কথা হলোঃ মানুষের শরীরে নফস একটাই। কখনো তা আম্মারা হয়, লাওয়ামা হয় কখনো, আবার কখনো মুতমাইন্না হয়।
নফসে মুতমাইন্নাহ'র সহচর থাকেন একজন ফেরেশতা। তিনি তাকে সঠিক দিশা দেখান। তার মাঝে হকের আলো নিক্ষেপ করেন। তাকে সত্যের দিকে উৎসাহিত করেন। তাকে সত্যের সুন্দর সমুজ্জ্বল চেহারা প্রদর্শন করান। বাতিল থেকে তাকে বিরত রাখেন। অন্যায় থেকে নিবৃত্ত রাখেন এবং গুনাহের কুৎসিত রূপ প্রত্যক্ষ্য করান। মোটকথা, আল্লাহ্ তায়ালার জন্য এবং আল্লাহ্ তায়ালার সাথে সম্পৃক্ত যাবতীয় জিনিষ নফসে মুতমাইন্নাহ থেকে উৎপাদিত হয়।
পক্ষান্তরে নফসে আম্মারার দোসর হয় শয়তান। সে তার সঙ্গ দেয়। তাকে প্রতিশ্রুতি দেয়। আশা ভরসা দেয়। তার মাঝে বাতিল ও মিথ্যা ঢেলে দেয়। তাকে অন্যায় ও মন্দ কাজের আদেশ ও মন্ত্রণা দেয়। মন্দকে তার সামনে সুশোভিত করে তুলে ধরে। তাকে দীর্ঘ আশা দেয়। তার সামনে বাতিলকে এতো সুন্দর রূপে প্রস্ফুটিত করে যে, সে তা গ্রহণ করে এবং সুন্দর মনে করতে থাকে।
নফসে মুতমাইন্না এবং তার সহচর ফেরেশতা ব্যক্তি থেকে নিম্নোক্ত সমস্ত জিনিষের দাবি জানায়ঃ আল্লাহ্ তায়ালার একত্ব, দাসত্ব, সততা, খোদাভীতি, আল্লাহ-নির্ভরতা, তাওবা, প্রত্যাবর্তন, আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করা, দুনিয়ার বুকে আশা স্বল্প রাখা, মৃত্যু এবং তার পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি।
অন্যদিকে শয়তান এবং তার কাফের মুনাফিক সাঙ্গপাঙ্গরা নফসে আম্মারার কাছে এর বিপরীত জিনিষগুলো দাবি করে।
নফসে মুতমাইন্নার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিজের আমলকে শয়তান থেকে মুক্ত করা এবং নফসে আম্মারা থেকে দূর রাখা। যদি উভয়কে ভেদ করে কোনো একটি আমল আল্লাহ্ পর্যন্ত পৌঁছতে পারে, তাহলে তা বান্দার মুক্তির জন্য যথেষ্ট। কিন্তু নফসে আম্মারা এবং শয়তান দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে, আল্লাহ্ পর্যন্ত একটি খালেস আমল পৌঁছতে দেবে না। এজন্যই জনৈক আল্লাহওয়ালা বলতেন, 'আমি যদি জানতে পারতাম যে, আমার একটি ইবাদত আল্লাহ্ তায়ালা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে, তাহলে মুসাফির তার পরিবারে ফিরে আসলে যে পরিমাণ আনন্দ লাভ হয়, তার চেয়ে বেশি আনন্দিত হতাম মৃত্যুর জন্য।
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, 'আমি যদি জানতাম যে, আল্লাহ্ তায়ালা আমার একটি সাজদা কবুল করেছেন, তাহলে মৃত্যু আমার কাছে অধিক প্রিয় হতো, প্রবাসীর নীড়ে ফিরে আসা থেকে'।
কখনো নফসে আম্মারা সরাসরি নফসে মুতমাইন্নার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়। ফলে নফসে মুতমাইন্না কোনো কল্যাণকর বিষয় উত্থাপন করলেই আম্মারা এসে তার প্রতিপক্ষ হয় এবং তার ভালো কাজের বিকৃত ব্যাখ্যা পেশ করে। যেমন জিহাদের আলোচনা আনলে আম্মারা বলবে, এটা তো প্রকারান্তরে নিজেকে হত্যার মুখে ঠেলে দেওয়া, স্ত্রীকে বিধবা করা, সন্তানদের এতিম করা এবং ধন সম্পদ নষ্ট করার নাম। তদ্রূপ যাকাত ও দানসদকার বাস্তবতা তুলে ধরবে সম্পদ অকাজে ব্যয় হয়ে হ্রাস হয়ে যাওয়া, নিজের সম্পদ ফুরিয়ে গেলে মানুষের কাছে হাত পাতা এবং ফকির মিসকিন অসহায়দের কাতারে নাম লিখাতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি অবান্তর যুক্তি দিয়ে। কাজেই আমার নফস কোন প্রকারের অন্তর্ভুক্ত, আমি তার গোলাম না সে আমার গোলাম, আমাকে সে কোন পথে পরিচালিত করছে এসব বিষয়ের প্রতি সদা সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
টিকাঃ
১১। সুরা নাজিয়াত ৩৭-৪০
১২। সুরা ফাজর ২৭-২৮
[৩] সুরা তাগাবুন ১১
[৪] সূরা যুমার ৫৬
[৫] সুরা ইউসুফ ৫৩
[৬] সুরা নূর ২১
[৭] সুনান ইবনে মাজাহ ১৮৯২
📄 আত্মনিয়ন্ত্রণ
মুমিনের অন্তরের ওপর নফসে আম্মারার কর্তৃত্ব স্থাপন করা একটি রোগ। এর প্রতিষেধক হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজের নফসের বিরোধিতা করা। শাদ্দাদ বিন আউস রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
'বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুপবর্তী জীবনের জন্য কাজ করে। আর নির্বোধ ওই ব্যক্তি যে স্বীয় নফসের অনুসরণ করে এবং আল্লাহ্ তায়ালার ওপর বৃথা আশা পোষণ করো'। [১]
উমর রদিয়াল্লাহু আনহু বলেন-'তোমরা নিজেদের হিসেব নাও জবাবদিহিতার সম্মুখীন হওয়ার আগে। নিজেদের ওজন করে নাও ওজনের সম্মুখীন হওয়ার আগে। কেননা কিয়ামতের দিন হিসাব দেওয়ার চেয়ে আজ হিসাব করে নেওয়া তোমাদের জন্য অধিক সহজ। তোমরা সবচেয়ে বড় জমায়েতের জন্য সজ্জিত হয়ে নাও, যেদিন তোমাদের (বিচারের জন্য) উপস্থিত করা হবে। তোমাদের কোনো কথাই সেদিন গোপন থাকবে না'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন—'মুমিন তার নিজের নফসের ওপর কর্তৃত্বশীল। সে নিজেকে হিসেব করে আল্লাহ্ তায়ালার জন্য। বস্তুত কিয়ামতের দিন ওই সমস্ত লোকের হিসেব সহজ হয়ে যাবে, যারা দুনিয়াতে নিজেদের হিসাব নেয়। আর যারা দুনিয়া কাটিয়ে দেয় বিনা হিসেবে, কিয়ামতের দিন তাদের হিসাব হবে অত্যন্ত কঠিন'।
'মুমিন ব্যক্তি আকস্মিক কোনো কিছু দেখলে যদি তার কাছে পছন্দনীয় মনে হয়। তখন সে বলে, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে পেতে চাই, তোমাকে আমার প্রয়োজন। কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা তোমাকে পাওয়ার কোনো রাস্তা রাখেন নি। তাই তোমার মাঝে আর আমার মাঝে বড় একটি প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে'।
'আবার কখনো কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ তার দ্বারা সম্পাদিত হয়ে গেলে সে বলে, এটা আমার কাজ নয়, এই কাজের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আল্লাহর শপথ, আমি আর কখনো এই কাজ করবো না'।
'মুমিনগণ এমন এক জাতি কুরআন যাদের স্থির করে রেখেছে, তাদেরকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। মুমিনরা দুনিয়াতে বন্দীর মতো, নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টায় সে মগ্ন। আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা নিজেদের নিরাপদ মনে করে না। তারা জানে যে, তাদের কর্ণ, দৃষ্টি, রসনা, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সবকিছুর ব্যাপারেই তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে এবং সব কিছুর জন্যই তাদের পাকড়াও করা হবে'। ।২।
মালিক বিন দীনার রহিমাহুল্লাহ বলেন-'যে ব্যক্তি তার নফসকে বলে, তুমি কি অমুক কাজ করো নি! তুমি কি অমুক কাজ করো নি! অতঃপর সে তাকে তিরস্কার করে এবং বশীভূত করে। তারপর তার ওপর আল্লাহ্ তায়ালার কিতাব চাপিয়ে দেয়, ফলে কুরআন হয়ে যায় তার পথপ্রদর্শক সেনাপতি- আল্লাহ্ তায়ালা এমন ব্যক্তির ওপর রহম করুন'।
অতএব আল্লাহ্ তায়ালা ও আখিরাতে বিশ্বাসী সচেতন ব্যক্তির জন্য নিজের হিসাব নিকাশ করা অপরিহার্য। নিজের চালচলন উঠাবসা এবং পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। জীবনের প্রতিটি শ্বাস এক একটি অমূল্য মুক্তা, যা দিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী অনেক নিয়ামত খরিদ করা যায়। সুতরাং এই অমূল্য শ্বাসগুলো নষ্ট করা কিংবা তার বিনিময়ে নিজের সর্বনাশ ডেকে আনা অনেক বড় ক্ষতির বিষয়; কোনো ন্যূনতম জ্ঞানবিশিষ্ট ব্যক্তি এ রকম অপকর্ম করতে পারে না। এর লোকসানের বিষয়টি তার সামনে স্পষ্ট হবে पुनरुत्थानের দিন,
يَوْمَ تَجِدُ كُلُّ نَفْسٍ مَّا عَمِلَتْ مِنْ خَيْرٍ تُحْضَرًا وَ مَا عَمِلَتْ مِنْ سُوءٍ تَوَدُّ لَوْ أَنَّ بَيْنَهَا وَ بَيْنَه أَمَدًا بَعِيدًا
'যেদিন প্রত্যেকেই তার ভালো কাজ উপস্থিত পাবে, তার খারাপ কাজও। সেদিন সে কামনা করবে, যদি তার ও খারাপ কাজের মধ্যে বহুদূর দূরত্ব হতো!' [৩]
টিকাঃ
[১] জামে তিরমিজি ২৪৫৯
[২] আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ইবনে কাসির ৯/২৭২
[৩] সূরা আলে ইমরান ৩০
📄 সবর
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা সবর বা ধৈর্যকে বানিয়েছেন হোঁচট না খাওয়া তুরঙ্গম, ভোঁতা না হওয়া তীক্ষ্ণ ধারালো তরবারি, অপরাজেয় বিজয়ী সেনাদল এবং দুর্লঙ্ঘ মজবুত দুর্গ। সবর এবং বিজয় দুই সহোদর। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় কিতাবে ধৈর্যশীলদের প্রশংসা করেছেন। তিনি তাদেরকে বেহিসাব প্রতিদান দিবেন, নিজ হিদায়েত, অমোঘ সহযোগিতা এবং সুস্পষ্ট বিজয় দিয়ে তাদের সুসজ্জিত করবেন, এমন সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّبِرِينَ
'তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।' [১]
আল্লাহ্ তায়ালার এই সঙ্গ দ্বারা ধৈর্যশীলগণ দুনিয়া ও আখিরাতের প্রভৃত কল্যাণ অর্জন করতে পারবেন। ঋদ্ধ হতে পারবেন তাঁর প্রকাশ্য গোপনীয় অসংখ্য নিয়ামতে। আল্লাহ্ তায়ালা এই দ্বীনের নেতৃত্ব ন্যস্ত করেছেন ধৈর্য এবং বিশ্বাসের ওপর। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَ جَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُوْنَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوْا بِايْتِنَا يُوْقِنُوْنَ
'তাদের মধ্য থেকে আমি কিছু নেতা মনোনীত করেছিলাম, যারা। আমার নির্দেশ অনুযায়ী পথ প্রদর্শন করতো, যখন তারা ধৈর্যশীল হয়েছিল। তারা আমার নিদর্শনসমূহের ওপরও দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করতো'। [২]
ধৈর্য, ধৈর্যশীলদের জন্য কল্যাণকর, আল্লাহ্ তায়ালা এই সংবাদ দিয়েছেন খুব জোরালো ভাষায়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَلَئِنْ صَبَرْتُمْ لَهُوَ خَيْرٌ لِّلصَّبِرِينَ
'তোমরা যদি ধৈর্য ধারণ কর, তাহলে অবশ্যই তা ধৈর্যশীলদের জন্য কল্যাণকর'। [৩]
শত্রু যদি খুব প্রতাপশালীও হয়, তবুও তার কোনো ষড়যন্ত্রই ক্ষতি করতে পারবে না, যদি ধৈর্য ও বিশ্বাস থাকে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوْا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُوْنَ محيط
'তোমরা যদি ধৈর্যধারণ করো এবং তাকওয়া অবলম্বন করো, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। নিশ্চয়ই তাদের সমস্ত কর্মকাণ্ড আল্লাহ্ তায়ালা আয়ত্তে রেখেছেন'। [৪]
সফলতাকে জুড়ে দিয়েছেন সবর ও তাকওয়ার সাথে। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اصْبِرُوا وَصَابِرُوا وَرَابِطُوا وَاتَّقُوا اللَّهَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُوْنَ
'হে ঈমানদারগণ, তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যের সাথে শত্রুর মোকাবেলা করো এবং সর্বদা সতর্ক থাকো। আর আল্লাহকে ভয় করো, তাহলে তোমরা সফলকাম হতে পারবে’। [৫]
আল্লাহ্ তায়ালা ধৈর্যশীলদের সাথে নিজের ভালোবাসার সম্পর্কের কথা ব্যক্ত করেছেন। এর চেয়ে উৎসাহব্যঞ্জক আর কি হতে পারে! আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
وَ الله يُحِبُّ الصَّبِرِين
‘আল্লাহ্ ধৈর্যশীলদের ভালোবাসেন’। [৬]
আল্লাহ্ তায়ালা ধৈর্যশীলদের তিনটি সুসংবাদ দিয়েছেন। প্রত্যেকটিই কল্যাণকর এবং দুনিয়াবাসির কাছে ঈষণীয়। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন—
وَبَشِّرِ الصَّبِرِينَ - ١٥٥ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَجِعُوْنَ - ١٥٦ أُولَبِكَ عَلَيْهِمْ صَلَاتٌ مِّنْ رَّبِّهِمْ وَ رَحْمَةٌ وَأُولَبِكَ هُمُ الْمُهْتَدُوْنَ
‘ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দিন। যারা কোনো বিপদে আক্রান্ত হলে বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (আমরা আল্লাহর জন্য এবং তাঁর দিকেই আমাদের ফিরে যেতে হবে)। তাদের ওপর রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে করুণারাশি আর অনুগ্রহ এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত’। [৭]
জান্নাত লাভ এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ারও একটি অন্যতম মাধ্যম হলো সবর। আল্লাহ্ জাল্লা জালালুহু বলেন—
إِنِّي جَزَيْتُهُمُ الْيَوْمَ بِمَا صَبَرُوا أَنَّهُمْ هُمُ الْفَابِزُوْنَ
‘আজ আমি তাদেরকে তাদের ধৈর্যের এমন প্রতিদান দিয়েছি যে, তারাই সফলকাম’। [সুরা মুমিনুন ১১১]
টিকাঃ
[১] সুরা আনফাল ৪৬
[২] সুরা সাজদা ২৪
[৩] সুরা নাহল ১২৬
[৪] সূরা আলে ইমরান ১২০
[৫] সুরা আলে ইমরান ২০০
[৬] সূরা আলে ইমরান ১৪৬
[৭] সুরা বাকারা ১৫৫-১৫৭
📄 শোকর বা কৃতজ্ঞতা
শোকর বলা হয়, দানকৃত কল্যাণের জন্য নেয়ামত দাতার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা।
বান্দার শোকর আদায়ের জন্য তিনটি উপাদান প্রয়োজন। এক সঙ্গে তিনটির সম্মেলন ব্যতীত শুকরিয়া আদায় করা সম্ভব নয়। এক, আন্তরিকভাবে নিয়ামতের স্বীকৃতি দেওয়া। দুই, প্রকাশ্যে তা নিয়ে আলোচনা করা এবং তৃতীয় হলো এই নিয়ামতকে আল্লাহ্ তায়ালার বাধ্যতার কাজে ব্যয় করা বা তার সহযোগিতা নেওয়া।
সুতরাং শোকরের সম্পর্ক একাদিক্রমে অন্তর, জিহ্বা এবং অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে। অন্তর হলো ভালোবাসা স্বীকৃতি এবং পরিচয়ের জন্য। জিহ্বা দ্বারা প্রশংসা ও স্তুতি গাওয়া হয়। আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে নিয়ামতকে ভালো কাজে ব্যয় করতে হয় এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। এই তিনের সম্মেলনেই শোকরের ষোল কলা পূর্ণ হয়।
আল্লাহ্ তায়ালা শোকরকে ঈমানের সাথে সংযুক্ত করে দিয়েছেন। জানিয়ে দিয়েছেন যে, বান্দা যদি তাঁর ওপর ঈমান স্থাপন করে এবং তাঁর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে, তাহলে তাদেরকে শাস্তি দেওয়ার কোনও প্রয়োজন তাঁর নেই। কুরআনে কারিমে আল্লাহ্ তায়ালা বলেন-
مَا يَفْعَلُ اللهُ بِعَذَابِكُمْ إِنْ شَكَرْتُمْ وَأَمَنْتُمْ
'তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো ও ঈমানদার হও, তাহলে আল্লাহ্ তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন কেন?' [১]
যারা কৃতজ্ঞ বান্দা, শোকর গোজার, তারা আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামত ও অনুগ্রহের জন্য বিশিষ্ট হিসেবে পরিগণিত। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন-
وَ كَذَلِكَ فَتَنَّا بَعْضَهُمْ بِبَعْضٍ لَيَقُوْلُوْا أَمْ ؤُلَاءِ مَنَّ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّن بَيْنِنَا أَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِالشَّكِرِينَ
'এভাবেই আমি কিছু লোককে কিছু লোক দ্বারা পরীক্ষায় নিপতিত করি। তারা যেন বলে যে, এরাই কি ওই সব লোক, আমাদের মধ্য থেকে যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন? আল্লাহ্ কি কৃতজ্ঞদের সম্পর্কে সুপরিজ্ঞাত নন?' [২]
আল্লাহ্ তায়ালা বান্দাদের দুই ভাগে ভাগ করেছেন। কৃতজ্ঞ ও অকৃতজ্ঞ। অকৃতজ্ঞতা এবং অকৃতজ্ঞ লোকেরাই তাঁর কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। আর সবচেয়ে পছন্দের হলো কৃতজ্ঞতা এবং কৃতজ্ঞ বান্দাগণ। আল্লাহ্ তায়ালা মানুষ সম্পর্কে বলেন—
إِنَّا هَدَيْنَهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُوْرًا
'আমি তাকে রাস্তা দেখিয়েছি। সে হয়তো কৃতজ্ঞ হবে কিংবা অকৃতজ্ঞ'। ৩
অন্যত্র বলেন-
وَإِذْ تَأَذَّنَ رَبُّكُمْ لَئِنْ شَكَرْتُمْ لَا زِيدَنَّكُمْ وَلَئِنْ كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ
'স্মরণ করো, যখন তোমাদের প্রভু ঘোষণা করেছিলেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞ থাকো তাহলে তোমাদেরকে বাড়িয়ে দেবো। কিন্তু যদি অকৃতজ্ঞ হও তাহলে (মনে রেখো) অবশ্যই আমার শাস্তি বড় কঠোর। [৪]
অতএব আল্লাহ্ তায়ালা নিয়ামত বৃদ্ধির ভার রেখেছেন শোকরের ওপর। শোকরের যেমন কোনও সমাপ্তি নেই তেমনি তাঁর নিয়ামতের প্রবৃদ্ধিরও কোনও সীমানা নেই। আল্লাহ্ তায়ালা অনেক দান প্রতিদানকে নিজের চাহিদা ও ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন-
فَسَوْفَ يُغْنِيْكُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ إِنْ شَاءَ
'আল্লাহ্ চাইলে নিজ অনুগ্রহে তোমাদের অভাবমুক্ত করে দেবেন'। [৫]
অনুরূপ ক্ষমার ক্ষেত্রে বলেন,
وَيَغْفِرُ لِمَنْ يَشَاءُ
'তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন'। [৬]
তদ্রুপ তাওবার ক্ষেত্রে বলেন-
وَ يَتُوْبُ اللَّهُ عَلَى مَنْ يَشَاءُ 1
'আল্লাহ্ যার ইচ্ছা তাওবা কবুল করেন'। [৭]
শোকরের প্রতিদান কী হবে, আল্লাহ্ তায়ালা তা নিদিষ্ট করে দেন নি; বরং রেখেছেন সাধারণ অনির্দিষ্ট, যা অমোঘ কিছু হওয়ার প্রতি ইঙ্গিত বহন করে। যেমন আল্লাহ্ তাবারাকা ওয়া তায়ালা বলেন-
وَ سَنَجْزِي الشَّكِرِينَ
‘আমি অবশ্যই কৃতজ্ঞদের প্রতিদান দেবো'। ।৮।
আল্লাহ্ তায়ালার শত্রু ইবলিস। সে শোকরের সমুন্নত মর্যাদা এবং কৃতজ্ঞদের সম্মানিত অবস্থানের কথা উপলব্ধি করতে পেরেছিল বিধায় তার চূড়ান্ত লক্ষ্য নির্ধারণ করে নিয়েছে, মানুষকে শোকর থেকে দূরে রাখা। সে বলেছে—
ثُمَّ لَا تِيَنَّهُمْ مِّن بَيْنِ أَيْدِيهِمْ وَ مِنْ خَلْفِهِمْ وَ عَنْ أَيْمَانِهِمْ وَ عَنْ شَمَا بِلِهِمْ وَلَا تَجِدُ أَكْثَرَهُمْ شُكِرِينَ
'অতঃপর আমি তাদের ওপর আক্রমণ করবো তাদের সামনের দিকে থেকে, তাদের পেছন দিক থেকে, তাদের ডান দিক থেকে, তাদের বাম দিক থেকে। এবং আপনি তাদের অধিকাংশকেই কৃতজ্ঞ পাবেন না। [৯]
কৃতজ্ঞ বান্দাদের ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তায়ালা বলেছেন—
وَقَلِيلٌ مِّنْ عِبَادِيَ الشَّكُورُ
'আমার খুব স্বল্প সংখ্যক বান্দাই কৃতজ্ঞ'।[১০]
আয়িশা রদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতের বেলা এতো পরিমাণ ইবাদত করতেন যে, তাঁর পা মোবারক ফেটে যেতো। একবার তাকে বলা হলো, আপনি এতো ইবাদত করেন, অথচ আল্লাহ্ তায়ালা আপনার পূর্বাপরের যাবতীয় ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন? তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছিলেন—
'আমি কি একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হবো না'! [১১৷
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুয়াজ রদিয়াল্লাহু আনহুকে বললেন,
'হে মুয়াজ, আল্লাহর শপথ, আমি তোমাকে ভালবাসি। প্রতি সালাতের পর তুমি এই দোয়া করতে ভুলো না—'আল্লাহুম্মা আয়িন্নি আলা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হুসনি ইবাদাতিকা' (হে আল্লাহ্, আপনার যিকির, শোকর এবং যথার্থ ইবাদত করতে আমাকে সাহায্য করুন)। [১২]
শোকর হলো নেয়ামতের জন্য কয়েদ কিংবা তালা স্বরূপ এবং এর দ্বারাই তার প্রবৃদ্ধি ঘটে। উমর বিন আব্দুল আজিজ রহিমাহুল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর নিয়ামতগুলো আবদ্ধ করে ফেল তাঁর কৃতজ্ঞতা দ্বারা।
আলী রদিয়াল্লাহু আনহু হামযানের এক লোককে বলেছেন, 'নিয়ামত পৌঁছে শোকরের দ্বারা। শোকর বৃদ্ধি করে দেয় নিয়ামতকে। শোকর এবং প্রবৃদ্ধি এক সুতোয় গাঁথা। তাই যতদিন বান্দা থেকে শোকর বিচ্ছিন্ন না হয় আল্লাহ্ তায়ালা থেকেও প্রবৃদ্ধি বন্ধ হয় না'।
হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'তোমরা বেশি বেশি আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতগুলোর কথা আলোচনা করো; কেননা সেগুলোর আলোচনাও শোকরেরই অংশ। আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় নবীকে তাঁর রবের নিয়ামতের কথা ব্যক্ত করতে বলেছেন। 'আর আপনার রবের অনুগ্রহের কথা প্রকাশ্যে বলুন'।[১৩]
আমর বিন শুয়াইব রদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছন-
'আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর নিয়ামতের চিহ্ন বান্দার ওপর দেখতে পছন্দ করেন'। [১৪]
অর্থাৎ যাকে যে রকম নিয়ামত প্রদান করা হয়েছে, সে সে অনুযায়ী জীবন যাপন করবে, এটাই আল্লাহ্ তায়ালার পছন্দনীয়।
আবুল মুগিরা রহিমাহুল্লাহকে কেউ যদি জিজ্ঞেস করতো যে, হে আবু মুহাম্মাদ, কেমন কাটছে আপনার দিন? তিনি বলতেন, 'দিন কাটছে আল্লাহ্ তায়ালার নিয়ামতে ডুবে, শোকর আদায়ে ব্যর্থ অবস্থায়। আমাদের রব আমাদের থেকে অমুখাপেক্ষী, তবুও তিনি আমাদের কাছে প্রিয় হতে চান। আর আমরা তাঁর কাছে অপ্রিয় হয়ে যাই, যদিও আমরা তাঁর প্রতি মুখাপেক্ষী'।
শুরাইহ রহিমাহুল্লাহ বলেন, কোনও বান্দার ওপর বিপদ আপতিত হলে তার মধ্যে আল্লাহ্ তায়ালার তিনটি অনুগ্রহ থাকে। এক, বিপদটা তার দ্বীনের ওপর না আসা। দুই, এর চেয়ে বড় কোনও বিপদ আসে নি। তিন, এটা হওয়া অপরিহার্য ছিল, তাই এখনি হয়ে গেলো।
ইউনুস বিন উবাইদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, এক লোক আবু গুনাইমাকে বলল, আপনার সকাল কেমন হলো? তিনি বললেন, 'আমার সকাল হলো দুটি নিয়ামতের মাঝে, আমি জানি না কোনটা উত্তম। এক, আমার অনেক গুনাহ রয়েছে, কিন্তু আল্লাহ্ তায়ালা তা গোপন করে রেখেছেন। ফলে কেউ সে ব্যাপারে আমাকে নিন্দা কিংবা তিরস্কার করতে পারে না। দুই, আল্লাহ্ তায়ালা স্বীয় বান্দাদের অন্তরে আমার ভালোবাসা ঢেলে দিয়েছেন, আমার আমল যে স্তরে পৌঁছার জন্য যথেষ্ট নয়'।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন
وَالَّذِينَ كَذَّبُوا بِايْتِنَا سَنَسْتَدْرِجُهُمْ مِّنْ حَيْثُ لَا يَعْلَمُوْنَ
'আর যারা আমার নিদর্শনসমূহ অবিশ্বাস করে তাদেরকে আমি ধীরে ধীরে এমনভাবে পাকড়াও করবো যে, তারা জানতেও পারবে না'। [১৫]
উক্ত আয়াতের তাফসিরে সুফিয়ান সাওরি রহিমাহুল্লাহ বলেন, 'আল্লাহ্ তায়ালা তাদের ওপর প্রচুর নিয়ামত দান করবেন অতঃপর তাদেরকে শুকরিয়া আদায় করা এবং কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা থেকে বঞ্চিত করে দেবেন। এভাবেই তারা আজাবের দিকে এগিয়ে যাবে'।
অনেকে এভাবেও ব্যাখ্যা করেছেন যে, 'তারা যখনই কোনও গুনাহ করবে, আল্লাহ্ তায়ালা তাদের জন্য একটি নিয়ামত বৃদ্ধি করে দেবেন। নিয়ামতের শোকর আদায় না করে তারা গুনাহ করতেই থাকবে এবং এক পর্যায়ে আজাবে পতিত হয়ে যাবে।
এক ব্যক্তি আবু হাজিম রহিমাহুল্লাহকে জিজ্ঞেস করলো, আবু হাজিম, চক্ষুদ্বয়ের শোকর কি? তিনি বললেন, ভালো কিছু দেখলে তা প্রকাশ করবে আর মন্দ কিছু দেখলে তা গোপন রাখবে। সে আবার জিজ্ঞেস করলো, তাহলে কর্ণদ্বয়ের শোকর কি? তিন বললেন, ভালো কিছু শ্রবণ করলে তা মুখস্থ করবে আর যদি মন্দ কিছু শ্রবণ করো তাহেল তা ঝেড়ে ফেলে দেবে। সে পুনরায় জিজ্ঞেস করলো, তাহলে হস্তদ্বয়ের শোকর কি? তিনি বললেন, তার মালিকানাধীন নয় এমন কিছু তা ধারা স্পর্শ করবে না আবার তার হক থেকে তাকে বঞ্চিতও করবে না। এবার সে জিজ্ঞেস করলো, তাহলে উদরের শোকর কি? তিনি বললেন, তার নিম্নাংশ হবে খানা এবং ঊর্ধ্বাংশ হবে ইলম ও জ্ঞানের স্থান। সে বলল, লজ্জাস্থানের শোকর কি? তিনি বললেন, এর উত্তর তো আল্লাহ্ তায়ালাই দিয়েছেন-
وَ الَّذِينَ هُمْ لِفُرُوْجِهِمْ حَفِظُوْنَ إِلَّا عَلَى أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُوْمِينَ فَمَنِ ابْتَغَى وَرَاءَ ذَلِكَ فَأُولَيكَ هُمُ الْعُدُوْنَ
'আর যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তবে তাদের স্ত্রী ও মালিকানাধীন দাসিদের ক্ষেত্রে সংযত না রাখলে তারা তিরস্ক্রিত হবে না। কিন্তু এর বাইরে (অন্যদের) কামনা করলে তারা সীমালঙ্ঘনকারী হবে'। [১৬]
তাহলে পায়ের শোকর কি?, সে জিজ্ঞেস করলো। তিনি উত্তর দিলেন, যদি তোমার জ্ঞাতসারে কোনও এমন মৃত ব্যক্তি থাকে, যাকে তুমি ঈর্ষা করো, তাহলে তোমার পা দুটোকে তার মতো কাজে ব্যয় করো। (অর্থাৎমৃত আল্লাহ ওয়ালারা যেমন কাজ করে গেছেন, তুমিও তাদের মতো আমল করো, নিজের পা দুটোকে ইবাদতের দিকে গমন করাও।) আর যদি কাউকে ঘৃণা করো, তাহলে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে তার মতো কাজ করা থেকে বিরত থাকো। বস্তুত যে লোক জবানে আল্লাহ তায়ালার শোকর আদায় করে কিন্তু তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দ্বারা করে না, তার উদাহরণ হলো ওই ব্যক্তির ন্যায় যার একটি কাপড় আছে, সে তার এক দিক হাতে নিয়েছে কিন্তু পরিধান করে নি; এই কাপড় তাপে ঠান্ডায় বৃষ্টিতে কুয়াশায় তার কোনো কাজে আসবে না। ঠিক তেমনি শুধু মুখের শোকর তার জন্য উপাদেয় হবে না।
জনৈক আলিম তার ভাইয়ের কাছে নিম্নোক্ত পত্র লিখে প্রেরণ করেছেন, 'পর কথা, আমরা অধিক হারে আল্লাহ্ তায়ালার নাফরমানী করি, তথাপি তার অগণিত নিয়ামতে ডুবে আছি। আমার জানা নেই কীসের জন্য তাঁর শুকরিয়া আদায় করবো; যে সমস্ত ভালো কাজের তিনি তাওফিক দিয়েছেন তার জন্য নাকি ঘৃণিত যে কাজগুলো তিনি গোপনে রেখেছেন তার জন্য?!'
টিকাঃ
[১] সুরা নিসা ১৪৭
[২] সুরা আনআম ৫৩
[৩] সুরা ইনসান ৩
[৪] সুরা ইবরাহিম ৭
[৫] সুরা তাওবা ২৮
[৬] সুরা মাইদা ৪০
[৭] সুরা তাওবা ১৫
[৮] সূরা আলে ইমরান ১৪৫
[৯] সুরা আ'রাফ ১৭
[১০] সুরা সাবা ১৩
[১১] সহিহ বুখারি ৪৮৩৭
[১২] সুনানে আবু দাউদ ১৫২২
[১৩] সুরা দুহা ১১
[১৪] জামে তিরমিজি ২৮১৯
[১৫] সুরা আ'রাফ ১৮২
[১৬] সুরা মুমিনুন ৫-৭